মা এক নির্ভীক সৈনিক

শৈলেন ঘোষ

সে কতদিন আগের কথা। হবে হয়তো চার হাজার বছর। এক যে ছিল রাজা। সে রাজা ভয়ংকর। তার নাম বুমবুজাং। তার হিংসুটে চোখ দুটো যেন দপদপ করছে অন্ধকার গুহার ভেতর। মাথায় একঝাঁক চুল লম্বা-নোংরা-রুক্ষ। গাল-ভরতি দাড়ি। রোদে ঝলসানো খসখসে চামড়া—ময়লা। রাজা চান করে কালেভদ্রে। যেমন রাজা, তেমনই তার প্রজারাও। তেমনই সৈন্যসামন্ত আর সক্কলে।

এ রাজার না-ছিল রাজপ্রাসাদ, না-কোনো দুর্গ। ছিল না রাজসিংহাসনও। তার সিংহাসন ছিল ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়ার পিঠে বসেই রাজা রাজকাজ চালাত, দেশশাসন করত, তির-ধনুক নিয়ে যুদ্ধ করত। আসলে বুমবুজাং ছিল এক ঘোড়সওয়ার যাযাবর রাজা। এ রাজার টাকা ছিল না, সোনা ছিল। এ রাজার রাজ্যে লেখাপড়ার বালাই ছিল না, সবাই মুখ্যু। এমনকী, রাজাও। রাজার পাত্রমিত্র তারাও। হবেই তো, কেননা সে-রাজ্যে লেখাপড়ার অক্ষরই ছিল না। তাই কারও অক্ষরজ্ঞানও ছিল না।

রাজা যেমন যাযাবর ঘোড়সওয়ার, তেমনই তার প্রজারাও। তারাও রাজার সঙ্গে ঘুরে বেড়াত ঘোড়ায় চড়ে। সবার ছিল নিজের নিজের ঘোড়া। হাজার হাজার প্রজার হাজার হাজার ঘোড়া যখন মাটি কাঁপিয়ে ছুটত, মনে হত ভূমিকম্প হচ্ছে। এই বুঝি মাটি ফেটে পাতাল বেরিয়ে পড়ে।

রাজার যে রানি, তার কিন্তু ঘোড়ায় চড়া বারণ। তার ছিল ছ-চাকার গাড়ি। সে-গাড়ি হয় বলদে টানে, না হয় চামরি। গাড়ির ওপর তিনখানা ঘর—শোবার ঘর, বসার ঘর, খাবার ঘর। রাজার ঘোড়া ছুটত টগবগ টগবগ, আর রানির গাড়ি টানত বলদ ঝমঝম ঝমঝম। রানি গাড়িতে সেজেগুজে বসত। বসে বসে ইতিউতি চাইত আর থেকে থেকে হাই তুলত।

তা, রানির সাজ দেখলেও মরে যাই। কাঠবিড়ালির লোম। সেই লোমের তৈরি লম্বা জামা। জামার নীচে টাট্টুঘোড়ার চামড়া দিয়ে ঝালর-সেলাই। ধারে ধারে উদবেড়ালের লোম। জামার হাতায় নকশা আঁকা। রংবেরং। পায়ে তার পশমি-মোজা, লাল জুতুয়া।

শুধু যে রানিই গাড়িতে থাকত তাই নয়। এ রাজার বলদ-জোতা গাড়ি ছিল সব মেয়ে-প্রজারই। অবিশ্যি তাদের গাড়ি কি আর রানির মতো! সে-গাড়ি অত বড়োও নয়, শৌখিনও নয়। সে-গাড়ি চার চাকার। গাড়ির ওপর একটি কি দুটি ঘর। সেই ঘরে তাদের থাকত ঘরকন্নার সাত-সতেরো জিনিসপত্তর, খুঁটিনাটি এটা-ওটা।

এমনই এক গাড়ির ঘরে সংসার ছিল কোহেনের মা-র। তার নাম ছিল আনাতুরি। কোহেনের বাবা ছুটত গাড়ির আগে আগে ঘোড়ার পিঠে। সে ছিল স্তান। স্তান রাজার কাছের মানুষ, রাজার বিশ্বাসী সহচর। সে যেমন যুদ্ধ করতে পারত, তেমনই রোগ-জ্বালায় দাওয়াই দিত। যেমন সে রাজার ভবিষ্যৎ বলতে পারত, তেমনই পারত ধুমধাড়াক্কা বাজনা বাজিয়ে পিশাচের সঙ্গে নাচতেও। হ্যাঁ, স্তান জানত কুহকবিদ্যে। এই কুহকবিদ্যের জোরেই সে করত অসাধ্যসাধন। তাই রাজা তাকে কী খাতিরই-না করত! কিন্তু যেদিন স্তানকে হত্যা করা হল, সেদিনই শুরু হল গল্প। এক মায়ের গল্প। কোহেনের মা আনাতুরির গল্প। যে-মায়ের বুক-ভরতি ছিল মমতা, ছিল ভালোবাসা। না, থাক এখন সেকথা।

একটা মস্ত মুল্লুকের রাজা ছিল এই বুমবুজাং। কে তাকে এই মুল্লুক দিয়েছিল কেউ জানে না। কেউ দিয়েছিল না নিজেই জবরদস্তি দখল করেছিল তাও কারও জানা নেই। মুল্লুক বলতে সে তো ওই ধু-ধু করছে জমি। জমির পর জমি। ওপরে খোলা আকাশ, তারও যেমন সীমা নেই, নীচে তেমনই এই জমি তারও তেমন শেষ নেই। দেখতে দেখতে চোখের নাগাল থই হারায়। এর নাম স্তেপ। শুকনো ঘাসের জমি। ঘাসের পাতায় বাতাস ছোটে হিসহিস করে। রাতের বেলা ঠায় কাঁপে হিহি করে। কোথাও পাহাড়, ককেশাস। তার চুড়োর তুষার গলে এধারে নদী, ওধারে নদী ডন আর দানিয়ুব বয়ে যায়। কৃষ্ণসাগরে ঢেউ ওঠে ফুলে ফুলে বুক কাঁপিয়ে। আরও দূরে, অনেক দূরে গাছের পর গাছ। ওক-পাইনের বন। গা-ছমছম। যুদ্ধের সময় এই বনই রাজার দুর্গ। এই দুর্গ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ো শত্রুর ওপর আচমকা। তিরের পর তির ছুড়ে মারো শত্রুকে। শেষ করে ফ্যালো। শত্রুর মুণ্ডুগুলো ছিঁড়ে নিয়ে লুফে লুফে খেলা করো। তারপর তাদের রক্ত পান করো, গায়ে মাখো। নয়তো মুণ্ডুগুলো সাফ করে তৈরি করো পানপাত্র। শত্রুর গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে তৈরি করো নরম গদি। কিংবা চামড়া দিয়ে বানিয়ে নাও গায়ের জামা আলখাল্লা। আর তা যদি না-চাও, ধরে আনো শত্রুকে যুদ্ধ-দেবতার সামনে। বলি দাও। সে কী বীভৎস দৃশ্য!

রাজা বুমবুজাং নোংরা যেমন, তার বাবুয়ানাও তেমনই। পোশাকের বহর দেখে থমকে যাবে। গায়ের জামা, সে তো তৈরি মরুর দেশের পশুর চামড়ায়। নরম যেন মখমল। কতরকম নকশা বোনা সেই জামাতে। চামড়ার কাজ-করা জামার গায়ে। কী সুন্দর। জামার বুকে ছুটন্ত হরিণের ছবি। তার চোখে সোনার পুঁতি। তা, আজ যদি রাজা এইটা পরে, তা কাল পরবে আর একটা। কালকেরটা নেউলের লোমের তৈরি। সেটা কাফটান। তাতে অগুনতি সোনায়-মোড়া কাঠের লকেট সাজানো—ঝুলছে আর দুলছে। রাজার মাথায় টুপি— কানচাপা, ঢেউখেলানো। সে-টুপি কপাল থেকে পিছিয়ে এসেছে ঘাড় পর্যন্ত। বাতাস না-ঢোকে। উফ! সে-বাতাসের কী তেজ! যেন হাড়ের ভেতর খামচি দিচ্ছে বরফের। রাজার পা পর্যন্ত লম্বা পাতলুন, সেও তৈরি চামড়ার। সেই পাতলুন জুতোর ভেতর অবধি ঢুকে গেছে। আর সে-জুতোও কেমন নরম, কেমন তুলতুলে!

রাজা বুমবুজাংয়ের বাবাও ছিল এক দুর্ধর্ষ রাজা। সেও যে কত মানুষ মেরেছে। কত যুদ্ধ যে জয় করেছে! তা আর কে গুনে রেখেছে। কিন্তু রাজা বুমবুজাংয়ের বাবা যেদিন মারা গেল, সেদিন কী রক্তারক্তি কান্ড। মানুষ মানুষকে মারছে। রক্ত মেখে আর্তনাদ করছে। আকাশ কাঁপাচ্ছে। কবর তৈরি করছে। কবরকে ওরা বলে কুরগাঁ। সে-কুরগাঁ মস্তবড়ো। তার ভেতরে অনেক ঘর বানানো হল। একটি ঘরে রাজা থাকবে, অন্য ঘরে থাকবে তার আপনজন। রাজা মারা গেলে তাদেরও মরতে হল। তাদের হত্যা করা হল গলা টিপে। তাদের মৃতদেহ থাকবে রাজার পাশে পাশে অন্য ঘরে। রাজার জন্য তৈরি হল শবাধার—কাঠের। অপরূপ কাজ-করা। মৃত রাজাকে সাজানো হল। সব সেরা পোশাকগুলি তার গায়ে পরানো হল। শবাধারে তার মৃতদেহটি শোয়ানো হল। তারপর রাখা হল কুরগাঁয়ে, তার ঘরে। রংচঙে গালিচা দিয়ে মুড়ে দেওয়া হয়েছে সেই ঘর। সে-গালিচা পশমের তৈরি। ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে কত রকমের পর্দা। কত কারুকাজ তাতে। কাঠের তৈরি হরেক আসবাব আর সোনার তৈরি অমূল্য সব গয়নাগাটি। ঝলমলিয়ে উঠছে সেই কুরগাঁ। রঙে রঙে রং ছড়িয়ে উপচে উঠছে।

সোনা। সোনা তাদের দেবতা। সোনা তাদের জীবন। ওই সোনার দেবতাকে তুষ্ট করার জন্যে কত মানুষের জীবন গেছে, কত রক্ত ঝরেছে। শীতের রাত—অন্ধকার। আগুন জ্বলছে ধিকিধিকি। সেই আগুন ঘিরে তারা গল্প করে, সোনার গল্প: এক যে ছিল দেশ। সে এক অনেক দূরের দেশ। সেই অনেক দূরের দেশে ছিল সোনার ভান্ডার। সে কত সোনা। মেপেজুখে শেষ হয় না। দেখে দেখে শেষ হয় না। অজস্র সোনা। এই সোনার ভান্ডারের পাহারাদার ছিল গ্রিফিন। কী ভয়ংকর দেখতে সেই গ্রিফিনকে! দেখতে খানিকটা সিংহের মতো, খানিকটা যেন ছোঁ-মারা ইগল। পাছে কেউ এই সোনার ভান্ডারের সন্ধান পেয়ে যায় তাই সে দিনরাত জাগত। জেগে জেগে নজরদারি করত। একবার কী হল, আরমাসপিয়ানরা এই সোনার খবর কেমন করে যেন জানতে পারল। এই আরমাসপিয়ানরা ছিল একচোখো মানুষ। তারা থাকত উত্তরে। সেই ঠাণ্ডার দেশ সাইবেরিয়ায়। একদিন তারা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়ল দেশ থেকে। অনেকখানি পথ এল তারা চিনতে চিনতে একচোখে। তারপর একদিন তারা খুঁজে পেল সেই সোনার ভান্ডার। ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা পাহারাদার গ্রিফিনের ওপর। তুমুল লড়াই হল গ্রিফিনের সঙ্গে। গ্রিফিন সেই একচোখো মানুষদের কখনো সিংহের থাবায় শেষ করে ফেলে, আবার কখনো ইগলের মতো ছোঁ মারে। অনেক আরমাসপিয়ানকে গ্রিফিন মেরে ফেলল। কিন্তু সবাইকে পারল না। শেষে আরমাসপিয়ানদের হাতেই গ্রিফিন মারা পড়ল। শেষমেষ এই একচোখো মানুষের দলই হল সোনার মালিক।

তা এ গল্প রূপকথার মতো শোনালেও, সত্যি। সত্যি বলেই বিশ্বাস করত স্তেপের এই ঘোড়সওয়ার মানুষেরা।

রাজা বুমবুজাং রাজা হল যেদিন থেকে, স্তানের কপালও খুলল সেদিন থেকে। রাজা যেতে চায় উত্তর দিকে। ডাক পড়ল স্তানের। এই নাও একমুঠো সোনা, বলো উত্তরে যাওয়া ঠিক হবে কি রাজার এখনই? কোনো বিপদ কি আছে উত্তরে?

স্তান অমনই শুরু করে দিল ভোজবাজি। ঘুরঘুট্টি রাত। অন্ধকার, সুনসান চারদিক। বাতাস বইছে হু-হু। স্তেপের বুক কাঁপছে হা-হা। যেন নিশ্বাস ফেলছে পিশাচ। সেই নিশ্বাসের তালে তালে ডুগডুগি বাজে। স্তান বাজায়, স্তান নাচে। যেন একটা ক্ষিপ্ত নেকড়ে। নাচতে নাচতে নিজেরই মাথার চুল খামচে ধরে। খেঁকিয়ে ওঠে:

তুফান ছোটে শন-শন-শন

বনবাদাড়ে ঝড়,

পা-টনটন পিশাচ রে তুই

হুমড়ি খেয়ে মর!

যাচ্ছে রাজা উত্তরে বল

তার কি বিপদ আছে?

সে-পথে কি নাক-খিঁচিয়ে

ভূত-ভূতুনি হাঁচে?

কিন্তু পিশাচ যে কী উত্তর দিত, কেউ জানত না। জানত শুধু স্তান।

রাজার কানের কাছে মুখ—স্তানের মুখ। মুখে ফিসফিস শব্দ।

রাজার কানের ভেতর ফিসফিসিয়ে স্তান শুনিয়ে দিত সেই কথা। তারপর রাজা ঠিক করত যাবে কোন দিকে। উত্তরে না দক্ষিণে। না কি যাওয়াই নয় কোনো দিকেই। তবে কি যেদিকেই যাও বিপদ সেই দিকেই!

একবার হল কী, বুমবুজাং-এর ছেলে, তার নাম তিত্তাচিনি, তার হল ভীষণ অসুখ। প্রাণ নিয়ে টানাটানি। ছেলে বুঝি বাঁচে না। ডাক ডাক, স্তানকে ডাক। স্তান এল। সঙ্গেসঙ্গে শুরু করল স্তান তন্ত্রমন্ত্র, ভোজবাজি। জ্বালা হল আগুন দাউদাউ। আনা হল তিত্তাচিনিকে সেই আগুনের ধারে। স্তানের চোখ কটমট, দাঁত কড়মড়। মন্ত্র পড়ে। বুক ধড়ফড়। তারপর ধাঁই-ধপাধপ নৃত্য শুরু। নাচতে নাচতে হুংকার ছাড়ে। হা-হা করে অট্টহাসে। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি। আগুন নিয়ে ছোড়াছুড়ি। তখন কী মূর্তি স্তানের। দেখলে গায়ের রক্ত হিম। মানুষজন হিমশিম।

যাক, সে-যাত্রায় তিত্তাচিনি জানে বাঁচল। স্তানেরও আদর বাড়ল। বাড়ল যেমন রাজার কাছে, তেমনই বাড়ল রানির কাছে। রানি বলল, স্তান, এখন থেকে আমার ছেলের দেখভাল তোমার হাতে। তাকে তুমি ছেলের মতো দেখবে। তাকে তুমি কেমন করে যুদ্ধ করতে হয় শেখাবে। শত্রুকে ঘায়েল করতে আর তার মুণ্ডুটা ছিঁড়ে আনতে।

ঠিক তখন থেকেই রাজার ছেলে তিত্তাচিনি স্তানের কাছে বেড়ে ওঠে।

তিত্তাচিনি বড়ো হয় একটু একটু। একটু একটু শেখে ঘোড়া ছোটাতে। শেখে ঘোড়ার পিঠে ছুটতে ছুটতে তির ছুড়তে, যুদ্ধ করতে, মানুষ মারতে।

এমনই করে মারতে মারতে তিত্তাচিনি হয়ে উঠল ভয়ংকর। ওর বাবার মতো ভয়ংকর। ভয়ংকর রাজা বুমবুজাংয়ের ভয়ংকর ছেলে তিত্তাচিনি। একজন যুদ্ধবাজ রাজপুত্র। বন থেকে আচমকা সে বেরিয়ে আসে। ঘোড়া ছোটায় তিরবেগে। ঘোড়ার খুরে শব্দ ওঠে, ধুলো ওড়ে। ধুলোর ঝাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে শত্রুর এলাকায় ঢুকে পড়ে। তির ছোড়ে শত্রুকে তাক করে। তারপর আবার লুকিয়ে পড়ে বনের ভেতর। আবার কখনো আকাশ শেষে ওই যে দূর, ওই দূরে হারিয়ে যায় ফুসমন্তরে। কেমন করে, কেউ বুঝতেই পারে না।

এখন তিত্তাচিনি বড়ো হয়েছে আরও। তাই সে জানে তাদের বলে কোলোৎস। এই স্তেপে যারা থাকে তারা সবাই কোলোৎস। অন্য দেশের মানুষ তাদের বলে সাইথিয়ান। সাইথিয়ান মানে জানে না তিত্তাচিনি, কিন্তু সে জানে সাইথিয়ানদের মধ্যে অনেক জাত, অনেক দল। এক-এক দলের এক-এক নাম। এক-এক রাজা। যেমন তাদের দলের নাম আসগুজাই। আসগুজাই-এর রাজা বুমবুজাং—তার বাবা। তিত্তাচিনি জানে, একদিন সেও রাজা হবে। তাই সে অন্যের ধন লুঠ করতে শিখছে এখন থেকেই। শিখছে শত্রুর রক্তে তিরের ফলা চুবিয়ে নিতে। শিখছে সেই রক্ত পান করতে, পান করে আনন্দ-উল্লাস করতে। সে জেনেছে যার ভাঁড়ারে যত সোনা, সে-ই তত বড়ো রাজা। যে যত বেশি শত্রুর মাথা কেটে আনতে পারে, সে-ই তত বড়ো বীর। তিত্তাচিনি জানে, তাদের সঙ্গে সৌরামাতির শত্রুতা সবচেয়ে বেশি। তারা থাকে পূর্ব দিকে। তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে ঝটিতি তাদের ওপর যখন-তখন। মারধর করে, তাদের ঘোড়া-ভেড়া লুঠ করে, গাই-বলদ ছিনিয়ে নেয়, তারপর পালিয়ে যায়। তিত্তাচিনির ঠাকুরদাদা পারেনি সৌরামাতি শত্রুদের ঢ্ঢি করতে। তার বাবা পারেনি তাদের সঙ্গে যুঝে উঠতে। এমনকী তার ঠাকুরদাদার বাবাও হেরে গেছে তাদের কাছে। এখন তাই তিত্তাচিনি ভাবে, সেও কি হেরে যাবে! অথচ সৌরামাতি রাজার আছে অঢেল সোনা, অনেক ঘোড়া, অনেক ধনদৌলত। তিত্তাচিনির লোভ হল। সে থাকতে পারল না, বাবার কাছে গেল। বাবা বুমবুজাংকে বলল, বাবা, বাবা, আমি এখন যুদ্ধ শিখেছি।

বাবা ছেলের মুখের দিকে তাকাল। ফস করে একফালি হাসি তার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল। তারপর ছেলেকে জিজ্ঞেস করল, যুদ্ধ তো শিখেছিস, ক-টা শত্রু মেরেছিস।

রাজার ছেলে তিত্তাচিনি ঘোড়ার দিকে চোখ ঘোরাল। তার নিজের ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে ঝোলানো মাথার খুলি—মানুষের। খুলি দেখিয়ে বলল, আমার ঘোড়ার পিঠে আছে এতগুলো, আর নদীর জলে ভাসছে অনেকগুলো।

বাবা তারিফ করল, শাবাশ!

ছেলে বলল, আমি এবার যুদ্ধে যাব।

বাবা জিজ্ঞেস করল, কার সঙ্গে যুদ্ধ করবি?

ছেলে চটপট উত্তর দিল, সৌরামাতির রাজার সঙ্গে।

রাজা বুমবুজাং চমকে উঠল ছেলের কথা শুনে। কোটর থেকে লাল টকটকে চোখ তার ঠিকরে বেরোল। চোখ টেরিয়ে দেখল।

হয়তো খুশি হল ছেলের বুকের পাটা দেখে। তারপর জিজ্ঞেস করল, পারবি?

ছেলে ভয় পেল না। বুক ফোলাল। উত্তর দিল, তোমার ছেলে আমি, স্তানের আমি শাগরেদ। না-পারার কারণ নেই।

বাবা বলল, সৌরামাতির রাজা কালো ঘোড়ার সওয়ার।

ছেলে উত্তর দিল, তোমার ছেলে নীল ঘোড়ার সওয়ারি। সে যদি হয় অন্ধকারের রাজা, তবে, আমি নীল আলোর বজ্রপাত। বলতে বলতে তিত্তাচিনি হা-হা করে হেসে উঠল। সে-হাসি তাচ্ছিল্যের।

রাজা বোধ হয় খুশি হল খুব, ছেলের কথা শুনে। ছেলের ঘাড়টা ঝাঁকিয়ে তার সাহসের বাহবা দিল। তারপর চ্যাঁচাল, ডাক স্তানকে।

ছুটে এল স্তান।

স্তান, এই নাও! বলে রাজা বুমবুজাং একটা হরিণের শিং ছুড়ে দিল তার দিকে। সেই শিং সোনায়-মোড়া।

স্তান সেই শিং লুফে নিয়ে অবাক হল। জিজ্ঞেস করল, এটা কী আজ্ঞে?

—তোমার ইনাম।

—কীসের ইনাম?

—আমার খুশির ইনাম।

স্তানের তখনও ঘোর কাটেনি। সে কী বলবে কিছুই ভেবে পাচ্ছে না। কী না-বলবে, তাও খুঁজে পাচ্ছে না—হতভম্ব।

স্তানের সেই অবস্থা দেখে রাজা হেসে ওঠে হো-হো করে। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, কেন খুশি হয়েছি জানতে চাইলে না?

তাই তো! স্তান থতোমতো খেয়ে গেছে। তখনই তার মুখ ফসকে গেল। বলে ফেলল, আমি বুঝতে পেরেছি।

কী বুঝতে পেরেছ? রাজা হাসে, জিজ্ঞেস করে।

স্তান উত্তর দিল, আপনি খবরটা পেয়ে গেছেন।

রাজার হাসি থামে। অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে, কীসের খবর?

স্তান লজ্জায় আধখানা হয়ে উত্তর দিল, কেন, আমার ছেলের খবর।

—তোমার ছেলে! রাজা বুমবুজাং যেন আকাশ থেকে পড়ল।

স্তান আরও লজ্জা পেল। তার মাথাটা আরও নুয়ে পড়ল। তারপর সে আমতা-আমতা করে বলল, হুজুর যখন সবই জানেন, তখন আমায় আর জিজ্ঞেস করে লজ্জা দিচ্ছেন কেন?

রাজা আরও অবাক হয়ে গেল, —সবই জানি মানে? আমি তো কিছুই জানি না!

—তবে আমায় ডাকলেন কেন? এখনও লজ্জা গেল না স্তানের। —তবে কোন আমায় সোনায়-মোড়া এই হরিণের শিং ইনাম দিলেন?

সে তো আমার নিজের খুশির খবর। রাজা উত্তর দিলেন?

সেই খুশির খবরটা কী আমি জানতে পারি না? জিজ্ঞেস করল স্তান।

রাজা বলল, আমার খবরটা তুমি জানার আগে, তোমার খবরটা কি রাজার আগে জানা উচিত বলে তুমি মনে করো না?

এবার স্তানের খুবই লজ্জা হল। লজ্জায় ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে ফিক করে হাসি বেরিয়ে এল। মুখখানা যেন মাটির সঙ্গে মিশে যায়। আর বোধ হয় না-বলে নিস্তর নেই। তাই স্তান বলেই ফেলল, হুজুর, কাল আমার একটি‌ বলতে বলতে থমকে গেল স্তান।

—আরে, থামলে কেন? বলো বলো!

স্তান বলেই ফেলল, —আমার একাটি পুত্র হয়েছে।

—বলো কী! রাজা বুমবুজাং চিৎকার করে উঠল আনন্দে। স্তানকে জাপটে ধরল। হা-হা করে হেসে উঠল। তারপর স্তানকে ছেড়ে নিজের ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠল। ছুটল স্তানের গাড়ি-ঘরের দিকে। স্তান হতবাক।

গাড়ি-ঘরে পৌঁছে গেল রাজা দেখতে দেখতে। ডাক দিল স্তানের বউ আনাতুরিকে। আনাতুরি সাড়া দিল। দেখা দিল। আনন্দে দিশেহারা রাজা বুমবুজাং। চেঁচিয়ে উঠল, আনাতুরি দেখাও, দেখাও, তোমার ছেলের মুখ দেখাও!

আনাতুরি গাড়ি-ঘরের পর্দা তুলল। রাজার চোখের ওপর তুলে দেখাল ছেলের মুখখানি। রাজা হাসল প্রাণ খুলে। হাসতে হাসতে ছেলের গলায় পরিয়ে দিল নিজের গলার সোনার হার। পরিয়ে দিয়ে বলল, আমি তোমার ছেলের নাম রাখলুম কোহেন।

আবার রাজার ঘোড়া ছুটল। এবার রাজা নিজেই খবরটা ছড়িয়ে দিল চারদিকে। হুকুম হল আনন্দ করো। খানাপিনা বানাও। ভোজ লাগাও।

অমনি শুরু হয়ে গেল গানা-নাচার আর খানাপিনার। সে এক মোচ্ছব। শুরু হল ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে বর্শার খেলা। হরিণ শিকার। ঘোড়ার পিঠে রাজার সেনা। ঘোড়া ছুটছে। হরিণ পালাচ্ছে। ভয়ে কাঁপছে। একটা নয়, অসংখ্য হরিণ। সেনার হাতের বর্শা কারও গায়ে লাগছে। কেউ পালাচ্ছে। যার হাতে যত মরছে হরিণ, সে তত পাচ্ছে ইনাম। একটি মানুষ জন্মাল। অসংখ্য হরিণ মরল। অসংখ্য হরিণের রক্তে লাল হয়ে গেল স্তেপের মাটি। নাচ হচ্ছে সেই রক্তের ওপর—যুদ্ধবাজ মানুষের নাচ। সে-নাচ কী বীভৎস। আনন্দের সে কী ভয়ানক হুল্লোড়। বাধা মানে না।

অনেকক্ষণ পর শান্ত হল সেই হুল্লোড়। শান্ত হলে বুমবুজাং চিৎকার করে উঠল, —শোনো আমার প্রিয় বন্ধুরা, আমার বিশ্বাসী সহচর স্তানের একটি পুত্র জন্মগ্রহণ করায় আমি যারপরনাই খুশি। এই খুশির দিনে আমি আরও একটি খুশির খবর দেব। আমার ছেলে তিত্তাচিনি এখন বড়ো হয়েছে। তার ইচ্ছে সে এবার যুদ্ধে যাবে। স্তানের কাছে সে যুদ্ধ শিখেছে। স্তান আমার ছেলের কপালে দেখেছে সৌভাগ্যের চিহ্ন। স্তান জানে কুহকবিদ্যে। পিশাচের সঙ্গে কথা বলে স্তান জেনেছে, আমার ছেলে তিত্তাচিনি হবে এক বীরযোদ্ধা। কোনো যুদ্ধেই তার হার হবে না। তাই আমিও মনস্থির করেছি। স্থির করেছি, আমার ছেলে যাবে সৌরামাতির রাজ্যে। সৌরামাতির রাজা আমাদের চিরশত্রু। এই শত্রুকে যতক্ষণ-না আমরা নিকেশ করতে পারছি, ততক্ষণ আমাদের স্বস্তি নেই। তা ছাড়া আমি জানি, সৌরামাতি রাজার অঢেল সোনা আছে। রাজা মরলে সেই সোনাও আমাদের দখলে আসবে। সেই কারণেই আমি আমার সৈন্যদের আদেশ করছি, তোমরা তৈরি হও। আমার ছেলে তিত্তাচিনির সঙ্গে চলো যুদ্ধে। শুনলে তোমাদের নিশ্চয়ই সাহস বাড়বে, স্তানও যাবে যুদ্ধে। সে হবে তোমাদের সেনাপতি। সে একদিকে যুদ্ধ পরিচালনা করবে আর একদিকে কুহকবিদ্যের সাহায্যে তোমাদের রক্ষা করবে। স্তন থাকলে তোমাদের নিশ্চিত জয়।

বেজে উঠল কাড়া-দুন্দুভি। সাজো-সাজো রব উঠল। শয়ে শয়ে রাজার সেনা সাজল। শয়ে শয়ে সেনা ঘোড়ার পিঠে উঠল। যুদ্ধে চলল। তাদের কাঁধে তির-ধনুক কোমরে গোঁজা ধারালো অস্ত্র। কিন্তু স্তানের যেন মন কাঁদে। কেমন করে যেন তার মন। বার বার নিজের ছেলের মুখটা তার ভেসে ওঠে চোখের ওপর। সে ছুটে গেল বউয়ের কাছে। বউকে বলে, আনাতুরি, সাবধানে থেকো!

আনাতুরি বলে, আমার ভয় করছে। চমকে ওঠে স্তান, —কেন?

—জানি না।

বিদায় নিল স্তান। বলে গেল, আনাতুরি, এই আমার শেষ যুদ্ধ। তারপর ছেলের কপালে একটা চুমো দিল।

আনাতুরির চোখে জল। চোখের জল মুছতে মুছতে সে স্তানের পেছু ডাকল, স্তান!

স্তানের ঘোড়া থামল। ফিরে তাকাল।

জানো স্তান,

ছেলেকে বুকে নিয়ে এগিয়ে গেল আনাতুরি। এগিয়ে গেল স্তানের ঘোড়ার সামনে।

কী বলছ আনতুরি?

—জানো স্তান, যেদিন আমাদের ছেলে এল এই পৃথিবীতে, সেদিন থেকে রক্ত দেখলে আমার বুক কাঁপে। মানুষকে হত্যা করতে দেখলে আমি থাকতে পারি না? আমি ভয় পাই। আচ্ছা স্তান, আমার ছেলেও যদি রক্ত নিয়ে খেলা করে? সেও যদি ঘাতক হয়? বলতে বলতে সে আর্তস্বরে চিৎকার করে ওঠে, না স্তান না, এ আমি কিছুতেই হতে দেব না। তাকে আমি হত্যা করতে দেব না কিছুতেই। স্তান, সে মানুষকে হত্যা করবে না সে ভালোবাসবে।

স্তান আনাতুরির কথা শুনল। ছেলের মাথায় হাত রাখল। তারপর বলল, কেঁদো না আনাতুরি। তোমরাও যা ইচ্ছে, আমারও তাই। আমি ছেলেকে ঘাতক করব না।

যুদ্ধে গেল স্তান। সে এখন সেনাপতি। সেনাপতি রাজপুত্র তিত্তাচিনির। স্তানের ঘোড়া ছোটে টগবগ, টগবগ। ঘোড়া ছোটায় তিত্তাচিনি পাশে পাশে। সেনার ঘোড়া অগুনতি। ঘোড়া ডাকে চিঁহি-চিঁহি। ধুলো ওড়ে খুরে খুরে। মাটির ডেলা গুঁড়িয়ে যায়। আগুন ছোটে পাথরে পাথরে ঘোড়ার খুরে।

ঘোড়সওয়ারি সেনার দল হাঁকার দিল, ‌শত্রু কোথায়, এগিয়ে আয়!‌

ছুটছে ঘোড়া। হাঁকছে সেনা। কোথাও ঘাস, কোথাও গাছ, কোথাও নদী, কোথাও হ্রদ। কোথাও দিন, কোথাও রাত। ছুটতে ছুটতে তারা পৌঁছে গেল। পৌঁছে গেল সৌরামাতির ডেরার কাছে নদীর পাড়ে। নদীর পাড়ে গাছগাছালি ঝুপসি। সেখানে তারা তাঁবু ফেলল। ওত পেতে বসে রইল। শত্রু এলেই আড়াল থেকে সাঁই-ই-ই। তির ছুড়বে। শত্রুকে শেষ করবে আচমকা।

অন্ধকার রাত, নিজঝুম। নদীর জলে ছলাতকার। ঠান্ডা বাতাস কনকন করে। ঝুপ-ঝাপ শব্দ। ঘোড়ার গলায় ঘড়ঘড়ানি। গাছের ডালে ঝটপটানি। সেই অন্ধকার রাতে তিত্তাচিনির সেনারা বসে রইল অনেকক্ষণ। তবু শত্রুর সাড়া নেই। যুদ্ধের কোনো তাড়াও নেই। তখন তিত্তাচিনি হাঁপ ছাড়ল। স্তানকে বলল, ‌সেনাপতি, আজ তবে ঝুটমুট জেগে কী লাভ! অনেকটা পথ আসতে হয়েছে। এসো সবাই বিশ্রাম নিই। আজ রাতটা বিশ্রাম নিয়ে কাল সকালে নদী পেরোব।‌

কিন্তু স্তানের মুখ গম্ভীর, মুখে কথা নেই। চোখ তার সতর্ক। কী দেখছে সে অমন করে!

রাজপুত্র তিত্তাচিনি অমন করে স্তানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‌কী দেখছ সেনাপতি?‌

স্তান এবার কথা বলল। তার গলায় উদবেগ। সে বলল, ‌শোনো রাজপুত্র, আজ রাতটা আমাদের জেগেই থাকতে হবে। শত্রুর কোনো সাড়া নেই, এ ঠিক কথা। কিন্তু তাই বলে যে কাছে-পিঠে লুকিয়ে নেই, একথা ঠিক নয়। আমি একটু আগে রাতের আকাশ দিয়ে একঝাঁক কালো ডানার পাখি উড়ে যেতে দেখেছি। এ খুব অশুভ লক্ষণ। কালো পাখির কালো ডানার বাতাস যদি গায়ে লাগে, তবে নির্ঘাত বিপদ। আমাদের মাথার ওপর দিয়েই পাখি উড়ে গেছে। তার মানে, তাদের ডানার বাতাসও লেগেছে আমাদের গায়ে।‌

তিত্তাচিনি যেন স্তানের কথা শুনে ভয় পেল। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌তার মানে কি বিপদ এগিয়ে আসছে?‌

স্তান উত্তর দিল, ‌তা ছাড়া আর কী ভাবতে পারি?‌

‌তুমি তাহলে মন্ত্র পড়ো! বিপদ কাটাও!‌ বলল তিত্তাচিনি।

স্তান জবাব দিল, ‌তুমি বললে আর আমি মন্ত্র পড়লুম অমনই বিপদ কেটে গেল, তাই কখনো হয়! এ বিপদ কাটানো অত সহজ নয়।‌

‌—তবে?‌

‌—এ বিপদ কাটাতে হলে রক্ত চাই। ওই উড়ন্ত পাখির রক্ত।‌

‌—পাখি তো পালাল অন্ধকার আকাশের আড়ালে।‌

—‌আবার আসবে। আমাদের জেগে থাকতে হবে, এলেই আকাশে তির ছুড়ে পাখি মারতে হবে।‌

কাজেই জেগে রইল সেনাপতি। জাগল সৈন্যরা। সেইসঙ্গে জেগে থাকল তিত্তাচিনি। সবাই জাগবে আর রাজার ছেলে ঘুমিয়ে থাকবে এ কখনো হয়! তিত্তাচিনি লাগাম ধরে বসে পড়ল ঘোড়ার পিঠে। বসল সেনাপতি স্তান। বসল সৈন্যরাও যে যার ঘোড়ায়। কার নজর নদীর জলে, কেউ তাকিয়ে আকাশপারে। আকাশে রং-ঝিলমিল তারা। নদীতে ঢেউ-টলমল জল। তবে অন্ধকারে নদীর ঢেউ দেখাই যায় না ভালো। দেখা যায় আকাশটা। অসংখ্য তারার আকাশ।

চমকে উঠল স্তান হঠাৎ। আকাশে দৃষ্টি তার স্থির। সে যেন দেখতে পেয়েছে আবার সেই কালো ডানার কালো পাখি! এবার শুধু একা স্তান নয়, দেখল তিত্তাচিনিও। এমনকী দেখতে পেল রাজপুত্রের সেনারাও।

ঘোড়াও ছোটাল তিত্তাচিনি। ঘোড়ার পিঠে বসে ধনুকে তির জুড়ল। আকাশের ওই পাখির দিকে তাক করল। তিত্তাচিনিকে দেখে ঘোড়া ছোটাল সেনারাও। ধনুকে তির জুড়ল তারাও। আগে কে মারবে পাখি? রাজার ছেলে না রাজসেনারা?

ঘোড়ার খুরে শব্দ উঠল।

পাখিরাও ডানায় ডানায় ঝাপটা দিয়ে আরও জোরে শব্দ তুলল। উড়ে চলল ঘোড়ার আগে।

‌মার, মার, মার।‌ চ্যাঁচাল রাজসেনারা।

‌মার, মার, মার।‌ চেঁচিয়ে উঠে তির ছুড়ল তিত্তাচিনি। আকাশে অন্ধকারে পাখির দিকে।

পাখি পালাল। তির ফসকাল। ঠিক সেই ফাঁকে শত্রুও ধেয়ে এল ঘোড়ার পিঠে। তিত্তাচিনির সেনারা থতোমতো খেয়ে গেছে। তারা বুঝতেই পারেনি, এ শত্রুর কারসাজি। বুঝতেই পারেনি আকাশে পাখি উড়িয়ে শত্রুই তাদের ফাঁদে ফেলেছে। এ পাখি রাতের পাখি। রাতের আকাশে উড়তে জানে। শত্রুকে বেপথের গোলকধাঁধায় নাকাল করে হিমশিম খাওয়ায়।

আর ঠিক তাই। তিত্তাচিনি ফাঁদে পড়ল। তার সেনারা পথ হারাল। শত্রুর ব্যূহে আটকে পড়ে এদিক ছোটে, ওদিক ছোটে। হাঁকপাঁকিয়ে পথ খোঁজে। হায় রে! আর পথ নেই! পথ নেই বেরিয়ে যাওয়ার! পালিয়ে যাওয়ার! এবার মরো!

স্তানের ঘোড়া থামাল । ফিরে তাকাল । ছেলেকে বুকে নিয়ে এগিয়ে গেল আনাতুরি ।

মরতেই যখন হবে, তখন তিত্তাচিনি মরিয়া হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, —‌সৈনিক, মারো তির!‌

তিত্তাচিনির সৈনিকের দল গর্জে উঠল, ‌সাবধান! সাবধান!‌ অন্ধকার কেঁপে উঠল।

সেই কাঁপা কাঁপা অন্ধকারে সৌরামাতির ঘোড়া ছোটে। শব্দ ওঠে। ঘোড়ার পিঠে সেনা হাঁকে, ‌শয়তানদের শেষ করো।‌

তির ছুটল এপাশ থেকে ওপাশে। যুদ্ধ লাগল একদলের সঙ্গে আর এক দলের। ঘোড়া ডাকে চিঁহি, চিঁহি। লম্ফ ঝম্পী এদিক-ওদিক। সে কী ভীষণ যুদ্ধ।

পারল না তিত্তাচিনি, হারল। তার সেনারা ছত্রভঙ্গ, পালাচ্ছে। তিত্তাচিনির তূণের তির শেষ। সে বোধ হয় মরবে এবার। মরবার আগে বাঁচার জন্যে কে-না চেষ্টা করে! অস্থত নেই। এবার পালিয়ে বাঁচো। তিত্তাচিনির ঘোড়া ছুটল বেগে। লাফ মারল আকাশজুড়ে। ডাক ছাড়ল দিক কাঁপিয়ে। সে তার প্রভুকে বাঁচাবে। সামনের কোনো বাধাই সে মানবে না। কেউ তাকে রুখতে পারবে না। যে ঘোড়ার সামনে পড়ে, দূরে পালায়। যে তার পায়ের সামনে এগিয়ে আসে, পিষে মরে। যে তাকে বাধা দেয়, তার মূর্তি দেখে ভিমরি খায়! সে তার প্রভুকে বাঁচাবেই। এই দারুণ শীতেও ঘোড়ার দেহে ঝরঝরিয়ে ঘাম ঝরে। ক্লান্তিতে হাঁপ ধরে। তবু সে লাফ মারবে। শত্রু-ব্যূহ টপকে যাবে পালাবে।

কিন্তু ঘোড়া একটা ব্যূহ টপকাল তো, সামনে আর একটা। আর একটা টপকাল তো আবার একটা। যেন একের পর এক ঢেউ আছড়ে পড়ছে তার ওপর।

কিন্তু কতক্ষণই-বা একা যুঝবে একটা ঘোড়া। তিত্তাচিনির সেনার দল পগারপার। যতজন পালিয়েছে তার চেয়ে বেশি জন মরেছে। স্তানও কি মরে গেল! কে জানে!

এখন তিত্তাচিনি একা। তার অস্ত্রও নেই, সৈন্যও নেই। শুধু আছে তার এই একমাত্র ঘোড়া। এ ছাড়া এখন কেউ আর তাকে রক্ষা করতে পারবে না। কিন্তু ঘোড়াই-বা আর কতক্ষণ! তিরের পর তির গেঁথে গেছে তার শরীরে। রক্ত ঝরছে অঝোরে। সময় তার ঘনিয়ে এসেছে। সুতরাং এবার বাঁচার শেষ চেষ্টা করতে হবে তিত্তাচিনিকে। ঘোড়ার কেশর খামচে ধরল। ঘোড়ার ঘাড়ে হুমড়ি খেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‌জোরসে মারো লাফ।‌

ঘোড়া লাফাল যেন আকাশ ছুঁয়ে।

তিত্তাচিনি আবার চ্যাঁচাল, ‌হট যাও, দুশমন!‌

কিন্তু তার মুখ থেকে মুখের কথা পড়তে পারল না। একটা তির ছুটে এল তার বুকে। শত্রুর তির। এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেল তার বুক। ‌আঃ!‌ আর্তনাদ করে উঠল তিত্তাচিনি। যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল। সঙ্গেসঙ্গে আর একটা তির উড়ে এল। এবার লক্ষ্য মাথা। ‌আঃ!‌ তিত্তাচিনির গলায় যন্ত্রণার আর্ত রব। রক্ত ছুটল তিত্তাচিনির দেহ থেকে। সে অসহায়ের মতো খামচে ধরল ঘোড়ার গলা। আর কোনো বাধা মানল না ঘোড়া। লাফ মারল। সব বাধা ডিঙিয়ে সে ছুট দিল, ছুট দিল তার আহত প্রভুকে পিঠে নিয়ে। ফিরে চলল সে তিত্তাচিনির বাবার কাছে।

এখন নীল ঘোড়া যেন একটা উড়ন্ত ইগল। উড়ছে সে না ছুটছে! সে ঝড় না দুরন্ত ঢেউ। নাকি বন্যা! সব কিছু ভাসিয়ে দিয়ে ধেয়ে আসছে, দুরন্ত বেগে!

দুরন্ত বেগেই ঘোড়া পৌঁছে গেল রাজা বুমবুজাংয়ের শিবিরে। তার প্রভু যেমন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছে, সেও তেমনই। তার প্রভু যেমন তিরের আঘাতে আহত, সেও তাই। সে এখনও বেঁচে আছে। সে এখনও নিশ্বাস ফেলছে। কিন্তু তার পিঠের ওপর যে-মানুষটা এখনও তার গলা জড়িয়ে আছে, সে আর নিশ্বাস ফেলছে না। তার প্রভুর মৃত্যু হয়েছে। তিত্তাচিনির মৃতদেহ থেকে এখনও রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। গড়িয়ে পড়ছে ঘোড়ার গা বেয়ে। ঘোড়ার বুক দিয়েও এখনও রক্ত ঝরছে। আহত ঘোড়ার।

ঘোড়া দাঁড়াল। ঘোড়ার পিঠ থেকে নামানো হল তিত্তাচিনির মৃতদেহটা। সঙ্গেসঙ্গে চিৎকার করে উঠল ঘোড়া। বিকট চিৎকার। তারপর সে ছিটকে পড়ল মাটির ওপর। তার কাজ শেষ। তার নিশ্বাসও শেষ।

ফিরে এল তিত্তাচিনির পরাজিত সেনারাও। সে তো মাত্র কয়েক জন। সেই কয়েক জনই বেঁচে ছিল। কিন্তু স্তান?

রাজা বুমবুজাং ছুটে এল। ছুটে এল রানি, তিত্তাচিনির মা। আকুল হয়ে বুক চাপড়াতে লাগল রানি ছেলের শোকে। রাজা বুমবুজাং ছেলের মৃতদেহ দেখে দাপাদাপি শুরু করে দিল। তার সে কী ভীষণ রাগ। শোকে পাগল হয়ে গেল রাজা। যাকে সামনে পায় তারই গলা টিপে ধরে। হা-হা করে হাসে। কাউকে মেরে ফেলে। কাউকে ছেড়ে দেয়। কারও রক্ত দ্যাখে। কারও রক্ত গায়ে মাখে। রাজা যেন একটা বুনো জন্তু। কী হিংস্র তার সেই মূর্তি। এখন কেউ তার সামনে যেতে পারবে না। কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে সাহস পায় না। যে পারে, সে স্তান। তবে সে কি সত্যিই যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দিয়েছে!

‌স্তান-ন-ন-ন!‌ বিকট চিৎকার করে হাঁক ছাড়ল রাজা বুমবুজাং।

স্তানের সাড়া পাওয়া গেল না।

‌স্তান-ন-ন-ন-ন।‌ এবার আরও জোরে চিৎকার করে উঠল রাজা বুমবুজাং।

এখনও স্তানের সাড়া নেই।

রাজা বুমবুজাংয়ের চোখ কটমট করে উঠল। ঠকঠক করে করে কাঁপতে লাগল তার হাত-পা। তার মাথার চুল যেন খাড়া হয়ে উঠল। সে কী ভয়ংকর মূর্তি। সে-মূর্তি যে দ্যাখে সেই পালায়। যে পারে না পালাতে, রাজা তাকে ধরে ফেলে। চেঁচিয়ে ওঠে, —‌পালাবি কোথায়? আমার ছেলে মরেছে। তোদেরও মরতে হবে। কেউ বেঁচে থাকবে না।‌

নিমেষে ফাঁকা হয়ে গেল সামনের খোলা জায়গাটা। মরার জন্য কে আর দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু দাঁড়িয়ে রইল রাজা। পড়ে রইল রাজার ছেলে তিত্তাচিনির দেহটা। আর তাকে দেখে বুক চাপড়ে কাঁদতে থাকল ছেলের মা রাজরানি ছেলের সামনে বসে বসে—একা। কিন্তু যারা মরল এইমাত্র রাজার হাতে, তারাও পড়ে রইল। তাদের জন্য কেউ কাঁদতে এল না।

ও কে? একটু দূরে দাঁড়িয়ে একা? ঘোড়ার পিঠে নি:সঙ্গ মানুষটি?

স্তান।

স্তানকে দেখে কী হল রাজার! কোথায় গেল তার তর্জন-গর্জন! অমন নির্বাক কেন রাজা! অমন স্থির কেন তার চোখের দৃষ্টি! অমন ধীর পায়ে কেন এগিয়ে যায় স্তানের দিকে ওই মৃতদেহগুলি মাড়িয়ে। এইমাত্র এই মানুষগুলিকে তো রাজা নিজেরই হাতে হত্যা করেছে।

স্তান পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল।

স্তানের সামনে এসে দাঁড়াল রাজা বুমবুজাং। তার চোখে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে! গায়ে কাঁটা দেয় সে-চোখ দেখলে। কিন্তু স্তান শান্ত। বসে রইল ঘোড়ার পিঠে।

দু-জনের চোখে চোখ।

নির্বাক।

নিস্তব্ধ চারদিক। ছেলের শোকে এতক্ষণ কেঁদে আকুল হচ্ছিল রানি। তার কান্নাও থেমে গেছে স্তানকে দেখে। শুধু ভেসে আসে তীক্ষ্ণ বাতাসের শব্দ। সি-ই-ই-ই, সি-ই-ই-ই!

আচমকা চিৎকার করে উঠল রাজা বুমবুজাং। আচমকা স্তানের ঘোড়ার লাগামটা হাত দিয়ে চেপে ধরল। তারপর কেঁদে উঠল। ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে রাজা স্তানের হাতটা ধরল, কাঁদতে কাঁদতে। বলল, ‌স্তান আমার ছেলেটা মরে গেল। স্তান তোমার হাতে তাকে আমি ছেড়ে দিয়েছিলুম। তুমি তাকে রক্ষা করতে পারলে না।‌

স্তান রাজার চোখে জল দেখে অবাক হল। কিন্তু অস্থির হল না।

রাজা স্তানের অমন অবিচল মূর্তি দেখে অস্থির হল। তার নিশ্বাসের হিংস্র শব্দ ছিটকে পড়ে। রাজা বলে, ‌তুমি চুপ করে আছ কেন? তবে কি আমি মনে করব তুমিই অপরাধী? তবে কি আমি মনে করব, তুমি তাকে রক্ষা করার কোনো চেষ্টা করোনি?

স্তান চমকে ওঠে, রাজার কথা শুনে।

রাজা আবার চ্যাঁচায়, —‌তিত্তাচিনি আমার ছেলে না-হয়ে যদি তোমার ছেলে হত? তুমি কি তাকে বাঁচাবার চেষ্টা করতে না? তাঁকে বাঁচাতে নিজের প্রাণ দিতে ভয় পেতে?‌

তীব্র রোষে রাজার গলার স্বর ফেটে পড়ে। স্তানের মন আনচান করে ওঠে হঠাৎই? তার মনে পড়ে গেছে নিজের ছেলের কথা। হঠাৎই সে চঞ্চল হয়ে ওঠে। হ্যাঁ, যুদ্ধে যাওয়ার আগেই তার একটি ছেলে জন্ম নিয়েছে। ছেলের কথা মনে পড়তেই সে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। ছেলের মুখখানি ভেসে উঠল তার চোখে। রাজার কথা আর তার কানে গেল না। রাজার কথার সে উত্তর দিতে পারল না। এখন এই মুহূর্তে সে আরকিছু চায় না সে তার ছেলের মুখখানি দেখতে চায়। সে কি তবে রাজার কথার উত্তর না-দিয়ে ঘোড়া ছোটাবে!

না, তাকে উত্তর দিতে হল না। রাজাই কথা বলল। আচমকা বুককাঁপানো সেকথা। তবে কি রাজা স্তানের মনের কথা জানতে পেরেছিল! নইলে রাজা বুমবুজাং কেন বলল, ‌ভেবো না স্তান, আমার ছেলে মরে গেছে বলে তোমার ছেলে বেঁচে থাকবে।‌

স্তান শিউরে উঠল। কী ভয়ংকর কথা। স্তানের বুকটা যেন শুকিয়ে যাচ্ছে। কে যেন তার বুকের রক্ত শুষে নিচ্ছে। বড্ড কষ্ট হচ্ছে তার। সে যেন আর বসে থাকতে পারছে না ঘোড়ার পিঠে। টলছে স্তান, বুঝি এখনই সে পড়বে মুখ থুবড়ে। জড়িয়ে ধরল ঘোড়ার গলা হাঁকপাঁক করে। তারপর আর্তনাদ করে উঠল, ‌আমার ছেলেকে মারবেন না রাজা।‌

স্তানের জামাটা খামচে ধরল রাজা। তারপর চিৎকার করে উঠল, —‌তোমার ছেলে সর্বনেশে, অলক্ষুণে। সে জন্মাল, সঙ্গেসঙ্গে আমার ছেলে নিহত হল, শত্রুর হাতে। এ আপদকে মরতেই হবে।‌

—‌না-আ-আ-আ।‌

স্তান গর্জন করে উঠল রাজার মুখের ওপর। তার জামায় খামচে-ধরা রাজার হাতটা ছাড়িয়ে নিল টান মেরে। রাজা হকচকিয়ে গেছে। এমন দুট্টসাহস কেমন করে হল স্তানের! সে টান মারে রাজার হাত ধরে। রাগে অন্ধকার দেখল রাজা। নিজেকে সামলাতে-না-সামলাতে রাজার চোখের ওপর দিয়ে ঘোড়া ছোটাল স্তান। ছুটল গাড়ি-ঘরে। সেখানে তার ছেলে আছে, ছেলের মা আছে।

স্তানের ঘোড়া ছুটতেই রাজার হুঁশ হয়েছে। রাজা নিজের ঘোড়ার পিঠে লাফ দেয় নিমেষে। ধাওয়া করে স্তানকে। ছুটতে ছুটতে হুংকার ছাড়ে, ‌শয়তান, দাঁড়া। পালিয়ে পার পাবি না। তুই মরবি। তোর ছেলে মরবে। বউ মরবে। আমার হাতে তোরা কেউ নিস্তার পাবি না।‌

স্তান শুনলই না রাজার কথা। তার ঘোড়া ছুটছে। দুর্দান্ত তার বেগ, তার তেজ। ঘাড় ফেরাল স্তান ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠ থেকে। তারপর বিদ্রোহী সেনার মতো শাসিয়ে উঠল—শোন রে দুশমন রাজা, যতক্ষণ আমার প্রাণ আছে, ততক্ষণ কেউ আমার ছেলের প্রাণ নিতে পারবে না। তোর ছেলে গোঁয়ার। সে মরেছে নিজের গোঁয়ার্তুমিতে। তাতে আমার ছেলের কী দোষ! মিথ্যে অপবাদ দিয়ে যে আমার ছেলেকে আপদ বলে, সে নিজে আপদ। যে আমার ছেলেকে হত্যা করতে চায়, তার মৃত্যুর চাবিকাঠি আমার হাতে।‌ বলতে বলতে স্তান ছুটছে ঘোড়ার পিঠে। ছুটতে ছুটতে নিজের হাতের মুঠি শক্ত করল। রাজার দিকে ছুড়ে দেখাল।

স্তান পৌঁছে গেল ছেলের আস্তানায় আনাতুরির কাছে।

পেছনে পেছনে পৌঁছে গেল রাজাও।

স্তান চোখের পলকে ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নামল। ছুটে গেল আনাতুরির ঘরের সামনে। উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে স্তান। হাঁপাতে হাঁপাতে ডাক দিল, ‌আনাতুরি-ই-ই-ই!‌

‌কে?‌ আনাতুরি চমকে ওঠে। এ যে স্তানের গলা! হন্তদন্ত হয়ে সে ঘরের ভেতর থেকে মুখ বাড়াল। দেখল বেদম হয়ে স্তান হাঁপাচ্ছে। দেখল তার পেছনে রাজা। রাজার মূর্তি দেখে শিউরে উঠল আনাতুরি। যেন এক ভয়ংকর ঘাতকের মতো তার চোখ জ্বলছে।

‌আমার ছেলে কই?‌ উত্তেজনায় অস্থির হয়ে স্তান জিজ্ঞেস করল আনাতুরিকে।

‌কেন, কী হয়েছে?‌ ভয়ে জড়সড় হয়ে জিজ্ঞেস করল আনাতুরি। দেখল স্তানের মুখে যেন বিপদের ছায়া!

আনাতুরির কথার উত্তর দিতে হল না স্তানকে। তার আগেই গাঁক করে উঠল রাজা, ‌—আমি তাকে হত্যা করব।‌

স্তান নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে। উঠে পড়ল তার গাড়ি-ঘরে। ঠেলে সরিয়ে দিল আনাতুরিকে। নিজের ছেলেকে সে জড়িয়ে নিল বুকে। তারপর গর্জে উঠল, —‌দেখি কে আমার ছেলেকে হত্যা করে!‌

রাজার ঘোড়া এগিয়ে এল। ঘোড়ার পিঠে যেন একটা জল্লাদ বসে। তার হাত দুটো নিশপিশ করছে। এখনই বুঝি গলা টিপে ধরবে ওই কচি ছেলেটার।

আতঙ্কে আর্তনাদ করে উঠল আনাতুরি। রাজার ঘোড়ার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক দিল, ‌দেখি কে আমার সামনে আসে!‌ রাজা বুমবুজাং লাফিয়ে নামল ঘোড়ার পিঠ থেকে। এক ঝটকায় ফেলে দিল আনাতুরিকে। ধেয়ে গেল স্তানের দিকে। এবার বুঝি কেড়ে নেয় তার ছেলেকে!

আনাতুরি ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ে। রাজার পোশাকটা টেনে ধরে সে। না, সে তার ছেলেকে স্তানের বুক থেকে ছিনিয়ে নিতে দেবে না। সে চিৎকার করে উঠল, ‌আমার ছেলেকে মারতে দেব না। কিছুতেই না।‌

আনাতুরির গলায় ধাক্কা দিল রাজা। এবার আরও জোরে। আরও জোরে ছিটকে পড়ল আনাতুরি মাটির ওপর মুখ থুবড়ে। তবু সে পরাজয় মানল না। আবার সে উঠে দাঁড়াল। ছুটে গেল রাজার সামনে। রাজার বুকটা খামচে ধরে বাধা দিল। তারস্বরে বলে উঠল, ‌স্তান, তুমি ছেলেকে নিয়ে পালাও।‌

স্তান চেঁচিয়ে ওঠে, ‌ও তোমায় মেরে ফেলবে আনাতুরি!‌

‌মারুক। আমি মরলে আমার ছেলে যদি বাঁচে, তাতে আমার দুট্টখ নেই। আমার বুকে যদি স্নেহ থাকে, তবে রাজার সাধ্যি নেই আমার ছেলেকে মারে! তুমি আমার ছেলেকে রক্ষা করো স্তান! তুমি ঘোড়ায় উঠে পড়ো। আমি এই নির্দয় ঘাতককে এখান থেকে এক পা-ও নড়তে দেব না।‌ বলে আনাতুরি রাজার পথ আটকাল।

রাজা এগোতে পারে না। রাজা ধাক্কা মারে।

আনাতুরি ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দেয়।

রাজা আনাতুরির চুলের মুঠি ধরে টান মারে।

আনাতুরি তবু হারে না।

রাজা আনাতুরির মুখের ওপর ঘুসি ছুড়ল।

আনাতুরিকে কাবু করতে পারল না।

রাজা আনাতুরির দুটো হাত একসঙ্গে মোচড় দিল।

আনাতুরি মাটিতে পড়ে গেল। সঙ্গেসঙ্গে উঠে পড়ল, আবার পথ আটকাল।

স্তান তার ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়েছে।

রাজা বুমবুজাং দেখতে পেল।

স্তানের ঘোড়া ছুট দিয়েছে।

রাজা এবার বেপরোয়া। পা ছুড়ল রাজা দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে। লাগল আনাতুরির। মুখ থুবড়ে পড়ল সে মাটির ওপর। প্রচন্ড লাগল, তবু সে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু তার আগেই রাজা নিজের ঘোড়ায় উঠে পড়েছে। স্তানের পিছু নিয়েছে।

ছুটল আনাতুরিও রাজার ঘোড়ার পেছনে। কিন্তু ঘোড়ার সঙ্গে কেমন করে টক্কর দেবে আনাতুরি!

স্তানের ঘোড়া ছুটতে ছুটতে বনে ঢুকল।

রাজার ঘোড়া তাকে দেখে বনেই ঢুকল।

স্তানের ঘোড়ার দম ফুরোয়।

রাজার ঘোড়া এগিয়ে আসে।

স্তানের ঘোড়ার হাঁপ ধরে।

রাজার ঘোড়া তার নাগাল পায়।

স্তান ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ল। ছেলে তার বুকে। রাজা স্তানকে ধরে ফেলল।

স্তান চেঁচিয়ে উঠল, —‌শোন রে রাজা, আমি কুহকী। শোন রে রাজা, একদিন তোর ছেলে মরতে বসেছিল ব্যামোতে। আমি তার প্রাণ বাঁচিয়েছি। আমার ছেলের গায়ে যদি হাত দিস, তবে শুনে রাখ শয়তান, আমার পিশাচ-মন্ত্রে তোর মরণ কেউ রুখতে পারবে না। তুই মরবি, তোর সব ধ্বংস হয়ে যাবে।‌

রাজা বুমবুজাং শুনল না তার কথা। ঝাঁপিয়ে পড়ল স্তানের ওপর। সে কেড়ে নিতে গেল স্তানের ছেলেকে। স্তান ছেলেকে আগলে রাখে। রাজা টানাটানি করে। ছেলে ককিয়ে ওঠে। মারামারি লেগে যায়। ছেলে ছিটকে গেল স্তানের হাত থেকে। পড়ল, ধাক্কা লাগল। চিলচেঁচিয়ে কোঁদে উঠল ছেলে। আর বুঝি পারল না স্তান ছেলেকো রক্ষা কারতে। তবু শেষ চেষ্টা করতে চায় স্তান। রাজাকে সে ফেলে দিল মাটির ওপর। বুকের ওপর চেপে বসল। বুঝি সে এবার মরণকামড় দেবে। কিন্তু পারল না। রাজা চকিতে তার গলাটা খামচে ধরল। দম আটকে আসে স্তানের। নিস্তেজ হয়ে পড়ে স্তান। এবার রাজা তার ওপর চেপে বসে। চেপে ধরে গলাটা। নিস্তঢ় হয়ে আসে স্তানের বুকের শব্দ ধীরে ধীরে। নিথর হয়ে গেল মানুষটা। চিরদিনের জন্যে।

কিন্তু স্তানের ছেলে? সে তখনও কাঁদছে। এবার খুনি রাজা ছুটে গেল তার দিকে। এবার তার গলাটা টিপে ধরবে রাজা।

—‌না-আ-আ-আ!‌

চমকে ওঠে রাজা বুমবুজাং। কে অমন করে চেঁচিয়ে ওঠে এই বনে আচমকা। ঝটপট পেছনে তাকায় রাজা। দ্যাখে এ যে স্তানের বউ আনাতুরি! তার হাতে একটা পাথরের চাঁই—মস্ত। তার চোখে প্রতিহিংসার ভয়ংকর চাউনি। ছুটতে ছুটতে এসেছে সে। হাঁপাচ্ছে, গজরাচ্ছে—ঘাম ঝরছে। আক্রোশে কাঁপছে।

তাকে দেখে থমকে গেল রাজা বুমবুজাং। একটা হিংস্র জানোয়ারের মতো লাফ মারল। ছেলেটাকে ছোঁ মারতে গেল। চোখের পলকে আনাতুরির হাতের পাথর ছিটকে পড়ল রাজার ঘাড়ে। রাজা চেঁচিয়ে উঠল, —‌আ-আ-আ!‌ মাটিতে পড়ল মুখ ঘসটে। যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল। রক্তের ফোয়ারা ছুটল। আবার মারল আনাতুরি ওই পাথর দিয়ে তার হাতের ওপর। ওই হাত দিয়েই সে তার স্তানকে মেরেছে। আর যেন কাউকে মারতে না-পারে।

ছুটে গেল আনাতুরি ছেলেটার কাছে। তার কান্না থামেনি। সে ছেলেকে তুলে নিল বুকে। তারপর ছুটে গেল স্তানের কাছে। স্তান পড়ে আছে। সে মৃত। আনাতুরি লুটিয়ে পড়ল। লুটিয়ে পড়ল স্তানের মৃতদেহের ওপর। সে আকুল হয়ে কেঁদে উঠল। বন নির্জন। সেই নির্জন বনে এক মায়ের কান্না যেন অনেক কান্না হয়ে হাওয়ায় ভেসে যায়। ভেসে যায় একটি প্রতিজ্ঞা। আনাতুরির প্রতিজ্ঞা, —শোনো স্তান, আমি তোমার ছেলেকে খুনি হতে দেব না কোনোদিন। সে কোনোদিন আসগুজাই মানুষের মতো মানুষের রক্ত গায়ে মেখে আনন্দে গান করবে না। তাকে আমি শেখাব ভালোবাসতে—মানুষকে ভালোবাসতে। শেখাব সাহসে বুক ফুলিয়ে খুনির মুখোমুখি দাঁড়াতে। তাকে মরতে শেখাব বীরের মতো। অন্যায়ের কাছে হারতে শেখাব না। তুমি জেনে রাখো স্তান, এই নিষ্ঠুর হত্যাকারী রাজার বিরুদ্ধে এইভাবে আমি নেব প্রতিশোধ। আমি হাজার হাজার মানুষকে বলে বেড়াব, রাজা হত্যাকারী। যে হত্যা করে সে মানুষ নয়, পশু। স্তান, তোমার এই মৃতদেহের ওপর আমার চোখের জল ছড়িয়ে রইল। এর বেশি আর কিছু নেই আমার। কিন্তু তুমি দিয়ে গেলে তোমার ছেলেকে। এর জন্যেই আমায় বেঁচে থাকতে হবে। বেঁচে থাকব তোমার আশীর্বাদ নিয়ে।‌

টগবগ, টগবগ ঘোড়া ছুটে আসছে।

বুঝতে পেরেছে আনাতুরি। রাজার সেনারা আসছে এদিকেই। এবার তার বিপদ। রাজা মরেনি। সে জ্ঞান হারিয়েছে, আহত! রাজাকে আহত দেখলে, রাজার সেনার হাতে নিস্তর নেই আনাতুরির। সেও মরবে, তার ছেলেটাও মরবে। তাকে এখনই পালাতে হবে, আর সময় নষ্ট করার সময় নেই। ছেলেকে বুকে নিয়ে সে ঘোড়ার পিঠেই চড়ে বসল। এ ঘোড়া স্তানের। দাড়িয়েছিল এতক্ষণ এখানেই। আশ্চর্য, সে তো এর আগে আর কোনোদিন ঘোড়ায় চড়েনি! ঘোড়া ছোটায়নি! আজ সে ঘোড়া ছোটাল কেমন করে!

না, আনাতুরি ঘোড়া ছোটাল না। স্তানের ঘোড়া নিজেই ছুটল। ছুটল তিরবেগে বনের গভীরে। লুকিয়ে পড়ল। এখানে কে তাদের খুঁজে পাবে। তাই রাজা বুমবুজাংয়ের সেনারা জানতে পারল না আনাতুরির কথা। জানতে পারল না, আনাতুরির আঘাতেই রাজা ধরাশায়ী।

কিন্তু এখন আনাতুরি কী করবে! এই বনে সে কতক্ষণ লুকিয়ে থাকবে। ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়েছে কাঁদতে কাঁদতে। গাড়ি-ঘরে তার সর্বস্ব পড়ে আছে। আনাতুরি কেমন করে যাবে আবার ঘরে! স্তানের জন্য মনটা বার বার কেঁদে উঠছে। তবু চোখের জল তার চোখেই শুকিয়ে যাচ্ছে। বারে বারেই সে তার ছেলের মুখখানি দেখছে। যতবার দেখছে, ততবারই কেমন যেন একটা দুরন্ত সাহসে সে কাঁদতে ভুলে যাচ্ছে।

না, আনাতুরি আর কাঁদল না।

কিন্তু হঠাৎ ছেলেটা কেঁদে উঠল। তার ঘুম ভেঙে গেছে। সেই নিশ্চুপ বনে ছেলেটার গলার স্বর ককিয়ে উঠছে। হারিয়ে যাচ্ছে। আনাতুরি ব্যস্ত হয়ে এদিক ওদিক চেয়ে দেখছে আর ভাবছে, কেউ যদি শুনতে পায় এ কান্না। তাই সে আদরে জড়িয়ে ধরে ছেলেকে ভোলাচ্ছে।

এদেশে বোধ হয় এই প্রথম একজন মা হত্যার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল। বোধ হয় প্রথম চোখের জল ফেলল। বোধ হয় প্রথম বলল, সে তার ছেলেকে খুনি হতে দেবে না। সে ছেলেকে ভালোবাসতে শেখাবে। প্রায় চার হাজার বছর আগে মানুষকে মেরেই আনন্দ করেছে স্তেপের এই আদিম মানুষগুলো। তারা বোধ হয় ভালোবাসেনি কাউকে কোনোদিন। হয়তো-বা জানেও না ভালোবাসা কাকে বলে। এ শব্দ এই স্তেপে আনাতুরিই একা জানত বুঝি। আর কাউকে সে কোনোদিন বলেনি। আজই বলল। বাতাসে এই শব্দটি আজই প্রথম ভেসে গেল। কিন্তু স্তনের মৃতদেহ ছাড়া এ শব্দ আর কারও কানে পৌঁছে দিতে পারল না আনাতুরি। বলতে পারল না, আমরা পশু নই, আমরা মানুষ। মানুষের রক্তপান করে নয়, মানুষকে ভালোবেসে আমরা জীবন সুন্দর করতে পারি। কিন্তু কে শুনবে তার কথা।

কেউ শুনবে না। কিন্তু এটাই সত্যি। ছেলেটাকে বুকে নিয়ে এই সত্যিটাই বার বার তার মনে সাহস জোগাচ্ছে। তাই লুকিয়ে থাকতে মন আর সায় দিচ্ছে না তার। না সে আর লুকিয়ে থাকবে না। যারা লুকিয়ে থাকে তারা ভীতু, কাপুরুষ। সে ঘোড়ার মুখ ফেরাল। সে বন থেকে বেরিয়ে আসবে। স্তানের ঘোড়া ছুটল আনাতুরির গাড়ি-ঘরের দিকে।

কিন্তু পারল না আনাতুরি, পারল না তার ঘরে ফিরতে। বনের অন্ধকার থেকে ফিরে এল সে আলোয়, আগুনের আলোয়। যে-আলো ঝলসে উঠছে দাউদাউ করে। পুড়ে যাচ্ছে মানুষ। পুড়ে যাচ্ছে শিবির। জ্বলে উঠছে চারদিক। এধার-ওধার ঘোড়া ছুটছে দুড়দাড়িয়ে—ভয়ে। ঘোড়ার পিঠে রাজার সেনারা চিৎকার করছে আকাশ কাঁপিয়ে। তির উড়ে যায় এলোপাথাড়ি। ধোঁয়া উড়ছে, কালো অন্ধকার ধোঁয়া। সেই ধোঁয়ার অন্ধকার থেকে মানুষের আর্তনাদ ভেসে আসছে। যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে—ছত্রাখান।

বেশিক্ষণ সময় লাগল না আনাতুরির। সে বুঝতে পারল সৌরামাতির সেনারা রাজা বুমবুজাংয়ের সৈন্যদের আত্রব্জমণ করেছে। যুদ্ধ লেগে গেছে আসগুজাইদের সঙ্গে সৌরামাতির। সৌরামাতি প্রতিশোধ নেবে এবার। আসগুজাই রাজার ছেলে তিত্তাচিনি তাদের আঘাত করে পালিয়ে এসেছে। এবার সৌরামাতির সেনারাই ঢুকে পড়েছে আসগুজাইয়ের আস্তনায়। মারো! মারো! যাকে সামনে পাও তাকেই মারো। রক্ত-বন্যায় ভেসে গেল চারদিক। বুমবুজাং-এর সেনারা মরছে শয়ে শয়ে। এখন কে তাদের হাল ধরবে! রাজাও নেই, রাজার ছেলেও নেই। ছেলে তো মরেই গেছে। রাজা আহত হয়ে পড়ে আছে বনে। এখন কে আটকাবে সৌরামাতির এই আত্রব্জমণ। দুরন্ত গতিতে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আগুন লাগাচ্ছে। লুটে নিচ্ছে সোনাদানা, ঘোড়া-গোরু যা পাচ্ছে।

কিন্তু এখন আনাতুরি কী করবে? তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই। কোলে ছেলেটা। সৌরামাতির দুর্ধর্ষ সেনার হাত থেকে সে ছেলেটাকে কেমন করে বাঁচাবে! বিপদের যেন শেষ নেই। স্তান শেষ হয়ে গেছে। এখন ছেলেটাও তো শেষ হয়ে যাবে! ভাবতে ভাবতে শিউরে ওঠে আনাতুরি। না, ছেলেটাকে সে মরতে দেবে না। সে নিজেও মরতে চায় না। তাকে বেঁচে থাকতেই হবে। বেঁচে থাকতে হবে তার ছেলের জন্যে।

এখানে আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না এমন করে বিপদের মুখোমুখি। মনে সাহস আনল আনাতুরি ঘোড়া ফেরাল। ঘোড়া আবার ছুটল বনের ভেতরে। লুকিয়ে পড়ল ঘোড়া। লুকিয়ে পড়ল আনাতুরি ছেলেকে নিয়ে ঘোড়ার সঙ্গে।

হয়তো অনেকক্ষণ তাদের থাকতে হয়েছিল এইভাবে লুকিয়ে। বোঝা যাচ্ছিল রাত নামছে। কেননা, স্তেপের বাতাসে এখন হিমানীর ছোঁয়া ভেসে আসছে। একটা ভয়-জাগানো নির্জনতা ছেয়ে ফেলছে বনের চারদিক। অন্ধকার হয়ে উঠছে আরও ভয়ংকর। আনাতুরির মনটাও যেন ছমছম করছে। একটা অজানা অস্বস্তিতে সে ছটফট করছে। আর থাকতে ইচ্ছে করছে না তার এই বনে, এই অন্ধকারে। সে আবার ঘোড়ার লাগাম ধরে টান দিল। এবার ধীরে হাঁটল ঘোড়া—দুলকি চালে। আনাতুরি ছেলেকে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে দুলছে আর ভাবছে। ভাবছে এতক্ষণে হয়তো যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।

আচমকা থমকে দাঁড়াল কেন আনাতুরি! বুকটা তার কেঁপে উঠল কেন?

একটা শব্দ। খুবই অস্পষ্ট। আনাতুরির দৃষ্টি সতর্ক, এদিক-ওদিক তাকায়—অন্ধকার। কোথা থেকে আসছে এ শব্দ! কেউ যেন এদিকেই আসছে। তার পা পড়ছে, শব্দ স্পষ্ট হচ্ছে!

ঘোড়াকে দাঁড় করাল আনাতুরি। সন্ধানী চোখ তার একজন পাকা সৈনিকের মতো। নিজেও সাবধানি উড়ন্ত ইগলের মতো। বেশিক্ষণ নয়, মাত্র কয়েক মুহূর্ত। হঠাৎ যেন চোখ তার ধাঁধিয়ে গেল! এ যে রাজা বুমবুজাং! তাকে তো দেখার কথা নয় আনাতুরির। তার তো অনেক আগেই মরে যাওয়ার কথা। সে যে হাঁটতে হাঁটতে এদিকেই আসছে। শয়তানটা আবার উঠে দাঁড়িয়েছে! পাথরের আঘাতে সে মরেনি! তবে কি আনাতুরি আর একটা পাথর দিয়ে ওর মাথাটা খানখান করে দেবে!

মনে হয় তার আর দরকার নেই। কেননা, রাজা যতই হাঁটছে ততই টাল খাচ্ছে। বোধ হয় সময় তার ঘনিয়ে এসেছে। হয়তো বনের অন্ধকারে ঘুরপাক খেতে খেতেই সে মরবে।

সে মরবে কি না সে পরের কথা। কিন্তু আনাতুরি কী করবে! সামনে দুশমন, কোলে তার ছেলে। দুশমনের হাত থেকে ছেলেকে রক্ষা করাই এখন তার একমাত্র ভাবনা। বুমবুজাং যদি দেখতে পায়! যদি সে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে! না, আনাতুরি ভীরুর মতো লুকিয়ে থাকবে না আর। সে ঘোড়া ছোটাল। অন্ধকারে বনের ভেতরে।

থতোমতো খেয়ে গেছে রাজা বুমবুজাং। সে কিছুই দেখতে পেল না।

কিছুই বুঝতে পারল না। শুধু কানে এল তার ঘোড়ার টগবগানি আর শুকনো পাতার খড়মড়ানি। রাজা বুমবুজাং কিছু ভেবে ওঠার আগেই আনাতুরি পগারপার। আর ঠিক তখনই রাজা আর্তনাদ করে উঠল, ‌আমাকে বাঁচাও। আমি রাজা বুমবুজাং!‌

এখন এখানে আর কেউ নেই। কেউ তাকে বাঁচাবে না। তার আর্তনাদ অন্ধকার বনে প্রতিধবনি তুলল, মিলিয়ে গেল। কেউ সাড়া দিল না।

সাড়া দিল আনাতুরির ঘোড়া। অনেকখানি বন ডিঙিয়ে খোলা আকাশের দেখা পেয়েই ঘোড়া চেঁচিয়ে উঠল, চিঁ-হিঁ-হিঁ!

এখন বনের বাইরে এসেছে আনাতুরি। এখন সে স্থপষ্ট দেখতে পাচ্ছে চারদিক। কেমন যেন নিজঝুম সব। শুধু আগুন জ্বলছে যুদ্ধের—ধিকিধিকি। এখানে-ওখানে মৃত মানুষের দেহ, মুণ্ডু নেই। যুদ্ধ জয় করে যে-সৈনিক শত্রুর যত বেশি মুণ্ডু রাজাকে উপহার দেবে সে-ই তত বড়ো বীর। এধারে-ওধারে রক্ত ছড়িয়ে আছে— মানুষের মুণ্ডুহীন দেহের রক্ত।

আনাতুরি সেখানে আর দাঁড়াল না। আনাতুরি ঘোড়া ছোটাল নিজের গাড়ি-ঘরের দিকে। কে জানে তার ঘরেও আগুন লেগেছে কি না!

কিন্তু তাকে ঘর অবধি যেতে হল না। সে জানতে পারেনি সৌরামাতির সেনারা ওত পেতে বসে আছে কাছেপিঠে। আনাতুরির ঘোড়া দেখেই তারা তেড়ে এল, চিৎকার করে উঠল। আনাতুরি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। তার বুকটা ধক করে চমকে উঠেছে। এবার সে ধরা পড়ে গেছে। আর বুঝি সে পারল না। পারল না ছেলেটাকে বাঁচাতে! নিজে মরবে, মরবে ছেলেটাও। সুতরাং আর চেষ্টা করে লাভ নেই।

আশ্চর্য, আনাতুরিকে কিছুই করতে হল না! করল তার ঘোড়া। শত্রুকে তেড়ে আসতে দেখে ঘোড়া নিজেই ছুট মারল। আর ঠিক তখনই আনাতুরির ছেলেটাও কেঁদে উঠল। বিপদে পড়ে গেল আনাতুরি। ঘোড়া যেখানে ছোটে, কান্নাও সেদিকে যায়! শত্রুর ঘোড়াও সেইদিকে ধাওয়া করে।

আর মিথ্যে বাঁচার চেষ্টা। এমন করে কতক্ষণই-বা বাঁচা যায়! পারল না আনাতুরি। সে বুঝতে পারল শত্রু তাদের ঘিরে ফেলেছে। যেদিকে চায় সে, সেইদিকেই শত্রুসৈন্য সৌরামাতির। ঘোড়ার পিঠে। তাদের হাতে তির-ধনুক। লক্ষ্য আনাতুরি অথবা তার ছেলেটা। তাকে দেখে চিৎকার করে হেসে উঠল সৌরামাতির সেনারা, হা-হা-হা! আর কিছু করার নেই। যেকোনো মুহূর্তে তির ছুটে আসবে। এক মৃত্যুর হাত থেকে সে নিষ্কৃতি পেয়েছে। এবার আর এক মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে আনাতুরি।

এগিয়ে আসছে সৌরামাতির সেনা। ঘোড়ার পিঠে।

ছেলেটা কাঁদছে আনাতুরির কোলে।

সৌরামাতির সেনারা হাসছে বিকট স্বরে।

আনাতুরির ঘোড়া ভেতরেভেতরে ফুঁসছে।

আরও এগিয়ে এল শত্রুরা।

আনাতুরি ছেলেকে আড়াল করছে।

শত্রু লাফ দিল।

আনাতুরির ঘোড়া তার আগেই শত্রুর মাথা টপকে মারল ছুট। শত্রু হকচকিয়ে গেছে। নিজেদের হাতের তির হাতেই রয়ে গেল, ছোড়া হল না।

আবার শুরু ছোটাছুটি।

আবার শুরু চেঁচামেচি।

আবার শুরু ঘোড়ার খুরের টগবগানি।

একটা ঘোড়া একা। এক-শোটা ঘোড়া তাকে তাক করেছে। এক-শোটা ঘোড়ার পিঠে এক-শো জন সেনা। এক-শো জন সেনার হাতে এক-শোটা তির-ধনুক। পারবে কেন! আনাতুরির ঘোড়া ছুটতে ছুটতে দম খোয়াল। সে হোঁচট খেল। ধুঁকতে ধুঁকতে হুমড়ি খেয়ে ছিটকে পড়ল। ছিটকে পড়ল আনাতুরিও ছেলেটাকে কোলে নিয়ে। ছেলেটাকে সে রক্ষা করল। কিন্তু আঘাত পেল নিজে প্রচন্ড। অন্য কেউ হলে হয়তো যন্ত্রণায় বেহুঁশ হয়ে লুটিয়ে পড়ত। কিন্তু না, আনাতুরি যন্ত্রণায় জ্ঞান হারাল না। সে তার ছেলেকে বুকের আড়ালে আগলে নিয়ে উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগল। তার আর পালাবার পথ নেই।

সৌরামাতির ঘোড়সওয়ার সেনার হাতে ধরা পড়ল আনাতুরি। তার সঙ্গে তার কোলের ছেলেটাও। শুরু হয়ে গেল হম্বিতম্বি, আনাতুরির ওপর। ভয় দেখানো হল—এখনই তার গলা কেটে ফেলা হবে, তার ছেলেটাকে আকাশে ছুড়ে লোফালুফি খেলা হবে, তারপর মেরে ফেলা হবে।

রুখে দাঁড়াল আনাতুরি তার ছেলেকে বুকে নিয়ে, একটা হিংস্র সিংহীর মতো। চোখ তার রক্তরাঙা।

কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। তার এই দুঃসাহস তছনছ করে দিল সৌরামাতির সেনারা। মুহূর্তের মধ্যে। তারা ছেলেটাকে কেড়ে নিল আনাতুরির বুকের আড়াল থেকে। তারপর আনাতুরির চুলের মুঠি ধরে ঘোড়া ছোটাল। ঘোড়া ছোটে। চুলে টান মেরে চিৎকার করে সৌরামাতির সেনারা। আনাতুরি হুমড়ি খেতে খেতে ঘষটে যায়। হোঁচট খায়। পা কাটে। রক্ত ছোটে।

‌থামো!‌ হঠাৎ কোউ ক্ষিপ্ত স্বরে চিৎকার করে উঠল।

ঘোড়সওয়ার সৌরামাতির সেনারা থামল। আনাতুরির চুলের মুঠি ছেড়ে দিল। আনাতুরি লুটিয়ে পড়ল মাটির ওপর। জ্ঞান হারাল। আর বোধ হয় তাকে কেটে ফেলার দরকার হবে না। একটু পরেই হয়তো আনাতুরির দম ফুরিয়ে যাবে। মরবে তার ছেলেটাও।

‌কেন তোমরা এই মেয়েটাকে এমন করে মারছ?‌ সে আবার ধমক দিল।

একজন সেনা নীচুস্বরে উত্তর দিল, ‌মহারাজ, মেয়েটা শত্রুপক্ষের লোক।‌

—‌কী করেছে মেয়েটা?‌

—‌মহারাজ, মেয়েটা তার ছেলেটাকে নিয়ে পালাচ্ছিল।‌

‌—কই ছেলে?‌

—‌আজ্ঞে, এই যে। ঘুমিয়ে পড়েছে।‌

‌দু-জনকেই শিবিরে নিয়ে চলো।‌ বলতে বলতে মহারাজ ঘোড়া ছোটাল। হয়তো শিবিরের দিকেই ঘোড়া ছুটল।

আনাতুরি কিছুই জানতে পারল না। কেননা, তখনও তার জ্ঞান ফেরেনি।

জ্ঞান ফিরেছিল আনাতুরির অনেকক্ষণ পর। অনেকক্ষণ পর সে বুঝতে পেরেছিল এখনও সে বেঁচে আছে। কিন্তু তার ছেলেটা! ছেলের কথা মনে পড়তেই আঁতকে ওঠে আনাতুরি। সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসার চেষ্টা করে। পারে না। অনেকগুলো অচেনা মানুষের মুখ। তার দিকে চেয়ে আছে ড্যাবড্যাব করে। আনাতুরি ভয় পায়। ঘোর অন্ধকার আবার যেন নেমে আসে তার চোখের পাতায়। সে চিৎকার করে ওঠে ভয়ে। কেঁদে ফেলে। আর ঠিক তখনই কেঁদে ওঠে আনাতুরির ছেলে কোহেন—ককিয়ে ককিয়ে।

থমকে থামে আনাতুরির কান্না। সে ছেলের কান্না শুনে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। তবে কি তার ছেলেটা এখনও বেঁচে আছে! তবে কি তার চোখের সামনেই কোহেনকে হত্যা করা হবে!

আনাতুরি আর পারল না শুয়ে থাকতে। তার মনে হল এবার সে উঠতে পারবে, উঠে বসতে পারবে। হ্যাঁ সে উঠে বসল। কষ্ট হল। পা দুটো তার ছিঁড়ে ছড়ে গেছে—ব্যথা, যন্ত্রণা। ছেলের কান্না শুনে যন্ত্রণা সে ভুলে গেল। কই তার ছেলে? আঁতিপাঁতি করে তার চোখ খুঁজতে লাগল তার ছেলেকে।

হঠাৎ স্থির হয়ে গেল তার চোখ। সে দেখতে পেয়েছে। এই তো তার ছেলে। কিন্তু ও কে! কার কোলে তার ছেলে শুয়ে আছে! কাঁদছে! ওই তো সৌরামাতির রাজা।

জানে না আনাতুরি চেনে না তাকে। অবাক চোখে দেখছে শুধু। সৌরামাতির রাজা হাসল আনাতুরিকে দেখে। তারপর বলল, ‌আমি তোমাকে এখানে নিয়ে এসেছি। আমি সৌরামাতির রাজা।‌

শিউরে উঠল আনাতুরি। ডুকরে উঠল, ‌আমার ছেলেকে মেরো না! ওকে ফিরিয়ে দাও আমার কাছে!‌

আশ্চর্য, রাজার চোখ তো প্রতিহিংসায় ঝলসে উঠল না! রাজা তো জল্লাদের মতো হেসে উঠল না! বরং ধীরপায়ে এগিয়ে এল রাজা আনাতুরির কাছে ছেলেকে নিয়ে। আনাতুরির কোলে তুলে দিল রাজা তার ছেলেকে। রাজার চোখের পলক পড়ে না। সে দেখছে মা আর ছেলেকে অবাক হয়ে।

আনাতুরি বিশ্বাস করতে পারে না। সে ভাবে তার ছেলেকে হয়তো এখনই হত্যা করা হবে, তাই দয়া করেছে রাজা। দয়া করে তাকে দেখতে দিয়েছে। এ বুঝি ছেলেকে তার শেষ দেখা। আনাতুরি ছেলের মুখের দিকে তাকাল, তারপর হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। কেঁদে উঠল ছেলেকে বুকে চেপে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে আবার বলল, ‌মেরো না রাজা। আমার ছেলেকে দয়া করো! আমায় দয়া করো!‌

এবার রাজা হাসল। হো-হো করে হাসল। হাসতে হাসতে বলল, ‌শত্রুকে আমরা বাঁচতে দিই না।‌

আনাতুরি কাঁদতে কাঁদতেই বলে উঠল, ‌আমার ছেলে দুধের শিশু। শত্রু কাকে বলে ও জানে না রাজা। ওকে বাঁচতে দাও! আমি ওকে কারও শত্রু হতে দেব না। আমার ছেলে হবে সকলের বন্ধু—তোমাদেরও।‌

রাজা উত্তর দিল, ‌তুমি নিজেই তো আমাদের শত্রু। শত্রুকে আমরা ধরে আনি তার রক্ত দেখার জন্যে। শত্রুকে যে বাঁচতে দেয় তার মতো আহাম্মক আর কে আছে! কে-না জানে, শত্রুকে বাঁচতে দেওয়া মানে নিজেরই বিপদ ডেকে আনা!‌

সৌরামাতি রাজার কথা শুনতে শুনতে আনাতুরির চোখের জল যেন শুকিয়ে গেল। তার মুখখানা যেন নিমেষে ঝলসে উঠল রাগের আগুনে। কঠিন হল তার গলার স্বর। নির্ভয়ে সে বলল, ‌তবে শোনো সৌরামাতিরাজ, আমার এই ছেলের বাবার নাম স্তান। স্তান ছিল রাজা বুমবুজাংয়ের বিশ্বাসী সহচর। বুমবুজাংয়ের ছেলে তিত্তাচিনি তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রাণ দিল, কিন্তু দোষ হল আমার এই দুধের ছেলেটার। রাজা বুমবুজাং অপবাদ দিল আমার ছেলে জন্মেছে বলেই তার ছেলে মরেছে। আমার ছেলে অলক্ষুণে! রাজা, তুমি এক বার ভালো করে চেয়ে দ্যাখো তো আমার ছেলেটার দিকে! বলো তুমি, কোথায় দেখতে পাচ্ছ অলক্ষণ? তুমি দ্যাখো, আরও ভালো করে দ্যাখো! বলো তুমি, আমার ছেলে কি সুন্দর নয়? বলো বলো? আমার এই সুন্দর ছেলেকেই রাজা হত্যা করতে চেয়েছিল। স্তান বাধা দিল। রাজা বুমবুজাং স্তানকে মেরে ফেলল। তারপর আমার এই ছেলের গায়ে যখন হাত তুলল, আমি রাজাকে পাথর ছুড়ে আঘাত করলুম। আমি ছেলেকে বাঁচালুম। ভাবলুম আমার পাথরের আঘাতে রাজা বুঝি মরেই গেছে। না সে মরেনি। আমি দেখেছি সে বনের অন্ধকারেই বাঁচার জন্য আর্তনাদ করে বেড়াচ্ছে। এতদিন আমি বুমবুজাংকে আমার রাজা বলে মান্য করে এসেছি কিন্তু আর নয়। সে ঘাতক। এখন আমার রাজা তুমি। আমার কেউ নেই। আমার এই ছেলেটিকে তুমি যদি মেরে ফ্যালো, আমার যে কিছুই থাকবে না। রাজা, আমাকে তুমি আশ্রয় দাও। তোমার আশ্রয়ে ছেলেটাকে নিয়ে আমায় বাঁচতে দাও! রাজা, মনে করো আমি তোমার মেয়ে বিশ্বাসী মেয়ে। আমি কারও ক্ষতি করব না কোনোদিন। আমি শুধু ঘাতকের হাত থেকে ছেলেটাকে বাঁচাব। তাকে ভালোবাসতে শেখাব আমি। সে ভালোবাসবে তোমাকে। তোমার দেশকে। দেশের মানুষকে।‌

সৌরামাতির রাজা নির্বাক হয়ে শুনল আনাতুরির প্রতিটি কথা। শুনতে শুনতে এক বারও সে উত্তেজিত হল না। এক বারও সে রাগে চিৎকার করে উঠল না। গম্ভীর হয়ে গেল সে। তারপর গম্ভীর স্বরেই রাজা কথা বলল। বলল, ‌আমি কখনো শত্রুপক্ষের কোনো লোককে আশ্রয় দিই না। শত্রু ধরা পড়লে তার মৃত্যু ছাড়া আর অন্য কোনো শাস্তি আমাদের জানা নেই। যুদ্ধ-দেবতার উদ্দেশ্যে শত্রুর রক্ত উৎসর্গ করাই আমাদের ধর্ম। কিন্তু তোমার কথা শুনে তোমাকে আমার শত্রু ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। আমার কাছে কেউ কোনোদিন এমন করে আশ্রয় চায়নি। কেউ কোনোদিন আমার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়নি। কেউ বলেনি এমন করে ভালোবাসার কথা। তোমার কথা আমি বিশ্বাস করছি, তাই আমি ঠিক করেছি তোমার প্রাণ আমি নেব না। আমার মেয়ের মতোই তুমি বেঁচে থাকবে। বেঁচে থাকবে তোমার ছেলেও। কিন্তু কোনোদিন যদি ঘুণাক্ষরে জানতে পারি, তুমি যা বলেছ সব মিথ্যে, যদি বুঝতে পারি তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ, তবে জেনো সেইদিনই তোমার শেষ দিন। শেষ দিন তোমার ছেলেরও।‌

সৌরামাতি রাজার কথা শুনে উছলে উঠল আনাতুরি খুশিতে। রাজার পায়ের কাছে মাথা নোয়াল। আবেগে সে আর চোখের জল সামলাতে পারল না। কান্নাভেজা গলায় বলল, ‌হে রাজা, তুমি মহৎ। তুমি দয়াবান। আমি যতদিন বাঁচব, তোমার এই দয়ার কথা আমি কোনোদিন ভুলব না। আমার ছেলেকেও আমি তোমার মতো দয়াবান করে তুলব। ভালোবাসতে শেখাব।‌

সৌরামাতির রাজা কথা বলল না, হাসল। তারপর আনাতুরি আর তার ছেলের জন্যে একটি ছ-চাকার গাড়ি-ঘরের ব্যবস্থা করে দিল সেইদিনই। সেইদিন থেকেই গাড়ি-ঘরের চাকা ঘুরতে শুরু করল। সেই গাড়ি-ঘরে এখন একা থাকে আনাতুরি ছেলেকে নিয়ে। একাই ছেলেকে আদর করে। যেদিন এখান থেকে পাড়ি দেয় রাজা আর তার প্রজারা আর এক জায়গায়, ঘোড়া ছোটে, সেদিন আনাতুরির গাড়িও ছোটে তাদের পিছু পিছু। এখন আর স্তান নেই। এখন আর স্তান ছুটতে ছুটতে ঘোড়া থামায় না। আনাতুরির গাড়ির কাছে দাঁড়ায় না। আনাতুরির কাছে একটু জলও চায় না কৎান্ত স্তান। এখন থামে রাজা। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, ‌ও মেয়ে, ছেলে কী করছে?‌

ছেলে কখনও ঘুমোয়, কখনো কাঁদে, কখনো হাসে। কখনো মায়ের কোলে বসে হাত বাড়ায় ওই অসংখ্য ঘোড়ার দিকে। কখনো আঁকপাঁকিয়ে লাফ দেয় মায়ের কোল থেকে ওই ঘোড়ার দিকে।

মা ছেলেকে আদরে জড়িয়ে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বলে, ‌ছেলের সাহস দ্যাখো! এখনই ঘোড়ায় চড়ার জন্য ছটফটানি! দেরি আছে, আগে বড়ো হ‌ তারপর।‌ বলতে বলতে ছেলের চিবুক ছুঁয়ে ধরে। ছেলে হেসে ওঠে।

ছেলে বড়ো হচ্ছে ধীরে ধীরে। এখন সে হাঁটতে পারে গাড়ির সঙ্গে। এখন সে ছুটতে পারে ঘোড়ার পিছু একটু একটু।

আরও বড়ো হচ্ছে ছেলে।

এখন সে চিনতে পারে। চিনতে পারে, ঘোড়ার পিঠে এই যে মাথাগুলো ঝুলছে, ওগুলো মানুষের খুলি। আর ওই যে সেনারা মাথার খুলিতে চুমুক দিয়ে যা খাচ্ছে, তা মানুষের রক্ত।

মা সাবধান হচ্ছে, মা ছেলেকে খুন করতে দেবে না—ভালোবাসতে শেখাবে। তাই খুনের কথা যখনই ওঠে কোথাও, মা ছেলেকে সরিয়ে নেয়। ভুলিয়ে-ভালিয়ে গল্প বলে। গল্প বলে: এক যে আছে আকাশকন্যা। তার নাম জ্যোছনা। সে আলো ছড়িয়ে দেয় আকাশে। আকাশ থেকে এই স্তেপের ঘাসের ওপর, নদীর ওপর পাহাড়ে তুষারের ওপর। এইটাই তো পৃথিবী। পৃথিবীকে সুন্দর করে সে আলো ছড়িয়ে দেয়। এই সুন্দর পৃথিবীতে কত গাছ, কত পাখি, কত ঝরনা। কত গান, কত কলতান, কত ভালোবাসা।

—‌মা।‌ আচমকা ছেলে ডাকল গল্প শুনতে শুনতে।

গল্প বলতে বলতে থমকে থামে আনাতুরি ছেলের ডাক শুনে।

ছেলে বলে, ‌আমার একটা তির-ধনুক চাই।‌

আঁতকে ওঠে আনাতুরি। ভাবে ছেলে কি তবে গল্প শুনছে না! জ্যোছনার গল্প! মা ব্যল্ডস্থ গলায় জিজ্ঞেস করে, ‌তির-ধনুক কী করবি?‌

ছেলে উত্তর দিল, ‌পাখি মারব।‌

মায়ের বুক দুরুদুরু করে ওঠে। ছেলেকে কোলে টানে। বলে, ‌পাখি মারতে নেই।‌

—‌কেন মারতে নেই! সবাই তো মারে। আগে পাখি মেরে টিপ শিখতে হয়।‌

মা উদবেগে অস্থির হয়। জিজ্ঞেস করে, ‌কে বলল তোকে?‌

ছেলে বলল, ‌একথা আর কে-না জানে!‌

মা তাড়াতাড়ি আবার গল্প শুরু করল। যেখানে থমকে গেছল জ্যোছনার গল্প, সেখান থেকে। সে-গল্পে পাখি মারার কথা নেই। আছে আকাশের আলোর গান।

ছেলে কিন্তু শোনে না—আনমনা। ভাবে অন্য কথা। ভাবতে ভাবতে বলে, ‌আমি এখন শুধু পাখি মারব। তারপর আমি হরিণ মারব। তারপর আরও বড়ো হলে, আমাদের শত্রুকে মেরে রক্ত নিয়ে খেলা করব।‌

‌—না-আ-আ-আ।‌ মা চিৎকার করে ধমক দেয়।

—‌হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা-অ্যা।‌ ছেলে ঠিক তত জোরেই উত্তর দেয়।

মায়ের চোখ ছলছলিয়ে ওঠে। সঙ্গেসঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে ছেলেকে আদর করে। একটা ভয়ংকর আতঙ্ক তার গলায়। বলে, ‌তুই ছাড়া আমার আর কেউ নেই।‌

ছেলে চমকে চায় মায়ের মুখের দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, ‌কেন নেই?‌

মা বলে, ‌সেকথা তোর শোনার মতো নয়। সময় হয়নি এখনও।‌

‌কেন হয়নি?‌ ছেলে জিজ্ঞেস করে।

‌তুই এখন ছোটো, তোর এখন খেলার সময়।‌ মা উত্তর দেয়।

ছেলে জানতে চায়, —‌আমি কতদিন ছোটো থাকব?‌

‌—যতদিন-না ঘোড়া চড়তে শিখছিস।‌

‌আমি এখনই ঘোড়ায় চড়তে পারি।‌ উত্তর দিল ছেলে।

মা আবার থমকে গেল। আবার তীক্ষ্ণ চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকাল। তারপর একটা ভীষণ ভয়জড়ানো স্বরে জিজেস করল, ‌তুই ঘোড়ায় চড়েছিস?‌

—‌হ্যাঁ।‌

—‌কার ঘোড়া?‌

—‌রাজার।‌

হঠাৎই যেন অন্ধকার নামল আনাতুরির চোখের তারায়। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। সে বুঝি পড়ে যায়! না, সামলে গেল। ছেলে কিছু বোঝার আগেই জানতে চাইল, ‌কবে চড়েছিস?‌

‌—ক-দিন আগে।‌

‌—কখন?‌

‌—তখন দুপুর। তুমি ঘুমোচ্ছিলে।‌ আমাদের এই গাড়ি-ঘরের পাশ দিয়ে রাজা যাচ্ছিল।‌

—‌তুই কোথা ছিলি?‌

‌—আমি বলদের পিঠে বসে খেলা করছিলুম। রাজা আমাকে দেখল। দাঁড়াল। হেসে বলল, এই তো কোহেন বলদের পিঠে বসতে শিখে গেছে।‌

—‌তুই কী উত্তর দিলি?‌

—‌আমি বললুম, আমি তোমার মতো ঘোড়াও ছোটাতে পারি।‌

‌রাজা বলল, ‌তুই ছোটো। পড়ে যাবি।‌ বলতে বলতে হাসল।

আমি বললুম, ‌এক-বার দিয়েই দ্যাখো না।‌ সঙ্গেসঙ্গে রাজা ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল। আমাকে বসিয়ে দিল ঘোড়ার পিঠে। অমনই আমি ঘোড়া ছোটালুম। সত্যি বলতে কী, প্রথমটা আমি একটু ঘাবড়ে গেছলুম। এমনকী আমার ঘোড়ার ছুট দেখে রাজাও ভড়কে গেছল। ভয়ে চিৎকার করে উঠেছিল রাজাও। কিন্তু তারপর আমার আর একটুও ভয় করেনি। আমার ঘোড়া ছুটল কদম পায়ে। আমি আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলুম। ওঃ সে কী মজা! মনে মনে ভাবলুম এখন আমি নিজেই রাজা।‌ বলতে বলতে আনাতুরির ছেলে হেসে উঠল।

হতবাক হয়ে গেল আনাতুরি।

আনাতুরির ছেলে কোহেনও মায়ের মুখে আর কোনো কথা না-শুনে অবাক চোখে তাকাল। মাকে দেখে বলল, তুমি বুঝি ভাবছ আমি মিথ্যে বলছি?‌

আনাতুরি তবুও নিশ্চুপ।

ছেলে বলল, ‌আমাকে বিশ্বাস যদি না-হয়, তুমি রাজাকে জিজ্ঞেস করে দ্যাখো।‌

এবার আনাতুরি কথা বলল। ভারি বিমর্ষ তার গলার স্বর। ছেলের কথার কোনো উত্তর না-দিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌কোহেন, তোর জ্যোছনার গল্প শুনতে ভালো লাগে না?‌

ছেলে তার ঠোঁট উলটিয়ে উত্তর দিল, ‌জ্যোছনার গল্প বিচ্ছিরি। তার চেয়ে যুদ্ধের গল্প অনেক ভালো।‌

আনাতুরি ভয়ে কুঁকড়ে যায়। মনে মনে ভাবে, তার ছেলেও কি তবে মানুষের রক্ত নিয়েই খেলা করবে! মানুষকে ভালোবাসবে না! বুঝি তার স্বপ্ন মিথ্যে হয়ে যায়। হায় রে, ছেলেটা তার কেন বড়ো হল! কেন থাকল না ছোট্টটি! যেমন ছিল সে এই ক-দিন আগেও!

কিন্তু দিন তো আর দাঁড়িয়ে থাকে না। সময় বয়ে যায়। কোহেনও বড়ো হয়। আরও বড়ো। আর গাড়ি-ঘরের আড়ালে বসে থাকতে ভালো লাগে না তার মায়ের সঙ্গে। এখন তার আরও পাঁচজনের মতো খেলা করতে ইচ্ছে করে খোলা আকাশে ঘোড়া ছুটিয়ে। আর, নয়তো কোনো বিদেশি মানুষের সর্বস্ব লুঠ করে আনন্দ করতে ইচ্ছে করে কিন্তু কিছুই পারে না সে। কেমন করে পারবে! তার তো ঘোড়া নেই। লুঠ করে পালাবে কেমন করে!

‌—মা। একদিন কোহেন মাকে ডেকে বলল, ‌দ্যাখো, এখন আমি বড়ো হয়েছি। তোমার সঙ্গে এই গাড়ি-ঘরের অন্দরে বসে থাকা আমার এখন সাজে না। এখন তুমিই থাকবে ঘরের ভেতরে। আমি থাকব ঘোড়ার পিঠে। আর তো আমি তোমার কোলের ছেলেটি নই।‌

আনাতুরি হতাশ চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকায়। তারপর বলে, ‌কোহেন, তুই যতদিন আমার কাছে কাছে থাকবি, ততদিনই তুই আমার ছোট্ট কোহেন হয়েই থাকবি। ওরে কোহেন, মায়ের কাছে ছেলে চিরদিনই তার ছোট্ট ছেলে। সে কোনোদিনই বড়ো হয় না। তাই তুই আমার কাছে সেই ছোট্ট কোহেন হয়েই আছিস।‌

কোহেন মায়ের কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠল।

মা অবাক হয়ে তাকাল কোহেনের মুখের দিকে। তবে কি মায়ের কথা পছন্দ হল না কোহেনের। তা না হলে অমন তাচ্ছিল্যের সুরে সে হাসে কেন!

অমন তাচ্ছিল্যের সুরে হাসতে হাসতে কোহেন বলল, ‌তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি কোনোদিনই বড়ো হব না। আমি কোনোদিনই ঘোড়ায় চড়ে স্তেপের ঘাস ডিঙিয়ে যুদ্ধ করতে শিখব না! কোনোদিনই আমি বীর হব না! শত্রুকে তির ছুড়ে ঘায়েল করতে পারব না! চিরদিনই গাড়ির ঘরে বসে থাকব তোমার কোল ঘেঁষে, জুজুর ভয়ে!‌ বলতে বলতে থামল। তারপরেই মুখখানা তার ঝলসে উঠল। রুক্ষ স্বরে সে ফুঁসিয়ে উঠল, ‌মা, তুমি কি চিরদিন আমায় ঠুঁটো হয়ে থাকতে বলো? তুমি কি চাও না, ছেলেটা রক্ত চিনতে শিখুক? ছেলেটা মানুষ হোক?‌

মা চমকাল। মাকে তো কোহেন কোনোদিন এমন কর্কশ স্বরে কথা বলেনি। এমন উদ্ধত ব্যবহারও করেনি। ভয় পায় আনাতুরি। স্তানের মৃতদেহের ওপর চোখের জল ফেলে সে যে-প্রতিজ্ঞা করেছিল, মিথ্যে হয়ে যায় বুঝি সে-প্রতিজ্ঞা! হায় রে, সে কোহেনকে শেখাতে পারল না ভালোবাসতে! প্রতিদিন রক্ত দেখে দেখে সেও বুঝি হয়ে উঠেছে রক্তপিশাচ! একটা যুদ্ধবাজ হিংস্র জানোয়ার!

‌আমার একটা ঘোড়া চাই।‌ হঠাৎ বেশ চড়া গলায় মা-র কাছে দাবি করল কোহেন।

আনাতুরি তাকাল কোহেনের দিকে। মমতায় ভরে আছে সে-দুটি চোখ।

সেই চোখের দিকে তাকিয়ে মায়া হল না কোহেনের। সে চড়া গলায় বলল, ‌আর আমি ঘরে বসে থাকব না গেঁতো হয়ে।‌

আনাতুরি এবারও শান্ত। মনের ব্যথাটা অনেক কষ্ট করে মনের মধ্যেই লুকিয়ে রাখল। তারপর বলল, ‌কোহেন, আমি তোকে ঘোড়া কোত্থেকে দেব বাবা। ঘোড়া দেওয়ার সামর্থ্য যে আমার নেই।‌

তেমনই ক্ষিপ্ত স্বরে কোহেন উত্তর দিল, ‌ঠিক আছে। তোমার সামর্থ্য নেই যখন, তখন আমাকেই দেখতে হবে।‌

শিউরে উঠল আনাতুরি। জিজ্ঞেস করল, ‌তুই কোথায় দেখবি?‌

কোহেন উত্তর দিল, ‌দেখার অনেক জায়গা আছে। আমাকে তো আর মায়ের আদরে অন্ধ হয়ে থাকলে চলবে না, যাহোক কিছু করতেই হবে।‌

মা অস্থির হল, ‌কী করবি তুই? ঘোড়া পাবি কোথায়?‌

‌আমি রাজার কাছে চাইব। তার অনেক আছে।‌ উত্তর দিল কোহেন।

চুপ করে গেল আনাতুরি। সে যে মনে মনে কী ভাবল, সে আনাতুরি ছাড়া আর কেউ জানল না। তারপর রাত্রিবেলা কোহেন যখন ঘুমিয়ে পড়ল তখন সে ছুটল। সে যেন ছুটছে প্রাণের ভয়ে। একটা হিংস্র বাঘ যেন তাড়া করেছে তাকে। এই বুঝি তার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে বাঘটা!

ছুটতে ছুটতে আনাতুরি পৌঁছে গেল রাজার আস্তানায়। রাজার শিবির এইখানেই। সামনে একটা স্বচ্ছ জলের সরোবর। থইথই জলের ছবিতে আকাশ-ভরতি তারার ছায়া দুলছে। দু-একটা গাছ—ওক অথবা পাইন। ঘাস এখানে সবুজ হয়ে আছে। হাওয়া বইছে, কেউ বাধা দেওয়ার নেই। যে বাধা দেয় সে তো হাওয়ার বন্ধু ওই গাছ, ওই সবুজ ঘাস। হাওয়া যেন ওদের খেলার সঙ্গী। হাওয়া বাজনা বাজায় গাছের পাতায়। দোল খায় গাছ। গান গায়, নাহয় নাচে।

রাজার শিবিরের পাশে আরও অনেক শিবির। যাযাবর এই ঘোড়সওয়ার মানুষের শিবির। এই রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। অনেকে জেগে আছে। কোথাও কোথাও মানুষের কঊ শোনা যাচ্ছে। কোথাও হাসি, কোথাও হুল্লোড়। দূরে দামামা বাজছে। ভেসে আসছে। শোনা যাচ্ছে গান।

রাজার শিবিরের সামনে এসে দাঁড়াল আনাতুরি। হাঁপাচ্ছে সে। রাজার শিবিরের দু-পাশে দু-জন সান্ত্রি।

‌কী চাই?‌ সান্ত্রি জানতে চায়।

‌মহারাজ কি ঘুমিয়ে পড়েছেন?‌ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করে আনাতুরি।

‌কেন?‌ সান্ত্রি প্রশ্ন করে।

‌আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই।‌ জবাব দিল আনাতুরি।

‌—কে তুমি?‌

—‌আমার নাম আনাতুরি।‌

‌—কাল সকালে এসো!‌

‌—আমার আজই দরকার।‌

‌তোমার দরকার থাকলেও আমাদের হুকুম নেই।‌ চড়াগলায় উত্তর দিল সান্ত্রি।

‌তোমরা শুধু এক বার খবর দাও, আনাতুরি এসেছে।‌ মিনতি করল আনাতুরি।

সান্ত্রি হুংকার দিয়ে বলল, ‌বলছি তো বিরক্ত কোরো না। যাও!‌

রাজা সান্ত্রির চিৎকার শুনতে পেয়েছে। রাজা শিবিরের ভেতরের থেকে হাঁক দিল, ‌কে? কেন চ্যাঁচাচ্ছ?‌

রাজার গলা শুনে আনাতুরি নিজেই আগ বাড়িয়ে সাড়া দিল, ‌আমি, আনাতুরি।‌

‌—কে? আনাতুরি! রাজার গলায় বিস্ময়। নিজেই শিবিরের পর্দা সরিয়ে এগিয়ে এল। ‌এত রাত্রে আনাতুরি? তুমি!‌

‌হে সৌরামাতিরাজ, আমার বড়ো বিপদ। আমি তোমায় দুটো কথা বলতে এসেছি। যদি তুমি দয়া করে শোনো!‌ অধীর হয়ে বলল আনাতুরি।

রাজা জিজ্ঞেস করল, ‌কী এমন বিপদ তোমার যে, এই রাতদুপুরেই আসতে হল আমার কাছে? এসো তুমি ভেতরে এসো!‌

রাজার পেছনে পেছনে আনাতুরি শিবিরের ভেতরে ঢুকল।

সান্ত্রি দু-জন হতবাক হয়ে চেয়ে রইল। হয়তো মনে মনে ভাবল, কে এই আনাতুরি!

‌বোসো!‌ শিবিরে ঢুকে রাজা আনাতুরিকে বসতে বলল।

আনাতুরি বসল।

‌কী হয়েছে তোমার?‌ অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল রাজা।

আনাতুরি আকুল হয়ে কেঁদে পড়ল, ‌—তুমি আমাকে বাঁচাও!‌

‌কে তোমায় বিপদে ফেলেছে?‌ রাজার গলায় আরও বিস্ময়। ‌সে কি আমার কোনো প্রজা?‌

‌—না। হে সৌরামাতিরাজ, সে আমার ছেলে।‌ আনাতুরির গলা কেঁপে উঠল।

‌তোমার ছেলে? কোহেন?‌

‌—হ্যাঁ, প্রভু।‌

‌—কী করেছে সে?‌

আনাতুরি আকুল হয়ে বলল, ‌হে রাজা, আমার স্বপ্ন ভেঙে খানখান হয়ে গেল। আমার ছেলে মানুষকে ভালোবাসতে শিখল না। আমি হেরে গেছি।‌

—‌কেন একথা বলছ?‌ খুবই অবাক হল রাজা।

‌মহারাজ, কোহেন আমাকে চোখ রাঙাল। সে আমার মুখের ওপর বলল, আমার কাছে সে আর থাকবে না। তার ঘোড়া চাই। সে যুদ্ধ করবে। সে হত্যা করবে।‌ বলতে বলতে আনাতুরির মুখখানা লাল হয়ে গেল। তার ঘন ঘন নিশ্বাস পড়ছে। সে হাঁপাচ্ছে, কাঁপছে।

রাজার উৎকন্ঠা এবার কমল। রাজা বলল, আনাতুরি, এতে তোমার এত উতলা হওয়ার কী আছে! তুমি শান্ত হও!‌

‌আমি শান্ত হতে পারছি না রাজা।‌ আনাতুরি কেঁদে বলল, ‌আমি যে কোহেনের বাবার মৃতদেহের ওপর চোখের জল ফেলে বলে এসেছি, আমি কোহেনকে ভালোবাসতে শেখাব। আমি বলেছি হত্যা নয়, ভালোবাসা দিয়ে সে তার বাবা স্তানের হত্যার প্রতিশোধ নেবে।‌

রাজা হাসল। অনেক দিন আগে আর একবার হেসেছিল রাজা এমন করে। আনাতুরির মুখে ভালোবাসর কথা শুনে।

‌হাসছ কেন হে সৌরামাতিরাজ? অনেক দিন আগেও তুমি একবার হেসেছিলে এমন করে, আমার মুখে ভালোবাসার কথা শুনে।‌ বলল আনাতুরি।

‌—আনাতুরি।

রাজার হাসি থামল, ‌—তোমার স্বপ্ন মিথ্যে। আমি জানতুম, তোমার ছেলে কোনোদিন ভালোবাসতে শিখবে না। আমাদের দেশে কেউ শেখে না। আমাদের এই দেশে ভালোবাসা নেই—থাকতে পারে না। কারণ আমাদের চারদিকে শত্রু। শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে আমাদের বাঁচতে হয়। আমাদের অস্ত্র হল হিংসা। আনাতুরি, আমাদের ঘর নেই, দোর নেই। তুমি তো জানোই, এই স্তেপের পথে পথে আমাদের ঘর। আমরা যাযাবর। আমাদের লড়াই করতে হয় আকাশের সঙ্গে। এখানে বাতাসে শীতের প্রচন্ড শিহরন। এখানে ঝড়ের শক্তি ভয়ংকর। সে-ঝড় বয়ে আনে কালো মেঘ। কালো মেঘের আড়াল থেকে নেমে আসে বজ্রের আঘাত। নেমে আসে বৃষ্টি। সব আমাদের সহ্য করতে হয়। ওই আকাশকে তুষ্ট করার জন্য আমরা ছড়িয়ে দিই রক্ত—মানুষের রক্ত। সেই মানুষের রক্তে চান করে আমরা ভয়কে জয় করি। আমাদের মৃত্যু হলে মানুষকে হত্যা করে আমরা দুঃখ জানাই। আনাতুরি, তুমি তো এও জানো, তিন-শো পঁয়ষট্টি দিনেও যে-পুরুষ এক জন শত্রুকেও হত্যা করতে পারে না, তাকে আমরা মানুষ বলি না। আমাদের সংসারে ভীরু পুরুষের জায়গা নেই, তাকে মেরে ফেলা হয়। সুতরাং তুমি কেমন করে ভাবলে তোমার ছেলে ভীরু হবে? কেমন করে ভাবলে তোমার ছেলে বীরের মতো যুদ্ধ না-করে তোমার হাত ধরে ঘুরে বেড়াবে ভীতুর মতো! সে ভালোবাসবে সবাইকে! আনাতুরি এই নিষ্ঠুর স্তেপে ভালোবাসা নেই। থাকতে পারে না।‌

আনাতুরি সৌরামাতির রাজার কথা শুনতে শুনতে এবার হাউহাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞেস করল, ‌ওগো রাজা, তবে কেন আমার মন এমন করে আদরে উছলে ওঠে ছেলেটার জন্যে? বলো তো রাজা, স্তানের হত্যা দেখে আমার মন অমন করে কেন কেঁদে উঠেছিল সেদিন? আমি কেন পাষাণ হতে পারিনি? রাজা, রক্ত দেখে আমিও কেন উল্লাস করতে পারি না? বলো রাজা, বলো। কেন? কেন? কেন?‌

‌মন শক্ত করো আনাতুরি!‌ রাজার গলা বড়ো শান্ত, —আনাতুরি, এই স্তেপে কোনো দয়া নেই। কোনো মায়া নেই। এই স্তেপ আমাদের নৃশংস হতে শিখিয়েছে। তোমার ছেলেও তাই শিখবে। তুমি একা কেমন করে পারবে স্তেপের নিয়ম ভাঙতে। এই নিয়মই আমাদের বাঁচার নিয়ম।‌

‌এই নিয়ম আমি মানি না!‌ হঠাৎ যেন ক্ষিপ্ত হয়ে গর্জে উঠল আনাতুরি।

রাজা এতটুকুও রাগ করল না।

আশ্চর্য, যে-রাজার সামনে এমন করে গলা চড়িয়ে কথা বললে তার মরণ ছাড়া অন্য শাস্তি নেই, সেই রাজা কিন্তু শান্ত স্বরেই আনাতুরিকে বলল, ‌আনাতুরি, তোমার ছেলে আমার সৈনিক হবে।‌

আনাতুরি আঁতকে উঠল। আর যেন তার গলা দিয়ে স্বর বেরোয় না।

স্থির চোখে চেয়ে থাকে রাজার মুখের দিকে। অসহ্য যন্ত্রণায় সে যেন জেরবার হয়ে যায়। সে-যন্ত্রণা বুঝি-বা তার সারা শরীর ঠুকরে খাচ্ছে।

‌কোহেনকে তুমি আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়ো।‌ ভারি শান্ত স্বরে রাজা আনাতুরিকে আদেশ করল।

‌—না-আ-আ-আ!‌

আনাতুরির মাথায় যেন কেউ আঘাত করল শেলের বাড়ি। সে চিৎকার করে উঠল। তারপর সে যেমন করে এসেছিল তেমনই করেই ছুট দিল রাজার শিবির থেকে নিজের আস্তানায়। এখন যেন আর কেউ নেই তার—একা, নি:সহায়। এই অন্ধকার রাতে, এই শেষ না-জানা আকাশটার নীচ দিয়ে সে একাই ছুটে চলেছে। ওই আকাশের অনেক বন্ধু আছে অসংখ্য তারা-চাঁদ। আছে সূর্য। আছে রাত আর দিন। আনাতুরির কেউ নেই, কিচ্ছু নেই। আজ আর কেউ তাকে গান শোনাবে না। কেউ তার সামনে এসে গলাটি জড়িয়ে ধরবে না হাসতে হাসতে। কেউ খুশিতে দু-হাত তুলে খেলা করবে না তার সামনে। সবাই তাকে দেখে বলবে, ভীতু। গঞ্জনা দেবে। ছি: ছি: করবে। হায় রে, সে তবে বাঁচবে কেমন করে!

পৌঁছে গেল আনাতুরি নিজের গাড়ি-ঘরে। থমকে গেল আনাতুরি। দেখল কোহেনের ঘুম ভেঙে গেছে। সে বসে আছে, চেয়ে আছে মায়ের পথের দিকে।

‌কোথা গেছলে?‌ খুবই রুষ্ট স্বরে সে জিজ্ঞেস করল।

আনাতুরি কী বলবে? কোন কথাটা বললে যে ছেলের মন পাবে, সে বুঝতে পারল না। কিন্তু ছেলের মন পাওয়ার জন্যে মিথ্যে বলতেও তার মন সায় দিল না। ছিট্ট! সে না মা! ছেলেকে মিথ্যে কেন বলবে সে! সে তো কিছুই অন্যায় করেনি। তাই নিজের সমস্ত উৎকঊা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে সে বলল, ‌রাজার কাছে।‌

রাজার নাম শুনে কী হল কোহেনের! তার সেই রুষ্ট স্বর কোথায় গেল! আনন্দে উচ্ছল হয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ‌রাজা কী বলল?‌

‌কীসের কী বলবে?‌ জিজ্ঞেস করল আনাতুরি।

‌—আমার ঘোড়ার কথা!‌

‌—জিজ্ঞেস করিনি।‌

সঙ্গেসঙ্গে চুপসে গেল কোহেন। জিজ্ঞাসা করল, ‌কেন?‌

মা-র গলার স্বর দৃঢ় হল। বলল, ‌আমি চাই না তুই ঘোড়সওয়ার হোস।‌

‌রাজাও কি চায় না?‌ মায়ের মতোই দৃঢ় গলায় কোহেন জিজ্ঞেস করল।

—‌রাজা কী চায় না চায় আমি জানি না। শুধু শুনে রাখ, আমি তোর মা। আমি চাই না।‌

কোহেন মায়ের মুখের দিকে কটমট করে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‌তুমি কি তবে আমাকে ঘোড়া দেওয়ার কথা বারণ করতে গেছলে রাজার কাছে?‌

—‌হ্যাঁ।‌ স্পষ্ট গলায় মায়ের উত্তর।

এবার চিৎকার করে উঠল কোহেন, ‌কেন?‌

‌আমার ইচ্ছে।‌ মা উত্তর দিল।

মায়ের এই উত্তর শুনে অবাধ্য ছেলের মতো হাত-পা ছুড়ে কোহেন জবাব দিল, ‌তোমার ইচ্ছে আমি মানি না। আমি নিজে রাজার কাছে যাব। আমি নিজে রাজাকে ঘোড়ার কথা বলব।‌

আনাতুরি আর থাকতে পারল না। ছেলেকে ধমক দিল, ‌না, তুই যাবি না!‌

মায়ের মুখের ওপর মুখ তুলে কোহেন উত্তর দিল, ‌তোমার কথায়?

—‌হ্যাঁ, আমার কথায়!‌ উত্তেজনায় কেঁপে উঠল আনাতুরি।

—‌আমি তোমার কথা যদি না-মানি?‌

আনাতুরি থাকতে পারল না। সহ্য করতে পারল না ছেলের বেয়াদবি। আচমকা সে কোহেনের গালে একটা চড় বসিয়ে দিল ঠাস করে। রাগে চিৎকার করে উঠল, ‌ভুলে যাস না আমি তোর মা। আমার মুখের ওপর কথা বলার স্পর্ধা দেখাস তুই কোন সাহসে! আমি যা বলব তোকে তা-ই শুনতে হবে।‌

আশ্চর্য, মায়ের হাতে মার খেল, অথচ কোহেনের মুখে আর একটি টুঁ শব্দ পর্যন্ত বেরোল না। ঠিক যেন বিদ্যুৎ চমকেই মিলিয়ে গেল। মুখে যেমন কথা নেই, চোখে তেমনই রাগ নেই। নিশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শোনা যায় না। বালিশে মুখ গুঁজে সে গোঁজ হয়ে পড়ে রইল বিছানায়।

শিউরে উঠল আনাতুরি। ইস! এ কী করল সে! এমন দপ করে সে রাগে কেন জ্বলে উঠল! কেন অমন করে আঘাত করল সে কোহেনকে! অস্থির হয়ে উঠল আনাতুরি। যে-হাত দিয়ে সে কোহেনের গালে আঘাত করেছে, সে-হাত তার কাঁপছে। যে-মনে তার ছেলে আঘাত করে আনাতুরিকে ক্ষিপ্ত করেছিল মুহূর্ত আগে, সে-মন এখন অনুতাপে ছটফট করছে। আহা রে, সে কেন এমন নির্দয় হল! আর একটু সহ্য করলে কী ক্ষতি হত! নিজের ছেলে হলেও, এখন তো সে বড়ো হয়েছে। কিছু যদি করে বসে ছেলেটা! তখন!

না, পারল না আনাতুরি। মমতায় উছলে গেল তার মন। দু-হাত বাড়িয়ে সে ছেলেকে আদরে জড়িয়ে ধরল। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‌ওরে, আমি এ কী করলুম! আমার কেন এমন রাগ হল! আমি কেন তোকে মারলুম! তুই ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই!‌

কোহেন সাড়া দিল না। ঠেলে দিল মাকে। মায়ের দুটি হাতের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

কোহেনের যে-গালটির ওপর আঘাত করেছিল, আনাতুরি সেই গালের ওপর নিজের হাত রাখল। বোলাতে বোলাতে আক্ষেপ করতে লাগল, ‌ওরে কোহেন, যাক, এ হাত আমার পুড়ে যাক! নয়তো ভেঙে তুই খানখান করে দে! ধিক, ধিক! আমি কেন আমার ছেলের গায়ে হাত তুললুম! আমি মা নই, আমি ডাইনি।‌

‌মা!‌ কোহেন শান্ত গলায় ডাক দিল। তারপর বলল, ‌তুমি মেরেছ ভালোই করেছ। এমনই করে মার খেতে খেতে আমিও একদিন অন্যকে মারতে শিখব। তুমি আমায় এতদিন কেন মারোনি! কেন তুমি আমায় মারতে মারতে পাহাড়ের পাথরের মতো শক্ত করোনি। আমার বাবাও কি তোমার মতো এইরকম দুর্বল ছিল?‌

আনাতুরি ছেলের মুখে এই কথা শোনার জন্যে তৈরি ছিল না। সে আর্তস্থূরে চিৎকার করে উঠল। আকাশের দিকে মুখ তুলে সে ডাক দিল কোহেনের মৃত বাবাকে, ‌—স্তান-ন-ন-ন, আমায় তুমি শক্তি দাও!‌

আকাশের ওপার থেকে তখন কি আর সাড়া পাওয়া যায় স্তানের!

১০

মনে হয় আনাতুরির সেদিন সকাল হয়েছিল একটু তাড়াতাড়িই। স্তেপের সেই রাতের শিরশিরে ঠা‌ণ্ডা যেন তার গা ছুঁতে পারছিল না একটুও। একটা অসহ্য যন্ত্রণা সারা দেহ তোলপাড় করছে। ঘুম আসছে, তবু চোখ বুজছে না। যখনই তন্দ্রা এসেছে, তখনই চমকে উঠেছে। তখনই হাত বাড়িয়ে ঘুমন্ত ছেলেটাকে ছুঁয়ে ধরেছে।

তারপর একবার যে কী হল, ঘুমিয়ে পড়ল আনাতুরি অঘোরে। কখন যে তার হাত ঘুমের আবেশে ছেলের হাত থেকে ঢলে পড়েছিল, খেয়াল করতে পারেনি আনাতুরি। যখন খেয়াল করল, তখন ভোরের আকাশে আলো নামছে একটু-একটু। সেই আলোয় বরফের ওড়না গায়ে দিয়ে বাতাস ছুটে বেড়াচ্ছে। ঠান্ডার আমেজে নিস্তব্ধ দিগবিদিক।

হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠেছে আনাতুরি। ঢলে-পড়া হাতটি বাড়িয়ে সে ধরতে গেছে কোহেনকে। কিন্তু কাকে ধরবে! কোহেন তো নেই!

নেই! সে কী! ঘুম ছুটে গেল নিমেষে। উঠে পড়ল চমকে! হায়! এ কী হল! ছেলেটা কই! চাপা স্বরে ডাক দিল, ‌কোহেন!‌ তার গলায় উত্তেজনা। কিন্তু সাড়া পেল না। ভেড়ার লোমের নরম লেপটা আনাতুরি উলটে ফেলে দিল। না, লেপের মধ্যেও কোহেন নেই। সে এবার চেঁচিয়ে ডাকল, ‌কোহেন!‌ কে সাড়া দেবে! আতঙ্কে ছটফট করে উঠল আনাতুরি। কোথা গেল ছেলেটা? আনাতুরি গাড়ি-ঘরের ভেতর থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল। গলা ফাটিয়ে ডাক দিল, ‌কোহেন!‌ কুয়াশায় ঢেকে আছে স্তেপ। দু-হাত দূরের মানুষকেও নজর করা যায় না এমনই জমাট সেই কুয়াশা। সেই কুয়াশা ভেদ করে আনাতুরি ছুটে যায়। কুয়াশার আড়ালে-আড়ালে সে খুঁজে বেড়ায় কোহেনকে পাগলের মতো। ডাক দেয়, ‌কোহেন, ওরে কোহেন, বাপ আমার, আমি তোর মা! আয় বাবা, ফিরে আয়!‌

কুয়াশা কাটছে। কুয়াশার জাল ছিঁড়ে সূর্য উঠছে একটু একটু করে। আকাশটারও মুখের ঢাকা সরে যাচ্ছে। শুকনো আর সবুজ ঘাসের মাথা-ভরতি রাশি রাশি শিশিরবিন্দু ঝিলমিল করছে। সেই শিশিরবিন্দুতে ভিজে যায় আনাতুরির পা। কিন্তু দেখা পায় না সে কোহেনের। সাড়াও নেই তার।

এখন শুধু একা আনাতুরি। খুঁজে বেড়াচ্ছে ছেলেকে—ডাক দিচ্ছে। এখনও কারও ঘুম ভাঙেনি। এখনও হয়তো কারও কানে পৌঁছোয়নি আনাতুরির কন্ঠস্বর। শিবিরের পর্দা ঠেলে কেউ উঁকি মেরে দেখেওনি তাকে। তারা জানেও না আনাতুরি নামে এক মায়ের দেখা সব স্বপ্ন তার ছেলে মিথ্যে করে দিয়েছে দিয়ে হারিয়ে গেছে। আনাতুরিই বুঝি সেই মা, একা এই স্তেপে যে ডাক দিয়ে বলে যায়, ‌ওরে কোহেন, বাপ আমার, তুই পৃথিবীতে জন্মেছিস, মানুষকে খুন করার জন্যে নয়। ভালোবাসার জন্যে।‌

আনাতুরি ডেকে ডেকে সারা হল। তবু খুঁজে পেল না কোহেনকে। পাবেই-বা কেমন করে! কোহেনে যে তখন রাজার শিবিরে।

সকাল। কুয়াশা কেটে গেছে, সূর্য উঠেছে। রাজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কোহেন! রাজা জিজ্ঞেস করল, ‌কী চাস তুই?‌

—‌আমার নাম কোহেন।‌

‌—আমি জানি।‌

‌—আমার মায়ের বিরুদ্ধে আমি নালিশ করতে এসেছি।‌

‌—মায়ের বিরুদ্ধে নালিশ!‌ অবাক হল রাজা।

‌হ্যাঁ‌, দৃঢ় গলায় উত্তর দিল কোহেন।

—‌যে-মা-র কোলে তুই জন্মেছিস, যে-মা তোকে কোলেপিঠে করে বড়ো করেছে, যে-মা হাজারটা ঝড়ঝাপটা সামাল দিয়ে তোকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তার বিরুদ্ধে তোর নালিশ! একথা বলতে তোর জিভ কাঁপছে না?‌

রাজার কথা শুনে থতোমতো খেয়ে গেল কোহেন। পলকে নিজেকে সামলে নিলে। তারপর আবার বলল, ‌রাজামশাই, আমাদের দলের যা নিয়ম-রীতি, তার বিরোধী যদি কেউ হয়, তার বিরুদ্ধে যেতে আমি ভয় পাই না! নিজের মা হলেও না।‌

‌—একথা এমন অনায়াসে কী করে বলতে পারছিস তুই?‌

—‌আমি তো কিছু অন্যায় বলছি না। আমি এখন বড়ো হয়েছি। সবাই যা পারে, এখনও আমি তা পারব না কেন? একজন শত্রুকে এখনও পর্যন্ত আমি খতম করতে পারিনি। এ আমার কম লজ্জা নয়। মা আমায় বাধা দেয়। মা আমায় আগলে রাখে। কেন? কেন?‌ রাগে মুখখানা ঝলসে উঠল কোহেনের।

‌তুই কি জানিস, তোর মা তোকে কেমন করে বাঁচিয়ে রেখেছে? তুই কি জানিস তোর বাবাকে কেমন করে হত্যা করা হয়েছে?‌ রাজা কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল।

‌সেটা আমার জানার কথা নয়‌, উত্তর দিল কোহেন। —‌সেটা আমি জানতেও চাই না। এখন আর মায়ের হাত ধরে আমার পা-পা হাঁটতে হয় না আমি নিজেই চলতে পারি। আমাদের এই দলের সবাই এখন যেমন করে চলে, আমিও এখন তেমনই করে চলতে চাই। আমি বীর হতে চাই। আমি একা একা ঘোড়া ছোটাব। আমি ঘোড়ার পিঠে বসে তির ছুড়ব। শত্রুকে মারব। শত্রুর রক্ত গায়ে মেখে আমি উল্লাস করব। মায়ের বারণ আমি মানব না। আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।‌

রাজা জিজ্ঞেস করল, ‌তোর তো কিছুই নেই। দাঁড়াবি কেমন করে?‌

‌মা আমায় কিছু না-দিলে আমিই-বা পাব কেমন করে?‌ উত্তর দিল কোহেন।

—‌কোনোদিন জেনেছিস, মা কেন দেয় না?‌

—‌সেটা জানার আমার দরকার কী? আমি যা চাইব তা-ই তোমায় দিতে হবে। নইলে তুমি মা কীসের!‌

—‌চুপ কর, অবাধ্য ছেলে!‌ রাজা আর সহ্য করতে পারল না কোহেনের এই উদ্ধত কথাবার্তা। রাজা ধমক দিল কোহেনকে। —‌মাকে এত তাচ্ছিল্য তোর? কে তোকে এ সাহস জোগাল?‌

রাজার ধমক খেয়ে থমকে গেল কোহেন! রাজার চোখের দিকে তাকিয়ে সে আর কথা বলতে সাহস করল না।

‌—শোন তবে তুই‌, কোহেনের বুকের জামাটা খামচে ধরে রাজা বলল, ‌তুই আমাদের দলের কেউ না, তোর মাও নয়। তোরা আসগুজাই। আসগুজাইয়ের রাজা বুমবুজাং তোর বাপকে মেরে তোকেও মেরে ফেলতে চেয়েছিল। তোকে বাঁচিয়েছিল তোর মা-ই। ঠিক সেই সময় আমরা আক্রমণ করেছিলুম তোদের দলকে। তোর মা বন্দি হয়েছিল আমার সেনার হাতে, সঙ্গে তুইও। হয়তো আমার সেনার হাতে মরতিস তুই—তোর মাও। কিন্তু আমি দেখতে পেয়ে তোদের প্রাণরক্ষা করি। সেই থেকে তোরা আমার কাছে আছিস। কোলের শিশু থেকে তুই এখানেই বড়ো হয়েছিস। আসগুজাইয়ের রাজা যেদিন তোর বাবাকে তোর মায়ের সামনেই হত্যা করেছে, সেইদিন থেকেই তোর মা প্রতিজ্ঞা করেছে, তোকে খুনি হতে দেবে না। তোকে মানুষকে ভালোবাসতে শেখাবে।‌

তুমি নিজেই তো খুনি।‌ হঠাৎ রাজার মুখের ওপর জবাব দিল কোহেন।

‌আমি রাজা।‌ রাজার উত্তর।

‌তোমার সব প্রজারাও তো খুনি।‌ যেন রাজাকে অবজ্ঞা করে বলে উঠল কোহেন।

‌আমরা যোদ্ধা।‌ দৃঢ় গলায় অগ্রাহ্য করল রাজা।

—‌আমিও যদি যোদ্ধা হই, তাতে তোমার আপত্তি কেন?‌ কোহেনের গলাও দৃঢ় হল।

রাজা উত্তর দিল, ‌তুই আমার কাছে আসার আগে পর্যন্ত আমার আপত্তি ছিল না। আমি তোকে যোদ্ধা করতে চাই, এ ইচ্ছা আমি তোর মাকেও জানিয়েছিলুম। কিন্তু এখন আমি তোকে যোদ্ধা করতে নারাজ।‌

—‌কেন?‌

—‌যে-ছেলে নিজের মায়ের নামে অন্যের কাছে নালিশ করতে আসে, সে যোদ্ধা হওয়ার যোগ্য নয়। সে শয়তান।‌ রাজা যেন গর্জে উঠল।

‌আর যে-মা ছেলের গায়ে হাত তোলে, তাকে বোধ হয় মা বলতে তোমার আপত্তি নেই।‌ ঠেস দিয়ে উত্তর দিল কোহেন।

‌চুপ কর হতচ্ছাড়া!‌ ধমকে উঠল সৌরামাতিরাজ। যে-ছেলে মায়ের কথা শোনে না, সে-ছেলেকে মা যদি শাসন না-করে তবে তাকেই আমার মা বলতে আপত্তি।‌

একথার আর কোনো উত্তর এল না কোহেনের মুখে। সে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু তার চোখে হঠাৎ একটা হিংস্র চাউনি ঝলক দিল। সে মুহূর্তের জন্যে তাকাল রাজার মুখের দিকে। পরক্ষণেই চোখ নামিয়ে নিল।

‌তুই এবার আসতে পারিস।‌ তীক্ষ্ণ স্বরে আদেশ করল রাজা।

‌আমার একটা আর্জি আছে।‌ গম্ভীর গলায় বলল কোহেন।

‌কীসের আর্জি?‌ রাজা বিরক্ত হয়েই জিজ্ঞেস করল।

—‌আমার একটা ঘোড়া চাই।‌

‌কে দেবে?‌ আরও বিরক্ত হল রাজা।

‌আমি তোমার কাছেই চাইছি।‌ সাফ সাফ উত্তর দিল কোহেন।

—‌রাজা কাউকে ঘোড়া দান করে না। যারা বীর, তারা শত্রুকে খতম করে ঘোড়া জয় করে।‌ রাজা কথা শেষ করে মুখ ফিরিয়ে নিল।

কোহেন আর দাঁড়াল না। সে রাজার কথার আর কোনো উত্তরও দিল না। একটা চাপা রাগে ছটফট করতে করতে সে বেরিয়ে এল রাজার শিবির থেকে। কিন্তু সে ঘরেও ফিরল না। রাজার একটা কথা তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে তখনই তার মনে। ‌যারা বীর, তারা শত্রুকে খতম করে ঘোড়া জয় করে, যারা বীর তারা...‌।

হঠাৎ যেন মাথাটা ঘুরে গেল কোহেনের। সে থমকে থামে। মনটা তার আনচান করে ওঠে। মনে ভাবে, কে তার শত্রু! কোথায় তার শত্রু! কোন শত্রুকে হত্যা করে সে ঘোড়া জয় করবে! ভাবতে ভাবতে জেরবার হয়ে যায় কোহেন। তবু ভেবে পায় না কিছু। একা একা অস্থির পায়ে সে হাঁটে। কোথায় হেঁটে যায় সে নিজেও জানে না। হাঁটতে হাঁটতে মায়ের ওপর অভিমানে মুখখানা তার রাঙা হয়ে ওঠে। কখনো নিজের ওপরেই রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। নিজেই নিজেকে ধিক্কার দেয়! হয়তো ভাবে, সে নিজেই বুঝি তার নিজের শত্রু। আর, সে যদি তার নিজের শত্রু না-হয়, তবে কি শত্রু তার রাজা বুমবুজাং! সেই বুমবুজাংই তো তার বাবাকে হত্যা করেছে। সেই বুমবুজাংই তো কোহেনকেও হত্যা করতে হাত তুলেছিল! মা তাকে রক্ষা করেছে। ঠিক-ঠিক। তবে বুমবুজাংকেই সে দেখে নেবে। বুমবুজাংয়ের ঘোড়াটাই সে জয় করবে। সেই জয়ই হবে সাচ্চা বীরের জয়।

না, বুমবুজাংকে শত্রু বলতে মন সায় দিল না কোহেনের। মুহূর্তের মধ্যে কেমন যেন তার সব তালগোল পাকিয়ে গেল। বুমবুজাং তো আসগুজাই দলের রাজা। কোহেনও তো আসগুজাই দলেরই ছেলে। আসগুজাই তো তার নিজের দল। আসগুজাইয়ের রাজাই তো নিজের রাজা। এই দলে তার বাবা জন্মেছে, মা জন্মেছে, কোহেনেরও জন্ম। না না, রাজা বুমবুজাং কখনো শত্রু হতে পারে না। শত্রু সে-ই, যে আসগুজাই রাজাকে আক্রমণ করে। আসগুজাই রাজাকে আক্রমণ করা মানে, সে তো কোহেনকেই করা। তার নিজের দলের রাজাকেই শেষ করে ফেলার চক্রান্ত। এ চক্রান্ত সে মেনে নিতে পারে না। যে-রাজা বুমবুজাংয়ের শত্রু, সে কোহেনেরও শত্রু। যে নিজেকে বাঁচানোর জন্যে সেই শত্রুর আশ্রয়ে পালিয়ে যায়, সে বিশ্বাসঘাতক।

তবে? তবে কি কোহেনের মা বিশ্বাসঘাতক? ভাবতে ভাবতে শিউরে ওঠে কোহেন। তার মা-ই তো পালিয়ে এসে শত্রুর আশ্রয়ে লুকিয়ে আছে। তবে কোহেনের মা-ই বুঝি সবচেয়ে বড়ো শত্রু তার! তবে কি সে তার মাকে হত্যা করবে?

১১

ভাবনার তাড়নায় অতিষ্ঠ হয়ে যায় কোহেন। সারাদিন সে মায়ের কাছে গেল না একটি বারের জন্যেও। সে লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুরে বেড়াল। তার মা যে দিনভর আকুল হয়ে কেঁদেছে, জানতে পারল না সেকথাও। সেকথা জানার এখন দরকারই-বা কী! ঘোড়া না-হোক, এখন তার দরকার একটা তির-ধনুক। শত্রুকে খতম করতে গেলে এইটাই চাই। খালি হাতে তো আর কাজ হয় না। কী আশ্চর্য, একটা তির-ধনুক পর্যন্ত তাকে দেয়নি তার মা! অথচ পাঁচজনের দেখতে দেখতে কোহেন ভাবে তির ছোড়া এমন কী আর শক্ত! এক্ষুনি একটা পেলে সে দেখিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কে দেবে? আর চাইবেই-বা কার কাছে। অগত্যা সে এইখানে বসে পড়ল। অনেকক্ষণ ঘুরপাক খেয়েছে, এখন একটু জিরিয়ে না-নিলে পা আর চলে না।

কিন্তু একটু বসেই মন চাইল তার শুয়ে পড়তে। খোলা আকাশ, এখন বাতাস শান্ত—ছুঁয়েছুঁয়ে যাচ্ছে। তার চোখেও ঘুম ছুঁই ছুঁই করছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই, ঘুম আসতেই পারে। সারাদিনে পরিশ্রমটা তো কম হয়নি। তবুও সে কিছুতেই চোখের পাতা এক হতে দেবে না। যতবারই ঘুমের আবেশে চোখ বুজে আসতে চায়, ততবারই সে ধড়ফড় করে উঠে পড়ে।

হঠাৎ যেন একটা ঘোড়দৌড়ের শব্দ তার কানে এল। কে আসে ঘোড়ার পিঠে এদিকে! তাকাল কোহেন। দেখতে পেল, স্তেপের ঘাস ডিঙিয়ে একজন সেনা আসছে ঘোড়া ছুটিয়ে। ওই দূরে তাকে দেখা যাচ্ছে। পাশেই শুকনো ঘাসের লম্বা ঝোপ। লুকিয়ে পড়বে কি না ভাবল কোহেন। না, কেন সে লুকোবে! আসতে দাও সেনাটিকে। কোহেন উঠে দাঁড়াল। সেনাটি কাছে এলে সে বুঝতে পারল, সৌরামাতিরাজেরই সেনা এই লোকটি। সেনাটি সটান কোহেনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। সে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল। কেমন যেন সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‌কে তুই‌?‌

কোহেনের ভয় পাওয়ার কিচ্ছু নেই। উত্তর দিল, ‌আমার নাম কোহেন।‌

—‌এখানে কী করছিস?‌

—‌কিচ্ছু না।‌

‌মিথ্যে বলছিস?‌ সেনাটি বেশ কর্কশ স্বরে জিজ্ঞেস করল।

‌যদি মিথ্যেও বলি, তুমি কে এমন যে তার উত্তর তোমাকে দিতে হবে?‌ জবাব দিল কোহেন।

সেনাটি এবার চটল। বাজখাঁই গলায় তেড়ে বলে উঠল, ‌খুব চ্যাটাং চ্যাটাং করে কথা বলতে শিখেছিস তো। দেখবি আমি কে?‌ বলে নিজের তির-ধনুকটা তুলে দেখাল।

—‌তুমি আমায় মারবে নাকি?‌ ভেতরে ভেতরে গুমরে উঠল কোহেন।

‌বেশি বেগড়বাঁই করলে একদম শেষ করে ফেলব।‌ সেনাটি শাসাল।

‌তাই নাকি!‌ তাচ্ছিল্যে ঠোঁট ওলটাল কোহেন। তারপর বলল, ‌হাতে অস্ত্র নিয়ে সবাই অমন জাঁক দেখাতে পারে। অস্ত্র ফেলে এসো! একা একা লড়ে যাও! দেখা যাক কে জেতে কে হারে!‌

‌ওরে ছেলে, তোর তো ভীষণ জিদ্দি!‌ বলতে বলতে ধাঁই করে কোহেনের গলাটা খাবলে ধরল সৈনিক। তারপর গলায় একটা রাম-ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, ‌ক্ষমতা থাকে তো দ্যাখ এবার!‌

সৈনিকের হাতের টিপুনিতে কোহেনের দম আটকে আসে আর কি! বাধ্য হয়ে সেনার হাত থেকে নিজে বাঁচার জন্য ঝটপটানি লাগিয়ে দিল।

কিন্তু সেনা ছাড়ে না। সে আরও জোরে চেপে ধরে। চ্যাঁচায়, ‌একা লড়বি? খুব দেমাক! অ্যাঁ!‌

আর ক্ষমতায় কুলোয় না কোহেনের। এবার সে দম ফেটে মরবেই। কিন্তু মরবার আগে সব মানুষই একবার আঁকপাঁক করে লাফিয়ে ওঠে। কোহেনও লাফাল। লাফিয়ে বেমক্কা এমন একখানি ধাক্কা মারল সেনাটিকে যে, এক ঘায়েই কাত! কোহেনের গলা ছেড়ে মাটিতে চিতপটাং। যেই-না পড়ল, অমনি কোহেনও পা দিয়ে তার গলাটা মাড়িয়ে ধরল। গলাটা পিষতে পিষতে কোহেন চ্যাঁচাতে লাগল, ‌দ্যাখ, এবার কে কাকে শেষ করে!‌

সত্যি সত্যি শেষ হয়ে গেল সৈনিকটি। শেষ হল কোহেনের পায়ের চাপে। এই সৈনিকটিকে মারার সঙ্গেসঙ্গে আনাতুরির ছেলে কোহেন চেঁচিয়ে উঠল উল্লাসে, ‌হ্যাঁ আমি পেরেছি। আমি শত্রুকে খতম করেছি। হ্যাঁ হ্যাঁ, শত্রুই তো! আমার রাজা বুমবুজাং। আমার শত্রু সৌরামাতির রাজা। আমার জন্ম আসগুজাই রাজার দলে। আমার আসগুজাই দলের সঙ্গে যে বিশ্বাসঘাতকতা করে সে-ই আমার শত্রু।‌ বলতে বলতে কোহেন তার হাতে নিহত সেনার তির-ধনুকটা হাতিয়ে নিল। মৃত সেনার ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠল। তারপর বুক ফুলিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‌সৌরামাতির রাজা, তুমি যেমন আমার শত্রু, তেমন শত্রু তোমার সেনাও। দ্যাখো তোমার সেনাকে মেরে আমি ঘোড়া জয় করেছি। আমি অস্ত্র কেড়ে নিয়েছি।‌ বলে সে ঘোড়ার লাগাম ধরে টান দিল— ‌হ্যাট ঘোড়া, হ্যাট!‌ ঘোড়া অমনি ছুটতে শুরু করল।

ঘোড়া ছোটে। ঘোড়ার পিঠে কোহেনও দোলে। বীরের মতো। এখন সে ছুটে যায় মায়ের কাছে। মাকে গিয়ে বলবে, ‌মা, এতদিন তুমি তোমার ছেলেকে কোলের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলে। তুমি চেয়েছিলে তোমার আদরে আমি যেন গলে যাই, তোমার কোল না-ছাড়ি। কিন্তু সে তোমার মিথ্যেই আশ। দ্যাখো আজ থেকে আমি অন্য কোহেন! আজ থেকে আমি বীর। আমি শত্রুর শমন।‌

ঘোড়া তাদের গাড়ি-ঘরের সামনে ছুটে এল। ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে কোহেন হাঁক পাড়ল, —‌মা!‌

মা সাড়া দিল না।

‌—মা, দ্যাখো আমি কোহেন। দ্যাখো আমি কী জয় করেছি।‌

তবু মা-র সাড়া পেল না।

‌মা, ওমা!‌ কোহেন ডাকতে ডাকতে গাড়ি-ঘরের পর্দা ঠেলল। মা নেই।

আরও ক-বার এমনই করে ডাকল কোহেন। সাড়া না-পেয়ে কী ভাবল সে-ই জানে। তারপর আর সেখানে দাঁড়াল না। মুখ ফেরাল ঘোড়ার। আবার সে ছুট দিল। তবে কি সে মাকে খুঁজতে বেরোল!

না, তার ঘোড়া ছুটতে ছুটতে এল সৌরামাতির রাজ-শিবিরের সামনে। এবারও সান্ত্রি তার পথ আটকাল। জিজ্ঞেস করল, ‌কাকে চাই?‌

‌রাজাকে।‌ পরোয়া না-করে সে উত্তর দিল।

‌—ওকে আসতে দাও!‌

সান্ত্রি চমকে উঠল। কেননা, আদেশ করল রাজা নিজে। শিবিরের ভেতর থেকে।

ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে শিবিরের ভেতরে ঢুকে গেল কোহেন।

‌আবার কী চাই?‌ রাজা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।

‌আর কিছু নয়,‌ উত্তর দিল কোহেন, ‌আমার যা দরকার ছিল, আমি তা জয় করেছি।‌

কোহেনের হাতে তির-ধনুক। রাজার নজর পড়ল। জিজ্ঞেস করল, ‌কোত্থেকে পেলি?‌

‌শত্রুকে খতম করে।‌ হাসতে হাসতে উত্তর দিল কোহেন।

‌—আর ঘোড়া?‌

‌জয় করেছি শত্রুকে মেরে।‌ বীরের মতো বুক ফুলিয়ে জবাব দিল কোহেন।

—‌কোথায় পেলি শত্রুর দেখা?‌ একটু অবাক হল রাজা।

‌কেন, শত্রু তো আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।‌ খুব সহজেই উত্তর দিল কোহেন।

—‌মানে!‌ স্তম্ভিত হল রাজা।

কোহেনের চোখের দৃষ্টি স্থির। সে-দৃষ্টি রাজার চোখের ওপর। তারপর বলল, ‌কেন, মানে তো খুবই সহজ। তুমি আমার শত্রু। তোমার সেনাকে হত্যা করে আমি জয় করেছি ঘোড়া আর তির-ধনুক।‌

রাজা যেন কেমন হতচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌আমি তোর শত্রু?‌

‌হ্যাঁ।‌ উত্তর দিতে দোনোমনো করল না কোহেন।

রাগে রাজার মুখ লাল হয়ে উঠল। গলা কাঁপল তার কথা বলতে। বলল, ‌ওরে অকৃতজ্ঞ ছেলে, আমাকে শত্রু বলতে তোর মুখে আটকাল না! আমি তোর আর তোর মা-র জীবন বাঁচিয়েছি। তোদের আশ্রয় দিয়েছি। সেই আশ্রয়ে তুই বড়ো হয়েছিস।‌

‌—কিন্তু তুমি আমার রাজাকে আক্রমণ করেছিলে।‌

—‌কে তোর রাজা?‌ ধমক দিল সৌরামাতিরাজ।

‌বুমবুজাং।‌ ধমক গ্রাহ্য না-করে উত্তর দিল কোহেন।

থতোমতো খেয়ে গেল সৌরামাতিরাজ কোহেনের উত্তর শুনে। তারপর যেন একটা ভয়ংকার দানবের মতো হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করে উঠল, ‌বেইমান, যে তোর জীবনরক্ষা করল সে তোর শত্রু! যে তোর মাকে আশ্রয় দিল, তোদের দুঃখ-কষ্ট দূর করতে যে এগিয়ে এল সে তোদের শত্রু! ওরে শয়তান, আমি না-থাকলে কবেই তোরা শেষ হয়ে যেতিস। কেউ কোনোদিন জানতেও পারত না কোহেন নামে একটা ছেলে ছিল এই পৃথিবীতে! আনাতুরি নামে একজন মা ছিল তার! তাদের দলের রাজা কবেই তাদের মেরে ফেলত। অথচ সেই রাজাই হল তোদের বন্ধু! তবে শোন, যেদিন তুই জন্মেছিলি সেইদিনই যুদ্ধে রাজা বুমবুজাং-এর ছেলের প্রাণ যায়। বুমবুজাং সেদিন তোকে অলক্ষুণে বলে হত্যা করার ফন্দি আঁটে। তোর মা তোকে নিয়ে পালিয়ে আসে। আমি তোদের আশ্রয় দিই। তোর কোহেন নামটাও বুমবুজাং-এর দেওয়া।‌

সৌরামাতিরাজ ঠিক যতখানি চিৎকার করে কোহেনকে ভর্ৎসনা করল, ঠিক ততখানি গলা চড়িয়ে কোহেন উত্তর দিল, ‌আসগুজাইয়ের রক্ত আমার শরীরে বইছে। সারাজীবন আমার বাবা আসগুজাই রাজার সহচর ছিল। স্তেপের এই যাযাবর মানুষরা একজন আর একজনকে হত্যা করে বেঁচে থাকে। এটা অন্যায় নয়। যে অন্যায় করে, তাকে না-মারাটাই এখানে অন্যায়। এখানে ছেলে বাপকে মারে, বাপ ছেলেকে । এখানে দাদা ভাইকে মারে, ভাই দাদাকে। সুতরাং আমার মা যদি কিছু অন্যায় করে থাকে, আর আমার রাজা বুমবুজাং যদি তাকে হত্যা করতে অস্থত হাতে নেয়, তবে সেটাও অন্যায় নয়। বরং তাকে যে বাঁচাবার জন্যে এগিয়ে আসে অন্যায় তার। তুমি সেই অন্যায় কাজ করেছ। কাজেই সেই অন্যায় কাজের জন্যে এখন যদি আমিই তোমাকে মারি, তবে সেটাই হবে ন্যায়ের কাজ।‌

সৌরামাতির রাজা কোহেনের কথা শুনে রাগে কাঁপতে লাগল থরথর করে। জ্বলে গেল রাজা ভেতরে ভেতরে। হঠাৎ চিৎকার করে হাঁক দিল, ‌এই, কে আছিস?

চোখের পলকে কোহেন তির-ধনুকটা হাতে তুলে নিল। তারপর রাজাকে চোখ রাঙাল, ‌আস্থীলন দেখিয়ো না রাজা! আজ হয় তুমি থাকবে নাহয় আমি। শুধু একটা কথা শুনে রাখো, তুমিও আমার কেউ নও, আমিও তোমার বন্ধু নই। আমরা দু-জনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি দুই শত্রু। এক শত্রুকে খতম করাই তো অন্য শত্রুর দস্তুর।‌

সৌরামাতিরাজ প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, ‌আমার হাতে এখন কোনো অস্থত নেই। নিরস্থত মানুষকে একা পেয়ে যে বীরত্ব দেখায় তাকে আমি ঘৃণা করি।‌

কোহেনও থোড়াই তোয়াক্কা করল রাজাকে। সে উত্তর দিল —‌যে-রাজা আমাদের মতো শত্রুকে হত্যা না-করে তাদের আশ্রয় দেয়, সে-রাজাকেও আমি রাজা বলি না। তাকেও আমি ঘৃণা করি।‌

—‌কোহেন!‌ হঠাৎ কে ডাকল।

চমকে ওঠে কোহেন। এ যেন তার চেনা স্বর। ধনুকে তির জুড়ে চকিতে সে ফিরে তাকাল। এ যে তার মা! শিবিরের পর্দা ঠেলে সে ভেতরে আসছে।

কোহেন মাকে দেখে চিৎকার করে উঠল, ‌তুমি কেন এখানে এসেছ?‌

‌আজ সারাদিন কোথায় ছিলি কোহেন? আজ সারাদিন ধরে তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। সারাদিন তোকে দেখিনি। এখন খুঁজতে খুঁজতে এখানে চলে এসেছি।‌ ভারি বিমর্ষ গলায় উত্তর দিল আনাতুরি।

কোহেন মায়ের কথা শুনল না। মাকে সাবধান করল, ‌তুমি চলে যাও এখান থেকে। আমার হাতে অস্ত্র।‌

এতক্ষণ খেয়াল করেনি আনাতুরি। চকিতে তার নজর গেল কোহেনের হাতের দিকে। চমকে উঠল আনাতুরি। তারপর অস্ফূট স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‌তুই আমায় মারবি?‌

‌না।‌ ঝাঁঝিয়ে উঠল কোহেন, ‌আমি আমার শত্রুকে মারব। যে আমাকে বাধা দেবে, তারও নিস্তার নেই।‌

—‌কে তোর শত্রু?‌ হঠাৎ যেন আনাতুরির গলার স্বর অস্থির হয়ে ওঠে।

—‌ওই আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সৌরামাতিরাজ।‌

‌কোহেন!‌ গর্জে উঠল আনাতুরি, ‌যে-লোকটা তোকে প্রাণে বাঁচাল, তাকে শত্রু বলতে তোর মুখে আটকাল না! ছি:! সৌরামাতিরাজ আমাদের বন্ধু।‌

‌এ কেমন বন্ধু? এই সৌরামাতিরাজই-না আমাদের দলের রাজা বুমবুজাংকে আক্রমণ করেছিল?‌ জিজ্ঞেস করল কোহেন।

‌এই সৌরামাতিরাজই হিংস্র বুমবুজাংয়ের হাত থেকে আমাদের বাঁচিয়েছে। আমাদের দয়া করেছে।‌ উত্তর দিল আনাতুরি।

‌—ছি:! শত্রুর দয়াভিক্ষা নিয়ে আমরা বেঁচে আছি! ওগো মা, আমাদের নিজের রাজা বুমবুজাংকে সাহায্য করতে যদি সেদিন আমরা নিজেদের প্রাণ দিতুম, তবে সেই হত আমাদের বীরের মৃত্যু।‌

—‌ওরে নির্বোধ ছেলে, প্রাণ দিলেই কি বীরত্ব দেখানো যায়? নাকি প্রাণ নিলে দেখানো যায় ক্ষমতা? শোন রে কোহেন, তোর হাতের ওই তির-ধনুকের চেয়ে ভালোবাসার ক্ষমতা অনেক, অনেক বেশি।‌

—‌হা-হা-হা!‌ মায়ের কথা শুনে তাচ্ছিল্যের সুরে হেসে উঠল কোহেন। তারপর তিরের তেকোনা ফলাটা রাজার দিকে তাক করে বলল, ‌এবার তুমি দ্যাখো মা, বীর কাকে বলে!‌

‌কোহেন!‌ উৎকন্ঠায় চিৎকার করে উঠল আনাতুরি। তারপর চোখের পলকে দাঁড়িয়ে পড়ল কোহেনের সামনে, রাজাকে আড়াল করে।

কোহেন উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠল, ‌মা, তুমি সরে যাও!‌

রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগল আনাতুরি। কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‌আগে তুই আমাকে মার। তারপর রাজাকে মারবি। আমি বেঁচে থাকতে সৌরামাতিরাজের গায়ে কে হাত দেয় দেখি!

—‌সরো!‌ মায়ের গায়ে ঝাপটা দিল কোহেন।

ছিটকে গেল মা। সঙ্গেসঙ্গে চিৎকার করে ডাক দিল, ‌সান্ত্রি-ই-ই-ই!‌

সান্ত্রি ছুটে এল।

কিন্তু সান্ত্রি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তির ছুড়ে দিল কোহেন। একেবার সান্ত্রির বুকে।

আর এক সান্ত্রি ছুটে আসার আগেই কোহেনের তির ছুটল। এবার সান্ত্রির বুকে নয়, তির আঘাত করল রাজার বুকে।

আনাতুরি আঁতকে উঠল। সে পারল না রাজাকে রক্ষা করতে। পারল না তার ছেলেকেও বাধা দিতে।

কোহেন চোখের পলক ফেলতে দিল না। একটা দমকা হাওয়ার মতো নিমেষে সব লন্ডভন্ড করে দিল কোহেন। ছুটে বেরিয়ে এল রাজার শিবির থেকে। একটা হিংস্র বাঘের মতো সে লাফ দিল। উঠে পড়ল ঘোড়ার পিঠে। তারপর ঘোড়া ছোটাল। স্তেপের ঘাসের ফাঁকে ঘোড়া ছোটে আর লাফ মারে। এক-একটা লাফ এক-একটা ঢেউ যেন। উদ্দাম সমুদ্রের বুক থেকে ছিটকে পড়ছে।

খবরটা ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো। খবর ছড়াল কোহেন রাজার বুকে তির মেরেছে, পালিয়েছে। রাজার মৃত্যু এখনও হয়নি, রাজা জ্ঞান হারিয়েছে!

রাজার সেনারা ঘোড়া ছোটাল। কোহেনের পিছু নিল। কোহেন ততক্ষণে উধাও! সেনাদের নিশানার অনেক দূরে। আর তাকে ধরে কার সাধ্যি! কিন্তু ধরা পড়ল কোহেনের মা। সৌরামাতির ক্ষিপ্ত মানুষ মারতে উঠল কোহেনের মাকে। তারা চিৎকার করে বলতে লাগল, ‌এমন ছেলের মা মানুষ নয়, ডাইনি। ওকে মারো! মারো!‌

কোহেনের মাকে অবশ্য তখনই মারা হল না। রাজাকে বাঁচাতেই তখন সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠল। রাজবদ্যিরা ছুটে এল। রাজশিবিরের চতুর্দিকে শয়ে শয়ে মানুষ জমায়েত হয়ে চিৎকার করছে, —‌ডাইনি! ডাইনি! ওকে বার করে দাও! ওর চামড়া ছিঁড়ে আমরা গায়ে জড়াব। ওর দেহটা পায়ে দলে মাটিতে পিষে ফেলব!‌

অবশ্য আনাতুরিকে রাজসেনারা সেই উন্মত্ত মানুষের হাতে তুলে দিল না। বন্দি করে রাখল সৌরামাতিরাজের শিবিরেই। রাজা যদি ভালো হয়ে ওঠে, তবে রাজাই করবে তার বিচার। আর যতদিন রাজা ভালো না-হয়, ততদিন আনাতুরি থাকবে বন্দি।

বন্দি হল আনাতুরি। তার মুখ দেখে কে বলবে মরণের ভয়ে সে ধুঁকছে! কে বলবে তাকে ডাইনি! কে বলবে সে সৌরামাতিরাজের শত্রু!

১২

সৌরামাতিরাজকে আঘাত করে কোহেনের ঘোড়া ছুটেছিল ঝড়ের বেগে। সে জানত যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাকে লুকিয়ে পড়তে হবে। এই স্তেপ টপকে লুকিয়ে পড়ার একটাই জায়গা—ওক-পাইনের গভীর বন। কিন্তু সে-বনও তো এখনও অনেক দূরে। সেই বনে পৌঁছোতে তাকে অনেকটা পথ ভাঙতে হবে। পাহাড়ের সুড়ঙ্গ পেরিয়ে নদীর তীর ধরতে হবে। সে তখনও শুনতে পাচ্ছিল সৌরামাতিরাজের সৈন্যদের ধেয়ে আসার চিৎকার। অস্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল ঘোড়ার পায়ের শব্দ। পথঘাট কিছুই জানা নেই কোহেনের। তবু শত্রুর হাত থেকে বাঁচার জন্যে কখনো সে আড়াল পেলে লুকিয়ে পড়ে। নি:সাড়ে। কখনো দাঁড়িয়ে পড়ে। অবশ্য অনেক দূরে একটা পাহাড়ের চুড়ো সে অনেকক্ষণ থেকেই দেখতে পাচ্ছিল। সেই দিকেই তার লক্ষ্য। ওই লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারলে হয়তো সে ফাঁকি দিতে পারবে সৌরামাতির সৈন্যদের। হয়তো সে বেঁচে যাবে।

হ্যাঁ বাঁচাল তাকে ওই পাহাড়টাই। ওই পাহাড়ের অন্ধকারে একটা সুড়ঙ্গপথের সন্ধান পেয়ে গেল কোহেন। ওই সুড়ঙ্গের মধ্যেই সে লুকিয়ে পড়ল। কিন্তু মুশকিলে ফেলল ওই ঘোড়াটা। অসম্ভব ছটফট করছে। নাকে শব্দ করছে, পা ঠুকছে। নিস্তব্ধ সুড়ঙ্গ চমকে চমকে উঠছে। চমকে উঠছে কোহেনেরও বুকটা। ঘোড়াটাকে সে ব্যস্ত হয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু সে-চেষ্টা বৃথা। ঘোড়া তো আর মানুষ নয় যে কথা শুনবে! অগত্যা মাঝে মাঝোই উঁকি মারছিল কোহেন। দেখছিল সুড়ঙ্গের অন্ধকার থেকে বাইরেটা। অবশ্য ঘোড়ার পিঠে শত্রু এলে শব্দ কানে আসবেই। পাহাড়ের পাথরের ওপর দিয়ে তো আর ঘোড়া নি:শব্দে হাঁটতে পারবে না। চাইকি, তার চোখকেও ফাঁকি দিতে পারবে না। তাই কোহেনের চোখের দৃষ্টি সজাগ, কান খাড়া।

অনেকক্ষণ এমনই সতর্ক হয়েই দাঁড়িয়ে রইল কোহেন সেই সুড়ঙ্গে। অথচ এখনও পর্যন্ত কোনো সাড়াও সে পেল না। কারও দেখাও না। সৌরামাতি-সেনার নাগাল থেকে বেশ খানিকটা দূরে ছিল কোহেন। দূরে দূরেই তার ঘোড়া ছুটছিল। কিন্তু তাদের দৃষ্টি ছিল কোহেনের ওপর স্থির। সুতরাং এতক্ষণে তো কোহেনের ধরা পড়ে যাওয়ার কথা! তবে কি ঘোড়সওয়ার সেনাদের চোখকে ফাঁকি দিতে পেরেছে কোহেন! তবে কি সেনারা অন্য পথে ঘুরপাক খাচ্ছে! হবে হয়তো!

তবুও চট করে বেরোল না কোহেন সুড়ঙ্গ থেকে। আরও কিছুক্ষণ ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে রইল সেইখানে। তারপর সত্যিই যখন কারও সাড়া পাওয়া গেল না, তখন সে সুড়ঙ্গ পথের সন্ধান করতে লাগল। অন্ধকার থেকে সে আলো খুঁজতে লাগল।

হ্যাঁ, সে আলো দেখতে পেল। সুড়ঙ্গের অন্ধকার পার হয়ে সে পথের হদিস পেল। কিন্তু সে বুঝতে পারল না কোন অজানা জায়গায় সে এসে পড়েছে। এদিকেও দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের খাড়া পাথর। নির্জনে শোনা যাচ্ছে বাতাসের শব্দ গাছের পাতায়। কোথাও কোথাও মানুষের পায়ে চলার স্পষ্ট চিহ্ন। এইখানেই সে এবার একটু বিশ্রাম নেবে। পাহাড়তলির এদিকে-ওদিকে সবুজ ঘাস দেখা যাচ্ছে। ঘোড়াটার খাওয়া নেই অনেকক্ষণ। এবার তাকে একটু ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। ঘোড়াটা ছাড়া পেয়ে ছুটল ঘাস চিবোতে। ঘোড়া হাঁটছে আর মুখে ঘাস ছিঁড়ছে। অবশ্য কোহেনেরও পেটে অনেকক্ষণ কিছু পড়েনি। নাই পড়ুক, সে খিদে সহ্য করতে পারবে। কিন্তু খিদে পেলে ঘোড়া শুনবে কেন! সুতরাং ঘোড়া ছিঁড়ে-ছিঁড়ে ঘাস খাক। কোহেন বসে বসে তাই দেখুক।

অনেকটা সময় পার হয়ে গেল। অনেকক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হল কোহেনের। মনে হয় ঘোড়াটারও পেট ভরে গেছে। এদিকে আকাশের রোদও পড়তির মুখে। না, আর নয়। কোহেন আবার ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ল। আবার চলল। এবার যে কোথায় চলল, কোহেন নিজেও জানে না। এখনও কি তার মা-র কথা মনে পড়ছে না? এখনও কি তার মন বলছে না, মা ছাড়া তার আর কেউ নেই? আর মায়েরও নেই সে ছাড়া আপন কেউ? না, এখন ওসব ভেবে সময় নষ্ট করতে চায় না কোহেন। কোহেনের শত্রু সৌরামাতিরাজ। তাকে সে তির মেরে পালিয়ে এসেছে। এখন তার ভাবনা, সেই তির রাজার বুকটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছে কি না! মরেছে কি না তার তিরের আঘাতে সেই রাজা! যদি মরে থাকে তবে আনন্দের শেষ নেই তার। কেননা সে মেরেছে এমন এক রাজাকে, যে তার শত্রু। রাজাকে মারতে পারে ক-জনে! একথা যদি রাজা বুমবুজাংয়ের কানে পৌঁছোয়, তবে কোহেনের জীবন সার্থক। কাজেই এখবরটা যত শিগগির সম্ভব রাজা বুমবুজাংয়ের কানে পৌঁছে দিতে হবে। সুতরাং এখন আসগুজাইরাজা বুমবুজাংয়ের ঠিকানাটা কোহেনকে খুঁজে বার করতেই হয়। কিন্তু কেমন করে!

আচ্ছা, রাজা বুমবুজাং কি এখনও বেঁচে আছে? সে তো কবেকার কথা। কোহেন তখন তো নেহাতই দুধের শিশু। তার এই কোহেন নাম সে তো রাজা বুমবুজাংয়েরই রাখা। আবার রাজার ছেলে তিত্তাচিনি যখন যুদ্ধে হেরে গেল, তখন সেই রাজাই তো আবার কোহেনকে অলক্ষুণে বলল। তাকে মারতে গেল! হ্যাঁ, এসব কথা শুনেছে সে সৌরামাতিরাজের মুখে। রাজা যে সত্যি একথা বলেছে, তারই-বা কী প্রমাণ! শত্রু কখনো সত্যি বলে! কক্ষনো না! কিন্তু মা?

না। কোহেন জানে না, পৃথিবীতে মা আর বাবার বড়ো কেউ নেই। তারা আছে বলেই পৃথিবীর বাতাসে আমরা নিশ্বাস নিতে পেরেছি। তারা আছে বলেই আমরা জানি পৃথিবী এত সুন্দর। একটি গাছ, অনেক রঙিন ফুল, অনেক পাখি, অনেক গান, সবই তো পৃথিবীর। কত সুন্দর! আর সেই সুন্দরকে আমরা সুন্দর বলতে পারি বলেই-না আমরাও এত সুন্দর!

এসব কথা বোঝে না কোহেন। শুধু কোহেন কেন, কোহেনের মতো স্তেপের অসংখ্য ঘোড়সওয়ার মানুষও বোঝে না। তারা জানে শুধু লড়াই করতে। শুধু মারো, কাটো আর বাঁচো! একে কি বাঁচা বলে!

ঘোড়া ছুটছে কোহেনের। ঘোড়া যে তার কোথা যাচ্ছে, সে জানে না। কোহেনের সতর্ক দৃষ্টি আঁতিপাঁতি এদিক-ওদিক ঘুরছে। চারদিকে ঘাস। কোথাও সবুজ, কোথাও শুকনো। ঘাসে ঘাসে স্তেপের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। কোনো সাড়া নেই। সাড়া শুধু তার ঘোড়ার খুরে, টগবগ টগবগ। সেই শব্দই হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে।

সাঁই-ই-ই! কী হল! আচমকা একটা তির ছুটে এল কোনখান থেকে! কে কোহেনকে লক্ষ করে তির ছুড়ল! কেউ কি কোহেনকে দেখতে পেয়েছে! কিন্তু কোহেন তো কাউকে দেখতে পাচ্ছে না!

কোহেন থতোমতো খেয়ে থমকে যায়। মুহূর্ত দাঁড়াল। ঝট করে একবার পেছনটা দেখে নিল। আবার ঘোড়া ছোটাল। যদিও সে কাউকে দেখতে পেল না, তবুও সে বুঝতে পারল বিপদ তার পিছু নিয়েছে। সুতরাং এবার ঘোড়ার গতি বাড়ল দ্বিগুণ।

সাঁ-ই-ই! আবার ছুটে এল আর একটা তির। এবারও কোন গোপন জায়গা থেকে তির উড়ে এসে তার ঘোড়ার সামনে পড়ল, বুঝতেই পারল না কোহেন। কিন্তু আঁ‌চ করতে পারল, তিরের লক্ষ্য কোহেন নিজে। আর ঘোড়া ছুটিয়ে পালাবার চেষ্টা করল না কোহেন, সে থামল। মনে মনে ভাবল, শত্রু যদি সত্যিই তাকে নিশানা করে থাকে, তবে মিথ্যে তার পালানোর চেষ্টা। সে একা। শত্রু তার একা নাও হতে পারে। যে একা অনেক জনের সঙ্গে লড়াই করতে যায়, সে আহাম্মক। কাজেই কোহেন দাঁড়িয়ে তার ধনুকে হাত পর্যন্ত ঠেকাল না। সে হাত তুলে দিল আকাশে।

মুহূর্তের মধ্যে অজানা সওয়ারির ঘোড়া ছুটে এল তিন দিক থেকে। দশটা ঘোড়া। দশ জন ঘোড়সওয়ার। দশ জন লুঠেরা। স্তেপের এই নির্জনে ওঁরা ওত পেতে বসে আছে শিকার এলেই ধরবে। সব কেড়ে নেবে। একা কারও সাধ্যি নেই ওদের চোখে ধুলো দিয়ে পালায়। কোহেনও পারল না।

দশ ঘোড়ার দশ সওয়ারি ঘিরে ধরল কোহেনকে।

‌কী চাই তোমাদের?‌ খুব ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল কোহেন।

‌কী আছে তোর কাছে?‌ দলের সর্দার তেড়েমেড়ে জিজ্ঞেস করল।

‌কিচ্ছু নেই।‌ উত্তর দিল কোহেন নির্ভয়ে।

দশ ঘোড়ার দশ সওয়ারি হো-হো-হো করে হেসে উঠল কোহেনের কথা শুনে। হাসতে হাসতে সর্দারটা এগিয়ে এল কোহেনের কাছে। তারপর মেজাজ তিরিক্ষি করে বলল, ‌কিছু না-থাকলেও ক্ষতি নেই। তুই তো আছিস। তোর মাথার খুলিটা তো আর ফেলনা নয়। তোর মাথাটা দেখে মনে হচ্ছে, একটা দামি পানপাত্র করা যাবে মাথার খুলিটা দিয়ে।‌

কোহেন চুপ করে থাকল।

সর্দার কড়কে উঠল, ‌চুপ করে থাকলে কেমন করে চলবে! দেখা কী আছে তোর কাছে!

কোহেন ঘোড়ার পিঠে বসেবসেই আবার বলল, ‌তোমরা নিজেই তল্লাশি করে দেখতে পারো।‌ বলে আবার আকাশে হাত তুলল।

লুঠেরার সর্দার চ্যাঁচাল, ‌এই, তোরা এর তির-ধনুকটা কেড়ে নে!

দশ সওয়ারির এক সওয়ারি কোহেনের কাছে এল। কোহেনের তির-ধনুকটা কেড়ে নিল। কোহেনের মুখ দিয়ে একটা টুঁ শব্দ পর্যন্ত বেরোল না।

সর্দার আবার হুকুম জারি করল, ‌দ্যাখ, এর কাছে আর কী আছে!‌ এবার দশ সওয়ারির তিন সওয়ারি কোহেনের পোশাক হাঁটকাতে লাগল।

আসলে, কোহেনের কাছ থেকে কিছুই তো পাওয়ার কথা নয়। কী অবস্থায় কোহেন এখানে পালিয়ে এসেছে, সেকথাই-বা কে-না জানে! যাও-বা তির-ধনুক ছিল, তাও গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মরা ছাড়া আর গত্যন্তর নেই। কোহেন এখন একা। একা অতজনের সঙ্গে যুঝতে পারা যায়! সে জানে, প্রথমেই ধড় থেকে তার মাথাটা কাটা হবে। তারপর ছিঁড়ে নেওয়া হবে তার দেহ থেকে ছালচামড়া। কাজ শেষ হলে তার দেহটা এইখানেই পড়ে থাকবে। লুঠেরার দল ছুটবে আর একজনকে ধরতে। এমনই করে সারাদিনে কত মানুষ যে তাদের শিকার হবে, কেউ জানে না।

আশ্চর্য, এইসব ভয়ংকর কথা ভাবতে কোহেনের বুক এখন আর একটুও কাঁপে না। খুন দেখে দেখে এসব ভাবনা এখন আর কিচ্ছু না তার কাছে। তার শুধু একটাই আপশোস, সৌরামাতির রাজাকে সে তির ছুড়ে আঘাত করল, কিন্তু রাজাটা মরল কি না সে দেখে আসতে পারল না। আর তার মা-রও যে কী হল, তাও জানতে পারল না।

হঠাৎ যেন দূরে একটা শোরগোল উঠল। সঙ্গেসঙ্গে সেই লুঠেরার দল অস্থির হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‌সামাল! সামাল!‌ চোখের পলকে তারা ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে বসল, বসেই কোহেনের হাতটা জাপটে ধরল দলের সর্দারটা। তারপর হাঁক দিল নিজের দলের লোকদের, ‌ঘোড়া ছোটাও-ও-ও!‌

দশ সওয়ারির ঘোড়া ছুটল। সর্দারের হাতের টানে কোহেনও ছুটল মাটিতে, ঘোড়ার সঙ্গে টালমাটাল করতে করতে। কিন্তু ঘোড়ার সঙ্গে কোহেন কখনো ছুটতে পারে। মাটিতে ঘষটাচ্ছে, পা কাটছে, ছড়ে যাচ্ছে। হাঁপাচ্ছে, দম বেরিয়ে যাচ্ছে। কোহেনের দফা শেষ হয়ে যায়!

এমন চটজলদি সব ব্যাপারটা ঘটে গেল! ধাঁধা লেগে যাওয়ার গোত্তর! কোত্থেকে যে হল্লা উঠল! আর কেনই-বা এই লোকগুলো পালায়, কিছুই বোঝা যায় না। তবে কি এদের পেছনেও আরও দুর্ধর্ষ একঝাঁক দস্যু ধাওয়া করেছে!

না, দস্যু নয়। ছুটে আসছে একদল ঘোড়সওয়ার সৈনিক। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরেই ওই সৈনিকের দল এদের খোঁজ-তল্লাশি করছিল। নজরে পড়ে গেছে, তাই চিৎকার করে তাড়া লাগিয়েছে।

দু-দলেরই ঘোড়া ছুটছে। আকাশ ছেয়ে ধুলো উড়ছে। শব্দ উঠছে। ঘোড়া চ্যাঁচাচ্ছে। এদিকে প্রাণ যাচ্ছে কোহেনের। সে নিজেকে সর্দারের মুঠো থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কী আপ্রাণ চেষ্টা-না করছে! কিন্তু যতই চেষ্টা করছে, ততই সর্দারের মুঠো শক্ত হচ্ছে। একদিন কোহেনের মা আনাতুরিও ঠিক এমনই বিপদে পড়েছিল। তবে সেদিন তাকে যারা টেনে-হিঁচড়ে নাকাল করেছিল তারা লুঠেরা ছিল না। তারা সৌরামাতিরাজের সেনা! তা হোক, কিন্তু বিপদের ধরন তো একই রকমের।

কিন্তু আর যেন পারছে না কোহেন। এখন সে নিজে ছুটছে না। নিজে ছোটার আর শক্তিই নেই তার। বলা যায়, সর্দার তাকে টানছে। কোহেন ঘষটাতে ঘষটাতে লাট খাচ্ছে।

এদিকে সেনারা ধরে ফেলে প্রায় সেই দলটাকে। এই ধরা পড়ল বলে দলের সর্দারটা! না, আর সে টানতে পারছে না কোহেনকে। যতই টানছে, ঘোড়াও তার কোহেনের ভারে ততই দমসম হয়ে পড়ছে। ঘোড়ার ছুটতে কষ্ট হচ্ছে। সর্দার বুঝল ছেলেটাকে আর টানা যাবে না। তার ভারে ঘোড়ার বেগ কমছে। একে ছেড়ে না-দিয়ে আর উপায় নেই। কাজেই কোহেনের মায়া ত্যাগ করল লুঠেরা-সর্দার। সর্দারের হাতের মুঠো খুলে গেল। কোহেন ছাড়া পেল। কিন্তু সে নিজে আর পালাতে পারল না। সে-শক্তি তার কোথায় তখন! যেখানে কোহেন ছাড়া পেল, সেখানেই পড়ে রইল। যেন একটা আধমরা মানুষ হাঁপাচ্ছে। হয়তো আর একটু পরেই দম ফেটে সে মরে যাবে।

দেখতে দেখতে তেড়ে-আসা ঘোড়সওয়ার সেনারা হুড়মুড় করে এসে কোহেনকে ঘিরে ফেলল। কোহেন ধরা পড়ে গেল। অবশ্য কোহেনকে ধরতে তেমন কসরত করার দরকারই পড়ল না সেনাদের। প্রায় মরেই আছে, তাকে ধরার জন্যে মাথার ঘাম পায়ে ফেলার কথাই ওঠে না।

না, মরল না কোহেন। যাদের হাতে ধরা পড়ল কোহেন, সেই সেনারাও তাকে আর আঘাত করল না। কোহেনের গায়ের জামাটা দেখে তারা থমকে গেল। তারা বুঝতে পারল, ছেলেটা সৌরামাতির লোক। সৌরামাতির লোক মানেই তো শত্রুপক্ষ। সুতরাং নিয়ে চলল তারা কোহেনকে তাদের নিজের দলের রাজার কাছে রাজার শিবিরে। রাজা? এ আবার কোন রাজা?

১৩

যে রাজার সামনে কোহেনকে হাজির করা হল, সে এক বুড়ো থুত্থুড়ে রাজা। রাজার বয়স হয়েছে যেমন, চুলও পেকেছে তেমন। বলিরেখা দেখা যাচ্ছে চোখে-মুখে। বেঁকেছে শিরদাঁড়া, আর ক-দিন পরে হয়তো কোমরটাও ভাঙবে। চোখের দৃষ্টিও কমেছে। কিন্তু তবু মনে হয়, তার দৃষ্টিতে কেমন যেন একটা সন্দেহের চাউনি। সেই সন্দেহভরা দৃষ্টি মেলেই কুতকুত করে দেখছে কোহেনকে রাজা। দেখতে দেখতে একটা ভীষণ ক্রূর গলায় রাজা কথা বলল, ‌কোথা ছিল এই জোয়ান ছেলেটা?‌ কথা বলতেই বোঝা গেল রাজার গলা ভেঙেছে। কাঁপছে গলার স্বর।

‌—একদল ঠগ ছেলেটাকে ফেলে পালাল।‌ বোধ হয় সেই সৈনিকদলের নায়ক উত্তর দিল।

‌ছেলেটাও কি ঠগের দলে ছিল?‌ জিজ্ঞেস করল রাজা।

‌সেটা বোঝা গেল না।‌ উত্তর দিল নায়ক।

‌এর কাছ থেকে কিছু পাওয়া গেছে?‌ আবার জিজ্ঞেস করল রাজা।

—‌আজ্ঞে না।‌

‌—তবে এর মাথাটা কেটে ফ্যালো!‌ আদেশ দিল রাজা।

রাজার আদেশ শোনার সঙ্গেসঙ্গে কথা বলল কোহেন। তার গলায় স্বর খুবই ক্ষীণ। সেই ক্ষীণ স্বরে সে বলল, ‌আমার মরতে ভয় নেই, তবে মরবার আগে আমি একটা কথা বলে যেতে চাই। বলে যেতে চাই, আমি ঠগ নই। আমি আমার এক শত্রুর খপ্পর থেকে পালাতে গিয়ে ওই ঠগের হাতে ধরা পড়ি।‌

‌কে তোর শত্রু?‌ বুড়ো রাজা গলায় বেশ জোর দিয়েই জিজ্ঞেস করল কোহেনকে।

‌সৌরামাতির রাজা।‌ উত্তর দিল কোহেন।

সৌরামাতি রাজার নাম শুনে যেন থতোমতো খেয়ে গেল এই থুত্থুড়ে রাজা। মুহূর্তের জন্য রাজা কথা হারাল। চমকে তাকাল কোহেনের মুখের দিকে। তারপর কেউ কিছু বুঝে ফেলার আগেই গলাখাঁকারি দিল। হুঁশিয়ার হয়ে গেল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‌শত্রুর হাতে তুই ধরা পড়লি কেমন করে?‌

‌আমি ধরা পড়িনি। আমার মা ধরা দিয়েছে।‌

কোহেনের উত্তর শুনে আনচান করে উঠল রাজা। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌তোর মা ধরা দিয়েছে?‌

—‌হ্যাঁ।‌

‌—তোর মা কোন দলে ছিল?‌

‌—আমার মা ছিল আসগুজাই দলে।‌

ছমছম করে উঠল রাজার বুকের ভেতরটা। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌তোর মায়ের নাম?‌

—আনাতুরি।‌

—‌তোর বাবার নাম?‌

—‌স্তান।‌

‌—তাকে তুই দেখেছিস?‌

—‌আমি তখন সবে জন্মেছি। নেহাতই শিশু। মনে নেই।‌

—‌তোর নাম?‌

—‌কোহেন।‌

এক-একটা উত্তর শুনছে বুড়ো রাজা। একটু একটু করে তার চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে পড়ছে। ভীষণ উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে রাজা জিজ্ঞেস করল, ‌তুই কোথায় পালাচ্ছিলি?‌

‌—আসগুজাইয়ের রাজা বুমবুজাংয়ের কাছে।‌

—‌কেন?‌

—‌আসগুজাইয়ের রাজাই তো আমার রাজা। আমি তো আসগুজাই দলে জন্মেছি। আমি রাজা বুমবুজাংয়ের কাছে গিয়ে সাহায্য চাইব।‌

—‌কীসের সাহায্য?‌

‌—আমি তাকে বলব, আমার মাকে আমি উদ্ধার করব। তুমি আমায় ফৌজ দাও!‌

‌—পারবি?‌

—‌কেন পারব না! আমি সৌরামাতিরাজের বুকে তির মেরে পালিয়ে এসেছি।‌

‌সে মরেছে?‌ বুড়ো ভীষণ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

‌—তার বুকে তির গেঁথেছে।‌

‌—তার রক্ত দেখেছিস?‌

—‌দাঁড়িয়ে দেখার সময় পাইনি।‌

‌সে যদি মরে না-থাকে?‌

‌—আবার মারব।‌

শাবাশ!‌ আচমকাই বুড়ো রাজা উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল।

কোহেন নিজেও যেন হকচকিয়ে গেল। তারপর বুড়ো রাজা চিৎকার করে সেনাদের আদেশ করল, ‌না, একে মারতে হবে না। একে ছেড়ে দাও!‌

রাজার সেনারা রাজার আদেশ শুনে থ হয়ে গেল।

রাজার সেনারাও যেমন থ হল, তেমনি কোহেনও কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নির্বাক হয়ে গেল। সে বিশ্বাসই করতে পারছিল না রাজা তাকে মুক্তি দিয়েছে।

রাজার সেনারা কোহেনকে মুক্ত করে দিল। তখন রাজা কোহেনকে বলল, ‌ভাবিস না আমি তোকে রেহাই দিলুম বরাবরের জন্যে। এখনকার মতো তুই ছাড়া পেলি। এখন থেকে তুই আমার জিম্মায় থাকবি। তোর সাহসের কথা শুনেই আমি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সৌরামাতিরাজের বুকে যখন তির মেরেছিস, তখন মনে হয় সে মরেছে। আর যদি মরে না-থাকে, তুই যদি তাকে মারতে পারিস আমি তোকে অনেক ইনাম দেব। আর, তার ওপর তুই যদি সৌরামাতিরাজের খলর থেকে তোর মাকে উদ্ধার করে আনতে পারিস, তবে তোকে আমার সেনাপতি করে দেব। তোর এই কাজে যত সেনা লাগে, তুই পাবি। যত ঘোড়া লাগে, তা-ও তুই পাবি। অস্ত্রশস্ত্র সবই তুই পেয়ে যাবি।‌

এই বুড়ো রাজার হঠাৎ এমন কোহেনের ওপর দরদ দেখলে কে-না অবাক হবে! না চাইতেই রাজা কোহেনকে গায়ে পড়ে কেন যে সাহায্য করতে চাইছে, তার হাটহদ্দ কিছুই উদ্ধার করতে পারল না সে। কোহেন আস্ত একটা বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

রাজা বোধ হয় বুঝতে পেরেছে, ছেলেটা তাকে বিশ্বাস করছে না। তাই কোহেনকে আরও অবাক করে দিয়ে রাজা যখন তাকে বলল, ‌তোর ওই কোহেন নামটা আমারই দেওয়া‌, তখন আরও ঘাবড়ে গেল। শুধু তাই নয়, রাজা যখন তার ঘাড়ের একটা আঘাত কোহেনকে দেখিয়ে বলল, ‌এই দ্যাখ, আমার ঘাড়ে এই যে আঘাতের চিহ্নটা দেখতে পাচ্ছিস, এটা তোর মায়ের হাতের আঘাত। আর তোর সামনে যে-রাজাকে তুই দেখতে পাচ্ছিস, সে-ই তোর আসগুজাইরাজা বুমবুজাং। তখন সত্যিসত্যি কোহেন বোবা হয়ে গেল। রাজা আবার বলল, ‌তোর বাবা স্তান ছিল আমার বিশ্বস্ত সহচর। সে আমার আদেশ শোনেনি। তাই আমি...না, সেসব কথা আর শোনার দরকার নেই। এখন দরকার সৌরামাতি থেকে তোর মাকে উদ্ধার করে আনা। আর সৌরামাতির রাজা যদি না-মরে থাকে, তবে সেই কাজটা শেষ করে ফেলা। তুই সেই কাজ পারবি আমার দৃঢ় বিশ্বাস। এগিয়ে চল।‌

রাজার কথা শুনে কোহেনের কেমন সব এলোমেলো হয়ে গেল। তবে কি একেই বলে বরাত! এমন আচম্বিতে যে রাজা বুমবুজাংয়ের কাছে সে পৌঁছে যাবে, একথা সে ভাবতেই পারেনি। সুতরাং আর ভাবনা কী!

এবার কোহেনের বীরত্ব দেখানোর পালা। এ বীরত্ব দেখাবে সে তার মাকে। দেখাবে ভালোবাসা নয়, অস্ত্রই মানুষের বড়ো শক্তি।

১৪

রাজবদ্যিদের অনেকক্ষণ অনেক চেষ্টায় সৌরামাতিরাজের জ্ঞান ফিরে এসেছিল। অসংখ্য মানুষের কানে খবরটা পৌঁছে গেল নিমেষের মধ্যে। উৎকন্ঠায় অস্থির সেই মানুষগুলোর তখন সে কী আনন্দের হুল্লোড়।

আকাশ কাঁপিয়ে তারা চিৎকার করে উঠল। কাঁচা বয়সের ছেলেরা উল্লাসে লাফাচ্ছে। ঝাঁপিয়ে পড়ছে আগুনের ভেতর। দাউদাউ করে জ্বলে ছাই হয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ নিজেরাই নিজেদের রক্ত ছড়িয়ে দিচ্ছে চারদিকে। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে অসংখ্য মানুষেরই পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ছে সমর্থ মানুষ, পিষে যাচ্ছে পায়ের চাপে। মরতে মরতে তারা চ্যাঁচাচ্ছে, ‌রাজা, তুমি দীর্ঘজীবী হও!‌

রাজা দীর্ঘজীবী হবে কি না সে পরের কথা, কিন্তু আপাতত রাজা বেঁচে উঠেছে। কোহেনের ছোড়া তির সৌরামাতিরাজের হৃৎপিন্ডে আঘাত করতে পারেনি। রক্ত ঝরেছে, কিন্তু জীবনের তাতে ক্ষতি হয়নি। রক্ষা পেয়েছে রাজা। এখন রাজা কী আদেশ করবে? রাজা কি এখন কোহেনের মা আনাতুরিকে হত্যা করার হুকুম দেবে?

রাজা যতদিন-না সম্পূর্ণ সুস্থ হল, ততদিনই আনাতুরি বন্দি হয়ে পড়ে রইল। রাজা যেদিন আনাতুরির বিচারের জন্যে সভা ডাকল, সেই দিনই আনাতুরিকে রাজার সামনে হাজির করা হল।

সৌরামাতিরাজকে দেখে বন্দি আনাতুরি স্থির। তার হাতে-পায়ে শেকল। সেই বন্দি-শেকলের শব্দ কেউ শুনতে পেল না।

রাজার দৃষ্টি পলকহীন।

আনাতুরি আনত।

রাজা গম্ভীর। জিজ্ঞেস করল, ‌তোমার কী বলার আছে আনাতুরি?‌

আনাতুরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর ধীর গলায় উত্তর দিল, ‌আমার আপশোস, আমার হাতের এত কাছে থেকেও পালিয়ে গেল ছেলেটা। আমি তাকে ধরতে পারিনি। এই একটি অপরাধেই আমার মৃত্যুদন্ড হওয়া উচিত।‌

সৌরামাতিরাজ মুহূর্তের জন্য অবাক চোখে তাকাল আনাতুরির চোখের দিকে। বোধ হয় রাজা ভাবতে পারেনি আনাতুরির মুখে এমন কঠিন কথা শুনতে পাবে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‌সে যদি তোমার হাতে ধরা পড়ত, তুমি কী করতে?‌

এবার দৃঢ় গলায় আনাতুরি উত্তর দিল, ‌রাজা, আমার ছেলের তিরের আঘাতে তোমার বুকের যত রক্ত ঝরেছে, আমার ছেলেকে ধরতে পারলে আমি তার বুক ফুটো করে তত রক্ত তোমাকে উপহার দিতুম।‌

রাজা বলল, ‌এখন যদি বলি, তোমার ছেলে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করছে এ দেখেও তাকে তুমি ইচ্ছে করে ধরোনি! যদি বলি তোমার ছেলে বলে তুমি তাকে বাঁচতে সাহায্য করেছ!‌

আনাতুরি উত্তর দিল, ‌রাজা, একথা তুমি বলতেই পারো। কারণ আমার মনের কথা এখন যদি আমি চিৎকার করে গলা ফাটিয়েও বলি, তুমি বিশ্বাস করবে না। বিশ্বাস করা উচিতও না। কেননা, কোনো মা এমন নির্দয় হতে পারে? কোনো নির্দয় মা ইচ্ছে করে তার ছেলেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়?‌

‌তবে কি তুমি মৃত্যুদন্ডই চাইছ?‌ জিজ্ঞেস করল রাজা।

—‌হ্যাঁ।‌ দৃঢ় গলায় উত্তর দিল আনাতুরি। পরক্ষণেই আবার বলল, ‌শুধু মৃত্যুর আগে ছেলেটাকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে যেতে পারলুম না, এই দুঃখ আমার থেকে গেল।‌

‌—বেঁচে থাকলে তাকে তুমি কী শাস্তি দিতে?‌

—‌ওই যে বললুম, তোমার বুকে তির ছুড়ে সে যেমন করে আঘাত করেছিল, তেমনই করে আমিও তার বুকটা ঝাঁঝরা করে দিতুম।‌

—‌ছেলেকে হত্যা করতে তোমার হাত কাঁপত না? তুমি তো মা।‌

রাজার এই কথা শুনে আনাতুরি চমকে উঠল। তারপর খুবই অসহায়ের মতো রাজার মুখের দিকে চোখ ফেরাল। তার চোখে জল। যেন মনে হল, একটা আহত মানুষ কথা বলার জন্য আকুলিবিকুলি করছে, কিন্তু কথা বলতে পারছে না। শুধু তার গাল দুটি চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে।

‌কী হল? তুমি কথা বলছ না যে?‌ রাজা জিজ্ঞেস করল।

আনাতুরি তবু কথা বলল না। বলা যায়, বলতে পারল না।

রাজা আনাতুরিকে কথা বলতে না-দেখে আবার বলল, ‌তুমি আমার কথার উত্তর দাও। আমার বিচারের দেরি হয়ে যাচ্ছে।‌

আনাতুরি এবার তার চোয়াল শক্ত করল। সিধে হয়ে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‌রাজা, একদিন স্তানের মৃতদেহের ওপর আমার চোখের জল ফেলে প্রতিজ্ঞা করেছিলুম, হিংসা নয়, আমার ছেলেকে ভালোবাসতে শেখাব। হিংসার প্রতিশোধ নেবে সে ভালোবেসে। কিন্তু আজ আমি তোমার কাছে প্রতিজ্ঞা করছি, ভালোবাসা নয়, আমার ছেলের রক্ত তোমাকে উপহার দেব। এই হবে তোমার প্রতি তার অকৃতজ্ঞতার প্রতিশোধ।‌

বলতে বলতে আনাতুরি আর বুঝি পারল না। কান্নায় ভেঙে পড়ল।

রাজা হাঁক দিল, ‌সান্ত্রি-ই-ই-ই!‌

সান্ত্রি ছুটে এল।

—আনাতুরির বন্দি-শেকল খুলে দাও!‌

সেখানে তখন যত ছিল সেনা, যত ছিল সেনাপতি, সবাই থ হয়ে গেল রাজার আদেশ শুনে। রাজা তাকে মুক্ত করে দিচ্ছে, একথা আনাতুরি নিজেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। সে হতচকিত। তাই আনাতুরি অস্থপষ্ট স্বরে বলে ফেলল, ‌রাজা!‌

‌—হ্যাঁ।‌ রাজা ঘাড় নাড়ল। বলল, ‌আমি তোমায় মুক্তি দিচ্ছি। আমি তোমায় অবিশ্বাস করিনি কেনোদিন, আজও করি না। তবে শুনে রাখো আনাতুরি, তোমার ছেলের খবর আমি জানি।‌

চমকে চাইল আনাতুরি। জিজ্ঞেস করল ব্যস্ত হয়ে, ‌কোথায় সে?‌

রাজা উত্তর দিল, ‌সে পালিয়েছে আসগুজাই রাজা বুমবুজাংয়ের আস্তানায়।‌

‌—তবে কি বুমবুজাং এখনও বেঁচে আছে?‌ অবাক হল আনাতুরি।

‌হ্যাঁ, বেঁচে আছে।‌ রাজা বলল, ‌তোমার ছেলে তার কাছে আমাদের সব খবর পৌঁছে দিয়েছে। তোমার ছেলে রাজা বুমবুজাংয়ের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার ফন্দি আঁটছে। তৈরি হচ্ছে আমাকে হত্যা করার জন্যে। অবশ্য সে এখনও জানে না, তার তিরের আঘাতে আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি।‌

সৌরামাতিরাজের কথা শুনতে শুনতে আনাতুরিরও চোখের দৃষ্টি কেমন যেন ক্রোধে দপদপ করে জ্বলে উঠছে। ক্রুদ্ধ গলায় সে বলে উঠল, ‌তা যদি সত্যি হয়, তবে শুনে রাখো রাজা, তার এই শয়তানি আমি রুখবই।‌

‌—তুমি!‌ রাজার গলায় বিস্ময়।

‌—হ্যাঁ, আমি।‌ আনাতুরির নির্ভয় উত্তর, ‌শোনো রাজা, তোমার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করার ষড়যন্ত্র করে, তার বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করব।‌

‌তোমার ছেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে?‌ আনাতুরির মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল রাজা।

‌হ্যাঁ রাজা, আমার ছেলের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ করব। এই যুদ্ধে হয় আমি মরব, নাহয় সে। রাজা, তুমি আমাকে একটা ঘোড়া দাও! আমাকে তুমি অস্ত্র দাও! তোমার বিশ্বস্ত ক-জন ঘোড়সওয়ার সেনা দাও! দ্যাখো আমি পারি কি না।‌

রাজা অবাক স্বরে বলল, ‌তুমি কখনো যুদ্ধ করোনি। তুমি পারবে কেমন করে?‌

আনাতুরি এক কঠিন শপথ করার মতো চিৎকার করে উঠল, ‌—পারব, পারব, পারব। নয়তো মরব। আর তুমি যদি রাজি না-হও, তবে রাজা আমি একাই আমার রাস্ত খুঁজে নেব।‌

রাজা বলল, ‌ঠিক আছে, আমায় ভাবতে দাও।‌

পুরো একটা দিন ভেবেছিল রাজা। পুরো একদিন পরে সৌরামাতিরাজ তলব করেছিল আনাতুরিকে। সকলকে অবাক করে আনাতুরিকে বলেছিল, আনাতুরি, আমি মনস্থির করেছি। আমি তোমার ছেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি। আমি দেখতে চাই, মা আর ছেলের এই যুদ্ধে তুমি জয়ী হও। আমি দেখতে চাই ভালোবাসার জয়, হিংসার নয়। আনাতুরি, আমরা অসভ্য বর্বর মানুষ। মানুষকে হত্যা করা আমাদের পেশা। আমরা ভালোবাসি রক্ত—মানুষের রক্ত। আমরা ভালোবাসি প্রতিহিংসা। তোমার মতো মা আমরা পাইনি কোনোদিন। আমার বংশের কোনো মা কোনোদিনই বলেনি, হত্যা নয়, মানুষকে ভালোবাসো, তাহলে পৃথিবী সুন্দর হবে। আমরা সবাই সুন্দর হব। হ্যাঁ আনাতুরি, তাই তোমাকে দেখে আমার এত কষ্ট হয়। আমি তোমাকে দেখি আর ভাবি, তুমি একা একজন মা ছেলেকে সুন্দর করার জন্যে একাই লড়াই করছ। একাই একজন মা আকুল হয়ে কেঁদে বেড়াচ্ছে ছেলের জন্যে। বলছে, ‌ভালোবাসো, ভালোবাসো, সবাইকে ভালোবাসো।‌ কিন্তু মিথ্যে তোমার কান্না। সেই ছেলেই তুলছে মায়ের বুকের ওপর তির। এ কী ভয়ংকার পাপ। এ পাপের শেষ হয়তো তুমিই করতে পারো। আনাতুরি, ছেলের বিরুদ্ধে তুমি লড়াই করলে, আমি তাই তোমার পক্ষে। তুমি যদি জেতো, আমি আমার সকল মানুষের হাত থেকে অস্ত্র চেয়ে নিয়ে বলব, অস্ত্র নয়, জয় হয়েছে ভালোবাসার। আর তুমি যদি পরাজিত হও, তবে জানব আমরা জঘন্য পশু। চিরদিন এমন পশুই থাকব, যেমন এখন আছি।‌

সৌরামাতিরাজের কথা শুনতে শুনতে আনাতুরির দু-চোখ ভরে অশ্রু উছলে পড়ছিল। কাঁদছিল একজন মা, যে ছেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাবে। সে-যুদ্ধে কে জিতবে কেউ জানে না। কে বাঁচবে, কে মরবে, কারও জানা নেই। যদি আনাতুরি মরে, তবে তো তার খেদ থাকে না একটুও। কিন্তু আনাতুরির অস্ত্রের আঘাতে ছেলেটাই যদি মরে যায়! তাই যুদ্ধে যাওয়ার আগে আনাতুরি যখন যুদ্ধের সাজসজ্জায় নিজেকে সাজাচ্ছিল, তখনও সে কেঁদেছে। যুদ্ধ-সাজ গায়ে পরে, ঘোড়ায় চড়ে সে যখন তির-ধনুক হাতে নিয়েছিল, তখনও তার চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছিল। কিন্তু যখন সে ঘোড়ার লাগাম ধরে টান মারল, ঘোড়া ছুটল শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে, তখন আর জল নেই তার চোখে। তখন একজন দুঃসাহসী সেনার মতো তার মুখখানা ঝলসে উঠছে। হাঁক দিয়ে ডাক দিচ্ছে আনাতুরি তার সৈন্যদের, ‌নির্ভীক—সৈনিক, তোমাদের অস্ত্র তৈরি রাখো! ছোটাও ঘোড়া। জয় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছে।‌

১৫

আনাতুরির ঘোড়া ছুটছে। ঘোড়ার পিঠে বসে আনাতুরি ছুটল তার ছেলে কোহেনের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিশোধ নিতে। ঘোড়া ছুটেছে সৌরামাতির সৈন্যদলের। স্তেপের বাতাসে ঝঞ্ঝার মতো শব্দ তুলে ধেয়ে যায় সৈন্যদলের ঘোড়া। স্তেপের নদীর তরঙ্গে বেজে উঠল দুঃসাহসের জয়গান। পাহাড়ের পাথরে পাথরে শোনা গেল সেই বীরগানের প্রতিধবনি।

চার হাজার বছর আগের একথা এখন কারও জানার কথা নয়। চার হাজার বছর আগে আনাতুরি নামে এক মায়ের এই বীরগাথা কেউ লিখেও যায়নি। কে লিখবে! এই দুর্ধর্ষ একরোখা যুদ্ধবাজের দল শুধু জানত যুদ্ধই করতে। ঘোড়াই তাদের সঙ্গী, আর সঙ্গী তির-ধনুক। তবু কেউ যদি হঠাৎ এখনও স্তেপের সেই ঘাসের রাজ্যে পৌঁছে যাও, যদি কান পেতে শোনার চেষ্টা করো, তবে হয়তো শুনতে পাবে আনাতুরি আর তার ঘোড়সওয়ার-সেনার এই গল্প ছড়িয়ে পড়ছে বাতাসে চারদিকে। শুনতে পাবে, আনাতুরি-মায়ের সেই ডাক, ‌—হে সৈনিকের দল, আমরা শত্রুর সীমানায় ঢুকে পড়েছি। অস্ত্র তৈরি রাখো। শত্রুকে হত্যা করার আগে নিজের প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করো। আমার সৈনিকের একটি প্রাণ, হাজার প্রাণের চেয়েও অনেক গুণ দামি।‌

মায়ের হাতে বন্দি-শেকল পরিয়ে দিয়েছে কোহেন । বন্দি মাকে সে নিয়ে এসেছে রাজা বুমবুজাংয়ের শিবিরে ।

সৌরামাতির সৈন্যরা ধেয়ে আসছে। খবরটা আসগুজাই রাজা বুমবুজাংয়ের কানে পৌঁছোতে বেশি সময় লাগেনি। সঙ্গেসঙ্গে বুমবুজাংয়ের সৈন্যরা তৈরি। রাজা বুমবুজাং যুদ্ধের হাঁক দিয়ে সৈন্যদের আদেশ করল, ‌যাও, শত্রুকে আঘাত করো! মরতে ভয় পেয়ো না। তোমাদের মাথা যায় তবু ভালো, কিন্তু শত্রুর মাথা জয় করতে ভুল কোরো না। যে যত মাথা জয় করবে, তার জন্য আমার কাছে আছে ততগুলোই পুরস্কার।‌

—‌রাজন!‌

কে ডাকল! চমকে ওঠে রাজা বুমবুজাং।

‌—আমি। কোহেন।‌ রাজার সামনে হঠাৎ সে দাঁড়াল।

রাজা বুমবুজাং কোহেনকে দেখে চিৎকার করে উঠল, ‌তৈরি হয়ে নে। শত্রু আমাদের সীমানায় ঢুকে পড়েছে।‌

‌শত্রু কারা, তুমি কি জানো?‌ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল কোহেন।

‌সৌরামাতি।‌ উত্তর দিল বুমবুজাং।

—‌তবে কি সৌরামাতিরাজ জানতে পেরেছিল, আমরা তাদের আক্রমণ করে আমার মাকে উদ্ধার করে আনব?‌

‌আমার জানা নেই।‌ রাজার উত্তর।

বাইরে শুরু হয়ে গেছে সাজ সাজ রব। চিৎকার-চেঁচামেচি। হঠাৎ এমনসময় রাজা বুমবুজাংয়ের একজন সহচর ছুটে এসে চিৎকার করে উঠল, —‌রাজামশাই, সৌরামাতির এই ফৌজের প্রধান একজন মেয়ে।‌

‌কে?‌ থমকে গেল রাজা বুমবুজাং। ‌আমাদের এই স্তেপে মেয়েদের জায়গা গাড়ি-ঘরে, যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। ফৌজের প্রধান এই মেয়েটি কে?‌

‌আমি জানি সে কে!‌ বলে কোহেন আর অপেক্ষা করল না। ছুট দিল। না, ছুটতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর বলল, ‌আমি এক্ষুনি আসছি। মহারাজ, তুমি এখানেই থাকো। দ্যাখো, আমি তোমার সামনে কাকে ধরে আনি!‌

এবার ঘোড়া ছুটল কোহেনের। তার কোমরে বাঁধা ধারালো অস্ত্র। কাঁধে ঝোলানো ধনুক, পিঠে তূণ—তাতে তির। সে ছুটছে, পেছনে ছুটছে বুমবুজাংয়ের ঘোড়সওয়ার সৈন্যদল।

ওদিক থেকে ধেয়ে আসছে ঘোড়ার পিঠে আনাতুরি। তার হাতে তির-ধনুক। প্রস্তুত সে। সতর্ক।

আরও কাছে এগিয়ে এল রাজা বুমবুজাংয়ের সেনা। তার আরও কাছে এগিয়ে এল সৌরামাতির ফৌজ। দু-দল আরও কাছাকাছি, একেবারে মুখোমুখি।

চিৎকার করে উঠল কোহেন, ‌আঘাত করো!‌

যুদ্ধের প্রথম তিরটি ছুটে এল সৌরামাতির সৈন্যের গায়ে। তারপর শুরু হয়ে গেল যুদ্ধের ভয়ংকার মারামারি। এদিক থেকে ছোটে যত তির, ওদিক থেকে ছুটে আসে তারও দ্বিগুণ। ওদিকের সেনার গলায় আক্রোশের যত আর্তনাদ, এদিকের সৈন্যের গলায় প্রতিহিংসার ততই অট্টরব। অস্ত্রের আঘাত, যন্ত্রণার চিৎকার, রক্তের বন্যা। এখানে এখন কেউ আর মানুষ নয়। এখন তারা এক-একজন যুদ্ধদানব। কেউ কাউকে ছাড়বে না। একজন আর এক জনের গলা টিপে ধরছে। কিন্তু ভাবতে পারছে না, সে যাকে হত্যা করছে, সেও তারই মতো মানুষ। কান্না শোনা যায় অসংখ্য শিশুর সঙ্গে অসংখ্য মায়ের। তাদের গাড়ি-ঘর জ্বলছে দাউদাউ করে। তাদের ঘরের ছেলে মরছে আগুনে। আগুনের ধোঁয়া উঠছে আকাশে। ধোঁয়ার সঙ্গে ধুলো উড়ছে স্তেপের বুক থেকে। এ ধোঁয়ায়, এ ধুলোয় চিনতে পারে না কোহেন তার মাকে। মা-ও খুঁজে পায় না তার ছেলে কোহেনকে।

কিন্তু সামনাসামনি যুদ্ধ কে করবে কতক্ষণ! দু-পক্ষের সৈন্যই মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে অস্ত্রের আঘাতে। দু-পক্ষেরই রক্তে ভেসে যাচ্ছে স্তেপের মাটি। এমন করে যুদ্ধ চললে, শেষ হয়ে যাবে দু-পক্ষেরই সৈন্য আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। সুতরাং আর মুখোমুখি যুদ্ধ নয়। রাজা বুমবুজাংয়ের ঘোড়সওয়ার সেনারা ছুটে পালাল ওক-পাইনের বনে। সঙ্গেসঙ্গে গর্জে উঠল আনাতুরিও, —‌সৈনিক, ওদের ধাওয়া করো। ওরা পালাচ্ছে।‌

বুমবুজাংয়ের সেনার পেছনে ঘোড়া ছুটল সৌরামাতিফৌজের।

বুমবুজাংয়ের সেনারা ঢুকে পড়ল বনের ভেতর। সঙ্গে কোহেনও।

সৌরামাতির ফৌজও তাদের তাড়া করল বনের আনাচেকানাচে। সঙ্গে আনাতুরিও।

বুমবুজাংয়ের সেনারা গা-ঢাকা দিল বনের আড়ালে আবডালে।

সৌরামাতির ফৌজিসেনারা তাদের তল্লাশ করতে লাগল হুঁশিয়ার হয়ে। বনের মধ্যে সে যেন আর এক নি:শব্দ যুদ্ধ। যেমন ভয়-জাগানো, তেমনই বুক-কাঁপানো। কখন যে আচমকা কার বুকে তির বিঁধবে, কারও জানা নেই। কিন্তু সেই ভয়কে তুচ্ছ করে আনাতুরি খুঁজে বেড়াচ্ছে তার ছেলে কোহেনকে। হাতে তার তির-ধনুক। গাছের আড়ালে লুকিয়েলুকিয়ে কোহেনও খুঁজছে তার মাকে। দৃষ্টি তার সতর্ক। কে কাকে আগে খুঁজে পাবে কেউ জানে না। জানে না কে জিতবে, কে হারবে।

এমন সময়ে বনের গাছের পাতায় দমকা হাওয়ার শব্দ।

এমন সময়ে হঠাৎ অস্ত্রের আঘাতে মানুষের আর্তনাদ।

হঠাৎ হঠাৎ বুক-দুরদুর রণহুংকার। ঘোড়ার হ্রেষা রব, চিঁ-হিঁ-হিঁ।

সেই হুংকার শুনে ডাক দেয় আনাতুরি, ‌—হুঁশিয়ার!‌

কোহেন জিগির তোলে, —‌মার, মার, মেরে ফ্যাল।‌

কিন্তু বনের মধ্যে মাও খুঁজে পায় না ছেলেকে, ছেলেও দেখতে পায় না মাকে। সে কী ভয়ংকার উত্তেজনা। গায়ে কাঁটা দেয়। শিউরে ওঠে সারা শরীর।

কিন্তু ভয় নেই আনাতুরির।

হয়তো ভয় নেই কোহেনেরও।

বনের আড়ালে আড়ালে তাদের দৃষ্টি আঁতিপাঁতি ঘোরে-ফেরে। কখনো এদিক, কখনো ওদিক।

এমনসময় হঠাৎ কেন আনাতুরি আঁতকে ওঠে! কেন তার ঘোড়া থামে!

হঠাৎ কেন চমকে ওঠে কোহেন! ঘোড়া তার দাঁড়ায় কেন!

কাকে দেখে আনাতুরি এগিয়ে আসে!

কাকে দেখে কোহেন তার তির খুঁজতে হাত বাড়ায়!

ধক করে ওঠে কোহেনের বুক।

কেন?

তার তূণে তির নেই। ফুরিয়ে গেছে! সামনে তার মা দাঁড়িয়ে। তার মায়ের হাতে তির। এই বুঝি তির ছুটে আসে! এই বুঝি মায়ের তিরে মরল কোহেন!

ভয় পেল কোহেন। তার ঘোড়া ছোটাল আচমকা। বনের গাছগাছালি ডিঙিয়ে ছুটল ঘোড়া —পালাল।

হঠাৎ ছেলেকে ছুটে পালাতে দেখে থতোমতো খেয়ে গেল আনাতুরি প্রথমটা। কিন্তু পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিল। চেঁচিয়ে ডাক দিল, ‌কোহেন!‌

কোহেন পিছু ফিরে দেখল না, ছুটল।

আনাতুরিও ঘোড়া ছোটাল তার পেছনে। ছুটতেছুটতে আনাতুরি আবার চ্যাঁচাল, ‌কোহেন, দাঁড়া! নইলে আমার হাতে মরবি তুই!‌

কোহেন বুঝতে পারল সে তার মায়ের তিরের নিশানার মধ্যেই রয়েছে। এখনই তার মায়ের হাতের তির ছুটে এসে আঘাত করবে। তবুও সে দাঁড়াল না। চিৎকার করে উত্তর দিল, ‌আমায় তুমি মারো, সেও ভালো, তবু তোমার হাতে ধরা দেব না কখনোই।‌

আনাতুরির ঘোড়া কোহেনের আরও কাছে এগিয়ে এল। আনাতুরি আবার চিৎকার করল, ‌আমি তোর মা।‌

কোহেন উত্তর দিল, ‌এখন তুমি আমার শত্রু।‌

শত্রু! মা তার শত্রু! আনাতুরির বুকটা দুঃখে যেন ভেঙে পড়ল। তবু আর একবার নিজের মনকে সে শক্ত করল। এবার সে ধমক দিল, ‌তবে তুই ধরা দিবি না?‌

‌না!‌ জোরগলায় উত্তর দিল কোহেন। তারপর আবার বলল, ‌যে-মা ছেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, ধিক তাকে।‌

ছেলে! হ্যাঁ, কোহেন তার ছেলে! সত্যিই তো, সে তার ছেলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে! আনাতুরির পরাক্রম যেন গুঁড়িয়ে গেল নিমেষের মধ্যে। তার শক্তি যেন ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল শরীর থেকে। আনাতুরি আর পারল না। আনাতুরি কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে আর্তস্বরে সে বলল, ‌আমি যদি অস্ত্র ফেলে দিই, তবে কি তুই ধরা দিবি বাবা?‌

না, তবু দাঁড়াল না কোহেন। সে ঘোড়ার পিঠে বন ডিঙোতে ডিঙোতে বলল, ‌আগে ফ্যালো, তারপর ধরা দেওয়ার কথা উঠবে।‌

আনাতুরি অবিশ্বাস করল না ছেলেকে। আনাতুরি অস্ত্র ফেলে দিল। চেঁচিয়ে উঠল, ‌ওরে কোহেন, এই দ্যাখ আমি অস্ত্র ফেলে দিয়েছি। এবার দাঁড়া আয় আমার কাছে!‌

কোহেনের ঘোড়া থামল। কোহেন দেখল মায়ের হাতের দিকে। সত্যিই তার মা অস্ত্র ফেলে দিয়েছে। সঙ্গেসঙ্গে তার চোখের চাউনি কঠোর হল। হঠাৎ সে হাঁক দিল, ‌শোনো রাজা বুমবুজাংয়ের সেনাদল, তোমরা যে-যেখানে আছ বেরিয়ে এসো। আমাদের জয় হয়েছে। সৌরামাতির সেনানায়ক তার অস্ত্র ফেলে দিয়েছে। তাকে বন্দি করো!‌

আঁতকে উঠল আনাতুরি। তবে কি ছেলে তার যেমন অকৃতজ্ঞ, তেমনই বিশ্বাসঘাতক!

খবরটা দাবানলের মতো বনের ভেতর ছড়িয়ে পড়ল। সৌরামাতির সৈন্যরা সে-খবর শুনে যে পারল, পালাল। যে পারল না, ধরা দিল। রাজা বুমবুজাংয়ের সেনারা আনাতুরিকে বন্দি করল। আনাতুরির স্নেহমাখা চোখ দুটি বুজে গেল নিমেষে। আবার উপচে গেল অশ্রুফোঁটায়। কান্নাভেজা গলায় সে আকুল হয়ে বলল, ‌কোহেন, বাপ আমার, আমি সত্যিই হেরে গেছি তোর কাছে। তোর কাছে আমার শেষ অনুরোধ, আমায় তুই হত্যা কর। আমাকে বন্দি করিস না।‌

কিন্তু মায়ের শেষ কথাও শুনল না কোহেন। সে মাকে বন্দি করে নিয়ে চলল রাজা বুমবুজাংয়ের কাছে। মাকে পরাজিত করেছে কোহেন। এখন তাকে পায় কে!

১৬

মায়ের হাতে বন্দি-শেকল পরিয়ে দিয়েছে কোহেন। বন্দি মাকে সে নিয়ে এসেছে রাজা বুমবুজাংয়ের শিবিরে। নিস্তব্ধ হয়ে গেছে মায়ের গলার শব্দ। অসহায়ের মতো সে চেয়ে আছে, দেখছে এদিক-ওদিক। দেখছে তার ছেলেকে। দেখছে রাজা বুমবুজাংকে।

রাজা বুমবুজাং আনাতুরির মুখের সেই চেহারা দেখে হেসে উঠল হো-হো করে। তারপর হাসতেহাসতেই বলল, ‌আশা করি আমাকে চিনতে তোমার কষ্ট হচ্ছে না?‌

আনাতুরি নির্বাক।

‌মনে আছে, একদিন আমাকে তুমি হত্যা করার চেষ্টা করেছিলে! এই চেয়ে দ্যাখো, তোমার সেই পাথরের আঘাতের চিহ্নটা এখনও স্পষ্ট হয়ে আছে।‌ বলতে বলতে গায়ের জামাটা সরিয়ে আনাতুরিকে নিজের কাঁধটা দেখাল। দেখিয়ে আবার হেসে উঠল। কী হিংস্র সেই হাসির শব্দ। কী বীভৎস রাজা বুমবুজাংয়ের সেই মূর্তি। সে-হাসি থামে না। সেই মূর্তি ভয় জাগায়।

নিস্তব্ধ আনাতুরি তবুও অসহায়। ঝাপসা হয়ে আসছে তার চোখের দৃষ্টি। ফিরে তাকায় ছেলের দিকে। এখন যেন একটা অস্পষ্ট ছায়া তার ছেলে তার চোখে। কী বলবে সে জানে না। কোন কথাটি বললে ছেলে তাকে ‌মা‌ বলে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরবে, তাও জানে না আনাতুরি। সে এখন শুধু জানে, তার সামনে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু নেই। না, মরতে ভয় পায় না আনাতুরি। ভয় তার এই ছেলেটার জন্যে। হায় রে, ছেলেটা কেমন করে এমন নৃশংস হল। কেমন করে সে পারল মায়ের হাতে বন্দি-শেকল পরিয়ে দিতে! বিশ্বাস হয় না। বিশ্বাস করতে মন চায় না আনাতুরির। এই ছেলের জন্যেই-না তার সমস্ত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়েছে আনাতুরি। ওই ছেলের কপালে কত-না স্নেহের চুমো এঁকে দিয়ে আদর করেছে তাকে! কত খুশির দিন কেটেছে তার ছেলেকে নিয়ে। কেটেছে কত আনন্দে! তবে কি সব মিথ্যে! মিথ্যে মা! মিথ্যে ছেলে! মিথ্যে স্নেহ! ভাবতে ভাবতে আনাতুরির চোখ ছলছলিয়ে উঠল।

তীক্ষ্ণ স্বরে কড়কে উঠল রাজা, ‌—না! আমি সেকথা ভুলিনি। তোমাকে আমি রেহাই দেব না। যে-ছেলেকে বাঁচাবার জন্য তুমি আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিলে, আজ সেই ছেলের হাতেই তুমি বন্দি। তুমি বিশ্বাসঘাতিনী! তুমি নিজের রাজার আশ্রয় ছেড়ে ছেলেকে বাঁচানোর জন্য অন্যের আশ্রয় নিয়েছিলে। ভেবেছিলে তাকে তুমি লুকিয়ে রাখবে আমার নজরের আড়ালে। কিন্তু পারোনি। সে নিজেই ছুটে এসেছে আমার কাছে। সে নিজেই আমার কাছে ধরা দিয়েছে। আমি রাখলে সে বাঁচবে। আমি চাইলে সে মরবে। এখন তার জীবন আমার হাতে। যেমন তোমার প্রাণও আমার হাতে। তবে সে-প্রাণ আর বেশিক্ষণ এই স্তেপের বাতাসে শ্বাস নিতে পারবে না। বেশিক্ষণ এই স্তেপের আলো তোমার চোখে আর ঝলসে উঠবে না। আর বেশিক্ষণ ছেলের জন্য তোমার মন কাঁদবে না। তোমায় মরতে হবে।‌

আনাতুরি একটুও চমকাল না রাজার কথা শুনে। কিন্তু কোহেন যেন কেমন অস্থির হল।

‌তবে শোনো আনাতুরি, তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি নিজের হাতে তোমাকে হত্যা করব না। আমি জানি, আমার হাতে হত্যার আঘাত ভীষণ কষ্ট দেয় মানুষকে। আমি এখন আর গলা টিপে মানুষকে মারি না। এখন আমি মানুষের গলা মুচড়ে ছিঁড়ে তাকে মেরে ফেলি। তোমাকে অত কষ্ট দিতে আমার মন সায় দিচ্ছে না। যতই হোক, তুমি আমার বিশ্বস্ত সহচর স্তনের বউ। স্তনকে আমি গলা টিপেই হত্যা করেছি। তুমি বিশ্বাস করো, তোমার কোহেনকেও আমি সেইদিন গলা টিপেই হত্যা করতুম। ওর তেমন কষ্ট হত না। ও তখন ছিল একেবারেই কচি শিশু। সেদিন যদি কোহেন মরত, তবে আজ তোমায় মরতে হত না। তুমি সুখে থাকতে। তোমাকে পালাতে হত না আমার শত্রু সৌরামাতির আশ্রয়ে।‌

আনাতুরি তুবও নিশ্চুপ। কিন্তু কোহেনের মুখের চেহারা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে আসে। যতবারই সে মায়ের চোখের দিকে তাকায়, ততবারই ছমছম করে ওঠে কেন তার মন!

‌শত্রুর আশ্রয়ে যে পালিয়ে যায়, তার নিষ্কৃতি নেই। তোমাকে মরতেই হবে। আমি নয়, তোমাকে হত্যা করবে তোমার ছেলে কোহেন।‌ বলে ভয়ংকার এক চিৎকার করে হেসে উঠল রাজা বুমবুজাং।

ভয়ে শিউরে উঠল কোহেন। দেখল মায়ের চোখ উপচে জল গড়াচ্ছে।

রাজা গর্জন করে উঠল, ‌তোমার চোখের জল মুছে ফ্যালো আনাতুরি! তুমি স্থির হয়ে দাঁড়াও!‌ তারপর কোহেনকে আদেশ করল, ‌কোহেন তুই অস্ত্র নে। ধনুকে তির জোড়!‌

কোহেন হাতে ধনুক নিয়ে ধনুকে তির জুড়ল।

রাজা আবার কর্কশ গলায় হেসে উঠল। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, ‌মরবার আগে তোমার কী ইচ্ছে আনাতুরি? কী চাও তুমি? যদি বলো, তোমার সে-ইচ্ছে আমি পূরণ করব।‌

রাজার মুখের দিকে এবার তীব্র রোষে তাকাল আনাতুরি। সে তার চোয়াল শক্ত করল। চোখের জল থমকে গেছে। সে-জল চোখের ভেতরই ছলছল করছে। উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে সে।

‌সময় চলে যাচ্ছে। তুমি কী চাও তাড়াতাড়ি বলো!‌ গলা চড়িয়েই জিজ্ঞেস করল বুমবুজাং।

আর থাকতে পারল না আনাতুরি। একটা সাংঘাতিক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির মতো সে হঠাৎ বিস্ফোরণে ফেটে পড়ল। সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‌আমার হাতে একটা অস্ত্র দাও! আমি তোমার প্রাণ চাই!‌

‌আনাতুরি-ই-ই-ই-ই!‌ ক্ষিপ্ত দানবের মতো আর্তনাদ করে উঠল রাজা বুমবুজাং। দানবের মতো তার চোখ দুটো কটমট করে উঠল। তার ভাঙা দাঁতের ফাঁক দিয়ে জিভটা লকলক করে বেরিয়ে এল! এই বুঝি সে আনাতুরির নড়া দুটো ছিঁড়ে নেয়! কড়মড় করে চিবিয়ে খায়!

না, তা করল না সে। রাজা বুমবুজাং গলা ফাটিয়ে হুকুম করল, ‌কোহেন, তির ছুড়ে তোর মায়ের হৃৎপিন্ডটা এফোঁড়-ওঁফোড় করে দে!‌

কোহেন মাকে তাক করল।

মা আকুল হয়ে কোহেনকে ডেকে উঠল, ‌কোহেন, বাপ আমার, আমি তোর মা। আমাকে মেরে ফেলার আগে একবারটি আমার কাছে আয়! আমি শেষ বারের মতো তোর কপালে একটা চুমো দিই।‌

—‌না-আ-আ-আ।‌ রাজা ধমক দিল।

সঙ্গেসঙ্গে কোহেনের ধনুকের ছিলা ছিটকে তির ছুটল তার মায়ের দিকে। হাত কেঁপে গেছে কোহেনের। একী। নিশানা যে তার ফসকে গেল!

চিৎকার করে উঠল রাজা বুমবুজাং, ‌কোহেন!‌

কোহেন সঙ্গেসঙ্গে আর একটি তির ধনুকে জুড়ল। এবার আর ডাকল না মা কোহেনকে। মা অপলক চোখে চেয়ে রইল কোহেনের মুখের দিকে। আহা! মমতায় উথলে উঠছে আনাতুরির সেই চোখ দুটি। সেই চোখের দিকে মুহূর্ত তাকাল কোহেন। তার কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল। আর দেরি নয়। সে ছুড়ে দিল তির। আশ্চর্য! এবারও তার চোখ নিশানা হারাল। উড়ে গেল তির আনাতুরিকে না-আঘাত করে।

ক্ষিপ্ত রাজা বুমবুজাং লাফিয়ে উঠল। লাফিয়ে হুংকার দিয়ে ধেয়ে গেল কোহেনের দিকে। কোহেনের গলাটা সে প্রায় টিপে ধরে। কোহেন ভয় পায় না। একটুও ব্যস্ত হয় না। সে রাজাকে শান্ত গলায় বলে, ‌হে রাজা, আমাকে ক্ষমা করো। আজ আমি ক্লান্ত। বড্ড ক্লান্ত। তাই আমার নিশানা লক্ষ্য হারাচ্ছে। আমি একটু বিশ্রাম চাই। অন্তত একটা দিন। কাল ভোরে আলো ফুটলেই আমার মাকে আমি হত্যা করব।‌

‌না-আ-আ-আ! আজই তোকে হত্যা করতে হবে এখনই।‌ রাজা চিৎকার করে উঠল।

‌একটা দিন এমন কিছু নয়, রাত গড়ালেই ভোর। এর বেশি তোমার কাছে আমি তো আর কিছু চাইছি না।‌ উত্তর দিল কোহেন।

ক্ষিপ্ত রাজা বুমবুজাং স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইল খানিক কোহেনের মুখের দিকে। হয়তো কিছু ভাবল। তারপর বলল, ‌ঠিক আছে, তোর কথাই সই। একটা দিন সময় তোকে দিতে রাজি। কাল ভোরেই তোকে একাজ করতে হবে। নইলে তোর মা-ও মরবে, মায়ের সঙ্গে তুইও। এই একটা দিন তোর মা বন্দি থাকবে বন্দি-শিবিরে। একা।‌

বুমবুজাংয়ের সৈন্যরা আনাতুরিকে টানতে টানতে নিয়ে গেল। বন্দি আনাতুরি। তার পায়ের শেকলে শব্দ ওঠে ঝন ঝন। সেই পায়ের দিকে চমকে তাকায় কোহেন। তারপর তার ঘোড়া ছুটিয়ে পালায় কোহেন নিজের শিবিরে।

১৭

সত্যিই, আজ বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কোহেন। আজ বনের মধ্যে নির্ঘাত সে-ই মরত তার মায়ের হাতে। মা ইচ্ছে করলেই একটি তিরের আঘাতে তাকে শেষ করে ফেলতে পারত। কিন্তু মা তো তাকে মারল না। মা কোহেনের কথায় বিশ্বাস করল। নিজের অস্ত্র ছুড়ে দিল। অস্ত্র ছুড়ে না-ফেললে কোহেন কি তার মাকে বন্দি করতে পারত? নাকি মাকে সে রাজা বুমবুজাংয়ের সামনে হাজির করতে পারত? সত্যি কথা বলতে কী, হেরে গেছে কোহেনই। কিন্তু কোহেন বিশ্বাসঘাতকতা করেছে মায়ের সঙ্গে। একদিন যে-মা নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে কোহেনের প্রাণ বাঁচিয়েছে রাজা বুমবুজাংয়ের হাত থেকে, সেই মাকে ধরে আনল কোহেন সেই ঘাতকেরই কাছে! ছি:! সেই মায়েরই হাতে-পায়ে শেকল পরানো হল, কোহেনেরই জন্যে। ধিক! ধিক! এখন কোহেনকে কে বোঝাবে, ‌ওরে কোহেন, তুই প্রথম যেদিন মায়ের কোলে শুয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছিলি, সেদিন মা-ই তোকে আদরে জড়িয়ে ধরে হেসে উঠেছিল। সেই হাসি দেখে তুইও হেসেছিলি। সেইদিনই পৃথিবী সুন্দর হয়ে উছলে উঠেছিল। আর যেদিন তুই সেই মাকে তিরের আঘাতে মারতে চেয়েছিলি, সেদিন পৃথিবীর কান্নার দিন। ওরে কোহেন, শুনে রাখ, তোর মা-ই তোর পৃথিবী। তোর মায়ের চোখের জল এই পৃথিবীরই কান্নার অশ্রুফোঁটা।‌

ভয়ানক নিসতেব্ধ লাগছে কোহেনের আজকের রাতটা। বড্ড নিথর। কিছুতেই আজ আর তার চোখে ঘুম আসছে না। ঘুম আসার কথাও না। কেননা, আজ বার বার তার চোখে ঝলসে উঠছে মায়ের সেই মুখখানি। সেই কান্নাভেজা চোখ দুটি। মায়ের চোখে কান্না দেখেই কি তবে কোহেনের নিশানা ফসকে গেছে। তিরের লক্ষ্য হারিয়ে গেছে! ভালোই হয়েছে, এই পৃথিবীতে তার যে আর আপন কেউ থাকত না। কেউ বলত না, ‌কোহেন, বাপ আমার, আমি তোর মা। আয় তোর কপালে একটা চুমো দিই।‌

কিন্তু কাল? কাল ভোরে কী হবে? কাল ভোরে যে মাকে মরতেই হবে কোহেনের হাতে!

উফ! কী যন্ত্রণা! জেরবার হয়ে যায় কোহেন ভাবতে ভাবতে। এই শীতের রাতেও ঘাম ঝরে তার কপাল বেয়ে। ঘামের বিন্দুগুলি যতবার সে মুছে ফেলে, ততবারই আবার ফুটে ওঠে। আর শুয়ে থাকা যায় না। পারল না কোহেন থাকতে। উঠে পড়ল। বেরিয়ে পড়ল বাইরে, শিবিরের পর্দা ঠেলে। তারপর স্তেপের অন্ধকারেই হারিয়ে গেল। কোথা গেল সে!

‌—মা!‌

—‌কে?‌ চমকে ওঠে আনাতুরি।

—‌আমি, কোহেন।‌ ভারি দুঃখ-জড়ানো সেই গলার স্বর। মায়ের বন্দি-শিবিরের পেছনের পর্দা তুলে কোহেন ঢুকল চোরের মতো। সামনে দিয়ে আসা যায় না। সেখানে সান্ত্রি। সুতরাং সান্ত্রিকে ফাঁকি দিয়েই কোহেন মায়ের সামনে দাঁড়াল।

তবে কি মা-র চোখেও এতক্ষণ ঘুম ছিল না। বোধ হয়। বন্দি-মা হয়তো জানত না এখন কত রাত। তাই শিবিরের অন্ধকারে কোহেনের মুখখানা খুঁজতে খুঁজতে জিজ্ঞেস করল, ‌ভোর হয়ে গেছে বুঝি?‌

‌—হ্যাঁ মা!‌ অনুতাপে কাতর যেন কোহেনের গলার স্বর।

‌এবার আমায় যেতে হবে?‌ জিজ্ঞেস করল মা।

‌—হ্যাঁ।‌

—‌আমি যে হাঁটতে পারছি না কোহেন। বন্দি-শিকলের ভার যে আমি বইতে পারছি না।‌

‌—তোমার বন্দি-শেকল আমি খুলে দেব মা। তোমার হাঁটতে আর কষ্ট হবে না।‌

‌—সেই ভালো। আমি পালাব না। আমি পালাতে আসিনি।‌

—‌জানি মা। আমি তোমায় নিয়ে যেতে এসেছি!‌

‌—কোথায়?‌

‌—যেখানে রক্ত নেই। আছে মায়ের ভালোবাসা।‌

—‌কোহেন!‌ একটা উত্তেজনার চাপা স্বর আনাতুরির গলায়।

‌—এসো মা, তোমার বন্দি-শেকাল খুলে দিই। দেরি হয়ে যাচ্ছে।‌

‌—কোহেন, তুই আমায় মারবি না?‌

‌—না।‌

—‌কোহেন, তুই আমাকে না-মারলে, রাজা যে তোকে মেরে ফেলবে!‌ মায়ের গলায় আতঙ্ক।

—‌মা, রাজা আমাদের খুঁজে পাবে না। আমরা হারিয়ে যাব। এসো, তোমার বন্দি-শেকল খুলে দিই।‌ কোহেন মায়ের পায়ে হাত দিল। পায়ের শেকল খুলে দিল। খুলে দিল হাতের শেকলও। তারপর বলল, ‌মাগো, এবার তুমি আমার কপালে চুমো দাও, যত ইচ্ছে! যেমন করে আদর করতে আমায় ছেলেবেলায়, তেমনই করে আদর করো মন ভরে। বিশ্বাস করো, আজ আমি তোমার কাছে হেরে গেছি। মা, তোমার ভালোবাসার কাছে আমি পরাজিত।‌

হতভম্ব হয়ে গেল আনাতুরি ছেলের কথা শুনে। দাঁড়িয়ে রইল বোবার মতো অন্ধকারে অনেকক্ষণ। কেউ কাউকে স্পষ্ট দেখতে পায় না। কার চোখে কত জল উপচে যায়, তাও দেখতে পায় না কেউ। শুধু শোনা যায় নিশ্বাস, মা আর ছেলের। সেই নিশ্বাসই নিস্তব্ধতা ভেঙে দেয়। সেই নিশ্বাস শুনে মা এগিয়ে যায় ছেলের দিকে। অন্ধকারেই চিনতে পারল মা ছেলের চিবুকটি। ছুঁতে পারল মা-র ঠোঁট দুটি, ছেলের কপাল। ছেলের কপালে চুমো দিল মা তার সমস্ত স্নেহ উজাড় করে। ছেলে তার হাতটি বাড়িয়ে দিল মায়ের হাতের দিকে। ছেলের হাত ধরে মা বেরিয়ে এল বন্দি-শিবির থেকে গোপনে। তারপর স্তেপের সেই অন্ধকার নির্জনে দাঁড়াল ক্ষণেক। আকাশে অসংখ্য তারা। দেখল দু-জনেই। ঘাসে পা ফেলল মা আর ছেলে। ছুটে চলল, ছুটতে ছুটতে হারিয়ে গেল কোথায়, কেউ জানে না। এখনও না।

অধ্যায় ৬ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%