শৈলেন ঘোষ
অনেকে বলে ছেলেটার বয়েস এখন এগারো। আবার কেউ কেউ বলে, বারো। হতেও পারে। কেননা, তুমিও যদি তাকে দ্যাখো, বলতে পারি, তার বয়েসটা ঠিক ঠিক আন্দাজ করতে তোমারও কষ্ট হবে।
ছেলেটার জন্ম এইখানে, এই শহরে। অবিশ্যি শহর বলতে তোমরা যা বোঝো, আদতে এ শহর মোটেই তেমন নয়। এখানে যেমন নেই মস্ত মস্ত রাস্তা। তেমনই নেই গাড়িঘোড়ার সেরকম ঝক্কিঝামেলা। শহরের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে তুমি এদিক-ওদিক তাকাও, দেখবে চারদিকে পাহাড়। আর পাহাড়ের চুড়োয় বরফ জমাট বেঁধে আছে। খুব যখন শীত পড়ে, বরফ নেমে আসে এই শহরেও। নেমে আসে পথেঘাটে, গাছে গাছে, বাড়িঘরের আনাচেকানাচে। এখানকার বাড়িঘর তো আর তেমন নয়, ছোটো ছোটো কাঠের তৈরি। দু-চারখানা বাড়ি অবশ্য ওরই মধ্যে একটু বড়োসড়ো। একটা গির্জা, একটা মসজিদ আর দুটো মন্দির। তিনটে-চারটে হোটেলও আছে। প্রত্যেক বছর এখানে হাওয়া বদল করতে আসে যেসব মানুষ, এইসব হোটেলে তারা ওঠে। কিন্তু শীতের সময় যখন বরফ পড়ে, তখন অন্য দৃশ্য, সব ফাঁকা।
শহরের গা ঘেঁষে একটি নদী বয়ে চলেছে। পাহাড়ের ওপর থেকে ভয়ংকর এক লাফ মেরে সে নেমে আসছে নীচে। তারপর ছুটে চলেছে অসংখ্য পাথরের সঙ্গে লড়াই করতে করতে দুর্বার গতিতে।
এখানে কত গাছগাছালি চারদিকে। ওক আর জুনিপার, পাইন আর দেওদার। এখানে-ওখানে বনগোলাপের ঝাড়, ডালিম আর আপেলের বাগান।
দেখেছ, কী কথা বলতে কীসব বকে যাচ্ছি, আসলে ছেলেটার নামটাই তো বলা হয়নি। তার নাম সুখনলাল। ওর মা আর বাবা দু-জনেই ওকে অবিশ্যি সুখন বলে ডাকে। কিন্তু সুখনলাল বলে ডাকে শুধু একজন। সে ওর বন্ধু শঙ্কর। খুব বেশি হলে শঙ্কর হয়তো সুখনের চেয়ে বছর খানেকের বড়োই হবে। অনেকে অবিশ্যি বলে, না তা নয়, দু-জনে সমবয়সি। হলেও-বা। কিন্তু বয়েস নিয়ে সুখনও যেমন কোনোদিন মাথা ঘামায়নি, শঙ্করও তাই। খামোকা এসব কথা নিয়ে আমাদেরও কথা না বাড়ানোই ভালো। কেননা, তাতে আসল কথাটাই হারিয়ে যাবে। আসলে কথা তো এই শঙ্করকে নিয়ে। সুখন তো এসেছে অনেক পরে।
বলতে গেলে সুখনের সঙ্গে শঙ্করের আগে কোনোদিন বন্ধুত্বই ছিল না। কেউ কাউকে চিনত না, জানতও না। সুখনরা থাকত শহরের সেই একেবারে শেষে। এবড়োখেবড়ো পাহাড়ের গায়ে গায়ে ক-ঘর মানুষ যেখানে বাস করত সেখানে। এদিকে বড়ো-একটা কেউ আসত না, ওদের খোঁজখবরও রাখত না। যেন একঘরে, অচ্ছুত একদল মানুষ।
আসলে কিন্তু তাই। সুখনলালরা হরিজন, ওর বাবা জুতো সেলাই করত। সুতরাং শঙ্করের সঙ্গে ওর বন্ধুত্বের কথাই ওঠে না। কারণ শঙ্কররা তো ওদের মতো হরিজন নয়, আর ওদের পাড়াতেও থাকে না। শঙ্কররা থাকে এখান থেকে আরও দূরে, আরেক পাহাড়ের গায়ে। আরেক ঘরে।
সুখন যখন আরও ছোটো ছিল, তখন তারা হরিজন না অন্য কিছু এসব কথা সে জানতই না। আর তা জানার কথাও নয় তার। পাহাড়ের ঢালুতে কাঠের তৈরি তাদের ছোট্ট ঘরখানা। সেই ঘরখানাই ছিল সুখনের ভালোবাসার পৃথিবী। ঘরের দেওয়ালে একটা গণেশের ছবি আরেকটা হনুমানের—রঙিন। আপন মনে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখত সুখন। হনুমানটার সঙ্গে নিজের মনেই বিড়বিড় করে কথা বলত। আর যখন কথা বলতে ভালো লাগত না, তখন বাবার জুতো সেলাই-এর যন্ত্রপাতিগুলো টেনে ছড়িয়ে খেলা করত। যখন খুব শীত করত, বিছানায় উঠে চিৎকার করে মাকে ডেকে বলত, মা, বড্ড শীত করছে।
শীত তো এখানে সবসময়ে লেগেই আছে। তবে শীতের ঋতুতে যেমন হাড় কাঁপায়, অন্যসময় অবশ্য তেমনটা নয়। তখন দু-একখানা হালকা পোশাক গায়ে দিলেই চলে যায়। এই এখন যেমন সুখন একটা নিকার-বোকারের ওপর একটা গরমজামা গায়ে দিয়ে আছে। এ পোশাককে ওরা হালকাই বলে। কারণ, শীতের সময় যখন বরফ পড়তে শুরু করে তখন রাজ্যের গরম পোশাক গায়ে চড়ালেও শীত বাগে আসবে না। বরফের সময় কাজকম্মও সব বন্ধ। বসে থাকো ঘরে খিল এঁটে ঠুঁটো জগন্নাথের মতো। তাই শীত আসার আগেই শাকসবজি শুকিয়ে নিয়ে ভাঁড়ারে জমিয়ে রাখার তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। বন থেকে কাঠও কেটে এনে মজুত করে রাখতে হয় এত এত।
সুখন যখন খুব ছোটো ছিল, তখন শীতের আগে যখন তার মা কাঠ কাটতে পাহাড়ের আরও ওপরে বনে যেত, তখন সুখন যেত মায়ের সঙ্গে। পাথরে পাথরে ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলে সুখন পাহাড়ে উঠত। উঠতে উঠতে যখন আর পারত না, মা সুখনকে তুলে নিত নিজের কাঁধে। তারপর পাথর ডিঙিয়ে পাহাড়ে উঠত। উঠে সুখনকে একটা গাছের নীচে বসিয়ে কাঠ কাটত। কাঠ কাটার কাজ শেষ হলে কাঠের বোঝা পিঠে বাঁধত। কাঠ কাটার কুড়ুলটা এক কাঁধে ফেলে আরেক কাঁধে সুখনকে নিয়ে নীচে নেমে আসত। ওই পাহাড়ের পাথরের মতোই শক্ত ছিল সুখনের মা। এত মেহনত করেও কেউ তাকে কোনোদিন বলতে শোনেনি, —বাবা আর পারছি না।
শীতের সময় সুখন একটা ভাল্লুকের লোমের জামা পরত। তা, সেটারও তো বয়েস কম হল না। এখন তার বেহাল অবস্থা। তার ওপর যত বড়ো হচ্ছে সুখন, জামাটাও তত ছোটো হচ্ছে। সুতরাং তার এখন দিন ফুরিয়ে এসেছে। এবার একটা নতুন না হলে শীতের সময় হিহি করতে হবে। তা, এখনই যে একটা কিনবে সে-পয়সাও নেই তাদের। এবছর দশেরার সময় অবশ্য একটা নতুন জামা হয়েছে সুখনের। দশেরার সময় একটা মস্ত মেলা বসে এই শহরে। হরেক জিনিসের যেমন পসরা আসে নানান দেশ থেকে, তেমনি শয়ে শয়ে মানুষও জমবে সেসব জিনিস বিকিকিনি করতে। দশেরার আগে তো সুখনের বাবা নিশ্বেস ফেলার ফুরসত পায় না। দিনরাত খেটে খেটে কম করেও আট-দশ জোড়া জুতো বানাবে। সব বিক্রি হয়ে যায়। এই মেলায় দশেরার দিন রাবণের একটা মস্তবড়ো মূর্তি বানায় এদেশের মানুষ। মেলার মধ্যিখানে সেটাকে বসিয়ে আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুনে ঝলসে রাবণের মূর্তিটা যতই পুড়বে, লোকেও ততই হইহই করে হল্লোড় করবে। আগে তো এই উৎসব দেখার জন্য সব ধর্মের মানুষই দলে দলে আসত। হিন্দ-মুসলমান সক্কলে। কোনো বাছবিচার ছিল না। তারা আসত, আনন্দ করত, এটা-ওটা কেনাকাটা করত, খুশিমনে যে-যার বাড়ি ফিরে যেত। কিন্তু একবার যে কী হল, দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে ভীষণ মারামারি হল। অনেক রক্ত ঝরল। অনেক লোকও ঘায়েল হল। সেই যে মারামারি হল, তারপর থেকে দু-দলের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। দু-দলই তাল খুঁজছে, সুযোগ পেলেই আবার লাগিয়ে দেবে। তবে সব মানুষই তো আর এমন নয়। ভালো মানুষেরও অভাব নেই এদেশে। কিন্তু হলে কী হবে, দু-দলের যে ক-জন দুর্জন আছে তারাই সর্বনেশে। তাদের ভয়েই সবাই তটস্থ।
শীত পড়লে ভারি কষ্ট সুখনের মা আর বাবার। তাদের তো আর দামি দামি শীতের পোশাক নেই। গরিব লোক, পাবে কোথায়! সুখনের মায়ের যে গরম পোশাকটা আছে, সেটা অনেক কালের। সে-পোশাকটা কম্বলের তৈরি, ছিঁড়ে ধুলধুল করছে। বরফ পড়লে সুখনের মা এই পোশাকটা গায়ে দিত। মাথায় একটা লাল রঙের টুপি পরত। মোজা না থাকলেও পায়ে একটা জুতো দিতেই হয়। বলতে কী, তারও যা অবস্থা! তবে গরিব হলেও সুখনের মা দেখতে কিন্তু খুব সুন্দরী ছিল। শীতের দেশ, তার ওপর পাহাড়। এমনিতেই সেদেশের মানুষের গায়ের রং ফেটে পড়ে—ওর মা-রও তাই। ছেঁড়া পোশাক পরে ওর মা যখন বরফ ডিঙিয়ে মোরগ ধরতে বেরোত, কী সুন্দর লাগত তাকে।
তবে যে মোরগের কথা আমি বলছি, সে-মোরগ কিন্তু শীতের সময় ছাড়া তুমি এখানে দেখতে পাবে না। এই মোরগগুলো থাকে কিন্তু পাহাড়ের আরও ওপরে জঙ্গলে—উত্তর দিকে। শীতের সময় তো উত্তরে সাংঘাতিক ঠাণ্ডা। মানুষই সেখানে থাকতে পারে না তো পাখি! তাই এই ঠাণ্ডার ভয়েই মোরগগুলো উত্তর ছেড়ে পালিয়ে আসে নীচে এইখানে। তারা শীতের কবল থেকে বাঁচত বটে, কিন্তু মানুষের খপ্পর থেকে নিস্তার পেত না। ধরা পড়ত—মরত।
সুখনের বাবা শীতের সময় যে-কোটটা গায়ে দিত সেটার অবস্থাও তথৈবচ। সেই কোন মান্ধাতার আমলের। না আছে ছিরি, না ছাঁদ। তার ওপর সুখনের বাবা আবার একটু শীতকাতুরে। সবসময় হি হি করছে। ঘরে আগুন না জ্বাললে রাতে ঘুমই হবে না কিছুতেই।
কিন্তু সত্যি সত্যি রাতের ঘুম কেড়ে নেয়, শীতের সময় যখন তুষারঝড় ওঠে। সে যে কী ভয়ংকর দুর্যোগ! সেই সময় কেউ যদি ঘরের বাইরে থাকে, তখন তার ভাগ্যে যে কী আছে, সে এক ভগবান ছাড়া আর কেউ জানে না। আর তুষারঝড়ের কথা উঠলেই শঙ্করের কথা মনে পড়ে যায়। কেননা, এই ঝড়ের মধ্যে পড়েই শঙ্করের মা আর বাবা হারিয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও আর তাদের খুঁজে পাওয়া গেল না।
খুব বেশিদিনের কথা তো নয়। দুর্ঘটনাটা ঘটে গেছে শীতের ঠিক মুখেই। সেদিন শঙ্করকে ঘরে রেখে ওর মা আর বাবা একসঙ্গে বনে কাঠ কাটতে গেছিল শীতের দিনে ঘরে মজুত করে রাখবার জন্যে। বন মানে, বললুম আর গেলুম তা তো নয়। অনেকটা পাহাড়ে উঠতে হবে। অনেক ঝোপঝাড় ডিঙোতে হবে। অনেক দুর্গম পথও পার হতে হবে। সেদিন শঙ্করের বাবা-মা যখন ঘর থেকে বেরিয়েছিল তখন আকাশে দুর্যোগের ছিঁটেফোঁটা চিহ্নও ছিল না। ঝরঝরে পরিষ্কার দিন! ঝলমল করছে রোদ। হল কী, অনেকখানি ওপরে যখন তারা উঠে গেছে, আর-কিছুটা গেলেই বন, ঠিক সেই সময় আচমকা আকাশ ঘনিয়ে এল। মেঘে ঢেকে গেল আকাশ। পাহাড়ের ওপর আকাশের মতিগতি বোঝাই ভার। কোথায় যে মেঘ থাকে, কেউ বলতেই পারে না। প্রথমে হয়তো দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি পড়ল। তারপর বৃষ্টির সঙ্গে বরফঝড় উঠল, শুরু হয়ে গেল ধুন্ধুমার কান্ড। ঝড়ের সঙ্গে তুষারের ঝাপটা, সে যে কী ভয়ংকর দৃশ্য, যে দেখেছে সে-ই বলতে পারে। হাওয়া ছুটছে দুরন্ত গতিতে। হাওয়ার সঙ্গে রাশি রাশি তুষার। মনে করো, তোমার চোখে-মুখে সারাশরীরে ছিটকে লাগছে। তুমি যতই হাত-পা ছুড়ে নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছ, পারছ না। ততই ঝড়ের আক্রমণ তীব্র হচ্ছে। সেই ঝঞ্ঝার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে তুমি বিধ্বস্ত হয়ে টালমাটাল করছ, এদিক-ওদিক আশ্রয় খুঁজছ, কিন্তু কোথায় আশ্রয়! তুমি মৃত্যুর ভয়ে তারস্বরে চিৎকার করছ। কোনো সাড়া নেই। শব্দ শুধু তোমার নিজেরই ভয়ংকর নিশ্বাসের। কিন্তু সেই নিশ্বাসের শব্দও যেন তোমার নিজেরই কানে পৌঁছোয় না ঝড়ের প্রচন্ড ঝাপটায়। তুমি কী দারুণ নি:সহায় তখন। তুমি আর পারলে না। মুখ থুবড়ে পড়ে গেলে পাথরের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁকঝাঁক তুষারের কুচো এসে তোমাকে ঢেকে ফেলছে আর তুমি ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছ সেই অসহ্য ঠাণ্ডা তুষারের নীচে। প্রাণের শেষ নিশ্বাসটুকু বুকের মধ্যে আগলে রাখার জন্যে তুমি যতই হাঁকপাঁক করছ, ততই যেন তুমি হারিয়ে যাচ্ছ। তোমার চোখে অন্ধকার নেমে আসছে। তোমাকে মরতেই হবে। আর ঠিক এমনই হয়েছিল শঙ্করের বাবা আর মা-র। শঙ্করকে অনাথ করে তারা চলে গেল চিরদিনের জন্যে। শঙ্কর পড়ে রইল একা এই পৃথিবীতে।
হ্যাঁ, এখন শঙ্কর একা। এখন সে কার কাছে থাকবে, কোথায় যাবে কিছু জানে না। জানে না কী করবে সে। এখন তার চোখ দুটি টলমল করে শুধু অশ্রুফোঁটায়। অথচ ছেলেটা কী হাসিখুশিই-না ছিল। এমন নয় যে ওদের অনেক পয়সা। পয়সা অঢেল নাই থাক, অনেক সুখ ছিল ওদের সংসারে। বন থেকে কাঠ কেটে আনত ওর বাবা। সেই কাঠ খোদাই করে কত-না মনোহারী জিনিস তৈরি করত শঙ্করের বাবা। দশেরার মেলায় সুখনের বাবা যেমন জুতো বেচত, তেমনি শঙ্করের বাবা বেচত কাঠের বাহারি আসবাব। ঘর সাজাবার শৌখিন পুতলি-পুতুল।
একা একা শঙ্কর ক-দিন পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াল। ঘুরে ঘুরে মা আর বাবাকে খুঁজতে লাগল। ক-দিন সে নির্জনে বসে বসে কাঁদল। কিন্তু যেদিন সে বুঝল তারা আর আসবে না কোনোদিন, সেদিন সে চোখের জল মুছে ফেলল। বুকখানা শক্ত করে দাঁড়িয়ে দুঃখ ভোলার চেষ্টা করল। কেননা, সে জানে এখন তাকে বাঁচতে হবে একা একা। তার কেউ না থাকলেও আছে পাহাড়ের পাথরে পাথরে তার মা আর বাবার পায়ের চিহ্ন। আর আছে ওই নদীর কলতানে তাদের কন্ঠস্বর। সে-কন্ঠস্বর যেন সকাল-সন্ধে তাকে আশ্বাস দিচ্ছে, ভয় পাস না শঙ্কর, আমরা আছি তোর পাশেই। শঙ্করের নিরাশা দূর হয়ে যায়। ওই নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে শঙ্কর বুক ভরে নিশ্বাস নেয়। তারপর ছুটে যায় নিজের ঘরে। ঘরের ধুলো-ময়লা সে সাফ করে ফেলল নিজের হাতে। মায়ের রান্নাবাড়ার বাসনগুলো ধুয়ে-মুছে গোছগাছ করে রাখল। বাবার কাঠখোদাইয়ের যন্ত্রপাতিগুলো বার করল। সেগুলো নিয়ে সে ছুটল বুড়ো আবদুলচাচার কাছে। এই আবদুলচাচাকে দেখে অনেকে বলে, চাচার গালে যতগুলো দাড়ি, তার বয়েসও যেন ততগুলো বছর। সত্যিই তাই, মানুষটা এখন একেবারে থুত্থুড়ে হয়ে গেছে। মাথার চুলগুলো রেশমের মতো ফুরফুরে সাদা। গাল-ভরতি দাড়ি। সেও যেন আকাশ-ভরতি সাদা মেঘের মতো ঝরঝরে। মুখের বলিরেখার চিহ্নগুলো ভারি স্পষ্ট। একটা মোটা কাচের চশমা চোখে দিলে তবে চাচা কোরানের ছোটোছোটো অক্ষরগুলো পড়তে পারে। তবে এককালে যে আবদুলচাচাকে দেখলে চোখ ফেরানো যেত না, তা সে-মানুষটাকে এখনও দেখলে বোঝা যায়। একটা খুব সুন্দর জোব্বা ছিল আবদুলচাচার। সেই জোব্বাটা গায়ে চড়িয়ে একটা ফেজটুপি মাথায় দিয়ে আর জরির কাজ-করা নাগরা জোড়া পায়ে দিয়ে যখন পাহাড়ের উঁচু-নীচু পথ দিয়ে হেঁটে যেত, তখন মনে হত যেন কোনো এক অচিন দেশের শাহেনশা চলেছেন বুক ফুলিয়ে। তবে এখন কি আর তেমন করে হাঁটতে পারে আবদুলচাচা! বয়েস যত বেড়েছে, আবদুলচাচার হাঁটাচলাও তত কমেছে। তবে একেবারে অকর্মণ্য বলতে পারি না। ঘরেতে বসে বসে এই সেদিনও টুকটাক এটা-ওটা কত কী কাজ করেছে। এমনকী কারও জ্বরজ্বালা হলে কিংবা বাতবেদনা ধরলে আবদুলচাচা দাওয়াই বাতলে দিয়েছে। তবে আসলে কিন্তু আবদুলচাচা ছিল কাঠখোদাইয়ের কারিগর। সারাটা জীবন শুধু কাঠ কুঁদে কুঁদে রকমারি জিনিস তৈরি করেছে। পয়সা হয়েছে। মেয়েটার বিয়েসাদি দিয়েছে। ছেলেটাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। ছেলের চাকরি হলে তারও বিয়ে দিয়েছে। বিয়ের পর বউকে নিয়ে ছেলে বিদেশে চাকরি করতে চলে গেছে। আর বুড়ো আবদুলচাচা বুড়িকে নিয়ে এখানে ঘর করছে নি:সাড়ে। কখনো-সখনো ছেলে বিদেশ থেকে আসে, বুড়ো মা-বাপকে দেখে যায়। মেয়েও আসে মাঝেমধ্যে। দু-চার দিন মা-বাবার কাছে থাকে, তারপর সেও ফিরে যায় তার শ্বশুরবাড়ি। আর বুড়ো বাপ-মা ভাবে যতদিন ছেলে-মেয়ে ছোটো ছিল, তখন তারা কত আপন ছিল। এখন যেন তারা কত পর হয়ে গেছে। এই কথা ভাবতে ভাবতে বুড়ো-বুড়ি দিন গোনে আর আল্লাকে ডাকে।
শঙ্করের বাবাকে বড্ড ভালোবাসত আবদুলচাচা। এই আবদুলচাচাই তো শঙ্করের বাবাকে কাঠখোদাইয়ের কাজ শিখিয়েছিল। কাজটাজ শিখে শঙ্করের বাবা নিজে একটি কাঠের খেলনা-জাহাজ বানিয়ে আবদুলচাচাকে উপহার দিয়ে বলেছিল, তোমার কাছে কাজ শিখে এটা আমি নিজের হাতে তৈরি করেছি। তোমার শাগরেদ আমি। তোমার জন্যে এটা আমার সওগাত।
আবদুলচাচা সেদিন কী খুশিই-না হয়েছিল। আনন্দে দিশেহারা হয়ে শঙ্করের বাবাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, শাবাশ বেটা। বহুত আচ্ছা চিজ বানিয়েছিস তুই। আমার যদি পয়সা থাকত তোর হাত দুটো সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে দিতুম। আমি কথা দিচ্ছি, আমি যদি বেঁচে থাকি তোর ছেলে বড়ো হলে তাকেও আমি কাঠের কাজ শিখিয়ে দেব।
তা সে আজ কতদিন আগেকার কথা। এখন কি আর আবদুলচাচার সেসব কথা মনে আছে! তার ওপর এখন দু-দলে ঝগড়া। এক ধর্মের মানুষের সঙ্গে আরেক ধর্মের মানুষের শত্রুতা। কেউ কারও পাড়ায় যায় না। মানুষ মানুষকে ভয় পায়। এই সেদিন পর্যন্ত শঙ্করকে সঙ্গে নিয়ে শঙ্করের বাবা আবদুলচাচার বাড়ি গেছে। তখন কী সুন্দর সম্পর্ক ছিল দু-জনের মধ্যে, যেন বাপ আর ছেলে। কিন্তু তারপর মেলার মাঠে দাঙ্গা বাঁধতে যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল দুটো মানুষ। ইচ্ছে থাকলেও কেউ কারও কাছে যেতে পারে না। কেউ কারও খবর পায় না, যেন বন্দি। তারপরে তো শঙ্করের বাবাই চলে গেল চিরদিনের জন্যে। কে জানে সেকথা শুনেছে কি না আবদুলচাচা।
কাঠখোদাইয়ের যন্ত্রপাতিগুলো হাতে নিয়ে এইসব সাত-সতেরো ভাবতে ভাবতে শঙ্কর চড়াই ভেঙে এগিয়ে চলল আবদুলচাচার বাড়ির দিকে। যেতে যেতে ভাবতে লাগল, আবদুলচাচা তাকে দেখে যদি রেগে যায়! কাঠখোদাইয়ের কাজ শিখিয়ে না দিয়ে তাকে যদি বাড়ি থেকে বার করে দেয়!
পথের মাঝে ঠিক এইসময় কে যেন ডাকল তাকে, —কী রে শঙ্কর, কোথা যাচ্ছিস?
শঙ্কর ঘাড় ফেরাল। দেখল রাজুকাকা। এককালে তার বাবার সঙ্গে লোকটার বন্ধুত্ব ছিল। শঙ্কর তাকে দেখে থতোমতো খেয়ে গেল। দেখল লোকটা বিচ্ছিরি মুখ করে হাসছে। ওই বিচ্ছিরি মুখের মতো লোকটাও যে বদ, এটা শঙ্কর অনেক আগের থেকেই জানে। তাই কোনো কথা গোপন না করে সে সত্যি কথাটাই বলল। বলল, যাচ্ছি আবদুলচাচার বাড়ি। এখন তো আর চুপচাপ বসে থাকলে চলবে না আমার, তাই আমি ঠিক করেছি বাবার মতো আবদুলচাচার কাছে আমিও কাঠখোদাইয়ের কাজ শিখব। বলে সে তার কাঠখোদাইয়ের যন্ত্রগুলো হাত বাড়িয়ে দেখাল।
অন্ধকারে ভূতের নাম শুনলে মানুষ যেমন চমকে ওঠে, তেমনই চমকে উঠে রাজুকাকার চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। থতোমতো খেয়ে জিজ্ঞেস করল, কোথা যাচ্ছিস?
শঙ্করও তেমনি সহজ গলায় উত্তর দিল, আবদুলচাচার বাড়ি।
রাজুকাকা এবার সত্যি সত্যি ভূত দেখল। তারস্বরে চিৎকার করে শঙ্করকে কড়কে উঠল, —তোর সাহস তো কম নয়! জানিস না ও-পাড়ার সঙ্গে আমাদের মারামারি হয়ে গেছে?
শঙ্কর খুব জানে। কিন্তু সে একটা জিনিস জানে না, ও-পাড়ার সঙ্গে মারামারি হয়েছে বলে সে কেন আবদুলচাচার বাড়ি যেতে পারবে না। সে-মারামারি তো আবদুলচাচার মতো মানুষ করেনি। করেছে এই রাজুকাকার মতোই দু-দলের কিছু বদমেজাজি লোক। তার ওপর আবদুলচাচা বুড়োমানুষ। সেই বুড়োমানুষটার কাছেই সে যাচ্ছে। এর আগেও সে কতদিন তার বাবার সঙ্গে আবদুলচাচার বাড়ি গেছে। আবদুলচাচা কত খুশি হয়েছে তাকে দেখে। কত আনন্দ করেছে তাকে নিয়ে। শঙ্করের একদিনের জন্যেও মনে হয়নি আবদুলচাচা তার পর। ও-পাড়ার কিছু লোকের সঙ্গে মারামারি হয়েছে বলে আবদুলচাচারও দোষ হবে কেন! না, আবদুলচাচার কোনো দোষ নেই। মানুষটা দোষ করতে পারে একথা বিশ্বাস করে না সে। তাই সে বলল, আবদুলচাচা তো আর মারামারি করেনি। আবদুলচাচা বুড়োমানুষ। আমাকে ভালোবাসে।
এই কথা যেই-না বলা, রাজুকাকাও তেমনি রেগে আগুন। চোখটোখ পাকিয়ে তিরিক্ষি গলায় ধমকে উঠল, —খুব কথা শিখেছিস তো। একফোঁটা ছেলের বড়ো বড়ো কথা! আমি যা বলছি তাই শোন!
শঙ্কর রাজুকাকাকে অমন চোটপাট করতে দেখেও নিজে কিন্তু এতটুকু বিচলিত হল না। শান্ত গলায় সে উত্তর দিল, কিন্তু কাকা, আমাকে যে কাজ শিখতেই হবে। আমার কেউ নেই, এখন আমাকে একাই চলতে হবে।
রাজুকাকা কিন্তু তাতেও ঠাণ্ডা হল না। তেমনই ধমকে ধমকে বলল, আমরা কি মরে গেছি? কাজ শিখতে চাস আমরা শেখাব, ওদের কাছে নয়।
কাকা, তুমি কি কাঠখোদাইয়ের কাজ জানো? জিজ্ঞেস করল শঙ্কর।
কাঠখোদাইয়ের কাজটাই কি শুধু কাজ? খ্যানখ্যানে গলায় উত্তর দিল রাজুকাকা।
—আমার ইচ্ছে বাবার মতো আমি কাঠখোদাইয়ের কাজই করব। বলল শঙ্কর।
শঙ্করের মুখে এই কথা শোনার সঙ্গেসঙ্গে রাজুকাকা ভীষণ খেপে গেল। চোখ পাকিয়ে কড়কে উঠল, —যা বলছি তাই শোন। মুখের ওপর কথা বললে টান মেরে খাদে ফেলে দেব।
এবার আর শঙ্কর থাকতে পারল না। রাজুকাকার ওই কথা শুনে শঙ্করও রাগে জ্বলে উঠল। বলে বসল, দাও দেখি ফেলে, দেখি তোমার কত ক্ষমতা!
যেই-না এই কথা শোনা, আর কি ঠিক থাকতে পারে রাজুকাকার মতো বদমেজাজের লোক। ধাঁ করে শঙ্করের ঘাড়টা ধরে এই দ্যাখ বলে মারলে এক ধাক্কা। শঙ্করের হাত থেকে কাঠখোদাইয়ের যন্ত্রপাতিগুলো ছিটকে ছড়িয়ে পড়ল এদিকে-ওদিকে। শঙ্করও মুখ থুবড়ে পড়ল পাথরের ওপর। খুব রক্ষে, তেমন কিছু হল না। একটু-আধটু ছড়ে-ছেঁচে গেল। পড়েই উঠে পড়ল শঙ্কর। নিজের জামা-প্যান্টের ধুলো-ময়লা সাফ করতে করতে সে রুখে দাঁড়াল। বলল, তুমি আমার গায়ে হাত দিলে কেন?
—বেশ করেছি!
—আর এক বার দাও! উত্তেজনায় কাঁপছে শঙ্কর।
চোখের পলকে রাজুকাকা শঙ্করের গালে এক চড় কষিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, —একফোঁটা ছেলে, তোর এত আস্পর্ধা।
হঠাৎ যে এমন করে রাজুকাকা তার গালে চড় মারবে, সেটা শঙ্কর একদমই বুঝতে পারেনি। তাই আঘাতের ধাক্কায় প্রথমটা সে ভীষণ হকচকিয়ে গেছিল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে সে চেঁচামেচি শুরু করে দিল, —আমায় তুমি মারলে কেন? কেন তুমি আমার গায়ে হাত দিলে?
তার চিৎকার শুনে দু-একজন রাস্তার লোক এদিক-ওদিক যেতে যেতে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই রাজুকাকা গলা ফাটিয়ে নালিশ শুরু করে দিলে। শঙ্করও ছাড়ে না, রাজুকাকা যত জোর চ্যাঁচাচ্ছে, শঙ্কর তারও ওপরে গলা চড়ায়। কিন্তু অবাক কান্ড, রাজুকাকা যে ঝুটমুট শঙ্করের গায়ে হাত তুলল, সে নিয়ে কেউ একটি টুঁ শব্দ পর্যন্ত করল না। উলটে একজন বলল, ছেলেটাকে আগে ভালো বলে মনে হত, এখন দেখছি বাপ-মা নেই বলে সাপের চার-পা দেখতে শুরু করেছে। দাও দাও, আরও দু-ঘা দিয়ে দাও!
অবশ্য তার গায়ে আর হাত দিল না বটে রাজুকাকা, কিন্তু লোকটা এমন খেপে গেছল যে, হম্বিতম্বি করতে করতে বলল, দাঁড়া তোর কাঠখোদাইয়ের কাজ করাচ্ছি, বলে শঙ্করের হাত থেকে ছিটকে-পড়া কাঠখোদাইয়ের যন্ত্রপাতিগুলো পা দিয়ে ঠেলে ঠেলে পাহাড়ের নীচে খাদে ফেলে দিল। শঙ্কর ছুটে বাধা দিতে গেল, কিন্তু পারবে কেন অমন একটা গুণ্ডার সঙ্গে। শঙ্কর ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দিল, কিন্তু ততক্ষণে কাজ শেষ। শঙ্করের আর কিছুই করার রইল না। সে শুধু রাগে ফুঁসতে লাগল। মুখ দিয়ে তার একটি কথাও সরল না আর। এমনকী সে আবদুলচাচার বাড়ির দিকেও আর গেল না। নিজের ঘরে ফিরে গেল সে।
শঙ্কর এখন সত্যিই অসহায়। বাবার যন্ত্রপাতিগুলো নিয়ে সে কত স্বপ্ন দেখেছিল। নিমেষে সেই স্বপ্ন তার টুটে গেল রাজুকাকার জন্যে। সে যে খাদের নীচে নেমে যন্ত্রপাতিগুলো আবার কুড়িয়ে আনবে, তারও উপায় নেই। এত নীচু সেই খাদ যে, সেখানে যাওয়াই যায় না। তা ছাড়া কোথায় পড়ল যন্ত্রগুলো, কোন পাথরের কোন খাঁজে, সেই-বা কে খুঁজে বার করবে। অগত্যা শঙ্কর ভেতরে ভেতরে গুমরে উঠতে লাগল আর মনে মনে ভাবতে লাগল, এর প্রতিশোধ তাকে নিতেই হবে। কিন্তু কেমন করে প্রতিশোধ নেবে শঙ্কর নিজেও জানে না। অথচ এই ভাবনাটা তাকে উঠতে-বসতে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল। সুতরাং সে ঠিক করল আবদুলচাচার বাড়ি সে যেমন করে হোক যাবেই।
কিন্তু কেমন করে? আবার যদি শঙ্করকে কেউ দেখতে পায়! না, দেখতে পাবে না। সে লুকিয়ে লুকিয়ে যাবে। সুতরাং সে রাতের অন্ধকারের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
এই পাহাড়ের দেশে রাত নামলেই নির্জন হয়ে যায় পথঘাট। দু-একজন মানুষ যদিও-বা হঠাৎ হঠাৎ নজরে পড়ে, তাও দেখা যায় না রাত আরও একটু গভীর হলে। এই একটু গভীর রাতেই শঙ্কর বেশ করে গরম জামা-চাদর গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। সে গায়ে-মাথায় এমনভাবে মুড়িসুড়ি দিল যে, দেখে ফেললে চেনা লোকজনও তাকে চিনতে পারবে না। অন্ধকারে সাবধানে উঁচু-নীচু পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে সে কখনো নীচে নামছে, আবার কখনো ওপরে উঠছে। আরও খানিকটা ওপরে উঠলেই আবদুলচাচার বাড়ি।
আবদুলচাচার ঘরের আশেপাশে আরও ক-ঘর মানুষ যারা আছে, তারাও আবদুলচাচারই জানাশোনা। একই ধর্মের মানুষ ওরা। এখন সেইসব মানুষরা শঙ্করদের পাড়ায় আর ভুলেও আসে না। ওরা জানে ও-পাড়ায় গেলে নিস্তার পাবে না তারা। কিন্তু শঙ্কর যে ওদের পাড়ায় যাচ্ছে এখন! ওরা যদি হঠাৎ শঙ্করকে দেখে ফেলে! তবে কি শঙ্করকে ছেড়ে কথা বলবে ওরা! অত কী, আবদুলচাচাই যদি ওকে রেহাই না দেয়!
অত কথা ভাবে না শঙ্কর। ও শুধু জানে একসঙ্গে থাকতে গেলে একথা-সেকথা নিয়ে ঝগড়া হতেই পারে। কিন্তু একটা কথা সে কিছুতেই বুঝতে পারে না, সেই ঝগড়া মানুষ কেন চিরদিন তাদের মনে পুষে রাখবে? কেন এত রেষারেষি? মানুষে মানুষে শত্রুতা?
খুব নির্বিঘ্নেই শঙ্কর পৌঁছে গেল আবদুলচাচার বাড়ি। অন্ধকারে কেউ তাকে দেখতে পেল না। দেখতে পেলেও কেউ তাকে সন্দেহ করল না। আবদুলচাচার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দরজায় ঠেলা দিল শঙ্কর। শীতের হাওয়া যাতে ঢুকে না-পড়ে তাই ঘরের দরজা-জানলা সব আঁটসাঁট করে বন্ধ। অবশ্য যতই বন্ধ করো, কোথাও-না-কোথাও একটু তো ফাঁক থাকবেই। শঙ্কর দেখল এমনই একটা ফোকর দিয়ে আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে। তার মানে আবদুলচাচা এখনও জেগে আছে। শঙ্কর এবার দরজায় টোকা মারল।
—কে?
শঙ্কর বুঝতে পেরেছে এ আবদুলচাচার গলা। শঙ্কর সাড়া না দিয়ে আবার একটা টোকা মারল।
কে? কে? আবদুলচাচা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল।
—আমি। এবার খুব চাপাস্বরে সাড়া দিল শঙ্কর।

আবদুলচাচা এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিল....
দরজা খুলে গেল। সামনে আবদুলচাচা, হাতে একটা লণ্ঠন।
শঙ্কর মাথার মুড়িটা সরিয়ে নিয়ে সেলাম করল।
—কে বাবা তুই? লণ্ঠনটা শঙ্করের মুখের কাছে এনে ওর মুখখানা দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল আবদুলচাচা।
শঙ্কর বলল, চিনতে পারছ না চাচা?
—কী করে চিনব বাবা, রাতে ভালো করে চোখে দেখি না। তার ওপর সারা দেহটা যে কাপড়ে ঢাকা তোর। কই বাবা দেখি, তুই কাছে আয়!
শঙ্কর আবদুলচাচার কাছে এগিয়ে গেল।
আবদুলচাচা হাতের লণ্ঠনটা নিয়ে শঙ্করের আরও একটু কাছে এগিয়ে এসে ভালো করে দেখতে দেখতে অস্ফুট স্বরে অবাক হয়ে বলে উঠল, শঙ্কর!
চিনতে পেরেছে আবদুলচাচা। ব্যস্ত হয়ে উঠল বুড়োমানুষটা। তাড়াতাড়ি তাকে ঘরে ডেকে নিল, —আয়! আয়!
শঙ্কর ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই দরজা বন্ধ করে দিল আবদুলচাচা। শঙ্করের মুখখানা হাত দিয়ে চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল, কথা বলিস না, কেউ শুনতে পাবে। তারপর সন্ত্রস্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, তোকে কেউ দেখেনি তো?
শঙ্কর ঘাড় নেড়ে জানাল, —না।
ততক্ষণে আবদুলচাচার বউও হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে। শঙ্করকে দেখে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে জিজ্ঞেস করল, এই রাতের বেলা একা একা এ-পাড়ায় এসেছিস কেন বাবা?
শঙ্কর কী উত্তর দেবে জানে না। তার চোখ দুটি ছলছলিয়ে উঠল। বলল, আমি এসেছি বলে তোমরা খুব ভয় পাচ্ছ, না? কিন্তু তোমরা ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই। বলতে বলতে শঙ্কর ডুকরে উঠল।
আবদুলচাচার বউ শঙ্করকে কাঁদতে দেখে নিজেও কেঁদে ফেলল। তারপর শঙ্করের চোখ দুটি মুছিয়ে দিতে দিতে বলল, ওরে বাছা, আমরা কি আর আমাদের জন্যে ভয় পাচ্ছি। ভয় পাচ্ছি তোর জন্যে।
শঙ্কর অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল।
আবদুলচাচা বলল, ওই জাঁহাবাজের দল যদি জানতে পারে তুই এখানে এসেছিস, ওরা ছেড়ে দেবে না তোকে। আমরা বুড়ো হয়েছি, আমাদের যদি মেরে ফেলে ক্ষতি হবে না কারও। কিন্তু তোকে যে বাবা এখনও অনেক দিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হবে।
এবার শঙ্কর কথা বলল। বলল, আমি ভেবেছিলুম আমার কেউ নেই, তোমরাই আমাকে দেখবে। কিন্তু এখন দেখছি আমার জন্য তোমরা বিপদে পড়েছ। বেশ, তাহলে আমি চলে যাচ্ছি। বলতে বলতে শঙ্কর পিছু ফিরল।
—দেখি। ভারি নিরাশকন্ঠে উত্তর দিল শঙ্কর।
—না, তুই যাবি না। কে বলল তোকে, তোর জন্যে আমরা বিপদে পড়েছি? যেন ধমক দিয়ে উঠল আবদুলচাচা।
শঙ্করও তেমনি অভিমানে ফেটে পড়ল। বলল, সকালেও তোমার কাছে আসছি শুনে রাজুকাকা আমাকে মারল। বাবার কাঠখোদাইয়ের যন্ত্রগুলো পাহাড়ের খাদে ফেলে দিল। আমাকে বলল, তোমার কাছে এলে আমাকে মেরে ফেলবে। তাই আমি এই রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে তোমাদের এখানে এসেছি। এখানে এসেও দেখছি তোমরা আমাকে ভয় পাচ্ছ। কই, আগে যখন বাবার সঙ্গে তোমাদের বাড়িতে আসতুম, তখন তো তোমরা কোনোদিন ভয় পাওনি। সেদিন তোমরা আমাকে দেখে কত খুশি হতে। আমাকে কত আদর করতে। আর আজ তোমাদের কী হল?
এবার আবদুলচাচা শঙ্করের মাথায় হাত রাখল। নিজের চোখ দুটি ওর চোখের ওপর রেখে বলল, দ্যাখ বাবা, এখনও বলছি, আমাদের জন্যে আমরা একটুও ভয় পাচ্ছি না। তুই তো জানিস শঙ্কর, ও-পাড়ার মানুষের সঙ্গে এ পাড়ার মানুষের কী সাংঘাতিক গন্ডগোল। কেউ কাউকে দেখতে পারে না। ভয়ে কেউ কারও পাড়ায় যায় না। জানিস তো সেই লাঠালাঠির কথা?
শঙ্কর বলল, হ্যাঁ আমি সব জানি। কিন্তু সে তো অনেক দিন আগের কথা। সেকথা এখনও কেন মনে রাখবে সবাই?
আবদুলচাচা বলল, আগে এমন ছিল না শঙ্কর, এখন হয়েছে। আগের দিনে আমাদের ইদ-মহরমে ও-পাড়ার মানুষ এ পাড়ায় এসে আনন্দ করেছে। আবার এ পাড়ার মানুষ ও-পাড়ায় গিয়ে দশেরা-দেওয়ালিতে যোগ দিয়েছে। সে বড়ো সুখের দিন ছিল রে। কিন্তু এখন দিন পালটে গেছে। আমরা সবাই পালটে গেছি। আমরা ভালোবাসতে ভুলে গেছি। এই পাথরে ভরা পাহাড়ের মতোই আমরা পাষাণ হয়ে গেছি। হায় রে, সেদিন আবার কবে আসবে, যেদিন আমরা বলতে পারব আমরা সবাই ভাই ভাই! আমরা সবাই এই পৃথিবীর একই বাতাসে নিশ্বাস নিচ্ছি। বাতাস যেদিন থেমে যাবে, সেদিন আমরা সবাই একসঙ্গে মরে যাব। সেদিন আমার ধর্ম তোমার ধর্ম বলে আর কিছু থাকবে না। সেদিন সবাই আমরা এক। সেদিন আমাদের একটাই পরিচয়, আমরা মানুষ, কিন্তু মৃত।
শঙ্কর আবদুলচাচার কথা শুনে নির্বাক হয়ে গেল। আবদুলচাচার মুখের দিকে নিষ্পলকে তাকিয়ে রইল সে। তারপর দেখতে পেল আবদুলচাচার চোখ দুটি ছলছল করছে। চোখের জল সামলাতে পারল না আবদুলচাচা। সে-জল মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।
ব্যথা পেল শঙ্কর। আলতো স্বরে ডাকল, —আবদুলচাচা!
চোখের জল অনেক চেষ্টা করেও সামলাতে পারল না আবদুলচাচা। কান্না ভেজা গলায় বলল, আমাদের কি কম আফশোস। তোর মা, বাবা দু-জনেই একসঙ্গে দুর্ঘটনায় পড়ল। দু-জনেই একসঙ্গে আমাদের ছেড়ে চিরদিনের মতো চলে গেল। অথচ তোকে আমরা এক বারের জন্যেও দেখতে যেতে পারলুম না। তোর পাশে গিয়ে তোর মুখখানি বুকে টেনে বলতে পারলুম না, ওরে শঙ্কর, তোর কিচ্ছু ভয় নেই। আমরা আছি, তোকে আমরা দেখব। কেন পারলুম না জানিস? এ পাড়ার দুশমনরা আমাদের যেতে দিল না তোর কাছে। আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে তারা বাধা দিল, তড়পাল। বলল, ঘর থেকে এক-পা বেরিয়েছ কি ঠ্যাং ভেঙে দেব। ঘরে আগুন লাগিয়ে দেব। বলতে বলতে মুহূর্ত থামল আবদুলচাচা। চোখের জল সামলাল। তারপর আবার বলল, এখন কি আমার সেই তাগদ আছে। যখন বয়েস ছিল, তখন ওই পাহাড়ের পাথরের মতো শক্ত ছিল আমার বুকখানা। তখন একখানা লাঠি নিয়ে পাঁচ-শো লোকের মোকাবিলা করতে পারতুম। কিন্তু এখন দিন ফুরিয়ে গেছে। সবারই ফুরোয়, আমারও ফুরিয়েছে।
আবদুলচাচার বউ বলল, আহা রে, কত ভালোমানুষ ছিল তোর মা-বাবা। কী কপাল, দুটো মানুষই আমাদের ছেড়ে একসঙ্গে চলে গেল! তোকে এখন কে দেখবে বল দেখি?
বউয়ের কথা শুনে আবদুলচাচা ধমকে উঠল। বলল, কে আবার দেখবে, আমরা দেখব আমরা। তুমি দেখবে, আমি দেখব। আমরা তো এখনও মরে যাইনি।
বউ বুড়োর কথা শুনে আঁতকে উঠল। বলল, ওরা যদি জানতে পারে!
—আমাদের মেরে ফেলবে, এর বেশি তো আর কিছু নয়। বউ, আমি ঠিক করে ফেলেছি, আমরা মরি সেভি আচ্ছা, তবু শঙ্করকে আমরা দেখবই। বলে আবদুলচাচা নিজের হাতের মুঠোটা শক্ত করে ওপর দিকে তুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
—কিন্তু ছেলেটাকেও যদি মারে? ভয়ে যেন কুঁকড়ে গেল আবদুলচাচার বউ।
—আমি থাকতে। বুড়ো মানুষটা বীরের মতো মাথা ঝাঁকাল।
শঙ্কর চমকে গেল আবদুলচাচার ওই মূর্তি দেখে।
আবদুলচাচা শঙ্করের ওই ভয়-জড়ানো মুখখানা দেখে ওর কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ভয় কী রে ছেলে। বাপ-মা কারও চিরদিন থাকে না। কিন্তু তুই ঠিক জায়গায় এসেছিস। আমরা তোকে দেখব। তোর বাবাকেও আমরা কোনোদিন পর ভাবিনি। সেও আমাদের আপনজন বলেই জানত। তাকে আমি কাঠখোদাইয়ের কাজ শিখিয়েছিলুম। তাকে আমি কথা দিয়েছিলুম, তুই বড়ো হলে তোকেও আমি এই কাজটাই শেখাব। সেই কথার খেলাপ আমি করি কেমন করে। বলতে বলতে থামল আবদুলচাচা। তারপর কিছু ভাবল। ভাবতে ভাবতে আবার বলল, কিন্তু বাবা, সে-কাজ তোকে শিখতে হবে গোপনে। আমার বাড়িতে তোকে আসতে হবে এমনই রাত্তিরে অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে। নইলে অমানুষগুলো দেখতে পেলে তোকে খতম করে ফেলবে।
আবদুলচাচার কথাগুলো শুনতে শুনতে শঙ্কর খানিক হতবাক হয়ে চেয়ে রইল তার মুখের দিকে। তারপর কেমন যেন হতাশ কন্ঠে বলে উঠল, চাচা, আমি কাজ শিখব কী করে? আমার কাঠখোদাইয়ের যন্ত্রপাতিগুলো যে ওরা খাদে ফেলে দিয়েছে।
—দিয়েছে তো বয়ে গেছে। রাগে ঝলসে উঠল আবদুলচাচার মুখখানা, —আমার যন্ত্রগুলো তো এখনও আছে। সেইগুলো দিয়ে তুই শিখবি। মনে কর সেগুলো তোর। তোকেই আমি দিয়ে দেব।
এতক্ষণ শঙ্করের মুখখানা উদবেগে শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছিল। আবদুলচাচার এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার বুকের ভেতরটা বাতাস-লাগা গাছের পাতার মতো খুশিতে ঝুরঝুর করে নেচে উঠল। যে-কথাটা শঙ্কর নিজে বলতে চেয়েছিল, সেই কথাটা যে আবদুলচাচা নিজেই বললে। কিন্তু শঙ্করের বড্ড মায়া লাগল এই বুড়ো মানুষটাকে দেখে। মানুষটা তাকে কাজ শেখাবে কেমন করে? যন্ত্র দিয়ে এই বয়েসে কাঠের ওপর কুঁদে কুঁদে নকশা বানাতে তার কষ্ট হবে না? তার ওপর মানুষটা ভালো করে চোখেও দেখে না। তাই সে সংকোচের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, চাচা, আমাকে শেখাতে তোমার কষ্ট হবে না? আমি তো কাঠখোদাইয়ের কিছুই জানি না।
আবদুলচাচা শঙ্করের মুখের দিকে তাকাল খানিক, তারপর হেসে ফেলল। বলল, কীসের কষ্ট রে! বুড়ো হয়ে গেছি বলে ভাবছিস অচল হয়ে গেছি! তবে হ্যাঁ, এখন আমি তেমন করে চোখে দেখি না ঠিকই। কাজ করতে গেলে এখন হাত দুটো কাঁপে। কিন্তু তাই বলে আমি অকেজো হয়ে গেছি একথা ভাবছিস কেন! হাতকে বশে আনতে আমার বেশি সময় লাগবে না।
—তবে চাচা শোনো, শঙ্কর খুশিতে উচ্ছল হয়ে বলল, আমিও কথা দিচ্ছি, আমার কাজ শেখা হয়ে গেলে আমিও তোমাদের আর কষ্ট করতে দেব না। মেহনত করে আমি রোজগার করে আনব। তোমাদের কষ্ট দূর করব।
শঙ্করের কথা শুনে বুড়ো আবদুলচাচা কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেল। চোখ দুটি তার ছলছলিয়ে উঠল। কেঁদে ফেলল আবদুলচাচার বউও। এমন কথা যে তাদের নিজের ছেলেও কোনোদিন বলেনি। তারা মনে মনে ভাবল, ঠিক যেন বাপেরই মতো হয়েছে শঙ্কর—ইমানদার। বাপেরই মতো দয়ালু। শঙ্করকে নিজের কাছে টেনে নিল আবদুলচাচার বউ। তারপর আদর করতে করতে বলল, বেঁচে থাক বাবা, বেঁচে থাক। সোনার টুকরো ছেলে।
আবদুলচাচাও আনন্দে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, শাবাশ! এমন কথা তুই কার কাছে শিখলি শঙ্কর? এমন কথা যে আমার নিজের ছেলেও বলেনি কোনোদিন।
শঙ্কর মাথা নীচু করে চুপচাপ বসে রইল।
কিন্তু বাবা শঙ্কর, আবদুলচাচা আবার বলল, আমার যে একটি আবদার তোকে রাখতে হবে।
শঙ্কর চকিতে মুখ তুলল। আবদুলচাচার মুখের দিকে চাইল। অবাক হল। জিজ্ঞেস করল, কী আবদার?
—তোর বাবার বড্ড ইচ্ছে ছিল তুই লেখাপড়া শিখিস, ইস্কুলে যাস। পাঁচজনের একজন হোস। কতদিন এসব কথা সে আমাকে বলেছে। তাই আমিও বলি, কাজ শেখার সঙ্গে সঙ্গে তুই যেন লেখাপড়াটাও করিস।
আবদুলচাচার কথা শুনে শঙ্করের মুখের কথা যেন হারিয়ে গেল।
কী রে, চুপ করে রইলি যে? জিজ্ঞেস করল আবদুলচাচা। তারপর অবাক হয়ে দেখল শঙ্করের চোখে জল। পলকে আবদুলচাচা শঙ্করকে আদর করে কাছে টেনে নিল। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, কাঁদছিস কেন?
শঙ্কর কান্না-জড়ানো গলায় উত্তর দিল, হ্যাঁ চাচা, আমি লেখাপড়া শিখব। আমি বড়ো হব।
শঙ্করের কথা শুনে বুড়ো আবদুলচাচা আর তার বউয়ের মুখ দুটি খুশিতে ঝলমল করে উঠল। বুকের মধ্যে আর একবার শঙ্করকে জড়িয়ে ধরে আবদুলচাচা চাপাস্বরে বলে উঠল, শাবাশ!
তারপর শঙ্করকে আবদুলচাচার বউ আদর করে কত কী খাওয়াল। কত খাবার তার সঙ্গে দিয়ে দিল। শঙ্কর সেই অন্ধকার রাতে আবার ফিরে গেল নিজের ঘরে। আবদুলচাচার আশ্বাস পেয়ে সেরাত্রে ভারি নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ল শঙ্কর। আবদুলচাচার আদর করে তাকে বলা শাবাশ কথাটা যেন বার বার শঙ্করের কানে ঝংকার দিয়ে বেজে উঠছে। খুশিতে উছলে উঠছে শঙ্কর থেকে থেকে। অনেকক্ষণ সে ঘুমোতে পারল না। অন্তত একটা কথা এখন সে বিশ্বাস করতে পারছে, সে আর একা নয়। তার আবদুলচাচা আছে, আছে আবদুলচাচার বউ—তার চাচি। দুটো মানুষের সঙ্গে তার সম্পর্ক কিছুই নেই, অথচ কত আপন। এক ধর্মের মানুষের সঙ্গে আরেক ধর্মের মানুষের যে এত হানাহানি, তা ওই দুটো বুড়ো মানুষকে দেখে কে বলবে! কই শঙ্করকে তো তারা শাসাল না, ভয় দেখাল না, বারণ করল না তাদের বাড়িতে যেতে। উলটে তাকে কত ভালোবাসল, কত যত্ন করল। কিন্তু এদিকে দ্যাখো রাজুকাকাকে, চোখে-মুখে যেন হিংসার আগুন জ্বলজ্বল করছে। কেন এত হিংসা জানে না শঙ্কর। সে ভাবে, কেন এমন হয়! একজন মানুষ ভালোবাসে। আবার অন্য আরেকজন মানুষ তাকে মারে। কীসের জন্যে দুটো মানুষের এত ফারাক ভেবে পায় না শঙ্কর। আচ্ছা, মানুষই তো মানুষকে ভালোবাসবে? তার বিপদে তাকে রক্ষা করবে, তার দুঃখের দিনে তার পাশে এসে দাঁড়াবে? কিন্তু তা হয় না কেন? ভাবতে ভাবতে কেমন যেন বিমনা হয়ে যায় শঙ্কর। ভাবে, তা যদি হত পৃথিবী কত সুন্দর হত!
এ যেন স্বপ্ন। শুধুই ভাবনা। এমনই সব এলোমেলো নানান কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে হঠাৎ শঙ্কর ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেও খেয়াল করতে পারল না।
সকালেই ঘুম ভেঙে গেছিল শঙ্করের। কাল ফেরার সময় আবদুলচাচার বউ সঙ্গে যে খাবার দিয়েছিল তার মধ্যে থেকে ক-টা রুটি আর খানিকটা ভাজি বার করল শঙ্কর। বাবা-মাকে হারিয়ে এতদিন ও যত দুঃখ পেয়েছে, ততই যেন খিদেও ওর ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু আজ শঙ্করের খিদে পেয়েছে—খুব খিদে। সকালে উঠে মুখ-হাত ধুয়ে ক-টা রুটি সে ভাজি দিয়ে প্রায় গবগব করে খেয়ে ফেলল। তারপর সে তার পড়ার বইগুলো নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। এখন রোদ উঠেছে। ঘরের বাইরে একটা মস্ত পাথর। রোদ পড়েছে সেই পাথরটার ওপরেও। রোজ সকালে এই পাথরটার ওপর বসে রোদে পিঠ দিয়ে সে লেখাপড়া করে। এই পাথরটার ওপরেই শঙ্কর যা শেখে, তাই লেখে। কিন্তু যেদিন থেকে শঙ্করের বাবা-মা ঘরে ফেরেনি, সেদিন থেকে ও যেমন লেখাপড়া ভুলেছে, তেমনই ভুলেছে ওই পাথরটাকেও। কিন্তু আজ ঘর থেকে বেরিয়ে সে পাথরটার ওপরেই বসে পড়ল। সকালের রোদ শুধু এই পাথরটার ওপরেই পড়েনি, ছড়িয়ে পড়েছে পাহাড়ের গায়ে গায়ে। চূড়ায় বরফের ওপরেও। ঝলমল করছে চারদিক। ভারি ভালো লাগছে শঙ্করের। কিন্তু কিছুই বিশ্বাস নেই। দ্যাখো আবার কতক্ষণ রোদ থাকে। কেননা, পাহাড়ের দেশে এই তো মজা। এই দেখছ রোদ, তারপর কোথাও কিছু নেই মেঘে মেঘে ঢেকে গেল আকাশ। মেঘের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল পাহাড়ের চূড়া। নামল বৃষ্টি, বৃষ্টির সঙ্গে বরফের কুচি। মনে হবে যেন আকাশ থেকে কে মুঠো মুঠো খই ছড়িয়ে দিচ্ছে। সে ভারি মজার দৃশ্য।
আজ আকাশের বরাত ভালো, মেঘ তাকে এখনও পর্যন্ত ছেয়ে ফেলেনি। সুতরাং ঝকঝকে রোদে পিঠ দিয়ে অনেকক্ষণ ধরে শঙ্কর পড়াশোনা করল। যখন আর ভালো লাগল না, শঙ্কর বইপত্তর গুছিয়ে রেখে ছুটে গেল ঘর থেকে পাহাড়ের ঢালু পথে। খুশিতে ঝলমল করছে শঙ্করের মুখখানা। আনন্দে নাচছে যেন তার পা দুটি। হবেই তো। কেননা ক-দিন পরে আবদুলচাচার কাছে অনেক কাজ শিখে ফেলবে শঙ্কর। ক-দিন পরে তার কাজের পসরা নিয়ে সে বাজারে বিকিকিনি করতে বেরোবে। তখন দেখিয়ে দেবে রাজুকাকাকে! লোকটার দেমাক তখন কোথায় থাকে দেখা যাবে! লোকটা শুধুমুধু তার গায়ে হাত দিল। কোনো উপকারে নেই, অথচ সর্দারি করার বেলায় ষোলো আনা।
হ্যাঁ, শঙ্কর তার কাজের পসরা বিক্রি করে যত পয়সা রোজগার করবে, সব পয়সা সে আবদুলচাচার হাতে তুলে দেবে। তারপর জিজ্ঞেস করবে, আচ্ছা চাচা, তোমাদের আল্লা আর আমাদের ভগবান তো এক?
ঢালুপথে ছুটতে ছুটতে শঙ্কর নদীর কিনারায় এসে দাঁড়াল। এখনও যে বসন্ত আসেনি সে বুঝতে পারে। কেননা, নদীর জলে এখনও বরফের টুকরোগুলো উঁকিঝুঁকি মেরে ভেসে যাচ্ছে। শঙ্কর নদীর ধার থেকে একটা ছোটো পাথরের নুড়ি তুলে নেয়। ছুড়ে দেয় নদীর জলে। মনে মনে ভাবে কবে যাবে শীতের জবুথবু বুড়িটা এদেশ থেকে। কবে নেমে আসবে বসন্ত! সবুজ পাতায় ভরে যাবে গাছ। বসন্তের হাওয়ায় ঝিরঝির করবে গাছের পাতা। ফুল ফুটবে পাপড়ি মেলে। তখন সেই কোন দূর দূর দেশ থেকে কত মানুষ আসবে এদেশে বেড়াতে। তাদের রংবেরঙের পোশাকের জৌলুস ছড়িয়ে পড়বে এই ছোট্ট শহরের পথে পথে। পাহাড়ের পাথরে পাথরে তাদের আনন্দের কলতান প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়বে চারদিকে। তখন জমজমাট এই পাহাড়।
—কী রে শঙ্কর, এখানে কী করছিস?
শঙ্কর চমকে উঠল। পিছু ফিরল। দেখল পেছনে রাজুকাকা দাঁড়িয়ে হাসছে। মুখখানা যেমন হিংসুটে, তেমনই হাসিটাও। এ হাসি সহ্য করতে পারে না শঙ্কর। তাই সে তাচ্ছিল্যের সুরেই বলল, এমনি, দাঁড়িয়ে আছি।
কী ঠিক করলি? জিজ্ঞেস করল রাজুকাকা।
—কীসের কী? জিজ্ঞাসু চোখে রাজুকাকার মুখের দিকে তাকাল শঙ্কর।
রাজুকাকা বলল, সেই যে কাজের ব্যাপার?
—এখনও কিছু ঠিক করিনি।
—না ঠিক করলে চলবে কী করে? খাবি কী?
শঙ্কর কোনো উত্তরই দিল না এ কথার। দাঁড়িয়ে রইল চুপ করে।
হঠাৎ রাজুকাকাই আবার জিজ্ঞেস করল, কাঠ কাটতে পারবি?
শঙ্কর জানে, রাজুকাকা পাহাড়ের জঙ্গলে গিয়ে কাঠ কাটার কাজ করে। কাঠ কেটে মহাজনের কাছ থেকে মজুরি নিয়ে সংসার চালায়। এখন মনে হয় শঙ্করকে সেই কাজটাই করতে বলছে রাজুকাকা। অবশ্য রাজুকাকা আরেকটা কাজও করে। মরসুমের সময় যখন দেশ-বিদেশ থেকে লোক এখানে বেড়াতে আসে, তখন তাদের মোট বয়ে দেয়। মালপত্তর পিঠে নিয়ে হোটেলে যাওয়া, আবার হোটেল থেকে ফেরার সময় গাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। এতেও রাজুকাকার বেশ চলে যায়। কিন্তু শঙ্করের একাজটা একদম পছন্দ নয়। অবশ্য তুমি বলতে পারো, খারাপ কী, বেশ তো স্বাধীন কাজ। যখন ভালো লাগছে করছে, যখন মন চাইছে না করছে না। তা ঠিক। কিন্তু সেইসঙ্গে শঙ্কর এই কথাটাও জানে, এতে বুদ্ধি খরচ করতে হয় না। তোমার নিজের বাহাদুরি কিছু নেই। গায়ে মোষের মতো শক্তি থাকলেই হচ্ছে। রাশি রাশি মাল পিঠে নিয়ে অক্লেশে হাঁটাহাঁটি করতে পারো। কিন্তু শঙ্করের বাবার মতো কাঠের ওপর খোদাই করে নকশা বানাতে তো পারো না। সে কাজ করতে গেলে এলেম থাকা চাই। শিখতে হবে মন দিয়ে। মকশো করতে হবে নিয়ম করে। বললুম আর অমনি ফুসমন্তর হয়ে গেল, তা মোটেই নয়।
শঙ্কর চুপচাপ দাঁড়িয়ে এইসব কথাই ভাবছিল। সুতরাং মুখ থেকে কোনো জবাব না-পেয়ে রাজুকাকা আবার জিজ্ঞেস করল, কী রে, শুনতে পাচ্ছিস না, কী বলছি? কাঠ কাটতে পারবি?
এবার শঙ্কর সাফ জানিয়ে দিল, না, পারব না।
তার উত্তর শুনে যেন মেঘ থেকে বাজ পড়ল। খাপ্পা হয়ে গেল রাজুকাকা। বলল, তবে কি বাবুগিরি করবি?
—দেখি। বলে শঙ্কর সেই নদীর কিনারা ধরে হনহন করে হাঁটা দিল। এই লোকটার সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলতেও কেমন যেন বিচ্ছিরি লাগছিল তার।
—এই শঙ্কর! নদীর জলোচ্ছ্বাসের শব্দের চেয়ে আরও উপরে গলা তুলে রাজুকাকা ডাক দিল।
শঙ্কর তবু দাঁড়াল না।
রাজুকাকাও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। চিৎকার করল, —আমার কথা তোর কানে ঢুকছে না? বলে দ্রুত পা ফেলল শঙ্করের পেছনে।
শঙ্করও চিল-চেঁচিয়ে বলল, তোমার কোনো কথা আমার শোনার দরকার নেই। বলতে বলতে সেও হাঁটতে লাগল। কিন্তু সে দেখল না রাজুকাকা তাকে ধরবার জন্যে এখন ছুটছে।
হ্যাঁ, প্রায় ছুটে এসেই রাজুকাকা শঙ্করের একটা হাত ধরে ফেলল। আবার তেমনই চোখ পাকিয়ে চোটপাট করতে করতে বলল, এত সাহস তুই কোত্থেকে পেলি? আমাকে অগ্রাহ্য করা!
—আমি তো বলেছি, কাঠ কাটার কাজ আমি করব না। শঙ্কর তার হাতটা রাজুকাকার হাতের মুঠি থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল।
—তোর বাবা আমার মুখের ওপর কোনোদিন কথা বলেনি জানিস!
—জানি। শঙ্করের উত্তর।
—সে যখন নেই, তোর ভালো-মন্দ আমাদের দেখা কর্তব্য। আমরা যা বলব তোকে তাই শুনতে হবে। আমার সঙ্গে তোকে কাঠ কাটতে হবে। মোট বইতে হবে। দু-জনে যা রোজগার করব, ভাগবাঁটোয়ারা করে নেব। এতে দু-জনেরই ভালো হবে।
শঙ্কর বুঝতে পেরেছে, একথার মানে কী। শঙ্কর তো লোকটাকে হাড়ে হাড়ে চেনে। এই টাকাপয়সা নিয়ে লোকটা তার বাবার সঙ্গে কি কম ঝামেলা করত। কত যে ঠকিয়েছে! এখন তাকেও ঠকাতে চায়। হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়ে নিশ্চয়ই লবডঙ্কা দেখাবে। লোকটার এই মতলব বুঝে ফেলতেই শঙ্করের হাসি পেয়ে গেল। সে অবশ্য হেসে উঠল না। মজা করার জন্যে জিজ্ঞেস করল, বখরাটা কেমন হবে শুনি?
—সে একটা যাহোক হয়ে যাবে। উত্তর দিল রাজুকাকা।
শঙ্কর বলল, না কাকা, আমি যদি তোমার সঙ্গে কাজ করি, তবে কথাবার্তা এখনই পাকা হয়ে যাওয়া ভালো।
—কেন, আমায় বিশ্বাস হচ্ছে না? জানিস, তোর বাবা পর্যন্ত কোনোদিন আমার সঙ্গে দরাদরি করেনি।
শঙ্কর টিপ্পনী কাটল, —খুব জানি।
—তবে তোর এত বাহানা কেন?
বাহানা আগে করে রাখাই ভালো। পরে ঝগড়াঝাঁটি হলে তুমি তো মারধর করতে ছাড়বে না। কালই তো তুমি আমায় মেরেছ। এখন কেমন করে বিশ্বাস করি। বলে শঙ্কর এমনভাবে তার দিকে তাকাল যে, দেখলে তোমারও হাসি পেয়ে যাবে।
কিন্তু যাকে বলল, সেই রাজুকাকা তো বোকা নয়। এক নম্বরের শয়তান। শঙ্করের চোখ দেখেই সে খেপে উঠেছে। বলল অন্যায় কথাবার্তা শুনলে মারবই তো, আলবত মারব। দরকার হলে বার বার মারব।
তবে কাকা, আমায় ছেড়ে দাও। আমাকে নিয়ে শুধুমুধু তোমার চিন্তার দরকার নেই। আমার রাস্তা আমাকেই বেছে নিতে দাও। তোমার হাতে আমি মারও খেতে রাজি নই, ঠকতেও চাই না। বলে, শঙ্কর আবার হাঁটতে শুরু করল।
—দাঁড়া! বেশ চটেমটেই ডাক দিল রাজুকাকা।
দাঁড়াল শঙ্কর। রাজুকাকার মুখের দিকে তাকাল।
আমি কাকে ঠকিয়েছি? আমি ঠকিয়ে বেড়াই? রেগে মুখ-চোখ বিচ্ছিরি করে জিজ্ঞেস করল রাজুকাকা।
তুমি ঠকিয়ে বেড়াও কি না জানি না, কিন্তু তোমার মতলবটা মোটেই সুবিধের নয়। উত্তর দিল শঙ্কর।
—মানে? আরও তিরিক্ষি মেজাজে তেড়ে উঠে রাজুকাকা শঙ্করের বুকের জামাটা খামচে ধরল।
শঙ্করও রুখে দাঁড়াল। বলল, দ্যাখো কাকা, আমার গায়ে তুমি যদি আবার হাত তোলো, আমিও ছেড়ে কথা বলব না।
—কেন, তুই কি মারবি আমায়? বলে রাজুকাকা শঙ্করের জামাটা আরও চেপে ধরল।
—আমার জামা ছাড়বে তুমি! আমার বুক থেকে হাত সরাবে! রাজুকাকাকে পরোয়া না করে গর্জে উঠল শঙ্কর।
না সরালে? রাজুকাকাও চোখ রক্তবর্ণ করে জিজ্ঞেস করল।
এই কথা শোনার সঙ্গেসঙ্গে শঙ্কর টেনে এক ঝটকা মারল রাজুকাকার হাতে। মেরেই চেঁচিয়ে উঠল, —ছাড়ো!
শঙ্করের জামা থেকে রাজুকাকার হাতটা ছিটকে গেল। কিন্তু শঙ্করের জামাটা ছিঁড়ে গেল বেশ খানিকটা। যাক, শঙ্কর আর ছেঁড়া জামা নিয়ে কথা কাটাকাটি করল না। সেখান থেকে প্রায় ছুটতে ছুটতেই ঘরের দিকে চলল।
সত্যি বলতে কী, রাজুকাকা শঙ্করের হাতের অমন একটা ঝটকা খেয়ে একদম বেকুব বনে গেছে। রাজুকাকা বুঝতেই পারেনি শঙ্করের এমন দুঃসাহস হবে। সুতরাং ঝটকা খেয়ে হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে রইল খানিক। তারপর শঙ্কর যখন বেশ খানিকটা চলে গেছে তখন গলা ফাটিয়ে আস্ফালন করতে লাগল, —তোর দেমাক কেমন করে ভাঙতে হয় সে আমার জানা আছে। তুই তো কালকের ছেলে। এতদিন তোর বাপের ঘাড়ে বসে বসে তুই খেয়েছিস। এবার তোকে কে খেতে দেয় দেখব। তোকে এখানে ভিক্ষে পর্যন্ত করতে দেব না। দেখি তুই আমার পায়ে ধরিস কি না। বলে গজগজ করতে করতে রাজুকাকা সেখান থেকে চলে গেল। রাজুকাকার চিৎকার শুনে যে ক-জন সেখানে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, তারাও একে একে হালকা হয়ে গেল।
ঘরে ফিরে গেল শঙ্কর। সে যে একটা ভীষণ সাহসের কাজ করে ফেলেছে, সে কে না জানে। রাজুকাকার হাতটা ঝটকা মেরে সরিয়ে দেওয়ার জের যে কতদূর গড়াবে সেটা শঙ্করের অজানা নয়। বিপদের খাঁড়াটা এখন তার মাথার ওপর ঝুলছে। কখন যে ছিঁড়ে পড়বে কেউ বলতে পারে না। কিন্তু তাই বলে অন্যায় কেন সহ্য করবে শঙ্কর। কাল অত লোকের সামনে শঙ্করের গালে চড় মারল রাজুকাকা। তাও বুঝতুম একটা ভয়ানক দোষ করেছে শঙ্কর, তা হলে কিছু বলার ছিল না। কিন্তু বেচারা চড়টা খেল শুধুমুধু। বয়সে সে ছোটো বলে তার ওপর তুমি গাজোয়ারি করবে! সর্দারি ফলাবে! এ তো বড়ো আশ্চর্য কথা। সুতরাং শঙ্করকে এখন যে খুব সতর্ক থাকতে হবে, একথাটা নতুন করে তাকে বলে দিতে হবে না। সে মানুষটাকে হাড়ে হাড়ে জানে। এমন হিংস্র ওই রাজুকাকা, বদলা নেবেই। আর তাই ঘরে ফিরে মনে মনে ঠিক করল, রাজুকাকা যা-ই করুক-না-কেন, সে কিছুতেই মাথা নোয়াবে না। রাত্রিবেলা সে আবদুলচাচার কাছে যাবেই যাবে। সে কাঠখোদাইয়ের কাজ শিখবেই।
এখন অনেক বেলা হয়ে গেছে, তা হলেও রাত আসতে এখনও বেশ দেরি আছে। এখন পেটে কিছু না-দিলেই নয়। খিদে পাওয়াটা আশ্চর্য নয়। তাই শঙ্কর মায়ের প্যাঁটরাটা খাটিয়ার নীচের থেকে টেনে বার করল। শঙ্কর জানে, বাবার রোজগারের সব পয়সা মা ওই প্যাঁটরাটার ভেতরই রোজ জমা রাখত। যখন যেমন দরকার পড়ত, মা বার করে দিত বাবাকে ওই বাক্সটা থেকেই। সুতরাং প্যাঁটরাটা খুলে ফেলল শঙ্কর। হ্যাঁ, সত্যিই তো! কত টাকা রে বাবা! ভালোই হল। একা শঙ্করের বেশ ক-দিন হেসেখেলে চলে যাবে। মনে হয় ওই টাকাগুলো থাকতে থাকতেই সে আবদুলচাচার কাছে কাজ শিখে ফেলতে পারবে। তখন তো আর কোনো ভাবনা থাকবে না। তখন তো শঙ্কর নিজেই রোজগার করবে। তাই এখন মাত্তর ক-টা টাকা সে বার করে নিল বাক্স থেকে, তারপরে ছুটে গেল বাজারে। বাজারে সবচেয়ে ভালো দোকান বলতে মহাদেবের। খাবারের যেমন স্বাদ, তেমনই টাটকা। তুমি যা চাইবে গরম গরম ভাজা পাবে। কাজেই মহাদেবের দোকানের সামনে গিয়েই সে দাঁড়াল। চোখ বুলিয়ে এটা-ওটা দেখে নিয়ে বলল, চারখানা পুরি আর দুটো মিঠাই দাও তো মহাদেবদাদা!
মহাদেব দোকানি প্রথমটা শঙ্করকে দেখেনি। চারখানা পুরি ঠোঙায় ভরতে গিয়ে চমকে উঠল শঙ্করকে দেখে, যেন ভূত দেখছে! কয়েক মুর্হূত সে শঙ্করের মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে তারপর হঠাৎ কথা কয়ে উঠল, —আরে শঙ্কর, তুই! বলতে বলতে হাতের ঠোঙায় পুরি না ভরে ঠোঙাটা ঠোঙার জায়গায় রেখে দিল। দিয়ে একটু দেঁতোহাসি হেসে জিজ্ঞেস করল, অনেক দিন পরে, কী ব্যাপার?
শঙ্কর প্রথমটা মহাদেব দোকানির হাতের দিকে তাকিয়ে, তারপর মুখের ওপর চোখ তুলে বলল, আসতে পারিনি।
—হ্যাঁ, অবশ্য তুই না এলেও তোর বাবা আসত। আহা রে, কী ভালো মানুষই-না ছিল তোর বাবা। এ তল্লাটে অমন মানুষ দুটি খুঁজে পাবে না কেউ। বলতে বলতে মহাদেব দোকানি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর কেমন একটা লোকদেখানো আক্ষেপ করার মতো সুর করে বলল, ভালোমানুষের দিন শেষ হয়ে আসছে রে শঙ্কর, ভালোমানুষ আর এ দুনিয়ায় থাকবে না।
মহাদেব দোকানির কথা শুনে শঙ্করের মনটা হঠাৎ কেমন জানি দুঃখে ভার হয়ে গেল। সে কথা বলতে পারল না সেই মুহূর্তে। তার চোখের ওপর স্পষ্ট ভেসে উঠল তার বাবা আর মায়ের মুখ দুটি। সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটি তার ছলছলিয়ে উঠল।
মহাদেব দোকানি আবার শুরু করল, —বাপ-মা কারও চিরদিন থাকে না ঠিক কথা, কিন্তু তাই বলে এই বয়সে দুটো শক্তসমর্থ মানুষ এমনি করে বেঘোরে চলে যাবে, কে ভাবতে পেরেছে বল? কপাল! কপাল! সবই কপাল! কার কপালে কখন যে কী ঘটে কে বলতে পারে!
মহাদেব দোকানির অমন বিলাপ শুনতে একেবারেই ভালো লাগছিল না শঙ্করের। তাই সে আবার বলল, আমায় চারখানা পুরি আর দুটো মিঠাই দাও।
শঙ্করের কথা যেন মহাদেব দোকানির কানে ঢুকল না। একঝাঁক বোলতা মিঠাই-এর গামলায় হামলে বসে রস চুষছিল। মহাদেব গামছা নেড়ে বোলতা তাড়াতে তাড়াতে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ রে, রাজুবাবুর সঙ্গে তোর কী হয়েছে রে?
শঙ্করের যেন চমক ভাঙল! সঙ্গেসঙ্গে সে দোকানির মুখের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোমায় কে বলল?
মহাদেব ফিক করে একটু হেসে বলল, শুনলুম।
কী শুনলে? দৃষ্টি তেমনি তীক্ষ্ণ রেখেই জিজ্ঞেস করল শঙ্কর।
—তুই নাকি রাজুবাবুর গায়ে হাত তুলেছিস? এবার বোলতা না তাড়িয়ে শঙ্করের মুখের দিকে চাইল মহাদেব দোকানি। নিজের মুখের ভেতর জিবটা নাড়িয়ে ক-বার চুকচুক করল। তারপর বলল, কাজটা তুই ভালো করিসনি।
ওই চুক চুক শব্দটা শুনে শঙ্করের মুখখানা রাগে ঝলসে উঠল। সে প্রায় ক্ষিপ্তস্বরে চেঁচিয়ে উঠল, —যে বলেছে সে একটা আস্ত মিথ্যুক।
দোকানি এবার শঙ্করের মুখের দিকে একটু আড়চোখে তাকিয়ে আলতো করে হাসল। হেসে বলল, যদি বলি রাজুবাবু নিজে বলেছে!
শঙ্কর তেমনই রেগে উত্তর দিল, তবে আমি বলব সে তোমাকে ধোঁকা দিয়েছে। আমার নামে ঝুটমুট বদনাম করছে।
দোকানি এবার একটু রহস্য রহস্য গলায় বলল, কী বলছিস রে শঙ্কর? অ্যাঁ! অতবড়ো একটা লোক তোর নামে ঝুটমুট বদনাম দেবে! শুনলে যে লোকে তোকেই ছ্যা ছ্যা করবে।
করে করবে। যারা দেখেছে তারাই জানে, রাজুকাকার গায়ে আমি হাত তুলিনি, রাজুকাকাই আমার গালে চড় মেরেছে। বলে শঙ্কর যেন গর্জন করে উঠল।
মহাদেব দোকানি কিন্তু শঙ্করের কথা কানেই নিল না। রাজুর হয়েই সে ওকালতি করতে লাগল, —না না, কাজটা তুই ভালো করিসনি। তোর বয়েস আর তার বয়েস। তোর বাবা কত ভালো লোক ছিল। সেই লোকের ছেলে তুই। আর তুই কিনা...
শঙ্কর আর শুনতে পারল না। সে বুঝতে পারল মহাদেব দোকানিকে যতই বলো, সে রাজুকাকার হয়েই কথা বলবে। আর তাই শঙ্কর মহাদেব দোকানির কথা শেষ হবার আগেই আবার বলল, যাক গে, কথা বাড়ালে কথা বেড়েই যাবে। তুমি আমাকে চারখানা পুরি আর দুটো মিঠাই দাও, আমি চলে যাই।
—বারণ। দোকানি গম্ভীর গলায় উত্তর দিল।
—মানে? অবাক হল শঙ্কর।
তোকে কিছু বিক্রি করতে বারণ করে দিয়েছে রাজুবাবু। মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে উত্তর দিল মহাদেব দোকানি।
কেমন যেন হতভম্ব হয়ে গেল শঙ্কর, দোকানির কথা শুনে। ঝট করে তার চোখের দৃষ্টি দোকানির মুখের ওপর পড়েই স্থির হয়ে গেল। তারপর তার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে একটি শব্দ বেরিয়ে এল, —ও! বলেই সে দোকানের সামনে থেকে পিছু ফিরল। একটা অপমানের বোঝা মনের মধ্যে চেপে ধরে সে হনহন করে হাঁটা দিল। পিছু ফিরে এক বারও দেখল না মহাদেব দোকানি বিজবিজ করে তার নাম ধরে তাকে দুষছে কি না।
—আরে শোন, শোন! মহাদেব দোকানি তাকে অমন করে চলে যেতে দেখে ডাক দিল।
শঙ্কর দাঁড়াল। পিছু ফিরল। দোকানির মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু কাছে গেল না।
মহাদেব দোকানি একটু চেঁচিয়েই বলল, আজ থেকে তোর পরামানিক, কাপড়কাচার লোক বন্ধ। সব বন্ধ। ভালো চাস তো রাজুবাবুর কাছে গিয়ে মাপ চেয়ে নে। নইলে উপোস করে মরতে হবে তোকে।
শঙ্কর কোনো উত্তর দিল না। যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকেই গটগট করে আবার সে হাঁটা দিল।
হাঁটা দিল ঠিকই, কিন্তু এখন কী করবে শঙ্কর! অবশ্য সকালে ক-খানা রুটি তার পেটে পড়েছে। আবদুলচাচার বউ দিয়েছিল। এখন যদিও খিদে পাচ্ছে, তবুও মনে হয় এ-বেলাটা কষ্টেসৃষ্টে কাটিয়ে দিতে পারবে। তারপরে রাত্রে আবদুলচাচার বাড়ি গেলে তখন আর কোনো ভাবনা থাকবে না। সুতরাং ততক্ষণ খিদের কথা ভুলে থাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই শঙ্করের।
শঙ্কর ঘরের পথেই হাঁটল। ভাবতে লাগল... রাজুকাকা যে ঝুটমুট তাকে মারল, আজেবাজে এটা-ওটা বলল, সেসব কথা তাহলে কেউ বিশ্বাস করবে না! রাজুকাকার কথাটাই তাহলে সত্যি বলে মেনে নেবে সবাই!
হ্যাঁ, হয়তো তাই। কেননা লোকটাকে ভয় পায় সবাই। গায়ে জোর থাক আর নাই থাক তার মুখের জোরেই সবাই তটস্থ। অন্যায় জোরজারি করলেও কেউ মুখে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করবে না। কেননা, তার হাতে অনেক লোক। সেইসব অন্যায় জুলুম সহ্য না করলে কারও নিস্তার নেই। অথচ এই লোকের সঙ্গে শঙ্করের বাবার যে কেমন করে বন্ধুত্ব হয়েছিল কে জানে! তবে কি নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ ছিল বলে শঙ্করের বাবাও রাজু নামে এই লোকটাকে ভয় পেত! হবেও-বা। কিন্তু শঙ্কর নতুন দিনের মানুষ, ও কেন সহ্য করবে অন্যায় ব্যবহার। সেবার যখন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মারামারি লেগেছিল, তখন পেছন থেকে লেলিয়ে দিয়ে কোন মানুষটা মজা লুটেছিল প্রাণভরে, কোন মানুষটার গায়ে একটি আঁচড়ও লাগেনি, সে কি শঙ্কর জানে না! একবার, ওই যেখানে দশেরার সময় মেলা বসে, ওই যেখানে রাবণের মূর্তিতে আগুন লাগিয়ে মানুষ হুল্লোড় করে, ওখানে ইদের সময় ওরাও মেলা বসাতে চেয়েছিল। ওই রাজুকাকার দল ওদের মেলা বসাতে দেয়নি। রাজুকাকার দল বলেছিল, এজায়গা আমাদের, আমরা এখানে মন্দির করব। তখন ওদের দলের ওমর বলেছিল, এজায়গা আমাদেরও, আমরা এখানে মসজিদ গড়ব। তারপর লেগে গেল ফাটাফাটি। কী ভীষণ দাঙ্গা। রক্তগঙ্গা বয়ে গেল এই সুন্দর পাহাড়ি শহরের গা দিয়ে। যে-মানুষগুলি প্রতিদিন এক নদীর জল পান করত, একই বাতাসে নিশ্বাস নিত, একই সঙ্গে হাসত, গান গাইত, সেই নিরীহ মানুষগুলি মানুষেরই তৈরি অস্ত্রের আঘাতে জীবন দিল। কেন? ভেবে পায় না শঙ্কর। ভাবতে ভাবতে এমনই সে আনমনা হয়ে যায় যে, খেয়াল করে না, যে আকাশে এতক্ষণ রোদ ঝলমল করছিল, সেই আকাশে এখন মেঘ। মেঘে মেঘে চারদিক ছেয়ে গেছে। বৃষ্টি হবেই। হঠাৎ ওই দূর পাহাড়ের আড়ালে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল। চমক ভাঙল শঙ্করের। শঙ্কর পা-চালিয়ে হাঁটল। কিন্তু পাহাড়ি পথে তো আর আস্তব্যস্ত হয়ে হাঁটতে পারে না কেউ, তাই শঙ্কর বুঝতেই পারে ঘরে যেতে যেতেই আকাশ ভাঙবে। সে ভিজবে।
হ্যাঁ, আকাশ ভাঙল ঠিকই। তবে বৃষ্টি নয়, আকাশ ভেঙে শিল পড়তে শুরু করল। না দাঁড়িয়ে আর শঙ্করের উপায় আছে। একটি তেমন শিল যদি মাথায় এসে পড়ে, তবে আর দেখতে হবে না বাছাধনকে। অগত্যা সে সামনের ছাউনিটার নীচে তড়বড় করে ঢুকে পড়ল। শঙ্কর ঢুকতে-না-ঢুকতেই তার পেছনে আরেকজনও ঢুকে পড়ল। শঙ্কর পিছু ফিরে তাকে দেখার আগেই সে ডাক দিল, —শঙ্কর না?
শঙ্কর চকিতে ফিরে তাকাল।
—কোথা গেছলি?
শঙ্কর হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল এখানেও সেই রাজুকাকা। মুখখানা ব্যাঙের মতো করে হাসছে। শঙ্কর কোনো উত্তর দিল না। মুখটা ঘুরিয়ে নিল। মনে মনে ভাবল, তবে কি আপদটা অনেকক্ষণ ধরে তার পিছু নিয়েছে!
রাজুকাকা নিজের মাথার টোপিটা ঝটপট খুলে ফেলে চটপট বরফের টুকরোগুলো ঝেড়ে ফেলে দিল। আবার টোপিটা মাথায় বসাতে বসাতে বলল, কী রে, কী জিজ্ঞেস করলুম শুনতে পেলি না?
শুনতে পেয়েছি। একটু ব্যাজার হয়েই উত্তর দিল শঙ্কর। তারপর বলল, আমি কোথায় গেছি, সেটা তো তোমার শোনার কোনো দরকার নেই। আর তা ছাড়া মনে হচ্ছে তুমি তো সবই জানো।
—বাহঃ! তুই ছেলেটা কালকের হলে কী হয়, তোর তো দেখি বেশ আক্কেল-বুদ্ধি হয়েছে। বলে একটুকরো দেঁতোহাসি ঠোঁটের ফাঁকে খেলিয়ে দিল।
গা-পিত্তি জ্বলে গেল শঙ্করের সেই হাসি দেখে। সে রেগে প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, তুমি শুধুমুধু আমার সঙ্গে গায়ে পড়ে ঝগড়া করছ কেন? কেন তুমি আমার পিছু নিয়েছ?
—বেশ করেছি। যত জোরে শঙ্কর চেঁচিয়েছিল, তার চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে কড়কে উঠল রাজুকাকা। জিজ্ঞেস করল, তুই মহাদেব দোকানিকে আমার নামে কী বলেছিস?
তোমার নামে বলতে আমার বয়ে গেছে। আমি কিছু বলিনি। সাফ সাফ জবাব দিল শঙ্কর।
তুই আমাকে আস্ত মিথ্যুক বলিসনি? রক্তবর্ণ চোখ দুটি ড্যাবড্যাব করে জিজ্ঞেস করল রাজুকাকা।
তুমিই-বা আমার নামে কেন মিথ্যে বলেছ? কেন বলেছ, আমি তোমার গায়ে হাত তুলেছি? রাজুর সমান চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল শঙ্কর।
—যা:! এখান থেকে ভাগ। শঙ্করের কথার কোনো উত্তর না দিতে পেরে রাজু রেগে এক ধাক্কা মারল শঙ্করকে। শঙ্কর টলতে টলতে সেই ছাউনির নীচের থেকে একেবারে রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল।
তখন অবশ্য শিলার তোড়টা কমে ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এই শীতে, এই বৃষ্টিতে একমাত্র যে পাগল সে-ই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজতে পারে। সুতরাং শঙ্কর ছুট্টে আবার ছাউনিতে আশ্রয় নিল। এবার কিন্তু সে তার রাগটাকে সামলে রাখতে পারল না। সে সটান রাজুকাকার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে প্রাণপণে চিৎকার করে বলল, কেন ভাগব আমি? এটা কি তোমার কেনা জায়গা? কেন তুমি বার বার আমার গায়ে হাত তুলবে? গাজোয়ারি করবে অন্য লোকের সঙ্গে? এতগুলো কথা একসঙ্গে রাজুর মুখের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে শঙ্কর এতটুকু পরোয়া করল না।
অথচ অবাক কান্ড, রাজু নামে ওই লোকটা কিন্তু শঙ্করের এই তর্জন-গর্জন শুনেও একটি কথা বলল না। বেমালুম হজম করে গেল। কিন্তু তার বুকের ভেতরটা যে অপমানের খোঁচায় দারুণ খচখচ করছে, সে তার নিশ্বাসের ফোঁসফোঁসানি শুনে আর চোখের কটমটানি দেখেই বোঝা যায়।
রাজুর মুখে কোনো বাদপ্রতিবাদ না শুনে শঙ্করের আরও সাহস বেড়ে গেল। দুম করে সে বলে বসল, ফের যদি তুমি আমার সঙ্গে লাগো, জেনে রেখো আমিও পড়ে পড়ে মার খাব না। কী করতে হয় সে আমার জানা আছে। বলতে বলতে শঙ্কর সেই ছাউনির তলা থেকে বেরিয়ে পথে নেমে পড়ল। তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টিও থেমে গেছে। এমনকী দূরের আকাশটা ঝরঝরে নীল রঙে ঝিকমিক করছে। শঙ্কর দূরের ওই নীল আকাশটাই দেখতে দেখতে হাঁটল। আর পিছু ফিরল না। দেখল না, রাজুকাকা আবার তার পিছু নিয়েছে না দাঁড়িয়ে আছে।
ঘরেই ফিরে গেল শঙ্কর। পাহাড়ের ঢালুতে এই শূন্য ঘরে এখন শঙ্কর একলা। একলা তার মনটাও। কার সঙ্গেই-বা কথা বলবে সে! কার কাছে তার মনের সব ব্যথা উজাড় করে বলে ফেলবে! ঘরের চারপাশের চার দেওয়ালে তার চোখের দৃষ্টি শুধু আঁতিপাঁতি করে ঘুরে যায়। সে আর কোনোদিনই এই ঘরে তার মাকে দেখতে পাবে না, দেখতে পাবে না তার বাবাকেও। তারা কেউই তার নাম ধরে আর ডাকবে না কোনোদিনই। আদর করে বলবে না শঙ্কর সকাল হয়ে গেছে, উঠে পড়।
মা যখন তাকে এমন করে রোজ ডাকত, সে-ডাক শোনার সঙ্গেসঙ্গে কোনোদিনই শঙ্কর বিছানা ছেড়ে উঠত না। বাব্বা, যা শীত! সে লেপটাকে গায়ের সঙ্গে বেশ করে লেপটে এপাশ থেকে ওপাশে ঘুরে শুত। মুখে শব্দটি পর্যন্ত করত না। ঘাপটি মেরে পড়ে থাকত। তারপর মা যখন কাছে এসে শঙ্করের মাথায় হাত দিয়ে মিষ্টি করে বলত, বাবা, উঠে পড়ো! অনেক বেলা হয়ে গেছে। তখন শঙ্কর মুখে উঃ-আঃ করতে করতে উঠে পড়ত। হাত-পাগুলো টান টান করে আড়ামোড়া ভেঙে মনে মনে বলত, দুর ছাই, ঘুমের রাতটা যে কেন এত জলদি-জলদি ফুরিয়ে যায় কে জানে! এক-একদিন এমন হয়, অনেক রাত অবধি ওর চোখে ঘুমই আসে না। বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়ে আর শঙ্কর অনেক রাত অবধি একাই জেগে শুয়ে থাকে। তখন হাজারটা ভাবনা শঙ্করের মাথায় এসে ওর চোখের পাতার ঘুম কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। সে-ভাবনার কী যে সব মানে, সে নিজেও জানে না। নিঝুম রাতের অন্ধকারে কত মানুষের মুখের ছবি যে তার চোখে ভেসে উঠত! সেইসব মানুষের মুখের ছবি, যারা বেড়াতে আসে এই পাহাড়ে। তাদের কোথায় দেশ, কত দূরে, জানে না শঙ্কর। তাদের মুখের ভাষাও বোঝে না শঙ্কর। তাদের পোশাকও নয় তেমন, যেমন শঙ্করের।
অথচ খুশি হলে শঙ্কর যেমন করে হাসে, তারাও হাসে ঠিক তেমনি করে। দুঃখ হলে শঙ্করের চোখে যেমন করে জল গড়ায়, তেমনই করে তারাও কাঁদে। তবুও তারা কেউ কাউকে আপন ভাবে না। একে অন্যকে ঘৃণা করে। হিংসা করে। যে মানুষের গায়ের রং ফর্সা তারা দেখতে পারে না কালো মানুষকে। দেখতে পারে না এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষকে। কেন? ভেবে পায় না শঙ্কর। ভেবে পায় না মানুষে মানুষে কেন এত ঝগড়া! মানুষের সঙ্গে মানুষকে কে এমন আলাদা করে দিল! কই, তারা তো এক দেশের মানুষের সঙ্গে আরেক দেশের মানুষের হাসিকে আলাদা করতে পারেনি! পারেনি দুঃখকে আলাদা করতে!
এমনই সব কতই-না উদ্ভট ভাবনা ভাবতে ভাবতে জেরবার হয়ে যায় শঙ্কর। তবুও সে কোনোই উত্তর পায় না। তারপর এইসব ভাবনাগুলো যখন আপনাআপনি তার মনের মধ্যে হারিয়ে যায়, তখনই সে ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুমের ঘোরে শঙ্কর এখনও মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে সেই ইংরেজ সাহেবের। সেই সাহেব বউ-ছেলেকে নিয়ে এই পাহাড়ে বেড়াতে এসেছিল। ছেলেটা আর কত বড়ো হবে, ধরো বছর-চারেকের মতো। বেশ ক-দিন পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে একদিন সাহেব-মেমের শখ হল জঙ্গল দেখতে যাবে। তা যখন শখ হল, তখন যেতেই হয়। পাথর টপকাতে টপকাতে বউ-ছেলেকে নিয়ে সাহেব জঙ্গলে চলল। সঙ্গে নিল ব্যাগ-ভরতি করে এত এত খাবার। ইচ্ছে ছিল ওই ওপরের জঙ্গলে গিয়ে একটা ছোটোখাটো পিকনিক করে ফিরে আসবে। কারণ, তখন সেই সময়টা পিকনিকেরই সময়। হাড়-কাঁপানো শীত নেই তখন। বসন্ত যাই যাই করছে। তুষারঝঞ্ঝার ভয় নেই। আকাশ একেবারে সাফসুতরো। সূর্য প্রাণ ভরিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। মেম-সাহেবও যতই ওপরে উঠছে রোদের তাপে ততই ঝিমিয়ে পড়ছে। সাহেবের তো আরও মুশকিল। কেননা, ছেলেটাকে তো আর মেম কোলে নিয়ে পাহাড়ে উঠতে পারবে না। তার ভার তো সাহেবকেই নিতে হবে। তাও কী, যতক্ষণ পেরেছে তারা ছেলেটাকে পাথরে পাথরে হাঁটিয়েছে। কিন্তু ওই পুঁচকে ছেলে আর কতক্ষণ পাথর ডিঙোবে! অগত্যা ছেলেকে কাঁধে নিতে হল বাপকেই। কিন্তু ছেলেকে কাঁধে নিয়ে পাথর টপকিয়ে পাহাড়ে ওঠা যে কী দুঃসাধ্য কাজ, তা সে যে জানে সেই বলতে পারবে। তবে হ্যাঁ, এই পাহাড়ের মানুষ হলে সে অন্য কথা। সুখনের মায়ের কথা তো আর আমরা ভুলে যাইনি। জঙ্গলে কাঠ কাটতে যেত সুখনকে সঙ্গে করে কাঁধে চাপিয়ে। সে তাদের অভ্যেস আছে। জন্ম থেকেই এদেশের মানুষের সঙ্গী হল পাহাড়। দিনরাত উঠছে-নামছে। পাহাড় তাদের স্বভাব-ধর্মে। সাহেব আর সে-ধাত পাবে কোত্থেকে! সুতরাং, সাহেব তার ছেলেকে কাঁধে নিয়ে চড়াই-উতরাই করতে করতে যায় আর কী! সাহেবের এমন তেষ্টা পেয়ে গেল, একটু জল গলায় না-দিলেই নয়। তবে একটা সুবিধে এই, জঙ্গলে উঠতে উঠতে অনেকগুলো ঝরনা চোখে পড়ে। সেই ওপর থেকে ঝিরঝির করে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসছে নীচে। তারপর নদীর জলে লাফিয়ে পড়ে নদী হয়ে ছুটে যাচ্ছে। সাহেব দাঁড়াল। ছেলেটাকে কাঁধ থেকে নামাল। জলের দিকে হাত বাড়াল। তা ধরো, সাহেব যেখানে দাঁড়াল, সেখানে পাহাড়ের কিনারা থেকে ঝরনাটা একটু তফাতে। মানে একটু ঝুঁকে হাত না বাড়ালে জলের নাগাল পাওয়া খুব মুশকিল। সাহেবের পাশে মেমসাহেবও দাঁড়াল। মেমসাহেব নিজের ছেলেকে একহাতে আগলে, আর একহাতে সাহেবের জামাটাকে টেনে ধরে রাখল। যেন সাহেব না ফসকে পড়ে যায়। কিন্তু হলে কী হবে। এদিকে যে চোপরদিন ঝরনার জলের ছিটে পড়ে পড়ে পাথরে শ্যাওলা ধরে গেছে! সাহেব কিন্তু সেসব তোয়াক্কাই করল না। কিন্তু হল কী, সাহেবের পা পড়ল তো পড়ল সেই শ্যাওলার ওপরেই! ব্যাস, সড়াত! পা হড়কে একেবারে নীচে, গভীর খাদে। এদিকে খাদ যতই নীচের দিকে নেমে গেছে, তার গায়ে গায়ে ততই সব দেওদার গাছের সারি। এখন সাহেব তো পড়লই, কিন্তু এমনই ভাগ্য, তাকে সামলাতে গিয়ে সঙ্গে পড়ল মেমসাহেবও। অবাক কান্ড, ছেলেটা গেল বেঁচে। সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। এদিকে সাহেব আর মেম পাথরের ওপর ধাক্কা খেতে খেতে দু-দিক দিয়ে দু-জনে গড়াতে লাগল। সাহেবের মাথার টুপি, পায়ের জুতো খুলেমুলে একশা। তবে সাহেব বেশ খানিকটা গড়িয়ে একটা গাছের গুঁড়িতে মারল এক ধাক্কা। আটকে গেল। কিন্তু তার মেম পড়ল গিয়ে আরও খানিকটা দূরে একটা পাথরের খাঁজে। ওই না দেখে চিল-চেঁচিয়ে উঠল তাদের ছেলেটা। সে তো পুঁচকে। সে বিপদের কথা অতশত কী বুঝবে! সে মাম্মা, পাপ্পা করে চ্যাঁচাতেই লাগল। কিন্তু তার কান্না শুনে তার পাপ্পাও এল না, মাম্মাও এল না। আর পাহাড়ের ওই অত ওপরে তার কান্নার সঙ্গে ঝরনার শব্দ এমন একাকার হয়ে গেল যে, তার কান্না কেউ শুনতেও পেল না। কিন্তু সাহেব আর মেমের যে কী অবস্থা হল সেও জানা গেল না।
এদিকে আর এক বিপদ। হল কী, ছেলেটা কাঁদতে কাঁদতে যখন দেখল তার মা-বাবা কেউই উঠে আসছে না, তখন ভয়ে সেও ঘাবড়ে গেছে। মা আর বাবার কাছে যাবার জন্যে একবার এই পাথরে পা দেয়, একবার ওই পাথরে। কিন্তু পা ফসকালেই যে বিপদ সে আর অতটুকু ছেলে কী বুঝবে! হলও কি ঠিক তাই! ছেলেটা আচমকা পা ফসকাল। যেই ফসকাল অমনি সেও ঘষতে ঘষতে নীচে গড়াল। কিন্তু এমনই ভাগ্য, ছেলেটার বাবা যে-গাছটার নীচে আটকে পড়েছিল, ছেলেটা সটান ওপর থেকে নীচে গড়িয়ে খাদের গায়ে সেই গাছটার একটা ডালে আটকে গেল। আর এমন আটকান আটকাল যে, ডাল টপকে সেখান থেকে তার পড়ে যাওয়ার আর উপায় থাকল না। ছেলেটা গাছের ডালে আটকে চিল-চেঁচিয়ে কাঁদতে লাগল। মানে ছেলেটার বাবা গাছের নীচে গুঁড়িতে আটকে পড়ে আছে, আর ছেলেটা সেই গাছেরই ডালে লটকে কেঁদে চলেছে। বোঝা গেল ছেলেটার বাবার জ্ঞান নেই। জ্ঞান থাকলে তো মানুষটা তার ছেলের কান্না শুনে নিশ্চয়ই তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করত। হেলপ, হেলপ বলে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করার শক্তি না থাকলেও, নিদেন ছটফটও তো করত। যেন মড়ার মতো পড়ে আছে।
বলব কী, পাহাড়ের খাদে পড়ে-থাকা মানুষগুলোর এই দুর্ঘটনার কথা সকাল থেকে সারাটা দিন কেউ জানতেও পারল না। এমনকী দিন গড়িয়ে রাত কাটল, তবুও কারও খেয়াল হল না। এদিকে যখন সারারাত মানুষগুলো হোটেলে ফিরল না, তখন শুরু হয়ে গেল হইহই কান্ড। থানা-পুলিশ থেকে আরম্ভ করে সবাই শুরু করে দিল খোঁজ-তল্লাশি। এমনকী সেই মতলববাজ রাজু পর্যন্ত পাহাড়ের ঘাঁতঘোঁত ঢুঁড়ে বেড়াতে লাগল। ওই অত বড়ো পাহাড়ের কোথায় যে হারিয়ে গেছে মানুষগুলো, সে বার করা তো আর মুখের কথা নয়। সুতরাং সারাদিন ধরে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কেউ তাদের হদিশ করতে পারল না। কিন্তু খুঁজে পেল শঙ্কর।
পাহাড়ের ওপরে ওই জঙ্গলে যাওয়া যায় অনেকগুলো রাস্তা দিয়ে। সেদিন যে-রাস্তাটা দিয়ে সাহেবরা ওপরে উঠছিল, সে-রাস্তাটা ছিল সবচেয়ে দুর্গম। ঠিক সেদিন সেই দুর্গম রাস্তাটা দিয়েই শঙ্কর ওপর থেকে নীচে নামছিল। সে মেমকে দেখেছিল, সাহেবকে দেখেছিল, সাহেবের কাঁধে তাদের ছেলেকেও দেখেছিল। ছেলেকে দেখে শঙ্কর খুশি হয়ে একটু মুচকি হেসেছিল। এমনকী তার পেটটা একটু টিপে আদর করে বলেছিল হ্যাল্লো। সাহেবের বউ শঙ্করের ইংরেজি শুনে খুব খুশি হয়ে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিল, হ্যাল্লো, হোয়াটস ইয়োর নেম?
—শঙ্কর। উত্তর দিয়েছিল সে।
সুতরাং শঙ্কর সেদিন কাউকে কিছু না বলে ওই দুর্গম পথে একাই চলে গেল। সন্ধান শুরু করে দিলে। সন্ধান করতে করতে শঙ্করের প্রথম যেটা নজরে পড়েছিল, সেটা হল মেমসাহেবের টুপিটা। লাল রঙের সেই টুপিটা নজরে পড়ে যেতেই শঙ্কর শিউরে ওঠে। তখনই তার অনুসন্ধানী চোখ দুটো আঁতিপাঁতি করে এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল। তার বুঝতে কষ্ট হল না, এখানেই সেই অঘটন ঘটেছে। সে আর সময় নষ্ট করল না। সেই লাল রঙের টুপিটা লক্ষ করে সে খাদের ঢালুতে খাড়াই একটা পাথরের ওপর লাফ দিল। পাথরটা ভয়ংকর এক বিপজ্জনক অবস্থায় পাহাড়ের গায়ে আটকে আছে। একটু যদি এদিক-ওদিক পা পড়ে যায় শঙ্করের, কেউ তাকে বাঁচাতে পারবে না। একদিকে ঝরনা সটান লাফিয়ে পড়ছে নীচে, আর একদিকে ভয়ংকর ঢালু খাদ। ওদিকে যদি তুমি টলে পড়ো, তবে ঝরনার তোড়ে তুমি ভেসে যাবে। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে তোমার হাড়গোড়গুলো। আবার যদি এদিকে পাথরে পা ফসকে যায়, তবে ছিন্নবিচ্ছিন্ন দেহটা তোমার খাদের কোনখানে যে গিয়ে পড়বে, তার কিছু ঠিক নেই। কিন্তু শঙ্কর পাহাড়ি ছেলে। পাহাড় ওর মজ্জায় মজ্জায়। পাহাড় ওর বন্ধু। এই বন্ধুর সঙ্গে দিনরাত ও খেলা করছে। পাহাড়কে শঙ্কর ভয় পাবে কেন! সুতরাং পাথরের ওপর লাফিয়ে পড়েই শঙ্কর মেমসাহেবের লাল টুপিটা হেঁট হয়ে তুলে নিল। সঙ্গেসঙ্গে চমকে উঠল শঙ্কর। তার চোখে যেন ধাঁধা লেগে গেছে। তার মনে হল যেন একটু নীচে ওই গাছটার ওপরে একটা বাচ্চা ছেলে আটকে আছে—লুটিয়ে পড়েছে। আর দোনোমনো করল না শঙ্কর। ঝটপট লাফ দিল এখান থেকে সটান ওই গাছটার ওপর। হুড়মুড় করে পড়ল গাছের ঘাড়ে। পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ঝুলে পড়ল একটা ডাল ধরে। তারপর এ-ডাল থেকে ও-ডালে লাফিয়ে সিধে ছেলেটার কাছে। না, ছেলেটার জ্ঞান নেই। তৎক্ষণাৎ গাছের নীচে তার চোখ পড়ে গেল। দেখল গাছের নীচে সাহেব আটকে পড়ে আছে, ছটফট করছে। কিন্তু শঙ্কর গাছ থেকে ছেলেটাকে নিয়ে নামবে কেমন করে! সে অনেক মেহনত করে বাচ্চা ছেলেটাকে গাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চ্যাঁচাল, মিস্টার, লুক, আপ আপ!
সাহেব ছটফট করতে করতে কেমন যেন চমকে উঠল। তারপর তড়বড় করে উঠতে গিয়ে আবার লুটিয়ে পড়ল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসে এদিক-ওদিক দেখতে লাগল ফ্যালফ্যাল করে। তার সারাশরীরে রক্ত, কাটা-ছেঁড়ার চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে মাথাটাও কেটেছে। কিন্তু যেমন তার পুরুষ্টু চেহারা, তেমনই তার গায়ের রং। দেখলে অনেকক্ষণ চোখ ফেরাতে পারবে না। সাহেব গাছের গুঁড়িটা ধরে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল। শঙ্কর আবার —লুক আপ, আপ বলে ছেলেটাকে দু-হাত দিয়ে বাগিয়ে ধরে গাছের ওপর দুলতে লাগল। গাছের ডাল-পাতা ঝমঝম করে নড়ে উঠতেই সাহেব চমকেওপরেই তাকাল। দেখতে পেল শঙ্করকে। দেখতে পেল শঙ্কর তার ছেলেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে তার দিকে চেয়ে আছে। সাহেব তাই দেখে প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, —মাই সন, মাই সন!
শঙ্কর আবার গাছের ওপর থেকে চ্যাঁচাল, ভয় পাবেন না সাহেব, আপনি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন। আমি আপনার ছেলেকে নিয়ে নীচে যাচ্ছি। বলে, ওইটুকু ছেলে শঙ্কর পাকা ওস্তাদের মতো এ-ডাল ও-ডালে পা দিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে নীচে নামতে লাগল। আর গাছের তলা থেকে সাহেব বুকের ধুকপুকুনি সামলে অসহায়ের মতো সেই ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে লাগল।
বাহাদুর ছেলে শঙ্কর। এতটুকু ঘাবড়াল না সে। ছেলেটাকে সামলে ঠিক গাছের ওপর থেকে নীচে নেমে এল। তারপর সাহেবের ছেলেকে সাহেবের কোলে দিয়ে হাঁকপাঁক করতে করতে খাদের ওপর থেকে উঠে এল রাস্তায়। হাঁক পাড়তে পাড়তে ছুটতে লাগল। তার হাঁক শুনে যে যেখানে ছিল ছুটে এল সেইখানে। তারপর শুরু হয়ে গেল উদ্ধারের কাজ। যদিও মেমসাহেব খাদের সেই একেবারে নীচে পড়ে গেছিল। জ্ঞান ছিল না, মাথা ফেটে রক্তারক্তি কান্ড ঘটে গেছিল, তবুও বেঁচে গেছিল মানুষটা। তবে তার জন্যে ডাক্তারবাবুদের মাথার ঘাম কি কম ঝরেছে! তবে মেমসাহেবকে একটি হাত খোয়াতে হয়েছিল। ভেঙে গেছিল একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে। তিন জনকে ক-দিন হাসপাতালে রেখে একটু সুস্থ করে ছুটি দেওয়া হয়েছিল। তারপর তারা সাগরপারে নিজের দেশে ফিরে গেছিল। কিন্তু যাবার আগে শঙ্করের বাবার কাছে শঙ্করের জন্যে কত যে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল চোখের জল ফেলতে ফেলতে! তারা বলে গেছিল, তোমাদের এই সাহসী ছেলে একদিন বড়ো হবেই হবে। আর কবুল করে গেছিল, শঙ্করের জন্যে তারা যা করতে বলবে, সাহেব তাই করতে রাজি আছে। এমনকী শঙ্করকে বিদেশে নিয়ে যেতেও চেয়েছিল। কিন্তু শঙ্কর কেমন করে যাবে। এই তার দেশ। এই পাহাড়, এই নদী, এই ঝরনা, গাছ-পাথর-আকাশ এই তো তার ভালোবাসার জগৎ। আর এই জগতের শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা তার মা আর বাবা। সুতরাং শঙ্কর এসব ফেলে সাহেবের সঙ্গে বিদেশে যায়নি। কিন্তু সাহেব যখন ভালোবেসে শঙ্করকে এত এত টাকা বকশিশ দিতে চেয়েছিল, সে-টাকাও শঙ্করের বাবা-মা হাত পেতে নেয়নি। তারা বলেছিল, টাকা নয় সাহেব। তোমরা এই যে আমাদের ছেলেকে ভালোবেসেছ এর চেয়ে বড়ো ইনাম আর কী আছে। তোমাদের শুভেচ্ছায় আমাদের ছেলে যেন অনেক লেখাপড়া শিখতে পারে। মানুষের মতো মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। এর বেশি আমরা আর কিছু চাই না।
সাহেবরা ফিরে গেছিল দেশে ক-দিন পরেই। যাবার আগে কত বার যে শঙ্করকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল সাহেব! সেই আলিঙ্গনের স্পর্শ শঙ্কর এখনও অনুভব করে। আর মাঝে মাঝে সাহেবের সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা ভাবে। ছেলেটার কথা মনে পড়লেই মনটা যেন কেমন করে শঙ্করের। ছেলেটার নামটাও ছিল ভারি সুন্দর, সুইট। ঝকঝকে নীল দুটো চোখ। একঝাঁক সোনালি চুল মাথায়। আর টুকটুকে লাল ঠোঁটে তার যখন হাসিঝলসে উঠত, মনে হত ক-মুঠো আলো যেন ঠিকরে পড়ছে। সত্যিই ভারি মিষ্টিছেলেটা।
সেদিন সারাটা বেলা ঘর থেকে আর বেরোল না শঙ্কর। ঘরে বসে বসে ওই সাহেবের কথাই আজ বার বার মনে পড়ে গেল তার। খিদে তার পেয়েছিল, কিন্তু সে-খিদে তাকে কাহিল করতে পারল না। মনটাকে শক্ত করে সে রাতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। তারপর নিজেরই অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ল বিছানায়।
হঠাৎ যখন শঙ্করের ঘুম ভেঙে গেছিল, তখন রাত্তির নেমে এসেছে। সে প্রায় ধড়ফড় করেই উঠে পড়ল। তবে কি এখন রাত অনেক। রাতের আকাশটা দেখার জন্যে চটপট সে ঘরের দরজাটা খুলে ফেলল। সত্যি, বাইরে কী ভীষণ ঠাণ্ডা। একঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া হুস হুস শব্দে ঘরে ঢুকে পড়তেই হিহি করে শিউরে উঠল শঙ্কর। এক ঝটকায় সে আবার ঘরে ঢুকে পড়ল। তাড়াতাড়ি কানঢাকা টুপিটা মাথায় দিয়ে কোটটা গায়ে চড়াল। ঘর থেকে বেরিয়ে এল। এখন সে শীতের ভয়টাকে থোড়াই কেয়ার করে। আকাশের দিকে চাইল সে। একটি-দুটি নয়, এখন অসংখ্য তারা আকাশ ভরিয়ে জ্বলে উঠেছে। না, খুব বেশি রাত হয়নি মনে হয়। কেননা, দূরে দূরে এখনও শোনা যাচ্ছে মানুষের কন্ঠস্বর। দেখা যাচ্ছে লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোর রোশনি। সুতরাং এখনই শঙ্করকে যেতে হবে আবদুলচাচার বাড়ি। তা না হলে ওই দুটো বুড়োমানুষকে শুধু শঙ্করের জন্যেই অনেকক্ষণ বসে থাকতে হবে। সে আবার ঘরে ঢুকল, পায়ে জুতোটা গলিয়ে নিয়ে আবার বেরিয়ে এল। ঘরের চাবিটা তালায় লাগাবার জন্যে সবে তৈরি হয়েছে, অমনি ঘটে গেল সেই ভয়াবহ কান্ড! হঠাৎ ঘরের আড়াল থেকে অনেকগুলো হিংস্র হাত একসঙ্গে ধেয়ে এসে শঙ্করকে চেপে ধরল। ওকে একেবারে কাবু করে ফেলল। ওরই মধ্যে একজন ঝপ করে একটা শক্ত কাপড় দিয়ে ওর চোখটা বেঁধে ফেলতেই শঙ্কর দেখতেও পেল না কারা তারা। তারপর মুখটা কষে বেঁধে দিতে, শঙ্কর মুখে শব্দটি পর্যন্ত করতে পারল না। সবশেষে শঙ্করের হাত দুটো পেছনে এনে এমন টেনে বেঁধে দিল যে, হাত দিয়ে যে সে মুখের বাঁধন কিংবা চোখের ঠুলি খুলে ফেলবে, তার উপায়ই রইল না। আর সেইজন্যে শঙ্কর জানতেও পারল না, এইমাত্তর এই অন্ধকার রাতে যারা লুকিয়ে চোরের মতো এসে তাকে পর্যুদস্ত করে ফেলল, তারা নি:শব্দে তার ঘরটাও লুঠ করে পালাল। যে-বাক্সটায় মায়ের টাকাপয়সা, কাপড়চোপড় ছিল, সেটাও নিতে তারা ভুল করল না। কোথা দিয়ে এল তারা, আর কোথা দিয়েই-বা চলে গেল, তার কিছুই জানতে পারল না শঙ্কর। শঙ্করের মুখ-চোখ-হাত সবই বাঁধা। শুধু পা দুটি তার সচল। সুতরাং শঙ্কর হাঁটতে পারলেও পা ফেলতে সাহস পাচ্ছে না। কারণ কোনদিকটা ঢালু, কোথায় গর্ত আর কোথায় পাথর, সে কিছুই আন্দাজ করতে পারছে না। সে জানেও না লোকগুলো তাকে কোথায় টেনে এনেছে হ্যাঁচকাতে হ্যাঁচকাতে। চোখবাঁধা অবস্থায় অন্ধের মতো চলতে গিয়ে পাহাড়ের ঢালুতে যদি পা ফসকায় তবে তাকে আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। কাজেই অসহায়ের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া শঙ্করের আর গতি নেই। বলতে কী, লোকগুলো এমনই পিশাচ যে, তার মাথার টুপিটা পর্যন্ত খুলে ফেলে দিয়ে গেছে। খোলা আকাশের নীচে এই অবস্থায়, এই শীতে বেশিক্ষণ থাকলে যে শঙ্করের গায়ের রক্ত হিম হতে বেশি সময় নেবে না, সে তো যে-কেউ হলপ করে বলতে পারে। অথচ মজা এই, লোকগুলো তার গায়ে একটু আঁচড়ও কাটেনি। তাকে ফেলেও দেয়নি এই ওপর থেকে খাদের নীচে। তারা ইচ্ছে করলে যা-খুশি তাই করতে পারত। এমনকী শঙ্করকে মেরে ফেললেও কেউ জানতে পারত না। তবে লোকগুলো যে ভীষণ ধড়িবাজ, সে তাদের বুদ্ধি দেখেই বোঝা যায়। কেননা তারা জানে এই শীতের রাতে প্রচন্ড ঠাণ্ডায় সে কোথাও পালাতে পারবে না। দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তাকে এইখানেই। এই ঠাণ্ডায় শঙ্করের বুকের রক্ত যতই জমাট হয়ে আসবে, ততই যন্ত্রণায় ছটফট করতে হবে তাকে। ছটফট করতে করতে সে নিজেই গড়িয়ে পড়বে ওপর থেকে নীচে। তারপর নিজেই মরবে পাথরের ওপর ঘষটাতে ঘষটাতে।
শঙ্কর চমকে ওঠে। ভয় পায়। মনে মনে ভাবে লোকগুলোর মাথায় হয়তো এই কুমতলবটাই খেলা করেছে। কিন্তু কার বুদ্ধি এমন ক্রূর! কোন নৃশংস করল এমন কাজ? শঙ্করের মাথায় তখন একটি দুর্জনের কথাই বার বার ভেসে এসেছে। সে ওই রাজুকাকা। সে ছাড়া এ বুদ্ধি আর কারও হতে পারে না। সে এমনই করেই শঙ্করের ওপর বদলা নিতে চায়। কিন্তু বদলা নিতে দেবে না শঙ্কর। কিছুতেই না! শঙ্করের বুকটা ফুলে ওঠে সাহসে। তার সারাশরীরে কেমন যেন একটা শক্তি ঢেউ খেলে যায়। সে মনে মনে ফুঁসে ওঠে, না, সে মরবে না। কিছুতেই মরবে না। মরবার আগে অন্তত রাজুকাকার মতো লোকটাকে সে এক বার দেখে যাবে। তাকে বলে যাবে, সে অসহায়ের মতো মরতে জানে না। সেও জানে রাজুর মতো মতলববাজদের কেমন করে শায়েস্তা করতে হয়।
কিন্তু এই মুহূর্তে সে কী করবে! এই যে সে এক ভয়ংকর বিপদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, এই বিপদ থেকে সে এখন কেমন করে নিস্তার পাবে। শঙ্করের বুকের ভেতরটা ভীষণ আক্রোশে যতই ছটফট করে উঠছিল, ততই যেন বুকের সাহসটা তার উছলে পড়ছিল। শঙ্কর আর এক মুহূর্তও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। সে জানে এই রাতের অন্ধকারে কেউ আর ঘর থেকে বাইরে বেরোবে না। কেউ তাকে দেখতেও পাবে না। তার সাহায্যে এগিয়েও আসবে না। সুতরাং যা করার তাকে একলাই করতে হবে। কিন্তু কী যে করবে সে, নিজেও জানে না। অগত্যা অত্যন্ত সাবধানে সে একটি একটি পা ফেলল। শঙ্কর এখন একেবারে অন্ধ, বলা যায় ঠুঁটোও। কারণ তার চোখও আঁটা, হাতও পিছমোড়া করে বাঁধা। তাই অন্ধের মতো হাত বাড়িয়ে সামনেটা পরখ করে দেখারও যেমন তার উপায় নেই, তেমনই নিজের নসিবের ওপর নির্ভর করা ছাড়া তার এখন কোনো পথও নেই। সুতরাং অত্যন্ত সন্তর্পণে শঙ্কর একটি করে পা ফেলছে আর মনে মনে ভাবছে, এই বুঝি ডিগবাজি খেল সে। এই মারাত্মক বেজুত অবস্থায় তার প্রথম কাজ নিজের ঘরের দরজাটা খুঁজে বার করা। কিন্তু এখন যেদিকে সে পা ফেলছে সেইদিকেই তার ঘরের দরজা কিনা, কে জানে? সুতরাং বলতে পারি, প্রায় প্রাণটি হাতে নিয়েই সে এক দুঃসাধ্য চেষ্টা করছে নিছক আন্দাজে। শঙ্করের এখন হঠাৎ মনে পড়ে গেল লোকগুলো যখন পেছন থেকে তাকে জাপটে ধরেছিল, ঠিক তখনই তার হাত থেকে ঘরের চাবিটাও ছিটকে পড়ে গেছিল। ঘরে তালা পর্যন্ত সে দিতে পারেনি। এখন ঘরের সেই চাবি সে যে আর খুঁজে পাবে না, সে তো শঙ্করের জানাই।
এই-ই—! দাঁড়াও, দাঁড়াও!
কেন কী হল?
ইস, আর একটু হলেই পড়েছিল শঙ্কর। সামনের পা-টা তার বেমক্কা পিছলে গেছিল। যাক, এ-যাত্রা সে বেঁচে গেল। ভাগ্যিস তার পায়ে জুতো ছিল। এ জুতো পায়ে দিলে খুব-একটা খাড়াইয়ে পা না পড়লে তেমন ভয় নেই। কিন্তু খাড়াই তো এদিক-ওদিক সব দিকে, পড়বে না যে কে বলতে পারে! ওই যে সামনে খাদটা দেখতে পাচ্ছ, ওটা কী মারাত্মক বিপজ্জনক বলো! বাবা-মা থাকতে শঙ্কর ঘর থেকে রোজ যখন বাজার যেত, তখন ওই খাড়াইটা তাকে প্রায় ছুটে নামতে হত। একটু অন্যমনস্ক হলে আর দেখতে হবে না, একদম গড়াতে গড়াতে ব্যাস—কম্মসারা! তা হলেই বলো, এখন শঙ্কর চোখেও দেখছে না, হাতও নাড়ছে না। সুতরাং পা ফসকালে সে যে একটা কিছু চট করে ধরে ফেলবে তারও উপায় নেই। তাকে মরতেই হবে।
একী! শঙ্কর যে ওই খাদটার দিকেই যাচ্ছে। ঘর তো তার পেছনে পড়ে রইল। এবার বুঝি সত্যিই তাকে কেউ বাঁচাতে পারল না। দেখছ, আর মাত্র ক-পা গেলেই ছেলেটা মরবে। উঃ, বাবা! গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সারা তল্লাট রাতের অন্ধকারে ঘুটঘুট করছে। তার ওপর শীত। শীতের ভয়ে ঘরে খিল এঁটে এ তল্লাটের মানুষ এখন ঘাপটি মেরে বসে আছে। তুমি গলা ফাটিয়ে চিল্লালেও কেউ তোমার ডাকে সাড়া দেবে না। আর শঙ্করের কথা বলছ? সে চ্যাঁচাবে কী! তার তো মুখটাও বাঁধা! তাই শঙ্কর নামে ছেলেটা ঠিক এই মুহূর্তে মরণের ফাঁদে পা দেবার জন্যে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। শীত কাকে বলে এখন শঙ্কর তা জানে না। ঠিক এই সময়ে কেউ যদি শঙ্করকে দেখতে পায়, তবে সে দেখবে রাতের অন্ধকারে অন্ধের মতো দিনের পাখিরা যেমন আলোর খোঁজে উড়তে উড়তে বিপদে পড়ে, তেমনি বিপদে পড়েছে শঙ্করও।
এই যা:! পড়ে গেল শঙ্কর!
আ-আ-আ। একটা বোবা কান্না ভেসে এল শঙ্করের গলা দিয়ে। ছেলেটা কি তবে সত্যি মরল!
না, শঙ্কর একটা পাথরে হুমড়ি খেয়ে ডিগবাজি মেরেছে।
মাথাটা ফাটল নাকি!
না তো!
তবে?
একটু ভালো করে দেখি এসো তো!
ওরে বাবা! কী বিপদসংকুল অবস্থায় শঙ্কর পাথরটার গায়ে আটকে আছে দ্যাখো! পাথরটাও দ্যাখো কেমন মাথা হেলিয়ে ঝুলছে গহ্বরের দিকে! মনে হচ্ছে এই বুঝি একটা মস্ত আওয়াজ করে পড়ে। কিন্তু অবাক কান্ড! সেই মান্ধাতার আমল থেকে পাথরটা এমনি আলগোছে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ আজ পর্যন্ত কেউ দেখল না সেটাকে একচুল নড়তে। কিন্তু যেদিন নড়বে সেদিন যে কী প্রলয়কান্ড ঘটে যাবে, ভাবলেই গায়ে কাঁটা দেয়।
কিন্তু সে যবে নড়বে তবে নড়বে। এখন যে সেই ঝুলন্ত পাথরটার ওপর শঙ্কর ঝুলে আছে তার কী হবে?
হায় রে! আমরা শুধুমুধু ভেবে মরি, অথচ শঙ্কর যে এমনই একটা কিছুর সন্ধান করছিল, সে তো আর আমাদের জানা ছিল না। যেমন সে তার ঘরের সন্ধান করছিল, সঙ্গে সঙ্গে তেমনই একটা গাছ কিংবা পাথরেরও খোঁজ করছিল। এখন সে পাথরের সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু এই সন্ধান করতে গিয়ে সে যে প্রায় যেতে বসেছিল! একে ভাগ্য ছাড়া তুমি আর কী বলতে পারো! ওই পাথরটার ওপর আলটপকা পড়ে যেতে ভেব না যেন শঙ্করের একটুও লাগেনি। এখন যদি রাতের অন্ধকার না হয়ে দিনের আলো থাকত, তবে তুমি দেখতে ওর কপালটা কেটে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে, আর সে-রক্ত ওর চোখে-বাঁধা কাপড়টা শুষে নিচ্ছে। কিন্তু ওইটুকু ছেলের এমনই হিম্মত যে, সে ওই আঘাত তুচ্ছ করে নিজের চোখের বাঁধনটা আলগা করার জন্যে পাথরে নিজের মুখটা ঘষতে লাগল। একদিকে তার রক্ত ঝরছে, আর একদিকে সে পাথরটাকে সঙ্গী করে বাঁচার জন্যে লড়াই করছে। সে-দৃশ্য দেখলে কার না গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে! কে-না উত্তেজনায় শিউরে ওঠে!
ওই দ্যাখো শঙ্কর জিতে গেছে। পাথরে ঘষতে ঘষতে সে আলগা করতে পেরেছে তার চোখের বাঁধন। দ্যাখো, তার চোখ থেকে দুর্বৃত্তের বাঁধা কালো কাপড়টা শিথিল হয়ে খসে পড়ল। শঙ্কর দু-চোখ ভরে এখন দেখতে পেল। যদিও অন্ধকার, তবুও আন্দাজ করতে এখন তার কোনো অসুবিধে নেই। সে চিনতে পারল কোথায় সে চলে এসেছে। বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। কেননা, সে যে এমন একটা ভয়ংকর পাথর আঁকড়ে এখনও বেঁচে আছে, এ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না শঙ্কর। অবশ্য এখন তার চোখের বাঁধন খোলা। আর অন্ধের মতো পড়ে যাওয়ার ভয় তার নেই। কিন্তু এখনও হাতের বাঁধন সে খুলতে পারেনি। দু-চার বার চেষ্টা যে করল না তা নয়, কিন্তু পারল না। সুতরাং আর সময় নষ্ট করা ঠিক নয়। এবার তাকে ওই পেছনের পাথরটা টপকে যা হোক করে ওপরে উঠতে হবে। এই পাথরটার ওপরে উঠলেই সে তার ঘরখানা দেখতে পাবে। কাজেই সে পাথরের এবড়োখেবড়ো জায়গায় পা রাখবার চেষ্টা করল। হাত নেই, এখন পা-ই তার একমাত্র সম্বল। এই অন্ধকারে এখন তার চোখের দৃষ্টি সজাগ। আর তাকে কে রুখতে পারে! পারে না বলেই শঙ্কর ধীর ধীরে পাথরের ওপর পা রেখে উঠে এল ওপরে। এখন আর তাকে পায় কে! সে ছোটো-বড়ো আরও ক-টা পাথর ডিঙিয়ে ছুটে এল নিজের ঘরের দিকে। সে দরজার সামনে থমকে দাঁড়াল। তারপর চমকে উঠল। দরজা খোলা—অন্ধকার। আলো জ্বালতে পারবে না সে। কিন্তু তবুও সে বুঝতে পারল ঘরটা তছনছ হয়ে আছে। কে করল ঘরের এমন দশা। তবে কি দুর্বৃত্তেরা তার মায়ের সেই প্যাঁটরাটা চুরি করে নিয়ে গেছে। এই কথা মনে হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে সে ঝাঁ করে বসে পড়ল। চৌকির নীচে মাথা গলাতেই তার বুকটা ধড়াস করে উঠল। চৌকির নীচেটা তোলপাড় করেও সেই প্যাঁটরার হদিশ পেল না শঙ্কর। শঙ্করের যা-কিছু পুঁজি সে তো ওই বাক্সটার ভেতরই আছে। আজই তো সে ওই বাক্সটার ভেতর থেকে টাকা বার করে মহাদেবের দোকানে খাবার কিনতে গেছিল। শঙ্কর যেন বিভীষিকা দেখল। মুহূর্তের মধ্যে শঙ্কর ওই চৌকিটার নীচে থেকে মাথা বার করে ওই চৌকিটার ওপরেই বসল। কিছু ভাবল। বোঝা গেল তার বুকের ভেতরটা ক্ষোভে অপমানে তোলপাড় করছে। বেশিক্ষণ নয়, উঠে পড়ল তক্ষুনি। ঘরের দরজা যতটা পারল পা দিয়ে টেনে ভেজিয়ে রাখল। তারপর বেরিয়ে গেল। পিছু ফিরে আর দেখল না কিছু। রাত এখন নিথর—অন্ধকার। এ অন্ধকারকে সে আর ভয় পায় না। এখন সব বাধা তুচ্ছ করে তাকে আবদুলচাচার বাড়ি যেতেই হবে। আবদুলচাচা আর চাচিই এখন তার একমাত্র ভরসা। সুতরাং সে পা চালিয়ে টপাটপ পাথরে ওঠা-নামা করতে করতে এগিয়ে চলল।
খানিক পরেই সে আবদুলচাচার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। কত রাত হয়েছে এখন যে, আবদুলচাচার ঘরে আলো জ্বলছে না। তবে কি ঘুমিয়ে পড়ল বুড়ো মানুষ দুটো। শঙ্কর আবার থমকে গেল। আবার চমকে তাকাল আকাশের দিকে। আকাশে তারা নেই। শীতের হাওয়ায় যেন বরফের কনকনানি। এতক্ষণ প্রচন্ড উত্তেজনায় শীত শঙ্করের গায়ে লাগেনি, এখন লাগছে। তার ওপর মাথার টুপিটাও দুর্বৃত্তেরা খুলে নিয়েছে। সুতরাং এখনই একটা কিছু করতে হবে তাকে। হয় আবদুলচাচার ঘরের দরজায় ঠেলা দিতে হবে, নয়তো নিজের ঘরে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু কোনটা যে করবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না। অথচ এখানে যে বেশিক্ষণ দাঁড়ানো ঠিক নয়, সেও শঙ্কর জানে। কেননা, আবদুলচাচার পাড়ার লোক যদি তাকে দেখে ফেলে, তবে সেও তো এক সাংঘাতিক বিপদ!
কিন্তু এখন কি সত্যিই অনেক রাত? ঘরের মানুষ দুটো কি সত্যিই অনেকক্ষণ শুয়ে পড়েছে? অন্তত সেটা তো এখন শঙ্কর একটু পরখ করে দেখতে পারে। দেখাই যাক-না ঘরের দরজায় একটু ঠেলা দিয়ে।
শঙ্কর তাই করল। পা বাড়াল। পা দিয়ে আলতো একটু ঠেলা মারতেই খুট করে দরজাটা নড়ে উঠল। ভেতর থেকে কোনো সাড়া আসে কি না সেটা শোনার জন্যে কান খাড়া করে দাঁড়াল শঙ্কর। কিন্তু না, কোনো সাড়া পেল না। তবে কি আর এক বার দেখবে সে! এমনও তো হতে পারে প্রথমবারের শব্দটা ওদের কানে পৌঁছোয়নি। হবেও-বা। অবিশ্যি যদি জেগে থাকে। কাজেই আরেক বার চেষ্টা করার জন্যে শঙ্কর পা তুলল। কিন্তু দরজায় পা ঠেকাবার আগেই নি:শব্দে দরজাটা খুলে গেল। শঙ্কর থতোমতো খেয়ে গেছে। বুকটা তার ধড়াস করে উঠেছে। সঙ্গেসঙ্গে সে পা নামিয়ে নিয়েছে। তার সামনে চাচি দরজা খুলে দাঁড়িয়ে। শঙ্কর কিছু বলার আগেই চাচি চাপা গলায় ডাক দিল, —আয়! এমনভাবে ডাকল যেন তারই জন্যে অপেক্ষা করছিল এতক্ষণ।
শঙ্কর দ্রুত ঘরে ঢুকে গেল। চাচি তার মুখখানা লক্ষ করল না। তাড়াতাড়ি দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে পিছু ফিরতেই শঙ্করের পিছমোড়া করে বাঁধা হাত দুটো দেখতে পেল। উৎকন্ঠায় আঁতকে উঠল। তাড়াতাড়ি শঙ্করের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোর হাত দুটোর এ অবস্থা কে করল?
শঙ্কর বলল, বলছি, আগে খুলে দাও।
চাচি বাঁধনের গেরো আলগা করতে করতে স্তম্ভিত হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, কোন হতচ্ছাড়া তোর হাত দুটো এমন করে বাঁধল রে? তোকে কি চোর ঠাউরেছে? বলে গজগজ করে গাল পাড়তে লাগল।
শঙ্কর কোনো কথা বলল না। কিন্তু ঘরের ভেতর থেকে আবদুলচাচা কথা কয়ে উঠল, কে এল? শঙ্কর নাকি? ভারি অবসন্ন সে-গলার স্বর। যেন বড্ড কাহিল।
চাচি উত্তর দিল, হ্যাঁ।
শঙ্করের হাত দুটো ততক্ষণে চাচি খুলে ফেলেছে। কিন্তু শঙ্করের মুখখানা আলো-আঁধারিতে ভালো করে নজর করতে পারেনি। হাত দুটো শঙ্করের বাঁধনের চাপে আড়ষ্ট হয়ে গেছে। যাক গে সে নিয়ে শঙ্কর গেলুম গো, মলুম গো করার ছেলে নয়। সে বুঝতে পেরেছে আবদুলচাচার নিশ্চয়ই একটা-কিছু হয়েছে। তাই সে ঘরে ঢোকার আগেই চাচিকে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, চাচার কী হয়েছে?
চাচি উত্তর দিল, —জ্বর।
প্রায় পড়তে পড়তে শঙ্কর ছুটে গেল আবদুলচাচার কাছে। তারপর মাথায় হাত দিয়ে চমকে উঠল। বলল, ইস, তোমার গা যে একেবারে পুড়ে যাচ্ছে!
—ও কিছু নয়। আবদুলচাচা বলল, মাঝে মাঝে জ্বরজ্বালা হওয়া ভালো, বুঝলি না। তার ওপর বয়েসটাও তো কম হল না। একটু জাড় লাগলেই জ্বর অমনি ক্যাঁক করে চেপে ধরে। বলে আবদুলচাচা একটু দম নিল। তারপর ধুঁকিয়ে ধুঁকিয়ে জিজ্ঞেস করল, খেয়েছিস?
শঙ্কর সেকথার কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু উৎকন্ঠাভরা চোখ দুটো স্থির রেখে সে আবদুলচাচার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। হয়তো আর বেশিক্ষণ সে চুপ করে থাকতও না। সে কিছু জিজ্ঞেসই করতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই আবদুলচাচা অস্থির হয়ে বউকে বলল, আরে দাও দাও, ছেলেটাকে খেতে দাও।
আবদুলচাচার কথা শুনে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করল শঙ্কর। সে চট করে বলে বসল, আমার খিদে পায়নি চাচা!
আবদুলচাচা তার ক্লান্ত হাতখানা শঙ্করের পিঠে মৃদু আঘাত করে বলল, মিথ্যে বলতে শিখলি কবে থেকে? হুঁ?
শঙ্কর আর কথা বলতে পারল না।
চাচি বলল, মিথ্যে বলছে না। ওর লজ্জা করছে।
আবদুলচাচা তেমনি দমসমস্বরে বলল, ওইটুকু ছেলে আবার লজ্জা কী রে? পেট ভরে খাবি আর দম ভরে কাজ করবি। দেখবি রোগজ্বালা কোনোদিন কাছে ঘেঁষতে পারবে না। বলে চাচির মুখের দিকে তাকিয়ে বললে, দাও দাও, ওকে খেতে দাও।
চাচি বললে, খেতে তো হবেই। আমি যে তোর জন্য খাবার করেছি।
আবদুলচাচা যেন ঘরের সেই জ্বলন্ত লণ্ঠনের ক্ষীণ আলোয় শঙ্করের মুখখানা দেখে ফেলল। কিন্তু চোখে তার চশমা ছিল না। তাই স্পষ্ট ঠাহর হল না। তাই বউকে ব্যস্ত হয়ে বলল, চশমাটা কোথায় রেখেছ? দাও তো একবার।
চাচির হাত থেকে চশমাটা চোখে দিয়েই ধড়ফড় করে উঠে বসল আবদুলচাচা। শঙ্করের মুখের কাছে লণ্ঠনটা তুলে ধরে চাচি আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, কী হয়েছে তোর?
শঙ্কর চট করে মুখখানা ঘুরিয়ে নিল।
আবদুলচাচা নিজের হাত দিয়ে শঙ্করের মুখখানা চোখের সামনে টেনে এনে তরাসে প্রায় চিৎকার করে উঠল, রক্ত কেন তোর কপালে? কে করল এমন?
শঙ্কর পলকের জন্যে অসহায়ের মতো চেয়ে রইল সেই দুটি মানুষের মুখের দিকে। তারপর শঙ্করের মাথায় হাত রেখে আদর করে বলল, আমাদের বল, তোর কোনো ভয় নেই।
ততক্ষণে চাচি একটুকরো নরম ধবধবে কাপড় এনে শঙ্করের সারামুখে ছড়িয়ে-পড়া রক্তের চিহ্নগুলো মুছে দিল ধীরে ধীরে। দিতে দিতে রুক্ষস্বরে নিজের মনেই বলল, আমি জানি কে করেছে।
অত জ্বরেও মানুষটা প্রায় হুংকার দিয়ে বলে উঠল, কে, সেই শয়তানটা?
উত্তর দেওয়া হল না চাচির কেননা ঠিক সেই সময়ে বাইরে ঘরের দরজায় আবার যেন কে নাড়া দিল। সাড়া দেবার আগেই ঘরের সেই তিনটে মানুষ একইসঙ্গে কেমন যেন চুপসে গেল। তবে কি শঙ্করকে কেউ দেখে ফেলেছে আবদুলচাচার বাড়ি আসতে! তাহলে যে ভয়ংকর কান্ড ঘটে যাবে। আবদুলচাচা যেন বোবা হয়ে গেল মুহূর্তের জন্যে। চাচির ঠোঁট দুটো ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। আর শঙ্কর একটি পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল তাদের মুখের দিকে চেয়ে। একটা জমাট নিস্তব্ধতা ঘরটার মধ্যে।
সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে প্রথম কথা বলল চাচি। ফিসফিস করে আবদুলচাচাকে জিজ্ঞেস করল, কী করব?
আবদুলচাচা অসহায়ের মতো বলল, আগে ছেলেটাকে ওই দেরাজের আড়ালে লুকিয়ে রাখো।
চাচি কথা না বলে ইশারায় ডাকল শঙ্করকে। ওর হাতটা ধরল, সাহসে বুকখানা ফুলিয়ে দৃঢ় গলায় উত্তর দিল, আমি মরব সেওভি আচ্ছা, তবু কাপুরুষের মতো লুকিয়ে থাকব না। বলেই সে আচমকা ঘর থেকে ছুটে গেল দরজাটা খুলতে। বাধা দেবার সুযোগই দিল না সে। আবদুলচাচা হা-হা করে চেঁচিয়ে উঠল। কিন্তু তার আগেই সে দরজাটা খুলে ফেলল। বাইরে বেরিয়ে সে বীরের মতো চিৎকার করে উঠল, —কে-এ-এ-এ?
কেউ সাড়া দিল না। কে সাড়া দেবে? কেউ থাকলে তবে তো! তবে কি তারা ভুল শুনল বাইরের দরজায় নাড়া দেবার শব্দটা! বাইরের এই খোলা আকাশের বাতাসেই কি তবে দরজা নড়ে উঠল। হবেও-বা। সুতরাং আবার দরজা বন্ধ করে শঙ্কর ছুটে গেল ঘরের ভেতর। তারপর বলল, আমার জন্যে তোমাদের কোনো ভয় নেই চাচা। যদি কেউ আসে আমি তাদের সামনে বুক ফুলিয়ে বলতে পারব, যদি তোমরা আমাকে মারতে চাও, সাহস থাকে তো সামনে থেকে মারো। পেছন থেকে আঘাত করে রাজুকাকার মতো কাপুরুষের দল। বলে রাগে যেন গর্জাতে লাগল শঙ্কর।
সুতরাং এখন আর আবদুলচাচার বুঝতে বাকি নেই শঙ্করের এই অবস্থা কে করেছে।
চাচি বলল, এ আমি জানতুম।
তারপর শঙ্কর একে একে তার দুর্দশার সব কথা একটি একটি করে শোনাল। শোনাল রাজুকাকা আজ সারাদিন ধরে একটার পর একটা কত হেনস্তা করেছে তাকে। শেষমেষ চাচির হাতে-গড়া ক-খানি রুটি খেল সে। হ্যাঁ, খিদে তো তার পেয়েছিল। সে তো সহ্য করেছে। কিন্তু সে সহ্য করতে পারছিল না রাজুকাকার সেই হিংস্র ব্যবহারটা। রাজুকাকা কি মানুষ না অন্য কিছু। লোকটাকে যেমন করে হোক শায়েস্তা করতেই হবে। কিন্তু কেমন করে, সেটা জানা নেই শঙ্করের। কাজেই তার খাওয়া হয়ে গেলে সে বলল, আজ আমি যাই।
কোথা যাবি? শঙ্করের চোখের ওপর চোখ রেখে জিজ্ঞেস করল আবদুলচাচা।
ঘরে। উত্তর দিল শঙ্কর।
না, তোকে ঘরে যেতে হবে না। যেন হুকুম জারি করল চাচি, তোকে আমাদের এখানেই থাকতে হবে। ঘরে গেলে ওই শয়তানটা তোকে মেরে ফেলবে।
আবদুলচাচা অনেকক্ষণ বসে বসে একফাঁকে কখন শুয়ে পড়েছে, খেয়াল করেনি শঙ্কর। শুয়ে শুয়ে আবদুলচাচা কেমন অস্থির হয়ে আনচান করছিল; সে কি জ্বরের তাড়সে না চাচির কথা শুনে সেটা বুঝতে পারল না শঙ্কর। তাই চটপট আবদুলচাচার কপালে হাতটা রেখে জিজ্ঞেস করল, তোমার কষ্ট হচ্ছে চাচা?
আবদুলচাচা স্নেহমাখা চোখে শঙ্করের মুখখানি দেখতে দেখতে বললে, না রে, তোর কথা যতই ভাবছি, মনটা ততই ছটফট করে উঠছে।
—আমার জন্যে অত কেন ভাবছ তুমি! দেখো, একদিন আমি সবাইকে শায়েস্তা করে দেব। তুমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে ওঠো। ভালো হয়ে আমাকে কাঠখোদাইয়ের কাজটা শিখিয়ে দাও, তারপর দেখতে পাবে আমি কী করি! বলে শঙ্কর আবদুলচাচার কপালে ধীরে ধীরে হাত বোলাতে লাগল।
আবদুলচাচা জিজ্ঞেস করল, কী দেখতে পাব?
—ওই রাজুকাকার মতো যত নচ্ছার লোক এই পাহাড়ে আছে সবাইকে বুঝিয়ে দেব, শঙ্করকে মারবার যতই তোমরা মতলব আঁটো, সেও জানে কেমন করে বাঁচতে হয়। বলে শঙ্কর ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে-নিশ্বাস সাহসে উপচে উঠল।
সে-রাত্রে শঙ্কর নিজের ঘরে ফিরতে পারল না। চাচি তো তাকে যেতে দিলই না, তার ওপর আবার তুষার পড়তে শুরু করল। তাও নাহয় চাচিকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফেরা যেত, কিন্তু এখন এই অনেক রাতে তুষার মাথায় নিয়ে সে ফিরবে কেমন করে? তখনই তো আকাশে একটিও তারা ছিল না। হাওয়া বইছিল হিমেল। বোঝা গেছিল হয়তো রাতেই তুষারপাত হবে। আর এখন সত্যিই তাই হল। কাল সকালে ঘুম ভাঙলে দেখবে পাহাড়ি এই শহরটা যেন একখানা সাদা ধবধবে পোশাক পরে নিঝুম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। কোথায় নেই তুষার! পাহাড়ের চুড়োর দিকে চেয়ে দেখো, তুষারে ঝকঝক করছে। গাছের ডালে-পাতায় তুষার। ঘরের চালে, ছাউনিতে তুষার। পথেঘাটে তুষার। যেদিকে চাও তুষার আর তুষার। শঙ্কর যখন আরও ছোটো ছিল, তখন এই ঝুরঝুরে তুষার মুঠিতে ভরে নিয়ে ছুড়ে ছুড়ে কত খেলা করেছে। মনে আছে সেবার যখন পিসি এসেছিল, তখন শঙ্কর মজা করেছিল ওর পিসতুতো বোনের সঙ্গে। শঙ্করের পিসতুতো বোন ধরো প্রায় শঙ্করেরই মতো, একেবারে পিঠোপিঠি। বোনের নামটাও ভারি মজার, ফুংচি। অবশ্য ওটা তার ডাকনাম। আসল নামটা কিন্তু খুব খারাপ নয়, শুক্লা। সেবার যখন শঙ্করের পিসি আসে, সাত দিন ধরে আকাশের মুখ দেখা যায়নি। উফ! কী শীত, কী শীত! আর সত্যি বলতে কী, শীতের সময় যদি অষ্টপ্রহর আকাশ মুখ ভার করে থাকে, কিচ্ছু ভালো লাগে মানুষের! শীতের সময় কোথায় রোদ উঠবে, রোদে ছুটোছুটি করে খেলা করবে, তা নয় শীতে জবুথবু হয়ে ঘরে বসে থাকো আর হিহি করে কাঁপো। তবে কিন্তু যাদের কাজকম্ম থাকে, তাদের ওই শীতের মধ্যেই ঘর থেকে বেরিয়ে বরফ ডিঙিয়ে কাজে যেতে হয়। সে আর কী করবে মানুষ, যে-দেশে যেমন। এই ধরো-না, গরমের সময় গরমের দেশের মানুষকে কি কম নাকাল হতে হয়। তার ওপর ধরো যারা মরুভূমিতে বাস করে, তাদের কী অবস্থা! অসহ্য তাপে বালির ওপর দিয়ে উট চলছে। তার পিঠে বসে চলো এখান থেকে আর এক জায়গায়। কী কষ্ট বলো? তুমি এখন কোনটাকেই-বা ভালো বলবে আর কাকেই-বা বলবে খারাপ। যেমন শীত তেমনই গরম। যে-দেশে যে জন্মাবে তাকে তো তেমন তেমন সহ্য করতেই হবে। এসব নিয়ে কে আর কার কাছে নালিশ করতে যাবে আর সে-নালিশ শুনবেই-বা কে!
যাক গে ওসব কথা। কথা হচ্ছিল শঙ্করের পিসতুতো বোন ফুংচিকে নিয়ে। মেয়েটার গাল দুটো যদি দেখতে, তুমি চোখের পাতা ফেলতে পারতে না। একেবারে টাটকা আপেলের মতো টুসটুসে। শীতের দেশে যেমন হয়। তার চোখ দুটো দেখলেই মনে হবে বুঝি এই মাত্তর ঘুম থেকে উঠে এল। তা সেবার তো সাত দিন ধরে আকাশের ওই অবস্থা। সাত দিন ধরে কখন যে তুষার পড়ছে আর কখন যে থামছে, কে তার হিসেব রাখে। শেষকালে হল কী, পাহাড়ের এ-চুড়ো থেকে ও-চুড়ো আর তার মধ্যিখানে যত উপত্যকা সব বরফে জমে গেল। ওই বরফের ওপর পায়ে স্কি বেঁধে খেলা করতে কী যে মজা—দারুণ! বরফের সময় প্রত্যেক বছরেই বিদেশ থেকে সব মানুষজন আসে স্কি করতে। শঙ্করও শিখেছিল স্কি করতে, তবে সে একজন বিদেশি মানুষ ওকে শিখিয়েছিল। তাই সেবার যখন ওর পিসি এল, পাহাড় বরফে জমে গেল, শঙ্করও স্কি পায়ে দিয়ে এপার-ওপার করতে লাগল। তাই দেখে ফুংচি আর থাকতে পারল না। তারও সাধ জাগল। ফুংচি বললে, এ আর এমন কী! আমিও পারি। বলে শঙ্করের পায়ের স্কিটা সে চাইল।
শঙ্কর বললে, স্কি করা অত সোজা নয়। আগে শেখ, তারপর। আমায় শিখতে গিয়েও কত বার ডিগবাজি খেতে হয়েছে জানিস? একবার তো ঘাড়টা প্রায় ভাঙতেই বসেছিলুম।
ফুংচি বললে, দে-না, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি পারি কি না।
শঙ্কর অবশ্য অনেক বার ফুংচিকে অনেক বারণ করল, কিন্তু মেয়ে শোনে না। ঝুলোঝুলি, সে স্কি করবেই। অগত্যা শঙ্করকে বলতে হল, হাত-পা ভাঙলে আমি জানি না।
ফুংচি উত্তর দিল, ভুলে যাস না আমিও পাহাড়ের মেয়ে।
শেষমেষ স্কি পায়ে দিয়ে, দু-হাতে দুটো স্টিক নিয়ে সড়াত-ত-ত! বলব কী, শুরু করতে-না-করতেই পাহাড়ের ঢালুতে খেল এক রাম-ডিগবাজি। একটা-দুটো-তিনটে। তবে ভাগ্যি ভালো হাত-পা ভাঙল না। কিন্তু যা লাগান লেগেছিল না! ওই টুসটুসে গাল চুপসে একেবারে বেলুন-ফাটা। তারপর কত কষ্ট করে যে ফুংচিকে বরফ ভেঙে ওপরে আনা হয়েছিল, সে বলতে গেলে আর এক গল্প। তারপর থেকে স্কিয়ের নামগন্ধ পর্যন্ত করত না ফুংচি। স্কি দেখলে সে সাত হাত দূরে।
আবদুলচাচার বাড়িতে অগত্যা থাকতে হল শঙ্করকে সেই তুষার-ঝরা রাতটা। সে শুয়ে পড়ল আবদুলচাচার পাশে। অনেক রাত অবধি শুয়ে শুয়ে আবদুলচাচার গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে দিল শঙ্কর। তারপর নিজেই কখন অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ল।
অবশ্য খুব সকালেই শঙ্করের ঘুম ভেঙে গেছিল। খুব সকালেই সে উঠে পড়েছিল। এখন এই ভোরের নরম আলোয় ওর মুখখানা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে কাল ওর লেগেছে মোক্ষম। কেননা, ওর ওই নিটোল ফুটফুটে মুখখানা যেন একটু ফুলে আছে এখনও। দেখা যাচ্ছে আঘাতের চিহ্নও।
না, এখনও থেকে থেকে বরফ পড়ছে। বিছানা থেকে উঠে প্রথমেই শঙ্কর আকাশের মতলবটা দেখার জন্যে জানলাটা একটু ফাঁক করল। যেমন তুষার পড়ছে, তেমনি বাতাসও বইছে। তুলোর মতো পেঁজা পেঁজা তুষার ছেয়ে আছে চারদিকে। শঙ্কর নিমেষে দেখেই জানলাটা বন্ধ করে দিল। সঙ্গেসঙ্গে তাকে দুর্ভাবনা পেয়ে বসল। এখন সে কেমন করে ফিরে যাবে নিজের ঘরে। এখনও ঘর থেকে একটি মানুষও বাইরে বেরোয়নি। যেতে হলে এখনই তাকে যেতে হয়। এরপর রাস্তায় কেউ-না-কেউ বেরোবেই। তখন জানাজানি হয়ে যেতে পারে। আর জানাজানি হয়ে গেলে তার নিজেরও যেমন বিপদ, তেমনই বিপদ এই দুটো বুড়ো-বুড়ির। এখনও ঘুম ভাঙেনি চাচিরও। শঙ্কর জানলাটা বন্ধ করে আবদুলচাচার কপালে হাত রাখল। নিশ্চিন্তে একটা নিশ্বাস নিল শঙ্কর। না, আবদুলচাচার গায়ে আর জ্বর নেই। চট করে হাতটা সরিয়ে নিল শঙ্কর। নড়ে উঠল যেন আবদুলচাচা। ইস, মানুষটা চোখ চাইল—জেগে উঠেছে। চোখ মেলে শঙ্করকে দেখে জিজ্ঞেস করল, উঠে পড়েছিস?
শঙ্কর থতোমতো খেয়ে বলে ফেলল, ভোর হয়ে গেছে।
ঘুম ভেঙে গেল চাচিরও। তাড়াতাড়ি উঠে জানলাটা খুলে, বাইরে একটু উঁকি দিল। তারপর বলল, কী জ্বালা, এখনও বরফ পড়ছে।
চাচা তখন হাসতে হাসতে উত্তর দিল, আমার কিন্তু গায়ে আর জ্বালা নেই। মনে হচ্ছে জ্বর ছেড়ে গেছে। শঙ্কর আমার কপালে হাত দিয়ে দেখেছে। জিজ্ঞেস করো।
চাচি জিজ্ঞেস করল না। নিজেই তার কপালে হাত দিয়ে বলল, তোমার এ ভাল্লুকের জ্বর। কালকে গা পুড়ে যাচ্ছিল, আজ একেবারে ঠাণ্ডা।
খুশিতে আবদুলচাচা হেসে উঠল। হাসতে হাসতে লেপটা গায়ে জড়িয়ে-মড়িয়েই উঠে বসল। বসেই শঙ্করের মুখে দিকে তার চোখ পড়ে গেল। শঙ্করের মুখে তখন হাসি নেই—ভাবনা। তাই আবদুলচাচা জিজ্ঞেস করল, কী রে, তুই কী ভাবছিস?
শঙ্কর ভাবনায় আড়ষ্ট হয়ে বলল, এখনও বরফ পড়ছে, যাব কেমন করে?
চাচা স্পষ্ট গলায় বলল, যাবি না।
চাচি বলল, কেন, তুই কি জলে পড়ে আছিস?
শঙ্কর ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, কেউ যদি জানতে পারে?
—কে জানবে? দ্যাখ-না, এই বরফে আজ কেউ ঘর থেকে বেরোবেই না। আর যদি কেউ এসে পড়ে, তোকে আমার বুকে এই লেপের মধ্যে লুকিয়ে রাখব। বলে হো-হো করে হেসে উঠল আবদুলচাচা। হাসতে হাসতে চাচিকে বলল, জ্বর যখন ছেড়েছে, তখন আজ হালুয়া আর পরোটা বানাও। ঠাণ্ডায় জমবে ভালো।
শঙ্কর আর কোনো কথা বলতে পারল না। আর সত্যি কথা বলতে কী, ওর আর কিছু বলারও ছিল না। কারণ আবদুলচাচার কথাটা তো আর মিথ্যে নয়। এই বরফ মাথায় নিয়ে তার ঘরে যাওয়াটাও এক দুঃসাধ্য কাজ। মাথায় তার টুপি নেই, গায়ে তেমন পোশাকও নেই। সে যে-অবস্থায় ছিল কাল, সেই অবস্থাতেই এখানে চলে এসেছে। কাজেই ঘরে ফেরা এখন একেবারেই সম্ভব নয় শঙ্করের। তাই সে আরেক বার জানলার কাছে গেল। আরেক বার উঁকি মারল আকাশের দিকে। আবদুলচাচা শঙ্করের রকম-সকম দেখে আবার বলল, ওরে বাবা, অত ব্যস্ত হচ্ছিস কেন?
শঙ্কর বলল, ব্যস্ত হচ্ছি আমার ঘরটা যে খোলাই পড়ে আছে।
চাচা বলল, যা নেবার সে তো নিয়ে গেছেই। এই দুর্যোগে চোরের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, তোর ছেঁড়া কাপড়চোপড়গুলো চুরি করতে আসবে। বরঞ্চ আয় হালুয়া-পরোটা খেয়ে আজ থেকে তোকে একটু একটু কাঠের কাজ শেখাই।
চাচার মুখে খুশির কথাটা শুনেই শঙ্করের ব্যথাকাতর ঠোঁটের কোণে যেন একটুকরো খুশির আলো উঁকি মারল। শঙ্কর আর ঘরে ফিরে যাওয়ার কথা তুলল না। শুধু জিজ্ঞেস করল, এখন আমায় কাজ শেখাতে তোমার কষ্ট হবে না চাচা?
—দুর বোকা! কীসের কষ্ট! শুনলি না তোর চাচি আমায় ভাল্লুক বলল। ভাল্লুক এই হঠাৎ জ্বরে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে চিতপাত হয়ে শুয়ে পড়ল; তারপর একটুখানি যেতে-না-যেতেই আবার উঠে দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করে দিল। আমারও ঠিক তাই রে। বলে আবদুলচাচা আবার হাসতে লাগল।
চাচি হঠাৎ টিপ্পনী কেটে জিজ্ঞেস করল, এই বুড়োবয়েসে তুমিও নাচবে নাকি? বলে মুখ টিপে চাচি হাসল।
চাচা বলল, মনে করছ নাচতে পারি না? এক্ষুনি দেখিয়ে দিতে পারি।
চাচি হাসতে হাসতেই বলল, না তোমাকে আর নাচ দেখাতে হবে না। শেষে আবার উলটো বিপত্তি হোক আর কী। বরঞ্চ এই সুযোগে ছেলেটাকে কাজ শেখাও। আমি খাবার করে আনি।
সুতরাং শেষমেষ কাজই শিখতে বসল শঙ্কর। অবিশ্যি তার আগে আবদুলচাচা শঙ্করের মুখের ক্ষত জায়গায় মলম লাগিয়ে দিয়ে বলল, তোর মুখের ফোলাটা এখনও কমেনি মনে হয়।
শঙ্কর বলল, মুখটা পাথরে ঘষটে গেছিল। বলে নিজের মুখে হাত দিল, তারপর উঠে গিয়ে চাচির আয়নায় মুখটা দেখে নিজেই কেমন চমকে উঠল। অবশ্য শঙ্করের বাবা থাকলে চমকাত না। হয়তো ছেলের কাঁধে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলত, আরে পাহাড়ের মানুষকে চলতে-ফিরতে এমন কত বিপদের মধ্যেই পড়তে হয়। সেই বিপদ যে জয় করতে পারে, সে-ই তো বাহাদুর রে।
শঙ্কর যে ওর বাবার মুখে এই বাহাদুর কথাটা কত বার শুনেছে! যতবারই শঙ্কর একটা করে সাহসের কাজ করেছে, ততবারই ওর বাবা ওকে বাহাদুর বলেছে। শুনতে শুনতে নিজেরই অজান্তে শঙ্কর যেন প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিল, সে একদিন সত্যিকারের বাহাদুর হবেই। সাহস কাকে বলে সে দেখিয়ে দেবে। আর এখনই যেন মনে হচ্ছে তার সেই সাহস দেখাবার দিন এসে গেছে। এখন তাকে শুধু রুখে দাঁড়ালে চলবে না, তাকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে সব শক্তি উজাড় করে। কাজেই কাজ তাকে শিখতেই হবে আবদুলচাচার কাছে নিজের বুকটা শক্ত করার জন্যে। তাই শঙ্কর এখন আর অন্য কথা ভাবল না। একমনে কাজ শিখতে বসল আবদুলচাচার কাছে।
এখন ঠিক দুপুর। আকাশটা মনে হয় একটু পরিষ্কার হয়েছে। হ্যাঁ, এখন আর তুষার ঝরছে না আকাশ থেকে, তবে এখনও বাতাস বইছে। তারও ধার ভোঁতা হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। শুধু কনকনে ঠাণ্ডাটাই জেঁকে বসে আছে। অবশ্য এখন ইচ্ছে করলে শঙ্কর ঘরে যেতে পারে। যদিও বরফে বরফে ঢেকে গেছে ওর বাড়ি যাবার রাস্তাটা, তবে ঢেকে গেলেও ও তো আর ভিনদেশি নয় যে, সে-রাস্তা চিনতে হাল্লাক হয়ে যাবে। চিনতে ঠিকই পারবে, কিন্তু এখন আবদুলচাচার ঘর থেকে বেরোনোই বিপদ। কারণ এখন কম হলেও ওই বরফের ওপর দিয়েই লোকজন হাঁটাচলা শুরু করে দিয়েছে। কাজকম্ম থাকলে সে দুর্যোগই থাকুক আর যাই হোক বাইরে না বেরিয়ে উপায় আছে। সুতরাং শঙ্কর বেরোলেই নির্ঘাত কেউ দেখে ফেলবে। দেখে ফেললেই ফ্যাসাদ। ফ্যাসাদ মানে দু-তরফেই। আবদুলচাচার পাড়ার লোক যদি দেখে ফেলে সেও যেমন ভয়ংকর বিপদ, তেমনি শঙ্করের পাড়ার লোক দেখে ফেললেও তাকে ছেড়ে কথা বলবে না। একটা কিছু পেলে লোকের ঘোঁট পাকাবার তো আর অভাব নেই। তার ওপর সবার মাথায় রয়েছে স্বয়ং রাজুকাকা। তিনি যদি দেখেন তাহলে তো আর কথাই নেই। শঙ্করকে ঠাণ্ডা মাথায় খতম করে ফেললেও কেউ টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করবে না।
তার চেয়ে বাবা এখন ঘরে যাবার কথাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভালো। রাতের অন্ধকারেই ফিরে যাবার কথা ভাববে শঙ্কর। কাজে-কাজেই সেদিনটা পুরো আবদুলচাচার ঘরে থাকার সিদ্ধান্তই পাকা হয়ে গেল। আবদুলচাচার ঘরে সেদিন প্রায় সারাটা বেলা সে চাচার কাছে কাঠের কাজ শিখল আর চাচির হাতের রান্না খেল। যখন কাজ করতে ভালো লাগল না, গল্প করল। সেসব কত গল্প—হাসান-হোসেনের গল্প, রাম-রাবণের গল্প, আরও কত কী? আর এদিকে গল্প করতে করতে কখন যে রাত এসে পড়েছিল খেয়ালই হয়নি শঙ্করের। হঠাৎ যখন খেয়াল হল, তখন ঝটপট সে গল্পের আসর থেকে উঠে পড়ল। চাচি ঘরের বাতি জ্বালতে জ্বালতে ওকে অমন ধড়ফড় করে উঠে পড়তে দেখে জিজ্ঞেস করল, কী রে, অমন হুটপাট করে উঠে পড়লি কেন?
শঙ্কর বলল, রাত হয়ে গেছে। এবার যাই।
আবদুলচাচা এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিল। বসে বসে কান খাড়া করে কী যেন শোনবার চেষ্টা করছিল। অন্ধকারে এতক্ষণ দেখা যায়নি, আলো জ্বলতেই দেখা গেল তার মুখটা গম্ভীর। চোখ দুটো ঘরের দরজার দিকে স্থির হয়ে আছে। শঙ্করের মুখে চলে যাওয়ার কথা শুনেই আবদুলচাচা চাপা স্বরে বলল, এখন তো যাওয়া হবে না। বলে হাতটা ধরে শঙ্করকে নিজের কাছে টেনে নিল।
—কেন? একটু জোরেই কথাটা বলে ফেলেছিল শঙ্কর।
আবদুলচাচা গলাটা তেমনি খাটো করে বলল, একদম কথা বলিস না।
সঙ্গেসঙ্গে শঙ্কর যেন চুপসে গেল। আবদুলচাচার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, কেন কথা বললে কী হবে?
আবদুলচাচাও ফিসফিস করে উত্তর দিল, আমার ঘরের আশেপাশে পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
কাদের? একেবারে মিহি সুরে জিজ্ঞেস করল শঙ্কর।
আবদুলচাচাও তার কানে কানে বলল, বুঝতে পারছি না।
আবদুলচাচার কথা শুনে চাচিও যে তখন ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে, সে তো তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। চাচিও তাই কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, তাহলে কী হবে?
আবদুলচাচা কোনো কথার উত্তর না দিয়ে সটান উঠে দাঁড়াল। তারপর গুটিগুটি এগিয়ে গেল ঘরের দরজাটার দিকে। আড়ি পাতল। শঙ্কর হতভম্বের মতো চাচির মুখের দিকে তাকাল। তারপর আবদুলচাচার পাশে এসে সেও কান পাতল। তিন জনেই এখন পাথরের মতো নিশ্চল, বোবা। শুধু লণ্ঠনের আলোটাই সারাঘরে কেঁপে কেঁপে উঠছে। বাইরে কোনো শব্দই আর শোনা গেল না। শোনা গেল না ফিসফিস ফুসফাস কিচ্ছু। তবে কি আবদুলচাচার শোনারই ভুল হল! হবে হয়তো। বুড়ো মানুষ কী শুনতে কী শুনেছে। তাই শঙ্কর এবার একটু গলা ছেড়েই জিজ্ঞেস করল, কালকের মতো হাওয়ার শব্দ শোনোনি তো?
আবদুলচাচার মুখখানা চাপা উত্তেজনায় থমথম করছে। বলল, কখনোই হাওয়া নয়। মানুষের গলার শব্দ। আমি নিজের কানে শুনেছি।
—কী শুনেছ? উৎকন্ঠায় যেন চাচির মুখ দিয়ে কথা সরছে না।
যা শুনেছি সে ভয়ংকর কথা। উত্তর দিল আবদুলচাচা।
কী? আবার জিজ্ঞেস করল চাচি।
ওরা শঙ্করের নাম ধরে অনেক কিছু বলছিল। হয়তো ওরা শঙ্করকে মারতে চায়।
—অ্যাঁ! আঁতকে উঠল চাচি। তারপর অসহায়ের মতো শঙ্করের মুখের দিকে তাকাল।
শঙ্কর কিন্তু এতটুকুও ভয় পেল না এখন। সে দৃঢ় গলায় বলল, তোমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমায় যেতে দাও। দেখি কে আমাদের ক্ষতি করতে পারে। বলে শঙ্কর দরজাটা খোলবার জন্যে চোখের পলকে হাত বাড়াল।
সেই হাত চটপট টেনে নিয়ে আবদুলচাচা ধমক দিল, —শঙ্কর!
শঙ্কর থমকে গেল।
কী হচ্ছে? তীক্ষ্ণ গলায় আবদুলচাচা বলল, আমার বাড়িতে এসে তুই দুশমনের হাতে মরবি আর আমরা তাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব! খবরদার। এখান থেকে তুই এক-পা বাইরে যেতে পারবি না।
শঙ্করও তেমনই উত্তেজিত হয়ে বলল, আমার জন্যে তোমাদের কেন ক্ষতি হবে। দুশমনরা যখন আমার কথা জানতে পেরেছে, তারা ছেড়ে দেবে না। ক্ষতি করবেই।
হোক ক্ষতি, তেমনভাবেই উত্তর দিল আবদুলচাচা, চ তুই ভেতরে। বলে শঙ্করের হাত ধরে ঘরের ভেতর টেনে নিল। শঙ্করও আর বাধা দিতে পারল না।
ঘরের মধ্যে তিন জনেই নির্বাক। নিথর ঘর। একটা কিছু অঘটনের আশঙ্কায় তিন জনেই নিশ্চল হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। শুধু কানে আসছে তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটুকু। সে শব্দ ভারি উদবেগে ভরা।
একটু পরেই হঠাৎ তিন জনে আবার অস্থির হয়ে উঠল। হ্যাঁ, এবার তিন জনের কানেই পৌঁছে গেছে বাইরের অন্ধকারে সেই অস্পষ্ট পায়ের প্রতিধ্বনি। মনে হল একজন নয়, দু-জন নয়, শোনা যাচ্ছে অনেক জনের পায়ে পায়ে ডিঙি-মারার খুট খুট শব্দ। আর সে-শব্দ ঠিক আবদুলচাচার ঘরেরই আশপাশে ঘুরঘুর করছে। শঙ্কর বোধ হয় কিছু বলতেই যাচ্ছিল, আবদুলচাচা চট করে তার মুখটা চেপে ধরে চোখ পাকিয়ে ইশারা করল। শঙ্কর কথা বলতে পারল না। কেমন যেন বোকার মতো চেয়ে চেয়ে আবদুলচাচার মুখখানা দেখতে লাগল।
যেমন হঠাৎ শঙ্করের মুখখানা আবদুলচাচা চেপে ধরেছিল তেমনই হঠাৎ আবার ছেড়ে দিয়ে নিজেই এগিয়ে গেল দরজাটার দিকে খুব সন্তর্পণে। কী বলে তারা শুনতে হয়। কান পাতল, হ্যাঁ, এ নিশ্চয়ই মানুষের কন্ঠস্বর। তারা কথা বলছে। তবে এখন এতই ফিসফিস করে, স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে না কিছুই। এরা কারা? সেই রাজুর দল না ওমরের? কে দেখে ফেলেছে শঙ্করকে আবদুলচাচার ঘরে ঢুকতে? সে যেই দেখুক, এখন আবদুলচাচা নিশ্চিত যে তার ঘর ঘিরে ফেলেছে একদল মানুষ। তারা নির্ঘাত শঙ্করকে হত্যা করবে। কিন্তু হত্যাই যদি করতে চায়, তবে এখনও তারা অপেক্ষা করছে কেন? তবে কি তাদের আরও বদ মতলব আছে?
যে-মতলবই থাক, শঙ্করকে হত্যা করার কুমতলবটা কিছুতেই হাসিল করতে দেবে না আবদুলচাচা। কিন্তু সেটা কেমন করে, সেই বুদ্ধিটা ভেবে বার করার জন্যে হাঁকপাঁক করছে আবদুলচাচা এই ঘরের ভেতর। আর তার সেই অস্থির মূর্তি দেখে থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে চাচি। অবাক হয়ে দেখছে শঙ্কর। যেন অগাধ সমুদ্রে একটি জাহাজ ফুটো হয়ে গেছে—জল ঢুকছে হুস হুস শব্দে। হয়তো একটু পরেই জাহাজ ডুববে, আর সে-জাহাজের এই তিন আরোহী নিশ্চিত মৃত্যুকে মাথায় নিয়ে অপেক্ষা করছে পরিত্রাণের। কিন্তু আপাতত তাদের রেহাই পাওয়ার কোনো পথই খোলা নেই। সুতরাং এখন বুঝি তাদের মরতেই হয়।
কোথাও কিছু নেই, হুট করে আবদুলচাচা ঘরের দরজাটা খুলে ফেলল। একঝলক দমকা হাওয়া ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর, ধাক্কা মারল আবদুলচাচাকে। যে-মানুষটার শীতের তীক্ষ্ণ কামড়ে শিউরে ওঠা উচিত ছিল, সেই বুড়ো মানুষটা এতটুকু টলল না। বুক চিতিয়ে দাঁড়াতেই বাইরের সেই ছদ্মবেশী মানুষগুলো হকচকিয়ে গেছিল। হ্যাঁ, দলে তারা পাঁচ জন—গোনাগুনতি পাঁচ জন। অথচ একজনকেও চিনতে পারল না আবদুলচাচা। বরফের ঠাণ্ডাকে দাবিয়ে রাখার জন্যে তারা আপাদমস্তক এমন পোশাক জড়িয়েছে যে, ঠাণ্ডা যেমন জব্দ হয়েছে, তেমনই চেনাও শক্ত হচ্ছে।
হ্যাঁ ঠিকই, দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমটা তারা ঘাবড়ে গেছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সামলে নিল নিজেদের। তারপর হুড়মুড় করে ধেয়ে গেল আবদুলচাচার দিকে। মুখে তাদের একটি শব্দ নেই। আবদুলচাচা দু-হাত আড়াল করে তাদের পথ আগলে দাঁড়াল। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, কে?
তারা তবুও সাড়া দিল না। একজন চোখের পলকে আবদুলচাচাকে ধাক্কা মারল। সঙ্গেসঙ্গে এই বুড়ো মানুষটার হাতে যেন যৌবনের সেই অফুরন্ত শক্তি ফিরে এসেছে। লোকটার গলাটা ঝপ করে চেপে ধরে আবদুলচাচা লোকটাকে ছুড়ে ফেলে দিল সামনে। তাকে ফেলার সঙ্গেসঙ্গেই আর একজন ঝাঁপিয়ে পড়ল আবদুলচাচার ওপর। আবদুলচাচা তার মাথার ঝুঁটিটা খপ করে খামচে ধরে টেনে মারল এক থাপ্পড়। সে যেখান থেকে তেড়ে এসেছিল পড়ল গিয়ে সেখানেই। এবার কিন্তু তারা একা একা আক্রমণ করল না আবদুলচাচাকে, একসঙ্গে সক্কলে লাফিয়ে পড়ল তার ঘাড়ে। আর বুড়োমানুষটা পারল না। পাঁচটা লোকের সঙ্গে কোস্তাকুস্তি করতে গিয়ে পর্যুদস্ত হয়ে মাটিতে ছিটকে পড়ল আবদুলচাচা। আবদুলচাচার বউ ঘর থেকে চিৎকার করে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে এল শঙ্করও। বিদ্যুৎবেগে তারা শঙ্করকে চেপে ধরল। শঙ্কর তাদের দেখারও সুযোগ পেল না। চিনতে পারল না লোকগুলো কারা। চেনার আগেই ওই পড়ের দল শঙ্করকে এমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল যে, সে মুখে টুঁশব্দটি পর্যন্ত করতে পারল না। শুধু হাত-পা ছুড়ে লটপট করতে লাগল।
সেই অন্ধকার দুর্যোগের রাতে, সেই ছদ্মবেশী দুর্বৃত্তের দল শঙ্করকে প্রায় ছিনতাই করে টানতে টানতে নিয়ে চলল। ছুটতে তারা পারছে না, কিন্তু ঢালু পথে তারা যেন হুমড়ি খেতে খেতে হাঁটছে। এদিকে বুড়ো আবদুলচাচা গর্জন করছে আর চাচি তাকে সামলাতে সামলাতে চ্যাঁচাচ্ছে, ওরে অভাগার দল, খোদাতাল্লা তোদের ছেড়ে দেবে না। তোরা মরবি।
বলব কী, চাচির মুখের বাক্যি শেষ হয়েছে কি হয়নি কোথা থেকে যে কী হল, মনে হল যেন সেই পাহাড়ি শহরটা প্রচন্ড শব্দ করে ভীষণ কেঁপে উঠল। যেন রসাতলে তলিয়ে যাচ্ছে সব কিছু। পাহাড় থেকে চাঁই চাঁই পাথর ভেঙে গড়িয়ে পড়ছে এদিকে-ওদিকে। মেঘের গুরুগুরু গর্জনের মতো কে যেন হুংকার ছাড়ছে। নদীর জলোচ্ছ্বাসে সে কী বিকট শব্দ! তারপরেই শোনা গেল মানুষের হাহাকার, আর্তনাদ।
আশ্চর্য! সেই দুর্বৃত্তের দলটাকে তো আর দেখা যাচ্ছে না! কোথায় গেল সেই নৃশংস মানুষগুলোর টেণ্ডাই-মেণ্ডাই! ওই দ্যাখো, ওরা শঙ্করকে ছেড়েমেড়ে পালাচ্ছে। এখন নিজে কেমন করে বাঁচবে সেই ভয়েই দে লম্বা। এখন কি আর হিংসার কথা ভাববার সময়! নাকি লোভের কথা মাথায় আসবে কারও! এখন সেই পাহাড়ি শহরের সব মানুষই প্রাণের ভয়ে দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছোটাছুটি লাগিয়ে দিয়েছে! কে কাকে বাঁচাবে!
হ্যাঁ, এখন এইমাত্তর পাহাড়ে ভূমিকম্প হয়ে গেল। সেই কাঁপুনির প্রবল তেজে পাহাড়ের চুড়ো ভেঙে পাথর ছিটকেছে, ধস নেমেছে। কত বাড়ি ভেঙে পড়েছে কেউ তার হিসেব এখনও জানে না। সেই বাড়ির ভগ্নস্তূপে কত মানুষের প্রাণ গেছে, তার খবরও এখন কেউ পাবে না। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে দেখা গেল মানুষের সাজানো সেই শখের পাহাড়ি শহরটা একটা যেন ধ্বংসস্তূপ। এখন রাতের সেই অন্ধকারটা যেন একটা ভয়াবহ কালো দানবের মতো দাঁতখিঁচিয়ে আছে। বিপন্ন মানুষেরা দানবটার ভয়ে ছন্নছাড়া হয়ে যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। কিন্তু এই ভয়ংকর দুর্ঘটনায় কোথায় পালিয়ে লুকিয়ে পড়ল দুর্জনের দল? কোথায় গেল শঙ্কর? সত্যিই তো! তবে কি সেও পাহাড়-ভাঙা পাথরের তলায় গুঁড়িয়ে গেল ওই দলটার সঙ্গে! নাকি ওই নদীর উত্তাল জলোচ্ছ্বাসের স্রোতে তলিয়ে গেল অতলে!
আশ্চর্য বলতে হয় আবদুলচাচা আর তার বউ-এর কপালকে। এই অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তাদের ঘরখানা। যেমনকে তেমন দাঁড়িয়ে আছে, একটি আঁচড়ও লাগেনি। অথচ মানুষ দুটোও ওই পাহাড়ের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তবে কি তারাও বুঝতে পেরেছে, শঙ্কর নামে যে-ছেলেটাকে এতক্ষণ তারা বাঁচাবার জন্য মরণপণ লড়াই করল দুর্বৃত্তদের সঙ্গে, শেষমেষ সে কি তবে বাঁচল না! এই পাহাড়ের ছোট্ট ছেলেটিকে তবে কি পাহাড়ই তার কোলে টেনে নিল!
হঠাৎ যেন আবদুলচাচার বুকের ভেতরটা দুমড়ে গেল। একটা বিকট চিৎকার করে আবদুলচাচা মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ওই ছেলেটার জন্যে। রক্ষে, এখানে বরফ নেই। লুটিয়ে পড়ে একটা নেহাত শিশুর মতো কেঁদে উঠল। যেন এ-কান্না শেষ হবার নয়। আর তাই আবদুলচাচার চোখে কান্না দেখে কেঁদে উঠেছিল চাচিও। কাঁদতে কাঁদতে অনেক কষ্টে চাচি মানুষটাকে সেই ঠাণ্ডা জমির ওপর থেকে তুলে নিল। সান্ত্বনা দিল, তারপর তাকে ধিরে ধিরে ধরে ঘরে নিয়ে গেল।
এইমাত্র যে ভয়াবহ প্রলয় ঘটে গেল পাহাড়ের বুকে, তার এতটুকু চিহ্নও নেই আবদুলচাচার ঘরে। অথচ বাইরে অন্ধকার পাহাড়ের নির্জনতা ভেঙে কত মানুষের কান্না ভেসে আসছে এই দিকে, আবদুলচাচার ঘরের দেওয়ালের আনাচেকানাচে। আবদুলচাচা শুনতে পাচ্ছে, শুনতে শুনতে অসহ্য হয়ে উঠল মানুষটার প্রাণ। তাই বউকে আকুল হয়ে বলল, বউ, আমরা যখন বেঁচেই আছি তখন স্বার্থপরের মতো ঘরের দরজা বন্ধ করে আমাদের বসে থাকা ঠিক নয়। চলো আমরা দেখি, যদি ছেলেটাকে রক্ষা করতে পারি। এখন তো সে আমাদেরই ছেলে।
বউ বলল, ঠিক বলেছ তুমি। কিন্তু তোমায় আমি যেতে দেব না। কাল তোমার গায়ে জ্বর ছিল, শরীরের গতিক ভালো নয়। আমি একাই যাচ্ছি। বাইরের ঠাণ্ডা গায়ে লাগলে তোমার আবার জ্বর আসতে পারে। তুমি ঘরে থাকো।
আবদুলচাচা উত্তর দিল, বউ, তোমাকে আমি জানি। জীবনভর তুমি শুধু আমাকে আগলে গেছ। কিন্তু আমার জীবনশেষে আজ তোমাকে আমি এই বিপদে একা ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকব, তুমি ভাবলে কেমন করে! তা হয় না বউ, তা হয় না। তোমার সঙ্গে আমাকেও নিয়ে চলো।
তুমি যা ভালো বোঝো। উত্তর দিল চাচি। তারপর হাতে হাত ধরে দুটো বুড়োমানুষ ছেলেটার খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। এই অন্ধকারে কে বুঝবে পাথরের ধাক্কা সামলে কোন মানুষটা এখনও বেঁচে আছে, কোন বাড়িটা এখনও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। দেখা যায় না কোথায় গর্ত, কোথায় খানা। শুধু আর্তনাদ ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না পাহাড়ের চারদিকে।
আচ্ছা, ওখানে কে পড়ে আছে ওই সামনে? পড়ে পড়ে কে গোঙাচ্ছে? ছুটে গেল আবদুলচাচা বউয়ের হাত ধরে। হ্যাঁ, একটা মানুষ। রক্তাক্ত। শঙ্কর নয়। পাশেই একটা পাথর। পাথরের গায়ে বরফের কঠিন আস্তরণ। বুঝতে কষ্ট হয় না, এই পাথরটাই ভেঙে পড়েছে তার ঘাড়ে। আবদুলচাচা বউকে বলল, এসো এসো, ওকে তুলে ধরি। এখনও ওর প্রাণ আছে। ছুটে গেল বউ, ছুটে গেল আবদুলচাচাও। অন্ধকারে চেনা গেল না। নাই চেনা যাক, ওই মুমূর্ষু মানুষটাকে এই দুটো বুড়োমানুষ তুলে নিল পাথরের ওপর থেকে। তারপর দু-জনে দুটো শক্ত-সমর্থ জোয়ানের মতো তাকে বয়ে নিয়ে এল তাদের ঘরে। তারপর শুশ্রূষা করতে করতে তার গায়ের রক্ত মুছে দিল। তার মুখে খানিক গরম দুধ দিল। শীতের কম্বলটা তার গায়ে জড়িয়ে শুইয়ে রাখল। তারপর দুই বুড়োবুড়ি আবার বেরোল শঙ্করের খোঁজ করতে।
ভারি হন্তদন্ত হয়ে হাঁটছিল দু-জনেই। দুটো বুড়োমানুষ। একটু এগোতেই হোঁচট খেল আবদুলচাচা। ব্যস্ত হয়ে বউকে বলল, দাঁড়াও তো বউ, দ্যাখো তো কীসে আমি হোঁচট খেলুম!
বউও ব্যস্ত হয়ে পিছু ফিরে তাকাতেই শিউরে উঠেছে। বলল, একটা মানুষ গর্তে পড়ে আছে। তার পা দুটো পাথরে আটকে।
কই? বলে ঘুরে দেখেই আবদুলচাচা চেঁচিয়ে উঠল, বউ, এসো এসো, পাথরটাকে দু-জনে ঠেলে ঠেলে সরাই।
বউ বলল, তুমি পারবে না, তোমার কষ্ট হবে। আমি একাই পারব।
মানুষকে বাঁচাতে মানুষের কষ্ট হলে তাকে কি তুমি মানুষ বলবে বউ? বলে নিজেই প্রথমে সেই পাথরটার গায়ে হাত দিল। তারপর বলল, বউ, এসো দু-জনে একসঙ্গে চেষ্টা করি।
বলার আগেই আবদুলচাচার বউ পাথরটা ঠেলতে শুরু করে দিয়েছে। একবার ভেবে দ্যাখো সেই দৃশ্যটা। ওপরে আকাশ, এখন তারা ঝিকমিক করছে। আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে স্তরে স্তরে বরফ-ঢাকা পাহাড়ের চুড়ো। অন্ধকারের গায়ে গা ঠেকিয়ে সেই পাহাড়ের বুকে ঘন জঙ্গল হাওয়ায় দুলছে। বরফের হিমানী তাদের সারাগায়ে ছড়িয়ে। আর নীচে বয়েসের ভারে নুয়ে-পড়া দুটো নি:সঙ্গ মানুষ কঠিন পাথরের সঙ্গে লড়াই করছে একটা অসহায় মানুষকে বাঁচাবার জন্যে। অবাক লাগছে না?
ওই বিরাট পাষাণটাকে সরাতে এই শীতের রাতেও ওই দুটো বুড়োমানুষের গা দিয়ে ঘাম ঝরল। কিন্তু মানুষের জিদ্দির কাছে পাহাড়ও হার মানে। সুতরাং কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পাথর সরিয়ে মানুষটাকে তারা উদ্ধার করল সেই গর্তের ভেতর থেকে। এবার কিন্তু এই আহত মানুষটাকে তারা স্পষ্ট চিনতে পারল। এই লোকটাই সেই রাজু। মনে হচ্ছে এখনও তার প্রাণ আছে, কিন্তু জ্ঞান নেই। দেরি করল না তারা মানুষটাকে নিজেদের ঘরে নিয়ে যেতে। এক বারও ভাবল না তারা এই রাজুই সেই রাজু। যত অনিষ্টের শিরোমণি ইনিই। লোকটার এই দুঃসময়ে কোন দয়াবান এমন কথা ভাবতে পারে! ভাবতে পারে সে, যে পিশাচ।
এই দুটো দুর্গত মানুষকে ঘরে এনে আবদুলচাচা আর তার বউ পারল না শঙ্করকে খুঁজে আনতে। কেননা, এই দুটো মানুষকে তাদের ঘরে জায়গা দিতে সব জায়গা তাদের ফুরিয়ে গেল। এখন শঙ্কর এলে কোথায় তার ঠাঁই হবে। তার ওপর এই দুটো মানুষকে নিয়েই তারা নাস্তানাবুদ হয়ে গেল। সারারাত শুশ্রূষা করতে করতে রাত কেটে যে নি:সাড়ে ভোর এসে গেছে, সেও তারা খেয়াল করল না। জানতে পারল না নিকষকালো পোশাকটা খুলে ফেলে পাহাড় এখন আলোয় ভরে গেছে।
হ্যাঁ, এখন সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ধ্বংসের চিহ্নগুলি। কোথাও ভেঙেছে পাহাড়, কোথাও ভেঙেছে ঘর। আর কোথাও-বা নেমেছে ধস। সেইসঙ্গে আবদুলচাচা এখন এই আলোয় স্পষ্ট চিনে ফেলল সেই মানুষটাকে, কাল রাতের অন্ধকারে যাকে চেনা যায়নি। এ সেই ওমর, তাদেরই পাড়ার চাঁই। আবদুলচাচা আর তার বউ মানুষটাকে দেখে একইসঙ্গে শিউরে উঠল। দুই পাড়ার যত অনিষ্টের দুই নেতা এখন তাদেরই ঘরে আহত হয়ে পড়ে আছে। এখন?
এখন এই সকালে এই আহত দুটো মানুষেরই জ্ঞান ফিরে এসেছে। দুটো মানুষই এখন অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, আর্তনাদ করে উঠছে। আর মমতায় ভরা সেই দুটো বুড়ো মানুষ তাদের সমস্ত চেষ্টা উজাড় করে এই মারাত্মক জখম দুটো মানুষের যন্ত্রণা দূর করার জন্যে প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছে। অবশ্য আবদুলচাচা এখন বুঝতে পেরেছে মানুষ দুটোর প্রাণের ভয় আর তেমন নেই, যদিও দু-জনের মাথা ফেটেছে, বুকে লেগেছে, পা কেটেছে। সুতরাং কবে যে তারা আবার উঠে দাঁড়াতে পারবে, কেউ বলতে পারে না। অগত্যা আবদুলচাচাকেই এখন তাদের দেখতে হবে আর মনে মনে ভাবতে হবে, শঙ্কর নামে সেই ছেলেটা কি সত্যিই পাথরের নীচে চাপা পড়ল!
আচ্ছা, ওই যে ছেলেটি এই সকালে একলাটি বসে চেয়ে আছে তার ঘরের ভগ্নস্তূপের দিকে, ওই কি শঙ্কর?
হ্যাঁ।
তবে কী শঙ্কর পাথরের নীচে চাপা পড়েনি!
না। শঙ্করের গায়ে পাহাড়-ভাঙা পাথরের একটি কুচিও আঘাত করেনি। ভূমিকম্পের প্রচন্ড আক্রোশে পাহাড়টা ভেঙে যখন চাঁই চাঁই পাথর ছিটকে এল ওই ওপর থেকে নীচে, তখন যারা শঙ্করকে ছিনতাই করে পালাচ্ছিল, ওকে ফেলে রেখেই ভয়ে কেঁচোর মতো চম্পট দিল তারা। শঙ্কর সেই দুর্যোগের সময় যেমন নিজের কপালে কী ঘটবে জানতে পারেনি, তেমনই জানতে পারেনি যারা তাকে ছিনতাই করে পালাচ্ছিল তাদের কথাও। তারা বাঁচল না মরল সে-খবর শঙ্কর এখনও পর্যন্ত জানে না। কেননা, তারা যখন ভূমিকম্পের ভয়ে শঙ্করকে ফেলে রেখে পালাচ্ছিল, শঙ্কর তখন নিজে দেখেছে তাদের পায়ের নীচের পাথর খানখান হয়ে ভেঙে পড়ছে। সেই পাথরের খোদলে তারা যে মুখ থুবড়ে ছিটকে পড়েছিল সেও শঙ্করের দেখা। শঙ্করও নিষ্কৃতি পায়নি, অন্ধকারে ছুটতে গিয়ে সেও পড়েছিল অন্য একটা গর্তে। রক্ষে তেমন গভীর ছিল না সে-গর্তটা, তাই বেঁচে গেছল। লেগেছিল ঠিকই কিন্তু তেমন নয়। নইলে কে বলতে পারে এতক্ষণ সে ওই গর্তে পড়ে পড়ে আর্তনাদ করত কি না। কিংবা প্রাণ যে তার যেত না, তাই-বা কে বলতে পারে!
গর্তে পড়ে ওপরে উঠে আসতে শঙ্করকে একটুও কষ্ট করতে হয়নি। কিন্তু সে ভীষণ ঘাবড়ে গেছিল পায়ের তলার কাঁপুনি দেখে। এটা যে ভূমিকম্পের দৌরাত্ম্য, সেটা শঙ্করের জানা আছে। এই পাহাড় ওর জ্ঞানে আরও অনেক বার কেঁপে কেঁপে উঠেছে। কিন্তু তখন সেসব কাঁপুনি এমনতরো ভয়ংকর মনে হয়নি শঙ্করের। এমন করে পাহাড় তখন গর্জে উঠে ভেঙেও পড়েনি। চোখের সামনে মানুষের ঘরগুলো যে এমন করে গুঁড়িয়ে যেতে পারে, এটা শঙ্করের একেবারেই জানা ছিল না। সে ভয় পেল, তার বুকটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠল। গর্তের ভেতর থেকে লাফিয়ে উঠে সেও ছুট দিল। ছুটল সে নিজের ঘরের দিকে। সে যখন ছুটছে, তখনও পাহাড় ভাঙছে। ফেটে চৌচির পাথরের টুকরোগুলো ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে আর তার সঙ্গে উপড়ে পড়ছে ফার, পাইন-এর মস্তমস্ত গাছগুলো। পড়ছে ওপর থেকে নীচে আরও নীচে। সেদিকে তখন তার চোখ নেই। সে এখন ঘরে যাবে। তার বাবা আর মায়ের দেওয়া সেই ছোট্ট ঘর! তাই সে প্রাণপণে ছুটছে।
ছুটতে ছুটতে তাকে থামতে হল আচম্বিতে। মনে হল পাহাড় থেকে ঝরে-পড়া সামনের ঝরনাটা যেন দিক ভুল করে এদিক দিয়েই ছুটছে। শঙ্করের পথ আটকে গেল, একটু দাঁড়াল সে। ঝরনার জলটা এড়িয়ে সে পথ খুঁজল—পেল না। অগত্যা সে ঝরনার জলেই পা ডোবাল। বরফ-ঠাণ্ডা জলে যেন পা অবশ হয়ে যায় শঙ্করের। যাক, তবু সে কোনো বাধাই মানল না। সে ওই জলে পা ডুবিয়েই নিজের ঘরের দিকে ছুটে চলল। দুঃসাহসী ছেলেটা একটু পরেই পৌঁছে গেল তার ঘরের সামনে। দুর্যোগের এই রাতে আর দুরন্ত এই শীতে এইখানে দাঁড়িয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল শঙ্করের চোখ দুটি। কেননা, সে দেখতে পেল পাথরের গুঁতোয় চুরমার হয়ে লুটিয়ে পড়ে আছে তার সেই ঘরখানা। কাঁদল না শঙ্কর এক ফোঁটাও। সে শুধু তাকাল তার মাথার ওপর ওই যে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের চুড়োটা, তার দিকে। চোখ তার অভিমানে টলমল করছে। অভিমান তার ওই পাহাড়টার ওপর। ওই পাহাড়ই তো তাকে বুকে নিয়ে বড়ো করেছে। ওই পাহাড়ের কোলে ছুটে ছুটে সে কত খেলা করেছে। ওই পাহাড়ের রোদ আর ছায়ায় সে কত-না স্বপ্ন দেখেছে। আর আজ সেই পাহাড়ই তার শেষ সম্বলটুকু ভেঙে চুরমার করে দিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। এত নির্দয় এই পাহাড়!
বসে পড়ল শঙ্কর তার ঘরের ভাঙা স্তূপের সামনে। বসে রইল সেই অন্ধকারে, সেই শীতে সারারাত। চোখ দুটি তার স্থির হয়ে চেয়ে রইল। ঘুমের আলস্য তাকে দুর্বল করতে পারল না, সে বসেই রইল। সকাল হয়ে গেল, তবুও উঠল না শঙ্কর।
পাহাড়ের এই শহরে সকালের এই আলোয় মানুষের দুর্ভাগ্যের চিৎকার ভেসে আসছে চারদিক থেকে। চমক ভাঙল শঙ্করের। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল আবদুলচাচার কথা। মনে পড়ে গেল চাচির কথা। আচ্ছা তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি তো! সে প্রায় ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল। তারপর ভাঙা পাথরের বাধা ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে সে এগিয়ে চলল আবদুলচাচার বাড়ির দিকে। এখন আর কারও মনে হিংসা নেই। এখন সবাই বাঁচার তাগিদে আর্তনাদ করছে। আজ ও-পাড়ার ইয়াসিন যদি এই সকালের আলোয় শঙ্করকে দেখতে পায়, সে চোখ রাঙিয়ে তেড়ে আসবে না। বলবে না, এ-পাড়ায় এলে তোকে কেটে ফেলব। বরং ওকে দেখে কেঁদে উঠে বলবে, শঙ্কর আমার সব শেষ হয়ে গেছে রে। আমি এখন কী করব? কোথা যাব? তখন হয়তো শঙ্করও বলবে, ইয়াসিনভাই, আমারও যে সব শেষ হয়ে গেছে। তোমার মতো আমিও আজ নি:স্ব। তখন কি মনে হবে না মিছেই আমরা ঝগড়া করি? মিছেই আমাদের অহংকার? আসলে তো তাই। পৃথিবী যেকোনো মুহূর্তে প্রলয়কান্ড বাঁধিয়ে আমাদের সব দেমাক চুরমার করে দিতে পারে। তবে কেন এত হানাহানি বলো তো!
সুতরাং আবদুলচাচার বাড়ির দিকে যখন পা ফেলে শঙ্কর এগিয়ে চলল, কেউ তার দিকে হিংস্র চোখে তাকাল না। কেউ তার সামনে এসে রুখে দাঁড়াল না। সে নির্বিঘ্নে এগিয়ে চলল।
কিন্তু চলতে চলতে থতোমতো খেয়ে দাঁড়ায় কেন শঙ্কর! অন্য মনে সে কি ভুল পথে চলে এসেছে! হয়তো। আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল শঙ্কর। সে একটি ছেলেকে দেখতে পেয়েছে। তারই মতো। হয়তো একটু ছোটো। দেখতে পেয়েছে, ছেলেটি আর তার মা তাদের ভাঙা ঘরের ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে একটি একটি করে পাথর সরাচ্ছে ছটফটিয়ে। আর কী যেন খুঁজছে পাগলের মতো। শঙ্কর দাঁড়াল না, ছুটে গেল সেইদিকেই। কিছু জিজ্ঞেস না করে সেও তাদের সঙ্গে হাত লাগিয়ে পাথর সরাতে লাগল। তারপর স্তূপাকার পাথরের চাঙড়গুলো সরিয়ে ফেলতেই আঁতকে উঠল শঙ্কর। কান্নায় ভেঙে পড়ল সেই ছেলেটি আর তার মা। কেননা, সেই স্তূপের নীচে এতক্ষণ চাপা পড়েছিল একটি মানুষ। সে-মানুষটি এই ছেলেটির বাবা। হয়তো-বা এখনও বেঁচে আছে। শঙ্কর ছেলেটির কাঁধে হাত রাখল, আর তার মাকে বলল, এখন কাঁদার সময় নয়, এসো আমরা ওঁকে বাঁচাবার চেষ্টা করি।
আশ্চর্য! তাদের বাড়ির অর্ধেকটা ভেঙেছে, অর্ধেকটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে। সুতরাং তিন জন ধরাধরি করে মানুষটাকে বার করে আনল জঞ্জালের ভেতর থেকে। তারপর তুলে নিয়ে এল যেদিকটা এখনও ভাঙেনি সেই দিকে, নিরাপদ পাশের ঘরে। বোঝা গেল মানুষটা বেঁচেই আছে। কেননা, আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হলেও এখনও বুকের শিহরনটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শঙ্কর। সুতরাং শঙ্কর আর নিমেষ অপেক্ষা না করে বলল, তোমরা দেখো। আমি এক্ষুনি আসছি। বলে শঙ্কর ঝড়ের বেগে সেখান থেকে বেরিয়ে ছুট দিল। ছুট দিল ডাক্তারখানায়। এখনই ডাক্তারবাবুকে তার চাই। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে ডাক্তারবাবুর দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু তার যাওয়াই সার। তখন সেখানে শুরু হয়ে গেছে দলে দলে আহত মানুষের মিছিল। সুতরাং সেখানে আর শঙ্কর দাঁড়াল না। আবার ছুটল আর এক ডাক্তারবাবুর কাছে। সেখানেও হাহাকার। সেখান থেকে ছুটছে শঙ্কর শহরের ছোট্ট হাসপাতালে। সেখানেও তার কথায় কেউ সাড়া দেবার সময় পেল না। অথচ সময় চলে যাচ্ছে। কী যে করবে শঙ্কর ভেবে পায় না। এতক্ষণ ধরে অস্থির পায়ে সে বৃথাই চড়াই-উতরাই করল। আর পারে না, হাঁপাচ্ছে। ক্লান্ত পা দুটিকে খানিক জিরান দেবার জন্য সে বসে পড়ল সামনেই ওই পাথরটার ওপর। তারপর ভাবতে লাগল এখন সে কী করবে।
এদিকে এখন ঘুমোচ্ছে আবদুলচাচার ঘরে সেই দুটো মানুষ, ওমর আর রাজু। সারারাত ঘুমোয়নি আবদুলচাচা আর তার বউও। এখন একটু সময় পেয়েছে। এখন একটু গড়িয়ে নিতে পারে তারা। এরপরে আজকের রাতটাও যে কেমন করে কাটবে তাদের জানা নেই। কাজেই তারাও শুয়ে পড়ল।
আজ এই সকালে পাহাড়ে রোদ উঠেছে ঝলমলিয়ে। রোদ উঠলেও পাখির ডাক তুমি শুনতে পাবে না। এই শীতের দেশের পাখিরা এখন শীতের ভয়ে তাদের পাহাড়ের দেশ ছেড়ে উড়ে গেছে অন্য দেশে। আবার ফিরবে তারা আর ক-দিন পরেই বসন্ত এলে। মনে হয় দুর্যোগ কাটল। প্রকৃতির রোষ বোধ হয় শেষ হল এবছরের মতো। বরফ হয়তো আর পড়বে না। তবে ভূমিকম্প হবে না যে, সেকথা কেউ হলপ করে বলতে পারবে না।
বেলা বাড়ছে। অকাতরে ঘুমোচ্ছে আবদুলচাচা আর চাচি। ক-টা কুকুর সারারাত বরফের ঠাণ্ডায় লুকিয়ে বসেছিল কোন ফোকরে। এখন রোদ পোয়াতে বেরিয়ে পড়েছে। খিদেও পেয়েছে, তাই যা সামনে দেখে তাই শোঁকে। মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে ঘেউ ঘেউ ঘে-উ-উ। কাল যখন পাহাড়টা কেঁপে উঠেছিল, তখনও তারা ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিল। তবে সে-চিৎকার কানে যায়নি। কেননা, কুকুরের চিৎকারের সঙ্গে মানুষের চিৎকার একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাই আজ ওদের চিৎকার বড়ো কানে লাগছে, ঘেউ ঘেউ ঘে-উ-উ।
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল রাজুর। হবেও-বা ওই কুকুরের চিৎকারে। আহত মানুষটার মুখখানা যেন ভালো করে চেনাই যায় না। চারদিকে ক্ষত। তবে কি রাজুই কাল দলবল নিয়ে শঙ্করকে ছিনতাই করে পালাচ্ছিল। তার ছিন্নবিচ্ছিন্ন পোশাকটা দেখলে যেন তাই মনে হয়। এ যেন তার সেই ছদ্মবেশের পোশাক। রাজু শুয়ে শুয়েই চোখ মেলল, ওঠারও চেষ্টা করল—পারল না। হয়তো কাউকে ডাকতে চায় সে। কিন্তু গলা দিয়ে তার স্বর বেরোল না। হঠাৎ পাশের মানুষটার দিকে তার নজর পড়ে গেল। সেও তারই মতো আহত। তাকে চিনতে পারল না রাজু। শুয়ে শুয়েই অনেক কষ্টে নিজের হাতটা তার গায়ে ঠেকাতে পারল। কিন্তু তার ঘুম ভাঙল না। হাতটা তার গায়ে ঠেকিয়ে ঠেলা দিল রাজু। না, তবুও তার ঘুম ভাঙল না। আরও একটু জোরে ঠেলল। তবুও সে জাগল না। তবে কি লোকটা মরে গেছে!
রাজুর হৃৎপিন্ডটা ধক করে কেঁপে উঠল। সে অনেক কষ্ট করে একটা হাতের ওপর ভর দিয়ে মাথাটা তুলল, তারপর গলায় একটা ভয়ংকর আওয়াজ তুলে আঁতকে উঠল, আ-আ-আ!
ঘুম ভাঙল না আবদুলচাচার কিংবা চাচির। সারারাত জেগে এখন মড়ার মতো ঘুমোচ্ছে মানুষ দুটো। কিন্তু এতক্ষণ রাজু যাকে মনে করেছিল মরা, সেই ওমরের এখন ঘুম ভেঙে গেছে রাজুর চিৎকারে। সে চোখ খুলে দেখতে পেয়েছে রাজুকে। দু-জনেই দু-জনকে চিনতে পেরেছে। দু-জনেই আতান্তরে শিউরে উঠেছে। চোখের দৃষ্টি স্থির রেখে দু-জনে দু-জনকে ভয়ে ভয়ে দেখছে। এই দুটো ঘাতক অনেক বার খুঁজেছে দু-জনে দু-জনকে। কত বার চেষ্টা করেছে দু-জনে দু-জনকে খতম করে ফেলতে। এখন সেই দুই ঘাতক একই ঘরে পাশাপাশি শুয়ে আছে। তারা কেমন করে এখানে এল, সেই ভাবনাই হয়তো এখন তাদের মনে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে। এ কার বাড়ি এখনও পর্যন্ত সেকথা জানে না এই ঘরের মধ্যে শুয়ে শুয়ে। সুতরাং দুই ঘাতকের বুকের ভেতরে এখন দু-জনের ভয়ে দুরু দুরু কম্পন শুরু হয়ে গেছে। একজন ভাবছে আরেকজন যদি তাকে খুন করে দেয়! আর অন্য আরেকজন ভাবছে ও যদি তাকে খতম করে ফেলে! ভয়ংকর চিন্তায় দুটো মানুষই এখন ছটফট করতে করতে জেরবার হয়ে যাচ্ছে। তাই দু-জনেই কেউ কারোর ওপর থেকে দৃষ্টি সরাতে পারছে না। বুঝি-বা তারা ভাবছে, অসতর্ক হলেই ঘাতকের অস্ত্র তাদের ঘাড়ে পড়বে।
আহত মানুষ দুটো অনেকক্ষণ তাদের দৃষ্টি অমনি করে সতর্ক রেখে বেঁচে রইল। অনেকক্ষণ তাদের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না। ভয়টাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে দু-জনেই হাঁপাতে লাগল। তারপর তাদের দম ফুরিয়ে আসতে লাগল, তারা আর পারল না। দুটো শয়তানের চোখের পাতা একই সঙ্গে ছলছল করে উঠল। তাদের ঠোঁটের ফাঁকে ক-টা শব্দ যেন বার বার হা-হুতাশ করে বলতে চাইল, আমাকে মারিস না ভাই। আর কখনো করব না। তারপর আর তারা কেউ কারও চোখের দিকে চেয়ে থাকতে পারল না। তারা মুখ ঘুরিয়ে নিল। অনেকক্ষণ তারা আর কাউকে দেখল না।
কতক্ষণ এমনি করে মুখ ঘুরিয়ে শুয়েছিল তারা খেয়াল করতে পারে না। আবার যখন তারা দু-জনে দু-জনকে দেখেছিল, তখন তাদের চোখে কান্না ছিল না। অস্পষ্ট হাসিতে ঠোঁট দুটি তাদের থরথর করে কাঁপছিল। তবে কি আঘাতে পঙ্গু দুটো ঘাতক আজ থেকে আবার হাসতে শিখল। তারা কি তবে বন্ধু হল। নাকি এ-হাসি শুধুই মিথ্যে চালাকি! কে জানে!
ওদিকে শঙ্কর অনেকক্ষণ সেই পাথরটার ওপর বসে বসে যখন কী করবে ভাবছিল, তখন তার মনে পড়ে গেল আবদুলচাচার কথা। মনে পড়ে গেল চাচির মুখখানি। সে মানুষ দুটোর কী হল? আচ্ছা, আবদুলচাচা তো হাকিমি জানে! যদি আবদুলচাচার কিছু না হয়ে থাকে তবে আবদুলচাচা তো সেই ছেলেটার আহত বাবার ইলাজ করতে পারবে। এই কথা যেই-না শঙ্করের মনে এসেছে, তক্ষুনি সে ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল, তার আর আয়েশ করা হল না। ক্লান্ত পায়েই সে তরতরিয়ে হাঁটা দিলে। এবার সে পথ ভুল করল না। এবার তার চোখের দৃষ্টি ওই দূর পাহাড়ের কোলেই। ওইখানেই আবদুলচাচার ঘর, ওইখানেই তাকে যেতে হবে।
এ কী! চলতে চলতে আবার কেন থমকে দাঁড়ায় শঙ্কর! ও কে দাঁড়িয়ে আছে সামনে, তার পথের মাঝখানে?
সেই ছেলেটি। মুখখানা এখন তার থমথম করছে কেন? উৎকন্ঠায় যেন কালো হয়ে গেছে মুখখানা। নির্বাক সে। স্থির।
শঙ্কর তাকে দেখে কিছু বুঝল কি না, কে জানে। হয়তো কিছুই বুঝল না। তাই বলল, আজ ডাক্তারবাবুদের কারও সময় হল না।
ছেলেটা ক্ষণেক চেয়ে রইল শঙ্করের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে। তারপর ঝড়ে ভেঙে-পড়া গাছের মতো ছিটকে বসে পড়ল একটি ঢিবির ওপর মুখ গুঁজে। চাপা কান্নায় ডুকরে উঠল, ডাক্তারবাবুর আর দরকার নেই।
চমকে উঠল শঙ্কর। শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। শুনতে লাগল তার কান্না। তারপর এগিয়ে গেল তার দিকে, তার পিঠে হাত রাখল। সান্ত্বনার নরম স্পর্শে শঙ্করের হাতখানি কেঁপে উঠল ওর পিঠের ওপর। মৃদুস্বরে বলল, কাঁদিস না। আমারও কেউ নেই। তুষারঝঞ্ঝায় আমার মা-বাবা দু-জনকেই আমি হারিয়েছি। এখন আমি একা। আমার মতো মনটাকে শক্ত কর। পাহাড়ে জন্মেছি যখন, তখন দুঃখ-কষ্ট আমাদের সহ্য করতেই হবে। নে ওঠ।
ছেলেটার চোখে কান্না উপচে পড়ছে। চোখ-ভরতি কান্না নিয়ে সে ফিরে তাকাল শঙ্করের দিকে।
ছেলেটার চোখের দিকে তাকিয়ে শঙ্কর উত্তর দিল, কালকের দুর্যোগে আমারও ঘরখানা চুরমার হয়ে গেছে।
ছেলেটা হতবাক।
শঙ্কর ছেলেটার পাশে ওই পাথরটার ওপরেই বসল। তার পিঠ থেকে হাত সরিয়ে ছেলেটার হাতের ওপর রাখল। তারপর জিজ্ঞেস করল, তোর নাম কী?
—সুখনলাল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উত্তর দিল ছেলেটি।
তুই ইস্কুলে পড়িস? আবার জিজ্ঞেস করল শঙ্কর।
সে বলল, আমরা অচ্ছুত। আমার বাবা জুতো সেলাই করত। বলতে বলতে সে থামল। সারা মুখখানা চোখের জলে ভিজে গেছে তার। কান্না ভেজা গলায় সে আবার বলল, এখন আমাদের কী হবে?
সুখনলালের গলায় হাতটি জড়িয়ে শঙ্কর বলল, ভয় পাস না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তো আছি।
তারপর দু-জনেই খানিকক্ষণ কথা বলল না। দু-জনেই বুঝি-বা কিছু ভাবছিল। হঠাৎ সুখনলালই বলল, আমাদের কেউ ছোঁয় না।
শঙ্কর সুখনলালের গলাটি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, কেন, এই তো আমি ছুঁয়েছি।
তোমায় কেউ বকবে না? শঙ্করের মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল সুখনলাল।
শঙ্কর হাসল। সে বড়ো ম্লান হাসি। তার কথার কোনো উত্তর দিল না। আরও কিছুক্ষণ শঙ্কর কোনো কথাই বলল না। হঠাৎ বলল, আয় আমার সঙ্গে।
কোথায়? জিজ্ঞেস করল সুখনলাল।
তোর মায়ের কাছে। উত্তর দিল শঙ্কর।
তারপর দু-জনে এগিয়ে চলল।
এতক্ষণে পাহাড়ি-শহরে উদ্ধারকাজ শুরু হয়ে গেছে। দলে দলে লোক এসে পড়েছে। মানুষের হাঁকডাক, ছোটাছুটি, ব্যস্ততা। এই নির্জন পাহাড় এখন অস্থির।
দিন তখনও শেষ হয়নি। তখনও আকাশভরা আলো। সুখনদের এই ঘরে সুখনলালের বাবার সব কাজ শেষ করে এতক্ষণ বসেছিল শঙ্কর। যাক তবু ভালো এই ঘরটা তাদের বেঁচে গেছে। এটা ভাঙলে মায়ের সঙ্গে সুখনও হয়তো বাঁচত না। এতক্ষণ এই যে শঙ্করের সঙ্গে সুখনলালের বন্ধুত্ব হল, এই যে এত কথা সে বলতে পারল, তখন তো আর সেসব হত না!
শঙ্কর উঠে দাঁড়াল।
সুখনলাল তার মায়ের সঙ্গে চমকে তাকাল শঙ্করের দিকে।
আমি এবার যাই। শঙ্কর বলল।
কোথায়? উৎসুক জিজ্ঞাসা সুখনের।
একটা মানুষের খবর এখনও আমি জানি না। আমি যাব আমার আবদুলচাচার খবর জানতে। উত্তর দিল শঙ্কর।
সুখনলালের মায়ের সঙ্গে সুখনের মুখখানাও আতঙ্কে থমথম করে উঠল আবদুলচাচার নাম শুনে। কেননা, এ-পাড়ার সঙ্গে ও-পাড়ার এই ভীষণ দলাদলির কথাটা তো ওদের অজানা নয়। শঙ্কর কিন্তু ওদের মুখ দেখেই বুঝতে পেরেছে ওদের মনের কথাটা। তাই বলল, আমি আবার আসব।
সুখনলাল থাকতে পারল না। ব্যস্ত হয়েই বলে ফেলল, যদি না যাও।
আবদুলচাচার কাছে আমার বাবা কাঠের কাজ শিখেছিল। তখন এ পাড়ার কেউ কারও দুশমন ছিল না, সবাই সবাইকে ভালোবাসত। বাবা রোজ যেত আবদুলচাচার বাড়িতে সালাম জানাতে। আর আজ এই বিপদের দিনে আমি যদি তার খোঁজ না নিতে যাই, মনে বড্ড কষ্ট পাবে আবদুলচাচা। বলে শঙ্কর ওদের ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
—বাবা! হঠাৎ সুখনলালের মা আর্তকন্ঠে ডাক দিল শঙ্করকে।
শঙ্কর দাঁড়াল। পিছু ফিরল। সুখনের মায়ের মুখের দিকে তাকাল। সে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সুখনলালের মা বলল, কাল থেকে ছেলেটার কিছু খাওয়া হয়নি বাবা। তোমারও তো মুখখানি শুকিয়ে আছে।
শঙ্কর নিজের কথা নিমেষও ভাবল না। কিন্তু সুখনের মায়ের কথা শুনে বুঝতে তার দেরি হল না, ছেলের সঙ্গে কাল থেকে মায়েরও কিছু খাওয়া হয়নি। কিন্তু ভারি বিপাকে পড়ে গেল শঙ্কর, কারণ সে এখন খাবার কোথায় পাবে? কেমন করে খেতে দেবে মা আর ছেলেকে? শঙ্কর বোধ হয় নিজের অজান্তেই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়েছিল কয়েক মুহূর্ত। তাকে অমন করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই সুখনলালের মা কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে বলে ফেলল, তোমাকে বোধ হয় অসুবিধেয় ফেললুম।
শঙ্করের চমক ভাঙল, আমতা-আমতা করে বলে ফেলল, কই, না। কীসের অসুবিধে?
তবে বাবা, তুমি অমন করে দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? বলে সুখনলালের মা একটু থামল। তারপর আবার বলল, আমার কোনো উপায় নেই। বুঝতে পেরেছি, তোমারও কিছু করার নেই। কী আর করা যাবে। আজকের রাতটা কোনোরকমে কাটলে কাল কারও কাছে চেয়েচিন্তে দু-মুঠো জোগাড় করব।
সুখনলালের মায়ের কথা শুনে শঙ্করের আঁতে যেন ঘা লাগল। সে কঠোর গলায় বলে উঠল, আমি থাকতে দু-মুঠো খাবারের জন্যে তুমি অন্যের কাছে হাত পাতবে! হ্যাঁ ঠিক কথা, আমারও সব গেছে। কিন্তু তাই বলে মনে কোরো না আমি কিছু পারি না। দাঁড়াও আমি এক্ষুনি আসছি। বলে চোখের পলকে শঙ্কর সেখান থেকে কোথায় যে উধাও হয়ে গেল, তাকে আর দেখা গেল না।
শঙ্কর ওপরে উঠছিল, পাহাড়ের ওপর। আর একটু ওপরে গেলেই শঙ্কর দেখতে পাবে আবদুলচাচার ঘরখানা। অবশ্য এখনও চাচা-চাচি দু-জনেই বেঁচে আছে কিনা, সেও জানে না শঙ্কর। অনেক আগেই খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল শঙ্করের। কিন্তু কেমন করে নেবে! একটার পর একটা বিপদ। খোঁজ নেবার সে ফুরসত পেল কোথায়। দোষ কী তার? কেউ যদি দোষ দেয় শঙ্করকে, সে আর কী করবে!
—শঙ্কর-র-র-র।
কে যেন ডাকল। চমকে উঠল শঙ্কর।
—শঙ্কর-র-র।
হ্যাঁ, তারই নামের প্রতিধ্বনি। শুনতে পেয়েছে শঙ্কর। কিন্তু কে ডাকল?
—শঙ্কর-র-র-র।
এবার শঙ্করের কেমন যেন ধন্দ লেগে গেল। কেননা, যে ডাকছে তার গলাটা শঙ্করের খুবই চেনা। তবে কি পাহাড়ের কোনো কন্দর থেকে আবদুলচাচা ডাকছে? শঙ্করের ওপরে ওঠা হল না। তরতর করে ওপর থেকে নীচে নামতে নামতে সাড়া দিল, —যাই-ই-ই।
কিন্তু কোনদিকে যাবে শঙ্কর। যেখানে সে দাঁড়িয়েছিল সেইখানেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে এপাশ-ওপাশ দেখতে লাগল।
শঙ্কর, তুই কোনদিকে-এ-এ-এ? তেমনিই তীব্র স্বরেই সে ডাকল। অবশ্য এখন গলার স্বরটা খুব স্পষ্ট শুনতে পেল শঙ্কর। সুতরাং শঙ্করের আর কোনো সন্দেহ নেই। তাই সে এবার নাম ধরেই সাড়া দিল, চাচা, আমি এই দিকে।
তারপর দু-জনেই খানিক এদিক-ওদিক করতে করতে দু-জনেই দু-জনকে দেখতে পেল।
শঙ্করই প্রথম আবদুলচাচাকে দেখতে পেয়ে জড়িয়ে ধরেছিল। ধরে আনন্দে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিল শঙ্কর। না তার আবদুলচাচার কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু চাচির? শঙ্কর মুহূর্তে দেরি না করে জিজ্ঞেস করেছিল, চাচি কেমন আছে চাচা? তার গলায় উৎকন্ঠা।
ভালো আছে রে। উত্তর দিয়েছিল আবদুলচাচা। তারপর বলেছিল, আমার যে কী ভাবনা হচ্ছিল তোর জন্যে! কাল রাতে কারা তোকে ধরে নিয়ে গেল আমি জানি না। খবর যে নেব, সে-সুযোগও আমার হল না। এখন তোকে দেখে আমার বুক ভরে গেল শঙ্কর।
চাচা তোমার ঘর? উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল শঙ্কর।
না, কিচ্ছু হয়নি। জানি না আবার যদি পাহাড় কাঁপে আমার ঘর থাকবে কি না। বলে আবদুলচাচা শঙ্করের চিবুকটা ধরে জিজ্ঞেস করল, তোর ঘরটা ঠিক আছে তো?
শঙ্করের মুখখানা ম্লান হয়ে গেল নিমেষে। তারপর সে অস্ফুট স্বরে উত্তর দিল, নেই। আমার ঘরখানা ভাঙা-পাথরে চাপা পড়েছে।
আবদুলচাচা আঁতকে উঠল, —বলিস কী রে।
তারপর দু-জনেই দু-জনকে জড়িয়ে ধরে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। একটু পরেই আবার আবদুলচাচা জিজ্ঞেস করল, তাহলে এখন?
তুমি তো আছ। উত্তর দিল শঙ্কর।
—কিন্তু আমিই যে তোর কাছে যাচ্ছিলাম। কেমন যেন একটা নিরাশকন্ঠে বলে ফেলল আবদুলচাচা।
আমিও তো তোমারই কাছে যাচ্ছিলাম। বলল শঙ্কর।
কেন? উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল আবদুলচাচা।
—একটা ছেলে আর তার মা-র খাওয়া নেই কাল রাত থেকে।
তাদের বাড়ির অর্ধেকটা ভেঙে গেছে। ছেলেটার বাবা ভাঙা বাড়ির পাথরের নীচে চাপা পড়েছে। এখন তুমি ছাড়া তাদের দুঃখের কথা আমি আর কার কাছে বলব? শঙ্কর কাতরকন্ঠে উত্তর দিল।
ওরে শঙ্কর, আমারও যে সেই দশা। বলতে শুরু করল আবদুলচাচা কাল দুটো আহত মানুষকে আমি উদ্ধার করে নিয়ে গেছি আমার ঘরে। কাল রাতভর আমি আর তোর চাচি তাদের শুশ্রূষা করেছি। মৃত্যুর হাত থেকে তারা হয়তো নিস্তার পাবে। কিন্তু বিপদের হাত থেকে আমি কেমন করে নিস্তার পাই বল তো?
কেন, কীসের বিপদ তোমার? ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল শঙ্কর।
আমার ভাঁড়ারে যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। আমার কাছে একটি কানাকড়ি পর্যন্ত নেই। এখন আমি মানুষ দুটোকে খেতে দেব কী? বলতে বলতে স্থির চোখে শঙ্করের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল আবদুলচাচা।
হায় রে, যার কাছে শঙ্কর ছুটে যাচ্ছে দুটো খাবার জোগাড় করতে, এখন তো দেখি, সে-ই ছুটে আসছে খাবারের তাগিদে শঙ্করের কাছেই। তাই আবদুলচাচার কথা শুনে কেমন যেন জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল শঙ্কর। কী করবে সে এখন, কিছুই ভেবে পেল না।
শঙ্করকে এমন নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবদুলচাচা জিজ্ঞেস করল, কী ভাবছিস?
শঙ্কর বলল, ভাবছি, আমাদের দু-জনেরই এখন খুব বিপদ।
কেন? ব্যস্ত হল আবদুলচাচা।
তুমি বুড়ো মানুষ। এই ঠাণ্ডায়, এই অসময়ে ছুটে আসছ দুটো আহত মানুষের জন্যে আমার কাছে, আর আমিও কত আশায় ছুটে যাচ্ছি তোমার কাছে দুটো দুর্গত মানুষের জন্যে। কিন্তু মিথ্যেই আমরা ছোটাছুটি করছি। বলতে বলতে থামল শঙ্কর।
কেন? মিথ্যে বলছিস কেন শঙ্কর? তোর কাছে কি কিছুই নেই? কেমন যেন হতাশ হয়ে জিজ্ঞেস করল আবদুলচাচা।
ওই বুড়ো মানুষটার অমন হতাশা দেখে ভারি কষ্ট হল শঙ্করের। কিন্তু কী বলবে এখন শঙ্কর আবদুলচাচাকে। সত্যিই তো, তারও তো এখন কিছুই নেই। তার মায়ের বাক্সে যা ছিল, তাও লুঠে নিয়েছে সেই অমানুষ দুর্বৃত্তেরাগুলো। কিন্তু হঠাৎ শঙ্করের মুখখানা অমন উছলে উঠল কেন এই কষ্টের মধ্যেও? সে চকিতে নিজের জামার পকেটে হাত পুরে দিল। ব্যস্ত হয়ে এ পকেট ও-পকেট ঘাঁটতে ঘাঁটতে চেঁচিয়ে উঠল, আবদুলচাচা, পেয়েছি পেয়েছি।
কী পেয়েছিস? ঠিক ততখানি ব্যস্ত হয়ে আবদুলচাচা জিজ্ঞেস করল।
শঙ্কর পকেট থেকে চট করে একটা দশ টাকার নোট বার করে যেন উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগল। বলল, চাচা, এই টাকাটা নিয়ে তখন মহাদেবের দোকানে গেছলুম খাবার কিনতে। মহাদেব দোকানি খাবার দিল না। কারণ আমাকে খাবার বিক্রি করতে বারণ করে দিয়েছিল রাজুকাকা। রাজুকাকা আমাকে অনাহারে মারতে চেয়েছিল। সেই টাকাটাই এখনও আমার পকেটে পড়ে আছে। এই নাও।
রাজু নামটা শুনে আবদুলচাচার মুখখানা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল। তার রোষভরা মুখ দিয়ে অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এল, —রাজু!
আবদুলচাচার সেই রোষ তেমন খেয়াল করল না শঙ্কর। তাই বলল, দ্যাখো, আমার পকেটে যে এই টাকাটা ছিল, একদম মনে ছিল না। ভাগ্যিস তালেগোলে হারিয়ে যায়নি। চলো এখন আমরা দু-জনে যাই। দেখি এবার মহাদেব দোকানি খাবার দেয় কি না।
আবদুলচাচা যে ভেতরে ভেতরে খুব রেগেছে, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। তাই চোয়াল দুটো শক্ত করে চেপে বলল, না, তোকে কিছু করতে হবে না।
—কেন? অবাক হল শঙ্কর।
যে লোক দুটোকে আমি ঘরে তুলেছি, সে দুটো লোকের একটার নাম ওমর আর একটার নাম রাজু। যে তোকে অনাহারে মারতে চেয়েছিল তাকে আমি দয়া করতে পারব না। ও- দুটোকেই আমি ঘর থেকে বার করে দেব। আমি চলি। বলে রাগে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে আবদুলচাচা ঘরে ফিরে যাবার জন্যে পা বাড়াল।
শঙ্কর চোখের পলকে আবদুলচাচার হাতটা ধরে ফেলে জিজ্ঞেস করল, কোথা যাচ্ছ?
—ফিরে যাচ্ছি।
আবদুলচাচা! ভারি দরদ মাখানো গলায় ডাক দিল শঙ্কর। —দুটো অক্ষম মানুষকে তুমি ঘর থেকে বার করে দেবে?
ও দুটো মানুষ নয়। ওরা ঘাতক। উত্তর দিল আবদুলচাচা।
—না চাচা, না, ওরা এখন আহত। আহত মানুষকে রাস্তায় বার করে দিলে লোকে তো আমাদেরই ঘাতক বলবে। তাদের বিপদের দিনে আমরা যদি এগিয়ে না আসি, তবে কে আসবে বলো?
শঙ্করের মুখে এমন কথা শুনে আবদুলচাচার বুকটা চমকে উঠল খুশিতে। শঙ্করের কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে আবদুলচাচা চেঁচিয়ে উঠল, —শাবাশ। তারপর বলল, তোর মা-বাবা যদি বেঁচে থাকত, তোর মুখে একথা শুনে তাদেরও বুক ফুলে উঠত। হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই ঠিক বলেছিস। চ আমরা বাজারেই যাই।
দু-জনেই বাজারে চলল।
পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে নামতে তারা দেখল অনেক ঘর ভেঙেছে, অনেক বাড়িই পড়েছে। অনেক মানুষ আশ্রয়হীন। আবদুলচাচা দেখছে আর শিউরে উঠছে। এদিকে কতদিন আসেনি আবদুলচাচা। আসবে কী, মানুষের ভয়ে মানুষই তো কুঁচকে আছে এখানে। কিন্তু আজ আর কেউ কাউকে ভয় পাচ্ছে না। সব মানুষের আজ একসঙ্গে একই বিপদ। সবাই আজ নিজের নিজের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত। সুতরাং আবদুলচাচাকে সঙ্গে নিয়ে শঙ্কর নির্বিঘ্নে বাজারে নেমে এল। আর একটু গেলেই মহাদেবের খাবারের দোকান। তবে এই নীচে বাজারের যে খুব-একটা ক্ষতি হয়েছে তা দেখে মনে হচ্ছে না। তবে যে একেবারেই কিছু হয়নি তা নয়। কোথাও রাস্তা ফেটেছে, কোথাও পাথর ছড়িয়ে পড়েছে, কোথাও-বা ধস নেমেছে। তবে পাহাড়ের আর-একটু ওপরে যা অবস্থা তার চেয়ে বাজারের চেহারা অনেক ভালো। ওপরেই যেন ভূমিকম্পের রোষটা বেশি।
চলতে চলতে থমকে দাঁড়াল শঙ্কর। চমকে গেল। থামল আবদুলচাচাও। দেখল মহাদেব দোকানির দোকানের চালাটা ধসে পড়েছে। খাবারদাবার সব চালার নীচে চাপা। মহাদেব দোকানি মরিয়া হয়ে একা একাই চালাটা তোলবার চেষ্টা করছে। একজনও কেউ নেই যে, তাঁকে একটু সাহায্য করে। একাই বেদম হয়ে টানাটানি করছে আর চ্যাঁচাচ্ছে, ওরে আমার সব্বনাশ হয়ে গেল রে।
ছুটে গেল শঙ্কর। মুখে একটিও শব্দ করল না। এখন কথা বলার সময়ও নয়। মহাদেব দোকানির হাতে হাত মিলিয়ে সেই ভেঙে-পড়া চালাটা তোলার জন্যে ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দিলে শঙ্কর। আবদুলচাচাও দাঁড়াল না, লড়ে গেল শঙ্করের সঙ্গে।
তিন জনের শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারল না চালাটা। তাকে উঠতেই হল। কিন্তু চালাটা এমন ভাঙা ভেঙেছে যে, তার আর কম্ম নয় মাথার আকাশটা আড়াল করে। মহাদেব দোকানি তার দোকানের হালত দেখে ভয়ে কাঠ। মুখে কথা সরছে না। চোখে জল। মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল দোকানের সামনে। তাকে দেখে মনে হল যেন দুর্বিপাকের কালো ছায়া তার মাথার ওপর ওত পেতে ভেংচি কাটছে।
শঙ্কর মহাদেব দোকানির পাশে বসল। তার হাত ধরল। আর বলব কী, একেবারে সঙ্গেসঙ্গে মহাদেব দোকানি যেন মরাকান্না কেঁদে উঠল, —ওরে শঙ্কর, আমার এ কী হল রে।
তাকে অমন করে কাঁদতে দেখে ভারি কষ্ট হল শঙ্করের। এক বারের জন্যেও শঙ্করের মনে হল না, কাল যখন শঙ্কর খাবার কিনতে এসেছিল এই লোকটাই তাকে বিমুখ করেছিল। উলটে সে মহাদেব দোকানির হাতটা ধরে বলল, মহাদেবদাদা, তোমার মতো আমারও ঘর ভেঙে গেছে, আরও কত মানুষের কত ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি সবাই কাঁদি, তাহলে কে কাকে দেখবে। এই দ্যাখো, আমার আবদুলচাচাও আজ বেরিয়ে পড়েছে এই বয়েসে আমাদেরই জন্যে। আজ আমরা সবাই সবাইকে দেখব। নাও ওঠো।
শঙ্করের কথা শুনে মহাদেব দোকানি উঠে দাঁড়াল। অবাক হয়ে তাকাল খানিক শঙ্করের মুখের দিকে। তারপর তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, কাল তোর ওপর আমি যে অন্যায় করেছি তার শাস্তি পেলুম।
শঙ্কর বলল, ছি ছি, ও-কথা কেন মনে করছ মহাদেবদাদা? আমি তো আজও এসেছি তোমার কাছে এই খাবারের জন্যে। তোমার দোকান ভেঙেছে। অনেক খাবার নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু দ্যাখো, এখনও অনেক খাবার ভালো আছে। তুমি যদি দাও অনেক মানুষ খেয়ে বাঁচবে।
সত্যিই তাই। দোকানের চালাটা ভেঙে পড়লেও এখনও অনেক খাবার নষ্ট হয়নি। সুতরাং মহাদেব দোকানির মুখখানা শঙ্করের কথা শুনে খুশিতে উছলে উঠল। সে বলল, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই দেব। নিয়ে যা শঙ্কর, সব নিয়ে যা। আমার আবার হবে।
শঙ্কর বলল, তবে আমি তোমাকে তো সব খাবারের দাম দিতে পারব না। আমার কাছে দশ টাকা আছে।
—কী বলছিস শঙ্কর? মানুষ বিপদে পড়েছে আর আমি পয়সা নেব।
শঙ্কর বলল, মহাদেবদাদা, বিপদ তো তোমারও।

মানুষের হাঁকডাক,ছোটাছুটি, ব্যস্ততা। এই নির্জন পাহাড় এখন অস্থির।
—তা হোক। তবু আজ আমি কারও কাছে পয়সা নিতে পারব না। বলে মহাদেব দোকানি আবদুলচাচার কাছে এগিয়ে গেল। বলল, তোমাদের কাছে পয়সা আমি নিতে পারব না।
আবদুলচাচা বলল, কিন্তু তোমার চলবে কেমন করে ভাই? তোমার এই বিপদের সময় পয়সাটা নেওয়াই ভালো।
—কিন্তু বিপদ তো আজ আর আমার একার নয়, সক্কলের। আমিও নাহয় কিছু করলুম তাদের জন্যে। বলে মহাদেব দোকানি আবদুলচাচার হাতটা ধরল।
না, মহাদেব দোকানি সত্যিই পয়সা নিল না। শঙ্কর বলল, ঠিক আছে মহাদেবদাদা, আজ আমরা খাবার নিচ্ছি। কিন্তু এরপরে যেদিন আসব তোমায় পয়সা নিতে হবে।
মহাদেব দোকানি বলল, ঠিক আছে। বলে শঙ্করের হাতে একথালা আর আবদুলচাচার হাতে আর একথালা খাবার তুলে দিল। শঙ্কর আর আবদুলচাচা খাবার নিয়ে হাঁটা দিল। শঙ্কর চলল সুখনলালদের বাড়িতে। আবদুলচাচা চলল নিজের বাড়ির দিকে।
শঙ্কর যখন সুখনলালদের আধ ভাঙা বাড়িতে পৌঁছোল তখনও সুখনলাল আর তার মা কাঁদছে। শঙ্কর ঘরে ঢুকেই ডাক দিল, মাসি, মাসি, তোমার ছেলের জন্যে খাবার এনেছি। এমনভাবে বলল যেন কত আপন।
সুখনলালের মা অবাক হয়ে তাকাল শঙ্করের মুখের দিকে।
সঙ্গেসঙ্গে শঙ্কর বলল, সুখনলালকে খেতে দাও, তুমি খাও। মাসি গো, আমারও বড্ড খিদে পেয়েছে।
শঙ্করের কথা শুনে সুখনের মায়ের অমন যে শোক-তাপ কেমন যেন ভুলে গেল নিমেষের জন্যে। চোখের জল মুছে ফেলে জিজ্ঞেস করল, তুমি এত খাবার কোত্থেকে পেলে বাবা?
—সেকথা পরে হবে। আগে খেয়ে নাও। বলে খাবারের থালাটা সুখনের মায়ের হাতে দিয়ে শঙ্কর সুখনের কাছে গিয়ে বসল। জিজ্ঞেস করল, দেরি হয়ে গেল, না রে?
সুখন সেকথার কোনো উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, এত খাবার তুমি কোত্থেকে পেলে?
মহাদেব দোকানি দিল। উত্তর দিল শঙ্কর।
—কিনে আনলে?
—পয়সা নিল না।
দয়া করে দিল? আবার জিজ্ঞেস করল সুখনলাল।
না, দয়া কেন করবে। উত্তর দিল শঙ্কর। বলল, মহাদেব দোকানির দোকানের চালাটা ধসে পড়েছিল। আমি আর আবদুলচাচা অনেক মেহনত করে সেটা তুলেছি। এ আমাদের মেহনতের দাম।
কাল কী করবে? জিজ্ঞেস করল সুখনলাল।
কালও মেহনত করব। উত্তর দিল শঙ্কর।
—কাল আমিও তোমার সঙ্গে যাব। তোমার সঙ্গে আমিও মেহনত করব।
শঙ্কর হাসল। জিজ্ঞেস করল, কী মেহনত করবি তুই?
—তুমি যা করবে।
—পারবি?
—তুমি পারলে আমিও পারব।
তবে আয় এখন খেয়ে নিই। বলে শঙ্কর সুখনলালের মায়ের হাত থেকে খাবারের বাটিটা নিয়ে গপগপ করে খেতে লাগল সুখনের সঙ্গে।
এদিকে বেলা পড়ে গেছে। সূর্যও নেই আকাশে। পেটে কিছু পড়তেই শঙ্কর কেমন যেন একটু ঝিমিয়ে পড়ল। বোঝা গেল শঙ্করের ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু এখন সে কোথায় যাবে? কোথায় গেলে একটু শোবার জায়গা পাবে? তার ওপর গায়ে দেবার লেপ-কম্বলগুলোও তো গেছে। এরপর এই শীতে যদি মাথায় ছাদও না থাকে, তবে এই রাতটা তার কাটবে কী করে! চেয়ে দ্যাখো, কী চেহারা হয়েছে ছেলেটার। অমন টলটলে চোখ দুটো কোথায় কোন কোটরে ঢুকে গেছে। আ-হা রে! মুখখানাও ঝলসে গেছে।
না, কিছু বলতে হল না। শঙ্কর নিজেই আর বসতে পারল না। ঢুলতে ঢুলতে শুয়ে পড়ল সুখনদের ঘরের চৌকিটার ওপর। তারপর আর কিছু জানার কথা নয় তার। তাই সে জানতে পারল না, বেশিক্ষণ সুখনও বসে থাকতে পারেনি। শুধু জেগে বসেছিল তার মা। কী সাংঘাতিক ভাবনা তার! এখন কী হবে? এখন সুখনকে নিয়ে একা একা তার কেমন করে দিন চলবে?
অনেক সকালে ঘুম ভেঙে গেছিল শঙ্করের। ঘুম ভেঙে যেতে সে দেখেছিল, তার গায়ে একখানা লেপ জড়ানো। তার পাশে সেই লেপের নীচে এখনও ঘুমোচ্ছে সুখনলাল। আর খানিক দূরে সুখনলালের মা জবুথবু হয়ে বসে আছে। কে জানে সারারাত ধরেই মানুষটা অমনি করে বসেছিল কি না।
আরও খানিকক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি দিল শঙ্কর। আরও খানিকক্ষণ সুখনও ঘুম থেকে উঠল না। না-ওঠাই ভালো। উঠলেই তো সুখনের বাবার কথা মনে পড়ে যাবে। মনে হবে, সে তো আর কোনোদিনই বাবাকে দেখতে পাবে না। এখন যেমন শঙ্করের মনে পড়ে যাচ্ছে, তার ঘরখানা ভেঙে গেছে ভূমিকম্পে। এই ঘরেই তো সে কত খেলা করেছে মায়ের সঙ্গে। কত গল্প করেছে বাবার সঙ্গে। এখন তার কিছু নেই। এখন একা।
শঙ্কর আর বেশিক্ষণ বিছানায় পড়ে থাকল না। কেননা, সুখনেরও এখন ঘুম ভেঙে গেছে, সে উঠে পড়ল। শঙ্কর জিজ্ঞেস করল, কী রে, ঘুম হয়েছে?
কিন্তু সুখন উত্তর দিল না। কেমন যেন অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল শঙ্করের মুখের দিকে। তারপর মাকে দেখে কেঁদে ফেলল।
শঙ্কর বলল, ওঠ। কাঁদিস না। চ, তৈরি হয়ে নে। দেখি কিছু করা যায় কি না। মেহনত করতে হবে। মনটাকে শক্ত কর।
সুখনলাল উঠে পড়ল। চোখের জল মুছে ফেলল। তারপর মায়ের কাছে গিয়ে বসল খানিক। মুখ-চোখ ধুয়ে-মুছে শঙ্করের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।
কাল রাতটা শঙ্কর অকাতরে ঘুমিয়েছে, সুতরাং আজ বেশ ঝরঝরে লাগছে। আজ আকাশটাও দ্যাখো! কে বলবে এই আকাশই তুষার ঝরায়। তেমনি আজ শঙ্করকে দেখলেই-বা কে বলবে কাল শঙ্করের অমন করে দিন কেটেছে। চলতে চলতে শঙ্কর সুখনলালকে বলল, চ আগে মহাদেব দোকানিকে দেখে আসি।
বাজারের পথই তারা ধরল। কিন্তু মেলার মাঠের কাছে গিয়ে শঙ্কর থ হয়ে গেল। কেননা, এই শহরের এ পাড়ার কত যে মানুষ আশ্রয় হারিয়ে এখানে জড়ো হয়েছে! তারা যে যেমন পেরেছে এদিকে-ওদিকে চট-কাপড়ের ছাউনি দিয়ে তারই ভেতর মাথা গলিয়ে বসে আছে। ভাগ্যিস এখানে বরফ জমে নেই। শঙ্কর দাঁড়াল। কিছু ভাবল। তারপর বলল, সুখনলাল, ভালোই হল। এখানে আমিও একটু জায়গা নিয়ে ঘর বানাব। বলে আবার হাঁটতে শুরু করল।
বাজারে এল বটে কিন্তু মহাদেব দোকানিকে তো তারা দেখতে পেল না। এদিকে-ওদিকে একটু খোঁজাখুঁজি করল। দু-একবার ডাকাডাকি করল। কিন্তু তার সাড়াও নেই, শব্দও নেই। অগত্যা শঙ্কর বলল, চ সুখনলাল, তাহলে আবদুলচাচার বাড়ি যাই।
তাই চলো। সুখন উত্তর দিল।
এখন আর ভয় নেই কারও। কেউ আর কাউকে অবিশ্বাস করে না। তাই নির্ভয়ে এগিয়ে চলল শঙ্কর সুখনকে নিয়ে পাহাড়ের ওই ওপরে আবদুলচাচার বাড়ির দিকে। ওই ওপরেই সেই দুটো ঘাতক আছে, রাজু আর ওমর। কে জানে আবদুলচাচার বাড়ি গিয়ে তাদের কেমন দেখবে শঙ্কর।
কিন্তু আবদুলচাচার বাড়ি অবধি যেতে পারল না শঙ্কর। আবদুলচাচার পাড়াতে ঢুকতেই শঙ্কর দেখল সেখানে যেন বিপদগ্রস্ত মানুষের হাহাকার পড়ে গেছে। এ পাড়ার কত লোকের যে ঘর ভেঙেছে তার হিসেব কে করবে। যে যেখানে পেরেছে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ পাথরের আড়ালে, কেউ গাছের নীচে। কেউ-বা ভাঙা বাড়ির আনাচেকানাচে। ভয়ে বিহ্বল তাদের মুখের চেহারা।
শঙ্কর তাদের দেখে থমকে দাঁড়াল। সুখন শঙ্করের মুখের দিকে তাকাল উৎসুক চোখে। জিজ্ঞেস করল, দাঁড়ালে?
শঙ্কর বলল, দ্যাখ এরা কী কষ্টে আছে।
সুখন বলল, হ্যাঁ, দেখছি তাই।
শঙ্কর তাদের দেখতে দেখতে কিছু ভাবল। তারপর বলল, সুখনলাল, আয় এদের আমরা মেলার মাঠে নিয়ে যাই। ওখানে অনেকে ঘর বেঁধেছে। এরাও তো সেখানে ঘর বেঁধে থাকতে পারবে।
সুখন বলল, মেলার মাঠে এদের থাকতে দেবে কেন? এরা তো অন্য পাড়ার লোক।
শঙ্কর উত্তর দিল, মেলার মাঠ কি কারও একার? আমাদের সকলের। এমন বিপদের দিনে এপাড়া-ওপাড়া বলে কেউ ভাবে নাকি? আবদুলচাচার পাড়া আর আমাদের পাড়া আজ এক হয়ে গেছে। আয় ওদের ডেকে নিয়ে যাই। বলে শঙ্কর এগিয়ে গেল ইয়াসিনভাইয়ের কাছে। বলল, ইয়াসিনভাই, তোমরা সবাই চলো মেলার মাঠে। যতদিন-না পাহাড়ের গায়ে ভাঙা ঘর আবার নতুন করে গড়তে পারছি, ততদিন আমরা সক্কলে ওখানে ছাউনি বেঁধে আশ্রয় নেব। আজ আমাদের সকলের বিপদ, আজ আমরা সবাই সমান।
কী জানি কী হল! ওই পুঁচকে ছেলেটার কথায় যেন সাড়া পড়ে গেল। সত্যিই তো কাল সারারাত এই ঠাণ্ডায় কী কষ্টে যে তাদের সময় কেটেছে, সে তো ওরা ছাড়া আর কে জানে! তাই শঙ্করের কথা শোনার সঙ্গেসঙ্গে সুলতানের সঙ্গে ইয়াসিনভাই আর তাদের সঙ্গে আরও কত মানুষ চিৎকার করে বলে উঠল, হ্যাঁ, এখানে এমন কষ্টে পড়ে থাকার চেয়ে আমরা মেলার মাঠে ছাউনি বাঁধব। চলো, চলো। বলে ও-পাড়ার মানুষ এ পাড়ায় আসার জন্যে সারে সারে দল বেঁধে নামতে লাগল পাহাড়ের ওপর থেকে। শঙ্কর আর সুখনলাল তাদের পথ দেখিয়ে নেমে এল তাদেরই সঙ্গে। শঙ্কর পিঠে বেঁধে নিল অথর্ব এক বৃদ্ধা সালমাবুড়ির ভাঙা বাক্সটা। আর সুখন ধরল সেই বৃদ্ধার হাতটি। চলতে চলতে ঢালু পথে না গড়িয়ে পড়ে বুড়ি।
না, কেউ গড়িয়ে পড়ল না। কেউ ভয়ও পেল না। এ পাড়ার সঙ্গে ও-পাড়ার রেষারেষির কথাও কেউ ভাবল না। একটা ছোট্ট ছেলের কথায় সব ভয় তুচ্ছ করে তারা নেমে এল পাহাড়ের নীচে সেই খোলা মেলার মাঠে। আশ্চর্য! আজ আর কেউ তাদের বলল না ও-পাড়ার মানুষ তোমরা কেন এ পাড়ায় এসেছ। কেউ আস্ফালন দেখাল না। সবাই জানে আজ ঝগড়া করার দিন নয় আজ বাঁচার দিন। সবাই আজ জেনে ফেলেছে, এ হানাহানি মিথ্যে। ওই পাহাড় যখনই মনে করবে তখনই সে কেঁপে উঠবে। তখনই সে চুরমার করে দেবে আমাদের সব দেমাক। সুতরাং সবাই আজ হাতে হাত মিলিয়ে লেগে পড়ল ছাউনি বানাতে সেই মেলার মাঠে। শুধু দাঁড়িয়ে রইল সেই সালমাবুড়ি। তার ভাবনা সে কোথায় থাকবে? কে তার ঘর বেঁধে দেবে?
শঙ্কর বলল, দাদি, তুমি কিছু ভেবো না। আমি আর সুখনলাল আছি। তোমার ছাউনি বেঁধে দেব আমরা। একটু সবুর করো। বোসো তোমার এই বাক্সটার ওপর।
হ্যাঁ, পাহাড়ে বরফ গলছে।
শঙ্কর বলল, সুখনলাল, চ একটা শাবল জোগাড় করে আনি। বলে দু-জনে যত জোরে ছুটল ঠিক তত জোরেই ছুটতে ছুটতে ফিরে এল।
শঙ্কর পিঠে করে চারটে কাঠের খুঁটি বয়ে এনেছে। ছাউনি বাঁধতে লাগবে। এখন তো আর ভাঙা খুঁটির অভাব নেই। চারদিকে ঘর ভেঙেছে, খুঁটিও উপড়ে পড়েছে। তা-ই তুলে এনেছে শঙ্কর। সুখন এনেছে ছেঁড়াখোঁড়া চট-কাপড়। জোগাড় করেছে একটা শাবল। তারপর তারা সেই বুড়ি দাদির জন্যে ছাউনি বানাতে মেহনত শুরু করে দিল। মেহনত শুরু করে দিয়েছে আরও অনেকে। এই মেলার মাঠে যে যেখানে পারছে আশ্রয় গড়ে নিচ্ছে। আজ আর কেউ বারণ করার নেই। আজ আর কেউ তেড়ে এসে দাঙ্গা শুরু করে দেবে না। যে দুটো মানুষ সব অনাচারের শিরোমণি, তারা তো নিজেরাই আজ ঘায়েল হয়ে পড়ে আছে আবদুলচাচার বাড়িতে।
শঙ্কর আর সুখনলাল অনেকক্ষণ ধরে অনেক মেহনত করে বুড়ি সালমাদাদির জন্যে ঘর বাঁধল। এই হাড়-কাঁপানো শীতেও তাদের কপালে ঘামের ফোঁটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। শঙ্কর বলল, দাদি, তোমার ঘর বেঁধেছি আমরা। এখানে আরাম করো।
সালমাবুড়ি কাঁপা কাঁপা গলায় উত্তর দিল, বেঁচে থাক বাবা, বেঁচে থাক। তোরা না থাকলে কে আর আমার ঘর বেঁধে দিত।
শঙ্কর বলল, দাদি, কিছু ভেবো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি ঘরে বোসো, আমরা তোমার জন্যে কাঠকুটো জোগাড় করে আনি। তুমি আগুন পোহাবে।
বুড়ি ঘরে বসল আর শঙ্কর-সুখনলাল কাঠকুটো জোগাড় করতে ছুটল।
হ্যাঁ, অনেক সাধ্যিসাধনা করে তারা কাঠ জোগাড় করল। কিন্তু তুষার পড়ে সে কাঠের যা অবস্থা। কী করে আগুন ধরবে কে জানে! তবু তো চেষ্টা করতে হবে। তাই চেষ্টা করল তারা অনেকক্ষণ ধরে। শেষমেষ অনেক কষ্টে আঁচ ধরিয়ে শঙ্কর বলল, দাদি, আগুনে হাত সেঁকো। আমরা অন্য কাজ দেখি।
সালমাদাদি বলল, বাবা, তোরা যে এত গায়ে-গতরে খাটলি আমি তো কিছুই তোদের দিতে পারলুম না।
শঙ্কর উত্তর দিল, তুমি কোথায় পাবে যে দেবে?
—ক-টা টাকা আছে আমার। তোরা নিয়ে যা, কিছু কিনে খাবি। মমতায় যেন উছলে উঠল সেই সালমাবুড়ির মনটি।
তুমি কিছু খেয়েছ দাদি? জিজ্ঞেস করল শঙ্কর।
বুড়ি চুপ করে রইল।
শঙ্কর দাদিকে আর কিছু জিজ্ঞেস না করে বলল, দাও টাকা। দেখি কোথাও খাবার পাই কি না।
সালমাবুড়ি নিজের কাপড়ের খুঁটে বাঁধা একগোছা টাকা বার করল। সব টাকাই শঙ্করের হাতে তুলে দিয়ে বলল, যা তোরা নিয়ে যা।
আমরা এত টাকা নিয়ে কী করব দাদি? এত টাকা আমাদের দরকার নেই। টাকা হাতে নিয়ে শঙ্কর বলল।
ওরে বাছা যা দিচ্ছি নিয়ে যা, তোদের কাজে লাগবে। আমার এই ভাঙা বাক্সে আরও আছে, দরকার পড়লে আরও দেব। বলে সালমাবুড়ি শঙ্করের মাথায় হাত রাখল।
শঙ্করের মনে পড়ে গেল আবদুলচাচার কথা। মনে পড়ে গেল চাচির কথা। ওদেরও পয়সা নেই। অথচ দুটো আহত মানুষ তাদের ঘরে। তাই ওই টাকা নিতে শঙ্কর আপত্তি করল না। কেউ তো আর বলতে পারবে না, হাত পেতে ভিক্ষে নিচ্ছে। শঙ্কর আর সুখনলাল দস্তুরমতো মেহনত করেছে সালমাবুড়ির জন্যে। এ তাদের মেহনতের পয়সা। এমনই করে রোজ তারা মেহনত করবে। এমনই করে পয়সা উপায় করবে।
শঙ্কর আর দাঁড়াল না। সালমাবুড়িকে বলল, দাদি আমরা একটু পরেই আসছি। তোমার জন্যেও খাবার আনছি। বলে সুখনলালের হাত ধরে বলল, চ।
ছুটতে ছুটতে শঙ্কর আর সুখনলাল চলল বাজারের দিকে। যাবার সময় দেখতে দেখতে গেল এ পাড়ার ভোলানাথ ও-পাড়ার আনোয়ারের সঙ্গে আর ও-পাড়ার হাসান এ পাড়ার শিউচরণ কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে বিপদের সঙ্গে লড়াই করে মেলার মাঠে ঘর বাঁধছে।
এবারেও বাজারে গিয়ে শঙ্কর মহাদেব দোকানিকে দেখতে পেল না। অগত্যা অন্য আর একটা দোকান থেকে সালমাদাদির দেওয়া টাকা দিয়ে অনেক খাবার কিনল। আরও অনেক টাকা বেঁচে গেল। সেই খাবার আর টাকা নিয়ে শঙ্কর সুখনলালের সঙ্গে এবার আবদুলচাচার বাড়ি ছুটল।
ওরা যখন আবদুলচাচার বাড়ি পৌঁছোল তখন মানুষটা শঙ্করের জন্যে একবার ঘর আর একবার দোর করছে। শঙ্করকে দেখে যেন তার ধড়ে প্রাণ এল। শঙ্করকে দেখতে পেয়েই হুলুস্থুল লাগিয়ে দিলে। কোথা ছিলি? কী করছিলি? যেন কথার শেষ নেই। তারপর যখন শুনল শঙ্কর আর সুখনলাল এতক্ষণ মেহনত করছিল, মেহনতের পয়সায় তারা এই খাবার কিনে এনেছে, তখন আবদুলচাচার চোখ ছলছল করে উঠল। আবদুলচাচার মুখ দিয়ে স্পষ্ট একটি শব্দ বেরিয়ে এল, শাবাশ। তারপর আর কিছু বলতে পারল না সেই বুড়ো মানুষটা।
ততক্ষণে শঙ্করের গলা শুনে ছুটে এসেছে চাচি। শঙ্কর টাকাগুলো আর খাবারের ঠোঙাটা চাচির হাতে দিয়ে বলল, এই নাও রাখো। বলে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল সুখনলালকে নিয়ে। দাঁড়াল সেই দুটো আহত মানুষের সামনে। একজন তার রাজুকাকা আরেকজন ওমর। শঙ্করকে দেখে থতোমতো খেয়ে গেল রাজু। চমকে উঠল শঙ্করও তার গায়ের পোশাকটা দেখে। এই পোশাকটা দেখেই শঙ্কর বুঝতে পেরেছে, এই রাজুই সেদিন তাকে ধরে নিয়ে পালাচ্ছিল। শঙ্কর মুখ ফিরিয়ে নিল। তাকাল ওমরের দিকে। তারপর সুখনলালের কাঁধে হাত রেখে বলল, চ।
শঙ্কর। ডাক দিল রাজু। তার গলার স্বর মিনমিন করছে।
শঙ্কর দাঁড়াল।
—আমার ঘরে পৌঁছে দিবি?
তোমার ঘর ভেঙে গেছে। উত্তর দিল শঙ্কর।
অ্যাঁ! ভয়ে আঁতকে উঠল রাজু।
আমার? ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল ওমর।
জানি না। উত্তর দিল শঙ্কর।
আমার ছেলে-মেয়েরা? আবার জিজ্ঞেস করল ওমর।
শঙ্করের জবাব, আমি তাদের দেখিনি। তবে এ পাড়ার ভাঙা ঘরের সব মানুষকেই আমরা মেলার মাঠে নিয়ে গেছি। সেখানেই তারা ঘর বেঁধেছে।
সেই ভয়ংকর আহত অবস্থাতেই রাজু চিৎকার করে উঠল, কেন? যেন এইমাত্র তার মাথায় বাজ পড়ল।
কারণ সেখানে তেমন কোনো বিপদ নেই। সেখানে এপাড়া-ওপাড়ার মানুষ একসঙ্গে ছাউনি বেঁধেছে। আমারও ঘর ভেঙেছে, আমিও বাঁধব। জবাব দিল শঙ্কর। জবাব দিয়ে সুখনলালের হাতটা ধরে আবদুলচাচাকে বলল, এর নাম সুখনলাল। এর বাবা জুতো সেলাই করত। এরা অচ্ছুত। সুখনলালের বাবা ঘর চাপা পড়েছে। আমার সঙ্গে এখন ওর বন্ধুত্ব। আমরা এখন দু-জনে একসঙ্গে মেহনত করব। তোমাদের কোনো ভাবনা নেই। এখন আমরা যাচ্ছি, পরে আসব। বলে শঙ্কর আর সুখনলাল ছুটতে ছুটতে চলে গেল।
হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের দেখতে লাগল আবদুলচাচা আর চাচি। ওদিকে শুয়ে শুয়ে রাগে যেন ফুঁসতে লাগল রাজু। আর অন্যপাশে পড়ে পড়ে হয়তো ভাবতে লাগল ওমর, তাদের মেলার মাঠের দখল নেওয়ার কাজটা বোধ হয় সহজ হয়ে গেল।
হা-হা-হা। হঠাৎ পড়ে পড়ে একটা চাপা বিদঘুটে গলায় হেসে উঠল ওমর। তখন ঘরে রাজু ছাড়া কেউ নেই।
রাজু শুয়ে শুয়েই ওমরের মুখের দিকে তাকাল। ওমরের হাসি শুনে মুখখানা তার রাগের তাপে ঝলসে উঠছে। সে বুঝতে পেরেছে ওমরের এ হাসির মানে কী! তাকে তাচ্ছিল্য করছে ওমর। কেননা, যে-মেলার মাঠে এতদিন তাদের পাড়ার লোক ঢুকতে পেত না, আজ তারা অর্ধেক মাঠ দখল করে নিয়েছে। সুতরাং রাজু ক্যাঁক করে উঠল, এই হাসির মানে?
ওমর হাসতে হাসতেই বলল, মানেটা জলের মতো সহজ। আমরা এখানে পড়ে রইলুম, ওদিকে মাঠটা দখল হয়ে গেল।
রাজু আবার চিৎকার করার চেষ্টা করল, আমি শঙ্করকে দেখে নেব। ওর বাড় ভাঙব আমি। আবার একটা অচ্ছুত ছেলের সঙ্গে দোস্তি করেছে। আমাদের জাতধর্ম বলে কিছু রাখল না।
রাজুর কথা শুনে আবার হেসে উঠল ওমর। আর ঠিক সেই সময়ে শঙ্করের আনা খাবারের ঠোঙা নিয়ে চাচি ঘরে ঢুকল। ওমরের হাসি থেমে গেল। চাচি সেই খাবার দু-জনকে ভাগ করে দিতেই দুটো আহত দুশমন গপগপ করে গিলতে লাগল। যেন কত কাল খেতে পায়নি।
ওদের খাওয়াও শেষ হল, চাচিও বেরিয়ে এল। ওমর তখন টেরা-চোখে রাজুকে দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, পেট ভরল?
রাজু ওমরের কথা শুনে যেন খেঁকিয়ে উঠল, তোকে দেখতে হবে না।
তবে একটা কথা, ওমর মুখ টিপে একটু হেসে খোঁচা দিল, খিদে পেলে কিন্তু জাত-ধর্মের কথা মানুষের মনে থাকে না।
রাজু কোনো উত্তর দিল না। মনে মনে গজরাতে লাগল।
যেমন ধর, ওমর আবার শুরু করল, তোর ধর্ম আর আবদুলচাচার ধর্ম আলাদা। অথচ দ্যাখ, আবদুলচাচা না থাকলে আমরা দু-জনেই এতক্ষণ পাথরের নীচে মরে পড়ে থাকতুম। লোকটা ছিল বলেই এখনও খেতে পাচ্ছি, বেঁচে আছি। বলতে হয় লোকটার দয়া-মায়াও আছে। নইলে তোর মতো একজন দুর্জনকে আশ্রয় দেয়!
এবার রাজু ওমরের কথা শুনে তেড়ে উঠল। বলল, তুই-ই বা কী এমন সজ্জন লোক রে! আমার যদি ক্ষমতা থাকত তবে তোকে আমি এতক্ষণে জাহান্নামে চালান করে দিতুম। বেশি বকবক করিস না।
ওমর একটু ঠেস দিয়ে উত্তর দিল, তোর কি জানা আছে জাহান্নামটা কোন দিকে? কিন্তু ভাগাড়টা কোথায় সেটা আমি জানি। তোকে সেখানে পাচার করে দিতে আমায় খুব-একটা মেহনত করতে হবে না।
হঠাৎ থামতে হল। কেননা, ঠিক সেই সময়ে ঘরে ঢুকে পড়ল আবদুলচাচা। আবদুলচাচার হাতে দাওয়াই। খেয়ে নাও বাবা! রাজু আর ওমরের মধ্যিখানে উবু হয়ে বসে পড়ল আবদুলচাচা। তারপর দু-দিকে দু-জনের মুখে দু-চামচ দাওয়াই ঢেলে দিল। তারপর একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, তোমরা দুটিতে কী নিয়ে ঝগড়া করছিলে বাবা?
কিছু না। যেন ধাতিয়ে উঠল রাজু।
অ। রাজুর মুখঝামটা খেয়ে চুপসে গেল আবদুলচাচা। উঠেই চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ ওমর জিজ্ঞেস করল, চাচা, আমরা আবার কবে হাঁটা-চলা করতে পারব?
পারবে, ক-দিন পরেই পারবে। উত্তর দিল আবদুলচাচা। তারপর ঘর থেকে খুটখুট করে বেরিয়ে গেল।
হ্যাঁ, সত্যিই দিন কাটছে, তার সঙ্গে রাজু আর ওমর ধীরে ধীরে সেরে উঠছে। তারা বসছে, হাঁটছে।
দিন কাটছে। মেলার মাঠে দু-ধর্মের মানুষ হাতে হাত মিলিয়ে দুর্ভাগ্যের সঙ্গে লড়াই করছে।
দিন কাটছে। শঙ্কর আর সুখনলাল সারাদিন ধরে এর বাড়ি তার বাড়ি যাচ্ছে আর বলছে, তোমাদের ভেড়াগুলো দাও চরিয়ে দিই। তোমাদের ঘর ভেঙেছে, দাও সারিয়ে দিই। খাটুনির পয়সা পাচ্ছে। সেই পয়সা নিয়ে খাবার কিনে সুখন ছুটছে মায়ের কাছে। শঙ্কর ছোটে আবদুলচাচার বাড়ি। সেখান থেকে ছুটতে ছুটতে সালমাদাদির কাছে। রাত হলে সুখন ঘুমোয় মায়ের কাছে। শঙ্কর শোয় সালমাদাদির ছাউনির নীচে। আর সেই দুটো শয়তান আবদুলচাচার বাড়িতে গান্ডেপিন্ডে গিলছে আর ঘুমোচ্ছে।
হঠাৎ একদিন গভীর রাতে আচমকা ঘুম ভেঙে গেছল রাজুর। ঘুমোচ্ছে সবাই। ঘুমোচ্ছে আবদুলচাচা আর চাচি নিজেদের ঘরে। আর ঠিক রাজুর পাশেই ঘুমোচ্ছে ওমর। রাজুর নজর পড়ে গেল ওমরের দিকে। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল রাজু। সে ভয় পেয়েছে ওমরকে। সেই অন্ধকার রাতে ওমরের মুখখানা দেখার জন্যে তার চোখ দুটো চনমন করতে লাগল। কিন্তু জমাট অন্ধকার, দেখা যায় না কিচ্ছু। এগিয়ে গেল রাজু ওমরের আরও একটু কাছে। হ্যাঁ এবার সে দেখতে পেয়েছে ওমরের মুখখানা। তার এত কাছে তার চিরশত্রু ঘুমিয়ে আছে! গায়ে যেন কাঁটা দিল রাজুর। একটা ভয়ংকর হিংস্রতা তার বুকে চেপে বসল। এক্ষুনি সে ওমরকে গলা টিপে শেষ করে ফেলতে পারে। এ সুযোগ বুঝি আর আসবে না। সুতরাং প্রতিহিংসায় হাতের আঙুলগুলো তার ছটফট করে উঠল। হ্যাঁ, এখনই সে ওমরকে খুন করবে। সে চোখের পলকে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকের ওপর। দু-হাত দিয়ে তার গলাটা টিপে ধরার আগেই ওমরের ঘুম গেছে ভেঙে। তড়াং করে উঠে বসল সে। নিজের বিপদের কথা বুঝতে বেশি সময় লাগেনি ওমরের। রাজুর হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়াবার জন্যে সে ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দিলে। তারপর লেগে গেল দুটো দুশমনের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। এ লড়াই দেখে বোঝাই যাচ্ছে দুটো মানুষই এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। নিঝুম সেই অন্ধকার রাতে এ যদি আঘাত করে ওকে, তবে ও বদলা নিতে দেরি করে না। এ যদি খামচে ধরে, ও গোঁত্তা দেয়। এর হাতের ঘুসিতে ও যদি আঁতকে ওঠে, তবে ওর পায়ের আঘাতে এ হুমড়ি খায়। অথচ মুখে তাদের টুঁ শব্দটি নেই। শুধু নিস্তব্ধ ঘরটা তাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের আস্ফালনে ফোঁস ফোঁস করছে।
এমনই করে অনেকক্ষণ তারা লড়াই করল। অনেকক্ষণ ধরে চুলের গোছা আর গালের দাড়ি ধরে তারা টানামানি করল। কিন্তু কেউ কাউকে হারাতে পারল না। অগত্যা লড়াই থামিয়ে দুটো মানুষ বেদম হয়ে ঘরের দু-পাশে লটকে পড়ে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে হাঁপাতে লাগল।
আরও কিছুক্ষণ হাঁপাল তারা। আরও কিছুক্ষণ তাদের নিশ্বাসের ফোঁস ফোঁস শব্দটা ঘরের আনাচেকানাচে প্রতিধ্বনি তুলল। তারপর তারা যখন নিস্তেজ হয়ে আবার শুয়ে পড়ল, তখন এক বারের জন্যেও মনে হল না এইমাত্র ঘরের মধ্যে একটা তুলকালাম কান্ড ঘটে গেছে।
সেইদিন বাকি রাতটুকু দু-জনেই জেগে কাটাল। কেউ কোনো কথা বলল না। দিনের আলোতেও কেউ কারুর মুখ দেখল না। অথচ দুটো মানুষই একই ঘরের চার দেওয়ালের আশ্রয়ে একই বাতাসে নিশ্বাস নিচ্ছে।
এমনই করে আরও একটা রাত এসে গেল। আরও একটা রাত তেমনই অন্ধকারে ঘরটাকে ছেয়ে ফেলল। তবু সেই দুটো মানুষের চোখে ঘুম এল না। কেননা, এখন আর কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। একজন ঘুমোলে যদি অন্যজন ঝাঁপিয়ে পড়ে?
কিন্তু একই ঘরে এমনই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে মানুষ থাকতে পারে কতক্ষণ! সুতরাং দু-জনেই দু-জনের সঙ্গে কথা বলার জন্যে উশখুশ করতে লাগল অনেকক্ষণ ধরে। তারপর ওমরই প্রথম কথা বলল। বলল রাজুকে, তুই একটা কাপুরুষ। তোর যদি বুকের পাটা থাকত তবে অন্ধকারে কোনো ঘুমন্ত মানুষকে মারতে তোর হাত উঠত না। তোর যে কী মতলব আমি তা জানি?
রাজু গজগজ করে উঠল, তুই ঘেঁচু জানিস।
ওমর তেড়ে উঠল, ঘেঁচু জানি! আমায় মেরে মেলার মাঠটা তোরা নিশ্চিন্তে ভোগ করতে চাস। অত সহজ নয়। আমি তা হতে দেব না। বলে ওমর ফুঁসতে লাগল।
রাজু একথার কোনো উত্তর দিল না। তারপর দু-জনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
হঠাৎ আবার ওমরই প্রথম মুখ খুলল। বলল, জানিস, আমাদের দু-জনের এখন ঝগড়া করা উচিত নয়। এখন উচিত আমাদের এক হয়ে জোট বাঁধা?
রাজু চমকাল। আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করল, একথার মানে?
মানেটা খুবই সহজ। উত্তর দিল ওমর, ক-দিন আগে শঙ্কর নামে ছেলেটা কী বলে গেল ভালো করে শুনেছিস? দু-পাড়ার দু-ধর্মের মানুষ এক হয়েছে। একসঙ্গে বিপদের সঙ্গে লড়াই করার জন্যে মেলার মাঠে ছাউনি ফেলেছে।
রাজুর বুকটা কেঁপে উঠল।
ওমর আবার বলল, দু-পাড়ার দু-ধর্মের মানুষ যদি এক হয় তবে কেউ আমাদের ছেড়ে দেবে না, আমাদের মরতেই হবে।
রাজুর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে সে বলল, ওদের আমরা এক হতে দেব না।
ওমর বলল, দেব না বললেই কি তোর কথা শুনবে কেউ?
চুপ মেরে গেল রাজু ওমরের কথা শুনে। সেই অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে সে যেন কিছু ভাবছিল। ভাবতে ভাবতে সে যখন আবার কথা বলল তখন তার গলা দিয়ে যেন শব্দ বেরোতেই চাইছে না। তাই সে যেন ওমরের কানে কানে বলার জন্যে একটু এগিয়ে গেল। তারপর সে ফিসফিস করে বলল, তোর কথাই ঠিক। আমি একটা আহাম্মক। হ্যাঁ, আমাদের জোট বাঁধতেই হবে। নইলে শঙ্করের মতো ছেলেরা আমাদের টিকতে দেবে না। আয় আমরা দু-জনে হাত মেলাই। দু-পাড়ার মানুষকে আমরা এক হতে দেব না। মেলার মাঠ থেকে সবাইকে আমরা তাড়াব। তা না হলে আমাদের দিন শেষ হয়ে যাবে। বলে একটু থামল রাজু। তারপর জিজ্ঞেস করল, একটা কাজ করবি?
ওমর জিজ্ঞেস করল, কী?
—চ, এই রাতের অন্ধকারে আমরা মেলার মাঠে যাই। সবাই এখন ঘুমোচ্ছে। ওদের ছাউনিতে আমরা আগুন লাগিয়ে দিয়ে দু-পাড়ার দু-দলকে ওখান থেকে ভাগাব।
যদি কেউ জানতে পারে? একটু আতঙ্ক-জড়ানো স্বরে জিজ্ঞেস করল ওমর।
কে জানবে? উত্তর দিল রাজু, এবাড়ির বুড়ো-বুড়ি এখন নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছে। আমরা এখনই এখান থেকে বেরিয়ে গেলে ওরা সাড়াও পাবে না। তারপর আগুন লাগিয়ে অন্ধকারেই আবার আমরা ফিরে আসব।
—মতলবটা তোর মন্দ না। কিন্তু তারপর?
রাজু বলল, আগের কথা আগে না ভেবে পরের কথা এখন ভেবে কোনো কাজের কাজ করা যাবে না। যদি রাজি থাকিস তবে এখনই যেতে হবে। যত দেরি করবি ততই অন্ধকার কেটে যাবে।
তাই চ। বলে এক ঘাতক আরেক ঘাতকের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু আগুন? জিজ্ঞেস করল ওমর।
আমার কাছে দেশলাই আছে। উত্তর দিল রাজু।
তারপর তারা পা ফেলল। ভারি সতর্ক তাদের চোখের দৃষ্টি। ভারি সজাগ। আগাগোড়া গায়ে মুড়ি দিয়ে এই রাতের শীতটাকে তারা যেমন সামাল দিচ্ছে, তেমনি তাদের চেনাও যাচ্ছে না। নি:শব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে তারা রাস্তায় যাবার দরজাটা খুলে ফেলল। তারপর বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে বাইরে। বাইরের দরজাটা ভালো করে ভেজিয়ে অন্ধকারে তারা এগিয়ে চলল মেলার মাঠের দিকে। আর পিছু ফিরে দেখল না। জানতেও পারল না, বাইরের সেই ভেজানো দরজায় খোলা আকাশের বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে। শব্দ উঠছে। সেইসঙ্গে ঘুম ভেঙে গেছে আবদুলচাচার বউয়ের।
ধড়ফড় করে উঠে পড়েছিল চাচি। তারপর হাত দিয়ে একটু ঠেলে ঘুম ভাঙাল আবদুলচাচার। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ফিসফিস করে বলল, দরজাটা খোলা কেন?
চমকে উঠে পড়ল আবদুলচাচা। তাড়াতাড়ি এঘর থেকে ওঘরে উঁকি মারল। একী! এ যে দেখি দুটো মানুষের দুটো বিছানাই খালি। কেমন যেন একটা অজানা আতঙ্কে বুকটা ঢিপঢিপ করে উঠল আবদুলচাচার। ভয় জড়ানো গলায় বউকে বলল, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি এক্ষুনি আসব। তুমি বাইরের দরজাটা বন্ধ করে একটু অপেক্ষা করো।
এই রাতদুপুরে কোথা যাচ্ছ? ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল বউ।
বউ, লোকদুটো নিশ্চয়ই কিছু কুমতলব এঁটেছে। নইলে এই শীতে, গভীর রাতে দরজা খুলে তারা পালাবে কেন? তুমি কিচ্ছু ভেবো না, আমি যাব আর আসব বলে বুড়ো আবদুলচাচা সত্যি সত্যি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তার অস্থির পা দুটো কখনো উঠছে, কখনো নামছে। পাহাড় ভাঙছে। আর চোখের দৃষ্টি তার সেই মানুষ দুটোর সন্ধানে ছটফট করছে।
আরও খানিকটা নীচে নেমে হকচকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল আবদুলচাচা। দুটো মানুষের চলন্ত ছায়া দেখতে পেয়েছিল আবদুলচাচা সেই অন্ধকারে। হ্যাঁ, যা ভেবেছে আবদুলচাচা, তারা মেলার মাঠের দিকেই এগিয়ে চলেছে। না, আর মুহূর্তও দেরি করা নয়। ওদের আগেই মেলায় পৌঁছোতে হবে। একটি দুর্গম বেপথ ধরল আবদুলচাচা। এক বারও ভাবল না বিপদের কথা। সব বিপদ তুচ্ছ করে বেপথ ডিঙিয়ে চলল বুড়োমানুষটা।
হ্যাঁ আবদুলচাচা ওদের আগেই পৌঁছে গেছল মেলার মাঠে। সবাই ঘুমোচ্ছে এখন যে যার ছাউনির নীচে। কাকে ডাকবে আবদুলচাচা! কাকে ডেকে বলবে, ওরে জোয়ানের দল উঠে পড়। দুটো শয়তান এদিকেই আসছে!
হ্যাঁ সত্যিই, সেই শয়তান দুটো প্রায় এসেই পড়েছে।
চট করে লুকিয়ে পড়ল আবদুলচাচা একটা ছাউনির আড়ালে। উঁকি মারল, দেখতে লাগল তাদের রকম-সকম আড়াল থেকে।
দুটো ধূর্ত শেয়ালের মতো ডিঙি মেরে মেরে ঢুকছে রাজু আর ওমর মেলার মাঠে। অত্যন্ত হুঁশিয়ার তারা, তাই মাঠের মধ্যিখান অবধি গেল না। খানিকটা ঢুকেই দাঁড়াল। চোখে চোখে কিছু কথা হল দু-জনের। রাজু চকিতে পকেট থেকে দেশলাইটা বার করে ফেলল। তারপরেই ফস-স-স! জ্বলে উঠল কাঠি। অমনি সঙ্গেসঙ্গে আবদুলচাচা চেঁচিয়ে উঠল, আগুন! আগুন!
কিন্তু ততক্ষণে একটি ছাউনিতে আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠেছে। সেই ছাউনির মানুষের ঘুম ভেঙে গেল। তারা আর্তনাদ করে হুটোপাটি লাগিয়ে দিলে।
এদিকে কিন্তু আবদুলচাচার চিৎকার শুনে হকচকিয়ে গেছে সেই রাজু আর ওমর। বিনা মেঘে যেন বাজ পড়ল তাদের মাথায়। ভয়ে তালগোল পাকিয়ে গেল তাদের সব মতলব। ঝটপট তারা একটা ছাউনির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। কিন্তু তাদের জ্বালানো আগুনেই তাদের ছায়া জ্বলজ্বল করে উঠল। লুকোতে পারল না তারা। অগত্যা তারা এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল। যতই ছুটছে তারা আবদুলচাচাও ততই চ্যাঁচাচ্ছে, দুশমন! দুশমন! তোমাদের ছাউনিতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে পালাচ্ছে।
আবদুলচাচার চিৎকারের শব্দটা যেন বজ্রের মতো গর্জে উঠল। সেই গর্জন শুনে সমস্ত ছাউনির মানুষ আতঙ্কে বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। তারাও চিৎকার শুরু করে দিল, দুশমন! দুশমন! কেঁপে উঠল সেই ছাউনি-বাঁধা সারামাঠটা।
সালমাদাদির ছাউনির ভেতর এতক্ষণ ঘুমোচ্ছিল শঙ্করও। উদয়াস্ত খাটতে খাটতে ছেলেটার শরীরে আর কিছু নেই। একেবারে মড়ার মতো পড়েছিল। অতগুলো লোকের একসঙ্গে ওই চিৎকার শুনে সে কি আর পড়ে থাকতে পারে! আচমকা ঘুম ভেঙে গেছিল তার। ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ে সে প্রায় লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। তারপর আগুন দেখে কেমন যেন থতোমতো খেয়ে গেল। হাওয়ার দাপটে আগুনের শিখা এক ছাউনি থেকে আরেক ছাউনিতে জ্বলে উঠছে। আর অসহায় মানুষেরা বে-দিশা হয়ে ছুটোছুটি করছে। সেই দেখে শঙ্কর আর থাকতে পারল না! নিমেষের মধ্যে নিজেকে সামলে নিলে। তারপর একটা পাথরের ওপর সে দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, ভয় পেয়ো না তোমরা। এখন এসো আমরা আগুন নেভাই।
কিন্তু এ আগুন নিভবে কেমন করে! এ যে ছড়িয়ে পড়ছে এখান থেকে ওখানে। সবাই চেঁচিয়ে উঠল।
ততক্ষণে আবদুলচাচা শঙ্করকে দেখতে পেয়েছে আগুনের আলোয়। ছুটে এসেছে শঙ্করের একেবারে সামনে। তারপর চিৎকার করে ডেকে উঠেছে—শঙ্কর-র-র।
শঙ্কর চমকে উঠল। চেঁচিয়ে উঠল, —আবদুলচাচা!
ওরে শঙ্কর, এ আগুন লাগিয়েছে রাজু আর ওমর নামে দুটো শয়তান। ওরা পালাচ্ছে। বলে আবদুলচাচা আবার গর্জে উঠল।
কই? কই? বলে শঙ্করের সঙ্গে সেই অসংখ্য মানুষ হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করে উঠল। তারপর মুহূর্তের মধ্যে তারা মাঠের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তল্লাশি শুরু করে দিল।
আগুন জ্বলছে আর সেই দুশমন দুটো একটা ছাউনির আড়াল থেকে আরেকটা ছাউনির আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে।
আগুন জ্বলছে। শঙ্করও সেই আগুনের ঝলকানিতে তাদের খুঁজতে খুঁজতে এদিক-ওদিক ছুটছে।
আবদুলচাচা চ্যাঁচাল, —শঙ্কর, যাস না।
শঙ্কর চ্যাঁচাল, —বারণ কোরো না আবদুলচাচা। দুশমনের সঙ্গে আজ আমার শেষ মোলাকাত হবে।
আবদুলচাচা বলল, ওরে শঙ্কর, তবে দাঁড়া আমিও তোর সঙ্গী হব। বলে আবদুলচাচা শঙ্করের পেছনে পেছনে ছুটল।
সমস্ত মানুষ ছুটল তাদের পেছনে।
আগুনে আগুনে ঝলসে উঠল গোটা মেলার মাঠটা। ঝলসে সমস্ত ছাউনি যখন ছাই হয়ে গেল, তখন আর লুকিয়ে থাকতে পারল না রাজু কিংবা ওমর। ওই তাদের দেখা যাচ্ছে। শঙ্করই চেঁচিয়ে উঠল, —ওই যে দুশমন!
ছুটল দুশমন দুটো শঙ্করের ভয়ে।
শঙ্করও ছুটল। ছুটল আবদুলচাচা, ছুটল সঙ্গে সঙ্গে দু-পাড়ার যত মানুষ।
দুশমন দুটো ছুটতে ছুটতে মাঠ পেরোল। পাহাড়ে উঠল।
শঙ্করও উঠল পাহাড়ে। উঠল আবদুলচাচা আর তার সঙ্গে আরও সবাই।
দুশমন দুটো পাহাড় থেকে খাদে নামছে।
নামছে সমস্ত মানুষ।
দুশমন দুটোর সামনে নদী। এবার কোথায় পালাবে তারা? তারা যেন থমকে দাঁড়ায়!
ছুটে এল শঙ্কর। ছুটে এল আবদুলচাচা। সঙ্গে এল শম্ভু, ওসমান। ইয়াসিন, কৃষণ। মহদেব দোকানি, সাত্তার। এল সুখনলাল আর দু-পাড়ার অসংখ্য মানুষ। রাজু আর ওমরকে এবার ওরা নির্ঘাত ধরে ফেলবে।
না, ধরতে পারল না। ওই অসংখ্য মানুষের তাড়া খেয়ে তারা ওই নদীর জলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। বরফ-ঠাণ্ডা জল। তাদের রক্ত যেন জমে যায়। তারা চিৎকার করে ওঠে, —বাঁচাও! বাঁচাও! কিন্তু এখন আর কেউ নেই তাদের বাঁচাবার। পাহাড়ি নদীর দুরন্ত স্রোতে তারা হাবুডুবু খেতে লাগল। পাথরে পাথরে আঘাত খেয়ে তাদের হাড়গোড় সব চুরমার হয়ে গেল। তারপর কোথায় যে তারা তলিয়ে গেল, আর দেখা গেল না।
ফিরে এল এই পাহাড়ি শহরের মানুষেরা আবার মেলার মাঠে শঙ্কর আর আবদুলচাচাকে নিয়ে। ছুটে এল সুখনলাল, ছুটে এল তার মা। এল চাচি, সালমাদাদি আর নাম-না-জানা আরও কত কে। তারা শঙ্কর আর আবদুলচাচাকে কাঁধে তুলে নিল। আর চিৎকার করে বলে উঠল, এ মেলার মাঠ আমাদের সকলের। এ আমাদের জন্মভূমি। এখানে আমরা আনন্দ করব সকলে। একে রক্ষা করব আমরা প্রাণ দিয়ে।
সকাল হয়ে গেছে। এই সকালের রোদে দেখতে পাচ্ছ আবদুলচাচা আর শঙ্করকে? একটু ভালো করে ওদের চোখ দুটি দ্যাখো! দ্যাখো কেমন খুশির ছোঁয়ায় অশ্রুফোঁটাগুলি টলমল করছে। এসো-না আমরাও ওদের কপালে জয়ের টিকা এঁকে দিই!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন