কণিষ্ক – ১৮

অমরজ্যোতি মুখোপাধ্যায়

সমাজ-উৎসবের সন্ধ্যা। নাগরিকদের সবাই মত্ত। কোনও কোনও অঞ্চলে নাটক ও সংগীত পরিবেশন করা হচ্ছিল। নগরের কুঞ্জ, উদ্যান, ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে প্রেমিক-প্রেমিকারা আশ্লেষে মত্ত। রতি-রভস স্পন্দনে পুরুষপুরের আকাশ বাতাস বিকৃত। মত্তের দল রাস্তায় হৈ-হৈ করে বেড়াচ্ছে। প্রহরীহীন পথঘাট।

জাঙ্ক আজ তার নিভৃত কক্ষ ছেড়ে কার্যালয়ের দাওয়ায় বসে প্রহরীদের নিমন্ত্রণে অংশ গ্রহণ করার অনুরোধ জানাচ্ছে। তাঁর পরিবর্তিত মূর্তিতে প্রহরীরা সবাই মুগ্ধ। আহারের বিপুল আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু কোন ষণ্ড বলিদান করা হয়নি। প্রশ্ন করলে জাঙ্ক রহস্যময় ভাবে হেসে বলছে, বলিদান হবে আর কিছু সময় অপেক্ষা কর। বলির লগ্ন হলেই আমি জানাব। এখন আহার আর মদ্য গ্রহণ কর খুশি মতো। রাত্রে আমরা এক অভিযানে বার হব। কোথায়? কী জন্য—এসব প্রশ্ন করিস না। যারা নির্দ্বিধায় আমাকে অনুসরণ করবে- তারা প্রকৃতপক্ষে লাভবান হবে। আমি কথা দিচ্ছি। তাদের কোনও আর্থিক সমস্যা আর থাকবে না।

চপল কিছু প্রহরী নিজেদের মধ্যেই আলোচনা করল, তবে কি জাঙ্ক রাজকীয় কোষ-ভান্ডার লুঠ করবে? করতেও পারে। তবে তিনি যদি সঙ্গে থাকেন তবে আমাদের অসুবিধা কোথায়? আজ রাতে ওখানকার হাতে-গোনা প্রহরীরা মত্ত থাকবে। আমাদের কাজ হাসিল করার কোনও অসুবিধা হবার কথাও নয়।

জাঙ্ক অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাবার ফাঁকে ফাঁকে চিন্তা করছিলেন, ঘাতক দলের যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। তারা ফিরে এলেই তিনি একটি জ্বলন্ত তির উত্তর পাহাড় লক্ষ্য করে আকাশে ছুঁড়বেন। পাহাড় থেকে নেমে আসবে প্রায় হাজার খানেক বল্ব দেশীয় যোদ্ধা। তাদের এক অংশ নগর তোরণ আক্রমণ করবে। অপর অংশ উত্তরের নগর প্রাচীর অতিক্রম করে নগরে ঢুকে পড়বে। তারপর ঐ বাহিনী নিয়ে ঘিরে ফেলা হবে সৈন্যাবাস, প্রাসাদ আর কোষ-ভান্ডার। কাল প্রভাতে কণিষ্কের ছিন্ন মুণ্ডু হাতে নিয়ে অলিন্দে দাঁড়িয়ে জনতার সামনে নিজেকে নতুন সম্রাট বলে ঘোষণা করবেন তিনি। অন্যদিকে বাসিষ্ক পুরুষপুরে পা রাখার আগেই হিউ-পিনান তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে হিন্দুকুশ পেরিয়ে পুরুষপুরে পৌঁছে যাবেন। নিম্নসিন্ধু অঞ্চলে পহ্লব বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধরত রাজকীয় বাহিনীকে অস্ত্র সংবরণ করতে বলা হবে। নচেৎ পেছন থেকে হিউ-পিনানের বাহিনী তাদের ঘিরে ফেলবে। ইতিমধ্যে সংবাদ এসে গেছে যে হিউ-পিনান তা-হিয়া থেকে যাত্রা করে গেছেন। পথিমধ্যে তিনি তাঁর বাহিনীর অভিমুখ কাশগড়-খোটান-ইয়ারকন্দ থেকে ঘুরিয়ে পুরুষপুরের দিকেই এগিয়ে আসবেন। কণিষ্কের জন্য তার দুঃখ হল—মণিকার পুত্রীর সঙ্গে তিনি এক শয্যায় শোওয়ার সুযোগও আর পাবেন না! মণিকার পুত্রীকেও হত্যা করার আদেশ তিনি দিয়েছেন।

একদল প্রহরী এসে জাষ্কের চিন্তার বিঘ্ন ঘটাল। —ষণ্ড বলিদান কখন হবে, প্রভু?

বিরক্ত জাঙ্ক বলল, প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তা মাংসের তো অভাব নেই এখানে। গেল না যত পারিস! ষণ্ড মাংস না হয় কালই খাবি!

প্রহরীরা জাষ্কের বিরক্তি উৎপাদন করা সমীচীন মনে না করে চলে গেল আহার-ঘরে। এই বিশাল ঘরটি সম্প্রতি তিনি তৈরি করিয়েছেন—প্রহরী-নিবাস হিসাবে।

.

সেনা-নিবাসে বসেছিলেন গুণবর্ধন আর নীলাকার। ক’জন গূঢ়পুরুষ ছোটাছুটি করছিল নানান সংবাদ নিয়ে। একজন গূঢ়পুরুষ সংবাদ নিয়ে এল, সোরোডান সম্রাটের আদেশনামা দেখিয়ে ক্ষমতা দখল করেছেন এবং হিউ-পিনানকে বন্দি করেছেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী গোপন প্রচারের ফলে সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ থেকেছে। হিউ-পিনানপন্থীরা বাধা দিতে গিয়ে নির্মমভাবে নিহত হয়েছে। হিন্দুকুশের পার্বত্যপথ সাময়িক ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে যাতে এই পরিবর্তনের কথা পুরুষপুরে না পৌঁছায়। বরং একজন গূঢ়পুরুষকে পাঠানো হয়েছে জাষ্কের কাছে। বলা হয়েছে, আগামী কালই হিউ-পিনান হিন্দুকুশ অতিক্রম করবে। সেনাবাহিনীর তা-হিয়ায় ফিরে যাবার কথাও গোপন করা হয়েছে। অপর দিকে মন্ত্রী পরিষদ তথা ইউনাস-ভার্গব আর দুবলের প্ররোচনায় যে চল্লিশ সহস্র সেনা নিম্নসিন্ধুর দিকে অগ্রসর হয়েছিল—তারা পথে বিভক্ত হয়ে গেছে। মাত্র দশ সহস্র সেনা নিম্নসিন্ধুর দিকে এগিয়ে গেছে। অপরদিকে সৌরাষ্ট্র আর নিম্নসিন্ধু অঞ্চলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি থেকে আরও তিরিশ সহস্র সেনা ঐ দশ সহস্রের সঙ্গে মিলিত হবে। পুরুষপুরের সেই উদ্বৃত্ত তিরিশ সহস্র সেনা ফিরে এসে আজ সন্ধ্যার অন্ধকারে উত্তর পাহাড়ের পাদদেশে গোপন ভাবে অবস্থান করছে। এছাড়াও কিছু সেনা যেমন নগর তোরণে এবং নগরের উত্তর প্রাচীর বরাবর রাখা হয়েছে—ঠিক তেমনি আরও কিছু সেনা গোপনে মন্ত্রী ইউনাস, ভার্গব এবং দুবলের প্রাসাদও ঘিরে রেখেছে। এই ষড়যন্ত্রে তাঁদের জড়িত থাকার প্রমাণ গূঢ়পুরুষ বিভাগ ইতিমধ্যেই হস্তগত করেছে। জাষ্কের কার্যালয়ের ওপরও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা হয়েছে। গুপ্তভাবে অবস্থান করছে প্রায় হাজার খানেক সেনা। সৈন্যাবাস এখন সেনাশূন্য। প্রাসাদের জন্য সেরকম কোন সেনা ব্যবহার করা হয়নি। কারণ, প্রাসাদের বাইরে বিভিন্ন স্থানে প্রহরী দেবার জন্য প্রাসাদের নিজস্ব কিছু বাহিনী রয়েছে। তাছাড়া, রাস্তায় গুপ্তভাবে অবস্থান করা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেনাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোনও বাহিনীরই প্রাসাদে আসা সম্ভব নয়। কিন্তু গুণবর্ধন আর নীলাকার যে বিষয়টি নিয়ে বিশেষ চিন্তা করেননি তা হচ্ছে কুবার তীর। ঐ দিকে অন্যান্য দিনের মতোই স্বাভাবিক প্রহরী ছিল। এও দেখা হয়নি যে উৎসবের দিনে কত প্রহরী সঠিক ভাবে কার্যক্ষম রয়েছে। কুবার দিক থেকে সহজেই রাজ-উদ্যানে প্রবেশ এবং উদ্যানের মধ্য দিয়ে প্রাসাদ পর্যন্ত এগিয়ে আসা সম্ভব—যদি না উদ্যানের প্রহরীরা সতর্ক থাকে। জাঙ্ক নিতান্ত বুদ্ধিহীন নন। তার বুদ্ধি যদি সত্যই কিছু কম থাকে—তবে তা পূরণ করে দেবার মত তিনজন কূটনীতিকও রয়েছেন। তাঁরা হচ্ছেন মন্ত্রীত্রয় ইউনাস, ভার্গব আর দুবল। তাঁরা প্রকাশ্য নন——অপ্রকাশ্যেই জাঙ্ককে পরিচালিত করছেন। বুদ্ধি জোগাচ্ছেন। তাদের বুদ্ধি অনুসারে দশজন বল্ব দেশীয় ঘাতক কুবা নদীর পথ অবলম্বন করেছিল। নিপুণ হত্যাকারীদের পক্ষে নদী ঘাটের অসতর্ক পাঁচজন প্রহরীকে হত্যা করে উদ্যানের মধ্য দিয়ে পথ করে নিয়ে উদ্যানের প্রহরী ছাউনির কাছে পৌঁছে যাওয়ার খুব একটা অসুবিধা ঘটল না। ছাউনির কাছাকাছি পৌঁছে তারা অপেক্ষা করে রইল কখন রাজপ্রাসাদের পেটা ঘড়িতে প্রথম প্রহর ঘোষিত হবে।

কার্যালয়ে একাই বসেছিল ভট্টরাই। তার মনের মধ্যে বিশেষ কোন দুশ্চিন্তা ছিল না। কারণ, গুণবর্ধন, নীলাকার আর মহামিশ্রের সব পরিকল্পনাই সে জেনেছে। তাই সে অলসভাবে আকাশ-পাতাল ভাবছিল। সকালে সম্রাটের সঙ্গে অলিন্দে দেখা কমলিকার সেই মূর্তিটি যেন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছিল এই অলসতার সুযোগে। আয়ত চোখ—তীক্ষ্ণ অথচ একটু চাপা নাসা। কুঞ্চিত কেশদাম। মর্মরশুভ্র গাত্র বর্ণ। পীন পয়োধর! রক্তাভ ছোট দু’টি ঠোঁট। ভ্রমরের মতো ক্ষীণ কটি—প্রশস্ত নিতম্বদেশ। অবাক হয়ে গিয়েছিল সে। এই কমলিকাকে সে কখনও দেখেনি! তার চোখে সে সুন্দর ছিল—কিন্তু এত সুন্দর! একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ভট্টরাইয়ের বুক থেকে। সঙ্গে সঙ্গে জানুকা আর বল্লভীর মুখচ্ছবি—দেহ ভঙ্গিমাও তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। কেমন যেন লালসায় ভরা। কমলিকার শান্তশ্রী তাদের মধ্যে অনুপস্থিত! তারা কেমন যেন অশ্লীল! না। যদি তাদের মহোৎসবের কথা সত্যও হয়—ভট্টরাই সেখানে অংশ নেবে না। সে খেলার বস্তু হতে পারে না। জানুকা সত্যই যদি তাকে আত্মনিবেদন করত—তাহলে সে তা বিবেচনা করে দেখত কমলিকার সম্রাজ্ঞী হয়ে যাবার পর—কমলিকার সম্মতি নিয়েই। কমলিকা নিশ্চয় বাধা দিত না। কিন্তু কুৎসিত যৌনাচারে আসক্তা এক নারীকে সে কখনই জীবনসঙ্গিনী করতে পারে না বা তার খেলার সামগ্রী হতে চায় না। প্রথম প্রহরের ঘণ্টার পর জানুকা তাকে না ডাকা পর্যন্ত এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকতে বলেছে। অন্যথা হলে—তাদের মহোৎসব নষ্ট হয়ে গেলে সে নাকি ভীষণ প্রতিশোধ নেবে। হঠাৎ ভট্টরাইয়ের মনে হল, এক রাতের ব্যবধানে জানুকা এত শক্তি আহরণ করবে কোথা থেকে? অবশ্য, সে জানে না যে ভট্টরাই এই পদে তার পিতা ইউনাসের কৃপায় বসে নি। স্বয়ং সম্রাট তাকে নিয়োগ করেছেন। হঠাৎ এক শিরশিরানির ভাব ভট্টরাইয়ের মেরুদণ্ড বেয়ে নামা শুরু করল। জাঙ্ক তো নেহাত মূর্খের মতোই হিউ-পিনানের ষড়যন্ত্রের ভাগিদার হয়ে সম্রাট হবার স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু জানুকা বা বল্লভীরাও কি জাষ্কের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে? তাদের পিতৃগৃহে জাষ্কের সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছে। গুপ্তচর পরিচারিকারা জানিয়েছে সমাজ-উৎসব কথাটি উচ্চারিত হয়েছে। প্রদীপ! কী করতে চায় জাঙ্ক? সম্রাটকে হত্যা? সেই দু’জন সন্দেহজনক শ্রমণের কথা মনে পড়ে গেল। সংখ্যায় তারা দশজন। নীলাকারের লোকজন সেখানে উপস্থিত হবার আগেই তারা সঙ্ঘারাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল। সবাই ভুলে গেছে তাদের কথা। অন্তত গুণবর্ধন, নীলাকার আর মহামিশ্রের পরিকল্পনায় তাদের নাম নেই। কোথায় গেল তারা? বল্বের পথে? তবে কেন এসেছিল তারা? বৌদ্ধ সম্মেলন? হঠাৎই যেন উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল ভট্টরাই।

রাজপ্রাসাদের পেটা ঘড়িতে প্রথম প্রহর ঘোষিত হল। বসে বসে সেই শব্দ শুনল ভট্টরাই। সে কি বসে বসে জানুকার যৌনচারের ডাকের অপেক্ষা করবে? সুন্দরী, ধনী, ক্ষমতাশালী পিতার কন্যাদের যৌনসুখ দিয়ে নিজের জীবনকে ধন্য করবে? এ সুযোগ কারই বা হয়? অতএব…!—না। প্রবল বেগে আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল ভট্টরাই। প্রাসাদ উৎসবের প্রভাবে আচ্ছন্ন। শত্রুপক্ষ বার বার এই দিনের কথা উচ্চারণ করেছে। ভট্টরাইয়ের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলল, ঘাতকেরা যদি আসে উদ্যান পথেই আসবে। সামনে দিয়ে প্রবেশের সুযোগ নেই।

ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ভট্টরাই কার্যালয় থেকে বেরিয়ে উদ্যানের দিকে গেল। ওখানকার রক্ষীদের আজ বিশেষ সতর্কভাবে থাকতে হবে।

উদ্যানের ছোট দ্বারটি ঠেলে সন্তর্পণে পা রাখল ভট্টরাই। কোষ থেকে অসি বার করে সে হাতের মুঠোয় নিল। ছায়া ছায়া অন্ধকার। ঝিল্লির শব্দ! এর মধ্যে যদি ঘাতকেরা লুকিয়ে থাকে! প্রহরীরা কী করছে? তাদের ছাউনি অন্ধকার। কোনো আলো নেই—কেন? তারা গেল কোথায়? নাকি মদ্যের প্রভাবে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে? ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল ভট্টরাই। একবার দেখা প্রয়োজন। এত করে সাবধান করে দেওয়ার পরেও যদি তারা ঘুমিয়ে পড়ে বা আলো নিভিয়ে বসে থাকে—তা হবে ঘোরতর অন্যায়। কোনো ক্ষমা প্রদর্শন না করে তাদের কর্ম থেকে বিদায় দিতেই হবে। পা বাড়াল ভট্টরাই। কিন্তু বাধা পেয়ে চমকে উঠল সে। নিচু হয়ে দেখল এক রক্ষীর মৃতদেহ। কে হত্যা করল? সেই ঘাতকেরা কি ঢুকে পড়েছে! ভট্টরাইয়ের শরীরে দরদর করে ঘাম ঝরতে থাকল। উদ্যানের গাছে গাছে যেন কিসের ফিসফিসানি! রহস্যময়! ভয়াল! অদূরে এক অস্পষ্ট খসখসানির শব্দে ভট্টরাইয়ের দৃষ্টি প্রাসাদের বাতায়নগুলির দিকে গেল। একটি বাতায়নে প্রদীপের কম্পিত শিখার আন্দোলন। মুহূর্তের জন্য দেখা গিয়ে নিভে গেল। কে এই রমণী—জানুকা? সে দেখতে পেল—বাতায়ন থেকে নিচ পর্যন্ত একটি রজ্জু ঝুলছে। কালো কাপড়ে আপাদমস্তক ঢাকা দুটি লোক সেই দড়ি ধরে ওঠবার চেষ্টা করছে। এরাই প্রথম—নাকি আরও কেউ উঠেছে? কতজন এরা? চকিতে ভট্টরাইয়ের মনে হলো, ওপরে সম্রাট রয়েছেন। কমলিকা রয়েছে।—না। কাউকেও ডাকার সময় এখন নেই। এখনই তাকে ওপরে ছুটতে হবে। ঘাতকেরা হত্যা লীলা শুরু করে দিয়েছে কি না কে জানে? ঊর্ধ্বশ্বাসে ভট্টরাই সোপান বেয়ে উঠে সোপানের মাথায় গিয়ে শ্বাস নিল। প্রশস্ত এবং দীর্ঘ অলিন্দ পথের শুরু। আলোয় উজ্জ্বল। শেষ মাথায় সম্রাটের কক্ষ। রক্ষিণীরা বন্ধ কপাটের দিকে মুখ করে গল্পে মত্ত। একটু নিশ্চিত হলো ভট্টরাই। ঘাতকেরা এখনো সম্রাট পর্যন্ত এগোয়নি। কিন্তু কার ঘরে তারা ঢুকেছে? নিশ্চয় জানুকা! কমলিকার ঘর কোনটি? তার জানা উচিত ছিল। আজ কারোর মৃত্যুর সম্ভাবনা না থাকলে অন্তত দুজনের সম্ভাবনা আছে। এক কমলিকা, দুই সম্রাটের। জানুকার কথাগুলির অর্থ সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে এখন। তাকে নিচে কার্যালয়ে বসিয়ে রেখে হত্যাগুলি নিরুপদ্রবে ঘটানো হতো। দেরি করলে জানুকা বা বল্লভীই কমলিকার ঘর দেখিয়ে দেবে। সম্রাটের ঘর পর্যন্ত পৌঁছতে ঘাতকদের এখনো কিছু দেরি আছে। ওখানে ছজন রক্ষিণীও পাহারায় রয়েছে। ততক্ষণে কমলিকাকে উদ্ধার করে নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তাকে কোথায় পাবে? কোন ঘরে?

অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ভট্টরাই অলিন্দের বাঁ দিকের এক কপাটে ধাক্কা দিল। নিদ্রাজড়িত আলুথালু বেশে এক প্রাসাদ-রমণী কপাট খুলেই ভট্টরাইকে দেখে লজ্জা পেল। সঙ্গে সঙ্গে সে কপাট বন্ধ করার চেষ্টা করতেই ভট্টরাই তাকে বাধা দিয়ে বলল, দেবী! কমলিকার ঘর কোনটি?

দুটো ঘর পরে। কিন্তু আপনি…? এভাবে…?

শত ধাক্কাধাক্কিতেও মহামিশ্রের কণ্ঠস্বর ছাড়া এ কপাট আর খুলবেন না।

চকিতে ভট্টরাই দুটি ঘরের পরের ঘরটির কপাটে আবার ধাক্কা দিল। কমলিকার উত্তেজনায় ঘুম আসেনি। সে সঙ্গে সঙ্গে শয্যা থেকে উঠে এসে কপাট খুলে অবাক হয়ে বলল, কী ব্যাপার ভট্ট—তলোয়ার হাতে তুমি!

ঠিক সেই মুহূর্তে বিপরীতে জানুকার ঘরের কপাট খোলার শব্দ হতেই ভট্টরাই কমলিকাকে হাত দিয়ে ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। অসাবধানতাবশত তার বাম হাত কমলিকার বক্ষ স্পর্শ করল। কমলিকা পড়ে যাচ্ছিল। বাঁ হাতেই ভট্টরাই তাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে—পা দিয়ে ঠেলে সাবধানে কপাট বন্ধ করে দিল।

ভট্টরাইয়ের যুগপৎ স্পর্শে এক সহজাত রোমাঞ্চে মুহূর্তের জন্য কমলিকার শরীরের রক্তপ্রবাহ দ্রুত হয়ে উঠেই থেমে গেল। সে ভট্টরাইয়ের বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেবার চেষ্টা করে চাপা স্বরে চিৎকার করে উঠল, একি দুর্বিনীত ব্যবহার! সম্রাট শুনলে…!

ভট্টরাই কমলিকার কথায় কান না দিয়ে তাকে ছেড়ে দিয়ে কপাটটি সামান্য ফাঁক করল। দেখল দুজন কালো পোশাক পরা আততায়ী জানুকার পাশের ঘরের কপাটে ধাক্কা দিচ্ছে। জানুকার ঘরের কপাট সামান্য ফাঁক। সেখানে চিৎকার-চেঁচামেচি একটু পরেই আর্তনাদ ভেসে এল! জানুকার কণ্ঠস্বর শোনা গেল, দুবল বা আমার বাবা মন্ত্রী ইউনাস শুনলে তোমাদের টুকরো টুকরো করে ফেলবে!

জড়িত একাধিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ওদের বলার জন্য তোমরা বেঁচে থাকলে তো!

ভট্টরাই বুঝতে পারল, সেখানে একাধিক ঘাতক ঢুকেছে এবং একাধিক প্রাসাদ-রমণীও রয়েছে। ঘাতকরা আগে ধর্ষণ করবে, তারপর অন্য কাজে হাত দেবে। আশ্চর্যের বিষয় ঘাতক দুটির ধাক্কাধাক্কিতেও দূরের রক্ষিণীদের কোনো ভাবান্তর ঘটছে না। তারা তখনও গল্পগুজবে মত্ত। হয়তো রসসিক্ত কিছু আলোচনা হচ্ছে! ভট্টরাই ঘাতকদের এই অসাবধানতার সুযোগ নিতে চাইল। পরক্ষণেই সে কমলিকাকে হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এল। চাপা স্বরে ভট্টরাই বলল, তুমি পালাও। নিচে গিয়ে যেকোনো ভাবে রক্ষীদের সংবাদ দাও। সম্রাট আক্রান্ত!

এ কী বলছ, ভট্ট!

যাও। দেরি কোরো না।

তোমায় একা ছেড়ে আমি যাব না।

ছিঃ! বুঝতে পারছ না, সম্রাটের প্রাণ সংশয়। ঘাতকরা কতজন আমি জানি না। বাইরের ঐ দুজন আমাদের দিকে আসছে। বাকিরা বোধহয় জানুকার ঘরে ধর্ষণে মত্ত। তারাও বেরিয়ে আসবে। তখন অনেক দেরি হয়ে যাবে। যাও।

কমলিকা যাবার সুযোগ পেল না। অলিন্দের একটি থামে সে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। তার সামনে তলোয়ার হাতে ভট্টরাই। ভট্টরাইয়ের পিঠ কমলিকার পীনোদ্ধত বক্ষদেশ যেন পিষে রেখেছে। ভয়ভীতি আর অদ্ভুত রোমাঞ্চে যেন ভাসছিল কমলিকা। ভট্টরাইয়ের এই স্পর্শ কি সে কখনও কামনা করেনি? ভেতর ভেতর গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল কমলিকা।

ঘাতকদুটির একজন বলল, এই তো আর একটা! আয়, আগে এটাকে ভোগ করি। ঘাতক দুজন ভুল করল। তারা হয়তো ভাগ দেওয়ার ভয়ে জানুকার ঘরে উপস্থিত সাথীদের ডাকল না। আরও একটি ভুল, তারা তরুণ ভট্টরাইকে চিনত না। তারা আঘাত হানার আগেই বিদ্যুতের মতো ঝলসিয়ে উঠল ভট্টরাইয়ের তরবারি। কোনো কিছু বোঝবার আগেই ঘাতক দুজন লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

চাপা স্বরে ভট্টরাই আবার বলে উঠল, কমলিকা যাও। এখুনি। আমার একটি কর্তব্য ছিল তোমায় বাঁচানো। এবার সম্রাটকে বাঁচাতে হবে। তাতে আমার জীবন যায়—যাবে।

কমলিকা যেন মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল। সম্পূর্ণ এক নতুন চোখে সে দেখছিল ভট্টরাইকে। প্রকৃতপক্ষে বীর ভট্টরাইকে সে এই প্রথম আবিষ্কার করল। এতকাল সে এক সুসভ্য-সুবিনয়ী ভট্টরাই নামে এক সামান্য সেনাকে দেখে এসেছে। আজ দেখল এক কর্তব্যনিষ্ঠ বীরকে। কিন্তু তোমাকে একলা রেখে…!

যাও! এবার ভট্টরাই কমলিকাকে সোপানের দিকে ঠেলে দিল।

জানুকার ঘরে থাকা কোনো ঘাতকের সম্ভবত কিছু সন্দেহ হয়েছিল। সে কপাটের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই ভট্টরাইকে দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে ভট্টরাই সম্রাটের ঘরের দিকে ছুটল। ছুটতে ছুটতেই সে চিৎকার করে রক্ষিণীদের বলতে থাকল, সম্রাটের কক্ষে ঢুকে পড়। এখুনি!

রক্ষিণীরা মুহূর্তের জন্যে বিভ্রান্ত হলেও পেছনে ছুটে আসা আটজন ঘাতককে দেখে তারা বুঝে নিতে পারল—সম্রাট আক্রান্ত হতে চলেছেন। ভট্টরাই কক্ষের ভেতরে পা রেখেই চিৎকার করে উঠল, কপাট বন্ধ কর। দুপাশে সারবদ্ধ হয়ে দাঁড়াও।

সত্যার আজ রাত-কর্তব্য ছিল। সে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কোনো রকমে বলল, ভট্টরাই… এ কী ব্যবহার? কী চাও তুমি?

ভট্টরাই বলল, দেবী আপনি সম্রাটের শয্যার অপর পারে গিয়ে আত্মগোপন করুন। ভয়ানক কিছু ঘটতে চলেছে।

সম্রাট কণিষ্ক ঘুমোচ্ছিলেন। চিৎকার-চেঁচামেচিতে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। তিনিও প্রচণ্ড রুষ্ট হয়ে গর্জন করলেন, এ কী ধৃষ্টতা, ভট্টরাই! সম্রাটের শয়নকক্ষে অস্ত্র হাতে এইভাবে প্রবেশ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। তোমায় মৃত্যুদণ্ড দেব। বেরিয়ে যাও।

ভট্টরাই সম্রাটের কথা গ্রাহ্য না করে ইশারায় তাঁকে চুপ করতে বলে কপাটের দিকে কান পাতল। কপাটের গায়ে ততক্ষণে ধাক্কা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে—তা ক্রমে প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছে।

সম্রাট আপনি আক্রান্ত। ঘাতকের দল কপাট ভাঙার চেষ্টা করছে। আপনি বিচলিত হবেন না। আপনার হৃৎপিণ্ড দুর্বল। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, ভট্টরাই জীবিত থাকতে কেউ আপনার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না।

সম্রাট হতবাক হয়ে শয্যায় বসে রইলেন।

কপাটের ওপর চাপ ক্রমেই প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠল। কপাটের দুপাশে তিনজন করে দাঁড়িয়ে থাকা রক্ষিণীদের ভট্টরাই আদেশ দিল, তোমরা তোমাদের বল্লম প্রস্তুত রাখো। কপাট ভেঙে যে মুহূর্তে তারা প্রবেশ করবে তোমরা তোমাদের অস্ত্র চালনা করবে। কথা শেষ করে ভট্টরাই কপাট থেকে একটু পিছু হটে তলোয়ার নিয়ে প্রস্তুত রইল।—আমার অনুমান, ওরা আটজন হবে। দুটোকে আমি অলিন্দে হত্যা করে এসেছি।

সত্যিই কপাট একসময় ভেঙে পড়ল। হুড়মুড় করে আটজন ঘাতক ভেতরে প্রবেশ করতে গিয়ে চারজন বল্লমবিদ্ধ হল। এরপর কক্ষের মধ্যে সম্রাট আর সত্যার সামনে দুরন্ত এক লড়াই শুরু হয়ে গেল। ভট্টরাইয়ের কোনো দিকে তাকাবার ফুরসৎ ছিল না। দুরন্ত গতিতে সে যেন সারা ঘর কর্ষণ করে ফেলছিল। দেখতে দেখতে চারজন ঘাতকের মধ্যে দুজন তার তলোয়ারের আঘাতে ভূমিশয্যা নিল। বল্লমের আঘাতে আহত চারজন ঘাতকের মধ্যে দুজন রক্ষিণীদের ওপর প্রত্যাঘাত হানল, দুজন রক্ষিণী লুটিয়ে পড়ল। ঘরের ভেতর স্বল্প পরিসরে তাদের বল্লম চালনায় অসুবিধা হচ্ছিল। কিন্তু আহত ঘাতকদের মধ্যে কেউই বাঁচল না। ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরে বেড়ানো ভট্টরাইয়ের তলোয়ার আর রক্ষিণীদের বল্লম তাদের নিহত করল।

দুজন ঘাতক এখনো সুস্থ এবং তারা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। ঘাতকেরা নিঃসন্দেহে অসিদক্ষ। রক্ষিণীদের অসুবিধা হচ্ছিল আত্মরক্ষায়। ভট্টরাই তাদের সরে যেতে বলল। তারাও আহত। রক্ত ঝরছে।

দুই ঘাতকের পথ রোধ করে দাঁড়াল ভট্টরাই। ভট্টরাই নিজের মনে স্বীকার করতে বাধ্য হল যে এরা অতীব দক্ষ যোদ্ধা! সুতরাং খুব সতর্কতার সঙ্গে এদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। দুজনেই যুগপৎ আক্রমণ করেছিল ভট্টরাইকে। ভট্টরাই একজনকে পিছিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল প্রবেশপথের দিকে। অন্যজন সরে সরে যাচ্ছিল। হঠাৎ সত্যা চিৎকার করে উঠল, ভট্টরাই। সম্রাট…!

মুহূর্তের জন্য ভট্টরাই পিছু ফিরে দেখল, অপর ঘাতকটি ছুটে যাচ্ছে অরক্ষিত সম্রাটের দিকে। সকলেই আতঙ্কিত হয়ে দেখল ঘাতকটির তলোয়ার প্রায় সম্রাটের ওপর নামতে চলেছে। যেন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল ভট্টরাই। চিৎকার করে সে তার বাড়িয়ে ধরা তলোয়ারটি নিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে পাখির মতো উড়ে গেল। ভট্টরাইয়ের তলোয়ার ঘাতকটির পিঠে আমূলে বসে গেল। কিন্তু ভট্টরাই ভারসাম্য রাখতে পারল না। ঘাতকটির সঙ্গে সেও মাটিতে পড়ে গেল। মাথায় কক্ষের শিলাময় কঠিন মেঝেতে আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারাল। শেষ ঘাতকটি আহত রক্ষিণীদের দিকে লক্ষ্য রাখতে রাখতে সম্রাটের দিকে এগোবার চেষ্টা করতে থাকল। কিন্তু সেই মুহূর্তে অঙ্গরক্ষকেরা—প্রাসাদ প্রহরীরা, মহামিশ্র ও গুণবর্ধনের সঙ্গে কমলিকা উদভ্রান্তের মতো কক্ষে প্রবেশ করল। অঙ্গরক্ষকেরা শেষ ঘাতকটিকে ঘিরে ফেলল।

কমলিকা যেন তার সব বাস্তবজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল—উত্তেজনায় আর এইসব মৃতদেহ দেখে। মেঝের ওপর পড়ে থাকা ভট্টরাইকে দেখে সে উন্মাদের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে ভুলে গেল ঘরভর্তি মানুষের কথা—সম্রাটের কথা, নিজের পদমর্যাদার কথা।—একটু দেরি হয়ে গেল ভট্টরাই! হায়! তোমাকে বাঁচাতে পারলাম না।

সকলের মনে হল কমলিকার এই আর্তনাদ যেন মর্মভেদী!

জ্ঞান ফিরে পাচ্ছিল ভট্টরাই। প্রথমে ঝাপসা—তারপর স্পষ্ট ভাবে সে কমলিকাকে তার বুকের ওপর পড়ে ক্রন্দন করতে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, কমলিকা কি সত্যিই উন্মাদ হয়ে গেছে! কমলিকাকে সে সরিয়ে দিয়ে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল। অস্ত্রাঘাতে সে সামান্য আহতও হয়েছে। সম্রাটকে ঝুঁকে পড়ে অভিবাদন জানিয়ে বলল, সম্রাট! এবার আদেশ দিন, জাঙ্ককে নিয়ে আসি।

সম্রাটের ভাবান্তর আর কেউ সেভাবে খেয়াল না করলেও মহামিশ্র করেছিলেন। বিষয়টিকে একটু লঘু করার জন্য তিনি বলে উঠলেন, সম্রাট! আজ ভট্টরাই আর কমলিকার যৌথ উদ্যোগেই আমরা ভীষণ এক বিপদ থেকে রক্ষা পেলাম।

সম্রাট মনের ভাব গোপন করেই বললেন, দেখলাম। এরা পুরস্কার যোগ্য!

মহামিশ্র কিন্তু সম্রাটের কণ্ঠের শীতলতার আভাস পেলেন।

সম্রাট প্রসাঙ্গন্তরে গিয়ে বললেন, অন্য সব সংবাদ কী?

জাঙ্ক সংকেত না জানানো পর্যন্ত তারা সম্ভবত পাহাড় থেকে নামবে না। সে এখনো তার কার্যালয়ে এইসব ঘাতকদের প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে।

তাহলে গুণবর্ধন! তুমি ভট্টরাই আর আমার অঙ্গরক্ষকদের নিয়ে গিয়ে বিষয়টির একটি নিষ্পত্তি কর। জাঙ্কের দেওয়া কথা অনুসারে আজই সমাজ-উৎসবের রাত্রি।

গুণবর্ধন বললেন, চিন্তা করবেন না সম্রাট। বিশ্রাম নিন। আমি দেখছি।

ব্যস্ত হয়ে উঠলেন মহামিশ্র। বললেন, সত্যা আর কমলিকা, সম্রাটকে নিয়ে অন্য এক কক্ষে যাও। তারপর এক দেহরক্ষীকে বললেন, তুমি আচার্য চরককে একবার ডেকে আনো। সম্রাটকে এই মুহূর্তে একবার পরীক্ষা করা দরকার। তিনি সম্রাটকে এখনো সম্পূর্ণ সুস্থ বলে ঘোষণা করেননি। আজকের এই উত্তেজনা…

সম্রাট ক্ষীণভাবে বাধা দিলেন, আবার আচার্যকে কেন?

মহামিশ্র বললেন, সম্রাট বাধা দেবেন না।

সম্রাট উঠে দাঁড়িয়েছিলেন পাশের ঘরে যাবার জন্য। হঠাৎ বললেন, সত্যা আর কমলিকা বিশ্রাম নিক। সত্যি ওদের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। অন্য কাউকে ডাকো। নয়তো পরিচারিকাদের।

মহামিশ্র বললেন, তাই হবে সম্রাট। তবে দেখতে হবে, প্রাসাদ-রমণীদের মধ্যে কজন জীবিত বা সুস্থ আছে।

কেন? বিস্মিত হলেন সম্রাট।

ঘাতকেরা তাদের ধর্ষণ এবং হত্যা করেছে। কারণ, এই ষড়যন্ত্রে ইউনাসের কন্যা এবং অন্যান্য কজন প্রাসাদ-রমণীও জড়িত। অপ্রত্যক্ষভাবে ভট্টরাইয়ের উপস্থিতি কয়েকজনের জীবন বাঁচিয়ে দিয়েছে!

আর্তনাদ করে উঠল সত্যা আর কমলিকা। জানুকার ঘরে হৈ-চৈ এর কথা কমলিকার মনে পড়ল।

সম্রাট যেন কেমন ভেঙে পড়লেন। কমলিকার একবার মনে হলো, সে সম্রাটের দেহভার নিজের ওপর নেয়। কিন্তু তার আর সাহস হল না। সম্রাটের কাছ থেকে সে যে এই মুহূর্তে শত যোজন দূরে দাঁড়িয়ে আছে তা উপলব্ধি করতে তার কোনো অসুবিধা হবার কথা নয়।

.

নিচে নেমে সবাই দেখল যে গুপ্তচর প্রধান নীলাকার মহামিশ্রের কার্যালয়ে বসে কয়েকজন গুপ্তচরের কাছ থেকে তাদের প্রতিবেদন নিচ্ছেন। গুণবর্ধনকে দেখে তিনি বললেন, ওপরের সংবাদ?

শুভ। কিন্তু হতাহত হয়েছে কয়েকজন। দশজন ঘাতকের মধ্যে ভট্টরাই বোধহয় সাক্ষ্যপ্রমাণের জন্য এই বন্দী ঘাতকটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে! একে আপনি প্রহরা দিয়ে সেনা-বন্দিশালায় নিয়ে যান। কাল প্রভাতে এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে। আর হ্যাঁ, বন্দিশালায় যেন স্থানাভাব না ঘটে। কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষও সেখানে আর রাতেই আশ্রয় নেবেন।

নীলাকার হাসলেন।—বুঝেছি। তারপর কয়েক প্রহরীকে বললেন, বন্দীটিকে সাবধানে নিয়ে যাও। রজ্জুবদ্ধ বন্দীটি চলে গেলে গুণবর্ধন বললেন, আপনার চরদের এখনই কয়েকটি কাজ করতে হবে। তারা ইউনাস, ভার্গব আর দুবলের গৃহে গিয়ে জানাক, সম্রাট নিহত হয়েছেন। জাষ্ক কার্যালয়ে অপেক্ষা করছেন। জাষ্কের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য তাঁরা গৃহ থেকে বেরিয়ে এলেই পথিমধ্যে যেন তাদের বন্দি করা হয়। আর একজন গুপ্তচর যাক জাঙ্কের কাছে। তাকেও জানাক, সম্রাট ঘাতকদের হাতে নিহত হয়েছেন।

যদি প্রশ্ন করে ঘাতকরা কোথায়? তারা সংবাদ দিল না কেন? উত্তর হবে, ঘাতক মিউ-সিনান—অর্থাৎ বন্দি ঘাতকটি জানিয়েছে যে তারা এখন আসতে পারবে না। প্রাসাদ-রমণীদের নিয়ে তারা মহোৎসবে ব্যস্ত! যথেষ্ট উদ্বেগের মধ্যে তাদের সময় কাটাতে হয়েছে। এখন প্রভাত পর্যন্ত তারা আনন্দ-ফূর্তি করবে।

নীলাকার বললেন, চমৎকার উত্তর। জাঙ্ক বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে।

রজন গূঢ়পুরুষ প্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে গেল তাদের অশ্বে।

ভট্টরাই বলল, আমার আর একটা কথা আছে। সামান্য এই অভিযানে সেনাপতির যাবার প্রয়োজন নেই। জাঙ্কের সঙ্গে আমার একটা বোঝাপড়া বাকি আছে। সে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। সে ভবিষ্যৎ সম্রাজ্ঞীকেও আজ হত্যা করতে চেয়েছিল। সে আমার এক ভিখারি চরকে হত্যা করেছিল।

গুণবর্ধন বললেন, তুমি পারবে বলেই আমার বিশ্বাস। কিন্তু তাকে জীবিত আনতে হবে। মরবার সুযোগ সে যেন না পায়।

আপনার উদ্দেশ্য আমি বুঝেছি। সম্রাটের ভাবমূর্তি স্বচ্ছ রাখতে তার প্রকাশ্য বিচার হওয়া প্রয়োজন। তাই হবে। অঙ্গরক্ষকেরা আমার সঙ্গে চলুক। পথিমধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকা সেনাদের আমি জুটিয়ে নেব!

ভট্টরাই অঙ্গরক্ষকদের নিয়ে বেরিয়ে গেল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%