শৈলেন ঘোষ
বাগডুম সিং সৈনিক। তাঁর দুর্দান্ত একজোড়া গোঁফ। গোলগাল মুখের ওপর নাকের গর্ত দুটি গোঁফ জোড়ায় ঢাকা পড়েছে। আঁটসাঁট পোশাক গায়ে। মাথায় সৈনিকের টুপি, পায়ে মোজা-জুতো। পিঠের ওপর ঝোলানো বন্দুক, কোমরে বাঁধা খাপে-আঁটা ছুরি। কী গম্ভীর মুখখানা, দেখলে মনে হবে এই বুঝি রেগে যান বাগডুম সিং। এই বুঝি দিলেন উড়িয়ে—গুড়ুম।
অবশ্য সেসবের ভয় নেই। কারণ তিনি সৈনিক হলেও তাঁকে কোনোদিন যুদ্ধে পাঠানো হয়নি। তিনি কোনোদিন বন্দুক ছোড়েননি, ট্যাঙ্কে উঠে কামান দাগেননি, ট্রেঞ্চে শুয়ে বোমা আটকাননি। তিনি একটি পুতুল-সৈনিক।
পুতুল বলেই তিনি ঘুমোচ্ছিলেন। এবং যে-বাড়িতে তিনি আছেন, সেই বাড়ির বই রাখার শেলফের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরেই ঘুমোচ্ছিলেন। অবশ্য তাঁর ঘুমোনোটা এমন কিছু আশ্চর্যের ব্যাপার নয়, কেননা যখন তিনি জন্মাননি, তখনও তিনি ঘুমোচ্ছিলেন। যখন জন্ম নিলেন তখনও তিনি ঘুমোচ্ছিলেন। কিন্তু আচমকা তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। এবং ঘুম ভাঙতেই তাঁর নাকের ডগায় এমন হাঁচি এসে গেল যে, তিনি সামলাতে পারলেন না। হ্যাঁ-চ-চো! তিনি হেঁচে ফেললেন। না-হেঁচে তাঁর কোনো উপায়ও ছিল না। কারণ ঘুমের ঘোরে তাঁর যেন মনে হল, নাকের নীচের গোঁফজোড়া তাঁর নাকের ভেতরে সুড়সুড়ি দিয়ে দিয়েছে। এবং তারপরেই তিনি চোখ চেয়ে দেখতে লাগলেন নিজেকে। দেখতে দেখতে ফিক করে হেসে ফেললেন। হাসলেন কারণ, ঠিক তখনই পাঁপড় ভাজার গন্ধ ছড়িয়ে ছড়িয়ে ওঁর নাকের মধ্যে সেঁদিয়ে যাচ্ছিল। সেই গন্ধে কেমন যেন কাতুকুতু মাখানো। অবিশ্যি হাসিটা কারও নজরে পড়েনি। তিনি নিজেও কারও নজরে পড়তে দেননি। বলা যায়, পাঁচজনে দেখে ফেললে পাঁচরকম কথা উঠবে! আসলে পাঁচজনে দেখে ফেলাটা সেদিন এমন কিছু অসম্ভবও ছিল না। কারণ সেদিন হরেক মুখ, হরেক চোখ, হরেক মানুষ আর হরেক কান্ড দেখা যাচ্ছে এই বাড়িতে। এবং কেন যে এত হইহল্লা সেটাও বুঝতে পারা সম্ভব ছিল না বাগডুম সিংয়ের। তিনি বুঝতে পারছিলেন না বলেই যেন কেমন ছটফট করে উঠছিলেন। ইস! কী বিচ্ছিরি রকমের চেঁচামেচি। একবাড়ি লোক যেন একসঙ্গে তাল ঠুকে হল্লা-চিল্লার ছ্যাকরাগাড়ি ছোটাচ্ছে। তার ওপর থেকে থেকে হি-হি, হো-হো করে সে কী হাসির ধুম! কান-ফাটানো এই হাসির বহর দেখলে বাগডুম সিংয়ের মতো মানুষ কখনো চুপ থাকতে পারেন! পারা সম্ভবও নয়, কারণ তিনি সৈনিক। তিনি যদি হাসতে চান, ওই ফিক করে এক বার। তিনি যদি কাশতে চান, খুক খুক দু-বার। তিনি যদি নাচতে চান, ধিন ধিন—আরে, বলতে-বলতেই দ্যাখো তিনি এক্ষুনি নেচে ফেলেছিলেন যে! এক্ষুনি তাঁর জুতো-আঁটা পা-দুটো নাচের ইস্কুলের ছোট্ট মেয়ের মতো কিলবিলিয়ে উঠেছিল। কী লজ্জার কথা!
রক্ষে, খুব সামলে গেছেন! সত্যি সত্যি নেচে ফেললে বাগডুম সিংয়ের মান-ইজ্জত বলতে আর কিছু থাকত? তা বাবু, অমন একজন সৈনিকের পা-জোড়া নাচবার জন্য হঠাৎ এমন উশখুশ করে ওঠে কেন?
উঠবেই তো। কারণ এই মুহূর্তে বর এসেছে বর এসেছে বলে বাড়িতে এমন একটা হইহল্লা শুরু হয়ে গেল, এমন ছোটাছুটি আর হুড়োহুড়ি লেগে গেল, সেইসঙ্গে মাইকে এমন বিকট সুরে গান বেজে উঠল যে, বাগডুম সিং সামাল দিতে পারলেন না। সেই গানের তালে তাঁর পা-দুটিও নেচে ফেলেছিল!
হ্যাঁ, এই বাড়িতে বিয়ে। বাড়ির ছোটোমেয়ের বিয়ে। ও হো তাই বলি! এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন বাগডুম সিং হইহইয়ের কারণটা। বিয়ে সক্কলেরই হয়। বিয়ের সময় সব বাড়িতেই একটু হইহল্লা লেগে থাকে। আলোর ঝিলিক, ফুলের বাহার, সেন্টের ফুরফুরি, স্নো-পমেটমে সারাবাড়ি যেন ম-ম। তার সঙ্গে লাগসই রং-বেরঙের সাজগোজের বহর দেখলে কার-না চোখ ঠিকরে পড়ে?
বলা শক্ত বাগডুম সিংয়েরও চোখ ঠিকরে পড়ছিল কি না! তবে তিনি ঠারেঠোরে দেখছিলেন। আর যতই দেখছিলেন, ততই তিনি কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলেন। তিনি একটা-কিছু ভাবছিলেন। ভাবতে ভাবতে কিছুতেই খেয়াল করতে পারছিলেন না, তাঁর নিজেরও বিয়ে হয়েছে কি না! এবং ভেবে যখনই তিনি কিছুই কূলকিনারা করতে পারছিলেন না, তখনই হইহই করতে করতে বর-কনেকে নিয়ে একদল ঘোমটা-পরা বউ, একদল ঘোমটা-খোলা মেয়ে, সঙ্গে ঘাঘরা-পরা একদল ছোট্ট খুকি সেখানে হাজির হল। বউগুলোও যেমন হাসছে, মেয়েগুলোও তেমনি খিলখিল করছে। হাসতে হাসতে আদেখলেদের মতো এমন করছে যে, তাই দেখে বাগডুম সিংয়ের গা রিরি করে উঠল। সত্যিই তো! তিনি সৈনিক। এত হাসাহাসি তাঁর কেন ভালো লাগবে! হাসো, হাসতে কেউ বারণ করছে না। তবে নিয়ম মেনে হাসো। তা নয় একেবারে খিলখিল! আর বরটাকে দ্যাখো, সেই হাসি শুনে কেমন বোকার মতো চেয়ে চেয়ে দেখছে! ক্যাবলাকান্ত! বোকা লোকগুলোকে বাগডুম সিং দু-চক্ষে দেখতে পারেন না। কেন রে বাবা! তেড়েফুঁড়ে তুইও ফোঁস করে ওঠ! তা নয়, হাঁদার মতো চেয়ে আছে।
অবিশ্যি বাড়ির ছোটোমেয়েটি বড়ো ভালো। ভারি শান্ত, লক্ষ্মী। কী সুন্দর মানিয়েছে তাকে! কী লক্ষ্মী দ্যাখো! যেন লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে কনেবউটি!
এমনসময় বেটপকা একটা কান্ড ঘটে গেল। এবং এমন অসাবধানের মতো বাগডুম সিং সেই কান্ডটি করে বসলেন যে, সব গুবলেট! অবিশ্যি বাগডুম সিংকেও খুব-একটা দোষ দেওয়া যায় না। তিনি ভালোমানুষের মতো চুপটি করেই দেখছিলেন। দেখছিলেন, মাথার টোপরটি খুলে বাসরঘরের আসরে বর বসল। পাশটি ঘেঁষে কনে বসল। বর-কনেকে সামনে রেখে রাজ্যির সব মেয়ের দল ভিড় করল। তারপর যে কী হল, প্যাঁ-প্যাঁ করে একটা বাজনা বেজে উঠতেই বাগডুম সিংয়ের চক্ষু কপালে! অমন একটা চৌকোপানা বাক্সের ভেতর থেকে এমন যে প্রাণ ঠাণ্ডা-করা সুর বেরিয়ে আসতে পারে, এমন কথা ভাবতেই পারেননি বাগডুম সিং। কারণ তিনি জন্মে এমন বাজনাই দেখেননি। তার ওপর সেই প্রাণ ঠাণ্ডা-করা সুরের সঙ্গে গলা মিলিয়ে যখন হাঁদারাম বরটা গান ধরলে তখন বলব কী, বাগডুম সিং যে বাগডুম সিং, যিনি অত গম্ভীর, অত রাশভারী, তিনি পর্যন্ত হেসে ফেললেন। কেমন একটা অদ্ভুত মজা লাগল তাঁর। আর এমন অদ্ভুত ভালো লাগল গানটা যে, তালে তালে তিনি মাথা না-দুলিয়ে পারলেন না। কেয়া বাত! কেয়া বাত! বড়ো লাগসই গানটা তো। বরটা বোকা হলে কী হবে, গানটা ভালোই গায়!
গান শুনে স্থির থাকতে পারলেন না বাগডুম সিং। পা-দুটি তাঁর উশখুশ করতে লাগল। এমনসময় ফস করে এবার নেচে ফেললেন বাগডুম সিং!
অ্যাঁ! বাগডুম সিং নাচছেন! ওই একঘর মেয়ের সামনে?
হ্যাঁ তিনি নাচছেন, এবং বেশ জোরেই নাচছেন। বাগডুম সিং আগুপিছু কিচ্ছু ভাবলেন না, তিনি দেখলেন না কোথায় তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। এক বার মনেও এল না এইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাচানাচি করাটি ঠিক কিনা! আর সবচেয়ে বড়ো কথা, তিনি চিন্তাই করলেন না তাঁর মতো একজন সৈনিকের পক্ষে একঘর মেয়ের সামনে নাচ করাটা উচিত না অনুচিত।
এখন তিনি এসব কথা ভাববেন না। বরের গান শুনে এখন তিনি নাচবেন। তারপর?
আ-হা-হা! করেন কী? করেন কী? এই দ্যাখো, নাচতে নাচতে বাগডুম সিংয়ের পা ফসকে গেল! আরে মশাই বাগডুম সিং ডিগবাজি খেলেন যে! তিনি যে মুখ থুবড়ে বইয়ের শেলফের ওপর থেকে মাটিতে ছিটকে পড়লেন। হ্যাঁ, তিনি এতক্ষণ ওই শেলফের ওপরই দাঁড়িয়ে ছিলেন। এবং তাঁর একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে একটি জেট বিমান— একটি খেলনা উড়োজাহাজ।
বাগডুম সিং গোঁত্তা মেরে পড়তেই গান থেমে গেল। কারণ তিনি পড়লেন বলে একঘর লোক সবাই চমকে উঠল, কে একজন মেয়েলি সরু গলায় চেঁচিয়ে উঠল, যা:! পুতুলটা পড়ে গেল!
লজ্জাবতী কনেটি তাড়াতাড়ি ঘোমটা সরিয়ে তাকাল বাগডুম সিংয়ের দিকে। ছুটে গেল বাগডুম সিংয়ের কাছে। ভাঙল নাকি! তাড়াতাড়ি তুলে নিল। নেড়েচেড়ে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অস্ফুট স্বরে বলল, যাক বাবা, ভাঙেনি। তারপর আবার শেলফের ওপর বাগডুম সিংকে যত্ন করে দাঁড় করিয়ে ফিরে এল।
বর বললে, পুতুলটি তো বেশ!
কনের দিদি বললে, মিজোরাম থেকে আমার মেজো মাসিমা এনে দিয়েছেন। পুতুলটার অনেক দাম।
বর বললে, হ্যাঁ হ্যাঁ, মিজোরাম। সেখানে তো ভালো এঁটেল মাটি পাওয়া যায় শুনেছি! সেখানে পুতুলও মেলে?
—মেলে। ভালো ভালো পুতুল মেলে। দেখুন-না এই পুতুলটাকে, ঠিক মানুষের মতো জীবন্ত মনে হচ্ছে না?
বাগডুম সিং চমকে উঠলেন। এবং তখনই তিনি প্রথম শুনলেন, তিনি পুতুল। ভাবলেন, তিনি পুতুল। বুঝলেন, তিনি পুতুল বলে নাচতে গিয়ে শেলফো থেকে পা ফসকে পড়লেন। আর সেই জন্যেই এই বাড়ির ছোটোমেয়ে, আজকে যার বিয়ে হল, তাঁর নড়া ধরে নেড়েচেড়ে তাঁকে আবার শেলফোর ওপর তুলে রাখলে। এবং এর জন্য বাগডুম সিংয়ের হাতে-পায়ে-ঘাড়ে-কোমরে কোথাও ব্যথা লাগল না। সঙ্গে সঙ্গে এও তিনি জানলেন, তাঁর অনেক দাম। তিনি মানুষ নন, কিন্তু মানুষের মতো জীবন্ত!
এই কথাটা চিন্তা করতেই বাগডুম সিংয়ের মাথার ভেতরে যেন হাজারটা চড়ুইপাখি ছটফটিয়ে কিচিরমিচির করে ডেকে উঠল। তাঁর বুকের ভেতরে খটাখট করে কারা যেন দুরমুশ পিটতে শুরু করে দিল। তাঁর মনে হচ্ছিল তখনই তিনি ওই শেলফোর ওপর থেকে লাফিয়ে পড়েন। লাফিয়ে পড়ে তুলকালাম কান্ড শুরু করে দেন!
কিন্তু না, তিনি তা করলেন না। কারণ তিনি একজন সৈনিক। তিনি শুধু চুপটি করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলেন তিনি কেন পুতুল! কেন, তাঁরও তো ওই মানুষগুলোর মতো দুটো হাত আছে পা আছে! মাথা আছে, কান আছে! মুখ আছে, চোখ আছে— আর নাক। তা ছাড়া তাঁর গোঁফটা কি ফেলনা? এরকম গোঁফ ক-টা মানুষের আছে শুনি? তবে হ্যাঁ, বলতে পারো তিনি একটু খাটো খাটো। হাত-পাগুলো ছোটো ছোটো। তাই বলে কি তিনি গায়ের জোরে কিংবা বুদ্ধির তোড়ে কমতি যান?
অবিশ্যি এখানে একটা কথা উঠতে পারে, এবং সেই কথাটা ভাবতেই বাগডুম সিং থমকে গেলেন। কথাটা হচ্ছে তিনি ওই বাক্স-মার্কা বাজনাটা বাজিয়ে গান করতে পারেন কি না! এটা অবশ্য তিনি জানেন না। জানেন না তার কারণ, ওই বরের মতো বর সেজে তিনি কোনোদিন গান করেছেন কি না সেটা এখনও মনে করতে পারলেন না। না-ই মনে করতে পারুন। কিন্তু গান গাওয়া ব্যাপারটা কীই-বা এমন শক্ত? ওই হাঁদারাম বরটা যদি পারে, তবে তিনিও পারেন! এখুনি পারেন! এবং বললে দেখিয়ে দিতে পারেন। ধুত! ভারি তো একটা গান!
ঢং!
ঘরের দেওয়াল ঘড়িতে ঘণ্টা বাজল। যা: চলে, কত রাত্তির হয়ে গেল। বাগডুম সিং ঘড়িটার দিকে দেখলেন। একঘর লোক সবাই ঘড়ি দেখল। সত্যিই তো, রাত যে অনেক হয়ে গেল। রাত একটা। হবে না? তুমি সময় নষ্ট করছ বলে তো আর সময় তোমার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকবে না। মানলুম বিয়েবাড়িতে সময়ের একটু ইদিক-উদিক হয়। একটু বেশি আনন্দ, একটু বেশি হাসাহাসি, একটু বেশি চেঁচামেচি হয়েই থাকে। কিন্তু তাই বলে সময় না-মেনে হুল্লোড় করব, এ কেমন আবদার!
ও হরি, কী আজব কান্ড দ্যাখো! ঘড়ির ঘণ্টা শুনে জমজমাট ঘরটা কেমন একটু একটু ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে! একে একে সব সরে পড়ছে। কেউ কেউ ওইখানেই ঢুলে পড়ছে, ফরাস পাতা মেঝের ওপর গা এলিয়ে শুয়ে পড়ছে। ওই দ্যাখো অমন যে বর, তিনিও আড়মোড়া ভেঙে গড়িয়ে পড়লেন। হাই তুলছেন।
ঘড়িটাকে বাহাদুর বলতে হয়। এক ঘায়েই সব কুপোকাত! অবশ্য বাগডুম সিংয়ের হাতেও একটা ঘড়ি আছে, কিন্তু সেটা বাজে না। কাঁটাগুলো নড়েও না, সরেও না। কাল যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, আজও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। দেখলে মনে হয় ঘড়ি তো নয়—ঘোড়া!
তখনই বাগডুম সিংয়ের মনে হল ঘরের দেওয়াল ঘড়িটা যেন তাঁর দিকে চেয়ে চেয়ে চোখ মটকাচ্ছে। বাগডুম সিংয়ের মনের কথাটা দেওয়াল ঘড়ি বুঝতে পেরেছে নাকি।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। হঠাৎ দেওয়াল ঘড়িটা বাগডুম সিংয়ের দিকে চেয়ে ট্যাক ট্যাক করে ভেংচি কেটে বলে উঠল, —ঠোঁট চেপে থাক, ঠোঁট চেপে থাক, নইলে কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়লে লজ্জা রাখবার জায়গা পাবিনি। বলিহারি তোর শখকে! কী করে ভাবলি যে তোর ঘড়িটা বাজবে? খেলনা-পুতুলের আবার বায়না দ্যাখো। বেশি উচ্চাশা ভালো নয় বুঝলি?
অবাক হলেন বাগডুম সিং। এবং চটেও গেলেন ভীষণ। চোখ কটমটিয়ে কড়কে উঠে বললেন, কোথাকার ছোকরা হে জ্ঞান দেয় দেখি! জানিস আমার বন্দুক আছে?
ঘড়িটা এবার টকটক করে এমন ঠাট্টার সুরে হেসে উঠল যে, বাগডুম সিংয়ের সারা শরীর জ্বলে গেল। হাসতে হাসতে ঘড়ি বললে, ওটাও খেলনা-বন্দুক!
বাগডুম সিং এবার খুবই অপমানিত বোধ করলেন। তিনি যারপরনাই রাগে থরথর করে কেঁপে উঠলেন এবং চিৎকার করে বললেন, ওরে মুখ্যু, ওরে ঘড়ি, তুই কি জানিস ওই বাক্সটা টিপে আমি এক্ষুনি গান গেয়ে দিতে পারি?
এবার দেওয়াল ঘড়িটা আরও জোরে হেসে উঠল। হেসে ঢং-ঢং করে দুটো ঘণ্টা বাজিয়ে দিল। বাজাতে বাজাতে বললে, রাত দুটো বাজল তাই, সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে তাই, নইলে একঘর লোক কথাটা শুনে ফেললে মহাশয়ের পেছনে কুকুর লেলিয়ে দিত। ওরে বুদ্ধির ঢেঁকি, ওটা বাক্স নয়, ওটার নাম হারমোনিয়াম।
বাগডুম সিং এবার একটু প্যাঁচে পড়লেন। কারণ এই নামটা তিনি এই প্রথম শুনলেন। কিন্তু গোঁ ছাড়লেন না। বললেন, ওই হল। নে নে, আমায় আর অত শেখাতে হবে না। ও আমার জানা আছে।
ঘড়ি বললে, জানা থাকলেই-বা কী! হারমোনিয়াম বাজানো তোর কম্ম নয়।
বাগডুম সিং তেড়ে-মেড়ে উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, আমার কম্ম।
—কেন তড়পাচ্ছিস বাবা!
বাগডুম সিং এবার প্রায় খেপে উঠেছেন। বললেন, এই ঘড়ি, তোর যে ভারি বুকের পাটা দেখি! আমায় অকথ্য কুকথ্য কইছিস!
দেখবি এখুনি আমি বাজিয়ে দেব?
—হুঁ! বাজাবে! ওই শেলফোর ওপর থেকে নামতেই পারবি না। বলে ঘড়ি চোখ বেঁকালে।
বাগডুম তাই শুনে বললেন, আরে ছো:! ঘড়িটা কী বলে! জানিস একটু আগে আমি লাফ মেরে এখান থেকে নীচে নেমেছিলুম!
—এই দ্যাখো, গুল দিচ্ছে। বলে ঘড়ি হেসে উঠল। —নাচতে গিয়ে ওপর থেকে ডিগবাজি খেলি, আমি দেখিনি মনে করছিস?
এবার বাগডুম সিংয়ের অবস্থা ল্যাজে-গোবরে! কিন্তু এমন গোঁয়ারগোবিন্দ, সত্যি কথাটা শুনে কোথায় চেপে যাবেন— তা না। উলটে বললেন, কী, কে বলেছে আমি ডিগবাজি খেয়েছি? দেখবি আমি আবার লাফাব?
মজা করার জন্যে ঘড়িটা বললে, দেখি লাফা!
শেলফোর ধারে দাঁড়িয়ে বাগডুম সিং ভড়কি দিলেন, এই লাফালুম!
কিন্তু লাফালেন না। ঘড়ি বললে, কই লাফালি?
আবার ভড়কি দিলেন বাগডুম সিং, মারি লাফ? এই মারলুম—ওয়ান, টু, লাফাই? লাফাই?
না-লাফিয়েই তিনি ওপর থেকে ধোঁকা দিতে লাগলেন। কারণ তিনি জানতেন, তখন নাচতে গিয়ে পড়ে গিয়ে তাঁর মাথাটা খুব বেঁচে গেছে। এবার পড়লে আর রক্ষে নেই! সুতরাং তিনি লাফাই, লাফাই যতই করছেন, ঘড়ি ততই কই লাফা-না, কই লাফা-না করে বাগডুম সিংকে তাতিয়ে দিচ্ছে! এই রে। লোকটার মানসম্মান বুঝি আর রইল না!
উরি ব্যাস! একে বলে কপাল। বাগডুম সিং খুব বেঁচে গেলেন, কেননা ঠিক তক্ষুনি বাড়ির গিন্নি-মা ঘরে ঢুকে পড়েছেন। গিন্নি-মাকে দেখে বাগডুম সিংও স্পিকটি নট, ঘড়িও ডোন্ট টক, টক টক! গিন্নি-মা ঘরে ঢুকে এদিক-ওদিক চোখ বুলিয়ে নিজের মনেই বললেন, বাবা, এতক্ষণে দস্যি মেয়েগুলো সব ঘুমোল! জামাইটাকে কী জ্বালাতনই-না করছিলসব।
অবশ্য জামাইটিও ঘুমিয়ে পড়েছে। জামাইয়ের কাছে গিয়ে গায়ের চাদরটি ভারি যত্ন করে টানতে গিয়ে মনটা তাঁর গরবে ভরে উঠল। মনে মনে বললেন জামাই যা করেছি, আর কাউকে মুখ ফোটাতে হবে না। আহা, যেন সোনার গৌরাঙ্গ! তারপর ঠাকুরকে ডাকলেন। কপালে হাত ঠেকিয়ে বললেন, ঠাকুর, আমার মেয়ে-জামাই যেন বেঁচেবর্তে সুখের সংসার গড়তে পারে। যেন এইটুকুই আমরা দেখে যেতে পাই। বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললেন গিন্নি-মা। তারপর চোখের জল নিজের আঁচলে সামলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
গিন্নি-মাকে দেখে ঘড়ি আর বাগডুম সিংয়ের ঝগড়াটা অবশ্য এখন থিতিয়ে গেছে। বলতে নেই, দেখে শুনে মনে হচ্ছে ঘড়িটার বোধ হয় সুমতি হয়েছে। ঝগড়াঝাঁটির মধ্যে আর বোধ হয় তার যাবার ইচ্ছে নেই। তাই এখন ঘর থেকে গিন্নি-মা বেরিয়ে গেলেও ঘড়ি ডোন্ট-টক, টক টক!
কিন্তু বাগডুম সিং? তিনি ভীষণ খাপ্পা! বটেই তো, একটা তুচ্ছ দেওয়াল ঘড়ি তাঁকে এমন করে অপদস্থ করল! এঁ:! এত বড়ো কথা! বলে, তিনি বাক্স বাজিয়ে গান করতে পারবেন না! এবং তিনি এতই চটেছেন যে, বাক্স-বাজনার নামটাই ভুলে বসে আছেন। কেবলই তাঁর মনে হচ্ছে বাজনাটার নাম হরিমন! আবার মনে হচ্ছে, না না হরিমন নয়, মনোহারী! যাক গে, যাক গে, যাই-ই নাম হোক, নামে কী আসে-যায়! তিনি আজ ওইটা বাজিয়ে গান গেয়ে দেখিয়ে দেবেন তিনি পারেন কি না! ওই তো নীচেই রয়েছে বাজনাটা—একবারে সামনে। এই শেলফোর ওপর থেকে নেমে পড়তে পারলেই হল! কিন্তু মুশকিলটাই তো তাই। এতক্ষণ ঘড়িটাকে ভড়কি দিলেও তিনি তো জানতেনই এখান থেকে নামা তাঁর কম্ম নয়! ভড়কি না দিয়ে উপায়ও ছিল না। তিনি একজন সৈনিক হয়ে ঘড়ির কাছে মাথা হেঁট করেন কী করে!
সুতরাং এই শেলফোর ওপর থেকে নামতে গেলে তাঁকে অন্য কৌশলে নামতে হবে। গোঁয়ার্তুমি করার কোনো মানে হয় না। কিন্তু কথা হচ্ছে, কী করে নামবেন তিনি? বিপদ তো কম নয়! একে শেলফোটা বেজায় উঁচু। তার ওপর এমন ঝকমকে পালিশ করা! হাঁটতে গিয়ে একটু যদি অসাবধান হয়েছে তো দুম ফট! তবে হ্যাঁ, একটু নীচে শেলফোর পাল্লা টানার হাতলটা দেখা যাচ্ছে। এক বার যদি ওখানে বাগডুম সিংয়ের পা নাগাল পায়, তা হলেই কেল্লা ফতে।
ওই হাতলটা দেখতে পেয়েই বাগডুম সিংয়ের সাহস বেড়ে গেল! তিনি নামবেনই এবং বাজনা বাজিয়ে গাইবেনই। ওই ঘড়িটার থোঁতামুখ যতক্ষণ-না তিনি ভোঁতা করতে পারছেন ততক্ষণ জলস্পর্শ করবেন না! দেখা যাক!
দেখা যাক বললে কী হবে! তিনি তো দেখছেনই। ওই শেলফোর ওপর থেকে তিনি নীচটা দেখছেন অনেকক্ষণ ধরে। কখনো বসছেন, কখনো উঠছেন। কখনো হেঁট হচ্ছেন, কখনো হাঁটু গাড়ছেন। না, অসম্ভব। এখান থেকে কিছুতেই নামা যাবে না!
অসম্ভব? বাগডুম সিংয়ের কাছে অসম্ভব? ছো:! তিনি-না একজন সৈনিক? তাঁকে-না পাহাড়ে উঠে, আবার কখনো পাহাড় থেকে নেমে যুদ্ধ করতে হয়? সুতরাং তিনি শেলফোর ধারে এসে সেই হাতলটা টিপ করে ঝুলে পড়লেন। হা কপাল! কোথায় হাতল আর কোথায় বাগডুম সিংয়ের ঠ্যাং দুটি! নাগাল পাওয়া অত সহজ। এই দ্যাখো, পুতুল-পল্টন আবার বুঝি পড়েন। এই বুঝি ঘাড় মটকে মরেন! এই রে! এখন যে তাঁর ত্রিশঙ্কু অবস্থা। তিনি না-পারছেন উঠতে, না-পারছেন নামতে! উঠতে গেলে হাত ফসকায়, নামতে গেলে বুক চমকায়। বাগডুম সিং গেলেন! গান গাওয়া তাঁর শিকেয় উঠল। হয়তো তাঁকে সগ্গে গিয়ে গান শোনাতে হবে। আচ্ছা, এমন মিথ্যে বাহাদুরির দরকারটা কী! যার যা খেমতা, সেই নিয়ে থাকলেই তো হয়! তা নয়, বাক্স বাজাবে, বাক্স বাজিয়ে গান গাইবে! এ কী আহ্লাদে-আবদার বাবা! এখন বোঝো ঠেলা!
বাগডুম সিং ঘামছেন। ঝুলতে ঝুলতে ঠকঠক করে কাঁপছেন। ঢোঁক গিলতে শুরু করলেন। এই বুঝি হাত ফসকায়! আর ঠিক তক্ষুনি তিনি চিৎকার করে উঠলেন, —বাঁচাও, বাঁচাও!
ঘড়িতে আরেকটা ঘণ্টা বাজল। মানে রাত্তির দুটো বাজার পর আরও আধ ঘণ্টা কেটে গেল। ঘড়িটা হ্যা-হ্যা করে হেসে উঠল। আর তক্ষুনি তিনি বেঁচে গেলেন। না, বেঁচে গেলেন না বলে বরঞ্চ বলা উচিত তাঁকে বাঁচানো হল। এবং যিনি তাঁকে বাঁচালেন তাঁর নাম—
না, নামটা নাহয় এখুনি না-ই শুনলে। একটু পরে তাঁরই মুখে শুনতে পাবে। তিনি শেলফোর ওপরেই এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং চুপটি করে দেখছিলেন। তাঁকে দেখে বোঝাই যায়নি যে, তিনি নড়তে পারেন বা ছুটতে পারেন। কিন্তু তিনি সত্যি সত্যি হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। বাগডুম সিংয়ের হাতের কাছে নিজের ঘাড়টা বাড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, ধরুন ধরুন। আমায় ধরে ফেলুন।
বাগডুম সিং ডুবন্ত জলে কুটো ধরার মতো আঁকপাঁক করতে লাগলেন। তিনি কাকে ধরবেন, কোথায় ধরবেন, তাই দেখার জন্য প্রাণপণে চোখ দুটো কপালে তুলে চিৎকার করে উঠলেন, কই? কাকে ধরি? আপনিই আমাকে ধরুন। বলতে বলতে তাঁর ঘাড়টা আর একটু এগিয়ে আসতেই বাগডুম সিং নাগাল পেয়ে গেছেন। তিনি খপ করে ধরে ফেলেছেন।
যাঁর ঘাড় ধরলেন, তিনি এবার বাগডুম সিংকে টানতে টানতে বললেন, সাবধানে উঠে আসবেন।
সাবধানে অনেক কষ্টে উঠলেন বাগডুম সিং। আঃ! একবুক নিশ্বেস নিলেন। যাক, বেঁচে গেলেন!
বাঁচলেন বটে, কিন্তু হাঁপাতে হাঁপাতে তাঁর প্রাণ যায় আর কী!
হাঁপটা যখন একটু স্থির হয়ে বুকের ভেতরটা ঠাণ্ডা করে দিল, তখন বাগডুম সিং তাঁর দিকে ভালো করে চেয়ে দেখলেন, তারপর বললেন, আমার আরেক বার ঠিক এমনি হয়েছিল। সেবার হয়েছিল মিরাটের যুদ্ধে! ঠিক এমনই করে ঠ্যাং ঝুলিয়ে আমি বাদুড়-ঝোলা হয়ে ছিলুম পুরো তিন দিন সাড়ে সাত ঘণ্টা। তা আপনাকে তো চিনতে পারলুম না?
যিনি বাগডুম সিংকে বাঁচালেন তিনি বললেন, চিনতে সময় লাগবে। সাধারণত যারা উপকার করে, তাদের সবসময় চেনা যায় না। আর যদিও-বা চেনা যায়, তাদের তাড়াতাড়ি ভুলে যেতে হয়। নইলে বাহাদুরি নেওয়া যায় না।
বাগডুম সিং হে-হে করে বোকার মতো দু-বার হেসে হাত দিয়ে প্যান্টটা পতপত করে ঝেড়ে নিয়ে উত্তর দিলেন, ঠিক বলেছেন তো! আপনার তো মশাই এ ব্যাপারে দারুণ জ্ঞান। আপনার নামটা জানতে পারি কি?
তিনি উত্তর দিলেন, জেট বিমান।
—সে কী মশাই, আপনি উড়োজাহাজ?
—আজ্ঞে।
—তাহলে তো মশাই আপনি সত্যই দারুণ!
তিনি বাগডুম সিংকে জিজ্ঞেস করলেন, —আপনি?
—আমি বাগডুম সিং। বেশ একটু গম্ভীর গলায় উত্তর দিয়ে বাগডুম সিং নিজের গোঁফ জোড়ায় আঙুল বুলিয়ে তা দিলেন।
জেট বিমান আবার জিজ্ঞেস করলেন, —আপনার দেশ?
—মেজোরাম।
জেট বিমান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, —সে কী মশাই? রাম তো একটাই। বড়োরাম, মেজোরাম, সেজোরাম, এমন সিঁড়িভাঙা রামের কথা তো আমি এর আগে কখনো শুনিনি! তবে হ্যাঁ, পরশুরামের কথা বলতে পারেন।
বাগডুম সিং বললেন, কেন মেজোরাম হয় না বুঝি?
—আরে মশাই, হবে না কেন! আজকাল সবই হচ্ছে। সবই উলটোপাল্টে ব্যাপার। এই দেখুন-না, মেয়েরা যখন দল বেঁধে গড়ের মাঠে ফুটবল খেলছে তখন ছেলেরা ঘরের কোণে বসে বসে আচার চাটছে।
—আপনার খুব দেখা আছে তো!
—না-দেখলে তাল রেখে চলব কী করে! পাঁচজনে ঠকিয়ে দেবে।
এবার বাগডুম সিং জিজ্ঞেস করলেন, —আপনার দেশ কোথায় জানতে পারি?
তিনি উত্তর দিলেন, —লাক্ষা দ্বীপে।
—সে জায়গাটা আবার কোন জায়গায়?
—সে জায়গাটা এমন জায়গায় যেখানে তপসে মাছ পাওয়া যায়!
—অ!
জেট বিমান বাগডুম সিংয়ের মুখে অ শুনে জিজ্ঞেস করলেন, অ করলেন যে? বুঝে ফেললেন বুঝি?
বাগডুম সিং উত্তর দিলেন, বুঝলে কি আর অ করতুম।
জেট বিমান বললেন, শাবাশ! আপনি বেশ উত্তর দিয়েছেন। আমি হলপ করে বলতে পারি, আপনি বুঝতে পেরেছেন। যাঁরা না বুঝে অ আ প্রভৃতি শব্দগুলো গড়গড় করে মুখস্থ বলে যেতে পারে, তাঁরা এগজামিনে এক-শোর মধ্যে এক-শো! কিন্তু বোঝবার চেষ্টা করলেই ফেল! না-বুঝে যিনি শুধু উগরে যান, তিনিই উতরে যান। এই তো চলছে আজকাল। তা এখন আপনি শেলফোর কানাটা ধরে অমন বিপজ্জনকভাবে ঝুলছিলেন কেন? চুরিটুরি করা অভ্যেস-টভ্যেস আছে নাকি?

যা!পুতুলটা পড়ে গেল !
—ছ্যা ছ্যা, এ কী বলছেন? আমি মশাই পল্টন। ওই হরিনামটা বাজিয়ে একটু গান গাইবার ইচ্ছে হয়েছিল, তাই নামবার চেষ্টা করছিলুম।
—কী বাজিয়ে?
বাগডুম সিং বুঝলেন বোধ হয় তাঁর নামটা আবার ভুল বলা হয়ে গেল। তাই মুখে এবার উচ্চারণ না করে আঙুল দিয়ে দেখালেন, —ওই যে ওইটা।
জেট বিমান হো-হো করে হেসে উঠে বললেন, আরে দূর মশাই, ওটা হরিনাম হবে কেন? ওটার নাম হারমোনিয়াম।
বাগডুম সিংও জেট বিমানের হাসির সুরে সুর মিলিয়ে উত্তর দিলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন, হার মানি না।
জেট বিমান তেমনি হাসতে হাসতে বললেন, হরি-হরি! আবার ভুল করলেন!
—কেন? কেন?
—উচ্চারণটা আপনার ঠোঁটে আসছে না। হারমোনিয়াম।
—অয়, দেখেছেন! মাঝে মাঝে কথাটা এমন গুলিয়ে যায়!
জেট বিমান এবার জিজ্ঞেস করলেন, তা মশায়ের গান-টানের শখ-টখ আছে বুঝি?
—একটু একটু। বেশ খুশি খুশি হয়ে উত্তর দিলেন বাগডুম সিং। তারপর আবার বললেন, তা শখ থাকলেই-বা কী করি বলুন! দেখুন-না, ইচ্ছে থাকলেও এখান থেকে নেমে যে হরি হরি— বলতে বলতে বাগডুম সিংয়ের হারমোনিয়াম শব্দটা আবার গুলিয়ে গেল।
ঝট করে জেট বিমান ভুলটা শুধরে দিলেন, —হারমোনিয়াম, হারমোনিয়াম।
—হ্যাঁ হ্যাঁ। বলে বাগডুম সিং একটু ঘাড়টা নাড়লেন।
নাড়তে নাড়তে আবার বললেন, এখান থেকে নেমে যে হারমোনিয়ামটা বাজিয়ে আপনাকে একটা গান শোনাব, তার তো আর উপায় নেই। জায়গাটা এত উঁচু, নামাই দায়!
জেট বিমান বললেন, তা আপনি যদি সত্যি সত্যি গান শোনান, আমি আপনাকে এখান থেকে নামিয়ে দিতে পারি।
বাগডুম সিং চমকে তাকালেন। আগ্রহে গলাটা বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, পারেন নাকি? সত্যি? কেমন করে পারবেন?
—কেন? খুব সহজ। উড়ে উড়ে। আপনি বসে পড়ুন-না আমার পিঠের ওপর, এক্ষুনি নামিয়ে দিচ্ছি।
—বসব তাহলে?
—নির্ভয়ে।
বাগডুম সিং বসতে বসতে বললেন, পড়ব না তো?
জেট বললেন, আপনি কেমন সৈনিক? একটুও সাহস নেই!
বাগডুম সিং বসে পড়লেন। বসতে বসতে বললেন, সাহস আমার যথেষ্ট আছে। তবে কী জানেন, একটু আগে দেখলুম পড়ে গেলে ভীষণ লাগে!
—তা পড়লে একটু লাগবে বই কী। বলে জেট বিমান বাগডুম সিংকে পিঠে নিয়ে ভট-ভট করে উড়তে উড়তে বললেন, ধরবেন ভালো করে। আমি এবার নামছি। নামবার সময় ফসকাবেন না যেন।
বাগডুম উত্তর দিলেন, না, ফসকাচ্ছি না। ধরেছি।
—তা হলে নামি?
—নামুন।
জেট বিমান বাগডুম সিংয়ের কথা শুনে হুশ-শ-শ করে নেমে পড়লেন সেই ফরাস-পাতা ঘরের মেঝেয়। একেবারে হারমোনিয়ামটার পাশে। তারপর বাগডুম সিংকে বললেন, এবার আমার পিঠ থেকে নেমে আসুন।
বাগডুম সিং নামতে নামতে বললেন, আরিব্বাস! আপনার তো মশাই দারুণ বাহাদুরি।
জেট বিমান হাসতে হাসতে বললেন, আমার বাহাদুরি তো দেখলেন। এবার আপনার বাহাদুরিটা দেখান! এবার একটা গান শোনান দেখি। হাত বাড়ালেই হারমোনিয়াম। বলে জেট বিমান আবার পট-পট-পট-পট করে উড়তে উড়তে বইয়ের শেলফোর ওপর নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়লেন।
জেট বিমানকে উড়ে চলে যেতে দেখে বাগডুম সিং চেঁচিয়ে উঠলেন, —এ কী করছেন! আমায় নীচে ফেলে কাটছেন কেন? অত দূর থেকে গান শুনবেন কী করে?
জেট বিমান শেলফোর ওপর থেকে বাগডুম সিংয়ের দিকে মাথা উঁচিয়ে বললেন, দেখুন আজকালকার গান মানে আধুনিক গান তো, একটু দূর থেকে শুনলেই বেশি মিষ্টি লাগে। শুরু করুন।
কিন্তু শুরু করবেন কী! হারমোনিয়াম দেখে তো বাগডুম সিংয়ের চক্ষু চড়কগাছ। আরে বাবা! বাজনাটা কী পেল্লাই উঁচু রে। বাজনাটার সামনে বাগডুম সিং তো লিলিপুট। ওপর থেকে মনে হচ্ছিল নামলেই বুঝি কেল্লা ফতে! কিন্তু এখন কোথায় বাজনা আর কোথায় বাগডুম। হাতই পৌঁছোবে না, বাজানো তো পরের কথা!
বাগডুম সিংকে আর কোনো কথা বলতে না শুনে জেট বিমান বললেন, কী হল? শুরু হোক!
বাগডুম সিং উত্তর দিলেন, আরে মশাই, এ যে আর এক বিপত্তি!
—কেন, আবার কী হল?
হারমোনিয়ামে হাত যাচ্ছে না। ওপর থেকে মনে হচ্ছিল হারমোনিয়ামটা একদম নীচু। কিন্তু নীচে নেমে দেখি আমিই নীচু। উত্তর দিলেন বাগডুম সিং।
জেট বললেন, সব ব্যাপারেই এইরকম। জানেন তো, ওপরে থাকলে সব কিছুকেই মনে হয় নীচু নীচু। আর ওপর থেকে নীচে নামলে দেখে-শুনে মনে হয় নিজেই নীচু! এ তো হামেশাই দেখতে পাবেন!
—অ! তা হলে তো গান ভেস্তে গেল!
—ভেস্তাবে কেন? হারমোনিয়াম ছাড়াই হোক। জানেন, বড়ো বড়ো ওস্তাদরা শুধু হাত নেড়েই গান করেন। ওসব হারমোনিয়াম তাঁরা তোয়াক্কা করেন না। হোক হোক, খালি গলাতেই হোক।
—বলছেন? তাহলে গাই, কী বলুন?
—নিশ্চয়ই।
বাগডুম সিং জেট বিমানের আশ্বাস পেয়ে তেড়ে-মেড়ে গলা ঝেড়ে নিলেন। তারপর যেই গাইতে গেছেন, সঙ্গেসঙ্গে থমকে গেছেন। তাই তো, তিনি গাইবেনটা কী। তাঁর তো গানের খাতা নেই। কথাও জানা নেই! এই সেরেছে!
জেট বিমান বাগডুম সিংকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার তাড়া দিলেন, —কী হল? এক্ষুনি বর-কনে যে উঠে পড়বে!
বাগডুম সিং তাড়া খেয়ে সাড়া দিলেন, —এই হচ্ছে। বলেই বরের দিকে নজর পড়ে গেল। এবং চমকে উঠে তাঁর মনের ভেতর যেন গানের কথাগুলো ঝলকে উঠল। তিনি গেয়ে ফেললেন:
—জামাইবাবু দিচ্ছে ঘুম...
প্রথম লাইন গানটা শুনেই জেট বিমান আহা! আহা! করে চেঁচিয়ে উঠলেন। কিন্তু বাগডুম সিং পরের লাইনটা যে কী গাইবেন ভেবে পাচ্ছেন না। তখন আবার জেট বিমান জিজ্ঞেস করলেন, থামলেন যে? থামবেন না, থামবেন না, তাল কেটে যাবে। চালিয়ে যান।
সঙ্গেসঙ্গে বাগডুম সিংয়ের নজর পড়ে গেল মাথার ওপর আলোর দিকে। তিনি গেয়ে উঠলেন:
মাথার ওপর জ্বলছে ডুম...
জেট বিমান আবার তাল দিলেন, —বাহা, বাহা!
বাগডুম সিংয়ের এবার নজর পড়ল দেওয়ালের দিকে:
—টিকটিকিটা হাঁটছে দ্যালে...
জেট বিমান এবার তালের সঙ্গে তালি দিলেন, —ওহো, ওহো।
পরের লাইনটা ভাবতে ভাবতে বাগডুম সিংয়ের এবার জামাইবাবুর পকেটের দিকে নজর পড়ে গেল। গান থামিয়ে নি:সাড়ে তিনি জামাইবাবুর কাছে এসে পকেটে হাত গলিয়ে দিলেন।
জেট বিমান দেখে ফেললেন! —ও কী করছেন? ও কী করছেন? পকেট মারছেন?
—আজ্ঞে না, গান খুঁজছি। বলেই আবার গেয়ে উঠলেন :
—জামাইবাবুর পকেট ঢু ঢু...
সঙ্গেসঙ্গে জেট বিমান বলে উঠলেন, আমার একটা লাইন মনে এসেছে, গাইব?
বাগডুম বললেন, গান-না!
জেট গাইলেন:
‘‘জামাইবাবুর পকেট ঢুঢু,
বাগডুম সিং খাবেন ডুডু!’’
হেসে ফেললেন বাগডুম সিং হো-হো করে। হাসতে হাসতে বললেন, আপনার তো বেশ জ্ঞান আছে! ইচ্ছে করলে আপনি গান লেখার চাকরি-টাকরি নিতে পারেন। তবে গলাটা আপনার একটু মোটা।
জেট বললেন, আরে মশাই, একে মোটা বলে না। বলে ভরাট।
আমার গলাটা আপনার কীরকম মনে হচ্ছে? জিজ্ঞেস করলেন বাগডুম সিং।
—দুর্দান্ত। গেয়ে যান। উত্তর দিলেন জেট বিমান।
জেট বিমানের উত্তর শুনে দ্বিগুণ উৎসাহ পেলেন বাগডুম সিং। এবং উৎসাহ পেয়ে গানের নতুন লাইন খুঁজতে খুঁজতে এখন তাঁর কনের গলার দিকে নজর পড়ল এবং তিনি গেয়ে উঠলেন:
‘‘কনে-বউয়ের গলায়...’’
গাইতে গিয়ে থমকে থামলেন বাগডুম সিং।
জেট বিমান জিজ্ঞেস করলেন, কী হল, থামলেন কেন?
বাগডুম সিং উত্তর না দিয়ে কনেবউয়ের গলায় যে সোনায় গাঁথা হিরা-জহরতের হারটা জ্বলজ্বল করছে, সেইদিকে অবাক হয়ে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন।
জেট বিমান আবার বললেন, থামবেন না, থামবেন না। চালিয়ে যান।
ততক্ষণে চুপি চুপি বাগডুম সিং ঘুমন্ত কনের কাছে এগিয়ে গেলেন। নি:সাড়ে ঘুমোচ্ছে কনে। তিনি দেখছেন কনের গলায় সাজানো হারটি। সেই হার থেকে হিরা-জহরতের জৌলুস বাগডুম সিংয়ের চোখে ঠিকরে পড়ছে।
এমনসময় জেট বিমান আবার ডাকলেন, সাড়া দিচ্ছেন না কেন?
বাগডুম সিং এবারও সাড়া দিলেন না। উলটে কনেবউটি যে বালিশটা মাথায় দিয়ে শুয়ে আছে, সেই বালিশটা দু-হাত দিয়ে খামচে ধরলেন। খামচে ধরে হামাগুড়ি দিলেন তিনি বালিশের ওপর। তারপর খাড়া দাঁড়িয়ে পড়লেন বালিশটার মাথায়। কনের গলার হারটি ধরার জন্যে হাত বাড়ালেন।
জেট বিমান হঠাৎ দেখতে পেয়েছেন। চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, —ও কী করছেন পল্টনমশাই?
অমনি সঙ্গেসঙ্গে ঢং! ঢং! ঢং!
ঘড়িতে তিনটে ঘণ্টা বেজে উঠল।
ঘণ্টা শুনে আঁতকে উঠলেন বাগডুম সিং।
ঘণ্টা বাজিয়ে ঘড়িটা চেঁচিয়ে উঠল, —চোর, চোর।
বাগডুম সিং ধরা পড়ে গেছেন। পেছন ফিরে যেই চোঁচা দৌড় মারতে গেছেন ব্যাস, টাল সামলাতে পারলেন না। আবার ডিগবাজি খেলেন। খেলেন খেলেন বাইরে খান, তা নয়। একেবারে পা-হড়কে কনের ঘাড়ের ওপর হুড়মুড়িয়ে চিতপটাং!
কনে আচমকা মা-উ বলে চিৎকার করে বেমক্কা হাত চালিয়ে দিলে একদম বাগডুম সিংয়ের ঘাড়ে। হাত লেগে বাগডুম সিং ফটাস। সাত হাত দূরে ছিটকে পড়লেন। সাত হাত দূরে কনের পিসতুতো বোন কপালে চোখ তুলে নিদ্রা যাচ্ছিলেন। পড়বি তো পড় তার ঘাড়ে ধাঁই! তিনি উ-বাবা-গো বলে ধড়মড়িয়ে উঠে চমকে বাগডুম সিংয়ের দিকে তাকালেন। ঘুম তো তাঁর তখনও চোখে জড়িয়ে। সেই ঘুম-চোখে বাগডুম সিংকে তাঁর বাগডুম সিং বলে মনেই হল না। মনে হল যেন একটা ছুঁচো! অমনি তিনি লাফিয়ে উঠে চেঁচিয়ে উঠলেন, —ছুঁচো!
আর দেখতে হয়, একঘর ঘুমন্ত মানুষ ঘুম-ছটকে ছুঁচো ছুঁচো করে চেঁচিয়ে উঠে লাফালাফি লাগিয়ে দিলে। মাসি লাফায় তো মাসির মেয়ে লাফায়! বউদি হাঁপায় তো মেজদি চ্যাঁচায়। খুড়ি নাচে তো বুড়ি হাঁচে! সঙ্গেসঙ্গে বর-বাবাজি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে চেঁচিয়ে হাঁকে, —কই ছুঁচো?
—ওই ছুঁচো! একসঙ্গে সবাই চেঁচিয়ে উঠল।
এই রে! এই সেরেছে! বাগডুম সিংকে যে ওরা দেখতে পেয়েছে! ওর দিকেই তো ছুঁচো বলে আঙুল দেখাচ্ছে! বাগডুম সিং কাট! কাট মানে কোথায় কাটবেন? এদিকে বর যে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসছে! বরের ঠ্যাংয়ের ফাঁক দিয়েই বাগডুম সিং মারলেন ছুট! বর মুখ ঘুরিয়ে দেখতে-না-দেখতে মাসির পায়ের নীচ দিয়ে ভো-মারি! মাসি বাবা রে, মা রে বলে হুমড়ি খেয়ে পড়তে-না-পড়তেই বউদির হাতের পাশ দিয়ে চোঁচা দৌড়! তারপর বিয়েবাড়ির একঘর লোকের সঙ্গে বাগডুম সিংয়ের শুরু হয়ে গেল ছুঁচোবাজির খেলা! একঘর লোক এমন ছুটোছুটি, লাফালাফি আর হাঁকাহাঁকি শুরু করে দিলে, যেন মনে হল ছুঁচো নয়, ঘরে ডাকাত পড়েছে!
বাগডুম সিং এখন যে কী করেন, কাকে ধরেন, কোথায় লুকোন কিছুই ঠাওর করতে না পেরে জোরে চিৎকার করে উঠলেন —বিমান-জ্যাঠা, আমাকে বাঁচান!
আসলে ভয়ে তিনি এখন দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য! এমন ভয় পেয়েছেন, জেট বিমান নামটি ভুলে তাঁকে জ্যাঠামশাই বলে ডাকতে শুরু করে দিলেন!
রক্ষে, ঠাকুরের দয়ায় অত গন্ডগোলের মধ্যেও জেট বিমান বাগডুম সিংয়ের গলা শুনতে পেয়েছেন! আর সময় নষ্ট না করে তিনি ঝটিতি ডানা বাড়িয়ে শেলফোর ওপর থেকে ওড়া দিলেন। উড়তে উড়তে এর মাথায়, ওর পিঠে, তার ঘাড়ে ঠাঁই ঠাঁই করে ঠোক্কর মারতে লাগলেন। ঘরের ভেতর সে আর এক তুলকালাম কান্ড। নীচে বাগডুম সিং ছুঁচোবাজি খেলছেন, ওপরে জেট বিমান হাওয়াবাজি লড়ছেন!
হঠাৎ কে যেন জেট বিমানকে দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়ে চিৎকার করে উঠল, —হাওয়া ভূত, হাওয়া-ভূত! পালাও পালাও!
বলতে-না-বলতে একঘর লোক দরজা ডিঙিয়ে বাবা গো, মা গো বলে দুদ্দাড়িয়ে যে যেদিকে পারল দে ছুট, দে ছুট! সে কী সাংঘাতিক পালাই পালাই হল্লাবাজি!
ঘর ফাঁকা। এদিকে তখনও উড়ছে জেট বিমান। তিনি উড়তে উড়তে ভাবলেন এক্ষুনি একটা কিছু করা দরকার, নইলে গোলমালটা আরও তালগোল পাকিয়ে যাবে! কেননা, এক বার যখন মাথায় ঢুকেছে ঘরে ভূত উড়ছে, তখন ভূত তাড়াতে ওঝা আসতে বেশি দেরি হবে না। কিন্তু তাই তো! তিনি কোথায়? তাঁকে তো দেখা যাচ্ছে না!
কাকে?
ওঁকে, ওঁকে! মানে বাগডুম সিংকে! এই দ্যাখো, কারও কাপড়ের প্যাঁচে জড়িয়ে পল্টনটা লটকে গেল নাকি!
জেট বিমান বাগডুম সিংকে দেখতে না পেয়ে উড়তে উড়তে ছটফটিয়ে উঠলেন। খুব নরম গলায় তিনি ডাকলেন, বাগডুম সিং, ও মিস্টার বাগডুম সিং! কোথায় গেলেন আপনি?
হঠাৎ দেখা গেল বাগডুম সিং একটা আলমারির নীচ থেকে মাথা বাড়িয়ে উঁকি মারছেন। এবং হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দিলেন, এই যে, আমি এখানে।
জেট বিমান বললেন, জলদি, জলদি বেরিয়ে আসুন, নইলে সাংঘাতিক বিপদ হবে!
বাগডুম সিং হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে এসে আর একটু গলা বাড়িয়ে ইদিক-উদিক চেয়ে বললেন, বেরুব? কেউ নেই তো?
এখন নেই। কিন্তু এক্ষুনি এসে পড়বে। জেট বিমান উত্তর দিলেন।
—তবে বেরিয়ে পড়ি, কী বলেন?
—হ্যাঁ, দেরি করা ঠিক না।
বলতে বলতেই তাই। যেই-না বাগডুম সিং আলমারির নীচ থেকে বেরিয়েছেন, আর ঠিক তক্ষুনি বাড়ির বামুনঠাকুর ভূত তাড়াতে ঘরে ঢুকেছেন। বলে, বামুন দেখলে নাকি ভূত ঘেঁষে না। তা আমাদের বামুনঠাকুরটি বামুন বলে বামুন— কী দশাসই চেহারা! পেটটি মোটা। পৈতে আঁটা। নেড়া-মাথায় লম্বা টিকি। তিনি কই ব্যাটা ভূত বলে যেই-না হাঁক পেড়েছেন আর অমনি জেট বিমান ঠকাস করে ঝেড়েছেন এক গোঁত্তা। ঠাকুরের নেড়া-মাথাটা ঝনঝন করে উঠল। ঠাকুর বাবা গো বলে মারলেন লাফ! লাফ মেরেই লাগ-বঙাবং লাগ-বঙাবং চরকি খেতে লাগলেন। যা:! বামুনঠাকুরের টিকির সঙ্গে জেট বিমানের ঠ্যাং গেছে জড়িয়ে। জড়িয়ে গিয়ে, বামুনঠাকুরের সঙ্গে চরকি খেতে খেতে জেট বিমান গোঁ-ও-ও করে দম ফেলতে লাগলেন। জেট বিমানের সেই গোঙানি শুনে, বামুনঠাকুরের তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া। তিনি ভাবলেন ভূতটা বুঝি তাঁর টিকি ধরে ঝুলে পড়েছে! আর দেখতে! ঠাকুর ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করলেন। কাঁপতে কাঁপতে ধপাস! মাটিতে পড়ে মূর্ছা গেলেন। ঠাকুরের টিকিতে আটকে জেট বিমানও গোঁত্তা খেলেন বটে, কিন্তু তাঁর চাকার সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া টিকিটি খুলল না। তিনি চ্যাঁচালেন, —ও সিংমশাই, কোথায় গেলেন? তাড়াতাড়ি আসুন! টিকির সঙ্গে আমার প্যাঁচ লেগে গেছে। খুলে দিন শিগগির!
বাগডুম সিং ঠাকুরকে দেখে আবার ঢুকে পড়েছিলেন আলমারির নীচে। আবার তিনি উঁকি মারলেন, দেখলেন হ্যাঁ সত্যিই তো জেট বিমান ঠাকুরের টিকি আটকে লটকে পড়েছেন! তাড়াতাড়ি হামা দিয়ে বেরিয়ে এলেন। বেরিয়ে জেট বিমানের ল্যাজ ধরে টানাটানি লাগিয়ে দিলেন। কিন্তু এমন পেঁচিয়ে গেছে, সে-প্যাঁচ আর খোলেই না।
বাগডুম সিং চেঁচিয়ে উঠলেন, আরে মশাই, এ কী করেছেন আপনি? এ যে ভীষণ জট পাকিয়ে গেছে, খোলা মুশকিল! টিকিটা কেটে দেব?
কাটবেন কী দিয়ে? জিজ্ঞেস করলেন জেট বিমান।
ছুরি দিয়ে। আমার কোমরে ছুরি আছে। উত্তর দিলেন বাগডুম সিং।
—তাই দিন।
ক্যাঁচ! কোমর থেকে ছুরি বার করে বাগডুম সিং ঠাকুরের টিকিটি একেবারে পেঁচিয়ে কেটে দিলেন। তখন জেট বিমান আবার ভট ভট করে ক-বার দম নিয়ে বাগডুম সিংকে বললেন, আমার পিঠে শিগগিরি উঠে পড়ুন। পালাতে হবে, নইলে মৃত্যু!
বাগডুম জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় পালাবেন?
—যেদিকে দু-চোখ যায়।
বাগডুম জেটের পিঠে বসতে বসতে বললেন, সেই ভালো। এই বয়েসে মরতে আমি রাজি নই। আমাদের যুদ্ধের সময়ও এমনই করে পালাতে হয়। আমরা বলি, পালানো মানে পরাজয় নয়।
অচৈতন্য ঠাকুরের এবার চৈতন্য ফিরছে। তিনি নড়লেন। বাগডুম সিং চমকে উঠলেন, এবং ভয় পেয়ে তিনি জেট বিমানের নামটা আবার গুলিয়ে ফেলে চ্যাঁচালেন, বিমান-জ্যাঠা, লোকটা নড়ছে।
জেট বিমান সঙ্গেসঙ্গে বাগডুম সিংকে পিঠে নিয়ে উড়তে শুরু করলেন। তাই দেখে ঠাকুর আই বাপ রে বলে কেঁদে এমন চিৎকার করে উঠল যে, বাড়িসুদ্ধ সবাই বাপ রে, বাপ রে বলে সেই ঘরে ছুটে এসেছে।
বাগডুম সিং চ্যাঁচালেন, পালান, পালান।
অমনি জেট বিমান কোথায় যাই, কোথায় যাই করতে করতে ঘরের খোলা জানলা দিয়ে সোজা বাইরে আকাশে উড়ে পালালেন।
ঢং ঢং ঢং ঢং।
তক্ষুনি ঘড়িতে চারটে বাজল। ঘণ্টা বাজিয়ে ঘড়িটা বললে, ছি ছি, চোর দুটো ভেগে গেল!
বিয়েবাড়ির লোকেরা তো তাই দেখে হাঁ! তারপর নিজেরাই এমন চেঁচামেচি লাগিয়ে দিলে, যেন মনে হচ্ছে ভাগাড়ে গোরু পড়েছে! চেঁচামেচি করতে করতে বলাবলি করল, ভূতটা বোধ হয় বিয়েবাড়িতে ভোজ খেতে এসেছিল!
বরটা কিন্তু মনে মনে ভাবতে লাগল, কী রে বাবা! আমার কি শেষে ভূতের ঘরে বিয়ে হল!
যাই হোক, যে যাই ভাবুক, এখন আপাতত বাগডুম সিং জেট বিমানের পিঠে আকাশে পাড়ি দিয়েছেন। এবং ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ভালো লাগছে! এমনি করে উড়ো জাহাজের পিঠে চেপে তিনি এর আগে আর কখনো আকাশে ওড়েননি। এতদিন তো ঘরের কোণে বন্দি ছিলেন। শেলফোর ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তিনি দিন-রাত ঘুমিয়েছেন। আকাশে ওড়ার যে এত মজা তা তো তিনি আগে জানতেন না। অবিশ্যি আকাশে এখনও রাতের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। এখনও চাঁদের আলো আকাশ উপচে পড়ছে। আকাশের আলো রেশমি নীল চুমকি-আঁটা কাপড় বিছিয়ে যেন মাটিতে দোল খাচ্ছে। চোখ মেলে সেই আলোর দিকে চেয়ে থাকতে বাগডুম সিংয়ের ভারি অবাক লাগছিল। এবং তিনি ভাবলেন এই সময় আর একটা গানও গাওয়া যেতে পারে। কেন জানি না, তাঁর মনে হচ্ছিল যেন চাঁদের আলো তাঁর গলায় সুড়সুড়ি দিয়ে তাঁকে হাসিয়ে হাসিয়ে গান গাইবার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তিনি গেয়েও ফেলতেন এবং তাঁর ঠোঁটের ডগাটি সুরের ঠেলায় ঢেউ খেলে উঠেছিল প্রায়! কিন্তু গাওয়া হল না। কারণ, জেট বিমান এইমাত্র কথা বলে উঠলেন এবং গম্ভীর গলায় বাগডুম সিংকে জিজ্ঞেস করলেন, কী মশাই, কিছু বলছেন না যে? বুঝতে পেরেছেন বুঝি আমরা খুব বিপদের মধ্যে পড়ে গেছি?
বিপদ কথাটা শুনে বাগডুম সিং কোথায় ভয় পাবেন, তা না উলটে হেসে উঠে বললেন, ঠাট্টা করছেন বুঝি? আর বিপদ-টিপদে ভয় পাই না। কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে!
জেট বিমান বললেন, দেখুন, পল্টন না হয়ে লণ্ঠন জ্বেলে আপনার কবিতা লেখা উচিত ছিল। আরে মশাই, চাঁদ আর কতক্ষণ। একটু পরেই তো সূর্য উঠবে। শুনে এলেন তো ঘড়িতে চারটে বাজার ঘণ্টা।
এবার বাগডুম সিং যথেষ্ট ভয় পেলেন। এবং ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে কী হবে?
জেট বিমান উড়তে উড়তে হঠাৎ আনিমানি করে ঘুরে হাওয়ায় পাক মারলেন। বাগডুম সিং পড়তে পড়তে দু-হাত দিয়ে বিমানের গলাটা ঝপাং করে আঁকড়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন, —কী করছেন? কী করছেন?
বিমান বললেন, কিছু না, কিছু না। আপনি বাগিয়ে ধরে থাকুন। আমি পাক মেরে মাথাটা একটু খেলিয়ে নিচ্ছি। অনেকসময় এমনই করে ঝাঁকুনি দিলে ভালো ভালো বুদ্ধি মাথার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।
—অ! তাই বলুন। আমি ভাবলুম আপনার দম আটকে গেল।
বুদ্ধি কিছু বেরুল? জিজ্ঞেস করলেন বাগডুম সিং।
—না।
—তাহলে?
—বিপদ!
—এক কাজ করলে হয় না? আপনার দেশ লাক্ষাদ্বীপে যাওয়া যেতে পারে তো?
—পারে। কিন্তু মুশকিল কী জানেন, শুনেছি লাক্ষাদ্বীপ আর লাক্ষাদ্বীপে নেই। সমুদ্রের জলে ভাসতে ভাসতে অন্য আরেক জায়গায় চলে গেছে। আর সেই জায়গায় যাবার রাস্তাটাও আমার ঠিক জানা নেই।
এমনসময় হঠাৎ একটা কাক ডেকে উঠল।
জেট বিমান চিৎকার করে উঠলেন, —কী করবেন তাড়াতাড়ি বলুন। কাকের ঘুম ভাঙছে।
বাগডুম সিং বললেন, কাকগুলোকে আর একটু ঘুমোতে বললে হয় না? ওরা যতক্ষণ ঘুমোবে ততক্ষণে আমরা অনেকটা চলে যেতে পারব।
জেট বিমান এবার একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, আপনি মশাই কিছু বোঝেন না। কাক ঘুমোলে কি সূর্য ওঠা বন্ধ হবে? তখন তো আরও ঝামেলা বেঁধে যাবে!
—উফ! তা হলে কী করা যায় বলুন তো? ভারি ছটফটিয়ে উঠল বাগডুম সিংয়ের মনটা। এবং তিনি কিছু ভেবে না পেয়েই জেটকে বললেন, তাহলে চলুন, আমরা ওই গাছটার ডাল-পাতায় এখনকার মতো লুকিয়ে থাকি।
জেট বললেন, কথাটা মন্দ বলেননি। তাই চলুন। বলে জেট বিমান মাথা ঘুরিয়ে কান্নিক মেরে একটা ঝাঁকড়ামতো গাছকেই টিপ করে উড়ে গেলেন। তারপর ফ্যাঁ-স-স করে ব্রেক কষে গাছের আগ-ডালের একটি নিরিবিলি জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন।
বাগডুম সিং স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, যাক, বিপদ কাটল।
—অনেকটা। জেট উত্তর দিলেন। উত্তর দিয়ে ধকলটা সামলাবার জন্যে একটু দম নেবার চেষ্টা করছেন, এমনসময় আচমকা কে যেন গাছের ওপর কথা কয়ে উঠল, কার বিপদ কাটল হে?
বাগডুম সিং জেট বিমানের পিঠ থেকে নেমে একটি ডালে পা ঝুলিয়ে বসবেন বলে সবে পা বাড়িয়েছেন, ঠিক এই সময়ে অচেনা গলার আওয়াজ শুনে থতোমতো খেয়ে গেছেন। আরেকটু হলেই পা-ফসকে গাছের ডাল থেকে মেরেছিলেন ডিগবাজি। সেই ধাক্কায় জেট বিমানও প্রায় ছররা কেটেছিলেন! কিন্তু রক্ষে, তেমন কোনো অঘটন ঘটল না। দু-জনেই টলমলিয়ে সামলে গেলেন। সামলে গিয়ে দু-জনাই চোখ পাকিয়ে যার গলা শোনা গেল, তাকে খুঁজতে লাগলেন। এই দ্যাখো, তিনি তো পাশেই বসে। জেট বিমান না-দেখে সরাসরি তারই সামনে খাড়া দাঁড়িয়ে পড়েছেন। সর্বনাশ!
তার চোখে চোখ পড়তেই বাগডুম সিংয়ের আক্কেলগুড়ুম! তার বিতিকিচ্ছিরি মুখখানা দেখে বাগডুমের দাঁতকপাটি লেগে যাবার গোত্তর! সেই অবস্থায় তিনি আঁতকে চিৎকার করে উঠলেন, কে! সে তেমনি ঠাণ্ডা গলায় উত্তর দিলে, আমি, আমি পাঁচকড়ি পেচক। দেখা গেল— পাঁচকড়ি-পেচক গাছের ডালে বসে বসে একটি ইঁদুরের ঠ্যাং চুষছেন। চুষতে চুষতে আবার বললেন, খাওয়াটা শেষ করে ফেলি। রোদ উঠে গেলে আবার চোখে দেখি না। আজকাল তো আর টাটকা ইঁদুর পাওয়াই ভার। জানো তো, আজকাল এ দেশের ইঁদুর সব বিদেশে চালান যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, লোমওয়ালা ইঁদুর ওসব দেশে খুব চাহিদা। এদিকে আমাদের পেটে যে টান পড়ছে, সেদিকে কে মন দেবে বলো? তা দুটিতে এখন কোথায়?
বাগডুম সিংয়ের চক্ষু কপালে। আমতা-আমতা করে বললেন, এখানে, মানে চাঁদ উঠেছে তো! তাই একটু ইয়ে আর কী—
—চাঁদ দেখতে বেরিয়েছ? বাগডুম সিংয়ের মুখের কথাটা কেড়ে জিজ্ঞেস করল পাঁচকড়ি-পেচক। —তা পদ্য-টদ্য লেখা অভ্যেস-টভ্যেস আছে বুঝি?
বাগডুম সিং থতোমতো খেয়ে কীরকম হেঁ-হেঁ করতে করতে বললেন, না, তেমন কিছু নয়।
পাঁচকড়ি-পেচক ইঁদুরের ঠ্যাঙের শেষ মাংসটুকু ঠুকরে খেয়ে ফেলে গাছের ডালে ঠোঁটটি মুছে নিয়ে বললে, তা লিখবে কী! এখন কি আর চাঁদের সেদিন আছে! যেদিন থেকে মানুষ চাঁদে যাওয়া-আসা শুরু করেছে, সেদিন থেকে চাঁদের কবিতাও শেষ হয়ে গেছে। দেখছ না, ইদানীং চাঁদের আর তেমন জেল্লা নেই! তা ওটি কে?
—আজ্ঞে উনি বিমান-জ্যাঠা।
পাঁচকড়ি-পেচক বললে, তা ভালো! তুমি তাহলে জ্যাঠার ঘাড়ে চেপে চাঁদ দেখতে বেরিয়েছ? জ্যাঠামশাইটি তো ভারি মাইডিয়ার!
জেট বিমান সঙ্গেসঙ্গে ভুলটা শোধরাবার জন্যে বলে উঠলেন,
—না না, উনি ভুল বলছেন। আমি বিমান-জ্যাঠা নই। আমি জেট বিমান।
সে জিনিসটা কী? পেচক জিজ্ঞেস করলে।
বাগডুম বললেন, এরোপ্লেন।
—ও তাই বলো, হাওয়াই জাহাজ।
বাগডুম আবার বললেন, উনি দারুণ উড়তে পারেন।
—তাই নাকি! বলে পাঁচকড়ি-পেচক তার গোল গোল চোখদুটো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে জেট বিমানটাকে দেখে নিলে একবার। তারপর জিজ্ঞেস করলে, ঘণ্টায় কতটা?
বাগডুম সিং বললেন, অনেকটা।
—অনেকটা মানে? কতটা?
তা অনেকটা। আবার বললেন বাগডুম সিং।
আমার চেয়েও অনেকটা? জিজ্ঞেস করলে পাঁচকড়ি।
আপনার অনেকটা কতটা, সেটা তো ঠিক আমাদের জানা নেই। উত্তর দিলেন বাগডুম সিং।
পাঁচকড়ি-পেচক বললে, ওর অনেকটা ঠিক যতটা, তার চেয়ে আমার অনেকটা ঠিক ততটা।
—ফুস! হঠাৎ ভারি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে শব্দটা বেরিয়ে এল জেট বিমানের মুখ থেকে।
অমনি চট করে একটা চোখ বুজে গেল পাঁচকড়ি-পেচকের। ঠোঁট দুটো একটু ফাঁক করে একপেট হাওয়া গিলে ফেললে। তারপর জিজ্ঞেস করলে, ফুস মানে?
জেট বিমান বললেন, ফুস মানে, আপনি আমার সঙ্গে উড়নবাজি লড়তে এলে আমি আপনাকে ট্যাঁকে গুঁজে ফেলতে পারি!
—ওহে ছোকরা, ভারি অপমানজনক কথা বলো যে দেখি! ভীষণ রেগে গেল পাঁচকড়ি-পেচক। —আমি হেন আমি, আমায় তুই ট্যাঁক দেখাস! চাঁদ দেখতে এসে পাঁচকড়ির সঙ্গে ফাজলামি!
বাগডুম সিং দেখলেন, এই রে, লেগে গেছে! সামলাবার জন্যে তাড়াতাড়ি বললেন, এই দেখুন, ভুল হয়ে গেছে! কী করতে কী হয়ে গেল! আসলে উনি ফুস বলতে চাননি। ওঁর তো খুব খিদে পেয়েছে, তাই ফুস করে একটি ঢেঁকুর মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে! আপনি একটু ঠাণ্ডা হন!
পাঁচকড়ি-পেচক ঠাণ্ডা হওয়া দূরে থাক, আরও খেপে গিয়ে বললেন, আমি ফুটবলের ব্লাডার না মিনি বাসের চাকা যে আমায় ফুস বলে! না না, আমি ওই ঝুটো-কথায় ঠাণ্ডা হব না। ও আমার সঙ্গে উড়ে দেখাক! দেখি ওর কত মুরোদ! দেখি ও কেমন করে আমায় ট্যাঁকে গোঁজে। আয় দেখি, ওড় আমার সঙ্গে। বলে পাঁচকড়ি-পেচক ডানা ঝাপটালে।
জেট বিমানও ভটভট করে তেড়ে উঠে বললেন, আসুন-না! বলে বাগডুম সিংকে পিঠে নিয়েই বোঁত করে হাওয়ায় গোঁত মারলেন।
সঙ্গে সঙ্গে পাঁচকড়িও পা ঠুকে, ডানা ছড়িয়ে শূন্যে ওড়া দিলে। দু-জনেই উড়ে গেল!
ঝগড়া করতে করতে এদিকে কারও খেয়ালই নেই, আকাশটা ফর্সা হয়ে আসছে। চাঁদটা আকাশের আলোয় ফ্যাকাশে মেরে যাচ্ছে। আর কাকেদের কাকা-কাকির ডাকাডাকি শুরু হয়ে গেছে।
আচমকা জেট বিমান যে অমন করে বাগডুম সিংকে পিঠে নিয়েই পাঁচকড়ি-পেচকের সঙ্গে উড়নবাজি লড়ে যাবে, সেটা বাগডুম সিং একদমই বুঝতে পারেননি। তাই বাগডুম সিং জেট বিমানকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন, করছেন কী? মারা পড়বেন যে!
কিন্তু গোঁ জিনিসটা এমন, এক বার মাথায় চাপলেই মুশকিল! তখন কি আর দিগবিদিক জ্ঞান থাকে? জেট বিমানের কথা নাহয় নাই ধরলুম। কিন্তু অমন যে পাঁচকড়ি, তিনিও কি পাগল হলেন?
শোঁ শোঁ করে খোলা আকাশের নীচ দিয়ে পাঁচকড়ি উড়ছে, পাঁচকড়ির পাশে পাশে বোঁ-বোঁ করে জেট উড়ছেন। আর জেট বিমানের পিট খামচে বাগডুম সিং ভাবছেন দু-গোঁয়ারের পাল্লায় পড়ে শেষে তাঁর-না প্রাণটি যায়!
তবে কিন্তু বলতেই হবে জেটের বাহাদুরি আছে। অমন ধুমসো মুখ-থ্যাবড়া পাঁচকড়িবাবুকে প্রায় কাত করে ফেলেছিলেন। আর একটু হলেই গো-হারান! কিন্তু বাদ সাধল একটা কাক। কাকের চোখে তো আর ধুলো দেওয়া যায় না। সে দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়ে বাছাধন এমন কা-কিয়ে উঠল যে ব্যাস! পাঁচকড়িকে ঘায়েল করার মস্ত সুযোগ ফস করে জেট বিমানের হাত ফসকে বেরিয়ে গেল। হল কী, একটা কাক যেই ডাকল, অমনি গন্ডায় গন্ডায় কেলেকিষ্টি কাকের দল উড়ে এসে জুড়ে বসে ডাকাডাকি শুরু করে দিলে।
তখন তো আর তেমন অন্ধকার নেই। পুব দিক থেকে ভোরের আলো এই উঁকি দিল বলে। আর এই সময়েই কাকদের যত চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়— যত তাড়াহুড়ো। সেই হুড়োহুড়ি দেখলে মনে হবে কাক-কর্তা এক্ষুনি দিল্লি ছুটবেন। তড়িঘড়ি বেডিং-বাক্স গুছিয়ে নিয়ে ছুট না দিলে ট্রেন ফেল করবেন! হাসি পায়, আবার রাগও ধরে! রাগ ধরবে না কেন বলো? ভোরের দিকে মানুষ যে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোবে তারও উপায় নেই। ভোরের বেলায় যদি তোমার ঘুম ভেঙে যায়, তুমি দেখো কাক-মহাশয় তোমার কানের পাশে ওই জানলার পাল্লাটার ওপর বসে ক্যারকেরে গলায় চিৎকার করছে, বলো সেই চিৎকার শুনলে তোমার হাড়-পিত্তি জ্বলে যায় না?
উঃ! এখন কী সাংঘাতিক বিপদের মধ্যেই-না পড়েছেন বাগডুম সিং আর জেট বিমান! ওই দ্যাখো, একটা কাকের ডাক শুনে এখন তাদের পাঁচ-শো কাকে তাড়া করেছে! পাঁচকড়িবাবু ভারি চালাক। তিনি তো জানেন কাকের পাল্লায় পড়লে তার ঠেলাটা কী! এক বার ধরতে পারলে একেবারে নাজেহাল করে ছাড়বে! কাজেই তিনি যখনই শুনতে পেয়েছেন কাকের কচকচানি, সঙ্গেসঙ্গে রণে ভঙ্গ দিয়ে ভোঁ-কাট্টা! একটা ভাঙা পোড়োবাড়ির ঘুলঘুলির মধ্যে সেঁদিয়ে পড়েছেন।
পাঁচকড়ি-পেচক তো লুকিয়ে পড়ল— বাঁচল। কিন্তু এদিকে যে বাগডুম সিং আর জেট বিমানের প্রাণ যায় যায়! ওদের তো আর পালাবার রাস্তা নেই। পাঁচ-শো কাক পাঁচ দিক থেকে ওদের ঘিরে ফেললে। তারপর কী চিৎকার, কী চিৎকার! যেন এখুনি ঠুকরে-ছিঁড়ে ওদের কুটোকুটি করে দেবে! বাগডুম সিংয়ের মাথার ভেতর ভোঁ-চক্কর লেগে গেল। তিনি কী করবেন, কী না-করবেন ভেবে না পেয়ে ব্যস্ত হয়ে জেট বিমানকে জিজ্ঞেস করলেন, কী করা যায়?
জেট হাওয়ায় চরকি খেতে খেতে বললেন, বন্দুক চালান। যুদ্ধ ছাড়া গত্যন্তর নেই।
বাগডুম সিং তেমনি ব্যস্ত হয়েই বললেন, বন্দুকে যে গুলি নেই।
—সব্বনাশ! ভয় পেলেন জেট বিমান। বললেন, বন্দুকের নল উঁচিয়ে ভড়কি দিন।
আওয়াজ বেরুবে না যে! উত্তর দিলেন বাগডুম সিং।
জেট বললেন, আওয়াজটা মুখে করুন।
বাগডুম সিং এবার জেট বিমানের গলা ছেড়ে পা দিয়ে পেটটা জড়িয়ে ধরলেন। পিঠ থেকে বন্দুক নামিয়ে কাকগুলোর দিকে তাক করলেন। তারপর লেগে গেল কাকে-পুতুলে তাক-তুড়তুড়! পৃথিবীর প্রথম আকাশযুদ্ধ!
বন্দুক তুলে বাগডুম মুখে আওয়াজ তোলেন, —গুডুম গুডুম।
আওয়াজ শুনে কাকের দল দু-পা ভাগে তো চার পা তেড়ে আসে। যেই তেড়ে আসে জেট বিমান অমনি নীচের দিকে গোঁত খান।
বাগডুম সিংয়ের মুখে আওয়াজ ওঠে গুডুম গুডুম!
কাকও চ্যাঁচায়, ক্যার-র-র, ক্যা-র-র!
জেটও ছোটে, পটপট, ভটভট!
সে কী ভীষণ যুদ্ধ।
কিন্তু কাকগুলো তো ভয়ানক ধূর্ত। ওদের চোখে ধুলো দেওয়া ভারি শক্ত। একটু পরেই তো ওরা দেখতে পেয়েছে, বন্দুক থেকে না বেরুচ্ছে ধোঁয়া, না গুলি। সব ফক্কা! শুধুই ভড়কি! তখন আর দেখতে হয়! তখন একেবারে ঝড়ের মতন ঝাঁপিয়ে পড়ল কাকের দল।
বাগডুম চেঁচিয়ে উঠলেন, বিমান-জ্যাঠা, ধরা পড়ে গেছি। পালান।
বিমান যখন দেখলেন সত্যিই ধরা পড়ে গেছেন এবং পালাবার পথ নেই, তখন কাকগুলোর সঙ্গে ওই শূন্যে কিতকিত খেলা শুরু করে দিলেন। কখনো বাঁ-দিকে হেলা মারছেন, কখনো ডান দিকে ঠেলা দিচ্ছেন। একবার তিনি নামছেন তো আরেক বার তিনি উঠছেন। এই তিনি গোঁত খেলেন তো ওই তিনি ঢুঁ মারলেন।
কিন্তু কাকগুলো তো আর ছাড়বার পাত্তর নয়! তারা নাছোড়বান্দা। তারাও জেট বিমানের সঙ্গে উড়ছে। এই ঘুরছে তো! এই ছোঁ মারছে। তারপর তাল বুঝে একটা কাক সত্যি সত্যি বাগডুম সিংয়ের পিঠে মেরেছে এক ঘা। ধাঁই!
বাগডুম সিংয়ের পা ফসকে গেল। হাত ফসকে বন্দুকটা ছিটকে পড়ল। বাগডুম সিং চিৎকার করে উঠলেন, বাঁচাও বাঁচাও!
ততক্ষণে বাগডুম সিং জেট বিমানের পিঠ থেকে ডিগবাজি খেয়ে ঠ্যাং ছুড়তে ছুড়তে মাটিতে পড়ছেন। এবং তিনি মাটিতেই পড়লেন আঁস্তাকুড়ের ওপর। পড়েই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
হ্যাঁ, তিনি ঘুমিয়েই পড়লেন। ঘুমোতে ঘুমোতে যখন তিনি নাক ডাকাতে শুরু করে দিলেন, তখন এক কান্ড হল। খাকি প্যান্ট-পরা যে-ছেলেটা রোজ পথের ইদিক-উদিক থেকে কাগজ কুড়িয়ে বস্তা-ভরতি করে, সেদিনও সে এটা-ওটা কুড়োতে কুড়োতে আঁস্তাকুড়ের সামনে এল। বাগডুম সিংয়ের মুণ্ডুটা খচ করে খামচে ধরে বস্তায় ভরে ফেললে। তারপর বস্তাটা পিঠে ফেলে হাঁটা দিলে। ইস! এ কী কান্ড! অমন একজন জাঁদরেল পুতুল-পল্টনের এ কী দুর্দশা! শেষকালে বস্তায় বন্দি হলেন!
বস্তার মধ্যে ঠেলা খেতেই বাগডুম সিংয়ের ঘুম ভেঙে গেল।
বাগডুম সিং ঠেলেমেলে উঠে পড়ে দেখলেন, তিনি তাল-তাল কাগজের ওপর বসে আছেন। বসে বসে দোল খাচ্ছেন। তারপর তিনি আঁকপাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাঁর কষ্ট হচ্ছে, নিশ্বাস আটকে আসছে। ভালো করে সব কিছু ঠাওর করতে পারছিলেন না বলেই তিনি বুঝতে পারছিলেন না, তিনি এখন বস্তার ভেতরে বন্দি।
এমনসময় বস্তার মুখটা খুলে গেল। একঝলক আলো। সঙ্গেসঙ্গে এক-পাটি ছেঁড়া চটি পড়ল একেবারে বাগডুম সিংয়ের মাথার টুপিটার ওপর— ঠকাস! বাগডুম সিং আ-ও করে চেঁচিয়ে ওঠার আগেই বস্তার মুখটা বন্ধ হয়ে গেল! এবং এখন বাগডুম সিং বুঝলেন, তিনি একটি বস্তার মধ্যে বন্দি। তিনি এ-ও বুঝলেন, বস্তার মালিক তাঁর মাথায় এক-পাটি চটিজুতো ছুড়ে মারল। এখন তিনি আর ওই চটি এবং বস্তা-ভরতি ছেঁড়াখোঁড়া কাগজপত্তর মালিকের পিঠে চেপে কোথাও চলেছেন। বাগডুম সিংয়ের ভারি মনখারাপ হয়ে গেল! হবারই কথা, কেননা যতদিন বাগডুম সিং ঘরের মধ্যে বন্দি ছিলেন, ততদিন সুখে ছিলেন। ঝঞ্ঝাট তো সেই বিয়ের রাত্তির থেকে। বরের গান শুনে কেন যে তাঁর গান গাইবার শখ হল, কে বলবে! কেন যে তিনি গান শুনে উশখুশিয়ে নাচতে গেলেন কে জানে! এখন বোঝো! কপাল মন্দ না হলে কারও এমন জঞ্জাল-ভরা বস্তার মধ্যে ঠাঁই হয়!
আবার বস্তার মুখ খুলে গেল। এবার একটা চৌকো শক্তমতো কী পড়ল। একেবারে বাগডুম সিংয়ের চ্যাপটা নাকের ওপর। তিনি হেঁচে ফেললেন— হ্যাঁচ্চো! আবার বস্তার মুখ বন্ধ হয়ে গেল! এইবার তিনি হাত দিয়ে নাকটা টিপে ধরলেন! ইস! বস্তার ভেতরে কী বিচ্ছিরি বোটকা গন্ধ। হবেই তো! রাজ্যের ময়লা জমে জমে বস্তাটার যে কী দুর্দশা হয়েছে, সে আর কে না-দেখছে! এতে আর বাগডুম সিংয়ের দোষটা কী! এই গন্ধের ঠেলায় বাঘ পালাবে তো বাগডুম সিং কোন ছার!
—নাক টেপো কেন হে খোকা? হঠাৎ বস্তার মধ্যে কে যেন কথা বলে উঠল।
বাগডুম সিং এবার দারুণ অবাক হয়ে গেলেন। বস্তার মধ্যে এই নোংরা জঞ্জালে কেউ যে থাকতে পারে, এটা তিনি ধারণাই করতে পারেন না। অবশ্য তাঁকে খোকা বলায় তাঁর মনটা তেমন খারাপ হল না। তিনি বুঝতে পারলেন, যে-ই তাকে খোকা বলুক, সে তার মুখখানা নিশ্চয়ই দেখতে পায়নি।
গলার স্বরটা আবার শোনা গেল, —খোকার নাম কী?
বাগডুম সিং তাকে দেখতে না পেলেও উত্তর দিলেন, আমি খোকা নই। আমি বাগডুম সিং। আমি সৈনিক। আমার গোঁফ দেখতে পাচ্ছ না?
অমনি সঙ্গেসঙ্গে সেই গলার স্বরটা হাসির মতো খসখসিয়ে উঠল। বললে, মুড়ি খাবে?
বাগডুম সিং বুঝলেন কেউ তাঁর সঙ্গে ফুক্কুড়ি করছে। একেই তিনি বস্তার মধ্যে গরমে, দুর্গন্ধে আইঢাই করছেন, তার ওপরে এইরকম গা-জ্বালানো কথা শুনলে মেজাজ ঠিক থাকে! তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, তুমি যে-ই হও আর সে-ই হও, জেনে রাখো এটা ঠিক ইয়ার্কির সময় নয়!
—আমি যে-ও নই, সেও নই। আমি একটি মুড়িমুড়কির ঠোঙা। বাচ্চাদের মুশকিল কী, একঠোঙা মুড়িমুড়কি দিলে অদ্ধেক খাবে, অদ্ধেক ফেলবে। আমারও সেই অবস্থা। একটি বাচ্চা অর্দ্ধেক খেয়ে আমায় রাস্তায় ফেলে দিয়েছে। আর এই প্যান্ট-পরা বস্তার মালিক আমায় রাস্তা থেকে তুলে বস্তায় ভরে নিয়ে চলেছেন। তুমি ইচ্ছে করলে মুড়ি ক-টা খেয়ে ফেলতে পারো!
বাগডুম সিং বললেন, কেন, আমি কি ফেলনা যে পরের এঁটো মুড়ি খাব?
এবার মুড়ির ঠোঙাটা খড়খড় করে হেসে উঠল। বললে, মেজাজটা তো দেখছি লাট-সাহেবের মতো। অত গুমর কেন? ফেলনা না হলে কেউ আঁস্তাকুড়ে পড়ে থাকে? কে আর আঁস্তাকুড়ে সোনাদানা ফেলে দেয়! আমাদের মুশকিল কী জানো? ছেঁড়া চাটাই পাই না শুতে, চাঁদে রাজপ্রাসাদ গড়ার স্বপ্ন দেখি! নাও নাও, দুটো মুড়ি মুখে দাও! মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ পেটে কিছু পড়েনি।
ঠিক এই সময় আবার বস্তার মুখটা খুলে গেল। বাগডুম সিংয়ের মাথার ওপর ধাঁই করে একটা লাটাই পড়ল, অবিশ্যি ভাঙা লাটাই কিন্তু বাগডুম সিংয়ের ভীষণ লাগল। বাগডুম সিং উ-হু-হু করে কেতরে উঠতেই লাটাইটা ফুর-র-র, ফুর-র-র করে কথা বলে উঠল, —ফাটল নাকি?
—না, ফাটল না। লাগল। কেউ যেন ফুট কাটল।
বাগডুম সিং এবার ভয়ানক রকমের ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছেন। বস্তার ভেতরে এই ধরনের কথাবার্তা শুনে তাঁর ভাবতে বেশি সময় লাগল না যে, তিনি ভালো জায়গায় পড়েননি। এখান থেকে পালাতেই হবে।
আবার কে কথা বলে উঠল, —মশাই কথা বলে না যে রে।
আর একজন বলল, মশাই কি মারা গেলেন।
আর একজন হাসতে হাসতে বলে উঠল, —না রে! লাটাইটা ভদ্রলোকের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।
সঙ্গেসঙ্গে বস্তা-ভরতি কাগজগুলো খড়মড় খড়মড় করে ডিগবাজি খেতে শুরু করে দিলে। বাগডুম সিং পা ফসকে একেবারে বস্তার ভেতর তলিয়ে গেলেন। বাগডুম সিংয়ের মনে হল, বস্তার মালিক যেন বস্তাটার মুণ্ডু ধরে ধাঁই-ধপাধপ নেড়ে দিচ্ছে, আর তিনি ওপর থেকে নীচে সেঁদিয়ে যাচ্ছেন। ভারি কষ্ট হচ্ছে তাঁর। নিশ্বেস আটকে আসছে। তিনি হাঁপাচ্ছেন।
হাঁপায় কে হে? কে যেন ফাঁপা ফাঁপা স্বরে কথা বললে।
বাগডুম সিং চেয়ে দেখলেন, একটা ফাটা টেনিস বল। তাঁর দিকে চেয়ে ফাটা ঠোঁটটা নাড়ছে। সে ঠোঁট নাড়তে নাড়তে বেশ ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ওহে তোমরা সরো, সরো! বস্তার ওইখানটায় একটা ফুটো আছে। ওঁকে ফুটোটার কাছে একটু যেতে দাও। নইলে ভদ্রলোক দম আটকে মারা যাবেন!
নীচের তলার ময়লাগুলো সভ্য আছে বলতে হয়! ফাটা বলের কথা শুনে যে যেমন পারল সরে গেল! আহা! সত্যি, পাড়াপড়শিরা এমন না হলে চলে কখনো! লোকটা দম আটকে মরতে বসেছে। তা পড়শিরা যদি সবাই মিলে এগিয়ে এসে নিজের নিজের জায়গা থেকে একটু সরে না দাঁড়ায়, তবে মানুষটা বাঁচে কী করে? তবে হাতের সব আঙুলগুলো তো আর সমান হয় না। একটা কাগজের ডেলা কিছুতেই সরবে না। ফাটা বল জিজ্ঞেস করলে, সরছ না, কে হে তুমি?
সে উত্তর দিলে, আমি সহজে সরি না।
—মানে?
—মানে উত্তর না পেলে আমি নড়ি না।
—কীসের উত্তর হে?
—ক্লাস থ্রি-র উত্তর।
—তুমি কোন ক্লাসের কে, যে তোমায় ক্লাস থ্রি-র উত্তর দিতে হবে?
—আমি ক্লাস থ্রি-র স্বাস্থ্যের প্রশ্নপত্র। আপাতত আমি একটি কাগজের ডেলা। এবং কেউ আমাকে ডেলা পাকিয়ে জঞ্জালে ফেলে দিয়েছে। আমাকে ডেলা পাকাক ক্ষতি নেই কিন্তু আমাকে জঞ্জালে ফেলবে? কত কষ্ট করে একটি প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হয় জান? এখন আমার প্রশ্নের উত্তর না পেলে আমি নড়ছি না, আলো-বাতাস বইতে দিচ্ছি না। বলে সেই প্রশ্নের ডেলাটা গ্যাঁট মেরে বসে বস্তার গায়ের ফুটোটা আটকে রইল।
বাগডুম সিংয়ের হাঁপানি বেড়ে গেল।
ফাটা বল জিজ্ঞেস করলে, তোমার প্রশ্নগুলো কোথায় আছে?
—ডেলার মধ্যে।
একটা একটা করে বলো, দেখি আমরা পারি কি না। ফাটা বল উত্তর দিলে।
তখন প্রশ্নের সেই ডেলাটা বললে, আচ্ছা বেশ, বলো তাহলে— সুস্বাস্থ্য বলিতে কী বুঝ? বুঝিতে না পারিলে কী করা উচিত বলিয়া মনে করো? স্বাস্থ্য সুস্থ রাখিতে হইলে নিম্নলিখিত ভিটামিনযুক্ত খাদ্যগুলির কোন কোনটি দিনে কত বার, কতখানি করিয়া খাওয়া উচিত?:
১ আলুর চপ
২ ফুচকা
৩ চুরান
৪ ঝালমুড়ি
৫ পাঁঠার ঘুগনি ইত্যাদি ইত্যাদি।
বলে প্রশ্নের ডেলা হে-হে করে হেসে উঠল। সেই হাসি শুনে সবাই বোকার মতো থমকে চুপ মেরে গেল। বাগডুম সিং মনে মনে ভাবলেন, না, প্রশ্নটা খুবই কঠিন। বুদ্ধিমান না হলে উত্তর দেওয়া শক্ত।
সবাই চুপ করে আছে দেখে ডেলাটা বললে, মশায়রা সব চুপ কেন? দ্যাখো, সময় তো বেশি দেওয়া যাবে না। আর এসব প্রশ্নের উত্তর ছোটো ছোটো ছেলে-মেয়েদের কাছে তো জল-ভাত। টুসকি মারবে আর উত্তর লিখবে। তোমরা বোমভোলানাথ হয়ে গেলে?
হঠাৎ ফাটা বলটা চেঁচিয়ে উঠল, আমি উত্তর জানি, আমি উত্তর জানি। উত্তর হচ্ছে গো—ল! গো—ল!
সঙ্গেসঙ্গে প্রশ্নের ডেলাটা দ্বিগুণ জোরে চিৎকার করে উঠল, ফে—ল! ফে—ল!
—কেন? কেন? ফাটা বল থমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে।
প্রশ্নের ডেলা বললে, গোল হয় খেলার মাঠে। আর পড়ার ক্লাসে গন্ডগোল। সুতরাং উত্তর হচ্ছে গন্ডগোল।
বাগডুম সিং থাকতে পারলেন না। এই গন্ডগোলে তাঁরও ভীষণ কষ্ট বেড়ে গেল। তিনি প্রশ্নের ডেলাটার পেটে টেনে এক ঘুঁষি কষালেন। ফট!
আরে শাবাশ! শাবাশ! ঘুঁষি খেয়ে প্রশ্নের ডেলা বস্তার ফুটো ছিটকে একেবারে রাস্তায়! সঙ্গে সঙ্গে বস্তার ফুটো দিয়ে একঝলক আলো ছড়িয়ে পড়ল। অন্ধকার সরে গেল। ফুরফুর করে হাওয়া ঢুকল। আঃ! একবুক নিশ্বেস নিলেন বাগডুম সিং। আর তখনই তিনি যেন শুনতে পেলেন একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডাকছে। এই এক উটকো ঝঞ্ঝাট! পিঠে বস্তাবাঁধা লোক দেখলে যে কুকুরগুলোর কী হয় কে জানে! এমন পেছনে পেছনে তেড়ে তেড়ে চিৎকার করবে, যেন এই বুঝি দেয় কামড়ে! বস্তার মধ্যে যে কী রহস্যের খোঁজ করে ওরা, সে খবর ওরাই জানে!
বাগডুম সিং ফুটো দিয়ে উঁকি মারলেন।
ফাটা টেনিস বলটা চেঁচিয়ে উঠল, করছ কী! করছ কী!
বাগডুম সিং কোনো কথা না বলে মাথার টুপিটা ফুটোর মধ্যে গলিয়ে দিলেন। অমনি ফস করে তাঁর মাথাটি বেরিয়ে পড়েছে।
টেনিস বল গলা চড়িয়ে হাঁক পাড়লে, —কুকুর কুকুর। কামড়ে দেবে! কামড়ে দেবে!
টেনিস বল মিথ্যে বলেনি! হ্যাঁ, কুকুরটা সত্যিই বাগডুম সিংকে দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়ে এইসা গলা ফাটিয়ে চিল্লাতে লাগল কী বলব! তখন সে বস্তা-ঘাড়ে লোকটাকে ছেড়ে বাগডুম সিংকে তাক কষছে আর ফোঁসফোঁসাচ্ছে! আশ্চর্য! এই কুকুরটার চিল্লানি শুনে এখন দ্যাখো আরও ক-টা কুকুর ছুটে এসেছে! আরি ব্যাস, পাঁচ-পাঁচটা! কী চিৎকার! কী চিৎকার!
বাগডুম সিংয়ের বয়ে গেছে! তিনি মাথা গলিয়ে বস্তার ছেঁড়া ফুটোটা আঁকড়ে ধরে বাইরে পা ঝুলিয়ে বসে পড়লেন। তখন কুকুরগুলোর সে কী আস্ফালন! তিনি বসে বসে কুকুরগুলোকে বক দেখাতে লাগলেন। একজন সৈনিকের পক্ষে অমন করে বক দেখানোটা ঠিক হচ্ছে কি না বলতে পারব না, কিন্তু দেখা যাচ্ছে কুকুরগুলো ভীষণ খেপেছে! কুকুর খেপলে আরও জ্বালা। যত খেপবে, তত চ্যাঁচাবে।
বাগডুম সিংয়ের কানে তালা লেগে গেল! তিনি দেখলেন এ তো আর এক ঝামেলা। খোলা হাওয়ায় কোথায় একটু ঠাণ্ডা হবেন বলে বাইরে এলেন, তা না উলটে এ যে মাথা গরম হবার উপক্রম। কুকুরগুলোর আস্পর্ধা দ্যাখো, বাগডুম সিংকে ভয় দেখাচ্ছে।
রেগে গেলেন বাগডুম সিং। রেগে বস্তার মধ্যে হাত গলালেন। বস্তার ভেতর থেকে কাগজ টেনে গোল্লা পাকিয়ে কুকুরগুলোর দিকে ছুড়তে লাগলেন। হাত ঢোকান আর কাগজ ছোড়েন। কুকুর ভাগে, আবার আসে।
শেষকালে হয়েছে কী, বস্তার ভেতর থেকে কাগজ টানতে গিয়ে বাগডুম সিংয়ের হাতে শক্তমতো কী একটা ঠেকল! কিন্তু কাগজের গোল্লা ছুড়তে ছুড়তে বাগডুম সিং-এর এমন অবস্থা, তিনি যে দেখবেন সেটা কী, তা আর মনে হল না। তিনি এই দিলেন ছুড়ে! না, ছোড়া হল না।
—আরে আরে! করছেন কী! করছেন কী! সেই শক্তমতো জিনিসটা বাগডুম সিংয়ের হাতের মুঠোর মধ্যেই কথা বলে উঠল। তার গলার স্বরটি কেমন মিষ্টি মিষ্টি বাজনার মতো।
থমকে গেলেন বাগডুম সিং।
সেই জিনিসটা আবার সরু গলায় সুর করে কয়ে উঠল, —আপনি তো মশাই আচ্ছা বোকা! কুকুরের চেঁচানি শুনে আমাকে ছুড়ে ফেলছেন! আরে মশাই আগে দেখুন আমি কে! চিনতে পারছেন? মাউথ অর্গ্যান! জানেন, এতদিন বড়ো বাড়ির বড়ো ছেলের আদরের ধন ছিলুম। যখন কলকবজা ঠিক ছিল, তখন কী খাতির আমার! কত যত্ন! এখন জঞ্জালে। আর আপনি মশাই আমাকে হাতে পেয়ে পায়ে ঠেলছেন! ছ্যা ছ্যা! আরে মশাই কুকুরের কাজ কুকুরকে করতে দিন, ওরা যত পারে চ্যাঁচাক। আপনিও আমার পেটে মারুন ফুঁ। দেখুন ব্যাটারা তখন কী করে! অবিশ্যি আমার গা-টা আর পা-টা একটু টসকে গেছে, তাতে কিন্তু সুরের কোনো গোলমাল হবে না। মারুন ফুঁ!
বাগডুম সিংয়ের তো চক্ষু কপালে। তাঁর মুখে আর রা নেই। তিনি শুধু ভাবলেন নোংরা এই জঞ্জালের মধ্যেও বাজনা বাজে!
বাগডুম সিংকে চুপ থাকতে দেখে মাউথ অর্গ্যান আবার সুর ছাড়লেন, —আমাকে আপনার মুখে তুলতে ঘেন্না করছে বুঝি? একটু ঝেড়ে-পুঁছে নিন-না। তাহলে আর ঘেন্নাও লাগবে না, পেটে ময়লাও ঢুকবে না। তা ছাড়া আপনি তো মশাই পুতুল। রোগ-জ্বালার তো আর ভাবনা নেই।
এদিকে বাগডুম সিংকে আর কিছু ছোড়াছুড়ি করতে না দেখে কুকুরগুলো এখন তারস্বরে চিৎকার করছে। একটা কুকুর করেছে কী, বাগডুম সিংয়ের পা-টা কামড়ে ধরার জন্যে মেরেছে এক লাফ। বাগডুম সিংও চটপট পা সরিয়ে নিয়েছেন। আর সঙ্গে সঙ্গে মাউথ অর্গ্যান ধরা তাঁর হাতটাও কেমন যেন আচমকা আপনা থেকে মুখে উঠে গেছে! বাগডুম সিং মারলেন ফুঁ। মাউথ অর্গ্যান বেজে উঠল:
‘ঝ্যান্না ঝ্যান্না পান্না পান্না
নিন্না নিন্না পুউ পুউ প্যান-ক্যান।’
বাজতে বাজতে মাউথ অর্গ্যান জিজ্ঞেস করলে, কীরকম বুঝছেন?
এবার আর চুপ করে থাকলেন না বাগডুম সিং। তিনি হাসলেন, তারপর কথা বললেন, —বড্ড ভালো। বলে আবার ফুঁ মারলেন। আবার অর্গ্যান বেজে উঠল। খুশিতে বাগডুম সিং পায়ে তাল কষতে লাগলেন। তিনি এমন মশগুল হয়ে গেলেন যে, দেখলেন না কুকুরগুলোও ডাক থামিয়ে ল্যাজ নাড়ছে। আর কেমন যেন নরম সুরে আঁ-উঁ করে বাজনার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে। কে জানে হয়তো চেষ্টা করছে বাজনার সুরে সুর মিলিয়ে গান গাইতে!
ওহো, সে ভারি মজার কান্ড! বস্তা-ঘাড়ে লোকটা হাঁটছে, বাগডুমের ঠোঁটে বাজনা বাজছে নিন্না-নিন্না।
বস্তার ওপর বাগডুম দুলছে, বাজনা শুনে কুকুর ডাকছে কিঁউঁনা, কিঁউঁনা।
আরে, আরে! এ কী কান্ড! এ তো শুধু ল্যাজ-নাড়া কুকুর নয়, কুকুরের পেছনে এত বিল্লি জুটল কোত্থেকে! ম্যাও ম্যাও!
আহা! বাগডুম সিং নিশ্চিন্তে গাল ফুলিয়ে, ঘাড় দুলিয়ে বাজনা বাজান! এদিকে বাজনা শুনে দল-বেদলে কুকুর ছোটে, বিল্লি ছোটে। ধাড়ি ছোটে, ধেড়ে ছোটে। ছোটকা ছোটে, ছুটকি ছোটে। বেঁড়ে ছোটে, হেঁড়ে ছোটে।
বাগডুম সিংয়ের সেদিকে নজরই গেল না। তিনি মশগুল হয়ে ফুঁ মারছেন, বাজনা বেজেই চলেছে।
ও বাবা! এ যে দেখি বস্তা-ঘাড়ে লোকটাও যেন নাচতে নাচতে পা ফেলছে। কী মজার ম্যাজিক! দেখে মনে হচ্ছে বাগডুম সিংয়ের বাজনা শুনে অদ্ভুত এক জলুস বেরিয়েছে রাস্তায়! ওরা যেন ময়দানে সার্কাসের খেলা দেখাতে চলেছে।
হঠাৎ—
ধাঁই-ধপাস!
বস্তাটা যেন লোকটার ঘাড় থেকে রাস্তায় পড়ল।
হ্যাঁ, বস্তা পড়ল রাস্তায় একটা গাছের গোড়ায়। টাল সামলাতে পারলেন না বাগডুম সিং। তিনি বস্তার ফুটো ফসকে ডিগবাজি খেলেন সাত হাত দূরে। মুখের বাজনাটা মুখ থেকে ছিটকে ঠোক্কর খেল সাত দু-গুণে চোদ্দো হাত দূরে। তাই দেখে কুকুরগুলো কিঁউ কিঁউ করে মারল ছুট! বিল্লিগুলো ম্যাও ম্যাও করে মারল লাফ! যা:! এমন একটা মজাদার কান্ড মাঠে মারা গেল! আচ্ছা ষন্ডামার্কা গুণ্ডা লোক তো! চোখ খুলে দ্যাখো কী হচ্ছে! তা তো উনি দেখবেন না! উনি এখন ছেঁড়াখোঁড়া ময়লা কাগজ, টুটাফাটা জিনিসপত্তর বস্তার ভেতর থেকে বার করে রাস্তায় ছড়াবেন। তোমার চলার রাস্তা নোংরা হল তো বয়েই গেল! কিংবা হঠাৎ উড়ে এসে সেই নোংরা জঞ্জাল তোমার নাকে-মুখে ঢুকলে লোকটার ঘেঁচু!
রক্ষে, আকাশে এখন ঝড়ের ভয় নেই। সে নাহয় তুমি-আমি বাঁচলুম! কিন্তু এখন বাগডুম সিং কেমন করে বাঁচেন? তিনি তো উলটে পড়েছেন মাঝ-রাস্তায়! তিনি যে এক্ষুনি মানুষজনের লাথি খাবেন! গাড়ির তলায় চেপটে যাবেন!
না, তা হবে না। তিনি ছিটকে পড়েই উঠে পড়লেন। এদিক-ওদিক দেখে নিয়েই তরতরিয়ে ছুটলেন। একটা গর্তের আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন। যাক, এখনকার মতো তো রক্ষা পেলেন। তারপর দেখা যাবে।
অবিশ্যি গর্তটা তেমন গভীর নয়। গর্তে বসে মুখ উঁচিয়ে সব দেখা যায়। হাত বাড়িয়ে ওঠা যায়, নামা যায়। ইস! বাগডুম সিংয়ের জামা-প্যান্টের কী দশা! ধুলোয় একেবারে মাখামাখি। দ্যাখো, কোমরের ছুরিটাও তিনি কোথায় খুইয়ে বসে আছেন। কী দুর্দশাতেই-না পড়লেন বাগডুম সিং। বস্তা থেকে রাস্তায়, রাস্তা থেকে গর্তে! এখন এই গর্ত থেকে বাগডুম সিং কোথায় উঠবেন কে জানে! এমন কপাল কারও দেখিনি বাবা! তবে তিনি এত বিপদের মধ্যেও মনটাকে যে শক্ত রাখতে পেরেছেন এই যথেষ্ট! ওই দ্যাখো-না, গর্ত থেকে মুখ উঁচিয়ে উনি কেমন উঁকিঝুঁকি মারছেন!
এখন ঝলমলিয়ে রোদ উঠেছে। বাগডুম সিং গর্তে বসে দেখছেন চারিদিকে কত সব বড়ো বড়ো বাড়ি। রাস্তা দিয়ে কত রকমের গাড়ি সোঁ সোঁ, পোঁ পোঁ করে ছোটাছুটি করছে। কত মানুষ। চলছে, বলছে, হাসছে, খাচ্ছে, হাঁটছে, থামছে। এইসব দেখে এতক্ষণে বাগডুম সিংয়ের মনে হল, সত্যি তিনি বড্ড ছোটো। এই রাস্তাটা যত চওড়া, তার চেয়ে তিনি কত ছোটো! এই বাড়িগুলো যত উঁচু, তার চেয়ে তিনি তত, নীচু! এসব দেখে খারাপ লাগবারই কথা। যেকোনো মানুষেরই খারাপ লাগে! তা বাগডুম সিংয়ের আর দোষ কী! তখন তাঁর এত খারাপ লাগছিল যে, মনে হচ্ছিল এক্ষুনি ওই মস্ত বাড়ির ছাতে উঠে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কেন ছোট্ট, এইটুকুনি পুঁচকে? আর কেন সব মস্ত মস্ত, এত বড়ো?
অবিশ্যি তিনি মস্ত বাড়ির ছাতে উঠলেন না। তিনি হাই তুললেন। তাঁর ঘুম পাচ্ছে। আবার হাই তুললেন। তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন।
এতক্ষণ ধরে বেশ জব্বর ঘুম দিচ্ছিলেন বাগডুম সিং। এবং বেশ নিশ্চিন্তে। হবেই তো! ওই গর্তটা যেন যুদ্ধের ট্রেঞ্চ। একজন সৈনিক ট্রেঞ্চে ভারি আরাম করে একটু গড়িয়ে নিচ্ছিলেন। তিনি হয়তো আরও অনেকক্ষণ ঘুমোতেন। কিন্তু তাঁর চোখের পাতায় হঠাৎ সুড়সুড়ি লাগল যেন! তাঁর ঘুম ভেঙে গেল। চোখ চাইতেই তিনি দেখেন গর্তটা ভীষণ অন্ধকার। এত ঘুমিয়েছেন, কখন যে রাত নেমে এসেছে তিনি বুঝতেই পারেননি। সেই অন্ধকারে গর্তের মধ্যে যেন একটা মুখ— এত্তবড়ো! দাঁত বার-করা! ফ্যাঁস ফ্যাঁস করে নিশ্বেস নিচ্ছে আর বাগডুম সিংয়ের মুখ শুঁকছে। বাগডুম সিং তড়বড়িয়ে উঠতে গিয়েও থমকে গেলেন! ইস! তার মুখে কী বিটকেল গন্ধ। যেন সাতজন্মে দাঁত মাজে না। সেই দাঁত বার-করা মুখটা শুঁকতে শুঁকতে হঠাৎ বাগডুম সিংয়ের গাল চাটতে শুরু করে দিল। কী রে বাবা! বাগডুম সিংকে খাদ্য ভাবছে নাকি! ঠিক তাই। এই দ্যাখো, মুখটা চাটতে চাটতে সে যে বাগডুম সিংয়ের মাথার টুপিটা চিবুতে লাগল। ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন বাগডুম সিং। শেষে টুপি ছেড়ে তাঁকেই খেয়ে ফেলবে নাকি! তিনি মড়ার মতো পড়ে রইলেন। মনে মনে ভাবলেন, টুপিটা খেলেই যদি ওর পেটের জ্বালা কমে তবে টুপিটাই খাক! খাক খাক! প্রাণ ভরে খাক। তিনি তো বাঁচবেন। বাঁচবেন বটে, কিন্তু টাক-মাথাটি যে বেরিয়ে পড়বে।
—ব্যা-এ-এ!
আরিব্বাস! এটা যে একটা ছাগল। বাগডুম সিংয়ের টুপি ইনিই খাচ্ছেন! খাবেই তো! কথায় বলে, ছাগলে কী না খায়! দেখতে দেখতে টুপিটা ছাগলমশায়ের গালের ভেতর গপ্পা। তারপর কচমচ, মচমচ করে গিলে ফেলে বাগডুম সিংয়ের কানে মারলেন এক কামড়। ঠুঁটো জগন্নাথের মতো এতক্ষণ যে বাগডুম সিং গর্তের মধ্যে মটকা মেরে পড়েছিলেন, তিনি আর থাকতে পারলেন না। আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেন, —উ-উ!
একদম ভূত দেখার মতো ছাগলটা তিড়িং করে লাফিয়ে উঠল। বাগডুম সিংয়ের কানটা তখনও ছাগলের মুখে। সুতরাং কানে টান পড়তে বাগডুম সিংও ছাগলের সঙ্গে লাফিয়ে উঠে গর্ত থেকে ডাঙায় পড়লেন। তারপর ছাগলটা বাগডুম সিংকে ডাঙায় ফেলে যেই পালাতে গেছে, বাগডুম সিং ছাগলের ল্যাজে দিয়েছেন এক রামচিমটি! চিমটি কেটে চেঁচিয়ে উঠলেন, —এই ব্যাটা ছাগল, আমার কান কামড়ে পালাস! তোর আস্পর্ধা তো কম নয়।
ছাগলের পালানো হল না বাগডুম সিংয়ের গলা শুনে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর যত পা ছুটে গেছিল, তত পা পিছিয়ে এসে বাগডুম সিংয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠল, ব্যা। কোন দেশের কোন বেঁটে রে তুই? এদেশে এসে আমার ল্যাজে চিমটি কাটিস? ব্যাটা, আমায় ছাগল বলিস? আমি তোর মেষ রে! মেষমশাই! জানিস না?
—আরে যা যা! ওরকম মেষমশাই অনেক দেখেছি! ব্যাটা আমার কান কামড়ে দিয়ে এখন মেষগিরি ফলাচ্ছে। বল আমার টুপিটা গিললি কেন?
—বেশ করেছি! তোকেসুদ্ধ যে গিলে ফেলিনি, এই তোর সাতজন্মের পুণ্যি! বলে ছাগলটা হঠাৎ বুড়ুত করে নাক ঝাড়লে। নাক থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি একরাশ সর্দি বেরিয়ে এসে বাগডুম সিংয়ের মুখময় ছড়িয়ে পড়ল।
—অ্যাঃ! বাগডুম সিং ঘেন্নায় মুখ সিটিয়ে খেঁকিয়ে উঠলেন, কোথাকার অসভ্য ছাগল রে তুই, ভদ্রলোকের মুখে হেঁচে দিস?
কথাটা শুনে ছাগলটা চাপা গলায় যাচ্ছেতাই ভাবে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বললে, ভদ্রলোক! কে তোকে লোক বলেছে? তুই তো একটা গুঁড়ো কাঠের পুঁটলি। চেপে যা, চেপে যা!
বাগডুম সিংয়ের মতো অমন একজন জাঁদরেল সৈনিককে পুঁটলি বললে কেমন করে মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন তিনি? তাও অন্য কেউ বললে কথা ছিল। শেষে একটা ছাগল তাঁকে পুঁটলি বলল। ধাঁ করে তাঁর মাথায় রক্ত চড়ে গেছে! একেবারে চক্ষের নিমেষে লাফিয়ে উঠে ছাগলের দাড়িটা খামচে ধরে ফেললেন বাগডুম সিং। দাড়ি ধরে ঝুলে পড়লেন। তারপর এমন টান মারতে লাগলেন যে, ছাগলের প্রাণ যায়! ছাগল তো চেঁচানি শুরু করে দিলে, ব্যা-অ্যা-অ্যা। চেঁচাতে চেঁচাতে মাথা ঝাড়তে লাগল। যতই মাথা ঝাড়ছে, ততই দুলুনি খাচ্ছেন বাগডুম সিং। আর ততই পেঁচিয়ে ধরছেন ছাগলের দাড়িটা। পেঁচিয়ে ধরে দুলতে দুলতে তিনি হেঁকে উঠলেন, —বল ব্যাটা, আমি পুঁটলি? আর খাবি আমার টুপি? আমার মুখে আর কোনোদিন হেঁচে দিবি?
ব্যাস! বাগডুমের মুখে হাঁচির কথা শুনেই ছাগলের নাকে আবার হাঁচি এসে গেল! সামলাতে পারলে না। সঙ্গে সঙ্গে দিয়েছে বাগডুম সিংয়ের মুখে হেঁচে। দাড়ির ঠিক ওপরেই তো ছাগলের নাকের গর্ত দুটি। একেবারে সিধে হাঁচির তোড়টি বাগডুম সিংয়ের মুখে ঝাপটা মেরেছে। মারতেই তিনি ছাগলের দাড়ি ফসকে মাটিতে চিতপটাং। চিতপটাং হতেই, ছাগল শিং দিয়ে বাগডুম সিংয়ের পেটে মেরেছে এক গোঁত্তা! এই দ্যাখো, পেট বুঝি ফুটো হয়ে কাঠের গুঁড়ো বেরিয়ে পড়ে। উঠতে গেছেন, আবার ঝেড়েছে। সটান নাকের ওপর ধাঁই! বাগডুম সিং ছিটকে পড়লেন। এমন বেকায়দায় ছিটকোলেন যে এক পাটি জুতো তাঁর পা থেকে খুলে কোথায় লোপাট হয়ে গেল তিনি দেখতে পেলেন না। সেই একপায়ে জুতো নিয়েই তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন। এবার ছাগলটা আচমকা ঠ্যাং ছুড়লে— এক লাথি। বাগডুম সিং ফুটবলের মতো পাক খেতে খেতে রাস্তার ধারে একটা কয়লার দোকান ছিল, সেই দোকানের কয়লার ফাঁকে গুঁজড়ে পড়লেন। তারপর মাথায়-মুখে পেটে-পিঠে কয়লার কালিঝুলি মেখে সে এক বীভৎস কান্ড! বাগডুম সিং যেন কেলেকিষ্টি একটি সাক্ষাৎ ভূত!
না, বাগডুম সিং আর ছাগলের মুখোমুখি হলেন না। তিনি এখন বুঝতে পেরেছেন, ছাগলের সঙ্গে পেরে ওঠা তাঁর কম্ম নয়। বেশি গা-জোয়ারি করতে গেলে তাঁর টুপির মতো ছাগলটা যদি তাঁকেই কচমচ করে খেয়ে ফেলে!
ছি! ছি! তাঁর এ কী দুর্দশা। কেমন ছিলেন ফিটফাট এক সৈনিক। আর এখন? না না, অন্য কেউ হলে নাহয় কথা ছিল। শেষকালে একটা ছাগলের হাতে এইভাবে তাঁকে নাকাল হতে হল। টুপি গেল, জুতোটা হাওয়া, জামা-প্যান্ট ফর্দাফাঁই। শেষমেষ লাথি খেয়ে কয়লার গাদায়! দুর্দশার একেবারে একশেষ! কী করা যায় এখন?
আর কিছুই করা যায় না। ওই তো ছাগলটা আবার আসছে। তাড়াতাড়ি কয়লার চাঁই চাঁই গাদার ফাঁকে বাগডুম সিং লুকিয়ে পড়লেন। এখন তাঁকে লুকিয়েই থাকতে হবে, কারণ ছাগলটা দেখতে পেলে আর তাঁকে ছেড়ে কথা বলবে না। শিং ঘুষিয়ে ঠিক যে তাঁর পেট ফাঁসিয়ে দেবে, একথাটা তিনি হাড়ে হাড়ে সমঝে গেছেন।
ছাগলটা বাগডুম সিংকে খুঁজে বার করার জন্যে চেষ্টার ত্রুটি রাখল না। কিন্তু কয়লার ফাঁকে কোথায় ভদ্রলোক লুকিয়ে আছেন, এই রাত্তির বেলা তা কি আর ছাগল ঠাওর করতে পারে। খুঁজে না পেয়ে ছাগলটা ধুমধাড়াক্কা কয়লার ওপর লাফালাফি লাগিয়ে দিলে। তারপর সত্যিই যখন কোনো সাড়াশব্দ পেল না, তখন নিজেই বিচ্ছিরি ভাঙাগলায় ব্যা ব্যা করে চিল্লাতে চিল্লাতে সেখান থেকে কেটে পড়ল।
আরও কিছুক্ষণ কয়লার ফাঁকে গা-ঢাকা দিয়ে বসে রইলেন বাগডুম সিং। তারপর মন যখন বলল সত্যি সত্যি ছাগলটা নেই, তখন তাঁর উঁকি মারতে ইচ্ছে হল। এবং তিনি উঁকি মারলেন। ছাগলটাকে দেখতে না পেয়ে স্বস্তির নিশ্বেস ফেললেন।
কিন্তু এখনটা, মানে যখনটা তিনি কয়লার গাদায় বসে আছেন, তখনটা তাঁর এতই খারাপ লাগছিল যে বলার কথা নয়। চেহারা! সে তো যা হয়েছে শুনে কাজ নেই। এই ভূতের মতো চেহারা নিয়ে তিনি যে এখন কী করবেন কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। আর পাঁচটা ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে দাঁড়াবেন কোন লজ্জায়। টুপি নেই, মাথায় টাক, এক পায়ে জুতো, এক-পা খালি, জামা ছেঁড়া, প্যান্ট ফাটা—একদম জেলেপাড়ার সং। এমন সংকে কে আর আদর করে ডেকে ঘরে ঠাঁই দেয়।
কিন্তু এখানে এই কয়লার গাদায় থাকতে তখন তাঁর যে কী খারাপ লাগছিল বলে বোঝাতে পারব না। তিনি ভাবছিলেন এক্ষুনি এখান থেকে সরে না পড়লে, তাঁর যেটুকু আর বাকি আছে সেটুকুও যাবে। ছাগলটাই যে আবার দলবল নিয়ে আসবে না, এও তো বলা যায় না। সুতরাং তিনি তক্ষুনি ওখান থেকে পালাবার রাস্তা খুঁজতে লাগলেন।
হ্যাঁ, তিনি ভারি সামলে-সুমলে রাস্তা খুঁজছিলেন। একবার কয়লার এই চাঁইটা ডিঙিয়ে ওইটাতে, আবার ওইটা লাফিয়ে সেইটাতে। সেইটা থেকে আর একটাতে যেই তিনি লাফ মারতে গেছেন, তখন কে যেন বলে উঠল, আরে ভাই, দেখো দেখো, আমার ঘাড়ে যেন পা তুলে দিয়ো না!
থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন বাগডুম সিং। তাঁর চোখ দুটি চমকে স্থির হয়ে গেল। সঙ্গেসঙ্গে বুকের ভেতরটা ধড়াস করে এমন লাফিয়ে উঠল যে, তাঁর মনে হল তিনি এক্ষুনি কপালে চোখ তুলবেন।
খুব রক্ষে, সামলে গেলেন। সামলে গেলেন তার কারণ, তিনি শুনতে পেলেন সেই কয়লার গাদার ফাঁকে কে যেন ডানা ঝাপটাচ্ছে। সেইদিকে তাকালেন বাগডুম সিং। একটা কাক কয়লার গাদায় লটকে পড়ে আছে!
কাকটার চোখে চোখ পড়তেই বাগডুম সিং আঁতকে উঠেছেন। তিনি ঘুরে পালাতে গেছিলেন, কিন্তু কাকটা আবার কথা কয়ে উঠল, —আরে ভাই পালাচ্ছ কোথা? দাঁড়াও দাঁড়াও। তোমাকে আমি চিনি। তুমিই তো খেলনা উড়োজাহাজটার পিঠে বসে উড়ছিলে। তারপর যুদ্ধ করতে গিয়ে রাস্তায় পড়লে!
বাগডুম সিং ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন।
কাক আবার বললে, আর বলো কেন। তুমি তো পড়লে সেই উড়োজাহাজটার পিঠ থেকে, আর এদিকে সেই উড়োজাহাজটার সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে আমার পায়ে এমন চোট লেগে গেল, কী বলব! আমিও তোমার মতো ওপর থেকে ছিটকে পড়লুম। বলে কাকটা ব্যথা হলে যেমন ‘আঃ আঃ’ করে মানুষ কাতরায়, তেমনি ‘কা কা’ করে সে কাতরাতে লাগল।
বাগডুম সিং কাকটার পায়ের দিকে তাকালেন। তাঁর মনে হল সত্যিই কাকটা যেন বাঁ-পাটা নাড়াচাড়া করতে পারছে না। সঙ্গে সঙ্গে এই ভেবে তিনি আশ্বস্ত হলেন, আর যাই হোক খোঁড়া কাকটা তো আর তাকে ঠোকরাতে পারছে না।
কাকটা আবার বললে, তখন তোমায় কেমন সৈনিকের মতো দেখতে লাগছিল, এখন ভূতের মতো চেহারা হল কী করে? বা:! মাথায় তোমার টাক-জ্যোৎস্না ঝিলিক মারছে।
কথা শুনে বাগডুম সিংয়ের গা জ্বলে গেল। তিনি রেগে ধমক দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলেন, আমার এ দুর্দশা তোমাদের জন্যে।
তাঁর না রেগে উপায়ও ছিল না। অন্তত রাগটা তাঁকে দেখাতেই হত কেননা, তখন তাঁর নিজের অবস্থার কথা চিন্তা করে ভীষণ লজ্জা করছিল। তাঁর মনে হচ্ছিল এই তালে কাকটাকে এক হাত নিতে পারলে টেকো মাথার লজ্জাটা একটু কমবে। কিন্তু কী কী কথা বললে যে গায়ের জ্বালা মেটে সেটা তিনি তখন কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলেন না।
তখন কাকটা আবার বললে, আরে ভাই রাগ করছ কেন? তোমার এক পায়ে জুতো আর মাথায় টাক, এই অবস্থায় তুমি যতই রাগবে, ততই আমার রগড় লাগবে। ওহো! তোমার বন্দুকটাও গেছে দেখছি।
বাগডুম সিংয়ের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে পড়ল। তিনি তিরিক্ষি মেজাজে খেঁকিয়ে উঠলেন। বললেন —দ্যাখো, অসময়ে ঠাট্টা-তামাশা আমি পছন্দ করি না। আমি নিজের জ্বালা নিয়ে মরছি, তার ওপর কাকের কচকচানি!
—তাহলে এক কাজ করো, কাকের কচকচানি না শুনে এখান থেকে সরে পড়ো। কাক কথাটা বলে নিজের পায়ের ব্যথাটা নিয়ে আবার কা কা করে কাতরাতে লাগল।
বাগডুম সিং বললেন, হ্যাঁ তাই যাচ্ছি।
যাচ্ছ যাও। তবে জিজ্ঞেস করতে পারি কি, ঘরবাড়ি কোনদিকে জানা আছে তো? কাক বললে।
—আমার ব্যাপারে তোমার নাক গলাবার দরকার নেই। কোথা যাব, কী করব, সেটা আমি বুঝব। একটা কাক কী বলে গায়ে পড়ে উপদেশ দিতে আসে!
কাক এবার বেশ ঠাণ্ডা গলায় বললে, দ্যাখো ভাই, বিপদে পড়ে মাথাটা অমন গরম করে ফেলাটা কি ঠিক হচ্ছে? বিপদে আমিও পড়েছি। রাগারাগি না করে বিপদ থেকে কেমন করে বাঁচতে পারি এখন কি আমাদের সেটাই ভাবা উচিত নয়? রেগেমেগে এখান থেকে তুমি চলে গেলে, ক্ষতি তোমারও হবে আমারও হবে। তুমি কি জানো, এই কয়লার গাদায় কিছু কিছু ধেড়ে ইঁদুর বাস করে? তাদের দাঁত সম্পর্কে তোমার যদি কিছু ধারণা থাকে, তবে তুমি নিশ্চয় জানো, সেগুলি কী সাংঘাতিক ধারালো! দেখলে তোমাকেও ফাটাফুটি করে দিতে পারে, আমাকেও কাটাকুটি করতে পারে। তার চেয়ে এসো-না, যখন দু-জনেরই বিপদ, তখন দু-জনেই চেষ্টা করে দেখি বাঁচতে পারি কি না।
ইঁদুরের কথা শুনে বাগডুম সিংয়ের আস্ফালন তো চুপসে একেবারে ফুটো বেলুন। বাগডুম সিং ভয়ে ঢোঁক গিলতে গিলতে বললেন, তাই নাকি, তাই নাকি। এখানে ইঁদুর আছে? তাহলে তো আমাদের এখানে বেশিক্ষণ থাকাটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু অন্ধকারে কোথায়ই-বা যাওয়া যাবে? বাগডুম সিং কাকের ওপর রাগ ভুলে প্রাণের ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
কাক বললে, তুমি যদি আমাকে একটু দাঁড়াতে সাহায্য করো, আমি তোমায় নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যেতে পারি।
বাগডুম সিং এবার এমন ভাব করলেন যেন কাকের সঙ্গে তাঁর কতদিনের বন্ধুত্ব। বললেন, এ কী কথা বলছ? এটুকু আর আমি করতে পারব না? কিন্তু তুমি দাঁড়ালে কষ্ট হবে না?
কাক উত্তর দিলে, কষ্ট হলেও কী করা! বাঁচার পথ তো খুঁজতে হবে! তুমি ধরো দেখি!
বাগডুম সিং অগত্যা ইঁদুরের ভয়ে কাকের সঙ্গে ভাব করে ফেললেন, তারপর হাতটি বাড়িয়ে কাককে জড়িয়ে ধরে বললেন, ওঠো তাহলে!
কাক উঠে দাঁড়াল। অবিশ্যি কষ্ট যে একটু হল না, তা নয়। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে কাক বললে, বা:! তোমার গায়ে তো বেশ জোর!
বাগডুম সিং শুনলেন। কিন্তু ভাবটা এমন দেখালেন যেন সেকথা তিনি কানেই তোলেননি। কাককে বললেন, হাঁটতে পারবে তো?
কাক উত্তর দিলে, একটু কষ্ট হবে। দেখা যাক!
যাবে কোন দিকে? জিজ্ঞেস করলেন বাগডুম সিং।
সামনে হাঁটো। উত্তর দিলে কাক।
অনেক কষ্ট করতে করতে সেই কয়লা-গাদার চড়াই-উতরাই পার হয়ে, কাক বাগডুম সিংকে নিয়ে একটা পোড়োবাড়িতে হাজির হল। জায়গাটা বেশ নিরিবিলি। মোটামুটি পরিষ্কার। কেননা, চামচিকে উড়ছে না। টিকটিকি ডাকছে না। কিংবা মাকড়শা জাল পাতছে না।
বাড়িটা দেখতে দেখতে বাগডুম সিং কাককে জিজ্ঞেস করলেন, এইটা তোমার সেই নিরাপদ স্থান? এখানে ইঁদুরটিদুরের ভয় নেই তো? ভয়ে ভয়েই জিজ্ঞেস করলেন বাগডুম সিং।
কাকটা বললে, না না, এখানে সেসব কিছুর ভয় নেই। কিন্তু এতখানি পথ হেঁটে এসে আমার পা-টা বড়ো টনটন করছে। —কা কা!
কাকের গলায় এবারকার কা কা শুনে বাগডুম সিং বড়োই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি হুমড়ি খেয়ে কাকের পায়ের কাছে হেঁট হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, দেখি দেখি, কোনখানটা ব্যথা করছে?
—এইখানটা। কাক উত্তর দিলে। তারপর ঠ্যাংটা বাড়িয়ে বললে, দেখো ভাই, সামলে টিপো। আবার না লেগে যায়!
না না। বলে বাগডুম সিং কাকের ঠ্যাং টিপতে বসলেন।
—আঃ! ভারি আরাম লাগছে। তুমি তো দেখছি বেশ পা টিপতে পারো। আগে কোথাও পা টেপার চাকরি করতে নাকি? জিজ্ঞেস করলে কাকটা।
বাগডুম সিং বললেন, না না, চাকরি-টাকরি আমি কখনো করিনি। আমি তো পল্টন।
—ও! যুদ্ধ কর? তা এখন যা চেহারা হয়েছে, দেখলে কে বলবে তুমি পল্টন।
বাগডুম সিং জিজ্ঞেস করলেন, খুব যাচ্ছেতাই দেখতে লাগছে বুঝি?
—যা-তা! মানে তোমাকে দেখলেই হাসি পাচ্ছে। মুখখানা একবার আয়নায় দেখবে নাকি? কাক জিজ্ঞেস করলে।
—আয়না আর পাচ্ছি কোথা?
—আছে।
—আছে? কোথায় আছে? কাকের পা টিপতে টিপতে থেমে গেলেন বাগডুম সিং। তারপর বেশ ব্যস্ত হয়েই জিজ্ঞেস করলেন।
কাকটা বললে, একটু থামো তো দেখি! মনে হচ্ছে দরদটা একটু কমেছে! দেখি নিজে নিজে দাঁড়াতে পারি কি না! বলে কাক দাঁড়াবার চেষ্টা করলে। হ্যাঁ, দাঁড়াতে পারল। দু-পায়ে ভর দিয়ে বেশ খাড়া হয়ে দাঁড়াল কাকটা। তারপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বললে, দেখি হাঁটতে পারি কি না!
হ্যাঁ, কাক প্রথমটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে তারপর লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটতে শুরু করে দিলে।
বাগডুম সিং কাককে হাঁটতে দেখে বললেন, বা:! এই তো হাঁটতে পারছ। ভালো হয়ে গেছ দেখছি!
কাক উত্তর দিলে, হ্যাঁ তাই তো দেখছি। তোমার হাতের গুণ আছে বলতে হবে!
বাগডুম সিং নিজের প্রশংসা শুনে গদগদ হয়ে বললেন, না না, তেমন আর কী! তোমার মতো একজন বন্ধু পাওয়া কি কম ভাগ্যের কথা। তুমি ছিলে বলেই এ যাত্রায় রক্ষা পেয়ে গেলুম। কই এবার আয়নাটা দেখাও, মুখের ছিরিটা একবার দেখে নিই!
—এসো আমার সঙ্গে। বলে কাক সেই অন্ধকার পোড়ো বাড়ির এঘর ডিঙিয়ে আর একটা ঘরের দরজার কাছে আসতেই, দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা গেল! আলো দেখতেই বাগডুম সিং বললেন, এখানে যে আলো দেখছি! কোথায় যাচ্ছি?
কাক বললে, এসো-না! প্রথমটা অন্ধকার তারপরেই আলো! অন্ধকার থাকলেই আলো থাকবে। অন্ধকার না থাকলে কী করে বুঝবে আলোর গুণ! এসো ঘরে ঢুকি। বলে কাক সেই অন্ধকার পোড়োবাড়ির এক আলো-জ্বলা ঘরে ঢুকে পড়ল। পেছনে পেছনে বাগডুম সিংও ঢুকলেন।
কাক বললে, ওই দ্যাখো, তোমার সামনেই আয়না।
সত্যিই! ঘরে ঢুকতেই একটা মস্ত আয়নার কাচের ওপর বাগডুম সিংয়ের অদ্ভুত চেহারাটা ঝলকে উঠল। অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে নিজেকে দেখতে লাগলেন বাগডুম সিং। অবাক হবারই কথা। কেননা, এই প্রথম তিনি নিজে নিজেকে দেখতে পাচ্ছেন! তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তিনি নিজের মুখটা দেখে ভীষণ লজ্জা পেলেন! মুখে কালি, সে নাহয় মোছামুছি করলে উঠে যাবে। কিন্তু মাথায় অমন একটা নিটোল টাক, সেটি যাবে কেমন করে! তিনি মাথায় হাত দিলেন। এবং টাকের ওপর হাত বোলাতেই তাঁর ছাগলের কথা মনে পড়ে গেল। ব্যাটা ছাগলটাই যত নষ্টের গোড়া! সে টুপিটা খেয়ে না ফেললে তার টাকটা তো বেরিয়ে পড়ত না! এখন এ লজ্জা ঢাকতে গেলে তাঁর একটা টুপি চাই। কিন্তু পান কোথা?
বাগডুম সিংকে চুপচাপ মাথায় হাত দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাক জিজ্ঞেস করলে, মাথায় হাত দিয়ে অমন করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবছ?
বাগডুম বললেন, না তেমন কিছু নয়।
কাক বললে, আরে বলো বলো, আমার কাছে লজ্জার কিছু নেই। তুমি আমার প্রিয় বন্ধু। তুমি না থাকলে আজ আমার বেঘোরে প্রাণটা যেত। তুমি পা টিপে দিলে বলেই তো এখন তবু একটু হাঁটাচলা করতে পারছি। তোমার উপকারের কথা আমি ভুলব কেমন করে!
বাগডুম সিং আবার তেমনি গদগদ হয়ে বললেন, না না, উপকার আর কী করতে পারলুম। বরঞ্চ তুমিই আমার উপকার করলে।
কাক বললে, একে কি আর উপকার বলে!
বাগডুম সিং বললেন, উপকারই তো। দ্যাখো ভাই কাক, তুমি আমায় এই আয়নার সামনে না আনলে আমি কি জানতে পারতুম যে, আমার মাথার ওপর এত বড়ো একটা টাক। পাঁচটা ভদ্রলোকের সামনে টাক নিয়ে দাঁড়ানো যায়? ছিল না, আগে আমার টাক ছিল না। ছাগলটা আমার টুপিটা খেয়ে ফেলতেই টাকটা বেরিয়ে পড়ল।
কাক বাগডুম সিংয়ের কথা শুনে বললে, আরে দুর, এই টাকের জন্যে তোমার এত ভাবনা। ও আমি ঠিক করে দেব।
বাগডুম সিং অবাক হয়ে কাকের মুখের দিকে তাকালেন। অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কী করে টাক ঠিক করবে?
—তুমি যেমন করে আমার পা ঠিক করলে! উত্তর দিলে কাক। —তুমি আমার জন্যে এত করলে, আমি এটুকু পারব না। নাও এখন শুয়ে পড়ো। আজ সারাটা দিন শরীরের ওপর ভীষণ ধকল গেছে। ওই দ্যাখো, ওই ছোট্ট খাটে তোমার বিছানা। বলে কাক বাগডুম সিংকে বিছানাটা দেখালে।
বাগডুম সিং জিজ্ঞেস করলেন, কী ব্যাপার বলো তো? আমি যত দেখছি ততই অবাক লাগছে। এই পোড়োবাড়ির সব দেখি তোমার নখদর্পণে!
কাক বললে, আমি এখানে বাস করি যে!
—অ! এটা তোমার বাড়ি?
—বলতে পারো।
তা হলে ভালো। বলে বাগডুম সিং কাককে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি ঘুমোবে না?
কাক বললে, ঘুমোব। এখনও সময় হয়নি। আমি একটু বেশি রাতেই ঘুমোই।
—সে কী! তুমি কাক! সন্ধে হলেই তো তোমাদের বাসায় সেঁদিয়ে পড়ার কথা।
—হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। তবে আজ তোমার জন্যে আমার আর একটু বেশি রাত জেগে থাকতে হবে। তুমি আমার অতিথি, তুমি না ঘুমোলে আমি শুই কী করে— এসো! কাক বাগডুম সিংকে বিছানায় উঠতে সাহায্য করল। একপায়ে জুতো পরে বাগডুম সিং টেকো-মাথা বালিশে ঠেকিয়ে শুয়ে পড়লেন। তারপর ঘুমিয়ে পড়লেন।
পরের দিন কতক্ষণ পরে ঘুম ভাঙল ঠিক বুঝতে পারলেন না বাগডুম সিং। ঘুম ভাঙতেই তিনি উঠে বসলেন। কাকের খোঁজ করতে এধার-ওধার চোখ ফেরাতেই হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন, ঠিক তাঁর মাথার বালিশের পাশে একটি রাজমুকুট! ছোট্ট, কিন্তু ভারি ঝলমলে। দেখে তিনি হকচকিয়ে গেছেন! হাত বাড়ালেন— নাড়াচাড়া করলেন। মুকুটটা মাথায় দিলেন। আয়নার কাছে ছুটে গেলেন। আয়নায় মুকুটের ছায়া দেখতে দেখতে তিনি নিজেই হেসে উঠলেন। ভাবলেন, দারুণ লাগছে তো! এ রাজমুকুট নিশ্চয়ই কাক এনেছে। যাক বাবা, এতক্ষণে নিশ্চিন্তি! কাকের জন্যে মাথার টাকটা চাপা পড়ল।
ঠিক এই সময়ে হঠাৎ কাক হাজির। —কী হে পল্টন, কেমন বুঝছ? কাক হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করলে।
খুব ভালো। তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব, বুঝতে পারছি না। খুশিতে উছলে উঠে বাগডুম সিং উত্তর দিলেন।
—থাক থাক বন্ধুকে আবার ধন্যবাদ কীসের! তোমার টাকটা যে ঢাকা পড়েছে এই দেখেই খুশি!
বাগডুম সিং তেমনি খুশি হয়েই বললেন, ঢাকা পড়েছে মানে! একেবারে রাজমুকুটে ঢাকা পড়েছে।
—তা যা বলেছ। কিন্তু ভাই পল্টন, মাথায় তোমার মুকুটটা ঠিক মানাচ্ছে না।
—কেন? যেন অনেকটা ভয় পেয়েই বাগডুম সিং জিজ্ঞেস করলেন।
—মাথায় রাজমুকুট, এদিকে মুখে তোমার কালিঝুলি। নাও এই রুমালটা দিয়ে তোমার মুখটা মুছে নাও। বলে কাকটা বাগডুম সিং যে বিছানায় শুয়েছিলেন, সেই বিছানার নীচের থেকে ফস করে একটা রুমাল টেনে বার করলে। বার করে বাগডুম সিংয়ের হাতে দিলে।
বাগডুম রুমালটা হাতে নিয়ে বললেন, বাবা! দেখছি তোমার এ পোড়োবাড়িতে সব কিছু পাওয়া যায়। বলে বাগডুম সিং রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে লাগলেন। রুমাল দিয়ে ভুরভুর সেন্টের গন্ধ বেরুচ্ছে। তিনি আঃ আঃ করে শুঁকতে শুঁকতে কাককে আবার জিজ্ঞেস করলেন, রুমালটা বুঝি তোমার?
কাক বললে, হ্যাঁ।
—তুমি মুখ মোছো বুঝি?
কাক হেসে ফেললে, বললে, আমার আবার মুখ, তাও আবার মোছা!
—বা:! বা:! এই দ্যাখো কাক, কয়লার কালিঝুলি সব মুখ থেকে উঠে গেল! খুব খুশি হয়ে বাগডুম সিং আয়নার থেকে মুখ সরিয়ে কাককে দেখালেন।
কাক বাগডুম সিংয়ের মুখখানা দেখে বললে, হ্যাঁ, এবার তোমাকে বেশ লাগছে।
—তাই নাকি? বাগডুম সিং এবার আয়নার সামনে ঘুরে ফিরে নিজেকে দেখতে লাগলেন। দেখতে দেখতে হঠাৎ তিনি থমকে গেলেন।
কাক জিজ্ঞেস করলে, আবার কী হল?
—হবে আর কী! মাথার এমন সুন্দর এক রাজমুকুট, এদিকে পায়ে আমার একপাটি জুতো! ভারি সুন্দর মানিয়েছে, কী বলো? ঠাট্টার সুরে কথাটা বলে বাগডুম সিং নিজেই হেসে ফেললেন।
কাক উত্তর দিলে, —হ্যাঁ, ব্যাপারটা হাসি পাবারই মতো। আচ্ছা দেখি তোমার জন্যে কী করতে পারি। বলে কাক বাগডুম সিংকে জিজ্ঞেস করলে, রাতে ঘুমের কোনো ব্যাঘাত হয়নি তো?
বাগডুম বললেন, খুব আরাম করে ঘুমিয়েছি।
—তোমার কোনো অসুবিধা হলে, তুমি বলতে লজ্জা পেয়ো না।
—না না, বন্ধুর কাছে লজ্জা কীসের! বলে বাগডুম সিং জিজ্ঞেস করলেন, এই বাড়িটা খুব বড়ো না?
—তা একটু। উত্তর দিলে কাক।
—আমার পায়ে জুতো থাকলে একটু ঘুরে-ফিরে দেখা যেত।
কাক উত্তর দিলে, —জুতো তোমার আসবে।
ঠিক কথা। পরের দিন বাগডুম সিংয়ের জুতো এসে গেল। জুতো মানে সে কি যে-সে জুতো, জরির কাজ-করা নাগরা জুতো। কাক জুতো জোড়া বাগডুম সিংয়ের সামনে রেখে বললে, পুরোনো ওই একপাটি জুতো খুলে ফেলে এই নতুনটা পরো। দেখি কেমন মানায়!
বাগডুম সিং তো আনন্দে আটখানা। নতুন জুতো পায়ে পরে, কাকের গলা জড়িয়ে লাফালাফি লাগিয়ে দিলেন। এদিকে কাকের তো প্রাণ যায়! কাক চিৎকার করে উঠল—আরে ভাই ছাড়ো, ছাড়ো। তোমার আদরের ঠেলায় আমার প্রাণ গেল যে!
বাগডুম সিং কাকের গলা ছেড়ে নিজেই লাফালাফি করতে লাগলেন।
কাক বললে, দেখো পা স্লিপ না করে! নতুন জুতো, বলা যায় না। ছোটো হয়নি তো?
বাগডুম বললেন, একদম ফিট।
কাক বললে, না লাফিয়ে একটু হাঁটো। দেখি কেমন ফিট হয়েছে।
বাগডুম সিং নাগরা পরে গটমট করে হাঁটা দিলেন।
কাক বললে, বা:! বেশ মানিয়েছে!
বাগডুম সিং হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেলেন।
কাক জিজ্ঞেস করলে, থামলে যে! কী ভাবছ?
—না, ভাবব আর কী! ভাবছি মাথায় মুকুট, পায়ে নাগরা। আর এদিকে গায়ে ছেঁড়া প্যান্ট, ছেঁড়া জামা। ভাবছি আমাকে এ-অবস্থায় দেখলে কুকুর-বেড়াল না ডাকতে শুরু করে দেয়!
কাক হেসে ফেললে। বললে, তা যা বলেছ! তোমার জামা-প্যান্টের বড়ো সঙ্গিন অবস্থা। ঠিক আছে, দেখি কী করতে পারি।
বাগডুমের মনে মনে খুব ইচ্ছে, নতুন জামা নতুন প্যান্ট হোক। কিন্তু বাইরে তাঁর ভাবখানা এমন, যেন কাক কষ্ট করে তার জন্যে কিছু না-করলেই তিনি খুশি হবেন। তাই তিনি বললেন, না ভাই কাক, তোমায় আর অত কষ্ট করতে হবে না। এমন তো নয় যে, জামা-প্যান্ট না হলে আমার চলবে না। তোমার দয়ায় আমার তো সবই হল!
কাক উত্তর দিলে, ছি ছি! ও কী কথা বলছ? আমার দয়ায় কেন হবে ভাই! বরঞ্চ বলতে পারো, তোমার দয়াতেই আমি আজ চলতে-ফিরতে পারছি। তুমি আমার বন্ধু। তা নিজের বন্ধুকে কেউ ছেঁড়া জামা-প্যান্ট পরিয়ে রাখে না বন্ধু ছেঁড়া জামা-প্যান্ট পরে থাকলে দেখতে ভালো লাগে?
কাকের কথা শুনে বাগডুম সিং মুখের ওপর একরাশ হাসি মাখিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
পরের দিন এসে গেল।
কী এসে গেল!
রাজপোশাক। রঙিন ছবির মতো রেশমি পোশাক।
বাগডুম সিংয়ের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। অবাক হয়ে কাককে জিজ্ঞেস করলেন, এই আমার পোশাক?
হ্যাঁ, কেন পছন্দ হল না? কাক জিজ্ঞেস করলে।
বাগডুম সিং সেই রঙিন পোশাক পরে ফেললেন। তারপর আবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। দাঁড়াতেই তাঁর যেন মনে হল তিনি আর সৈনিক নন, তিনি এক রাজা! তাঁর মাথায় রাজার মুকুট। গায়ে রেশমি পোশাক। পায়ে নাগরা জুতো। ভারি চমৎকার মানিয়েছে তাঁকে। তিনি কাককে হাসতে হাসতে বললেন, আরে ভাই, শেষকালে যে তুমি আমায় রাজা বানিয়ে ছাড়লে!
কাক হাসল।
বাগডুম সিং জিজ্ঞেস করলেন, হাসলে যে?
—হাসি পেয়ে গেল!
—কেন?
—হ্যাঁ, আমি তোমায় রাজা সাজিয়েছি বটে, তবে পুতুল-রাজা। কাক একটু ঠাট্টা করেই উত্তর দিলে। —তুমি সত্যিকারের রাজা হলে, তোমার ওই মাথার মুকুটে থাকত চুনি-পান্নার জৌলস, মুক্তা-মণির ঝলমলানি। তোমার এই মুকুটে তো সেসব কিচ্ছুই নেই, তাই একে তো রাজমুকুট বলতে পারি না।
কাকের কথা শুনে কেমন যেন মুষড়ে গেলেন বাগডুম সিং। এবং তাঁর মনে হল এ যদি রাজমুকুট না হল, তো এ মুকুট মাথায় রেখে কী লাভ! কেমন যেন একটা লোভ চুপি চুপি এই ফাঁকে তাঁর মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে! তখন তিনি ভাবলেন, আহা! ওই চুনি-পান্নার জৌলস আর মুক্তা-মণির ঝলমলানো রাজমুকুট যদি পাওয়া যায় তো বেশ হয়। তারপর তিনি কেমন যেন লজ্জা লজ্জা চোখে কাকের দিকে তাকালেন।
কাক জিজ্ঞেস করলে, কিছু বলবে?
বলতে ইচ্ছে করছে, আবার লজ্জাও করছে। উত্তর দিলেন বাগডুম সিং।
কাক বললে, সে কী! আমাকে লজ্জা? আর কিছু চাই তোমার?
বাগডুম উত্তর দিলেন, কী করে বলি! আমি না চাইতেই তো তুমি আমায় কত দিলে।
বন্ধুকে দেব না তো কাকে দেব? কাক বললে।
—হ্যাঁ সত্যি! তুমি আমার বন্ধু বলেই আমার বার বার মনে হচ্ছে কথাটা বলে ফেলি। আর যেই মনে হচ্ছে বলে ফেলি, অমনি এমন লজ্জা লজ্জা করে উঠছে, তোমায় কী বলব! বলে বাগডুম সিং লজ্জায় মাথা নুইয়ে আড়চোখে কাকের মুখখানা দেখে নিলেন!
বাগডুম সিংয়ের বলা শেষ হলে, কাক বললে, ছি ছি! তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি আমাকে আপন বলে মনেই করতে পারছ না। বড়ো দুঃখ পেলুম! বলো তোমার কী কথা আছে?
বাগডুম সিং আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করলেন, বলব?
—নিশ্চয়ই।
—তবে বলি অ্যাঁ? তুমি-না অ্যাঁ, একটা-না ওই চুনি-পান্না আর মুক্তা-মণি ঝলমলানো রাজমুকুট এনে দাও আমায়। লজ্জার মাথা খেয়ে বাগডুম সিং বলে ফেললেন। তারপর নিজের মাথার থেকে সেই মুকুটটা খুলে ফেললেন। খুলে কাকের সামনে রেখে বললেন, তুমি যখন আমার জন্যে এত করলে, তখন এই অনুরোধটুকু নিশ্চয়ই রাখবে। সত্যি বলছি, আমি পুতুল হলেও এখন আমার রাজাই সাজতে ইচ্ছে করছে!
কাক কেমন যেন বেঁকা-চোখে একবার তাকাল বাগডুম সিংয়ের মুখের দিকে। তার এই ঠাট্টা শুনে পুতুলটা যে সত্যি সত্যি একটা মণি-মুক্তার মুকুট চেয়ে বসবে, এটা কে বুঝবে! লোভ যে তার তুঙ্গে উঠেছে, বুঝতে পেরেছে কাক। এই পুতুলটা পর্যন্ত অল্পে সন্তুষ্ট নয়! কাক তাই বললে, অনুরোধটা তোমার একটু শক্ত বটে, তবে শক্ত হলেও আমাকে রাখতে হবে। যতই হোক, আমার জন্যে তুমি কম করোনি! বলে কাক বাগডুমের চোখের সামনেই মুকুট আনতে ওড়া দিলে। এবং বাগডুম সিং আজই প্রথম দেখলেন, কাকটা পোড়োবাড়ির এই ঘরটার সামনে সেই ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারের মধ্যে কালো ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে হারিয়ে গেল। তাই দেখে বাগডুম সিংয়ের কেমন যেন মনে হল!
খুবই আশ্চর্য! বাগডুম সিংয়ের জন্য সত্যি সত্যি চুনি-পান্নার জৌলস আর মুক্তা-মণি ঝলমলানো রাজমুকুট এসে গেল। এ মুকুট দেখে সে কী আনন্দ বাগডুম সিংয়ের। আনন্দে তিনি যে কী করবেন কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। কখনো তিনি মুকুট মাথায় দিচ্ছেন, কখনো খুলছেন। আয়নার সামনে দাঁড়াচ্ছেন, দাঁড়িয়ে হাসছেন! কখনো হা-হা-চিৎকার করছেন, কখনো আনন্দে কেঁদে ফেলছেন। মুকুটটা দেখে বাগডুম সিং আত্মহারা হয়ে গেলেন। এবং তখন তাঁর মনে হল, তিনি পুতুল হলেও রাজা। তাঁর মাথায় রাজমুকুট, আর তিনি কাকে ডরান!
কাক জিজ্ঞেস করলে, কী বন্ধু, কেমন লাগছে?
—বাগডুম সিং উৎসাহে হাত তুলে চেঁচিয়ে উঠলেন, দারুণ। তারপর আয়নার ছায়ায় নিজের মুখটা দেখতে দেখতে তিনি রাজার মতো হেসে উঠলেন, হা-হা-হা! হাসতে হাসতে চেঁচিয়ে বললেন, আমি রাজার চেয়েও বড়ো, আমি মহারাজা!
কাকটা এবার মুচকি হাসল।
কাকের মুচকি হাসি দেখে বাগডুম সিং থমকে গেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, হাসছ যে!
কাক বললে, শুধু হাসছি না, সঙ্গে ভাবছি।
—কী ভাবছ?
—ভাবছি, তুমি ভাগ্যিস মানুষ-রাজা হওনি!
বাগডুম সিং থতোমতো খেয়ে গেলেন। এবং থতোমতো খেতে খেতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কেন?
—কারণ তারা মানুষ, তারা যত পায় তত চায়। যেখানের যা দামি জিনিস, অন্যের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনে নিজের ঘর সাজায়।
—আমার এই মুকুটের চেয়েও তাদের মুকুট দামি?
—অনেক দামি।
—আমার এই পোশাকের চেয়েও তাদের পোশাক সুন্দর?
—অনেক সুন্দর!
—আমার চেয়ে তাদের দেখতে ভালো?
—অনেক ভালো।
চুপ করে গেলেন বাগডুম সিং। কেমন যেন মনমরা হয়ে গেলেন তিনি।
কাক জিজ্ঞেস করলে, চুপ করলে যে!
বাগডুম বললেন, এমনি।
উত্তর শুনে কাক একটি বার শুধু বাগডুম সিংয়ের মুখের দিকে তাকাল। তখন আর কোনো কথা বলল না।
পরের দিন বাগডুম সিং তাঁর মাথার মুকুটটি খুলে ফেললেন। খুলে চুপ করে বসে রইলেন। কাক তাই দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে, কী ভাই, কী হল? মুকুটটা খুলে ফেলেছ কেন?
—এমনি! বাগডুম সিং অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দিলেন।
—কেন, পছন্দ হচ্ছে না? কাক জিজ্ঞেস করলে।
বাগডুম সিং কোনো উত্তর দিলেন না। চুপ করে গেলেন।
তার পরের দিন বাগডুম সিং রেশমি জামা খুলে ফেললেন।
তার পরের দিন নাগরা জুতো সরিয়ে রাখলেন।
কাক জিজ্ঞেস করলে, কী ব্যাপার বলো তো? আমার ব্যবহারে তুমি কি কোনো দুঃখ পেয়েছ?
বাগডুম সিং মুখটা শুকনো শুকনো করে উত্তর দিলেন, না।
—আমি কি কোনো অন্যায় করেছি তোমার ওপর?
—না।
—তবে? আর ভালো লাগছে না আমাকে? না, ভালো লাগছে না এখানে থাকতে?
—কেন ভালো লাগবে না? একটু বেশ অভিমানের সঙ্গেই উত্তর দিলেন বাগডুম সিং।
—তবে আমার ওপর রাগের কারণ? কাক জিজ্ঞেস করলে।
—রাগ করেছি কে বললে?
—আমি নিজেই তো দেখছি!
এবার একটু স্বর চড়ালেন বাগডুম সিং। এবং চড়া স্বরেই কাককে বললেন, তুমি কিছুই দেখছ না। তা যদি দেখতে তা হলে তুমি আমায় পুতুল-রাজা সাজিয়ে রাখতে না। এতদিনে তুমি আমায় মানুষ-রাজা করে দিতে!
বাগডুম সিংয়ের কথা শুনে এবার কাকের চোখ দুটো চমকে স্থির হয়ে গেল। ভাবল পুতুলটা বলে কী! একটু কী ভেবে কাক আবার বলল, ভাই, না চাইতেই তো তোমায় আমি সব এনে দিয়েছি। কিন্তু এ যে তোমার অসম্ভব কথা! মানুষ-রাজা আমি তোমায় কেমন করে করব? আমি তো নেহাতই একটা কাক!
—কাক হলেই-বা! তুমি আমায় জুতো এনে দিচ্ছ, জামা এনে দিচ্ছ আর আমায় মানুষ-রাজা করতে পারছ না? এ আমায় বিশ্বাস করতে হবে?
কাক বললে, কেন ভাই, আমরা দুটি তো বেশ আছি। অল্পে আছি, অল্পে থাকব, অল্পেই সুখ। কী দরকার মানুষ হয়ে!

বস্তার উপর বাগডুম দুলছে, বাজনা শুনে কুকুর ডাকছে...
কাকের কথা শুনে বাগডুম সিংয়ের হঠাৎ যেন একটা চাপা রাগ ফস করে ফেটে পড়ল। তিনি রেগে জ্ঞান হারালেন। চিৎকার করে বলে ফেললেন, —বুঝতে পেরেছি, তুমি আমায় ইচ্ছে করে মানুষ-রাজা করতে চাও না। অমন জানলে কে তোমায় ওই কয়লার গাদা থেকে তুলে আনত! আমার জন্যেই যে তুমি বেঁচেছ, এরই মধ্যে সেকথা ভুলে গেলে? তুমি এত অকৃতজ্ঞ!
ইস! ছি ছি! এ কী কথা বললেন বাগডুম সিং। একথা বলতে তাঁর মুখে আটকাল না! এক বারও মনে হল না কাকও তো তাঁকে বাঁচিয়েছে! কাকের জন্যে তো তাঁর মুখের কালিঝুলি মুছে গেছে। কাকই তো তাঁকে মুকুট এনে দিয়েছে। জামা-জুতো সব দিয়েছে। একথা তিনি এরই মধ্যে ভুলে গেলেন! কেন, এই নিয়েই তো তিনি সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারতেন!
বাগডুম সিংয়ের কথা শুনে কাকের কোনো দুঃখ হল কি না কে জানে! ইস! লোভে লোভে দু-জনের বন্ধুত্বও বুঝি শেষ হয়ে যায়। তবে কাক তখন আর কোনো কথা বললে না! না বলে আবার সেই কালো অন্ধকারের মধ্যে উড়তে উড়তে মিলিয়ে গেল!
বাগডুম সিংয়ের কেমন যেন চমক ভাঙল! তিনি ভাবলেন, তাই তো, কিছু বললেই কাকটা ওই অন্ধকারের মধ্যে কোথায় যায়! ওখানে কী আছে! ভাবতে ভাবতে তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়লেন।
পরের দিন বাগডুম সিংয়ের ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে। তিনি বড্ড ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভাঙতেই আজ সবপ্রথম তাঁর কাকের কথা মনে পড়ে গেল। এবং হয়তো ভাবলেন কাল কাকের সঙ্গে অমন চটামটি না করলেই হত! কিন্তু একী! তাঁর বিছানাটা এত বড়ো হয়ে গেছে কী করে! একী! তিনি নিজে এত বড়ো হয়ে গেলেন কী করে! তিনি ধড়ফড়িয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন। ছুট্টে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আয়নার ছায়ায় নিজেকে দেখতে দেখতে তাঁর চোখ দুটি স্থির হয়ে গেল! না না, তিনি তো আর এইটুকু একটি পুতুল নন! ছোট্ট তাঁর দেহটা কত বড়ো হয়ে গেছে! চোখ দুটি ডাগর ডাগর। ঠোঁট দুটি কাঁপছে। হাতের আঙুলগুলি নাচছে। মুখখানি থমকে থেমে ভাবছে। দেখতে দেখতে তিনি চিৎকার করে উঠলেন :
আমি কে?
আমি কে?
আমি কে?
কাক ঘরে ঢুকল। শান্ত গলায় বললে, বন্ধু, তুমি এখন মানুষ।
বাগডুম সিং আনন্দে দু-হাত বাড়িয়ে কাককে বুকে তুলে নিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, —এ কি সত্যি! এ কি সত্যি!
কাক বললে, হ্যাঁ, তুমি আমার প্রাণ বাঁচিয়েছ, আমিও তোমার ঋণ শোধ করলুম।
ছি ছি! ও-কথা কেন বলছ? ও-কথা বললে আমি কষ্ট পাব। বলে, বাগডুম সিং একটু থামলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, এরপর তুমি বুঝি আমাকে রাজা করবে?
কাক উত্তর দিলে, ভাই, পুতুলকে রাজা সাজানো যায়। কিন্তু মানুষকে তো রাজা বানানো যায় না। আমি তোমাকে মানুষ করতে পেরেছি, কিন্তু রাজা তো করতে পারব না। তোমাকে রাজা হতে হবে নিজে চেষ্টা করে।
কাকের কথা শুনে বাগডুম সিং হাসলেন। বললেন, বুঝেছি ঠাট্টা করছ। প্রত্যেক বারই তুমি বলো পারব না, কিন্তু শেষপর্যন্ত ঠিক পারো!
কাক বললে, বিশ্বাস করো, এবার কিন্তু সত্যি পারব না।
—মিথ্যে কথা। আবার চটে উঠলেন বাগডুম সিং। এতদিন তাঁর যে রাগ ছিল সে-রাগ পুতুলের, কিন্তু আজ তাঁর রাগ মানুষের। তাই তিনি চোখ রাঙিয়ে কাককে বললেন, যে পুতুলকে মানুষ করতে পারে, সে মানুষকে রাজাও করতে পারে। তুমি আমাকে রাজা করে দাও! আমাকে সোনার সিংহাসন এনে দাও! আমার রাজপোশাক এনে দাও! সোনার মুকুট এনে দাও!
কাক আবার বললে, আমি পারি না।
—কেন পারো না?
—সে ক্ষমতা আমার নেই।
—কেন নেই?
—তা তো জানি না।
—তুমি মিথ্যুক! জান জান, তুমি সব জান। তুমি ইচ্ছে করে আমায় রাজা করবে না। বলে চিৎকার করে উঠলেন বাগডুম সিং। তিনি যেন পাগল হয়ে গেলেন। পাগলের মতো বিছানার বালিশটা তুলে নিয়ে তিনি কাককে ছুড়ে মারলেন। কাক চক্ষের নিমেষে নিজেকে সামলে নিলে। তারপর ডানা ঝাপটিয়ে সেই কালো অন্ধকারটার মধ্যে উড়ে পালিয়ে গেল। বাগডুম সিং থমকে গেলেন। তিনি তাকিয়ে রইলেন সেই অন্ধকারের দিকে। সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর মাথায় একটি একটি করে ভাবনা জুড়ে বসল। যতদিন তিনি পুতুল ছিলেন, সে-ভাবনা ছিল পুতুলের। আর আজ তিনি মানুষ। তাঁর ভাবনাও মানুষের। তাই তাঁর এখন মনে হল কথায় কথায় কাকটা অন্ধকারে কোথায় ছোটে! ওই অন্ধকারে কি কোনো রহস্য আছে! নইলে কী ক্ষমতা একটা কাকের যে, তার কাছে যা চাওয়া যায় তা-ই এনে দেয়!
হ্যাঁ, ওই অন্ধকারটা বাগডুম সিংকে হাতছানি দিচ্ছে। নিশ্চয়ই ওই অন্ধকারেই কোনো জাদু লুকোনো আছে। সেই জাদুর খোঁজ এই কাকটা নিশ্চয়ই জানে। সেই জাদুটাই তাঁকে হাতাতে হবে। তাই ওই অন্ধকারে তিনি পা বাড়ালেন এবং অন্ধকারের মধ্যে তিনি হারিয়ে গেলেন।
প্রথমে তিনি বুঝতেই পারেননি এই অন্ধকারটা এমন ভয়ংকর! তাঁর পা দুটি যতই এগিয়ে চলেছে, অন্ধকারটা ততই যেন জমাট বাঁধছে! কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে বাগডুম সিংয়ের। এখন তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দানা বাঁধছে। তাঁর হাত-পাগুলো কাঁপছে। তিনি বুঝতে পারছেন না কোন দিকে যাবেন, কোন দিকে গেলে আলো পাবেন। শেষে অন্ধকারের গভীরে হাতড়াতে হাতড়াতে তিনি নিজেই যেন অন্ধ হয়ে গেলেন। তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। মুঠো মুঠো অন্ধকার তাঁকে ঘিরে ধরে তাঁর বুকের ওপর যেন দাপাদাপি শুরু করে দিলে। মনে হচ্ছে কে যেন তাঁর গলাটা দু-হাত দিয়ে চেপে ধরেছে। তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন। নিস্তার পাবার জন্যে তিনি দু-হাত তুলে চিৎকার করে উঠলেন, —কাকভাই, আমাকে বাঁচাও!
কেউ এল না। তিনি অন্ধকারে হোঁচট খেলেন। ছিটকে পড়লেন। তাঁর কপালে ঘা পড়ল। এবং সঙ্গেসঙ্গে শোনা গেল ঘড়-ঘড়-ঘড়। বিশাল এক লৌহকপাট ধীরে ধীরে খুলে গেল বাগডুম সিংয়ের চোখের সামনে।
হ্যাঁ, কপাট খুলল। তিনি ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে আলো এল। বাগডুম সিংয়ের মুখের ওপর কে যেন রঙিন আলোর একখানি মিহি আঁচল ছড়িয়ে দিল। অবাক হয়ে থমকে তাকালেন বাগডুম সিং। একী! এ যে মুঠো মুঠো সোনার টুকরো সারা ঘরে কে ছড়িয়ে রেখেছে! না না, এ তো শুধু টুকরো সোনার আলো নয়! ওই তো থরে থরে ছড়িয়ে আছে মণি-মুক্তার ঝলমলানি! অসংখ্য, অফুরন্ত!
এতক্ষণ অন্ধকারে যে লোকটা ছটফটিয়ে আলোর জন্যে চিৎকার করছিল, এখন তাঁর আবার লোভে চোখ দুটো ছটফট করে উঠল। ছুটে তিনি ঘরে ঢুকলেন। তিনি দিশেহারা হয়ে গেলেন। কখনো তিনি হাতের মুঠিতে সোনা তুলে নেন, ছুড়ে ফেলেন। কখনো তিনি দু-হাত ভরে মণি-মুক্তা নিয়ে লোফালুফি করেন। সেই টুকরো টুকরো সোনার আলোর ওপর তিনি গড়াগড়ি খান। কখনো তিনি ছোটেন, কখনো লাফান, কখনো হাঁটেন। তিনি চিৎকার করে হেসে ওঠেন। হাসতে হাসতে বলেন, ওরে কাক, তুই আমাকে রাজা না-ই করলি। আমি মানুষ! আমার চোখে ধুলো দিয়ে তুই আমাকে বোকা বানাবি? হা-হা-হা!
হা-হা-হা! হাসির প্রতিধ্বনি শোনা গেল। সেই প্রতিধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে আর একটা দরজা খুলে গেল। তিনি দরজা ডিঙিয়ে ছুটে গেলেন।
একী! এঘরটা এমন কেন! নেহাতই একটা ঘর। একটা খাট, বিছানা পাতা। একটা টেবিল, টেবিলে বই। একটা চেয়ার, চেয়ারে কুশন। একটা ছবি ফ্রেমে আঁটা। একটা ফুলদানি, তাতে ফুল। একটা আলনা, জামাকাপড়। আর?
একটা বন্দুক।
প্রথমে বাগডুম সিং বন্দুকটা দেখতে পাননি। তিনি আনন্দে চিৎকার করে খাটের ওপর লাফিয়ে উঠলেন। বিছানায় গড়াগড়ি দিতে দিতে তিনি ফুলদানির ফুল ছিঁড়ে নিলেন। তার পাপড়িগুলি ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছুড়ে ফেললেন। চেয়ারটাকে টান মারলেন। ছবির কাচটাকে ভেঙে ফেললেন। আলনার জামাকাপড়গুলো ছিঁড়ে ফর্দাফাঁই করে দিলেন। তারপরই তিনি বন্দুকটি দেখতে পেলেন।
—বন্দুক! বাগডুম সিং চিৎকার করে উঠলেন। ছুটে গিয়ে বন্দুকটা তুলে নিলেন তিনি। আর ঠিক তক্ষুনি তাঁর মনে হল এ-পৃথিবীতে তাঁর মতো শক্তিশালী আর কেউ নেই। তিনি ঘরের মধ্যেই বন্দুক ছুড়লেন— গুড়ুম! আগুনের ফুলকি ছুটল। ছিটকে ওই তাল তাল সোনার ওপর গিয়ে ধাক্কা মারল। আর শব্দটা সেই অন্ধকার চত্বরের ওপর ঘুরপাক খেতে খেতে মিলিয়ে গেল। বাগডুম সিং আবার হেসে উঠলেন, হা-হা-হা! তারপর ছুটতে ছুটতে ওই সোনার ওপর লাফিয়ে উঠে চেঁচিয়ে বলেন, এখন আমায় কে রুখবে! আয় দেখি কার কত ক্ষমতা। আমার হাতে বন্দুক! আমার পায়ের নীচে গুপ্তধন! যে আমায় বাধা দেবে, এই বন্দুক দিয়ে তাকে আমি উড়িয়ে দেব! আমি রাজা! না না, আমি সম্রাট! তিনি ডাক দিলেন, —এই, কে আছিস?
কেউ সাড়া দিল না।
তিনি আবার ডাকলেন, —কোই হ্যায়?
এবারও তিনি সাড়া পেলেন না। আর সাড়া না পেয়ে তিনি বুঝলেন কাছেপিঠে কেউ নেই। কিন্তু কেউ নেই বলে তো আর তিনি বসে থাকতে পারেন না! তিনি গায়ের জামাটা খুলে ফেললেন। সেই জামায় তিনি তাল তাল সোনা রাখলেন। তারপর বেঁধে ফেললেন। এখুনি এই জামায় বাঁধা সোনার বস্তা নিয়ে তিনি অন্ধকার পেরিয়ে বাইরে যাবেন। এই সোনা দিয়ে তিনি রাজপ্রাসাদ বানাবেন। সাতমহলা রাজপ্রাসাদ, সাত-শো সাতাশ দাস-দাসী আসবে। সাত লক্ষ সিপাই-সান্ত্রি। হাতি-ঘোড়া, কামান-বন্দুক। দুর্গ-তোরণ।
তিনি জামায় বাঁধা সোনার বস্তা পিঠে তুললেন। পারলেন না। উঃ! কী ভারী! তখন একহাতে বন্দুক নিয়ে তিনি সেই সোনা-বাঁধা জামাটা প্রাণপণে টানতে লাগলেন। মেঝেতে ঘষটাতে ঘষটাতে এগিয়ে চললেন ওই লৌহকপাটের চৌকাঠের দিকে।
—কী বন্ধু, চিনতে পারছ।
চমকে থামলেন বাগডুম সিং। একী! এ যে সেই কাকটা। একটা কপাটের মাথায় বসে তার দিকে চেয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।
কাক আবার জিজ্ঞেস করলে, অত কষ্ট করে এত সোনা নিয়ে কোথা যাচ্ছ? কী করবে এত সোনা?
বাগডুম সিং উত্তর দিলেন, —এ সোনা আমার। আমার যা খুশি তাই করব!
—আমায় দেবে না?
—তোমায় কেন দেব? তুমি তো কাক। সোনা নিয়ে তুমি কী করবে?
কাক বললে, তুমিও তো পুতুল!
প্রচন্ড রেগে চিৎকার করে উঠলেন বাগডুম সিং, —কে বলেছে আমি পুতুল? আমি মানুষ।
—হ্যাঁ, তা ঠিক। এখন তুমি মানুষ। কিন্তু আগে পুতুল ছিলে!
—যখন ছিলুম, তখন ছিলুম।
—একদিন তুমি পুতুল ছিলে, লোকে যদি জানতে পারে?
—জানবে না, জানবে না। আমার কাছে সোনা আছে।
—আমি যদি বলে দিই!
—এই সোনা দিয়ে তোমার মুখ আমি বন্ধ করে রাখব।
কাকটা কা-হা-হা করে হেসে উঠল।
বাগডুম সিং জিজ্ঞেস করলেন, হাসলে যে?
—না, ভাবছি তুমি একটু একটু করে কত পালটে গেছ! যখন তুমি সব হারিয়েছিলে, কিছুই তোমার ছিল না, তখন তোমার মনটি ছিল ভারি সুন্দর। তখন তোমার মনে আনন্দ ছিল, ভালোবাসা ছিল। কিন্তু যখন তুমি ফিরে পেলে সব কিছু একটি একটি করে, তখন কিন্তু তোমার সেই সুন্দর মনটি হারিয়ে গেল!
বাগডুম সিং কী যেন ভাবলেন একটুখানি। তারপর বললেন, ভাই কাক, আমি আবার সুন্দর হব। দোহাই তোমার, আমি যে একদিন পুতুল ছিলুম একথাটা কাউকে বলে দিয়ো না!
কাক আবার হাসল।
—সত্যি বলছি, আমি আবার সুন্দর হব!
কাক বললে, আমি জানি একথা তোমার মনের কথা নয়!
—কেন? আমি তো সত্যি করে বলছি।
—বেশ, তাহলে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি আবার পুতুল হতে রাজি আছ?
—না! ভীষণ চিৎকার করে উঠলেন বাগডুম সিং। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, —আমি আর পুতুল হব না। আমি পুতুল হব না।
তেমনই জোরে হেসে উঠল কাকটা, কা-হা-হা!
বাগডুম সিংয়ের কানে সে হাসি শেলের মতো বিঁধছে। তিনি কান চেপে আবার চিৎকার করলেন, —হাসি থামাও।
কাক থামল না। কাক সেই ঘরের মধ্যে উড়তে শুরু করে দিলে। উড়তে উড়তে হাসতে লাগল, কা-হা-হা! কা-হা-হা!
বন্দুক তুলে নিলেন বাগডুম সিং।
কাক আরও জোরে জোরে হাসতে লাগল।
তাক করলেন বাগডুম সিং।
তবু কাক থামল না। হেসেই চলল।
গুলি চালালেন বাগডুম সিং, গুড়ুম!
বন্দুকের আগুন ঝলসে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল কাকের কালো ডানা দুটো কী ভয়ংকর শব্দ করে ওঠা-নামা করছে। দেখতে দেখতে কী বিরাট হয়ে গেল ডানা দুটো। সারাঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। ছেয়ে গেছে। তারপর শূন্যে দোল খেতে খেতে সেই কালো ডানা ধীরে ধীরে নেমে আসছে বাগডুম সিংয়ের মুখের ওপর। বাগডুম সিং আঁতকে উঠলেন। ছুটে পালাতে গেলেন, পারলেন না। কালো ডানা দুটো ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, —বাঁ-চা-ও! ব্যাস! তারপর সব চুপ!
অনেকক্ষণ পর দেখা গেল, সেই তাল তাল সোনাগুলো আর সোনা নেই— সব লোহা। সেই মুক্তা-মানিক, পান্না-চুনির আর কোনো জৌলস নেই। সেগুলো সব টুকরো কাচ। ছড়িয়ে আছে। সেই লোহা আর কাচের ওপর পড়ে আছেন বাগডুম সিং নামে একটি পুতুল। তাঁর মাথায় টুপি নেই। মুখে কালিঝুলি, গায়ে ছেঁড়া জামা-প্যান্ট আর এক পায়ে একপাটি জুতো ।
হ্যাঁ, বাগডুম সিং আবার পুতুল হয়ে গেছেন!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন