বুদ্ধদেব গুহ

এরকম কখনোই হয় না। অসময়ে এমন বৃষ্টি নেমেছে যে, মনে হচ্ছে বর্ষাকাল। সাতদিন হয়ে গেল। বাড়ির পেছনের নালা দিয়ে এমন তোড়ে জল বইছে যে, মনে হচ্ছে শ্রাবণ মাস। সারাপৃথিবীর আবহাওয়াই বদলে গেছে। শীতে গরম, গ্রীষ্মে বর্ষা, হেমন্ত-বসন্ত বোঝাই যায় না, তবে শরৎকালটা এখনও বোঝা যায়, এই যা সান্ত্বনা।
সবে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। আকাশ এখনও অন্ধকার। প্রায় সাতদিন হল রোদ ওঠে না। পুরুণাকোটের পাটকিলে-রঙা ধুলোর পথ এখন পিচের হয়ে গেছে। বর্ষাকালে পথের মাটি থেকে যে-গন্ধ উঠত আগে, তা আর ওঠে না। তবু দু-পাশেই মাটি আছে আর আছে বনের পাদদেশে। কচি গাছের ঝাড় হয়েছে বড়োগাছের পায়ের কাছে। তাতে ফুল এসেছে সুন্দর। মাঝে মাঝেই ময়ূর ডেকে উঠছে বনের মধ্যে ‘নিক্কণ’ তুলে। একটা মন্থর বনগন্ধবাহী হাওয়া বয়ে আসছে লবঙ্গী পাহাড়ের দিক থেকে। ভারি আলসেমি মাখা সে-হাওয়াতে। কোনো কাজকর্মতেই মন বসে না এমন আবহাওয়াতে। অথচ কাজ করতেই হয়। পেট বড়ো জ্বালা!
আতশের স্কুলটা কাছেই। ও কটক থেকে বি. এড. পাশ করে জেলাসদর অঙ্গুলের একটি স্কুলে ইংরেজি পড়াত। ছিলও স্কুলটা ভালোই। করতপটার ওই স্কুলের সেক্রেটারি মাধব মিশ্র অঙ্গুলের বিমল বোসকে চিনতেন। আতশের বাবাকেও চিনতেন। খুব আদর্শবাদী মানুষ। এমন মানুষ এ যুগে বিরল। এই স্কুল পত্তনের আগে থেকেই বিমলজেঠুর মাধ্যমে মাধব মিশ্র আতশের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তাকে হেডমাস্টার করে তাঁর নতুন স্কুলে নিয়ে আসেন। মাইনেও দেন প্রায় দু-গুণ। তা ছাড়া পূর্ণ স্বাধীনতা। সবসুদ্ধু শ-খানেক ছেলে পড়ে ওই স্কুলে। করতপটা খুব-ই ছোটো জায়গা। তবে কিছু ছেলে-মেয়ে পুরুণাকোট থেকেও পড়তে আসে। সবসুদ্ধু পাঁচজন শিক্ষক। সবাই ওড়িয়া। আতশরাও প্রায় ওড়িয়াই হয়ে গেছে। দু-পুরুষ হয়ে গেল অঙ্গুল-এ বাস। তাদের কলকাতার আত্মীয়স্বজনেরা, যদি কখনো এদিকে আসেন, অথবা ও যদি কখনো বছর দু-তিন অন্তর কলকাতাতে যায়, তখন ওর বাংলা উচ্চারণ নিয়ে ওঁরা ঠাট্টা করেন। আতশ মজা পায়। তার বাংলাতে ওড়িয়া টান থাকলেও বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে ওড়িশার এই পাহাড়জঙ্গলে থেকেও যোগাযোগ রাখে পুরোপুরি। কটক থেকে বাংলা কাগজ ও কটকের বাংলা বইয়ের দোকান থেকে বাংলা বইও আনায় সে নিয়মিত।
লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন, দেশভাগের সময়ে নিজেদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে, নিজেদের বিনা দোষে পূর্ববাংলা ছেড়ে প্রাণ ও মান নিয়ে সব সম্পত্তি ছেড়ে নিরুপায়ে চলে আসেন ওরাও তেমন-ই এসেছিল বরিশাল থেকে। কলকাতায় ওদের যেসব আত্মীয়স্বজন ছিলেন, গরিব এবং অবস্থাপন্ন, তাঁরা সবাই আতশের পরিবারের ছ-জনকে পাকাপাকিভাবে রাখতে গররাজি হন। তাঁদের কোনো দোষ দেননি আতশের বাবাও। কারণ কলকাতাতে হঠাৎ করে ছ-জন মানুষকে আশ্রয় দেওয়া সহজ কথা ছিল না। ছ-জন মানুষের জন্য কমপক্ষে তিনটি ঘরের দরকার ছিল। কলকাতায় তিনটি বাড়তি ঘর, খুব কম মানুষের বাড়িতেই থাকত। তাঁরা আশ্রয় দিতে পারেননি বলে, তাঁদের সঙ্গে ভালো সম্পর্কের কোনো হেরফের হয়নি।
তখন আতশ-এর বাবা, ওঁর এক বন্ধুর পরামর্শে ঢেনকানলে চলে আসেন। বাবামস্ত বড়ো এক পাটকলের অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন। দেশভাগের সময় বয়সও তিরিশের কোঠাতে ছিল। ঢেনকানলে এসেই তিনি চৌদুয়ারের আই. পি. পি.-র কাগজ কল-এ একটা চাকরি পেয়ে যান, জুনিয়র অ্যাকাউন্ট্যান্টের। ঢেনকানল থেকে চৌদুয়ারে বাসে যাতায়াত করতেন। কাজটা ভালোই ছিল এবং যথেষ্ট মাইনে। তারপর ধীরে ধীরে নিজের কঠোর পরিশ্রম, বুদ্ধি ও সতততার জোরে অনেক-ই উন্নতি করেন। পছন্দমতো জমি কিনে বাগান ও বাড়ি করেন। তবে বাড়ি করেন ঢেনকানলে নয়, অঙ্গুলে। রিটায়ারমেন্টের বছর দশেক আগেই।
আতশ-এর জন্ম ঢেনকানলেই। তাই ওর সব বন্ধুবান্ধব, খেলার সাথি পরিচিত জন সবাই ওড়িয়াই ছিলেন। তবে বাঙালিও ছিলেন কয়েকঘর। বহিরাগত তাদের পরিবারকে স্থানীয় অধিবাসীরা পরমমমতায় গ্রহণ করে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তার দুই দিদির মধ্যে ছোড়দির বিয়ে হয়েছে সম্বলপুরের একটি ওড়িয়া ছেলের সঙ্গে। সে পড়তে এসেছিল ঢেনকানলে। দিদিকে ভালোবেসে বিয়ে করে। এখন সম্বলপুর—অঙ্গুল নতুন রেলপথের একটি ছোটোস্টেশন রেঢ়াখোল-এর রেল-এর স্টেশনমাস্টার। কথা হচ্ছে সম্বলপুরের কাছেই বামরা স্টেশনে সে বদলি হয়ে যাবে শিগগিরি। বড়ো স্টেশন অন প্রোমোশন। আর বড়দির বিয়ে হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগরে। জামাইবাবুদের পাটের ব্যাবসা ছিল। সচ্ছল অবস্থা। বড়দি ক্লাস নাইন অবধি পড়েছিল। তবে দেখতে অত্যন্ত সুন্দরী হওয়াতে বিয়ে হতে অসুবিধে হয়নি।
ঠাকুরদা ও ঠাকুমা দেশ ছেড়ে আসার দুঃখ ভুলতে না পেরে পাঁচবছরের মধ্যেই দু-জনেই দেহ রাখেন। বাবাও নেই। মা আছেন। মা খুব-ই একা হয়ে গেছেন। বিশেষ করে আতশ অঙ্গুল ছেড়ে করতপটাতে চলে আসার পরে। কিছুটা সময় অঙ্গুলে নিজেদের বাড়ির বাগান-টাগান দেখাশোনা করে কাটান। গতবছর অবধি পুরোনো একটা পরিবার ওদের বাড়িতেই থাকত। ওদের সার্ভেন্টস কোয়ার্টারে। মায়ের দেখাশোনা করত এবং ওদের ওপরেই বাড়ি ছেড়ে, মা বছরের বেশিরভাগ সময়ইে দুই দিদির কাছে পালা করে থাকতেন। আতশের বিয়ের বয়স বহুদিন-ই হয়ে গেছে। কিন্তু এই করতপটার জঙ্গলের পরিবেশে ওর মন বসে গেছে। এই জঙ্গুলে জায়গাতে কোনো শিক্ষিত মেয়েই পাকাপাকিভাবে থাকতে রাজি নয়। এখানে সিনেমা হল নেই, অন্য কোনো বিনোদনও নেই। তবে টিভি তো এসে গেছে বহুদিন-ই অঙ্গুলে। কিন্তু আতশ টিভির-পোকা মেয়ে পছন্দ করে না, নিজেও টিভি দেখেই না বলতে গেলে। তা ছাড়া করতপটাতে তার বাড়িতে অবশ্য বিজলি আলোও নেই। নানা কারণেই বিয়েটা ঘটে ওঠেনি। মা যতদিন আছেন, বিয়ে করলেও তার স্ত্রীকে মায়ের কাছেই থাকতে হবে অঙ্গুলে। আতশ যাবে মাঝে মাঝে, নয়তো সে, আসবে মাঝে মাঝে। আজকালকার কোনো মেয়েই শাশুড়ির সেবাদাসী হয়ে থাকতে চায় না। বিয়ে না হওয়ার সেটাও আর একটা কারণ। তা ছাড়া, মায়ের সঙ্গে বনিবনা হবে কি না, তাই বা কে বলতে পারে! তাই আতশ ভাবে, বেশ আছে। তবে আতশেরও মরূদ্যান আছে। তাদের পাশের বাড়ির মেয়ে, নলিনী। নলিনী চাঁদ। তাদের দু-জনকেই দু-জনের পছন্দ। তবে তার পড়াশুনো এখনও শেষ হয়নি। শেষ হলে কী হবে কে জানে!
এই করতপটার একদিকে মহানদীর ওপরে টিকরপাড়া, পুরুণাকোট হয়ে। পুরুণাকোটে, এর আগে গেলে টুল্টবকা, ডানদিকে গেলে বাঘবমুন্ডা। টিকরপাড়াতে ফেরিতে নদী পেরিয়ে ওপারে গেলে দশপাল্লা বৌধ আর ফুলবাণি। ফুলবাণি বেশ উঁচু। গরমের দিনে ছোটোখাটো হিল স্টেশনের মতো ঠাণ্ডা, যদিও বরফ পড়ে ক্বচিৎ কদাচিৎ। বরফে ঢাকা পাহাড় ধারে কাছে নেই। করতপটা ও পুরুণাকোটের মধ্যে একটা পথ চলে গেছে পাহাড়ে পাহাড়ে লবঙ্গীতে। লবঙ্গী হয়ে রায়গড়া। এই লবঙ্গীর উপত্যকাতে গদাধরের কাছে শুনেছে, সক্ট-উড-এর এক প্রজাতি আছে। তাদের গায়ের রং মসৃণ সাদা। তাদের নাম গেন্ডুলি। গ্রীষ্মদিনে চাঁদনি রাতে গাছগুলোকে মনে হয় একদল বিবসনা শ্বেতাঙ্গিনি যেন, হাতছানি দিয়ে ডাকছে। গা ছমছম করে।
স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক কামিনী পট্টনায়কের বাড়ি দশপাল্লাতে। তার মুখে নাম শুনেছে বিরিগড়ের। দশপাল্লার টাকরা গ্রাম থেকে বুরুসাই হয়ে যেতে হয় বিরিগড়। মস্ত উঁচু পাহাড় সে। যেখানে খন্দ আদিবাসীরা থাকে। তাদের পূর্বপুরুষেরা মেঘে চড়ে এসে বিরিগড়ে বাসা বাঁধে। বছরে তারা নাকি মাত্র একবার নীচে নেমে দশপাল্লার রাজাকে খাজনা দিয়ে যেত নইলে সমতলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। ফুলবাণিতেও খন্দ আদিবাসীরা থাকে। খন্দদের বাস উঁচু পাহাড়ে। অদ্ভুত তাদের রীতিনীতি নাকি।
এই পরিবেশ এবং আবহে আতশের নেশা ধরে গেছে। আজকাল অঙ্গুলে ওর যেতে ইচ্ছে করে না। নেহাত মায়ের জন্যেই যায়। নলিনীর জন্যেও। নলিনী যখন থাকে। অঙ্গুলের আশপাশেও ভালো জঙ্গল ছিল আগে। এখনও আছে কিছু। ঢেনকানল-এর রাজবাড়িটা একটা খুব উঁচু ন্যাড়া পাহাড়ের ওপরে। গল্প আছে যে, প্রজাদের আর হাতি দিয়ে সব বড়ো বড়ো পাথর বইয়ে নিয়ে সেই পাহাড়ের চূড়াতে প্রাসাদ তৈরি করেছিলেন রাজার পূর্বপুরুষরা। হাতিদের চোখ দিয়েও নাকি জল গড়িয়েছিল এ-কঠিন কাজ করতে। মানুষদের চোখ দিয়ে তো গড়িয়েই ছিল।
আতশ-এর মনে হয়, ওড়িশার বিভিন্ন করদ রাজ্যের রাজারা গরিব, সহায়হীন, সরল প্রজাদের ওপরে যে-প্রকার অত্যাচার করেছেন, তার নজির সারাভারতবর্ষেই নেই। অথচ কখনো তেমন বিদ্রোহও হয়নি। রাজন্যপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরে এখন রাজাদের সেই বর্বরতা আর নেই। কিন্তু সেই রাজাদের জায়গায় এসেছে অন্য অত্যাচারীরা। বড়ো ব্যবসায়ীরা, বাঁশ ও কাঠের ঠিকাদারেরা। আতশের প্রায়ই মনে হয়, একদিন-না-একদিন এই গরিবদের চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসের অভিশাপে তাদের অতিবড়ো শাস্তি পেতে হবে। জানে না, আতশের এই খুশিময় ইচ্ছে মিথ্যেও হতে পারে। ভগবান-টগবান সব বোগাস। থাকলে এত দীর্ঘদিন ধরে গরিবেরা এমন করে বঞ্চিত হত না। এত পাপও জমতে পারত না নানা ঠিকাদারের ঘরে ঘরে।
আশ্চর্য! ওড়িশাতে জনযুদ্ধ বা এম.সি.সি. বা নকশালরাও কোনোদিন শিকড় গাড়েনি। অথচ তাদের-ই এখানে সবচেয়ে প্রথমে আসা উচিত ছিল। কেন আসেনি, তা ভেবে অবাক হয়।
স্কুলের পাঠ্যবইতে এসব বিষয় থাকে না কিন্তু আতশ আর তার অধিকাংশ সহকর্মী অল্পবয়সি ছেলে-মেয়েদের মধ্যে একটা বিদ্রোহের বীজ পুঁতে দেওয়ার চেষ্টা করে। তার ছাত্রদের বদ্ধমনা না করে মুক্তমনা করতে চায়। ছাত্ররা অতসব ইজম-ফিজম বোঝে না। বোঝে যে, অনেকদিনের এই অত্যাচারের বোঝাটাকে তাদের মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। এই ভাবনাটার বীজ যদি, তাদের মধ্যে একবার বপন করে দিতে পারে তবেই ভবিষ্যতে কাজ হবে। আর কোনো প্রজা কাঁদতে কাঁদতে বিনা পারিশ্রমিকে, বিনা খাদ্যে কখনো পাথর বয়ে পাহাড়ে উঠবে না, রাজার বাড়ি বানাবার জন্যে।
‘বাজাজ’-এর একটা মোটরসাইকেল কিনেছে আতশ গতবছর অঙ্গুলের ডিলার পট্টনায়েক কোম্পানির কাছ থেকে। সহজ কিস্তিতে। বিমলজেঠু বলে দিয়েছিলেন। বিমল বোস বহুদিনের বাসিন্দা অঙ্গুলের এবং নিজে বাঙালি হলেও ওড়িয়া সমাজে তাঁর খুব-ই প্রতিপত্তি। যদিও ব্যাবসাদার, কিন্তু সৎ ব্যাবসাদার। কর্মচারীদেরও ঠকান না। তাদের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ান। সেই কারণেই তাঁকে এক বিশেষ চোখে দেখে আতশ।
করতপটা গ্রাম থেকে পুরুণাকোটে যাওয়ার পথে বাঁ-দিকে একটা পাহাড়ি নালা পড়ে। গ্রীষ্মে তির তির করে বয়। এখন বর্ষাতে কলরোলে জল চলেছে নুড়ি-পাথর গড়িয়ে নিয়ে। এই নালার-ই পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথ। স্কুলটা তার ভাড়াবাড়ির কাছেই। তাই স্কুলে যেতে মোটরসাইকেল নেয় না। স্কুলটা বড়োরাস্তা থেকেও বেশি দূরে নয়। দূরে হলে বাস থেকে নেমে বাইরের ছাত্রদের স্কুলে আসতে অসুবিধে হত। যদিও বাস-ভাড়া দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাদের কম জনের-ই আছে। সকলেই প্রায় মাইল পাঁচেক হেঁটে আসে, হেঁটে ফেরে। খুব ইচ্ছে করে ছেলে-মেয়েদের কিছু টিফিন খাওয়াতে। ন-মাসে ছ-মাসে খাওয়ায়ও কিন্তু রোজ পারে না।
বাইধর নামের একটি তেরো-চোদ্দো বছরের ছেলে আছে। ও-ই রেঁধে-বেড়ে দেয়, জামাকাপড় ধুয়ে দেয়। ছেলেটা বাধ্য। ব্যবহারও খারাপ করে না। তার বাড়ি লবঙ্গী যাওয়ার পথে পম্পাশরে।
যেহেতু সে হেডমাস্টার তাই তাকেই সবচেয়ে আগে পৌঁছোতে হয় স্কুলে। আতশ নিজে নিয়মানুবর্তী, তাই স্কুলের মাস্টারমশাইরা এবং ছাত্ররাও যাতে ‘নিয়মানুবর্তী’ হন এবং হয়, সেদিকে সবসময় সজাগ দৃষ্টি রাখে। বড়ো বড়ো শহরের অনেক স্কুলেও এরকম নিয়মানুবর্তী নয়, শিক্ষক এবং ছাত্ররা। এ-বাবদে আতশের গর্ব আছে। তার স্কুলের ছেলে-মেয়েরা ভালো ফলও করে। পঞ্চম শ্রেণি অবধি আছে তাদের স্কুলে। কম ছাত্র বলে পড়াশোনাও যথাসাধ্য যত্ন করে করায় ছাত্র-ছাত্রীদের। ছাত্রই বেশি, ছাত্রী সবসুদ্ধু সাতজন এক-শো জনের মধ্যে। তবে ছাত্রীরা ছাত্রদের চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগী। অনেক যুগ ধরে যে-সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হয়ে এসেছে সেই সুযোগ পাওয়াতেই যেন, ওরা তার পূর্ণ সদব্যবহার করতে চায় এখন। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই এই পঞ্চম ক্লাস অবধি পড়েই পড়াশুনো ছেড়ে দেয়। আর্থিক কারণে আর পড়তে পারে না।
আতশ-এর স্কুলের খুব সুনাম এই অঞ্চলে। অনেক ছেলে-মেয়েই এই স্কুলে পড়তে চায় কিন্তু মাধববাবু এবং আতশও চান না এবং চায় না যে, এর চেয়ে বেশি ছাত্র এ-স্কুলে আসুক। এলে, তাদের যথাযোগ্য মনোযোগ দেওয়া যাবে না। মাধববাবু একজন আদর্শবান মানুষ। এই যুগে ‘টাকা’ই যখন সকলের একমাত্র কাম্য ও প্রার্থনার, সেই যুগে মাধব মিশ্রের মতো মানুষ কম-ই দেখা যায়। তাঁর বড়োভাই যাদব মিশ্র ইনকাম ট্যাক্সের কমিশনার। প্রচন্ড ঘুসখোর বলে তাঁর কুখ্যাতি আছে। এখন চেন্নাইতে বদলি হয়ে গেছেন। বড়োভাই-এর জীবনযাত্রা ও মানসিকতার সঙ্গে মাধববাবুর এক্কেবারেই মেলে না বলেই তিনি পৈত্রিক নিবাস ছেড়ে অঙ্গুলের সিমলিপদা অঞ্চলে, আতশদের বাড়ির কাছে একটা ভাড়াবাড়িতে চলে এসেছেন অনেকদিন হল। তাঁর এক ছেলে, এক মেয়ে। তাঁর ছেলে-মেয়েরা বড়োভাই-এর ছেলে-মেয়েদের জীবনযাত্রাতে প্রভাবিত হয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে এমন ভয়েই উনি চলে এসেছেন। মাধববাবুর স্ত্রী একসময়ে বছর তিনেক শান্তিনিকেতনে পড়েছিলেন। তাঁরও খুব-ই ইচ্ছা নির্জন জায়গাতে অনেকখানি জমি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনের আদর্শে একটি শিক্ষায়তন গড়ে তোলেন। সমআদর্শে বিশ্বাসী মানুষ বেশি পাননি এবং অতখানি জমি ও আনুষঙ্গিক সব কিছুর জন্যে যত অর্থর দরকার তাও জোগাড় হয়ে ওঠেনি বলেই, তাঁর স্বপ্ন এখনও পূরিত হয়নি। তবে আতশ এবং অন্যান্য অনেক শিক্ষকের-ই পূর্ণ সমর্থন আছে ওই স্বপ্নকে সফল করে তোলার জন্যে। বড়োস্কুল না করে, মাধববাবু এমন ছোটো ছোটো চারটি স্কুল করেছেন। একটি চৌদুয়ারে, একটি ঢেনকানলে, একটি অঙ্গুলে এবং আর একটা অঙ্গুল থেকে সম্বলপুর পথের রেঢ়াখালে।
ওদের স্কুলে সবসুদ্ধু আটটি ঘর। সায়ান্স নেই, তাই ল্যাবরেটরির প্রয়োজন হয় না। তবে লাইব্রেরিটি ভালো। শুধুই আর্টস স্ট্রিমের বই পড়ানো হয় এই দীনবন্ধু স্কুলে। অঙ্গুলে একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হতে চলেছে শুধুমাত্র আর্টস স্ট্রিমের জন্যে। এই বিজ্ঞানের যুগে এ, এক দারুণ পদক্ষেপ। এই স্কুল সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাফিলিয়েশান চাইবে। ‘দীনবন্ধু স্কুলে’-র সব ঘরে দেওয়ালে একটি করে বোর্ডে লেখা আছে ‘Literature Makes A Person.’
আর্টস স্ট্রিমের নানা বিষয় ছাড়াও গান, ছবি আঁকা ইত্যাদিও শেখানো হয় আতশের স্কুলে। এসবের জন্যে একজন টিচার আছেন। তিনি অঙ্গুল থেকে বাসে করে এসে চারদিন ক্লাস নেন। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ওসব ‘সুকুমার’ বৃত্তি জাগিয়ে তোলাটাই আসল উদ্দেশ্য। শিক্ষা, সুরুচি সব এই বয়েসেই গড়ে ওঠে, তাই।
রবীন্দ্রনাথ যে, ‘পূর্ণ মনুষ্যত্ব’র কথা বলতেন তার ওপরে খুব জোর দিতে বলেন মাধববাবু। বলেন, আমার স্কুলে যেন, শুধুমাত্র জীবিকার জন্যে পড়াশুনো শেখানো না হয়। ‘You should bring the horse near the water and make it thirsty.’ জানার ইচ্ছেটা যেন, জেগে ওঠে ছাত্রদের মধ্যে।
আতশ তার বাড়ির বাইরের বারান্দার কাঠের চেয়ারে বসে বৃষ্টিভেজা প্রকৃতির শোভা দেখছিল। গন্ধ নিচ্ছিল দু-নাক ভরে। বাড়ির পেছনের নালা দিয়ে জোরে জল বয়ে যাচ্ছিল ‘ঝর ঝর’ করে। সন্ধের পরে যখন, প্রকৃতি নির্জন ও নিশ্চুপ হয়ে যায় তখন, এই শব্দটা ক্রমশ জোর হতে থাকে। ‘ঘুমপাড়ানি’ গানের মতো শোনায় তখন ঝরনার শব্দ। অনেকগুলো বড়ো বড়ো কনকচাঁপার গাছ আছে নালাটার ও-পাশে। চাঁপার গন্ধে ‘ম ম’ করে বন। বিশেষ করে রাতে।
জঙ্গলের ঠিকাদার পাল্টববাবুদের মুহুরি গদাধর আসছিল সাইকেল চালিয়ে। সে এখন ছুটিতে এসেছে। বর্ষাকালে তো জঙ্গলের কাজ বন্ধ থাকে। জঙ্গল আবার খুলবে অক্টোবরের গোড়াতে। তাই গদাধরের ছুটি এখন। গদাধরের কাছেই জঙ্গলের নানা গল্প শোনে আতশ। অঙ্গুল আধা-শহর জায়গা। জঙ্গলের এতসব গোপন খবর যেহেতু ও অঙ্গুলের বাসিন্দা, তার জানার কথা নয়। তা ছাড়া, বি. এড. করার সময়ে তাকে কটকেও থাকতে হয়েছে বেশ কিছুদিন।
গদাধরকে বলেছে আতশ, স্কুলে পুজোর ছুটি যখন হবে, এবার পুজো পড়েছে অক্টোবরের শেষে, তখন গদাধরের সঙ্গে যাবে সে জঙ্গলে। থাকবে গিয়ে দিন পনেরো। গদাধর বলেছে কোনো অসুবিধা নেই। ট্রাক যায় প্রতিদিন, যে-জঙ্গলেই কাজ হোক-না-কেন। তাকে ট্রাকে করে নিয়ে গিয়ে ট্রাকে করেই ফেরত পাঠিয়ে দেবে।
গদাধরের কাছ থেকেই জঙ্গলের নানা গল্প শোনে। তাকে দেখলেই ডেকে বসিয়ে ওমলেট আর চা খাওয়ায়। ওর তো একার সংসার—কখনো-কখনো খাইয়েও দেয়। বাইধরও খুশি হয়ে খাওয়ায় কারণ গদাধরের বাড়িও পম্পাশরেই। কোনো কোনো রবিবার বাইধর গদাধরের সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে চলেও যায় পম্পাশরে।
নানা জায়গা থেকে বড়ো বড়ো ঠিকাদারেরা আসেন নিলামে জঙ্গল ডেকে নিতে। জঙ্গল ডাকবার আগে তাঁদের লোকেরা সেইসব জঙ্গলে গিয়ে কী কী গাছ আছে, কত গাছ আছে তাদের চেহারা-ছবি কেমন, সেসব সম্বন্ধে সরেজমিন তদন্ত করে ফিরে এসে মালিকদের রিপোর্ট দেয়। কত দামে কোন জঙ্গল ডাকলে কত লাভ থাকবে তার একটা মোটামুটি হিসেব করে নিয়ে নিলাম ডাকেন তাঁরা। তবে দুর্গম পাহাড়ি বনের অভ্যন্তরের সব জায়গাতে পৌঁছোনো যায় না। অনেকটা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাতে আন্দাজেই ঠিক করে নিতে হয় জঙ্গলের প্রকৃতি। তা ছাড়া, জঙ্গলের গভীরে পৌঁছোনোর মতো রাস্তাও তো থাকে না। যে-ঠিকাদার যে-জঙ্গল কিনবেন তাঁকেই পথ তৈরি করে নিতে হয়। পথ তৈরি করা হয়, বিশেষ করে পাহাড়ে, অধিকাংশ সময়েই হাতির পথকে অনুসরণ করে। হাতিদের অসাধারণ ‘বুদ্ধি’। পাহাড়ের চড়াই-উতরাই বুঝে কোথা দিয়ে উঠলে পাহাড়ে সবচেয়ে কম পরিশ্রমে ওঠা যায়, হাতিরা তা ঠিক করে নিয়ে, নিজেদের চলাচলের পথ বানায়। ঠিকাদারের লোকেরা সেই পথ-ই যথাসম্ভব মনে করে, চওড়া করে জিপ ও ট্রাক যাওয়ার উপযুক্ত করে নেয়।
জঙ্গলের মধ্যে মধ্যে যেখানে গাছ কাটা হয়, সেখানে গাছের কান্ড ও মোটা মোটা শাখা ও প্রশাখাকে ট্রাকের সাইজমতো কেটে ফেলে কাবাড়িরা। তারপর মোষ দিয়ে বা বলদ দিয়ে সেই কাঠ টানিয়ে এনে পথের পাশে উঁচু জায়গাতে থাক দিয়ে রাখা হয় যাতে ট্রাকে সেইসব কাঠ তুলতে সুবিধে হয়। পাহাড় যেখানে খুব খাড়া সেখানে খালি ট্রাক উঠে আসতে পারে না। ট্রাকের চাকা জমি আঁকড়াতে পারে না। তখন বড়ো বড়ো পাথর দিয়ে ট্রাক বোঝাই করে তারপর ট্রাক পাঠানো হয় পাহাড়ে। পাহাড়ে পৌঁছোলে সেইসব পাথরগুলো আবার ট্রাক থেকে নামিয়ে ট্রাক খালি করে কাঠ বোঝাই করা হয়। গোরু-মোষ দিয়ে কাঠ ডেসপ্যাচ পয়েন্টে টানিয়ে আনার প্রক্রিয়াকে বলে ‘ঢোলাই’ করা।
এসো এসো গদাধর।
আপ্যায়ন করে বসায় আতশ গদাধরকে।
গদাধরের পরনে খেটো ধুতি। গায়ে খাকি শার্ট একটা। কোনো বাবুর ব্যবহৃত শার্ট বলেই মনে হয়। শার্টটার কায়দা আছে। গোটা ছয়েক পকেট। ডান কাঁধের কাছে ছিঁড়ে গেছে। পায়ে হাট থেকে কেনা প্লাসটিকের পাম্প শ্যু। ছাতাটা সাইকেলের রড-এর সঙ্গে নারকোলের দড়ি দিয়ে বাঁধা। মুখে গুন্ডি পান।
গদাধর খুব খুশি হয় আতশ ডাকলে। স্কুলের হেডমাস্টার বলে কথা। সে নিজেও পঞ্চমফেল। মানে, ক্লাস ফাইভের পরীক্ষাও পাশ করতে পারেনি। তবে অঙ্কে মাথাটা তার ভারি সাফ। প্রতিবছর এই যে, এতগাছ কাটা হচ্ছে, তারপর টুকরো করা হচ্ছে তার প্রতি বর্গফিটের হিসেব একটা খাতাতে লিখে রাখে সে, জঙ্গলের ক্যাম্পে। তারপর কত বর্গফিট লগ কটকে গেল তারও হিসেব রাখতে হয়। জঙ্গলের ক্যাম্পের সে-ই ম্যানেজার-কাম-অ্যাকাউন্ট্যান্ট। গাই-বলদের দেখাশোনা, কাবাড়িদের দেখাশোনা, তাদের হপ্তা দেওয়া, কটক থেকে টাটা মার্সিডিজ ট্রাক চালিয়ে আসা পাইলট সাহেব আর তাঁর খালাসির খাওয়া-দাওয়া দেখা, রাতে শোয়ার ব্যবস্থা করা, এসব-ইতার-ই কাজ। গরমে তারা অবশ্য ট্রাকেই শুয়ে পড়ে রাতে। শীতকালে অন্যত্রই শুতে হয়।
আরও কত কাজ। কী রান্না হবে—চাল ডাল তেল নুনের হিসেব রাখা—বাবুরা এলে তাঁদের খিদমদগারি করা—কাজ কী কম? তবে মন্দ লাগে না। স্বাধীনতা? স্বাধীনতা থাকলে কাজের বোঝা সহজেই বওয়া যায়। এত মানুষে যে, থেকে থেকে, তাকে ‘গদাধরবাবু, গদাধরইভাই’ বলে ডাকে, তার সব আদেশ মান্য করে এরমধ্যে একটা মায়া আছে। যারা জানে, তারাই জানে।
গদাধর সাইকেলটা বারান্দার ভেতরে উঠিয়ে রাখে—যদি আবার বৃষ্টি নামে। তারপর হেডমাস্টারবাবুর উলটোদিকের চেয়ারে বসে নানা গল্প জুড়ে দেয়। তার আটচল্লিশ বছরের জীবনে তিরিশটা বছর—প্রতিবছর কটকের মঙ্গলাবাদের বাসিন্দা পাল্টববাবুদের নেওয়া জঙ্গলে জঙ্গলেই কাটিয়ে দিল। কত জায়গার নাম জানে। কতরকম অভিজ্ঞতা। তবে পাল্টববাবুরা কটক থেকেই কন্ট্রোল করা যায়, এমন সব জঙ্গল নিতে ভালোবাসেন। বাবুদের নানারকম ব্যাবসা। তবে জঙ্গলের ব্যাবসাটা মেজোবাবুই দেখেন। খুব ঠাণ্ডা বুদ্ধির মানুষ। কারোকে খুন করলেও এমন-ই ঠাণ্ডাভাবেই করবেন যে, কাকপক্ষীতেও জানতে পারবে না। তবে ছোটোবাবুর বড়ো গরম, সাহস বেশি। একবার কালাহাণ্ডিতে এক জঙ্গল নিয়েছিলেন জঙ্গলের কাজ করবেন বলে। সেই জঙ্গল ডাকতে হয়েছিল কালাহাণ্ডির রাজধানী ভবানী পাটনাতে গিয়ে। সে-জঙ্গলের রকম-ই আলাদা।
—কেন?
আরে বাবু, মানুষখেকো বাঘে ভরা সে জঙ্গল। আমাদের পাঁচজন কাবাড়িকে খেয়ে দিল যখন, তখন কাজ বন্ধ করে ফিরে এসেছিলাম আমরা। বড়োবাবু খুব বকেছিলেন ছোটোবাবুকে। বলেছিলেন, আমার চারলাখ টাকা জলে ফেললে আর শুধু তাই নয় পাঁচটা মানুষকে বাঘে খাওয়ালে।
যারা মরল তারা কোথাকার লোক?
সব এদিককার-ই লোক। তারা দু-পুরুষ ধরে কাজ করছে বাবুদের কাছে। বাপে গাছ চাপা পড়ে মরল বা বাপকে বাঘে খেল বা গয়ালে গুঁতোল—পটল তুলল—তো বারো-তেরো বছরের ছেলে ধুতির ওপরে গামছাটা জড়িয়ে নিয়ে কাঁধে কুড়ুল নিয়ে চলে এল বাপের জায়গাতে কাজ করতে।
বারো-তেরো বছরের ছেলে। বলো কী গদাধর?
হঁ আইজ্ঞাঁ। না এলে খাবে কী? মা ভাই-বোন যে, সব না খেয়ে মরবে।
তা যে, পাঁচজন কুলি মরে গেল তাদের ক্ষতিপূরণ দিলে না, মানে দিলেন না, তোমাদের বাবুরা?
দিলেন বই কী! সে দিক দিয়ে ওঁরা খুব-ই ভালো।
কত করে দিলেন?
সে অনেক টাকা বাবু।
কত বলো-না?
আ-ড়া-ই হাজার।
বলো কী? একটা প্রাণের দাম আড়াই হাজার?
আমাদের প্রাণের দাম কী অত নাকি? পাঁচ-শো টাকা পেলেই যথেষ্ট বলে মনে করে কাবাড়িরা। আড়াই হাজার টাকা—রাখবে কোথায়? কী করবে তা দিয়ে? অনেকে অবশ্য এক-দুই গুঁঠ জমিও কিনে ফেলেছিল সে-টাকা দিয়ে বুদ্ধি করে। ভবিষ্যতে কাজে লেগেছিল।
ওড়িশার সব জায়গাতেই জমির মাপকে ‘গুঁঠ’ বলে, না? মায়ের কাছে শুনেছিলাম বাংলায় জমির মাপ হয় বিঘা দিয়ে।
বাংলায় কী হয় জানি না। আমাদের এখানে গুঁঠ।
এমনি করে নানা গল্প করতে করতে বেলা গড়ায়। আকাশ আরও কালো করে আসে। ‘ঝুরুঝুরু’ করে হাওয়া বইতে থাকে একটা। বাঁশবনে ‘কটকটি’ শব্দ ওঠে। কুম্ভাটুয়া পাখি ডাকে ‘গুব-গুব-গুব’ করে। পাহাড়তলির ঝিলের কাছ থেকে কালো আকাশের পটভূমিতে একঝাঁক সাদা কুন্দু বকফুলের মালার মতো দুলতে দুলতে একবার ছেঁড়া-মালা হয়ে আবার জোড়-লাগা গোড়ের মালার মতো ভেসে যায় উত্তর থেকে দক্ষিণে। বনের গভীর থেকে তক্ষক ডেকে ওঠে। ‘ঠিক ঠিক ঠিক ঠিক’। বড়ো গেকো ডাকে নদীর ওপার থেকে ‘ট্বাক-ট্যুউ ট্বাক-ট্যুউ ট্বাক-ট্যু’ করে। নদীর ওপারের পেছনের গভীর বন থেকে তার দোসরা সাড়া দিতে থাকে। কোথায় যেন, কেয়ার ঝোপ আছে—বাতাসে কেয়ার গন্ধ ভাসে আর ওর বাড়ির পেছনেই যে, মস্ত কনকচাঁপার গাছটা তা থেকে টুপটাপ করে চাঁপাফুল ঝরে পড়ে পৃথিবীকে গন্ধে ভরে দেয়। আর তারপর-ই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। দুপুরেই ঘোর অন্ধকার।
আতশ বলে, কী করে যাবে এই বৃষ্টিতে পম্পাশরে! সে যে-অনেকখানি পথ। তা ছাড়া পাহাড়ে তো সাইকেল চালাতেও পারবে না। তোমাকে সাইকেল টেনে টেনে যেতে হবে। থেকে যাও, তোমার গল্প শুনি। বাইধরকে বলছি আমাদের জন্যে খিচুড়ি চাপিয়ে দেবে। সঙ্গে মুসুর ডালের বড়া...পেঁয়াজি, কড়কড়ে আলুভাজা, কেমন?
গদাধর বলে, হঁ আইজ্ঞাঁ। এ-বছর সাপের বড়ো উপদ্রব হয়েছে। বেলাবেলি ফিরতে হবে।
তা ফিরো।
গরমের ছুটিতে আতশ অঙ্গুলে এসেছে। মা খুব খুশি। যদিও ওর কর্মস্থল করতপটা থেকে অঙ্গুলে আসাটা এমন কিছু কঠিন নয় তবু ওর স্কুল খোলা থাকলে আসা কঠিনও হয়। শনিবার বিকেলে এসে সোমবার ভোরের বাসে ফিরে যেতে হয়। তবে ও তো মোটরসাইকেলেই যায়। ছোটো স্কুল হলেও সে হেডমাস্টার। তাই নানা দায়দায়িত্ব তো থাকেই। তা ছাড়া, শুধুই টাকা রোজগারের জন্যে ও কাজ করেও না। স্কুলের শিক্ষকমাত্রই যে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ —একথাটা ও বোঝে এবং কথাটাকে বিশেষ গুরুত্বও দেয়। যদিও স্কুলটি ছোটো এবং ক্লাস ফাইভ অবধি।
ওড়িশার এই ছোটোশহরে আতশ নিজের ঘরে বসে খবরের কাগজ পড়ছিল। এখানে বাংলা কাগজ কষ্ট করে পেতে হয়। কটক অথবা সম্বলপুর হয়ে আসে। দু-দিন পরে পায়। তবুও রাখে। মায়ের বাংলা সাহিত্যে খুব-ই উৎসাহ। তবে বলেন যে, আজকালকার লেখকদের অধিকাংশ লেখাই অপাঠ্য। কী যে, ছাতা-মাথা লেখেন এঁরা। বাংলা ছাড়াও একটি ওড়িয়া কাগজ এবং একটি ইংরেজি কাগজ রাখা হয় সারাবছর-ই বাড়িতে।
ওদের বাড়িটা একতলা। বসার ঘর ও আলাদা খাবার ঘর ছাড়া চারটি শোয়ার ঘর। বাবা অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন বলেই, যা-কিছুই করেছেন তা হিসেব করে। অ্যাকাউন্ট্যান্ট হলেও তাঁর কিন্তু রুচি ছিল খুব সুন্দর। এবং শখও ছিল নানারকমের। দু-বিঘা জমির ওপরে বাড়ি করার সময়েই প্ল্যান করে নানা গাছ লাগিয়েছিলেন গেটের দু-ধারে। দু-পাশে দু-টি বটল ব্রাশ-এর গাছ। ভেতরে বসন্তি, চাঁপা, নাগকেশর, অগ্নিশিখা, শিউলি, ইত্যাদি গাছ। ফলের মধ্যে আম, কালোজাম, জলপাই, চেরি, আতা, ফলসা ওইসব গাছ। ঝোপের মধ্যে রঙ্গন, হাসনুহানা, রক্তকরবী, জুঁই। ওড়িশার জঙ্গল থেকে কন্টা বাঁশ গাছ এনেও লাগিয়েছিলেন বাউণ্ডারি ওয়ালের পাশে। সব গাছ-ই এখন বড়ো হয়ে গেছে। ফলগাছগুলোতে গ্রীষ্ম, বর্ষা, হেমন্তে নানা পাখির মেলা বসে। বাঁশঝাড়ের নীচে নীচে ‘কুম্ভাটুয়া’ পাখিরা তাদের বাদামি-কালো চিকন শরীর নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে পোকা ধরে খায়। টিয়া, ময়না, কোকিল আসে-যায়। ছাতারে আছে একঝাঁক যাদের ইংরেজি নাম ‘সেভেন সিস্টার্স’। কুম্ভাটুয়া পাখিগুলোকে মা ‘কুবো’ বলেন। বাংলাতে নাকি ওই নাম তাদের। চড়ুই, শালিক, ঘুঘু বাস্তু হয়ে থাকে আর থাকে একটা মস্ত বড়ো দাঁড়াশ সাপ জলপাই গাছের গোড়াতে। ইঁদুর ধরে খায় সে। শীতের দুপুরে একটা কেটে-ফেলা কনকচাঁপা গাছের কাটাগুঁড়িতে কুন্ডলী পাকিয়ে সে রোদ পোহায়। কখনো-কখনো সে পাখি ধরেও খায়। মা তখন রাগ করেন তবে ওর কোনো ক্ষতি করেন না। সাপটা বাবার আমল থেকে আছে। যা কিছু বাবার স্মৃতি বহনকারী তার সবকিছুকেই মা সযত্নে বাঁচিয়ে রাখেন।
বাবা বাইরের বারান্দার ডেক-চেয়ারে বসে ছুটির দিনের সকালে সম্বলপুর থেকে আনানো ‘অম্বুরি’ তামাক দিয়ে গড়গড়া খেতে খেতে কাগজ পড়তেন আর বিকেলে ঘুম থেকে উঠে পাখিদের ডাক শুনতেন। গ্রীষ্মদিনে পাখিদের স্নান করার আর তৃষ্ণা নিবারণের জন্যে বার্ড বাথ বানিয়েছিলেন বাড়ির চারদিকে। পাখিরা আরাম করে স্নান করে তাতে। তা থেকে জল খায়। আজও খায়। পৃথিবী থেকে পাখির সংখ্যা যতই কমে আসছে, কমে আসছে এই অঙ্গুল শহর থেকে, তখন তাদের এই বাড়ির অভয়ারণ্যে ভিড় ক্রমশই বেড়েছে। বর্ষাকালে টুকটুকে লাল স্কার্লেট মিনিভেট পাখিরা আসে জোড়ে। গোল্ডেন ওরিওন বা বেনে-বউ, পিউ-কাঁহা বা ব্রেইনফিভার পাখি বসন্তের কামতি দুপুরে অবিরত ডেকে ডেকে আতশের কামকেও চাড়িয়ে দিয়ে যায়।
ওদের বাড়ির নাম ‘তিয়াসা’। কারো বাড়ির নাম-ই এমন দেখা যায় না। কিন্তু বাবা, মায়ের সঙ্গে পরামর্শ না করেই এই নাম দিয়েছিলেন। মা কিছু মনে করেননি। বলতেন, ‘আমার খুশি তো সব ব্যাপারেই মেনে নিয়েছেন তোদের বাবা, একটা ব্যাপারে না-হয় নিজের মত খাটালেন-ই’।
বড়দি ছোড়দি বলত, কিন্তু তিয়াসা কেন? এমন উদ্ভট নাম কখনো শুনিনি। আমাদের স্কুলের মেয়েরা খ্যাপায়। বলে, ‘কীসের তিয়াসা রে’?
মা বলতেন, ‘তাদের বলবি যে, জীবন-তিয়াসা। বলবি, প্রত্যেক মানুষের জীবন-ই এক পিয়াসা বা তিয়াসা। এ-কথা উপলব্ধি করার মতো গভীরতা সকলের থাকে না। এই বলে, বকে দিবি ওদের।
দিদিরা হাসত। বলত, ‘বকব’।
সকাল থেকে দু-কাপ চা খেয়েছে আতশ। এবারে জলখাবার খাওয়ার সময় হয়েছে। পটা এসে বলল, ‘চালন্তু রাজাবাবু, মা ডাকচি। নলিনীদিদি আসিলানি’।
আতশ-এর মা শিশুকাল থেকেই একমাত্র ছেলেকে ‘রাজাবাবু’ বলে ডাকেন বলেই কাজের লোকজনেরাও তাই বলে ডাকে।
কেব্বে আসিলা নলিনীদিদি? বলল, আতশ।
তা ঘণ্টাভর হইথিবে।
নলিনী এক ঘণ্টা হল এসেছে অথচ ওর কাছে আসেনি। অভিমান হল আতশের। আতশের মায়ের যেমন প্রিয় নলিনী, নলিনীরও তেমন-ই প্রিয় আতশের মা। বয়েসের কত ব্যবধান কিন্তু দু-জনে যখন মুখোমুখি বসে ঘণ্টার-পর-ঘণ্টা গল্প করেন, হেসে গড়ান, তখন দেখে মনে হয় দুই প্রিয়সখীই বুঝি। একজন অসমবয়েসি মেয়ের সঙ্গে অন্য একজন মেয়ের যেমন সখ্য তেমনটি দু-জন পুরুষের মধ্যে কখনো হয় না।
আতশ খাওয়ার ঘরে গিয়ে খাবার টেবিল ও চেয়ার টেনে বসল। দেখল, নলিনী লাগোয়া রান্নাঘরে আলু আর কুমড়োর ছেঁচকি করছে কালোজিরে কাঁচালঙ্কা দিয়ে—যেমনটি আতশ খেতে ভালোবাসে। আর মা লুচি ভাজছেন।
কতক্ষণ এসেছ?
আতশ জিজ্ঞেস করল নলিনীকে।
এই তো এলাম।
পটা যে বলল, এক ঘণ্টা হল এসেছ!
তাহলে তাই। কেন? জবাবদিহি করতে হবে নাকি?
স্নিগ্ধা বললেন, এই শুরু হল তোদের খুনশুটি।
আতশ বলল, আমি তোমার কে যে, আমার কাছে জবাবদিহি করতে হবে তোমার?
তবে তো জানোই! জেনে-শুনেও বলা কেন?
অভ্যেসে বলি।
বদভ্যাস ত্যাগ করো।
তোমার কলেজ কবে খুলবে?
সকলের-ই যখন খুলবে। গ্রীষ্মের ছুটির পরে।
মাধব বিশ্ববলের কাছে কোচিং নিতে যাও না আজকাল?
কথাটার মধ্যে নিছক জিজ্ঞাসাই নয়, একটু যেন ঈর্ষারও গন্ধ ছিল।
নলিনী তার খঞ্জন পাখির মতো কুচকুচে কালো দু-টি চোখের মণি নাচিয়ে বলল, যাই তো! প্রায় রোজ-ই যাই। না গেলে আমার ঘুম-ই হয় না।
তাই?
বলল, আতশ।
নলিনী বলল, এবারে ছুটিতে এসে একদিনও যাওনি তুমি মাধবদার কাছে?
আমি কী করতে যাব? আমি তো মাধবের ছাত্র নই।
তা নও কিন্তু মাধবদাদা তোমার সহপাঠী তো বটেই।
ওরকম সহপাঠী তো অঙ্গুল শহরে আমার কতই আছে। ঢেনকানলেও আছে।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, দেশের কী অবস্থা হল। যত বাজে ছাত্র তারা সবাই অধ্যাপক হয়ে গেল, অন্য কিছু হতে না পেরে।
তুমিও তো স্কুলমাস্টার।
আমি তো খুব-ই খারাপ ছাত্র ছিলাম। খারাপ হলেও ভালোর ভান তো করিনি কখনো।
কেন? থার্ড ক্লাস এম. এ.-রাই তো ভালো অধ্যাপক হয়ে এসেছে চিরদিন। ভালো পরীক্ষার্থী হওয়া আর ভালো শিক্ষক হওয়ার মধ্যে তফাত আছে।
বলেই বলল, যাকগে তোমার সঙ্গে এখন কথা বলব না। আলু-কুমড়োর ছেঁচকিটা ভালোমতো নামাই, তারপর খাওয়ার টেবিলে বসে কথা হবে।
বলেই, স্নিগ্ধার দিকে চেয়ে বলল, ও মাউসি। তুমি কতগুলো লুচি বেলেছ? পুরো শিমলিপদার মানুষের খাওয়া হয়ে যাবে।
আরে আমার উপোসি ছেলেই তো খাবে গোটাকুড়ি। বেচারি কী খায় আর না খায়—একা থাকে আর ওর দেখাশোনা যে, করে সে বাইধর পিলাটা একেবারেই রাঁধতে জানে না। তাই যখন কাছে থাকে তখন একটু পছন্দসই খাবার রেঁধে খাওয়াই।
নলিনী বলল, আমরা ভারতীয়রা খেয়ে আর খাইয়েই, সবটুকু সময় নষ্ট করলাম। We believe that the only way to the heart is through the stomach.
স্নিগ্ধা বললেন, আমাদের প্রজন্ম আর কতদিন থাকবে? আমাদের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই তো এসব পাট যাবে। তখন তোমরা ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড-এর মতো ব্যাগেল আর চিজ খেয়েই থেকো।
ব্যাগেল-এর কথা তোমাকে কে বলল? নলিনী জিজ্ঞেস করল।
পাশের বাড়ির কালু। সে তো এখন স্টেটসে থাকে। ন্যুইয়র্কের কাছেই। বাল্টিমোরে।
ব্যাগেল আমার খেতে ভালো লাগে না। যখন মনট্রিয়ালে দিদির কাছে গেছিলাম তখন খেয়েছি।
নলিনী বলল।
তারপর বলল, ওটা ইজরায়েলি রুটি একরকম। পুরো পশ্চিমে সকলেই খায়। পরে হয়তো আর খাবে না। যখন যার ওপর নেকনজর পড়ে ওরা তাই করে।
আতশ বলল, আসলে পশ্চিমি দেশে জুতো-সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ সবকিছুই নিজেদের-ই তো করতে হয় আর প্রত্যেকেই ভীষণ টেনশানে থাকে, প্রত্যেককেই সপ্তাহে পাঁচদিন ভীষণ-ই কাজ করতে হয়, সে ছাত্রই হোক, কী চাকুরে। তাই খাওয়া নিয়ে অত ঝামেলা ওদের পোষায় না। তবে সপ্তাহে দু-একদিন যখন, বাইরে রেস্তোরাঁতে খায় তখন এমন-ই পেট ভরে খায় যে, পরে দু-দিন উপোস করে।
স্নিগ্ধা বললেন, তোর যত বাজে কথা।
নলিনী বলল, না মাউসি। কথাটা ঠিক-ই বলেছে আতশ।
সকলে মিলে খেতে বসে নানা গল্প করছিল। আতশ বলল, ‘কোনো আচার নেই মা?’
স্নিগ্ধা বলল, ‘নেই। তবে আমের আচার বানাচ্ছি। আর ক-দিন রোদ পেলেই হয়ে যাবে।’
নলিনী বলল, ‘তেঁতুলের আচার খাবে?’
কোথায়?
আমাদের বাড়িতে আছে। বউদি করেছে। লঙ্কার আচারও আছে। আমি এখুনি নিয়ে আসছি। যাব আর আসব।
সে কী? লুচিগুলো সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে যে।
স্নিগ্ধা উদবেগের সঙ্গে বললেন।
যাবে না যাবে না, বললাম না, যাব আর আসব?
দাদা বউদি বসে চা খাচ্ছিল। বউদি বলল, কী হয়েছে রে? মাউসির হার্ট-অ্যাটাক হল নাকি?
না-না। দুটো পাত্র দাও তো!
পাত্র? কী করবি?
আচার নিয়ে যাব। আতশ খেতে বসেছে। তোমার হাতের আচার ওর খুব পছন্দ, খুব-ই ভালোবেসে খায়।
চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে নলিনীর বউদি নন্দা ওর সঙ্গে ভাঁড়ার ঘরে যেতে যেতে বলল, আতশ তোর চেয়েও ভালোবেসে খায় আচার?
এমন বাজে কথা বলো-না! তুমি বড্ড বাজে কথা বলো বউদি।
কপট রাগের সঙ্গে বলল নলিনী। তারপরেই দুটো কাচের বাটিতে করে আচার নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
নন্দা বলল, জলখাবার খাবি তো? তাড়াতাড়ি আয়। আমি চিঁড়ের পোলাউ করছি আজ।
ওখানেই খেয়ে আসব বউদি।
নলিনী চলে গেলে, নলিনীর দাদা নন্দন বলল, এত ভালো ভালো ছেলের সঙ্গে সম্বন্ধ করলাম। ওরা নলিনীর পড়াশোনারও কোনো ব্যাঘাত ঘটাতেন না। অত অবস্থাপন্ন সব ঘর। ছেলেও তো একটি নয়, তিন-তিনটি। দেখতে-শুনতে, স্বভাব-চরিত্রে সকলেই ভালো। বাড়ি, গাড়ি, বাগানবাড়ি, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান—তা মেয়ের পছন্দই হল না।
তুমি বড়ো অবুঝ।
নন্দা বলল।
বাড়ি, গাড়ি, বাগানবাড়িকে তো বিয়ে করবে না? নলিনী যে, আতশকে পাগলের মতো ভালোবাসে।
হা:। করতপটার প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার!
তাতে কী? প্রকৃতি ভালোবাসে বলে ও তো ইচ্ছে করেই ওই চাকরি নিয়ে গেছে। বি. এড. ছেলে, ও কি কটক, ভুবনেশ্বর, সম্বলপুরে চাকরি পেত না? তা ছাড়া একমাত্র সন্তান না হলেও ও তো একমাত্র ছেলে। দুই দিদি আর বিধবা মায়ের চোখের মণি। আর ওদের বাড়িটা কী সুন্দর!
...গাছগাছালি, যেন তপোবন। আর আতশের মতো ছেলে হয় আজকের দিনে? যখন বহির্মুখীনতাই হচ্ছে যুগের হাওয়া, সে-যুগে অমন অন্তর্মুখী ছেলে আমি তো আর দেখি না। সবসময়ে পড়াশোনা করছে, গান গাইছে, ছবি আঁকছে। আমি তো ওরকম একটা স্বামী পেলে বর্তে যেতাম।
তা করোই না বিয়ে। আমি তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি। আমার বোনটা বেঁচে যাবে। আতশ! আনসোশ্যাল। একটা বুকওয়ার্ম। আমি তো ওকে ওর ছেলেবেলা থেকেই দেখে আসছি। ও তো পুরুষ নয়, মেয়েই।
সূক্ষ্মরুচির পুরুষেরা একটু মেয়েলিই হয়।
হ্যাঁ। তোমাকে বলেছে।
তুমি কী করে বুঝবে? তুমি যে, একটি আকাট। ব্যাবসা বোঝো, সম্পত্তি বোঝো, টাকা বোঝো। আমার শ্বশুরমশায়ের মতো অতবড়ো লেখকের যে, কী করে তোমার মতো বেরসিক ছেলে হল ভেবেই পাই না।
তা তো বটেই। আছ তো ভালো! সূক্ষ্মরুচির ছেলেদের আমার দেখা আছে। নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। বউকে একটা শাড়ি কিনে দিতে পারে না, অভাবে দিন কাটে। তোমার আর্থিক সাচ্ছল্য আছে বলেই এত বড়ো বড়ো কথা বলতে পারো। বিয়ের পরে একদিনও কি হেঁটে কোথাও গেছ?
যাইনি। কিন্তু সে তো তুমি যেতে দাওনি বলে। তোমার অসম্মান হবে, আমি কোথাও হেঁটে গেলে। আশ্চর্য! কী অদ্ভুত সম্মানজ্ঞান। হেঁটে যেতে, রিকশাতে যেতে, কত স্বাধীনতা। আমার বিয়ের আগের দিনগুলোই ভালো ছিল। টাকাই জীবনে একমাত্র প্রার্থনার জিনিস নয়। বিয়ের পরে আমার সব স্বাধীনতাই চলে গেছে।
বললাম-ই তো! টাকার পাহাড়ের ওপরে বসে থাকো, দাস-দাসী-দারোয়ান-ড্রাইভার—তুমি অভাবী মানুষদের দুঃখের কথা জানবে কী করে?
যাকগে! প্রসঙ্গ বদলাও! রবিবারের সকালে ঝগড়াঝাঁটি ভালো লাগে না। সপ্তাহে এই একটা দিন-ই তো থাকো বাড়িতে। ছেলে-মেয়ে থাকলে তাও সময়টা তাদের নিয়ে কেটে যেত।
ছেলে-মেয়ে হয়নি বিয়ের আটবছর পরেও সে কি আমার দোষ?
কার দোষ তা জানব কী করে? তুমি তো ভালো করে পরীক্ষাই করালে না। তোমার পরীক্ষা তো একেবারেই করালে না। ছেলে-মেয়ে না হলে, সব দোষ তো চিরদিন মেয়েদের-ই হয়। তাদের বদনাম দেওয়া হয় বাঁজা বলে। পুরুষশাসিত সমাজে এই-ই নিয়ম। আমার দ্বারা হল না তা, আর একটা বিয়ে করো। নইলে অ্যাডাপ্ট করো—এতই যখন ছেলে-মেয়ের শখ। এখন কত লোক-ই তো অ্যাডাপ্ট করছে। নইলে আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন করাও। সারোগেট মাদার ঠিক করো। আমি কিছুই মনে করব না—আমাকে শুধু সবসময়ে ও-জন্যে এমন বাক্যবাণে বিদ্ধ কোরো না। সত্যি বলছি, ভালো লাগে না আমার। আমার বাপের বাড়ির অবস্থা ভালো হলে আমি ফিরে যেতাম সেখানে। দুই ভাই নিজেরাই নিজেদের সংসার টানতে পারে না, মাকে ভালো করে দেখতে পারে না—আমার যাওয়ার পথ তো সব বন্ধ। কেন যে, মরতে ভগবান এই রূপ দিয়েছিলেন আমাকে। রূপ না থাকলে তো তোমার বাবা আমাকে আনতেন না। একটা জিনিস ভেবে আমার অবাক লাগে। নলিনীর মতো মেয়ে, তোমার বোন হল কীভাবে? তার মতো সূক্ষ্মরুচির, সুরসিক, আত্মমর্যাদাজ্ঞানসম্পন্ন, সুশ্রী মেয়ে, তার মতো সাহিত্য ও গান-বাজনা ভালোবাসা মেয়ে যে, তোমার বোন তা ভাবা পর্যন্ত যায় না। এক মা-বাবার যে, কতরকম সন্তান-ই হয়।
আমাকে কাগজগুলো ভালো করে পড়তে দাও। এম. সি. সি.র ছেলেরা ওড়িশাতেও নাকি গোলমাল শুরু করেছে। কটকে, সম্বলপুরে, ঢেনকানলে—অঙ্গুলে শুরু করতেই বা কী? আমি মরি আমার চিন্তাতে আর তোমার যত আজেবাজে কথা সকালবেলাতে।
নন্দা রান্নাঘরের দিকে চলে গেল। রান্নার লোক, বেয়ারা, আয়া থাকলে কী হয়, নিজে তদারকি না করলে কিছুই সুষ্ঠুভাবে হয় না। ‘কপিলাশ! কপিলাশ!’ বলে রান্নার ঠাকুরকে ডাকতে ডাকতে রান্নাঘরের দিকে এগোল নন্দা।
রান্নার ঠাকুরের নাম কপিলাশ। রাউরকেল্লার কাছে বাড়ি ওর।
আতশদের খাওয়া হয়ে গেল। লুচি, কুমড়ো-আলুর ছেঁচকি, তেঁতুল আর লঙ্কার আচার দিয়ে ওদের জলখাবার খাওয়া হয়ে গেলে স্নিগ্ধা বললেন, গতকাল মাসের বাজার এসেছে। আমায় এখন সেসব গুছিয়ে রাখতে হবে। দু-শিশি কাসুন্দি পাঠিয়েছে যতীনবাবুর স্ত্রী। আমাদের এখানে খাবার লোক কোথায়? আতশের তো আসার সঙ্গে সঙ্গেই যাওয়ার সময় হয়ে গেল। শাকটাক হলে কাসুন্দি দিয়ে ভাত মেখে খাই মা-ছেলেতে। দু-বোতল পড়ে থেকে নষ্ট হবে। তুই নিয়ে যা নলিনী একবোতল।
নলিনী বলল, ‘দাদা খুব ভালোবাসে। খুব খুশি হবে। খাবার টেবিলের ওপরে রেখে দাও মাউসি, আমি যাওয়ার সময় নিয়ে যাব।’
তারপর নলিনী আর আতশ, আতশের ঘরে গেল। ঘরময় বই, খাটের ওপরে বই, মেঝেতে বই।
নলিনী বলল, তুমি যদি কোনোদিন বিয়ে করো তখন, তোমার বউ শোবে কোথায়? বই-ই তো দেখছি তোমার বউ।
আমি তো সাধারণ মেয়ে বিয়ে করব না। ‘বই’-ই হবে আমাদের দু-জনের মধ্যের সেতু। সেও আমার-ই মতো ভালোবাসবে বই, উচ্চাঙ্গসংগীত, রবীন্দ্রসংগীত। তাই বিছানার বই নিয়ে আমার চিন্তা নেই।
না হলেই ভালো। বলেই বলল, মার্কেজের এই বইটা তো দেখিনি। নেরুদারও। নতুন আনালে?
হ্যাঁ। ভুবনেশ্বরে একটি নতুন বইয়ের দোকান হয়েছে। নাম ‘দ্য প্রিন্ট ওয়ার্ল্ড’।
কোথায়, দোকানটা?
ভুবনেশ্বরে যে-মাঠে বইমেলা হয়, তার সামনের রাস্তায়। ঠিকানাটা লেখা আছে, ফোন নাম্বার ও ই-মেইল নাম্বারটা কিন্তু ফেলে এসেছি করতপটাতে। ওখানে অর্ডার দিলে ওরা ভি. পি. পি.-তেবই পাঠিয়ে দেয়। ও ভুলেই গিয়েছিলাম তুমি তো ভুবনেশ্বরেই থাকো। তবে এদুটো তুমি নিয়ে যাও। আমি যাওয়ার আগে দিলেই হবে। না দিলেও রাগ করব না। আমার পড়া হয়ে গেছে। এখানে তো নানা জিনিস পড়ি—মুশকিল হয় করতপটাতে। সেখানে তো কিছুই নেই। ভালো লাইব্রেরি তো দূরস্থান।
স্কুলের লাইব্রেরিতেও কিছুই নেই? তা সেখানে মরতে গেলে কেন? চাকরি তো আরও অনেক পেয়েছিলে?
মরতে গেলাম অনেককে বাঁচাব বলে।
মানে?
মানে, আমরা তো ভাগ্যবান নলিনী। তুমি আমার স্কুলের ছেলে-মেয়েদের যদি দেখতে, তারা কীভাবে থাকে? কী খায়? কী পোশাক পরে? যদি জানতে তবে বুঝতে পারতে আমরা কত বড়ো ভাগ্যবান। ভাগ্যবান যেমন, তেমন, স্বার্থপরও বটে। শুধু আমরাই ভালো থাকব, ভালো পরব, ভালো খাব আর দেশের নব্বইভাগ মানুষ মনুষ্যেতর জীবনযাপন করবে স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরেও এটা কি কাজের কথা?
তুমি দেখছি কমিউনিস্টদের মতো কথা বলছ।
আমাদের দেশে সাচ্চা কমিউনিস্ট আছে নাকি? সব বুলিবাজ, মুখোশধারী। তুমি বলতে পারো আমি এম. সি. সি.-দের মতো কথা বলছি, জনযুদ্ধ গোষ্ঠীর মতো কথা বলছি।
তারা কী কথা বলে? দাদার কাছে গতরাতে শুনলাম, তারা নাকি, ওড়িশাতেও আস্তানা গাড়ছে। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড, ছত্তিশগড়, অন্ধ্রপ্রদেশ, এসব রাজ্যে তো বহুদিন-ই হল এরা ঘাঁটি গেড়েছে। এই তো কিছুদিন আগে অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুকে ল্যাণ্ডমাইন দিয়ে তারা প্রায় মেরেই ফেলেছিল। উনি প্রাণে বেঁচেছিলেন কিন্তু অন্য অনেকের প্রাণ গেছিল। ওরা মানুষ মারে কেন? মিটিং-মিছিল করতে পারে না? অত্যাচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে না?
হাসল আতশ।
বলল, মিটিং-মিছিল, ঘেরাও করে নিজেদের শ্লাঘাকে সুড়সুড়ি দেওয়া যায় শুধু। বন্দুকের নল দিয়ে যা হয়, তা হয় না। হলে, ওরা কেউই অস্ত্র হাতে তুলে নিত না। আর আইনের কথা বলছ তুমি? সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এ সেই কবে বলে গেছিলেন, ‘আইন! সে তো তামাশামাত্র। বড়োলোকেরাই কেবল পয়সা খরচ করিয়া সে তামাশা দেখিতে পারে’। রবীন্দ্রনাথও কি লিখে যাননি? ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। অন্য পথ খোলা থাকলে ওরা এই বিপজ্জনক পথে যেত না। সত্তরের দশকে আমরা যখন প্রায় শিশু তখন, কলকাতার মেধাবী ছেলেরা নকশাল হয়ে যায়নি?
তা গেছিল। কিন্তু সে-আন্দোলন তো দমন করা হয়েছিল। কলকাতার পুলিশ কমিশনার রঞ্জিত গুপ্তর নেতৃত্বে রাইফেল আর রিভলবার দিয়ে তরতাজা বহুছেলেকে গুলি করে মেরে সে-আন্দোলন স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পুলিশি অত্যাচারে কত ছেলে পঙ্গু হয়ে গেছিল। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে আমেরিকাতে চলে গেছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য আন্দোলন থেকে অ্যাবাউট টার্ন করে বুর্জোয়াও হয়ে গেছিল। তাদের কারো কারোকে দেখবার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য যা-ই বলো, আমার হয়েছে।
তবে? আন্দোলন করে লাভ কী? যদি তা নিভেই যায়?
লাভ আছে নলিনী! আগুন নিভলেও ছাই থাকে, পুড়ে যাওয়ার স্মৃতি থাকে, হয়তো সব নেভে না, স্ফুলিঙ্গ থাকেই, যে-স্ফুলিঙ্গ থেকে পরে, আবার বড়ো আগুনের সৃষ্টি হতে পারে, হয়।
নলিনী চিন্তিত মুখে বলল, জানি না। তোমার জন্যে আমার বড়ো ভয় করে।
ভয়? ভয় কেন করবে নলিনী? আমার জন্যে গর্বিত হবে। নিজের একার জন্যে, নিজের নিজের বউ, সন্তান নিয়ে সুখী হওয়া তো খুব-ই সহজ। ছিমছাম ফ্ল্যাট, সুরক্ষিত চাকরি, কনভেন্টে পড়া বব-কাট চুলের তম্বী স্ত্রী, মারুতি ৮০০ গাড়ি, এই তো আজকের দিনের ‘উচ্চিশিক্ষিত’ ছেলে-মেয়েদের পরমকামনা। আর সে-কামনাতে নিরন্তর আগুন জ্বালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন মিডিয়া। তারা তা করছে তাদের মুনাফা বাড়াবার জন্যে। দেশের বা দেশের অধিকাংশ মানুষদের কথা কি কোনো খবরের কাগজ বা টেলিভিশন চ্যানেল ভাবে? টেলিভিশনের পর্দায় বা সিনেমাতে মডেলদের পোশাক-আশাক, বাড়িঘর-এর যে, ছবি গাঁ-গঞ্জের মানুষ দেখে-তাতে তাদের মনে তুমুল খিদের সৃষ্টি হয়। সবরকম খিদে। সকলের-ই সব পেতে ইচ্ছে করে তা পাওয়ার ‘যোগ্যতা’ তাদের থাক আর নাই থাক। এই বিকৃত খিদের-ই ফল আমরা দেখতে পাই, রোজ সকালে কাগজ খুললে বা টিভির নিউজ চ্যানেলে খবর দেখলে এবং শুনলে। এত ধর্ষণ, এত চুরি-ডাকাতি, এত খুন কী আর এমনি হয়? আগে তো হত না। সাধারণ গরিব গ্রামীণ মানুষকে পুরোপুরি বিপথচালিত করছে এই বিজ্ঞাপন-নির্ভর নানারকম মিডিয়া। এতে বড়োলোকের আরও টাকা হচ্ছে আর গরিব আরও গরিব হচ্ছে।
নলিনী অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল।
তারপর বলল, তোমার কথা শুনলে রক্ত গরম হয়ে যায়, বুকের মধ্যে ধড়াস ধড়াস করে। আজকে সন্ধেবেলা এসো-না আমাদের বাড়ি, দাদাকে বলবে।
হাসল আতশ।
বলল, কিন্তু বলে লাভ হবে না। এসব কথা শোনবার ধৈর্য ও মানসিকতা নন্দনদার নেই। শুধু নন্দনদা কেন? সুখে-থাকা কারোর-ই নেই। বলে লাভ নেই। নন্দনদা ভাববে, আমিও ‘জনযুদ্ধ’ গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছি। অথচ আমি সেই গোষ্ঠীর একজনকেও চিনি না। তারা ওড়িশাতে ঘাঁটি গেড়েছে কি না তাও জানি না। যদিও আমি চাই যে, তারা ঘাঁটি গাড়ুক। আমাদের এমন সুন্দর দেশটা কিছু খল, ভন্ড, বক্তৃতাবাজ রাজনীতিকের অপার লোভে ক্রমশই আমাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। অথচ এই দেশকে আমরা সোনার দেশ করে গড়ে তুলতে পারতাম। সব দলের নেতাদের-ই কোটি কোটি টাকা আর মুখে গরিব জনতার প্রতি জনদরদ। আর কতদিন সইবে বলো তো গরিবরা? তারা কি এমনি করেই মরতে জন্মেছিল এই সোনার ভারতবর্ষে? কী বলো তুমি?
আমি কিছু বুঝি না। লক্ষ্মীটি আতশ। এবারে এই প্রসঙ্গ বন্ধ করো। এসো আমরা একটু অন্য কথা বলি।
বলেই বলল, আমাকে একদিন মা সমলেশ্বরীর মন্দিরে নিয়ে যাবে, তোমার মোটরসাইকেলের পেছনে বসিয়ে?
অনেকক্ষণ চুপ করে রইল আতশ। তারপর বলল, ‘অতখানি পথ মোটরসাইকেলের পেছনে বসে যেতে তোমার কষ্ট হবে।’
নলিনী মুখে না বলে বলল, ‘অতখানি পথ তোমাকে জাপটে ধরে বসে যাব সেইটাই তো হবে আমার আনন্দ।’
আতশ বলল, কবে যাবে ঠিক করো। গাড়ি ভাড়া করে নেব। মাও যেতে পারবে। নন্দা বউদিও যদি যেতে চায় তো যেতে পারবে। চলো, পথে রেঢ়াখোলে ননার দোকানে জমিয়ে দুপুরের খাবার খাব। ভোরে বেরোলে, মহানদীর ওপরের হিরাকুঁদ ড্যাম দেখে, সমলেশ্বরী মন্দিরে পুজো দিয়ে, সম্বলপুর শহর, বুড়লা ঘুরে আমরা সন্ধে সন্ধেতে ফিরে আসব অঙ্গুলে।
বেশ। তাই হবে।
নলিনী বলল।
তারপর বলল, আমাকে তোমার করতপটার বাড়িতে যেতে বললে না তো একদিনও।
ইচ্ছে তো করে। খুব-ই করে। কিন্তু আমি যে, একা থাকি। লোকে কী বলবে? তার চেয়ে একদিন চলে এসো নন্দা বউদি আর মাকে নিয়ে। থেকে যেয়ো দু-তিনদিন। খুব মজা হবে।
আদুরে গলাতে নলিনী বলল, না। আমি একাই যাব।
তুমি একটা পাগলি। অবশ্য সে জন্যেই তোমাকে এত ভালোবাসি।
তারপরে বলল, সম্বলপুরে যেতে গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অনেক মাইল পথ যেতে হবে। কোথাও বাইক খারাপ হয়ে গেলে, তোমার বিপদ হতে পারে। আমারও। তাই গাড়ি ভাড়া করে নেব।
কী বিপদ?
আমার বিপদ হতে পারে মানে টাকাপয়সা, মায় বাইকটা পর্যন্ত ছিনতাই হতে পারে। আরও বিপদ হতে পারে, তোমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে গিয়ে। দেশটা সভ্য হওয়ার বদলে দিনে দিনেই আগের থেকেও অনেক বেশি অসভ্য হয়ে উঠছে। জঙ্গলের মধ্যে তোমাকে একা পেলে তোমাকে নিয়ে যা-খুশি করতে পারে খারাপ মানুষ। তবু একথা বলব যে, গ্রামের বা জঙ্গলের মানুষের মধ্যে এখনও কিছু মনুষ্যত্ব আছে। শহরের মানুষদের মধ্যে একেবারেই নেই। তবে জঙ্গলের বা গ্রামের মানুষও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে টি. ভি. দেখে দেখে। কোনো সরকার-ই যে, কেন টিভির বিজ্ঞাপন আর টিভির নানা চ্যানেলের নানা অনুষ্ঠান সেন্সর করছে না, করছে না সিনেমাকেও তা আমার বুদ্ধির বাইরে। মানুষের ষড়রিপুর এমন বাড়বাড়ন্তর মুখে যে, এইসব বিজ্ঞাপন, টিভি সিরিয়াল আর সিনেমাই, একথা কবে বুঝবে দেশের হর্তা-কর্তারা তা ভগবান-ই জানেন।
নলিনী বলল, তাহলে গাড়িতেই যাব।
হ্যাঁ তাই চলো। তুমি নন্দা বউদি আর মায়ের সঙ্গে কথা বলে তারিখটা ঠিক করে ফ্যালো। তার আগে চলো একবার কটকে যাই। মা বলছিলেন, বহুদিন কটকের কটকচন্ডীর মন্দিরে পুজো দেন না। আমারও একবার কটকের গুলি-বন্দুকের দোকান ‘কে. সি. দাঁ’-তে কাজ আছে। দুই কাজ-ই হয়ে যাবে।
গুলি-বন্দুক দিয়ে তুমি কী করবে?
না, বাবার বন্দুকটা তো বাবার জীবদ্দশাতেই আমার নামে ট্রান্সফার করে দিয়েছিলেন, কটক থেকে লাইসেন্স করিয়ে। তখন অঙ্গুল তো আলাদা ডিস্ট্রিক্ট ছিল না। কটকের সাব-ডিভিশন ছিল। বন্দুকটা বিদেশি—ইংলিশ অথবা জার্মান হবে। নাম ‘জেকো’। যা গুলি ছিল, সব পুরোনো হয়ে গেছে। লাইসেন্সে অনেক গুলিই পাওনা হয়েছে। কিছু নতুন গুলি তুলে আনব।
কী গুলি আনবে? মানে কী মারার গুলি?
সে ওঁদের কাছে জিজ্ঞেস করে নেব। কিছু পাখি মারার গুলি, কিছু হরিণ, শম্বর মারার গুলি, আর কিছু বাঘ, ভাল্লুক মারার গুলি।
মানুষ মারার গুলি আনবে না তো?
মানুষ তো সবচেয়ে কমজোরি, নাজুক প্রাণী। তাকে তো চড়াই পাখি মারার গুলি দিয়ে মারলেও সে মরে যায়। তবু জিজ্ঞেস করব, দোকানের কালাবাবুকে। জানি না আজও বেঁচে আছেন কি না। বাবার সঙ্গে গেছিলাম সে-দোকানে বছর পনেরো আগে একবার। তখন আমি ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি কটকের র্যাভেনশ কলেজে।
তা সবরকম-ই শিকার-ই তো এখন বেআইনি। গুলি দিয়ে কী করবে?
তা ঠিক! কিন্তু দেশে কোন আইনটা মানা হচ্ছে বলতে পারো? আইন যদি মানাই হত তবে দেশের জেলখানাগুলোতে আর জায়গা থাকত না। সব জায়গাতে নতুন নতুন জেলখানা বানাতে হত। শুয়োরদের মতো জনসংখ্যার বৃদ্ধি হয়েছে গত পঞ্চান্ন বছরে। সে তুলনায়, স্কুল, হাসপাতাল এবং জেলখানাও কি বৃদ্ধি পেয়েছে? জজসাহেবরা রায় দিচ্ছেন নানা মামলাতে, ফৌজদারি অথবা সিভিল মামলাতে, তা কার্যকর করছে না অ্যাডমিনিস্ট্রেশান, অধিকাংশ রাজ্যেই। নইলে, তুমি ভাবতে পারো, দাগি চোর-ডাকাতেরা নির্বাচনে দাঁড়িয়ে নির্বাচন জিতে সংসদ বা বিধানসভার সভ্য এমনকী মন্ত্রীও হন কী করে? তাঁদের বিবেকে ‘লজ্জা’ বোধ বলে যে, কোনো বস্তু নেই, দেশের জনগণেরও কি ‘সহ্য’শক্তির কোনো সীমা পরিসীমা নেই? আসলে, কিছু মনে কোরো না, সকলেই তোমার দাদা নন্দনদার-ই মতো অথবা আমার-ই মতো। নিজের ব্যাবসা, নিজের রোজগার ঠিক আছে, স্ত্রী আর বোনকে নিয়ে সুখে আছেন। বড়োস্ক্রিনের টিভিতে নানা ক্যাসেট বা সি.ডি.তে দেশি-বিদেশি সব ছবি দেখছেন, বউদিকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে সফট পর্নো। নিজের সুখের তো কোনো বিঘ্ন ঘটছে না। দেশের যাই হোক-না-কেন। অসুবিধে যা-হচ্ছে, তা তো গরিবদের-ই। ওঁদের তা নিয়ে ভাববার প্রয়োজন-ই বা কী? আমিও মাস গেলে মাইনের চেক পাচ্ছি। রান্না এবং দেখাশোনার লোক আছে, ঝরনার পাশে চমৎকার বাড়িতে থাকি, স্কুলের হেডমাস্টারি করি—আমার স্কুলের ছেলেমেয়েরা যে, কেরোসিনের অভাবে রাতে পড়াশুনো করতে পারে না, রোজ জঙ্গলপাহাড়ের বিপজ্জনক নির্জন পথ দিয়ে পাঁচ-সাত মাইল হেঁটে আসে হেঁটে ফেরে স্কুল থেকে, দু-বেলা ভরপেট খেতে পায় না, তাদেরও তো আমরা বুলিবাজ, ভন্ড, অসৎ রাজনীতিবিদদের মতো মানুষ করে তোলবার জন্যেই লেখাপড়া শেখাই। শুধুমাত্র সিলেবাসে, যা আছে তাই-ই যদি পড়াই তাদের, তাহলে বাঁদরে দেশ ছেয়ে যাবে—মাধব যেমন পড়ায় তোমাদের। ‘শিক্ষা’ বলতে যে, শুধুই বর্ণ-পরিচয় নয়, নানা বিষয়ে পন্ডিত হওয়া নয়, শিক্ষা মানে যে, চরিত্রগঠন ও শিক্ষা মানে যে, আদর্শবাদ রবীন্দ্রনাথের আদর্শ ‘পূর্ণ মনুষ্যত্ব’র সাধনা এসব কথা, ক-জন স্কুল-শিক্ষক বা কলেজের অধ্যাপক জানেন? শিক্ষা নিয়ে ভাবেন ক-জন? পশ্চিমবঙ্গে তো শুনি শিক্ষার নামে প্রহসন চলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও অনেকে ঠগ এবং ভন্ড বেরোচ্ছেন—তুমি এই শিক্ষকমন্ডলীর কাছ থেকে কোনো শিক্ষার আশা করতে পারো?
নলিনী বলল, তোমার মধ্যে বড়োবেশি তিক্ততা জমে উঠেছে, বড়োবেশি ক্ষোভ এবং যন্ত্রণা। বুঝেছ আতশ?
তা তো জমেছেই। অস্বীকার করি না তা।
তোমার এইসব প্রলয়ংকরী ধ্যানধ্যারণা সমাজের বা দেশের কতটুকু ভালো করবে তা আমি জানি না। কারণ, তোমার ক্ষমতা যে, অতিসামান্য। কিন্তু এটা বুঝতে পারছি যে, হাসিখুশি রসিক, জীবনকে দারুণ ভালোবাসা একজন মানুষের ভেতরটা এইসব, ভাবনা, চিন্তা কুরে কুরে খেয়ে যাচ্ছে। তুমি মানুষটাই যদি নষ্ট হয়ে যাও, ভেঙে পড়ো, তাহলে দেশ ও দশের কী হল-না-হল তা দিয়ে তোমার কী লাভ হবে আতশ? আমার-ই বা কী লাভ হবে?
দ্যাখো নলিনী, আমরা সকলেই নিজের নিজের ‘লাভ’-এর কথাই ভাবি বলেই তো দেশের আজ এই অবস্থা। আমার শিক্ষা, বিদ্যা এবং বুদ্ধি দিয়ে দেশের এবং দশের কোনো উপকার-ই যদি না করতে পারি তবে তো আমার সব শিক্ষাই বৃথা গেছে বলতে হবে।
কিন্তু তোমার এই ভাবনা-চিন্তা তোমার ব্যক্তিগত জীবনটাকে যে, নষ্ট করে দিচ্ছে তোমার অনবধানে তা কি তুমি ভেবেছ একবারও?
তা কেন হবে? আমার ব্যক্তিগত জীবন আমার-ই থাকবে। তবে আমার মতো অন্যরকম মানুষের জীবনসঙ্গিনী কোনো নারী যে, হতে চাইবে না তা আমি জানি। তা কী করা যাবে! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতমা নারীর থেকেও আমার দেশকে আমি যে, বেশি ভালোবাসি। আমার ব্রতে, আমার যজ্ঞে যদি কেউ শামিল হয় কোনোদিন তবেই দাম্পত্য হবে আমার, নইলে এমন-ই একা একাই কেটে যাবে বাকিজীবন।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, জানো নলিনী, যে-মানুষ একা থাকতে না পারে, যার বেঁচে থাকার জন্যে অন্য পুরুষ বা নারীর প্রয়োজন হয়, বলতে হবে তার মনুষ্যত্ব পূর্ণতা পায়নি।
তাই?
তাই তো! কথাটা ভেবে দেখো।
তারপর বলল, এতকিছু যে পড়ো, তা নিয়ে কখনো ভাবো কি? পড়ার চেয়ে ভাবাটা অনেক-ইবেশি জরুরি। আমরা প্রত্যেক মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষিত মানুষ, অন্ধকার সমুদ্রে একা একা নৌকো বাইছি। কোন দিকে চলেছি তা আমরা নিজেরাই জানি না। যেটাকে গন্তব্য বলে জানি, সেটা হয়তো অনিশ্চিত অথবা অবর্তমান। মরীচিকা!
নলিনী চুপ করে রইল অনেকক্ষণ।
আতশ বলল, কী হল? কথাগুলো পছন্দ হল না বুঝি?
পছন্দ হল। খুব-ই হল। কিন্তু তোমার জন্যে আমার খুব ভয় করছে।
ভয়? কেন ভয় কেন?
না, তুমি এতটাই ওয়ার্কড-আপ, উত্তেজিত হয়ে রয়েছ যে, ভয় হয় তোমার হার্ট-অ্যাটাক হবে, নয়তো তুমিও এম.সি.সি. বা জনযুদ্ধে যোগ দেবে।
সে-ভয় তোমার অমূলক। তাদের আমি কারোকেই চিনি না। তা ছাড়া, যতদূর জানি এই মুহূর্তে তারা এই অঞ্চলে আসেওনি। তা ছাড়া আমার মতো তিরিশ পেরোনো মানুষকে ওরা দলে নেবেই বা কেন? ওদের টগবগে-রক্তের পুরুষ ও নারীর দরকার, সতেরো-আঠারো থেকে পঁচিশ-ছাব্বিশ। যে-বয়সে মানুষের অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা থাকে না—যখন সহজেই আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়া যায়। আর হার্ট-অ্যাটাক আমার হবে না। হার্ট-অ্যাটাক হয় ঈর্ষা থেকে, অর্থচিন্তা থেকে, বিদ্বেষ থেকে, পরের ক্ষতি করার চিন্তা থেকে বা কোনো গভীর উদবেগ থেকে। আমার তো সবসময়েই আনন্দ। ‘আনন্দম! আনন্দম! আনন্দম’! এই আমার জীবনের মন্ত্র। না, আমার হার্ট-অ্যাটাক হবে না, তুমি নিশ্চিন থাকতে পারো।
নলিনী বলল, তোমার সঙ্গে অনেক কথা ছিল। আজ আর কোনো কথাই হবে না। পরে আসব আর একদিন। আমাদের বাড়িতে এসো একদিন। বউদি বলেছিল, কবে যেতে পারবে জেনে আসতে।
নন্দা বউদি যেদিন খাওয়াবেন। তবে ওঁর সামনে যেতে ভয় করে।
কেন?
বাবা: যা রূপ! মনে হয়, আগুনে পুড়ে যাব।
তারপর-ই বলল, ‘তুমিও তো কম রূপসি নও। কিন্তু তোমার সৌন্দর্য কাঁঠালিচাঁপার মতো স্নিগ্ধ আর নন্দা বউদি যেন, অগ্নিশিখা। অমন সৌন্দর্যকে ভয় করে। মনে হয়, পুড়িয়ে দেবে বুঝি।’
নলিনী হেসে বলল, ‘বই দু-টি আমি নিয়ে যাচ্ছি। তুমি করতপটা ফেরার আগে এখানেই পড়ে ফিরিয়ে দেব। বউদিকে গিয়ে তোমার কমপ্লিমেন্টস দেব।’
তারপর বলল, তুমি যে, বউদিকে ভয় পাও সে-কথা বলব বউদিকে?
বলতে পারো। তাতে বউদি খুশিই হবেন। মেয়েমাত্রই পাবক। দগ্ধ করাতেই তাঁদের আনন্দ।
সব মেয়েই কি সেরকম?
না, সব মেয়ে নয়। তোমার মতো স্নিগ্ধ, সুগন্ধি অগ্নিনির্বাপক খুব কম মেয়েই হয়। বলল, আতশ।
চলি।
বলে, ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এল নলিনী।
বিকেল চারটে বাজে। রবিবার। নন্দা আর নলিনী বসেছিল বসার ঘরে। এখনও চা খাওয়ার সময় হয়নি। ওরা পাঁচটাতে চা খায়। নন্দন তার ঘরেই থাকে। তার চা ঘরেই পাঠিয়ে দেয় বেয়ারা রবিকে দিয়ে। আজ রবিবার। দুপুরের খাওয়া হয় দেরি করে। খাওয়া-দাওয়ার পর আড়াইটে নাগাদ ঘুমোতে যায় নন্দন। একটু পরে নন্দাও যায়। রবিবারের দুপুরে আদর করে নন্দন ওকে। আদরটাকে আদর বলে মনে হয় না নন্দার, সাদা একটি নরম পেলব কবুতর যেন, হুলোবেড়ালের হাতে ছিন্নভিন্ন হয়, অনাবৃতও হতে বলে না নন্দন নন্দাকে। কে দেখে তার রূপ আর লাবণ্য! গুহাচারী একটা পশুর মতো; কচুবনে শুয়োরের মতো, উইঢিবিতে ভালুকের মতো কিছুক্ষণ সশব্দে তার শরীরে বিচরণ করে অ্যাটাচড বাথরুমে চলে যায় নন্দন। কড়িকাঠের দিকে চেয়ে একটি মৃতদেহের মতো পড়ে থাকে অতৃপ্ত শরীর আর মন নিয়ে নন্দা।
তার আনন্দ নিয়ে তার রোমান্টিসিজম নিয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি নন্দন। এই ব্যাপারটা একটা Mundane, রুচিহীন, একতরফা কর্তব্য হয়ে গেছে। বিয়ের পর পর প্রাত্যহিক ছিল ব্যাপারটা, এখন সাপ্তাহিকে এসে ঠেকেছে। এই মনহীন, ভালোবাসাবিহীন, রোমান্টিকতাহীন চর্ম-ঘর্ষণ যে, অবিবাহিতা ও বিবাহিতার বিভাজন করে ওকথা ভাবলেই অবিবাহিতা রমণীদের প্রতি অসূয়া হয়। বিয়েটা সত্যিই লিগালাইজড প্রস্টিট্যুশান—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার-ই মতো অন্য লক্ষ লক্ষ বিবাহিতাই এই জীবনকেই মেনে নিতে বাধ্য হয়। আজকালকার স্বাবলম্বী মেয়েরা যে, বিয়ে করতে চায় না, বেশ করে। তবে ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। আমার-ই জানাশোনা অনেক মেয়ে আছে তারা বিয়ে করে সত্যিই সুখী হয়েছে সব দিক দিয়ে। তারা আমাদের মতো সুখের ভান করে না। আমার বাপেরবাড়ি অবস্থাপন্ন হলে, আমি নিজে স্বাবলম্বী হলে কখনোই এই অপমানকর সম্পর্কে আজীবন বাঁধা থাকতাম না।
তার একমাত্র ননদ নলিনী। শিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, সংবেদনশীল এবং মমত্বসম্পন্ন বলে নন্দা অনেক কথাই বলে নলিনীকে। বলে সেসব কথা, যেসব কথা একজন মেয়েই শুধু বলতে পারে অন্য একজন মেয়েকে।
নলিনী নন্দার কথা শুনে দুঃখিত হয়। নন্দার জন্যে, যেমন দুঃখিত হয়, তেমন তার দাদার জন্যেও।
নলিনী আতঙ্কিত গলাতে বলে, এসব জেনে বিয়ে করতে বড়ো ভয় করে বউদি।
তুই যাকে বিয়ে করবি সে অন্যরকম পুরুষ।
কী করে জানলে?
জানি। একদিন আমি দেখেছি।
খুব ভয় পেয়ে যায় নলিনী।
বলে, কী দেখেছ তুমি? দেখবার মতো কিছু তো ঘটেনি।
ঘটেছিল। গতবছর পিঙ্কির বিয়েতে আমরা সকলে গেছিলাম, মনে আছে?
হ্যাঁ।
তোর দাদা তাড়াতাড়ি খেয়ে মহান্তিদের বাড়ি তাস খেলতে চলে গেলে, আতশ, আমি আর তুই হেঁটে ফিরলাম। মনে আছে?
হ্যাঁ।
পূর্ণিমা ছিল। ফুটফুট করছিল জ্যোৎস্না। আতশ বলল, ‘চলো বউদি, আমাদের বাড়ি। এককাপ করে কফি খেয়ে যাবে আর একটু গান-টানও হতে পারে। নন্দনদাও তাস খেলতে গেল। কী করবে একা বাড়িতে?’
‘চলো।’ বলেছিলাম আমি।
আতশদের বাড়িটাতে ঢুকলেই আমার মনে হয় নন্দনকাননে এলাম। বসন্তের দিন। হু হু করছে নানারকম ফুলের গন্ধ বয়ে আনা ‘বাসন্তী’ হাওয়া। ছমছম করছে ডাইনি জ্যোছনা। মাউসি কটকে গেছিলেন তখন ছোটোবোনের বাড়ি। আতশ পটাকে বলল কফি করতে। আমরা তিনজনে বারান্দাতে বসেছিলাম। তুই হঠাৎ গান ধরলি, ‘পূর্ণচাঁদের মায়ায় আজি ভাবনা আমার পথ ভোলে, যেন সিন্ধুপারের পাখি তারা, যায় যায় যায় চলে।’ মনে আছে?
আছে।
আমি বললাম, ‘আমি একটু বাথরুমে যাব।’
আতশ বলল, ‘মায়ের বাথরুমে নানা জিনিস ডাঁই করা আছে তুমি আমার বাথরুমেই যাও।’
আমি বাথরুমে গেলাম। বাথরুমের জানলাটা খোলা ছিল। হাওয়াতে পর্দা উড়ছিল এলোমেলো। আমি দেখলাম, তোকে চেয়ার থেকে তুলে আতশ তোর গ্রীবাতে আলতো করে চুমু খেল। তারপর চুমু খেল তোর দু-চোখে। তুই যেন, চাঁদের আলো আর ‘পিউ-কাঁহা’র ডাকের মধ্যে একেবারে গলে গেলি। জানি না, শরীরেও হয়তো গলেছিলি। আমাকেও যদি, কোনো ভালোবাসার পুরুষ অমন করে আদর করত, আলতো করে, স্বপ্নের মতো, আমিও হয়তো গলে যেতাম। খুব কম পুরুষ-ই জানে মেয়েরা কীসে খুশি হয়, তাদের কী করে আদর করতে হয়। তোর আতশ জানে। ও একটা অন্যরকম পুরুষ।
বাথরুম থেকে এসে তোকে আমার খুব ঈর্ষা হচ্ছিল। তোর দাদা যদি জানত, অমন করে আদর করতে। তা তো সে জানে না। আমি তার তৈলার ফসলের-ই মতো একটি ফসল। তার সঙ্গে আমার মনিব-চাকরের সম্পর্ক। আমি তার আজ্ঞাবাহী প্রাণী। তার বেশি কিছুই নই। আসলে তার অভিধানে, আতশ-এর অভিধানে যা আছে, তার কিছুই নেই। তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, তোর দাদার দোষ নেই। এসব পরিশীলিত ব্যাপার-স্যাপার তো এমনিতে কোনো পুরুষের কুক্ষিগত হয় না। এরজন্যে পড়াশোনা, সুরুচি, সুন্দর ভাবনা, সাহিত্যপ্রীতি সংগীতপ্রীতির প্রয়োজন হয়। তারপর বলল, সেই একটা গান ছিল-না: Nothing comes from nothing, nothing ever could, I must have done something good in my youth or in my childhood. এই হচ্ছে আসল ব্যাপার।
একটু চুপ করে তারপর নন্দা বলল, বিয়ের কথা কিছু হল কাল?
না, না। কী যে বলো? আমার পড়াশোনা শেষ হতে তো আরও দু-বছর লাগবে।
যৌবনের সবচেয়ে সুন্দর আরও দুটো বছর একা একা কাটাবি? যৌবন তো চিরদিন থাকে না রে। বড়ো তাড়াতাড়িই ফুরিয়ে যায়। শরীরের যৌবন ফুরোনোর অনেক আগেই মনটা বুড়িয়ে যায়—এটা অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও—ঘটনা। বিয়েটা কি আগেই সেরে ফেলা যেত-না?
না বউদি। তা ছাড়া ও যেন, কেমন হয়ে গেছে। সবসময়ে আদর্শ আর দেশ আর জনযুদ্ধ। ওকে যেন, ভূতে পেয়েছে। অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতো আর নেই ও। মনে হয় অসুস্থ হয়ে গেছে—একটা ঘোরের মধ্যে আছে ও।
নন্দা বলল, হতেই পারে। ও তো কোনোদিনও আর দশজনের মতো ছিল না, আর ছিল না বলেই তো তুই হাজার ছেলের মুগ্ধতা অবহেলে ঠেলে সরিয়ে হিরেকে বেছেছিলি। ও যে, আর দশজনের মতো হবে, এমন তুই ভাবিস কী করে?
নারে বউদি, তোকে ঠিক বোঝাতে পারব না। ও যেন, কেমন একসেন্ট্রিক হয়ে গেছে। আমাদের বাড়ি যেদিন যাবে সেদিন এই প্রসঙ্গ উঠলে তুই নিজেই বুঝতে পারবি ওর মধ্যে কী পরিবর্তন এসেছে। সবসময়ে এম. সি. সি. আর জনযুদ্ধ গোষ্ঠীর কথা বলছে।
তা বলছে হয়তো তাদের আইডিয়োলজির প্রতি ওর সমর্থন আছে বলেই। তা বলে ও কি ল্যাণ্ডমাইন আর ডিনামাইটের কারবারি হয়ে উঠবে?
কী হয়ে উঠবে তা আমি জানি না।
তোর দাদাও কিছুদিন হল এইসব নিয়ে ভাবছে। এখানকার অন্য ব্যবসায়ীরাও আলোচনা করছে এ-নিয়ে। সবাই চিন্তিত। ওড়িশার এ-অঞ্চলে ওই আতঙ্কবাদীদের হাত পৌঁছোতে পারে।
দাদা তো কোনো অন্যায় করে না। তার তেলকল, ময়দাকল তো অ্যাবাভ বোর্ড। তেলকলে তো শুধু সরষের তেল হয় না, মহুয়া, নিম, করৌঞ্জ আরও কত তেল হয়। নলিনী বলল।
সেটাই তো চিন্তার। মহুয়া, নিম, করৌঞ্জের সাপ্লায়ার তো জঙ্গলের মানুষেরাই। আর এম. সি. সি. জনযুদ্ধের সকলের ঘাঁটি তো হল জঙ্গলেই। তা ছাড়া তোর দাদা সরষের তেলে ভেজাল দিলে কী, তোকে আমাকে বলে দেবে? টাকার লোভ বড়ো মারাত্মক লোভ রে।
অন্যায় না করলে আর কীসের চিন্তা?
তা অবশ্য ঠিক।
প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে এবারে নলিনী বলল, আতশ বলছে, একদিন মাউসিকে নিয়ে গাড়ি ভাড়া করে কটকে যাবে। কটকের বন্দুকের দোকানে ওর কী কাজ আছে, আর মাউসি কটকচন্ডীর মন্দিরে পুজোও দেবে। বহুদিন যাননি নাকি। তা ছাড়া মাউসির ছোটোবোনও তো থাকেন কটকের-ই মঙ্গলাবাদ-এ না, কটকচন্ডী রোড-এ। তাঁর সঙ্গেও দেখা করে আসতে পারবেন। যাবে বউদি? বেশ আউটিং হবে।
আমি যাব? আমার যেতে কী আপত্তি? কিন্তু আমি গেলে তোদের ডালমে কালা হবে না তো?
বা বা: হিন্দি ছবি দেখে দেখে তো খুব উন্নতি হয়েছে দেখছি।
তা কী করব বল? রিমোট টিপলেই সারাপৃথিবী ঘরের মধ্যে। টি. ভি. যে, আমার মতো, অসংখ্য বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের মতো, কত মানুষকেই আত্মহত্যা থেকে বাঁচিয়েছে তা তোকে কী বলব!
তার মানে?
মানে, তোদের তো ভবিষ্যৎ বলে অনেক কিছু আছে, ভবিষ্যতের স্বপ্ন আছে কতরকম—আমার যে, কিছুই নেই। থোড় বড়ি খাড়া—খাড়া বড়ি থোড়। বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও তাই। তাঁদের সব একাকিত্ব। ছেলে, ছেলে-বউ-এর অবহেলার দুঃখ তাঁরা টিভির সামনে বসে ভুলে যান।
আর এই টিভির ওপরেই যা রাগ-না আতশের! পারলে স্ক্রিন-ই ভেঙে দেয়।
তাই?
না তো কী?
নন্দা বলল, তবে এটা ঠিক-ই যে, অল্পবয়েসিদের পক্ষে, অভাবীদের পক্ষে টি. ভি. তো খারাপ-ই। অসময়ের নানা অনুভূতির জন্ম দেয় অল্পবয়েসিদের মনে, আর অভাবীদের মনে লোভ জাগায়। কাম জাগাতে পারে সকলের-ই মনে—যা অবদমিত হয়ে সমাজের নানা ক্ষতি করে। অবদমতি লোভও নানা ক্ষতি করে। একথাও সত্যিই যে, টি. ভি. আসার পরেই সারাদেশে চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ ভীষণভাবে বেড়ে গেছে। আতশ যা বলে, তার কিছুটা তো সত্যিই।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, আমি আমার কথা বলতে পারি। কী আছে বল আমার জীবনে? তাও তুই যখন, ভুবনেশ্বর থেকে আসিস একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। মনের জানালাগুলো সব খুলে যায় যেন, তখন। তুই যখন থাকিস না, মাঝে মাঝে তিয়াসাতে মাউসির কাছে যাই। ফোনে তো কথা বলি রোজ-ই এক দু-বার। বয়স্কা হলে কী হয়, মানুষটা পড়াশুনো নিয়ে থাকেন তাই মনটা খুব উদার। আধুনিকও। অনেক কিছু জানেনও। টি. ভি. দেখলে একরকমের জানা হয় আর ওঁর মতো মানুষের কাছে গিয়ে বসলে অন্য নানারকম জানা। এখানকার লাইব্রেরি থেকে, কটকের বইয়ের দোকান থেকে কত বই আনান উনি। এ যুগে বই কেনা একটা অপচয় বলে মনে করেন অনেকে। তুই কিনিস কিন্তু তোর দাদা কি গত সাতবছরে একটি বইও কিনেছে? একটিও নয়। বই উপহার দেওয়ার রেওয়াজও কমে গেছে। আমাদের ছেলেবেলাতে জন্মদিনে, বিয়ের তারিখে, পইতেতে, বিয়েতেও কত বই উপহার দিতে দেখেছি মানুষকে। আসলে মানুষের ‘গভীরতা’ কমে গেছে। একটা ভালো বই পড়ার, বার বার পড়ার যা-আনন্দ, তা কি অন্য কিছুতে আছে? বল তুই-ই।
সত্যিই হয়তো টি. ভি. আমাদের গভীরতা নষ্ট করে দিচ্ছে। এর মূল্য আমাদের দিতে হবে।
তারপর বলল, মাউসির কাছ থেকে অনেক বই এনে পড়ি। কোনো বই ওঁর ভালো লাগলে উনি নিজেও পাঠিয়ে দেন পটাকে দিয়ে। আর একটু চুপ করে থেকে বলল, এই মোবাইল ফোন, কম্পিউটার এসবের জন্যেই হয়তো মূল্য দিতে হবে। ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে? আর সেই মূল্যের পরিমাণটা যে, ঠিক কীরকম হবে তাই বা কে বলতে পারে!
আতশ কিন্তু নেয়নি মোবাইল ফোন। বলে, দুস কী হবে? স্কুলে এবং বাড়িতে ল্যাণ্ডলাইন আছে। ওর বাড়িতে ইলেকট্রিসিটিও নেই। ও বলে, নেই বলেই দারুণ লাগে। বলে, আমি কে এমন কেষ্টবিষ্টু যে, মোবাইল-এর দরকার আমার?
সেলসম্যান-টেলসম্যান, বিদেশে যেমন ট্যাক্সি-ড্রাইভার, এদের মোবাইল ফোন জরুরি। নইলে মোবাইল ফোন থাকলেই মানুষ অকারণে বিরক্ত করে। কোনো মানে হয় না।
তোর দাদা তো অয়েল মিল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠেই রোজ ফোন করবে, কী রান্না হল আজ? দেখ একবার —পনেরো মিনিট পরে, বাড়ি ফিরে হাত ধুয়ে খেতে বসলেই তো দেখতে পাবে কী রান্না হয়েছে। তা, না। তা ছাড়া এসব বাড়ালেই বাড়ে। সব প্রয়োজনের বেলাতেই এ-কথা খাটে।
সেটা ঠিক-ই বলেছ। আমরা যখন ছোটো ছিলাম বাড়িতে না ছিল টি. ভি. না মোবাইল ফোন—টেলিফোন-ই তো ছিল না তখন, কিন্তু সেজন্যে আনন্দ কী আমাদের কম ছিল! প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগটাও নিবিড় ছিল। মাঠে না হোক উঠোনেও আমরা কতরকম খেলা খেলতাম। গাছপালা আর পাখপাখালির মধ্যে বড়ো হয়ে উঠেছি আমরা। তার একটা স্থায়ী প্রভাবও পড়েছে আমাদের ওপরে।
তা যা বলেছিস। ছেলে-মেয়েরা আজকের মতো সহজে মেলামেশা করতে পারত না বটে কিন্তু আমাদের যে, ঘোরাটোপের মধ্যে রাখতেন গুরুজনেরা সে-কারণে অনাত্মীয় ছেলেদের মধ্যে, তাদের সম্বন্ধে এক ধরনের রহস্য থাকতই আমাদের। ছেলেদেরও নিশ্চয়ই থাকত আমাদের প্রতি। জীবনকে সুন্দর করতে রহস্যময়তারও দরকার আছে। তাই-না? তুই কী বলিস?
আছেই তো। এখনকার ছেলেমেয়েরা যেমন পেয়েছে অনেক কিছু, যা আমরা ছেলেবেলাতে পাইনি, সেইসঙ্গে হারিয়েছেও অনেক কিছু, যা আমাদের-ই নিজস্ব ছিল।
নিশ্চয়ই। একথা এক-শোবার সত্যি।
দেখতে দেখতে ছুটি শেষ হয়ে গেল আতশের। করতপটাতে ফিরে এসেছে। অঙ্গুলে কাটানো ছুটির দিনগুলো পেছনে ফেলে এল স্বপ্নের মতো। এই স্বপ্নের মধ্যে একটা কাঁটাও আছে। কাঁটার ওপরে ফুলও আছে, যেমন থাকে। সেকথা ভাবলে এক দারুণ আনন্দ যেমন হচ্ছে, তেমন এক গভীর অপরাধবোধেও সে জর্জরিত হচ্ছে। আদর্শবান আতশ আদর্শচ্যুত হয়েছে। ও ভাবতেও পারে না, কী করে ঘটনাটা ঘটে গেল।
সংসারে বোধ হয় এরকম-ই ঘটে থকে। একজনের আনন্দই অন্যজনের দুঃখ। ব্যাপারটা যে, ঘটতে পারে, তা তার আগের মুহূর্তেও ভাবেনি। অথচ ঘটে গেল ঘটনাটা। নলিনীর সঙ্গে কি সে, বিশ্বাসঘাতকতা করল? নলিনীকে এই ঘটনার কথা বলাও যাবে না—কোনোদিনও না। বুকের মধ্যে বয়ে বেড়াতে হবে এই গোপন কথা।
স্কুলে ওর চেয়ারে বসে এসব কথা ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল ও। কাদম্বিনী বলল, ‘বাড়ি যাবেন না, আতশদা? আবার বৃষ্টি আসছে কিন্তু। এ তো সেই গরমের সিউডো বর্ষা নয়, রিয়াল বর্ষা।’
তারপর বলল, ‘এবার রজোৎসবের সময়ে কটকে গেছিলাম, মা আপনার জন্যে একটা সিল্কের পাঞ্জাবির কাপড় দিয়েছেন। আজ আনতে ভুলে গেছি। কাল আনব।’
আতশ হেসে বলল, ‘কোনো মানে হয়? মাউসি আছেন কেমন? এবারে অঙ্গুল থেকে একবার কটকে গেছিলাম। সকালে গিয়ে বিকেলে ফিরে এলাম। সঙ্গে মা আর আমাদের পাশের বাড়ির নলিনী আর তার বউদি নন্দাও গেছিল। আমার একটু কাজ ছিল বন্দুকের দোকানে। মা আর ওরা কটকচন্ডীর মন্দিরে পুজো দিলেন।’
একটু চুপ করে থেকে বলল, কটকে তোমাদের বাড়ি কোন পাড়াতে?
বাখরাবাদে। মহানদীর খুব কাছে। একসময়ের বিখ্যাত শিকারি এবং বর্তমানের বিখ্যাত চিত্রী সমরেন্দ্র দে, চাঁদবাবুর বাড়ির প্রায় লাগোয়া। উলটোদিকে দে’জ মেডিকেলের একটা ডিপো আছে, মানে গুদাম। যদি কখনো যান তো যাকে বলবেন সে-ই দেখিয়ে দেবে।
যাব কখনো যদি, এর পরে কটকে যাই। তারপর বলল, তোমার বিয়ের কতদূর এগোল?
কাদম্বিনী বলল, বিয়ে কি এককথাতে হয়? হাজার কথা লাগে। মা আর মামারা দেখছেন। একটি ছেলে দেখেছিলেন, খুব অবস্থাপন্ন—কিন্তু সে, ফরসা মেয়ে চায়, সে মানে, তার বাড়ির লোকজন। আমি তো ফরসা নই।
নাই বা হলে। তুমি তো খুব-ই সুন্দরী। কালো, জগতের আলো। তোমার দু-টি গজদন্ত আর হাসলে দু-গালের যে, দু-টি টোল পড়ে তা আর কার আছে? তুমি যে, বড্ড বাচ্চা। নইলে আমিই তোমাকে বিয়ে করতাম। তুমি খুব ভালো মেয়ে।
কাদিম্বনীর গালে আর কানের লতিতে রক্ত ছুটে এল। জাম-রাঙা হয়ে গেল মুখটি।
বলল, এরকম সুন্দর মিথ্যে কথা আর ক-জনকে বলেছেন আতশ দাদা?
আতশ হেসে বলল, আর কারোকেই নয়। তোমাকে যে-বোন পাতিয়েছি আর তুমি যে, এখনও ছোট্টটি আছ—নইলে ঠিক তোমাকে বিয়ে করতাম।
বিয়ে-টিয়ে আস্তে আস্তে উঠে যাবে দেশ থেকে। আমি তো চাকরি ছাড়তে পারব না। আর পুরুণাকোটের স্থায়ী বাসিন্দা কোথায় পাব, বর হিসেবে?
তুমি আরও একটা বছর পড়াও। টিচারও তো তুমি খুব-ই ভালো। তোমাকে খুব ভালো রেকমেণ্ডেশান দেব। তুমি কটক, ভুবনেশ্বর, সম্বলপুর এসব জায়গাতে লাগাতার অ্যাপ্লাই করতে থাকো।
ভুবনেশ্বর বা সম্বলপুর হলে তো হবে না। মায়ের জন্যে কটকেই সবচেয়ে সুবিধে আমার। মা যতদিন আছেন। মা চলে গেলে আমিও মুক্ত হয়ে যাব। তবে তেমন মুক্তি আমি চাই না।
মাউসির বয়স কত হল?
ষাট। আমি তো সবচেয়ে ছোটোসন্তান। আমার দুই দাদার একজনও থাকলে আমার কোনো চিন্তা থাকত না।
দু-জনেই কি একইসঙ্গে মারা গেছিলেন?
দু-জনে এবং বাবাও। বাবা তো জঙ্গলের ঠিকাদারি করতেন। জিপ চালিয়ে আসছিলেন, সম্বলপুর-অঙ্গুল রোডে জিপ উলটে তিনজনেই মারা যান একসঙ্গে।
ইস। তোমার কপালটাই খারাপ।
আমার তখন সাতবছর বয়েস। বাবার অনেক ধারদেনাও ছিল। সব কিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেল। থাকতাম আমরা ভাড়াবাড়িতেই তবে বড়োবাড়ি ছিল। সে-বাড়ি ছেড়ে দিয়ে বাখরাবাদে মামাবাড়িতে এসে উঠলাম। তারপরে মামাদের-ই আশ্রিত। মামারা আদর করেই রেখেছিলেন আমাকে আর মাকে কিন্তু দুই মামাই সামান্য চাকরি করেন। তাঁদেরও ভাড়াবাড়ি। চার মামাতো ভাই-বোন, তাদের লেখাপড়ার খরচ ছিল। তবে আমাকে মামারা কখনো বুঝতে দেননি যে, আমার বাবা নেই। আপন ভাই-বোনের-ই মতো বড়ো হয়েছি আমরা। এক দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। অন্য দিদি এল.আই.সি.-তেচাকরি করে। বিয়ে করবে না সে।
কেন?
একজনকে ভালোবাসত। একটি মুসলমান ছেলেকে। দিদিকেও মুসলমান করে বিয়ে করতে চেয়েছিল। সেইজন্যেই মামারা রাজি হয়নি। দিদিরও এ-ব্যাপারে আপত্তি ছিল। তবে কাদের দাদা চমৎকার ছেলে। সে এসব চায়নি কিন্তু তার এক কাকা মৌলবি। কট্টর মুসলমান। তিনি রাজি হননি। বিয়েও হয়নি।
তোমার কাদেরদা বিয়ে করেছেন?
হ্যাঁ। তার বিবির নাম নুরুন্নেসা। তবে দেখতে ভালো নয়। তাদের চার ছেলে মেয়ে হয়ে গেছে।
কাদেরদা দিদির সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে?
সম্পর্ক মানে কী? ন-মাসে ছ-মাসে আসে, চা খায়, আমাদের সকলের সঙ্গেই গল্প করে, বকরি ইদে খুব ভালো বিরিয়ানি রেঁধে পাঠায় আর ফিরনি, আমরাও বিজয়াতে মিষ্টি পাঠাই। এই সম্পর্ক আর কী!
তোমার দিদি তো খুব বোকা। সেও কেন অন্য কারোকে বিয়ে করল না?
করল না। দিদি একটু শক্ত ধাতের মেয়ে। কাদেরদাদের বাড়ির সামনে দিয়েই রোজ অফিসে যায়। নুরুন্নেসা বোরখা পরে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে দিদিকে দেখে। দিদি যে, স্বাধীন। মুসলমান মেয়েদের মতো পর্দানশিন বা পরাধীন নয়, সেটা দেখায় দিদি—দিদি তার স্বাধীনতাকে পুরোমাত্রায় উপভোগ করে। দিদির অফিসের একজন বিবাহিত সহকর্মীর সঙ্গে একটা রোমান্টিক সম্পর্ক আছে, তবে গোপনীয় কিছু নয়। তাঁর স্ত্রীও দিদির বন্ধুই। ওরা তিনজনে নানা জায়গাতে বেড়াতে যায়, সিনেমাতে যায়, এই আর কী।
তুমি কি আজ বাড়ি ফিরবে না?
ফিরব তো। আপনার সঙ্গে কথা বলতে খুব ভালো লাগে।
—আমার সঙ্গেই কথা বলতে ভালো লাগে বলে নয়, মাঝে মাঝে সব মানুষকেই কথাতে পায় কিন্তু পেলে কী হয়? কথা বলার মানুষ তো বেশি পাওয়া যায় না।
ঠিক বলেছেন আতশদা।
তা ছাড়া, ওয়েভ লেংথ-এরও একটা ব্যাপার থাকে। তুমি তো গান গাও। স্কেলের ব্যাপারটা তো বোঝো। তুমি যদি ‘জি’ শার্প-এ কথা বলো তবে যে, তোমার কথা শুনবে তার স্কেলকেও ‘জি’ শার্প-এই নামিয়ে আনতে হয়। তা না করতে পারলে একজনের বলা কথা অন্যের পায়ের কাছে গিয়ে পড়ে, নইলে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। জীবনে একটাই ট্র্যাজেডি। এক-ই স্কেলে কথা বলা মানুষ খুব বেশি পাওয়া যায় না।
বা:। কী সুন্দর করে কথা বলেন আপনি। তাই তো আপনার সঙ্গে কথা বলতে, এত ভাল লাগে।
বলেই, হাতঘড়ির দিকে চেয়ে বলল, না: এবার বাসের সময় হল। চলি আতশদা।
এসো।
একটা ফলসা-রঙা কটকি শাড়ি পরেছে কাদম্বিনী। বাটিকের ব্লাউজ, ফলসার ওপরে সাদা কাজ করা। ব্লাউজটা ছোটোহাতা। দু-বেণি করেছে। চোখে কাজল। কাদম্বিনী মাথাতে একটি কদমফুল গুঁজেছে। সুগন্ধি মেখেছে ভালো, কিংবা চুলের তেলও হতে পারে। ‘এলিন’ হবে, ভারি সুন্দর গন্ধ। কাদম্বিনী যতক্ষণ ছিল ততক্ষণ, ঘরটা তার অস্তিত্বে ভরে ছিল। আতশ ভাবছিল, মেয়েদের মধ্যে বিধাতা এমন কিছু উপাদান দিয়েছেন যা, একজন পুরুষের জীবনকে পূর্ণ করে। সে-নারী স্ত্রীই হোক, কী বান্ধবী, কী সহকর্মী। ঝগড়ুটে মেয়ে আতশ একদম সহ্য করতে পারে না। মেয়েরা চেঁচিয়ে কথা বললে বা ঝগড়া করলে আতশের সব রোমান্টিকতা চুরমার হয়ে যায়। ভীষণ-ই বিরক্ত বোধ করে ও। সংসারে তেমন মেয়েও আছে কিছু। কী আর করা যাবে!
কাদম্বিনীই শেষে গেল। কাদম্বিনী চলে যাওয়ার একটু পরেই অঙ্গুল থেকে বাসটা হর্ন দিতে দিতে এসে বাস-রাস্তাতে দাঁড়াল। কাদম্বিনী নিশ্চয়ই পৌঁছে গেছে এতক্ষণে। স্কুলের নাইটগার্ড আর ঝাড়ুদারকে প্রয়োজনীয় কিছু কথা বলে সেও উঠল। হেঁটে চলল বাড়ির দিকে। তাড়াতাড়ি পা চালাল। কাদম্বিনী ঠিক-ই বলেছিল, ‘খুব জোর বৃষ্টি আসবে’।
আতশ ভাবছিল, কাদম্বিনী তার মেস-এ গিয়ে কী করবে? ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে কাজ করা একটি মেয়ে, পোস্ট অফিসে কাজ করা একটি মেয়ে আর কাদম্বিনী এই তিনজনে মিলে মেস করে থাকে। ওঁদের দু-জনের বয়স হয়েছে, মানে মাঝবয়েসি। পাকাবাড়ি নয়। ছেঁচা বেড়ার বাড়ি—মাথায় খড়ের চাল। দু-টি শোয়ার ঘর। একটি ছোটো আর অন্যটি বড়ো। রান্না-খাওয়ার জন্যে একটি ঘর। ছোটো রান্নাঘর। বারান্দাও আছে একটি। কাদম্বিনী একা থাকে ছোটোঘরটিতে। একটি স্থানীয় মেয়ে আছে। ভোরে আসে, রাতে ওদের রান্না করে দিয়ে সে চলে যায়। নন্দিনী-নালার পাশের তৈলাতে তার মাসি কাজ করে। রাতে তার নিজের বাড়ি ফিরে সে, রাতের রান্না করে। দুপুরে তার স্বামী যা-হোক কিছু ফুটিয়ে নেয়। সকালের জলখাবার, দুপুরের খাওয়া এবং বিকেলের চা-টা কাদম্বিনীদের সঙ্গেই খায়।
এতকথা জানে আতশ কারণ, ওই তৈলাটি অঙ্গুলের বিমলজেঠুর। উনিই বলে দিয়েছিলেন যে, সময় পেলে গিয়ে খোঁজখবর নেবে। ফলের গাছগুলো বড়ো হয়ে গেছে কিন্তু অন্য ফসল, সরষে, তিসি, মটরশুঁটি, কচু, শুঁটি এইসব, যখনকার যা। বিমলজেঠু মাসে একবার করে আসেন তাঁর অ্যাম্বাসাডার গাড়ি নিয়ে। লোকজনের মাইনেপত্র দিয়ে যান, কলাটা, মুলোটা, লেবুটা নিয়ে যান। আমের সময়ে আম। আতশকেও দিয়ে যান গাড়ি ঘুরিয়ে এসে।
আতশ একদিন পুরুণাকোটে গিয়ে কাদম্বিনীদের মেস-এ ঘণ্টা দুয়েক ছিল। ছুটির দিন ছিল। খুব আপ্যায়ন করেছিল কাদম্বিনী এবং তার সঙ্গিনীরা। এঁচড়ের ডালনা, ধোকার ডালনা এবং টিকরপাড়া থেকে আনা পাকালাল, গোঁফআলা মহাশোল মাছভাজা এবং তার কালিয়াও খাইয়েছিল। খাওয়ার পর পোড়াপিঠা। মধুরেণ সমাপয়েৎ।
এসব ভাবতে ভাবতে বাড়ি পৌঁছোতেই বাইধর বলল, ‘গদাধরদাদা দু-বার এসে ফিরে গেছে। আবারও আসবে বলেছে। খুব-ই জরুরি দরকার। স্কুলে আতশ কারো সঙ্গেই দেখা করে না। তাই সাহস করে গদাধর স্কুলে যায়নি।’
শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সারাবছর-ই ও দু-বার স্নান করে। বাইধর স্নানঘরে গরম জল, লুঙ্গি, বাড়িতে পরার খদ্দরের ফতুয়া, তোয়ালে এসব দিয়ে দিয়েছে। আদা আর বিটনুন দিয়ে এক কাপ চা খেয়েই আতশ স্নানে গেল।
স্নান থেকে বেরোতে-না-বেরোতে বাইরে গদাধরের গলা পেল। বাইধর ততক্ষণে তাকে বারান্দাতেই বসিয়েছে। বসিয়ে চা খাবে কি না জিজ্ঞেস করছে। গদাধর বলছে, ‘কিছুই খাবে না, বাবুর সঙ্গে দেখা করেই সে চলে যাবে।’
আতশ পায়ে চটি গলিয়ে বারান্দাতে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার গদাধর? এই নিয়ে তিনবার এলে?’
গদাধর বলল, আমার বড়ো বিপদ বাবু। মেয়েটাকে বোধ হয় বাঁচাতে পারলাম না।
কী হলটা কী?
ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া। পাঁচদিন জ্বর।
ওষুধ দিয়েছ? সুঁই-টুঁই?
পুরুণাকোটের হাসপাতালের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছিলাম। তিনি ‘লারিয়াগো’ বলে একটা ওষুধ দিয়েছিলেন। জ্বর আজও না কমাতে সাইকেলের পেছনে মেয়েকে বসিয়ে হাসপাতালে নিয়ে গেছিলাম।
সাইকেলে করে গেল কী করে অতজ্বর নিয়ে? কত বয়স তোমার মেয়ের?
এগারো বছর বাবু। আমার ছ-বছরের ছেলে ক্যারিয়ারের পিছনে বসে দিদিকে ধরেছিল।
তারপর? হাসপাতালে কী হল?
ডাক্তারবাবু বললেন, ফ্রি বেড নেই। তিনটি মোটে ফ্রি বেড—সব ভরতি।
তা পেয়িং-বেড-এ ভরতি করালে না কেন?
ডাক্তারবাবু দু-হাজার টাকা চাইলেন। বললেন, তাঁর ফি, ওষুধ ইঞ্জেকশনের খরচ, বেডের ভাড়া বাবদ ওই টাকা অগ্রিম দিতে হবে। আমি অত টাকা কোথা থেকে পাব বাবু? ডাক্তারবাবু বললেন, তোমার মেয়ের লিভার নষ্ট হয়ে গেছে জ্বরে। হেপাটাইটিস না কী যেন হয়ে গেছে। মেয়েকে বাঁচানো মুশকিল।
এতকিছু বলেও ভরতি করলেন না?
না বাবু।
তারপর?
ওই অবস্থাতে তো আবার পাহাড়ি পথে চড়াইয়ে সাইকেলে তাকে নিয়ে যাওয়া যায় না। তাই আমাদের-ই গোস্নানির এক কাবাড়ির বাড়িতে তাকে আর ছেলেকে রেখে টাকার জোগাড়ে বেরিয়ে পড়েছি আমি বিকেল চারটেতে।
জোগাড় হয়েছে টাকা?
হয়েছে। আড়াই-শো টাকা। তা ছাড়া আমার বাড়িতে যা, ছিল সব-ই নিয়ে এসেছিলাম সঙ্গে করে।
কত টাকা?
সাড়ে তিন-শো টাকা।
আমার বাড়িতে এগারো-শো টাকা মতো হবে। টাকার বেশি প্রয়োজন হয় না। সোমবারে পুরুণাকোটের পোস্ট অফিস থেকে তুলব। সাড়ে তিন-শো আর আড়াই-শো ছ-শো আর আমার এগারো-শো, সাড়ে সতেরো-শো টাকা হল।
বলেই বাইধরকে ডেকে বলল, —এই তোর কাছে কত টাকা হবে?
ষাট টাকা আইজ্ঞাঁ।
তা তোর ষাট টাকাটাও দে। সোমবারে তোকে দিয়ে দেব।
বলেই, মোটরসাইকেলটা আর টর্চটা নিয়ে বারান্দা থেকে নামল আতশ। গদাধরকে বলল, ‘তোমার সাইকেলটা এখানেই রেখে যাও।’
লুগা-পটা বদল করিলানি আপুনি বাবু?
না। সময় নেই কাপড় বদলাবার। বিলিরুবিন কত তা কি বলেছে ডাক্তার?
সেটা কী জিনিস বাবু?
রক্ত পরীক্ষা করেছিল ডাক্তার?
না, পয়সাই তো দিতে পারিনি। রক্ত নেবে কেন?
হুঁ। এই হাসপাতাল কি সরকারের?
হুঁ আইজ্ঞা। পঞ্চায়েত চালায়।
হুঁ।
সেগুন বনটার কাছে আসতে-না-আসতেই তুমুল বৃষ্টি নামল। ওরা দু-জনে ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল। মোটরসাইকেলের হেড লাইটের আলোতে বৃষ্টির ফোঁটা ইলিশ মাছের আঁশের মতো চকচক করতে লাগল। বৃষ্টির সঙ্গে হাওয়ার দাপটও কম ছিল না। ভিজে গায়ে শীত করতে লাগল আতশের।
মিনিট পনেরো জোরে বাইক ছুটিয়ে যাওয়ার পরে, সামনে পুরুণাকোট বাজারের আলো দেখা গেল। আতশ বলল, চলো, আগে মেয়েটাকে তুলে নিই তারপর হাসপাতালে যাব।
যা ভালো মনে করবেন আপনি।
পুরুণাকোট থেকে টুল্টবকার দিকে যাওয়ার পথে বনদপ্তরের ডানদিকে যে, ছোটোবস্তিটি আছে তার-ই একটি ঘরে গিয়ে ‘দশরথ্ব দশরথ্ব’ করে ডাকতে লাগল বাইধর। ওই অন্ধ বৃষ্টির মধ্যে একটা ঝুপড়ির দরজা খুলে গেল। গদাধর নেমে ভেতরে গিয়েই দশরথ্বের সঙ্গে মেয়েকে ধরে ধরে এনে মোটরসাইকেলের পেছনে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বসল। তার ছেলেও সঙ্গে সঙ্গে এসেছিল। গদাধর বলল, ‘তুই এখন এখানেই থাক। আমরা দিদিকে হাসপাতালে দিয়ে ফিরে আসব।’
হাসপাতালের লাগোয়াই ডাক্তারের কোয়ার্টার। তিনি বসার ঘরে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরে বসে, টি. ভি. দেখছিলেন।
আতশ শুনল, তিনি কাজের ছেলেটিকে বলছেন, ‘যারে পিল্টবা। কাঁই আসিলা এমিতি দুর্যোগমধ্যে? তাঁকু কহি দে কালি সকালেরে আসিবাকু।’
ছেলেটা দরজা খুলে ওই কথা বলবার আগেই আতশ বাইকে গদাধর আর তার মেয়েকে বসিয়ে রেখে ভেতরে ঢুকে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল, পম্পাশর থেকে একটা মেয়েকে নিয়ে এসেছিল বিকেলে গদাধর মোহান্তি—ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়ার রোগিণী—ফ্রি বেড-এ জায়গা নেই বলে আপনি ভরতি করেননি।
ডাক্তার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, তারজন্যে কি আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে?
আমি করতপটা প্রাইমরি স্কুলের হেডমাস্টার ডাক্তারবাবু।
সে আপনি কটকের র্যাভেনশ কলেজের প্রিন্সিপালও হতে পারেন। টাকা ছাড়া তো আমি পেয়িং-বেডে ভরতি করতে পারি না।
টাকা এনেছি ডাক্তারবাবু। মেয়েটা বাইরে আমার মোটরবাইকে ভিজছে। এখন-ই ভরতি না করে নিলে হয়তো মরেই যাবে। দয়া করে একটু আসুন।
এই দুর্যোগে যাব কী করে? আপনারা হাসপাতালে যান, আমি জামাকাপড় বদলে ছাতা নিয়ে যাচ্ছি।
আতশ মোটর বাইকে ফিরে গিয়ে হাসপাতালে পৌঁছোল। ওয়ার্ড বয়কে বলল, ‘এখুনি পেশেন্টকে ভরতি করে নিতে।’ যে দু-জন নার্স ডিউটিতে ছিলেন তাঁদেরও বলল।
মেয়েটা একেবারে নেতিয়ে গেছিল। গায়ে আগুনের মতো জ্বর। হুঁশ নেই কোনো।
একজন নার্স বলল, বিকেলেই তো এসেছিল। চোখ দেখে মনে হল, জণ্ডিস একেবারে গেঁড়ে বসেছে। বিলিরুবিন কত তা কে জানে! এখানে তো রক্ত পরীক্ষা করার কোনো বন্দোবস্ত নেই। রক্ত আমরা নিতে পারি কিন্তু পরীক্ষা করাতে হবে সেই অঙ্গুলে কী বৌধ-এ গিয়ে। তাও রাতে তো কোনো ক্লিনিকাল ল্যাবরেটরি খোলা পাবেন না। সকাল সাতটাতে খুলবে।
তারপর বলল, ‘টাকা এনেছেন?’
আতশ বলল, ‘এনেছি কিন্তু দু-হাজারের কিছু কম আছে। আমি এখুনি গিয়ে আড়াই-শো নিয়ে আসছি একজনের কাছ থেকে।’
তারপর বলল, ‘আমি করতপটা স্কুলের হেডমাস্টার, আতশ দাস।’
নার্সটি বলল, ‘ও ও ও—আপনার কথা অনেক শুনেছি কাদম্বিনীর কাছে। আমি তো ওদের মেসেই থাকি। ফরেস্টের দিদিমণি রেঢ়াখোলে বদলি হয়ে গেছেন সেই জায়গাতে আমি ঢুকেছি। আপনি কি কাদম্বিনীর কাছ থেকেই টাকা আনতে যাচ্ছেন?’
ঠিক ধরেছেন।
আপনি যান। আমি মেয়েটিকে ভরতি করে নিচ্ছি। নিচ্ছি বটে কিন্তু বাঁচার আশা কম।
রোগিণীর, যদিও সে বেঁহুশ এবং তার বাবার সামনে, ভরতি না করেই ‘বাঁচার আশা কম’ —যিনি বলেন তিনি কীরকম নার্স কে জানে!
ওদের ভেতরে দিয়ে আতশ কাদম্বিনীদের মেস-এর দিকে বাইক ছোটাল। কাদম্বিনীরা দু-জনে বসে গল্প করছিল। লুঙ্গি পরে ভিজে চুপচুপে হয়ে আতশকে দেখে খুব-ই অবাক হল।
আতশ বলল, আমাকে কিছু টাকা ধার দিতে পারো? সোমবারেই ফেরত দিয়ে দেব।
কত টাকা? বেশি টাকা তো নেই। তোমার কাছে কত আছে রেখাদি?
তিন-শো মতো হবে।
আমার কাছেও তাই। এক-শো টাকা রেখে দিয়ে পাঁচ-শো টাকা দিচ্ছি। হবে তো এতে? এই দুর্যোগের মধ্যে টাকার কী দরকার হল?
আতশ সংক্ষেপে বলল, যা বলার।
তারপর বলল, সোমবার স্কুলের পরে বিস্তারিত বলব। এখন চলি। অনেক ধন্যবাদ।
হাসপাতালে ফিরতেই ডাক্তার বললেন, বাকি টাকাটা এনেছেন?
হ্যাঁ। এই নিন বলে, আড়াই-শো টাকা দিয়ে দিল ডাক্তারকে।
ডাক্তার বললেন, রোগী যদি বাঁচে তবে, কাল-পরশু আরও টাকা লাগবে।
কত?
আতশ শুধোল।
তা কী করে বলব আগে থেকে। পঞ্চাশ এক-শোও হতে পারে, এক দু-হাজারও হতে পারে।
আপনার নামটা জানতে পারি ডাক্তারবাবু?
কেন পারবেন না? আমার নাম গণপতি বিশ্ববল। নাম জানতে চাইছেন কেন? কমপ্লেইন করবেন নাকি?
আতশের মনে হল যে বলে, কমপ্লেইন করলেই যদি কাজ হত এই দেশে তবে কি আপনার মতো হৃদয়হীন ডাক্তারের চাকরি থাকত? শতবার চাকরি যেত। কমপ্লেইন করলে কোনো লাভ হয় না—তা ছাড়া কমপ্লেইন করার সাহসও হয় না, এইসব গরিব অসহায় মানুষদের। তাই এরা নীরবে মরে এসেছে যুগের পর যুগ। এ এক, আশ্চর্য অচলায়তন। এর-ই নাম ‘ভারতবর্ষ’।
আতশ মুখে না বলে মনে মনে বলল, কবে আসবি তোরা এম. সি. সি.-র তরতাজা ছেলেরা? জনযুদ্ধের যোদ্ধারা? মেধাবী নকশালেরা চিতা থেকে উঠে? কবে ধড়াধ্বড় করে লাশ ফেলবি এই জন্তুজানোয়ারগুলোর, এই বিবেকহীন, হৃদয়হীন অসৎ আমলাদের? শিক্ষা, চিকিৎসা, সমাজসেবা সব জায়গাতে এই এক-ই ছবি। সব রাজ্যেই। বাঙালি বলে আতশের পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে গর্বিত হওয়ার বিন্দুমাত্রও কারণ নেই। বিহার ওড়িশা পশ্চিমবঙ্গ—কোনো তফাত নেই। লজ্জা! লজ্জা!! লজ্জা!!!
তোমার মেয়ের নাম কী? শুধোল গদাধরকে।
হেমা। হেমামালিনীর নামে নাম রেখেছিল আমার বউ অঙ্গুলে হেমামালিনীর সিনেমা দেখে। লজ্জিত মুখে বলল, ‘গদাধর’। নার্সটি চেনা বেরোতে একটু ভরসা পেল আতশ এবং গদাধরও।
ও বলল, আপনারা চলে যান। এখন আমাদেরও কিছু করার নেই, আপনাদেরও না। কাল সকালে এসে খোঁজ নেবেন। কোনো ওষুধ যদি আনতে হয় অঙ্গুল থেকে। কাল তো রবিবার, তবে কিছু ওষুধের দোকান খোলা থাকে। আমাদের হাসপাতালে থাকলে তো ভালোই। কিছু ওষুধ আমাদের রাখতেই হয়। তবে ফুরিয়ে গেলেও রিপ্লেসড হতে অনেক সময় নেয়। বোঝেন-ই তো সরকারি ব্যাপার!
ডাক্তার গণপতি বিশ্ববল নার্সকে ধমক দিয়ে বললেন, অতকথা কীসের? নিজের কাজ করো। স্যালাইন দাও, প্রেশার চেক করো, জ্ঞান ফিরলে কী কী কষ্ট জিজ্ঞেস করো পেশেন্টকে। তোমার কি আজ নাইট ডিউটি?
না স্যার।
মল্লিকা আসেনি?
সময় হয়নি।
এলেই কেস ভালো করে বুঝিয়ে দিয়ে তারপরে যেয়ো। রাতে নিতান্তই প্রয়োজন না পড়লে যেন, আমাকে না ডাকে। আজ কাজল আর শাহরুখ খানের একটা ছবি আছে—অমিতাভ আর জয়া বচ্চনও আছে।
নার্স বলল। ‘কভি খুশি কভি গম’? আমরাও দেখব।
আতশ বাইরে বেরিয়ে বলল, তুমি আমার সঙ্গেই ফিরে চলো করতপটা। কাল ভোরে চা খেয়ে তোমার সাইকেলটা নিয়ে চলে এসো। ছেলে আজ তোমার সহকর্মী দশরথের বাড়িতেই থাকুক। চলো, তাকে বলে যাই সে-কথা। আর এই সাড়ে তিন-শোটা টাকা তোমার কাছেই রাখো গদাধর। কখন কী দরকার হয়।
আমার জন্যে আপনি টাকা ধার করলেন বাবু?
তাতে কী হয়েছে? এখন আমাদের প্রয়োজন।
বৃষ্টিটা তখনও হয়ে যাচ্ছিল ‘টিপ টিপ’ করে কিন্তু গদাধরের সহকর্মীর বাড়ি পৌঁছোবার আগেই থেমে গেল। সহকর্মীকে যা-বলার বলে, ছেলেকেও বুঝিয়ে বলে গদাধর এসে বসল মোটরসাইকেলের পেছনে।
বড়োরাস্তাতে পৌঁছে বাইকের মুখ ঘুরিয়ে চলল উলটোদিকে। কাদম্বিনীদের মেস-বাড়িতে পৌঁছে কাদম্বিনীকে বলল, তোমাদের নতুন অতিথির নাম কী? মানে, নার্সটির?
কাদম্বিনী বলল, মালতী।
তারপর, মোটরসাইকেলে বসেই যা বলার বলল কাদম্বিনীকে। তারপর বলল, রাতে যদি কোনো ক্রাইসিস হয় তবে, আমাকে কি কোনো খবর দেওয়া সম্ভব হবে? এখানে কি কোনো পাবলিক টেলিফোন বুথ আছে?
না, তা নেই। তবে হাসপাতালেই আছে। আপনি যাওয়ার সময়ে মালতীকে নাম্বারটা জানিয়ে যান, যে সিস্টার নাইট ডিউটিতে থাকবে তাকে ও দিয়ে রাখবে। মালতীর ডিউটি আটটাতে শেষ হয়ে যাবে। ও এলে, ওর কাছ থেকে জানব রোগিণীর অবস্থা কেমন। তেমন হলে আমি হঠবাবুর বাড়িতে গিয়ে সেখান থেকে আপনাকে ফোন করে দেব।
হঠবাবু কে?
হঠবাবু কটকের শূরবাবুদের জঙ্গলের মুহুরি ছিলেন। রিটায়ার করে এখন, পুরুণাকোটেই বাড়ি করে থিতু হয়েছেন। তিনি খুব বুড়ো হয়ে গেছেন কিন্তু তাঁর দুই জোয়ান ছেলে আছে। বাড়িঘর এবং পি. ডব্লু. ডি-র কনট্রাক্টারি করেন। আমাকে ওঁদের বাড়ির সকলেই চেনে। মাঝরাতেও আমি গিয়ে ফোন করতে পারি।
দ্যাখো, মাঝরাতে গেলে একা যেয়ো না। দিনকাল ভালো নয়।
তা তো জানি আতশদা। গেলে, লালুকে সঙ্গে নিয়ে যাব।
লালু কে? এখন তো দেশে একজন-ই লালু আছে বলে জানি।
কোন লালু?
জাতীয় ভাঁড়।
না। ও আমাদের দো-আঁশলা কুকুর লালু। বড়োবাঘের সঙ্গেও টক্কর দিতে জানে আমাদের লালু।
ঠিক আছে।
করতপটার দিকে বাইক চলতে থাকল। বৃষ্টিটা থেমে গেছে।
লালু যাদব কিন্তু বেশ লোক। গদাধর বলল।
সেটা ঠিক। এদেশে এরকম নেতার-ই দরকার। রেলে মাটির ভাঁড়, খদ্দর চালু করার কথা তো আর কারো মনে হয়নি। অথচ মনে হওয়া অনেকদিন আগেই উচিত ছিল।
সকলে বলে, লালু চোর।
চোর কোন নেতা নয়? তুমি তো সব কথা জানো না, নরসিংহ রাও-এর ঘরে যে, স্যুটকেস-ভরা কোটি টাকা দিয়ে এল হর্ষদ মেহতা তার কী হল? সি. বি. আই., কোর্ট, সবাই তো আছে কিন্তু তারা আছে সাধারণের হেনস্তার-ই জন্যে। আজ অবধি একজন নেতারও জেল হয়েছে কি? তবে আমাদের ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী সৎ। অবশ্য ওঁর টাকার দরকার-ই বা কী? বাবা যা রেখে গেছেন, তাতেই তো কয়েক পুরুষের চলে যাবে। তবে ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী ‘ওড়িয়া’ বলতে পারেন না, এটা একটা ভাববার মতো বিষয় বটে। উনি তো সাহেব-ই। ইদানীং খদ্দরের ধুতি-পাঞ্জাবি ছাড়া কিছু পরেন না। আমাদের নেহরুসাহেব আর পাকিস্তানের জিন্নাসাহেবও তো থ্রি-পিস-স্যুট পরা সাহেব-ইছিলেন। জিন্না সাহেব তো একটিও ভারতীয় ভাষাও জানতেন না। না। উর্দু পর্যন্ত নয়। এই দেশের মহাদুর্ভাগ্য এই যে, ইংরেজদের তাড়িয়ে দিয়ে ইংরেজরাই—ইংরেজি শিক্ষিত ব্যারিস্টার, এম. বি. এ., ইকনমিস্ট এঁরাই দেশের দন্ডমুন্ডের কর্তা হলেন, যাঁরা দেশকে জানেন না, দেশকে ভালোবাসেন না, যাঁদের বিদ্যা সব পুথি নির্ভর—গুণের মধ্যে তাঁরা কেবল বক্তৃতা দিতে পারেন।
‘থ্রি-পিস-স্যুট’টা কী জিনিস বাবু?
তা জেনে তুমি কী করবে গদাধর? কিন্তু তোমার টনক-ই যদি নড়ল তবে এতদেরি করে নড়ল কেন? আগেই কেন হাসপাতালে আনলে না মেয়েকে?
আগে তো বুঝতে পারিনি বাবু। আমাদের জ্বর-জ্বারি হলে উপোস করে শুয়ে থাকি দু-তিন দিন। জ্বর বেশি হলে মাথার নীচে বড়ো কচুপাতা দিয়ে ঢালু ঢালু জল ঢালি মাথাতে, মাথাতে খুব বেশিব্যথা হলে ‘ঝাণ্ডুবাম’ ঘষে দিই একটু। ওষুধ আমরা পাবই বা কোথায়? ওষুধের খোঁজে হাসপাতালে আসতেও তো পাহাড়ে জঙ্গলে সাত কিলোমিটার নামতে-উঠতে হয়।
তোমাদের গ্রামে ক-ঘর মানুষের বাস?
গ্রামে তো আমি থাকি না। গ্রামে জমির দাম অনেক। গ্রাম থেকে আধ কিলোমিটার দূরে লবঙ্গী যাওয়ার পথের পাশে, বাবুর দেওয়া টাকাতে একগুঁঠ জমি বন্দোবস্ত করে বাঁশের ছেঁচা বেড়া আর মাটি দিয়ে বাড়ি বানিয়েছি। দুটো ঘর একটা উঠোন। কাছেই ঝরনা আছে। বারোমাস জল থাকে।
বর্ষাকালেও সেই ঝরনার জল খাও? ঝরনার জলের পাশে-পাশে যা-জল জমে থাকে, তাতে মশারা ডিম পাড়ে। সেই মশা কামড়ালে বা সেই জল থেকে ম্যালেরিয়া হয়। ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া। আমার একবার হয়েছিল তাই জানি। বাবার সঙ্গে শিকারে গিয়ে জঙ্গলের ঝরনার জল খেয়েছিলাম। মাথাতে যে কী যন্ত্রণা! যার না হয়েছে, সে বুঝবে না। তোমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা পোস্ট অফিসের অ্যাকাউন্ট নেই গদাধর?
এখানে ব্যাঙ্ক পোস্ট অফিস কোথায়? যে-পোস্ট অফিস আছে, তাতে টাকা রাখার বন্দোবস্ত নেই।
কে বলেছে নেই? আমি তো পোস্ট অফিসেই টাকা রাখি।
তারপর বলল, তবে তোমার সঞ্চয় রাখোটা কোথায়? কত বছর মুহুরির কাজ করছ তুমি পাল্টববাবুদের কাছে?
সে তো হল প্রায় পঁচিশ বছর।
কটকের জঙ্গলের ঠিকাদার শূরবাবুদের মুহুরি হঠবাবু যে-পুরুণাকোট শহরে বাড়ি করলেন। উনি পারলেন, তো তুমি কেন পারবে না?
হ্যাঁ? ওঁর আয় আর আমার আয়! শূরবাবুরা মস্ত বড়ো ঠিকাদার। তা ছাড়া, হঠবাবু তো তখনকার দিনের আই.এ. পাশ ছিলেন। শুনেছি ডি.এফ.ও সাহেবদের সঙ্গে ইংরেজিতে রীতিমতো দাবড়ে কথা বলতেন। নরেন শূর ক্বচিৎ-কদাচিৎ আসতেন জঙ্গলে—নিলামে জঙ্গল ডাকা থেকে রাস্তা বানানো, কাঠ-কাটা, কাঠ শহরে পাঠানো ইত্যাদি সব কাজ-ই হঠবাবুই করতেন। পাল্টববাবুদের কাছে মুহুরির কাজ করার আগে কিছুদিন হঠবাবুর আণ্ডারে মেট-এর কাজ করেছিলাম। কাজ তো সেখানেই শিখি। ওঁর সঙ্গে আমার তুলনা!
তোমার সঞ্চয়ের টাকা কোথায় রাখো তা তো বললে না!
আমার আবার সঞ্চয়। আমার হিসাব সব পাল্টববাবুদের ব্যাবসার ক্যাশবাবু জগবন্ধু পানিগ্রাহীর হাত-চিঠাতে লেখা থাকে। বছরের প্রথমে কাজ শুরু হওয়ার আগে কালীপুজোর পরে একবার করে কটকে গিয়ে হিসাব দেখে আসি—টাকার দরকার পড়লে কিছু টাকা উঠিয়েও আনি। আপনার কাছে আজ যা-ধার হল, তাও সেই সময়েই শোধ করে দেব। তখন বউকেও কিছু টাকা দিয়ে দিই—সংসার খরচের জন্যে। তেমন দরকার হলে ট্রাক-ড্রাইভার মারফত জগবন্ধুবাবুকে চিঠি পাঠাই—ট্রাক-ড্রাইভার এনে দেয় টাকাটা। সঙ্গে হাত-চিঠাটাও নিয়ে আসে, তারিখ দিয়ে সই করে দিই।
তা গত পঁচিশ বছরে কত টাকা জমেছে তোমার?
সে অনেক টাকা।
তবু, কত টাকা?
সে দশ-পনেরো হাজার টাকা তো হবেই।
দশ আর পনেরো হাজার কী এককথা হল নাকি?
না, তা হল না, তবে সব খরচাখরচ বাদ দিয়েই তো জমেছে। আমার নিজের জন্যে তো সারাবছর আমার খরচ-ই হয় না। থাকাটা, খাওয়াটা, লুগা-পটাটা মানে লুঙ্গি শার্ট গামছা এসব তো বাবুরাই দেন। একগুঁঠ জমি কেনার টাকা, বাড়ি তৈরির টাকা—সে নয় নয় করে তো হাজার চার-পাঁচ হবেই—সেটাও তো তাঁরাই দিয়েছেন।
তোমার মাস-মায়না কত?
সে তো আমি বলতে পারব না বাবু। মানে, আমি জানি না। মেজোবাবু বলেন, আমি বেঁচে থাকতে তোর চিন্তা কী রে গদাধর? কখন কী প্রয়োজন আমাকে শুধু বলবি। তা আমার তেমন কোনো প্রয়োজন-ই নাই, বলব কী? গত বছর একটা ফিলিপস-এর ট্রানজিস্টার কিনেছিলাম বউ-এর জন্যে। বিবিধ ভারতী আর এফ. এম. শুনবে বলে বায়না ধরেছিল।
তোমার ছেলে-মেয়েকে আমার স্কুলে পাঠাও-না কেন?
কী হবে? গরিব লোক আমরা। পড়াশুনো দিয়ে হবেটা কী? আমি মরলে, ছেলে কুড়ুল কাঁধে নিয়ে পাল্টববাবুদের জঙ্গল-ক্যাম্পে শামিল হয়ে যাবে আর মেয়েটা এখন-ই রাঁধতে-বাড়তে শিখে গেছে—পনেরো বছর হলেই ওর বিয়ে দিয়ে দেব।
দূর থেকে করতপটার আলো দেখা যাচ্ছিল। যে-নালাটা পথটাকে কেটে গেছে তার ওপরে একটা কজওয়ে আছে। সেখানে একটা বড়ো মার্কারি ভেপার ল্যাম্প জ্বলে। গত বছরে পি. ডব্লু. ডি. থেকে লাগিয়েছে। দু-পাশের পথেই বহুদূর থেকে সেই আলো দেখা যায়। বৃষ্টিস্নাত, বনের মধ্যে একটা উজ্জ্বল বাদামি-রঙা রহস্যের সৃষ্টি করে এই আলো।
এসে গেছে ওরা।
বড়োরাস্তা ছেড়ে ওর বাড়ির দিকে বাইকের মুখ ঘুরিয়ে আতশ বলল, ‘আজকালকার দিনে পড়াশুনো না করলে কোনো উপায়ই নেই। মানে, কোনো ভবিষ্যৎ। তোমাদের দিন শেষ হয়ে গেছে গদাধর। তোমার সঙ্গে হঠবাবুর তফাত দেখেও কী একথা বোঝোনি গদাধর? ছেলে-মেয়েকে আমার স্কুলে পাঠাও।’
জঙ্গলের মধ্যে পথ-ই তো প্রায় চার-পাঁচ কিলোমিটার তারপর বড়োরাস্তাতে পড়েও এতখানি। সারাটা দিনই তো ওদের হেঁটে হেঁটেই কাবার হয়ে যাবে। বাড়ির কাজ, পড়াশুনো এসব করবে কখন?
কথাটা ভাববার মতো বটে। শুনে, আতশ চুপ করে রইল।
গদাধর বলল, তার ওপরে স্কুলের মাইনেও তো আছে। সে কত টাকা হবে?
তাদের দু-জনের মাইনে না-হয় আমিই দিয়ে দেব। নয় স্কুলের মালিক মাধববাবুকে বলে মকুব করিয়ে দেব।
বইপত্র খাতা এসবের খরচও তো আছে। স্কুলে এলে তখন জামাকাপড় পরে তো আসতে হবে—সে জামাকাপড় তো নোংরা থাকলেও চলবে না।
তারপর-ই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গদাধর বলল, ‘না: এ-জন্মে হবে না বাবু। পরের জন্মে দেখা যাবে। যদি ভাগ্য করে এসে থাকি তাহলে পরজন্মে পড়বে স্কুলে আমার ছেলে-মেয়েরা।’
বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়াতে বাড়ি ফিরে আবার চান করতে হল গরম জলে। বাইধর শুকনো লুঙ্গি আর জামা দিল গদাধরকে। সেও পরিষ্কার হয়ে নিল। তারপর বাইধর গরম গরম খিচুড়ি, পেঁয়াজি আর ডিমভাজা করে দিল আতশদের।
রাতে দু-বার চান করার জন্যেই বোধ হয় আতশের একটু জ্বরভাব হয়েছিল। পুবে আলো ফুটতে-না-ফুটতেই সাইকেলে চলে গেছিল গদাধর। আতশের ঘুম ভাঙল সকাল সাতটা নাগাদ। আজ স্কুল আছে। স্কুলে বসে দশটাতে, পৌনে ন-টাতে জামাকাপড় পরে এককাপ চা খেয়ে সেও বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ল পুরুণাকোটের হাসপাতালের দিকে।
হাসপাতালের সামনে একটু মাঠমতো আছে। দূর থেকেই দেখল যে, সেখানে গদাধর, গদাধরের ছেলে, তার নাম জিজ্ঞেস করা হয়নি কাল, এবং কাদম্বিনী চানটান করে স্কুলে যাওয়ার পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে।
আতশ যেতেই গদাধর কেঁদে তার পায়ের ওপরে পড়ল, তারপর কাটা-পাঁঠার মতো ছটফট করতে লাগল। বলল, ‘মোর ঝিওটা চাল্টিব গল্টবা বাবু, ঝিওটা চালি গ্বলা। আপনংকু এত্বে টংকা বরবাদ হেল্টবা।’
আতশ কাদম্বিনীকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’
কাদম্বিনী বলল, ‘মালতী সকালে ডিউটিতে গিয়েই ফিরে এসে আমাদের খবর দিল। ভোর পাঁচটাতে চলে গেছে মেয়েটা। কিডনি ফেল করে গেছিল জণ্ডিস-এ।’
ডাক্তারবাবু কোথায়?
তিনি তো কোয়ার্টারেই আছেন। আসবেন ন-টা নাগাদ।
রাতে ডাক্তারবাবু ছিলেন না রোগীর কাছে?
না তো। উনি নার্সদের যা-যা করণীয় তা করতে বলেই চলে গেছিলেন।
ডাক্তারবাবু পৌনে ন-টার সময়ে এলেন সাদা অ্যাপ্রন পরে।
এসেই গদাধরকে বললেন, আরও দুইশত টংকা দিবা লাগিব।
গদাধর তার পকেট থেকে টাকাটা বের করে দিল।
রোগীর কী হল?
আতশ ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করল।
তাংকু টাইম হইথিলা, চালি গ্বলে।
তারপর বললেন, ‘আমরা তো ম্যাজিশিয়ান নই। সময়মতো আনলে কিছু করা যেত। শেষসময়ে আনলে আমরা কী করতে পারি? ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিচ্ছি। নিয়ে গিয়ে দাহ করুন। মরা বেশিক্ষণ রাখার কোনো বন্দোবস্ত এই ছোটো হাসপাতালে নেই।’
গদাধর বলল, ‘ওর মা একবার শেষদেখা দেখবে না?’
আতশ বলল, ‘ওকে তোমার বাড়িতে না নিয়ে গিয়ে, ওর মাকে এখানে নিয়ে এলে হয়-না?’ বলেই গদাধরের ছেলেকে বলল, ‘তুমি আমার সঙ্গে চলো। তোমার মাকে বাইকের পেছনে বসিয়ে নিয়ে আসব। তুমি দাহ করার বন্দোবস্ত করো গদাধর।’
গদাধরের যে-কাবাড়ি সহকর্মী ছেলেকে রাতে রেখেছিল সে এবং পুরুণাকোটের আরও দশ-পনেরোজন লোক জড়ো হয়ে গেল। সেই সহকর্মীই, যার নাম দশরথ, সঙ্গীদের নিয়ে নন্দিনী-নালার পাশের শ্মশানে চলে গেল কাঠ কাঠতে। অন্যরা বাঁশঝাড়ে গিয়ে বাঁশ কেটে তাড়াতাড়ি একটা চাকি তৈরি করে এনে গদাধরের মেয়েকে তাতে উঠিয়ে হাসপাতালের কম্পাউণ্ডে একটি তেঁতুলগাছের নীচে শুইয়ে রাখল। মেয়েটির মুখে গভীর ক্লান্তির ছাপ। বড়ো ক্লিষ্ট। দেখে মনে হচ্ছিল তার মা বোধ হয় একটু আগে তার চুলটা বেঁধে দিয়েছে। শুয়ে রইল গদাধরের মেয়ে হেমা, হেমামালিনীর নামে যার নাম। যে বেঁচে থাকলে, পনেরো বছর বয়সে বিয়ে দিত গদাধর।
আতশ গদাধরের ছেলেকে নিয়ে চলে গেল। সে-ই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে পম্পাশরে। যাওয়ার সময়ে আতশ শুনল দু-তিনজন লোক বলাবলি করছে, এই ডাক্তারটাকে একদিন খুন করতে হবে। এ ছাড়া এই হারামির আর কোনো ওষুধ নেই।
আমরা এত বড়ো বড়ো গাছ কুড়ুল দিয়ে কাটি আর এই ষড়াকে কোপাতে পারব না?
একটি অল্পবয়েসি রক্তগরম কাবাড়ি বলল। তার শালপ্রাংশু চেহারা।
গদাধরের ছেলে তাকে দেখে ভেঙে পড়ল। বলল, ভীম্বকাকা-আ-আ।
ছেলেটার নাম ভীম্ব। জানল আতশ। আতশের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ভাবল, এরা উত্তেজিত হয়ে মুখে এসব বলছে স্পষ্ট কিন্তু এদের মধ্যে কারোরই সাহস হবে না, ওই ডাক্তারকে মারবার। ডাক্তারকে মারলে থানা-পুলিশ তো হবেই, ওদের সারাজীবন জেলে পচতে হবে। নয়তো ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। কোনো আইন-ই গরিবের পক্ষে নেই। হেমার মতো আরও কত রোগীকে অপার ঔদাসীন্যে এই ডাক্তার পরপারে পাঠিয়েছেন তা কে জানে! তার ওপরে আর্থিক অত্যাচার। যারা প্রায় না খেয়ে থাকে, তাদের কাছ থেকে এমন জবরদস্তি করে টাকা আদায় করা! মানুষে নিরুপায় হয়ে মেনে নেয়। টাকার তো কোনো রসিদ-টসিদও দিলেন না উনি। ফিরে এসে রসিদ চাইবে ও ঠিক করল।
তারপর ভাবল, বন্দুকটা তো এবারে নিয়ে এসেছে। তা দিয়ে বউনি এই বুড়োটাকে মেরে করলেই হল। ব্যাপারটা মাথায় থাকল, থাকবে আতশের। এই পুরুণাকোটের ডাক্তারকে খুন করেই বিপ্লব শুরু করবে ও।
কেহি রহি নাই
রহিব নাই
রহিব না ইট্টি।
এই ভব রঙ্গ।
ভূমিতলে।স্বব্বে নিজ নিজ
অভিনয় সারি
বাহুরিবে কালবেলে।।
এই কবিতাটি আতশদের বাড়ির বুড়োমালি মাইচা মৌসা প্রায়-ই আবৃত্তি করত। বুড়ো মালির আসল নামটা কেউই জানত না। সে একটু মেয়েলি ছিল কথাবার্তাতে এবং চেহারাতেও, তাই সকলেই তাকে ‘মাইচা’ অর্থাৎ মেয়েলি বলে ডাকত। ‘তিয়াসা’ বাড়ির বাগান-ই তার প্রাণ ছিল। থাকত সে একা ঢেনকানল যাওয়ার পথের পাশের এক কুঁড়েতে। বিয়ে-থা করেনি বা হয়নি। সারাদিন-ই থাকত আতশদের বাড়িতেই। বাবার খুব-ই প্রিয় ছিল সে। একেবারে রাতের খাওয়া সেরে সে, বাড়ি গিয়ে ঘুমোত। কাজের লোকদের কোয়ার্টারে কখনো রাত কাটাত না। অন্য কাজের লোকেদের বলত, ‘বাবার জীবদ্দশাতেও অনেক কাজের লোক ছিল, আমার নিজের বাসা নেই, কী যে আমি তোদের মতো এখানে থাকব?’
কবিতাটির মানে হল, কেউই নেই, কেউই থাকবে না এখানে। থাকবে না। এই হল ভবের রঙ্গ। এখানে সকলেই নিজের নিজের অভিনয় সাঙ্গ করে একদিন এই রঙ্গভূমি ছেড়ে সময় হলেই চলে যাবে।
বাবা চলে গেছেন, মাইচা বুড়োও চলে গেছে। কিন্তু তাঁরা গিয়েছেন পরিণত বয়সে। গদাধরের মেয়েটার যাওয়াটা বড়ো অসময়ে হল। হেমামালিনীর নামে নাম রাখলে কী হয়, কোনোরকম অভিনয় করার সুযোগ পাওয়ার আগেই, সে চলে গেল। তবে ওই ডাক্তারকে আতশ দেখে নেবে। তার নাম কী বিশ্ববল যেন? ভুলে গেছে নামটা। সময় সুযোগমতো বোঝাপড়া করবে তার সঙ্গে আতশ।
স্কুলে আসতে খুব-ই দেরি হয়ে গেল। তবে কাদম্বিনী সময়মতো পৌঁছে সকলকেই খবরটা দিয়েছিল। রোজ একঘণ্টা আগে— সে স্কুলে আসে, এ-কথা সব টিচারেররা, ওর ছাত্র-ছাত্রীরাই জানে তাই কেউ কিছু মনে করেনি। দু-টি ক্লাস মিস হয়েছে ওর। অন্য টিচারেরা সে, দু-টি ক্লাস নিয়ে নিয়েছেন।
বাড়ি ফিরে স্নান করে আতশ শুয়েছিল। বাইধর সব শুনেছে, আতশের কাছে। ওরও মন খারাপ খুব।
গদাধরের বউ খুব-ই ছেলেমানুষ। তারও বোধ হয় পনেরো বছরেই বিয়ে হয়েছিল, যে বয়সে হেমার বিয়ে দেবে বলে ঠিক করে রেখেছিল গদাধর। দেখতে শুনতে ভালোই, তিরিশের নীচে বয়েস। সে কী করে ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়ে নিয়ে এই গভীর জঙ্গলবেষ্টিত গ্রামে বছরের অনেকগুলো মাস প্রোষিতভতৃকা হয়ে থাকে, তা কে জানে! জংলি জানোয়ারের তো অভাব নেই। হালকা পলকা বাঁশের কঞ্চির বেড়া ভেঙে বুনো শুয়োর বা বারা ও শজারুরা তো আসেই, এসে ফসল খেয়ে যায়। তা ছাড়া, মানুষদের মধ্যেও তো ‘জানোয়ার’-এর অভাব নেই। তা ছাড়া ওদের বাড়ি তো গ্রামেও নয়, গ্রামের বাইরে।
ডাল-টাল লাগালে হরিণ শম্বরও আসে। মটরশুঁটি লাগলে আসে ধাড়ি খরগোশগুলো।
এসব কথা জানে আতশ মাধবজেঠুর তৈলার মানুষদের কাছ থেকে। জঙ্গলের মধ্যের আবাদকে ওড়িয়াতে বলে ‘তৈলা’। বিমলজেঠু কখনো-কখনো অঙ্গুলের শিকারি বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। রাতে রাম আর খিচুড়ি খাইয়ে তাদের খুশি করে তাদের দিয়ে শুয়োর-শজারু মারিয়ে দিন কয়েকের জন্যে নিশ্চিন্ত হন। সেই বারা আর শজারুর মাংস গরিব মানুষগুলো মহানন্দেই খায়। সেই জমায়েতে রেঞ্জার সাহেবকেও ডেকে নেন। বিমলজেঠু নিজের খেতের ওপরে জানোয়ার মারলে বনের আইন লঙ্ঘিত হয় না। বজ্র আঁটুনি, ফসকা গেরো। তবে বিমলজেঠুর মুখেই শুনেছে যে, শিগগিরি ওসব অঞ্চল সাতকোশীয়া নণ্ড অভয়ারণ্য নামের এক অভয়ারণ্যের অধীনে চলে যাবে। তখন এখানে খরগোশ মারলেও জেলে যেতে হবে, ফাইনও হবে।
মহানদী তার উৎসমুখ থেকে বেরিয়ে চোদ্দো মাইল অর্থাৎ সাতকোশ পথ এক গভীর গন্ড দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সেই গন্ডে বড়ো বড়ো রুই, মহাশোল মাছ এবং কুমির আর মেছোকুমিরের বাস। নদীর ওপারে টিকরপাড়া, যেখানে কুমির প্রকল্পও হয়েছে। নদী বা নদের এপারে পুরুণাকোট, বাঘবমুন্ডা, টুল্টবকা, লবঙ্গী, রায়গড়া ইত্যাদি জঙ্গল আর টিকরপাড়ার ঘাটে ফেরি পেরিয়ে ও পারে গেলে দশপাল্লা, বৌধ, ও ফুলবাণীর জঙ্গল। গদাধরের মুখে এপারে-ওপারের সেইসব ভীষণ গহন জঙ্গলের কথা শুনেছে আতশ কিন্তু এপর্যন্ত কোথাও যাওয়া হয়নি এক পুরুণাকোট হয়ে টিকরপাড়া যাওয়া ছাড়া। যাবে এবার পুজোর ছুটিতে। পুজোর ছুটি দেখতে দেখতে এসে যাবে। এবারে নাকি লবঙ্গীর জঙ্গল নিলামে নিয়েছেন পাল্টববাবুরা। জঙ্গলের গভীরে একটা নালার পাশে খড়ের ঘরের ক্যাম্প তৈরি হবে। সেখানে গিয়েই থাকবে তখন গদাধর। আতশও সঙ্গে যাবে।
শুয়ে শুয়ে নানা কথা ভাবছিল এখন সময়ে ফোনটা বাজল। কাদম্বিনী ফোন করেছে পুরুণাকোট থেকে। বলল, দাহ শেষ করে গদাধরদা এসে হাসপাতালে নার্সকে বলে গেছে যে, আজ আর আপনার কাছে যেতে পারবে না—ওর বউ-ছেলেকে নিয়ে ফিরতে হবে বাড়িতে। কাল আপনার সঙ্গে দেখা করবে। আপনি যে-টাকাটা দিয়েছেন তা কী করে শোধ করবে তাও তখন বলবে। পরশু সে নাকি কটকে যাবে ওর বাবুদের কাছ। বাবু যেন, কিছু মনে না করেন।
ফোন ছেড়ে দিয়ে আতশ ভাবছিল মানুষটার বিবেকের কথা। আতশ নিজে শবদেহ চিতায় ওঠানোর পরেই চলে এসেছিল। গদাধরের স্ত্রীর কান্না আর সহ্য করতে পারছিল না। তা ছাড়া আরও অনেকে তো সেখানে ছিল, যারা গদাধরের আপন লোক। যাদের সঙ্গে গদাধর স্বচ্ছন্দ বোধ করে। শত হলেও আতশের শ্রেণি তো বাবুর-ই শ্রেণি। যতই ও গদাধরের কাছের মানুষ বলে নিজেকে ভাবুক না কেন—তা কাকের ময়ূরপুচ্ছর-ই মতো হয়ে যায় নিশ্চয়ই ওদের কাছে। বিভিন্ন শ্রেণির এই বিন্যাসকে এক করে তুলতে আর কতদিন লাগবে কে জানে! আতশের জীবদ্দশাতে কি দেখে যেতে পারবে?
রিসিভারটা নামিয়ে রেখে যখন ফিরে এসেছিল তখন ফোনটা আবারও বাজল।
তুলতেই শুনল ও পাশ থেকে নন্দা বউদির গলা। চোরের মতো গলা।
আতশের সমস্ত মন বিতৃষ্ণায় ভরে গেল নন্দার গলা শুনেই। এক গভীর অপরাধবোধে ওর মন নতুন করে বর্ষার ঘন কালো মেঘের মতো হয়ে গেল।
নন্দা বউদি বলল, একটা এস. টি. ডি. বুথ থেকে বলছি। বাড়ি থেকে কী তোমাদের বাড়ি থেকেও তো এ-কথা বলা যেত না।
কী কথা?
এ-মাসে আমার হয়নি।
বিরক্ত গলাতে আতশ বলল, তার মানে?
মানে, আমি কনসিভ করেছি।
লজ্জাতে আতশের সারাশরীর রি রি করে উঠল। নলিনীর সুন্দর অপাপবিদ্ধ মুখটি চোখের সামনে ভেসে উঠল। আতশ মুখে কিছু বলল না। চুপ করে থাকল।
নন্দা বলল, এবারে নলিনীর দাদা নন্দনকে বলতে হবে কথাটা। জানি না, কীভাবে নেবে ব্যাপারটা। ও বিশ্বাস করবে কি না! তবে তোমার সঙ্গে ওর গায়ের রং ও চেহারার এমন-ই মিল যে, বেবি যখন হবে, তখন ওর সব সন্দেহের নিরসন হবে।
তারপর বলল, আসল বাবা তো তুমিই। তাই তোমাকেই সবচেয়ে আগে জানালাম। মাউসি আর নলিনীকেও জানাব। ওরাও খুব খুশি হবেন এই শুনে। আমার মাকেও জানাতে হবে। তাঁরও খুশির শেষ থাকবে না। আর তোমাকে কী বলব আতশ। আমি সারাজীবনের মতো তোমার বাঁদি হয়ে থাকব। তুমি যখন চাইবে, আমাকে পাবে আর যদি কখনো না চাও, আমাকে ঘেন্না করো, তাহলে নিজেকে দূরে সরিয়েই রাখব। বাকিজীবন আমার আদরের সন্তান হয়ে তুমি তো আমার চোখেই থাকবে। তাতেই খুশি থাকব আমি। আমার কাছ থেকে এ-জীবনের মতো তুমি কোথাওই পালাতে পারবে না।
আতশের বিরক্তি যাচ্ছিল না।
বলল, নলিনী কবে ফিরে গেল ভুবনেশ্বরে?
তুমি যাওয়ার পরদিন-ই তো। তোমাকে চিঠি লিখবে বলেছে। ও এমন-ই ভালোবাসে আমাকে যে, কোনোদিন এই সত্য প্রকাশ হয়ে পড়লেও ও আমাকে ক্ষমা নিশ্চয়ই করবে। আমার বিশ্বাস আছে। আমার দুঃখের রকমটা যে, ওর জানা—দুঃখের নানা রকম হয়—যা শুধুমাত্র একজন মেয়ের-ই বোঝার। কোনো পুরুষের পক্ষে, এই কষ্টর কথা বোঝা কখনোই সম্ভব নয়। তাদের বলেও লাভ নেই। অনেক কথাই থাকে, যা, একজন মেয়ে অন্য আর একজন মেয়ের কাছেই বলতে পারে।
তারপর বলল, ভালো থেকো। সন্ধে সাতটার আগে আমাকে ফোন কোরো। যদি সময় পাও। আর তোমাদের বাড়িতেও করতে পারো, শনিবার সকাল এগারোটা থেকে একটার মধ্যে আমি তখন তোমাদের বাড়িতেই থাকি। মাউসির সঙ্গে তোমার কথা হয়ে গেলে আমি তোমার সঙ্গে বলব কথা।
তারপর-ই বলল, না, থাক, আমাকে ফোন করার দরকার নেই তোমার। আমি এস. টি. ডি. বুথ থেকে তোমাকে ফোন করে নেব। রাখছি। ভালো থেকো। তোমার কাছে, যা-ঋণ জমা রইল তা এ-জীবনে শেষ করার নয় আতশ।
ছেড়ে দেওয়ার আগে আবার বলল, তুমি দেখো, তোমার ছেলে অথবা মেয়ে যা-ই হোক, তাকে কেমন করে মানুষ করে তুলি। ছাড়ছি।
এবারে ফোনটা সত্যিই ছেড়ে দিল।
এক গভীর বিষণ্ণতাতে ডুবে গেল আতশ।
বাইধরকে বলল, কী রেঁধেছিস আজ?
রুটি আর ছানার ডালনা।
ক্ষীর আছে?
আছে।
আম আছে?
আছে। আম আর পাওয়া যাবে না। আর দু-একদিন।
ক্ষীর দিয়ে আম দিয়ে খাব।
হহউ আইজ্ঞাঁ। বাইধর বলল।
ওড়িয়াতে দুধকে ‘ক্ষীর’ বলে।
বাইধর বলল, পনসও আর বেশিদিন পাওয়া যাবে না। তাই কাল পনসর তরকারি করব।
করিস যা খুশি, অন্যমনস্ক গলাতে বলল আতশ।
সে ফোন্বটা কার আসিথিলা?
তা দেইকি তম কন কাম্ব? যা নিজকার্য কর যাইকি।
হউ! আইজ্ঞাঁ।
বলে, বাইধর চলে গেল।
বর্ষা পুরো নেমে গেছে। লাগাতার বৃষ্টি পড়ছে। একবার জোরে, একবার আস্তে। ছেলে আর বউকে নিয়ে অতখানি পথ, এই দুর্যোগের মধ্যে পাহাড়ে-জঙ্গলে কী করে গেল গদাধর কে জানে! সারাদিন তো ওদের খাওয়াও হয়নি কিছু। রাতে বাড়ি পৌঁছেই বা কী খাবে? সন্তান-হারা, পাঁচরাত জেগে-থাকা মা কি রাঁধতে পারবে কিছু? না খেয়েই হয়তো থাকবে তিনজন। সারাবছর-ই তো না খেয়ে থাকার মতোই থাকে। তবু কিন্তু পুরো উপবাসে তো থাকে না! কোনো অনুযোগ নেই, প্রতিবাদ নেই, রাগ নেই, ক্ষোভ নেই, প্রতিহিংসা নেই, এক আশ্চর্য ‘মনুষ্যেতর’ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে ওরা। ওদের গায়ে চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছে করে আতশের, লাগে কি না। সর্বংসহ হয়ে গেছে ওরা, ওই অরণ্যবাসী লোকজন ও স্কুলের পোড়োদের বাবা-মায়েরা।
এই অঞ্চলের অর্থনীতি পুরোপুরিই অরণ্যনির্ভর। অরণ্যই তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। বাড়িঘর বানাবার মতো সামগ্রী, সারাবছরের খাদ্যসংস্থান—অরণ্যের ফুল, শাকপাতা মূল, অরণ্যের পশুপাখি, অরণ্যের মধ্যে থেকে বাঁশ, কাঠ, মধু, নানা ভেষজ দ্রব্য আহরণকারী ঠিকাদারদের হয়ে দিন-মজুরি খাটা এই তাদের জীবিকা। এইসব ঠিকাদারদের অধিকাংশই শহরে থাকেন। তাঁদের হয়ে কাজ করে তাঁদের মুহুরিরা। নানা মহীরুহ উৎপাটন করে প্রকান্ড মোটা মোটা কাঠের লগ, ট্রাকের পর ট্রাক চলে যায় কটকের কাঠপট্টিতে। সেখান থেকে সারাভারতবর্ষে। শাল, সেগুন, তেঁতরা, সিধা, মিটকুনিয়া, বিজা, হলুদ, গেন্ডুলি, নানা কাঠ। প্রাসাদোপম বাড়িতে বাস করেন মালিকেরা—নতুন নতুন মডেলের গাড়ি চড়েন। তাদের ছেলেমেয়েরা দিল্লি, হায়দরাবাদ, পুণে, ভুবনেশ্বর, কলকাতায় পড়ে—তারপর চলে যায় বিলেত, আমেরিকা, কানাডা, আজকাল অস্ট্রেলিয়াতেও যাচ্ছে অনেক ছেলে-মেয়ে—তারপর বেশির ভাগ-ই থেকেই যায় সেইসব দেশে, নিজের দেশে আর ফেরে না। নবীন পট্টনায়েকও হয়তো ফিরতেন না, যদি-না মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার জন্যে নির্বাচনে দাঁড়াতেন। এই গদাধর বা বাইধর বা কাদম্বিনীদের জন্যে কারোর-ই মাথাব্যথা নেই। বক্তৃতা আছে, প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি আছে কিন্তু দরদ নেই—কোনো রাজ্যেই নেই—ওড়িশা কোনো ব্যতিক্রম নয়। লাল, নীল, হলুদ পতাকাধারী নানা দলের চোর ডাকাত খুনে গুণ্ডারা গদি দখল করে বসে আছে! নির্বাচনে অবাধ রিগিং হচ্ছে। দুর্নতিতে ডুবে গেছে সারাদেশ। সাধারণ মানুষ আরও কতদিন সহ্য করবে? হাতে বন্দুক তুলে নেওয়া ছাড়া আর কোন পথ খোলা আছে এই বদমায়েশদের শায়েস্তা করবার জন্যে?
আতশ-এর চোখের সামনে সেই ধুতি-পরা গায়ে গামছা জড়ানো টগবগে যুবকের মুখটা মনে পড়ে গেল। যে বলছিল, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে, ভীম্ব না কী যেন নাম, বলছিল, ‘এই ডাক্তারটাকে শিক্ষা দেওয়া দরকার।’ গদাধর তাড়াতাড়ি তাকে চুপ করতে বলেছিল ভয় পেয়ে। এই অঞ্চলে অন্য কোনো ডাক্তারও নেই, অন্য কোনো হাসপাতালও নেই। ওরা করবেই বা কী?
বাইধরকে বলল, আজ তাড়াতাড়ি খেতে দিয়ে দিস বাইধর।
হউ আইজ্ঞাঁ।
বলল বাইধর।
বড়ো অপরাধী বোধ করছে আতশ। বোধ করছে গত পনেরো দিন থেকেই। অথচ সেই অপরাধের কথা কারোকে বলে যে, হালকা হবে তারও কোনো উপায় নেই। একা একাই কষ্ট পেতে হচ্ছে তাকে। শুধু কষ্টই নয়, এই অপরাধবোধের মধ্যে এক গর্হিত আনন্দও সুপ্ত আছে। কারোকেই বলা যাবে না তা।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে সে ভাবছিল, সেই ঘটনার কথা। ব্যাং ডাকছে। নালার পাড়ে সাপে ব্যাং ধরেছে। বৃষ্টির মধ্যেই দুটো পেঁচা উড়ে-ঘুরে ঝগড়া করছে। রাতের শেষ বাস হর্ন বাজাতে বাজাতে বড়োরাস্তা দিয়ে চলে গেল অঙ্গুলের দিকে। টিকরপাড়া থেকে আসে সে-বাস। চাদরটা পায়ের কাছ থেকে টেনে গায়ে দিল আতশ তারপর কোলবালিশ জড়িয়ে শুয়ে পড়ল।
মা আর নলিনী প্রশান্ত পারিজার নাতনির অন্নপ্রাশনে গিয়েছিল। এগারোটা নাগাদ গিয়েছিল, ফিরতে ফিরতে বিকেল হবে। প্রশান্তবাবু বাবার খুব বন্ধু ছিলেন। তিনিও গত হয়েছেন। তাঁর দুই ছেলে একসঙ্গেই থাকে। দু-জনেই ভালো চাকরি করে। বাবার করে যাওয়া বাড়িতে থাকে। মা আছেন। প্রশান্তবাবুর স্ত্রীও আতশ-এর মায়ের খুব-ই বন্ধু। এঁরা সবাই অঙ্গুলের পুরোনো বাসিন্দা। ওঁর ছোটোছেলের প্রথম মেয়ের অন্নপ্রাশন।
ওঁরা সাইকেলরিকশা করে যেতে-না-যেতেই নন্দা বউদি এলেন ওদের বাড়িতে। ওদের কাজের লোক পটারও আজ নেমন্তন্ন। যাওয়ার আগে রেঁধে দিয়ে গেছে। আতশের এইসব সামাজিক ক্রিয়াকান্ড ভালো লাগে না, তাই সে যায়নি। নলিনী যখন এল মাকে নিয়ে যেতে তখন বলল, বউদিকে বলে এসেছি, এসে তোমার খাবার গরম করে তোমাকে খাইয়ে তারপর বাড়ি যাবে। এখানেও খেয়ে যেতে পারো ইচ্ছে করলে। দাদা তো দুপুরে ফেরে না।
বা: বা:। এর কী দরকার ছিল? খাবারটা কি আমি, একদিন গরম করে নিতে পারতাম না?
মা বলেছিলেন, ‘চুপ কর। তুই কি গ্যাস জ্বালাতে জানিস? খালি জানিস তো পড়াশুনো করতে। অকর্মার ঢেঁকি একটা।’
যাওয়ার সময়ে নলিনী বলল, ‘বউদিকে আসতে বলেছি। কিন্তু দেখো ফাঁকা বাড়ি, আমার অপরূপা সুন্দরী বউদির সঙ্গে কোনো দুষ্টুমি কোরো না যেন। বউদি কিন্তু খুব কনজারভেটিভ। আর দাদা যে, রগচটা তা তো জানোই।’
মা বললেন, ‘কথা শোনো ফাজিল মেয়ের।’
‘চললাম’, বলল নলিনী। ‘ফিরে এসে কফি খাব আর তোমার সঙ্গে গল্প করব।’
মা বললেন, ‘তোরা দু-জনে সারাজীবন কি পড়াশোনাই করবি? বিয়ে-থা করে কবে সেটল করবি।’
নলিনী আতশ-এর দিকে আড়চোখে চেয়ে বলল, ‘বিয়ে করার মতো ছেলেই দেখি না।’
মা চুপ করে রইলেন। বললেন না কিছু।
নন্দা বউদি এল, ওরা চলে যাওয়ার মিনিট পনেরোর মধ্যেই। নন্দার মুখ-চোখ দেখে মনে হল জ্বর হয়েছে। একটা লাল-কালো রঙা কটকি শাড়ি পরেছে। জরির কাজ করা। সঙ্গে লাল ব্লাউজ। কিছুক্ষণ আগেই স্নান করেছে। আতর মেখেছে বোধ হয়, জুঁই কিংবা বেলি। চুল বাঁধেনি। পিঠের ওপরে ভরা শ্রাবণের মতো ভিজে চুল খোলা। ‘জবাকুসুম’ কী ‘লক্ষ্মীবিলাস’ তেল মেখেছে মাথাতে। নাকি ‘এলীন’? সুগন্ধ ভুর ভুর করছে।
নন্দা হাতে করে এক প্যাকেট ধূপকাঠি নিয়ে এসেছিল। রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাস জ্বালানোর লাইটারটি দিয়ে চারটি ধূপকাঠি একসঙ্গে ধরিয়ে আতশের পড়ার টেবিলের ওপর পেপার-ওয়েট চাপা দিয়ে রাখল। ঘরময় সুন্দর ধূপের গন্ধ ভরে গেল।
মুখ নীচু করে বলল, ‘সমলেশ্বরীর মন্দিরে এই, গণপতি মার্কা ধূপ জ্বালানো হয়।
ঘরের দরজাটা এবং বাগানের দিকের দুটো জানলাই খোলা ছিল। রঙ্গনের ঝোপে মৌটুসি এবং পেয়ারাগাছের ডালে বুলবুলি শিস দিচ্ছিল। খোলা জানলা দুটোর দিকে চেয়ে নন্দা বলল, গেটের চাবিটা কোথায় থাকে?
বসার ঘরে দেওয়ালে টাঙানো আছে। কিন্তু কেন?
বলব পরে।
‘আমি একটু আসছি’ —বলেই নন্দা গেট-এর চাবিটা নিয়ে বাগান পেরিয়ে বাইরের গেট-এর কাছে চলে গেল। গেটটা বন্ধ করার শব্দ শোনা গেল। তেল না দেওয়াতে ‘ক্যাঁচ ক্যাঁচ’ শব্দ করে গেটটা খোলা-বন্ধর সময়ে। তারপর, ঘরে ফিরে এসে, দরজাটা লাগিয়ে দিল। বলল, জানলা খোলাই থাক।
আতশ হতবাক হয়ে গিয়েছিল। গলা শুকিয়ে আসছিল তার ভীষণ ভয়ে, উদবেগে।
নন্দা আতশকে বিছানার ওপরে টেনে নিল। বলল, একটা ভিক্ষা নিয়ে এসেছি আমি। জানি আতশ, তুমি ভাবছ আমি নলিনীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, জানতে পারলেও নলিনী হয়তো আমাদের ক্ষমা করবে।
দীর্ঘক্ষণ পরে নন্দা বলল, উঠতে তো হবেই, ছেড়ে যেতেও হবে। তোমার কাছে একটি সন্তানের ভিক্ষা নিয়ে এসেছিলাম। তুমি আমাকে সম্পূর্ণা করলে আতশ। এ যে, কত বড়ো দান, তুমি আজ দিলে তা তোমাকে বোঝাতে পারব না। আমি জানি, নলিনীর প্রতি, আমি চরম বিশ্বাসঘাতকতকা করলাম। তোমারও তেমন-ই মনে হতে পারে। কিন্তু এই ঘটনা নিহিত সংগোপনে থাকবে আমাদের মাঝে। যখন আমার সন্তান হবে তখন তুমি তাকে দেখে জানবে ও তোমার-ই মুহূর্তের দান। তোমার নন্দনদাও খুব খুশি হবে, খুশি হবে নলিনী। এতে খুশি হবেন ঈশ্বর। আমরা তো কারোরই কোনো ক্ষতি করিনি আতশ।
আতশ অস্ফুটে বলল, আজ তুমি ভিক্ষা চাইলে আমার কাছে। ভবিষ্যতে যদি তোমার কাছ থেকে আমি ভিক্ষা চাই?
চেয়ো না আতশ। চাইলে, আমি না করতে পারব না তোমাকে। কিন্তু নলিনীর কথা ভেবে আমাদের দু-জনের-ই সেই চাওয়া-পাওয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। তুমি একদিন নিজেই বুঝতে পারবে যে, পাওয়ার চেয়েও না-পাওয়ার আনন্দ, কত গভীর। তোমাকে আজ তা বোঝাতে পারব না।
কাপড়জামা নিয়ে নন্দা উঠে বাথরুমে গেল।
যাওয়ার আগে বলল, শুনছ, গেট-এর তালাটা এবারে খুলে দিয়ে এসো।
বাইধর এসে, আতশের চিন্তার জাল ছিঁড়ে-খুঁড়ে দিয়ে বলল, খাবার লাগিয়ে দিয়েছি বাবু।
চমকে উঠল আতশ। ও তো করতপটাতে ওর ভাড়াবাড়িতে আছে। এক গভীর আচ্ছন্নতাতে ডুবেছিল সে। বড়ো পাপ হে, বড়ো পাপ! নিজের মনেই বলল আতশ! তারপর খেতে গেল।
আগামীকাল মুসলমানদের কী একটা পরব আছে। স্কুল বন্ধ। আজ বন্ধ থাকলে ভালো হত। গদাধরের মেয়ের দাহর শেষ অবধি থাকতে পারত এবং গদাধরের বউ আর ছেলেকে বাইকের পেছনে বসিয়ে পৌঁছিয়েও দিয়ে আসতে পারত।
নন্দার টেলিফোনের অভিঘাতের ধাক্কাটাও বড়ো কম ধাক্কা নয়। সামলাতে সময় নেবে। আগামীকাল ছুটি হয়ে ভালোই হল। এই ছুটিটা, ওই ধাক্কাটা সামলাতে সাহায্য করবে কিছুটা। আতশ যে, ‘বাবা হবে’ —এই ভাবনাটাই তাকে রীতিমতো বিধ্বস্ত করেছে অথচ ওর ভীষণ-ই সুখী হওয়ার কথা ছিল।
কিছুদিন আগে অবধিও আতশের মা ‘চান্দ্রায়ণ’ ব্রত পালন করতেন। এখন দিদিদের বকাবকিতে আর আতশেরও কথাতে করা বন্ধ করেছেন। কোনো পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যে, এই ব্রত পালিত হয়। আতশ জানে না, কোন পাপ স্থালনের জন্যে, মা ওই ব্রত পালন করতেন। তবে সংসারে এমন মানুষ কী একজনও আছেন যাঁর পাপ নেই কোনো? গোপন পাপ। তবে যেসব দু-কান-কাটা মানুষের ‘পাপবোধ’-ই নেই তাঁদের কথা আলাদা।
এই ব্রত চাঁদের তিথি অনুসারে পালিত হয়। পূর্ণিমাতে পনেরো গ্রাস খেয়ে তারপর থেকে প্রত্যেকদিন এক এক গ্রাস কম করে খেতে খেতে, অমাবস্যাতে এসে পূর্ণ উপবাস। তারপর এক এক গ্রাস করে খাওয়া বাড়িয়ে পূর্ণিমাতে পৌঁছে আবার পনেরো গ্রাস খাওয়া। পূর্ণ আহার। তার মানে, এই ব্রত পালনে পুরো একমাস লাগে।
আতশ ভাবছিল, তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চান্দ্রায়ণ করবে ও এবারে। প্রায়শ্চিত্ত হোক আর নাই হোক মনটা তো শান্ত হবে।
কাগজগুলো পড়া হয়ে গেছে। জলখাবার খাওয়া হয়েছে। আচারের তেল দিয়ে মুড়ি মেখে দিয়েছে বাইধর সঙ্গে কাঁঠালের বিচিভাজা। গতবছরের কাঁঠালের বিচি রোদে শুকিয়ে রেখেছে বাইধর ধুয়ে-টুয়ে। মুড়ি দিয়ে কাঁঠালের বিচিভাজা খেতে বেশ লাগে।
তখন সাড়ে আটটা বাজে। অঙ্গুলের দিক থেকে বাসটা গেল টিকরপাড়ার দিকে। অঙ্গুল থেকে শাটল-বাসও আসা-যাওয়া কবে পুরুণাকোট হয়ে টিকরপাড়া অবধি আবার কটক থেকেও টিকরপাড়া অবধি আসে বাস চৌদুয়ার, হিন্দোল, ঢেনকানল এবং অঙ্গুল হয়ে। ঢেনকানলের বড়ো রাস্তার ওপরেই অঙ্গুলে আসতে ডানদিকে পড়ে সরু সরু থামআলা সরু বারান্দা সমেত একতলা একটি বাড়ি। এটি অন্নদাংশকর রায় মশায়দের বাড়ি। তাঁর ছেলেবেলা ঢেনকানলেই কেটেছিল। তখন অবশ্য ঢেনকানল আজকের ঢেনকানল ছিল না। বিমলজেঠুর মুখে ঢেনকানল-এর নিনিকুমার অর্থাৎ ছোটোকুমারের কথা অনেক শুনেছে আতশ। তিনি নাকি খুব ভালো শিকারি ছিলেন। কলকাতা থেকে তাঁর এক বন্ধু আসতেন শিকারে। সুধীরঞ্জন দাস মশায়ের ছোটোছেলে মানিক দাস। সাহেবি আমলের অ্যান্ড্রু ইউল কোম্পানিতে কাজ করতেন। ‘হোম লিভ’-এ বিলেতে না গিয়ে জঙ্গলে আসতেন শিকারে। সপরিবারে বন-বাংলোয় থাকার পারমিট নিয়ে আসতেন। এখানের বাঘবমুন্ডা বাংলোতে থেকে তিনি একটি বড়োবাঘ মেরেছিলেন। পারমিট রিনিউ করার জন্যে এক শীতের দুপুরে বাঘবমুন্ডা থেকে অঙ্গুলে গিয়ে ফিরে আসার সময়ে জিপ-অ্যাকসিডেন্টে উনি এবং ওঁর একমেয়ে মারা যান। স্ত্রী এবং অন্য মেয়েও সাংঘাতিক আহত হন। নিনিকুমার-ই জিপ চালাচ্ছিলেন। দুপুরবেলা, মদ-টদও কেউই কিছু খাননি।—‘নিয়তি’ কাকে বলে!
বারান্দাতে বসেই আতশ দেখল, গদাধর আসছে।
তুমি কোথা থেকে গদাধরদাদা?
বাইধর বলল।
এই তো। কটক থেকে। কাল আমি আর বাড়ি ফিরিনি। হেমার দাহ হয়ে গেলে ভীম্বই বউ আর ছেলেকে নিয়ে গেছিল আমার বাড়িতে। আমি কটকের বাস ধরে রাতেই মঙ্গলাবাদে বাবুদের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছোলাম। সব শুনে তো মেজোবাবু খুব-ই দুঃখ করলেন। তখন বাবু খেতে বসেছিলেন। আমাকেও খেতে দিতে বললেন ঠাকুরকে। রান্নাঘরের বারান্দাতে বসে খেয়ে নিলাম। খেতে ইচ্ছে করছিল না মোটে কিন্তু কী করা যাবে? শরীর তো রাখতে হবে।
খাওয়ার পরে মেজোবাবু জঙ্গলের কথা পাড়লেন। বললেন, এবারে তো পুজো দেরিতে। অঙ্গুলের নিলামে এবার লবঙ্গীর জঙ্গলটাই ডেকে নেব ঠিক করেছি গদাধর। শূরবাবুরা যত-দাম-ই তুলুন আমি এবারে ছবি দাস বা নরেন শূরের ছেলেদেরও নিতে দেব না। তোমরাই তো ভরসা। তোমরাই তো আমার হাত-পা।
তুমি কী বললে?
আতশ বলল।
আমি বললাম, সে তো এক-শোবার। আমরা তো আপনাদের জন্যেই বেঁচে আছি।
তারপর মেজোবাবু বললেন, তোমার মেয়েটার বয়েস কত হয়েছিল?
এগারো বছর বাবু।
তাহলে তো ক-বছর পরে বিয়েও দিতে, নাকি?
তাতো বটেই। ভেবে তো ছিলাম পনেরোতে পড়লেই বিয়ে দিয়ে দেব।
তোমার অনেকগুলো টাকা বেঁচে গেল। কী বলো?
বাবু বললেন।
তাই বললেন?
হ্যাঁ বাবু। শুনে আমার খুব কষ্ট হল। আমার মেয়েটাই চলে গেল। ক-টাকা আর বাঁচল? মেয়ের বিয়েতে কীই বা খরচ করতে পারতাম? বাবু হয়তো দেড়-দু-হাজার ধরে দিতেন।
সে কী? তোমার সব টাকা তো ওঁর কাছেই জমা আছে। তুমি যত টাকা চাইতে তত টাকাই তো ওঁর দেওয়ার কথা।
তা কি ওঁরা পারেন বাবু? কতরকম কারবার—কত দিকে কত টাকা খাটছে—বললেই কী আর ঝপ করে টাকা দিতে পারেন?
তারপর বলল, আমি আপনার কথা বললাম মেজোবাবুকে। শুনে খুব খুশি হলেন। বললেন, তাহলে তো ভালো মুরুব্বিই জুটিয়েছ গদাধর, এতদিনে। কিন্তু একটু দূরে দূরে থেকো। ওই মাস্টার-ফাস্টার মানুষগুলো সুবিধের হয় না, বদবুদ্ধি দিতে ওস্তাদ।
আমি তখন বললাম, হেডমাস্টারবাবু নিজের থেকে এবং ধার করে আমাকে দু-হাজারের বেশি টাকা দিয়েছেন। তাঁকে টাকাটা শোধ দিতে হবে বলেই আমি আপনার কাছে এসেছি।
তা মাস্টার তো দেখছি মস্ত বড়োলোক হে! সে করতপটার মতো স্কুলে মাস্টারি করছে কেন?
তা তো বলতে পারব না।
তারপর বাবু বললেন, শেয়ার বাজারে ধস নেমেছে তা কি জান?
সেটা কী বাবু?
গদাধর বলল।
ওসব জেনে তোমার লাভও নেই। কিন্তু আমার প্রাণ যাওয়ার মতো অবস্থা। সেনসেক্স একেবারে শুয়ে পড়েছে।
তিনি কে বাবু?
ও তুমি চিনবে না।
তুমি পনেরো-শো টাকা নিয়ে যাও, না-হয় আরও এক হাজার নাও। ধার শুধবে, একমাস খাবে। সবসুদ্ধু আড়াই হাজার দিতে বলছি ক্রষ্ণ ক্যাশিয়ারকে। বলেই, ডাকলেন ‘ক্রষ্ণ’ বলে।
তারপর বললেন, সেবার সহদেব গাছ চাপা পড়ে মরল টুল্টবকাতে—তার ছেলেকে কত দিয়েছিলাম মনে আছে?
আছে বাবু। আড়াই হাজার।
তোমাকেও দিলাম আড়াই হাজার। খুশি তো তুমি?
আমি বললাম, খুব খুশি।
আতশ বলল, তোমার সবসুদ্ধু কত টাকা জমেছে বাবুর কাছে?
তা তো জিজ্ঞেস করিনি বাবু।
তিনিও তোমাকে বলেননি কখনো?
না তো বাবু।
এই আড়াই হাজার টাকা কি তোমার টাকা থেকেই দিলেন, না, বাবু খয়রাত করলেন তোমাকে?
না, না, আমার টাকা থেকেই। ক্যাশিয়ার সই করিয়ে নিল হাত-চিঠায়।
আতশ বলল, হুঁ। রাতে থাকলে কোথায়?
বাবুদের গদিঘরে। তক্তপোশের ওপরে শতরঞ্জি পাতা, তাতেই শুয়ে পড়লাম খাওয়ার পর হাতে মাথা দিয়ে।
জঙ্গলে যখন কাজ হবে তখন বাবু একদিনও আসবেন না জঙ্গলে?
তা এক-দু-দিন আসবেন নিশ্চয়ই। নিজের জিপ নিয়ে আসবেন। পঞ্চানন ড্রাইভার জিপ চালিয়ে আসবে। তবে রাতে জঙ্গলে থাকেন না বাবু। লবঙ্গীতে এলে সেখান থেকে বিকেল বিকেল বেরিয়ে পুরুণাকোটের বন-বাংলোতে থাকবেন এসে, নয়তো অঙ্গুলের সার্কিট হাউসে। পরদিন ভোরেই বেরিয়ে অঙ্গুলে চা-জলখাবার খেয়ে সোজা কটক।
তোমার বাবুর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।
বাইধর গদাধরকেও আমের আচারের তেলমাখা মুড়ি আর কাঁঠালবিচিভাজা এনে দিয়েছিল। আর চা।
গদাধর তার ধুতির খুঁট খুলতে খুলতে বলল, আগে টাকাটা রাখুন বাবু। এই আড়াই হাজার। আমি আলাদা করে গিঁট দিয়ে এনেছি।
আগে খাও তো গদাধর।
খাচ্ছি। কিন্তু টাকাটা ধরুন।
আমাকে তোমার টাকা শোধ দিতে হবে না। তুমি পুরুণাকোটের কাদম্বিনী দিদির টাকাটা শুধু শোধ করে দিয়ো।
সে কী বাবু? আমাকে আপনি এ, কী পাপের মধ্যে ফেললেন? আমার যে, চান্দ্রায়ণ ব্রত করতে হবে নইলে, এ-পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে কী করে?
খাও, মুড়ি খাও।
গদাধর, চায়ে এক চুমুক দিয়ে বলল, সারাটা জীবন ধরেই তো চান্দ্রায়ণ করছি বাবু তবু প্রায়শ্চিত্ত হল কোথায়? পাপের কী শেষ আছে, আমার, আমাদের?
আতশ-এর চোখে জল এসে গিয়েছিল। সে মুখটা ঘুরিয়ে নিল। এই ওর এক দোষ। ইদানীং ভীষণ-ই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে। কথায় কথায় চোখে জল চলে আসে। দুঃখে তো আসেই, আনন্দেও আসে। সত্যি!
নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আচ্ছা গদাধর, কাল হাসপাতালের সামনে একটি ছেলে দাঁড়িয়েছিল, লম্বা-চওড়া, খুব ভালো স্বাস্থ্য—কী যেন, নামে ডাকলে তুমি? ভীম্ব না কী যেন? সে বলছিল, এই ডাক্তারকে একটু শিক্ষা দিতে হবে কিংবা ওরকম কিছু!
হ্যাঁ হ্যাঁ। মনে পড়েছে। ভীম্বই তো। গদাধর বলল। তারপর বলল, ও খুব সাংঘাতিক ছেলে বাবু। ও তো আমাদের-ই কাবাড়ি।
পুরুণাকোটের ননার দোকানে বিড়িবড়া আর গুলগুলা বিক্রি করত, আগে চায়ের গ্লাস ধুত, অন্যসব ফরমাশ খাটত। সকাল থেকে রাত, দিনে চার টংকা পেত। আমিই তো ওকে ডেকে নিয়ে লাগালাম কোম্পানিতে। আমার কথা তো কোম্পানি শোনে, আমিই তো হেড মুহুরি। এখন মাসে তিনশত টংকা পায়। অবস্থা ফিরে গেছে। ও-ই তো আমার পরিবারের দেখাশোনা করে। আজ বলে নয়, প্রায় দশ বছর হল। আমার বউও ওকে খুব পছন্দ করে।
ওর টাকাও মেজোবাবুর কাছে জমা থাকে?
হ্যাঁ। ওর টাকাও। ও তো একা লোক। মা-বাবা নেই। বিয়ে করেছিল, বউ সাপের কামড়ে মারা গেছে একমাসের মধ্যেই। আর বিয়ে করেনি। কিন্তু ভীষণ খরুচে। ‘এইচ. এম. টি.’ ঘড়ি কিনেছে। রোলেস গামছা ছাড়া অন্য গামছা ব্যবহার করে না। জিনস-এর প্যান্ট পরে, নাইলনের গেঞ্জি। চোখে গগলস লাগায়। হাটবারে তার ড্রেস যদি দেখেন। আমার বউকেও রঙিন ফিতে, কাঁচুলি-টাচুলি কিনে দেয়। এসব কারণেই তো মেজোবাবু ওর হাতে পুরো টাকা দেন না। বলেন, বছরে ন-মাস তো জঙ্গলেই থাকিস—খেতে অত পয়সা লাগে না। তোর হাতে টাকা পড়লেই তুই নষ্ট করবি, আমার কাছেই থাক বরং। যখন যেমন, দরকার চেয়ে নিবি।
চা খাওয়া হয়ে গেলে আতশ বলল, যাবে কীসে?
হাঁটতে থাকি—কোনো-না-কোনো বাস ওদিকে যাবে, চড়ে পড়ব রাস্তাতে। কোনো ট্রাক ধরেও যেতে পারি।
...বউটারও জ্বর কাল থেকে। তারও আবার ম্যালগানা না-হয়। গদাধর বলল।
জ্বর হলেই সঙ্গে সঙ্গে এই ওষুধটা পুরুণাকোটের ওষুধের দোকান থেকে কিনে খাইয়ে দেবে। আর অসুখটার নাম ম্যালগানা নয়। ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া।
ওই হল।
আতশ ডাকল, বাইধর।
সে এলে বলল, আমার টেবল থেকে একটু কাগজ আর একটা কলম নিয়ে আয়। কাগজ কলম এনে দিলে আতশ লিখে দিল, ‘লারিয়াগো’। বলল, এমনি জ্বর হলে এটা দেবে না। যদি কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে তবেই দেবে। আর এমনি ঠাণ্ডা লেগে জ্বর হলে ওই ওষুধটা দেবে, বলে, লিখে দিল ‘ক্যালপল’। আর যদি খুব বেশি জ্বর হয় তবে ‘ক্রোসিন’ দেবে। ক্রোসিনের নামটাও লিখে দিল ইংরেজিতে। তিনটি ওষুধের পাশে এক, দুই, তিন নাম্বার বসিয়ে দিয়ে গদাধরকে বুঝিয়ে দিল। গদাধর মুখস্থ করতে করতে উঠে দাঁড়াল।
বলল, এইসব ওষুধ-ই কি অল্প অল্প কিনে বাড়িতে রাখব মাস্টারবাবু?
রাখলে তো ভালোই হয়। তবে উলটোপালটা ওষুধ খাইও না।
তারপর বলল, জ্বর হলে খবর দিয়ো। আজকাল যেখান-সেখান থেকে ওষুধ কেনাও মুশকিল। সব জাল ওষুধ। আমার কাছে যা যা আছে, দু-চারটে করে দিয়ে দিচ্ছি। অঙ্গুলের পানিগ্রাহী কোম্পানি থেকে কেনা এসব—একেবারে খাঁটি।
ওষুধেও ভেজাল?
অবাক হয়ে বলল, গদাধর।
হ্যাঁ, বলল, আতশ।
তারপর মনে মনে বলল, শুধু ওষুধেই নয়, তেলে, আটায়, ময়দায়, সাবানে, শ্যাম্পুতে, সব জিনিসেই ভেজাল। ‘মানুষ’-এই ভেজাল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এসব কথা গদাধরকে বলে লাভ নেই।
গদাধর বলল, যাউচি আইজ্ঞাঁ।
আতশ বলল, হউ।
সেদিন সন্ধেবেলা ফোনটা এল অঙ্গুল থেকে। আতশ দুপুর বেলা মাকে করেছিল। মাকে ফোন করলেই সেই এক-ই কথা—কী খেলি? রাতে কী খাবি? ভালো করে খাওয়া-দাওয়া কর। তোর হাতদুটো শুকিয়ে গেছে। এইসব।
মা-ই আজ বললেন, জানলি, একটা সুখবর আছে।
কী?
নন্দা কনসিভ করেছে। নন্দনও খুব খুশি। নলিনী গতকাল ফোন করেছিল। তাকেও জানালাম খবরটা। ও ফোন করবে বলেছে নন্দাকে।
আতশের বুক শুকিয়ে যাচ্ছিল শুনতে শুনতে। ভাবছিল, মা যদি জানতে পারেন যে, নন্দার কোল আলো করে যে-আসবে সে, ছেলেই হোক কী মেয়ে, সে তাঁর-ই নাতি বা নাতনি, তাহলে কী হবে?
এই ফোনটা নন্দা বউদির। বলল, কী করছ?
কী আর করব? একটা বই পড়ছিলাম।
তারপর বলল, আজ দুপুরে তোমার কথা খুব মনে হচ্ছিল। ঘটনাটা স্বপ্ন কী দুঃস্বপ্ন এখনও বুঝে উঠতে পারছি না। এখনও হজম হয়নি ব্যাপারটা।
স্বপ্নও নয়, দুঃস্বপ্নও নয়। তবে স্বপ্নের-ই মতো সুন্দর কিছু। তারপর-ই বলল, তুমি কী সুন্দর তাই ভাবছিলাম আর ভেবে শিহরিত হচ্ছিলাম।
নন্দনদা কিছু বুঝতে পারেনি তো?
বুঝতে কী করে পারবে? তবে অবাক হয়েছে। যত অক্ষমতাই থাক, ও তো কখনো নিজের অক্ষমতা স্বীকার করেনি, নিজের পরীক্ষাও করায়নি কখনো তাই মনে মনে উইশফুল থিংকিং হয়তো একটা ছিলই যে, ও সক্ষম। সাতবছর পরে হঠাৎ কী করে, এই অঘটন ঘটল তা-নিয়ে ভেবেছে নিশ্চয়ই। কিন্তু খুব-ই খুশি হয়েছে। কে বলতে পারে? তোমার এই দান আমার আর নন্দনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে। আমাদের সন্তান, সেতু গড়ে দেবে আমাদের দু-জনার মধ্যে।
তারপর বলল, একটা সমস্যা হয়েছে। ডাক্তার বলছেন, আর কিছুদিন পর থেকে আমার নাকি মায়ের কাছে গিয়ে থাকা উচিত। তুমি তো জানো যে, টানা কয়েকমাস থাকার মতো পরিবেশ, আর্থিক অবস্থা কিছুই নেই আমার এখনকার বাপের বাড়িতে।
আমার মায়ের কাছ গিয়ে থাকো। আতশ বলল।
নন্দা হেসে উঠল।
বলল, যে-বিপদ থেকে বাঁচতে আলাদা থাকা, সে বিপদ তো তুমিও ঘটাতে পারো। তুমি তো পুজোর সময়েই আসবে।
এবার নাও আসতে পারি। এবারে পুজোর ছুটিটা জঙ্গলেই কাটাব। ভাবছি।
কোন জঙ্গলে?
এখনও ঠিক নেই। তবে সম্ভবত লবঙ্গীর জঙ্গলে। পাল্টববাবুরা এবারে অঙ্গুলে বনবিভাগের নিলামে সেই জঙ্গল-ই ডাকবেন বলে বদ্ধপরিকর। তাই হয়তো লবঙ্গীতেই যাব।
পুজোর, ক-টা দিন তো পৃথিবীসুদ্ধু বন্ধ। মাউসি বলছিলেন, মহাষ্টমীর দিনে কটকের কটকচন্ডীর কাছে পুজো দিতে যাবেন। নলিনীও আসবে ভুবনেশ্বর থেকে। নন্দন-ই গাড়ি করে নিয়ে যাবে আমাদের। তুমি থাকলে আরও আনন্দ হবে। পুজোর, দিনক-টা অন্তত কাটিয়ে যেয়ো অঙ্গুলে।
দেখি। জানি না নন্দনদার সামনে কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াব।
বোকা বোকা কথা বোলো না। ও কোনো কিছু সন্দেহই করেনি। তা ছাড়া, দোষ তো সব আমার। তুমি তো কিছু করোনি, আমি জোর করেছি। ধর্ষণের কথা যদি ওঠেই তবে আমিই তোমাকে ধর্ষণ করেছি।
জানি না।
ছেড়ে দিচ্ছি। ভালো থেকো। নলিনী কি ফোন করেছিল?
একদিন করেছিল। ও তো তোমার মতো বড়োলোক নয়। বেচারি ছাত্রী তো এখনও। আমি তো বড়োলোকের বউ। নিজে তো বড়োলোক নই। তাও আবার দু-জন বর আমার। একজন অর্থে বড়োলোক আর অন্যজন...
আতশ কথা কেটে বলল, অনর্থে বড়োলোক।
হাসল নন্দা।
বলল, ছাড়লাম।
গদাধরের মেয়েটা ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়াতে মারা গেল। তাদের তিনজনের কোনো প্রিভেন্টিভ খাওয়া উচিত। কারণ, জঙ্গলের মধ্যে ওদের বাড়ি যা, দেখে এল আতশ, তা কহতব্য নয়। ঝরনার জল-ই খায় শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা।
পুরুণাকোটের ডাক্তারের ওপরে ভরসা তো নেই-ই, লোকটার মুখও দেখতে ইচ্ছে করে না আতশের। তাই অঙ্গুলে ওদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ানকে ফোন করে ওষুধের নাম লিখে নিয়েছিল। ওষুধ কিনবে পুরুণাকোটের দোকান থেকেই।
আগামীকাল রবিবার। এরমধ্যে গদাধর আর আসেনি। তারও জ্বর হল কি না কে জানে! তাই ঠিক করল দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পরে ওষুধগুলো নিয়ে যাবে গদাধরের বাড়ি। রবিবার দোকান বন্ধ থাকে। তাই শনিবার-ই, মানে গতকাল বাইধরকে বাসে করে পাঠিয়ে ওষুধগুলো আনিয়ে নিয়েছিল।
দুপুরে খেতে দেরি হয় রবিবারে। আসলে, জলখাবার খেতেই দেরি হয়ে যাওয়াতে রান্না-বান্না সারতে সময় নেয় বাইধর। তা ছাড়া রবিবারে দু-একটা পদ বেশিও করে। অনেকদিন সকালের বাসে টিকরপাড়া চলে গিয়ে সেখান থেকে টাটকা বড়োমাছ কেটে নিয়ে আসে। টিকরপাড়ার মাছ পুরুণাকোটের বাজারেও আসে কোনো কোনোদিন। যদিও রোজ আসে না। সেখান থেকেই কিনে আনে, টিকরপাড়া অবধি যেতে হয় না।
খাওয়া-দাওয়ার পরে একটু বিশ্রাম নিয়ে মোটরসাইকেলে চড়ে বেরিয়ে পড়ল ওষুধগুলো সঙ্গে নিয়ে পম্পাশরের দিকে।
গদাধরের মতোই অবস্থা এখানের অধিকাংশ মানুষের। সকলকে মদত দেওয়ার সামর্থ্য তো নেই আতশের। তা ছাড়া, এখানে এসে, এই স্কুলের পত্তন করার দিনেই গদাধরের সঙ্গে আলাপ। পম্পাশরের একটি পঞ্চম ফেল ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল সে, পিয়োনের চাকরির জন্যে। কিন্তু সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট-ই মাধববাবু নিজেই অঙ্গুলে এবং পুরুণাকোটে বসে করেছিলেন। কারোকেই চাকরি দেওয়ার ক্ষমতা আতশের ছিল না। কিন্তু গদাধরের চেহারা এবং কথাবার্তা ওর ভারি ভালো লেগেছিল। কিছু মানুষ থাকে সংসারে, যাদের ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস দু-শো ভাগ এবং হয়তো সেই কারণেই সংসারের হাতে তারা প্রতিনিয়ত মার খায়। গদাধরের মুখের মধ্যে সেরকম মানুষের আদল ছিল। এবং পরে তার সঙ্গে মিশে দেখেছে আতশ যে, তার অনুমান এক-শো ভাগ-ই সত্যি। মানুষটার মতো হাসিমুখে ঠকতে আর বেশি মানুষকে দেখেনি আতশ ওর এই বয়েস অবধি এবং সে কারণেই গদাধর মানুষটার প্রতি তার একবিশেষ দুর্বলতা জন্মে গেছে।
পুরুণাকোটে পৌঁছে কিছু পোড়াপিঠা এবং গুলগুলা কিনে নিল। কিছু বিরিডালের বড়া। পৌঁছোতে পৌঁছোতে অবশ্য বড়াগুলো ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।
ও যখন এসব কেনা-কাটা করছে তখন-ই হঠাৎ দেখল ভীম্বকে। দোকানের সামনের জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। ছোটো জায়গায় রবিবারের জটলা।
আতশ বলল, আমি গদাধরের বাড়ি যাচ্ছি। তুমি যাবে কি?
ভীম্ব একবাক্যে রাজি হয়ে গেল। বলল, আমি বিকেলে আজ এমনিতেই যেতাম। ভালোই হল। অতখানি চড়াইতে যেতে হবে না পায়ে হেঁটে। আপনার মোটরবাইকের পেছনে বসে আরামে চলে যাবে।
মিষ্টি আর নোনতার প্যাকেটটা ওর হাতে দিয়ে দিল আতশ। তার কাঁধের গামছা দিয়ে সেগুলোবেঁধে নিয়ে চড়ে পড়ল ভীম্ব।
মোটরবাইকে যেতে মিনিট কুড়ি-পঁচিশ লাগে যাওয়ার সময়ে। পুরোটাই চড়াই তো। সরু পথ। বর্ষার জল পেয়ে জঙ্গল যেন, শত শত ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে চারদিকে। ভয় ভয় করে। এই পাহাড়ের ঢালে হাতি নাকি কখনো আসে না যদিও, পুরুণাকোটের কাছেই বাঘমুন্ডার একটু দূরেই হাতিগির্জা পাহাড়। সেখানে অনেক হাতির বাস। কিছুদিন আগেও পুরুণাকোট বাজারের উলটোদিকে এবং হাসপাতালের পেছনের ধানখেতে ধান পাকলে হাতির দল নেমে আসত প্রতিরাতে। তবে এ-অঞ্চলের হাতি মানুষের কোনো ক্ষতি করে না, যদি-না কোনো হাতি হঠাৎ দলছুট বা রোগাক্রান্ত হয়ে যায়। হাতি না এলে কী হয়! ভীম্ব বলছিল, গদাধরের বাড়িটা যেহেতু পম্পাশর গ্রাম-এর বাইরে, ওখানে বাঘ, ভালুক, চিতা, শুয়োর, শজারু এবং নানা জাতের হরিণের অবাধ রাজত্ব। পাখিদের মধ্যেও ময়ূর, মুরগি, টিয়া বিস্তর। ধনেশপাখিও আছে। তবে তারা বড়ো বড়ো কুচিলাগাছে আর অপেক্ষাকৃত ছোটো ডালিয়া গাছে বসে ‘হ্যাঁক হ্যাঁক হ্যাঁক হ্যাঁক’ আওয়াজ করতে করতে ফল খায়। বড়ো বড়ো ধনেশগুলোর নাম ‘কুচিলা খাঁই’ আর ছোটোগুলোর নাম ‘ভালিয়া খাঁই’। যেটুকু সামান্য জমি আছে তাতেও কোনো ফসল-ই করা যায় না। করা যায়। কিন্তু ঘরে ওঠানো যায় না। সাপের জন্যেও এই পাহাড় কুখ্যাত। কতরকমের সাপ-ই যে, আছে। এই পথের ওপরেই বড়ো বড়ো গাছের গোড়াতে বিষধর সাপেরা থাকে। সন্ধের পরে হাতে আলো ও লাঠি নিয়ে খুব সাবধানে পথ চলতে হয়। এই দুঃসাহসী মানুষদেরও।
এইরকম জায়গাতে গদাধরের বউ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে একা একা থাকে কী করে? বলল, আতশ।
ভীম্ব দার্শনিকের মতো বলল, কী করা যাবে বাবু। আমরা গরিব লোক, এইভাবে থেকেই আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে। একবার থেকে গেলে কিন্তু অত ভয়াবহ মনে হবে না। আমরাও গান গাই, হাসি, মজা করি। সব-ই যে, দুঃখ তেমন নয়। আপনারা শহরের মানুষ তো তাই এত ভয়াবহ মনে হয়।
এদিকে বাইসন বা গয়াল আসে না?
না বাবু। গয়াল আর হাতিরা গভীর জঙ্গলের প্রাণী। এই ঢালে তারা আসে না। বড়োবাঘও ক্বচিৎ কদাচিৎ আসে। তবে চিতা আসে নিয়মিত। ওদের জ্বালায় পাঁঠা, ছাগল, ‘বারা’, মানে শুয়োর এমনকী মুরগিও রাখা মুশকিল। শিয়াল আর ভাম তো আছেই।
দূর থেকে মোটরসাইকেলের আওয়াজ শুনেই গদাধর আর তার ছেলে ঘরের মধ্যে থেকে বাইরে এল। তারপর আতশ আর ভীম্বকে দেখে খুব-ই খুশি হল।
ভীম্ব গদাধরের ছেলেকে বলল, মাকে যাই কহন্তু বাবু কেত্বে জিনিস আনিচি তমমান পাঁই। আমি বাবু কহ ইটি।
ছেলে ভীম্বের হাত থেকে গামছা জড়ানো জিনিসগুলো নিয়ে ভেতরে গেল।
গদাধর বউকে ডাকল, বলল সীতা, বাবু আসিল্টবা, আসিকি তাঁকু ভেটিবি নাকি তু ঘর মধ্যরে পশিকি রহিবি?
আতশ মোটরবাইক থেকে নেমে বাইকটা পাশ করে রাখল।
সীতা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে, আতশের দু-পায়ে দু-হাত রেখে মাথাটা পায়ের পাতার ওপর রেখে প্রণাম করল। ওড়িশার এমন-ই রীতি। শহরে এমন করে প্রণাম করার রেওয়াজ আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে, বিনয় এখন দুর্বিনয়ের দিকে যাচ্ছে কিন্তু ওড়িশার গ্রামে-গঞ্জে এই রীতি এখনও আছে।
সীতা একটা মাদুর পেতে দিল বাইরের বারান্দাতে। ঝকঝকে করে মাজা পেতলের ঘটিতে জল আর গ্লাস নিয়ে এল, সঙ্গের রেকাবিতে দু-টি বাতাসা।
আতশ বলল, জলের বোতল আমি সঙ্গে নিয়ে এসেছি। বাইধর ফুটিয়ে দেয় জল। তোমরাও জল ফুটিয়ে খাও না কেন? জল থেকেও তো ম্যালেরিয়া হয়! শুধু মশার কামড়েই হয় না।
বাবু বর্ষাকালে রান্না করার জন্যে শুকনো কাঠ-ই জোগাড় করা কঠিন তার ওপরে আবার জল ফোটানোর কাঠ। ও আমাদের কিছু হয় না। এইভাবেই তো আমাদের বাপঠাকুরদা সকলে জীবন কাটিয়ে গেলেন। দীনবন্ধুর ‘দয়া’ থাকলে কোনো অসুবিধাই অসুবিধা নয়। তবে হেমাটাকে যে, কেন দীনবন্ধু নিয়ে গেলেন!
দু-ফোঁটা চোখের জল গড়াল গদাধরের বউ সীতার চোখ দিয়ে। তারপরেই মুখে হাসি ফুটিয়ে আতশকে বলল, বাতাসা দুটো তো খাবেন বাবু?
হ্যাঁ হ্যাঁ। নিশ্চয়ই খাব। তোমাদের জন্যে যা-এনেছি তোমরা খাও। ভীম্বকেও দাও। বড়াগুলো বোধ হয় ঠাণ্ডা হয়ে গেল। দ্যাখো তো ঠাণ্ডা হয়ে গেলে একটু গরম করে নাও।
হেব্ব হেব্ব, সব হেব্ব। বলল গদাধর।
তারপর বলল, আমাদের কী সৌভাগ্য যে, আপনি এলেন। ভীম্ব কি চিনিয়ে নিয়ে এল?
বা: সেদিন তোমার ছেলের সঙ্গে এসেছিলাম না, সীতাকে নিয়ে যেতে।
হ্যাঁ হ্যাঁ। ভুলেই গেছিলাম। তবে রাতে এসেছিলেন তো। ওই জঙ্গলে পথ চিনে আসা ভারি কঠিন। একটা ভুল বাঁক নিলেই জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে হবে। জঙ্গলের পথে চিহ্ন করে নিয়ে চলতে হয়।
মানে?
মানে, ধরুন একটা মস্ত মহুয়া গাছ, বা মস্ত শিমুল গাছ বা একটা বাজে পোড়া শাল। এইসব চিহ্নগুলো মনে রাখলেই আর রাস্তা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
আতশ বলল, কই সীতা, তোমরা খাবারগুলো খাও সকলে, আমি দেখি। দেখে, খুশি হই।
হউ আইজ্ঞাঁ। বলল সীতা।
আদুড় গায়ে একটা লাল খাটো শাড়ি জড়িয়ে পরেছে। শায়া নেই, ব্লাউজ নেই, দু-পায়ে শুধু দুটো পেতলের পায়জোর আছে আর গলাতে একটা পেতলের সরু হার। বিনা প্রসাধনেই, বিনা আভরণেই আতশ বুঝল যে, সীতা যথেষ্টই সুন্দরী। সেদিন রাতে লক্ষ করার মতো মানসিকতাটা ছিল না ওর।
একটু পর আতশ দেখে যুগপৎ অবাক এবং খুশি হল যে, ক-দিন আগে এগারো বছরের মেয়ে হারানোর শোক ভুলে হাসতে হাসতে সীতা পোড়পিঠা, গুলগুলা এবং বিরিবড়া খাচ্ছে।
একটু চা করতে হবে বাবুর জন্যে।
গদাধর বলল।
ওরা কী করে চা বানায়, তা আতশ জানে। ঘটির মধ্যে, ঘটিকে ওড়িয়ারা ‘ঢাল্টব’ বলে, গুঁড়োচা একটু দিয়ে তারমধ্যে দুধ আর জল দিয়ে কিছুক্ষণ ফোটায়। তারপরে তার সঙ্গে চিনি মিশিয়ে খায়। আতশ জানে যে, সেই চা অপেয়। কিন্তু ভালোবেসে দিলে খেতেই হবে।
তোমরা এখানে দুধ পাও কোত্থেকে?
পম্পাশরে কারো কারো বাড়িতে গোরু আছে। যাদের গোরুর বাছুর হয়েছে তাদের বাড়িতে ছেলেকে পাঠাই। ও ঢাল্টব করে একটু দুধ নিয়ে আসে। কখনো বেশিও দেয় তারা। এখন দুগ্ধপোষ্য তো কেউই নেই এখানে। চা-টাই হয় দুধ দিয়ে। এমনিতে দুধ কারোরই খাওয়া হয় না।
কত করে নেয় দাম?
পয়সা নেয় না। আমাদের খেতে যখন যা হয় লাউ, কুমড়ো, শাক, আলু, পটল তাই একটু-আধটু পাঠাই।
সীতা গলা তুলে বলল, এখানে টাকাপয়সা কম আছে বাবু, ভালোবাসা আছে। হেমার মৃত্যুর পরদিন পম্পাশর গ্রাম থেকে কত মানুষ যে, এসেছিল। ওর কাজ আর কে করবে? কিন্তু সাতদিনে রান্না করতে দেয়নি। দু-বেলাই তারা রান্না খাবার দিয়ে গেছে আমাদের জন্যে।
বা:। শুনলেও ভালো লাগে।
আতশ বলল।
তারপর বলল, তোমাদের জন্যে ওষুধ নিয়ে এসেছি। অঙ্গুলের ডাক্তারকে ফোন করে নাম জেনেছি। এই ওষুধটা তিনজনে অথবা চারজনেই, ভীম্ব যদি এখানে থাকে, তবে সকালে একটা বিকেলে একটা করে খাবে। জ্বর হওয়ার পরের ওষুধ তো সেদিনে দিয়েই দিয়েছি। নামও লিখে দিয়েছি।
হ্যাঁ তা তো দিয়েছেন-ই।
তাহলে একটা করে এখুনি খেয়ে নাও ওষুধটা।
ওরা সকলেই খেয়ে নিল।
কথাবার্তা বলতে বলতে চা খাওয়াও হল।
গদাধর বলল, রাতে এখানে খেয়ে যাবেন বাবু? সীতা খুব ভালো খিচুড়ি রাঁধে। বাইধরের চেয়েও অনেক ভালো। ভারি আনন্দ হবে আমাদের, আপনি খেয়ে গেলে। তারপর খাওয়ার পরে আমিও আপনার সঙ্গে চলে যাব। কাল সকালের বাস ধরে কটকে যাব এবার। মেজোবাবুর সঙ্গে দেখা করতে হবে। যা-টাকা আপনি দিয়েছেন, তাতে জঙ্গলে যাওয়া অবধি খাওয়া-দাওয়া হয়ে যাবে কিন্তু যদি আবার কারো অসুখ-বিসুখ করে? তা ছাড়া, আমার-ই টাকা যখন, তার কিছু আমার কাছেই বা থাকবে না কেন?
সে তো এক-শোবার ঠিক। এতদিন এই হুঁশটা যে, কেন হয়নি তাই তো বুঝি না।
আসলে অভাবের সংসার। হাতে টাকা এলে তা খরচ হয়ে যেতে বেশিক্ষণ লাগে না। সেই ভয়েই নিই না।
তা বললে তো চলবে না গদাধর। ‘সঞ্চয়’ করাটাও একটা শিক্ষার মধ্যে পড়ে। শুধু গাছ চিনলে আর বাবুদের ট্রাকের পর ট্রাক গাছ কেটে ভরে দিলেই তো চলবে না। নিজেদের ভালোমন্দ তো বুঝতে শিখতে হবে।
এবার থেকে তাই শিখব।
ভীম্ব এতক্ষণ চুপচাপ-ই বসেছিল। ও বলল, শিখব বললেই কী আর বাবুরা শিখতে দেবেন? এই গদাধরদা কারো কথাই শোনে না। বাবুদের সবচেয়ে বড়ো দালাল-ই হচ্ছেন উনি।
এই! মুখ সামলে কথা বল। ননার দোকানে তো বাসন মাজতিস আর বিড়িবড়া গুলগুলা দিতিস জনে জনে। ক-পয়সা দরমা পেতিস? তোকে আমি হাত ধরে নিয়ে গেলাম বাবুদের কাছে আর আজ তুই-ই এসেছিস আমার বিচার করতে? ভালো না লাগে তো যাস না জঙ্গলে আর। এ-বছর তোকে আর ডাকব না, যা:।
তোমার পাল্টববাবুরা ছাড়া আর কি বাবু নেই? আমি এ-বছর রবি দাসের কোম্পানিতে চলে যাব। যার গায়ে জোর আছে, খাটার ক্ষমতা আছে, দুটো হাত আছে তার কীসের অত চিন্তা? তা ছাড়া আমার তো আর তোমার মতো বউ, মেয়ে, ছেলে নেই। আমি একা মানুষ। কোন চিন্তা আমার?
মেয়ের কথা তোলাতেই সীতার চোখের কোণ দুটো আবার ভিজে এল।
আতশ বলল, আর একদিন সকাল সকাল আসব। দুপুরে তোমাদের সঙ্গে খাব। তারপর বেলাবেলি আবার করতপটাতে ফিরে যাব। আজ আমি উঠব। গদাধর যাবে তো উঠে পড়ো। রাতে আমার ওখানেই খেয়ে শুয়ে থেকো। কাল যেয়ো কটকে সকালের বাসে।
গদাধর বলল, ভীম্ব তুই এখানে থাক।
তোমার বউ, ছেলেকে রোজ রোজ পাহারা দিতে পারব না আমি। অনেক দিন তুমি আমাকে এই বেগার খাটিয়েছ। এবার আমাকে ছেড়ে দাও।
গদাধর কিছু না বলে, কাপড়ের ঝোলাতে একটা লুঙ্গি ও জামা নিয়ে ঝোলাটা কাঁধে ঝুলিয়ে এসে বসল বাইকের পেছনে। ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে। আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। যখন তখন বৃষ্টি নামতে পারে।
আতশ বাইকে উঠে বলল, চললাম সীতা, চললাম ভীম্ব।
—আসুন্ত আইজ্ঞাঁ। ওরা দু-জনেই বলল।
মোটরবাইকটা স্টার্ট করে কিছুটা আসতেই গদাধর বলল, নামতে সময় লাগবে না। তবে সাবধানে নামতে হবে। বর্ষার দিন। আর পাথর মাটি সব-ই তো ভেজা।
তারপর-ই স্বগতোক্তির মতো বলল, ওই ভীম্বর একটা কিছু করতে হবে। কথায় কথায় ‘তোমার বউ’ ‘তোমার ছেলে’ বলে কথা শোনায় অথচ আমি কী জানি না যে-ছেলেটা ওর? হেমা আমার মেয়ে ছিল। বলরাম হওয়ার সময়েই সীতার অপারেশন করে দিয়েছে ডাক্তার, অবশ্য আমার অনুমতি নিয়েই, আর ছেলে-মেয়ে তো ইচ্ছা করলেও হবে না। ভীম্ব ভাবে, ও খুব চালাক।
তুমি জানলে কী করে যে, ছেলে তোমার নয়, ওর?
কথাটা বলতে বলতে আতশের গলা শুকিয়ে গেল। ওর হঠাৎ মনে হল গদাধর নয় নন্দনদা কথা বলছে।
গদাধর বলল, যে-বছরে বলরাম হল সে-বছরে, আমি আটমাস দশপাল্লার নেম্বুগছার জঙ্গলে ছিলাম। রাস্তা ভেঙে যাওয়াতে খুব বিপদ হয়েছিল। বর্ষার আগে সব কাঠ বের করতে না পারলে বাবুদের অনেক লক্ষ টাকার ক্ষতি হয়ে যেত। আমায় থাকতেই হয়েছিল।
তারপর বলল, ষড়া বেধুয়া। সীতা ওরও বউ, যেমন আমারও। আর বলরাম তো ওর-ই।
—কী সাংঘাতিক কথা বলছ তুমি গদাধর?
আতশ বলল। আতশের বুকের মধ্যে কষ্ট হচ্ছিল। খুব কষ্ট। গদাধরের জন্যে। এবং নন্দনদার জন্যেও।
তারপর সারাপথ আর কোনো কথা বলল না গদাধর। আতশও বলল না। পুরুণাকোটের বড়ো রাস্তাতে পড়ার পরেই বৃষ্টি নামল। বৃষ্টির অঝোর ধারা দ্রুতগামী বাইকে সামনে বসা আতশের চোখে-মুখে লাগতে লাগল এসে তিরের ফলার মতো। বৃষ্টির ধারার সঙ্গে, আতশ জানে, তার চোখের জলও মিশে গেল তাতে। তার কোমরের কাছে জাপটে বসে থাকা গদাধরের চোখের জলে ভিজতে লাগল আতশের পিঠ। গদাধর ভাবছিল, এমন একটা গোপন কথা সে বলে ফেলল আতশকে। ও চিরদিন-ই এমন কান্ডজ্ঞানহীন-ই থাকবে। আতশ ভাবছিল, আতশকে চান্দ্রায়ণ করতেই হবে। নইলে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত কিছুতেই হবে না। নন্দনদার সঙ্গে গদাধরের তফাত এই যে, নন্দনদা জানবে না তার সন্তানের বাবা কে? আর গদাধর তা জানে।
আতশ ভাবছিল, শুধুমাত্র মায়েরাই জানে, তার কোন সন্তানের জন্মদাতা কে? সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে বোকা বাবারা পরের সন্তানকে নিজের বলে জেনে তাকে বুকে জড়িয়ে পুলকভরে চুমু খেয়ে এসেছে। পুরুষ জাতটাই বড়ো বোকা।
করতপটাতে যখন ফিরল তখন, দু-জনেই চুপচুপে হয়ে ভিজে গেছে। আতশ গরম জলে স্নান করল, গদাধরও। তারপরে দু-জনেই জামাকাপড় বদলে এসে বারান্দাতে বসল। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে। ভেজাবনের সোঁদা গন্ধ ভাসছে হাওয়াতে, চাঁপার গন্ধ, কেয়ার গন্ধ। কয়েক-শোজোনাকি নিভতে-জ্বলতে, জ্বলতে-নিভতে জঙ্গলের গভীর থেকে ভাসতে ভাসতে এসে ডবা বাঁশের একটা মস্ত ঝাড়ের ওপরে থিতু হল। শয়ে শয়ে নীলচে-সবুজ টুনি বালব যেন, জ্বলতে লাগল বাঁশঝাড়ের মাথাতে।
গদাধর সেদিকে চেয়ে হঠাৎ বলল, একটা গান গাইতে ভীষণ ইচ্ছে করছে বাবু। গাইব? আমার হেমা মা এই গানটা বড়ো ভালো গাইত।
কোনো সিনেমার গান?
না না বাবু, দীনবন্ধুর গান। আমি বাড়ি থাকলে প্রতিসন্ধেতে, সে আমাকে এই গানটা গেয়ে শোনাত।
আতশ বলল, তুমি গানের চর্চা করো?
কখনো করিনি বাবু। জঙ্গলে থাকি। সারাদিনের কাজের পরে সন্ধেবেলা নালাতে চান করে এসে ক্যাম্পের বারান্দাতে দুটো ধূপকাঠি জ্বালিয়ে একটু গান করি। বলতে পারেন, ও-ই আমার পুজো। জানেন বাবু, গভীর জঙ্গলে থেকে থেকেই আমার ঈশ্বরে বিশ্বাস জন্মেছে। ওইসব আদিম জঙ্গলে না থাকলে আমি মানুষটা অন্য দশজন মানুষের মতোই হতাম। জঙ্গল পাহাড়ের নানা রূপ, নানা ঋতুকে দেখে আমার মন শান্ত হয়ে গেছে। টাকাপয়সা, ঘরসংসার এসব কিছুই ভালো লাগে না আর। সবাইকেই ক্ষমা করে দিতে পারি, কারো ওপরেই কোনো রাগ নেই আমার।
তুমি ভীম্বকেও ক্ষমা করে দিয়েছ?
নিশ্চয়ই। কবে ক্ষমা করেছি। বলরামের বয়স তো সাত হতে চলল। ক্ষমা কেন করব না বলুন? ও আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোটো, অনেক ভালো স্বাস্থ্য ওর, লম্বা-চওড়া, ওই নির্জনে যদি একা মানুষ একজন যুবতীর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকে তাহলে তার তো ইচ্ছে হতেই পারে। এ তো অস্বাভাবিক কিছু নয়। তা ছাড়া আমিই তো ওদের সুযোগ করে দিয়েছি। এ-সংসারে বদলে কিছু না পেয়ে কেউ কী কিছু দিতে চায়? দেবে যে, তা ভাবাটাই তো অন্যায়।
আর সীতাকে? তাকেও ক্ষমা করেছ তুমি?
তাকেও। কেন করব না বলুন? সীতার মতো সুন্দরী মেয়েকে তো আমি রাবণের মতো আশোক কাননে সীতার মতো করেই দুঃখে রেখেছি এত বছর। দেওয়ার মতো কীই বা দিতে পেরেছি তাকে বলুন? ও যদি ওর যা উদবৃত্ত তা অন্যকে দিয়েই থাকে তা নিয়ে আমি অনুযোগ করব কেন? তা করলে তো অন্যায় করা হত।
তুমি যে, সীতাকে সুখে রাখতে পারোনি তার জন্যে, দায়ী তো তোমার মেজোবাবু। এত বছরে তো তোমার মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা তিনি রোজগার করেছেন। তোমাকে কী দিয়েছেন?
সেটা তো বাবু আমার দেখার নয়। এই সংসারে যে-যার কপাল নিয়ে আসে। ওই রঙ্গমঞ্চে যে-যার ভূমিকা নিয়ে আসে এবং সেই ভূমিকাতে অভিনয় শেষ হলে চলে যায়। এই স্বাভাবিক। প্রকৃতির মধ্যে যেমন, অনেক নিয়ম থাকে। বাঘ যখন হরিণ ধরে খায়, আমাদের খুব খারাপ লাগে কিন্তু তারমধ্যে বীভৎসতা তো কিছু নেই, কারণ, সেটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। মেজোবাবুর ভূমিকা তাঁর। আমার ভূমিকা আমার। অন্যের কপাল নিয়ে ‘ঈর্ষা’ করলে কখনো সুখী হওয়া যায় না জীবনে।
তুমি কি সুখী গদাধর?
আমার নিজের কোনো নিজস্ব দুঃখ তো নেই। আমি নিশ্চয়ই সুখী। যতটুকু অসুবিধে হয় সীতা আর ছেলে-মেয়ের জন্যে। ওদের চাহিদা আছে, থাকা স্বাভাবিক। তাই আমার যতটুকু অনুযোগ তা ওদের-ই কারণে।
তারপর বলল, আমার কথা আপনি ঠিক বুঝতে পারবেন না বাবু। আমার সঙ্গে এবারে জঙ্গলে চলুন, দেখবেন মন কী শান্ত হয়ে যাবে। কত অল্পেতে আমরা সুখী হতে পারি সে-কথা আপনি বুকের মধ্যে অনুভব করবেন। আমাদের সব দুঃখ, সব অশান্তি আমাদের নানারকম চাওয়া ও আশার-ই জন্যে। কিছু আশা যে না করে, সে কখনোই নিরাশ হয় না।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বলল, আপনাকে একবার ময়ূরভঞ্জের রাজার জঙ্গল সিমলিপালে নিয়ে যাব। পাল্টববাবুদের কোম্পানি মাত্র একবার সে-জঙ্গল ডেকেছিলেন বারিপদার ফরেস্ট অফিসে গিয়ে। সেসব তো জঙ্গল নয়, দেবপুরী। মেঘের মতো, পাহাড়ের পর পাহাড়, কত নালা, কত ঝরনা, কতরকম গাছ। কত জঙ্গল! চাহালা, ভঞ্জবাসা, রাজাদের পদবি তো ভঞ্জ তাই ভঞ্জবাসা, বাছুরিচরা, জেনাবিল, ধুধুরুচম্বা, জোরাণ্ডা, বড়াইপাণি, নআনা আরও কত কী? ওই যে, জোরাণ্ডা, যেখানে একটা বাংলো আছে, তার নীচে খাড়া খাদ আর সেই খাদের মধ্যে বহুওপর থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে জোরাণ্ডা জলপ্রপাত। সেই খাদের গা এমন-ই খাড়া যে, পাখিরও পা পড়ে না সেখানে, মানে, পাখি পর্যন্ত বসতে পারে না। অথচ সেই খাদের-ই গায়ে রাতের বেলা নানা ভৌতিক আলো জ্বলে আর নেভে। দেব-দেবতার বাস সেখানে। আসল নাম তো জোরাণ্ডা নয়—আসল নাম জাউরন্ধা। জগন্নাথদেব আগে বহুদিন ওখানেই থাকতেন। জগন্নাথের প্রসাদ যে ভাত, তাকে তো বলে ‘জাউ’, সেই জাউই সেখানে রান্না হত, তাই জাউরন্ধা। সাহেবরা উচ্চারণ করতে পারত না তাই বলত জোরাণ্ডা। কত হাতি, গয়াল, বুনো মোষ, বুনো কুকুর, হরিণ, ময়ূর, কুটরা, গুরাণ্ডি, বড়ো বড়ো বাদামি রঙা নেপালি ইঁদুর, তারা যখন বড়ো বড়ো তেঁতরা আর মিটকুনিয়া গাছের উঁচু ডাল থেকে অন্য ডালে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে বেড়ায় তখন শীতকালের ভোরে বৃষ্টির মতো শিশির ঝরে নীচে। কত রং, কত গন্ধ। কত ছবি সেই ভঞ্জরাজাদের সিমলিপালে, গেলে আর ফিরে আসতেই ইচ্ছে করবে না বাবু আপনার।
গানটা গাইলে না গদাধর?
হ্যাঁ বাবু, গাইছি। বলে গদাধর গান ধরল:
দয়া করো দীনবন্ধু শুভে যাউ আজদিন
কলিযুগে জগন্নাথ বিজে চক্রহস্ত
সাধিয়ে পউঠ অন্ন আপে করুছ ভবন
তুমি এ-সংসারে সার আউড় সব মায়া ঘর
কুতাংত ভর উঠরো কহে দীন জনহীন
দয়া করো দীনবন্ধু শুভে যাউ আজদিন...
গদাধরের পরমভক্তিভরে এবং আশ্বাসে গাওয়া গানটি, দীনবন্ধু দয়া করো, দয়া করো, আজ যেন, আমার দিনটি ভালো যায়, এই বৃষ্টিভেজা সান্ধ্য অরণ্য প্রকৃতির পরিবেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেন, ভরে গেল।
গদাধর কিছু না বলে চুপ করে অন্ধকারে চেয়ে বসে রইল। এ-বাড়িতে, এই জায়গাতে বিজলি আলো নেই। যদিও রাস্তাতে মাঝে মাঝে আছে। লন্ঠনটা ফিতে কমিয়ে রাখা আছে বারান্দার দরজার আড়ালে, যেন চোখে আলো না লাগে আর সাপ-বিছেও বারান্দাতে উঠে এলে দেখা যায়।
গদাধরের ঈশ্বরভক্তি আর জঙ্গলের বর্ণনাতে আবিষ্ট হয়ে গেছিল আতশ।
বাইধর এসে বলল, খাবার লাগিয়ে দিয়েছি।
ক-টা বাজে?
ন-টা।
বলিস কী রে?
হ্যাঁ বাবু। আপনারা তো সাতটা থেকে বারান্দাতে বসে আছেন। কত গল্প করল গদাধরদা কতরকম, টুকরো-টাকরা আমিও শুনেছি রান্নাঘর থেকে তবে গানটা ভারি ভালো শুনলাম, বুঝলে গদাধরদা।
গদাধর বলল, হউ।
আতশের মনে এক তীব্র বাসনা জন্মাল গদাধরের মতো হতে, একজন এক-শো ভাগ ভারতীয় হতে, যারা সাধারণ সুখ-দুঃখের নাগালের বাইরে থেকেও বাঁচতে জানে, বেঁচে এসেছে যুগযুগান্তর ধরে। তারা যদি সুখী হয়, সুখী থাকে, তবে আতশের কোন অধিকার আছে, নিজেদের সুখ-দুঃখের সংজ্ঞা জবরদস্তি করে তাদের ওপরে প্রয়োগ করে!
আতশ ভাবছিল কটকের পাল্টববাবুদের মেজোবাবু কি চান্দ্রায়ণ করবেন? করা তো উচিত। অন্তত তিনি করুন আর নাই করুন, আতশ করবে।
দয়া, ওগো দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে।
নইলে কী আর পারব তোমার চরণ ছুঁতে।।
তোমায় দিতে পূজার ডালি বেরিয়ে পড়ে সকল কালি,
পরান আমার পারি নে তাই, পায়ে থুতে।
দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে।
না গেয়ে, গানটি গাইল আতশ।
বাইরের জমাটবাঁধা ভেজা অন্ধকারে চেয়ে বসে রইল ও।
বাইধর আবার এসে বলল, চালন্তু আইজ্ঞাঁ।
আতশ, নীচু গলায় বলল, চলো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন