পঞ্চম অধ্যায়

মতি নন্দী

বাবা বাগানে গাছের গোড়ায় খোল-পচা সার দিচ্ছিল। আমি পাশে দাঁড়িয়ে, ‘উঁ, কি গন্ধ, উঁ কি গন্ধ’ করছিলুম। গাছের কী বিচিত্র খাদ্য! যার গোড়ায় অমন দুর্গন্ধ, তার আগায় সুগন্ধ ফুল। ভগবানের নিয়ম-কানুনই আলাদা। চন্দন-মহারাজ দূরে গাছের ছায়ায় বসে ছবি আঁকছেন জলরঙে। চোখে সেই অদ্ভুত গোল চশমা। ঝুলে আছে নাকের ডগায়। পিংকা গাছে-গাছে জল দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা তার স্বভাব।

বাবা জিজ্ঞেস করলে, “হ্যাঁ রে বুড়ো, দাঁত তুলতে কী রকম লাগে রে?”

একটু ভেবে বললুম, “খুব একটা ভাল লাগবে বলে মনে হয় না। কেন জানো, টেনে তুলবে তো!”

“তা হলে কী হবে? তোর মায়ের দাঁতটা যে তুলতে হবে। আহা, বেচারার খুব কষ্ট হবে। কিছু একটা কর না বুড়ো।”

“কী করা যায় বলো না?”

“তাই তো ভাবছি। সব ক'টা গাছকে জিজ্ঞেস করলুম। এখনও কোনও উত্তর পাইনি।”

“ব্যস্‌, গাছের কথা যেই বললে অমনি আমার মনে পড়ে গেল। মনে করো আমি পেয়ারা গাছ। পেয়ারা গাছের হয়ে আমি বলছি, পেয়ারা-পাতা থেঁতো করে সেই রস দাঁতের গোড়ায় লাগালে ভাল হতে পারে।”

বাবা লাফিয়ে উঠল, “দি আইডিয়া। হাত মেলা, বুড়ো, হাত মেলা। ছেলেবেলায় আমার দাঁতের কী অবস্থা ছিল, তোর কোনও ধারণা নেই। সেই সময় তুই আমার পাশে থাকলে, তোর চোখ ফেটে জল আসত। আর তখন তো শরীর নিয়ে মানুষ এত মাথা ঘামাত না। তায় আবার দাঁত। দাঁতের ব্যথায় মানুষ তো আর মরে না। শেষে ময়দানব আমাকে পেয়ারা-পাতা দিয়ে সারাল।”

“ময়দানব কে বাবা?”

“তিরিশ বছর টানা আমাদের সংসার মাথায় করে রেখেছিলেন। নাম ছিল মধুসূদন। সেই থেকে ময়দানব।”

চন্দনকাকু যে-দিকে বসে ছবি আঁকছেন, সেই দিকেই পেয়ারা গাছ। দাদি পুঁতেছিলেন। বাবা সেই গাছ থেকে এক মুঠো পেয়ারা-পাতা তুলে আনলেন। আমি জানি বাবা কী করবে। এক্ষুনি শিলে ফেলে পেয়ারা-পাতা বাটবে, তারপর সেই রস মায়ের চিকিৎসায় লাগিয়ে তবে অন্য কাজে যাবে। বাবা প্রায়ই বলে, “আমি যদি রাবণ হতুম, তা হলে দেখতিস স্বর্গের সিঁড়িটা শেষ হত। বুড়ো, তুই আমার মতো জীবনে কাজ ফেলে রাখবি না। মনে হওয়া মাত্রই করে ফেলবি।”

বিকেলে ঠিক সময়ে আমি আবার বিশুদার কাছে গেলুম। আজ সাঙ্ঘাতিক গরম পড়েছে। বিশুদা বললেন, “এই রকম একটা গরম দিনই আমি খুঁজছিলুম।”

“কেন বিশুদা?”

“শরীরকে খুব কষ্ট না দিলে মন তৈরি হয় না। জেনে রাখো, দেহ সুখে মন অসুখী। জীবন হল ছানা। জল-ছানা দেখেছ?”

“হ্যাঁ, দেখেছি। সাধুময়রার দোকানে।”

“সেই ছানাকে প্রথমে জাঁকে রাখতে হয়। ওরা বলে জাঁক দেওয়া। জাঁক কী জিনিস জানো?”

“না বিশুদা।”

“কাপড়ে জড়িয়ে সবার আগে ঝুলিয়ে রাখো। সব জল, বাড়তি জল ঝরে গেল। এরপর তালটাকে দুটো কাঠের বারকোশের মাঝখানে রেখে চাপ দাও। প্রথমে দু’হাতের চাপ; তারপর হাঁটু, শেষে পা। একটা লোক শেষে দাঁড়িয়ে উঠল। সমস্ত জল বেরিয়ে গিয়ে পড়ে রইল প্রায় শুকনো ছানার তাল। এরপর সেই ছানাকে ফেলা হল কড়ায়। নরম আঁচে তাড়ু দিয়ে নেড়ে-নেড়ে, ডলে-ডলে, পাক করে-করে তৈরি হল সন্দেশ। তারপর ছাঁচে ফেলে, তালশাঁস, বরফি, শাঁখ, বাতাবি। বুঝলে, আমাদের জীবন হল ছানা। অনেক বাড়তি জল আছে, কষ্ট দিয়ে ঝরাতে হবে। দুঃখের নরম আঁচে পরিমাণ মতো সুখের চিনি দিয়ে, শাসনের তাডুতে ডলে-ডলে, মিহি থেকে আরও মিহি পাক; তারপর কারিগরের হাতের ছাঁচ। ছানা থেকে সন্দেশ হওয়ার নামই হল মানুষ হওয়া। নাও, ওঠো।”

বিশুদার সঙ্গে এগিয়ে গেলুম। তকতকে উঠোনের মাঝখানে একটা চৌকো ইটের গাঁথনি। প্লাস্টার করা। লাল রং। বেশ বড়। অনেকটা বেদীর মতো।

বিশুদা বললেন, “এটার নাম হল কফিন। এ মুখ আর ও-মুখ দুটো মুখ খোলা। তোমাকে এ-মুখ দিয়ে ঢুকে ও-মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসতে হবে।”

“এই ব্যাপার! এ তো খুব সোজা।”

“চেষ্টা করে দ্যাখো। তবে সাবধান। এই দ্যাখো, ঢোকার মুখটা হল গোল। মাথা দিয়ে ঢুকবে। আর জেনে রাখো, একবার ঢুকলে উলটো দিক দিয়ে ছাড়া আর বেরনো যাবে না। আর বেরোতে হবে নিজেকে। নিজে না বেরোলে কারও সাধ্য নেই তোমাকে বের করে আনার।”

বিশুদা কী যে বলেন! এটা কোনও ব্যাপার। কংক্রিটের একটা চারচৌকো বাক্‌স। এ-মুখে ঢুকে ও-মুখে বেরোব, এই তো! বিশুদা বললেন, “নাও, জামাটামা সব খুলে ফ্যালো, শুধু জাঙ্গিয়াটা থাক। এই নাও, সারা শরীরে তেল মাখো চকচক করে। কাজটা যত সহজ ভাবছ, ততটা সহজ নাও হতে পারে। ভেতরে একটা ধাঁধা আছে। গোলকধাঁধা। স্ট্যামিনা চাই। চাই বুদ্ধি। চাই মনের জোর। আলোর নিশানা পাবে, আর মনে রাখবে, মাথা আগে, পা পিছে। কেমন? উইশ ইউ বেস্ট অব লাক। আর-একটা কথা, ফেরার পথ নেই। সব সময় সামনে। অনওয়ার্ড, অনওয়ার্ড। ফরোয়ার্ড মার্চ। দাঁড়িয়ে পারবে না। হামাগুড়ি দিতে হবে। ইউ আর টু ক্ৰল। মনে করো তুমি একটা বিশাল সাপ। যাও, ঢুকে পড়ো।”

গোল গর্তটা মাটির কাছে। হাঁটু গেড়ে বসে মাথাটা গলিয়ে, শরীরটাকে ভেতরে ঠেলে দিলুম। পায়ের পাতা দুটো তখনও ঢোকেনি। মাথাটা দেওয়ালে ঠেকে গেল। সোজাসুজি আর এগনো যাবে না। পথ? পথ কোথায়? অনেকটা বাঁ দিক থেকে আলো আসছে। মাটির কাছাকাছি দেওয়ালে আর-একটা গোল ফুটো। শরীরের ওপর দিকটা বাঁকিয়ে, টুইস্ট করে মাথা ঢুকিয়ে সাপের মতো দেহটাকে টানতে লাগলুম। বেশ বুঝতে পারছি শরীরটা আমার ইংরেজি ‘এস’-এর মতো হয়ে গেছে। একটাই সুবিধে, ভেতরের দেওয়াল আর মেঝে খুব মসৃণ। তেল মাখায় শরীরটা সাপের মতো সহজেই পিছলে পিছলে যাচ্ছে। দ্বিতীয় গর্তে মাথা ঢুকিয়ে শরীরটাকে টানতেই দ্বিতীয় খোপে কোমর পর্যন্ত ঢুকলেও তলার দিকটা বেয়াড়াভাবে আটকে গেল। ভীষণ লাগছে; কিন্তু কিছু করার নেই। বিশুদা আচ্ছা কায়দা করেছেন। ফেরার উপায় নেই। সাঙ্ঘাতিক জ্যামিতি। ফেরার উপায় নেই। দাঁড়াবার বা বসবার উপায় নেই। বুকে হেঁটে সামনে এগোতে হবে। শরীরের বেঁকে থাকা নীচের অংশ ভেতরে আসবে তখনই, যখন উপরের অংশটাকে তৃতীয় খোপে পাঠাতে পারব। তৃতীয় অংশে যাবার গর্তটা একেবারে ডান দিকে। আলো দেখে বুঝলুম। বিশুদার গলা ভেসে এল, “চিয়ার আপ। হেরে যেয়ো না। পরাজিত হোয়ো না। এগিয়ে চলো। পারতেই হবে। তোমাকে বের করে আনার রাস্তা নেই। উপায় নেই। নিজেকেই বেরোতে হবে। এর নাম, ডেথ টানেল।”

ভেবে দেখলুম, সত্যিই তাই। অন্যভাবে বেরোবার উপায় নেই। ঢুকেছি যখন, নিজেকেই বেরোতে হবে। চাড় মেরে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে ঘুরে মাথাটা তৃতীয় গর্তে চালিয়ে দিলুম। শরীরটাকে টানছি, ভেতরে টানছি। গরমে ঘেমে গেছি বলে, সহজেই হড়কে যেতে পারছি। বাঁ থেকে ডান, ডান থেকে বাঁয়ে যখন মোচড় মারছি, মনে হচ্ছে, হাড়গোড় সব ভেঙে যাবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার নেশা ধরে গেল। ভেতরে মোট ছ'টা গর্ত, ছ’টা খোপ। বেরিয়ে আসতে আমার আধঘণ্টা সময় লাগল। বেরিয়ে আসামাত্রই বিশুদা আমার গলায় মোটা একটা জুঁই ফুলের মালা পরিয়ে দিলেন। বিশুদার আখড়ার সমস্ত ছেলে সাদা পোশাক পরে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা হাততালি দিল। বিশুদা আমার পিঠে চাপড় মেরে বললেন, “ফ্যান্টাসটিক। এত কম সময়ে কেউ বেরোতে পারেনি ‘ডেথ টানেল’ থেকে। চলে যাও চৌবাচ্চায়। চান করে এসো। এরপর একটা অনুষ্ঠান হবে তোমাকে নিয়ে।”

চান করে আসতেই, বিশুদা আমার হাতে একটা প্যাকেট দিলেন, “যাও, পরে এসো।”

প্যাকেটে একটা সুন্দর ঢোলা পোশাক। ঢোলা, থ্রি-কোয়ার্টার পাজামা, ঢোলা-হাতা বুক-চেরা কোট-জামা। কোমরে ফিতে বাঁধা। পোশাকটা পরে ব্যায়াম করার আয়নার সামনে দাঁড়াতেই, নিজেকে দেখে নিজেই মুগ্ধ। ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে আসতেই বিশুদা বললেন, “যাও, ওই বেদীতে বোসো।”

বেদী ঘিরে অন্য ছেলেরা বসে আছে। পিছনে ঝাঁকড়া একটা বকুল গাছ। বিশুদাও আমার মতোই একটা পোশাক পরেছেন। কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে! ছ’ফুট লম্বা। ফর্সা টকটকে। এক মাথা কোঁকড়া-কোঁকড়া চুল। এই উঁচু নাক। টানাটানা চোখ। ভুরু যেন তুলি-টানা কুচকুচে কালো দুটো ধনুক।

একটি ছেলে বিশুদার সামনে একটা ট্রে ধরল। কিছু ফুল, ধান, দুর্বো। হলুদ রঙের একটা তাগা। বিশুদা প্রথমে ডান হাতের ওপর বাহুতে হলুদ তাগাটা বেঁধে দিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে শাঁখ বেজে উঠল। মাথায় ফুল, ধান, দুর্বো দিয়ে আশীর্বাদ করলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে বেদী থেকে নেমে এসে প্রণাম করলাম। বিশুদা বললেন, “আজ থেকে তুমি নির্ভীক দলের সভ্য হলে। তোমার ধর্ম হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। অত্যাচারিতের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো। দুর্বলকে সবলের হাত থেকে রক্ষা করা। সব কাজে শ্রেষ্ঠ হওয়া। সত্য বলবে। সৎ আচরণ করবে। গুরুজনকে শ্রদ্ধা করবে। আলস্য ত্যাগ করবে। সৎ কর্মই হবে তোমার ধর্ম।”

“আপনাকে আমি কী দেব?”

“তুমি আমাকে দেবে নিষ্ঠা। আর দেবে এক ফোঁটা রক্ত। এই নাও।”

বিশুদা, আমার হাতে মোটা ছুঁচের মতো জিনিস দিলেন। নিয়ে গেলেন ভেতরের একটা ঘরে। ঠাকুরঘর। মেঝেতে সুন্দর কার্পেট। একটা বেদী। বেদীতে মা কালী। কার্পেটের ওপর বিশাল একটা তম্বুরা। মা কালীর বেদীর পাশে কাঠের ফ্রেমে একটা ‘গং’ ঝুলছে। তার তলায় বাজাবার হাতুড়ি। বিশুদা বললেন, “স্থির হয়ে চোখ বুজে বোসো। আর মনে-মনে ভাবো, তোমার শরীর হল আলোর শরীর।”

এইভাবে আমি কোনওদিন ভাবিনি। ভাবতে ভাবতে সত্যিই মনে হল, আমি একটা আলোর শরীর পেয়ে গেছি। ভেতরটা আমার সাঙ্ঘাতিক উজ্জ্বল লাগছে। এরপর আঙুলে ছুঁচ ফুটিয়ে এক বিন্দু রক্ত নিয়ে ফ্রেমে বাঁধানো এক টুকরো পাটের কাপড়ে টিপ লাগিয়ে দিলুম। ওই কাপড়ে আরও অন্তত পঞ্চাশটা টিপ আঁকা রয়েছে। পটটা নিয়ে বিশুদা মায়ের পায়ের তলায় খাড়া করে রাখলেন। বললেন, “এইটা হল শক্তি-পট, সঙ্কল্প পট। আজ থেকে তুমি আমাদের অর্ডারের একজন হলে।”

বাড়ি ফেরার পথে দেখি, শ্যামলরা রসে বসে আড্ডা মারছে। ওদের মধ্যে কে একজন আমাকে দেখে, সিকসিক করে তিনবার সিটি মারলে। তারপর কে একজন সুর তুললে, “কে যায়! পাগলা বাপের ন্যাংলা ছেলে যায়। কে যায়! ভণ্ডতপস্বী যায়।”

চলা থেমে আসছিল। শরীর রাগে জ্বলছে। আমার বাবাকে কেউ কিছু বললে খুন করে ফেলতে ইচ্ছে করে। বিশুদার কাছে মাত্র তিনদিন গেছি। তিনদিনে দেহ না পালটালেও মন পালটে গেছে। একটু আগে ‘মৃত্যু সুড়ঙ্গ’ আমার শরীরে শক্তির ঢেউ তুলে দিয়েছে। বিশুদার শিষ্যদের লড়াই দেখেছি। দেখেই অনেকটা যেন শেখাও হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, ওই জঞ্জালগুলোর ওপর চিলের মতো তীব্র শব্দ করে ঝাঁপিয়ে পড়ি। তারপর একই সঙ্গে বিদ্যুৎ-গতিতে হাত আর পা চালাই। সব কটার ওপর পাটির দাঁত ঝরিয়ে দিই।

বিশুদা বলেছেন, “চিলের শিকার ছোঁ মারার চিৎকার, মুরগির ডানার ঝাপটা, ঘোড়ার লাথি আর সিংহের বিক্রম এক করলে যা হয়, তাই তোমাকে আয়ত্ত করতে হবে।” আর বলেছেন, “আমার অনুমতি ছাড়া কোথাও কিছু করবে না।” মাথা উঁচু করে যেভাবে হাঁটছিলুম, সেই ভাবেই হাঁটতে হাঁটতে,বিন্ধ্যবাসিনীতলার মোড়ে চলে এলুম। শুকুরের দোকানে গরম জিলিপি ভাজছে। অন্য সময় হলে লোভ হত। আজ আর হল না। বিশুদা বলেছেন, “যত লোভনীয় জিনিসই হোক, যখন-তখন খাবে না। খাওয়ার একটা সময় থাকবে। আর লোভের জিনিস, ইচ্ছে হোক, তবু খাবে না। নিজেকে জয় করতে শেখো। বিশ্ববিজয় নয়, নিজেকে জয়। সম্রাট আলেকজাণ্ডার। যখন মনে হবে নিজের শক্তিতে পারছ না, তখন চোখ বুজে ভাববে তুমি নারায়ণ; তোমার এক হাতে সুদর্শন, অন্য হাতে শঙ্খ। ভাববে তুমি বিশাল। বৃহৎ ভাবনায় মানুষ বৃহৎ হয়। সুন্দর একটা ইংরেজি কথা বলেছেন, আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। বিশুদা যেখানে আসন করে বসেন, তার পেছনের দেওয়ালে কথাটা সুন্দর করে লেখা আছে: our life is what our thoughts make it। যার যেমন চিন্তা, তার জীবনও সেই রকম হবে।

কুঁচেদের রকে তপন আপনমনে বসে আছে। ছেলেটাকে দেখলে আমার ভীষণ দুঃখ হয়। বড়-বড় চোখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। ফর্সা, সুন্দর। একমাথা কুচকুচে কালো কোঁকড়া চুল। ভাল করে কথা বলতে পারে না। তো-তো করে। ট উচ্চারণ করতে পারে না। তপনের বাবা, মা, দেখা হলেই দু’চার কথার পর বলেন, “তোমরা কত সুন্দর! আমার একটাই ছেলে। ভগবানের কী মার দ্যাখো! সারা জীবন কে ওকে খাওয়াবে পরাবে! কে ওকে দেখবে?

তপনের পাশে গিয়ে বসলুম। কেউ তো ওর সঙ্গে মেশে না! আমাকে দেখে একমুখ হাসি। জড়িয়ে জড়িয়ে বললে, “কোতা দাও তুমি?”

“বাড়ি। তুমি এখানে একা বসে কেন?”

“আমি দেত্তি। কত ওক্‌।”

পকেটে হাত ঢুকিয়ে কী বের করল। তিন-চারটে কাগজ-মোড়া লজেনস্‌। সামনে মেলে ধরে বললে, “তাও, তাও!”

ঠিক যেন বড় মাপের একটি শিশু। একটা লজেন্‌স তুলে নিতেই, মাথা ঝাঁকিয়ে বললে, “তব্‌, তব্‌। তব্‌ তোমার।”

অনেকক্ষণ জলতেষ্টা পেয়েছিল। তপনের দেওয়া একটা লজেন্‌স মোড়ক খুলে মুখে পুরলুম। বেশ ভাল। তপন আপনমনে হাসছে। ও ওইরকম। কখনও হাসে। কখনও দোলে। কখনও আপনমনে উঁউঁ করে গান গাইবার চেষ্টা করে। অবাক হয়ে তপনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। বোঝার চেষ্টা করছি, ওই মন আর আমার মনে কী তফাত! তপনের মনে এই মুহূর্তে কী হচ্ছে! কী সে ভাবছে! কেন সে হাসছে!

রাস্তার মোড়ের দিকে ঘাড় ঘোরাতেই দেখি, শ্যামল আর আরও দুটো ছেলে আসছে। প্রথমে মনে হল, উঠে, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে সরে পড়ি। তারপর মনে পড়ল, বিশুদা বলেছেন, ভয় পাবে না। বসে রইলুম। শ্যামল আর দুটো ছেলে রকের সামনাসামনি এসে ঝপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তপনকে দেখছে। আমি শক্ত হয়ে গেছি। অনুমান করার চেষ্টা করছি, তপনকে কী করতে পারে! আগেও দেখেছি, সুযোগ পেলেই ওরা তপনের ওপর নানারকম অত্যাচার করে।

হঠাৎ তিনজনে চিতাবাঘের মতো তপনের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অসহায় তপন। দু’জনে চেপে ধরেছে। শ্যামল চেষ্টা করছে জামা-প্যান্ট খুলে নেবার। আমি আর চুপ করে থাকতে পারলুম না। চিৎকার করে বললুম, “শ্যামল, সাবধান!”

শ্যামল আড়চোখে তাকাল। খুব অবজ্ঞার গলায় বললে, “ভাগ বেটা প্যাংলা।” তারপর ছেলে দুটোকে বললে, “সরোজ, ব্যাটাকে ধর তো চেপে। ফ্যাচোর-ফ্যাচোর করছে।”

তার মানে একটা ছেলের নাম সরোজ। তপনকে ছেড়ে দিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তিনটে মুখই আমি দেখছি হায়নার মতো। বাঁদিকে ঘুরে আমার দিকে আসছে। জানি কী করবে। বিশুদা সেদিন একটি ছেলেকে শেখাতে-শেখাতে বলছিলেন, “অনেকে যখন আক্রমণ করতে আসবে, নিজেকে মনে করবে, চেপে রাখা একটা স্প্রিং। যেই কাছাকাছি আসবে ছিটকে উঠবে। এই সময় নিজের মাথাটাকে বুদ্ধি করে কাজে লাগাবে। যে সবচেয়ে কাছে, সোজা তার চিবুকে মারবে। তলা থেকে ওপরে। তার মাথাটা পেছন দিকে হেলে যাওয়ামাত্র, গলার সামনের দিকে মারবে কাটারি মার। ব্যস, ফ্ল্যাট।

সরোজ বলে ছেলেটা আমার খুব কাছে। “বিশুদা!” আমার বিকট চিৎকারে থতমত খেয়ে গেছে। যা প্রয়োজন, আমার ভেতরের সব বায়ু বেরিয়ে গেছে। ফুসফুস একেবারে খালি। সঙ্গে-সঙ্গে আমি স্প্রিংয়ের মতো ছিটকে উঠলুম। আমার তখন দিগ্বিদিক-জ্ঞান চলে গেছে। শুধু মনে হল, আমার মাথার সামনের দিকটা ফেটে গেল। সরোজ, ‘উঃ’ বলে ছিটকে পড়ল রাস্তায়। সেই সময় রাস্তা দিয়ে একটা সাইকেল যাচ্ছিল। সরোজের ডানহাতের পাঁচটা আঙুল স্পোকে ঢুকে, পুরো একটা পাক খেয়ে মটমট করে ভেঙে আটকে রইল। সাইকেল-আরোহী ছিটকে পড়ে গেল তিন হাত দূরে।

বিশুদা সেদিন একটি ছেলেকে শেখাতে-শেখাতে বলছিলেন, “ভগবান আমাদের দুটো চোখ দিয়েছেন। আত্মরক্ষার সময় দুটো চোখ একই দিকে রেখো না। দুটো চোখ দুদিকে রাখবে। সার্চলাইটের মতো ঘোরাবে। আমিও তাই করছিলাম। একটা চোখ সরাজের দিকে, আর-একটা চোখ শ্যামলের দিকে। শ্যামলের হাতে ভোলা ক্ষুর। চিতাবাঘের মতো গুটিগুটি এগিয়ে আসছে। বিশুদা আমাকে মানুষের শরীরের কয়েকটা জায়গা চিনিয়ে দিয়েছিলেন, যেসব জায়গায় ঠিকমতো মারতে পারলে আর কথা নেই।

শ্যামল যেভাবে আসছে, সামনে ঝুঁকে, তাতে আমার একটাই করার আছে, হাত নয়, পা চালানো। ক্ষুর ধরা হাতের তলায় পাঞ্চ করতে হবে। কারণ, মারার সঙ্গে-সঙ্গে ওর হাত দুটো আচমকা ওপর দিকে উঠবে। বুকের ওপরে কিছু করতে গেলেই মরতে হবে। মারতে হবে বুকের তলায়, পেটের মাঝখানে। মারতে হবে সাঙ্ঘাতিক জোরে। ভেবেছিলাম আমার খুব ভয় করবে। কিন্তু করছে না। মাথা ঠাণ্ডা। চোখ দুটো ভোলা। ক্ষুরের ফলায় মাঝে-মাঝে আলো ঝিলিক মেরে উঠছে। আমি না মারলে ও আমায় মেরে ফেলবে। ফালাফালা করে দেবে।

টিউব থেকে যেমন তীব্র হিশ্‌ শব্দে হাওয়া বেরোয়, আমি সেইভাবে শব্দ করতে করতে যেভাবে ফুটবলে লাথি হাঁকড়ায়, সেইভাবে আচমকা ডান পা’টা চালাতেই, শ্যামল আঁক করে একটা শব্দ করল। তার খোলা ক্ষুর তারই বাঁগালের ওপর দিয়ে চলে গেল। শ্যামল দু’হাতে পেট চেপে বসে পড়ছে।

শ্যামলের পড়ে যাওয়া দেখে দলের তৃতীয় ছেলেটা ঊর্বশ্বাসে দৌড় লাগাল। আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে চাই না। তপনকে রক থেকে তুলে, কুঁচেদের বাড়িতে ঢুকিয়ে দিয়ে, আমি দৌড় লাগালুম, বাড়ির দিকে নয়, বিশুদার আখড়ার দিকে। আমার খুব আনন্দ হচ্ছে। এতদিনে আমি প্রতিশোধ নিতে পেরেছি।

বিশুদা সবে পুজোয় বসেছেন। আমি দরজার বাইরে চুপ করে বসে রইলুম। এতক্ষণ কোনও ভয় ছিল না। যত ভয় এইবার তেড়ে আসছে। শ্যামল যদি মরে যায়? তা হলে কী হবে! আমাকে নিশ্চয় পুলিশে ধরবে। আমার ফাঁসি হবে। মাকে, বাবাকে আর দেখতে পাব না। ভীষণ মন কেমন করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি ছুটে বাড়ি চলে যাই। বিশুদাকে না বলে যেতে পারছি না। বিশুদা প্রায় আধ ঘণ্টা স্থির হয়ে বসে রইলেন। তারপর আসনে বসা অবস্থাতেই ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালেন। আর তাঁর কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলুম। বিশুদা বললেন, “কাজটা তুমি ভাল করলে না। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ। আজই না তোমার দীক্ষা হল! সমস্ত শক্তিটা ওইখানেই ক্ষয় করলে।”

“আপনি সব জানেন?”

“কিছু-কিছু।”

আমি আর জিজ্ঞেস করলুম না, কী করে জানলেন! বললুম, “শ্যামল আমার ওপর ক্ষুর চালাতে আসছিল। তখন আমার আর কোনও উপায় ছিল না।”

“ছেলেটা কে ছিল?”

“শ্যামল, পাঁচতলা বাড়ির শ্যামল।”

“ও। ওই জানোয়ারদের বাড়ির ছেলে। চোরের বাড়ি। জাল ওষুধের কারবারি। জাননা তো, ওরা এ-পাড়ায় খুব পাওয়ার-ফুল। তা, তুমি কীভাবে আত্মরক্ষা করলে?”

পুরো ঘটনাটা আমি বিশুদাকে বললুম। ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “যেভাবে বসে পড়ল, মরে যাবে না তো?”

“মানুষ অত সহজে মরে না। যেখানে মেরেছ, জায়গাটা খুবই খারাপ। তবে শ্যামলরা সহজে মরে না।”

“ওর হাতে ক্ষুর ছিল বলে আমি ওপরে মারার জায়গা পাইনি। আমাকেই মেরে দিত।”

“জায়গা ছিল, অবশ্য তুমিই বা জানবে কী করে! সে-জায়গাটা হল পা। একজন ফুটবলার যেভাবে রাইট উইং থেকে লেফট্‌ উইংয়ে বল মারে, সেই কায়দায় ডান পা টা টলিয়ে দিতে পারলেই ও কাটা কলাগাছের মতো পড়ে যেত। আর,একবার ফেলতে পারলে তোমার বহু কিছু করার ছিল। যাক, গতস্য শাচনা নাস্তি। যা হয়ে গেছে, গেছে। একটাই ভাবনা, কেসটা কোন দিকে চলেছে! শোনো, শ্যামলের বাবা মোটেই সুবিধের লোক নয়। থানা-পুলিশ করতে পারে। তোমার বাড়িতে হামলা করতে পারে। তোমার বাবাকে বিপদে ফেলতে পারে। বল যখন একবার গড়িয়ে দিয়েছ, তখন খেলা যেদিকেই যাক, খেলতে হবে। গেট রেডি। প্রস্তুত হও।”

“আমি তা হলে বাড়ির দিকে যাই বিশুদা। গিয়ে দেখি কী হচ্ছে!”

“চলো, আমি তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।”

“বিশুদা, শ্যামল মারা যাবে না তো?”

“তোমাকে একবার বলেছি, মানুষের ভেতরের যন্ত্রপাতি অত ঠুনকো নয়। মানুষের কারখানায় তৈরি নয়। তৈরি ভগবানের কারখানায়। সে কারখানার মেকানিক আলাদা। তোমাকে একদিন অ্যানাটমিটা ভাল করে বুঝিয়ে দেব। অবাক হয়ে যাবে।”

ফেরার সময় দেখি কুঁচেদের রকের সামনে রাস্তা ফাঁকা। বোঝাই যাচ্ছে না যে, একটু আগে কিছু হয়েছিল। রাস্তার মাঝখানে চশমার দুটো ভাঙা কাচ পড়ে আছে। মনে হয়, সাইকেলে করে যে-ভদ্রলোক যাচ্ছিলেন, তাঁর চশমাটা ভেঙে গেছে। সরোজের আঙুলের কী হবে! শ্যামলের গালের কী হবে! এখন আমার যত সব ভাবনা আসছে।

বিশুদা গেটের কাছ থেকে চলে গেলেন। বাড়ি থমথমে। কী হল? পুলিশ এসেছিল না কি। ভেতরের ঘরে সন্ন্যাসীকাকু একা বসে আছেন। চোখে সেই গোল চশমা। সামনে খোলা বই। আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার এত দেরি হল?”

পাল্টা প্রশ্ন করলুম, “বাবা আসেনি? মা কোথায়?”

“তোমার মাকে নিয়ে বাবা গেছেন ডেন্টিস্টের কাছে। অসম্ভব যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন।”

“আমিও তা হলে যাই।”

“তুমি যাবে? জানো কি কোথায় গেছেন বা যেতে পারেন?”

“জানি।”

আমি একেবারে ভুলেই গেলুম যে, একটু আগে এত বড় একটা কাণ্ড হয়ে গেছে। আমার মা অসুস্থ, বাবা একা। রাস্তায় নেমে হনহন হাঁটছি। ডক্টর সরকার ডেন্টিস্ট। আমার সামনে আর কিছুই নেই। প্রশান্ত সেলুনের কাছে দেখি একটা জিপ আসছে উলটো দিক থেকে। বিপদ আসার আগে জানিয়ে দেয়। কে যেন ভেতর থেকে বলে উঠল, ‘বুড়ো, পালা।’ আর পালাবার সময় নেই। অনেক লোক চলাচল থাকলে ভিড়ে মিশে যাওয়া যেত। চারপাশে ফটফট করছে আলো। জিপটা আমাকে পেরিয়ে চলে গিয়েছিল। হঠাৎ পেছন থেকে কে একজন বললে, “ওই যে, ওই যে পালাচ্ছে!”

হয়তো সত্যিই পালাতুম, ওই কথাটা কানে আসামাত্র পা দুটো স্তম্ভের মতো ভারী হয়ে গেল। বুকের কাছটা ছলকে উঠল। মুখটা তেতো হয়ে গেল। বুট-পরা ভারী পায়ের শব্দ। পুলিশকে ভয়, পুলিশকে ঘৃণা, সেই পুলিশ। পেছন থেকে আমার ঘাড়টা চেপে ধরার জন্যে হাত বাড়িয়েছিল এত জোরে, আমি মুখ থুবড়ে পড়ে গেলুম। কোমরে ভীষণ জোরে একটা লাথি এসে পড়ল। সারা শরীর ঝনঝন করে উঠল। বলিষ্ঠ একটা হাত পেছন থেকে আমার জামার কলার চেপে ধরে হ্যাঁচকা মেরে মাটি থেকে টেনে তুলল। ঠোঁট কেটে আমার রক্ত ঝরছে। তবে এইবার আমি আমার সাহস ফিরে পেয়েছি। শান্ত গলায় বললুম, “সাবধান, আমার গায়ে হাত তুলবেন না।”

“কেন বাপ? তুমি কে? প্রাইম মিনিস্টার?”

গলাটা চেনা মনে হল। তাকিয়ে দেখি, শ্যামলের বাবা। সিনেমার নায়কদের মতো ঝলমলে জামা-প্যান্ট। গোল চাকার মতো মুখ। অশ্লীল দুটো চোখ।

শ্যামলের বাবার কথায় সবাই হোহো করে হাসল। একজন পুলিশ কোমরে রুলের গুঁতো মেরে জিপের পেছন দিকে তুলে দিল। আমার খুব লেগেছে। তবু আমি শান্ত। বিশুদা আমাকে বলেছেন, ‘লাগে শরীরে নয়, লাগে মনে। যখন-তখন মন তুলে নাও। মনকে উড়িয়ে দাও পাখির মতো। আমার মন উড়ে গেল। ডক্টর সরকার, ডেন্টিস্টের চেম্বারে। দেখতে পাচ্ছি, মা চেয়ারে। দাঁত তোলা হচ্ছে।

পুলিশের জিপ যেমন চলে। তীরবেগে ছুটল থানার দিকে। আমি ছোট ছেলে, তাও আমাকে অ্যারেস্ট করল! ভেবে অবাক। আমার তখন সাহস এসে গেছে। আমি আমার দু’পাশে বসে থাকা পুলিশ দু’জনকে বললুম, “আমি কিন্তু দাঁতের ডাক্তারবাবুর কাছে যাচ্ছিলুম। বাড়িতে না জানিয়ে রাস্তা থেকে ধরলেন কেন?”

পুলিশ দু’জন কিছু বলার আগেই সামনের আসনে অফিসারের পাশে বসে থাকা ঝলমলে শ্যামলের বাবা বললেন, “একটু আদর করা হবে বলে মানিক। লকআপে চলো, তোমার সব ক’টা দাঁত বিনা পয়সাতেই তুলে দেওয়া হবে চাঁদু।” শ্যামলের বাবা হ্যাহ্যা করে হাসতে লাগলেন।

হঠাৎ মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “কাকাবাবু, শ্যামল কেমন আছে?”

ভদ্রলোক অবাক হয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন। ঠোঁটে সিগারেটের আগুন স্থির বিন্দুর মতো জ্বলছে। বেশ যেন অবাক হয়ে গেছেন। ঠোঁট থেকে সিগারেট সরিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, “শ্যামল কেমন আছে, সে তো তোমারই জানা উচিত। যেভাবে ক্ষুর চালিয়েছ, দশটা স্টিচ পড়েছে। চোখটা হয়তো অল্পের জন্যে বেঁচে যাবে। ছিছি, কী ফ্যামিলির কী ছেলে! অ্যাঁ, কী দিনকাল পড়ল! না না, আমাদের শান্ত ভদ্রপাড়ায়, এসব আমরা টলারেট করব না। বড়বাবু, এইসব ছেলেকে আপনি উচিত শিক্ষা দেবেন।”

“ক্ষুর আমি চালাইনি কাকাবাবু। শ্যামলই এসেছিল আমার ওপর চালাতে। নিজের ক্ষুরেই নিজে আহত হয়েছে।”

“সেটা তুমি কোর্টে প্রমাণ করো।” বড়বাবুকে প্রশ্ন করলেন, “এদের কি জেল হবে?”

“কিশোর অপরাধী তো! জেল হবে, তবে আলাদা জেল। চরিত্র-সংশোধনী জেল।”

মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “আপনার ছেলের জেল হবে না?”

সামনের আসনে শ্যামলের বাবার পাশে বসে থাকা বড়বাবু হাত ঘুরিয়ে আমার মাথায় আচমকা রুলের বাড়ি মারলেন। মাথাটা ঝান্ করে উঠল। মুখে বললেন, “চুপ, একেবারে চুপ।”

এত কষ্টেও আমি মনে-মনে হাসলুম। এই শ্যামলকে আমার দাদি এক বছর পড়িয়েছিলেন। তারপর আর পড়াননি। শ্যামলের বাবাকে বলেছিলেন, “আপনার ফ্যামিলিতে লেখাপড়া হওয়া শক্ত। জানেন তো, অর্থই হল অনর্থের মূল। নিজে ঠিক না হলে ছেলেপুলে মানুষ হয় না। নিজেকে সংযত করুন।”

সেই থেকে শ্যামলদের আমার ওপর ভীষণ রাগ, আমাদের বাড়ির ওপর রাগ। শ্যামলের বাবা আমার বাবাকে ঘুষ দিয়ে গত বছর কী একটা অন্যায় কাজ করাতে এসেছিলেন, বাবা দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই থেকে আরও রাগ। বলেছিল, পাড়া-ছাড়া করে দেবে। বাবা বলেছিল, ‘দেখা যাক, কত ক্ষমতা!’

থানায় নিয়ে গিয়ে, লোহার গরাদ দেওয়া একটা খাঁচা খুলে, এক ধাক্কা মেরে ভেতরে ফেলে দিলে। প্রথমে আলো-অন্ধকারে বুঝতে পারিনি, কী আছে, কে আছে। চোখে অন্ধকার সয়ে যেতে দেখলুম, কোণের দিকে রোগামতো একজন মানুষ হাঁটুতে মাথা গুঁজে চুপ করে বসে আছে। লোকটি হঠাৎ কেসে উঠল, দমকা কাসি। কাসির শব্দ শুনে বয়েস আন্দাজ করা গেল। মনে হয় বৃদ্ধ।

কাসি থামতে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, “কী কেস?”

“মারামারি।”

“শেষ করে দিয়েছ?”

“না, আধমরা।”

“তা হলে আর কী হল? যদুবংশ যত তাড়াতাড়ি ধ্বংস হয়! আমার চুরি কেস। বুঝলে, যে বাড়িতে কাজ করতুম, সাত মাস মাইনে বাকি পড়েছিল। চাইতে চাইতে শেষে বিরক্ত হয়ে কাল খুব মেজাজ নিয়েছিলুম। আজ বলে কিনা গিন্নির গলার হার পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ নিয়ে এল। হার বেরোল আমার বালিশের ভেতর থেকে। বুঝলে, কোন্ ফাঁকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ভদ্দরলোক শয়তান হলে, সাঙ্ঘাতিক হয়, বুঝলে? সাপের চেয়ে বিষাক্ত। মেরেছে ছছাবল, দ্যাখো এখন কী হয়! যা হবার তা হবে। আর আমি ভাবতে পারি না। আচ্ছা, তুমি কোনও খবর রাখো?”

“কী বলুন তো?”

“ভগবান-ভদ্দরলোক বেঁচে আছেন?”

“কেন থাকবেন না?”

“যাই বললা বাপু, যত বয়েস বাড়ছে, তত সন্দেহ বাড়ছে। এই এতখানি বয়েস হল, একবারও তো তাঁর বেঁচে থাকার প্রমাণ পেলুম না।”

“ভগবানের জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই।”

“তার মানে তিনি নেই। যত ধাপ্পা!”

বৃদ্ধের আবার কাসি এসে গেল। আমি বসে আছি। বাবার কথা ভাবছি। মায়ের কথা ভাবছি। সন্ন্যাসীকাকু কি এখনও বই পড়ছেন! বিশুদার সেই মৃত্যু-সুড়ঙ্গের কথা মনে পড়ছে। গরাদের ফাঁক দিয়ে গলতে পারব না! গরাদ ধরে উঠে দাঁড়ালুম। বাইরে থেকে বিশাল একটা তালা ঝুলিয়ে পাহারাঅলারা পালিয়েছে। অফিস-ঘর থেকে অনেকের হাসির শব্দ ভেসে আসছে।

রাত দশটার পর বাবা-মা আর সন্ন্যাসীকাকু এলেন। গরাদের ওধারে পাশাপাশি তিনজনে দাঁড়িয়েছেন। ওঁদের পেছন দিকে আলো। সেই আলোয় তিনজনকে কালো পাথরের মূর্তির মতো দেখাচ্ছে। আমি কারও মুখ দেখতে পাচ্ছি না। চোখ দুটো চকচক করছে। সন্ন্যাসীকাকুর গোল চশমার কাচ থেকে আলো ঠিকরোচ্ছে। মেঝের ওপর লম্বা-লম্বা গরাদের ছায়া পড়েছিল। তার গায়ে-গায়ে তিনজন মানুষের ছায়া। কোণের দিকে বৃদ্ধ মানুষটি ঘুমিয়ে পড়েছেন। দেওয়াল ঘেঁষে ‘দ’ হয়ে পড়ে আছেন।

বাবা, মা আর সন্ন্যাসীকাকু তিনজনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। বেশ বুঝলুম, অবাক হয়ে আমাকে দেখছেন। আমি ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ালুম। গরাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালুম। কেউ যেন শুনতে না পায়, এইভাবে বাবা আমাকে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “বুড়ো, তুই কী করেছিস! বুড়ো?”

এইজন্যেই আমার বাবার কোনও তুলনা হয় না। অন্য কেউ হলে চিৎকার করত। বকত। এমন সব কাণ্ড করত, আবার লোক জড়ো হয়ে যেত। আমার মা-ও স্থির। সাদা শাড়ি। আমার মনে হল, আমি আর মাকে দেখতে পাব না। বুকটা কেমন যেন করে উঠল। বাবার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছি না। কথা আটকে যাচ্ছে।

বাবা আবার জিজ্ঞেস করল, “কী করেছিস বুড়ো?”

আমি সব বললুম। যা-যা হয়েছে, সবই বললুম। তিনজনে স্থির হয়ে আমার কথা শুনলেন। সন্ন্যাসীকাকু শুধু বললেন, “বড় বিশ্রীভাবে জড়িয়ে পড়লে। এইবার আইন প্যাঁচের পর প্যাঁচ মারবে।”

মা বললে, “কী হবে?”

মায়ের গলাটা ভারী-ভারী শোনাল। কথা কেমন যেন ফুলো-ফুলো।

“মা, তোমার দাঁত কি তোলা হয়েছে?”

“আর দাঁত! তুই যা কাণ্ড করলি!”

বাবা বললে, “ঠিক করেছে। সব বাড়াবাড়িরই একটা শেষ থাকে।”

মা বললে, “এখন কী হবে?”

“এখন আমরা একজন উকিল ধরব। ধরে জামিনের ব্যবস্থা করব!”

তিনজন গরাদের সামনে থেকে সরে গেলেন অফিসের দিকে। কোণের দিকে যে প্রৌঢ় মানুষটি শুয়ে আছেন, তাঁর নাক ডাকছে। আমাকে তিনজন ছাড়াতে এসেছেন। বৃদ্ধের জন্যে কেউ আসেননি। আমি বাবাকে বলব, তুমি আমার সঙ্গে-সঙ্গে ওই নির্দোষ বৃদ্ধকেও ছাড়াবার ব্যবস্থা করো। ওই লোকটির কেউ নেই।

অফিস-ঘর থেকে বেরিয়ে এসে মা আবার আমার সামনে দাঁড়াল, “তোর কেমন লাগছে বুড়ো?”

“কেমন যেন বন্দী বন্দী লাগছে, মা।”

“ওরা বলছে, তোকে জামিন দেওয়া যাবে না। চন্দনদা কাকে যেন ফোন করছেন। ধরাধরি করে ছাড়াতে হবে। তোর লজ্জা করছে না?”

“লজ্জা কেন করবে মা? আমি যা করেছি, বেশ করেছি। আবার করব। যারা অন্যায় করবে, তাদের সকলকে ধরে-ধরে আমি পেটাব। আমি ছাড়া পাই, সোজা রাইটার্স বিল্ডিংয়ে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে বলব, শ্যামলের বাবাকে ধরে হাজতে পুরুন। লোকটা চোর। লোকটা গুণ্ডা।⋯তুমি কেমন আছ মা?”

“খুব খারাপ বাবা। দাঁতটা তো তুলেছে, মুখটা ক্রমশই ফুলছে।”

“কেন মা?”

“কী করে বলব। হয়তো তা-ই হয়।”

বাইরে বেরিয়ে মাকে ভীষণ জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে। এই এতক্ষণ পরে বুঝতে পারছি, আমি বন্দী। আমার স্বাধীনতা নেই। মানুষ হয়ে মানুষই আমাকে খাঁচায় ভরেছে। বিচার হবে পরে। কোণের দিকের বৃদ্ধ মানুষটি ধড়মড় করে উঠে বসে কাসতে শুরু করলেন। কাসির ফাঁকে-ফাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “রাত ক’টা হল ভাই?”

“এগারোটা।”

“আহা, এই সময় বুটা খুব কাঁদে।”

“কে বু? সে আবার কে?”

“ওই যে গো, যে বাড়িতে কাজ করতুম, সেই বাড়ির বাচ্চাটা। আমাকে সাঙ্ঘাতিক ভালবাসে তো! একেবারে বাচ্চা। এই সময় আমার কোলে চেপে বাড়ির সামনের রাস্তায় বেড়াতে বেড়াতে আবার আমার কাঁধে মাথা রেখে উঁউঁ করে গান গাইতে গাইতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ত। আমি তখন বিছানায় এনে আস্তে করে শুইয়ে দিতুম।”

“আপনি কেন?”

“তুমি আমাকে আপনি-আপনি করছ কেন? আমি কি ভদ্দরলোক? আমি একটা চোর।”

“গুরুজনদের আমি আপনিই বলি।”

“তুমি খুব সভ্য ছেলে। দিনকাল কীরকম পালটে গেছে, তাই না? চোররা সব বাইরে। সাধুরা সব ভেতরে।”

বৃদ্ধ হাহা করে হাসতে লাগলেন। হাসি থেকে শেষে বেদম কাসি। কাসি একটু কমতে বললেন, “বুঝলে, এবার আমি মরেই যাব। আর মরলেই বা কী! আমার তো কেউ কোথাও নেই রে বাপু। তোমার মতো আমার যদি একটা ছেলে থাকত!”

বাবা আর সন্ন্যাসীকাকু গরাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। আমি এগিয়ে গেলুম।

“শোন বুড়ো, তুই আর-একটু কষ্ট কর। জামিন দেবে বলেছে। আমার বন্ধু যোগেনকে ধরে আনি। চিয়ার আপ বুড়ো।”

“আমি কোনও অন্যায় করিনি বাবা। আমি এখানে বেশ ভালই আছি। তুমি আমার একটা অনুরোধ রাখবে?”

“বল।”

“তুমি ওই ভদ্রলোকের জামিনের ব্যবস্থা করতে পারবে?”

“অ্যাঁ। কে উনি?”

“মিথ্যে চুরির দায়ে ধরে এনেছে। কেউ নেই। ভদ্রলোকের কেউ নেই।”

“সেটা কি ঠিক হবে?”

অন্ধকার কোণ থেকে ভদ্রলোক বললেন, “না ঠিক হবে না। আমি অজ্ঞাতকুলশীল।”

বাবা বললে, “কিছু মনে করবেন না। নিচু মনের পরিচয় দিয়ে ফেলেছি। আমার ছেলে যখন বলেছে, তখন অবশ্যই আমি ব্যবস্থা করব।”

বৃদ্ধ বললেন, “আমার কিন্তু কিছুই নেই। চালচুলো ঘটিবাটি।”

“সেইজন্যেই তো করব।”

“পরিচয় না জেনে? জানেন, আমি চোর?”

“কথা আর কণ্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছে, আপনি জ্ঞানী।”

বৃদ্ধ হাহা করে হেসে উঠলেন। কোনওরকমে কাসি চেপে বললেন, “পৃথিবীতে কিছু বোকা লোক আছে বলে এখনও মানুষ বেঁচে আছে।”

বাবা, মা আর সন্ন্যাসীকাকু চলে যাচ্ছেন।

আমি বললুম, “মা, তুমি আর ওই শরীরে আসবে না কিন্তু।”

ওঁরা চলে যেতেই বৃদ্ধ বললেন, “এখনও এমন পরিবার এ-পাড়ায় আছে? তোমাদের পরিচয়?”

“একটু পরেই জানতে পারবেন।”

রাত দেড়টার সময়ে আমরা দু’জনে জামিনে ছাড়া পেলুম। বৃদ্ধ ভদ্রলোকের নাম, সিদ্ধেশ্বর দাস।

বাবা জিজ্ঞেস করলে, “আপনি এখন কোথায় যাবেন?”

“বাবু, আপনি আমাকে তুমি’ কি ‘তুই’ বলুন। ভুল করছেন, আমি ছোটলোক, আমি চাকর।”

“সে আমি বুঝব। এখন বলুন, আপনি যাবেন কোথায়?”

“রাতটা শ্মশানে কাটাই। সবচেয়ে ভাল জায়গা।”

“না, রাতটা আপনি আমার বাড়িতে কাটাবেন।”

সন্ন্যাসীকাকু বললেন, “সত্যিই আমার একটা শিক্ষা হল। আপনারা কী ধাতুতে তৈরি! আপনাদের সংসার যেন শিবের সংসার। কংসের কারাগারে শ্রীকৃষ্ণ জন্মেছিলেন, আজ জন্মাল বুড়োর মন। হরি ওম্‌। স্বর্গ যদি কোথাও থাকে।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই সিদ্ধেশ্বর দাস হয়ে গেলেন আমার সিধুজেঠু। অন্ধকারে ভাল করে দেখতে পাইনি, আলোয় দেখলুম, যীশুখ্রীস্টের মতো মুখ। বাড়িতে ঢুকেই বাগানের অন্ধকারে কুয়োতলায় চলে গেলেন। অত যাঁর কাসি, তিনি রাত পৌনে দুটোর সময় হুড়হুড় করে চান করলেন। সংস্কৃত স্তোত্রপাঠের শব্দে বাগান ভরে গেল।

সন্ন্যাসীকাকু বললেন, “কী অপূর্ব উচ্চারণ! মানুষটির অতীত জানতে ইচ্ছে করছে। নিজের পরিচয় মনে হয় গোপন করছেন।”

বাবা এসে বললে, “অবস্থা খুব খারাপ। তোমার মায়ের দিকে আর তাকানো যাচ্ছে না। সারা মুখ ফুলে চোখ-টোখ সব চাপা পড়ে গেছে।”

রাত তখন তিনটে। আমাদের কারও চোখে ঘুম নেই। মায়ের ঘরে পিংকা আর পুশ, দু’জনেই জেগে। পিংকা মাঝে-মাঝে খাটের ধারে সামনের দুটো পায়ে ভর রেখে উঠে-উঠে দাঁড়াচ্ছে। মাকে দেখছে। ছটফট করছে। আমরাও ছটফট করছি।

সন্ন্যাসীকাকু বললেন, “কীভাবে দাঁতটা তুললেন! এমন সাঙ্ঘাতিক ইনফেকশন হয়ে গেল!”

সিধুজে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে ঠায় বসে আছেন। ঠোঁট নড়ছে। আঙুলে আঙুল সরছে। বেশ বুঝতে পারছি, জপ করছেন। আমি দাদির ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ালুম, “দাদি, আজ সন্ধে থেকে এ আপনি কী করছেন? কেন করছেন?”

অন্যদিন দাদির মুখে একটা হাসি লেগে থাকে, আজ যেন গম্ভীর! মুখটা কালো।

“দাদি, মায়ের কিছু হবে না তো!”

কোনও উত্তর নেই। তাকিয়ে রইলুম দাদির মুখের দিকে। ভোর হয়ে আসছে। আলাদা একটা আলো এসে পড়েছে দাদির মুখে। থমথমে মুখ। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। শ্যামলকে মেরেছি বলে রাগ হল কি? আমি কি অন্যায় করেছি! দাদি আমাকে বলেছিলেন, “দেখো বুড়ো, পরিবারের মুখ ডুবিয়ো না। মুখ উজ্জ্বল কোরো। উজ্জ্বল, আরও উজ্জ্বল।’

একেবারে শেষ রাতে বাবা চা করতে চাইলে।

সিদ্ধেশ্বরজেই বললেন, “ও কাজটা আমার। আপনি বসুন।”

সেই সংসারের কাজে লেগে গেলেন সিধুজেঠু। কে জানে, মানুষের জীবনে কী থাকে! আজ যারা হাসে, কাল তারা কাঁদে। আজ যাদের দুঃসময়, কাল তাদের সুসময়। আজ যাদের সুসময়, কাল তাদের উলটো। আমার দাদি তাঁর ‘অপদার্থ বিজ্ঞান’-এ লিখে গেছেন, ‘সময়কে ধরে রাখা যায় না। যা হবার তা হয়, যা হবার নয় তা হয় না। আমরা সব নাচের পুতুল।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%