অমরজ্যোতি মুখোপাধ্যায়
মহামিশ্র প্রাসাদে তাঁর কার্যালয়ে কমলিকার ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। এক সময় পেটিকা হাতে তাকে প্রবেশ করতে দেখে হাসি মুখে প্রশ্ন করলেন, কী! রত্ন ফেরত পেয়েছ?
মৃদু হেসে কমলিকা পেটিকাটি মহামিশ্রের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, শূন্য! রঙ্গমঞ্চে তৃতীয় জনের আবির্ভাব ঘটেছে। সেই সম্ভবত রত্নগুলি হাতিয়েছে। অন্তত জাঙ্কের তো সেইরকমই অনুমান।
মহামিশ্র বললেন, সে আবার কী?
কমলিকা বলল, জাঙ্ককে প্রশ্ন করুন। আমাকে তো সে তাই বোঝাল!
দস্যুটিকে সনাক্ত করা গেছে?
না।
কেন?
আমি করতে চাইনি। আমি চিনতে অস্বীকার করেছি ইচ্ছে করে। জাঙ্কের গল্প আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে হয়নি। আমার মনে হয়, সে ঐ দুজনকে পরিকল্পনা করে হত্যা করেছে। রত্নের বিষয়টি চাপা দেবার জন্য ঐ তৃতীয়জনকে নিয়ে এসেছে। একদিকে অবশ্য সে ঠিক কথাই বলেছে। তৃতীয়জন হচ্ছে সে স্বয়ং। যাহোক ভট্টরাইয়ের সঙ্গে দেখা হল। জাঙ্ক তাকেও অহেতুক ডেকে পাঠিয়েছে! তবে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা হচ্ছে, বিষ্ক আর ভট্টরাই আজ কিছুদিন যাবৎ জাঙ্কের ওপর লক্ষ রাখছে। ওকে একবার ডাকিয়ে সব শুনুন না কেন? মহামিশ্র চিন্তিত ভাবে বললেন, ওরা লক্ষ রাখছে কেন? রাজকীয় গূঢ়-পুরুষেরা কী করছে?
তারা হয়ত তাদের কাজ করছে। ওদের ডেকে প্রশ্ন করলেই সব জানতে পারবেন। আচ্ছা, আমি আসছি। কমলিকা উঠে দাঁড়াল।
মহামিশ্রও উঠে দাঁড়ালেন।—ও! একটা কথা। সম্রাট কয়েক দিনের মধ্যে কণিষ্কপুরের মহাসম্মেলনে যোগদান করতে যাবেন। তুমি আর সত্যা যাচ্ছ। আরও জনা তিনেকের নাম ঠিক করতে বলেছি তাকে। দশ বারোজন দাসদাসী ও সঙ্গে যাবে। সম্রাট ওখানকার প্রশাসকদের অসুবিধার কথা চিন্তা করে বেশি লোকজন সঙ্গে নিতে চাইছেন না।
কমলিকার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আমি কৃতার্থ হব। কমলিকা নিজের কাজে ফিরে গেল।
অপসৃয়মাণ কমলিকার দিকে তাকিয়ে মহামিশ্র ভাবলেন, সত্যিই বুদ্ধিমতী এই কমলিকা। সম্রাট যদি কোনোদিন সাংসারিক জীবনে ফিরে আসেন—তবে এই কমলিকাই হবে সম্রাজ্ঞীর উপযুক্ত। অন্য সব প্রাসাদ রমণীরা সবাই উচ্চ ঘরের হলেও কমলিকার সমকক্ষ কাউকে দেখতে পান না মহামিশ্র। রূপে, গুণে, স্বভাবে, হৃদয় ঔদার্যে সে অতুলনীয়া। কমলিকা ইতিমধ্যেই সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে। অন্যরা যা এযাবৎ কাল পর্যন্ত পারেনি। বাকিটা ঈশ্বরের ইচ্ছা। কমলিকাকে তিনি নির্বাচন করে কণিষ্কপুরে পাঠাচ্ছেন। সম্রাট যে নির্দিষ্ট কোনো প্রাসাদ-রমণীকে তাঁর সঙ্গে যেতে বলবেন—এমনটা নয়। কারণ, তিনি বিভেদ সৃষ্টি করতে চান না। নেহাৎ যেটুকু না হলে চলে না—সেটুকু বলেন এবং তাও মহামিশ্রকে। কমলিকাকে দেখে প্রথম দর্শনেই যে সম্রাট সন্তুষ্ট হয়েছিলেন তা কমলিকার নিযুক্তির অনুমোদনের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পেয়েছে। যা হোক, সম্রাট প্রাসাদ-রমণীদের বিষয়ে যতদূর সম্ভব নিরপেক্ষ থাকাই পছন্দ করেন।
কণিষ্কপুরে চতুর্থ বৌদ্ধ সংহতির উদ্বোধনের দিন সমাগত। সম্রাট কণিষ্কপুরে পৌঁছলেই সম্মেলন শুরু হবে। এখন সম্রাটের আসার জন্য প্রতীক্ষা।
উত্তুঙ্গ পাহাড়ের কোল দিয়ে পথ চলে গেছে। একদিকে পাহাড়। অন্যদিকে অতলস্পর্শী খাদ। দেখলে গা ছমছম করে। যূথবদ্ধ ভাবে সম্রাটের শকটগুলি এবং অন্যান্যেরা এগিয়ে চলেছিল। সর্বপ্রথম একদল অশ্বারোহী সেনা। তাদের পেছনে সম্রাটের রাজকীয় শকট। অঙ্গ-রক্ষকদের দ্বারা বেষ্টিত। সেই শকটের পেছনে যথাক্রমে প্রাসাদ-রমণীরা—দাসদাসীরা। তাদের পরে রসদবাহী কিছু শকট। সর্বশেষে আরও একদল অশ্বারোহী সেনা। পদে পদে বাঁক।
শকটের জানালা দিয়ে দূর পর্বতগুলির দিকে তাকিয়েছিল কমলিকা। পীরপাঞ্জাল পর্বতশ্রেণির শিখরে শিখরে তুষার আবরণ। সুনীল আকাশ। কোথাও বা পাহাড়ের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে ঝর্ণা ধারা। নিচে সবুজ উপত্যকা ভূমি। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য কমলিকা আগে কখনো দেখেনি। চন্দ্রভাগার তীরে তার অজাত নগরের সৌন্দর্য ভিন্নধর্মী। সেখানেও রয়েছে পাহাড়ের সারি। তারই মধ্য দিয়ে ভীম গর্জনে ছুটে চলেছে চন্দ্রভাগা। বর্ষায় তা ফুলে ফেঁপে ওঠে। শীতে হিমালয়ের বরফের স্তূপ ভাসে। সে নদী কোথাও অগভীর। কোথাও গভীর। কোথাও বা তীব্র খরস্রোতা, সংকীর্ণ। আবার কোথাও গভীর শান্ত—প্রশস্ত! স্বচ্ছ কাকচক্ষু জল। তলের নীচের নুড়িপাথরগুলি পর্যন্ত দেখা যায়। প্রায় আড়াইশত বছর আগে যবনবীর আলেকজান্ডার এই নদী পার হতে গিয়ে প্রবল ক্ষয়ক্ষতির সামনা-সামনি হয়েছিলেন। তবুও চন্দ্রভাগা তিনি পার হন।
কমলিকা জানে, কণিষ্কপুরের অদূরেই রয়েছে সম্রাট অশোকের শ্রীনগর। চিনার গাছের ছাওয়া, সেই নগর অজস্র হ্রদ—উদ্যান-ঝর্ণায় শোভিত। গ্রীষ্মে যখন উপত্যকায় ফুল ফোটে—সারা উপত্যকা যেন হেসে ওঠে। নীল চক্ষু হ্রদে আকাশের ছায়া। মনে হবে যক্ষিণী, কিন্নরীরা এখানেই জল বিহার করে। বরফগলা জলে পূর্ণ থাকে বিতস্তা। কশ্যপপুরার মাঝ দিয়ে বয়ে চলে সিন্ধুর উদ্দেশ্যে।
শকটের মধ্যে তখন নিস্তব্ধতা। সবাই প্রকৃতির সৌন্দর্যে বিভোর—মুগ্ধ।
মন্ত্রী ইউনাসের পুত্রী জানুকা একটু নড়ে চড়ে বসল। সে লক্ষ করছিল কমলিকাকে। এক সময় সে তাকে ব্যঙ্গ করে সত্যাকে বলে উঠল, দেখ, সত্যা! কমলিকা বোধহয় সম্রাটের ধ্যান করছে।
সত্যা বিরক্ত হল। বলল, তাই যদি করে তবে অন্যায়টা কী? আমরা সবাইতো কায়মনোবাক্যে সম্রাটেরই ধ্যান করছি। নচেৎ এখানে আসলি কেন? অবশ্য তোরা বলতে পারিস, সম্রাটের কৃপা না পেলে তোদের উপযুক্ত পাত্র তোদের বাবা-মা-ই জুটিয়ে দেবে। এই মেয়েটির কী হবে? ওর যাবার জায়গাই বা কোথায়? ওর যা রূপ—যা দেহের সৌষ্ঠব তাতে বুভুক্ষু পুরুষগুলো একলা পেলেই তো ওকে ছিঁড়ে খাবে। সুতরাং, সম্রাটের ধ্যান করা ছাড়া ওর উপায় বা কী? তোদের ভাল না লাগলে পড়ে আছিস কেন এখানে? চলে যা না বাপের বাড়ি…!
বল্লভী বলে উঠল, ইস আর কী! আমরা সরে যাই আর ও সম্রাটকে দখল করুক। কী সুন্দর কথা!
জানুকা বলল, তা সত্যা, তুই বা কেন পড়ে আছিস? তুই গেলে আমাদের অন্তত একজন প্রতিযোগী কমে!
সত্যা বলল, যাবই তো! তোদের একজন যেদিন সম্রাটের কোলে চড়ে বসবি—সেদিনই আমি পালাব। উপপত্নী হবার জন্য এখানে পড়ে থাকব না। আমার একজন প্রেমিক আছে—জানিস তো! বেচারি মুখ শুকনো করে মাঝে মাঝে প্রাসাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। আমার বড় কষ্ট হয় রে!
বল্লভী বলল, আহা! মরি মরি! তা পালাচ্ছিসই বা না কেন?
বাবার ভয়। পালিয়ে যাব কোথায়? বাবার হাতের নাগাল ছাড়াতে পারব? তাঁর হাত কী কম লম্বা! আমাকে সম্রাজ্ঞী করার কত সখ! বাবার ইচ্ছে, সম্রাট যদি কপালে না জোটেও—তবে যে কোনো রাজপুরুষকে ধরে ঝুলে পড়তে হবে। ওসব গান্ধার শিল্পী-টিল্পী চলবে না!
জানুকা আর বল্লভী বলল, বেচারা!
সত্যা বলল, বেচারাই বটে! তবু আমার আশা ছাড়বে না। ও জানে না, আমাদের বাবারা কত স্বার্থপর। মেয়েদের জীবনের সুখ-শান্তির কোনো মূল্য নেই ওদের কাছে। ওরা জানে, মেয়েরা যদি সম্রাটকে গাঁথতে সফল হয় তাহলে তাদের ভাগ্যও সফল হবে। রাজ্য শাসনের সুখ আস্বাদন করতে পারবে। প্রয়োজনে তাঁরা অবাধ্য মেয়েকে হত্যাও করতে পারে।
আনন্দের মধ্যে যেন এক বিষাদ ঘনিয়ে এল। কমলিকা তা লক্ষ করে পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বলল, এসব আলোচনা থাক। এখনও সময় আছে। যৌবন যাবার আগে রণে ভঙ্গ দেওয়াই বুদ্ধিমতীর কাজ হবে। নইলে হয়ত একুল-ওকুল দুকূলই যাবে। সম্রাটের জন্য আমরা আজীবন কুমারীব্রত নিয়ে বসে থাকব—এমন কথাটাও আমরা নিশ্চয় কেউ ভাবিনি। যদি ভেবে থাকে কেউ—তবে তা স্বতন্ত্র ব্যাপার। হয় সম্রাট, নয় অন্য কোনো রাজপুরুষ—আর নয়ত আমার মতো শুধুই সম্রাটের ধ্যান কর। আমার তো যাবার অন্য কোনো জায়গা নেই। পাত্র খুঁজে আমার বিয়ে দেবারও কেউ নেই। আমি কারোকে ঈর্ষা করি না। তোরাও নিশ্চয় আমায় করিস না। সবই ভাগ্য! নইলে আমার এ অবস্থা কেন হবে। রাগ করিস না, ধনজনমানে আমিও তো কিছু কম ছিলাম না!
সত্যা বলল, তুই একটি বোকা। মহামিশ্রের কাছে আমি শুনেছি, তোদের বিশাল ভূসম্পত্তি তুই অবহেলায় আচার্য চরকের আশ্রমকে দান করে দিয়েছিস। কেন? নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবলি না?
কমলিকা বলল, সত্যি বলতে কি আমার চাহিদা অল্প। আমার যেটুকু অলংকার আছে তা বেচে কষ্টেসিষ্টে আমার দিন চলে যাওয়ার কথা। আসলে আমি যা চেয়েছিলাম, তা হচ্ছে এক নিরাপদ আশ্রয়, আর সামান্য একটি কর্ম। মহামিশ্র আমাকে তোদের দলে যুক্ত করেছেন ঠিকই। আসলে আমি তাঁর কাছে একটি সভ্য-ভব্য কর্মের জন্যই অনুরোধ জানিয়েছিলাম। আমি তাই নিজেকে ঠিক প্রাসাদ-রমণীদের একজন বলে ভাবতে পারি না। ভাবি এটিই আমার কর্ম। মহামিশ্রের সহযোগী। সুতরাং…। বিষণ্ণ হয়ে লাভ নেই।
কমলিকা হাসল। সবাই হাসল।
.
অপরাহ্নে সম্রাট পৌঁছলেন কণিষ্কপুরে। চারদিকে সাড়া পড়ে গেল। তটস্থ হয়ে উঠল কর্মচারীরা।
আগাম সংবাদ পেয়ে কণিষ্কপুরের প্রশাসক শিবির প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। বৃত্তাকার সেই ব্যবস্থা। কেন্দ্রে সম্রাটের বিশাল শিবির। যতদূর সম্ভব রাজকীয় সাজসজ্জার ও উপকরণের ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। সম্রাটের শিবির ঘিরে চার প্রাসাদ-রমণীদের শিবির। সেই শিবিরকে ঘিরে দাসদাসীদের শিবির। এরপর যথাক্রমে দেহরক্ষীবাহিনী আর সর্বশেষে সেনাবাহিনী।
সম্রাট শকট থেকে নেমে নিজের শিবিরে প্রবেশ করলেন। তাঁর সঙ্গে প্রবেশ করল কয়েকজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারি এবং বৌদ্ধ সংঘের অশ্বঘোষ, বসুমিত্র, সংঘ-রক্ষিত আদি বৌদ্ধ শ্রমণেরা। মহামিশ্রের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন কণিষ্কপুরেরই এক উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারি। সম্রাট তাঁকেই তাঁর শিবিরসজ্জা ও অন্যান্য বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে অতিথিদের সঙ্গেই আগামী কালের সভাস্থল দেখতে বেরিয়ে পড়লেন।
সম্রাট বেরিয়ে যাবার পরই রাজপুরুষটি প্রাসাদ-রমণীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলল, দেবীরা! সম্রাট তাঁর শিবিরসজ্জার জন্য নির্দেশ দিয়ে গেছেন। বলেছেন, দেবী কমলিকা যেন তাঁর শিবিরটি সজ্জিত করে অন্যান্য দেবীদের সহায়তায়। আর আপনারা সম্রাটের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি তো জানেনই। আমি বিরুপাক প্রয়োজনে আমায় ডেকে পাঠাবেন।
বিরুপাক বিদায় নিতেই সত্যা যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল কমলিকার ওপর।–তুই কি জাদু করেছিস সম্রাটকে! কক্ষ-সজ্জা তুই ছাড়া হয় না?
কমলিকা সত্যার ঠাট্টা বুঝতে পেরে রাগ করল না। বলল, “আমি তো কক্ষ-সজ্জা করার অধিকারিণী। সম্রাটের শয়ন-শয্যাটির দায়িত্ব কিন্তু আমার নয়। ও দায়িত্ব তোমরা কেউ নিতে পার।”
কপট ক্রোধে সত্যা বলল, “দাঁড়া! মজা দেখাচ্ছি।”
সম্রাটের শিবিরটি বিশাল। রাজপ্রাসাদের অনুকরণেই রঙিন মোটা কার্পাস বস্ত্র দিয়ে শিবিরটির অভ্যন্তরভাগ নানান কক্ষে ভাগ করা হয়েছে। শয্যাকক্ষ, স্নানকক্ষ, আহারকক্ষ, দর্শনদানের কক্ষ, পরামর্শকক্ষ…।
সত্যা, জানুকা আর বল্লভী অন্যান্য দিকে নজর দিল। শয্যাকক্ষ নিয়ে পড়ল কমলিকা। সম্রাট ফুল ভালোবাসেন, তাই নানান রঙের ফুলের এক সম্ভার রাখা ছিল কক্ষে। কমলিকা দ্রুত চিন্তা করল, সম্রাট এখন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসেছেন। কক্ষে এক ধর্মীয় বাতাবরণ সৃষ্টি করাই তার উচিত হবে। পবিত্র ফুল গাঁদা—দেবার্চনায় ব্যবহৃত হয়। কমলিকা গাঁদা আর বুদ্ধ-প্রতীক পদ্ম ফুলগুলোকে আলাদা করে নিল। নতুন ছন্দে, নতুন ছাঁদে সে গড়ে তুলল পুষ্পস্তবকগুলো। আজ কামনার প্রতীক গোলাপ নয়। অন্যান্য ফুলগুলোকে সে শিবিরের নানা স্থানে ব্যবহার করল। এক সময় সে ক্লান্তও হয়ে উঠল। বিশ্রামের জন্য অন্য সকলের সঙ্গে নিজেদের শিবিরে ফিরে গেল। স্নানাহার করতে হবে। এখানে পা রাখা অবধি সে সুযোগ তারা কেউই পায়নি। সম্রাট স্নান সেরে গেছেন। আহার করেন নি। হয়তো সভাকক্ষে অন্যান্য সকলের সঙ্গে তা করে থাকতেও পারেন।
বল্লভী যেন মুখিয়ে ছিল। “বাসর সাজানো হল? হায়! ডাক তো এল না। বৃথা যায় নিশিদিন।”
সত্যা বিরক্ত হয়ে বলল, “আবার শুরু করেছিস, বুঝেছি। যৌবন জ্বালায় জ্বলছিস। সম্রাট নয়, যেকোনো পুরুষ এখন তোদের কাম্য। পুরুষপুরে ফিরে আমি মহামিশ্রকে বলব।”
বল্লভী বলল, “আহা! একটু ঠাট্টা তামাশা করেও কি নিজেদের একটু স্থির করতে পারব না? পুরুষের আদর খাবার বয়স কি আমাদের হয়নি? তুই যেমন বলছিস! দেখিস।” ভ্রূকুটি করল বল্লভী। “আমরা তো ফুটন্ত ফুল। মৌমাছির ছোঁয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। এর মধ্যে লুকোচুরির কী আছে?”
সত্যা বলল, “মর! চল—চল। স্নানাহার সেরে নে। সম্রাট ফিরলে আবার ওদিকে ছুটতে হবে।”
.
কণিষ্ক যখন ফিরলেন তখন সূর্য অস্ত গিয়ে আঁধার ঘনিয়ে এসেছে। কিছু পরেই চাঁদ উঠবে। সম্রাট নিজেও ক্লান্তি অনুভব করছিলেন। পথে ঠিক বিশ্রাম পাননি। বরফ শোভিত পীর-পাঞ্জালের শোভায় বিভোর হয়েছিলেন। তারপর তো শিবির থেকে বেরিয়েই সভাগৃহ। নানান আলোচনা। পাঁচশতাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত হয়ে গেছে। তাদের আহার-বাসস্থান সম্পর্কে অনুজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর দান। উদ্বোধনের বিষয়সূচি প্রণয়ন করা। দেশ-দেশান্তরে পাঠাবার জন্য দূতদের নাম সংকলন করা। মহাপুরুষদের নানান দেহ সৌষ্ঠব অবলম্বন করে গান্ধার শিল্পীদের দ্বারা বোধিসত্ত্ব ও শেষ বোধিসত্ত্ব অর্থাৎ বুদ্ধের দুটি মূর্তি প্রস্তুত করে ঢেকে রাখা হয়েছে। বুদ্ধের মূর্তি নির্মাণ কার্য অনুমোদিত হলে মূর্তি দুটির আবরণ উন্মোচন করা হবে। অতঃপর পৃথিবীর যাবতীয় বুদ্ধমূর্তি এই মূর্তির অনুকরণে প্রস্তুত করা হবে। ফলে, বুদ্ধের বিবিধ মূর্তির জটিলতা আর থাকবে না। প্রতিটি জাতক কাহিনিকে চিত্রায়িত অথবা খোদিত করা হবে।
ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের সেই মূর্তি আচ্ছন্ন করে রেখেছে সম্রাটকে। বুদ্ধের সেই মূর্তির কথা স্মরণ করতে করতে সম্রাট তাঁর শিবিরে প্রবেশ করলেন। শয্যাকক্ষে প্রবেশ করে বিস্ফারিত হলেন ফুলসজ্জা দেখে। গাঁদা ফুলের পুষ্পস্তবক আর একটি কাঠের বেদির ওপর রাখা একটি বড় পদ্ম সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সম্রাট যেন দেখতে পেলেন পদ্মাসনে বসে রয়েছেন ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ। কক্ষের এই ধর্মীয় পরিমণ্ডল সম্রাটকে মুগ্ধ করল। পদ্মফুলটির সামনে ভূমিতে বসেই সম্রাট বুদ্ধকে প্রণতি জানালেন।
সম্রাট কতক্ষণ এভাবে বসেছিলেন—ঠিক তা জানেন না। এক সময় এক পরিচারিকার পায়ের শব্দে বাস্তবে ফিরে এলেন।
“সম্রাট সম্ভবত আজ অভুক্ত রয়েছেন। তাই প্রাসাদ-রমণীরা আপনাকে আহার গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছে।”
সম্রাট সত্যিই ক্ষুধার্ত বোধ করলেন। বললেন, “চল। আমি আসছি।”
আহার সেরে শয্যায় আশ্রয় নিয়ে সম্রাট আজ এক অস্বস্তিবোধ করলেন। তাঁর চোখের সামনে হঠাৎ ভেসে উঠল কমলিকা। তিনি ভাবলেন, কেমন করে এই রমণী তাঁর পছন্দ-অপছন্দের কথা জানল? সম্রাট এই মুহূর্তে নিজের কাছে অনেক খোলামেলা হয়ে উঠলেন। তিনি আপাত নির্লিপ্ত হলেও অস্বীকার করতে পারেন না যে তিনি কমলিকাকে কিছুদিন যাবৎ লক্ষ করছেন। তার প্রশান্ত ব্যক্তিত্বব্যঞ্জক মুখটি, তাঁর আয়তচোখের গভীর দৃষ্টি যেন বারবার অলক্ষ্যে তাঁকে বিদ্ধ করে। শব্দহীন স্বরে কমলিকা যেন তাঁকে কিছু নিবেদন করতে চায়। কমলিকা কাছাকাছি উপস্থিত হলে তাঁর ভেতরে সম্প্রতি যেন কেমন এক কম্পন জাগে। অথচ অন্যান্য প্রাসাদ-রমণীদের কেমন যেন যন্ত্রবৎ বলে মনে হয়। তাঁদের কাজে তিনি কোনো প্রাণের সাড়া পাননি। কিন্তু কেন, মণিকার পুত্রীর ক্ষেত্রে তাঁর এই বিশেষ অনুভব?
একসময় সম্রাট সচেতন হয়ে উঠলেন। ভাবলেন, না। এ অন্যায়! তিনি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। শীঘ্র তিনি প্রাসাদ-রমণীদের গৃহে ফিরে যেতে বলবেন। বৃথা এক আশায় তারা নিজেদের রূপ-যৌবন নষ্ট করছে দিনের পর দিন। কারোকে অহেতুক আশা দেওয়া এক অপরাধ। বুদ্ধ যেন তাঁর এই অপরাধ ক্ষমা করেন। সম্রাট পদ্মফুলটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়লেন।
.
পরের দিন সভাগৃহ বৌদ্ধ প্রতিনিধিরা পূর্ণ করে তুলল। প্রভাতে ত্রিশরণ মন্ত্রে মুখরিত হয়ে উঠল কণিষ্কপুরের আকাশ বাতাস। সম্রাট, অশ্বঘোষ, বসুমিত্রের নামে জয়ধ্বনি উঠতে থাকল। বহুকষ্টে অশ্বঘোষ দর্শকদের চুপ করিয়ে বললেন, “আজ এই পবিত্র দিনে সম্রাট কণিষ্ক এই মহাসম্মেলন উদ্বোধন করতে গিয়ে আপনাদের উদ্দেশ্যে দু’চার কথা বলবেন। আপনারা সম্রাটকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে তাঁকে তাঁর ভাষণ দান করার সুযোগ করে দিন।”
সম্রাট মঞ্চে তাঁর ভাষণ রাখতে উঠলেন। সম্রাট বললেন, “আজ এই চতুর্থ বৌদ্ধ সংহতি উদ্বোধন করতে এসে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। এর পূর্বে আরও তিনটি বৌদ্ধ সংহতি হয়ে গেছে তা আপনারা নিশ্চয় জানেন। প্রথমটি বুদ্ধের মৃত্যুর অব্যবহিত পরে রাজগৃহে সপ্তপর্ণী গুহায় সংঘটিত হয়েছিল। তারপর বৈশালী, পাটলিপুত্র এবং আজ কণিষ্কপুরে। কিন্তু প্রথম দিন থেকে যে জটিলতা দেখা দিয়েছিল তার কোনো মীমাংসা তো হয়নি, বরং বহুগুণে বেড়ে গেছে। কারণ, বৌদ্ধধর্মের অনুরাগীদের সংখ্যা তখন কম ছিল—আজ তা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন বহির্ভারতীয় ধর্মের সঙ্গেও তাকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আমার বিশাল সাম্রাজ্যে রয়েছে ভিন্ন-ভিন্ন জাতি, যেমন যবন—গ্রীক, সুমেরীয়, এলামাইট, মিথরেইক, জরাথ্রুষ্টবাদী, নির্গ্রন্থ এবং হিন্দু বা সনাতনধর্মীরা। তাদের ভিন্ন ভিন্ন প্রথা, আচার-আচরণ, বিশ্বাস। প্রতিবেশী হিসাবে রয়েছে রোমকরা—তারাও যবন আর সনাতনপন্থীদের মতোই পৌত্তলিক। কিন্তু রোম বা ঐ অঞ্চল ঘিরে খ্রিস্ট নামে নতুন এক ধর্মের উদ্ভব ঘটেছে। আজ এইসব জাতি বা ধর্মের মানুষের সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ এবং ওঠাবসা। শক-পহ্লবেরা আজ এদেশেরও অধিবাসী। তাই এদের প্রভাবও আমাদের ধর্মের ওপর পড়ে নিত্য নতুন অভিঘাত সৃষ্টি করছে। ফলে, কালের নিয়মে বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর থেকে প্রধানত দুটি মতবাদের সংঘাতেই আমাদের ধর্ম এগিয়ে চলেছে—সেটি থেরবাদ এবং মহাসংঘিক। আজ আমাদের এই দুটি মতবাদের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে না পারলে আমরা বিপর্যয়ের মুখোমুখি হব। বুদ্ধকে বিশ্বমানবের মুক্তিদাতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হব।
আমি বৌদ্ধপণ্ডিত বা দার্শনিক নই। আমি যোদ্ধা। রাজনীতিক। এই সমস্যার সমাধান করবেন আমার সাম্রাজ্য থেকে আগত বিভিন্ন পণ্ডিতেরা এবং পুরুষপুর মহাসংঘের নেতা অশ্বঘোষ, বসুমিত্র এবং সংঘরক্ষিত প্রমুখ পণ্ডিতেরা। বুদ্ধের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি এবং সম্মেলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য বুদ্ধচরিত প্রণেতা অশ্বঘোষকে অনুরোধ জানাচ্ছি।”
সম্রাট নিজের আসনে ফিরে গেলেন।
অশ্বঘোষ উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন: “ভগবান বুদ্ধের জীবনকথা আপনারা সবাই জানেন। আমি আবার তা উল্লেখ না করেও বলতে চাই, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর স্বরূপ দেখে মানবপ্রেমী বুদ্ধ চিন্তিত হয়ে এই ত্রয়ী কষ্টের হাত থেকে মানবকে উদ্ধার করার পথ খুঁজতে থাকেন। তিনি সংসার ত্যাগ করে যৌবনবতী স্ত্রী যশোধারা এবং পুত্র রাহুলকে ত্যাগ করে পথে এসে নামেন। পরিশেষে তিনি গয়ার কাছে উরুবিল্ব গ্রামে এক বটবৃক্ষের নীচে ধ্যানস্থ হয়ে বোধি লাভ করে বুদ্ধ হয়ে ওঠেন। সেসব আজ থেকে প্রায় পাঁচশত বছর আগেকার কথা। একে একে মানুষ তাঁর প্রচারিত সত্যের আলোকে আলোকিত হয়ে উঠতে থাকে। বুদ্ধ হয়ে ওঠেন মানবের মুক্তিদাতা। দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে তাঁর বাণী। বুদ্ধের পথ হয়ে উঠল বেদ বিরোধী। যাগযজ্ঞ নয়। সরল সাধারণ জীবনযাত্রার পথেই বুদ্ধ নির্দেশ করলেন মানব মুক্তি। পুনর্জন্মের কষ্টের হাত থেকে তিনি মানবকে দেখালেন মহানির্বাণের পথ। এ পর্যন্ত সবই ঠিক আছে। সমস্যা দেখা দিল তাঁর মৃত্যুর পর। বুদ্ধের সব উপদেশ এবং কথাবার্তা—সবই ছিল অলিখিত। ফলে সঠিক, বেঠিক নিয়ে তর্ক শুরু হল। রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহার সম্মেলন সেই সমস্যার সমাধান করতে পারল না। বৌদ্ধরা স্পষ্টতই দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। থেরবাদী এবং মহাসংঘিক যা আজ মহাযান নামে খ্যাত। আর একটি সমস্যার উদ্ভব ঘটল—তা হচ্ছে বুদ্ধের মূর্তি পূজা। বুদ্ধ স্বয়ং একদা নিজের মূর্তি পূজার সমর্থন করেন নি। তিনি ব্যক্তি মানুষের মুক্তির পথ নির্দেশ করেছিলেন। কিন্তু মহাযানীরা মনে করেন তিনি ব্যষ্টির মুক্তির পথ প্রদর্শক। যাহোক, অধিকাংশ বুদ্ধশিষ্যেরা এখন মনে করেন যে বুদ্ধের মূর্তির প্রয়োজন। এবং বিভিন্ন দেশে তার রূপ একই হওয়ারও প্রয়োজন। ভারতবাসীর কাছে নিরাকারের সাধনা করা সহজসাধ্য। কারণ, এখানে ব্রহ্মচর্চা রয়েছে এবং তা আছে পৌত্তলিকদের সমান্তরাল ভাবেই। কিন্তু বিদেশীদের কাছে তা একটু দুরূহ ব্যাপার। কারণ বহির্ভারতে বেশির ভাগ ধর্মের মধ্যে রয়েছে মূর্তি পূজা। সেই মূর্তির দাবি আমাদের মধ্যেও উঠছে। গান্ধার-শিল্পীরা তাঁদের মনোমত মূর্তি রচনায় হাত দিয়েছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে বুদ্ধের এবং বোধিসত্ত্বের কোনো মূর্তি অনুমোদিত না হলে অসুবিধার কারণ হবে। স্থান বিশেষে—দেশ বিশেষে বিভিন্ন রকমের মূর্তি হবে—এ হয় না। তাই আমরা কেন্দ্রীয় ভাবে বুদ্ধ ও বোধিসত্ত্বের মূর্তি নির্মাণ করিয়েছি। অতঃপর বুদ্ধের অপরাপর মূর্তি এই মূর্তির অনুকরণেই হবে। আমি সম্রাটকে অনুরোধ করব—মূর্তি দুটির আবরণ উন্মোচন করতে।”
সম্রাট মূর্তি দুটির আবরণ উন্মোচন করলেন।
সভাগৃহ পদ্মাসীন ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি দেখে আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। বুদ্ধের পবিত্র নামে সভাস্থল পূর্ণ হল।
দর্শকেরা একটু শান্ত হলে অশ্বঘোষ বললেন, “আজ থেকে আমাদের ধর্মে দুটি ভাগ হল, হীনযান এবং মহাযান। এসবের ব্যাখ্যা তো আপনারা আগেই শুনেছেন। যাঁরা বুদ্ধের আদি উপদেশেই বিশ্বাস রাখেন তাঁরা হীনযানী, কারণ সংখ্যায় তাঁরা অল্প। আর আমরা মহাযানী বা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পূর্ব ভারত, দক্ষিণ ভারত, তাম্রপর্ণী, সুবর্ণভূমি—এঁরা হীনযানী। উত্তর ও বহির্ভারত—হিমালয় সংলগ্ন দেশ অতঃপর মহাযানী সম্প্রদায়ভুক্ত হল।”
সভার সকলে অশ্বঘোষকে অনুমোদন করল।
অশ্বঘোষ আসনে ফিরে যেতে বসুমিত্র উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বললেন, “আরও একটা কথা। এ পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র পালি ভাষায় লিপিবদ্ধ হয়ে এসেছে। এবার থেকে আমরা সংস্কৃত ভাষা ব্যবহার করব। অতঃপর আমরা শাস্ত্র নিয়ে বিতর্কে যাব—এবং যথারীতি টিকা-টিপ্পনীও প্রস্তুত করা হবে। এই টিকা-টিপ্পনীগুলি একত্রিত করলে তা ‘মহাভিভায্য’ নামে পরিচিত হবে।”
সম্রাট বললেন, “এবার আমায় শিবিরে ফিরে যাবার অনুমতি দিন। কারণ, আমি রাজনীতিক। ধর্মশাস্ত্রে আমার কোনো দক্ষতা নেই। মহাপণ্ডিত-দার্শনিকেরা এখানে আছেন। তাঁরাই আলোচনা করে সিদ্ধান্তে আসুন। তাঁদের সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাব।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন