কণিষ্ক – ৪

অমরজ্যোতি মুখোপাধ্যায়

সেদিন প্রভাতে নির্মীয়মান মহাবিহার পরিদর্শন করতে এসেছিলেন বসুমিত্র আর নাগার্জুন। তাঁরা যখন বিশাল স্তুপ এবং মহাবিহারের স্থাপত্য গভীর ভাবে নিরীক্ষণ করছিলেন—যবন স্থপতি এজিসিলাওসকে সঙ্গে নিয়ে উপস্থিত হলেন অশ্বঘোষ।

এজিসিলাওস বসুমিত্র আর নাগার্জুনকে প্রশ্ন করলেন, “কেমন দেখছেন, আপনারা?”

“অপূর্ব! সম্রাট—যুবরাজও দেখে গেছেন। তোমার স্থাপত্য, গান্ধার শিল্পীদের অঙ্কন আর খোদাই উচ্চ প্রশংসিত হয়েছে।”

অশ্বঘোষ বললেন, “গান্ধারে যবন-রোমক আর ভারতীয় রীতি মিলে যে শিল্পের উদ্ভব হয়েছে—তা অতি সুন্দর।”

সংঘরক্ষিত এসে গিয়েছিলেন। তিনি বললেন, “একটা আশ্চর্য সুন্দর জিনিস আপনারা দেখেন নি। সেটা হচ্ছে বুদ্ধের ভস্মাধার পেটিকা। সেখানে অন্যান্য কয়েকটি মূর্তির সঙ্গে গান্ধার শিল্পীরা বুদ্ধের একটি কাল্পনিক মূর্তি নির্মাণ করেছে। দেখতে অনেকটা যবন দেবতা অ্যাপেলোর মতো।”

অশ্বঘোষ বললেন, “সম্রাটের শিল্পপ্রীতির প্রশংসা করতে হয়। গান্ধারে গান্ধার শিল্প আর মথুরায় মৌর্য-শুঙ্গ ও আধুনিক ভারতীয় কলা মিলিয়ে মথুরা শিল্প! সম্রাটের তরফে বাসিষ্ক এর উৎসাহদাতা।”

সামনে বিহারের উদ্যান। সেখানে নানান ফুল, গাছ আর সরোবর। গাছগুলি এখনও যথেষ্ট বেড়ে ছায়াদানকারী হয়ে উঠতে পারেনি। তবে সেখানে ছাদ-দেওয়া বসার আসন ছিল। সকলে এমনি এক ঢাকা দেওয়া স্থানে গিয়ে বসলেন।

অশ্বঘোষ বসুমিত্রকে বললেন, “দেখ, আমি এখন পুরুষপুরের অধিবাসী। বুদ্ধ তো সর্বত্রই আছেন। পুরুষপুরেও রয়েছেন। ফলে রয়েছে বহু বৌদ্ধ-বিহার ও চৈত্য। বিপরীতে রয়েছেন অন্যান্য ধর্মালম্বীরা। যেমন, সনাতন বা ব্রাহ্মণ্য ধর্মীরা, নির্গ্রন্থীরা। তবে সম্রাটের পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্মের যথেষ্ট শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে এখানে। এই স্তুপ আর মহাবিহার নির্মিত হলে শ্রীবৃদ্ধির মাত্রা বহুগুণে বেড়ে যাবে। এই সুউচ্চ স্তুপ এদেশে আর কোথায় আছে?”

সকলেই বললেন, “সে তো নিশ্চয়। যুগযুগান্তর ধরে কণিষ্ক-মহাবিহার মাথা উঁচু করে থাকবে।”

অশ্বঘোষ বললেন, “কিন্তু একটা প্রশ্ন অনেকদিন ধরেই ভাবাচ্ছে। ভগবান বুদ্ধের কোনো মূর্তির প্রয়োজন আছে কি না? ভগবান বলেছিলেন, প্রতিটি মানুষ এক একটি স্বতন্ত্র দ্বীপ। তিনি তাদের ত্রিপিটক অর্থাৎ সুত্তপিটক, বিনয়পিটক আর অভিধর্মপিটক দিয়েছেন। সেগুলি ব্যক্তিগতভাবে চর্চা করে অষ্টমার্গের পথে চললে নির্বাণলাভ সম্ভব হবে। তাঁর পূজা বা মূর্তির প্রয়োজন নেই। এইসব বলেই তিনি তাঁর প্রিয়তম শিষ্য বৈমাত্রেয় ভ্রাতা আনন্দকে বিমুখ করেছিলেন। ঘটনাটি প্রায় পাঁচশত বৎসর পূর্বের। কালধর্ম—যুগধর্ম বলেও একটি বস্তু আছে। তা অনেক কিছুকেই পরিবর্তন করে যুগধর্মী করে তোলে। নিরাকারের সাধনা করা কষ্টসাধ্য। তাই দেখুন, ব্রাহ্মণ্যধর্মে নিরাকারের সাধক বা অদ্বৈতবাদীরা থাকলেও অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তিরও অভাব নেই। মূর্তি তাদের পূজাপাঠ-ধ্যানকে সহজতর করে তোলে। সম্রাটও পরধর্ম সহিষ্ণু। তিনি সনাতনধর্মী মূর্তি পূজকদের দেবমূর্তিগুলিকে অসম্মান করেন নি। তাঁর মুদ্রাতে এর প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। আমাদের দুঃখ, এ পর্যন্ত মুদ্রাতে বুদ্ধের কোনো মূর্তি নেই! কারণ, বুদ্ধের মূর্তিই নির্মিত হয়নি।”

বসুমিত্র, সংঘরক্ষিতেরা প্রশ্ন করলেন, “আচার্য আপনি কী বলতে চাইছেন? আপনার বক্তব্য একটু স্পষ্ট করুন।”

অশ্বঘোষ বললেন, “আমরা যদি বুদ্ধের এবং বোধিসত্ত্বের কোনো মূর্তি প্রচলন করি তা কি ধর্মের বিরুদ্ধে হবে?”

সংঘরক্ষিত বললেন, “তা না করে আমাদের উপায় কী? মানুষ নিজে থেকে বুদ্ধের মূর্তি রচনায় হাত দিয়েছে।”

বসুমিত্র বললেন, “কথাটা সত্যি, যেমন ভস্মধারের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি। কিন্তু এতে একটা অসুবিধা দেখা দেবে। সার্বজনীন একটি মূর্তি না হলে প্রত্যেকে খুশিমত এক একটি বোধিসত্ত্ব আর বুদ্ধের মূর্তি গড়ে তুলবে।”

সকলেই বসুমিত্রকে সমর্থন করলেন।—এই সমস্যার সমাধান আমাদের অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু তারও আগে আমাদের প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে বুদ্ধের মৃত্যুর পাঁচশ বছর পর বুদ্ধকে পদ্ম, হস্তি ইত্যাদি প্রতীক দিয়ে পূজা করা আর সম্ভব নয়। বুদ্ধের এক মূর্তির প্রয়োজন—যা মানুষ সনাতনপন্থীদের দেব-দেবীর মতো চোখের সামনে দেখতে পাবে।”

অশ্বঘোষ বললেন, “প্রতিটি জন্মের জন্মকালীন রূপ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। বুদ্ধের উপদেশগুলি লিপিবদ্ধ না থাকায় বুদ্ধের শিষ্যেরা তাঁর মহানির্বাণের পর নিজেদের সুবিধা মতো ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। ফলে নানান জটিলতার সৃষ্টি হল। মাত্র একশত বছরের মধ্যেই নানান উপকথা এবং কিংবদন্তী মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। এই বিপদ থেকে বাঁচার উপায় ছিল সমস্ত কিছুকে একটি কেন্দ্রীকতার মধ্যে নিয়ে আসা। বুদ্ধের মহানির্বাণের পর রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহায় প্রথম এক সংহতির আয়োজন করা হয়। এর একশ বছর পর বৈশালীতেও একটি সংহতি সভার আয়োজন করা হয়। কিন্তু সংহতির প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সেখানে মূলত দুটি ধারার আবির্ভাব ঘটে। এক, স্থবির বা থেরবাদী এবং অন্যটি মহাসংঘিক। থেরবাদীরা বুদ্ধের নিরাকার রূপের পুজারী। তাঁরা অহিংসা এবং ব্যক্তিগত নির্বাণ লাভ করার সাধনাকেই পরমধর্ম বলে মনে করেন। অন্যদিকে মহাসংঘিকরা নিজেদের পূজা বা নিরাকার সাধনার পক্ষপাতী নন। তাঁরা বুদ্ধকে মনুষ্য সমাজের ত্রাণকর্তা বলে মনে করেন। ইনারা বোধিসত্ত্বে বিশ্বাসী—মূর্তি পূজায় বিশ্বাসী। সম্রাট অশোকের সময়েও পাটলিপুত্রে তৃতীয় সংহতি সভা হয়। কিন্তু বৃথা!”

বসুমিত্র বললেন, “এ তো জানা কথা। পাঁচশত বছর পরেও সেই দ্বন্দ্ব একই ভাবে রয়ে গেছে। এই সমস্যা সমাধানের একান্ত প্রয়োজন। বৌদ্ধধর্ম আজ যুগ-সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পৃষ্ঠপোষকরূপে আমরা সম্রাট কণিষ্ককে পেয়েছি। সম্রাট অশোক দক্ষিণের দেশগুলিকে ছুঁতে পেরেছিলেন। আজ বহির্ভারতীয় কুষাণ সাম্রাজ্যের সুবিধাটুকু গ্রহণ করে আমরা উত্তরেও এগিয়ে যেতে পারি। এই সুযোগ আমাদের গ্রহণ করতেই হবে।”

সংঘরক্ষিত বললেন, “তাহলে আসুন, আমরা আর এক মহাসংহতির আয়োজন করে নানান বিষয়ে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাই।”

অশ্বঘোষ বললেন, “উত্তম প্রস্তাব। তাহলে মহাবিহারের উদ্বোধনের পরেই আমরা ঐ সংহতি সভা আহ্বান করব সম্রাটের অনুমোদন নিয়ে। আপনারা প্রস্তুত?”

সকলে বললেন, “হ্যাঁ, আমরা প্রস্তুত।”

.

জাঙ্কের প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক নিষ্ঠুরতা, রক্ত দর্শনের আকাঙ্ক্ষা। নগরাধ্যক্ষ হিসাবে তিনি যে খুব দক্ষ তা নয়। তবে তাঁর এই নিষ্ঠুরতার জন্য অপরাধী-অনপরাধী সবাই শংকিত। তুচ্ছ কারণে বা কারণ ছাড়াই কে যে কখন তাঁর রোষানলে পড়বে তা বলা শক্ত। প্রথমত কারাগারে যে কোনো বন্দী পরমভাবে সেবিত হবেই। পরে বিচারকের কাছে মুক্তি পেতেও পারে। তবে জাঙ্ক যাদের বিচারকের সামনে উপস্থিত করেন তাদের মধ্যে মুক্তি পাওয়ার মতো ভাগ্যবান খুব কমই আছে। অবশ্য অপরাধী-নিরাপরাধী গোপনে অর্থের বিনিময়ে মুক্তি লাভ করতেই পারে। কিন্তু সেরকমই বা ক’জন আছে যে জাঙ্কের উচ্চমূল্য চোকাবে? প্রথম প্রথম জাঙ্ক এতটা দুর্নীতিপরায়ণ ছিলেন না। কিন্তু ক্রমেই তিনি উগ্রতার দিকে পৌঁছচ্ছেন। এর থেকে একটা সত্য বেরিয়ে আসছে: জাঙ্ক অর্থলোলুপ হয়ে উঠেছেন। জাঙ্কের এই বাঁধন ছাড়া ব্যবহারের কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে প্রশাসনে তাঁকে সহায়তা করার মতো কয়েকজন শক্তিশালী মন্ত্রী রয়েছেন। তাঁরা বিষয়গুলি সম্রাট বা মহামিশ্র পর্যন্ত পৌঁছতে দেন না। সম্রাটও পুরুষপুরের এত তুচ্ছ প্রশাসন নিয়ে ব্যস্ত হন না বা চিন্তা করেন না। তাঁর চিন্তার বিষয় অনেক উচ্চমার্গের। এটিকে সম্রাটের গুণ বলা যাবে না দোষ?

আজও জাঙ্ক বন্ধনশালায় এক বন্দীকে যথেচ্ছ সেবা করে নিজের কক্ষে এসে বসে বসে চিন্তা করছিলেন কমলিকার পুরুষানুক্রমে সঞ্চিত রত্নপেটিকার কথা। এহেন সম্পদ আয়ত্ব করার জন্য তিনি নিশ্চেষ্ট হয়ে বসেছিলেন না। রত্ন কেনাবেচা হয় এমন সব নগরে আদেশ পাঠিয়েছিলেন যে সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহজনক রত্ন বিক্রি করতে দেখলে যেন তাঁকে সংবাদ দেওয়া হয় অথবা তাকে তাঁর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাছাড়াও তিনি সার্থবাহকদের দলপতি বণিক ভল্লাটকের কাছ থেকে বাকাটকির বিবরণ লোক মাধ্যমে সংগ্রহ করে আশপাশের জনপদগুলিতে প্রচারও করেছিলেন। বাকাটকিকে তাঁর চাই-ই। এরমধ্যে তিনি আর একটি কাজ করেছিলেন। কমলিকার বক্তব্যের সত্যাসত্য আবিষ্কার করার জন্য তার নির্দেশিত স্থানে লোক প্রেরণ করেছিলেন। তারা কমলিকার বর্ণনা মতো শিবির, শকট ও গলিত দুটি শব উদ্ধার করেছিল। একটি পুরুষ—অপরটি স্ত্রী। সেই গলিত শব কমলিকাকে দেখতে নিষেধ করে অন্তেষ্টি করবেন কি না জানতে চেয়েছিলেন। আচার্য চরকের পরামর্শ মতো কমলিকা অন্তেষ্ঠির অনুমতি দিয়েছিল। জাঙ্ক এখানেও ক্ষান্ত হননি। অজাত-নগরে মণিভদ্র সম্পর্কে খবরাখবর নেবার জন্যও লোক পাঠিয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাই তিনি এখন রত্নপেটিকার কথা সত্য বলে বিশ্বাস করেন এবং তা ফেরত দেবার জন্য নয়—অধিকার করতে ভীষণ উদ্গ্রীব। আজ তিনি উদাস হয়ে অপেক্ষা করছেন তক্ষশিলা বা সোয়াত নদীর উপত্যকার নগরগুলি থেকে কী সংবাদ আসে তা শোনার জন্য! বাকাটকিকে হাতে না পাওয়ার ক্ষোভ তিনি বন্ধনাগারের বন্দীদের ওপর মেটাচ্ছিলেন।

কমলিকা এখন প্রায় সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু তার যাবার জায়গা কোথায়? এই রূপ-যৌবন নিয়ে সে একাকী কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এ সংসারে নারী, বিশেষ করে রূপবতী নারীর একা বেঁচে থাকা খুবই কষ্টকর। লোলুপ দৃষ্টি—শ্বাপদ নখদন্ত সবসময় প্রস্তুত হয়ে রয়েছে ছিঁড়েখুঁড়ে খাবার জন্য। অথচ মনে মনে সে কুণ্ঠিত আচার্য চরকের গলগ্রহ হয়ে থাকাতে। সে যে গলগ্রহ এমন কথা আচার্য বা তাঁর পত্নী ঘূর্ণাক্ষরেও তাকে জানাননি। বরং তাঁরা বলেছেন, “তুমি আমাদের কাছে সন্তান হিসাবে থেকে যাও।” অবশ্য, “আমি তোমার তথাকথিত আত্মীয় মহামিশ্রের কাছে একটা সংবাদ পাঠিয়েছি অনুমানের ওপর নির্ভর করেই। সৌভাগ্যক্রমে তিনিই তোমাদের সেই মহামিশ্র! তিনি স্বীকার করেছেন আত্মীয়তা। সুযোগ পেলেই তিনি একদিন স্বয়ং আসবেন বলেও জানিয়েছেন।” এসব দিন দশেক আগেকার কথা। ব্যস্ত মানুষ। দেখা যাক, কবে আসেন।

অপরাহ্নে কমলিকা একাকী কুটিরের দাওয়ায় বসেছিল। সূর্য অস্তগামী। দাসীরা আশ্রমের দেওয়ালগিরিগুলি জ্বালাবার জন্য প্রস্তুত করছে। চরক-গৃহিণী রন্ধনশালা পরিদর্শনে ব্যস্ত। নিজের সংসার, পরিচারক, পরিচারিকা, শিষ্য এবং রোগীদের পথ্য—সে এক বিশাল ব্যাপার! দশ বারোজন পাচক এই কাজে সদা ব্যস্ত। আচার্য এখন রোগী পরিদর্শনে গিয়েছেন শিষ্যদের সঙ্গে। একমাত্র কর্মহীন—সে। অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে কমলিকা তাই ভবিষ্যতের কথা ভাবছিল। ভট্টরাইয়ের কথাও তার মনে পড়ছিল। প্রতিদিনই সে তার পথ চেয়ে বসে থাকে। কে জানে তার বিশ্রামের দিন কবে? সেই যে জাঙ্কের সঙ্গে এসেছিল—তারপর থেকে তার আর কোনো সংবাদ নেই। কমলিকা ভাবতে বাধ্য হল, মহামিশ্র যদি সাহায্য না করেন, তবে সে কী করবে? সে কি আচার্যের প্রস্তাব মতো এই সংসারেই থেকে যাবে? কিন্তু চিরকাল তো সে এখানে থাকতে পারবে না। তার বিবাহের বয়স উপস্থিত হয়েছে। সে ক্ষেত্রে আচার্যের পছন্দ মতন পাত্রকে বিবাহ করতে হবে। কারণ, তিনি হবেন অভিভাবক। বাবার কাছে যে স্বাধীনতাটুকু সে ভোগ করেছে—তা এখানে পাবার সম্ভাবনা কম। আচার্য উদার কিন্তু প্রাচীন রীতি-নীতিতে বিশ্বাস করেন। এছাড়াও আর একটা বিষয় রয়েছে। অন্য কোনো পাত্রকে তো সে চেনেই না। সুতরাং, আচার্যের বিবেচনাই তাকে মানতে হবে। তাঁর বিবেচনার ওপরই নির্ভর করতে হবে। তবে, আচার্য নিশ্চয় চেষ্টা করবেন তার সমমূল্যের পাত্র জোগাড় করতে। ভট্টরাইকে পছন্দ করলেও তাকে তার পতি হিসাবে নিশ্চয় মানতে পারবেন না। শ্রেণিগত পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে সে যদি কারোর ওপর নির্ভর না করে কোনো সুরক্ষিত স্থানে কোনো কর্মের সন্ধান পায়—তাহলে পাত্র নির্বাচনে তার স্বাধীনতা বজায় থাকবে। নিজের জীবনকে সে নিজেই গড়ে নিতে পারবে। অর্থাভাব খুব একটা বেশি হবে না। তার অলংকারের সামান্য কিছু অংশ বিক্রি করে দিতে পারলেই তার অর্থাভাব মিটে যাবে। ভট্টরাইকে সে ব্যবহার করতে পারে বন্ধুর মতো। মানুষটি সরল এবং বুদ্ধিমান। নিজের ওজন সম্পর্কে সে নিশ্চয় অবহিত। প্রথম আলাপে তো তাই মনে হয়েছে। তবে বিষয়টি যে কঠিন এতে তার কোনো সন্দেহ নেই। পুরুষ বন্ধু হিসাবে জীবনে এই প্রথম আলাপ তার একটি সুদর্শন, সাবলীল যুবকের সঙ্গে। সে তার স্তর হয়ত সহজে ভুলবে না। কিন্তু যৌবনের আকর্ষণে যদি সে নিজে থেকেই স্তর-ভ্রষ্ট হয়? ভট্টরাই যে আকর্ষণীয়—অন্তত তার দেখা যুবাদের মধ্যে তো নিশ্চয়। ভট্টরাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রাখতে গেলে তাকেও তার স্থানে স্থির হয়ে অবস্থান করতে হবে এক্ষেত্রে। কিন্তু আশ্চর্য! মনের মধ্যে কোনো দৃঢ়তা অনুভব করল না সে। একটি মাত্র উপায় যা তার মনে হল, যদি মহামিশ্র তাঁকে অন্য কোনো স্থানে টেনে তুলে নিয়ে যান—তবেই সে হয়ত ভট্টরাইয়ের অধ্যায় বন্ধ করতে পারে। সেক্ষেত্রেও যে একটি অসুবিধা রয়েছে তা ও সে দেখতে পেল। মহামিশ্র তার রক্ত সম্পর্কিত আত্মীয় নন। গ্রাম সম্পর্কিত। বাবার জোর ছিল যে তিনি এক সময়ে ওনাদের পরিবারকে দুঃসময়ে প্রতিপালন করেছিলেন মহামিশ্র কার্যক্ষম না হওয়া পর্যন্ত। জীবনে এই ঋণ কে মনে রাখে—একমাত্র মূর্খেরা ছাড়া? অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে এমনই সব ভূত-ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করছিল কমলিকা। তার মাথার ওপর থেকে বাবার ছাদ ভেঙে পড়েছে। এখন নিজের বুদ্ধি মতো—চিন্তা মতো নিজের ছাদ নিজেকেই গড়ে নিতে হবে। জীবনের নোঙ্গর নিজেকেই বুঝে শুনে ফেলতে হবে।

এর মধ্যে পড়ন্ত রোদ্দুর মেখে ভট্টরাই যে কখন এসে দাঁড়িয়েছিল তা কমলিকার খেয়াল হয়নি। ভট্টরাইয়ের কথাতেই তার চমক ভাঙল।—”মণিকার পুত্রী! কী ভাবছেন? যদিও জানি, এ জগতে ভাবনার অন্ত নেই।”

“তুমি!” যেন বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বল জলের মতো হয়ে উঠল কমলিকা!

“তুমি! এটা কি ঠিক হল মণিকার পুত্রী!” ভট্টরাই হাসল, “’আপনি’র ওজনটা কি একটু বেশি বলে মনে হচ্ছে?”

লজ্জায় লাল হয়ে উঠল কমলিকা। একটু সামলিয়ে বলল, “তুমি ভারি ওজনের যোগ্য নও। তাই…! আমার তো মনে হয় তুমি যথেষ্ট দুর্বল। বৃথা কেন বোঝা বওয়া!”

দুজনেই আবার সশব্দে হেসে উঠল। দূর থেকে আবার সবাই আশ্চর্য হয়ে তাকাল তাদের দুজনের দিকে। এই মেয়েটার এত প্রাণ বিমর্ষতার মধ্যে আটকা পড়েছিল! বাবা-মার অন্ত্যেষ্টির পর থেকেই বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল সে। চরক আর চরক-পত্নী অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়েও তা দূর করতে পারেননি। আজও ভট্টরাই বোধহয় বসন্ত-বাতাস সঙ্গে নিয়ে এসেছিল, সেই হাওয়ার পরশে দুজনেই কেঁপে কেঁপে উঠছিল।

তবু গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল ভট্টরাই। বলল, “আমি সামান্য মানুষ। ভারবহন করেই আমাদের দিনে কাটে। বোঝা বওয়াটা আমাদের উত্তরাধিকার।”

কমলিকা যেন ক্ষুদ্ধ হল। “এমন কথা বলছ কেন, ভট্টরাই? তুমি যেমন তা তোমার কর্তব্য-স্থানে এবং বাড়িতে। আমার সঙ্গে শুধুমাত্র তো বন্ধুত্বের সম্পর্ক। এখানে আমরা ‘ওজন’ নিয়ে কথা নাই বা বললাম। আমার স্পষ্ট কথা, তুমি আর আমি কেউই বোকা নই—অপরিণতও নই। তোমার সঙ্গে দেখা হলে, কথা বললে আমার ভাল লাগে। তাই তোমার পথ চেয়ে থাকি। তোমারও নিশ্চয় ভাল লাগে, নইলে বিশ্রামের দিনে এখানে ছুটে আসতে না। মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি।”

“অর্থাৎ আমরা আবার পরস্পরের কাছে ধরা পড়ে গেছি। বেশ। তুমি আমায় বসতে বল। আমি বসি।”

“দাঁড়াও। কাষ্ঠাসন এনে দিই।”

“না। থাক। আমি দাওয়ার ওপর তোমার মুখোমুখি বসে তোমার জীবনের কথা শুনতে বেশি পছন্দ করব।” দাওয়ায় উঠে খুঁটিতে ঠেস দিয়ে ভট্টরাই কমলিকার মুখোমুখি বসল।—”তোমার জীবনের কথা শুরু কর।”

কমলিকা বলল, “অতীত অতীতই। তা শুনে তোমার মনই কেবল ভারাক্রান্ত হবে—আমারও।”

“না। তুমি হালকা হয়ে যাবে। তোমাকে আমি চিনতে পারব। বুঝতে পারব। মনের দিক দিনে আমাদের কী মিল—কী অমিল তাও ধারণা করতে পারব।”

কমলিকা হেসে বলল, “তার মানে তুমি দেখে নিতে চাইছ—আমার দিকে ভট্টরাই কতটা ঝুঁকে পড়তে পারবে?”

“মোটেও না। বরং তুমিই ঝুঁকে পড়তে পার। রূপবতী বলে যদি তোমার দম্ভ থাকে—রূপবান বলে আমার দম্ভও কম নয়। তবে আরও একটা জিনিস আমার আছে—সেটা বাস্তববোধ। কল্পনাকে আমি উড়তেই দিই। মাটিতে নামিয়ে আনতে চাই না। তুমি আমার কল্প জগতের পরী, তুমি উড়তেই থাক। কক্ষনো মাটি ছোঁবার চেষ্টা কোরো না।”

বিস্মিত ভাবে কমলিকা বলল, “তুমি সুন্দর কথা বলত! বেশ, বল কী শুনতে চাও?”

“জানতে চাই অজাতনগরের মণিকার পুত্রীকে।”

দীর্ঘশ্বাস ফেলে কমলিকা বলল, “সে আর কী জানবে? চন্দ্রভাগার কুলে এক প্রাচীন বর্ধিষ্ণু জনপথ অজাতনগর। কয়েক পুরুষের বাস সেখানে। যদিও সেখান থেকে কিছু দূরে সংকটা ছিল আমাদের গ্রাম। যাতায়াত ছিল। কারণ সেখানে আমাদের বিশাল ভূসম্পত্তি ছিল। অর্থাৎ ব্যবসা আর ভূসম্পত্তি মিলিয়ে আমরা ছিলাম এক ধনাঢ্য পরিবার। দাসদাসী…। কিছুরই অভাব ছিল না। পড়াশুনা, নৃত্যগীত সবই শিখলাম। নিজেকে সবসময়ে সাজিয়ে রাখার একটা অভ্যাস আমার গড়ে উঠেছিল। রত্নালংকারে নিজেকে সাজাতাম। মা বকাবকি করলেও বাবা প্রশ্রয় দিতেন। তিনি বলতেন, ‘বিয়ে আমি রাজা-মাহারাজার ঘরে দেব।’“

“আমি আমার স্বপ্নের রাজপুত্রের পথ চেয়ে থাকতাম। দু’এক জন সামন্ত প্রভুর ঘরে কথা চালাচালি হচ্ছিল। আমার কিন্তু পছন্দ হচ্ছিল না। আমার প্রত্যাশা বোধহয় আরও বিশাল ছিল।”

ভট্টরাই কমলিকার প্রত্যাশার এক গভীর অর্থ করল। তার মনে হল, কমলিকা বোধহয় সাবধান করার জন্যই কথাগুলি তার দিকে ছুঁড়ে দিয়েছে। সে অবশ্য কথাগুলি গায়ে না মেখে স্বাভাবিক স্বরেই বলল, “শেষ পর্যন্ত কী হল?”

“আমার পছন্দ হল না। তারা নারী সঙ্গে যতটা আসক্ত—বীরত্ব কর্মে নয়। পানপাত্রে তাদের যত আসক্তি—তলোয়ারে নয়। তাদের অবয়বে বীরত্ব ব্যঞ্জকতা কিছু নেই। নেই ব্যক্তিত্ব। তারা যেন কেমন পুতুল পুতুল খেলনা। আমি বেঁকে বসলাম। চলল, আমাকে বোঝানোর পালা। আর ঠিক সেই সময় চন্দ্রভাগার কুলে বাঁধ ছাপিয়েও প্রবল জলধারা স্মরণাতীত কালের এক ঘটনা হয়ে দৈত্যাকারে ছুটে এল। ভাসিয়ে—ডুবিয়ে দিয়ে গেল সবকিছু! প্রয়োজনীয় মেরামতির অভাবে বিরাটাকার বাঁধটিই ভেঙে পড়েছিল। জল আর শুধু জল! আমরা বেঁচে গেলাম বাড়িটা উঁচু টিলার ওপর হওয়ার জন্য। দাসদাসীরা তাদের পরিবারদের বাঁচাবার জন্য নিজেদের গ্রামে চলে গেল। কিন্তু বেশ কয়েকদিন অপেক্ষা করার পরও আর কেউ ফিরে এল না। প্রকাণ্ড বাড়িতে আমরা একা! তারপরের ইতিহাস তো তোমার জানা।” কমলিকা থামল।

ভট্টরাই বলল, “তোমার দুঃখ হয় না ছবির মতো সেই নগরের কথা ভেবে—বিশাল বাড়ি—বিশাল সম্পদ! সর্বোপরি বাবা-মা! তোমার কথা ভেবে আমার দুঃখ হয়। রাজকন্যা এখন পথের ধুলোয়!”

“পথের ধুলোয় কেন হব? তুমি কি জানো না মেয়েরা কেন অলংকার সংগ্রহ করে? তা তো ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। দুর্দিন তো সবারই আসতে পারে। মানুষ তার জন্য সঞ্চয় করে। এই অলংকার তো আমাদের সঞ্চয়। কিছু তো রইল—না খেতে পেয়ে মারা যাব না।”

“মারা গেলেই হল আর কি! ভট্টরাইয়ের সঙ্গে তোমার পরিচয় তবে হল কেন?”

সন্দিগ্ধ ভাবে কমলিকা বলল, “অর্থাৎ—এর মানে?”

“মানে আর কী? তোমার মহামিশ্র যদি কিছু না করেন তবে আমিই চেষ্টা করব তোমার জন্য। এই মহানগরীতে আমার পরিচিত মানুষের সংখ্যা কী কম? তোমার নিরাপত্তা, তোমার একটি কর্ম—সে আমি জীবন দিয়েও করে দেব। আমার পরীর গায়ে তো আমি দুঃখের ছোঁয়াচ লাগাতে পারি না। তখন হয়ত তোমারই আমার কথা মনে থাকবে না। ভুলে যাবে আমাকে। তা যেও। আমি রাগ করব না।”

কমলিকা চোখ বড় বড় করে অপার বিস্ময় নিয়ে ভট্টরাইয়ের দিকে তাকাল।—”তুমি আমার জন্য এত করবে? কিন্তু কেন? ক’দিনেরই বা আমাদের পরিচয়? এই তো মাত্র দ্বিতীয় দিন আমরা মুখোমুখি কথা বলছি।”

“যে আপন হয় সে এক লহমায় হয়। সেদিন প্রভাতে মুহূর্তের জন্য যে মুখ তুলে আমার কাছে বাঁচাবার জন্য আর্তি জানিয়েছিলে—সেই মুখটাই আমার মনে গেঁথে রয়েছে। চোখ বুজলেই দেখতে পাই উট নিয়ে তুমি ছুটে আসছ ভয়ার্ত ভাবে। চোখে তোমার বাঁচবার আর্তি। সুতরাং জানি তোমাকে— বাঁচাবার দায়িত্ব আমারই।”

আবার হো-হো করে হাসল কমলিকা।—আশ্চর্য মানুষ তো তুমি?

সত্যিই আশ্চর্য! তোমার সঙ্গে মুখোমুখি আজ দ্বিতীয় দিন কথা বলছি ঠিকই। কিন্তু মনে মনে কদিন বলছি, বলত?

কমলিকা গভীরভাবে তাকাল ভট্টরাইয়ের দিকে। তারপর ফিসফিস করে বলল, “আমিও!”

কমলিকার দৃষ্টির সামনে যেন শিউরে উঠল ভট্টরাই। সে যেন তার সর্বনাশকে প্রত্যক্ষ করতে পারল। নিজেকে শাসন করল সে। ভট্টরাই উন্মাদ নয়। সে তার সামাজিক স্তর ভাল ভাবেই জানে। কমলিকা তার জগতের লোক নয়। সে ধরাছোঁয়ার বাইরে এক পরী। পরীকে কে না ভালবাসে? তাই তো সে ছুটে আসে—ভাবে—কল্পনা করে।

একটু নিস্তব্ধতা ঘনাল। সূর্য অস্ত গেল। দেওয়ালগিরিগুলি জ্বলে উঠল। ভট্টরাই বলল, “তোমার ভাগ্য ভাল। সেদিন আচার্য চরক দৈবাৎ উপস্থিত হয়েছিলেন। নচেৎ, কোনও অঘটন ঘটতে পারত তোমার ঐ অলংকারগুলির জন্য। কোনো লোভী বৈদ্য হয়ত…।”

“অলংকারগুলি সুন্দর? তোমার পছন্দ হয়?”

“নিশ্চয়! এই অলংকারের জন্যই তো তুমি আরও ঝলমল করে উঠেছো। চোখ ধাঁধিয়ে যায়!” ভট্টরাই হাসল।

হঠাৎ কমলিকা বলল, “তোমার কথা তো কিছু বললে না ভট্টরাই!”

“কেন? আমি আগে নিশ্চয় বলেছি যে আমরা দরিদ্র শ্রেণির মানুষ। বেঁচে থাকার দায়ে জীবন হাতে নিয়ে আমাদের জীবিকা অর্জন করতে হয়। আমার ভাই অবশ্য তলোয়ার ভালবাসে না। সে বাণিজ্য বিভাগের এক কর্মী। বাবা ছিলেন সেনা বিভাগের এক সৈনিক। নিম্নসিন্ধু অধিকার করার যুদ্ধে বাবা আহত হয়ে অবসর নেন। তবে আমার ছোটবেলা থেকে তলোয়ার আর ধনুকের নেশা ছিল। বাবার কাছেই শিখেছি। পড়াশোনাও করতাম। কিন্তু অর্থাভাবে শেষ করতে পারিনি—তার আগেই চাকুরির সন্ধানে বার হতে হয়। পেয়েও গেলাম। দায়িত্ব পেলাম তোরণ শীর্ষ পাহারা দেওয়া। আজ বছর দুই সেই কর্তব্যই পালন করে আসছি। তোমার সঙ্গে পরিচয় হবে বলেই এই রকম একটি চাকুরি আমি পেয়েছিলাম!”

“আর তোমার সঙ্গে এক বিশেষ পরিবেশে সাক্ষাৎ হবে বলেই বোধহয় অজাতনগরের সর্বস্ব ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম।”

আবার তারা দুজনে হো-হো করে হেসে উঠল। কিন্তু তাদের হাসি মাঝপথেই থেমে গেল। দেখা গেল, সন্ধ্যার অন্ধকার ঠেলে একটি রথ এগিয়ে আসছে। দুজনেই প্রশ্ন করল নিজেদের—”কে?”

আচার্য চরকের ভুল হল না। তিনি আরোগ্যশালা থেকে বেরিয়ে এসে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এগিয়ে গেলেন। “স্বাগত, মহামিশ্র! আপনি আসবেন আমি জানতাম।”

মহামিশ্র রথ থেকে নেমে এগিয়ে এলেন। “সময় পাচ্ছিলাম না। মণিভদ্রের কন্যা তো আমারও কন্যার মতো। কই সে?”

আচার্য চরক বললেন, “ঐ যে দাওয়ায় বসে আছে। চলুন।”

“সঙ্গের যুবকটি কে?”

“ঐ তো ভট্টরাই। ঐ যুবকটিই তো বাঁচিয়েছিল কমলিকাকে।”

“বা! বেশ চালাক চতুর আর সপ্রতিভ বলে মনে হচ্ছে।”

কমলিকা আর ভট্টরাই—দুজনেই বুঝে গিয়েছিল রাজ-অতিথির পরিচয়। দুজনেই উঠে দাঁড়িয়েছিল অভিবাদন করে।

দাসীরা কাষ্ঠাসন বয়ে নিয়ে এল। আচার্য আর মহামিশ্র বসলেন। সামান্য নীরবতা। তারপরেই তিনি বললেন, “তুমিই মণিভদ্রের পুত্রী? মণিভদ্র গ্রামের সুবাদে আমার বড় ভাই। আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে প্রচন্ড ঘনিষ্ঠতা ছিল। তবে তোমরা ছিলে ধনী। আমরা দরিদ্র। তাতে অবশ্য সম্পর্কের কোন অবনতি হয়নি। আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন আমার বাবা। হঠাৎই এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে তিনি মারা গেলেন। আমি তখন যথেষ্ট ছোট। পড়াশুনা করছি। চোখে অন্ধকার দেখলাম। সংবাদ পেয়ে তোমার বাবা ছুটে এলেন। আমাদের সাংসারিক পরিস্থিতি দেখার পর আমার মাকে দুটি প্রস্তাব দিলেন। এক, আমরা যেন তাঁর সঙ্গে অজাতনগরে গিয়ে বসবাস করি। আমাকে তিনি তাঁর পুরুষানুক্রমিক মণিরত্নের ব্যবসায় নিয়ে নেবেন।”

“ঐ সব রত্ন-ব্যবসা আমার ভাল লাগে না। আমি চাইছিলাম, পড়াশুনা শেষ করে কোনও প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হব। তাই আমি বিনয়ের সঙ্গে তাঁর প্রথম প্রস্তাব অস্বীকার করলাম। বললাম ওকাজ আমার মনোমত নয়।”

“মা বললেন, তাঁর স্বামীর ভিটে তিনি ত্যাগ করে যেতে পারবেন না। আমাদের কপালে দুঃখ থাকলে তুমি আর কী করবে বাবা?”

“তোমার বাবা অনেকক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, ‘আর একটি প্রস্তাব রয়েছে কাকিমা।’“

“’কী প্রস্তাব, বাবা?’“

“’দেখুন, নগরের ব্যবসা ফেলে জমি-জমা দেখার জন্য আমাকে মাঝে মধ্যেই ছুটে আসতে হয়। আমি এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইছি।’“

“’অর্থাৎ?’ আমার মা বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন।”

“’আজ থেকে আমার জমি-জমা মহামিশ্র নিজের মনে করেই ভোগ করুক। সে যখন নিজের পায়ে দাঁড়াবে—তখন যেন তা আমাকে ফিরিয়ে দেয়। মাঝে মধ্যে জমির ফসল যদি সে কিছু দিতে চায়—দিতে পারে।’“

“আমার মা হা-হা করে উঠেছিলেন। ‘এ কী করে হয়, মণি? এতো বিপুল সম্পত্তি!’“

“’হোক গে। কারোর কাজে লাগুক। আমার তো বিশাল ব্যবসা রয়েছে। মহামিশ্রকে আমি জানি। সে আমায় ঠকাবে না।”

মহামিশ্র আচার্য চরকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি কিন্তু বিশ্বাসভঙ্গ করিনি। যেদিন আমি পুরুষপুরের প্রশাসনে নিযুক্ত হয়েছিলাম, তার পরের দিনই মণিভদ্রের সম্পত্তি ফিরিয়ে দিয়ে আমি এই নগরে চলে আসি। সে আজ দীর্ঘদিনের ব্যাপার। কমলিকার জন্মও তখন হয়নি। মা বেঁচে থাকা অবধি কিছু যোগাযোগ ছিল। তারপরেই সব শূন্য। আমার ব্যস্ততা তো জানেন, আচার্য! সেদিন আপনার লোকের মুখে শুনলাম মণিভদ্রের কথা, তাঁর নির্মম মৃত্যুর কথা—তাঁর একমাত্র কন্যার অসহায়তার কথা! এখন কমলিকা বল, তোমার কী প্রার্থনা? জলে তুমি পড়ে নেই। আচার্য চরক আছেন। আমি আছি। আশা করি এই যুবকটিও তোমার পাশে আছে। রয়েছে তোমার এই বিপুল অলংকার আর সংকটা গ্রামে বিশাল জমি-জমা। জানি না। সেগুলোর কী অবস্থা। তবে আমার সব মুখস্থ। এক লহমায় আমি তা উদ্ধার করে দোব। এখন বল, তোমাকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত করে দোব? তোমার বাবার উপকার আমি ভুলিনি। তোমার বিবাহের বয়সও হয়ে গেছে। দায়িত্ব নিশ্চয় আমার, তুমি রাজরানি হওয়ার যোগ্য।”

একটু চিন্তা করে কমলিকা বলল, “আমি নিজে প্রথমে প্রতিষ্ঠিত হতে চাই। আমাকে একটি সুরক্ষিত—নিরাপদ কর্মের সন্ধান করে দিলে বাধিত হব।”

কারোরই বুঝতে অসুবিধা হল না যে কমলিকা স্বতন্ত্র থাকতে চায়।

মহামিশ্র বললেন, “বেশ। বুঝলাম। কিন্তু তোমার জমির আয় থাকতে কেন তুমি কর্ম প্রত্যাশী হচ্ছ? জমি-জমাগুলো কি বারোভূতে ভোগ করবে?”

“তা কেন? আচার্যের আশ্রমে দিয়ে দিন। আমি জানি, তাঁর রুগ্ন-মানুষের সেবার জন্য বিপুল বিত্তের প্রয়োজন। কত রোগী স্থানাভাবে ফিরে যায়।”

মুগ্ধ হল ভট্টরাই। চরক আপ্লুত হয়ে বলে উঠলেন, “ধন্য, ধন্য কমলিকা!”

মহামিশ্র উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, “তোমাকে আমি যেটুকু বোঝবার তা বুঝেছি। তোমার প্রার্থনা মতো একটি কর্মের সন্ধান তোমায় আমি নিশ্চয় দোব। অবশ্য তুমি যদি তা পছন্দ কর।”

তারপর চরককে বললেন, “আচার্য, আমি শিঘ্র জমি-জমাগুলো আপনার আশ্রমের নামে পরিবর্তিত করার আদেশ দোব। আপনি নির্ভয়ে আপনার আরোগ্য নিকেতনের শয্যা বাড়ানোর কাজে হাত দিন। আর মহাবিহার উদ্বোধনের দিন কমলিকাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। সুযোগ মতো সম্রাটের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবার চেষ্টা করব।”

মহামিশ্র চলেই যাচ্ছিলেন হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলেন ভট্টরাইয়ের সামনে। এতক্ষণ পর্যন্ত সে চুপচাপই দাঁড়িয়েছিল উচ্চ প্রশাসনিক ব্যক্তিটির সামনে। মহামিশ্রকে এত কাছ থেকে দেখা তার মতো মানুষের সৌভাগ্য!

মহামিশ্র বললেন, “তুমি ভট্টরাই?”

“আজ্ঞে।” বিনয়াবনত হয়ে ভট্টরাই বলল।

“হঠাৎ আশ্রমে?”

“আজ্ঞে কমলিকার সঙ্গে দেখা করতে। মণিকার পুত্রী আসতে বলেছিলেন।”

কমলিকা বলল, “হ্যাঁ, কাকা এখানে গল্পগুজব করার মতো তো কেউ নেই। তাই ওকে আসতে বলেছিলাম। এখানে অন্য সবাই ব্যস্ত!”

“ও! তা ওর কর্তব্য নেই?”

“আজ আমার বিশ্রামের দিন।” কিছুটা ভীত হয়েই ভট্টরাই বলল। মহামিশ্রের ব্যক্তিত্বের কাছে সে যেন নুইয়ে পড়ছিল কিছুটা।

“তুমিই দস্যুদুটিকে হত্যা করে ওর প্রাণ বাঁচিয়েছিলে?”

“আজ্ঞে।”

“এই কাজে তুমি জীবনে কি উন্নতি করতে পারবে বলে ভাব?”

“কেন নয়?” সোজা হল ভট্টরাই।—”যদি কর্তব্যনিষ্ঠ এবং সৎ থাকি তবে একদিন না একদিন নিশ্চয় উন্নতি করব।”

“তোমার আত্মপ্রত্যয়ের প্রশংসা করি। যাহোক। তোমার একটি পুরস্কার পাওয়া উচিত। তুমি আমার ভাইঝির প্রাণ বাঁচিয়েছ। আচ্ছা আসি।” মহামিশ্র রথের দিকে এগিয়ে গেলেন।

পুরস্কার বলতে তিনি ঠিক কী বলে গেলেন তা কারোরই কোন বোধগম্য হল না।——অর্থ পুরস্কার?

রান্নাঘর থেকে চরক-গৃহিণী বললেন, “ভট্টরাই। চলে যেও না।”

চরক কক্ষে চলে গেলেন। তারপরেই চরক-গৃহিণী একটি থালিতে কয়েকটি দুগ্ধজাত মিষ্টান্ন ও একটি পাত্রে পানীয় জল নিয়ে এসে ভট্টরাইকে দিলেন।

ভট্টরাইয়ের ক্ষুধা পেয়েছিল। তাই সে লোকলজ্জা না করে অচিরেই থালি খালি করে পাত্র থেকে জলপান করে নিয়ে কমলিকার দিকে তাকাল।—”হাঁ করে কী দেখছ? ভীষণ ক্ষিদে পেয়েছিল। আচার্য-গৃহিণী সুবিবেচক।”

কমলিকা বলল, তোমাকে পছন্দ করেন। তোমার কথা জিজ্ঞেসও করেন।

তোমার হিংসে হচ্ছে কি?

আবার সেই প্রাণখোলা হাসি। তবে নিচু মাত্রায়।

চাঁদ উঠেছিল। ম্লান আলোক ছড়িয়ে পড়েছিল আঙিনায়। কুবা নদীর দিক থেকে বাতাস বইছিল। কমলিকা এক সময়ে বলল, “তোমাকে তো যেতে হবে অনেক দূর। কিন্তু যাবে কী করে?”

“আমার একটা ঘোড়া আছে জানো না? জোর গতিতে ছুটিয়ে যাব। পথঘাট এখন ফাঁকা।”

“বাঃ। বেশ আছ!”

“তা কেন? সেদিন তুমিও তো উট ছুটিয়েছিলে।”

হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল কমলিকা।—”জানো আমি জীবনের আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু ঊষাকালের আলোকে তোমার মুখটা দেখতেই মনে হল, মৃত্যুভয় আর নেই।”

“আমার বুঝে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেছিল। তাইতো তোমায় তিরবিদ্ধ হতে হল।”

“সে আর কী করবে বল? কপাল! প্রাণে বেঁচে গেছি। তোমার মতো এক বন্ধু পেয়েছি এই নির্বান্ধব পুরীতে। এ কি কম ভাগ্য?”

উঠে দাঁড়াল ভট্টরাই!—”আসি। প্রভাতেই তোরণের কর্তব্য রয়েছে।”

“তবে এস।” অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেন বলল কমলিকা—”তবে মহাবিহার উদ্বোধনের দিনে কি দেখা হবে?”

“বলতে পারছি না। অবসর পেলে নিশ্চয় যাব। মহাবিহার না হোক এখানে তো দেখা পাব।”

“যাঃ। আবার আমি কি দেখার বস্তু?”

ভট্টরাই বলল, “পরীরা দেখার বস্তু নিশ্চয়। আমি ছোট বেলায় পরীদের গল্প শুনেছি। কিন্তু দেখিনি। এখন তোমায় দেখতে পাচ্ছি।”

“যাঃ! লজ্জা পেল কমলিকা।—সাবধানে যেও।”

কমলিকার সঙ্গে ভট্টরাইয়ের চোখ মিলল। আবার সেই শিহরণ জাগল তার সারা শরীরে। কমলিকার প্রতিক্রিয়া কিছু ঘটল কি না—তা সে জানবার জন্য পিছু ফিরতে চাইল না। ঘোড়ার দিকে এগাতে এগোতে ভট্টরাই ভাবল, অজাতনগরে সে যদি এই কমলিকাকে তাদের প্রাসাদ বাতায়নে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখত তাহলে কি সে এমন রোমাঞ্চ অনুভব করতে পারত? না। সময় আর পরিস্থিতি স্তর ভেঙে মানুষকে কত কাছাকাছি এনে দেয়! তার মনে হল, সহজেই সে চাঁদরূপা কমলিকাকে হাতের মুঠোয় ধরতে পারে। পরক্ষণেই সে নিজেকে ছিঃ-ছিঃ করে উঠল। এ পাপ! বিশ্বাসহন্তার পাপ!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%