মতি নন্দী
আমাদের এত আনন্দের বাড়িটা হঠাৎ কেমন যেন হয়ে গেল। সেই দাদির কথা মনে পড়ছে। বলতেন, সময় কখনও এক রকম যায় না। অন্য-অন্য দিন, বাবা এই সময় বাগানে গিয়ে গাছপালার সঙ্গে কথা বলে। ফুলেদের বলে ফুটতে। দোয়েলপাখিদের শিস শুনে বলে, ‘বা ভাই, বেশ হচ্ছে, বেশ। আর-একটু খেলিয়ে।’ বাগানের এপাশ থেকে ওপাশ আমরা নালি কেটে সাদা কালো পাথর বিছিয়ে পাহাড়ি নদী করেছি, সেই নদীতে তিন-চার বালতি কলের জল ঢেলে বলতে থাকি, আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে। আজ আর কিছুই নেই।
সিধুজেঠু বললেন, “সকাল হয়েছে। আমি ডাক্তার ডেকে আনি। আর ফেলে রাখা যায় না। মায়ের আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।”
আমি যতবার মা বলে ডাকছি, চোখ মেলে মা চাইছে; কিন্তু কথা বলতে পারছে না। আমার চুলে হাত বোলাচ্ছে আর দু’ চোখ বেয়ে জল নামছে। ঠাকুর, তুমি আমার মাকে কী করে দিলে ঠাকুর। সন্ন্যাসীকাকু বলছেন, “আমি অসহায়। প্রার্থনা করা ছাড়া আমার আর কিছু করার নেই।”
ডাক্তারবাবু এলেন। আমাদের খুব ভালবাসেন। ডক্টর যজ্ঞেশ্বর রায়। প্রবীণ মানুষ; কিন্তু খুব তাঁর নাম। মাকে দেখেই বললেন, “সবার আগে রক্ত পরীক্ষা। আমি আমার কম্পাউণ্ডারকে পাঠাচ্ছি।”
দশটার সময় আমাকে আর সিধুজেঠাকে আদালতে হাজিরা দিতে হবে। কোনও উপায় নেই। সন্ন্যাসীকাকু বললেন, “আমি বউদিকে সামলাব, আপনারা ঘুরে আসুন। এদিকে যতই বিপদ হোক, আইন তো আর ছাড়বে না। বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে একশো ছত্রিশ ঘা। বউদিকে আমি পাতলা করে সুজির পায়েস করে দেব।” আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বুড়ো, ভেঙে পোড়ো না। সময় খারাপ, তবু পেরিয়ে যেতে হবে। সময় কখনও এভারেস্ট, কখনও ফুলের উপত্যকা।”
আমি ভাবছি, আমার মায়ের এই অবস্থা, যদি আজ আমাকে জেলে ভরে দেয়? তা হলে কী হবে? বাবা বলছিল, আমাদের আর খাওয়া-দাওয়ার প্রয়োজন নেই। সিধুজেঠু বললেন, “তা কখনও হয়, দেহ-ইঞ্জিনে কয়লা না দিলে চলে?
মা ওই অবস্থাতেও বললে, “আমি তোমাদের দুটো ভাতে-ভাত ফুটিয়ে দিই।”
সিধুজেঠু বললেন, “ভগবান আমাকে তা হলে পাঠালেন কী করতে?”
ঠিক দশটার সময় আমরা কোর্টে হাজিরা দিলাম। উকিল যোগেনবাবুর ফর্সা চেহারা কালো কোটে আরও ফর্সা দেখাচ্ছে। আমাদের সাহস দিচ্ছেন, “ভয়ের কিছু নেই। পেটি কেস। এ-সব আজকাল অনবরত হচ্ছে। ঝামেলা, সময় আর টাকার শ্রাদ্ধ। এগারোটার সময় জজসাহেব এজলাসে এসে বসলেন। পৃথিবীতে এমন ঘিচিরমিচির জায়গা আর দুটো নেই। কত রকমের লোক। কত রকমের কথা। কেউ মুখভার করে বসে আছে। কেউ উকিলের পেছনে ছুটছে। বাইরে একটা বাঁধানো গাছতলায় গুচ্ছের লোক বসে। পুলিশের বিশ্রী কালো গাড়ি থেকে আগামী নামাচ্ছে। হাতে হ্যাণ্ডকাফ, কোমরে মোটা দড়ি।
শ্যামলের বাবা এসেছেন। সেই রকম বিশ্রী ঝলমলে জামা পরে। আগে, দেখতে বেশ ভালই ছিলেন। এখন থলথলে বিকট একটা ভুঁড়ি হয়েছে। বারোটার সময় আমার ডাক পড়ল। উকিলে আর জজসাহেবে আইনের ভাষায় গাদা-গাদা কথা হল। আবার জামিন। আবার সাতদিন পরে আসতে হবে। সেইদিন আবার কেস উঠবে। শুরু হবে বিচার। আমি নাকি শ্যামলকে ক্ষুর চালিয়েছি। আমি এক বিপজ্জনক, বিশ্রী ছেলে। আমি যে-পাড়ায় থাকব, সে-পাড়ার কোনও সৎ ছেলেই নিরাপদ নয়। কথা শুনছি, আর মনে-মনে হাসছি। অপদার্থ বিজ্ঞানে, আমার দাদি বড়-বড় করে লিখে গেছেন, ‘এ হল সেই যুগ, যে যুগে সত্য থেকে মিথ্যাকে আলাদা করা যাবে না।’
একটাই ভাল হল, সিধুজেঠু ছাড়া পেয়ে গেলেন। ওরা কেস তুলে নিয়েছে। কারণটা শোনা গেল। সেই বাচ্চাটা কেবল কাঁদছে। খাচ্ছে না। ঘুমোচ্ছে না। কাল সারারাত কেঁদে-কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। আদালতের বাইরে এসে, বাবা সিধুজেঠুকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি আবার ওখানেই ফিরে যাবেন?”
“আমার পয়সা থাকলে এদের বিরুদ্ধে এখনই মানহানির মামলা ঠোকা যায়। গরিবের আবার মান-সম্মান কী বলুন!”
“আপনি কে বলুন তো?”
“আই অ্যাম এ ম্যান।”
সিধুজেঠুর মুখে ইংরেজি শুনে আমরা অবাক।
বাবা বললে, “তা হলে কী সিদ্ধান্ত?”
“আপনার বিপদে আপনার পাশে দাঁড়ানো।”
“আর বাচ্চাটা?”
“মাঝে-মাঝে গিয়ে সামলে দিয়ে আসব।”
সন্ধেবেলা আমাদের বাড়িতে শাঁখ বাজল না। ঠাকুরঘরে প্রদীপ দিলুম আমি। দাদির ছবির মাথায় একটা ফুল দেবার চেষ্টা করছি। যতবার দিই, ততবারই পড়ে যায়। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। কেন দাদি আমার দেওয়া ফুল নিচ্ছেন না! সন্ন্যাসীকাকু বললেন, “মনে কুসংস্কার আনছ কেন? ফ্রেমের মাথায় ফুল ধরিয়ে রাখা খুব শক্ত। মনকে মুক্ত করো। মুক্ত।”
রাত সাতটার সময় আমি আর বাবা দু’জনে মিলে ডাক্তারখানায় গেলুম। রক্তের রিপোর্ট পাওয়া যাবে। বাবা পথে যেতে-যেতে আমাকে কেবল বলতে লাগল, “বুঝলি বুড়ো, ওই হ্যাঁচকা টান মেরে তুলেছে তো, তাই মনে হয় মুখটা ফুলে গেছে। ও কিছু না। দু’ পুরিয়া ওষুধ পড়লেই দেখবি মুখটা চুপসে আবার আগের মতো হয়ে গেছে। আরে দাঁত বুঝলি তো, দাঁত খুব সহজ জিনিস নয় বুড়ো। কাঁচা দাঁত ধরে টানাহ্যাঁচড়া করলে একটু হবে। একটু ভুগতেই হবে।”
“আমিও তো তাই ভাবছি বাবা। এ-দাঁত তো হাতির দাঁত নয় যে, তুমি টেনে বের করে আনলে, আবার ইচ্ছে মতো খাপে ভরে দিলে। মানুষের দাঁত।”
বাবা আর আমি এই সব কথা বলেছি বটে, কিন্তু চিন্তা তাতে কিছুই কমেনি। এইরকম তো হয় না। কেন হল! চেম্বারে প্রচুর রুগী, তবু আমরা গিয়ে দাঁড়াতেই ডাক্তারবাবু মুখ তুলে তাকালেন, “ও হ্যাঁ, আপনার রিপোর্ট।” অনেক খাম পড়ে আছে টেবিলে। একটা খাম তুলে নিলেন। ভেতর থেকে কাগজটা বের করে চোখের সামনে মেলে ধরলেন, তারপর আপনমনেই বলে উঠলেন, “এ কী? এ কী সর্বনেশে ব্যাপার!” আমি আর বাবা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিলুম টেবিলের সামনে। বাবা একটা হাত আমার কাঁধে রাখলে। ডাক্তারবাবু রিপোর্ট থেকে মুখ তুলে আমাদের দিকে তাকালেন। মুখ কালো, অন্ধকার।
বাবা জিজ্ঞেস করল, “কী হল ডাক্তারবাবু?”
“কোনও আশা নেই। দিনের ব্যাপার। তিনদিন, সাতদিন, পনেরোদিন।”
“অসুখটা কী?”
“ব্লাড ক্যানসার।”
আমার কাঁধে বাবার হাতটা কেঁপে উঠল, “ব্লাড ক্যানসার? কোনও আশা নেই?”
“এ দেশে নেই।”
“কী হবে তা হলে?”
“সহ্য করতে হবে। ভাগ্যকে মেনে নিতে হবে।”
“কেউ কিছুই করতে পারবেন না? কোনও ভাবেই নয়?”
“অনেক রকম চেষ্টা হবে। তবে হবে না কিছুই।”
“বাড়ি ফেরার পথে আমরা সেই পার্কটায় পাশাপাশি বসলুম। বাবা হুহু করে কেঁদে ফেললে। আমিও আর চোখের জল ধরে রাখতে পারলুম না। একটা আধমরা গাছতলায় বসে আমরা দু’জনে খুব কাঁদলুম। বাবা ধরা-ধরা গলায় বললে, “যাঃ, সব গেল।”
“বাবা, আমরা যদি অনেক অনেক রক্ত দিই, তা হলে মা বাঁচবে না?”
“ওই তো শুনলি ডাক্তারবাবু কী বললেন?”
“শোনো বাবা, তারকেশ্বরে যাবে? গিয়ে হত্যে দেবে। শুনেছি ওষুধ পাওয়া যায়।”
“যেতে পারি। তবে এ-হল রাজ-রোগ। জানিস বুড়ো, ভালই হল, আমি চন্দনদার সঙ্গে চলে যাব। আর আমি বাঁচতে চাই না।”
“বা রে, আমি তা হলে কোথায় যাব?”
“তোর দুঃখ হচ্ছে না বুড়ো? তোর কাঁদতে ইচ্ছে করছে না?”
“আমার বুকের কাছটায় পাক মারছে। তোমাকে আমি বলতে পারব না আমার কী হচ্ছে!”
“চল, গোটা পার্কটায় গোল হয়ে দৌড়োই। দৌড়, দৌড়ে, দৌড়ে, দৌড়ে ভেতরটা একেবারে খালি করে ফেলি। আয়, আমরা আমাদের খুব কষ্ট দিই। কী হবে সুখে। কী হবে ভোগে। আমি তো সংসারের কিছুই বুঝি না। আমি তো একটা হাবা। আমি তো একটা গবা। আমি তো একটা অপদার্থ। আমাকে তো চালায় তোর মা। এই পার্কে বসে, এই গাছ সাক্ষী রেখে, তুই ছেলে, তোকে আজ আমি একটা কথা অকপটে বলি। তোর মা আমাকে মানুষ করেছে। আমাকে পড়িয়েছে। আমাকে এম. এ. পাশ করিয়েছে। আমি টাকাপয়সা, তেল-ডাল-চাল-নুন কিছুই বুঝি না।”
বাবা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ছুটতে শুরু করল। তীরবেগে ছুট। লোকে কী মনে করবে! আমিও দৌড় লাগালুম পিছু-পিছু। ছুটছি আর বলছি, “বাবা, তুমি ছুটো না। বাবা, তুমি ছুটো না। তুমি পড়ে যাবে।” বলতে না বলতেই বাবা হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। ঘাস তো নেই। ধুলো আর কাঁকর। হাত-পা ছড়ে একাকার। ওপরের ঠোঁটটা থেঁতলে গেল।
“চলো, আবার ডাক্তারবাবুর কাছে চলো। টেট-ভ্যাক নিতে হবে।”
“আমি কিচ্ছু নেব না। আজ বাদে কাল চোখের সামনে একজন মারা যাবে, সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে প্রিয়জন, আর আমরা জীবন জীবন করব। আমি চাই, আমার ধনুষ্টঙ্কার হোক।”
হঠাৎ মনে হল, আমি অনেক বড় হয়ে গেছি। আমার বাবার চেয়ে বড়। ধুলো-জড়ানো চুলে হাত বুলোতে বুলোতে বললুম, “বাবা, অমন করতে নেই। তোমার এই চেহারা দেখলে মা ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়বে। মাকে জানতে দিলে চলবে না। ইস, তোমার ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ছে। কেন তুমি এমন করলে? তোমার রুমালটা দাও, জলে ভিজিয়ে আনি।”
“ছেড়ে দে। বাড়ি চল। যেতে তো হবেই। আজ হোক, কাল হোক, যেতে তো হবেই।”
বাবার পায়েও খুব চোট লেগেছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে।
“একটা রিকশা করব?”
“না না, রিকশা কিসের। আর কি সেদিন আছে? আর সেদিন নেই। চাঁদের আলোয় ছাদে মাদুর পেতে গল্প। ঘাটশিলায় বেড়াতে যাওয়া। বাগানে চাদরের তাঁবু ফেলে বনভোজন। দিন চলে গেছে, বুড়ো।” গলা ধরে এল।
দেখতে দেখতে তিনটে দিন কেটে গেল। সব কিছু এলোমেলো হয়ে যেত, যদি সিধুজেঠু আর সন্ন্যাসীকাকু হাল না ধরতেন। সিধুজেঠু বাড়ির একটা দিক একেবারে হাসপাতালের মতো করে ফেলেছেন। আর সন্ন্যাসীকাকু আর-একটা দিককে করে ফেলেছেন মন্দির। উপনিষদ পাঠ করছেন। নাম সঙ্কীর্তন। বাড়িতে যেন উৎসব লেগে গেছে। সন্ন্যাসীকাকু জোর কায়দা করেছেন। বাবাকে এক মিনিট একা থাকতে দিচ্ছেন না। খাটিয়ে খাটিয়ে একেবারে শেষ করে দিচ্ছেন। ফুল দিয়ে রোজ বাড়ি সাজানো হচ্ছে। ঘরে-ঘরে ধূপ জ্বলছে। বাড়িটা যেন আশ্রম হয়ে গেছে।
দুপুরে মায়ের ঘর তখন খালি। মেঝেতে পিংকা আর পুশ জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে। পুশটা এর মধ্যে বেশ একটু বড় হয়েছে। আমি মায়ের মাথার কাছে বসে আছি। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, আমার সুন্দর মা, সন্ধেবেলা হরিদ্বারের গঙ্গায় একে-একে প্রদীপ ভাসাচ্ছে। একপাশে দাদি। একপাশে বাবা। আমি তখন ছোট। কিন্তু আমার সব মনে আছে। চোখের সামনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, মনসাপাহাড়ের সবচেয়ে কঠিন জায়গাটায় মা উঠতে পারছে না। দাদি ওপরের একটা পাথরে দাঁড়িয়ে মায়ের হাত ধরে সাবধানে টেনে তুলছেন। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, মা দাদির কাছে বসে দুপুরবেলাএকের-পর-এক অঙ্ক কষছে। আর মায়ের বুদ্ধি দেখে দাদির মুখচোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। মাঝে-মাঝেই বলছেন, “বাঃ মা, বাঃ। ভেরি গুড, ভেরি গুড। তুমি আমার খনা।”
মায়ের দিকে তাকালুম। কখন চোখ খুলে গেছে। একদৃষ্টে চেয়ে আছে, পিংকা আর পুশের দিকে। চোখ দিয়ে জল গড়িয়েছে। চোখ দুটো নরম রুমাল দিয়ে মুছিয়ে দিলুম।
মা ফিসফিস করে বলল, “হ্যাঁ রে, ও দুটো খেয়েছে?”
“হ্যাঁ মা।”
“তোরা খেয়েছিস?”
“হ্যাঁ মা।”
“কে রাঁধলে?”
“আজ সন্ন্যাসীকাকু রাঁধলেন।”
“কী রান্না হল?”
মাকে বললুম। মা তখন বালিশের তলা থেকে একটা চাবির গোছা বের করে আমার হাতে দিলে।
“শোন বুড়ো। এই হল আমার সংসার। তোর হাতে দিয়ে গেলুম। আর দিয়ে গেলুম তোর বাবাকে। মানুষটা শিশুর চেয়ে শিশু। তুই একটু দেখিস বুড়ো, তা না হলে ও চলে যাবে। দাদি আমার হাতে দিয়ে গিয়েছিলেন, আমি তোর হাতে দিয়ে গেলুম।”
মায়ের খুব কষ্ট হচ্ছিল। ধীরে-ধীরে চোখ বুজে এল। বুকচাপা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। হাতে-ধরা চাবির গোছাটার দিকে তাকালাম। হঠাৎ চোখ থেকে চার-পাঁচ ফোঁটা জল পড়ে গেল। দাদি আমাকে বলেছিলেন, ‘দুঃখকে চাপতে শিখবে। সেইটাই মানুষের লক্ষণ। বীরের লক্ষণ। কখনও ভেঙে পড়বে না। বলার পরই গান ধরেছিলেন, ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু। আমি অনেক চেষ্টা করলুম, পারলুম না। মা নেই আমি ভাবতে পারছি না। এই তো আমার মা, এখনও আছে। মাকে আমি ধরে রাখতে পারব না! মা চলে যাবে!
মা আবার ধীরে চোখ খুলল। সারা ঘরের এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিজের মুঠোয় আমার ডান হাতটা তুলে নিয়ে বললে, “হ্যাঁ রে, তোকে কি ওরা জেলে দেবে?”
“না মা, জেলে দেওয়া কি অতই সোজা। দেশে আইন নেই? একটু ভোগাবে।”
“আবার কবে দিন পড়ল?”
“দশ তারিখে দিন পড়েছে।”
“কী হবে বুড়ো?”
“কিছু ভেবো না মা, মিথ্যে মামলা থেকে আমি ঠিকই বেরিয়ে আসব।”
হঠাৎ তাকিয়ে দেখি ডান দিকে, বাগানের দিকের জানলায় বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
“ওই দ্যাখো মা, বাবা।”
মা ফিসফিস করে বললে, “কোথায়?”
“ওই তো বাগানের জানলায়।”
মা কোনও রকমে ঘাড় ঘুরিয়ে বললে, “ওখানে কী করছ? ভেতরে এসো না।”
“তোমার অপরাজিতা গাছে ফুল এসেছে।”
মা মৃদু হাসল। হাত নেড়ে বাবাকে আসতে বলল। এই ক’দিনে বাবার চেহারাটা কেমন যেন হয়ে গেছে। চুলে চিরুনি নেই। একমুখ দাড়ি। বাবা নীল একটা অপরাজিতা হাতে নিয়ে ঘরে এসে মায়ের বিছানার একপাশে বসল। মা বললে, “চুল আঁচড়াওনি, দাড়ি কামাওনি কেন? মন খারাপ করছ কেন? আবার দেখা হবে। আবার, আবার, অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে। এবার আর তোমার সঙ্গে নৈনিতাল যাওয়া হল না। পরের বার যাব। আমি যখন থাকব না, তখন নিজের দিকে একটু তাকিও। সময়ে খাওয়া-দাওয়া কোরো। তুমি ওরকম করলে, বুড়োটা যে ভেসে যাবে!”
বাবার হাত থেকে অপরাজিতাটা খসে মায়ের বুকের ওপর পড়ল। বাবার চোখে জল এসে গেছে। আমিও আর বসে থাকতে পারছি না। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আমার। একটু আগে মা যেসব কাজ করে যেতে পারল না, সেই সব কাজের কথা বলছিল। আমার অনেক জামার বোতাম ভেঙে গেছে। পিংকা আর পুশ খেলতে খেলতে নতুন চাদরটা ফালা করেছে। ঘরের পেতলের জিনিসপত্র সব ম্যাড়ম্যাড় করছে। তেঁতুল আনিয়ে রেখেছে। মাজার সময় আর পাওয়া গেল না। এমনই সব নানা কাজের কথা।
রাতে আমরা উকিল যোগেনবাবুর কাছে গেলুম। যোগেনবাবু বললেন, “তপনটাকে যদি সাক্ষীর কাঠগড়ায় একবার দাঁড় করানো যেত। কোনও রকমে যদি দুটো-একটা কথা বলানো যেত। তা হলে সঙ্গে-সঙ্গে কেস খারিজ।”
বাবা বললে, “তপনের বাবাকে একবার বলে দেখব। যদি কোনও রকমে রাজি করানো যায়। আমি খুব বিপদে পড়ে গেছি। একদিকে এই সাঙ্ঘাতিক অসুখ, আর-একদিকে এই কেস।”
“মাঝে-মাঝে ভগবান মানুষকে এরকম পরীক্ষায় ফেলেন। ভেঙে পড়বেন না।”
তপনের বাবা কোনও মতেই রাজি হলেন না। “না মশাই, আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। ওসব কোর্ট-কাছারি, আইন-আদালতের মধ্যে যেতে চাই না। তা ছাড়া জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিবাদ চলে না। শ্যামলের বাবা অতি প্রতাপশালী ব্যক্তি।”
বাবা বললে, “ও, তাই না কি?”
আমি খুব অবাক হয়ে গেলুম। আশ্চর্য মানুষ!
তপনের বাবা বললেন, “আপনার ছেলে একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে। শ্যামল কী আর এমন করত। তপনের সঙ্গে সকলেই তো মজা করে।”
রাগে, দুঃখে, অপমানে আমরা আবার যোগেনবাবুর কাছে ফিরে এলুম।
যোগেনবাবু বললেন, “এ-সব কেসে সাক্ষী একটা বড় ব্যাপার। সাক্ষীরাই প্রমাণ করবে কে অপরাধী, কে নিরপরাধী। দেখা যাক কোন রাস্তা দিয়ে কেসটাকে বের করে আনা যায়। আমি আর-একটু স্টাডি করি। একটা ফাঁক-ফোকর বেরোবেই।”
আমরা ফিরে এলুম। ডাক্তারবাবু এসেছিলেন। বাইরে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, “কিছু মনে করবেন না। আমি আজ রুগীর ঘরে মৃত্যুর গন্ধ পেলুম। এখন যে-কোনও মুহূর্তে যা কিছু ঘটতে পারে। মনে-মনে প্রস্তুত থাকুন।” বাবা গেটের কাছে বসে পড়ল। ডাক্তারবাবুর গাড়ি চলে গেল। আমি বললুম, “বাবা ওঠো। চলো, ভেতরে চলো। যা হবার তা হবেই।”
বাবা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুই কত বড়, কত শক্ত হয়ে গেছিস বুড়ো!”
পথের দিকে তাকিয়ে দেখি, কে একজন আসছেন এই দিকে। একজন মহিলা। কাছাকাছি আসতে চিনে ফেললুম। তপনের মা। গেট খুলে ভেতরে এলেন। দেখেই আমার রাগ হচ্ছে। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। ভদ্রমহিলা বাবাকে বললেন, “আমি আপনাকে একটা কথা বলতে এলুম। আমার স্বামী, তপনের বাবা, বড় ভীতু। সারা জীবন ভয়ে-ভয়েই কেঁচো হয়ে রইল। আমার ছেলে সাক্ষী দেবে। বুড়ো আমার ছেলের মতো। যা করেছে, আমার ছেলের জন্যেই করেছে। সে সাক্ষী দেবে। আমিও সাক্ষী দেব। কবে যেতে হবে বলুন?”
“মনে হয় দশ তারিখে।”
“দিদি কেমন আছেন?”
“দিদি?” বাবার কথা আটকে গেল।
“আমি একবার দেখে যাব?”
বাবা অতি কষ্টে বলল, “কোনও লাভ নেই।”
তপনের মা একটু ইতস্তত করে চলে গেলেন। বাবা বললে, “অল্প একটু আশার আলো দেখা গেল বুড়ো। এই ঘোর সঙ্কটে দাদিকে স্মরণ কর।”
মা এখন প্রায় অচৈতন্য। সিধুজেঠু সর্বক্ষণ বসে আছেন ঘরে। সন্ন্যাসীকাকু অনবরত ধর্মগ্রন্থ পাঠ করছেন। আর না হয় সামগান। যোগেনবাবু অদ্ভুত একটা কথা বললেন, “মৃত্যুটা দশ তারিখের আগে হলে আদালতে দরখাস্ত করে দিন নেওয়া যেত।”
আমি অবাক! এ আবার কী কথা! আমার সুবিধে হবে বলে মায়ের মৃত্যু এগিয়ে আনার চিন্তা। ছিছি। আমার না হয় সাজাই হোক। আমি জেলে যেতে প্রস্তুত।
দশ তারিখ আজ। দাদিকে প্রণাম করলুম। 'মাকে প্রণাম করলুম। মা আমার দিকে চোখ মেলে তাকাতেই পারল না। মাথার কাছে গিয়ে ‘মা, মা’ বলে তিন-চারবার ডাকার পর একবার চোখ মেলেই আবার চোখ বুজে ফেলল। ঠিক দশটার সময় আমরা আদালতে পৌছে গেলুম। আমাদের দু’জন মাত্র সাক্ষী। তপন আর তার মা। যোগেনবাবু আগেই তপনকে সব বুঝিয়েছেন, কী বলতে হবে। “তুমি কোনওরকমে বোলো। যা হয়েছে তোমার তো মনে আছে।” তপন বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়েছে।
এগারোটায় আদালত বসল। আসামীর কাঠগড়ায় বসে আছি। ওদের উকিলকে দেখে ভয় করছে। সরকারপক্ষের উকিল যেমন হয়। পুলিশ প্রথমে প্রায় আধঘণ্টা ধরে কেসটা জজসাহেবকে বোঝাল। যা খুশি, তা-ই বলে গেল আমার নামে। আমার মতো খারাপ ছেলে হয় না। আমি সমাজবিরোধী। বিশুদা আরও বেশি সমাজবিরোধী। বিশুদার আখড়ায় গুণ্ডা তৈরি হচ্ছে।
প্রথমেই যোগেনবাবু উঠলেন একে-একে সব অভিযোগের কাটান দিতে। বললেন, “আমার মক্কেলের মতো ভাল ছেলে হয় না।” তিনি আমার স্কুলের হেডমাস্টারমশাইয়ের দেওয়া ক্যারেকটার সার্টিফিকেট পড়ে শোনালেন। বললেন, “আমার মক্কেল লেখাপড়ায় অত্যন্ত ভাল। প্রতিটি পরীক্ষায় হয় প্রথম, না-হয় দ্বিতীয় হয়। পাড়ার গৌরব। সমাজের গৌরব।”
সঙ্গে-সঙ্গে সরকারপক্ষের উকিল ব্যঙ্গ করে বললেন, “তার প্রমাণ ওই যে! আক্রান্ত বসে আছে। তার মুখটা দেখুন। কীভাবে ক্ষুর মেরে ফালা করা হয়েছে।”
তাকিয়ে দেখলুম, শ্যামল বসে আছে সামনের আসনে গম্ভীর মুখে। ডান গালে লম্বা একটা ক্ষতচিহ্ন।
দুই উকিলে বেশ কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি হল। যোগেনবাবু বললেন, “নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রাভঙ্গ আজকের কথা নয়, প্রাচীন প্রবাদ। আসামীপক্ষের সাক্ষীরাই বলবেন শ্যামল কীভাবে নিজেই নিজের ওপর ক্ষুর চালিয়েছিল।”
“শ্যামলকে কি আপনার পাগল মনে হয়, না জীবনের ওপর বীতশ্রদ্ধ এক যুবক, যে আত্মঘাতী হবে?”
“মারতে এসে মার খেয়েছে।”
“আমাদের সাতজন সাক্ষী একে-একে প্রমাণ করবে আসামী কীভাবে শান্ত, নিরীহ ছেলেকে হত্যা করতে চেয়েছিল। আমাদের এক নম্বর সাক্ষী সেই সময় সাইকেলে চেপে ওই রাস্তায় যাচ্ছিলেন। তিনি বাধা না দিলে শ্যামল এই আদালতে আজ আর হয়তো উপস্থিত থাকতে পারত না।”
আমি অবাক হয়ে দেখলুম, সেই সাইকেল-আরোহী বসে আছেন। যাঁর সাইকেলের চাকায় সরোজের আঙুল ঢুকে গিয়েছিল। শ্যামলের বাবা টাকাপয়সা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে বলার অনেক লোক জড়ো করেছেন। এত জন তো সেদিন ঘটনাস্থলে ছিল না। অবাক হয়ে শুনতে লাগলুম, কীভাবে আমার চরিত্র অন্যের হাতে ভাঙছে আর গড়ছে।
তপনের মা সাক্ষ্য দিতে উঠে সরকারি উকিলের জেরায় তিন মিনিটেই মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হলেন। তিনি ঘটনা ঘটার সময়টা ঠিকমতো বলতে পারলেন না। একবার বলেন চারটে, একবার বলেন ছ'টা। সরোজকেও চিনতে পারলেন না। শ্যামল সেদিন কী পরে ছিল তাও দ্যাখেননি। অপমানিত হয়ে কাঠগড়া থেকে নেমে এলেন।
ভরসা এখন তপন। যাকে নিয়ে ঘটনা। কাঠগড়ায় উঠে শপথ নিতে গিয়েই সে খারিজ হয়ে গেল। অন্য সময় যদিও বা ‘ত, ত’ করে কিছু বলত, আজ আর মুখ দিয়ে এক ধরনের শব্দ ছাড়া কিছুই বেরোল না। কাঠগড়ায় একটা বোকা জন্তুর মতো দাঁড়িয়ে রইল। মুখে বোকার হাসি। এদিক-ওদিক তাকায় আর হাসে। শেষে তাকে নামিয়ে দেওয়া হল। তার মানে আইনের খেলায় আমি হারছি।
হঠাৎ শ্যামল কাঠগড়ায় উঠে দাঁড়াল। সবাই অবাক। আমিও অবাক। শ্যামলকে তো জজসাহেব ডাকেননি। শ্যামল বললে, “আমাকে কিছু বলার অনুমতি দিন।”
জজসাহেব বললেন, “বলো।”
শ্যামলকে শপথবাক্য পাঠ করানো হল। শ্যামল বলতে লাগল, “আমি এক বড় লোকের বাঁদর-ছেলে। আদরে বাঁদর হয়, আমি তাই।”
শ্যামলের বাবা চিৎকার করে উঠলেন, “এ কী, এ কী? পাগল হয়ে গেছে? যেতেই পারে। মাথায় চোট লেগেছিল তো!”
জজসাহেব হাতুড়ি ঠুকে বললেন, “অডার, অডার।”
শ্যামল আবার শুরু করল, “চোট মাথায় নয়। চোট লেগেছে আমার মনে। আমি অনুতপ্ত। আজ বুড়োর মা মৃত্যুশয্যায়, আর মিথ্যা মামলা সাজিয়ে আমরা বুড়োকে টেনে এনেছি আদালতে। এ-সবই আমার বাবার ষড়যন্ত্র। সবার আগে আমার বাবাকে জেলে দেওয়া উচিত। জাল ওষুধ তৈরির অপরাধে। আমার বাবা খুনী। ওই বুড়ো আমার বন্ধু ছিল। বুড়োর দাদি আমাকে পড়াতেন। বুড়ো ভাল ছেলে, ফাস্ট-সেকেণ্ড হয় বলে আমার হিংসে ছিল, রাগ ছিল। আমিও ভাল হতে চেয়েছিলুম। হতে পারিনি। কারণ কেউ আমাকে ভাল হতে বলেনি। অঢেল টাকা আমার সর্বনাশ করেছে। বদ বন্ধু দিয়েছে। বদ নেশা দিয়েছে। বদ খেয়াল দিয়েছে। বুড়ো আমাদের স্কুলের ফার্স্টবয়। বুড়ো আমাদের পাড়ার গর্ব। তপন আমাদের পাড়ার দুঃখ। অমন একটা সুন্দর ছেলে ভালভাবে কথা বলতে পারে না। আর আমরা কয়েকজন এমন শয়তান, তাকে দেখলেই নানাভাবে অত্যাচার করি। জামাপ্যান্ট খুলে নিই। ছেলেটার অসহায় অবস্থা আমাদের আনন্দ দেয়। সে যখন কাঁদে, আমরা তখন সবাই মিলে হো-হো করে হাসি। আজ আমার সেই ব্যাঙের গল্পটা মনে পড়ছে। ছেলেরা ডোবার-ব্যাঙকে বড়-বড় পাথর ছুঁড়ে মারছে। ব্যাঙ বলছে, তোমাদের আনন্দ আমাদের মৃত্যু। সেদিন আমরা তপনের ওপর আমাদের পুরনো খেলা খেলতে গিয়েছিলুম। বুড়ো বাধা দিতে এলে, বুড়োকেও আমরা চেপে ধরেছিলুম। বুড়ো অপমান বাঁচাবার জন্যে লাথি ছুঁড়ছিল, তখন আমি ক্ষুর মারতে গিয়ে ওর লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ি। পড়ার সময় আমার ক্ষুরে আমি আহত হই। এই ক্ষুর-চালাচালি আমাকে কারা শিখিয়েছে? আমারই পাড়ার দাদারা। শিখিয়েছে হিন্দি সিনেমা। আমাকে কেউ ভাল হতে শেখায়নি। বলেছে মস্তান হও। মস্তান হলে তুমি নেতা হবে। নেতা হলে তোমার অনেক টাকা হবে। বলেছে, চোর হও, সাধুদের দিন শেষ। জজসাহেব, আপনি বুড়োকে ছেড়ে দিন। আমাকে ধরুন। আমার বাবাও বাবা, আবার বুড়োর বাবাও বাবা। বুড়োকে আপনি ছেড়ে দিন। বুড়ো অনেক বড় হবে। বুড়ো বৈজ্ঞানিক হবে।”
শ্যামলের বাবা আবার চিৎকার করে উঠলেন, “ও মিথ্যে কথা বলছে। পাগল হয়ে গেছে।”
জজসাহেব হাতুড়ি ঠুকলেন, “অর্ডার, অর্ডার।”
সারা কোর্টঘর নিস্তব্ধ। কাঠগড়ায় শ্যামলকে যেন অনেক বড় মনে হচ্ছে। কপালে চুল ঝুলে পড়েছে। বড়-বড় চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। জজসাহেব কেস ডিসমিস করে দিলেন। আমরা আদালতের বাইরে এসে গাছতলায় দাঁড়ালুম।
শ্যামলের বাবা শ্যামলকে ফেলে রেখে তাঁর ঝকঝকে গাড়ি চেপে হুশ করে বেরিয়ে গেলেন। যাবার সময় শ্যামলকে বলে গেলেন, “তোমাকে আমি দেখে নেব।”
শ্যামল চিৎকার করে বললে, “থ্যাঙ্ক ইউ গডফাদার।”
বাবা এগিয়ে গিয়ে শ্যামলকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। “তুমি গ্রেট। তোমার কোনও তুলনা নেই। হাত মেলাও।”
শ্যামল বললে, “আমি আপনাদের বাড়িতে একবার যেতে পারি?”
“কেন পারবে না!”
“যে মাসিমা আমাকে এত ভালবাসতেন, তাঁকে একবার প্রণাম করব।”
“এরপর তুমি কোথায় থাকবে? বাড়িতে?”
“বাড়িতে আমার জায়গা হবে না। আমি হারিয়ে যাব। রোজ কত ছেলেই তো হারিয়ে যায়! বাবাই হয়তো খুন করিয়ে দেবে।”
“বলো কী?”
“ভদ্রলোককে তো আপনি ভালই চেনেন।”
শ্যামল আমার হাত দুটো ধরে বললে, “বুড়ো, আমাকে ক্ষমা কর।”
আমার তখন ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। ভাবছি, কত তাড়াতাড়ি মাকে গিয়ে আমার ছাড়া পাবার খবরটা দিতে পারব। ভাগ্য ভাল, একটা গাড়ি পাওয়া গেল। যোগেনবাবু বললেন, “আজকের হিরো হল এই ছেলেটি, শ্যামল। আদালতের ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই ঘটেছে। তবে তুমি ভীমরুলের চাকে খোঁচা মেরেছ। কোথাকার জল কোথায় গড়ায় এখন তাই দ্যাখো।”
শ্যামল বললে, “যা করেছি, জেনেশুনেই করেছি। যা করব এরপর, তাও আমার ঠিক করা আছে।”
যোগেনবাবু বললেন, “তা হলে আপনারা এবার বাড়ি যান। আর দেরি করবেন না।”
গাড়ি যখন বাড়ির প্রায় কাছাকাছি এসেছে, তখন আমার বুকটা হঠাৎ কেমন যেন খালি হয়ে গেল। মনে হল, একটা আকাশ যেন ঢুকে পড়েছে। ছেঁড়া ত্রিপলের মধ্যে দিয়ে যেমন ফালা-ফালা নীল আকাশ দেখা যায়, অনেকটা সেইরকম। কী হল? কেন এমন হল?
গাড়ি গেটের সামনে ঢুকতেই দৌড়ে বাড়ির ভেতর গেলুম। সন্ন্যাসীকাকু নাম করছেন। আমি ‘মা মা’ বলে ঘরে ঢুকতেই সিধুজেঠু আমাকে কাছে টেনে নিলেন। কানের কাছে মুখ এনে আস্তে-আস্তে বললেন, “বাইরে নয়, এবার ভেতরে ডাকো।”
“কেন সিধুজেঠু?”
“একবার তাকিয়ে দ্যাখো, মায়ের কেমন রূপ খুলেছে। দেবী!”
খাটের ওপর শুধু ফুল। অজস্র ফুল। বড়-বড় পদ্ম, সাদা গোলাপ। মা আমার ঘুমিয়ে পড়েছেন। যে-ঘুম আর ভাঙবে না।
অনেক অনেক দিন হয়ে গেল। বহু দিন। সব ফাঁকা। মায়ের চিতার সামনে দাঁড়িয়ে শ্যামল সেই রাতে শপথ করেছিল, বুকের চিতায় যে আগুন আছে, সেই আগুন একবার যখন জ্বলে উঠেছে, আর সে আগুন নিভতে দেবে না। সাতটা দিন সে আমাদের বাড়িতে ছিল। এর মাঝে একদিন তাকে কে বা কারা গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। পারেনি। দশ দিনের দিন সি. বি. আই-এর লোক এসে শ্যামলদের বিশাল বাড়ি তল্লাশি করে শ্যামলের বাবাকে জেলে ভরে দিয়েছে। তার আগেই সন্ন্যাসীকাকু শ্যামলকে ওঙ্কারেশ্বরের আশ্রমে রেখে এসেছেন। শ্যামল আর সে শ্যামল নেই।
বাবা এককথায় চাকরি ছেড়ে দিল। সত্যি-সত্যিই, কাঠ আর কয়লার একটা ডিপো করেছে। দেখতে হয়েছে একেবারে ঋষির মতো। খাটো একটা ধুতি আর গেঞ্জি পরে যখন কাঠ কি কয়লা ওজন করে, তখন মনে হয় একজন শ্রমিক। নানা জনে নানা উপদেশ দিয়েছিলেন। শোনেনি কারও কথা। বলেছিল, স্বাধীন হব। ঘাম ঝরিয়ে জীবিকা অর্জন করব। পরিশ্রম না করলে সৎ হওয়া যায় না। সিধুজেঠু সেই থেকে আমাদের বাড়িতেই থেকে গেছেন। সাতটার সময় রোজ মায়ের ঘরে দু’জনে নাম সঙ্কীর্তন করেন। বাবার হাতে মন্দিরা। জ্যাঠার কোলে খোল। সন্ন্যাসীকাকু সব শিখিয়ে দিয়ে বিলেত চলে গেছেন বক্তৃতা করতে।
আর আমার সম্বল মায়ের একটা চিঠি। অসুস্থ শরীরে আমাকে একটা চিঠি লিখে বালিশের তলায় রেখেছিল। সেই চিঠিই আমার পথ। সেই চিঠিই আমার গুরু।
স্নেহের বুড়ো,
আর কয়েকদিন পরেই আমি চলে যাব। দূরে, বহু দূরে। আমার অনেক সাধ ছিল, কত কী করার ছিল। খেলা না ফুরাতে খেলাঘর ভেঙে গেল। জীবনে একবারই দেখা হয়। তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না। তুমি বড় হও। যত পারো, বেড়ে ওঠো। আমি নেই বলে তোমার বড় হওয়া যেন আটকায় না। আমার জন্যে মন খারাপ কোরো না। আমি নেই বলে আরও বেশি করে থাকব। তুমি আমাকে দেখতে পাবে না। কিন্তু আমি তোমাকে দেখব। তোমার বাবা যেনএইরকম শিশুই থাকেন। বোলো তাঁকে। যেখানে আমি যাচ্ছি, সেখানে তোমরা থাকবে না, এইটাই আমার দুঃখ। যাওয়াটা এইরকম আগে পরেই হয়ে যায়। যে খেলার যা নিয়ম!
সব সময় সোজা পথে চলবে। সমস্ত ব্যাপার বুদ্ধি দিয়ে নয় হৃদয় দিয়ে বোঝার চেষ্টা করবে। রোজ আয়নার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়াবে। নিজের মুখ দেখবে স্থির নজরে। যখনই দেখবে চোখের উজ্জ্বলতা কমছে, তখনই চিন্তার দিকে নজর দেবে। চিন্তাই মানুষ। একা থাকবে না। কাজকে সঙ্গী করবে। বাবার মতো গাছপালা, জীবজন্তু, পশুপক্ষীকেই বন্ধু করবে। সবুজের ঘরে থাকলে মানুষ চির-সবুজ থাকে। দিতে শিখবে, নিতে নয়। ‘আমি আমি’ করবে না। ‘আমি’ বলে কিছু নেই। সবই ‘তুমি’। ভেতরটাকে বড় করলে বাইরেটা বড় হয়। নকল থেকে আসল বেছে নিতে শেখো। তোমার দাদির বাড়িকে অপবিত্র কোরো না। প্রতিষ্ঠা মানে সত্যের প্রতিষ্ঠা। ঐশ্বর্য হল চরিত্র। যুদ্ধ হল নিজের সঙ্গে। জয় হল নিজেকে জয়।
সব সময় মনে রাখবে তুমি কোন্ পরিবারের ছেলে। পিতা, মাতা, পিতামহকে ভুলো না।
বিদায়। অনেক অনেক ভালবাসা। জল নয়, আগুন।—ইতি তোমার মা।
—————
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন