অমরজ্যোতি মুখোপাধ্যায়
হিউ-পিনান অনেকদিন পরে খোটান, কাশগড় আর ইয়ারকন্দ জয়ী সম্রাট কণিষ্ককে দেখে অবাক হলেন। এ যেন সেই প্রাণচঞ্চল সম্রাট নন। এক গাম্ভীর্যের আবরণে তিনি নিজেকে ঢেকে ফেলেছেন। উচ্চগ্রামে সকলকে সচকিত করে তিনি আর চিৎকার করেন না। শান্তস্বরে কথা বলেন। সম্রাটের এই পরিবর্তনের জন্য হিউ-পিনান দুটি কারণ খুঁজে পেলেন। এক—স্ত্রীর মৃত্যু আর দুই—বৌদ্ধধর্মের প্রতি অত্যাধিক মনোযোগ। যাইহোক, নিরাপত্তার বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করা হল। সম্রাট কিছু কিছু নির্দেশ দিলেন এবং তা যথাযথ ভাবে পালন করার আদেশও দিলেন। আগামীকালও আলোচনা চলবে। আমুদরিয়া বা অক্ষুনদী, শিরদরিয়া, কিছুই বাদ যাবে না। রোমের সঙ্গে বাণিজ্যের আরও উন্নতির বিষয়ে কিছু পরিকল্পনাও গ্রহণ করতে হবে।
আজকের দুপুরের আহার হিউ-পিনান অতিথি ভবনেই সেরেছেন সম্রাটের সঙ্গে। উপস্থিত ছিলেন মহামিশ্র সমেত সাম্রাজ্যের নানান গণ্যমান্যেরা। সম্রাট চলে যাবার পর অতিথিশালায় হিউ-পিনান কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আবার স্নান সারলেন। স্নানের পর তাঁর আর বেরুবার ইচ্ছা করছিল না। অথচ উপায় নেই। জাঙ্কের প্রতিনিধি এসে বসেছিল। তবু তিনি বিশ্রামের অছিলায় কিছুক্ষণ কাল-হরণ করার চেষ্টা করলেন। বসে বসে ভাবলেন জাঙ্কের উদ্দেশ্যটা কী? এর আগেও তো তিনি এখানে অনেকবার এসেছেন, কিন্তু সামান্য সৌজন্যটুকু দেখানো ছাড়া জাঙ্ক তো তাঁকে এমন আপ্যায়ন করেনি! তোরণ দ্বারে জাঙ্কের অতি উৎসাহের পেছনে যে একটি কারণ ক্রিয়াশীল তা অনুমান করতে তাঁর ভুল হয়নি বলেই বিশ্বাস। কারণ, জাঙ্ককে তিনি চেনেন। জাঙ্ক কি এবার নগরাধ্যক্ষের পদ ছেড়ে অন্য কোন পদের জন্য লালায়িত হয়ে উঠে আবার তাঁর সাহায্যের প্রত্যাশী হয়েছে? তাই যদি হয়—তবে কোন সেই উচ্চতর পদ? জাঙ্ক নিশ্চয় কোনো মন্ত্রীপদের আশা করে না। সে যোগ্যতা তার আছে বলে হিউ-পিনানের মনে হয় না। শত হলেও জাঙ্ক তাঁর নিকট আত্মীয়। তার ওপর তাঁর একটা স্বাভাবিক দুর্বলতাও রয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত কৌতূহলী হয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন যাবার জন্য। কিন্তু বর্তমানে পরিবর্তিত কণিষ্কের চিন্তাটাও তাঁর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটে গেছে সম্রাটের মধ্যে। এই শান্তরূপ নিয়ে তিনি কেমন করে শাসন করবেন এই বিশাল সাম্রাজ্য? তবে কি কুষাণ সাম্রাজ্যের পতন আসন্ন? সঙ্গে সঙ্গে অদ্ভুত এক চিন্তা হিউ-পিনানকে গ্রাস করল। কণিষ্ককে যদি সিংহাসনচ্যুত করা যায়! কিন্তু প্রজাকুলের মধ্যে কণিষ্কের যে জনপ্রিয়তা তাতে তাঁর জীবিতকালের মধ্যে তাঁকে সরানো সম্ভব নয়। একমাত্র কণিষ্কের মৃত্যুই সেই পথ সুগম করে দিতে পারে। কিন্তু সেই মৃত্যুই বা তাঁর পক্ষে কেমন করে ঘটানো সম্ভব? পুরুষপুরের বিরুদ্ধ শক্তির সহায়তা তাঁকে নিতেই হবে। কে এখানে তাঁর সেই সহায়ক শক্তি হতে পারে? দু-একজন মন্ত্রী অবশ্যই রয়েছেন। কিন্তু মাটির বুকে কাজ করার জন্য অন্য এক কুটিল মানুষকে তাঁর চাই। জাঙ্ক কি তাঁর সেই মানুষ হয়ে উঠতে পারবে না? জাঙ্ক যথেষ্ট ক্ষমতাশালী ও কুটিল। তাকে আজ এ বিষয়ে একটু নাড়াচাড়া করে দেখতে হবে।
জাঙ্ক হিউ-পিনানের জন্য কার্যালয়ের দ্বারে দাঁড়িয়েছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তিনজন মন্ত্রী আর কিছু অভিজাতবর্গ। সবাই জাঙ্কের গোষ্ঠীভুক্ত মানুষ। হিউ-পিনানের রথকে আসতে দেখে সকলে স্বাগত জানালেন।
জাঙ্ক নাচ-গানেরও সংক্ষিপ্ত আয়োজন করেছিলেন। পুরুষপুরের বুকে সুদূর বল্খের নৃত্য-সংগীত সবাইকে মুগ্ধ করল। এসবের পর খাওয়া-দাওয়ার আসর বসল। তাও শেষ হতে বেশ কিছু রাত হল। জাঙ্ক পরিষ্কার ভাবে অতিথিদের এক সময়ে বললেন, “আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন। হিউ-পিনানের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আলোচনা রয়েছে। উনি আমার নিকট আত্মীয়—এ কথা তো সবাই জানেন। তাই পারিবারিক আলোচনা সবার সামনে করা সম্ভব নয়।”
অতিথিরা “অবশ্যই—অবশ্যই” বলে একে একে বিদায় নিতে থাকলেন। মদের প্রভাবে তারা তখন কেউই স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন না। অনেকে আবার হিউ-পিনানের সঙ্গ লাভের জন্য লালায়িত ছিলেন। জাঙ্ক তাঁদের আশ্বাস দিয়ে বললেন, “হিউ-পিনান আগামী কালও থাকবেন। আপনাদের কারোর কোনো বক্তব্য থাকলে তা সন্ধ্যাবেলায় অতিথিশালায় গিয়ে বলতে পারেন।”
অগত্যা…!
সবাই চলে গেলে জাঙ্ক তাঁর নিভৃত কক্ষে হিউ-পিনানের মুখোমুখি হলেন। হিউ-পিনান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে জাঙ্কের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “বল। এতসব আয়োজন হঠাৎ কেন? তুমি কি পদোন্নতির আকাঙ্ক্ষা করছ?”
“হ্যাঁ, মহামান্য প্রশাসক।” নাটকীয় ভাবে জাঙ্ক বললেন।
“কী সেই পদ? মন্ত্রিত্ব? সৈনাপত্য?”
“না, রাজপদ। আমি রাজা হতে চাই।”
চমকে উঠলেন হিউ-পিনান। “এ তুমি কী বলছ জাঙ্ক!”
জাঙ্ক গম্ভীর স্বরে বললেন, “আমি ঠিকই বলছি। বুদ্ধ-বুদ্ধ করে কণিষ্কের অধঃপতন ঘটেছে। সম্রাট থাকার আর সে যোগ্য নয়। আমি সোজাসুজি আপনাকে বিশ্বাস করেই বলছি, আমি কুষাণদের ভারতীয় অংশের সম্রাট হতে চাই। আপনি সম্রাট হন বর্হিভারতীয় অংশের। আপনার চেয়ে যোগ্য ব্যক্তি আর কে আছে?”
“কিন্তু কেমন করে কণিষ্ককে সিংহাসন থেকে নামাবে? প্রজারা সব তাঁর অনুকূলে। সৈন্যবাহিনীও। সেনাপতি গুণবর্ধন কেন রাজি হবে আমাদের প্রস্তাবে? বাসিষ্ক রয়েছে মথুরায়।”
জাঙ্ক বললেন, “যুদ্ধ-বিগ্রহ পরের কথা। আমি প্রথমে কণিষ্ককে হত্যা করে প্রাসাদ অধিকার করে নিতে চাই।”
হিউ-পিনান বললেন, “বুঝলাম। কিন্তু প্রাসাদে ঢুকে তাঁকে হত্যা করাটা অত সহজ কাজ নয়। প্রহরীরা রয়েছে। অঙ্গ-রক্ষকেরা রয়েছে আর অদূরেই রয়েছে সেনানিবাস। বাইরেও হত্যা করা যাবে না। সম্রাট মারা গেলেও যে হত্যা করবে তার মৃত্যু অথবা ধরা পড়া নিশ্চিত। তাছাড়া অঙ্গ-রক্ষক এবং সেনারা বাইরে সম্রাটকে এমনভাবে ঘিরে থাকে যে হত্যা করার সুযোগই দুর্লভ হবে। আরও একটা কথা, হঠাৎ সম্রাটকে হত্যা করলে লাভটা কী হবে? যদি কোনো অভ্যুত্থান ঘটানো না যায় তবে হত্যাটা মিথ্যা হয়ে যাবে।”
“অভ্যুত্থান ঘটাবেন আপনি। বল্খে বিদ্রোহ ঘোষণা করে আপনি ভারতে ঢুকে আসবেন। ইত্যবসরে আমি আমার অনুগতদের সংগঠিত করব। বৌদ্ধ বিরোধী জনসাধারণকে স্বপক্ষে নিয়ে আসব। সেনাবাহিনীর মধ্যে সম্রাট বিরোধী বিষ ছড়িয়ে দোব। এখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা বৌদ্ধদের ওপর খুব ক্রুদ্ধ। তাদের অভিযোগ রাজকোষ বৌদ্ধধর্মের শ্রীবৃদ্ধির পিছনেই ব্যয় করা হচ্ছে। ঐ মহাবিহার আর স্তুপ তৈরি করতে কী বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়।”
হিউ-পিনান একটু চুপ করে থেকে কিছু চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, “এটা সম্ভব। পদানত পহ্লব, শক, নাগবংশীয় আর শুঙ্গদের আমরা প্ররোচিত করতে পারি। কিন্তু তা সময়সাপেক্ষ।”
জাঙ্ক বললেন, “খুব বেশি একটা সময় লাগবার কথা নয়। বৌদ্ধরা খুব শীঘ্রই কণিষ্কপুরে তাদের চতুর্থ সংহতির আয়োজন করবে বলে শুনেছি। দেশ বিদেশ থেকে সেই সম্মেলনে যোগদান করার জন্য বৌদ্ধ প্রতিনিধিরা আসবে। বল্খ থেকেও নিশ্চয় আসবে। আপনি কৌশলে সেই দলের সঙ্গে জনাদশেক ঘাতককে পাঠিয়ে দেবেন। তারা যেন দুঃসাহসী এবং দক্ষ হয়।”
হিউ-পিনান বললেন, “কেন ঘাতক কি এখান থেকে সংগ্রহ করা যাবে না?”
“যাবে। কিন্তু আমি ঝুঁকি নিতে চাই না। এক, সম্রাটকে হত্যার ব্যাপারে এই মুহূর্তে উৎসাহী লোকের সংখ্যা কমই হবে। দ্বিতীয়ত, লোক জানাজানির সম্ভাবনা থেকেই যায়।”
হিউ-পিনান বললেন, “ঠিক আছে। আমি দশ-বারোজন ঘাতককে বৌদ্ধ দলের সঙ্গে পাঠাবার ব্যবস্থা করব। এরপর?”
জাঙ্ক বললেন, “সমাজ-উৎসবের ঠিক আগে থাকতেই আপনি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে কিছু—অন্তত দু হাজার সৈনিককে পাঠাবেন। তারা নগরের পেছনে হিন্দুকুশের যে শৈলশিরা রয়েছে সেখানে কোনো ছদ্মবেশে—কোনো অজুহাতে আশ্রয় নেবে। পাহাড়টিতে রয়েছে নিবিড় অরণ্য। তাদের পক্ষে দু-একদিন সেই জঙ্গলে আত্মগোপন করে থাকা বিশেষ কষ্টকর হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। অন্যদিকে আপনি আপনার সেনাবাহিনী নিয়ে হিন্দুকুশের কাছে অপেক্ষা করবেন। সময় নির্দিষ্ট করছি সমাজ-উৎসবের রাত্রি। সারা দিনের উৎসবের ক্লান্তি আর যথেচ্ছ মদ্যের প্রভাবে মানুষজন এমনকি সৈন্যরাও শিথিল হয়ে থাকবে।”
হিউ-পিনান বললেন, “তাহলে হাতে মাত্র কয়েক মাসের সময়।”
জাঙ্ক বললেন, “হ্যাঁ। এই অবসরে আমি অবৌদ্ধদের নিয়ে এখানে কিছু অশান্তির চেষ্টা করব। সেনাবাহিনীর মধ্যে আমাদের লোকজনকে প্রভাবিত করার চেষ্টাও করব।”
হিউ-পিনান বললেন, “এবার উঠি। রাত অনেক হল। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে যাচ্ছে।”
জাঙ্ক বললেন, “স্বাভাবিক। দীর্ঘপথ পেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু একটা কথা। এখানে কাজ শুরু করতে হলে তো বেশ কিছু পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন। আমি সামান্য এক নগরাধ্যক্ষ। এই অর্থের যোগান কেমন করে দোব?”
উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে হিউ-পিনান বললেন, “চিন্তা কোর না। আমি বল্খে ফিরে গিয়ে এক প্রতিনিধির হাতে কিছু অর্থ পাঠাব। আশা করি তাতেই তুমি তোমার কাজ শুরু করে দিতে পারবে।”
“অজস্র ধন্যবাদ আপনাকে। নিশ্চিন্ত হলাম।” বিনয়ে গলে পড়লেন জাঙ্ক।
টলমল পায়ে হিউ-পিনান তাঁর রথে উঠলেন। কার্যালয়ের অপর প্রান্তে আধা জঙ্গলের মধ্যে এক পর্ণকুটীর থেকে এক ভিখারি সমস্ত বিষয়টি লক্ষ্য করার পর শুয়ে পড়ল। প্রভাতেই আবার তাকে ভিক্ষা করতে বার হতে হবে।
.
সেদিন প্রভাতে প্রস্তুত হয়ে কমলিকা ঘর থেকে বেরুচ্ছিল। অলিন্দ পথে দেখা হয়ে গেল মহামিশ্রের সঙ্গে। অভিবাদন জানাল কমলিকা।–সুপ্রভাত, ভন্তে মহামিশ্র!
“সুপ্রভাত। তোমাকেই খুঁজছিলাম। একটা সুখবর রয়েছে তোমার জন্য।”
কমলিকা উৎসাহিত হল না। সে জানে তার জীবনে সুখবর কিছুই নেই। বাবা-মায়ের ঐ মর্মন্তুদ মৃত্যুর পর তার জীবনে সুখকর আর কিছু থাকতে পারে না। তবু আশায় বুক বেঁধেছিল। ভট্টরাইয়ের সঙ্গে এক সহজ সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। কিন্তু হঠাৎ তার জীবনের সীমানায় আবির্ভাব ঘটল সম্রাটের। সমস্ত কিছুর যেন ওলট-পালট ঘটে গেল। ভট্টরাই মিথ্যে হয়ে গেল। সম্রাজ্ঞী হবার লোভ তার নেই। সম্রাটের বীরমূর্তিই তাকে আকর্ষণ করেছে। তার কল্পনা করা বীরমূর্তির সঙ্গে সম্রাট যেন একীভূত হয়ে গেছেন। প্রথম প্রথম প্রাসাদ-রমণীর জীবনে সে আনন্দ উপভোগ করছিল। কিন্তু ক্রমে সম্রাটের নিরস ব্যবহার যেন তাকে ক্লান্ত করে তুলছে। এ পর্যন্ত সম্রাট কোনো বাক্যালাপই করেন নি। অপরদিকে যন্ত্রের মতো নিবিষ্ট মনে সে তার কাজ করে গেছে। মনের মাধুরী মিশিয়ে সম্রাটের কক্ষসজ্জা করেছে। এখন নিরাশার প্রান্তসীমায় সে। সুতরাং মহামিশ্র আর কী সুখকর সংবাদ বয়ে আনতে পারেন? সেই রত্নপেটিকা? না, রত্নপেটিকার ওপরও আকর্ষণ নেই তার! যে পেটিকার জন্য তাকে তার বাবা-মাকে হারাতে হয়—সেই পেটিকা তার কাছে অভিশাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। তবু সেই রত্ন-পেটিকা এক দস্যুর ভোগে না লেগে কোনো কল্যাণকর কাজে লাগলে ভাল হোত।
মহামিশ্র কমলিকার ভাবান্তর লক্ষ করছিলেন। তাই আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করলেন, “কী হল? কী ভাবছ?”
লজ্জিত হয়ে কমলিকা বলল, “না, কিছু নয়। বলুন কী সেই সুসংবাদ?”
“সম্রাট গতকাল রাতে আমার প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কে মাঝে মধ্যে আমার কক্ষ-সজ্জা করে যায়? একটি কৃষ্ণ গোলাপ দিয়ে কে ঐ পুষ্পস্তবকটি সাজিয়েছে?’“
ভীত কমলিকা বলল, “সম্রাটের পছন্দ হয়নি?”
অভয় দিয়ে মহামিশ্র বললেন, “মোটেও তা নয়। তুমি মিথ্যে ভয় পাচ্ছ। সম্রাট বলেছেন, অতঃপর যেন ঐ রমণীটিই কেবলমাত্র আমার কক্ষ-সজ্জা করে!”
কমলিকার মুখ এবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল। “সত্যি!” কিন্তু পরক্ষণেই আবার সে বিষাদে ছেয়ে গেল।
“কী হল?”
“অন্যান্য প্রাসাদ-রমণীরা আমায় ঈর্ষা করা শুরু করবে। তারা রাজনৈতিক অভিজাতদের পুত্রী। আমি সামান্য এক মণিকার কন্যা। এমনিতেই কথা শুনতে হয়।”
মহামিশ্র হাসলেন। “ওসবে কান না দিয়ে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাক। প্রাসাদ-রমণীদের প্রত্যেকের গুণাবলী আমি জানি। তোমার মতো গুণাবলী আর কারোর আছে বলে আমার মনে হয় না।”
কমলিকা বলল, “ভন্তে মহামিশ্র! সম্রাটকে জানাবেন, আমি কৃতজ্ঞ।”
মহামিশ্র নিজের কাজে চলে গেলেন। মন্ত্রমুগ্ধ কমলিকা ঐ একই স্থানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার সারা দেহে এক কম্পন। এই আনন্দ অন্য কারোর সাথে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু কার সঙ্গে সে এই আনন্দ ভাগ করে নেবে? কেন জানি, ভট্টরাই মুহূর্তের জন্য তার চোখের সামনে ভেসে উঠেই বিশালদেহী সম্রাটের আড়ালে চলে গেল। প্রশান্ত মুখে সম্রাট সামনে এসে দাঁড়ালেন। স্বপ্নের ঘোরে কমলিকা বলল, “আপনার জীবনে শান্তি আমি ফিরিয়ে দোব, সম্রাট। সুযোগ দিন, আদরে-সোহাগে আপনাকে ভরিয়ে দোব।”
সত্যা ঘর থেকে বেরিয়ে কমলিকাকে ঐভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হল। তার ডাকে বাস্তবে ফিরে এল কমলিকা। “কী রে! হাসিমুখে কী ভাবছিস? খবর শুনেছিস? আজ থেকে সম্রাটের কক্ষ-সজ্জার দায়িত্ব তোর? মহামিশ্র, কাল রাতে আমায় জানিয়েছেন।” সত্যার মুখে যেন সামান্য অভিমান। “তুই কী ভাগ্যবতী রে! আমাদের হাত ক্ষয়ে গেল, তবু সম্রাটের মন উঠল না। আমাদের কোমর ব্যথা হয়ে গেল। অথচ সম্রাট একবারও বললেন না—’সত্যা! তোমার কোমরটি বড় সুন্দর!’“
কমলিকা হেসে উঠল। “তুই পারিস বটে, সত্যা!”
সত্যা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। ফিসফিস করে বলল, “তোকে একটা কথা বলে রাখি কমলিকা। সম্রাটকে তুই ছাড়া আর কেউ জয় করতে পারবে না। আমার অনুরোধ যত তাড়াতাড়ি পারিস সম্রাটের মাথাটা চিবিয়ে ওনাকে সংসার ধর্মে টেনে নিয়ে আয়। তাতে তাড়াতাড়ি আমিও মুক্তি পাব।”
বিস্মিত কমলিকা বলল, “তোর মুক্তি! এর অর্থ?”
“জানিস না? আমার একজন ভালবাসার মানুষ রয়েছে। কিন্তু আমার বাবা যেহেতু একজন মন্ত্রী, তিনি চান আমি যেন সম্রাটকে জয় করে সম্রাজ্ঞী হই। দূর—তা কি হয়? ছোটবেলা থেকে যার সঙ্গে খেলাধুলো-খুনসুটি করে বড় হলাম—তাকে ছেড়ে…। অবশ্য সম্রাজ্ঞী হবার লোভ যে আমার নেই তা নয়। কত লোকে অভিবাদন করবে…তোরাও করবি…কত লোকের মুণ্ডু নিতে পারব…।” তারপর সত্যা আবার ফিসফিস করে বলল, “আমার কুষাণ সাম্রাজ্য চাই না। আমার নিজের সাম্রাজ্য গড়ে নিতে চাই। আমি জানি এই সম্রাজ্ঞী হবার প্রতিযোগিতায় তুই ছাড়া কেউই বিজয়ী হবে না। তবে একটা কথা—সাবধানে থাকবি। তুই এবার সবার বিষ নজরে পড়বি।”
কমলিকা হাসল। “দূর! কোথায় কী? কাজে যাই। দাসীরা ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা ভবিষ্যতই জানে। আমি প্রকৃতপক্ষে মহামিশ্রের সহকারী হয়ে এসেছিলাম। তিনিই আমাকে তোদের দলভুক্ত করে দিয়েছেন। আমার মাথার ওপর ছাদ নেই। পায়ের নীচে শক্ত জমি নেই!”
সত্যার স্বর সহানুভূতিতে ভরে গেল। “আহা রে! দস্যুটা এখনও ধরা পড়েনি। রত্নপেটিকাটি উদ্ধার হলে তোর আর কোনো চিন্তা ছিল না।”
“বাব্বা! পেটিকার খবর শুনেছিস তাহলে! তবে পেটিকা নিয়ে আমার দুঃখ আছে বটে—কিন্তু মাথাব্যথা নেই। সম্রাট যখন নির্দেশ দিয়েছেন তখন তা উদ্ধার হবে নিশ্চয়।” একটু থেমে কমলিকা বলল, “থাক ওসব। চল, বেলা বাড়ছে।”
.
সম্রাটের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার পর হিউ-পিনান বিদায় নিয়েছেন। সম্রাট নিঃসন্দেহে বুদ্ধিমান এবং লোকচরিত্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ। নচেৎ এই বিশাল সাম্রাজ্য তিনি যথাযথভাবে পরিচালনা করতে পারতেন না। হিউ-পিনান যে মনোযোগ দিয়ে প্রথম দিনের আলোচনা করেছিলেন—সম্রাটের মনে হয়েছে, দ্বিতীয় দিনে হিউ-পিনানের মধ্যে তা অনুপস্থিত। কোথায় যেন তাঁর মধ্যে এক চঞ্চলতা রয়েছে। আর চঞ্চলতার সৃষ্টি হয়েছে গতরাত্রের জাঙ্কের নিমন্ত্রণ রক্ষা করে আসার পর থেকেই। অবশ্য সম্রাট এ বিষয়ে কারোর কাছে মন খুলে কিছু বলেন নি। শুধুমাত্র সন্দেহের বশে কোনো কিছু করা উচিত হবে না। পাঁচ কান হলে জল ঘোলা হওয়ার সম্ভাবনা। মহামিশ্র ছাড়া কারোর কাছে মন খুলে কিছু বলাও যাবে না।
সম্রাট শেষ পর্যন্ত মহামিশ্রের কাছে তাঁর সন্দিগ্ধতার কথা বললেন। মহামিশ্র গুপ্তচর প্রধান নীলাকারকে ডেকে সম্রাটের কথা ব্যক্ত করে তাকে সাবধানে হিউ-পিনান ও জাঙ্কের ওপর দৃষ্টি রাখতে বললেন।
অন্যদিকে ভিখারিটি তার প্রতিবেদন পাঠিয়েছিল বিষ্কের কাছে। সে বলেছিল, হিউ-পিনান গভীর রাত্রে একাকী কার্যালয় ত্যাগ করে যান। তাঁর যাওয়ার অনেক আগেই অন্যান্য অতিথি-অভ্যাগতরা চলে গিয়েছিলেন। এর অর্থ জাঙ্কের সঙ্গে তিনি দীর্ঘ সময় আলোচনায় মত্ত ছিলেন। দ্বিতীয় একটি চমকপ্রদ তথ্যও জানা গিয়েছিল। হিউ-পিনান যাবার পর আর এক অতিথির আগমন ঘটেছিল। এই অতিথিটি নাকি প্রায়ই গভীর রাতে কার্যালয়ে আসে। কিছুক্ষণ থাকে এবং বিদায় নেয়।
বিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই বুঝেছিলেন যে—গভীর রাতে যে অতিথিটি আনাগোনা করে—সে অন্ধকারেরই লোক! একটি ষড়যন্ত্র যে চলছে একথা ঠিক। কিন্তু কিসের ষড়যন্ত্র? কোনো তথ্য প্রমাণ হাতে না আসা অবধি মহামিশ্রের কাছে জাঙ্ক সম্পর্কে কোনো অভিযোগ করাও সম্ভব নয়। মহামিশ্রের সঙ্গে তার এমন কিছু ঘনিষ্ঠতা নেই যে বিষ্ক তাঁকে উপদেশচ্ছলেও কিছু বলতে পারেন!
ভট্টরাইও বিষ্কের সঙ্গে সহমত হল। সে বলল, “অপেক্ষা করা যাক।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন