তৃতীয় অধ্যায়

মতি নন্দী

সেদিন বিকেলে বিশুদার আখড়ায় গেলুম। একটা উঠোন আছে। একপাশে বিশাল একটা কদমগাছ আছে। প্যারালাল বার আছে। রোমান রিং আছে। উঠোনে ব্যায়াম। ঘরের ভেতর যোগ-ব্যায়াম। আরও ওপাশে বেশ বড় একটা ঘেরা জায়গায় জুডো, ক্যারাটে, কুংফু। আমি যেই ‘বিশুদা, বিশুদা’ করে ঢুকছি, বিকট এক চিৎকার, ‘ইয়া হু’, পরক্ষণেই ঠাস্‌ করে একটা শব্দ। বেশ ভয় পেয়ে গেছি। কী রে বাবা! শব্দটা এল ভেতরের ঘেরা জায়গা থেকে। বিশুদার গলা পেলুম, “একসেলেন্ট, একসেলেন্ট।” আমি ভেবেছিলুম, কেউ কাউকে বুঝি মেরে ফেললে। বিশুদার গলা শুনে সাহস পেলুম।

ভেতরে উঁকি মেরে দেখলুম, বিরাট বড় একটা ম্যাট পাতা। বিশুদা সাদা রঙের ঢোলাঢালা পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে আর-একটি ছেলে। তারও পরনে বিশুদার মতো পোশাক। আরও তিন-চারজন একধারে বসে। দু’জন একেবারে ওপাশে দাঁড়িয়ে শূন্যে নানা কায়দায় ঘুসি ছুঁড়ছে।

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলুম কিছুক্ষণ। বিশুদা তখন সামনে দাঁড়ানো ছেলেটির থেকে বেশ কিছু দূরে সরে গেছেন। হঠাৎ একটা শব্দ করলেন, ইয়াপ। ডান পা’টা বিদ্যুৎ-গতিতে উঠেই নেমে গেল, আর দেখি ছেলেটা ছিটকে পড়ে গেল আর-একধারে। সে কিন্তু পড়ে রইল না। এক পাক গড়িয়েই ঝট করে উঠে দাঁড়াল, তারপর ছুটে এসে ভীষণ শব্দ করে বিশুদাকে কী একটা করল, বিশুদা ছিটকে পড়ে গিয়েই বললেন, “সুপার্ব, সুপার্ব।”

আমি একপাশে হাঁ করে দাঁড়িয়ে সব দেখছি, আর মনে-মনে ভাবছি, বাবা রে, কী কাণ্ড! এইরকম মার এক ঘা খেলে আমি আর উঠতে পারব না। ওইখানেই পড়ে থাকব সাতদিন। বিশুদার হঠাৎ চোখ পড়ল আমার দিকে। এতক্ষণ লড়াই করে চোখমুখ একেবারে লাল-টকটকে। পোড়া পেতলের মূর্তির মতো। আমার সামনে এগিয়ে এসে বললেন, “কী রে, তুই এখানে ভয়ে-ভয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কী হয়েছে?”

“আমি আপনার কাছে এসেছি। অনেক কথা আছে।”

“কী কথা বল। তোর সব কথা আমি রাখব। তোর দাদু ছিলেন আমার শিক্ষাগুরু, ব্যায়ামগুরু।”

“আপনার ঘরে চলুন।”

বিশুদা ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “প্র্যাকটিস, প্র্যাকটিস। ডোন্ট স্টপ। শরীর গরম করো, গরম করো।” ছেলেরা সঙ্গে-সঙ্গে লাফাতে লাফাতে শুরু করল। শূন্যে ঘুসি ছুঁড়তে লাগল। কেউ-কেউ ম্যাটের ওপর ডিগবাজি খেতে শুরু করল। আমরা চলে এলুম বিশুদার ঘরে। চৌকির ওপর পুরু করে কম্বল পাতা। দেওয়ালে বিখ্যাত ব্যায়ামবীরদের ছবি। তা ছাড়া, মা কালী, মা দুর্গা। সুদর্শনধারী শ্ৰীকৃষ্ণ। চতুর্দিকে দেহ সাধনার নানা যন্ত্রপাতি। চৌকির ওপর আবার একটা হারমোনিয়াম। এই ঘরটাই হল বিশুদার রাজত্ব।

আমাকে বললেন, “বোস।”

চৌকির একধারে বসলুম। একটু ভয়-ভয় করছে। বিশুদা সব শুনে হাঃ হাঃ করে হেসে যদি বলেন, ‘বুড়ো, এই শরীরে তোর হবে না রে! তুই এখন তিন-চার বছর ফ্রি-হ্যান্ড কর,’ তা হলেই হয়ে গেল। তিন-চার বছর অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য আমার নেই। ততদিনে আমাদের স্কুল শেষ হয়ে যাবে। শ্যামল বেরিয়ে যাবে। বড়লোক তো, বিলেত-টিলেত চলে যাবে।

বিশুদা ধূপ জ্বালালেন। বিশুদার গুরুর ছবির সামনে ধূপদানিতে ধূপ দুটো গুঁজে দিলেন। সারা ঘর মিষ্টি গন্ধে ভরে গেল। আমি চুপ করে বসে আছি। দেখছি বিশুদা আর কী করেন। বিশুদাকে আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি। যেমন সুন্দর দেখতে, তেমনি সুন্দর স্বাস্থ্য। আর তেমনি সুন্দর চরিত্র। লেখাপড়াতেও সাঙ্ঘাতিক ভাল ছিলেন। নিজে ডাক্তার। খুব ভাল ডাক্তার। আমার বাবার কথায়, যার হয়, তার সব হয়। যার হয় না, তার কিছুই হয় না।

ধূপ দেখাবার পর বিশুদা লাল রঙের একটা প্লাস্টিকের কৌটো থেকে ডেলামতো দুটো কী বার করলেন। একটা ডেলা আমার হাতে দিয়ে বললেন, “মুখে ফেলে দাও।” আর-একটা ডেলা নিজের মুখে ফেলে দিলেন। মুখে দিয়ে বুঝলুম তাল-মিছরি।

বিশুদা চৌকির একপাশে বসে বললেন, “বুঝলে বুড়ো, শরীর থেকে এনার্জি বেরিয়ে যাবার পর একটু মিষ্টি খেতে হয়। তাতে ক্লান্তি অনেক কমে যায়। শরীর স্নিগ্ধ হয়। মিছরি হল সবচেয়ে ভাল মিষ্টি। বিশেষ করে তাল-মিছরি। আর একটু নেবে?”

“না বিশুদা। আর নেব না।”

“বলো, এইবার, তোমার জন্য আমি কী করতে পারি?”

“আমাকে আপনি শক্তি দিন।”

“কথাটা কী রকম যেন হল! তোমাকে আমি শক্তি দেব? শক্তি দেবার মালিক আমি? শক্তি দেবেন ভগবান।”

“আমি আপনার কাছে ব্যায়াম করব। যুযুৎসু, ক্যারাটে শিখব।”

“হঠাৎ তোমার এমন ইচ্ছে হল কেন?”

“আমি একটা ছেলেকে ধরে ঠ্যাঙাব।”

“সে আবার কী?”

“সেই ছেলেটা আমার সঙ্গে পড়ে। বড়লোকের ছেলে। গায়ে খুব ক্ষমতা। অকারণে আমার ওপর অত্যাচার করে। আমি যদি একদিন বেশ করে তাকে ধোলাই দিতে পারি, তা হলে ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।”

“তুমি সেই ছেলেটার নাম বলো আমাকে। কোথায় থাকে বলো। আমি তাকে ঠাণ্ডা করে দিয়ে আসব।”

“না বিশুদা, ওই কাজটা আমাকে নিজে-হাতে করতে হবে। আমার শক্তি চাই। ওইরকম ছেলে একটা নয়, আরও অনেক আছে।”

“মারের বদলা মার, হিংসার বদলা হিংসা, এটা তো পথ নয়, পথ হল ক্ষমা।”

“তা হলে আপনি এসব শেখান কেন?”

“হুঁ, প্রশ্নটা তুমি ভালই তুলেছ।”

“আমার দাদি আমাকে বলতেন, দ্যাখ্ বুড়ো, অহিংসা, ক্ষমা এসব অনেক উঁচু জিনিস, সকলের জন্যে নয়। পশুরা বুঝবে না। যারা ব্রুট, তাদের দাবাতে হবে শক্তি দিয়ে। তাদের ক্ষমা করতে যাওয়ার মানে হবে দুর্বলতা।”

“হুঁ, তিনি ঠিকই বলে গেছেন।”

“তা হলে আপনি আমাকে শেখান।”

“দেখি, তোমার ডান হাতটা আমার ডান হাতে রাখো।”

আমার ডান হাত দিয়ে বিশুদার ডান হাতটা ধরলুম।

“নাও, এবার চাপ দাও। তোমার যত জোর আছে, সব জোর লাগাও। চাপো। দাও চাপ। জোরে, আরও জোরে।”

আমার যত জোর আছে, সব জোর দিয়ে বিশুদার হাতটা চেপে ধরলুম। আমার দাঁত কিড়ির-মিড়ির করছে।

বিশুদা জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি নিশ্বাস নিচ্ছ?”

“হ্যাঁ, নিচ্ছি।”

“দম নিয়ে, দম বন্ধ করে চাপো।”

তাই করলুম। এক সময় আমার দম ফুরিয়ে গেল। হাত আলগা হয়ে গেল। আমি আর পারলুম না।

বিশুদা বললেন, “গুড। ভেরি গুড। একে বলে জোর চালা। মানুষের জোর, মানুষের শক্তি, যা তুমি অন্যের ওপর প্রয়োগ করতে চাও, তা কখনও তরল, কখনও কঠিন। আর মনের শক্তি হল বিদ্যুৎ-তরঙ্গ। স্পার্ক। জোর এইভাবে চেলে দিতে হয়।”

“আমার জোর আছে বিশুদা?”

“হ্যাঁ আছে। দাঁড়াও, তোমার মন দেখি।”

বিশুদা উঠে গিয়ে একটা দড়ি বের করে আমার সামনে ফেলে দিলেন, “নাও, ছিঁড়ে দু’টুকরো করো।”

দড়িটা খুব মোটা নয়। পাটের দড়ি, কিন্তু টেনে দেখলুম বেশ শক্ত। মনে হল ছিঁড়তে পারব না।

“বিশুদা, এ ভীষণ শক্ত। এটাকে দু’টুকরো করা আমার পক্ষে অসম্ভব।”

বিশুদার ফর্সা, সুন্দর, মুখ লাল হয়েই আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। গম্ভীর গলায় বললেন, “অসম্ভব শব্দটা, বুড়ো, অক্ষমের অভিধানেই পাওয়া যায়। হাঁটু গেড়ে বোসো। দু’হাত দিয়ে দড়িটাকে বুকের কাছে ধরো। ধরে, দম ছেড়ে, দম নিয়ে টানো। মনে-মনে বলো, আমি হারব না। কিছুতেই আমি হারব না। ডিফিট মানে মেন্টাল ডেথ। মানসিক পরাজয়। মন হাজারবার, লক্ষবার পরাজিত হতে-হতে যে চেহারা নেয়, তাকে বলে পরাজিতের মন। ইংরেজিতে বলে, ডিফিটিস্ট মেন্টালিটি। তখন সেই মনের একটাই কথা হয়, এ আমি পারব না। ‘আমি পারব না,’ এই কথাটা তোমাকে ভুলতে হবে। মনে করো, তোমার ভাষায় ওই শব্দটা নেই। অমন কথা তুমি শোনোনি। নাও, চেষ্টা করো। চেষ্টা করো, চেষ্টা করো।”

বিশুদার গলাটা হঠাৎ অন্যরকম হয়ে গেল।

দড়িটাকে টেনেটুনে কিছুতেই কিছু করতে পারছি না। হাতে কেটে বসে যাচ্ছে, তবু ছিঁড়ছে না। দম ফুরিয়ে আসছে। বিশুদা বলেছেন, প্রথমে দম নিবি, নিয়ে ফুলবি। দম ছাড়বি না। তারপর চোখ বুজে একাগ্র হয়ে ছেঁড়ো। ছেঁড়ার চেষ্টা করো। মনে করো, এর ওপর নির্ভর করছে, তোমার বাঁচা-মরা। সেই গল্পটা শোনালেন, ছেলের মাথায় আপেল রেখে তীর মেরে দু’ভাগ করে মুক্তি আদায় করেছিলেন বীর। বললেন, প্রাণভয়ে মানুষ যখন দৌড়য়, তার বেগ তখন ওলিম্পিকের দৌড়বীরকেও ছাড়িয়ে যায়।

চোখ বুজে দম বন্ধ করে প্রাণপণে চেষ্টা করছি, কিছুতেই কিছু করতে পারছি না। ভেতরটা এত গরম হয়ে উঠেছে, এক-একবার যখন নিশ্বাস ফেলছি, নাকের কাছে ওপর-ঠোঁটটা যেন পুড়ে যাচ্ছে। শেষে দড়িটা মেঝেতে ফেলে দিয়ে আমি কেঁদে ফেললুম। বিশুদা আমার সামনে চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে ছিলেন। মাথায় হাত রেখে বললেন, “কী হল বুড়ো?”

“আমি কিছুতেই পারলুম না বিশুদা।”

“কাঁদছ কেন?”

“আমি যে ফেল করলুম।”

“ফেল করলে কী হয়?”

“ফেল করলে লজ্জা করে।”

“আর কিছু করে না?”

“মনে হয় এক জায়গায় আটকে গেলুম। আর সামনে এগোবার পথ নেই। পরীক্ষায় ফেল করলে বন্ধুরা সব পেছনে ফেলে উঁচু-ক্লাসে চলে যায়। যারা নীচে ছিল, তারা ওপরে এসে ধরে ফেলে।”

“তার মানে, সবাই চলছে, তুমি এক জায়গায় আটকে গেলে।”

“দড়িটা ছিঁড়তে পারলুম না, তার মানে আপনি আর আমাকে শেখাবেন না।”

“কিন্তু আমি তো সহজে ছাড়ি না। তোমাকে দিয়ে দড়িটা আমি ছেঁড়াবই।”

“আমি যে পারছি না বিশুদা। এই দেখুন আমার হাতে রক্ত জমে গেছে।”

“আমি যে ওই রক্তটাই জমাতে চাই। আমি ওই নরম তুলতুলে হাত দুটোকে শক্ত করতে চাই। তুমি ওই দড়িটা বাড়ি নিয়ে যাও। যেদিন ছিঁড়তে পারবে, সেদিন আমার কাছে আসবে।”

আমি মনখারাপ করে বিশুদার আখড়া থেকে বেরিয়ে এলুম। জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না, যদি ছিঁড়তে না পারি, তা হলে কি আসব না বিশুদা? সন্ধে প্রায় হয়ে এসেছে। রাস্তায় কত লোক। কেউ এদিকে যাচ্ছে, কেউ ওদিকে যাচ্ছে। আমার মনের কথা কেউ জানে না। মা আমাকে একটা টাকা দিয়েছিল সকালে। সামনেই মা কালীর মন্দির। মা কে প্রণাম করে, টাকাটা প্রণামীর থালায় রেখে, একদৃষ্টে মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে রইলুম অনেকক্ষণ। মনে-মনে অন্তত হাজারবার বললুম, মা কালী, আমাকে শক্তি দাও। মা কালী, আমাকে শক্তি দাও। যিনি পুজো করেন, তিনি এক পাশে আসনে বসে ছিলেন। কী সুন্দর তাঁর চেহারা! কপালে এতখানি গোল একটা ফোঁটা। ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। হঠাৎ আমাকে বললেন, “তোমার কি দীক্ষা হয়েছে?”

“দীক্ষা কাকে বলে?”

“তুমি কি গুরুর কাছে মন্ত্র নিয়েছ?”

“আজ্ঞে না তো!”

“তা হলে বিড়বিড় করে কী জপ করছিলে?”

“জপ কাকে বলে?”

“একই মন্ত্র বারে-বারে বলা। একশো আটবার। হাজার আশিবার।”

“আমি বলছিলুম, মা কালী, আমাকে শক্তি দাও।”

“ওই তো জপ। মা কালী বলেছ তো, ওর আগে একটা বীজমন্ত্র লাগালেই হয়ে গেল।”

“বীজমন্ত্র কাকে বলে?”

“একটি মাত্র অক্ষর, যার ধ্বনি আছে, ঝঙ্কার আছে। সব মন্ত্র যার মধ্যে জমে আছে। তুমি যখন দীক্ষা নেবে, জানতে পারবে।”

“দীক্ষা নেব কেন?”

“তা না হলে তোমার ভেতরটা জাগবে না যে! দীক্ষা তোমাকে নিতেই হবে। তোমার লক্ষণ ভাল। দেখি, ডান হাতটা দেখি।”

ডান হাতটা তাঁর সামনে পাততেই চমকে উঠলেন। বললেন, “এ কী! কেউ বেত মেরেছে না কি?”

“আজ্ঞে না, আমি একটা দড়ি ছেঁড়ার চেষ্টা করছিলুম। অনেকক্ষণ ধরে। তাই রক্ত জমে গেছে।”

“কাঁচি দিয়ে কেটে নিলেই তো পারতে।”

“আজ্ঞে না, তা হবে না। হাত দিয়ে টেনে ছিঁড়তে হবে।”

“বাবা, কী সাঙ্ঘাতিক। দড়িটা তো তোমার হাতে কেটে বসে গেছে গো। তোমার হাতে ব্যথা হবে। খেতে গেলে জ্বালা করবে। রাতে শোবার আগে প্রদীপের পোড়া তেল একটু লাগিয়ে নিও। যাও, হাত ধুয়ে এসো। প্রসাদ দেব।”

“আপনি আমার হাত দেখতে চাইলেন কেন?”

“দেখতে হবে না? এই বয়েসের ছেলে মায়ের মন্দিরে ঠায় আধঘন্টা বসে আছ। কোন্‌ সংস্কারে! দেখতে হবে না!”

“সংস্কার কাকে বলে?”

“বাঃ, তোমার তো খুব জ্ঞান-তৃষ্ণা! তোমার হবে। তুমি কে আমি তা জানি না, তবে তোমাকে আমি বলে রাখছি, বহু লোক পরে তোমাকে আমার মায়ের ইচ্ছায় চিনবে। শোনো, সংস্কার হল মনের একটা ভাল অবস্থা, যা মানুষ নিয়ে আসে। যেমন ধরো, তুমি মায়ের কাছে এসে বলছ, মা, আমাকে শক্তি দাও। কেউ আবার ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে বলবে, একটা টনিক লিখে দিন তো, যাতে শক্তি হয়। কেউ, ধরো, বাবা-মা কে খুব ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। কেউ আবার গ্রাহ্যই করে না। কেউ, ধরো, গান শুনলে মোহিত হয়ে যায়, কেউ ভীষণ বিরক্ত হয়। সবই পূর্বজন্মের ব্যাপার। কেউ সাধুর কাছে ছোটে, কেউ শয়তানের কাছে।”

“পূর্বজন্ম কাকে বলে?”

“সাহেবরা পূর্বজন্ম মানে না। আমরা মানি। তুমি কি ভাবছ, তুমি এই প্রথম জন্মেছ! না, তুমি হয়তো এর আগে হাজারবার লক্ষবার জন্মেছ। তা না হলে, ভাবো, কেউ পাঁচ বছর বয়সেই সাঙ্ঘাতিক ভাল তবলা কি সেতার বাজায়। খুব ভাল ছবি আঁকে। শক্ত-শক্ত অঙ্ক কষে। কী করে করে! এর একটাই মাত্র উত্তর, পূর্বজন্মে এসব সে করত। সেই জ্ঞানটা সে এ-জন্মে নিয়ে এসেছে।”

আমার দাদির কথা তখন মনে পড়ল। যাবার আগে গভীর রাত পর্যন্ত কেবল অঙ্ক কষতেন। খাতার পর খাতা শুধু শক্ত শক্ত অঙ্ক। জিজ্ঞেস করতুম, দাদি, এসব আপনি কার জন্যে করছেন? বলতেন, নিজের জন্য। পরের জন্মের ভিত তৈরি করছি। আমি তো ছোট, অত সব বুঝতুম না। আজ ঠাকুরমশাইয়ের কথায় বুঝছি।

পেছন দিকে হাত ধুতে গেলাম। ছোটমতো একটা উঠোন। একটা কল্কেফুলের গাছ। একপাশে একটা উনুন। অনেক কাঠ। মাটির হাঁড়ি রয়েছে। একটা কুয়ো, পাম্প লাগানো। সব একেবারে পরিষ্কার তকতকে। জায়গাটা এত ভাল লাগল! মনে হল এইখানেই থাকি। ফুলের গন্ধ। ধূপের গন্ধ। একপাশে সাদা ধপধপে একটা বেড়াল ঘুমোচ্ছ। আমি আবার লেজটা পরীক্ষা করে দেখলুম, মোটা কি না! বেশ মোটা। চামরের মতো। বাবা দেখলে আনন্দে একেবারে লাফিয়ে উঠত। এখুনি বলত, চল বুড়ো, কোলে করে নিয়ে যাই। হাতে এক মগ জল ঢালতেই হুহু করে জ্বলে উঠল। বাবা রে! হাত দুটো আমাকে ভোগাবে। বিশুদা আমার এ কী করে দিলেন!

পূজারী আমার হাতে একটা সন্দেশ দিলেন। মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, “এসো, একটু জপ করে দিই।”

আমার সারা শরীর যেন জুড়িয়ে গেল। চোখ দুটো বুজে আসছে। মাথা থেকে হাত তুলে নিয়ে বললেন, “যাও, তোমার খুব ভাল হবে। খুব ভাল।”

আমি প্রণাম করলুম। আমার দাদি, আমার বাবা, আমাকে শিখিয়েছেন, তেমন-তেমন মানুষ দেখলে ভূমিষ্ঠ হয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করবে। জানবে, গুরুজনের আশীর্বাদের মতো জিনিস নেই। প্রণাম করে উঠতেই পূজারীঠাকুর বললেন, “যাও, আবার হাত ধুয়ে এসো। মায়ের পায়ের ফুল দেব তোমাকে। সব সময় কাছে-কাছে রাখবে।”

বাড়ি ফিরে আসতেই, মা বললে, “এইবার যে তুই বড় হচ্ছিস, তা বোঝা যাচ্ছে।”

“কেন মা?”

“অত্যাচার আরম্ভ করেছিস।”

“তার মানে?”

“মানেটা বুঝতে পারছি না। ক’টা বাজল? তুই ক’টায় ফিরলি?”

“শোনো মা, মাই নেম ইজ বুড়ো। আমি অত্যাচার করার জন্যে জন্মাইনি। অত্যাচারীদের মারার জন্যে জন্মেছি। এই দ্যাখো আমার হাত। আমার হাত দুটোর অবস্থা তুমি দ্যাখো।”

মা চমকে উঠল, “আবার তুই মার খেয়ে ফিরে এলি! এবার তো দেখছি বেত মেরেছে!”

“আমি জানতুম, তোমার সেই রকমই মনে হবে। বলো তো, এটা কী!”

“দড়ি। দড়ি নিয়ে কী করছিস?”

“এইটা আমি দু’ঘন্টা ধরে ছেঁড়ার চেষ্টা করছি। ছিঁড়তে পারিনি। তাই আমার হাতের এই অবস্থা।”

“আমাকে দে, বঁটি দিয়ে কেটে দিচ্ছি।”

“তাতে হবে না, মা। হাত দিয়ে টেনে আমাকে ছিঁড়তে হবে। দ্যাট ইজ মাই সাধনা। আমার হোমটাস্ক।”

মা যখন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, মুখটা এত সুন্দর দেখায়! আমার মুখটা যদি মায়ের মতো হত। টানা-টানা দুটো ভুরু। সেই ভুরু দুটো এখন ধনুকের মতো হয়ে গেছে। চোখ দুটো মা দুর্গার মতো। চাঁপাফুলের মতো গায়ের রং। হাত দুটো কী লম্বা। দাদি বলতেন, যাদের হাত ছোট হয়, তাদের মনও ছোট হয়। যাদের হাত লম্বা, হাঁটু ছুঁই-ছুঁই, তাদের মন হয় সাধকের মতো। শ্রীচৈতন্যদেবের ওই রকম লম্বা হাত ছিল। আজানুলম্বিত মানে জানিস? জানু স্পর্শ করে যে হাত।

আমার মা কে আমি কখনও নোংরা জামাকাপড় পরতে দেখিনি। সব সময় পরিষ্কার। কোনও কিছু নোংরা অপরিষ্কার দেখলে মা ভীষণ রেগে যায়। আমাকে রোজ দু’বার জামা-প্যান্ট ছাড়তে হয়। এই এখন যা পরে আছি, সব খুলে বালতিতে সাবান-জল করা আছে, তাইতে ডুবিয়ে দিতে হবে। কাল সকালে কাচা হবে।

“নাও, মাথাটা নিচু করো, মা কালী তোমাকে আশীর্বাদ করবেন। একটু আগে মা আমাকে আশীর্বাদ করেছেন।”

আমি আমার মায়ের কথা শুনি, মা আমার কথা শোনে। মা মাথা নিচু করে বললে, “দে, আশীর্বাদ দে।”

মায়ের মাথায় কী সুন্দর চুল! কালো কুচকুচে। একটু কোঁকড়া-কোঁকড়া। সব দিক থেকে আমার মা এত ভাল! এমন মা আর কারও নেই। দাদি কথায়-কথায় বলতেন, এমন মেয়ে লাখে একটা মেলে। জবাফুলটা মায়ের মাথায় ঠেকিয়ে বললুম, “মা কালী, আমার এই সুন্দর মা কে একশো বছর বাঁচিয়ে রাখো মা।”

“রক্ষে কর বাপ, একশো বছর কে বাঁচবে! তুই একটু বড় হলেই আমি চলে যাব। জানিস তো, শক্তি থাকতে-থাকতেই চলে যাওয়া ভাল।”

“আহা, তাই না কি! তোমাকে ছেড়ে আমি থাকতে পারব না।”

মা কে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলুম। মায়ের বুকে মাথা রেখে চোখ বুজে থাকতে বেশ লাগে। কানের কাছে মায়ের হৃৎপিন্ড ধুকধুক করছে। মায়ের জীবন। আমার দাদি একটা গান শুনতে ভীষণ ভালবাসতেন, ‘মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে।’ পিংকাটা ভীষণ হিংসুটে। খাটের তলায় শুয়ে ছিল। যেই মা কে জড়িয়ে ধরেছি, অমনি ছুটে এসেছে। ভেবেছে মা কে আমি বোধহয় মারছি। সামনের দুটো পা মায়ের গায়ে রেখে দাঁড়িয়ে উঠেছে। উঁউঁ করে কাঁদছে। মিষ্টি গলায় মাঝে-মাঝে ধমকাচ্ছে। আহা, মা যেন ওর একলার!

বাবার আজ ফিরতে বেশ রাত হল। সিমেন্ট জমানো বিরাট একটা ফুলগাছের টব নিয়ে হেঁইয়ো হেঁইয়ো, হেঁইয়ো করে ঢুকছে। মা বললে, “যেদিন ফিরতে রাত হবে, সেদিন বলে যাও না কেন?”

“রাত কি হত নাকি। এইটার জন্যে হল।”

“এত ভারী জিনিস একা-একা তুলতে যাও কেন! খ্যাঁচ করে কখন লেগে যাবে! এটা কেনার কী দরকার ছিল?”

বাবা এক কোণে টবটা রেখে হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বললে, “তোমাদের সাঙ্ঘাতিক একটা জিনিস করে দেখাব, বনসাই। বটগাছ বনসাই করব। বুড়ো কোথায় গেলি রে! আমার খোকা বুড়ো।”

“তোমার পেছনে বুড়ো স্ট্যান্ডিং বাবা।”

“আমার ডান হাতটা ধরে ঝুলে পড়ো?”

“আমি যে পারব না বাবা। এই দ্যাখো আমার হাতের অবস্থা।”

“এ কী রে! কী করে এমন নকশা করলি?”

“সে তোমাকে আমি পরে বলব।”

পিংকা টবটাকে ফোঁস-ফোঁস করে শুঁকছে। ভেতর থেকে একটা চাপা গড়গড় শব্দ বের করছে।

বাবা বললে, “আর-একটা যা জিনিস এনেছি না! দেখলে তোমাদের মাথা খারাপ হয়ে যাবে।”

মা বললে, “তা হলে আর দেখে কাজ নেই। মাথা খারাপ হয়ে গেলে মহাবিপদ হবে।”

আমি বললুম, “কী এনেছ বাবা?”

“ফোলানো অ্যাটলাস। বুঝলি, যেই ফুঁ দিবি, ফুলে উঠবে। ফুলতে ফুলতে সুন্দর একটা অ্যাটলাস। কী মজা!”

“কোথায় বাবা? কোথায় বাবা?”

“ধৈযং ধরং। আমার কাঁধের এই ঝোলা ব্যাগে, সুন্দর একটা বাক্সের মধ্যে পৃথিবী এখন চুপসে আছে। দাঁড়া, আগে ড্রেসটা পালটাই, হাত-মুখ ধুই, তারপর পৃথিবী ফোলাব।”

মা বললে, “কত টাকা খরচ করলে?”

সঙ্গে-সঙ্গে বাবার মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল। মা এমন-এমন সময় টাকার কথা তোলে, বাবার আনন্দটাই নষ্ট হয়ে যায়। বাবা বললে, “বেশি না। এই টব আর অ্যাটলাস নিয়ে মোটে একশো টাকার মতো খরচ হয়েছে।”

“তোমাকে নিয়ে আমি আর পারি না বাবা। বাবাও চলে গেছেন। কার কাছে তোমার নামে কমপ্লেন করব! আমার আর মাথায় কিছু আসছে না।”

“কমপ্লেন করার তো কিছু নেই। আমি তো সংসারের টাকা খরচ করিনি। আমি আমার জলখাবারের টাকা জমিয়ে এইসব কিনছি। আরও পাঁচটা এইরকম টব কিনব। দোকানে বেছে রেখে এসেছি। তাইতে লেবুগাছ বনসাই করব। কাঁঠাল করব। গোলঞ্চ। নিম। লেবুগাছ যা হয় না, তোমার কোনও ধারণা নেই।”

“তার মানে তুমি দুপুরে অফিসে কিছু খাও না! এইবার শরীরটা যাবে।”

“কেন যাবে? সকালে আমি দু’ মুঠো ভাত ওই কারণে বেশি খেয়ে নিই। আর যেদিন খুব বেশি খিদে পেয়ে যায়, সেদিন করি কী, আমাদের অফিস থেকে একটু দূরে, একটা গাছতলায় ছাতুর হোটেল আছে, সেখানে গিয়ে বলি, শালপাতায় বেশ করে নুন-লঙ্কা দিয়ে ছাতু মেখে দাও, সঙ্গে এক টুকরো পেঁয়াজ। আঃ, সে যা টেস্ট! একেবারে তোফা। পেটে থাকেও অনেকক্ষণ।”

“তোমার কোনও মান-সম্মান নেই।”

“কেন থাকবে না। মানসম্মান তো অপরের, আমাকে দেবে। ও এমন এক জামা, যা নিজে কিনে পরা যায় না। লোকে পরাবে। ছাতু খেলে মানসম্মান চলে যাবে আর কাটলেট খেলে মানসম্মান বজায় থাকবে, এ-কথা কে তোমাকে বললে?”

“আজ কী খেলে?”

“ঘোড়ার ডিম।”

“তোমার যা প্রাণ চায়, তা-ই করো, আমি আর কিছু বলব না। যে-যার সব বড় হয়েছ, বোধবুদ্ধি হয়েছে, কেউ তো আর ছেলেমানুষটি নও।” মা রাগ-রাগ মুখ করে চলে গেল।

বাবা বললে, “কেন যে তুমি আমাকে এত বকো! আমি বলে কত লক্ষ্মী ছেলে! আমার মতো ছেলে হয়!”

আমি বললুম, “আপনারে বড় বলে বড় সেই নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়।”

“সে তো বড়! আমি বলেছি লক্ষ্মী। তুই আর ঝামেলা করিস না তো!”

বাবার পুজো-পাঠ হয়ে যাবার পর ঝোলা থেকে সেই অ্যাটলাস বার হল। ফুফু করতে করতে ফুলে ছোটখাটো একটা পৃথিবী হয়ে গেল। বাবার কী আনন্দ! যত ফুলতে থাকে, ততই বলতে থাকে, “ওই দ্যাখ বুড়ো, মহাদেশগুলো কী রকম স্পষ্ট হয়ে উঠছে! আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ। ফোলা বুড়ো, ফোলা।”

“আর ফুলবে না বাবা। ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। এবার তুমি ফিট করো।”

স্ট্যান্ড, নাট, স্ক্র চারপাশে সব ছড়িয়ে আছে। বাবাকে সব দেখিয়ে দিয়েছিল, কীভাবে লাগাতে হয়। সব ভুলে গেছে। একবার এটার সঙ্গে ওটা লাগাচ্ছে, একবার ওটার সঙ্গে এটা, আর থেকে-থেকে বলছে, “কী হল রে বুড়ো। এ যে উলটো হয়ে গেল রে বুড়ো!” শেষে বললে, “মাকে ডাক।”

আমার মায়ের অবশ্য খুবই বৈজ্ঞানিক বুদ্ধি। বাড়ির ছোটখাটো সব মেরামতি কাজের জন্যে বাইরের লোক ডাকতে হয় না। ইলেকট্রিকের কিছু হলে নিজেই করে ফেলে। আমার জামা-প্যান্ট মা-ই করে দেয়।

মা রান্নাঘরে লুচি ভাজছিল। বললে, “আমি এখন যাই কী করে!”

বাবা ও-ঘর থেকে সমানে চিৎকার করছে, “লক্ষ্মীটি একবার এসো। প্লিজ, একবার এসো।”

মা হতাশ মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললে, “কী করা যায় বল তো? তোরা বাপে-ছেলেতে দু’জনে মিলে আমাকে কি পাগল করে দিবি?”

আমারও স্বার্থ আছে। বললুম, “পাঁচ মিনিটের জন্যে গেলে তোমার এমন কী ক্ষতি হবে মা?”

“তা হলে আজ রাতে আর খাওয়াদাওয়া করে কাজ নেই! কেমন?”

মা কড়াটা ঠক করে নামিয়ে রাখল। ঝাঁজরির ওপর ফুলকো লুচি।

বাবার সামনে বসে আছে পিংকা। মাঝে-মাঝে থাবা বাড়াচ্ছে। খুব ইচ্ছে করছে আর কি! বাতাস-ভরা গ্লোবটা পেলে একটু টেস্ট করে দেখবে। বাবা বলছে, “ছিঃ, অমন করে না পিংকা। ছিঃ, অমন করে না।”

বাবার হাঁটুর পাশে পুশ, কখনও পাশ ফিরে, কখনও চিত হয়ে খলবল-খলবল করে খেলছে। সে একটা স্ক্রু পেয়েছে।

মা বললে, “তোমার দু’জন অ্যাসিস্ট্যান্টই তো এসে হাজির! আমাকে আর কী দরকার!”

“আরে তুমি না হলে এসব হয়! তোমার কত বড় মেকানিক্যাল ব্রেন! তোমার তো ইঞ্জিনিয়ার হওয়া উচিত ছিল!”

“থাক, খুব হয়েছে।”

মা আমাদের আসরে এসে বসায় পিংকা আর পুশের খুব আনন্দ হল। পিংকা দু’তিনবার মায়ের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বার চেষ্টা করল। পুশ গুটিগুটি এসে মায়ের কোলে জোব্বা হয়ে বসল। বসেই গলা দিয়ে ঘুড়ুড়-ঘুড়ুড় শব্দ বের করতে লাগল। আমার মায়ের কোল পেলে পুশের আর কিচ্ছুর দরকার নেই। পিংকার আবার সেইটাতেই ঘোরতর আপত্তি। পিংকা মনে করে, মা শুধু তার একার। ফলে মাথা খারাপ হয়ে গেল। গোঁড়োর-গোঁড়োর শব্দ করছে। ভিজে ভিজে নাক দিয়ে মা কে গোঁত্তা মারছে। সামনের থাবা দিয়ে খুবলে পুশকে কোল থেকে তুলে আনার চেষ্টা করছে। ঘাড়ের কাছে কায়দা করে কামড়ে ধরে টেনে নামিয়ে আনার চেষ্টা করছে। যখন কিছুতেই কিছু করতে পারছে না, তখন উঁউঁ করে কাঁদছে। ছোটখাটো একটা বিপ্লব বেধে গেল।

মা বললে, “কী জ্বালায় পড়েছি! এ ভাবে কিছু করা যায়!”

বাবা বললে, “যাই বলো, এই দৃশ্য দেখার জন্যে আমি হাজার বছর বাঁচতে পারি।”

আর ঠিক সেই সময় পিংকা পুশের ওপর মায়ের কোলে হালুম করে চেপে বসল। মা বললে, “তবে এই হোক। আর কিছু করে দরকার নেই।”

“দাঁড়াও, আমরা দু’জনে তোমাকে প্রোটেকশান দিচ্ছি। বুড়ো, আমি পিংকাকে ধরছি। তুই পুশকে তুলে নে।”

মা ঠিক পাঁচ মিনিটের মধ্যে গ্লোবটা ফিট করে দিয়ে বীরের মতো চলে গেল। বাবা বললে, “তোমার কোনও তুলনা নেই। তোমার তুলনা তুমি।”

মাঝখানে গ্লোব, একপাশে আমি, এক পাশে বাবা, ওপাশে পিংকা, এপাশে পুশ। আমরা গোল হয়ে বসে আছি। পিংকা আর পুশও যেন ছাত্র। অবাক হয়ে সুন্দর জিনিসটাকে দেখছে। পিংকার নাক দেখে বুঝতে পারছি, জোরে-জোরে শ্বাস নিচ্ছে আর ছাড়ছে। নাক দিয়ে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে। পুশ দেখছে পিংকাদাদা কী করে! সেই অনুসারে ঠিক হবে তার কী করা উচিত।

বাবা হাহা করে হেসে বললে, “পৃথিবী এখন আমার হাতের মুঠোয় বুড়োকুমার।”

“তুমি এবার কী করবে বাবা?”

“মাঝরাতে আমার জাহাজ ছাড়বে। আমি ক্যাপ্টেন, তুই আমার মেট। পিংকা আর পুশ আমাদের যাত্রী। আমি হয়ে যাব ভাস্কো-ডা-গামা।”

“আর মা?”

“মা হয়ে যাবে ম্যাডাম গামা। তোর নাম হবে অ্যান্টোনিও ফারনান্‌ডেজ। এই দ্যাখ, লিসবন থেকে আমাদের জাহাজ ছাড়বে, ম্যাডেইরা আইল্যান্ড, ক্যানারি আইল্যান্ড হয়ে এই স্প্যানিশ সাহারায়, এই যে ভিলা সিসনেরোগ, এই বন্দরে জাহাজ ভেড়াব। তুই সকালে উঠে দেখবি, বালি আর বালি। একদিকে অতলান্তিকের নীল জল গর্জন করছে, অন্যদিকে সাহারার শান্ত বালির ঢেউ। দেখবি, উট চলেছে মুখটি তুলে। গলায় ঘন্টা বাঁধা। রোদ উঠলে আর তাকাতে পারবি না। চোখ ঝলসে যাবে। একটা সানগ্লাস নিতে ভুলিস না।”

“ভীষণ গরম হবে বাবা। সাহারায় না নেমে চলো না আইভরি কোস্ট-এ গিয়ে নামি। নামটা ভারী সুন্দর।”

“সাহারা নামটা খারাপ? কবিতাতে পর্যন্ত আছে, আমার বুকে সাহারার হাহাকার। তারপর আমরা ‘স্কেলিট্যান কোস্ট’-এ যাব। সাঙ্ঘাতিক জায়গা। কেন এইরকম নাম হয়েছে জানিস? কোনও জাহাজ ওখানে ভিড়তে পারে না। দিন-রাত শুধু শোঁশোঁ করে বাতাস বইছে প্রচণ্ড। বেলাভূমিতে বালির সঙ্গে ছড়িয়ে আছে, জড়িয়ে আছে হীরে। এই খবরটা যেই ছড়িয়ে পড়ল সভ্য দুনিয়ায়, দুঃসাহসী নাবিকের দল, যে-যেমন পারল, ভেসে পড়ল এক-একটা জাহাজ নিয়ে। উথালপাতাল ভয়ঙ্কর সমুদ্র। পাহাড়ের মতো এক-একটা ঢেউ। ভীম গর্জনে আছড়ে পড়ছে তীরে। একশো, দেড়শো, দুশো মাইল বেগে বাতাস ছুটছে। তীরের ফলার মতো বালির কণা ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুটে আসছে, অদৃশ্য যোদ্ধাদের ধনুক থেকে। হীরের পাহারাদার। জানিস তো, লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু। মাঝদরিয়া ছেড়ে জাহাজ আসছে কূলের দিকে। কাপ্তেন ডেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছেন, ‘অন দি লারবোর্ড টু ডিগ্রি ইস্ট।’ সারেং ধীরে-ধীরে ডাঙার দিকে আসার চেষ্টা করছে।”

“লারবোর্ড মানে কী বাবা?”

“জাহাজের বাঁ দিকটাকে বলে লারবোর্ড। ডান দিকটাকে বলে স্টারবোর্ড। জাহাজ তীরের দিকে আসছে। ভাবতে পারিস, কী অদ্ভুত জায়গা! মরুভূমি এসেছে সাগরে স্নান করতে। আর প্রকৃতি চালিয়েছে পাখা!”

ব্যাপারটা পিংকার তেমন পছন্দ হল না মনে হয়। দু’বার ভুক্‌ভুক্‌ করে উঠল। পুশ তার পিংকাদাদার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকাল। আর মা ওপাশ থেকে জোরে বললে, “সব যে ঠাণ্ডা হয়ে গেল। খেয়ে নিয়ে, যত পারো, স্টারবোর্ড লারবোর্ড করো।”

বাবা বললে, “চলো সব, লাইন দিয়ে চলো। খাবার ঘণ্টা পড়েছে।”

পিংকা সব বোঝে। সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল। ওঠার সময় পুশকে নাক দিয়ে একটা ঠেলা মারল। আমরা সব খেতে চলেছি। আগে-আগে পিংকা। তার পেছনে পুশ, আমি। সবার শেষে বাবা। লাইন চলেছে খাবার ঘরের দিকে। পিংকা জানে তার খাবার কোথায় দেওয়া আছে! রুটি আর মাংস। পুশের দিকে তাকিয়ে দু’বার গঁগঁ করল। করেই মুখ নামিয়ে খাওয়া শুরু করে দিল। পুশের বাটিতে ভাত-মাছ। মা সব রেডি করে রেখেছে। পুশটার একটু হ্যাংলা স্বভাব। নিজেরটা ছেড়ে পিংকার খাবারের দিকে উঁকিঝুঁকি মারতেই হবে। পিংকা অবশ্য রোজই প্রসাদ দেয়। দু’জনের ভীষণ ভাব তো!

বাবা বললে, “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাদ্য হল লুচি, বেগুনভাজা আর মাঝে-মাঝে এক কামড় করে কাঁচা লঙ্কা।”

আঙুল দিয়ে একটা ফুলকো লুচির মাঝখানটা ফুটো করতেই ফুস্ করে বেরিয়ে গেল গরম হাওয়া। এইটায় আমার খুব মজা লাগে! কত জনকে প্রশ্ন করেছি, হাওয়া কীভাবে বন্দী হল! কেউ সেভাবে বুঝিয়ে বলতে পারেনি!

বাবা বললে, “এদিকে তিন হাজার মাইল, ওদিকে হাজার মাইল।”

“কী বাবা?”

“সাহারা মরুভূমি। অতলান্তিক থেকে লোহিত সাগর। বালির ঢেউ আর ঢেউ। সোনালি বালির ওপর দিয়ে ঝোড়ো বাতাস বয়ে যাবার সময় লক্ষ-লক্ষ সাপের মতো খেলে-খেলে গেছে। যেদিকে তাকাও, শুধু বালি আর বালি। বালির পাহাড়। কবে কোন্‌ কালে আগ্নেয়গিরি ছিল। ভয়াবহ। হঠাৎ একদিন ভীষণ রেগে গিয়ে আকাশের দিকে ছুঁড়তে শুরু করল আগুনের গোলা। নামতে লাগল লাভার স্রোত। যেখানে একদিন গ্রাম ছিল, নগর ছিল, নদী বয়ে যেত কুলকুল করে, সব চাপা পড়ে গেল লাভার তলায়। আগ্নেয়গিরির রাগ একদিন কমল সব ধ্বংস করে। লাভা জমে পাথর হয়ে গেল। বিচিত্র আকৃতির সব পাহাড় তৈরি হল। ছোট বড় স্বচ্ছ মোতির দানার মতো উপলখণ্ডে ছেয়ে গেল অনেক জায়গা। কোথাও কোনও গাছ নেই, প্রাণ নেই, জল নেই, অভিশপ্ত ভূমির ওপর সারাদিন কাঁপে রোদের পাখা। তামাটে আকাশ উপুড় হয়ে আছে মাথার ওপর। দিনে যেমন গরম, রাতে তেমনি ঠাণ্ডা। ভুতুড়ে চাঁদ ওঠে। বেরিয়ে আসে হায়না, বেড়ালের মতো ছোট-ছোট শেয়াল। সাঙ্ঘাতিক বিষাক্ত, পাথুরে রঙের কাঁকড়াবিছে।”

আমার আর বাবার দু’জনেরই খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। মা লুচি দিতে এসে জিজ্ঞেস করলে, “তোমরা এখন কোথায় আছ?”

বাবা বললে, “সাহারা মরুভূমিতে।”

“দয়া করে থালায় ফিরে এসো। সব জুড়িয়ে জল হয়ে গেল।”

“আমরা তো খেতে-খেতে কথা বলছি।”

“সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কথাই হচ্ছে, খাওয়া হচ্ছে না। চারখানা লুচির সাড়ে তিনখানা পড়ে আছে।”

বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললে, “কী করছিস বুড়ো, তাড়াতাড়ি হাত চালা। রাত বারোটায় আমাদের জাহাজ নোঙর তুলবে। ওই দ্যাখ, পিংকা আর পুশের খাওয়া হয়ে গেছে। শুয়ে-শুয়ে কেমন গা চাটছে।”

মা বললে, “বারোটার সময় তোমাদের নোঙর তোলাচ্ছি, তবে জেগে নয়, স্বপ্নে। ঠিক এগারোটা বাজবে আর আমি সব আলো নিভিয়ে দেব। প্রতি মাসে দুশো-তিনশো টাকা ইলেকট্রিক বিল হচ্ছে।”

খাওয়াদাওয়ার পর বাবা বললে, “চল্‌, আমরা ছাদে যাই। রাতে আকাশের তলায় বসলে অনেক কিছু ভেসে আসে।”

“কী আসে বাবা?”

“কণ্ঠস্বর আসতে পারে। ভাব আসতে পারে। দৃশ্য আসতে পারে। আকাশের পশ্চিম দিকে এক দৃষ্টে অনেকক্ষণ তাকালে দেখবি, সাদা মন্দির, গাছপালা, নদী ভেসে উঠছে। হঠাৎ দেখবি একটা আগুনের গোলা উত্তর থেকে পশ্চিমে ছুটে যাচ্ছে। রাত যখন আরও গভীর হয়ে আসবে, তখন শুনবি, কোথায় যেন কোন্‌ মন্দিরে আরতির কাঁসর ঘন্টা বাজছে। দ্যাখ, দ্যাখ বলছি, আমার গায়ে কীরকম কাঁটা দিয়ে উঠছে! তোর কিছু হচ্ছে না?”

“আমার কীরকম ভয় করছে। গা-ছমছম করছে।”

“দূর! তুই না আমার ছেলে! আমার বাবার নাতি, তোর কেন ভয় করবে? অজানাকে জানবি। বিশালের মুখোমুখি হবি। সারা পৃথিবী হবে তোর ঘর। তোকে আমি অক্‌সফোর্ড পাঠাব লেখাপড়া করতে। ভয় পেলে চলে!”

আমার মা ছাতটাকে কী অপূর্ব করে রেখেছে। পরিষ্কার তকতকে। চারপাশে সার-সার ফুলগাছের টব। কিছু লতানে ফুলগাছ, অপরাজিতা, জুঁই, দড়ির জাল বেয়ে-বেয়ে লতিয়ে উঠেছে। জুঁই ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভাসছে বাতাসে। বিশাল একটা টবে একটা কাঠচাঁপা গাছ; এমনই তার বেড়ে ওঠার ভঙ্গি, যেন শতবাহু মেলে নাচছে। এরই মাঝে মাদুর বিছিয়ে আমি আর বাবা পাশাপাপি বসে পড়লুম।

“তোর মায়ের বাগানটা বেশ মনোরম হচ্ছে রে বুড়ো!”

“দাদি যে মা কে বলে গিয়েছিলেন, “আমি শুরু করে গেলুম, তুমি শেষ করে যেও।”

“এখানে, বুঝলি বুড়ো, শুরুও নেই শেষও নেই। এবড় মজার জায়গা, একটা মানুষ আসে, তার তখন শুরু, সেই মানুষটা যখন চলে যায়, তার তখন শেষ। এই হল ব্যাপার, বুঝলি কি না! অনাদি অনন্ত। সন্ধি করে অনাদ্যনন্ত। নে, চিত হয়ে শুয়ে পড়। চিতপাত ভব। আকাশটাকে দ্যাখ রে বুড়ো, ভাল করে দ্যাখ। আকাশই আমাদের আশ্রয়। মস্তকোপরি থাকে বলে ব্যস্ত মানুষ তাকাতে ভুলে যায়। সবাই মুরগির মতো মাটিতে দানা খুঁজছে। কী রকম ভাল-ভাল বাংলা বলছি বুড়ো!”

বাবা আর আমি পাশাপাশি শুয়ে পড়লাম। শুয়ে-শুয়ে আকাশের দিকে তাকালে মনটা কেমন যেন হয়ে যায়! বাড়ি নেই, ঘর নেই, পথ নেই, মানুষ নেই। জায়গায় জায়গায় তারাদের জটলা, যেন সানাই বাজাতে বসেছে।

“বাবা, কিছু তো শোনা যাচ্ছে না!”

“যাবে যাবে, সব যাবে। পাড়াটাকে আগে পুরোপুরি শান্ত হতে দে। শুনছিস না! এখনও কাদের বাড়িতে গান হচ্ছে, কোথায় একটা বাচ্চা কাঁদছে চ্যাঁ-চ্যাঁ করে। সব যখন শান্ত হয়ে যাবে, তখন প্রথমেই কী শুনবি বল তো?”

“কী বাবা?”

“জলে ঘটি ডোবালে যে রকম শব্দ হয়, ঠিক সেই রকম শব্দ শুনবি।”

“কেন বাবা?”

“সে কি তুই বুঝবি? তোর কি সে বয়েস হয়েছে? মানুষ হল একটা ঘট। মহাকাল সময়ের সমুদ্রে সেই ঘট ডুবিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেন। মানুষ একটু একটু করে ঢালতে ঢালতে এক সময় সব শেষ করে ফেলে। তখন সেই শূন্য ঘট ঈশ্বর ভেঙে দেন। কী মজা বুড়ো! আমি যখন ভাবি, তখন যেন কেমন হয়ে যাই! মনে করি একটু কম খরচ করব। আমি কে! বৈশাখ মাসে তোর মা তুলসীগাছে ঝারি বাঁধে দেখেছিস তো! মাটির ভাঁড়ের তলায় ছোট্ট একটা ফুটো। মা তাইতে জল ঢেলে দেয়। টুপটুপ ফোঁটা ঝরতেই থাকে, ঝরতেই থাকে। ফুটো পাত্র যদি মনে করে, জল আমি ধরে রাখব, পারবে না। সে স্বাধীনতা নেই। আমাদের পাঠাবার সময় ভগবান ছ'টা ফুটো করে দিয়েছেন। ছ'টা ইন্দ্রিয়, রাগ, লোভ, মোহ, এই সব আর কি। সেই ফুটো ধরে ফিনকি দিয়ে সময় বেরিয়ে যাচ্ছে। তুই কি জানিস?”

“কী বাবা?“

“তৈলঙ্গ স্বামী নাকি অনেক অনেক বছর বেঁচেছিলেন?”

“তিনশো বছর!”

“তা হয় তো হবে! কী করে বল তো! ভগবান আমাদের দেহে একটা যন্ত্র দিয়েছেন, এক জোড়া ফুসফুস। তুই যেই শ্বাস নিচ্ছিস, সঙ্গে-সঙ্গে কিছুটা অক্সিজেন ঢুকে পড়ছে। অক্সিজেন না পেলে প্রাণী মারা যায়, আবার এই অক্সিজেনই ভেতরটা পুড়িয়ে দেয়। জানিস তো, মানুষ যখন জ্ঞানী ছিল, তখন আয়ু মাপত বছর দিয়ে নয়, শ্বাসপ্রশ্বাস দিয়ে। যোগীরা তাই শিখলেন প্রাণায়াম। প্রাণায়াম হল শ্বাসপ্রশ্বাসকে খুশিমতো কমানোর কায়দা। তুই যত কম নিশ্বাস নিবি, তত বেশি দিন বাঁচবি। যোগীরা একবার শ্বাস নিয়ে অনেকক্ষণ থাকতে পারেন। এই থাকার নাম কুম্ভক। আমরা তা পারি না। আমরা ফোঁসফোঁস নিশ্বাস ফেলি এলোমেলো। রেগে গেলে বেশি ফেলি। আমাদের নিজেদের ওপর কোনও কন্ট্রোল নেই। আমাদের দিন টুপটুপ করে ঝরেঝরে বছর হয়। বছর থেকে যুগ। একদিন সব পুঁজি শেষ।”

“বাবা, তুমি আমাকে কুম্ভক শেখাবে?”

“আমি কি শেখাতে পারব রে! আমার সে ক্ষমতা নেই বাবা। তবে আমি তোকে এমন এক যোগীর কাছে নিয়ে যেতে পারি, যিনি প্রাণায়াম করতে করতে হাল্‌কা হয়ে শূন্যে ভেসে ওঠেন। নদীর জলে একেবারে চিত হয়ে মড়ার মতো ভাসতে ভাসতে যত দূর ইচ্ছে তত দূর চলে যেতে পারেন।”

“কবে নিয়ে যাবে বাবা?”

“দাঁড়া, খোঁজ নিই, কবে তিনি কলকাতায় আসেন! সারা বছরই তো তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়ান।”

আমি জামার পকেট থেকে দড়িটা বের করে ফেলেছি। বিশুদার কাছে আমাকে কালই যেতে হবে। আজ রাতে এই দড়ি আমি ছিঁড়বই ছিঁড়ব। আমার হাত ফালাফালা হয়ে যায় তো যাক। বাবা চিত হয়ে তারাদের আসরের দিকে তাকিয়ে আছে, আর আমি আপন মনে দু’হাতে দড়ির দুটো পাশ পাকিয়ে নিয়ে প্রাণপণে টানছি। হাতে ভীষণ লাগছে। বাবা বলেছিল, ব্যথা থেকে মনটা সরিয়ে নিতে। সেই চেষ্টাই করছি। কখন আমার মা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল নেই। চমকে উঠেছি, মা যখন বললে, “আবার সেই দড়ি!”

বাবা বললে, “তোমরা সেই তখন থেকে কী একটা দড়ি-দড়ি করছ বলো তো! ব্যাপারটা কী!”

“তোমার গুণধর পুত্রের মুখেই শোনো। আঃ, ছাতটা কি সুন্দর!”

মা আলসের ধারে চলে গেল। আমি বাবাকে সব বললুম। বাবা সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল।বিশুদারহোমটাস্কটা বাবার মনে ধরে গেছে, “দড়িটা দে তো, আমি ছিঁড়তে পারি কি না দেখি।”

“তুমি ছিঁড়লে হবে না বাবা। আমাকে ছিঁড়তে হবে। আমার পরীক্ষা।”

“তুই বিশুর কাছেই তো প্রাণায়াম শিখতে পারিস। দুর্দান্ত ছেলে। তোর জীবনের ধারাটাই পালটে দিতে পারে। নে, টান। যত জোরে পারিস্‌ টান। দম নিয়ে বন্ধ করে টান। টান। আরও জোরে, আরও জোরে।”

সারা ছাতটা এক পাক ঘুরে মা আমার সামনে এসে বসেছে। আমি টানছি। বাবা আমাকে উৎসাহ দিচ্ছে, “টান, টান। আরও জোরে।” এত করেও হল না। আর একবার হেরে গেলুম। হাত জ্বলছে। কপাল থেকে এক ফোঁটা ঘাম হাতের ওপর ঝরে পড়ল। আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে। পরীক্ষায় ফেল করলে যেমন হয়, মনের ভেতরটা সেই রকম করছে।

বাবা বললে, “যা, সারা ছাতটা এক পাক ঘুরে আয়। ওই তুলসীগাছের টবের কাছে গিয়ে বল, নারায়ণ, আমাকে শক্তি দাও।”

সারা ছাতটা আমি একবার পাক মেরে এলুম। তুলসীগাছের টবের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলুম। মনে-মনে বললুম, “নারায়ণ, সত্যিই যদি তুমি তুলসীতে থাকো, আমাকে শক্তি দাও।”

মা বললে, “এদিকে আয় পাগলা।”

দেখি, দড়িটাকে মা ভাল করে দেখছে। অন্ধকার হলেও অল্প-অল্প সবই দেখা যাচ্ছে। রাতের আকাশেও একটা আলো থাকে। বিশুদার দড়িটাকে মা আগে দ্যাখেনি। মায়ের গা ঘেঁষে বসলুম। মায়ের কাছে বসতে ভীষণ ভাল লাগে। মনটাই কেমন যেন হয়ে যায়। আমার এইবার একটু একটু ঘুম পাচ্ছে। মনে হচ্ছে মায়ের কোলে মাথা গুঁজে আজকের রাতের মতো ঘুমিয়ে পড়ি।

মা বললে, “দেখি, তুই এটাকে কীভাবে ধরছিস?”

দু’হাতে, আগে যেভাবে ধরেছিলুম, সেইভাবে ধরলুম। মা সামনে ঝুঁকে পড়ে চোখ কাছে এনে দেখল। দেখে বললে, “শোন বুড়ো, জোর খাটানোর মধ্যেও একটা অঙ্ক থাকে। শ্লোকটা মনে আছে? বুদ্ধির্যস্য বলং তস্য, নির্বুদ্ধেস্তু কুতঃ বলং! অত কাছ থেকে মাথা দুটো ধরলে যত চেষ্টাই কর, কোনওদিন ছিঁড়তে পারবি না। হাত সরা। আরও ডগার দিক থেকে ধর। লেংথ বাড়া। হ্যাঁ। নে, এইবার ‘জয় মা’ বলে টান। বসে হবে না। উঠে, দুটো পা ফাঁক করে দাঁড়া। বুকটা সামনে চিতিয়ে দে। হ্যাঁ, এইবার টান।”

টানার আগে জিজ্ঞেস করলুম, “মা, হবে তো?”

“হতেই হবে। শুধু টানবি না, মনে-মনে ভাব, ছিঁড়েই গেছে। ছিঁড়েই আছে। শক্তির সঙ্গে মন লাগা।”

আমি আলসের দিকে সরে গেলুম। চোখ বুজে আমার মনের সামনে মা কে ধরলুম। পরীক্ষায় বসেও আমি তা-ই করি, তখন আর কোনও প্রশ্নই কঠিন লাগে না। পাশে মা থাকলে আমি এভারেস্টেও উঠে যেতে পারি। আমার দাদিকে স্মরণ করলুম। পেছন ফিরে তাকালুম। বাবা আর মা ছবির মতো বসে আছে। মা বললে, “টান।”

আমি টানছি। জোরে, আরও জোরে। মনে-মনে ভাবছি, এ তো ছিঁড়েই আছে। আমি চোখ দুটো বুজে রেখেছি। টানছি, আর মনে-মনে দেখতে পাচ্ছি, একটু একটু করে দড়ির পাক আল্গা হয়ে আসছে। ফেঁড়ে যাচ্ছে। দম বন্ধ করে শেষ টান। পট করে একটা শব্দ, দুটো হাত দুদিকে ছিটকে গেল। দু’হাতে দু’খণ্ড দড়ি। ছুটে এসে মায়ের কোলে ডাইভ। আমার চুলে মায়ের হাত খলবল করছে। কানে চুড়ির টিংটিং।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%