কণিষ্ক – ১৭

অমরজ্যোতি মুখোপাধ্যায়

সমাজ-উৎসবের আগের দিন দুটি রাজাদেশ প্রচারিত হল। এক, সম্রাট উৎসবের দিন থেকে স্বাভাবিক আহার করা শুরু করবেন। অর্থাৎ আচার্য চরকের নির্দেশে ঐ দিন থেকে তিনি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারবেন। দুই, সমাজ-উৎসবের প্রভাতে সম্রাট তাঁর প্রাসাদ-অলিন্দ থেকে প্রজাদের দর্শন দেবেন। তাঁর পাশে থাকবেন ভবিষ্যত সম্রাজ্ঞী। অর্থাৎ, সত্যিই সম্রাট আবার স্বাভাবিক সংসার-জীবনে ফিরতে চলেছেন! সমাজ-উৎসবের দিনে প্রশাসন মদ্যের ওপর থেকে শুল্কও প্রত্যাহার করে নেবে। এরই মধ্যে নগরে আরও দুটি ঘটনা ঘটে গেছে।

একটি প্রকাশ্যে, অন্যটি অপ্রকাশ্যে। অপ্রকাশ্য বলার অর্থ, ঘটনাটি মুষ্টিমেয় কয়েকজনই জানেন।

প্রথম ঘটনাটি হচ্ছে, দিন-দুয়েক আগে উপসেনাপতি সোনাপতের নেতৃত্বে প্রায় চল্লিশ হাজারের এক বাহিনী নিম্নসিন্ধু অঞ্চলে পহ্লব অভ্যুত্থান প্রতিহত করার জন্য নগর থেকে বেরিয়ে গেছে। মন্ত্রী পরিষদের তিন মন্ত্রী ইউনাস, ভার্গব আর দুবলের প্রবল চাপে পরিষদ এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। নগর প্রায় অরক্ষিত। সর্বসাকুল্যে প্রায় হাজার সাতেক সেনা রয়ে গেছে। সুতরাং, নগর যদি অন্য কোনও শক্তি দ্বারা বা অন্য কোন দিক দিয়ে আক্রান্ত হয় তবে বিপদ ঘটতে পারে। জনসাধারণ অবশ্য এসব কথা জানে না। তাদের অযথা আশংকিত করে প্রতীক্ষিত সমাজ-উৎসবের আনন্দ নষ্ট করার কোন অর্থ হয় না। সম্রাটকে মহামিশ্র সবই জানিয়েছেন। সম্রাট সম্মতি দিয়েছেন অনন্যোপায় হয়ে। মথুরায় এ সম্বন্ধে কোন সংবাদ পাঠানো হয়নি। কারণ, মন্ত্রী ইউনাসের মতে বিদ্রোহীদের শক্তি অতি ক্ষীণ। তারা সহজেই পুরুষপুরের বাহিনীর হাতে পর্যুদস্ত হবে। অন্য দিক দিয়ে নগর আক্রমণের সম্ভাবনাও নেই। অপরদিকে বল্বের বাহিনী চৈনিক দমনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে—রাজধানী তা-হিয়া থেকে। চৈনিক সম্রাট ঘোষণা করেছেন, তা-হিয়ার পণবন্দী চৈনিক রাজকুমারকে কুষাণরা হত্যা করতে পারে—কিন্তু তারা রেশম-পথের অধিকার ছাড়বে না। ফলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। তবে, বল্ব সম্পর্কে আরও একটি গোপন সংবাদ পুরুষপুরের মুষ্টিমেয় কয়েকজনের কাছে এসে পৌঁছেছে। সংবাদটি জানেন, মহামিশ্র, গুণবর্ধন, নীলাকার আর স্বয়ং সম্রাট। মন্ত্রী পরিষদের কাছে সংবাদটি সাময়িকভাবে গোপন রাখাই হয়েছে বিশেষ এক উদ্দেশ্যে।

বিজ্ঞপ্তি প্রচারের পরে ভট্টরাই যেন খানিকটা নির্জীব হয়ে বসেছিল তার কার্যালয়ে। তখন বেলা প্রায় অপরাহ্ন। হঠাৎই চরক আশ্রমের ঔষধী বোঝাই শকটটি প্রাসাদের তোরণদ্বারে এসে দাঁড়াল। প্রহরীরা আশ্চর্য হল।—সম্রাটের কী এত ঔষধী লাগবে?

শকট থেকে দেবলকে নামতে দেখে প্রহরীরা তাকে চিনতে পেরে অভিবাদন জানাল। তারপর প্রশ্ন করল, কী ব্যাপার ভন্তে দেবল?

দেবল বলল, কার্যালয়ে কে আছেন? মহামিশ্র—না ভট্টরাই?

প্রহরী বলল, মহামিশ্র সেনানিবাসে গেছেন। ভট্টরাই রয়েছে।

আমি তার সঙ্গে এখনই দেখা করব। বিশেষ প্রয়োজন।

আপনি প্রাসাদের পরিচিত। আপনি স্বচ্ছন্দে ভেতরে যেতে পারেন।

দেবলকে দেখে ভট্টরাইও বিস্মিত হল, কী ব্যাপার, দেবল! সম্রাট….

না-না। অন্য ব্যাপার। সময় কম। আচার্য চিন্তা করছেন। সুতরাং তোমাকেই ঘটনাটি বলে যাই। যথাস্থানে পৌঁছে দিও।

বল।

আজ সকালে আমরা উত্তর পাহাড়ে গিয়ে এক আশ্চর্য ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। সচরাচর আমাদের প্রয়োজন পাহাড়ের পাদদেশে বা সামান্য উঁচুতেই মিটে যায়। কখনও সখনও ওপরে উঠি। আজও তেমন ওঠবার সময় হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, ওপরে গভীর জঙ্গলের মধ্যে বেশ কয়েক শত মানুষ শুয়ে আছে। দু’একজন সশস্ত্র প্রহরী জেগে ছিল। সৌভাগ্যবশত তারা আমাদের দেখতে পায়নি। আমরাও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিনি। তারা বোধহয় ভীষণ ক্লান্ত।

ভট্টরাই বলল, দেখতেই যখন পেলে, তখন তাদের প্রশ্ন করে খোঁজ খবর নিয়ে এলেই বোধহয় ভালো করতে।

দেবল বলল, না। তাতে হয়ত আমাদের প্রাণ সংশয় হোত। তারা কেউই সাধারণ নাগরিক বলে মনে হল না। নিঃসন্দেহে বল্ববাসী। যোদ্ধা শ্রেণির। অস্ত্রও রয়েছে তাদের কাছে।

অস্ত্র রয়েছে! ভট্টরাই এবার চিন্তিত হল।—বল্বের অস্ত্রধারীরা পাহাড়ের মাথায়! কেন? তারপর সে দেবলকে আবার প্রশ্ন করল, কত মানুষ হবে?

ঐ ঢালে তো কয়েকশত জনকে দেখলাম অকাতরে ঘুমোচ্ছে। অপর ঢালে কত জন আছে–কে জানে?

ভট্টরাইয়ের কপালে চিন্তার রেখা গভীর হল।—তুমি তোরণদ্বারে বা অন্য কারোর কাছে এ বিষয়ে কিছু বলনি তো?

না—ভট্টরাই। বিষয়টির গুরুত্ব আমি উপলব্ধি করেছি। এমন কি আচার্যও জানেন না। অবশ্য তাঁর সঙ্গে আমার এখনও সাক্ষাৎ হয়নি।

দেবল! এই ঘটনা তোমার সাথীদের কেউ জানে?

না। আমিই আগে আগে ওপরে উঠছিলাম। তারপর, হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়ে সব দেখেশুনে সাবধানে আবার নিচের পথ ধরি। সাথীদেরও নিচে নেমে আসতে বলি। তারা অবশ্য প্রশ্ন করে। উত্তরে আমি বলি, যে বিশেষ লতাটি সংগ্রহ করব বলে ঠিক করেছিলাম—তা যথেষ্ট লম্বা হয়নি। পরের বার নিয়ে যাব। কাল উৎসব। আজ একটু তাড়াতাড়ি যাওয়া ভালো। তারা আর কিছু প্রশ্ন করেনি বা সন্দেহও করেনি।

ভট্টরাই বলল।—ঠিক আছে দেবল। তুমি এখন আশ্রমে ফিরে যাও। সংবাদটি গুরুতর। দস্যুদলও হতে পারে। কাল উৎসব। মানুষজন অসতর্ক থাকবে। মদিরায় আচ্ছন্ন হবে প্রভাত থেকেই—নাগরিক, সেনা-প্রহরী সবাই। নগরের বেশির ভাগ সেনাও তো বিদ্রোহ দমনে গেছে। সময় থাকলে নাগরিকদের সতর্ক করা যেত! এখন তা করতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। যাহোক, দেবল তুমি যাও। সংবাদটির জন্য ধন্যবাদ।

দেবল চলে গেল।

ভট্টরাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল।–কী করা উচিত? বিষয়টি ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ! দস্যুদল হলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তারা নিশ্চয় জানে, নগরে পর্যাপ্ত সেনা নেই। নাগরিকরা উৎসবে মত্ত থাকবে। আনন্দের সঙ্গেই তারা এই অতি সমৃদ্ধ নগরকে লুন্ঠন করবে! আবার এ জাষ্কের কোনও পরিকল্পনাও হতে পারে। এই বাহিনীর ভরসাতেই সে বোধহয় সমস্ত সমস্যা সমাজ-উৎসবের রাতে সমাধান করবে বলে সম্রাটকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, মহোৎসবের অছিলায়—ষণ্ড বলিদানের প্রতিশ্রুতিতে সে তার সমস্ত প্রহরীকে কার্যালয়ে সমবেত হওয়ার গোপন আদেশ দিয়েছে! ভট্টরাই অশান্ত ভাবে উঠে দাঁড়াল। তিনজনকে তার বিষয়টি এই মুহূর্তে জানানো প্রয়োজন। আক্রমণ যদি আজ রাতেই নেমে আসে! কিন্তু মহামিশ্র না আসা অবধি সে এই প্রাসাদ ছেড়ে তাঁদের খোঁজে কেমন করে যাবে? অন্যদিকে তিনজনকে একত্রে প্রাসাদে উপস্থিত হতে বলাটাও তার পক্ষে ধৃষ্টতা মূলক হবে। অগত্যা সে একটি পত্র লিখে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এক পরিচারকের হাতে দিয়ে সেই পত্র সেনানিবাসে পাঠিয়ে দিল। তাঁরা অসন্তুষ্ট হলেও—তাঁরা এলে ভট্টরাই ব্যাখ্যা করে বিষয়টি বোঝাবে।

সত্যি। ভট্টরাইয়ের পত্র পেয়ে সেনাপতি আর নীলাকার ক্ষুব্ধ হলেন। গুণবর্ধন বললেন, এভাবে আমাদের আহ্বান করাটা ভট্টরাইয়ের অধিকারের মধ্যে পড়ে না। সে তার অধিকারের সীমারেখা ভুলে গেছে। প্রয়োজন হলে যে নিজে আসতে পারত।

মহামিশ্র বললেন, আমরা বোধহয় একটু ভুল বুঝছি তাকে। কোন অবস্থাতেই প্রাসাদে সম্রাটকে একা রেখে তার এখানে আসা সম্ভব ছিল না। আবার বিষয়টি নিশ্চয় এত গুরুতর যে আমার ফেরা পর্যন্তও সে অপেক্ষা করতে পারছিল না। চল, আমরা গিয়েই দেখি না বিষয়টা। ভট্টরাইকে অত বুদ্ধিহীন বলে ভাববার কোনও কারণ নেই।

তিনজন ঊর্ধ্বতন আধিকারিককে দেখে ভট্টরাই বুঝতে পারল যে তাঁরা যথেষ্টই ক্ষুব্ধ। তাই তাঁরা কিছু বলার আগেই সে বলল, আমার ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন। সম্রাটকে প্রাসাদে রেখে আমার পক্ষে যাওয়াটা গর্হিত অপরাধ হোত। মহামিশ্রের আগমনের সময়ও অনিশ্চিত। অথচ বিষয়টি সময়ের অপেক্ষা নাও করতে পারে।

মহামিশ্র গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করলেন, কী ব্যাপার? কাকে নিয়ে তুমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছ? সম্রাট নিশ্চয় নন। তাহলে অবশ্যই তুমি তা উল্লেখ করতে। তবে?

ভট্টরাই মহামিশ্রের উষ্মা গলাঃধকরণ করে দেবলের কাহিনিটি খুলে বলল। তারপর তিন প্রধান যখন হতচকিত হয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছেন তখন ভট্টরাই বলল, অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। রাত নেমে আসছে—যদিও আমার অনুমান—কিছু ঘটলে আগামীকালই ঘটবে। তবু…!

গুণবর্ধন এবার সহজ হলেন। বললেন, তোমায় ভুল বোঝার জন্য দুঃখিত। নিঃসন্দেহে বিষয়টি গুরুতর। তোমার অনুমানই হয়ত সঠিক। উৎসবের অসতর্কতার সুযোগই তারা নিতে চাইবে। আজকের সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও—আমি নগর তোরণে হাজার খানেক সেনা পাঠিয়ে তোরণের শক্তিবৃদ্ধি করছি। শুধু তাই নয়। নগরের উত্তর প্রাচীর পার করেও তারা প্রবেশ করতে পারে। সুতরাং কয়েক হাজার সেনা ঐ প্রাচীর রক্ষায়ও পাঠিয়ে দেব। বাকি সেনা সেনানিবাসে থাকবে।

মহামিশ্র বললেন, গুণবর্ধন যা কিছু করবে সংগোপনে এবং শত্রু পক্ষের আর নাগরিকদের দৃষ্টি এড়িয়েই করতে হবে। নাগরিকদের মধ্যে আতংকের ভাব কোন রকমেই সৃষ্টি করা যাবে না।

গুণবর্ধন বললেন, আপনার উপদেশ মনে থাকবে। সেনারা কিছু পর থেকেই ছোট ছোট দলে এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেনানিবাস থেকে বার হবে। তাদের ঘোড়ার চাল খুবই ধীর গতিতে হবে—যাতে যে কেউ ভাবতে পারে যে এরা নগর ভ্রমণে বেরিয়েছে। অবশ্য নগর জেগে থাকতে থাকতেই এই চলাচল শেষ করতে হবে। রাত্রে নির্জন রাস্তায় তারা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। আগামী প্রভাত থেকেই আমরা শংকা মুক্ত হব। শুধু, আজ রাত্রে সোনাপতের কাছে নির্দিষ্ট সংবাদটি পাঠিয়ে দিতে হবে।

গুণবর্ধন আর নীলাকার চলে গেলেন। ভারমুক্ত হল ভট্টরাই। সে বলল, আমি তাহলে প্রাসাদ-প্রহরী আর অঙ্গরক্ষকদের সঙ্গে দেখা করে আসছি। আজ আর কাল আমাকে এখানেই অবস্থান করতে হবে।

সে তো নিশ্চয়। আবার আগামী প্রভাতে সম্রাট আর ভাবী সম্রাজ্ঞী জনসাধারণকে দর্শন দেবেন। আমি সম্রাটের কাছে যাচ্ছি!

ঠিক আছে, ভন্তে মহামিশ্র!

.

প্রভাতে প্রাসাদের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গণে শত শত মানুষ সম্রাটের দর্শন দানের আশায় অপেক্ষা করছে। একটু পরেই সম্রাট আর ভবিষ্যত সম্রাজ্ঞী অলিন্দে দাঁড়িয়ে জনতার অভিবাদন—শুভেচ্ছা গ্রহণ করবেন। জনসাধারণ এবং সকলেই  বিষয়টিকে স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছে। মথুরায়ও সংবাদ গেছে। বাসিষ্কের রুষ্ট হওয়ার কোন কারণ নেই। কারণ, সেই-ই এই সাম্রাজ্যের যুবরাজ। তার অধিকার খর্ব হচ্ছে না। সম্রাটের অবর্তমানে সেই-ই এই বিশাল সম্রাজ্যের অধিকারী হবে। কমলিকার পুত্র সন্তান জন্ম নিলেও অধিকার থেকে তারা বঞ্চিত হবে।

ঘোষক এক সময়ে ঘোষণা করল, সম্রাট আর ভাবী সম্রাজ্ঞী অলিন্দে আসছেন। পরক্ষণেই সম্রাট আর কমলিকা এসে অলিন্দে দাঁড়ালেন। জনতা উদ্বেলিত হয়ে উঠল। সম্রাট আর ভবিষ্যত সম্রাজ্ঞী হাত তুলে জনতার অভিনন্দন গ্রহণ করলেন। সম্রাট জনতার সম্মুখেই অঙ্গুরী বিনিময় করলেন কমলিকার সঙ্গে। জয়ধ্বনি উঠল।

হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে ভট্টরাই দূর থেকে কমলিকাকে দেখল। তার মুখ দিয়ে ‘অপূর্ব’ শব্দটা আপনা থেকেই বেরিয়ে এল। কিন্তু একটা জ্বালা যেন তার বুক ছুঁয়ে গেল। নিজের ওপরই রুষ্ট হয়ে উঠল ভট্টরাই। নিজেকে সে প্রশ্ন করল, এই আনন্দের দিনে কেন তার বুকে জ্বালা? সে কি কমলিকার ভাগ্যে ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠেছে? এটাই তো স্বাভাবিক—কমলিকা সম্রাজ্ঞী হবার যোগ্য। সম্রাট প্রাসাদ-রমণীদের ভেতর থেকে উৎকৃষ্ট রত্নটিকেই বেছে নিয়েছেন। তার বরং গর্ব হওয়া উচিত। এই সম্রাজ্ঞীর জীবন সে একদিন রক্ষা করেছে। এই সম্রাজ্ঞীর করুণায় সামান্য ক-দিনে সে কোথা থেকে কোথায় উঠে এসেছে! সম্রাজ্ঞী যদি কৃপা করেন, তবে ভবিষ্যতে সে আরও কোথায় গিয়ে পৌঁছবে! জাঙ্ক পর্যন্ত আজ তাকে সমীহ করে কথা বলে। এ তো কমলিকার দান! সে না হয় বাকি জীবন তার বুকের মাঝে এই দানটুকুই ধরে রাখবে।

হঠাৎ তার মনে পড়ল, জানুকা আর বল্লভীর আজ ফিরে আসার কথা। জানুকা আজ রাতে তাকে নিয়ে তার কক্ষে মহোৎসব করবে! নারীদেহ কখনও স্পর্শ করেনি ভট্টরাই। করতেও চায় না। অন্তত যাকে সে না ভালোবাসে- তার দেহ সে কখনই ছোঁবে না। তাছাড়া, ভট্টরাইকে একদিন হয়ত সংসার ধর্ম পালন করতে হবে। সেক্ষেত্রেও সে জানুকা বা বল্লভী বা অন্য কোনও প্রাসাদ- রমণীকে কামনা করতে পারে না। কারণ, সেই একই দূরত্ব। আবার ঐসব বুভুক্ষু প্রাসাদ-রমণীদের কথা তো উঠতেই পারে না। তারা যে তাকে প্রমোদ সামগ্রী হিসাবেই গ্রহণ করতে চায় তা বোঝার মতো বুদ্ধি তার আছে। এই প্রাসাদে পুরুষহীন হয়ে থেকে তাদের মতো যৌনতাপ্রিয় নারীদের সমকামীতার পথ গ্রহণ করতে হয়েছে এতকাল—এ বিষয় তার কোন সন্দেহ নেই। আর প্রাসাদে সে পা রাখতেই তাদের বাসনার পথ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। তারা এখন তাদের তৃপ্ত করার জন্য তার মতো একজন বলিষ্ঠ পুরুষের প্রয়োজন অনুভব করছে। আজকের রাত বাধাবন্ধহীন! কারণ আজ সব জায়গায় সতর্কতার অভাব থাকবে। কুঞ্জে-কুঞ্জে-উদ্যানে, ঝোপঝাড়ে চলবে গোপন রতি-বিলাস। কত নারী যে অবৈধভাবে আজ গর্ভবতী হয়ে পড়বে তার হিসাব কে রাখবে? কিন্তু জানুকা কি সত্যিই রতি-বাসনা নিয়ে ফিরে এসেছে প্রাসাদে? তার প্রতিজ্ঞাগুলো? ডাইনীকে সে মজা দেখাবে! তাকে সম্রাজ্ঞী হতে দেবে না। তবে কি জানুকা কোনও গোপন অভিসন্ধী নিয়ে ফিরে আসছে? সম্রাটের প্রতি তার কোন মোহ নেই- সে কথা পরিষ্কার হয়ে গেছে। তবে?

ভট্টরাই কার্যালয়ের দিকে এগোল। পরিচারিকা দু’টির সঙ্গে সাক্ষাৎ না হওয়া পর্যন্ত এই ‘তবে’-এর সন্ধান সে পাবে না। পরিচারিকাদের এবং জানুকা ও বল্লভীর সঙ্গে দেখা করতেই হবে!

ভট্টরাইকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। প্রাঙ্গণের ভিড় কমে গেলেই দেখা গেল দুটি শকট এসে থামল। কার্যালয়ের ভেতর থেকে তোরণ পর্যন্ত দেখা যায়। ভট্টরাই দেখল, জানুকা আর বল্লভী বেশ উৎফুল্ল ভাবেই তার দিকে এগিয়ে আসছে। হাসিমুখে ভট্টরাই তাদের দিকে তাকাল। জানুকা একটু এগিয়ে এসে বলল, তোমার জন্য আর থাকতে পারছিলাম না!

পারলেন তো?

কী করব? বাবা ছাড়লেও মা ছাড়ছিলেন না। বল্লভীরও এক দশা। হ্যাঁ। সম্রাটের পাশে ডাইনীটা কি আজ দর্শন দিয়েছে?

হ্যাঁ।

আমার সহ্য হবে না ভেবেই একটু দেরি করে এলাম। আজ রাতের কথা কি মনে আছে?

নিশ্চয় আছে। আমার মতো মানুষ কি এই সুযোগ হারাতে পারে?

আমি কিন্তু একা নই। একাধিক। ভয় করছে না তো?

ভয়? কিসের ভয়? আজ সবাই তো প্রায় হতচেতন হয়ে থাকবে। পথে ঘাটে—আনাচে-কানাচে তো রতি লীলায় ব্যস্ত থাকবে। আমরা তো থাকব বন্ধ ঘরে। কে দেখছে? চেঁচামেচি না করলেই হল।

জানুকা বলল, তা হলেই বা ক্ষতি কী? ছুটে এলে তো আসবে আর কয়েকজন প্রাসাদ-রমণী। এরকম তো তারা প্রায়ই আসে। আজ তোমাকে দেখে সবায়ের রসনা দিয়ে জল গড়াবে। কেউ নাক সিঁটকে চলে যাবে বলে ভাবছ?

বাবা! অত জন…পারব?

দূর বোকা! তুমি আমার। বড়জোর বল্লভীরও। সবাইকে আমি বিলোতে যাব নাকি তোমায়? ওরা নিজেরা যে কাজ করে নিজেদের সঙ্গে তাই করবে। বরং তাতে আমাদের উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে।

১৭৮ ভট্টরাইয়ের গা ঘিনঘিন করে উঠল। এদের মধ্যে কেউ সম্রাজ্ঞী হলে দেশে আর শক্ত সমর্থ পুরুষ থাকবে না। বেশ! তাহলে তো ভালই হল। কিন্তু কখন যাব? প্রাসাদের ঘন্টাধ্বনি তো হবেই। কোন দিকে কত সংখ্যার ঘর?

বল্লভীর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে জানুকা বলল, ওসবের কোনও প্রয়োজন নেই। প্রথম প্রহরের পর যে কোন মুহূর্তে আমি এসে তোমায় সঙ্গে করে নিয়ে যাব। আসলে, ওপরে রক্ষীরা কখন ঘুমিয়ে পড়ে তার ওপরই সময়টা নির্ভর করছে। তাদের জন্য সমাজ-উৎসবের উপহার হিসাবে কিছু মদ্য নিয়ে এসেছি। তাতে ঘুমের ঔষধী মিশিয়ে পান করাবো। পরিচারিকাগুলোরও একই অবস্থা করব। ওরা ঘুমিয়ে পড়লেই আমরা বাধাবন্ধহীন।

চমৎকার পরিকল্পনা।

কিন্তু একটা শর্ত।

কী শর্ত?

তুমি প্রথম প্রহরের ঘণ্টাধ্বনির পর এখান থেকে এক পাও কোথাও যাবে না। কারণ, আমি বা অন্য কেউ এসে তোমায় খুঁজে বেড়াতে পারবে না। তোমার কার্যালয়ের সকলকে উৎসবের জন্য ছেড়ে দিও। সাক্ষীও রাখতে চাই না। একটু থেমে চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে জানুকা ভট্টরাইয়ের থুতনি স্পর্শ করে বলল, কথা দিচ্ছ? যা বললাম, তা বর্ণে বর্ণে পালন করবে?

করব।

যদি না কর—আমাদের মহোৎসব যদি নষ্ট হয়ে যায়—তাহলে ফল কিন্তু ভাল হবে না। জানুকা প্রতিশোধ নিতে জানে!

ভট্টরাই হালকা ভাবে হেসে বলল, তুমি কি আমাকে এতই মূর্খ ভাব? তারপর সে ফিসফিস করে বলল, মন্ত্রী ইউনাস, ভার্গব আর দুবলের রূপসী কন্যাদের আমন্ত্রণ আমি ভুলে যাব? জীবনে কি আমি তোমাদের মতো রূপসীদের সংস্পর্শে আসতে পারব? আজ আমি ধন্য হয়ে যাব। দেখনা, আমার শরীরে কেমন রোমাঞ্চ হচ্ছে!

বিলোল কটাক্ষে জানুকা বলল, তাহলে ‘তুমি’ বললে! অসহ্য লাগছিল ‘আপনি—আজ্ঞে’! শরীর হিম করা দৃষ্টিবাণ হেনে জানুকা আর বল্লভী সোপানের দিকে এগিয়ে গেল।

প্রাসাদ-রমণী দুজন চলে যাবার পর আসনে গা এলিয়ে দিয়ে ভট্টরাই ভাবতে বসল। তার গুরু বিষ্ক তাকে বলেছেন, মেয়েদের প্রতিটি কথা সতর্কতার সঙ্গে বিচার করবি—বিশেষ করে যখন ওরা দৈহিক প্রলোভন দেখাবে। মেয়েরা কার্য উদ্ধারের জন্য পুরুষকে প্রলোভিত করে। ভট্টরাইয়ের জীবনে এরকম ভয়ংকর প্রলোভন এই প্রথম। কমলিকার ক্ষেত্রে প্রলোভনের কোনও কথাই ওঠে না। তাকে দিয়ে কমলিকার কার্য-সিদ্ধি করার মতো কোনও ব্যাপারই ছিল না! জানুকার ক’টি কথা ভট্টরাইয়ের মনে সন্দেহের উদ্রেক করল। তাদের দৈহিক ক্ষুধার কথা হয়ত সত্য হতে পারে। তারা দৈহিক ভাবে উত্তপ্ত হতেই পারে। কিন্তু কমলিকার সম্রাজ্ঞী হবার ঘোষণার আভাস পেয়েই কেন তাদের এই পরিবর্তন? তাকে নিয়ে টানাটানি? তারা তো অনেকেই স্থির করেছিল— সম্রাজ্ঞী না হতে পারলেও উপপত্নী হতে তারা রাজি। সম্রাটের অঙ্কশায়িনী হবার বাসনা ত্যাগ করে তার মতো তুচ্ছ এক মানুষকে নিয়ে কেন রতি ক্রীড়ার বাসনা? এত সহজে তাদের মোহমুক্তি কী করে ঘটল? তাকে প্রথম প্রহরের ঘণ্টা ধ্বনির পর কেন একই জায়গায় বসে থাকার কথা বলা হল? তাদের কথার মধ্যে যুক্তি আছে। কিন্তু ভট্টরাই সন্তুষ্ট হতে পারল না। কেন প্রথম প্রহরের ঘণ্টার পর থেকে? অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রহরের শুরুতে। মনে সন্দেহের উদ্রেক হোত না—আসলে তাকে প্রথম প্রহরের পর এক জায়গায় বসিয়ে রাখার জন্য যে আপ্রাণ প্রচেষ্টা—সেটাই সন্দেহের উদ্রেক করছে। প্রাসাদের প্রায় সকলেই জানে, আজ কয়েকদিন যাবৎ ভট্টরাই রাতের যে কোনও সময়ে প্রাসাদের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায়। অনেক প্রাসাদ-রমণী তাকে বাতায়ন পথে চাঁদের আলোতে দেখেছে, আসলে তারা ভুল বুঝেছে। প্রকৃতপক্ষে তারা জানে না, দুটি উদ্দেশ্যে নিয়ে ভট্টরাই ঘুরে বেড়ায়। এক, প্রাসাদের নিরাপত্তা দেখা তো আছেই। দুই, তার আশা, কোন না কোনদিন বাতায়নে সে চাঁদের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা কমলিকাকে দেখতে পাবে। তাকে দেখাও তার কাছে সুখের। হোক না সে প্রাসাদ- রমণী—হোক না সে ভাবী সম্রাজ্ঞী। তার মনের মধ্যে সে কমলিকা হয়েই চিরকাল বিরাজ করবে। সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল ভট্টরাই। সে ভাবল যৌন উত্তেজনায় সে তার কর্তব্যচ্যুত হতে পারে না। বিশেষ করে উত্তরের পাহাড়ের মাথায় যখন সন্দেহজনক বল্ববাসীদের দেখা গেছে! অনুমান মতো গতরাতে কিছু ঘটেনি – কিন্তু আজ রাতে কিছু ঘটতে বাধা কী? বেশ কিছুদিন ধরে সমাজ-উৎসবের কথা শত্রুদের মুখে শোনা গেছে। কেন? এ কি কাকতালীয়?

জানুকা আর বল্লভী চলে যেতেই কোথা থেকে যেন দুই গুপ্তচর দুই পরিচারিকার উদয় ঘটল। — ভন্তে ভট্টরাই!

হাসি মুখে ভট্টরাই জিজ্ঞেস করল, কী? কোন সংবাদ আছে?

তারা বলল, না। তেমন কিছু নয়। জাঙ্ক এসেছিল। গভীর কিছু আলোচনা হচ্ছিল। কানে বারবার একটা কথাই এসেছে। সমাজ-উৎসবের রাত। জাঙ্ক ইউনাস আর দুবলের বাড়িতে জানুকা আর বল্লভীকে সম্ভবত একই কথা বলেছেন—সমাজ-উৎসবের রাত!

ভট্টরাই বলল, আর কিছু?

জানুকার পরিচারিকা বলল, আর একটি কথা আমার কানে এসেছে। জাঙ্ক প্রদীপের কথা কী যেন বলছিলেন। পরে জানুকা আমায় প্রশ্ন করে, প্রদীপ কোথায় পাব?

আমি বলেছি, চিন্তা করবেন না। আমি এনে দেব। প্রাসাদে তো কোন প্রদীপের ব্যবহার নেই। সবই দেওয়ালগিরি বা অগ্নিশলাকা। তা আপনি প্রদীপ নিয়ে কী করবেন?

কাজল তৈরি করব। নিজের হাতে তৈরি করা কাজল খুব মনোরম আর শীতল হয়। বাইরের কাজল আমার সহ্য হয় না।

ভট্টরাই বলল, তা এনে দিয়েছ?

হ্যাঁ। একটি পাত্রে সামান্য ঘৃত ও একটি চকমকি পাথরও এনে দিয়েছি সলিতা জ্বালাবার জন্য।

চমৎকার! নিজের হাতে তৈরি কাজলে জানুকাকে নিশ্চয় আরও সুন্দর দেখাবে।

না, ভন্তে। ও মায়া-কাজল তৈরি করতে চায় সম্রাটকে বশ করার জন্য।

ভট্টরাই হেসে বলল, তা বেশ। তোমদেরই বা কী—আমারই বা কী? তোমরা এস এখন।

গুপ্তচর-পরিচারিকারা চলে গেল। ভট্টরাই আবার তার আসনে বসে ভাবতে বসল, প্রদীপ কেন? জানুকা যা বলেছে তা কি সরল অর্থে নেওয়া যায়? বিষয়টি অতীব সন্দেহজনক, কারণ জাষ্কের সঙ্গে কথা বলার সময় এই প্রসঙ্গটি উঠে এসেছে। জাঙ্ক মেয়েদের কাজল নিয়ে মাথা ঘামায়—একথা কোনদিন শোনা যায়নি। অতএব, বিষয়টিকে সরল অর্থে নেওয়া সম্ভব নয়। বিষ্কের কথা আবার তার মনে হল। বিষ্ক তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন, তুমি প্রাসাদের প্রতিরক্ষার কাজে যোগদান করেছ। সব সময় মনে রাখবে সম্রাটের প্রাণ তোমার হাতে। কোন বিষয়কে—কারোর মুখের কথা সরল বিশ্বাসে মেনে নেবে না। বক্তাকে বুঝতে দেবে না তোমার মনের কথা। এখানে অজস্র দেওয়ালগিরির আলো। রাতভোর প্রাসাদ আলোয় ঝলমল করে। গরিবের কুঁড়ের প্রদীপ এখানে অচল। কাজল তৈরি? প্রাসাদ রমণীদের প্রসাধনিক জিনিস তো কোন কম নেই। সবই উৎকৃষ্ট শ্রেণির। তবে জানুকার হঠাৎ কাজলের কী প্রয়োজন পড়ল? তাছাড়া কোন পরিচারিকাকে আদেশ করলেই তো তারা ঐ কাজল প্রস্তুত করে দিত। নিজের হাতে করার কী অর্থ? হঠাৎ ভট্টরাই চমকে উঠল। প্রদীপের আলো সংকেত হিসাবেও ব্যবহার হতে পারে? কিন্তু কীসের সংকেত? কাকে সংকেত? কোন গুপ্ত-প্রেমিক আসার সংকেত? তবে জানুকা কি তার সঙ্গে নাটক করে গেল? অথচ সে প্রথম প্রহরের ঘণ্টার পর তাকে স্থানান্তরে যেতে নিষেধ করে গেছে। প্রেমিক এলেও কোন পথে আসবে? তাকে তো তার সামনে দিয়েই সোপানে পা রাখতে হবে। আর আসার পথ কোথায়? বিভ্রান্ত হয়ে উঠল ভট্টরাই।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%