মতি নন্দী
শ্যামল খুব বড়লোকের ছেলে। বড়-বড় কথা বলে। স্কুল ইউনিফর্ম পরে খুব দামি কাপড়ের। গায়ে আবার সেন্ট মাখে। কাছে সবসময় একশো, দুশো টাকা রাখে। আমরা সবাই জানি, ওর বাবা সৎ নয়। দু’ নম্বরি কারবার আছে। আমরা অনেকেই ওর সঙ্গে মিশি না। আমাদের ঘেন্না করে। অনেকে আবার খুব মেশে। বড়লোকের ছেলে, ভাল খায়দায়, তাই দেখতে একটু বড়সড়। অনেকে আবার দাদা বলে। শ্যামলদা, শ্যামলদা বলে আদিখ্যেতা করে।
সেদিন স্কুল ছুটির পর শ্যামল বললে, “বুড়ো, একটা বিলিতি সিগারেট খাবি?”
শুনে আমি হাঁ হয়ে গেলুম, “তুই সিগারেট খাস?”
“কেন খাব না! বিলিতি সিগারেটের দাম জানিস? পঁচিশ টাকা প্যাকেট। আমার বাবা ডেলি চার প্যাকেট ওড়ায়। আমরা তো সবাই মিলে রাতে বিলিতি বিয়ার খাই। মডার্ন হতে শেখ বুড়ো। মডার্ন হতে শেখ। তোর বাবা একটা চাষা, তুইও একটা চাষা।”
“শ্যামল, মুখ সামলে। ভদ্রভাবে কথা বলতে শেখ। পয়সার গরম বাড়িতে দেখাস।”
আমি প্রস্তুত ছিলুম না। আচমকা এক ধাক্কা মারতেই ছিটকে পড়ে গেলুম। থেঁতো হয়ে গেল নাকটা। ওপর-ঠোঁটটা কেটে গেল। রক্ত গড়িয়ে জামার বুকের কাছটা ভিজে গেল।
শ্যামল হ্যাহ্যা করে হাসতে হাসতে বললে, “ব্যাটা চামচিকে।”
আমি কিছুই করতে পারলুম না। শ্যামল আর তার মোসায়েবরা রাক্ষসের দলের মতো হ্যাহ্যা করে হাসতে হাসতে চলে গেল। আমার যারা বন্ধু, আমাকে যারা ভালবাসে, তারা ছুটে এল।
খোকন বললে, “ইস, তোর ঠোঁটটা কেটে গেছে রে, নাক দিয়েও রক্ত বেরোচ্ছে। চল, ডাক্তারখানায় যাই।”
শ্যামলের ওপর নয়, আমার রাগ হচ্ছে নিজের ওপর। কেন আমি দুর্বল। রাগ চেপে বললুম, “কোনও দরকার নেই। বাড়ি গিয়ে ঠিক করে নেব। আমার মতো ছেলের এই রকমই হওয়া উচিত।”
“ওর গায়ে খুব জোর রে! ভাল-মন্দ খায় তো!”
আমি কোনও উত্তর দিলুম না। বাবা সেদিন আমাকে বলেছে, দেহের মাপে মন নয়, মনের মাপে দেহ করবি। ওই শ্যামলকে আমি দেখে নেব। খুব শিগগিরই দেখব। ওকে আমি আমার পায়ে ধরে ক্ষমা চাওয়াব। তবেই আমার নাম বুড়ো।
মা বললে, “ইস, তুই কোথা থেকে এমন কেটেকুটে এলি? কে করলে তোর এমন অবস্থা!”
আমি চেপে গেলুম। খুব ইচ্ছে করছিল, মা কে সব বলি। বলতে পারলে মনটা অনেক হালকা হয়ে যেত; কিন্তু বললুম না। রেখে দিলুম নিজের কাছে। অপমান জমিয়ে রাখতে হয়। সাজিয়ে রাখতে হয় ইটের মতো। দাঁতের বদলে দাঁত। নখের বদলে নখ।
বাবা অফিস থেকে ফিরে এসে, সব দেখে বললে, “আর কিছু না, রাস্তার কাটাকুটি তো, একটা টেট-ভ্যাক নিবি চল।”
রাস্তায় বেরিয়েই বললে, “মার খেলি?”
“কী করে বুঝলে?”
“শার্লক হোমস পড়ে। হোমস বলতেন, প্রবল বিচারবুদ্ধি থাকলে মানুষের আর কিছুর দরকার হয় না। তুই কীভাবে হাঁটিস, তোর স্বভাব আমি জানি। অবজারভেশান। একটা মানুষকে ভালভাবে লক্ষ্য করলে তার চরিত্রের তিনের-চার ভাগই জানা যায়। তুই শান্ত, ধীর আর সাবধানী। এভাবে তুই পড়ে যেতে পারিস না।”
“আমাকে আচমকা ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছে।”
“একটা ধাক্কা খেলি, তোর এখন কী করা উচিত?”
“তুমি বলো?”
“না না, যার-যার সমস্যার সমাধান তার-তার কাছে। এ-রকম অনেক ধাক্কা আসবে। সামলাতে হবে। স্ট্যাণ্ড করতে হবে। দেহে আসবে। মনে আসবে।” বাবা রাস্তার একধার দিয়ে হাঁটছে। হঠাৎ সরে এসে আমার কাঁধে হাত রেখে বললে, “দেহের ধাক্কা দেহ দিয়ে সামলাতে হবে। মনের ধাক্কা মন দিয়ে।”
“আমার এই সব কাটাকুটি সেরে গেলে বিশুদার কাছে ব্যায়াম শিখতে যাব। তুমি আমাকে ছোলা আর আখের গুড় কিনে দেবে?”
“নিশ্চয়। ছোলা, গুড় আর কাঁচা হলুদ খাবি। দেখবি, তোর চেহারা কী হয়ে যায়; কিন্তু মনের জন্যে কী করবি?”
“মনটা তুমি নিয়ে নাও।”
“যোলো আনা দিতে পারবি?”
“অফকোর্স।”
“হাত মেলা। অবশ্য তার আগে নিজের মনটা ঠিক করতে হবে।”
“তোমার মন ঠিকই আছে।”
“না রে, এখনও একটু কমজোর আছে। ফাটাফুটি আছে। ক্র্যাক আছে। আসলে কি জানিস, আমার এই চাকরিটা আর ভাল লাগছে না। মাথা তুলে বাঁচার মতো সম্মানজনক একটা কিছু পেলে দেখতিস, আমার চেহারা অন্য রকম হয়ে যেত। স্বাধীন না হলে মানুষের কিছু হয় না। দাস দাসের মতো মন পায়, প্রভু প্রভুর মতো, সাধু সাধুর মতো।”
আমার নাক দিয়ে তখনও একটু একটু রক্ত বেরোচ্ছে। ওপরের ঠোঁটটা ফুলে ঢোল। হাঁটুর কাছে থেঁতলে গেছে। এখনও পা ভাঙতে গেলে লাগছে, জ্বালা করছে। শরীরে লেগেছে ঠিকই, তার চেয়ে বেশি লেগেছে মনে। সেই বিকেল থেকে কিছুতেই ভুলতে পারছি না। যতদিন না এর বদলা নিতে পারছি ততদিন শান্তি নেই।
ডাক্তারবাবু যেই জিজ্ঞেস করলেন, “কাটল কী করে?” বাবা অমনি দুম করে সব বলে দিলেন। লজ্জার কথা। না বললেই ভাল হত। বাবা আবার ভীষণ সত্যবাদী। অকারণে মিথ্যে বলে না। ডাক্তারবাবু স্পিরিট দিয়ে সিরিঞ্জ ধুতে ধুতে বললেন, “আজকাল স্কুল-কলেজ যেন গুণ্ডার আখড়া। ছেলে যতক্ষণ না বাড়ি ফিরছে, ততক্ষণ আতঙ্কে থাকতে হয়। এই কয়েকদিন আগে আমার ছোট ছেলেটাকে ধাক্কা মেরে সিঁড়ি দিয়ে ফেলে দিলে। গড়াতে গড়াতে দোতলা থেকে একতলায়। পায়ে প্লাস্টার করে পড়ে আছে।”
ডাক্তারবাবু ইঞ্জেকশান দিয়ে সিরিঞ্জটা সামনের ট্রে তে রাখতে রাখতে। বললেন, “তোমাকে এখন দিন কয়েক বেশ ভোগাবে। একেই বলে, সুখে থাকতে ভূতে কিলোনো। লিখে দিচ্ছি, একটু ওষুধ খাও।” তারপর বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এখন যদি আপনি ওই বাঁদর ছেলেটার বাবাকে গিয়ে কম্প্লেন করেন, কী বলবে জানেন! বলবে, বেশ করেছে। এখন ইউরোপ আমেরিকার মতো প্রত্যেককেই আত্মরক্ষার কায়দা শিখতে হবে। এরপর দেখবেন আমাদের প্রত্যেককেই ফায়ার আর্মস ক্যারি করতে হচ্ছে। ভালই হল। বেদান্তের দেশ ভারতের কী অবস্থা! যাক, যা হচ্ছে হোক। নেতারা বুঝুক। আমি কোনওরকমে আর দশটা বছর কাটিয়ে পালাতে পারলে বাঁচি।”
বাবা জিজ্ঞেস করল, “কোথায় পালাবেন! বিদেশে?”
“না না, বিদেশে নয়, স্বদেশে। নিজ ভূমে। যেখান থেকে আগমন সেইখানেই প্রস্থান। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। খুব শিক্ষা হয়েছে ভাই। এখন ভালয়-ভালয় বিদায় দে মা, আলোয় আলোয় চলে যাই। এখন একটু উনিশ-বিশ হলে রুগীরা কী ভাষায় কথা বলে জানেন, মেরে থোবনা উড়িয়ে দেব, মায়ের ভোগে পাঠিয়ে দেব। বাঙালী মারতে শিখেছে মশাই। বাপকেই ধরে ঠেঙিয়ে দিলে। জ্যাঠামশাইয়ের কাছা খুলে দিলে।”
বলতে বলতেই চেম্বারে এক রুগী ঢুকল। হাতে বালা। গলায় পদক। গায়ে জেব্রা টি-শার্ট। টেবিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বললে, “কী ওষুধ দিলেন মা কে? তিন দিন হয়ে গেল জ্বর ছাড়ার নাম নেই। হাতে রেখে চিকিৎসা হচ্ছে! আপনার মশাই হেভি বদনাম আছে। এইবার একদিন চেম্বার এনে আপনার চেম্বার চৌপাট করে দেব। আসলি মালটা এইবার ছাড়ুন তো। তিন দিন হয়ে গেছে।”
ডাক্তারবাবু বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “একটু আগে আপনাকে কী বলছিলুম!”
তারপর সেই ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমার মায়ের ভাই টাইফয়েড হয়েছে। সারতে সময় নেবে। আমার বাবারও ক্ষমতা হবে না তিন দিনে সারাবার।”
বাবা ডাক্তারবাবুর সমর্থনে বললে, “টাইফয়েড ভাই মাসখানেক লাগে। কিছু কিছু রোগের একটা মেয়াদ থাকে, যেমন স্মলপক্স, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডেঙ্গু, টাইফয়েড। এ-নিয়ে ডাক্তারদের সঙ্গে চোটপাট চলে না।”
ছেলেটা চোখ বাঁকিয়ে বললে, “থামুন, আপনাকে আর দালালি করতে হবে না।”
ছেলেটার উত্তর শুনে আমার মাথাটা একেবারে চড়াত করে উঠল। আমার বাবাকে অপমান! যত তাড়াতাড়ি পারি আমাকে বড় হতে হবে। তারপর এদের ধরব আর পেটাব। এই ধরনের কথার একটাই জবাব, নীচের চোয়ালে একটা আণ্ডারকাট। ঝুলে হাঁ হয়ে থাক একমাস। বাবা কত ভালভাবে বলতে গেল, তার জবাব হল এই!
ডাক্তারবাবু টেবিলের টানা খুলে একটা একশো টাকার নোট বের করে ছেলেটার দিকে বাড়িয়ে ধরলেন, “এই নাও ভাই, তোমার মা কে আমি তিন দিন দেখেছি। তার মধ্যে তুমি আমাকে একদিন ভিজিট দিয়েছ, দু’দিনের বাকি আছে। আর আমার কথামতো তিন দিন ওষুধ পড়েছে। এই নাও একশো। বেশিই তোমাকে দিলুম। তুমি দয়া করে এসো। তোমার মায়ের চিকিৎসা আমার দ্বারা সম্ভব নয়। তুমি অন্য ডাক্তার দেখাও।”
ছেলেটা ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে নিল। পকেটে ভরতে ভরতে বললে, “যত ব্যাটা ঘোড়ার ডাক্তার এই পাড়ায় এসে আড্ডা গেঁড়েছে। সব ব্যাটাকে এখান থেকে হটাতে হবে। মেহনতি জনতার পকেট কেটে গাড়ি বাড়ি।”
রাস্তায় আর-একটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। সে চিৎকার করলে, “কী হল ওস্তাদ! একটু চমকে দেব?”
“দরকার হবে না। আমি এখনও বেঁচে আছি।” জামার কলারটা দু’ আঙুল দিয়ে টেনে একটু উঁচু করে বুক চিতিয়ে ছেলেটা বেরিয়ে গেল।
বাবা বললে, “এ কী করলেন! টাকাটা দিয়ে দিলেন! এভাবে তো আপনি ডাক্তারি করতে পারবেন না। ভয় পেলে তো চলবে না।”
“ভয় নয়। সেই বাংলা প্রবাদ আছে না, ‘সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল’, এ হল তাই। আর আমিও মনে-মনে ঠিক করে ফেলেছি, বাছা-বাছা দু-একটি ফ্যামিলিতে বছর পাঁচেক প্র্যাকটিস করব, তারপর ছেলের কাছে চলে যাব ফিলাডেলফিয়াতে। আমার চেম্বারে একটা দিন বসলে আপনি যে সমাজচিত্র দেখতে পাবেন, তাতে আপনারও মনে হবে, যঃ পলায়তে স জীবতি। জানেন তো, সেদিন এক রুগীর বাড়িতে আমার সব ছিনতাই করে নিয়েছে।”
“অ্যাঁ, বলেন কী?”
“রাত তখন প্রায় একটা। বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গেল কান্নাকাটি করে। সে প্রায় পায়ে পড়ে আর কি। চিনি না ছেলেটাকে। আর আজকাল কে-ই বা কাকে চেনে! সবই তো নতুন মুখ। পুরনো মুখ হারিয়ে যেতে বসেছে। তারপর দেখলুম রুগীটুগী সব বাজে। দাসবাগানের কাছে একটা লকআউট ফ্যাকট্রির কাছে নিয়ে গিয়ে যা টাকাপয়সা সঙ্গে ছিল সব কেড়ে নিলে। ঘড়িটা গেল, স্টেথো, ব্লাডপ্রেশার মাপার যন্ত্রটা গেল। আমেরিকা থেকে ছেলে একটা গোল্ড ফ্রেম এনে দিয়েছিল, সেই চশমাটা চোখ থেকে খুলে নিলে। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমি দাঁড়িয়ে রইলুম অন্ধের মতো। না একটা লোক, না একটা পুলিশ, কেউ কোথাও নেই। বন্ধ কারখানার গেটে পোস্টারের পর পোস্টার। একপাশে একটা ভাঙা রিকশার কঙ্কাল।”
“ছেলেটাকে পরে দেখতে পেলে চিনতে পারবেন না?”
“ছেলে একটা নয় তো, ছেলে তিনটে। আর চিনলেই বা কী হবে। সাক্ষী কোথায়! আইন দিয়ে কিছু করতে পারবেন না। সাক্ষীর অভাবে অপরাধী খুন করেও বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে আসছে জেল থেকে। আইন কিস্যু করতে পারছে না। আমাদের এখন দল চাই। ওই ঘরের কোণে বসে ‘গেল গেল’ করলে হবে না। তাতে সবই চলে যাবে। সমাজটাকে পুরোপুরি ঢেলে সাজাতে হবে। আইন দিয়ে, বক্তৃতা করে, নির্বাচন করে, সরকার পালটে, কিছুতেই কিছু হবে না। চারটি জিনিস চাই। চারটে পা। মানুষও চতুষ্পদ প্রাণী। শিক্ষা আর সংস্কৃতি হল দুটো হাত, আর দুটো পা হল, জীবিকা ও স্বাস্থ্য। চরিত্র হল মেরুদণ্ড। তা কে এসব করবে। মেরুদণ্ড বেঁকে ধনুক। হাত দুটো সরু লিকলিকে। দুটো পায়েই পক্ষাঘাত। রিকেটি ছেলেকে তেল মালিশ করে কত আর সুস্থ করা যায়?”
আমার দিকে তাকিয়ে হাসি-হাসি মুখে ডাক্তারবাবু বললেন, “বড় শক্ত সময়ে এসে পড়েছ তোমরা। কী যে হবে? আমাদের তো যাবার সময় হল, তোমাদের এখনও অনেকদিন টানতে হবে বাবু।”
আমরা দু’জনে রাস্তায় নেমে এলুম। রাত্তিরটা আমার এত ভাল লাগে! কত দোকান! কত আলো। কত লোক? বাবা বললে, “শোন বুড়ো, এই গরমকালে, এমন হাওয়া ফুরফুর রাতে কী কিনতে হয় বল তো?”
“কী? বেলফুলের মালা?”
“না, বালি-বালি কুঁজো, হাতপাখা আর গোলাপজাম। জামরুল আর ফলসা। চ, ওই তো বাজার! কিনে আনি। বেশ মজা হবে। মনে হবে আজ বাড়িতে কোনও পুজো আছে।”
“আমার যে হাঁটতে খুব কষ্ট হচ্ছে বাবা। তা ছাড়া দাদি তোমাকে বলেছিলেন না, বাজে খরচ করবে না। আমার সেই ইংরেজিটা এখনও মনে আছে, ওয়েস্ট নট, ওয়ান্ট নট।”
“তোকে নিয়ে আর পারা যায় না। তুই আমার চেয়েও জ্ঞানী হয়ে উঠেছিস। চল, তা হলে বাড়ি যাই। কী, একটা রিকশা নেব?”
“না। দাদি বলে গেছেন, কখনও কারও ঘাড়ে চেপে চলবে না।”
“তা অবশ্য ঠিক। তোর মধ্যে আমার বাবা বেঁচে আছেন। চল তা হলে, কদম কদম বাড়ায়ে যা।”
আমরা হাঁটা শুরু করলুম। আমার মনে হয় জ্বর আসছে। কেমন যেন শীত-শীত করছে। আমাদের বাঁ দিকে পার্ক। একটি লোক কেরোসিনের কুপি জ্বেলে ফুচকা বিক্রি করছে। আর তাকে সব গোল হয়ে ঘিরে ধরেছে। হাতে শালপাতার ঠোঙা। একটা করে পেট-টেপা, জল-ভরা ফুচকা ঠোঙায় পড়ছে আর পুটুস করে মুখে পুরে দিচ্ছে। ছবির মতো দৃশ্য। আমার জিভে জল এসে যাচ্ছে।
বাবা বলে উঠলেন, “জানিস, তুই যে-ই বললি আমি আর হাঁটতে পারছি না, আমার একটা গল্প মনে পড়ল। চল, পার্কে বসে তোকে গল্পটা বলি।”
“পার্কে বসলে দেরি হয়ে যাবে না বাবা? মা আবার ভাববে।”
“শোন না, মাত্র পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট বসব। কবেই বা আমরা আর পার্কে বসি! এর পাশ দিয়ে রোজই আমরা যাই আর আসি। ফিরেও তাকাই না। পার্কেরও তো রাগ হয়, অভিমান হয়। ওই ভাঙা বেঞ্চে আমরা বসব। মাথার ওপর আকাশটাকে একবার দেখব। কত তারা কত দূর থেকে আমাদের দেখছে! তারপর তোকে গল্পটা বলব। তারপর বাড়ি চলে যাব। এর মধ্যে তো ঝামেলার কিছু নেই।”
সারাদিনের রোদে বেঞ্চটা তখনও গরম হয়ে আছে। বাবা ঘাড় উঁচু করে আকাশ দেখছে। সত্যি আকাশটা যেন বিশাল একখণ্ড মিছরির মতো। তারাদের জলসা হচ্ছে। কালপুরুষ পশ্চিমে হেলছে, পেছনে আসছে তার কুকুর। বাবা গল্পটা শুরু করল। মনের জোরে মহাপুরুষেরা কী না করতে পারেন? স্বামী অভেদানন্দের জীবনের ঘটনা। তিনি তখন আলমোড়ায়। একদিন বিকেলে আশ্রম থেকে বেরিয়েছেন বেড়াতে। হাঁটতে হাঁটতে চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলে গেছেন বহু দূর। সূর্য ধীরে-ধীরে অস্ত যাচ্ছে। এইবার তিনি ফিরবেন। জঙ্গলের পথ। রাতে বাঘ-ভাল্লুক বেরোয়। দ্রুত পা চালিয়েছেন। পথের ঢালুতে হঠাৎ তিনি পা হড়কে পড়ে গেলেন। পড়লেন অনেকটা নীচে। পায়ের সামনের হাড়টা ভেঙে গেল পাথরের ধাক্কায়। বুঝলি বুড়ো, শিনবোনটা ভেঙে, ভাঙা বাখারির মতো ঠেলে বেরিয়ে এল। আশেপাশে কেউ কোথাও নেই। জঙ্গল। পাহাড়। ছোট-বড় পাথর। আর পায়ে-চলা পথ। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে দ্রুত। অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে। বুঝতেই পারছিস হাড় ভাঙার যন্ত্রণা কী জিনিস! যে ভাবেই হোক আশ্রমে ফিরতে হবে। কী করবেন! জয় ঠাকুর। জয় রামকৃষ্ণ। মনটাকে তিনি তুলে নিলেন পা থেকে।”
“তার মানে কী বাবা?”
“সে একটা যোগ বাবা। মনই তো সব। আমাদের দুঃখ, কষ্ট, জ্বালা, যন্ত্রণা, সবই তো মন দিয়ে বুঝতে হয়। তুই পিঁপড়ে দেখেছিস তো?”
“বাঃ, পিঁপড়ে দেখিনি! আমাদের বাগানে রোজ দুপুরবেলা তো আমি পিঁপড়েই দেখি। সার বেঁধে পিলপিল করে চলেছে। এ-গাছের গোড়া থেকে ও-গাছের গোড়ায়। পিঠে বোঝা নিয়ে। যেন কুম্ভমেলায় তীর্থযাত্রীরা চান করতে চলেছে।”
“ওরা চিনির খবর কী ভাবে পায় জানিস? প্রথমে একটা পিঁপড়ে বেড়াতে বেরোল। এদিক যাচ্ছে, সেদিক যাচ্ছে। ঘুরঘুর করে ঘুরছে। হঠাৎ দেখলে এক জায়গায় একটু গুড় কী চিনি পড়ে আছে। প্রথমে শুঁকে দেখলে জিনিসটা কী। ছোট্ট জিভ বের করে একটু টেস্ট করলে। পুরোটা কিন্তু সে খাবে না। কিছুতেই খাবে না। হাতে পায়ে ধরলেও খাবে না। সে এবার ধড়ফড় করে ফিরে চলল। জানিস তো পিঁপড়ে, মৌমাছি এরা দল ছাড়া কিছু করে না। এইবার সে দেখলে, তার দল সার বেঁধে আসছে। দেখিসনি, এক সার পিঁপড়ে আসছে, আর একটা মাত্র পিঁপড়ে উলটো দিক থেকে আসছে, আর প্রত্যেকের সামনে থেমে থেমে শুঁড়ে শুঁড়ে কী বলে যাচ্ছে। প্রত্যেককে ওই খবরটা দিচ্ছে। অত অক্ষাংশ অত দ্রাঘিমাংশে খানিকটা চিনি পড়ে আছে। ভাইসব, চলো চলো, জলদি চলো।”
“তুমি ঠিক বলেছ বাবা। প্রত্যেকদিন বাগানে আমি ওই দৃশ্য দেখি। এক সার পিঁপড়ে একদিকে যাচ্ছে আর একটা মাত্র পিঁপড়ে উলটো দিকে যাচ্ছে। প্রত্যেকের সামনে থামছে আর মাথা-ঠোকাঠুকি করছে।”
“তোর যেটা মাথা-ঠোকাঠুকি মনে হয়েছে, আসলে সেটা ওই এক কথা। ভাইসব, সন্ধান পেয়েছি, তুরন্ত চলো। মনও ওই পিঁপড়ের মতো। সারা শরীরে ঘুরে বেড়ায়। যেখানেই কোনও গোলমাল দ্যাখে, অনবরত খবর পাঠাতে থাকে মাথার মূল ঘাঁটিতে। আর আমরা ছটফট করতে থাকি। মন-পিঁপড়েকে ব্যথার জায়গায় না যেতে দিয়ে অন্যদিকে পাঠিয়ে দে, দেখবি অবাক কাণ্ড। ব্যথা নেই, বেদনা নেই, আরাম নেই, সুখ নেই, আনন্দ নেই। বাঁচার কৌশলটা রপ্ত করতে পারলে, পৃথিবীটা কী অপূর্ব জায়গা রে বুড়ো! টেরিফিক জায়গা। শুধু কি জানিস তো, মনটাকে একেবারে হাতের মুঠোয় নিতে হবে। তুই তো এখনও ছোট আছিস, তুই এসব এখনও বুঝবি না। তোকে আমি বলে রাখছি। শুনে রাখ। বলা তো যায় না, আজ আমরা দু’জনে পার্কের বেঞ্চে পাশাপাশি বসে আছি। এক বছর পরে কে কোথায় থাকব, কে বলতে পারে! এই যেমন ধর, তোর দাদি! এই তো, এই তো সেদিন ছিলেন, আজ আর নেই। জানিস তো, মানুষের সঙ্গে মানুষের জীবনে একবারই দেখা হয়। তোর দাদি একবারই আমার বাবা হয়েছিলেন। আর কখনও, কখনও আর হবেন না। আমি হুহু করে যতই কাঁদি না কেন। একবার, সবকিছুই একবারের জন্যে।”
“তুমি এইসব বললে আমার খুব কষ্ট হয়, বাবা। তুমি কেন আমাকে এসব বলছ?”
“কেন বলছি জানিস, তোর মনটা শক্ত হবে বলে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, মাটির হাঁড়ি যখন কাঁচা থাকে, সেই কাঁচা অবস্থায় যা কিছু আকার-আকৃতি দিতে হয়। পুড়ে পাকা খনখনে হয়ে যাবার পর আর কিছু করা যায় না। তখন কিছু করতে গেলেই ঠুন্ করে ভেঙে যায়। তোর ওই কাঁচা মনে এখন থেকেই বৈরাগ্যের রং ধরাতে হবে।”
“বৈরাগ্য কাকে বলে বাবা?”
“সব কিছুর মধ্যে থেকেও না থাকা। কোনও কিছু আঁকড়ে না ধরা। সংসার নিয়ে পাগল না হয়ে যাওয়া। তুই যখন খুব ছোট, তখন পুজোর সময় তোর মায়ের খুব ইচ্ছে হল তোকে ধুতি আর সিল্কের পাঞ্জাবি পরাবে। অনেক কাণ্ড করে খুঁজে-পেতে নিয়ে এলুম কিনে। পরিয়ে দেবার পর তোর সে কী ডাঁট! এদিক যাচ্ছিস, ওদিক যাচ্ছিস। কেউ হাত দিলে রেগে যাচ্ছিস। খুলে দাও না বললে কেঁদে ফেলছিস। ঘণ্টাখানেক পরে দেখা গেল সব দলাপাকিয়ে একপাশে ফেলে দিয়ে দিগম্বর হয়ে ঘুরছিস। এর নাম বৈরাগ্য। কোনও কিছুর জন্যেই দুঃখ-সুখ নেই। হল হল, না হল না হল। তুই কথামৃতটা পড় বুড়ো। আর দেরি করিসনি। ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলতেন, সংসারে থাকবি পাঁকাল মাছের মতো। পাঁকাল পাঁকে থাকে, গায়ে কিন্তু পাঁক লাগে না।”
বাবা যখন এইসব কথা বলে, মুখ-চোখ খুশিতে আনন্দে যেন ডগমগ করে ওঠে। আমার ভুলও হতে পারে, তবে মনে হয়, বাবার গা দিয়ে যেন ফুলের গন্ধ বেরোচ্ছে। এইসব সময়ে বাবাকে যেন চিনতে ভুল হয়। একবার সেই সিনেমায় দেখেছিলুম, ঠাকুর রামকৃষ্ণ স্বামী বিবেকানন্দকে প্রশ্ন করছেন, বলো তুমি কে? আমারও বাবাকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, বলল, তুমি কে?
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর বাবা বললে, “ভিড়টা কমেছে, ফুচকা খাবি না কি বুড়ো?”
“না বাবা, তুমি কখনও ফুচকা খেয়ো না। মা জানতে পারলে আর রক্ষে থাকবে না। মা বলে, ওই যে হাঁড়ির মধ্যে তেঁতুল-গোলা জল, ওর মধ্যে সময়-সময় ছুঁচো-ইঁদুর পড়ে। ফুচকা খেয়ো না বাবা। মা বলেছে, বাড়িতে একদিন করবে।”
“অন গড?”
“অন গড।”
“কী করে করবে? ওইটুকু লুচি ফোলাবে কী করে?”
“সে ঠিক ফুলিয়ে দেবে। মায়ের খুব বুদ্ধি আছে। জানো তো, মুখে-মুখে গুণ করে। এই শনিবার ফুচকা করবে।”
“হাত মেলা। আমি পঞ্চাশটা খাব। না, পঞ্চাশটা নয়, পঁচিশটা। তুই ক’টা খাবি?”
“মিনিমাম একশোটা।”
“অত খাসনি বুড়ো। অসুখ করবে।”
“তা হলে তিরিশটা।”
এরপর আমরা উঠে পড়লুম। রাস্তা অনেক নির্জন হয়ে এসেছে। আমাদের বাড়ির রাস্তায় যোগেনদার দোকানে যখন রসগোল্লা তৈরি হতে শুরু করে, তখনই বুঝতে পারি দিন শেষ হয়ে গেল। বাবা বলে, বছর হল তিনশো পঁয়ষট্টিটা পাখির একটা ঝাঁক। রোজ একটা করে উড়ে পালায়। কোনও খাঁচায় এ-পাখিকে ধরে রাখা যায় না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন