চতুর্থ অধ্যায়

মতি নন্দী

বিশুদা বললেন, “তুমি তা হলে পারলে? কীভাবে পারলে?”

“মায়ের আশীর্বাদে।”

“বলো কী? মা কে তা হলে চিনলে? সারা জীবন মনে রেখো কিন্তু।”

“বাবাও ছিল। এক পাশে বাবা, এক পাশে মা, মাঝখানে আমি। বাবা বললে, পারতেই হবে। আর মা বললে, জীবনের সবকিছুতেই একটা অঙ্ক থাকে। সেই অঙ্কটাই আমাকে শিখিয়ে দিলে।”

বিশুদা আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন, “আরে, বলো বলল, সেই কথাটাই বললা।”

“মা বললে, যত জোরেই টান, একটা ডিসট্যান্স রাখতে হবে। খুব কাছ থেকে ধরে টানলে কিছুতেই ছিঁড়বে না। মা আমাকে কায়দাটা শিখিয়ে দিলে, আর সঙ্গে সঙ্গে দড়িটা ছিঁড়ে গেল।”

“তোমার মা কে আমার প্রণাম, শত কোটি প্রণাম। আচ্ছা নাও, কথা নয়, কাজ। দূরে একটা চৌবাচ্চা দেখতে পাচ্ছ?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“যাও, ছুটে গিয়ে মারো এক ঝাঁপ। জামা আর গেঞ্জিটা ওই হুকে ঝুলিয়ে রেখে যাও। ছুটে গিয়ে ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়বে।”

বেশ মজা। আমি ছুটে গিয়ে এক লাফে চৌবাচ্চার জলে পড়লুম। পড়া মাত্রই দম যেন বন্ধ হয়ে যাবে মনে হল। বরফ গলা জল। হাড় পর্যন্ত কেঁপে গেল। তাড়াতাড়ি উঠে পড়তে গেলুম। ততক্ষণে বিশুদা পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন, “উঁহু, উঠলে চলবে না। সহ্য করো। অন্তত পাঁচ মিনিট তোমাকে থাকতে হবে। মনে জোর আনো।”

কোনওরকমে পাঁচ মিনিট জলে ডুবে রইলুম। কান কটকট করছে। শরীরের ভেতরটা কেঁপে-কেঁপে উঠছে। চৌবাচ্চা থেকে উঠে যেই বাইরে এলুম, আঃ, কী আরাম। সারা শরীর যেন চনচন করছে। বিশুদা একটা পরিষ্কার তোয়ালে এগিয়ে দিলেন। গা মুছে ফেললুম।

“এবার জামা-গেঞ্জি পরব বিশুদা?”

“না রে ভাই, জামা-গেঞ্জির কথা আপাতত ভুলে যাও। ঢুকে পড়ো ওই ছোট ঘরটায়। তুমি ঢুকলে আমি দরজা বন্ধ করে দেব। কী, ভয় করছে?”

“একটু একটু।”

“ভয়ের কিছু নেই। যাও।”

ঘরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দিলেন বিশুদা। ঘরের কোথাও জানলা নেই। সবটাই সাদা ধপধপে দেওয়াল। অনেক উঁচুতে দুটো ভেন্টিলেটার। এ-দেয়ালে একটা, ও-দেওয়ালে একটা। দরজাটা যেই বন্ধ হল, বুকটা কেমন যেন করে উঠল। পটপট করে গোটা বারো লাল আলো জ্বলে উঠল এদিকে ওদিকে। ঘরের উত্তাপ বেড়ে গেল। মাঝখানে একটা টুল। লাল অক্ষরে জ্বলে উঠল নির্দেশ। সোজা হয়ে বসে পড়ো টুলে। উত্তাপ বাড়ছে। ক্রমশই বাড়ছে। গলগল করে ঘামছি। সর্বাঙ্গ জ্বলছে গরমে। ঘাম গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। তবু আমি সহ্য করছি। বসে আছি চুপ করে। অনেক পরে সব লাল আলো একে-একে নিভে গেল। জ্বলে উঠল একটা সাদা আলো। দরজা কিন্তু খুলল না। উত্তাপ যেমন বেড়েছিল তেমনি আবার কমে এল ধীরে-ধীরে। তারপর এক সময় দরজাটা খুলে গেল। বিশুদার ডাকে বেরিয়ে এলুম। পালকের মতো হাল্‌কা লাগছে শরীর।

বিশুদা বললেন, “আর কুড়ি মিনিট তোমাকে আটকাব, তা হলেই আজকের মতো শেষ।”

আমাকে একটা থামের কাছে নিয়ে গিয়ে খাড়া দাঁড় করিয়ে দিলেন। থাম পেছনে, আমি সামনে। আমার সামনে দূরে সাদা একটা দেওয়াল। দেওয়ালে একটা ছবির ফ্রেম। ফ্রেমে কোনও ছবি নেই।

বিশুদা বললেন, “পা জোড়া করে একেবারে সোজা টানটান হয়ে দাঁড়াও। এইবার সোজা তাকাও। কী দেখছ?”

“ছবির ফ্রেম। কোনও ছবি নেই।”

“আছে। তোমার মনে আছে। একটুও নড়বে-চড়বে না। সোজা ফ্রেমটার দিকে তাকিয়ে দশ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। চেষ্টা করবে চোখের পলক যেন না পড়ে। প্রথমে চোখ জ্বালা করবে। জল এসে যাবে চোখে। আসুক। আর ওই ফ্রেমে তোমার মা কে দেখার চেষ্টা করো। মা লালপাড় সিল্কের শাড়ি পরে এলোচুলে বসে আছেন, ধ্যানে। নাও, স্টার্ট। এক, দুই, তিন, চার⋯।”

বিশুদা সরে গেলেন। প্রথমে আমার মনটা খুব ছটফট করল কয়েক মিনিট। হাত নাড়তে ইচ্ছে করছে। ঘাড় ঘুরিয়ে চারপাশ দেখতে ইচ্ছে করছে। চলেফিরে বেড়াতে চাইছে মন। সাদা ফ্রেমে মায়ের ছবি আসছে আর চলে-চলে যাচ্ছে। শেষে সব মন চলে গেল ছবির ফ্রেমে। রোখ চেপে গেল, কেন মা কে ধরে রাখতে পারছি না! রাখবই। রাখতেই হবে। মনের জোর যেই বাড়ালুম, অমনি দেখি কী, মা আমার পটে এসে স্থির হয়ে বসেছে। পাছে আমি নড়লে মা নড়ে যায়, তাই আমি স্থির। পাছে চোখের পাতা ফেললে মা সরে যায়, তাই আমার চোখের পলক স্থির। শেষটায় ভীষণ মজা পেয়ে গেলুম। স্থির থেকেও এ যেন এক বিরাট কাজ। দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে দশটা মিনিট কেটে গেল। একভাবে, অপলকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে গেছে। দু’গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে। এখন আর পড়ছে না। সবকিছু এখন আগের চেয়ে উজ্জ্বল দেখছি।

বিশুদা এগিয়ে এলেন। পিঠে হাত রেখে বললেন, “ভেরি গুড।”

জিজ্ঞেস করলুম, “এইবার?”

তোমার কেমন লাগছে বলো?”

“ভীষণ ভাল।”

“বাঃ, ফাইন। এইবার এক পায়ে দাঁড়াতে হবে। ডান পায়ে পাঁচ মিনিট। বাঁ পায়ে পাঁচ মিনিট। পারবে?”

“খুব পারব।”

“এইবার চোখ বুজে থাকবে, আর মনে-মনে অবিরাম মা বলে যাবে। এক-একবার মা বলবে, আর মনে করবে, চোখের সামনে আলো ঠিকরোচ্ছে। ফ্ল্যাশ, ফ্ল্যাশ, ফ্ল্যাশ। কেমন? এ পায়ে পাঁচ। ও পায়ে পাঁচ। একটা পায়ে পাঁচ হলে আমি তালি দেব। নাও, স্টার্ট।”

এবার বেশ কঠিন মনে হল। এক পায়ে স্থির হয়ে দাঁড়ানো! মনে হচ্ছে টলে পড়ে যাব। কিন্তু মা-মা বলতে বলতে, ওই দিকে মন চলে গেল। এক একবার মা বলছি, আর চোখের সামনে আলো চমকে চমকে উঠছে। দারুণ মজা।

সবশেষে বিশুদা বললেন, “আজকের মতো ছুটি। এই নাও, তোমার জন্যে আমি একটা খাতা তৈরি করেছি। দ্যাখো, খাতার মলাটে লেখা আছে, সঙ্কল্প। প্রথম পাতায় লেখো, এই নাও কলম। আগে একটা স্বস্তিকা চিহ্ন আঁকো। ওখানে না। পাতার শুরুতে, মাঝখানে। হ্যাঁ। ফাইন। এইবার লেখো, সত্য। সত্য বলব, সত্যকে জানব, সত্যকে ভালবাসব। আমি সত্য। হয়েছে? এইবার লেখো, সৎ। আমার চিন্তা সৎ, আমার কর্ম সৎ, আমার সঙ্গ সৎ, আমি সৎ, চিৎ আনন্দ। লেখা, পবিত্র। আমার দেহ এক পবিত্র মন্দির। হ্যাঁ। সেই পবিত্র মন্দিরে, পবিত্র মনই আমার ভগবান। লেখো, বুদ্ধি হল বেদী। চিন্তা হল ফুল। পূজা হল কর্ম। এরপর লেখো, নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত।”

বিশুদা আমার মাথায় হাত রাখলেন, “যাও, আজ থেকে তোমার হাঁটাচলায় একটা ছন্দ আনবে। তাল, লয়, ছন্দ। রিদ্‌ম। যেমন লেফ্‌ট, রাইট, লেফ্‌ট, রাইট, সেই রকম নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত। হাঁটবে আর বলবে, নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত। ডান বাঁ, ডান বাঁ।”

বিশুদাকে প্রণাম করলুম। রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, প্রথমে এলোমেলো পা পড়ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছন্দ এসে গেল। চারটে শব্দ যেন মনে বসে যাচ্ছে কেটে কেটে, নিত্য, শুদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত। আর কোনও খেয়াল নেই। হাঁটছি তো হাঁটছিই। কেমন যেন নেশা ধরে গেছে। বিশুদা একটা দারুণ জিনিস দিয়েছেন আমাকে। শরীরটা যেন চনমন করছে।

মা বললে, “কী করে এলি? তোকে খুব ঝলমলে লাগছে।”

“যা জিনিস পেয়েছি মা! দাঁড়াও, তোমাকে একটা প্রণাম করি ভাল করে।”

“হঠাৎ?”

“ওকথা বোলো না মা। তোমাকে আমি রোজ দু’বেলা প্রণাম করি। এখন একটু বেশি করে করব; কেন বলো তো! তুমি আমার ভেতরে চলে এসেছ।”

“তোর পাগলের কথা, আমি সব বুঝি না।”

আমার মায়ের পা দুটো কী সুন্দর! ফর্সা ধপধপে। পাতলা। যেন মাটির সঙ্গে মিশে আছে।

মা বললে, “আয়, তোকে ঘণ্টাখানেক পড়িয়ে তারপর রান্নাঘরে ঢুকব।”

দাদির ঘরের মেঝেতে সেই পুরু গালচেটা পাতা। যেটার ওপর বসে দাদি আমাকে পড়াতেন। সেই বসে-লেখার চকচকে চৌকি। দাদির ছবির সামনে ধূপ জ্বলছে। ছোট্ট একটা ডিশে সন্দেশ, এক গেলাস জল। জলে ভাসছে ফুলের পাপড়ি। আমাদের এই ঘরটা যা সুন্দর!

মা বললে, “নাও, হাত জোড় করে প্রার্থনা করো, জয়, জয়, দেবী, চরাচর সারে⋯।”

পড়াতে-পড়াতে মা এক সময় বললে, “জানিস বুড়ো, আজ দুপুর থেকে কষের একটা দাঁত ভীষণ জ্বালাচ্ছে। মাঝে-মাঝে ভীষণ কনকন করে উঠছে।”

“ওষুধ এনে দেব?”

“দাঁতের যন্ত্রণার একটাই ওষুধ বাবা, তুলে ফেললা, সমূলে উৎপাটন। আর দু’একদিন দেখব, তারপর দেব উপড়ে। তুই এবার একা একা পড়, আমি রান্নার দিকে যাই।”

একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল বাড়ির সামনে। আমি তাড়াতাড়ি উঠে-গিয়ে জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালুম। গাড়ি থেকে নামলেন এক সন্ন্যাসী। এক হাতে বড় একটা লাঠি। অন্য হাতে কমণ্ডলু। কাঁধে ঝুলছে গেরুয়া ব্যাগ। পাট করা কম্বল। ফর্সা, লম্বা চেহারা। চোখে সোনার চশমা। উঁচু খাড়া নাক। কে ইনি! দৌড়ে গিয়ে মা কে বললুম। মা দরজার দিকে এগোতে না এগোতেই, বেল বেজে উঠল।

মা প্রথমে চিনতে পারেনি। সন্ন্যাসী ফিনফিন করে হাসছেন। বড়-বড় চোখ দুটো কী সুন্দর। মিষ্টি গলা, “আমাকে চিনতে পারছেন না?”

মা না বলতে গিয়েও হঠাৎ চিনে ফেলল, “চন্দনদা! আপনি? এতদিন পরে মনে পড়ল?”

সন্ন্যাসী বললেন, “মুড়ি খাব, নারকোল খাব, শশা খাব। আর যা কখনও খাই না, তাই খাব স্টিলের গেলাসে। ভাল চা।”

গালচের ওপর সন্ন্যাসী কম্বল পাতলেন। ঝোলা ব্যাগটা রাখলেন এক পাশে। লাঠিটাকে শোয়ালেন। তার পাশে কমণ্ডলু। তারপর দাদির বইয়ের র‍্যাকের কাছে গিয়ে কী একটা বই টেনে নিয়ে, সেইখানেই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে পড়তে শুরু করলেন। আমি দূর থেকে দেখছি। পড়ছেন। পড়েই যাচ্ছেন। একেবারে ডুবে গেলেন। এমনও হয়! মনে-মনে ভাবলুম, আমাকেও এই রকম হতে হবে। কোনও খেয়াল নেই। কারও সঙ্গে কোনও কথা নেই। সাহস করে কিছু বলতেও পারছি না। অমন করে একভাবে দাঁড়িয়ে না থেকে, কোথাও এক জায়গায় বসে-বসেও তো বইটা পড়া যায়। অবশ্য আমিও তো আজ বিশুদার আখড়ায় অনেকক্ষণ একভাবে দাঁড়িয়ে থাকার সাধনা করে এসেছি। তবু আমি আর থাকতে পারলুম না, একটা চেয়ার তুলে নিয়ে গিয়ে তাঁর পেছনে আস্তে করে রেখে বললুম, “আপনি বসুন।”

সন্ন্যাসী চমকে উঠলেন। যে জায়গাটা পড়ছিলেন, সেই জায়গায় আঙুল দিয়ে বইটা মুড়ে আমার দিকে তাকালেন। সত্যি, কী সুন্দর চোখ! কী সুন্দর হাসি! আমাকে বললেন, “কী সুন্দর তোমার ট্রেনিং! বাঃ বাঃ! তুমি আমাকে চিনতে পারোনি! আমি তোমার দাদির বন্ধু। সাত বছর আগে, তোমার দাদিকে আমি গান শুনিয়ে গিয়েছিলুম। আমাকে ভীষণ ভালবাসতেন। তাঁর লেখা শেষ চিঠিটি আমার ঝোলায়, আমার সঙ্গে সারা পৃথিবী ঘোরে। তোমার দাদির মতো মানুষ আমি খুব কম দেখেছি।”

সন্ন্যাসী চেয়ারে বসলেন। বইটা খুলে আবার পড়া শুরু করলেন। নিমেষে তলিয়ে গেলেন বইয়ের পাতায়। মা মুড়ি, শশা, নারকোল নিয়ে এল। সন্ন্যাসী বললেন, “আপনি গঙ্গাজল ছিটিয়ে ওই জায়গাটায় রাখুন, আমি নিবেদন করে খাব।”

আমি সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের মেঝেটা মুছে দিলুম। মায়ের পুজোর আসনটা পেতে দিলুম। মা বললে, “চল, আমরা বাইরে যাই। দরজাটা ভেজিয়ে দে। চন্দনদা, আপনার হয়ে গেলে ডাকবেন।”

বাইরে এসে ফিসফিস করে বললুম, “মা, কী সুন্দর দেখতে সন্ন্যাসী মহারাজকে, আমি অমন হতে পারব না?”

“কেন পারবি না? জ্ঞান, সৎ চিন্তা, সাধনা, সৎসঙ্গ। সুন্দর হবার এই তো পথ। জানিস, ওঁর মতো পণ্ডিত খুব কম আছেন। ইংরেজি, বাংলা, সংস্কৃত সব মিলিয়ে দশ বারোটা ভাষা জানেন। সাঙ্ঘাতিক ভাল ছবি আঁকেন। অসাধারণ গান করেন। কী রকম জীবন জানিস! আজ ভারতে তো কাল বিলেতে। পৃথিবীর বড়-বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করে বেড়ান।”

“আমি ওঁকে কী বলে ডাকব?”

“কাকু বলিস। কাকু বলতে দোষ কী?”

এক সময়ে ঘরের দরজা খুলে গেল। কাকু, সন্ন্যাসীকাকু বেরিয়ে এলেন। হইহই করে মিশে গেলেন আমাদের সঙ্গে। বাবাও এসে গেছে। বাবার গলা পেয়ে পিংকা আর পুশও নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে। বাবা দেখলুম, সন্ন্যাসীকাকুকে ‘আপনি’ বলছেন। বুঝলুম জ্ঞানী সন্ন্যাসীর বয়েস নেই, আছে সম্মান। দাদিও ‘আপনি বলতেন।

সন্ন্যাসীকাকু মা কে রান্নাঘর থেকে বের করে দিলেন। নিজে রাঁধবেন। বিলেতে থাকার সময় প্যারিসে রান্নায় ডিপ্লোমা নিয়ে এসেছেন। একজন মানুষ কত কী শিখতে পারেন। অবাক হয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখছি, বাবা আর সন্ন্যাসীকাকুর কাণ্ডকারখানা। মায়ের মুখ দেখে মনে হচ্ছে, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে দাঁতের যন্ত্রণায়। আমি এক ফাঁকে বেরিয়ে গিয়ে ওষুধের দোকান থেকে একটা ট্যাবলেট কিনে নিয়ে এলুম।

সন্ন্যাসীকাকু খিচুড়ি রেঁধেছেন। উপাদেয়। আমি খেয়ে যাচ্ছি। খেয়েই যাচ্ছি। খাওয়ার যেন কূল-কিনারা নেই। বাবা বললে, “দেখিস বুড়ো, পেটটা না ফেটে যায়?”

সন্ন্যাসীকাকু বললেন, “পেট কখনও ফাটে না। পেট হল ব্লাডার। ইলাস্টিক। বলো, কেমন হয়েছে রান্না?”

“অসম্ভব ভাল। কোনও তুলনা হয় না।”

“যাবার আগে তোমাকে তিন-চারটে রান্না শিখিয়ে দিয়ে যাব। মানুষের সব কিছু শেখা উচিত। শিক্ষার শেষ নেই।”

আমরা ছাদে গিয়ে মাদুর পেতে বসলুম। সন্ন্যাসীকাকু আসার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির আবহাওয়া অন্যরকম হয়ে গেছে। আমার কেবল মনে হচ্ছে সন্ন্যাসীকাকু চলে যাবার পর বাড়িটা কত খালি হয়ে যাবে! আমাকে যদি সঙ্গে করে নিয়ে যান তো বেশ হয়!

বাবা বললেন, “আপনি এলে মনে আগুনের ছোঁয়া লাগে। এবারে জীবনটা নষ্ট হয়ে গেল। আসছে বার দেখে নেব। প্রথম থেকেই সাবধান হতে হবে। সংসারটংসার নয়। জীবনটাকে আপনার মতো করে ফেলব।

সন্ন্যাসীকাকু বললে, হাসলেন। বললেন, “সব জীবনই ভাল, যদি লক্ষ্যটা ঠিক রাখা যায়। জীবন নিয়ে হাহুতাশ করবেন না। আপনার জীবনটা খারাপ কিসের? ছেলেকে মানুষ করুন। ওই তো আপনার স্বপ্ন।”

“আপনি এসেছেন, খুব ভাল হয়েছে। ওকে একটু সহজ প্রাণায়াম শিখিয়ে দেবেন?”

“ওকে একটু গান শেখাতে হবে। গান হল প্রাণায়াম। হারমোনিয়ামটা মাঝে-মাঝে বাজানো হয় না পড়েই আছে?”

“অনেকদিন বাজানোনা হয়নি।”

সন্ন্যাসীকাকু আমাকে বললেন, “কাল ভোরে তোমাকে আমি ডেকে দেব। আমার সঙ্গে হারমোনিয়াম নিয়ে বসবে। সকালটা যদি সুর দিয়ে শুরু করতে পারো, তা হলে আর বেসুরো হবার সম্ভাবনা থাকবে না।”

মা এসে একপাশে বসল। আঁচল দিয়ে গাল চেপে রেখেছে।

“কী গো মা, ট্যাবলেটটা খেলে না?”

“খেয়েছি।”

“তা কমছে না?”

বাবা আর সন্ন্যাসীকাকু দু’জনেই এক সঙ্গে বললেন, “কী হয়েছে?”

যেই শুনলেন দাঁত, কাকু বললেন, “লবঙ্গ আছে?”

মা বললে, “আছে।”

“চলুন, নীচে চলুন, আমি এক্ষুনি সারিয়ে দিচ্ছি ”

সাত-আটটা লবঙ্গ শিলে ফেলে থেঁতো করা হল। তারপর সেই মণ্ডটা লাগিয়ে দেওয়া হল মায়ের দাঁতের গোড়ায়। বাবা আমাকে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করলে, “কখন থেকে হচ্ছে রে?”

“মনে হয় সেই সন্ধে থেকে।”

“আগে তো কোনওদিন হয়নি!”

বাবাকে খুবই চিন্তিত মনে হল। আমাদের কারও কিছু হলে বাবা এমন করে যেন নিজেরই হয়েছে।

কাকু বললেন, “ভাববেন না, লবঙ্গ পড়েছে। আধঘণ্টার মধ্যে কমে যাবে। তবে সারবে না। কাল একবার ডেন্টিস্টের কাছে যেতে হবে। দাঁতের যন্ত্রণার অব্যর্থ ওষুধ হল উৎপাটন। দুষ্ট গোরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভাল।”

দাঁতের যন্ত্রণা নিয়েই মা দাদির ঘরের মেঝেতে সন্ন্যাসীকাকুর জন্যে কম্বল বিছিয়ে বিছানা করছিল, কাকু এসে সরিয়ে দিলেন। বললেন, “সন্ন্যাসীর আবার বিছানা কিসের! সন্ন্যাসীর হল আসন। সারারাত তো বসেই কাটবে। প্রয়োজন হলে আসনেই গড়িয়ে পড়ব। বউদি, যদি ঘুমোতে পারেন তো শুয়ে পড়ুন, আর তা না হলে এমন কোনও বই পড়ুন, মন ডোবানো বই, দাঁতের ব্যথা ভুলে যাবেন। আচ্ছা দাঁড়ান, আমার কাছে একটা প্রোজেক্টার আছে আর আছে স্লাইড, ঘণ্টাখানেক ঘরে বসেই তীর্থ-ভ্রমণ হয়ে যাবে।”

বড় ঘরের সাদা ধপধপে দেওয়ালে কাকু প্রোজেক্টারের আলো ফেললেন। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফোকাস ঠিক করলেন। তারপর একের-পর-এক ছবি পড়তে লাগল। হরিদ্বার, কুম্ভমেলা। মায়ের বুকে মাথা রেখে আধশোয়া হয়ে আরাম করে দেখছি। আমার চুলে মায়ের আঙুল ঘুরছে কুড়কুড় করে। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করছি, “যন্ত্রণা কমেছে, মা?”

মা বলছে, “আর আমার মনে পড়ছে না রে।”

কুম্ভমেলায় সন্ন্যাসীরা হর কি পৌরিতে স্নান করছেন। হৃষিকেশ। লছমনঝোলা। গীতাভবন। দেবপ্রয়াগ। রুদ্রপ্রয়াগ। বদ্রীনাথ। কেদারনাথ। কোথা থেকে যে কোথায় আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন সন্ন্যাসীকাকু। হঠাৎ আমার কপালে, গালে, নাকে টপাটপ-টপাটপ কয়েক ফোঁটা জল পড়ল।

“মা, তুমি কাঁদছ?”

মা ধরা-ধরা গলায় বললে, “বাবার সঙ্গে এই সব জায়গায় আমরা কত আনন্দে ঘুরেছি বুড়ো। সেইসব দিনের কথা মনে পড়ছে আর বুকটা কেমন করে উঠছে।”

“দাদির সঙ্গে মা?”

“হ্যাঁ রে।”

“আমি? আমি তখন কোথায় মা?”

“তুই তখনও বুড়ো হয়ে আসিসনি।”

সন্ন্যাসীকাকু দেওয়ালে একটা পাহাড় ফেলেছেন। চূড়োটা একেবারে বরফে ঢাকা। রুপোর মতো ঝকঝক করছে। এ একদম হিমালয়। আমার মা দুর্গা এখানে থাকেন।

“মা, দুর্গাপুজো কবে গো?”

“আর কী, এসে গেল।”

“বাবাকে বললা না মা, পুজোর ছুটিতে আমরা সেই মধুপুরে আর একবার যাই। দাদির সঙ্গে আমরা মধুপুর গিয়েছিলুম না মা?”

“হ্যাঁ রে, এই তো মারা যাবার এক বছর আগে। উঃ, সে কী আনন্দই হয়েছিল। সকাল-বিকেল আমরা মাইলের পর মাইল বেড়াতুম। বেড়ানো, গান, গল্প, খাওয়া।”

সন্ন্যাসীকাকু এবার গোমুখে চলে গেছেন। আহা, কী দৃশ্য।

মা বললে, “এই সব জায়গাতেই ভগবান থাকেন। এই তো স্বর্গ।”

বাবা কাকুকে বলছে, “চলুন মহারাজ, এই পুজোয় হিমালয়টা একবার ঘুরে আসি।”

“চলুন, আমার আর কী? আপনাদেরই অনেক বাধা।”

“বাধা একটাই, আমাদের কুকুর আর বেড়াল। ফিরে এসে দেখব দুটোই মরে গেছে।”

বাবা ঠিক বলেছে, এটা তো ভেবে দেখিনি। পিংকা আর পুশ থাকবে কোথায়? না, আমাদের আর কোথাও যাওয়া হবে না। কিছু দূরে ঠাণ্ডা মেঝেতে পিংকা হাত-পা ছড়িয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। পাখার বাতাসে লোম উড়ছে ফুরফুর করে। একেবারে কোলের কাছে ছোট্ট পুশ। হিমালয়ের দৃশ্য ভাল, আবার এ-দৃশ্যও ভাল।

আমরা যে-যার শুয়ে পড়লুম। সন্ন্যাসীকাকুর ঘরে আলো জ্বলছে। কী আশ্চর্য মানুষ! ঘুমের ঠিক নেই। খাওয়াদাওয়ার নিয়ম নেই, অথচ চেহারা দিয়ে যেন জ্যোতি বেরোচ্ছে। অনেক রাতে আর একবার উঠেছিলুম, তখনও দেখি, কাকুর ঘরে আলো জ্বলছে। খুব চাপা গলায় অপূর্ব সুরে গান গাইছেন। আমি আবার এসে টুপ করে শুয়ে পড়লুম।

ভোরবেলা ঘুম ভাঙল কাকুর গানে। কখন স্নান হয়ে গেছে। তারে ঝুলছে গেরুয়া কাপড় আর উত্তরীয়। ধূপের গন্ধ। আর এক অবাক কাণ্ড, সারা রাত বসে-বসে, দাদির বিশাল বড় একটা ছবি এঁকে ফেলেছেন। টেবিলের ওপর সোজা করে রেখেছেন, একেবারে জীবন্ত। খাটের ওপর যে ফোটোটা ছিল, সেটা অনেক ছোট। ফোটো দেখে কাকু যা এঁকেছেন, তা অনেক বড়। কী করে এমন সুন্দর ছবি আঁকেন! কালকে আমাকে বলেছিলেন, ইচ্ছেটাই সব। ইচ্ছে করেছিল বলে মানুষ চাঁদে গিয়েছিল। পরমাণু বোমা তৈরি করেছিল। পাখি হতে ইচ্ছে করেছিল, তাই বিমান। সমুদ্রে ভাসতে ইচ্ছে করেছিল, তাই জাহাজ।

জিজ্ঞেস করেছিলুম, “মানুষ ইচ্ছে করলে লম্বা কি বেঁটে হতে পারে?”

“হয়তো পারে। কথামৃত পড়ে দেখো, ঠাকুর যখন হনুমান-ভাবে সাধনা করছিলেন, সেই সময় তাঁর মেরুদণ্ড দু’তিন ইঞ্চি বড় হয়ে গিয়েছিল। ইচ্ছের জোর থাকা চাই গো। ঠাকুর বলতেন, ব্যাকুলতা। তাঁর উপমার তো কোনও তুলনা ছিল না। কারও চাকরি চলে গেলে, সে কী করে? পাগলের মতো এ-অফিস সে-অফিস ঘোরে, আর জনে-জনে জিজ্ঞেস করে, ভাই কোনও পোস্ট খালি আছে? ব্যাকুলতায় মানুষ ছটফট করে। গোঁফে চাড়া, পায়ের ওপর পা, বাবু বসে আছেন, পান চিবোচ্ছেন, কোনও ভাবনা নেই, এমন হলে হবে না। আমি চাই, তাই আমি পাই। এই হল কথা।”

মহারাজ ছবিটা গোল করে গুটিয়ে নিয়ে বললেন,চলো প্রাতঃভ্রমণআর ছবি বাঁধাই, দুটো কাজই এক সঙ্গে সেরে আসা যাক।”

মা কে জিজ্ঞেস করলুম, “তোমার দাঁত কী বলছে মা?”

“বলছে, উৎপাটন। যা, চন্দনদার সঙ্গে বেড়িয়ে আয়। কাল সন্ধে থেকে তুই আমার দাঁত নিয়ে ভীষণ ভাবছিস। অত চিন্তার কী আছে রে পাগলা। তেমন বুঝলে তোর বাবার সঙ্গে গিয়ে তুলিয়ে আসব। পনেরো মিনিটের ব্যাপার। ধরবে আর উপড়োবে। যা, তুই বেড়িয়ে আয়।”

চন্দনমহারাজ হাঁটেন বটে! হুহু করে হেঁটে চলেছেন। গেরুয়া চাদরের দুটো প্রান্ত পতপত করে উড়ছে। আমি কেবলই পিছিয়ে পড়ছি। একবার একবার একটু করে দৌড়ে নিচ্ছি। আবার পিছিয়ে পড়ছি। এভাবে হয়? শেষে বলেই ফেললুম, “কাকু, আমি যে আপনার সঙ্গে পারছি না।”

কাকু দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমাদের পাশেই পার্ক। পার্কের আধভাঙা রেলিং। একটা কৃষ্ণচূড়া গাছ। বিশাল ডালপালা মেলে আকাশের দিকে উদ্ধত ভঙ্গিতে উঠে গেছে। কাকু বললেন, “কী পারছ না?”

“আপনার সঙ্গে হাঁটায় পারছি না। আপনি সাঙ্ঘাতিক জোরে হাঁটেন।”

চন্দনমহারাজ হাসতে হাসতে বললেন, “আমি জোরে হাঁটি, না তুমি আস্তে হাঁটো?

মহারাজের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলুম। সত্যিই তো, কী উত্তর হবে! কোনটা ঠিক? আমার আস্তে হাঁটা, না মহারাজের জোরে হাঁটা? কোনটা ঠিক? কী উত্তর হবে?

“কী ভাবছ তুমি? জবাব দাও।”

“ঠিক বুঝতে পারছি না, কী উত্তর হবে।”

“কেন, তুমি তো আমায় বললে, আমি জোরে হাঁটছি। আমি তোমাকে বলছি, তুমি আস্তে হাঁটছ। কোনটা ঠিক?”

“আমি জানি না মহারাজ।”

“শোননা, এখানে বিচারের বিষয় তিনটে, গতি, তুমি আর আমি। তুমি। আর আমি বেরিয়ে আসি, কী রইল?

“রইল গতি।”

“গতির সঙ্গে কী জড়িত?”

“সময়।”

“বাঃ, ঠিক বলেছ। আর কী জড়িত?”

“দূরত্ব।”

“একসেলেন্ট। তা হলে আবার আমরা নতুন করে সাজাই। বস্তু, দূরত্ব, আর সময়। ঠিক তো?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“তা হলে তুলনাটা আমার সঙ্গে তোমার নয়। তোমার সঙ্গে তোমার। তুমি আমার দিকে মন না দিয়ে, পথের দিকে মন দাও। মাথা নিচু করে, একাগ্র হয়ে পথ হাঁটো। পথ ছুটছে উলটো দিকে। পথকে যত জোরে ছোটাতে পারবে, তত জোরে তুমি ছুটবে সামনে। চলো, আমরা এই পার্কটায় কিছুক্ষণ বসে যাই। এখন বেশ খালি আছে।”

একটা জায়গায় একটু ঘাসমতো রয়েছে। বিশাল একটা সাবুগাছ। বাতাসে পাতার মর্মর শব্দ। গাছের তলায় মুখোমুখি আমরা দুজনে বসলুম।

মহারাজ বললেন, “একটু আগে আমরা যা করলুম, তাকে বলে ছোটখাটো বিচার। বৌদ্ধ ধর্মে এই বিচার খুব আছে। বিচারে বুদ্ধি আর যুক্তি দুটোই খুব ধারালো হয়। তোমাদের এখানে আসার আগে মহীশূরের সেরা বৌদ্ধ বিহারে দিন কাটিয়ে এলুম। বুঝলে, সে এক অভিজ্ঞতা! শহর থেকে বহু-বহু দূরে, জঙ্গল আর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে সে যেন এক বিস্ময়। মনে হল, হাজার বছর পেছিয়ে গেছি। সেই বৌদ্ধ বিহারে দু’হাজার লামা প্রাচীন ধারায় জীবন কাটাচ্ছেন। সেখানে তিন বছরের শিশুও লামা হয়ে আছে। সারা দিনরাত শুধু লেখাপড়া। তা শোননা, প্রতিদিন রাতে সেখানে তর্কযুদ্ধ হয়। তোমার জানা না থাকলে মনে হবে মারামারি হচ্ছে। তর্ক হয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, তাল ঠুকে, চাপড় মেরে। সেইটাই হল প্রথা। মানে ঝিমিয়ে পড়ার উপায় নেই। সন্ধেতে শুরু হয়ে তর্ক মাঝরাত পর্যন্ত গড়াতে পারে। বুঝলে, আমার এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা হল।”

“কী রকম কাকু?”

“প্রথমত ভারতবর্ষে ওই রকম যে একটা বিহার আছে, আমার জানা ছিল না। তারপর ওই নিষ্ঠা, জ্ঞানতৃষ্ণা! একদিন দেখি, কম বয়সী লামারা তর্কের আসরে নেমেছে। শুনবে সেই তর্ক কেমন তর্ক? আসরে নেমেছে যারা, তাদের বয়েস সাত থেকে নয়। একজন বলছে, বল তো ঘট বলতে কী বোঝা যায়?

‘“যার মধ্যে সব ঘটের যা সাধারণ ধর্ম তা থাকে।’

‘“আরে, আগে তো ঘট চিনবে, তবে তো সব ঘটের সাধারণ ধর্ম জানবে।’

‘“আচ্ছা, যা দিয়ে জল আনা যায় তা-ই ঘট।’

‘“ও, তা হলে বালতিও ঘট।’

‘“না, না, গোল হতে হবে।’

‘“ও তা হলে ফুটবলও ঘট।’

‘“না, গোলও হবে, আবার জলও আনা যাবে।’

‘“যদি ফুটো থাকে?’

‘“তা হলে সেটা ফুটো ঘট।’

“যদি তা দিয়ে জল সব পড়ে যায়?’

‘“বেশি ফুটো থাকলে তা ঘটের অংশ, ঘট নয়।’

“এইভাবে চলতে লাগল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শোনার জিনিস, অনুধাবনের জিনিস। আমার জীবন সার্থক। মঞ্জশ্রী বুদ্ধের প্রতিমা দেখেছ! জ্যোতির্বলয়ের মধ্যে উপবিষ্ট বুদ্ধ। অর্ধনিমীলিত টানা-টানা, ঢেউ খেলানো ধ্যানী দুটি চোখ। ডান হাতে তীক্ষ্ণ ধার অসি, যার দু’দিকই নিশিত খরশান। একদিকে কাটে অন্ধকার, অপর দিকে কুতর্কের জাল।”

সন্ন্যাসীকাকু উদাস হয়ে তাকিয়ে রইলেন নীল আকাশের দিকে। হঠাৎ আমার দিকে ফিরে বললেন, “বাবা বলছিলেন প্রাণায়াম শেখাতে, প্রাণায়াম কাকে বলে জানো?”

“আজ্ঞে না।”

“প্রাণের নিরোধ। অথাৎ শ্বাসপ্রশ্বাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা কন্ট্রোল। শ্বাসপ্রশ্বাসয়োর্গতি রোধঃ প্রাণায়ামঃ। আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাস এমনি খুবই এলোমেলো। শ্বাস গ্রহণ আর শ্বাস ছাড়ার মধ্যে সমতা আনা হল সহজ প্রাণায়াম। এসো, এই মুক্ত বাতাসে তোমাকে সেই কায়দাটা শেখাই। বোসো। পদ্মাসনে বোসো।”

পদ্মাসন আমার জানা ছিল। দাদি আমাকে শিখিয়েছিলেন। জীবনের যা কিছু ভাল, দাদি আমাকে সময় পেলেই শেখাতেন। পদ্মাসনে বসার পর সন্ন্যাসীকাকু হাঁটুতে চাপড় মেরে তাল দিতে লাগলেন, এক, দুই, তিন, চার। চার, তিন, দুই, এক।

“সময়ের গতির দিকে নজর রাখো। যে ছন্দে যাচ্ছে, সেই ছন্দে ফিরে আসছে। মনে-মনে বলো।”

বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে চলার পর কাকু বললেন, “তাল আর লয়টা বসেছে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।”

“এইবার নিশ্বাস আর প্রশ্বাস মেলাও।”

এক, দুই, তিন, চার নিলাম। চার, তিন, দুই, এক ছাড়লাম। বেশ কিছুক্ষণ এইভাবে চলার পর নেশা ধরে গেল। মনে হল একটা ঘর এলোমলো হয়েছিল, বেশ সব গোছগাছ হয়ে এল। মিনিট-দশেক এইভাবে চলার পর সন্ন্যাসীকাকু বললেন, “আর না, এবার বিশ্রাম। প্রাণায়ামের পর দুধ খেতে হয়। বাড়িতে চলল, দাদির ঘরে বসে তোমাকে আমি গায়ত্রী শেখাব।”

“আমি জানি।”

“জানার এখনও বাকি আছে। প্রতিটি শব্দকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করতে হয়। নীচে থেকে ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে হবে। শেষে একেবারে মাথায়। মাথা থেকে সোজা সূর্যলোকে।”

পার্ক থেকে আমরা গঙ্গার ধারে গেলুম। সেখানে চন্দনকাকু সোজা নেমে গেলেন জলে। গামছা বা তোয়ালে নেই, কোনও পরোয়াও নেই। সন্ন্যাসীর বস্ত্র আর উত্তরীয় ছাড়া কিছু থাকা উচিত নয়। নেইও। ভিজে কাপড়েই কাকু বাড়িমুখো হলেন। পথে রোদ আর বাতাসে সব শুকিয়ে গেল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%