কুর্চিবনে গান

বুদ্ধদেব গুহ

অমু ঘোষের ডায়েরি-১

স্টিল এক্সপ্রেস ধরে জামশেদপুর এসেছিলাম সোমবার সকালে।

নিশির ডাকের-ই মতো জামশেদপুর আমাকে ডাকছিল কিছুদিন ধরেই। কিছু কিছু স্থান মাঝে মাঝে, এমন করে ডাক পাঠায়। যখন পাঠায়, তখন অগ্রাহ্য করা যায় না।

ঘুমের মধ্যে জেগে উঠছিলাম। তারাভরা আকাশে চেয়ে, জানলার সামনে বসে মনে হচ্ছিল, কত্তদিন একটু রোদ লাগেনি গায়ে, কত্তদিন বদগন্ধ কর্মব্যস্ত পুরুষদের ধাক্কাধাক্কি, ধুলো, বিকট আওয়াজ আর ফিরিওয়ালার চিৎকার এড়িয়ে, একটু নির্জন-পথে গাছগাছালির ছায়ায় ছায়ায় হাঁটিনি একটুও। কত্তদিন! দমবন্ধ হয়ে আসছিল একেবারে।

রোজ সকালে কাগজ খুললে এক-ই খবর। দাম বেড়েছে। সব জিনিসের-ই দাম বাড়ছে ‘হু হু’ করে প্রতিদিন। আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে একেবারেই। হাত ফসকে যাওয়া গ্যাস-বেলুন যেমন, উড়ে যায় উপরে, নীচে দাঁড়িয়ে-থাকা শিশুকে হতভম্ব করে, ঠিক তেমনি করেই দাম বাড়ছে। আর দাম কমছে মানুষ আর টাকার। টাকা একদিন অনেক-ই রোজগার করেছি, ট্যাক্সও দিয়েছি অনেক।

একদিন ছিল, যখন লোকে আমাকে বড়োলোক বলেই জানত। কিন্তু নিজের-ই স্বভাব দোষে (না, মদ খেয়ে বা জুয়া খেলে নয়) সব টাকা নষ্ট করেছি। নষ্ট করেছি না-বলে, বলা ভালো, নষ্ট হয়েছে। সত্য-মিথ্যা নানা অজুহাতে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে বহুলোকে। তার চেয়েও বেশি নষ্ট হয়েছে, নিজের মধ্যের-ই নষ্ট করার তাগিদে। যারা ঠকিয়েছে, সে-আত্মীয়ই হোক, কী বন্ধু, কী কর্মচারী, তারা সবাই ভেবেছে বোকাটাকে ঠকিয়ে নিলাম। কিন্তু তারা কেউই জানেনি যে, এ-বোকা জেনেশুনেই ঠকেছে বার বার।

আমার বহু দূরসম্পর্কের-পিসতুতো ভাই গবু এখানেই আছে। শুনেছি, বড়োচাকরি করে। তার মূল পড়াশোনার খরচাটা পুরো আমিই দিয়েছিলাম। বাড়িওয়ালা একবার উৎখাত করতে চেয়েছিলেন, বহু হাজার টাকা ভাড়া বাকি পড়াতে, তাদের সমস্ত পরিবারের সেই দায়, আমি উদ্ধার করেছিলাম। তার বিয়ের সময়, গবু পণ নিয়েছিল এবং আমার কাছ থেকেও লোক খাওয়ানোর জন্যে, কিছু টাকা নিয়েছিল। যে, শিক্ষিত মানুষ বিয়েতে ‘পণ’ নেয়, তাকে শিক্ষিত বলে মানা অসম্ভব। মিছিমিছিই ওর পড়াশোনার জন্যে টাকা নষ্ট করেছিলাম। এখন মনে হয়।

একদিন বড়োলোক এবং কবি বলে অগণ্য মানুষ-ই খাতির করত। আজকে যে, খাতির-যত্নটুকু পাই, তা শুধু মাত্র কবি বলেই! এই খাতিরের দাম অন্য।

আজ আমার কাউকেই দেওয়ার মতো কিছু নেই। তবে থাকলেও, আজ হয়তো কাউকেই কিছু দিতামও না। কারণ, যে-ডানহাতটি নিয়ে দান করতাম সকলে মিলে নির্মম মোচড়ে মোচড়ে সেই ডান হাতটিকেই ভেঙে দিয়ে গেছে। ভাঙা হাতের যন্ত্রণা তো আছেই, তার চেয়েও অনেক বেশি বাজে অকৃতজ্ঞতা আর কৃতঘ্নতার আঘাত। আমার স্ত্রী রানি বলে, ‘যা-কিছুই যা-কারো জন্যেই করেছ, তা মনে করো নিজের আনন্দর জন্যই করেছিলে। প্রত্যাশা করবেই বা কেন?’

যখন করেছিলাম, তখন কিন্তু আনন্দের জন্যেই করেছিলাম। এখন তাদের কৃতঘ্নতাতে কেন যে, কষ্ট পাই, জানি না।

আমি কবি। যেহেতু আমি কোনো রাজনৈতিক দলের-ই পোস্টার লিখিনি, লিখব না; তাই আমি এখনও লিটল ম্যাগাজিনের-ই কবি। পাঠকসমাজ আমাকে কবি বলে মেনে নিয়েছিল, এইটে ভেবেই আনন্দে থাকি শত দুঃখের মধ্যেও। কবিরা প্রায় কেউই মানেননি যদিও। আমি তাঁদের মতে ‘রোমান্টিক মহিলাদের মদতপুষ্ট কবি’। অতএব কবি নই।

রানির আত্মাটি খুব ভালো। এবং ওর ভেতরে এক, প্রচন্ড শক্তি আছে। নইলে আর্থিক অবস্থার এই সাংঘাতিক পরিবর্তন, ওর পক্ষে মানিয়ে নেওয়াই সম্ভব হত না। কৃতঘ্নতা, এবং অকৃতজ্ঞতার আঘাত, ওকে সইতে হয় আমার চেয়ে অনেক-ই বেশি। কিন্তু রানি স্বীকার করে না কিছুমাত্র। অনুযোগও করে না। আমি বলব যে, ওর সবচেয়ে বড়োকৃতিত্ব এই যে, ও, আমার মতো স্বামী নিয়ে এতদিন ঘর করে এল। শিশু অথবা সেনাইল বৃদ্ধকে সামলানোও, এর চেয়ে অনেক-ই সোজা!

রানিই আমার জীবনে একমাত্র নারী নয়। অথচ রানি নিজে প্রকৃতার্থে সতী। বারংবার অনুরোধ-উপরোধ করেও, ওকে একবারটির জন্যেও অসতী করতে পারলাম না। জানি না, অসতী হলে তো ও আমাকে বলে হবে না। না হওয়াই ভালো। তবে এ-ব্যাপারে আমার কোনো মান্ধাতার আমলের ধ্যানধারণা নেই। বিয়ে যে, একটা চুক্তি সে-কথা আমিও মানি। কিন্তু যেকোনো চুক্তিই যদি, ধনুক ভাঙা-পণ হয়ে ওঠে তাহলে তা তো প্রহসন-ই। চুক্তির দু-পাশেই বিদেশের হাইওয়েতে যেমন থাকে, তেমন-ই ‘Soft Shoulder’ থাকা উচিত। Parking Lane। হু হু করে ছুটে যেতে যেতে, ক্লান্তি লাগলে পথপাশে একটু থেমে থাকলে বা হোটেলে পছন্দসই কারো সঙ্গে একটি রাত কাটালে সেই, দামামা-বাজানো চুক্তি আরও ঔজ্জ্বল্য পায়। ঘর না ভেঙেও ঘরকে নতুন করা যায়।

কিন্তু আমাদের দেশের পুরুষেরা সেই শ্বেতকেতু আর উদ্দালকের দিন থেকেই নারীকে গাভীর চেয়ে বেশি মর্যাদা দিতে নারাজ। নারীরা নিজে হাতে এই অধিকার তুলে না নিলে, তারা দেবেনও না কোনোদিন।

তবে আমার ব্যাপারে রানির কোনো দ্বিধা নেই। ও বলে, তুমি কবি। এই নিখিলবিশ্ব তোমার চারণভূমি। ‘চারণভূমি’ কথাটার মধ্যে একটু খোঁচা যে, নেই তা-নয়। তবু আমি হাসি।

রানি বলে, ‘তোমার জীবনে যে-অভিজ্ঞতাই হোক-না-কেন তা, তোমার নিজের একার নয়, নিজের নিজস্ব করে রাখবারও নয়। তাই তার ভালোত্ব-মন্দত্ব তোমাতে বর্তায় না। পাঠক-পাঠিকাকে তা দিয়ে দিলেই তুমি ফুরিয়ে যাবে। তারপর নতুন করে ভরে নেবে নিজেকে আবার।’ ও হাসতে হাসতে বলে, ‘বাচ্চাদের যেমন যখন তখন স্টম্যাক-আপসেট হয়, তোমারও যখন তখন প্রেম হয়।’ শিশুদের অনেক দোষ ক্ষমা করে দিতে হয়। আর ক্ষমার কথাই যখন ওঠে তখন, মা অথবা স্ত্রীই যদি ক্ষমা না করে অথবা বাবা এবং স্বামী; তবে ক্ষমা করবেটা কে?

রানির এই মহীয়সী, প্রকৃত শিক্ষিত, প্রখর বুদ্ধিমতী চরিত্রই হয়তো, কোনোদিন আমাকে সত্যিকারের বড়োকবি করে তুলবে। তুলবে কি? এই অমু ঘোষকে?

লক্ষ্মী যতদিন ছিলেন, সরস্বতীর বোধ হয় পা ফেলতে দ্বিধা হচ্ছিল। অন্যান্য অনেক কবিদের কথাও জানি যে, লক্ষ্মী যখন ছিলেন না তখন, ঘরে সরস্বতী জাঁকিয়ে ছিলেন। লক্ষ্মী যেই এলেন অমনি সরস্বতী নীরবে চলে গেলেন। লক্ষ্মী-সরস্বতীর সহাবস্থান বড়ো একটা দেখা যায় না। গেলে, সুখের কথা হত। লক্ষ্মীর প্রাচুর্য বোধ হয়, অধিকাংশ মানুষের সূক্ষ্ম বৃত্তিগুলিকে স্থূল করে দেয়।

তবে আমি খুশি। এক দেবীকে এক স্ত্রীকে ভজনা করাই যথেষ্ট কষ্টের কাজ। তার ওপর আবার দু-নম্বর। অথবা ততোধিক। সরস্বতী আর রানিকে নিয়েই আমি খুশি। আপাতত।

এখানে যে, মান-সম্মান, অকৃত্রিম প্রীতি ও ভালোবাসা পেলাম ও পাচ্ছি আসার পর থেকেই যে, সত্যিই অভিভূত হয়ে গেছি। স্টেশনে নেমে সাইকেল-রিকশা নিয়ে কুটুর কুটুর করে ছবিদের বাড়ি পৌঁছে বললাম, এই যে ছবি! আমি এসেছি। ‘আমি এসেছি’ এই সামান্য শব্দ দু-টি যে, নীলডির ছবির মতো পরিবেশে ছবির মনে এবং অনেকের-ই মনে, এমন ঢেউ পর পর ঢেউ তুললে তা অভাবনীয় ছিল। কবিতা পড়ুন কী, না পড়ুন সকলেই যে, আমাকে এমন আপন করে নেবেন তা ধারণারও বাইরে ছিল। ঈশ্বরের কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা আমার। জানি না, যাওয়ার দিনে কেমন করে, কী বলে বিদায় নেব এদের কাছ থেকে। চলে যাব কীভাবে এদের সকলকে রেখে। না বলেই পালিয়ে যাব কি? সরস্বতীর মতন? না, তা কেন? জাগতিক দুঃখ থেকে পালানোর প্রবৃত্তিও যেমন খারাপ, ভালোবাসা এবং প্রাপ্তি থেকে অমন চোরের মতো পালানোও খারাপ। জানি না, চোখে জল এসে যাবে না তো? যাঁরা আমাকে অন্তরের মধ্যে ঠাঁই করে দিলেন তাঁদের নিরন্তর অন্তরে রাখাও তো কর্তব্য। কিন্তু পারব না। আমি জানি। কলকাতায় থেকে কোনো মানবিক বৃত্তির লালন সম্ভব নয় আর। সে-কৃতজ্ঞতাই হোক কী প্রেম।

আবার বলি, ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। নীলডির সকলেই ভালো থাকুক। ভালো থেকো, তোড়া। তুমি বড়ো-বিস্রস্ত করেছ আমাকে। বাঁচা দায় এখন।

তোড়া

কী অদ্ভুত সব নাম তোমাদের নীলডির রাস্তার। ভিয়াস রোড। ভিসুভিয়াসও আছে নাকি?

না, না। নদীর নামে নাম যে! ভিয়াস, রবি, ঝিলম, সুবর্ণরেখা, খড়কাই। পাহাড়ের নামেও আছে। যেমন দলমা। জার্মান সাহেবরা যখন, এক্সপ্যানশনের সময়ে এসেছিল, কাইজার বাংলোতে ছিল, তখন কিছু নাম তাদের খাতিরেও হয়েছিল। যেমন স্টুটগার্ট রোড।

এটা কী গাছ?

গাছ-ফাছ-আমি চিনি না। আমি কি বটানিস্ট?

অমনোযোগী গলায় উত্তর দিল কবি অমু ঘোষ।

বটানিস্ট না হলেও গাছ ভালোবাসেন তো।

তো? গাছ ভালোবাসলেই কি, তাদের নাম বলে বলে বিদ্যে জাহির করতে হবে?

ভালোবাসেন অথচ নাম জানেন না, চেনেন না, কখন ফুল আসে, খোঁজ রাখেন-না? অদ্ভুত মানুষ তো আপনি!

মানুষ কি না সে-সম্বন্ধে এখনও নি:সন্দেহ নই। তবে আশ্চর্যজনক জীব যে, সে-কথা নিশ্চয়ই মানি। অনেককিছুই, অনেককিছুকেই ভালোবাসি, আবার বাসিও না।

না কেন? এটা ভালো না।

তোমার নাম কী?

আমার নাম তো আপনি জানেন-ই।

সে তো তোড়া! মা-বাবার দেওয়া নাম। সে তো পোশাকি নাম। যে-নামে, নামি হয়ে অন্নপ্রাশনের দিনে, মামার কোলে বসে চামচে করে পায়েস খেয়েছিলে। যে-নাম লিখিয়ে দিয়ে এসেছিলেন কিণ্ডারগার্টেন স্কুলে, তোমার দাদু বা দিদা। সেই নাম কী নাম? নাম-ই নয় সেটা।

কেন সে-নাম, নাম নয়, কেন?

ওটা একটা চাপিয়ে-দেওয়া নাম। তোমার মেজোজ্যাঠা বা ন-পিসি বা বাড়িওলি দিদা, যাঁর প্রচন্ড স্নেহ ছিল, তোমার মায়ের প্রতি, তাঁর মনোমতো নাম। যে-নামে তিনি নিজেকে ডাকতে পারলে খুশি হতেন, বা তাঁর প্রিয়তমা কাউকে, তা না, পেরে তোমার অবোধ ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। অথবা তোমার মায়ের নিজের নাম, নিজে দিলে, যে-নাম দিতেন তিনি অথবা তোমার বাবার বিয়ের আগে প্রেমিকার নাম।

সেটা ঠিক নয়।

বললে কী হয়। সে নাম, নাম-ই নয়। তোমার বাবার অফিসের বড়োসাহেবের দেওয়া নাম অথবা তোমার দোর্দন্ডপ্রতাপ বড়োমামা বা বড়োজ্যাঠা বা কুঁদুলে বড়োপিসির দেওয়া নামের ভারে নিশ্চয়ই তুমি চাপা পড়ে আছ জন্ম থেকেই ইট-চাপা ঘাসের-ই মতো। সে-নামে বিকশিত, পুষ্পিত হওনি কখনো।

আমার কোনো জ্যাঠা বা মামা নেই। আমার মা এবং বাবাও একমাত্র সন্তান।

আগেই বোঝা আমার উচিত ছিল। নইলে এমন টোটালি স্পয়েল্ট তুমি হতে না। তার ওপর স্বামীও মোটে একজন। তুমি ছাড়া স্পয়েল্ট আর হবেটা কে?

আপনার নিজের নামটাও কি চাপানো নাম নয়? অমুদা?

এই বঙ্গভূমে একটি বড়ো বদভ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে। চলচ্চিত্রাভিনেতা, লেখক, গায়ক, বাদক, আবৃত্তিকার, কবি, সকলকেই তাঁদের জ্যাঠামশায় অথবা ঠাকুরদার বয়সি মানুষেরাও দাদা বা দিদি বলে ডাকেন—‘অ্যাজ আ রুল।’ এতে ঠিক কী ধরনের ভক্তি দেখানো হয় বুঝি না। কিন্তু আমি এইরকম সম্বোধন মানতে রাজি নই। এ-কথা সবাইকে বলেও দিতে পারো। তবে তুমি ‘দাদা’ ডাকলে আপত্তি নেই।

নাম সম্বন্ধে একটি ভারি ভালো গপ্পো আছে। হিতুদাদের বাড়ি পৌঁছে বলব সে-গপ্পো। নামের নামাবলির কথা।

অনেকক্ষণ চুপচাপ হাঁটল দু-জনে। ডিনার খেতে খেতেই বলা যাবে।

কী হল? কথা বলুন।

অমু বলল, সত্যি! ভাবতেই ভালো লাগছে। কত্তদিন পর যে, ক-টা দিন ছুটি পেলাম। এ, ক-টা দিন শুধু আমার-ই দিন। খেয়ালখুশির নিয়মভাঙার দিন। তোমাদের এখানে প্রত্যেকে যে, এই ঠাণ্ডাতে উঠে তৈরি হয়ে সাতটার মধ্যে কারখানায় পৌঁছোচ্ছে এ-কথা ভাবলেই আনন্দে মূর্ছা যাচ্ছি আমি। আমার একার-ই ছুটি। আর সকলের-ই কাজ। আঃ। বাঙালি হয়ে জন্মেছি তো! শুধুমাত্র নিজে সুখী হলেই সুখী হতে পারি না। আমার সুখের প্রেক্ষিতে অন্যদের দুখি দেখতে না পারলে নিজের সুখটা যেন, সম্পূর্ণ হয় না।

তোড়া হাসল অমুর কথা শুনে।

আঃ। কী সুন্দর রাত। কী সুন্দর গাছগাছালিতে-ভরা সব নির্জন পথ। কী সুন্দর তুমি। আমার হাত ধরে নিয়ে চলেছ অচেনা পথে।

আমি সুন্দর নই।

সৌন্দর্যের বিচার করে অন্যের ‘চোখ’। নিজের চোখ নয়। ‘আমার হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা আমি যে, পথ জানি না, তোমার উপর করিনু নির্ভর তোমা বই কিছু মানি না।’ অমু আবৃত্তি আর গানের মাঝামাঝি গোছের কিছু একটা করল। আবার বলল, গাছটা কী?

এটা সোনাঝুরি।

হ্যাঁ। তোমাদের জামশেদপুর তো সোনাঝুরির জন্যে বিখ্যাত। সোনারি লিঙ্কের দু-পাশে তো অনেক-ই সোনাঝুরি গাছও আছে-না? একসময় প্রতিসপ্তাহে এসে কাইজার বাংলোতে থাকতাম। একটি কোম্পানির ডিরেক্টর ছিলাম। আদিত্যপুরের কারখানায় যেতাম ভোরে উঠে। সন্ধেবেলা এসে দু-পাত্তর হুইস্কি চড়িয়ে ডিনার খেয়ে লাইনিং-এ কেটে রাখা রাউরকেল্লা এক্সপ্রেসে লাগবার জন্যে আলাদা যে, ডিট্যাচট কোচ থাকত, তাতে উঠে ঘুমিয়ে পড়তাম। সেসব সুখের দিন ছিল! স্বপ্নর মতো মনে হয়। জামশেদপুরের আর জানতাম না কিছুই। স্টেশন-কাইজার বাংলো-কারখানা বাংলো স্টেশন। ব্যস। মাঝে-মাঝে লাঞ্চে ‘বেলদি’ ক্লাবে যেতাম অবশ্য। ফর অ্যান অকেশনাল পিংক-জিন। অথবা ভদকা। অথবা টু স্পিল্ট আ বিয়ার উইথ সামওয়ান।

আপনি বড়োবেশি কথা বলেন।

জানি। সবার কাছে বলি না। যাদের ভালো লাগে, পছন্দ হয়, তাদের কাছে বলি। জানি, এটা আমার মস্ত দোষ। মার্জনা কোরো নিজগুণে।

অমুদা, আপনি যেমন কথা বলেন তেমনি চিঠিও লেখেন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, কোনো মানুষ এই টেলিফোন-টেলেক্স-টেলিফ্যাক্স-এর দিনেও এমন চিঠির ভাষায় কথা আর কথার ঢঙে চিঠি লিখতে পারেন। এই অভ্যেস হল কী করে?

কু বলছ না সু? অভ্যেসটাকে? যাত্রা করি বলছ কি?

হেসে ফেলল তোড়া। বলল, দুটোর একটাও নয়। এটা একটা আশ্চর্য অভ্যেস। এ যুগে বেমানান। অলমোস্ট প্রাগৈতিহাসিক। কী করে হল এই অভ্যেস?

ব্যর্থ প্রেমের চিঠি লিখে লিখে, ও পাঠিয়ে। অথবা নিজের সঙ্গে অনর্গল কথা বলে বলে!

তাই?

হ্যাঁ তাইতো!

কিন্তু প্রকৃত প্রেম মানেই তো ব্যর্থ।

তোড়া বলল।

যে-প্রেম পূরিত হয়েছে তারমধ্যে নিলামে কেনা ফার্নিচারের-ই মতো, পরে অনেক-ই ফাঁকফোকর বেরোয়; ফাটাফুটি। পুডিং দিয়ে অনেক জায়গা মেরামত করা থাকে। যতই দিন যেতে থাকে, ততই সেসব ছিদ্র গহ্বর, চিড়, ফাটল নগ্নভাবে প্রকট হতে থাকে। অপূরিত প্রেম বা ব্যর্থপ্রেম-ই তো আসল প্রেম। যা থাকে, নীরব মুহূর্তে, জানলা দিয়ে চাওয়া তারাভরা আকাশে, নিজের গায়ের শালের নীচের ওম-এ, দুঃখময় একাকীরাতের সুন্দর সব স্বপ্নে।

বা:। তুমি খুব সুন্দর কথা বলেছ। সুন্দর করেও। চমৎকার খড়কাই নদীর মতো তোমার কথার চাল। যার বোঝার সেই বুঝবে।

আরে এটা কী গাছ? দাঁড়িয়ে পড়ে অমু বলল। কী সুন্দর সটান শরীর, ছিপছিপে। ঠিক তোমার-ই মতো। আমি দেখেছি আকাশমুখী আগুনবরণ ফুল, কোমল সবুজ পাতার মোড়কে ফোটে এই গাছেই। বসন্তকালে। নাম কী এর জান?

অগ্নিশিখা।

অমু মাথা উঁচু করে দেখল। গাছটির দিকে বার বার তাকাল। তারপর বলল, কী স্নিগ্ধ গাছটি। আর ফুল যখন ফোটে তখন এই স্নিগ্ধতার মধ্যেই জমিয়ে তোলা বছরভরের সব জ্বালা নরম আগুন হয়ে নিবাত নিষ্কম্প হয়ে থাকে। নি:শব্দে হাতছানি দেয়। বুকের মধ্যেটা কেমন যেন, করে। আমি তোমার পুরোনো নাম বদলে নতুন নাম দিলাম অগ্নিশিখা। পছন্দ?

তোড়া দাঁড়িয়ে পড়ে, গাছটির দিকে চাইল একবার। তারপর মাথা হেলাল।

বলল, যে-নামেই ডাকতে ভালো লাগে ডাকবেন। সাড়া দেব। দেখবেন। কাছেই দারুণ কুর্চিবন আছে। যাবেন একদিন? আমি আর আপনি। পূর্ণিমার রাতে? গান শোনাতাম আপনাকে।

অমু তোড়ার বাঁ-হাতখানি তুলে নিয়ে ওর হাতের পিঠে চকিতে চুমু খেল।

একটু লজ্জা, একটু উত্তেজনায় গাল লাল হয়ে উঠল তোড়ার। বলল, কেউ দেখে ফেলবে। চারধারে বাড়ি। কী যে, করেন! আপনার কোনো কান্ডজ্ঞান নেই।

কান্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ এইসব মোটা মোটা গাছের-ই কান্ডের মতো অচল হয়ে যায়। তাদের একজায়গাতেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ‘আজীবন’। কান্ডজ্ঞানকে আমি সযতনে এড়িয়ে চলি।

নিশ্চয়ই কেউ দেখেছে। গাছগাছালির মধ্যের বাংলোগুলো থেকে হাজার চোখ চেয়ে থাকে। এসব পথে যে-লোক চলে না।

দেখলেই-বা। গোপনে কতটুকু আর ঘটে একজন নারী বা পুরুষের মধ্যে। যেটুকু ঘটে বন্ধ দরজার ঘরের মধ্যে সেটুকুও অনুমান করেই নেওয়া যায়। গোপন আসলে থাকে না। কিছুই গোপন থাকে না। কিন্তু যা-কিছু ঘটে দু-জন মানুষের মনে মনে, তার একটুও কি কেউ আঁচ করতে পারে? প্রতিপক্ষ লোকে ভুল দেখে ভুলে বোঝে এবং এক-অষ্টমাংশ ভেসে-থাকা হিমবাহর টুকরোটুকু দেখেই সব-ই দেখেছে এবং জেনেছে বলে ভাবে! রাজেশ খান্নার মুখে সেই বিখ্যাত গান শোনোনি? ‘ও ছোড়ো বেকার বাঁতে। লোগো কো কহেগা লোগোকো যো ক্যাহনা’।

আপনার মতো মানুষের মুখে এইসব ভাষা, গান ভালো লাগে না।

মস্ত ভুল। ‘আমার মতো’, ‘তোমার মতো’ বলে কোনো আলাদা মানুষ নেই। সব মানুষ-ই সমান। ভাগ শুধু দুই। ভালো আর মন্দ। তা ছাড়া, ভাষা নানারকম হয়, মনের ভাবকে প্রকাশ করার জন্যে। যে-অভিব্যক্তি, যে-শব্দ বা বাক্য ছাড়া প্রকাশ করা যায় না, তা ব্যবহার না-করলে সে-অভিব্যক্তি অব্যক্তই থাকে। প্রকাশিত হয় না। ভাষা নিয়ে বাতিকগ্রস্ততা সুস্থমনের পরিচায়ক নয়।

বলেই, অমু থেমে পড়ে বলল, বা:। সামনের এই বিস্তীর্ণ মাঠটি তো বেশ। এ কি গলফ-এর কোর্স নাকি?

হ্যাঁ। কী দারুণ দেখেছেন আমাদের গোলমুড়ি!

মুড়িকে কোনোদিন চৌকো হতে দেখিনি বটে। তবে তোমাদের গোলমুড়ি নীলডি সত্যিই সুন্দর। কিন্তু তোমাদের গলফ কোর্সটি যাচ্ছেতাই।

তাই?

হ্যাঁ।

কেন?

মজফফরপুরের কোনো সান-ট্যানড় মধ্যবয়সি মানুষের মাথার টাকের মতো এ-মাঠ। গলফ-লিঙ্কস দেখবে তো কলকাতায় এসো ‘আর. সি. জি. সি.’ বা ‘টলি’-তে। অথবা চলে যাও শিলঙে। বা ডিগবয়ে। পূর্বী না হলে, চাপ চাপ দুব্বো ঘাস না হলে, খেলার মজাই হয় না। তা সে কোর্স, নাইন হোলের-ই হোক আর কম হোলের-ই হোক। একসময় তো আমিও গলফ খেলতাম। যখন বড়োলোক ছিলাম।

কী জানি! আমি তো গলফ খেলি না। ও খেলে, ওই জানে।

ম্যাচ খেলার সময় আসো তো দেখতে? তোমার স্বামী দুর্বার যখন খেলে? চ্যাম্পিয়নশিপে? তোমার স্বামীর নামটা ভারি পছন্দ আমার। কিন্তু মানুষটি একেবারেই তোমার আঁচলধরা। সে-দিক দিয়ে ওর নামটিও একটি ট্র্যাজেডি। কই বললে না, গলফ খেলা দেখতে আসো কি না?

তা আসি।

কী দ্যাখো?

মানে?

ম্যাচ? না কাঁচাপাকা জুলফির ছোটোশর্টস পরা নানা পুরুষের সুগঠিত পা।

অসভ্য আপনি।

আমি সবচেয়ে বেশি সভ্য। তোমাদের অভ্যেসের বাঁধন ছিঁড়ে ফেলতে সাহায্য করি আমি। সত্যি স্বীকার করতে বড়োভয় তোমাদের। কী করবে না করবে—কী করা উচিত না উচিত ভাবতে ভাবতেই আঁজলা গলে তোমাদের জীবন গড়িয়ে পড়ে যায়। যা বাকি থাকে তা একঘেয়েমি, হা-হুতোশ, পেছন ফিরে তাকানো। জীবন এক ধরনের জলীয় পদার্থ। আঁজলা গলে গড়িয়ে গেলে তা আর কুড়োনো যায় না। তারপর বেলা বাড়ে। বেলা পড়ে। কী দুরন্ত গতিতে যে, আমাদের এই একটামাত্র জীবন ফুরিয়ে আসে, তা ফুরিয়ে এলেই শুধু বোঝা যায়। বাইরে ধুলো ওড়ে। ধুলোয় খড়কুটো। আর তারমধ্যে ঘূর্ণির মতো ওপরে উঠে নাগালের বাইরে চলে যায় তোমাদের অতীত। আমাদের অতীত। সবাকার অতীত। যে-অতীত তামাদি হয়ে গেছে! বড়োদুঃখ হয় তখন। অথচ করার কিছুই থাকে না। দ্যাখো। সুপুরুষের সুগঠিত পা দেখলে পাপ নেই। কিছুতেই পাপ নেই। পাপ নিজেকে বেঁধে রাখায়; নিজেকে কষ্ট দেওয়ায়। এই ছোট্টজীবনে পরিতাপ করার সময় নেই। বাঁচো। প্রতিটি মুহূর্ত বাঁচার মতো বাঁচো।

বড্ড মন খারাপ করে দেন আপনি, অমুদা।

মানুষের-ই মন থাকে। এবং থাকে বলেই, সে-মন মাঝে মাঝে খারাপ হয়। যা-কিছুই সত্যি তারমধ্যেই মিথ্যেও সুপ্ত থাকে। কখনো সত্যিটা মন খারাপ করায়; কখনো মিথ্যেটা। কী করা যাবে!

দামুদা কিন্তু দলমা পাহাড়ে পিকনিকের বন্দোবস্ত করেছেন আপনার অনারে। রবিবারে।

তাই?

তুমিও যাবে তো? শ্রেয়া, শ্রমণা, জ্যোৎস্না, জয়িতা এবং তাদের স্বামীরা?

স্বামীরা যে আমাদের, আপনার সঙ্গে একা ছাড়বার মতো বুদ্ধিহীন এমন মনে করবেন না। তবে মজার কথা এই যে, আমাদের প্রত্যেকের স্বামীরাও আপনার প্রেমে পড়েছেন। এটা একটা ফ্যান্টাসটিক ব্যাপার! এমনটি ঘটে না সচরাচর।

সে কী? সে তো ভালো কথা নয়। মন্দলোকে এর খারাপ মানে করতে পারে।

খুব-ই মজা লাগছে ভাবলেই যে, একটা পুরোদিন একসঙ্গে কাটানো যাবে আপনার সঙ্গে। দলমাতে।

তারপর-ই বলল, জানেন, সেদিন দলমা থেকে একটি হাতি নেমে হাইওয়েতে একটি মারুতি গাড়িকে চেপটে দিয়েছে। বাস তাড়া করেছে। পরে নাকি হাতিটাকে মারাও হয়েছে। কী অন্যায়।

তুমি বুঝি হাতি খুব ভালোবাসো?

খুব।

আমাকে কি হাতির মতোই ভালোবাসো? না তার চেয়ে একটু কম?

ইয়ার্কি ভালো লাগে না সবসময়। ভালোবাসার মতো সূক্ষ্ম একটা ব্যাপারের মধ্যে, কবি হয়ে আপনার হাতি এনে ফেলতে লজ্জা করল না?

আমার নাম ষষ্ঠীচরণ, যিনি হাতি লোফেন যখন-তখন। জানি না, তোমরা সকলেই আমাকে হাতির মতো ভালোবাসলে কেন?

আমরাও ঠিক জানি না। কালকে শ্রমণার সঙ্গে আপনার বিষয়ে কথা হচ্ছিল। সত্যি! আপনি একজন পূর্ণ মানুষ।

হা:। হা: খুব জোরে হেসে উঠল অমু ঘোষ। বলল, জোক অফ দ্যা ইয়ার ইনডিড। আমার স্ত্রী রানি তো বলেন আমি একটি বিদূষক। ভাঁড়। এন্টারটেইনার। ওইটুকুই আমার দাম। আর কোনো প্রয়োজনীয়তাই নেই আমার, এ-সংসারে। যদি বিদূষকের বা ক্রাউনের দরকার হয় কখনো, ডেকো তাকে। পূর্ণ পুরুষ! আর এখন মরলেও আমার কোনো দুঃখ নেই। এই উপাধিটি আমার বুকে বাঁধিয়ে দিতে বোলো শ্রমণাকে।

মিথ্যে কথা বলেন বড়োই আপনি বানিয়ে বানিয়ে। মিথ্যে কথা বলাটাই আপনার অবসর বিড়োদন। আপনি বিদূষক, একথা কোনো মানুষ-ই বলতে পারেন না। আপনার স্ত্রী তোনন-ই। আপনার মতো স্বামী পেলে যেকোনো মেয়েই....।

আমার স্ত্রী মস্ত বড়ো মানুষ। ভালো মানুষ। কবির এই কাছা-খোলা বাউণ্ডুলে অবাস্তব স্বভাবের কারণে তাকে অনেক-ই দুঃখ দিয়েছি। তাই হয়তো বলে। তবে আমি কবি। আমার জাত আলাদা। তাই কুজাত বা বজ্জাতও অনেকে বলেন। সত্যিটাকেও এমন সুন্দর করে বলি যে, তা মিথ্যের মতো শোনায়। অথবা উলটোটাও বলতে পারো। একজন গোলা কাঁঠালের মহাজন বা কালোয়ারের কথার সঙ্গে আর একজন কবির কথার সঙ্গে তফাত তো কিছু থাকবেই! নাকি থাকবে না?

মোটেই না। আপনি সবসময়-ই সুন্দর করেই বলেন। ঈশ্বরের দান এ। আপনার কথা।

দুর্বার তো চমৎকার ছেলে। কৃতী। বড়োলোক। বড়ো চাকুরে। প্র্যাকটিকাল। দায়িত্ববান। স্ত্রীর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে সবসময়। তার তো হীনম্মন্যতা থাকার কথা নয় কোনোরকম, তারও আমাকে ভালোলাগার কারণ তো কিছু খুঁজে পাচ্ছি না। ব্যাপারটা সন্দেহজনক।

সব-ই ঠিক। তবু।

অগ্নিশিখা, তোমার নিজের কখনো দুর্বার ছাড়া আর কাউকে ভালো লাগেনি? বিয়ের পর? কারো জন্যে একটু দুর্বলতা? না দেখতে পেলে মন খারাপ হওয়া? চিঠির জন্যে বার বার শূন্য লেটার বক্সে কারো চিঠির আশায় হাত ঢুকিয়ে নিজেকে অভিশাপ দাওনি কি কখনো? সত্যি করে বলবে?

একটুক্ষণ চুপ করে থাকল তোড়া। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

বলল, আপনাকে মিথ্যে বলব না। কারণ মিথ্যে বলা যায় না আপনাকে। অদ্ভুত বাজে লোক আপনি একটা! আপনি র‌্যাসপুটিন!

কী বললে? র‌্যাসপুটিন! হা:। হা:। তোমার মুখে ফুলচন্দন পড়ুক। এ-কথা যদি কখনো সত্যি হত!

তবে র‌্যাসপুটিনের মতো হতে হয়তো সব পুরুষের-ই সাধ যায়। তাতে তার যে, শাস্তিই হোক-না-কেন। কিন্তু আমি র‌্যাসপুটিন নই। হতে পারব না কখনো। হতে চাইও না। হলে, বড়োজোর হতে পারি কোনোদিন ডরিয়ান গ্রে। যে-মানুষের ‘বিবেক’, বাড়ির গভীরের ঠাণ্ডা অন্ধকার সেলারে তার মুখের ওপরে, তার প্রকৃত চরিত্রর ছাপ এঁকে দিয়ে দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখে, নষ্ট হলেও নষ্ট হয়ে যাওয়া থেকে।

অগ্নিশিখা, এমন কে কবি আছে বলো যে, একা ঘরে নীরবে কেঁদে বলে না যে, ‘প্রভু নষ্ট হয়ে যাই’। এমন কোন কবি আছে যে, ঠোঁট কামড়ে নিজের দাঁতে তা রক্তাক্ত করে চোখের ধারা বওয়ায় না? আমরা তো সব ভেতো বাঙালি! এখানে পিকাসো, গঁগা, বোদলেয়র, সেজান, হুইটম্যান, হেমিংওয়ে, রবার্ট ফ্রস্ট, এমনকী রিচার্ড বাখও নেই। সে-রক্ত, সে-জেদ, সেই রক্তক্ষরণের সাহস আমাদের কারোরই নেই। হবেও না আগামী পঞ্চাশ বছরে। হবে না, যতদিন, এ-দেশের মেয়েরা কবিদের যোগ্য মর্যাদা দেবে। তোমাদের জন্যেই একটি প্রজাতির পুরুষজাত পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেল। তবু শেষে বলি, র‌্যাসপুটিন হওয়ার বাসনা আমার নেই। যাই-ই পাই, তাই-ই আমি গ্রহণ করি না। অন্যকে কষ্ট দিয়ে আমি কবি হইনি। অন্যের কষ্টকে ‘ফুল’ করে ফুটিয়ে তোলাই আমার সাধনা। সব কবির-ই সাধনা।

এবার বলো, তুমি কি দুর্বার ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসোনি? বিয়ের পরে? তার কথা বলো, যার কথা বলছিলে।

একবার-ই হয়েছিল। মুম্বইতে। তখন মুম্বইতেই থাকতাম। একটি পাঞ্জাবি ছেলে। ব্যাচেলার। ওদের-ই কোম্পানির। ‘ভাবি’ ‘ভাবি’ করত। একসঙ্গে খেতে বসে আমার জন্যে মাছ, কী ভালো রান্না, যথেষ্ট পরিমাণে রইল কি-না, তা দেখা থেকে আমাকে কোন শাড়িতে কেমন দেখায়, কোন জামা, শাড়িতে। কোন ফুল যায়, এইসব-ই নজর করা, প্রায় ওর প্রি-অকুপেশানই ছিল বলতে পারেন। অথচ দুর্বার কখনো কোনোদিন মাথা ঘামায়নি এসব ব্যাপার নিয়ে। সব স্বচ্ছল মানুষের জীবন-ই এখন যেমন হয়, গাড়ি, ভি সি আর, কালার টি ভি, ইত্যাদি ইত্যাদি; প্রতি শুক্রবার বা শনিবারে পার্টি। আমার হাতে যখন যা-চাই, তা দেওয়া। এসব-ই দুর্বার করে। স্বচ্ছল ও সচ্চরিত্র স্বামীদের যে, অন্য কোনো দোষ বা অপূর্ণতা থাকতে পারে, এমন কথা আমি কেন, অন্য কোনো মেয়েই ভাবে না অমুদা। কারণ ভাবনার কোনো অবকাশ-ই ঘটে না। সংসারের জাল এমন-ই। তবে যখন-ই একটু ফাঁক পাই, তখন-ই একটি বই নিয়ে হয়তো বসি। বই পড়তে আমার খুব ভালো লাগত। আপনিও আমার প্রিয় কবি ছিলেন। আপনার কিছু কিছু কবিতা পড়ে মন, বড়োখারাপ হয়ে যায়। ঝড় ওঠে মনে। আপনি মানুষটি মানুষ হিসেবেও যেমন ডিস্টার্বিং কবি হিসেবেও তেমন-ই।

পাঞ্জাবি ছেলেটির কথা বলো। একটি সিগারেট ধরিয়ে অমু বলল।

ছেলেটির কাছে আমার কখনো কিছু চাইতে হয়নি। ও বুঝতে পারত নিজে থেকেই, আমার কখন, কী দরকার! কখন আমার পারফ্যুম ফুরিয়ে গেছে, কখন আমার উইকএণ্ডে একটু কাছাকাছি বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছে করছে, কখন লং-ড্রাইভে যেতে ইচ্ছে করছে, ও সব-ই বুঝতে পারত। কখন আমার মাথা ধরেছে বা কখন আমি বিরক্ত হয়েছি তাও ও, আমার মুখ দেখেই বুঝতে পারত।

ছোকরা নিশ্চয়ই খুব ফাঁকিবাজ ছিল। দুর্বারের মতো অত খাটতে হলে আর পরস্ত্রীর পরিশ্রম আর মাথাধরা নিয়ে নিজের মাথা খাটাবার সময় থাকত না। কী বল?

একদম-ই ভুল কথা। আর অমুদা, আপনি ওকে ‘ছোকরা’ বলবেন না।

কেন?

‘ছোকরা’ কথাটার মধ্যে একধরনের অপমান এবং তাচ্ছিল্য জড়ানো আছে।

আছে বলেই তো বলেছি। প্রিসাইসলি, সেই কারণেই।

এটা অন্যায়।

একটুও নয়। যে তোমাকে ভালোবেসেছে, সে আমার শত্রু। প্রয়োজনে তার সঙ্গে আমি ডুয়েলও লড়তে পারি।

হেসে উঠল তোড়া জোরে। পথ-পাশের গাছগাছাল, চতুর্থীর চাঁদ নড়ে-চড়ে উঠল যেন, হাসিতে। ঠিক সেইসময়ে একটা কালো বেড়াল হঠাৎ ডান-দিক থেকে বাঁ-দিকে গেল, পথ পেরিয়ে সামনে দিয়ে।

ও মা: গো! বলে জড়িয়ে ধরল তোড়া অমুকে মুহূর্তের জন্যে।

তারপর-ই লজ্জা পেয়ে ছেড়ে দিল।

বলল, বিচ্ছিরি। অলুক্ষণে। বাঘের মতো দেখতে। কীরকম ভূতুড়ে-হলুদ চোখ।

বুদ্ধদেবটা থাকলে ভালো হত। অমু বলল।

ওঁরা তো আসবেন পঁচিশে শুনেছি! ছাব্বিশে কী একটি অনুষ্ঠানে।

হুঁ।

আমাকে ডাকেনি কমল।

উনি কি সত্যিই শিকার-টিকার করেছেন কখনো?

কার কথা বলছ?

বুদ্ধদেব গুহর।

জানি না। তবে ও নিজে বলে, শহরে শিকার হল না বলে, প্রায় শিশুকাল থেকেই বনেজঙ্গলে ঘোরে।

একটু চুপ করে থেকে বলল, কেন? তুমি বুদ্ধদেবের লেখার ভক্ত?

একদম না। এখানে কিছু বোকা বোকা মহিলা আছেন, তারা খুব ভক্ত। আসলে সাহিত্যের কিসসু বোঝেন না।

এবারে আমার কথাটির উত্তর দাও। বুদ্ধদেব-ফুদ্ধদেব ভুসিমালের নাম এনে আমার কনসেনট্রেশান নষ্ট কোরো না। আমি কিন্তু সত্যিই ডুয়েল লড়তে পারি সেই ছেলেটার সঙ্গে।

তোড়া বলল ‘হা:’। আপনি আমাকে ভালোবাসেন এ-কথা বিশ্বাস করব। আপনি আসলে একটি ফ্লার্ট। সকলকেই আপনি দেখান যে, ভালোবাসেন। আপনি জীবনে একজনকেও ভালোবেসেছেন কি না, আমার সন্দেহ আছে। আসলে আপনি নিজেকেই সবচেয়ে ‘বেশি’ ভালোবাসেন।

কী জানি! বুঝে উঠতে পারলাম না এখনও।

আমি ওকেও, মানে ওই ছেলেটিকেও ঠিক ভালোবেসেছিলাম কি না জানি না। জানেন অমুদা।

ভালোবাসা ব্যাপারটা তো এককথার নয়। কত্তরকম থাকে ভালোবাসার। প্রত্যেক বিবাহিতা মহিলার-ই, এক বা একাধিক প্রেমিক থাকা ভালো কিন্তু সবদিক বিচার করেই বলছি।

জানি না। তবে ওর কথা এখনও মাঝে মাঝে মনে হয়। চিঠিও লেখে মুম্বই থেকে মাঝে মাঝে। আমাকে বলে, লিখলে যেন, অফিসের ঠিকানাতে লিখি। এখন বিয়ে করেছে তো। স্ত্রী সব চিঠি খুলে পড়েন।

একবার লিখেছিল, ‘ভাবি, ভেবেছিলাম বিয়ে যদি কখনো করি তো তোমার মতো মেয়েই বিয়ে করব। আমার বউ বাইরে থেকে চেহারা-ফিগারে প্রায় তোমার-ই মতো। কিন্তু আর কোনোই মিল নেই। জীবনটা বরবাদ হয়ে গেল। ডিভোর্স করার মতো মনের জোর, সমাজকে তোয়াক্কা না করার জোর আমার নেই। ছেলেটা এসে গেছে। ওর কী দোষ? ওর মুখ চেয়েই পারব না। তবে সোনিয়া, আমার বউ হয়তো পারবে। ওর চরিত্র নুড়ির মতন। পাহাড়ি নদীর নুড়ি। মাটি লাগে না। ঘাস, পাতা, কাদা কিছুই লেগে থাকে না তাতে। সে কোনোরকম পিছুটান ছাড়াই গড়িয়ে যায় নদীর স্রোতের সঙ্গে এক বাঁক থেকে অন্য বাঁকে! আমার স্ত্রীর এক প্রেমিক আছে। হরবিন্দর। ছেলেটা ভালো। বিয়ে করলে ও মরবে। সোনিয়া বহলতা নদী। সোঁতা নয়। প্রেম করা এক আর বিয়ে করা অন্য। তবে ছেলেকে আমার কাছে রেখে দিতে রাজি থাকলে, আমি কাল-ই সোনিয়াকে ডিভোর্স দিয়ে দেব। শুনেছি, উকিলের বাড়ি যাওয়া-আসাও করছে। খবর শিগগির-ই হবে। খবর হলে জানাব। মন ভালো লাগে না। তোমার যে, ফোটো ক-খানি আছে তাই মাঝে মাঝে একা বাড়িতে বসে দেখি। ভালো আছ তো ভাবি?’

ওর চিঠি পড়ে বড়ো মন খারাপ হয়ে যায়, আপনার কবিতা পড়ে যেমন হয়। জানেন, প্রত্যেক চিঠির শেষে ও লেখে; ‘তোমার চিরদিনের খিদমদগার’। ও উত্তীয় যেন, আমার। আমি শ্যামা। একবার ওর এখানে, মানে জামশদেপুরে, ট্রান্সফার হয়ে আসার কথা হয়েছিল। পরে শুনেছিলাম বলতে লজ্জা করছে কথাটা যে, দুর্বার-ই কলকাঠি নেড়ে তা বানচাল করে দেয়। আমার স্বামী আসলে উদার নয়। খুব কম স্বামীই উদার। ঔদার্যের মুখোশ পরে থাকেন সবাই।

বজ্রসেন কেউ আসেনি জীবনে তাহলে?

একটু চুপ করে থেকে বলল অমু। সিগারেটের ধুয়ো ছেড়ে।

না:। যার জন্যে, সব ছেড়ে ভেসে চলে যাওয়া যায়, তেমনি পুরুষ এই জন্মে দেখলাম-ই না! সেসব পুরুষ স্বপ্নেই থাকে। ভাগ্যিস।

সামনের বাড়িতে বোধ হয় কোনো পার্টি-টার্টি আছে। অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে। অমু বলল।

বা:। এটাই তো হিতুদার বাংলো। আপনার-ই অনারে তো পার্টি।

‘আমার অনারে পার্টি’ —কথাটা শুনলে কেমন, সুড়সুড়ি লাগে।

তা লাগলেও কথাটা সত্যি। আপনি তো অনারেবল বটেই।

কারা আসছেন?

তা হিতুদা নিশ্চয়ই অনেককেই বলেছেন।

এই রে!

কেন? এই রে কেন?

যাদের চিনি, শুধু এখানেই নয়, সবখানেই, তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে পারি না। সময়ের-ইএত অভাব। সত্যিই অভাব। তাই জানা-চেনার পরিধি আর বাড়াতে ভালো লাগে না। অথচ জেনুইনলি আমি মানুষজন ভালোবাসি। গল্প করতে মজা পাই। মানুষেরা, মনে হয় স্ত্রী-পুরুষ-শিশুনির্বিশেষে আমাকে পছন্দও করেন। তবু শুধুই সময়াভাবেই গুটিয়ে রাখি নিজেকে। অন্যে, অসভ্য অসামাজিক এমনকী অভদ্রও বলেন। দুঃখও কম পাইনি জীবনে নানা-জনের কাছ থেকে। মাঝে মাঝে প্রতিবাদ, বিদ্রোহ করতে মন চায় কিন্তু আমার অপরাগতার কথা আমি জানি আর ঈশ্বর-ই জানেন। প্রতিবাদ করিনি, করি না কারণ, করলে অন্যকে আহত করা হয়। সব অসামাজিকতা, অভদ্রতা, অসভ্যতার দায়িত্ব নিজের কাঁধেই বয়ে বেড়াই। এতসব কথা বলতেও ইচ্ছে করে না। কাউকে। বললেও বোঝে না কেউ। তোমাকে বললাম। হয়তো তুমি বুঝবে।

তোড়া দারুণ হাসি-খুশি মজার প্রাণবন্ত এই পুরুষটির বুকের মধ্যে কোথাও যে, পাথর-চাপা কিছু আছে সে-সম্বন্ধে বুঝতে না পারলেও অনুমান করতে পারল। এই প্রথমবার দুঃখও হল মানুষটার জন্যে। যে, মানুষটা এখানে তিন-চারদিন এসে ওঠার পর থেকে তারমধ্যে সম্পূর্ণতার সংজ্ঞা খুঁজে পেয়েছেন যাঁরাই মিলিত হয়েছেন, তার সঙ্গে তার সত্তাও যে, অখন্ড নয় এ-কথা জেনে মন খারাপ হয়ে গেল। দুঃখ নেই, এমন মানুষ-ই বোধ হয় নেই। তবে প্রত্যেকের-ই দুঃখের রকম আলাদা আলাদা।

ভাঙাচোরা আছে যে, অমু ঘোষ-এর হৃদয়েরও ভেতরে, এ-কথা হৃদয়ে উপলব্ধি করে বড়োই মন খারাপ লাগতে লাগল তোড়ার। আবার আনন্দও হল। সকলের বুকেই যখন পাথর চাপা দুঃখ থাকে তখন, এই মানুষটাই বা অন্যরকম হবে কেন? তোড়ার এবং অগণ্য নারী-পুরুষের দুঃখের সেও ভাগীদার হোক। তা ছাড়া এতবড়ো কবি, দুঃখ ছাড়া কবিতা লিখবেন-ই বা কী করে? দুঃখ ছাড়া কী, কিছু হয়? তোড়া যখন-গান গাইত এবং মোটামুটি ভালোই গাইত তখন একথা বুঝেছিল। কখনো-কখনো বাথরুমে গায় এখনও। নগ্ন শরীর, সাবান, শ্যাম্পুর ফেনা, খোলা কলের একটানা ঝরঝরানি, বাগানের বুলবুলির শিস তাকে যখন, ক্ষণকালের জন্যে উন্মনা করে তোলে তখন তোড়া গান গায়। গান গাইবার পরিবেশ চাই। শোনবার মতো আগ্রহী মানুষ চাই। দুর্বার গান একেবারেই ভালোবাসে না। এমনকী ওর সামনে কেউ গান গাইলে ও বিরক্ত হয়। মনে পড়ে গেল তোড়ার, ওদের বাড়ির বেডরুমের দরজায় চাপা পড়েছিল একটি টিকটিকি। সে তিল তিল করে দেওয়ালের এক-ই জায়গাতে ঝুলে থেকে শীর্ণ হতে হতে একদিন প্রায় উবেই গেল। তেমন-ই গেছে তোড়ার গান।

হঠাৎ-ই, একেবারেই হঠাৎ, বিন্দুমাত্র প্রস্তুতি ছাড়াই বুকের মধ্যেটা দুমড়ে উঠল তোমার এই দীর্ঘদেহী, অসুন্দর মানুষটির জন্যে। হিতুদার বাড়ির সামনে পৌঁছে গেছে এখন ওরা। মধ্যে থেকে অ্যালসেশিয়ান ডাকছে গম্ভীর গলায় ‘ঘাউ ঘাউ’ করে। গেটেও কুকুরের ছবি। লেখা আছে ‘Beware of Dogs’ বিখ্যাত কবি অমু রায়ের মুখের দিকে মার্কারি ভেপার ল্যাম্পের কৃত্রিম বাদামি ঔজ্জ্বল্য এবং মানুষের পদদলিত চাঁদের ম্লান নীলচে আলোয় তাকাল তোড়া একবার। তারপর বলল, চিঠি লিখলে চিঠির জবাব দেবেন তো? অমুদা?

ঘোর ভেঙে অমু বলল, নিশ্চয়ই। আমি প্রত্যেককেই জবাব দিই চিঠির। তোমাকে দেব-না? তবে লেখার কিছু থাকলেই লিখো।

‘আমি ভালো আছি। আপনি কেমন? এখানে গরম পড়িতেছে। নমস্কার জানিবেন।’

এইরকম লিখো না।

যদি ভালো থাকো তো কতখানি ভালো আছ এবং কতখানি নেই এবং কেন নেই তাও জানিয়ো। যদি গরম পড়ার কথা লেখো, তাহলে পলাশ, শিমুল ফুটল কি না এবং কোকিল ডাকছে কি না তাও জানাতে ভুলো না। কথা সাজালেই চিঠি হয় না; ‘হৃদয়ের পাঞ্জার ছাপও যেন তাতে থাকে। বুঝেছ!

অমুর ডায়েরি-২

সব গোলমাল হয়ে যায়। ‘মন’ যা-বলতে চায়, মুখ তা বলে না। তবু যত কথা তা, মুখ-ই বলে। সারাদিন।

বিষ্ণুদের বই ছিল-না? ‘নাম রেখেছি কোমল গান্ধার’। আমি নাম রেখেছি অগ্নিশিখা। কোনোদিন একটি কবিতা লিখব। অগ্নিশিখা তোমাকে নিয়ে।

বেশ লাগল অনেক অনেকদিন পর চাঁদের আলোয় নানা ফুলের গন্ধভরা পথে কারো পাশাপাশি হাঁটতে; এমন মানুষ, যে-নীচুস্বরে কথা বলে, যাকে দেখে মনে হয় সে, উচ্চস্বরে কর্কশভাষায় কখনো ঝগড়া করতে জানে না। যে গরমের দুপুরবেলায় তার পুরুষ ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলে তাকে বড়োগাছের মতো ছায়া দেয়। কলাই-এর ডাল, ঝিঙে-পোস্ত আর শুকতো রেঁধে খাওয়ায়। আর শীতের রাতে যে, বিরিয়ানি পোলাও আর বটি-কাবাব তৈরি করে অম্বর আতর লাগানো ফলসা রং মালিদার নীচে নিজের শরীরের সব উষ্ণতাটুকু জিইয়ে রেখে অপেক্ষা করে, দুয়ার-দেওয়া ঘরে রাতের খেলার সাথির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি হওয়ার জন্যে।

বেশ বলেছিল অগ্নিশিখা।

বিয়েটা একটা চুক্তি। এগ্রিমেন্ট। সব মেয়েই অবশ্য বলে এ-কথা। ছেলে-মেয়ে এসে যাওয়ার পর, তা আর ভাঙা যায় না।

কথাটা ঠিক। অমুও বিশ্বাস করে কথাটা। তবে উইলেরও ‘কোডিসিল’ হয়। উইলও তো একটা চুক্তি। নিজের সঙ্গে নিজের। এগ্রিমেন্টের সংশোধনী হয় পুরোনো দলিলকে না ছিঁড়েও। এ-কথাটা নিজে যতটা বোঝে অন্যকে ততটা বোঝাতে পারে না। বোঝাতে চায় না। জোর করে কাউকে কিছু বোঝানো উচিতও নয়। যে, যতটুকু বোঝে, তার পক্ষে যা-ভালো বলে বোঝে; সেটুকু বোঝাই ভালো। নইলে বোঝা, ভারী বোঝা হয়ে ওঠে।

বেশ মেয়েটি অগ্নিশিখা। বুদ্ধিমতী। কিন্তু সেই-বুদ্ধি প্রকাশের জন্যে, কোনো ছটফটানি নেই। বুদ্ধিমানের চোখে বুদ্ধি চাপা থাকে না। ধরা তাকে পড়তেই হয়।

জমাটি শীত। বাইরে এখন গোলমুড়ি ক্লাবের পাহাড়ের সমান উঁচু ভেতরে বড়ো ক্লাব-হাউসের চত্বরে, বড়ো বড়ো গোল আলোর মালায় মনে হচ্ছে যেন, গোয়ালিয়রের রাজপ্রাসাদ। বাড়িটা চমৎকার। বন্দোবস্তও চমৎকার। কিন্তু হলে কী হয়! যে-মানুষদের ভার একে সুষ্ঠুভাবে চালানোর, তাঁরা তাঁদের কর্তব্য করেন না। বেয়ারা থাকে না। বাবুর্চি থাকলেও খারাপ রান্না করে। নিয়মানুবর্তিতা আছে ঘড়ির কাঁটাতেই শুধু। চরিত্রে নেই; উদ্যমে নেই। মানুষ-ই, এক-একটি দেশের চরিত্র, সুস্থতা, স্বাচ্ছল্য নিরূপণ করে।

সেদিন গোপনে এই ক্লাবেই ডিনার খাওয়াল অনেককে। রবি মুখার্জি ও ড. গৌতম দাশগুপ্তকেসস্ত্রীক বলেছিল আসতে। আরও অনেককে। আমাকে তো বলেছিলই। অর্ডার করেছিল চিকেন ফ্রায়েড রাইস, বোনলেস-চিকেন আর কী কী যেন। একজন বার-বেয়ারা মেক-শিফট বার-এ দাঁড়িয়ে হুইস্কি খেয়ে নিজেই আউট হয়ে গেল। খাবার যখন সার্ভ করল তখন, চক্ষুস্থির হয়ে গেল। এমন চিকেন ফ্রায়েড-রাইস আর বোনলেস-চিকেন পৃথিবীর কোনো জায়গাতেই খাইনি। এমনকী আমার সেজোপিসির মতো পৃথিবীর খারাপতম রাঁধুনিও পরমচেষ্টাতেও অমন বিচ্ছিরি রান্না করতে পারতেন না। বেচারা গোপেন। মুখ কালো করে বসেছিল। পুরো নীলডি এবং গোলমুড়ি ক্লাবের ইজ্জত রক্ষার ভার যেন, ওর-ই একার! ও বেচারা কী করবে? সরষের মধ্যেই ভূত ঢুকে গেছে। এই ভূত ছাড়াবার ‘ওঝা’র দরকার সারাদেশে। কবে যে সে, আসবে! এই পার্টিতেই কল্যাণ আমার হাতে আড়ালে ডেকে একটি কবিতা দিল।

কোথাও কি ছাপাতে বলতে হবে?

না, না। আপনার-ই জন্যে। এমনিই।

কবিতাটি গোলমুড়ি ক্লাবের বারান্দাতে দাঁড়িয়েই পড়ে ফেললাম। অভিভূত হয়ে গেলাম।

কবিতার নাম দিয়েছে ‘ঝড়’—

এখানে ভীষণ খরা, প্রচন্ড গরমে

সকলের ওষ্ঠাগত প্রাণ।

একঘেয়ে গুমোটের চাপে

শত্রু কুকুরেরা স্বরে স্থবিরতা পেল।

নিথর গাছের পাতার মতো

ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষাগুলো স্থির হয়ে আছে,

চাইবার কিছু নেই, দেবারও না কিছু—

একঘেয়ে বিষণ্ণতা, দুঃখ নিয়ে দিন।

এমন সময় সে এল, ঝড়ের মতো!

হাওয়ার দাপটে গাছগুলো টলোমলো,

ধুলো ওড়ে, চারিদিক আবছা আঁধার।

শত্রু কুকুরেরা এ ওর, ঘাড়ে পড়ল ঝাঁপিয়ে;

নিস্তব্ধতা ছারখার হল অজস্র চিৎকারে।

তবুও এ-ঝড় চিরস্থায়ী নয়।

যেমন এল আচম্বিতে তেমনি চলে যাবে

অন্য একদিন, অন্য কোনোদিকে হাওয়া দেবে

শুকনো আর ধূসর প্রান্তরে।

শুধু এরপর বৃষ্টি যেন, আসে—

গুমোটের পাতাগুলো ঋতুস্নান সেরে

স্পন্দন এনেছে দ্যাখো ফসিলিত গাছে

শিকড়েরা সব, যার যার গহ্বরে নেমে গেছে।’

এই ঝড় কি অমু নিজে? ভেবে, নিজের মনেই খুশি হল খুব। এবং একটু শঙ্কিতও যে, হল না এমনও নয়। ব্যস্ত ডাক্তার অথচ কবি। পুলিশ অথচ ভদ্রলোক। ভাবা যায় না।

ঘুম পাচ্ছে বড়ো। যোগেন আর রিতার বাড়িতে অনেক-ই রাত হয়ে গেল। মালুরা নামিয়ে দিয়ে গেল। খাদ্য, পানীয় দুই-ই বেশি হয়েছে। ভালো ঘুম হবে না। এবং না-হলে নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখব।

কিন্তু কাকে?

অগ্নিশিখাদের বাড়ির আউট হাউসের সামনে চড়ে-বেড়ানো লোম-উঠে-যাওয়া লাল মুরগিটাকে? না, ছবির বসবার ঘরে টাঙানো অস্ট্রিয়ার টিরল প্রভিন্স-এর নিসর্গ দৃশ্যকে? নাকি কোনো রক্তমাংসের নারীকে? কাকে?

স্বপ্ন না দেখাই ভালো। কোনোরকম স্বপ্নই। কারণ, মনে থাকে না। সুন্দর স্বপ্নগুলিও মুছে যায়। অথচ ‘স্মৃতি’ থেকে যায় বুকে অস্পষ্ট ব্যথা হয়ে।

অগ্নিশিখা

ব্রেকফাস্ট শেষ করে বারান্দার চেয়ারে বসে রোদ পোয়াচ্ছি। টেনিসের হার্ডকোর্টের পাশের ঝাউবনে বুলবুলি শিস দিচ্ছে। এমন সময় গবু এল। আমার ডিসট্যান্ট কাজিন।

বউ কোথায়?

তৈরি হচ্ছে। একঘণ্টা টাইম দিয়ে এসেছি। যাওয়ার সময় তুলে নেব।

যাবি কোথায়?

আজ শনিবার যে! গবু বলল। চলো অমুদা, আজ লাঞ্চ খাব মাঠে, আর ক্রিকেট দেখব। দারুণ ম্যাচ আজ।

কার সঙ্গে কার খেলা?

ফাদার্স ভার্সাস সানস। লিমিটেড ওভারের খেলা, লাঞ্চ-এ বিরিয়ানি অ্যাণ্ড বিয়ার। তুমি আমার গেস্ট। অবশ্য আরও অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়ে যাবে।

চলো বেরিয়ে পড়ি। বাজারে গিয়ে পান খাওয়াই তোমাকে। তারপর ওষুধও কিনতে হবে। টেলকো দেখেছ ভালো করে?

আমার দেখার উৎসাহ নেই।

কেন?

অনেক দেখেছি। সব দৃশ্যই মনে হয় আগে দেখা। সব দ্রষ্টব্য।

নতুন কিছু দেখাতে পারিস যা, কখনো দেখিনি? যা-দেখে, অন্য কোনোকিছুর কথা মনে হবে না?

মনে মনে বললাম, কোনো গাছ, ফুল, পাখি বা নারী?

না। ওষুধ তো কিনতে হবে। নাকি? ফোনে বললে যে!

হ্যাঁ।

এত ওষুধ খাও কেন?

এও এক অভ্যেস। চাকরির মতো। বিবাহিত জীবনের মতো।

ভূপেনবাবু কী বলেন জান?

কে ভূপেনবাবু?

আরে ভূপেনবাবু গো! দেজ মেডিকেলের।

ও। তা কী? কী বলেন? কী ব্যাপারে?

যেমন ওষুধ তৈরি করার সময় লিখে দেওয়া হয় ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট আর এক্সপায়ারি ডেট আমাদের যিনি বানিয়েছেন তিনিও ওমনি তারিখ লিখে দিয়েছেন অদৃশ্য কালিতে কপালে। যেদিন যাওয়ার সেদিন যেতেই হবে।

অমু হেসে উঠল। বলল, বেশ বলেছেন। হক কথা।

দু-তিনটি গাড়ি আসার শব্দ হল গোলমুড়ি ক্লাবের গেট পেরিয়ে।

গবু বলল, বা: বা:। এ যে, দেখছি লেডিস স্পেশ্যাল। তুমি দেখালে অমুদা। মেয়েরা তোমাকে এত পছন্দ করে কেন বলো তো? এই বয়েসেও?

শোন গবেট! শুধুমাত্র মেয়েরাই নয়, মেয়েদের স্বামীরা এবং বাবারাও করে নইলে, তাঁদের অমতে কি আর এঁরা আসতে পারতেন? তবে পছন্দ মেয়েরা আমাকে আদৌ করে না। আমি মেয়েদের পছন্দ করি। বললে কী হবে, তোদের মতো কাঠখোট্টারা তো গান, সাহিত্য, ছবি এসবের কদর করিস না। একদিন যা ছিল কিন্তু আজকের এই গরিব নির্গুণ, রোজগারহীন, নিরূপ বৃষকাঠ কবিরও কিছু দাম যে, আছে এত মেয়েদের, স্ত্রীদের, বোনেদের কাছে তা, নিজচোখে দেখে রাখ। পাখিপিসিকে চিঠি লিখিস যে, তাঁর বকা ভাইপো ফাঁকায় নেই। তোর মতো অ্যাকাউন্টেন্ট না-হলে কী হয়। নিজের বউকে আজ দুধেভাতে রাখতে পারি না বটে অন্য অনেকের বউ-মেয়েরা এই পোড়াকাঠ কবিকে অশেষ খাতির-যত্ন করে।

তাইতো দেখছি।

জীবনের ‘হিসাব’ ঠিক-ই মেলে। বুঝলি গবু। একদিকে কম থাকলে অন্যদিকে বেশি হয়। যাকে বিধাতা মেধা দেন না, তাকে সিধে দেন কুলীন ব্রাহ্মণের মতো। যাকে রূপ দেন না, গুণ দেন কিছু। কনসোলেশান প্রাইজ হিসেবে। যাকে অর্থ দেন না, তার ওপরে যশ ছিটিয়ে দেন সামান্য। পূত গঙ্গাজলের-ই মতো। আমাকে ঈর্ষা করিস না। তোর বউদির নিরন্তর গঞ্জনাবাক্য, তাকে সুখে না রাখতে পারার অনুযোগ, অভিযোগ, যদি এইসব ভালো মানুষদের (তারমধ্যে তোর স্ত্রীও পড়েন) অকৃত্রিম স্বার্থহীন ভালোবাসায় সামান্য সময়ের জন্যেও পূর্ণ হয়ে ওঠে তাতে, নিজের চোখ টাটাস না। কবিরা বড়ো দুঃখীরে। সব কবিই। সব গাইয়েই। সব শিল্পীই। দুঃখের সঙ্গে ঘর করারই আর এক নাম শিল্পসৃষ্টির পরিবেশ। এই দুঃখটার রকম, নানা হয়। কারো দুঃখ ভাত-কাপড়ের। কারো দুঃখ অন্যকিছুর। এই অন্যকিছুর রকমও অনেক। তবে দুঃখটা ‘খাঁটি’ হওয়া চাই। দুঃখ খাঁটি না হলে, কবিতা বা ছবিও জাল হতে বাধ্য। কবিদের ‘হো হো’ হাসি আর ক্বচিৎ বেলেল্লাপনার কথাই ফেরে তোদের মুখে মুখে। তার প্রাত্যহিক একাকিত্ব, তার গভীর দুঃখ তাকে যে, প্রতিক্ষণ ক্যান্সারের মতো কুরে কুরে খেয়ে যায় নি:শব্দে, এটা খুব কম মানুষ-ই বোঝে। আমার মতো একজন মধ্যবয়সি, আর্থিক দিক দিয়ে অসফল, নিরূপ, নির্গুণ লোককে ঈর্ষা করলে ঈশ্বর তোকে ক্ষমা করবেন না গবু, একথাও বলে দিলাম।

আর লেকচার দিয়ো না তো। এইজন্যেই আমি এই আর্ট-কালচারের লাইনের লোকগুলোকে অ্যাভয়েড করি। চলো, বললাম রোদে বসে বিয়ার খাই। ভালো লাগল না। শুরু করলে মনুমেন্টের তলার লেকচার। একী। অমুদা! তোমার চোখ ছলছল করছে যে? এ কী ছেলেমানুষি করছ?

অমু একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, আমি যে, কবি। তাই। আমি তোর মতো বিচক্ষণ অ্যাকাউন্টেন্ট নই। তাই। তোরা আমাদের বুঝবি না। বুঝবে, ওই যারা আসছে ওই শ্রেয়ারা, শ্রমণারা, জয়িতারা।

কেন?

মেয়েদের মনের গড়নটাই অমন। নরম। স্পর্শকাতর। ভালোবাসার কাঙাল। যতই ভালোবাসা থাক-না, এই নির্গুনের ভান্ডারে। ওরা যেমন, বেগুন বা মাছ কেনার সময় বেছে কেনে, ভালোবাসার বেলাতেও ওরা বাছাবাছি করে। বেগুনে বেগুন-পাতুড়ি হয় বলেই, যে-কোনো বেগুনে, পাতুড়ি রাঁধতে রাজি হয় না ওরা। ভালোবাসার স্বীকৃতিও মেয়েরা যেমন করে দিতে জানে, তেমন করে আমরা পারি না। সে, জ্বরগ্রস্ত কপালে হাতের পাতা ছুঁইয়েই হোক কী, কিছু রান্না করে খাইয়েই হোক বা এককলি গান শুনিয়েই হোক। মেয়েরা না-থাকলে পৃথিবীর সব সৌন্দর্য, সব ফুল, সব পাখি, সব সৃষ্টি অনাদৃত হয়ে মাটিতে লুটোত। ওদের প্রত্যেকের মধ্যেই একজন সাহিত্য-কলা-সংগীত সমালোচক বাস করেন। যাঁরা শুধু ওঠানো-নামানোর সমালোচনায়, পারদর্শী দুরভিসন্ধিসম্পন্ন সমালোচক, ওরা তেমন সমালোচক নয়। সৎ সমালোচক।

কী গো? তোমরা সকলে মিলে এই সকালবেলা চড়াও হলে? ব্যাপার কী?

অমু বলল, ওদের সকলকেই একসঙ্গে।

কালকের পিকনিক-এর কথা মনে করিয়ে দিতে এলাম। আপনার যা-ডিম্যাণ্ড দেখছি এখানে, হয়তো মনেই থাকবে না। ডাইরিতে লিখে রাখুন। দাজুদার অর্ডার।

খুব-ই মনে আছে। যতদিন জামশেদপুরে আসছি ততদিন থেকেই দলমা পাহাড়ে যাওয়ার ইচ্ছে। শুনেছি, সুন্দর বাংলোও আছে ওপরে। পূর্ণিমার আগের দু-তিনদিন যদি কখনো থাকা যেত! বড়োদলে নয়। খুব কম লোকের সঙ্গে। গান শুনতাম। আর কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম। হয়-না কখনো, না? এ-জীবনে? জীবনের বাকিও তো খুব, বেশি নেই।

বড়োবাজে কথা বলেন। জয়িতা ধমকে বলল।

চেষ্টা কেন? কবিতা লেখার?

শ্রেয়া বলল।

চেষ্টাটুকুই তো সার। কবিতা তো আর রসগোল্লা নয় যে, ইচ্ছে করলেই বানিয়ে ফেলা যায়। অনেক অনেক কাগজ ছিঁড়ে, অনেক অনেক শব্দ ও লাইন কেটে তবেই একটি কবিতা হয়। তাও নিটোল কবিতা নয়। নিটোল কবিতা এখনও একটিও লেখা হয়নি পৃথিবীতে। হয়তো কখনো হবে।

সরি অমুদা। জয়িতা আবার বলল, বাংলোর রিজার্ভেশান পাওয়া গেল না। এ-যাত্রা থাকা হবে না, দলমাতে। আপনি ধূমকেতুর মতো এলেন আর চলেও যাবেন। এত শর্ট নোটিশ-এ হয় না। তা ছাড়া, পরপর ছুটি পড়েছে তো। আমরা এমনিই পাহাড়চুড়োয় গিয়ে পিকনিক করব।

তাতেই আমি খুশি।

অমু বলল।

তারপর বলল, আমি তো ধূমকেতুই! তবে ক্ষতিকারক নই। এইটুকুই তফাত!

ছবি বলল, কখনো আগে জানিয়ে এলে...

আগে আমি নিজেই জানতে পাই না। মনের মধ্যের মন কখন যে, কোনদিকে আমাকে টানে, তা জানতে পেলে তো গবুর মতো চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট-ই হতাম। ওহো! তোমাদের সঙ্গে ওর আলাপ-ই করিয়ে দেওয়া হয়নি। আমার পিসতুতো ভাই। লতায়-পাতায়।

আছে। আছে। টেলকো এবং টিনপ্লেটের সবাই সবাইকে চেনে। মানে, বিশেষ করে নীলডিতে যাঁরা থাকেন। মালু বলল। তারপর বলল, পিসতুতো ভাই থাকতে, আপনি ক্লাবে বন্দোবস্ত করতে বললেন যে! আমাদের কারো বাড়িতে তো থাকলেন-ই না!

পিসতুতো ভাই থাকলেও থাকতাম না। কোনো পরিবারের মধ্যে থাকলে ‘স্বাধীনতা’র অনেকখানিই জমা দিতে হয়। আর স্বাধীন হতেই তো আসা!

একে তো চিনলাম না।

অমু বলল।

ছবি বলল, চেনবার জন্যই তো নিয়ে এলাম। খুব ভালো গান গায়।

রবীন্দ্রসংগীত। ওর নাম মোমা।

আমি আপনাকে চিঠি লিখেছিলাম। আপনার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ পড়ে। আপনি জবাবও দিয়েছিলেন।

মোমা বলল, অমুকে।

হ্যাঁ, মনে পড়েছে। খুব সুন্দর চিঠি লেখো তুমি। আমার কবিতার চেয়েও ভালো।

ছবি বলল, আপনি গান ভালোবাসেন তাই আমি জোর করেই ধরে আনলাম ওকে। গান শোনাবে। লজ্জা পাচ্ছিল আসতে।

শোনাও।

শোনাব? বলেই, মোমা গান শুরু করল।

অবাক লাগল অমুর। খালি গলায় এককথাতেই গান শুরু করার মতো মেয়ে আগে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ল না। মেয়েদের যত লজ্জা সব গানের বেলাতেই। গানটি আগে শুনেছে বলেও মনে পড়ল না। চমৎকার গলা। খুঁতহীন গায়কি—

সময় কারো যে নাই, ওরা চলে দলে দলে—

গান হায় ডুবে যায় কোন কোলাহলে।।

পাষাণে রচিছে কত কীর্তি ওরা সবে বিপুল গরবে,

যায় আর বাঁশি—পানে চায় হাসিছলে।।

বিশ্বের কাজের মাঝে জানি আমি জানি,

তুমি শোনো মোর গানখানি।।

আঁধার মথন করি যবে লও তুলি গ্রহতারাগুলি

শোনো যে নীরবে তব নীলাম্বর তলে।।

বা:। কার কাছে শেখো তুমি?

বাড়িতেই শিখি। আমার মাস্টারমশাইয়ের কাছে।

তাঁকে আমার নমস্কার দিয়ো। আর তোমাকেও ধন্যবাদ গান বাছার জন্যে। এই শীতের সকালে যদি, তুমি হঠাৎ কোনো বর্ষার গান গেয়ে বসতে তবে তোমার গলা আর গায়কির কোনো দাম-ই থাকত না। রবীন্দ্রসংগীতে গান ‘নির্বাচন’ও শিক্ষার মধ্যে পড়ে। তাই-না?

মোমা মাথা নাড়ল।

গবু বলল, আমিই অমুদার একমাত্র আত্মীয় জামশেদপুরে। এখানে এসেছে, লোকমুখে শুনেছিলুম। কিন্তু আসার সঙ্গে সঙ্গেই, আপনারা আমার দাদাকে এমন-ই গায়েব করে দিলেন গুপ্তধনের মতো যে, তাকে খুঁজে বের করতেই আমার পাঁচদিন লেগে গেল।

ওরা সকলে হেসে উঠল।

অমু বলল, এমন আত্মীয়কে তোর অস্বীকার-ই করা উচিত। আসলে কী জানিস? যারা আত্মার কাছে থাকে তারাই হল প্রকৃত আত্মীয়। তোর সঙ্গে রক্তসূত্রের আত্মীয়তা। প্রত্যেক মানুষ কচুরিপানার মতো জীবনের স্রোতে ভাসতে ভাসতে যাদের সঙ্গে, জড়াজড়ি করে থাকে তারাই হয়ে যায় আত্মীয়। আর রক্তর আত্মীয়রা দূরে সরে যায়। এটাই নিয়ম।

আমরা ওঁকে গায়েব করিনি। উনিই গুণ করেছেন আমাদের।

ছবি বলল, পুরোনো কথার জের টেনে।

এই পোড়াকাঠে যে, এমন অসীম ক্ষমতা রাখে আমাদের অমুদা, তা তো আগে জানা ছিল না।

গবু বলল।

অমু হেসে বলল, না দেখলে তো বিশ্বাস করতিস না। তোদের পাড়ার অনুরাধাকে মনে আছে? তাকে নিয়ে কলেজস্ট্রিটের কফিহাউসে কী দামামাই না, বাজত ছেলেদের বুকে বুকে! অনুরাধাকে নিয়ে কলেজের দিনগুলোতে কত কবিতাই লিখেছিলাম। আর সে, বড়োলোকের সুন্দরী মেয়ে বলে আমাকে বিয়ে তো করলই না এমনকী কোনোরকম পাত্তাই দিল না। আজ সে, থাকলে এই কবির মান-সম্মান-দাপট দেখে কেমন আঙুল কামড়াত বল?

সকলেই অমুর কথায় হেসে উঠল।

গবুও কথায় কম যায় না। বলল, তোমাকে বিয়ে করেনি বলে অনুরাধা হয়তো আঙুল কামড়াত কিন্তু তোমাকে বিয়ে করেও তো আমার রানিবউদি কম আঙুল কামড়াচ্ছে না। সে-খবর তো আমরা রাখি।

হো হো করে হেসে উঠল অমু। এবং অন্য সকলেও।

অমুর হাসিটা শুধুই হাসি ছিল, না, তাতে কান্নাও মিশেছিল, তা ঠিক বোঝা গেল না।

ছবি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়েছিল অমুর মুখে।

ভালো বলেছিস। অমু বলল। বেচারি রানি। ওর কপালটাই মন্দ। নইলে এমন ছন্নছাড়া কবিকে কেউ ভুলেও বিয়ে করে?

ছন্নছাড়া তো ছিলে না? নিজেই হয়েছ। দুঃখ সেটাই।

অমু লজ্জা পেল অতলোকের সামনে কথাটা গবু বলাতে!

বলল, আর্থিক অবস্থার হের-ফের তো হয়-ই! আজ যে, ছন্নছাড়া, কাল সে আমির, আজ যে আমির, কাল সে ছন্নছাড়া। গবুরে, গবেট; আমার দেবী যে, লক্ষ্মী নন, তিনি যে, সরস্বতী। তাঁর মুখ চেয়েই সব সয়ে নিয়েছি। তা ছাড়া ছন্নছাড়ার সুখের রকমটাও তো নিজচোখেই দেখে গেলি তুই।

গবু বলল, এবার চলো উঠি। বউ তো তৈরি হয়ে বসে থাকবে। আমার বাড়িতে একদিন যাবে তো, নাকি? নইলে আমার বউয়ের কাছে কিন্তু বেইজ্জত হয়ে যাব। ইতিমধ্যেই বলেছে, এত বড়োকবি! উনি তোমার ভাই না ছাই।

বড়োকবি যে, তা জানল কী করে?

বা:। বড়ো বড়ো অক্ষরে বিজ্ঞাপনে তোমার নাম বেরোয় যে।

তবে তো নির্ঘাত বড়োকবি! ঠিক-ই ধরেছে। তা নিশ্চয়ই যাব। কী যেন, নাম তোর বউয়ের? জ্যোৎস্না, না?

থাক। নামটা তাও মনে রেখেছ, এ-কথা শুনলে জ্যোৎস্না খুশি হবে।

এখানে অনেক জ্যোৎস্না আছে।

জয়িতা বলল।

থাকবেই। চাঁদ থাকলেই জ্যোৎস্না থাকবে। এবং অনেক-ই থাকবে। আশ্চর্য হওয়ার তো কিছু নেই।

মালু বলল।

তা চাঁদটা কোথায়?

গবু বলল। অমুদাকে যদি আপনারা চাঁদ বলেন, বলতে হবে আপনাদের চোখের গোলমাল আছে।

শ্রমণা বলল, চাঁদ দেখার চোখ সকলের থাকে না। কবিতাও কি সবাই বোঝে? বিশেষ করে আধুনিক কবিতা?

গবুও হিসেবরক্ষক। সহজে ছাড়বার পাত্র মোটেই নয়। সে বলল, কবিতার রস আমিও এক-আধবার চিপে খেয়ে দেখেছি। সেটি সুপানীয়ের মধ্যে আদৌ পড়ে না। বাসকপাতার রসের মতো লাগে অনেকটা। ‘আধুনিক কবিতা’ পাগল ছাড়া কেউ লেখে না। পাগল ছাড়া কেউ পড়ে না। তবে এ-কথা অবশ্য স্বীকার করব যে, কবির রস কোনোদিনও খেয়ে দেখিনি। তাও আমার এই দাদাটির মতো পোড়া-কাঠ কবির। চেলাকাঠের রস কেমন-ই বা হতে পারে? চিরতা-টিরতার মতোই হবে।

বা:। কে বলবে যে, তুই অ্যাকাউন্টেন্ট। তোর তো বেশ রসবোধ আছে রে গবু।

না থাকার কী? রসের একচেটিয়া ইজারা তো টিনপ্লেট কোম্পানি বা জামশেদজি টাটা তোমাকেই একমাত্র দিয়ে যাননি।

গবুর কথায় সকলেই হো হো করে হেসে উঠল।

তারিখটা কবে? মানে আমার বাড়িতে খাওয়ার তারিখটা? এখুনি ফাইনাল করো। গবু উঠে দাঁড়িয়ে আঙুলে গাড়ির চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে বলল।

সেটা সম্বন্ধে তুই ছবি আর জয়িতার সঙ্গে কথা বলে নে। আমার লোকাল গার্জেন হল ছবি। কিছুটা জয়িতাও। ওরাই বলতে পারবে ব্রেকফাস্ট অথবা আফটারনুন—টি অথবা লাঞ্চ, ডিনার কোন সময়ে আমি ফ্রি! আমি এখানে ভি-ভি-আই-পি। কতজন এ. ডি. সি. দেখছিস-না?

তাহলে আপনারাই বলুন। একটু আহতস্বরেই বলল গবু। আমার কিন্তু সত্যিই দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমার স্ত্রীকে এবারে গিয়ে, না নিয়ে এলেই নয়। তারপর অমুদাকে নিয়ে যাব।

কোথায় নিয়ে যাবেন ওঁকে?

মাঠে। ‘ফাদার্স ভার্সাস সানস’ ক্রিকেট ম্যাচে।

সে তো আমরাও যাব। এখনও তো দেরি আছে।

তা আছে। কিন্তু ভেবেছিলাম, দাদাকে একটু টেলকোর টাউনশিপটা দেখাতে নিয়ে যাব।

দেখাবেন কাকে? সেদিন রাতে নির্জনে ডিনার খাওয়ার জন্যে ‘হাডকো’ লেক-এ নিয়ে গেছিলাম আমরা অনেকে মিলে। অমুদা বলেছিলেন, বেশ ফাঁকা জায়গায় জঙ্গলে বসে একটু গল্প করবেন। আমাদের স্বামীদের সঙ্গে একটু গা-গরম করে নিয়ে তারপর ওই হ্রদের পাশেই ডিনার।

ছবি বলল।

তারপর?

তারপর আর কী? আমাদের সকলের তো বটেই, পুরো টেলকোর-ই ইজ্জত উনি মাটি করে দিলেন।

কেন?

বললেন কী জানেন?

ছবি চোখ বড়ো বড়ো করে বলল,

কী?

বললেন, এ কী হিতু! তুমি কিনা শেষে, এই শীতের রাতে একটি কমোডের পাশে নিয়ে এলে আমাকে তোমাদের বিউটি-স্পট হ্রদ দেখাবে বলে! আর এ, কীরকম জঙ্গল! চার-পাঁচ গাছা গাছ লাগানো শুধু।

ওঁর কথা শুনে আমরা সকলে হেসে বাঁচি না। দুঃখও হল। আমাদের ‘হাডকো’র এমন অসম্মান কেউই করেননি আগে।

গবু বলল, আপনারা বউদি, মেনে নিলেন কেন অমুদার কথা? যা-তা বললেই হল! একবার দিনের বেলা গিয়ে দ্যাখো তো! ক-পাত্র চড়িয়ে ছিলে ‘হাডকো’ দেখার আগে সেটা বল?

ছবি ও অন্যান্যরা গবুর কথা বলার ধরনে একটু যেন, ব্যথিত হল। মনে হল ভাবটা যেন, ভাই হতে পারেন; কিন্তু গুণীর সম্মান দিতে জানেন না।

এবারও অমু কিন্তু জোরে হেসে উঠল। বলল, গুণে মদ যারা খায়, তারা তোর মতো অ্যাকাউন্টেন্ট। কবি নয়।

গবু হেসে উঠল। তারপর পা বাড়িয়ে বলল, আমি তাহলে এগোই।

জয়িতা বলল, হ্যাঁ। ওখানেই দেখা হবে। ওঁকে আমরাই নিয়ে যাব।

গবু, যাব বলেও গেল না। এতজন সুন্দরীর সঙ্গ ছেড়ে কার-ই বা যেতে ইচ্ছে করে?

না। তোমাদের সঙ্গেও আমি যাব না। তোমরা সবসময় এমন খাতিরের চাপে রেখেছ এই অনভ্যস্ত আমাকে যে, আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে। সত্যি বলছি। আমি একটু একলা থাকি। একটু হাঁটি বরং গল্ফ লিঙ্কস-এ। তোমরা বরং যাও এখন।

বা:। আপনি যাবেন কী করে? চিনবেন কী করে? তা ছাড়া এখানে তো ট্যাক্সি পাবেন না!

শ্রেয়া বলল।

ছবি বলল, তাহলে আপনাকে দুর্বার আর তোড়াই নিয়ে যাবে। যদিও একটু দূরে থাকে ওরা। তবে ক্লাব থেকেই ফোনে বলে দিচ্ছি। ওরা খুশিই হবে।

না। না। কাউকেই নিয়ে যেতে হবে না। আমার এক বন্ধু আসবে একটু পরে। তাকেই বলব খেলার মাঠে নামিয়ে দিতে।

কে বন্ধু?

সালদানা।

কে? মি. সালদানা? তিনি তো আমাদের বস।

চেনো নাকি তুমি?

গবু বলল, উত্তেজিতগলায়। এবারে সত্যিই চলে যেতে হবে।

নিশ্চয়ই চিনি। সালদানা খুব ভালো কবিতা লিখত একসময়। একটি কবিতার প্রথম লাইন এখনও মনে আছে আমায় ‘ওয়াহ, কিন্না আচ্ছা মাওসম হোগা?’

আমি কেটে পড়ি মানে মানে। পাঞ্জাবি কবিতা আর বাঙালি কবিতার মাঝে পড়ে প্রাণটা যাক তা, আমি চাই না।

গবু বলল।

কিন্তু কতটা যে, কবিতার ভয়ে আর কতটা যে, সালদানার ভয়ে ও কেটে পড়ল, তা ঠিক বোঝা গেল না।

গবু চলে গেল।

সত্যিই আসবেন সালদানা সাহেব?

ছবি শুধোল।

হ্যাঁ। তাই তো বলেছিল।

তবে আমরা সকলে যাই। আপনি তাহলে ওঁর সঙ্গেই চলে আসবেন। দেরি করবেন না কিন্তু। খেলা কিন্তু শুরু হবে আধঘণ্টা পৌনে একঘণ্টার মধ্যেই। জয়িতা বলল।

প্রথমে গিয়ে হবেটা কী? খেলা জমুক।

বা:। সালদানা সাহেব নিজেও তো খেলবেন।

অমু বলল, তাহলে বোধ হয় ও টেইল অ্যাণ্ড-এ ব্যাটিং করবে।

মালু বলল, টস-এ কারা জিতবে আর কারা ব্যাটিং করবে তা জানবেন কী করে?

আরে বাবাদের আর ছেলেদের মধ্যেই তো ম্যাচ। আসলে তো রোদ পোয়ানো। তার আবার অত!

অমু বলল!

তা অবশ্য ঠিক।

ছবি বলল।

তোমরা কেউ কিন্তু সালদানাকে বোলো না আমার কথা।

অমু বলল।

উৎসুক গলায় জ্যোৎস্না শুধোল। কেন?

কারণ আছে।

কী কারণ?

আমি যেদিন চলে যাব, সেদিন বলব।

কীসব হেঁয়ালি করেন, মানে বুঝি না।

ছবি বলল, অনুরাগ আর অনুযোগ মিশিয়ে।

বুঝবে।

আমরা তাহলে সকলেই যাচ্ছি। আপনি দেরি করবেন না কিন্তু।

না। বলে, অমু উঠে দাঁড়াল। এবং ওদের প্রত্যেককেই গাড়ি অবধি এগিয়ে দিল। ওদের গাড়িগুলো লাল কাঁকরে ঝড় তুলে চলে যেতেই অমু ফিরে এসে চেয়ারে বসল। ভাবল, একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলল বোধ হয়। সালদানা সাহেব যে, ওদের বস, সে শুনেছে কাল হিতুর-ইমুখে। কোনোদিনও চেহারাও দেখেনি। আফটার অল ছোট্টজায়গা। বড়োসাহেবকে নিয়ে মিথ্যাচারটা বুমেরাং হয়ে ফিরে আসতেও পারে। তা ছাড়া এখন ম্যানেজ-ই বা করবে কী করে? দোষ অবশ্য পুরোটাই অগ্নিশিখার। সে বলেছিল, ঠিক দশটাতে আসবে। আসেনি। আজকে সকলে যে, অমুকে মাঠে নিয়ে যাবে এ-কথা জেনেশুনেও আসেনি। এই অবিবেচনা। শুধুমাত্র অগ্নিশিখার-ই জন্যে সকলকে, সকলের আন্তরিক উষ্ণতাকে সরিয়ে দিয়ে একা হতে হল। এখন যদি না আসে তবে। এই বয়েসে কারো আসার অপেক্ষায় মেট্রো বা লাইট হাউস বা ন্যাশনাল লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে থাকাও পোষায় না।

এসব কথা ভাবতে ভাবতেই অগ্নিশিখার ছোট্টগাড়িটা ঢুকল ক্লাবের গেটে। গাড়ি-টাড়ি বিশেষ চেনে না অমু। তবে মারুতি চেনে।

অগ্নিশিখা অগ্নিশিখার-ই মতো কমলা পাড়ের শাড়ি পরেছে একটি। শাড়ি-ফাড়ি চেনে না অমু। ও কাছে এলে, দেখল একটি ব্লাউজ পরেছে যে, তার রংও গাঢ় কমলা। দূর থেকে কবুতরের পায়ের মতো গোলাপি বলে ভুল হয়েছিল। চওড়া বারান্দাটা যেন, ঝলমল করে উঠল। অগ্নিশিখার সদ্যস্নাতা সুগন্ধি ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে দিল হাজার হাজার অসময়ের শেফালি ফুল।

অমু উঠে দাঁড়িয়ে বলল, তোমার জন্যে অনেকগুলো মিথ্যে বলতে হল অনেককেই।

কাকে কাকে?

কৌতুকের চোখে চেয়ে বলল তোড়া।

অমু লক্ষ করল যে, চোখে কাজল দিয়েছে অগ্নিশিখা। তাতে তার রূপ অপ্রতিরোধ্য হয়েছে আরও।

ছবিকে, জয়িতাকে, মালুকে এবং আমার পিসতুতো ভাই গবুকে এবং আরও অনেককেই।

ওঃ। ভারি তো! মিথ্যে বলার আর এক নাম-ই তো কবিতা। সব কবিরাই মিথ্যেবাদী। ঠিক আছে।

একটু চুপ করে থেকে বলল, মিথ্যে তো আমিও বলে এলাম আমার স্বামীকে। দুর্বার ওয়াজ আ লিটল সাসপিসাস।

রিয়্যালি? হাউ ডাজ ইট ম্যাটার? অ্যাট লিস্ট, নট টু মি!

কিছু মিথ্যা বলা ও সামান্য মিথ্যাচার করা বেঁচে থাকবার জন্যেই জরুরি প্রয়োজন। ন্যূনতম প্রয়োজন। কিছু সত্যি বলতে গিয়ে, যে-অশান্তি ও ঝামেলার ঝড় ওঠে তা, অ্যাভয়েড করাই ভালো।

অমু বলল।

তা ঠিক। তবে এখন ভাবছি, মিথ্যেটা বললাম কেন? বড়ো কোনো পাওয়া, গভীর কোনো সুখের কারণে মিথ্যাচারী হলেও, না-হয় বুঝতাম। আপনার সঙ্গে একটু গল্প করব তার জন্যেই মিথ্যাচারী হতে হল। এইটেই দুঃখের। আমি যদি স্বাবলম্বী হতাম তাহলে নিজেকে এরকম ‘বাঁদি-বাঁদি’ মনে হত না। নিজস্ব সম্বলহীন নারীর কাছে বিয়েটা নিছক-ই একটা এগ্রিমেন্ট নয়; এক ধরনের দাসত্বই।

আমার সঙ্গে গল্প করার সুখবরটা যে, বড়ো কিংবা গভীর নয়, তোমার কাছে এবং আমার কাছেও, তা নিশ্চিতভাবে জানলে কী করে?

তা অবশ্য জানিনি। কিন্তু আমার স্বামী আমাকে খুব-ই ভালোবাসে। বিশ্বাসও করে। তাই ছোটো লাগে ‘মিথ্যে’ বলতে। অথচ বিশ্বাস যে-করে, এই বিশ্বাসটা পুরোনো গৃহভৃত্যকে বিশ্বাস করার-ই মতো। যার কাছে আলমারির চাবি, বাড়িঘর সব নিশ্চিন্ত হয়ে ছেড়ে দিয়ে বেরুনো যায়, কারণ সে, কখনো চুরি করবে না যে, এ-কথা জানা আছে। এটা কি বিশ্বাস? বিশ্বাসের মধ্যে তো একধরনের শ্রদ্ধাও মিশ্রিত থাকে। থাকা উচিত অন্তত। এতদিন ভাবতাম, ওর এই বিশ্বাসের শ্রদ্ধাও আছে। আপনি আসার পর দেখছি যে, তা ঠিক নয়। ও, আমাকে স্বাধীনতা দিয়ে দেখছে আমি কী করি তা নিয়ে। পোষাপাখির শিকল খুলে যেমন, মালিক নতুন করে নিশ্চিন্ত হতে চায়, সে দাঁড়ে ফিরে আসে কি না!

ছোটো লাগলে, মিথ্যে বলা উচিত হয়নি। তোমার ফিরে যাওয়াই উচিত।

ফিরে যাব মানে? আমি কি আপনার সঙ্গে পালিয়ে যাচ্ছি? ঘর ছেড়ে?

আমার সঙ্গে পালাবার মতো দুর্মতি যেন, কোনো নারীর-ই না হয়। যে, নিজেই পালাতে পারেনি তার নিজের পরিবেশ, জীবনের ছোট্টপরিসর, তার ধূলিমলিন নৈমিত্তিক নিত্যতার দানা আর জল-ছড়ানো খাঁচা থেকে, তার সঙ্গে পালানোটা আদৌ বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু তুমি মিথ্যে বলে আমার কাছে এলেই বা কেন? আমারও ছোটো লাগছে নিজেকে।

ভাবছি। এখনও নিজেই ঠিক জানি না। জানেন অমুদা, যে-বয়েসে কারো সঙ্গে প্রেমে পড়াটা স্বাভাবিক, সে-বয়েসে প্রেম করার সুযোগ আসেনি। তাই প্রেম জিনিসটা যে, কেমন তা জানতে ভারি ইচ্ছে করে। যে-এস্কিমো ‘সূর্য’ কখনোই দেখেনি সে, সূর্যের দেশে এসে শেষ বিকেলের সূর্যও হয়তো দেখতে চায়।

প্রেম তো কোনো জিনিস নয়, অগ্নিশিখা। প্রেম এক ধরনের শূন্যতা, যা শুধুই পূর্ণতার আশাটুকু বয়ে নিয়ে আসে। যাকে হাত দিয়ে ছোঁওয়া যায় না, ঠোঁট দিয়ে চুমু খাওয়া যায় না, যাকে মুঠোর মধ্যে ধরা যায় না, তার নাম-ই প্রেম। আকাশের দিকে চেয়ে দ্যাখো। মনে হবে আকাশ নীল। কিন্তু আকাশের সত্যিই তো কোনো রং নেই। মহাশূন্যকেই নীল বলে মনে হয়। তাই-না?

আপনি খুব সুন্দর কথা বলেন।

কখনো-কখনো। তেমন কোনো মানুষ পেলে বলতে পারি। এ-কথা আগেও বলেছি। এমন মানুষ, যাকে এসব বলা যায়। সকলকে সব কথা বলা যায় না। বলা উচিত নয়।

আপনি কেন আমাকেই বেছে নিলেন? আমার ‘তোড়া’ নামকে ছুড়ে ফেলে নিজের নামে কেন ডাকলেন? ভারি বিপদে ফেললেন আপনি আমাকে। আমার যে, কেবল-ই ‘অগ্নিশিখা’ হয়ে উঠতে ইচ্ছে করছে এখন। আপনার দেওয়া নামকে সার্থক করে তোলার জন্যে। দেদীপ্যমান হয়ে ওঠার এক তীব্র বাসনা লক্ষ করছি আমি আমার ভেতরে। আমার সমস্ত শরীর-মনে। নাম বদলে দিলে যে, একজন মানুষও বদলে যায়, তা আমি নিজে এমন করে না, জানলে বিশ্বাস-ই করতাম না। আমার শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনে, যা আদৌ দাহ্য ছিল না, তাতে হঠাৎ-ই অগ্নিশিখা থেকে ছড়িয়ে-যাওয়া আগুন লেগে গেছে অমুদা। আমি কী করি এখন?

একটু চুপ করে থেকে অগ্নিশিখা বলল, গায়ে আগুন লাগলে মেয়েরা কেন মরে আর ছেলেরা কেন বেঁচে যায় বলুন তো? জানেন আপনি?

না। কেন?

অবাক হয়ে বলল অমু।

মেয়েরা তাদের শাড়ি, শায়া, ব্লাউজ খুলে ফেলতে পারে না। সংস্কারের বশেই। আর পারে না বলেই, তাদের সারাশরীরে থার্ড-ডিগ্রি বার্ন ছড়িয়ে যায়। প্রেমও একরকমের আগুন। একধরনের অগ্নিশিখা। যা আপনার কাছে নিছক-ই এক খেলা, তাই আমার কাছে মরণ।

যে-প্রেম, ‘মরণ’-এর কথা মনে করায়, তাকে আগুন-লাগা জামাকাপড়ের মতো ছুড়ে ফেলাই উচিত।

উচিত তো অনেক কিছুই। কিন্তু জীবনে সব উচিতকর্ম তো করা যায় না, করা হয়ে ওঠে না।

তুমি কি দাঁড়িয়েই কথা বলবে?

আপনাকে দেখছি। একটু ভালো করে দেখি। এখুনি আবার কেউ এসে পড়বে। অন্য কোনো নারী। মেয়েরা ভীষণ ঈর্ষাকাতর হয়। মেয়েরা মেয়েদের চোখের ভাষা যেমন করে পড়তে পারে, তা আপনাদের ধারণাই নেই।

কী দেখছ?

দেখছি যে, মানুষের কলম থেকে এমন কবিতা বেরোয়, যে-মানুষ গুছি ভরে বছরের পর বছর সাজিয়ে তোলা তোড়াকে প্রথম দেখাতেই বিস্রস্ত করে দিয়ে, আচম্বিতে অগ্নিশিখা করে তুলতে পারেন তাঁর বহিরঙ্গের আড়ালে কে আছেন? তাঁকে দেখা যায় কি না? চেনা যায় কি না; তাই দেখছি। আপনার নাম হওয়া উচিত ছিল, ‘স্ফুলিঙ্গ’।

কবির মধ্যের কবিকে কখনো দেখতে যেয়ো না, চিনতে যেয়ো না অশি। শঙ্খচূড় সাপের গর্ততে হাত দিতে নেই। কিছু দেখা ও চেনার আছে, এ-সংসারে যা, হৃদয় দিয়ে শুধুমাত্র বোধ দিয়েই ছোঁওয়া যায়। ছোঁওয়া উচিত। দূর থেকেই। তাই কোরো।

আপনি কেন এলেন এখানে?

বুঝতে পারছি যে, অনেক-ই কারণে আসাটা আমার অন্যায় হয়েছে। এখন বুঝতে পারছি। এবারে তো এসে পড়েইছি। এটুকু কথা দিতে পারি যে, আর কখনোই আসব না। ভবিষ্যতে আমি কারোর-ই অসুবিধার কারণ হতে চাই না। কারোর-ই না।

তোড়া অমুর সামনের চেয়ারে বসে পড়ে অসহায় হতাশ গলায় বলল, সত্যিই আর আসবেন না?

হয়তো।

তবে এবারেই-বা এলেন কেন? আমার জন্যেই কি আসবেন না আর? দোষী শুধু আমিই?

জানি না, কেন এলাম! জামশেদপুর হঠাৎ আমাকে ডাক দিল। হয়তো তোমার কুর্চিবনের হাতছানি, সোনাঝুরির ‘ঝুরু ঝুরু’; মনটা হঠাৎ-ই বড়ো উচাটন হয়েছিল।

কার জন্যে?

বিশেষ কারো জন্যেই নয়। কখনো-কখনো এমন হয়। অশরীরী আত্মা যেমন করে প্ল্যানচেটে আসে, হঠাৎ আসে। এসে নানা কথা বলে আবার হঠাৎ-ই চলে যায় তেমন-ই, অশরীরী কোনো বোধ, কোন বিশেষ জায়গায় আমাকে ধাওয়া করিয়ে নিয়ে যায়। প্ল্যানচেটের আত্মারই মতো। তার কাজ শুধু ‘পৌঁছেই দেওয়া’। তারপর ফিরে যেতে হয় শূন্যমনে, আশাভঙ্গতার গাঢ় ভারী বোধ বুকের মধ্যে নিয়ে। এমন বহুবার-ই হয়েছে আমার। নিজের মনের অশান্তি, ক্ষুন্নিবৃত্তির সামান্যতা-মাপা নিত্য অসম্মান, জীবনযাত্রার গ্লানি, দারিদ্র্যর কষ্ট, এইসব ভোলবার জন্যে দৌড়ে এসেছি বারে বারে কোথাও-না-কোথাও। নিজের শূন্যতাকে পূর্ণ করবার আশা নিয়ে। অথচ যখন-ই ফিরতি ট্রেনে উঠেছি তখন-ই আবিষ্কার করেছি যে, আমি দীনতর, রক্তাক্ত; জানো, অশি, সুখকে এবং প্রেমকেও প্রেম সুখের-ই এক বিশেষ রকম বলেই বোধ হয়, দৌড়োদৌড়ি করে পাওয়া যায় না কখনোই। ‘স্থিতপ্রজ্ঞ’র মতো স্থির হয়ে বসে থাকলেই সুখ বা প্রেম সব-ই ভোরের পাখির মতো ছটফট করতে করতে তোমার কাছে এসে, পায়ের কাছে বসে। কোলে মুখ ঘষে। শীতের সকালের রোদের মতো স্নিগ্ধ উষ্ণতায় ভরে দেয়, হৃদয়-মনের সব খানা-খন্দ, শীত; যেমন, আমাকে দিয়েছে ভরে এই মুহূর্তে। হয়তো দিয়েছে তোমাকেও। এইমুহূর্তে তোমার মুখোমুখি বসে আছি আমি। প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ হয়ে। আমরা দু-জনে ইচ্ছে করলেই আমার ঘরে গিয়ে আলিঙ্গনাবদ্ধ হতে পারি। এমনকী দু-জনেরই আপত্তি না থাকলে চরম আদরও করতে পারি একে অন্যকে। কিন্তু হয়তো সহজে পারি জেনেই, নিজেদের দু-জনকেই অনেক কষ্ট দিয়েও তা, না করতে পারাটাই বোধ হয় ‘প্রেম’। তোমাকে ভালো লাগার সবটুকু আনন্দ, তোমাকে যতটুকু কাছে পেয়েছি, তার চেয়ে আরও বেশি কাছে না-পাওয়ার সাধনার-ই মধ্যে। এই-ই প্রেম। অশি, আমার প্রেম, তোমার প্রেম, সকলের প্রেম।

আপনি না এলেই পারতেন অমুদা। দেখুন। আমার সারাশরীর কাঁপছে, এই ঝাউবনের মতো থরথর করে। এইমুহূর্তে আমি এমনকিছু করে ফেলতে পারি, দিয়ে দিতে পারি আপনাকে এক্ষুনি যা, কখনো কাউকে দিতে পারার স্বপ্ন অথবা দুঃস্বপ্নও আমি দেখিনি। কোনোদিনও দেখিনি।

তোমার ভয় নেই?

আমার নেই। আপনার আছে?

তোড়া দেখল, এই আপাত অসুন্দর মানুষটার মধ্যে কোথায় যেন, এক গভীর সৌন্দর্য লুকোনো আছে। মাঝে মাঝেই ঝিলিক তোলে তা; বুঝিয়ে দেয়, কেন এত ভালোবাসে মানুষটাকে।

কিছুক্ষণ চুপ করে তোড়ার মুখে চেয়ে থেমে অমু বলল, ভয় নিশ্চয়ই আছে। তবে নিজেকে নয়। তুমি যা আমাকে দিয়েছ আজ সকালে, সেদিন চাঁদের রাতে, নির্জনপথে হাঁটতে হাঁটতে, তার অমর্যাদা যাতে, না-হয় সেই ভাবনাটুকুই ভয়। পাছে তুমি, আমি চলে যাওয়ার পর, একবারও ভাব যে, মানুষটা আমাকে ঠকিয়েই গেল, আমার মুহূর্তের দুর্বলতার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে গেল; আমার সেই ভয়। পেছনের দরজা দিয়ে, যে-চোর ঢোকে কোনো নারীর মনের বা শরীরের ঘরে, বা ‘সিঁদ’ কেটে, সে বুক ফুলিয়ে সামনের দরজা ভেঙে ঢোকা ডাকাতের সম্মান কোনোদিনও পায় না। তোমাকে ভেঙে তোমার একটি টুকরো নিয়ে লোভী কুকুরের মতো পালানোকে আমি ‘ভালোবাসা’ বলি না। সন্ধ্যাতারার মতো, যতদিন বাঁচব, ততদিন দূর থেকে তোমার দিকে এই সুন্দর পৃথিবীর সব স্নিগ্ধতা নিয়ে চেয়ে থাকব। মনে মনে বলব, ‘অগ্নিশিখা ভালো থেকো। তোমার শরীরের সঙ্গে আমার শরীর জড়িয়ে রেখে যতটুকু শুভার্থী হওয়া যায় তোমার, আমি তার চেয়ে তোমার অনেক-ই বড়ো শুভার্থী। আজ বুঝবে না। একদিন বুঝবে। কোনোদিন।’

জানেন, ওর কথা মনে পড়ছে খুব-ই। মানে, দুর্বারের কথা। তোড়া বলল। আমি যদি আজ সকালের নির্জনে ওকে মিথ্যে কথা বলে আপনার কাছে, মনে মনেও কিছু প্রত্যাশা করে এসে থাকি, তাও কি অন্যায় নয়, চুক্তিভঙ্গতা নয়?

চারধারে চেয়ে দ্যাখো। আমার মুখে চেয়ে দ্যাখো। এখানে কোনো ঘাতক নেই। বিশ্বাস অথবা শ্লীলতা অথবা ন্যায় সবকিছুই অম্লান অটুট থাকবে এই সকালে। তুমি নিশ্চিন্ত থাকো। শুধু তোমার কেন, কোনো মানুষের ঘর ভাঙার-ই ইচ্ছা নেই আমার। তেমন শিক্ষাও নেই। তোমারও নেই। তুমি নিজেকে পুরোপুরি না জেনেই মিথ্যে ভয় পাচ্ছ! আমি অন্যকে ভাঙতে শিখিনি শিশুকাল থেকেই। নিজেকে কী করে ভাঙে, তা নিয়েই পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়েছি। চিরদিন-ই অন্ধকারকে ভাঙতে গিয়ে ভুল করে আলোই ভেঙেছি বার বার।

কিন্তু আমি তো চাই! আমি জানি, আমি চাই। আমি জানি কেন...

আমিও চাই। হয়তো তোমার চেয়ে অনেক-ই বেশি তীব্রতার সঙ্গে চাই। যা-চাই, যা-পেতে পারি, তা নিই না বলেই, তুমি আমাকে এক ধরনের ভালোবাসা বেসেছ। এবং জানি, আমি চলে যাওয়ার পর আরও বেশি করে বাসবে। তোমার নির্জন অবসরের মুহূর্তগুলির অনেকখানিই ভরে থাকব আমি। থাকবে আমার ভাবনা, আমি জানি। আমার কবিতার বইও। মোমার মতো ভালো গাইতে জানলে তোমায় গানও শুনিয়ে যেতাম। না থেকেও, থেকে যেতে পারতাম তোমার এবং তোমাদের কাছে। আমার গানের মধ্যেও।

ভাগ্যিস জানেন না গান!

কেন? ভাগ্যিস কেন?

জানলে, আপনি না থাকলে, হয়তো অনেক বেশি দুঃখ পেতাম আপনার গান শুনে।

এতই খারাপ গাইতাম? তাই বলছ?

কৌতুকের হাসি হেসে বলল অমু।

অগ্নিশিখাও হেসে ফেলল। অথচ ওর দু-চোখে জল।

বলল, সবসময় ইয়ার্কি করলে ভালো লাগে না।

কী সুন্দর দেখাচ্ছে তোমায়। দেখি দেখি, মুখ ঘুরিয়ো না, আমার দিকে তাকাও। তোমাকে ভালো করে দেখি একটু। তুমি একটি রিয়্যাল পাগলি।

দুর্বার। বেশ নামটি তোমার স্বামীর। মানুষটিও চমৎকার। স্বগতোক্তির মতো বলল অমু। স্বভাবটির মধ্যেও, ওর নামের সার্থকতা আছে। ওর মুখের মধ্যে চাপা একধরনের নিষ্ঠুরতাও আছে। কখনো কি তা প্রকাশ পায়?

চুপ করে রইল অগ্নিশিখা।

তারপর বলল, দুর্বারের প্রসঙ্গ আসছে কেন? আপনার স্ত্রীর নাম তো রানি! শুনেছি। আমাদের বিয়ে হয়েছে, একটি সন্তান হয়েছে বলেই কি আমার এবং আপনার জীবন শুধুমাত্র দুর্বার এবং রানিময়ই হতে হবে? ওই বৃত্তর বাইরেও কি, কোনো অস্তিত্ব নেই আমাদের? থাকতে পারে-না?

সাধারণত থাকে না। থাকে না, কারণ এই ‘বৃত্ত’ বিশ্বাসের জন্যে যতটা নয়, তার চেয়েও অনেক বেশি কারণ এই বৃত্তর বাইরে পা ফেলার সময়, মানসিকতা বা সাহস আমাদের মধ্যে খুব কম মানুষের-ই থাকে। সকালে দাঁতমাজা বা বিকেলে চা খাওয়ার-ই মতো এই বৃত্তর নাগপাশের অভ্যেস অজানিতে আমাদের পিষ্ট করে ফেলে। কেউ কেউ বাইরে এসে দাঁড়ায়ও কিছুক্ষণ। কোমর ভেঙে যাওয়া সরীসৃপের মতো মাথা তোলে, ল্যাজ দোলায়; কিন্তু চলচ্ছক্তিহীন। পরক্ষণেই ল্যাজে জ্বলন্ত-তারাবাজি বেঁধে দেওয়া কুকুর-কুকুরির-ই মতো ভয়ে দিশেহারা হয়ে পুরোনো, ব্যবহৃত, মলিন বৃত্তর সহজ সুখের নিরাপত্তার ঘেরের মধ্যে তারা সবাই দৌড়ে যায়। স্বাধীনতা ও মুক্তির তাপ সকলের সহ্য হয় না, তা যতই সাময়িক হোক-না-কেন। দৌড়ে যদি ফিরতেই হবে তবে বৃত্তর মধ্যেই সহজ সুখ ও নিরুপদ্রব শান্তির দানা খুঁটে খাওয়া, রমণ-সুখী পোষা-কবুতরের মতো নিজের নিজের বৃত্তর মধ্যেই বকবকম করে ঘাড়ের রেশমি পালক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ানোই ভালো। সকলকেই যে, বৃত্তর বাইরে এসে দাঁড়াতে হবে তার মানেই বা কী? দাসপ্রথা থেকে, ইস্ট-ইণ্ডিয়া কোম্পানি থেকে আজকের মহান ভারতীয় গণতন্ত্রে এসব-ই তো চুক্তির-ই জিনিস। প্রকৃতার্থে বিদ্রোহী হয়েছে বা হতে পেরেছে ক-জন? বল?

আপনার মতো বাজেকবি দেখিনি। আপনি কি প্রেমের ওপর থিসিস তৈরি করছেন? আমার সামান্য প্রশ্নটাকে বড়োই ঘোলা করে দিলেন আপনি।

তা নয়। বলেইছি তো। এতসব কথা যতখানি তোমাকে শোনাবার জন্যে বললাম, তার চেয়ে অনেক-ই বেশি বলছি নিজেকেই শোনাবার জন্যে। আমার মনের গভীরে অনেক-ই প্রশ্ন আছে। বার বার প্রশ্ন করে নিজেই তার উত্তর দিয়ে প্রাঞ্জলভাবে বোঝার চেষ্টা করি নিজেকেই। ভাবনার গভীরে ‘ডুব’ দিয়ে দেখি, তা মনোমতো হল কি না!

আপনি কি ডুবুরি?

কবিরা তো ডুবুরিই। দিন-রাত, মাস-বছর মনের গভীর অতলান্তে আমাদের স্কুবা-ডাইভিং। যখন কোনো কবিকে দ্যাখো, একা বসে সিগারেট খাচ্ছেন তখন, ভেবো-না যে, তিনি আলস্যর প্রতিমূর্তি। গঞ্জনা দিয়ো না তাঁকে, যেমন তাঁর পরিবারের অনেকেই দেন। তাঁর ভেতরে নিরন্তর ভাঙা-গড়ার, ডুব-দেওয়া, চিত-হওয়ার নানারকম অনামা প্রক্রিয়া চলেছেই। কবিদের মতো কঠোর পরিশ্রমী, ওভারটাইম-না-পাওয়া, শ্রমিক-আইনের দায়বদ্ধতাহীন এবং সবরকম প্রাপ্তিহীন শ্রমিক খুব কম-ই আছেন। কবিরা এদেশে উপহাসের-ই পাত্র। কিন্তু কবিদের সবচেয়ে বড়ো উপহাস তাদের নিজেদের প্রতি। তাই তাঁরা কবি।

এতসব বড়ো বড়ো কথা বুঝি না।

বোঝো ঠিক-ই। শুনলে ভয় করে বলে বুঝতে চাও না। নিজের জন্যে ভয়, দুর্বারের জন্যে ভয়, নিজের ছেলের জন্যে ভয়। এবং হয়তো কবিদের ভবিষ্যৎ-এর জন্যেও ভয়। তাও বুঝি।

ওসব কিছু নয়। আমার সময় নেই। আমি আপনার কাছে এসেছি। আপনার-ই কাছে। কবিদের তরফে আপনার দীর্ঘবক্তৃতা শুনতে নয়। তা ছাড়া আর এক্ষুনি ফিরেও যেতে হবে। ওকে অফিস থেকে তুলে নিয়ে বাড়ি যাব। আজ তাড়াতাড়ি ফিরবে বলেছে। তারপর ছেলেকে নিয়ে খেলার মাঠে। সময় বড়োকম।

সত্যিই সময় বড়োকম। সকলের-ই। সকালে ছবি, মোমাকে নিয়ে-এসেছিল। সে গাইল রবীন্দ্রনাথের একটি গান। ‘সময় কারো যে নাই’। আগে শুনিনি। চমৎকার লাগল। তারপর একটু চুপ করে থেকে অমু বলল, যদি তাড়া থাকে তো যাও।

আর একটু বসি।

কেন? বসবে কেন? তাড়া থাকলে যাও।

আপনাকে ভালো লাগে বলে বসব।

তবে বোসো।

একটা কবিতা শোনাবেন? এখানে কিছু লেখেননি? ভেবেছিলাম, আপনি আর আমি চুপ করে বসে থাকব একটু। কিন্তু এতকথা হল!

দোষ আমার নয়। সকালে এলে না কেন? কত মানুষ যে, এল সকাল থেকে।

লেখেননি কিছু?

না। বাইরে এলে আমি এক লাইনও লিখতে পারি না। তবে কাল রাতে একটি পদ্য লিখেছি।

পদ্য তো কবিতাই। শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলেন।

শক্তি ঠাট্টা করে বলেন। নীরেনদা, শঙ্খদা, সুনীল, শক্তি ওঁরা সত্যিকারের বড়োমাপের কবি। ওইসব ঠাট্টা ওঁদের মুখে মানিয়েও যায়। কিন্তু অমু ঘোষের পদ্য নিছক পদ্যই।

তবু, শোনান-না।

না। আমার পদ্য শোনাব না। কবিতা যখন লেখা শেষ হয় তখন, তাকে খুন করে মর্গে এনে রাখতে হয়। তারপর কাটা-ছেঁড়া, শব-ব্যবচ্ছেদ করে তার জিয়নকাঠি মরণকাঠির হদিশ করে কবির নিজস্ব মন্ত্রবলে কবি প্রাণ দেন আবার সেই কবিতাকে। তারপর-ই তা পড়াবার বা ছাপাবার যোগ্য হয়ে ওঠে।

তবু শোনান। দুই-জীবনের মধ্যবর্তী মর্গের কবিতাই।

তুমি আজ আদৌ কবির অনুরাগিণীর মতো কথা বলছ না। শোনাচ্ছি তোমাকে, তবে আমার কবিতা নয়। লালা মিয়ার শায়েরি থেকে।

তিনি কে?

তিনি কে, তা আমিও জানি না। তবে বইটি পেয়েছিলাম কলেজস্ট্রিটে। কবিতা অবশ্য একে বলে না। তবে আমার পড়তে ভালো লাগে। বলার কথাগুলির সঙ্গে আমার না-বলা কথার খুব মিল আছে বলে। একটু বোসো। ঘর থেকে আনি।

অমু ঘরে গিয়ে ঢুকল। তারপর ঝোলাঝুলি হাতড়ে বইটা বের করে পেছন ফিরতেই দেখে অগ্নিশিখা। ঘরের মধ্যে! আগুন! আগুন!

মুখে সে কিছুই বলল না। কোনো কোনো ব্যাপারে মেয়েরা আদৌ মুখর নয়। কিন্তু ওর দু-চোখ ভরতি কথা ছিল।

অমু তাকে হাতে ধরে নিয়ে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড় করাল। অগ্নিশিখার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।

বলল, গলা টিপে মারবেন বুঝি?

কথা না বলে অমু অগ্নিশিখার দু-টি হাত নিজের দু-টি হাতে নিল। তারপর বলল, চোখ বোজো।

অগ্নিশিখা সমর্পণ করল নিজেকে সমস্ত সম্পূর্ণতায়। কবির কাছে। না, না। কবি নয়; কবিতার কাছে। অমু প্রথমে তার কন্ঠায়, গলায়, কানের লতিতে এবং তারপর তার দু-চোখে বার বার কিন্তু ধীরস্থির হয়ে চুমু খেল। শেষ চুমু খেল তার স্তনসন্ধিতে। বুকে-মাখা অচেনা পাউডারের গন্ধে, ভুলে যাওয়া পারফিউমের গন্ধে, চুলের তেলের মিষ্টি ভেজা-ভেজা গন্ধের আবেশে অমুর যেন, ঘুম এসে গেল।

অগ্নিশিখার শরীর শিথিল হয়ে যাচ্ছিল। দেওয়ালে ভর দিয়ে সে, শক্ত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে বসে পড়েছিল আস্তে আস্তে। অমু তাকে কোমরের কাছে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে একটি তীব্রগভীর চকিত চুমু খেল তার ঠোঁটে। হঠাৎ কালবৈশাখীর মতো উথাল-পাতাল করে উঠল বড়ো বড়ো নিশ্বাসে তার বুক। পরক্ষণেই দু-হাতে জোরে অমুকে জড়িয়ে ধরল। অমু অগ্নিশিখার উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার সময় দিল। থরথরানি থেমে এল। যেন, বৃষ্টি থামল কাঠটগরের বনে।

অমু বলল, অস্ফুটস্বরে; অগ্নিশিখা!

তোড়া কাঁদছিল।

অমু বলল, চলো, বাইরে গিয়ে বসি।

না। আমি বাইরে যাব না।

অগ্নিশিখা বলল, গাঢ়, নীচু স্বরে। তারপর বলল, পাজি, অসভ্য!

বলেই, দু-হাতের নরম হালকা মুঠি দিয়ে অমুর বুকে করাঘাত করতে লাগল অবিরত। জোরে জোরে।

অমু অগ্নিশিখাকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। অগ্নিশিখার হাত দু-টি থেমে গেল। পরমসোহাগে সে, তার মুখ রাখল অমুর বুকে। অমুর সমস্ত শরীরে একটা বনবেড়াল দাপাদাপি করছিল। পুরুষের কষ্টের রকমটা অন্য। তা বলে, তাদের কষ্টও কিছু কম নয়। কোনো মেয়েই এ-কথাটা বুঝল না কোনোদিন।

অমু বলল, ফিসফিসে গলায়, তুমি ছেলেমানুষ হতে পারো। আমি নই অশি। লক্ষ্মী মেয়ে, আমি তোমাকে ভালোবাসি।

বলেই, দরজা খুলে বারান্দায় এল। দরজা খুলে দেখল, সেই মহিলা বসে আছেন। সে-রাতে আলাপ হয়েছিল পার্টিতে। কী যেন, নাম মহিলার। ভুলে গেছে। মিসেস কী যেন, মুখটি মনে আছে, কারণ, ভোলা মুশকিল বলে। আগ্রাসী।

কতক্ষণ?

অমু বলল।

এই একটু আগে।

বলেই বন্ধ দরজার মধ্যে দিয়ে তাঁর এক্স-রে আই দিয়ে তাকিয়ে বললেন, ভেতরে কি, কেউ আছে?

হ্যাঁ।

কে?

একজন..

মহিলা?

হ্যাঁ।

কী করছেন আপনার ঘরে?

ভদ্রমহিলার স্ক্যাণ্ডালাস গলায় তীব্র রাগ ও বিতৃষ্ণা ঝরে পড়ল।

অমু বলল, কবিতার বই খুঁজছেন।

কবিতার বই? খাটের তলায়? না, খাটের ওপরে?

এই মহিলাকে অমুর প্রথম দর্শনেই ভালো লাগেনি। ওঁর স্বামী জামশেদপুরের (নীলডির নন) মস্ত একজন কেউকেটা লোক। ব্যবসায়ীও হতে পারেন। ঠিক মনে নেই। সচরাচর লক্ষ্মী আর সরস্বতী সহাবস্থান করেন না কোনোখানেই। এখানেও করেননি। মহিলা মস্ত বড়োগাড়ি চড়েন, দামি শাড়ি পরেন, দেখতে অনেকের-ই চোখে সুন্দরী। বাড়িতে ডেকে একদিন চাইনিজ খাওয়াবেন অমু এবং অমুর খাতিরে অন্যান্য অনেককে। সেদিন বলছিলেন। সুতরাং, একজন গরিব বাঙালি কবি তাঁকেই সবচেয়ে বেশি পাত্তা দেবেন, এ-বিষয়ে তাঁর নিজের কোনোই সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তোড়াকে কবির সঙ্গে একঘরে আবিষ্কার করাতে তাঁর মেজাজের তখন ঠিক ছিল না।

দরজাটা আস্তে খুলে তোড়া ঘর থেকে বেরোল। ওর শাড়ি বিস্রস্ত, চোখের কাজল লেপটে গেছে। চোখে জল।

উনি তীক্ষ্ণ মেয়েলি চোখে তোড়ার দিকে তাকালেন।

অমু বলল, কই? বই কই?

বোকার মতো তাকাল অগ্নিশিখা! হাতে-নাতে ধরা পড়া বামাল চোরের মতো।

অমু বলল, সেন্টার-টেবিলে রেখে এসেছি। নিয়ে এসো।

মহিলা বললেন, আই থিঙ্ক ইউ নিড আ ওয়াশ টু ব্যাডলি। মুখ-চোখ ধুয়েই আসুন।

তোড়া ঘরে ঢুকে যেতেই মহিলা বললেন, তোড়া-না?

অমু মাথা হেলাল।

শকুনের চোখে সব-ই ধরা পড়ে।

তোড়া বইটা দিয়ে গেল আর একবার এসে। উনি যে, এই অবস্থায় ওকে দেখে গেলেন তার ফলটা ঠিক কীরকম দাঁড়াবে পুরো নীলডি অঞ্চলে, তা বেশ বুঝতে পারছিল তোড়া। বুক ফেটে কান্না আসছিল ওর। ওই পাজি লোকটা!

কবি! অথচ তেমন কিছু ঘটল না। না, কিছুই না। যদি বুঝত যে...। দুর্নাম তো সমান-ই হবে।

শুনুন। একটা কবিতা পড়ি।

অমু বলল।

কার লেখা?

লালা মিয়া।

তিনি আবার কে?

মুরশিদাবাদের লালগোলায় বকরির ব্যাবসা আছে। কিন্তু পদ্যও লেখেন।

ট্র্যাশ। আমার ‘সময়’ নেই সময় নষ্ট করবার। বড়োকবিদের কোনো কবিতা শোনালে শুনতে পারি। নিদেনপক্ষে আপনার। কিন্তু ঘরে যে, কবিতাটি লিখলেন সেটি সম্বন্ধে কিছু বলুন।

ঘরে কবিতা?

হ্যাঁ। তোড়া তোড়া ফুল দিয়ে....

অমু গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, আমার ধারণা ছিল, আপনি কবিতা সত্যিই বোঝেন। এখন দেখছি তরজাই আপনার বিষয়। বা কবিয়ালদের লড়াই।

আই ফিল ইনসালটেড। ওমলেটে বেশি লঙ্কা দিয়ে দেওয়াতে তোড়া বেচারির পাগলের মতো অবস্থা হয়েছিল। ঝালে চিৎকার করতে করতে লাফাচ্ছিল। তাই...

অমু স্বগতোক্তির মতো সাফাই গাইল।

আই সি। ঝাল খেলে লাফানোই তো স্বাভাবিক।

পদ্যটি কি শুনবেন? সম্ভবত আপনাকে নিয়েই লেখা।

আমাকে নিয়ে মানে?

ভদ্রমহিলা নড়েচড়ে বসলেন।

মানে, লালা মিয়ার কবিতা পড়ে অন্তত তাই মনে হচ্ছে।

পড়ুন তাহলে।

এক সেকেণ্ড, অশি, মানে তোড়া আসুক।

তোড়ার নাম অশি নাকি?

না না। তোড়ার নাম অশি হতে যাবে কেন?

মুখ ফসকে?

হ্যাঁ। মুখ ফসকে।

তোড়া এল। মুখের দাগ ধুয়ে এসেছে ঠিক-ই কিন্তু মুখের ভাব একটুও ধুতে পারেনি।

শুনুন। অমু বলল, শোনো তোড়া—

সদ্য আলাপ হল সেদিন

প্রথম চাওয়ায় লাগল ভালো

ম্যায়ফিলেতে অনেক হুরিকিন্তু তুমি একাই আলো।

মানে? কার কথা বলছেন। অমুবাবু আপনি?

আমি কিছুই বলছি না। লালা মিয়া বলছেন।

আই সি। ক্যারি অন প্লিজ।

করিয়ে দিল, এক সে সুজন

মিয়ার সঙ্গে আলাপ তোমার

ভাবেনি সে, বার এক তরেও

মিলবে দু-চোখ হঠাৎ দোঁহার

মিয়ার ইয়ার অনেক-ই দোষ

মধ্যে তাহার প্রধান এটাই

লাগবে ভালো কোথায় কাকে

খুদ জানে না, দুঃখ সেটাই।

শুরু হল ফিসফিসানি

পুটুর-পুটুর ফুলল পেট

হাসলো মিয়া আপন মনেই

নিন্দুকেদের ভেজল ভেট।

এই দুনিয়ায় হঠাৎ যদি,

কাউকে কারো লাগেই ভালো

দেরি না সয়, নারীজাতির

ঠিকরে বেরোয় মনের কালো।

তাইতো আজ-ই বলছে মিয়া

ভয় পেয়ো-না প্রিয় গো মোর

বাসোই ভালো অথবা পাও

দুনিয়া ঠিক-ই তুলবে শোর।

ভালোবাসার সয় না আওয়াজ

শব্দ বিনাই মুকুল ফোটে

মুকুল ফোটে, মুকুল ঝরে

মহক-এ তার বোলতা জোটে।

বোলতা ছিল পয়লা দিনে

আখরি দিনেও থাকবে জেনো।

কথা শোনো নতুন প্রিয়া

গন্ধে মাতো; মুকুল চেনো।

তোড়া চুপ করে চেয়েছিল অমুর মুখের দিকে।

মহিলা বললেন, এটা কি কবিতা হয়েছে নাকি? এ তো অন্ত্যমিল। নো-ওয়াণ্ডার ওই মিয়ার বকরির ব্যাবসা।

অমু হেসে বলল, অমন করে বলবেন না। টিভি সিরিয়াল ‘তামস’ নিয়ে সারাদেশে নানা মুনির, নানা মত চলছে এখন। লালা মিয়াকে পাঁঠা বললে দাঙ্গা বেঁধে যেতে পারে জামশেদপুরে। আর জামেশদপুর তো রাওটপ্রোন এলাকাও।

তাহলে পাঁঠাকে পাঁঠা, বলব না?

এরইমধ্যে তোড়া বলল, আমি চলি অমুদা। চলি।

অমু কথা না বাড়িয়ে বলল, যাওয়া নেই। এসো।

বলেই বলল, আমার পিসিমা বলতেন। এমন সুন্দর কথা তো দেশ থেকে উঠেই যাচ্ছে বলতে গেলে। কী বলেন?

অমু এখন একটু নার্ভাস ফিল করছে। নিজের জন্যে নয়। তোড়ার জন্যে। এই মহিলা সারাশহরে কী না, বলে বেড়াবেন কে জানে!

অগ্নিশিখার সুন্দর কোমল কমলাভ পাপড়িগুলোকে যেন, কোনো প্রমত্ত বাতাস দলে দিয়ে গেছে। অথচ বাতাস আদৌ প্রমত্ত ছিল না। ফুল যখন, দলিত-মথিত হতে চায় তখন, তার নিজের ভেতরেই একটি স্বয়ংক্রিয় মিশ্রণ যন্ত্র কাজ করে নি:শব্দে। মন্থন যা-হওয়ার, তা এক তরফের অভ্যন্তরীণ কক্ষে কক্ষেই ঘটে যায়। বিশেষ করে মেয়েদের শরীরে, মনে। পুরুষ নিমিত্তমাত্র।

বেচারি তোড়া!

পার্ক করানো গাড়ির দিকে আস্তে আস্তে হেঁটে যাওয়া তোড়ার দিকে একবার চেয়ে অমুর বুকের মধ্যে কেমন যেন, করে উঠল। ও বুঝতে পারছে যে, সেই সর্বনাশা বোধের শিকার হতে চলেছে সে, আবারও। বহুদিন পরে। ঘরপোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘকে ভয় পায়। সমুদ্রের নোনা খোলা হাওয়ায় দূরাগত সাইক্লোনের গন্ধ পাচ্ছে অমু। হাওয়ার সঙ্গে কথা বলছে ঢেউ। তিমি মাছ জলের রং গভীরতর করে জলরেখার কান অবধি উঠে নিশ্বাস নিচ্ছে ফোয়ারা তুলে। বুকের মধ্যে ‘মবিডিক’ আবার জাগছে। বিপদ। খুব বিপদ! এই বিপদ যে, কী ‘সামান্যতা’ দিয়ে শুরু হয়, তা ভালোই জানে অমু। তাই এক বারান্দা রোদের মধ্যে বসেও ওর শীত করতে লাগল।

প্রেমের মতো অসুখ আর কিছু নেই।

অমুর মা বলতেন প্রায়-ই, তাঁর মৃত্যুর আগে আগে, ‘আমার কানের মধ্যে কী যেন-‘শিঁ শিঁ’ শব্দ হয়। কে যেন, বাঁশি বাজায়। জানিস খোকন। এবারে যম ডাকছে। যেতে হবে।’

অমুকেও প্রেম ডাকছে। স্পষ্ট শুনেছে তার আওয়াজ। জিম করবেট-এর ‘বনশি’-র ডাক। এবারে মরতে হবে। সমুদ্র ফুঁসছে ভেতরে।

তোড়ার গাড়িটা চলে গেল। অমু মনে মনে বলল, সাবধানে যেয়ো তোড়া। ভালো থেকো।

আমার হাজব্যাণ্ড পাঁচদিনের জন্যে ব্যাংকক যাচ্ছেন। ওড়িশার বর্ডারে আমাদের একটা ছোট্ট কান্ট্রি-হাউস আছে। আপনি কি যেতে পারবেন আমার সঙ্গে? তিনটে দিন। শান্তি, পাখির ডাক, জঙ্গল, বেস্ট অফ ড্রিঙ্কস অ্যাণ্ড ফুডস। সফট বাট ফার্ম বেডস। ইলেকট্রিসিটি নেই। উই উইল হ্যাভ ক্যাণ্ডেললাইট ডিনার। এভরি নাইট।

অমু চোখ ছোটো করে তাকাল মহিলার দিকে। ভাবল কিছুক্ষণ। এরকম প্রস্তাব কলকাতাতেও বহু বহুবার পেয়েছে। তখন শরীর প্রবল ছিল। কাম আর প্রেম যে, আলাদা তা বুঝত না। মুখে কিছু বলল না অমু। কিন্তু তোড়াকে বাঁচাতে হবে। প্রয়োজন হলে নিজে মরেও। ভাবল অমু, জীবনের-ই মতো, মরণেরও ক-রকম হয়! কিন্তু না বলে, চুপ করেই রইল।

উনি ব্যাপারটাকে আরও স্থূল করে বললেন, এবারে। দু-হাত নেড়ে। ইউ নো! হোয়াট আই মিন? অ্যাপার্ট ফ্রম দ্যাট, পোলট্রি আছে, ডেয়ারি ফার্ম আছে।

আপনার কান্ট্রি-হাউসে কোনো ষাঁড় আছে?

ষাঁড়! হোয়াট আফুল ল্যাঙ্গোয়েজ।

হোয়াট ইজ আ ষাঁড়?

স্টাড-বুল। ফর ব্রিডিং।

না তো। তবে গোরু আছে দুটো। কিন্তু হঠাৎ এই প্রশ্ন? ভেরি সিলি? যাইহোক, আমি ঠিক চারটের সময় এসে আপনাকে তুলে নিয়ে যাব।

কিডন্যাপ করবেন বলছেন?

অলমোস্ট। আই গিভ আ ড্যাম বাই হোয়াট নেম ইউ কল ইট। সো লং উই মেক ইট।

পরক্ষণেই বললেন, আই ফিল সো হ্যাপি বাট ইট! কেউই বলতে পারে না, আপনি কান্ট্রি-হাউসে তিনটে দিন আমার সঙ্গে থাকলে আমিও কোনোদিন ‘টিরিং-এ অমু ঘোষ’ বলে কোনো বই লিখতে পারব না।

না। তা অবশ্য কেউই বলতে পারে না। তবে মৈত্রেয়ী দেবীর একটি বহুপঠিত ভালো বই যদি আপনার অনুপ্রেরণা হয় তবে বলব সে, অনুপ্রাণিত কর্তব্য আপনার না করাই ভালো। অমু গম্ভীরগলায় বলল।

তারপর বলল, যদি লেখেনও, ‘টিরিং-এ অমু ঘোষ’ কোনো প্রকাশক ছাপবেন না। এবং এককপিও বিক্রি হবে না।

ছাপব আমি নিজে। আর বিক্রি করার দরকার কী? প্রেজেন্ট করব। যাচ্ছেন তো তাহলে?

কেন যাব-না? এমন অফার কেউ ছাড়ে? খাওয়া-দাওয়া, আপনার সঙ্গ; কম্পানি।

উৎফুল্ল হয়ে উনি বললেন, তাহলে আমি উঠি। এখুনি গিয়েই একটি গাড়ি পাঠাতে হবে সব বন্দোবস্ত করবার জন্যে টিরিং-এ।

টিরিং! ভারি মজার নাম তো!

পঞ্চাশোর্ধ্ব মেমসাহেব চোখ দু-টি গোল করে বিলোল ভাব হয়েছে ভেবে নিয়ে বললেন, তিড়িং-বিড়িং করার জায়গা হিসেবে ‘টিরিং’ নামটা তো ভালোই। একেবারে বিহার আর ওড়িশার বর্ডারে। একধারে গেলে বাদামপাহাড়, রায়রাঙ্গপুর অন্যদিকে বড়োবিল, বড়োজামদা, রাউরকেল্লা। নট আ সোওল টু ডিস্টার্ব আস দেয়ার। উ-উ-উ-উ ভাবলেও আমার...

এবার চলুন। আমাকে একটু খেলার মাঠে নামিয়ে দেবেন?

হঠাৎ রসভঙ্গ করে বলল অমু।

নিশ্চয়ই। কিন্তু তার আগে চলুন-না, আপনার ঘরটা একটু দেখে আসি আর ইউ কম্ফর্টেবল হিয়ার?

ফাইন।

চলুন। অমু কথা কেটে বলল।

আপনি তোড়াকে নিয়ে ঘরে কী করছিলেন? প্লিজ, এক্সকিউজ মাই আস্কিং দিস।

সত্যজিৎ রায়ের একটি ছোটোদের বই বেরিয়েছে কিছুদিন আগে। নাম ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’। জানেন কি? ঘোড়ার ডিম বাঁধছিলাম তোড়া করে। তোড়াকে নিয়ে।

হাউ নটি!

বলেই, উনি মুখে ব্রীড়াভঙ্গি ফোটাবার জন্যে এমন-ই এক ভাব করলেন যে, অমুর দেখে মনে হল তার দিদিশাশুড়ি কটকের গুড়াখু দিয়ে দাঁত মাজছেন। পারেনও কিছু মহিলা! সত্যি! অসীম তাঁদের ক্ষমতা, জীবনের সমস্তক্ষেত্রেই। এইরকম স্বভাবের সব বর্ষিয়সী মহিলাদের স্বামীদের নিয়ে থিসিস করতে আসবে বলেছিল ডেরিক গবসন। মিজৌরি থেকে। এল না। আসা উচিত ছিল।

উর্দিপরা সোফার গাড়ির দরজা খুলে দিল। উনি ঘন হয়ে বসলেন বিরাট গাড়িতে অমুর পাশে।

অমু বলল, বাই এনি চান্স মি. সালদানাকে কি চেনেন?

চিনি বই কী! আমার স্বামীর সঙ্গে আলাপ তো আছেই। আমার সঙ্গেও আছে। তবে বোঝেন তো, ওঁরা বড়ো বড়ো সাহেব। ওঁদের দয়াতেই আমার স্বামীর ব্যাবসাপত্তর; তাই দূরে দূরেই থাকি।

আমার জন্যে একটি কাজ করতে পারবেন?

মোটে একটা? বলুন কী কাজ?

মাঠে নেমেই মি. সালদানার সঙ্গে আমাকে আলাপ করিয়ে দেবেন।

নো প্রবলেম।

অমু ভাবল, যদি মি. সালদানা এখন ফিল্ডিং বা ব্যাটিং করেন তাহলেই চিত্তির হবে।

সামান্যই পথ। একটু গিয়েই গাড়ি পৌঁছোল মাঠে। শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। বাবা মায়েরা একদিকে আছেন। অন্যদিকে, ছেলে-মেয়েরা বসে। মায়েরা ছেলেদের-ই সাপোর্টার।

গাড়ি থেকে নেমেই ভদ্রমহিলা দৌড়ে গেলেন। অমু ইচ্ছে করে খুঁড়িয়ে খুব-ই আস্তে হাঁটতে লাগল। যাতে মিস্টার সালদানার সঙ্গে আলাপটা সকলের সামনেই না, করতে হয়। তা হলেই তো সকালের বলা ডাহা মিথ্যেটা ধরা পড়ে যাবে। মিথ্যেটা না বললেই পারত। অগ্নিশিখার জন্যেই বলতে হল। ভবিষ্যতে অগ্নিশিখার জন্যে, আরও অনেক মিথ্যে বলতে হবে। বুঝতে পারছিল ও। মিথ্যের ওই দোষ। একটা বললে তা ঢাকতে আরও দশটা বলতে হয়।

মি. সালদানা হাসিখুশি স্মার্ট ভদ্রলোক। বয়স পঞ্চাশ কী তারও কম হবে। উনি ওই মহিলার সঙ্গে অমুর দিকে এগিয়ে আসতেই সকলকে দেখিয়ে হাত তুলে হাই! বলল, অমু মি. সালদানাকে। সকলেই যাতে জানে যে, যেমন ও বলেছিল, তেমন-ই উনি, ওর পুরোনো বন্ধুই।

কবি-সাহিত্যিক-গায়ক-বাদকের খাতির সর্বত্র। ‘স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।’ মি. সালদানা অমুর পরিচয় জেনে খাতির করে নিয়ে গিয়ে বসালেন। অন্য অনেকেই পরিচিতদের মতোই এগিয়ে এলেন। নিজেদের জায়গা ছেড়ে উঠে এলেন সবাই ওর কাছে। হীতু, ছবির স্বামী বিয়ার এনে দিল।

অমু বেশ ‘অ্যাট হোম’ হয়ে যেতেই একটু ফাঁকা পেয়েই ও মহিলাকে ডেকে বলল আপনি না বললেন, ওদিকের বন্দোবস্ত করতে যাবেন? ঘিড়িং-এর?

খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল মহিলার মুখ। বললেন, ঘিড়িং নয়, টিরিং।

হীতু বলল, এই মহিলাকে কোথায় পেলেন? ওঁর সঙ্গেই তো এলেন দেখছি। সালদানা সাহেব তো আপনাকে চিনতে পারলেন না! যখন বললাম আপনার কথা।

চেনেন যে, তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই এখন তোমাদের। ও বরাবর-ই ওইরকম ভুলোমনা। ছেলেবেলা থেকেই। সব-ই ভুলে যায়। আর এখন তো অনেক-ই দায়দায়িত্ব! এমনিতে পুরোনো সহপাঠীদের কী সকলেই মনে রাখতে পারে? মুখ দেখলেই তখন ফ্ল্যাশব্যাক হয়। তাই-না?

তা ঠিক। হীতু বলল একেবারেই ঠিক বলেছেন! অমুকে বিশ্বাস করে। তা ছাড়া সালদানা সাহেবকে না চিনলে, অমুর মিথ্যে বলবার কোনো সংগত কারণও খুঁজে পেল না। অমু মিথ্যে বলবেই-বা কেন?

‘ফাদার্স ভার্সাস সানস’-এর ক্রিকেট ম্যাচের আম্পায়ারিং দেখে অমুর মাথা ঘুরে গেল। এই ভদ্রলোককে, পাকিস্তানে যখন ইণ্ডিয়া খেলতে যায় তখন, আম্পায়ার করে পাঠালে মন্দ হয় না। ছেলেদের ফিল্ডিং। কিন্তু একটা আউটও আম্পায়ার দিচ্ছেন না। কিছুতেই না। পরিষ্কার এল-বি-ডাব্লু, পরিষ্কার ক্যাচ। কিন্তু হলে কী হয়? সজোরে উনি মাথা, এ পাশ-ওপাশ করে যাচ্ছেন যত আপিল-ই প্রায় কাঁদো কাঁদো ছেলেরা করুক-না-কেন। আম্পায়ারের হাতে বিয়ারের বোতল। আর জবাবে ‘নো’। লজ্জা, মান এবং ভয় এই তিনের-ই মাথা চিবিয়ে না খেলে, এরকম দোর্দন্ডপ্রতাপ আম্পায়ার হওয়া যায় না।

খোঁজ নিয়ে জানল অমু। ভদ্রলোক ‘টেলকো’ হাসপাতালের ডাক্তার। মেডিসিনের নাম্বার ওয়ান। ডা. তাপস সরকার তাঁর নাম। খেলা আর কী দেখবে! খেলা ছেড়ে অমু মনোযোগ দিয়ে আম্পায়ারিং দেখতে লাগল। খেলা তো বহুজায়গাতেই দেখা যায়, এমন আম্পায়ারিং দেখার সুযোগ তো রোজ আসবে না।

তোড়া আর দুর্বার এতক্ষণে এল। তোড়া কাছাকাছি আসতেই অমু বলল, চলো, একটু হাঁটি। সকাল থেকে বসে আছি এক নাগাড়ে। পা ছেড়ে যাবে। তারপর ভিড় থেকে একটু তফাত হতেই অমু বলল, তুমি একটুও ভয় পেয়ো না। ওই ভদ্রমহিলা সম্বন্ধে সকলের-ই ধারণা দেখলাম একইরকম। আমি সকলকে যা-বলব, তা তুমি সাপোর্ট করবে শুধু। তারপর দেখো।

কী। কী বলবেন? কাকে? ভয়ার্ত গলায় শুধোল অগ্নিশিখা।

দ্যাখোই-না, কী বলি!

লাঞ্চব্রেক-এ বিরিয়ানির প্লেট এনে দিল জয়িতা। হীতু আর দুর্বার আরও বিয়ার লাগবে কি না, তা যেচে গেল। গবু আর গবুর বউ, জ্যোৎস্না আগেই এসে কাছে বসেছিল। অন্য জ্যোৎস্নাও ছিল। পৃথা, জয়িতা। আরও অনেকে। জয়িতা তখন শুধোল, ব্যাপারটা কী? আপনি আমাদের সকলকে তাড়িয়ে ওই নোটোরিয়াস মহিলার সঙ্গে এলেন যে, বড়ো! আমাদের বুঝি ভালো লাগছে না আর? উই ফিল ইনসালটেড।

সেকথা নয়। ব্যাপার কী, তা তোড়াকেই জিজ্ঞেস করো।

তোড়ার মুখ কালো হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। কিন্তু পুরোপুরি কালো হওয়ার আগেই অমু বলল, ভদ্রমহিলা মহাঝামেলার সৃষ্টি করেছিলেন। ভাগ্যিস তোড়া ঠিক সেইসময়-ই আমি আছি কী, চলে গেছি তা দেখতে গেছিল বাজার সেরে।

দুর্বার অবাক হয়ে বলল, তোড়াকে; তুমি অমুদার কাছে গেছিলে? কই? বলোনি তো।

তোড়া সপ্রতিভ গলায় বলল, বলবার সময়টা দিলে কোথায় তুমি? তা ছাড়া আমি কি কিণ্ডারগার্টেনের ছাত্রী যে, সবকিছুর জন্যেই তোমার পারমিশান লাগবে?

দুর্বার, তোড়ার উষ্মা দেখে অবাক হল। বলল, আঃ—

অমু এবার নতুন করে অবাক হল। প্রত্যেক মেয়েই জন্ম-অভিনেত্রী। তারা ধরা পড়ে যায় শুধু, অন্য মেয়েদের কাছে। কোনো পুরুষের সাধ্যই নেই যে, নারীর অভিনয় করে। স্বামীদের তো নয়-ই! চমৎকার।

তারপর কী হল বলুন! ছবি বলল।

হবে কী আর? ওই মহিলার অথবা আমারও কপালটাই কিছু হওয়ার মতো নয়, আর কী! উনি সবে আমার সঙ্গে একটু নিভৃতে ভালো করে আলাপ করার চেষ্টা আরম্ভ করেছিলেন আর তক্ষুনি তোড়া দরজাতে নক করল এসে। ‘ধুক ধুক’ করে উঠল বুক। ভেতরে আসতে বলতেই তোড়া ভেতরে এল এবং উনি প্রচন্ড রেগে গেলেন। বাধ্য হয়েই তখন তোড়াকে চলে যেতে বললাম। বেচারি তো অপমানিত হয়ে ঝরঝর করে কেঁদেই ফেলল। দুর্বার কিছুই বোঝোনি তুমি তোড়ার মুখ-চোখ দেখে? স্ত্রীর মুখে একটুও মনোযোগ দিয়ে তাকাও-না কি? ছি:।

দ্যাটস রাইট। বুঝেছিলাম, অমুদা ঠিক-ই! কিন্তু ভেবেছিলাম, প্রশ্ন করলে প্রশ্নটা যদি, গোলমেলে হয়ে যায়? আমাকে বলল, বাজার থেকে এল। কিন্তু রাজেন আমার কলিগ, ফোন করেছিল আমাকে। সে বলল, তোড়াকে গোলমুড়ি ক্লাব থেকে একটু আগেই বেরোতে দেখেছে।

বা:। এত খারাপ-না তুমি! তুমি ওমনি ভাবলে...। অমুদার কাছে গেলেই কী? আমি যখন খুশি যাব।

জয়িতা বলল, আঃ। কথাটাই ঘুরে যাচ্ছে অন্যদিকে।

প্রদ্যুম্ন বলল, আর অমুদা আমাদের স্ত্রীদের সঙ্গে যা-খুশি করুন। আমাদের আপত্তি নেই বিন্দুমাত্র। আমরাই যে, প্রেমে পড়েছি অমুদার। তোমাদের আর দোষ কী? আমরা সবাই তোমাদের অথোরাইজ করলাম। শুধু দ্যাখো, যেন, অমুদা ওই মহিলার খপ্পরে না পড়েন।

আরে কথাটাই যে, ঘুরে যাচ্ছে। অমুদা, বলবেন তো!

জয়িতা এবার বিরক্ত গলায়ই বলল।

অমু লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, কী আর কহিব সখী? বড়োই বিপদে পড়েছি।

কী বিপদ? খেতে খেতে সকলেই অমুকে ঘিরে ধরল।

টিরিং-এর কান্ট্রি-হাউসে তিনদিন থাকতে হবে ওঁর সঙ্গে। ক্যাণ্ডেললাইট ডিনার খেতে হবে। পাখি ডাকবে। আঃ! উই উইল হ্যাভ আ ওয়াণ্ডারফুল টাইম টুগেদার। তোমরা তো হাতের গোড়ার দলমাতেই আমাকে নিয়ে দলে-বলেও রাত কাটাতে পারলে না। এতইচ্ছে ছিল আমার। আর দ্যাখো তো! সাধা লক্ষ্মী কি পায়ে ঠেলা যায়?

সকলে একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল। নেভার। নেভার। ওই মহিলার সঙ্গে আপনাকে আমরা একমিনিটও অ্যালাও করব না। ওঁর সম্বন্ধে আপনি কী জানেন?

কারো সম্বন্ধেই তো কিছু জানি না।

অমু বলল। হেসে।

কিন্তু না গেলে, উনি চটে যাবেন না-তো? চটে গিয়ে, হয়তো বেচারি তোড়াকেই এক হাত নেবেন। যেহেতু অসময়ে গেছিল আমার কাছে, তাই ওঁর রসভঙ্গ হওয়াতে রাগটা তোড়ার ওপরেই বেশি।

তোড়াকে উনি কী করবেন? তোড়াকে আমরা সবাই চিনি। আমরা সবাই আছি-না। তা ছাড়া উনি স্ক্যাণ্ডাল-মংগারিং-এর রানি। সক্কলেই সেটা জানে। এমনিতেই প্রত্যেকের নামে যা-তা বলে বেড়ান। পাঁচ পার্সেন্ট সত্যি পঁচানব্বই পার্সেন্ট মিথ্যা। এই তো মালু! তুই-ই বল?

মালু লজ্জা পেল।

বলল, যা:। তোমরা না...একদম ভাল্লাগে-না ওঁর প্রসঙ্গ আমার।

পৃথা বলল, মালুর ছেলের গায়ের রং কালো হয়েছে বলে, উনি তার পিতৃত্ব সম্বন্ধে নানা বাজেকথা বলে বেড়াচ্ছেন।

বুঝতে পারছি। অত্যন্তই বাজে মহিলা।

অমু বলল। কিন্তু, তাহলে আমি কী করব?

অমু অসহায়ের মতো বিরিয়ানির হাড় চিবোতে চিবোতে বলল।

আপনার কিছুই করতে হবে না।

মহিলারা সমস্বরে বললেন। আপনার মতো কবিকে উনি টার্টার সস দিয়ে খেয়ে ফেলতে পারেন এবেলা-ওবেলা।

কিন্তু উনি যে, বিকেল চারটেতে আসবেন। ক্লাব থেকে আমাকে নিয়ে যেতে। কোনো মহিলাকে এমন করে ফেরাতে নেই। ছি:।

আসাচ্ছি! সাড়ে চারটেতে মন্দিরার বাড়ি আপনার কড়াইশুঁটির কচুরির নেমন্তন্ন। দুর্বার আর তোড়া আপনাকে নিয়ে যাবে। আপনার ঘরের চাবিটা যাওয়ার সময়ে আমাদের দিয়ে যাবেন। আমরা ঘরের মধ্যে ঢুকে চুপ করে বসে থাকব চার-পাঁচজন। তারপর উনি যখন, আসবেন তখন যা-করবার, যা-বলবার আমরাই বলব।

অমু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল। যাক বাবা! বাঁচা গেল।

আমুর ডায়েরি-৩

বিকেলে মন্দিরাদের বাড়ি কড়াইশুঁটির কচুরি খেয়ে রাতে মালুদের বাড়িতে ডিনার খাওয়ার জায়গা ছিল না আর।

এখন রাত। অনেক রাত। বিকেলে ওরা সকলে মহিলার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করল কি না, কে জানে! মেয়েরা যখন কর্কশ হতে চায়, তখন পুরুষদের চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।

বাইরে নানারকম গন্ধ। কাঁঠালের মুচির গন্ধ। আমের বোলের গন্ধ এখনও ভাসেনি হাওয়ায়। নানা ফুলের গন্ধের সঙ্গে মিশে গেছে মুচির গন্ধ। হরজাই ফুল। গাছপালা ঝাউ। তাদের গন্ধ।

বাইরে বারান্দাতে এতক্ষণ আলো নিভিয়ে বসেছিলাম। কিন্তু ঘর-বারান্দার আলো নিভোলে কী হয়, গোলমুড়ি ক্লাবের আলো ঝলমল ক্লাব হাউস স্বপ্নপুরীর মতো চোখের সামনে জেগে থেকে স্বপ্ন দেখতে দেয় না।

আমি তো এক-জন সামান্য কবি। আমার সামান্যতার মাপ আমি ভালো করেই জানি। কবিদের অনেক-ই কষ্ট। গদ্য লেখকদের মতো প্রাপ্তিযোগ তাদের ঘটে না। জনপ্রিয়তাও তাঁদের মতো নয়। মনে হয়, আনন্দবাজারেই একটি প্রতিবেদনে একবার পড়েছিল, গদ্য-লেখকের জনপ্রিয়তা অনেকটা ফুটবলারদের-ই মতো। অটোগ্রাফ-শিকারিরা তাঁদের ছেঁকে ধরেন। ক্বচিৎ কিন্তু গভীর, অন্তর্মুখী পাঠক বা পাঠিকা খুঁজে খুঁজে একা কবিকে যখন, খুঁজে বের করেন ভিড়ের মধ্যে থেকে তখন, খাতাখানা বাড়িয়ে দিতেও তাঁর হাত কাঁপে। সই নিতে তো কাঁপেই। যেমন প্রকৃত কবি; তেমন-ই তাঁর প্রকৃত অনুরাগী।

আমি এখানে এসে যে, এতমানুষের ভালোবাসা, নিত্যসঙ্গ, সাহচর্য, আদরযত্ন পেলাম সেটা মানুষ হিসেবেই, কবি হিসেবে নয়। কিন্তু যে, আমিকে ওঁরা ভালোবাসলেন, সে-আমি তো আমার আসল আমি নই। আমার এই জ্বলজ্বলে মূর্তিটাই আমার আসল মূর্তি নয়। আমি বড়োদুঃখী। কবিমাত্রই দুঃখী। হয়তো দুঃখের কিছুটা কল্পনা, কিছুটা বিলাস; কিন্তু অনেকটাই সত্যি। হয়তো প্রকৃত কবিমাত্রই জানেন যে, এই দুঃখের মধ্যে এক গভীর আনন্দও নিহিত থাকে। যিনি কবি, তাঁর পথ ভিড়ের পথের থেকে চিরদিন-ই আলাদা। যে-অমু ঘোষকে নীলডির মানুষেরা কাছ থেকে জানলেন, সেই অমু, কবি অমু নয়।

কিন্তু আমি এই নির্গুণ, নিরূপ অমু, এক মোটামুটি কবি, এখানে এবারে এসে, যা-পেলাম তার ঋণ শোধ করি এমন সাধ্য তো আমার নেই! জীবনের অনেক ঋণ-ই শোধ করা যায় না। তবু, ‘স্বীকার’ তো করা যায়। যায় বলেই স্বীকার করি। অনেকে অবশ্য ঋণ ‘শিকার’ও করেন। আমি পারিনি। সবাই সব পারে না। সব ভালো, সব খারাপ।

শ্রেয়া, শ্রমণা, জ্যোৎস্না, সোমা, পৃথা, ছবি এবং তোড়া। এবং আরও অসংখ্য মহিলারা বলেছেন, রোজ-ই বলছেন, কবি নাকি অনেক-ই তাঁরা দেখেছেন, আমার মতো মুখর কবি তাঁরা আর দেখেননি। এ-কথাটা আমার বাইরের আমিকে খুব-ই খুশি করেছে। সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার ভেতরের আমিকে করেনি। আমি বুঝে গেছি যে, আমার এই জনপ্রিয়তাই প্রমাণ করে যে, কবি হিসেবে, অন্তত বাংলা ভাষার কবি হিসেবে, আমি তত বড়ো নই। যাঁরা সত্যিই বড়ো, তাঁরা বাইরেও নির্জন; ভেতরেও নির্জন। এই নির্জনতার, নি:সঙ্গতার বোবাকান্না থেকেই জন্ম নেয় ‘কবিতা’। কবিতার মতো কবিতা।

তবু, যখন বড়োকবি হতে পারলাম-ই না, তখন এতমানুষের ভালোবাসাটা প্রত্যাখ্যান তো করতে পারি না। ভালোবাসাও তো একধরনের কবিতা। এখানের প্রত্যেক পুরুষ ও নারী, যাঁদের আমি কাছ থেকে দেখলাম, জানলাম, আমার প্রতি তাঁদের প্রত্যেকের ভালোবাসাও কবিতা। ভালোবাসার যেমন অনেক-ই রকম হয়, ভালোবাসার কবিতারও হয়।

আমি একথা জেনে বড়োশ্লাঘা বোধ করছি যে, আমার এই মানসম্মান, আদরযত্ন আমি বিত্তবান বা রূপবান বলে নয়। বিত্ত বা রূপ থাকলে এই ভালোবাসা হ্যাণ্ডিকাপে পাওয়া হত। তার মূল্য নেই কোনো। যা পেয়েছি তা যে, শুধু কবি-পরিচয়ের-ই জোরে এবং কবির মুখরতার জোরে এইটে ভেবেই বড়োভালো লাগছে।

আমি আজকে ভীষণ-ই খুশি। যেমন জামশেদপুরের জন্যে, এক শেষরাতে মন বড়ো উচাটন হয়েছিল বলে, রানিকেও না-বলে কয়ে চলে এসেছিলাম, তেমন-ই কাউকেই না-বলে আমি কাল ভোরের ট্রেন ধরে ফিরে যাচ্ছি। কলকাতা। কী যেন নাম ট্রেনটার? স্টিল না ইস্পাত? গুলিয়ে যায় আমার।

আজ শেষবিকেলে টেলকো বাজারে পান খাওয়ার অছিলায় একবার গিয়ে ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে কথাও বলে রেখেছি। অ্যাডভান্সও দিয়ে এসেছি। সে আসবে ঠিক সকাল পাঁচটাতে। তখনও অন্ধকার থাকবে।

হঠাৎ-আসার-ই মতো হঠাৎ-যাওয়াতেও একরকম মজা আছে। কষ্টও আছে। নিখাদ মজা বা নিখাদ কষ্ট বলে তো কিছু নেই। সব-ই মিলেমিশে আছে, থাকে। সবকিছুর-ই মধ্যে।

তা ছাড়া আমাকে পালাতে হবে অগ্নিশিখার-ই জন্যে। আমি নিজেকে বুঝি। নইলে আরও দিনসাতেক এঁদের সকলের অতিথি হয়ে স্বচ্ছন্দেই থেকে যেতে পারতাম।

নির্জন ‘হু হু’ হাওয়া সমুদ্র পারের সি-গাল-এর বিধুর চমকানো ডাকের মতো, শীতের পড়ন্ত বেলায় ঝাঁটি জঙ্গলের মধ্যে কালি তিতিরের উত্তেজিত ‘চিঁহা চিঁহা’ রবের তীব্র বিষণ্ণতার মতো কৃষ্ণপক্ষর মধ্যরাতের নিথর সবুজাভ তারাদের রহস্যের গাঢ় বেদনার মতো আমার মন নিশ্চিত সুখের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়েই আজ করজোড়ে ছুটি চাইছে। ভালোবাসাবাসি ভালো; সমুদ্রের ঢেউ, জলের মধ্যে দাঁড়ানো কবির বুকের সামনে সেই, ঢেউ-এর নেচে যাওয়াও ভালো, ফুলের গন্ধ ভালো, পাখির ডাক ভালো, সব-ই ভালো; কারণ তারা এসে, প্রত্যেকেই ফিরে যায় বলেই। কোনো সৌন্দর্যই পুরোনো হলে আর সৌন্দর্য থাকে না। জাপানি ক্যালেণ্ডার বা নতুন শাড়ি ও পারফিউমের গন্ধভরা নতুন বউদির-ই মতো। নীলডির মানুষেরা, তোমাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতা গভীর থাকতে থাকতে আমি নেচে-যাওয়া ঢেউ-এর মতোই সরে যেতে চাই। আর কখনোই আসব না।

অমু ঘোষের মধ্যে যেমন, একজন পুরোপুরি কবি বাস করে, বাস করে একজন অকবিও! যে-বিদূষকের মতো মানুষকে হাসায়, যার মধ্যে কোনো আভিজাত্য নেই, যে-রিকশাওয়ালা থেকে সালদানা সায়েব, সকলের সঙ্গেই একমুহূর্তে বন্ধুত্ব করতে পারে; সকলকেই তার হৃদয়ের আসনে একাসনে বসায় নির্দ্বিধায়। সে কবি নয়। কবিরা মুখচোরা, লাজুক স্বভাবের হয়।

মুখর কবিদের মুখরতাও নীরব হওয়ার-ই জন্যে।

আমি অমু ঘোষ, ভালো কবি নই। কিন্তু ভালোমানুষ। আমি জানি, অগ্নিশিখা আমাকে ভালোবেসে ফেলেছে। হয়তো আরও কেউ কেউ বেসেছে। এক একজনের ভালোবাসার ভিন্ন ভিন্ন ধরন। কিন্তু অগ্নিশিখার ভালোবাসাটা অন্য কারো ভালোবাসার মতো নয়। দুর্বারও আমাকে ভালোবাসে। কিন্তু একজন পুরুষ ও নারীর মধ্যে ভালোবাসা, সম্পূর্ণতার জন্যে উভয় পক্ষের কারণেই স্বীকৃতির গন্তব্যে পৌঁছোবে বলে পরিপ্লুতি খোঁজে। অগ্নিশিখার কোরকের সুগন্ধি-স্নিগ্ধতা আমি সঙ্গে করে নিয়ে ফিরে যেতে পারি। কিন্তু অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করবে নিজেকে, যে-আগুনে সেই আগুনের তাপ থেকে তাকে এই নির্মোহ মুখর কবিই একমাত্র বাঁচাতে পারে। এই মুহূর্তে দূরে সরে গিয়ে।

দুর্বার খুব-ই ভালো ছেলে। চমৎকার তাদের একমাত্র সন্তান। শান্ত। অগ্নিশিখার ভালোবাসা আমি পেয়েছি। আমার ঠোঁটে এখনও তার সিক্ত ঠোঁটের সিক্ততা সিরসির করছে। নাকে পাচ্ছি তার স্তনসন্ধির পাউডারের গন্ধ, স্নিগ্ধতার ঘ্রাণ। তার চোখের পাতায় যখন, চুমু খেয়েছিল অমু ঘোষ তখন অগ্নিশিখার চোখের পাতার নীচের মণি আর কণীনিকাও তার ঠোঁটের পরশের জন্যে তিরতির করে কাঁপছিল। চাঁদের রাতে নির্জন পথে হাঁটার সময়, ওর হাতের পাতার পিঠে চুমু খাওয়াতে অগ্নিশিখা বলেছিল, অস্ফুটে ‘সাহেবদের মতো’।

আমি, অমু ঘোষ, বলব, অশি, আমি সাহেবদের মতো নই; কবিদের মতো। জল্লাদের কাজ ফুলকে পিষ্ট করার। কবির কাজ ‘ফুল’কে ফোটানোর। অনেক-ই পেয়েছি আমি। অনেক-ই নিয়েছি।

এই স্তব্ধশীতের রাতে, ক্লাবের নাইটগার্ড আগুন জ্বালিয়ে তার কুকুরকে পায়ের কাছে নিয়ে বসে আছে। তোমার বাড়ি কাছে হলে আমি তোমার ঘরের বন্ধ জানলার সামনে গিয়ে এখন দাঁড়াতাম। চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে কিছুক্ষণ কল্পনায় তোমার কাছে থেকে ফিরে আসতাম। কিন্তু তোমাদের বাড়ি যে, অনেক-ই দূরে!

আমি জানি যে, তুমিও এইমুহূর্তে জেগে আছ। লেপের নীচে। দুর্বারের হাত তোমার কোমরে জড়ানো। তোমাকে আদর করার পর দুর্বার অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কিন্তু তুমি তৃপ্ত হওনি। এই অতৃপ্তি তোমার নতুন। অশি, তোমার মধ্যে আমি এক নতুন অভাববোধ জাগিয়ে দিয়ে গেলাম। এই আমার দান। তোমাকে। যে-নারীর মনের মধ্যে কোনোরকম অভাববোধ নেই, তিনি শূকরীর মতো তৃপ্ত হয়ে নি:শেষিত হয়ে গেছেন। তিনি নারী নন; যন্ত্র।

শুধু শারীরিক মিলনের তৃপ্তিটুকুই নয়, তোমার সমস্ত পরিবেশ, তোমার অস্তিত্ব, তোমার বর্তমান, ভবিষ্যৎ সবকিছুকেই আমি আমার কবিতা লেখার আঙুলগুলি দিয়ে ছুঁয়ে গেলাম অশি। তোমাকে আরও অনেক কিছু, না দিয়ে তোমাকে দুঃখী করে গেলাম। তোমার ‘মানবী-সত্তা’কে আমি জাগিয়ে গেলাম অগ্নিশিখা, যাতে তুমি জীবনে প্রকৃত অগ্নিশিখার-ই মতো নিভৃত, উজ্জ্বল নম্রতার নীরব আনন্দে ফুটে থাকো।

ভেবে দেখো, তোমাকে এর চেয়ে দামি আমি আর কীই বা দিতে পারতাম! তুমি যদি গান গাও তো এই দুঃখবোধ, তোমার মধ্যে এই অভাববোধ তোমাকে মস্তবড়ো গায়িকা করে তুলবে কোনোদিন। যদি ছবি আঁকো তুমি, তো ছবি আঁকতে বসে, তুমি আমার কথা ভাবতে ভাবতেই তুলি বোলাবে ইজেলে। তুলি হবে তোমার পাতলা ঠোঁট আর ইজেল হব আমি। নিরন্তর, অনাদিকাল ধরে আমরা পরস্পরকে কাছের, আরও কাছের করে পাব। এই পাওয়া, এই কাছে থাকাই তো আসল ঘনিষ্ঠতা। তাই-না?

আমি তোমাকে কোনোদিনও চিঠি লিখব না। তোমার নীরব চোখের প্রার্থনা মঞ্জুর-করা অথবা আমার-ই চুরি করে খাওয়া, চকিত চুমুর-ই মতো, আমার দু-হাতের পাতার মধ্যে তোমার হঠাৎ ভালো লাগায় শিশিরের মতো গলে যাওয়ার মতো, তোমার জীবনে আমি ক্ষণিকের স্মৃতি হয়ে থেকে যাব অশি। ক্ষণিকের অতিথি হয়ে। যদি কোনো দুর্জ্ঞেয় কারণে আমাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলে থাকো তাহলে, সে-ভালোবাসাকে নিত্যতার, পৌনঃপুনিকতার পরশে দাম্পত্য সম্পর্কের মতো ব্যবহারে মলিন নিষ্প্রভ না করে, নির্মল চিরনতুন করে রেখো। ‘আনন্দম! আনন্দম! আনন্দম!’

তুমিই একবার বলেছিলে, এবং এ-কথা অনেক মেয়েই বলে এখানের মালু, ছবি, পৃথা এরাও বলেছিল যে, যাকে ভালোবাসা যায় তাকে, ভুলেও বিয়ে করতে নেই। কথাটা মানি। আমি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলব, যাকে ভালোবাসা যায়, তাকে বিয়ে না করলেও কখনোই তার সঙ্গে পূর্ণভাবে মিলিত হতে নেই। এটা মেয়েদের কাছে আরও বড়োব্যাপার। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-না? মায়ার খেলায়? ‘আশ মিটালে ফেরে না কেহ, আশ রাখিলে ফেরে’।

পুরুষের আশ মিটে গেলে, পুরুষ তখন নবতর বিজয়ের খোঁজে বেরোয়। সব পুরুষ-ই কবি নয় অমু ঘোষের মতো। আশ না মিটালেও অধিকাংশ পুরুষ, আশাভঙ্গ হয়ে অন্যত্র যায়। তারাও ফেরে না। পুরুষ জাতের চরিত্র তীক্ষ্ণ এবং পক্ষপাতহীনভাবে বিশ্লেষণ করেই আমার মনে হয় যে, আমাদের পূর্বসূরিরা যতখানি বাঁদর, তার চেয়েও বেশি কুকুর ছিলেন। অধিকাংশ পুরুষ-ই ভালোবাসার কিছুই বোঝে না অশি। অমু ঘোষ বোঝে। এবং বোঝে বলেই তুমি যখন, আজ ভোর-হয়-হয় শীতের রাতে তোমার স্বামীকে আলিঙ্গন করে শুয়ে থাকবে অভ্যাসবশে তোমার ওম-ধরা লেপের নীচে, আমি তখন রওনা হব স্টেশনের দিকে। তোমার জন্যে পৃথিবীর সমস্ত শুভাকাঙ্ক্ষা আর প্রীতি আর ভালোবাসা এই নীলডির আকাশ-বাতাসে আবিরের মতো ছড়িয়ে দিয়ে যাব, যাওয়ার সময়ে। এবারে হোলির দিনে সেই, আবির মাখামাখি করে হোলি খেলো তুমি!

দেখতে দেখতে শীত চলে যাবে। বসন্তের কোকিল যখন, ‘কুহু কুহু’ করে ডাকবে তোমার বাগানে, আমের বনে যখন, মুকুল আসবে, তখন মনে পড়বে তোমার-আমার কথা। পড়বে, না? যখন গ্রীষ্মর প্রচন্ড দাবদাহে ঘুঘু সারাদুপুরে ‘ঘুঘুর র-র-র-ঘু—ঘুঘুরঘুউউ’ করে একটানা ডাক ডেকে যাবে, দরজা-জানলা বন্ধ প্রায়ান্ধকার একা-ঘরে বসে, বাইরের ‘লু’-এর ধুলো আর ঝরাপাতা ওড়ানো ‘ঝরঝরানি’ শব্দ শুনতে শুনতেও আমার কথা মনে হবে তোমার। বর্ষার দিনের কুর্চিবন উথাল-পাতাল করা গা-শিরশির হাওয়ার ফিসফিসানির মধ্যে তুমি যখন, দুর্বারের জন্যে খিচুড়ি আর আলু ভাজা আর শুকনো লঙ্কাভাজা ভালোবাসায় নিজে হাতে রেঁধে তার সঙ্গে খেতে বসবে তখন, তোমার মনে হলেও হতে পারে যে, তোমাদের খাবার টেবিলের জানলার পাশে আরও একটি প্লেট বেশি থাকলে মন্দ হত না!

কিন্তু যদি, আর একটি প্লেট বেশি রাখতেও আমার জন্যে, আমি কিন্তু এসে পড়লেও, প্রথমেই বলতাম আরও একটি প্লেট নেই কেন? মুম্বাইর সেই ছেলেটি কোথায়? যে তোমায় ‘ভাবিজি’ বলে ডাকে? যে-তোমার উত্তীয়?

আমার অশি। তোমাকে আমি ভালোবেসেছি। হঠাৎ। এখন। এই বয়সে! এমন হঠাৎ ভালোবাসা যে, হয়, হতে পারে; তা আমারও বিশ্বাসের বাইরে ছিল। তবু হল। অবিশ্বাসকে কখনো বিশ্বাস করতে নেই। কখন, কার জীবনে যে, কী ঘটে যায় তা আগের মুহূর্তেও আমরা জানতে পারি না।

আমি তোমাকে ভালোবেসে লজ্জিত অশি। আমার বয়স আরও দশ বছর কম হলে, তোমার মতো কাউকে ভালোবাসার যোগ্যতা আমার থাকত। অমু ঘোষ যে, শুধুই একজন সাদামাঠা কবি। জাদুকর তো সে নয় যে, বয়স কমিয়ে দিতে পারে নিজের, কোনো দারুণ ভোজবাজিতে! কিন্তু ভালোবাসা যে, কোনোদিন-ই ‘যোগ্যতা’র বিচার করেনি। যোগ্যতা বিচার করে, ঠিকুজি-কুষ্ঠী মিলিয়ে রাজযোটক বিবাহ হলেও-বা হতে পারে, ভালোবাসা কোনোদিন-ই হয়নি। তবুও আমি বড়োই লজ্জিত তোমাকে ভালোবেসে। কারণ, তোমার অথবা অন্য কারো ভালোবাসা পাওয়ার-ই যোগ্যতা আমার নেই। আমি জানি তা। আয়নার সামনে দাঁড়াতে আমার লজ্জা করে। আমার কিছুই নেই। শুধু আমার মিডিয়োকার কলমটি ছাড়া। তুমি আমাকে ভালোবেসে হয়তো আমাকে নয়, কবিতাকেই সম্মান দিয়েছ আসলে। আমার কবিতাকেই নয়, পৃথিবীর সব কবিদের কবিতাকে। আমি অধম বলে তুমি উত্তম হবে না কেন? উত্তম বলেই তো দয়া করে অধমকে ভালোবেসেছে!

ভালো থেকো অগ্নিশিখা। দুর্বার, তুমিও ভালো থেকো। ভালো থেকো, মুম্বাই-টেলকোর সেই সুন্দর প্রাণবন্ত অদেখা ছেলেটি। ভালো থেকো শ্রেয়া, শ্রমণা, জ্যোৎস্না, ছবি, মালু, জয়িতা, পৃথা, সোমা। ভালো থেকো। বিবাহিতাদের স্বামীরা। ভালো থেকো অবিবাহিতাদের বা একা নারীদের প্রেমিকরা।

কাল সকাল আটটাতে দলমাতে যাওয়ার জন্যে, আমাকে তুলতে এসে যখন শুনবে তোমরা যে, আমি চলে গেছি তখন, নিশ্চয়ই তোমাদের খুব রাগ হবে আমার ওপর। বহুজনের কাছে শুনেছি যে, হাজার হাজার কাঞ্চন ফুলের গাছ আছে দলমা পাহাড়ে। এখন যদিও কাঞ্চন ফুল ফোটার সময় নয় তবু গাছগুলিই দেখে এসো আমার হয়ে। তাদের কবির আদর জানিয়ো। কিন্তু যখন, আমার অদেখা পাহাড়ের চুড়োয় বসে শীতের রোদে চড়ুইভাতি করবে তোমরা, যখন ধীরে ধীরে উষ্ণ হয়ে উঠবে তোমাদের শরীর তখন, ধীরে ধীরে বুঝতেও পারবে যে, আপদ বিদায় হয়েছে, ভালোই হয়েছে।

কিছু আপদ থাকে, তারা যতক্ষণ কাছে থাকে; ততক্ষণ সম্পদ বলে ভ্রম হয়।

ট্যাক্সিটা যখন গল্ফ-লিঙ্কস-এর মাঠের মধ্যের পথ দিয়ে চলেছে তখন, অমু হঠাৎ দাঁড়াতে বলল ড্রাইভারকে। ড্রাইভার অবাক এবং কিঞ্চিৎ বিরক্তও হয়ে দাঁড় করাল ট্যাক্সিটা। আলোয়ান মুড়ি দিয়ে-বসা-তার সঙ্গীকে বলল, ‘বিড়ি ছোড়বে এক’।

অমু নেমে পড়ে ডান দিকে-বাঁ-দিকে তাকাল। বার বার। এখনও বেশ শীত। ক্লাবের আলোগুলোজ্বলছে। কিন্তু পুবের আকাশে ধীরে ধীরে ফুটছে আসন্ন সকালের অস্পষ্ট লালিমা।

হঠাৎ-ই মনে হল যেন, নি:শব্দে গাছগুলিতে পাশে এসে দাঁড়াল অগ্নিশিখা।

নিজেই পালিয়ে যাচ্ছেন? ভীতু? আমি যে, পালাব বলেছিলাম আপনার সঙ্গে। কাল সারাদিন, আজ সারারাত শুধু এইকথাই ভেবেছি।

তোমার ভেতরের দিকে অনেক বাধা। পারবে না। যারা পালায় তারা, বলে পালায় না।

চলুন অমুদা! আমরা পালাই, এই নিয়মবদ্ধতা থেকে, এই ঘড়ি-ধরা সংসার থেকে। অন্য সকলের মতো না হয়ে চলুন, আমরা ব্যতিক্রম হই।

তুমি একটি পাগলি।

পাশে পাশে অগ্নিশিখা হাঁটছিল। এখন দু-একটি করে পাখি ডাকছে। পৃথিবী জেগে ওঠার আগে, সমুদ্রের বড়োঢেউ অতিকায় নীল পাটিসাপটার মতো পুঞ্জীভূত হওয়ার আগে, হঠাৎ নীল নাগের মতো কুন্ডলী ছেড়ে লাফিয়ে ওঠার পূর্বমুহূর্তে যেরকম থমথমে ভাব হয়, একধরনের বিপজ্জনক নৈ:শব্দ্য; ‘মবিডিক’ ‘সারফেস’-এ উঠে আসার ঠিক আগের মুহূর্তে যেমন নৈ:শব্দ্য; এখন তেমন। এই নৈ:শব্দ্যে জীবন আর মৃত্যু মাখামাখি হয়ে থাকে।

অগ্নিশিখা বলল,আমার হাতটা একটু হাতে নিন অমুদা। আমার হাতের তেলোর পিঠে সাহেবদের মতো আর একটা চুমু খান। তারপর চলুন, আমরা দৌড়ে যাই ভোরের সূর্যকে ছোঁব বলে।

অমু হাত বাড়িয়ে অগ্নিশিখার নরম সুগন্ধি হাতটা ধরতে গেল। ভোরের সোঁদা গন্ধ পথের শূন্যতা থেকে উঠে এল, ট্যাক্সি ড্রাইভারের বিড়িখেকো দুর্গন্ধ হাত। ট্যাক্সি ড্রাইভার অমুকে পাকড়াও করতেই এসেছিল।

বলল, ‘টিশান যানা হ্যায় কি নহি? টিরেন ফেইল হো যায় গা আপকি। গাড্ডি খুল যায়েগি।’

অমু সংবিৎ ফিরে পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর ফিরল ট্যাক্সির দিকে। অগ্নিশিখা কোথাওই নেই। নিজের মিথ্যেসত্তাকে নিজের প্রকৃতসত্তার চেয়ে বড়ো করে তুলে এখন, ফিরে যেতে খারাপ লাগছে খুব-ই। ট্যাক্সিওয়ালাকে অমু বলল, ‘সব খেলাতেই যে, খেলুড়ে ফেল করে ইয়ার; তার ট্রেইন তো মিস হতেই পারে!’

ট্যাক্সিতে উঠতেই ট্যাক্সি ছেড়ে দিল।

অগ্নিশিখা এখন গাঢ়ঘুমে। নিশ্চয়ই। আহা ঘুমোক! ঘুমোক! অমুর কাছে থাকলে তাকে তুলোর মধ্যে করে রাখত। তুলো কিনতে না পারলে সারাবসন্ত গ্রীষ্ম মাঠেঘাটে বীজফাটা শিমুলের দিগবিদিকে উড়ে-যাওয়া তুলো, কুড়িয়ে কুড়িয়ে আনত। অগ্নিশিখাকে সে, কোনোরকম কষ্টই দিত না।

ট্যাক্সিওয়ালার শাগরেদ কটুগন্ধ বিড়ির ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘সুব্বে সুব্বে পাগল পিসেঞ্জার উঠায়া উস্তাদ! দিন বহত-ই খারাপ নিকলে গা।’

অমু শুনে বলল, ‘পাগল নেহি হুঁ ম্যায়।’

অগ্নিশিখা এখন, ঘুমের মধ্যে পাশ ফিরল। ভেতরের জামা পরেনি। ফিকে হলুদরঙা ব্লাউজের সব বোতাম বন্ধ নেই। ব্লাউজের ভেতরে দু-টি ফুল ফুটে আছে। নিভৃত নিটোল; পেলব সুগোল; সুডৌল। ভরা-শ্রাবণের কদমের মতো। হলুদ, কোমল।

ততক্ষণে ট্যাক্সি নীলডির গাছগাছালি আর পাখিডাকা নির্জনতা ছেড়ে এক, শিল্পনগরীর পথে এসে পড়েছে। ‘ভোঁ’ বাজবে একটু পরে। হাজার হাজার রাত-জাগা মানুষ টিফিন ক্যারিয়ার সাইকেলে ঝুলিয়ে ঘরমুখো ছড়িয়ে যাবে পিঁপড়ের মতো কারখানাগুলো থেকে বেরিয়ে। খিদে পাবে কারো, কারো তৃষ্ণা; কারো কাম। নিবৃত্তি আর খিদে, খিদে আর নিবৃত্তি; এর-ই নাগরদোলায় দুলবে এরা।

‘আ গ্যায়া।’ ট্যাক্সিওয়ালা বলল।

হাঁটা হল না এবারে অগ্নিশিখার সঙ্গে হাতে হাত ধরে। চুমু খাওয়া হল না, হাতের পাতের পিঠে।

অমুর ডায়েরি-৪

তিস রুপাইয়া।

ট্যাক্সিওয়ালা বলল।

চারধারে শোরগোল। হাঁকাহাঁকি। ডাকাডাকি। কত জায়গায় যাওয়ার জন্যে, হাজার মানুষের দৌড়োদৌড়ি। অথচ এদের বেশির ভাগের-ই প্রকৃত কোনো গন্তব্য নেই। বৃত্তের মধ্যেই দৌড়ে বেড়াচ্ছে সারাটা জীবন।

তিস রুপাইয়া।

ট্যাক্সিওয়ালা আবার বলল।

কুড়ি টাকা কাল দিয়েছিল। আরও ত্রিশ টাকা দিয়ে নেমে গেল ব্যাগটা হাতে করে। স্টেশনে ঢুকে সেকেণ্ড ক্লাসের টিকিট কাটল একটা। একটা সময় ছিল যখন, কখনো এসি ফার্স্ট ক্লাস ছাড়া ট্রেনে চড়ত না অমু। এখন সেই অমু ঘোষ মরে গেছে। কোনোই দুঃখ নেই অবশ্য সেজন্যে। সত্যিই নেই। আর্থিক অবস্থাটা তার ‘নিজস্বতা’কে একটুও বদলাতে পারেনি। অথচ ও জানে যে, অধিকাংশ মানুষকেই এই হেরফের প্রচন্ডভাবে প্রভাবিত করে। এবং জানে বলেই ওকে যে, প্রভাবিত করেনি, তা জেনে আনন্দিত হয়।

চা খেল এককাপ। তারপর ট্রেন এলে, জানলার দিকের একটি সিট দেখে গিয়ে বসল।

ছ-টা বাজছে। নীলডিতে এখন সকাল হয়েছে। দলমা রোড, ঝিলম রোড, ভিয়াস রোড, রভি রোড, খড়কাই রোড সব রাস্তার বাংলোগুলিতেই জীবন জাগছে ভোরের পাখির মতো। অস্ফুটে। যেমন প্রতিদিন-ই জাগে। পিকনিকে যাওয়ার প্রস্তুতিও চলছে কিছু বাংলোতে। আজ রবিবার।

ঠিক আটটাতে ওদের আসার কথা ছিল। গোলমুড়ি ক্লাবে। আটটার সময় ট্রেনটা কোথায় পৌঁছোবে কে জানে? ঘাটশিলা? না ঝাড়গ্রাম?

অমু ঘোষের বাঁ-দিকের বুকে একটু ‘ব্যথা ব্যথা’ করে উঠল। সঙ্গে ওষুধ নেই। কাল রাতেই ফুরিয়ে গেছে। বাঁ-দিকের কন্ঠার কাছটাও ব্যথা ব্যথা করতে লাগল একটু।

পিঠটা এলিয়ে দিল সিটে অমু। ট্রেনটা ছেড়ে দিল।

টাটানগর স্টেশন থেকে নীলডির গাছগাছালির পাখপাখালি কিছুই দেখা যায় না। বোঝারও উপায় নেই যে, অমন সুন্দর একটি এলাকা আছে এই ইস্পাতনগরীতে।

বুকের মধ্যে ব্যথাটা ট্রেনের গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই তীব্রতর হতে লাগল। কাল সারারাত-ই জেগেছিল ও। ট্রেনটা ঝাঁকুনি দিয়ে যেন, লাফিয়েই নদীর ওপরের ব্রিজটা পেরোল। সেই ঝাঁকুনিতে ব্যথাটাও যেন, অসহ্য হয়ে উঠল। কুঁজো হয়ে গেল এতমানুষের ভালোবাসা পাওয়া অমু ঘোষ। মুখটা বিকৃত হয়ে গেল। মনে হল, এবার ফেরার সময় হল। গবুর, ভূপেনবাবুর কথামতোই ‘এক্সপায়রি ডেট’ এসে গেছে।

মেঘের মতো দলমা রেঞ্জ দেখা যাচ্ছে লাইনের বাঁ-পাশে। তার চুড়োয় ওঠার কথা ছিল ওর। হল না। সব চুড়োই এখন, ওর কাছে আউট-অফ-বাউণ্ডস হয়ে গেছে। টিরিং-এর কান্ট্রিহাউসে ক্যাণ্ডেল-লাইট ডিনারের লোভ দেখানো মহিলা জানেন না তা! মহিলা ব্রয়লার চিকেন চেনেন। ‘প্রেম’ চেনেন না।

ট্রেনটা এবারে শহর ছাড়িয়ে জঙ্গলের মধ্যে এসে পড়ল। সকালের রোদ শিশিরভেজা বন-প্রান্তরে হাজার হিরের ঝিকিমিকি তুলেছিল।

অমু সোজা হয়ে বসল আবার। ওই ঠাণ্ডাতেও জানলাটা কষ্ট করে খুলে দিল। কিন্তু পরক্ষণেই অন্য যাত্রীদের আপত্তিতে বন্ধ করে দিতে হল। এখনও বেশ ঠাণ্ডা বাইরে। সমস্ত শরীরে,মনে অমুরও শীত। উষ্ণতা ছেড়ে যাওয়ার সময় এমন-ই হয়।

তবু ওই একঝলক হাওয়াতেই বুকের কষ্টটা কমল।

ট্রেন যতজোরে এগোতে থাকল, গাছপালা মাঠ-বাড়ি-পাহাড়ও ততই দ্রুত পিছিয়ে যেতে লাগল। এখন আর ইচ্ছে করলেও অমু পেছোতে পারবে না। ফেরা যাবে না নীলডিতে। হয়তো কোনোদিন-ই। ওই নীলডিতে।

একদৃষ্টে বাইরে চেসে বসে রইল অমু। কামরার বাইরেটা ক্রমশ-ই উজ্জ্বল হতে থাকল।

আর ওর ভেতরটা অন্ধকার।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%