শৈলেন ঘোষ
ওই যে ছোট্ট মেয়েটি এখন নিজের ঘরে খোলা জানলার ধারে একলাটি দাঁড়িয়ে আছে, ওর নাম সোনালি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেমন একমনে দেখছে বাইরের ওই সবুজ গাছগাছালি। থেকে থেকে দুরন্ত হাওয়ার দস্যিপনায় গাছের পাতারা লুটোপুটি খাচ্ছে। পাতায় পাতায় ঝুরুঝুরু শব্দের বাজনা শোনে সোনালি। কখনো-বা নীল আকাশটা পাতার ফাঁকে ফাঁকে উঁকি মারছে। বেশ লাগছে সোনালির। ওই জানলাটা খুশি ছড়িয়ে দেয় মুঠো মুঠো ওর চোখে। খুশিতে গান গায় সোনালি গুনগুন করে। সে-গান অবিশ্যি আর কেউ শুনতে পায় না। শুনতে পায় সোনালি একা, নিজেই।
এই ছোট্ট বাড়িটা ওদেরই। হোক ছোট্ট, তবু তো আপনার। অনেক সুখ এখানে। সুখী সবাই। মা-বাবা সোনালি, সক্কলে। মুখগুলি তাদের সবসময় হাসিতে ঝলমল করছে! দেখলে ভারি ভালো লাগে।
সোনালির বাবা ট্রাক চালাতেন। দু-ধারে ওই যে সবুজ খেত, তার মাঝখান দিয়ে ওই যে পিচ-ঢালা রাস্তাটা চলে গেছে এঁকেবেঁকে দূরে আরও অনেক দূরে, ওই রাস্তার ওপর ভয়ংকর শব্দ তুলে ছুটে যায় সোনালির বাবার সেই ট্রাক। তারপর হারিয়ে যায় এই সবুজের ছায়ায় ছায়ায় আর এক সবুজ খেতের ওপারে। সেখান থেকে ছুটে যায় শহরে। সওদাগরের বেচা-কেনার হাটে-বাজারে।
সোনালি ইস্কুলে পড়ত! মা সারাদিন ঘরকন্নার কাজ করতেন। ভালো গান জানতেন মা আর তেমনি পারতেন গল্প বলতে। মায়ের কাছে গান শিখেছে সোনালি। আর রাত-ঘুমঘুম অন্ধকারে মায়ের মুখে গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ত সোনালি।
আরও যখন ছোটো ছিল সোনালি, তখন যা একটা মজা হয়েছিল না! হয়েছিল কী, তখন একটা কুকুর রোজ তাদের বাড়িতে আসত। সেই সাতসকালে আসত, সারাদিন থাকত, তারপর সন্ধে যেই হত কোথায় যে চলে যেত, কেউ জানতেই পারত না। সোনালি ইস্কুল যাবে, ও মা! কুকুরটাও পায়ে পায়ে ছুটবে। আর যেদিন সোনালি ইস্কুলে যেত না, সেদিন সোনালির সঙ্গে তার সে কী ছুটোছুটি আর হুটোপাটি খেলা। কিন্তু আশ্চর্য, সোনালি এক বার যদি গান গেয়ে গুনগুন করে উঠত, কুকুর এক্কেবারে ঠাণ্ডা। অবাক হয়ে সোনালির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত কুকুরটা, যেন গান শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে গেছে। কুকুরটার নাম রেখেছিলেন চুক। রেখেছিলেন সোনালির বাবা। ওই নামে ডাকতে সোনালির কী মজাই-না লাগত। চুক বলে একবার ডেকেছে কি একেবারে ল্যাজ নেড়ে, লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে তোমাকে ব্যতিব্যস্ত করে ছাড়বে।
সেবার হয়েছিল কী, সোনালিদের ইস্কুলে একজন ভিনদেশি মানুষ পুতুলনাচ দেখাতে এসেছিল। সবাই বলেছিল লোকটি যাযাবর। সোনালি তো আগে কখনো যাযাবর দেখেনি, তাই কাদের যে যাযাবর বলে সে জানতই না। পরে অবিশ্যি মায়ের কাছে যাযাবরের গল্প শুনে অবাক হয়ে গিয়েছিল সোনালি। ওদের ঘর নেই, দোর নেই। পথেই ওদের সংসার। দেশে দেশে ওদের অভিযান, বেঁচে থাকার জন্যে সে-অভিযান যেন এক-একটা আশ্চর্য গল্প।
ভিনদেশি যে-মানুষটি ওদের ইস্কুলে পুতুলনাচ দেখাতে এসেছিল, কী সুন্দর ঝলমলে পোশাক তার গায়ে। জামাটার বুকপকেটের ওপর কত মেডেল আঁটা। সোনালি শুনেছে, পুতুলনাচ দেখিয়ে পেয়েছে ওইসব মেডেল ওই লোকটি। সত্যি, মেডেল পাবার মতোই কেরামতি জানে। হাতে তার পুতুল নাচছে। গলায় তার গান। মুখে তার কত কথা। কখনো রাজার মতো গলাটা গম্ভীর। কখনো-বা রানির মতো মিষ্টি মিষ্টি। কখনো কখনো এমন পাখির মতো ডাকাডাকি করছে যে, শুনলে তোমার মনে হবেই হবে এ একেবারে সত্যিই পাখির কিচিরমিচির। শুধু পাখি কেন, সে তার গলায় বাঘও ডাকছে, শেয়াল হাঁকছে। আবার দরকার পড়লে কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ, বেড়ালের মতো মিউ মিউ। এক-একটা ডাক হচ্ছে, এক-একবার গান হচ্ছে, আর সঙ্গে সঙ্গে এক-এক পুতুলের এক-এক রকম নাচ হচ্ছে। লোকটার সত্যি বাহাদুরি আছে বলতে হয়।
হ্যাঁ, ওই যে সোনালির কুকুরটা, মানে চুক, ওকে প্রথম দেখা গিয়েছিল ওই ভিনদেশি মানুষটির সঙ্গে। ওর পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করছে। দেখলে তোমার হয়তো মনে হবে, পুতুল-নাচিয়ের পোষা কুকুর বুঝি। আসলে কিন্তু তা নয়। রাস্তার কুকুরকে শখ করে কে আর পোষ মানায়! কে জানে, হয়তো কুকুরটার ভালো লেগে গিয়েছিল পুতুল-নাচিয়েকে কিংবা তার পুতুলগুলিকে। একবার হয়েছে কী, একটা খুব মজার নাচের খেলা হচ্ছে। একটা বেড়ালের সঙ্গে কুকুরের ঝগড়া। দুটোই অবশ্য পুতুল। পুতুল নাচিয়ের একহাতে একটা বেড়াল, আর-একহাতে একটা কুকুর। চুক তো বসেছিল মাটির ওপর। লম্বা হয়ে বসে মুখ তুলে খুব অবাক হয়ে নাচ দেখছিল। যতক্ষণ ঝগড়া শুরু হয়নি, ততক্ষণ ঠিক ছিল। কিন্তু যেই-না পুতুলনাচিয়ে বেড়াল আর কুকুরের ঝগড়া বাঁধিয়ে ঘেউ ঘেউ চেঁচামেচি আর ম্যাও ম্যাও করে দাঁত খিঁচিয়ে উঠল, তখন লেগে গেল কুকুর বেড়ালে ঝটাপটি। এতক্ষণ ঠিক ছিল চুক। ঝটাপটি লাগতেই তার মেজাজ গেল বিগড়ে। মুখে গররর-গররর করে আওয়াজ শুরু করে দিলে। উঠে দাঁড়াল। তারপর কোথাও কিচ্ছু নেই, ঘ্যাক করে লাফিয়ে উঠে একেবারে বেড়ালটার ঘাড়ে। এমন কামড়ে ধরল যে, আর ছাড়ে না। চুক বুঝতেই পারেনি ওটা সত্যিকারের বেড়াল নয়। বেমালুম বুদ্ধু বনে বসে আছে।
এদিকে তো পুতুল নাচিয়ে একদম হাঁদা। কী করবে, কী করবে ভাবতে-না-ভাবতেই চুক তো বুঝতে পেরেছে, বেড়ালটা বেড়াল বটে কিন্তু আসল না, সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছে। তারপর যারা নাচ দেখছিল, তাদের হইহই করে সে কী হাসির ধুম। পুতুল-নাচিয়ে ধাক্কাটা সামলে নিয়ে এমন তাড়া মারল চুককে যে, একছুটে একদম ভো-কাট্টা। তারপর অবিশ্যি আরও কিছুক্ষণ নাচ হয়েছিল, কিন্তু তখন পুতুলনাচ দেখার চেয়ে সবাই বোকা কুকুরটার গল্প নিয়েই মাতামাতি শুরু করে দিলে। সোনালি ঘরে ফিরে মা আর বাবাকে সেই গল্প বলতে বলতে হেসে একেবারে লুটোপুটি। হ্যাঁ, সত্যিই সে যে একটা বলবার মতো গল্প, একথাটা সবাই স্বীকার করে।
তার পরের দিন হল কী, সোনালি ইস্কুলে যাচ্ছিল। সেদিন ইস্কুল যেতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে সোনালি প্রায় ছুটছে। ছুটতে ছুটতে ইস্কুলে যাচ্ছে। আরে আরে! কোথাও কিছু নেই, সেই কুকুরটাও যে ছুটছে। ছুটতে ছুটতে একেবারে সোনালির পায়ের গোড়ায়। প্রথমে সোনালি অতটা খেয়াল করেনি। কিন্তু একবার যেই-না কুকুরটার মাথা সোনালির পায়ে ঠেকেছে, অমনি থতোমতো খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে সোনালি। হ্যাঁ, যা ভেবেছে, কুকুর! তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে ল্যাজ নাড়ছে আর ঘুরঘুর করছে। সোনালি তো ভয়ে একেবারে যায় আর কী। না পারে এগোতে, না পিছোতে। নড়তেও পারে না, কাউকে ডাকতেও পারে না। ঘ্যাক করে কামড়ে দিলেই হয়।
কিন্তু আশ্চর্য, কুকুর কামড়ালও না, কিছু বললও না, শুধু ল্যাজই নাড়তে লাগল। এবার সোনালির সাহস হল। দিল এক ধমক, যা:!
বয়ে গেছে কুকুরের ধমক শুনতে। সে ল্যাজ নাড়ছে তো নাড়ছেই। আর ফ্যালফ্যাল করে সোনালির মুখের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু সোনালি দাঁড়াবে কী, এদিকে যে ইস্কুলের ঘণ্টা পড়ল বলে! সোনালি মারল ছুট আচমকা। আর দ্যাখো কুকুরটাও যে ছুটল একেবারে সোনালির পাশে পাশে। ঠিক যেন ওর বন্ধু। তবে কি কুকুরটা সত্যিই সোনালির বন্ধু হয়ে গেল!
একী! সোনালির ইস্কুলের ছুটির পরেও যে সেই কুকুর! আবার সোনালির পিছু নিল। সোনালির পায়ে পায়ে বাড়ি চলল। আশ্চর্য তো!
আশ্চর্য বটে। ক-দিনের মধ্যে কুকুরটা যে কেমন করে সোনালিদের আপন হয়ে গেল, বোঝাই গেল না। কিন্তু হলে কী হবে, রাত্তিরে কিন্তু এক দিনও থাকে না কুকুরটা। রোজ আসে সেই ভোর থাকতে, তারপর সন্ধে হতে-না-হতে ফুস! কোথায় যে চলে যায়, হদিসই করতে পারে না কেউ। ব্যাপারটা গভীর রহস্যই থেকে গেল সোনালির কাছে। মাঝে মাঝে অবিশ্যি সোনালি ভাবে, একদিন চুপিচুপি কুকুরটার পিছু নেবে, দেখবে ও কোথায় যায়। কিন্তু সে-দেখা আর হয়ে ওঠেনি সোনালির কোনোদিন।
সোনালির বাবার এক বন্ধু ছিলেন। সোনালি তাঁকে ডাকত কুবাইকাকা বলে। প্রায়ই সোনালিদের বাড়িতে আসতেন তিনি। কুবাইকাকাকে খুব ভালো লাগত সোনালির। যেমন হাসিখুশি মানুষটি, তেমনি সুপুরুষ চেহারা। ইয়া চওড়া বুক, বড়ো বড়ো চোখ, হাতের আঙুলগুলো এমনি মোটা মোটা। আর মাথায় এমন লম্বা যে, তোমায় ওপর দিকে মুখ উঁচিয়ে তাঁকে দেখতে হবে। গলার স্বরটা গম্ভীর ঠিকই, কিন্তু কথা বললে শুনতে কী ভালোই-না লাগে।
কুবাইকাকার একটা বন্দুক ছিল। একদিন হয়েছে কী, কুবাইকাকা বন্দুকটা নিয়েই সোনালিদের বাড়িতে এসেছেন। ওঃ! যেই-না কুবাইকাকা বাড়িতে ঢুকেছেন, তাঁর কাঁধে বন্দুক দেখেই কুকুরটার সে কী ছুট পাঁই পাঁই করে। অবিশ্যি কুবাইকাকা চলে যেতে আবার এসেছিল কুকুরটা। তখন তুমি তাকে দেখে বুঝতেই পারবে না যে, বন্দুক দেখে একটু আগে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল। কুবাইকাকার বন্দুকটা খুব যে একটা বড়ো তা নয়, কিন্তু ভীষণ ভারী। সোনালি তুলতেই পারে না। ওই বন্দুক দিয়ে কুবাইকাকা কত শিকার করেছেন। একবার একটা মানুষখেকো বাঘ মেরেছিলেন কুবাইকাকা। মানুষখেকো বাঘ মারা তো আর চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। তোমার হাতে বন্দুক দিলেই যে তুমি গুড়ুম করে গুলি ছুড়বে আর অমনি বাঘ মরে যাবে, তা যেন ভেবো না। সাহস থাকা চাই যেমন, তেমনই বুদ্ধি। কুবাইকাকার দুটোই ছিল। কিন্তু হলে কী হবে! এই মানুষখেকো বাঘটাকে শিকার করতে গিয়ে কুবাইকাকা এমন বিপদে পড়েছিলেন না, সেকথা বলতে গিয়ে হাসিও পায় আবার গায়ে কাঁটাও দেয়। হয়েছে কী, কুবাইকাকা তো বাঘটাকে মারবেন বলে একটা গাছের ওপর মাচা বেঁধে গুছিয়েগাছিয়ে বসেছেন। ঠিক সেই গাছটার নীচে, একটু দূরে একটা মানুষকে মেরে টেনে এনেছে বাঘটা। খানিকটা মাংস খেয়েছে আর বাকিটা পরে খাবে বলে লুকিয়ে রেখেছে। এখন অবিশ্যি বাঘটা নেই হয়তো কোথাও ঘুমোচ্ছে। খিদে পেলেই সে এখানে আবার মাংস খেতে আসবেই আসবে। তাই কুবাইকাকা বন্দুক উঁচিয়ে তক্কে তক্কে আছেন। এক বার এলেই হয়, গুড়ুম!
কিন্তু ব্যাপারটা হচ্ছে, তুমি গাছের ওপর মাচায় বসে বন্দুক উঁচিয়ে থাকলেই তো বাঘ আর তোমার সামনে এসে বলবে না, আমি এসেছি। আমায় মারো। তিনি যতক্ষণ-না আসছেন, সেই ততক্ষণ তোমায় বসে থাকতে হবে ঠায় লক্ষ রেখে। তা সে ঘণ্টার পর ঘণ্টাও হতে পারে, চাইকী দু-দিন, তিন-দিনও গড়িয়ে যেতে পারে। কুবাইকাকারও হল তাই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে আরও কত ঘণ্টা কেটে গেল, তবু বাঘমশাইয়ের দেখাই নেই। তখন কুবাইকাকার খিদে পেয়ে গেল। তা খিদের আর দোষ কী। সেই কখন পেটে চাট্টি পড়েছে, তারপর থেকে টানা উপোস। কুবাইকাকার খাবার তো সঙ্গেই ছিল। থাক এখন বাঘ শিকার। আগে পেটটা তো ঠাণ্ডা হোক। এই কথা ভেবে, হাতের বন্দুক পাশে রেখে কুবাইকাকা খাবারের বাণ্ডিল থেকে খাবার বার করলেন। সবে দু-এক টুকরো রুটি মুখে দিয়েছেন, এমনসময় হল কী, কোত্থেকে একটা বাঁদর হাজির। কুবাইকাকা যে-গাছে মাচা বেঁধে বসেছিলেন, বাঁদরটা ছিল সেই গাছেই। মগডাল থেকে নি:সাড়ে নেমে এল বাঁদরটা। কুবাইকাকার পেছনে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ল। তিনি জানতেই পারলেন না তাঁর পেছনে সাক্ষাৎ একটি বাঁদর। ও মা! বাঁদর করেছে কী, আচমকা ঝপ করে বন্দুকটা খামচে ধরে, ঝপাং করে ফেলে দিয়েছে মাচার ওপর থেকে নীচে ঝোপের মধ্যে। এই সর্বনাশ! ফেলে দিয়েই বাঁদর তরতর করে গাছের ওপর দে চম্পট। তাই-না দেখে কুবাইকাকা একেবারে থ। আর খাওয়া! খাবারদাবার ফেলে তিনি তখন ঝোপের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন। কী হবে? আর যাই হোক, বন্দুকটা তো চাই! যেমন করে হোক বন্দুকটা ঝোপের ভেতর থেকে খুঁজে আনতেই হবে। সে তো বোঝা গেল খুঁজে আনতে হবে, কিন্তু মুখে বলা যত সহজ কাজটা কি অতই সোজা? ঝোপের মধ্যে নানান বিপদ। বাঘও থাকতে পারে, সাপটা-খোপটা, তাও থাকতে পারে। তা ঠিক। তবে বাঘই থাকুক আর যাই-ই থাকুক, কুবাইকাকার তখন আর ওসব কথা ভাববার সময় নেই। তিনি খাবারের ঠোঙা পাশে রেখে ঝটপট মাচার ওপর থেকে নীচে নামতে লাগলেন। কুবাইকাকা পাক্কা শিকারি। কাজেই খুব সাবধানি। এক-পা নামছেন তো দশ বার এদিক-ওদিক দেখছেন। তখন তাল বুঝে সেই বাঁদরমহারাজ করেছে কী, খাবারের ঠোঙাটি নিয়ে দে হাওয়া। ও! তাই বলি, এই জন্যেই বন্দুক ফেলা। কী বুদ্ধি দেখেছ? খাবারটা হাতাবে বলে বন্দুকটা ফেলে দিয়ে কুবাইকাকাকে একদম বোকা বানিয়ে ছাড়ল। গাছের ওই মগডালে বসে ল্যাজটি ঝুলিয়ে কেমন পেটপুজো করছে! আর এদিকে কুবাইকাকার অবস্থা দ্যাখো, হাতে প্রাণটি নিয়ে ঝোপঝাড়ে বন্দুক খুঁজে বেড়াচ্ছেন। বুঝতেই পারছ, এ তো আর যেমন-তেমন ঝোপ নয়, জঙ্গলে ভরা ভয়ংকর ঝোপ।
যাক, তবু ভালো, কুবাইকাকাকে বেশি মেহনতও করতে হল না। ঝোপের মধ্যে তেমন কোনো অঘটনও ঘটল না। একটু খুঁজতেই বন্দুক পেয়ে গেছেন। আবার তিনি মাচায় উঠে পড়লেন বন্দুক নিয়ে। খাবারের ঠোঙা তো কখন ফাঁকা করে দিয়েছে বাঁদরটা। এখন পেটে খিদে নিয়ে থাকো বসে বাঘের পথের দিকে চেয়ে।
বরাত ভালো, বেশিক্ষণ বসতে হল না। যত দেরি হবে মনে করেছিলেন তিনি, তার অনেক আগেই বাঘ হাজির। তারপর বুঝতেই পারছ, কুবাইকাকার একটি গুলিতেই বাঘের কম্ম শেষ।
একদিন হঠাৎ সোনালির পিসি এল তাদের বাড়িতে। সঙ্গে সোনালির পিসতুতো ভাই টুসাই। সোনালির চেয়ে ছোটো ঠিকই, তবু খুব-একটা ছোটো নয়। দেখলেই মনে হবেদুটিতে পিঠোপিঠি। সোনালির পিসিদের অনেক পয়সা, সবাই বলে ওরা নাকি খুব বড়োলোক। সে তুমিও দেখলে বুঝতে পারবে। কী সুন্দর সাজগোজ। যেমন ছেলে, তেমনি মা। সাজলে আর কাকে না সুন্দর দেখতে লাগে বলো! তায় আবার পিসিকে এমনিতেই দেখতে ভালো। তা বলে তুমি যেন মনে কোরো না সোনালির মাকে দেখতে ভালো নয়! খুব সুন্দরী। কিন্তু সোনালির মা-র পিসির মতো এমন সাজগোজ করতে ভালোই লাগে না। সোনালি কি মাকে সাজার কথা কম বলেছে, তা সে বলাই সার, মা শোনেই না।
সোনালির পিসিরা আগে কিন্তু এত বড়োলোক ছিল না। আগে তো পিসি সোনালিদের বাড়িতেই থাকত। তখন তো পিসির সংসারটা চলতই না প্রায়। খুব কষ্টের সংসার। অবিশ্যি দুঃখ-কষ্ট এসব তো আর সোনালির বোঝার কথা নয়, ও তখন আরও ছোটো। পিসি ওদের বাড়িতে এলেই ওর আনন্দ। কিন্তু এক-একদিন পিসি যখন সোনালির বাবার কাছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চোখের জল ফেলত, তখন অবাক হয়ে যেত সোনালি। তার চোখের দিকে চেয়ে চেয়ে সোনালি ভাবত, অত বড়ো একটা মানুষ কাঁদছে কেন অমন করে! পিসি যখন আবার শ্বশুরবাড়ি চলে যেত, সোনালি দেখত বাবা তাকে কত টাকা দিচ্ছেন। পিসি অবিশ্যি সোনালির বাবার চেয়ে বয়সে বড়োই ছিল। তাই দিদি বলে ডাকতেন তিনি। দিদিকে কী ভালোই-না বাসতেন সোনালির বাবা। যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি যত্ন-আত্তি করতেন। সোনালির মাকে সবসময় বলতেন, দেখো দিদির যেন কষ্ট না হয়। এই কথা শুনলে, সোনালির বুকটা খুশিতে উপচে উঠত। তখন তার মনে হত, বাবা তার সত্যিই কত ভালো।
তারপর ধীরে ধীরে কেমন করে যে পিসিরা বড়োলোক হয়ে উঠল, সোনালি তার কিছুই জানে না। আর সত্যিই তো, সেকথা জানার কি তখন তার বয়েস হয়েছে! তবে সোনালি এখন বুঝতে পারে, পিসিদের চেয়ে তারা গরিব। যে-পিসিকে সোনালি একদিন বাবার কাছে কেঁদে কেঁদে চোখের জল ফেলতে দেখেছে, বাবার কাছ থেকে অনেক জামাকাপড়, টাকা-পয়সা নিয়ে যেতে দেখেছে, সেই পিসিই সেদিন যখন সোনালিদের বাড়িতে এসে বাবার সঙ্গে চোটপাট শুরু করে দিল, সেদিন অবাক হয়ে পিসির মুখের দিকে চেয়েছিল সোনালি। সোনালির সামনেই পিসি বাবাকে বললে, তুই যে গাড়ির ড্রাইভারি করিস, এটা পাঁচজনকে বলতে আমার লজ্জা করে। লোকে শুনলে আমাদেরই ছ্যা-ছ্যা করবে। যতই হোক, কাজটা তো আর পাঁচজনকে বলার মতো নয়।
পিসির কথা শুনে বাবা সোনালির মুখের দিকে এমন হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন যে, তাই দেখে সোনালিরই মনে মনে বাবার জন্যে ভারি দুঃখ হল। বাবার মুখখানা দেখে সোনালির তখনই মনে হচ্ছিল ঘর থেকে ছুটে পালায় কিন্তু সোনালি পারল না। কেমন যেন বোবা হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কিন্তু হঠাৎ বাবা-ই কথা বললেন। বললেন, সোনা, দ্যাখো তো মা চুকটা বাইরে চেঁচাচ্ছে কেন!
সোনা বেঁচে গেল। ওর যেন ধড়ে প্রাণ এল। সত্যিই তখন চুক বাইরে ভীষণ ঘেউ ঘেউ করছিল। একছুটে ঘর থেকে বাইরে এসে একেবারে চুকের সামনে। চুক তো সোনালিকে দেখে একদম চুপ। তারপর গায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে সে কী আদর। কিন্তু সোনালির মনে তখন অন্য ভাবনা। ভাবছে সে, পিসি তার বাবাকে অমন কথা বলল কেন! আগে তো কোনোদিন বলেনি! আগে যখন পিসিরা গরিব ছিল, তখন পিসি বাবার কাছে এসে কত কান্নাকাটি করেছে। কাঁদতে কাঁদতে বলেছে, তুই না-থাকলে না-খেয়ে আমরা মরে যেতুম। তোর এ উপকার আমি কোনোদিনও ভুলব না। ভগবান তোর ভালো করবেন। এসব কথা সোনালি নিজেই কানে শুনেছে। অথচ সোনালির বাবা তো তখনও ট্রাকের ড্রাইভারই ছিলেন। এখন হঠাৎ এমন কী হল যে, বাবার কথা পাঁচজনকে বলতে পিসির লজ্জা করে! ভেবে ভেবে কূলকিনারা কিছুই করতে পারে না সোনালি। শুধু তার মনে বাবার জন্যে কেমন যেন একটা দুঃখ হচ্ছিল। তবে কি সোনালির বাবা ড্রাইভার বলে পিসি তাকে খুব ছোটো ভাবে। বুঝতে পারে না সোনালি।
এতক্ষণে সোনালি বুঝতে পেরেছে, চুক অত চিৎকার করছিল কেন। প্রথমটা সোনালি তেমন খেয়াল করেনি। নজরটা তার হঠাৎ ঘরের জানলার দিকে পড়তেই সে বুঝতে পেরেছে। সে দেখে কী, তার পিসতুতো ভাই টুসাই ঘরের জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উঁকি মারছে। তারপর সে হাত বাড়াল। হাতে ইট। টুসাই চেঁচিয়ে উঠল, ব্যাটা কুত্তা, আমায় কামড়াতে আসিস! বলেই ধাঁই করে ইট ছুড়ে দিল চুকের দিকে। ইট দেখে চুকও মারল ছুট। খুব রক্ষে, লাগেনি। লাগল না বটে, তবে চুককে পালাতে দেখে টুসাইয়ের সে কী হাসির হুল্লোড়। হাসতে হাসতে একেবারে গড়িয়ে গেল। চুক একটু ছুটে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে আবার চিৎকার শুরু করে দিলে। ঘেউ ঘেউ ঘেউ। মানে পায় তো টুসাইকে ছিঁড়ে খায়। সোনালি ছুটল চুকের কাছে। কিন্তু কে তার কথা শোনে। সোনালি মুখে চুক চুক করে গায়ে-পিঠে হাত বুলিয়ে যতই আদর করুক, ওর নজর এখন টুসাইয়ের ওপর। এমন খাপ্পা হয়ে আছে, ঠাণ্ডা করাই দায়।
পিসি ছুটে এল।
টুসাই চ্যাঁচাল, চেঁচিয়ে নালিশ করল, মা, কুকুরটা আমায় কামড়ে দিচ্ছিল।
পিসি আঁতকে উঠল, অ্যাঁ! বলিস কী রে!
সোনালি একবার টুসাইয়ের মুখের দিকে, আর একবার পিসির মুখের দিকে তাকাল।
পিসি চোখ কটমট করে রাগে গজরাতে গজরাতে জিজ্ঞেস করল, এটা কার কুকুর?
সোনালি উত্তল দিল, আমাদের।
পিসি যেন ভূত দেখল। রেগে কাঁই কাঁই করে উঠল। —দেখে তো মনে হচ্ছে রাস্তার নেড়িকুত্তা। রাস্তার কুকুর ধরে এনে ঘরে পুষেছিস! ছেলেটাকে কামড়ে দিলে তখন কী হত? যত্তসব!
পিসির কথায় সোনালির একটু কষ্ট হল বটে, তবে সে রাগ করল না। হাসতে হাসতেই বলল, চুক কাউকে কামড়ায় না।
টুসাই নালিশ করে আবার চ্যাঁচাল, না মা, আমাকে কামড়ে দিচ্ছিল। আমায় তেড়ে আসছিল।
ততক্ষণে সোনালির মা আর বাবাও চেঁচামেচি শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছেন।
কী হয়েছে? বাবা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
পিসি মুখখানা বেঁকিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল—আর কিছু পেলি না, একটা ফেতি কুকুর ধরে এনে ঘরে পুষেছিস! আর একটু হলেই যে আমার ছেলেটাকে হাসপাতালে ছুটতে হত।

পিসি মুখখানা বেঁকিয়ে ঝাঁঝিয়ে উঠল-আর কিছু পেলি না,একটা ফেতি কুকুর ধরে এনে ঘরে পুষেছিস !
সোনালি বাধা দিয়ে বলল, না পিসি, টুসাই ইট দিয়ে মারছিল যে চুককে। তাই তো চুক রেগেমেগে চ্যাঁচাচ্ছিল।
তুই তো বেশ মেয়ে, কড়কে উঠল পিসি, একটা রাস্তার কুকুর যদি টুসাইকে তেড়ে আসে, তবে ছেলেমানুষ ও কী করবে? ইট দিয়ে মারবেই তো!
সোনালি আর কোনো কথা বলল না।
বাবা বললেন, সত্যি চুকটা দিন কে দিন ভয়ানক বেয়াড়া হয়ে উঠেছে, এবার দেব তাড়িয়ে।
বাবার কথা শুনে সোনালি শিউরে উঠল। কেননা, চুক যে একটুও বেয়াড়া নয়, এটা সোনালির মতো ওর বাবাও জানেন। তবে কি পিসির মন রাখার জন্যে বাবা এই কথাটা বললেন! কে জানে।
অবিশ্যি তখনকার মতো চুকের ব্যাপারটা সেইখানেই শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আর এক কান্ড বাঁধল সোনালিকে নিয়ে পরের দিন। সকাল হয়েছে, পিসিকে কাছেপিঠে দেখতে পাচ্ছিল না সোনালি। পিসি যে শাড়িটা পরে এসেছিল, ভারি সুন্দর সেটা। সোনালির মা পরিপাটি করে গুছিয়ে আলনায় রেখে দিয়েছেন। শাড়িটা দেখে এত ভালো লেগে গেছে সোনালির, বার বার হাত দিচ্ছে। নাড়াচাড়া করছে। করতে করতে শাড়িটা পরার জন্যে এমন লোভ হল তার। ভাবল নিজের পিসিরই তো শাড়ি, পরলে কী আর হয়েছে! অবিশ্যি অত বড়ো শাড়িটা পরলে যে সামলাতে পারবে না, এটা সোনালি নিজেও জানে। কারণ ওর তো আর শাড়ি পরার বয়স নয় এখন, নেহাতই ছোটো। কিন্তু মন, সে তো কিছুতেই মানে না। সোনালি আলনা থেকে শাড়িটা নামাল। দেখতে লাগল। রেশমি শাড়ি তো, হালকা ফুরফুর করছে। তার ওপর রংটা কমলা। সারাগায়ে কী সুন্দর নকশাকাটা। দেখতে দেখতে লোভ আর সামলাতে পারল না সোনালি। কাপড়ের ভাঁজ খুলে কোমরে জড়িয়ে ফেলল। ওমা! টুসাই কোথায় ছিল, ঠিক এইসময়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। সোনালিকে দেখে ভূত দেখার মতো থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর একবার সোনালির থেকে চোখ সরিয়ে শাড়ি দেখে আর একবার শাড়ির থেকে চোখ উঠিয়ে সোনালিকে দেখে। কেমন বিচ্ছিরি কটমট করে তাকাচ্ছে দ্যাখো।
কার শাড়ি? হঠাৎ সে বেশ গম্ভীর চালেই জিজ্ঞেস করল।
সোনালি হাসি হাসি মুখেই উত্তর দিল, পিসির। খুব সুন্দর! পরলে আমায় কেমন মানায় তাই দেখছি।
একেবারে সঙ্গে সঙ্গে টুসাই চিৎকার করে উঠল, ও মা, দেখবে এসো, তোমার শাড়ি পরেছে!
আর দেখতে হয়, কোথায় ছিল পিসি, প্রায় ছুটতে ছুটতে ঘরে এসেছে। তারপর লেগে গেল হুলুস্থুলু কান্ড! সোনালিকে এই মারে তো সেই মারে। সোনালি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। পিসির শাড়ি পরলে যে এমন তুলকালাম ব্যাপার ঘটে যাবে, সে আর সোনালি জানবে কেমন করে। শাড়িটা তো তার পিসির, আর পিসিও তো তার নিজেরই পিসি। সোনালিকে এমন বকাঝকা করছে যেন মনে হচ্ছে সোনালি কোথাকার কে। অথচ দ্যাখো, সোনালিদের পাশের বাড়িতে যে মাসি থাকে, সে তো আর আপনারজন নয়। কিন্তু সোনালি দেখেছে, সেই মাসি মায়ের কাছে চেয়ে চেয়ে কতদিন শাড়ি নিয়ে গেছে। তা মানুষের যদি এদিক-ওদিক যেতে লাগে, চাইতেই পারে। এতে তো কিছু অন্যায় নেই। সোনালির মা কোনোদিন অমন চেঁচামেচি করে মাসিকে দু-কথা শুনিয়ে দেননি।
পিসি তো সোনালিকে যাচ্ছেতাই করে ধমকাধমকি করলই, এমনকী শুধু মারতে বাকি রাখল। পিসি সোনালির গা থেকে টেনে খুলে নিল শাড়িটা। আর থাকতে পারল না সোনালি, তার চোখ ছলছল করে উঠল। পিসির সঙ্গে সোনালির মা আর বাবাও কত বকলেন। টুসাইয়ের সামনে বকা খেয়ে সোনালি যেন লজ্জায় মরে যায়! সোনালির ওই অবস্থা দেখে এদিকে টুসাই কেমন মজা পেয়ে গেছে। কেমন মুচকি মুচকি হাসছে। ঠিক তক্ষুনি সোনালির মনে হল, এ ঘর থেকে পালাতে পারলেই সে বাঁচে।
সোনালি সত্যিই সেখানে আর দাঁড়াতে পারল না। তার গাল বেয়ে চোখের জলের ফোঁটাগুলি গড়িয়ে পড়তেই সে পালাল ঘর থেকে। তারপর যে কী হল সে আর সোনালি জানে না। কারণ, ঘর থেকে ছুটে সে সটান রাস্তায় চলে এসেছিল। ওইটাই তো সেই রাস্তা। ওই রাস্তার ওপর দিয়েই ট্রাক ছোটাছুটি করে। ওই রাস্তাটা পেরিয়ে ওদিকে গেলেই একটা মস্ত ঝিল দেখতে পাবে। কত পলাশ গাছ। গাছে গাছে ফুটন্ত পলাশের রং উপচে পড়ছে। রাস্তা পেরিয়ে ঝিলের ধারে এসে দাঁড়াল সোনালি। গাছে গাছে ওই ফুটন্ত ফুলগুলির দিকে সে চোখ মেলে তাকাল। তারপর আপনমনে ভাবতে লাগল, টুসাই যদি ওর চোখে জল দেখে থাকে, তবে কী লজ্জা!
একী, ওই দ্যাখো চুক! কোত্থেকে এল! ঠিক সোনালিকে দেখতে পেয়েছে। কেমন সোনালির পেছনে এসে চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে। চুক বোধ হয় সব বোঝে। বোঝে সোনালির সব কথা। তার দুঃখের কথা, তার খুশির কথা। তাই যখনই সোনালি এখানে আসে, চুক যেখানেই থাক ছুটে আসবে। এখানে যেন চুক সোনালির বড্ড আপন তাই সোনালির গায়ের ওপর সামনের দুটি পা তুলে দিয়ে কত আদর করবে। তারপর সোনালি যেই ওর মুখখানা দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরবে, তখন তার সে কী আনন্দ। সোনালিকে ছেড়ে সে ছুট দেবে ওই খোলা জমিটার ওপর দিয়ে। ছুটতে ছুটতে দাঁড়াবে, সোনালিকে দেখবে, দেখতে দেখতে চরকি খেয়ে এমন লম্ফঝম্ফ শুরু করে দেবে যে, তাই দেখে সোনালির দুঃখের কথা আর মনেই থাকে না। তখন সোনালিও তার সঙ্গে ছুটোছুটি লাগিয়ে দেয়, তাকে ধরতে যায়। কিন্তু চুক এমন দৌড় মারে যে, তাকে ধরে কার সাধ্যি।
সোনালির পিসি চলে গেল পরের দিনই। চলে গেল টুসাইও। যাবার সময় যদিও সোনালি পিসির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল, পিসি মুখ ভার করেই রইল। সোনালি টুসাইকে যখন বলল, আবার আসিস টুসাই, টুসাই মুখ ভেংচিয়ে বলল, দূর, এখানে আবার কেউ আসে নাকি!
টুসাইয়ের এই কথা শুনে থতোমতো খেয়ে গিয়েছিল সোনালি। চকিতে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল মায়ের মুখখানাও কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে গেছে নিমেষে। অবিশ্যি সঙ্গে সঙ্গে মা নিজেকে সামলে নিলেন। আবার মায়ের মুখে হাসি দেখা গেল বটে, কিন্তু সে-হাসির সেই জৌলুস আর চোখে পড়ল না।
সেদিনও সোনালি রোজকার মতো ইস্কুলে গিয়েছিল। বাবা অনেক দূরে গিয়েছিল ট্রাক-ভরতি মাল নিয়ে। ক-দিন পর আজ ফিরবেন। মা রান্নাবান্না সেরে দুপুর বেলা সেলাই ফোঁড়া নিয়ে বসেছিলেন। ভাবছিলেন, আর একটু পরেই হয়তো সোনালির বাবা ফিরতে পারেন। সোনালির অবশ্য ইস্কুলের ছুটি হতে এখনও দেরি আছে। এখন বোধ হয় টিফিন। টিফিনের সময় যখন ছুটে ছুটে ও খেলা করে, তখন বেশ লাগে মেয়েটাকে। সোনালিকে যেমন দেখতে, যেমন সুন্দর মুখখানি, তেমনি স্বাস্থ্য। খুব বেশি হলে কত আর বয়স হবে—দশ। কিন্তু তুমি দেখলে বুঝতেই পারবে না অত ছোটো সে। মায়ের মতোই ঝলমল করছে মেয়েটা। সোনালির বাবার শরীর-স্বাস্থ্যও খুব ভালো। এত্তখানি বুকের ছাতি, লোহার মতো শক্ত দেহটা। ওই দৈত্যের মতো ট্রাকের ভেতর বসে যখন স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি চালান, তখন দেখলে মনে হবে যেন অচিন দেশের বীরপুরুষ। সোনালির বাবা যত জোরেই গাড়ি চালান, তুমি যদি তাঁর পাশে বসে থাকো, তোমার একটুও ভয় করবে না। মনে হবে দুরন্ত গতিতে এই যে ছুটে চলেছে গাড়িটা, এটা যেন তাঁর হাতের খেলনা।
মুশকিল কী, দূর পথে একবার গাড়ি নিয়ে পাড়ি দিলে ঘরে ফেরার সময়ের হিসেবটা সব গোলমাল হয়ে যায়। আজ সোনালির বাবারও তাই হল। কথা ছিল আজ তিনি দুপুরের মধ্যে ফিরবেন। তা দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল, তবু তিনি ফিরলেন না। দোষ দেবে কাকে! রাস্তাঘাটের যেমন অবস্থা, তেমনি পথেঘাটে কত গাড়ি বলো! রাস্তায় যদি গাড়ির পর গাড়ি দাঁড়িয়ে জট পাকিয়ে যায়, তখন যতই হিসেব করো, ঘরে ফেরার সব হিসেব তোমার ভন্ডুল হয়ে যাবেই।
সোনালি ইস্কুল থেকে ফিরে যখন জানলায় দাঁড়িয়ে বাবার পথের দিকে চেয়েছিল, ঠিক তখনই বাইরের দরজায় কড়া নড়ল, ঠন-ঠন-ঠন।
সোনালি চমকে উঠল। তার গলায় খুশির সুর, —বাবা এসেছে!
মা তাড়াতাড়ি ছুটে এলেন ঘর থেকে। দরজা খুললেন। থতোমতো খেয়ে গেলেন। সোনালির বাবা নয়, পুলিশ। কেন?
অ্যাক্সিডেন্ট!
হ্যাঁ, সোনালির বাবার ট্রাক অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। বাবা হাসপাতালে। এক্ষুনি যেতে হবে। তিনি আহত।
একমাস ধরে হাসপাতালে যমে-মানুষে লড়াই চলল সেই ক্ষতবিক্ষত মানুষটিকে নিয়ে। একমাস পরে সোনালির বাবা যখন হাসপাতাল থেকে ছুটি পেলেন, তখন তিনি প্রাণটি ফিরে পেলেন ঠিকই, কিন্তু অক্ষম হয়ে গেলেন। না পারেন উঠতে, না পারেন বসতে। কী হবে এখন! কেমন করে সংসার চলবে! যে ক-টা পয়সা ছিল, এই একমাসে খরচ করতে করতে সব শেষ। এখন পয়সা না হলে এক বেলাও চলবে না। অগত্যা সোনালির মা বললেন, ক-টা গয়না আছে, বিক্রি করে দিই।
না। সোনালির বাবা সায় দেন না।
তবে? চলবে কেমন করে? মেয়েটার ইস্কুল আছে। নিজেরা না খাই, মেয়েটাকে তো দু-বেলা দু-মুঠো খেতে দিতে হবে। কে দেবে খেতে? মা জিজ্ঞেস করেন।
চলো আমরা দিদির বাড়িতে যাই, বাবা বললেন।
চমকে উঠলেন সোনালির মা।
সোনালির মুখখানা শুকিয়ে গেল। ভয়ে ভয়ে অস্ফুটস্বরে সে জিজ্ঞেস করল, পিসির বাড়ি?
বাবা বললেন, হ্যাঁ।
সোনালি তেমনি ভয়ে ভয়েই জিজ্ঞেস করল, বাবা, পিসি যদি বকাবকি করে?
দূর বোকা, আমি তার ছোটোভাই। এখন আমার বিপদ বিপদের সময় বোন ভাইকে যদি না দেখে কে দেখবে। তা ছাড়া আমার তো নিজের ওই দিদি ছাড়া আর কেউ নেই। আর থাকব তো ক-টা দিন। আবার যখন উঠে বসে চলাফেরা করতে পারব, তখন তো চলে আসব। চলো সেখানেই যাই। তা ছাড়া আমার দিদির তো আর অভাব নেই। মস্ত বাড়ি হয়েছে এখন। মনে হয় আমাদের অসুবিধে হবে না।
মা জিজ্ঞেস করলেন, কিন্তু সোনালির ইস্কুল?
—ক-টা দিন তো, কামাই করলে কী আর অসুবিধা হবে?
অগত্যা এবাড়িতে তালা লাগিয়ে পিসির বাড়ি যাওয়াই ঠিক হল। কিন্তু যাবার দিন চুকের সে কী কান্ড! কিছুতেই ছাড়তে চায় না সোনালিকে। কিন্তু সোনালিই-বা কী করবে। তাকে তো যেতেই হবে চুককে ফেলে। চুকের মুখখানা নিজের মুখের কাছে এনে আদর করে সোনালি। আদর করতে করতে বলে, আবার আসব রে, বাবা ভালো হয়ে গেলেই আসব। এই দ্যাখ-না, ঘরের একটি জিনিসও আমরা নিয়ে যাচ্ছি না। সব রইল, তুই দেখবি। দেখিস যেন চোর-ডাকাতে নিয়ে না যায়।
সোনালির কথা কিছুই বোঝে না চুক, শুধু বোঝে তাকে ফেলে চলে যাচ্ছে সোনালি। তারপর সোনালি যখন বাবাকে নিয়ে সত্যিই গাড়িতে বসল, তখন চুককে কে ধরে রাখবে! একবার গাড়িতে লাফিয়ে ওঠে, একবার সোনালিকে জড়িয়ে ধরে। গাড়ি যখন ছাড়ল, সে কী দৌড় তার।
কিন্তু খানিক ছুটেই চুক দাঁড়িয়ে পড়ল।
তার দিকে ক্ষণিক তাকিয়েই সোনালির চোখ দুটিও ছলছল করে উঠল। সে আর পারল না, কেঁদে ফেলল নি:শব্দে।
পিসির বাড়ি পৌঁছে সোনালির যেন চোখে ধাঁধা লেগে গেল। সত্যিই কী সুন্দর সাজানো- গোছানো বাড়িটা। ঘর-ভরতি কত কী জিনিস! কত বড়োলোক পিসিরা। অথচ এই কিছুদিন আগেও সোনালি পিসিকে দেখেছে বাবার কাছে টাকা চাইতে। অবাক কান্ড, এই ক-দিনে এত বড়োলোক পিসিরা হল কেমন করে! ভেবে পায় না সোনালি। তবে কি পিসেমশাই অনেক বড়ো কাজ পেয়েছে। কে জানে!
পিসির ওই অতবড়ো বাড়ির একখানা ঘর এমন কিছু নয়। সেই ঘরেই সোনালির বাবার থাকার ব্যবস্থা হল। মা আর সোনালিও রইল সেই ঘরে। কোথায় পড়ে রইল তাদের সেই হাসি-খুশির ছোট্ট বাড়িটি। এখন অন্যের বাড়িতে অন্যের দয়ায় তাদের থাকতে হবে। এই কথা সোনালি যতই ভাবে, ততই কেমন যেন বিষণ্ণ হয়ে পড়ে। তার ওপর এখনকার মতো ইস্কুলে যাওয়াও তার বন্ধ হয়ে গেল। এখানে এই পিসির বাড়ি, আর সেই কোথায় কত দূরে তাদের ইস্কুল! সোনালি তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সবসময়, আর মনে মনে বলে, হে ভগবান, তুমি আমার বাবাকে তাড়াতাড়ি ভালো করে দাও। আমাদের সেই আনন্দের দিনগুলি তুমি আবার ফিরিয়ে দাও!
কিন্তু খুশির দিন তাদের ফিরে আসে কই! কই, সোনালির বাবা তো এখনও ভালো হলেন না। মায়ের মুখে-চোখে ভয়ের ছায়া দেখে সোনালি। সেই ছায়া দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যায় সে। অমন হাসিখুশি ঝলমলে মেয়ে সোনালিও ক-দিনেই মায়ের মতো শুকিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
এখানে এসে ক-দিন পরে আজই প্রথম সোনালি তার পিসেমশাইকে দেখল। গুরুজন তাই বলতে নেই, পিসেমশাইকে সোনালির একদম ভালো লাগল না। মানুষটা কখন ঘরে থাকে আর কখন বেরিয়ে যায়, বুঝতেই পারে না সোনালি। মুখে কথাই নেই। এমনকী, সোনালির বাবা এখানে আসার পর একদিন কি দু-দিন এই ঘরে এসেছে বাবাকে দেখতে। দায়সারা একটি কি দুটি কথা জিজ্ঞেস করে চলে গেছে। অবশ্য সে-সময়ে সোনালি ঘরেই ছিল না। তাই দেখাও হয়নি মানুষটাকে। পিসেমশাইকে দেখে পর্যন্ত সোনালির বার বার মনে হচ্ছে, তারা এখানে আছে বলে যেন কত বিরক্ত।
তবে বলতে নেই, পিসি কিন্তু বিরক্তি-টিরক্তি দেখায়নি একটুও। পিসির সেই মূর্তিই নেই। তুমি দেখলেই বুঝতে পারবে, একেবারে অন্য মানুষ। বকাঝকা তো করেই না, বাবাকে কত যত্ন করে। যখন-তখন বাবার ঘরে আসে। মায়ের সঙ্গে গল্প করে, হাসে, বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সোনালি হতভম্ব হয়ে যায় পিসিকে দেখে। কী ভয়ংকর রণমূর্তি দেখেছে পিসির। এখন একদম উলটো, যেন কত শান্ত মানুষটি। এই শান্ত মানুষটিকে অবাক দৃষ্টিতে সোনালি যতই চেয়ে চেয়ে দেখে, ততই তার বুকটা যেন কোনো এক অজানা ভয়ে ছমছম করে ওঠে।
একদিন রাত্রে কী যে হল, সোনালির চোখে একদম ঘুম এল না। সবাই ঘুমোচ্ছে, চারিদিক নির্জন। অন্ধকারে থেকে থেকে দু-একটি শব্দ। কখনো গাছের পাতায়, কখনো-বা ঘরের আনাচেকানাচে। এরা বোধ হয় রাতের অতিথি, কীটপতঙ্গ। কেউ খাবার খুঁজছে। কেউ-বা ঝগড়া করছে। সোনালি সেইসব শব্দ শুনছে আর শুয়ে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। কখনো-বা উঠে বসছে। দেখছে মাকে বাবাকে। শুনতে পাচ্ছে, বাবার ঘুমের শব্দটা নিশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসছে। ভারি ভাবনা হয় বাবাকে দেখলে। পরের দয়ার ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে নাকি চিরদিন মানুষটাকে! না, বাবা ভালো হয়ে গেলেও সে আর ট্রাক চালাতে দেবে না বাবাকে— কোনোদিনও না।
ঠিক এইসময়ে হঠাৎ যেন ওর মনের ওপর ভেসে ওঠে ইস্কুলের কথা। কতদিন হয়ে গেল সোনালি ইস্কুলে যায়নি। হয়তো এতদিনে কত পড়া হয়ে গেছে ক্লাসে। ওদের ক্লাসে ফার্স্ট হয় উলতি। এ বছরে যখন ফোর থেকে ফাইভ-এ উঠল, উলতি অঙ্কে তো এক-শো পেয়েই ছিল, এক-শো ভূগোলেও। তারপর ইংরেজি, বাংলা সব নয়ের ঘরে। উলতিকে খুব ভালো লাগে সোনালির। যেমন তাকে মিষ্টি দেখতে, তেমনি শান্ত। সোনালির যত কথা সব উলতির সঙ্গে। আর উলতিরও যত ভালোবাসা সব সোনালির জন্যে। দু-জনের খুব ভাব। সোনালি যদিও ক্লাসে ফার্স্ট হয় না, তবে পড়াশোনায় তাকে খারাপ কেউ বলতে পারবে না। কিন্তু সে খেলাধুলোয় চ্যাম্পিয়ন। সেখানে তাকে আর হারাতে হচ্ছে না। এবছর শীতে ইস্কুলের স্পোর্টসে গাদা গাদা প্রাইজ পেয়েছে সোনালি। একটা করে দৌড় হয়, সোনালি প্রাইজ পায়, আর উলতি আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। সোনালিকে জড়িয়ে ধরে। খুশিতে সোনালির চোখ ছলছল করে ওঠে। উলতিও যখন ক্লাসে ফার্স্ট হয়ে সোনার মেডেল পায়, তখন কি সোনালিও চুপ করে বসে থাকে? একেবারে নদীর মতো উছলে উঠে উলতির গলা জড়িয়ে নেচে ওঠে সোনালি।
হ্যাঁ, সোনালি নাচতেও পারে। তবে কী আর তেমন। তেমন না হলেও, তুমি কিন্তু তাকে আনাড়ি বলতে পারবে না। সোনালি তোমার মুখে গান শুনতে শুনতে এমন নাচবে, তুমি মনে মনে বলবেই, বা:, বেশ তো!
একবার ঘোড়ায় চড়েছিল সোনালি। সে ওই পুলিশের বড়োবাবুর ঘোড়া। বড়োবাবুর মেয়ে তো সোনালিদের ইস্কুলেই পড়ত। অবশ্য সোনালিদের চেয়ে উঁচু ক্লাসে। বড়োবাবু মাঝে মাঝেই ইস্কুলে আসতেন মেয়ের খোঁজখবর নিতে। একবার তিনি ঘোড়ায় চড়ে এলেন। হলে কী হবে বড়োবাবু, ইস্কুলে এসে একেবারে অন্য মানুষ। বাচ্চার মতো তিনি খেলা করতেন সোনালিদের সঙ্গে। যেদিন তিনি ঘোড়ায় চড়ে এসেছিলেন সেদিন তিনি বললেন, যে আমার ঘোড়ায় চড়ে ছুটতে পারবে তাকে আমি মেডেল দেব। তা অত আর সাহস কার আছে! কেউ ঘেঁষতেই চায় না তাঁর কাছে। এঃ, তোমাদের কারও সাহস নেই, তোমরা হেরে গেলে! বলে তিনি ঠাট্টার সুরে এমন হেসে উঠলেন যে, সোনালি আর থাকতে পারল না। বড়োবাবুর কাছে এগিয়ে এসে বলল, আমি পারি।
তাহলে ওঠো ঘোড়ার পিঠে, বলে বড়োবাবু লাগাম ধরে সোনালির সামনে তাঁর ঘোড়া নিয়ে এলেন।
অবাক কান্ড, সোনালি প্রথমটা একটু দোনোমোনো করল বটে, কিন্তু তারপরই ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠে মারলে দৌড়। শাবাশ! শাবাশ! কী দুর্দান্ত সাহস দ্যাখো! ইস্কুলবাড়ির সামনের মাঠটার ওপর সোনালির ঘোড়া তাকে পিঠে নিয়ে এমন ছুটতে শুরু করল, মনে হল যেন এ ঘোড়াটা সোনালির কতদিনের চেনা। আজই প্রথম নয়, যেন ঘোড়ায় চড়া অনেক দিনের অভ্যেস।
বড়োবাবু খুশি হয়ে সত্যিই তাকে মেডেল দিয়ে বলেছিলেন, বাহাদুর মেয়ে।
বা:! দূর থেকে কেমন মিষ্টি মিষ্টি ঘণ্টার শব্দ ভেসে আসছে। নিস্তব্ধ রাত্রে গির্জার ঘণ্টা বাজছে। এখান থেকে একটু গেলেই তুমি গির্জা দেখতে পাবে। দেখতে পাবে গির্জার চূড়ার ভেতরে এত্ত বড়ো একটা ঘণ্টা। সেটাই বেজে বেজে সময় জানিয়ে দিচ্ছে সবাইকে। এখন এই গভীর রাতে সময় জানার জন্যে কেই-বা জেগে বসে আছে। এক সোনালির চোখেই শুধু ঘুম নেই। বোধ হয় এখন একা সোনালিই শুনছে ওই শব্দ। ওই শব্দ যেন অন্ধকারকে খান খান করে ভেঙে ভেসে আসছে সোনালির কানে। এই নিঝুম ঘরের ভেতর।
হঠাৎ রাতের অন্ধকারে একটা কুকুর ডেকে উঠল। ঘুম ছোঁয়া রাতে একটা কুকুর ডাকলে আরও দশটা ডেকে ওঠে! ছ্যাঁৎ করে উঠল সোনালির বুকটা, মনে পড়ে গেল চুকের কথা। চুকের কথা মনে হতেই ভারি ধড়ফড় করে ওঠে সোনালির বুকের ভেতরটা। সব মনে পড়ে যায় সোনালির, চুকের সব কথা। সোনালিরা যেদিন এখানে এল, সেদিন আকুল হয়ে চুক কী-না করেছে! তবু তাকে ফেলেই চলে আসতে হল। এখন যে একা একা চুক কী করছে, কী খাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে তার খবর কে রাখছে! যাক, থাক ক-টা দিন একটু কষ্ট হবে চুকের। তারপর ক-দিন পরে আবার বাড়ি গেলে তখন তো আর কোনো কষ্ট থাকবে না তার।
হ্যাঁ, সোনালি ফিরে যাবে তার সেই ছোট্ট ঘরে। যে ঘরে তার বই আছে, রঙিন ছবি আছে, এত এত প্রাইজ সাজানো আছে আর সেই বড়ো আয়নাটা আছে। সেই আয়নাটার সামনে মা সোনালির মাথার চুল বেঁধে রিবন পরিয়ে দেন। তারপর সোনালি সেই রিবনের রঙের সঙ্গে রং মিলিয়ে কপালে একটা টিপ পরে। আয়নার ছায়ায় ঘরের ভেতরটার প্রায় সবই দেখা যায়। দেখা যায় টেবিলটা, আর টেবিলের ওপর সেই জাপানি পুতুলটা। একটা রঙিন ঘাগরা পরে, রঙিন ছাতা মাথায় দিয়ে কেমন নাচের ভঙ্গিতে কোমর বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পুতুলটা দেখলেই সোনালির হাসি পায়। সোনালি রোজ দেখে আর রোজই হাসে।
পিসিদের এই ঘরটা একদম সাদামাঠা। ছবি-আয়না-পুতুল কিচ্ছু নেই। এমনকী, ওই জানলা দিয়ে বাইরের গাছপালা—তাও দেখা যায় না। থাকলে তবে তো!
হঠাৎ যেন সোনালির বুকটা ধড়াস করে চমকে উঠল। তার ঠিক পাশে মা ঘুমোচ্ছেন, একটু দূরে বাবা ঘুমোচ্ছেন, চারদিক নিস্পন্দ। অথচ কে যেন তাদের পাশের ঘরের দরজায় ঠেলা দিল আলতো হাতে ঠিক এক্ষুনি। পাশের ঘরেই তো পিসি থাকে। প্রায় রুদ্ধশ্বাসে কান খাড়া করে রইল সোনালি। হ্যাঁ, খিল খোলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। খুব সন্তর্পণে কে যেন দরজা খুলল পিসির ঘরের। সঙ্গে সঙ্গে আবার বন্ধও হয়ে গেল। তারপর শুরু হয়ে গেল ফিসফিসিয়ে কথা বলার অস্পষ্ট আওয়াজ। সোনালির গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। তার মনে হল পিসির ঘরে এই রাতের অন্ধকারে কেউ যেন ঢুকল, ঢুকে কেউ যেন উত্তেজনায় হাঁপাতে হাঁপাতে ফিসফিস করছে।
ভয়ে সোনালিরও হাত-পা কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে। সে বসে থাকতে পারল না। খুব সাবধানে বিছানা থেকে নামল। না, মা-বাবা দু-জনেই ঘুমুচ্ছে—টের পাননি। ঘরের খিলটা ধীরে ধীরে খুলে ফেলল। দরজা ফাঁক করে বাইরে উঁকি মারল। হ্যাঁ, পিসির ঘরে আলো জ্বলছে। আলতো পায়ে ডিঙি মেরে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সোনালি। দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে পিসির ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। পিসির ঘরটা সোনালিদের পাশের ঘর হলেও মধ্যিখানে একচিলতে দালান আছে। দালানটা ডিঙিয়ে পিসির ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল সোনালি। কী প্রচন্ড উত্তেজনা, হ্যাঁ, ওই খোলা জানলাটা দিয়ে আলো আসছে। টুক করে উঁকি মারল সোনালি ওই জানলায়। মেরেই আঁতকে উঠেছে। কয়েক মুহূর্ত মাত্র সে দাঁড়াল, তারপর মারল ছুট। নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল নি:শব্দে। দরজায় খিলটা কোনোরকমে এঁটে আবার শুয়ে পড়ল বিছানায়। হাঁপাতে লাগল সোনালি ভীষণ ভয়ে। তার নিশ্বাসে ভয়ের শব্দটা যেন আছড়ে আছড়ে পড়ছে। শত চেষ্টাতেও সে যেন সেই শব্দটাকে বশ মানাতে পারছে না। পারবেও না, কারণ সে পিসির ঘরের জানলায় উঁকি মেরে যা দেখেছে, তা এক ভয়ংকর ভয়ের দৃশ্য। পিসির ঘরে বিছানার ওপর এত্ত বড়ো একটা ছুরি আর এত্ত সোনার গয়না। গয়নাগুলো সোনালির পিসি আর পিসেমশাই নেড়েচেড়ে দেখছে আর উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে। সোনালি এও দেখেছে, সোনার ওই গয়নাগুলো ঘরের দেওয়ালে একটা গোপন ফোকরের মধ্যে লুকিয়ে রাখছে। ব্যাস! এই পর্যন্তই সোনালি দেখেছে। তারপর সে পালিয়ে এসেছে। আর কিছু জানে না। বাকি রাতটুকু এই কথা ভাবতে ভাবতে বয়ে গেল। একফোঁটা ঘুমও তার চোখ ছুঁতে পারল না। ভীষণ অস্বস্তিতে জেগে জেগে সোনালি বিছানায় ছটফট করতে লাগল। আর মনে মনে ভাবতে লাগল, তবে কি এই অন্ধকার রাতে পিসেমশাই...
মা ঘুমোতে ঘুমোতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরলেন। চেয়ে দেখল সোনালি মাকে। না, মা ঘুমোচ্ছেন। আবার কান পাতল সোনালি। না, আর কোনো শব্দ সে শুনতে পেল না। শুনতে পেল নিজের বুকের শব্দ। আর ভাবতে লাগল, সকাল হতে কি এখনও অনেক দেরি!
অবিশ্যি সকাল হবার অনেক আগেই সোনালির চোখ দুটি ঘুমে জড়িয়ে এসেছিল। বাচ্চা তো! সারারাত যে কী অস্থিরতায় কেটেছে তার! যাক, তবু ভালো। এখন একটু ঘুমোক।
কতক্ষণ আর ঘুমোবে সোনালি। খানিক পরেই সকালের ঝলমলে আলো ঘরে ছড়িয়ে পড়তেই সে ধড়মড় করে উঠে পড়েছে। রাতের সেই ঘটনাটা তার চোখে যেন স্বপ্নের মতো লেগে আছে এখনও। ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে সোনালি, কী করবে এখন সে? কথাটা কাকে বলবে? মাকে?
সকাল থেকেই সোনালির চোখ দুটো কেমন যেন সন্দেহের ভারে ঘুরপাক খাচ্ছে। সোনালি ঘুরছে-ফিরছে আর পিসির ঘরের দিকে উঁকি মারছে। সত্যি, এমন সাজানো ঘরখানা যে, দেখে কে বুঝবে ঘরের দেওয়ালে একটা এত্তবড়ো গোপন ফোকর আছে! সেই ফোকরে সব সোনাদানা ভরতি!
হঠাৎ পিসি সোনালিকে ঘরের সামনে দেখতে পেয়েছে। বাইরে বেরিয়ে এসেছে পিসি। ডাক দিল, সোনালিকে, কী রে সোনালি বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? আয় ভেতরে আয়! বাবা! হঠাৎ পিসির গলায় এমন আদর কেন?
সোনালি অবাক হয়ে গেল পিসির এমন আদরমাখা কথা শুনে। ঘরে ঢুকতে ইতস্তত করল সোনালি।
পিসি হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, কী রে, ভয় করছে? দূর বোকা মেয়ে, আয় আয়। বলে পিসি এগিয়ে এসে নিজেই সোনালির হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল।
ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে সোনালির চোখের পাতা দু-টি তিরতির করে কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে। সে দেখছে, কাল রাতে এইখানে, ঠিক এইখানটিতে সোনার গয়নাগুলো ছড়িয়ে ছিল। পলকে সে দেওয়ালের দিকে চোখ ঘোরাল। সেই গোপন জায়গাটা তার নজরে পড়ার আগেই পিসি কথা বলল, কী দেখছিস?
সোনালি থতোমতো খেয়ে গেছে। আমতা আমতা করে বলল, না, কিছু না। দেখছি, তোমার ঘরটা কী সুন্দর সাজানো।
পিসি বলল, বোস।
সোনালি ভয়ে ভয়ে বিছানার ওপরেই বসে পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে পিসি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললে, এখন তোর কপালে যে কী আছে কে জানে।
হঠাৎ পিসির এই কথা শুনে সোনালি চমকে চাইল পিসির মুখের দিকে। তার চোখ বিস্ফারিত।
সোনালির ভয়ে চমকে-ওঠা সেই মুখখানা দেখে পিসি আবার বললে, ভয় পাবারই তো কথা। এখন কে তোদের দেখবে আর কে তোদের জন্য করবে বল তো! আমি কতদিন তোর বাবাকে বলেছি, ওইসব গাড়িটাড়ি চালানো ছেড়ে দে, ওসব কাজ ভদ্দরলোকদের সাজে না, তা আমার কথা কানে নিল! এখন তো ডাক্তার বলেই দিয়েছে, তোর বাবার ফের হাঁটা-চলা করা খুবই শক্ত। এক ভগবান যদি দয়া করে। তা ভগবান কবে দয়া করবে আর সেই ততদিন আমি তোদের দেখব, এ তো হতে পারে না। আমার নিজের সংসারই কে দেখে!
পিসির কথা শুনে ভয়ে হিম হয়ে গেল সোনালি। বিহ্বল দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইল পিসির মুখের দিকে। তারপর হঠাৎ কখন টুপ টুপ করে দু-ফোঁটা জল সোনালির অজান্তে গড়িয়ে পড়ল দু-চোখ দিয়ে।
দেখে ফেলেছে পিসি। ছলনা করে বললে, তা কান্নার আর দোষ কী! তোর বাবা আজ আছে কাল নেই। তোর কী হবে বল তো?
সোনালি আর বসে থাকতে পারল না, উঠে পড়ল। তারপর কান্না-ভেজা গলায় বলল, পিসি, আমি যাই।
—কেন, বোস-না?
না, সোনালি দাঁড়াল না। প্রায় দুড়দাড় করে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তারপর নিজের ঘরে এসে বাবার চোখের আড়ালে মুখখানা লুকিয়ে কান্নায় ডুবে গেল।
পাশেই তো বাবা বালিশে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। সোনালিকে দেখে ফেলেছেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী রে সোনা, কী হল?
সোনালি উত্তর দিল না।
—কাঁদছিস কেন?
এবার সোনালি মুখ তুলল। দূর থেকে বাবাকে দেখল। কাছে এগিয়ে গেল। বাবার মাথায় হাত রাখল। তখনও সোনালির চোখ-ভরতি অশ্রুর ফোঁটাগুলি টলমল করছে। বাবা হাত বাড়িয়ে সোনালির চিবুকটি ছুঁয়ে ভারি আদরভরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে রে, বল?
সোনালির অমন মিষ্টি গলার স্বর, বাতাস-লাগা পাতার মতো কেঁপে উঠল। জিজ্ঞেস করল, তুমি কবে ভালো হবে বাবা?
বাবা হো-হো করে হেসে উঠেছেন। হাসতে হাসতে বললেন, ও, এইজন্যে বুঝি মনখারাপ লাগছে? আমি তো ভালোই হয়ে গেছি। দেখছিস না, কেমন উঠে বসেছি আমি?
—তুমি আবার কবে হাঁটবে বাবা?
—হাঁটব রে দ্যাখ-না ক-দিন পরেই হাঁটব।
সোনালির দৃষ্টি আবার স্থির হয়ে রইল বাবার মুখের দিকে চেয়ে। আর কোনো কথা তার মুখ দিয়ে বেরোল না। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তারপর সে চোখ ফিরিয়ে নিল।
যেদিন থেকে সোনালিরা এখানে এসেছে, সেদিন থেকেই মা রান্নাঘরে ঢুকেছেন। বাড়ির সকলের রান্না এখন মা একাই করেন। করতেই হবে। দয়া করে এখানে থাকতে দিয়েছে এরা। পায়ের ওপর পা রেখে তো আর খাওয়া যায় না। তাও যদি কিছু টাকাপয়সা থাকত, তা হলে অন্য কথা। এখন ক-টা গয়নাই যা আছে। সোনালির কানের ওই ঝুমকো দুটো আর মায়ের হাতের ওই বালা দুটো ছাড়া আর সবই তো বাক্সের ভেতর যত্ন করে রেখেছেন মা। কে জানে, শেষ অবধি ওগুলোও থাকবে কি না!
অনেকক্ষণ থেকে মায়ের কথাই সোনালি ভাবছিল, ভাবছিল কখন মাকে একা পাবে। কখন মাকে সব কথা বলবে। ফুরসত তার কিছুতেই হচ্ছে না। ঘরে বাবা আর রান্নাঘরে পিসি। সবসময় ঢুকছে আর বেরোচ্ছে। পিসি নিজে কুটোটি পর্যন্ত নাড়ছে না, শুধু মা-র ওপর খবরদারি চালাচ্ছে। তবু রান্নাঘরেই ঢুকল সোনালি। মায়ের কাছে বসল। বসে মায়ের এটা-ওটা কাজে হাত লাগাল। ঠিক এই সময়ে পিসিও এসে হাজির। আচ্ছা জ্বালাতন তো!
কী রে সোনালি, তুই? সোনালিকে রান্নাঘরে দেখে পিসি অবাক হল।
মা তো একা, সোনালি উত্তর দিল।
ও, তাই মাকে সাহায্য করছিস? ভালো, ভালো, বলে পিসি হাসল।
মা বললেন, হ্যাঁ এখন থেকে একটু একটু করে শিখুক। একদিন তো পরের ঘরে যেতেই হবে।
পিসি বলল, হ্যাঁ তা ঠিকই বলেছ। এখন থেকে একটু একটু ঘরকন্নার কাজ শিখুক। আমরা তো সারাজীবন খেটেই মলুম। একদন্ড আরাম করতে পারলুম না।
মা হাসলেন।
পিসি চলে গেল। ভালোই হল। মা এখন একা।
—মা। খুব সতর্কগলায় মাকে ডাকল সোনালি।
—কী? মা ফুটন্ত তরকারিতে একটু জল ঢেলে ফিরে তাকালেন সোনালির দিকে।
সোনালি তেমনি চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল, এখানে আর কতদিন থাকতে হবে মা?
—যতদিন না...
মায়ের কথা শেষ হবার আগেই সোনালি ফুঁপিয়ে উঠল।
—কী হল সোনা? হঠাৎ সোনালিকে অমন ফুঁপিয়ে উঠতে দেখে মা অবাক হলেন।
সোনালি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়েই বলল, পিসি বলছিল, বাবা নাকি আর ভালো হবে না।
মা থমকে গেলেন।
—বলছিল, এখন ভগবানকে ডাক। যদি কিছু হয়।
সোনালির কথা শুনে মায়ের বুকটাও হু-হু করে জ্বলে উঠল। মুখে কথা সরল না।
—আমার এখানে থাকতে ভীষণ ভয় করছে মা। সোনালির গলায় যেন আতঙ্ক।
মা-ও যেন সোনালির কথা শুনে আতঙ্কিত হলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কেন, ভয় কীসের?
—কাল রাত্তিরে... বলতে বলতে হঠাৎ যেন তার গলায় কথা আটকে গেল।
—মা ব্যস্ত হলেন, কী হয়েছে কাল রাত্তিরে? মা উদগ্রীব হয়ে এগিয়ে এলেন সোনালির কাছে।
সোনালির মুখখানা ভয়ে লাল হয়ে উঠল। তার হাতের আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। —অতিকষ্টে তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল সোনার গয়না!
—মামি ডাকতে ডাকতে হঠাৎ টুসাই ঢুকল রান্নাঘরে।
উফ! ডাক শুনে সোনালির বুকখানা ভয়ে ধড়াস করে উঠেছে।
টুসাই ঘরে ঢুকেই থমকে গেল। দু-জনের মুখের দিকে কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, মায়ে-মেয়েতে চুপিচুপি কী কথা হচ্ছে?
মা নিমেষে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, তোমার কথাই হচ্ছিল বাবা।
—আমার কথা? অবাক হল টুসাই।
—হ্যাঁ, সোনালি বলছিল, টুসাই খুব ভালো ছেলে।
—উঁহু, তা তো নয়, তোমরা তো কী সব গয়না গয়না করছিলে।
মা সঙ্গে সঙ্গে টুসাইয়ের কথায় সায় দিয়ে বললেন, ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, সোনালির কানের ঝুমকো দুটো একটু ময়লা হয়ে গেছে, তাই ওটা পরিষ্কার করার কথা বলছিলুম।
টুসাই চট করে তাকাল সোনালির কানের দিকে। তারপর বলল, কই, খুব একটা ময়লা দেখছি না তো।
মা বললেন, তা অবিশ্যি খুব-একটা ময়লা হয়নি ঠিকই, তবে যতটা হয়েছে, ততটাই পরিষ্কার করে ফেলা ভালো। বেশিদিন ফেলে রাখলে আরও ময়লা পড়বে।
টুসাই উত্তর দিল, তা তুমি ঠিক বলেছ মামি। তারপর চোখের দৃষ্টি সোনালির ঝুমকো দুটোর ওপর রেখে বলল, আমাকে দাও, আমি একেবারে পরিষ্কার ঝকঝকে করে দেব।
মা বললেন, তুমি পারবে না বাবা।
টুসাই উত্তর দিল, কে বলেছে পারব না। একবার দিয়েই দ্যাখো-না!
তুমি হারিয়ে ফেলবে বাবা।
টুসাই সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, কী যে বলো! আমি কি এখনও সেই ছেলেমানুষ টুসাই আছি নাকি!
সোনালি এবার থাকতে না পেরে বলল, না টুসাই, এখন পরিষ্কার করার দরকার নেই। বেশ তো আছে। বলে একটা দুল নিজের কান থেকে খুলে টুসাইকে দেখাবার জন্যে হাত বাড়াল। ওমা! টুসাই প্রায় চোখের পলকে সোনালির হাত থেকে ঝুমকোটা ছোঁ মেরে কেড়ে নিলে। নিয়েই দে ছুট। সোনালি এমন থতোমতো খেয়ে গেছে যে, ভয়ে জাপটে ধরেছে মাকে। মা-ও এমন হকচকিয়ে গেছেন যে, টুসাইকে চেঁচিয়ে ডাকার মতো ক্ষমতাও তখন তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। ডাকলেই-বা কী। ততক্ষণে টুসাই পগারপার।
মা যখন সব বুঝতে পারলেন, তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। তিনি রান্নাঘর থেকে টুসাইকে ডাক দিয়ে বেরিয়ে এলেন। কিন্তু তিনি তাঁর নিজের গলার শব্দটাই শুনতে পেলেন, টুসাইয়ের সাড়া পেলেন না। ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেলেন তিনি।
সোনালি উত্তেজনায় কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে ডাকল, মা!
মা ফিরে চাইলেন সোনালির মুখের দিকে।
কী হবে এখন? জিজ্ঞেস করল সোনালি।
মা এবারও কোনো কথা না বলে খুব দ্রুত নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। সোনালিও মায়ের পিছু নিল।
সোনালির বাবা আধশোয়া অবস্থায় বালিশে ঠেসান দিয়ে গল্পের বই পড়ছিলেন। মাকে অমন হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকতে দেখে তিনি বই থেকে চোখ সরালেন। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী হল?
মা প্রায় উত্তেজনায় হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, টুসাই সোনালির কানের একটা ঝুমকো নিয়ে কোথায় ছুটে পালাল।
—সে কী! বাবা ছটফট করে উঠলেন।
আর সোনালি ভয়ে জুজু হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বাবার মুখের দিকে চেয়ে, ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগল।
না, তখন আর টুসাইয়ের টিকিটি পর্যন্ত দেখা গেল না। সে যতক্ষণ-না ঘরে ফিরল, ততক্ষণ একবার মা আর একবার সোনালি বাইরে বেরোয়, ঘরে ঢোকে। বাবাও শুয়ে শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে লাগলেন। কিন্তু তখনও পর্যন্ত সোনালির পিসিকে এই কথাটা বলার সাহস হল না কারও। কে জানে, যদি হিতে বিপরীত হয়ে যায়।
হ্যাঁ, অনেকক্ষণ পর টুসাই ঘরে ফিরল। কিন্তু এ কী দশা হয়েছে তার! হাত-পা কেটেছে। মুখটা ফুলে একেবারে ঢোল। রগের ওপর কালশিটে পড়েছে। জামা-প্যান্ট ছিঁড়েছে। কারও সঙ্গে হাতাহাতি করে ফিরল নাকি! ঘরে ঢুকেই কটমট করে তাকাল সোনালির দিকে। তারপর রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে গেল নিজের ঘরে। তার সেই ছন্নছাড়া অবস্থা দেখে মা আর সোনালি ভয়ে কাঠ।
—সোনা! ঘরের ভেতর থেকে সেই সময় বাবা ডাকলেন।
মা আর সোনালি দু-জনেই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকল।
টুসাই এল বুঝি? বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
এসেছে, মা উত্তেজিত হয়ে উত্তর দিলেন।
—দিয়েছে?
চাইতে পারিনি, মা বললেন— গা-হাত-পা সব কেটেকুটে ফিরেছে। বোধ হয় কারও সঙ্গে মারামারি করে ফিরল।
বাবা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, জিনিসটা ওর হাতে দেখলে না?
—দেখলুম না। মায়ের গলাতেও উদবেগ।
—তাহলে দিদিকে এক্ষুনি এক বার ডাকো! বাবা অস্থির হয়ে উঠলেন।
সোনালির মা বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন বোধ হয়। তাই সোনালির বাবাকে শান্ত করে বললেন, হুট করে কথাটা দিদির কানে না তোলাই ভালো। আগে টুসাইকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে জিনিসটা আদায় করতে পারি কিনা দেখি।
বাবা বললেন, যা করবার তাড়াতাড়ি করো, দেরি হয়ে গেলে জিনিসটা খোয়া যেতে পারে।
মা সোনালিকে বললেন, যা তো সোনা, টুসাইকে ডেকে নিয়ে আয় তো।
সোনালি ছুটল। দু-পা ছুটেই দেখল কী, টুসাই যেমন অবস্থায় বাড়ি ঢুকেছে, ঠিক তেমনি অবস্থাতেই বিছানায় শুয়ে শুয়ে যন্ত্রণায় এপাশ-ওপাশ করছে।
টুসাই! সোনালি ডাকল।
টুসাই মুখ তুলে তাকাল।
—মা ডাকছে।
যাব না। ক্ষিপ্ত স্বরে উত্তর দিল টুসাই।
সোনালিও কম যায় না। সেও গম্ভীর স্বরে বলল, তবে তুমি আমার ঝুমকোটা ফেরত দিয়ে দাও?
ঝুমকো! টুসাই যেন আকাশ থেকে পড়ল, কার ঝুমকো!
—সে কী! আমার ঝুমকো। তখন তুমি নিয়ে পালালে।
সোনালির এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে টুসাই একেবারে রেগে টং। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, একটি ঘুসিতে তোমার নাকটি ছেতরে দেব। আমার নামে মিথ্যে বদনাম দেবার জায়গা পাওনি! বলে হাতের ঘুসিটা পাকিয়ে সোনালিকে ভয় দেখাল।
টুসাইয়ের ঘুসি দেখে সোনালিরও মেজাজ গেল বিগড়ে। সেও চ্যাঁচাল, এঁ:, মারবে! দেখি কেমন মারতে পার! তুমি তো নিয়েছ আমার সোনার ঝুমকোটা। চাইছি বলে মারের ভয় দেখাচ্ছে!
তারপর লেগে গেল ঝগড়া।
—পিসি ছুটে এসেছে চেঁচামেচি শুনে, কী হয়েছে?
টুসাই গলা ফাটিয়ে নালিশ করলে, দ্যাখো-না মা, মিথ্যে মিথ্যে আমাকে চোর বলছে।
সোনালিও তেমনি গলা চড়িয়ে বললে, মিথ্যে নয় পিসি। টুসাই আমার কানের একটা ঝুমকো আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ঘর থেকে ছুটে পালাল। এখন চাইছি, বলছে নিইনি।
হইহট্টগোল শুনে ততক্ষণে সোনালির মাও সেখানে ছুটে এসেছেন। সোনালির মা খুব শান্ত গলাতেই বললেন, টুসাই, সোনালি তো ঠিকই বলছে, তুমি তো নিয়েছ বাবা।
আগুনে যেন ঘি পড়ল। টুসাই একেবারে চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠে বাড়ি মাথায় করল। —যেমন মেয়ে, তেমনি মা! নিজেরাই লুকিয়ে রেখে আমার নামে দোষ দিচ্ছে। ফের যদি ওকথা বলেছ, লাঠি মেরে সব ঠাণ্ডা করে দেব।
এবার পিসি কথা বলল, সত্যিই তো, টুসাই ওসব নিতে যাবে কেন? আমার ছেলে কখনো পরের জিনিসে হাত দেয় না। তোমার মেয়েই হয়তো কোথাও ফেলেছে দ্যাখো!
মা বললেন, না দিদি, আমার সামনেই তো...
মায়ের কথা শেষ না-করতে দিয়েই পিসি বলল, তাহলে টুসাই কি মিথ্যে কথা বলছে?
সোনালি বলল, হ্যাঁ পিসি, মিথ্যেই তো। তুমি বিশ্বাস করো, টুসাই আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়েছে।
পিসি ধমক দিল, তুই চুপ কর। টুসাই তো বলেছে ও নেয়নি। তা ছাড়া তোর ঝুমকো নিয়ে ও ছেলেমানুষ কী করবে? বদনাম দিলেই হল! কী অন্যায় কথাবার্তা সব।
পিসির ওইকথা শুনে সোনালি আর মা দু-জনেই যেন হতভম্ব হয়ে গেল। সোনালির মায়ের গলা যেন রুদ্ধ হয়ে গেছে। সত্যিই তো আর কী বলার আছে! যেখানে মা নিজেই ছেলের দোষ ঢাকতে অন্যকে শাসায় সেখানে কথা বাড়ানোই বৃথা। অগত্যা সোনালির হাত ধরে সোনালির মা নিজের ঘরে ফিরে এলেন।
সেদিন ওই কথা নিয়ে আর কোনো কথা বলাবলি করল না কেউ। না মা-বাবা করলেন, না সোনালি। এই বাড়িতে আশ্রিত এই মানুষগুলির সব ক-টি মুখ ভয়ে অথবা ভাবনায় যেন থমথম করছে। এখন কী হবে!
ঠিক সন্ধ্যে বেলা, সোনালির পিসি এল বাবার কাছে ঘরে। মুখে হাসি নেই, গম্ভীর। যেন কোনো এক দুঃসংবাদের খবর নিয়ে এসেছে। বাবা তাকে বসতে বলার আগেই পিসি বলল, তোকে একটা বিশেষ জরুরি কথা বলার জন্যে আমি এসেছি।
বাবা নিষ্পলক চোখে তাকালেন পিসির মুখের দিকে। তারপর বললেন, বলো।
পিসি বলল, টুসাই-এর বাবা বলছিল, তোরা আসার পর থেকে খরচাপাতি অনেক বেড়ে গেছে। ও একা মানুষ। এত বড়ো সংসারটা ওর একার পক্ষে টানা সম্ভব নয়। তাই...
আমাদের চলে যেতে বলছ? শান্ত স্বরে বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
ঠিক চলে যেতে না বললেও, ওকে একটু সাহায্য করা যায় কি না সেটা ভেবে দেখতে বলছি। পিসি উত্তর দিল।
—দিদি, তুমি দেখছ তো, আমি পঙ্গু হয়ে পড়ে আছি। আমার আপন আর কেউ নেই বলেই তোমার কাছে এসেছি।
দিদি তীক্ষ্ণ স্বরে উত্তর দিল, সে তুমি চিরদিনই যদি পঙ্গু হয়ে পড়ে থাকো, তাই বলে তো আমরা চিরদিন তোমাদের টানতে পারব না।
কথাগুলো যেন তিরের মতো বুকে বিঁধে গেল ওই তিনটে প্রাণীর। যন্ত্রণাভরা গলায় বাবা বললেন, এখন ওই বাড়িটা ছাড়া আমার আর তো কিছু নেই।
—কেন, কিছু গয়নাগাটিও তো আছে। ফুঁসে উঠল পিসি।
থমকে গেলেন বাবা। চমকে দিদির মুখের দিকে তাকালেন তিনি। তারপর অস্ফুট স্বরে বললেন, সে তো দু-চারটে।
—তবে বাড়িটা আমার নামে লিখে দিতে পারিস কি না ভেবে দ্যাখ। তাহলে আর কোনো ভাবনা নেই তোদের, বলে পিসি কেমন যেন একটা ধারালো দৃষ্টিতে সোনালির বাবার মুখের দিকে চেয়ে রইল।
স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সোনালির বাবা তাঁর দিদির কথা শুনে। হতবাক মা-ও। অসহায় দুটো মানুষ সোনালির মতো একটা ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াবেন! কে তাঁদের আশ্রয় দেবে! যতই হোক, একদিন তো সোনালির বাবা দিদির জন্যে করেছেন যথেষ্ট। আজ তাঁর বিপদের দিনে সেই দিদিই তাঁকে এমন করে হেনস্তা করবে, এ যেন বিশ্বাসই করা যায় না। সোনালির বাবার দৃষ্টি এখন ভারি করুণ। এক গভীর দুঃখ এই মুহূর্তে যেন তাঁর বুকের ওপর চেপে বসেছে। সেই দুঃখের বোঝাটা হালকা করার জন্যে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর অস্ফুট স্বরে দিদিকে বললেন, দেখি, আমাকে ভাবতে দাও।
হ্যাঁ, যা ভাববার একটু তাড়াতাড়ি ভাবলেই ভালো। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। বলে সোনালির পিসি হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
পিসির অমন নির্দয় কথাগুলো শুনে থাকতে পারেনি সোনালির মা। তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। পাছে বাবা দেখতে পান, তাই নিজেকে আড়াল করে সোনালিকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। মাকে দেখে সোনালিরও চোখ ছলছলিয়ে উঠেছিল। ভীষণ ক্ষোভে সে ক্রুদ্ধ গলায় বলল, আমি সব বলে দেব। পিসেমশাইয়ের সব কথা আমি জানি।
মা চমকে তাকালেন সোনালির মুখের দিকে।
—হ্যাঁ মা, পিসেমশাই ডাকাত।
—না-আ-আ-আ। মা ভয়ে আঁতকে উঠে সোনালির মুখটা চেপে ধরলেন।
—কী হল? মায়ের গলা শুনে বাবাও অবাক হলেন।
মা নিজেকে সামলে নিলেন নিমেষে। তারপর সোনালির বাবাকে বললেন, আমাদের এবাড়িতে না থাকাই ভালো। চলো, আমরা এখান থেকে অন্য কোথাও চলে যাই।
—কোথায়?
—যেখানে হোক। এখানে থাকলে আমাদের বিপদ। এরা আমাদের সব কেড়ে নেবে। আমাদের বাঁচতে দেবে না। কোথাও জায়গা না-হোক নিজেদের বাড়িটা তো আছে। পড়ে পড়ে এখানে এই অপমান সহ্য করার চেয়ে নিজের বাড়িতে না খেয়ে থাকাও অনেক ভালো।
বাবার বুকের ভেতর থেকে একটা গভীর নিশ্বাস বেরিয়ে এল। তারপর যেন যুদ্ধে পরাজিত এক সৈনিকের গলায় হতাশার ক্ষীণ স্বর শোনা গেল, দরকার হলে তাই হবে।
সে-রাত্রেও সোনালির চোখে ঘুম এল না। অনেক রাত অবধি মা-ও শুয়ে শুয়ে ছটফট করছেন। তারপর কখন অজান্তে ঘুমিয়ে পড়েছেন। সোনালির বাবা অবিশ্যি বেশিক্ষণ জেগে ছিলেন না। এখন শুধু জেগে আছে একা সোনালি। একটা ভয়ংকর আতঙ্ক বুকের মধ্যে চমকে উঠছে তার থেকে থেকে। এখন কোত্থেকে তার ঘুম আসবে! কেননা সে জানে, সে ডাকাতের সঙ্গে একই বাড়িতে, একইসঙ্গে বাস করছে। আর সে-ডাকাত অন্য কেউ নয়, তারই পিসেমশাই। সারাদিন কেন যে পিসেমশাইকে সে দেখতে পায় না, তার রহস্য সে এতদিনে উদ্ধার করতে পেরেছে। হ্যাঁ, আজও সে ঘুমোয়নি ঠিক ওই কারণেই। আজও সে পিসেমশাইয়ের জন্যে অপেক্ষা করছে। রাতে শোবার আগে পর্যন্ত সে খুব ভালো করে এঘর-ওঘর সব ঘরে দেখেছে, পিসেমশাই নেই। সুতরাং পিসেমশাইয়ের ঘরে ফেরার রাত বোধ হয় এখনও হয়নি।
ঘণ্টা বাজল গির্জার। ঠিক যেমন কাল রাতেও বেজেছিল। রাত দুটোর ঘণ্টা। কান দুটো সজাগ হয়ে আছে তার। হয়তো সে কালকের মতোই শব্দ শুনতে পাবে, দরজা খোলার আলতো শব্দ। সে শুনতে পাবে...
টুক! টুক!
সোনালি চমকে উঠেছে।
আবার টুক! টুক!
সোনালির বুকের ভেতরটা ভীষণ ভয়ে ধকধক করতে লাগল। মনে হল যেন তাদেরই ঘরের দরজায় কে টোকা মারছে! সে শুয়ে শুয়ে মাথা তুলে দেখতে লাগল নিজেদের ঘরের দরজাটা। তবে কি পিসেমশাই দরজায় আলতো হাতে টোকা মারছে। না, তবু সে মা-কে ডাকল না। কেননা, সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর ক্লান্ত মানুষটা অকাতরে ঘুমোচ্ছেন। খাটতে খাটতে বেচারি মায়ের এই ক-দিনে কী ছিরি হয়েছে। অমন ফর্সা গায়ের রংটা পুড়ে ঝলসে গেছে। এমন রোগা হয়ে গেছেন যে, কন্ঠা বেরিয়ে পড়েছে। এখন মা একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোন।
আশ্চর্য, আর তো কোনো শব্দ শোনা যাচ্ছে না! তাহলে কি সোনালিই ভুল শুনল!
সে কী, ভুল কেমন করে শুনবে সে। এক বারের জায়গায় দু-বার তার কানে বেজেছে, টুক! টুক!
—চুপ! চুপ!
—কেন? কেন?
—পিসির ঘরে গলার শব্দ শোনা যাচ্ছে না?
—তাই তো!
সোনালির হৃৎকম্প শুরু হয়ে গেছে। কান খাড়া করে সে শোনবার চেষ্টা করল সেই কথাগুলো। হ্যাঁ শুনতে সে পাচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছে না কিছুই। শুধু বুঝতে পারছে শব্দটা তার পিসেমশাইয়ের গলার স্বর। ঠিক কালকের মতো আজও বোধ হয় পিসির সঙ্গেই ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। বিছানা থেকে আলতো পায়ে নেমে এল সোনালি। তারপর কালকের মতোই সে নিজের ঘরের দরজাটা খুলে ফেলল। উঁকি মেরে দেখল বাইরেটা। না কেউ নেই। সাবধানে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। ওই তো পিসির ঘরের জানলা দিয়ে আলো আসছে, কালকের মতোই। নিশ্চয়ই আজও পিসেমশাই অনেক গয়না এনেছে ডাকাতি করে। এগিয়ে গেল সোনালি। ওই জানলার আড়ালে দাঁড়িয়ে তাকাল ঘরের ভেতরে। কী ভীষণ উৎকন্ঠায় সে ঠকঠক করে কাঁপছে। কিন্তু আশ্চর্য, আজ তো সে গয়নাগাটি কিছুই দেখতে পেল না।
গয়নাগাটি দেখতে না পাক, যেসব কথা সে শুনতে পেল, তাতেই তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। সে শুনল, পিসেমশাই তীক্ষ্ণ চাপা গলায় পিসিকে বলছে, তোমাকে ছলে-বলে কৌশলে যেমন করে হোক বাড়িটা হাতাতে হবে। আর গয়নাগাটি যা আছে, যদি তা দিতে না চায়, তার ব্যবস্থা আমি করে নেব। একটু ভয় দেখালেই সব দিয়ে দেবে।
পিসি বলল, তারপর হইহল্লা শুরু করে দিলে?
এই তো! এটা কেন আছে! বলে পিসেমশাই একটা ছুরি দেখাল। বলল, দরকার হলে এই ছুরিটাকে কাজে লাগাতে হবে। আমার বাড়িতে আছে। আমি তিনটেকে কেটে ফেললেও কেউ জানতে পারবে না।
—এই ওখানে কে? জানলার দিকে পিসির হঠাৎ নজর পড়ে গেছে।
চমকে উঠেছে সোনালি। দুড়দাড় করে ওখান থেকে মেরেছে ছুট।
টর্চ! টর্চ! পিসেমশাই চেঁচিয়ে উঠেছে। টর্চ নিয়ে ঘরের ভেতর থেকে পড়ি মরি করে ছুটে বেরিয়ে এসেছে।
অন্ধকারে লুকিয়ে পড়েছে সোনালি। কিন্তু এখানটা যে লুকিয়ে থাকার জায়গা নয়, সে তো সোনালি তখন বুঝতে পারেনি। তাই পিসেমশাইয়ের হাতের টর্চটা অন্ধকারে ঝলসে উঠতেই একেবারে তার গায়ে সেই আলো ঠিকরে পড়েছে। ততক্ষণে পিসিও বেরিয়ে এসেছে। সোনালিকে দেখতে পেয়ে আঁতকে উঠল, সোনালি!
পিসেমশাই টর্চের আলোটা সোনালির গায়ে স্থির রেখে নরখাদক বাঘের মতো এগিয়ে চলেছে। তার চোখে যেন আগুন ঝরছে। সোনালি এখন নিশ্চিত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। তাকে এখন বাঁচার শেষ চেষ্টা করতে হলে চিৎকার করে উঠতে হবে। আর তা নয়তো পালাতে হবে।
কিন্তু না, সে পালাতে পারল না। ওই দ্যাখো, পিসেমশাই সোনালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সোনালিও বাঁচার তাগিদে দু-হাত বাড়িয়ে ধাক্কা দিল পিসেমশাইকে। পিসেমশাইয়ের হাত থেকে ছিটকে পড়ল টর্চটা। ঝনঝন করে ভেঙে গেল আলোর কাচটা নিভে গেল টর্চ। তারপর আবার অন্ধকার। পালাল সোনালি, ধরতে পারল না পিসেমশাই। সোনালি সেই অন্ধকারে পিসেমশাইয়ের হাতের মুঠোকে ফাঁকি দিয়ে ছুট দিল। ছুটে যে আবার কোথায় লুকিয়ে পড়ল, আর দেখা গেল না।
পিসেমশাই আর পিসি দু-জনেই সেই অন্ধকার হাতড়ে আঁতিপাঁতি করে সোনালিকে খুঁজতে লাগল। খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ পিসেমশাইয়ের পায়ে ঠেকল সেই টর্চটা। সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিয়েছে। জ্বালাতে গেছে, যা! জ্বলল না। নির্ঘাত ভেঙেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে শোনা গেল একটা শব্দ। খসখস! বিদ্যুৎ গতিতে ঘুরে গেল পিসেমশাইয়ের দৃষ্টি। মনে হল কে যেন বাড়ির সদর দরজাটা খুলছে। পিসি চেঁচিয়ে উঠল, ওই যে!
ঝাঁপিয়ে পড়ল পিসেমশাই। হ্যাঁ, সোনালি। সে-ই দরজা খুলছে। সোনালি আর্তনাদ করে ওঠার আগেই পিসেমশাই ওর মুখখানা তার হাতের থাবা দিয়ে চেপে ধরলে। তারপর হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে নিয়ে এল ঘরের ভেতর।
আ! কী ভয়ংকর সেই হাতের চাপ। সোনালির নিশ্বাস ফুরিয়ে আসছে। যতই সে পিসেমশাইয়ের হাত থেকে নিজেকে ছাড়াবার চেষ্টা করছে, ততই যেন সেই হাত পাথরের মতো শক্ত হয়ে তার মুখখানা দুমড়ে দিচ্ছে। মাটিতে ছিটকে পড়ল সোনালি... আর সে কিছুই জানে না। অচৈতন্য হয়ে ধুঁকতে লাগল পড়ে পড়ে।
পিসি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, মেয়েটা মরে গেল?
—না এখনও মরেনি, ধুঁকছে।
—মরে গেলে?
—মরবার আগেই ওকে এখান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। আমাকে একটা বস্তা দাও বস্তায় পুরে ওকে নদীতে দিয়ে আসি তাহলে আর কোনো চিহ্ন থাকবে না।
পিসি বলল, হ্যাঁ তাই করো। একটা আলুর বস্তা আছে, তাতেই ধরে যাবে মনে হয়।
পিসেমশাই বলল, নিয়ে এসো বস্তাটা, তাড়াতাড়ি নিয়ে এসো। এই অন্ধকার থাকতে থাকতে কাজটা সেরে ফেলতে হবে। নইলে জানাজানি হয়ে যাবে।
পিসি বস্তাটা আনলে, সোনালির হাত-পা দুমড়ে তাকে বস্তায় পুরে ফেলল পিসেমশাই।
বস্তার মুখটা বেশ করে বেঁধে ফেলল। তারপর কাঁধে ফেলে বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। চলল সেই নদীর দিকে এই রাতের অন্ধকারে।
এখান থেকে নদী বেশ দূরে, সময় লাগবে অনেক। তার ওপর জমাট অন্ধকার, সাবধানে দেখে-শুনে যেতে হবে। ভোর হবার আগে পৌঁছোতেই হবে, নইলে নির্ঘাত বিপদ! সুতরাং পিসেমশাই সোনালিকে পিঠে নিয়ে প্রায় ছুটতেই শুরু করল।
বেশ খানিকটা ছুটে হাঁপ ধরে গেল পিসেমশাইয়ের। তখন থেকে খানিকটা হাঁটে, খানিকটা দাঁড়ায়—দম নেয়। কিন্তু এভাবে হাঁটলে তো ভোরের আগে কেন, পুরো চব্বিশ ঘণ্টা গড়িয়ে গেলেও নদীর তীরে পৌঁছোতে পারবে না।
কিন্তু আর বইতে পারে না পিসেমশাই। একটা নিরিবিলি জায়গায় পিঠ থেকে বস্তাটা নামিয়ে একটু জিরিয়ে নেবার জন্যে বসল। বসে বসে তার মনে হল নদী অবধি যাওয়া যাবে না সুতরাং মেয়েটাকে বস্তাবন্দি করে এইখানেই ফেলে রেখে পালানো বুদ্ধিমানের কাজ। অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে এদিকটা ঝোপে ভরতি। ওই ঝোপের মধ্যে ফেলে গেলে কে আর টের পাচ্ছে! তাকে কেউ ধরতেও পারবে না। এই ভেবে পিসেমশাই আবার বস্তাটা দু-হাত দিয়ে হেঁচড়ে হেঁচড়ে টানতে লাগল। ঝোপের মধ্যে বেশ খানিকটা টেনে এনে একটা গর্ত ঠাওর করতে পারল। বা:! ভালোই হল। বস্তাটা গর্তের মধ্যে ঠেলে ফেলে দিতেই ধুপ করে একটা আওয়াজ হয়েছে। হতেই গাছের ক-টা কাক ভয়ে গাছ ছেড়ে সেই অন্ধকারেই কা-কা করে ডেকে উড়তে লাগল। অবিশ্যি সে কিছুক্ষণ, তারপরেই আবার সব নিঝুম নিস্তব্ধ। পিসেমশাইও এই ফাঁকে সেখান থেকে সরে পড়েছে। এই অন্ধকার ঝোপে ওই গর্তের ভেতর এখন শুধু সোনালিই পড়ে রইল। সে নড়েও না, চড়েও না। কষ্টের কোনো শব্দও তার মুখ থেকে শোনা যাচ্ছে না। তবে কি মেয়েটা এতক্ষণে মরেই গেল!
শেষ রাত থাকতে থাকতেই সোনালির মায়ের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। বিছানায় নিজের পাশে সোনালিকে দেখতে না পেয়ে ধড়ফড় করে উঠে পড়েছিলেন। তারপর চাপা গলায় ডাক দিয়েছিলেন, সোনালি। সাড়া পাননি।
ঘরের আলোটা তাড়াতাড়ি জ্বেলে ফেললেন। জ্বলতেই নজর পড়ে গেল দরজাটা খোলা। তবে কি সোনালি একা একা বাইরে গেছে! দুরুদুরু বুকে মা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বাইরে। আবার ডাক দিলেন, সোনালি।
এবারও সাড়া পেলেন না।
এই শেষ রাতের অন্ধকারে বাড়িখানা থমথম করছে। সোনালির সাড়া না পেয়ে আতঙ্কে থরথর করে কাঁপছেন মা। কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে সারা শরীর। এই মুহূর্তে তিনি যেন চিৎকার করার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন। তারপর ধীরে ধীরে তিনি পাথরের মতো নিশ্চল একটি মূর্তি হয়ে সেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি জানতেও পারলেন না, সোনালির পিসি তার নিজের ঘর থেকে জানলায় উঁকি মেরে তাঁকে লক্ষ করছে। জানতে পারলেন না, এক ভয়ংকর বিপদ বিষাক্ত সাপের মতো ফণা তুলে তাঁর মাথার ওপর দুলছে। হঠাৎ তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন। ছুটলেন নিজের ঘরে। চিৎকার করে সোনালির বাবাকে ডাক দিয়ে নিজে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
এখন আকাশ ভেঙে উছলে পড়েছে সকালের রোদ। সেই রোদের আলোয় চোখ মেলে তাকালে তুমি স্পষ্ট দেখতে পাবে বস্তায় বন্দি হয়ে সোনালি যেখানে পড়ে আছে, সে জায়গাটা কী নোংরা। এদিকে মানুষের চলাফেরা করার কথা ছেড়েই দাও, ভুলেও এ-পথে কেউ পা দেবে না। অবিশ্যি যে গর্তটায় সোনালি পড়ে আছে, সেটা একটা খুব গভীর কিছু নয়। তা হলেও গর্ত তো! চট করে তোমার-আমার নজর পড়বে না।
কিন্তু দ্যাখো তো, গর্তের ভেতর সোনালির বস্তাটা যেন একটু একটু নড়ছে!
হ্যাঁ, ঠিক বটে তো!
তবে কি সোনালি বেঁচে আছে?
হ্যাঁ, সোনালির গলার ক্ষীণ শব্দটা এখন তুমি একটু কান পাতলেই শুনতে পাবে।
দ্যাখো, দ্যাখো, এখন যেন সোনালি ছটফটিয়ে উঠছে। বোধ হয় তার খুবই কষ্ট হচ্ছে। তার গলার সেই ক্ষীণ শব্দটা যেন ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। হ্যাঁ, ওই তো সে ভীষণ আওয়াজ তুলে চিৎকার করে উঠল, বাঁচাও-ও-ও-ও।
চিৎকারের সেই ভয়াবহ স্বরটা তুমি এখান থেকে শুনতে না পেলেও, শুনতে পেয়েছিল একটি ছেলে। তার কী হয়েছিল কে জানে, সেও বোধ হয় লুকিয়ে-ছাপিয়ে ওই নোংরা ঝোপঝাড়ের পথ ধরেই হাঁটছিল। চলতে চলতে সে দাঁড়াল।
আবার শোনা গেল, বাঁচাও-ও-ও-ও।
বিস্ময়ভরা চোখের দৃষ্টি তার ছটফট করে উঠল। সে বুঝতে পেরেছে, এইখানে, ওই গর্তের ভেতর যে-বস্তাটা পড়ে আছে, ওর মধ্যে কেউ বন্দি। মুহূর্তও সে দেরি করল না, গর্তের মধ্যে লাফ দিল। বস্তার মুখের দড়িটা ঝটপট খুলে ফেলল। বস্তার আবরণটা খানিক সরিয়ে দিতেই সোনালির মুখখানা ঝলসে উঠল সূর্যের আলোয়। সোনালির সেই মুখখানি ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। হাঁপাচ্ছে সোনালি। বস্তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে হাঁকপাঁক করে উঠল সে।
ছেলেটি তো ভীষণ ঘাবড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি সে তার নিজের হাত বাড়িয়ে সোনালিকে বস্তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করল। তারপর গর্ত ডিঙিয়ে আবার ওপরে উঠে সোনালির হাত ধরে তাকে টেনে তুলে নিল।
তখনও হাঁপাচ্ছে সোনালি। ঠোঁট দুটি তার কাঁপছে। ভয়ে বিস্ফারিত চোখ দুটি তার চেয়ে আছে সেই ছেলেটির মুখের দিকে। বিস্ময়ে ছেলেটিরও চোখ নিষ্পলক। যেন এখনও সে বিশ্বাস করতে পারছে না এইমাত্র ওই বস্তার ভেতর থেকে যে বেরিয়ে এল, সে একটি জীবন্ত মানুষ! একটি মেয়ে, তার চেয়ে বড়ো। তার এই বিচ্ছিরি চোহারাটার পাশে মেয়েটি যে একটি ছোট্ট অপ্সরির মতো, একথা না বললেও বুঝতে অসুবিধে নেই। মেয়েটি যে-জামা পরে আছে, তা দেখে তার নিজের জামার দিকে চাইতে লজ্জা করছে। বিচ্ছিরি ময়লা এই জামা। পায়ে জুতো নেই। ধুলো-ভরতি মুখখানা শুকনো। মাথার চুলে তেল নেই, রুক্ষু এলোমেলো। অবিশ্যি মেয়েটির পায়েও জুতো নেই। না থাক, ধুলোও নেই। মুখখানা ভয়ে কুঁকড়ে আছে বটে, কিন্তু চোখ দুটো কী সুন্দর! সতেজ, টানাটানা।
সোনালির হঠাৎ যেন চমক ভাঙে। সে বস্তাটা দেখার জন্যে চকিতে গর্তটার ভেতরে তাকাল ভয়ে ভয়ে। পরক্ষণেই চোখ ফেরাল ছেলেটির দিকে। সোনালির বোবা মুখখানা ছেলেটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় করুণ হয়ে ওঠে। চোখে জল আসে তার। সোনালি কী বলবে তাকে? কী বলে তাকে ধন্যবাদ জানাবে?
সোনালি ধন্যবাদ জানাতে পারল না। তার মুখের কোনো কথাই শোনা গেল না। সে শুধু ছেলেটির মুখের দিকে এক বার কৃতজ্ঞ চোখে ফিরে তাকাল। তারপর পিছু ফিরল, পা ফেলল। সেই জঞ্জালভরা নোংরা জায়গা থেকে বেরিয়ে এল সে।
—শোনো। চমক ভাঙল ছেলেটিরও। সে ডাক দিল সোনালিকে।
থমকে গেল সোনালি। দাঁড়াল। মুখ ফেরাল।
কোথায় যাচ্ছ? সে জিজ্ঞেস করল।
তাইতো, কোথায় যাচ্ছে সোনালি! তা তো সে নিজেও জানে না। হঠাৎ পিসির বাড়ির কথা মনে হতে শিউরে ওঠে সোনালি! পিসেমশাইয়ের সেই ক্রূর মুখখানা তার চোখের ওপর ভেসে উঠতেই তার বুকখানা ভয়ে যেন থমকে থেমে যায়! কিন্তু সেখানেই যে তার মা আর বাবা আছেন সেই কথা মনে হতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে সোনালি। সে কোনোদিন মা আর বাবাকে ছাড়া থাকেনি কোথাও আজ সে কেমন করে থাকবে! তার ওপর বাবা এখন অক্ষম কী করবে সে! ভারি ভয় করছে তার। সে নিজের কানে শুনেছে, পিসেমশাই তাদের সব কেড়ে নেবে। সে নিজের চোখে দেখেছে, পিসেমশাইয়ের হাতে এতবড়ো একখানা ছুরি। না, না, সোনালি তার বাবা-মার কাছেই যাবে এক্ষুনি যাবে—তাকে যদি মরতে হয় তবু ভালো, কিন্তু সে মা-বাবাকে মরতে দেবে না, কিছুতেই না।
—তোমার বাড়ি কোথায়?
সোনালিকে অমন বোবার মতো চুপ করে থাকতে দেখে সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
একী, সোনালি আচমকা অমন করে ছুটে পালাচ্ছে কেন?
ওই দ্যাখো, সোনালির পিসেমশাই! লোকটা নিশ্চয়ই কাছেপিঠে কোথাও ছিল। সোনালির শেষপর্যন্ত কী হয়েছে নিশ্চয়ই তাই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে এসেছে। দ্যাখো! দ্যাখো! সোনালিকে ছুটতে দেখে সোনালির পিসেমশাইও তার পেছনে তাড়া লাগালে। যদিও সোনালির সারাটা রাত দুঃসহ কষ্টে কেটেছে, তবুও কী তীব্রগতিতে ছুটছে সে। হ্যাঁ, এখন তাকে দেখলে তোমাকে বলতেই হবে সত্যিই স্পোর্টসে চ্যাম্পিয়ন সোনালি। সোনালির সঙ্গে ছুটতে পারা কি অতই সহজ! সোনালি তিরবেগে ছোটে, আর তাকে ধরতে না পেরে পিসেমশাই আস্তে আস্তে পিছিয়ে পড়ে।
রকমসকম দেখে ছেলেটা তো থ। তার বুঝতে বাকি রইল না, খুবই গোলমেলে ব্যাপার। দেখতে তো হয় শেষপর্যন্ত। ছেলেটাও ছুটল ছুটল পিসেমশাইয়ের পিছু পিছু।
ছুটতে ছুটতে পিসেমশাইয়ের দম গেল ছুটে। সোনালি তার নাগালের বাইরে কোথায় যে চলে গেল, আর দেখাই গেল না তাকে। সোনালির পিসেমশাই দাঁড়িয়ে পড়ল। আর ছোটার কোনো মানে হয় না। পিসেমশাইয়ের পেছনে ছুটতে ছুটতে ছেলেটাও দাঁড়িয়ে পড়ল। বেদম হাঁপাচ্ছে পিসেমশাই, আর চোখ পিটপিট করে দেখছে ছেলেটাকে। ছেলেটাকে দেখে পিসেমশাইয়ের ঘাবড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। কোনো কথা না বলে পিসেমশাই মুখ ফিরিয়ে নিল।
হঠাৎ ছেলেটাই বলে উঠল, আপনার একপাটি জুতো পায়ে, আর একপাটি পথে গড়াগড়ি খাচ্ছে।
পিসেমশাই বিরক্ত হয়ে চট করে একবার নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে নিল।
ছেলেটা একটু মজা করেই বলল, আপনি হেরে গেলেন!
পিসেমশাই ছেলেটার দিকে কটমট করে তাকাল। যেন পারলে এক্ষুনি ভস্ম করে দেয়।
ছেলেটা আবার বলল, খুব জোরে ছুটতে পারে মেয়েটা। ওকে ধরা আপনার কম্ম নয়।
পিসেমশাই এবারও নিশ্চুপ। ছেলেটার চোখের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে জুতো খোঁজার ছলনায় মাটির দিকে তাকাল। তাকিয়ে তাকিয়ে এক-পা দু-পা করে হাঁটতে লাগল।
ছেলেটিও পিসেমশাইয়ের পেছনে পেছনে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল, আপনার কেউ হয়?
পিসেমশাই সেকথার কোনো উত্তর না দিয়ে তেড়ে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, তোর এত জমা-খরচের কী দরকার?
ছেলেটা বলল, আসলে কী জানেন, ওই ঝোপের মধ্যে একটা গর্তের ভেতর মেয়েটাকে কেউ বস্তায় বেঁধে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। যে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল, সে নিশ্চয়ই মেয়েটাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। আমি দেখতে না পেলে এতক্ষণে কম্ম শেষ হয়ে যেত।
তুই এখানে কী করছিস? বেশ রেগেই জিজ্ঞেস করল পিসেমশাই।
—আপনি ওর পেছনে ছুটছিলেন, আমি আপনার পেছনে ছুটছিলুম।
—মেয়েটাকে ধরে দিতে পারিস?
—না বাবা, ওসব ধরাধরির মধ্যে আমি নেই।
—তবে ভাগ এখান থেকে।
ছেলেটা এবার কীরকম সন্দেহ সন্দেহ চোখে দেখতে লাগল পিসেমশাইকে। তারপর সন্দেহ সন্দেহ গলায় বলল, আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি ওকে মেরে ফেলার জন্যে এই কান্ডটা করেছেন।
পিসেমশাই হকচকিয়ে গেছে। নিমেষে নিজেকে সামলে নিয়ে ছেলেটাকে কড়কে উঠল, ফের যদি আজেবাজে কথা বলেছিস তো জিভটা তোর টেনে ছিঁড়ে ফেলব!
ছেলেটা যেই-না লোকটাকে তেড়ে কথা বলতে শুনেছে, তার মেজাজ গেছে বিগড়ে। সঙ্গে সঙ্গে বুক ফুলিয়ে সেও তড়পে উঠল, চোখ রাঙাবেন অন্য লোককে। আমার গায়ে এক বার হাত দিয়ে দেখুন, মজা টের পাইয়ে দেব। দাঁড়ান, আমি পুলিশকে খবর দিচ্ছি।
ছেলেটার মুখ থেকে কথা পড়তে-না-পড়তেই পিসেমশাই তাকে ধরে ফেলেছে। ব্যাপারটা এমন আচমকা ঘটে গেল যে, ছেলেটা একদম ফুরসত পেল না পালাবার বা নিজেকে বাঁচাবার। কিন্তু সেও তেমনি ছেলে। ধরা পড়ার ধাক্কা সামলে নিয়েই চিৎকার শুরু করে দিলে, পুলিশ, পুলিশ!
সঙ্গে সঙ্গে পিসেমশাই তার গলাটা টিপে ধরেছে। আর বলব কী, ছেলেটাও ফাঁক পেয়ে পিসেমশাইয়ের হাতটা এমন কামড়ে ধরল যে, প্রাণ বেরিয়ে যাবার জোগাড় পিসেমশাইয়ের। লেগে গেল ধস্তাধস্তি। পিসেমশাই ছেলেটাকে যতই ধাক্কা মারছে, ছেলেটাও ততই জোরে জোরে কামড়ে ধরছে। শেষে গলগল করে রক্ত ঝরে পড়ল তার হাত দিয়ে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে পিসেমশাই তার ঘাড় ধরে মারল এক ঝটকা। ছেলেটাকে ছুড়ে ফেলে দিল সাত হাত দূরে। উঃ কী জোরে লেগেছে! কিন্তু তবু তাকে থামানো গেল না। পড়ে পড়েই সে চেঁচিয়ে উঠল পুলিশ, পুলিশ!
আর দাঁড়ায় সেখানে! পুলিশের নাম শুনে দে ছুট, দে ছুট! একপায়ে জুতো, সেদিকে তখন আর কে খেয়াল রাখছে!
জায়গাটা জনমানবহীন বলে তাই। এমন যে একটা তুলকালাম কান্ড ঘটে গেল, সেটা কেউ জানতেও পারল না। লোকটাকে ছুটতে দেখে ছেলেটাও লাফিয়ে উঠে মারলে তাড়া। কিন্তু পারল না, আচমকা সোনালি তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে তার পথ আটকাল। হ্যাঁ, সোনালি এইখানেই লুকিয়ে ছিল। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল। সোনালিকে পথ আটকাতে দেখে সে চ্যাঁচাল, আমায় ছেড়ে দাও। লোকটা খুনি। আমাকে আর একটু হলে মেরে ফেলত। আমি লোকটাকে পুলিশে ধরিয়ে দেব। তুমি এখানে দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি আসছি। বলে সে আবার ছুটল।
ছুটতে ছুটতে পিসেমশাইয়ের তখন আর এক পাটি জুতো পা থেকে খসে রাস্তায় গড়াচ্ছে, তারপর এধার দিয়ে কোন ধারে যে পিসেমশাই কেটে পড়ল, তা আর হদিশ করতে পারল না ছেলেটা।
সোনালি সেইখানেই দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু ভেবে পাচ্ছিল না, এখন সে কী করবে! কী যে বিপদ তার, সে এক ভগবান ছাড়া এখন আর কেউ জানে না। সত্যি বলতে কী, যতবার মা আর বাবার কথা তার মনে পড়ে যাচ্ছে, ততবারই মনে হচ্ছে এক্ষুনি ছুটে তাঁদের কাছে চলে যায় সে। কিন্তু পিসেমশাইয়ের সঙ্গে যেরকম একটা ছোটোখাটো লড়াই হয়ে গেল, এখন সেখানে যাওয়া মানে প্রাণটি হাতে নিয়ে যাওয়া। একান্তই যদি তাকে যেতে হয়, লুকিয়ে-ছাপিয়ে যেতে হবে। যেতে হবে রাতের অন্ধকারে। কিন্তু পিসির বাড়ির পথটা যে কোন দিকে তা তো সে জানে না, যাবে কেমন করে!
বেশিক্ষণ নয়, একটু পরেই ছেলেটা হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে এল। রাগে তার চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। সে উত্তেজনায় ফুঁসে উঠল। শয়তানটা কোথায় লুকিয়ে পড়ল ধরতে পারলুম না। এক বার পেলে হয়, ভুষ্টিনাশ করে ছেড়ে দেব।
সোনালি ছেলেটার মুখখানা এবার ভালো করে দেখল। দেহে একফোঁটা মাংস নেই, একদম ল্যাকপেকে সিং। পিসেমশাইয়ের একখানা ঘুসো খেলে যে বাছাধন চোখে সরষে ফুল দেখবে, সে-ভয় একদম নেই। ভয় যে নেই সে তো দেখতেই পেলে। ওই ল্যাকপেকে সিংয়ের তাড়া খেয়েই তো অমন জাঁদরেল পিসেমশাই একদম ভো-কাট্টা!
কী ভাবছ? ছেলেটা সোনালিকে জিজ্ঞেস করল।
সোনালি উত্তর দিতে পারল না। তার মুখের দিকে তাকিয়েই রইল।
সোনালির মুখখানা ভয়ে এইটুকু হয়ে গেছে। তার সেই মুখ দেখলে যে-কেউ বুঝতে পারবে। তাই ছেলেটা বলল, দ্যাখো, তুমি যদি ভয়ে অমন সিঁটিয়ে থাকো, আমি কী করব! তোমার বাড়ি কোথায় বলো, আমি পৌঁছে দিয়ে আসছি।
জানি না, সোনালি উত্তর দিল। তার গলার স্বর ভাঙা—অস্পষ্ট, কাঁপা কাঁপা।
—সে কী, খুব অবাক হল ছেলেটা। —নিজের বাড়ি কোথায় জান না! এমন কথা তো আমি কখনো শুনিনি! আরে বাবা, একটা আস্তানা তো আছে। আমার কথা যদি বলো, সে স্বতন্ত্র। আমার সবই আছে। যাক সেসব বৃত্তান্ত তোমার শুনে কাজ নেই। বলে ছেলেটা একটু থামল। বেশ সন্ধানী চোখে এবার একটু তাকাল সোনালির দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, লোকটা তোমায় ধরল কোত্থেকে?
—লোকটা আমার পিসেমশাই।
—পিসেমশাই! ছেলেটা যেন ভূত দেখল।
—আমার বাবা গাড়ি চালাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে এমন আহত হয়েছে যে, আর উঠতে পারে না। আমরা তাই পিসির বাড়িতে থাকি। আমার পিসেমশাই ভালো লোক নয়—ডাকাত। আমি সে-কথাটা জানতে পেরেছি বলেই পিসেমশাই আমাকে মেরে এখানে ফেলে দিয়ে গেছে। পিসেমশাই বোধ হয় ভেবেছিল আমি মরেই গেছি।
—সর্বনাশ! ছেলেটা আঁতকে উঠল।
সোনালি কেঁদে ফেলল।
সোনালিকে কাঁদতে দেখে ছেলেটার চোখও ছলছল করে উঠল। সে নরম গলায় বলল, কাঁদছ কেন? একটা উপায় তো কিছু বার করতে হবে।
সোনালি চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, এখন আমি কী করব বুঝতে পারছি না। পিসেমশাইয়ের বাড়িতে বাবা আছে মা আছে কী যে হবে তাদের। আবার কেঁদে ফেলল।
সোনালির চোখ দিয়ে যতক্ষণ জল গড়িয়ে পড়ছিল, ততক্ষণ সোনালির চোখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে ছেলেটাও যেন কী ভাবছিল। ভেতরে ভেতরে সে যে খুব অস্থির হয়ে উঠেছে, সে তার চোখের চাউনি দেখলে যে-কেউ বুঝতে পারবে। হঠাৎ কেমন যেন এক নরম মমতায় তার বুকখানি ভরে গেল। সে এগিয়ে গেল সোনালির কাছে। তারপর জিজ্ঞেস করল, আমার সঙ্গে যাবে তুমি?
সোনালি জলটলমল চোখের দৃষ্টি তার দিকে ফেরাতেই সে আবার বলল, এখানে কিন্তু আর বেশিক্ষণ দাঁড়ানো ঠিক নয়। তোমার পিসেমশাই আবার আসতে পারে। তখন আর নিস্তার নেই।
সোনালি জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাব?
—সেটা পরে শুনলেও হবে। আগে এখান থেকে পালাতে হবে আমাদের।
সোনালি আর কথা না বাড়িয়ে তার সঙ্গে পা চালিয়ে দিল। আর হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগল, অচেনা এই ছেলেটার সঙ্গে না-জানা ঠিকানায় যাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে!
ছেলেটা হুট করে জিজ্ঞেস করে বসল, আমার সঙ্গে যেতে ভয় লাগছে নাকি?
সোনালি থতোমতো খেয়ে গেছে। তার মনের কথাটা পাছে সে বুঝতে পারে, তাই তাড়াতাড়ি উত্তর দিল, না না।
—ভয় না হোক, ভাবনা হচ্ছে ঠিকই।
সোনালি চুপ করে গেল।
সে বলল, এখন তো আমার সঙ্গে চলো তারপরে কী হয় দেখা যাবে।
এবার সোনালি আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ তার সঙ্গে হাঁটতে লাগল।
ছেলেটা বললে, এত ঢিমেতালে হাঁটলে ধরা পড়ে যাবে, ছোটো। বলে ছেলেটা সত্যি দৌড়োতে লাগল।
সোনালির যদিও সারারাত ঘুম নেই, যদিও শরীরের ওপর সাংঘাতিক ধকল গেছে, তবুও সে ছুটল। ছুটতে ছুটতে ছেলেটাকেই পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল। ছেলেটা যে ছুটতে ছুটতে সোনালির কাছে হেরে গেল, সেটা বুঝতে পেরেই চিৎকার করে উঠল, আর ছুটতে হবে না। বলে সে নিজেই দাঁড়িয়ে পড়ল।
সোনালিও দাঁড়াল।
হাঁপাচ্ছে ছেলেটা।
সোনালিও হাঁপাচ্ছে।
হাঁপাতে হাঁপাতে ছেলেটা বলল, দারুণ ছুটতে পার তো তুমি? আমাকে হারিয়ে দিলে!
সোনালি ইচ্ছে করলে তক্ষুনি বলতে পারত, ইস্কুলের স্পোর্টসে সে ফার্স্ট হয়। কিন্তু সেসব কথা না তুলে চুপ করেই থাকল সে।
তুমি খুব খেলাধুলো করো না? ছেলেটি জিজ্ঞেস করল।
আমি ইস্কুলে পড়ি, উত্তর দিল সোনালি।
ইস্কুলে পড়ো? ছেলেটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কোন ক্লাসে?
—ফাইভে।
—আমি তোমার চেয়ে নীচে পড়তুম দু-বছর আগে। এতদিনে আমারও ফোর হত।
সোনালি অবাক হয়ে তাকাল তার মুখের দিকে।
বাবা ইস্কুল ছাড়িয়ে দিয়েছে। আমি চাকরি করি, বলে ছেলেটা একটু মুচকি হাসল।
সোনালি যেমন নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়েছিল তার মুখের দিকে, তেমনিভাবেই চেয়ে রইল।
ছেলেটা বলল, অনেকটাই ছুটে চলে এসেছি আমরা। চলো, এবার হেঁটে হেঁটেই যাই। মনে হয় না, এত দূরে তোমার পিসেমশাই এসে হামলা করবে। তার ওপর আমারও দম ফুরিয়ে গেছে।
সোনালিও দেখল, সেই নির্জন জায়গাটা পেরিয়ে তারা লোকালয়ে চলে এসেছে। লোকজন চলাফেরা করছে। গাড়িঘোড়া ছোটাছুটি করছে। এ জায়গাটায় সে যে কোনোদিন আসেনি, সেটা সে বুঝতে পারলেও তার ভয় কাটছে না। চোখের ওপর থেকে থেকেই ভেসে উঠছে বাবা আর মা-র মুখের ছবি দুটি।
তোমার নামটা কিন্তু আমি জানি না। ছেলেটি হঠাৎ বলল। সোনালিও একমুহূর্ত দেরি না করে উত্তর দিল, সোনালি।
আমার নামটাও তো তুমি জান না। বলব?
সোনালি তার মুখের দিকে তাকাল।
ছেলেটি হাসল। বলল, তান্না। বলেই আরও জোরে হেসে উঠল। হাসিটা খানিক পরে থামিয়ে সে বলল, আসলে এটা আমার ডাকনাম। ভালো নাম একটা আছে—অর্জুন। কিন্তু ও-নামে কেউ ডাকে না আমায়। ইস্কুলে পর্যন্ত সবাই তান্না, তান্না করত। এমনকী, ইস্কুলের যে-মাস্টারমশাই আমায় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, সেই ড্রইং স্যার পর্যন্ত আমাকে তান্না বলে ডাকতেন। শুধু অর্জুন বলে ডাকত আমার দিদি। আমার দিদির অবিশ্যি অনেক দিন আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। ওই আমার এক দিদি। কতদিন দেখিনি তাকে। তুমি আমার দিদির চেয়ে অনেক ছোটো, তবে তোমার মুখের আদলটা অনেকটা আমার দিদিরই মতো। তুমি একটা জিনিস দেখেছ কি? দিদিদের বিয়ে হয়ে গেলেই দিদিরা কেমন পর হয়ে যায়! যাক গে, আজ থেকে তোমাকেই আমি দিদি বলে ডাকব। তুমি আমার দিদিই তো। আমার চেয়ে এক ক্লাস উঁচু তুমি। তবে তুমি আমাকে তান্না বলেই ডেকো। অর্জুন বলার দরকার নেই। অর্জুন নামটা কেমন জানি একটু সেকেলে সেকেলে। তবে অবিশ্যি অর্জুনও তো ফেলনা নয়। বলে একটু হাসল সে। হাসতে হাসতেই বলল, আমার নামটা ধরে ডাকো দেখি। শুনি তোমার মুখে কেমন লাগে!
আসলে, এতসব কথা শুনতে শুনতে নিজেরই অজান্তে সোনালি কেমন যেন আনমনা হয়ে যাচ্ছিল। বার বার মা আর বাবার মুখের ছবি দুটি ওর চোখের ওপর ভেসে উঠছিল। তখন তার চোখ দুটিতেও অশ্রুর ফোঁটা টলমল করে উঠে গড়িয়ে পড়ছিল গাল বেয়ে। সে কথা বলতে পারছিল না, বোবা পুতুলের মতো হেঁটে চলেছে ছেলেটির পাশে পাশে।
সোনালির মুখে কোনো কথা না শুনে ছেলেটি হঠাৎ তার মুখের দিকে চোখ ফিরিয়েই থমকে গেছে। ছেলেটির ঠোঁট দুটি এতক্ষণ হাসছিল। সোনালির চোখে জল দেখে সে-হাসি মিলিয়ে গেল। সে বিষণ্ণ গলায় জিজ্ঞেস করল, কাঁদছ কেন, তোমার মন কেমন করছে বুঝি? নিশ্চয়ই মা আর বাবার কথা ভাবছ! তাহলে তুমি আমার কথা শুনলে কী করবে! বলে চলতে চলতে হঠাৎ সে দাঁড়াল। তার ছেঁড়া জামাটা তুলে ক্ষিপ্তস্বরে বলল, এই দ্যাখো!
—ইস!
সোনালি তার পিঠের ওপর চোখ মেলে শিউরে উঠেছে। চাবুকের দাগ দগদগ করছে।
জামাটা টেনে আবার নামিয়ে ফেলল ছেলেটি। বলল, দেখলে তো? আবার হাঁটতে লাগল।
কেমন যেন মমতায় উছলে গেল সোনালির মনটা। সোনালি কিছু বলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগে ছেলেটিই বলল, তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ কে অমন করল!
—কে? সোনালির গলায় ভাঙা, অস্পষ্ট উদবেগ ফুটে উঠেছে।
—একটা পিশাচ! আমার মনিব। ঘৃণায় মুখখানা বিকৃত করল সে।
সোনালি ছেলেটির একথার মানে বুঝতে না পেরে উদগ্রীব চোখে তাকাল তার দিকে।
সে বলল, বুঝতে পারলে না বুঝি? আমার মনিব, মনিব। আমি তার কাছে চাকরি করি।
বুঝতে পেরেছে সোনালি।
কিন্তু সে বলল, তুমি এখনও বুঝতে পারনি। আমি চাকরি করি মানে চায়ের দোকানের বয়। টেবিলে টেবিলে চা দিই। চায়ের কাপ টেবিল থেকে তুলি, ধোয়া-মোছা করি। এই ধোয়া-মোছা করতে প্রথম প্রথম আমার ঘেন্না করত। তারপর আর ঘেন্নাটেন্না ওসব কিছু ছিল না, সয়ে গেল। আসলে কী জান, আমার বাবা একটা লোহার কারখানায় কাজ করত। আমরা গরিব ছিলুম ঠিকই, তবে চায়ের দোকানে কাজ না করলে যে উপোস করে থাকতে হবে তেমন গরিব আমরা ছিলুম না। হল কী, একবার কারখানায় কাজ কমে গেল। লোকসানের পালা শুরু হল। আর সেই সুযোগে কারখানার মালিক হঠাৎ একদিন গেটে তালা ঝুলিয়ে কারখানা বন্ধ করে দিল। যারা সেখানে চাকরি করছিল, তাদের কী অবস্থা বলো। যার যা জমানো পয়সা ছিল তা তো খরচ হয়ে গেলই, শেষে ধারদেনা করা ছাড়া আর গত্যন্তর রইল না। আমি এখন যে চায়ের দোকানে কাজ করি, সেই চায়ের দোকানে বাবাও চা খেত একসময়ে। এই চা-দোকানের মালিকের সঙ্গে বাবারও বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। অগত্যা বাবা আর কোনো উপায় না দেখে চায়ের দোকানের মালিকের কাছে কিছু টাকা ধার চাইল। তা বলতে নেই, মালিক দিল। বাবাকে দিয়ে কাগজে সই করিয়ে পাঁচ-শো টাকা ধার হিসেবে দিয়ে বলল, টাকাটা তাড়াতাড়ি শোধ করে দিয়ো ভাই। কিন্তু পাঁচ-শো টাকা কদিনই-বা যাবে। কারখানাও খোলে না, টাকাও শেষ। অর্ধেক দিন ভাত জোটে না। ইস্কুলের মাইনে দিতে পারি না। শেষে ইস্কুল ছাড়িয়ে দিল বাবা। এদিকে ক-টা দিন কেটে যাবার পরই চা-দোকানের মালিক বাবার কাছে ওই পাঁচ-শো টাকার তাগাদা শুরু করে দিল। বাবা তো পড়ল ফাঁপরে। টাকা থাকলে তবে তো শোধ করবে! মালিকও নাছোড়বান্দা। শেষমেষ বাবা অন্য কিছু না পেয়ে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ঝাল-চানা বিক্রি শুরু করল। তাতে আর কী হবে! টাকা না পেয়ে মালিকের ধৈর্য গেল। বাবার সঙ্গে লাগিয়ে দিলে চোটপাট। রাস্তাঘাটে চ্যাঁচামেচি করে বাবাকে একেবারে নাস্তানাবুদ করে ছাড়লে। নিজের মানসম্মান বাঁচানোর জন্যে বাবার তো প্রায় তার হাতে-পায়ে ধরার অবস্থা। তখন রফা একটা হল। ঠিক হল বাবাকে টাকা দিতে হবে না আমি মালিকের চায়ের দোকানে কাজ করে বাবার টাকা শোধ করব। এতে আমার মা অবিশ্যি একটু আপত্তি করেছিল, কিন্তু ধোপে টিকল না। অগত্যা লেখাপড়া ছেড়ে, বাবা-মাকে ত্যাগ করে, চায়ের দোকানের বয় হয়ে গেলুম।
তা কাজ করতে করতে বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। মাসে মাসে বাবা আসে। আমাকে ছেড়ে দেবার কথা মালিককে বললেই উত্তর দেয়, পাঁচ-শো টাকা শোধ হতে এখনও অনেক টাকা বাকি। কত টাকা যে বাকি, তার হিসেবও খুলে বলতে চায় না। আসলে আমার যে মাসমাইনে কত, সেই কথাটি বাবা যখনই জিজ্ঞেস করে, মালিক বলে, ওইটুকু ছেলের আবার মাইনে কী! খেতে দিচ্ছি, এই যথেষ্ট। সুদে-আসলে টাকা তো কম হয়নি। এরই মধ্যে শোধ হয়ে যাবে ভাবছ কী ভাবে। তা বাবা আর কী উত্তর দেবে। চুপচাপ ফিরে যায়। আর আমিও চায়ের দোকানে কাজ করি।
বাবা আমাকে দেখতে এলে কোনো কোনো দিন মা-ও বাবার সঙ্গে আসে, কিন্তু মা আমার দুর্দশা দেখে চোখের জল সামলাতে পারে না। শেষে মা আর আসতই না! তখন মায়ের জন্যে আমার মন কী-ই না খারাপ হত। কিন্তু এখন আমি পাথর হয়ে গেছি।
ছেলেটি কথা বলতে বলতে থামলে সোনালি তার মুখের দিকে তাকাল। ছেলেটির সে-মুখ দেখে সোনালির বুঝতে কষ্ট হল না, এই মুহূর্তে সত্যিই পাথরের মতো কঠিন তার মুখখানা।
হঠাৎ সে রেগে ঝাঁঝিয়ে উঠল, টাকা দেবে না, পয়সা দেবে না, রাজ্যের এঁটোকাঁটা খেতে দেবে, আবার পানের থেকে চুন খসলেই মারবে! লোকটা কালও আমায় মেরেছে। তাই আজ আমি সকালেই পালিয়ে এসেছি। আর আমি যাব না সেখানে, কোনোদিনও না। আমি যদি এখন তাকে একা পাই, ইট মেরে থেঁতো করে ফেলব!
সোনালির মুখ দেখে বোঝা গেল, ছেলেটার কথা শুনে সেও যেন ভয় পেয়েছে। মুখখানা চুপসে গেছে সোনালির।
হঠাৎ সোনালির ওই অবস্থা দেখে কী জোর হেসে উঠেছে সে। হাসতে হাসতে বলল, একী! তুমি যে ভয়ে একেবারে কুঁকড়ে গেলে। না না, ভয় পাবার কিচ্ছু নেই। আমি এখন তোমাকে যেখানে নিয়ে যাচ্ছি, সেখানে ভয় নেই, সেখানে মা আছে।
হ্যাঁ, এই পথটাই ছেলেটির বাড়ির পথ। এখন সে একটু জোরে জোরে হাঁটতে শুরু করল আর মজা করে বলল, আমি বাবা আর ছুটছি না। ছুটলেই তোমার কাছে হেরে যাব।
—আরে তান্না তুই? হঠাৎ কে যেন ডাকল তাকে।
ছেলেটি পিছু ফিরল। দেখল হ্যাঁ, সে প্রায় তার বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। তাকে ডাক দিয়েছেন তার ইস্কুলের ড্রইং-স্যার। ছেলেটি ছুটে গেল স্যারের কাছে, প্রণাম করল, তারপর স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল।
এ কী চেহারা হয়েছে তোর! স্যার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন। তারপর সোনালিকে দেখে বললেন, এ কে?
আমার দিদি। জবাব দিল সে।
স্যার বললেন, আগে তো কখনো দেখিনি।
সোনালি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
ছেলেটি বলল, খুব জোরে ছুটতে পারে স্যার।
—তাই নাকি! কী নাম তোমার?
—সোনালি।
ছেলেটি বলল, আমরা দু-জনে আবার ইস্কুলে ভরতি হব স্যার।
—তুই তো চাকরি করিস?
—না স্যার, চাকরি আর করব না।
—কেন?
আমার মনিব আমাকে আপনার মতো ভালোবাসে না, আমাকে মারে। দেখবেন স্যার? বলে ছেলেটি জামা তুলে তাঁকে নিজের পিঠটা দেখাল।
শিউরে উঠলেন তার ড্রইং স্যার। তারপর ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ছি! ছি! এমন করে তোকে মেরেছে?
—আমি পালিয়ে এসেছি স্যার।
—বেশ করেছিস। রাগে ঝলসে উঠল স্যারের মুখখানা।
আর এই যে আমার দিদিকে দেখছেন-না স্যার, একে আমি কুড়িয়ে পেয়েছি। সে অনেক কথা, পরে বলব। এখন বাড়ি যাচ্ছি, বলে ছেলেটি সোনালিকে ডাকল, এসো দিদি। তারপর স্যারের চোখের ওপর ভাসতে ভাসতে বাড়ির দিকে চলল।
স্যার কিছু বলবার জন্যে হাত তুললেন, কিন্তু ততক্ষণে তারা হারিয়ে গেছে পথের বাঁকে।
হ্যাঁ তাদের সেই বাড়ির সামনে পৌঁছে গেল ছেলেটি। কিন্তু দেখেশুনে সে অবাক হয়ে গেল। এবাড়িতে তো তার বাবা-মাকে দেখতে পাচ্ছে না সে। এখানে তো অন্য কারা সব বাস করছে। সবই ঠিক আছে, শুধু বাড়ির মানুষগুলি অচেনা। তাদের ওইভাবে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একজন বৃদ্ধ বেরিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কী চাই?
ছেলেটি বলল, না, চাই না কিছু। আমার মা আর বাবা এবাড়িতে ছিল।
বৃদ্ধ জবাব দিলেন, এই বাড়িতে আগে যাঁরা ছিলেন তাঁরা বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। এখন আমরা আছি।
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা বলতে পারেন তাঁরা কোথায় গেছেন?
বলতে পারি না, তবে শুনেছি তাঁরা নদীর ওপারে কোথাও চলে গেছেন, বলে বৃদ্ধ আবার বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন।
ছেলেটি কেমন যেন বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সোনালির মুখের দিকে। সোনালিও নির্বাক থমথম করছে তার মুখখানাও।
কিছুক্ষণ দু-জনেই কে কাকে কী বলবে, কিছুই ভেবে পাচ্ছিল না। দু-জনেই নিশ্চুপ। হঠাৎ সোনালি ডাকল তাকে—তান্না!
তান্না চমকে উঠল। কেননা এই প্রথম সে সোনালির মুখে তার নাম শুনতে পেয়েছে। এত দুঃখেও তার মনটা খুশিতে উছলে উঠল। সে জিজ্ঞেস করল, কী বলছ দিদি?
—নদী এখান থেকে কত দূর?
—অনেক দূর।
—আমরা যেতে পারব না?
—কেন যেতে পারব না! ওই সামনের পথটাই তো নদীর পথ।
—তবে চলো না যাই।
—যাবে? যদি তোমার কষ্ট হয়?
—আমার একটুও কষ্ট হবে না।
—যদি মা আর বাবার জন্যে মন কেমন করে তোমার?
সোনালি একটু চুপ করে কিছু ভাবল। তারপর বলল, আমার মা আর বাবার ঠিকানা তো আমার জানাই আছে, খুঁজলে পেয়ে যাব। কিন্তু তোমার মা আর বাবার ঠিকানা যে হারিয়ে গেছে। সেই ঠিকানাটাই আগে খুঁজে বার করতে হবে। বলে সোনালি হাতটি বাড়িয়ে দিল তান্নার দিকে। দিদির হাতটি ধরে তান্না বললে, তবে চলো।
হাঁটতে হাঁটতে নদীর পথে চলল তান্না আর সোনালি। যতটা সম্ভব দ্রুতই হাঁটল তারা। কিন্তু কতক্ষণই-বা পারবে এত দ্রুত হাঁটতে। খাওয়া নেই, ঘুম নেই। ক্লান্তি ছেয়ে আছে সারাশরীরে। সোনালি তো এরই মধ্যে ক-বার হোঁচট খেল রাস্তায় এলোমেলো পা ফেলে। যদিও ঠাঠা করছে রোদ্দুর, যদিও সারাটা পথ রোদের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তাদের হাঁটতে হয়েছে, হাঁটতে হাঁটতে শহর ফেলে এই জনশূন্য জায়গায় তারা চলে এসেছে, তবু ভালো, তেমন অঘটন কিছু ঘটল না। তবে কষ্ট হয়েছে খুবই। তা হলেই-বা কী করা যায়।
যেখানে এই রাস্তাটা বাঁক নিয়েছে বাঁ-দিক ঘেঁষে, ঠিক তার সামনেই নদী। সোনালি থমকে দাঁড়াল। নদীর দিকে তাকিয়ে সে চমকে গেল। কী মূর্তি নদীর! এপারে দাঁড়িয়ে ওপারটা নজরই করা যায় না। যেমন চওড়া তেমনি স্রোত। এ নদী তারা পার হবে কেমন করে! না আছে নৌকো, না কিছু। সোনালি হতাশ চোখে তান্নার মুখের দিকে তাকাল। কিছু বলতেই যাচ্ছিল সোনালি কিন্তু তার আগে তান্নাই জিজ্ঞেস করল, তুমি সাঁতার জান, দিদি?
না, উত্তর দিল সোনালি। তারপর জিজ্ঞেস করল, তুমি?
আমিও জানি না। জবাব দিল তান্না।
তাহলে ওপারে যাব কেমন করে?
তান্না বলল, চলো এগিয়ে দেখি, যদি নৌকো পাই।
সোনালির যেন আর পা চলতে চাইছিল না, অবশ্য তান্নাকে সেটা বুঝতেই দিল না। নিজের কষ্টটা মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখে তান্নার সঙ্গে নদীর তীরে তীরে নৌকোর খোঁজ করতে লাগল।
হায় রে! নদীতে তারা একটাও নৌকো দেখতে পেল না। আর এদিকে ক্লান্ত পাও যেন আর এগোতে চাইছে না। সত্যিই তাই। হঠাৎ তান্না হোঁচট খেল, ছিটকে পড়ল মাটির ওপর। সোনালি তাড়াতাড়ি তাকে ধরতে গেল, পারল না। বেটাল হয়ে সেও পড়ল তান্নার মতো। তান্নার মতো সেও ধুঁকতে লাগল পড়ে পড়ে। এমন অবস্থা কাউকে যে চেঁচিয়ে ডেকে জল চাইবে সে-ক্ষমতাও নেই তাদের। আর জল চাইলেই-বা কী, কে তাদের ডাকে সাড়া দেবে! এখানে আছেটা কে। শূন্য খাঁ-খাঁ করছে চারিদিক।
সোনালি আর তান্না অনেকক্ষণ কথাই বলতে পারল না। খানিক পরে সোনালি একটু যেন ধাতস্থ হল। তখন সে তার ক্লান্ত চোখের পাতা দুটি মেলে ধরে দেখার চেষ্টা করল এখান থেকে কাছের ওই দেবদারু গাছটা কত কাছে। বুঝতে পারে, খুব দূরে না হলেও ক-পা হাঁটতে হবে। একটু কষ্ট করে ওখানে এক বার পৌঁছোতে পারলে গাছের ছায়া পাবে তারা। জলের বদলে ছায়া পেলেও তারা বাঁচে যেন এখন। তাই সোনালি ডাক দিল, তান্না!
তান্নার উদাস চোখ দুটি স্থির হয়ে চেয়ে রইল সোনালির মুখের দিকে।
সোনালি রুদ্ধ স্বরে বলল, ওইখানে গাছ, ছায়া।
তান্না দেখল।
সোনালি জিজ্ঞেস করল, যেতে পারবে?
তান্না ঘাড় নাড়ল। পারবে সে।
—তবে চলো!
ওখানে জল পাওয়া যাবে? খুব ধরা ধরা গলায় জিজ্ঞেস করল তান্না।
সোনালি উত্তর দিল, জল না পাই, ছায়ার নীচে ঠাণ্ডা বাতাস পাব। তুমি হাঁটতে পারবে তো?
তান্না বলল, তুমি আমায় ধরলে পারব।
সোনালি ধরল। তান্না উঠে দাঁড়াল। দু-জনেই ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলল। অন্যসময় হলে এই পথটুকু তারা চোখের পলকে ছুট দিয়ে পৌঁছে যেত, কিন্তু এখন সত্যিই বড্ড কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে এ পথ যেন যোজন-দূর।
আচ্ছা, দেবদারু গাছটার কাছাকাছি এসে অমন থতোমতো খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল কেন সোনালি আর তান্না! গাছের ছায়ায় কে যেন বসে আছে! ঠিক তার পাশেই একটা ঘোড়া! বোধ হয় তারই কেননা, ঘোড়ার পিঠে বেশ একটা বড়োসড়ো পোঁটলা ঝুলছে। এত বড়ো পোঁটলার পেট-ভরতি কী মালপত্তর আছে কে জানে। ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে, আর লোকটা রুটি চিবোচ্ছে। বয়েস হয়েছে, তা হলেও বেশ শক্তপোক্ত গড়নটা। একমাথা চুল, গাল-ভরতি দাড়ি—চাপ চাপ। এত্তখানি চওড়া বুক। বয়েসকালে যে দেখার মতো স্বাস্থ্য ছিল, সে এখন দেখলেই বোঝা যায়। সে যতক্ষণ খাচ্ছিল, ততক্ষণ সে এক বারও চোখ তোলেনি। কিন্তু খাওয়া শেষ করে জলের বোতল মুখে দিতে গিয়েই সোনালি আর তান্নাকে সে দেখে ফেলল। থমকে গেছে। তাড়াতাড়ি সে উঠে দাঁড়াল। দেখা গেল তার পরনে পাজামা আর কুর্তা। পাশে খোলা চপ্পলটা পায়ে গলিয়ে এগিয়ে গেল। ওদের সামনে এসে অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল, কে রে তোরা? তাকে দেখে সোনালি আর তান্নাও হকচকিয়ে গেছে। মুখে কথা নেই, ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই রইল।
কী হয়েছে তোদের? তাদের অবস্থা দেখে খুবই ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল লোকটি।
সোনালি আর থাকতে পারল না। শেষমেশ বলেই ফেলল, আমাদের একটু জল দেবেন?
সোনালির মুখের কথা পড়তে দিল না। একেবারে সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাতের সেই জলের বোতলটি সোনালির হাতে এগিয়ে দিতেই সোনালি তান্নার গলায় জল ঢেলে দিল ধীরে ধীরে! সেই বোতলের সব জলটাই খেয়ে ফেলল তান্না। আঃ! কী আরাম! জল খেয়ে তান্না বসে পড়ল গাছের নীচে। বিহ্বল চোখে দেখতে লাগল অচেনা মানুষটিকে। দেখতে দেখতে জিজ্ঞেস করল, আর জল নেই? আমার দিদিকে একটু দেবেন না?
লোকটি তেমনি ব্যস্ত হয়েই বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ আছে। বলে তার ঘোড়ার পিঠে বাঁধা সেই পোঁটলার ভেতর থেকে জল-ভরতি আরেকটা বোতল বার করে সোনালির হাতে দিল। তৃষ্ণা মিটিয়ে জল খেল সোনালি। তারপর সেও বসে পড়ল গাছের ছায়ায়। বসে অত্যন্ত কুন্ঠার সঙ্গে বলল, আপনার সব জলটুকুই বোধ হয় আমরা শেষ করে ফেললুম।
লোকটি সেকথার কোনো উত্তর না দিয়ে বলল, মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ কিছু খাওয়াও হয়নি।
উত্তর দিল না সোনালি। হ্যাঁ সত্যিই তো, সেই সকাল থেকেই তারা খায়নি কিছু। কিন্তু তাই বলে কি সেকথা কোনো অচেনা মানুষকে বলা যায়! একটু তৃষ্ণার জল চাইতে তেমন লজ্জা করে না কিন্তু একটুকরো রুটির জন্যে হাত পাততে লজ্জা করে বই কী!
অবিশ্যি হাত তাদের পাততে হল না। সেই লোকটিই আবার ছুটে গেল ঘোড়ার কাছে। সেই পোঁটলাটার ভেতর থেকে দু-খানা রুটি বার করল। তাদের কাছে এসে বলল, সব ফুরিয়ে গেছে এই দু-খানাই আছে। এখন খেয়ে নে তারপর দেখছি।
সোনালির কেমন যেন বাধো-বাধো ঠেকল। বলল, না না, আমাদের তেমন খিদে পায়নি।
সোনালির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তান্না বলল, আমরা নদীর ওপারে যাব। ওখানে মা আর বাবা আছে। আমরা অনেকক্ষণ থেকে নৌকো খুঁজছি, পাচ্ছি না।
লোকটি ভারি নরম গলায় বলল, ঠিক আছে, আমি ওপারে পৌঁছে দেব। ওপারে যেতে নৌকো পাওয়া যায় না, সেতু পেরোতে হবে। তা সেতুও তো এখান থেকে অনেক দূর—সময় লাগবে। অন্তত এখন রুটি দু-খানা দু-জনে খেয়ে নে, নইলে এতখানি পথ যেতে কষ্ট হবে।
না, লজ্জা করলেও আর তারা আপত্তি করল না। একটা রুটি সোনালি নিল আর একটা তান্না। সেই শুকনো রুটি দুটো নিমেষে শেষ করে ফেলল তারা। যদিও খিদে তাদের মিটল না, তবুও মানুষটির দয়ার এমনই অভিভূত হয়ে গেল যে, দু-জনেরই চোখ ছলছলিয়ে উঠল।
লোকটি বলল, চ এবার আমরা যাই। তান্না বলল, আর একটু বসলে হয় না। আপনি তো বললেন, অনেকটা যেতে হবে। আমরা অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছি তো!
লোকটি বলল, না রে বোকা ছেলে, আর হাঁটতে হবে না। আমরা তিন জনে ঘোড়ায় চড়ে যাব।
সোনালি জিজ্ঞেস করল, ঘোড়ার কষ্ট হবে না?
লোকটি হাসল। বলল, আমার ঘোড়া তো আর আমার মতো বুড়ো নয়, একদম জোয়ান। চল উঠে পড়ি।
লোকটার পরনের অমন পোশাক আর ছিরিছাঁদ দেখে কেমন যেন মনে হচ্ছিল সোনালির। ভাবছিল এমন একটা টগবগিয়াল ঘোড়া সে কোত্থেকে পেল! কেমন যেন সন্দেহ হয়। লোকটা আবার পিসেমশাইয়ের মতো ডাকাত নয় তো! তবে ডাকাত হোক আর যাই হোক, লোকটার দয়ামায়া আছে। সুতরাং আর দোনোমোনো না করে ঘোড়ায় চড়ার জন্যে এগিয়ে গেল। তান্না আর সোনালির চেয়ে ঘোড়াটা অনেক উঁচু, কাজেই লোকটি দু-জনকেই ধরাধরি করে ঘোড়ার পিঠে তুলে দিল। সোনালি অবশ্য নিজেই একবার ঘোড়ার পিঠে উঠেছিল। সে তো ইস্কুলে, পুলিশের বড়োবাবুর ঘোড়া। এবারও উঠতে পারত কিন্তু পা দিয়ে এ ঘোড়াটার পিঠে ওঠার তো রেকাব নেই। ঘোড়ার পিঠে উঠে তান্নার যদিও একটু একটু ভয় করছিল, সোনালির কিন্তু একটুও ভয় করছিল না। দু-জনকে বসিয়ে এবার লোকটিও উঠে পড়ল। লাগাম ধরে হাঁক দিল, চল রে জয়কুমার।
তান্না ছোটো বলে মধ্যিখানে বসেছিল আর তার পেছনে সোনালি। ঘোড়াটা তার মনিবের হুকুম শুনে যেই ছুটতে শুরু করেছে, কী ঘাবড়ে গেছে তান্না। তাড়াতাড়ি লোকটিকে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। লোকটি হেসে ফেলেছে। জিজ্ঞেস করল, কী রে, ভয় করছে?
তান্না ভয়ের লজ্জাটাকে লুকিয়ে ফেলার জন্যে সঙ্গে সঙ্গে বলল, আপনার ঘোড়ার নাম জয়কুমার?
—হ্যাঁ।
—খুব ভালো নাম।
—আমার আরেকটা ঘোড়া ছিল, তার নাম রেখেছিলুম বাহাদুর। তাকে নিয়ে আমি সার্কাসে খেলা দেখাতুম।
তান্না অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, আপনি ঘোড়ার খেলা জানেন?
লোকটি মুখে শব্দ করে হাসল।
—কী খেলা জানেন?
—সে কত রকমের খেলা। ধরো ঘোড়া ছুটছে, মাটির ওপর দাঁড়িয়ে ভল্ট মেরে ঘোড়ার পিঠে বসে পড়ছি। ঘোড়ার পিঠে দাঁড়িয়ে একটা-দুটো-তিনটে ডিগবাজি মেরে মাটিতে নেমে পড়ছি। একটি ছোট্ট মেয়েকে কাঁধে নিয়ে ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে কসরত দেখাচ্ছি—সে কত খেলা।
—এখনও পারেন?
—এখন আমার বয়েস হয়ে গেছে। তেমন না পারলেও একটু একটু পারি বই কী।
তখন সোনালির মা আর বাবার কথা মনে পড়ে গেল। মনে হল তার আহা রে সেও যদি ঘোড়ার খেলা জানত! তাহলে কি আর তার বাবাকে পিসির কাছে অত কথা শুনতে হত! সোনালি সার্কাসে খেলা দেখিয়ে নিজেই পয়সা উপায় করে আনত। তখন কোনো চিন্তাই থাকত না তার বাবার।
কিন্তু এ তো মিথ্যেই ভাবা।
ঘোড়ার পিঠে বসে বেশ খানিক পথ তারা পেছনে ফেলে এল। এখন তারা লোকজনও দেখতে পাচ্ছে, দোকানপাটও নজরে পড়ছে। লোকটি ঘোড়া থামিয়ে বলল, দাঁড়া কিছু খাবার কিনে আনি। বলে লোকটি ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে জলের বোতল নিয়ে দোকানের দিকে এগিয়ে গেল। ঠিক তক্ষুনি তান্না চুপিচুপি সোনালিকে বলল, ভাগ্যিস লোকটিকে দেখতে পেয়েছিলুম। বেশ ভালো না?
সোনালি কথার উত্তর না দিয়ে ঘাড় নাড়ল।
দেখতে দেখতে লোকটি খাবার নিয়ে হাজির। বলল, নে তোরা খেয়ে নে।
আপনার? তান্না জিজ্ঞেস করল।
আমারও আছে। উত্তর দিল লোকটি।
—খেলেন না?
—পরে খাব, আগে তোদের বাড়ি পৌঁছে দিই।
খাওয়া শেষ হতে আবার ঘোড়া ছুটল।
আরেকটু গেলেই সেতু। সোনালি চুপচাপ চলেছে। যদিও তান্নাকে নিয়ে তার তেমন কোনো ভয় নেই, তবে এই অচেনা লোকটি সম্পর্কে তার সন্দেহ যে এখনও দূর হয়েছে সেকথা বলা যায় না।
হঠাৎ লোকটি বলল, দেখেছিস তোদের নাম জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি।
তান্নার উত্তর দিতে তর সইল না। বলল, আমি অর্জুন, তবে ডাকনাম তান্না।
—আর তোর কী নাম রে মেয়ে?
—আমি সোনালি।
—বা:।
এবার তান্নার মনে হল, লোকটিকে জিজ্ঞেস করে, আপনি কে? কিন্তু সে-সুযোগ তার এল না। লোকটিই জিজ্ঞেস করল, দেখতে পাচ্ছিস?
সোনালি আর তান্না দু-জনেই উদগ্রীব হয়ে সামনে তাকাল। তান্না চেঁচিয়ে উঠল, ওই তো সেতু।
আরেকটু যেতেই সেতুর ওপর ঘোড়ার পায়ের শব্দ বেজে উঠল, টগবগ টগবগ। নীচে একূল-ওকূল দু-কূল ছাপিয়ে বয়ে চলেছে নদী। আর সেতুর ওপরে ঘোড়ার পিঠে বসে সোনালির মনে ভেসে বেড়াচ্ছে হাজারটা চিন্তা। সে ভাবছে, তান্না যখন তার মাকে আর বাবাকে ফিরে পাবে তখন সে কী করবে?
সেতু পেরিয়ে নদীর এপারে আসতেই লোকটি জিজ্ঞেস করল, কোনদিকে তোদের বাড়ি?
তান্না বলল, খুঁজতে হবে।
সে জিজ্ঞেস করল, ঠিকানা আছে তো?
তান্না বলল, ঠিকানা তো জানি না।
—সে কী রে? লোকটি অবাক হল।
তান্না বলল, আসলে আমরা যেখানে থাকতুম, বাবা সেখান থেকে এখানে কোথাও চলে এসেছে। আমাকে খুঁজে বার করতে হবে।
লোকটি বলল, জায়গাটা তো একটুখানি নয়, কোথায় খুঁজবি?
তান্না বলল, আর আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। আমাদের ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে দিন, এবার আমরা খুঁজে বার করে নিচ্ছি।
লোকটি বলল, তাই কখনো হয়? তোদের পৌঁছে দিয়ে তবে আমার ছুটি।
তখনও বিকেল যায়নি। ঘোড়া ছুটিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজে বেড়াতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কোথায় তার মা-বাবা আছে সেটা বার করা কি চাট্টিখানি ব্যাপার। শহরের আনাচেকানাচে তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছু হদিশ করা গেল না। তখন সন্ধেও হয়ে এসেছে। সুতরাং লোকটি হতাশ স্বরে বলল, না রে, হল না।
তান্নার কান্না পেয়ে গেল।
লোকটি বলল, আজ আমার সঙ্গে চ তোরা। তারপর কাল আবার দেখা যাবে।
—আপনার বাড়ি কত দূরে?
—আমার বাড়ি নেই।
বিস্ময়ে চমকে উঠল সোনালি।
—আমি মুসাফির। আমার বাড়ি খোলা আকাশের নীচে, সবখানে। আমি পথে পথে ঘুরে বেড়াই। রাতের অন্ধকারে তাঁবু ফেলে শুয়ে থাকি মাঠেঘাটে। ঘোড়ার খেলা দেখিয়ে পয়সা উপায় করে খাবার কিনি। আমি একা, কেউ নেই আমার।
হতবাক হয়ে সোনালি শুনছিল তার কথা। ইচ্ছে করছিল জিজ্ঞেস করে, তবে কি কেউ কোনোদিন ছিল না? না সেকথা সোনালি জিজ্ঞেস করল না। কিন্তু এক ভয়ংকর দুশ্চিন্তা তার মাথায় চেপে বসল, এখন তার কী হবে! অবিশ্যি আজ রাতটা যেমন করে হোক তাকে ওই মুসাফিরের তাঁবুতেই থাকতে হবে। তারপর যা হবার, সে হবে কাল।
খানিক পরে সত্যিই একটা ফাঁকা জায়গায় এসে থামল সেই মুসাফির লোকটি। বলল, আজ রাতে আমরা এখানেই তাঁবু ফেলব। জায়গাটা ভালো, খোলামেলা। কাছেপিঠে নদীও আছে।
সুতরাং তিন জনেই ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ল। মুসাফির ঘোড়ার পিঠে বাঁধা পোঁটলার ভেতর থেকে তাঁবু বার করল। সত্যি, কী নেই তাঁবুর মধ্যে! ঘটি-বাটি থেকে শুরু করে ঘোড়ার ছোলাদানা পর্যন্ত রয়েছে।
তাঁবু খাটানো হল। তাঁবুতে লণ্ঠন জ্বলল। কিছু খাওয়াদাওয়া হল। আর যেন পারছিল না তান্না সোনালি কেউই। শুয়ে পড়ল। দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল তান্না। কিন্তু সোনালির চোখে ঘুম ছুঁই ছুঁই করেও যে পালিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। সে ছটফট করছিল। বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিল মা আর বাবার কথা। আঁতকে উঠছিল পিসেমশাইয়ের সেই বীভৎস চেহারাটার কথা ভেবে।
—কী রে সোনালি, ছটফট করছিস কেন? ঘুম আসছে না?
মুসাফির লোকটি আচমকা জিজ্ঞেস করল।
সোনালি হকচকিয়ে গেছে।
—নে নে, ঘুমিয়ে পড়। সারাদিন কী কষ্টটাই-না গেছে তোদের। তান্না তো অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
হঠাৎ কোথাও কিছু নেই সোনালি উঠে বসল।
—কী রে, উঠলি কেন?
আপনাকে একটা কথা বলব? অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল সোনালি।
—কী?
—আপনি আমাকে ঘোড়ার খেলা শিখিয়ে দেবেন?
—তুই?
—হ্যাঁ।
—কী হল হঠাৎ?
চুপ করে গেল সোনালি।
তোর মা-বাবা রাজি হবে? আবার জিজ্ঞেস করল লোকটি। এবার সোনালি কথা বলল। তার গলায় যেন কান্নার কাঁপা শব্দ। সে বলল, আমার বাবা কাজ করতে পারে না। গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, তারপর বিছানা থেকে বাবা উঠতে পারে না। আমাদের যা পয়সা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। বলেই সোনালি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
লোকটি হতচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, কাঁদছিস কেন?
সোনালি হাঁটুর ওপর নিজের মুখখানি রেখে অঝোরে চোখের জল ফেলতে লাগল।
মুসাফির লোকটি এবার সোনালির কাছে এগিয়ে এল। মাথায় হাত রাখল। সোনালি লোকটির সেই স্পর্শে আর নিজেকে সামলাতে পারল না, আকুল হয়ে বলল, আপনি আমায় বাঁচান।
লোকটি বলল, কিছু ভয় নেই তোর, বল কী হয়েছে?
সোনালি তেমনি কাঁদতে কাঁদতেই বলল, এই যে তান্নাকে দেখছেন, তান্না আমার ভাই নয়। ভাই নয়? অবাক হল লোকটি।
তান্না আমার ভাইয়ের চেয়েও বড়ো। আমার পিসেমশাই আমাকে মেরে ফেলার জন্যে... আর বলতে পারল না সোনালি। সে এবার হাউহাউ করে কেঁদে ফেলল।
মুসাফির লোকটি অনেক কষ্টে তাকে ভোলাল। তারপর একে-একে সব শুনল সোনালির মুখ থেকে। শুনল তার বাবার কথা, মা-র কথা, পিসি-পিসেমশাই-টুসাই, সব্বার কথা। আর শুনল তান্নার কথা। সব শুনে জিজ্ঞেস করল, তুই ঘোড়ার খেলা শিখে কী করবি?
—পয়সা উপায় করব। বাবা আর মাকে পিসির বাড়ি থেকে নিয়ে আসব।
—তোর পিসিরা কোথায় থাকে?
—রাস্তা ভুলে গেছি, ঠিকানা জানি।
—ঠিক আছে, রাস্তা আমি খুঁজে বার করে নেব। কিন্তু ঘোড়ার খেলা শেখা, সে-যে খুব শক্ত।
সোনালি বলল, শক্ত হলেও আমাকে শিখতে হবে। আমি পারব। ঠিক পারব।
—ঠিক আছে কাল দেখব, এখন ঘুমিয়ে পড়। খুব সকাল সকাল উঠতে হবে। কাল সকাল থেকেই তোকে খেলা শেখাব। নে, আর কাঁদিস না।
সোনালি আবার শুয়ে পড়ল।
বাইরে খোলা মাঠ, নিস্তব্ধ। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেঙে নদীর তীরে জলের ঢেউ উপচে পড়ছে। কখনো কখনো ঘুমের ঘোরে মুসাফিরের ঘোড়া পা ঠুকে মশা তাড়াচ্ছে। পাশে শুয়ে তান্না অকাতরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নিশ্বাস ফেলছে। ঘুমিয়ে পড়ল সোনালি।
আশ্চর্য, এত যে ধকল গেছে কাল থেকে, দু-দিন ধরে দু-চোখ যে এক করতে পারেনি, সেই মেয়ে কী করে যে আজ এত ভোরে উঠে পড়ল কে জানে! তান্না কিন্তু তখনও ঘুমোচ্ছে। এমনকী ঘুম থেকে উঠে সোনালি মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে যখন সামনের ওই ফাঁকা মাঠে খেলা শুরু করে দিল, তখনও পর্যন্ত তার ঘুম ভাঙল না।
সত্যি, বাহাদুর বলতে হয় সোনালিকে। ঘোড়ার পিঠে চড়ার জন্যে এবার আর তাকে সাহায্য করতে হল না। নিজেই উঠল। নিজেই ঘোড়ার লাগাম ধরে ঘোড়াকে তির বেগে ছোটাতে শুরু করে দিলে। মুসাফির দেখে তো থ। সোনালির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে নিজের মনে বলে ফেলল, শাবাস।
আজ একটা খেলার অনেকখানি খুব সহজেই শিখে ফেলল সোনালি। খেলাটা কিন্তু খুব শক্ত। ঘোড়া ছুটছে গোল হয়ে। ধরো তুমি সেই গোলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছ। ঘোড়া ছুটতে ছুটতে যেই তোমার সামনে আসবে, তোমাকে চোখের পলকে তার পিঠের ওপর লাফিয়ে উঠতে হবে। ঘোড়া তখনও ছুটছে। সেই ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে সটান দাঁড়িয়ে দু-পাশে দু-হাত ছড়িয়ে আর পেছনে এক-পা তুলে তোমাকে এমনভাবে দাঁড়াতে হবে, দেখলেই মনে হবে তুমি যেন একটি পরি। কী সুন্দর!
সাত দিন ধরে মুসাফিরের কাছে খেলা শিখল সোনালি। খেলা শেখার ফাঁকে ফাঁকে এই সাত দিন অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তান্নার মা আর বাবার কোনো খবরও পাওয়া গেল না। ভারি মন খারাপ হয়ে গেল তান্নার। শেষমেষ তান্নাও সোনালির সঙ্গে ঘোড়ার খেলা শিখতে শুরু করে দিলে। তবে সোনালি যেমন প্রথম থেকেই ওস্তাদ, তান্না অবিশ্যি ততটা নয়। কিন্তু যখন ধীরে ধীরে সবটা শিখে ফেলল, তখন তাকেও তুমি শাবাশ না দিয়ে পারবে না। বিশেষ করে সেই খেলাটা, সেই যে সোনালি ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে দাঁড়াল, দু-পাশে দু-হাত বাড়াল আর অমনি সঙ্গে সঙ্গে তান্নাও ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে উঠে সোনালির দু-হাতের ওপর দু-পা রেখে সিধে দাঁড়িয়ে পড়ল। উঃ! সে কী রুদ্ধশ্বাস খেলা! একবার ফসকে গেলেই ব্যাস! নির্ঘাত মরণ!
নদীর ওপার থেকে এপারে একদিন আবার ফিরে এল সোনালিরা। ওপারে খেলা শিখে এপারে প্রথম যেদিন মুসাফিরের হাতে ঢোলক বেজে উঠল, সোনালি প্রথম যেদিন তান্নাকে নিয়ে সবার সামনে ঘোড়ার খেলা শুরু করল, সেদিনও কিন্তু তাদের গায়ে সেই পুরোনো জামা। কিন্তু প্রথম দিনের খেলা দেখেই হইহই পড়ে গেল। প্রথম দিনে খেলা দেখার জন্যে যদি হয় পঞ্চাশ জন দর্শক, তবে দ্বিতীয় দিনে দু-শো, তারপরে পাঁচ-শো, হাজার। শেষে অসংখ্য মানুষ। কত পয়সা পাচ্ছে। এখন তাদের সেই পুরোনো পোশাক নতুন হয়েছে। সোনালির যদি হয় সোনা রং জামা, সাদা রং পাজামা আর নানা রং পাথরের জমকালো মুকুট; তবে তান্নার গায়ে গায়ে ফুল আঁকা পোশাকের রং-ঝরা রোশনাই। আর তেমনি সেজেছে ঘোড়া জয়কুমার। মাথায় পালকের বাহারি সাজ, গায়ে জরির ঝালর। কিন্তু মুসাফির যেমনকে তেমন। অবিশ্যি খেলা শুরু হলে সে যেন অন্য মানুষ। যেন অদ্ভুত এক জাদুকর।
এমনই করে খেলা দেখায় তারা এখান থেকে আর একখানে। পয়সা জমে। দিনের শেষে তাঁবু খাটায় খোলা মাঠে। রাতের শেষে তাঁবু গুটিয়ে আবার চলে আরও কোথাও—ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে। যদিও-বা তান্না পারে ভুলে থাকতে, সোনালি পারে না। সবসময় ভাবে সোনালি কবে যাবে বাবার কাছে!
এমনই চলতে চলতে হঠাৎ একদিন মুসাফির জিজ্ঞেস করল, সোনালি, পিসির বাড়ির ঠিকানাটা ভুলে যাসনি তো?
কাগজে লিখে রেখেছি। সোনালি উত্তর দিল।
—দেখি কাগজটা।
সোনালি বার করে দিল।
এবার মুসাফির তান্নাকে জিজ্ঞেস করল, তান্না তুই পারবি তো তোর সেই চায়ের দোকানটা খুঁজে বার করতে?
আলবত। উত্তর দিল তান্না।
—তবে চ, আজ আমাদের খেলা হবে তোর সেই চায়ের দোকানের সামনে। খেলা দেখাবার জায়গা আছে তো?
—মাঠ আছে তান্নার গলায় উত্তেজনা।
তারপর ঘোড়ার পিঠে তিন জনেই সেই পথে চলল।
সোনালি বোধ হয় ভয় পেল। জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা, চায়ের দোকানের লোকটা যদি তান্নাকে ধরে রাখে, আবার মারে?
মুসাফির হাসল। সে বড়ো তাচ্ছিল্যের হাসি।
অনেকটা পথ পার করে তারা ঠিক সেই চায়ের দোকানের কাছ বরাবরই চলে এল।
তান্না বলল, ওই দোকানটা।
সোনালি ভয়ে ভয়ে তাকাল সেই দিকে। আর মুসাফির চট করে একবার দোকানের ওপর চোখ বুলিয়ে তান্নাকে জিজ্ঞেস করল, কই মাঠ?
তান্না বলল, ওই যে!
মুসাফির মাঠটা দূর থেকে দেখে কাছে গিয়ে বলল, এখনই খেলা শুরু হবে।
মাঠে তাঁবু পড়ল।
তাঁবুর ভেতর সোনালি আর তান্না সাজগোজ করতে লাগল। আর মুসাফির মাঠের মধ্যিখানে ঢোলক নিয়ে গান শুরু করে দিলে। শহরজুড়ে সোনালি আর তান্নার অবাক করা ঘোড়ার খেলার খবরটা অনেক আগেই সবাই শুনেছে। এদিকের মানুষ তো আর ওদিকের খেলা দেখেনি, তাই এদিকে খেলার খবরটা যখন সব দিকে ছড়িয়ে পড়ল তখন হইহই করে মানুষ ছুটে এল খেলা দেখতে। মাঠটা যখন ভিড়ে উপচে গেল, তক্ষুনি, ঠিক তক্ষুনি সোনালি আর তান্না তাঁবুর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ঘোড়ার পিঠে মারল লাফ। ঘোড়া মারল ছুট। সেই ভিড়ের মাথা টপকে ঘোড়া পড়ল মাঠের মধ্যিখানে। তারপর শুরু হয়ে গেল হাততালি আর খুশির হট্টগোল।
খেলা হচ্ছে। ঢোলক বাজছে মুসাফিরের। সতর্ক দৃষ্টি তার এদিক-ওদিক।
ভিড়ের মধ্যে দেখতে পাচ্ছ সেই চা-মালিককে? হ্যাঁ, ওই তো এসেছে।
দ্যাখো দ্যাখো, চা-মালিক কেমন চোখ বড়ো বড়ো করে খেলা দেখছে! ও কি চিনতে পারছে না তান্নাকে? হয়তো তাই। অমন সুন্দর সাজপোশাক পরেছে তান্না, চেনা যায় কখনো?
কিন্তু দেখতে দেখতে কেমন যেন ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল তার চোখে। কেমন যেন চেনা চেনা লাগছিল তার ছেলেটাকে।
হ্যাঁ, ঠিক তাই। হঠাৎ চা-ওয়ালা চিৎকার করে উঠল, ওই যে হতচ্ছাড়া তান্না!
তান্না চমকে উঠেছে।
মুসাফির ফিরে তাকাল।
তান্না ঘোড়ার পিঠ থেকে ডিগবাজি মেরে লাফিয়ে পড়ল একেবারে মাটিতে। ঠিক চা-মালিকের সামনে। চা-মালিক খপাত করে তান্নাকে ধরে ফেলে ঠাস ঠাস করে গালে দুই চড় মেরে ধমকে উঠল, শয়তান!
অমনি হল কী, কে কী বুঝল কে জানে, তান্নাকে মারতেই সেই জমায়েত জনতা মার মার করে তেড়ে গেল চা-ওয়ালাকে। চা-ওয়ালা আরে শোনো ভাই, মেরো না ভাই বলে যত চিৎকার করে, লোকেরা ততই বেধড়ক ঘুসি-চড় চালিয়ে লোকটাকে একেবারে আধমরা করে ছাড়ে। তারা কেউ বলে, ছি ছি, অমন বাহাদুর ছেলেটাকে শুধুমুধু মারল।
কেউ বলল নাহয় লোকটার সামনেই লাফিয়ে পড়েছে ছেলেটা। সে তো আর ইচ্ছে করে নয়। খেলতে খেলতে অমন হয়েই থাকে। তাই বলে ওইটুকু ছেলেকে চড় মারবে!
চা-ওয়ালা মার খেয়ে সেখান থেকে দে চম্পট। আর যদি বেশি তক্কাতক্কি করত, তাহলে তাকে হয়তো ছিঁড়েই খেয়ে ফেলত সবাই।
যাই হোক, শেষ অবধি খেলা হল। শেষ খেলাটি শেষ হতে সবাই একেবারে ছুটে গিয়ে সোনালি আর তান্নাকে নিয়ে খুশির আনন্দে নাচানাচি শুরু করে দিলে। সে কী হইহই কান্ড! তারপর ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল। রাত নেমে এল।
—মুসাফির রাতের বেলা তাঁবুর ভেতর শুয়ে শুয়ে ডাকল তান্না।
—কী রে?
—তোমার খুব বুদ্ধি।
—কিন্তু তোর তো গালে দুটো চড় পড়ল।
—তা হোক। চা-মালিকেরও তো নাক ফাটল। ঠিক হয়েছে, যেমন কর্ম তেমনি ফল।
মুসাফির হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, দ্যাখ-না কাল আবার কী হয়।
কাল কী হবে? জিজ্ঞেস করল তান্না।
মুসাফির উত্তর দিল, কালকের কথা কাল হবে আজ ঘুমো।
তাঁবুর লণ্ঠন নিভে গেল। ওরা ঘুমিয়ে পড়ল।

তার কোমরে বাঁধা দড়ির গোড়াটা মুসাফিরের হাতে
ঘোড়ার পিঠে সোনালি আর তান্নার আজব খেলার গল্প এখন মুখে মুখে। ওই ফুটফুটে মেয়ে সোনালিকে আজ আর কে না-চেনে। কে না-জানে ওই ছটফটে ছেলে তান্নাকে। মুসাফির কত কষ্ট করে নিজের হাতে গড়েছে তাদের। তবে তুমি জয়কুমারের কথা বাদ দিতে পারো না। কী ওস্তাদ ঘোড়া বলো!
মুসাফির তো জানতই, যেদিন ওদের খুব নামডাক হবে, সেদিন ওদের আর কোনো দুঃখই থাকবে না। ফিরে আসবে সুখের জীবন। ফিরে পাবে সব কিছু। তারপর মুসাফির ওদের কাছে বিদায়ও নেবে। পাড়ি দেবে আরেক দেশে—নি:সঙ্গ একাকী।
তাঁবুর ভেতর গভীর রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গিয়েছিল মুসাফিরের। এমনিতে খুব সজাগ ঘুম তার। হঠাৎ পায়ের শব্দ, কানে এল অস্পষ্ট। কানে এল। চোখে পড়ল, কে যেন তাঁবুর পর্দা সরিয়ে খুব সতর্ক চোখে উঁকি মারছে। এ সেই চা-মালিক নয়তো? রাতের অন্ধকারে এসেছে প্রতিশোধ নিতে! নিজের ঘুম-ভাঙা চোখ লুকিয়ে রেখে চুপটি করে শুয়ে রইল মুসাফির। লোকটা আলতো পায়ে ঢুকে পড়ল তাঁবুর ভেতর। তার সন্ধানী-চোখ সোনালির মুখের ওপর গিয়ে থমকে দাঁড়াল। ঘুমে অচেতন সোনালি। সোনালির গলাটা টিপে ধরবার জন্যে হাত বাড়াল সে। তার আগেই মুসাফির একেবারে চোখের পলকে জাপটে ধরেছে দু-হাত দিয়ে। লোকটা একদম থতোমতো খেয়ে গেছে। সোনালির গলা টিপবে কী, প্রাণপণে মুসাফিরের সঙ্গে ঝটাপটি লাগিয়ে দিলে। মুসাফিরের হাত ফশকে গেছে সেই ঝটাপটিতে। লোকটা তাঁবুর ভেতর থেকে মারল ছুট। বেরিয়ে এসেছে মুসাফিরও। ততক্ষণে সেও অনেকখানি এগিয়ে গেছে। গেলে কী হবে, মুসাফিরের তো ঘোড়া আছে। মুসাফির ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে বসল। ছুটল ঘোড়া। কতক্ষণ আর লাগবে! দু-কদম ছুটতেই ঘোড়া ধরে ফেলেছে তাকে। লোকটা আর না ছুটে ঘুরে দাঁড়াল একেবারে ঘোড়ার মুখোমুখি। ঘোড়া মারল এক ধাক্কা, সে ছিটকে পড়ল মাটিতে। মুসাফিরও ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ল তার ঘাড়ে। তারপর লেগে গেল ধস্তাধস্তি। সহজে ছেড়ে দেবার পাত্র নয় লোকটা। তার কোমরে ছুরি। সেটা বার করার জন্যে সে কোমরে হাত দিতেই, মুসাফিরও খামচে ধরল তার সেই হাতটা। তারপর চলল টানাটানি। দু-জনেই ছুরিটা নেবার জন্যে পাঞ্জা কষতে লাগল। হঠাৎ সুযোগ পেয়ে গেল মুসাফির, লোকটার মুখের ওপর একখানা টেনে ঘুসি চালিয়ে দিলে। মুখ সামলাতে গিয়ে তার কোমর থেকে হাত গেল সরে। সেই তক্কে মুসাফিরও বার করে নিল ছুরিটা তার কোমর থেকে। তার বুকের ওপর ছুরিটা উঁচিয়ে ধরে জিজ্ঞেস করলে, কে তুই?
তখন তার মুখ দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে। সে হাঁপাচ্ছে।
—বল, নইলে এই ছুরি তোর বুকে বসবে।
তবু সে হাঁপাতেই লাগল।
মুসাফির এবার লোকটার চুলের মুঠি ধরে মাটিতে ঠুকতে ঠুকতে গর্জে উঠল, —বল, বল, বল।
প্রচন্ড যন্ত্রণায় ছটফট করে সে কবুল করে ফেলল, আমি সোনালির পিসেমশাই।
—ও। থমকে গেল মুসাফির। —তুমিই সেই শয়তান! কোথায় সোনালির মা-বাবা?
—আমি জানি না।
—মিথ্যে কথা বলছিস। বল তারা কোথায়? বলে মুসাফির তার গলাটা টিপে ধরল।
একটা অসহায় শিশুর মতো কেঁদে উঠে সে বলল, আমায় মেরো না, আমি সব বলছি।
—তাড়াতাড়ি বল, ধমক মারল মুসাফির।
সে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল, সোনালির মা-বাবা আমার বাড়িতে ছিল এখন নেই। তারা চলে গেছে।
—আবার মিথ্যে বলছিস! মুসাফির তার চুলের মুঠিটা খামচে ধরে এমন টানতে লাগল যে, সে চিৎকার করে বলে ফেলল, তাদের আমি লুকিয়ে রেখেছি।
—আমাকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে পারবি?
—পারব।
তবে আয়, বলে মুসাফির তাকে টানতে টানতে আবার তাঁবুর ভেতর নিয়ে এল। তখনও ঘুমোচ্ছে সোনালি আর তান্না। মুসাফির তার পেটমোটা পোঁটলাটার ভেতর থেকে দড়ি বার করে তার হাত দুটো বেঁধে ফেলল। তারপর আর একটা লম্বা দড়ি দিয়ে কোমরটা বাঁধল। বেঁধে সোনালি আর তান্নাকে ডাক দিল। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি গেছে, এখন দু-জনেই ঘুমে অচেতন। মুসাফিরের ডাক শুনে দু-জনেই ধড়ফড় করে উঠে পড়ল। সোনালি চোখ কচলে চমকে উঠেছে। এ যে তার পিসেমশাই! তান্নাও অবাক তাকে দেখে। ইনি যে সেই মহাপ্রভু!
সোনালি একে চিনতে পারছিস? লণ্ঠনটা জ্বেলে লণ্ঠনের আলো তার মুখের কাছে এনে মুসাফির জিজ্ঞেস করল।
সোনালি নিষ্পলক চোখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, পিসেমশাই!
তান্না বলল, হ্যাঁ, আমিও চিনি।
মুসাফির বলল, তাড়াতাড়ি উঠে পড়। আমাদের এক্ষুনি যেতে হবে।
কোথায়? দু-জনে প্রায় একইসঙ্গে জিজ্ঞেস করল।
গেলে জানতে পারবি। উত্তর দিল মুসাফির।
সুতরাং তারা উঠে পড়ল। তাঁবুটা তারা আবার গুটিয়ে ফেলে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসল। বসল মুসাফির, তান্না আর সোনালি। দাঁড়িয়ে রইল সোনালির পিসেমশাই মাটিতে। তার হাত বাঁধা। তার কোমরে বাঁধা দড়ির গোড়াটা মুসাফিরের হাতে। ঘোড়া ছুটল। দড়িতে টান পড়ল। সোনালির পিসেমশাই হোঁচট খেতে খেতে ছুটতে লাগল ঘোড়ার পিছু পিছু।
একটুখানি গিয়েই মুসাফির চ্যাঁচাল, কোন দিকে?
—বাঁ-দিকে।
আরও খানিকটা ছুটে মুসাফির জিজ্ঞেস করল, এরপর কোন দিকে?
—ডান দিকে। সোনালির পিসেমশাই হাঁপাচ্ছে। রাস্তার ঢিল-পাথরে পা কাটছে।
খানিক পরে ডান দিকটা পেরিয়ে মুসাফির হাঁক পাড়ল, এরপর?
—সামনে।
তখন প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। সামনে ঘোড়া থামল। সক্কলে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ল।
কই তারা? কড়া গলায় জিজ্ঞেস করল মুসাফির।
ওইখানে, বলে বিধ্বস্ত শরীরটা টানতে টানতে এগিয়ে চলল সোনালির পিসেমশাই।
এদিকে বেশ জঙ্গল। জঙ্গলের গভীরে একটা ভাঙা বাড়ি। তার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, এর ভেতর।
ওরা দরজার শেকল ভেঙে ভেতরে ঢুকল। চমকে উঠল। সামনেই সোনালির মা আর বাবা। সোনালি চিৎকার করে উঠল, মা, আমার বাবা। জড়িয়ে ধরল মাকে।
সোনালিকে দেখে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেছে মায়ের বুকের ভেতরটা। সোনালির বাবার চোখে যেন অসম্ভব স্বপ্নের মতো একটা ছবি ভেসে উঠছে। যেদিন থেকে সোনালি নেই, সেদিন থেকে ওঁদের চোখে ঘুমও নেই। ওঁরা যেন মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছেন এই অন্ধকার গহ্বরে। সোনালির মুখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ উন্মাদের মতো চেঁচিয়ে উঠলেন সোনালির বাবা, —সোনা, আমার সোনা।
সঙ্গে সঙ্গে মায়ের সেই পলকহীন চোখে নেমে এল মেঘ-ভাঙা আকাশের কান্না!
আর কাঁদলে হবে না মা, এবার তোমাদের যেতে হবে, হঠাৎ মুসাফির বলল। এখানে বেশিক্ষণ থাকলে আমাদের বিপদ হতে পারে। যে শয়তানটা তোমাদের এখানে বন্দি করে রেখেছে, সেই শয়তানের জন্যে এইটাই উপযুক্ত জায়গা। উঠে এসো মা! শয়তানটাকে এখানে নিশ্চিন্তে থাকতে দাও! বলে মুসাফির সোনালির পিসেমশাইকে সেই ঘরে ঠেলে ফেলে দিলে। পিসেমশাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল আর উঠতে পারল না। পড়ে পড়ে ধুঁকতে লাগল।
একী, সোনালির বাবা উঠে দাঁড়ালেন কেমন করে! তবে কি তিনি ভালো হয়ে গেছেন! হ্যাঁ, তিনি উঠতে পারছেন। মুসাফিরের কাঁধে হাত রেখে তিনি ধীরে ধীরে সেই অন্ধকার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। বেরিয়ে এলেন সোনালির মা। তারপর সেই ঘরের দরজায় শেকল এঁটে দিল মুসাফির। ঘরের ভেতর আর্তনাদ করে চেঁচিয়ে উঠল পিসেমশাই, আমায় বাঁচাও!
কেউ সাড়া দিল না।
মুসাফির বলল, সোনালি, আমাদের অর্ধেক জয় হয়েছে। আর অর্ধেক বাকি। তুমি তোমার মাকে, বাবাকে ফিরে পেয়েছ। এবার আমাদের খুঁজতে হবে তান্নার মা আর বাবাকে। সে-কাজের শুরু আমাদের এখন থেকেই। চলো।
সোনালি তান্নার হাত ধরল।
মুসাফির আবার বলল, তোমার মা আর বাবা যাবেন জয়কুমারের পিঠে চেপে। কারণ তোমার বাবা এখনও হাঁটতে কষ্ট পান। তোমার মা ক্লান্ত। আমরা চলব পায়ে পায়ে হেঁটে হেঁটে, জয়কুমারের সামনে। পারবে না?
পারব। অনেকখানি খুশির শব্দে সোনালি চেঁচিয়ে উঠল।
—তান্না তুমি?
আমিও পারব। তান্না যেন আরও জোরে চিৎকার করে উঠল।
—তবে এগিয়ে এসো।
হ্যাঁ, ঘোড়ার পিঠে বসল সোনালির মা আর বাবা। পথে পথে হেঁটে চলল ওরা তিন জন—মুসাফির, সোনালি আর তান্না। ওরা যখন হাঁটতে হাঁটতে গান গায়, তখন তুমি কান পাতলে শুনতে পাবে, সেই অন্ধকার ঘরে পিসেমশাইয়ের আর্তনাদ, —আমায় বাঁচাও, বাঁচাও!
তোমাদের সেই খুশির খবরটা জানিয়ে দিই, তান্নাও তার মা আর বাবাকে ফিরে পেয়েছে। আর মুসাফিরও বন্ধু হয়ে থেকে গেছে সোনালি আর তান্নার কাছে। কী ভালো! তাই না?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন