বাসনা কুসুম

বুদ্ধদেব গুহ

জগা মুকুজ্যে সেরেস্তাতে বসে নথি ঘাঁটছিলেন। এখন সকাল আটটা।

চানু পান্ডে তার সামনে বসেছিলেন। জগাদার জুনিয়র তিনি। জগাদা লাতেহার কোর্টে প্র্যাকটিস করেন। ফৌজদারি উকিল।

ঘর-ভরতি দু-ভাঁজ করা মান্ধাতার আমলের ধুলো-পড়া সব ব্রিফ। লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা। ফৌজদারি আইনের কিছু বইপত্র। অল ইণ্ডিয়া ট্যাক্স রিপোর্টস-এর কিছু প্রাচীন সংখ্যা। চামড়া বাঁধানো। সে চামড়াও ফেটে-ফুটে গেছে।

চানু পান্ডে বললেন, ‘সুও-মোটু মুভ করা কি ঠিক হবে স্যার? ইস্যুটার ওপরে যে, কোনো ডিসিশন নেই। রেশিয়ো অফ সাব-সাইলেন্সিও অ্যাপ্লাই করবে না?’

চানু পান্ডে-ই প্রথমে দেখেছিলেন শিরীষকে।

বললেন, ‘আইয়ে। আইয়ে, পাধারিয়ে, শিরীষবাবু।’

শিরীষ তখনও বারান্দাতে।

জগা মুকুজ্যে বললেন, ‘ওক্কে চানু। লেটস কল ইট আ ডে। ঠিরিঠ রেয়ারলি কামট ডিজ ডে’জ।’

নব্যভারতবর্ষে এখন ওকালতি করতে আর পড়াশোনা না করলেও চলে। আইন, জনগণের সমতাতেই প্রায় নেমে এসেছে। একেবারে আক্ষরিক অর্থেই। ‘সহজলভ্য’ হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের বক্তৃতাতে যেমন করে বলেন, ঠিক তেমন-ই। তাঁরাই তো দেশের রাজা, হুজৌর; মাই-বাপ। এখন মামলা জিততে উকিলের ওকালতি, এমনকী তথ্যও না জানলে চলে।

প্রকৃতই স্বাধীন হয়ে গেছে ভারতবর্ষ!

মক্কেলের যদি পয়সা থাকে, তবে সে খুন, বলাৎকার, বা ডাকাতি করলেও আইনের হাত; তার ইজ্জত, দামি জামার ভেঙে-যাওয়া ইস্ত্রির মতোই ঠিক-ঠাক করে দেয়। আইন তার কেশাগ্রও স্পর্শ করে না। আর যাঁর পয়সা নেই, বা যিনি নব্যভারতের রীতিনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি এখনও, আইনের সাঁড়াশি যে কী, তা তিনি হাড়ে-হাড়েই টের পান। আইনের মতো ‘তামাশা’ আজ আর দু-টি নেই।

তবে জগা মুকুজ্যে অন্য ধাঁচের মানুষ, অন্য জগতের মানুষ। পাঁকের মধ্যে বাস তিনি করেন বটে কিন্তু সত্যিই ‘পঙ্কজ’ হয়ে ফুটে থাকেন। তাঁর মতো সরল ও সজ্জন মানুষ এ যুগে বিরল। হয়তো সেই কারণেই পসারও তাঁর সুবিধের নয়। তাতে কোনোই দুঃখ নেই জগাদার। কারণ, জগাদা আর মাধাদা দুই ভাই-ই ব্যাচেলার। দায়দায়িত্ব বলতেও কিছুই নেই। নেশার মধ্যে জগাদার দাবা এবং মাধাদার পাখি-টাখি শিকার। বড়ো জন্তুজানোয়ারের ধার মাড়ান না। নিজেই মারেন, কখনো ‘ন্যাঙ্গোটিয়া দোস্ত’ বানওয়ারিলালও। নিজেরাই ছাল-চামড়া ছাড়ান, কখনো-সখনো নিজেরাই রাঁধেন। তারপরে দাদা-ভায়ে-দোস্তে মিলে-মিশে খান। তবে মাধাদার দোনলা বন্দুক-নি:সৃত অতিস্বল্পসংখ্যক গুলিকেই ‘মনোয়া-মিলন’-এর ছেলে-বুড়ো-মেয়ে-ই বন্দুকের লক্ষ্যর সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেখেছে। তাতে মাধাদার কোনো দুঃখ নেই। লজ্জাও নেই।

ওঁরা দু-ভাই-ই একটু দার্শনিক ধরনের। সাধারণের সুখ-দুঃখ ওঁদের ছোঁয় না। এজন্যেই শিরীষের খুব ভালো লাগে এঁদের। সময় পেলেই এঁদের সঙ্গ করে শিরীষ।

এঁদের কোনো পূর্বপুরুষ নাকি কলকাতার কাছের বিখ্যাত হুড়কোহাটের বিখ্যাত মুকুজ্যে পরিবারের সন্তান ছিলেন। হুড়কোহাটের সাবেক বাড়িতে এখনও নাকি বহুমূল্য রাইফেলের গুলিতে নিহত এক বারফটকা বাঘের সামনে শিকারের খাকি পোশাক-পরা, টুপি-মাথায়, মাল্যবান পূর্বসূরির ছবি দো-তলার বারান্দাতে টাঙানো আছে। মাধাদা বলেন সে-কথা। যদিও তিনি কখনো হুড়কোহাটে যাননি। জগাদা একবার গিয়েছিলেন। তাও এমন বয়সে, যখন ঘনঘন পেন্টুলন খসে যায়। জগাদাই হাসতে হাসতে জানিয়েছিলেন শিরীষকে এই তথ্য এক দিন।

নিজেকে নিয়ে রসিকতা করার মানুষ ক্রমশই কমে আসছে এই পৃথিবীতে।

মানুষের জীবন যে, আকাঙ্ক্ষা আর আকাঙ্ক্ষিত বস্তু আহরণের চেষ্টাতে গলগঘর্ম হয়ে কাটিয়ে দেওয়ার জন্যে আদৌ নয়, এই অমোঘ কিন্তু অধিকাংশ অধুনা মানুষের কাছেই অজানা সত্যটা এই দুই ভাই শুধু উপলব্ধিই যে করেছেন তাই নয়, রীতিমতো ট্যাঁকস্থও করেছেন। তাই দু-ভাইকেও শ্রদ্ধা করে শিরীষ। এঁদের দু-জনের জীবন-ই স্ত্রী-ভূমিকাবর্জিত। স্ত্রী-চরিত্রের অভাবও যে, তাঁরা কখনো অনুভব করেছেন এমনও মনে হয়নি কখনো শিরীষের, এঁদের নাটুকে-জীবন শিশুকাল থেকে কাছ থেকে দেখেও।

একজন বয়স্ক কাজের লোক, মন্টুরাম কাহার এঁদের দু-জনের খিদমদগারি করে আসছেন ঠিক কত বছর যে হল, তা জগাদা-মাধাদা-ই সঠিক বলতে পারেন না, আর শিরীষ জানবে কোত্থেকে?

মন্টুদাদা কানে বেশ কম শোনেন। তবে যখন কোনো কথা শুনতে ইচ্ছে করেন না, তখন-ই কম শোনেন। ইচ্ছে করলেই শুনে ফেলেন। মন্টুদাদার বাঁ-কানটা ডান কানের চেয়ে বড়ো এবং দু-কানের গহ্বরেও লিটপিটিয়ার ঝাড়ের-ই মতো সাদা-কালো লোমের ঝাড় ফ্লাওয়ারিং-পট থেকে ঝুলে-থাকা লাভা-লুলেগাঁও-এর অর্কিডের মতোই ঝুলে থাকে। ক্কচিৎ-কদাচিৎ তাতে উদবাস্তু পোকা-মাকড়েরাও আশ্রয় নেয়। কিন্তু ‘মাতৃধাম’-এ, জগাদা-মাধাদাদের এই পৈতৃক নিবাসে; মন্টুদার কথাই শেষকথা। ভাঁড়ারের চাবি থেকে আলমারির চাবি, ধোপার হিসেব থেকে মুদির ফিরিস্তি, ওষুধের থলে থেকে ইসাবগুলের ভুসি এইসব-ই থাকে মন্টুদাদার কাছেই।

সংসারটা চলে জগাদার অনিয়মিত ওকালতির রোজগারে। কিছু জমি-জিরেতও আছে পুনয়ার দিকে। ভাগে দেওয়া আছে। তাও দেখাশোনার ভার মন্টুদাদার ওপরেই। তার-ই ফসলের আয় থেকেই যতটুকু শখ-আহ্লাদ। অভাবও নেই; বাহুল্যও নেই।

মাধাদা নির্ভেজাল বেকার। তবে মাঝে-মধ্যে ‘চাকরি-চাকরি’ খেলা করেন। কিন্তু দুইভায়েতে বেজায় ভাব। মাঝ-মাঝেই জগাদার কাছে মাধাদা গালাগাল যে, খান না এমন নয়। তবে তা তাঁর বেকারত্বর কারণে কখনোই নয়। এবং রামের মতো অগ্রজের দেওয়া কোনো গালাগালিতেই, তা যদি অন্যায়ও হয়; তবুও কখনোই মনেও করেন না মাধাদা কিছুমাত্রই।

জগাদার জিভে একটু আড়ষ্টতা আছে। বাচ্চাদের মতো ‘ট’ ‘ট’ করে কথা বলেন তিনি। যেমন ‘কেমন আছ’-কে বলেন ‘কেমন আট?’ ‘তাপ্পর’কে বলেন ‘টাপ্পর’। এজন্যেও শিরীষের খুব মজা লাগে জগাদার কথা শুনতে। ওঁরা দু-ভাই এই পিতৃমাতৃহীন শিরীষকেও খুব-ই পছন্দ করেন। স্নেহ করেন অকৃত্রিম। প্রায়-ই ওঁদের সঙ্গে খেয়ে যেতে বলেন। ভালোমন্দ রান্না হলে তো অবশ্যই বলেন। ওঁদের বড়োবাড়িতে এসে পাকাপাকিভাবে থাকতেও বলেছেন বহুদিন, যেহেতু শিরীষ একলা থাকে। কিন্তু পিতৃপুরুষের ভিটে ছেড়ে আসতে চায়নি ও। মা-বাবার স্মৃতি ছড়ানো আছে সেখানে। তা ছাড়া বুড়ি-মাই কোথায় যাবে? সেই অতিসাধারণ রূপের কিন্তু দিব্য-সুন্দর মনের বৃদ্ধা, অশক্ত, বিধবা মহিলার তো শিরীষ ছাড়া কেউ-ই নেই। শিরীষ যতদিন দু-টি ডাল-রুটি খাবে, বুড়ি-মাইকেও খাওয়াবে। ওই শেষবন্ধন শিরীষের।

অবশ্য কালু কুকুরও আছে। কুকুরের জীবনের গড় দৈর্ঘ্য ও মানুষের জীবনের গড় দৈর্ঘ্য বিবেচনা করলে কালু আর শিরীষ সমবয়েসি।

বাড়ি ছেড়ে, জগাদা-মাধাদাদের নিবাস ‘মাতৃধাম’-এ না-আসার আরও কারণ আছে। শিরীষের বাড়ির পেছনেই পাহাড়তলির জঙ্গল। তারপরেই পাহাড়। ওর কবিমন বড়োই আনন্দে থাকে ওই পরিবেশে। তা ছাড়া, ‘মাতৃধাম’ ‘মনোয়া-মিলন’ বাজারের-ই মধ্যে। নানা মাড়োয়ারির এবং দু-একজন বিহারির পাইকারি দোকান। খোলের গন্ধ, গুড়ের গন্ধ, কেরোসিন তেলের গন্ধ। আর সারাদিন বয়েল গাড়ি, ট্রাক, আর বাইরে দাঁড় করিয়ে-রাখা মস্ত দাঁড়িপাল্লাতে হরেকরকমের বস্তা ওজনের ধাঁই-ধপ্পর আওয়াজ; শোরগোল।

এমন জায়গাতে, একেবারে বাজারের মধ্যে থাকার সুবিধে থাকতে পারে অনেকইরকম কিন্তু অসুবিধেও কম নয়।

শিরীষের ভালো লাগে না।

শিরীষ ‘মাতৃধাম’-এর বাইরে চওড়া কিন্তু ধূলি-ধূসরিত লাল সিমেন্টের বারান্দার ওপর সাইকেলটাকে তুলে মোটা গোলাকৃতি লাল সিমেন্টের থামে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে বসবার ঘরে ঢুকল। সেই ঘরটি-ই সেরেস্তা জগাদার।

সোনালি ফ্রেমের হাফ-আই গ্লাসের চশমা থেকে চোখ দু-খানি ভুরুর সঙ্গে তুলে, কাচ টপকে, জগাদা শিরীষের মুখে ফোকাস করে বললেন, এই ডে ঠিরিঠ! এটো, এটো! টোমার কটাই ভাবটিলাম এটক্কন। ফোনটাও খাডাপ।

কেন? আমার কথা কেন জগাদা?

না, মানে, মাডাটা গেটে বানোয়ারিলালকে টঙ্গে নিয়ে টোড়ি আর লাটেহাড়ের মড্যের কোনো ডায়গাটে। করগোট ঠিকার করটে। মটলা-টটলা বেটে রাকটেও বলে গেঠে মন্টুডাডাকে। এডিকে গেঠে, ঠেই কোন বোরে কিন্টু ড্যাকো, একনও টো পিরল না। ডেকেটো! চাট্টে বেডে গেল। কিন্তু একনও পিরল না। এ টো বড়ো টিন্টার কটা হল! ব্যাপারটা ইনভেট্টিগেট করটে হট্টে। পান্ডেকে বললুম ডাও, এট্টু কোঁজ কডো। কিন্টু ঠে বলটে, টার ঠালি এটেটে টার বাড়িতে, ঠুটুরবাড়ি, গুমিয়া টেকে; তাই ঠে ডেটে পাট্টে না।

যাওয়ার দরকার-ই বা কী জগাদা? আর আন্দাজে যাবেনটাই বা কোথায়? কোন বাদাড়ে বা টাঁড়ে খরগোশ খুঁজে বেড়াচ্ছেন তাঁরা, তা জানাই-বা যাবে কেমন করে? খরগোশ তো সব টাঁড়ের গর্তেই থাকে, যেখানেই পুটুস বা ঝাঁটিজঙ্গলের ঝাড়। আমাদের বাড়ির পেছনের টাঁড়েই কত খরগোশ-তিতির আছে। তো দূরে যাওয়ার দরকারটাই বা কী ছিল?

শিরীষ বলল, একটু বিরক্তির গলাতেই।

টা ঠিক। কিন্তু টিন্টাও টো হয়। ঠোটো বাই বলে কটা। টাও পাঁচটা নয়, ডটটা নয়; একটা মাট্রই বাই। বলো?

হাসিই পেল শিরীষের। কিন্তু হাসি সামলে বলল, ছোটো হলেও এমন কিছু ছোটো তো নয়। আমার চেয়ে কমপক্ষে বছর পনেরোর বড়ো তো হবেন-ই।

কত বয়স হবে মাধাদার? আটত্রিশ-উনচল্লিশ? শুধোল শিরীষ।

আরে বায়া, বয়েট কী আর বয়েটে হয়! ও ডে বড্ড ঠেলেমানুট। ওর কোনো অভিজ্ঞটাই টো হল না। ডট বঠরের খোকাটাই আটে একনও।

তা, আপনি আজীবন খোকা করে রাখলে আর মাধাদা বড়ো হবেন কী করে? চিন্তা করবেন না, এসে গেলেন বলে। সন্ধে অবধিও না এলে মন্টুদাদাকে দিয়ে আমাকে একটা খবর পাঠাবেন।

একন টো বোটো। কী কাবে? টা? না টাণ্ডা কিছু?

না:। কিছুই খাব না জগাদা।

পান্ডেবাবু বললেন, ম্যায় তব চলে স্যার।

ডাও, ডাও। ঘরমে মেহমান আয়ি হ্যায়, আরে, জরুকি বহিন; ডলডি ডাও। রুপিয়া পয়সাকি কুচ জরুরত হ্যায় টো লে যাও পান্ডে।

নেহি স্যার। কাল-ই তো আপনে দিয়া। বহত সুক্রিয়া।

আরে টিনেমাকো ডায়ালগ মট ঢাড়ো ইয়ার। ডাও। ডের হো রহি হ্যায়।

আচ্ছা! তব ম্যায় চলে। আচ্ছা, শিরীষবাবু, চলে।

আচ্ছা পান্ডেজি।

শিরীষ বলল।

পান্ডেজি তাঁর স্কুটারে করে চৈত্রমাসের পথের লাল ধুলো আর হালুইকরের দোকানের সামনের পথের এঁটো শুকনো পাতা উড়িয়ে চলে গেলে শিরীষ বলল, ‘জগাদা, মাধাদা লাতেহারে একটা চাকরি পেয়েছিলেন তার কী হল? কিছুদিন আগে তো স্টেশনে দেখাও হয়েছিল আমার সঙ্গে।’ হেসে বললেন, ‘চাকরি করছি যে, শিরীষ। ছোট্ট অফিস। ঝামেলা নেই। মনে হচ্ছে, এবারে থিতু হয়ে বসব। দাদার ঘাড়ে সারাজীবন। বিবেকে বড়ো দংশন হয়।’

এটা কত নম্বর চাকরি হল তোমার মাধাদা?

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।

তা সম্ভবত এক-শো পনেরো কিংবা ষোলো। চাকরি তো দাদা কম ঠিক করে দেয়নি। আর কতরকমের-ই বা চাকরি! কিন্তু আমার শিরাতে রয়েছে হুড়কোহাটের মুকুজ্জেদের রক্ত, জমিদারি রক্ত; কারো চাকর হতেই যে, ভালো লাগে না। কী করব বলো শিরীষ?

জগাদা হাসলেন একথা শুনে।

বললেন, হাউ ঠুইঠ!

জগাদা মাধাদারা যতই আয়েশি হোন না কেন, এদিকের বাঙালিরা কিন্তু কুঁড়ে নন। আসলে, ‘মনোয়া-মিলন’-এ থাকলেও মনে মনে এখনও তাঁরা হুড়কোহাটে-ই রয়ে গেছেন।

পান্ডেবাবু মাঝে মাঝেই বলেন শিরীষকে, ‘‘আররে শিরীষবাবু, বাঙালি আদমি বনতা হ্যায় বাঙালকা বাহার যা কর।’’ শুনতে খারাপ লাগলেও কথাটা হয়তো মিথ্যে নয়। মিথ্যে নয় বলেই এ নিয়ে ঝগড়াও করেনি কোনোদিন।

নিজের চিন্তাতেই বুঁদ হয়ে ছিল শিরীষ। ও এরকম-ই।

ঝিঁঝি মাঝে মাঝে হেসে ওকে বলে, কী হল রে তোর? তুই কি চাঁদে চলে গেলি?

হ্যাঁ। ও এরকম-ই। ও ওর-ই মতো। অন্য কারো মতোই নয়।

টাকরি টো বালোই করটিল।

স্বপ্নোত্থিতের মতো চমকে উঠল শিরীষ জগাদার কথাতে।

তাহলে? আবার কী হল? চাকরিতেও তো খুব খুশিও ছিলেন মাধাদা মনে হয়েছিল তার কথা শুনে।

টাও টেল।

তবে?

পোটোম ডুডিন আপিট গেল। আই ওড ভেরি হ্যাপি। টাপ্পরডিন ডেকি আপিট ডাট্টে না।

বললুম, কী ব্যাপার ড়ে মাডা? আপিটে গেলি না?

টা মাডা বললে, ডাডা, পেটের নীটোতে ব্যটা করটে।

আমি বললুম, ডাড়া! ডাড়া! টোকে নাক্স-বোমিকা ঠাট্টি এনে ডিট্টি। কেয়ে নে। টঙ্গে টঙ্গে বালো হয়ে ডাবি।

টা, ওটুড টো এনে ডিলাম। বিকেলের ডিকে বলল, ব্যটা নেই।

তারপর?

টাপ্পরডিনও ডেকি মাডা আপিটে ডাট্টে না। আমি কোর্টে বেরুট্টিলুম ডকন, টকন বললুম, মাডা আড কী হল?

টা, ঠে বলল, ডাডা। ওপর-পেটে বিটন ব্যটা। টা ঠুনে, এনে ডিলুম ওকে ওপর পেটের ব্যটার ওঠুডও। বললুম, কাঁটকলার ঢোল ডিয়ে পুরোনো টালের বাট রেঁডে ডিটে বল মন্টুডাডাকে। কেয়ে, টুয়ে ঠাক।

তারপর?

টাপ্পরডিনও ডেকি মাডা অপিসে ডাট্টে না, বুডলে ঠিরিঠ। টকন আমার টণ্ডেহ হল। টণ্ডেহ পোটম ঠেকেই হট্টিল কিন্টু টকন টা ঘনীভূট হল।

কী বললেন জগাদা?

শিরীষ শুধোল।

বললুম, টণ্ডেহটা ঘনীভূট হল।

টেডিন লাটেহারের কোর্টে মামলা ঠেঠ করে গেলুম মাডার আপিটে। টা, আপিট বণ্ড। ডেকলুম, বাইরে ডরডাটে মট্টবড়ো টালা ডুলটে একটা। এক কামডাড আপিট। টালা ডোলা মানেই লাল বাটি ডেলে ডাওয়া। না টো কী? বলো ঠিরিঠ?

তা তো বটেই জগাদা। তারপর?

কী করি? ডেকলুম, মাডার আপিটের ঠিক উলটোডিকেই একটা ডড্ডির ডোকান। ডু-ডন কাবুলি-ডড্ডিপা-মেঠিনে বঠে বঠে ঝররররর ঠব্দ করে কী ঠব ডেন ঠেলাই করে ডাট্টে। ঢড়ের মটো, ঢর্নার ঠবডর মোটো ঠবড।

কাবুলিওয়ালার দর্জির দোকান? বলেন কী জগাদা? আছে নাকি? জন্মে দেখিনি। তারা তো হিং, সুরমা এসব-ই বেচে। নয়তো সুদের কারবার করে।

শিরীষ মজা পেয়ে বলল।

এ বিপুলা পিটিবীর কটটুকু ডানো টুমি বায়া? আমি-ই বা কটটুকু ডানি? ডা বলটি, ঠোনো।

হ্যাঁ। তারপর?

টাপ্পর টাডের-ই গিয়ে ঠুডোলুম, বাইঠাব, উলটোদিকে যে, আপিটটা ঠিল, টার কী হল?

একডন কাবুলি, পা-টালানো ঠামিয়ে আমার ডিকে হাট টালিয়ে বলল, ওকিলবাবু, আপিট টো ঠা স্রিফ ডো আডমিকা। হেডবাবু ঔর অ্যাটিটট্যান্ট! অ্যাটিটট্যান্ট, রুলার ডেকে হেডবাবুকি শারপর অ্যায়সা ঠোক ডেল, যো হেডবাবু চলে গেল হটপিটালমে।

আঁ? হটপিটালমে?

জি হাঁ।

আমি বন্নু, ডাহান্নমে ডান হেডবাবু। মাডার টাকরিটা ঠেল অ্যাটিটট্যান্টের। টাই, আমি ঠুডোলুম, আর অ্যাটিটট্যান্ট? টার কী হল?

তারপর?

শিরীষ উত্তেজিত হয়ে শুধোল।

হা:। হা:। হা:। করে হাসল সেই কাণ্ডাহারের কাবুলি। বললেন, অ্যাটিটট্যান্ট টো অ্যাবস্কণ্ডিং। ঔর হেডবাবু হটপিটালমে।

বোচো টালে! ঠাডে কি বায়া আমার নীচের পেটে ওপর পেটে ব্যটা বলে ঠুয়ে ঠাকে?

মাধাদার অফিস আর খুলবে না?

খুলবে কী? হেডবাবু ঠেল নগর-উন্টারির এক ঠেঠ। ঠে হটপিটাল ঠেকে ছাড়া পেয়ে ট্রেট নগর-উন্টারি। মাডার বিরুড্ডে কেঠ পড্ডন্ট করল না। অবশ্য ঠরকার ঠেকে করেঠেল কিন্টু আমি ডরা-কড়া কড়ে টাকে ‘নিপ্ট-ইন-ড্যা-বাড’ কড়ে ডিলুম।

এমন সময়ে পাশের শর্মা ডাক্তারের ডিসপেনসারি থেকে একটি ছোকরা, তার নাম বিহারি; দৌড়ে এসে বলল, ফোন হ্যায় ওকিল সাহাব!

কাঁহাঠে রে?

টোড়িসে।

কওন কিয়া?

কোই আনজান আদমি। কহতে কী যো মাধাবাবু বহত খাতরে মে হ্যায়।

খাটরা? কওন নয়া খাটরারে বাবুয়া?

ম্যায় ক্যা জানু ওকিল সাব?

ডাও বায়া ঠিরিঠ, একটু ডেনে এটো। আমি টটক্ষণে একটু মকরঢবজ মেড়ে, কেয়ে আটি। কী খাটরারে বাবা!

শিরীষ উঠে গিয়ে ডাক্তারখানাতে ঢুকল। বলল, পরনাম ডাক্তারসাব।

পরনাম শিরীষ। মজেমে হ্যায় না?

জি হাঁ। মজেমে।

রিসিভার তুলে নিয়ে শিরীষ বলল, বলিয়ে জি। হুয়া ক্যা?

আপ কৌন?

আরে বলিয়ে না জি, হুয়া ক্যা?

মাধাইবাবু হ্যায় না ‘মনোয়া-মিলন’ কি? ফওজদারি ওকিল, ‘ট’ ‘ট’ করনেওয়ালা জগাইবাবুকি ভাই...।

হাঁ হাঁ। সমঝ গ্যয়া। বলিয়ে না জি। আগে বাড়িয়ে।

মাধাবাবুনে ঔর উড়কি দোস্ত বানোয়ারিলালজি, মনোয়া-মিলনকি, কাপড়াওয়ালা...

হাঁ হাঁ। মুঝে মালুম হ্যায়। খরহা শিকার খেলনে গ্যয়া থা...

খরহা?

হ্যাঁ। ঔর ক্যা?

বলেই, ও-প্রান্তের মানুষ বললেন, অব সমঝা।

ক্যা সমঝা আপনে?

খরহা? খরহা তো মানহুশ হোতা হ্যায়। কোই রহিস খানদানিকি আদমিকি লায়েক শিকার নহি হ্যায় জি....। অর্থাৎ, খরগোশ তো অপয়া। কোনো ভদ্রলোকের যোগ্য শিকার হল খরগোশ? ছ্যা:।

আপ ক্যা বকোয়াস কর রহা হ্যায় জনাব, জারা খুল কর তো কহিয়ে, আসলিমে হুয়া ক্যা?

জগাবাবুনে ভইষ শিকার কিয়া। ভইষ! লেহ-লটকা। হা:।

ভইষ! হা রাম!

মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল শিরীষের। স্থানমাহাত্ম্যে।

জি হাঁ। ম্যায়নে অ্যাইসিহি শুনা। ঔর দুসরা জানোয়ার ভি হোনা শকতা।

জগাদা মাঝে মাঝেই পান্ডুকটা, হরিয়ালটা, তিতিরটা, বটেরটা, খরহা বা জংলি মোরগাটাও শিকার যে, না করেছেন তা নয়। কোনো বজরঙ্গবলীর কোনো কুক্ষণের দৈবাদেশে হঠাৎ উৎসারিত হওয়ায় শরীরের এবং মস্তিষ্কের মেটাবলিজম-এ কীসব অদৃশ্য অঘটন-পটিয়সী কান্ড-মান্ড ঘটিয়ে অচানক জগাদাকে মোষ-শিকারিতে উন্নতি করে দিল তা ভেবে ও যারপরনাই উল্লসিত, উত্তেজিত, উৎকণ্ঠিত এবং যাবতীয় ‘উঃ’ হয়েই পরক্ষণেই একেবারে কাঠ হয়ে গেল।

এ যে গো-হত্যা। মোষও তো গবাদি পশু।

টেলিফোনের ওপাশ থেকে দৈববাণী হল, ‘মুঙ্গালাল শেঠকি ভইষ পোকরাকি বগলমে ঘাস চুনচুনকে খতা থা।’ মাধাবাবু ভারি ঔর নামি জঙ্গল, ভাগলপুরকি ভাইষালোটনকি জংলি ভইষ শোচকর হম্মচকে উসহিকি উপ্পর গোলি ঠোক দিহিন। হা রাম।

এবার নতুন করে অবাক হওয়ার পালা শিরীষের।

বলল, মর গ্যয়া ভইষ? অব ক্যা হোগা? বি. জি. পি. ওয়ালালোগোঁকে পত্তা লগ যানে সে?

ওপাশ থেকে চাপা হাসি শোনা গেল। তারপর পুনঃবাণী। লেহ লটকা। ভইষ কা, স্বপ্ন কি ভইষ হো, যো বটের-মারনেওয়ালি গোলিসে পটক যায়ে গা? অচানক? হুঃ।

আরে ইয়ার, হুয়া ক্যা? বাতাও তো সাহি।

ঔর হোগা ক্যা? যো হোনেকা থা, ওহি হুয়া।

শেঠ মুঙ্গালাল, মাধাবাবু ঔর বানোয়ারিলালকো উনকি হাভেলিমে ভর দিহিস। আজ তো ইতোয়ার। কাল কোতোয়ালিমে কেস চড়ে গা। আভি জগা মুকার্জি ওকিলকো আনে বলিয়ে ভাইয়াকো ছোড়ানেকি লিয়ে, নেহি তো জান কয়লা হো যায়গা দোনো হান্টরসাবকি। না-দানা, না-পানি। ঔর কুছ বাদ-বাদ ধাদ্দারধ্বানি!

ভইষালোটনওয়ালা ভইষ মরা তো নেহি না ভাই?

আররে নেহি জি। ভইষকো শিংমে তো থোড়াসি গুদগুদিহি লাগা হোগা। ঔর ক্যা? অজীব আদমি হ্যায়, ভাই তু। জবরদস্ত জংলি ভইষ মারনা বাচ্চোঁকা কাম হ্যায় ক্যা?

ফোন নামিয়ে রেখে জগাদার কাছে গিয়ে সব বৃত্তান্ত বলল শিরীষ।

জগাদা বললেন, এই নিয়ে টেট্রিশ বার।

কী?

‘বেল’ ডিয়ে মাডাকে ঠাডানো। একন ডেকি। ঠেঠ কী বলে? অবঠ্য আমাকে ঠেনেন উনি। একটা কেঠ করেছিলাম ওঁর পক্ষে। ম্যাজিটট্রেটও অবঠ্যই টেনেন।

তা, যাবেন কীসে? অতদূর? এখন তো ট্রেনও নেই।

কেন? চৌপান এক্সপ্রেস। একন-ই টো এটে ডাবে ট্রেন। টুমি বরং আমাকে টোমার ঠাইকেলে করে এটু টেঠনে পৌঁঠে ডাও ঠিরিঠ। আমারটা টায়ার পাংটার হয়ে পডে আটে।

ফিরবেন তো আজ রাতেই?

আরে হ্যাঁ হ্যাঁ। বিকেলের গাড়িটেই ফিরে আটব।

চলুন, তাহলে আপনাকে পৌঁছেই দিয়ে আসি স্টেশনে।

শিরীষ বলল।

শীত শীত করছে যে রে।

ঝিঁঝি বলল, ওদের বাড়ির কাঠের গেটটা বাইরে থেকে বন্ধ করতে করতে।

শিরীষ নিজের সাইকেলটা প্রাচীন একটি ইউক্যালিপ্টাস গাছের গোড়াতে হেলান দিয়ে রেখেছিল। ডান হাতে সাইকেলটার হ্যাণ্ডল ধরে সেটাকে টেনে নিয়ে বলল, তুই তো এখানে নতুন নোস। তোরও তো জানার কথা। পয়লা বৈশাখ অবধি রাতে চাদর গায়ে দিয়ে শুতে হয়। সন্ধের পরেই ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগবে। আর সকালেও, রোদ ওঠার আগে। এ তোদের কলকাতা? না রাঁচি? রাঁচির আবহাওয়া একসময়ে অন্যরকম ছিল। এখন তো যেকোনো শিল্পনগরীর মতোই হয়ে উঠেছে প্রায়। এত লোক, এত রিকশা, এত গাড়ি; এত আওয়াজ। সপ্তাহে একদিন যাই বইয়ের জন্যে কিন্তু তাতেই দম একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। কেন? রাতে চাদর লাগেনি?

হ্যাঁ। তা লেগেছিল। তবে ভোর হওয়ার পরেও যে, লাগবে তা বুঝতে পারিনি।

কোথায় বসবি? ক্যারিয়ারে, না রড-এ?

কোথায় বসলে তোর সুবিধে হবে চালাতে?

যেখানে তোর খুশি, বোস।

তাহলে রডেই বসছি।

তোর লেডিজ সাইকেলের কী হল?

দু-একদিনের মধ্যেই এসে যাবে।

চালাতে ভুলে যাসনি তো?

সাইকেল চালানো আর সাঁতার একবার শিখলে কেউ কখনো ভোলে না।

তাই?

হ্যাঁ। ব্যাপারটা ব্যালান্সের। ‘ব্যালান্স’-এর বাংলা কী রে?

ভারসাম্য।

আর ‘ইকুইলিব্রায়াম’ কথাটার?

সেটা তো অর্থনীতির জার্গন। এমন চৈত্রর উষাকালে অর্থনীতি না-হয় থাকলই এখন।

তাহলে থাক।

আয়, উঠে বোস। বলেই, শিরীষ সাইকেলটা একটা গোলাকৃতি পাথরের পাশে নিয়ে গিয়ে, নিজে উঠে বসে, দুই ঊরু ও পা শক্ত করে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে বলল, আয়।

উঠে বসতে গিয়েই ঝিঁঝি শিরীষের প্রায় বুকের ওপরেই এসে পড়ল, ভারসাম্য হারিয়ে। এবং সঙ্গে সঙ্গেই অস্বস্তিতে বলে উঠল, দেখেছিস। একটু হলেই পড়ে যেতাম!

ওঠাটা সম্পূর্ণই তোর নিজের ইচ্ছাধীন ছিল। কিন্তু পড়াটা নয়। পড়ার আশঙ্কা থাকলেই জড়িয়ে ধরতাম তোকে। পড়তে তোকে দিতাম থোড়িই!

সেই আশঙ্কাটা ছিল বলেই তো আতঙ্কিত হয়েছিলাম। পড়লে তো পড়তাম তোর গায়েই!

তাই?

বলল শিরীষ।

ভারি ভালো কথা বলে ঝিঁঝি। অনেকে বলে, শিরীষও বলে। শিরীষ নিজে যদিও তা মনে করে না। তবে একথা ও জানে এবং মানেও যে, কথা বলা বা চিঠি লেখা বা গান গাওয়া বা ছবি আঁকা এইসব-ই শিল্পের পর্যায়ে পড়ে। এবং একমাত্র মানুষকেই বিধাতা এইসব বিশেষ মানবিক গুণপনাতে সম্পৃক্ত করেছিলেন। মানুষ যদি চর্চা দিয়ে, মনোযোগ দিয়ে, যত্ন দিয়ে এইসব গুণপনার উৎকর্ষসাধন করতে পারে তাহলে মন্দ কী!

নীল-ডুংরি অবধি কি সাইকেল যাবে?

না:।

তবে?

সাইকেল রেখে দেব পাহাড়তলিতে।

চুরি হবে না?

মনোয়া-মিলনে চোর নেই।

চোর নেই, এমন জায়গা এখন ভারতবর্ষে আছে নাকি?

আছে আছে। অনেক-ই আছে। চোর-জোচ্চোরের ভিড় সব শহরে-নগরে। গ্রাম-গঞ্জ, এমন সব শুনসান জংলি এলাকা এখনও অপেক্ষাকৃত ভালো আছে।

মা তো সেইজন্যেই কলকাতা ছেড়ে এসেছিলেন।

কাকিমা বুদ্ধিমতী।

আর কাকিমার মেয়ে?

তার ‘বুদ্ধি’র পরীক্ষা তো নিইনি এখনও। পরীক্ষা আগে হোক, তারপর ফল জানাব।

আচ্ছা।

বলল ঝিঁঝি, চাপা কৌতুকের সঙ্গে।

ভারি ভালো লাগছিল শিরীষের। চৈত্র-শেষের এইসব আলো-ফোটা সকালে কোথা থেকে যে, একটা মিষ্টি, হরজাই-গন্ধমাখা হাওয়া ছাড়ে। আসলে, হাওয়াটা থাকেই। সারারাত-ই থাকে। নিজেরা ঘরবন্দি থাকে বলেই উদোম হাওয়াটা এমন সর্বাঙ্গে আদর বুলোতে পারে না। কতরকম নাম-জানা এবং না-জানা পাখি ডাকছে এই সকালকে স্বাগত জানিয়ে। গন্ধের আভাসের মতো এই গন্ধ, শব্দের আভাসের মতো এই শব্দ, এই আলতো চুমুর মতো এলোমেলো ছুঁয়ে-ছাওয়া এই হাওয়া; সব মিলেমিশে দিনের এই সময়টুকুতে অত্যন্ত নীচ, ইতর চরিত্রের মানুষকেও সম্ভবত মহৎ, উদার, ক্ষমাময় করে তোলে। সব শত্রুতা, নীচতা, খলতা, ঈর্ষা, কুটিলতা, ধর্মান্ধতা যেসব দোষের কারণে মানুষের মতো এমন মহৎ-প্রাণও অমানুষ হয়ে ওঠে, সেসবের সবকিছুই ক্ষমা করে দিতে ইচ্ছে করে।

ঝিঁঝির বাবা, যাকে ইংরিজিতে বলে ‘ফিলদি-রিচ’, তাই ছিলেন। তাঁকে দেখেছে শিরীষ ওর কৈশোরে। এবং দু-একবার ছাড়া, দূর থেকেই। শিরীষের বাবাই যেতেন ঝিঁঝির বাবার কাছে, যখন উনি আসতেন ‘মনোয়া-মিলন’-এ বছরে একবার কী দুবার; কলকাতা থেকে। শিরীষের বাবা স্বপ্নময় যখন এক আত্মীয়র বিয়ে উপলক্ষে কলকাতায় গেছিলেন, তখন গেছিলেন ঝিঁঝিদের বাড়িতে। ফিরে এসে, উত্তেজিত হয়ে ঝিঁঝিদের বৈভবের গল্প করেছিলেন শিরীষের মাকে।

কিশোর শিরীষ অবাক হয়ে শুনছিল।

শিরীষের বাবার চরিত্রে অনেক ভোগ, বাসনা, অর্থ, ক্ষমতা এবং প্রতিপত্তিরও লোভ ছিল। যশ-এর আকাঙ্ক্ষা অবশ্য ছিল না। কারণ, বুদ্ধি রাখতেন বলেই জানতেন যে, ‘যশ’ ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে। চাইলেই তা সবসময়ে পাওয়া যায় না এবং চালাকির দ্বারা পেলেও সেই যশ রাতের হাসনুহানার গন্ধের মতোই সকালে মরে যায়। এই কারণে, শিরীষ তার বাবাকে অপছন্দ না করলেও খুব একটা পছন্দও করেনি কোনোদিন। কিন্তু ওর মা, মালিনী ছিলেন সম্পূর্ণ অন্য চরিত্রের, কোনোরকম পার্থিব ব্যাপারেই তাঁর বিন্দুমাত্র লোভ ছিল না। তখন থেকেই মা রাঁচির অথবা ডালটনগঞ্জের লাইব্রেরি থেকে নানারকম বই আনাতেন, রেকর্ড কিনিয়ে আনাতেন। গ্রামোফোনও ছিল মায়ের, শিরীষের যেমন ক্যাসেট-প্লেয়ার। সাহিত্য, গান, জীবনের যা-কিছু সুন্দর দিক শিরীষের, তা তার মায়ের-ই দান। মা নিশ্চয়ই মুক্ত হয়ে গেছেন।

অন্ধকার রাতে তারাভরা আকাশে চেয়ে মায়ের হাসিকে খোঁজে শিরীষ। হিন্দুধর্মে বলে যে, ‘আত্মা’ অবিনশ্বর। যদি সে-কথা সত্যি হয়, তবে মায়ের আত্মাকে আর কখনোই ফিরে আসতে হবে না এখানে। বাবা হয়তো ফিরে এসেছেন আবার। তাঁর চেয়ার-টেবিল, তাঁর জমি-জিরেত, তাঁর বনের গাছ কেটে পয়সা উপার্জনের ব্যাবসা ছাড়াও গরিব-গুরবোদের সর্বস্বান্ত করার সুদের ব্যাবসা, যে-কথা বড়ো হওয়ার পরে জেনে বড়োই লজ্জিত বোধ করেছে শিরীষ তার বাবার জন্যে; এ সবকিছুই ছিল তাঁর প্রাণ। এর বাইরে, খাওয়া-দাওয়া, হুই-হল্লা, অর্থ-চিন্তা ছাড়া বাবার জীবনে আর কিছুই ছিল না। বরং এইজন্যেই তাঁর লোভের হাতেই তাঁকে মরতেও হল। ‘পাপের বেতন মৃত্যু’। পুনুয়ার জঙ্গলের পাশে তার বাবার যে-জমি এবং ভান্ডার ছিল, সেই জমির ভাগচাষিকে তার ন্যায্য পাওনা থেকে বছরের পর বছর বঞ্চিত করায়, নকশাল ছেলেরা প্রচন্ড গরমের মধ্যে একদিন সন্ধের মুখে টাঙ্গি দিয়ে কুপিয়ে শিরীষের বাবাকে কেটে ফেলে। সেইদিন থেকেই বাবার সেই ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত দেহের ভয়াবহ স্মৃতি আর মানুষের পার্থিব জিনিসের প্রতি তীব্র কামনা-বাসনা শিরীষের চোখে যেন, সমার্থকই হয়ে গেছে। লোভ, যে-কোনোরকম লোভ দেখলেই ও চিনতে পারে। বাবার মৃতদেহের কথা মনে হয়।

এইমুহূর্তে সত্যিই ভারি ভালো লাগছে শিরীষের। তার বুকে, প্রায় পিঠ লাগিয়ে বসে-থাকা ঝিঁঝির গায়ের গতরাতে-মাখা পাউডারের, অথবা কোমর-ছাপানো খোলা চুল থেকে উড়ে-আসা মাথার তেলের অথবা অন্য কোনো প্রসাধনের হালকা গন্ধ উড়ছে নাকের সামনে। কোনোদিনও ওর পঁচিশ বছর বয়েসে ও কোনো সমবয়েসি বা অসমবয়সি যুবতী-শরীরের এতকাছে আসেনি। শুধু কৃষ্ণপক্ষের মধ্যরাতের কালপেঁচার বুক কাঁপানো ডাক অথবা হায়নার বুক-হিম-করা অট্টহাসি অথবা শুক্লারাতের পাগল-করা পিউ-কাঁহা, বা পাগল-হওয়া কোকিল বা বসন্তবৌরির চন্দ্রাহত, বিপন্ন-বিস্ময়ের তীব্র তীক্ষ্ণ রোমাঞ্চ জাগানো ডাক-ই নয়, যুবতী-শরীরের সান্নিধ্যও যে, একজন যুবকের কাছে সমান বিপজ্জনক এবং রোমাঞ্চকর এই সত্যটি সম্বন্ধে সে, সম্পূর্ণ অনবহিত ছিল।

অবশ্য ভাবছিল ও, কতটুকুই বা ও জানে! তবে এটুকু বুঝতে পারছে সাতসকালে যে, যে নীলপাখির বাসস্থান দেখানোর অভিপ্রায়ে চলেছে ঝিঁঝিকে নিয়ে নীল-ডুংরির টোংড়িতে আজ এই স্নিগ্ধ, সুগন্ধি ভোরে, সেই আশ্চর্য রহস্যময় নীলপাখির-ই মতো, প্রকৃতির-ই মতো নারীও সমান রহস্যময় প্রতিটি পুরুষের কাছে। পুরুষের তাবৎ জ্ঞান-বুদ্ধি, নারীর তাবৎ স্বাধীনতা-আন্দোলন এই আশ্চর্য রহস্যের কোনোদিন-ই কোনো হেরফের হয়তো করতে পারবে না। শিরীষের এই সুন্দর মুহূর্তে এও মনে হচ্ছিল যে, বিশ্বের নারীরা নারী-প্রগতির সব আন্দোলন ইচ্ছে করলে এবং সিরিয়াসলি বিবেচনা করলে বন্ধও করে দিতে পারতেন। কারণ, বিধাতা সৃষ্টির সময়ে তাঁদের-ই পুরোপুরি জিতিয়ে রেখেছেন। পুরুষ চিরদিন-ই ভঙ্গুর। সস্তা কাচের বাসনের মতো। তাঁদের যা বল, পুরুষের সেটাই দুর্বলতা। পুরুষ যখন নারীর ভুরুভঙ্গিতে, কটাক্ষে, চিকন গলার স্বরে, তার অন্যরকম ভয়ানক, পুরুষের পক্ষে অত্যন্ত-ই বিপজ্জনক শারীরিক সৌন্দর্যে এবং নমনীয় মানসিক কমনীয়তায়, মমত্বে, মাতৃত্বে এবং বন্ধুতায়ও পুরুষদের চিরদিন-ই অঙ্গুলি-হেলনে চালনা করেই এসেছে তখন আর সেই চিরহেরো-প্রজাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করার তাঁদের দরকার-ই বা কী ছিল?

এটা কী গাছ রে শিরীষ?

এটা কুসুমগাছ।

গাছের-ই নাম কুসুম? বা:।

হ্যাঁ।

এখন এদের পাতা সব ঝরে গেছে। ন্যাড়া। আরও ক-দিন বাদে বৈশাখের গোড়াতে এদের ডালে ডালে নতুন পাতা আসবে। পাতাগুলোর রং যে, কী সুন্দর তোকে কী বলব! লালের তো বহুরকম হয়। লাল, গোলাপি, মরচে-লাল, ইট-লাল, ফর্সা গালের-লাল, রক্ত-লাল, টিয়া-ঠোঁট লাল, পোস্টাপিস-লাল, আরও কতরকম লাল। কিন্তু কুসুমগাছের নতুন-আসা পাতার যে-লাল সেই লালের কোনো তুলনা বা বর্ণনা কোনো কাব্য-সাহিত্যেই পাবি না। যেমন পাবি না, বৈশাখের ওই সময়ের বা শীতের সময়ের বন-জঙ্গলের সবুজের বর্ণনা।

মানুষে জানে, সবুজ শুধু সবুজ-ই!

কিন্তু আমাদের দেশে বনে-পাহাড়ের লাল, সবুজ আর হলুদের যে, কতরকম হয়, সেই কথাটা একজন লেখকও লিখলেন না। কিন্তু তুই দেখিস, আমি যখন লিখব, তখন আমি ঠিক-ই লিখব।

ঝিঁঝি চুপ করে রইল। সে বুদ্ধিমতী মেয়ে। বুঝল যে, শিরীষকে এখন কথাতে পেয়েছে। এই তোড়ে এখন বাধা দিতে নেই।

শিরীষ বলল, ঈশ্বর সব মানুষকে-ই চোখ দিয়েছেন, নাক দিয়েছেন, কান দিয়েছেন, একটি করে মনও দিয়েছেন, কিন্তু দেখতে বা গন্ধ নিতে বা শুনতে বা ভাবতে ক-জন মানুষ সত্যিই পারে? বল? আমি খুব ভাগ্যবান রে ঝিঁঝি। এই জঙ্গলের-ই মতো, এই সকালের-ই মতো তোকেও আস্তে আস্তে একটু একটু করে চিনছি। আমার খুব সৌভাগ্য।

ঝিঁঝি মনে মনে বলল, কেউ-ই কাউকে চেনে না। চেনা কি অতসোজা?

তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল দু-জনেই। নির্জন, প্রায় নিস্তব্ধ, শুধুমাত্র হাওয়ার অদৃশ্য হাতে ঝাঁট-দেওয়া শুকনো পাতার গড়িয়ে যাওয়ার মৃদু শব্দ আর প্রভাতি পাখির ডাকের অনুচ্চ শব্দে ছিদ্রিত এই সকালকে সাইকেলের চেনের ‘ক্যাঁচ ক্যাঁচ’ শব্দ আর লাল মোরাম-মাটির ওপরে টায়ারের গড়িয়ে যাওয়ার মৃদু ‘কুড়মুড়’ শব্দ বিরক্ত করতে লাগল।

শিরীষ স্বগতোক্তি করল, চেনটায় তেল লাগাতে হবে। সময়ই পাই না।

ঝিঁঝি উত্তর দিল না কোনো। কিছু কথা থাকে, স্বগত; তার উত্তর হয় না।

একটু পরে ঝিঁঝি বলল, ওই নীলপাখি দুটি কি সব বছরেই আসে?

কোনো ঠিক নেই, আদিবাসীরাই জানে না। তা আমি কী করে বলব। তবে, যে-বছরে আসে, সে-বছরে নীল-ডুংরির টোংড়ির নীচে পাহাড়তলিতে মস্ত মেলা বসে। সারাদিন বিকিকিনি চলে। তারপর সন্ধের পরে হাঁড়িয়া খায় সকলে আর সারারাত নাচে। দিনের যে-সময়ে পাখিরা গাছে থাকে তখন টোংড়ির দিকে কিন্তু যায় না একজনও। পাখিরা বিরক্ত হবে বলে। যে-বছরে ওই পাখি দুটো আসে, সে-বছরে খেতি-জমিনে ভেলকি লাগে। গেহুঁ, বাজরা, মাড়ুয়া, কাড়ুয়া, সরগুজা, কুলথি, আর অড়হর-এর খেতে সবুজ-বিপ্লব ঘটে যায়। সবুজ আর হলুদের মারদাঙ্গা লেগে যায় জমিতে, ঢালে; এমনকী টাঁড়েও। টাঁড়ে টাঁড়ে অগুনতি পলাশ, শাল এবং নানা হরজাই গাছের নতুন চারা আসে। খরগোশের, হরিণের কানের মতো তাদের বড়ো বড়ো সবুজ পাতারা হাওয়াতে ইতি-উতি লটরপটর করে। নড়ে চড়ে। সে-বছর, পাকা-ফসলের গন্ধে ‘ম ম’ করে হাওয়া। বাজরাখেতে শুয়োর ঢুকে, ঘোঁতর-ঘোঁতর করে। ঢোকে কিতারীর খেতেও। সারারাত বাঁশিতে ঢেউ খেলানো সুর তুলে চাঁদে-অন্ধকারে রাত জাগে ‘রাখোয়ার’ ছেলেরা। পাহাড়তলির এধার-ওধার থেকে মাদল আর ধামসা বাজে রাতের বেলা, আর দোলানি সুরের ঘুমপাড়ানি গান ভেসে আসে এগ্রাম-সেগ্রাম থেকে। এতসব কারণেই এই নীল চিড়িয়াদের মনোয়া-মিলনের আশপাশের সব বস্তির মানুষেরা ‘দেবদেবী’ জ্ঞান করে। বনদেওতার থানে যেমন পুজো চড়ায় সকলে, তেমন-ই যে, প্রাচীন মস্ত শিমুল গাছটার ডালে ওরা এসে ওদের স্বল্পকালের আশ্রয় নেয় সেই শিমুলের গুঁড়ির কাছেই ওরা পুজো চড়িয়ে যার যার নীরব প্রার্থনা জানিয়ে শালপাতার দোনাতে করে তাদের নৈবেদ্য সাজিয়ে দিয়ে আসে। কেউ বাড়িতে বানানো ছাতুর লাড্ডু, কেউ কোনো ফল, কেউ-বা একটু দুধ বা দই, কেউ হালুইকরের দোকান থেকে কিনে-আনা কোনো মিষ্টি। ওদের ধারণা, সাতসকালে নীলচিড়িয়ারা ওই নৈবেদ্যর কিছুটা গ্রহণ করে আর কিছুটা ঠুকরে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে উড়ে চলে যায় সারাদিনের মতন কোনো অজানা বন বা প্রান্তরে, বিকেলে বেলা পড়লে আবার ফিরে আসবে বলে।

তাদের মূলবাস যেকোনো মহাদেশে বা এদেশের-ই কোথায় সে-খবর কেউ রাখে না। কয়েকদিনের জন্যে আসে; ক্কচিৎ-বসন্তে, আবার ফিরে যায়।

সকাল আটটা-ন-টা নাগাদ যারা পুজো চড়িয়েছিল, তারা টোংড়ির সেই শিমুলতলিতে এসে নজর করে কার কার নৈবেদ্য নীল চিড়িয়ারা গ্রহণ করল। যাদের করল, তারা নিজেদের ভাগ্যবান বলে মনে করে। যাদেরটা ঠুকরে ফেলে-ছড়িয়ে গেল, তারা আবার দুপুরে এসে নতুন করে নৈবেদ্য চড়িয়ে যায়। তুই কখনো দেখেছিস নিজচোখে ওই পাখিদের?

ঝিঁঝি শুধোল।

কাউকে বলিস না কিন্তু। দেখেছি একবার।

কেন? বলব না কেন?

ওই পাখিদের ‘বুড়হা-করম’-এর থানের পূজারি ছাড়া নিজচোখে আর নাকি কেউই দেখেনি। আরে ওই পাখি নিজচোখে দেখেছিল বলেই তো সে আজ বুড়হা-করম-এর পূজারি। তার এত খেতি-জমিন, কাঁড়া-বয়েল। এত রমরমা। ওই পাখি সকলকে থোড়াই দেখা দেয়!

কী করে তাহলে দেখলি তুই? তা দেখলিই যদি তো, তুইও বুড়হা-করমের পূজারির মতো বড়োলোক হয়ে গেলি না কেন? তোর পেট-চালাবার জন্যে চিরাঞ্জিলাল মাড়োয়ারির গদিতে বসে তোর খাতা লেখার দরকার কী ছিল?

না, না। ওসব করিস না। নিজের মেহনতের কামাই ছাড়া আমি খাই না। সে যদি দু-টি শুখা রুটিও হয়, সেও ভালো।

চল, এবার নামতে হবে ঝিঁঝি। সাইকেলটা এখানেই কেলাউন্দা ঝোপের মধ্যে রেখে যাব।

ঝিঁঝি নামল। শিরীষ সাইকেলটাকে সুঁতিপথ থেকে একটু বাঁ-দিকে ঢুকিয়ে শুইয়ে রাখল ঝোপের ওপর। যেই-না শোয়ানো, অমনি ডানায় ডানায় ‘ভররর-র-র-র’ শব্দ করে একদল তিতির উড়ে গেল। ঝিঁঝিকে ভীষণ চমকে দিয়ে। হালকা খয়েরি-রঙের তিতিরগুলো যে, এমন জোরে উড়তে পারে জানতই না ঝিঁঝি। এতকাছ থেকে দেখেওনি কখনো আগে। তবে ডাক শুনেছে। ওদের বাড়ির পেছনের জঙ্গলেই রোজ সকাল-সন্ধেতে ডাকে। ওদের ইংরিজি নাম, ‘Patridge’। ও জানে। কারণ, ওর মায়ের কাছে শুনেছে ঝিঁঝি যে, এই তিতির আর তিতিরের বাচ্চার মতো দেখতে একরকম পাখি, যার স্থানীয় নাম বটের, ইংরিজি ‘Quail’, শিকার করতেই তার বাবা আসতেন এখানে। বাড়িটাও বানিয়েছিলেন শুধু সেই শখেই। বাড়িটা যেখানে, তার চারদিকেই মহুয়া বন ছিল একসময়ে। এখনও আছে কয়েকটি মহীরুহ। বাবা শখ করে বাড়ির নাম রেখেছিলেন ‘মহুয়া’, তাই।

কী রে! চমকে গেলি যে!

চমকাব না। যদি আমার নাকে-মুখে উড়ে আসত? কীরকম একটা গন্ধ ওদের গায়ে। তাই-না?

ওরা আবর্জনা এড়িয়ে চলে। তোর কাছে আসত না আদৌ।

শিরীষের রসিকতায় না মজে ও বলল, এগুলো কী ধরনের পাখি? পাখি তো গাছে বসে থাকে, মাটিতে বসেছিল কেন, গাছে না বসে?

তিতিররা বোধ হয় গাছে বসেই না। আমি তো দেখিনি কোনোদিনও বসতে। বটেরদেরও দেখিনি। এই তিতিরগুলোর ইংরিজি নাম ‘Grey Patridge’। তবে হ্যাঁ, অন্য একরকমের তিতির আছে, তাদের গায়ের রং কালো; সে-কারণে তাদের নামও ‘কালি তিত্বর’। এখানে তাদের দেখেছি, ঝোপঝাড়ের ওপরে বসে ভীষণ মনখারাপ-করা ডাক ডাকতে; সারাদুপুর।

তাই?

হুঁ। আয় ঝিঁঝি, এবারে পাহাড়ে চড়ি। দেখ, রোদ উঠে গেছে এখন তবুও কেমন মনোরম লাগছে। অবশ্য জানি না, হয়তো তুই সঙ্গে আছিস বলেই এতটা ভালো লাগছে।

বলেই বলল, তোর কেমন লাগছে?

দা-রু-ণ। তবে সেটা তোর সঙ্গগুণে আদৌ নয়। প্রাকৃতিক কারণেই। নিছক-ই পরিবেশের প্রভাবে। প্রকৃতি, পরমাপ্রকৃতির সুষমাতে।

আমি তো প্রকৃতি নই। আমি পুরুষ। প্রকৃতি তো তুই।

কথা তো শিখেছিস অনেক। তা সেই নীল পাখিগুলো কেমন করে দেখলি, কী করে দেখলি, তা বল একটু।

হ্যাঁ। সেদিন পাখি দেখতে আসিনি আমি আদৌ। ওই পাখির কথা জানতামও না। নীল-ডুংরি পাহাড়ের টোংড়ির ওপরে আমার বাবার বানানো একটা ঘর আছে। তোর বাবাও, মানে কাকাবাবুও শিকার করার জন্যে এসেছেন এখানে অনেকবার। শুনেছি, মায়ের কাছে। বাবা যখন কাঠ-বাঁশের ঠিকাদারি করতেন তখন কাজের সুবিধের জন্যে এই ঘরটি বানিয়েছিলেন। অব্যবহারে, অযত্নে, ঘরটা প্রায় ভেঙেই গেছে। তবে মাথার ওপরে ছাদ এখনও আছে। যদিও পাশের কাঠের দেওয়ালগুলো ফেটে-ফুটে রোদে-জলে চৌচির হয়ে গেছে। কিছু কিছু খুলে খালেও পড়ে গেছে। তবু কখনো মন খারাপ হলে কিংবা মন খুব ভালো থাকলে আমি ওই ঘরে চলে যেতাম। এখনও যাই। গিয়ে, চুপটি করে বসে থাকতাম। কবিতা লিখতাম কখনো। গরমের দিনে জংলি আম পেড়ে খেতাম। জংলি জামও। শীতে কেলাউন্দা, জংলি পেয়ারা।

একদিন সারাটা দুপুর এখানে থেকে বিকেল বিকেল নেমে আসছি টোংড়ির সেই ঘর থেকে, এমন সময়ে হঠাৎ-ই মাথার ওপরে বড়ো বড়ো ডানার ‘সপসপ’ শব্দ শুনে চমক খেয়ে দেখি দু-টি মস্তবড়ো নীল পাখি উড়ে গেল আমার মাথার ওপর দিয়ে। অমন পাখি জীবনে দেখিনি। প্রথমে ভাবলাম, ময়ূর। কিন্তু ময়ূরের গায়ের রং তো ময়ূরের-ই মতো। তা ছাড়া, এমন স্নিগ্ধ নীল, নীলকন্ঠ পাখিরও নেই। চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লক্ষ করলাম।

না:! সত্যিই অমন পাখি আমি আগে দেখিনি। ময়ূরের মতো অতবড়ো নয় পাখি দুটো। তাদের ল্যাজও নেই ময়ূরের মতো। ময়ূরের গলার মতো লম্বাও নয় তাদের গলা। আয়তনে, হেমন্তের পাকা ধান-খাওয়া বড়ো জংলি মোরগেরও আড়াই-তিনগুণ হবে পাখি দুটো। দেখতে লাগলাম। এমন সময়ে ওদের মধ্যে যেটা বড়ো, সম্ভবত মদ্দা, পুরুষ যেটি, সেটি ডাকল ‘কুঁউক-কুঁউক’ করে। আশ্চর্য বিষণ্ণ সে ডাক! মনে হল, যেন কোনো সদ্য-বিধবার চাপা-কান্না। ওই পাখি দু-টির ঠোঁটদু-টি কিন্তু উজ্জ্বল বাদামি। অনেকটা হাঁসের মতো। তবে জোড়া নয় কিন্তু। আর পুরুষ পাখিটার মাথার ওপরে গাঢ় নীল রঙের ঝুঁটি। কাকাতুয়ার মতো নয়। বুলবুলির মতোও নয়। একেবারে তাদের-ই মতো।

তারপর?

তারপর-ই পাখি দুটো বড়ো আদরে-যত্নে-সোহাগে একে অন্যের পালক ঠোঁট দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে লাগল। এবারে মেয়ে পাখিটাও ডাকল, ‘কুঁউক-কুঁউক’ করে। অনেকক্ষণ ধরে দেখে যখন আশ মিটল আমার, তখন আমি পাহাড়ে নামতে শুরু করলাম। তখন বৈশাখের মাঝামাঝি। পর্ণমোচী জঙ্গল পাতলা হয়ে এসেছে। ডুংরি থেকে নেমে আসবার সময় নীলা-ঝোরাটা পেরিয়ে ফিরতে হবে। ছোটো-বড়ো নানা আকারের সাদা-কালো-বাদামি পাথর ছড়ানো আছে নদীর বুকময়। যেহেতু গরম পড়ে গেছে, সন্ধের মুখে মুখে বড়ো বড়ো সাপ, চিতা এবং বড়োবাঘও জল খেতে আসত ওই ঝোরাতে; তা ছাড়া, ভালুকও ছিল জঙ্গলে অনেক, বিশেষ করে গরমের সময়ে আম খাওয়ার জন্য তাদের হুড়োহুড়ি লেগে যেত। তাই, আমি তাড়াতাড়ি নেমে আসতে লাগলাম।

বাড়ি ফিরে সালিম আলির বই খুলে লণ্ঠনের সামনে বসে তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। না:। অমন কোনো পাখির ছবি-ই নেই তাতে। অমল হোম মশায়ের ‘বাংলার পাখি’ বইটিও দেখলাম।

বা রে! বাংলার পাখি বিহারে পাবি তা ভাবলি কী করে?

বা রে! বাংলার পাখি কি বিহারে আসতে পারে না? পাখিদের জন্যে তো রাজ্যের সীমানা নেই কোনো! ভাষার সীমানাও নেই! তাদের জন্যে আলাদা গভর্নর বা মুখ্যমন্ত্রীও নেই। তাদের ডানা তাদের যেখানে নিয়ে যায় সেটাই তাদের দেশ। এইজন্যই তো কেবল-ই আমার ইচ্ছা করে পাখি হয়ে যেতে।

তারপর?

ওই পাখি দুটি যে, আদিবাসীদের কাছে অমন মঙ্গলের দ্যোতক তাও তো জানতাম না। বাবাও কখনো আমাকে বলেননি ওই পাখিদের কথা। বাবা হয়তো জানতেন। জানি না, জানতেন কি না! মার কাছেও কখনো শুনিনি। কিন্তু পরদিন যখন আবার একবার দেখার লোভে প্রথম বিকেলের দিকে চলেছি ওই দিকে, দেখি, একজন দু-জন করে আদিবাসী চলেছে হাতে বুনো গাছের পাতার দোনা নিয়ে, ওই দিকেই। স্ত্রী-পুরুষ প্রত্যেকেই স্নান করে, পরিষ্কার কাপড় পরেছে।

ওদের সঙ্গেই এগোতে এগোতে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় চলেছে ওরা? তখন ওদের-ই কাছে সব শুনলাম ইতিবৃত্ত। সেই প্রাচীন শিমুলটা, যার উঁচু-ডালে আগের দিন পাখি দুটোতে বসেছিল, সেটার কাছে গিয়ে দেখি, শিমুলের গুঁড়িতে সিঁদুর লেপেছে ওরা।

বলেই, থেমে গিয়ে বলল, শিমুলের গুঁড়ি দেখেছিস কখনো? নীচের দিকে অনেক ভাগ থাকে। বড়োগাছের গুঁড়িতে ওই ভাগগুলো এমন-ই হয় যে, এক-একটির কাঁধে পাঁচ-ছ-জন পূর্ণবয়স্ক মানুষও লুকিয়ে থাকতে পারে।

তারপর?

তারপর দেখলাম, আদিবাসীরা সেই গুঁড়ির সব ক-টি ভাগেই দগদগে লাল সিঁদুর লাগিয়েছে। আর বুনোপাতার দোনার নৈবেদ্য সাজিয়েছে প্রত্যেকটি খাঁজের মধ্যবর্তী জমিতে। বনফুল দিয়েছে ছড়িয়ে।

ওদের কাছেই শুনলাম যে, পাখি দুটো এসেছে মাত্র দু-দিন হল, বারোবছর, মানে একযুগ পরে।

বা-রো বছর পরে?

ঝিঁঝি অবাক হয়ে বলল।

হ্যাঁ রে, নইলে বলছি কী!

ওদের মধ্যেই দু-জন নাকি বনশুয়োর শিকার করতে এসেছিল এদিকের দোলাতে। তারাই পরশু প্রথম দেখে পাখি দুটোকে। উত্তেজনাতে রাতে ঘুমোতে পারেনি। কাউকে তাদের সৌভাগ্যের কথা বলতেও পারেনি। উত্তেজনা প্রশমিত করার জন্যে হাঁড়িয়া খেয়ে দু-জনেই প্রায় বারো ঘণ্টা মড়ার মতো ঘুমিয়েছিল। প্রকৃতিস্থ হলে ফিস-ফিস করে জানিয়েছে একে-ওকে। আর তারপরেই এই পরব। ওদের ভাষায় ওই পাখিদের ওরা বলে, জাডুগুণা। ওদের মিথোলজিতে নাকি আছে ওই ‘জাডুগুণা’, পরম-মঙ্গলকারী, মঙ্গলবাহী পাখিদের কথা।

আমাকে দিবি ওদের বই? যে বইয়েতে ‘জাডুগুণার’ কথা আছে?

ঝিঁঝি জিজ্ঞেস করল।

পাগলি তুই! আদিবাসীদের কোনো হরফ নেই। লেখ্য ভাষা নেই। মনে মনে ওদের ধর্ম-কর্ম, মিথোলজি, বিশ্বাস-অবিশ্বাস ভালো-মন্দ এমনি করেই বয়ে আসছে ওরা বংশ-পরম্পরাতে। তবে শুনেছি, আগেকার দিনের ইংরেজ আই-সি-এস অফিসার, ফরেস্ট সার্ভিসের অফিসার, এবং ইংরেজ ও জার্মান মিশনারিদের মধ্যে অনেকেই ওদের ভাষা, সংস্কার, সামাজিক রীতিনীতি, ধর্মীয় আচার-বিচার সম্বন্ধে অনেক সব প্রণিধানযোগ্য বই লিখে গেছেন।

তাই? ভারতের সব আদিবাসীদের বেলাতেই কি এক-ই নিয়ম?

তা আমি বলতে পারব না। আমি কতটুকুই বা জানি বল? আমি শুধু এদের কথাই বলতে পারি।

তারপর শিরীষ বলল, তোদের বাড়িতে যে-কাজের লোকটা আছে, ঝাণ্ডু, ফাগুয়া-বস্তিতে থাকে, ও-ও আদিবাসী। ওই এক-ই উপজাতির। সময় পেলে, ওর সঙ্গে বসে গল্প করিস। দেখবি, কত কী জানতে পাবি ওদের বিষয়ে। শিখতে পাবি। ওরাই তো এদেশের আদি ও অকৃত্রিম মানুষ!

আরে! এইটিই কি তোর সেই নীলা-ঝোরা?

হ্যাঁ, এইটিই।

বা:! বা:! পাথরগুলো কেমন রে। কত্ত বড়ো বড়ো। কুচকুচে কালো। দেখলেই ভয় করে। ঠিক ভয় নয়; কী যেন।

হ্যাঁ। এখন গরম বলেই জেগে রয়েছে, চ্যাটালো-চ্যাটালো বুক চিতিয়ে। বর্ষার সময়ে, যখন তোড়ে জল বয়ে যায়, এই নদী দিয়ে, তখন মনে হয় অগণ্য দাঁত বের করে রয়েছে নদীটা।

তাই?

হ্যাঁ। পালামৌ জেলাতে তো আছিস। ‘পালাম্যু’ শব্দটার মানে জানিস?

মানে, ওরিজিন?

না। কী? তুই জানিস?

জানি, মানে, একটা বইয়ে পড়েছিলাম। ‘পালামৌ’ শব্দটি আসলে একটি দ্রাবিড় শব্দ। এই ঝাণ্ডুদের পূর্বপুরুষেরা এসেছিল দক্ষিণ ভারত থেকে। পালাম্যু হচ্ছে ‘পল-আম্ম-উ’ এই তিনটি অক্ষরের সমষ্টি। মানে হল, ‘দাঁত বের করা নদী’।

ও হ্যাঁ, আমিও তো পড়েছি এইকথা, একটি উপন্যাসে। তবে যিনি লিখেছেন তিনি তো ঔপন্যাসিক। ‘নৃতত্ত্ব’ সম্বন্ধে উনি কী জানেন?

আমিও ওই বই থেকেই জেনেছি। তবে, তুই ঠিক-ই বলেছিস। বাংলা ভাষার ঔপন্যাসিক তো! এবং পশ্চিমবাংলার! গুল-গপ্পো চালিয়েছেন হয়তো! এসব কিন্তু তুই পশ্চিমি দেশের ঔপন্যাসিকদের মধ্যে কখনো পাবি না। তাঁরা উপন্যাস লেখেন যদিও, তবুও তা কত তথ্য-নির্ভর, বাস্তব। কত পড়াশুনো থাকে তাঁদের অনেকের-ই।

তা হতে পারে। কিন্তু উপন্যাসের মধ্যে বাস্তবের সঙ্গে কল্পনাও তো মিশিয়ে দিতে হয়। নইলে তো ইতিহাস, ভূগোল, নৃতত্ত্ব, পুরাতত্ত্ব সবকিছু-ই সাহিত্য হয়ে উঠতে পারত। হয় যে না, তার কারণ, একজন প্রকৃত ঔপন্যাসিক-ই জানেন কী করে বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার মিশেল দিতে হয়। সাহিত্যিক; তাই ঐতিহাসিক, ভূগোল-বিশারদ, নৃতত্ত্ববিদ এবং পুরাতত্ত্ববিদ সকলের-ই শ্রদ্ধার পাত্র। তাই নয় কি?

সেটা ঠিক। তবে একটু দাঁড়া। একটু জিরিয়ে নিই। হাঁফিয়ে গেছি।

তা ঠিক। চড়াইটা এখানে প্রায় পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি। দাঁড়াই একটু।

বিশ্রাম নেওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পরে, ওরা দু-জনে ওই প্রাচীন শিমুল গাছটিকে দেখে নিয়ে যখন শিরীষের বাবার ভগ্নপ্রায় এককালীন ডেরাতে গিয়ে পৌঁছোল তখন ওরা দু-জনেই ঘেমে-নেয়ে গেছে।

বোস এখানে, আরাম করে, ঝিঁঝি। বলল শিরীষ।

দেখ, এই পাথরটা আমার চেয়ার আর এইটা হচ্ছে টেবিল। এখানেই বসে বসে আমি কবিতা লিখি। ভাবি।

কার কথা ভাবিস?

তা তোকে বলব কেন? ভাবনা শুধু মনেই থাকে। তা প্রকাশ করে ফেললেই, মুখেই হোক, কী সাদা পাতায় কালি দিয়ে, তা আর নিজের থাকে না। সকলের হয়ে যায়। তাই আমার ভাবনা মনেই থাকুক।

ঝিঁঝি চেয়ে রইল শিরীষের চোখে। মুখে কিছু বলল না।

হাওয়াটা এখন আরও জোর হয়েছে। ঝরা-পাতারা রাতের শিশিরে সকালে ভিজে ছিল বলে তাদের গড়িয়ে যাওয়ার আওয়াজটা নরম ছিল। এখন পাতাগুলো রোদে শুকিয়ে খটখটে হয়ে যাওয়াতে মচমচ করে শব্দ হচ্ছে পাথরের ওপরে, পাথরের ঘষটানিতে। হাওয়াটা গরমও হচ্ছে আস্তে আস্তে। আর মাসখানেক পরে এই হাওয়ার-ই নাম হয়ে যাবে ‘লু’।

শিরীষ গদিতে বসেছিল গতকালের অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে। তবে তাড়াতাড়িই চলে যাবে কাজ শেষ করে।

বাজারে সবসময়েই একটা নৈর্ব্যক্তিক শোরগোল থাকেই। মিশ্র আওয়াজ। দূর সমুদ্রের চাপা গুমগুমানির মতো। অথচ কাছের-ই আওয়াজ। তার-ই মাঝে মাঝে পুনমচাঁদজির তিনকন্যার কোনো কন্যার চিকন নারীকন্ঠের স্বর সমুদ্রতটের কোনো একাকী সিগাল বা টার্ন বা স্যাডপাইপারের তীক্ষ্ণ, তীব্র, স্বল্পস্থায়ী চকিত আর্তির-ই মতো যেন সেই একঘেয়ে শোরগোল ছাপিয়ে কানে আসে। কিন্তু ভালো করে উৎকর্ণ হওয়ার আগেই আবার সেই ক্ষণিকের ব্যতিক্রম, একঘেয়েমির বোবা নিয়মে চাপা পড়ে যায়।

শিরীষের টেবল-এর ঠিক সামনেই একটা জানলা। যদিও গরাদ দেওয়া। সেই জানলা দিয়ে, চিনি, কেরোসিন এবং ভোজ্যতেলের হোলসেল ডিলার মেসার্স মুঙ্গিরাম চিরাঞ্জিলালের মুনিম পুনমচাঁদজির বাড়ির উঠোনটা দেখা যায়। উঠোনটা ন্যাড়া কিন্তু পেছনেই একটা বড়ো আমলকী গাছ আছে। ভেতরে আছে একটা জবা। এদিকে সব-ই বাজার-দোকান। গাছগাছালি বেশি নেইও। তাদের মানায়ও না এখানে। ময়দা, নানারকম ডাল, কেরোসিন ও সরষের তেল, দিশি ঘি, খোল এবং ভুসির মিশ্র গন্ধ বাতাসে ভুরভুর করে। কাজটাও, এই পরিবেশের-ই মতো। অত্যন্তই একঘেয়ে। ক্যাশবই লেখা, তাও পেটি-ক্যাশ। আর তার ভাউচার, ইন্টারন্যাল ডেবিট-নোটসুদ্ধু; নিজে হাতে তৈরি করা। পেটি-ক্যাশ বই ইমপ্রেস্ট সিস্টেম-এ রাখা হয়। মেইন ক্যাশিয়ার পনেরো হাজার করে ক্যাশ দেন। কলামনার পেটি-ক্যাশ বুকে প্রত্যেকটি অ্যাকাউন্ট হেড-এর নাম লেখা থাকে। কিছু অ্যাকাউন্ট অবশ্য আছে যা কনসলিডিটেড। যেমন, জেনারেল চার্জেস, পোস্টেজ অ্যাণ্ড স্টেশনারি ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রতিকলামে প্রতিটি খরচ পোস্টিং করে সপ্তাহান্তের টোটাল টেনে জেনারেল লেজারেও সেই অ্যাকাউন্টে পোস্টিং করে দিতে হয় শিরীষকেই।

যেমন বিদ্যা তার, তেমন-ই কাজ। এবং তেমন-ই মাইনে। তবে শিরীষ বি. কম.-এর পরে আর পড়াশুনা করেনি বলেই যে, তার জীবন বৃথা হয়ে গেছে এমন কথা সে কখনোই বিশ্বাস করেনি। শুধুমাত্রই বি.কম. হলেও অ্যাকাউন্ট্যান্সিটা সে, যেকোনো চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের মতোই জানে। অনেক পাশ-করা অ্যাকাউন্ট্যান্ট দেখেছে ও, মামুলি জার্নাল-এন্ট্রি পাশ করতে যাঁদের কালঘাম ছুটে যায়। স্পাইসার পেগলার বা পিকলস বা অন্য দিশি অ্যাকাউন্ট্যান্টদের বই মুখস্থ করে তিনঘণ্টায় ছ-খানি ব্যালান্স শিট মিলিয়ে দিয়ে যাঁরা ছাপটা পান। কিন্তু অ্যাকাউন্ট্যান্সি জানেন না। অথচ অ্যাকাউন্ট্যান্সির মতো সহজ সাধারণ-বুদ্ধির বিজ্ঞান কম-ই আছে।

তবে এখনকার সময়ের পরীক্ষা অনেক কঠিন হয়ে গেছে বলে শুনেছে। একে বিজ্ঞান না বলে শিরীষের ইচ্ছে করে ‘দর্শন’ বলতে। জীবনের সব ক্ষেত্রেই অ্যাকাউন্ট্যান্সির অন্তর্নিহিত মূল সত্যর মতো সত্য আর কিছু-ই নেই। একটি ডেবিট হলে একটি ক্রেডিট হয় বা দিতে হয়। কষ্ট করলে, কেষ্ট মেলে। ভালোবাসলে, ভালোবাসা পাওয়া যায়, নিজে সুখী হতে হলে প্রায়শ-ই অন্যকে দুঃখ দিতে হয়।

জীবনে অ্যাকাউন্ট্যান্সির মতো সত্য গার্হস্থ্য-বিজ্ঞানও আর দু-টি নেই বোধ হয়।

শিক্ষাব্যবস্থার ওপরে শিরীষের বিন্দুমাত্রও হাত থাকলে এদেশের ছেলে-মেয়েকে, বিশেষ করে মেয়েদের, স্কুলের নীচুতলাতেই এলিমেন্টারি অ্যাকাউন্ট্যান্সি শেখাবার বন্দোবস্ত করত ও। ভারতের মতো গরিব দেশে, সুযোগহীন দেশে, যদি প্রত্যেক ছেলে-মেয়েই নিজের মাতৃভাষা আর ইংরিজিটা মোটামুটি লিখতে-পড়তে পারত আর এলিমেন্টারি অ্যাকাউন্ট্যান্সি জানত তাহলেই তাদের হিল্লে হতে পারত। আজকের দিনেও ক-জন ভারতীয় ছেলে-মেয়ে বি. এ. বা বি.এস.-সি. পর্যন্ত পড়াশুনো চালাতে পারে? চালাতে যদিও-বা পারে, তারা কী শেখে? কতটুকু শেখে? যা, তাদের জীবনে প্রকৃত কাজে আসে? ক-জন কম্পিউটার-ট্রেনিং নিতে পারে? নিতে পারলেও ক-জন চাকরি পায়? পেলেও, তারা সমাজের কত ভাগ? কত পার্সেন্ট?

শিরীষ বাংলা, ইংরিজিতে অত্যন্ত ভালো, ছেলেবেলা থেকেই। কিন্তু অঙ্কে কাঁচা। সাহিত্য ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে ওর বিশেষ উৎসাহ নেই। ইতিহাস এবং ভূগোল অবশ্য ব্যতিক্রম। ফলে, পরীক্ষার ফল সে, কোনোদিন-ই ভালো করেনি। তাই সে ব্যর্থ। ছাত্র হিসেবে, দিশি শিক্ষাব্যবস্থাতে।

বি. কম. পড়তে বলেছিলেন বাবাই, জোর করে। যদি চাকরি জুটে যায়, সেইজন্যে।

‘অ্যাকাউন্ট্যান্সি’ ব্যাপারটা ওর খারাপ লাগেনি কিন্তু সব অ্যাকাউন্ট্যান্সি পরীক্ষার বেলাতেই একটা গাধামি আছে বলে মনে হয় ওর। সেটা যাঁরা সিলেবাস নির্বাচন করেন এবং প্রশ্নপত্রও লেখেন তাঁদের কোনো গূঢ় উদ্দেশ্যসাধনের জন্যে কি না তা, ও বলতে পারে না কিন্তু ‘সি. এ.’ পরীক্ষাতেও যখন তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় ইনশিয়োরেন্স, ব্যাঙ্ক, হোল্ডিং কোম্পানি (যখন ছিল), লিমিটেড লায়াবিলিটির নানারকম সাধারণ কোম্পানির ব্যালান্সশিট তৈরি করতে হয়, তাকে কেরানি বৃত্তির চরমতর উদাহরণের পরাকাষ্ঠা বলেই শিরীষের মনে হয় চিরদিন, মেধা বা বুদ্ধির পরীক্ষা বলে কোনোদিনও মনে হয়নি। এও হতে পারে যে, যাঁরা এইসব পেশায় জাঁকিয়ে বসে নিজেদের আসন ও অর্থনৈতিক বুনিয়াদ সুরক্ষিত করে রেখেছেন তাঁরা চান না যে, এইসব পেশাতে বেশি প্রতিযোগীরা আসুন। এলে, তাঁদের ভাতে কম পড়লেও পড়তে পারে। এসব শিরীষের-ই ধারণা। যে-ছেলে বি.কম. পরীক্ষায় কোনোমতে পাশ করেছে তার মুখে এসব কথা মানায় না।

তবুও এসব কথা ওর অনেক বি.এ. পাশ এবং সি. এ.-ফেল বন্ধুদের মুখেই ও শুনেছে। এবং শুনে, তাদের সাপোর্ট করেছে।

শিরীষের কোনোদিনও অর্থনৈতিক সাফল্যকে প্রকৃত ‘সাফল্য’ বলে মনে হয়নি। তবুও ওর ধারণা যে, যাঁরা প্রকৃতই কৃতী, তাঁদের প্রতিযোগীর সংখ্যা কম না বেশি, তাতে কিছুমাত্রই এসে যায় না। তাঁরা সবার আগেই থাকেন। কিন্তু যাঁদের নিজেদের সম্বন্ধে ‘প্রত্যয়’ নেই, বিশ্বাস নেই নিজেদের যোগ্যতাতে; জীবনের সবক্ষেত্রেই তাঁরাই এমন সব নেতিবাচক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাজার হাজার স্বপ্নদেখা তরুণের স্বপ্ন, তাদের মা-বাবার আশা, ধূলিসাৎ করে দেন হয়তো, তাঁদের নিজেদের মুখের গ্রাসের পরিমাণ যাতে ছোটো না হয়ে যায়, সেই চিন্তায়। এই পুরো দৃষ্টিভঙ্গিটাই ভুল। অন্যায়। কিন্তু শিরীষের কী ক্ষমতা? সে তো এদেশের লক্ষ লক্ষ সাধারণ বি.কম পাশ মুহুরিগিরি করিয়েদের-ই একজন।

পুনমচাঁদবাবুর তিনটে মেয়ে। মেয়েরা কেউ যে দেখতে ডানাকাটা-পরি তা একেবারেই নয়, তাঁর স্ত্রীও মারা গেছেন গতবছর তিনদিনের জ্বরে। মেয়েরাই রাঁধে, বাড়ে, আচার বানায়, পাঁপর বানায়, কাপড় কাচে, ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে, চুল বাঁধে উঠোনে রোদের মধ্যে, সামনে দেওয়াল-আয়না নিয়ে বসে। বাড়িতে সম্ভবত একটিই আয়না। আয়না নিয়ে তাই কন্যাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যায়।

পুনমচাঁদজি-ই একদিন শিরীষকে ডেকে বলেছিলেন, তাঁর বড়োমেয়ে গুঞ্জনকে একটু লেখাপড়া শেখাতে। ওরা কেউ-ই লেখাপড়া জানে না। তাই সপ্তাহে দু-দিন শিরীষ গুঞ্জনকে সামান্য ইংরিজি ও অ্যাকাউন্ট্যান্সি পড়ায়। অ্যাকাউন্ট্যান্সি শেখানোতে অবশ্য ভীষণ আপত্তি ছিল পুনমচাঁদজির। বলেছিলেন, আমার মেয়ে তো আর চাকরি করবে না। দু-একটা ইংরিজি শব্দ বলতে পারলে লোকে বলবে মেয়ে আমার ‘এক্সপার্ট’ আছে।

দোষ কী চাকরি করলে?

আমাদের সমাজে মেয়েরা চাকরি করে না। চাকরি-করা মেয়েকে কেউ বিয়েই করবে না। মেয়েরা ঘর সামলাবে, বাচ্চার মা হবে, যা তাদের কাজ। বড়ি দেবে, আচার বানাবে, রোজগেরে স্বামীর দেখভাল করবে। আবার কী? বিয়ে দিতে হবে। তিন মেয়ের-ই বিয়ের বয়েস হয়ে গেছে। গুঞ্জনের বয়স তো প্রায় ঝিঁঝিদিদির মতো।

তবে দিচ্ছেন না কেন বিয়ে?

হা:।

বড়ো করুণ হাসি হেসেছিলেন পুনমচাঁদজি।

বলেছিলেন, শিষবাবু, (শিরীষকে ‘শিষবাবু’ বলেই ডাকেন পুনমচাঁদজি) আমাদের সমাজে একটি মেয়ের বিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকা লাগে, জানেন কি? আর আপনাদের তো ধারণা মাড়োয়ারিমাত্রই বড়োলোক। আমাদের সমাজে যা গরিবি, যা বঞ্চনা, যা অত্যাচার সে-সম্বন্ধে কোনো ধারণই করতে পারবেন না আপনারা।

পাঁচ লাখ টাকা! বলেন কী?

শিরীষ অবাক হয়ে বলেছিল।

জি হাঁ। নইলে আর বললাম কী! আমার যদি একটা বড়োছেলে থাকত তবে রোজগার তো সে করতই তার ওপরে তার বিয়ে দিয়ে যে-টাকা পেতাম তা দিয়ে, অন্তত একটা মেয়ে পার করতে পারতাম। রামজি সে কৃপাও করলেন না আমাকে। মওত-এর পর মুখে আগ দেবার জন্যে ভি কেউ রইল না। বোংশো রোক্ষা হল না।

আপনি এত টাকা পাবেন কোথা থেকে?

রামজি-ই জুগিয়ে দেবেন। আমি কোথা থেকে পাব? একটা ছেলে পেয়েও ছিলাম। মেয়ের বিয়ের কথা শেঠকে বলেছিলাম। আসলে বলছি, গোতো পাঁচ বসর থেকেই। শেঠ বললেন, তিনি নিম-করৌঞ্জের একটা তেলকল আর চুনের ভাঁটি করবেন সেই চক্করে টাকার বড়োই টান চলেছে। আমার স্ত্রী তো মেয়েদের চিন্তা করতে-করতেই চলিয়ে গেলেন। আমি যে, কী করব তা রামজি-ই জানেন!

আপনার মতো সাধারণ অবস্থার মানুষের মেয়ের বিয়েতেও অত টাকা লাগবে? এ যে, ভাবাই যায় না।

পাঁচ লাখ না হলেও দু-তিন করে তো লাগবে! আমাদের সমাজে ‘টাকা’-ই একমাত্র জিনিস শিষবাবু, যা মান, সম্ভ্রম, খাতির, প্রতিপত্তি সব এনে দেয়। টাকাই ইজ্জত। আপনাদের মতো নয় আমাদের সমাজ। আমরা শুধুমাত্র গণেশজি আর লক্ষ্মীজির-ই পূজারি।

হয়তো সেকারণেই ওই দুই দেবদেবী আমাদের কলা দেখিয়ে আপনাদের-ই কুক্ষিগত হয়ে আছেন।

তা হতে পারে। তা ছাড়া, আমাদের মতো খাটতে তো পারবেন না আপনারা। আপনারা একটু ফাঁকিবাজ আছেন। তবে আপনারা কবিতা লেখেন, গান করেন, ছবি আঁকেন, সোরোস্বোতীর সেবা করেন। আর চাঁদিই হল আমাদের কবিতা, গান, ছবি; সব।

আপনারাই তো এখন বিহার-ওড়িশার মালিক বনে গেছেন শুধুমাত্র টাকা এবং উদ্যোগের জোরে। ‘ডি-ফ্যাকটো’ রুলার। বাংলার তো বটেই!

ছি: ছি:।

দু-কানে দু-হাত ছুঁইয়ে পুনমচাঁদজি বলেছিলেন, উসোব বলবেন না। আপনাদের অনেক গুণ আছে, যা আমাদের নেই। আপনাদের সমাজে অনেক বিয়ে-ই পণ ছাড়া হয়। শিক্ষার গুণেই এটা হয়। আমাদের সমাজে যতই শিক্ষা থাকুক, টাকা ছাড়া মেয়ের বিয়ে কখনোই হয় না।

শিরীষ বলেছিল, আপনি এই গর্তে বাস করেন বলেই এমন ভাবছেন, এ-কথা ঠিক নয়। এখন শিক্ষাতেও তো আপনারা আমাদের পেছনে ফেলে দিয়েছেন। শুধু ব্যবসায়ী নন, ইণ্ডাস্ট্রির মালিক-ই নন, ডাক্তার-এঞ্জিনিয়ার, সলিসিটর, উকিল, সব-ই তো এখন হচ্ছেন আপনারা এবং আমাদের চেয়ে ভালোই হচ্ছেন। যে-সমাজে টাকার জোর আছে ওইসব কাজে তাঁরা অগ্রাধিকারো পান সহজে।

ছোড়েন শিষবাবু উসোব বড়ো বড়ো কথা। আমি শুধু আমার কথাই জানি। চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না শিষবাবু। কী বলব আপনাকে।

গুঞ্জন আর তার দু-টি বোন কিন্তু ভারি ভালো। তাদের যৌবন আছে, খিদে আছে, লোভ আছে, আনন্দর সাধ আছে, কাম আছে, এসব তাদের চোখ দেখেই বুঝতে পারে শিরীষ। থাকাই তো স্বাভাবিক! অন্য দশজনের যা আছে, ওদেরও তা তো থাকবেই। অথচ ওদের কোনো প্রয়োজনের বা চাহিদার নিবৃত্তির কোনোই বন্দোবস্ত নেই। পেটের খিদেটা মোটামুটি মেটে। পরনের পোশাকও অতিমোটামুটি। কোনো বাহুল্যর কথাই ওঠে না। কিন্তু অন্য কোনোকিছুই....।

প্রতিবছরেই শরতে আমলকী গাছটার পাতা ঝরে, ঝুরঝুর হাওয়ায়। আবারও পাতা আসে। চকচক করে নতুন সেই পাতারা শীতের রোদে। রোদ চমকায় তাদের মসৃণ গা থেকে। আবারও ফল ফলে। কিন্তু গুঞ্জন আর তার বোনেরা প্রতিবছর পাতা ঝরিয়েই আছে শুধু। কোনো নতুন চিকন পাতাতেই তাদের শরীর-মন নতুনত্ব পায় না। পাচ্ছে না। তাদের কচি সতেজ মনগুলি টাঁড়ের মধ্যের বাজ-পড়া শিমুল গাছের-ই মতো দু-পাশে হাত ছড়িয়ে ‘হা-হা’ করে ঠাঠা-রোদে, ঝড়ে-জলে দাঁড়িয়ে থাকে। প্রাণের কোনো সম্ভাবনাই আর নিহিত নেই বলে মনে হয় তাদের মধ্যে। তারা যেন, মৃতের চেয়েও মৃত। অথচ প্রশ্বাস নেয় এবং নিশ্বাসও ফেলে।

পেটি-ক্যাশ-এর ভাউচার লিখতে লিখতে অনবধানে চোখ ওদিকে চলে গেলেই শিরীষ ওই তিনকন্যার কথা ভাবে। কী হবে মেয়েগুলোর?

পুনমচাঁদজি মুনিমজি। মুঙ্গিরাম তাঁর শেয়ার বেচে দিয়ে রাঁচিতে, ময়দাকল খুলেছেন। চিরাঞ্জিলাল মালিক এখন। শেঠ চিরাঞ্জিলালের একনম্বরের দু-নম্বরের সব হিসাব-ই পুনমচাঁদজির নখদর্পণে। তাঁর-ই কোমরে থাকে লোহার মস্ত সিন্দুকের চাবির গোছা। ‘চাব’ কোম্পানির। ব্রিটিশ আমলের। সে-আলমারি উঠিয়ে নিয়ে যেতে কুড়ি-পঁচিশজন মানুষ লাগবে। তা ছাড়া, তা গাঁথাও আছে সিমেন্ট দিয়ে, গদিঘরের পাকা-দেওয়ালের সঙ্গে। তাতে কত যে, টাকা থাকে! একদিন দেখেছিল শিরীষ। পাঁচ-শো টাকার নোটগুলো ফিনফিনে। সবজে সবজে। এক-একটা নোটের বাণ্ডিলে পঞ্চাশ হাজার টাকা। গোটা-দুই বাণ্ডিল অবহেলায় জিনের প্যান্টের দু-টি হিপ-পকেটে ফেলে রাখা যায়। এক লক্ষ টাকা! একজন গড়পড়তা ভারতীয়র সারাজীবনের উপার্জনের চেয়েও বেশি। পুনমচাঁদজি, শেঠ চিরাঞ্জিলালের নির্দেশে ওইসব লক্ষ লক্ষ টাকা কত সহজে নাড়েন-চাড়েন, শেঠকে হিসেব দেন, চাষিদের দাদন দেন, ফরোয়ার্ড পারচেজ করেন। গেঁহু, বাজরা, মকাই ধান, অড়হর, সরগুজা, কিতারী, সরষু ইত্যাদি।

মধ্যপ্রদেশের কোনো জঙ্গলে যেন, কিছুদিন হল মার্বেল পাহাড়ের ইজারা নিয়েছেন শেঠ। তাই প্রায়-ই তাঁকে সেখানে যেতে হয়। শেঠ-এর বড়োছেলে পবন দিল্লিতে পড়াশুনো শেষ করে আসছে। এসে যাবে আর দিন দশেকের মধ্যেই। সে জে.এন.ইউ. থেকে ইকনমিক্স-এ বি.এ. করেছে। তারপর কম্পিউটার কোর্সও শেষ করেছে। সে-ই এসে মার্বেল এক্সপোর্ট-এর ব্যাবসা চালু করবে। পবন-এর প্রত্যাবর্তন নিয়ে মুঙ্গিরাম চিরাঞ্জিলালের পুরো প্রতিষ্ঠানে সাজ-সাজ রব পড়ে গেছে। পবনের বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে পাটনার বড়োশেঠ বোকালিয়ার বাড়িতে। এক শরিকের একমাত্র মেয়ের সঙ্গে। সে যে কী পেল্লায় ব্যাপার হবে তার-ই জল্পনা-কল্পনা চলছে বহুদিন হল। পবন নাকি এখানে রিফ্যাক্টরি কারখানাও খুলবে। বিহার ফিনানশিয়াল কর্পোরেশন-এর সঙ্গে কথাবার্তাও হয়েছে। চাঁদোয়া-টোড়ির দিকে টাঁড়ের মধ্যে পঞ্চাশ একর জমিও কেনা হয়ে গেছে। এখন যেখানে ফাঁকা টাঁড়, ঝাঁটিজঙ্গল, ঝোপঝাড়, মধ্যে মধ্যে খোয়াই আর ক-টি প্রাচীন মহুয়া, সেখানেই অচিরে গড়ে উঠবে ফ্যাক্টরি, রিফ্যাক্টরির। চিমনি উঠবে টেরাকোটা রঙের। ইটও তৈরি হবে নানারকম টেরাকোটা শেড-এর। কুলি-লাইন বসবে। দোকান-বাজার ধাবা, ভাঁটিখানা, ধোপা, নাপিত। পেটের-তলার ধন-ভাঙিয়ে খাওয়া মেয়েছেলের ঘর। মানে, যেসব নইলে কোনো ইণ্ডাস্ট্রিই সম্পূর্ণতা পায় না, তার সব-ই থাকবে সেখানে। ম্যানেজারের ফুলের কেয়ারি-করা লনঅলা বাংলো, তার চেয়েও সরেস ডিরেক্টরস বাংলো। বাবুদের ঘুপচি, আলো-হাওয়া-হীন এলা-রং-করা মনমরা, ম্লান কোয়ার্টার। আর খাপরার চালের কুলি-লাইন। দারিদ্র্য, মাতলামি, চিৎকার, অশ্লীলতা; এই সব কিছুই হবে। শিল্পপ্রসূত।

সব-ই দেখতে পায় মনের চোখে শিরীষ। শিরীষ অনেক ভেবে-টেবে শেঠের কাছে একদিন আর্জিও জানিয়েছে যে, কারখানা যখন হবে তখন রিফ্যাক্টরির কাছে একটি পান-বিড়ির দোকান দেবে ও। হিসেব করে দেখেছেও ও যে, যে-কোনো ব্যাবসাই চাকরির চেয়ে ভালো। কলকাতায় থাকাকালীন ওর দৃঢ় প্রত্যয় হয়েছে যে, ওর এক বন্ধুর সামান্য-শিক্ষিত জামাইবাবু আলুর চপ-এর দোকান দিয়ে তাঁর অন্যান্য ইঞ্জিনিয়র, ডাক্তার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট ভায়রা-ভায়েদের চেয়ে অনেক বেশি রোজগার করছেন। তাও ছুটির দিন ছাড়া সকালে দোকান খোলেন-ই না। অন্যদিন বিকেলে ৪-টে থেকে রাত ৮টা। মানুষ, সাইকেল, গাড়ির লাইন লেগে থাকে দোকান খোলার আগে থেকেই।

অঢেল টাকা, ট্যাক্স-না-দেওয়া। আর টাকার চেয়ে বড়ো কৌলীন্য আজ বাঙালি সমাজেও বা কী আছে? পুনমচাঁদজি জানেন না যে, সরস্বতীকে ছেড়ে লক্ষ্মীর মন পেতে গিয়ে বাঙালি না পেয়েছে লক্ষ্মীকে, আর হারিয়ে ফেলেছে সরস্বতীকেও। মাড়োয়ারি সমাজের কাছাকাছি এসে গেছে নব্যমানসিকতাতে। শেঠ, পানের দোকানের জন্যেও সেলামি চেয়েছেন পনেরো হাজার। নইলে প্রস্তাব দিয়েছেন ওর বাড়িটা যদি শেঠকে লিখে দিতে পারে তাহলে খুব ভালো জায়গাতে দোকানঘর নিজেই বানিয়ে দেবেন উনি। সব-ই লেন-দেনের ব্যাপার। যেমন দেবেন, তেমন নেবেন।

তারপর হেসে বলেছিলেন, ‘যা কাজ করছেন, তাই করুন। যা আপনাদের কাজ। কেরানিগিরি। বেওসাই যদি বাঙালিরা করতে জানত, তবে কি কলকাতার মালিক হইয়ে যেতাম আমরা?’

কথাটা শোনার পর থেকেই দোনামনা করছে শিরীষ। তা ছাড়া মা-বাবার স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি। স্টেশনও বেশি দূরে নয়। পরে এর দাম-ই কত হয়ে যাবে। বাড়ি-জমির দাম কখনোই পড়ে না। সোনার দামের মতো। তা ছাড়া যদি কোনোদিন কোনো দৈব-দুর্বিপাকে ওরও মতিভ্রম হয় বিয়ে করার তখন ও থাকবে কোথায় বউ নিয়ে? রিফ্যাক্টরির কারখানায় পানের দোকানে?

কত কিছু ভাবনা আসে-যায় মাথার মধ্যে। হাত দুটো কাজ করে যায়। ট্রাক-হায়ার ডেবিট, কুলি চার্জেস-লোডিং-আনলোডিং-এক্সপেনসেস, ট্রাভেলিং এক্সপেনসেস। ‘স্টাফ-ওয়েলফেয়ার’ ডেবিট অর্থাৎ অফিসের কর্মচারীদের জন্যে জুগনুর দোকানের ভাঁড়ের চা, দিনে দু-বার। আর কিছু নয়।

তার-ই গালভরা নাম ‘স্টাফ-ওয়েলফেয়ার এক্সপেনসেস’।

শেঠ-এর নতুন বাড়ি বানাচ্ছে জিউপ্রসাদ আগরওয়াল। রাঁচির রাতু রোডের ছোকরা কনট্রাক্টর। সে গতবছরে এক বর্ষার দিনে গদিতে শেঠ-এর সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভুলে ছাতাটা ফেলে গেছিল। শেঠ শিরীষকে দিয়েই সেই ছাতা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন রাঁচিতে। রাঁচিতে শেঠ-এর অন্য অনেক-ই কাজ নিয়েও গিয়েছিল শিরীষ। তবু সেদিনের যাতায়াতের বাসভাড়াটা শেঠ, ঠিকাদার জিউপ্রসাদের নামেই ডেবিট করে দিতে বলেছিলেন। অর্থাৎ তার পাওনা থেকে ওই টাকাটা কাটা যাবে, যা ছাতার দামের প্রায় সমান-ই।

একেই বলে ডেবিট আর ক্রেডিট।

এমনিতে বাইরে থেকে দর্শন হিসেবে দেখলে অ্যাকাউন্ট্যান্সির মতো মহান দর্শন খুব কম-ই আছে কিন্তু গভীরে ঢুকে পড়ে দেখতে গেলে যখন এইসব ময়লা-কুচলা বেরিয়ে পড়ে তখন মন ভারি খারাপ করে দেয়। মনে বলে, এখনও যাদের কোনো পদার্থ আছে; তাদের।

পবন, মুঙ্গিরাম চিরাঞ্জিলালের প্রিন্স অফ ওয়েলস, একমাত্র ছেলে, যে মনোয়া-মিলনে আসছে, এ-নিয়ে শিরীষের পরিচিতর বৃত্তে সবচেয়ে বেশি উত্তেজিত পুনমচাঁদজির কন্যারাই। বিশেষ করে গুঞ্জন। এ-কারণেই সপ্তাহ দুই হল গুঞ্জনের পড়াশুনোতে কোনোই মন নেই। পবন কেমন দেখতে? লম্বা না বেঁটে? সজ্জন না দুর্জন? ফর্সা না কালো? এইসব প্রশ্নই তার একমাত্র প্রশ্ন এবং অন্য বোনেরা নীরবে সেইসব প্রশ্নকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে তাদের চোখের আলোতে।

শেঠ বোকালিয়ার বাড়ির মেয়েটিই-বা কেমন দেখতে? তার সঙ্গে পল্লবী যোশীর বেশি মিল না মাধুরী দীক্ষিতের? এইসব প্রশ্নই করছে নানাজনকে ওরা সবসময়। কতদূর পড়াশোনা করেছে সে মেয়ে?

গুঞ্জনেরা যে-জ্ঞান চায়, সেই জ্ঞান শিরীষের কাছে নেই। শিরীষের টি.ভি. নেই। কেনার সামর্থ্যও নেই। টি.ভি. দেখতে তার ভালো লাগে না। তার ধারণা, টি.ভি.র নেশা একবার ধরে গেলে মানুষের চিন্তাশক্তি এবং কল্পনাশক্তি একেবারে শেষ হয়ে যায়। টি.ভি.র ছোঁয়াচ তাই ও বাঁচিয়েই চলে। এবং চলে বলেই, গুঞ্জনের প্রশ্নর একটা উত্তরও তার ঝুলিতে থাকে না।

গুঞ্জন ডান হাতের পাঁচটি আঙুল নেড়ে তাকে সামারিলি ডিসমিস করে দিয়ে বলে, ‘আপ একদম বেকামকা আদমি হ্যায় শিসবাবু’। অজীব আদমি হ্যায় আপ। সাচমুচ।

এই ‘সাচমুচ’ শব্দটি এমন করে উচ্চারণ করে গুঞ্জন যে, শিরীষের মনে গুঞ্জনের বুকের মধ্যে তো বটেই, শিরীষেরও বুকের মধ্যে ভুজিয়ার মতো, ভাজা পাঁপরের মতো, কুড়কুড়ে, CRISP কোনো মুচমুচে বোধ, বোধ হয় শব্দ করে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে।

কী, কখন, কোথায়, কেন, কবে? কোন মানুষের বুকের মধ্যে যে ভাঙে, গুঁড়োয়, শব্দ করে অথবা নি:শব্দে; তা সেই মানুষ-ই পূর্বমুহূর্তে জানতে পারে না, তা জানবে কী করে!

পোস্টিং করতে করতে আর ভাউচার লিখতে লিখতে শিরীষ ভাবে যে, শেঠ চিরাঞ্জিলালের ছেলে পবন যেন, প্রিন্স চার্লস। কোন ডায়নার সঙ্গে প্রিন্স চার্লস-এর বিয়ে হবে এই জল্পনা-কল্পনা ও স্বপ্নে পৃথিবীর কোটি কোটি মেয়ে যেমন উত্তেজিত ছিল একসময়ে, তেমন-ই উত্তেজিত থাকে সবসময়েই এখন গুঞ্জন এবং তার বোনেরাও।

যাচ্ছিস কোথায়?

স্টেশানে।

কেন? কেউ আসবেন বুঝি? কিন্তু এখন তো কোনো ট্রেন নেই। এই অসময়ে?

সাইকেল থেকে নেমে পড়ল ঝিঁঝি। লেডিস সাইকেল থেকে। মনোয়া-মিলনেও অধিকাংশর-ই বাহন সাইকেল। আমেরিকায় যেমন গাড়ি। শহরে পা।

ওর কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমেছিল। নাকটা তেলেতেলে। একটুতেই ঘেমে ওঠে নাক। মাথায় একটা তালপাতার টোকা। মাথার দু-পাশ দিয়ে কোমর-সমান চুল নেমে এসেছে। সদ্যস্নাতা। এই ছোটো, প্রায় গ্রাম-সদৃশ ‘মনোয়া-মিলন’ জায়গাটাতে এখনও মেয়েদের মধ্যে চুল-কাটার মহামারিটা এসে পৌঁছোয়নি। রোদে চকচক করছে কোমর-সমান চুল। সুগন্ধি তেলের বাস উড়ছে বাতাসে। এখন চৈত্রমাস।

গতবছর পৌষমেলাতে মণিমাসিদের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে গেছিল ঝিঁঝি। তখন-ই কিনে নিয়ে এসেছিল টোকাটা। এদিকে তালগাছ নেই-ই বলতে গেলে। ‘টোকা’ বানাতে কেউ জানেও না। তাই স্থানীয় মানুষেরা অবাক হয়ে চেয়ে দেখে টোকাটাকে।

এখনও তো গরম পড়েনি। এরইমধ্যে মাথায় টোকা চড়িয়েছিস যে? তা ছাড়া, তুই তো টেকোও নোস।

শিরীষ, উত্তর পাক আর নাই-ই পাক, প্রশ্নই করে চলল ঝিঁঝিকে লাগাতার।

শিরীষ অমন-ই ছটফটে। অধৈর্য। আয়নাতে নিজের মুখ দেখা ওর স্বভাব নয়। ওর চেহারা এবং ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন অন্য চোখে বা অন্য মনে পড়ল কী পড়ল না, তা নিয়েও কোনোদিন কোনো মাথাব্যথা ছিল না ওর। ও নিজের ছন্দে, নিজের লয়ে, নিজের তালে চলে। কে কী বলল ওকে, কে কী ভাবল; তা নিয়ে ওর কোনোদিনও কোনো মাথাব্যথা নেই। নদীর মতো ওর চলা। কারো ডাকে বা কারো মানাতে কান দেওয়া বা থেমে যাওয়া ওর চরিত্রে আদৌ নেই।

জল খাবি? তোর কালো মুখটা তেতে বেগুনি হয়ে গেছে।

না:। সবাই তো তোর মতো ফর্সা নয়। ফর্সা মানে জানিস? ফর্সা মানে, রংহীনতা। আমি কালো। বেশ ভালো।

ঝিঁঝি সাইকেলে উঠবে বলে দু-হ্যাণ্ডেলে দু-হাত রেখে ডান প্যাডলে পা রাখবে বলে ডান পা-টি তুলল।

কী রে! উত্তর দিলি না তো আমার কথার। কেউ কি আসবেন? স্টেশনে যাচ্ছিস যে!

এই সময়ে কি কোনো ট্রেন আসে?

ঝিঁঝি বলল উলটে; শিরীষের প্রশ্নর উত্তর না দিয়ে।

না, তা নয়। তবে ঝিঁঝি ব্যানার্জি যদি স্টেশনে গিয়ে দাঁড়ায় তবে, শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস পর্যন্ত অ্যাটেনশানে দাঁড়িয়ে যাবে। ‘ঝিঁঝি-হল্ট’। এই লাইনের একটা স্টেশনের নাম একসময়ে ছিল ‘আণ্ডা-হল্ট’। তা কি জানিস? মনোয়া-মিলনের নামও না-হয় হয়ে যাবে ‘‘ঝিঁঝি-হল্ট’’।

কেন?

প্রশ্ন করার সঙ্গে-সঙ্গেই ঝিঁঝির দু-টি ভ্রূ, ভঙ্গিভরে বেঁকে উঠে ধনুকের মতো হয়ে গেল। শিরীষের দু-চোখ টায়ে টায়ে রেখে ও বলল, একথার মানে?

মানে আবার কী? তুই তো একজন ভি. আই. পি.। তাই বললাম।

তুই সবসময়ে ওরকম বাঁকা বাঁকা কথা বলবি না তো। তুই আমার সঙ্গে একেবারে কথা না বললেই খুশি হব।

তোকে খুশি অথবা দুঃখী করতে আমার বয়েই গেছে! কেন যাচ্ছিস তা যখন বলবিই না তাহলে চল আমিও তোর সঙ্গে যাই। ব্যাপারটা ‘ইনভেট্টিগেট’ করে আসি। ‘ইনভেট্টিগেট’ শব্দটাও ও জগাদার মতো করেই উচ্চারণ করল।

ইচ্ছে করেই।

ঝিঁঝি সাইকেলে উঠে, প্যাডল করা শুরু করল এবং তার কিছু বলার আগেই সামনের সেগুন গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে-রাখা ওর সাইকেলটা টেনে নিয়েই তাতে চড়ে বসল শিরীষ। তারপর ঝিঁঝির পাশে পাশে ধীরে ধীরে প্যাডল করতে করতে বলল, তুই তো জানিস-ই; ঝিঁঝি’স উইশ ইজ আ কম্যাণ্ড টু মি!

ঝিঁঝি বলল, ইনকুইজিটিভনেস ভালো, সেটা অবশ্যই স্বাস্থ্যকর ব্যাপার। কিন্তু বাড়াবাড়ি রকমের ইনকুইজিটিভনেসটা ভালো নয়। সেটা একটা রোগ। পারভার্শান। বুঝেছিস?

হবে হয়তো। কিন্তু কী করা যাবে। মানুষ তো আর নাট-বল্টু নয় যে, হুবহু একইরকম হবে। আমি ওইরকম-ই। বল না, কেন যাচ্ছিস স্টেশনে? অসময়ে?

তুই সত্যিই অসহ্য।

তোর ব্যাপারটাও অসহ্য।

শোন তাহলে। যাচ্ছি, পেঁপে পাওয়া যায় কি না প্ল্যাটফর্মে, তাই খোঁজ করতে, ন্যান্সিমণির কাছে। তুই কি এরপরও পিছু পিছু আসবি ‘ইনভেট্টিগেট’ করতে?

পেঁপে? হায় আল্লা। আমি তো পৃথিবীর সব সেরা সুন্দরীর জন্যেও এমন হন্যে হয়ে কোথাও যেতাম না। আর তুই পেঁপে...। সত্যি! কী অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স!

জানার পরও পিছু ছাড়লি না! তোর স্বভাবটাও তোর কালু কুকুরের-ই মতো হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। সবসময়েই যাকে দেখবি তার-ই পিছু পিছু যাওয়া চাই।

তা কী করব? তুই যে, আমার মালকিন! তা ছাড়া ‘পেঁপে’ বলেই কি তাচ্ছিল্য করা যায়? পেঁপে থেকে কী বেরোয়, তা কে বলতে পারে?

মানে?

মানে, কেঁচো খুঁড়তে সাপের-ই মতো ব্যাপার আর কী! তা হঠাৎ পেঁপের এমন ডিম্যাণ্ড? পলাশ গঞ্জুর বাড়ির উঠোনের গাছেই তো পেতিস। পেঁপেগাছ, মনোয়া-মিলনের কার বাড়িতে নেই? সব বাড়িতেই আছে। শুধু আমাদের বাড়ি ছাড়া। আমাদের বাড়িটা অবশ্য বাড়ির মধ্যেও গণ্যও নয়। ‘দাঁড়কাকের বাসা’।

পেঁপেগাছ আমাদের বাড়িতেই নেই। তা ছাড়া, মা সব জায়গাতে লোক পাঠিয়ে খোঁজও করেছিলেন। প্রত্যেকেই সব পেঁপে আজ পাঠিয়ে দিয়েছে চাঁদোয়া-টোড়ির হাটে। আজ সেখানে লালুপ্রসাদ যাদবের মিটিং। পেঁপে তো পেঁপে, শালপাতা পর্যন্ত হয়তো খেতে চাইবে লোকে এই দু-দিন। অতলোকের সারাদিনের খাবার জোটানো কী সহজ কথা!

তা, তোদের বাড়িতে কোন লালুপ্রসাদ আসছেন যে, পেঁপের জন্যে হন্যে হয়ে এই চৈতি-রোদে ছুটোছুটি করছিস? তা ছাড়া, প্ল্যাটফর্মের ন্যান্সিমণির কাছেও যে, পাবি তার-ই বা গ্যারান্টি কী? সেও তো প্রতিসপ্তাহে-ই ওইদিনে টোড়ির হাটেই যায়।

জানি। তবু, একটা চান্স নিলাম। এও জানি যে, তার স্টেশান থাকার কথা নয়। সত্যি! একটা দাদা বা ভাই থাকলেও হত। মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র সন্তানকে যে, কতরকম হ্যাপাই সামলাতে হয়!

তুই বলছিস আমাকে! হা:, আরনট উই ইন দ্যা সেম বোট মাদাম?

চার্চের কাছে পৌঁছে ডান দিকে মোড় ঘুরেই শুধোল শিরীষ, তোর এই মহতী মেহনতির পেঁপেটা পাবেন অথবা খাবেন কোন ইতরজনে?

কে যে খাবেন তা ঠিক জানি না। তবে, আমাদের বাড়িতে কালকে কলকাতা থেকে দু-তিনজন অতিথি আসছেন। অতিথি। অচেনা। মানে, এখনও অচেনা। তাঁদের মধ্যে একজনের কী না কী রোগ আছে নাকি। সকালে পাকা পেঁপে, দুপুরে কাঁচা পেঁপে সেদ্ধ, বিকেলে পেঁপের হালুয়া, রাতে কাঁচা পেঁপের স্যুপ ছাড়া যে, ক-দিন থাকবেন, সে ক-দিন কিছুই নাকি খাবেন না।

ভদ্রলোকের নামটা কী? পেঁপেদু? তিনি ‘মনোয়া-মিলনে’ না এসে, কলকাতার বড়োবাজারের ফলপট্টিতেই তো যেতে পারতেন। কষ্ট কম হত। তাঁরও, তোরও। তা, যাঁরা আসছেন, তাঁরা কারা?

কারা, বললাম-ই তো তা জানি না। মানে, সঠিক জানি না। তবে আভাসে ইঙ্গিতে যা বুঝছি...কিন্তু তোকে বলাটা কি ঠিক হবে? তুই তো মনোয়া-মিলনের গেজেট। একনাম্বারের গসিপ-মঙ্গার।

সাইকেলের স্পিড কমে গেল দু-জনেরই। সামনে দিয়ে একটা কালো বনবেড়াল একদৌড়ে রাস্তা পেরোল। ডানদিকের ঝাঁটি-জঙ্গল থেকে বেরিয়ে বাঁ-দিকের শাল-জঙ্গলে ঢুকে গেল।

দাঁড়িয়ে যাবি নাকি একটু?

প্যাডল করা থামিয়ে ঝিঁঝি বলল।

দুস। বলেই শিরীষ বলল, ঠিক আছে। তুই যখন বলছিস, দাঁড়াই। তবে আমার ওসব সুপারস্টিশান নেই। এদিকে এতরকম কুসংস্কার আর এমন-ই ভাব দেখাস, ইংরিজি ফুটোস যে; মনে হয়, মেমসাহেব।

কালো বেড়াল যে, অশুভ সে তো সাহেব-মেমসাহেবদের-ই সুপারস্টিশান!

পারি না আর তোদের মতো না-ঘরকা না-ঘাটকাদের নিয়ে।

ত্রিশ সেকেণ্ড পর আবার সাইকেলে উঠেই শিরীষ স্টেশনের আউটার-সিগনালের দিকে চেয়ে বলল, পেঁপেদু সম্পর্কিত সেনটেন্সটা তো কমপ্লিট-ই করলি না।

মা আমার বিয়ের সম্বন্ধ করছেন। কী বুঝলি? বলেওছেন আমাকে। ঘণ্টেমামা এসে পৌঁছোচ্ছেন আজ রাতেই ডালটনগঞ্জ থেকে সেইজন্যেই। তিনিই ওই চক্রান্তের চক্র। কাল ঘণ্টেমামা ঝাণ্ডুকে নিয়ে স্টেশনে আসবেন। রামু শেঠ-এর ভটভাটিয়াও ভাড়া করে রেখেছেন মা অগ্রিম, অতিথিদের মালপত্র স্টেশন থেকে আনার জন্যে।

শিরীষের গলাটা হঠাৎ শুকিয়ে গেল কথা শুনেই। রোদটা হঠাৎ যেন, ঠাণ্ডা মেরে গেল। গায়ে যেন জ্বর এল। ডাঙায়-তোলা মাছের মতো খাবি খেতে লাগল যেন, ভেতরটা। একটু সামলে নিয়ে, সুস্থিত গলাতে শুধোল ঝিঁঝিকে, পাত্রও আসছে নাকি?

জানি না। আসতেও পারে। মা বলেননি কিছু। আজকাল কি আর শিক্ষিত পরিবারে একে অন্যকে না দেখে কেউ বিয়ে করে? যাদের সময় আছে, সুযোগ আছে; তাদের কোর্টশিপও হয়। তবে আমার...

তোর কী?

আমার তো কোনো চয়েস নেই। চয়েস, যে আসছে; শুধু তার-ই, ইউনিল্যাটারাল। অবশ্য যদি আসে আদৌ।

কেন? নেই কেন? চয়েস?

কথাটা বলতে গিয়ে শিরীষের গলাতে থুতু আটকে গেল।

মায়ের কথা শুনেই বুঝে গেছি যে, নেই।

কী করে? বুঝলি কী করে?

আমাদের কি টাকা আছে? আজকাল প্রত্যেক মেয়েকে হয় স্বাবলম্বী হতে হবে, স্বচ্ছল; নয় তার বাবার প্রচুর টাকা থাকতে হবে। নইলে...

তাহলে তুইও স্বাবলম্বী হয়ে ওঠ।

বোকা বোকা কথা বলিস না।

ওই চেয়ে দেখ। দেখেছিস তো। ন্যান্সিমণি নেই। ফাঁকা। শুনসান সব। এসময়ে কোনোদিন-ই থাকে না। ট্রেন-ই যে, নেই কোনো।

শিরীষ বলল, তোকে বলেইছিলাম।

তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, যাক গে। তুই আর খামোকা পেঁপে নিয়ে চিন্তা করিস না। যতদিন তোর শ্বশুরবাড়ির মানুষেরা থাকবেন ততদিন পেঁপের চিন্তা আমার। একটু পরেই আমি খিলাড়িতে কিংবা লাতেহার চলে যাচ্ছি। একবস্তা কাঁচা ও পাকা পেঁপে জোগাড় করে এনে আজ রাতেই কাকিমাকে জিম্মা দিয়ে আসবখন। কাকিমাকে টেনশান করতে মানা করিস, বুঝলি, কি, না? তোর শ্বশুরবাড়ির লোক বলে কথা!

ভালো হবে না বলছি শিরীষ। শ্বশুরবাড়ি! কোথায় কী? কী ধরনের প্রাণী সব নামবে ট্রেন থেকে, ডাইনোসর না ম্যামথ তা-ই জানা নেই।

বা রে। তুই-ই তো বললি। নইলে, আমি কি জানতাম!

যদি স্বাবলম্বী হতাম তবে এই লজ্জাকর ব্যাপারটার সম্মুখীন আদৌ হতাম না। কিন্তু বিহারের এই দেহাতে কোন চাকরিটা পাব বল? আমার বাজার-দরটা কী? সাধারণ, অতিসাধারণ মেয়ে আমি। তা ছাড়া মাকে ছেড়ে যাওয়াও যাবে না কোথাও। কতরকমের প্রবলেম! এবং প্রত্যেকটাই রিয়াল।

কেন? তোর ফিচার্স? তোর গানের গলা? সেগুলো বুঝি কিছুই নয়? তোর বুদ্ধি, সেটাও বুঝি ফালতু? তোর সেন্স অফ হিউমার? তারপরে একমুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, বাজারে তো সাজানো থাকে অনেক জিনিস। সকলের চোখে কি সব পড়ে? হিরে ফেলে কাচ নেওয়ার মানুষ-ইতো বেশি। তা ছাড়া, তোর মতো ভালোমানুষ... গুণী, সকলেই হতে পারে ইচ্ছে এবং চেষ্টা থাকলেই। কিন্তু ভালোমানুষ চেষ্টা করে হওয়া যায় না।

রাখ তো। জানি রে জানি, আমি বাঁশবনে শেয়াল-রানি। তাও শুধু তোর-ই কাছে। এমনই একটা ‘পান্ডব বর্জিত’ জায়গা যে, তুই ছাড়া হাতের কাছে দ্বিতীয় কোনো বাঙালি ছেলেও নেই। সত্যি! কী অবস্থা আমার!

একটা বড়োশ্বাস ফেলে বলল ঝিঁঝি।

চল, শিরীষ বলল, কোয়ানটিটি কোনো ব্যাপার-ই নয়, আসল হচ্ছে ‘কোয়ালিটি’। জুলিয়েটের শুধু রোমিও-ই ছিল।

চল এবারে, ফিরবি তো?

না তো কী?

চল তবে। ঘোরা সাইকেল।

বলেই বলল, ঝিঁঝি, চা খাবি নাকি একটু? ভাঁড়ের চা?

চা? তা খেতে পারি। একটু অবাক হয়ে বলল, ঝিঁঝি।

তবে, আয় চলে যায়।

ঝাঁটি-জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে শিরীষ বলল, ওই দেখ, সাপ যায়।

কই সাপ? কী সাপ? দেখিনি তো।

তুই দেখতে পাবি না। ওটা প্রতীকী সাপ। ‘সাসানডিরি’ বইটা কি পড়েছিস তুই? তোকে দিয়েছিলাম যে, ‘আনন্দ’-পাবলিশার্স-এর।

হুঁ।

বলেই, ঝিঁঝি অন্যমনস্ক হয়ে গেল।

তারপর বলল, সেই চাটান মুণ্ডা আর মুঙ্গরীর গল্প। সোনালি সাপ? দাবানল? কেন মনে করালি বইটার কথা? মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

‘‘সুইটেস্ট টেলস আর দোজ হুইচ টেল অফ স্যাডেস্ট থিঙ্গস।’’

শিরীষ বলল।

তুই এখানে দাঁড়া। আসছি। বলেই, শিরীষ মাটির সমতার প্ল্যাটফর্মে নেমে গিয়ে লাইন পেরিয়ে চায়ের স্টলে গিয়ে চা দিতে বলে এল।

দোকানদারের খিদমদগার ছোটোছেলেটি চা নিয়ে আসবে মাটির কুলহার-এ করে। চায়ের গন্ধের চেয়ে মাটির ভাঁড়ের গন্ধটাই বেশি ভালো লাগে ঝিঁঝির। ‘মনোয়া-মিলন’ স্টেশনে এলেই চা খেতে ইচ্ছে করে ওর শুধু এইজন্যেই। এই ভাঁড়ের চা-এর গন্ধ নাকে গেলেই মনে হয় ট্রেনে করে দূরে কোথায় চলে গেছে—ছেলেবেলার মতো—ফ্রক পরে বসে আছে ছোট্টমেয়ে—ট্রেনের জানলার ধারে—‘চায়ে গরম। চায়ে গরম!’ করে হেঁকে যাচ্ছে চা-ওয়ালা নিঝুম রাতে—কামরার মধ্যে নিভু-নিভু আলো—কামরা-ভরা-ঘুম—কেবল ও-ই বসে আছে একা জেগে—পৃথিবীর শেষ কোথায় তা দেখার জন্যে। পৃথিবীটা কত রহস্যময়, কত সুন্দর, কত ছোটো, কত রঙিন কল্পনার ছিল সেই বয়েসে। এইসব স্বাদ-গন্ধ পৃথিবী থেকে বড়ো দ্রুত লোপ পেয়ে যাচ্ছে। ভাবলেও কষ্ট হয়।

তবু এখনও এই বদলে-যাওয়া পৃথিবীকেও খুব-ই ভালোবাসে ঝিঁঝি। শিরীষও সেই পৃথিবীর-ই বাসিন্দা। তবে, শিরীষকে যে, ওর ভীষণ-ই ভালো লাগে, সে-কথা একমুহূর্তের জন্যেও জানতে দেয় না, দেয়নি ঝিঁঝি। ও ওইরকম-ই। মন যা বলে, সবসময়ে তার উলটোটাই বলে মুখ। মনে-মনে ভাবে, যার বোঝার সে বুঝে নেবে। ওর বয়েই গেল!

সাইকেল দুটো একটা শালগাছের কান্ডে হেলান দিয়ে একটি বড়ো কালো পাথরের ওপরে বসল ওরা দু-জনে পাশাপাশি।

শিরীষকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল।

ঝিঁঝি বলল, কী ভাবছিস? তোর দিল্লি যাওয়ার কী হল? ম্যানেজমেন্ট না, কী পড়তে যাবি বললি?

হিল্লি-দিল্লি গিয়ে কী হবে? এইখানেই থেকে জায়গাটার জন্যে কিছু করতে পারলে তবু হত। দিল্লি গেলেই কি ল্যাজ গজাবে?

সকলের তো ল্যাজ গজায় না। ল্যাজ গজাতে হলে বানর প্রজাতির প্রাণী হয়।

শিরীষ চুপ করে গেল।

একটু পরে ঝিঁঝি বলল, কী ভাবছিস রে? তুই এমন হঠাৎ হঠাৎ চুপ মেরে যাস কেন?

ভাবছি, তোর বর কেমন হবে।

হোক-ই আগে। ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল।’

তোর যদি পছন্দ না হয়?

আমার পছন্দ-অপছন্দর প্রশ্ন তো ওঠে না। বলেইছি তো তোকে। চয়েসটা একতরফের-ই। তার বা তাদের যদি আমাকে পছন্দ না হয় তবে স্টেশনের মাস্টারবাবু থেকে ঝাণ্ডু গঞ্জু পর্যন্ত সকলেই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে। বলবে, ‘ইমতেহানমে ফেল কর গ্যয়ি। উনকি ডাল গলা নেহি।’ আর তুইও বলবি.... ছেড়ে দিবি কি? তখন?

চুপ কর। আমার কথা থাক।

চায়ের সঙ্গে ঝাল বিস্কিট খাবি? লঙ্কার গুঁড়ো দেওয়া? লেড়ো?

কী ব্যাপার, খুব যে, বড়োলোক হয়েছিস দেখছি।

‘শেষ’-এ একটা কবিতা ছাপা হয়েছিল। কাল-ই টাকা এসেছে মানি-অর্ডারে। অনেক টাকা দেয় রে ওরা। তবে, কবিতা লিখে বড়োলোক হওয়া যায় না। যাবে না কোনোদিন-ই। গদ্য লিখতে হবে। গদ্য। গোদা গোদা বই। কলেজস্ট্রিট পাড়ার কোনো কোনো প্রকাশকের ভাষায়, ‘মোটা মাল’। প্রথম বইটা যদি লেগে যায়, তবে আর দেখতে হবে না। বড়োলোক হয়ে যাব। রিয়্যাল-রিচ। কোনো বড়োকাগজে একটা চাকরি যদি হয়ে যায়। তখন রিয়্যাল রিচ-প্লাস রিয়্যাল আঁতেলও হয়ে যাব। ওভারনাইট আই উইল থিঙ্ক বিগ। তখন লেখা ছাপাবার জন্যে কত উঠতি কবি-সাহিত্যিক তেল দেবে আমাকেই। দ্যা টেবল উইল বি টার্নড। কত খাতির, প্রতিপত্তি, ঘুস-ঘাস। হা: হা:।

ছেলেটি চা দিয়ে গিয়েই দৌড়ে বিস্কুট আনতে গেল।

চায়ে চুমুক দিয়ে ঝিঁঝি বলল, আমার যদি অনেক টাকা থাকত, তবে তোকে আমি বলতাম, শুধুই লিখে যা। তোকে আর কিছুই করতে হবে না। না, টাকা রোজগারের জন্যে নয়, কোথাও ছাপাবার জন্যেও নয়, শুধু নিজের আনন্দের জন্যেই লিখে যা। তা ছাড়া, তুই তো কবি, কবিতাই লিখবি। গোদা-গোদা গদ্য লেখার তোর দরকার-ই বা কী? কবিতা হচ্ছে আতর। আর গদ্য পারফিউম। কবিতার বিন্দুতে সিন্ধু।

হা:। এসব ডায়ালগ সিনেমাতে শোনা যায়, হিন্দি, বাংলা, তামিল, মারাঠি। জীবনে এমন হয় না রে। কবিতা লেখা আর বালুবেলায় নাম লেখা এক-ই কথা।

কারো কারো জীবনে হয়তো ঘটেও, ঘটতেও পারে। এত হতাশ হোস কেন?

হা:। ‘অমি কেবলি স্বপন করেছি বপন বাতাসে/দিনশেষে দেখি ছাই হল সব হুতাশে হুতাশে।’

কার লেখা?

লেখা নয়, গান।

কার?

কার হতে পারে?

একমাত্র যার হতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ?

ইয়েস।

কার গাওয়া গান?

একমাত্র যার হতে পারে।

কার হতে পারে?

হেঁয়ালি করিস না।

হেঁয়ালি নয়। কিছু কিছু রবীন্দ্রসংগীত আছে, যা কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যেই বোধ হয় সেই দাড়িঅলা ভদ্রলোক লিখে গেছিলেন।

ঠিক-ই বলেছিস।

যদি তোর মতো করে কোনো হান্টারওয়ালি, বা মিলিয়নিয়রকা বেটি এমন অফার, মানে শুধুই খেতে পরতে দিয়ে কবিতা লেখার; দেয়ও কোনোদিন, সত্যি সত্যি, তবেও হয়তো আমি তা নিতে পারব না।

কারণ?

কারণ, শুধু শুধু লিখে আবর্জনার স্তূপ বাড়িয়ে কী হবে? যে-কোনো ‘গুণ’-এর জিনিস-ই সম্পূর্ণতা পায় না অন্যের স্বীকৃতি না পেলে। লেখাই বল, গান-ই বল, ছবি আঁকাই বল। দশ জনে, হাজার জনে, যদি তা না-ই পড়ল, না-ই শুনল, না-ই ভালো বলল; তাহলে উৎসাহটা আসবে কী করে! কবিতা গান, ছবি আঁকা এসব-ই হচ্ছে ‘ইয়ো-ইয়ো’-র মতো, বুঝলি। যা কিছুই আছে তা নৈবেদ্যর-ই মতো পাঠক কী শ্রোতা কী দর্শকদের দিকে তোর সব ছুড়ে দিতে হবে। তাঁরা তার গতিজাড্য বাড়িয়ে দিয়ে তোকে আবার ফিরিয়ে দেবেন। যদি অবশ্য তাঁদের তা ভালো লাগে। এমনিভাবেই দেওয়া-নেওয়া ফিরিয়ে দেওয়ার একটা অদৃশ্য বৃত্ত সম্পূর্ণ হবে; হয়। এবং তা না হলে কী লেখা, কী গান গাওয়া, কী ছবি আঁকা, সব-ই নিরর্থক। মিছিমিছি।

‘গতিজাড্য’ শব্দটার মানে কী? কখনো তো শুনিনি আগে।

শুনিসনি? মানে হচ্ছে, ‘মোমেন্টাম’।

দেখ, সাহিত্যের ছাত্রী আমি। আর আমিই...

দেখ কোনোক্রমে বি.কম. পাশ শিরীষ সেন তোকে বাংলা শেখাচ্ছে। তোকে ‘বাংলা’ পড়াতেপারলে অবশ্য আরও খুশি হতাম।

বলেই, শিরীষ হেসে উঠল। ঝিঁঝিও হেসে উঠল জোরে।

হাসির তোড়ে চা চলকে পড়ল ঝিঁঝির কামিজ-এ।

ঝিঁঝি বলল, কী হবে। খুব বকুনি খেতে হবে মায়ের কাছে। আছে তো মোটে এক জোড়াই ভদ্রস্থ সালোয়ার-কামিজ। তার-ই একটা গেল।

তাহলে আজ ভালোটা পরে এলি কেন মিছিমিছি?

বা:। তোর সঙ্গে দেখা হবে তা তো জানতাম-ই! তুই আমার শিশুকালের খেলার সাথি— যদি আমার ‘বিদাইয়া’ হয়ে যায় সত্যি সত্যিই?

বলছিস? ‘বাবুল মোরা নইহার ছুটহি যায়!’

ইয়ার্কি নয়। আজ তো একটা বিশেষ দিন আমার জীবনের।

তোর জীবনের?

শিরীষ একটু অবাক হয়ে শুধোল। আজ? কেন? আজ কেন?

হ্যাঁ।

কেন?

আমার স্বাধীনতার ইতিহাসের শেষদিন।

এত বাজেকথা বলিস-না তুই।

শিরীষ বলল।

তারপর বলল, দেখিস, তোর বর তোকে কত আদরে-গোবরে রাখবে। বিয়ে তো একটা আনন্দের-ই ব্যাপার। বিশেষ করে মেয়েদের জীবনে। বিয়ে তো একটা উৎসব। পরমোৎসব।

হুঁ। যদি হয়...

তোর বরের নাম কী রে?

আঃ। ভালো হচ্ছে না কিন্তু। আবারও তুই ‘বর বর’ করছিস?

কী বলব তাহলে?

পরীক্ষাতেই বসলাম না, আর।

নাম কী? গোরু-ছাগলেরও নাম থাকে আর তোর বরের, মানে হবু-বরের কোনো নাম নেই?

নীলোৎপল। শুনেছি।

বাবা! একে উৎপল, তায় নীল। তা, তিনি করেন কী?

ব্যাবসা।

বা:।

বা: কেন? ঠাট্টা করছিস?

ঠাট্টা নয় রে কেবলি। বাঙালির ছেলে ব্যাবসা করলেই, সে পাত্র হিসেবে খারাপ বলে চিরদিন-ইবিবেচিত হয়েছে। অথচ ‘বাণিজ্যে বসতে: লক্ষ্মী।’ আমি এমন চারটে কেস জানি যেখানে পাত্র ব্যাবসাদার বলে, বাবা-মা তার সঙ্গে বিয়ে দেননি মেয়ের। অথচ চাকরিজীবী ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার কয়েক বছর পর-ই দেখা গেছে যে, জামাই সেই বাতিল-করা ছেলের-ই কর্মচারী হিসেবে কাজ করে দিন গুজরান করছে। ‘বাঙালি’ জাত কখনোই, জীবনের কোনোক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে পারেনি; অবশ্য বাংলাদেশের বাঙালিরা ব্যতিক্রম। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা পরের চাকরি করেছে। যেকোনো চাকরি। ফিক্সড-ডিপোজিটে টাকা রেখেছে। ঘরে বসে বাবা-ঠাকুরদার উপার্জনের সঞ্চয়ের নিরাপদ কলসির জল গড়িয়ে খেয়েছে। তাই তো আজ বাঙালির এই অবস্থা! জামাই যে ব্যবসায়ী, তা জেনে সত্যিই প্রীত হলাম। দাঁড়া। দাঁড়া। একটিপ নস্যি দিয়ে ব্যাপারটা সেলিব্রেট করি।

জ্যাঠার মতো কথা বলিস না। যেন তোর-ই জামাই! এতবেশি কথা বলিস-না তুই!

ঝিঁঝি চায়ের ভাঁড়টা রেললাইনের পাশের ঝাঁটি-জঙ্গলে ছুড়ে ফেলে দাঁড়িয়ে উঠে বিরক্তির সঙ্গে বলল, নস্যি নিস কেন রে? আমার দু-চোখের বিষ। তোকে কোনো মেয়েই জীবনে চুমু খাবে না।

হা:। নস্যি না নিলেই যেন চুমুর বন্যা হয়ে যেত! কী করব বল? মাসে চার-পাঁচ টাকার নস্যিতে চলে যায়। আমার মতো হা-ভাতের পক্ষে এর চেয়ে সস্তা আর কোনো নেশাই নেই। তা ছাড়া আরও একটা কারণ আছে।

কী কারণ?

ভালো গদ্য-লেখক হতে হলে নস্যি নিতে হয়।

তার মানে?

হ্যাঁ রে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় নেন। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় নিতেন। তারাপদ রায়ও নেন।

হাতছানি দিয়ে শিরীষ ডাকল চায়ের ছেলেটিকে। সে এসে পয়সা নিয়ে গেল। একটা সিকি দিল বকশিশ। বলল, লে রে ছোটুয়া।

ছোটুয়া সেলাম করে চলে গেল, ঝিঁঝি বলল, বাবা: কবিতার টাকা পেয়েই তুই এত দরাজ-দিল! আর উপন্যাস লিখলে না কী করতিস?

তা ঠিক। তবে এও যে, যাদের দরাজ-দিল তাদের টাকা দেন না বিধাতা। টাকা দেন শুধুই চিপ্পুদের। সিকিটা আসলে দিলাম সেলামটা পাবার জন্যেই। আমি তো মাত্র সিকি-ই দিলাম! যারা লক্ষ কোটি দেয়; সে শালারাও সকলেই কিন্তু ওই সেলাম পাবার জন্যই দেয়।

হয়তো।

অন্যমনস্ক গলায় বলল ঝিঁঝি।

ওরা ফেরার পথ ধরল।

একটু এগিয়ে গিয়ে শিরীষ বলল, কীসের ব্যাবসা করে রে তোর বর?

আবারও ‘বর বর’ করছিস!

সরি! নীলোৎপল। নীলোৎপল কী?

নীলোৎপল দাস।

ও। তোদের মতো ব্রাহ্মণ নয়?

ব্রাহ্মণ্য তো একটা টাকা। সবসেরা ব্রাহ্মণ্য। ব্রাহ্মণ নয় মানে কী?

তা, বললি না, কীসের ব্যাবসা?

বিড়ির ব্যাবসা।

লজ্জামাখা গলায় বলল, ঝিঁঝি।

বলিস কী রে!

উৎসাহে চেঁচিয়ে উঠল শিরীষ।

ঝিঁঝি আরও লজ্জা পেল। মাথা নীচু করল।

শিরীষ বলল, তাহলে তো মালটি-মিলিয়নিয়র! বিড়ির ব্যাবসা যে, কী প্রফিটেবল ব্যাবসা তুই জানিস না। তবে ক্যাপিটালও লাগে অনেক।

ঝিঁঝির অপ্রতিভ ভাবটা কেটে গেল। অবাক গলায় বলল, তুই এত জানলি কী করে রে?

বা:। আমি কলকাতার এক অডিট ফার্মে কাজ করতে গেছিলাম-না? অডিট-ক্লার্ক ছিলাম। সেখান থেকেই অডিটে পাঠিয়েছিল। হুগলি জেলার সিঙ্গুরে ছিল আশুতোষ পাধা অ্যাণ্ড কোম্পানি। বহরমপুরের ধুলিয়ানে ‘বিনোদিনী’ বিড়ি। আরও কত বিড়ি কোম্পানি। বিনোদিনী বিড়ির অডিটর অবশ্য ছিলেন সেন কোম্পানি। বিড়ির ব্যাবসা শুনে যদি কেউ ভাবে ছোটোব্যাবসা, তবে বলতে হয়, সে ব্যাবসা-জগতের কিছুমাত্রই জানে না।

ঝিঁঝি বলল, শুনেছি, আগে নাকি চাতরা লাতেহার ডালটনগঞ্জ এসব জায়গাতে কেন্দুপাতার জঙ্গল নিতেন ওঁরা। সেইসময়েই তো ঘণ্টেমামা ওঁদের কোম্পানিতে কাজ নেন।

ওঁরা মানে?

মানে ওই নীলোৎপলের পরিবারের মানুষেরা। বাবা, কাকারা।

তাই?

হ্যাঁ। সেইসূত্রেই সম্ভবত জলটা অথবা বলটা যাই বলিস এতদূর এগিয়েছে। আর ঘণ্টেমামাকে তো জানিস-ই। বাড়িয়েই সব কিছু বলেন! আমি তো লজ্জায়, ভয়ে, কুন্ঠায় একদম সিঁটিয়ে আছি। ওঁদের নাকি ‘উঠতি ঘর’। তাই ভালো পরিবারের ‘পড়তি ঘর’ থেকে মেয়ে খুঁজছিলেন।

শিরীষ হাসল। হেসে বলল, এবার ওঠ। তোর বিয়ে তো আমার কী?

বলে, সাইকেলটা উঠিয়ে দিল। ঝিঁঝিও। তারপর দু-জনে আস্তে আস্তে প্যাডল করতে করতে ফেরার পথ ধরল।

আসবার সময়ে খুবজোরে প্যাডল করেই এসেছিল। এখন ফেরার সময়ে খুব আস্তে আস্তে ফিরছে। জীবনের যেকোনো গন্তব্যে পৌঁছোনো ও ফিরে আসার বেলায়-ই অমন হয়, লক্ষ করেছে শিরীষ। অন্তত ওর বেলাতে হয়। যাওয়ার সময় পথ দীর্ঘ বলেও মনে হয়, আর ফেরার সময় হ্রস্ব।

হাসছিলি কেন তুই? ঝিঁঝি শুধোল।

আসলে ওইসব কথার পেছনে একটা ফিউডাল মনোবৃত্তি কাজ করে, তাই। মেয়ের সঙ্গে ‘উঠতি ঘর’ ‘পড়তি ঘর’ এর কী সম্পর্ক? মেয়ে-মেয়ে, ছেলে-ছেলে।

কেন? ও-কথা বলছিস কেন? তা ছাড়া, মেয়েরা এখনও তো এদেশে ‘সুলক্ষণা’ গাই বলেই গণ্য হয়। এবং হয়তো আরও বহুদিন হবেও।

একটি নিশ্বাস ফেলে বলল ঝিঁঝি।

একথা বলছি কারণ, উদ্দেশ্যটা সরল। পড়তি ঘরের মেয়ে মাথা নীচু করে থাকবে। অথচ সুদিনের সময়ে সে স্বাচ্ছল্যের মধ্যেই মানুষ হয়েছে। জন্মাবধি হা-ভাতে নয়। টাকা থাকলেই তো আর হয় না। সচ্ছল, রুচিশীল জীবনযাত্রা, বড়োলোকিও একটা আর্ট বিশেষ। শিখতে হয়; শিক্ষানবিশি লাগে। পড়তি ঘরের মেয়েরা ‘বড়োলোকি’ কাকে বলে তা জানে-শোনে। দু-জন সমান বড়োলোকের ঘরের মধ্যে বিয়ে হলে দু-পক্ষের মধ্যেই সামান্য টকরা-টকরিতেই ‘হাম কিসিসে কম নেহি’ ভাব জাগতে পারে। ‘পড়তি ঘরের’ মেয়ের তো সে-সামর্থ্য বা হিম্মত হবে না কখনো। তাই ‘উঠতি ঘরের’ পক্ষে ‘পড়তি ঘরের’ মেয়েকে বউ করে আনাই সুবিধে। মাথা নীচু করে সে তাদের সব অত্যাচার মেনে নেবে।

বাবা:। তুই কত কী ভাবিস। ভেবে রেখেছিস রে শিরীষ!

ভেবে রাখিনি। এখন ভাবছি। আমার ঝিঁঝির বিয়ে বলে কথা।

‘আমার ঝিঁঝি’ মানে?

হঠাৎ যেন, ঝিনিঝিনি তুলে বলল ঝিঁঝি।

অন্তত তাই মনে হল শিরীষের।

বলেই, ঝিঁঝি গম্ভীর হয়ে গেল। প্যাডল-করা থামিয়ে মুখ ঘোরাল শিরীষের দিকে, ডানদিকে। সাইকেলের সামনের চাকা বাঁ-দিকে গড়িয়ে যেতে লাগল।

ঝিঁঝির মুখের দিকে চেয়ে অপ্রতিভ হয়ে গেল শিরীষ। রোদটা আবারও যেন হঠাৎ ঠাণ্ডা মেরে গেল। ঝিঁঝিকে ও বোঝে না একটুও। শিরীষের খুবই ইচ্ছা করছিল যে, স্টেশন থেকে বেরিয়েই ওকে বলে, বিকেলে ঝিরিনালার দহর কাছে একবার আসতে। ওর অনেক কথা বলার ছিল ঝিঁঝিকে। বলা হল না। হয়তো বলা হবে না আর কোনোদিনও। গত পাঁচ বছর ধরেই বলি-বলি করেও বলা হয়ে ওঠেনি যেসব কথা।

সরি। আমার অন্যায় হয়েছে।

আর কোনোদিনও এই কথা বলবি না। দু-কান খুলে শুনে রাখ শিরীষ যে, আমি কারোর-ই নই। তোরও নই, কোনো নীলোৎপল বা রক্তোৎপল বা শ্বেতোৎপলেরও নই। তুই জানিস তো আমার দিদিমা পাগল ছিলেন। এক ন্যাকারেকে খুন করেছিলেন বঁটি দিয়ে। কেন করেছিলেন, সে-কথা তো ভবানীপুরের সকলেই জানে! আমার মনে হয় আমার মধ্যে দিদিমার জিন এসেছে। ঘণ্টেমামা আর মা এইসব করছেন বটে কিন্তু আমার মনে হয় না কোনো পুরুষের-ই ঘর করতে পারব আমি। আমি বনের হরিণী। আমার ইচ্ছে হলে আমি কিছুদিন কারো কাছে থাকতেও পারি কিন্তু ইচ্ছে ফুরোলেই ফিরে আসব। আবারও হয়তো নতুন কারো কাছে গিয়ে থাকতে পারি। তাও কিছুদিন, যতদিন ভালো লাগে; কিন্তু যে-কেউই আমাকে বলবে ‘আমার ঝিঁঝি’ তার কপালে অশেষ দুঃখ।

প্যাডল-করা থামিয়ে দিয়েছিল শিরীষ। ওর বাড়ি, বাড়ি না বলে ‘ডেরা’ বলাই ভালো; দেখা যাচ্ছে। ওর কালু কুকুর, বেঁটে-নাটা, ল্যাজ-কাটা; ধুলোর মধ্যে শুয়েছিল। শিরীষকে আসতে দেখেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠেই ল্যাজ নাড়তে নাড়তে দৌড়ে এল। বড়ো শিমুলের ডাল থেকে পাগলা কোকিলটা ডেকে উঠল জোরে জোরে। হরিহরলালের বাড়ির পেছনের জঙ্গলের অন্য শিমুল থেকে তার দোসর সাড়া দিল।

এই চৈত্রমাস এলেই বড়ো ভয় করে শিরীষের। শিরীষ যে শিরীষ-ই!

ভয় করে ঝিঁঝিরও! ওর মাথার মধ্যের পাগলামির বীজগুলো কিলবিল করে তখন। ওর শিকড় আলগা হয়ে যেতে থাকে। সংসার, সমাজ, ঘর, সব কিছুর মায়া কাটতে থাকে, ছানার জল কাটার মতন। মনোয়া-মিলন, মহুয়া-মিলন, চাঁদোয়াটোরি, হেহেগাড়া, রিচুঘুটা, চাহাল-চুঙরুর বন তাকে হাতছানি দেয়, হাতছানি দেয় দূরের করণপুরার টাঁড়, কাটকামচারীর জঙ্গল, ‘আরণ্যক’-এ পড়া নাড়া বইহার, লবটুলিয়া, রাজা দোবরু পান্না, রাজকুমারী কুন্তী। এসব জঙ্গলের অধিকাংশই সে, কোনোদিন চোখে দেখেনি, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক-এর সরস্বতী কুন্ড বা রাজু পাঁড়েকেও যেমন দেখেনি। কিন্তু এরা সকলেই তাকে হাতছানি দেয়। বিশেষ করে, শুক্লপক্ষর তৃতীয়া থেকে বাসন্তী পূর্ণিমা অবধি। আবারও শুক্লপক্ষর তৃতীয়া থেকে বৈশাখী পূর্ণিমা অবধি।

এমন-ই ঘটে ও ঋতুমতী হওয়ার পর থেকেই। দু-দু-বার সে, জঙ্গলে পালিয়ে গেছিল। তখন বাবা বেঁচে ছিলেন। অর্থবল, জনবল সব-ই ছিল। এখন যদি পালিয়ে যায়, মা কেঁদেকেটে সারা হবেন। কোনো গ্রামের মাহাতো বা পঞ্চায়েতের নেতা তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করে খাদে ছুড়ে দেবে মৃতদেহ। এখন মেয়েদের বড়োই বিপদ। ঘরে থাকাই বিপজ্জনক, তার বনে-পাহাড়ে! তবুও ভাবছিল ঝিঁঝি, সময় হয়েছে। সেই নীল-রঙা পাখি দু-টি কি জোড়ে আসবে এবারে? চাট্টি নদীর দহর পাশের জঙ্গলে একদিন যেতে হবে চাঁদের রাতে। যদি না আসে? ভাবতেও ভয় করে।

ওই পাগলা কোকিল দুটোই যেন, ওর মাথাতে পাগলাঘণ্টি বাজিয়ে দিল।

শিরীষ বলল, আচ্ছা, তাহলে ভালো থাকিস।

ঝিঁঝি উত্তর দিল না কথার। স্থিরদৃষ্টিতে চোখ তুলে ধরল একবার শিরীষের চোখের দিকে, প্রদীপ তোলার মতো করে।

শিরীষের মনে হল, ঝিঁঝির চোখ দু-টি অপ্রকৃতিস্থ।

তোর কি জ্বর-টর হল?

উত্তর দিল না ঝিঁঝি।

বাড়ি যা। সাবধানে যা। স্বগতোক্তির মতো ফিসফিসে গলায় বলল শিরীষ।

ঝিঁঝির ঠোঁটে একটা হাসি ফুটি-ফুটি করেও নিভে গেল।

ও হাসলে ওর ঠোঁটের দু-পাশের চামড়াতে সামান্য ভাঁজ পড়ে। টোল নয়; ভাঁজ। ইউরোপিয়ান, আমেরিকান, সুন্দরীদের কারো কারো মুখে যেমন পড়ে। ইংরিজি সিনেমাতে দেখেছে ও।

তারপরে ও হ্যাণ্ডেল থেকে ডান হাতটা তুলল একটু। এক লহমার জন্যে। তারপরেই আর কথা না বলে, ধীরে প্যাডল করতে করতে চলে গেল। ডাইনে এক মোড়ের পরে বাঁয়ে এক মোড়। তারপরেও অনেক দূরে ডানহাতি বাড়ি, নাম ‘মহুয়া’। সাদা শ্বেতপাথরের ফলকের ওপরে লেখা আছে নীল রঙে। বাড়ির পেছনেই জঙ্গল ক্রমশ ঘন হয়ে গড়িয়ে গেছে পাহাড়তলিতে। সেখানে পৌঁছে পাহাড়ের পায়ে পায়ে এগিয়ে পাহাড়ে উঠে গেছে। ঢেউয়ের পরে ঢেউ তুলে মিশে গেছে পালামৌর, ডাকসাইটে সব বন-পাহাড়ের সঙ্গে চাহাল-চুঙরু, বাগেচম্পা, বাড়েষাঁর; আরও কত নাম না জানা, অদেখা গা-ছমছম প্রত্যন্ত প্রদেশে।

যতক্ষণ-না ঝিঁঝি মোড়ের মাথায় মিলিয়ে গেল, ততক্ষণ সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়েই রইল শিরীষ। ঝিঁঝিকে যখন আর দেখা গেল না, তখন দরজা ঠেলে খুলে উঠোনে ঢুকল।

শিরীষদের বাড়ির নাম নেই। বাইরের রং-চটা ফাটা-ফুটো কালো শালকাঠের দরজার ওপরে সাদা চকখড়ি দিয়ে শিরীষ লিখে রেখেছে ‘দাঁড়কাকের বাসা।’

ঝিঁঝি বলে, এমন অ্যাপ্রোপিয়েট নাম ‘মনোয়া-মিলনে’-র আর কোনো বাড়ির-ই নেই।

মধ্যে উঠোন, দুইধারে ঘর। উঠোনের-ই একপাশে কুয়ো। লাটাখাম্বা লাগানো। কুয়োর উলটোদিকে একটা লক্ষ্ণৌ ল্যাংড়া আমের গাছ। শিরীষের মা শখ করে লাগিয়েছিলেন। তাতে বসে, একজোড়া দাঁড়কাক ডাকছে। কর্কশ নয়; আশ্চর্য কোমল স্বরে। টেনে টেনে। অমন ডাক কখনো শোনেনি আগে কাকেদের গলাতে।

হুসস হুসস করে কাক দুটোকে তাড়াতে যাবে, এমন সময়ে...উঠোনের এককোণে যে, একটা সজনে গাছ ছিল, অনেক দিনের পুরোনো; আশ্চর্য। সেই গাছটিতেই কোথা থেকে একটা হলুদ-বসন্ত পাখি উড়ে এসে বসল। প্রজাপতি উড়ছিল নাচতে নাচতে। হলুদ আর লাল। পাগলা কোকিলটাও আবার ডেকে উঠল। কোকিলের ডাকটা শিরীষের বুকের মধ্যে তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো বিঁধে গেল। হঠাৎ।

বড়ো বিপন্ন বোধ করল শিরীষ। ওর এই বিপন্নতার কথা ও একাই জানে।

তারপর-ই ডাকল, বুড়ি-মাই। চান করতে যাই। খাবার গরম করো। ঘরের ভেতর থেকে নীচুগ্রামের এক অক্ষরের একটি সংক্ষিপ্ত এবং দুর্বোধ্য শব্দ বেরিয়ে এল।

শিরীষের ভয় করে প্রায়-ই যে, একদিন বুড়ি-মাইকে ডেকে আর সাড়া পাবে না।

যেকোনো দিন।

সুনীতি রুক্ষকন্ঠে বললেন, খালি হাতে এলি, তো করলি কী এতক্ষণ? গেছিলি কোথায়?

স্টেশনে গেছিলাম না! তোমাকে বলেই তো গেলাম।

তা, পেঁপে কোথায়?

সেখানেও তো পেলাম না পেঁপে।

এদিকে ঝাণ্ডু বলছে, হানিফ আজ এবং আগামীকালও পাঁঠাই কাটবে না এখানে। ও নাকি চাঁদোয়া গেছে। ওখানেই থাকবে দু-দিন। হাটিয়ার হোটেলওয়ালার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে যে, দু-দিন শুধু হোটেলের খিদমদগারিই সে করবে। লালু যাদবের মিটিং। তার মানে, মাংস পাওয়া যাবে না। তুই বরং বিকেলে রায়বাবুর কাছে একবার যা ঝিঁঝি। যদি কাল সকালে একটা বড়ো মুরগি আর এক ডজন ডিম উনি দেন।

ওঁর কাছে যেতে আমার ভালো লাগে না মা।

কেন?

ওঁর চোখের চাউনিটা ভালো লাগে না।

ওঁর চোখ-ই ওরকম। আমার দিকেও অমন করেই তাকান। যারা সহায়-সম্বলহীন, বিশেষ করে মেয়ে, তাদের সকলের-ই দিকে সব পুরুষ-ই ওরকম করেই তাকান। ওঁর কি সাহস হবে কখনো সেনবাবুর বউ-মেয়ে বা মগনলালবাবুর বাড়ির মেয়েদের দিকে অমন চোখে তাকাবার! ওসব ছোটোখাটো ব্যাপার নিয়ে আমাদের অনুযোগ করে লাভ নেই। তাও তো শুধু তাকিয়েছেন-ই আজ অবধি। আর কোনোরকম অসভ্যতা তো করেননি!

করেই দেখুন-না একবার।

করলেও, তুই কিছুই করতে পারবি না। কী কলকাতা বা পাটনাতে, আর কী এখানে, সমস্ত সমাজ, সমস্ত আইন, সমস্ত পুলিশ ওঁদের-ই দিকে। বঙ্কিমবাবু ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এ সেই কবে লিখে গেছেন, না? ‘আইন। সে তো তামাশা মাত্র। বড়োলোকেরাই পয়সা খরচ করিয়া সে তামাশা দেখিতে পারে।’ সে-কথা এদেশে আজও তেমন-ই সত্যি! যদি তোর একটা ফয়সালা করে দিতে পারি, তুই যদি কখনো গাড়ি করে গিয়ে নামিস রায়বাবুর পোলট্রিতে, দেখবি তাঁর চোখের দৃষ্টি কত নরম, কত ভদ্র হয়ে গেছে। আসলে, খুব কম পুরুষের-ই মুখ আছে, ওদের শুধুই মুখোশ।

ঝিঁঝি বলল, আমাদের ধার তো ওঁর কাছে কম নেই। সেই যখন মণি মাসিমারা এসেছিলেন গত শীতে, তখন থেকেই বাকি পড়ে আছে। তা তো আজ অবধিও শোধ দেওয়া হয়নি। আজ কতদিন হয়ে গেল ওঁর পোলট্রির সামনে দিয়েই যেতে পারি না। লজ্জায় এবং ভয়েও। ওদিকে গেলে, পেছনের হাঁটাপথ দিয়েই যাই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। সাইকেল চালিয়ে বা হেঁটেও। যদি ওই টাকাটা সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতাম তবেও না হয় কথা ছিল। তুমি বরং ঝাণ্ডুকে পাঠাও, বস্তির-ই কারো বাড়ি থেকে যদি জোগাড় করে নিয়ে আসতে পারে একটা মুরগি।

সুনীতি বললেন, রোজ-ই তো ভাবি দিয়ে দেব কিন্তু এদিক ঢাকতে ওদিক উদলা হয়ে যায়। টাকাটা হয়তো দিয়েও দিতে পারতাম কিন্তু ওঁরা ক-জন যে আসবেন তা কে জানে! ওঁরা চলে গেলেই রায়বাবুর ধার শোধ করে দেব। এ ক-দিন তো বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, কম্বলের ওয়াড় কেচে কেচে তোর আমার হাতে ব্যথা হয়ে গেছে। ঝাণ্ডু একা লোক আর কত করবে? তুই একটু যা-না বস্তিতে। তুই নিজে গেলে যা হবে, ঝাণ্ডু গেলে কি তাই হবে?

হবে। বড়োলোক হলে অন্য কথা ছিল। ঝাণ্ডুও যে, দাম দিয়ে কিনবে আমিও সেই দাম দিয়েই কিনব। বরং ঝাণ্ডু গেলেই ভালো হবে। তা ছাড়া, একটা কথা বলব মা! তোমার এত ভাবনা-চিন্তা কীসের? তাদের মোরগা-আণ্ডা বা বিরিয়ানি খাওয়াতেই যে, হবে তার মানে কী? আমরা রোজ যা খাই, তাই খাওয়াবে। ভান করার দরকার কী আছে জানি না। তাঁরা তো জানেন-ই যে, আমরা গরিব। তাঁদের কাছে বড়োলোক সাজবার প্রয়োজনটাই বা কী? তাঁরা যদি মানুষ ভালো হন তো...

হুঃ। মানুষ ভালো! ভালোমানুষ আর কোথায় আছে? বেতলাতে ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফাণ্ড এবং ভারত সরকার মিলে বছরে কত কোটি টাকাই না-জানি খরচ করছেন ‘প্রায় বিলুপ্ত’ হয়ে যাওয়া বাঘেদের গুষ্টিকে বাঁচাতে। আর মানুষের মধ্যেও যে, ‘ভালোমানুষ’ বলে একটি বিশেষ প্রজাতি ছিল, সেই প্রজাতিটিও যে পুরোপুরিই নির্মূল, নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, সকলের-ই চোখের সামনে এই স্বাধীন-হওয়া ভারতবর্ষে, তা নিয়ে তো কই, কারোর-ই কোনো মাথাব্যথা নেই! যাঁরা আসছেন, তাঁরা যে, ভালো মানুষ হবেন-ই; এমন ভরসা আমার অন্তত নেই।

একটা স্কুল করলে কেমন হয়? সেই স্কুলে আমরা ছেলে-মেয়েদের চরিত্র গঠন করব। নতুন ভারতবর্ষের নতুন প্রজন্মকে ‘মানুষ’ হওয়ার শিক্ষা দেব। শিক্ষা আর জীবিকা যে, এক নয়, বড়োলোক হওয়াই যে, শিক্ষার বা জীবনের একমাত্র গন্তব্য নয়; এইসব শেখাব তাদের আমাদের স্কুলের মাধ্যমে। তা ছাড়া আমাদের মেয়ে-মায়ের সাচ্ছল্য ও সম্মানের জীবিকাও হবে একটা। করবে?

ভালোই বলেছিস!

কেন? ও-কথা বলছ কেন?

চরিত্র গঠন-টঠনের কথা বললে লোকে হাসবে এখন। এখন প্রত্যেক মানুষের-ই জীবনের একটাই গন্তব্য। ভালো-থাকা, ভালো-খাওয়া, ভালো-পরা, ফ্ল্যাট, গাড়ি টি.ভি., ভি.সি.আর.। যাঁদের এসব আছে তাঁরাই চরিত্রবান। মনুষ্যত্ব আর এইসব ভ্রান্তি; জঞ্জাল সব জড়িয়ে-মড়িয়ে গেছে। এই না?

সুনীতি একটি ফুলদানি পরিষ্কার করতে করতে বলেন, কোনটা আগে আর কোনটা পরে এ-জ্ঞান তোর কোনোদিনও ছিল না। হবেও না। আমি মরছি কালকের ভাবনা ভেবে। কোথায় পেঁপে, কোথায় দুধ, কোথায় দই, কোথায় ডিম-মুরগি; আর তুই পড়লি তোর স্বপ্নের স্কুল নিয়ে। কত যে, ‘আকাশ-কুসুম’ দেখতে পারিস তুই! সত্যি!

মা, আমাদের রোজগারের একটা স্থায়ী বন্দোবস্ত হলে কোনো স্বপ্নই আর আকাশ-কুসুম থাকবে না। সত্যি হয়ে উঠবে মা। একটু আগেই শিরীষ একটি গানের কথা বলছিল;

আমি কেবল-ই স্বপন করেছি বপন বাতাসেদিনশেষে দেখি ছাই হল সব হুতাশে হুতাশে।

নিশ্চয়ই রবীন্দ্রসংগীত?

এমন আর কে লিখেছেন বাংলাতে? না লিখবেন? অনেক কবিই তো এলেন গেলেন।

বলেই বলল, তবে শোনো। ইস, কী অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স। তবু তোমার পেঁপের প্রবলেম-সলভ হয়ে গেছে।

কী করে? একটাও তো আনতে পারলি না।

শিরীষ বলেছে, আজ রাতের মধ্যেই একবস্তা কাঁচা-পাকা পেঁপে তোমার পায়ের কাছে নামিয়ে দিয়ে যাবে।

তাই?

ইয়েস।

ছেলেটা ভালো।

সুনীতি বললেন।

কেন? পেঁপে-জোগানদার বলে?

না, তা নয়। পেঁপে ব্যতিরেকেই ভালো। কিন্তু নৈবেদ্যটা তো আমার প্রাপ্য নয়।

তবে? কার প্রাপ্য?

তুই ভালো করেই জানিস, কার? কিন্তু বেচারা কি জানে যে, সেই পেঁপের বস্তাতে করেই সে তার স্বপ্ন-মারণের বীজও বয়ে আনবে? তারমধ্যেই তার ক্বচিৎ-কল্পনার মৃত্যু নিহিত আছে?

জানে।

জানে?

হ্যাঁ। আমিই ওকে বলেছি।

কী বলেছিস?

একটা সম্ভাবনার কথা। মানে...

এমন করেই বললি যে, ‘সম্ভাবনা’ শব্দটাকে শোনাল যেন ‘সদ্ভাবনা’।

ঝিঁঝি হেসে উঠল। বলল, ডায়াসেশানে পড়ে এত ভালো বাংলা তুমি শিখলে কী করে মা?

ভাষাটা ভালোবাসার জিনিস। মাতৃভাষা বলে কথা! যে-মানুষ তার মাতৃভাষা ভালো করে জানে না, তার মতো অশিক্ষিত আর হয় না।

শিরীষের স্বপ্ন প্রসঙ্গে একটা কথা বলব মা। শুধু ওর স্বপ্ন কেন, কারো স্বপ্ন নিয়েই বোধ হয় হাসি-তামাশা করা উচিত নয়। যারা স্বপ্ন দেখতে পারে এখনও, তারা নিশ্চয়ই অন্য এক নির্মল, অকলুষিত গ্রহের জীব। স্বপ্নই তো জীবন; জীবনের পাথেয়। তা ছাড়া, আরও একটা কথা মা! আমি শিরীষের স্বপ্নের অতীত কেউ নই। স্বপ্ন দেখার অধিকার প্রত্যেক মানুষের-ই জন্মগত অধিকার। কারো স্বপ্ন থেকেই কারোকে বঞ্চিত করার অধিকার অন্য কারোর-ই নেই।

কিছুক্ষণ উদাস চোখে জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকল ঝিঁঝি।

ঝিরিঝিরি করে একটা হাওয়া বইছিল। সামান্য ভাপ আছে হাওয়াটাতে। বইছিল শুকনো পাতা উড়িয়ে উড়িয়ে।

হাওয়াতে মহুয়ার গন্ধ।

বাইরে থেকে ভেতরে মুখ ফিরিয়েই হঠাৎ বলল ঝিঁঝি, তা ছাড়া, মা! আরও একটা কথা। কার স্বপ্ন যে, কখন সত্যি হয়ে ওঠে, বাস্তব; তা কি আমরা কেউ-ই জানি?

সুনীতি মেয়ের মুখে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন।

তারপর বললেন, স্বগতোক্তির-ই মতো, ‘সে-কথা ঠিক’।

সুনীতিকে উদবিগ্ন দেখাল একটু।

ঝাণ্ডু ধামা করে নানা আনাজ নিয়ে বাড়িতে ঢুকল। বস্তিতে গিয়েছিল। যার কাছে যা পেয়েছে তাই কুড়িয়ে-বাড়িয়ে এনেছে।

গুছিয়ে রাখ বাবা ভাঁড়ারে।

সুনীতি বললেন।

বাজারের রকম দেখে মনে হচ্ছে যেন, আমরা কলকাতাতেই আছি। ডান-বাম-উত্তর-দক্ষিণ-ঈশান-নৈঋতের কোনো নচ্ছার দলের ডাকা ‘বনধ’-এর আগের দিন। তাই-না?

ঝিঁঝি বলল।

কলকাতার কথা ছাড়ো। পৃথিবীর ইতিহাসে কলকাতার ‘বনধ’-এর নজির আর কোথাও নেই।

তারপর দু-জনেই চুপচাপ রইল কিছুক্ষণ।

ঝিঁঝি বলল, আমার বড়ো ভয় করছে।

কেন? ভয় কীসের? তোর ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি কিছুই করতে বলব না। তা ছাড়া, বিয়ে যে, করতে হবেই তার-ই বা কী মানে আছে? দিনকাল পালটে গেছে। তবে এও ঠিক যে, এখন তোর যা সবচেয়ে বেশি দরকার তা হচ্ছে অবলম্বন। সাচ্ছল্য, একজন পুরুষের অনেক দোষ-ই ঢেকে দেয়। দেখি, নীলোৎপল ছেলেটিকে কেমন লাগে। তুইও দেখ।

অন্য কথা বলো মা। ওই শোনো, কোকিল ডাকছে। আমার কিন্তু বছরের এই সময়টা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। এই বসন্ত, শেষ-বসন্ত, চৈত্র। চৈত্র-শেষ। একেবারে পাগল-পাগল করে মনটা।

শরীরের মধ্যে রিকিঝিকি করে না? আমার তো করত তোর মতো বয়সে।

দু-চোখে হাসির ঝিলিক তুলে কিন্তু না হেসে সুনীতি বললেন।

ঝিঁঝি জোরে হেসে উঠল। সুনীতিকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে বলল, সত্যি মা! তুমি না! রিকিঝিকি! কীসব যে-বলো!

ঠিক-ই বলি। লজ্জা পাওয়ার কী আছে? মনের মতো শরীরও তো বিধাতার এক আশ্চর্য দান। শরীরের কথাও শুনতে হয় বই কী! তাতে লজ্জা কীসের? শরীর তো মনের চেয়ে একটুও কম পবিত্র নয়!

সত্যি মা! তুমি তুমি-ই। তোমার মতো রিয়্যাল মর্ডান মা যদি, সব মেয়ে পেত। আমার কত কিছুই নেই, যা অন্যদের আছে। আবার আমার তুমি আছ যে, যা অন্য কারুর-ই নেই।

অনেক হয়েছে, এবারে কাচের আলমারিটা খুলে কাচের গেলাসগুলো বের করে ধুয়ে-মুছে রাখ। জাপানিজ টি-সেটটা একবার অবশ্য পরিষ্কার করে রেখেছিলাম ক-দিন আগে। তবু, সাবধানে আর একবার ধুতে হবে। তোর বাবা জাপান থেকে নিজে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। কত জিনিস-ইযে এনেছিলেন। কলকাতার বাড়ি বিক্রি হবার সময়ে সবকিছু কারা যে নিয়ে গেল। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সকলেই হাতে হাতে লোপাট করে দিল। কী করব! মহুয়া-মিলনের মতো জংলি জায়গাতে এই নির্বাসিত জীবনে অবশ্য ওইসব জিনিস মানাতও না। একদিক দিয়ে, যা হয়েছে তা ভালোই হয়েছে।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সুনীতি যেন, কোন দূরের ভোরে চলে গেলেন। যেন, অনেক দূর থেকে বললেন, কত মানুষ-ই না ছিল তখন আমাদের ঘিরে! আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, অনাহূত, রবাহূত কত লোক-ই যে, আসত আর তোর বাবার পয়সাতে হুইস্কি-বিয়ার-জিন-ভদকা সব খেত। তারা যে, কোথায় গেল। সেসব সুখের পায়রারা।

ঝাণ্ডু বলে, ‘ফসলি বটের।’

ঝিঁঝি বলল, সত্যি। ভাবলেও অবাক লাগে। মানুষের দুর্দিন এলেই শুধু বোঝা যায় যে, পৃথিবীটা কত স্বার্থপর, কত নীচ, কত কৃতঘ্ন।

সুনীতি একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

ঝিঁঝি বলল, ছাড়ো তো পুরোনো কথা। স্মৃতিতে, যা-কিছু সুন্দর শুধু সেই সবকিছুই রেখো; আর যা সুন্দর নয়, তা ভুলে যেয়ো। সুন্দর ‘স্মৃতি’ মানুষকে সুন্দর করে, প্রসন্ন করে। আসলে কী জানো মা, একদিন যদি আমরা আবারও বড়োলোক হই, আবারও আমাদের চারপাশে অমন মানুষেরা ভিড় জমাবে। বাড়ির সামনে লাইন পড়বে গাড়ির, যেমন পড়ত আগে, বাবার আমলে। দেখো, তখন আমরা নিজেরাই ভুলে যাব তাদের সব কৃতঘ্নতার কথা। আসলে, তুমি ও বাবা নিজেরা ভালো বলেই মন্দ লোকদেরও দূরে সরিয়ে রাখতে পারোনি, পারবে না।

পারব, পারব। আমি আর ভালো নেই। সেইসব ইতর খল স্বার্থপর মানুষদের কৃতঘ্নতা আমি কোনোদিন ক্ষমা করব না। দেখিস তুই।

জানো, শিরীষ একটা কথা প্রায়-ই বলে। বলে, টাকার বিনিময়ে শেষপর্যন্ত পাওয়ার মতো কোনো কিছুই পাওয়া যায় না, এই জীবনে। ভালোবাসা, প্রীতি, প্রেম, মান, যশ কিছুই নয়। টাকা, একটা ফালতু ব্যাপার। ভালোবাসা-প্রেম-প্রীতি কিনতে পারা যায়, শুধু ভালোবাসা-প্রেম-প্রীতি দিয়েই। আর স্থায়ী মান যশ পাওয়া যেতে পারে শুধু ‘গুণপনা’ দিয়েই। হয়তো টাকা বা ক্ষমতা ভাঙিয়েও সেসব পেয়ে থাকেন কেউ-কেউ। কিন্তু সেইসব থাকার নয়। থাকেও না। টাকা আর ক্ষমতা ফুরোলেই সেই মান-যশও উবে যায়।

বা:। শিরীষ বলে বুঝি এই কথা?

সুনীতি বললেন।

ঠিক-ই বলে। ছেলেটা খুব-ই বুদ্ধিমান। এবং স্বভাবটাও মিষ্টি। কিন্তু পুরুষের মস্ত গুণ যে, তার সাচ্ছল্যও। বড়োলোক হতে বলছি না, কিন্তু গরিব থাকতেও বলব না। যে যাই বলুক, এখন পঞ্চাশ-এক-শো বছর আমাদের এই গরিব দেশে এই বোধটা থেকেই যাবে। আমরা অশেষ গুণী হলেও, স্বাবলম্বী হলেও, পুরুষের সংজ্ঞা আমাদের মনে শাল-শিমুলের-ই মতো ঋজু, সটান হয়ে বেঁচে থাকবে আর আমরা নরম, লাজুক, নাজুক স্বর্ণলতার মতো তাদের জড়িয়েই খুশি থাকব। আমি জানি না, তোরা, উইমেনস লিব-এ বিশ্বাসী আধুনিক মেয়েরা কী বলবি! কিন্তু আমার এই মত। এখনও এই মত।

ঝিঁঝি কথা বলল না কোনো। জানলা দিয়ে বাইরের টাঁড়, জঙ্গল আর পাহাড়ের দিকে চেয়ে রইল।

একটা কোকিল ডাকছিল, পাগলের মতো, বাড়ির হাতার মধ্যের অশোক গাছে বসে।

ঝিঁঝি জানে না যে, এইটাই সেই পাগলা কোকিলের দোসর। যে-কোকিলটা শিরীষের বাড়ির পাশের শিমুলগাছের লাল ফুলের মধ্যে কালো শরীর লুকিয়ে রেখে একটু আগেই শিহর তুলে-তুলে ডাকছিল তার-ই দোসর এসে ডাকছে এখন ঝিঁঝিদের বাড়িতে।

ঘটনাটা কাকতালীয়। কিন্তু ঝিঁঝি জানে না। হয়তো জানে না শিরীষও।

এক-ই কম্পার্টমেন্টে সকলেই ফিরল ওরা একসঙ্গে। ঘণ্টেমামা উঠেছিলেন ডালটনগঞ্জ থেকে। জগামামা, মাধামামা এবং বানোয়ারিচাচার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, পেঁপে সংগ্রহ করে টোরী থেকে ট্রেনে উঠতেই। ওঁরা আসছিলেন লাতেহার থেকে। মাধামামা, তাঁর বন্ধু বানোয়ারিলাল, ঘণ্টেমামা, জগামামা এবং শিরীষ।

সত্যি সত্যিই দু-টুকরি পেঁপে, কাঁচা ও পাকা এবং অধিকন্তু এক টুকরি কাঁচাকলা যে, জোগাড় হবে এতটা ভাবেনি শিরীষ। হয়ে গেল, ঝিঁঝির কপালে।

পুরো পথটাই মাধামামা চুপচাপ-ই ছিলেন।

আরও চুপচাপ বানোয়ারিলাল চাচা। তাতেই সন্দেহ হল, ভইষালোটনের ভইষ ভালো ‘কেচাইন’ করেছে।

অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিলেন শুধু ঘণ্টেমামাই। অধিকাংশ মানুষ-ই নিজের গলার স্বরকে বড়োই ভালোবাসেন। তাঁকে অবশ্য বাচালের পর্যায়েরই ফেলা চলে। তবে উলটোপালটাও কথা একটাও বলেননি। ঝিঁঝির সম্ভাব্য বিয়ে-সম্পর্কিত একটি কথাও তাঁর মুখ দিয়ে বেরোল না দেখে ‘বাচালের বাকসংযম’ শীর্ষক একটা প্রবন্ধ লিখবে কোনোদিন এমন-ই স্থির করল শিরীষ মনে মনে।

অথচ শিরীষ নিজেই মাধামামার দু-বছরের বড়োদাদা জগামামাকে প্রায় বলেই ফেলেছিল কথাটা পেঁপের এক্সপ্লানেশান না দিতে পেরে।

লাতেহার স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম-এ দাঁড়িয়ে যদিও শিরীষ ঘটনার বিবরণ শোনাচ্ছিল কিন্তু লক্ষ করল যে, মাধামামা তাঁর ‘অ্যাডভেঞ্চার’ ঘণ্টেমামার কাছে বেমালুম চেপে গেলেন। লাতেহার থেকে মনোয়া-মিলনের পথে ট্রেনের মধ্যে কথোপকথন মাধামামা এবং ঘণ্টেমামার মধ্যে এইরকমে হল:

মাডেমড্যেই কোটায় কোটায় উপে ডান মটাই?

আমি কী কপ্পুর যে, উপে যাব। যেখানেই থাকি, সেখানেই রুহ-খসস আত্মরের মতো গন্ধ উড়িয়ে থাকি। আমি উড়ি। উপি না।

খপর-টপর ঠব বালোটো?

ফাস্টোকেলাস। আপনি আজকাল কি রেতের বেলাও ওকালতি করছেন? কী কেস? রেপ নাকি?

আরে না, না। ট্রেটপাসিং এবং আর্মস অ্যাক্ট-এর কেস।

সে কী মহায়। সঙ্গে যে, দু-গাছি বন্দুকও দেকচি। ডাকাতি করতে গেসলেন নাকি সদলবলে?

প্রায় ঠেরকম-ই। টবে ঠিরিঠ নয়। ঠিরিঠ অন্য কাডে গেটিল।

কী কাজে গেচিলে শিরীষ?

ঝিঁঝিদের বাড়ির একটা কাজে।

শিরীষ বলল।

তুমি কি বাবা আজকাল টিকটিকি হয়েচ? ঝিঁঝি ধরে খাবার ইচ্চে হয়েচে বুজি?

এইসময়ে, হঠাৎ-ই ‘ওয়াইল্ড-লাইফ বিশেষজ্ঞ’ মাধামামা তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা বা অধীত-বিদ্যাচাপতে না পেরে বলে উঠলেন, করকম ঝিঁঝি হয় তা কি জান ঘণ্টেদা? সব ঝিঁঝি তো সব টিকটিকির খাদ্য নয়।

আঃ! কী হট্টেটা কী? এটো আড হাইপটেটিকাল ব্যাপাড নয়। ঢিঁঢিঁ নামে ডে রক্তমাংটেরও একজন আটেন রিয়্যাল।

মাধামামা বললেন, রিয়্যাল ঝিঁঝির গায়ে রক্তমাংস থাকে না, তোমায় তা কে বলল?

ড্যাক মাডা! অনেক ডালিয়েটিস আড। এবাডে ক্যামা ডে। আনরিয়্যাল ঢিঁঢিঁর কটা ঠাক একন।

থাক তাহলে।

শিকার কি হল আজ মাধাবাবু?

মাধাদা তাঁর বাল্যবন্ধু বানোয়ারিলালের দিকে চেয়ে, তারপর জগাদার দিকেও একঝলক চেয়ে নিয়েই বললেন, হয়নি কিছুই। তবে, হতে পারত।

কী হতে পারত?

অনেক কিছুই হটে পারট। হাটি, বাঘ, গন্ডার, কী লয় টাই বলো-না?

ফু:। পালামৌর টাঁড়ে গন্ডার আসবে কোত্বেকে? তবে এ-অঞ্চলের মনিষ্যির মধ্যে খোঁজ করলে দু-এক গাছি পেলিও পেতি পারো। সারাজীবন বিড়িপাতার ঠিকেদারের হয়ে জঙ্গলে জঙ্গলেই তো কাটালাম আর মাল চিনি না আমি বিশ্বেশ্বর? তোমরা আমায় ভাবোটা কী হে? জঙ্গলের ব্যাপারে খাপ খুলতে এসো না আমার কাচে।

কথাটা জগাদা-মাধাদা ভুলেই গেছিলেন। মানে, ঘণ্টেমামার ব্যাকগ্রাউণ্ড। চকিতে কথা ঘুরিয়ে নিলেন। বুদ্ধিমান তো দু-জনেই। তবে মাধাদার বুদ্ধি একটু বেশি বলেই মাঝে-মাঝে উথলানো-দুধের মতো উপচে পড়তে চায়।

লাতেহার স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে অবশ্য মাধাদা দুর্ঘটনাটা কী করে ঘটল তা সবিস্তারে আগেই বলেছিলেন শিরীষকে। আগে ব্যাপারটা মিস-রিপোর্টেড হয়েছিল। মোষ নয়; হাতি। ঘণ্টেমামা ডালটনগঞ্জ থেকে আসছেন তাই ব্যাপারটা জানেন না। ব্যাপারটা, জগামামার ভাষায় বলতে গেলে, ‘ইনভেট্টিগেট’ করার মতোই ব্যাপার!

মাধামামা আবারও ‘ফিনসে’ শুরু করলেন ঘণ্টেমামার বেনিফিটের জন্যে।

ওখানে, মানে যেখানে শিকারে গেছিলেন, একটি তালাও ছিল। মানে পুকুর, তাতে একঝাঁক বত্তক ঘুরে ঘুরে চরে যাচ্ছিল। বড়ো বড়ো হাঁস। খুব বড়ো বড়ো হাঁস।

কী হাঁস?

শুধোল শিরীষ-ই। কারণ, এত ডিটেইলস-এ তখন বলেননি মাধামামা।

গুলি মার, গুলি মার। হাঁস; হাঁস। এক-একটার ওজন হবে দেড় কেজি। কম সে কম। মানে, পালক-ফালক ছাড়িয়ে।

মাধামামা বলেছিলেন।

তারপর?

তারপর আমি আর বানোয়ারি ঘাসের মধ্যে লেপার্ড-ক্রলিং করতে করতে আস্তে আস্তে এগোলাম। উঃ। বহুতদিন এমন ‘র‌্যাফিং’ করিনি। বুয়েচিস। তাপ্পর অকুস্তলে পৌঁচে ছুপকি মেরে শুয়ে থেকে ভালো করে নিশানা নিলাম। নিশানা নিতে নিতে বড্ডই দেরি হয়ে গেল কারণ আমরা দু-জনে দুটি ‘চোট’-এ দু-ডজন হাঁস মারবার মওকাতে ছিলুম। শেষমেশ, যখন এক লাইনে হবে, হবে। মানে যখন তাদের গলার সঙ্গে মাথার সঙ্গে, গলা আর মাথায় ঘেঁটি আর ঘেঁটিতে এক লাইন হবে, তখন-ই ঠিক ঘোড়া দাবব! আর হাঁসগুলোও এমনি টেঁটিয়াল, একবার লাইন হয় তো সঙ্গে-সঙ্গেই ভেঙে যায়। একমুহূর্ত সমান তো পরক্ষণেই হিজিবিজি। এর-ই মধ্যে হতভাগা, ইডিয়ট, শর্ট-সাইটেড বানোয়ারি শালা হঠাৎ ফিসফিস করে বললে, মাধারে! ওয়াইল্ড অ্যালিপ্যান্ট।

যেই না বলা, আমি অমনি ডানধারে চেয়েই দেখি, প্রায় আমার বুকের ওপর-ই পা উঠিয়ে দেবার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে মিস্টার গণেশ। বাপরে বাপ। সে কী দৃশ্য! মিস্টার ডানবার বাণ্ডার চাক্ষুষ করলেও তাঁর ভিরমি লেগে যেত! উরিব্বাস। ইয়া ইয়া দুইকান আর একটি ইয়াব্বড়ো দাঁত দেখিয়ে হাতি চেয়ে আছেন নাতি-কষাবার অভিপ্পায়ে।

উত্তেজিত হয়ে শিরীষ বলেছিল, তারপর?

তারপর আর কী, মাধামামা বললেন, আমি ভাবলুম যা: শালা! সারাজীবনে তো কিছুই করলুম না, সব বাঙালিই যা হেলাফেলায় করে, সেই একটা চাকরি পর্যন্ত একনাগাড়ে তিনদিনের বেশি করতে পারলুম না, ছেলেবেলা থেকে ‘জন টেইলর’, ‘পোণ্ডোরো’, ‘আর্নেস্ট হেমিংওয়ে’, ‘বব রুয়ার্ক’ এমনি কত বাঘ-সিংহী মানুষের লেখা পড়েছি, স্বপ্নে কত শত হাতি-সিংহ মেরিচি...

ঘণ্টেমামা বললেন, মাধা গো! দাদা স্বপ্নে আর কী কী মেরেচ তা আবার বলতে যেয়োনি যেন। মেরে থাকলেও কাউকে বোলোনি। জানো তো, সাপকে মারলে সে-সাপ জ্যান্ত হয়ে উটে কামড়ে দেয়। সাপ মেরেই তাকে পুড়িয়ে দিতে হয়।

সাপের কথা হচ্ছে না।

অ।

গেরাম-গঞ্জ জঙ্গল-টাঁড়ের লোকজন সব। মুখের আগল নেই। কথাবার্তা খারাপ দিকে ঘুরে যাচ্ছিল বলে ঘণ্টেমামা নিজেই ব্রেকটা মারলেন। তাই তো নিয়ম। যে-অ্যাকসিলারেটর দাবায় সে-ই তো ব্রেক মারে।

ভুলেই গেছিলাম। বলো, হাতির কথা হচ্চিল।

ঘণ্টেমামা বললেন।

হ্যাঁ। তা ভাবলাম, ছেলেবেলার স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে এতদিনে। এ নির্ঘাত পটলার মায়ের-ইদান...

পটলার মা-টি আবার কে?

সে, ছেল একজন।

ছেল তো বুজলাম, কিন্তু তিনি কে?

কেন? আমার কি কেউ-ই থাকতে পারে না?

দেকো দিকি! আমি কি তাই বলিচি?

সে ছেলো, আমাদের মনোয়ামিলনের প্রতিবেশী। কিচুদিন আগেও এয়েছেল। দাদাকে জিজ্ঞেস করো না, বিশ্বেস না হয়তো। সে আমার জন্যি কত পুণ্যিপুকুর ব্রত করেচেল গো। সে বলেচেল, তুমি যা চাবে, তাই পাবে। ভাবলুম, এতদিন ধরে হাতি চেয়েচি আজ এই নাদু-হাতিকে মেরে কোলবালিশ করে নে ঘুমুব। ‘ঘুঘুর-সই ঘুগুর-সই’ করে খেলব। কিন্তু হা-হতোস্মি। বানোয়ারি আমার বাঁ কানের মধ্যে, ইয়ারফুল অফ অ্যাজিটেটেড, ওয়ার্ম হুইসপার ঢেলে বলল; ‘হোয়াট টু ডু? গুরু?’

আমি বললুম, ‘টু শুট। হোয়াট এলস?’

তাপ্পর বানোয়ারি বলল, ‘ওয়ান—টু—’

আমি বললুম, থিরি-ই-ই-ই...।

তাপ্পর?

ঘণ্টেমামা প্রবল উত্তেজনার বশে বিড়িতে হাত পুড়ে যাওয়া সত্ত্বেও টান না লাগিয়েই শুধোলেন।

তাপ্পর আর কী? থিরির সঙ্গে রি-রি-রি করে ছররাদানাগুলো হাতির পায়ে যেয়ে বিঁধল। মানে, সেঁদোল আর কী। আর সঙ্গে সঙ্গে হাতিও পা তুলল। ভাবলুম, অ্যাই মারল বুজি, গোদা পায়ে নাতি। নয়তো পা-টি ভুঁড়িতে চাপিয়ে দিয়ে দিল সাধের ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে। মাধামামা বললেন।

কিন্তু না। দুর্ঘটনা কিছু ঘটল না। পটলার মায়েই বাঁচিয়ে দিল।

কিন্তু...

বানোয়ারিলাল বলল।

কী, কী? ঘণ্টেমামা আবারও উত্তেজিত হয়ে শুধোল।

হাতি ছেড়ে দিল আমাদের নিজগুণে। অথবা পটলার মায়ের গুণে। কিন্তু প্যায়দাতে ধরল।

প্যায়দা?

ইয়েস।

কার প্যায়দা? পটলার মায়ের?

কী ইয়ার্কি করচ?

তবে কার?

কার আবার? রাজার। রাজার পোষা হাতি য্যা! ঘাস খাচ্চিল। তার পেছনে পেছনে মাহুত আর রাজার খাস প্যায়দাও চেলো। আমরা ঘাসের মধ্যে শুয়েছিনু তাই তেনারা আমাদের দেকতে পায়নি।

এই অবধি শুনেই ঘণ্টেমামা হিহিহি-হিহিহি-হিহিহি করে কেবল-ই হাসতে লাগলেন। হাসতে হাসতে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। দমবন্ধ হয়ে মারাই যান আর কী! বানোয়ারি তড়িঘড়ি ওয়াটারবটল-এর জল থেবড়ে থেবড়ে মুখে-মাথায় দিতে থাকলে তবে অনেকক্ষণ পরে ঘণ্টেমামা শান্ত হলেন। বললেন কেলো, কী কেলো! ফিরে গিয়ে প্রসাদ সাহেবকে বলে ডালটনগঞ্জের রোটারিতে এই হাতি শিকারের গল্প শোনাবার আসর বসাতে হবে একদিন। তুমি কি আসবে মাধা? তোমার বন্ধু বানোয়ারিলালকে নিয়ে? যদি আসো তো নেক্সট মিটিং-এর আগে তোমাদের অফিসিয়ালি ইনভাইট করবেন তাহলে ওঁরা।

জগাদা বললেন, ঘণ্টেদা, এনাফ ইজ এনাফ। ইউ উইল হিট দ্যা সিলিং।

এইটেই এক পরমাশ্চর্য! জগাদা যখন ইংরিজি বলেন তখন অমন ‘ট-ট’ করেন না। করলে, অবশ্য ওকালতি হত না। ওকালতিতে তো, ‘কথার’-ই খেলা!

মনোয়া-মিলনের জমির সমান প্ল্যাটফর্মে ওরা সকলেই নামল। ট্রেনটা চলে গেল। গার্ড সাহেবের শেষ কামরার আলো আর ট্রেনের পেছনের লাল বাতিটা হারিয়ে গেল খিলাড়ির দিকে।

যেকোনো ট্রেন চলে গেলেই শিরীষের বুকের মধ্যেটা হু হু করে ওঠে। লাইনের দুটো কালো দাগ পড়ে থাকে স্মৃতি বুকে করে। কত মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, আশা-নিরাশা বুকে করে দুলতে দুলতে ট্রেন চলে যায়, দূরে; বহুদূরে।

শিরীষ বলল, ঘণ্টেমামা আপনি আমার সাইকেলটা নিয়ে যান। সাইকেলটা রাখা আছে মাস্টারবাবুর ঘরের বাইরের বারান্দাতে। কাল একসময়ে গিয়ে আমি বরং নিয়ে আসব। তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবেন।

শিরীষের যেন মনে হল যে, ঝাণ্ডু দাঁড়িয়ে আছে ঝুপরি আতাগাছটার তলাতে। একটু এগিয়ে যেতেই দেখল শিরীষ, শুধু ঝাণ্ডুই নয় আরও দু-জনে আছে। ঝাণ্ডুর বস্তির লোক। মুখ চেনে, নাম জানে না শিরীষ।

ঘণ্টেমামা, শিরীষের প্রস্তাবে ‘‘হ্যাঁ’’ বা ‘‘না’’ কিছুই বললেন না। হয়তো বিবেচনা করে দেখছেন। ঝাণ্ডু বোধ হয় আগামীকাল রাতের মহড়া দিচ্ছে। ভালোই হল। টুকরি তিনটি তারা কাঁধে তুলে নিতে শিরীষ আর ঘণ্টেমামা হেঁটে রওনা হলেন। ততক্ষণে জগাদারা সকলেই যার যার সাইকেলে অদৃশ্য হয়ে গেছেন। মাধাদা আর বানোয়ারিবাবুও বন্দুক কাঁধে লম্বা লম্বা পা ফেলে সামনের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।

ঘণ্টেমামা দাঁড়িয়ে পড়ে, হাওয়া আড়াল করে একটা বিড়ি ধরালেন।

বললেন শিরীষকে, চললে নাকি?

না।

শিরীষ বলল।

সকলেই শুধোয়, বিড়ি কেন খাই? ভদ্রলোক তো বিড়ি খায় না। তা আমি বলি...

ঘণ্টেমামার বিড়ি খাওয়ার এক্সপ্লানেশন শিরীষের কানে গেল না।

এখন শুক্লপক্ষ। সপ্তমী কী অষ্টমী হবে। কিছুদিন বাদেই দোলপূর্ণিমা। চৈতি রাতের হাওয়া ছেড়েছে গাছগাছালি, ঝোপঝাড়, ঘাসে-পাতায় বনমর্মর তুলে। মহুয়া ফোটার সময় এখনও হয়নি। তবু অনেক গাছে অসময়েই ফুল এসেছে। কখনো-কখনো হাওয়ার দমকে সেই গন্ধ এসে উদাস করে দিয়ে যায়। করৌঞ্জ, নিম, ইউক্যালিপ্টাস, কাঁঠালের মুচি, আমের মুকুল সবকিছুর-ই গন্ধে মাখামাখি হয়ে যায় এখন হাওয়া।

রাহেলাওলা, লিটপিটিয়া, সফেদিয়া, পিলাবিবি, জীরহুল ইত্যাদির ফুলে গন্ধ নেই। কিন্তু তাদের গায়ে আছে। নারীর গায়ের গন্ধর মতো। হালকা হয়ে ভাসে। উগ্র নয়; কিন্তু আলাদা আলাদা। ঝিঁঝির গায়ের গন্ধর কথা মনে পড়ে গেল শিরীষের। যদিও ওর নিরাবরণ শরীরের গন্ধ কখনো নেয়নি নাক। এ-জীবনে তা নেওয়া হবেও না। জানে।

এইরকম রাতে পাথরের, পাহাড়ের শালফুলের ঊষর টাঁড়ের গন্ধ, সাপের গায়ের গন্ধ, খরগোশের গায়ের গন্ধ, বনহরিণীর তলপেটের গন্ধ, চিরচিরি আর চাট্টি নদীর জলের গায়ের গন্ধের সঙ্গে মিলেমিশে মনকে উদাস করে দেয়। সকলের মনকে দেয় কি না জানে না ও। তবে শিরীষের মনকে দেয়।

পরবে-তেওহারে যখন প্রদীপ ভাসায় মেয়েরা, হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে; পাতার দোনার মধ্যে ফুল, মিষ্টি, আগরবাতির গন্ধ আর রেড়ির তেলপোড়ার গন্ধ বুকে নিয়ে অবিন্যস্ত এলোমেলো, আগে-পিছে জলবাহিত হয়ে বয়ে-যাওয়া প্রদীপেরা যখন নদীর বাঁকে অদৃশ্য হয়ে আবারও অন্য কোনো অদৃশ্য বাঁকের দিকে বয়ে যায়, তখন শিরীষের জন্যে, তার মঙ্গলকামনায় প্রদীপ ভাসানোর জন্যে সুবেশা সুগন্ধি হাসিমুখের তরুণী এই পৃথিবীতে একজনও যে নেই, সে-কথা হঠাৎ-মনে হওয়ায় এক তীব্র দুঃখ, তীক্ষ্ণ, উত্তপ্ত ছুরির মতো শিরীষের বুককে বিদ্ধ করে দিয়ে চলে যায়।

সব-ক্ষততে রক্ত ঝরে না।

যে ক্ষততে ঝরে না, তা আরও বেশি বেদনাদায়ক।

নীলোৎপলের জন্যেও একটি প্রদীপ ভাসাবে, ভাবে শিরীষ। মাঝরাতে এসে ভাসিয়ে যাবে চাট্টি নদীতে কোনোদিন। ঝিঁঝির যে, রক্ষক হবে, বাহক হবে; ধারক, যে-বুকে নিয়ে আদর করবে ঝিঁঝিকে, তার-ই মঙ্গালাকাঙ্ক্ষাতেই ভাসাবে ওই প্রদীপ। ভাসাবে সেই শিরীষ, যে, সেই ভাগ্যবান নীলোৎপলের পেঁপে এবং কাঁচকলার বাহক। কী যেন বলে? ট্রান্সফারড এপিথেট? হা:। ইডিয়ট। ‘দাঁড়কাক-এর বাসা’-র বাসিন্দা আর একটা দাঁড়কাক; শিরীষ!

ছেলেটি তো খুব-ই ভালো শুনলাম।

স্বগতোক্তির মতো বলল শিরীষ। ঘণ্টেমামাকে শুনিয়ে।

ঘণ্টেমামা বিড়িতে সুখটান লাগাচ্ছিলেন। হঠাৎ এই প্রশ্নে চমকে উঠে বললেন, কে? কার কথা বলছ হে?

নীলোৎপল।

তোমাকে কে বলল, নাম?

ঝিঁঝি-ই বলেছে। যাদের জন্যে পেঁপে খুঁজে বেড়ালাম দিনভর তাদের নামটা জানাটাও কি অপরাধ?

না, না, তা কেন? তবে এ-কথা ঠিক-ই যে, নীলোৎপলের মতো ছেলে এই মনোয়া-মিলনের মতো টাঁড়ে-জঙ্গলে কোথায় পাওয়া যাবে! নীলোৎপল সম্বন্ধে আর কী বলব। লক্ষে এমন একটি ছেলে মেলে। অমন স্বামীর জন্যেই মেয়েরা যুগে যুগে শিবের মাথাতে ঘড়া ঘড়া জল ঢেলে এয়েছে। যেমন চেহারা, তেমন-ই গুণপনা, যেমন বড়োলোক, তেমন-ই স্বভাব-চরিত্তির।

একেবারে কপিবুক যে।

শিরীষ বলল।

বলেই, মনে হল ঘণ্টেমামা ভাবতে পারেন যে, ওর অভিব্যক্তির মধ্যে একটু ঈর্ষার দানা আছে। কিন্তু তার মৃতা মায়ের দিব্যি, বাক্যটাতে কোনো দ্বেষ, শ্লেষ বা ঈর্ষা আদৌ ছিল না।

মুখ দিয়ে পানের পিক ছিটকে যাওয়ার মতোই বেরিয়ে গেছিল বাক্যটা। আচমকাই।

ঘণ্টেমামা দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, মানে? কপিবুক তো ক্রিকেট হয়, ড্রাইভিং-এ হয়; ছেলেও হয় নাকি?

হবে না কেন? ছেলে হয়, মেয়ে হয়, বাঁদর হয়, কচ্ছপ হয়। যা-কিছু পার্ফেক্ট তাই কপিবুক।

অ।

ঘণ্টেমামা শিরীষের অফার করা সাইকেলে চড়লেন না। তাই শিরীষ তাঁর পাশে পাশে সাইকেল নিয়ে হাঁটতে লাগল। নির্জন পথে সাইকেলের চেনে ‘ঝিরঝির’ শব্দ উঠতে লাগল ওরা কথা বন্ধ করলেই।

হাঁটতে হাঁটতে শিরীষের মাথার মধ্যে ঘোরটা বাড়তে লাগল। এমন-ই হয়! শিরীষের বোধ হয় মাথার গোলমাল আছে। হয়তো পিতৃপুরুষের কারো ছিল। কার ‘জিন’ যে, কাকে কখন কুটুস করে কামড়ে দেয়, তা কে বলতে পারে?

জগাদা-মাধাদাদের এক জ্যাঠতুতো দাদা রাঁচির কাঁকে রোডের মানসিক রোগীদের হাসপাতালে তিনবছর ছিলেন। তাঁকে যখন আনতে গেলেন ওঁরা, শিরীষও সঙ্গে গেছিল। বিল-টিল মিটিয়ে, সই-সাবুদ করে, দাদাকে নিয়ে ওরা যখন ট্যাক্সি করে রওয়ানা হয়েছে তখন জগাদা শুধোলেন, টোমারটো ডেকি কিচুই হয়নি ডাডা। মিটিমিটি টিন টিনটে বটর টোমাকে ওরা একানে আটকে রেকে ডিলো! চিন্টা করা যায়? কী অন্যায়! বলোটো দেকি!

দাদা বললেন উত্তরে, তাঁর নিজের কপালে দুই জোর চাপড় মেরে; কী করব বল জগা! সব-ই শালা আমার পোঁদের-ই দোষ।

সর্পদ্রংষ্টের মতো জগাদা বললেন, ডাইভার! ডাইভার গাড্ডি ঘুমাও। ঘুমাও আব্বি ঘুমাও। যাঁহাঠে আয়াঠা হুঁয়াই লওটাকে চালো ফিন।

এতদিন পরে সেই কথা মনে পড়ে গিয়ে, এই আঁকাবাঁকা শুক্লপক্ষের এখনও চাঁদ-না-ওঠা রাতের মিষ্টি-গন্ধ ধুলোর পথে হাঁটতে হাঁটতে খুব হাসি পেল শিরীষের।

দেখতে দেখতে ‘দাঁড়কাকের বাসা’ এসে গেল।

শিরীষ বলল, ঝাণ্ডু, তুমি তাহলে মামাবাবুকে নিয়ে এগোও।

ঝাণ্ডু বলল, ঠিক্কে হ্যায়।

একটা টর্চ দেব কি মামাবাবু? চাঁদ তো এখনও জোর হয়নি।

কী বলচ কী শিরীষ? কেন্দুপাতার জঙ্গলে সারাটা জীবন কাটালাম আর আমার লাগবে টর্চ? অমাবস্যার অন্ধকারেও আমি দেখতে পাই।

শিরীষ বলল, বা:। তাহলে তো চমৎকার! আমি তাহলে...

হ্যাঁ, হ্যাঁ। তুমি আরাম করো। কাল সকালে এসো, পারলে একবার। আরও যদি কিছুর প্রয়োজন হয়, ঝাণ্ডু ছাড়া এসব করার তো কেউ নেইও। যাঁরা আসবেন তাঁরা সব খুব-ই মান্যি-গণ্যি লোক বুয়েচ।

কাল তো সোমবার। আমার তো কাজে যেতে হবে। তবে যদি মনে করেন যে, প্রয়োজন আছে তবে কাকিমাকে জিজ্ঞেস করে বলবেন। রাতে স্টেশানে যাবই। মালপত্র যদি বেশি থাকে, ঝাণ্ডুরা যদি সব বইতে না পারে? নামাতেও তো হবে। এক মিনিট তো মাত্র স্টপেজ।

ঝাণ্ডু বলল, উও বাত ঠিক হ্যায়। ভটভটিয়া নেহি না মিলা বাবু। সবহি চলা গ্যায়া লালু বাবুকো মিটিংমে। চান্দোয়াটোড়ি।

ও বাবা। তবে তো দরকার হবেই। আমি মাল-টাল বইতে পারব না। আমার আবার স্পণ্ডিলাইটিস আচে। যাদের কাজ, তাদের-ই সাজে।

শিরীষ কথাটার মধ্যে একটু অপমানের গন্ধ পেল। কিন্তু ভাবল যে, ওকে যদি মাল বইতেই হয় তবে ও তো ঘণ্টেমামার জন্যে বইবে না, ঝিঁঝির জন্যেই বইবে। মনে মনে ক্ষমা করে দিল ও ঘণ্টেমামাকে।

চললাম তাহলে।

শিরীষ বলল।

আচ্ছা। মানে আপাতত। কাল এসো। রিসেপশান কমিটি গড়তে হবে একটা।

ওঁরা এগোলেন।

ওর গলার শব্দ শুনে বুড়ি-মাই লণ্ঠন হাতে ভেতর থেকে এগিয়ে এল। ফুটো-ফাটা দরজার মধ্যে দিয়ে উঠোন থেকে আসা সেই আলো দেখা গেল। শিরীষের কুকুর কালু, ল্যাজ নাড়তে নাড়তে এগিয়ে এল। ল্যাজের এক ধাক্কায় দরজার পাল্লা খুলে বুড়িমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়েই ও এক লাফে পেছনের দু-পায়ে দাঁড়িয়ে উঠে সামনের দু-পা শিরীষের দু-ঊরুর ওপর রেখে ওর কোমরে মুখ ঘষতে লাগল।

শিরীষ ভাবল, কুকুরের ভালোবাসার মতো পবিত্র, নির্ভেজাল, আনকম্পলিকেটেড ভালোবাসা কোনো মানুষের কাছ থেকে অন্য কোনো মানুষ কোনোদিন-ই পায়নি। পাবেও না হয়তো।

এমনি সময়ে বাইরে একটা শব্দ হল। বাইরে না গিয়েও শিরীষ বুঝল যে, ঘণ্টেমামা অন্ধকারে পথের পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। ভালোই চোট পেয়েছেন নিশ্চয়ই।

শিরীষের মুখে এক শীতল নিষ্ঠুর হাসি উঠল, যা একেবারেই ওর চরিত্রানুগ নয়। কিন্তু ও বাইরে না গিয়ে সারমেয়র গলকম্বলে আদরের হাত বোলাতে লাগল। ‘জঙ্গলের পোকা’ যদি জঙ্গলে পথে পড়ে গিয়েও থাকেন অন্ধকারে, তবে শিরীষের কিছুই করার নেই। অন্ধকারেও দেখতে পায় শুধুমাত্র শ্বাপদেরাই। দ্বিপদ, শ্বাপদ হতে চাইলে বা হওয়ার দাবি করলে, কিছু ঝামেলা তো তাকে পোয়াতেই হবে!

শিরীষের কিছুই করার নেই। শেঠ চিরাঞ্জিলালের গদিতে একটা নতুন ছেলে এসেছে রাজস্থানের ঝুনঝুন থেকে। ছেলেটা বেজায় মোটা। সেটা দোষের নয়। কিন্তু ছেলেটা ভীষণ-ই কুটিল চরিত্রের। ওইরকম চেহারা কিন্তু গলার স্বর মেয়েদের মতো। নাম পুরুষোত্তম। তার বাবা-মায়ের রসবোধ আছে। নরাধম নাম দিলেও যার প্রতি, যথেষ্ট দয়া দেখানো হত তার-ই নাম পুরুষোত্তম।

ছেলেটা ব্যাঙ্কের কাজ-ই দেখে মুখ্যত। রোজ যায় চাঁদোয়াটোড়িতে। বিল্টি ছড়ায়। বিল-ডিসকাউন্টিং-এর ব্যাপার-স্যাপার দেখে। যেহেতু শেঠ-এর পরিচিত পরিবারের ছেলে এবং নিজের জাতের, তাই শেঠ প্রথম দিন থেকেই তাকে বিশ্বাস করে অনেক-ই দায়িত্ব দিয়ে দিয়েছেন।

পুনমচাঁদজির বয়েস হচ্ছে। তা ছাড়া, তিনি এখানে না থাকলে এখানের দুর্গ সামলাবে কে? মাড়োয়ারি কোম্পানির চিফ-অ্যাকাউন্ট্যান্ট সবসময়ে মাড়োয়ারিই হয়। তা তার ডিগ্রি থাকুক আর নাই থাকুক।

শিরীষের মনে হয় যে, ছেলেটা ভালো পরিবারের নয়। তার চোখের দৃষ্টিটাও ভালো নয়। প্রায়-ই সে নিজের কাজ ছেড়ে শিরীষের টেবিলে এসে বসে। আর কোনো কারণে নয়, পুনমচাঁদজির ‘কন্যার’ বিশেষ করে গুঞ্জনের দেখা পাওয়ার জন্যে।

পুনমচাঁদজির চোখে যে পড়েনি ব্যাপারটা তাও নয়, কিন্তু তাঁর চোখে যেন, আশার ঝিলিক দেখতে পায় শিরীষ একধরনের। যদি মেয়েটার একটা হিল্লে হয়ে যায়। হয়তো ভাবেন। শিরীষ ভাবে, অমন সুন্দর ফিগারের দুবলা পাতলা মেয়েটাকে এই অসুরটা বিয়ে করবে? পদ্মবনে হস্তীযথা! কিন্তু ভালো মাল-কড়ি না পেলে বিয়ে করবে যে, এমন ভালোমানুষ বলে তাকে মনে হয় না।

এই কথা ভেবেই দুঃখ হয় শিরীষের। গুঞ্জন চলিতার্থে গরিব হতে পারে, অশিক্ষিত হতে পারে কিন্তু বেশ সুন্দরী ও সপ্রতিভ মেয়ে। সুন্দর ব্যবহার। তা ছাড়া স্কুল-কলেজে না পড়লেই যে অশিক্ষিত হবেই এমন কোনো মানেও নেই। এক ধরনের শিক্ষা, সহজাতও হয়, সহবতও। যখন হাসে, তখন শিরীষের মনে হয় যেন ওর অদেখা আলোয়ারের বুঝি ভোর হল। গুঞ্জনদের দেশ রাজস্থানের ‘আলোয়ারে’। ‘আলোয়ার’ রাজস্থানের মধ্যের একটি করদ রাজ্য ছিল। যেখানে পুনমচাঁদজির বাড়ি। আর ‘সুন্দরী’ মানে, যৌবনের সৌন্দর্য নয়। যৌবনে কুশ্রী কুকুরিও সুন্দরী। সেই আলগা সৌন্দর্য যৌবন অপগত হলেই ঝরে যায়। এ-সৌন্দর্য থেকে যাওয়ার সৌন্দর্য।

ওই পুরুষোত্তম নামক নরাধমটার চোখের দৃষ্টিতে প্রেম নেই, শুধুই কাম। অমন কামুক চোখ, ওইরকম কুদৃশ্য পুরুষ শরীর, আগে কখনোই দেখেনি শিরীষ। কষ্ট-কল্পনাতেও আনেনি কোনোদিনও। ওই পেটমোটা, মেয়েলি-গলার ঝুনঝুনবাসী নরাধম শিরীষের মনের মধ্যে এক আশ্চর্য অথচ ব্যাখ্যাহীন কষ্টর জন্ম দিয়েছে।

অথচ গুঞ্জন ওর কেউ-ই নয়। তার প্রতি ওর কোনো দুর্বলতা থাকার প্রশ্নই ওঠে না। পুরুষোত্তম অথবা নরাধমও ওর কেউ নয়। তবুও কেন যে, কষ্ট পায় ও, ভেবে পায় না। ঠিক কষ্ট নয়, চিন্তা। একধরনের দুশ্চিন্তা হয় গুঞ্জনের জন্যে।

অথচ গুঞ্জনের বাবা পুনমচাঁদজি আনন্দিত।

বড়ো আশ্চর্য জায়গা এই ‘পৃথিবী’।

মাঝে মাঝেই মানুষ হয়ে জন্মেছে বলে, নিজস্বার্থ ছাড়াও সম্পূর্ণ অনাত্মীয় দূর-জনের জন্যেও ও উদবিগ্ন হয়। বুঝতে পারে যে, মানুষ হয়ে জন্মানো বড়ো কষ্টের। এর চেয়ে বদরুদ্দিন মিয়ার বকরি বা জুগনু ধোবির গাধা হয়ে জন্মানোও অনেক সুখের ছিল হয়তো।

গদিঘরের দেওয়াল-ঘড়িতে দেখল চারটে প্রায় বাজে। আজ একটু তাড়াতাড়িই উঠবে। কারণ, ভেবেছিল; জগাদা-মাধাদাদের সঙ্গে একবার দেখা করে তারপর-ই যাবে স্টেশনে।

ঝিঁঝিদের বাড়িতে সকালে ইচ্ছে করেই যায়নি। কাল ঘণ্টেমামার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকেই ঝিঁঝির ওপরে কেমন যেন, এক অভিমান জন্মেছে ওর। বাবুটি না-হয় একেবারে নীল পদ্মই। তা বলে, ও কি শাপলা বা ঘেঁটুফুল হওয়ার যোগ্যতাও রাখে না? তবে স্টেশনে ঠিক-ই যাবে। শুষ্ক-কর্তব্য যা করার, তা করে দেবে।

একথাও অস্বীকার করতে পারে না যে, নীলোৎপল নামক রূপবান এবং সর্বগুণসম্পন্ন পুরুষটিকে একবার চাক্ষুষ দেখার ইচ্ছেটাও বড়োই প্রবল হয়েছে। তার-ই সঙ্গে মিস্টার পেঁপেদুকেও দেখবে। কতরকম ‘চিড়িয়া’ই যে, খোদার দুনিয়াতে থাকে।

খিদেও পেয়েছে। সকালে কাঁটায় কাঁটায় ন-টাতে এসে হাজিরা দেয়। বারোটায় সাইকেল নিয়ে বাড়ি যায় খেতে। খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে ফিরে আসে একটাতে। থাকে, টানা ছ-টা পর্যন্ত। কোনো কোনোদিন বেশিও থাকতে হয়। ন-টা-দশটাও বেজে যায় কোনো কোনোদিন, গ্রীষ্ম, বর্ষা এবং শীতের রাতেও। মোদ্দা কথা, রোজকার কাজ রোজ শেষ করে দিয়ে যেতে হয়। ওর কাজের পর পুনমচাঁদজি আর লাডসারিয়া বসে এক-নম্বর দু-নম্বরের হিসাব পাকা করেন। মাড়োয়ারিরা হিসেব-কিতেবে একেবারে পাকা। চুরি যদি থাকে, যা থাকে; তা খাতার বাইরেই থাকে। খাতাতে কোনো খুঁত-ই থাকে না তাঁদের।

পুনমচাঁদজিকে বলে উঠল, শিরীষ। সাইকেলটা বারান্দার লোহার দরজাতে লাগানো চেনের তালা খুলে টেনে নিয়ে যখন নামল পথে তখন দেখল নরাধম, থুড়ি, পুরুষোত্তম আসছে গলদঘর্ম হয়ে। তার পেটটা এতই মোটা যে, সেটা পাইলট-কারের মতো তার সামনে সামনে চলে। দশ পা চললেই হাঁস-ফাঁস করে।

সে ‘বাসা’-তেই খায়। মাড়োয়ারি সব ব্যাবসাদারদের-ই ‘বাসা’ থাকে, বা ‘মেস’। পুরি, সবজি, চাল, খাঁটি ঘি, কাড়হি, দহি, আচার আর পাঁপর। খাবারের মধ্যে এই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারেও তাঁদের কাছ থেকে শেখার আছে অনেক। এমন মিতাহারী বাঙালিরা কেউ-ই নন। অন্ধকার থাকতে ঘুম থেকে উঠে গভীর রাত অবধি পরিশ্রমও এদের মতো বাঙালিদের মধ্যে খুব কম মানুষ-ই করেন। শিরীষ এদের গুণগুলোই দেখার চেষ্টা করে, যাতে নিজের উন্নতি হয়। দোষগুলো সযত্নে পরিহার করার চেষ্টা করে।

কিন্তু নরাধম বেজায় খায়। এমন পেটুক মাড়োয়ারি শিরীষ আর দেখেনি যদিও, মাড়োয়ারি ফার্মে কাজ করে বলে অগণ্য মাড়োয়ারিকে কাছ থেকে দেখেছে। ছেলেটার হাঁটা, চলা, কথা বলা, খাওয়া সবকিছুর মধ্যেই এক ধরনের জংলামি আছে। যা, এই জঙ্গুলে জায়গাতেও চোখে লাগে।

নরাধম বলল, আজ ইতনা জলদি চল দিয়ে হেঁ আপ? কাম খতম হো গ্যয়া ক্যা?

শিরীষের মাথায় রক্ত চড়ে গেল।

বলল, তুম আপনা কাম সামহালো পুত্তমবাবু। তুম কওন হো, যো হামে পুছতা হ্যায়?

গলার আওয়াজে নরাধম একটু ঘাবড়ে গেল। বলল, আপকি টেবলমে আভ্যি ম্যায় যাকর বৈঠকে কামতো করনে শকতা হ্যায়-না?

তখন শিরীষ বুঝল ওর আসল উদ্দেশ্য। দিনের ঠিক এই সময়টাতেই গুঞ্জন সিঁড়িতে বসে চুল আঁচড়ায়। পাকা বেলের মতো দু-টি আঁটসাঁট বুক থেকে শাড়ি খসে যায় তখন।

আশ্চর্য! দৃশ্যটা কখনো তেমন করে লক্ষ করেনি শিরীষ। মনে কোনো কু-ভাবনাও ছিল না। অথচ অনবধানে দেখে প্রায়-ই। দেখে, মানে চোখে যাই পড়ে, তার সব-ই কেউ দেখে না। আজ নরাধম লোলুপ চোখে গুঞ্জনকে দেখবে বলেই হঠাৎ, ওই দৃশ্যটা কেন যে, ওর কল্পনাতে এমন তাৎপর্যময় হয়ে উঠল তা নিজেই ঠিক বুঝল না। কথাটা মনে হওয়াতেই ও খুব আশ্চর্য হয়ে গেল। এবং একটু লজ্জিতও।

বলল, টেবল তো হামরা বাপকা নেহি হ্যায়।

নরাধম মেয়েলি গলায় বলল, যো, কুর্সিপর বৈঠতা কুর্সি উসিকা না হ্যায় জি?

শিরীষ বুঝল, কথাটা দ্ব্যর্থক। ওর মুখটা বিকৃত হয়ে গেল।

মুখে বলল, জি হাঁ।

বলেই, প্রয়োজনের অনেক বেশি জোরে সাইকেলের প্যাডলে চাপ দিল। এবং শেঠ চিরাঞ্জিলালের গদি থেকে যতদূরে পারে চলে যাবে মনস্থ করে খুব জোরে সাইকেল ছোটাল। জ্যা-মুক্ত তিরের মতো কিছু পথ দ্রুত এসে তারপর খুব-ই আস্তে প্যাডল করতে করতে শিরীষ ভাবছিল যে, ঠিক এই সময়টাতে গুঞ্জন চুল বাঁধছে বসে। গুঞ্জনদের উঠোনের পাশের বারোমেসে ঝুমকো জবা গাছটার ডালে ডালে নানারকম মৌটুসি পাখির মেলা বসে। এখন তারা ফিস ফিস করে কথা বলে আর টুসকি দিয়ে দিয়ে চমকে বেড়ায় ফুলে ফুলে। পশ্চিমের আলো নরম হয়ে এসে পড়ে আমলকী গাছের ডাল-পাতার ফাঁক-ফোকর দিয়ে গুঞ্জনদের বাড়ির পুবের বারান্দায়। একসঙ্গে অনেকগুলো তিতির ডাকতে থাকে অদূরের রেলইয়ার্ডের পাশের খোওয়াই-এর পুটুসের ঝাড় থেকে। দিনের এই সময়টাতে পেটি-ক্যাশ বই লিখতে লিখতে আর ভাউচার বানাতে বানাতে হঠাৎ-ই রোজ-ই মনটা বড়ো উদাস হয়ে ওঠে ওর। বুঝতে পারে যে, এই কাজ তার আসল কাজ নয়। ও ওর সময়, ওর জীবন নষ্ট করছে। কিন্তু কী করবে, কী করা উচিত তা ভালো করে ভাববার আগেই গদিতে সন্ধের বাতি জ্বলে ওঠে। ধূপধুনো দিয়ে লক্ষ্মীজি আর গণেশজির কাছে উঠে দিয়ে জুতো খুলে মাথা নোয়ান পুনমচাঁদজি, লাডসারিয়াজি এবং নরাধম থাকলে, নরাধমও। বিড়বিড় করে কীসব বলেন। শেঠ নিজে যদি থাকেন সেই সময়ে তবে শেঠও এমন করেন নিজের আলাদা ঘরে বসে। আরও একটি সমৃদ্ধির, স্বর্ণমুদ্রার রাতকে, আবাহন জানিয়ে লক্ষ্মীজিকে ঘরের মধ্যে নিয়ে আসেন ওঁরা। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লাডসারিয়াজির সেই কাশিটা আরম্ভ হয়। এইরকম কাশি কোনো বাঙালিকে কাশতে দেখেনি কখনো। কী যে, কষ্ট পান ভদ্রলোক! সারাবছর গলাতে একটি মাফলার জড়ানো থাকে। গলার কাছে একটা লাম্প মতো হয়েছে। কখনো-কখনো মনে হয়, কাশতে কাশতে অজ্ঞান-ই হয়ে যাবেন কিন্তু তার-ই মধ্যে কুঁজো হয়ে বসে গেঁহু, বাজরা, চাল তেলের পুরচা কাটতে থাকেন। ওঁর কন্ঠস্বরও ভেঙে গেছে। রুক্ষ, কর্কশ স্বর। লাল লাল চোখ দু-খানি। কাশির-ই দমকে লাল হয়ে থাকে সবসময়—মাঝে মাঝেই বদ্যিনাথধামের কোনো কবিরাজের দেওয়া ছাগলাদ্যর মতো গুলি খান। তারপর একটু চাঙ্গা হলেই আবার কাজে লেগে যান। ওঁর পরিবারে কেউ নেই। স্ত্রী গত হয়েছেন। একছেলে, সে ঔরঙ্গাবাদে এক ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির অ্যাকাউন্ট্যান্ট। এখনও বিয়ে করেনি। লাডসারিয়াজি এখানে ‘বাসা’-তেই থাকেন। ছেলেও সেখানের বাসাতে। এই মানুষটি খুব-ই ধার্মিক প্রকৃতির। ছেলের বিয়ে দিয়ে টাকা নেওয়ার কথা নাকি তিনি চিন্তাও করতে পারেন না। শিরীষ ভাবে, গুঞ্জনের সঙ্গে কেন ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন না উনি। ভাবে, কিন্তু কিছু বলতে পারে না। এসব ওঁদের সমাজের এবং ব্যক্তিগত ব্যাপারও।

‘মাড়োয়ারি’ জাতটা যে, ব্যাবসাবাণিজ্যে এতবড়ো হয়েছে তা শুধু মালিকদের জন্যেই নয়, প্রত্যেক কর্মচারীরও জন্যে। এমন পরিশ্রমী, কাজ-গত প্রাণ, দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন, নিয়মানুবর্তী কর্মচারী যে, হতে পারে তা এদের কাছ থেকে না জানলে জানতেও পেত না শিরীষ। কাজের কোনো সময় নেই। কোনোরকম অবহেলা নেই মালিকের কোনো কাজেই, তা অফিসিয়াল-ই হোক, কী ব্যক্তিগত; কোনো ‘না’ নেই। কাজ দিলে নিশ্চিন্ত থাকেন মালিক যে, সে-কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবেই।

অন্যমনস্ক ছিল বলে, পথের যে-মোড়ে ডানদিকে গেলে জগাদা-মাধাদাদের বাড়ি যাওয়া যেত সেখানে ঘুরতেই ভুলে গেল।

স্টেশনে পৌঁছোতে পৌঁছোতেই অন্ধকার হয়ে গেল। দু-তিনজন লোককে দেখল, বসে আছে স্টেশন-মাস্টারের ঘরের সিমেন্ট-বাঁধানো বারান্দাতে। কিন্তু ঝাণ্ডুয়াকে দেখতে পেল না। লোকগুলোর মুখ চেনা ওর। কালকে বোধ হয় এরাই এসেছিল ঝাণ্ডুয়ার সঙ্গে। সাইকেলটা রেখে ওদের দিকে এগোতেই ওদের-ই মধ্যে এক একজন এগিয়ে এসে বলল ঝাণ্ডুয়া আসছে এখুনি। তবে মামাবাবু আসতে পারবেন না। তাঁর পা ফুলে গেছে পড়ে গিয়ে। আজ সকাল থেকে ঝিঁঝি দিদিমণি দু-বার এসেছিল আপনার ডেরাতে—আপনি তো ছিলেন না বাবু।

না। আমার কাজ ছিল। সকালেই বেরিয়ে গেছিলাম।

তারপর বলল, এসেছিলেন কেন? ঝিঁঝি দিদিমিণি?

আপনাকে টিশানে আসতে বলতে। চিঠিও লিখে এসেছেন, মাজি বললেন। আপনি বাড়িতে যাননি?

না:।

একটু বিরক্তির সঙ্গেই বলল, শিরীষ।

মনে মনে বলল, স্টেশানে তো এসেইছি রে বাবা। তোমাদের কাছেও কি এক্সপ্ল্যানেশন দিতে হবে!

টিরেন চারঘণ্টা লেট হ্যায় বাবু।

চারঘণ্টা!

হাঁ। আভি তো মাস্টারবাবুকে পুছা।

ঝাণ্ডুয়া কাঁহা হ্যায়?

উত্তভি লওট গ্যয়া। আযায়গা টাইম পর।

তো ম্যায় হিঁয়া বৈঠকে কোন মচ্ছর মারেগা? হামভি ঘুম-ঘামকে আতা।

আচ্ছা বাবু।

এই মানুষগুলোর ‘আনুগত্য’ও মাড়োয়ারি কর্মচারীদের মতন-ই। এদেরও উন্নতি হবে।

সাইকেলটা টেনে নিয়ে একবার ভাবল, বাড়িতেই যায়। খিদেও পেয়েছে বেশ। কিন্তু বাড়িতে, মাঝে মাঝে, সন্ধের পরে ঢুকতে ইচ্ছে করে না। ‘দাঁড়কাকের বাসা’। বড়ো শূন্য লাগে। মন খারাপ। পূর্ণিমা যতই এগোবে বুড়ি-মাই-এর বাতের ব্যথাটা ততই বাড়বে। সর্বক্ষণ একটা গোঙানি থাকে তার মুখে। কালুটা খচরখচর শব্দ করে গা চুলকোবে। শিরীষের সামনে বসে দু-থাবার ওপরে মাথাটা রেখে উজ্জ্বল দু-টি বুদ্ধিদীপ্ত কালো চোখ মেলে নীরবে কত কথাই যে, বলবে সে শিরীষের সঙ্গে। তারপর, হয়তো শিরীষের মনের কথা বুঝতে পেরেই জোর শব্দ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। নাকের সামনে থেকে ধুলো উড়ে যাবে কিছুটা। তারপর-ই আবার যেন, ভাগ্যের-ই হাতে নিজেকে সমর্পণ করে, দু-থাবার মধ্যে মাথা রেখে চেয়ে থাকবে তার দিকে। কে জানে! বুড়ি-মাই-এর মতো কালু কুকুরও ভাগ্যবিশ্বাসী কি না!

কালুটা না থাকলে যে কী হত? কেমন করে যে, থাকত, কাটত বর্ষার আর, গ্রীষ্মর আর বসন্তের দীর্ঘ সব একাকী রাত!

বাড়ি গেল না। লেভেল-ক্রসিং-এর মোড়ের চায়ের দোকানে গিয়ে চা আর সামোসা খেল। নস্যি ফুরিয়ে গেছিল, ছোটোকৌটোতে ভরে নিল পঞ্চাশ পয়সার নস্যি। তারপর...

এইসব সময়েই বড়ো পাগল পাগল লাগে। যখন কোথাও গিয়ে হঠাৎ-ই পড়ে-পাওয়া সময়ের একটা সুন্দর ফালি কারো কাছে দিয়ে আসতে ইচ্ছে করে এবং ঠিক তখন-ই যখন মনে পড়ে, যাওয়ার মতো একটাও জায়গা নেই তার।

ঝিঁঝিদের বাড়িতে যেতে পারত কিন্তু যাবে না। কারণ, অভিমান।

বানোয়ারির (বানোয়ারিচাচা নয়, ওর খেলার বন্ধু) বাড়িতেও যেতে পারত। কিন্তু যাবে না। সন্ধের পরেই সেখানে মদের ঠেক বসে। মদ খেলে বানোয়ারি সূক্ষ্ম নয়, নানারকম উচ্চস্তরের আলোচনা তখন ওকে পেয়ে বসে—সেটা আনন্দের-ই—কিন্তু ওর কাছে যেসব ছেলেরা আসে তাদের অধিকাংশকেই পছন্দ হয় না শিরীষের। মদের আড্ডাতে গভীরতা প্রায়-ই অচিরে আহত হয়। তারপর পালিয়ে যায়।

মগনলালের বাড়িতেও যেতে পারত। ওর বউটিকে বেশ লাগে শিরীষের। খুব সুন্দর কথা বলে। সুন্দর করে সাজে। হায়ার-সেকেণ্ডারি পাশ। লণ্ঠনের আলোতে তার উজ্জ্বল কালো চোখ দু-টি, স্নান-করে-ওঠা, সস্তা পাউডারের গন্ধমাখা শরীরের গন্ধ উলটোদিকের চেয়ারে বসে পেতে ভালো লাগে। মুন্নির সাহিত্যপ্রীতিও আছে। বাংলা গল্প-উপন্যাসও পড়ে। রবিবারে আনন্দবাজার রাখে আর সাপ্তাহিক বর্তমান। প্রায়-ই বিমল কর-এর গল্প করে ও। ওর মামাবাড়ি হাজারিবাগের সারিয়াতে—। রোড স্টেশনে। ওখানে আগে আগে পুজোর সময়ে যেত। সাহিত্যিক বিমল করও সেখানে যেতেন পুজোর সময়ে—হয়তো। ওঁর বাড়িও ছিল সেখানে—জানে না শিরীষ। বিমল করের লেখার কথা উঠলেই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে মুন্নি। আর ভালো লাগে ওর দিব্যেন্দু পালিতের লেখা। তিনিও নাকি ভাগলপুরের-ই মানুষ।

বিহারে তো পরশুরাম, সতীনাথ ভাদুড়ি, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়, বনফুল, বিমল কর এবং দিব্যেন্দু পালিতও ছিলেন জীবনের কোনো-না-কোনো সময়ে। কেউ কেউ আজীবন। শিরীষ ভাবে, আজকের লিটল ম্যাগাজিনের কবি ‘মহুয়া-মিলন’-এর শিরীষ সেনও কি নামজাদা সাহিত্যিক হয়ে উঠবে একদিন? কে বলতে পারে! বুড়ি-মাই-এর কথাতে বলতে গেলে বলতে হয়, ‘সবহি তকদিরহিকা খেল।’

ভালো লাগা সত্ত্বেও যায় না, কারণ, মুন্নি তাকে একটু অন্য চোখে দেখে। অথচ মগন তার ছেলেবেলার বন্ধু।

মেয়েদের সম্বন্ধে শিরীষ বিশেষ কিছু জানে না। কাউকেই কাছ থেকে দেখেওনি। ওর তীব্র রোমান্টিসিজম ওকে কোনোরকম শারীরিক ব্যাপার থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। ভয় করে ওর। তা ছাড়া, মগনলালের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাও করা হবে। মগন রোজ-ই ফেরে রাত করে, বাঘড়া মোড় থেকে। প্রতিসন্ধেতেই মুন্নি একাই থাকে। আসতেও বলে শিরীষকে আন্তরিকভাবেই। মুন্নির সঙ্গর জন্যে মাঝে মাঝে এক ধরনের অনাস্বাদিত শারীরিক কাঙালপনাও যে, বোধ করে না এমনও নয়। কিন্তু ওই যে, বিবেক! শেঠ চিরাঞ্জিলাল বলেন, ‘বিবেক শালা, হারামজাদা আছে। সে শালা বেঁচে থাকলে বেওসা-কারবার সবহি চৌপাট।’ সেই বিবেকের জন্যেই শিরীষের যাওয়া হয় না মুন্নির কাছে। ও নিজের চারিত্রিক জোরটা কখনো পরীক্ষা করেও দেখেনি। যদি পরীক্ষাতে ফেল করে যায়? সেই ভয়। যদিও অনেক-ই মানুষের অধিকাংশ প্রাপ্তির পেছনেই হয়তো অন্যের প্রতি বঞ্চনা নিহিত থাকেই তবু, শিরীষ ভীতু বলে, ভালোমানুষ বলেই, তেমন করে মুন্নির দিকে হাত বাড়ায়নি। তাই ইচ্ছে করলেও কখনো-সখনো শরীরের অদৃশ্য কাঁকড়াগুলো কামড়ালেও, যাওয়া হয় না। মুন্নিকে শরীর-সর্বস্ব মেয়ে বলেও মনে হয়।

যেহেতু নারী-শরীর সম্বন্ধে ও সম্পূর্ণ অজ্ঞ, ও ভয়ও পায়।

যেতে পারে, জগাদা-মাধাদার কাছেও। কিন্তু গেলেই খাইয়ে দেন ওঁরা। ও গরিব বলেই দ্বিধাগ্রস্ত হয়। যদি ওঁরা কখনো ভেবে বসেন, খাওয়ার লোভেই যায় শিরীষ?

মদন, তার আর এক বন্ধু; বলে, যে, সে কয়লার ব্যাবসা করে, ঠিক যে, কী করে, তা সে-ই জানে। বড়োকাকানার একটি বিহারি মেয়েকে বিয়ে করেছে। চারবছরের মধ্যে তিনটি ছেলে-মেয়ে। আজকের দিনেও। ভাবা যায় না। কিছুদিন হল, সে সন্ধের পরে সিদ্ধির গুলি খেয়ে পড়ে থাকে। শিরীষ গেলেই টাকা ধার চায়। দিয়েছেও কয়েকবার। বলা বাহুল্য; ফেরত পায়নি। কানাঘুসোতে শোনে, ওর বউটা নাকি রাতে বাজারের বাবু ডাকে। বেচারি! চালাবেই বা কী করে! কিন্তু ভিক্ষা দিয়ে সাহায্য করে তো কাউকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। যদি না সে, নিজে বাঁচতে চায়, বাঁচানো কাউকেই যায় না। মদনকে ঘেন্না করে শিরীষ, আর মদনের বউ মুঙ্গলিকে ভয় পায়।

অথচ মদনের মতো বন্ধু তার ছিল না একজনও। কষ্ট হয় তাই। কিন্তু জীবন এইরকম-ই। যতই সময় যায় ততই ঝড়ের মধ্যে পড়া নৌকার-ই মতো আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিতরা কে যে, কোন দিকে ভেসে যায়! কার জীবন, কার চরিত্র, কার রুচি, কার মানসিকতা, কার সাফল্য বা কার ব্যর্থতা যে, কেমন রূপ ধারণ করে তা আগে থেকে থেকে একটুও বলা যায় না। এবং সেইসব ব্যাপারের ওপরে অন্য কারোর-ই বিন্দুমাত্র নিয়ন্ত্রণও থাকে না। বন্ধুর কাছে মানুষে যায় আনন্দ করতে, দুটো মজার কথা বলতে, শুনতে, হাসতে, হাসাতে। সবসময়ই যদি দুঃখ, দুর্দশা, অর্থাভাব, হতাশা, অসুবিধের কথা শুনতে হয়, তখন আর সেখানে যেতেই ইচ্ছে করে না।

কার জীবনেই বা সুখ উথলানো-দুধের মতো উপচে পড়ছে?

একটিপ নস্যি নিয়ে সাইকেলে উঠে বসল শিরীষ। বসে, তার ‘দাঁড়কাকের বাসা’র কিছুটা আগেই যে-পথটা পাহাড়তলির দিকে চলে গেছে, গিয়ে, চাট্টি নদী থেকে বেরিয়ে-আসা বুড়হা-নালাটাকে কেটে চলে গেছে খিলড়ির দিকে, সেখানে নদীর মধ্যের বড়ো বড়ো কালো পাথরে গিয়ে বসে এই বাসন্তী রাতের শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ নেবে ভাবল ও। ‘প্রকৃতি’র মধ্যে যা-আনন্দ আর কোনো কিছু থেকেই পেতে পারে না একজন—বিশেষ করে আজকের দিনে। যতই দিন যাচ্ছে ততই এই সত্যটা ওর কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ও যখন, গদ্য লিখবে তখন ওর এই বিশ্বাস, ওর এইসব বোধের কথা ও লিখবে।

দশ মিনিটেই পৌঁছে গেল। গিয়ে বসল, মধ্যের বড়ো পাথরটাতে। এখানে এমন-ই এক রাতে গতবছর ঝিঁঝিকে নিয়ে এসে বসেছিল। অনেকক্ষণ ছিল ওরা। চাঁদের মধ্যে এলেই ঝিঁঝি চন্দ্রাহত হয়ে যায়। এক ধরনের পাগলামি জাগে ওর ভেতরে।

‘চিরিপ-চিরিপ-চিরিপ-চিরিপ’ শব্দ করে একটা পাখি ডাকছে। এই পাখিটা ওর চেনা, ডাকও ওর চেনা কিন্তু নাম জানে না পাখির। এখানে এলে, এখানেই বসে শিরীষ। পিউ কাঁহা পাখি ডাকছে ‘পিউ-কাঁহা, পিউ-কাঁহা’ করে। ‘কাঁহা? কাঁহা? কাঁহা’-রবের আর্তি মাথার মধ্যে হাতুড়ি পিটতে থাকে।

বুকের মধ্যে অভ্রখনি খুঁড়তে শুরু করে অদৃশ্য হাতে। এই স্তব্ধ, সুগন্ধি, দিগন্তব্যাপী প্রকৃতির মধ্যে এলেই শিরীষের কেবল-ই ঝিঁঝির কথা মনে হয়। আর কারো কথাই নয়।

এর মানে কী?

নিজেকে শুধোয় শিরীষ।

তারপর জবাবটার আভাস নিজের বুকের মধ্যে উঁকি মারামাত্রই ভয়ে একেবারে সিঁটিয়ে যায়। অপমানেও।

‘ডিড-ইউ-ডু-ইট, ডিড-ইউ-ডু-ইট’ করে হট্টিটি পাখি পাহাড়ের কোলে লম্বা লম্বা পা দুলিয়ে দুলিয়ে ভাসতে ভাসতে দূরে চলে যায়। আবারও কাউকে ওই প্রশ্ন করবে বলে। এই পাখিগুলো চিরদিন-ই বোধ হয় শুধু এই প্রশ্নই করে ফেরে। জবাব কি পায় কারো কাছ থেকে? কে জানে!

কী করার কথা শুধোয় পাখিগুলো? কী করার? কে জানে তা!

পাখির ভাষা পাখিই জানে।

এইরকম বনজ্যোৎস্নাতে একা একা বসে থাকতে থাকতে, এক ধরনের আচ্ছন্নতা আসে। জগৎ-সংসার, ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া ছাড়িয়ে মন এক অপার্থিব লোকে ভেসে যায়। ইচ্ছে করে, সারাজীবন এমন করেই বসে থাকে। নদীধারার কুলকুলানি, সুগন্ধি হাওয়ার থমকে থেকে আবার হঠাৎ চলা, রাতপাখির বিষণ্ণ উদাস ডাক মনকে বড়োই সংসারবিমুখ, পার্থিব সব বস্তুর প্রতি উদাসীন করে তোলে। অথচ দুঃখটা এই যে, একসময় ঘরে ফিরতেই হয়, ময়দা কী চিনির খবর করতে হয় বুড়ি-মাই-এর কাছ থেকে। কী খাবে, তার বরাত দিতে হয়। শেঠ চিরাঞ্জিলালের গদিতে যেতে হয়। নরাধমের সঙ্গে কথা বলতে হয়। এসব-ই করতে হয় শুধু পেটের-ই জন্যে। মানুষের পেট-ই মানুষকে তার মূলগন্তব্য থেকে বোধ হয় কেবল-ই সরিয়ে নিয়ে যেতে থাকে, পঙ্কজের সুগন্ধ থেকে পঙ্কের পচা গন্ধর মধ্যে। পেটের ক্ষুধার নিবৃত্তি হলেও পেট সুখী হয় না। তখন আরও চায়। পুঞ্জীভূত অর্থ, মান, প্রতিপত্তি এইসবের জন্যে তীব্র লোভ জাগে মনে। আর যেই জাগে; মন আর মন থাকে না; মানুষ আর মানুষ থাকে না।

এমন সময় শিরীষের খুব-ই ইচ্ছে করে যে, একটি বড়ো উপন্যাসে হাত দেয়। এই বনজ্যোৎস্নায় সিক্ত প্রকৃতির মতো আনন্দময় কোনো লেখাতে। মানুষের সব ক্ষুদ্রতা, ব্যর্থতা, কুটিলতা, আবিলতা ছাপিয়ে যা-শাশ্বত হয়ে থেকে যাবে চিরদিন। যেমন লেখা পড়ে মানুষ আনন্দ পাবে, লক্ষ লক্ষ পাঠক-পাঠিকাকে সেই লেখার মাধ্যমে, সে পরম-আপন করে তুলে নিজেকে তাদের প্রত্যেকের মধ্যে রেণু রেণু করে বিলিয়ে দিতে পারবে। বিলিয়ে দিয়ে, নিজের অন্তরে সে, পরমরিক্ত হয়ে যাবে। এই রিক্ততাও এক ধরনের ‘পূর্ণতা’। সেই পূর্ণতাই শিরীষ সেনের একমাত্র প্রার্থিত ধন।

পারবে কি শিরীষ? গদ্য লিখতে? ও যে, কবি!

কিন্তু উপন্যাস কী করে যে, লিখতে হয় তা তো ও জানে না। কীভাবে শুরু করবে, কীভাবে ভাগ করবে অধ্যায়গুলি, কীভাবে, যা বলতে চায়, তা সঠিকভাবে বলবে? কীভাবে, প্রতিটি নি:শব্দ শব্দকে বা'য় করে তুলে আলোকবর্তিকা করে, পাঠক-পাঠিকার হৃদয়মূল উদ্ভাসিত করবে তার প্রক্রিয়ার কিছুমাত্রই যে, তার জানা নেই!

এখানে বসেই শিরীষ ঠিক করল, আজ-ই রাত থেকে শুরু করবে সেই লেখাটি। একবার লেখার পর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পাতা বার বার করে পড়বে, বার বার করে কাটবে। আবার নতুন করে লিখবে। যতবার প্রয়োজন, ততবার। তারপর একসময়ে পুরো লেখাটাই, যা ছিল গোড়াতে; তা থেকে আলাদা হয়ে উঠবে। নিজের কাছেই নিজের লেখা যতক্ষণ না পাশ করছে, সেই প্রথম পরীক্ষাতে, তার লেখাকে পাঠক-পাঠিকাদের কাছে, তার আসল পরীক্ষকদের কাছে পেশ-ই করবে না। গানের যেমন ‘পকড়’, লেখারও তেমন ‘পকড়’ নিশ্চয়-ই আছে। লেখকজীবনের প্রথম লেখা ‘বন্দিশ’ই যদি পাঠক-পাঠিকার মনোমতো না হয় তবে সে, কেমন ‘তান-কর্তব’ করল, কেমন বিস্তার, কেমন রাগের বাহার ফুটোল পরে, তা জানার অপেক্ষা না করেই, তাঁরা তাকে বাতিল করে দেবেন।

লেখা বোধ হয় দু-রকমের হয়, শিরীষ ভাবে। একরকম : স্বগতোক্তি। আত্মচরিতের মতো। অন্যরকম: সংগম, মনের সংগম; পাঠক-পাঠিকাদের সঙ্গে। সেই প্রত্যাশিত সংগমেই যেকোনো লেখার সার্থকতা; পরিপ্লুতি।

পারুক আর নাই পারুক, চেষ্টা করতে দোষ কী? তা ছাড়া লেখার মধ্যে শারীরিক কষ্ট যেমন আছে, যেমন আছে, নিজেকে অনেক-ই আনন্দ থেকে নিরন্তর বঞ্চনা করার দুঃখ, রাতের পর রাত জাগার কারণে স্নায়বিক দুর্বলতা, তেমন-ই এক গভীর আনন্দ নিশ্চয়ই আছে; যা, লেখকমাত্রই জানেন।

পাঠক-পাঠিকার শিরোপা বা মুরেঠা বোধ হয় আসে অনেক-ই পরে, তার অনেক আগেই লিখতে লিখতেই লেখক এক গভীর নিভৃত আনন্দে অবগাহন করেন। গায়ক যেমন করেন, আলাপ শুরু করার পরমুহূর্ত থেকেই। ‘লেখা’ও এক ধরনের পুজো, নামাজ পড়া। ঈশ্বরের সঙ্গে, খোদার সঙ্গে তখন তার আলাপচারী। লেখক বা গায়ক যখন, লেখেন বা গান করেন তখন তাঁর অন্তরে জেগে থাকেন তাঁর নিভৃত প্রাণের দেবতা। যাঁর চরণেই সব সৃষ্টিশীলতার নৈবেদ্য-বর্ষণ।

পাঠক-পাঠিকারা যখন কোনো ঝকঝকে ছাপা, সুন্দর, বহুরঙা প্রচ্ছদের বই হাতে পেয়ে আনন্দে ঝলমল করে ওঠেন, তখন তাঁরা জানতেও পান না কত অশ্রুজল, কত ঘাম, কত বিনিদ্র রজনির তপস্যা সেই বইয়ের পাতায় পাতায় বিমূর্ত হয়ে থাকে। সেই বই পড়ে পাঠক-পাঠিকা যদি, সুখী হন বা দুঃখী হন, হাসেন বা কাঁদেন, শুধু তখন-ই লেখকের সব দুঃখ অমৃত হয়ে ওঠে। পাঠক-পাঠিকারাই লেখকের জীবনকাঠি-মরণকাঠি। তাঁরাই লেখককে রাজা করেন এবং হেঁটো-কাঁটা দিয়ে পুঁতে দেন বিস্মৃতি ও অবহেলার নাবাল জমিতে।

না, সত্যিই শুরু করবে আজ-ই একটা লেখা শিরীষ।

শিরীষের হাতঘড়ি নেই। টাইটান কোম্পানির অ্যাকুরা মডেলের রেডিয়াম দেওয়া একটি ঘড়ি কেনার স্বপ্ন দেখে রোজ-ই কিন্তু যে-মাইনে সে পায়, তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। বই কিনতেই চলে যায়, সামান্য উদবৃত্ত যদি কখনো-বা থাকে। তার উপন্যাস লেখার স্বপ্নের-ই মতো, কবে যে, তার হাতঘড়ির স্বপ্ন সত্যি হবে, ঈশ্বর-ই জানেন।

সন্ধ্যাতারার দিকে চেয়ে তার অবস্থান জেনে আন্দাজ করার চেষ্টা করল ও, তখন ক-টা বাজতে পারে। ট্রেনের সময় হতে বেশি বাকি নেই আর। আর এক টিপ নস্যি নিয়ে উঠে পড়ল শিরীষ। তারপর পাথরের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা সাইকেলটাকে উঠিয়ে নিয়ে নদীর বালিতে কিছুটা হেঁটে গিয়ে পাকদন্ডী পথটিতে পড়েই উঠে পড়ল সাইকেলে। ও যখন ফাঁকা এবং নির্জন পথে সাইকেল চালিয়ে যায় নিধুবাবুর (রামনিধি গুপ্তের) একটি গান গায় গুনগুন করে। মা গাইতেন এই গানটি। কার কাছ থেকে শিখেছিলেন, তা অবশ্য জানে না ও। গানের কথাগুলি খুব-ই সুন্দর।

তবে প্রেমে কী সুখ হত

আমি যারে ভালবাসি, সে যদি ভালবাসিত

তবে প্রেমে কী সুখ হত।

কিংশুক শোভিত প্রাণে, কেতকী কণ্টক হীনে

ফুল ফুটিত চন্দনে, ইক্ষুতে ফল ফলিত

তবে প্রেমে কী সুখ হত

প্রেমে, তবে প্রেমে, কী সুখ হত।

প্রেম যমুনার জল, তা হলে হত শীতল

বিচ্ছেদ বাঢ়বানল তাহে যদি না থাকিত

তবে প্রেমে কী সুখ হততবে,

তবে প্রেমে, কী সুখ হত।

গানটা গাইতে গাইতে ওর দু-চোখের কোণ ভিজে ওঠে। যখন-ই গায়। আর কেবল-ই ঝিঁঝির মুখটা মনে পড়ে। বড়ো খারাপ লাগে।

সেদিন ঘণ্টেমামা বলেছিলেন, ‘তুমি কি বাওয়া টিকটিকি? ঝিঁঝি ধরে খাওয়ার শখ হয়েচে বুজি?’

ওই কথাটা মনে পড়ে গিয়ে হাসি পেল। এবং পরক্ষণেই কান্না। বাজে, বাজে, বাজে। ও একটা বাজে ছেলে। হতচ্ছাড়া।

স্টেশনের কাছে যখন পৌঁছোল, তখন ডিসট্যান্ট সিগন্যাল পড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি সাইকেল নিয়ে লাইনটা পেরোল। ডিজেল ইঞ্জিনগুলি পাগলা হাতির মতো নি:শব্দে চলে আসে অতগুলি কামরাকে টেনে নিয়ে। দূরাগত ঝরনার আওয়াজের মতো একটা ঝরঝর শব্দ হয়। কিন্তু সেটাও ট্রেন একেবারে কাছে না এলে বোঝা পর্যন্ত যায় না। গতমাসে হামিদ বাবুর্চি কাটা পড়ে গেল এই কারণেই। এখানে তো প্ল্যাটফর্ম বলেও কিছু নেই। সমতল। ট্রেনে ওঠা বা ট্রেন থেকে নামা এক ঝকমারি।

ঝাণ্ডুরা দাঁড়িয়েছিল অন্যদের সঙ্গে।

শিরীষ বলল, মামাজি কাঁহা? যদিও শুনেছিল, ঝাণ্ডুর সঙ্গীর কাছে।

ঝাণ্ডু বলল, উনকি টেংরিমে চোট লাগা। চুন-হলুদ লাগাকর ঘরমে বইঠা হুয়া হ্যায়।

মনে মনে খুশি হল শিরীষ। বলল, ঠিক হয়েছে। নীলোৎপল দাসের পাবলিসিটি অফিসার।

ঝাণ্ডু বলল, ম্যায় কেইসে পহেচানেগা মেহমানলোগোঁকো?

শিরীষ বলল, এখানে নামবে ক-জন? যারা নামবে তারা সবাই আমাদের চেনা। যে, ক-জন অচেনা তারাই আমাদের মেহেমান। তাদের-ই দায়, তারাই খুঁজে নেবে আমাদের। বেশি ভ্যাজর-ভ্যাজর কোরো না তো। আমার মাথা ধরেছে।

ঝাণ্ডু হেসে বলল, হাঁ! ইয়ে বাত তো ঠিক্কেই বোলা আপনে শিস বাবু।

আমি সবসময় ঠিক-ই বলি।

ঝাণ্ডু বলল, ওহি দেখিয়ে, আভিতক লাল দিখাতা হ্যায়।

কী?

যাঁহা হামিদ মিয়া কাট গ্যায়থে, খুন কা দাগ আভিভি হ্যায়।

আঃ। বাস করো। বাস করো। শিরীষ মুখ ঘোরাল অন্য দিকে।

শিরীষের মাথার মধ্যে পাগলা ঘণ্টি বেজে গেল। মনে হল, মাথা ঘুরে পড়ে যাবে। প্রচন্ড যন্ত্রণা হতে লাগল মাথার মধ্যে। হামিদ যেদিন ট্রেনে কাটা পড়ে, ও সেদিন স্টেশনেই ছিল। শেঠ চিরাঞ্জিলালের সাডুভাইকে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছিল। পুনমচাঁদজি, লাডসারিয়াজি, নরাধম এবং পুরো অ্যাকউন্টস ডিপার্টমেন্টের সকলেই এসেছিল শেঠ-এর আদেশে। এটাও তাদের সকলের অলিখিত ডিউটির মধ্যে পড়ে। মাড়োয়ারিদের গুণের মধ্যে ‘সামাজিকতা’ও পড়ে। এমন ঘনসন্নিবিষ্ট, পরিব্যাপ্ত প্রজাতি ভারতে আর বেশি নেই। এমন ‘সংঘবদ্ধ’ও নয়। তাদের জাগতিক ব্যাপারে সাফল্যের সেটাও একটা মস্ত কারণ; যেমন, তার অভাব বাঙালিদের ব্যর্থতার।

কী রক্ত! কী রক্ত! রক্ত দেখতে পারে না শিরীষ। শিরীষকে অনেকেই এই কারণে মেয়েলিও বলেন। হবেও হয়তো। কিন্তু তাতে দোষের কিছু দেখতে পায় না ও। যারাই সংবেদনশীল, যারাই সূক্ষ্মরুচির, যারাই মমত্ববোধসম্পন্ন তাদের-ই স্থূল পুরুষেরা মেয়েলি বদনামে ভূষিত করে। করুক।

ভারি রাগ হল ঝাণ্ডুর ওপরে। দেখবার আর দেখাবার অন্য কোনো জিনিস পেল না। রাগটা বাড়তে-না-বাড়তে ট্রেনটা এসে গেল। ঝাণ্ডু হাত পাতল শিরীষের কাছে। দেখা হলেই এমন করে। নস্যির কৌটোটা থেকে একটু নস্যি দিল ঝাণ্ডুয়াকে। ঝাণ্ডুয়া পরম ভক্তিসহকারে সেই দান গ্রহণ করে, তার পুরো পুরু ঠোঁট দু-খানির নীচেরটা ফাঁক করে মাড়ি আর ঠোঁটের মধ্যে চালান করে দিল।

শিরীষ ভাবছিল, এত লোক এই প্ল্যাটফর্মহীন স্টেশনে কাটা পড়ে মরে, তা নীলোৎপলও কী পড়তে পারে না? রক্তোৎপল হয়ে যায় তাহলে। পরক্ষণেই নিজেকে ধমক দিল মনে মনে, নিজের ক্ষুদ্রতার কারণে। নিজেকে মনে মনে তৈরি করল, রিসেপশন কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে। ডায়লগ এবং মহড়াও দিল। ‘আসুন আসুন কী সৌভাগ্য আমাদের। আমার নাম...। ঘণ্টেমামা পড়ে গিয়ে...’।

ট্রেনটা দাঁড়াল। ওরা সকলে ফার্স্ট-ক্লাস কামরার সামনে দাঁড়িয়েছিল প্রায় পবননন্দনের মতো হাতজোড় করে রামজির রিসেপশনের জন্যে। কিন্তু ফার্স্ট-ক্লাস থেকে কেউই নামলেন না। জনা দশেক মানুষ নামল কুল্লে। সেকেণ্ড ক্লাস থেকে। দু-জনের বগলে, সাদা, জবরদস্ত দু-টি মোরগা। একজনের হাতে দড়িবাঁধা কালো কুচকুচে বোঁটকা-গন্ধের পাঁঠা একটা। আর একজনের হাতে দুটো লাউ।

ওদের বিস্ময়ের ঘোর কাটতে-না-কাটতেই ডিজেল ইঞ্জিনটা হেঁপোরোগীর কাশির মতো একবার বমকে কেশেই ছেড়ে দিল।

এখন আর বাঁশি বাজায় না কোনো ট্রেন। স্বপ্নের মধ্যে বাজিয়ে শরতের রোদ আর কাশফুলের মধ্যে, বসন্তের শিমুল, অশোক আর পলাশের মধ্যে, বর্ষার চাপ চাপ স্নিগ্ধ-সবুজ সিক্ত তৃণভূমির মধ্যে ছুটে যায় না। ট্রেনগুলিও এখন নরাধমের মতো হয়ে গেছে। রোমান্টিসিজম বিদায় নিয়েছে এই স্থূল, ধমকে-দেওয়া, থমকে-থাকা পৃথিবী থেকে।

ঝাণ্ডুয়া কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইল শিরীষের মুখের দিকে।

বলল, ‘অব ক্যা হোগা’?

ভাবে মনে হচ্ছে, যেন নীলোৎপলের সঙ্গে ঝাণ্ডুয়ার-ই বিয়ে হতে যাচ্ছিল। হাসি পেল শিরীষের। এতক্ষণ যে, তীব্র এক টেনশন জমে উঠেছিল ওর মধ্যে, নীলোৎপল দাস অ্যাণ্ড ‘পেঁপেদু’ কোম্পানির আগমন উপলক্ষে তা মুহূর্তে অন্তর্হিত হল। পূর্ণিমার আগের দুধলি চাঁদের আলোকে হঠাৎ আরও সুন্দর বলে মনে হতে লাগল। স্তবকে স্তবকে ফুটে-থাকা শালফুলের গন্ধ হঠাৎ ছুটে এল চৈতি হাওয়ায়। কাঁঠালের মুচির গন্ধ, আমের বোলের সুবাস, সবাই না-বলে বলল, শিরীষ। ‘খুশি তো? খুশি তো? খুশি তো?’

‘নীলোৎপল আসেনি তো কী হয়েছে?’ শিরীষ মনে মনে বলে উঠল।

এমন সময় লাইন্সম্যান ভরত পাঁড়ে এসে বলল, মাস্টারবাবু বোলাইন।

শব্দটা শিরীষের কানে শোনাল ‘বেলাইন’।

নীলোৎপল বেলাইন?

কাহে লা?

ম্যায় ক্যা জানে?

চাল, ম্যায় আ রহা হ্যায়।

মাস্টারমশায় বললেন, বড়োকাকানার টিশন-মাস্টার ওয়্যারলেস-এ খবর পাঠিয়েছেন যে, মিস্টার এন দাস অ্যাণ্ড পার্টি আসতে পারেননি। পরের সপ্তাহে আসবেন। এইদিন-ই বিশেষ কাজ পড়ে যাওয়াতে দুঃখিত।

ঝাণ্ডুয়া বলল, ক্যা হুয়া বাবু?

ওরা সব সামনের বৃহস্পতিবারে এই গাড়িতেই আসবেন। বাড়ি গিয়ে বলে দিস। জরুরি কাজে আটকে গেছেন।

হামারা শালাকা শাদি হ্যায়। হাম তো ছুটি লে লুঙ্গা। যো ভি হো।

শিরীষ বলল, সেসব কথা পরে হবে।

ওরা লাইন পেরিয়ে, কিছুটা হেঁটে; পথে গিয়ে উঠল।

শিরীষ বলল, ম্যায় অব চলে।

ইতিনা ফেরাইড-রাইস আউর চিলিয়া-চিকেনওয়া কি ক্যা হোগা? সবহি তো বরবাদ হোগা। জাড়াকি টাইম তো নেহি না!

হলে হবে, তার আমি কী করব! আমার জন্যে যেন, কিছু আবার নিয়ে এসো-না ভালোবেসে। হামারা পেট গড়বড় হুয়া। কালুয়া কুত্তাকেই খিলানা পড়েগা। সমঝা-না। কান খোলকর শুন লো। আউর তুমহারা ঝিঁঝি দিদিকে যাকে কহ দো।

ঝিনঝি বাবাকো?

হা। ঝিনঝি বাবাকো আউর ঝিনঝি বাবাকো মাইজিকো ভি। সমঝা-না?

হাঁ বাবু, সমঝা।

শিরীষ সাইকেলে উঠল। উঠেই মনে মনে বলল, তু কুছ নেহি সমঝা!

তারপর-ই বলল মনে মনেই,

‘সেজে গুজে রইল রাই,এই লগনে বিয়া নাই।।’

তিন সেকেণ্ডের মধ্যেই শিরীষের সব খুশি উড়ে গেল। নিজের মানসিকতার কারণে নিজের কাছেই লজ্জিত হল। ঝিঁঝির জন্যে, এক গভীর দুঃখে ওর মন ভরে গেল। বেচারি ঝিঁঝি! এবং সেই মুহূর্তেই ও জীবনে প্রথমবার বুঝতে পারল যে, যদি কেউ কাউকে সত্যিই ভালোবাসে, তবে তার সব সুখ অথবা দুঃখ-ই নিজের-ই সুখ অথবা দুঃখ হয়ে ওঠে।

শিরীষ ঠিক করল, এই কথাটিই বলবে ওর উপন্যাসে। ও নিজেকে যতখানি ভালো করে চেনে তেমন করে তো আর কাউকেই চেনে না। এমনকী ঝিঁঝিকেও নয়। তাই নিজের সব আবরণ উন্মোচন করবে সেই উপন্যাসে ধীরে ধীরে, পরতের পর পরত, পেঁয়াজের খোসার মতো। নিজেও যা, কোনোদিন দেখেনি, সেই নিজের অভ্যন্তরের মোড়কে কী আছে, তা খোসা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে একেবারে মর্মমূলে পৌঁছে দেখাবে পাঠক-পাঠিকাকে। তাদের সঙ্গে নিজেও দেখবে।

আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না, ফুরাবে নাসেই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা।

সুনীতি বারে বারে বসার ঘরের ঘড়ি দেখছিলেন এবং একবার বসার ঘর এবং আরবার খাওয়ার ঘর করছিলেন। ঝিঁঝি তার নিজের ঘরেই ছিল।

আয়নার সমানে বসে, সন্ধের পরে মুখে একটু হালকা প্রসাধন করেছিল। ভালো করে গা ধুয়েছিল। সুনীতি সকালে স্নান করার আগে নিজের হাতে মেয়ের মুখে সর-ময়দা মাখিয়ে দিয়েছিলেন, ঝিঁঝির তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও। গলাতে একগাছি মটরমালা। দু-কানে দু-টি রুবির দুল। সাচ্ছল্যের দিনের প্রতীক। তার সঙ্গে ম্যাচ করে একটি কুসুম গাছের নতুন পাতার মতো লাল-রঙা তাঁতের শাড়ি পরেছিল। তাঁতির বোনা। কবে ঢাকা, টাঙাইল সব পূর্ব-পাকিস্তানে চলে গেছে, অধুনা বাংলাদেশ; তবু এখনও নামগুলো রয়ে গেছে ঘর ছেড়ে-আসা মানুষের স্মৃতিতে।

শাড়িটি পরতে পরতে, শিরীষের কথা মনে পড়েছিল ঝিঁঝির। কারণ, শিরীষ-ই তাকে কুসুমগাছ চিনিয়েছিল একদিন পাহাড়তলিতে নিয়ে গিয়ে। বলেছিল, চৈত্র-শেষে বৈশাখের প্রথমে যখন, নতুন পাতা আসে কুসুমগাছে, তখন আশ্চর্য এক, লালের ছোপ ধরে পাতাগুলিতে। পরে, ধীরে ধীরে রং সবুজ হয়ে আসে। যখন নতুন পাতা আসবে তখন দেখাবে বলেছিল ওকে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে। মনেই পড়েনি ঝিঁঝির যে, চৈত্র শেষ হয়ে যাবে ক-দিন পরেই। তখনও দেখাতে পারেনি শিরীষ ঠিক-ই। কিন্তু একটা জংলি ফুল ছিঁড়ে দেখিয়েছিল রঙের রকমটা। তাই জানে, ঝিঁঝি।

সুনীতি বললেন, কী হল আপনার অতিথিদের? ঘণ্টেবাবু! নিজে তো পা মচকে পড়ে থাকলেন। এদিকে আজ যদি ওঁরা না আসেন, তবে আপনার ঘাড় মটকাব আমি। না আছে ফ্রিজ, না আছে কিছু; শীতের দিনও নয় যে, খাবার রেখে দিলে থাকবে। এতজনের খাবার! না এলে যে কী হবে! ভাবতেও আতঙ্ক লাগছে।

ঘণ্টেবাবু বললেন, আরে, ওঁরা মান্যিগণ্যি মানুষ। ওঁদের কি সেন্স অফ রেসপনসিবিলিটি বলে কোনো ব্যাপার নেই? গতবুধবারে নীলোৎপলের কাকার সঙ্গে আমার নিজের কথা হয়েছে ট্রাঙ্ক-কলে।

কোথা থেকে?

ডালটনগঞ্জ থেকে।

এস. টি. ডি. বুঝি হয়নি এখনও?

না-হলেও আমাদের ম্যানুয়াল-ই ভালো। রাঁচিতে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে লাকরা বাবু আছেন। বললেই লাইন লেগে যায় ফটাফট। তবে এস. টি. ডি হবে শিগগিরি।

জানি না বাবা! আপনি যাই বলুন। আমার মন কিন্তু ভালো বলছে না।

ঘণ্টেবাবু, সুনীতির আপন ভাই তো নন-ই, কোনোরকম আত্মীয়ই নন। ঘণ্টেবাবুর বাবা সুনীতির বাবার কর্মচারী ছিলেন কলকাতায়। সুনীতির বাবার ওষুধের কারখানা ছিল। ছেলেবেলা থেকেই ঘণ্টেবাবুদের পুরো পরিবার-ই ওঁদের পরিবারের বশংবদ। উনি চারবারেও ইন্টারমিডিয়েট পাশ করতে না পেরে, ভাগ্যসন্ধানে বেরিয়ে পড়ে ঘুরতে ঘুরতে বিহারের পালামৌ জেলার ডালটনগঞ্জে এসে, ওই বিড়ি কোম্পানিতে থিতু হন। ঝিঁঝির বাবা সুমনবাবু, হঠাৎ-ই এনকেফেলাইটিস-এ গত হওয়ার পরে, যখন কলকাতার পাট চুকিয়ে একদিন শখ করে বানানো, এবং ক্বচিৎ-ব্যবহৃত এই মনোয়া-মিলনের ‘শুটিং-লজ’ ‘মহুয়া’তে এসে সুনীতিকে আশ্রয় নিতে হয় তখন-ই ঘণ্টেবাবুর সঙ্গে যোগাযোগটা বাড়ে।

সুমন ব্যানার্জির একটু আধটু শিকারের শখ ছিল। শিকারি ছিলেন না প্রকৃতার্থে। বড়োলোকদের নানা শখ থাকে। সেইরকম-ই এক শখ ছিল তাঁর এই জঙ্গলময় জায়গাতে এসে, শীতে বা বসন্তে ক-দিন কাটিয়ে যাওয়ার। মানুষটি নির্জনতাও ভালোবাসতেন। জগা মুকুজ্যে এবং এই ঘণ্টেবাবুর মাধ্যমেই এখানে নির্জনে জঙ্গলের মধ্যে জমি দেখে অনেকখানি কম্পাউণ্ড নিয়ে একটি ভিলা বানান। আউট-হাউস। কেয়ার-টেকারের কোয়ার্টার। সুমনবাবু আসতেন সপারিষদ। ক্রেট-ক্রেট হুইস্কি-জিন-রাম-ভদকা আসত সঙ্গে। বোড়া-ভরতি বিয়ার। বেয়ারা, বাবুর্চি, মোসাহেব।

মানুষের পায়ের তলা থেকে যখন, মাটি সরতে থাকে তখন কম মানুষ-ই তা বোঝেন। বোঝা যায়, যখন পাড় ধসে নদীতে পড়ে। কিন্তু তখন বড়োই দেরি হয়ে যায়। সুমন ব্যানার্জির বেলাতেও তাই-ই ঘটেছিল। কর্মচারীদের মধ্যে আত্মীয় ও মোসাহেব-ই বেশি ছিল। তাঁরাই তাঁর অর্থনৈতিক ভিত-এর ভেতরটা ফোঁপরা করে দেন। মৃত্যুর পরে পথে বসতে হয় সুনীতিকে, ঝিঁঝিকে নিয়ে। অবস্থার সামান্য বৈকল্যও কষ্টে ফেলে সন্দেহ নেই কিন্তু সেই বৈকল্য যদি প্রচন্ড হয় তখন আর্থিক ধাক্কার চেয়েও যা, বেশি বিধ্বস্ত করে মানুষকে তা ‘মানসিক’ ধাক্কা। বাঙালির মতো ‘পরশ্রীকাতর’ জাত আর দু-টি নেই। একদিন যে, আত্মীয় বা বন্ধু অতিসচ্ছল ছিল, তার দৈন্যদশা দেখে বাঙালি যে, অসীম পুলকলাভ করে তা বাঙালিমাত্রই নিজের বুকে হাত ছোঁওয়ালেই অবশ্যই স্বীকার করবেন। যদি অবশ্য তিনি আপাদমস্তক ভন্ড না হন।

সুমন যখন আসতেন তখন, ঘণ্টে মিত্তিরও বিড়ি কোম্পানি থেকে ছুটি করে চলে আসতেন দু-তিনদিন আগেই। সব ঠিকঠাক করতে। এদিকে জঙ্গল ও জংলি জানোয়ার তখন অনেক-ই ছিল।

নির্জনতা যদিও সুনীতিরও প্রিয় কিন্তু হঠাৎ দক্ষিণ-কলকাতার অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত পাড়া ছেড়ে এখানে নিতান্ত বাধ্য হয়েই চলে আসার পর কত রাত যে, তাঁর কেঁদে কেটেছে কিশোরী মেয়েকে বুকে জড়িয়ে, তা সুনীতিই জানেন। তবে এখন বোঝেন যে, আচমকা স্বামী-হারা হয়ে প্রচন্ড আর্থিক কষ্টের মধ্যে না পড়লে পৃথিবীও চেনা হত না তাঁর। সংসার ও সমাজ যে, নিছক-ই ‘কনভিনিয়েন্স’-এর তা সেদিন প্রচন্ড আঘাতের সঙ্গে বুঝেছিলেন। আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, পরিচিতজনের মধ্যে অধিকাংশর-ই স্বরূপ দেখে সেদিন চমকে উঠেছিলেন।

তবে এই সংসারে ভালোমানুষও যে, নেই একথাও ঠিক নয়। কলকাতাতেও কিছু শুভানুধ্যায়ীও ছিলেন।

অনেক পরিচিত ধনবান আবার কাছে আসতে চেয়েছিলেন ‘এাতা’ হয়ে শুধুমাত্র তাঁর সুন্দর শরীরটার-ই লোভে। সুনীতি কোনো ব্যাপারেই গোঁড়া ছিলেন না কিন্তু দুর্দিনে যেসব পুরুষ অসহায় এক পরিচিত মহিলার শরীরের লোভেই মহত্ত্বর মুখোশ পরে কাছে আসতে চেয়েছিলেন তাঁদের তিনি চিনতে ভুল করেননি।

জীবনযাত্রার মান রাতারাতি নিরুপায়ভাবে নামিয়ে আনাটা কলকাতার চেয়ে এখানে অনেক-ই সহজ হবে বলেই এখানে চলে আসা। সামান্য সঞ্চয়ের সুদের ওপরে ভরসা করেই যখন বাকি জীবন বাঁচতে হবে বলে, স্থিরীকৃত হল তখন তাঁর অন্য কোনো উপায়-ই ছিল না।

রাঁচিতে, হস্টেলে রেখে, ঝিঁঝিকে বি.এ.-টা পাশ করিয়েছিলেন। স্কুল ফাইনাল প্রাইভেট হিসেবে দিয়েছিল। উনিই পড়িয়েছিলেন। চোখ-কান সব বন্ধ করে, অনেক অসুবিধের মধ্যে, ওই দুর্যোগের মধ্যে বন্যার মধ্যে বনহরিণীর মতো একটি বছর সাঁতরে এসেছেন। তবু, আত্মসম্মানবোধ কখনোই খোয়াননি উনি। যাঁরা, তা খুইয়েও বেঁচে থাকেন, তাঁরা তো নিজেদের আর মানুষ বলে দাবি করতে পারেন না। খোওয়াননি বলেই, ঘণ্টেবাবুর কথাতে, এই মেয়ে দেখতে আসার প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়ে এই মুহূর্তে সাংঘাতিকরকম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত বোধ করছেন উনি।

এতদিন পরে কি আত্মসম্মানজ্ঞান এমনি করেই খোয়াতে হবে?

যদি তাঁরা না আসেন? যদি ছেলে, ছেলের কাকা, ছেলের পিসেমশাই মেয়েকে দেখে অপছন্দ করে চলে যান? সেও তো একরকমের ধর্ষণ-ই হবে বলতে গেলে। এবং সেই ধর্ষণের ফল শারীরিক ধর্ষণের চেয়েও ব্যাপ্ত, সুদূরপ্রসারী হতে পারে। কেন জানেন না, ওঁর মনটা আদৌ ভালো বলছে না।

সুমনের যেদিন মৃত্যুবাহী জ্বরটা এসেছিল, সেদিনও তাঁর মনটার মধ্যে ঠিক এইরকম-ই হয়েছিল। অথচ জ্বর তো সুমনের কতবারই হয়েছিল বিয়ের পরে!

খাবার ঘরে গিয়ে, কী মনে করে, তাড়াতাড়ি টেবল-ক্লথটা বদলালেন।

ঝিঁঝি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, কী হল মা?

এটা দিনের বেলায় পাতব কাল। রাতে, এই রংটাতে মন খারাপ হয়ে যায়।

ঝিঁঝি একদৃষ্টে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইল। কথা বলল না কোনো।

এই দেশে যে, মেয়ে ‘স্বাবলম্বী’ নয়, তার মা-বাবা যতই ভালো এবং বুঝি হন না কেন, তার বিয়ের ব্যাপারে বাবা-মায়ের উদবেগ, অর্থসংস্থানের চিন্তা-ভাবনাতে মেয়ে নিজে যে, কতখানি ক্লিষ্ট হয়, তা শুধু এই দেশের মেয়েরাই জানে! নিজেকে বড়োই অপরাধী বলে মনে হয়। বড়ো বোঝার মতো; অপারগ মা-বাবার অশক্ত কাঁধে।

এমন সময়ে ঘণ্টেমামার উত্তেজিত হুংকার শোনা গেল বসার ঘর থেকে। ই লোগ ক্যা আদমি হ্যায়? না, জানোয়ার?

কী হয়েছে?

বলে, সুনীতি তাড়াতাড়ি বসবার ঘরে এলেন খাওয়ার ঘর ছেড়ে।

ঝিঁঝি গেল না। খাওয়ার ঘরের পর্দার আড়ালেই দাঁড়িয়ে রইল। কে এসেছে, কে জানে।

সিঁড়িতে ঝাণ্ডুর পা-পোঁছার শব্দ পেল ঝিঁঝি। ঝাণ্ডুর পদতল ফুটি-ফাটা; কর্কশ। বাইরে থেকে এলেই সে, প্রথমে সিঁড়ির কোনাতে অমন করেই পা পুঁছে, তারপর-ই ভেতরে ঢোকে। পাপোশ কখনোই ব্যবহার করে না।

সুনীতি বললেন, ক্যা হুয়া! ঝাণ্ডু?

নেহি আয়া। আগলা বিফেকো আয়েগা।

ঔর আনা নেহি হোগা।

প্রচন্ড বিরক্তির সঙ্গে বললেন সুনীতি।

বলেই, ঝাণ্ডুর কাছে একথা বলার কারণে লজ্জিত হলেন।

কত কষ্টে দু-দিনের মতো খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করেছিলেন। ঝিঁঝিও জানে না। বাজারের ফকরালাল ‘সোনা চাঁদিওয়ালার’ দোকানে তাঁর বিয়েতে-পাওয়া একগাছি চুড়ি বিক্রি করেছেন উনি পরশু। যা সামান্য গয়নাগাটি আছে তা সব-ই রাখা আছে জগা মুকুজ্যের-ই কাছে। এই জঙ্গলে, এমন জায়গাতে, দুই মহিলা এমনিতেই যথেষ্ট বিপদের মধ্যে বাস করেন।

মেয়েদের শরীররটাই তো নানারকম বিপদকে চুম্বকের-ই মতো আকর্ষণ করে। তার ওপরে আবার সোনাদানা!

ঘণ্টেবাবু প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে আবারও বকলেন, ‘ই লোগ আদমি হ্যায় না জানোয়ার হ্যায়?’

বলেই, প্রবল বেগে উঠে দাঁড়াতে গেলেন বেতের চেয়ার ছেড়ে এবং পরক্ষণেই প্রবলতর বেগে পড়ে গেলেন ‘উঁ উঁ উঁ উঁ উঁ’ করতে করতে।

অনেকেই মনে করেন যে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন। আসলে দাঁড়াবার যে, এখনও দেরি আছে, তা তাঁরা আদৌ বুঝতে পারেন না। বুঝতে পারলেও, স্বীকার করতে চান না।

‘শিরীষবাবু গ্যয়াথা? স্টেশনমে?’ সুনীতি শুধোলেন।

এই প্রশ্ন, ভেতর থেকে শুনতে পেয়ে ঝিঁঝি বাইরের ঘরে এল।

পাঁচ মিনিট আগেই ও শেষবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল। যদিও ওর গায়ের রং কালো, বাবার মতো রং পেয়েছে ও; কিন্তু ‘ফিচার্স’ অসাধারণ সুন্দর। ও সেটা জানে। তা ছাড়া, ওর মুখে ‘বুদ্ধির’ যা প্রসাধন তা প্যারিসের ক্রিশ্চান-ডায়র বা লণ্ডনের ম্যাক্স-ফ্যাক্টর-এর প্রসাধনকেই ম্লান করে দেয়। ও সেটাও জানে।

শিরীষ একদিন বলেছিল, আমার ভীষণ ইচ্ছে করে, তোকে কুন্তী বলে ডাকি।

খুন্তি?

ঝিঁঝি বলেছিল, অবাক হয়ে। এবং রেগে গিয়েও।

কেন, খুন্তি কেন? আর তুই, শিরীষ সেন, তাহলে কি কড়াই?

উঃ কী আটারলি অশিক্ষিত বাঙালি তুই!

হতাশ ভঙ্গিতে হাট থেকে কেনা সস্তা লাল-সাদা ডোরাকাটা শার্ট-পরা দু-টি হাত ওপরে তুলে শিরীষ বলেছিল।

কেন? অশিক্ষিত কেন? সত্যিই বলছি জানি না। কুন্তি বা খুন্তি কী ব্যাপার?

তুই ‘আরণ্যক’ পড়িসনি?

না। সেটা কী জিনিস? বৃহদারণ্যক না বৃহদারণ্য উপনিষদ-এর নাম শুনেছি মার কাছে, কিন্তু ‘আরণ্যক’টা কী জিনিস?

ছি:। ছি:। আমাকে বললি, বললি, অন্য কোনো শিক্ষিত বাঙালিকে আবার এ-কথা বলতে যাস না। যে বাঙালি, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ পড়েনি তাকে আর যা-ই বলা যাক, শিক্ষিত বলা যায় না। সেই আরণ্যকের-ই একটি চরিত্র রাজা দোবরু পান্না। গভীর জঙ্গলের গহনে বসবাসকারী এক আদিবাসী রাজা। আর কুন্তী হচ্ছে তাঁর-ই মেয়ে। রাজকুমারী। বিভূতিবাবু কুন্তীর যে-সৌন্দর্য এঁকেছেন, নিকষ কালো-পাথরে কোঁদা অনির্বচনীয় সুন্দরী অথচ সারল্যের প্রতিমূর্তি—সেই কুন্তী। তোকে আমার কুন্তী বলে মনে হয়। জানি না কেন!

ঝিঁঝি বলেছিল, থ্যাঙ্ক ইউ।

তারপরেই বলেছিল, বাঙালিরা প্রত্যেকেই নিজেকে উচ্চশিক্ষিত বলে মনে করে কিন্তু তুই বোধ হয় ঠিক-ই বলেছিস। যে, বাঙালিরা নিজের মাতৃভাষার সাহিত্য পড়ে না, নিজের সংস্কৃতির খোঁজ রাখে না কোনোই তাদের বোধ হয় শিক্ষিত বলা সত্যিই চলে না। বলা উচিত তো নয়-ই!শুধু বাংলাভাষাকে বুকের কোরকে রেখে, মাথায় স্থান দিয়ে রাখবে! পশ্চিমবাংলার বাঙালিরা ডায়মণ্ডহারবার বা বহরমপুর বা বাঁকুড়ার উচ্চারণে ইংরিজি বলে মাড়োয়ারি-গুজরাতি-পাঞ্জাবি মালিকের তৈরি তেল-সাবান-গুড়-চা-পাট বিক্রি করবে। সেলসম্যানশিপ-ই হবে শিক্ষার চরম পরাকাষ্ঠা। সাহিত্য, সংগীত, দর্শন, ইতিহাস এসবের চর্চা উঠেই যাবে পুরোপুরি। ভালোই হয়েছে যে, আমরা আর পশ্চিমবঙ্গে থাকি না। তুই এনে দিবি ‘আরণ্যক’ আমাকে?

এনে দেব কী রে? আমার কাছেই আছে। কাল-ই তোকে দেব।

পড়েছিল ঝিঁঝি। পড়ে, অভিভূত হয়ে গিয়েছিল। শিরীষ যে, তাকে কুন্তীর সঙ্গে তুলনা করে একথা জেনে মনে মনে খুব খুশিও হয়েছিল।

এত কথা ভাবার সময় এ নয়। অথচ আশ্চর্য মানুষের মন। ফিলম-এর ফ্ল্যাশব্যাকের-ই মতো কোনো-না-কোনো অতীতের স্মৃতি মুহূর্তের মধ্যে খুঁড়ে বের করে আনে এই মন যে, ভাবলেও অবাক হয়ে যেতে হয়।

শিসবাবু তো দো দফে, টিশান গ্যয়া থা।

ঝাণ্ডু বলল, সুনীতির প্রশ্নর উত্তরে।

দো দফে? কেন, দো দফে কেন?

পইলে মরতবে গ্যয়া থা টাইম পর। ঔর দুসরা মরতবে গ্যয়া আভি। টিশন মাস্টারকো পাস বাড়কাকানাসে খবর আয়া।

কী খবর?

যো, মেহমানলোগোঁনে আগলা বিফেকোরোজ আওবে করেগা।

সামনের বৃহস্পতিবার।

হতাশ হয়ে সুনীতি বসে পড়লেন একটি চেয়ারে।

পরক্ষণেই ঝিঁঝিকে শুধোলেন। কী করব? মিছিমিছি শিরীষ ছেলেটা দু-দুবার! ঝাণ্ডুকে দিয়ে বেশি করে খাবার পাঠিয়ে দিই ওকে। কী বলিস? যাতে দু-দিন খেতে পারে। আর ঝাণ্ডুর সঙ্গে যে-বেচারারা গেছিল, ওদের গ্রামের লোক, ওদেরও একটু খাইয়ে দিই।

ঝাণ্ডু বাংলা বোঝে। কিন্তু বলতে পারে না।

সুনীতির কথা শুনে ও বলল, শিষবাবুকো পেট খারাব।

তোকে কে বলল?

বাবুনেই বোলা।

ঝিঁঝির কথাটা শোনামাত্রই সন্দেহ হল যে, খাবার যে যেতে পারে, তা শিরীষ আগে থাকতেই অনুমান করেই ঝাণ্ডুকে বানিয়ে এই কথা বলে দিয়েছে।

সুনীতি যেন, ঝিঁঝির মনের কথা বুঝেই বললেন, খাবার এখন পাঠালে ছেলের অভিমান হতেই পারে। আমরা তো ওকে আজ রাতে খেতেও বলতে পারতাম! আপন বলতে তো জগাবাবু-মাধাবাবু আর ও-ই। আর কে খোঁজ রাখে আমাদের? এখন খাবার ফেলা যাবে বলে, যদি ওর জন্যে পাঠাই ও তো ভাবতে পারে কিছু। ও কি ভিখিরি! তবে এমন ভাবটা উচিত নয় ওর। ওর জানা উচিত...

ঝিঁঝি মায়ের মুখের কথা কেড়ে বলল—

‘আত্মসম্মান’ থাকাটা তো দোষের নয় মা। না-থাকাটাই বরং দোষের।

তুই চুপ কর তো!

হঠাৎ ঝিঁঝির ওপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ঝাঁঝের সঙ্গে বলে উঠলেন সুনীতি।

ঝিঁঝির মুখটা বেগুনি হয়ে গেল। ও জানে যে, সুনীতির যত অশান্তি, যত বিড়ম্বনা, যত খরচ তার সবের-ই মূলে ও-ই।

ঝিঁঝি উঠে বাইরে গেল, যেখানে ঝাণ্ডুর গ্রামের তিনজন লোক বাঁক হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর ছমছমে জ্যোৎস্নার মধ্যে দাঁড়িয়ে, মেয়ে হয়ে জন্মেছে বলে, নিজে স্বাবলম্বী নয় বলে; নিজেকে নীরবে অজস্র অভিশাপ দিতে লাগল। গেটের দু-পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছ দুটো, বাউণ্ডারির কাঁটাতারের বেড়া বরাবর বোগোনভিলিয়া লতা। হাতার বাইরের প্রাচীন মহুয়ারা এই চাঁদের রাতে ছোপ ছোপ অন্ধকারের ঝোপ গড়েছে, বড়ো ছোটো, তার আলোকিত মনের মধ্যের ছায়ার ঝোপের-ই মতো।

সুনীতি এবার ঝাঁঝটা স্থানান্তরিত করলেন ঘণ্টেবাবুর ওপরে। বললেন, চলুন, ঘণ্টেবাবু, আজ সব খাবার আপনাকেই খাওয়াব। যে-মানুষদের দায়িত্বজ্ঞানের বহর এরকম তাঁদের বাড়িতে মেয়ের বিয়ে আদৌ দেওয়া উচিত হবে কি না তাও ভেবে দেখতে হয়।

সুনীতির ভাব দেখে ঘণ্টেবাবু আর ‘রা’ কাড়লেন না। ‘উঁ উঁ উঁ উঁ’ শব্দটাই নীচুগ্রামে করে যেতে লাগলেন সমানে, সুনীতির মন অন্যত্র স্থানান্তরিত করার চেষ্টায়।

সুনীতি বাইরের দরজাতে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ভেতরে আয় ঝিঁঝি। ঝাণ্ডুদের খেতে দিতে হবে।’ ঝাণ্ডুকে বললেন, ‘তুমলোগ সব্বে আও ঝাণ্ডু। বাওয়ার্চিখানামে আও।’

ঝাণ্ডু, বাগানের মধ্যে দিয়ে পেছন দিক দিয়ে গিয়ে বাওয়ার্চিখানার দরজাতে দাঁড়িয়ে বলল, উলোগোঁনে জিন্দগিমে কভভি ফেরায়েড-রাইস নেহি না খায়া মাইজি। আপ যোভি দিজিয়েগা, উলোগোঁনে, কহ রহা হ্যায় কি, ঘর লে কর যায়েগা। বিবি-বাচ্চোকা সাথ থোরা থোরা করকে বাঁটকে খায়েগা।

বাসন কোথায় যে, দেব?

সুনীতি বললেন।

হাঁড়ি-কড়াতে করেই দিয়ে দিন মাইজি। ওরাই কাল মেজে-টেজে দিয়ে যাবে ফেরত।

ওদের জন্যে খাবার বাড়তে বাড়তে সুনীতি বললেন, ঝিঁঝিকে উদ্দেশ করে, কিন্তু স্বগতোক্তির-ইমতো; সব দিয়ে-টিয়ে তো দিলাম। এখন যদি এসে হাজির হন তাঁরা, গাড়ি-টাড়িতে করে? ঝাণ্ডু, ধান শুনতে কান শুনল না তো রে!

না:। শিরীষ যখন গেছিল এবং ফিরেও এল, ওঁরা যে, আসেননি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আগে জানলে, জগামামা-মাধামামাকেও আজ খেতে বলে দেওয়া যেত। শিরীষকেও। কতগুলো বাজে লোকের মধ্যে তোমার এত ও এত্তরকম কষ্ট। অর্থব্যয়। সব-ই তো আমার-ই জন্যে। নিজের ওপরে ঘেন্নায় মরি!

সুনীতি ঝিঁঝির কাছে এসে, একটু আগেই বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন বলে, সম্ভবত অনুতপ্ত হয়ে মেয়ের গাল টিপে আদর করে দিয়ে বললেন, কেন? তোর এমন মনে হল কেন? তোর ভালো হলে তো আমার-ই ভালো। আমার স্বার্থ তো তোর স্বার্থর-ই সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তুই বড়ো ঘরে পড়বি। ভালো থাকবি, ভালো খাবি, গাড়ি চড়বি, বেড়াতে যাবি নানা জায়গায়, ব্যাপারটা ঘটলে, কত্ত সুখী হবি তুই! ছেলেবেলায় তো শখ-আহ্লাদ কম করিসনি, তোর বাবার কত্ত আদরের মেয়ে ছিলি তুই! সেসব দিনের কথা তো আমি ভুলিনি! তোর হয়তো সব কথা মনে নাও থাকতে পারে।

মায়ের অনাদরে যা ঘটেনি, এবারে তাই ঘটে গেল মায়ের আদরে, মুখের দুটো মিষ্টি কথাতেই।

এমনিতে খুব-ই চাপা-মেয়ে ঝিঁঝির দু-চোখের কোণ জলে ভরে এল।

ঘণ্টেমামা চেঁচিয়ে বললেন, বউদি! কাল যে-করেই হোক লাঠি হাতে করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমি জগাবাবুদের বাড়ি গিয়ে, কলকাতাতে একটা ফোন করব এবং ডালটনগঞ্জেও। ভুল হয়ে গেল বড়ো। কাল রাতে বা আজ সকালেও একটা ফোন করে জেনে নেওয়া উচিত ছিল। সব-ই কপাল। ট্রেন থেকে নামতে-না-নামতেই তো পা-টার এমন হাল করলাম। শিরীষ বলেওছিল, একটা টর্চ নিয়ে যেতে। আমিই বাহাদুরি করতে গেলাম।

সুনীতি খাবার ঘর থেকেই গলা তুলে বললে, আসুন এবারে, সাবধানে। আস্তে আস্তে খাবার টেবলে চলে আসুন ঘণ্টুবাবু। বড়ো টেনশান গেছে আমার আজ সারাদিন। সব পাট চুকিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ব। কালকে, আপনি যা মনে হয়, তাই করবেনখন। আমরা তো তাঁদেরই চিনিই না। তাই আমার অথবা ঝিঁঝির পক্ষে তো কথা বলা সম্ভব নয়। উচিত তো নয়ই।

তারপর-ই গলা নামিয়ে বললেন, ‘বাহাদুরি তো উনি চিরটাকাল-ই করে এলেন। নেহাত-ই অসহায় না হলে কি, আমার এইসব মানুষের শরণাপন্ন হতে হয়। যাইহোক, আজ ওঁকে ফাঁসির খাওয়া খাওয়াব।’

ঝিঁঝি বলল, ‘ওরকম করে বোলো না মা। উনি তো ভালো ভেবেই যা করার করতে গেছিলেন। যাঁদের আসার কথা ছিল তাঁরা তো ওঁর মালিকও বটেন। তাঁদের ওপরে যে, হম্বি-তম্বি করবেন তারও কোনো উপায় নেই। একথা ঠিক যে, বাবার কাছে উনি অনেক-ই উপকৃত, ওরা পুরো পরিবার-ই উপকৃত, তবু তো মানুষটির মতো কৃতজ্ঞতাবোধ-ই বা ক-জন দেখিয়েছেন বলো!’

বলেই, ঘরে গিয়ে ঘণ্টেবাবুর হাত ধরে ওঠাল ঝিঁঝি, চেয়ার থেকে, বলল, চলুন ঘণ্টেমামা। আজকে যাকে বলে ‘ফাঁসির খাওয়া’ তাই খাওয়াবে মা আপনাকে। একটু আগেই বলছিলেন।

আর বোলো না মা। ফাঁসির খাওয়া না খেয়ে নিজে আমগাছ থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ফাঁসিতে ঝুলে যেতে ইচ্ছে করছে আমার! তোমাদের জন্যে একটু কিছুও যদি করতে পারতাম তাহলে আমার মতো সুখী আর কেউই হত না। অন্য কোনো ভাবে তো কিছুই করতে পারি না। তাই ভেবেছিলাম...। তোমার বাবার কথা তো...।

ঝিঁঝি তাঁকে ধরে ধরে খাবার ঘরে নিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘ফাঁসির খাওয়া’ কাকে বলে ঘণ্টেমামা?

ও, তাও জানো না? যার ওপরে ফাঁসির আদেশ হয়, তাকে ফাঁসির আগের দিন-ই সম্ভবত জেলে কতৃপক্ষ জিজ্ঞেস করেন যে, তার শেষ ইচ্ছে কী? তাকে সম্ভবত গান্ডেপিন্ডে খেতেও দেওয়া হয়। যদি নিজে সে কিছু খেতে চায়, তবে তো কোনো কথাই নেই। অনেক সময়েই ফাঁসির খাওয়াটা ফাঁসি যাওয়ার চেয়েও মারাত্মক হয়ে ওঠে বলে শুনেছি। বউদি, দেখি, সে বন্দোবস্তই করছেন। তবে যার আগামীকাল ফাঁসি হবে, সে মানুষ কি আদৌ কিছু খেতে পারে? জানতে ইচ্ছে করে খুব।

ওরা তিনজন খেতে বসলেন যখন, তখন সুনীতি বললেন, আপনি কাল যে, কোথাও হেঁটে যেতে পারবেন বলে তো আমার মনে হচ্ছে না। তার চেয়ে ঝিঁঝি, তুই একবার শিরীষের কাছে যাস। ওকে আমার সঙ্গে দেখা করতে বলিস কাজে যাওয়ার আগে। আমিই ওকে বুঝিয়ে বলব, যা বলার, তারপরে জগাবাবুর বাড়ি গিয়ে ওঁকে বলে কলকাতায় যদি ওঁকে দিয়েই একটা ফোন করাতে পারে! শিরীষ ছেলেমানুষ। ও বলার চেয়ে, জগাবাবু বললেই ব্যাপারটা ভালো দেখাবে।

ঘণ্টেমামা বললেন, এ যে দেখছি, ইংরিজিতে কী একটা কথা আছে না ‘ফ্রম দ্য ফ্রাইং প্যান টু দি আভেন’ তাই ঘটবে। জগাবাবু বললেন : ‘আপনাডা কেমন মানুট মডাই? খপরডা এট্টু আগে কি ডিটে পাট্টেন না? কোনোই টেনট অপ রেটপনটিবিলিটিই নেই ডেকচি। আপনাডেড টঙ্গে কোন ভটটায় মেয়েড বিয়ে ডেব বলটে পাডেন?’

সুনীতি হেসে উঠলেন ওই বিড়ম্বনার মধ্যেও।

ঝিঁঝিও হাসল।

ঘণ্টেবাবুর এই গুণটি আছে! যে-মানুষকে সাধারণত অন্যেরা নিতান্তই নির্গুণ বলেও জানেন তাঁর মধ্যেও অনেক-ই গুণ থাকে, যা বড়ো বড়ো গুণীর মধ্যেও থাকে না। নির্ভেজাল-গুণী অথবা নির্ভেজাল-নির্গুণ মানুষ সংসারে বড়ো একটা দেখা যায় না বোধ হয়। তা ছাড়া ‘মোসাহেবি’, দোষ কী গুণ তা তর্কসাপেক্ষ হলেও মোসাহেবি করতেও যে, প্রচুর গুণপনার প্রয়োজন হয় সেটা সহজবোধ্য। ঘণ্টেবাবু সুমন ব্যানার্জির সুদিনে ভালো মোসাহেব ছিলেন বলেই, তাঁর মধ্যেও অনেক গুণ ছিল। মানুষ হিসেবে, যদিও মোসাহেবদের একটি বড়ো অংশের মধ্যেই ভেজাল থাকে কিন্তু উজ্জ্বল ব্যতিক্রমের মধ্যে ঘণ্টেবাবু পড়েন।

মানুষটি তিনি ভালোই।

পরিবেশটা লঘু করে দেওয়ার জন্যে ঝিঁঝি ও সুনীতি দু-জনেই স্বাভাবিক কারণেই খুশি হলেন। মনের মধ্যে জমে-ওঠা গুমোটটা কেটে গেল হঠাৎ-ই। সুনীতি ভাবলেন যা হবার তা হবে। বিয়ে কি এককথায় হয়? লাখ কথায় হয়। তা ছাড়া, তাঁরা এলেই যে, তাঁদের পছন্দ হত, ঝিঁঝিকে বা ঝিঁঝি এবং সুনীতির তাঁদের; তাই বা কে বলতে পারে।

ঈশ্বর যা করেন, মঙ্গলের জন্যেই করেন।

খাওয়া শেষ করে বাসন-পত্র দু-জনে মিলে ধুতে ধুতে সুনীতি বললেন, শিরীষ ক-টার সময় কাজে বেরোয় রে?

শুনেছি সকাল ন-টায় গদিতে পৌঁছোয়। তারপর দুপুরে একবার খেতে আসে বাড়িতে, তারপর ফিরে গিয়ে আবার ছ-টা অবধি থাকে। কোনো-কোনোদিন অনেক রাত অবধি থাকে। তবে কাল তো শুক্রবার। ওর ছুটি তো। গতকাল হাট ছিল। হাটের পরদিন ছুটি থাকে ওর।

তাহলে তো ভালোই হল। তুই একেবারে সকালেই এক কাপ চা খেয়ে চলে যাস, শিরীষের কাছে। তারপর ওকে ডেকে নিয়ে আসবি।

ডেকে এনে কী লাভ হবে? আমি কি বুঝিয়ে বলতে পারব-না ওকে? বরং জগামামাদের ওখান থেকে ফিরতি পথে আমাদের এখানে হয়ে যেতে বলব।

তাই ভালো। ওর জন্যে চিঁড়ের পোলাও করব। ছেলেটা খেতে ভালোবাসে।

তুমি কী করে জানলে? তোমাকে বলেছে?

মুখে কি সবাই সব কথা বলে? বুঝে নিতে হয়। একদিন খেয়েছিল, আমার হাতের চিঁড়ের পোলাও। ওর মুখ-চোখ দেখেই বুঝেছিলাম যে, খুব ভালোবেসে খেয়েছিল।

চুপ করে থাকল ঝিঁঝি। কী যেন, ভাবল একটুক্ষণ।

তারপর বলল, বলব ওকে। তবে ও কি আসতে পারবে? মানে, এলেও খাবে কি? সেদিন কী করে পেঁপে আর কাঁচকলা জোগাড় করে আনল! মাসের সব ছুটির দিন-ই ও রাঁচি যায় লাইব্রেরিতে আর বইয়ের দোকানেও। যা মাইনে পায় তার সব-ই তো চলে যায় বই আর ক্যাসেট কিনতে। হরিমটর চিবিয়েই থাকে বলতে গেলে।

ভালোই তো।

বলেই, উদাস হয়ে গেলেন সুনীতি। তারপর বললেন, তোর বাবাও প্রথম জীবনে এইরকম-ইছিলেন। বলতেন, আমার জীবনের লক্ষ্য ‘‘লো লিভিং হাই থিঙ্কিং’’। প্রাচুর্যময় জীবনযাত্রার মধ্যে কোনো বাহাদুরি নেই বরং এক ধরনের স্থূলতা আছে। মানুষের গর্ব হওয়া উচিত চিন্তার-ই সমারোহে, ‘মানসিকতা’র এমন গভীরতা মানুষের মতো তো বিধাতা আর কোনো প্রাণীকেই দেননি!

অমন-ই ছিলেন প্রথম জীবনে। বিয়ের আগে যখন জানতাম ওঁকে। তারপর কী যে হল! জাগতিক সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষটা ভেসে গেলেন সাচ্ছল্যর বন্যাতে। অন্য মানুষ হয়ে গেলেন। এমন হবেন জানলে ওঁকে আমি বিয়েই করতাম না। অর্থ, বিষধর সাপের-ই মতো। হয়তো, ক্ষমতা-প্রতিপত্তিও। কোনোদিন সে সাপুড়েকেই ছোবল মারবে, আগে থাকতে বোঝা যায় না।

কেন হলেন বাবা ওরকম?

কী করে বলব। শিকড় বোধ হয় যথেষ্ট শক্ত ছিল না। জীবনে ‘শিকড়’টাই হচ্ছে আসল, বুঝলি। জীবনের সবক্ষেত্রেই। শিকড় যাঁদের গভীরে না পৌঁছেছে তাঁদের পক্ষে মহীরুহ হয়ে ওঠা একেবারেই অসম্ভব। যাই করিস, যতটুকুই করিস; শক্ত পায়ে দাঁড়িয়ে থাকবি তোর নিজস্ব জমিতে। শিকড় নামিয়ে দিবি অনেক গভীরে। এই শিকড়ের ব্যাপারটা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের বেলাতেও সমানভাবে খাটে। যেসব সম্পর্কে শিকড় গভীরে গিয়ে পৌঁছোয়, শুধু সেইসব মানুষ-ই কোনো হঠাৎ-বানে কখনোই ভেসে যায় না। পাহাড়ি নদীর ওপরের ‘কজওয়ের’-ই মতো সে স্বস্থানেই থাকে—উপর দিয়ে তখনকার মতো তাকে ডুবিয়ে দিয়ে, তার মাথার উপর দিয়ে আলোড়ন তুলে তোলপাড় করে, যতই বেগে জল বয়ে যাক-না কেন।

ঝিঁঝি, খেতে খেতে, কথা না বলে, সুনীতির মুখের দিকে তাকাল একবার।

সুনীতি বললেন, কথাটা জীবনভর-ই মনে রাখিস।

একটু অবাক হল ঝিঁঝি! ‘জ্ঞান দেওয়া’ যাকে বলে তা কখনোই দেননি ওর মা ওকে। নিজের জীবন দিয়েই, জীবনযাত্রার আত্মসম্মানের প্রকৃতি দিয়েই যা-শেখাবার তা শিখিয়েছেন, ওকে শিশুকাল থেকেই। শিখিয়েছেন উপদেশ দিয়ে নয়; উদাহরণ দিয়ে।

আজ কেন, হঠাৎ এমনভাবে কথা বলছেন সুনীতি তা ঝিঁঝি ঠিক বুঝল না।

সবে পুবে আলো ফুটেছে।

সুনীতি ঝিঁঝির ঘরের দরজায় টোকা দিলেন। টোকা দিতেই দরজা খুলে গেল। সুনীতি দেখলেন, দরজাটা ভেজানোই ছিল। ঝিঁঝি জানলার সামনে বসেছিল, পেছনের পাহাড়তলির দিকে চেয়ে।

দরজা খুলে যেতেই, ঝিঁঝি জানলা ছেড়ে সরে এল।

বলল, এত সকালে উঠলে যে, মা!

বা:। তোকে তো বলেইছিলাম কাল। আজ আমিই চা করছি। তুই মুখচোখ ধুয়ে তৈরি হয়ে নিয়ে এক কাপ চা খেয়ে একবার যা, শিরীষের কাছে। লজ্জাও করে। অথচ ও ছাড়া, কার কাছেই বা যেতে বলতে পারি।

কেন? জগামামা-মাধামামার কাছেই তো যেতে পারি। ফোনটা যদি ওঁদের বাড়ি থেকে করতে হয় তবে আবার অন্য মুরুব্বি ধরা কেন?

আসলে শিরীষের কাছে যেতে ওর ভীষণ-ই লজ্জা করছিল। কোন মুখ নিয়ে যাবে? নীলোৎপলের না-আসাটা যে, ঝিঁঝির পক্ষে কতবড়ো অপমানকর ব্যাপার তা সুনীতি বুঝবেন না। বুঝবেন, অন্যরকম করে। ঝিঁঝির মনে এই মুহূর্তে যে, কী হচ্ছে তা উনি মা হয়েও বুঝবেন না।

তা নয়। শিরীষ কথা বলে খুব সুন্দর। ওর মধ্যে একেবারেই ‘গ্রাম্যতা’ দোষ নেই। ও যে, ‘মনোয়া-মিলন’-এর মতো একটা জংলি জায়গাতে থাকে, তা ওর কথাবার্তা, ব্যবহারে বোঝাই যায় না।

সেটা হয় ওর পড়াশুনো ও গান শোনার জন্যে। ওর আসল বন্ধু হচ্ছে, বই ও ক্যাসেট। তাই হয়তো অমন হয়। কিন্তু শুধু সেইজন্যেই কি, ওকে এই সাতসকালে গিয়ে বিরক্ত করতে হবে? করাটা কি আমাদের পক্ষে সম্মানের হবে, মা?

সুনীতির কন্ঠস্বর রুক্ষ লাগল। বললেন, বিরক্ত কি তবে শুধু আমাকেই হতে হবে? তোদের যদি এতই মান-সম্মান জ্ঞান, এতই কনসিডারেশান অপরের প্রতি, তাহলে তোরা যা ভালো মনে করিস, কর। আমি আর এ-নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। সম্মানের কি কিছু অবশিষ্ট আছে এখনও?

ঝিঁঝি এক পলক মায়ের মুখের দিকে চেয়ে কী ভাবল। তারপর বলল, যাচ্ছি। চা খাব না মা। রোজ তো আমি চা খাইও না সকালে।

একটু পর-ই চোখমুখ ধুয়ে তৈরি হয়ে ঝিঁঝি বেরিয়ে পড়ল। সাইকেলটা নিতে পারল না। কারণ, সেটা ঝাণ্ডুর ঘরেই থাকে রাতের বেলা। আর ঝাণ্ডুও কাল তার বস্তির লোকেদের সঙ্গে তার ভাগের ‘ফেরাইড-রাইস আর চিলি-চিকেনওয়া’ নিয়ে চলে গেছে। যদিও বলে গেছে, ভোরে উঠেই চলে আসবে।

গেটের চাবিটা বসার ঘরের দেওয়ালে একটি মাউন্ট-করা শম্বরের শিং-এ ঝোলানো থাকে। চাবিটা নিয়ে, গেটটা খুলে চাবিটা নিজের ব্লাউজের মধ্যে ফেলে গেটটা এমনি বন্ধ করে, বেরোল ও। ঘণ্টেমামা তখনও ঘুমোচ্ছিলেন।

এখন প্রতিদিন-ই গরম বাড়ছে। রোদটা উঠলেই চিটপিট করতে থাকবে শরীর।

গরম বাড়ছে তার মাথারও মধ্যে। মাঝে মাঝেই মনে হয়, স্বনির্ভর না হলে, মেয়ে হয়ে এদেশে জন্মানো আজকের দিনেও বড়ো পাপের। অথচ লেখাপড়া একটু শিখেছে বলেই, শুধু মেয়ে বলেই একজন পুরুষের ওপরে সারাজীবন নির্ভর করতে হবে পুরো ভবিষ্যৎ-জীবন, এই কথাটা ভাবলেও ভীষণ ঘৃণা বোধ করে ও। অথচ কী যে করবে, তাও ভেবে পায় না। মাঝে মাঝে ভাবে, একদিন মাকে কিছু না বলে, রাঁচিতে চলে যায়। কলেজের প্রত্যেক বন্ধুদের বাড়িতে বাড়িতে ঘুরে একটা চাকরির চেষ্টা করে। কিন্তু মা! মায়ের কী হবে? সে ছাড়া তো মায়ের কেউ-ই নেই। সাধারণভাবে পাশ করা বি.এ.কে, কে, কী এমন চাকরি দেবে, যাতে মা-মেয়ে দু-জনেই রাঁচিতে থাকতে পারে। জানাশোনা থাকলেও না-হয় হত। আজকাল জানাশোনা, ধরাধরি, সংযোগ, ঘুস-ঘাস ছাড়া নাকি কিছুই হয় না।

অথচ ও কিন্তু সত্যিই কোনোদিন-ই চাকরি করতে চায়নি। ছেলেবেলা থেকেই ভেবেছিল যে, সুন্দর দেখতে না-হলেও সুন্দর মনের, উদার, শিক্ষিত, সুরুচিসম্পন্ন, রস-বোধসম্পন্ন স্বামীর সঙ্গে, সে স্বামী-সন্তান-সংসার নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থেকে, সামান্য সাধ নিয়েই জীবনটা কাটাবে। কিন্তু সেই চাওয়া পূরিত হওয়া তো চাকরি পাওয়ার চেয়েও অনেক-ই কঠিন। এখন বুঝেছে। ক্রমশই এই জানাটা ওর ভেতরের সব ভারসাম্য নষ্ট করে দিচ্ছে।

শিরীষের ‘দাঁড়কাকের বাসাতে’ ও যখন, গিয়ে পৌঁছোল তখন রোদ ওঠেনি। হেঁটে আসতে মিনিট পনেরো লাগল।

দরজায় কড়া নাড়তেই কালু ‘ভুক ভুক’ করে দৌড়ে এল। এবং তার পেছনে পেছনে, নিশ্চয়ই শিরীষ। আওয়াজে বুঝল।

দরজা খুলতেই ঝিঁঝি দেখল, চৈতি-সকালের সূর্য-না-ওঠা কোমল নরম আলোর মধ্যে এক-দরজা শিরীষ।

ওর দিকে তাকিয়ে লজ্জা পেয়ে গেল ঝিঁঝি। কখনো খালি গায়ে দেখেনি শিরীষকে। ওর শরীরটা যে, এমন সুগঠিত, ওর গায়ের রংটাও যে, এমন সাহেবদের-ই মতো, তা জামা-কাপড় পরা অবস্থাতে একটুও বোঝা যায় না। কিংবা কে জানে, ও হয়তো বুঝতে চায়ওনি কখনো।

পায়জামা-পরা, খালি-গা, টকটকে-শরীর, বুকভরতি কুচকুচে-কালো চুল, সরু কোমর, চওড়া বুক, যেমন সুগঠিত বাহু তেমন-ই হাতের কবজি, আঙুলগুলিও।

এই দু-হাতেই শিরীষ সাইকেল-এর হ্যাণ্ডেল ধরে কতদিন ঝিঁঝিকে তার সাইকেলের রডে বসিয়ে নিয়ে গেছে কোথায়-না-কোথায়, অথচ ভালো করে নজর করে দেখেনি ঝিঁঝি কিছুই। বেশি কাছে থাকলে বোধ হয় অন্যকে ভালোভাবে দেখা যায় না।

তুই! এত সকালে! কী রে! শিরীষ বলল, অবাক হয়ে এবং না-হয়েও।

তারপর-ই বলল, ‘আয়। আয়। ভিতরে এসে বোস। অতিথি নারায়ণ। পথে দাঁড়িয়ে থাকলে আমার মা যে, ওপর থেকে আমাকে অভিসম্পাত দেবেন। বোস। বোস।’

বলেই, বেতের চেয়ারটা দেখিয়ে দিল। দু-টিমাত্র বেতের চেয়ার। রং-ওঠা, ভাঙা-চোরা। মধ্যে একটা সেন্টার-টেবল। বেতের-ই। তারও একটা পায়া ভেঙে যাওয়াতে একদিকে ঝুঁকে আছে। পায়ের নীচের দিকে বেতের বাঁধন খুলে গিয়ে কোঁকড়া মতো হয়ে গেছে। তার-ই মধ্যে লম্ফ ঝম্ফ করছে কালু। ল্যাজ নাড়ছে। ‘ফটাফট’ শব্দ উঠছে চেয়ার-টেবলের পায়াতে ল্যাজের বারি লেগে।

এই কালু, মার খাবি তুই চুপ করে না বসলে। চুপ করে বোস। তুই কি চিনিস-না ঝিঁঝিকে?

বলেই বলল, এত সকালে নিশ্চয়ই চা খেয়ে আসিসনি। চা খাবি তো? চা-ই করছিলাম। দাঁড়া এক মিনিট। আগে বুড়ি-মাইকে দুধটা দিয়ে আসি। উনুনে বসিয়েছি। কাল সকাল থেকেই বুড়ি মাই-এর জ্বর। রাতে স্টেশন থেকে ফিরে দেখি গা পুড়ে যাচ্ছে। ক্রোসিন দিয়ে দিয়ে রেখেছি। সারারাত ছটফট করেছে মাথার যন্ত্রণায়। পা টিপে দিলাম আমি আর কালু মিলে। মাথাও টিপে দিলাম আমি। এই শেষরাতের দিকেই একটু ঘুমিয়েছে। সারারাত ওর সঙ্গে আমরাও জেগে।

কালু পা টিপে দিল মানে?

ঝিঁঝি বলল অবাক হয়ে।

কালু ভালো পা টেপে। ওর শরীরের সমস্ত ওজনটুকু চাপিয়ে দেয়, পেছন ফিরে; যেখানে ব্যথা সেখানে। আরাম লাগে খুব। তোর জ্বর যদি হয় কখনো তবে খবর দিস, কালুকে নিয়ে যাব। দেখিস!

ঝিঁঝি কথা না বলে, শিরীষের দিকে চেয়ে রইল মুগ্ধ দৃষ্টিতে। আশ্চর্য! ও ওর খুব-ই বন্ধু। বলতে গেলে, ওর একমাত্র বন্ধু এখানে। অথচ আজ পর্যন্ত একদিনও এই বাড়ির ভেতরে ঢোকেনি। একা-পুরুষ থাকে বলেই হয়তো। সমাজ, সংসার, ওর আজন্ম মেয়েলি-সংস্কার, যুগযুগ-ধরে সঞ্চিত ভয়-ই হয়তো ওকে ঢুকতে দেয়নি। সুনীতিও আভাসে-ইঙ্গিতে বলে রেখেছিলেন, না-ঢুকতে। অথচ কত দিনে-রাতে অন্ধকারে বা চাঁদে ওরা পাহাড়ে বসে অসীম নির্জনতায় কাটিয়েছে একে-অপরের সান্নিধ্যে। ভাবছিল, পুরুষ ও নারীর দেহঘটিত সমস্ত ব্যাপার-ই চিরদিন-ই আগল-দেওয়া ঘরের মধ্যেই সংঘটিত হয়েছে বলেই বোধ হয় ঘরকে এত ভয়; বাহিরকে নয়।

ঝিঁঝি চেয়ারে একবার বসেই উঠে পড়ে বলল, দুধটা আমাকে দে। আমি খাইয়ে আসছি বুড়ি-মাকে।

তুই খাওয়াবি?

আনন্দে যেন মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল শিরীষের।

তারপর-ই বলল, তুই যেখানে বসে আছিস, লক্ষ্মী মেয়ের মতো সেখানেই বসে থাক। একদিন, একবেলা আমাকে সাহায্য করে কী-বা লাভ হবে? মধ্যে দিয়ে, আমার অভ্যেস-ই খারাপ হয়ে যাবে। রোজ যদি-আমার দায়িত্বর ভার নিতে পারতিস তাহলে না-হয় তোকে অনুমতি দেওয়া যেত। এসব-ই ঘরের মানুষের কাজ। ক্ষণিকের-অতিথির নয়। বোস। চা আনছি আমি।

বলেই বলল, কিছু কি খাবি? চায়ের সঙ্গে? আমি কিন্তু দারুণ ওমলেট ভাজতে পারি। আর চিঁড়েভাজাও। কড়াইশুঁটি, ধনেপাতা, কাঁচা-লঙ্কা আর পেঁয়াজকুচি দিয়ে ভালো হয় যদিও, তবে গরমের সময় তো এখন। ধনেপাতা বা ওসব কোথায় পাওয়া যাবে? তবে, তোকে চিনেবাদাম দিয়ে ভেজে দিতে পারি, সঙ্গে একটু কারিপাতা ফেলে। খাবি?

ঝিঁঝি দু-দিকে মাথা নাড়ল।

শোয়ার সময়ে দু-বিনুনি করে শুয়েছিল। মাথা নাড়ানোতে বেণি দু-টিও দুলে উঠল দু-পাশে।

শিরীষ বুড়ি-মাইকে দুধ খাইয়ে এসেই, হাত ধুয়ে দু-জনের জন্যে গেলাসে করে চা আর ঝাল-বিস্কিট এনে সামনে রাখল। একটা প্লেটে করে চা আর বিস্কিট দিল কালুকেও উঠোনের কোণে, কালুর খাবার জন্যে যে, অ্যালুমিনিয়ামের থালাটি রাখা আছে, তার ওপরে।

খা ঝিঁঝি। ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। আর চিনি লাগবে, কি না বলিস।

বলে, নিজেও নিজের গ্লাস তুলে নিয়ে চুমুক দিল চায়ে।

এক চুমুক দিয়েই বলল, স্যরি। দেখ। আমি-না একটা ছোটোলোক। বলেই, এক দৌড়ে ঘরে গিয়ে দেওয়ালে ঝোলানো কালকের ছাড়া-শার্টটা পরে এল। হেসে বলল, অসভ্যতা মার্জনীয়।

ঝিঁঝি তবুও কিছু বলল না। কিন্তু শিরীষ জামা পরে ওর চেনা শিরীষ হয়ে-ওঠাতে ঝিঁঝির মধ্যে স্বাভাবিকতা ফিরে এল।

আধ-গেলাস চা খাওয়া হতে-না হতেই, ঝিঁঝি বাইরের একটা লম্বা গাছ দেখিয়ে বলল, ওটা কী গাছ রে?

কোনটি ?

একটা হলুদ-বসন্ত পাখি ঠিক সেই সময়েই উড়ে এসে বসল, সেই গাছটির উঁচু ডালে।

ঝিঁঝি আঙুল দিয়ে দেখাল, ওইটা। যেটাতে পাখি এসে বসল।

ওঃ ওটা। তাই বল।

ভারি সুন্দর তো গাছটা।

হতেই হবে। ওটা যে, আমিই!

তুই মানে?

শিরীষ রে, শিরীষ।

তাই?

সত্যিই যেন, মিল খুঁজে পেল ঝিঁঝি ওই গাছের সঙ্গে এই চৈত্র-সকাল বেলার শিরীষের।

চায়ের গ্লাসটা শেষ করেই শিরীষ বলল, এবার চল তাহলে জগাদাদের বাড়ি।

কী করে জানলি? তুই?

শিরীষ বাঁ-হাতের আঙুল দিয়ে মাথার বাঁ-দিকে টোকা মেরে দেখাল।

পরক্ষণেই বলল, কিন্তু জগাদাদের বাড়ির ফোন খারাপ ছিল। এখন ভালো হয়েছে কি না বলতে পারব না। তা ছাড়া কী বলতে হবে-না হবে, তা কাকিমার কাছ থেকে জেনে এসেছিস তো? বলাতে হবে মাধাদাকে দিয়েই। জগাদা টরেটক্কা করে দিলে নীলোৎপল আর এমুখো হবে না।

কাল তোর খুব-ই কষ্ট হয়েছে না রে? অতঘণ্টা গাড়ি লেট। এদিকে বাড়িতে রোগিণী।

তা কী আর করা যাবে! তোর কারণে যে, আমার কত এবং কতরকমের কষ্ট তা তোর বোঝার-ই কোনো ক্ষমতা নেই। তোর শুধু এই কষ্টটুকুই চোখে পড়ল? সত্যি! নীলোৎপল কি জানে যে, সে কতখানি ভাগ্যবান? রাজকুমারী কুন্তী তার জন্যে বনফুল কুড়িয়ে নিয়ে, ফুলের মালা গেঁথে এই ‘মনোয়া-মিলন’-এ বনবাসে তাকে বরণ করার জন্যে বসে আছে যে, তাও কি সে জানে? বোকা একটা!

কালকে মিথ্যে কথা বলেছিলি কেন? ঝাণ্ডুকে? আমি শুনেই বুঝেছিলাম যে, কথাটা মিথ্যে।

কোন কথাটা?

তোর পেটের অসুখ।

হাসল শিরীষ। বলল, হ্যাঁ, মিথ্যা বলেছিলাম। তুই ঠিক-ই ধরেছিস।

কিন্তু কেন?

যেহেতু তোর বুদ্ধি আছে সেহেতু, এও ভেবেছিলাম যে, তুই এই মিথ্যে বলার কারণটাও বুঝবি।

ঝিঁঝি মুখ নামিয়ে নিল।

প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে শিরীষ বলল, ব্যাপারটা কী জানিস। আমার হচ্ছে কুকুরের পেট। আর কালু তো জেনুইন কুকুর-ই। ঝাণ্ডুর কাছে যা শুনলাম, ‘ফেরাইড রাইস আর চিলি চিকেনওয়া’ ওসব আমাদের পেটে সহ্যই হত না। কুকুরের পেটে যে ঘি সয় না, তা জানিস না বুঝি? আমি কি নীলোৎপল? তার পেটে যা সয় তা কি আমার পেটে সয়?

ঝিঁঝি চুপ করে রইল।

শিরীষ বলল, চল, এবারে বেরোই।

এই কালু, বুড়ি-মাইকে দেখবি।

কালু ল্যাজ নাড়িয়ে জানাল যে, দেখবে।

বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে শিরীষ বলল, রডে বসবি? না ক্যারিয়ারে?

দাঁড়া। চল একটু দূর অবধি হেঁটে যাই। বুদ্ধিটা গুলিয়ে যাচ্ছে। মা যে, কী করেন। মা-রও কোনো দোষ নেই। এরজন্যে দায়ী ঘণ্টেমামাই। এই ফোন করার আইডিয়াটা ঘণ্টেমামার-ই।

তাঁরা তো বলেইছেন যে, বৃহস্পতিবার আসবেন।

কী ইরেসপনসিবল ভেবে দেখ একবার।

এরকম ভাবাটা কিন্তু ঠিক নয়। কত জরুরি কাজেই না আটকে পড়তে হয় মানুষকে। তার ওপরে অতবড়ো ব্যাবসাদার বলে কথা! ওঁর দিকটা একটু ভাববার চেষ্টা কর। মানুষকে ‘বিচার’ না করেই বাতিল করার মধ্যে কোনো যুক্তি নেই কিন্তু। ভেবে দেখ। আমি তো বলব, ভদ্রলোক প্রচন্ড রেসপনসিবল। মাস্টারমশাই-এর কাছে খবরটা এসেছে বাড়কাকানা থেকে। তার মানে বাড়কাকানাতে খবর এসেছে গোমো থেকে। সম্ভবত গোমোতে ধানবাদ থেকে এবং ধানবাদে কলকাতা থেকে। ট্রেন আসতে-না-আসতে খবরটাও স্টেশন মারফত এসে যে, পৌঁছেছে এটাই তো একটা মিরাকল। হ্যাঁ। এটা ঠিক যে, জিনিসপত্র ফেলা গেল, অপেক্ষা উৎকন্ঠা; প্রতীক্ষা অর্থনাশ সব-ই সত্যি। কিন্তু আমার কথাই ভাব একবার। তোর বিয়ে হয়ে-যাওয়া মানে আমার ঝিঁঝিকে হারানো। এতবড়ো একটা ঘটনা বা দুর্ঘটনা, যাই বল; ঘটতে যাচ্ছে তারজন্যে তোরা কেউ-ই একটুও ঝক্কি-ঝামেলা পোয়াতে রাজি নোস। এটা তো হয় না।

তুই কী বলিস? যাব না জগামামার বাড়িতে?

যাব না কেন? চল। আমি তো এসব ব্যাপারে মতামত দিতেই পারি না। যে-কেউই ভাববে আমার ভেস্টেড-ইন্টারেস্ট আছে এ-বিয়ে ভেস্তে দেওয়ায়।

কেন? তোর কী ইন্টারেস্ট?

না, না, আমার নয়; লোকের কথা বলছি। আমার ইন্টারেস্ট থাকলে তুই কি আর এতদিনেও জানতে পারতিস না? তুই তো বোকা নোস। তুই-ই বল।

বলটাকে অত্যন্ত বুদ্ধিমানের মতো শিরীষ ঝিঁঝির কোর্টেই ঠেলে দিল।

ঝিঁঝি আরও বুদ্ধির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে পাকা অভিনেত্রীর মতো বলল, কী যে, হেঁয়ালি-হেঁয়ালি কথা বলিস তা বুঝতেই পারি না।

শিরীষ কথা ঘুরিয়ে বলল, ফোন করে মাধবদাকে কী বলতে বলবি ওঁদের?

‘দেখুন মশাই! আমাদের খুব হেনস্থা করেছেন। যা করেছেন তো করেছেন-ই। কিন্তু সেদিনও যদি না আসেন তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।’ এই তো বলবি। এখন তুই-ই বল, যেখানে সম্বন্ধ করে বিয়ে হওয়ার কথা হচ্ছে, সেখানে কনেপক্ষ বরপক্ষকে কখনো এমন কথা, এমন করে বলতে পারেন? আলটিমেটাম দিতে পারেন এমন? বললে, তাঁরা কী ভাববেন? হয়তো আসবেন-ই না, শুধু এই টেলিফোনের-ই অপরাধে।

আমি কী বলব। আমার এত অপমান, মানে, কী যে, বলব! ইচ্ছে করে যে, তোদের বাড়ির পেছনের ওই শিরীষগাছটা থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে যাই।

ছি:। ছি:। ভুলেও ও কর্ম করিস না ঝিঁঝি। তুই তো মরবি, মরে আমাকেও মেরে যাবি। ছেলেবেলায় কেত্তন শুনেছিলাম। রাধা তমাল গাছ নিয়ে কীসব খেদোক্তি করেছিলেন-না? তমাল গাছে কী ঝুলিয়ে রাখতে, নাকি নিজেই ঝুলে যেতে চেয়েছিলেন? ভালো মনেও তো নেই। হাজার গাছ থাকতে শিরীষগাছ কেন? তোকে আমি খুব ভালো অন্য গাছ ঠিক করে দেব। দয়া করে শিরীষগাছে ঝুলিস না।

ঝিঁঝি হেসে ফেলল, এত মন খারাপের মধ্যেও ফিক করে।

শিরীষ বলল, নে, চল। জগাদাদের বাড়ি যাই। তোকে কিছু বলতে হবে না। আমি ঠিক ম্যানেজ করব। তুই শুধু দেখবি। ঘটনার বর্ণনা দিলেই, যেকোনো বুদ্ধিমান মানুষ-ই আমি যা, বললাম, তাই বলবেন।

দেখ। কী বলেন ওঁরা।

অস্ফুটে বলল, ঝিঁঝি।

বলেই, সাইকেলে উঠে পড়ল। শিরীষের সামনে, রডেই বসল। শিরীষের জামা-খোলা বুক দেখেছে আজকে ঝিঁঝি। কেন জানে না, নিজের অজানতেই আজ কি একটু বেশি পিছিয়ে বসল রডটার ওপরে? যাতে নিজের পিঠটা, অসমান পথে ঝাঁকুনি লাগলে শিরীষের বুকের সঙ্গে লাগে? আসলে, ভালো করে উঠে বসার মতো উঁচু কোনো কিছু ছিল না তাই এক হ্যাঁচকাতে বসতে গিয়ে একটু এগিয়েই বসে পড়েছিল।

ব্রিজমোহন সিং-এর বাড়ির সামনে পৌঁছোল সাইকেলটা। ব্রিজমোহনবাবু দাঁতন করছেন নিমের ডাল দিয়ে। সন্দিগ্ধ চোখে তাকালেন। ওই ভদ্রলোক ওদের বন্ধুত্বটা ভালো চোখে দেখেন না।

ঝিঁঝি বলল, তোদের বাড়িতে প্রথমবার ঢুকলাম, তোর শোবার ঘরটা দেখালি না তো আমাকে!

দুর। কী দেখতিস। ‘ব্যাচেলরস ডেন?’ অগোছালো। বই ছড়ানো-ছেটানো চারধারে। ক্যাসেট। তা ছাড়া, আমার ঘরে যে-মেয়ে ঢুকবে প্রথমে, সে আমার বউ-ই। তুই কি আমার বউ যে, তোকে আমার ঘরে ঢোকাব?

বোকার মতো কথা বলিস না।

বোকার মতো কেন বলছিস? আমি তো বোকাই। আমার মতো বোকা সংসারে খুব কম-ই আছে।

ঝিঁঝি উত্তর দিল না কোনো।

জগাদাদার বাড়ি পৌঁছে শিরীষ পুরো মিস্টার পেঁপেদু থেকে, পেঁপের ঝুড়ি থেকে যা জগাদা-মাধাদারা নিজের চোখেই সেদিন দেখেছিলেন; তারপর ঘণ্টেমামার অধঃপতন থেকে একেবারে মাস্টারমশায়ের সন্দেশ-প্রেরণ পর্যন্ত সবিস্তারে বলে গিয়ে জগাদা মাধাদাদের পরামর্শ চাইল এমন করে; যেন, কাকিমাই ওঁদের পাঠিয়েছেন।

জগাদা সব শুনে বললেন, ওই ঘণ্ডেডা লোকডা টিরডিন-ই বারফাট্টাই কডে গেল। বৌডি ডডি আমাডেড আগে একবাড বলটেন। কোনো খোঁড কবড না কডে, ওই ঘণ্টেবাবুড কটাটেই বউডি ঢিঁঢিঁকে....

শিরীষ বলল, সকাল বেলাই তো আপনাদের ডেকে নিয়ে আসার ভার দেওয়া ছিল, আমার-ইওপরে। কে বলতে পারে! হয়তো কাকিমার মনে কোনো প্রিমনিশান এসে থাকবে। বোঝেন-ই তো! মায়ের ‘মন’।

ওঁরা নাও আসতে পারেন, এমন একটা সন্দেহ হয়ে থাকবে হয়তো তাই আগে থাকতে বলেননি। বলল, যা-হয়রানিটা কাকিমার, ঝিঁঝির এবং আমারও হল, তার ভাগ আপনাদেরও নিতে হত। বুঝতেই তো পারেন জগাদা, আপনারা ছাড়া সত্যিই তো কেউই নেই আমাদের। আপনারাই তো আমাদের সকলের গার্জেন। মুরুব্বি। কাকিমা তো আপনাদের ভরসাতেই এখানে আছেন।

কটাটা টিক। কিন্টু বায়া, টুমিও ডডি গার্ডেন বলে মানো আর বউডিও ডডি মানেন, টাহলে টো আমার কাঠে একটা ঠট-কার্ট ঠেল—একেবাডে কুইক...লিলপড্য-ফড্যর কাঠে ডাবাড ডডকার কী ঠেল?

শিরীষ তাড়াতাড়ি কথা কেড়ে বলল, না, না। জগাদা, আগে এই ব্যাপারটার একটা সুষ্ঠু পরিণতি না, কী যেন বলে, তাই হয়ে যাক। যদি না হয়, তখন আপনি আপনার কুইক-মিক্স না কুইক-ফিক্স কী বললেন, তা চেষ্টা করে দেখবেন।

যদিও, কী আপনি বলছেন তা আমি কিছুই বুঝছি না। ঝিঁঝি, তুই কি বুঝেছিস?

ঝিঁঝি মাথা নেড়ে বলল, কী বলছিস?

টালে একন টোমডা আমাকে কী কডটে বলো?

আপনি কাকিমাকে আপনার মতামত ও অ্যাডভাইস জানিয়ে একটা চিঠি লিখে দিন। আমি সেই চিঠি নিয়ে গিয়ে কাকিমাকে নিজে হাতে দেব। এখন-ই। বোঝেন-ই তো! সারারাত জেগে কাটিয়েছেন। অতজনের খাবার ফেলা গেল এই বাজারে। আমার বয়ে-আনা পেঁপেগুলো পচে ফেনাভাত হয়ে যাবে। একঝুড়ি কাঁচকলা। ইশ।

টিক আটে। টিক আটে।

জগাদা বললেন।

চিঠিটা নিয়ে যখন, ওরা ঝিঁঝিদের বাড়ি ‘মহুয়া’তে ঢুকল তখন, সুনীতি ভেতরে ছিলেন। ঘণ্টেমামা, বসার ঘরে একটা চেয়ারে বসে টেবলের ওপর মচকানো পা-টি তুলে বসে জম্পেশ করে চিঁড়ের পোলাও খাচ্ছিলেন।

ওদের দেখেই চেঁচিয়ে বললেন, বউদি, ওরা এয়েচে।

সুনীতি মনে মনে বিরক্ত হয়েছিলেন। আগামী বিষ্যুৎবার অবধি ঘণ্টেবাবু অতিথি হয়েই থাকবেন। তা ছাড়া, বহুদিন পুরুষহীন জীবনে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াতে সবসময়ে একজন বাইরের মানুষ বাড়িতে থাকায়, ন্যায্য কারণেই অস্বস্তিতে পড়েছিলেন উনি। খাওয়া-দাওয়াটা বড়োকথা নয়। মা-মেয়ে-ঝাণ্ডু যা-খাবেন তা উনিও খাবেন। কিন্তু ওঁর এই সর্বক্ষণ ঘরে বসে থাকা আর হাঁক-ডাক আদৌ সুনীতির পছন্দ হচ্ছিল না।

সুনীতি ভেতর থেকে এলেন।

বললেন, বোসো শিরীষ। তোমার জন্যেই চিঁড়ের পোলাউ করেছি। বেশি ঝালও দিইনি আজ। পেট কেমন আছে?

ভালো। বলেই, চিঠিটা বের করে দিল শিরীষ।

কার চিঠি? নীলোৎপলের?

না। মাথা নাড়ল শিরীষ।

তবে?

জগাদার।

জগাবাবু চিঠি দিলেন। কেন?

পড়ে দেখো মা। চিঠিতে কী আছে তা তো আমরা জানি না।

পড়লেই বুঝতে পারবেন। আমাদের তাঁর সেরেস্তাতে বসিয়ে রেখে ভেতরের ঘরে গিয়ে এই চিঠি লিখে গালা দিয়ে সিল করে আমাকে দিলেন আপনাকে দেবার জন্যে। শিরীষ বলল।

চিঠিটা পড়তে শুরু করেছিলেন সুনীতি ভুরু কুঁচকে। কিন্তু পড়তে-পড়তেই ভুরু স্বাভাবিক হয়ে এল, মুখের চামড়া, নরম, মসৃণ হয়ে এল—আবার।

চিঠিটা পড়া শেষ করে বললেন, জগাবাবু ঠিক-ই বলেছেন। আমিও তো ফোন করার কথা ভাবিনি। ঘণ্টেবাবুই তো শোরগোল তুললেন কাল রাতেই। আমারও চিন্তাশক্তি সব গুলিয়ে গেল বাবা।

ঝিঁঝি, যা, হাত ধুয়ে শিরীষের জন্যে নিয়ে আয় চিঁড়ের পোলাও বেড়ে। তোমাদের তো অনেক-ই সময় লাগল বাবা।

বাড়িতে যা ঝামেলা ছিল কাকিমা। বুড়ি-মাই-এর খুব জ্বর। সারারাত পা-মাথা টিপে দিতে হল। সকালে দুধ গরম করে দুধ খাইয়ে তারপর নিজের জন্যে একটু চা করে, চা খেয়ে, তারপর-ইবেরোলাম। তা ছাড়া, ঝিঁঝিও তো হেঁটেই গেছিল। সাইকেলে গেলে...

হ্যাঁ। ঝাণ্ডুর জন্যে। সাইকেলটা ঘরে বন্ধ করে নিজে...

‘ফেরাইড-রাইস ঔর চিলি-চিকেনওয়া’...

সুনীতি অবাক হয়ে বললেন, আশ্চর্য! তুমি জানলে কী করে?

ঝাণ্ডু তো স্টেশানেই বলল যে, এতগুলো ফেরাইড-রাইস আর চিলি-চিকেনওয়া বরবাদ হবে।

তাই? হেসে ফেললেন সুনীতি।

ভেতর থেকে ট্রে হাতে করে বাইরের ঘরে আসতে আসতে ঝিঁঝি সুনীতির মুখে হাসি দেখে খুব-ই আনন্দিত হল। মা, গোমড়া মুখে থাকলে একেবারেই ভালো লাগে না ওর। শিরীষের অনেক গুণের মধ্যে এটাও একটা গুণ। ওর রসবোধ। যেখানেই থাকে ও, বা যায়; সেখানকার গুমোট কেটে যায়। তবে ওর নিজের মনের মধ্যে কী হয়, তা একমাত্র শিরীষ-ই জানে। যারা অন্যদের হাসায় তাদের মধ্যে অনেকেই নিজের বুকে জমে-থাকা কান্না নিয়ে ফেরে।

চা খাবে তো বাবা, না কফি?

কফি থাকলে খেতে পারি।

তবে আমিও আর এক কাপ খাব।

ঘণ্টেমামা বললেন।

শিরীষ, চিঁড়ের পোলাও খেতে খেতে বলল, ঘণ্টেমামা, আপনার এই মহিলা-মহলে দম নিশ্চয়ই একেবারে বন্ধ হয়ে আসছে। কেন্দুপাতার জঙ্গলে সারাজীবন আউটডোর লাইফ কাটিয়ে এমন বন্দিজীবন কি আর ভালো লাগে? তাও আবার আগামী বুধবার পর্যন্ত।

তা যা বলেচ বাবা। সত্যিই এই মহিলা-মহলে হাঁপিয়ে উঠেচি এই দেড় দিনেই।

তাহলে দম নেওয়ার জন্যে আপনি আপনার ডালটনগঞ্জেই গিয়ে আবারও ফিরে আসতে পারেন। ওখানে আপনার কাজ কে সামলাবে?

না, কাজ অবশ্য আচে। তবে তুমি বলেচ ভালোই। কিন্তু এই পা-টা। পা-টাই তো বাধ সেধেছে না!

আমি কাল রাত থেকে ভেবে ভেবে, একটা মধ্যপন্থা বের করেছি।

সেটা কী বাবা?

আপনি পুরুষ মহলেই চলুন। এ ক-টা দিন আপনি আমার সঙ্গেই থাকবেন। ‘মামা-ভাগনে যেখানে, বিপদ নাই সেখানে।’ কী বলেন!

হা। হা। তা যা বলেচ।

আপনি শুনেছি দারুণ রাঁধেনও। বুড়ি-মাই সব জোগাড় করে দেবে আর আপনি বসে বসে রাঁধবেন। নড়াচড়া করতে হবে না। সব-ই একেবারে হাতের কাছে। আর যদি অনুমতি করেন তো ঝিঁঝি, কাকিমা, জগাদা মাধাদাদেরও খেতে নেমন্তন্ন করে দেব আপনার হাতের রান্না, আমার দাঁড়কাকের বাসাতে।

রান্নার অভ্যেস একেবারে ছেল না যে, তা নয়। কিন্তু তোমার মামিমা একেবারেই সে, অভ্যেসটির দপারপা করেছেন। তোমরা যদি ডালটনগঞ্জ আসো কখনো, তাহলে খাওয়াতে পারি মনোমতো করে।

নেমন্তন্ন তো আর কোনোদিনও করলেন না। বলছেন, যখন তখন যাওয়া যাবে একবার। ডালটনগঞ্জ এখান থেকে যেতে অসুবিধের কী? ট্রেনে চড়ব, আর নামব। বলেই বলল, তা কী ঠিক করলেন বলুন।

আজকের দিনটা ভেবে নিই বাবা।

আজকের দিন চলে গেলে তো থাকবে আর ছ-দিন। তাই হোক। ছ-ছটি দিন মামাবাবুকে সেবা করার সুযোগ পাওয়া যাবে। এই বা আমার কম সৌভাগ্য কী!

স্টেশনে যদি চেয়ার-টেয়ার বসিয়ে আমাকে ট্রেনে তুলে দিতে পারতে আমি তাহলে ওখান থেকে একেবারে যে-রাতে ওঁরা আসবেন, সেই বৃহস্পতিবারেই ভোরের গাড়িতে না-হয় এসে পৌঁচে যেতাম।

সুনীতি বললেন, ‘ছাড়ুন তো আপনি শিরীষের কথা। জলে তো আর পড়েননি। তবে শিরীষের সঙ্গে গিয়ে যদি থাকতে চান, মানে তাতে যদি আপনার সুবিধে হয়; তবে অন্য কথা।’

‘দাঁড়কাকের বাসা’তে যদি থাকতে না চান তবে আপনি তো জগাদাদের বাড়িতেও সাক্ষাৎ পুরুষ-সিংহদের গুহায় থাকতে পারেন গিয়ে এই মহিলামহল ত্যাগ করে।

না বাবা। টক্কা টরে শুনতে হবে জগাবাবুর আর শিকারের গল্প শুনতে হবে মাধাবাবুর। তার চেয়ে, যেকোনো শাস্তিই ভালো।

অমন করে বলবেন না ঘণ্টেমামা। ওঁরা দু-জনেই মানুষ হিসেবে চমৎকার।

তা কি আমি অস্বীকার করচি? কিন্তু তাদের মনুষ্যত্বে গিয়ে পৌঁচোবার পরেই যে, বিস্তর বাধা। মাঝপথেই যে-ফেঁসে যাব।

ঝিঁঝি নিজের খাবার ও সুনীতির খাবারও নিয়ে এল। তারপর কফি করতে গেল ভেতরে, নিজে দু-চামচ মুখে তুলে।

ঘণ্টেমামা বললেন, আর পা মচকাবার শক-এ এবং ‘স্যার’রা না-আসার শক-এ আমার খেয়াল-ই হয়নি যে, পরের বিষ্যুৎবার মানে এক সপ্তাহ বাদ। সত্যিই তো! এক সপ্তাহ এখানে পড়ে থেকে করবই বা কী?

আপনি চলে যাবেন? যাবেন কেন? আমার সঙ্গে থাকুন-ই না ক-দিন। রাঁধব-বাড়ব, গান-শুনব দু-জনে মিলে। মজাই হবে। আপনার কেন্দুপাতার জঙ্গলের জীবনে একটা চেঞ্জ আসবে। আমিও আপনার গল্প শুনতে পারব। ‘জঙ্গলের পোকা’র গল্প শোনার ভাগ্য ক-জনের হয়?

না রে ভাই, মনটাই উচাটন হয়ে গেছে।

কিন্তু আপনি যদি গিয়ে বুধবার ভোরে না ফিরে আসেন মানে, আসতে না পারেন, তাহলে কাকিমার অবস্থাটা কী হবে একবার ভেবেছেন?

আরে বাবা! আমি কী অত্ত ইরেসপনসিবল, স্যারেদের মতো? নেহাত নীলোৎপল ছেলেটা হিরের টুকরো আর আমার ঝিঁঝি মায়ের কথা আর কী বলব!

আর টিকটিকির কথা কিছু বলবেন না?

টিকিটিকি! কোন টিকটিকি?

ওই যে! টিকটিকির কথা ট্রেনে বলেছিলেন।

ভীষণ-ই লজ্জিত ও অপদস্থ হয়ে ঘণ্টেমামা বললেন, ও-হো-হো:। ছাড়ো তো ওসব কতা।

টিকটিকি? সে আবার কী?

সুনীতি ও ঝিঁঝি সমস্বরে বললেন।

ও সে আছে এক, মানে নেই; কী যেন বলে, মানে থাকতে পারত; যাক সেসব কথা। শিরীষ বলল।

তারপর-ই বলল, আমি এখন চলি তাহলে কাকিমা।

কী হল? আজ তো তোমার ছুটি, ঝিঁঝি বলছিল।

হ্যাঁ। গদির ডিউটি থেকে ছুটি কিন্তু অন্য সব কাজ-ই তো আজ। ঘরের ভাড়ারে কী আছে, কী নেই? বুড়ি-মাইয়ের জ্বরের রেমিশান হল কি না, নিজের জামা-কাপড় কাচা, কালুকে সাবান দিয়ে চান করানো, ঘর গোছানো, উঠোন বারান্দা সব ভালো করে পরিষ্কার করা; একটু গান শোনা, একটু বই পড়া। তারপর বিকেলে যাব গুঞ্জনকে পড়াতে।

সে কে?

সে পুনমচাঁদজির বড়োমেয়ে।

পুনমচাঁদজি কে?

শেঠ চিরাঞ্জিলালের মুনিম।

মেয়েটা কত বড়ো?

ঝিঁঝির থেকে একটু ছোটো।

বিয়ে দেয়নি কেন?

বিয়ে দিতে নাকি পাঁচ লাখ টাকা লাগে ওদের সমাজে। গুঞ্জন ছাড়া আরও দু-টি মেয়ে আছে পুনমচাঁদজির। বিবাহযোগ্যা।

তবে কী হবে?

কী হবে? তা ঈশ্বর-ই জানেন।

মেয়েটা কিছু করে না কেন? চাকরি-বাকরি?

চাকরি কোথায় পাবে? লেখা-পড়াও তো করেনি। যারা করেছে, তারাও কি পাচ্ছে চাকরি?

ঝিঁঝি অপাঙ্গে একবার তাকাল শিরীষের দিকে। ওই মন্তব্যে তার প্রতি একটু খোঁচা ছিল।

শিরীষ আবার বলল, ওঁরা আবার নিজেদের সমাজের বাইরে বিয়ে দেন না। নইলে, আমিই বিয়ে করতাম ওকে কাকিমা। দেখতে-শুনতেও ভালো, খুব-ই সুসভ্য, স্কুল-কলেজে না পড়লেও খুব সপ্রতিভ এবং সহজাত বুদ্ধি আছে। কী যে, কাজের মেয়ে কী বলব! রান্না-বান্না, সেলাই-ফোঁড়াই, যত্ন-আত্তি, বড়ি-দেওয়া, পাঁপড়-দেওয়া...

তুমি এমন মেয়ের সঙ্গে ঘর করতে পারতে? ওইসব-ই কি সব?

আমার যা-যোগ্যতা, তাতে অমন মেয়ে পাওয়াই ঢের। সুখে তো রাখবে। শুধু কাজটা করব আর বাকি সময় পায়ের ওপর পা তুলে, নইলে ঘণ্টেমামার মতো টেবিলের ওপর পা তুলে বসে; বই পড়ব আর গান শুনব। ঘড়ি-ঘড়ি চা, সঙ্গে গরম গরম পকৌড়া, যখন যা খেতে ইচ্ছে হবে সেই খাবার। মা চলে যাবার পর তো, খাবার-দাবার সুখ সব গেছে। আহা ভাবলেই সুখে মরে যাই। কিন্তু আমার কপালে কি অত সুখ আছে কাকিমা? তা ছাড়া আমার বিয়ে করতে তো কোনো অসুবিধাই নেই। কারণ, আমার গার্জেন তো আমিই। মনস্থিরটা করে ফেললেই হয় আর কী। পুনমচাঁদজিও মুক্ত হতেন।

সত্যিই তোমার একটা বউয়ের খুব-ই দরকার। বুড়ি-মাই তো সাহায্য কিছুমাত্র করতেই পারে না, উলটে তোমাকেই দেখতে হয় তাকে।

তা কী করব কাকিমা? মায়ের তিরিশ বছরের আয়া। সেও মাতৃসমা। আর তার যে, কেউ নেইও।

কেন? ছেলে ছিল তো একটা। গোমিয়াতে ভালো চাকরি করত-না?

হ্যাঁ। সে গোমিয়াতেই থাকে এবং এখন আরও ভালো চাকরি করে কিন্তু সে মাকে নেয় না। দেখে না। ওদেরও ‘ভদ্রলোকের’ রোগে ধরেছে। ছেলে আমেরিকায় ফুটানি করে আর মা-বাবা কলকাতায় না খেতে পেয়ে মরেন এমন কত কেস জানি আমি। লোভ কাকিমা; সব শিল্পনগরীর, মহানগরের আকাশে ‘লোভ’ উড়ে বেড়ায়। যারা একদিন দু-বেলা ডাল-রুটিকেই সুখের পরাকাষ্ঠা বলে জানত, তারাই সেখানে গিয়ে পলিয়েস্টার ফাইবারের জামাকাপড়, পাখা, ফ্রিজ, টিভি এমনকী ভি.সি.আর.-এর স্বপ্ন দেখে। ওপরে তাকাবার কি কোনো শেষ আছে কাকিমা! আসলে ‘সুখ’ জিনিসটা যে, কী সে, সম্বন্ধে সম্ভবত গরিব-বড়োলোক, শিক্ষিত-অশিক্ষিত কারোর-ই কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। অথচ সুখের সন্ধানেই আমরা জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি সাঁতরে বেড়াই।

সত্যিই কী দুঃখ বেচারির!

সুনীতি বললেন। বুড়ি-মাইকে আমি গরিব ছেলে হলেও দেখি। তবুও বুড়ি-মাই হয়তো দুঃখীই! কিন্তু তার ছেলে ঝুমরা বা আমি বা ঝিঁঝি বা ঘণ্টেমামা বা আপনিও কি সুখী? ‘সুখ’ বলে যা আমরা জানি তাই কি সুখ? তা ছাড়া সুখ কী? সুখ যে, ঠিক কী, তা নিয়ে আমরা কেউই কি কোনোদিনও ভাবি? ভাবার সময় পাই?

বা: বা:। বেড়ে কতা বলো তো তুমি শিরীষ। ভাববার মতো কতা বটে হে।

ঘণ্টেমামা মচকানো পা নাড়িয়ে, চিঁড়ের পোলাওয়ের ডিশটা নামিয়ে রেখে বললেন।

ভাবনা-চিন্তা এসব তো মানুষদেরই জন্যে ঘণ্টেমামা! জঙ্গলের অথবা নর্দমার পোকাদের জন্যে তো নয়।

ঘণ্টেমামা একটা ধাক্কা খেলেন কথাটাতে। ঝিঁঝি বা সুনীতি জানালেনও না। ধাক্কাটা কেন এবং কোথায়!

ঘণ্টেমামা কথাটা হজম করে বললেন, বা: বা:, বেশ বলেচ হে।

আচ্ছা কাকিমা, আমি এবার উঠি। চললাম ঘণ্টেমামা। মন ঠিক করলেই খবর দেবেন ঝাণ্ডুকে দিয়ে একটা। আমি এসে আপনাকে নিয়ে যাব।

আচ্ছা বাবা।

সাইকেলে উঠে পেছন ফিরে ঝিঁঝির দিকে হাত তুলল শিরীষ। তারপর প্যাডল করতে লাগল। ‘মহুয়ার’ গেট পেরিয়ে বাইরে পড়ে হঠাৎ-ই ও আবিষ্কার করল যে, ওর মধ্যে যে এমন নিষ্ঠুরতা ও প্রতিশোধস্পৃহা ছিল সে সম্বন্ধে ও সম্পূর্ণ অনবহিত ছিল আজ সকালের আগে। ঘণ্টেমামা না হয় নীলোৎপলের প্রশংসাতে পঞ্চমুখই হয়েছিলেন কিন্তু তা বলে তাঁকে এমন আঘাত করাটা ওর অনুচিত হয়েছে। এমন ব্যবহার ওর চরিত্রানুগও নয়।

ভাবছিল শিরীষ যে, ওর নিজের চরিত্রের খবর কতটুকু ও নিজে জানে! কোনো মানুষই কি জানেন?

কিছুদিন হল গুঞ্জনের মধ্যে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছে শিরীষ। একটা ছটফটানি ভাব। নরাধমও ইদানীং মাঝে-মাঝেই আসে পুনমচাঁদজির বাড়িতে।

শিরীষ বোঝে যে, এতে পুনমচাঁদজিরও হাত আছে। বাবাদের অসহায়তার কতরকম হয় বা বাবাদের কতরকম হয় তা শিরীষ জানে না। নিজে বাবা নয় বলেই। তবে, অনুমান করতে পারে।

কন্যায়দায়গ্রস্ত পুনমচাঁদজির অসহায়তার কথা ও বুঝতে পারে কিন্তু গুঞ্জনের মানসিকতা বোঝে না।

কিছুদিন হল গুঞ্জন যে, শুধু ছটফট করে, তাই নয়। এ-ও লক্ষ করেছে শিরীষ যে, যখন-ই ও যায় ওকে পড়াবার জন্যে গুঞ্জন বাড়িতে একাই থাকে। ওর বোনেরা প্রায়ই থাকে না। মুন্নি-তিন্নি কোথায় গেছে তা তো জিজ্ঞেসও অবশ্য করে না শিরীষ। গুঞ্জনও বলে না।

পড়াশোনা তো থোড়িই হয়। তবে শিরীষ বোঝে যে, গুঞ্জনের প্রায়-বন্দিনি, আলো-হাওয়াহীন মনের একমাত্র জানলা সে-ই। গদিঘরের জানলায় বনবেড়ালের মতো তক্কে তক্কে থাকে নরাধম। আর গুঞ্জনের মনের জানালায় শিরীষ-ই শুধু শরতের মেঘের মতো আসা-যাওয়া করে।

গুঞ্জনের বাড়ি, কাজ এবং ওদের বাড়ির ব্ল্যাক-অ্যাণ্ড-হোয়াইট ছোট্ট ‘টেলেরামা’ টিভির বাইরেও যে, মস্ত একটা জগৎ পড়ে আছে, সেই জগতের প্রতিভূ হয়েই শিরীষ এসে পৌঁছোয়, প্রতিসপ্তাহে একবার করে ওদের বাড়িতে।

সেদিন অনেকক্ষণ ধরে কী করে ‘রোকড়’ মেলাতে হয়, তা শিখিয়ে দেওয়ার পর গুঞ্জন বলল, এই দেখুন। কেমন ইংরিজি শিখেছি। লিখেছি।

দেখি।

গুঞ্জন খাতাটা এগিয়ে দিল।

দিয়েই মুখ নীচু করে ফেলল। খাতা মানে, চিরাঞ্জিলালের ডুপ্লিকেট ক্যাশমেমো জড়ো করে স্টেপলার দিয়ে স্টেপল-করা বাণ্ডিল। যে-সমস্ত বিক্রির ক্যাশমেমো একনম্বর খাতাতে ওঠানো হয় না, যেসব বিক্রির সেইসব ক্যাশমেমো এইভাবে সদব্যবহার করে পুনমচাঁদজি। এইসব মেমো কোনো অহিতার্থীর হাতে পড়লে ইনকাম-ট্যাক্স বা সেলস-ট্যাক্স-এও লাগিয়ে দিলে বাঘে-ছোঁওয়া আঠারো ঘা হয়ে যাবে। যাতে, বাইরের কারো হাতে না পড়ে সে জন্যেও এই অভিনব উপায়ে ওইসব ডুপ্লিকেট মেমো ব্যবহার করা হয়। একেই বোধ হয় পশ্চিমি দেশের মানুষেরা ‘গার্বেজ-রিসাইক্লিং’ করা বলেন।

শিরীষ খাতাটা টেনে নিয়ে দেখল, গুঞ্জন লিখেছে; I love you!

ও মুখ তুলতেই গুঞ্জন ফিক করে হেসে দিল।

কিন্তু হাসিটা কেমন আড়ষ্ট দেখাল।

মনে হল, শিরীষের।

মন ভুলও বুঝতে পারে।

খাতাটা দিন। আরও একটা শিখেছি।

শিরীষ কথা না বলে, খাতাটা এগিয়ে দিল।

গুঞ্জন লিখল। I love Pawan. লিখেই, স্থিরদৃষ্টিতে শিরীষের চোখে চেয়ে রইল।

মালিকের ছেলেকে ভালোবাসার মতো অপরাধ আর কী থাকতে পারে? গুঞ্জনের দৃষ্টিটা ধীরে ধীরে কুয়াশার মতো অস্পষ্ট হয়ে গেল দেখে, ভাবল, শিরীষ।

তুমি পবনকে দেখেছ?

শিরীষ শুধোল।

না:।

না দেখেই...

শেঠানির কাছে ফোটো দেখেছি। দেখতে অনেকটা বিনোদ খান্নার মতো।

সে আবার কে?

বিনোদ খান্না। চেনেন না?

না তো! কে সে? সিমেন্ট ফ্যাক্টরির নতুন ম্যানেজার নাকি?

সচ। ক্যা কঁহু ম্যায়! আপ সাচমুচ এক আজীব আদমি হেঁ শিষবাবু।

বোকার মতো শিরীষ বলল, দিন-রাত টিভি-র সামনে বসে থাকছ বুঝি আজকাল? সিনেমা বা টি.ভি. স্টার ছাড়াও পৃথিবীতে দেখার কত কী আছে! তুমি কখনো নীল-ডুংরিতে গেছ? নীল-টোংড়ির চুড়োতে উঠেছ?

বিষাদগ্রস্ত গলাতে ও বলল, কোথায়ই বা যাই! নিয়ে যাবেন আমাকে একদিন শিষবাবু? দু-বেলার নাস্তা আর দোপেহর আর রাতের খানাপিনা সকলের জন্যে বানিয়ে দিনগুলো তো এমনি করেই চলে যাচ্ছে। বোনগুলি তো কোনো কম্মের নয়। সব-ই আমার ঘাড়ে।

নিয়ে যাব, যদি তোমার বাবা যেতে দেন। তারা আজ কোথায়? সাড়া পাচ্ছি না যে। আজকাল প্রায়-ই দেখি, থাকে না বাড়িতে।

পাশের বাড়িতে সিং সাহেবের কাছে গেছে। কালার টি.ভি. আছে তো বড়ো স্ক্রিনের।

তাই?

ওখানে আজ ‘খাবসুরতি’ দেখবে ওরা।

সেটা কী জিনিস?

আরে! সিনেমা।

ও। কিন্তু এখন তো সিনেমার সময় নয়।

ভি. সি. আর. আছে যে, সিং সাহেবের। মোটর ভেহিকলস-এর ইনসপেক্টর সাব হচ্ছেন তো উনি। পয়সা কোথায় রাখবেন তার জায়গা নেই। ফারিয়াগঞ্জে তাঁর এক শালাবাবু থাকেন তিনি সেলট্যাক্সের বড়োবাবু। এই বিহার জায়গা হচ্ছে হিরের-খনি। যারা খুঁড়তে জানে তারা ক্রমাগত খুঁড়ে যাচ্ছে। ফাড়িয়াগঞ্জের সেই বাড়িতে এয়ারকুলারভি আছে, মারুতি গাড়ি। সিং চাচা একদিন নিয়ে গেছিলেন আমাদের। খুব ভাব দু-জনের। জরুকা ভাই ইকতরফ, সারি দুনিয়া দুসরি তরফ। মুন্নি আর তিন্নির সঙ্গে সিং সাহেবের শালার দুই ছেলের লটর-পটর হয়ে গেছে। ওরা এসেছে ফারিয়াগঞ্জ থেকে গতরাত্রে। আজ সারাদিন তো মুন্নি আর তিন্নি ওখানেই।

তুমি যাও না?

না:।

কেন?

ওরা ওদের মতো, আমি আমার মতো। আমার ভালো লাগে না।

তাই? কিন্তু সিং সাহেবের মোটরসাইকেল তো দেখলাম না বাইরে। উনি নেই?

তবে আর বলছি কী? চাচা তো গেছেন গোয়াতে দু-দিনের জন্যে চাচিকে নিয়ে রিস্তেদারের বাড়ি। কী, তওহার আছে। আর অমনি শালার বেটারা এসে হাজির। ওরা কীসব ক্যাসেট নিয়ে এসেছে সঙ্গে করে। বুলু-ফিলিমের। তাই ওরা মুন্নি-তিন্নিকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেখছে। তাতে যা-থাকে বলে ওরা, তা কি সত্যি শিষবাবু? আমার তো শুনলেই গা ঘিনঘিন করে।

শিরীষ বিরক্ত মুখে বলল, জানি না। আমি তো দেখিনি কখনো। দেখবার ইচ্ছেও নেই।

পুনমচাঁদজি কোথায়? তিনি কি জানেন? এসব?

জানেন, আবার জানেনও না। জানেন ঠিক-ই। তবে দেখান যে, জানেন না।

কেন, ভাব দেখাবেন কেন?

যে-করেই হোক একটা হিল্লে হয়ে গেলেই তো হয় মেয়েদের। তিন-তিনটে মেয়ে ঘাড়ে। বাবাকে দোষ দিই না কোনো। আর কী খাটনি তা তো আপনি জানেন-ই শেঠ-এর কাজে। সকাল চারটেয় ওঠে—শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা। চান করে, পুজো করে। তারপরে পাঁচটার সময়ে আমার হাতে বানানো দুধের ঘটিতে চা পাতা—ফেলে ফোটানো এককাপ চা আর একমুঠো মাঠরি খেয়েই চলে যায় কাজে। বারোটার সময়ে দুপুরে খেতে আসে। স্রিফ দো ফুলকা, একটু ডাল, আর একটা সবজি। একটার বেশি সবজি বানাবার অবস্থাও তো নেই আমাদের। কোনোদিন হয়তো-বা একটু কাড়হি। কোনোদিন একটু দহি। ব্যস।

বিকেলেও তো পুনমচাঁদজি খান না কিছুই।

শিরীষ বলল।

না:। গদিতেই তো খান। ঠিক এককাপ চা।

আর রাতে?

রাতেও দো ফুলকা ঔর থোরিসি সবজি। ঔর ডাল। বাস।

তবে তোমার রান্নার এত গল্প শোনাচ্ছিলে কেন?

বাবা না খেলে কী হয়? আমিও খুব কম-ই খাই। কিন্তু মুন্নি তিন্নি! এক একটা রাক্ষস! কাজের মধ্যে তো খালি খাওয়া। বাবার না আছে দেখার সময়, না শাসন করার। উচ্ছন্নে গেল মেয়ে দুটো একেবারে।

তোমার উচ্ছন্নে যেতে ইচ্ছে করে না?

শিরীষ শুধোল।

গুঞ্জন মুখ তুলে চাইল। শিরীষের চোখে চোখ রাখল। টায়ে টায়ে। যাতে চাউনির একটুও উপচে পড়ে অপাত্রে না নষ্ট হয়, এমনভাবে।

বলল, না শিষবাবু। আমি আমার মতো। আমি ওদের মতো নই।

তুমি কার মতো?

বললাম যে, আমি আমার-ই মতো।

বলেই বলল, আচ্ছা, ঝিঁঝিদিদি কেমন আছে?

তুমি চেনো নাকি ঝিঁঝিকে?

চিনি, মানে আলাপ তো নেই। আমি একদিন লাডসারিয়া চাচার বাড়ি থেকে আসছি এমন-ই এক বিকেলে, আপনার সাইকেলের রড-এ বসে হাসতে হাসতে হাসতে চলে যেতে দেখেছিলাম। দু-জনেই খুব হাসছিলেন আপনারা। হাসতে হাসতে ঝিঁঝিদিদি আপনার বুকের ওপর ঢলে পড়ছিলেন। তারপরেও দেখেছি দু-তিনদিন।

তাই?

হ্যাঁ! বাড়ি এসে বাবাকে শুধোলাম। বাবার জ্বর ছিল। সেদিন গদিতে যাননি। বাবার জন্যে দাওয়াই আনতেই গিয়েছিলাম চাচিজির কাছে। বাবা বলল, যে ওঁর নাম ঝিঁঝি। কেমন আছে ঝিঁঝিদিদি?

ভালোই। তার বিয়ের সম্বন্ধ হয়েছে। বর আসার কথা ছিল গতকাল। আসতে পারেনি। আগামী বৃহস্পতিবারে আসবে।

বর?

হ্যাঁ।

সে কী। আমি তো ভেবেছি...আপনার সঙ্গেই বিয়ে হবে।

কেন? অমন ভাবলে কেন?

বা:। আপনারা দু-জনে অমন হাসছিলেন যে!

হাসলেই কি বর-বউ হতে হবে?

না। ঠিক তা নয়। তবে...

তোমার হাসি ভালো লাগে না? কেউ হাসলে তোমার মন খুশি হয় না?

সত্যি কথা বলব?

নিশ্চয়ই। সত্যি নয় তো কি মিথ্যে বলবে?

না। হয় না খুশি।

খুশি হও না তুমি?

না।

কেন?

কেন হব? যার জীবনে একটুও সুখ নেই, সে অন্যর সুখ দেখে খুশি হবেই বা কেন?

শিরীষ চুপ করে থাকল।

গুঞ্জনের মুখটি শেষবিকেলের আলোতে রাঙিয়ে উঠেছিল। ও হাসলে, ওর দুই গালেই টোল পড়ে, চিবুকের একটু ওপরে দুটি খাঁজ পড়ে—পাতলা ভাঁজ। ভারি সুন্দর দেখায় তখন।

হাটিয়াতে কেনা একটি সস্তা বেগুনি-রঙা মিলের শাড়ি পরেছিল গুঞ্জন। সঙ্গে একটু একটু ছিঁড়ে-যাওয়া একটা সাদা-রঙা ব্লাউজ। ম্যাচ-ট্যাচ করে শাড়ি পরার বিলাসিতা ওদের নেই। যা জোটে, তাই পরে। অথচ যৌবন এমন-ই এক সাংঘাতিক ব্যাধি যে, সেই ব্যাধিতে ভিখিরি থেকে কুকুরি সকলেই সমানভাবে আক্রান্ত হয়।

আশ্চর্য, বিধুর এক বিষণ্ণতা, এই শেষবিকেলের নরম আলোর-ই মতো; গুঞ্জনের মুখময় ছড়িয়ে ছিল। মৌটুসি পাখিগুলো বারোমেসে জবা গাছটার রাশ রাশ ফুলে নড়ে-চড়ে ঘুরে-ফিরে টুসকি মেরে মেরে ফুল চুষছিল। কাছেই, হঠাৎ ইঞ্জিন স্টার্ট-করা মার্সিডিস ট্রাকের ঘড়ঘড় আওয়াজও সেই সুন্দর বিকেলকে আচমকা খুন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল। কোনো কোনো মুহূর্তের এমন-ই সৌন্দর্য থাকে, যার কাছে কর্কশ শব্দ তো অতিতুচ্ছ, মৃত্যুও হেরে যায়, দু-হাত নামিয়ে; লড়াই না করেই।

ঝিঁঝিদিদিটা খুব বোকা আছে! বলল, গুঞ্জন।

কেন? হঠাৎ এই কথা!

তোমাকে ওর ভালো লাগল না? আশ্চর্য তো!

তা, আমি কী করে বলব! হয়তো লাগে কিংবা লাগেও না। যদি লাগেও তো কী?

তাহলে তোমাকেই তো বিয়ে করতে পারত।

ভালোলাগার অনেকইরকম হয় গুঞ্জন। তুমি ঠিক বুঝবে না।

কেন? বুঝব না কেন? আমি আনপড় হতে পারি কিন্তু আমিও তো মেয়ে। একজন মেয়ের মনের কথা বুঝতে পারব না?

বলেই, বলল, ভালোলাগার বুঝি অনেকরকম হয়? কী জানি বাবা! আমি জানি না। ঝিঁঝিদিদির কথা না-হয় বাদ-ই দিলাম, আপনার কেমন লাগে? ঝিঁঝিদিদিকে?

শিরীষ একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমার?

হ্যাঁ। আপনার।

ভালো। ভালোই তো লাগে।

আপনি কোনোদিন ঝিঁঝিদিদিকে কিছু কি বলেছিলেন?

কী বলব?

বিব্রত বোধ করল খুব শিরীষ। পুনমচাঁদজির মেয়ে গুঞ্জনের এই প্রত্যাশিত পৌনঃপুনিক গুঞ্জনে ও কী যে বলবে, কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, ভেবে পেল না। তা ছাড়া, এসব বিষয় তো গুঞ্জনের এক্তিয়ার-বহির্ভূতও।

মানে, কখনো বলেছিলেন কি ঝিঁঝিদিদিকে যে, আপনি ওঁকে...

চমকে উঠল শিরীষ। পুনমচাঁদজির ‘অশিক্ষিত’ মেয়ের কাছে এমনভাবে ধরা পড়বে যে, তা কখনো ভাবেনি।

দু-ধারে মাথা নাড়াল শিরীষ। প্রয়োজনাতিরিক্ত জোরে।

আপনি কি ভেবেছিলেন যে, ঝিঁঝিদিদি আপনাকে মুখ ফুটে বলবেন যে, আপনাকে ওঁর ভীষণ ভালো লাগে। বলবেন, ভালোবাসেন আপনাকে? আপনি কি ভেবেছিলেন, এই কথা উনিই বলবেন?

তারপরে শিরীষকে বিন্দুমাত্র প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়েই বলল, ছেলেদের মতো নয় মেয়েরা। মেয়েরা অনেক কিছুই পারে আবার অনেক কিছু পারেও না। ও-কথা, মুখ ফুটে যদি, অতসহজে বলাই যেত; তাহলে শুধু ঝিঁঝিদিদিই বা কেন? হয়তো...আ...মানে, অনেকেই হয়তো...

চমকে উঠল শিরীষ। এবং ঠিক সেই সময়েই পাগলা কোকিলটা বাজারের মধ্যের দাঁড়িপাল্লা আর মালের বস্তা আর হিসেব-নিকেশ, এইমাত্র মিল-করা ‘রোকড়’ সব গোলমাল করে দিয়ে প্রচন্ড জোরে তিনবার ডেকে উঠে উঠোনের একচিলতে আকাশের ওপর দিয়ে উড়ে গেল।

বাক্যটি শেষ করেই, যেন ফুরিয়ে গিয়েই; গুঞ্জন একদৌড়ে ঘরের ভেতরে চলে গেল।

কিছুক্ষণ স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে রইল শিরীষ।

তারপর আলোভরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘরের অন্ধকারকে উদ্দেশ করে বলল, আমি আজ আসছি গুঞ্জন। আমি আর নাও আসতে পারি। এই দেড়বছরে যতটুকু শেখার তা শিখে গেছ।

বলামাত্রই, গুঞ্জন ঘরের ভেতর থেকে দৌড়ে বাইরে এল। তার দু-চোখে জল ছিল। ওই গুঞ্জনের মধ্যেই যে, এই গুঞ্জনও ছিল তা আগে কখনোই লক্ষ করেনি শিরীষ। একজন প্রেমিকা-নারীকে আবিষ্কার করে আবারও চমকে উঠল ও। ভয় পেল ভীষণ। মেয়েরা বড়ো আশ্চর্য!

গুঞ্জন বলল, আসবেন না কেন শিষবাবু? ভালোবাসা কি পাপ? আমি তো কিছুই চাইনি আপনার কাছ থেকে। আপনার ভালোবাসা তো চাইনি। আমি শুধু ভালোবাসতে চেয়েছি আপনাকে।

এ বড়োই সাংঘাতিক জিনিস গুঞ্জন। পাপ কি না জানি না কিন্তু এ সাপ অবশ্যই। শাপও। সাপের চেয়েও বেশি বিষ ভালোবাসার। সব ভালোবাসাই মধুর নয়। এ-খেলনা নয়, গুঞ্জন। তোমাকে আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না। পুনমচাঁদজি আমাকে খুব-ই বিশ্বাস করেন। আমি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারব না।

একজন মানুষকে বাঁচানো আর বিশ্বাসকে মারা কি এক-ই জিনিস শিষবাবু?

বাক্যবন্ধটিতে চমকে উঠল শিরীষ। কার মধ্যে যে, কে থাকে! গুঞ্জন যে, এমন করে কথা বলতে পারে স্বপ্নেও ভাবেনি।

আপনি সপ্তাহে যে, আধঘণ্টার জন্যে আসেন, সেইটুকুই আমার পুরো সপ্তাহের একমাত্র আনন্দ। আপনাকে দেখে, আপনাকে নিজে হাতে চা করে খাইয়ে, আপনাকে মিছিমিছি চটিয়ে দিয়ে; আপনাকে হাসিয়ে...আমি ঠিক বোঝাতে পারব না।

ঠিক এমন-ই সময়ে গদির দিক থেকে কে যেন, হঠাৎ কেশে উঠল। নকল কাশি।

গুঞ্জনের ভুরুদু-টি সঙ্গে সঙ্গে বাঁকা হয়ে উঠল। মুখ বিরক্তিতে ভরে উঠল।

ঘাড় ঘুরিয়ে শিরীষ ওই দিকে, তাকাতেই বুঝল যে, নরাধম, জানলার সামনেই ছিল। ও ঘাড় ঘুরোতেই সরে গেল সেখান থেকে।

গুঞ্জন গলা নামিয়ে বলল, ওই লোকটা ভালো নয় শিষবাবু। বাবা আজকাল প্রায় রোজ-ই বাইরে থাকে সারাদিন। মানে, শেঠের কাজে মনোয়া-মিলনের বাইরে যায়। আপনি তো জানেন-ই।মুন্নি-তিন্নিও থাকে নিজেদের নিয়ে। কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ায়। খাবার সময়ে খেতে আসে। বাড়িতে আমি একাই থাকি। আপনি আমাকে বাঁচাতে না চান তো বাঁচাবেন না কিন্তু আমাকে মারবেন না শিষবাবু। আপনার গোড় লাগি। ওই পুরুষোত্তম কোনোদিন ঝুড়ি-চাপা সাদা কবুতরকে হুলো বেড়াল যেমন করে পালক ছিন্নভিন্ন করে রক্তাক্ত করে খেয়ে যায়, লুটপাট করে যায় শরীর এবং মনকে; ও আমাকে তেমনি করেই খেয়ে যাবে কোনোদিন। আপনি আসা বন্ধ করলে বাবা ওকেই ঠিক করবে আমাকে পড়াবার জন্যে। ইতিমধ্যে একদিন এ-নিয়ে আলোচনাও হয়েছিল। নিজেদের জাতের লোক। ‘জান-চিন’ পরিবার। বাবার উদ্দেশ্য অন্য। কিন্তু ওর যে, কী উদ্দেশ্য তা আমার বুঝতে বাকি নেই। বাবা খাতা বুঝতে পারে, খাতা পেটা ধার বুঝতে পারে, একনম্বর দু-নম্বরের হিসাব বুঝতে পারে কিন্তু মানুষ বোঝে না। কথা দিন আপনি যে, আসবেন আগামী বৃহস্পতিবারে?

গুঞ্জনের মুখের দিকে চেয়ে একমুহূর্ত ভাবল শিরীষ। তারপর গদিঘরের জানলার দিকে চাইল একবার। পরক্ষণেই কী ভেবে বলে উঠল, আসব গুঞ্জন। তোমার ভয় নেই।

আমার ভয় আমার জন্যে নয়। আমার ভয় আপনার-ই জন্যে। ওই লোকটা আপনার জানও নিয়ে নিতে পারে। সাংঘাতিক খারাপ মানুষ ও।

তুমি জানলে কী করে?

আমি ওর ‘চোখ’ দেখেই বুঝি। বাবা ওকে কালও বাড়িতে এনেছিল। বাবা বড়োবোকা শিষবাবু। অথবা, বেশি চালাক। মেয়েদের পার করার চিন্তাতে বাবা আমাকে গলা টিপে মেরেও দিতে পারে হয়তো। হয়তো এই পুরুষোত্তমের সঙ্গে বিয়েও দিয়ে দিতে পারে। যদি ওই প্রস্তাবও কখনো ওঠে আমি আত্মহত্যা করব। কারণ ও বিয়ে করার কিছুদিন পরে নিজেই আমাকে পুড়িয়ে মারবে। আপনি জানেন না আমাদের সমাজের গরিবদের কথা। বাঙালিদের ধারণা মাড়োয়ারিমাত্রই বড়োলোক। আমাদের সমাজে যে, কী গরিবি, কী অসাম্য, কী অবিচার এখনও আছে...

বোকার মতো কথা বোলো না। আত্মহত্যা করে ভীরুরা।

ভুল কথা। আত্মহত্যা করতে যে-সাহসের দরকার হয়, সেই সাহস কম মানুষের-ই থাকে। কত কষ্টে যে, কোনো মানুষে আত্মহত্যা করে তা কি একবারও ভেবে দেখেছেন? যার বাঁচার একটুও উপায় আছে সে কি কখনো করতে যায় আত্মহত্যা? বড়ো নিরুপায়, বড়ো অসহায় সে অভাগারা। এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে কার যেতে ইচ্ছে করে? যেখানে ফুল আছে, পাখি আছে, ভালোবাসা আছে, আপনার মতো মানুষ আছেন সেই জায়গা ছেড়ে যেতে কি ইচ্ছা করে?

এসব আলোচনা পরে হবে কখনো। তোমার মনে যদি কখনো ভয় হয়—কোনো কিছুর-ই জন্যে—তুমি সোজা আমার কাছে চলে আসবে—কোনো দ্বিধা করবে না—আমাকে যে-করেই হোক খবর দেবে একটা—সঙ্গে সঙ্গে আমি চলে আসব। কোনো ভয় নেই তোমার। তুমি কি আমার বাড়ি চেনো?

প্রয়োজনে চিনে নেব। চিনি না, তবে বাবার কাছে শুনেছি, স্টেশনে যাবার রাস্তাতে মস্ত তেঁতুলগাছ আছে একটা, তার বাঁ-দিকে...

আমি যাবার সময়ে, মুন্নি-তিন্নিকে কি ডেকে দিয়ে যাব? সন্ধে তো হয়ে এল!

না, না। থাকুক ওরা যেখানে আছে। ওরা আমার মতো নয়। ওরা ওদের-ই মতো। ওদের কোনো সাহায্যের দরকার নেই আমার। সকলেই আলাদা আলাদা, প্রত্যেকেই প্রত্যেক্যের মতো। ওরা যাতে মজা পায়, যাতে ওদের আখের অথবা সর্বনাশ ওরা তাই করুক। তা ছাড়া, বাবা তো প্রায়-ই বলে, মুন্নি তিন্নি কত ‘এসমার্ট’—আমিই একটা অপদার্থ, ‘কেবলি’। বাবার দু-মেয়ের হিল্লে তো হয়ে যাবেই। সে হিল্লে যেমন-ই হোক। বাবার ঘাড় থেকে নামলেই হল। সমাজে; অরক্ষণীয়া কন্যার বাবা হিসেবে দুর্নাম না-হলেই হল। চোখের আড়ালে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে যা-খুশি তাই করুক। শাশুড়ি ননদে পুড়িয়েই মারুক নয়, বেশ্যাবৃত্তি করেই খাক। যেখানেই গরিবি সেখানেই সমাজ বড়ো নিষ্ঠুর শিষবাবু। তুমি শরৎবাবুর বই দিয়েছিলে আমাকে পড়তে ‘পল্লীসমাজ’ হিন্দি—। সমাজ, কিন্তু, বিশেষ করে এই গ্রামগঞ্জে এবং গরিবের সমাজ, শরৎবাবুর দিন থেকে আদৌ বেশিদূর এগোয়নি। যে যাই বলুক।

ভুল। একথা ভুল। দেশ অনেক-ই এগিয়েছে।

শিরীষ, রাজনৈতিক নেতাদের মতো আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মিথ্যে বলল।

একটু থেমে বলল, এসবের আলোচনা করা যাবে পরে, অন্যদিন।

একটু দাঁড়ান শিষবাবু।

বলেই, ঘরের ভেতরে চলে গেল গুঞ্জন। ভেতর থেকে একটি পিরিচ নিয়ে এল। পিরিচে জল ভরে তাতে হাসনুহানা ফুল রেখে দিয়েছিল।

মুখ নামিয়ে বলল, প্রতিবছর-ই আরও পরে ফোটা শুরু হয় কিন্তু কেন জানি না এবার তাড়াতাড়ি ফুটছে। আপনার জন্যে রেখে দিয়েছিলাম। আসলে রোজ-ই রাখি কিছু না কিছু। আপনাকে কখনো দিতে পারিনি সাহস করে। আজ লজ্জার মাথা যখন চিবিয়েই খেলাম তখন দেব নাই বা কেন?

অন্যদিন, আপনি চলে যাওয়ার পরে, আপনাকে উৎসর্গ-করা ফুল আমি আমার বালিশের নীচে নিয়ে শুই। কখনো চাঁপা, কাঁঠালি-চাঁপা, কনক-চাঁপা, বর্ষাকালে কদম, বেলি, জুঁই; শীতে গোলাপ। এমন বসন্তে, মহুয়া, করৌঞ্জ।

কী করব এই ফুল?

ভেজে খাবেন। সচ। আজীব আদমি হ্যায় আপ!

তারপর বলল, আজ আপনি আপনার বালিশের নীচে এই মুঠিভর হাসনুহানা রেখে, শুয়ে শুয়ে আমার কথা ভাববেন। আমি যেমন রোজ আপনার কথা ভাবি ঘুমুবার আগে। ফুলের গন্ধের সঙ্গে আমার ভাবনা মিশে যাবে, যেমন করে আপনার ভাবনা মিশে যায় আমার মাথাতে রোজ রাতে!

ফুল কোথায় পেলে?

ইচ্ছে করেই বেরসিকের মতো বলল শিরীষ। মুনিম পুনমচাঁদজির মেয়ের মধ্যে যে, এত কাব্য, এত প্রেম আছে, বিশ্বাস করতে তখনও অসুবিধা হচ্ছিল ওর।

যে চায়, সে ঠিক-ই পায়। ফুলওয়ালিই জানে, ফুল কোথায় পাওয়া যায়।

ফুলগুলি কীসে নেবে ভাবছিল এমন সময়ে গুঞ্জন একটি মহুলান পাতার দোনা এনে দিল ভেতর থেকে তাতে ভেজা ফুলগুলি তুলে দিয়ে বলল, বুকপকেটে রাখুন। যেতে যেতে বুক হয়তো ভেজা ফুলে একটু ভিজে যাবে। আমার বুকও রোজ রাতে ভেজে। নিজের-ই চোখের জলে।

শিরীষ অবাক হয়ে চেয়েছিল গুঞ্জনের দিকে।

গুঞ্জন বলল, লজ্জার মাথা আমি সত্যিই চিবিয়ে খেয়েছি। এরপরে জানি না কী করে বাঁচা হবে আমার। আমি মরলে, আমার শব যখন চাট্টি নদীর ধারের শ্মশানে দাহ হবে, আপনি আসবেন কিন্তু। নইলে ‘পেতনি’ হয়ে আপনাকে বহত জ্বালাব বলে দিচ্ছি।

শিরীষ সাইকেলটা ঠেলে নিয়ে উঠোনের দরজার দিকে যেতে যেতে বলল, চলি।

কিন্তু একটা কথা বলে যান শিষবাবু। সত্যি করে বলবেন কিন্তু।

কী?

আপনি ঝিঁঝিদিদিকে ভালোবাসেন। তাই-না?

জানি না গুঞ্জন।

মিথ্যে বলবেন না। আপনার চোখ-ই বলছে।

আমি চলি।

যাওয়া বলতে নেই, আসুন।

বলেই, গুঞ্জন দরজার একটি কপাট মেলে দিয়ে বেগুনি শাড়ির নরম আভায় আসন্ন সন্ধ্যাকে আরও বিধুর বিষণ্ণ করে দাঁড়িয়ে রইল।

শিরীষ আবারও ‘চলি’ বলে, সাইকেলে উঠতে উঠতে ভাবছিল, এই দরজা দিয়েই তো কতবার ও, এ-বাড়িতে এসেছে এবং গেছে কিন্তু আজ সন্ধের পর থেকে এই যাওয়া-আসার প্রকৃতি কত ভিন্ন হয়ে যাবে। আবারও কি আসা উচিত হবে এখানে? নিরাপদ হবে?

বাজার পেরিয়ে ফাঁকা এলাকাতে পড়েই মনে হল, প্লেট-ভরতি লোভ-জাগানো খাবার কেউ এগিয়ে দিলে বিনাবাক্যে ‘না’ করা যায়, টাকার বাণ্ডিল দিলেও তাও সহজে প্রত্যাখ্যান করা যায়, কোনো নারী তার শরীর, মন-বিবর্জিত শরীর নিবেদন করলেও নিজের শরীর-মনকে কুঁকড়ে নিয়ে পিছিয়ে গিয়ে তাও নিতে অস্বীকার করতে পারা হয়তো যায়; কিন্তু কেউ অকৃত্রিম মনোজ ভালোবাসা, হাসনুহানা ফুলের সঙ্গে দিলে তা ফিরিয়ে দেওয়াটা যে, কত বড়ো কঠিন কাজ, কত দুঃখবহ কাজ; তা এই মুহূর্তের আগে ও কখনোই ভেবে দেখেনি।

হৃদয়ের অর্ঘ্য ফেরানো বড়োই মুশকিল, মানুষ হিসেবে নিজে নিতান্তই হৃদয়হীন না হলে।

তা ছাড়া, যে, তার চিকন পবিত্র করপুটে করে সেই শ্রদ্ধাঞ্জলি দিচ্ছে তার যোগ্যতা বিচারের যোগ্যতা গ্রহীতারও বোধ হয় কখনোই থাকে না। শুধুমাত্র প্রেম-ই, নিবেদকের সমস্ত অসম্পূর্ণতা-অযোগ্যতাকে হৃদয়ের নির্মল পবিত্রতায় ধুয়ে-মুছে নিয়ে যেতে পারে। সেই নিবেদনের দীপ্তিতে নিবেদকের অপারগতার অকৌলীন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এ বোধ হয় বড়ো আশ্চর্য দান! দাতা ও গ্রহীতা দু-জনেই আকস্মিক অভিভূতির আচমকা গতিজাড্যতে অনবধানে ভেসে যায় নিরুদ্দেশে, পরিণতি সম্বন্ধে সম্পূর্ণই অনবহিত হয়েও।

মানুষের রক্তর যেমন কোনো জাত নেই, ধর্ম নেই, প্রেমও নিজেই স্বরাট, অন্যান্য এবং বিশিষ্ট এক প্রজাতি। প্রেম-এর প্রজাতিতে কোনো শ্রেণিবিন্যাস নেই। ধর্মের কচকচি নেই। জাত-পাত নেই। পৃথিবীর সব ধর্মের-ই বড়ো ধর্ম হচ্ছে প্রেম। তা মানুষের প্রতি প্রেম-ই হোক, কী ঈশ্বরের প্রতি।

গুঞ্জনের প্রেম বড়োই বিপদগ্রস্ত করেছে শিরীষকে। বড়োই বিপদ তার। এমন দুর্ঘটনা যে, ঘটতে পারে ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি আগে।

গুঞ্জনের দেশ রাজস্থানের আলোয়ার-এ। অনেক গল্প করেছে গুঞ্জন ওর দেশের। ওর ছেলেবেলার। ওদের দারিদ্র্যর। ওর মরে-যাওয়া মায়ের। জাতে ওরা গোয়ালা। ও যখন ছোটো ছিল, পনেরো বছর অবধি ও গোরু চরাত। দারিদ্র্য ছিল চরম, কিন্তু তবুও কী সুন্দর, খোলামেলা, ভাবনাহীন প্রকৃতি-সম্পৃক্ত ছিল সেইসব দিন! যৌবনকে দারিদ্র্যও ছুঁতে পারে না কলুষিত করতে পারে না।

মনোয়া-মিলনের পথে সাইকেল চালাতে চালাতে যেন, দেখতে পেল শিরীষ এমনি এক আসন্ন-সন্ধ্যায় হাতে পাঁচন-বাড়ি নিয়ে শতচ্ছিন্ন, রাজস্থানি ঘাগরাপরা, অনির্বচনীয় সারল্য-ভরা মুখের একটি মেয়ে তার গোরুদের নিয়ে ঊষর চারণভূমি থেকে ফিরে আসছে গ্রামের দিকে। গোরুর খুরে খুরে ধুলো উড়ছে। গোধূলিবেলায় শেষপ্রহরের সূর্য উজ্জ্বল নরম আলোর করুণ চিরুনি বোলাচ্ছে পায়ে-চলা পথপাশের বাবলার ডালে। দূরে দেখা যাচ্ছে, উঁচু পাঁচিল-ঘেরা আলোয়ার শহর, দুর্গ। মন্দিরের সন্ধ্যারতির ঘণ্টা বাজছে। গুঞ্জনের পালের গোরুদের মধ্যে একটি ডেকে উঠল ‘হাম্বা’ করে। গুঞ্জন মুখ ঘুরিয়ে দেখল। তার চুলের ঢল নেমেছে গালের ওপরে। মুখ-ঘোরানোতে বুকের ওড়না খসে গিয়ে কচি-বুক আড়াল-করা কাঁচুলি বেরিয়ে পড়ল। আবার ওড়না ঠিক করে নিল গুঞ্জন। মুহূর্তের জন্যে তার মুখ সেই সাঁঝবেলাতে এক, দৈবী-দীপ্তি পেল যেন!

আশ্চর্য। গুঞ্জনের-ই মুখে শোনা তার ছেলেবেলার গল্প আজকে কতদিন পরে চিত্রকল্প হয়ে ফিরে এল শিরীষের স্মৃতিতে। কী নিখুঁত অনুপুঙ্খতাতে।

রাজস্থানের আলোয়ারের সুন্দরী, সপ্রতিভ, বুদ্ধিমতী এক রাখাল-বালিকা বড়ো দেরি করে ফেলল এই ‘মনোয়া-মিলন’-এ এসে পৌঁছোতে।

বনে অথবা মনে, সময়মতো না পৌঁছোতে পারলে সব-ই গন্ডগোল হয়ে যায়।

গুঞ্জনের জন্যে ভীষণ-ই মন খারাপ হয়ে গেল শিরীষের। ঝিঁঝির জন্যেও হয়। বুড়ি-মাই-এর জন্যে হয়। কালুর জন্যেও হয়। কালু কুকুর না হয়ে মানুষ হলে কী ভালোই হত। মাঝেমধ্যেই ভাবে শিরীষ।

কিন্তু হত কী?

এও ভাবে।

মনখারাপ, এমনকী, ঘণ্টেমামার জন্যেও হয়।

ঘণ্টেমামার আসল সমস্যাটা এক্সটেনশনের। ডালটনগঞ্জের হরিরামবাবুর কাছে শুনেছে শিরীষ যে, এ-বছরই ঘণ্টেমামাকে রিটায়ার করতে হবে। হরিরামবাবু আচ্ছুরাম কালখফ লাক্ষা কোম্পানিতে কাজ করেন। যদি ঝিঁঝির সঙ্গে নীলোৎপলের বিয়েটা ঘটিয়ে দিতে পারেন তাহলে ঘণ্টেমামার চাকরির মেয়াদ আরও পাঁচবছর কমপক্ষে বেড়ে যাবে। মুখ্যত সেই কারণেই, এই হরকত।

তবে এটাকে দোষের মধ্যে বা মতলব-এর মধ্যে গণ্য করে না শিরীষ। নিজের ভালো কে না চান! বিয়ে-থাও করেছেন খুব দেরি করে। ছেলেটি এখনও পড়ছে। পড়াশুনোতেও কিছু আহামরি নয়! মেয়েটি তো বেশ ছোটোই। নয়-দশ বছরের। তাই চিন্তা হওয়ার-ই কথা। আর রিটায়ার করলেও এমন কিছু লাখ লাখ গ্র্যাচুইটি, পি-এফ, পেনশন পাবেনও না যে, সেই টাকায় দিন গুজরান হবে। ওসব আদৌ আছে কী নেই, ওঁদের কোম্পানিতে তাই বা কে জানে! হয়তো হেড-অফিসের কর্মচারীদের জন্যে আছে। জঙ্গলে জঙ্গলে যারা থাকেন তাঁদের কথা আর কে ভাবেন! অথচ প্রয়োজনটা, জীবনের ঝুঁকিটা; তাঁদের-ই সবচেয়ে বেশি। এদেশের সবকিছু সুযোগ-সুবিধাই শহর-ভিত্তিক।

বেচারি ঘণ্টেমামা!

ঘণ্টেবাবু আজ ডালটনগঞ্জেই ফিরে এসেছেন পা একটু ভালো হওয়াতে। সুনীতিদের বলে এসেছেন যে, সময়মতো পৌঁছে যাবেন রাতের গাড়ি করে ডালটনগঞ্জ থেকে। এখান থেকে কলকাতায় খবরটাও করে আসবেন। বলেছেন।

নীলোৎপলরা না আসাতে মনে মনে ঘণ্টেবাবু বেশ শঙ্কিতই হয়ে আছেন। ব্যাপারটা যে, কী ঘটেছে তা উনি জানেন না।

তবে বড়োকাকুকে, মানে নীলোৎপলের বাবাকে না-জানিয়েই তিনি এই সম্বন্ধটি করেছেন। ওঁকে যে, জানাননি তাঁর কারণও ছিল। উনি হয়তো এককথাতেই ‘না’ করে দিতেন। কারণ উনি সুমন ব্যানার্জি, মানে ঝিঁঝির বাবাকে চিনতেন। সাহেবিভাবাপন্ন সুমন ব্যানার্জির জীবনযাত্রা আর ওঁর জীবনযাত্রাতে আকাশ-পাতাল তফাত ছিল। তা ছাড়া সুমন ব্যানার্জি ব্যবসায়ী হলেও, উচ্চশিক্ষিত মানুষ ছিলেন। উনি কোটিপতি কিন্তু অশিক্ষিত বড়োবাবুকে পাত্তা দিতেন না। তখন থেকেই রাগ ছিল চাপা।

কিন্তু নীলোৎপল শিক্ষিত আধুনিক ছেলে। ক্লাব-বাজি করে। তার এয়ার কণ্ডিশাণ্ড গাড়িতে দারুণ মিউজিক-সিস্টেম আছে। গাঁক-গাঁক আওয়াজ ছাড়ে সেটা। দিনরাত ইংরিজি গান বাজে তাতে। আর নীলোৎপলের বাবা, বড়োবাবু এখনও খেটো ধুতি পরেন। গায়ে বহরমপুরি বাফতার পাঞ্জাবি, হিরের বোতাম বসানো। হাতে তাবিজ-মাদুলি। ‘নাচন-খ্যাপা’, ‘নেদো-কার্তিক’, ‘হসন্তি-মা’ ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক গুরু আর মায়ের পদপ্রান্তে বসে থাকেন সপ্তাহান্তে দু-দিন। নামকীর্তন করেন। তবে নীলোৎপল জানে কি না তা ঘণ্টেমামা জানেন না, তাঁর একজন পঁচিশ বছর বয়সি অশিক্ষিতা কিন্তু অপরূপা রক্ষিতাও আছে গল্ফ-গ্রিনে। আলাদা ফ্ল্যাট কিনে দিয়েছেন। ঝিং-চ্যাক এয়ার-কণ্ডিশাণ্ড ক্যাটক্যাটে-লাল মারুতি গাড়ি। সপ্তাহে দু-দিন তার কাছে সন্ধেবেলা গিয়ে ঘণ্টা দু-তিন কাটান বড়োবাবু। তারপর বাড়ি পৌঁছে মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে সদ্য মা-হারানো বকনা-বাছুরের মতো সকাতরে কই গো, গিন্নি, বড়োগিন্নি কই? বলে নীলোৎপলের মা হৈমপ্রভাকে ডাকতে ডাকতে ওঠেন। যেন সারাদিন স্ত্রীকে না দেখে পিপাসার্ত বড়ো। বড়োবাবু, একজন, যাকে বলে একেবারে ‘সম্পূর্ণ’ মানুষ। মদ ছোঁন না। নেশার মধ্যে শুধু একটু পান। লাল-রঙা টিনের, বাবা জর্দা দিয়ে। ‘ছ-শো’, নম্বর।

তাঁকেই না-জানিয়ে তাঁর ছোটোভাইকে বলে নীলোৎপলের জন্যে সম্বন্ধ করার কথাটা জানলে তাঁর ‘খেপচুরিয়াস’ হয়ে যাওয়ার-ই কথা। কিন্তু বহুবছর হয়ে গেছে ঘণ্টেমামার সঙ্গে বড়োবাবুর তো কোনো যোগাযোগ-ই নেই। সেজোবাবুই জঙ্গল দেখেন। তিনিই ডালটনগঞ্জে আসেন। তা, তিনি বড়োবাবুকে বলেছেন কী বলেননি তা ঘণ্টেবাবুর জানার কথা নয়। সেজোবাবু, বড়োবাবুর ছোটোশালা এবং নীলোৎপলের-ই আসার কথা ছেল মনোয়া-মিলনে। কী যে-ঘটে গেল নেপথ্যে হঠাৎ করে, যার জন্যে ওঁরা আসা ক্যানসেল করে দিলেন তার কোনো হদিশও পাওয়া যাচ্ছে না ডালটনগঞ্জে বসে। ফোন আসে যায় না প্রতিদিনেই। ক্যুরিয়ারও যায় আসে। ফোনে সেজোবাবুকে পায়নি। নীলোৎপলকেও নয়। তাই ক্যুরিয়ার মারফত একটা চিঠি লিখে পাঠালেন আজ সকালেই ঘণ্টেবাবু, সেজোবাবুকে।

হৈমল্লা,

ডালটনগঞ্জ, রবিবার

সম্মানপুরঃসর নিবেদনমিদং পরম-পূজনীয় সেজোবাবু,

পত্রে আপনাদিগের কুশল প্রার্থনা করি।

বহুদিন আপনি ডালটনগঞ্জে আসেন নাই বলিয়াই এই পত্র প্রেরণ করিতেছি।

গত বুধবারে ‘মনোয়া-মিলন’-এ আপনাদের সাদরে অভ্যর্থনা করিবা-নিমিত্ত ন্যায্য-বিধায় আমি স্টেশনে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ কোথা হইতে কী হইয়া গেল, বিনামেঘে বজ্রপাতের ন্যায় খবর আসিল স্টেশন মাস্টারের তরফ হইতে যে, আপনারা শুভযাত্রা স্থগিত করিয়া আগামী বৃহস্পতিবার পুনঃস্থির করিয়াছেন।

এই সন্দেশ-জ্ঞাপনার্থেই এই পত্র প্রেরণ করিতেছি যে, অধম পুনরায় বৃহস্পতিবার ঠিক ওই সময়েই ‘মনোয়া-মিলন’ স্টেশনে উপস্থিত থাকিবে এবং উষ্ণতার সহিত আপনাদিকের অভ্যর্থনা করিবে।

শালাবাবুর নিমিত্ত এক বস্তা পাকা পেঁপে এবং এক ঝুড়ি কাঁচাকলাও সংগৃহীত হইয়াছিল। আবারও হইবে। কোনোরূপ কষ্ট আপনাদিগের হইবে না। আশা করি, এতদিনে ভগবদ কৃপায় আপনার সেজোকন্যার (ধুপিমা) তৃতীয়া কন্যার সর্দিজ্বর ভালো হইয়া গিয়াছে। জানাইয়া নিশ্চিন্ত করিবেন।

ইতি—

আপনাদিগের যুগান্তকারী সেবক শ্রীঘণ্টাকর্ণ মিত্র

চিঠিটা চলে যাওয়ার পর-ই খেয়াল হল, চিঠিতে অনেক-ই ভুল রয়ে গেল।

গত পঁচিশ বছরে এই প্রথম একটি চিঠি লিখলেন। আত্মীয়স্বজনদের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে পত্রযোগে যা-সম্পর্ক তা স্ত্রী শেফালিই করেন। ক্লাস নাইন অবধি রমেশ মিত্র স্কুলে পড়েছিলেন। স্কুল তো ভালোই ছিল। পড়াশোনাতেও ভালো ছিলেন। অর্থাভাবে পড়াশুনো আর চালাতে পারেননি। ইংরিজি ও বাংলা হাতের লেখাটি খুব সুন্দর। গোটা গোটা অক্ষর। ভাষাও ভালো।

একটা চিঠি লিখতে যে, এত পরিশ্রম ও উত্তেজনা হয়, সে-সম্বন্ধে ঘণ্টেবাবুর কোনো ধারণা ছিল না। শব্দটা বোধ হয় ‘যুগান্তকারী’ নয়, ‘যুগযুগান্তরের’ হত। সংস্কৃততেও ভুল ছিল। সেজোবাবুর স্ত্রী আবার বাংলাতে বি.এ.। যদিও কম্পার্টমেন্টাল। তবুও তো বি.এ. পাশ। কলকাতা ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি-হোল্ডার বলে কথা! তাঁর চোখে ভুলগুলি সব প্রকট হয়ে উঠবে, যদি এ-চিঠি তাঁর গোচরীভূত হয়। যদি সেজোবাবু তাঁকে দেখান। সেজোবাবুও বাড়ি ফেরার সময়ে ‘সেজোগিন্নি’ ‘সেজোগিন্নি’ হাঁক ছাড়তে ছাড়তে ওঠেন কি না, তিনটি সিঁড়ি বেয়ে, তা ঘণ্টেবাবুর জানা নেই। বড়োলোকদের ব্যাপার-স্যাপার-ই আলাদা।

উঠোনের পেঁপে গাছে বসে কাক ডাকছিল। অলক্ষুণে দাঁড়কাক। কাল কী উত্তরে আসবে কলকেতা থেকে তা কে জানে। মাঝে তো আর মাত্র তিনটি দিন।

বসার ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দু-খাবলা তেল থাপ্পড় মেরে মেরে লাগালেন টাকে এবং গোটা তিরিশেক চুলে। তারপর রান্নাঘরের দিকে চেয়ে হাঁক দিলেন, ‘কী এমন রাঁধছ গো পোলাউ-কালিয়া? শেফালি?’

একবার ইচ্ছে হল, বড়োবাবুর-ই মতো ‘বড়ো গিন্নি’ বা ‘বড়ো-বউ’ বলে হাঁক ছাড়েন। পরক্ষণেই পাছে শেফালি ভিরমি খান, তাই সামলে নিলেন।

বললুম, পায়ে একটু আয়োডেক্স লাগিয়ে দে যাও, তা শুনতেই পেলে না।

কী আর রাঁধব। যেমন আনবে তেমন-ই তো রাঁধব। পোলাউ-কালিয়া রাঁধতে যে, জানি না তা তো নয়! কিন্তু সেসব রান্না তো কবেই ভুলে মেরে দিয়েছি।

কী রাঁধলে? এত অবান্তর কথা কেন?

কাঁচা কলাই-এর ডাল। আলু পোস্ত। নিম-বেগুন ভাজা আর লাউ এর ছেঁচকি।

ঠিক এমন সময়ে দরজার কড়া নড়ে উঠল খট-খট করে।

কে এল আবার এই দুপুরে বারোটার সময়ে?

ঘণ্টেবাবু গিয়ে দরজা খুলেই মুখ ব্যাজার করলেন। জিতেন। ডাক্তার মদন রায়ের একমাত্র ছেলে। ঠিকাদারি করে। বড়োলোক বাপের বড়োলোক ছেলে। নিজের রোজগারও মন্দ নয়। ছেলেটাকে ভালো লাগে না ওঁর।

তবে নিজের বয়েস হয়েছে কি না জানেন না, আজকালকার ছেলেদের কারোকেই পছন্দ হয় না ওঁর।

শেফালির কাছে তাঁর অনুপস্থিতিতে যে, সে আসে যায়, সে খবর তাঁকে দিয়েছেন উলটোদিকের বাড়ির গোরু-ঘোড়ার ডাক্তার জনার্দন পাঁড়ে। শেফালির সঙ্গে তাঁর নিজের বয়েসের তফাত প্রায় পঁচিশ বছরের। শেফালির এখন পঁয়ত্রিশ বছর বয়স আর তাঁর ষাট হতে চলল।

কী ব্যাপার জিতেন? অসময়ে? আমায় তো দোকানে পাওয়াই সোজা। সারাদিন তো সেখানেই থাকি।

আপনার কাছে আসিনি ঘণ্টেদা। এসেছি বউদির কাছে।

বলেই বলল, কোথায়? বউদি কোথায় গেলে। তোমার জিনিস এনেছি।

এনেছ?

না তো কী?

কী? জিনিসটা কী?

সন্দিগ্ধ গলাতে শুধোলেন ঘণ্টেবাবু।

এসব আপনার সাবজেক্ট নয় দাদা। চন্দ্রাবলী রুদ্রর পুরাতনি বাংলা গানের ক্যাসেট আর সুমন চ্যাটার্জির আধুনিক গানের।

তাই?

শেফালি, উৎফুল্ল গলায় বললেন।

গান আবার পুরোনো নতুন হয় নাকি? গান গান।

ঘণ্টেবাবু বললেন।

ঘণ্টেদা, এ তো আপনার বিড়ি-পাতা নয়। গানের অনেক-ই রকম হয়।

শেফালি কথা ঘুরিয়ে বললেন তুমি তো আনলে। কিন্তু শুনব কীসে? আমার কি ক্যাসেট-প্লেয়ার আছে? তোমারটা ধার দেবে তো দু-একদিনের জন্যে?

তাও এনেছি।

তোমারটা তো। কবে ফেরত নেবে?

ফেরত নেব না।

তার মানে?

তার মানে তোমার জন্মদিনের প্রেজেন্ট। নতুন একটা কিনে এনেছি তোমার জন্যে। সকালেই দেওয়া উচিত ছিল। বাসটা এত দেরি করল পথে। চান্দোয়াতে একটা ট্রাক উলটে গেছে। পিঁপড়ের মতো সারি দিয়ে সব বাস-ট্রাক-প্রাইভেট দাঁড়িয়ে গেছে।

আজ তোমার জন্মদিন নাকি?

ঘণ্টেবাবু একটু অবাক এবং বিরক্ত হয়ে শেফালিকে শুধোলেন। এইসব ব্যাপার বড়োমানুষদের বাড়িতে আর ব্রাহ্মবাড়িতে হয় বলেই জেনে এসেছেন। গরিবের ঘোড়ারোগ!

শেফালি বললেন, ছাড়ো তো। আমি আবার একটা মানুষ! তার আবার জন্মদিন!

আমাকেও তো বলোনি কখনো কবে তোমার জন্মদিন? অথচ ওকে...।

আমি বলেছি থোড়াই। ওই জেনে নিয়েছে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে। কখন যে, অজানতে বলে ফেলেছি নিজেই। আসলে, গতবছর বড়োজামাইবাবু চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিটা যখন আসে তখন জিতু ছিল। পড়াচ্ছিল ছুটকিকে। তাই ও জেনে যায়। ছুটকির কাছ থেকে।

ছুটকিকে ও-ই পড়ায় নাকি আজকাল?

হ্যাঁ। ও পড়াশোনাতে কত ভালো তা জানো না বুঝি? পালামৌ ডিস্ট্রিক্টে সেকেণ্ড হয়েছিল স্কুল ফাইনালে। বি.এ.-তে সেকেণ্ড-ক্লাস থার্ড।

বি.এ. কীসে করেছিল জিতেন?

ইতিহাসে।

ইতিহাসে বি.এ. করে সরকারি ঠিকাদার!

ইয়েস। এই দেশটার নাম ভারতবর্ষ। পেটের জন্যে ভূগোলের এম.এ. জুতো পালিশ করে, সাহিত্যের এম.এ. মটন-রোল এর দোকান দেয়। এখানে শিক্ষা একটা প্রহসন।

তুমি কি জিজ্ঞেস করেছিলে কখনো মেয়ের কোনো সাহায্যের দরকার আছে কী নেই? কোন ক্লাসে পড়ে বলো তো ছুটকি? শেফালি বললেন ঘণ্টেবাবুকে।

ওই হবে, সিক্স বা সেভেন।

না। ক্লাস ফাইভে।

রাখো তো ওসব কথা। আর এই দ্যাখো। ইশ। খারাপ-ই হয়ে গেল বোধ হয় গরমে।

জিতেন বলল।

ওটা কী আবার?

শেফালি বলল, হাসিমুখে।

কেক। কেক। কলকাতার ‘ক্যাথলিন’ থেকে এনেছি। জন্মদিনে কি কেক না হলে চলে? এই দ্যাখো পঁয়ত্রিশটা মোমবাতি আছে। ছোট্ট ছোট্ট। সন্ধেবেলা কেক কাটবে। সাজুগুজু করে থাকবে। কী বলেন ঘণ্টেদা? আমি আসব। ছুটকির আর পাগলার ক-জন বন্ধুও আসবে। মাংসর চপ আর ঘুগনি নিয়ে আসব আমি। মা বানাচ্ছেন সারাদিন ধরে মুঙ্গুলীর সঙ্গে বসে। মাকে যে, বউদি তুমি কী জাদু করেছ তুমিই জানো।

মাসিমাকে প্রণাম করে আসতে হবে গিয়ে একফাঁকে।

হেসে বললেন, শেফালি।

ঘণ্টেদা, আপনি কিন্তু তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। বিকেল বিকেল।

হুঁ।

ঘণ্টেবাবু বললেন।

তারপর বললেন, আমি তাহলে চানটা সেরেই নিই। তুমি বোসো। ওকে একটু শরবত-টরবত।

না, না। তবে আদা-লবঙ্গ দিয়ে এককাপ চা যদি করে দিতে পারো বউদি, তাহলে খাব। তোমার চায়ে যে, কী মিশিয়ে দাও তা তুমিই জানো। মা রোজ বলে আমাকে। বলে, আমার চা মুখে রোচে না তো, যা না শেফালির কাছে গিয়েই খা। যা রেগে যায় না মা!

শেফালি বলল, ছি:! মাকে এসব ব্যাপারে দুঃখ দিতে হয়? আর তোমার মায়ের মতো মা।

মস্ত এবং লম্বাটে উঠোনের অপর প্রান্তের কুয়োতলায় গিয়ে লাটাখাম্বা নামিয়ে দিয়ে বালতিতে জল তুলে ঝপাঝপ করে মাথায় ঢেলে তারপর একবালতি জল তুলে কুয়োর বাঁধানো গোলাইতে বসে সাবান মাখতে লাগলেন ঘণ্টেবাবু মনোযোগ সহকারে। পায়ের ব্যথাটা এখনও আছে।

পেঁপেগাছের ডালে বসে দাঁড়কাকটা আবারও ডাকল। বড়ো কর্কশ, অলক্ষুণে ডাক এই দাঁড়কাকেদের।

জিতেন রান্নাঘরের দরজায় মোড়া পেতে বসেছে গিয়ে। শেফালির কাছে। উনুনের আঁচে শেফালির মুখটাকে ও দেবীপ্রতিমার মতো দেখে।

বাড়িতে কেউই থাকে না, এই সময়ে। ঘণ্টেবাবু ছুটিতে আছেন, তাই।

ঘণ্টেবাবু সাবান মাখতে মাখতেই ব্যাপারটা লক্ষ করলেন। ওঁর তো ‘মনোয়া-মিলন’-এই থাকার কথা ছিল। এই ছেলেটা সব খবর-ই রাখে। শেফালিই দেয় নিশ্চয়ই। নইলে এই সময়ে আসবে কেন? ওঁর কোনো আসক্তি বা বিরক্তি কিছুই আর নেই। শারীরিক ব্যাপার শেফালির সঙ্গে বহুবছর হলই নেই। ওঁর কোনো তাগিদ-ই নেই। সেদিন বিড়ি কোম্পানির পেঁচো বলছেল, ডায়াবিটিস হলে, তাগিদ কমে যায়। উপেও যায় নাকি। একবার রক্তটা আর ইউরিনটা চেক করাতে হবে। ভাবেনও করাবেন। কিন্তু হয়ে ওঠে না। পয়সাও লাগবে অনেক। তবে রোগাও হয়ে যাচ্ছেন। পিপাসাও বোধ করেন আজকাল খুব। একটুতেই ক্লান্ত হয়ে যান। মেজাজও বড়ো খিটখিটে হয়ে গেছে। করতে হবে, কিছু একটা।

ব্যাগ থেকে একটি শাড়ি বের করে জিতেন গলা নামিয়ে বলল, এই শাড়িটা পরবে কিন্তু সন্ধেবেলায় চান-টান করে। আর এই নাও।

কী?

সাবান। এই সাবান দিয়ে চান করবে। তোমার চান করে-ওঠা গায়ের গন্ধ আমার খুব ভালো লাগে।

এই নাও।

তুমি কি পাগল। এটা কী?

সেন্ট। দিশিই! বিলিতি পেলাম না।

আমার ভীষণ খারাপ লাগে জিতু।

কেন?

তুমি কেন, আমাকে এতকিছু দাও? তুমি কি খুব বড়োলোক?

বড়োলোক কি মানুষ পয়সাতে হয়? বড়োলোক হয় ‘মন’-এ! আমি তো বড়োলোক-ই। মস্ত বড়োলোক।

তোমাকে আমি তো কিছুই দিতে পারি না। তবে তুমি কীসের জন্যে দাও এতকিছু?

আমি তো কিছুই চাইনি তোমার কাছে কখনো। এখনও চাইনি। যা পাই তাতেই তো ভীষণ খুশি থাকি।

যখন চাইবে? মানে যদি চাও, তখনও তো দিতে পারব না।

তখনকার কথা তখন-ই হবে। কিন্তু তুমি তো কিছু কমও দাও না আমাকে বউদি।

তুমি যা দাও, তার কণামাত্রও তো ফেরত দেবার ক্ষমতা আমার নেই।

তুমি আমাকে যত বোকা ভাবো অত বোকা আমি নই। সবাই কি সব জিনিসের দাম বোঝে? আমি বুঝি।

তুমি একটু হস্তিমূর্খ। ডালটনগঞ্জ শহরে শয়ে শয়ে সুন্দরী কুমারী মেয়ে তোমার অপেক্ষায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর তুমি এই বুড়ির জন্যে যে...

খবরদার। তুমি বুড়ি! আর কী দেখেছি সে, আমার চোখ-ই জানে। চোখ তো প্রতিদিন কত নারীকেই দেখে। পথে ঘাটে, বাজারে দোকানে বাসে ট্রেনে, স্টেশনে স্টেশনে অফিসে, অন্যের বাড়িতে কিন্তু সকলকেই কি ভালো লাগে! তবে, কখন, কোন জায়গায় কার যে, কাকে ভালো লেগে যায় তা শুধু বিধাতাই জানেন। এসব কথা থাক। এখন চা-টা দাও। খেয়ে পালাই। তুমি না বললে আমাকে যে, ঘণ্টেদা বৃহস্পতিবার ফিরবেন। মানে আগামী বৃহস্পতিবার। ইশ এক্কেবারে ‘কট-রেডহ্যাণ্ডেড’।

কথা তো তাই ছিল। অনেক আগেই ফিরে এসেছে।

আবার কবে যাবেন?

কথা আছে, পরশু।

তাই?

হ্যাঁ। কিন্তু তাতে তোমার কী? বেল পাকলে কাকের কী?

কাকের কী? তা পরজন্মে কাক হয়ে জন্মিয়ো, তাহলে জানতে পাবে। ‘বেল পাকলে কাকের কী’ —এই প্রবাদ মানুষের-ই বানানো। পাকা-বেলের মোটা আস্তরণে ঠোকর মেরে মেরে কাকের ঠোঁটের যে, কী সুখ হয় তা শুধু কাক-ই জানে। মানুষে কী জানবে! মানুষের মতো সবজান্তা জ্ঞানীও বিধাতা আর বানাননি। সর্বজ্ঞ একেবারে!

তোমার ক্যাসেট-প্লেয়ারটা রাখতে পারব না।

কেন?

অশান্তি হবে।

তা হোক।

আমি ইনস্টলমেন্টে কিনেছি। ফিলিপস-এর একজন বড়ো অফিসার আমার এক বন্ধুর দাদা। উনি সস্তাও করে দিয়েছেন অনেক।

যারা সব জিনিস-ই সস্তায় চায় তাদের আমার ভালো লাগে না। তারা নিজেরাই সস্তা।

তোমাকে তো সস্তায় চাইনি। তোমার দাম আমি বুঝি। এটা ব্যবহার কোরো। প্রতিমাসে তোমাকে দুটো করে ক্যাসেট এনে দেবে।

চা খাও।

লাটাখাম্বাটা বড়ো ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে। সাবান দেওয়া হয়ে গেলে আবারও দু-বালতি জল তুলে স্নান করলেন ঘণ্টেমামা। মনে হচ্ছে কোথায় যেন, ময়লা লেগেছে। শরীরের কোথাও তো দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু লেগেছে অবশ্যই। ঘিনঘিন করছে গা। মনটা খিঁচিয়ে রয়েছে ঘণ্টেবাবুর।

জিতেন বলল, আমি এখন আসছি। সন্ধেবেলায় আসব। তুমি পাগলাকে একটু পাঠিয়ে দেবে। দু-জনে মিলে নিয়ে আসব। চপগুলো মা গড়ে দেবেন। তুমি শুধু গরম গরম ভেজে নেবে এখানে। তেলও নিয়ে আসব আমি সিলড টিন। আজ না হয় আমিই ভেজে দেব। তোমার জন্মদিন। সেজেগুজেরান্নাঘরে ঢুকলে তুমি ঘেমে-নেয়ে যাবে। টিনের চালের রান্নাঘর।

বলেই, বলল, চললাম বউদি। শুভ জন্মদিন।

রান্নাঘর থেকে বাইরে বেড়িয়ে জিতেন গলা তুলে বলল, চলি ঘণ্টেদা। বিকেলে দেখা হবে।

আচ্ছা।

রান্নাঘরের দিকে স্নান করে গামছা ছেড়ে নতুন লুঙ্গি পরে হঠাৎ-ই ঘণ্টেবাবু ভূতগ্রস্তর মতো মাথা মুছতে মুছতে এগিয়ে এলেন।

এসেই বললেন, আমাকে খেতে দাও। আজ এখুনি খেয়েই যেতে হবে বিড়ি কোম্পানিতে। একটা জরুরি খবরের অপেক্ষাতে আমি। ঝিঁঝির বিয়েটা এখানে না-হলে, আমার এক্সটেনশানটাও হয়তো হবে না। তখন কী যে, হবে!

বলেই বললেন, ওটা তো ক্যাসেট-প্লেয়ার। আর ওটা কী?

শাড়ি।

আর ওটা?

সেন্ট।

সেন্টও?

আর ওটা?

ওটা সাবান।

হ্যাঁ।

তুমি কি ও ছোকরার রাঁড়?

হঠাৎ মাথায় রক্ত চড়ে গেল ঘণ্টেবাবুর।

শেফালি বললেন, দ্যাখো, ভদ্রলোকের মতো কথা বলো। তুমি কোনোদিন হাতে করে এতবছরে আমার জন্যে একটি জিনিসও এনেছ? নিজের পছন্দের খাবার ছাড়া?

চুপ করো তুমি। ভদ্রতা শেখাচ্ছ আমাকে? রাঁড়ের সঙ্গে কে আর কবে ভদ্রলোকের মতো কথা বলেচে! তুমি ঘরে বসে বেশ্যাবৃত্তি করবে আর আমি চুপ করে থাকব?

মুখ সামলে কথা বলো। যা বোঝো না, তা নিয়ে কথা বোলো না। ভালোবাসার তুমি কী বোঝো? এখন না হয় বুড়ি হয়েচি, যৌবনেও কি বুঝতে?

না, তা আমি কী করে বুঝব? সব বোঝে তোমার নাগর। ও ছোকরাকে বলে দিয়ো আর একদিনও যদি ও ঢোকে আমার বাড়িতে তাহলে আমি মেরে ওর মাথা ফাটিয়ে দেব। দাঁত ভেঙে দেব।

ইশ কত্ত সাহস। মেরে দ্যাখোই না। ওর গায়ে হাতে দিয়ে দ্যাখো একবার।

কী! এত্ত সাহস। রাঁড়-এর আবার এতবড়ো মুখ! দাঁড়াও তোমার নাগর নয়, তোমাকেই দেখাচ্ছি। বলেই, তেড়ে গিয়ে ঘণ্টেবাবু জোরে মারলেন এক চড় শেফালিকে। শেফালি প্রায় মাথা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিলেন কিন্তু পড়তে পড়তে সামলে নিয়ে রান্নাঘর থেকে খুন্তিটা তুলে নিয়ে ধেয়ে গেলেন তাঁর স্বামীর দিকে। তাঁর মাথার ঠিক ছিল না।

প্রথমে ওই রণরঙ্গিণী মূর্তি দেখে ঘণ্টেবাবু একটু পেছিয়ে গেলেন। তারপর নিজের প্রাণ বাঁচাতেই খুন্তিটা শেফালির হাত থেকে কেড়ে নিলেন। নিয়েই কান্ডজ্ঞানরহিত হয়ে খুন্তিটা চেপে ধরলেন শেফালির দুর্মর ঠোঁট দু-টির ওপর। এবং খুন্তির ধার সম্বন্ধে তাঁর কিছুমাত্রও জ্ঞান ছিল না বলেই শেফালির ওপর এবং নীচের ঠোঁট দু-খানি প্রায় দ্বিখন্ডিত হয়ে গেল। রক্তে শাড়ি জামা ভেসে যেতে লাগল।

শেফালির ওই রূপ দেখে আতঙ্কিত হয়ে ঘণ্টেবাবু নিজেই গ্যাঁদা ঝোপের কাছে গিয়ে অনেকগুলোপাতা ছিঁড়ে দু-হাতে কচলে গ্যাঁদার রস লাগিয়ে দিতে গেলেন নিজে হাতে স্ত্রীর ঠোঁটে। কিন্তু এক ঝটকা মারলেন শ্রীমতী। বলতে গেলেন, ‘তুমি আমাকে ছোঁবে না, ছোঁবে না’। কিন্তু নাক দিয়ে খোনা, নাকি-নাকি স্বর বেরোল, ‘চোঁবে না চোঁবেঁ না’।

ঝটকা-মারা সত্ত্বেও ঘণ্টেবাবুর দশাসই নড়াতে না পেরে হালকা ছিপছিপে শেফালি নিজেই পড়ে গেলেন রান্নাঘরের বারান্দাতে। পড়ে যেতে, কপালেও খুব লাগল।

দাঁড়কাকটা তখনও পেঁপে গাছের ডাল ছেড়ে উড়ে যায়নি। সে ভাবছিল, মানুষ-মানুষী কত অসহায়। কী করুণ তাদের অবস্থা। বেশ আছে, সে কাক আছে। এই মানুষদুটোর দু-জনেরই কারো-ই কোনো দোষ নেই। অথচ যা-ঘটল তা না ঘটলেই বায়সবাবু খুশি হতেন। কিন্তু ঘটল।

এক একজন মানুষের এককরকম বাসনা-কামনা, চাওয়া-চিন্তা, কিন্তু সেই বাসনা-কামনা, চাওয়া-চিন্তা পূরিত হয় কতজনের? পাকা-বেল নিয়ে মানুষ কাকেদের ঠাট্টা করে অথচ মানুষেরা নিজেরা কি জানে যে, পাকা বেল নিয়েই তাদের সকলের-ই কারবার!

জামাটা গায়ে গলিয়ে, মাথায় চিরুনির দু-চকিত থাপ্পড় কষিয়ে, ঘণ্টেবাবু খররোদে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন।

শেফালি রান্নাঘরের দাওয়াতে রক্তাক্ত হয়ে পড়েই ছিলেন। হয়তো বা জ্ঞানও হারিয়ে থাকবেন। কিন্তু ঘণ্টেবাবুর শেফালির প্রতি, কিছু কম ভালোবাসা ছিল না জিতেনের চেয়ে। কিন্তু ভালোবাসার বড়ো অধিকারবোধ আছে। সকলের ভালোবাসার-ই। সেই অধিকার-বোধে ধাক্কা লাগলে গভীর ভালোবাসাও প্রলয়ংকরী ঘৃণাতে রূপান্তরিত হতে পারে, একমুহূর্তে।

পায়ের ব্যথার জন্যে সাইকেল এখনও চালাতে পারেন না ঘণ্টেবাবু।

আস্তে আস্তে ধুলোর মধ্যে হেঁটে যাচ্ছিলেন পা টেনে টেনে, বিরক্ত, ক্ষুধার্ত, রিক্ত, বঞ্চিত খোঁড়া-গোরুর মতো। কাছারির সামনে লম্বুবাবুর সঙ্গে দেখা। বহুদিনের জান-চিন। তিনি রসিক মানুষ। গাড়ি করে একবার রাঁচিতে যাচ্ছিলেন, জিপ গিয়ে সোজা সেঁধিয়ে যায় চাস রোদে পেছনের আলো জ্বালিয়ে-না-রাখা পার্ক-করা একটা ট্রাকের পেছনে। বাঁ-পাটি হাঁটুর নীচ থেকে ভেঙে যায়। ক্রাচ নিয়ে চলেন। কিন্তু তাঁর মনের ফুর্তি কমেনি একটুও।

লম্বুবাবু স্বভাবসিদ্ধ রসিকতকায় বললেন, ‘কী হল ঘণ্টে? এই দুপুরে? বিড়ি বাঁধতে চললে নাকি? বউ কি আজ ভাত রাঁধেনি? খাবার টাইমে এমন বিবাগি?’

হঠাৎ-ই ঘণ্টেবাবু, তেলে-বেগুনে জ্বলে-উঠে বললেন, ‘আমার তো বউ আছে একটা। তোর তো....। আজ যাসনি? রাঁড়ের বাড়ি?’

ঘণ্টেবাবু এমনিতে নির্বিরোধী মানুষ। কখনো মুখ খারাপ করেন না। কিন্তু রসিক লম্বুবাবুও কাছারির পথে অন্য দশটা লোকের সামনে অমন বিনা কারণে অপমানিত হয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে বললেন, ‘জিতেন রয়েছে বুঝি তোর বাড়িতে এখন? তাই ল্যাজ গুটিয়ে পাইল্যে এলি। তুই শালা পুরুষ! বউ বেচে খাস।’

ঘণ্টেবাবু বিদ্যুৎস্পৃষ্টর মতো বললেন, আজকে ঘাঁটাস না আমাকে লম্বু। খুন হয়ে যাবি আমার হাতে। আমার মন ভালো নেই।

হ্যাঁ মন আর ধন যেন, শালা তোর একার-ই আছে। আমি তো আর পুরুষ নই।

ধন থাকলেই পুরুষ হয় না।

দু-জনেরই যে, ভোক্যাবুলারির জোর এমন তা দু-জনেরই জানা ছিল না!

যা। যা! মেলা জ্ঞান দিস না। যা, বিড়ি বাঁধগে যা। দাঁড়া তোকে আমি ফিট করছি।

অভুক্ত, ঘণ্টেবাবু কিন্তু কোম্পানির দিকে গেলেন না। ধীর, আহত পায়ে, খোঁড়া-গোরুর মতো এগোতে লাগলেন জিতেনের বাড়ির-ই দিকে। আশ্চর্য!

যখন পৌঁছোলেন, পৌঁছোতে সময় লাগল অনেক-ই, সাইকেল-রিকশা নিতে পারতেন কিন্তু সামর্থ্যে কুলোয় না তাই পা দু-টিকে টেনে টেনে ধুলো-পড়া পথে হেঁটে গেলেন অতখানি পথ। জিতেন তখন খেতে বসেছিল। ছোকরা চাকরটা বলল, ‘বসুন বাবু। জিতুবাবু খাচ্ছেন। আপনার কী হয়েছে বাবু? চোখ দুটো লাল।’

ঘণ্টেবাবু বললেন, ‘না। আমি ওই পিপ্পলগাছটার নীচে দাঁড়াচ্ছি। তুমি খবর দিয়ো জিতেনকে। বসব না।’

জিতেন এঁটো-হাতেই দরজাতে এসে একবার দেখল, পিপ্পলগাছের নীচে দাঁড়ানো ঘণ্টেবাবুর দিকে। তারপর সময় একটুও নষ্ট না করে, এঁটো হাতেই এল ওঁর কাছে। গাছতলায় একটা চায়ের আর পান-বিড়ির দোকান ছিল। সেখানে কয়েকজন লোক বসে-দাঁড়িয়েছিল। ঘণ্টেবাবুকে একটু পাশে টেনে নিয়ে গিয়ে জিতেন জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে? দাদা? আপনার মুখ-চোখ এমন কেন?’

ঘণ্টেবাবু, কেউ শুনল কি না তার তোয়াক্কা না করে, যেন প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যেই বললেন, তোমার বউদিকে আমি মেরেছি। ঠোঁট দুটো কেটে দু-ফাঁক হয়ে গেছে। মাথাও ফেটে গিয়ে থাকবে।

হতবাক হয়ে জিতেন বলল, মেরেছেন! কিন্তু কেন?

মারটা তোমাকেই মারতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পাকে-চক্রে শনি ভর করেছিল আমায়। মারটা খেল শেফালিই।

তা, আমার মারটা কবে হবে?

হবে। পরে হবে। এখন তাড়াতাড়ি ডাক্তার নিয়ে যাও। যদি তুমি শেফালিকে সত্যিই ভালোবাসো।

আর আপনি?

আমি কোম্পানিতে যাব। কাজ আছে। আমার কী? সে তো তোমাকেই ভালোবাসে। আমার কী দায়? তুমিও তো তাকে ভালোবাসো। কী? অস্বীকার করতে পারো কি, সে-কথা?

আমি বউদিকে ভালোবাসি। কিন্তু আপনি বাসেন না? বলুন?

বাসি। কিন্তু সে বোঝে না।

বোঝেন। ঠিক-ই বোঝেন।

ভালোবাসার অনেক পরত থাকে জিতেন। পুরোনো ভালোবাসা একদিন মলিন হয়ে যায়, ফিকে হয়ে যায়; ইমারতের রঙের মতো, তার ওপরে নতুন করে চুন ফিরোতে হয়। নতুন হয়ে ওঠে বলেই, পুরোনো যে, যা; তা বাতিল না হলেও; চাপা পড়ে যায়। আমিও চাপা পড়ে গেছি জিতেন।

বলেই, তাড়াতাড়ি বললেন, এই কথাটা যদি আমি স্বীকার করতাম তবে, তোমার বউদির গায়ে হাত দিতাম না। বিশ্বাস করো, কথাটা এক্ষুনি আমার মাথায় এল; এই রোদের মধ্যে হেঁটে আসতে আসতে। তা ছাড়া, কেই বা হারতে....

আপনি চলুন। খেতে বসবেন। আমি যাচ্ছি বউদির কাছে রামরিচ ডাক্তারকে নিয়ে।

না:। খাব না। তুমি যাও।

খিদে পায়নি?

পেয়েছিল। এখন মরে গেছে। একটা দারুণ আবিষ্কার করলাম জিতেন একটু আগে। জান?

কী? মানুষের মনের প্রশান্ত-সাগরে কলম্বাসের অ্যামেরিকা আবিষ্কারের চেয়েও বড়ো আবিষ্কার।

বলেই, ঘণ্টেবাবু হাসলেন।

জিতেনের মনে হল, মাথা খারাপ হয়ে গেছে বোধ হয় ঘণ্টেদার। অথচ ঈশ্বরের দিব্যি। শেফালিকে শুধুমাত্র মনের সঙ্গই দিয়েছে। অন্য কোনো সম্পর্কই জিতু আর শেফালির মধ্যে ছিল না। সেই সম্পর্কর জন্যে মনের গভীরে প্রোথিত এক অদৃশ্য কাঙালপনা যে, দু-তরফেই ছিল না এমন কথা জোর করে বলতে পারে না ও। কিন্তু ভবিষ্যতে হয়তো কিছু হলেও হতে পারত, সেই ঘটনাই হয়তো ঘণ্টেদা নিজেই ত্বরান্বিত করে দেবেন আজকের এই ঘটনাতে।

কে বলতে পারে!

ভারি কষ্ট হতে লাগল জিতেনের শেফালির জন্যে। তার নিজের জন্যেও। এবং সবচেয়ে বেশি, ঘণ্টেদার জন্যে। জিতেনও একদিন ছেলে-মেয়ের বাবা হবে, স্ত্রীর স্বামী; তারও একদিন ষাটবছর বয়েস হবে। এবং তখন, তার মোটামুটি বিধিবদ্ধ নিরুপদ্রব জীবনে যদি, হঠাৎ কোনো জিতেনের আবির্ভাব হয় তাহলে সে কী-যে করবে তখন, তা জোর করে বলতে পারে না। ও শিক্ষিত। সবকিছু ‘নৈর্ব্যক্তিক’ যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করতে শিখেছে।

হাত ধুয়ে, সাইকেলটা বের করবার সময়ে জিতুর মা শুধোলেন, খাওয়া ফেলে কোথায় চললি?

শেফালি-বউদির খুব বিপদ। আজ বোধ হয় আর জন্মদিনটা করতে পারবেন না ওঁরা।

সে কী! ঘুগনি যে, হয়ে গেছে এক গামলা। চপও সব গড়া শেষ, কিশমিশ, আর চিনাবাদামও দিয়েছি ভেতরে তোর কথামতো, শেফালি ভালোবাসে বলে।

উত্তর না দিয়ে, সাইকেলটা নিয়ে দরজা খুলে জিতেন জোরে সাইকেল চালিয়ে বেরিয়ে গেল ঘণ্টেবাবুর পাশ দিয়ে। যেন, শেফালি ঘণ্টেবাবুর স্ত্রী নয়। জিতেনের-ই স্ত্রী!

দাঁড়াকাকটা তখনও বসেছিল পেঁপেগাছটার ডালে।

গাছ আর পাখিরা সব মানুষের সব, লুকোছাপা-দেওয়া ঘটনার সাক্ষী থাকে। অনেক সময়ে বেড়াল অথবা কুকুরেরাও থাকে।

ঘণ্টেবাবু বেরিয়ে যাওয়ার একটু পরেই খোলা দরজা দিয়ে যে, পাটকিলে-রঙা কটা-চোখের একটা বেড়ালনি ঢুকে বারান্দাতে রক্তের মধ্যে পড়ে-থাকা শেফালির পাশ কাটিয়ে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পড়ল, সেটা একটা বজ্জাত। মানুষের বা অন্য প্রাণীর ‘অসহায়তা’র সুযোগ যারাই নেয়, তারাই বজ্জাত।

কাকেদের চোখের মণিগুলি আজকালকার সাইন-পেনের রিফিলের ডগার মতো ঘোরে। ‘রোটেট’ করে। কাকটা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখছিল। কাক জঙ্গুলে পাখি নয়। গ্রাম-গঞ্জের কাছে-থাকা চিতাবাঘের-ই মতো মানুষের জীবনযাত্রার সব খুঁটিনাটিই তাদের নখদর্পণে। তা ছাড়া ওই কাকটা ত্রিকালজ্ঞও বটে।

জিতেন যখন, রামরিচ ডাক্তারের কাছে গেল, তখন সে সবে খেয়ে দেয়ে একটু শোবার বন্দোবস্ত করছে। সকালে রোগী দেখতে গেছিল রাংকাতে। একদম ‘থকে’ গেছে।

জিতেন তাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে, নিজেই তার ব্যাগ হাতে তুলে নিয়ে, তার নিজস্ব রিকশাতে রাখল।

বলল, খাতরা বন-গ্যায়া ইয়ার। ভাবিজিকে মার-পিট কিয়া। বহুত খুনভি নিকলা। দাদা গ্যয়া কোতোয়ালিমে ডাইরি করেনেকো লিয়ে।

কওন অ্যাইসো কিয়া?

কোই ডাকু—বদমাশ হোগা। ম্যায় ক্যায়সা জানু?

রেপ তো নেহি না কিয়া?

আজীব আদমি হ্যায় তু ডাগদার। যানে সে, পুছনেসে, তবহি না পত্তা চলেগি। তু ডাগদার হো। দুসরেকি বিবি থোরি বাতায়েঙ্গি মুঝকো রেপকি বারেমে।

চাল। তেরা ভাবিজিনে আজ ছাত্তুকি লিট্টি বানায়ি থি। আজ শালা এহি ধুপমে লওটা-লওটা পানি পিতে পিতে ম্যায় মর যায়েগা। তেরা পেয়ারি ভাবিজি জান-পুছ কর আজ-ই রেপড হুয়ি। শালা দুসরি জনমমে ডগদার কভভি নেহি বনুঙ্গা।

চাল চাল। পানিকি ক্যা কম্মি। পানিসে নাহা দেখা তুঝকো, অব চাল তো জলদি রামরিচ।

জ্ঞান এসে গিয়েছিল কয়েক মিনিট পরেই শেফালির।

রাগ, দুঃখ এবং লজ্জাতে ওঁর ইচ্ছে করছিল মাটিতে মিশে যান।

এটা ঠিক যে, কিছুদিন হল একটু বাড়াবাড়িই করছিলেন, মানুষটির কী দোষ! রিটায়ার করবে। এক্সটেনশন পাবে কী পাবে না, এই চিন্তাতে ঘুম হয় না। পাগলা গতবারেই হায়ার-সেকেণ্ডারি পাশ করেছে। আর ছুটকি তো ক্লাস ফাইভেই। যখন বিয়ে হয়েছিল, তখন খেতে পেতেন না শেফালিরা। চারবোনের মধ্যে ও তৃতীয়। দিদিদেরও ওইরকমভাবেই পার করেছিলেন বাবা। বাবাও নিরুপায় ছিলেন। তবে এত ছেলে-মেয়ে কেন হয়েছিল মা-বাবার সে-কথা বড়ো হওয়ার পরে ভেবেছে। ওঁরা তো নিজেদের ইচ্ছেতে পৃথিবীতে আসেননি। অন্যর ইচ্ছেতে, অন্যের ক্ষণিকের সুখের-ফসল হিসেবে উপনীত হয়ে আশৈশব এই গ্লানির জীবন কেনই বা বইতে হবে? তা ভেবে পাননি। শেফালির একমাত্র দাদা গুণ্ডামি করতেন। সমাজ, সভ্যজীবনের সুযোগ দেয়নি। মারাও যান, একদিন পুলিশের গুলিতে। ওয়াগন-ব্রেকারদের দলে ভিড়ে। সেই সময়ে এই মানুষটাই এই বিহারের ডালটনগঞ্জে সামান্য চাকরি-করা ঘণ্টে মিত্তির-ই, বলতে গেলে, তাঁকে উদ্ধার করেছিলেন এসে। না করলে তাঁর স্থান ‘সোনাগাছিতে’ও হতে পারত। কথাটা ভাবলেও বুক ধড়ফড় করে। বড়োলোক ছিলেন না কোনোদিনও। বিশেষ গুণও ছিল না কোনো। তবু ডাল-ভাত তো খাওয়াতেন। সৎপথের কামাই। মানুষটার অন্য দোষ কিছু ছিল না। আসলে চারিত্রিক ‘দোষ’ বলতে যা সাধারণত সাধারণে বোঝে, তা আসে অতি-স্বাস্থ্য এবং বৈচিত্র্য-প্রীতি থেকে। তা, মানুষটার নড়েবড়ে স্বাস্থ্যে আর একঘেয়ে জীবনের অভ্যস্ততায় সেইসব ‘ঝামেলা’ কোনোদিন ছিল না। তাঁকে অন্য কোনো মেয়ের কখনো ভালো লাগেনি। সাতপাকে-বাঁধা পড়ে খোঁটায়-বাঁধা গোরু আর চাষের বলদের মতো জীবন কাটিয়ে এসেছেন শেফালি এতদিন। সাচ্ছল্য যে কী, আর্থিক, মানসিক, শারীরিক; তা জিতেন-ই এসে বোঝায়। নইলে শেফালির মনে কোনো অভাব বোধ ছিল না। এই জীবনে জিতেন-ই এসে...

কিন্তু জিতেনকে যে, শুধু ভালোই লাগে শেফালির তাই নয়, জিতেনের জন্যেই শেফালি আজকে বেঁচে আছেন।

ঘণ্টেবাবু এক্সটেনশন না পেলে হয়তো জিতেনের সাহায্যেই প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষ সংসার চালাতে হবে। ছেলে-মেয়ে দুটোও আছে। শুধু যে, ভালোলাগা—ভালোবাসাই ছিল জিতেনকে প্রশ্রয় দেওয়ার পেছনে তাও না, নিজের নিরাপত্তাবোধও হয়তো কাজ করেছিল অনবধানে।

অত্যন্ত ভালো করেই জানেন তা শেফালি।

উঠে, রান্নাঘরের দেওয়ালে মাথাটা হেলান দিয়ে বসলেন শেফালি। একবার ভাবলেন, আয়নায় গিয়ে দেখেন ঠোঁটের অবস্থাটা। পরক্ষণেই ভাবলেন, নিজের ভালোলাগা ভালোবাসার এমন রক্তাক্ততা নিজে চোখে দেখতে পারবেন না।

আসলে খুন্তিটা তো উনিই এনেছিলেন। দোষটা তাঁর-ই। খুন্তির ক্ষমতা জানার কথা তো ঘণ্টেবাবুর ছিল না। তা ছাড়া, এই প্রায় জড়ভরত, থোড়-বড়ি-খাড়া, খাড়া-বড়ি-থোড়, নিজের বউ-ছেলেমেয়ে-ময় ষাটবছরের মানুষটার বুকের মধ্যে তাঁর প্রতি এখনও এত ভালোবাসা আছে জেনেও অবাক হয়ে গেলেন শেফালি। ঘৃণা বা রাগ তো শুধু ভালোবাসা থাকলেই আসে! এই সরল কথাটা এর আগে এমন করে কখনো ভাবেননি বা জানেননি শেফালি!

মানুষটার আজ আর যৌবন নেই। এ-কথা ঠিক। এক নবীন, সচ্ছল, সুশ্রী, প্রেম-জর্জর যুবককে তাঁর স্ত্রীর এত ঘনিষ্ঠ হতে দেখে রাগ তো তাঁর হতেই পারে! সেই ঘনিষ্ঠতার রকম যাইহোক-না কেন!

ঠিক এইসময়েই জিতেন ঢুকল ডা. রামরিচ দুবেকে নিয়ে।

শেফালির পক্ষে কথা বলা মুশকিলও ছিল। রক্ত জমে গেছিল। উনি কিছু বলার আগেই জিতেন বলল, তোমার কথা বলতে হবে না বউদি! বদমায়েশরা ক-জন এসেছিল? একজন না বেশি?

অবাক হয়ে চাইলেন শেফালি জিতেনের দিকে।

আঙুল তুললেন। তর্জনী দেখালেন, এক।

একজন। যাকগে। দাদা গেছেন থানায় ডাইরি করতে। দাদার কাছেই শুনে আমি ডাক্তার নিয়ে এলাম। কিছু কি নিয়েছে? গলার হার, বা হাতের চুড়ি? অ্যাই তো! তোমার ডান হাতের বালা তো নেই। বুঝেছি। দেখেছ, কালশিরা পড়ে গেছে!

শেফালির সবসময়ে পরার মতো ছিলই মাত্র একগাছা বালা। বাঁ-হাতে পরত সেটি। ডান হাতে শুধুই শাঁখা।

শেফালি বুঝল, কোথাও কিছু একটা ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কিন্তু সেটা যেন, তার স্বামীর বিরুদ্ধে না হয়, এটাই মনে মনে প্রার্থনা করছিল।

ঠিক সেই সময়েই কাকটা ‘কা-খা-কা-খা’ করে স্বগতোক্তি করল।

বলল, মানুষগুলিকে প্রাণী হিসেবে যত খারাপ ভাবতাম, আসলে তারা তত খারাপ নয়। এই প্রাণীদের এখনও ভবিষ্যৎ আছে।

বেলা পড়ে এসেছিল। ঘণ্টেবাবু পথে পথে অভুক্ত অবস্থাতে ঘুরে ঘুরে কী করা উচিত, কী করা কর্তব্য, কিছুই ঠিক করতে না পেরে, একটি সাইকেল রিকশা, জিতেনদের বাড়ির কাছ থেকেই ধরে, ওদের বাড়ি গিয়ে, জিতেনের মাকে বললেন, বউদি জিতেন আমাকে পাঠাল কীসব আপনি বানিয়েছেন তা নিয়ে যেতে।

বাঁচালে ভাই। আমি তো ভাবলুম সব ফেলাই যাবে। সময়মতোই এসেছ। এখুনি টিভিতে সিনেমা আরম্ভ হয়ে যাবে। তা কখনো-সখনো আসো না কেন? তোমার দাদা থাকতে তো...। তোমাকে পথ দিয়ে যেতে দেখি, ক্বচিৎ-কদাচিৎ। একদিন এসো। শেফালি অবশ্য আসে মাঝে-মাঝেই।

নানা ঝামেলাতে থাকি। রিটায়ার করার সময়ও হয়ে এল।

অবশ্য তোমাদের সব খবর-ই পাই জিতেনের কাছে। বড়ো লক্ষ্মীবউ পেয়েছ তুমি ভাই! এমন রূপগুণের মেয়ে পুরো ডালটনগঞ্জে একজনও নেই। আর কী ভালো যে, গান গায়। পুরোনো দিনের গান, আজকালকার গান। আমি আবার গান পাগল যে!

গান গায়? আমার স্ত্রী?

কথাটা পুনরাবৃত্তি করতে গিয়েও চেপে গেলেন ঘণ্টেবাবু।

ফুলশয্যার রাতে যে-গান শুনেছিলেন তাই। গান-ফান ওঁর ভালোও লাগে না। জঙ্গলে-জঙ্গলে থাকেন। ওসব বিলাসিতা তাঁর জন্যে নয়। শেফালি তো কই, কখনো তাঁকে গান শোনাননি! অবশ্য শুনতে না চাইলে শোনাবেন-ই বা কেন!

বউদিই সব গুছিয়ে-গাছিয়ে দিলেন।

ঘণ্টেবাবু দেখছিলেন, বউদির বয়স প্রায় তাঁর মতোই হবে। এবং বউদি এখনও যথেষ্ট সুন্দরী। হঠাৎ ওঁর মনে হল, আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে, আজকে ওঁর সংসারে জিতেনের যে-ভূমিকা, ঠিক সেই ভূমিকা তাঁরও হতে পারত এই সংসারে।

জিতেনের অনেক-ই গুণ আছে। ওঁর কোনোক্রমে একটি চাকরি করে বনে-বাদাড়ে পড়ে থেকে কোনোক্রমে সংসার প্রতিপালন করে ওঁর মধ্যে জীবনের কোনোক্ষেত্রেই উপচে দেওয়ার মতো যৌবন, রূপ বা গুণ কোনোদিন ছিল না। যা হওয়ার নয়, তা হয়নি। জিতেনকে ঈর্ষা করাটা শুধু মূর্খামি নয়। বড়ো দৈন্যেরও কথা। নীচতা।

ঘণ্টেবাবু যখন, নিজের বাড়ির সামনে সাইকেল রিকশা থেকে নামলেন, পাতলা চাদর ঢাকা-দেওয়া গড়া-চপ-এ-ভরা মস্ত বারকোশ আর ঘুগনির হাঁড়ি নিয়ে, তখন ছুটকি দৌড়ে এসে বলল, বাবা! জানো আজ আমাদের বাড়ি ডাকাত পড়েছিল। মাকে কীরকম মেরেছে। একেবারে রক্তারক্তি।

ডাকাত? বলিস কী রে?

হ্যাঁ বাবা। একজন বদমাশ ডাকাত।

বলেই বলল, এগুলি কী বাবা?

আজ যে, তোদের মায়ের জন্মদিন।

হ্যাঁ। হ্যাঁ। আমরা তো জানিই। জিতুকাকু তো বলে রেখেছিল। মা যে, বিকেলে কেক কাটবে না বলছে! জিতুকাকুর এনে-দেওয়া নতুন শাড়িও পরবে না।

পরবে রে পরবে। পাগলা গেল কোথায়? দাদাকে ডাক। এগুলি সব নামাতে হবে। তোদের বন্ধুরা আসবে কখন?

এসে পড়বে।

তোর জিতুকাকু কোথায়?

কোতোয়ালিতে ডায়েরি লেখাতে গেছে। তুমি কোথায় ছিলে?

আমি?

কী উত্তর দেবেন, ভেবে পেলেন না ঘণ্টেবাবু।

শোওয়ার ঘরে, খাটের ওপরে শুয়ে ছিলেন শেফালি। ঘরে ঢুকে, ধারে কাছে কেউ নেই দেখে নিয়ে, ছেলে-মেয়েরা রান্নাঘরে সব গুছিয়ে রাখছিল; ঘণ্টেবাবু বললেন, আমাকে ক্ষমা কোরো। এই কান ধরছি।

শেফালি কেঁদে ফেললেন। তারপর-ই বিছানা থেকে উঠে, হঠাৎ-ই ঘন্টেবাবুর মচকানো পায়ে মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।

ওঠো। ওঠো। করো কী তুমি! ইশ। কী অবস্থা করেছি তোমার। আমি একটা পাষন্ড।

তারপরে কেউ কোনো কথা বললেন না কয়েক মুহূর্ত।

দাঁড়কাকটা কোথা থেকে ফিরে এসে, মহোল্লাসে ডাকতে লাগল ‘খবা-খবা-খবা-খবা’।

ডেকেই, উড়ে চলে গেল।

যেন বলে গেল, ভালো থেকো মানুষেরা, সুখে থেকো; মঙ্গল হোক সকলের।

ঘণ্টেবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, আরে পাগলা, ছুটকি, রান্নাঘরে শেকলটা দিতে ভুলিস না।

হ্যাঁ বাবা। বেড়াল তো ভাত-ডাল খেয়ে গেছে দুপুরে এসে।

ঘণ্টেবাবু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

মনে মনে বললেন, ভয় এই বেড়ালগুলোকেই।

এমন সময় জিতেন এল।

এসো এসো জিতেন। এসো। আজ তুমি না থাকলে, কী যে, হত! তুমি জানলে কী করে?

আমি তো প্রায়-ই আসি বউদির সঙ্গে গল্প করতে দুপুর-বেলায়। ঘর ফাঁকা হলেই সুড়ুৎ-করে-ঢোকা বেড়ালের-ই মতো। কিন্তু আজ এসেছিলাম ভাগ্যিস। না এলে, কী হতে পারত বলুন তো ঘণ্টেদা! এতক্ষণ তো পড়োশিরাও সকলে ছিলেন। এই তো গেলেন সব একে একে। ডালটনগঞ্জ জায়গাটাও কলকাতা-দিল্লি-মুম্বাই হয়ে উঠল। ছি:।

আমি একটু আসছি। তুমি বোসো তোমার বউদির কাছে। নতুন শাড়ি পরবে না বলেছেন নাকি? দ্যাখো তুমি। তোমার কথা শোনেন।

ঘণ্টেবাবু চলে যেতেই জিতেন বলল, শাড়িটা পরে ফ্যালো বউদি। একটু সাজো। যাও, তাড়াতাড়ি চান করে এসো। আমি চপ ভেজে দেব।

শেফালি বললেন, যা সুন্দর ছিল, পবিত্র ছিল, যা, ঘিরে এত স্বপ্ন ছিল আমার, সব আজ নোংরা হয়ে গেল। অথচ, তারজন্যে তুমি একটুও দায়ী নও।

চুপ করে থাকল জিতেন।

শেফালি বললেন, তুমি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো জিতু?

তুমি...। হঠাৎ আজ এই প্রশ্ন?

আমার জন্মদিনে আমাকে একটি উপহার দেবে?

কী?

কথা দাও যে, আমার সঙ্গে তুমি আর কোনো সংশ্রব রাখবে না। তোমার জন্যে দারুণ মেয়ে দেখেছি আমি। নাম, ঝিঁঝি। পছন্দ?

তোমার ঘণ্টেমামা তার বিয়ের জন্যেই দৌড়াদৌড়ি করে বেড়াচ্ছেন মনোয়া-মিলনে। তুমি ওঁর সঙ্গে চলে যাও। নিজে দেখে এসো। খুব বড়োঘরের মেয়ে। পড়তি ঘর। মাসিমার খুব পছন্দ হবে। গান জানে। শিক্ষিতা। সুরুচিসম্পন্না।

জিতু চুপ করে রইল।

কী হল? কথা দাও। দাও কথা।

জিতেন ঘর ছেড়ে উঠে চলে গেল।

ঘণ্টেবাবু বললেন, কী হল হে? তোমার বউদি কী বললেন?

জিতেন বলল, যে-ডাক্তার বউদিকে দেখতে এসেছিলেন, রামরিচ দুবে, তাঁর স্ত্রীর খুব অসুখ। আমার যেতে হবে এখুনি। কাউকে বলবেন চপগুলো ভেজে নেবেন। পরে যোগাযোগ করব আমি ঘণ্টেদা। বউদিকে খাওয়ার পরে ওষুধ খেতে হবে, ঠোঁটে ওষুধ লাগাতে হবে। মনে করে সব...চলি।

ঘণ্টেবাবু কিছু বলার আগেই জিতু চলে গেল।

শেফালি বুঝতে পারলেন সব। উনি শুয়ে শুয়ে ভাবছিলেন অনেক কথা। ইফফাত আরা খান আঙুরবালার একটি গান গেয়েছেন ক্যাসেটে শুনতে।

‘প্রেম-পূজা আজি সাঙ্গ করেছি, প্রতিমা ফেলেছি ভাঙিয়া

বাসনাকুসুম হৃদয়ে যা ছিল সকলি দিয়েছি জ্বালিয়া—’

কার লেখা কে জানে? সম্ভবত নজরুল-এর।

রাত গভীর। হঠাৎ কীসের ডাকে যেন, ঘুম ভেঙে গেল শিরীষের।

প্রথমে বুঝতে পারেনি কীসের ডাক। অনেক সময়ে সত্যি কোনো শব্দ নয়, শব্দহীন কোনো ডাকে, কারো ডাকে, এমনি করেই, আজ রাতে শিরীষের যেমন ভাঙল, তেমন করেই ঘুম ভেঙে যায় সব মানুষের-ই।

‘মানুষ’ বলেই, মানুষ অন্য মানুষের শুধু মুখের ডাক-ই নয়, মনের ডাকও শুনতে পায়। এই কষ্ট বা আনন্দ মানুষ হয়ে জন্মানোর অগণ্য কষ্ট বা আনন্দের মধ্যে বিশিষ্ট। যাঁরাই শুধুমাত্র মানুষের অবয়বের প্রাণী নন, মনুষ্যপদবাচ্য প্রাণী, তাঁরাই এই চাপা, প্রতিকারহীন কষ্ট বা আনন্দের কথা জানেন।

ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘুম ভেঙে গেল ঝিঁঝির, ঘুম ভেঙে গেল গুঞ্জনের, ঘুম ভেঙে গেল জিতেনের ডালটনগঞ্জে। এবং ঘণ্টেমামারও। ঘণ্টেমামার স্ত্রী শেফালিরও ভাঙল ঘুম। তখন রাত নিঝুম।

বাহ্যিক, শ্রবণ-জগতের কোনো-না-কোনো শব্দ হয়তো সেইমুহূর্তে প্রত্যেকের কানেই গিয়েছিল। কিন্তু সেটা নিতান্তই গৌণ। ঘুম ভাঙল প্রত্যেকের-ই, চৈত্র-শেষের গভীর রাতের, না-গরম না-ঠাণ্ডার শান্তির ঘুমের অশান্তি ঘটিয়ে, কারণ, তারা মানুষ, তাই। মানুষমাত্রের-ই বড়োই অশান্তি।

একটা কাল-পেঁচা ডাকছিল পাহাড়তলি থেকে। কাল-পেঁচার গুরু-গম্ভীর ডাক বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটোতে থাকে। যারা এই ডাক শোনেনি কখনো তারা ভয়ে কুঁকড়ে যাবে। কাল-পেঁচা, অত্যন্ত গভীর বনের বাসিন্দা। এই পেঁচাটা এখানে থাকে না। কোনো কোনো বছরে, এই সময়টাতে কোথা থেকে যেন, উড়ে আসে এবং মাসখানেক থেকে আবার অদৃশ্য হয়ে যায়। যেমন ক্বচিৎ আসে এবং চকিতে চলে যায় নীল-টোংড়ির শিমুলচুড়োর নীল পাখিরা, তেমন-ই। অবশ্য তারা আসে যুগের পর একবার। অনেক বছর ঘুরে।

সাধারণ পেঁচার ডাক সন্ধের পর-ই প্রায় রোজ-ই শোনা যায়। ‘কিঁচি-কিঁচি-কিঁচির’ শব্দ করে ডাকতে ডাকতে, উড়তে উড়তে তারা চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে ঝগড়া করে। নিত্যদিন কখনো-কখনো কোনো দুধলি চাঁদের রাতে গরিব গৃহস্থর মনে অনেক সুখ-কল্পনা জাগিয়ে দিয়ে ধবল লক্ষ্মীপেঁচা উড়ে এসে বসে। বাড়ির-ই কোনো গাছে। ছমছম করে জ্যোৎস্না। ঝমঝম করে গরিব গৃহস্থর সাচ্ছল্যর আশা তার দুরুদুরু বুকের মধ্যে। কখনো তার সাচ্ছল্যর সুখ-কল্পনা সত্যি হয়। অধিকাংশক্ষেত্রেই হয় না। তাতে লক্ষ্মীপেঁচার কিছুমাত্রই যায় আসে না। ঈশ্বরের বা খোদার-ই মতো। তাঁরা ভালো করলেও সাধারণ মানুষে তাঁদের মান্য করে, খারাপ করলেও করে। তাঁরা দুর্জ্ঞেয় বলেই তাঁরা অবশ্যপূজ্য, প্রণম্য। ভক্তির সঙ্গে ভয়ও জাগিয়ে রাখেন বলেই, তাঁরা নিয়ত-স্মর্তব্য।

কাল-পেঁচা ডাকে, তার ডাক অনুরণিত হয় পাহাড়ে পাহাড়ে, বনে বনে, পাহাড়তলি যেখানে গড়িয়ে গিয়ে পশ্চিমে, অদেখা; বিস্ময় এবং ভয় জাগানো মস্তিষ্কের মধ্যে জমা-থাকা বিচিত্র সব নামের বনে গিয়ে মিশেছে, সেদিকে গড়িয়ে যায়। ভাইষালোটান, গিমারিয়া, চাহাল-চুঙরু, ইটখোরি-পিতিজ, রাংকা বনগাঁওয়া, কাঠকামচারি ইত্যাদি ইত্যাদি সব অরণ্য, ভূগোলের সব জ্ঞান ও নির্দেশ অমান্য করে অথবা বিভূতিভূষণের ‘আরণ্যক’-এর প্রতীকী, লবটুলিয়া, নাড়া বইহার গহন-বনের মধ্যের সরস্বতী-কুন্ড, ইত্যাদির-ই মতো মনের মধ্যে জেগে-থাকা চিরকালীন সব আরণ্যর স্তব্ধ, সতত-অপস্রিয়মাণ দিগন্তের দিকেই গড়িয়ে যায়। আধো-ঘুমে, আধো-জাগরণে বুনোমোষেদের দেবতা, তখন কল্পনায় চোখের সামনে শিং-নাড়ানো, অতিকায় বন্য-মহিষের পিঠে-বসা ‘টাঁড়বারো’, এসে দাঁড়ান। প্রাগৈতিহাসিক মানুষের আবাস গুহাগাত্রের, আশ্চর্য ম্যাঙ্গানিজ—আকরের রঙের মতো লাল রঙে আঁকা সব ছবির প্রাগৈতিহাসিক জানোয়ারেরা, আর উলঙ্গ, নয়তো পশুচর্ম-পরিহিত নৃত্যরত প্রাগৈতিহাসিক, মনোলিথিক, প্যালিয়োথিক যুগের শিকারিরা; ‘ধেই-ধেই তাতা থই-থই’ নাচতে থাকে। কত কত শতাব্দী পিছিয়ে যায় শিরীষ। ও যেখানে থাকে। ওর মধ্যের প্রাগৈতিহাসিক আদিম মানুষটি ওর মস্তিষ্কের একাংশের দখল নিয়ে, তাকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে মড়ার খুলির টুকরোর মতো।

সেই টুকরোর-হওয়া একটি অংশ নিয়ে দারহা-কিচিং ভূতেরা গেন্ডুলি খেলে আর অন্য অংশ দ্রৌপদীর মতো কোনো রমণীর অখন্ড-দৈর্ঘ্যর শাড়ির প্রান্তের মতো আধুনিকতার খোঁটায় আটকে গিয়ে থেকে, মনকে সম্পূর্ণভাবে প্রাক-ইতিহাসের মধ্যে নগ্ন অথবা মগ্ন হওয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখে। ও আলুথালু বেশে, বিস্রস্ত কেশে, ফুটি-ফাটা মস্তিষ্কে কোনো অতলান্ত শীতল সমুদ্রের গহনের উষ্ণজলের চোরা-রাজপথে পড়ে, স্রোতের টানে দ্রুত ফিরে আসতে থাকে আবার ‘মনোয়া-মিলন’-এরদিকে, যেখানে প্রাগৈতিহাসিক কোনো বন্য বস্তু নেই, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাধ্য এবং বশ-করা গৃহপালিত কুকুর আছে; কালু। যে, শিরীষের-ই প্রতীক্ষায় বনের দিকে মুখ উঁচু করে, কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে। বনের মধ্যে থেকে উঠে-আসা হাওয়ার মধ্যে যে, তার মনিবের শরীরের গৃহপালিত গন্ধ খোঁজে।

সেই মাহেন্দ্রক্ষণে থাকে এক নারীও, সে নগ্না নয়, পশুচর্ম পরিহিতা নয়; কাঁচা রক্ত-মাংস-খাদক নয়; যে, অনেক শতাব্দী ধরে তার আদিমতাকে, তার নগ্নতাকে, সভ্যতা-নামক, পরিশীলন-নামক, কৃষ্টি এবং রুচি নামক নানা ভঙ্গুর, সামান্য আঘাতেই ছিন্নভিন্ন হওয়া, কিন্তু আপাত-দুর্ভেদ্য নির্মোকে, আবরণে, অন্তর্বাসে, কাঁচুলিতে, শায়াতে, ব্লাউজে, শাড়িতে বিভিন্ন ভাষার জ্ঞানে বিভিন্ন বিষয়ের অধীত-বিদ্যায় মুড়ে রেখেছে নিজেকে; সেই নারীর নাম ঝিঁঝি, ঘুমের মধ্যে পাশ-বালিশ চেপে ধরে শিরীষের কথা মনে করে, সেই বালিশেই চুম্বন আঁকছে সে, এই ঘুম ভেঙে-যাওয়া গভীর রাতে।

মানুষ আসলে বোধ হয় এখনও আদিম যুগেই বাস করে। তার আধুনিকতার বা সভ্যতার বা বিজ্ঞানমনস্কতার যথার্থ বিশ্লেষণ এখনও হয়নি। হয়তো হবেও না কোনোদিনও। তার আবরণটি এখনও যথেষ্ট পুরু হয়নি। যা-কিছুই সহজ ছিল, সোজাসুজি ছিল, আকাশের মতো, বাতাসের মতো, নদী আর বনের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসারে উৎসারিত সুঘ্রাণের মতো; তার সবকিছুই কত গোলমেলে কুটিল, দুর্গম, দুর্ভেদ্য; নাগালের বাইরের করে তুলেছে, আধুনিকতা, সভ্যতা, তথাকথিত শিক্ষায়-শিক্ষিত এই শিরীষ আর ঝিঁঝির মতো। জিতেন আর শেফালির মতো, গুঞ্জন আর ঘণ্টেমামার মতোই বড়ো অসহায় মানুষেরা! একবিংশ শতাব্দীতে পা-দেওয়া বিজ্ঞানমনস্ক কম্পিউটার-বিশারদ গর্বিত কিন্তু অভিশপ্ত মানুষেরা!

শিরীষ দীর্ঘশ্বাস ফেলল ঘুম ভেঙে।

কালুও ফেলল একটা।

তারপরেই শিরীষের দু-পায়ের ওপরে শরীরের ভার চাপিয়ে দিয়ে আবারও কালু ঘুমিয়ে পড়ল।

সারমেয়রা খুব-ই ভাগ্যবান। একসঙ্গে কোনো দুঃখ বা আনন্দের ভাবনা বেশিক্ষণ ভাবতে পারে না ওরা। কোনো ভাবনাই তাই পীড়িত করতে পারে না, ওদের মনকে কখনোই। তাই মানুষের মতো কষ্ট পায় না ওরা।

শিরীষ ভাবল, কালু কী ভাগ্যবান, যে, সে মানুষ নয়। এখনও কতশত যোনিসম্ভূত হয়ে, কত জন্ম পার করে তাকে, মানুষ-জনম পেতে হবে কে জানে! যতদিন না পাচ্ছে, ততদিন মনুষ্যোচিত বোধের সব দুঃখ থেকেই ও বেঁচে গেল। এ-জন্মের মতো বেঁচে গেল। ও জানে না কী বাঁচা বাঁচল ও!

ঝিঁঝি উঠে একবার বাথরুমে গেল। কোনো-কোনোদিন এবং রাতেও শরীরের মধ্যে একধরনের গরম বোধ করে। এই রহস্যের তল পায় না ও। এই কি সুনীতির ভাষায়, কী যেন? রিকিঝিকি? তাই? কে জানে! তবে এই কষ্টটা আজকাল একেবারেই যে, বোঝে না ও, তাও নয়! বোঝে একটু একটু! কিন্তু এইকষ্ট নিরসনের কোনো পথের হদিশ ওর কাছে নেই। তবে একথা ঠিক যে, এমন এমন সময়ে, ওর শিরীষের কথা খুব-ই মনে হয়। বিশেষ করে খালি-গায়ের, আগুনের মতো গায়ে-রঙের বুকভরতি সতেজ কালো কোঁকড়ানো-চুলের শিরীষের কথা। তার সরু কোমর আর চওড়া বুকের কথা। একজন পুরুষ আর একজন নারী তাদের দু-জনের শরীরের খেলনাপাতি নিয়ে কোন খেলা যে, খেলে, কেমন করে যে, খেলে, তা যেমন, কল্পনাতে জানে ঝিঁঝি আবার হাতেকলমে জানেও না। কিছু কিছু জানা থাকে, স্বাদ থাকে, সাধ থাকে; যা পরের মুখে ঝাল খাওয়ার-ই মতো, পরস্মৈপদী আদৌ হয় না। স্বশরীরের স্বীয় অনুভূতিতে তাকে পঞ্চমেন্দ্রিয় দিয়ে না ছুঁলে তার আনন্দ অথবা দুঃখ অজানাই থেকে যায়।

ঝিঁঝি বাথরুম থেকে ফিরে এসে শুল। কিন্তু ঘুম হল না। পাহাড়তলিতে শালফুলের গন্ধ, করৌঞ্জের গন্ধ, মহুয়ার গন্ধ, নানা মিশ্র গন্ধ নদীর সামান্য সোঁদা গন্ধর সঙ্গে মিশে গিয়ে ‘থম’ মেরে আছে। মাঝে মাঝেই একটা দমকা হাওয়া, শিরীষের কুকুর কালুর-ই মতো ছটফটে, আচমকা এসে, রিলে-রেস-এ দৌড়োনো স্কুলের মেয়ের মতো সেই জমে-থাকা গন্ধ সমষ্টিকে উড়িয়ে নিয়ে এদিকপানে এসে ঘাপটি-মেরে দাঁড়িয়ে-থাকা অন্য কোনো নবীন, সদ্যোজাত হাওয়ার হাতে তুলে দিচ্ছে, যে আবারও সেই গন্ধবাহী অদৃশ্য দামাল রুমাল বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এই পৃথিবীর ছোট্ট এককোণ থেকে অন্য কোনো কোণের কোনো শান্তশ্রী প্রান্তকে সুরভিত করবে বলে। ঝিঁঝিদের বাড়ি ‘মহুয়ার’ হাতার বাগানে আমের মুকুল আর কাঁঠালের মুচি এসেছে। তাদের গন্ধেও ‘ম-ম’ করে সারারাত। এই চৈত্রশেষের চাঁদের আলোয় ফুটফুট-করা মধ্যরাত মাঝরাত তারার বিছানাতে শুয়ে ওর-ই মতো ছটফট করে। হয়তো এই রাতেরও কোনো মনের মতো পুরুষ আছে, যার সঙ্গে মিলনে তার অনেক-ই বাধা। তাই রাতেরও রিকিঝিকি হয়।

রাত্রি, অবশ্যই নারী। এবং নারী যদি হয় তবে এই রাতও ঝিঁঝির মন-শরীরের সব কথা অবশ্যই বুঝবে।

গুঞ্জন ঘুমের মধ্যে একবার বিড়বিড় করে উঠল। ওরা তিনবোনে একঘরেই শোয়। গদিঘরের গদির মতো মস্ত বিছানার ওপরে ঢালা ফরাশ পাতা। একঘরে শোয় বটে, এক মা-বাবার গর্ভে এবং ঔরসে তাদের জন্মও বটে কিন্তু কতই না তফাত তাদের একে অন্যের মধ্যে!

হাসনুহানার গন্ধ পাচ্ছিল গুঞ্জন। যে হাসনুহানা শিরীষকে দিয়েছিল তার-ই অন্যভাগ নিজের বালিশের নীচে নিয়ে ঘুমিয়েছিল। প্রতিরাতেই শুতে যাওয়ার আগে স্নান করে গুঞ্জন ভালো করে। শরীরের সারাদিনের গ্লানি ও ক্লেদ ধুয়ে আসে। সারাদিন ধরে শরীরে যে, ময়লা-কুচলা জমে তার কণামাত্র নিয়েও সে, ঘুমের জগতে প্রবেশ করতে চায় না। সারাটা দিন ও রাতের কিছুটা আবিলতায় অবশ্যই মাখামাখি হয়ে যায় কিন্তু শয্যাহীন গুঞ্জনের শরীর-মনে আবিলতার কণামাত্রও থাকে না।

স্বপ্ন দেখতে দেখতে গুঞ্জন মাঝে মাঝে শিশুর মতো দেয়ালা করে। কিন্তু আজ হাঁউ-মাউ করে কেঁদে উঠল।

তিন্নি মড়ার মতো ঘুমোচ্ছিল। জানলও না।

মুন্নি তাকে এক ঠেলা মেরে বলল, নেকি হয়েছে একটা! কতবার বলেছি যে, বুকের ওপর হাত রেখে শুবি না, তা কথা কে শুনছে!

গুঞ্জন জেগে থাকলে মনে মনে ভাবত, মুন্নি-তিন্নি বড়ো নিষ্ঠুর। যেসব মেয়ে তাদের জীবনে পুরুষের ভালোবাসা পেয়েছে তারা বড়ো দয়ালু হয়, নরম হয়; স্নিগ্ধ হয়। তাহলে মুন্নি-তিন্নি সিং-চাচার শালাবাবুর বড়োলোক ছেলেদের কাছ থেকে যা পায়, তা বোধ হয় ভালোবাসা নয়; অন্যকিছু। ভালোবাসা কাকে যে বলে, তা জানে ক-জন পুরুষ? ক-জন নারীই বা তা সঠিক জানে? একটা গন্ধ পেল শিরীষ নাকে। এ-গন্ধ, রাতের হাওয়ার হাত ধরে ছুটে আসা বন-গন্ধ নয়। অন্য এক ধরনের গন্ধ।

হঠাৎ-ই মনে পড়ল ওর, কাল শেষবিকেলে গুঞ্জনের দেওয়া হাসনুহানার কথা। পাশ ফিরে শুয়ে বালিশের তলা থেকে ফুলগুলো বের করল। সুন্দর টাটকা সাদা নরম ফুলগুলো খয়েরি এবং কালো হয়ে গেছে এখন। যদিও গন্ধই প্রমাণ করছে যে, যখন তারা সাদা ছিল, নরম ছিল; তখন তাদের নাম ছিল ‘হাসনুহানা’।

এমন-ই বোধ হয় হয়। ফুলও ভালোবাসার-ই মতো। তার ওপরে ঢাকা-চাপা পড়লে, বেশি চাপ পড়লে, আলো-হাওয়া থেকে সরিয়ে এনে, তাকে চেপে-ঢেকে অন্ধকারে রাখলে সে, এমন শুকিয়ে খয়েরি-কালোই হয়ে যায়। ভালোবাসা ঢাকা-চাপার নয়, লুকো-ছাপার জিনিস।

শিরীষ ভাবল, ঝিঁঝি কি জানে এই কথাটি?

শেফালিরও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ঠোঁটের যন্ত্রণায়। পাশে ঘণ্টেবাবু নামক একজন পুরুষ শুয়ে আছেন। যিনি তাঁর স্বামী। লুঙ্গিটা সরে যাওয়াতে শেফালির বহুবছর অদেখা, পুরুষাঙ্গটি দেখা যাচ্ছে, কমিয়ে রাখা লণ্ঠনের স্তিমিত আলোতে। পুলিপিঠের মতো দেখতে, পুরুষের অনুত্তেজিত জননেন্দ্রিয়র মতো কুদৃশ্য কোনো বস্তু পৃথিবীতে আর কিছু আছে বলে, মনে হয় না শেফালির। পুরুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংবলিত এই মানুষটা জাগতিকার্থে তার স্বামী। বিগত বহুবছর এক-ই বিছানাতে তাঁদের রাত্রিবাস। সমাজে তাঁদের দু-জনকে অঙ্গাঙ্গি বলেই জানে সকলেই। অথচ সবচেয়ে মজার কথা এই যে, নিস্তরঙ্গ, ভালোবাসা-হীন, ঝগড়া-হীন এই দাম্পত্য যে, আদৌ বেঁচে নেই সে-সম্বন্ধে দম্পতির একজনও ওয়াকিবহাল নন। ঘণ্টেবাবু তাঁর চাকরি, তাঁর রিটায়ারমেন্ট, তার সম্ভাব্য বা অসম্ভাব্য এক্সটেনশান এবং তাঁর বিপুল অসহায়তা এবং রিটায়ারমেন্টের পর, কী হবে এই ভাবনাতেই সবসময়ে বুঁদ থাকেন। যতই মাসের একতারিখ এগিয়ে আসতে থাকে ততই মাথার তিরিশটা চুলের সংখ্যাও হ্রাস পেতে থাকে। কী করে কী হবে? পাগলা ও ছুটকির স্কুলের মাইনে, দুধের দাম, চাল, ডাল, তেল, নুন; শেফালির শাড়ি-জামাও সব-ই প্রায় ছিঁড়ে-খুঁড়ে গেছে; নিজের কথা ভাবার সময় বা বিলাসিতা আর নেই। কিন্তু কী হবে?

শেফালি ভাবেন, তেল যতটুকু আছে তাতে কাল অবধি চলে যাবে কোনোক্রমে। পঞ্চাশ টাকা কে.জি. হয়ে গেছে সরষের তেলের।

জুনিয়র পি.সি সরকারের ম্যাজিক দেখেছিল একবার রাঁচিতে। ওয়াটার-অব-ইণ্ডিয়া। এক-ইগ্লাসে অনন্ত জলরাশি। যতবার-ই উপুড় করে ঢালা যাক-না-কেন, জল অফুরান-ই থাকে যেন কামধেনু। তেমন-ই অয়েল-অব-ইণ্ডিয়া (ইণ্ডিয়া অয়েল নয়) এই ধরনের একটি ম্যাজিক যদি শিখে নিতে পারতেন উনি জুনিয়র পি.সি সরকারের কাছ থেকে!

প্রত্যেক মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মহিলাই ভাবেন সংসার চালানো আর আধুনিকতম বৃহত্তর এরোপ্লেন ‘কনকর্ড’ চালানোতে কোনো তফাত নেই। অথচ তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের এই সংগ্রাম, দুর্গম পবর্তারোহণ বা এরোপ্লেনের মহিলা-পাইলট হওয়ার, খবরের মতো খবরের কাগজের খবর হয় না কোনোদিনও। খবরের কাগজগুলো, প্রত্যেকটি কাগজ-ই; চিরদিন-ই বাহির-পানে চেয়ে থাকে খবরের জন্যে, ভিতর-পানে চেয়ে দেখবে এমন চোখ-ই নেই কারো। প্রতিদিন কত খবর-ই যে, একটা সাধারণ সংসারের মধ্যে ধুলোয় পড়ে নষ্ট হয়, ঘটে। সেসব খবরের প্রত্যেকটিই সর্বজনীন, বিশ্বব্যাপ্ত! কারণ, ব্যক্তির সমষ্টি নিয়েই ‘বিশ্বজন’ এ-কথা বোঝার মতো ক্ষমতা খবরের কাগজের মাথা-মোটা মালিক এবং সাংবাদিকদের একজনেরও নেই। লেখাপড়া শেখার সুযোগ পেলে শেফালি সাংবাদিক-ই হতেন। লেখাপড়াতে খারাপ তো ছিলেন না আদৌ। প্রতিবছরেই ফার্স্ট হতেন। সামর্থ্যের অভাবে বাবা আর পড়াতে না পেরে নিতান্ত নিরুপায় হয়েই বয়েসে ওর চেয়ে, পঁচিশ বছরের বড়ো ঘণ্টেবাবুর সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলেন ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে ‘খেতে-পরতে তো পাবে’।

মৃত্যুর সময়ও বাবা আক্ষেপ করেছিলেন শেফি, তোকে পড়াতে পারলে তুই ইন্দিরা গান্ধি হতে পারতি। আমার-ই দোষ।

পৃথিবীর বৃহত্তম ডোমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট ইণ্ডিয়ার, যে-দেশের জনগণের ‘প্রতিভূরা’ জনগণের পয়সাতে রাজা-মহারাজার মতো জীবনযাপন করেন; সেই দেশের-ই ঘরে ঘরে কত কোটি শেফালিরা যে, তাদের সব মেধা ও বুদ্ধি ও সাফল্যের পর্বতশৃঙ্গ আরোহণের সব স্বপ্নকেই শুধুমাত্র গর্ভধারণ, সন্তান-পালন এবং পতি-সেবাতেই কবরস্থ করল তার হিসাব কি নেবেন সেইসব নেতারা?

শেফালির বাবা ভুলে গিয়েছিলেন যে, শেফালি পড়বার সুযোগ পেলেও কখনোই ইন্দিরা গান্ধি হয়ে উঠতে পারত না। ইন্দিরা গান্ধি, মতিলাল নেহরুর ছেলে জহরলাল নেহরুর কন্যা। একটা ‘ক্লাস’-এর ব্যাপার আছে-না? একটা ‘ঐতিহ্য’? অর্থ এবং সুযোগ-ই এই সমাজের সমস্ত ঐতিহ্যের মূলে।

শেফালি জানতেন সে-কথা। বাবা যে, কত-বড়ো বোকা তা মৃত্যুর সময়েও নতুন করে প্রমাণ করে গেলেন।

শেফালির অন্ধকার ভবিষ্যৎহীন জীবনের আকাশে জিতেন-ই একফালি চাঁদ। একমাত্রও। মাঝে মাঝে মেঘে ঢাকা পড়ে যায় বটে, তবে ফিরে ফিরে দেখাও দেয়।

অথচ শেফালির বিন্দুমাত্র রাগ বা ক্ষোভ নেই ঘণ্টেবাবুর ওপর। সে বেচারিও তো শেফালির-ই মতো পৃথিবীর এই বৃহত্তম ডেমোক্র্যাসির, এই বুলি-কপচানো, ভন্ড, রাজনীতিক নেতাদের দেশে গড্ডলিকার মতো স্রোতে-ভাসা, পরম নির্বুদ্ধি শুয়োরের মতো, বংশবৃদ্ধিকারী জনগণের মূঢ়তার-ই শিকার!

জীবনে, মানুষের মতো বাঁচতে হলে সকলকেই যে, ইংরিজি জানতেই হবে বা পড়াশুনোতে ভালো হতে হবে, বা কোনো পার্টির সদস্য হতে হবে তার তো কোনো মানে ছিল না! শেফালি পড়াশুনোতে ভালো ছিলেন। ঘণ্টেবাবু ছিলেন না। তাতে কী যায় আসে। এই পড়াশুনোর প্রকৃত তাৎপর্যটিই বা কী? মরা-পাঁঠার গায়ে কলকাতা কর্পোরেশনের কসাইখানার ছাপের-ই মতো সমান দাবি তো এইসব ডিগ্রি-ফিগ্রির। কী শেখানো হয় স্কুল-কলেজে? সে-শিক্ষাতে ‘মনুষ্যত্ব’র কি বিকাশ হয়? আর যেসব জায়গাতে ভালো শিক্ষা দেওয়া হয়, সেখানে ক-জন সাধারণ মানুষ-ই বা যেতে পারে?

এতসব গভীর কথা-টথা ঘণ্টেবাবু জানেন না, জানতে চানও না। মানুষটা সাদা-সরল, অত তলিয়ে বোঝার ক্ষমতা নেই তাঁর, কিন্তু ঘণ্টেবাবুর সঙ্গে তাঁর মালিকপক্ষের নীলোৎপল বা তার কাকার বা বাবার সচ্ছলতার, মান-প্রতিপত্তির যা-ব্যবধান তার জন্যে ঘণ্টেবাবু দায়ী নন আদৌ। দায়ী এই সমাজব্যবস্থা।

শেফালি লেখাপড়া শেখার সুযোগ পেলে হয়তো এমন চাকরি বা ব্যাবসা করতে পারতেন যে, নীলোৎপলের পুরো পরিবার তাঁর অধীনে কাজ করতেন। বা হাত-কচলাতেন সামনে দাঁড়িয়ে। এমন মেধা এবং বুদ্ধি ছিল শেফালির। কিন্তু তাঁর একমাত্র দোষ ছিল তিনি গরিবের মেয়ে। এতবড়ো দোষ তো আর নেই এদেশে! এই ব্যবধান, এই বিধান তো সমাজব্যবস্থার-ই তৈরি! বেচারি ঘণ্টেবাবুর কোনো দোষ নেই। শেফালি জানেন। প্রতিদিন আঠারো ঘণ্টা খাটেন মানুষটা। এই বয়েসেও। বনে-পাহাড়ে-কন্দরে মূল খুঁড়ে-খাওয়া বন-ভালুকের-ই মতো ঘুরে বেড়ান সকাল থেকে রাত কেন্দুপাতার সন্ধানে, কুলি মজুরদের সামলে। মালিক কম রোজ দিলে টাঙ্গি পড়ে চিরদিন ঘণ্টেবাবুদের-ই টাকে। তাঁর তো দোষ নেই। মানুষটা যদি, কুঁড়ে হতেন, কাজ না করতেন, তবে হয়তো তাঁকে দোষ দেওয়া যেত কিন্তু তা তো নন! তাই গত চুয়াল্লিশ বছর ধরে দিনে আঠারো ঘণ্টা খেটেও যদি সাচ্ছল্যের মুখ তিনি এ-জীবনে কোনোদিনও না দেখে থাকেন তবে তাঁকে দোষী করা যায় না। দোষী তাঁর মালিকেরাই। দোষী এই সমাজব্যবস্থা। শিক্ষাব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা।

বিহারের কোনো পার্টিতে নাম লিখিয়ে নিলেই নি:সন্দেহে এতদিনে রমরমা হয়ে যেত তার। কালার টি ভি, মোটরসাইকেল, ভি. সি. আর! রাজনীতি করতে, না লাগে শিক্ষা, না ভব্যতা; না পরিশ্রম। ধূর্তামি-নষ্টামি থাকলেই চলে যায়। আর সেই রাজনীতি-করা অশিক্ষিত, অমানুষ, ‘ভেড়চাল’-এর, শুধুমাত্র মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসম্পন্ন জীবগুলোর হাতেই আজকে দেশের স্টিয়ারিং। এবং এই স্টিয়ারিং, যে, দেশকে কোন জাহান্নামে নিয়ে যাবে তা, সেই মানুষগুলোই জানে।

না:! মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল শেফালির।

যাওয়ার আগে আজ জিতেন শেফালির কেটে-যাওয়া, ফুলে-ওঠা, যন্ত্রণাদায়ক বীভৎস ঠোঁটে একটি আলতো চুমু খেয়েছিল। ‘চু:’ করে শব্দ করে চুমু খেয়ে বলেছিল, তোমাকে আমি ভালোবাসি বউদি।

ওই একটি শব্দ, ‘ভালোবাসি’ শেফালির মাথায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে গেছে।

একথা অজানা ছিল না তাঁর কাছে যে, বারুদের স্তূপের ওপরেই বসেছিলেন তিনি এতদিন। তিনি অবশ্যই জানতেন। বারুদ নিয়ে খেলছেন যে, তা জানতেন কিন্তু কেউই তাতে দেশলাই ঠোকেনি। আজ জিতেন দেশলাই-কাঠিটি জ্বালাল। যেন, ছেলেবেলার কালীপুজোর রাতে আশ্চর্য-গন্ধ-লাল-নীল-দেশলাই জ্বালাল। কোনো নিষ্পাপ পুরুষ-শিশু। রং-মশাল বা তারাবাজি জ্বালাবে বলে।

পরক্ষণেই ঘটে দুর্ঘটনা। আলোয় আলোয় চোখ ধেঁধে গেল।

চৈত-বোশেখের বনে দাবানল জ্বলতে দেখেছে, শেফালি তেহার বা বেতলার আশ-পাশের পাহাড়ে। বিয়ে হয়ে, বিহারের এই নগণ্য অখ্যাত শহরে এসে থিতু হওয়ার পরে। কিন্তু সেই দাবানল যে, তাঁর নিজের মস্তিষ্কের মধ্যেও এমন করে ছড়িয়ে যাবে কোনোদিন, তা দুঃস্বপ্নেও আগে ভাবেননি।

প্রত্যেক মানুষ-ই বোধ হয় বারুদের স্তূপের ওপরেই বসে থাকেন সারাজীবন। শেফালির-ই মতো; কেউ লাল-নীল-দেশলাই নিয়ে এসে কোনো অবহেলাতে তাতে অগ্নিসংযোগ করবে বলে। আগুনের কতরকম হয়, প্রতীক্ষা কত না দীর্ঘ এবং বিচিত্র হয়, দাবানলও কত শীতল হয়, কখনো কখনো; তা যিনি জানেন তিনি জানেন।

হ্যাঁ। কখনো কখনো।

শেফালির ঠোঁটে খুব-ই যন্ত্রণা হচ্ছিল। উঠে বাথরুমে গেলেন শেফালি। ফিরে এসে, ওষুধটা খাবেন ভাবলেন। ব্যথা বাড়লে, ডাক্তার যে-ওষুধটা খেতে বলে গিয়েছিলেন।

বাথরুম থেকে ফিরে কী মনে করে ওষুধটা আর খেলেন না।

ওঁর যন্ত্রণার সঙ্গে জীবনের প্রথম চুমুর অপরাধের, পরকীয়ার লজ্জাকর সুখ মিশে আছে যে! ব্যথার উপশম হলেই, সেই অনুভূতিটা হারিয়ে যাবে। থাক, আজ রাতভর ব্যথাটা থাক-ই। জ্বরও থাক। প্রায় ভুলে-যাওয়া একটি মনোরম অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কল্পনাতে অন্য কোনো অভিজ্ঞতার কথা মনে করার চেষ্টা করবেন বাকি রাত শেফালি, যে-অভিজ্ঞতার, গত প্রায় পনেরো বছরে একবারও পুনরাবৃত্তি হয়নি ঘণ্টেবাবুর সঙ্গে। থাক, জ্বর থাক।

জিতেনের প্রেমময়, সুন্দর, নবীন, নিষ্পাপ মুখটা মনে করে চোখ বুজলেন শেফালি।

ডাক্তারেরা কতটুকু জানেন? কী জানেন মানুষের মনের? একগাদা অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ খেতে দিয়ে গেছেন। টেডভ্যাক ইনজেকশন। আরও কীসব।

ডাক্তারেরা কি জানেন যে, কাম-জ্বর বলেও একধরনের জ্বর আছে? যে-জ্বর রাধার হত? কৃষ্ণ-ভাবনায়?

ঘণ্টেবাবু বললেন, ঘুমের মধ্যে, না বাবু? আমি তো মাল লোড করে দিয়েছিলাম বাবু বিষেণ সিং-এর ট্রাকে। না বাবু। চাকরিটা খাবেন না বাবু। বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে পথে বসে যাব। না বাবু।

শেফালি কনুইয়ে ভর করে উঠে বসে ঘণ্টেবাবুর চোখের দিকে চেয়ে দেখলেন। দেখেই...। দু-চোখের কোণে জল। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে গেলেন তিনি। কিন্তু ঠিক সেই সময়েই ঘণ্টেবাবু চোখের পাতা মেললেন।

বললেন, কী হল? ব্যথা কি বেড়েছে? ওষুধ দেব?

না, না।

বলেই, শুয়ে পড়লেন শেফালি, অনেক বছর পরে; ঘণ্টেবাবুর কোল ঘেঁষে।

কোনো মানুষ যখন নিরুপায়, অসহায় হন, তাঁর নিরুপায়তা বা অসহায়তার নিরসনের ক্ষমতা যাঁর হাতে নেই, এমন মানুষের পক্ষে সেই মানুষকে সান্ত্বনা দিতে যাওয়াটা তাকে অপমান করারই নামান্তর।

তাই বুদ্ধিমতী শেফালি বিরত থাকলেন। কিছুমাত্রই বলা বা করা থেকে।

শেফালি তার খুব-ই কাছ ঘেঁষে আজ হঠাৎ শোওয়াতে ঘণ্টেবাবু বাঁ-পাশ ফিরে শুয়ে শেফালির কোমরের ওপরে ডান হাতখানি রেখে একটি গভীর নিশ্বাস ফেলে বললেন, তোমাকে বিয়ের দিন থেকে শুধু কষ্টই দিয়ে এলাম।

শেফালির বাহুতে ঘণ্টেবাবুর চোখ-গড়ানো জলের ফোঁটা পড়ল।

চমকে উঠলেন শেফালি।

যে-চোখে জিতেনের সুন্দর, সজীব, প্রেমময় মুখের স্বপ্ন আঁকা ছিল একমুহূর্ত আগে সেই চোখ দু-টিই মুহূর্তের মধ্যে তাঁর অযোগ্য স্বামী ঘণ্টেবাবুর জন্যে, এক গভীর কষ্টে জলে ভরে গেল।

শেফালি অস্ফুটে বললেন, কষ্ট কীসের?

তা ছাড়া, বিয়ে করে কষ্ট তুমিও তো কম পাওনি!

দেওয়ালের গায়ে একটা বড়ো কালো টিকটিকি একটা ছোট্ট পোকার দিকে খুব আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছিল। পোকাটা বোকা।

শেফালি ভাবছিলেন, মানুষ হয়ে জন্মানো বড়োই কষ্টের। ভারি কষ্টের। বড়ো বিচিত্র মানুষের এই মন। তাঁর মাথার মধ্যে বুকের মধ্যে যে, কতগুলো মানুষে একইসঙ্গে ঘর পেতেছে! তাঁদের সকলকে তিনি চেনেনও না পর্যন্ত। একজনের সঙ্গে অন্যজনের কোনো সম্পর্কই নেই। আশ্চর্য! অথচ সবাই আছে জড়িয়ে-মড়িয়ে, যাত্রাদলের গ্রিনরুমের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের মতো। কে যে ,কখন কোন, বেশে এসে, কোন ভূমিকাতে জীবনের মঞ্চে হঠাৎ প্রবেশ করবে তা কেউই আগে থাকতে জানে না। এই যাত্রাতে কোনো অধিকারী নেই। নির্দেশক নেই। ক্ল্যারিওনেটবাদকও নেই।

তবে, এই যাত্রায় বিবেক অবশ্যই আছে।

সে মাঝে-মাঝেই সাদা পোশাক পরে এসে গান গেয়ে যায়।

ভাগ্যিস বিবেক আছে।

শেফালি, তার কোমরে-রাখা ঘণ্টেবাবুর হাতটা, তাঁর গোবেচারা স্বামীর হাতটা; নিজের বুকের কাছে টেনে নিলেন তাঁর ডান হাত দিয়ে। অনেক বছর পরে।

পবননন্দন আগরওয়ালার বাড়ির পেটা ঘড়িতে রাত দুটো বাজল।

ঢং। ঢং।

দেখতে দেখতে আরও দু-টি দিন কেটে গেল।

গত বৃহস্পতিবারে সুনীতি আনন্দিত, উত্তেজিত হয়ে নীলোৎপলদের আসার অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু এ-সপ্তাহে বৃহস্পতিবার যতই এগিয়ে আসতে লাগল ওঁর হাত-পা যেন ভয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যেতে লাগল। ঘণ্টেবাবুও যদি সময়মতো না আসেন তাহলে যে, তিনি ওই অপরিচিত মানুষদের নিয়ে কী ফাঁপরেই পড়বেন সে-কথা ভেবেও অত্যন্তই অস্বস্তি হচ্ছিল তাঁর।

শেঠ চিরাঞ্জিলালের গদিঘরে বসে কাজ করতে করতে শিরীষ প্রার্থনা করেছিল যে, বৃহস্পতিবার যেন না আসে এই সপ্তাহে আদৌ। তার আগেই যেন, পঞ্জিকাতে আদ্যন্ত বদল ঘটে যায়। কোনো দৈবী-প্রক্রিয়ায়। বৃহস্পতিবার সম্বন্ধে তার অস্বস্তি ছিল দু-টি কারণে। প্রথমত নীলোৎপল এবারে নিশ্চয়ই আসবে এবং সম্ভবত তার কাছ থেকে ঝিঁঝিকে সে কেড়েও নিয়ে যাবে শহর কলকাতায়। যেখানে, মানুষ একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে আসে না।

দ্বিতীয়ত বৃহস্পতিবার আবারও এলেই তাকে পড়াতে যেতে হবে গুঞ্জনকে। মুখোমুখি হতে হবে তার। এবং সেই মুখোমুখি হওয়া তার জীবনে নদীর এক প্রধান বাঁকের-ই মুখোমুখি হওয়া। গেলে, কী যে হবে তা ও নিজেই জানে না। না-গেলে কী হবে, তাও জানে না।

ও জানে না, ঝিঁঝির ওর প্রতি ভালোলাগাটা কতখানি গভীর এবং সেটা আদৌ ঘর-বাঁধার মতো জোরালো কি না!

কিন্তু গুঞ্জন, তার নিজের মনের কথা অত্যন্ত স্পষ্ট করেই প্রকাশ করেছে শিরীষের কাছে। শুধু স্পষ্টভাবে প্রকাশ-ই করেনি, অত্যন্ত সুন্দরভাবেও করেছে; যেমন করে, খুব কম মানুষ-ই করতে জানে। ইংরিজিতে একটা কথা আছে-না? ‘‘To say it with Flowers!’’ নরম সুগন্ধি হাসনুহানা ফুলকে তার নরম, ভীরু ভালোবাসার বাহন যে, মেয়ে করতে জানে, তার ভালোবাসার রকমটাও নিশ্চয়ই ফুলগন্ধীই হবে।

তা ছাড়া, যখন-ই ‘নরাধম’-এর কথা মনে হয় শিরীষের তখন-ই মনে হয়, একটা হুলো-বেড়ালের মুখ থেকে নরম, ধুকপুক-বুক-এর কোমল অথচ দৃঢ় কবুতরটিকে বাঁচানো এখন ওর নৈতিক দায়িত্বও বটে। নরাধমকে ও প্রথম দর্শনের ক্ষণ থেকেই অপছন্দ করে এসেছে বলেও এই কর্তব্যটি ও সানন্দেই করতে চায়। গুঞ্জনকে বিয়ে করে ও গুঞ্জনদের সমাজের পণ-প্রথার বিরুদ্ধে জাজ্বল্যমান বিদ্রোহের উদাহরণও হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক নেতাদের মতো শুধুই কথার ফুলঝুরির উৎসার নয়, কাজে করেই ও দেখাতে পারে। নরাধমদের চোখের সামনে ও গুঞ্জনকে নিয়ে সুখে ঘর করে অনুক্ষণ তার মুখে, না-মেরেও থাপ্পড় মারতে পারে। শিক্ষার বাহ্যিক আড়ম্বর বা ইংরিজি জ্ঞানের অর্থহীন ঔজ্জ্বল্য ছাড়াও যে, একজন মানুষ পুরোপুরি শিক্ষিত, সভ্য ও ভদ্র হতে পারে, তার মূর্ত প্রমাণ গুঞ্জন। যতটুকু না শিখলেই নয়, তা শিখিয়ে নেবে শিরীষ গুঞ্জনকে, ধীরে ধীরে। শুধু রাঁধুনি আর নর্মসহচরীই নয়; গুঞ্জনকে সে প্রকৃতার্থেই জীবন-সঙ্গিনী হিসেবে গড়ে নেবে।

প্রেম জিনিসটা বোধ হয় আকাশ থেকে পড়ে না, এই কথাটি শিরীষ ক্রমাগতই ভাবছে। তা বোধ হয় জমিতেই ফলে। এবং সেই জমিটি হচ্ছে দয়া, মায়া, প্রীতি, সহমর্মিতা, সখ্যতা, সমরুচি এবং অনেক সময়ে অনুকম্পাও। এইসব জমিতে কোন শুভক্ষণে অজানিতে যে, হঠাৎ ওই প্রেম অঙ্কুরিত হয় অন্য মনের বর্ষার প্রথম বর্ষণে তা বোধ হয় না জানে, সেই জমি নিজে; না জানে বৃষ্টি। গুঞ্জনের মুখ থেকে, পুনমচাঁদবাবুর মুখ থেকে, ওদের সমাজের সব কথা শোনার পরে, নরাধমকেও কাছ থেকে জানার পরে, শিরীষের মনে গুঞ্জনকে বাঁচানোর জন্যে, একধরনের ‘শিভালরি’ উঁকি-ঝুঁকি মারছে যেন, সেই বিকেল থেকেই। জীবন যৌবনের প্রতিমূর্তি কোনো কাল্পনিক সাদাঘোড়ায় চড়ে, বর্শা-হাতে, বর্মে, অঙ্গদে, কুন্ডলে, শিরস্ত্রাণে, সেজে, পুরোনো দিনের কোনো বীর যোদ্ধার-ই মতো সে বর্শার ফলাতে নরাধমকে এবং গুঞ্জনদের সমাজের অন্যায় অবিচারকে গেঁথে ফেলে গুঞ্জনকে সেই ঘোড়াতেই, তার সামনে বসিয়ে, ঘোড়া ছুটিয়ে টগবগিয়ে চলে আসতে ইচ্ছে করে ওর। বীরত্ব, ন্যায় এবং শুভবোধের প্রতীক হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে ওর, যেসব গুণপনা আজকাল নাবাল-জমির তৃণকণার-ই মতো ধূর্তামি, ধাষ্টামির ছাগলেরা অবিরতই মুড়িয়ে খাচ্ছে, যেসব গুণপনা আজকের দিনে মূর্খামির-ই নামান্তর।

কিন্তু তবুও প্রচন্ড সুখের কথা এই যে, আজও পৃথিবীতে শিরীষের মতো কিছু মূর্খ বেঁচে আছে, হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছে এবং শুধুমাত্র সেই মূর্খরাই জানে; মূর্খামিতে কী গভীর সুখ। ‘সততা’র মধ্যে কী অন্তর্লীন শান্তি। রাতের ঘুম। সৎ-সাহসের মাধ্যমে অনাগত দিনের প্রজন্মর বড়ো অভাগা মানুষদের জন্যে বিরাট স্বরাট এক, সতেজ শ্যামল ঋজু মহীরুহর সুপ্তবীজ এখনও গোপনে রোপণ করা যেতে পারে। শিরীষের মনে হয় যে, এই প্রজন্মর সব মানুষের-ই অবশ্য-পালনীয় কর্তব্য আগামী প্রজন্মকে কিছু দিয়ে যাওয়া। এইসব বোধের কণামাত্রও যদি আগামী প্রজন্মের মানুষদের মধ্যে চারিত করে দিতে পারে, জারিত করে দিয়ে যেতে পারে শিরীষ তার ব্যক্তিগত জীবনের দৃষ্টান্ত দিয়ে; তবে বড়ো খুশি হবে ও। তার চেয়ে বড়ো উত্তরাধিকার আর কীই বা রেখে যাওয়ার থাকতে পারে তার নিজের সন্তান এবং উত্তরসূরিদের জন্যে!

শিরীষের গভীর বিশ্বাস আছে যে, চিরদিন-ই সততা, ভালোত্ব, বীরত্ব এবং সৎ-সাহসেরই জয় হয়েছে। এবং ভবিষ্যতেও হবে। এই অসৎ, নীচ, সস্তা, টাকা ও ধূর্তামি-সর্বস্ব পৃথিবীতে বাস করেও শিরীষ এই বিশ্বাসকে তার অন্তরের গভীরে প্রোথিত করে রেখেছে।

গুঞ্জন এখন তার ‘অ্যাসিড-টেস্ট’। মানুষ কী অমানুষ, তা প্রমাণ করার পরমপরীক্ষাতে কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়া হঠাৎ-ই বসতে বাধ্য করেছে এই স্বল্পচেনা, অন্য-প্রদেশীয়, অন্য-তরঙ্গমালার গুঞ্জন তাকে। এই পরীক্ষাতে কোনো ডিভিশন বা ক্লাস নেই। শুধুমাত্র পাশ আর ফেল আছে। এই পরীক্ষাতে ফেল করলে, শিরীষের ভবিষ্যৎ-জীবনের সব সুখের মধ্যে অনুক্ষণ একটি সরল, নিষ্পাপ, অভাগী মেয়ের দীর্ঘশ্বাস জড়িয়ে থাকবে। যে-আনন্দে, যে-সুখে, অন্যের ‘দীর্ঘশ্বাস’ জড়ানো থাকে তা আজীবন বয়ে বেড়ানো বড়োই অস্বস্তির। অমন আনন্দ বা সুখ কখনোই চায়নি শিরীষ।

শিরীষকে না হলেও ঝিঁঝির সহজেই চলে যাবে। শিরীষের চেয়ে সর্বার্থেই অনেক ভালো ছেলে, নীলোৎপল, রক্তোৎপল, শ্বেতোৎপলেরা এসে ঝিঁঝিকে সসম্মানে নিয়ে যাবে কিন্তু বেচারি গুঞ্জনের তো শিরীষ ছাড়া আর কেউ-ই নেই! গুঞ্জনের বাঁচা এবং এবং মরার মধ্যে একমাত্র সেতু যে, এখন সে-ই।

তা ছাড়া, ঝিঁঝির ওপরে অভিমানও যে, ওর কিছু জমেনি; তাও নয়। ঝিঁঝি তো একমুহূর্তের জন্যেও শিরীষের ওপরে নির্ভর করেনি। সে-কারণেই শিরীষের বিন্দুমাত্রও দায়িত্ব-কর্তব্য থাকার কথা নয় ঝিঁঝির প্রতি। ঝিঁঝি বোকাও নয়। ঝিঁঝির যদি, তার প্রতি বিন্দুমাত্র দুর্বলতাও থেকে থাকে তবে তারসঙ্গে সম্মানেরও ছিটেফোঁটা জড়িত থাকবে এই প্রত্যাশাই ছিল শিরীষের। শিরীষকে কণামাত্র সম্মান করলে, তার স্বামীর জন্য পেঁপে-কাঁচকলা বাহকের কাজে নিয়োজিত করত না ঝিঁঝি তাকে। ঝাণ্ডুর সমগোত্রীয় ভেবে স্টেশনে ডিউটি দিতে বলত না আগন্তুকদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্যে! শিরীষ যে, কোনোদিনও নীলোৎপল বা যেকোনো উৎপলের সমকক্ষ হতে পারে না, ও যে, এই জঙ্গল-পাহাড়ের কটুগন্ধী পুটুসফুল-ই মাত্র, পদ্ম নয়; তা ঝিঁঝি এবং কাকিমা প্রমাণ করে দিয়েছেন। এই সত্য সম্বন্ধে অবহিত হওয়ার পর থেকেই ঝিঁঝির প্রতি এক গভীর অভিমান-ই শুধু নয়, তীব্র এক বিরক্তিও বোধ করেছে এ ক-দিন হল।

রাগ হয়েছে শিরীষবাবুর।

আগামীকাল রাতে ডালটনগঞ্জ থেকে রয়ানা দেবেন ঘণ্টেবাবু। সেজোবাবুকে লেখা চিঠির কোনো উত্তর আসেনি আজ অবধিও। অথচ ক্যুরিয়ার আসে কলকাতা থেকে রোজ-ই। তাড়া তাড়া চিঠি, ব্যাঙ্কের বিলটি, চেক, টাকা আসে রোজ অথচ তাঁর নামেই কোনো চিঠি এল না।

মন বলছে, কোনো সাংঘাতিক গড়বড়-টড়বড় হয়ে গেছে। ওঁরা হয়তো আগামী বৃহস্পতিবারও আসবেন না। আর তাঁদের না আসার অর্থ তাঁর এক্সটেনশনও না-পাওয়া। আর ওঁরা না-এলে, সুনীতির কাছে, ঝিঁঝির কাছে, ‘মনোয়া-মিলন’-এর প্রত্যেকের কাছেই তো তিনি চিরজীবনের-ই মতো খেলো, সস্তা হয়ে যাবেন, আর কি মুখ দেখাতে পারবেন কোনোদিনও?

অথচ, রামকৃষ্ণদেবের দিব্যি; ঝিঁঝির সঙ্গে নীলোৎপলের সম্বন্ধটা যখন করেন তখন কিন্তু সুমন ব্যানার্জির কাছে তাঁর গভীর ঋণ, পাত্রী এবং পাত্র হিসেবে ঝিঁঝি এবং নীলোৎপলেরও ‘ভালোত্ব’ই সত্যি সত্যিই তাঁকে চালিত করেছিল।

অন্য কোনো উদ্দেশ্য তখন আদৌ ছিল না।

সুনীতি নিজেও জানেন না আজ অবধিও যে, ঘণ্টেবাবু ডালটনগঞ্জে বাড়িটি বানাবার সময়ে এবং তাঁর বিয়ের সময়েও তাঁর মালিকেরা একটি পয়সা দিয়েও সাহায্য করেননি। সব টাকাই দিয়েছিলেন সুনীতির স্বামী সুমন ব্যানার্জিই। চাইতেও হয়নি। নিজেই ঘণ্টেবাবুকে যেচে দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ স্বার্থহীন, গোপন দান। ব্যানার্জিসাহেবের ডান হাত দান করলে, বাঁ-হাত কখনো জানেনি।

তারপরেও উনি কত কী করেছেন। পাগলা এবং ছুটকির মুখেভাতে পাঁচ হাজার করে টাকা দিয়ে ওদের নামে ফিক্সড ডিপোজিট করে দিতে বলেছিলেন। তখন টাকার মূল্যও অনেক-ই ছিল। কে করে? তার বদলে কী এবং কতটুকুই বা করেছেন ঘণ্টেবাবু ব্যানার্জিসাহেবের জন্যে এ-জীবনে? তবে হ্যাঁ, অসততা করেননি। মনোয়া-মিলনের ব্যানার্জিসাহেবের ‘মহুয়া’ বাড়িটি নিজে ছুটি নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে থেকে তৈরি করিয়েছেন। সব খরচ-ই হয়েছিল তাঁর-ই হাত দিয়ে। একটি পয়সাও এদিক-ওদিক করেননি। সেই চলে-যাওয়া মানুষটির-ই, কালো যদিও, কিন্তু সপ্রতিভ, সুরুচিসম্পন্না, সচ্চরিত্র-মেয়ের ভালো হোক, এইটেই তিনি স্বাভাবিকভাবে চেয়েছিলেন মনে-প্রাণে।

মাথাতে এক্সটেনশনের চিন্তাটা এসেছিল অনেক-ই পরে। এই সম্বন্ধ উত্থাপনও প্রথমবার করেন বছর তিনেক আগে সেজোবাবুর কাছে। তা ছাড়া, নীলোৎপল তাঁর মালিক হলেও সম্পূর্ণই অন্য ধরনের মালিক। তার বাবা-কাকার সঙ্গে কোনোই মিল নেই তার চরিত্রের। সম্ভবত সে-তার মায়ের চরিত্রই পেয়েছে। মাতৃমুখী সন্তানও। উদার, নম্র, যদিও প্রচন্ড বদরাগি; রেগে গেলে চিৎকার করে কথা বলে; কিন্তু ক্ষতিকারক নয় কারোর-ই। ওর বাবা-কাকারা কোনোদিনও গলা উঁচু করে কথা কারো সঙ্গেই বলেননি কোনোদিনও কিন্তু যাঁদের তাঁরা অপছন্দ করেন বা যাঁরা মুখের ওপরে ন্যায্য কথা বলেছেন তাঁদের, সেইসব মানুষদের কোনোরকম ক্ষতি করতেই বাধেনি তাঁদের।

তাঁদের মুখের ভাব বদলায় না। রাগ অথবা খুশি কিছুই বোঝা যায় না তাঁদের মুখের দিকে চেয়ে। পাথরের মতো শক্ত, শীতকালের মাটির মতো ঠাণ্ডা, অজগরের চাউনির মতো ভয়াবহ চাউনি তাঁদের। চোখে চেয়ে থাকা যায় না বেশিক্ষণ।

নীলোৎপল অন্য প্রজন্মের মানুষ। শিক্ষিত, উদার; খোলামেলা। ঝিঁঝি মায়ের সঙ্গে ওকে মানাত খুব-ই আর ব্যানার্জিসাহেবের মেয়ে শুধু ভালো স্বামীই পেত না, ফিরে পেত হারিয়ে-যাওয়া সব জাগতিক স্বাচ্ছন্দ্যও। সুখী হত সর্বার্থেই। এইজন্যেই ঘণ্টেবাবুর এত মাথা-ব্যথা। সকলের ভালোই করতে চেয়েছিলেন উনি। সেই ভালো করার সঙ্গে সঙ্গে যদি, তাঁর নিজেরও একটু ভালো হত, যে-ভালোর ওপরে তাঁর স্ত্রী-ছেলে-মেয়ের পুরো ভবিষ্যৎটাই নির্ভরশীল; তাহলে তাতে অন্যায়ই বা কী ছিল। প্রাথমিক স্তরে তাঁর নিজের ভালোর কথাটা সত্যিই একবারও ভাবেননি উনি। তখন মালিকেরা যদি, তাঁকে অমন নীচ বলে মনে করেন, তাহলে তাঁর আর কী করণীয় থাকতে পারে।

সুমন ব্যানার্জি তাঁদের কর্মচারীকে আর্থিক সাহায্য করেছেন একাধিকবার, যখন তাঁরা নিজেরা তা করতে অপরাগ বলে জানিয়ে দিয়েছেন, এই কারণেও ব্যানার্জিসাহেবের ওপরে রাগ ছিল ওঁদের। ‘কর্মচারী’ হচ্ছে মালিকের প্রজার-ই মতো। তাঁদের-ই গরিব প্রজাকে অঢেল অর্থসাহায্য করে ‘বড়োলোকি’ দেখানোর অপরাধে চিরদিন-ই ব্যানার্জিসাহেবকে দোষী করে রেখেছিলেন ওঁরা। বদলাও হয়তো কিছু নিতেন কিন্তু তার সুযোগ না দিয়ে পরপারে পার হয়ে গিয়েছিলেন ব্যানার্জিসাহেব।

গরিবের, অভাগার, অভাবীর উপকার করাটাও কারো কারো চোখে ‘অহংকার’-এর প্রকাশ বলে ঠেকে। ঠেকে, এইজন্যেই যে, শুধুমাত্র টাকা ছাড়া সেইসব মানুষদের ‘অহং’-এর আর কিছুমাত্রই থাকে না বলে। এই সংসারে যে, যেমন মানুষ সে, সমস্ত সংসারকে তেমন চোখেই দেখে। যে মহৎ বা উদার, সে সকলের মধ্যের ভালোটুকুই দেখে আর যে নীচ, কুটিল, বক্র তার দৃষ্টিও ঠিক সেইরকম-ই হয়। সে প্রত্যেককেই নীচ, কুটিল বা বক্র বলে জানে। এই সর্বমান্য নিয়মকে অগ্রাহ্য করেন এমন উপায় তো নিরুপায় ঘণ্টেবাবুর নেই।

গতকাল বাজার থেকে একটা লাউ কিনে এনেছিলেন ঘণ্টেবাবু। ধনেপাতা ও বড়ি দিয়ে লাউয়ের ছেঁচকি খেতে ভালোবাসেন উনি। শেফালি কাঁচা কলাই-এর ডাল রেঁধেছেন। বেগুন দিয়ে তেঁতুলের টক করেছেন আগেই। নিম-বেগুন ভাজা। এখন লাউ-এর ছেঁচকিটা বসিয়েছেন। হঠাৎ-ই গরম পড়ে গেছে গতকাল থেকে ডালটনগঞ্জে। এই সময়ে এমনটা হওয়ার কথা নয়। হয়তো ঝড়-বৃষ্টি হবে। হলে, বাঁচা যায়। দশটা বেজে গেলেই হাওয়াটাতে ‘লু’ ‘লু’ ভাব আসে। উঠোনময় শুকনো পাতা গড়াতে গড়াতে ছড়াতে থাকে হাওয়াটা। সঙ্গে ধুলো।

মোড়াটা রান্নাঘরের বাইরে এনে বসলেন একটু শেফালি। আঁচল দিয়ে মুখ, গলা, ঘাড় ও বুকের ঘাম মুছলেন। বাড়িতে এখন কেউই নেই। পাগলা ও ছুটকি স্কুলে। ঘণ্টেবাবু বিড়ি-কোম্পানিতে, যখন একা থাকেন তখন-ই বুকের মধ্যে একটা চাপা কষ্ট বোধ করেন শেফালি। বিশেষ করে সেদিনের পর থেকে।

ঠোঁটের ব্যথা চলে গেছে তবে ঘা শুকুতে দেরি হবে মনে হয়। আর মনের ঘা? সে কি আদৌ শুকুবে? কে জানে?

দাঁড়কাকটা আবারও এসে বসল। কী যে দেখে, চোখের মণিটা ঘুরিয়ে, চকচকে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, তা ও-ই জানে। কাকের চোখের মণি যে, এমন করে ঘোরে, তা উনি ছেলেবেলা থেকে অগণ্য কাক দেখলেও কখনোই লক্ষ করেননি। তাঁর মেয়ে ছুটকির-ই আবিষ্কার এটা। আসলে, প্রতিদিন কত জিনিস-ই তো আমাদের চোখে পড়ে, ভাবছিলেন শেফালি; ‘চোখে-পড়া’ আর ‘দেখা’ বোধ হয় এক কথা নয়। ‘চোখ’ তো সকলের-ই থাকে কিন্তু ‘দেখার চোখ’ বোধ হয় কম মানুষের-ই থাকে। কে, কী দেখে এবং কেমন করে দেখে; তার ওপরেই সবকিছু নির্ভর করে। জিতেন যেমন দেখেছিল শেফালিকে। এবং শেফালি দেখেছিলেন জিতেনকে।

‘দেখেছিল’ শব্দটা মনের মধ্যে আপনি গড়ে উঠেই ভেঙে গেল। দেখে, এখনও দেখে; বলল না মন। বলবার সাহস হল না। কেন?

জিতেন কি সত্যিই আর আসবে না তাঁর কাছে? যদি না আসে, তবে কী নিয়ে, কেমন করে বাঁচবেন শেফালি?

তাঁর স্বামীকে তো তিনি সব-ই দেন, যা-কিছুতেই তাঁর প্রয়োজন। যাতে তাঁর প্রয়োজন নেই, যেমন শেফালির একান্ত অবকাশ অথবা শেফালির শেফালি-ফুলের-ই মতো শরীর; তা তো তিনি জিতেনকে দিতে পারেন। দিলে, কী এমন ক্ষতি? অব্যবহারে যা-কিছুই মৃত তা, ব্যবহারে যদি নতুন জীবন পায় তাতে কার ক্ষতি? কে জানে! ক্ষতি হয়তো আছেও।

ঘণ্টেবাবু বুড়ো হয়ে যেতে পারেন, যদিও আজকাল ষাটবছরে কেউ-ই বুড়ো হয় না; ঘণ্টেবাবুর জীবনযাত্রা এবং মানসিকতাই তাঁকে ‘বুড়ো’ করে দিয়েছে, কিন্তু শেফালি তো এখনও বুড়ো হননি। আরও দশবছর তিনি ঋতুমতী হবেন। এখনও উর্বর আছেন তিনি। এখনও একজন পুরুষকে শুধু, শরীরী সুখ-ই নয়, সন্তান পর্যন্ত দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

আর মন? তাঁর মনটা যে, শুকিয়ে টাঁড় হয়ে গেছে। প্রায় মরুভূমি। তাঁর স্বামী কোনোদিন-ই মনের কারবারি ছিলেন না। হয়তো অধিকাংশ পুরুষ-ই তাই। এবং প্রত্যেক বিবাহিতা নারীর-ই দাম্পত্যর ঘরের লাগোয়া যে, একফালি বারান্দা আছে এবং থাকে, তাতে যদি জিতেন মাঝেমধ্যে এসে দাঁড়াত, শীতের রোদ, গ্রীষ্মের চাঁদের আলো, বর্ষাদিনের কদমফুলের সুবাস হয়ে, তাতে কী খোয়া যেত তাঁর স্বামীর? কী ক্ষতি হত এই ব্যস্ত, স্বার্থপর পৃথিবীর?

তবে যা হয়েছে, বোধ হয় ভালোই হয়েছে। ওঁর আর জিতেনের সুন্দর, সুস্থ, মনের ভালোবাসাটা ক্রমশই দু-জনের অজানিতেই শরীরের ভালোবাসার দিকে হয়তো গুটি গুটি লোভী বেড়ালের মতো এগিয়ে যাচ্ছিল।

কিছু কিছু সম্পর্ক থাকে, সেসবের পরিণতি অমোঘ; অপ্রতিরোধ্য। ফাঁকা বাড়িতে একজন শারীরিক-ব্যাপারে অনভিজ্ঞ, কল্পনা-বিলাসী বত্রিশ বছরের টগবগে যুবক আর অভিজ্ঞা, মা-হওয়া, পঁয়ত্রিশ বছরের পুরোপুরি সেক্স-স্টার্ভড এক যুবতী কোনো দাঁড়কাক-ডাকা গ্রীষ্মদুপুরে হঠাৎ-ই কখন যে, একে অন্যের অঙ্গাঙ্গি হয়ে পড়তেন তা একমাত্র মদনদেব-ই বলতে পারেন। ব্যাপারটা ঘটবার আগে অনেক মাস-বছরের প্রস্তাবনা থাকে। অনেক হাসি, গল্প, সাহিত্য ও তত্ত্বের নিষ্পাপ আলোচনা। কিন্তু যখন ঘটে যায়, তখন কয়েক মিনিটেই বহুবছরের রোমান্টিকতা, ফুল ও চকোলেট, কবিতা, গান, শিল্পচর্চা হঠাৎ-ই উৎসাহিত দু-টি শরীরের আঁচড়ে, কামড়ে, ঘামে, আলিঙ্গনে, অস্ফুট এবং স্ফুট প্রেমময় এবং কপট-কলহর স্বগতোক্তিতে মাখামাখি হয়ে গিয়ে রমণীর মসৃণ তলপেটের রোমশ কাঠবিড়ালিটি দলিত-মথিত হতে পারে দু-জনেরই তাৎক্ষণিক ইচ্ছায়। আর কোন শুভ বা অশুভ ক্ষণে যে, সেই ঘটনা ঘটবে, তা পূর্বমুহূর্তেও কেউ জানতে পারেন না। পরমপবিত্র দৈবী-প্রেমের মুখোশের আড়ালেও নিতান্ত জান্তব—কাম গোপনে থাকেই; বাঘের নরম থাবার মধ্যে লুকোনো প্রখর নখের-ই মতো।

প্রেমিকা পুরুষ ও প্রেমিকা নারীর এই অবধারিত গন্তব্য। বিধাতা-নির্দেশিত এই পরিণতি ঠেকাবার কোনো উপায়-ই নেই তাদের কারোর-ই।

জিতেন কি আর সত্যিই আসবে না?

দাঁড়কাকটা বলল, ‘ক্ব-খব-ক্ব-আ-আ’।

হঠাৎ পেঁপেগাছের দিকে উদাস উদ্দেশ্যহীন চোখে চেয়ে-থাকা শেফালির কানে সেই ‘ক্ব-আ-আ’ আওয়াজটাকে হঠাৎ-ই ‘ন্ব-আ-আ’ বলে মনে হল। ‘ন্ব-আ-আ’ করে।

তাঁর দু-টি চোখ জলে ভরে গেল।

মনে মনে নিরুচ্চারে বললেন, শেফালি, সেই নিষ্ঠুর-গ্রীষ্ম-সকালকে উদ্দেশ করে—জিতেন! জিতু! তুমি ছাড়া আমার এই জীবনে, এই অভ্যাসের, এই দৈনন্দিনতার, এই দারিদ্র্যর, এই আনন্দহীন জীবনে যে, আর কেউই নেই! কিছুমাত্রই নেই! তোমার জন্যে আমি স্বামী-ছেলে-মেয়ে সংসার সব ত্যাগ করে যেতে পারি। চলো, আমরা কোথাও পালাই। পালিয়ে যাই দু-জনে। নতুন করে ঘর পাতি। পাগলা ও ছুটকি আমার কে? পাগলা বড়ো হবে, আর দশজন শিক্ষিত বঙ্গসন্তানের-ই মতো কোনো মাড়োয়ারি, গুজরাটি পাঞ্জাবির চাকর হবে। তারপর বিয়ে করবে। বউ নিয়ে আলাদা হয়ে যাবে। যাবেই। ছুটকির বিয়ে হয়ে সেও চলে যাবে শ্বশুরবাড়ি। কারণ সে, পড়াশুনোতে ভালো হওয়া সত্ত্বেও তাকে আর পড়াতে পারবেন না ঘণ্টেবাবু। সেও, তার চেয়ে বয়সে অনেক বড়ো কাউকে বিয়ে করবে, দায়ে ঠেকে। এবং শেফালির-ই মতো রান্না করবে, সন্তান উৎপাদন করবে এবং স্বামী-সন্তানের জন্যে নিজের জীবনের সব, সুখ-আহ্লাদ-আনন্দ তিল তিল করে গলা টিপে মেরে শেফালির-ই মতো হঠাৎ আবিষ্কার করবে একদিন যে, জীবনটা, মাত্র একটামাত্র জীবন—এমনি করে না-বুঝে, না-জেনে মিছিমিছি নি:শেষে নষ্ট করে বসে আছে। তার মাও যেমন করেছিলেন একদিন। বিয়ে যে, কেন করতেই হবে, স্বামী-পুত্র-কন্যা নিয়ে, যুগযুগান্ত ধরে, এই ধরা-বাঁধা ছক-এর মধ্যে নিজেকে ফেলে অন্য চিন্তা ভাবনার শক্তি অথবা ইচ্ছাধীন অগণ্য মূর্খরা যা চিরদিন-ই করে এসেছে তার নিপুণ অনুকরণপ্রিয়তা কেন যে, মাছি-মারা-কেরানির-ই মতো করতেই হবে প্রত্যেক মেয়ের-ই, তা শেফালি কিছুতেই ভেবে পান না, আজকাল। বিশেষ করে জিতেন তাঁর জীবনে আসার পরে।

এতদিন এই তাঁর ‘ভাগ্য’ বলে এই জীবনকেই বিনা-প্রতিবাদে বিনা-অনুকরণে মেনে নিয়েছিলেন। না। ছুটকিকে তিনি লেখাপড়া শিখিয়ে স্বাবলম্বী করবেন। স্বয়ম্ভর। বিয়ে দেবেন না। বিয়ে না-করেও জীবন অবশ্যই পুরোপুরি উপভোগ করা যায়, যদি স্বাবলম্বী হওয়া যায়। তাঁরা ভুল করেছেন, তেমন ভুল ছুটকিদের করতে দেবেন না শেফালি!

না জিতু। তুমি ওরকম নিষ্ঠুর হোয়ো না। এসো, কথা শোনো, অনেকদিন পরে পরে হলেও, এসো। আমার লক্ষ্মীসোনা।

এমন সময় গন্ধ বেরোল একটা। হঠাৎ।

কীসের গন্ধ? তাঁর প্রেম-পোড়া গন্ধ কি?

না, না।

কিন্তু ইশ, লাউটা ধরে গেল! গেছে, এক্কেবারে! রান্না চড়িয়ে, নিজে যে, কোন অন্য দিগন্তে চরতে-চরতে গেছিলেন মনে মনে! হবে না এমন!

ইশ! ভাবলেন শেফালি; মানুষটা যে, ধনেপাতা-দেওয়া লাউ-চচ্চড়ি খেতে খুব-ই ভালোবাসেন। ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত হয়ে আসবেন মানুষটা রোদে এতখানি হেঁটে। এখনও সাইকেল চালাতে পারেন না পায়ের জন্যে। নিজে হাতে শখ করে লাউটা এনেছিলেন কাল বিকেলের হাট থেকে।

ইশ। আগের মুহূর্তেই বিদ্রোহের কথা ভাবছিলেন কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁর স্বামী এবং তাঁর পছন্দের লাউ ছাড়া আর কিছুই তাঁর মস্তিষ্কে রইল না।

মানুষ বড়ো আশ্চর্য জীব। ঝিঁঝি বসেছিল জানলার পাশে। এখন বেলা সাড়ে দশটা। হাওয়াটা জোর হয়েছে মনোয়া-মিলনে। গরমটা এবারে খুব তাড়াতাড়ি পড়ল। পাহাড়তলিটা পুরোটাই দেখা যায় এখান থেকে।

ঝিঁঝির প্রিয় জানালা এটি। চেয়ারে বা খাটে বসে, পাহাড়তলির দিকে চেয়ে কাটিয়ে দেয় ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

‘এবং’ পত্রিকাতে, লিটল ম্যাগাজিনে, অনেকদিন আগে শিরীষের একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল। দিয়ে গিয়েছিল শিরীষ নিজেই। কবিতাটির নাম ‘তোমাকে’। সেই পত্রিকার কপিটিই বই-পত্র গুছিয়ে রাখার সময়ে আজ হঠাৎ-ই বেরিয়ে পড়ল। আবারও পড়ল কবিতাটি। ‘তোমাকে’র ‘তুমি’ যে কে, তা জানতে বাকি নেই ঝিঁঝির। অনেকদিন হলই ও জেনে গেছে, যা জানার। অথচ ওর কিছুই করার নেই। ও যদি একা হত তবে শিরীষ ছাড়া অন্য কারোকে নিয়ে ঘর-বাঁধার কথা ভাবতেই পারত না। কিন্তু মা! মা যে, অনেক-ই কষ্ট করে বাবা চলে যাওয়ার পর থেকে ওকে বুকে জড়িয়ে বড়ো করেছেন। ওর বিয়েটা, ওর একার সুখের বা ইচ্ছের ওপরে যে, নির্ভরশীল নয়! মায়ের নিরাপত্তা, মায়ের ভবিষ্যৎও যে, মস্ত বড়ো কথা! যে-পুরুষ তার এবং সুনীতির দু-জনের-ই নিরাপত্তার অঙ্গীকার করবে ও শুধু তাকেই বিয়ে করতে পারে।

শিরীষ, মানুষ হিসেবে চমৎকার। সত্যি বলতে কী, এমন মানুষ হয় না। কিন্তু সাচ্ছল্য? প্রতিমুহূর্তেই কত ‘চমৎকার’ মানুষ যে, ‘সচ্ছল’ মানুষদের কাছে জীবনের কতশত পরীক্ষাতে হেরে যাচ্ছেন, তার হিসেব আর কে রাখে।

তবে ‘বাস্তববাদী’ না হলেও চলে না। বাবার মৃত্যু না হলে, এই পৃথিবীর স্বরূপ ঝিঁঝিরা হয়তো বুঝতে পারত না। পৃথিবীর বাস্তব দিক সম্বন্ধে এখন ঝিঁঝির আর কোনোই সংশয় নেই। কবিতা, প্রেম, সব-ই শুকিয়ে যায় অর্থের অভাবে। দারিদ্র্য, মানুষের মধ্যের অনেক ভালো জিনিসকেই গলা টিপে মেরে ফেলে। মহৎ নীচ হয়ে যায়। হাসিখুশি মানুষ, রামগড়ুরের ছানা। আশাবাদী মানুষ, নিরাশ। নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়েই এইসব জেনেছে তাই বাস্তব দিকটা না দেখে ওর যে, কোনোই উপায় নেই।

নিরুপায় ঝিঁঝি।

তবে ঝিঁঝি একথাও জানে, যাকেই ও বিয়ে করুক-না-কেন, যেখানেই ও চলে যাক-না-কেন বিয়ে হয়ে; মাকে নিয়ে; শিরীষ, ওর প্রথম-ই হয়তো, হয়তো ওর শেষপ্রেম হবে। অধিকাংশ মানুষের জীবনেই, প্রথম এবং যে-প্রেম বিয়েতে ‘প্রোথিত’ হয় না, সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থেকে যায় তাঁদের মনে। শিরীষের জায়গাতে অন্য কারোকেই বসাতে পারবে না, আর এ-জীবনে।

কখনো আবার এ-ও ভাবে যে, এই হয়তো ভালো। পূরিত হবে না বলেই, দৈনন্দিনতার ছোঁয়া লাগবে না বলেই হয়তো এই প্রেম, চিরজীবন প্রেম-ই থাকবে। ম্লান হবে না কোনোদিনও।

শিরীষটা বড়োই ছেলেমানুষ! ঝিঁঝির সন্দেহ আছে, ওর ভালোবাসাটা ও বোঝে কি না আদৌ। এবং বুঝলেও, তার গভীরতা সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণামাত্রও শিরীষের আছে কি না!

দামাল হাওয়াটা পাহাড়তলির মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়ে পাহাড়ে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে আরও বড়ো মুঠিতে ঝরা ও মরা পাতা, আরও ফুল, আরও লাল ধুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে উড়িয়ে আবারও ধেয়ে আসছে এদিক পানে। তার ছোটাছুটির এই এলোমেলোমির জন্যে ছোটো ছোটো ঘূর্ণির সৃষ্টি হচ্ছে। শুকনো পাতা আর ধুলো দলা পাকিয়ে পাকিয়ে ওপরে উঠছে ফণা-তোলা সাপের মতো। কিছুক্ষণ স্তম্ভাকারে থাকছে। তারপরেই মাথায় গুলি-লাগা সাপের-ই মতো আবার লুটিয়েও পড়ছে মুহূর্তের মধ্যে মাটিতে।

পাহাড়তলির এবং পাহাড়ের সবক-টি কুসুম গাছে এখন নতুন পাতা এসেছে। কী আশ্চর্য উজ্জ্বল ফিকে বাদামি-লাল দেখাচ্ছে পাতাগুলোকে। মনে হচ্ছে যেন, ফুল-ই ফুটেছে গাছময়।

শিরীষ এইরকম-ই এক চৈত্রদিনে এইরকম-ই একটি মস্ত কুসুমগাছতলায় দাঁড়িয়ে ঝিঁঝিকে বলেছিল, ‘বাসনাকুসুম’।

কেন বলেছিল কে জানে?

এইসব শিরীষ-ই তাকে চিনিয়েছিল। গাছের নাম, ফুলের নাম, পাখির নাম, প্রজাপতির নাম। কুসুম ছাড়াও ওইরকম-ই লাল লাল চিকন নতুন পাতা এসেছে আসন আর বহেড়া গাছেও। বহেড়া গাছগুলো মস্ত মস্ত হয়। প্রত্যেকটা ডাল-ই প্রায় পঁয়তাল্লিশ-ডিগ্রিতে তড়িঘড়ি উঠে গেছে ঊর্ধ্বমুখী। যেন, মাটিকে একটুও পছন্দ নয় ওদের। আর মহুয়ারা যেন, ঠিক এদের উলটো। প্রতিটি ডাল-ই যেন, মাটির সঙ্গে কোলাকুলি করবে বলে, নীচে নেমে এসেছে। জমির সঙ্গে বড়ো ভাব-ভালোবাসা মহুয়াদের। এসবও শিরীষ-ই দেখিয়েছিল। ওর দেখার চোখ আছে।

মহুয়ার আর করৌঞ্জের গন্ধে এখন ভারী হয়ে আছে হাওয়া। সারারাত গন্ধে ‘ম ম’ করে, মাথার মধ্যে ঝিলিক তুলে ডেকে যায় ব্রেইনফিভার, ইয়ালো-ওয়াট্রেলড ল্যাপউইঙ্গ, আর কুক্কু। কপারস্মিথ পাখি ডাকে—দুই দোসরে, দূরে দূরে; থেকে থেকে। যেন, ঝিঁঝি আর শিরীষ। এ ডাকে, আর ও সাড়া দেয়।

একটা পাখি খুব মজার। তারা শুধু রাতের বেলাতেই ডাকে। ঝাণ্ডুরা তাকে বলে ‘উল্লু’। পাখিটার চেহারা কোনোদিনও দেখেনি কারণ তারা শুধু রাতের অন্ধকারেই ডাকে। হয়তো চেহারাও দেখেছে কখনো দিনমানে কিন্তু কোন পাখি যে, সেই পাখি তা জানে না বলেই চিনে রাখতে পারেনি। পাখিগুলো ডাকে ‘ওঁক-ওঁক-ওঁক’; এইরকম শব্দ করে। এবং সারারাত স্বল্পসময়ের ব্যবধানে ডেকেই চলে। বিশেষ করে, চাঁদের রাতে। পাহাড়তলির রাতের মোহময়তা এইসব পাখির ডাকে বহুগুণ বেড়ে যায়।

এমন এমন রাতে হঠাৎ-ই শিরীষকে কাছে পেতে খুব ইচ্ছে করে ঝিঁঝির। খুব-ই কাছে। বোকাটা জানেই না যে, কত কষ্ট পায় ঝিঁঝি তার জন্যে। বোকা একটা। মিষ্টি, দুষ্টু, রুখু ছেলে।

নীলডোংরি পাহাড়ের নীলটোংড়ির নীল পাখি দুটো কি এ-বছরে আসবে? কে জানে! এলে খুব-ই ভালো হত! ঝিঁঝির তো হতই, অন্য অনেকের-ই হত।

শিরীষ কি সারাটা জীবন চিরাঞ্জিলাল মাড়োয়ারির গদিতে খাতা লিখেই কাটিয়ে দেবে? এত গুণ নিয়ে? বাঙালি ছেলেরা নিজেরা কি কোনোদিনও বড়ো ব্যবসাদার বা শিল্পপতি হয়ে উঠতে পারবে না? চিরদিন-ই শুধু ‘চাই! চাই’ আর ‘চলবে না।’ করাটাই কি তাদের জীবনের একমাত্র অন্বিষ্ট হবে? আজীবন গ্রহীতা না হয়ে, দাতার ভূমিকাতে কি তাদের দেখা যাবে না কখনোই? তারা কি বলতে পারবে না? ‘নাও নাও, চলবে চলবে।’ যুগযুগান্ত ধরে কি তারা বিভিন্ন শ্রেণির চাকর আর শ্রমিক হয়েই থাকবে, ধুরন্ধর, অসৎ, খল, ধূর্ত, ভন্ড ট্রেড ইউনিয়নিস্টদের বলি হয়ে? কুঁড়ে হয়ে? ঝুঁকি নিতে ভীতু হয়ে? আত্মসম্মানজ্ঞানহীন, পরিশ্রমবিমুখ; অনিয়মানুবর্তী হয়ে? চিরদিন?

অদেখা নীলোৎপলের প্রতি মনে মনে অনবধানে এইজন্যেই একধরনের দুর্বলতা জন্মেছে ঝিঁঝির। সে, অন্তত কারো চাকর নয়, দয়ার ভিখিরি নয় কারো। ও নিজেই মালিক। উলটে ও দয়া করে দান করে, নেয় না কারো কাছ থেকেই।

ঝিঁঝি ভাবছিল, নীলোৎপলের যদি, ঝিঁঝিকে পছন্দ হয় এবং ঝিঁঝিরও নীলোৎপলকে; তবেও এ-বিয়ে নাও হতে পারে। সুনীতির ব্যাপারে ঝিঁঝিকে পরিষ্কার করে কথা বলে নিতে হবে নীলোৎপলের সঙ্গে। ইংল্যাণ্ডে, ইউরোপে এবং স্টেটসেও বয়স্কা ও অপারগ হলে শাশুড়ি-মায়েরা যেমন, মেয়ে-জামাই-এর সঙ্গেই থাকেন, সুনীতি তেমন-ই থাকবেন। এই শর্ত মেনে নিতে না পারলে, তাকে বিয়ে তো করতে পারবে না ঝিঁঝি। অবশ্য নীলোৎপলের তাকে পছন্দ নাও হতে পারে। আর যদি না হয় তো তবে কী করবে ও? কেমন করে মুখ দেখাবে শিরীষের কাছে?

ঝিঁঝি সত্যি সত্যিই কাউকেই বিয়ে করতেও চায় না শিরীষ ছাড়া। যদি শিরীষ করতে পারত কিছু একটা। কোনো ব্যাবসা বা সেরকম কিছু। যদি আর্থিক সামর্থ্য বাড়াতে পারত ও, কিছুটাও অন্তত। অর্থ যে, এতখানি প্রয়োজনীয় বস্তু তা না-বুঝতে হলেই ভালো হত হয়তো।

কিন্তু না-বুঝে উপায়ও যে, নেই!

ঝিঁঝি প্রায়-ই ভাবে, ওরা দু-জনে মিলে কিছু একটা করে। কোনো ব্যাবসা। ঘণ্টেমামা নাকি রিটায়ার করবেন। কেন্দুপাতার ব্যাবসাটা কেমন? ওঁর তো জানাশোনাও কম নেই। এত বছরের অভিজ্ঞতা! ঘণ্টেমামা এলে এই বিষয়ে সিরিয়াসলি কথা বলবে ঝিঁঝি। শিরীষের সঙ্গেও বলবে। নীলোৎপল যদি, ওকে বিয়ে সত্যি সত্যিই করে তবেও শিরীষ আর ঘণ্টেমামা পার্টনারশিপে কোনো ব্যাবসা আরম্ভ করে নীলোৎপলদের কোম্পানিতেই কেন্দুপাতা বা অন্য কিছুও সাপ্লাই-টাপ্লাই দিয়ে শুরু করতে পারে। ‘বাণিজ্যে বসতে: লক্ষ্মী।’

সব প্রেম, সব বিয়ে, সংসারেই সাচ্ছল্যর ভূমিকা অনেকখানি। কবিতা-লেখা, প্রেমিক বাঙালিরা এই সত্যটা আজও কেন, হৃদয়ংগম করতে পারল না, কে জানে।

ডালটনগঞ্জ থেকে বেতলা যাওয়ার পথের ঠিক ওপরেই, রেড়মার পরে একটি ফ্যাক্টরির এক্সটেনশন-এর কাজ হচ্ছিল। Sisal Hemp থেকে দড়ি তৈরি হয় এই ফ্যাক্টরিতে।

Sisalকে এই অঞ্চলে বলে ‘মোরব্বা’। আনারসের মতো দেখতে হয় গাছগুলো তবে আনারসের চেয়ে অনেক-ই বড়ো হয়। আর মধ্যে একটি স্তম্ভের মতো থাকে। তাতে, বছরের এই সময়ে ফুলও আসে। অনেক লম্বা হয়ে ওপরে ওঠে স্তম্ভগুলো। প্রায় দেড় দু-মানুষ সমান উঁচু হয়। তার ফুল ফোটে তাদের মাথায়।

Sisal Hemp থেকে দড়ি ইত্যাদি তৈরি হয়।

ফ্যাক্টরি-বিল্ডিংটার ছাদ ঢালাই হচ্ছিল আজ। জিতেন একটা শিশুগাছের নীচে ছায়া খুঁজে চেয়ার পেতে বসে ঢালাই-এর কাজের তদারকি করছিল। আকাশে সকাল থেকেই মেঘ জমছে। ঝড়-বৃষ্টি আসতে পারে। এবারে পালামৌতে অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। যতটুকু বৃষ্টি হয় তার ছিঁটেফোঁটাও হয়নি গতবছরে। ফলে এ-বছরে অবস্থা শোচনীয়। এমনিতেই তো বিহারের এই জেলা ঊষর। জায়গাতে জায়গাতে মরুভূমির-ই মতো। এবারে সারাজেলাতেই এই চৈত্রেই মরুভূমির মতো অবস্থা হয়েছে। সবে তো চৈত্রমাস। পরে যে, কী হবে!

বেতলা টাইগার-প্রোজেক্টের হাতিরা সব, ওই অঞ্চল ছেড়ে ‘বাড়েষাঁনের’ দিকে চলে গেছে। হয়তো কিছু আছে ‘মারুমার’ এবং ‘কুজরুম’-এ। কিছু গেছে মধ্যপ্রদেশেও। শম্বর, গাউর, হরিণ এবং বাঘেদের জন্যে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট জঙ্গলের ভেতরে ভেতরে ডিপ টিউবওয়েল খুঁড়িয়ে জেনারেটর দিয়ে পাম্প চালিয়ে জল তুলে তাদের পানীয় জলের জোগান কোনোক্রমে রাখার চেষ্টা করছেন যাতে তারা পিপাসাতে না মরে। বেতলার কমলদহে হাতিরা বরাবর-ই থাকে গরমের সময়ে। এবারে সেখানেও একটুও জল নেই। ডালটনগঞ্জ শহরে এই চৈত্রতেই জলকষ্ট শুরু হয়ে গেছে। গরম চলবে জুলাই-এর প্রথম সপ্তাহ অবধি। তারপরে যদি বর্ষা আসে। পুরো জেলার অনেক কুয়োতে জল নেই। ভরসা, ডিপ-টিউবওয়েল আর হাত-টিউবওয়েল। এখন-ই এমন! তবে মে-জুন-এ যে-কী হবে, ভাবতেও আতঙ্কিত হচ্ছে সকলে।

পিপাসা, বড়োই পিপাসা।

ডালটনগঞ্জ শহরে তবু তো বৃষ্টি এলে, বর্ষা নামলে পিপাসা মিটবে, আশা করা যায়। কিন্তু জিতেনের মনের পিপাসা? তা কি মিটবে?

শেফালিকে যে, ঠিক অতখানি ভালোবেসে ফেলেছিল লুডো খেলতে খেলতে, গল্প করতে করতে, চা খেতে খেতে, গান শুনতে শুনতে, কোনো সদ্য-প্রকাশিত বাংলা উপন্যাস বা কোনো পত্রিকার ‘রবিবাসরীয়’তে প্রকাশিত ছোটোগল্পর আলোচনা করতে করতে; তা আগে বোঝেনি জিতেন। যা এতদিন শুধু খেলাই ছিল, তা-ই অত্যন্ত বিপদ হয়ে উঠেছে। তার ভালোবাসার পুরস্কার যে, শেফালিকে অমনভাবে পেতে হবে, তার স্বামীর হাতে, ওই আধবুড়ো; পৃথিবী ও সংসার সম্বন্ধে সাধারণার্থে পরম-উদাসীন ঘণ্টেদার হাতে, তার বিন্দুমাত্র আশঙ্কাও করেনি জিতেন আগে। মানুষমাত্রই বড়ো পজেসিভ। যা সে, তার নিজের বলে একবার জেনেছে, তাকে সে নিজের পদাধিকারে সহজেই পরম-অবহেলা করতে পারে। এবং যখন করে, তখন ভাবে যে, সেই হেলাফেলাটাও তার স্বাভাবিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। নিজের কতখানি যে, যোগ্যতা আছে কোনো প্রাপ্তির-ই পেছনে এবং সেই প্রাপ্তিকে জিইয়ে রাখার জন্যেও; তা খুব কম মানুষ-ই নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিচার করে দেখার মানসিকতা রাখেন। রাখলে, ঘণ্টেদা অমন নৃশংস হতে পারতেন না। ঘণ্টেদার মধ্যে যে, এই ঘণ্টেদা আদৌ থাকতে পারেন তা দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি জিতেন, যে-ঘণ্টেদা শেফালিকে মেরেছিলেন তিনি এবং যিনি মারার পর তার কাছে ডাক্তার ডাকার অনুরোধ নিয়ে দৌড়ে এসেছিলেন, তিনিও এক-ই মানুষ?

সেদিন জিতেন তার নিজের ব্যবহারেও এবং তার ঠাণ্ডা-মাথার কারণেও নিজেই চমৎকৃত হয়ে গেছে। চমৎকৃত হয়েছে ঘণ্টেদার প্রায় তাৎক্ষণিক অনুশোচনাতেও। যদিও মারাধরের রকমের জন্যে পুলিশ-কেস হতে পারত, পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে বেইজ্জতিও হতে পারত ঘণ্টেদা, জিতেন বুদ্ধি না খাটালে; তবু বলতেই হয় যে, মানুষটি অন্যায় করামাত্রই সেটা যে, অন্যায় তা বুঝতে পেরে, যাঁর ওপরে তাঁর সবচেয়ে বেশি ক্রুদ্ধ হওয়ার কথা, ঠিক তাঁর-ই কাছে দৌড়ে এসেছিলেন শেফালির ভালোর জন্যে। শেফালির প্রতি ওঁর ভালোবাসার গভীরতার আশ্চর্য প্রকাশ বলেই মনে হয়েছে ব্যাপারটা জিতেনের। জিতেন তাঁকে অপমান করতে পারত, তাঁকে উলটে প্রহার করতে পারত তা ভালো করে জেনেও ঘণ্টেদা যেন, সেই সম্ভাব্য শাস্তি গ্রহণ করবেন বলেই, নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার অভিপ্রায়েই যেন দৌড়ে গেছেন তাঁর স্ত্রীর প্রেমিকের-ই কাছে।

এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা কোনো নাটক-নভেলেও পড়েনি এর আগে।

যতি দিল, একটু জিতেন তার ভাবনাতে। ঢালাইও থেমেছে।

ভাবল, ও কি শেফালির প্রেমিক? এ প্রেম নয়তো কী? এই কি পরকীয়া? শুধুই মনের ভালোবাসাও।

ও কি সত্যিই শেফালির প্রেমিক? ভাবছিল জিতেন। যদি প্রেমিক-ই হবে তবে, শেফালি যে-নরকে বাস করে, যে-দমবন্ধ ঘেরাটোপের মধ্যে, আলো-বাতাসহীন, আনন্দহীন, বৈচিত্র্যহীন দৈনন্দিনতার মধ্যে; তা থেকে তাঁকে ক্ষণকালের জন্যেও মুক্তি দিতে না পারার সিদ্ধান্ত নিয়ে কি ও যথার্থ কাজ করেছে? যা করেছে, সেটা কি অন্যায়?

না গিয়ে কি পারবে জিতেন? শেফালি যে, অনুক্ষণ তার-ই পথ চেয়ে থাকবেন। রান্নাঘরের গরমে অলক লেপটে থাকবে ঘামে, শেফালির গালে; তাঁর অতিসুন্দর স্তনসন্ধি ঘামে ভিজে চকচক করবে আর সেখানে দুলতে থাকবে তাঁর গলার, সরু সোনার হারের ছোট্ট সাদামাটা লকেটটি। ও না গেলে আর কে দেখবে সেই সাধারণ কিন্তু অসাধারণ দৃশ্য?

কী সুন্দর যে, দেখে জিতেন শেফালিকে! রান্নাঘরেও সুন্দর দেখে, সমান সুন্দর দেখে অন্য জায়গাতেও।

মনে পড়ে গেল। অনেকদিন আগের এক বর্ষা-দুপুরের কথা। শেফালি একদিন, ওকে বসিয়ে রেখে স্নান করতে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে দু-জনে মিলে একসঙ্গে খাবেন বলে। ওদের বাড়ির বাথরুমের দরজাটাতে অনেক ফাঁক-ফোঁকর। বাজে কাঠ দিয়ে বানানো হয়েছিল। অনেক জায়গাতে চিড় খেয়ে গেছে। জিতেনের ভারি ইচ্ছে করেছিল, নি:শব্দে গিয়ে, সেই ফাঁক-ফোকরের একটিতে চোখ লাগিয়ে শেফালির নিরাবরণ রূপটি দেখে। চমৎকার শরীরের গড়ন শেফালির। বাঁধনও চমৎকার। সুন্দর বুদ্ধিদীপ্ত মুখটি। বড়ো বড়ো আনত-পল্লবের স্বপ্লিল চোখ দু-খানি। চমৎকার।

ইচ্ছেটা মনের মধ্যে জাগতেই নিজেকে বকেছিল খুব।

যদি শেফালি নিজের ইচ্ছেতে কখনো দেখান জিতেনকে তাঁর নিরাবরণ রূপ, তবেই দেখবে। তস্কর হতে যাবে কেন? সেই সুন্দর দিনটির জন্যে অপেক্ষা করে থাকবে জিতেন, যতদিন অপেক্ষা করতে হয়।

কী যে করে ও! শেফালির মতো যে, ওর আর কারোকেই অত ভালো লাগে না। অগণ্য নারীকেই তো সে জানে। কেন যে, এই বিবাহিতা নারীর প্রেমেই এমন করে পড়ল! মাঝে মাঝেই মনে হয়, ওর জীবন অভিশপ্ত। শেফালিকে জীবনে ওর একার করে না পেলে, বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই আর ওর কাছে। শেফালির কোনো বিকল্প নেই ওর কাছে। হবেও না। তিনি ‘অদ্বিতীয়া’।

স্বামীর অন্ন কিন্তু কখনো তাঁর প্রেমিককে খাওয়াননি একদিনও শেফালি। জিতেনও খায়নি। যেদিন নিজেই হাতে করে কিছু নিয়ে গেছে, সেদিন-ই শুধু শেফালি বলেছেন, এখুনি রাঁধছি, দুটো খেয়ে নাও। অথবা পরে একদিন আসতে বলেছেন খেতে।

মাঝে মাঝেই দেরাদুন-চাল, ছাড়ানো-মুরগি, ব্রয়লার নয়; ব্রয়লার একদম ভালোবাসেন না শেফালি; ক্বচিৎ মাছ, আইস-বক্স-এ করে কোলাঘাটের ইলিশ, বছরের প্রথম এঁচড়, ফুলকপি, রাংকা বা গাড়োয়া বা লাতেহার থেকে বহুকষ্টে জোগাড় করা খাঁটি গাওয়া-ঘি; বাজারের নয়। কসাই রসিদ আলিকে বলে অনেক যত্নর সঙ্গে জোগাড়-করা কচি-পাঁঠার মাংস; এইসব। শেফালি লাতেহারের পন্ডিতের দোকানের, কাছারির উলটোদিকের ‘কালাজামুন’ আর নিমকি খেতে খুব ভালোবাসেন। যখন-ই লাতেহারে যায় জিতেন তখন-ই নিয়ে আসে শেফালির জন্যে। পাগলা আর ছুটকির জন্যে নিয়ে আসে ‘কালাকাঁদ’। আর ঘণ্টেদা খেতে ভালোবাসেন সাদা রসগোল্লা। বলেন, বাগবাজার-এর ছেলে বাঘবাজার-এ এসে নর্থ-ক্যালকাটার মিষ্টির স্বাদ-ই ভুলে গেচি।’

তাই তাঁর জন্যে অবশ্যই আনে সাদা রসগোল্লা। যেদিন মিষ্টি আনে।

কত কথাই যে, মনে পড়ছে আজ জিতেনের। ঢালাই-করা কুলি-কামিনদের শোরগোল। কংক্রিট মিক্সচার মেশিনের ঘড়ঘড়, বিরক্তিকর সব আওয়াজ, ভ্যাপসা গরম এসবের কোনো কিছুই জিতেনকে শেফালির চিন্তা থেকে এক লহমার জন্যেও নড়াতে পারছে না। আজ কাজে আসার আদৌ ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ঢালাই-এর দিন। নিজে না-দাঁড়িয়ে থাকলেই সিমেন্টের ভাগ কম দেবে, কুলি-কামিন বেশি করে লেখাবে। নিজেরা যে, এমন চোরের জাত হয়ে উঠল তা ভেবেও লজ্জা করে।

বলে তো এসেছে শেফালিকে যে, আর কখনো যাবে না! কিন্তু যদি শেফালিও আর না ডাকেন? তবে? কী যে, করবে ও, ও নিজেই জানে না।

পাগলা আর ছুটকিও খুব-ই পছন্দ করে ওকে। জেনুইনলি। হাতে করে নানা জিনিস নিয়ে যায় বলেই শুধু নয়, ওর নিজের ‘নিজস্বতা’র জন্যেই ভালোবাসে।

মানুষটিও ভালো, তাই ভালোবাসে।

আর যখন পড়াতে যাবে না ছুটকিকে, তখন ছুটকিকে কী বলবেন শেফালি? ‘জিতুকাকু আর কোনোদিন আসবে না বলেছেন।’

তাই বলবেন?

ভাবছিল, জিতেন।

তার উত্তরে যদি ছুটকি জানতে চায় কেন? তবে?

রামখেলাওন পাঁড়ে ‘ভরর-র-র-র’ শব্দ করে এসে নামল। রেড়মাতেই থাকে।

‘ফাকসা’ আলাপ করবে এখন কিছুক্ষণ। ভ্যাগাবণ্ড মানুষদের যা কাজ। অনেক-ই জমি-জমা আছে। ভোগতা, মুণ্ডা, দোসাদ, চামার এদের দিয়ে চাষ করায়। নিজে পায়ের ওপর পা তুলে বসে খায়। রাংকার দিকে ওর ভান্ডারও আছে। গরিব-হরিজন ও আদিবাসীদের ওপরে বিহারের এইসব ব্রাহ্মণ শ্রেণির অত্যাচার-ই আজকে নকশাল এবং ঝাড়খন্ডি আন্দোলনের এক প্রধান কারণ। ধৈর্য ধরে ধরে তারা ক্লান্ত হয়ে গেছে।

যে, যতই বড়োলোক হোক-না-কেন, যে-মানুষেরা বসে খায়, বাপ-ঠাকুরদার সঞ্চয়ে, বা তাঁদের জমি-জমার রোজগারে, বিনা-মেহনতে; সেই মানুষগুলোকে মনের গভীর থেকে মনে মনে ঘেন্না করে জিতেন। তাদের নিজেদের প্রয়োজন না থাকলেও কোনো মিশনে বা মঠে যোগ দিয়ে গরিবের বা আর্তর বা কুষ্ঠরোগীদের সেবাও তো করতে পারে এই রামখেলাওনেরা! কী করে সুস্থদেহের কোনো মানুষ কিছুই না করে দিন কাটায়, দিন, মাস, বছর, যুগ তা ভাবতেও জিতেনের অবাক লাগে।

রামখেলাওন পাঁড়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে। রাসকেল!

শেফালির মুখটা দ্রুত, অতিদ্রুত মুছে যাচ্ছে জিতেনের চোখের মণি থেকে।

দ্রুত রামখেলাওন পাঁড়ের কাড়ুয়া-তেলমাখা, ঘি-দুধে অতিপুষ্ট লাল গোলাকৃতি মুখটা ঢেকে দিচ্ছে সুন্দর গড়নের, সুন্দর বাঁধনের শেফালির ছবি, তাঁর মুখ, তাঁর চোখ; তাঁর শরীর মনের সব সৌন্দর্য; স্নিগ্ধতা।

হারামজাদা!

মনে মনে বলল, জিতেন।

সব ঠিক্কে না হ্যায়?

বলল, রামখেলাওন।

জিতেন, উত্তর না দিয়ে; মনোযোগ সহকারে ঢালাই দেখতে লাগল।

মনে মনে বলল, যা-না ইডিয়ট। ভাগ এখান থেকে।

আমার আজ মন ভালো নেই।

প্রচন্ড একটা আঁধি এল। মেঘ, ফুল, ঝরাপাতা আর ধুলোর এলোচুল উড়িয়ে দিগবিদিক ঢেকে। তবে হঠাৎ নয়। আকাশ সাজছিল সকাল থেকেই।

ঘণ্টেবাবু, শিরীষ, ঝাণ্ডু এবং তার দু-জন শাগরেদ মনোয়া-মিলনের ছোট্টস্টেশনের বারান্দাটাতে ঠাঁই নিয়েছিল আরও তিন-চারজন স্থানীয় আদিবাসী মানুষদের সঙ্গে। ঝড়ের দাপট এমন-ই যে, মনে হচ্ছিল ওদের-ই উড়িয়ে নেবে।

ঝড়টা হঠাৎ-ই ঘণ্টেবাবু ধুতির কাছা খুলে দিল। অনেক ঝড় দেখেছে শিরীষ এ-পর্যন্ত কিন্তু এইরকম ‘কাছা-খোলানো’ মিচকে-ঝড় দেখেনি।

ঘণ্টেবাবুর সামনের দু-খানি দাঁত পড়ে গিয়েছিল। ডেঞ্চার একটা করা যেত না, তা নয়; তাঁর নিজের-ই এক বোনপো আছে দাঁতের ডাক্তার, রাঁচিতে, নাম ঘতু। সে বুদ্ধি দিয়েছে, বলেছে, মামা, সবগুলো একে একে পড়ুক তারপর সুন্দর করে বাঁধিয়ে দেব। ভুবনমোহিনী স্টাইলে।

সেটা কী বস্তু?

ঘণ্টেবাবু শুধিয়েছিলেন।

মানে, হাসলে, পৃথিবী মোহিত হয়ে যাবে। ‘ভুবনমোহিনী’ মানে বুঝলে-না?

একটা নতুন মেটেরিয়াল তৈরি হচ্ছে, প্লাস্টিকের-ই রকমফের আর কী! রংও একেবারে ম্যাচ করে দেব। যদি-না বুড়ো বয়সে মারামারি করে সেই ডেঞ্চার ভাঙো তবে যাবার দিনে, ওই দাঁত পরেই স্ট্রেট ডালটনগঞ্জের কোয়েলের ধারের চানোয়ারি ঘাটের ধারে নিয়ে যাবে তোমার বিড়ি-কোম্পানির লোকেরা, ‘রাম নাম সত হায়’ করতে করতে। যাবার সময়ে অচেনা লোক বলবে, ‘ইয়ং ম্যান, আনটাইমলি চলে গেল।’

ঘতুটা রসিক আছে।

ভেবেছিলেন, ঘণ্টেবাবু।

কথাতে বলে ‘নরাণাং মাতুলক্রমঃ’। কিন্তু একমাত্র মামা হলেও ঘণ্টেবাবুকে ‘রসিক বড়ো’ এমন বদনাম এ-পর্যন্ত কেউই দিতে পারেনি। ঘতু রসিক হয়েছে, সম্ভবত ঘণ্টেবাবুর ভগ্নীপতি ফচকের-ই জন্যে।

রস-কষ পছন্দ নয় ঘণ্টেবাবুর। শিশুকাল থেকে নিজের জীবনে রস-রসিকতার কোনো সুযোগও আসেনি। তাই, কেউ রসিকতা করলে সচরাচর রেগে যান। তাঁকে নিয়ে করলে তো কথাই নেই। তবে ভাগনে বলেই, সেদিন ঘতুর ওপরে রাগতে পারেননি। কিন্তু একটু কৌশল, কষ্ট করে এই রসিক-ঝড় তাঁর কাছা খুলে দেওয়াতে ঝাণ্ডু লাফিয়ে উঠে দু-হাতে তালি দিয়ে, ‘লে লটকা! দেখিয়ে শিষবাবু মামাবাবুকো! ...’ বলেই অট্টহাস্য করে উঠতেই ঘণ্টেবাবু For a change নিজেও হাপিস-দাঁতে হেসে উঠলেন। এবং তাঁর হাসির সঙ্গে সঙ্গেই স্টেশনের জমির সমান্তরাল প্ল্যাটফর্মের ওপরে পোঁতা একটা চিলবিল গাছ মড়াৎ করে উপড়ে গেল। গেল তো গেল, পড়ল এসে প্রায় স্টেশনের-ই ছাদের ওপরে হুড়মুড় করে। ভাগ্যিস লাইনের ওপরেই পড়েনি! তাহলে, নীলোৎপলদের ঝামেলা হত!

ওরা সকলেই আতঙ্কে প্রায় বোবা হয়ে গিয়েছিল।

ঘণ্টেমামাই সর্বপ্রথমে কথা বললেন।

বললেন, এইজন্যেই তো হাসি না। আমি হাসলেই এমন অঘটন ঘটে!

এবারে শিরীষ হেসে উঠল, ঘণ্টেবাবুর কথাতে।

বলল, আমি হাসলে সুঘটন ঘটে, ফুল ফোটে, বনে গন্ধ ছোটে; বিয়ে হয়। তা আজকে আপনার ‘নীলোৎপল অ্যাণ্ড কোম্পানি’ আসছে তো, নাকি আজকেও ‘ফেরাইড-রাইস আর চিলি-চিকেনওয়া’ ফেলা যাবে?

ঘণ্টেমামা বললেন, আ-কতা কু-কতা বোলোনি।

একটু থেমে বললেন, তবে আজকে আর বউদি ওই অপয়া মেনু রাখেননি। হলদে-রঙা মিষ্টি-পোলাও, কচি-পাঁঠার মাংস, আলু-বখরার চাটনি আর লাতেহারের কালাকাঁদ।

কথাগুলো ভালো শোনা গেল না। অর্ধেক কথা ঝড়ে উড়িয়ে নিল। আন্দাজে কথাগুলো ঝড়ের খপ্পর থেকে উদ্ধার করে কুড়িয়ে নিল শিরীষ।

কালাকাঁদের জন্যে লাতেহারে লোক পাঠিয়েছিলেন নাকি কাকিমা? নাকি, আপনিই এবারে বাসে এলেন? ট্রেন তো অতক্ষণ থামে না লাতেহার স্টেশানে। তা ছাড়া ভালো দোকানগুলোও তো স্টেশান থেকে অনেক দূরে।

আরে না, না। জিতু পাঠিয়েছিল গতকাল ডালটনগঞ্জে আমাদের বাড়িতে। ওকে কোন ‘মেট’ না ‘সর্দার’ স্পেশাল করে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে এনে দিয়েছিল লাতেহার থেকে। আমিও তোমার মামিমার ও ছেলে-মেয়েদের জব্বর খপ্পর থেকে ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিয়ে সটান স্টেশনে। ওরা তো প্রায়-ই খায় এটা-ওটা, জিতুর দয়াতে। তোমরা, নীলোৎপলরাও একদিন খাও।

জিতু কে? ঘণ্টেমামা?

জিতু! আ! তোমাকে বলিনি বুজি আগে?

না তো! না!

অ! তোমার তো জানার কতাও নয়। দারুণ ছেলেটি। ডালটনগঞ্জের মদন ডাক্তারের নাম শুনেচো? ধন্বন্তরি ডাক্তার ছিলেন হে। খুব ভালো পসার ছেল। শহরেই তিন-তিনটে বাড়ি, নিজের গাড়ি ছেল, অস্টিন-সমারসেট। কুচকুচে কালো রঙের। অনেক জমি-জিরেত, পুকুর।

জিতু কে? শিরীষ আবার বলল।

আহা শোনোই না। তাড়া কীসের? আগে মদন ডাক্তারকে শেষ করি। তারপর জিতুতে আসছি। তবে, পয়সা রোজগার করেছিলেন যদিও অঢেল, কসাই ছিলেন না। প্রতিদিন দু-ঘণ্টা বিনি-পয়সাতে রুগি দেখতেন। কত দূর-দূরান্ত থেকে পাহাড়-জঙ্গল থেকে আত্মীয়-স্বজনের কাঁধে চেপে, ডুলিতে চেপে, চৌপাইয়ে শুয়ে যে-রুগিরা আসত! বাড়ির হাতা গোরুর-গাড়ি, মোষের-গাড়িতেও ভরে যেত। যদিও এদিকে পাহাড়ি এলাকা বলে গোরু-মোষের গাড়ির তেমন ব্যবহার নেই। মানে, খুব কম দেখা যায়, তবুও।

শিরীষ বিরক্ত হয়ে বলল, ঘণ্টেমামা! আমি আপনাকে শুধিয়েছিলাম জিতু কে?

ওহো! দেখেছ! একেই বলে ভীমরতি! কথার কোনোই খেই থাকে না আজকাল। আসলে এত বছরে, এত কথা, এত অভিজ্ঞতা ভেতরে জমে গেছে যে, বলতে গেলে হেড-টেল ঠিক থাকে না! তা ছাড়া, আমার কথা যে, শোনাই এমন একজনও মানুষ পাই না বলেও কথা বলতে শুরু করলে, কী যে, বলতে চাইছিলাম তাই ভুলে যাই। হ্যাঁ। জিতু হচ্ছে আমাদের মদন ডাক্তারের একমাত্র ছেলে। শুধু ছেলেই নয়, একমাত্র সন্তান!

উনিও ডাক্তার?

অ্যাঁ? না, না, ও ডাক্তার নয়। ঠিকাদার। অগাধ সম্পত্তি। কিন্তু বসে খায় না।

ইঞ্জিনিয়ার?

না, তাও নয়। পাশ করা নয়। ‘ওভারসিয়ারি’তে ডিপ্লোমা কি না, তাও জানি না। মফসসলে ঠিকাদারি করতে আবার ইঞ্জিনিয়ার হতে হয় নাকি? ওই তো আমাদের বজরঙ্গ পান্ডে, সরকারি ভেটিরিনারি ডিপার্টের ডাক্তার ছেল, ছেড়েছুড়ে দিয়ে ঠিকাদারি করছে। হায়। হায়। লে রুপিয়া লে রুপিয়া! এখন নামি গভর্নমেন্ট কনট্রাক্টর। অফিসারদের সঙ্গে পুরো লাইন করে নিয়েছে। তার বড়োলোক শ্বশুরের বি-কম-ফেল ছেলেকে পার্টনারও করে নিয়েছে। কী রমরমা। জিপ, মারুতি, ভ্যান, এমনি মারুতি, সেটা আবার এয়ার-কণ্ডিশাণ্ড। শুনতে পাচ্ছি, এবারে একটা লাল-টুকটুকে মারুতি ওয়ান-থাউজ্যাণ্ড না, কী গাড়ি আছে না একটা, মোহন বিশ্বাসের ছেল একটা; সামনেটা নীচু, কুয়াশা-কুয়াশা হেডলাইট; সেই গাড়িও কিনবে।

একটু পরে স্টেশন মাস্টার নিজের থেকেই অপেক্ষমান জনগণকে কৃতার্থ করে; বাইরে এসে চিলবিল গাছটি পড়ে যাওয়ায় ক্ষয়-ক্ষতি অ্যাসেস করলেন।

তারপর দয়া করে জগাদারের আইনি-ভাষায় ‘সুও-মুট’ ঘোষণা করলেন ‘সওয়া-ঘণ্টা লেট হ্যায় টিরেন।’

আচ্ছা মাস্টারসাব, আপনি কি মনে করতে পারেন, গত তিনবছরে এই ট্রেন কোনদিনটিতে রাইট-টাইমে এসেছে?

ঘণ্টেবাবু ফ্রন্টাল অ্যাটাক করলেন স্টেশন মাস্টারকে।

নেহি। মগর ইসমে হামারা ক্যা কসুর? অ্যাভি ক্যা? আনেওয়ালি টাইমমে দেখিয়ে গা সবহি টেরেন ঔর কিতনা জাদা লেট হোতি হ্যায়।

ঔর জাদা লেট? লেহ লটকা!

ঝাণ্ডু বলে উঠল, মালিকদের কথার মধ্যে কথা; প্রোটোকল ভেঙে।

মগর কাহে?

আঃ। ভাড়া বাড় গ্যায়া ই হপ্তেমেই দশ পার্সিন্ট? জাফফর শরিফ সাহাবকি শানদার অকলদারি সে।

ভাড়া বাড়ালে তো ট্রেনের সার্ভিস আরও ভালো হওয়াই উচিত।

ঘণ্টেবাবু বললেন।

থোড়ি হবে। বিনা-টিকিটের যাত্রী আরও বাড়বে। যেখানে-সেখানে চেনা টানবে তারা। ফার্স্ট-ক্লাস এ.সি, এ.সি. স্লিপার, এমনি ফার্স্ট-ক্লাসে দেশের ‘শিক্ষিত’ ‘ভদ্রলোকেরা’, ‘বড়োলোকেরা’ কনডাক্টার-গার্ডকে ঘুস দিয়ে বিনি-পয়সায় ট্রাভেল করবে। রেলে যেমন, রামরাজত্ব এমন রাজত্বের কল্পনা কেউ-ই কোনোদিনও করতে পারেনি।

স্টেশন মাস্টার মইনুদ্দিন সাব চকিতে অ্যাবাউট-টার্ন করে বললেন, ‘ইয়ে দেশ নেহি হ্যায়, জানোয়ারকি দেশ হো গ্যায়া। ঔর হোনেকাভি নেহি হ্যায় হিঁয়া কুছভি। বরবাদি পুরি হো গ্যায়ি। যিতনা আদমি অলরেডি প্যায়দা হো চুঁকে হ্যায় ইস দেশমে, রাম ইয়া খুদাহ কোই নেহি বাঁচানে শাকেগা ইস দেশকি।

স্টেশন মাস্টারের কথার অবিসংবাদী হিমেল সত্যটি হিমেল হাওয়ার চেয়ে, বেশি হিমেল এক ভাবনায় ছেয়ে দিল নিরুপায় ঘণ্টেবাবু আর শিরীষকে। নীরব অসহায় সাক্ষী যারা, এই দেশের স্বেচ্ছামৃত্যুর।

আঁধির সঙ্গে সঙ্গে, এখন জল পড়াও শুরু হয়েছে। বহুদিন থেকে তৃষিত মাটিতে, পাথরে, গাছে, পাতায় প্রায় পড়ে-যাওয়া ঘাসে ঘাসে প্রায় দেড় বছর পরে প্রথম বৃষ্টি পড়াতে পোড়া-পোড়া গন্ধ উঠছে। বৃষ্টিটার জন্ম হতেই হাওয়াটার মৃত্যু হয়েছে। তাই সেই গন্ধ উড়ছে না। থম মেরে আছে। ঊর্ধ্বপানে উঠছে মাটি থেকে। এদিকে-ওদিকে চাড়িয়ে যেতে পারছে না হাওয়ার অভাবে।

শিরীষ ভাবছিল, তার ভালোবাসার দেশ থেকেও, তার জন্মভূমি থেকেও এখন সম্ভবত এমন-ই‘পোড়া-পোড়া’ গন্ধ বেরুচ্ছে। কর্তব্যহীনতা, লজ্জাহীনতা, বিবেকহীনতা, অসততা, ধূর্তামি, ধাষ্টামি এইসব-ই চিতায় তুলেছে দেশকে। পুড়ছে এই দেশ। শিরীষ যখন লিখবে, গদ্য; তখন এইসব নিয়েও লিখবে। ‘সাহিত্য’ মানে অনেক গভীর ব্যাপার। সমসময়, সমকাল, স্বদেশ যে-সাহিত্যে অনুপস্থিত তা সাহিত্য-পদবাচ্যই নয় বোধ হয়।

জিতুর সঙ্গে তোমার কাকিমার অনেক-ই মিল আছে। বুয়েচ।

চমকে উঠল শিরীষ। ঘণ্টেবাবু হঠাৎ প্রসঙ্গান্তরে চলে যাওয়ায়।

বলল, তাই বুঝি?

হ্যাঁ। দু-জনেই পড়াশুনোতে ভালো ছিলেন তো। আমি তো লাড্ডুমার্কা। সাহিত্য, গান-বাজনা ইত্যাদি ইত্যাদি নানা বিষয়ে নিয়ে ওদের আলোচনা হয়। সেসব অন্য একটা জগৎ। বুঝলে বায়া। সে-জগতের ভাষা একেবারেই অন্য। আমি শালা ঘণ্টে মিত্তির, অশিক্ষিত, সারাজীবন কেন্দুপাতার ফেরে চাতরা, হাজারিবাগ, চাঁদোয়া, সীমারিয়া, লাতেহার, বারোয়াড়ি, কুটকু, কুটমুঁর জঙ্গলে জঙ্গলেই ঘুরে বেড়িয়ে কোনোক্রমে বিয়ে-করা বউ আর সন্তানদের ভরণ-পোষণের প্রায় ব্যর্থ-চেষ্টাতেই কাটিয়ে দিলাম। আর্ট-কালচার-সাহিত্য এসব করি, তার সময় কোতায় ছেল আমার। বলো?

বা: ঘণ্টেমামা। মামিমার কথা শুনে খুব-ই ভালো লাগল। আপনি তো আর আলাপ করিয়ে দিলেন না কোনোদিন, মামিমার হাতের রান্নাও খাওয়ালেন না। আমাকেও ভালো লাগতে পারত মামিমার, আলাপ হলে; কে বলতে পারত?

বলেই বলল, তবে একটা কথা বলব মামাবাবু। কেন্দুপাতার জঙ্গলে থেকে জীবিকা-নির্বাহ করার সঙ্গে কিন্তু আর্ট-কালচার-সাহিত্যের বা গান-বাজনার কোনোই ঝগড়া নেই।

ঝগড়া নেই? তুমিও তো দেখি জিতুর মতোই কথা বলো হে! যখন ঘাড়ে সংসার পড়বে, ঘাড়টি যখন ‘ফট’ করে মটকে যাবে, তখন দেকব কোতায় থাকে বড়ো বড়ো কথা!

আমি ঘাড় না-পেতে দিলে সংসার ঘাড়ে পড়বে কী করে মামাবাবু? সংসারের জন্যেই কি জীবন? নাকি জীবনের জন্যেই সংসার? জীবিকা? জীবিকা প্রত্যেক মানুষের-ই একটা-না-একটা থাকেই। আপনি আপনার মালিকের বিড়ি-কোম্পানির বিড়ির জন্যে জঙ্গলে কেন্দুপাতা সংগ্রহে কাটালেন সারাজীবন কারণ এইটেই আপনার জীবিকা। আমি এই মনোয়া-মিলনের মতো ছোট্ট জঙ্গুলে অখ্যাত জায়গাতে চিরাঞ্জিলাল মাড়োয়ারির গতিতে খাতা লিখি, এও আমার জীবিকা। জিতুবাবু না, কার কথা বললেন একটু আগে, উনি প্রয়োজন না থাকলেও নিজেকে নিয়োজিত রাখার জন্য ঠিকাদারি করেন। সেটা ওঁর জীবিকা। সাইকেল রিকশাওয়ালা রিকশা চালায়, পানের দোকানি পান-বিড়ি বেচে। সব-ই পেটের জন্যে। জীবিকা হিসেবে, কোনো ‘জীবিকা’ই ছোটো বা বড়ো নয়। যে-ড্রাইভার গাড়ি চালিয়ে মস্ত কোম্পানির এম. ডি. কে অফিসে নিয়ে যায় সেই ড্রাইভারের জীবিকা, ম্যানেজিং ডিরেক্টরের জীবিকা অথবা, যে, সাহিত্যিক অর্থাগমের জন্যেই লেখেন তাঁর জীবিকা থেকে কোনো অংশেই হীন নয়। কোনো জীবিকাই তাচ্ছিল্যের নয়। কিন্তু একটা কথা আপনাকে বুঝিয়ে বলা দরকার মামাবাবু, জানি না জিতুবাবু কেমন করে কথাটা আপনাকে বলেছেন; বা আদৌ বলেছেন কি না, তা হল এই যে, জীবিকার ভারে চাপা পড়ে যাওয়াটা কিন্তু আদৌ মনুষ্যজনোচিত ব্যাপার নয়। জীবিকাটার প্রয়োজন; জীবনের-ই জন্যে। আর মানুষের জীবনের মানেই বা কী থাকে যদি, মানুষের জীবনে সাহিত্য-গান-বাজনা বা শিল্পকলার চর্চাই না থাকল! সেইসব গুণপনার জন্যে গুণগ্রাহীতাই যদি জেগে না থাকল? জানোয়ারের সঙ্গে মানুষের তফাতটা তো শুধু এটুকুই মামাবাবু! তারাও দিনেরাতে ঘুরে-ঘারে খাবার সংগ্রহ করে, তারাও মানুষের-ই মতো খায়, ঘুমায়, রমণ করে অন্য-লিঙ্গর সমগোত্রীয় প্রাণীকে, পুরুষ যেমন রমণীকে করে, তাদেরও শাবক হয়, আমাদের সন্তানের মতো। তাদেরও ভয় আছে প্রাণে। ভয় আছে কিন্তু ‘ভক্তি’ নেই। কাম আছে কিন্তু ‘প্রেম’ নেই। পেট-ভরাবার খিদে আছে কিন্তু মন-ভরাবার খিদে নেই। তাই তো ওরা জানোয়ার। আর আমরা মানুষ! আপনি মামিমাকে এবারে নতুন চোখে দেখতে শুরু করুন, বুঝতে শুরু করুন; তাঁর আনন্দর জগতের পার্টনার হয়ে উঠুন, দেখবেন, কত আনন্দ পাবেন।

না শিরীষ।

এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন ঘণ্টেমামা।

আমার আর আনন্দ দিয়ে কাজ নেই। অনেক আনন্দ হয়েছে জীবনে। এখন মানে মানে, লুঙ্গিটা ছেড়ে একটি নতুন ধুতি পরে ডালটনগঞ্জের কোয়েলের ধারের চানোয়ারিঘাটে ছাই হয়ে যেতে পারলেই বেঁচে যাই এ-জন্মের মতো।

কী যে বলেন মামাবাবু! মাত্র ষাটবছর-ই তো বয়স হয়েছে আপনার। আপনার জীবনের এই তো শুরু। বিদেশে, সত্তর-আশিতে বিয়ে করে মানুষে।

না বাই। আর কোনো সাধ-আহ্লাদ রাখি না। শুধু একটাই চিন্তা। ছেলে-মেয়ে দুটো এখনও ছোটোই। বুড়োবয়েসে বিয়ে করেচিলাম তো!

সে কী! সারাজীবন খাটলেন-খুটলেন, জীবন তো এখন-ই সবে উপভোগ করতে শুরু করবেন। মাছ ধরতে ইচ্ছে হলে মাছ ধরবেন। তাস খেলতে ইচ্ছে করলে, তাস খেলবেন। গ্যাঁজাতে ইচ্ছে করলে, পরনিন্দা-পরচর্চা করে আনন্দ পেলে, জমিয়ে বসে তাই করবেন। যাতেই আপনার আনন্দ তাই করবেন। মোদ্দা কথা। এখন ‘নিজের জন্যে বাঁচার সময়’ তো এই সবে শুরু হল। যৌবনের প্রথম দিক থেকে তো পরের জন্যেই বেঁচে এসেছেন। বাবা-মাকে দেখা, বিয়ের পর থেকে মামিমাকে দেখা, ছেলে-মেয়ে হওয়ার পর তাদের দেখা, তাদের ভবিষ্যৎ-চিন্তা, কখন, কী করে, তারা নিজের পায়ে দাঁড়াবে? আর পায়ে একবার দাঁড়ানো মাত্রই কী করে এবং কখন বাবার বুকে জোড়া-পায়ে লাথি মারবে তার অপেক্ষা করা। এবারে ছুটি দিন। অনেক-ই করেছেন এই কৃতঘ্ন সংসারের জন্যে। আর কেন? জগামামা বলেন, ‘টং-টার’।

মানে?

মানে, সং-সার; সংসার।

শিরীষের মনে হল, ওর এইসব কথাতে ঘণ্টেমামার দু-টি চোখ যেন হঠাৎ-ই ছলছল করে উঠল। ঘণ্টেমামা বললেন, আচে নাকি শিরীষ?

কী মামাবাবু?

নস্যি। দাও তো দেখি একটু বায়া! আঁধিটার পরে এই বৃষ্টি। বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগচে। তোমার ঘড়িটা দ্যাখো তো, আর কত দেরি ট্রেন আসতে।

আমার তো হাত-ঘড়ি নেই মামাবাবু।

নেই? আশ্চর্য।

কেন? আশ্চর্য কেন? প্রত্যেকের-ই যে, ঘড়ি থাকতেই হবে তার কী মানে আছে? আমাদের দেশের ক-জন মানুষের হাতঘড়ি বা অন্য ঘড়ি আছে? সূর্যের সঙ্গে জীবন বাঁধা। বাবার একটা ছিল। পেয়েছিলাম উত্তরাধিকারসূত্রে, খুব-ই ভালো ঘড়ি, ‘ওমেগা’। কিন্তু মায়ের অসুখের সময়ে মুঙ্গালালের দোকানে বন্ধক রেখে যখন, টাকা নিলাম তখন-ই সেটা যে-চিরদিনের-ই মতো বেহাত হয়ে গেল তা বুঝেছিলাম।

বললেন, আমি যদি লটারি জিতি কোনোদিন নিজের জন্যে একটা ‘টাইটান’ ঘড়ি কিনব আর তোমাকেও কিনে দেব একটা।

লটারি, আমি-আপনি কোনোদিনও জিতব না মামাবাবু। বিনা-মেহনতে এক পয়সা কামাই-এরও কপাল করে আসিনি আমরা।

হাসলেন, ঘণ্টেমামা।

তোমার সঙ্গে আমার অনেক-ই মিল দেকচি যে, হে! আমিও পেয়েছিলাম। ...ঘড়ি একটা। তবে ওমেগা নয়, সস্তাতম মডেলের এইচ. এম. টি.। বিয়েতে আমার গরিব শ্বশুরমশাই গরিব জামাইকে দিয়েছিলেন। ‘জওয়ান’ নাম ছিল সম্ভবত। কালো ডায়ালের। রাতেই ঝকমক করত সবুজ রেডিয়াম। তা, সেটি আমাকেও বেচতে হয়েছিল আমার মেয়ে হওয়ার সময়ে। এমন-ই আটকে গেচিলাম যে, কী বলব! ইঞ্জেকশান কিনেছিলাম তোমার মামিমার জন্যে। তারপরে কেনা হয়নি আর। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় বাবা তার ঘড়ি কিনব কোন উদবৃত্ত দিয়ে? বলো? তা ছাড়া, সত্যিই কি খুব একটা দরকার আছে? আমার তো কোনোই অসুবিধে হয় না।

ঠিক-ই বলেছেন মামাবাবু। আমারও একটুও অসুবিধে হয় না কিন্তু যা-কিছুকেই আমরা এখন ‘প্রয়োজন’ বলে মনে করতে শুরু করেছি, যেমন ফ্রিজ, টি ভি, কালার টি ভি, ভি সি আর, গাড়ি, নিজস্ব বাড়ি এসবেরও কি সত্যিই খুব-ই প্রয়োজন? আমার তো মনে হয় যে, নেই। এসব না-থাকলেও দিব্যি চলে যায়। অথচ এইসব-ই স্ব-মালিকানায় আনার জন্যে প্রতিমুহূর্তেই চারপাশের কত অগণ্য মানুষ যে, অমানুষ হয়ে যাচ্ছে, চোখের সামনে তা দেখে, তা বুঝে; বড়ো মন খারাপ হয়ে যায়। এই ঘুস-ঘাস জালিয়াতি-জুয়াচুরি, মিথ্যাচার, অত্যাচার...। শুধু এইসবের জন্যে? ভাবা যায় না।

শিরীষের প্লাস্টিকের নস্যির কৌটো থেকে বড়ো করে একটিপ নস্যি নিয়ে খুব ভালো করে রুমালে নাক ঝেড়ে নিয়ে, লাল হয়ে-যাওয়া জল-ভরা চোখে শিরীষের দিকে চেয়ে ঘণ্টেবাবু বললেন, আসলে ব্যাপারটা কী জানো শিরীষ। প্রত্যেকেই আজকাল ওপরের দিকেই তাকায়। আরে, আমি তোমার মামিমাকে সব সময়েই বলি, দ্যাকো, ওপরের দিকে চাইবার কি শেষ আছে কোনো? ওপর তো অসীম। কত উঁচু, তার খোঁজ কে রাকে? তার চে নাবোর দিকে চাও, নিজের বাকুল-এর মধ্যে থাকো, দেখবে, সুখ গড়িয়ে গড়িয়ে পড়চে। অন্যের যা-আচে তা আমার নেই কেন? তা ভেবে কাঁদতে বসলে, সে-কান্না জীবনেও থামবে না। তার চেয়ে ‘আমার যা আচে অন্যের তাও যে, নেই,’ —সেই কতাটি মনে করলেই মন শান্তিতে কানায় কানায় ভরে যাবে। বলো বাবা! সুখ-শান্তি কি আর ধন-সম্পত্তি দিয়ে হয়? সে তো মনের-ই ব্যাপার।

তারপর নাকটা একবার টেনে নিয়ে বললেন, তবে হ্যাঁ। একটা কথা বলব, তোমার মামিমার কিন্তু কোনো পার্থিব জিনিসের প্রতিই বিন্দুমাত্র লোব নেই। অন্য চরিত্রের মেয়েচেলে হলে, আমাকে চোর-ডাকাত বানিয়ে ছাড়ত। ভোগবিলাসী ওরাইফেরা এদেশে যত, চোর-ডাকাতের সৃষ্টি করেচে অমনটি বোধ হয় আর কোথাওই হয়নি।

বোধ হয় ঠিক-ই বলছেন আপনি।

চলো শিরীষ, পা যে, ধরে গেল দাঁইড়ে দাঁইড়ে। ওই চায়ের দোকানের সামনের বেঞ্চে চলো, গিয়ে বসি। ভিজে গেছে যদিও বেঞ্চিটা, তবু। এককাপ করে চা খাওয়া হোক। আমিই খাওয়াচ্ছি।

চলুন।

বলল শিরীষ।

চায়ের দোকানের দিকে যেতে যেতে ঘণ্টেমামা বললেন, তোমার ফিলসপি অফ লাইপ আর আমার ফিলসপি অফ লাইপের মধ্যে দেখছি বেশ মিল আচে শিরীষ। চমৎকার ছেলে তুমি। আমি বুঝি না, হাতের কাছে তুমি থাকতে, বউদি হিল্লি-দিল্লি-কলকাতা কেন করে বেড়াচ্ছেন ঝিঁঝির পাত্রের খোঁজে? যাকগে। আমার নিজের ‘বিবেক’-এর প্রতি একটা কর্তব্য ছিল। করে দিলাম। সম্বন্ধ হলেই তো আর বিয়ে হয় না। কী বলো?

হ্যাঁ। তা তো ঠিক-ই। তবে আপনি কী যে, বলেন! কোথায় নীলোৎপলবাবু আর কোথায় আমি! শিবের সঙ্গে বাঁদরের তুলনা? তা ছাড়া, ঝিঁঝি আমার ছেলেবেলার বন্ধু। আমরা দু-জনেই দু-জনকে পছন্দ করলেও স্ত্রী-পুরুষের মধ্যের সব সম্পর্কর পরিণতি কি বিয়েই হয়ে ওঠে মামাবাবু? না, হওয়াটা উচিত?

তা তো নয়ই! অবশ্যই নয়! তোমার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণই একমত। তুমি চেলেটি খুব-ই ইন্টেলিজেন্ট হে শিরীষ!

শিরীষ হেসে ফেলল, ঘণ্টেমামার এই হঠাৎ-দেওয়া কমপ্লিমেন্টে।

অপ্রস্তুত হয়ে বলল, থ্যাঙ্ক-ইউ।

কইরে, পাগলা! জানলা-দরজাগুলো সব বন্ধ কর তাড়াতাড়ি। কী আঁধিই উঠল রে! ছুটকি! করছিসটা কী? দাদাকে সাহায্য কর একটু। দৌড়ো। দৌড়ো। দুধ বসানো আছে আমার কড়াইয়ে, প্রায় ফুটে এসেছে। আমি উঠতে পারছি না।

ছুটকি বলল, আঁধিটা উঠেই মরে গেল। বৃষ্টি নামল মা! কী মজা! কী বড়ো বড়ো ফোঁটা, দেখ, দাদা দেখ। আঁধি মরে গেল। বৃষ্টি নামল, মা! বৃষ্টি!

বৃষ্টি? আঃ। তবু দরজা-জানলাগুলো ভালো করে বন্ধ কর। বৃষ্টি থামলেই খুলিস।

আমি বৃষ্টিতে ভিজব মা! গতবছর তো বৃষ্টি হয়ইনি!

ঢের হয়েছে। বৃষ্টিতে ভিজে আর দরকার নেই। আজ বাদে কাল পরীক্ষা! বৃষ্টিতে ভিজবেন মেয়ে!

ছুটকি, পাগলাকে দরজা-জানলা বন্ধ করতে সাহায্য করার পরে রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়াল কপাটে হেলান দিয়ে, বাঁ-পায়ের হাঁটুর কাছে ডান পায়ের পাতাটি তুলে। এটাই ওর নিজস্ব ভঙ্গি দাঁড়াবার। যখন বাইরের কেউ না থাকে।

ও কি? আবারও অসভ্যতা। বলেছি না, বদভ্যেস হয়ে যাবে। অমন করে কখনোই দাঁড়াবে না। বড়ো হচ্ছ না তুমি ছুটকি? তোমার এখন যা-বয়েস তার ঠিক দু-বছর পরে আমার বিয়ে হয়েছিল, জান? অতটুকু মেয়ে। কোনোদিনও কলকাতার বাইরে না-যাওয়া মেয়ে। একা এই ‘কেকরা-মেকরা’ ভাষা বলা মানুষদের মধ্যে এসে যে, কী বিপদেই পড়েছিলাম! তবে এখানে আসার পথের দৃশ্যর কথা কখনো ভুলব না কোনোদিনই। সব দুঃখ ভুলে গেছিলাম সেই দৃশ্যে। কলকাতায় যেমন, অনেক কিছুই আছে, আবার নেইও অনেক কিছু। কুড়ি বছর বিয়ে হয়েছে অথচ, সেই যে, এসেছি তারপর ডালটনগঞ্জ থেকে একদিনের জন্যেও বাইরে বেরোইনি আর। মানুষের মা-বাবা থাকে, সচ্ছল দিদি-দাদা থাকে, ননদ-নন্দাই, ভাসুর-জা। আদর করে যেতে-বলার একজনও মানুষ আমার কেউ-ই নেই। যাঁরা আছেন, তোর বাবার আর আমার তরফেও তাঁদের অবস্থাও তথৈবচ। তাঁরা যে, সপরিবারে টিকিট কেটে এখানেও চলে আসবেন বেড়াতে, তেমন সামর্থ্যও তাঁদের নেই, যেমন আমরাও পারি না কোনো জায়গাতে যেতে। কেউ এলেও এই একঘেয়েমি হয়তো সামান্য দিনের জন্যে হলেও কাটত!

কোন পথের দৃশ্যর কথা বলছিলে মা?

আরে কলকাতা থেকে ডালটনগঞ্জে আসার দৃশ্যর কথা। তখন তো সকালে-বিকেলে দু-টিমাত্র ট্রেন ছিল। নাম ছিল চৌপান এক্সপ্রেস। হাওড়া থেকে বাড়কাকানার জন্যে, একটি বগি জুড়ে দিত দুন-এক্সপ্রেসে। গভীর রাতে সেই বগিটি দুন এক্সপ্রেস ‘গোমো’ স্টেশনে ফেলে রেখে চলে যেত দেরাদুন-এর দিকে।

দেরাদুন কোথায় মা?

যতদূর জানি, দিল্লি থেকে আরও আগে। তবে জিতুকাকুদের বাড়িতে ঠাকুমা যে, তোদের একদিন পোলাও খাইয়েছিলেন? সেই পোলাও রেঁধেছিলেন দেরাদুন-রাইস-এ। কেমন গন্ধ ছিল চালটাতে? কেন? জিতু তো আমাদেরও....

উঃ দারুণ।

পাগলা ঘর থেকে চেঁচিয়ে বোনকে শাসন করে বলল, দেরাদুন-রাইসের গল্প না করে, পড়া করো। আজ বাদে কাল পরীক্ষা। জিতুকাকু আজ এলেন না বলে, কি পড়তে হবে না তোমার?

তুই নিজের চরকাতে তেল দে। আমার চিন্তা তোর করতে হবে না। তোর চেয়েও ভালো রেজাল্ট যদি না করি তো দেখিস। নাকে খৎ দেব।

ওই নাকে আর খৎ-টৎ দিতে যাস না। একে তো, নাক না তো, মুগের ডালের ছোট্টবড়ি। ঘষে খয়ে গেলেই চিত্তির। লোকে ভাববে ডালটনগঞ্জ জঙ্গুলে জায়গা, ভাল্লুকেই বুঝি খুবলে নিয়েছে নাক!

চুপ কর তুই। নিজের পড়া কর।

বলেই বলল, তারপর বলো মা।

ওই লাইন দিয়েই বিহারের ও বাংলার যত কয়লা সব যেত তখন উত্তর ভারতে। চৌপান হয়ে। তাই ওই ট্রেনটির নাম ছিল চৌপান এক্সপ্রেস। সারাপথে খাবার-দাবার কিছুই পাওয়া যেত না। সকালে চা জলখাবার খেতে হত বাড়কাকানাতে এসে। সেখানে আটটা, সাড়ে আটটা নাগাদ আবার সেই ‘বগি’ কেটে রাখত গোমোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।

একটু চুপ করে থেকে বললেন, কিন্তু ভোর হতে-না-হতেই দু-দিকে যে কী সুন্দর দৃশ্য। আমার বিয়ে হয়েছিল ফেব্রুয়ারির শেষে উনিশে। পুরো মার্চ মাসে দু-তরফের আত্মীয়স্বজনদের বাড়ি নেমন্তন্ন খেয়েই বেড়ালাম। ওইভাবেই তখন নতুন বর-বউ-এর সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনদের আলাপ-পরিচয় হত ঘনিষ্ঠভাবে। জানি না, আজকাল মানুষের ব্যস্ততা অথবা সংগতির অভাবের কারণে কলকাতার এই রেওয়াজ উঠে গেছে কি না! তা, তোর বাবার জয়েন করার তারিখ ছিল সাতাশে এপ্রিল। এখনও মনে আছে তারিখটা।

তারপর? বলো।

ঘুম ভেঙে উঠেই সেকেণ্ড ক্লাস কামরায় জানলার পাশের সিটে বসে যেন, স্বর্গরাজ্যে ঢুকলাম বলে মনে হল। তোর বাবাকে বললাম, আপনি এতসুন্দর জায়গাতে থাকেন?

তোর বাবার রসকষ চিরদিন-ই কম। বললেন, এই পান্ডব-বর্জিত জঙ্গলের মধ্যে সুন্দরটা তুমি কী দেখলে! আশ্চর্য তো!

তুমি বাবাকে ‘আপনি’ বলতে নাকি?

প্রথমে প্রায় ছ-মাস তাই বলতাম। আমার চেয়ে উনি বয়সে এতই বড়ো ছিলেন যে, ‘তুমি’ বলতে ভয় করত। চেহারাও তো তখন এমন ছিল না। একেবারে বাঘের-ই মতো ছিল। বিচ্ছিরি গন্ধের বিড়ি খেতেন। বড়োজামাইবাবু বাবাকে বলেছিলেন : ‘বাবা, আপনি কিন্তু শেফুকে হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিলেন!’

তাতে দাদু কী বলেছিলেন?

বলেছিলেন, তোমারও তো মেয়ে হয়েছে। তুমিও একদিন বিয়ে দেবে তাকে। যদি কোনো বাবা তাঁর মেয়েকে হাত-পা বেঁধে কখনো জলে ফেলেন, তা যে, তিনি কত অসহায় হয়েই ফেলেন; তা যেন, তোমাকে কখনো জানতে না হয় কামু।

বড়োমেসোর নাম কি কামু নাকি?

নাম ছিল কামিনীবল্লভ। বাবা ডাকতেন কামু বলে। বলতেন, কী বিচ্ছির নাম। কামুদের পরিবারে কোনো শিক্ষা নেই। অবশ্য আমাকে যেখানে পাঠালেন তাঁদের-ই বা কী শিক্ষা! তবে তোর বাবা মানুষ খুব-ই ভালো। আমার শ্বশুর-শাশুড়িও খুব ভালো মানুষ ছিলেন বলে শুনেছি সকলের-ই কাছে। আজকাল অনেক-ই শিক্ষিত, যশস্বী সব মানুষ দেখতে পাই যাঁদের ‘অমানুষ’ বলেই মনে হয়।

বলেই বললেন, বৃষ্টি থামলে দরজা-জানলা সব খুলে দিবি দু-জনে মিলে। আমায় যেন, বলতে না হয়। যা! এবারে পড়তে বোস গিয়ে। আর গল্প নয়।

রাতে কী রাঁধছ মা?

কী আর! এই দেরাদুন-চালের পোলাও, কচি-মাংসের কালিয়া, গলদা-চিংড়ির মালাইকারি। আর খাবি কী বল?

বলেই, হেসে ফেললেন। হয়তো কান্নাও মিশে ছিল সেই হাসিতে। সেটা দেখা গেল না, কিন্তু হাসিটাকে তা, একটু আড়াল করল মাত্র।

ছুটকি বলল, বাবা তো মনোয়া-মিলনে। বাবা তো খিচুড়ি একদম-ই পছন্দ করে না। আজ প্রথম বৃষ্টি হল, যদিও বর্ষার বৃষ্টি নয়; তবু, খিচুড়ি করবে, মা?

মুগের ডাল যে, নেই।

না থাকলে আর কী করবে? মুসুরির ডালের-ই করো।

মুসুরির ডালও নেই। অড়হর আর খেসারির ডাল আছে শুধু। ওইসব ডালে কি খিচুড়ি হয়?

হবে না কেন? তুমি রাঁধলে আর আমরা ভালোবেসে খেলেই হয়। ওই দু-ডালের যে, ডাল দিয়ে তোমার খুশি, করো।

পাগলাও যে, তোর বাবার-ই মতো! খিচুড়ি দু-চোখে দেখতে পারে না। অথচ কেন যে, তা কে জানে! তোর বাবার না-হয় জঙ্গলে খিচুড়ি খেয়ে খেয়ে মুখে অরুচি ধরে গেছে। পাগলার কী?

হয়তো ‘লাইক ফাদার লাইক সান’ বলে।

বা:। বেশ তো কথাটা। আগে শুনিনি। স্কুলে শিখেছিস?

হ্যাঁ। তাহলে তো হতই। আমাদের স্কুলে আবার এসব শেখায় নাকি?

তবে?

জিতুকাকুই বলেছিল একদিন। আচ্ছা মা! জিতুকাকু আজ এল না কেন? আজ যে, বৃহস্পতিবার তা কি ভুলে গেল? কই এমন তো কখনো হয় না।

শেফালি প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার চেষ্টা করে বললেন, তা আমি কী করে বলব। এলে, খিচুড়িও খেয়ে যেতে পারত। খিচুড়ি খেতে খুব ভালোবাসে জিতুকাকু।

তুই কী করে জানলি?

আমি জানি। আমার সঙ্গে আজ দেখাও হল একঝলক।

কোথায়? প্রশ্নটা করেই, প্রশ্নর মধ্যে জিজ্ঞাসার আকুলতাটা বড়োবেশি তীব্র হয়ে গেল যে, তা বুঝতে পেরেই মেয়ের কাছে লজ্জিত হলেন শেফালি।

স্কুল থেকেই তো আসছিলাম আমি। আমাকে যেই দেখল, অমনি স্কুটারটা দাঁড় করিয়ে বলল, ‘ছুটকি, ভালো করে পড়াশুনো কোরো। পরীক্ষা কিন্তু এসে গেছে তোমার। আজকে একটু অসুবিধে হয়ে গেছে। আসলে, এবার থেকে তুমি যদি, তোমার সুবিধেমতো আমাদের বাড়িতে আসো পড়তে তাহলে আমার সুবিধে হয়। মায়ের শরীরটা তো ভালো যাচ্ছে না। এমনিতে তো সারাদিন আমি বাইরে বাইরেই থাকি নিজের কাজে। ডালটনগঞ্জের বাইরেও যাই। তাই বাড়িতে থাকার সময় যতটুকু পাই ততটুকু বাড়িতেই থাকা উচিত। মায়ের হঠাৎ কিছু হলে? শেষ ই.সি.জি. রিপোর্টটা খুব ভালো বেরোয়নি। আর বাড়িতে তো কাজের লোকজন ছাড়া দ্বিতীয় প্রাণীও নেই।’

তাই?

শেফালি বললেন।

তারপর বললেন, ও তো তোমাকে পড়ায় ভালোবেসেই। কোনোরকম জোর তো আমাদের নেই তোর জিতুকাকুর ওপরে। না আসতে পারলে আর কী করা যাবে?

শেফালির দু-চোখে দু-চোখ রেখে ছুটকি বলল, তুমি কিছু জান না? মানে, তোমাকে কিছু বলেনি জিতুকাকু? কেন আসবে না?

না তো। প্রয়োজনের চেয়ে অনেক-ই বেশি জোরের সঙ্গে বললেন শেফালি।

ওঁদের বাড়ি নানা লোকজন আসে সবসময়ে। তা ছাড়া দিদা ভীষণ জোরে টিভি চালান। বেশি বেশি। এলে কী হয়, আমাদের বাড়ি? আসবে না কেন? তা ছাড়া, আমাদের কি কোনোই দাবি নেই মা? আমরা যে, ওঁকে ভালোবাসি। তুমি....

জিতুকাকু কি তোর মাইনে-করা মাস্টারমশাই?

তাড়াতাড়ি কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে, বললেন, শেফালি। আমরা তো কিছুই দিই না ওকে, ও যা দেয় তার বদলে। আমাদের সাধ্য কতটুকু? টাকাপয়সার কথা বলছি না, অন্যকিছুর কথা বলছি, উপহার-টুপহার উলটে ওই তো, কত কী দিচ্ছে সবসময়, আমাদের সবাইকেই। আমাদের কী জোর আছে বল ওর ওপরে? ইচ্ছে করলে আসবে; ইচ্ছে না করলে আসবে না।

ছুটকি চুপ করে রইল কিছুক্ষণ।

তারপরই হঠাৎ বলল, ‘ভালোবাসাটার’ বুঝি কিছু দাম নেই?

মুখ নীচু করে রইলেন শেফালি। জবাব দিলেন না কোনো।

ছুটকি বলল, আচ্ছা মা, বাবা কি জিতুকাকুকে কিছু বলেছে?

কীসের কিছু?

না, বিশেষ কিছু না, বাবা...মানে, বাবা তো হঠাৎ-হঠাৎ রেগে যায়...

তোমার বাবা রাগ করতে পারেন এমন কোনো কিছু তো জিতুকাকু করেননি। তবে হ্যাঁ, আমার জন্যে, তোমাদের জন্যে এতকিছু যে, জিতু কিনে আনে, দেয়; তা তো তোমার বাবার মনে, যেহেতু সামর্থ্য কম; একধরনের কষ্টের জন্ম দিতেও পারে। তোমার বাবার দিকটাও বোঝার চেষ্টা করো একটু। জানি না, উনি কিছু বলেছেন কি না! তবে আমার সামনে তো বলেননি।

তোমার সঙ্গে কিছু কি হয়েছে? মা? জিতুকাকুর?

শেফালি পাকা অভিনেত্রীর মতো দুধের কড়াতে ডোবানো হাতা থেকে তর্জনীটি তুলে নিজের গালে ছুঁইয়ে বললেন, ‘পাগল! আমার সঙ্গে? কী হতে পারে? কী হতে পারে বলে, ভাবছিস তুই! আশ্চর্য!’

নারীমাত্রই জন্মসূত্রে পাকা অভিনেত্রী। ফাইভ ক্লাসে-পড়া ছুটকি তার মাকে এক গোল দিয়ে বলল, ‘সত্যিই তো। তোমার সঙ্গে কীই বা হতে পারে। আমার-ই মাথা খারাপ! তবে জিতুকাকু না এলে ভালো লাগে না!’

হঠাৎ-ই প্রমাদ গোনলেন শেফালি। ছুটকির শরীরেরও মনের গড়ন-বাঁধন একেবারেই শেফালির-ইমতো। ইতিমধ্যেই পাড়া-বেপাড়ার ছেলেরা তার সৌন্দর্যর জন্যে তাকে বিরক্ত করতে আরম্ভ করেছে। তবে প্রখর বুদ্ধিমতী এবং নিজের পড়াশুনো, কেরিয়ার সম্বন্ধে, স্বাবলম্বনের স্বপ্ন সম্বন্ধে যথেষ্ট সচেতন বলেই ওইসব স্বাভাবিক বিপদ-আপদ সে, সহজেই কাটিয়ে দেয়। ছুটকি জল-পাওয়া বোগোনভিলিয়ার মতো যেভাবে বেড়ে উঠেছে দৈর্ঘ্যে, সৌন্দর্যে, যৌবনে এবং মনের গভীরতাতেও, তাতে জিতুকে নিয়ে অন্য বিপদে না পড়তে হয় শেফালিকে। তাঁর সৌন্দর্যের কারণে, এবং তা দারিদ্র্যলালিত বলেই অনেক-ই ধরনের বিপদের সন্মুখীন হয়েছেন এপর্যন্ত তিনি নিজে, যেসব বিপদের কথা মেয়ে-মাত্রই জানে। এবং আজও হন। শুধুমাত্র নিজের প্রখর ‘বুদ্ধি’ দিয়েই তা থেকে পার পেয়ে এসেছেন। ঘণ্টেবাবুর এসব ব্যাপারে কোনোরকম বুদ্ধি-সুদ্ধিই নেই। অত্যন্তই ভোলে-ভালা, কাছাখোলা মানুষ তিনি। তবে মানুষটি ভালো। তাঁর যা-অভিজ্ঞতা তাতে উনি জানেন যে, পুরুষমানুষদের সম্বন্ধে ধারণাটা ওঁর আদৌ উচ্চ নয়। হয়তো জিতু একমাত্র ব্যতিক্রম। তাঁর চোখের ভাষা না-পড়তে পারার মতো বোকা তাঁর নিজের মেয়ে ছুটকি আদৌ নয়।

শেফালি বললেন, যাও এবার পড়ো গিয়ে। দেখি, তোমার খিচুড়ির কী করতে পারি।

বৃষ্টিটা থেমে গেছে একটু আগে। স্নিগ্ধ হয়েছে শহর, কৃতজ্ঞ হয়েছে; এই বৃষ্টির কাছে।

ডালটনগঞ্জ শহরের মধ্যেও অনেক গাছগাছালি এখনও আছে। পথের পাশে মহুয়া, বাড়ির হাতাতে আম-কাঁঠাল, নানা সুগন্ধি ফুলের গাছ বা ঝোপ-ঝাড়। বৃষ্টি হওয়াতে কাঁকুড়ে লাল মাটি থেকেও ঝাঁঝালো একধরনের গন্ধ উঠছে। যেমন ঝাঁঝ—ছুটকির বয়সি মেয়েদের যৌবন থেকে ওঠে। কাঁঠালের মুচি ও আমের বোলের গন্ধ, শালফুলের মঞ্জরির গন্ধ, মহুয়ার গন্ধের সঙ্গে মিশে ভেসে আসছে ভেজা হাওয়ায়।

রোমান্টিক শেফালি বছরের এই সময়টাতে আর বর্ষাতে পাগল-পাগল বোধ করেন। গত কুড়িবছর ধরে বছরের এই দুই-সময়ে যে, কত কষ্টই পেয়েছেন তা উনিই জানেন! ঘণ্টেবাবু তাঁকে ঠাট্টা করে ডাকেন গন্ধ-গোকুল। বলেন, নাকে কিছু গন্ধও পাও তুমি বটে। পুলিশে জানলে, গন্ধ-শোঁকা কুকুরের পার্টনার হিসেবে তোমাকে চাকরিও দিয়ে দিতে পারে।

হেসেছেন শেফালি, ঘণ্টেবাবুর কথা শুনে।

যে-মানুষটা চিরদিন জঙ্গলে-জঙ্গলে কাটালেন তাঁকেই বিধাতা দেখার চোখ বা ঘ্রাণের নাক বা শোনার কান দিলেন না! ওঁর স্বামীর বড়োই মন্দভাগ্য! এ ছাড়া আর কীই বা বলতে হয়; ভাবেন, শেফালি।

খিচুড়ি চাপিয়ে দিয়েছেন অনেকক্ষণ। খেসারির ডালের খিচুড়ি ব্যাপারটা নিজের কান গ্রহণ করল না তাই আর এক অভাবনীয় খাদ্যবস্তু অড়হড়ডালের খিচুড়িই করছেন। আনাজ বলতে, আলু ছাড়া আর কিছুই নেই। আলুই ভাজবেন কড়া করে। আর শুকনো লঙ্কা ভাজা। কাল পাগলাকে একবার বাজারে পাঠাতেই হবে। কবে যে, কর্তা ফিরবেন ‘মনোয়া-মিলন’ থেকে তার ঠিক নেই কোনোই। মালিকেরা যতদিন থাকবেন, ততদিন-ই সেখানে থাকতে হবে তাঁর। এদিকে, দিয়ে গেছেন মাত্র পঁচিশটা টাকা। তা ছাড়া, ভাঁড়ারে যা আছে তা আছে।

শেফালিই জানেন, ভাঁড়ারে মা অন্নপূর্ণা! এ-নিয়ে বেশি ভেবে সময় এবং নিজের মনের প্রশান্তি ক্ষুণ্ণ করতে চান না উনি! যা-দিনকাল পড়েছে, যার স্বামীর-ই যেমন রোজগার থাকুক-না-কেন, প্রত্যেক গৃহিণীর পক্ষেই সংসার চালানো বড়োই দুরূহ হয়ে উঠেছে। ঘণ্টেবাবুর চেয়ে কম রোজগারও তো আছে বহুমানুষের! বোঝেন সব-ই। তবু, মাঝে মাঝে ছেলে-মেয়ে দুটোর মুখের দিকে চেয়ে বড়োই কষ্ট পান।

ভারি সুন্দর হয়ে উঠেছে আবহাওয়া এখন। খিচুড়ি ফোটার গন্ধের সঙ্গে বাইরের মিশ্র গন্ধ মাখামাখি হয়ে গেছে। হঠাৎ-ই বড়ো স্নিগ্ধ হয়েছে প্রাকৃতিক পরিবেশ।

বঁটিটা নিয়ে আলু কাটতে বসলেন শেফালি। রান্নাঘরের বাইরে, বারান্দাতে। মেঘ কেটে গিয়ে চাঁদ উঠেছে এখন। ঝকঝক করছে যেন, মলিন ডালটনগঞ্জ শহর।

দরজার শিকলে কে যেন, নাড়া দিল। হাওয়াটা মাতামাতি করছিল বাইরে। গাছাপালার ডাল আন্দোলিত হচ্ছিল। তবে হয়তো বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরে সব জানালা দরজা এখনও খোলেনি ছেলে-মেয়েরা। ওরা তো শুনতে পেল না। কিন্তু শেফালির মনের দরজা খোলাই ছিল অনুক্ষণ। শেফালি কোনোদিনও বাইরের দরজা নিজে গিয়ে খোলেন না, বাড়িতে স্বামী অথবা ছেলে-মেয়েরা থাকলে; কিন্তু আজ ওর হৃৎপিন্ডে হঠাৎ দামামা বাজল। হঠাৎ-ই মনে হল, শিকলে নাড়া পড়ার শব্দ শোনার জন্যে ওঁর মন যেন, উন্মুখ হয়েছিল। কোনোক্রমে বঁটিটাকে সরিয়ে রেখে উঠে পড়ে, বুকের আঁচল সামলে প্রায়, নি:শব্দ পায়ে দৌড়ে গিয়ে যথাসম্ভব কম শব্দ করে দরজার একটি কপাট খুললেন। যাতে পাগলা বা ছুটকি দরজা খোলার শব্দ শুনতে না পায়।

কেন যে, এমন চৌর্যবৃত্তি আশ্রয় করল তাঁকে, বুঝতে পারলেন না।

জিতেন সাইকেল-রিকশাতে বা হেঁটেই আসে। কখনোই স্কুটার নিয়ে আসে না। ও, চিরদিন-ই বিশ্বাস করে এসেছে যে, যেখানে ভালোবাসা আছে অথবা মৃত্যু; সেখানে শব্দ করে যেতে নেই! তা ছাড়া, তার যাওয়া-আসার হিসেব রাখার জন্যে ঘণ্টেদাদের পাড়া-প্রতিবেশীরা, নখ-চঞ্চু-তীক্ষ্ণ-ঠোঁট-সম্পন্ন সামাজিক বাজপাখিরা; সবসময়েই তক্কে-তক্কে থাকে। কারো একটু সুখ দেখলেই শকুনের মতো তারা দূর আকাশ থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপর পরম-আক্রোশ এবং নোংরামির সঙ্গে। প্রেম যেন, গলিত, দুর্গন্ধময় শব; যেন, আবর্জনা! যে-সমাজকে জিতেন চেনে-জানে, তার নব্বই ভাগ মানুষ-ই আনন্দ-হীন, প্রেম-হীন, হয়তো তাই সেক্স-স্টার্ভড; হয়তো তাই, তাঁদের এই বিকৃত-রুচি; বিকৃত জীবন-দর্শন।

জিতেন মুখটা নামিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিল। ওদের দরজার পাশে শালগাছের পাতা-পিছলে বৃষ্টি-ভেজা চাঁদের আলো এসে তার মুখের একপাশে পড়েছিল। বৃষ্টি-ভেজা একরাশ গাছগাছালির আশীর্বাদ গায়ে-মাথায় মেখে, যেন, কোনো কাল্পনিক, স্বপ্নের বাগানে পৌঁছোনোর মোরামের মিষ্টি-ঝাঁঝের গন্ধ-ওঠা পথ বেয়েই জিতেন এল।

দরজা খুলে, শেফালি কিছু না বলে; তার দু-চোখে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ।

জিতেন-ই বলল, অপরাধীর গলায়, আবারও এলাম!

তারপর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, কারণ...

কারণ কি জিজ্ঞেস করেছি?

না, তা নয়, তবে এলাম আবারও, কারণ; না-এসে পারলাম না, তাই-ই!

এসো, ভেতরো এসো।

শেফালি বললেন।

বলেই ভাবলেন যে, আজকের ভেতরে আসার ‘আমন্ত্রণ’টি কত ব্যাপ্ত, কত গভীর এবং হয়তো দ্ব্যর্থকও।

এমন করে, এর আগে; কোনোদিনও ডাকেননি উনি জিতেনকে।

ভয় করতে লাগল শেফালির। এই সম্পর্কে প্রীতি ছিল, আনন্দ ছিল, হয়তো প্রেমও ছিল; হয়তো কেন, নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পরের বর্ষণের-ই দ্যোতক হয়ে জিতেন আজ এই স্নিগ্ধ-রাতে তাঁর দুয়ারে এই প্রথমবাব ভয়-পায়ে ঢুকল, কাঁকুরে-লাল, বৃষ্টি-ভেজা মাটি আর ঝড়ে-ওড়া ফুল-পাতার সঙ্গে।

খেলাটা আর এলেবেলে রইবে না আদৌ। এলোমেলো ঘূর্ণি উঠবে এবারে ওর জীবনে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে-থাকা বিষাক্ত সাপের-ই মতো এখন-অদৃশ্য, অ-প্রণিধানযোগ্য ঘুমিয়ে-থাকা সেই ঘূর্ণির গন্ধ পেল নাকে।

তাই, খুব-ই ভয় করতে লাগল শেফালির।

মনোয়া-মিলনে, আজ শেষ-বিকেলের প্রায় দু-ঘণ্টা ধরে ঝড়-বৃষ্টির তান্ডব চলল। তাপাঙ্ক একলাফেই অনেক নীচে নেমে গেল।

পূর্ণিমা প্রায় এসে গেছে। কিন্তু আকাশে চাঁদের হদিশ নেই কোনো। মাঝে মাঝে অবশ্য ছেঁড়া-খোঁড়া আছে, কালো মেঘের আস্তরণ; সেখানে উজলা-আকাশের উদ্ভ্রান্ত উদ্ভাস। নইলে, ঘন-কালো, ফিকে-কালো, ছাই-রঙা মেঘ আর সেই মেঘের আড়াল থেকে কোনো অদৃশ্য, মনমৌজি মাদল-বাদক ক্রমান্বয়ে ‘দ্রিমি-দ্রিমি-দ্রিমি’ করে মাদল বাজিয়ে চলেছে। বিদ্যুৎ ঝলকাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে কখনোও মুহূর্তে বিশ্ব-চরাচরকে উন্মোচিত করে, তীব্র, সাদা আলোর প্যানোরোমিক ফোকাস-এর মাধ্যমে সবকিছুকে দৃশ্যমান করে, আবার কখনো-বা শুধু প্রকৃতির কোনো বিশেষ অংশ বা ফালিকেই। একসারি ঊর্ধ্ববাহু পত্রহীন গাছ, নদীর একটি অংশ, পাহাড়তলি অথবা কাছিমপেঠা পাহাড়ের একটি ঢালকে হঠাৎ বোতাম-টেপা প্রচন্ড শক্তিশালী ঐশ্বরিক টর্চের মুহূর্তবাহী চকিত আলোয় আলোকিত করেই পরক্ষণেই নিকষ-কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত করে দিচ্ছে।

নীলপাখি দু-টি এবারেও এল না। ভাবছিল, শিরীষ অথচ অনেক অনেক মানুষের-ই টুকরো-টাকরা মঙ্গলের জন্যে তাদের এবারে আসাটা বড়োই প্রয়োজন ছিল। মানুষের দরকারের কথাই যদি তারা না বুঝল, তবে তারা কীসের মঙ্গলদাতা বা দাত্রী?

ট্রেনটা এসে চলে গেছে অনেকক্ষণ-ই। ঘণ্টেমামা, শিরীষ, ঝাণ্ডু, ঝাণ্ডুর দু-জন দোসর এবং অটো-রিকশাওয়ালা, ওরা সবাই ফিরে এসেছে ঘণ্টা দুই আগে। শিরীষ ফিরেছে তার সাইকেলেই। অন্যরা সকলে অটো-রিকশাতে। আগামী কাল সকালের ট্রেনেই ফিরে যাবেন ঘণ্টেমামা ডালটনগঞ্জে। শিরীষের মন-ই যখন এতটা খারাপ হয়ে গেছে নীলোৎপলরা না-আসাতে; তখন কাকিমা, ঝিঁঝি এবং ঘণ্টেমামারও মনের মধ্যে কী যে, হচ্ছে কে জানে!

বুড়ি-মাই আজ সুজির খিচুড়ি রেঁধেছিল। মধ্যে আলু ও পটল ও কাঁচালঙ্কা ফেলে। তা গরম করে নিয়ে তাতে যখন একটু ঘি ঢেলে নিয়ে খেতে বসেছিল, শিরীষ তখন বুড়ি-মাই তার আলো-ছায়া কম্পমান ঘরের মধ্যের চৌপাই-এর ওপরে বসেই বলল, গলা তুলে; ঝিঁঝির বর কি এল?

বর কোথায়? বিয়ের কথাই তো হচ্ছিল শুধু।

বহত-ই আচ্ছি লেড়কি হ্যায়, ঝিঁঝি।

খেতে খেতে শিরীষ নীচুস্বরে বলল, ‘হুঁ’।

কালু তার দুধ-রুটি খাচ্ছিল। সেও যেন, জিভের চকাচক আওয়াজ থামিয়ে বলল, ‘হুঁ’।

তুঝে বহত-ই পেয়ার করতি হ্যায় উও লেড়কি।

ক্যা? হামে?

খাওয়া থামিয়ে, মুখ তুলে অবাক গলায় শুধোল শিরীষ।

একটা লঙ্কায় হঠাৎ কামড় দেওয়াতে কান ঝাঁ-ঝাঁ করছিল।

হাঁ। উসমে কোই শক নেহি।

তুমে ক্যায়সি মালুম বুড়ি-মাই?

বুড়ি-মাই হাসল, ফোকলা মাড়িতে।

বড়ো সুন্দর দেখে শিরীষ, তার চলে-যাওয়া সম্ভ্রান্ত মায়ের এই সম্ভ্রান্ত সুন্দরী পরিচারিকাকে, কুচকুচে কালো ত্বকের, ধবধবে সাদা চুলের, শান্ত, কোনোরকম জাগতিক চাহিদাহীন, ক্ষোভহীন, অনুযোগহীন এই মমতাময়ী বৃদ্ধাকে।

বুড়ি-মাই বলল, আমিও তো মেয়েই! না-হয় এখন লোল-চর্ম বৃদ্ধাই। যৌবন তো একদিন আমারও ছিল! যুবতী নারীর মন বোঝা তো আমার পক্ষে কষ্টের নয়। তোর মাও খুব পছন্দ করত ঝিঁঝিকে। যদিও ঝিঁঝির মা-বাবাকে তেমন করত না!

শিরীষ বলল, থাক-না এসব কথা বুড়ি-মাই। পরের বাড়ির মেয়েকে নিয়ে এত আলোচনার কী আছে? আমাকে স্টেশনে যেতে বলেছিল, তা দু-দিন-ই গেছিলাম। পাত্রই এল না, তার কী করতে পারি আমি? এর আগেরবার তো ঝুড়ি ঝুড়ি পাকা-পেঁপে আর কাঁচকলাও লাতেহার থেকে জোগাড় করে এনেছিলাম। এবারে অবশ্য তেমন কিছু করতে হয়নি।

পেঁপে আর কাঁচকলা! কেন?

আছে। সে অনেক কথা! পরে কখনো বলবখন।

খেয়ে উঠেই আজ শুয়ে পড়ল শিরীষ। কিন্তু ঘুম এল না। মাথার মধ্যে নানারকমের চিন্তা। আজ বৃহস্পতিবার। গুঞ্জনের কাছে যাওয়া হল না এবং খবরও দেওয়া হল না।

আজ ছুটি বলে সে গদিতেও যায়নি। গত পরশু পুনমচাঁদজি বিশ্রামপুরে গিয়েছেন লাইম-স্টোনের কাজে। সে অনেক দূরের পথ। ডালটনগঞ্জ থেকে মধ্যপ্রদেশের দিকে, যে-পথ চলে গেছে তার-ই ওপরের বর্ডারের প্রায় কাছাকাছি। খুব-ই জঙ্গুলে জায়গা। বিশ্রামপুর থেকে গাড়োয়া আর রাংকা হয়ে ফিরতে ফিরতে রবিবার হয়ে যাবে। এদিকে শেঠ চিরাঞ্জিলাল এবং লাডসারিয়াজিও মনোয়া-মিলনে নেই। ওঁরা থাকলে, গুঞ্জনদের দেখাশোনা ওঁরাই করেন পুনমচাঁদজির অনুপস্থিতিতে। গতকাল দেখেছে, ওঁদের নিজেদের মানুষ বলতে আছে শুধু ‘পুরুষোত্তম’ নামক নরাধম। মুন্নি-তিন্নি ওদের পাশের বাড়ির সিংসাহেবের সঙ্গে দু-দিনের জন্যে গেছে খিলাড়ি। সম্ভবত ওই ছেলেগুলোও সঙ্গে গেছে। পুনমচাঁদজি সব জেনেশুনেও কী করে যে, দিনের পর দিন সদ্য-যুবতী মেয়ে দুটোকে অমন ছাড়া-গোরুর মতো ছেড়ে রাখেন, ভেবে পায় না শিরীষ। শিরীষ, মুন্নি-তিন্নির গার্জেন নয়। পুনমচাঁদজি যা মনে করবেন, করবেন।

গতকাল কাজ সেরে বেরোবার সময়ে নরাধম জিজ্ঞেস করেছিল, ওর সরু গলাতে; কাল আইয়েগা ক্যা আপ?

কাল তো ছুট্টি হ্যায়।

শিরীষ বলেছিল।

সব কাম অর বে-কামসে ছুট্টি নেহি না হ্যায়!

মতলব?

নেহি, কাল পুনমচাঁদজিকা ঘর নেহি আইয়েগা আপ? কাল-তো বিফে হ্যায় না?

কথাটা শিরীষের খুব ভালোই মনে ছিল। আজ উঠোনে ঘোরা-ফেরা করা গুঞ্জনের সঙ্গে তিন-তিনবার চোখাচোখিও হয়েছে। প্রথমবার ওর চোখে লজ্জা ছিল। ভালো করে চোখ খুলে তাকায়নি গুঞ্জন। দ্বিতীয়বারে, দুপুর নাগাদ যখন চোখাচোখি হয়েছিল, তখন মনে হয়েছিল অনুরাগ ছিল তার চোখে। তৃতীয়বার যখন চোখ পড়েছিল চোখে, তখন আবার মনে হয়েছিল যে, অভিমান ছিল। সেবারেও ভালো করে তাকায়নি গুঞ্জন।

না-তাকাবার কারণও তো আছে! গতবৃহস্পতিবারের পর শিরীষ তো কোনো যোগাযোগ-ই করেনি ওঁর সঙ্গে। দু-জনেরই যা বলা-কওয়ার তা আজকে ওদের বাড়ি গেলেই হয়তো হত।

শিরীষের মনে হয়েছে যে, বিয়ের ব্যাপারে খুব ভালো করে ভাবা-ভাবি না করে এরকম ইমোশনাল মেয়ের প্রেমকে গ্রহণ করেছে বলে স্বীকার করা খুব-ই বিপজ্জনক ব্যাপার। একবার এগিয়ে গেলে পিছিয়ে আসা আর সম্ভব নয়। তা ছাড়া ঝিঁঝির সম্বন্ধেও ওর ভাবনা এখনও শেষ হয়নি নানা কারণে। তারমধ্যে নিজের আর্থিক দৈন্যও অছে। নীলোৎপলরা আজ না আসাতে পুরো ব্যাপারটাই আরও কমপ্লিকেটেডও হয়ে গেল। এসব বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসার-ই সময় হয়নি এখনও। নিজের জীবনকে ও ঢেলে সাজাতে চায়। এই গদিঘরের চাকরির সামান্যতা—সব সামান্যতাই; এই সংস্থার ক্রিয়াকর্মের সার্বিক সামান্যতা এবং সামান্য জীবিকা থেকে ওর যা-আয় তার সামান্যতা থেকেও ও নিজেকে মুক্ত এবং বিযুক্ত করতে চায়। সেই সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্ত উদ্ভূত ভবিষ্যতের ওপরেই তার ব্যক্তিগত জীবনের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করছে। তাই এই Juncture-এ তাঁর পক্ষে হিন্দি সিনেমার হিরোর মতো এ-গাছ থেকে সে-গাছ জড়িয়ে গান গেয়ে গেয়ে প্রেম করার কোনো অবকাশ-ই নেই। গুঞ্জন মুখে যাই বলুক, ওর সঙ্গে মুন্নি-তিন্নির মানসিকতাতে বিশেষ কোনো তফাত নেই। ওকে আর একদিনও পড়াতে গেলেই আগুনে ঘৃতাহুতি পড়বে।

প্রেম অনেক-ই গভীর ব্যাপার, যা পুনমচাঁদজির ভালো কন্যার সৎ ও নরম অনুভূতি অথবা অভিঘাতের গন্ডির বাইরের জগৎ। শিরীষ যেমন ওকে ঠকাতে চায় না, নিজেও জেনেশুনে ঝামেলাতে জড়াতে চায় না। তা ছাড়া আত্মহত্যা করাও অতসহজ নয়! সকলেই বলে, ‘গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে যাব’ কথায় কথায়। সেদিন ঝিঁঝি যেমন বলল, ‘দাঁড়কাকের বাসা’র পেছনের শিরীষ গাছ থেকে ঝুলবে বলে। নিজেকে এই রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শর পৃথিবী থেকে চিরদিনের মতো সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো মূর্খামি গুঞ্জনের কখনোই হবে না। প্রত্যেক মানুষ-ই জীবনকে বড়ো ভালোবাসে। মৃত্যু আর নরাধমের মধ্যে যদি প্রতিযোগিতা হয় তবে গুঞ্জনও অতিসহজে নরাধমকে বরণ করে নেবে যে, সে-বিষয়ে শিরীষের কোনোই সন্দেহ নেই।

সব-ই বুঝছে, জানছে কিন্তু তবু বুকের মধ্যে কোথায় যেন, একটা অপরাধবোধ কাঁটার মতো খচখচ করছে। গুঞ্জনের সঙ্গে একবার দেখা করা অবশ্যই উচিত ছিল। হুলো বেড়ালটাকেও একবার ইনডাইরেক্টলি সাবধান করে দেওয়া উচিত ছিল যে, কবুতরের দিকে ও যেন, হাত না বাড়ায় ভুলেও। বাড়ালে, ফল খুব-ই খারাপ হয়ে যাবে।

আবারও এই অঞ্চলে নকশালদের ক্রিয়াকলাপ শুরু হয়েছে। শিরীষ মনে মনে অবশ্য তাদের সমর্থন করে। ঝাড়খন্ডিদের বক্তব্যকেও করে। যদিও তাদের বক্তব্য প্রকাশের পথকে সবসময়ে সমর্থন করে না। কিন্তু এই পোড়া দেশে যে, প্রার্থনা, যুক্তি, অনুনয়-বিনয়, বহুবছরের প্রতীক্ষাতেও কোনো ফল ফলে না। সকলেই চোখের সামনে দেখছে যে, এই মূক-বধির স্বার্থপরায়ণ, অন্ধ প্রশাসন কথা শোনে শুধু তখন-ই; যখন হাতে কেউ অস্ত্র তুলে নেয়। সশব্দে, সবেগে, আগ্নেয়াস্ত্রর গুলির সঙ্গে বিদ্ধ করে সেই বক্তব্যকে পেশ না করতে পারলে কোনো বক্তব্যই যাঁদের তা শোনার, তাঁদের কানে পৌঁছোয় না! এই সত্য। এবং অত্যন্ত দুঃখবহ হলেও শতভাগ সত্য। নকশাল ছেলেগুলোর কাউকে কাউকে চেনে শিরীষ। ঝাড়খন্ডিদেরও কারোকে কারোকে চেনে। ওরা ওকে মানেও। ওর সহমর্মিতার কথা জানে। ওদের লুকিয়ে থাকার জায়গাও চেনে জঙ্গলের গভীরে। নরাধম যদি ‘বাড়াবাড়ি’ করে তবে তাকে লুকুমখার বা চাহাল-চুঙরুর জঙ্গলের কোনো শিমুলগাছ থেকে ন্যাংটো করে ঝুলিয়ে তার মাংস খুবলে নিতে বলবে ওদের।

ঝিঁঝি কী মনে করল, কে জানে! কাকিমারও ওটা ভীষণ-ই বাড়াবাড়ি। ঘণ্টাখানেক আগেই নিজের সাইকেল চালিয়ে এসেছিল ঝিঁঝি ‘দাঁড়কাকের বাসা’-তে। ঝাণ্ডুর হাতে, তার আগে আগে টিফিন-ক্যারিয়ারে পোলাও-মাংস পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কাকিমা এবং সম্ভবত কাকিমার নির্দেশেই এসেছিল ঝিঁঝিও।

শিরীষ রেগে গিয়ে যখন ঝাণ্ডুকে বলেছিল, ‘নিয়ে যাও এসব। তোমার দিদিমণিকে তো বলেইছি যে, ঘি-এর খাবার সহ্য হয় না গরিবের পেটে’। ঠিক তখন-ই ঝিঁঝি এসে পৌঁছেছিল।

ঝাণ্ডু তাকে নালিশ করেছিল, ‘দেখিয়ে ঝিনঝিদিদি। মাইজি ইতনা পেয়ারসে আপনা হাতসে সব দে কর ভেজিনথি, ঔর শিসবাবুনে ইনকার কর দিই’।

ঝিঁঝি বলল, ‘বসতে তো বলবি! এই রাতে তোর বাড়িতে একা-একা এলাম সাইকেল চালিয়ে। এটুকু ভদ্রতাও তো দেখাতে পারিস।’

কথা না বলে, হাত দিয়ে ঝিঁঝিকে ভেতরে আসতে বলল শিরীষ।

ঝিঁঝি মুখ নামিয়ে বলল, আজ কেন খাবি না? আজ তো তোকে মা আমাদের বাড়িতে খেতে বলেছিলেন-ই। জগামামা-মাধামারাও এসেছিলেন। খাওয়া-দাওয়া করছেন ওঁরা এখন।

শিরীষ মুখ নীচু করে ঘাড় গোঁজ করে বলল, আমি তো বলেইছি যে, কুকুরের পেটে ঘি সহ্য হয় না!

তুই যে, পোলাও-মাংস খাস না এমন তো নয়! মায়ের হাতের মিষ্টি পোলাও তো তুই খুব ভালোবেসেই খেতিস। সঙ্গে কচি পাঠার কালিয়া। ঘণ্টেমামা এবং মা বসে থাকবেন তোর জন্যে। চল। খাবার ঝাণ্ডুকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। চল শিরীষ। আমরা আজ একসঙ্গে খাব।

না। বলেইছি তো যে, আমি যাব না। এত উৎসব করার কী আছে? বিশেষ কিছু কি ঘটেছে ‘তেওহার’ মানানোর মতো? সে তো এল না।

অপমানে ঝিঁঝির মুখ বেগুনি হয়ে গেল।

তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বলল, সে যে এল না, এইটাই হয়তো উৎসব-পালনের একটা মস্ত কারণ। আমাদের বাড়ির কোনো উৎসব-ই কি, তুই ছাড়া সম্পূর্ণ হয়? বল?

তাই কি? আমি যে, মহুয়াতে এতবড়ো একজন ইম্পর্ট্যান্ট লোক হয়েছি তা তো জানতাম না আগে।

যদি আজও না-জেনে থাকিস, তাহলে বলব, যে, তুই পরমবোকা!

হা:।

হাসল শিরীষ।

তারপর বলল, তা আর বলতে! আমার মতো গাধা তো আর দু-টি নেই! তবে রাত বাড়ছে। একা যাস না। ঝাণ্ডুর সঙ্গেই যা, আস্তে আস্তে সাইকেল চালিয়ে। দিনকাল খারাপ। আগের ‘মানোয়া-মিলন’ আর নেই।

সত্যিই যাবি-না? খাবিও না এখানে বসেও?

বললাম-ই তো, না।

বুড়ি-মাই বলেছিল, লম্ফ-জ্বালা ঘরের আধো-অন্ধকার গভীর থেকে, কওন আয়া রে শিস?

ম্যায় হুঁ বুড়ি-মাই। ঝিঁঝি।

ঝিঁঝি বলল।

তারপরেই বলল, যাবিও না এবং খাবিও না যখন, তাহলে আর কী। যাই!

যা।

এটুকু জানিস না যে, ‘যা’ বলতে নেই, বলতে হয় ‘আয়’।

না। জানি না।

আর কোনো কথা না বলে ঝিঁঝি চলে গিয়েছিল।

বলল, যা রহি হ্যায় বুড়ি-মাই।

ফির আনা বেটিয়া। রোজহি আনা।

ঝিঁঝি খুব অপমানিত হয়েছিল। হওয়ার-ই কথা! অপমান করার জন্যেই তো এমন ব্যবহার করা! সত্যিই যদি নাই খেত তবে ও রেখে দিতে পারত বয়ে আনা খাবারটা। কালুকে দিতে পারত। পোলাওটা বুড়ি-মাইও খুব ভালোবেসেই খেত যদিও, দাঁত না থাকায় মাংস খেতে পারত না। আসলে এই খাবার শিরীষেরও ভীষণ-ই প্রিয়। কিন্তু কেন যে, এরকম করল! নীলোৎপল না-আসাতে ঝিঁঝির কী এবং কতটুকু অপরাধ? শিরীষের এই ব্যবহারের হেতু কারো পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয়। শিরীষের নিজের পক্ষেও নয়। আসলে, ঝিঁঝির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে, ওকে দুঃখ দিয়ে, ওকে কাঁদিয়ে শিরীষ খুব-ই সুখী হয়। ছেলেবেলাতেও, যখন ঝিঁঝিরা মনোয়া-মিলনে আসত এমন-ই করত ও। কেউকেটা বড়োলোকের মেয়ে বলে কোনো রেয়াত করত না। কিন্তু শিরীষকে এমনিতে প্রত্যেকেই অত্যন্ত ভদ্র-সভ্য ছেলে বলে জানে। ঝিঁঝিকে কষ্ট দিয়ে যে, কী সুখ পেয়ে এসেছে চিরদিন তার ব্যাখ্যা ও খোঁজেনি কোনোদিনও। খোঁজার চেষ্টাও করেনি।

কিছুতেই ঘুম আসছে না। আসলে নীলোৎপলদের না আসাতে ঝিঁঝির যে, অপমান তার কারণে ও নিজেও যে, এতখানি অপমানিত উত্তেজিত হবে তা বুঝতে পারেনি। নিজেকে বোঝে না শিরীষ। বুঝতে পারলে সুখী হত।

সেই বাদামি-কালো বড়ো ল্যাজঅলা লাফিয়ে-লাফিয়ে-চলা পাখিটা, যার স্থানীয় নাম ‘কাউকল’, অনেকে বলে, ‘মহুকল’; যার ইংরিজি নাম ক্রো-ফেজেন্ট, ডাকছে পাহাড়তলি থেকে। সারারাত ধরেই ডাকব। তার গম্ভীর ‘ঢাব-ঢাব-ঢাব-ঢাব’ দূরাগত ডাক ভেসে আসছে বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির গভীর থেকে। বৃষ্টির পরে প্রকৃতির শব্দপ্রেরণের ক্ষমতা যেন, বহুগুণ বেড়ে গেছে। সমস্ত বনে-পাহাড়ে অনুরণন উঠছে সেই ডাকের।

সেই অদেখা পাখিটাও ডাকছে, খুব কাছ থেকে। নিয়মিত এবং সমান সময়ের ব্যবধানে, ‘ওঁক-ওঁক-ওঁক-ওঁক’ করে। বহুদূরে কপার স্মিথ ডাকছে ‘টাকু-টাকু।’ তার দোসর সাড়া দিচ্ছে আরও দূর থেকে, ‘টাকু-টাকু-টাকু।’ ইয়েলো-ওয়াট্রেলড ল্যাপউইঙ্গ ডাকছে—‘টি—টি-রটি—টি-টি-টি-টি’ করে, রাতের মোহময়তাকে বাড়িয়ে দিয়ে। ঝড়-বৃষ্টির পরে চাঁদ ওঠাতে চারদিক চকচক করছে চাঁদের আলোয়। রুপোঝুরি হয়ে উঠছে রাত।

জিতেন বলল, ‘সব অন্ধকার আজ। সব মহল্লা ডালটনগঞ্জের’।

তাছাড়া এমনিতেই আজকাল ডালটনগঞ্জে ভীষণ লোডশেডিং। সব কারেন্ট চলে যাচ্ছে কুটকু, হামিগঞ্জ, আবাদগঞ্জ, কাচাইরির দিক, নয়াটুলি, নইমহল্লা, বেলুয়াডিকার এমনকী রেড়মা পর্যন্ত। ড্যামে। ড্যাম বানানো হচ্ছে সেখানে। এমার্জেন্সি-ফুটিং-এ কাজ হচ্ছে। সব সরকারি কাজ-ই প্রথমে শুয়ে-বসে, চূড়ান্ত ঢিলেমি করে এবং অবস্থা যখন বেগতিক তখন-ই ‘এমার্জেন্সি-ফুটিং’, ‘ওয়ার-ফুটিং’-এ। তদুপরি আছে তার চুরির অন্ধকার। তার চুরি যায় প্রতিসপ্তাহেই একবার করে, গড়ে।

চোর-জোচ্চোর-ছ্যাঁচড়ে দেশটা একেবারেই ভরে গেছে। গরমে ঘেমে-নেয়ে উঠতে উঠতে শেফালি বললেন, নিজের মনে, চারদিকে একেবারে ‘লুট-মার’-এর রাজত্ব চলছে।

যেন, ওঁর মনের কথাই বুঝতে পেরে জিতেন বলল, জানো বউদি। একটা দেশ গড়ে মানুষেই! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গেল; ফ্রান্স, জার্মানিও। আর আজ দ্যাখো, তারা পৃথিবীকে কত ব্যাপারেই-না নেতৃত্ব দিচ্ছে। আর সেই যুদ্ধশেষের পরে পরেই আমরাও স্বাধীন হয়েছিলাম। কী করলাম বলো, আমরা সেই স্বাধীনতা নিয়ে? শুয়োর আর গিনিপিগদেরও লজ্জা দিয়ে বংশবৃদ্ধি করা ছাড়া, আর কী করলাম? জনসংখ্যাই এই দেশের সর্বনাশের মূলকারণ হল। অথচ ভোটে হাত পড়ার ভয়ে প্রতিটি রাজনৈতিক দল-ই এই প্রধানতম সমস্যাটি এড়িয়ে গেল। এই গণতন্ত্র নিয়ে কী করার আছে আর আমাদের? মনুষ্যত্ব, সারল্য, সততা, নিয়মানুবর্তিতা, পরিশ্রমমুখীনতাই আজ হয়েছে সবচেয়ে বড়োবলি, স্বাধীনতার পরে। মানুষের মনুষ্যত্বে যত ভেজাল হয়েছে, তত ভেজাল ডালডা বা সিমেন্টেও হয়নি। এই ভেজাল, প্রজন্মর পর প্রজন্মকে কুরে-কুরে খেয়ে যাবে। আমরা আবারও পরাধীন হব শিগগিরি। আমরা তো আর বড়োজোর তিরিশ-চল্লিশ বছর বাঁচব। কিন্তু এই পাগলা আর ছুটকিদের জন্যে কোন ভবিষ্যৎ রেখে যাচ্ছি আমরা? বলো?

জিতেন বলল।

সত্যি! ঠিক-ই বলেছ তুমি। ভাবলেও আতঙ্কিত হই। ওদের ভবিষ্যৎ সত্যিই বড়োই অন্ধকার। এখানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে চোর-জোচ্চোর-অসৎ কতগুলো জানোয়ার, মানুষের চেহারার; কিন্তু মানুষ সেগুলো আদৌ নয়।

শেফালি বললেন, উষ্মার সঙ্গে।

পাগলা আর ছুটকির খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। ওরা আবার গিয়ে পড়তে বসেছে। এগারোটা অবধি পড়বে। কারেন্ট থাকলে, চোখগুলো বাঁচত।

আর একটু খিচুড়ি দেব? তোমায়?

না, না। তুমি খাবে কী? তা ছাড়া আমাকে তো বাড়ি গিয়ে মায়ের সঙ্গে একটু খেতে হবেই। মা বসে থাকবেন আমার জন্যে। তুমি খাও।

আর দেরি কোরো না, মাসিমা বসে থাকবেন। তোমার তো পেটও ভরল না।

যাব এবারে। খিচুড়ির স্বল্পতার দোষ কী? আমি যে, আসব তা তো জানতে না তুমি!

জানতাম।

শেফালি বললেন।

জানতে?

জিতেন অবাক গলায় বলল।

জিতেনের চোখে চোখ রেখে শেফালি মাথা নাড়িয়ে জানালেন, ‘হ্যাঁ’।

জিতেন চুপ করে শেফালির মুখে চেয়ে রইল। কথা বলল না কোনো।

অড়হর ডালের খিচুড়ি কি কোনো ভদ্রলোকে খায়? কিন্তু কী করব। ওই ছুটকিটা! ভীষণ-ই খিচুড়ি ভক্ত। মুগ-মুসুর ছিল না, তা কী করব বলো?

আমি কাল-ই নিয়ে আসব।

না, না। সেজন্যে বলিনি। লজ্জিত হয়ে বললেন শেফালি।

তা জানি।

না, না, ওসব আনতে হবে না। ‘কষ্ট’র মধ্যে ছেলেবেলাটা তো কাটা ভালো। এটা শিক্ষার একটা অঙ্গ। যাঁরা জীবনে বড়ো হন, তাঁদের মধ্যে, লক্ষ্য করলে দেখবে; অধিকাংশই আসেন গরিবঘর থেকেই। আমার তো পড়াশোনা হল না। আমি চাই, আমার ছেলে-মেয়েরা অনেক পড়াশোনা করুক, জীবনে মস্তবড়ো কেউকেটা হোক তারা। পয়সার মাপে বড়ো নয়, মিডিয়া-বাহিত ফালতু উদ্দেশ্যপ্রসূত যশের মাপেও বড়ো নয়; মনুষ্যত্বের মাপে বড়ো।

হবে হবে। ওরা খুব-ই ভালো হবে। চমৎকার ছেলে-মেয়ে ওরা তোমার বউদি।

স্বগতোক্তি করল জিতেন।

শোনো, তোমার কিন্তু চাল-ডাল কিছুই আনতে হবে না। যা নিয়ে আসো, শুধু সেটুকু নিয়েই এসো।

কী তা?

তুমি তা জান না?

স্বল্পক্ষণ শেফালির মুখে চেয়ে থেকে, হঠাৎ-ই লজ্জা ও আনন্দে জিতেনের ফর্সা মুখটি রেঙে উঠল।

লক্ষ করলেন শেফালি, লণ্ঠনের আলোতেও।

আজ ভারি সুন্দর করে সেজে এসেছিল ঝিঁঝি। হালকা বেগুনি-রঙা জমির সিল্কের শাড়ি পরেছিল একটা। হয়তো কাকিমার-ই শাড়ি। শাড়িটি পুরোনো। এবং পুরোনো বলেই, নরম। ঔজ্জ্বল্যও কম। তাতে শ্রী আরও খুলেছিল ঝিঁঝির। ম্যাজেন্টা-রঙা পাড় শাড়িটির। সঙ্গে, সাদা ব্লাউজ। গলার কাছে লেসের ফ্রিল দেওয়া। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা রবিঠাকুরের আমলে যেমন পরতেন। গলাতে প্লাস্টিকের ছোটো ছোটো বেগুনি-রঙা সস্তা হার। তাই ঝিঁঝির মরালী-গ্রীবাকে মহামূল্য বলে মনে হচ্ছিল। খোঁপা করেছিল। তাতে বেগুনি ফুল গাঁথা ছিল; জ্যাকারাণ্ডা। হাতে ম্যাজেন্টা-রঙা প্লাস্টিকের বালা। কোনো সুগন্ধি মেখেছিল আজ ঝিঁঝি। এমনিতেই ঝিঁঝির গায়ে সুগন্ধ। ওর গায়ে কোনো কটু গন্ধ নেই। পদ্মিনী-নারী ঝিঁঝি। এই সুগন্ধি, নিশ্চয়ই কাকিমার। এবং বহুবছর আগেকার। সযত্নে আলমারিতে তুলে রাখা ছিল এমন-ই কোনো দিনে বের-করার জন্যে।

বেচারি ঝিঁঝি!

এখনও ‘দাঁড়কাকের বাসা’-র বারান্দাটা সুগন্ধে ভরে আছে। সে-গন্ধ বৃষ্টি-ভেজা বন-গন্ধের সঙ্গে ভাসছে মনোয়া-মিলনের আকাশের স্তরে স্তরে।

শিরীষ ভাবছিল, এখন ঝিঁঝি কী করছে, কে জানে? কী ভাবছে? কার কথা? না-আসা নীলোৎপলের কথা কি? না, অন্য কারো কথা?

ঘণ্টেমামার সঙ্গে সিরিয়াসলি কথা বলবে কালকেই শিরীষ। স্টেশনেই কথা হচ্ছিল, কেন্দুপাতার ব্যাবসা নিয়ে। এক্সটেনশন না-পেলে তাঁকে কিছু একটা করতেই হবে। যা জানেন, যা-নিয়ে জীবন কাটালেন; তাই করবেন। বলেছিলেন ছোট্ট করে কেন্দুপাতার কাজ আরম্ভ করতেও লাখখানেক টাকা লাগবে। তবে তাঁকে ওই-লাইনে সকলেই চেনে। ওঁর পক্ষে অনেক কমেও হয়তো করা সম্ভব হবে। কিন্তু সেই কমটাই বা জোগাড় হবে কোত্থেকে? তা ছাড়া, জনবলেরও দরকার। সব স্টেজে খবরদারি না করলে, অন্তত জনাদুই বিশ্বাসী লোক না থাকলে টাকা সব মার যাবে। কাঁচা-টাকার ব্যাপার। জঙ্গল থেকে কেন্দুপাতাই বেরুবে না।

শিরীষ বলছিল, ওরও আর এই চাকরি ভালো লাগে না। কিছু একটা করতে হবে।

ভাবছিল, ঝিঁঝির কাছে ঝিঁঝির গয়না ধার চাইবে। ওসব গয়না দিয়ে কী হবে? নীলোৎপলের মতো, কোনো কথা-দিয়ে, কথা-না রাখা তথাকথিত ‘‘শিক্ষিত’’ অভদ্র বাঁদরকে বিয়ে করে, বিয়ের দিনে সেইসব গয়না পরার জন্যে? শিরীষের মায়ের গয়নাও তো সব রাখা আছে জগামামাদের কাছেই। মস্ত লোহার সিন্দুকে রাখা আছে তা। বাড়িতে বন্দুক আছে। তা ছাড়া জগামামা মান্য-গণ্য মানুষ তাই সেখানে তা নিরাপদে আছে। ঝিঁঝির জন্যে, যে-গয়না তাও কাকিমা ওখানেই রেখেছেন। কী গয়না, তার দাম কত; সেসব যাচাই করতে হবে এবারে পুঁটলিটা ফেরত চেয়ে নিয়ে। মা নিজেই জগামামাকে ডেকে গচ্ছিত রেখেছিলেন।

শিরীষ মায়ের একমাত্র সন্তান। ‘না-খেতে পেলেও গয়না বিক্রি করব না’—এই বোকা-বোকা বাঙালি সেন্টিমেন্ট মায়েরও ছিল। যে-মেয়ের কাছে ‘গয়না’র দাম ভালোবাসা বা স্বামীর সম্মানের দামের চেয়েও বেশি, তেমন মেয়েকে শিরীষ বিয়ে করবে না কখনোই। তাই তার স্ত্রীর জন্যে মায়ের গয়না যখের ধনের মতো আগলে রাখার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই তার। জগামামাদের বাড়ি গিয়ে কোনো সোনা-চাঁদিওয়ালাকে তাঁদের বাড়িতেই ডাকিয়ে এনে মূল্যায়ন করতে হবে সেগুলোর। পঁচিশ-তিরিশ ভরিও যদি হয়, তো তারও দাম তো আজকে অনেকেই। তার ব্যাবসার ক্যাপিটাল তা থেকেই পেয়ে যাবে। কত টাকার জোগাড় হতে পারে জেনে নিয়ে তারপর ঘণ্টেমামার সঙ্গে ডালটনগঞ্জে গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে আসবে। তাদের ব্যাবসার সম্ভবনার শিকড় নিয়ে।

ঝিঁঝি কি পার্টনার হতে রাজি হবে? ঘণ্টেবাবুর কাছে গল্পশোনা সেই বিত্তবান কিন্তু মেহনত করে খাওয়া সংস্কৃতিসম্পন্ন ডালটনগঞ্জের সেই জিতেনবাবুর, ঠিকাদার? তিনিও যদি সঙ্গে থাকেন তো বেশ হয়। তবে বাঙালির পার্টনারশিপ! এতজনে কি টিকবে বেশিদিন? জগাদা গভীর ঘুমে ছিলেন। আজকে একটা খুনের মামলার আসামিকে বেকুসর খালাস করিয়েছেন তাঁর জোরালো সওয়ালে।

যে-মানুষটাকে খুন করার অপরাধে তাঁর মক্কেল অভিযুক্ত হয়েছিল তার বউ ছিল আদালতে। সাক্ষীও দিয়েছিল সে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এর আগের দিন, একথা জানিয়ে যে, সে নিজের চোখে দেখেছে তাঁর স্বামীকে খুন করতে জগাদার মক্কেলকে। জগাদার তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার জেরার মুখে, অবলা, দেহাতি গাওয়ার সাক্ষ্য টেকেনি।

ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, সত্যদ্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র বলে গিয়েছিলেন কবেই যে, ‘আইন! সে তো তামাশামাত্র! বড়োলোকেরাই পয়সা খরচ করিয়া সে-তামাশা দেখিতে পারে।’

আজও আইন তামাশাই আছে। ফাঁক-ফোঁকর, বেনিফিট-অফ ডাউটের লঙ্কাগুঁড়ো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মক্কেলকে বের করে এনেছেন ফাঁসির মঞ্চ থেকে জগাদা। কিন্তু জজসাহেব রায় দেওয়ার পরেই সে, বউটির মুখে যে-ভাব দেখেছিলেন, উনি তাতে বুঝেছেন যে, তাঁর মক্কেল-ই খুন করেছিল মেয়েটির স্বামীকে। কোনো মামলার রায়-ই অবলম্বহীন, অসহায় বিধবার মুখের অভিব্যক্তির চেয়ে বেশি মান্য নয়! অন্তত মানুষের বিবেকের কাছে। জগাদারও বিবেক আছে। এবং আছে বলেই তাঁর মামলা জিতেও এতকষ্ট!

মক্কেল অবতার সিং, ধষর্ণকারী, গুণ্ডা, পাজি, মাফিয়া, জঙ্গলের কাঠচোর, তাঁর দু-পায়ে পড়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল। আর একটি বাণ্ডিল দিয়েছিল দশ হাজার টাকার। এক-শো টাকার নোটের।

বলেছিল, ‘সরকার হাইকোর্টমে আপিল করনেসে আপহিকা পাস আয়েগা হজৌর। সিনিয়র-উনিয়র যো লাগানেকি হ্যায় আপহিকা জিম্মেদারি হ্যায়। সমঝে না হজৌর! রুপিয়া যিতনা চাহিয়ে ম্যায় লায়েগা। বে-ফিক্কর রহিয়ে।’

মাঝরাতে মৃত মানুষটির স্ত্রীর চোখ দু-খানি যেন, স্থিরনেত্রে জগাদার চোখে চেয়ে রয়েছে দেখলেন। অমন সুন্দর ঠাণ্ডা রাতেও ঘুম-ভেঙে, ঘেমে-নেয়ে জেগে উঠলেন তিনি।

নিজেকে বললেন, আমি কী করব! খুনি বেঁচে গেল আইন ব্যবস্থার ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে। আমার যে এই কাজ! ফৌজদারি উকিল আমি। বিবেক, আমার বাড়িতে সুগন্ধি রুমাল জড়িয়ে রেখে দিয়ে আসি, কোর্টে আসার আগে। বিবেকের সঙ্গে পেশাদারি কর্তব্যর কোনো সম্পর্ক নেই। বিপক্ষের সরকারি উকিল যদি খেটে না আসে, ভালো সওয়াল না করে, যদি তাঁর মাফিয়া মক্কেলের কাছে ঘুস খেয়ে বিধবাকে ডুবিয়ে দেন, তবে তিনি কীই-বা করতে পারেন? দেশ এখন, এই করেই চলছে। এইভাবেই। তাঁর বিবেকটা তবু এখনও বেঁচে আছে ধুকপুক করে হলেও। কিন্তু সরকারি উকিলের বিবেক? যিনি সরকার থেকে ফিসও পান এবং বিপক্ষের মক্কেলের কাছে ঘুসও খান তাঁর বিবেক? খুনিকে বাঁচিয়ে দিয়ে, অসহায়, সুন্দরী বিধবাকে চিরজীবনের মতো ওই মাফিয়াদের ভোগ্য করে তুলে যে-টাকা, সেই উকিল উপার্জন করলেন সেই টাকার রোটি-ডাল পোলাও-মাংস কি তাঁর মুখে রুচবে? তাঁর কি ঘুম হয় রাতে? তাঁর নিষ্পাপ নাতি-নাতনিদের যখন কোলে নিয়ে বসিয়ে আদর করবেন সেই সরকারি উকিল তখন কী ভয়ে তাঁর বুক কাঁপবে না যে, তাঁর পাপের দায় এই শিশুদের-ই হয়তো বইতে হবে?

কে জানে! হয়তো কাঁপবে না। কারণ শুভ-অশুভ, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-খারাপ এইসব বোধ-ই উবে গেছে এখন দেশ থেকেই। ধর্মের বাঁধনও পুরোপুরি ছিন্ন হয়ে গেছে। ‘ধর্ম’, সাধারণের-ই জন্যে। অসাধারণ মানুষদের জন্যে নয়, তাঁরা নিজস্ব ধর্ম, মানবধর্মকে অবলম্বন করে বাঁচতে পারেন। কিন্তু ‘ধর্মভয়’ চলে যাওয়াতে হিন্দুরা ভ্রষ্ট-নষ্ট হয়ে গেছে পুরোপুরিই। মুসলমানেরা ধার্মিক। সে-ধর্ম অন্যের কাছে মান্য কী নয়, উৎকৃষ্ট বলে গণ্য কী নয়; সেকথা অবান্তর। কিন্তু ধর্ম যে, তাদের বেঁধে রেখেছে, সাধারণ মানুষদের মধ্যে বিরাদরি, ন্যায়-অন্যায়—বোধ, শুভাশুভ বোধ জাগিয়ে রেখেছে এরজন্যে, সেই ধর্মের বাঁধনের-ই সবটুকু কৃতিত্ব। আজকে ধর্ম হয়ে গেছে লুটমারের ধর্ম। যেন-তেন-প্রকারণে টাকা চাই। টাকাই ঈশ্বর যেন! তা ছাড়া, হিন্দুধর্মের জাতপাত, মানুষকে মানুষ জ্ঞান না করার চরম অশিক্ষা কত নিরুপায় নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নেহাত-ই নিরুপায় করে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে অন্য ধর্মের ছত্রছায়াতে। ইসলামের ‘বিরাদরি’র গুণটি সবচেয়ে বড়োগুণ। সর্বার্থেই ওই ধর্ম পরমসোশ্যালিস্ট। সেইখানেই সেই ধর্মের সবচেয়ে বড়োজোর। হিন্দুধর্মের যা-কিছুই ভালো তা নষ্ট হয়ে গেছে বা নষ্ট হতে বসেছে। এরজন্যে দায়ী কারা সে-সম্বন্ধে একটু অস্পষ্ট ধারণা যে, নেই জগাদার তা নয় কিন্তু সেইসব প্রসঙ্গ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে কেউ নাড়ে-চাড়ে না। বড়োই অস্বস্তি হয় জগাবাবুর। কিন্তু উনি একা হাতে কী করতে পারেন? তবে যেটুকু পারেন, সেটুকু করবেন। যে-মামলাতে মিথ্যে কথাকে সত্যি বলে চালাতে হবে তেমন মামলা তিনি আর নেবেন না।

কিন্তু তাঁর জুনিয়র পান্ডে বলেন, ‘স্যার, ওকিলকি কম্মি থোরি হ্যায় লাতেহার কোর্টমে? আপ কনসান্স কি চক্করমে ফাঁসনেসে আপকি পরফেশান বিলকুল চৌপট হো যায়েগা’।

ই ভি সাহি বাত। মগর করু ক্যা?

জগাবাবু বলেছিলেন।

জগাবাবু ঠিক করেছেন এই মক্কেলকে ফি-এর টাকাটা উনি মৃতর স্ত্রীকে পৌঁছে দেবেন এবং জানাবেন যে, তিনি সত্যিই দুঃখিত।

নিজের বাড়িটাও একটা মেস-বাড়ি হয়ে রইল। মুখে-আগুন দেওয়ার জন্যেও কেউই রইল না। তা ছাড়া একজন মেয়ে না থাকলে কি বাড়িকে বাড়ি বলে মনে হয়? কত করে বললেন মাধাটাকে একটা বিয়ে করতে, তা সে শুনল কই?

এইসব ভাবতে ভাবতেই আবারও ঘুমিয়ে পড়লেন জগাবাবু।

ঘুমের মধ্যেই মাধাবাবুর সঙ্গে কিঞ্চিৎ উত্তেজিত কথোপকথন হল এইরকম :

কীরে মাডা! ডামডা হয়ে আড কটোডিন রইবি? একটা বে কড এবাডে।

মাধাবাবু বললেন, সবসময় ‘দামড়া-দামড়া’ কোরো না তো দাদা। সেদিন পান্ডে সাহেবের সামনেও বলেছিলে! আমার কি কোনো প্রেস্টিজ নেই?

পেস্টিড? ডাডার কাটে আবার পেস্টিড কী রে? টোর রাগ কি একনও পডেনি আমাড উপডে?

কীসের রাগ?

ঠেই ডে,ডকন পটলার মাকে বিয়ে কডটে টেয়েটিলি টকন আমি ‘না’ কডেটিলাম বলে? ড্যাক, হুডকোহাটের মুকুজ্জেবাডিড টেলে হয়ে টুই ঠেঠে একটা ঝিকে....ঠেই জন্যেই মানটে পাডিনি, ঠেডিন।

তাহলে আবার পুরোনো কতা নিয়ে পড়লে কেন? ঝি বলে কী সে মানুষ ছেলোনি? ভদ্রলোকের মেয়ের যা থাকে, ঝি-এরও তাই থাকে।

আঃ। মাডা। ডোট কটাবাটটা বডো ক্রুড হয়ে ডাট্টে আডকাল। ঠরীরটাই কী ঠব? মেন্টাল কম্প্যানিয়নটিপ কি পেটে পারটিট পটলার মায়ের কাঠ ঠেকে?

তা কেন পারতাম না? সোশ্যাল ইনজাস্টিদের জন্যে সে পড়াশুনোর সুযোগ পায়নি, ইংরিজি শেখেনি; তা বলে কি সে মুক্কু ছেল। দ্যাখো দাদা, প্রত্যেক মানুষ কিছু সহজাত বিদ্যা-বুদ্ধি নিয়ে আসে। দু-পাতা ইংরিজি ফরফরালেই আর বড়োলোকের বাড়ি জন্মালেই কিন্তু ল্যাজ গজিয়ে যায় না মেয়েচেলের। তার বুদ্ধিই যদি না-থাকত তবে তাকে আমার, ভালো কি লাগত? তা ছাড়া, স্বামীহারা মহিলা। ছেলেটাকে মানুষ করতে কী না কী করচে। কে জানে!

আমার আপট্টিটা টো সেইকানেই ঠিল! বিয়েই ডডি কডবি, টো, ঠবৎসা গাবীকে কেন? মেয়ের কি অবাব পড়েটেল ডেঠে?

কী বললে? সবৎসা গাভী! মাইণ্ড ইয়োর ল্যাঙ্গোয়েজ।

ল্যাঙ্গোয়েজ আবাড কী? ঠব ঠিক-ই আটে। কী করে পটলার মা, টার পটলাকে মানুঠ করঠে ভেবে তোর কেঁডে লাব কী? টোর ঠঙ্গে ডা করটো টাই ঠে অন্যর ঠঙ্গে কট্টো। ঠে কি আড তোড ডন্যি কেঁডে ভাটাট্টে? ‘‘বাবনা কী টোর হাবি, পেটের টলায় ডে ঢন আঠে, টাই ভাঙিয়ে কাবি।’’

তুমি বড্ড অশ্লীল দাদা। তোমার রুচি বড়ো খারাপ। যে-মেয়ে তোমার ভ্রাতৃবধূ হতে পারত তার সম্বন্ধেই তুমি এমন কতা বলতে পারলে?

কী বলেটি? খাড়াপটা কী বলেডি?

‘ভাবনা কি তোর হাবি, পেটের তলায় যে-ধন আছে তাই ভাঙিয়ে খাবি’ —এটা খারাপ কথা নয়?

টাটে কী? বিয়েটা আর হয়নি টোর ঠঙ্গে পটলার মায়ের। আর হবেও না। টার ঠম্বন্ধে কী বললাম না ঢললাম টাটে কী হডো? কট্টো বালো বালো মেয়ে আটে। রাঁটিতে পালটি-ঘরের বাঁড়ুজ্যেডা আটে, রাঢ়ি ওরিডিনাল বাডি টেলো বড্ডমানে। টাডের বাডির এট্টি মেয়েকে ডেকেটিডাম....বড্ড পটণ্ডও হয়েঠিল।

ওসব কথা থাক দাদা। তোমার পছন্দ হয়ে থাকে তো তুমি বে করোগে। আমি দাঁড়িয়ে থেকে তোমার বে দেব। এই বুড়োবয়সে বিয়ে আমি করব না আর। বেশ আছি। শিকার-শিকার খেলা করি, তোমার ঘাড়ে খাই-দাই, বানোয়ারিলালের সঙ্গে আড্ডা মারি, তোমার সঙ্গে তাস পিটি, শিরীষের সঙ্গে দাবা; বেশ তো কেটে যাচ্ছে জীবন। তারমধ্যে এই শেষবেলাতে একগাছা মেয়েচেলে এনে ফেলে জীবনটা মাটি করার দরকারটাই বা কী? আমার কী? তুমিই পড়বে সবচেয়ে বিপদে। ‘কত প্যাডিতে কত রাইস’ জানবে তকন হাড়ে হাড়ে। মেয়েচেলের মতো অমন বজ্জাত জাত ভগমান এ-পিথিবীতে দু-টি পয়দা করেননি। এমন সুকে আচো, তোমাকে হঠাৎ ভূতে কিলোতে শুরু করল কেন?

জগাবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ডা বালো মনে করিট। ইয়োর লাইফ ইজ ইয়োর লাইফ। আমি টো টিরডিন বাঁডব না! তুইও বুডো হবি। টকন টোকে ডেকবেটা কে?

বুড়ো হলে বউ দেখবে? তাই ভাবচ তুমি! সেসব সুখের দিন চলে গেচে কবে। সে ‘রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই।’ বুজেচ দাদা!

আবার অডোড্যার কটা টোলা কেন? পট্টিমবঙ্গের ড্যোটি বটু বা বুড্ডডেব ভটাটাড্ডিরা একবার ঠুনঠে পেলেই টোড ওপরেও কুব রেগে ডাবে। বলবে, ‘‘ঢম্মো-নিরপেক্কতা বিগ্নিটো হডো।’’

জিতেন বলল, চলি বউদি।

আবার এসো। কবে আসবে?

ইচ্ছে তো করে রোজ-ই আসি।

ওইসব দুষ্টু ইচ্ছে মন থেকে ঝেড়ে ফ্যালো। ‘ইচ্ছে’ হচ্ছে বাস্তুসাপের-ই মতো। তাকে প্রশ্রয় দিয়ে ফেললে পরে, তাকে আর কখনোই মারা যায় না। বুঝেছ!

তারপর বললেন, তুমি ছেলেমানুষ হতে পারো। তা বলে, আমি তো নই।

তা তো বটেই। তুমি তো বুড়িই!

তারপর গলা চড়িয়ে জিতেন বলল, পাগলা, ছুটকি, চললাম রে। আসতে হবে না। পড়া করো।

কিন্তু দু-জনেই হুড়মুড়িয়ে চেয়ার ঠেলে দৌড়ে এল জিতেনকে দরজা অবধি পৌঁছে দেওয়ার জন্যে। ওরা খুব-ই ভালোবাসে জিতেনকে।

শেফালি ভাবছিলেন, জিতেন যখন সংসারী হবে, ওর সংসার সুখের প্রতিমূর্তি হবে। ওর ছেলে-মেয়েরা খুব ভাগ্যবান-ভাগ্যবতী হবে। ‘স্নেহ’ ব্যাপারটা, আজকাল খুব কম ছেলে-মেয়েই তাদের মা-বাবার কাছ থেকে পায়। বাবা-মায়েদের সব অজুহাত-ই হয়তো সত্যিও, তাঁরা অনেকে-ই নিরুপায় যে, একথাও ঠিক-ই কিন্তু শৈশবে বা কৈশোরে যে, শিশু মা-বাবার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হল তার বা তাদের মতো হতভাগ্য বড়োবেশি হয় না।

ঝিঁঝি শাড়ি-জামা সব ছেড়ে, নাইটি পরে শুয়েছিল। ঘণ্টেমামা কাল সকালেই চলে যাবেন। প্রচন্ড অপমানিত ও লজ্জিতও হয়েছেন উনি। বারে বারেই মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

জগামামারাও চলে গেছেন অনেকক্ষণ-ই খেয়ে-দেয়ে।

সুনীতির মুখের দিকে সন্ধে থেকেই চাইতে পারছে না ঝিঁঝি। দাঁতে-দাঁত কামড়ে ও প্রতিজ্ঞা করেছে, এ-বিষয়ে আর কোনো দেখতে-আসা-টাসার কথা নয়। এ-জীবনে আর এমন করে অপমানিত করবে না নিজেকে। সুনীতিকেও। ও নিজেই কিছু একটা শুরু করবে। ব্যাবসা; বাণিজ্য। জগামামাদের সঙ্গে কথা বলবে ভাবছে কালকেই। যাবে সেখানে।

ঝিঁঝির কানদুটো তখনও ঝাঁ ঝাঁ করছিল। ও ঠোঁট কামড়ে স্থির করল যে, আসুক শিরীষ এরপরে তাদের বাড়িতে একবার। অপমান কাকে যে, বলে তা ঝিঁঝি বোঝাবে তাকে! কী মনে করেছে ও? কী মনে করে নিজেকে?

শিরীষ ঘুমিয়ে পড়েছিল।

ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরে শুল। ঘুমন্ত শিরীষের স্বপ্নমাখা চোখ দু-টি জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে সুগন্ধি ঝিঁঝি। বেগুনি ঝিঁঝি, বেগুনি শাড়ি, খোঁপায় বেগুনি-ফুল।

শিরীষ দেয়ালা করে বলল, ‘ঝিঁঝি, তোকে আমি ভীষণ ভালোবাসি রে! তাই তো এত দুঃখ দিই। তুই দুঃখী হলে আমি সুখী হই। আমাকে সকলেই ভুল বোঝে। তুইও যদি ভুল বুঝিস তো...। তুই আমার-ই ছিলি,আমার-ই আছিস; আমার-ই থাকবি চিরদিন। কোনো মিস্টার ‘পল’-ই তোকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। আমি ব্যাবসা আরম্ভ করছি শিগগিরি। দেখিস। তোকে রাজরানি করে রাখব। তোকে কি অনাদরে রাখতে পারি? কত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যর মধ্যে মানুষ হয়েছিস তুই!’

পরক্ষণেই মনে পড়ে গেল গুঞ্জনের কথা। গুঞ্জনটা যা পাগলি মেয়ে! সত্যি সত্যিই আত্মহত্যা-ফত্যা করে বসবে না তো। ও উৎসাহ না দেখালেই হয়তো গুঞ্জন ভুলে যাবে ওকে। এমন ভালোবাসা এই বয়সি মেয়েদের মনে কত জন্মায় আবার আপনা থেকেই মরে যায়।

পরে ওকে একদিন বুঝিয়ে বলবে শিরীষ যে, সে গুঞ্জনের হাসনুহানা-ভালোবাসা অবশ্যই গ্রহণ করেছে। ভালোবাসার ফুল রাখার জন্যে ফুলদানি তো চাই! একজনের ভালোবাসা নির্ভেজাল, খাঁটি এবং পুষ্পিত হলেও অনেকসময়ে অন্যজনের তা গ্রহণ করার মতো, ফুলদানি থাকে না। এবং থাকে না বলেই সেই মহার্ঘ্য দান গ্রহণ করতে পারে না অন্যজনে। তাতে দাতার অসম্মান হয় না কোনোই। লজ্জা বা দুঃখ যা, তা গ্রহীতার-ই। অপমানটা তার-ই। ভালোবাসা, কারো ভালোবাসাই অনাদরে, অমর্যাদায় শুকিয়ে মলিন করার অধিকার অন্যের একেবারেই নেই।

শিরীষ জানে যে, বোঝালে, গুঞ্জন বুঝবে। ইন্টেলিজেন্ট আছে মেয়েটি। সুইটি-পাই। আহা। সুখী হোক বেচারি, সুখী হোক। কে বলতে পারে? হয়তো নরাধমও গুঞ্জনকে সত্যিই ভালোবাসে।

ওদের নিজেদের প্রজাতির ছেলে। কাজে-কর্মে ভালো। তা ছাড়া নরাধমের মোটা চেহারার ও আপাত কামুক দৃষ্টির আড়ালে কোন সূক্ষ্ম মানুষ বাস করে, কোন দুর্মর প্রেমিক তা কি, অত সহজে বলা যায়? ঘণ্টেমামার মধ্যে যে, এমন একজন সংবেদনশীল অভিমানী মানুষ বাস করেন তাও কী আগে জানত?

ঘণ্টেবাবু পাশ ফিরে শুয়েছিলেন। পাশেই টেবলের ওপর রাখা ওঁর চশমাটি। চশমা-ছাড়া চোখদুটিকে গহ্বরের মতো মনে হয়। বড়ো করুণ, দুর্বল সেই খালিচোখের দৃষ্টি। হতাশার প্রতিমূর্তি যেন, সেই চোখ দু-খানি।

দাঁতের ফাঁকফোকর দিয়ে নাল গড়িয়ে পড়ে আজকাল। বালিশ ভিজে যায়। বুঝতে পারেন, বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন, হেরে যাচ্ছেন জীবনের হাতে মার খেয়ে খেয়ে ক্রমাগত। জীবনটা অন্যরকম হলে যৌবনও থাকত আরও অনেকদিন। ব্লাড-সুগারটা চেক করাতে হবে একবার। ভারি পিপাসা পায়, ক্লান্ত বোধ করেন; খিটখিটে হয়ে গেছেন।

ঘণ্টেবাবু বিড়বিড় করে ঘুমের মধ্যে বললেন : ‘আমাকে বিয়ে করে তুমি জীবনে অনেক এবং অনেকরকম কষ্টই পেয়েছ! কালকে ডালটনগঞ্জে পৌঁছেই আমি রেজিগনেশন দেব এই চাকরি থেকে। যতটুকু আছে, সব ভেঙে নিজেই নতুন করে আরম্ভ করব। এতগুলো বছর ধরে শালাদের কোটি টাকা কামিয়ে দিয়েছি। এখন আমি নিজেও যে, পারি কিছু কামাতে তা ওই শালা অকৃতজ্ঞদের দেখাব। ছোটোলোকের কাছে চাকরি আর করব না। হাতজোড় করে ‘বাবু’ ‘বাবু’ করব না আর একদিনও। শেষজীবনে তোমাকে সোনায়-দানায় মুড়ে দেব। বদলে তোমার কাছে আমি কিছুই চাই না। আমি জানি যে, তুমি এবং তোমার ছেলে-মেয়েরাও সকলেই জিতেনকেই ভালোবাসো। আমাকে তোমরা একদিনের জন্যেও কেউই চাওনি। জানি তা আমি। লুঙ্গি-পরা, বিড়ি-ফোঁকা, টেকো-বুড়ো আমি। আর্ট-কালচার হীন। অপদার্থ। আমার দিন গেছে। বাকিজীবন আমি হান্টারগঞ্জ, জৌরী, চাতরা কি সীমারিয়ার জঙ্গলের ডেরাতেই থেকে যাব? তোমাদের জন্যে টাকা পাঠাব থোকা-থোকা। আমাকে তো তোমরা কেউ-ই চাওনি একদিনের জন্যেও। আমার জন্যে আমাকে চাওনি। কেউই। টাকা চেয়েছ, টাকাই দেব। নিভে যাওয়ার আগে শেষবারের মতো জ্বলে উঠে প্রমাণ করে যাব যে, যতখানি অপদার্থ তোমরা আমাকে ভাব; আমি তা নই। সংসারে নিতান্ত নির্গুনের ও কিছু গুণ থাকে।

শেফালি আমাকে মুক্ত করে দাও এই জীবনের মতো। আর যে ক-টা দিন বাঁচি, এই গ্লানি থেকে, অপমান থেকে, এই সবরকম অপারগতার গভীর লজ্জা থেকে আমাকে ছুটি দাও। ছুটি চাই। আর কিছুই চাই না।’

ছেলে-মেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন রাত বারোটা বাজে। সারাশহর আজ আরামে ঘুমোবে। বৃষ্টির পরে।

শুতে যাওয়ার আগে শেফালি জিতেনের দেওয়া ক্যাসেট-প্লেয়ারে একটি রবীন্দ্রসংগীত শুনছিলেন। বৃষ্টি হয়ে ঠাণ্ডা হওয়াতে আজ গাঢ় ঘুম এসেছে বহুদিন পরে।

গানটি বাজছিল কানে, ঘুমঘোরে; ঘুরে ঘুরে—

আমি নিশিদিন তোমায় ভালোবাসি।তুমি অবসরমতো বাসিও।আমি নিশিদিন হেথায় বসে আছিতোমার যখন মনে পড়ে আসিও।

বুড়ি মাই-এর কোমরের ব্যথাটা বড়োই বেড়েছে।

পূর্ণিমা, যুবক-যুবতীদের-ই জন্যে।

বয়েস হয়ে গেলে, বাত-ব্যধিতে ধরলে, পূর্ণিমা এবং অমাবস্যাও বড়ো কষ্টের। পূর্ণিমা এল কি না তা দেখতে, চাঁদের দিকে তাকাতে হয় না, ব্যথা বাড়তে থাকলেই বুঝতে পারেন।

আজ আঁধি ও বৃষ্টি হওয়াতে মনোয়া-মিলনের ঘরে ঘরে সব মানুষ-ই স্বস্তিতে শুয়েছে। এই স্নিগ্ধ পরিবেশে স্বামী ও স্ত্রী দু-জনে দু-জনকে আদর করার পর স্ত্রীর কোমরে বা বুকে হাত রেখে আশ্লেষে ঘুমিয়ে পড়েছে স্বামী। প্রেমিক ঘুমের মধ্যে, প্রেমিকার কথা ভাবছে; প্রেমিকা, প্রেমিকের। কত জ্বালা, যন্ত্রণা কত খিদে, কত কাম, কত প্রেম, কত বিরহ বুকে নিয়ে এই পৃথিবী হেঁটে চলেছে কত হাজার শতাব্দী ধরে।

এই সবকিছুই জড়িয়ে আছে পৃথিবীকে কিন্তু এসব কিছুই নয় আসলে।

বুড়ি-মাই-এর মতো, পথের শেষে পৌঁছে মানুষের ‘বুদ্ধি ও জ্ঞান’ যখন পরিণত হয়, তখন এই পৃথিবীকে মানুষ সম্পূর্ণ অন্য এক চোখে দেখতে শেখে। এর নিত্যরূপকে দেখতে শেখে, অনিত্যরূপের মোড়ক খুলে।

যখন পরপারে যাওয়ার সময় আসে, যেমন, বুড়ি-মাই-এর এসেছে; তখন এইসব কুয়াশার মধ্যে দিয়ে স্বচ্ছদৃষ্টি মেলে এইসব কিছুর-ই অসারতার স্বরূপ বোঝা যায়। উলঙ্গ হয়ে একদিন এসেছিলেন শিশুর রূপে আবার উলঙ্গ হয়েই যা-কিছু জীবনভর দু-হাতে জড়ো করেছিলেন, যা-কিছুকেই মানসিক প্রাপ্তি বলেও জেনেছিলেন, তার সব কিছুকেই ফেলে রেখে শুধু একটি নতুন চাদরে শরীর ঢেকে নিয়ে চলে যেতে হবে, তা জানেন। ‘‘রাম নাম সত হ্যায়’, ‘রাম নাম সত হ্যায়’ বলতে বলতে শিষ আর তার বন্ধুরা মিলে তাকে চাট্টি নদীর শ্মশানে নিয়ে যাবে। তাঁর ছেলে হয়তো আসবে। হয়তো আসবে না। তাতে যাবে-আসবে না কিছুমাত্রই। সব দাবি ও বন্ধনের-ই পরপারে তিনি তখন। তখন-ই হবে আসল মিলন, তাঁর এবং সব মানুষের-ই প্রিয়তম প্রিয়র সঙ্গে। সম্পূর্ণর সঙ্গে ‘অংশ’ সেদিন একাত্ম হবে; পূর্ণর মধ্যে লীন হবে ‘খন্ড’।

এই শিষ, ঝিঁঝি এবং আরও অগণ্য যুবক-যুবতী, প্রেমিকা-প্রেমিকারা এখনও জানে না আসলে ‘প্রেম’ কাকে বলে? ওরা নকলকেই ‘আসল’ বলে জানে। জীবিকা এবং জাগতিক নানা ক্রিয়াকলাপকেই, দৈনন্দিন মানবিক মানসিকতাকেই ‘জীবন’ বলে জানে। আসলকে চেনে না বলেই নকলকে আসল ভাবে!

তবু, এইসব জীবনের-ই অঙ্গ। নিয়ম এমন-ই। সবকিছুর-ই নিজস্ব ‘সময়’ আছে। তার আগে কোনো ঘটনা, কোনো জ্ঞান, কোনো জানাকেই ত্বরান্বিত করা যায় না। এইসব মধুর-বিধুর খেলা, হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, যুগের পরে হঠাৎ নীল-ডোংরির নীলপাখিদের আসা এবং চলে-যাওয়াও, এই সমস্তই একটি বৃত্তকে সম্পূর্ণ করে। সেই বৃত্ত পরিক্রমা না করে বৃত্তান্তে পৌঁছোবার উপায় নেই কোনোই, কোনো মানুষের-ই। এই, মানুষের ভাগ্যলিপি।

ভারি মজা পান বুড়ি-মাই যুবক-যুবতীদের এই প্রেম-প্রেম খেলা দেখে। ওরা এখন ওসব কিছুই জানবে না। জানার কথাও নয়। কারণ, এই জীবনের বৃত্ত পরিক্রমার প্রক্রিয়াটাই এমন। যেটুকু জানার, তা নিজের নিজের জীবনের সুখ-দুঃখর ভেতর দিয়ে, প্রেম ও ঘৃণার মধ্যে দিয়ে; নিজের নিজের তীব্র অনুভূতির নানা অভিঘাতের জারক রসে জারিত করে নিয়ে তবেই কোনো স্থির এবং স্থায়ী জানাতে তাদের প্রত্যেককেই পৌঁছোতে হবে। যতক্ষণ-না সেইসময় আসে ততক্ষণ পরিক্রমা চলবে নিজের-ই নিয়মে। এই গন্তব্যের কোনো পাকদন্ডী পথ নেই যে, অন্যদের চেয়ে স্বল্পসময়ে কেউ কেউ গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছোবে, অন্যের আগে ‘বুড়ি ছোঁবে।’

চৌশিঙা হরিণ-হরিণীর-ই মতো খেলছে তার পেয়ারের শিরীষ আর পেয়ারি ঝিঁঝি। অনেক ধূলো ওড়াবে ওদের খুরে খুরে, ঘুরে ঘুরে ওরা। অনেকবার অনেক লড়াই হবে, ভালোবাসার লড়াই, শিঙের সঙ্গে শিং ঠেকিয়ে। তারপর একসময়ে এক শুভক্ষণে সযত্নে চান করে, অতিসুন্দর করে সেজে, সুগন্ধি হয়ে, ঝিঁঝি, শিরীষের ঘরে, শিরীষের শোয়ার খাটের দিকে লঘুপায়ে, মৃদু আলো, আগরবাতির ও ফুলের গন্ধের মধ্যে এগিয়ে যাবে। যে-সাজ, বহুযতনে করেছিল, বেশ-ভূষা, কাঁচুলি, বংশ-পরম্পরার অলংকার সব-ই একে একে খুলে ফেলে নিরাবরণ, নিরাভরণ হয়ে শিরীষের অঙ্কশায়িনী হবে।

নারীর সব সাজের-ই পরমগন্তব্য বোধ হয় নগ্নতা। মানুষের জীবনেরও সব কোলাহল, সব সুখ-দুঃখ, প্রেম-ঘৃণাও তেমন-ই প্রকৃত এবং পরমপ্রেমাস্পদের সঙ্গে একদিন, বিনিসুতোয় মিলিত হওয়ার-ই জন্যে। বুড়ি-মাই শেষমিলনের দিনের খুব-ই কাছাকাছি চলে এসেছেন বলেই এদের এই মিথ্যের মান-অভিমান খুনশুটি, ঝগড়া দেখে খুব-ই মজা পান উনি।

মনে মনে বলেন, বুড়ি-মাই; মঙ্গল হোক শিরীষের, মঙ্গল হোক ঝিঁঝির, ঝিঁঝির মায়ের, মঙ্গল হোক এই পৃথিবীর সকলের-ই। সুখী হোক প্রত্যেক মানুষ-মানুষী। নীলডোংরির নীলটোংড়ির নীল পাখিরা আবারও আসুক। আসুক, বারে বারে।

কালু হঠাৎ-ই চাপাস্বরে ‘ভুউক-ভুরু’ করেই ডেকে উঠল।

ডেকে উঠেই, দৌড়ে গেল।

এমন উজলা, দুধলি চাঁদের রাতে হাওয়া দিলে যখন গাছগাছালির ছায়াগুলো কাঁপতে থাকে এলোমেলো, তখন কালু বড়োই উদ্ভ্রান্ত, ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। ছায়াগুলো নি:শব্দে ঝুপ-ঝাপ করে লাফিয়ে নামে উঠোনে আর কালু মনে করে, তার বুঝি বেড়াল বা ইঁদুর। দৌড়ে বেড়ায় এদিক থেকে ওদিকে। তার থাবা দু-টি দিয়ে ছায়াগুলি চেপে চেপে ধরার চেষ্টা করে। থাবা, কোনো কিছুকেই পায় না নাগালে। কোনো কিছুকেই ছিঁড়তে পারে না, কামড়াতে পারে না, গরিবের নিষ্ফল আক্রোশের-ই মতো। অথবা, অপরাগের, অক্ষমের ঈর্ষার-ই মতো। তাই আরও বেশি হতাশায় আর আক্রোশে কালু দাপিয়ে-বেড়ায় ঘর-বারান্দা-উঠোন এমন রাতে।

চাঁদের রাত তাই ভারি অপছন্দ কালুর।

কালুর খুব ইচ্ছে করে যে, এমন-ই এক রাতে এই ছায়াগুলো সব ভরাট হয়ে উঠবে, সতত-আন্দোলিত হবে না, হবে না ফাঁকি; এবং সেদিন...

বুড়ি-মাই-এর ফোকলা-দাঁতে হাসি ফোটে নি:শব্দে। সারারাত জেগেই থাকবেন উনি। কারণ, সারাদিন-ই পড়ে পড়ে ঘুমোন।

বুড়ি-মাই অস্ফুটে ডাকেন, ‘কালুয়া। আঃ বেটা, আঃ। শো যা’!

কালুর ভাষা জানলে, বুড়ি-মাই কালুকে বোঝাতেন যে; মানুষের জীবনও ঠিক এমন-ই। চাঁদের রাতে নড়াচড়া-করা ছায়াদের থাবার নীচে চেপে ধরার জন্যে, তোর যে-আকুতি, প্রত্যেক মানুষেরও তাই; সে নারীর-ই হোক, কী পুরুষ! যেদিন তারা জানতে পারে যে, ওগুলো ছায়াই, অবয়বহীন, অলীক সেদিন ছায়ারা যদি প্রাণও পেত তবুও তাদের ধরার ইচ্ছে আর মানুষদের মতোই ও নিজেও করত না।

মানুষেরাও এমন-ই! কালুর-ই মতো। তারা জানে না, এই যা। জীবনের শেষে এসেই যা বোঝার, তা তারা বোঝে। বৃত্ত-পরিক্রমা শেষ করেই বৃত্তান্তে পৌঁছোয়। সেই পরিক্রমা শেষ হওয়ার আগে যা-কিছুই তারা পায়, তার কিছুই তারা চায় না। আর যা চায়; তা তো পায়-ই না।

জীবন এমন-ই! বাসনা, কামনা, স্বপ্ন এইসব-ই জীবনের সব। এইরকম করেই চাইতে চাইতে, দিতে দিতে, পেতে পেতে, হারাতে হারাতে, ছড়াতে ছড়াতে জীবনের পথে চলতে হয় সব মানুষকেই! এই পরিক্রমার নাম-ই ‘জীবন’। বৃত্ত-পরিক্রমা করে সে, যেদিন বৃত্তান্তে পৌঁছোয় সেদিন তার ‘জানা’ সম্পূর্ণ হয়ে বটে কিন্তু যে-জীবনের জন্যে এত পিপাসা, সেই জীবনের প্রতি, তার কণামাত্রই দুর্বলতা থাকে না।

বুড়ি-মাই-এর এখন যেমন হয়েছে।

বড়ো আশ্চর্য হন এসব কথা ভাবলে। হাসেন বুড়ি-মাই। প্রেমময়, ক্ষমাময়, কিছুমাত্র চাওয়া-পাওয়ার, কোনোরকম সুখ-দুঃখের গর্ব এবং গ্লানিহীন এক পবিত্র-হাসি।

সেই বাদামি-কালো ল্যাজ-ঝোলানো রাত-পাখিটা ডেকে চলে পাহাড়তলির ফুটফুটে চাঁদের আলোর মধ্যের কালো কালো ছায়ার গাছগাছালি, ঝোপ-ঝাড়ের গভীর থেকে গম্ভীর স্বরে; ‘ঢাব-ঢাব-ঢাব-ঢাব-ঢাব-ঢাব’...

আর সেই অদ্ভুত পাখিটাও ডাকে, ‘ওঁক-ওঁক-ওঁক-ওঁক-ওঁক’ করে সময়কে নিয়ামানুবর্তিতার সঙ্গে ছিদ্রিত করে। রাত-পাখি।

ইয়ালো-ওয়াট্রেলড ল্যাপউইঙ্গ ডাকে, ‘ডিড উ্য ড্যু ইট? ডিড উ্য? ডিড-উ্য ড্যু ইট’?

এরা সব কালের প্রহরী। জীবন-মৃত্যু যেন, এদের ছোঁয় না। এরা সব সর্বজ্ঞ পাখি। বিধাতার আশ্চর্য খেয়ালে, এরা সম্ভবত বৃত্ত-পরিক্রমা সম্পূর্ণ না করেই বৃত্তান্তে না পৌঁছেই; ‘বোধিলাভ’ করে বুদ্ধ হয়ে গেছে।

বুড়িমা ডাকেন নীচুস্বরে, ‘আ বেটা, কালু, আ, শো যা’।

কিন্তু কালু কথা না শুনে, অগণ্য মানুষের-ই মতো, ছায়া-ধরার খেলায় মেতে দাপিয়ে বেড়ায়, ‘দাঁড়কাক’-এর বাসার আলো-ছায়ার রহস্যভরা, দুধলি, উজলা-রাতের বারান্দায়।

আমাদের এই আশ্চর্য সুন্দর পৃথিবীর, এধার থেকে ওধারে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%