সোনাঝরা গল্পের ইনকা

শৈলেন ঘোষ

আমার নাম? না, থাক। আমার নামটা নাহয় এখন নাই শুনলে। সময় হলে জানতেই তো পারবে। এখন শুধু জেনে রাখো, আমি একজন ইনকা। যদি ‌ইনকা‌ বললেও আমাকে তোমরা চিনতে না পার, তবে নাম বললেও হয়তো আমাকে চিনবে না। এমনকী আমি যদি এখনই তোমাদের সামনে দাঁড়াই, আমাকে তোমরা দেখতেও পাবে না। কারণ আমি প্রায় পাঁচশো বছর আগের এক মানুষ। এই পৃথিবীর কোন মানুষটাই-বা পাঁচ-শো বছর বেঁচে আছে? কেউ না। সুতরাং আমিও বেঁচে নেই। আমি যদি বেঁচে থাকতুম, তবে নিশ্চয়ই আমার হাতটি বাড়িয়ে দিতুম তোমাদের দিকে। হাত ধরে তোমাদের নিয়ে যেতুম সেই দেশে, যে-দেশের মানুষ বিশ্বাস করত ক্লান্ত সূর্যের ঘাম ঝরে সৃষ্টি হয় সোনা। চাঁদের টুপটাপ চোখের জলে জন্ম নেয় রুপো। তারপর ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর বুকে। একদিন সত্যি সত্যি সূর্যের এই ক্লান্তি-ঝরা সোনা দিয়েই গড়ে উঠেছিল আমার দেশ। সোনা, শুধুই সোনা। যেদিকেই চোখ ফেরাও, দেখবে সোনা তাল তাল। ছড়িয়ে আছে রাজপ্রাসাদে, নয়তো মন্দিরে কিংবা মৃত সম্রাটের ‌মমি‌-র পাশে।

হ্যাঁ, এই সোনার দেশেই আমার জন্ম। জন্মেছিলুম এক রাজবংশে। যে-রাজবংশের রাজপুরুষরা এক দুর্গম পর্বতের কোলে গড়ে তুলেছিল অবাক জগতের এক আশ্চর্য রাজ্য। সেই রাজ্যের রাজধানীটিও ছিল ওই পর্বতেই। কঠিন পাথর ভেঙে গড়ে উঠেছিল সেই রাজধানীর রাজপ্রাসাদ। গড়ে উঠেছিল কত মন্দির, পান্থশালা। কত দুর্গ-রাজপথ-অস্ত্রাগার। অথচ শুনলে অবাক হবে, আমাদের দেশে টাকার চল ছিল না। আমরা জানতুম না লোহা কাকে বলে। জানা ছিল না চাকা কী! এমনকী বলতে লজ্জা নেই, আমরা পড়তেও জানতুম না, লিখতেও পারতুম না। লিখবই-বা কেমন করে! আমাদের লেখা বা পড়ার কোনো অক্ষরই ছিল না। তাই বলে যেন মনে কোরো না আমরা কথা বলতে পারতুম না। মনে কোরো না, বুঝি আমরা ইশারা-ইঙ্গিতে কাজ সারতুম। না, তা মোটেই নয়। তা যদি হত তাহলে তোমাদের এত কথা বলতে পারতুম কী করে? হ্যাঁ, ভাষা আমাদের ছিল, তবে সে শুধু কথা বলার ভাষা। সে-ভাষার নাম দিয়েছি আমরা ‌কোয়েচুয়া‌। আরও শুনলে অবাক হবে, আমাদের যেমন লেখার কোনো অক্ষর ছিল না, তেমনই ছিল না হিসেব কষার সংখ্যাও। তাই আমরা জানতুম না অঙ্ক কেমন করে কষতে হয়। এখন তাহলে নিশ্চয়ই ভাবছ আমরা অঙ্কে গোল্লা। মোটেই না। আমরা হিসেব রাখবার জন্য এক ধরনের সুতো ব্যবহার করতুম। সে-সুতোর নানান রং। নানান রঙের সুতোয় নানা ধরনের গিঁট বেঁধে আমরা সব হিসেবই রাখতে পারতুম। বলে দিতে পারতুম কে কবে জন্মেছে, কবে কার মৃত্যু হয়েছে। বলা যেত অস্ত্রশালায় কত অস্ত্র আছে, কিংবা ভাঁড়ারে খাদ্য মজুত আছে কতটা। এমনকী এই রঙিন সুতোয় গিঁট বেঁধে নানা খবরও পাঠানো হত আমাদের রাজ্যের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। সে এক আশ্চর্য সংকেত।

আমাদের এই রাজবংশটি গড়ে উঠেছিল যে পর্বতমালার বুকে, তার নাম আন্দিজ। পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা এই পর্বতমালা। ওই দেখা যায় প্রশান্ত মহাসাগর। মহাসাগরের উত্তাল ঢেউগুলি উথালিপাথালি আছড়ে পড়ছে তার তীরে তীরে। এই তীর ঘেঁষে কোথাও-বা মরুভূমি, কোথাও বৃষ্টিভেজা ঘন অরণ্য। নয়তো অরণ্য পেরিয়ে কঠিন পাথরের দেশ এই আমাদের জন্মভূমি আন্দিজ। এই পাথর ডিঙিয়ে আরও ওপরে চলো, দেখবে তুষারের মুকুট পরে ঝলমল করছে আন্দিজের চূড়াগুলি। চোখ জুড়িয়ে যায়, মনে হবে বার বার দেখি, আরও দেখি। তবু যেন মন ভরে না।

আমাদের পূর্বপুরুষের কথা শুনলেও যে তোমরা আমাদের খুব-একটা সভ্যভব্য মানুষ বলে মনে করবে, এই আশা আমি মোটেই করি না। কেননা, আজকের মানুষের মতো তাদের তো আর ঘরবাড়ি ছিল না। তারা বাস করত আন্দিজের জঙ্গলে, গুহায়। বাস করত জন্তুর মতো। কী ভয়ানক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে তাদের। আন্দিজের বুকে যেমন ঠাণ্ডা, মরুভূমির বালিতে তেমনই তাপ। তাদের সারাজীবন লড়াই করতে হয়েছে এই ঠাণ্ডা আর তাপের সঙ্গে। খেতে হয়েছে ঘাস-পাতা। আর যখন খিদে পেত খুব, কিছুই পাওয়া যেত না, তখন মানুষই খেত মানুষের মাংস। অবশ্য সে অনেক অনেক বছর আগে। তা কম করে চার হাজার বছর তো হবেই।

সেই অনেক অনেক বছর আগেরও আগের কথা। ধরো পৃথিবীতে তখন একটিও মানুষ ছিল না। তখন প্রথম কে এসেছিলেন এখানে জান? ভিরাকোচা। আমরা মনে করি তিনিই প্রথম মানুষ। তাঁকে নিয়ে আমাদের কত গল্প মুখে মুখে চলে আসছে। তিনিই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁরই আদলে এই পৃথিবীর মানুষকেও গড়েছেন। আন্দিজ পর্বতের অনেক ওপরে একটা হ্রদ আছে। আমরা ডাকি টিটিকাকা। যেমন মস্ত লম্বা, তেমনই অ্যাইসা চওড়া এই হ্রদ। হ্রদের মধ্যে মধ্যে জলের ওপর এখানে-ওখানে দ্বীপ মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কত গুহা। হ্রদের এই এমনই একটি দ্বীপের তীরেই দেখা দিয়ে প্রথম মানুষ গড়লেন ভিরাকোচা। কী করে বাঁচতে হয় সেটিও তিনি মানুষকে শিখিয়ে দিলেন। তাদের মুখে ভাষা দিলেন। তারপর তিনি যখন অনেক বুড়ো হয়ে গেলেন, মানুষের কাছে বিদায় নিলেন। পার হলেন একটির পর একটি আন্দিজের চূড়া। তিনি নেমে এলেন সাগরতীরে। এই সাগরতীরেই তিনি মানুষের কাছে তাঁর শেষ বিদায় জানালেন। তারপর সাগরের জলের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মানুষের চোখের আড়ালে হারিয়ে গেলেন। আর তাঁকে দেখা গেল না। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করতুম আমাদের বিপদ এলে তিনি আবার আসবেন, তিনি আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন, আমাদের রক্ষা করবেন।

হ্যাঁ, তিনি এসেছিলেন। আমাদের বিপদের দিনেই এসেছিলেন। এসেছিলেন ওই সাগরের ওপর দিয়েই। তবে একজন নয়, অসংখ্য ভিরাকোচা। হাজার হাজার বছর ধরে ভিরাকোচা নামে যে-দেবতার মূর্তিটি আমরা পূজা করে এসেছি, এই অসংখ্য ভিরাকোচাদের মূর্তি কিন্তু তেমন না। এই ভিরাকোচারা আমাদের বিপদ থেকে রক্ষা করতে আসেননি। এসেছিলেন আমাদের জন্য এক ভয়ংকর বিপদ সঙ্গে নিয়ে। সেই গল্পই আমার গল্প। আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগের সেই আমার গল্পের কথা।

সেই অসংখ্য ভিরাকোচার গল্প এখন থাক। সেই গল্প বলার আগে যে আরও কিছু কথা শুনিয়ে রাখতে হবে তোমাদের। তা না হলে আমাদের সেই ভয়ংকর বিপদ যে কেমন করে হল, সে তোমরা জানবে কেমন করে! আমাদের এই আন্দিজ পর্বতের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে কত মানুষই-না বাস করত। পর্বতের এক-এক শিখরে এক-এক দল। যত দল তত রেষারেষি। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারত না। খুচখাচ ঝগড়াঝাঁটি লেগেই ছিল। কখনো-সখনো এমন লাগত, রক্তারক্তি কান্ড ঘটে যেত। কিন্তু আমাদের দেশের সবসেরা মানুষটি যখন সিংহাসনে বসলেন, তখন কোথায় দল আর কোথায় ঝগড়া! তিনি এলেন, অমনিই সঙ্গে সঙ্গে যেন নদীতে বান ডাকল। সেই বানের স্রোতে দলাদলি, ঝগড়াঝাঁটি কোথায় যে ভেসে গেল! গড়ে উঠল এক স্বপ্নরঙিন স্বর্গরাজ্য। আমরা সেই স্বর্গরাজ্যের নাম দিয়েছি টাহুয়ানটিনস্যু। আর আমাদের সেই শ্রেষ্ঠ মানুষটিকে আমরা ভালোবেসে ডাক দিলুম সম্রাট পাচাকুটি। হ্যাঁ, তিনি পাচাকুটিই তো। কেননা, তিনি আমাদের পৃথিবীর চেহারাটাই পালটে দিয়েছিলেন তাঁর বীরত্বে। পাচাকুটি মানে যে তাই-ই। যদি আমাদের বোকা না ঠাওরাও তো একটা কথা স্বীকার করতে পারি। আমরা জানতুম আমাদের এই পর্বত রাজ্যটিই বুঝি গোটা পৃথিবী। আমাদের সাম্রাজ্যের বাইরেও যে আরও দেশ আছে, আরও মানুষ আছে, এ খবরটা আমাদের একেবারেই জানা ছিল না। সেইজন্যই আমাদের সাম্রাজ্যের এই নাম—টাহুয়ানটিনস্যু। যার মানে পৃথিবীর চার দিগন্ত। এই টাহুয়ানটিনস্যুর রাজবংশের পুরুষরাই ইনকা, মানে রাজকুমার। তাই আমিও একজন রাজকুমার। আমার শিরায়শিরায় রাজরক্তের স্রোত। বীর পাচাকুটি আমার ঠাকুরদার বাবা। তিনিই ইনকা নামের এই রাজবংশের প্রথম সম্রাট। তার আগে যারা সিংহাসনে বসেছে তারা ছিল শুধুই রাজা, সম্রাট নয়। কেনই-বা পাচাকুটি সম্রাট হবেন না। আন্দিজের মাঝ বরাবর মাত্র এইটুকু এক রাজ্য ছিল আমাদের। তিনি আন্দিজের চূড়ার পর চূড়া ডিঙিয়ে জয় করেছেন একের পর এক ছোটো-বড়ো অনেক পাহাড়ি রাজ্য। উত্তর থেকে দক্ষিণ আর পূর্ব থেকে পশ্চিম, তাঁর যুদ্ধের বাহাদুরির কাছে সবাই মাথা নীচু করেছে। তিনি যেমন জয় করেছেন গভীর জঙ্গলের রাজ্য, তেমনই মরুভূমির দেশ। জয় করেছেন উপত্যকা। তাঁর জয়ের নিশান তুলেছেন সবচেয়ে উঁচু যে পর্বতশিখা, সেখানেও। তিনি আমাদের রাজধানীটি সাজিয়েছিলেন এমন করে, যেন স্বপ্নপুরী। সে-রাজধানীর নাম কুজকো। একটি মন্দির গড়া হয়েছিল কুজকোতে। সে-মন্দিরে ছিল শুধু দেবতাদের সোনার মূর্তি। আমরা সে-মন্দিরের নাম দিয়েছিলুম কোরিকানচা। এখানে সোনায় সাজানো সূর্যমন্দিরটি ছিল সবচেয়ে সুন্দর। দেবতা সূর্যকে আমরা বলতুম ইনটি। হ্যাঁ, আমরা বিশ্বাস করতুম দেবতা ইনটিই আমাদের এই ইনকা বংশের জনক। তিনিই আমাদের এই ইনকা রাজ্যের সৃষ্টিকর্তা। এই সূর্যদেবতার দয়ায় কেমন করে আমাদের এই সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল সেই গল্পও তোমাদের শোনাবার লোভ সামলাতে পারছি না।

আমি আগেই তো বলেছি টিটিকাকা হ্রদের কথা। বলেছি এখানেই প্রথম মানুষ গড়েছিলেন দেবতা ভিরাকোচা। তেমনই এই হ্রদেরই একটি দ্বীপে সূর্যদেবতা ইনটি প্রথম দেখা দিলেন। হ্রদের চারদিকে আন্দিজের আকাশছোঁয়া শিখর, আর সেই শিখরের মধ্যিখানে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু মিষ্টিজলের হ্রদ টিটিকাকা। শিখরে শিখরে তুষার। তার ছায়া পড়ছে জলে। ঝিলমিল করে জলের দোলনায় দুলে দুলে ঢেউ খাচ্ছে। সে যে কী চমৎকার দৃশ্য কেমন করে বোঝাই আমি। সূর্যদেবতা যে-দ্বীপটিতে প্রথম দেখা দিলেন সেটা অবশ্য টিটিকাকার অনেক গভীরে। তখন পৃথিবী অন্ধকারে ডুবে ছিল। তিনি দ্বীপের আড়াল থেকে মুখ তুলে দেখতে পেলেন, কী অসহ্য কষ্ট ভোগ করছে মানুষ। এক-একটা মানুষ যেন এক-একটা জন্তু। তাঁর দয়া হল। তিনি তাঁর একটি ছেলে আর একটি মেয়েকে পাঠালেন স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে, মানুষের কাছে। তাদের দুঃখ দূর করার জন্য। তাঁর সেই ছেলের নাম মাহনকো কাপাখ আর মেয়ের নাম মামাওকলো। দেবতা ইনটি তাদের একটি সোনার লাঠি দিলেন। আদেশ করলেন, ‌তোমরা পৃথিবীতে গিয়ে মানুষকে শেখাবে কেমন করে ঘর বাঁধতে হয়। কেমন করে ফসল ফলাতে হয়। শেখাবে কেমন করে মানুষের মতো বাঁচতে হয়। তোমরা যাবে এক দেশ থেকে আর এক দেশে পায়ে হেঁটে। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য যেসব জায়গায় তোমরা দাঁড়াবে, সেইসব জায়গার মাটিতে এই সোনার লাঠিটি গাঁথার চেষ্টা করবে। যে-জায়গায় লাঠিটি গাঁথার সঙ্গে সঙ্গে সম্পূর্ণ মাটির ভেতর অদৃশ্য হয়ে যাবে, জানবে তোমাদের জন্য সৌভাগ্য লুকিয়ে আছে সেইখানেই। তোমরা সেইখানেই ঘর বাঁধবে। মানুষকে শেখাবে আমার আলোয় বাঁচতে। আমি মানুষকে দুঃসহ ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য দেব কিরণ। জমিতে ফসল ফলাবার জন্য তাদের আমি সাহায্য করব। আর প্রতিদিন আকাশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে ঘুরে ঘুরে তাদের রক্ষা করব।‌

সূর্যদেবতা ইনটির আদেশ নিয়ে মাহনকো কাপাখ আর তাঁর বোন মামাওকলো স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে এলেন। যে-দ্বীপটি থেকে সূর্যদেবতা মানুষের কষ্ট দেখেছিলেন, ঠিক সেই দ্বীপটি থেকেই তাঁরা যাত্রা শুরু করলেন। যাত্রাপথে একটি-একটি করে অনেক মানুষ তাঁদের দোসর হল। তাঁরা আন্দিজের পাথরে পাথরে কতদিন যে হাঁটলেন তার হিসেব নেই। কত জায়গায় তাঁরা সেই সোনার লাঠিটি পোঁতবার চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। শেষে একটি জায়গায় একদিন সত্যিই তাঁদের সোনার লাঠি জাদুর মতো পর্বতের শক্ত পাথরে গেঁথে গেল। অদৃশ্য হয়ে গেল পাথরের গভীরে। সেই জায়গাটি ছিল আন্দিজ পর্বতের কী সুন্দর একটি উপত্যকা! এখানে বাস করত আদিম মানুষ। তাদের কাছ থেকে এই উপত্যকাটি কেড়ে নিয়ে মাহনকো কাপাখ আর তাঁর বোন মামাওকলো এখানে গড়লেন সূর্যদেবতা ইনটির একটি মন্দির। আন্দিজের এই উপত্যকায় জন্ম নিল একটি নতুন রাজ্য। সেই রাজ্যে মাহনকো কাপাখ হলেন প্রথম রাজা। আর এই যেখানে সোনার লাঠিটি গেঁথে গেল, সেইখানে গড়ে উঠেছিল এই ইনকা নামে শক্তিশালী এক রাজবংশের রাজধানী। সে-রাজধানীর নামই কুজকো। হ্যাঁ, এই সেই কুজকো। সম্রাট পাচাকুটির হাতে সাজানো আমাদের সেই স্বপ্নের শহর। কত যে সোনা ছিল এই শহরে! তার কে করবে হিসেব! যেদিকে চাইবে, দেখবে শহর যেন উছলে পড়ছে সোনার ঝলকানিতে। দ্যাখো দেব-দেবীর মূর্তি, সে শুধু সোনার। তাই বলে যেন মনে কোরো না সেইসব মূর্তি এইটুকুনি ছোট্ট ছোট্ট! উঁহু! তা নয়, অনেক বড়ো। তোমার চেয়েও বড়ো। একটা পুরুষ্টু মানুষ যেমন দেখতে ঠিক তত বড়ো। এইসব দেবদেবীর মূর্তি পা থেকে মাথা অবধি সোনায় গড়া। দেব-দেবীর মন্দিরের দেওয়াল, সেও সোনার পাতে মোড়া। এদিকে-ওদিকে ফোয়ারা, সেও তৈরি সোনা দিয়ে। এমনকী বিরাট বিরাট তোরণ, তাও সোনার। হাতে-গড়া গাছ, ফুল, পাখি যা দেখবে সোনা আর সোনা। তা বলে এই সোনায় কারও হাত দেওয়ার হুকুম ছিল না। একটুকরো সোনাও কুজকো থেকে বাইরে নিয়ে যেতে পারত না কেউ। যারা কাজ করত, তারা মজুরি পেত কাপড়চোপড় আর খাদ্যশস্য। সে ছিল ভারি সুখের দিন। সে-সুখ যে কত বছর ধরে ভোগ করেছিল আমাদের দেশের মানুষ! তারপর যে কী হল! তছনছ হয়ে গেল টাহুয়ানটিনস্যুর সব সুখ, সব আনন্দ। এই সোনার সাম্রাজ্য কেমন করে শুধু সোনার জন্যই ধ্বংস হয়ে গেল, সেই ভয়ংকর দুর্ভাগ্যের গল্পই আজ শোনাতে এসেছি আমি। বলতে এসেছি আমার কথা। সে বুঝি এক আহাম্মকের কাহিনি! না কি বিশ্বাসঘাতকের! কে জানে!

আমাদের যেমন সোনা ছিল অফুরন্ত, তেমনই পাথর দিয়ে কী-না তৈরি করেছে আমাদের দেশের মানুষ! এই ধরো রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে রাজপ্রাসাদ, প্রাসাদের গম্বুজ, যন্ত্রপাতি, এমনকী যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র পর্যন্ত। সম্রাট পাচাকুটি এমন একটি দুর্গ করেছিলেন এই পাথর দিয়ে যে, দেখলে তোমরা থ হয়ে যাবে। সে কী বিশাল দুর্গ। সে-দুর্গের নাম সাকসাহুয়াম্যান। তোমরা যদি দ্যাখো সেই দুর্গ, তোমাদের মনে হবেই হবে মানুষে কখনো এ-দুর্গ করতে পারে না। এ নিশ্চয়ই কোনো দৈত্য তৈরি করেছে। নয়তো কোনো শয়তান। কারণ এমন সব বড়ো বড়ো পাথর দিয়ে এই দুর্গের দেওয়াল গাঁথা হয়েছে, সে-যে মানুষে করেছে এ তোমাদের বিশ্বাসই হবে না। এক-একটা পাথর যেন এক-একটা পাহাড়ের চূড়া। কী প্রকান্ড!

তোমরা শুনলে হয়তো হাসবে, আমাদের মধ্যে যার কান দুটি খুব বড়ো, আমরা তাকে বলতুম উঁচু বংশের মানুষ। এক-এক জনের কান তো প্রায় এক-একটা হাতের চেটোর মতো অ্যাইসা বড়ো। আমরা যখন ছোটো থেকে বড়ো হই, তখন নিয়ম ছিল দু-কানে দুটি গর্ত করে সোনার চাকতি পরিয়ে দেওয়া। আর সোনার সেই চাকতিও তেমনই—এত্তখানি। কানের লতি থেকে ঝুলে কাঁধে এসে ঠেকত। আমাদের রাজপরিবারের পোশাকও ছিল তেমনই ঝলমলে। জামা ধরো সেই হাঁটু অবধি লম্বা, হাতকাটা। জামায় সোনার পাতের কারুকাজ। শীতের প্রচন্ড প্রকোপ বলে গায়ে থাকত নানা রঙের গা-ঢাকা। আমাদের সম্রাটের মাথায় মুকুট থাকত না। মুকুটের বদলে তাঁদের মাথায় বাঁধা থাকত গোল করে পাকানো সরু দড়ি। তার রঙের কত জলুস, লাল-নীল-সবুজ। সম্রাটের ঠিক কপালের ওপর সেই দড়িতে আটকানো থাকত সোনার পাতে পাখির পালক। পায়ে পরতেন চপ্পল—চামড়ার। আর এই চামড়া জোগান দিত আমাদের এই দুর্গম পর্বতের সবচেয়ে বড়ো বন্ধু লামা। তোমরা কি কখনো লামা দেখেছ? না-দেখলে বলি, এদের দেখতে অনেকটা ছোট্ট উটের মতো। অমনই ঘাড়টা লম্বা, মুখটা ছুঁচোলো। এই উঁচু-নীচু পর্বতের রাস্তায় এরা ভারী ভারী মাল বইত পিঠে নিয়ে। এদের একটুও কষ্ট নেই। এদের চামড়া আর লোম দিয়ে তৈরি হত আমাদের পোশাক। উৎসব-অনুষ্ঠানে এদের বলি দেওয়া হত দেবতার কাছে। আর এদের মাংস? সে-যে কী মুখরোচক খেতে, যে কখনো খায়নি তাকে বোঝাব কেমন করে? এই লামারা এমনিতে খুব ঠাণ্ডা, কিন্তু কোনো কারণে যদি মেজাজ বিগড়ে যায় তাহলে আর রক্ষে নেই। এমন গোঁ, কাজ তো করবেই না, তার ওপর বেশি টানাহ্যাঁচড়া করলে প্যাচ করে গায়ে থুতু দিয়ে দেবে।

সম্রাট পাচাকুটির গল্প—সে শুধু বীরত্বের গল্প। তাঁর আগে আরও আট জন সিংহাসনে বসেছিলেন। কিন্তু কেউ সম্রাট হতে পারেননি। কেউ সাম্রাজ্য গড়তে পারেননি। তাঁরা ছিলেন আন্দিজের কুজকো উপত্যকার সর্বেসর্বা। বলতে পারো রাজা। তাঁদের মধ্যে যিনি ষষ্ঠ, তাঁর নাম রোখা। সিংহাসনে বসে তিনিই প্রথম ‌ইনকা‌ উপাধিটি চালু করেন, তাই তাঁর নাম শুধু রোখা নয়, ইনকা রোখা। আর সেই ইনকা বংশের নবম যে-জন সিংহাসনে বসেছিলেন, সেই পাচাকুটিই প্রথম সম্রাট। তাঁর দাপটের সামনে কে দাঁড়াবে! তাঁর ভয়ে সবাই জুজু। কিন্তু তাঁকে ভয় পেল না এই আন্দিজেরই একটি গোষ্ঠী। তাদের নাম চানকা। তারাও কম যায় না।

আসলে হয়েছে কী, তখনও পাচাকুটি সিংহাসনে বসেননি। তখন তাঁর বাবা রাজত্ব করছেন। তাঁর বাবার নাম ছিল ভিরাকোচা ইনকা। রাজত্ব করতে করতে তাঁর বাবা কাছাকাছি ক-টা দেশ জয় করেছিলেন। জয় করে তিনি হয়তো চানকাদেরও কুপোকাত করার মতলব এঁটেছিলেন। কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক তিনি এদের গায়ে হাত দেননি। সুতরাং তিনি যতটুকু অন্যের দেশ জয় করেছিলেন সেই নিয়েই খুশি ছিলেন। এমনই করে অনেক দিন তিনি রাজত্ব করলেন। তারপর বয়েস বাড়ল। তিনি বুড়ো হয়ে গেলেন। আর ঠিক এই সময়ে চানকারা ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা আমাদের রাজধানী কুজকো আক্রমণ করার জন্য ধেয়ে এল। পাচাকুটির বাবার ইচ্ছে ছিল তাঁর বড়ো ছেলেটি সিংহাসনে বসুক। কিন্তু সে-ছেলের যা চেহারা! এমনই রোগাপটকা আর তেমনই ল্যাকপ্যাকে সিং। এদিকে চানকাদের স্বাস্থ্য কী! ইয়া লম্বা-চওড়া। বুকের ছাতি এই এত্তখানি। হুংকার ছেড়ে তারা যখন লম্ফঝম্প করতে করতে এগিয়ে এল, ব্যাস, তখন তো থরহরি কম্পমান। ওই ল্যাকপ্যাকে সিং ছেলেকে নিয়ে ভিরাকোচা ইনকা দেশ ছেড়ে একদম ভোকাট্টা। ছেলেকে নিয়ে কুজকো ছেড়ে তিনি পালালেন। তখন এমন অবস্থা দাঁড়াল, এই বুঝি চানকারা দিল ইনকাদের শেষ করে!

না, তা হল না। ভিরাকোচা ইনকা তাঁর আদরের ল্যাকপ্যাকে সিং ছেলেকে নিয়ে প্রাণের ভয়ে পালালেন বটে, কিন্তু তাঁর আর এক ছেলে এই বীর পাচাকুটি চানকাদের সামনে বুক ফুলিয়ে রুখে দাঁড়ালেন। অবশ্য তখনও তিনি ‌পাচাকুটি‌ উপাধি নেননি। তখন তাঁর আসল নাম ইনকা উফানকি। যখন চানকারা কুজকো আক্রমণ করল, তখন তাঁর খুবই কম বয়েস। চানকাদের হাত থেকে আমাদের রাজধানী কুজকোকে রক্ষা করার জন্য তিনি তাঁর দেশের মানুষকে ডাক দিলেন। বললেন, ‌হে আমার দেশবাসী, জন্মভূমি বিপদগ্রস্ত। চানকারা তাঁকে আঘাত করার জন্য অস্ত্র ধরেছে। এসো তাকে রক্ষা করি।‌

কিন্তু তিনি তাঁর দেশবাসীর সাড়া পেলেন না।

তিনি হাঁক দিলেন সৈন্যদের। বললেন, ‌ওহে বীর যোদ্ধার দল, আমি তোমাদের নায়ক, তোমরা দেশের রক্ষাকর্তা। সময় এসেছে, দেশকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচাবার। তোমরা প্রস্তুত হও।‌

সৈন্যরা অনেকে তাঁর ডাকে সাড়া দিল। অনেকে দিল না।

একটা কথা এই সুযোগে বলে রাখি, আমরা যেকোনো কাজে দৈবজ্ঞদের কথা খুব মেনে চলতুম। আমাদের দেশে দৈবজ্ঞ যাঁরা ছিলেন, তাঁদের আমরা যেমন ভয় পেতুম, তেমনই বিশ্বাসও করতুম। কারণ আমাদের বিশ্বাস ছিল, এঁদের মুখ থেকে যে-কথাটি এক বার বেরোবে, সেটি ফলে যাবেই যাবে। এঁরা অনেকটা সেই জ্যোতিষীর মতো। সুতরাং দৈবজ্ঞেরও ডাক পড়ল।

রাজদৈবজ্ঞ অনেক পুজোআর্চা করে দৈববাণী শুনতে পেলেন। নিদান দিলেন, এ যুদ্ধে উফানকির জয় হবে। তবে যুদ্ধযাত্রার আগে দেশের দশটি তরুণ ছেলেকে জীবন্ত সমাধি দিতে হবে আর এক-শোটি লামাকে বলি দিতে হবে সূর্যদেবতা ইনটির মন্দিরে।

হ্যাঁ, এই কথাটাও শুনে রাখো তোমরা। আমাদের দেশে এই ছিল প্রচলিত নিয়ম। কোনো শুভকাজের শুরুতে, কোনো উৎসবে অথবা যুদ্ধযাত্রার আগে মানুষকে জীবন্ত সমাধি দিতেই হবে। লামার বলিও এই নিয়মের মধ্যে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধজয়ে অথবা রাজ-অভিষেকের সময়েও এই নিয়ম মেনে চলতেই হত। সুতরাং দৈবজ্ঞের নিদানমতো দশটি তরুণকে ঠিক করা হল। তবে ভেবো না যেন এই তরুণদের জোর করে মায়ের কোল থেকে ছিনিয়ে আনা হল। তা নয়। তারা স্বেচ্ছায় হাসিমুখে দেশের জন্য নিজের প্রাণ দিতে এগিয়ে এল। পুরোহিতরা তাদের নিয়ে চলল তুষারে আচ্ছন্ন পর্বতের চূড়ায়। সেখানে যে কী সাংঘাতিক ঠাণ্ডা, সে মুখে বলা যায় না। পুরোহিতরা সেই চূড়ায় তাদের সমাধির জন্য পাথর কেটে আর বরফ সরিয়ে সমাধিস্থল তৈরি করল। সূর্যদেবতা ইনটির কাছে প্রার্থনা জানিয়ে সেই সমাধিতে তাদের রেখে দিল। জীবন্ত তরুণ দল সেই প্রচন্ড ঠাণ্ডায় মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। তারপর ধীরে ধীরে তাদের শিরায় শিরায় রক্ত জমাট বাঁধল, তাদের নিশ্বাস বন্ধ হল। সাহসী তরুণেরা বীরের মতো মৃত্যুকে বরণ করে নিল।

যুদ্ধে চললেন ইনকা উফানকি। তাঁর অস্ত্র সোনায় বাঁধানো। সঙ্গে চলল অসংখ্য সৈন্য, তাদের হাতে পাথর ছোড়ার অস্ত্র। পর্বতের চড়াই-উতরাই তারা লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে এগিয়ে চলেছে। বুকে তাদের সাহস, মুখে তাদের গান—শত্রুর উদ্দেশ্যে:

তোদের মুন্ডুগুলো ফাটিয়ে ভেঙে এই এখুনি,

ঘিলু খেয়ে ঢেকুর তুলি বারংবার,

তোদের দাঁতগুলোকে উপড়ে নিয়ে সবাই বুনি,

একটি-একটি গলায় পরার দন্ত হার।

তোদের হাড়গুলোকে মটকে ভেঙে বানাই বাঁশি,

চামড়াগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে বাজাই ঢাক।

তারপরে খোশ-মেজাজে প্রাণ খুলে হাসি,

হেসে-গেয়ে-নেচে বেড়াই তাক ধিন তাক।

এদিকে চানকারাও বীরবিক্রমে এগিয়ে আসছে। চানকাদের একটা প্রথা ছিল, যুদ্ধে যাওয়ার সময় সঙ্গে একটি দেবতার মূর্তি নিয়ে যাওয়া। হয়তো সে-দেবতা যুদ্ধেরই। হয়তো তাদের বিশ্বাস ছিল, যুদ্ধদেবতা সঙ্গে থাকলে কেউ তাদের হারাতে পারবে না, তারা জিতবেই। সুতরাং অস্ত্র উঁচিয়ে গর্জন করতে করতে তারা আমাদের রাজধানীর কাছাকাছি চলে এল। আমাদের সৈন্যরা তাদের একটু দূরে দেখতে পেয়েই ঝুপঝাপ এধার-ওধার পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে। চানকারা কোনো বাধা না পেয়ে ভাবল শত্রু পগারপার! সুতরাং তারা মহাআনন্দে নাচানাচি শুরু করে দিলে। আর ঠিক তক্ষুনি চারিদিক থেকে পাথরের বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। উফানকির সৈন্যরা আড়াল থেকে আচমকা চাঁই চাঁই পাথর ছুড়তে লাগল চানকাদের মাথায়। চানকারা তো ভ্যাবাচাকা-হাম্বা। তাদের আর পালাবার পথ নেই। যেদিকে পালাতে যায়, সেইদিকেই ঝাঁক ঝাঁক পাথরের বৃষ্টি। ইনকা উফানকির সৈন্যরা ঘিরে ফেলেছে তাদের। কিন্তু চানকারা যখন দেখল আর উপায় নেই, বাঁচতে গেলে রুখে দাঁড়াতেই হবে, তখন তারাও ঝাঁপিয়ে পড়ল আমাদের সৈন্যের ওপর। লেগে গেল লড়াই সামনাসামনি। দু-পক্ষই শত্রুকে ঘায়েল করার জন্য হুংকার ছেড়ে তেড়ে গেল। কিন্তু আমাদের সৈন্যদের সঙ্গে ওরা পেরে উঠল না। পারবে কেমন করে! লোকে বলে, সে-যুদ্ধে যেন মস্ত মস্ত পাথর নিজের থেকেই লাফিয়ে পড়ছিল চানকা শত্রুদের ওপর। তখন তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে শুরু করল। এদিকে তখন উফানকি নিজে তাঁর সেনাপতিদের নিয়ে ছুটে গেলেন চানকাদের ওই যুদ্ধদেবতার মূর্তিটির দিকে। যাদের কাঁধে মূর্তিটি ছিল, তাদের আচ্ছা করে পেটাই দিয়ে সেই মূর্তিটি কেড়ে নিলেন। ব্যাস, এই মূর্তিটি হাতছাড়া হয়ে যেতেই চানকারা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। আর তারা কোনো বাধা মানল না। দুড়দাড়িয়ে ছুট দিল পেছন দিকে। উফানকির সৈন্যরা তখন জয়োল্লাসে নিজেরাই নিজেদের জড়িয়ে ধরে লাফালাফি শুরু করে দিলে। সে কী দৃশ্য! আগুনের মশাল জ্বালিয়ে এধার-ওধার লাফাতে লাফাতে তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, ‌জয়, রাজপুত্র ইনকা উফানকির জয়।‌

হ্যাঁ, রাজপুত্রই তো। তখনও তো উফানকির বাবা ইনকা ভিরাকোচাই রাজা। যদিও তিনি ভয়ে পালিয়েছেন। না, তিনি আর এলেন না। ভয়ে সেই যে ছেলেকে নিয়ে জঙ্গলে লুকিয়ে পড়লেন আর তাঁর খোঁজ পাওয়া গেল না। তখন আমাদের রাজধানী কুজকোর সমস্ত মানুষ একসঙ্গে তাদের আদরের বীর ছেলে ইনকা উফানকিকে সিংহাসনে বসাল। কুজকোর বীর ছেলে সিংহাসনে বসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের সূর্যদেবতা ইনটি যেন মুখ তুলে আমাদের আশীর্বাদ করলেন। আমাদের সুদিন এল। ইনকা উফানকি আন্দিজ পর্বতের এপার থেকে ওপার একটির পর একটি রাজ্য জয় করে এক মস্ত সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন। তাঁর এই অসামান্য কীর্তির জন্য লোকে তাঁকে ভালোবেসে নাম দিল সম্রাট পাচাকুটি। আর এইজন্যই তিনি ইনকা সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট। তাঁর কপালে পরিয়ে দেওয়া হল সম্রাটের শিরোপা। আন্দিজ পর্বতমালার সমস্ত দেশেই তাঁর জয়জয়কার পড়ে গেল।

দ্যাখো, সম্রাট পাচাকুটির তা বলে এত জয়জয়কারে একটুও দেমাক হল না। তাঁর তখন কম বয়েস। তিনি দেশের মানুষের ভালো করার জন্য একবার এখানে, একবার ওখানে ছুটে যান। খোঁজখবর নেন। কখনো তিনি পর্বতের শিখরের দেশে যাচ্ছেন, কখনো মরুভূমিতে ছুটছেন। নয়তো অন্ধকার গা-ছমছম বনের ভেতরে পাড়ি দিচ্ছেন। সব ভালো কিন্তু বন বড়ো সাংঘাতিক। তার ওপর আমাদের বন। সে আর কহতব্য নয়। যেমন গভীর, তেমনই সব নানা ভয়। কত রকমের হিংস্র জন্তু, এইসা লম্বা লম্বা সাপ। আর বিষাক্ত পোকামাকড় যে কত, গুনে শেষ করা যায় না। এক বার যদি দয়া করে কামড়ায় তবে আর রক্ষে নেই, নির্ঘাত প্রাণটি যাবে। সুতরাং বনে যাওয়া মানে প্রাণটি হাতে নিয়ে যাওয়া। কখন যে কী হয় কেউ জানে না। তা একবার সম্রাট পাচাকুটি এমনই একটা ঘন বনের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। অবশ্য রাজারাজড়াদের কথা আলাদা। তাঁরা তো আর পায়ে হেঁটে যান না, তাঁরা যান ডুলিতে চেপে। ঝকঝকে ডুলির মাথার ওপর রংচঙে ছাউনি, রঙিন কাপড় দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। সম্রাট সেই ডুলিতে বসতেন আর চার জন বাহক কাঁধে তুলে তাঁকে হেঁইও হেঁইও করে নিয়ে যেত। এবারও সম্রাট পাচাকুটি এমনই করে চলেছেন। বাহকের দল কখনো উঁচু পাথরে উঠছে, কখনো নীচু পাহাড়ে নামছে। কখনো ছোটো নদীতে পা পড়ছে, কখনো ছোট্ট সাঁকো পার হচ্ছে। পাহাড় কোথাও সটান খাড়া, কোথাও পাথর সিধে ঢালু। বুঝতেই পারছ কী বিপজ্জনক রাস্তা! এক বার যদি পা ফসকায় সিধে খাদে—কারুর সাধ্যি নেই বাঁচায়। তবে বাহকরাও তেমনই ওস্তাদ। এই বনে, পর্বতে চড়াই-উতরাই করা তাদের কাছে জলভাত। তা একবার সম্রাট পাচাকুটি এমনই একটা বনের ভেতর দিয়ে ডুলি চেপে অভিযানে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিল তাঁর সেনা, সেনাপতি বেশ ক-জন। কিন্তু শত্রু যে তাঁর পিছু নিয়েছে, সে আর কে জানে! অবশ্য তাঁর সেনারা সজাগ ছিল ঠিকই। কিন্তু হঠাৎ যদি কেউ গুলতি দিয়ে এক বার পাথর ছুড়ে দেয়, তখন তো আর কিছু করবার থাকবে না—গায়ে লাগলেই সব শেষ। কিন্তু এই শত্রুটি অবশ্য পাথর ছুড়ল না। একটা আধমনি পাথর হাতে নিয়ে হঠাৎ একটা ঝোপের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসে সম্রাটের দিকে তেড়ে গেল তাঁকে হত্যা করতে। আর বলব কী, একেবারে চোখের পলকে সম্রাট পাচাকুটির সেনারা লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ভাগ্যিস তারা দেখতে পেয়েছিল! কিন্তু কে এই লোকটা! চিনতে বেশি সময় লাগে কি! ইনিই তো তিনি—সম্রাট পাচাকুটির বাবা ভিরাকোচা ইনকা! সঙ্গে আবার ওটি কে? দেখতে পাচ্ছ না? ইনিই তো তাঁর আদরের ছেলে! ও, তাহলে এই জঙ্গলেই তাঁরা পালিয়ে এসে লুকিয়ে আছেন! এ কেমন বাবা! আদরের ছেলের জন্য আর এক ছেলেকে হত্যা করতে অস্ত্র তুলেছেন! তাও যদি আদরের ছেলেটি তেমন বীর হত। আরে দুর! বীর না ছাই!

বাপ আর ছেলেকে ধরে আনা হল সম্রাট পাচাকুটির সামনে। বাবাকে দেখে পাচাকুটি থ হয়ে গেলেন। তাকে হত্যা করতে তার বাবা নিজে পাথর তুলেছেন! হ্যাঁ, আমাদের দেশে একজন মানুষ অনেক বিয়ে করতে পারত। এটা কোনো দোষের নয়। ভিরাকোচা ইনকাও অনেক বিয়ে করেছিলেন। তাঁর আদরের ছেলেটি ছিল প্রথম বউয়ের, আর সেইজন্যই বুঝি এত টান! হবে হয়তো, কিন্তু তাই বলে অন্য বউয়ের আর এক ছেলের প্রাণ নিতেও তিনি পিছপা নন! কী নির্দয়, হিংস্র!

সম্রাট পাচাকুটির সামনে দাঁড়িয়ে মাথা তুলতে পারলেন না তাঁর বাবা ভিরাকোচা ইনকা আর তাঁর ছেলে। সম্রাট পাচাকুটি স্থিরদৃষ্টিতে হয়তো কয়েক মুহূর্ত তাঁর দিকে তাকিয়েছিলেন। হয়তো কয়েক মুহূর্ত তাঁদের নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনাও যাচ্ছিল না সেখানে। হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে অত্যন্ত শান্ত স্বরে সম্রাট পাচাকুটি বলেছিলেন, ‌তুমি কি বিশ্বাস করো বাবা, যে মানুষ কর্তব্য পালন না-করে পালায় তাকে বোধ হয় মানুষ বলে না? যে রাজা নিজের দেশকে রক্ষা করতে পারে না, ভীতুর মতো লুকিয়ে পড়ে, তাকে রাজাও বলা যায় না। চানকাদের হাতে আমাদের সূর্যদেবতা ইনটির গড়া পবিত্র রাজভূমিকে তুলে দিয়ে তুমি একটা খুব অপরাধের কাজ করেছ বলে কি তোমার মনে হয় বাবা? আমাদের দেশবাসী তোমার মুখের দিকে চেয়েছিল বাঁচার জন্য। তাদের আশা ছিল দুঃসাহসী বীরের মতো তুমি দুর্ধর্ষ চানকাদের সামনে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে গর্জে উঠবে। শত্রুর বুকে অস্ত্রের আঘাত করে কোথায় তুমি ইনকা বংশের মাথা উঁচু করবে, তা নয়, তুমি সে-মাথায় কলঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছ। তুমি তোমার এই অপদার্থ ছেলেকে নিয়ে একটা কুচ্ছিত কেঁচোর মতো এখানে লুকিয়ে আছ আমাকে মারবার জন্য। যদিও সবাই জানে আমিও তোমার ছেলে। আর তুমিও জানো, তোমার এই ছেলেই চানকাদের সব দর্প চূর্ণ করে দেশকে বাঁচিয়েছে। আমার কৃতিত্ব তুমি সহ্য করতে পারছ না। হিংসেয় তুমি ফেটে পড়ছ! ধিক তোমাকে। এ তুমি কেমন বাবা? শুনে রাখো, দেশের মানুষ আমার মাথায় সম্রাটের শিরোপা পরিয়ে দিয়েছে ভালোবেসে। কেননা আমি তোমার মতো আমার জন্মভূমির মানসম্মান ধুলোয় লুটিয়ে দিইনি। আমি তাঁকে আরও মহান করেছি। তাঁকে আমি যে শুধু শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত করেছি তাই না, তাঁর জন্য আরও অনেক দেশ আমি জয় করে এনেছি। সূর্যদেবতা ইনটির হাসিমুখ তাই আমারই মুখের দিকে চেয়ে ঝলসে উঠছে। তোমাকে তিনি ঘৃণা করেন। যে মানুষ সূর্যদেবতা ইনটির হাতে-গড়া পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে না, তার রক্ত না দেখলে সে দেবতার রোষ শান্ত হয় না। সুতরাং তাঁর রোষ শান্ত না করতে পারলে আমারও নিস্তার নেই। তাই শুনে রাখো পিতা, ‌আজ এখনই এই মুহূর্তে তোমাকে আর তোমার ছেলেকে হত্যা করার আমি হুকুম দিলাম।‌

হ্যাঁ, এমন করেই এক ছেলের হাতে এক ভীরু পিতা আর তাঁর আদরের ছেলের মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু তবুও সম্রাট পাচাকুটি সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হতে পারছিলেন না। চানকারা যেমন তাঁকে হেনস্তা করার চেষ্টা করেছিল, তেমনই আর একটা পাহাড়ি দলের সর্দার সম্রাট পাচাকুটির পেছনে লেগেছিল। আসলে পাচাকুটির নাম ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ধন্য-ধন্য করছে সবাই। মন মন সোনা-রুপোয় সাজানো হয়েছে তাঁর রাজধানী, তাঁর রাজপ্রাসাদ। সেসব দেখলে অন্যের চোখ তো টাটাবেই। পাহাড়ি দলের সেই সর্দারটার নাম ছিল চুচি কাপাখ। সেও হিংসেয় ফেটে পড়ল। সম্রাট পাচাকুটির নাম শুনলেই লোকটা তাচ্ছিল্য করে এমন ফুট কাটত যে, তা শুনলে যেকোনো ঠাণ্ডা মানুষেরই হাড়পিত্তি জ্বলে যেত। সম্রাট পাচাকুটিকে সে গ্রাহ্যই করত না। তার এমন বাড় বেড়েছিল যে, শেষে সে বলতে শুরু করল, ‌কে বলেছে পাচাকুটি সম্রাট? ইনকা সম্রাট আমি।‌

ব্যাস! এসব কথা কি চাপা থাকে! সম্রাট পাচাকুটির কানে কথাটা পৌঁছে দেওয়ার লোকের অভাব ছিল না। কথাটা যেই শোনা, সঙ্গে সঙ্গে তিনি দূত পাঠালেন চুচি কাপাখের কাছে। মুহূর্ত দেরি না করে তাঁর সামনে হাজির হওয়ার জন্য তিনি চুচি কাপাখকে আদেশ করলেন। তা কে কার কথা শোনে! উলটে চুচি কাপাখ স্পর্ধা দেখিয়ে বলল কী, ‌যা যা, তোর সম্রাটকে বল গে যা আমি তার কেনা গোলাম নই। বল গে যা তার মাথাটা সামলাতে। পৃথিবীতে এখন তোর সম্রাটের মাথাটাই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। সে যদি নিজের ইচ্ছায় সে-মাথা না দেয়, তবে তাকে বলিস এই চুচি কাপাখ যুদ্ধ করে সেটি জয় করবে।‌ বলে লোকটা হাসতে হাসতে আস্ফালন করতে লাগল।

বুঝতেই পারছ, চুচি কাপাখের এই হামবড়াই শুনে সম্রাট পাচাকুটি যে চুপ মেরে যাবেন, সে বান্দা তিনি নন। সুতরাং তিনি তখনই হুকুম দিলেন, ‌সৈন্য সাজাও!‌

অমনই সাজো-সাজো রব পড়ে গেল। সম্রাট পাচাকুটি চুচি কাপাখকে শায়েস্তা করতে চললেন। সম্রাট লোকটার ওপর এমন ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন যে, তাকে শিক্ষা দিতে না পারলে যেন তিনি থাকতে পারছিলেন না। লোকটাকে এই শিক্ষা দিতে তাঁকে বেশ কয়েক-শো মাইল যেতে হবে। দুর্গম পর্বত কিংবা নদীর দুর্বার স্রোত, গভীর জঙ্গল অথবা উদ্দাম জলপ্রপাত কিছুই তাঁকে রুখতে পারল না। যারা তাঁর পথ আটকাবার চেষ্টা করল, ফুৎকারে তিনি তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিলেন। তাঁর সৈন্যদের কে ঠেকাবে তখন! কার মুরোদ আছে তাদের সামনে দাঁড়ায়।

তিনি পৌঁছে গেলেন টিটিকাকার তীরে। চুচি কাপাখ এইখানেই অনেকখানি জায়গা দখল করে হম্বিতম্বি করছিল। লেগে গেল যুদ্ধ। সে কী ভয়ংকর লড়াই! টিটিকাকার জল যে কত মানুষের রক্তে উপচে গেল, সে হিসেব কে রাখছে। যুদ্ধ হল দিনের পর দিন। কত দিন, তাও-বা কে বলতে পারে। কিন্তু যে বীর, জয়তিলক তাঁর কপালেই চিরকাল এঁকে দেয় দেবতা। তাই বীর পাচাকুটিই জয়তিলক পরলেন। পাচাকুটির সৈন্যের অস্ত্রের আঘাতে শত্রুসৈন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। ধরা পড়ল চুচি কাপাখ। সেইসঙ্গে ধরা পড়ল চুচি কাপাখের ক-জন সেনাপতি। তাদের বন্দি করা হল। সম্রাট পাচাকুটি জয় করলেন অনেক অনেক সোনা-রুপো। এইসব সোনা-রুপো, তার সঙ্গে বন্দি চুচি কাপাখ আর তার সেনাপতিদের তিনি নিয়ে চললেন রাজধানী কুজকোতে। সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীতে যুদ্ধজয়ের ডঙ্কা বেজে উঠল। শুরু হয়ে গেল উল্লাস আর উৎসব।

রাজধানীর হাজার হাজার মানুষের সামনে হাজির করা হল চুচি কাপাখকে। সে তখন প্রাণের ভয়ে কাঁপছে। সম্রাট পাচাকুটি তার সেই কাঁপুনি দেখে হো-হো করে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‌আশা করি চুচি কাপাখ, তুমি এখন বুঝতে পেরেছ আসল ইনকা কে?‌

চুচি কাপাখ সম্রাটের মুখের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাল।

সম্রাট আবার হাসলেন। আবার বললেন, ‌তুমি আমার এই মাথা জয় করতে চেয়েছিলে, আশা করি সেই বাসনা তোমার ঘুচে গেছে। আশা করি বুঝতে পেরেছ, মূর্খরাই বেশি ফোঁস ফোঁস করে। নিজের মাথা না বাঁচিয়ে যে অন্যের মাথার দিকে হাত বাড়ায়, তার হাতও যায়, মাথাও যায়, এটা কী তোমার জানা ছিল না?‌

চুচি কাপাখ মুখ নীচু করল।

সম্রাট হুংকার দিলেন এবার। তিনি ওই সামনের জমায়েত অসংখ্য মানুষের দিকে হাত তুলে বললেন, ‌এখন আমি যদি তোমাকে ওই জনতার মাঝখানে ছুড়ে দিই, তবে জান কি তোমার হাত-পাগুলো ওরা নিমেষে ছিঁড়ে ছিঁড়ে আকাশে ছুড়ে দেবে? তোমার মাথাটা তোমার দেহ থেকে উপড়ে নিয়ে ওরা লোফালুফি খেলবে?‌

চুচি কাপাখের চোখ দুটো ছটফট করতে লাগল।

সম্রাট আবার হাসলেন। বললেন, ‌না, ভয় নেই, তোমাকে আমি এমন নৃশংসভাবে মরতে দেব না। তবে শোনো কাপাখ, তুমি নিজেকে প্রকৃত ইনটি বলে মিথ্যে প্রচার করেছ। তুমি মিথ্যে বলে আমাদের ইনকা বংশের জন্মদাতা সূর্যদেবতা ইনটির প্রতি অশ্রদ্ধা দেখিয়েছ। সুতরাং শাস্তি তোমাকে পেতেই হবে। তবে সে-শাস্তি কী হবে, তার রায় দেবে ওই যে অসংখ্য জনতা সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওরাই।‌

চুচি কাপাখ বিস্ফারিত চোখে তাকাল জনতার দিকে।

সম্রাট জনতার দিকে হাত তুলে চিৎকার করে উঠলেন, ‌হে আমার প্রিয় বন্ধুগণ, আপনাদের সামনে এই যে মানুষটিকে আমি বন্দি করে এনেছি, এর নাম চুচি কাপাখ।‌

জনতা চিৎকার করে উত্তর দিল, ‌হ্যাঁ আমরা জানি, আমরা জানি।‌

সম্রাট বললেন, ‌আপনারা কি মনে করেন, এই লোকটি নিজেকে মিথ্যে ইনকা নামে পরিচয় দিয়ে আমাদের ইনকা নামের এই রাজবংশের অমর্যাদা করেছে?‌

জনতার চিৎকার, ‌—নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।‌

সম্রাট আবার বললেন, ‌ইনকা সম্রাটের বিরুদ্ধে যে-উদ্ধত মানুষ অস্ত্র তোলার সাহস পায়, তাকে আপনারা কী বলবেন?‌

‌—ঘাতক। ঘাতক।‌

—‌সেই ঘাতকের কোনো শাস্তি পাওয়া উচিত বলে আপনারা মনে করেন?‌

তখন সেই জনতা হাজার হাজার হাত চুচি কাপাখের দিকে ছুড়ে দিয়ে গর্জে উঠল, —‌মৃত্যু, মৃত্যু।‌

আঁতকে উঠল চুচি কাপাখ জনতার গর্জন শুনে। তারপর তার গলায় যখন সম্রাট পাচাকুটির সৈন্যরা অস্ত্রের আঘাত করল, তখন সে আর্তনাদ করে ওঠার আগেই ধড় থেকে তার মাথাটি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। উল্লাসে ফেটে পড়ল জনতা। কেঁপে উঠল কুজকোর আকাশ। ধীরে ধীরে উঁকি মারলেন পাহাড়ের আড়াল থেকে সূর্যদেবতা ইনটি। ছড়িয়ে দিলেন আলো। সে আলো খুশিতে ঝলসে উঠল।

এই খুশির আলো ছড়িয়ে ছিল অনেক দিন আমাদের এই টাহুয়ানটিনস্যুতে। অনেক-অনেক দিন তিনি সম্রাট হয়ে রইলেন আমাদের পৃথিবীতে। অনেক দিন তিনি দেশের ভালোর জন্য কত কীই-না করলেন। তারপর একদিন সব মানুষের মতো তাঁরও বয়েস বাড়ল। তিনি তাঁর প্রিয় ছেলেটিকে ডাক দিলেন। তাঁর সেই প্রিয় ছেলের নাম টুপা ইনকা। তিনিই আমার ঠাকুরদাদা। তাঁকে বললেন, ‌শোন রে ছেলে, আমার বয়েস হচ্ছে। আমি যখন থাকব না, আমার এই সাম্রাজ্য তোকেই যে দেখতে হবে। তাই বলি, এখন থেকে আমার কাজের বোঝা একটু একটু করে নিজের কাঁধে বইতে শেখ। দেশ জয় করার অভিযানে এগিয়ে চল। দেবতা ইনটি আছেন আকাশে, আর আমি আছি এখানে। তোর ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সাহসে বুক বাঁধ।‌

ছেলে বলল, ‌ভয় নেই বাবা, তোমার গৌরব মাথায় নিয়ে আর দেবতা ইনটির আলোয় পথ চিনে আমি তোমারই মতো সাহসী বীর হব। আমি আমার এ জন্মভূমি টাহুয়ানটিনস্যুর গলায় সোনায়-গড়া রত্নহার পরিয়ে দেব, যেমন তুমি দিয়েছ।‌

সম্রাট পাচাকুটি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন, ‌—আঃ! তারপর বললেন, ‌দেখিস বাপ, অনেক মানুষের অনেক রক্তে গড়া আমাদের এ দেশের বুকে যেন শত্রু আঘাত করার সাহস না পায় কোনোদিন। কেউ না লুঠে নিয়ে যায় আমাদের সম্পদ। কেউ না ভেঙে ফেলে আমাদের গড়া ওই মন্দির কিংবা দুর্গ। আসছে দিনের মানুষের জন্য আমরা যে-সৌধ গড়েছি, সেই সৌধ যেন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকে চিরকাল।‌

ছেলে নিজের বুকে হাত রাখল। তারপর বলল, ‌বাবা, তোমার গড়া এই সৌধচূড়ায় যত মণিরত্ন আছে, তার একটি কণাও কেউ ছুঁতে পারবে না। তোমার মণিরত্নের সমান মণিরত্ন আমি জয় করে এনে তোমাকে উপহার দেব।‌

ছেলে টুপা ইনকার কথা শুনে সম্রাট পাচাকুটির মুখখানি উছলে উঠেছিল আনন্দে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে তিনি তাঁর কপালে চুমো খেয়ে বলেছিলেন, ‌শাবাশ।‌

হ্যাঁ, সত্যিই তাই। টুপা ইনকা তাঁর বাপেরই মতো হয়ে উঠলেন এক অজেয় যোদ্ধা। একটার পর একটা পাহাড়ি দেশ জয় করে তিনি সম্রাট পাচাকুটির বুকভরা ভালোবাসা আদায় করেছিলেন।

সম্রাট পাচাকুটি বেঁচেছিলেন অনেক দিন। অনেক দিন পর যখন তাঁর অনেক বয়েস হয়ে গেল, তখন সবার মতো তাঁরও পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় হল। দেশের মানুষের কী অফুরন্ত ভালোবাসায় তিনি ডুবেছিলেন। কোন মানুষটা না তাঁর জন্য চোখের জল ফেলেছে। তারা তাদের প্রিয় সম্রাটের কীর্তিগাথা গানে গানে গেয়ে বেড়িয়েছে কতদিন ধরে। তিনি মারা যাওয়ার পর এক বছর ধরে মানুষ দুঃখের গান গেয়েছে। এক বছর ধরে দূর দূর দেশ থেকে কত মানুষ এসেছে তাঁকে দেখতে। হ্যাঁ, এক বছর ধরে তাঁর দেহের মমিটি দেখে গেছে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী কুজকোতে এসে। আর চোখের জলে ভাসিয়ে দিয়ে গেছে কুজকোর পথঘাট।

সিংহাসনে বসলেন আমার ঠাকুরদাদা টুপা ইনকা। আমাদের ইনকা সাম্রাজ্যের তিনি হলেন দ্বিতীয় সম্রাট, আর আমার বাবা হলেন তৃতীয়। কিন্তু আমি? আমি কোন সম্রাট? এসে গেল সেই কথা। এসে গেল আমার দাদাদেরও কথা। সে যেন এক শিহরন জাগানো গল্প! কী ভয়ংকর!

আমার ঠাকুরদাদা টুপা ইনকা তাঁর বাবা সম্রাট পাচাকুটির স্বপ্নের সাম্রাজ্যটিকে করেছিলেন আরও কত বড়ো। আরও অনেক দেশ তিনি জয় করেছিলেন। জয় করেছিলেন প্রশান্ত মহাসাগরের তীর পর্যন্ত। একবার হল কী, তিনি তখন রাজধানী ছেড়ে চলেছেন দক্ষিণ দিকে এক জঙ্গল অভিযানে। সে-যে কী ভয়ংকর জঙ্গল, যে না দেখেছে তাকে বলা মিথ্যে। যতই তুমি সাহসী হও, এই জঙ্গলে এক বার ঢুকলে ভয়ে ধাত ছেড়ে যাবে। যেমন জঙ্গল, তেমনই এক দুরন্ত নদী জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ঝরঝর করে বয়ে চলেছে। এইসব জঙ্গলে বাঘের উৎপাত এমন, একটু অসাবধান হয়েছ কি, ব্যাস! বাঘ তোমাকে খপ করে ধরে গপ করে গিলে ফেলবে। এইসব বাঘ মহাশয় আবার গাছেও চড়তে ওস্তাদ। তা হল কী, টুপা ইনকা তাঁর দলবল নিয়ে তো জঙ্গলে ঢুকলেন। আর বেরোন না। অনেকগুলো দিন আর অনেকগুলো রাত পেরিয়ে গেল। অথচ তাঁর কোনো খবর নেই। লোকে তো ভেবেই বসল নিশ্চয়ই একটা কিছু অঘটন ঘটেছে। না-জানি সম্রাট হয়তো বাঘের পেটেই গেছেন। অবশ্য সেই সময়ে আমাদের এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় খবর পাঠানোরও খুব ভালো ব্যবস্থা ছিল। খবর পাঠানো হত লোক মারফত। তাদের বলা হত চাসকুই। এই ধরো তোমরা যেমন বলো ডাক হরকরা। তোমাদের ডাক হরকরাদের যেমন বনজঙ্গলের ভেতর দিয়ে ছুটতে ছুটতে ডাক পৌঁছে দিতে হয় এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায়, তেমনই জরুরি খবর নিয়ে আমাদের চাসকুইরাও ছুটে যেত এক পাহাড়ের চূ¨ড়া থেকে আর এক পাহাড়ে। তারা খবর নিয়ে যেত মুখে মুখে কিংবা সেই নানা রঙের রঙিন সুতোয় গিট বেঁধে। তোমরা তো আগেই জেনেছ আমাদের লেখাজোখার বালাই ছিল না। তাই সুতোয় গিট অথবা মুখে-শোনা খবর মনে রাখা ছাড়া চাসকুইদের আর কোনো উপায়ই ছিল না। কিন্তু সম্রাট টুপা ইনকার এই ভয়ংকর জঙ্গল অভিযানে চাসকুইদেরও কাজে লাগানো গেল না। এত বাধা আর বিপত্তি যে, বলার কথা নয়। ব্যাস! তাল পেয়ে গেল টুপা ইনকার এক ভাই। সে তো পা বাড়িয়েই ছিল। রটিয়ে দিল টুপা ইনকা মারা গেছে। তার মতলব নিজে ইনকা সম্রাট হবে। আর ওদিকে সেই টিটিকাকার কাছে আর একজন সর্দার লোক খেপিয়ে নিজে সাম্রাজ্য হাতড়াবার চেষ্টা করল। আরে বাবা, এসব খবর কি আর চাপা থাকে। ঠিক পৌঁছে গেল টুপা ইনকার কানে। সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীতে ফেরার হুকুম জারি হল। কিন্তু ফিরব বললুম আর ফিরে এলুম, তা তো হওয়ার নয়। যেমন যেতে সময়, তেমনই ফিরতেও দেরি।

তিনি তখন রাজধানী ছেড়ে চলেছেন দক্ষিণ দিকে এক জঙ্গল অভিযানে

সম্রাট দেশে ফিরেই তলব করলেন নিজের ভাইকে।

ভাই কি আর আসতে চায়! সম্রাটকে দেখে কোথায় যে সে লুকিয়ে পড়ল খুঁজেই পাওয়া যায় না।

সম্রাট হুকুম দিলেন। সেনাদের বললেন, ‌যেখানেই থাক সে, যেমন করে পারো, তাকে ধরে আনো।‌

সুতরাং সেনারা এ-জঙ্গল, সে-পাহাড়, এখান-ওখান করে তাকে খুঁজতে লাগল। খুঁজে কি আর পাওয়া যায়! অনেক চেষ্টা করে তাকে ধরা হল। সম্রাটের সামনে তাকে নিয়ে আসা হল। সম্রাট টুপা ইনকা তাকে দেখলেন। কোনো কথা তাকে বলবারও সুযোগ দিলেন না। তার ঘাড় থেকে মুন্ডুখানা ধুলোয় লুটিয়ে দিলেন এক লহমায়। আর সেই টিটিকাকার সর্দারকে আচ্ছা করে শিক্ষা দিয়ে তাকেও খতম করে দিলেন মুহূর্তের মধ্যে।

বাবার মতো ছেলে টুপা ইনকাও যে কত দেশ জয় করলেন! কত বড়ো হয়ে গেল তাঁদের সেই টাহুয়ানটিনস্যু। বুঝি দেশ জয়ের আর বাকি রইল না কিছু। তিনি ভাবলেন, বোধ হয় গোটা পৃথিবীটাই তাঁর জয় করা হয়ে গেছে।

কিন্তু একদিন তাঁর এক সেনাপতি সব গোলমাল করে দিল তাঁর ধারণা। সে বলল, ‌সম্রাট, জানা গেছে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপারেও মানুষ আছে, দেশ আছে।‌

সম্রাট চমকে তাকালেন তার দিকে।

সেনাপতি বলল, ‌মহাসাগরের বুকে ভেলায় চড়ে মানুষকে আসতে দেখা গেছে।‌

সম্রাট টুপা ইনকা থতোমতো খেয়ে গেলেন। ভাবলেন তবে কি তাঁর পৃথিবীর চার দিগন্ত জয় করা হয়নি! তিনি ডাক দিলেন দেশের কারিগরদের।

শয়ে শয়ে কারিগর হাজির হল।

তিনি বললেন, ‌খবর পেয়েছি সাগর পেরিয়ে আরও দেশ আছে, সে-দেশে মানুষ আছে। আমি সে-দেশ জয় করতে চাই।‌

তারা বলল, ‌আমরা আপনার জন্য কী করতে পারি হুজুর?‌

সম্রাট টুপা ইনকা বললেন, ‌তোমরা আমার সমুদ্রযাত্রার ব্যবস্থা করবে। কেমন করে সমুদ্র পেরিয়ে সে-দেশে যেতে পারি তার উপায় তোমাদের বের করতে হবে।‌

কারিগররা অনেক মাথা খাটিয়ে একটা উপায় বের করল। তারা তৈরি করল ভেলা। একটা নয়, অসংখ্য ভেলা। জলে ভাসল সেই ভেলা। সেই ভেলায় চড়ে সম্রাট টুপা ইনকা হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে সমুদ্রজয় করতে বেরোলেন। সে কী এলাহি কান্ড! সমুদ্রের জলে ঢেউয়ের সঙ্গে টালমাটাল করতে করতে সেই অগুনতি ভেলা এগিয়ে চলল। ভেলায় যাচ্ছে বীর সেনারা। সঙ্গে যাচ্ছেন সম্রাট টুপা ইনকা নিজে। সূর্যদেবতা ইনটির কিরণ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। ঝলমল করছে রাশি রাশি আলোর ফুলকি। সেই আলোর ফুলকির সঙ্গে ঢেউয়ের ওপর ঢেউ খেলে এগিয়ে চলেছে সম্রাটের ভেলাগুলি। সম্রাটের চোখের দৃষ্টি এখন ওই দূরে, সীমাহীন সমুদ্রের জলের ওপর। সন্ধানী চোখ তাঁর আঁতিপাঁতি করে এদিক-ওদিক খুঁজে বেড়াচ্ছে একটি নতুন দেশ। খুঁজে বেড়াচ্ছে নতুন দেশের নতুন মানুষ। যে-মানুষের গল্প তিনি শুনেছেন নিজের দেশের মানুষের কাছে। না, সমুদ্রের কোনো বাধাই তাঁকে আটকে রাখতে পারল না। একটি তিমি কিংবা একটি হাঙরও তেড়ে এল না তাঁদের দিকে। কিন্তু সে-দেশ কোথায়? কোথায় সেই নতুন দেশের মানুষ? ভেলা ভেসে যায় দিনের পর দিন রাতের পর রাত। কিন্তু কই? হতাশ হয়ে পড়ে তাঁর সৈনিকেরা। কিন্তু সম্রাট তবু এতটুকু মুষড়ে পড়েন না। চলো, এগিয়ে চলো। ভেলা ভেসে যায়। কিন্তু এরপর? খাবার ফুরিয়ে গেলে তখন?

কিন্তু হঠাৎ-ই একদিন একঝাঁক পাখি উড়ে এল তাঁদের ভেলার দিকে। বাতাসে ভাসতে-ভাসতে তারা ডাকতে লাগল নানা সুরে। অমনই উল্লাস শুরু হয়ে গেল সৈনিকদের। তারা বুঝতে পেরেছে, কাছেই কোনো স্থল আছে। সম্রাট টুপা ইনকার মুখে হাসি ফুটল। তাঁর কপাল-ভরতি ভাবনার চিহ্নগুলি মুছে ফেললেন তিনি। ভেলার নাবিকরা চেঁচিয়ে উঠল, ‌সামনে জমিন, সামনে জমিন!‌

সম্রাট চকিতে সামনের দিকে তাকালেন। হ্যাঁ, ওই তো দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের বুকের ওপর একটি দ্বীপ। ভেলা তিরতির করে ভেসে চলল সেইদিকে। অসংখ্য সৈনিকের সঙ্গে সম্রাটও উদগ্রীব হয়ে চেয়ে রইলেন। সেই দ্বীপের যত কাছে এগিয়ে যায় ভেলা, ততই যেন তোলপাড় শুরু হয়ে যায় তাঁর বুকের ভেতরে। এ তিনি কোথায় চলেছেন? কোন দেশে? তবে কি পৃথিবীটা শুধু তাঁর দেশই নয়! পৃথিবী কি আরও বড়ো, অনেক বড়ো? ভাবতে ভাবতে তিনি পৌঁছে যান সেই দ্বীপটির তীরে।

চোখ জুড়িয়ে যায় সম্রাটের। এ যে এক প্রবালদ্বীপ।

হ্যাঁ, সম্রাট টুপা ইনকা সেইদিনই বোধ হয় বুঝতে পেরেছিলেন, পৃথিবীকে যত ছোটো এতদিন তাঁরা ভেবে এসেছেন, সে তত ছোটো নয়। বড়ো, অনেক বড়ো। একে জয় করা বুঝি সম্ভব নয়।

এই প্রবালদ্বীপটিকেও তিনি বোধ হয় জয় করেননি। কাছাকাছি এমনই আরও একটি দ্বীপের সন্ধান তিনি পেয়েছিলেন। একটির নাম আভাচুম্বি আর একটির নাম নিভাচুম্বি। হয়তো এই দেশের মানুষের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্ব করেছিলেন। এক বছর পর তিনি যখন দেশে ফিরছিলেন এত-এত সোনা এনেছিলেন সঙ্গে করে। আর এনেছিলেন ও-দেশের অনেক কালো মানুষ আর ঘোড়ার চামড়া।

আমার ঠাকুরদাদা ইনকা সাম্রাজ্যকে অনেক দূর পর্যন্ত, অনেক দেশ জয় করে অনেক বড়ো করে গড়েছিলেন। আমার ঠাকুরদাদার অনেক ছেলে-মেয়ে ছিল। তিনি যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, তখন সিংহাসনে বসলেন আমার বাবা। আমার বাবা অবশ্য ঠাকুরদাদার বড়োছেলে ছিলেন না। কিন্তু ঠাকুরদাদা মারা যাওয়ার পরই শুরু হয়ে গেল সিংহাসন নিয়ে লাঠালাঠি। এ বলে সিংহাসন আমার, আর একজন বলে সিংহাসন তার। অগত্যা দেশের সব বড়ো বড়ো মানুষ, গণ্যমান্য ব্যক্তিরা এগিয়ে এলেন ঝগড়া মেটাতে। বড়ো বড়ো মানুষের বড়ো বড়ো মাথা এক হল। তাঁরা এঁর সঙ্গে যুক্তি করে, ওঁর সঙ্গে কথা বলে আমার বাবাকেই সিংহাসনে বসালেন। সিংহাসনে বসিয়ে তাঁরা আমার বাবাকে উপাধি দিলেন ‘‌হুয়ানা কাপাখ‌’। যার মানে তরুণ-রাজা।

তরুণই তো। কারণ তখনও পর্যন্ত আমার বাবার বিয়ে হয়নি। তাঁর বিয়ে হল যেদিন তিনি সিংহাসনে বসলেন সেইদিন। আমি শুনেছি সেদিন রাজ্যজুড়ে শুধু উৎসব আর উৎসব। কী আনন্দ মানুষের! দলে দলে গান গাইতে গাইতে তারা এসেছিল রাজধানী কুজকোতে। যত মানুষ, ততই যেন রঙের বাহার। গায়ে তাদের রংবাহারি ঝলমলে পোশাক। মুখে তাদের ইনকার জয়ধ্বনি। রাজপ্রাসাদের চত্বরজুড়ে মেয়েরা গান গাইছে, নাচছে। পুরোহিতরা আমার বাবাকে আশীর্বাদ করে আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছেন পাখির পালক। সে-পালকের কত রং। রঙে রঙে ভরে যায় আকাশ। সে-রং বাতাসে দোল খায়। তাঁরা পথে পথে ছড়িয়ে দিচ্ছেন স্বর্ণরেণু। কয়েদখানার বন্ধ দুয়ার খুলে গেল। মুক্তি পেল বন্দিরা। তারাও আজ আনন্দ করবে। চারদিকে শুধু খুশি আর খুশি।

খুশি ছড়িয়ে পড়ল আমার ঠাকুরমার মুখেও। আমার ঠাকুরমা ভীষণ ভালোবাসতেন আমার বাবাকে। তিনি তেমনই ছিলেন শক্তপোক্ত মানুষ। কোনো নতুন কাজে হাত দেওয়ার আগে আমার বাবা ঠাকুরমার পরামর্শ না নিয়ে এক পাও এগোতেন না। আমার ঠাকুরমার বুদ্ধিও ছিল তেমনই। তাঁর কাছে বুদ্ধি নেওয়ার জন্য আমার বাবা কেন, অনেকেই ছুটে আসত। ছেলেকে চোখে চোখে রাখতেন তিনি। সবসময় থাকতেন বাবার পাশে পাশে, কারণ বিপদ যেকোনো সময় আসতে পারে। কে না জানে, আমার বাবা সিংহাসনে বসায় তাঁর দাদারা ভীষণ খেপে গেছেন। সিংহাসনের লোভ কে ছাড়তে পারে বলো? সিংহাসনে বসলেই তো সোনার ছড়াছড়ি। এক-একটা দেশ জয় করো আর বস্তা বস্তা সোনা আনো সে-দেশ থেকে—ঘরে তোলো। সে-সোনায় তো আর কেউ ভাগ বসাতে পারবে না। সম্রাট স্বর্গে গেলেও অন্য যিনি সিংহাসনে বসবেন তিনিও না। সম্রাটের সোনার ভাগীদার হবে তাঁর দেবতা, আর নয়তো তাঁর আপনজন। নতুন যিনি সম্রাট হবেন, দেশ জয় করে তাঁর সোনার ভান্ডার তাঁকেই ভরতি করতে হবে—এই ছিল আমাদের নিয়ম।

আমার ঠাকুরমা মারা গেলেন।

আসলে কী জান, আমার বাবার রাজত্ব থেকেই শুরু হয়েছিল ইনকা সাম্রাজ্যের দুর্ভাগ্যের সময়। আমার ঠাকুরমা মারা যাওয়ার পর আমার বাবা সৈন্য সাজালেন। দেখতে চললেন নিজের রাজ্যের হালচাল। তা রাজ্য মানে, সে তো আর একটুকরো দেশ নয়। আমার ঠাকুরদাদা তাঁর ছেলের জন্য রেখে গেছেন মস্তবড়ো এক সাম্রাজ্য। সেই সাম্রাজ্যের হাল-হকিকত ঠিক ঠিক খেয়াল না রাখলে ভেতরে ভেতরে কলকাঠি নাড়ার লোকের তো আর অভাব নেই। তাঁর নিজের ভাইরাই তো কোমর বেঁধে উঁচিয়ে আছে। সুতরাং সম্রাট নিজেই চললেন। সঙ্গে নিলেন অনেক উপহার, অনেক পোশাক-আশাক। এক-এক দেশে যান, নিজের হাতে সেইসব উপহার মানুষের হাতে তুলে দেন। মানুষের মন জয় করেন। যারা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছিল, সম্রাটকে দেখে তারা শান্ত হল। যারা দেশের মধ্যে গোলমাল বাঁধাবার চেষ্টা করছিল, সম্রাটের কথা শুনে তারা গোলমাল থামাল। তিনি দুর্গ তৈরি করলেন শত্রুর হাত থেকে দেশকে বাঁচাবার জন্য। বড়ো বড়ো বাড়ি তৈরি করলেন। দেশের মানুষ সেইসব বাড়িতে আনন্দের পসার বসাবে, তারা নাচবে গাইবে দেশের মানুষকে আনন্দ দেবে। মানুষকে তুষ্ট করে তিনি এবার চললেন উত্তর দিক জয় করতে। আমার বাবা দেখলেন, তাঁর পূর্বপুরুষরা সব দেশই প্রায় জয় করেছেন। শুধু বাকি আছে উত্তর দিকের দেশ। তিনি দৈবজ্ঞদের ডাক দিলেন যুদ্ধে যাওয়ার আগে। তিনি বললেন, ‌মহাত্মাগণ, আমি উত্তর দেশ জয় করার ইচ্ছে করি। আমি কি সূর্যদেবতা ইনটির আশীর্বাদ লাভ করতে পারব? আমি কি জয় করতে পারব সেই দেশ?‌

দৈবজ্ঞরা বললেন, ‌সম্রাট, আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আপনি এগিয়ে চলুন, আপনার জয় হবে।‌

দৈবজ্ঞদের আশ্বাস পেয়ে তিনি সেনাপতিদের ডাকলেন। আদেশ করলেন সৈন্য প্রস্তুত করতে।

সৈন্য প্রস্তুত হল।

আমার বাবার যুদ্ধে যাওয়ার আগে সারারাজ্যে উৎসব শুরু হয়ে গেল। রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন অংশ থেকে উচ্ছল কিশোর-কিশোরীরা রাজধানী কুজকোতে ছুটে এল। তারা রাজধানীর পথে-পথে নেচে-গেয়ে বীরের জয়গান গাইতে লাগল। সেই কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যারা রূপবন্ত কিংবা রূপসী তাদের দেবতার সামনে বলি দেওয়া হল।

বাবা আদেশ করলেন, ‌আমার পূর্বপুরুষের মমিগুলি রাজপ্রাঙ্গণে সাজাও।‌

সেগুলি সাজানো হল। চারণকবিরা সেইসব মমির কীর্তিগাথা গেয়ে তাদের গুণগান করতে লাগল। আর আমার বাবা সেইসব মমির সামনে নত হয়ে আশীর্বাদ ভিক্ষা করলেন। তাদের উদ্দেশ্যে হাজার হাজার পাখির পালক ছড়িয়ে দিলেন। তারপর যুদ্ধে চললেন।

সে কত সৈন্য! রাজধানী কুজকো থেকে তারা সার সার হাঁটা দিল—যেন শেষ নেই। আমার বাবা চললেন ডুলিতে চেপে, সঙ্গে নিলেন তাঁর দুই ছেলেকে। একজনের নাম নিয়ানকুয়ুচি আর অন্যজন আতাহুয়ালপা। তোমাদের বলে রাখি, এরা আমার সৎভাই। আমিও তখন খুবই ছোটো। ধরো-না দু-তিন বছর হবে আমার বয়েস। আমার মনে নেই বাবা যুদ্ধে যাওয়ার সময় আমায় আদর করেছিলেন কি না। তাঁর মুখখানি আমার একটুও মনে পড়ে না। এখন বলতে কষ্ট হয়, বাবার আদরমাখা মুখখানি আমি আর কোনোদিনই দেখতে পাইনি। কেননা, যুদ্ধের পর যখন তিনি রাজধানী কুজকোতে ফিরলেন তখন তিনি বেঁচে নেই। ফিরল তাঁর মৃতদেহ ‌মমি‌ হয়ে।

সেকথা এখন থাক। আমার বাবার মৃত্যুর আগের ঘটনাই আগে বলি তোমাদের। বলি তাঁর যুদ্ধ-অভিযানের কথা। চলেছেন তিনি উত্তরের পথের দিকে চোখ মেলে। সে তো শুধু পাথরের পথ। পেছনে পেছনে পড়ে থাকছে পথ। জয় করছেন একটির পর একটি দেশ, জয় করছেন মানুষের মন। দেবতার পায়ে পুজো দিচ্ছেন, মানুষকে উপহার দিচ্ছেন, আবার এগিয়ে চলছেন। যেখানে তাঁর বাধা নেই, সেখানে মানুষ তাঁর আসার খবর পেয়ে পথঘাট ধুয়ে-মুছে ঝকঝকে করে রাখছে। হাজার হাজার মানুষ পথে-পাহাড়ে তাঁকে দেখতে ছুটে আসছে। তাঁকে দেখে তাদের জীবন সার্থক হচ্ছে, কেননা সম্রাট তো দেবতা; তিনি সূর্যের সন্তান। তাই তারা চিৎকার করে বলছে, ‌আনচা হাটুন আপু, ইনটিপচুরি।‌ ...হে মহান শক্তিশালী প্রভু, সূর্যের সন্তান।

কোথাও চলেছেন তিনি জলাভূমি পেরিয়ে। সেখানের বাতাসে আগুনের হলকা। সম্রাটের চিবুক ছুঁয়ে ঘাম ঝরে। তাঁর ডুলি-বাহকের পায়ে মনসা গাছের কাঁটা ফুটে যায়— রক্ত ঝরে। রক্তচোষা মাছি ছেঁকে ধরে তাঁর সৈন্যদের, তবু তারা থামে না। চলছে আর চলছে। হাজার হাজার সৈনিকের নিশ্বাসে অদম্য শক্তির শব্দ শোনা যায়।

এমনই করতে করতে আমার বাবা হুয়ানা কাপাখের সৈন্যদল পৌঁছে গেল টোমবামবা। এই সেই দেশ, আমার ঠাকুরদাদা টুপা ইনকা জয় করেছিলেন। এই সেই দেশ, এখানেই আমার বাবা হুয়ানা কাপাখ জন্মেছিলেন। প্রকৃতি এখানে কী চমৎকার সাজে সেজে আছে। তাঁর জন্মভূমি এই টোমবামবার সৌন্দর্য আমার বাবার এত ভালো লাগল যে, এখান থেকে যেন আর কোথাও যেতে মন চাইল না তাঁর। যে-সোনার দেশ জয় করার জন্য টোমবামবায় ঘাঁটি করার পরামর্শ দিলেন তাঁর সেনাপতিরা, সে-পরামর্শে ঘাঁটি তিনি করলেন, কিন্তু সেইসঙ্গে এখানেই একটি রাজপ্রাসাদও গড়লেন। কী চোখ-ঝলসানো সে রাজপ্রাসাদ! রঙে রঙে ঝলমল করে প্রাসাদের অন্দরমহল, বারমহল। দেওয়ালের গায়ে গায়ে একটি-একটি করে গাঁথা হল হাজার হাজার মুক্তো-মানিক। প্রাসাদের একটি পবিত্র জায়গায় আমার বাবা আমার ঠাকুরমার একটি সোনার মূর্তি গড়ে সাজিয়ে রাখলেন। তাঁর সব খুশি যেন উপচে পড়ল এইখানে, এই প্রাসাদে। শেষকালে এই টোমবামবাই যেন তাঁর হয়ে উঠল সব। রাজধানী কুজকো বুঝি তাঁর মন থেকে মুছে যায়। দূরে, আরও দূরে কুজকো বুঝি হারিয়ে যায়! বিপদ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাঁকে!

হয়তো তাই। এবার তিনি চললেন স্বর্ণকারের দেশ জয় করতে। সে-দেশ আরও উত্তরে। সেই উত্তর-দেশে যেতে যেতে সামনে দেখা যায় রাশি রাশি আগ্নেয়গিরির কালো ছাই ছড়িয়ে আছে। কোথাও-বা অগ্ন্যুৎপাতে পাহাড়ের মাথা দাউদাউ করে জ্বলছে। সেই আগুনে ঝলসে যায় সেনাদের দেহ, তবু তারা মানে না বাধা কিছুই— এগিয়ে চলে। পৌঁছে গেল তারা সেই কুইটো দেশে। এখানে আবার একটি ছাউনি পড়ল সেনাদের। এখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন সেনাপতিরা। আমার বাবা তাদের সাহস দেবেন।

হ্যাঁ, সেই সাহসেই বুক বেঁধে সেনারা এগিয়ে গেল যুদ্ধক্ষেত্রে। বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। গর্জে উঠল দু-দেশের সেনারা। রক্তে ভেসে গেল পর্বতের চূড়া। স্বর্ণকারের দল কিছুতেই জিততে দেবে না সম্রাট হুয়ানা কাপাখকে। সেই দেশের সমস্ত মানুষ একসঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। তাদের দেশের একটুকরো পাথরও তারা নিতে দেবে না শত্রুকে। তারা মরবে, তবু ছাড়বে না।

হেরে গেলেন আমার বাবা। তাঁর নিজের সৈন্যরাই এবার বেঁকে বসল। না, তারা আর যুদ্ধ করবে না। তারা ফিরে যাবে কুজকোয়।

বিদ্রোহী সেনাদের দলনেতাকে ডাকা হল। সম্রাটের সামনে এসে সে দাঁড়াল। সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, ‌তোমরা কী চাও?‌

সে বলল, ‌আমরা ফিরে যেতে চাই রাজধানী কুজকোতে।‌

সম্রাট বললেন, ‌যদি ফিরে যেতে না-দিই?‌

‌আমরা শুনব না আপনার সে-আদেশ।‌ দৃঢ় গলায় উত্তর দিল বিদ্রোহী নেতা।

‌জানো আমার আদেশ পালন না করলে তোমাদের হত্যা করা হবে? কঠিন স্বরে ধমক দিলেন সম্রাট।

‌—আমরা আছি হাজারে হাজারে। ক-জনের প্রাণ নেবেন আপনি? একজনের প্রাণ গেলে আমরা হাজারে হাজারে অন্যের প্রাণ নিতে পারি।‌ সেই বিদ্রোহী যেন গর্জে উঠল।

আমার বাবা সম্রাট হুয়ানা কাপাখ তার উত্তরে চমকে উঠলেন। কী স্পর্ধা! রোষে তাঁর মুখখানা লাল হয়ে উঠল, তবু কিছু বলতে পারলেন না। তিনি ডাক দিলেন প্রধান পুরোহিতকে।

প্রধান পুরোহিত ছুটে এলেন।

সম্রাট বললেন, ‌আমি মনে করি এই লোকটার বেয়াড়াপনা এখনই শেষ করে দিতে হবে। লোকটা আমায় ভয় দেখায়। আমি সম্রাট। আমার দেহে ইনকার রক্ত। আমি সূর্য-দেবতা ইনটির সন্তান। সুতরাং আমার আদেশ, একে আমার সামনেই হত্যা...‌

সম্রাটের কথা শেষ করতে দিলেন না প্রধান পুরোহিত। তিনি তাঁর কথার মাঝখানেই খুবই শান্ত গলায় বললেন, ‌হে ইনটির পুত্র, এই দুঃসময়ে আপনার রোষ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। সেইসঙ্গে আমাদের জানতে হবে, সেনাদেরও অসন্তোষের কারণ কী! সম্রাট, আমি বিশ্বাস করি এই সৈনিকের দল আপনাকে যেমন তাদের প্রভু বলে জানে, তেমনই তাদের জন্মভূমিকেও তারা ভালোবাসে প্রাণ দিয়ে। সম্রাট, আমাদের এই বীর সেনানীর অনেক রক্তে গড়ে উঠেছে আমাদের এই সোনার দেশ, টাহুয়ানটিনস্যু, চার দিগন্ত। এখনও অনেক রক্তে ভিজে আছে আন্দিজের শক্ত পাথর। আমাদের এই টাহুয়ানটিনস্যুর আকাশে দেবতা ইনটির যে হাসি ছড়িয়ে আছে সে তো এই দুর্জয় যোদ্ধাদের জন্যই। সুতরাং সম্রাট, এই বিপদের দিনে আর হত্যা নয়। হত্যা করে ভয় দেখানো যায় কিন্তু তাতে মন পাওয়া যায় না, বিরোধ বাড়তেই থাকে। সুতরাং আমাদের এই সৈনিক বন্ধুদের সঙ্গে আমি একাই গোপনে একটু আলোচনা করতে চাই। আমাকে সেই সুযোগ দিলে, আমি মনে করি সকলেরই মঙ্গল।‌

প্রধান পুরোহিতের ইচ্ছা কোন সম্রাট অমান্য করবেন? সুতরাং আমার বাবাও তাঁর ইচ্ছায় সায় না দিয়ে পারলেন না। তিনি বললেন, ‌হে আচার্য, ইনকার মঙ্গল আপনার হাতে। আপনার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা। আপনি যা ভালো বোঝেন, আমি তাতে বাধা দেওয়ার স্পর্ধা দেখাতে পারি না। সুতরাং আপনি এই সৈনিক বন্ধুটির সঙ্গে নিশ্চয়ই আলোচনা করতে পারেন।‌

সে-যাত্রায় আমার বাবা রক্ষা পেয়েছিলেন। প্রধান পুরোহিতের চেষ্টায় সেই বিদ্রোহী সেনারা আর বিরোধ পাকাবার মতলব আঁটেনি। কুজকোতে ফিরে যাওয়ার গোঁও ধরেনি। তারা থেকে গেল টোমবামবায়, সম্রাটেরই কাছে। কিন্তু তাহলে কী হয়! দুর্ভাগ্যের কালো ছায়া এগিয়ে আসছে ধীরে ধীরে এই টোমবামবায়, আমার বাবার দিকে হাত উঁচিয়ে। হঠাৎই এমনসময় একদিন বাজ পড়ল টোমবামবার রাজপ্রাসাদে। সমস্ত প্রাসাদ কেঁপে উঠল, আমার বাবার বুকও কাঁপল। এ যে এক ভয়ংকর অলক্ষুণে কান্ড। আকাশের বজ্রদেবতা ‌ইলিয়াপা‌ কেন রাগ করেন। তাঁর রোষ কেন আঘাত করে রাজপ্রাসাদ! বজ্রদেবতা ইলিয়াপার ক্রোধ শান্ত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন সম্রাট। শুরু হয়ে গেল তাঁর পুজো মন্দিরে, দেবালয়ে।

কিন্তু সে-পুজো শেষ হতে-না-হতে সম্রাট দেখতে পান, আকাশে ‌মামা কিলাইয়া‌-কে ঘিরে ধরেছে তিন-তিনটে বলয়। হ্যাঁ, তোমাদের হয়তো জানা নেই, কে এই ‌মামা কিলাইয়া‌? এই মামা কিলাইয়া হলেন চাঁদ। আমাদের মা। কেননা, সূর্যদেবতা ইনটির তিনি বউ। সুতরাং তিনি দেবী, এই ছিল আমাদের বিশ্বাস। তাই তাঁকে বলয় ঘিরে ধরা মানে, সামনে ভীষণ সংকট। সেই সংকট কাটাবার জন্য হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে আর্তনাদ করতে শুরু করে দিলে। চিৎকার করতে লাগল অসংখ্য কুকুর, সেই চাঁদ-মায়ের দিকে মুখ তুলে। বেজে উঠল ভেঁপু। বাজতে লাগল দামামা। সে যে কত! নির্জন পর্বত যেন জেগে উঠল নিমেষে। সেই বলয়কে লক্ষ করে হাজার হাজার মানুষ ঝাঁকে ঝাঁকে পাথর ছুড়তে লাগল সেই বলয়ের দিকে। আমরা বিশ্বাস করি ওই বলয় আর কিছু নয়, বিষধর সাপ। সুতরাং তাকে মারতে হবে যেমন করে হোক। তা না হলে চাঁদ-মাকে সে যদি ছোবল মারে, তবে যে পৃথিবীটাই ধ্বংস হয়ে যায়!

একটা বিপদ কাটতে-না-কাটতে আবার আর এক বিপদ ধেয়ে এল। ‌পাচা মামা‌ ক্ষিপ্ত হলেন। পাচা মামা আমাদের পৃথিবী-মায়ের নাম। তিনি একদিন কেঁপে উঠলেন। পর্বতের চূড়া ভেঙে পড়ল। হাহাকার শুরু হয়ে গেল টোমবামবার রাজপ্রাসাদে। সেইসঙ্গে শুরু হয়ে গেল কান্না। কেননা রাজপ্রাসাদের স্বর্ণচূড়ায় ছিটকে পড়ল একটা রুগণ ইগল, আকাশ থেকে। তারপরেই একদিন রাতের অন্ধকারে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সম্রাট দেখতে পেলেন, হাজার হাজার পিশাচ তাঁর ঘরে ঢুকে পড়েছে! কী বীভৎস তাদের চেহারা! আঁতকে উঠলেন সম্রাট চিৎকার করে! তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। সারারাত তিনি আর ঘুমোতে পারলেন না। সেই নিস্তব্ধ ঘরে তিনি জেগে বসে রইলেন চুপচাপ। মুখে-চোখে তাঁর ভয় জড়িয়ে আছে। এখন তাহলে?

সকাল হয়ে গেল। হয়তো তিনি তখনও ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছেন। ঠিক সেই সময়ে খবর নিয়ে এল দূত। সে বলল, ‌সম্রাট, সমুদ্রের তীরে একদল অচেনা মানুষকে দেখা গেছে। অদ্ভুত তাদের পোশাক। গাল-ভরতি তাদের দাড়ি। হিংস্র তাদের চোখের দৃষ্টি। তাদের বিরাট বিরাট ঘর, কাঠের তৈরি। সেই ঘর সমুদ্রের জলে ভাসছে। দিনের বেলা সেই ঘর থেকে তারা বেরিয়ে আসে। ঘুরে বেড়ায় এদিক-ওদিক। সতর্ক চোখে চায়, কিছু খোঁজে। হয়তো আপনার সঙ্গে তারা দেখাও করতে চায়। তারপর রাতের বেলা সেই ঘরেই তারা ঘুমোয়।‌

এই কথা শুনে সম্রাট থতোমতো খেয়ে গেলেন। অস্থির চোখে তাকালেন সেই দূতের দিকে। ভয় পেল দূত সম্রাটের মূর্তি দেখে, সে পালাল। সম্রাট ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন, তারপর একা একা সেই ঘরের ভেতর কী-যে করলেন কেউ জানতে পারল না।

পরের দিন আবার খবর এল। নিয়ে এল আর একজন দূত। সে বলল, ‌সম্রাট, সেই অচেনা দাড়িওয়ালা লোকগুলো কাউকে ভয় পাচ্ছে না। প্রহরীকে তোয়াক্কা না করে যেখানে-সেখানে ঢুকে পড়ছে। সোনাদানা ছিনিয়ে নিয়ে পালাচ্ছে। এমনকী সম্রাটের পোষা বাঘ-সিংহ যেখানে আছে সেই গুহাতে ঢুকতেও তারা ভয় পাচ্ছে না। কেননা, তাদের হাতে এমন ভয়ংকর একটা লাঠি আছে, যেটা টিপলেই আগুন ছিটকে গর্জে ওঠে।‌

সম্রাট হুংকার দিয়ে চিৎকার করলেন, ‌অকর্মণ্য, অপদার্থ তোমরা সব। কেন তাদের এখনও গ্রেফতার করনি তোমরা! কেন তাদের নিয়ে আসনি আমার সামনে! কেন তাদের মুন্ডুগুলো এখনও কেটে ফেলনি? তোমাদের মুখ আর দেখতে চাই না আমি। দূর হয়ে যাও আমার সামনে থেকে।‌

না, সেই লুঠেরাদের ধরা গেল না। উলটে ভয়ংকর এক অসুখ দেখা দিল সেই সূর্যদেবতা ইনটির ইনকা রাজ্যে। হাজার হাজার টাহুয়ানটিনস্যুর মানুষ সেই অসুখের কবলে পড়ল। কত মানুষ যে মারা গেল তার হিসেব দিতে পারল না কেউ। এমনকী সেই রোগে আমার এক সৎমা মারা গেলেন, আমার দাদা মারা গেল। রাজ্যজুড়ে নেমে এল বিভীষিকা। আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ পালাতে লাগল। কিন্তু তারা যাবে কোথা! সারাদেশে এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ কেউ বলল, অচেনা ওই দাড়িওয়ালা মানুষগুলোই এই রোগ ছড়িয়ে দিয়েছে। দুর্ভাবনায় আমার বাবা অস্থির হয়ে উঠলেন। কী করবেন তিনি, কেমন করে বাঁচাবেন দেশের মানুষকে!

না, পারলেন না তিনি। কেননা এ রোগ তাঁকেই ধরল! এখন কে কাকে বাঁচায়! আমার বাবার বাসনা ছিল তাঁর ছেলে নিয়ানকুয়ুচি আমার বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসবে। বাবার সে-সাধ পূর্ণ হল না, কেননা সেই ভয়ংকর রোগের হাত থেকে বাবাও নিস্তার পেলেন না। বাবা তো মারা গেলেনই, মারা গেল আমার দাদা নিয়ানকুয়ুচিও ওই অসুখেই। দেশজুড়ে ঘোর সংকট ঘনিয়ে এল। এখন কে সিংহাসনে বসে দেশের হাল ধরবে, সেই নিয়ে লেগে গেল হট্টগোল। তোমরা তো জানই, আমার বাবা নিয়ানকুয়ুচির সঙ্গে আমার আর এক দাদা আতাহুয়ালপাকেও যুদ্ধে নিয়ে গেছিলেন। নিয়ানকুয়ুচি যেই-না চোখ বুজল, অমনই আতাহুয়ালপা আগ বাড়াল। বলল, ‌সিংহাসন আমার।‌

সিংহাসন আমার বললুম আর বসে পড়লুম, তা তো হয় না। বড়ো বড়ো মাথা সব একসঙ্গে বসল। যুক্তি-পরামর্শ করে সম্রাট করল আমার আর এক দাদাকে। তাঁর নাম হুয়াসকার। ব্যাস! লেগে গেল গলাবাজি। আতাহুয়ালপা তো রেগে টং। এমন বেঁকে বসল যে, বাবার মৃতদেহ যখন টোমবামবা থেকে রাজধানী কুজকোতে নিয়ে আসা হল, সে সঙ্গে এল না। অথচ দেশজুড়ে মানুষের সে কী কান্না! তাঁর দেহটি যখন টোমবামবা থেকে যাত্রা শুরু করল, তখন পর্বতের চূড়ায় অসংখ্য মানুষ। তারা শেষ বারের মতো বাবার ‌মমি‌টি দেখবে আর তাদের ভুরুর চুল নিজেরাই ছিঁড়ে আকাশে উড়িয়ে দেবে। এ ছিল আমাদের শোক প্রকাশের একটি প্রথা।

অনেক পথ পেরিয়ে বাবার মমি কুজকোতে এল। আমি চোখ মেলে দেখলুম আমার বাবাকে প্রথম, আমার জ্ঞানে। আমার যখন দু-তিন বছর বয়েস, তখন বাবা গেছলেন কুজকো ছেড়ে উত্তরদেশ জয় করতে। তা সে হয়ে গেল বারো বছর। বারো বছরে তিনি কুজকোতে এক দিনের জন্যও ফেরেননি। আর আজ ফিরেছেন তিনি। কিন্তু আজ তিনি কথা বলবেন না কারও সঙ্গে। কাউকে ডাকবেন না। ডেকে জিজ্ঞেস করবেন না, ‌কী খবর তোমার?‌ কারণ আজ তিনি ‌‘‌মমি‌‌’।

এই আমার বাবা। আমার চোখের সামনে তিনি শুয়ে আছেন। কী চমৎকার ঝলমলে পোশাক পরে আছেন তিনি! কোমরে তাঁর যুদ্ধের অস্ত্র। তিনি যেন এইমাত্র যুদ্ধজয় করে ফিরলেন। আমার বাবা বীর সন্তান ওই সূর্যদেবতা ইনটির। ইনটির সহস্র আলোর কণার তিনিও আজ একটি কণা হয়ে আকাশের বুকে ছড়িয়ে থাকবেন। আমাদের আলো দেবেন। আমাদের টাহুয়ানটিনস্যুর মানুষকে সোনার আলোয় উপচে দিয়ে তিনি আকাশময় খুশিতে হেসে বেড়াবেন।

কিন্তু না, তা হল না। আমার দাদা আতাহুয়ালপা এমন চটান চটল, আমার বাবাকে শেষ দেখা দেখতেও এল না। এমনকী আমার ওই দাদা হুয়াসকার যেদিন সিংহাসনে বসল, মানে যেদিন হুয়াসকারের অভিষেক হল সেদিনও সে এল না। অথচ দাদার অভিষেকের দিনে কে না এসেছে! দেশের বড়ো বড়ো মানুষ, গণ্যমান্য ব্যক্তি থেকে শুরু করে জ্ঞানীগুণী, দৈবজ্ঞ, সেনাধ্যক্ষ, সেনাপতি সৈনিক—কে না! অথচ এল না দাদা আতাহুয়ালপা। এল না তো এল না, ঠিক আছে। কিন্তু করল কী, তার কয়েক জন দূতের হাতে আলতু-ফালতু কিছু উপহার পাঠিয়ে দিয়ে গ্যাঁট হয়ে বসে রইল সেই উত্তরের দেশে। বলে রাখি, সেই উত্তরের দেশটার নাম ছিল কুইটো।

আতাহুয়ালপার বদলে সেই দূতদের দেখে তো হুয়াসকারের মাথা গরম। কী! সে সম্রাট, তাকে হেলাফেলা করা। সামনে আর কিছু না পেয়ে রাগের চোটে দিল দূতেদের নাক কেটে! ব্যাস! আর দেখতে হয়, সেই উত্তরের দেশ কুইটোতে আতাহুয়ালপার কানে যেই-না খবর গেছে, সে তো রেগে প্রাসাদ মাথায় করলে। সঙ্গে সঙ্গে সে ঘোষণা করে দিলে, ‌শোনো তোমরা কুইটোবাসী, আমার ভাই হুয়াসকার আমার দূতদের নাক কেটে দিয়েছে। আমার দূতের নাক কাটা মানে আমাকেই অপমান করা। তার এই বেয়াদপির আমি উচিত শিক্ষা দেবই দেব। আমি তার ধড় থেকে মুন্ডুটা যতক্ষণ-না খসাতে পারছি ততক্ষণ আমার সোয়াস্তি নেই। আমি ঘোষণা করছি, তাকে আমি ইনকা বংশের সম্রাট বলে মানি না। সূর্যদেবতা ইনটি আমার ওপর ভার দিয়েছেন দেশকে শাসন করবার। তাই শুনে রাখো তোমরা, আজ থেকে আমি রাজা। আমার রাজ্য এই কুইটো। তোমরা আমার প্রজা। আজ থেকে তোমাদের ভালোমন্দ আমার হাতে। সুতরাং তোমরা দলে দলে আমার সেনাবাহিনীতে যোগ দাও। ইনকা রাজ্যের তিন শ্রেষ্ঠ সেনাপতি আমারই সঙ্গে আছে। বিশ্বাস করি, তাদের সহায়তায় আর তোমাদের সাহায্যে আমার ভাই হুয়াসকারের দম্ভ আমি ভেঙে চুরমার করে দিতে পারব। আজ থেকে তার সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই। আজ থেকে হুয়াসকার আমার ভাই নয়, শত্রু।‌

আর ঠিক এখন থেকে দু-ভাই পাঞ্জা কষতে শুরু করে দিলে। কে আগে কাকে শায়েস্তা করবে, এই নিয়ে চলছে হম্বিতম্বি।

এমনই করতে করতে ক-বছর কেটে গেল। দু-জনেই রাগে কসকস করছে, কিন্তু আগে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস কেউ আর দেখাচ্ছে না। এদিকে বছর কাটছে, আমিও বড়ো হচ্ছি। আমি অবশ্য আমার দাদা হুয়াসকারের সঙ্গে কুজকোতেই আছি। বলতে পারো আমি হুয়াসকারের দিকেই। আমি যখন ছোটো ছিলুম তখন তো কে ঠিক করছে আর কে বেঠিক করছে এসব নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে হত না। কিন্তু এখন যত বড়ো হচ্ছি, একটু-একটু বুঝছি দোষটা কার! দোষ নিশ্চয়ই দাদা আতাহুয়ালপার। কেননা, দেশের গণ্যমান্যরা হুয়াসকারকেই সিংহাসনে বসিয়েছেন। দেশের রীতি অনুযায়ী সেইটাই তো সবাইকে মানতে হবে। সুতরাং দাদা আতাহুয়ালপা রাজা বলে কুইটো দখল করে দেশটাকে টুকরো করে ফেলবে, এটা কখনোই উচিত হয়নি। কাজেই বয়েস বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমারও ভীষণ রাগ হল দাদা আতাহুয়ালপার ওপর। না না, এটা একেবারেই অন্যায় কাজ। ওকে উচিত শিক্ষা দেওয়া উচিত। এমনসময় হঠাৎ একদিন আমি দাদা হুয়াসকারকে দেখলুম ঘরে একা বসে কী ভাবছে। মুখখানা শুকিয়ে গেছে। আমি ঘরে ঢুকলুম, দাদার পাশে বসলুম। জিজ্ঞেস করলুম, ‌কী হল? কী ভাবছ?‌

দাদা হুয়াসকার আমাকে দেখে প্রায় গর্জন করে উঠল। মুখের চোয়াল দুটো শক্ত করে সে বলল, ‌আতাহুয়ালপাকে এখনও আমি শায়েস্তা করতে পারিনি। এখনও সে বহালতবিয়তে রাজত্ব করছে। এই কথা যখনই আমি ভাবি, তখনই মনে হয় কে যেন আমার সারা শরীরে কাঁটা ফোটাচ্ছে। আমি ক-দিন ধরে ভাবছি একদল সৈন্য পাঠাব কুইটোতে। তাকে ধরে-বেঁধে আনতে বলব আমার কাছে। তার মাথার ঘিলুটা যতক্ষণ-না আমার পেটে যাচ্ছে, ততক্ষণ যেন শান্তি নেই আমার।‌

মাথার ঘিলু খাওয়ার কথা শুনে, আমি জানি, তোমাদের গা নিশ্চয়ই ঘিনঘিন করছে। কিন্তু শুনে রাখো, শত্রুকে হত্যা করে তার মাথার ঘিলু খাওয়া আমাদের আনন্দেরই একটা অঙ্গ। আমাদের তা বলে ঘেন্না নেই। এ তো আমাদের একটা তোফা খানা। যাক গে, খাবারের কথা এখন থাক। সে বলতে গেলে এখন অনেক কথা বলতে হয়। এখন যে-কথা হচ্ছিল, আমার দাদা হুয়াসকারের কথা। আমি দাদার কথা শুনে বললুম, ‌হ্যাঁ, আমিও বলি তাকে শায়েস্তা করা দরকার। কেননা আমাদের বাবা, ঠাকুরদা কিংবা ঠাকুরদার বাবার তৈরি এই এত বড়ো সাম্রাজ্যটা ভেঙে ফেলতে চাইছে তার খেয়ালখুশি মতো একটাই লোক, এটা কখনো সহ্য করা উচিত নয়। তাঁরা কত কষ্ট করে, কত দিন ধরে এই সাম্রাজ্য গড়েছেন। কত রক্ত ঝরেছে কত মানুষের। হাজার হাজার সৈনিকের মৃত্যু হয়েছে, এ কি ভোলা যায়!‌

আমার কথা শুনে আমার হুয়াসকারদাদা বলল, ‌ঠিক বলেছিস, আমি কালই কুইটোতে সৈন্য পাঠাব।‌

আমি বললুম, ‌এই কুজকো থেকে কুইটো অনেক দূর। সব আটঘাট বেঁধে কাজ করতে হবে কিন্তু! কেননা, আমাদের সাম্রাজ্যের তিন জন সেরা সেনাপতি তার দিকে।‌

দাদা হুয়াসকার বলল, ‌আমার শক্তি তাদের চেয়ে তুই কম দেখলি কোথায়? আমি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেব।‌

আমি বললুম, ‌দরকার হলে আমাকেও তুমি কাজে লাগাতে পারো।‌

দাদা বলল, ‌এখন না। তবে পরেও দরকার হবে না। কারণ যাদের পাঠাব তাকে ধরে আনার জন্য, তারাই যথেষ্ট।‌

আমি বললুম, ‌তুমি যা ভালো বোঝো।‌

একদিন সত্যি সত্যিই ইনকা সম্রাটের সৈন্য চলল কুইটো রাজার দর্প চূর্ণ করতে। ভেরি বেজে উঠল আবার। বীর বাহিনীর গর্জনে পর্বতও যেন কেঁপে ওঠে। সম্রাট হুয়াসকার তাদের বিদায় জানাল। বলল, ‌তোমাদের পরাজয় মানে সূর্যদেবতা ইনটির পরাজয়। তোমাদের বিজয় উৎসবের জন্য তৈরি থাকবে কুজকোর প্রতিটি মানুষ। সুতরাং এগিয়ে চলো।‌

সৈন্যরা এগিয়ে চলল।

ভুল হয়ে গেল সম্রাট হুয়াসকারের। কেননা আতাহুয়ালপার শক্তি যে কতটা, সেটা একদমই জানতে পারল না সে। সম্রাটের অত যে গুপ্তচর, তারা পর্যন্ত ভুলভাল খবর নিয়ে এল। তাই হুয়াসকার আতাহুয়ালপাকে ধরে আনতে এমন ক-জন সেনাপতির ওপর ভার দিল, যাদের না আছে অভিজ্ঞতা, না জানে যুদ্ধকৌশল। আতাহুয়ালপা যে সৈন্য সাজিয়ে বসে আছে, সে আর কে জানে! তাই সম্রাট হুয়াসকারের সৈন্যদের কুইটো পর্যন্ত যেতেও হল না। কুইটো যেতে আমবোটা বলে একটা জায়গা পড়ে। সেইখানে আতাহুয়ালপার সৈন্যরা ঘাপটি মেরে লুকিয়েছিল। ব্যাস! যাঁহাতক হুয়াসকারের সৈন্যদের দেখা, সঙ্গে সঙ্গে আক্রমণ। সে কী যুদ্ধ আতাহুয়ালপার সৈন্যদের। হুয়াসকারের সৈন্যদের মেরে একেবারে শেষ করে ছাড়ল। হাজারে হাজারে সৈন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল আতাহুয়ালপার সৈন্যদের হাতে। আর যায় কোথা! আতাহুয়ালপা তার সেরা তিন জন সেনাপতিকে বললে, ‌চলো কুজকো। হুয়াসকারকে জ্যান্ত ধরে আনো আমার কাছে।‌

সেনাপতিরা রাজার হুকুম তামিল করতে কোমর বাঁধল। চলল তারা কুজকোর পথে। এবার হুয়াসকারের সৈন্যদের সঙ্গে একের পর এক যুদ্ধ করছে তারা। জয় করছে। এগিয়ে চলছে। এমনই করতে করতে আতাহুয়ালপার সৈন্য আমাদের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল। এখানেই আমাদের সেই নদী আপুরিমাক। শত্রুসৈন্য এই নদী পেরোলেই সর্বনাশ আমাদের। সম্রাট হুয়াসকার এবার নিজেই যুদ্ধের হাল ধরল। লক্ষ লক্ষ মানুষ সম্রাটকে রক্ষা করার জন্য অস্ত্র তুলে নিল। তারা একের-পর-এক অগুনতি সৈন্য খতম করে ফেলল আতাহুয়ালপার! যারা বেঁচে রইল, তারা ভয়ে গা-ঢাকা দিয়ে বসে রইল। আমার দাদা সম্রাট হুয়াসকার ভাবল, শত্রু শেষ হয়ে গেছে, ভাবল যুদ্ধে তারা হেরে ভেগেছে।

ব্যাস! আবার ভুল করে বসল হুয়াসকার। করল কী, যুদ্ধের সব তোড়জোড় তুলে রেখে রাতের অন্ধকারে মশাল জ্বেলে নাচ-গান শুরু করে দিলে। যেন যুদ্ধ শেষ। এ যেন যুদ্ধজয়ের বিজয় উৎসব।

কিন্তু আতাহুয়ালপার সেই সেরা সেনাপতির একজন ফাঁদ পাতল। এ লোকটা ছিল ভীষণ চতুর। হুয়াসকারের সৈন্যরা যখন নাচা-গানা করছে, সে তখন অন্ধকারে নি:শব্দে সৈন্য সাজাচ্ছে পর্বতের আনাচেকানাচে। আমাদের সময়ে তো আর রাত্তিরে যুদ্ধ হত না। তাই যেই-না সকাল হল, যেই-না আমার দাদা সম্রাট হুয়াসকার ডুলিতে চেপে এপাশ-ওপাশ একটু তদারকি করার জন্য বেরিয়েছে, অমনই রে-রে-রে করে আতাহুয়ালপার সৈন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। যারা ডুলির বাহক তাদের কাবু করে ফেলল চোখের পলকে। তারপর আমার দাদা সম্রাট হুয়াসকারকে ডুলির থেকে টেনে ফেলে দিলে মাটিতে। ইস! কে কবে ভাবতে পেরেছে, একদিন চার দিগন্তের চতুর্থ সম্রাটের এই দুর্দশা হবে! তারপর সম্রাট হুয়াসকারকে ওই ধুরন্ধর সেনাপতি নিজেদের ছাউনিতে নিয়ে এল।

বুঝতেই পারছ, সম্রাট ধরা পড়েছে, আর সেখানে দাঁড়ায় কে! সৈন্যরা সব ছত্রভঙ্গ হয়ে পালা! পালা! আতাহুয়ালপার সেনাপতিকে তখন আর পায় কে! সে চিৎকার করে সৈন্যদের হুকুম দিল, ‌শত্রুসৈন্য পালিয়েছে। আপুরিমাক নদী পার হও। চলো কুজকো।‌

দেখতে দেখতে রাজা আতাহুয়ালপার ‌সৈন্যরা বিনা বাধায় কুজকো পৌঁছে গেল। আমাদের স্বপ্নের শহর কুজকোকে ভেঙে তছনছ করে ফেলল আতাহুয়ালপার সেনারা। আমার ঠাকুরদা টুপা ইনকার প্রাসাদের পবিত্রতা নষ্ট করে তাঁর ‌মমি‌টা আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ফেললে। আমি তখন রাজপ্রাসাদে। আতাহুয়ালপার সেনার ভয়ে আমি যে কী করি, কোথায় লুকোব কিছুই ঠাওর করতে পারছি না। আমি জানি দাদা হুয়াসকার যখন ধরা পড়েছে, তখন আমারও নিস্তার নেই। কেননা এটা আর কারও অজানা নয় আমি কার দিকে। সবাই জেনে ফেলেছে এ যুদ্ধে আমি দাদা হুয়াসকারকে মদত দিয়েছি, সুতরাং আমিও শত্রু। আমাকেও ওরা ধরবে। আমার দাদার মতো আমাকেও ওরা ধরে নিয়ে যাবে আমার আর এক দাদা আতাহুয়ালপার কাছে। এখন কেউ আর কাউকে ভাই বলে মানবে না। কারণ সিংহাসনের চেয়ে ভাই কখনো বড়ো হতে পারে না। সিংহাসনে বসা মানে সোনার ওপর গড়াগড়ি খাওয়া। সোনা মানেই শক্তি।

কিন্তু আমি এ কী করছি! আমি না ইনকা! আমার গায়ে বয়ে যায় সূর্যদেবতা ইনটির রক্ত! আর আমি কাপুরুষের মতো লুকিয়ে পড়ার গর্ত খুঁজছি! অথচ আমার চোখের সামনে প্রাসাদের সমস্ত মানুষকে হত্যা করছে শত্রুসৈন্য একে একে। লুঠ করছে মুঠো মুঠো সোনা। রেয়াত দিচ্ছে না রাজবাড়ির মেয়েদেরও। সে এক বীভৎস দৃশ্য। আমি থাকতে পারলুম না। আমি জানি আমার মৃত্যু আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমি অস্ত্র তুলে নিলুম হাতে। আমার হাতে সেই অস্ত্রটি আর কিছুই নয়, একটি গুলতি। আমাদের তো তখন তরোয়াল কী তা জানা ছিল না। জানা ছিল না বন্দুক আর বোমা-বারুদের কথাও। এই গুলতিই ছিল আমাদের ভরসা। আমাদের দেশের সৈন্যরা এই গুলতি দিয়েই একটার-পর-একটা দেশ জয় করে এসেছে অ্যাদ্দিন। এই গুলতি দিয়ে বড়ো বড়ো পাথর ছুড়েছে তারা, আর শত্রুকে ঘায়েল করেছে। আমার হাতেও এখন সেই গুলতি। গোলা নাই থাক, আছে পাহাড়-ভরতি পাথরের টুকরো। এই-ই আমাদের গোলা। সেই পাথর গুলতিতে গুটিয়ে ছুড়তে পারলেই হল। ভেব না যেন, সেইসব পাথরের টুকরো ছোট্ট ছোট্ট খোলামকুচির মতো। যেমন গুলতিগুলো ছিল বেঢপ, তেমনই পাথরগুলোও ছিল মস্ত মস্ত। অবশ্য তোমাদের মনে হতে পারে গুলতি দিয়ে অত বড়ো পাথর ছোড়া যায় নাকি! অত বড়ো পাথর ছুড়তে হলে গায়ে তেমন শক্তি থাকা চাই! এমনকী তোমরা জিজ্ঞেস করতে পারো, সে-শক্তি কী ছিল আমাদের! আমি বলি, আলবত! এই দেশের মানুষের বুকের ছাতি ছিল এইসা। কী চেহারা আমাদের! যেমন হাতের গড়ন, তেমনই শরীরের বাঁধন। তার ওপর আমরা খেতেও পারতুম রাক্ষসের মতো। এখানে যে কী প্রচন্ড ঠাণ্ডা সে তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না। ধরো, একটা গভীর রাত। চারদিকে আন্দিজের উঁচু উঁচু পর্বতশিখর। ঠাণ্ডায় বরফ জমে আছে। সেই শিখর ছুঁয়ে বরফ ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটে আসছে। ঝুরঝুর করে তুষার পড়ছে। সেই সময় পাঁচটা লেপেও যেখানে নিস্তার নেই, সেখানে আমাদের এই পর্বতের মানুষরা খোলা আকাশের নীচে, বেমালুম ওই নরম তুষারের ওপর শুয়ে শুয়ে ঘুম দিতে পারত। ওই ঠাণ্ডা তাদের একটুও কাবু করতে পারে না। এমন তাদের রক্তের তেজ। শক্তির কথা যখন উঠল, তখন এই ফাঁকে একটা গল্প বলি। গল্পটা আমারই এক পূর্বপুরুষকে নিয়ে। তাঁর নাম ছিল মাহেটা কাপাখ। হয়েছে কী, তিনি তখনও মায়ের পেটে। তাঁর জন্মগ্রহণের তখনও সময় হয়নি। তখনই তিনি মায়ের পেট থেকে তিড়িং করে বেরিয়ে এলেন। তিনি যখন পৃথিবীর আলো দেখলেন, তখন হতবাক হয়ে সবাই তাঁকে দেখতে লাগল। যেমন তাঁর স্বাস্থ্য, তেমনই শক্তি। যখন তাঁর এক বছর বয়েস, তখনই তাঁকে দেখতে যেন আট-ন‌ বছরের শিশু। দু-বছরে পড়তেই লোকে তো তাঁকে দেখে তটস্থ। কেউ একটু বেগড়বাই করেছে কী ব্যাস, দে মার, দে মার! ভয়ে কেউ কাছেই ঘেঁষতে পারত না তাঁর। সেই সময় কুজকো উপত্যকার কিছু আদিম মানুষ থেকে থেকেই গাজোয়ারি দেখাত। মাহেটা কাপাখ বললেন, ‌তবে রে! দাঁড়াও তোমাদের মজা দেখাচ্ছি।‌ বলে এমন পেটাতে শুরু করলেন যে, ‌বাপ বাপ‌ বলে তারা মাহেটা কাপাখের পায়ে লুটিয়ে পড়ল।

আশা করি এই ঘটনার পর আমাদের শক্তি স্বাস্থ্য নিয়ে তোমাদের মনে আর কোনো সন্দেহ থাকবে না। সুতরাং আমিও সেই মস্ত গুলতিটা নিয়ে রাজপ্রাসাদের বাইরে যাওয়ার পথ খুঁজতে লাগলুম। কিন্তু কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছি না। অথচ শত্রুসৈন্য কিলবিল করে ঢুকে পড়ছে প্রাসাদের কোণে কোণে, এঘরে-সেঘরে। তারা যুদ্ধজয়ের উন্মাদনায় চিৎকার করছে। সারা প্রাসাদ যেন থরথর করে কাঁপছে। তাদের অস্ত্রের ঘায়ে আর্তনাদ করছে রাজপ্রাসাদের মানুষেরা, তারপর লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। ঠিক এই মুহূর্তে আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসে গেল। আমি আমার সোনায় সাজানো রাজপোশাকটা খুলে ফেললুম। আমার মাথার নিশানটা ছুড়ে ফেললুম মাটিতে। তারপর শত্রুর চোখকে ফাঁকি দিয়ে ওই লুটিয়ে-পড়া মৃত মানুষের সঙ্গে আমিও মৃত মানুষের মতো মটকা মেরে পড়ে রইলুম। আর আমার হাতের গুলতিটা আমারই বুকের নীচে লুকিয়ে রাখলুম। শত্রুসৈন্যরা হইহই করতে করতে ছুটছে, আমাকে মাড়াচ্ছে। আমি পিষে যাচ্ছি তাদের পায়ের চাপে, তবু মুখে টুঁশব্দটি পর্যন্ত করতে পারছি না।

আমি এইভাবে পড়ে রইলুম কতক্ষণ জানি না। আমার সারাগায়ে রক্ত। সে-রক্ত আমার নিজের যতটা, তার চেয়ে বেশি অন্যের। এই যে মৃত মানুষগুলি আমার পাশে পড়ে আছে, এ রক্ত তাদের। গড়িয়ে আসছে কারও মুখ দিয়ে কিংবা বুকের কলিজা ভেদ করে। আমি বুঝতে পারছি শত্রুসৈন্য নিকেশ করে দিয়েছে রাজবাড়ির প্রতিটি প্রাণ। হয়তো-বা বেঁচে আছি শুধু আমিই একা। যা লুঠ করার সে-সবই লুঠে নিয়েছে তারা। তাই বুঝি ধীরে ধীরে তাদের তান্ডব থেমে আসছে। শান্ত হয়ে আসছে যুদ্ধের গর্জন। আমি বুঝতে পারছি আতাহুয়ালপার সেনারা একে একে ফিরে যাচ্ছে তাদের ছাউনিতে। কেননা, মনে হচ্ছে বেলা পড়ে আসছে। সূর্যদেবতা ইনটি আর একটু পরেই আন্দিজের শিখরের পর শিখর টপকে ফিরে যাবেন নিজের ঘরে। আজ তিনি দেখে যাবেন, তাঁর ছন্নমতি দুই সন্তান নিজেরাই মারামারি করে তাঁর সৃষ্টি এই স্বর্ণরাজ্য ধ্বংস করে ফেলছে! তিনি হয়তো ভাববেন, এমন সন্তানের জন্ম না-দিলেই বুঝি ভালো করতেন। আজ ঘেন্নায় তিনি আমাদের ধিক্কার দিয়ে মুখ ঢাকবেন হয়তো। কী লজ্জা!

অন্ধকার হয়ে এল। হ্যাঁ, তিনি মুখ লুকিয়ে ফেললেন আজকের মতো। নিস্তব্ধ হয়ে গেল রাজপ্রাসাদ। এই অন্ধকারে যে-প্রাসাদ আলোয় উছলে ওঠে প্রতিদিন, আজ যেন সে একটা মৃত্যুপুরী। সত্যিই তাই। আমার চারদিকে ছড়িয়ে আছে মানুষের প্রাণহীন দেহ। শুধু আমার বুকের প্রাণটাই ধুকপুক করে কাঁপছে। আমি মাথা তুললুম, দেখবার চেষ্টা করলুম চারপাশটা। সেই অন্ধকারে কিছুই দেখতে না পেলেও আমার হাত দিয়ে আশপাশের মৃতদেহগুলি স্পর্শ করতে কোনো বিঘ্ন ঘটল না। একটি একটি মৃতদেহ দেখছি। খুঁজে বেড়াচ্ছি প্রাণের শব্দ। কিন্তু কই প্রাণ! তুষারের মতো শীতল সেই মৃতদেহগুলি স্পর্শ করে কেঁপে যায় আমার হাত। আমি জানি এ মিথ্যে চেষ্টা। এবার আমি কান পাতলুম। না, কোনো মানুষেরই কষ্টের কান্না আমার কানে এল না। এমনকী আমি শুনতে পেলুম না, জীবন্ত শত্রুসেনারও গলার স্বর। আমি সাহস পেলুম। আমার মনে হল, এখন হয়তো উঠে দাঁড়াতে পারি আমি। আমি চেষ্টা করলুম, দাঁড়াতে গিয়ে একটা অসহ্য যন্ত্রণায় আমি কুঁকড়ে গেলুম। ওদের পায়ের চাপে আমার কোমরটা কি ভেঙে গেছে! আঁতকে উঠলুম। তবে, এবার আমি কী করব! আমি কি তবে এইখানেই পড়ে পড়ে মরব। না কি, কাল ওরা সকালে এসে আমাকে জীবন্ত দেখে আমার টুঁটিটা ছিঁড়ে নেবে! আমি ইনকা। আমি রাজপুত্র। তবে আমার মৃত্যু হবে জন্তুর মতো! এই কথা মনে হতে কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল আমার বুকের ভেতরটা। আমার মন যেন চিৎকার করে বলতে চাইল —‌না, আমি মরব না। আমি আমার সৎ দাদা আতাহুয়ালপার এই নির্দয় অত্যাচারের প্রতিশোধ নেবই নেব। আমাকে বাঁচতে হবে। বাঁচাতে হবে ইনকা সাম্রাজ্য। আমাকে মাথা তুলে দাঁড়াতেই হবে।‌ এই কথা ভাবতে ভাবতে আমি সত্যিই আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ালুম। এখন আর যন্ত্রণা আমাকে কাবু করতে পারল না। আমি আমার বুকের আড়ালে লুকিয়ে-রাখা সেই মোক্ষম অস্ত্র গুলতিটি হাতে নিয়ে এক-পা এক-পা করে এগিয়ে চললুম। আমার পা অন্ধকারে কখনো হোঁচট খায় মৃতদেহের শরীরে, কখনো থমকে দাঁড়ায়। মনে হয় ওই বুঝি কেউ দেখে ফেলল আমায়। ওই বুঝি শোনা যায় শত্রুর ফিসফাস শব্দ। তবে কি ওরা এখনও ঘিরে রেখেছে রাজপ্রাসাদ? নিরাশ হলুম না আমি। আতঙ্ক আমাকে দুর্বল করতে পারল না একচুলও। আমায় এখনই এই অন্ধকার ভেঙে রাজপ্রাসাদের বাইরে যেতেই হবে। সুতরাং আমি এগিয়ে চললুম। অন্ধকারে আমার কানদুটো সজাগ, দৃষ্টি সতর্ক।

এ কী, মৃতদেহ ডিঙোতে ডিঙোতে এ আমার পায়ে কী ঠেকল! হেঁট হয়ে তাড়াতাড়ি তুলে নিলুম, পরখ করলুম। অন্ধকারেও আমার বুঝতে অসুবিধে হল না এ আমার সেই মাথার নিশান। আমি যে ইনকা রাজপুত্র, এ নিশান তারই পরিচয়। একটু আগে আমার গায়ের সোনায় সাজানো রাজপোশাকের সঙ্গে মাথার এই নিশানটি আমি খুলে ফেলেছিলুম। যাতে শত্রু না আমায় চিনতে পারে। এখন ভালোই হল এটি ফিরে পেয়ে। এখন আর মাথায় এটি বাঁধা নয়, হাতেই লুকিয়ে নিলুম। তারপর আবার ডিঙি মারলুম, বেরিয়ে এলুম আকাশের নীচে।

না কেউ কোথাও নেই, সবই নিথর হয়ে আছে। এই নিস্তব্ধতা ভেঙে বয়ে যায় উত্তুরে হাওয়া। আমার গায়ে এখন হাঁটু পর্যন্ত ঝোলানো নিমাটি ছাড়া আর কিছুই নেই। বাতাসের দাপটে এক বিশাল সাম্রাজ্যের রাজপুত্রের কী শোচনীয় অবস্থা! সত্যিই তাই, এখন এই নির্দয় বাতাসের অসহ্য কামড়ানি সহ্য করা ছাড়া তার কিছুই করার নেই। রাজপুত্রের গর্ব এখন ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। হায় রে! এত সোনা, এত সম্পদ, এত ঐশ্বর্য সব মিথ্যে!

রাজপ্রাসাদের বাইরে এই আকাশের নীচে যেদিকে চোখ মেলি, দেখি সবই কেমন আবছা। একটি মানুষেরও সাড়া নেই, হয়তো শত্রুর ভয়ে সবাই পালিয়েছে এই শহর ছেড়ে। যারা পারেনি, মরে পড়ে আছে রাস্তায়। আমাদের রাজধানীর রাস্তা এখন রক্তে ভেসে আছে। রাজধানী কুজকোর সেই রাস্তা দিয়ে এখন আমি হেঁটে চলেছি। হেঁটে চলেছি সেই সূর্যদেবতা ইনটির মন্দির কোরিকানচার পথে। ইনটির পায়ের কাছে আমি আশ্রয় নেব, অন্তত আজ এই রাতটুকুর জন্য। তারপর কাল যে কী করব সে আমি এখন আর ভাবতে পারছি না। ওই দ্যাখো আমার সামনেই ‌হুয়াকাপাটা‌। এ হল খোলা ময়দান। যুদ্ধজয়ের পর এখানেই আমরা উৎসব করে থাকি। উৎসব হয় আমাদের পালাপার্বণেও এখানে। আমি দেখতে পাচ্ছি ময়দানের চারদিক ঘিরে নি:শব্দে দাঁড়িয়ে আছে নামিদামি মানুষের বাড়িগুলো— খাঁ-খাঁ করছে। হয় তারা ধরা পড়েছে, নাহয় তাদের হত্যা করা হয়েছে। চারপাশে ধ্বংসের চিহ্ন। বুক কাঁপে আমার। তবু আমায় সতর্ক পায়ে হাঁটতে হয়।

হঠাৎ আমার বুকটা ধক করে ওঠে। কে ওখানে! কে বসে বসে হাঁপাচ্ছে। এই নিস্তব্ধ হুয়াকাপাটার খোলা চত্বর থেকে তার নিশ্বাসের শব্দটা ভারি স্পষ্ট হয়ে আমার কানে ভেসে আসছে। এই অন্ধকারে সে কি আমায় দেখতে পেয়েছে! সে কি আহত কোনো শত্রুসৈন্য! না আমাদের মিত্র! আমি ধীর পায়ে তার দিকেই এগিয়ে গেলুম, তার মুখের সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম। সে আঁতকে উঠল—কে‌?

আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‌তুমি কে?‌

সে বলল, ‌তুমি তোমার পরিচয় না দিলে, আমি আমার পরিচয় দেব না।‌

আমার হাত থেকে অস্ত্র আর রাজবংশের নিশানটা মাটিতে পড়ে গেল তার কথা শুনে। আমি ক্ষিপ্ত হয়ে চাপা স্বরে গর্জন করে উঠলুম, ‌তবে রে!‌ বলেই তার গায়ের জামাটা খামচে ধরে তাকে টেনে তুললুম। তার গায়ে রক্ত। ভালো করে চোখ মেলে তার মাথার দিকে তাকিয়েই আমি চমকে উঠেছি। দেখলুম সে একজন সৈনিক। তার মাথায় রয়েছে আমার দাদা সম্রাট হুয়াসকারের পরিচয়চিহ্ন। আমি নিমেষে তার বুক থেকে হাত সরিয়ে নিয়েছি, তাকে জড়িয়ে ধরেছি। ব্যস্ত হয়ে বলেছি, ‌কিছু মনে কোরো না সৈনিক। আমি তোমায় চিনতে পারিনি।

সেই আহত সৈনিকটি তখন জিজ্ঞেস করল, ‌আপনি কি তবে আমাদের মিত্র?‌

আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার রাজবংশের নিশানটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে, তাকে বললুম, ‌এই আমার পরিচয়। আমি সম্রাট হুয়াসকারের ছোটোভাই। আমি রাজপুত্র।‌

সৈনিক আমার সামনে নত হয়ে অভিবাদন করল। তারপর বলল, ‌আমাকে ক্ষমা করুন, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি।‌

আমি বললুম, ‌না না, তোমার কোনো দোষ নেই। দোষ আমার। অন্ধকারে আমিও ভালো করে না দেখে তোমাকে আঘাত করতে হাত তুলেছি। তুমি নিশ্চয়ই রাজপ্রাসাদ রক্ষা করার জন্য এখানে মোতায়েন ছিলে?‌

সে বলল, ‌হ্যাঁ হুজুর।‌

আমি তখন ব্যস্ত হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলুম, ‌তুমি কি বলতে পারো সম্রাট হুয়াসকারের কোনো খবর?‌

সে উত্তর দিল, ‌তিনি পরাজিত হয়েছেন।‌

‌—তাঁর কি মৃত্যু হয়েছে?‌

—‌না, তিনি বন্দি হয়েছেন। তিনি এখন শত্রুশিবিরে।‌

‌—শত্রুশিবির কোনদিকে সে কি তুমি জান?‌

‌—জানি। আপুরিমাক নদীর ধারে।‌

‌—তুমি আমায় নিয়ে যেতে পারবে?‌

সে বলল, ‌পারব। অনেক সময় লাগবে।‌

—‌তোমার কষ্ট হবে না? কোথায় আঘাত তোমার?‌

সে উত্তর দিল, ‌পিঠে।‌

আমি সঙ্গে সঙ্গে তার পিঠের ক্ষতস্থানে হাত দিয়ে পরখ করার চেষ্টা করলুম। আমার হাতে রক্ত লাগল। আমার হাতের স্পর্শে সে ব্যথা পেল, কুঁকড়ে গেল দেহটা তার। মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল ‌—উঃ!‌

আমি সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিলুম। জিজ্ঞেস করলুম, ‌তোমার কি খুবই লাগল?‌

সে উত্তর দিল, ‌আমি সৈনিক। যতক্ষণ প্রাণ আছে ততক্ষণ রাজপুত্রকে যেকোনো সাহায্য করতে আমি প্রস্তুত।‌

তার প্রভুভক্তির এই কথা শুনে আমি নির্বাক হয়ে গেলুম মুহূর্তের জন্য। সেই অন্ধকারে এই বীর সৈনিকের মুখখানা দেখার আমি চেষ্টা করলুম। কিন্তু সে ব্যস্ত স্বরে বলল, ‌হে রাজপুত্র, আমাদের আর বেশি দেরি করা ঠিক নয়। এখনই এখান থেকে যেতে হবে। শত্রুর নজরে পড়ে গেলে আপনার জীবন বিপন্ন হতে পারে।‌

আমি বললুম, ‌বীর সৈনিক, তুমি শুধু আমার কথাই ভাবছ কেন? জেনে রাখো আমিও তোমাকে মরতে দিতে চাই না। আজ এই দুঃসময়ে আমাদের দু-জনকেই বেঁচে থাকতে হবে। হয়তো আমাদের দু-জনকেই প্রয়োজন আছে টাহুয়ানটিনস্যুর তাই এই ভয়ংকর কঠিন সময়ে আমরা দু-জনেই বেঁচে আছি। এই জমাট অন্ধকারে সূর্যদেবতা ইনটি আমাকে তোমার কাছে নিয়ে এসেছেন বোধ হয় আমাদের দু-জনেরই জন্য।‌ বলে আমি মাটি থেকে আমার অস্ত্র গুলতিটা তুলে নিয়ে তার হাত ধরলুম, তারপর দ্রুত পা ফেললুম।

আমাদের মুখে আর কোনো কথা নেই। শুধু উঁচু-নীচু পাথরে ওঠা-নামা করতে করতে আমরা হাঁপাচ্ছি আর হাঁটছি। আমাদের নিশ্বাসের শব্দটুকু আমরা শুনতে পাচ্ছি আর আমি বুঝতে পারছি আহত এই সৈনিকটি ক্লান্ত হয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে। তবু সে থামবার নাম করছে না। আর আমি তাকে দেখে মনে মনে ভাবছি আরও কতটা পথ যেতে হবে!

আরও কতদূর!

হঠাৎই সে থামল। আমিও থমকে গেলুম।

সে বলল, ‌রাজপুত্র, শত্রুসৈন্যের চিৎকারের শব্দ কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন?‌

তার কথা শুনে আমি রুদ্ধশ্বাসে কান পাতলুম। হ্যাঁ আমি শুনতে পেয়েছি। ভারি ক্ষীণ সেই চিৎকার। পর্বতের নিস্তব্ধতা ভেঙে অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে যেন অনেক মানুষের কোলাহল।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‌সৈনিক, ওরা কত দূরে আছে? ওরা চিৎকার করছে কেন?‌

‌—আমার মনে হয় ওরা এই পথ দিয়েই আসছে। খুব বেশি দূরে ওরা নেই বলেই আমার মনে হচ্ছে।‌ উত্তর দিল সৈনিক।

‌তাহলে?‌ ত্রস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলুম আমি।

সে বলল, ‌আর এগোনো চলবে না আমাদের। এখানেই কোথাও লুকিয়ে পড়তে হবে।‌

—‌কিন্তু এখানে তো লুকোবার জায়গা নেই।‌ আমি তেমনই উদবেগ নিয়েই বললুম।

সৈনিক বলল, ‌আছে, ওই পাথরের আড়ালে।‌ বলে সে পাথরের আড়ালেই আমাকে নিয়ে চলল।

সত্যি বলতে কী, এই অন্ধকারে খানাখন্দ পেরিয়ে পাথরের আড়াল খোঁজা আমার সাধ্য নয়। কিন্তু সৈনিক খুঁজে পেল। সৈনিক জানে আমি রাজপুত্র। পাথরের এই আড়ালে লুকিয়ে পড়তে সেই রাজপুত্রের যাতে বিপদ না হয় তাই সৈনিক তার হাতটি বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‌রাজপুত্র, এই পাথরটা ডিঙোতে হবে। এইটা পার হলেই নিরাপদ আশ্রয়। আমার হাত ধরুন। চারদিক ভিজে, দেখবেন পিছলে না যান।‌

আমি বুঝতে পারছি, শত্রুসৈন্যের চিৎকার কাছে এগিয়ে আসছে। আমি তড়িঘড়ি সেই পাথরটায় লাফ মারলুম। আমি পিছলে যেতুম আর একটু হলেই, কিন্তু সৈনিকের শক্ত হাত আমাকে রক্ষা করল। আমি ঝটপট লুকিয়ে পড়লুম। তারপর সেই আড়ালে এক রাজপুত্র আর তার এক বন্ধু-সৈনিক নি:শব্দে অপেক্ষা করতে লাগল সেই শত্রু নামের মানুষগুলো কখন তাদের চোখের আড়ালে চলে যায় সেই চিন্তায়।

তাদের চিৎকার শুনতে শুনতে বোঝা যায়, তারা আরও কাছে এগিয়ে এসেছে।

সৈনিক এই আড়াল থেকেই উঁকি মারল, সে দেখবার চেষ্টা করল। আমি উত্তেজনায় কোনো কথাই বলতে পারছি না। শুধু তার মুখের দিকে তাকাবার চেষ্টা করলুম। সাবধান করার জন্য ইশারা করলুম। কিন্তু এই অন্ধকারে সেও আমার চোখ দেখতে পায় না, আমিও দেখতে পাই না তার মুখ। সে আমাকে ফেলে এগিয়ে গেল আরও খানিক। আমি ব্যস্ত হয়ে অস্ফুট স্বরে ডাক দিলুম, ‌ওদিকে কোথা যাচ্ছ?‌

সৈনিকও তেমনই ফিসফিস করে উত্তর দিল, ‌কথা বলবেন না রাজপুত্র। আমাকে ওদের গতিবিধি লক্ষ করতে দিন।

আমি থতোমতো খেয়ে চুপ করে গেলুম। বসে রইলুম এই পাথরটার আড়ালে নি:সাড়ে। আসলে আমিও যেন একটা পাথর। বুঝি আমারও এখন নড়াচড়া করার শক্তি নেই।

তাদের হট্টগোল আরও এগিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আকাশটা যেন আগুন-আলোয় লাল হয়ে উঠেছে। সৈনিকটি ঝটপট বসে পড়ল নিজেকে লুকিয়ে। আমি অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলুম, ‌কী হল‌?

সৈনিক বলল, ‌কোনো কথা বলবেন না। ওদের হাতে মশাল। মনে হয় ওরা আমাদের খবর পেয়েছে, তাই তল্লাশি চালাচ্ছে।‌

আমি আবার চুপ করে গেলুম। ভয়ে কাঠ হয়ে বসে রইলুম। আকাশে চোখ তুলে দেখতে পেলুম, যেমন যেমন হট্টগোল বাড়ছে, তেমন তেমন শূন্যে আলোও ছড়িয়ে পড়ছে। ওদের কোনো ভয় নেই, কেননা যাকে ভয় সেই সম্রাটকে ওরা বন্দি করে ফেলেছে। এখন বোধ হয় রাজবংশের কোনো মানুষেরই ওরা চিহ্ন রাখবে না। তাই কি এই অন্ধকার রাতেই বেরিয়ে পড়েছে মশাল নিয়ে!

ধীরে ধীরে তাদের চিৎকারটা যখন একেবারে কাছাকাছি ভেসে এল, তখন বোঝা গেল আমার কথাই ঠিক। কেননা তাদের এ চিৎকার শুধু জয়ের আনন্দ নয়, হত্যার হুংকার। তারা চ্যাঁচাচ্ছে—

ইনকা সম্রাট হলেন কে?

ইনকা আতাহুয়ালপা আবার কে!

বন্দি হল, নাম কী তার?

হুয়াসকার, হুয়াসকার!

চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে এমন সব জিগির তুলে তাদের গলার স্বর যেমন দূর থেকে ভেসে আসছিল, তেমনই ধীরে ধীরে দূরেই ভেসে গেল। হয়তো এযাত্রা আমরা বেঁচে গেলুম। কিন্তু যতক্ষণ-না ওদের চিৎকার একেবারেই শোনার বাইরে গেল, ততক্ষণ আমরাও রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করতে লাগলুম। উঠে দাঁড়িয়ে উঁকি মারল আবার সৈনিকই প্রথম। যে-আলো ঝলসে উঠেছিল একটু আগে, সে-আলোর রোশনি এখন একেবারেই নেই। আবার সেই জমাট অন্ধকার। সেই অন্ধকারে এখান থেকে উঁকি মেরে আর কি দেখা যাবে কিছু! আমি যখন সেই কথাই ভাবছি, তখন সৈনিক বলল, ‌আমার মনে হচ্ছে ওরা আপুরিমাক নদীর পথটা আটক করে রেখেছে। ওই পথ দিয়ে কুজকো উপত্যকার কোনো মানুষকে ওরা বেরোতে দেবে বলে মনে হচ্ছে না।‌

সৈনিকের কথা শুনে আমার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।

আমি তাকে কিছু বলার আগেই সে বলল, ‌আপনি কি জানেন, আতাহুয়ালপা এই যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব কার ওপর দিয়েছে?‌

আমি বললুম, ‌শুনেছি সেনাপতি চালকুচিমার ওপর।‌

সৈনিক বলল, ‌তার সম্পর্কে কি আপনার কিছু জানা আছে?‌

—‌হ্যাঁ, শুনেছি লোকটা হিংস্র আর ধূর্ত।‌

‌সেনাপতি চালকুচিমাই যে বুদ্ধি করে সম্রাট হুয়াসকারকে বন্দি করেছে, এটাও আশা করি আপনি জানেন?‌ সৈনিক জিজ্ঞেস করল।

আমি উত্তর দিলুম, ‌সেটা জানার সুযোগ পাইনি।‌

সৈনিক বলল, ‌এখন আতাহুয়ালপার সেই ধূর্ত সেনাপতি হয়তো জানতে পেরেছে আপনি জীবিত আছেন। আপনি যাতে পালাতে না পারেন, তাই এই অন্ধকারেও তারা তল্লাশি চালাচ্ছে।‌

আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‌তাই যদি হবে, তবে সে-তল্লাশি গোপনে না চালিয়ে ওরা চিৎকার করছে কেন?‌

‌—এটাও বোধ হয় চালকুচিমার একটা ওপরচালাকি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে বুঝতে পেরেছে আপনি কোথাও লুকিয়ে আছেন। তাই সে ইচ্ছে করেই একদল সৈন্যকে নির্দেশ দিয়েছে জিগির তুলে পথের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে। সে জানে, আপনি যেখানেই থাকুন এই সৈন্যদের দেখতে পাবেন। দেখতে যদি না পান, আকাশে তাদের মশালের ঝলক দেখতে পাবেন। তাদের চিৎকারও শুনতে পাবেন। তারপর তাদের আলোর চেকনাই মিলিয়ে গেলে কিংবা তাদের চিৎকার দূরে ভেসে গেলে হয়তো আপনি নিজেকে নিরাপদ ভাববেন। ভাববেন শত্রু হয়তো নিরাপদ দূরে চলে গেছে। এই ভেবে আপনি গুপ্তস্থান থেকে চুপিসারে বেরিয়ে এলেই ওরা আপনাকে ধরে ফেলবে।‌

সৈনিকের মুখে এই কথা শুনে আমি হতচকিত হয়ে তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। মনে মনে তার বুদ্ধির তারিফ না করে পারলুম না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ভাবলুম তবে কি এখানেই ঘাপটি মেরে বসে থাকতে হবে। তাই সৈনিককে জিজ্ঞেস করলুম, ‌তা হলে এখন কী করা যায়? তোমার কী মনে হয়?

‌রাজপুত্র, আপুরিমাক নদীর ওই পথ ধরে আর আমাদের যাওয়া চলবে না।‌ সৈনিক উত্তর দিল।

—‌তবে?‌

সৈনিক বলল, ‌এখন আমাদের এই পর্বতের শিখর পেরিয়ে সেখানে যেতে হবে।‌

‌এ যে ভীষণ কঠিন কাজ।‌ আমি আমতা-আমতা করে বলে ফেললুম।

সৈনিক বলল, ‌এ ছাড়া আর পথ নেই।‌

‌কতক্ষণ লাগবে?‌ দুরুদুরু বুকে তাকে জিজ্ঞেস করলুম।

সৈনিক উত্তর দিল, ‌যদি আবহাওয়া ভালো থাকে, বরফ যদি পথে বিঘ্ন না ঘটায় কিংবা তুষারপাত অথবা তুষারঝঞ্ঝা যদি বাধা না দেয় তবে কাল পৌঁছে যেতে পারি।‌

‌কাল কখন?‌ আমি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করি।

‌ধরা যাক সকাল।‌ সৈনিক উত্তর দিল।

আমি বললুম, ‌আমার গায়ে যে-পোশাকটি আছে এটি লামার লোমের। রাজপোশাক আমি খুলে ফেলে দিয়েছি। এই ঠাণ্ডায় এটি অসুবিধা করছে না। কিন্তু পর্বতের শিখরের ঠাণ্ডা সহ্য করা যাবে কি না জানি না। তার ওপর আমাদের সঙ্গে কোনো খাবারও নেই। শেষপর্যন্ত আমরা পৌঁছোতে পারব কি না জানি না।‌

সৈনিক আমার কথা শুনে মুহূর্ত চুপ করে থাকল। তারপর বলল, ‌রাজপুত্র, আমরা তো মৃত্যুর দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে আছি। বাঁচার জন্য এ আমাদের শেষ চেষ্টা। যদি আমরা বাঁচি, তখন আপনার দাদা সম্রাট হুয়াসকারকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে পারব।‌

আমি বললুম, ‌কিন্তু তুমি এতখানি পথ এত পাথর পেরিয়ে যাবে কী করে? তোমার পিঠের আঘাতে তুমি কষ্ট পাবে না?‌

সৈনিক বোধ হয় হাসল। বলল, ‌রাজপুত্র, সম্রাট আর সাম্রাজ্যের গৌরবের চেয়ে সৈনিকের প্রাণ কি আরও বড়ো?‌

আমি লজ্জা পেলুম।

সুতরাং সেই অন্ধকারে আন্দিজের পাথর ডিঙিয়ে আমরা আপুরিমাক নদীর পথে পা বাড়ালুম।

অন্ধকার বলে অন্ধকার। প্রতিটি পা কী ভীষণ সতর্কতার সঙ্গে ফেলতে হচ্ছে। এমনই করে পর্বতের পাথর টপকে চূড়ায় ওঠা সৈনিকের কাছে এমন-কিছু শক্ত কাজ নয়। কিন্তু আমার? আমি রাজপুত্র, সোনায় মোড়া ডুলিতে চেপে চার বাহকের কাঁধে চড়ে আমার আনাগোনা। চার বাহকের সঙ্গে চার প্রহরী আমার দেহরক্ষী। কিন্তু আজ আমার ডুলিও নেই, বাহকও নেই। নেই দেহরক্ষী চার প্রহরীও। আজ আমার সঙ্গে আছে শুধু আমার এক সৈনিক বন্ধু। সে আমায় সেই পথ দিয়ে নিয়ে যাবে, যে-পথ এতদিন আমার চেনার দরকার হয়নি। কেননা, আমরা তো কেউ কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি, আমাদের মহান সম্রাট, আমার ঠাকুরদাদার বাবা পাচাকুটি আর আমার ঠাকুরদাদা সম্রাট টুপা ইনকার গড়া এই ইনকা সাম্রাজ্যে ভাইয়ে ভাইয়ে গৃহযুদ্ধ লাগবে। যে-গৃহযুদ্ধ ডেকে আনবে সর্বনাশ। সর্বনাশ ডেকে আনবে ইনকার আর চার দিগন্তে ইনটির আলোয় উজ্জ্বল এই টাহুয়ানটিনস্যুর।

‌রাজপুত্র, দেখবেন সামনেই একটি বিপজ্জনক খাদ।‌ হঠাৎ সৈনিক থমকে দাঁড়িয়ে আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে সাবধান করল।

আমিও থতোমতো খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম। অন্ধকারে সৈনিকের অস্পষ্ট মুখখানির দিকে তাকালুম। তারপর ধীরে ধীরে তার কাছে এগিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে আমিও খাদের দিকে চোখ ফেরালুম।

সৈনিক বলল, ‌আমাদের ওই খাদটা একটু পাশ কাটিয়ে যেতে হবে। যে-পথটা সহজ ছিল, অন্ধকারে সে-পথটা আমি ঠিক চিনতে পারিনি। আমি বোধ হয় আপনাকে একটু কষ্ট দিলুম।‌

আমি বুঝতে পারলুম চড়াই-উতরাই করতে করতে সৈনিক হাঁপাচ্ছে। অবশ্য আমিও হাঁপাচ্ছি। হয়তো-বা সৈনিকের চেয়েও বেশি। কিন্তু আমার কষ্টটা চেপে আমি বললুম, ‌আমার কিচ্ছু কষ্ট হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কষ্ট দিচ্ছি তোমাকে আমিই।‌

সৈনিক উত্তর দিল, ‌দেখুন রাজপুত্র, একটু আগে আমার পিঠে যে-যন্ত্রণা আমাকে অসুবিধে করছিল, এখন তার অনেকটা সামলেছি আমি। মনে হয় আর কিছু ভয় নেই। দেখুন, আকাশটাও ভারি ঝরঝরে। আবহাওয়া যদি খারাপ না হয়, কাল ভোরেই হয়তো আপুরিমাকের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারব। কিন্তু আমার সন্দেহ, সারারাত ধরে ওঠা-নামার এই ধকল আপনার পক্ষে কি সহ্য করা সম্ভব হবে? আপনি যদি বলেন, আমরা আজকের এই রাতটা কোনো গুহায় থাকতে পারি। চেষ্টা করলে তেমন গুহা খুঁজে পাওয়াও শক্ত নয়।‌

আমি সৈনিকের কথা শুনে একটু মৃদু হাসলুম। তারপর তার কাঁধে আলতো হাত রেখে উত্তর দিলুম, ‌তুমি কি সৈনিক জান এই বয়েসটাই আমার দুরন্তপনার বয়েস। আমি তরুণ। তোমার যদি কষ্ট না হয়, আমারও হবে না। চলো, কাল সকালে যেমন করে হোক শত্রুসৈন্যের শিবিরের সন্ধান আমাদের করতেই হবে। অপেক্ষা করার আর সময় নেই।‌

না, অপেক্ষা আমরা করলুম না। এই খাদটা পাশ কাটিয়ে আরও বেশ খানিকটা আগু-পিছু করে আর একটা গিরিশৃঙ্গের পথ ধরলুম। এখন নিশ্চয়ই গভীর রাত। কেননা, সময় যে কেটে গেছে অনেকটা, তা আকাশ দেখলেই বুঝতে পারি আমরা। দিনের আলো আর রাতের তারা, বলতে পারো এরাই আমাদের সময় জানার বন্ধু।

হ্যাঁ, চড়াই-উতরাই করতে করতে রাত কেটে গেল। পর্বতের গায়ে গায়ে যখন প্রথম ভোরের আলো আলতো ছোঁয়ায় লুটিয়ে পড়ল, তখনও ঘুমিয়ে আছে মেঘ তারই কোলজুড়ে। এখন আমরা দু-জনে দু-জনকে ভালো করে দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি, আমি সৈনিককে, দেখছে সৈনিক আমাকে। পর্বতের পাথর আর বরফের ঠাণ্ডা পেরিয়ে দুটো মানুষ চলেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, তুষারে চান করে যেন দুটি প্রাণী ওই মেঘের দেশের তোরণ পেরোবে এবার। তবে সে মানুষ দুটি বিধ্বস্ত ঠাণ্ডা আর অমানুষিক মেহনতে।

না, ওই মেঘের দেশের তোরণ অবধি যেতে হল না আমাদের। সূর্যদেবতা ইনটি আকাশে উঠছেন। যেমন প্রতিদিন তিনি প্রথম আন্দিজের তুষারচূড়ায় তাঁর আলোর মুকুট পরিয়ে দেন, তেমন আজও দিলেন। কিন্তু সেইসঙ্গে তিনি আজ হয়তো অবাক হলেন চোখ মেলে আমাকে দেখে। আমি এতক্ষণ আমার রাজবংশের নিশানটি আমার বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলুম। লুকিয়ে রেখেছিলুম আমার অস্ত্রটিও। নিশানটি বের করলুম। কিন্তু এ কী! হঠাৎ যেন মেঘের আড়ালে তিনি মুখখানি লুকিয়ে ফেললেন। যেন তিনি রুষ্ট হয়েছেন আমাদের ওপর।

সৈনিক আমার মুখের দিকে তাকাল। দাঁড়াল। ওই দূর আকাশের দিকে চোখ রেখে বলল, ‌শব্দ শুনতে পাচ্ছেন রাজপুত্র?‌

আমি বললুম, ‌পাচ্ছি। ঝরনার।‌

সৈনিক উত্তর দিল, ‌আপুরিমাক নদী।‌

‌—তবে কি আমরা এসে গেছি?‌

সৈনিক বলল, ‌হ্যাঁ, সামনে ওই গিরিসংকটের জঙ্গল। ওর পাশেই সেতু। মনে হয়, ওই সেতু এখন শত্রুসৈন্য দখল করে আছে। এ-পথে আমাদের আর এগোনো ঠিক হবে না। এখন নদীতে জল কম। আমাদের কোনো গোপন পথে নদী পার হতে হবে।‌

‌সৈনিক, তবে কি এখানে কোথাও লুকিয়ে থাকব আমরা?‌ আমি জিজ্ঞেস করলুম।

সৈনিক বলল, ‌আমার মনে হয় আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, এও শত্রুর দখলে। সুতরাং এখানে লুকিয়ে থাকা মোটেই নিরাপদ নয়। আমাদের...‌ সৈনিক হঠাৎ থামল। দেখতে পেলুম অত্যন্ত উত্তেজনায় সে ক-পা পিছিয়ে এল। আমায় ইশারা করল। কোনো কথা নয়। তড়িৎগতিতে আমার হাত ধরে আমায় একটা ঝোপের মধ্যে টেনে আনল। তারপর অপলক দৃষ্টিতে ঝোপের আড়াল থেকে কিছু লক্ষ করতে লাগল। আমি বুঝতে পেরেছি, সৈনিক একটা-কিছু বিপদের গন্ধ পেয়েছে। আমিও তাই গলার স্বর খুবই নীচু করে তার কানের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করলুম, ‌কে?‌

সৈনিকও আমার কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে বলল, ‌একদম কথা বলবেন না, শত্রু-সৈন্য।‌

আমার সেই মুহূর্তের মুখের চেহারাটা ভয়ে কতখানি বেঁকে গেছিল, সে একমাত্র সৈনিক ছাড়া আর কেউ জানে না। কিন্তু আমিও তখন দেখেছিলুম আমার পাশের সেই সৈনিককে। তার চোখে-মুখে যে আতঙ্ক ছেয়ে আছে, সে বুঝি আমার জন্যই। তার রাজপুত্রকে সে কেমন করে রক্ষা করবে এই ভাবনাই যেন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। আমি দেখতে পাচ্ছি তার পিঠের জামায় রক্তের দাগটা এখন কালচে হয়ে গেছে। মুখখানা শুকিয়ে গেছে, চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে অনেকখানি। অবশ্য আমিও জানি না, আমার মুখখানা সৈনিকটিই-বা কেমন দেখছে। কাল সারারাত পর্বত ডিঙিয়ে আমারও যে অবস্থা বেহাল নয়, এ কেউ বলবে না। তার ওপর দু-জনেরই খাওয়া নেই। অবশ্য এই ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কে আর খিদের কথা ভাবে? কারই-বা খিদে পায়?

আমার সৈনিক শত্রুসেনার গতিবিধির ওপর থেকে এক মুহূর্তের জন্যও চোখ সরাল না। শুধু আমার দিকে হাত বাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ‌রাজপুত্র, আপনার গুলতিটা দিন।‌

—‌কেন?‌

—‌এখন কোনো প্রশ্ন করবেন না।‌

আমি আমার পোশাকের ভেতর থেকে গুলতিটা বের করে তার হাতে তুলে দিলুম।

সৈনিক নিমেষে একটি পাথর তুলে নিল। গুলতিতে জড়িয়ে ফেলল সেই পাথর। তারপর শত্রুসেনাকে তাক করে নি:শব্দে দাঁড়িয়ে রইল। সৈনিকের সেই মূর্তি দেখে আমার নিজেরই বুকের ভেতরটা তোলপাড় শুরু করে দিল। আমি বুঝতে পারছি, আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ওই পাথর ছিটকে পড়বে শত্রুসেনার মাথায় অথবা শরীরের অন্য কোথাও। উত্তেজনায় আমার সৈনিক বন্ধুটি কী দুরন্ত গতিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে! আমি তার পেছনে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাই দেখছি।

বেশিক্ষণ আমায় দেখতে হল না। আচমকা একটা প্রচন্ড শব্দ করে সৈনিকের হাতের গুলতি থেকে ছিটকে পাথর ছুটল। সঙ্গেসঙ্গে সৈনিক ঝোপের ভেতর থেকে প্রায় লাফিয়ে বেরিয়ে গেল। বেরিয়েই ছুটে গেল শত্রুর দিকে। শত্রু ততক্ষণে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে। সেই পাথর তার মাথায় লাগল না, লাগল বুকে। সে বুকে হাত দিয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে মাটিতে। আঘাতের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। বুঝতে পারছি, চিৎকার করার শক্তি নেই তার। আমার সৈনিক ছুটে তারই কাছে গিয়ে তার হাতের অস্ত্রটা ছিনিয়ে নিল চোখের পলকে। তারপর নিজের গলার স্বর চেপে ধমক দিল, ‌সাবধান, যদি চিৎকার করিস তবে এখান থেকে ছুড়ে ফেলে দেব তোকে ওই খাদে। মনে রাখিস, আমার হাতে তোর মরণের চাবিকাঠি। আর পালাতে পারছিস না।‌

শত্রুসেনা হাঁপাচ্ছে। ভয়ে না যন্ত্রণায় বোঝা গেল না।

আমার সৈনিক বন্ধু আবার বলল, ‌আমি যা জিজ্ঞেস করছি তার ঠিক ঠিক জবাব দিতে হবে তোকে। কিন্তু যদি না দিস, ছাড়ান নেই তোর।‌

আমি এখনও ঝোপের মধ্যে দাঁড়িয়ে। দেখছি আর শুনছি আমার সৈনিকের কথা। আর ভাবছি এখনই যদি অন্য কোনো শত্রুসেনা আমার সৈনিককে দেখতে পায়! কিন্তু তার ভাবভঙ্গি দেখে আমার মনে হল না আমার সৈনিক এতটুকু ভয় পেয়েছে। সে হয়তো বুঝতে পেরেছে, আপুরিমাকের এই পর্বতের ওপর আর কোনো সৈনিক নেই। হয়তো আহত এই সৈন্যটি একাই নজরদারি করছিল।

আমার সৈনিক আবার কড়কে উঠল, ‌—কী রে, যা বললুম শুনতে পেয়েছিস?‌

আহত শত্রুসেনাটি ঘাড় নাড়ল। বোঝা গেল সে জবাব দিতে রাজি।

‌—তবে বল আমাদের সম্রাট হুয়াসকার কোথায়?‌

শত্রুসেনাটি উত্তর দিল, ‌সেনাপতি চালকুচিমা তাঁকে বন্দি করেছে। তিনি এখন সেনাপতির শিবিরেই আছেন।‌

—‌তুই এখানে কী করছিস?‌

—‌সেনাপতি চালকুচিমা খবর পেয়েছে সম্রাট হুয়াসকারের ছোটোভাই রাজপুত্র এখনও বেঁচে আছেন। তিনি যাতে পালাতে না পারেন, তাই তাঁর বেরিয়ে যাওয়ার সমস্ত পথে প্রহরা বসানো হয়েছে। আমি এখানে নজর রাখছি।‌ আহত সৈন্যটি কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে উত্তর দিল।

এতক্ষণ আমি উদগ্রীব হয়ে তার উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করছিলুম। শত্রুসেনার জবাব শুনে মনে মনে আমি আমার বন্ধু-সৈনিকের বুদ্ধির তারিফ না করে পারলুম না। কেননা সে তো সেনাপতি চালকুচিমার এই কুমতলবের কথা আমাকে আগেই বলেছিল। কিন্তু আবার আমাকে চমকে দিয়ে আমার সৈনিক যখন তাকে বিদ্রূপ করে বলল, ‌সেই রাজপুত্র এখনই যদি তোর সামনে এসে দাঁড়ায় আর তোর মুণ্ডুটা ছিঁড়ে ফেলে, তুই কী করবি তখন?‌

সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। কোনো উত্তর দিল না।

‌—তবে শোন রে বিশ্বাসঘাতক সৈনিক, তিনি আমার সঙ্গেই আছেন।‌ বলে আমার বন্ধু মুখ ফেরাল আমার দিকে। আমাকে ইশারা করল সে। আমি ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে তার দিকে এগিয়ে গেলুম।

আমাকে দেখে হতভম্ব সেই সৈন্যটি ছটফট করতে লাগল। বুঝতে পারলুম সে ভয় পেয়েছে। হয়তো-বা লজ্জা পেয়েছে। অবশ্য আমার কিছু বলার ছিল না তাকে। আমার বন্ধু-সেনাই তাকে জিজ্ঞেস করল, ‌সম্রাট হুয়াসকারের বন্দিশিবির এখান থেকে কতদূরে?‌

সে বলল, ‌কাছেই।‌

আমার সৈনিকটি মুহূর্ত কী ভাবল। তারপর বলল, ‌আমার পোশাকের সঙ্গে তোর পোশাক আমি পালটে নিতে চাই।‌

‌কেন?‌ সে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‌কেন‌-র উত্তর আমি তোকে দিতে রাজি নই। যদি স্বেচ্ছায় না দিস আমি জবরদস্তি খুলে নেব।‌ আমার সৈনিক উত্তর দিল।

‌—ওরা যে আমায় মেরে ফেলবে!‌

—‌যদি তোর মরণের ভয় এতই, তবে গৃহযুদ্ধে শত্রুপক্ষে গেছিস কেন?‌ কড়কে উঠল আমার বন্ধু-সেনা।

‌বুঝতে পারিনি।‌ সে যেন অপরাধীর মতো উত্তর দিল।

‌এখন বোঝো।‌ বলে আমার সৈনিক নিজের জামা খুলতে খুলতে বলল, ‌আর কথা নয়। দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের যেতে হবে। নিজের জামা আর তোর নিশানটা খোল। এই নে, পর আমারটা।‌

শত্রুসেনা বুঝতে পারল এখন আর তার আপত্তির কোনোই যুক্তি নেই। তাই সে আস্তে আস্তে উঠে বসল। নিজের মাথার নিশানটা আগে খুলে তারপর জামাটা খুলল। ভেতরে তার আরও জামা। থাকাই স্বাভাবিক। কারণ এই শীতে আমাদের কেউই একটি জামা গায়ে দিয়ে যুদ্ধে যায় না। আমি দেখলুম আমার সৈনিকের গায়েও জামার ওপর জামা। আমারই গায়ে শুধু লামার লোমের এই জামাটি। রাজপোশাক তো আমি খুলে ফেলে বাঁচার রাস্তা খুঁজছি। কিংবা বলা যায়, ইনকা সাম্রাজ্যের সম্রাটকে উদ্ধার করার চেষ্টা করছি।

আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলুম, শত্রুসেনার সঙ্গে আমার বন্ধু সৈনিক জামা পালটাপালটি করে নিল। এতক্ষণ যে ছিল সেনাপতি চালকুচিমার বন্ধু, সেই-ই হল পোশাক পালটে তার শত্রু, আর যে ছিল শত্রু সে হল বন্ধু। একজন ছিল আমার শত্রুসেনা। আর একজন ছিল বন্ধু-সৈনিক। আমার বুঝতে কোনো অসুবিধে হল না, আমার বন্ধু সৈনিকটি শত্রুর পোশাক পরে আর মাথায় নিশান এঁটে ছদ্মবেশ ধারণ করল। এবার সে অনায়াসেই শত্রুশিবিরে ঢুকতে পারবে। আর তাকে সন্দেহ করবে কে? আমি হতবাক হয়ে তাকে দেখতে লাগলুম। আরও একবার মনে মনে তার বুদ্ধির তারিফ করলুম।

শত্রুসৈন্যের পোশাক পরে সে আমার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, ‌রাজপুত্র, আমায় বেমানান লাগছে কি?‌

আমি হাসলুম।

সে বলল, ‌আশা করি আমার এই ছদ্মবেশের কারণটা বুঝতে আপনাকে বিশেষ মাথা ঘামাতে হচ্ছে না?‌

আমি বললুম, ‌বুঝতে পেরেছি।‌

—‌তবে এবার আমরা যেতে পারি।‌ আমার সৈনিক শত্রুসেনার মুখের দিকে কটমট করে দৃষ্টি হেনে আমাকে বলল।

‌—আমিও যাব।‌

আমি চমকে তাকালুম শত্রুসেনার মুখের দিকে। দেখলুম কথাটা বলতে বলতে উঠে দাঁড়াচ্ছে সে।

মনে হল, তার কথা শুনে আমার সৈনিকও থতোমতো খেয়ে গেছে। নিমেষে সে শত্রুটির মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করল, ‌কোথা যাবি তুই?‌

—‌তোমাদের সঙ্গে।‌

—‌তুই শত্রু, তোকে কেন সঙ্গে নেব আমরা?‌

সেই শত্রুসেনা উত্তর দিল, ‌এখন আমি সম্রাট হুয়াসকারের সৈনিকের পোশাক গায়ে দিয়েছি। এখন যদি তোমরা আমাকে শত্রু না ভাবো, আমি কৃতজ্ঞ থাকব। মনে করতে পারো, আমি আর তোমাদের শত্রু নই। আমি সম্রাট হুয়াসকার আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এই যে মহান রাজপুত্র, আমি তাঁদের মিত্র। আমি সূর্যদেবতা ইনটির নামে প্রতিজ্ঞা করছি, যতক্ষণ আমার প্রাণ থাকবে ততক্ষণ আমি তোমাদের প্রাণ রক্ষা করার চেষ্টা করব।‌

আমি সেই শত্রুসেনার কথা শুনে এগিয়ে গেলুম। তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলুম। বললুম ‌ওঠো।‌

সে উঠে দাঁড়াল।

আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‌পারবে তো?‌

সে বলল, ‌পারব।‌ বলতে বলতে কাশল সে। বুকে হাত দিল। বুঝতে পারলুম গুলতির পাথরটা বুকের এইখানেই লেগেছে, তবে খুব-একটা জোরে নয়। হয়তো ইচ্ছে করেই আমার বন্ধু সৈনিকটি তার বুকে জোরে আঘাত করেনি। তবে কি সে বুঝতে পেরেছিল এই শত্রুটিও আমাদের বন্ধু হবে! হয়তো-বা!

আমার বন্ধু সৈনিকটির মুখেও মৃদু হাসি দেখা দিল। হাসতে হাসতে সেও হাত বাড়িয়ে দিল শত্রুসেনার দিকে। তারপর বলল, ‌আমি ইচ্ছে করলে তোকে শেষ করে ফেলতে পারতুম। আমার গুলতির পাথর তোর বুকে না মেরে আমি সহজেই তোর মাথায় মারতে পারতুম। আমি একটু নজর রেখে দেখছিলুম, তুই এখানে একা আছিস না অনেকে। যখন বুঝলুম তুই একা, তখন জানি অনেকটা কাজ আমার এগিয়ে গেছে। ভাবলুম অতর্কিতে আক্রমণ করে তোকে যদি কাবু করে ফেলতে পারি, তবে তোর মুখ থেকে খবর বের করা সহজ হবে। তাই তোকে হত্যা করিনি। সেটা না করে আমি যে সঠিক কাজ করেছি, তা এখন ভালোই বুঝতে পারছি। কেননা তোর কাছ থেকে কথাও বের করা গেল আর সেইসঙ্গে তুই আমাদের মিত্রও হয়ে গেলি।‌

আমি আমার সৈনিক বন্ধুর আর কত তারিফ করব! তার এক-একটা নতুন কৌশলের কথা যতই শুনছি আমি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমি আর একটু হলে প্রায় বলেই ফেলেছিলুম, শাবাশ। কিন্তু না, নিজেকে সামলে নিয়ে আমি অন্য কথা পাড়লুম। সেই শত্রুসেনাকে বললুম, ‌এখন থেকে তোমাকে আমি ‘‌মিত্র‌’ বলে ডাকব। আশা করি আমার বন্ধু-সৈনিকটিও তোমাকে মিত্র বলেই সম্বোধন করবে।‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি অত সহজে সব কথায় সায় দেওয়ার যে মানুষ নয়, সেটা তোমরাও নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝে ফেলেছ। তাই আমার বন্ধু সৈনিকটি যখন বলল, ‌হ্যাঁ আমিও নিশ্চয়ই ওকে মিত্র বলে ডাকব, তবে ও যে আমাদের সত্যিই ‌‌‘মিত্র‌‌’ সেটা ওকেই কাজে প্রমাণ করতে হবে।‌ বলে আমার বন্ধু সৈনিক তার দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌ঠিক বলিনি মিত্র?‌

নতুন মিত্রটি ঘাড় নাড়ল। বোঝা গেল এখনও বুকের যন্ত্রণা তাকে রেহাই দেয়নি। তবে, মনে হয় সেই যন্ত্রণাকে অগ্রাহ্য করেই সে বলল, ‌এখানে আর বেশিক্ষণ থাকাটা ঠিক হচ্ছে না। বলা যায় না, কেউ দেখে ফেলতে পারে।‌

আমার বন্ধু সৈনিক আমার মিত্রসেনাকে জিজ্ঞেস করল, ‌সম্রাট হুয়াসকারের বন্দিশিবিরটা কি আপুরিমাক নদীর এপারে, না ওপারে?‌

সে বলল, ‌ওপারে। আমাদের নদী পেরোতে হবে।‌

আমার বন্ধু বলল, ‌নদী পেরোনো মানে, সেও তো এক ভীষণ বিপদের ঝুঁকি নেওয়া।‌

মিত্রসেনা বলল, ‌হ্যাঁ ঝুঁকি তো আছেই। বিশেষ করে এই দিনের আলোয়।‌

‌তবে?‌ আমার বন্ধু-সেনা জিজ্ঞেস করল।

আমি বললুম, ‌তবে আমাদের অন্ধকার অবধি অপেক্ষা করতে হবে। রাত না এলে নদী পেরোনোর ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হবে না।‌

আমার বন্ধু বলল, ‌তা ঠিক, ততক্ষণ আমরা থাকব কোথা?‌

তখন সেই মিত্র সেনাটি বলল, ‌কোনো গুহায় আত্মগোপন করে থাকা ছাড়া এখন আর অন্য কোনো রাস্তা নেই।‌

‌এখানে কি তেমন কোনো গুহার হদিশ মিলবে?‌ জিজ্ঞেস করল আমার বন্ধু-সৈনিক।

মিত্র বলল, ‌চলো, মনে হয় আরও কিছুটা নীচে নামলে নিরাপদ কোনো গুহা আমরা পেয়ে যেতে পারি।‌

আমিও তার কথায় সায় দিলুম।

বন্ধু সৈনিকও বলল, ‌সেই ভালো।‌

আমরা এবার তিন জন। একসঙ্গে হাঁটা দিলুম। আমার বন্ধুসৈনিকের পিঠের রক্তের দাগটা নতুন জামা পরতে ঢাকা পড়ে গেছে। দেখতে পাচ্ছি, মিত্র-সেনার আঘাতের জেরটা এখনও যায়নি। হয়তো কমেছে, কেননা একটার পর একটা পাথর ডিঙিয়ে দেখছি সে সহজেই নামছে। এতক্ষণ নদীর স্রোতের শব্দটাই আমাদের কানে আসছিল এবার নদীর ছুটন্ত স্রোতের দুরন্তপনা আমাদের নজরে পড়ল। পাথরে পাথরে ধাক্কা খেয়ে উছলে উঠছে তার ফেনিল জলের রাশি। আমরা তিন জনে নদীর সেই জলও দেখছি, আর দেখছি সতর্ক দৃষ্টিতে পাথরের ঘুঁজি-ঘুপচি—শত্রু যদি লুকিয়ে থাকে!

অবশ্য এখনও পর্যন্ত তেমন কিছু অঘটন ঘটল না। অনেকখানিই নেমে এলুম আমরা। এতক্ষণ তিন জনেই মুখে কুলুপ এঁটে পাথর ডিঙিয়েছি। এমনই সময় হঠাৎ আমার বন্ধু সৈনিক কথা বলল, ‌দেখতে পাচ্ছেন?‌

হ্যাঁ, আমরা তিন জনেই একসঙ্গে ঘুপচিটার দিকে চোখ মেললুম। বুঝতে কষ্ট হল না সেই ঘুপচি একটি গুহা। চারদিকে পাথর আর পাথর, কে বুঝবে ওটি গুহা। আর একটু নামতেই দেখতে পেলুম, আপুরিমাকের জলের স্রোত ওখানেও খানিকটা জল ছিটকে দিয়ে একটা জলাশয় গড়ে তুলেছে। সেই জল আবার উথলে ঝরে পড়ছে আর একটা পাথরের পিঠের ওপর।

মিত্র-সেনা বলল, ‌হ্যাঁ, জায়গাটা খুবই নিরাপদ মনে হচ্ছে। ওখানেই চলুন।‌

ঠিক বলেছে, নিরাপদই। ভেতরটা ঘন অন্ধকার, ঠাণ্ডাও। তার ওপর জলাশয়। কাছেই নদী। জলাশয়ের ওপরে পাথরের বড়ো বড়ো চাঁই। ফাঁকেফোকরে বেশ শুয়ে-বসে থাকা যায়, কেউ টেরও পাবে না। এমনই একটা পাথরের ওপর বসে পড়লুম। আঃ! কী-যে আরাম লাগছে, কী বলব! একটানা হেঁটেছি, এতক্ষণ একফোঁটা বিশ্রামও নেওয়ার ফুরসত পাইনি। আমার সঙ্গে সৈনিক বন্ধুটিও বসল। আমাদের দু-জনের পায়েই জুতো নেই। না থাকারই কথা। এতক্ষণ যে এত দুর্ঘট সহ্য করে বেঁচে আছি এটাই যথেষ্ট। প্রাণে বাঁচলে জুতো আবার হবে। কিন্তু প্রাণটাই তো যেতে বসেছিল। রোখের মাথায় একটা গোটা রাত পর্বত ডিঙিয়েছি। তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন বসতে-না-বসতেই কোমরের ব্যথাটা চাগাড় দিয়ে উঠল। পা দুটোও বেশ ফুলে গোদা হয়ে গেছে। ফিরে দেখি আমার সৈনিক বন্ধুরও একই অবস্থা, পা ফুলে ঢোল। সে সটান শুয়ে পড়ল। আমি যে তার সামনে এক রাজপুত্র বসে আছি, সেটা হয়তো সে এখন ভুলে বসে আছে।

কিন্তু হঠাৎ কেন যে মিত্র-সেনাটিকে সে অমন দৃষ্টি হেনে দেখছিল, সেটা একেবারেই আমি বুঝতে পারিনি। তার চোখে যেন একটা অস্পষ্ট সন্দেহ দেখা যাচ্ছে। আমি নিমেষে বুকে হাত দিয়ে দেখে নিলুম ইনকার নিশানটা এখনও আছে কি না। হ্যাঁ আছে। আমার গুলতিটাও আমারই কাছে রেখে দিয়েছি। সেটাও একবার পরখ করে দেখে নিলুম। আমার দেখা শেষ হতে-না-হতেই আমার সৈনিক বন্ধুটি ধড়ফড় করে উঠে পড়ল। বেশ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌কী রে, তুই বসছিস না যে?‌

সে উত্তর দিল, ‌বসছি। বাইরেটা একটু ভালো করে দেখে নিচ্ছি।

আমার বন্ধু জিজ্ঞেস করল, ‌তোর গুলতিটা কোথায়? ভেতরে ভেতরে অন্য কোনো মতলব আঁটছিস না তো?‌

মিত্র-সেনাটি বলল, ‌না, আমার গুলতি আমি ঠিক জায়গাতেই রেখেছি। সেটা নিয়ে আমাকে তোমাদের ভয় নেই। তবে আমি একটা অন্য মতলব আঁটছি।‌ বলতে বলতে সে বসল।

আমি উদগ্রীব হয়ে তার মুখের দিকে তাকালুম। আমার সৈনিক বন্ধুটি মুখখানা বেশ কাঁচুমাচু করেই জিজ্ঞেস করল, ‌কী মতলব আঁটছিস?‌

সে বলল, ‌আমার তো মনে হচ্ছে সারারাত তোমাদের পেটে কিছু পড়েনি।‌ বলেই সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌রাজপুত্র, আপনার কি খাওয়া হয়েছে কিছু?‌

আমি উত্তর দেওয়ার আগেই আমার সৈনিক বন্ধুটি বলল, ‌সেকথা তোর শুনে কাজ কী?‌

‌—কাজ আছে বলেই তো শুনতে চাইছি।‌

আমার সৈনিক বন্ধুটি উত্তর দিল, —‌নিরেট বোকা না হলে তুই এমন কথা জিজ্ঞেস করিস। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে ফিরেছে দুটো মানুষ। সারারাত মানুষ দুটো পর্বতের পথ টপকেছে। প্রচন্ড শীত আর দুরন্ত হাওয়ার সঙ্গে লড়াই করতে করতে এখন তারা ধুঁকছে। তোর কী মনে হয়, যুদ্ধের সময় শত্রু আমাদের গায়ে পাথর না ছুড়ে মুখে মাংসের ঠুকরো গুঁজে দিয়েছে? আমাদের মুখ-চোখ দেখে কি তোর তাই মনে হচ্ছে?‌

সে বলল, ‌মনে হচ্ছে না বলেই তো কথাটা জিজ্ঞেস করলুম।‌

‌তাহলে শুনেই-বা তোর লাভ কী হল?‌ আমার বন্ধুটি জিজ্ঞেস করেই আবার শুয়ে পড়ল।

—‌মাংস খাবে?‌ এমন আচমকা কথাটা বলল সেই মিত্র-সেনাটি যে, আমি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিই, আমার বন্ধুটিও এমন আঁতকে উঠল যেন ভূত দেখেছে সে। গুহার এই অন্ধকূপের মধ্যে তড়বড়িয়ে উঠে বসে সে প্রায় চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, ‌কই? মাংস কই?‌

আমি দেখতে পেলুম ততক্ষণে সেই মিত্র-সেনাটি তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের মধ্যে হাত পুরে একটা মুখঢাকা পাত্র বের করে আনল। আমার বন্ধু সৈনিকটি কিন্তু আর থাকতে পারল না। সে প্রায় তার হাত থেকে ছোঁ মেরে পাত্রটা ছিনিয়ে নিয়ে ঢাকনাটা খুলে ফেলল। পাত্র মানে কি আর এইটুকু! এত বড়ো ঢাম্পুস। তার ভেতর এত্তখানি মাংস— লামার। এবার সত্যি বলছি, আমিও থাকতে পারলুম না। আমার মুখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। ছ্যা ছ্যা, রাজপুত্রের এ কী দুর্দশা! এখন যদি কেউ আমাকে হ্যাংলা বলে, তবে সে মিথ্যে গঞ্জনা দেবে না। কেননা, এখন ওই মাংস দেখে হঠাৎ আমার এমন খিদে পেয়ে গেল যে, মনে হচ্ছে আমি এখনই আমার বন্ধু-সৈনিকটির হাত থেকে কেড়ে নিই ওই মাংসের পাত্রটা। আমি একাই খেয়ে ফেলি সবটা।

অবশ্য কাড়াকাড়ি করাটা আমার সাজে না। কেননা, যতই হোক আমি রাজবংশের ছেলে। রাজবংশের ছেলেরা কাড়াকাড়ি করে না যে, তা নয়। তবে তাদের কাড়াকাড়ি মাংস নিয়ে নয়, সিংহাসন নিয়ে। সুতরাং আমার মুখে জল এলেও সে-জল আমায় গিলে ফেলতে হল। আর মনে মনে ভাবতে হল, আমার বন্ধুটি কি আর একটুকরো মাংস দেবে না!‌

হ্যাঁ, সে দিয়েছে। একটুকরো নয়, সবটাই। আমার মুখের কাছে পাত্রটি তুলে সে বলল, ‌রাজপুত্র, ভাববার কিছুই নেই, এই নিন সবটাই আপনার। দেরি করবেন না।‌

আমি তার কথা শুনে কেমন যেন হকচকিয়ে গেলুম। এ কী বলে! আমার মনের কথাটা ও বুঝতে পারল না কি! আমি তাই ভীষণ একটা আপত্তি করে বলে উঠলুম, ‌না না, সে কী কথা। আমারও যদি খিদে পেয়ে থাকে, তোমারও পাওয়া উচিত। তা ছাড়া এই মুখরোচক খাদ্যটি যে আমাদের মুখের সামনে ধরে দিল, তাকেও তো আমরা বাদ দিতে পারি না। আসলে খাবারটা তার, আমরা ভাগ বসাচ্ছি। সুতরাং, এসো আমরা তিন জনেই একসঙ্গে ভাগাভাগি করে খাই।‌

আমার সৈনিক বন্ধুটি সঙ্গেসঙ্গে আমার কথায় সায় দিয়ে বলল, ‌আপনি ইনকা বংশের রাজপুত্র। আপনার কথা তো অমান্য করা যায় না। এই রাজপুত্রই যে একদিন ইনকা সম্রাট হবেন না, সেকথা কেউ কি হলপ করে বলতে পারে? সুতরাং আপনার আদেশ মেনে আমাদের মিত্র-সেনাটিও যে আপত্তি করবে না, এটাও মনে করা যেতে পারে।‌ বলে আমার বন্ধু সৈনিকটি একটু মুচকি হেসে মিত্র-সেনার মুখের দিকে তাকাল।

মিত্র-সেনাটি সঙ্গেসঙ্গে বলে উঠল, ‌আরে না না, আপনাদের ভাগ থেকে আমাকে বাদ দিলেই বরং আমি খুশি হব। আপনাদের কাল থেকে খাওয়া নেই। আর আমার কাল থেকে খাওয়ার বিরাম নেই, কাজেই আমার না-খেলেও চলবে। তা ছাড়া মাংস কতটুকুই-বা আছে, আপনাদের দু-জনেরই পেট ভরবে না।‌

যদিও আমার মন বলছিল সবটাই আমি খেয়ে নিই, আসলে সবটা খাওয়া মোটেই আমার একার সাধ্য নয়। তবে তিন জনে শেষ করতে খুব-একটা কষ্ট করতে হবে না। তাই আমি সেই মিত্র-সেনাটিকে বললুম, ‌তাই কখনো হয়? এসো তিন জনেই ভাগ করে খেয়ে নিই।‌

শেষপর্যন্ত সত্যি সত্যি তিন জনেই সেই মাংসের পাত্রে ভাগ বসালুম। আর বলতে কী, আমার তখন খাওয়ার ধরন দেখলে তোমরা যদি আমাকে রাজপুত্র না ভেবে রাক্ষসপুত্র ভাবতে তবে কেউ তোমাদের দোষ দিত না। গবগব করে খাচ্ছি আর হাঁপাচ্ছি। এই ঠাণ্ডাতেও যেন গা গরম হয়ে গেল।

যাক, এখনকার মতো নিশ্চিন্ত। মিত্র-সেনাটিকে অনেক ধন্যবাদ-টন্যবাদ দিয়ে আমি আমার বন্ধু সৈনিকটিকে জিজ্ঞেস করলুম, ‌তোমার পেট ভরেছে তো?‌

সে উত্তর দিল, ‌মাংসের পাত্রে আমাদের তিন জনেরই পেট ভরার মতো মাংস ছিল না বলে কি আপনার মনে হচ্ছে? তবে কি আপনার পেট ভরেনি?‌

আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললুম, ‌আরে না না, সেকথা বলছি না। আমার যথেষ্ট পেট ভরেছে।‌

বন্ধুসৈনিকটি বলল, ‌তবে কি আপনি এখন একটু বিশ্রাম নেবেন? সারারাত ঘুম নেই, তার ওপর যুদ্ধের ধকল আর একটানা পাথর ডিঙোনো। আপনাকে খুবই ক্লান্ত দেখাচ্ছে। শুয়ে পড়ুন।‌

‌তুমি?‌ আমি বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করলুম।

সে বলল, ‌আমরা সৈনিক। কষ্ট কি আর আমাদের গায়ে মাখলে চলে? আপনি বিশ্রাম নিন। আমরা দু-জনে বসে বসে নজরদারি করি। বলা তো যায় না।‌

আমি জানি আর বেশি কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। আমি শুধু একটা কথাই বললুম, ‌ঠিক আছে, আমি একটু গড়িয়ে নিই। তারপর আমি নজরদারি করব, তোমরা তখন বিশ্রাম নিয়ো।‌

পেটে মাংস পড়েছে, চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে। সত্যি বলতে কী, আমি বসেই থাকতে পারছিলুম না। শুয়ে পড়ল এক রাজপুত্র গুহার অন্ধকারে। যাদের আমি বন্ধু ভেবেছি, সেই সৈনিক দু-জন আমি ঘুমিয়ে পড়লে যদি আমাকে খুন করে পালায়, তবে কেউ জানতেও পারবে না যে, এই গুহার অন্ধকারে সূর্যদেবতা ইনটির এক ছেলের প্রাণহীন দেহটা পড়ে আছে। না থাক, এখন ও-কথা ভেবে লাভ নেই। যা হওয়ার সে হবেই, কেউ রুখতে পারবে না।

অন্ধকার এই গুহার যে-পাথরটার ওপর আমি শুয়ে আছি, সেটা একটু ভেতরেই। বড়ো। ক্ষীণ আলোর একটা রেখা গুহার মুখ টপকে ভেতরে এসে পড়েছে। জলাশয়ের ওপর আপুরিমাক নদীর যতখানি জল ছিটকে পড়ছে, ঠিক ততখানি জল লাফিয়ে পড়ছে ঝরনার মতো ঝরঝর করে। পর্বতের এই নির্জন চত্বরটা সেই শব্দে যেন উছলে উঠছে। মনে হচ্ছে রাজপ্রাসাদের হাজারটা রাজনর্তকী একসঙ্গে নূপুর পায়ে নাচছে। গুহার অন্ধকারে বাতাসের দোলনায় দুলতে দুলতে সেই শব্দ আমার কানে ছড়িয়ে পড়ছে। এই অন্ধকারে এত বিপদের মধ্যেও কেন জানি সেই শব্দের নিক্বণ শুনতে আমার খুব ভালো লাগছে। সব শেষ হয়ে গেলেও ভালো লাগার কিন্তু শেষ নেই। একটি রঙিন পাখি যখন একা একা একটি মন্দিরের সোনার চূড়ায় বসে ল্যাজ ঝুলিয়ে গান গায়, তখন কার না ভালো লাগে! কার না ভালো লাগে, আকাশের ইনটি-দেবতা সব আলো উজাড় করে যখন আন্দিজের সব উঁচু বরফ-ঢাকা চূড়ার ওপর রং ছড়িয়ে দেয়! আঃ, কী ভালো লাগে! দুর্গম এই আন্দিজের বিপদসংকুল পর্বতগুহায় এমনই সব ভালো লাগার কথা ভাবতে আরও ভালো লাগে।

ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে পড়লুম।

সেই যে সকাল থেকে ঘুমোলুম আমি, সারাদিন আর কী হল আমি কিছুই টের পেলুম না। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। হঠাৎ আমার মনে হল সকালের সেই যে একটুকরো আলোর রেখা অন্ধকারে ভেসে আসছিল, সে-আলো এখন আর দেখা যাচ্ছে না। মনে হল অন্ধকার গুহা আরও অন্ধকার হয়েছে। বুঝতে পারছি বাদুড়ের উৎপাত শুরু হয়ে গেছে। ঝাঁক ঝাঁক বাদুড় এ-মাথা থেকে ও-মাথা উড়তে উড়তে গোঁত মারছে। আমি তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালুম। এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে বাইরে যাওয়া ভারি মুশকিলের কাজ। অথচ আমার সেই বন্ধু সৈনিক দু-জনকেও আমি দেখতে পাচ্ছি না। সত্যি বলতে কী, এই জমাট অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে থাকতেই যেন আমার দম আটকে আসছে। সুতরাং সমঝে বুঝে পা ফেললুম গহ্বরের বাইরেটা লক্ষ্য করে।

না, তেমন কোনো অসুবিধে হল না। বাইরে বেরিয়ে স্পষ্ট দেখতে পেলুম আকাশ পেরিয়ে সূর্যদেবতা ইনটি ঘরে গেছেন। রাত নেমেছে। অথচ আশ্চর্য লাগছে, আমার সৈনিক দু-জনের কেউই তো নেই এখানে! তাই তো, আমায় একা ফেলে তারা কোথায় গেল! এখান থেকে উঁচুস্বরে ডাকা যেমন ঠিক হবে না, তেমনই তাদের হদিশ করাও তো অসম্ভব। কী করা যায় তবে? এ যে আর এক বিপদ। না, অত উতলা হলে চলবে না আমার। নিশ্চয়ই তারা কোনো সন্ধানে গেছে। সুতরাং আমি চুপটি করে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলুম।

অবশ্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। ভাগ্য ভালো, দেখলুম দু-জনেই পাথর ডিঙিয়ে এগিয়ে আসছে—অস্পষ্ট ছায়ার মতো। আমিও ক-পা এগিয়ে গেলুম লাফ মেরে। আমার বন্ধু সৈনিকটিই আগে আগে এগিয়ে আসছে। তার একটু পেছনেই মিত্র-সেনা। এতই সাবধান তারা যে, তাদের পায়ের শব্দও শোনা যাচ্ছে না। আমাকে দেখে দু-জনেই আমার অনেক কাছে চলে এল। আমিই প্রথম জিজ্ঞেস করলুম, ‌কোথা গেছিলে?‌

দেখতে পেলুম, দু-জনেই অস্থির। দু-জনেই উত্তেজিত।

আমি আবার জিজ্ঞেস করলুম, ‌কী হয়েছে?‌

এবার আমার বন্ধু সৈনিকটি উত্তর দিল, ‌আমি শত্রুশিবিরে আমার এই ছদ্মবেশে ঢুকেছিলুম রাজপুত্র। আমাকে কেউ সন্দেহ করতে পারেনি। আমি শত্রুশিবির থেকে শুনতে পেলুম, সম্রাট হুয়াসকারকে বন্দি করে সেনাপতি চালকুচিমা তাঁকে কুজকোতে নিয়ে গেছে। কুইটো থেকে আতাহুয়ালপা রওনা দিয়েছে কুজকোর উদ্দেশ্যে। কুজকোতে গিয়ে আতাহুয়ালপা ইনকা-সাম্রাজ্যের সিংহাসন জয়ের উৎসব করবে। আর তখনই বোধ হয় সম্রাট হুয়াসকারকে হত্যা করা হবে।‌

তার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার সেই মিত্র-সেনাটিও অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বলল, ‌আতাহুয়ালপার সেনাপতি সম্রাট হুয়াসকারের হাজার হাজার সৈন্যকে হত্যা করে তাদের মুণ্ডুগুলো এখানে-ওখানে ঝুলিয়ে রেখেছে। হুয়াসকারের সৈন্যরা যারা বেঁচেছিল, তারা পালিয়েছে। যুদ্ধে মালবাহী হাজার হাজার লামা মরে পড়ে আছে।‌

আমি হতবাক হয়ে তাদের কথা শুনলুম। ভেবে পেলুম না এখন কী করা উচিত। তবে এটা ঠিকই, যেমন করে হোক হুয়াসকারের জীবনরক্ষা করতে হবে। তাই আমার দুই সঙ্গীকে বললুম, ‌চলো আমরা আবার কুজকোতে ফিরে যাই!‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি সঙ্গেসঙ্গে উত্তর দিল, ‌না রাজপুত্র, আর কুজকোতে ফেরা ঠিক হবে না। আমাদের রুখতে হবে আতাহুয়ালপাকে। তাকে কিছুতেই আমরা কুজকোতে ঢুকতে দেব না। উত্তর দিকের দূর শহর কুইটো থেকে কুজকো আসতে তার বেশ কয়েক দিন সময় চলে যাবে। পথের মাঝে মাঝে তাকে ছাউনি ফেলতে হবে। আতাহুয়ালপা কুজকোতে না আসা পর্যন্ত সম্রাট হুয়াসকাসেরও বিচার হবে না। সুতরাং এই সুযোগ। আমার গায়ে আছে আতাহুয়ালপার সৈনিকের পোশাক। তার মুখোমুখি হতে পারব আমি সহজেই। তাকে ওই পথের মাঝখানেই আমি হত্যা করব।‌

—‌কিন্তু তুমি ধরা পড়লে?‌ আমি তার সাহস দেখে আতঙ্কিত হলুম।

সে জবাব দিল, ‌আমি মরব, কিন্তু সম্রাট হুয়াসকার বাঁচবেন। আমাদের চার দিগন্তের এই সাম্রাজ্য টাহুয়ানটিনস্যু রক্ষা পাবে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে।‌

আমি তার জবাব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলুম। অন্ধকারে মুখ ফেরালুম আমার সেই মিত্র-সেনাটির দিকে। সে বলল, ‌ভয় পাবেন না রাজপুত্র, আমার গায়ে এখন সম্রাট হুয়াসকারের সৈনিকের পোশাক। আমি থাকব আপনার সঙ্গে আপনার পাশে পাশে।‌

‌তাহলে এখন কী করব আমরা?‌ আমি জিজ্ঞেস করলুম।

‌এখনই আমাদের আপুরিমাক নদী পার হতে হবে। এখন আর নদী পার হতে আমাদের বাধা নেই, কেননা শত্রুসৈন্য সবাই নদী পার হয়ে কুজকোর পথে রওনা দিয়েছে। যদিও-বা কেউ থাকে, আমরা সহজেই অন্ধকারে গা-ঢাকা দিতে পারব।‌ বলল আমার সেই মিত্র-সেনাটিই।

—‌আর দেরি করা ঠিক হবে না, চলুন।‌ দুই সঙ্গী আমার দু-পাশে দাঁড়িয়ে আমার দুটি হাত ধরল।

আমি কাল রাতের মতো আজ রাতেও আবার পাথর টপকাতে শুরু করলুম। একটু পরেই নদীর কিনারে পৌঁছেও গেলুম। নদীতে জল কম। কাজেই জলের ওপর মাথা উঁচিয়ে যে পাথরগুলো কাছে-দূরে নদীর এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে, সেই পাথরে পা ফেলে ফেলে আমরা আপুরিমাক নদীর অন্য পারে পৌঁছে গেলুম। তারপর আবার চলল পাথর পেরিয়ে পথ চলা।

খানিকটা হেঁটেই আমার মিত্র-সেনাটি বলল, ‌আচ্ছা, এখন তো আর আমার কাছে কোনো খাবার নেই। রাতের খাবারের তাহলে কী ব্যবস্থা হবে?‌

আমি শুনে একটু থমকে গেলুম ঠিকই, কিন্তু আমার উৎকন্ঠা নিজের মনের ভেতরই লুকিয়ে রাখলুম। কিন্তু দেখলুম, আমার বন্ধু সৈনিকটি খুবই ধীরস্থিরভাবে উত্তর দিল, ‌—আপুরিমাক নদী পেরিয়ে একটা ব্যাপারে আমরা নিশ্চিন্ত যে, আমরা এখনও বেঁচে আছি। আমাদের ওপর কোনো অতর্কিতে আক্রমণ হবে এমন সম্ভাবনাও দেখছি না। কারণ আতাহুয়ালপার সমস্ত সৈন্য রাজধানী কুজকোর পথে হাঁটা দিয়েছে। তারা এখন জয়ের আনন্দে মশগুল। সুতরাং আজ রাতটা শুধুমুধু কষ্ট করে না হেঁটে আমরা বিশ্রাম নিতে পারি অবশ্যই কোনো নিরাপদ জায়গায়। তার আগে আমরা ইচ্ছে করলে যুদ্ধে মৃত ওই অসংখ্য লামা এদিকে-ওদিকে পড়ে আছে, ওদের একটিকে তুলে এনে আগুনে ঝলসে নিতে পারি। মনে হয় ঝলসানো মাংসে রাজপুত্রেরও আপত্তি হবে না।‌

আমি সঙ্গেসঙ্গে আমার সম্মতি জানিয়ে বললুম, ‌না না, আপত্তি কেন হবে? ঝলসানো মাংস আমার খুবই প্রিয় খাদ্য।‌

সে-রাতটা আমার বন্ধু সৈনিকটির কথামতো আপুরিমাক নদীর এপারে আবার এক পাথরের নীচে একটি জুতসই জায়গা খুঁজে বের করা হল। রাতটা এখানেই থাকা যাবে। ঠিকই তো, কাল সারারাত হাঁটা হয়েছে। যদিও আমি সারাদিনই ঘুমিয়েছি, কিন্তু আমার বন্ধু সৈনিকটির একটি বারের জন্যও চোখের পাতা এক হয়নি। তার বিশ্রাম অবশ্যই দরকার। তারপর সৈন্যটি আহতও বটে। সুতরাং এই জায়গাটা তিন জনেরই পছন্দ হয়ে গেল। জায়গা পছন্দ হয়ে যেতেই, ওরই মধ্যে একটি মৃত লামা টেনে এনে বেশ কিছু শুকনো জ্বালানি জোগাড় করে আগুন ধরানো হল। তোমরা হয়তো ভাবতেই পারো, এখানে আমরা আগুন পেলুম কোত্থেকে। খুব সহজ। এত পাথর যখন ছড়ানো, তখন আর আগুন জ্বালানো এমন কী ব্যাপার। পাথর পাথরে ঘষো। দ্যাখো, আগুনের ফুলকি কেমন ছিটকে পড়ছে শুকনো ঘাস-পাতার ওপর। দাউদাউ করে জ্বলে উঠল সেই জ্বালানি। কিছু পরেই ঝলসে গেল মাংস। তারপর খাও যত পারো।

সে-রাতটা বেশ কাটল। তিন জনেই পালা করে ঘুমোলুম আর পালা করে পাহারা দিলুম। যদিও ভয়ের তেমন কিছু ছিল না, তবুও সাবধানের মার নেই।

সকাল বেলা বেশ ঝরঝরে লাগছিল আমার। ক্লান্তি নেই বললেই চলে। আমার বন্ধু সৈনিকটিকে দেখেও ভালো লাগছিল। তবে বেশ শীত, সকাল থেকেই কুয়াশা। এই কুয়াশার মধ্যেই আমরা পাথর টপকাতে টপকাতে এগিয়ে চললুম। আমার ঠাকুরদাদা টুপা ইনকা আর তাঁর বাবা পাচাকুটি এই পর্বতের পাথর কেটে রাস্তা তৈরির এক আশ্চর্য কাজ করে গেছেন। আমি এখন যে-পথ দিয়ে চলেছি, এ পথ তাঁদেরই সময়কার। এই পথ দিয়েই লামাদের পিঠে বেঁধে খাদ্যশস্য, যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হয়। এই পথ দিয়েই সম্রাট যান তাঁর সাম্রাজ্য পরিদর্শন করতে সোনার ডুলিতে চেপে। কিংবা ডাক হরকরা যায় খবর নিয়ে রাজধানী কুজকোতে। নয়তো কুজকো থেকে অন্য কোথাও। তোমাদের বলতে ভুলে গেছি, ওই ডাক হরকরাদের আমরা বলি ‌‌চাসকুই‌‌। এখন এই পথ দিয়েই আমরা হাঁটছি। আমরা জানি এই পথ দিয়েই আতাহুয়ালপাও আসছে রাজধানী কুজকোতে। এই পথেরই কোথাও তাকে রুখতে হবে আমাদের। তবে তার আগেই যদি আমাদের কেউ দেখে ফেলে? আর সে যদি হয় আতাহুয়ালপার দলের লোক? তখন ভেস্তে যেতে পারে আমাদের সব মতলব। সেকথা এখন ভাববার সময় নয়। এখন দ্রুত হাঁটতে হবে। কেননা, আর একটু পরে কুয়াশা কেটে গেলে আবার শুরু হয়ে যাবে খুনোখুনি, তখনই বিপদ।

তোমাদের বলি, এমনই নানা বিপদ কাটিয়ে আমরা কুইটোর পথে অনেকগুলো রাত পার করে দিলুম। আশ্চর্য, আমরা কোনো বাধা পেলুম না! অনেক রাতের পর আমাদের চাঁদ- মামা কিলাইয়া আকাশে দেখা দিলেন। আকাশের অন্ধকার কেটে আলো ফুটছে। বিপদ এল তেমনই এক আলোর রাতে। আমরা বুঝতে পারিনি আমরা তখন আমাদেরই এক বন্ধু এলাকার ওপর দিয়ে চলেছি। কিন্তু সেই এলাকার মানুষ যে আমাদের ওপর নজর রেখেছে আমরা তা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। আসলে হয়েছে কী, আমার বন্ধু সৈনিকটি অতি-উৎসাহে আমাকে ফেলে দ্রুত এগিয়ে চলেছে। অবশ্য আমার পাশে পাশে চলেছে আমার মিত্র-সেনা। তার গায়ে ছিল সম্রাট হুয়াসকারের পোশাক, সে তো তোমরা জানই। আর এও জান, আমার বন্ধু সৈনিকটির গায়ে ছিল শত্রুসেনার পোশাক। সুতরাং সেই এলাকার মানুষ যেই-না আমার বন্ধু সৈনিকটিকে দেখতে পেয়েছে, কোথাও কিছু নেই আচমকা এদিক-ওদিক থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে এসে একেবারে তার ঘাড়ের ওপর। আর কোনো কথা নয়, মার মার। আমি আর আমার মিত্র-সেনাটি হকচকিয়ে গেছি। যদিও আমরা পেছনে আছি, তবু জ্যোৎস্নার আলোয় দেখতে তো কোনো অসুবিধে নেই। ছুটে গেছি তাকে বাঁচাতে। তো, তারা ছাড়বে কেন? আমাদের কথাই শোনে না। তাকে প্রায় আধমরা করে ফেললে। তখন আমি নিজেকে আর সামলাতে পারলুম না। নিজের বুকের ভেতর থেকে ইনকা বংশের নিশানাটা বের করে চিৎকার করে উঠলুম, ‌শোনো বন্ধুগণ, আমি ইনকা বংশের রাজপুত্র, তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এই দ্যাখো আমার নিশান। যাকে তোমরা মারছ সে আমার বন্ধু। শত্রুর চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য সে শত্রুর পোশাক পরেছে। আসলে এই বন্ধু দু-জন সম্রাট হুয়াসকারের পক্ষে। আর আমি সম্রাট হুয়াসকারের ছোটোভাই। আশ্চর্য! এত হল্লার মধ্যেও আমার কথা তাদের কানে গেল। তারা তৎক্ষণাৎ মারধর থামিয়ে আমার হাতের দিকে তাকাল। আমার হাতে ইনটির মূর্তি খোদাই-করা রাজবংশের সোনার তৈরি নিশান। চাঁদ-মা মামা কিলাইয়ার আকাশ উপচে পড়া আলোয় সে-নিশান ঝকমকিয়ে উঠল। তাদের চোখ ঝলসে গেল। তারা আমাকে দেখে আর আমার হাতের এই নিশান দেখে আমার পায়ের কাছে বসে পড়ল নি:শব্দে। কেননা তারা বিশ্বাস করে ইনকা মানেই দেবতা। ইনকার বন্ধুর গায়ে হাত তোলা মানে দেবতার গায়েই আঘাত করা।

আমি আবার বললুম, ‌বিশ্বাসঘাতক আতাহুয়ালপা তোমাদের সম্রাট হুয়াসকারকে বন্দি করেছে। তাকে হত্যা করার জন্য আতাহুয়ালপা কুইটো থেকে কুজকোর পথে যাত্রা করেছে। আমরা তাকে কুজকোতে কিছুতেই যেতে দেব না। তোমরা যদি আমার সঙ্গে থাকো, তবে এই পথের মাঝখানেই তাকে আমরা রুখতে পারব। এমনকী আতাহুয়ালপাকে যদি আমরা পরাজিত করে বন্দি করতে পারি, তখন আমরা আমাদের প্রিয় সম্রাট হুয়াসকারকেও বাঁচাতে পারব।‌

আমার মুখের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন জাদুর মতো সব পালটে গেল। যে-মানুষগুলি এতক্ষণ চড়াও হয়ে আমার বন্ধু সৈনিককে আঘাত করছিল, তারাই এখন তাকে বুকে জড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, ‌—আমরা আতাহুয়ালপাকে রুখবই রুখব।‌

তাদের চিৎকারে নির্জন সেই পর্বতের ছোট্ট উপত্যকা যেন কেঁপে উঠল। তারা চিৎকার করতে করতেই আমার সেই আহত বন্ধু সৈনিকটিকে নিয়ে চলল তাদের আস্তানায়। নিয়ে চলল আমাদেরও। সম্রাটের দেখা পেলে তারা যেমন আনন্দে উচ্ছল হয়ে ওঠে, আমাকে দেখেও তাদের তেমনই আনন্দ। হয়তো তারা জানে, একদিন আমিও সম্রাটের সিংহাসনে বসব। টাহুয়ানটিনস্যুর সমস্ত ঐশ্বর্য তখন আমার হবে। আমি আমার দেশের মানুষকে সুখ দেব, শান্তি দেব। কেননা, এই গৃহযুদ্ধ তারা চায় না। তারা প্রাণে বেঁচে থাকতে চায়। তারা চায় আবার ভিরাকোচা ফিরে আসুন। তিনি মানুষকে আশ্বাস দিয়ে যেমন করে মহাসাগরের জলের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিদায় নিয়েছিলেন, তেমনই করে জলের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি ফিরে এসে মানুষকে বাঁচান। নইলে বুঝি মানুষ জাতটাই শেষ হয়ে যায়!

আমার বন্ধু সৈনিকটিকে তারা যে-হাত দিয়ে আঘাত করেছিল, সেই হাত দিয়েই তার শুশ্রূষা করতে লাগল। আমি দেখতে পাচ্ছি আমার বন্ধু সৈনিকটির পিঠের সেই ক্ষত দিয়ে আবার রক্ত ঝরছে। সুতরাং তাদের সঙ্গে আমি আর আমার পাশের এই মিত্র-সেনাটিও উৎকন্ঠায় ছটফট করতে লাগলুম। একসময় আমি থাকতে পারলুম না, তাকে জিজ্ঞেস করলুম, ‌তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে সৈনিক?‌

সে দৃঢ় গলায় উত্তর দিল, ‌কিচ্ছু না। রাজপুত্র, যতক্ষণ-না সম্রাট হুয়াসকারকে মুক্ত করতে পারছি, ততক্ষণ আমি মরছি না।‌

এখন সেই এলাকার সমস্ত মানুষ ভেঙে পড়েছে আমাদের দেখতে। আমার বন্ধু সৈনিকের সেই দুঃসাহসী কথা শুনে তারাও গর্জে উঠল। ‌তুমি মরার আগে হে সৈনিক, আমাদের যেন মৃত্যু হয়। টাহুয়ানটিনস্যুর গৌরব রক্ষা করার জন্য তোমার আগে আমরাই ঝাঁপিয়ে পড়ব। আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, শত্রুকে কুজকোর পথে এক-পাও এগোতে দেব না। কিছুতেই না।‌

সে-রাতটা আমরা সেখানেই বিশ্রাম নিলুম। শুনলে অবাক হবে, সকাল বেলা উঠে দেখি অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়েছে আমাদের দেখতে। তাদের সবার হাতে অস্ত্র সেই গুলতি। তাদের সবার বুক-ভরতি সাহস। তারা আমাদের সঙ্গী হবে। তারা সবাই আতাহুয়ালপার পথ আটকাবে। এলাকার এই মানুষেরা আমাদের দিকে। তারা মানে না আতাহুয়ালপাকে সম্রাট বলে। তাদের সম্রাট হুয়াসকার।

আমার বন্ধু সৈনিকটি আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। দেখতে পাচ্ছি অসংখ্য মানুষ অস্ত্র নিয়ে আমাদের সঙ্গী হবে বলে প্রস্তুত হচ্ছে। আমার মিত্র-সেনাটি কেমন করে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে সেই নিয়ে তাদের নেতাদের সঙ্গে কথা বলছে। এমনসময় এক ভয়ংকর খবর এল। একজন চাসকুই সংবাদ এনেছে, মহাসাগরের জলের ওপর ভাসতে ভাসতে একজন নয়, অসংখ্য ভিরাকোচা সাগরের তীরে নেমেছে। নেমে আন্দিজের পর্বত ডিঙিয়ে এগিয়ে আসছে কাজামারকা শহরের দিকে। এই ফাঁকে বলে রাখি, এই কাজামারকা শহরটা ছিল প্রায় কুইটো আর কুজকোর মাঝামাঝি জায়গায়। সে আরও খবর দিল, কুজকোর পথে আতাহুয়ালপা এই কাজামারকায় ছাউনি ফেলেছে। তার সঙ্গী অসংখ্য সৈন্য। আর সেই খবরটা আরও ভয়াবহ মনে হল, যখন সে বলল ভিরাকোচার আসার সংবাদ শুনে টাহুয়ানটিনস্যুর মানুষ চারদিকে আনন্দ করছে। তারা দলে দলে ভিরাকোচাদের সঙ্গ নিয়েছে। আমাদের সেই প্রাচীন দেবতা ভিরাকোচার মতো এদেরও দাড়ি আছে। এদের গায়ের রং র্ফসা। তবে, এদের পরনে এক অদ্ভুত পোশাক। হাতে এদের এমন এক অস্ত্র যা টিপলেই বজ্রের মতো গর্জে ওঠে। এরা সাগর পেরিয়ে মানুষকে বাঁচাতে এসেছে অজানা এক জন্তুর পিঠে চেপে। যে-জন্তু এদেশে কখনোই দেখা যায় না। তাদের কোমরেও ঝোলানো একধরনের অস্ত্র। সে-অস্ত্র দিয়ে আঘাত করলে খান খান হয়ে যায় লামার মুণ্ডু। এখানকার মানুষ গৃহযুদ্ধে ক্লান্ত, এখন তারা বলছে ভিরাকোচা তাদের এই বিপদের হাত থেকে বাঁচাবে। তাই তারা হাজারে হাজারে তাদের সঙ্গী হয়ে ভিরাকোচার জয় গাইছে।

আমার বন্ধু সৈনিকটির মুখ ভার হয়ে গেল ‌চাসকুই‌-এর মুখে এই কথা শুনে। কিন্তু দেখতে পেলুম, এই যে এখানে জড়ো হয়েছে অগুনতি মানুষ, তাদের অনেকের মুখে খুশির ছোঁয়া লেগেছে। তারা যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। মনে হল এরাও বুঝি আর আন্দিজের পাথর রক্তে রাঙা দেখতে চায় না। তারা চায় শান্তি।

আমার বন্ধু সৈনিকটিকে দেখে বুঝতে পারলুম, হয়তো সে কিছু বলতে চায় আমায়— গোপনে। আমি তার কাছে এগিয়ে গেলুম। জিজ্ঞেস করলুম, ‌কিছু বলবে তুমি?‌

সে বলল, ‌হ্যাঁ রাজপুত্র, আমাদের আজই এখান থেকে রওনা দিতে হবে। যত তাড়াতাড়ি আমরা কাজামারকা যেতে পারি ততই ভালো। আর এই যে মানুষগুলি আমাদের সঙ্গ নেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে, ওদের বুঝিয়ে বলতে হবে এখনই আমাদের সঙ্গে যাওয়ার দরকার নেই। প্রয়োজন হলে ডেকে নেব আমরা।‌

আমি তাকে অন্য আর কিছু না জিজ্ঞেস করে বললুম, ‌মনে হচ্ছে আমরা তো প্রায় কাজামারকার কাছাকাছিই চলে এসেছি।‌

বন্ধু সৈনিকটি বলল, ‌এখান থেকে কাজামারকা আমরা এক রাতেই পৌঁছোতে পারব। কিন্তু এখনই যাত্রা শুরু করতে হবে।‌

সুতরাং আর আমরা অপেক্ষা করলুম না। সেই মানুষগুলিকে আমার বন্ধু সৈনিকটির পরামর্শমতো বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বিদায় নিলুম। পথে নামলুম আর মনে মনে ভাবতে লাগলুম, আমার এই বন্ধুসৈনিকটির শরীরটাও বোধ হয় এই আন্দিজের পাথর দিয়েই তৈরি। নইলে কাল অত মানুষের এত আঘাতের পরেও আজ পথ চলতে মানুষটার কষ্ট নেই একটু! বেশ স্বচ্ছন্দে হাঁটছে সে, যেন কিছুই হয়নি। আমার আর এক সঙ্গী মিত্র-সেনাটিও বেশ শক্তপোক্ত, তারও দেখছি না কোনো ক্লান্তি।

এই সুযোগে আর একটা কথা বলে নিই, আমার বন্ধু সৈনিকটি এতক্ষণ শত্রুসেনার যে পোশাকটি গায়ে পরেছিল, সেটি খুলে ফেলেছে। এখন সে পরেছে অন্য আর একটি পোশাক। শত্রুসেনার পোশাকটি সে মিত্র-সেনার কাঁধের ঝোলার মধ্যে রেখে দিয়েছে। জানি না সে কী ভেবেছে। না ভেবে সে যে কোনো কাজ করে না, সে আমার ভালোই জানা হয়ে গেছে। কিন্তু এই চলতি-পথে একটা কথা বার বার যেন আমাকে অন্যমনা করে দিচ্ছে। বার বার আমার মনে পড়ে যাচ্ছে সেই বেশ ক-বছর আগের কথা। সেবারেও একদল মানুষ এসেছিল অজানা। বোধ হয় সেকথা তোমাদের বলেওছি। বলেছি তারাও ভেসে এসেছিল সাগরের জলে। ভেসে এসেছিল মস্ত মস্ত বাড়িতে। তাদের হাতে ছিল গর্জে-ওঠা লাঠি। সেই লাঠি দেখিয়ে তারা লুঠ করেছিল অনেক সোনার অলংকার, সোনায়-গড়া দেবতার মূর্তি। ভয় দেখিয়েছিল আমাদের দেশের মানুষকে। তাদের দেখে ভয়ে পালিয়েছিল তারা। তবে কি তারাই এসেছে আবার! আমরা কি মিথ্যেই ভাবছি ভিরাকোচা এসেছেন। ভিরাকোচাই যদি হবেন, তবে তিনি ওই অদ্ভুত জন্তুটার পিঠে চাপবেন কেন? আর পোশাকই-বা হবে কেন অমন? তোমাদের বলে রাখি, আমরা পরে জেনেছিলুম ওই জন্তুটার নাম ঘোড়া। আর...

হঠাৎ আমার মিত্র-সেনাটি থেমে পড়ল। এতক্ষণ সে আমাকে আর আমার বন্ধু সৈনিকটিকে পেছনে ফেলে কয়েক পা আগে আগে হাঁটছিল। মনে হচ্ছে সে বোধ হয় কিছু দেখেতে পেয়েছে। পর্বতের উপত্যকার জনপদ আমরা অনেক আগেই ফেলে এসেছি। এখন আমরা পর্বতের যে-অংশ দিয়ে হাঁটছি সেখানে জনমনুষ্যের লেশমাত্র নেই, শুধু শব্দ সোঁ-সোঁ হাওয়ার। এ ছাড়া শব্দের আর কোনো সাড়া নেই। কখনো-সখনো যেখানে নীচু, সেখানে দু-একটি পাখির কলতান কানে আসে। তা ছাড়া ভয়ংকর নিস্তব্ধতা।

আমরা ততক্ষণে মিত্র-সেনাটির আরও কাছাকাছি চলে এসেছি। আমিই তাকে জিজ্ঞেস করলুম, ‌কী দেখছ?‌

সে আমার কথার উত্তর না দিয়ে বলল, ‌বলছি রাজপুত্র, আপনারা এখানেই একটু অপেক্ষা করুন।‌ বলে তরতর করে সামনের একটা উঁচু পাথরের ওপর উঠে গেল। দূর থেকে সে কিছু দেখার চেষ্টা করল। আমি এবার বুঝতে পারলুম, যে-শব্দ এতক্ষণ হাওয়ার ঝাপটায় আমাদের কানে পৌঁছোয়নি, সেই শব্দ আমার মিত্র-সেনা শুনতে পেয়েছে। সেই শব্দেরই খোঁজ করছে তার কান, সঙ্গে চোখ দুটোও।

হয়তো সে খোঁজ পেয়েছে, কেননা যেমন করে সে উঠেছিল ঠিক তেমন করেই সে নেমে এল। একেবারে আমাদের দু-জনের কাছাকাছি এসে সে ব্যস্ত হয়ে বলল, ‌একজন চাসকুই আসছে।‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি জিজ্ঞেস করল, ‌ঠিক দেখেছিস?‌

সে বলল, ‌হ্যাঁ।‌

সত্যিই, এবার আমাদেরও চোখে পড়ে গেল। একজন চাসকুই আসছে বটে। গায়ে তার লামার লোমের তৈরি হাতকাটা নিমা। কাঁধে ঝোলানো একটি থলি। মাথায় রংচঙে পাকানো দড়িতে বাঁধা পাখির পালক। আর শত্রুকে আঘাত করার জন্য তার হাতে অস্ত্র সেই গুলতি। খালি পা। কিন্তু আমরা এই এতদূর থেকে ঠিক ঠিক ঠাওর করতে পারলুম না তার মাথায় কোন দলের নিশান আঁটা। সুতরাং তার অপেক্ষায় আমরা দাঁড়িয়ে রইলুম এইখানেই। সে ছুটে আসছে।

বেশিক্ষণ দাঁড়াবার কথা নয়, কেননা সে অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। একেবারে আমাদের মুখোমুখি। আমাদের দেখেই সে ছোটা বন্ধ করল, থামল— হাঁপাচ্ছে। আমরা তার মাথার নিশান দেখে বুঝতে পারলুম সে সম্রাট হুয়াসকারের পক্ষে। সুতরাং আমি আমার বুকের ভেতর থেকে আমার নিশানটি বের করে তাকে দেখাতেই সে আমাকে নত হয়ে শ্রদ্ধা জানাল। সে একটু সুস্থির হতেই আমি তাকে অত্যন্ত উদবিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, ‌কী খবর চাসকুই?‌

সে বলল, ‌ইনকা রাজপুত্র, খবর ভয়াবহ!‌

—‌কেন? কেন?‌

তখন সে বলল, ‌সে অনেক কথা। ইনকা রাজপুত্র, আপনি শুনেছেন কি না জানি না, ইনকা-সাম্রাজ্যের উত্তর দেশের লোকেরা আতাহুয়ালপার অত্যাচারে অতিষ্ঠ। তারা নিস্তার পেতে চাইছিল তাঁর হাত থেকে। এমনসময় সাগরের জলে ভেসে একদল দাড়িওয়লা ফর্সা মানুষ এল। তারা উঠে এল আন্দিজে। উত্তর সাম্রাজ্যের মানুষ ভাবল, এরাই আমাদের দেবতা ভিরাকোচা। সুতরাং তাদের দেখে দলে দলে মানুষ উল্লাস শুরু করে দিলে।‌

আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললুম, ‌হ্যাঁ, এ সংবাদ আমি পেয়েছি। এ ছাড়া আর কী খবর আছে বলো!‌

—‌ইনকা রাজপুত্র,‌ সে আবার বলতে শুরু করল। —‌টাহুয়ানটিনস্যুর মানুষ গৃহযুদ্ধে বিরক্ত। তাদের জীবন বিপন্ন। তাই তারা অনেকেই সেই অচেনা মানুষের সঙ্গ নিয়েছে। তাদের উদ্দেশ্যে রঙিন পালক উড়িয়ে তাদের অভ্যর্থনা করছে। তাদের পথঘাট পরিষ্কার করে দিচ্ছে। হে রাজপুত্র, আপনার সৎদাদা আতাহুয়ালপা যখন ইনকা-রাজ্যের কাজামারকার উষ্ণ ঝোরার স্নান-প্রাসাদে অপেক্ষা করছিলেন, তখন তিনি এই অচেনা মানুষগুলির আসার খবর পান। এইসময় কাজামারকায় আতাহুয়ালপার অসংখ্য সৈন্য ছাউনি ফেলে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হয়তো আতাহুয়ালপাও এই অচেনা মানুষদের ভিরাকোচা বলেই মনে করেছিলেন। তাই আতাহুয়ালপা তাদের নেতাকে উষ্ণ ঝোরার বিলাস প্রাসাদে নেমন্তন্ন করলেন। হে রাজপুত্র, তারা এল মাত্র কয়েক জন। এল সেই অদ্ভুত জন্তুটার পিঠে চেপে। তারপর হঠাৎ তাদের শিঙা বেজে উঠল। বজ্রের মতো গর্জে উঠল তাদের অস্ত্র। অস্ত্রের সেই গর্জন শুনে আর সেই অদ্ভুত জন্তুদের দুরন্ত বেগে তাদের দিকে তেড়ে আসতে দেখে আতাহুয়ালপার সেই অসংখ্য সেনা ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যে-দিকে পারল পালাল। তারা ভাবল বুঝি কোনো দেবতার রোষ তাদের আঘাত করছে। সেনাদের সমস্ত ছাউনি চোখের পলকে শূন্য হয়ে গেল। পালাতে গিয়ে আর তাদের অস্ত্রের আগুনে অনেক অনেক সেনার মৃত্যু হয়েছে। হে রাজপুত্র, আতাহুয়ালপা তাদের হাতে ধরা পড়েছেন। এখন তিনি বন্দি।

তার কথা শুনতে শুনতে আমার গায়ে কাঁটা দিল। আমার গলা শুকিয়ে আসছিল। আমি সেই মুহূর্তে একটা অজানা ভয়ে অস্থির হয়ে পড়লুম। তাকে জিজ্ঞেস করলুম, ‌এখন তুমি কোথা যাচ্ছ?‌

সে বলল, ‌আগের চাসকুইকে এই খবরটা পৌঁছে দিতে। যাতে আসছে তিন দিনের মধ্যে এই খবরটা কুজকোয় পৌঁছে যায়, সেইমতো একের-পর-এক চাসকুই তৈরি হয়ে আছে।‌

চাসকুই-এর এই কথা শুনতে শুনতে আমি তোমাদেরও একটা কথা বলে রাখা দরকার মনে করি। আমাদের এই ইনকা-সাম্রাজ্যের এক অঞ্চল থেকে আর এক অঞ্চলের দূরত্ব তো কম নয়। ধরো কুইটো থেকে কুজকো যেতেই কত দিন লেগে যায়। আমাদের সমস্ত খবর আদান-প্রদান করত এই চাসকুইরা। একজন চাসকুই তো আর এত দূরত্বের রাস্তা একা পার হতে পারত না সেইজন্য অঞ্চল ভাগ করা থাকত। সেই এক-এক অঞ্চলে এক-এক জন চাসকুই থাকত। এক অঞ্চলের চাসকুই আর এক অঞ্চলের চাসকুইকে খবরটা পৌঁছে দিলে, সে আবার পরের অঞ্চলের চাসকুই-এর কাছে ছুটত। এমনই করে একটা গোটা দিনে প্রায় এক-শো পঞ্চাশ মাইল রাস্তা চাসকুইরা একে একে ছুটে যেতে পারত। সুতরাং আমি আর চাসকুইকে বেশিক্ষণ না আটকে বললুম, ‌ঠিক আছে তোমাকে আর দাঁড়াতে হবে না, তুমি যেতে পারো। তবে আমাদের কোনো সেনাধ্যক্ষের তুমি যদি দেখা পাও, তাহলে তাকে বলবে আমরাও তোমাদের পেছনে কুজকোয় ফিরে আসছি।‌

আমার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার বন্ধু সৈনিকটি চাসকুইকে রুখে দিয়ে বলল, ‌দাঁড়াও একটু!‌ তারপর আমাকে বলল, ‌রাজপুত্র, আমার মনে হয় আপনার এই মুহূর্তে আর কুজকো ফেরা ঠিক হবে না। কারণ কুজকোর যুদ্ধে আমাদের পরাজয় হয়েছে। এখন আমাদের কাজামারকাতেই যেতে হবে, কেননা চাসকুই-এর মুখে যা শোনা গেল, তাতে বোঝা যায় কাজামারকায় আতাহুয়ালপা পরাজিত। কাজামারকায় গিয়ে আমাদের এই পরাজয়ের সুযোগ নিতে হবে।‌ আমাকে এই কথা বলেই আমার সেই বন্ধু সৈনিকটি চাসকুইকে বলল, ‌তুমি কুজকোয় গিয়ে আমাদের সেনাধ্যক্ষ যদি বেঁচে থাকেন তাঁকে বলবে আমরা কাজামারকায় আছি। দরকার পড়লে তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।‌ বলে সে মিত্র-সেনার কাঁধে ঝোলানো থলির মধ্যে হাত পুরে শত্রুসেনার সেই পোশাকটা বের করে বলল, ‌আর শোনো, সেনাধ্যক্ষকে এই কথাও বোলো, তিনি যেমন করে পারেন যেন সম্রাট হুয়াসকারের সঙ্গে বন্দিশালায় দেখা করেন। তিনি যেন সম্রাটকে রাজপুত্রের কথাও বলেন যে, তিনি বেঁচে আছেন এবং সম্রাটকে রক্ষা করার জন্য সমস্তরকম ব্যবস্থা নিচ্ছেন।‌

বলতে বলতে একটু থেমে আমার বন্ধু সৈনিকটি শত্রুসেনার সেই পোশাকটি তার হাতে তুলে দিয়ে বলল, এই নাও, শত্রুসেনার এই পোশাকটি তাঁকে দেবে। এই পোশাকটি দেখলেই তিনি বুঝতে পারবেন, রাজপুত্র তাঁকে ছদ্মবেশ ধারণ করতে বলেছেন। নইলে গুপ্তচরবৃত্তি করতে গিয়ে তিনি ধরা পড়তে পারেন।‌

আমার বন্ধু সৈনিকটির কথা শুনে চাসকুই আমার মুখের দিকে তাকাল। আমার এতে আপত্তি আছে কিনা, বোধ করি সেটা জানার জন্যই। আমি চাসকুইকে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিলুম আমার সম্মতি। চাসকুই এই উঁচু-নীচু পাথরে খালি-পায়ে ছুট দিল। খালি-পায়ে ছোটাই তাদের অভ্যেস।

আমরাও আর দাঁড়াবার দরকার মনে করলুম না। যে-পথে চাসকুই গেল আমরাও তার উলটো পথে হাঁটা দিলুম। আমার বন্ধু সৈনিকটি হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‌রাজপুত্র, আপনি কুজকোতে ফিরে যেতে চাইছিলেন কেন?

আমি তার এমন প্রশ্নের জন্য তৈরি ছিলুম না, তাই মুহূর্তের জন্য থতোমতো খেয়ে গেছিলুম। তারপর নিমেষে নিজেকে সামলে নিয়ে বললুম, ‌আতাহুয়ালপা পরাজিত। সুতরাং আমার দাদা হুয়াসকারকে এখন মুক্ত করা এমন কিছু কঠিন হবে না এই ভেবে কুজকোতে ফিরে যেতে চাইছিলুম।‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি মৃদু হাসল। তারপর বলল, ‌রাজপুত্র, চাসকুই-এর মুখে সমস্ত কথা শুনে একটা কথা মনে হল, আমাদের শত্রু আতাহুয়ালপা যখন ধরা পড়েছে সমুদ্রে ভেসে-আসা অচেনা মানুষের হাতে, তখন সেই অচেনা মানুষই সম্রাট হুয়াসকারকে মুক্ত করতে পারে। এখন আমাদের সেই অচেনা মানুষেরই সাহায্য নিতে হবে। শুনলেন-না রাজপুত্র, চাসকুই বলল দেশের অনেক মানুষ তাদের সঙ্গ নিয়েছে। ভায়ে-ভায়ের ওই গৃহযুদ্ধে মানুষ তিতিবিরক্ত। সুতরাং রাজপুত্র, আমরাও সেই অসন্তুষ্ট মানুষের সঙ্গে নতুন অচেনা মানুষের বন্ধু হয়ে সম্রাট হুয়াসকারকে মুক্ত করার চেষ্টা করব। আর বদলা নেব আতাহুয়ালপার ওপর। আপনি কি আমার এই পরামর্শটা সঠিক বলে মনে করেন না?‌

আমি সঙ্গে সঙ্গে বন্ধু সৈনিকটির কথায় সায় দিয়ে বললুম, ‌দ্যাখো সৈনিক, তোমার বুদ্ধির পরিচয় যতই পাচ্ছি, ততই আমার মনে হচ্ছে তোমার হওয়া উচিত ছিল সম্রাটের উপদেষ্টা। তা না-হয়ে কেন যে যুদ্ধে নেমেছ! আমি কেন, আমার মনে হয় আমাদের এই মিত্র-সেনাটিও তোমার বুদ্ধির তারিফ করবে। তাই না মিত্র-সেনা?‌ আমি মিত্র-সেনার উত্তরের জন্য তার মুখের দিকে তাকালাম।

মিত্র-সেনা বলল, ‌নিশ্চয়ই। আমিও যত দেখছি, আমাদের এই বন্ধুটির বুদ্ধি ততই যেন আমাকেও অবাক করে দিচ্ছে।‌

আমরা পরের দিন সকালেই কাজামারকা পৌঁছে গেলুম। পৌঁছে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলুম, যখন দেখলুম শহরের প্রায় সব মানুষই হাসিখুশি, আনন্দে মশগুল। আমি যে রাজপুত্র, কাজামারকার মানুষ সে আর কেমন করে বুঝবে! তারা জানেই না আমি সম্রাট হুয়ানা কাপাখের ছেলে। আমার দাদা হুয়াসকার। অবশ্য না জানাটা মনে হয় ভালোই, কারণ কার মনে কী আছে আমরা কে বলতে পারি!

আতাহুয়ালপা গৃহযুদ্ধ বাঁধাল বলেই-না এত নিরীহ লোকের প্রাণ গেল

কিন্তু আশ্চর্য, সেই ভিনদেশি অচেনা মানুষের কাউকেই তো আমরা এখনও পর্যন্ত দেখতে পেলুম না! তবে তারা কোথায়? আমার মনের সঙ্গে চোখটাও যখন তাদের দেখার জন্য ছটফট করছিল, তখন আমার বন্ধু সৈনিকটি হঠাৎই বলল, ‌এখন আমাদের এমন একটা জায়গা বের করতে হবে, যেখান থেকে আমাদের কাজ করার সুবিধে হয়।‌

আমি বললুম, ‌সৈনিক, আমার তো কিছুই জানা নেই এখানকার।‌

আমার মিত্র-সেনাটি বলল, ‌এখানকার অতিথিশালায় তো আমরা থাকতে পারি।‌

বন্ধু সৈনিকটি বলল, ‌তা পারি। তাহলে কিন্তু তোমার ওই যুদ্ধপোশাকটি এখনই খুলে ফেলতে হবে। কারণ এখানে আমাদের সাধারণ মানুষের মতো ঘোরাফেরা করতে হবে। কেউ-না বুঝে ফেলে আমাদের মনে কী আছে। কেউ-না চিনে ফেলে আমরা কার দলে।‌

আমার বন্ধু সৈনিকটির কথা শুনে আমার মিত্র-সেনাটি বলল, তা খুলে ফেলছি। আমার সৈনিকের পোশাকের নীচে তো একটা অন্য জামা আছেই সুতরাং অসুবিধে হবে না।‌

সে সৈনিকের পোশাক খুলে ফেলল। পরিপাটি করে গুছিয়ে-গাছিয়ে রেখে দিল তারই পাশের ঝোলাতে। কেউ যে দেখতে পাবে না সে তার রাখার কায়দা দেখেই বোঝা গেল। সুতরাং এখন আমাদের গায়ের পোশাক দেখলে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, আমরা তিন জনেই এই শহরের সাধারণ মানুষ। আমাদের চলাফেরা দেখে কেউ যদি হাবাগোবা ভাবে, তবে বোধ করি ভুল করবে না। সে যাই হোক, এখন কিন্তু আমাদের একটা অতিথিশালা খুঁজে বের করা দরকার। সেই চিন্তাটাই যখন আমার মাথায় ঘুরঘুর করছিল, তখন হঠাৎ দেখি আমার বন্ধু সৈনিকটি একজন পথচারীর সামনে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন করল। আমি তো ঘাবড়ে গেছি। এ কী করে বন্ধু সৈনিকটি! অভিবাদন করেই আলাপ শুরু করে দিল। এমন কায়দায় কথা বলছে, দেখলে কে বলবে পথচারীকে চেনে না সে। প্রথমেই সে জিজ্ঞেস করল, ‌মহাশয়ের কি কাজামারকাতেই থাকা হয়?‌

মহাশয়টি মাথা নেড়ে জবাব দিল, ‌আজ্ঞে হ্যাঁ।‌ তারপর জিজ্ঞেস করল ‌—আপনারা?‌

সৈনিক বলল, ‌আজ্ঞে আমরা আসছি অনেক দূর থেকে। আসলে আমরা শুনলুম কাজামারকায় ভিরাকোচা এসেছেন, তাই তাঁকে দেখতে ছুটে এলুম। সত্যিই কি ভিরাকোচা এসেছেন?

বলব কী, আমার সৈনিকের কথা শেষ হতে-না-হতেই সেই মহাশয়টি একেবারে আগুনে কাঠ ফাটার মতো ফটফট করে বকতে শুরু করে দিলে। বললে, ‌আলবাত এসেছেন মশাই। আসবেন নাই-বা কেন? কী আরম্ভ করেছিল বলুন ওই আতাহুয়ালপা। খোয়াব দেখছেন, খোয়াব! তিনি হবেন সম্রাট! আরে বাবা সম্রাট হব বললেই হওয়া যায়! বলুন তো, আতাহুয়ালপা লোকটা সম্রাট হওয়ার যোগ্য? বলি, তুই সম্রাট হুয়াসকারের পায়ের নখের যুগ্যি। তুই সম্রাট হুয়াসকারের গায়ে হাত দিস কোন সাহসে! আরে মশাই, ধম্মের কল বাতাসে নড়ে। তুই যেমন তাঁকে বন্দি করেছিস, তেমনই ভিরাকোচাও তোর পায়ে শেকল বেঁধেছে। এখন সামলাও ঠেলা।‌

লোকটা গড়গড় করে একসঙ্গে এত কথা বলে, যেন দম নেওয়ার জন্য থামল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‌আপনারা সম্রাট হুয়াসকারের খোঁজখবর কিছু জানেন নাকি?‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি বলল, ‌আজ্ঞে আমরা কেমন করে জানব? তিনি তো রাজধানী কুজকোতে থাকেন!‌ বলতে বলতে একটু থেমে সেই পথচারীর চোখের দিকে নিমেষ তাকিয়ে আবার বলল, ‌ভিরাকোচা আতাহুয়ালপাকে বন্দি করেছেন, আপনি ঠিক জানেন?‌

‌ঠিক জানেন মানে!‌ লোকটার যেন আঁতে ঘা লাগল। আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, —‌তবে আমায় জিজ্ঞেস করছেন কেন? আপনারা তো আচ্ছা তেএঁটে লোক মশাই! যদি বিশ্বাসই করবেন না, তবে জিজ্ঞেস করার কী দরকার?‌ বলে এমন তেড়ে এল যেন এই বুঝি দেয় কষিয়ে। কী রে বাবা, লোকটার মাথায় ছিট আছে না কি!

আমার মিত্র-সেনাটি চট করে তার সামনে গিয়ে তাকে ঠাণ্ডা করার জন্য কাকুতিমিনতি করতে লাগল। কিন্তু লোকটা এমন খ্যাপা খেপেছে তাকে থামায় কে! আমি দেখলুম, আর বেশিক্ষণ চেঁচামেচি চললে নির্ঘাত লোকজন জমে যাবে। তাই এবার আমিই এগিয়ে গেলুম তার কাছে। ভদ্রলোককে বুকে জড়িয়ে ধরে বললুম, ‌না ভাই না। আপনাকে আমরা মোটেই অবিশ্বাস করছি না। আতাহুয়ালপার মতো অমন বদ লোককে ভিরাকোচা ছাড়া আর কে শায়েস্তা করতে পারবে! বলুন, আতাহুয়ালপা গৃহযুদ্ধ বাঁধাল বলেই-না এত নিরীহ লোকের প্রাণ গেল? এমন লোভী, নিষ্ঠুর লোক আমাদের এই চার দিগন্তে আর দুটি পাবেন না।‌

লোকটা ঝট করে আমার বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে একটু শান্ত গলায় উত্তর দিল, ‌—তাই বলুন।‌ বলে সৈনিকের দিকে হাত তুলে তাকে দেখিয়ে বলল, ‌কিন্তু উনি তো সেকথা বিশ্বাস করতে চান না।‌

বলতে বলতে লোকটা থামল, এমনভাবে থামল, মনে হল হঠাৎ যেন কী-একটা মনে পড়ে গেছে তার। থেমেই নিজের বুকে হাত দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল। এই সেরেছে! আমার তো ধুকপুকুনি শুরু হয়ে গেছে! কী রে বাবা, লোকটা কি আমাকে চিনে ফেলেছে!

আমায় বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। আলটপকা সে জিজ্ঞেস করে বসল, ‌আপনার বুকে জামার নীচে কী আছে মশাই? আমার লাগল!‌

এই রে, ধরা পড়ে গেলুম বোধ হয়! বুকের ভেতর যে আমার রাজপুত্রের নিশানটা আমি লুকিয়ে রেখেছি। মুখখানা আমার এইটুকু হয়ে গেছে ভয়ে। কাঁচুমাচু হয়ে আমতা-আমতা করতে লাগলুম আমি। আর লোকটা আমায় দেখতে লাগল কেমন একটা সন্দেহের চোখে।

সে আচমকা বলে উঠল, ‌কী লুকিয়ে রেখেছেন?‌

এবার মনে হল, আর আমার চুপ করে থাকা ঠিক নয়। তাই বলেই ফেললুম, ‌না মশাই, কিছুই লুকিয়ে রাখিনি। আমার লুকিয়ে রাখার মতো কিছুই নেই।‌

‌নেই তো বুকে কী? দেখান!‌ সে বলল।

আমি জবাব দিলুম, ‌এ দেখে আপনার কিছু লাভ হবে না।‌

—‌লাভ নাই হোক। তবু দেখতে চাই।‌

আমি দেখলুম লোকটা নাছোড়বান্দা, দেখবেই। সুতরাং তার হাত থেকে ঝটিতি নিস্তার পাওয়ার জন্য আমার বন্ধু সৈনিক দু-জনকে বললুম, ‌চলো আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।‌

সে অমনই আমাদের পথ আগলে বলে উঠল, ‌ওটি হচ্ছে না মশাই। না দেখালে আমি আপনাদের যেতে দিচ্ছি না। আপনি বুকের ভেতর নিশ্চয়ই কোনো গুপ্ত কিছু লুকিয়ে রেখেছেন। তাহলে কি মনে করব আপনারা আতাহুয়ালপার লোক? গুপ্তচরের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন! ভালোয় ভালোয় বের করুন, নইলে চিৎকার করে লোক ডাকব!‌

চিৎকার সে করতেই পারে, কেননা তার কথাবার্তায় বোঝাই যাচ্ছে ভীষণ একরোখা। কাজেই এই অবস্থায় আমার যে কী করা উচিত আমি বুঝে উঠতে পারলুম না। হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম আর ভাবতে লাগলুম, আর বোধ হয় আমার পালাবার পথ নেই।

কিন্তু আমার এই অসহায় অবস্থা থেকে আবার আমায় রক্ষা করল আমার সেই বন্ধু সৈনিকটি। সে হঠাৎ বলে উঠল, ‌—শুনে রাখুন মশাই, আপনি যা ভাবছেন সবই মিথ্যে। আমরা কারও গুপ্তচরও নই আর আমরা গোপনও করছি না কিছু। ওঁর বুকে যা আছে সেটি এখনই যদি উনি বের করেন, আপনি যে চমকে উঠবেনই এটা আমি নিশ্চিত। কিন্তু আপনি কতটা চমকে উঠবেন সে-আন্দাজ করার মতো আমার বুদ্ধি নেই।‌ বলে সে আমার দিকে চাইল আর এমন চট করে চোখ মটকে আমাকে ইশারা করল যে, আমি কেমন সব গুলিয়ে ফেললুম। কিন্তু সে আর কতক্ষণ! পলক পড়তে-না-পড়তেই আমার সৈনিক বন্ধুটি লোকটিকে বলল, ‌ঠিক আছে, উনি আপনাকে দেখাবেন, কিন্তু দুটি শর্তে। এক, আপনাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, আপনি যা দেখবেন এখনই সেটি কাউকে বলতে পারবেন না। দুই, আমাদের সব কাজে আপনি আমাদের সাহায্য করবেন।‌

লোকটি বলল, ‌সে আর বলতে। আপনারা যদি আতাহুয়ালপার লোক না হন, স্বচ্ছন্দে মনে করতে পারেন আমি আপনাদেরই একজন। সুতরাং আমার সাহায্য পাবেনই।‌

‌তবে চলুন একটু আড়ালে যাওয়া যাক।‌ আমার বন্ধু সৈনিকটি বলল।

লোকটি উত্তর দিল, ‌বেশ, চলুন-না ওই তো কাছেই দেখা যাচ্ছে পাথরের ওই আড়ালটা। ওদিকে বড়ো-একটা কেউ যায় না, আর তা ছাড়া এখন শহরেও লোকজন কম। কারণ কে আর মশাই পড়ে পড়ে মার খেতে চায়। অধিকাংশ বাড়িঘরই ফাঁকা। প্রাণের মায়া কার নেই বলুন? যুদ্ধে যুদ্ধে কাজামারকা একেবারে ছারখার হয়ে গেল।‌

আমরা শেষমেষ সেই পাথরের আড়ালেই গেলুম। সেই আড়ালে দাঁড়াতে-না-দাঁড়াতেই আমার বন্ধু-সৈনিকটি লোকটিকে বলল, ‌তবে শুনুন, আপনার সামনে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, যিনি এতক্ষণ তাঁর পরিচয় আপনার কাছে গোপন রেখেছিলেন, তিনি সম্রাট হুয়ানা কাপাখের পুত্র, সম্রাট হুয়াসকারের ভাই। ইনি রাজপুত্র—‌

আমার বন্ধু সৈনিকের কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি বুকের ভেতর থেকে আমার রাজপুত্রের নিশানটা বের করে ফেললুম। লোকটি সেই নিশান দেখে কেমন যেন হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ আমার মুখের দিকে। তারপর দেখতে পেলুম তার ঠোঁট দুটো কাঁপছে থরথর করে। তার মাথাটা বোধ হয় একটু টলে পড়েছিল। সে পড়ে যেত, কিন্তু তার আগেই সে ঝট করে ধরে ফেলল সামনের পাথরটা। সঙ্গেসঙ্গে আমার মিত্র-সেনাটিও তাকে ধরে ফেলে জিজ্ঞেস করল, ‌আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন?‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি চটপট এগিয়ে গিয়ে তার মাথায় হাত রেখে বলল, ‌আশা করি আপনাকে আর কিছু বলার দরকার হবে না?‌

সেই লোকটা মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‌আমি কী ভয়ংকর পাপ করেছি! আমি বুঝতেই পারিনি সূর্যদেবতা ইনটির পুত্র আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে ক্ষমা করুন রাজপুত্র।‌ বলে সে আকুল হয়ে আমার পায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ল।

আমি তাকে ধরে ফেললুম। উত্তর দিলুম, ‌না না, আপনার তো কোনো দোষ নেই। আমরা যদি আপনাকে আমাদের পরিচয় না দিই আপনিই-বা জানবেন কেমন করে আমরা কে!‌

লোকটি তেমনই গদগদ হয়ে বলে উঠল, ‌কত পুণ্য করলে তবে দেবতার দেখা পাওয়া যায়!‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি তাকে থামিয়ে বলল, ‌দেখুন এখানে তো বেশিক্ষণ দাঁড়ানো ঠিক নয়, কেউ দেখে ফেললে সন্দেহ করতে পারে। এখন আমাদের একটা থাকবার মতো জায়গা আপনি যদি বলে দেন, তবে সেখানে আমরা আশ্রয় নিতে পারি।‌

আমার মিত্র-সেনাটি সঙ্গেসঙ্গে জিজ্ঞেস করল, ‌শুনেছি এখানে তো অতিথিশালা আছে। অতিথিশালা হলেও চলবে আমাদের।‌

সেই লোকটি আবার নিজমূর্তি ধরল। আমার মিত্র-সেনার কথা শুনে একেবারে ফোঁস করে উঠল। ‌—কেন, আমি কি মরে গেছি? আমার কি ঘরদোর নেই? আমি থাকতে আমার রাজপুত্র থাকবেন অতিথিশালায়! না না, অন্য কোথাও আপনারা কিছুতেই থাকতে পারবেন না। চলুন আমার ঘরে!‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি আবার চকিতে আমার মুখের দিকে তাকাল। বুঝতে পারলুম আমাকে ইশারা করল। প্রস্তাবটা যে তার মনোমতো হয়েছে এটা বুঝতে আমার ভুল হল না। মুখ দেখে এও বুঝতে পারলুম, আমার মিত্র-সেনাটিরও এই প্রস্তাবে আপত্তি নেই। সুতরাং সেই পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে আমরা লোকটির ঘরের দিকেই রওনা দিলুম।

ঘর তার একটিই। এ ঘর রাজপুত্রের মোটেই উপযুক্ত নয়, সেই কথাটা ঘরে ঢুকে ইস্তক সে যে কত বার বলল তার হিসেব নেই। অবশ্য ঠিক কথাই, যে-বংশের মানুষ সোনার পালঙ্কে, পাখির পালকের বিছানা ছাড়া অন্য কোথাও বিশ্রাম নেওয়ার কথা চিন্তা করেনি কোনোদিন, পাকেচক্রে আজ তার কী অবস্থা! তবে এটা ঠিক, গুহার সেই অন্ধকারের চাইতে এ ঘর নিশ্চয়ই অনেক অনেক মনোরম। বলা যায় নিরাপদও।

সুতরাং ঘরে ঢুকে আমরা তিন জনেই বেশ হাত-পা ছড়িয়ে হাঁপ ছাড়লুম আঃ! দেখলুম বাড়ির কর্তা আমাদের আপ্যায়ন করার জন্য কী-যে করবে সেই নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছে। একবার বাইরে যাচ্ছে, আবার ঘরে ঢুকছে। কখনো বসছে, কখনো উঠছে। আর বার বার জিজ্ঞেস করছে আমরা কী খাব না খাব। সেইসঙ্গে থেকে থেকেই আমার সামনে মাথা নত করে কাকুতিমিনতি করে বলছে, ‌হে ইনটিপুত্র, আমি যদি কিছু অন্যায় করে ফেলি আমায় ক্ষমা করবেন।‌

অন্য সময় হলে আমি কী বলতুম জানি না। কিন্তু এখন রাজপুত্রের কি আর সেই রাজগৌরব মাথায় নিয়ে হম্বিতম্বি করার কিছু আছে। তাই তাকে সাহস দিয়ে বললুম, ‌আরে না না, আপনাকে অত ব্যস্ত হতে হবে না। আমি মনে করি এসব কথা আপনি মনে ঠাঁই না দিলেই আমরা খুশি হব।‌

আমার কথাও শেষ হয়েছে আর ঠিক তক্ষুনি অদ্ভুত একটা শব্দ আমাদের কানে এল টগবগ-টগবগ! আমরা সকলেই একটা অজানা আতঙ্কে সচকিত হয়ে উঠলুম। সেই লোকটিকে কিন্তু ঘাবড়াতে দেখলুম না। সে বেশ খুশিতে ডগমগ করতে করতে বলল, ‌ওঃ! আপনাদের তো দেখছি দারুণ বরাত।‌

‌কেন? কেন?‌ আমরা তিন জনে প্রায় একইসঙ্গে ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলুম।

সে বলল, ‌একী! আপনারা এত ভয় পেয়ে গেলেন কেন? ভিরাকোচা আসছেন।‌

ভিরাকোচা! আমার বুকখানা ধক করে উঠল। আমি কি তবে সত্যিই সেই দেবতাকে দেখতে পাব! এতদিন আমরা শুধু সেই ভিরাকোচার গল্প শুনে এসেছি। শুনে এসেছি আমাদের বিপদের দিনে তিনি আসবেন। এখন সত্যিই আমাদের বিপদ। তবে কি সত্যিই তিনি এসেছেন! হ্যাঁ, শব্দ তো পর্বতের পাথরে প্রতিধ্বনি তুলেছে টগবগ-টগবগ! আমরাও তিন জনে ঝটপট উঠে দাঁড়ালুম, উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলুম সামনের দিকে। আমরা তিন জনেই এখন নির্বাক, কেননা যতই শব্দ এগিয়ে আসছে, আমাদের চোখের দৃষ্টিও ততই উদবেগে ছটফট করছে।

বেশিক্ষণ আমাদের এই উদবেগ নিয়ে অপেক্ষা করতে হল না। আমরা তিন জনে একইসঙ্গে দেখতে পেলুম তিন জন মানুষ তিনটে অদ্ভুত জন্তুর পিঠে চেপে টগবগ করতে করতে এদিকেই এগিয়ে আসছে। আমি বোধ হয় তোমাদের আগেই বলেছি, এই জন্তুগুলোর নামই ঘোড়া। আমাদের লামার সঙ্গে এদের কোনো মিল নেই। লামার চেয়ে এরা অনেক বড়ো, অনেক উঁচু। এমনকী ডাকটাও এদের কেমন যেন চিঁ-হিঁ-হিঁ! কিন্তু তাদের পিঠের সওয়ারদের দেখে আমার শোনা দেবতা ভিরাকোচার মিল আমি একটুও খুঁজে পেলুম না। এদের গায়ে দেখলুম আজব ধরনের সাজপোশাক, মাথায় শিরস্ত্রাণ। মাথা থেকে পায়ের পাতা অবধি পোশাকের কোথাও ফাঁক নেই, শুধু মুখের সামনেটা ছাড়া। বুকের ওপর রুপোর রক্তের বর্ম। চামড়ার জুতোটা হাঁটু থেকে শুরু করে শেষ হয়েছে পায়ের পাতায়। কোমরে ঝোলানো অস্ত্র। আমি শুনেছি এরই নাম তরোয়াল। প্রথম দেখলেই মনে হবে যেন ওই পোশাকের আড়ালে লোভী কোনো দস্যু লুকিয়ে আছে। আমি শিউরে উঠলুম। জানি না তাদের দেখে আমার বন্ধু দু-জনের কী মনে হল। কিন্তু আমাদের এই গৃহকর্তার মুখে ভয় বা ভাবনা আমি কিছুই দেখতে পেলুম না। দেখলুম আনন্দে তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে।

তিনটে ঘোড়া ছুটতে ছুটতে আরও কাছে এগিয়ে এল। দেখলুম তিন জনের মধ্যে একজন আমাদের এই সাম্রাজ্যেরই মানুষ। মনে হল সে ঘোড়ায় চড়তে শিখেছে। সে ওদের সঙ্গে ঘোড়ার পিঠে ছুটতে ছুটতে কথাও বলছে দেখছি। তবে কি ভিরাকোচা আমাদের ভাষাও জানে!

না, তা নয়। আমি পরে আরও শুনেছি, সমুদ্র কিনারে নেমে এই ভিনদেশের মানুষেরা আমাদের দেশের অনেক মানুষকে অনেক দিন ধরে তাদের ভাষা শিখিয়েছে। তাদের সঙ্গী করেছে। এরাই তাদের কথা আমাদের শোনায়। বলে এরাই আমাদের ভিরাকোচা। তার মানে, তবে কি এই ভিনদেশের মানুষেরা আমাদের এই চারদিগন্তে এসেছে অনেক দিন আগেই! হ্যাঁ তেমন কথাই শোনা গেল শেষে।

ঘোড়ার পিঠে ছুটতে ছুটতে তারা দাঁড়াল ওই সামনের ফাঁকা জায়গাটায়। তারা ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল না। একজন হঠাৎ একটা বাজনা মুখে দিয়ে আশ্চর্য এক শব্দ করল। সেই শব্দ পর্বতের গায়ে গায়ে আঘাত করে প্রতিধ্বনি হল। এই চমৎকার প্রকৃতির রাজ্যে সে যেন এক বিকট বেসুরো আওয়াজ।

সেই আওয়াজ শুনে, দেখতে দেখতে অনেক মানুষই এদিক-ওদিক থেকে উঁকি মারল। দেখলুম অনেকেই তাদের সামনে নত হয়ে অভিবাদন করল। এমনকী আমাদের এই গৃহের কর্তাটি পর্যন্ত ছুটে গেল। আর আমরা এই ঘরের ভেতর থেকেই উঁকি মেরে তাদের দেখতে লাগলুম।

হঠাৎ বাজনার শব্দ থামল। শব্দ থামবার সঙ্গে সঙ্গেই একজন ভিরাকোচা চেঁচিয়ে উঠল। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে সে যে কী বলছে, আমরা কেউই কিছু বুঝলুম না। কিন্তু আমরা উৎসুক হয়ে তার কথা শুনতে লাগলুম।

তার বলা শেষ হতেই ঘোড়ার পিঠে তাদের সেই সঙ্গী আমাদের দেশের মানুষটি আমাদের কোয়েচুয়া ভাষায় বলে উঠল, ‌শুনুন বন্ধুগণ, ভিরাকোচা যা বললেন আমি সেটি আমাদের ভাষায় আপনাদের শোনাচ্ছি। তিনি বললেন, প্রধান ভিরাকোচা ফ্রানসিসকো পিজারো আপনাদের সামনে উপস্থিত হতে পারেননি, যেহেতু তিনি অসুস্থ। সেই কারণে তিনি আদেশ করেছেন, ইনকা আতাহুয়ালপা বন্দি হলেও তিনি কারাগার থেকেই দেশ শাসন করবেন। কারাগারে যে-কেউ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। যে-কেউ তাঁদের অভাব-অভিযোগ তাঁকে জানাতে পারবেন। তিনি যদিও প্রধান ভিরাকোচার হাতে বন্দি হয়েছেন, তবুও তাঁদের সম্পর্ক খুবই মধুর আছে। গতকাল রাত্রে প্রধান ভিরাকোচা তাঁর সঙ্গে আহার করেছেন, খোশগল্প করেছেন এবং তাঁকে আশ্বাস দিয়েছেন, কারাগারে যাতে তাঁর কোনোরকম অসুবিধে না হয় তা তিনি দেখবেন। এমনকী তাঁর ইচ্ছেমতো তাঁকে খাবারদাবার দেওয়া হবে। পছন্দমতো পোশাক-পরিচ্ছদ দেওয়া হবে। চাইকী ইচ্ছে করলে তাঁর কয়েদখানায় শ্রেষ্ঠ সুন্দরীদের নাচও তিনি দেখতে পারেন। সুতরাং বন্ধুগণ, প্রধান ভিরাকোচা ফ্রানসিসকো পিজারোর এই আদেশ আপনারা সকলেই মেনে চলবেন এই আশা রাখেন তিনি। আর এও শুনে রাখুন, আপনাদের যার কাছে যত সোনা-রুপো আছে, সেসব যদি আপনারা প্রধান ভিরাকোচার কাছে স্বেচ্ছায় জমা দেন, তবে ভিরাকোচা আপনাদের সমস্তরকম সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করে দেবেন। আপনাদের কোনোই কষ্ট অথবা অভাব থাকবে না। এমনকী থাকবে না গৃহযুদ্ধের ভয়ও। আপনারা নির্ভয়ে থাকতে পারবেন এই টাহুয়ানটিনস্যুতে সকলে একসঙ্গে। সুতরাং কেউ নিজের কাছে একরতিও সোনা রাখতে পারবেন না।‌

তার বলা শেষ হলে আবার সেই বাজনাটা শব্দ করে বেজে উঠল। ঘোড়া ছুটল, ভিরাকোচারা সামনের ওই পর্বতের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল। অদৃশ্য হয়ে গেল তাদের সঙ্গী এদেশের সেই মানুষটিও! বলে রাখি, আমি পরে শুনেছি ওই বাজনাটার নাম বিউগল। অবশ্য সেটা আমাদের কোয়েচুয়া ভাষা নয়, অন্য এক বিদেশি শব্দ। সেইসঙ্গে এও জেনেছি, এই যে দাড়িওলা ফর্সা মানুষ, যাদের আমরা মনে করছি দেবতা ভিরাকোচা, তারা দেবতাও নয় ভিরাকোচাও নয়। তারা কি তবে...

ঠিক এই সময়েই গৃহকর্তাটি ঘরে ঢুকল। তার মুখখানা দেখে তাকে যেন কেমন লাগল আমার। মুখে হাসি নেই। কী ভাবছে মানুষটা?

আমরা তিন জনেই তার মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলুম। এতক্ষণ যে মানুষটাকে মনে হচ্ছিল ভিরাকোচার নামে মহাখুশি, এখন সেই মানুষটাকে দেখে মনে হচ্ছে নিষ্প্রাণ। ঘরের মধ্যে এখন আমরা ক-জনই নির্বাক। ঠিক এই মুহূর্তে কথা বলার মতো আমাদের মনের অবস্থা কারও নয়। কেননা, আতাহুয়ালপা বন্দি হয়েছে বটে কিন্তু পরাজিত হয়নি। সেই-ই এখন সম্রাট। বন্দিশালায় বসে বসে রাজ্যশাসন করবে সে-ই। রাজ্যের ভালোমন্দ দেখার ভার তারই হাতে। এখবর শুনলে আমরা খুশি হই কেমন করে!

ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আমার সৈনিক বন্ধুটিই প্রথম কথা বলে উঠল। হঠাৎ সে লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, ‌অমন ভেঙে বসে পড়লেন কেন মশাই?‌

সে উত্তর দিলে, ‌খবরটা কি চাঙ্গা হয়ে দাঁড়াবার মতো কিছু?‌

সৈনিক বলল, ‌নিশ্চয়ই না। খবরে আমাদের আনন্দিত হওয়ার মতোও কিছু নেই। কিন্তু তাই বলে আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকলেও তো চলবে না। আমাদের লক্ষ্য হবে সম্রাট হুয়াসকারকে যেমন করেই হোক সিংহাসনে বসানো। এখানে বসে আমাদের সেই কাজটিই করতে হবে।‌

—‌আরে মশাই, আপনি তো দেখি অসম্ভব এক স্বপ্ন দেখছেন,‌ লোকটি বলল, ‌এটা হল কাজামারকা। আর হুয়াসকার আছেন কুজকোর বন্দিশালায়। এখানে বসে বসে তাঁকে আপনি সিংহাসনে বসাবার কথা ভাবছেন কেমন করে?‌

আমার বন্ধু সৈনিক বলল, টাহুয়ানটিনস্যুর অধিকাংশ মানুষ যদি চান, তবে তাঁকে আটকাবে কে! এখন আমাদের কাজ হবে অধিকাংশ মানুষকে সম্রাট হুয়াসকারের দিকে নিয়ে আসা।‌

এই ফাঁকে আচমকা আমার মিত্র-সেনাটি একটা মোক্ষম প্রশ্ন করে বসল। ‌—আচ্ছা, এই অজানা মানুষেরা কি সত্যিই ভিরাকোচা?‌

মিত্র-সেনার প্রশ্ন শুনে আমরা সবাই কেমন যেন একটু হকচকিয়ে গেলুম। নড়েচড়ে বসলুম সবাই। আমার তো উত্তর দেওয়ার মতো কিছুই ছিল না। উত্তর দিল না আমার বন্ধু সৈনিকটিও। তার ঠোঁটে একফালি হাসি ফুটে উঠল তাচ্ছিল্যের। কিন্তু উত্তর দিল সেই লোকটিই, ‌—দেখুন মশাই, আমরা দেবতা ভিরাকোচাকে কেউই দেখিনি। তবে এইটুকু বলতে পারি তিনি সত্যিই দেবতা ছিলেন। তিনি একা এসেছিলেন, একাই চলে গেছেন। তাঁর যা ছিল তিনি সব আমাদের জন্যই রেখে গেছেন। কিন্তু দেখুন এই দাড়িওয়ালা মানুষগুলোকে। যারা দেবতা হবে, তাদের চোখ-মুখগুলো লোভে অমন দপদপ করবে কেন বলতে পারেন? দেশের অনাচারই যদি রুখতে চায় তবে তারা অসহায় মানুষকে মারবে কেন?‌

মিত্র-সেনাটি বলল, ‌অসহায় মানুষকে মারছে, আবার সোনা দাও, সোনা দাও বলে কড়কাচ্ছে।‌

—‌আচ্ছা, সত্যি সোনা চাইছে কেন বলুন তো?‌ লোকটি খুবই অবাক হয়েছে মনে হয় সোনার কথা শুনে।

আমারও কেমন যেন অবাক লাগল। সত্যিই তো সোনা চাইছে কেন? দেবতা ভিরাকোচা তো আমাদের কাছে কোনোদিন সোনার জন্য অমন হাঁক পেড়ে ভয় দেখাননি। এরা যদি সেই ভিরাকোচাই হবে, তবে এরা সোনা চায় কেন? এরা কি সোনা খায়? না কি সোনা দিয়ে অন্য কিছু করে? সত্যি বলতে কী, আমাদের দেশে অঢেল সোনা-রুপো ছিল ঠিকই, কিন্তু সোনা-রুপো যে এমন অমূল্য ধন সেটা আমাদের আদপেই জানা ছিল না। সোনা-রুপো দিয়ে আমরা কত কী গড়েছি, কত গয়নাগাটি, কত দেবতার মূর্তি। খেলনা-বাসনকোশন-মন্দিরের চূড়া-পূজার বেদি-সিংহাসন-সম্রাটের ডুলি-পোশাক-আশাক এমনই সব আরও কত। কিন্তু কোনোদিনই সোনা দিয়ে আমরা কোনো কিছু বিকিকিনি করার কথা ভাবিনি। এ ছিল আমাদের শৌখিন সম্পদ। আর মৃত্যুর পরেও আমাদের এই সম্পদ থাকত আমাদেরই ‌মমি‌-র পাশে। তাতে কারও হাত দেওয়ার জো ছিল না। একথা তো তোমাদের আগেই বলেছি। এ ছিল আমাদের রীতি। তোমাদের এ রীতির কথা শুনতে যতই অদ্ভুত লাগুক এই ছিল সত্যি।

এবার আমার বন্ধু সৈনিকটি কথা বলল। সে বলল, ‌দেখুন এসব কথা নিয়ে আমাদের এখন মাথা খারাপ করলে চলবে না। এখন আমাদের মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবতে হবে কেমন করে আতাহুয়ালপার হাত থেকে আমাদের টাহুয়ানটিনস্যু রক্ষা পায়। এখন আমাদের কাজ হবে সেই উপায় খুঁজে বের করা।‌

‌আর সেইসঙ্গে আমাদের এটাও জানতে হবে, এই অচেনা মানুষগুলো সত্যিকারের ভিরাকোচা না, অন্য কেউ।‌ আমার বন্ধু সৈনিকটির কথার ওপর বলল আমার সেই মিত্র-সেনাটি।

‌ঠিক, ঠিক।‌ একইসঙ্গে সেই লোকটি আর আমার বন্ধু সৈনিকটি তাকে সমর্থন করল।

কিন্তু আমার মতে, দুটো কাজই যে খুব সহজ তা মোটেই নয়। তবে দুটো কাজই খুব জরুরি। আর এই জরুরি কাজ দুটো করতে গেলে এক-আধদিনের কম্ম নয়, সময় চাই। তার ওপর এই কাজ করতে ঠিক যতদিন সময় লাগবে ঠিক ততদিন এই লোকটির ঘরে থাকা উচিত কি না সেটাও ভাবা দরকার। সুতরাং এইসব সাত-সতেরো ভেবে আমায় কথা বলতে হল। বললুম, দ্যাখো এই জরুরি কাজ দুটো করতে গেলে আমাদের হাতে কিছু সময় দরকার, আর তা করতে হবে আমাদের এই কাজামারকাতে বসেই। কাজেই এই ভদ্রলোকের ঘরটি ততদিন আটকে রাখা কি উচিত হবে?‌

লোকটি আর একটু হলেই গলা ফাটাত। রক্ষে এই, আমি রাজপুত্র। তাই ঝলসে উঠেও লোকটি মিইয়ে গেল। ভারি নরম গলায় আমায় বলল, ‌রাজপুত্র, এ আপনি কী বলছেন? টাহুয়ানটিনস্যুর প্রতিটি ধূলিকণা ইনকা দেবতার অধিকারে। সুতরাং এঘর আমার এ আমি কেমন করে মনে করতে পারি! এসবই তো আপনাদের ইনটিপুত্র! এখান থেকে আপনার আর কোথাও যাওয়া চলবে না। যা কিছু করতে চান এখান থেকেই করতে হবে, এই আমার অনুরোধ। কেউ কিছু না করুক আমি অন্তত এইটুকু ভাবতে পারব, টাহুয়ানটিনস্যুর জন্য আমিও কিছু করতে পেরেছি।‌‌

সুতরাং তার অনুরোধ আর ফেলা গেল না, আমরা সেইখানেই থেকে গেলুম। পরের দিন থেকেই সুযোগ খুঁজতে লাগলুম, আর কোনো একটা জুতসই বুদ্ধির জন্য আমরা চার জনেই মতলব ফাঁদতে বসলুম। অবশ্যই গোপনে, কেননা জানাজানি হয়ে যাওয়াটা এখনই ঠিক উচিত কাজ বলে মনে হল না আমাদের। কাজেই অনেকটা তস্করের মতো লুকিয়ে-ছাপিয়ে আমাদের বেশ ক-টা দিন কেটে গেল। এই বেশ ক-টা দিনের মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই আমরা ঘোড়ায়-চড়া সেই অজানা মানুষগুলোকে ঘুরতে-ফিরতে দেখলুম। দেখলুম কখনো তারা হম্বিতম্বি করে হাঁক পাড়ছে, আবার কখনো হাসছে। বাঁকা চোখে এদিক-ওদিক দেখছে। আরও আশ্চর্য এই, দেখছি প্রতিদিনই সেই মানুষগুলোর নতুন নতুন মুখ। দেখছি নতুন নতুন ঘোড়া। কালো-সাদা-বেগনি-বাদামি নানান রং। আর মনে মনে ভাবছি, তবে কি এরা দলে অনেক জন?

এরা দলে অনেক জনই ছিল, কিন্তু কতজন, এখনই তা ঠিক ঠিক বলা যাচ্ছে না। তার ওপর এও শোনা যাচ্ছে, আতাহুয়ালপার অনেক সৈনিক তাদেরই আদেশ তামিল করছে। বলা যায় এই ভিনদেশি মানুষগুলোরই দলে তারা ভিড়ে গেছে। আর আমাদের এই ধারণাটা সত্যি হল, যেদিন আমরা দেখলুম অগুনতি সেনা মাত্র সাত-আট জন ভিনদেশি মানুষের সঙ্গে কাজামারকার মন্দিরগুলো ভেঙে চুরমার করে সোনা লুঠ করছে। কেউ বাধা দেওয়ার নেই। কেউ একটি কথা বললে, বুঝি-বা ঘোড়া ছুটিয়ে কিংবা তরোয়াল চালিয়ে তাকে খতম করে ফেলবে। সেদিন যে আমার কী অসহ্য লেগেছিল এই অত্যাচার, আমি তোমাদের বোঝাতে পারব না। মনে হয়েছিল তখনই ছুটে যাই, আমার এই গুলতি দিয়ে ওদের বুকের পাঁজরগুলো ফুটো করে দিই। কেননা আর আমার কোনোই সন্দেহ নেই, আমরা মিথ্যেই ভেবেছি এরা ভিরাকোচা। এরা কখনোই ভিরাকোচা হতে পারে না। এদের বলতে পারি একদল নৃশংস লুঠেরা। এরা শুধু আমাদের সোনা লুঠ করতে আসেনি, বুঝি-বা এসেছে আমাদের এই সোনার সাম্রাজ্যটাকেই ছারখার করে দিতে। এমনই সময় বজ্রাঘাতের মতো একটা সাংঘাতিক দুঃসংবাদ পৌঁছে গেল আমাদের কাছে। খবর এসেছে, আতাহুয়ালপার হুকুমে আমার দাদা হুয়াসকারকে বধ করা হয়েছে। আমি আর থাকতে পারলুম না। এই দুঃসংবাদ আমার মনটাকে ভেঙে দুমড়ে টুকরো টুকরো করে দিল। আমি কেমন যেন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলুম না। আমার শরীর ইনকা-রক্তের প্রবল তেজে কেঁপে উঠল। আমি ঠিক করে ফেললুম, যেমন করে হোক এর প্রতিশোধ নিতে হবে। তাই আমি আমার তিন বন্ধুকে গর্জে উঠে বললুম, ‌শোনো তোমরা, আর আমাদের অপেক্ষা করার সময় নেই। এই অত্যাচার আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এখনই আমাদের একটা কিছু করতে হবে। যেমন করে হোক আতাহুয়ালপার মাথাটা কেটে আমার সামনে নিয়ে এসো তোমরা। এর বেশি এখন আর কিছু চাই না আমি।‌

সত্যি, কী অসম্ভব বুদ্ধি আর ধৈর্য ছিল আমার এই বন্ধু সৈনিকটির। আমার এই উত্তেজনা দেখে সে এতটুকুও অস্থির হল না। ভারি শান্তস্বরে সে আমাকে বলল, ‌রাজপুত্র, এই দুঃসংবাদ শুধু আপনাকেই নয়, আমাদেরও কী কম দুঃখ দিচ্ছে? সম্রাট হুয়াসকার ছিলেন আমাদের সকলেরই এক প্রিয় নেতা। সুতরাং তাঁকে হত্যা করা মানে আমাদের সকলকেই আঘাত করা। কিন্তু তবু এখনই সকলে মিলে আমরা যদি এই আঘাতের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উত্তেজিত হয়ে বুদ্ধি হারিয়ে ফেলি, তবে আমাদের ঠকতে হবে। শুনুন রাজপুত্র, এখন আমাদের খুবই ধীরস্থিরভাবে কয়েকটি কাজের কথা চিন্তা করতে হবে। এখন আমাদের নিশ্চয়ই কোনো সন্দেহ নেই, এই যে ভিনদেশি মানুষগুলোকে দেখছি, এরা কেউই ভিরাকোচা নয়। বুঝতে পারছি এরা আমাদের সাম্রাজ্যটাকে লুঠ করতে এসেছে। এদের সঙ্গে এমন অস্ত্র আছে, যার সামনে দাঁড়াবার সাহস নেই আমাদের কারোরই। জেনে রাখুন, আতাহুয়ালপাকে এরা বন্দি করেও হত্যা করেনি শুধু একটাই কারণে। আতাহুয়ালপার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে তারা সোনার খোঁজ নিতে চায়। কাজ শেষ হলেই এই দুর্বৃত্তেরা তাকেও রেহাই দেবে না। সুতরাং আমাদের এই অবস্থায় একদম উতলা হলে চলবে না। ধীরে ধীরে পা ফেলতে হবে। যাতে সাপও মরে, লাঠিও না ভাঙে।‌

তার কথা শুনে অবাক হয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলুম। আমার রাগটাকে অন্তত তখনকার মতো আমি সামলালেও, আমি আমার শোকটাকে কিছুতেই আটকে রাখতে পারছিলুম না। যতই হোক, হুয়াসকারদাদার সঙ্গে আমার যে প্রাণের টান সেটা আমি কেমন করে ভুলে যাই! সেই টানটাই আমাকে বারে বারে রাগের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। আর ঠিক এই সময়েই আমার সেই মিত্র-সেনাটি আমার বন্ধু সৈনিককে জিজ্ঞেস করল, ‌তা হলে আপনার মতে এখন আমাদের কী করা উচিত?‌

তখন আমার সৈনিক বন্ধুটি উত্তর দিল, ‌সম্রাট হুয়াসকারকে যখনই হত্যা করা হয়েছে, তখনই আমাদের মনে করতে হবে, আমাদের কাজের ছকটাও পালটাবার সময় হয়েছে। এখন আমাদের পরিচয় গোপন রেখে যোগাযোগ করতে হবে আতাহুয়ালপার সঙ্গে তার বন্দিশালায়। আর যোগাযোগ করতে হবে এই ভিনদেশি মানুষের নেতার সঙ্গে তার শিবিরে। এই কাজটার ভার নেব আমি। সেইসঙ্গে রাজপুত্রকে করতে হবে আর একটি খুবই দরকারি কাজ। টাহুয়ানটিনস্যুর প্রতিটি অঞ্চলে তাঁকে যেতে হবে। সেই সেই অঞ্চলে রাজপুত্র নিজের পরিচয় দেবেন নির্ভয়ে। পরিচয় দিয়ে প্রতিটি মানুষের কাছে এই ভিনদেশি মানুষের মুখোশটা খুলে দেবেন তিনি। এই মানুষগুলো যে ভিরাকোচা নয়, এরা যে লুঠেরা, সেই কথাটাও ফাঁস করে দিতে হবে তাঁকেই। আর সেইসঙ্গে সম্রাট হুয়াসকার বধ হয়েছেন যার হুকুমে, সেই আতাহুয়ালপার বিরুদ্ধেও মানুষকে তাতিয়ে দিতে হবে। এখন এই হবে আমাদের কাজের পরিকল্পনা।‌

আমি হতবাক হয়ে শুনলুম তার কথা, তেমনই শুনল এই ঘরের মালিকটিও। কিন্তু কথা বলল আমার মিত্র-সেনাটি। সে সৈনিক বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করল, ‌তাহলে আমাদের দু-জনের কী কাজ?‌ জিজ্ঞেস করে সে দু-জন বলতে তার সঙ্গে যে এই গৃহকর্তাকেও বোঝাতে চাইছে সেটা আমরা বুঝতে পারলুম।

আমার সৈনিক বন্ধুটি সঙ্গেসঙ্গে উত্তর দিল, ‌সেকথাও আমি ভেবে রেখেছি। আমার কাজে সাহায্য করার জন্য আমার সঙ্গে থাকবেন এই গৃহকর্তাটি। আর রাজপুত্রের সঙ্গে থাকবে মিত্র-সেনা।‌

আমি দেখতে পেলুম বন্ধু সৈনিকের এই প্রস্তাবে দু-জনেরই সায় আছে। কেননা, তাদের মুখে খুশির ঝলক দেখতে আমি ভুল করিনি।

তারপরেই বন্ধু সৈনিকটি আবার বলল, ‌মনে রাখবেন আপনারা, আমাদের এই কাজ করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। কেননা আমাদের চারদিকেই আছে শত্রু। তারা সুযোগ পেলেই আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। তখন আর আমাদের কিছুই করার থাকবে না। সুতরাং সাবধান।‌

পরের দিন থেকেই পরিকল্পনামতো আমাদের কাজ শুরু হয়ে গেল। আমি মিত্র-সেনাটিকে নিয়ে কাজামারকা ছেড়ে উত্তর দিকে অন্য একটি অঞ্চলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলুম। আমার হয়ে আমার মিত্র-সেনাটিই প্রথমে কাজ শুরু করে দিল। আমার দাদা হুয়াসকারের প্রতি যে মানুষের এত ভালোবাসা জমা হয়েছিল, এ আমার ধারণাই ছিল না। এক-এক অঞ্চলে যাই, আমার পরিচয় দিই, আর সেই অঞ্চলের মানুষ আমাকে দেখার জন্য দলে দলে ছুটে আসে। তারা যখনই শোনে আতাহুয়ালপার হুকুমে আমার দাদাকে হত্যা করা হয়েছে, তারা ক্ষিপ্তস্বরে চিৎকার করে ওঠে, ‌আতাহুয়ালপার মুণ্ডু চাই, রক্ত চাই! ইনকার সিংহাসনে রাজপুত্রকে দেখতে চাই, দেখতে চাই!‌

আমার গায়ে কাঁটা দিল। আমার দেশের মানুষ যে আমাকেই সিংহাসনে বসাতে চায়! তারা যে আমার নামেই জয়ধ্বনি দিচ্ছে, এ যেন বিশ্বাস করতে পারি না। তারা দলে দলে আমার সঙ্গ নেয়। আমি যেখানে যাই সেখানেই তারা আমার সঙ্গে দল বাঁধে। আমারও উৎসাহ বেড়ে যায়। আমি বুঝতে পারি এবার বোধ হয় তাহলে আতাহুয়ালপার দিন ফুরিয়ে এল। প্রতিশোধ নেওয়ার দিন এগিয়ে আসছে।

তোমাদের খুলে না বললেও তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, এখন টাহুয়ানটিনস্যুর প্রায় অধিকাংশ মানুষ হুয়াসকারকে হত্যা করার জন্য আতাহুয়ালপার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করে দিয়েছে। আমি যে আতাহুয়ালপার বিরুদ্ধে মানুষকে খেপিয়ে তুলতে পেরেছি, এর জন্য মনে মনে আমি ভীষণ খুশি। অন্তত এই ব্যাপারে আমি আমার বন্ধু সৈনিকটির কথামতো কাজ করতে পেরেছি। আমি সবাইকে বোঝাতে পেরেছি, আমার পেছনে আছে সারাদেশের মানুষ। আমিই তাদের ভবিষ্যৎ সম্রাট। আর মনে হয় এই কথাটা ওই যে ভিনদেশি লুঠেরা ওরাও জানতে পেরেছে। সুতরাং শুনছি, সেই ভিনদেশিরাও আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমাকে খুঁজে পেলে তারা যে কী করবে সে আমার জানা নেই। তবে আমায় যে পুজো করবে না সে আমি হলপ করে বলতে পারি। কেননা, আমি আমার দেশের মানুষকে এটাও বোঝাতে পেরেছি—এই যে ভিনদেশি মানুষ, যাদের আমরা ভাবছি ভিরাকোচা, তারা কখনোই ভিরাকোচা নয়। এরা লুঠ করতে এসেছে আমাদের দেশটাকে। হয়তো-বা দখল করতে এসেছে আমাদের সিংহাসন।

আমার এই পর্বতের দেশের মানুষের কাছে আমি দিনের পর দিন এইসব প্রচার করে বেড়িয়েছি আর তাদেরই আশ্রয়ে থেকেছি। তারাই আমাকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছে। দিয়েছে মুঠো মুঠো সোনা-রুপো, আরও কত অলংকার। ইনকা-রাজপুরুষদের এইসব উপহার দিয়ে সম্মান দেখানো ছিল আমাদের রীতি। ওই আতাহুয়ালপা আর ভিনদেশি অচেনা মানুষগুলো এখন তাদের চোখে শত্রু। এখনই যদি আমি আমার দেশের মানুষদের ওই শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে বলি, তবে যে তাদের এক জনও পিছপা হবে না এ আমি ভালো করেই জানি। কিন্তু আমি তা করলুম না। কেননা, আমায় অপেক্ষা করতে হবে আমার বন্ধু সৈনিকটির জন্য। সে কতদূর এগোল সেইটাই তো এখন আমায় জানতে হবে। সে কি পেরেছে আতাহুয়ালপার সঙ্গে যোগাযোগ করতে?

হ্যাঁ, এখন সেই রোমহর্ষক কাহিনিটাই তোমাদের শোনাব আমি।

তোমাদের তো আগেই বলেছি, ভিনদেশি সেই মানুষেরা আতাহুয়ালপাকে বন্দি করলেও তারই ওপর দিয়েছিল দেশের শাসনভার। আতাহুয়ালপা কারাগারে বসে বসেই দেশ শাসন করছিল, নানা হুকুম জারি করছিল। এর-ওর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করছিল। তবে সবই কিন্তু ওই ভিনদেশি মানুষের নেতার হুকুমে। মানে আতাহুয়ালপার নিজের কিছু করার কোনো ক্ষমতাই ছিল না। সে যেন তাদের হাতের পুতুল। সুতরাং আমার বন্ধু সৈনিকটি ঠিক করল, ওই ভিনদেশি মানুষের সঙ্গেই সে প্রথম যোগাযোগ করবে। কিন্তু সে-কাজটা যে খুব সহজ, তা যেন কেউ মনে কোরো না। এই ভিনদেশি মানুষের দুর্বলতা যে কোথায়, সে তো আর অজানা ছিল না আমার বন্ধু সৈনিকটির। তাদের হাতে তুলে দাও একমুঠো সোনা, অমনই তারা তোমায় মাথায় তুলে নাচানাচি শুরু করবে। কিন্তু সেই সোনা তো আর আমার বন্ধু সৈনিকের কাছে ছিল না। আমি অবশ্য এখন অনেক সোনা সংগ্রহ করেছি। কিন্তু আমি আছি অনেক দূরে। টুমবেশ বলে একটা জায়গায় আমার প্রচার অভিযান চালাচ্ছি। আর তোমরা তো জানই, আমার বন্ধুটি এখন পরিকল্পনামতো কাজামারকায়। কাজেই তার যে এখন সোনার দরকার, এটাও যেমন আমি জানি না, তেমনই জানি না তার কাজই-বা কতটা এগিয়েছে। তোমরা হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারো, ‌সে যখন তুমি জান না তখন এত কথা বলছ কেমন করে?‌ ঠিকই বলেছ, এই প্রশ্ন তোমাদের মনে আসতেই পারে। তবে শুনে রাখো, এখন আমি তোমাদের যা বলছি, সবই আমার সেই বন্ধু সৈনিকটির কাছেই শোনা। এসব কথা তার মুখে আমি পরে শুনেছি। ঠিক যেমন যেমন শুনেছি তেমন করেই তোমাদের শোনাচ্ছি:

সে যখন সোনা জোগাড় করতে পারল না, তখন ঠিক করল একদিন একাই ভিনদেশির শিবিরে যাবে। তাদের নেতার সঙ্গে দেখা করবে। কিন্তু দেখা করব বললেই তো আর নেতার দেখা পাওয়া যায় না। তার ওপর নেতা এখন আহত। আতাহুয়ালপাকে বন্দি করতে গিয়ে নেতার একটি হাত জখম হয়েছে। কাজেই আমার বন্ধু সৈনিকটি যখন তার শিবিরের দিকে এগোচ্ছিল, তখন নেতার দেহরক্ষীরা বাধা দিল তাকে। বলে রাখি, এই দেহরক্ষীরা প্রায় সবাই আমাদের দেশেরই মানুষ। এখন তারা এই ভিনদেশিদেরই দলের হয়ে কাজ করছে।

আমার বন্ধু সৈনিকটি ভয় পেল না। রক্ষীদের বলল, ‌তোমরা মিথ্যে আমায় বাধা দিচ্ছ। তোমাদের মতো আমিও এই ভিনদেশিদের বন্ধু।‌

রক্ষীদের একজন জিজ্ঞেস করল, ‌তুমি যে বন্ধু তার প্রমাণ কী আছে?‌

‌তোমরা আমার শরীর পরীক্ষা করে দেখতে পারো, কোনো অস্ত্র আমার কাছে নেই।‌ উত্তর দিল আমার বন্ধু সৈনিকটি।

‌অস্ত্র না-থাকলেই কি তোমাকে বন্ধু বলা যায়?‌ একজন তীক্ষ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল।

আর একজন রক্ষী বলল, ‌তুমি যে গুপ্তচর নও তারই-বা প্রমাণ কী?‌

বন্ধু সৈনিকটি উত্তর দিল, ‌হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ তোমরা, আমি গুপ্তচর।

তবে আমি শত্রুপক্ষের গুপ্তচর নই। গুপ্তচর তোমাদের।‌

‌কীরকম?‌ তারা যেন একটু থতোমতো খেয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‌আমি সোনার গুপ্ত খবর দেওয়ার জন্য ভিনদেশি নেতার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।‌ জবাব দিল বন্ধুসৈনিকটি।

নিমেষের মধ্যে রক্ষীদের আস্ফালন ঝিম মেরে গেল। সঙ্গেসঙ্গে তাদের মধ্যে একজন ছুটল ভিনদেশি নেতার কাছে। একজন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল আমার সৈনিক বন্ধুটির মুখের দিকে। একজন হাত কচলাতে কচলাতে কাকুতিমিনতি করে বলল, ‌তুমি কিছু মনে কোরো না ভাই, বুঝতেই তো পারছ, আমাদের যেমন হুকুম আমরা তেমনই করতে বাধ্য।‌

আমার বন্ধুসৈনিকটি তাদের কথার উত্তর দেওয়ার সুযোগ পায়নি, কেননা ততক্ষণে তার ডাক পড়েছে নেতার সঙ্গে দেখা করার। সে ছুটল নেতার ঘরে। ঘরে ঢুকেই সে দেখল নেতা একটি ছোট্ট আরামকেদারায় গা এলিয়ে বসে আছে। এরকম কেদারা এদেশে কেউ দেখেনি কোনোদিন। খুবসম্ভব এটি তারা সঙ্গে করে এনেছে। সুতরাং আমার সৈনিক বন্ধুটি যতটা অবাক হয়ে সেই আরামকেদারাটি দেখছিল, ঠিক ততটা সন্দেহের চোখে ভিনদেশি নেতাটিও তাকে লক্ষ করছিল। দেখতে দেখতে নেতাটি ভাঙা ভাঙা কোয়েচুয়া ভাষায় হঠাৎ কথা বলে উঠল, —‌কী খবর?‌

আমার সৈনিক বন্ধুটি তার মুখে কোয়েচুয়া ভাষা শুনে হকচকিয়ে গেছিল প্রথমটা। পরক্ষণেই সে বুঝতে পারল ভিনদেশি নেতাটি এদেশি ভাষা রপ্ত করার চেষ্টা করছে। সুতরাং আর হতভম্ভের মতো দাঁড়িয়ে না থেকে সে ঝটপট বিদেশি কায়দায় একটা সেলাম ঠুকে দিল। ভিনদেশি নেতাটি তার তারিফ করে হো-হো করে হেসে উঠল। তারপর তাকে বসতে বলল।

আমার বন্ধু সৈনিকটি নেতার সামনে রাখা একটা নীচু ছোট্ট চৌকির ওপর বসতেই ভিনদেশিটি জিজ্ঞেস করল, ‌সোনার খবর তুমি জান?‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি তো ঘাবড়াবার লোক নয়। সে কী বলবে না বলবে তার ছক ঠিক করেই রেখেছে। তাই সে বলল, ‌জানি বলেই তো আপনার কাছে এসেছি হুজুর!‌

নেতাটি এতক্ষণ গা এলিয়ে বসেছিল। এবার নড়েচড়ে উঠে বসল। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌কোথায় আছে সোনা?‌

আমার বন্ধুটি বলল, ‌আছে তো হুজুর অনেক জায়গায়। কিন্তু সবই আছে লুকোনো। আর সেইসব সোনা কে-কে লুকিয়ে রেখেছে হুজুর আমি তাও জানি। এখন আমি যদি তাদের নাম বলে দিই আপনার কাছে, আপনি নিশ্চয়ই তাদের ভয় দেখিয়ে সোনা কেড়ে নিতে চাইবেন। কিন্তু তখনই হবে মুশকিল। তারা সোনা তো দেবেই না, উলটে সব গোলমাল হয়ে যাবে। আজ্ঞে হুজুর, ভয়ডর না দেখিয়ে বা মারধর না করে আমরা যদি অন্য উপায়ে সোনা আদায় করতে পারি সেইটাই কি ঠিক কাজ হবে না?‌

আমার বন্ধুর কথা শুনে ভিনদেশি নেতাটি ঝটপট পলক ফেলে তার দিকে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‌অন্য উপায় বলতে তুমি কী বলতে চাইছ?‌

‌অন্য উপায় বলতে আমি বোঝাতে চাইছি হুজুর, তাদের লোভ দেখাতে হবে।‌ বলল আমার বন্ধুসৈনিকটি।

‌কীসের লোভ?‌ জিজ্ঞেস করল নেতাটি।

‌আজ্ঞে, যেমন যেমন লোক, লোভটাও হবে তেমন-তেমন।‌ উত্তর দিল আমার সৈনিক বন্ধু।

‌সে-লোক কারা?‌ আবার জিজ্ঞেস করল ভিনদেশি নেতা।

‌আপনি যদি আমায় সাহস দেন আমি বলতে পারি।‌ জবাব দিল বন্ধুটি।

—‌তোমার কোনো ভয় নেই, তুমি বলতে পারো।‌

‌—কিন্তু আমার কথা আপনি ছাড়া আর কেউ জানবে না। কাউকে আপনি বলতে পারবেন না।‌

—‌সে ঠিক আছে।‌

‌—আর হুজুর, আমি যা বলব সেইমতো আমাকে কাজ করতে দিতে হবে। আমি যদি আপনার সোনা এনে দিতে না পারি, তখন আপনি আমাকে যা খুশি করতে পারেন। এমনকী আমাকে...‌

‌ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি কী করতে চাও তাই বলো-না!‌ আমার সৈনিকের কথা শেষ করতে না দিয়ে নেতাটি বলে উঠল।

ভিনদেশি নেতার আশ্বাস পেয়ে আমার বন্ধু সৈনিকটি বলেছিল, ‌হুজুর যারযার কাছে সোনা আছে, তাদের সবার গায়ে একসঙ্গে হাত দিলে চলবে না। এক-এক জনকে আমাদের ধরতে হবে। একজনের কাছে সোনা আদায় করার পর অন্যজনের পালা। আর এ কাজটাও আমাদের করতে হবে খুব কৌশলে, কেননা জানাজানি হয়ে গেলে অন্যজন সাবধান হয়ে সোনা লুকিয়ে ফেলতে পারে। আমাদের এই পর্বত-রাজ্যে এমন এমন জায়গা আছে, যেখানে কিছু লুকিয়ে ফেললে শত চেষ্টা করলেও তা আর বের করা যাবে না।‌

আমার বন্ধু সৈনিকটির কথা বলার কায়দায় ফাঁদে না পড়ে উপায় ছিল না সেই ভিনদেশি নেতাটির। যেকোনো মানুষের মন জয় করার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। আর তাই সেই ভিনদেশি নেতাটির তার প্রতি সন্দেহটাও দেখতে দেখতে উবে গেল। নেতা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‌তাহলে সোনার জন্য কাকে তুমি প্রথম ধরতে চাও?‌

বন্ধুটি উত্তর দিল, ‌বন্দি আতাহুয়ালপাকে।‌

—নেতা অবাক হল। —‌আতাহুয়ালপা?‌

‌—আজ্ঞে হ্যাঁ, হুজুর।‌

—‌তুমি জান তার কাছে সোনা আছে?‌

—‌না জানলে আপনাকে বলব কেন?‌

‌—তুমি একলা পারবে তার সোনা আদায় করতে?‌

—‌পারব বলেই তো আপনার কাছে আসা। তবে আমার ওপর আপনাকে বিশ্বাস রাখতে হবে।‌

নেতা উত্তর দিল, ‌বেশ, বিশ্বাস আমি তোমাকে করব। আর তুমি যদি সত্যি সত্যি সোনা আদায় করে দিতে পার, তোমাকে অনেক ইনামও দেব।‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি মুচকি হাসল। হেসে সে যে কী বোঝাতে চেয়েছিল, লোভী নেতাটির মাথায় সেই বোঝার বুদ্ধি ছিল না তখন। আমার বন্ধুটি তাই হাসতে হাসতে বলল, ‌হুজুর, ইনামের কথা পরে হবে। আগে আমি আপনার কাজ করে দিই, তারপর তো ইনাম।‌

—‌ঠিক আছে, ঠিক আছে। তো এখন তুমি কী করতে চাও?‌

‌হুজুর, এখন আমাকে যখন-তখন আতাহুয়ালপার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ করে দিতে হবে। আর যেমন যেমন কাজ হবে সেই কাজের খবরটা আপনাকে জানাবার জন্য আমি এলে, আপনার সঙ্গে দেখা করার যেন কোনো বাধা না থাকে আমার।‌ উত্তর দিল আমার সৈনিক বন্ধু।

‌—না না, সে-আদেশ আমি তোমাকে দিচ্ছি। আর যাতে আমার সঙ্গে দেখা করার তোমার কোনো অসুবিধে না হয় সেও আমি দেখছি।‌

ভিনদেশি নেতার আদেশ নিয়ে আমার বন্ধু সৈনিকটি যেদিন প্রথম আতাহুয়ালপার সঙ্গে দেখা করেছিল, সেদিন আমি ছিলুম টুমবেশের আশপাশের একটি মহল্লায়। আতাহুয়ালপার সঙ্গে প্রথম দেখা করেই বন্ধু সৈনিকটি আমার গতিবিধির কথা শুনিয়ে খুঁচিয়ে দেয় তাকে। আমার বন্ধুটি সহজে আতাহুয়ালপারও বন্ধু হয়ে যায়। বন্ধুর মতোই সে আতাহুয়ালপার কান ভাঙায়। বলে, ‌মহানুভব, আপনি শুনলে অবাক হবেন, রাজপুত্র আপনার নামে যা নয় তাই কুৎসা রটিয়ে বেড়াচ্ছে। আপনাকে সে সম্রাট বলে মানেই না। এমনকী দলে দলে মানুষ তার কথায় সায় দিয়ে তাকে মাথায় নিয়ে নাচানাচি করছে। এখন আপনি যদি কিছু না করেন, সিংহাসন আপনার হাতছাড়া হয়ে যাবে।‌

আমার বন্ধুর কথা শুনে আতাহুয়ালপার মেজাজ এমন বিগড়ে গেল যে, আর তাকে ঠাণ্ডা করে কে! সেই বন্দিশালার ভেতরেই চিৎকার করে দাপাদাপি শুরু করে দিল, —‌আমি রাজপুত্রের মাথার ঘিলু খেতে চাই! ধরে নিয়ে এসো তাকে আমার কাছে এক্ষুনি!‌

যতটা রাগ আতাহুয়ালপার, ঠিক ততটাই ঠাণ্ডা মেজাজ আমার সৈনিক বন্ধুটির। সে বলল, ‌মহানুভব, আমি বিশ্বাস করি এ অপমান আপনার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। কিন্তু হে ইনকা, এই অপমানের ভারে আপনি যদি ভেঙে পড়েন তবে ক্ষতি তো আপনারই। আপনাকে এখন শান্ত হয়ে ভাবতে হবে রাজপুত্রকে শায়েস্তা করতে হলে আমাদের কী করা উচিত।‌

আতাহুয়ালপা গর্জে উঠল, ‌—বধ করা ছাড়া তাকে শায়েস্তা করার আর কোনো পথ আমার জানা নেই।‌

বন্ধু সৈনিকটি বলল, ‌আপনি নিজেই এখন ভিনদেশি শত্রুর হাতে বন্দি। এই বন্দি অবস্থায় দেশের মানুষের প্রিয় রাজপুত্রকে আপনি হত্যা করবেন কেমন করে?‌

—‌যেমন করে আমি হুয়াসকারকে হত্যা করেছি।‌

—‌আপনি কি জানেন, ভিনদেশি নেতাকে না জানিয়ে হুয়াসকারকে হত্যার হুকুম দিয়েছিলেন বলে তারা আপনার ওপর ভীষণ খাপ্পা!‌

—‌আমি এখন বুঝতে পেরেছি এই ভিনদেশিরা আমাদের দেশটাকে ছারখার করতে এসেছে। আমি ওদেরও শেষ করে ফেলতে চাই।‌

‌—কিন্তু শেষ করতে চাই বললেই তো আর শেষ করা যায় না। আপনি বন্দিশালায় ওই ভিনদেশিদের হুকুমেই আটকে আছেন। আপনি যতক্ষণ না মুক্তি পাচ্ছেন, ততক্ষণ আপনার কিছু করারও নেই। ওরা যা বলবে সেইমতো আপনাকে চলতে হবে। আপনাকে ভিনদেশিরা কুকুর বেড়ালের মতো অপমান করছে। এ অপমান আপনার যতটা, ঠিক ততটাই আমাদেরও।‌

আমার বন্ধু সৈনিকের কথা শুনে থমকে গেছিল বন্দি আতাহুয়ালপা। মনে মনে কিছু ভেবেছিল সে। তারপর খুব একটা চাপা মারমুখো স্বরে আতাহুয়ালপা বলেছিল, ‌হ্যাঁ, যেমন করে হোক আমাকে মুক্তি পেতে হবে।‌

‌—কিন্তু মহানুভব, আপনার শত্রুরা আপনাকে এমন নজরবন্দি করে রেখেছে, আপনার মুক্তির কোনো রাস্তাই খোলা নেই।‌

আতাহুয়ালপা উত্তর দিল, ‌তাও ঠিক। আমি পালাতে গেলে ওরা আমায় ধরে ফেলবে। তাহলে কী করব?‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি এবার বলল, ‌আপনি যদি আমাকে সাহস দেন, আমি আপনার মুক্তির একটা উপায় বাতলাতে পারি।‌

‌কী সে উপায়?‌ উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল আতাহুয়ালপা।

অন্য আর কেউ যাতে শুনতে না পায় তাই আমার বন্ধু সৈনিকটি আতাহুয়ালপার খুব কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‌আসল কথা কী জানেন, এই ভিনদেশি মানুষরা আমাদের সোনা-রুপো লুঠ করতে এসেছে। আমার বিশ্বাস, আপনি যদি ওদের হাতে কিছু সোনা-রুপো তুলে দেন, তাহলে ওরা নিশ্চয়ই আপনাকে মুক্ত করে দেবে।‌

আমার বন্ধুর প্রস্তাবটা একেবারে সঙ্গেসঙ্গে লুফে নিল আতাহুয়ালপা। খুবই উৎসাহের সঙ্গে সে বলেছিল, ‌তুমি ঠিকই বলেছ। হ্যাঁ সেই ভালো, আমি ওদের আজই ডেকে পাঠাব, আজই একটা হেস্তনেস্ত করে ফেলব আমি। আমাকে মুক্তি পেতেই হবে, নইলে রাজপুত্রকে আমি শিক্ষা দিতে পারব না।‌

তারপর? তার পরের গল্প আরও শিহরন জাগানো। সে-গল্প আরও রোমাঞ্চকর। কল্পনা করো এমন একটা ঘরের, যে-ঘরের লম্বাটা চার জন মানুষ একজনের মাথার ওপর আর একজন পর পর শুলে যতটা লম্বা হয় ততটা। আর চওড়াটা ধরো, ঠিক ওইভাবে তিন জন শুলে যতটা হয়। ঘরের উচ্চতা একজন পুরুষ্টু মানুষের হাত যেখানে পৌঁছোয় সেখান পর্যন্ত। নিজের মুক্তির জন্য এইরকম মস্ত একঘর সোনা দিয়েছিল আতাহুয়ালপা ভিনদেশিদের। আর দিয়েছিল এমনই দুটো ঘর-ভরতি রুপো। সেই ঘর-ভরতি সোনায় ছিল দেবতার মূর্তি-পেয়ালা-বয়ম-টব-ফলক-সম্রাটের চৌদোলা, গলার অলংকার, সোনার দলা, দেবতার সিংহাসন, সোনার ফোয়ারা, ঘর সাজাবার জন্য সোনার তৈরি নানান আসবাব, বড়ো বড়ো সোনার নৌকা। আর তোমরা যারা আমার গল্প পড়ছ, হয়তো তাদেরই কারও মতো অত বড়ো নিরেট সোনার মূর্তি। শুনলে হয়তো মনে কষ্ট হবে, আমাদের শিল্পীদের গড়া এই সোনার কারুকাজ নিজের দেশে নিয়ে যাবে বলে আগুনে গলিয়ে ফেলেছিল ওই ভিনদেশিরা। এই অসংখ্য সোনা আর রুপো গলানো হয়েছিল একনাগাড়ে একমাস ধরে, অনেকগুলো বড়ো বড়ো উনুনে। হয়তো মনে হবে এসব আজব গল্প, কিন্তু আজব নয়, সব সত্যি।

থাক সেকথা, এখন আসল কথায় ফিরে আসি। আসল কথা কী জান? ওই অত সোনা দিয়েও আতাহুয়ালপার বন্দিদশা ঘুচল না। তাকে যে ভিনদেশিরা মুক্তি দেবে না, এ তো আমার বন্ধু সৈনিকটির জানাই ছিল। আর এই সুযোগটাই আমার বন্ধু নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল আতাহুয়ালপাকে যেমন করে হোক সিংহাসন থেকে নামাতে হবে। আর সেই সিংহাসনে বসাতে হবে আমাকে। তাই আবার সে ছুটল আতাহুয়ালপার কাছে। আবার তাকে খেপিয়ে তুলল ভিনদেশিদের বিরুদ্ধে। বলল, ‌হে মহানুভব, ভিনদেশিদের এই বেয়াদপি আপনার আর সহ্য করা উচিত নয়। ভিনদেশিরা আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ওরা সোনা নিয়ে আপনাকে ঠকিয়েছে।‌

আতাহুয়ালপা এবার অগ্নিমূর্তি ধরল। বলল, ‌দেশটা আমার। আমি সূর্যদেবতার সন্তান। আমি ভিনদেশিদের শায়েস্তা না করতে পারলে দেবতা আমাকে ক্ষমা করবেন না।‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি তাকে আরও ক্ষিপ্ত করে তুলল। বলল, ‌আপনি ঠিক বলেছেন মহানুভব, সিংহাসন আপনার। আপনার সেই সিংহাসন আমরা কাউকে দেব না। আমি আপনার সঙ্গে আছি, আপনি হুকুম করুন আমাকে কী করতে হবে।‌

‌—ওদের হত্যা করতে হবে।‌ চিৎকার করে দাপিয়ে উঠল আতাহুয়ালপা। ‌আর সে-কাজটা করতে হবে তোমাকে!‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি উত্তর দিয়েছিল, ‌আমি একা কেমন করে করব হুজুর? আমি তো একজন গরিব ছা-পোষা মানুষ! আমি বরঞ্চ আপনার অনুগত দু-একজন বিশ্বাসী মানুষকে আপনার সামনে হাজির করতে পারি। আপনি বললেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে।‌

‌—ঠিক আছে, তাই নিয়ে এসো।‌ রোখ চেপে গেল আতাহুয়ালপার।

এই কথা শোনার পর আমার সৈনিক বন্ধুটি অন্য কোথাও গেল না। ছুটল ভিনদেশি নেতার শিবিরে। এখন খেপিয়ে তুলতে হবে সেই ভিনদেশি নেতাটিকে, আতাহুয়ালপার বিরুদ্ধে। যেমন করে সে লেলিয়ে দিয়েছে আতাহুয়ালপাকে সেই ভিনদেশিদের বিপক্ষে। তাই বন্ধু সৈনিকটি ভিনদেশি নেতার শিবিরে পৌঁছে নেতার সামনে দাঁড়িয়ে আর অন্য কোনো কথা না বলে প্রথমেই বলল, ‌হুজুর, খবর অত্যন্ত সাংঘাতিক। সম্রাট আতাহুয়ালপা বন্দিশালায় বসে বসে আপনাকে হত্যার চক্রান্ত করছে।‌

এত সোনা যে পাইয়ে দিয়েছে ভিনদেশি নেতাকে, আমার বন্ধু সৈনিকটিকে এখন কি আর অবিশ্বাস করতে পারে সেই নেতা! আমার বন্ধুর কথা শুনে তাই ভিনদেশি নেতাটি চমকে উঠল, ‌—কীরকম?‌

‌সম্রাট লোক খেপাচ্ছে। যাকে পাচ্ছে তাকেই বলছে আপনাকে হত্যা করতে। আমাকেও বলেছে হুজুর।‌ বন্ধু সৈনিকটি উত্তর দিল।

‌—তাই নাকি! তুমি কী বলেছ?‌

‌—আমি বলেছি, আমি গরিব মানুষ। একাজ আমি পারব না। হত্যা করতে পারে এমন দু-একজন বিশ্বাসী মানুষ তার কাছে আমি নিয়ে যেতে পারি।‌

‌তার মানে তুমিও আমার বিরুদ্ধে তাকে উত্তেজিত করছ?‌ বেশ রুষ্ট হয়েই জিজ্ঞেস করল নেতাটি, আর তারপরেই বলল, ‌তুমি যে তার নামে মিথ্যে অভিযোগ করছ না তারই-বা প্রমাণ কী?‌

আমার বন্ধু সৈনিকটি খুব ধীর গলায় উত্তর দিয়েছিল, ‌হুজুর, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি যে মিথ্যে বলছি না তাও আমি প্রমাণ করে দেব। আর এটা প্রমাণ করার জন্য আপনার দু-জন বিশ্বস্ত লোককে আমার সঙ্গে দিন। আমি তাদের সম্রাট আতাহুয়ালপার কাছে তারই বিশ্বাসী মানুষ সাজিয়ে নিয়ে যাব। তারা ফিরে এসে আপনাকে যা বলবে, সেটা আশা করি আপনি মিথ্যে বলে উড়িয়ে দেবেন না।‌

হ্যাঁ, ভিনদেশি নেতার এদেশি দু-জন বিশ্বাসী মানুষকে আমার বন্ধু সৈনিকটি নিয়ে গেছিল আতাহুয়ালপার বন্দিশালায়। ক্ষিপ্ত আতাহুয়ালপা তাদের যা বলেছিল, বিশ্বাসী মানুষ দু-জনের মুখে সেকথা শুনে ভিনদেশি নেতা মিথ্যে বলে উড়িয়ে দিতে পারেনি। পারেনি বলেই ভিনদেশি নেতা আতাহুয়ালপাকে তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করার জন্য আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল। বিচারে আতাহুয়ালপাকে তারা দিয়েছিল মৃত্যুদন্ড। একদিন কাজামারকার বধ্যভূমিতে শূলে চাপানো হল আতাহুয়ালপাকে। দলে দলে লোক দেখতে এসেছিল সেই দৃশ্য। কেউ সেদিন আতাহুয়ালপার জন্য চোখের জল ফেলেনি। কেননা, কিছুদিন আগেই সে যে তাদের প্রিয় সম্রাট হুয়াসকারকে হত্যা করেছে। এ তারা ভুলবে কেমন করে!

আমার বন্ধু সৈনিকের একটি কাজ সফল হয়েছে। এবার আমার পালা। এখন সে আমাকে টাহুয়ানটিনস্যুর সম্রাটরূপে দেখতে চায়। অবশ্য একাজটা করতে তাকে বিশেষ মাথা ঘামাতে হয়নি। এই ভিনদেশিরা তো আর নিরেট বোকা ছিল না। তারা বুঝেছিল, এই পর্বত-রাজ্যের মানুষের মন পেতে হলে সিংহাসনে বসাতে হবে সূর্যদেবতা ইনটির আর এক সন্তানকে। আর সে-সন্তান আমাকে ছাড়া আর অন্য কাউকে ভাবতে পারেনি তারা। তারা বুঝতে পেরেছিল, আমাকে সিংহাসনে বসালে দেশের অধিকাংশ মানুষই খুশি হবে। আমার বন্ধু সৈনিকের কথামতো এতদিন ধরে এই অধিকাংশ মানুষের মন জয় করার জন্য আমি সারা টাহুয়ানটিনস্যু চষে বেড়িয়েছি। সুতরাং দলে দলে মানুষ আমার জয়ধ্বনি দিয়ে কাঁপিয়ে তুলল আন্দিজ পর্বতের চূড়াগুলি। আমি সিংহাসনে বসলুম। আমার অভিষেক হল রাজধানী কুজকোতে।

আমার অভিষেকের দিন রাজধানী কুজকোতে সে কী আনন্দ উৎসবের ধুম। আমার রাজপ্রাসাদটি সাজানো হয়েছে হাজার হাজার রঙিন পালকের মালা দিয়ে। নানা অঞ্চল থেকে এসেছে মেয়েরা। তাদের নাচে-গানে উছলে উঠেছে রাজধানী। রাতের কুজকো ঝলসে উঠেছে জ্বলন্ত মশালের আলোয়। সে-মশাল মানুষের হাতে হাতে। সেদিন কেউ ফিরে যাবে না শুকনো মুখে অথবা খালি হাতে। অঢেল খাবার রান্না হয়েছে তাদের জন্য। অসংখ্য রঙিন পোশাক তুলে দেওয়া হয়েছে তাদের হাতে হাতে। শিশুদের উপহার দেওয়া হল কত খেলনা। তাদের দেখানো হল কত মজাদার খেলা! আমিও থাকতে পারলুম না। আমার একটি খেলা অত্যন্ত ভালো লাগত। খেলাটার নাম আংটা ছোড়াছুড়ি খেলা। মানে একটা লক্ষ্য টিপ করে একটা ধারালো আংটা ছুড়ে সেই লক্ষ্য ভেদ করা। তাদের সেই খেলাটি দেখাবার জন্য আমিও সিংহাসন খেকে নেমে এলুম। আমি যে এখন রাজপুত্র নই, আমি সম্রাট, খেলতে খেলতে আমি সেকথাটা ভুলেই বসলুম। কিন্তু হঠাৎ আমায় দেখে ছোট্ট ছোট্ট শিশুরা যখন হাততালি দিয়ে কলস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, ‌সম্রাট মানকো ইনকা তুমি আমাদের ভালোবাসা নাও। তখন কিছুক্ষণ আমিও খেলতে খেলতে থমকে দাঁড়িয়েপড়েছিলুম। তারপর তাদের সঙ্গে আমিও চিৎকার করে তাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেছিলুম, ‌তোমরা সুখী হও! সুখী হও!‌ তখন তাদের ছোট্ট হাতের তালি দ্বিগুণ জোরে বেজে উঠেছিল, আর তাদের কচিমুখের কলতান আমার কানে গানের সুরের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল।

হ্যাঁ, তোমরা তো এখন জানতেই পারলে আমার নামটা কী! মানকো ইনকা। আর আমাকে যেন রাজপুত্র বলে ডেকো না তোমরা। এখন আমি সম্রাট। সম্রাট টাহুয়ানটিনস্যুর। এখন আমার প্রধানমন্ত্রী আমার সেই সৈনিক বন্ধুটি। আর আমার সেনাধ্যক্ষ আমার সেই মিত্র-সেনাটি। যদিও কাজামারকার সেই গৃহকর্তাটিকে আমি কুজকোতে আমন্ত্রণ করে কুজকোর নগরপাল করতে চেয়েছিলুম, কিন্তু তিনি রাজি হননি। তিনি কাজামারকাতেই থাকতে চেয়েছেন। তাই তিনি এখন কাজামারকার প্রধান। সুখেই আছেন।

কিন্তু সম্রাটের সুখ আমার ভাগ্যে বেশিদিন সইল না। এই ভিনদেশি মানুষগুলো জাঁকিয়ে বসল আমাদের রাজ্যে। এই মানুষগুলো সোনা ছাড়া আর কিছুই জানে না। সোনা পেলেই ঠাণ্ডা, আর না পেলেই কী নৃশংস তারা! কী অত্যাচার! আমাদের সোনা লুঠ করতে করতে এমন তাদের লালসা বেড়ে গেল, শেষে ভাবল আমাদের গোটা দেশটাই বুঝি সোনা দিয়ে তৈরি। তাই বুঝি আমার সিংহাসনটাই এখন তাদের লক্ষ্য। আমি খবর পাচ্ছি, এই ভিনদেশিরা তাদের ওই অস্ত্রের জোরে এবার আমার বিরুদ্ধেও দেশের মানুষকে লেলিয়ে দিচ্ছে। আমি সম্রাট, অথচ আমাকে তাচ্ছিল্য করতে তাদের সাহস হয় কী করে! তারা কী ভেবেছে, আমি তাদের হাতের পুতুল! এ অপমান আর সহ্য হয় না আমার।

এমনই করে অপমানের জ্বালা সইতে সইতে দুটো বসন্তকাল পেরিয়ে গেল। এমনই সময় একদিন ভিনদেশিদের দুই নেতা আমার সঙ্গে দেখা করতে এল।

‌কী চান আপনারা?‌ আমি জিজ্ঞেস করি।

তারা বলে, ‌সম্রাট, দেশের মানুষ আপনার শাসন পছন্দ করছে না।‌

আমি একটুু রোষভরা গলায় বলি, ‌চাইছে না দেশের মানুষ না আপনারা?‌

‌সম্রাট, আপনার দেশের মানুষকে নিয়েই তো দেশ। আমরা তো ভিনদেশি।‌ তারা উত্তর দিল।

আমার ধীরে ধীরে রাগ চড়ছে। আমি বললুম, ‌নিজেরা যখন জানেন আপনারা ভিনদেশি, তখন আমার দেশের মানুষের হয়ে আপনারা কথা বলতে এসেছেন কেন?‌

‌—কথা বলতে এসেছি এই কারণে যে, আমরা আপনাকেই দেশে সম্রাটরূপে দেখতে চাই। আপনি বললেই আমরা আপনার বিরোধীদের এখনই শায়েস্তা করে দিতে পারি। তবে এক শর্তে। আমাদের আরও কিছু সোনা দিতে হবে।‌

আমি উত্তর দিলুম, ‌শুনুন আপনারা, সোনার বদলে আমি আপনাদের মতো বিদেশির হাতে আমার দেশের মানুষকে শায়েস্তা করার ভার দিতে রাজি নই। আমার দেশের মানুষের সঙ্গে বোঝাপড়া করব আমি নিজে। আমাদের মধ্যে আপনাদের নাক গলাবার দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। দেশটা আমাদের, আপনাদের নয়।‌

তারা আমার কথা শুনে এমন তাচ্ছিল্যের সুরে হো-হো করে হেসে উঠেছিল যে, শুনে আমার গা রিরি করে উঠল। রেগে আমি চিৎকার করে উঠলুম, ‌সম্রাটের সামনে অমন বেহায়ার মতো হাসতে আপনাদের ভদ্রতায় বাধে না! আমার সামনে থেকে চলে যান আপনারা!‌ আমি তাদের হাত উঁচিয়ে আমার প্রাসাদের ফটকটা দেখিয়ে দিলুম।

তারা হাসতে হাসতে থামল। তারপর চোরা চোখে আমায় দেখতে দেখতে বলল, ‌দেশটা আপনাদের না আমাদের সেটা কিছুদিনের মধ্যেই জানতে পারবেন। আমাদের সোনা চাই-ই, আর সে-সোনা কেমন করে আদায় করতে হয় তাও আমরা জানি। ভুলে যাবেন না সম্রাট, আমাদের হাতের এই অস্ত্রটা এখনও আমাদের হাতেই আছে।‌ বলে একটা বন্দুক আমার চোখের সামনে ধরে আবার হাসল। হাসতে হাসতে আবার বলল, ‌আপনার সামনে থেকে এখন যাচ্ছি, কিন্তু আবার দেখা হবে।‌ বলতে বলতে তারা বেরিয়ে গেল।

হ্যাঁ আমি বুঝতে পারছি আবার একটা দুর্দিন আমার সামনে ঘনিয়ে আসছে। আমি আমার প্রধানমন্ত্রী আর আমার সেনাধ্যক্ষের সঙ্গে আবার পরামর্শ করতে বসলুম। আমার প্রধানমন্ত্রীটি যে এখন খুবই একটা ভাবনায় অস্থির হয়ে উঠেছে, সেটা তার মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। আতাহুয়ালপাকে ছলেবলে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার পর এই ভিনদেশিরা যে এমন করে মাথায় চড়ে বসবে, এটা যেন আদপেই সে ভাবতে পারেনি। সুতরাং এখনই যে কী করা উচিত, আমার প্রধানমন্ত্রী সেই বুদ্ধি ভেবে পেল না। আমায় শুধু জিজ্ঞেস করল, ‌সম্রাট‌, এখন আপনি কী চান? নিজের প্রাণ না ইনকার সিংহাসন?‌

আমি উত্তর দিলুম, ‌দুটোই।‌

‌—তবে একটা দিন আমাকে ভাববার সময় দিতে হবে।‌

আমি বললুম, ‌ঠিক আছে কাল আমরা আবার বসব।‌ সেনাধ্যক্ষের দিকে মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, ‌আমার সৈন্যরা প্রস্তুত আছে তো?‌

সেনাধ্যক্ষ বলল, ‌প্রস্তুত।‌

কিন্তু সেনার প্রস্তুতি অথবা মন্ত্রীকে ভাববার সুযোগ, দুটোই কিন্তু মিথ্যে হয়ে গেল। কেননা পরের দিন সকালেই আবার বেজে উঠল ভিনদেশিদের মুখে বিউগিল। কুজকোর পথে পথে ঘোড়ার চিৎকার। দেখা গেল আমার এদেশের বিরোধী মানুষেরা হল্লা করতে করতে কুজকোর পথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারপর শোনা গেল বন্দুকের শব্দ। এই শব্দে আমার নিজের সৈন্যরাই ভয়ে লুকিয়ে পড়ল নিজের নিজের ছাউনিতে। আমি বুঝতে পারলুম ভিনদেশিরা এখন যুদ্ধ করতে আসেনি, এসেছে সোনা লুঠ করতে। তারা পঙ্গপালের মতো রাজপ্রাসাদের আনাচেকানাচে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। রাজপ্রাসাদের এখানে-ওখানে সাজানো সোনার অলংকরণগুলি তারা টেনে টেনে খুলে ফেলল। সোনায়সাজিয়ে রাজমহলের অন্দরে যেখানে রাজপুরুষদের ‌মমি‌গুলি রাখা হয়েছিল, সেই সোনাও তারা লুঠ করল। তারা কুজকোর মন্দিরে মন্দিরে ঢুকে পড়ল। মন্দিরের সোনার সিংহাসন আর সোনার মূর্তিগুলি ছিনতাই করে উল্লাস করতে লাগল। আমার প্রধানমন্ত্রী আর সেনাধ্যক্ষ আমার কাছে ছুটে এল। আমি পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে বসে আছি। তারা আমার সামনে নতজানু হয়ে বলল, ‌সম্রাট, আপনার জীবন বিপন্ন। রাজপ্রাসাদ ছেড়ে আপনাকে চলে যেতে হবে।‌

‌কোথায়?‌ আমার গলায় উদবেগ।

‌কোনো গোপন স্থানে।‌ তাদেরও গলা কাঁপছে।

‌না গেলে?‌ আমি জিজ্ঞেস করি।

‌ভিনদেশি দস্যু আপনাকে হত্যা করে আপনার সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দেবে।‌ উত্তেজিত স্বরে তারা বলল।

আমি লক্ষ করলুম এই প্রথম তারা ভিনদেশিদের দস্যু বলল। আমি বললুম, ‌কেন, এখান থেকেই কি আমরা দস্যুর মোকাবিলা করতে পারি না?‌

‌—না সম্রাট। ওদের হাতে ভয়ংকর আগ্নেয়-অস্ত্র আছে, আমাদের নেই। সেই অস্ত্রের মুখোমুখি দাঁড়াবার সাহস নেই আমাদের সেনার। আমরা যদি ভিনদেশিদের হাত থেকে রক্ষা করতে চাই আমাদের এই সাম্রাজ্য, তবে আমাদের লড়াই করতে হবে লুকিয়ে-ছাপিয়ে। জঙ্গলে গা-ঢাকা দিয়ে।‌

আমি আমার সেনাধ্যক্ষের এই প্রস্তাব মেনে নিলুম। সেই রাত্রেই জঙ্গলে পালাবার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলুম।

রাত গভীর হল। একটি জনমনুষ্যির সাড়া নেই কোথাও। দিনের দুর্যোগ রাতের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে আছে। ঠিক হয়েছিল সেনাধ্যক্ষ তার বিশ্বস্ত সৈনিকদের নিয়ে চুপিচুপি ছাউনি থেকে রওনা দেবে অন্ধকারে। আর আমি যাব আমার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে, সেই অন্ধকারে তাদের প্রহরার আড়ালে আড়ালে। সেইমতো সৈন্যরা ছাউনি থেকে নি:সাড়ে বেরিয়ে পড়ল। একসময়ে আমিও মন্ত্রীর সঙ্গে রাজপ্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পড়লুম। তাদের সঙ্গ নেব বলে মাত্র কয়েক পা গেছি, এমনই সময় আচমকা ভয়ংকর শব্দ করে ভিনদেশিদের অস্ত্রে আগুন ঝলসে উঠল— গুড়ুম-ম-ম। গুড়ুম-ম-ম। সে-শব্দ শোনা গেল একদিকে নয়, কুজকোর চতুর্দিকে। সঙ্গে সঙ্গে শোনা গেল প্রচন্ড শোরগোল। তারস্বরে মানুষ চিৎকার করছে। আমার সৈন্যরা সেই অন্ধকারেই দিশেহারা হয়ে যে যেদিকে পারছে পিঠটান দিচ্ছে। আমি এমনই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছি, তখন যে কী করব মাথায় এল না। কিন্তু আমার মন্ত্রী আমার সৈন্যদের ছত্রভঙ্গ হয়ে পালাতে দেখে গলা ফাটিয়ে হেঁকে উঠল, ‌বন্ধুগণ, আপনারা ভয় পাবেন না। মনে রাখবেন আমাদের প্রিয় জন্মভূমির আজ বিপদ। একদল ভিনদেশি দস্যু মিথ্যে ভিরাকোচা সেজে আমাদের দেশটাকে শেষ করে ফেলতে এসেছে। এ বিপদ থেকে আপনারা ছাড়া কে তাকে রক্ষা করবে? আপনারা ভয় পাবেন না, ওদের আগ্নেয়-অস্ত্রের চেয়ে আপনাদের শক্তি কোনো অংশে কম নয়। ওরা দলে মাত্র ক-জন। আপনারা অসংখ্য। সুতরাং...‌

গুড়ুম-ম-ম! গুড়ুম-ম-ম!

আবার বন্দুকের শব্দ। আবার মানুষের হুল্লোড়। আবার চিৎকার-চেঁচামেচি। আবার ছোটাছুটি। আর শোনা গেল না আমার মন্ত্রীর কথা। সেই হুল্লোড়ে হারিয়ে গেল তার কন্ঠস্বর। একাই সে চ্যাঁচাচ্ছে, কিন্তু শোনার কেউ নেই। একাই সে হাত তুলে তাদের নিরস্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু কে কার কথা শোনে।

আবার বন্দুক গর্জন করে উঠল, গুড়ুম-ম-ম! গুড়ুম-ম-ম!

আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না আমার মন্ত্রী। সেই পলাতক সৈন্যদের ভিড়ের মধ্যিখানে ছুটে গেল সে। ‌থামো, থামো‌ বলে সে তাদের জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল। ক-জনকে ধরবে সে! কে তার কথা শুনবে। বুঝি-বা দেশের চেয়ে প্রাণ অনেক দামি! সুতরাং তারা আমার মন্ত্রীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল পর্বতের কঠিন পাথরের ওপর। অনেক মানুষের পায়ের তলায় তখনও সে চিৎকার করছে, ‌ওরে শোন তোরা, পালাস না! ওরা তোদের স্বাধীনতা কেড়ে নেবে। তোদের দেশের গৌরব ওরা লুঠে নিয়ে যাবে। তোরা রুখে দাঁড়া! বল দেশ আমাদের! তোমরা ভিনদেশি, দূর হটো!‌

না, কেউ তার কথা শুনল না। সেই অন্ধকারে অসংখ্য আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের পায়ের নীচে সে দলে গেল। তার ক্ষীণ কন্ঠস্বর কেমন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে মিলিয়ে গেল। বুঝি-বা স্থির হয়ে গেল তার প্রাণের শেষ নিশ্বাসটুকু।

নিস্তব্ধ হয়ে গেল মানুষের কোলাহল। বন্দুকের শব্দে যাদের পালাবার কথা তারা সবাই পালিয়েছে। এগিয়ে গেলুম আমি। এগিয়ে গেলুম আমার মন্ত্রীর নিশ্চল মৃতদেহটার দিকে। মৃত মানুষটার মুখখানা দেখার চেষ্টা করলুম অন্ধকারে। যে ছিল এই ইনকা সাম্রাজ্যের এক বিশ্বস্ত সৈনিক, সে আজ আমার প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এখন সে মৃত— এ যেন বিশ্বাস হয় না। আমি তার নিষ্প্রাণ দেহটার সামনে বসে পড়লুম। মানুষের পায়ের আঘাতে তার দেহটা বিধ্বস্ত হয়ে লুটিয়ে আছে। আমি নতশিরে আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধুটিকে বিদায় জানালুম। আমার চোখের পাতায় অশ্রুফোঁটাগুলি টলমল করে উঠল। আমি তার রক্তাক্ত কপালে আমার কৃতজ্ঞতার একটি চিহ্ন এঁকে দেব বলে ঠোঁট দুটি যে মুহূর্তে ঠেকিয়েছি, ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার পেছনে কে যেন অত্যন্ত অস্থির গলায় ডাকল, ‌সম্রাট।‌

আমি চমকে গেছি। পেছনে তাকিয়ে দেখি আমার সেনাধ্যক্ষ।

‌এখানে আর একদন্ডও আপনার থাকা ঠিক নয়। শত্রু আপনাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমাদের কোথাও লুকিয়ে পড়তে হবে।‌ সেনাধ্যক্ষ একনিশ্বাসে বলে গেল।

আমি আমার মৃত বন্ধুকে শেষ বারের মতো বিদায় জানিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম। জিজ্ঞেস করলুম, ‌কোথায় যাবে?‌

গুড়ুম-ম-ম! সে আমার কথার উত্তর দিতে পারল না। তার আগেই শোনা গেল বন্দুকের শব্দ। আমার হাত ধরে ছুট দিল সেনাধ্যক্ষ সেই শব্দ শুনে। আমিও ছুটলুম।

কিন্তু পারলুম না। দেখতে পেলুম শত্রুরা আমাদের ঘিরে ফেলেছে। তারা বন্দুক উঁচিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমরা দু-জনেই ধরা পড়লুম। তারা আমাকে বন্দি করল। বন্দি করল আমার সেনাধ্যক্ষকেও। আমাকে নিয়ে চলল যেদিকে, ঠিক তার উলটো দিকে নিয়ে গেল সেনাধ্যক্ষকে। শত্রুর হাতে ধরা পড়ে আমি এলুম কুজকোর বন্দিশালায়। টাহুয়ানটিনস্যুর ইনকা-সম্রাট আজ এক ভিনদেশি লুঠেরার হাতে বন্দি হল কারাগারে। আর আমার কিছুই করার নেই, অপেক্ষা করতে হবে মৃত্যুর জন্য। আর নয়তো যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন অপমান সহ্য করতে হবে এই লুঠেরার হাতে।

হ্যাঁ, এই ভিনদেশি লুঠেরার দল আমাকে কারাগারে অবহেলা করতে কসুর করল না। সত্যিই তো, বন্দিকে আদরই-বা করে কে! আমাকে তারা চোখ রাঙায় উঠতে-বসতে। যেটা করার নয়, তাই করতে বলে। আমার ইচ্ছা না থাকলেও করতে হয়। ভেতরে জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাই আমি। তখন আমি একেবারেই অসহায়। অসহায় বলেই তাদের সব কাজেই আমাকে সায় দিতে হয়। শেষে আমি মনে মনে একটা ফন্দি আঁটলুম। ভাবলুম এবার ভিনদেশিদের সঙ্গে আমিও ভিনদেশিদের মতো হয়ে যাই। ওরা যেন বুঝতে পারে আমি ওদেরই দলে। আমার মনে যা আছে মনেই থাক, ওদের সঙ্গে বন্ধুর ভান করে ওদের মন জয় করতে হবে আমায়। এক বার যদি ওদের বিশ্বাসী হয়ে উঠতে পারি, মুক্তি পেতে তখন খুব-একটা কষ্ট করতে হবে বলে মনে হয় না।

সুতরাং এই ফন্দিমতো ওরা যা বলে, করে যাই। ওরা বলার আগেই, কোথায় সোনা আছে জানিয়ে দিই। ওরা যতই সোনা পায়, ততই আমার প্রতি ওদের মন একটু একটু করে নরম হয়ে ওঠে। সোনার এত দাম ওদের কাছে! যতই দেখছি অবাক হয়ে যাচ্ছি।

এমনই করে বন্দিদশায় অনেকগুলো দিন কেটে গেল। অনেক দিন ওদের হাতের পুতুলের মতো আমি উঠলুম-বসলুম। ওরা ‌‌হ্যাঁ‌‌ বললে আমি ‌‌হ্যাঁ‌‌ বলি। ওরা ‌‌না‌‌ বললে আমিও ‌‌না‌‌ বলি। আমি ওদের বন্ধু হয়ে গেলুম। ওরা আরও সোনা চায় আরও সোনার খোঁজ দিতে বলে। আমিও খোঁজ দিই। এমনই করে লোভে যখন তারা অন্ধ হয়ে গেল তখন একদিন আমার ফন্দিটাও খেটে গেল।

সেদিন ওদের নেতা আমার কাছে যখন আরও সোনার খোঁজ করতে এল, আমি সেদিন জলজ্যান্ত একটা মিথ্যে বললুম। বললুম, ‌দেখুন, সম্রাট হুয়ানা কাপাখকে যত বড়ো দেখতে ছিল, ঠিক তত বড়ো তাঁর একটা সোনার মূর্তি আমার সন্ধানে আছে। আমি ছাড়া সেই সোনার মূর্তি কোথায় আছে কেউ জানে না। আমি এক দিনের মধ্যে সেটি আপনাকে এনে দিতে পারি।‌

আমার এই মিথ্যেটা এক কথায় বিশ্বাস করে ফেলল সেই নেতা। আমার ফন্দিটা কাজে লেগে গেল। আমাকে সেই নেতা ছেড়ে দিতে একটুও দোনোমনা করল না। আমি মুক্তি পেয়ে গেলুম।

তারপরের সেই গল্প আরও রোমাঞ্চকর। আমি মুক্তি পেয়ে ওই ভিনদেশিদের চোখে ধুলো দিয়ে লুকিয়ে পড়লুম। গোপনে আমার দেশের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিলুম আমার ডাক। বললুম, ‌সূর্যদেবতার রক্তে-গড়া আমাদের এই মহান ইনকা-সাম্রাজ্য আজ বিপন্ন। ভিনদেশি দস্যু তাকে গ্রাস করতে উঠে-পড়ে লেগেছে। আমি সম্রাট মানকো ইনকা। হে প্রিয় দেশবাসী, তোমরা আমার পাশে দাঁড়াও। ওই ভিনদেশিদের আমরা যদি তাড়াতে না পারি আমাদের এই দেশ থেকে, তবে বোধ করি সূর্যদেবতার অভিশাপ থেকে আমরা কেউই রক্ষা পাব না। সুতরাং এসো দেবতার জন্য আমরা প্রাণ দিই। আমাদের রক্তে দেশ মুক্ত হোক!‌

কে জানত, এত মানুষ আমার ওই ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য উঁচিয়ে ছিল। সে যেন এক জনসমুদ্র। দলে দলে এগিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়াল। বলল, ‌হে সম্রাট, বলুন আমাদের কী করতে হবে?‌

আমি বললুম, ‌আমাদের রাজধানী কুজকো অধিকার করে আছে ভিনদেশিরা। ওদের আগুনে পুড়িয়ে মারতে হবে।‌

যেমন কথা তেমনই কাজ। সেই জনসমুদ্র একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা রাজধানী কুজকো শত্রুদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেবে। আগুন লাগিয়ে দিল তারা ভিনদেশিদের আস্তানায়। কিন্তু হায় রে, তবু তাদের হটানো গেল না! আমার কাছে খবর এল, ভিনদেশিরা দলে এখন অনেক। তার ওপর এদেশি অনেক মানুষ তাদের মদত দিচ্ছে। তাদের সঙ্গে আমার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তারা শিখে গেছে তরোয়াল চালাতে। শিখেছে বন্দুকের গুলি ছুড়তে। কিন্তু আমাদের সম্বল শুধু ওই গুলতি আর নয়তো পাথরের মুগুর। তা বন্দুকের সঙ্গে গুলতি পারবে কেন? অগত্যা আমাদের পিছু হটতে হল। কুজকো জয়ের আশা ছেড়ে আমরা জঙ্গলে ঢুকে পড়লুম। এইবার কিন্তু ওই বিদেশিরা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমাদের আক্রমণ করল। কিন্তু ওই জঙ্গলে এক মরণপণ যুদ্ধ করে জিতল আমার সৈনিকেরাই। বেদম মার খেল শত্রুসৈন্য। যারা বেঁচে রইল, তারা পালাবার পথ পেল না!

কিন্তু আমি ভাবলুম, বিদেশি শত্রু যখন একবার হদিশ পেয়েছে এই জঙ্গলের, একবার যখন এই জঙ্গলে আমাদের কাছে হেরেছে, তখন ওরা নিশ্চয়ই আবার আক্রমণ করবে। সুতরাং আমি আরও ওপরে উঠে গেলুম। পাহাড়ঘেরা জঙ্গলের এমন একটা জায়গায় ঘাঁটি বাঁধলুম যে, ভিনদেশিদের সাধ্য কী সেখানে যায়, সেখানে আমাদের আক্রমণ করে! স্থির করলুম এখান থেকেই আমরা ছোটো ছোটো দলে ভাগ হয়ে জঙ্গলযুদ্ধ করব ওই ভিনদেশিদের সঙ্গে। আর সেইভাবে আমরা তৈরিও হলুম।

ভাবো তো এক বার আমার কথা। ভাবো কোন বংশে জন্ম আমার। সূর্যদেবতা ইনটির রক্ত আমার শরীরে। আমার ঠাকুরদাদা, তাঁর বাবা, আমার বাবা একদিন যে শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়েছিলেন এই আন্দিজের পর্বতচূড়ায়, সেই সাম্রাজ্যের আমিও এক সম্রাট। আমিও এক ইনকা। বীরের বংশধর আর এক বীর সম্রাট মানকো ইনকা। কিন্তু কী দুর্দশা আমার! এই দ্যাখো, আমি সাম্রাজ্যের রাজধানী ছেড়ে, সিংহাসন ছেড়ে লুকিয়ে আছি পাহাড়-ঘেরা এই জঙ্গলে। কিন্তু এই দুর্ভাগ্যের জন্য কি দায়ী আমি? না দায়ী আমার পূর্বপুরুষের ঘরোয়া কোঁদল? অথবা আমার আহাম্মকি? জানি না কার দোষ। যেদিন সব শেষ হয়ে যাবে, হয়তো-বা সেইদিনই হবে তার বিচার। সেদিন কি দূর অনেক?

হ্যাঁ ওই জঙ্গল আর পর্বতের চূড়ায় গড়ে উঠেছিল আমার দুর্গ। গড়ে উঠেছিল একটি শহর ভিলকাবামবা। আমার রক্ষীরা পর্বতশিখরে উঠে নজর রাখত চারদিক। যেন চোখকে ফাঁকি দিয়ে ঢুকে না পড়ে শত্রু।

ঠিক এই সময়ে আমার এই দূর পর্বত-দুর্গে একটি ভারি আনন্দের খবর নিয়ে এল আমার এক গুপ্তচর।

—‌কী খবর?‌

সে বলল, ‌সম্রাট, সোনার লোভে আর সাম্রাজ্যটা যে যার নিজের দখলে রাখার জন্য ওই ভিনদেশিরা নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করে দিয়েছে। একে অন্যকে হত্যা করছে। সম্রাট হয়তো শুনলে খুশি হবেন, ওই ভিনদেশিদের একদল বিদ্রোহী সৈন্য তাদের প্রধান নেতা ফ্রানসিসকো পিজারোর ভবনে ঢুকে তাকে তরোয়াল দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছে। তাদের মধ্যে অনেকে ধরা পড়েছে। যারা ধরা পড়ল তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। বিদ্রোহী সেনাদের সাত জন কোনোরকমে পালিয়ে এসেছে এই জঙ্গলে। তারা এসেছে ঘোড়ায় চড়ে। তারা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।‌

আমি ক্ষণেক ভাবলুম। তারপর বললুম, ‌তাদের নিয়ে এসো আমার কাছে।‌

হ্যাঁ তারা এসেছিল আমার কাছে। সাত জনই বটে। তাদের সাতটা ঘোড়া। তাদের সঙ্গে আগ্নেয়-অস্ত্র, তরোয়াল। তারা আশ্রয় চাইল আমার, আমি আশ্রয় দিলুম। তাদের সঙ্গে আমি বন্ধুত্ব পাতালুম। তারা থেকে গেল আমার কাছে। তারা আমার সৈনিকদের তাদের কায়দায় যুদ্ধ শেখাল। তাদের কাছে আমি ঘোড়া ছোটাতে শিখলুম। শিখলুম বন্দুক চালাতে। ঠিক এই সময়ে আমার মনে পড়ে গেল আমার সেই মন্ত্রী বন্ধু সৈনিকটির কথা। মনে পড়ে গেল আমার সেনাধ্যক্ষ মিত্র-সেনাটির কথাও। আজ যদি তারা থাকত! জানি না এখনও আমার সেই সেনাধ্যক্ষটি বেঁচে আছে কি না! থাকলে এই ভিনদেশি সৈনিকের কাছে তারাও শিখতে পারত ঘোড়ায় চড়তে আর বন্দুক চালাতে। তারপর হয়তো সবাই মিলে আমরা মুক্ত করতে পারতুম আমাদের জন্মভূমিকে ওই ভিনদেশিদের কবল থেকে।

এখন আমিও সেই কথাই ভাবছি। ভাবছি আমার জন্মভূমির সেই মুক্তির কথা। আমি আমার সৈনিকদের এই মুক্তির কথাটাই বার বার শোনাচ্ছি। বলছি, ‌বন্ধুগণ সেই দিনের জন্য তৈরি হও, যেদিন আমাদের সকলের বুকের রক্ত ছড়িয়ে দিতে হবে জন্মভূমির পায়ে। দিন আসছে। তৈরি থাকো সেই দিনের জন্য।‌

কিন্তু শোনো আমার বন্ধুরা, সে-রক্ত আর অন্য কাউকে দিতে হয়নি। দিতে হল আমাকেই। আমি একা। কে জানত এই সাত ভিনদেশি সৈনিককে বিশ্বাস করে আমি আর এক আহাম্মকি করেছি। কে জানত, তারা খবর পেয়েছে ফ্রানসিসকো পিজারো নিহত হওয়ার পর আর এক নতুন নেতা এসেছে তাদের এই রাজ্যে। ওই নতুন নেতাটি আসার পর সেই ফ্রানসিসকো পিজারোর ভাইদের সঙ্গে নেতার লেগেছে ঝগড়া। ওই সাত সৈনিক এই খবরটা যে কেমন করে জেনেছিল তা আমি জানি না। তারা ভেবেছিল ওই নতুন নেতার সঙ্গে যখন পিজারোর ভাইদের ঝগড়া, তখন হয়তো সেই নতুন নেতার দলে যোগ দিলে পিজারোকে হত্যা করার শাস্তির হাত থেকে, এই সাত জন রেহাই পেয়ে যাবে। এই কথা ভেবেই হয়তো সেই সাত সৈনিক আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল। আমি প্রতিদিনের মতো সেদিনও তাদের সঙ্গে আমার সেই প্রিয় আংটা ছোড়াছুড়ি খেলাটি খেলছিলুম। খেলতে খেলতে তাদের সঙ্গে কত হাসিঠাট্টা হচ্ছিল। কত মজাদার কথাবার্তা, কত আনন্দ। কিন্তু বুঝতে পারিনি তাদের এই হাসির আড়ালে লুকিয়েছিল একটা ভয়ংকর হিংস্রতা। হাসতে হাসতে সেই সাত সৈনিকের দল অতর্কিতে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমাকে হত্যা করার জন্য চোখের পলকে আমার পিঠে বসিয়ে দিল ধাসরালো ছোরা। রক্তাক্ত দেহটা আমার লুটিয়ে পড়ল পাথরের ওপর। তাদের ঘোড়া তৈরিই ছিল। মুহূর্তের মধ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে পালাল সেই বিশ্বাসঘাতক সৈনিকের দল। আর আমি পড়ে পড়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলুম।

কিন্তু পারল না সেই বিশ্বাসঘাতক সাত সৈনিক আমার সেনাদের টপকে পালাতে। তারা ধরা পড়ল। দেশের মানুষ দেবতার মতো পুজো করে যে সম্রাটকে, তাকে হত্যা করতে যে দুশমন হাত তোলে, তার যে কী শাস্তি হওয়া উচিত সেটা আর কাউকে বলে দিতে হয় না। সেই সাত সৈনিক মরল আমারই সৈনিকদের হাতে। তারা মরল অস্ত্রের আঘাতে আর আগুনে দগ্ধ হয়ে।

হে বন্ধু, আমারও মৃত্যু হল। আমি পারিনি আমার জন্মভূমিকে রক্ষা করতে। ওই ভিনদেশি দস্যুরা ছারখার করে দিল আমাদের এই চার দিগন্তের সোনার সাম্রাজ্য টাহুয়ানটিনস্যু। তারা অধিকার করে নিল ইনকার সিংহাসনটা। কেড়ে নিল আমার দেশের মানুষের স্বাধীনতা।

হ্যাঁ, আমার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু আমার প্রাণের শেষ নিশ্বাসটুকু যে এখনও ভেসে বেড়াচ্ছে আকাশে-বাতাসে। ভেসে বেড়াচ্ছে টিটিকাকা হ্রদের তুষার-ঠাণ্ডা জলের ওপর দিয়ে, কখনো ঊরুবামবা নদীর স্রোতের সঙ্গে কিংবা আপুরিমাক নদীর জলোচ্ছ্বাসে। হে আমার প্রিয় বন্ধুরা, তোমরা কেউ যদি কোনোদিন আমাদের এই দেশে আসো, যদি আমাকে খুঁজে বেড়াও শহরের কোলাহলে, তবে নিরাশ হবে। আমার খোঁজে তোমাদের উঠে আসতে হবে আন্দিজের পাথর টপকে আরও ওপরে। এসো এখানে, এই সাকসাহুয়াম্যান দুর্গের ভাঙা চত্বরে। চিৎকার করে ডাকো আমার নাম ধরে, মা-ন-কো ই-ন-কা-আ-আ-আ। প্রতিধ্বনি শোনো কান পেতে। হয়তো-বা পেয়ে যাবে উত্তর। চলে এসো ওলানটেট্যামবো দুর্গের ঠিক গায়ে ঊরুবামবা গিরিখাতের সামনাসামনি। কান পাতো। শুনতে পাচ্ছ না আমার কন্ঠস্বর? এসো এসো, ঊরুবামবার আরও ওপরে এসো। দ্যাখো চোখের সামনেই ভিলাকাপামপা। এখন এই ভিলাকাপামপাকে সবাই বলে মাচু পিকচু। মাচু পিকচুর ভেতরে ওই যে দেখতে পাচ্ছ প্রকান্ড প্রকান্ড পাথর সাজানো তিন জানলার মন্দির, ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আন্দিজের শিখর-ছোঁয়া সূর্যদেবতার কিরণ ছড়ানো আকাশের শোভা দেখতুম। দেখতে দেখতে আমার চোখ উছলে উঠল অশ্রুফোঁটায়। এইখানেই আমি শেষ নিশ্বাস ফেলেছি। পৃথিবীর কাছে বিদায় নিয়েছি আমি এইখানেই। বিদায় নেওয়ার আগে আমার শেষ কথাটি বলার জন্য আমি যে কত চেষ্টা করেছি তবু পারিনি। শুধু মনে আছে আমার মৃতদেহটা সবাই নিয়ে গেছিল লুকিস।।স।য়ে লুকিয়ে আন্দিজের একটা খুব উঁচু শিখরে। পাথর-ভাঙা একটা মস্ত গহ্বরে আমার দেহটা ওরা কবর দিয়েছিল। হায় রে! সেই গহ্বরের নীচে আমি হারিয়ে গেলুম চিরদিনের জন্য। কেউ আর খুঁজে পেল না আমায়।

হে বন্ধু, তোমরা কি পার না আমায় খুঁজে বের করতে? পার না একটি বারের জন্য সেই কবরে কান পাততে? আমি যে সেই কবরে বোবা কান্নায় জেরবার হয়ে আর্তনাদ করছি, ‌হে বন্ধু আমার, সাবধান! ওই দ্যাখো আমার মতো তোমারও চারদিকে শত্রু। তোমার জন্মভূমির স্বাধীনতা ওরা কেড়ে নিতে চায়! ওরা তোমার জন্মভূমিকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করার জন্য অস্ত্র ধরেছে। রুখে দাঁড়াও বুক ফুলিয়ে। রক্ত ঝরে ঝরুক, তোমার রক্তের বদলে দেশমায়ের স্বাধীনতা রক্ষা করো! রক্ষা করো! রক্ষা করো!‌

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%