চরপর্ব : নিতাইদের বাস্তুত্যাগ ও সীমান্তবাহিনীর সীমান্তত্যাগ

দেবেশ রায়

ব্রিজে আলো কেন?

নরেশ ওর লাল টর্চটা জ্বেলে হাতের ঘড়ি দেখে। টর্চের আলো ভেজা এটেল মাটিতে গোল হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেই আলোর বৃত্তে শুধু পা-মাথাছাড়া, ধড়ছাড়া পা; হাঁটু পর্যন্ত, কুচকি পর্যন্ত খালি পা; জলেকাদায় বেশির ভাগ পায়েরই হাঁটু পর্যন্ত লেপ্টানো।

নরেশ টর্চ নিবিয়ে দেয়। তাতে মাটির ওপরটা অন্ধকার হয়ে যায় কিন্তু সেখানে টর্চের আলো পড়ে নি। সেই আবছা কুয়াশার মত উজ্জ্বলতার ভেতর দিয়ে নরেশ তিস্তা ব্রিজের দিকে তার নেবানো টর্চটা তুলে দেখায়, নেবানো টর্চটা সহ হাতটা টানটান তুলে দেখায়, যেন ওটা টর্চ নয়-বন্দুক, বা অন্তত রিভলভার, হিন্দি ছবিতে ভিলেইনের হাতে একমাত্র দেখা রিভলভার। রিভলভারের কথা একবার মনে এলে তখন নরেশের টর্চটাকে সত্যি-সত্যি রিভলভারের মতই দেখতে লাগে যেন; সিনেমায় দেখা রিভলভারের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা মনে-মনে একবার শুরু হলে তখন আবার মনে হয় নরেশের টর্চটা বরং উল্টনো রিভলভারের মত দেখতে–নলটা নরেশেরই বুকে, টর্চের হ্যান্ডেল আর ঘোড়াটা হচ্ছে কাঁচে ঢাকা বান্ধ। কিন্তু সেই উল্টনো টর্চ থেকে এখন অন্ধকারই ছোঁড়া হয় তিস্তা ব্রিজের দিকে।

নরেশ বলে–রাত্তির বাজে দশটা, এখনো তিস্তা ব্রিজের আলো নিবায় না?

সবাই তখন তিস্তা ব্রিজের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়।

নরেশের টর্চের ইঙ্গিতে এরা সবাই তিস্তা ব্রিজের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। ঘুরে দাঁড়ানোর দরকার ছিল না, শুধু ঘাড়টা ফেরালেই দেখা যেত, আর দেখার জন্যে ঘাড় ফেরানোরও কোনো বাধ্যতা ছিল না, একেবারে উল্টো দিকে তাকিয়েও ত বোঝা যায় পেছনে তিস্তা ব্রিজে আলো জ্বলছে। কিন্তু, এখন, নরেশের কথায়, আবার খানিকটা যেন রিভলভারের মত উদ্যত নরেশের টর্চের নেবানো নির্দেশেই, ওরা ঘুরে দাঁড়ায় এবং দেখে, তিস্তা ব্রিজের আলো নেবে নি। ঘড়ি দেখার জন্যে নরেশের টর্চের আলো একটু আগে ভেজা মাটিতে গোটা-গোটা এত পা মাটি থেকেই খুঁড়ে তুলেছিল আর সেই পাগুলোর লম্বা, কোনাচে, খাটো ছায়াগুলো পরস্পরকে কাটাকুটি করে মাটিতে এমন জট পাকিয়ে-পাকিয়ে গিয়েছিল বা গা বেয়ে উঠে শরীরের ওপরের অন্ধকারে এমন মিশে গিয়েছিল, যেন, তখন, নরেশের টর্চের চৌহদ্দিতে, মানুষের বন যদি নাও হয়, অন্তত দিগন্ত-আকাশে, মানুষের ভিড়। কিন্তু এখন, এই নদী থেকে আকাশজোড়া কুয়াশার মত আচ্ছন্নতার নীচে, দেখা যায় এরা মাত্র গুটিকয়েক মানুষ, যেন আকাশ-মাটি বিস্তৃত এই কুয়াশায় পথ হারিয়ে ফেলেছে, যেন, যেখানে তারা দাঁড়িয়ে সেটা কোনো মাটি নয়, চর নয়, বরং একটি নৌকো, মোহানায় পথহারানো নৌকো। তেমন একটি নৌকোয় যাত্রীরা, মাঝিরা, যেমন ওরকম একটা ছোট কাঠের টুকরোর ওপরে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে থেকে চোখ দিয়ে তীর খোঁজে, শুধু চোখ দুটো দিয়ে, আর সেই জলপ্রান্তরে তাদের ভেসে থাকাটাকেই সবচেয়ে অপ্রাসঙ্গিক ঠেকে, এরা, এই চরের এই গুটিকয়েক মানুষ তেমনি সামনে তিস্তাব্রিজের আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে–চরটা ভাসতে-ভাসতে ঐ ব্রিজে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে ভেঙে যাবে এমনই এক আতঙ্কে। তখনো, ওদের এই চরের উত্তর পাড়ে তিস্তার জল এসে ধাক্কা খেয়ে, ডাইনে ঘুরে, শহরের দিকের পাড়ে গিয়ে আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এখন আর ওদের কানে সেই আওয়াজটা আসছে না–জলের সেই লোহা-গুড়ানো আওয়াজ, কারণ গত তিনদিনে এই আওয়াজটা ওদের অভ্যাসে ঢুকে গেছে। এখন তাদের গলা তুলে কথা বলতে হয়, নইলে শোনা যায় না। বাতাস ত উড়িয়ে নিয়ে যায়ই, জলের সেই আওয়াজেও চাপা পড়ে যায়। কথা বলার সময় নিজেদের স্বরগ্রাম তুলে ওরা নদীর বন্যার আওয়াজকে চাপা দিতে চাইছে, এই ক দিন।

কেউ একজন বলে–ভুলি গেইসে।

ভুলে ত রুজ সন্ধ্যায়, আইজ একিবারে মাঝরাত্তির পর্যন্ত ভুইল্যা থাইকল?

সিনেমা দেখিবার গেইসে, ফিরে নাই–ভঙ্গিতে রাবণকে চেনা যায়।

শ্বশুর বাড়ি গিছে, শালা, তিন রাত্রির ধইর‍্যা বিচি কপালে উইঠছে, কয় সিনিমায় গিছে?–জগদীশ বারুই খেপে উঠে বলে। একটা সামান্য হাসির আঁচ পাওয়া যায়। রাবণ জগদীশকে খেপানোর জন্যেই বলেছিল। জগদীশও খেপে উঠেছে। চুখ ভাল কইর‍্যা মেইল্যা দ্যাখ, ব্রিজের উপর গাড়িটাড়ি আছে, নি নাই? নরেশ বলে আর ডান পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে সোজা হলেই চোখের দৃষ্টি বেড়ে যাবে, এমন ভাবে সে ব্রিজের দিকে তাকায়।

আওয়াজ পাও নি? ট্রাকের? জগদীশ এবার মাটির ওপর উবু হয়ে বসে বিড়ি ধরায়। তার চোখে ছানি পড়েছে, দিনের বেলাতেই এখান থেকে অত বড় ব্রিজটাকে মনে হয় ওপারের গাছগাছালি। দেখতেই যখন পারছে না, মিছিমিছি খাড়া দাঁড়িয়ে থেকে লাভ কী? বরং, এই ভিড়ের মধ্যে বসে পড়লে, যেন তিস্তা ব্রিজের আলোজ্বলা বিপদ কিছুটা কাটবে।

সেই ভিড়ের তলা থেকে জগদীশের চিৎকার, কী? দেখা যায় কিছু? নড়াচড়া? একটু সময় কাটে, যেন জগদীশের নির্দেশমত ওরা ভাল করে দেখছে, সত্যিই কিছু দেখা যায় কি না। তারপর চীৎকার করেই বলে, অয়, অয়, দেখা যায়, দেখা যায়। আরো একটু সময় কাটে, তর্জনী আর মধ্যমার মাঝখানে বিড়ি আঙুলের গোড়ার দিকে। মুঠো পাকিয়ে রেখেও জগদীশ টানে না, উত্তেজনায়। তারপর রেগে ওঠে, হালা শুয়ারের বাচ্চা, দেখা যায় ত কওয়া যায় না?

সকলে আবারও হেসে ওঠে। কথাটা জগদীশকে খেপানোর জন্যে গজেন বলেছে, আর জগদীশও খেপেছে।

এ জগদীশ, তুই আয় কেনে এইঠে, দেখ ত, নজর করি দেখ, ব্রিজটা আছে কি নাই, মোর মনত খায় কি ব্রিজটা নাইরো, জগদীশের প্রায় সমবয়সী রাবণের গলা আবার শোনা যায়। কিন্তু জগদীশের ছানি নিয়ে এই ঠাট্টাতেও সে চটে না, মনে-মনে চটে উঠলেও মুখে কিছু বলে না। একটু সময় কেটে গেলে নরেশ তার টর্চটা মাথার ওপর তুলে, ব্রিজের দিকে ফেলে, জ্বালায়, যেন, সে এতক্ষণ ধরে এই হিশেবই কষছে যে টর্চটা জ্বালালে কত দূর যাবে।

নরেশের সন্দেহ হয়, টর্চটা বোধ হয় জ্বলে নি। সে সুইচটা অফ করে আবার জ্বালায়। কিন্তু আবারও তাকে অফ করতে হয়। এবার নীচে নাবিয়ে একটা ঝাঁকি দিয়ে টর্চটা নিজের মুখের দিকে ঘুরিয়ে অন করে আর সঙ্গে-সঙ্গে চোখ বোজে–আলোতে তার চোখ ঝলসে যায়।

আরে নরেশুয়াক দেখি উমরার টর্চখানও নাজ্জা পাইসে হে রাবণের এ কথায় সকলেই হেসে ওঠে। ভিড়ের মাঝখানে জগদীশ বারুই যে হঠাৎ মাটির কাছাকাছি থেকে কেশে ওঠে তার কারণ, এক হতে পারে, সে-ও হেসে ফেলেছিল, তারপর বিড়ির ধোয়ায় কেশে ফেলেছে, আর, নয় ত, এত হাসির মাঝখানে সে একটু কেশে জানান দেয়, সে-ও আছে, কিন্তু বসে।

নরেশ আবার মাথার ওপর তুলে ব্রিজ লক্ষ করে টর্চটা জ্বালে। এবার বোঝা যায়, তার টর্চের আলো জ্বলছে কি না টের পাওয়াই যায় না কুয়াশা আর হাওয়া এতই জমাট। যেন, বাতাস সেই টর্চের আলোটাকেও মুহূর্তে মুছে ফেলছে। তার টর্চের আলো যে এই ঝড়-জল ভেদ করে একটুও যেতে পারে না, এতে যেন নরেশের একটু অপমান ঘটে, নিজের কাজে নিজের অপমান। খানিকটা আশঙ্কাও বটে। কারণ, এই টর্চটাই ত গত কদিন ধরে তাকে একটা মর্যাদা দিচ্ছিল, অন্তত রাতটুকুতে তাকে ছাড়া চলছিল না। কিন্তু এখন চোখের সামনে তিস্তা ব্রিজের লাইন বাধা আলো সত্ত্বেও, এখানে সে যে তার টর্চ দিয়ে একটু বিধতেও পারল না চারপাশের জল মেশানো বাতাস, তাতে ত তার ওপর সকলের সেই আগেকার নির্ভরতা একটু কমে যেতে পারে। নিতাই চিৎকার করে ওঠে, এই কায় আছিস, যা ত চট করি দেউনিয়ার রেডিও ধরি নিয়া আয়।

জগদীশ রে-রে করে দাঁড়িয়ে পড়ে–এই এই, বৃষ্টির জলত ব্যাটারি ডাউনহয়্যা যাবে, ডাউন হয়্যা যাবে, একখান রেডিওই এখন ভরসা, কানকাটু মাস্টারেরটা ত আগেই গিছে, রেডিও আনবা না, রেডিও আনবা না।

জগদীশ তারপরে দুই হাত সামনে দুলিয়ে বলে, কই? কেউ যাও নাই ত? অ্য, কথা কয় না কে কেউ?

নিতাই চিৎকার করে ওঠে, কথা আবার কী কবে নে? তোমার সব তাতেই পুতুপুতু। ব্রিজের উপর এত রাত্তিরে আলো জ্বলে, তা হালি কি এক্কেরে লাল সিগন্যাল দিল নাকি, রেডিওতে শুইনতে হবে না? নাকি কাকির সঙ্গে সিনেমার গান শুইনব্যা নে?

চুপ যা হারামজাদা, জগদীশও চিৎকার করে ওঠে, শুইনব্যার হয় ত বাড়িত গিয়্যা শুইন্যা আয়, তা আবার এইখানে রেডিও আননের কী আছে, এহন কি পতিঘাতিনী সতী পালা হব নাকি? যত্ত সব

জগদীশ দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সে প্রায় কিছুই দেখতে পায় না বলে দাঁড়িয়ে একটা দিকে মুখ রেখে চেঁচায়। তার ঘাড় ফেরানোর ভঙ্গিতে একটু অনিশ্চয়তা ছিল যে যার উদ্দেশে বলছে, সে তার সামনেই আছে, কি না। কথার শেষে জগদীশ হাত মুঠো করে একটা খুব জোরে টান দেয়, কিন্তু বুঝতে পারে আগুন নিভে গেছে। সে হাতটা ঝাঁকিয়ে বিড়িটা ফেলে দেয়। বিড়িটা পড়ে না, তার হাতেই লেগে থাকে। জগদীশ মাথায় হাত দিলে বিড়িটা তার মাথার চুলে গেঁথে যায়।তো যা না নকু, রেডিওটা শুনি আয়, বানার সিগন্যালটা শুনিই চলি আসবি জগদীশ বলে।

নকু বলে, এইঠে খাড়ি-খাড়ি গাব না পাকি চলো কেনে সগায় যাই, এ্যালায় ত সিগন্যাল দিবারই নাগিসে, মুই আসার বাদে যদি আবার দেয়?

ত্যামন হলি ত তর জেঠি নোক পাঠাইবে, কাথা আছে, যা বাবা, আমরা এইখানে খাড়াইয়্যা-খাড়াইয়্যা ব্রিজের আলোর বৃত্তান্তটা দেখি, জগদীশ বলে।

অয়, অয়, জগদীশের আঁখতৎ ত ফোকাচিং লাইট, রাবণ আস্তে করে বলে। নকু চলে যায়। জগদীশ তার ধুতির খুঁট থেকে দুটো বিড়ি আর দেশলাই বের করে। একটা বিড়ি বাড়িয়ে ধরে বলে, কায় খাবে? নে।

রাবণ বিড়িটা নিয়ে বলে, বাপের তালই বসি আছে, দেখিবার পাস না?

জগদীশ দেশলাইটা জ্বালাতে যায়, পারে না। তারপর, আবার সে সেই ভিড়ের মধ্যে বসে পড়ে। এবার আঁজলার মধ্যে আগুনটাকে বাঁচিয়ে বিড়িটাকে ধরাতে পারে। রাবণও উটকো হয়ে বসে তার হাতের স্পর্শ দিয়ে বোঝায় সে আগুন চাইছে। জগদীশ আগুনটা এগিয়ে দেয় না, কিন্তু আজলার ওপর থেকে তার মুখটা সরিয়ে রাবণকে জায়গা করে দেয়। দেশলাই কাঠির আগুন থেকে জগদীশের কোঁচকানো চোখ, নাকের দুপাশ আর গলাটাতেও আলো পড়ে। সেটা মুছে রাবণ তার মুখ এগিয়ে দেয়।

.

জগদীশের রাগ

ওরা বিড়ি খাচ্ছিল বিড়িটাকে হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে। এর মধ্যে আরো দু-একজন জগদীশ আর রাবণের আশোপাশে বসেও পড়ে। তাদের মধ্যে দু-একজন বিড়ি ধরায়। যতক্ষণ এরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিল তিস্তা ব্রিজের আলোর-দিকে তাকিয়ে ততক্ষণ বাতাস ও জলের ছাটের কথা যেন ওদের খেয়াল হয় নি। কিন্তু মাটিতে উবু হয়ে বসার পর বাতাস ও জল থেকে শরীর বাঁচাতে মাথাটা বুকের ওপর ঝুলিয়ে দেয়। যেন, ঘাড় ও পিঠটা তাদের শরীরের অংশ নয়। যেন, ঘাড়ে ও পিঠে বোঝা বইতে বইতে, সেখানে একটা প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বতই জন্মে আছে।

নরেশের টর্চের আলোতে পায়ের স্থাপত্য দেখা গিয়েছিল। তিস্তা ব্রিজের দিকে তাদের সমবেত তাকানোতে, পটভূমির সঙ্গে মিশে যাওয়া এই বর্ণভঙ্গতে, গায়ে-গালাগান তাদের দেখা গিয়েছিল। এখন তাদের দেখায় যেন মূর্তির ধ্বংসস্তূপের মত সেখানে বাতাসের জোর এতই যে মূর্তির ভঙ্গি বদলে যায়। নকু যখন জগদীশের বাড়িতে রেডিওর খবর শুনতে গেছে, তখন ওদের অপেক্ষা করতেই হবে। রাত দশটার পরও তিস্তা ব্রিজের বাতি জ্বলা দেখে একবার রেডিও না শুনে থাকে কী করে। রেডিও বন্ধ হওয়ার পরও সারাটা রাত থাকে বটে কিন্তু শিলিগুড়ি থেকে শেষ খবরেও নতুন কিছু না বললে, কেমন একটা আশ্বাস জোটে, বোধহয় নতুন কোনো বিপদ হবে না। কিন্তু নতুন বিপদের দরকারই বা কী? পুরনো বিপদই যদি আর-একটু এগিয়ে আসে তাহলেই সেটা এদের পক্ষে চরমতম ও নতুনতম বিপদ হয়ে উঠতে কতক্ষণ।

হে নিতাই, তোমরালার পার্টিত কী কহিল বানার কথা, আসিবেক, না, না আসিবেক? নিতাই তার পার্টি থেকে এই চরের গ্রামসভার সদস্য। এই চরকে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে ওদিকে দোমোহনির গ্রামসভার সঙ্গে। একটা গ্রাম এই চর, আর-গুলো আছে ডাঙাতেই। পঞ্চায়েতের অফিসও সেখানেই।

কহিল যে কমোরেড, বানা আসিলে কিন্তু আসিবেন না, না আসিলে কিন্তু কুনোভাবেই আসিবেন না, গজেন আস্তে বলে। এখানে এত আস্তে বলা কথা শোনা যাচ্ছিল না। কিন্তু ওরা সবাই মাথা নিচু করে বসেছিল বলেই বোধহয় শোনা যায়। যেন, যদি ওরা মাথাটা বুকের ওপর হেলিয়ে ওরকম চুপচাপ কথা বলে যায়, তাহলে পরস্পর ভালই শুনতে পাবে। গজেনের কথার জবাব না দিয়ে নিতাই বলে, পার্টি আবার কবে কী, অ্য, পার্টি কবে কী? বৃষ্টি হবার ধরছে পন্দর দিন ধইর্যা, আর সঙ্গে বাতাস পাহাড়ঠে বানা নামিছে, তা পার্টির এইঠে কী কহার আছে, কহেন দেখি–

এইডা একটা কথা হইল রে নিতাই। এত বড় একখান পার্টি তর, তক না পুছি পাহাড়ঠে বানা আমি ঠেলা মারিবে বানার এ্যানং সাহস? বদলি করি দে বানাক, ট্যানেসফার করি দে।

নিতাই একটু চুপ করে থাকে, যেন কথাটার একটা জবাব খোঁজে। তারপর বলে, মুই কহি আছুি। আমিই কয়্যা দিছি পাটিক।

কী? কী কহিছিস?

কয়া দিছি, আমাগো চরখান যদি ভাইস্যা যাবার দ্যাখেন আমাগো জন্যে মিলিটারি পাঠাইবেন না ক্যাম্প বসাইবেন না, রিলিফ দিবারও নাগবে নাকয়্যা দিছি।

রাগিস ক্যান বোকা, চুপ যা, জগদীশ যেন গোপন পরামর্শ দেয়।

আরে আমি ত চুপই আছি, দ্যাহ না, মুখ চাইপ্যা ধইরলে সব পাছা দিয়া কথা কয়– নিতাই জবাবে বলে।

পাছার কথায় ত গন্ধ বাড়ায়, ঐ কথা শুননের কামডা কী? জগদীশ মাটির দিকে তাকিয়ে বেশ চেঁচিয়ে বলে, যাতে সবাই শুনতে পায়, তারপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সবার হাসি শোনার জন্যে। কিন্তু কেউ হাসে না, এমন কি নিতাইও না। জগদীশের নিজেরও হাসার সময় পেরিয়ে যায়। তা হলে এখন আবার বলে, আবার হাসতে হয়। শালা নিতাই, সকলের লাথথি খায় তাই ভাল, উয়্যার পক্ষে কথ কইলাম–শালা চুপ মাইর‍্যা থাইকল।

জগদীশ রেগে হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে থুতু ফেলে কারো গায়ে লাগলে সে খুশিই হয়। সে যে রাতে প্রায় কিছুই দেখে না তা সবাই জানে, আর তাই নিয়েই এতক্ষণ তাকে ঠাট্টা করছিল। এখন সেই সুযোগটা নিতে পারে–সে ত দেখতেই পায় না, কার গায়ে লাগল কী করে দেখবে?

কিন্তু তবু কেউ কোনো আওয়াজ করে না। জগদীশের ইচ্ছে হয় উঠে একটা লাথি মেরে দেখবে কেউ আছে কি না, বেশ টানা একটা লাথি।

জগদীশের মাথায় এই ইচ্ছেটা জাগার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ সকলে হো হো করে হেসে ওঠে। নিতাই হাসতে-হাসতে চিৎকার করে, এই নরেশ, খোঁচা মারিস কেন তর হাতুড়ি দিয়্যা।

নরেশও হাসতে-হাসতে চিৎকার করে, আমারে গজেন ধাক্কাইছে, কিন্তু হাসির ধাক্কায় আর বলতে পারে না। বলার যেন দরকারও ছিল না, তার সঙ্গে সঙ্গেই গজেন চেঁচায়, আমারে আষাঢ় ধাক্কাইছে। গজেনের কথা শেষ হওয়ার আগেই আর-কেউ যেন বলে ওঠে, আরে, বঁড়খান গরম হইছে,.ফোঁ ফোঁস করিবার ধইরছে, থুতু ছিটাবার ধইরছে।

অনেকে মিলে চেঁচায়, গাই আন, গাই আন।

আর, জগদীশ উঠে দাঁড়ায়, শালারা আসিস এর বাদে, কোন তালই তগ খাওয়ায় দেখি বলে সে ভিড় থেকে ছিটকে বেরিয়ে যায়। বেরিয়ে গিয়েও পঁড়ায় না, হনহন করে হাঁটতে থাকে। বাতাসের বেগে সে ধাক্কা খায়, একটু পেছিয়ে আসে, কিন্তু পা ফেলে এগিয়ে যায়। তার পা ফেলার নিশ্চয়তার চাইতেও প্রধান হয়ে ওঠে বাতাস, এই বাতাসের ঠেলা সামলে তার এগিয়ে যাওয়া। সবাই মাটির ওপর উবু হয়ে, মাথা বুকের ওপর ঝুলিয়ে-ঘাড় আর পিঠটা বাতাস আর জলের ঝাঁপটের জন্যে খুলে এম বসে ছিল যেন পাথরের চাই। তা থেকে জগদীশের ছিটকে যাওয়াটায় এখন দেখায় যেন এই পাথরে চাই পড়ে আছে আর সেটা বেয়ে একা একজন মানুষ মেনে যাচ্ছে তিস্তার স্রোতের চাইতেও প্রবলতায় তিস্তার স্রোতের ধাক্কা একই রকম, সেই ধাক্কা ঠেলতে-ঠেলতে এগতে হয়, যেন মাথার ওপর বিশমণি পাথর, মাথার ওপর নিলে নিয়ে যেতেই হবে অথবা ঐ পাথরের চাপে বসে পড়তে হবে। আর এই বাতাস যেন শিলাবৃষ্টি-কোথায় যে লাগবে তার আন্দাজ করাও যায় না।

রাবণ এই দঙ্গলের ভেতর থেকে উঠে দাঁড়ায়, তারপর জগদীশের দিকে হাঁটতে শুরু করে। সে একবার চেঁচায়ও, হে-এ জগদীশ কিন্তু তার ডাকটা উল্টো দিকে উড়ে যায়। রাবণ আর ডাকে না কিন্তু একটু তাড়াতাড়ি হেঁটে জগদীশকে ধরতে চায়। বাতাসের ধাক্কায় তারা পরস্পর থেকে একই দূরত্বে থেকে যায়। জগদীশকে ডাকার জন্যেই বোধহয় রাবণ একবার হাত তোলে। বাতাসের ধাক্কায় তার হাতটা যেন ভেঙে নেমে আসে। এখন যেরকম বাতাস আর বাতাসে জলের কণা, তাতে জগদীশ আর রাবণকে দেখতে পাওয়ার কথা নয়, তাদের এই জলকুয়াশার আড়ালে চলে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখনো যে তাদের দেখা যাচ্ছে, যেন দুটো গাছের মত দাঁড়িয়ে আছে আর বাতাস তাদের উপড়ে ফেলতে চাইছে, তাতেই বোঝা যায় তারা বেশি দূর এগতে পারে নি আর দু-জনের মাঝখানের দূরত্ব বাতাসে অপরিবর্তিত থাকছে। রাবণ আবারও হাত তোলে, যেন বাতাসই এক ধাক্কায় তার হাতটাকে পেছন থেকে মুচড়ে ওপরে তুলে সঙ্গে-সঙ্গে আবার মুচড়ে নীচে নামিয়ে দেয়। রাবণ হাত তোলে, কিন্তু চিৎকার করে না। তার চিৎকার বাতাসে উল্টো দিকে চলে যাবে, কিন্তু হাত তোলে কেন? জগদীশ ত তাকে দেখতে পাচ্ছে না। বোধ হয় জলে ডুবে গেলে মানুষ যেমন হাত তুলে বাঁচতে চায়, তেমনি, এই বাতাস থেকে বাঁচতে হাত তুলে ফেলছে মাঝে-মাঝে রাবণ।

এখানে কেউ জিজ্ঞাসা করে, কী, খাড়ি আছে, না যাছে?

যাবার দে, যাবার দে, তখন কইল্যাম, তোমার আর এই রাত্তির বেলা পাক খাওয়ার কাম কী, বসি থাকো, রেডিওটা শুনো কুনো খবর বলে কি না, তা না, কয়, ক্যান, আমিও যাব, চল, এখন দেইখব্যারও পায় না কিছু, কিন্তু সব জাইনব্যার লাগবে। যাবার দে, যাবার দে।

রাবণ কাহা আবার পাছ ধইরছে ক্যান?

রাবণ কাহা চলি যাবে, না, জগদীশকাহাক বুঝসুঝ করি আইনবে?

আনিবার দ্যাও, আনিবার দ্যাও, বাতাস খারাপ, সগায় একসঙ্গে থাকাই মনত লাগে।

বৃষ্টি এখন জোরেই বইছে, বেশ জোরে, বাতাস না থাকলে সারা শরীর-মাথা ভিজে যেত। কিন্তু এখন বাতাসের বেগে বৃষ্টি সোজা নেই, বেঁকে গেছে। সেই জ্বলের তীর এই দঙ্গলটার পিঠেঘাড়ে।

.

একটা নদীর ভেতর অনেক নদী

এই ঝোড়ো বাতাস, এই বৃষ্টি, এই বন্যার মধ্যেও আকাশ থেকে আলো ছিটকচ্ছে একটা–এমন আলো যা দেখা যায় না। কিন্তু অনেকক্ষণ এই আকাশের নীচে নদীর পাড়ে ঘোরাঘুরি করলে বোঝা যায়। সে আলো এমন নয় যে অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাবে, বরং উল্টো, সে আলো এমনই, যা চোখের সামনে একটা আড়াল তৈরি করে, এমন ঘের, যা কিছুতেই ভেদ করা যায় না। সে আলো এমনই, যাতে কিছুই স্পষ্ট হয় না, অথচ সব কিছুরই বাইরের রেখাটা দেখা যায়। সব কিছুরই মানে, একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিসীমার ভেতরে সব কিছুর। সে আলোতে মাটি দেখা যায় না, অথচ মাটির অস্তিত্ব বোঝা যায়, পায়ের তলার মাটির অস্তিত্বটুকু, বড় জোর সামনে পা ফেলার জায়গাটুকুরও। সে আলোতে চোখের সামনে টেনে আনলেও মানুষের মুখের রেখাগুলো স্পষ্ট হয় না, অথচ তীরের ফলার মত বৃষ্টির ছাটগুলো এসে ঘাড়ে আর পিঠে বিধে থাকলে সেই জলবিন্দুগুলি নিষ্প্রভ এক উজ্জ্বলতায় পিঠটাকে, ঘাড়টাকেও আবছা স্পষ্টতা দেয়। এখন, পিঠঘাড়জোড়া আবছা উজ্জ্বলতায় এই দঙ্গলটা অনেকটা যেন স্পষ্ট, জলে ধুয়েধুয়ে যেমন পাথর স্পষ্ট করা হয়। কিন্তু, তার মধ্যেও, যারা বৃষ্টির ছাটটার দিকে পেছন ফিরে বসেছিল পূবের আর দক্ষিণের সেই লোকগুলির পিঠ ভিজে গেছে বেশি, উল্টো দিকের মানুষজনের পিঠ প্রায় শুকনো।

আলোটা আসছে আকাশ থেকেই, গত তিন দিনের সম্পূর্ণ লোপাট আকাশ থেকে। প্রথম থেকেই বাতাস দিয়ে শুরু, পরে বৃষ্টি এসেছে। যেন, দিন তিনেক আগে বুধবারে, এখানকার আকাশে, বাতাসই কোথাও থেকে খেদিয়ে নিয়ে এল মেঘ। তারপর বাতাসই সেগুলোকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে, ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আকাশ আর তিস্তার মাঝখানের ফাঁকটা সম্পূর্ণ ভরে দিল। দিনের বেলা সূর্য দেখা যাচ্ছে না–আলোও মাঝেমধ্যে এত কমে আসছে যেন প্রায়ই অকালে সন্ধ্যা ঘনিয়ে উঠছে। আর ওপরে মেঘ, নীচে নদীর জলের মাঝখানের আকাশ জুড়ে বাতাস একেবারে দাপটে বেড়াচ্ছে। এই বাতাসে জল বাড়ে। এ বাতাস এখানকার বন্যার বাতাস না। ওপরে, পাহাড়ের ভেতরে কোথাও বর্ষা শুরু হয়েছে–সেই বর্ষা, যা মাটির তলায় ঢুকে যায়, তারপর সেখান থেকে মাটি খুঁড়ে, গাছ উপড়ে, পাথর টলিয়ে নেমে আসে নদীকে একেবারে দ্বিগুণ, তিনগুণ চওড়া করতে করতে। এখন ত তিস্তার প্রায় মাথা থেকে শেষ পর্যন্ত বাঁধে মোড়ানো। কিন্তু, বাঁধ ত আর মাটিকে গভীর করে তুলতে পারে না। খাতনা-পাওয়া জল ফুঁসে উঠে বাঁধের গায়েই ধাক্কা মারতে চায়। তারপর আবার বিপরীত আক্রোশে ফিরে আসে কিছু মাটি খুবলে নিয়ে। সেই জন্যে বাধ থেকে লম্বা-লম্বা স্পার নদীর মধ্যে চলে এসেছে, জল যাতে সোজা পাড়ে গিয়ে ঘা না মারতে পারে।

বর্ষার তিস্তায় ত এরকম কোথাও না কোথাও হবেই। কোথায় হবে সেটা নির্ভর করে পাহাড়ে কোথায় বৃষ্টি হচ্ছে। এখানে না হয় এই একটা নদীকেই তিস্তা বলে, এখানে–এই সমতলে। কিন্তু ওপরে, পাহাড়ে, তিস্তা ত আর একটা নদী নয়। কোথা থেকে কত ঝোরা, কত ছোট নদী নেমে এসে তিস্তায় মেলে।

এত জায়গায় এত স্রোত তিস্তা দিয়ে যায় বলেই তিস্তাও যেন নিজেকে এমন ছড়িয়ে দেয়। এমনকি এই সমতলে, যেখানে তিস্তা তিস্তাই, সেখানেও পশ্চিম পারে বোদাগঞ্জ রংধামালি জলপাইগুড়ি-হলদিবাড়ি আর পুব পারে মাল-লাটাগুড়ি-দোসোহনি-ময়নাগুড়ি- বানেশঘাট-বাকালি মেখলিগঞ্জ এই দুই পারের মাঝখানে তিস্তা মাইল-মাইল ছড়ানো-ছিটনো। যাকে তিস্তা বলা হয়, যে-জায়গাটিকে তিস্তা বলে সব সময় দেখা হয়, দেখানো হয় তার সবটা জুড়ে ত আর কখনো জল থাকে না। তিস্তা কোনো নদী নয়, এটা একটা ভূখণ্ড। শীতকালে এই ভূখণ্ডের মধ্যে পাথরের টিলা জেগে ওঠে, তাকে ঘিরে সুতোর মত সরু কিন্তু স্থায়ী জলরেখা সোনা রঙের বালিকে সব সময় ভিজিয়ে রাখে, আর ভেজা বালিতে সেই টিলার জীবন্ত ছায়া সকাল থেকে সন্ধ্যা ঘুরে যায়। এই ভূখণ্ডের কোনো অংশ জুড়ে নরম সবুজ কচি ঘাসের মাইল-মাইল বিস্তারে গরুমোষের বাখান ঘুরে-ঘুরে বেড়ায় আর আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রোমন্থন করে। এই ভূখণ্ডের কোনো অংশ জুড়ে নতুন কোনো অরণ্য জেগে ওঠে। কাশফুলের মাইল-মাইল বিস্তারকে দূর থেকে শরতের রোদে জল বলে বিভ্রম জাগে।

বর্ষায় এই সব আবার ধ্বংস হতে থাকে। তিস্তার কোন খাত দিয়ে কখন জল গড়াবে তা কেউই জানে না। কোনো বর্ষায় ডাইনে, পশ্চিম পাড় ভাঙে ত, তার পরের বর্ষায়, বায়ে পুব পাড় ভাঙে। এমন-কি একই বর্ষার মাঝখানেও খাত বদলে যায়। বর্ষা জুড়ে জলের তলায় সেই অদলবদলের পর আবার শরৎ থেকে ধীরে-ধীরে তিস্তার ভূখণ্ডের নতুন চেহারা দেখা যায়। যেখানে জল ছিল না, সেখানে স্থায়ী স্রোত ভেজা বালির মধ্যে দিয়ে বইছে। যেখানে অনেকদিনের নদী বইছিল, সেখানকার জল হঠাৎ সবুজ হয়ে যেতে শুরু করে, কোথায় মূল নদীর স্রোতের সংযোগ তার আটকে গেছে, সহসা আবার জেগে উঠেছে পাথুরে টিলা–মাথার ওপরে বনের একটা ছোট টুকরো নিয়ে, সেই টুকরোর ওপরে প্রায় পঞ্চবটী বনের মত যেন বাছাই গাছ, কোথায় মাটির চর জেগে উঠেছে–হালেবলদে কলা গাছে আর ছনের ঘরে সেখানে দেখতে-দেখতে একটি জনবসতি গড়ে ওঠে, তিস্তার বড় খাতটা থেকে অর্ধেক। জলই আরেক খাত দিয়ে বইতে শুরু করে দেয়, নৌকাগুলো চরে আটকে যায়, তারপর নদী বদল করে, নদীর ভেতরেই নদী বদল করে। তিস্তা ত একটা নদী নয়–একটা নদীর ভেতরেই অনেক নদী।

বছরে ছ-মাস প্রায় এই ভূখণ্ডজোড়া অনেক নদীর পারস্পরিক যোগবিয়োগ ঘটতে থাকে।

কোনো নদী, বা সোঁতা, তার বহুদিনের খাত থেকে উঠে আসে, যেন মাটির সঙ্গে লেপটে থাকা হাতি হঠাৎ তার গুঁড়টা প্রথমে আকাশে নাচিয়ে, তারপর দুই-তিন ধাক্কায় এক ঘূর্ণিঝড় তুলে, জেগে উঠল, আর নিজের এতক্ষণের ঘুমের ক্ষতি পোষাতে, যেদিকে চোখ যায় সেদিকেই, খানিকটা ছুটে, আবার ফিরে আসে, তার পায়ের চাপে ধুলোর ঝড় ওঠে, তার গা থেকে ধুলোর ঝড় ঝরে, তার শুড়ের ঝাঁপটে শুকনো ঝড় মাটি থেকে আকাশে লাফিয়ে ওঠে হঠাৎ। তারপর, এমন হতে পারে, সে আবার তার পুরনো খাতেই ফিরে যাবে, অভ্যস্ত পুরনো খাতে। আবার, এমনও হতে পারে, ছুটতে ছুটতে খেলতে-খেলতে ঘুরতে-ঘুরতে, নিজের তৈরি ধুলোর ঝড়ে তার নিজেরই চোখে আঁধি লাগে। সে আর তার পুরনো খাত চিনে নিতে পারে না।

কোনো নদী, বা সোঁতা, তার মূল ধারা থেকে ছিটকে চলে যায়, একটা বড় হাতির পাল বা চলমান মহিষ বাথান থেকে যেমন কোনো বাছুর একটু বেশি স্বাধীনতায় এদিক-ওদিক করতে করতে দলছুট হয়ে পড়ে। দলছুট হওয়ার প্রথম আনন্দে সে যেন তার স্বাধীনতার স্বাদ পেতে থাকে চারপাশের আকাশবাতাস থেকে। মাটি কত রকম, কোন মাটিতে কী ভাবে হাঁটতে হয় সেসবও দলের কাছ থেকে যার শিখে নেয়া হয় নি, সে তার নিজের গায়ে-গায়ে মাটি চিনে নেই, ছোট্ট শুড় বা লালচে নাক তুলে বাতাস থেকে অজানা সব ঘ্রাণ নিতে শেখে। যেন সে জানেই, এরকম ভাবে আবার পালে বা বাথানে ফিরে যাওয়া যায়। কিন্তু তারপর সেই তরুণ হাতি বা মহিষ হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে অদৃঢ় ঘাড় একবার পেছনে ফেরায়। তখনো সে ঘাড়ে, অতিক্রান্ত পথ দেখার অভিজ্ঞতার দাগ পড়ে নি। তখনো সেই খাটো গুঁড়ে নিজের অতিবাহিত বাতাস শোকার টান পড়ে নি। একবার, একবার শুধু নিজের লুপ্ত পদচিহ্নের জন্যে তীব্র করুণ ডাক দেয়। তারপর প্রতিধ্বনিকে প্রত্যুত্তর ভেবে পালে বা বাথানে ফিরে যাওয়ার জন্যে ভয়ের তাড়নায় ছোটে। সেই তরুণ পশু তখনো ধ্বনি-প্রতিধ্বনির নিয়ম শেখে নি। সে-নদী, বা সোঁতা চিরকালের জন্যে তার মূল খাত থেকে ছিন্ন হয়ে যায়, প্রত্যাবর্তনের সব পথ মুছে দিয়ে।

বা, তখনো পর্যন্ত নদীর মূল ধারা অবিচ্ছিন্ন গতিতে তার বিরাট বিস্তার নিয়ে প্রাকৃতিক নিয়মে বয়ে চলে, কোথাও কিছু ফেলে যায়–যেমন তার স্বভাব, যেন, হাতির একটা বিরাট পাল, বা মহিষেরই কোনো বিপুল বাথান। এ ত সেই পালের বা বাথানের নিয়মিত ঘোরাফেরা, চেনাজানা জায়গায়, নিজেদেরই অভ্যস্ত পায়ের ছাপ ধরেধরে, নিজেদেরই অভ্যস্ত গাছ-লতা পাতার গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতে, নিজেদের ওপড়ানো বা ঘোড়া, গাছ বা মাটি, আরো ভেঙে ও খুঁড়ে, একটু বেশি রকম অসতর্ক। অভ্যস্ততায়। কিন্তু হঠাৎ কোথায় যূথপতির কান দুটো খাড়া হয়ে ওঠে, আকাশে গাছের মত উঠে যায় বিশাল মাথা, কিংবা হাতদুটো যেন বাতাস খুঁড়বে এমন শাণিত প্রস্তুতি নেয়, গুঁড়টা তখনো এক অনিশ্চয়তায় মাটির ওপর দোলে আর সেই দোলনের রেখা ধরে মাটির ওপরে নিশ্বাস পড়ে, ঘাস দোলে, কুটো ওড়ে, বা নাকের গরম নিশ্বাসে সামনে থেকে পোকামাকড় উড়ে যায়, ধীরে-ধীরে সেই শুড়ের দোলা বাড়তে থাকে, ডান দিকের পা দুটো একটু-একটু এগিয়ে থাকে, ঐ বিশাল মহীরুহের মত শরীরের ঢালে এক তীব্রতা আসে, তারপর হঠাৎ সেই যূথপতি শুড় বাতাসে তুলে এক চণ্ড বৃংহতিতে বন কাঁপিয়ে, বা শিং বাতাসে তুলে আর্ত আহ্বানকে প্রতিধ্বনিময় করে নিজের কান দুট্টোকে দু পাশে মেলে ধরে ছুটে চলে, এই বৃদ্ধের শ্রুতিতে কানে এসে পৌঁছেছে কোন সন্ততির পথ-হারানো সঙ্কেত, মুহূর্তে পুরো বাথান বা দল তৈরি হয়ে যায়, আকাশে মাঝে-মাঝেই সমবেত আহ্বানের সঙ্কেত তুলে-তুলে সেই হারানো বাছুরের খোঁজে এই পুরো পাল বা বাথান ছুটে চলে–সংক্ষিপ্ততম পথে, পথের মাঝখানে যত লতাপাতা, গাছগাছড়া, সব কিছুকে মুহূর্তে ধুলিসাৎ করে, ফলে সারা বাতাসে পিষ্ট পাতার গন্ধ মেশাতে-মেশাতে। সেই পাল, বা বাথান তার সন্ততিকে হয়ত আর কখনোই ফিরে পায় না, কিন্তু তার খোঁজে সে তার চারণভূমিই বদলে ফেলেছে, সেই পাল বা বাথান আর পুরনো জায়গায় ফিরে যায় না।

কিন্তু শুধু নদীই খাত বদলায়, তা ত নয়, ভূখণ্ডই বদলে যায় বছরের ছ মাস জুড়ে। আর তাতে ত নদীও বদলায়, নদীরা বদলায়। অদৃশ্য জলতলে কোথায় বালুবাড়ির ওপর থকথকে পলি পড়ে যায়, একেবারে সাত-আট ইঞ্চি পুরু–এক শীতের রোদে শক্ত হয়ে পরের বর্ষাতেই সেটা ধানি জমি হয়ে উঠতে পারে। আবার সেরকমই, দু-তিন, বা এমন-কি দশ-পনের, বছরের পুরনো ধানিজমি ও বসতি কলাগাছ-কুলগাছ ডোবানো জল বালির পাহাড়ে ঢেকে দেয়, যেন নদীর তলে কোথাও এক ধারাবাহিক মরুঝড় চলছে। জল সরে গেলে শীতে দেখা যাবে দু-একটা গাছের পাতাহীন শুকনো ডাল-যাদের শুকিয়ে যাওয়া তখনো শেষ হয় নি, দু-একটা আলগা বাশ–যেন বালির নিশানার জন্যে সদ্য পোতা কিন্তু আসলে বালির তলার মাটিতে সেগুলো পোতাই আছে। আর সেই বালির ওপর হুমড়ি খেয়ে থাকা কোনো বাড়ির চালের একটা টুকরো। তখন, শীতে দেখে মনে হয়, জলে নয়, ঝড়ে উড়ে গেছে, চালটা শুধু মুখ থুবড়ে আছে।

এখন, এই বর্ষার ছ-মাস তিস্তার ভেতরে-নদীগুলোর যোগবিয়োগ ঘটে চলেছে তীব্র অথচ অনিশ্চিত এক বেগে। জলের তলে তিস্তা-ভূখণ্ডের ভেতরেও সেই গতি সঞ্চারিত হয়ে গেছেনাটকীয় ঘনঘটায়, কিন্তু এমনই দ্রুততায় যেখানে কোনো নাটকীয় পরিকল্পনা নেই।

.

ভূগোলের ভেতরে ইতিহাস

ওপরে, সেই মালবাজার-ওদলাবাড়ির কাছে মউয়ামারির চর থেকে শুরু করে নীচে হলদিবাড়ির কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত তিস্তার, মানে, তিস্তা বলতে যে-ভূখণ্ড বোঝায়, তার, একেবারে মাঝখানে, লোকবসতি তৈরি হয়ে আসছে অনেক দিন হল। কিন্তু সে অনেক দিনেরও একটা ইতিহাস আছে।

রাজবংশীরা তিস্তার চরে সাধারণত বসতি গাড়ত না, গাড়ে নি। তারা বরং যেন বেশি অভ্যস্ত ছিল তিস্তার পারে–জঙ্গলের মধ্যে। সেই জঙ্গল তাদের খেতিজমি দিত, দরকারী সার দিত, ঘর তুলবার ডালপাতা দিত।

নদীর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল নদীর স্বভাবের মতই যখন যেমন, তখন তেমন। যে-নদী এমন ঘন-ঘন বদলায়, যে-নদী, নদী হিশেবে চিনতে-চিনতেই, ডাঙা হয়ে যায় আর ডাঙা, নদীর ভেতর চলে যায়, সে নদীকে নদীর জায়গা ছেড়ে দিয়ে রাজবংশীরা বনান্তরাল থেকে নদীকে ব্যবহার করত। ব্যবহার বলতে যে শোষণও বোঝায়, তেমন ব্যবহার নয়। এ যেন এই নিসর্গের মতই ব্যবহার–জলপাইগুড়ির এই নিসর্গ, যেখানে গহনতম ফরেস্ট নদীর জলপ্রান্তরকে আড়াল দিয়ে রাখে, যেখানে পাহাড়ের ঘের সেই ফরেস্টকে ঘিরে রাখে। যেন মনে হয়, এ নিসর্গকে দেখাতে পারে, পাহাড়বননদী দিয়ে ঘেরা, পাহাড়বন-নদী দিয়েই তৈরি এক রক্ষিত নিসর্গের মত। দেখাতে পারে এমন যে ঘিরে রাখা পাহাড় থেকে ধাপে-ধাপে নেমে এসেছে এই নদী বন-পাহাড়, যেন, এখানে এই ঘেরের মধ্যেই থাকবে বলে। এ ত মানসসরোবর নয়। এখানে, এই সীমার দক্ষিণে কোনো পাহাড় নেই, তিস্তা সেই মুক্তিতেই মিশে গেছে। কিন্তু তিন দিকে ত আছে। সেই তিন দিক ঘেরা এই দেশে পাহাড়বন-নদীর যে-সহাবস্থান ভূগোলের কারণেই ইতিহাস হয়ে উঠেছে, রাজবংশীরাও এই নদীর সঙ্গে সেই সহাবস্থানের নীতিতেই চলে আসে। সেখানে কোনো আক্রমণ নেই, কোনো দ্বিতীয় পক্ষ নেই, কোনো সংঘাত নেই। সেই অর্থে, রাজবংশীদের সঙ্গে তিস্তার সম্পর্কই নেই কোনো। কারণ, সম্পর্ক বলতেই ত দুইটি আলাদা জিনিশের ভেতরকার এক সংযোগকে বোঝায়। রাজবংশী সমাজ আর তিস্তা ত দুটো আলাদা জিনিশই নয় যে সেখানে আবার একটা সংযোগের দরকার হবে।

সেই সংযোগের দরকার হল, যখন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভাটিয়ারা এখানে এত বেশি সংখ্যায় আসতে লাগল যে, জনসংখ্যার পুরনো অনুপাত আর টিকল না। এই ভাটিয়াদের মধ্যে যারা আরো ভাটিয়া, তারা এল যেন গায়ে পদ্মা-মেঘনা এইসব জায়গার জলের গন্ধ নিয়ে। তাদের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক হচ্ছে আক্রমণের, সংঘাতের, জয়পরাজয়ের, দখলবেদখলের। এই নদীকে তারা চেনে না। তারা যে-নদীকে চেনে তার তল দেখা যায় না, আর এই নদী যেন তার তলদেশের রঙিন পাথরগুলোকে ঢেকে রাখার জন্যেই বয়ে চলেছে। তারা যে-নদীকে চেনে, তার জলের রং কাল, মাটির রং কাল। আর এ, নদীর জল রোদের মত ঝলকায়, বড় জোর কাদামাটিগোলা। তারা যে-নদীকে চেনে তার চৌহদ্দি অত্যন্ত চিহ্নিত ও সেই চৌহদ্দির মধ্যে মানুষের সঙ্গে নদীর মরণবাচন লড়াই। আর, এ নদীর কোনো চৌহদ্দিই নেইকখনো গাছের মাথায় চড়ে, কখনো গাছ নদীতে মাথা ডুবিয়ে স্নান করে। কিন্তু যত পার্থক্যই থাক-নদী ত নদীই। আর, তারাও, এত উত্তরে এসেও, ঐ নদীর ভেতরে, ঐ অচেনা নদীর ভেতরেই, নিজেদের অভ্যস্ত জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ খুঁজে পায়। জলে, জলের চেনা গন্ধ পায়।

পুব বাংলায় নমশূদ্রেরাই প্রধানত তিস্তার চরগুলোতে প্রথম বসতি গাড়ে। দলবদ্ধ ভাবে বসতি হিশাবে। এর আগে, তিস্তার চরের ভামনি বনের ভেতর বাঁশ পুঁতে সেই বাঁশের মাথায় ঘর তুলে যে দু-চারজন কখনো কখনো থাকত, তারা কখনো বসতি গড়ে নি, বসতি গড়ার মত করে থাকেও নি। কিন্তু নমশূদ্ররা এই চরগুলোতেই আবিষ্কার করল সেই জমি, যার দখলের জন্যে তাদের কারো সঙ্গে দাঙ্গাহাঙ্গামা করতে হবে না। চরের জমি তারা চেনে–নিজেদের পছন্দমত জমি তারা বেছে নিতে পারল। তারপর ভামনি বন কেটে নিজেদের বসতের জমি আর আবাদের জমি দুইই তৈরি করতে লাগল। তারা রাজবংশীদের মত বাঁশের মাথায় ঘর বানাল না–ভিটে গাড়ল, দাওয়া বানাল, তারপর তিস্তার চরের ছন দিয়ে আর পারের ফরেস্ট থেকে বাশ এনে ভাটিয়া বাংলার মতই চারচালা ঝর তুলল। তিস্তার চরে এত ভামনি আর তিস্তার পারে এত বাশ, যেন এই রকমের ঘরবাড়ি একমাত্র এখানেই হওয়া সম্ভব। নমশূদ্রেরা এক সৈন্যবাহিনীর মত স্বয়ংসম্পূর্ণতায় এমন ভাবে এই চরগুলির দখল নিল–ওপরে মউয়ামারি থেকে তলায় কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত তিস্তার একেবারে মাঝ বরাবর এই চরগুলির দখল এমনভাবে নিল, যেন, তারা বরাবর এখানেই থেকেছে, সৈন্যবাহিনীর কাছে যেমন কোনো জায়গাই বিদেশ না, যুদ্ধ না করলেও ত একটা সৈন্যবাহিনী একটা অজানা-অচেনা জায়গায় তাদের প্রতিদিনের রুটিনে বাধা থাকে।

ভয় নিশ্চয়ই ছিল–তিস্তার ভয়। কিন্তু সেখানেও আশ্বাস ছিল আবার নতুন বসতি ও আবাদ গড়ে তোলার, কোথাও-না-কোথাও ত ডাঙা জাগবেই, সব ত আর ভেসে যেতে পারে না। আর, তখন, সেই মুহূর্তে যে-কোনো একটি জায়গায় খুঁটি গেড়ে বসাটাই ছিল প্রধান দুশ্চিন্তা। তিস্তার মত নদীর স্বভাবকে ভয় করে চরে না-যাওয়ার চাইতেও প্রবলতর ছিল, সেই ভয়ঙ্কর স্বভাবের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও, একটা কোথাও ঘর তৈরি করা ও আবাদ বানানোর প্রয়োজন।

ঠিক যেন পুঁজিপুথি মেনেই, ১৯৫০ সালে তিস্তায় যেবন্যা এল, তার সঙ্গে জানা ইতিহাসের কোনো কথার তুলনাই চলে না। তিস্তার চরটর কোথায় উড়ে গেল। পারের ফরেস্টকে-ফরেস্ট, স্রোতের সঙ্গে উধাও হয়ে গেল। সেই প্রথম জলপাইগুড়ি শহরের ভেতরে তিস্তার জল ঢুকল।

এখন যদি তিস্তার চরের এই জনবসতির কথা ভেবে বিচার করা যায়, তা হলে, মনে হয়, ১৯৫০ সালের ঐ বন্যাটা হয়ে সব দিক থেকেই ভাল হয়েছে।

তখনো সব চরে ত বসতি হয়নি। সবে মউয়ামারির চরে কিছুটা জায়গা হাসিল করে বসবাস শুরু হয়েছে, চাষআবাদও একটু-আধটু হচ্ছে। ঠিক সেই সময়েই সেখানকার, ঐ মউয়ামারির নমশূদ্রেরা, বুঝে নিতে পারল তিস্তার অনিশ্চয়তাটা আসলে কী রকম অনিশ্চয়তা। জল যে এমন আচমকা এসে যায়, তাও আবার এরকম বেগে, তা এরা ভাবতেও পারে নি। নৌকো ছিল একটা মাত্র। ওস্তাদ মাঝির অভ্যস্ত হাল নৌকোর টাল সামলাতে পারে বটে কিন্তু জলের তলায় বিরাট-বিরাট পাথরের চাঙরের সঙ্গে ধাক্কা লেগে যে-নৌকোর তলা খসে যেতে পারে–সেটা জানা ছিল না। বন্যা নেমে গেলে ঐ চরেই আবার ঘর ভোলার ও আবাদের কাজ শুরু হল।

আর সেই প্রথম তিস্তাকে একটু সামলাবার ব্যবস্থা হল। সব দিক খোলা তিস্তা বর্ষাকালে শেবক পাহাড়ের তলা থেকে হলদিবাড়ি-মেখলিগঞ্জ পর্যন্ত ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। যেখান দিয়ে খুশি বয়ে যেত। পঞ্চাশ সালের বন্যার পর শহর ঘিরে বাধ হল। তারপর তিস্তার দুই পারেই বাধ বেড়ে যেতে লাগল। লম্বা হতে-হতে সেই ওদলাবাড়ি থেকে কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত তিস্তার দুই পারই বাধে বাধা হয়ে গেল।

এরই ভেতর তিস্তার ওপর দিয়ে দুটো ব্রিজ তৈরি হল, একটা রোড ব্রিজ, আর একটা রেল ব্রিজ। ১৯৬৮ সালে তিস্তার বন্যা এই ব্রিজের পাশের বাধ ভেঙে শহরে ঢুকল। তার আগে ওদলাবাড়ির বন উপড়েছে, ন্যাওড়া আর ধরলার মাঝখানের ত্রিভুজটাকে মাটি থেকে খুবলে নিয়েছে, মউয়ামারির চর থেকে বোয়ালমারির চর পর্যন্ত সমস্ত জায়গায় তিস্তা তার পুরনো খাত বানে ভাসিয়ে দিয়েছে। ১৯৬৮ বন্যা কেন হয়েছে তার কারণ নিয়ে বহুবিধ মত আছে। মতের বৈচিত্র্য নির্ভর করে বন্যার সঙ্গে জড়িত সরকারি বিভাগের সংখ্যার ওপরে। তাতে অন্তত এটা প্রমাণিত হয়ে যায়, প্রত্যেক বিভাগেরই বন্যা বানাবার মত যথেষ্ট কারণ ছিল। এখানে ১৯৬৮র বন্যা আলোচ্য নয়। আলোচ্য তিস্তা ১৯৬৮ বন্যাতে এরকম প্রমাণ আবার পাওয়া গেল যে তিস্তা, বাধ বাধার ফলে, আরো অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এটাও সত্যি যে বাহান্ন থেকে আটষট্টি ত ষোল বছর। এই সোল বছরে তিস্তার বন্যা ত অনেকটাই সামলানো গেছে। ৫০-এর পর ওরকম, বা ওর চাইতে বেশি বন্যার জন্যেও ৬৮ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। ৬৮র পর নিশ্চয়ই আরো বিশ বছর কাটার আগেই তিস্তা সম্পর্কে আরো বৈজ্ঞানিক ও সংগঠিত ব্যবস্থা নেয়া যাবে। ইতিমধ্যেই তিস্তা ব্যারেজের কাজ প্রথম দফা শেষ হয়ে গেছে। যদিও এখনো অতটা নিশ্চিত করে বলা যায় না, এবং এখনো বন্যার ভয় সব সময়ই আছে, তবু তিস্তার জল যাতে পাহাড় থেকে আচমকা নেমে সমতল ভাসিয়ে দিতে না পারে তার জন্যে তিস্তার মাঝামাঝি ত ব্যারেজ বাধা হয়েছে।

তিস্তার চরে যে স্থায়ীভাবে বসবাস করা যায়, চাষ-আবাদ করা যায়,সেটা পঞ্চাশ সালে প্রমাণিত ছিল না। উদ্বাস্তু নমশূদ্রেরা তখন তিস্তার চরে সবে আশ্রয় নিয়েছে। একটা বন্যা তাদের উৎখাত করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল না। এমনকি বাহান্ন ও চুয়ান্ন সালের বন্যাতেও তারা মরে-ভেসে আবার চরে ফিরে এল। যদিও তখনো তারা চরে শিকড় গাড়ে নি।

কিন্তু ৬৮ সালের বন্যায় চরের মাটিসুষ্ঠু উপড়ে গেলেও, চরের মানুষদের চরে ফিরে আসা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কারণ ততদিনে, প্রায় দুই দশকে তিস্তার চর, মউয়ামারি থেকে কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত বসতি হিশেবে প্রায় পাকাপাকি গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে চরের কৃষকদের নিয়ে কো-অপারেটিভের চুরিজোচ্চুরি যেমন হয়েছে, তেমনি, চরের কৃষকের স্বাধীন উদ্যোগে, সরকারি সাহায্যহীন স্বাধীন উদ্যোগে, ধান ও তরকারির ফলনে জেলার কৃষি-অর্থনীতি ও বিপণনের চেহারা বদলে গেছে। ৬৮র বন্যার সময়, চরের কৃষক জলপাইগুড়ির জনবসতির একটা প্রধান অংশ, চরের ফসল ও ফলন আর্থিক জীবনের অপরিহার্য ভাগ।

তাই ৬৮র বন্যার পর চরের মানুষদের আবার চরে ফিরে আসা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। বন্যায় তিস্তার ভূখণ্ড পাল্টে গিয়েছিল। বন্যার পর সেই পরিবর্তিত ভূখণ্ডে এরাও নিজেদের মত করে আবার নিজেদের পুনর্বিন্যাস করে নিয়েছে। তাতে হয়ত দেখা যাবে, কোনো চর আর নেই, আবার নতুন চর দেখা দিয়েছে। তাতে হয়ত দেখা যাবে, তিস্তার সীমার মধ্যে তিস্তা নিজেকে যেমন বদলেছে, এই কৃষকরাও নিজেদের সেরকম বদলে নিয়েছে। কিন্তু ৬৮র বন্যাতেও তিস্তার ভেতর থেকে যাদের উচ্ছেদ করা যায় নি, তারা আর উচ্ছেদ হবার নয়। ৬৮-র বন্যাই যেন তিস্তার চরকে ও সেই চরের কৃষকদের প্রধান ভূভাগের অংশ করে দিল।

দেশ ভাগ হওয়ার পর পূর্ববঙ্গের উদ্বাস্তু নমশূদ্র চাষী, উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি এ-নদীকে এক রকম করে জিতে নিল। ভূগোলের ওপর ইতিহাসের জয় ঘটল।

.

চরের ভেতরে চরুয়া

তিস্তার এই চর প্রধানত পূর্ববঙ্গের নমশূদ্র কৃষকরাই হাসিল করেছে, আবাদ করেছে। সরকারি আইন অনুযায়ী চরের জমির ওপর সাধারণ আইনকানুন খাটে না। কারণ নদীর চরকে, এরকম অনিশ্চিত চরকে, জনবসতির জায়গা হিশেবে সরকার মেতে নিতে পারে না। তাতে অবিশ্যি কোনো অধিকার থেকে এরা বঞ্চিত হয় নি। প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছে, এবার এমন-কি পঞ্চায়েতে সদস্যও পাঠিয়েছে। সরকারি আইন থেকে আইনই মুক্ত থাকার ফলে চরে প্রায় সবাই জোতদার, কেউই শুধু হালুয়া নয়। বা এই কথাটাই উল্টে বলা যায়, চরে সবাইই হালুয়া কেউই কেবল জোতদার না। জমির মালিকানা থেকে জমির ওপর, চাষের ওপর, ফসলের ওপর সমস্ত পুরুষানুক্রমিক ও আইনমাফিক স্বত্ব তৈরি হয়, চরে ত আর তেমন কোনো স্বত্বভোগের সুযোগ নেই। সুতরাং দেউনিয়া-জোতদারির কোনো ব্যাপার চরে যেন থাকতে পারে না।

থাকতে পারে না, কিন্তু আবার একরকমভাবে থাকেও বটে। সবার আর্থিক ক্ষমতা সমান না, সব বাড়িতে কাজের লোক সমান না। কখনো কখনো অনেককেই টাকার ধার করতে হয়। কাউকে কম সময়ের জন্যে, কাউকে বেশি সময়ে জন্যে। সে সময় টাকার ধার দেয়ার দেউনিয়া দরকার হয়। চরে এসমস্ত ধার অনেকটা নগদ টাকায়, শোধ হয়। যার নিজেরও টাকার ক্ষমতা আছে, সে টাকা দিয়ে সুদসহ ধার শোধ করে। কিন্তু এর মধ্যে কারো কারো আবার ফসলে শোধ করলে সুবিধে হয় বেশি। তার হয়ত টাকার জোর কম। তখন, যেমন জোতদারিতে, তেমনি চরেও, যখন শোধ করা হচ্ছে তখনকার শস্তা দরে না, যখন ধার দেয়া হয়েছিল তখনকার আক্ৰা দরে ঋণ শোধ করতে হয়। কিছু কিছু জমিতে কৃষক আর নিজে চাষ করে কুলোতে পারে না–সেখানে তারা কিছু-কিছু জমিতে কাজের জন্যে লোক রাখে। তেমন লোক সহজেই পাওয়া যায়-রাজবংশীরা এসে হালের সময়, বোয়া গাড়ার সময়, ধানকাটার সময় কাজ করে দেয়। সাধারণভাবে চরের অর্থনীতিতে আধিয়ারি চলে না। কিন্তু মজুরি জমা রেখে-রেখে ফলনের ভাগে মজুরি নিয়ে রোয়াও চালু আছে। এতে যেন রাজবংশী হালুয়ার অন্তত আধিয়ারির মর্যাদাটুকু জোটে।

এই চরগুলোতে একটা অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চালু আছে–উৎপাদনের ভূমিকা থেকে তৈরি গণতন্ত্র। রাজবংশীরা কোনোদিন দলবদ্ধভাবে চরে বসতি গাড়ে নিতাই নমশূদ্রেরা চরকে বাসযোগ্য করে তোলার পর রাজবংশীরা সেখানে নিজেদের অধিকার দাবিও করে নি, সে নিয়ে কোনো ঝামেলাও হয় নি। বরং, যাকে বলা হয় কায়েম এলাকা, অর্থাৎ সরকার যে-জমি সেটেলমেন্ট মারফৎ জরিপ করতে পারে সেই আইনি জমিতে নমশূদ্ররা যেখানে বসতি গেড়েছে, সেখানে কোনো-কোনো সময় পুরনো রাজবংশী বসতির সঙ্গে দাঙ্গাহাঙ্গামা ঘটেছে। এরকম সবচেয়ে খারাপ ঘটনা ঘটেছিল বছর চোদ্দ-পনের আগে তিস্তাপারের ক্রান্তি থানার ঝাড়মাঝগ্রাম এলাকায়। সেখানে আগুন লাগানো, আগুনে পুড়িয়ে মারা, কুপিয়ে কাটা–এ সবই ঘটেছিল। কিন্তু চরে এখনো এরকম কোনো ঘটনা ঘটে নি, সাম্প্রদায়িক হুজ্জতহাঙ্গামার কোনো ঘটনাই নয়! আর প্রথম দিকে যদিবা বলা যেত যে নমশূদ্রেরা চরে নিজেদের লোক ছাড়া কাউকে বসতে দেয় না–তেমন কে-ই বা বসতে চেয়েছে–কিন্তু পরে, যখন চর বাসযোগ্য ও কর্ষণযোগ্য জায়গা হিশেবে সাধারণ ভাবে স্বীকৃত হয়ে গেল, তখন, প্রধানত মনশূদ্ররা হলেও, রাজবংশীদেরও বেশ কিছু অংশ একসঙ্গে চরে এসে বসতি গাড়ে, আবাদ করে।

ব্যাপারটা তখন এরকম দাঁড়িয়েছে যে, চরে নমশূদ্রেরাই যাবে তা নয়, চর যখন আছে, তখন সবাই মিলেই সেখানে যাওয়া যাক। এরকম একটা পরিবেশ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিশেষত, তিস্তার দুই পারেই ত রাজবংশী জনবসতি আছে। তাদের সেই সব গ্রামবন্দরের ভেতর দিয়েই চরের মানুষজনকে যাতায়াত করতে হয়। এক ধরনের চেনাজানা, তার ফলে হয়েই যায়। স্বাধীনতার পরেই সেই প্রথম ধাক্কায় যা হওয়ার হয়েছে, কিন্তু তার পরে তিস্তার চরগুলিতে নমশূদ্র ও রাজবংশীদের মিশ্র জনবসতি তৈরি হয়েছে। তাতে হয়ত বেশির ভাগ জায়গাতেই নমশূদ্রদের প্রাধান্য, কিন্তু কোনো-কোনো জায়গায় রাজবংশীরাও সংখ্যাগুরু।

সামাজিক দিক থেকে, অন্তত সমাজের বাইরে দিক থেকে, বা, বলা ভাল, এই সমস্ত চরের জনসংগঠনের দিক থেকে নমশূদ্র ও রাজবংশীদের মিলিত জীবনযাপনই প্রধান, সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর প্রশ্নটা সেখানে অবান্তর। জগদীশ বারুই-এর মত নমশূদ্র মহাজন এক-এক চরে নিশ্চয়ই আছে কিন্তু চরের কৃষকও আর পুরুষাক্রমিক খাতক নয়, সুতরাং সে বারুইয়ের ধার ধারতে পারে কিন্তু ভাত ধারে না। জনসংগঠনের এই গণতন্ত্র থেকেই বোধহয় চরের কৃষকদের ভাষাতেও পূর্ববঙ্গের আর রাজবংশী ভাষার একটা মিশ্রণ ঘটেছে। অন্ধকারে ভাষা শুনে বোঝা মুশকিল ভিড়টার প্রধান অংশ–ভাটিয়া না দেশিয়া। এই যেমন জগদীশ বারুই যে-ভাষায় খিস্তি করে উঠে যায়, রাবণ রায়বর্মন তাকে সেই ভাষাতেই প্রায় বুঝিয়েসুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে যায়।

.

ফ্লাড আসতে কতক্ষণ-চার ঘণ্টা না ছয় ঘণ্টা

কিন্তু এবাতাস ঠেলে জগদীশও এগতে পারে না, রাবণও জগদীশের কাছে পৌঁছতে পারে না। এরা এখানে প্রায় গোল হয়ে বাতাসের ঝাপটায় শাণিত বৃষ্টির তীর পিঠে-ঘাড়ে-মাথায় নিতে নিতে দেখে, তাদের এখান থেকে উঠে গিয়েও জগদীশ বা রাবণ কোথাও যেতে পারছে না।

বৃষ্টিভরা বাতাসের কুয়াশার ভেতরে ওদিক থেকে বাতাসের অনুকূলতায় কু ক্রমেই ছুটে কাছে আসে। সে জগদীশকে এরকম দলছুট একাকী দেখবে, ভাবে নি। ভাবে নি বলেই যেন জগদীশকে দেখেও না দেখেই ছুটে আসে। জগদীশ নকুকে চিনতে পারে না। কিন্তু তার যেন মনে হয় বিপরীত দিক থেকে জমাট কুয়াশা নড়ে চড়ে এদিকে আসছে। এখন ওদিক থেকে এক নকুই আসবে। কিন্তু সেটা, তার কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও কুয়াশার আরো ভেতরে চলে যায় দেখে জগদীশ চিৎকার করে ডেকে ওঠে,হে-এ নকু। সেই চিৎকারে আহ্বানের সঙ্গে ধমকও ছিল, বা হয়ত ওটাই জগদীশের স্বরের পাকা ভঙ্গি–সে কথা বললেই একটু জোরে বলে ফেলে। কিন্তু জোরটা এখানে তার স্বভাবের চাইতে অনেক বেশিই ছিল-নইলে এই বাতাসে সে-আওয়াজ রাবণের কাছে ও তারও পেছনে ঐ দলের কাছে অমন হুমড়ি খেয়ে পড়ত না-হে-এ নকু।

নকু দাঁড়িয়ে পড়ে। জগদীশ চিৎকার করে ওঠে, কী কইল রেডিওতে?

এখন, এই চরে কুয়াশায় তিনটি দাঁড়ানো মূর্তি রাবণ, নকু আর জগদীশ। একটু দূরে সেই দলটা গোল হয়ে বসে–মাথা নিচু করে। নকুকে জগদীশ ডাকতেই সেই দলের দু-একজন দাঁড়িয়ে পড়ে। নকু জগদীশের দিকে ফিরে গলার সমস্ত জোর দিয়ে চিৎকার করে-লাল সিগন্যাল দিই দিসে, লাল সিগন্যালনকুর চিৎকার ঐ বাতাসে ছিঁড়ে যায় আর আওয়াজগুলো পুর্ব থেকে পশ্চিমে চলে যায়। আওয়াজগুলো এমন টুকরো-টুকরো হয়ে উড়ে যায় যে এরা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে সেগুলোর ভেতর কোনো সংযোগ তৈরি করা অসম্ভব হত–সেগুলোকে বাতাসেরই শব্দ মনে হত।

তিন-তিনজন দাঁড়িয়ে থাকায় বাতাস তাদের ঘিরে আরো উত্তাল হয়ে উঠতে পারে। জগদীশ পেছন ঘুরে এই দলটির দিকে ফিরে আসতে শুরু করে। এতক্ষণ জগদীশ বাতাস ঠেলে এগতে পারছিল না আর এখন হঠাৎ বাতাসটা তাকে পেছন থেকে ধাক্কায় ধাক্কায় সামনে ঠেলে দেয়। তাতে তার শরীরটা কেমন হালকা লাগে। স্রোতের বিপক্ষে সাঁতার কেটে হঠাৎ স্রোতের মুখে গা ছেড়ে দেয়ার মত।

নকুর কথা ঐ দলটাকে মুহূর্তে ভেঙে দেয়। সবাই যেমন একসঙ্গে গোল হয়ে ঘাড় নিচু করে বৃষ্টি আর বাতাস থেকে বাচছিলনকুর চিৎকারে বাঁচার সেই চেষ্টাটা তুচ্ছ হয়ে যায়। সবাই দাঁড়িয়ে পড়েছে আর কেমন আগোছালো ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। বাতাস এতক্ষণ এক রকম করে বইছিল, যেন জলের স্রোতের ঢালের মত, এরা যেন কোনোক্রমে সেই ঢালের নীচে মাথা বাঁচিয়ে বসে ছিল। আর, এখন ওরা দাঁড়াতেই বাতাস ওদের এতগুলো শরীরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল। তাতে বাতাসের আওয়াজ যেন হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে গেল। ঐ আওয়াজের মধ্যে ওরা খাবি খেতে লাগল।

এই দলের সবাই বাতাস ঠেলে নকু জগদীশ আর রাবণের দিকে এগতে চাইছিল। কিন্তু তার আগেই বাতাসের ঠেলায় ওরা এদের কাছে এসে পৌঁছে গেছে।

নকুই এই পুনর্গঠিত দলের ঠিক মাঝখানে পড়ে যায়, কহিল যে লাল সিগন্যাল দেয়্যা গেইল। সগায় রেডি থাকেন। ধাধছাড়, নদীর পারত যেইলা আছেন সায় ছাড়ি চলি যান, ছাড়ি চলি যান। যেইলা মানষিক এলায়ও যান নাই, স্যালার দায়ি সরকার না নিবেক। চরত যে মানষিলা আছেন স্যালায় এ্যানং এই রাতত ডাঙায় চলি যান, ডাঙায় চলি যান। পাহাড়ঠে বান নাবিবার শুরু করিছে, শিবক পাহাড়ের তলায় রেলের ব্রিজখান ভাঙি যাবার পারে-সেই তানে আসামের সব রেল ক্যানসেল, ক্যানসেল, ক্যানসেল নকুর দম ফুরিয়ে যায়। সে থামার পর তার কথার বাকি অংশ শেষ করে দিতেই যেন বাতাস হঠাৎ-গর্জনে মাটি থেকে আকাশে লাফ দিয়ে ওঠে। নকুর কথাটা যে এমন আচমকা শেষ হয়ে যাবে, সেটা কেউ বোঝে নি। তাই নকুর কথা শেষ হওয়ার পরও কেউ কোনো কথা বলতে পারে না। ঐ আকাশ জুড়ে বাতাস গর্জায়, গর্জে-গর্জে লাফায়।

নরেশ ব্রিজের দিকে মুখ করে বলে–সিগন্যাল আগেই আইসছে, ব্রিজের বাতি সারা রাত্রি জ্বালাইয়া রাইখচে

নিতাই বলে ওঠে, এই ব্রিজের তানে কিছু কইল?

নকু আবার পুরনো স্বরেই চিৎকার করে বলে, এই ব্রিজের তানে কিছু না কইসে, চরুয়া মানষি ডাঙায় যাও, ডাঙায় যাও, কায়ও নদীর কিনারাত থাকিবেন না, কায়ও থাকিবেন না

গজেন জিজ্ঞাসা করে, বান পাহাড়ত নামিবে কইসে, নাকি নামা ধরিসে, নকু? যেন নকু প্রাসঙ্গিক পাহাড় থেকে এইমাত্র নেমে এল, এরা তার কাছ থেকে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ জেনে নিচ্ছে। কথাটার জবাব নকু চট করে দিতে পারে না। সে বাতাসের গর্জনের মধ্যে এক নিজস্ব নীরবতায় মনে আনবার চেষ্টা করে, এই একটু আগে রেডিওতে যা শুনেছে তার যথাযথ ভাষা।

মনত খায়নামা ধরিসেই বলিছে। নামা ধরিসে, শিবক পাহাড়ের রেল ব্রিজ বন্ধ করি দিয়া হইসে, হয়, হয়, নামা ধরিসে বলিছে, নামা ধরিসে, নামা ধরিসে। নকু পুনরাবৃত্তিতে নিজের কথার সত্য নিজেই পরীক্ষা করে যায়।

রাবণ উঁচু থেকে নীচে জিজ্ঞাসা করে, রাতত কি আবার নিউজ দিবা ধরিবে?

না দিবে। কহি দিছে–এইখানই শেষ নিউজ, এর বাদে আর কুনো নিউজ নাই, আর কহিসে সাইরেন বাজি দেয়া হইসে–

সাইরেন? বাজি দেয়া হইসে? শুনো নাই রো? কায় শুনিছেন? গজেন বলে ওঠে।

জগদীশ ধমকে ওঠে, চুপ যা বলদের দল, বাতাস কী সাইরেন বাজায়, শুনিস নাই? তর বিয়ার বাদে সানাই বাজাবার ধইরবে, শালো, নিজের আওয়াজ নিজে শোনন যায় না, সাইরেন শুনব? করবা কী তাড়াতাড়ি কও, তাড়াতাড়ি কও, জগদীশ চুপ করে গিয়ে আবার হঠাৎ কথা বলে ওঠে, হে-ই নকু, নকু, নকু কই রে? জগদীশ ছানিকা চোখ এলোমেলো বোলায়।

কহেন না, এইঠে আছি।

তর জেঠি রেডিওটা খুইল্যা রাইখল ত? বন্ধ কইর‍্যা থোয় নাই ত?

কহেন কী? এ্যালায় জেঠি গান শুনিবার বইসবে নাকি?

চুপ যা শুয়ার। যদি আবার নিউজ দ্যায়।

জয়হিন্দ কয়্যা দিছে, আবার নিউজ দেবে?

জয়হিন্দ কয়্যা দিছে? তা হইলে, কী, হইব ডা কী, এই ন্যাতাই কেউ জবাব দেয় না।

জগদীশ আবার হাঁকড়ে ওঠে, এই ন্যাতাই, ন্যাতাই নাই এইখানে।

নিতাই ধমকে ওঠে, আরে, চুপ যান তো দেখি, শুধু চিল্লাবার ধরেন। এই নরেশ, বাজে কয়ডা রে দেখ ত?

নরেশের টর্চের আলোয় এতগুলো লোকের শরীরের ওপর সময় ঝলকে ওঠে

এগারোটা বাইশ।

হে-এ, এককেরে বাইশ, শাপলা আকাশবাণী শিলিগুড়ির টাইম দিবার ধরসে, গজেন বলে।

ত টাইম জিগাইলি, বেটাইম কব নাকি?

হে-ই, চুপ যা, চুপ যা–নিতাই এই ভিড়ের মাঝখানটাতে দাঁড়ায়। নিতাইয়ের চুলগুলো বাবরি। বাতাসে সব চুল তার মাথায় ওপরে উঠে আসে আর মাঝে-মধ্যেই ফণা তোলে। সেই চাপা আলোয় নিতাইয়ের মেদহীন শরীরের রেখাটা যেন খোদাই হয়ে যায়। এতক্ষণ এরা একসঙ্গে এখানে আছে–যেন দঙ্গলে ছিল সবাই। এতক্ষণ, এই বাতাস, এই বৃষ্টি, এই আলো তাদের ঢেকে রেখেছে। এখন কি স্পষ্ট হতে শুরু করল? নিতাই দুই হাত ওপরে তুলল, খাড়াও, এই তালই চিল্লাবেন না, শুনেন–

ভিড়টা একটু ঘন হয়।

নিতাই বলে; শুনেন, এখন বাজে রাত্তির সাড়ে এগার। ধরেন, তিস্তা বাজার থিক্যা এই খানত ফ্লাড আইসতে লাগে, কতক্ষণ, এই নরেইশ্যা, ছয় ঘণ্টা

হয়, ছয় ঘণ্টা

তয় ত ধর কেনে, সাড়ে এগার সাড়ে

এগার ত এ্যাহেন বাজে, নিউজ হয়্যা গিছে সেই পনে এগারটায়।

হয়, পনে এগারডায়।

পনে এগারডায়? নিতাই জিজ্ঞাসা করে।

হয়, পনে এগারডায়।

তা হউক গ্যা, তর পনে এগারডাই হইল, তার সঙ্গে ছয় ঘণ্টা যোগ দেকয়ডা হয়? পনে এগারডা আর ছয় ঘণ্টা?

এ ধর কেনে এগারডা, হিশাবের সুবিধা তানে, গজেন বলে।

শালো, তোর সুবিধার লাইগ্যা ফ্লাড লেট কইরা আইসবে–জগদীশ ধমকে ওঠে।

হেই তালই, আপনি কথা কহেন তয়, আমি চুপ যাই–, নিতাই ঠাণ্ডা গলায় জগদীশকে বলে।

ভুইল্যা গিছিলাম ন্যাতাই, তুই ক, তুই ক, এই শালো গজেনটা সব উল্টাপাল্টা কথা কয়-

– নিতাই আবার গলা তোলে, শুনেন, যে হিশাবই করেন, এইখানে ফ্লাড কাইল সকাল চাইড়ডার আগে আইসব না–

নিতাইয়ের এই হিশাবের একটা বড় তাৎপর্য আছে। সকাল চারটে মানে তারা আজ রাত্রির জন্যে নিরাপদ। এমন কি সকাল চারটোতও যদি চর ছেড়ে ডাঙায় চলে যাওয়ার দরকার হয়, তা হলে দিনের আলো ফুটে যাবে। নিতাই সকলের হয়ে মুখ ফুটে সময়টা বলেছে। এখন সবাই সময়টা খতিয়ে দেখছে। রাবণ কিছুক্ষণ পরে বলে ওঠে, কহিল যে আসামের রেলগাড়ি বন্ধ করি দিসে। স্যালায় ত ফ্লাড শিবক–তক আসি গেইসে

রাবণের কথার জবাবে নিতাই, বা অন্য কেউ, কিছু বলে না। তারা সবাই সঙ্গে সঙ্গে আর-একটা হিশাব করতে থাকে। ফ্লাডের ওয়ার্নিং দেয়ার উৎস–পাহাড়ের ভেতর, কালিম্পঙের পথে তিস্তারাজার বলে একটি জায়গা। সেখান থেকে জলের হিশেব পেলে, সেই অনুযায়ী আন্দাজ করা যায়–তিস্তাবাজার থেকে হলদিবাড়ির কাশিয়াবাড়ি পর্যন্ত তিস্তার বুকের ওপর দিয়ে প্রায় ষাট মাইল পথ আসতে জলের কতক্ষণ সময় লাগবে। শিবক ব্রিজ পর্যন্ত নদী নামে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে। তিস্তাবাজার থেকে শিবক পর্যন্ত যত তাড়াতাড়ি নামবে, শিবক থেকে জলপাইগুড়ি তার চাইতে বেশি সময় লাগে–এই জায়গাটাতে তিস্তা শুধু সমতল তা-ই নয়, তিস্তার সেই ভূখণ্ড শুরু–তার নানা খাত, নানা পথ।

নরেশ বলে, এ্যাহন ত তাও সৰ্গলে জাইগ্যা আছে, রাত আড়াই তিনডায় যদি চর ছাইড়্যার লাগে ত অন্ধেকের বেশি ভাইস্যা যাবে নে

.

আটষট্টির বন্যার স্মৃতি

নরেশ কথাটা যেন কাউকে শোনানোর জন্যে বলে না। কিন্তু এই বাতাসে তার স্বরে সেই নিভৃতি আর থাকে না, ভেঙে যায়। তার কথা শেষ হওয়ার পর তার কথার স্মৃতিতে সকলের মনে হতে থাকে, নরেশ যেন সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছে। তারপরও, তাদের ওরকম চুপ করে থেকেই সেই সাবধান বাণীর অর্থ বুঝে নিতে হয়। সেই অন্ধকার শেষ রাতে জল চরে উঠতে শুরু করেছে। জলের সেই চেহারা দেখেই যে যার মত মুহূর্তে ঠিক করে ফেলবে-তখনই সব কিছু ফেলে পারের দিকে যেতে হবে। কেউ কারো সঙ্গে কথা পর্যন্ত বলতে পারবে না–সবাই মিলে জলপাইগুড়ি শহরের পারের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কে পেছনে থাকল, কে পারল, কে পারল না, কে ভাসল, কে উঠল, সেসব হিশেব হবে পারে। ওঠার পর, খোঁজাখুঁজির পর, বাঁচার পর। একা-একা বাঁচার পর সবাই মিলে বাঁচা গেল কিনা সেই হিশাব হবে।

এখানে যারা আছে, তাদের প্রায় সবাই আটষট্টির বন্যায় তিস্তাকে দেখেছে। সবাই এখানেই ছিল, তা নয়। কিন্তু সকলেরই নিজের নিজের মত করে জানা আছে, কী করে বানভাসি মানুষের হিশেব বেরয়, কী ভাবে এক ধাক্কায় গোয়াল খালি হয়ে যায়, দিন পাঁচ-সাতের ভেতর ভরভরন্ত, ধানিজমি হাঁটুভর বালুয়ারি হয়ে যায় কী ভাবে। প্রত্যেকে একই পদ্ধতিতে হয়ত এই স্মৃতিচারণ করছিল না, কিন্তু সেই স্মৃতিই তাদের এই সব হিশেবনিকেশকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। আগামী চার থেকে ছ ঘণ্টার হিশেবের সঙ্গে মিলে ছিল, প্রায় পনের-ষোল বছর আগের অভিজ্ঞতা।

কিন্তু পনের-ষোল বছর আগের অভিজ্ঞতা এখন এদের মধ্যে কতটা সক্রিয় থাকতে পারে। নিতাই-এর বয়স এখন কত হবে? ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ! তা হলে পনের বছর আগে তাকে থাকতে হয় পনের-বিশ বছরে। কিন্তু তখনই ত নিতাইকে দেখাত পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের। তা হলে, এখন কি নিতাইয়ের বয়স চল্লিশ হয়ে গেল? বা চল্লিশ পেরিয়ে গেল? জগদীশের বয়স কত? পনের-ষোল বছর আগেও জগদীশকে ত এখনকার মতই পঁয়তাল্লিশ-পঞ্চাশ লাগত। জগদীশের কি এখনই ষাট হল, না, তখনই তিরিশ ছিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে তিস্তার ঐ চরে ঝঞ্জার ভেতরে বাতাসময় বৃষ্টিপাতে বিদ্ধ হতে হতে ঐ দঙ্গলবাধা মানুষগুলি এক অপরিবর্তিত ব্যক্তিগতে পৌঁছে গিয়েছিল। প্রত্যেকেই নিজের নিজের মত করে শেষ রাত্রির হিমেল জলের পাহাড়ভাঙা বন্যার ভেতর দিয়ে নিরাপত্তার খোঁজে সপরিবার ভাসছিল। সেই স্রোত হাতে কিছু রাখতে দেয় না। সেই স্রোতে শরীরের ভিতর থেকে শরীরটা বের করে আনে। সেই স্রোত শুধু অতলে টানে, শুধু অতলে। এখন সেই স্রোত রওনা হয়েছে ছ-ঘণ্টা দূরে, না চার-ঘণ্টা দূরে, কে জানে।

সেই মুহূর্তটিতে ওরা যেন এই নদীর ভেতরে চরের লোক আর থাকে না। নদীর ভিতরের এই চরে ওদের এমনই স্বাভাবিক বসবাস যে ওরা চরকে চর বলে মনে রাখে না, নদীকে নদী বলে চেনে না। ডাঙা দিয়ে হাঁটার মতই জল দিয়ে হেঁটে যায়। কিন্তু তখন ঐ বাতাসের মধ্যে ওরা ভয় পেয়ে যায়, নিজের নিজের মত করে গোপন, একান্ত ভয়, গভীর চাঁদনিতে কোনো অচেনা চরের বালুর ওপর দিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে আসার সময় যেমন ভয় হয় পাশে কেউ হাঁটছে। এই চরটা জলপাইগুড়ি শহরের কাছে, রায়পুর চা বাগানের পাশে, তিস্তার রোড-ব্রিজ আর রেলব্রিজর উত্তরে। বাঁ দিকে দোমোহনি। এখান থেকে তিস্তা-ব্রিজের আলো, দেখা যাচ্ছে শুধু নয়, এতক্ষণ দেখে দেখে মনে হচ্ছে তারাও ঐ আলোর অন্তর্গত। নিরাপত্তা এত কাছে। ইলেকট্রিক আলল, বাঁধ, পাকা বাড়ি, লোহার ব্রিজ, কংক্রিটের ব্রিজ–এই সমস্ত মিলে এক নিরাপত্তা, তাদের ডাইনোয়ে, তাদের সামনে, এমনই প্রত্যক্ষ যে ছ-ঘণ্টা বা চার-ঘণ্টা পরে মরেও যেতে পারে এমন বাঁচতে এখন ভয় হচ্ছে।

জল বাড়ছে গত বুধবার থেকেই। বৃষ্টি শুরু হয়েছিল মঙ্গলবার রাত থেকে। কিন্তু মঙ্গলবার রাতের জলে ত আর এ নদীর জল বাড়বে না। বরং এ নদীর জল বাড়তে শুরু করেছিল এখানে বৃষ্টি থেমে যাবার পর। তখন বাতাস উঠেছে। এই টানা বাতাস। একেবারে যেন নদীর ভেতর থেকে জল নিয়ে এই বাতাস উঠে আসছে আর নদীর আকাশ জুড়ে সেই জলকণা ছিটিয়ে দিচ্ছে। বাতাসবাহিত জলকণায় আকাশমাটি জুড়ে এই জলকুয়াশা স্থির হয়ে আছে। বাতাস থাকলে ত হিমকুয়াশা মুহূর্তে কেটে যায়। কিন্তু এ জলকুয়াশা বাতাসের সঙ্গে-সঙ্গে বাড়ে, যত বাতাস তত ঘন হয়। বাইরে থেকে বা ওপর থেকে দেখলে এই চরটাকে আর আলাদা করে বোঝা যেত না, মনে হত, নদী-আকাশ জোড়া এই জলবাত্যায় চরটাকে নদীর মধ্যে টেনে নিয়েছে।

কিন্তু এত সত্ত্বেও এরা জল দেখে বুঝেছিল বিপদ নেই।

বিপদের গন্ধ বাতাসে এল শুক্রবার, আজকের, সকাল থেকে, বা বেস্পতিবার, কাল শেষ রাত থেকে। সেও রেডিয়োর ফলে, আর, পারে গিয়ে নানা জন নানা খবর নিয়ে আসায়। পাহাড়ে তুমুল ধস নামছে, পাহাড় ভেঙে ঢল নামছে। বন্যা-ডিপার্টমেন্ট থেকে সিগন্যাল দেয়া শুরু হয়েছে।

এত সত্ত্বেও আজকের এই শুক্রবারের রাতটা, এখন, এই রাত প্রায় বারটায়, যে রকম বিপদসঙ্কুল হয়ে উঠল, তেমন না হতেও পারত। বাতাস কমে যেতে পারত। জল আর না বাড়তেও পারত। সেরকম একটা হিশেব ছিল বলেই আজ বিকেল পর্যন্ত সবাই দেখেছে। আর, দেখার পর আজ রাতে এরকম দল বেঁধে চর ঘুরতে বেরিয়েছে, নদীর জলের ধরন-ধারণ বুঝতে। তিস্তা ব্রিজের ওপর যদি রাত দশটাতেও আলো না দেখত, তা হলে হয়ত জলটল দেখে, সকাল নাগাদ আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে এ রকম একটি আন্দাজ নিয়ে, যে যার মত ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। তার পর, সেই রাত আড়াইটে-তিনটের সময় ঘুমের ভেতর বন্যা ঢুকে যেত, সেই আটষট্টির মত। কিন্তু এখন, এখান থেকে সেই পনের-ষোল বছর আগের সময়টাকে যেন সহজ ঠেকে। যেন, তখন সেবন্যা তাও সামলানো, গেছে, এখন সেরকম বন্যা আর সামলানো যাবে না। তিস্তা ব্রিজের আলো থেকে রেডিওর সংবাদে জানা সিগন্যাল পর্যন্ত সেই বন্যা এত বেশি পূর্বজ্ঞাত হয়ে গেল যে চার বা ছ-ঘণ্টা পর গভীর ঘুম থেকে মুহূর্তে সম্পূর্ণ জাগরণে জেগে প্রায় অনিবারণীয় মৃত্যুর ভেতর থেকে বেঁচে ওঠার জন্যে প্রয়োজনীয় তড়িৎস্পর্শ শরীরের ভেতরে আর খেলে না। বরং তার বদলে ভয় ছড়িয়ে যায় সারা শরীরে। জানা গেল, অথচ, সেই জানা থেকে কোনো উপায় হাতে এল না–এমনি এক নিরুপায়ের ভেতরে সেই মধ্যরাত্রিতে ঝড় জলের মধ্যে ওরা দাঁড়িয়ে থাকে। যেন, এই খবর, এই খবর জানার আনুষঙ্গিক ছিল–অন্তত এমন কিছু নৌকো, যা সারারাত ধরে এই চরের মানুষের সংসারকে ডাঙায় নিয়ে গিয়ে তুলতে পারে। কিন্তু এত বড় চরে ত এখন নৌকো বলতে দু-তিনটে ভাঙা ডিঙি আর একটা খেয়া নৌকো। এই খেয়াতেই সারা দিন প্রধান স্রোতটা পেরনো হয়। তার পরে হেঁটে, সাঁতরে পারে ওঠা যায়।

তিস্তা ব্রিজে আলো জ্বলছে। তার মানে তিস্তা ব্রিজ রক্ষার কাজ শুরু হয়ে গেছে। আটষট্টির বন্যার সময় বন্যার খবরই পাওয়া যায় নি। আর এখন বন্যার খবর আসার পর সিগন্যাল দেওয়া ত হয়েইছে, সাইরেনও বোধহয় বেজে গেছে, এমন কি তিস্তা ব্রিজের আশেপাশে যাতে ভাঙন না ধরে তার জন্যে হয়ত গাড়ি গাড়ি বোন্ডার নিয়ে সারি সারি ট্রাকও দাঁড়িয়ে গেছে।

কিন্তু এখন এই দলের ভেতরে আটষট্টির বানভাসা এতগুলো লোক আটষট্টি থেকে পনের-ষোল বছর পরে বন্যার নিশ্চয়তা সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞানটুকু নিয়ে একই উপায়হীনতায় অপেক্ষা করছে। আটষট্টিতে জ্ঞানই ছিল না, অপেক্ষাও ছিল না। তখন মনে হয়েছিল–আগে জানলে বাঁচা যেত। এখন, এত আগে জেনেও বাঁচার কোনো নিরাপত্তা, এরা, এই দলের এরা, নিজেদের ভেতর থেকে সংগ্রহ করতে পারে না।

.

হিন্দি সিনেমার জোকার

বানার খবরের হিশাব ত ঐ তিস্তাবাজার থিক্যাই দেয়, ঐখান থিক্যাই ত সিগন্যাল দ্যায়, এর মইধ্যে আবার শিবক আইসল কবে থিক্যা? নরেশ বলে, এটা না বুঝেই সে-ই একটু আগে এর উল্টো কথাটা বলেছে।

শুইনলি কইছে আসামের গাড়ি বন্ধ কইরা দিছে, তা রেলগাড়ি কি তিস্তাবাজার দিয়া যায় নাকি? নিতাই ঠাণ্ডা গলাতেই বলে।

শুইনছে উপর থিক্যা বন্যা নামবার ধরছে, তাই বন্ধ কইরা দিছে, সে আবার কোন বছর দেয় না, জগদীশ বলে।

ঐ কথাখান ত এডিওত ভাল করি শনিবার নাগত, এলের ব্রিজত গাড়ি বন্ধ হইয়া গিছে নাকি আগতই বন্ধ করিছে রাবণ বলে।

এ্যাহন ত কথা ঝাড়ত্যাছ পুরুতের নাগান, তখন রেডিও শুইনতে গেলেই পারত্যা, রাবণের কথায় জগদীশ ঝাঁঝিয়ে উঠে রাবণের দিকে না তাকিয়েই জবাব দেয়। তাতে মনে হয় সে বোধহয় নরেশকেই বলে।

কহসেন কী আগরবাগর, বেলা আড়াইটার গাড়ি ত এই ব্রিজ দিয়া পার হইসে, গজেনের হঠাৎ মনে পড়ে যায় আর সে সবাইকে তাড়াতাড়ি মনে করিয়ে দেয়।

হ্যাঁ, কথাটা সকলের মনে পড়ে। মনে পড়ে, গোপনে, একান্তে। এটা এমন মনে পড়া নয় যা নিয়ে লাফালাফি ঝাপাঝাপি করতে হবে। গজেন ওটা খুব ভাল কাজ করেছে যে তার মনে পড়েছে, সে মনে পড়িয়ে দিয়েছে। এখন তারা এই ট্রেনের হিশেব থেকে পেছিয়ে-পেছিয়ে হিশেব কষতে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই এই শেষ সিগন্যালের পরে শিবকের রেলব্রিজ দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তার মানে কাল থেকে আর ট্রেন চলবে না। তার মানে, তাহলে সিগন্যালটা তিস্তাবাজার থেকেই এসেছে। এখানে সেই জল আসতে আসতে সেই সকাল হয়ে যাবে। তা হলে আজ রাত্রিতে আর চর ছেড়ে না গেলেও চলে।

নিতাই বলে, ট্রেন না হয় গিছে, কিন্তু সিগন্যাল দিল কুখন। স্থানীয় সংবাদ কেউ শুইনছে?

আমি ত শুনছি, বাজার দর শুনছি, না, তহন ত কিছু কয় নাই, না কয় নাই, জগদীশ তাড়াতাড়ি বলে। একটু চুপ করে থেকে নিতাই বলে, তালই, ভাল করি ভাইব্যা দ্যাখেন কয় নাই ত–

জগদীশ একটু চুপ করে থাকে। তার পক্ষে সেই সন্ধ্যার কথার স্মৃতি এই মধ্য রাতে খুঁচিয়ে তোলা খুব সহজ নয়। কিন্তু তবু সে একবার মনে করতে চেষ্টা করে যে কোন অবস্থায়, কী ভাবে সে খবরটা শুনছিল। বাজার দর শোনার সময় ত হাতের কাজ ফেলে কান খাড়া করল। কিন্তু দিন তিনেক ধরে এই বাতাসে আর জলের মধ্যে থেকেও কি জগদীশ বন্যার খবরটা শোনার জন্যে কান খাড়া করে থাকে নি? হঠাৎ মনে পড়ে যায় জগদীশের–না, কয় নাই, তোর কাকি জিগ্যাইল চিক্কর দিয়্যা, কী বানাটানার কাথা কিছু কইসে, আমি কইল্যাম, চিকুর দিয়্যা, না কয় নাই, কয় নাই, না, কয় মাই

তয় এতক্ষণ কী নিদ্রা গিছিলেন? নিতাই খেঁকিয়ে ওঠে, ধরো রাইত আটটার মইধ্যো সিগন্যাল দ্যায় নাই, সিগন্যাল দিছে তার বাদে, দশটাও যদি ধরো, রাত্তির চাইরড়ার আগে জল আইসবে না, আর ধরো, যদি একঘণ্টা আগেও ধরো, তা হলিও ত রাইত তিনড়ার আগে আইসবে না।

তা তিনটাত আসিলে করিবেনটা কী! স্যালায় যা আন্ধার হইবে, চান্দ ডুবি যাবে, রাবণ বলে।

আকাশের দিকে না তাকিয়ে তারা সেই ছায়াহীন মরা আলোতে চাঁদের হিবেশনিকেশ বুঝে নেয়। এখন শুক্লপক্ষ চলছে। চাঁদের আলো ঐ জলকুয়াশা ভেদ করে মাটিতে এসে পৌঁছচ্ছে না। তার ওপর আছে আকাশের মেঘ। আকাশের দিকে তাকিয়ে চাঁদটা কোথায়, তার হদিশও করা যায় না। শুধু চারদিকের এই আবছাভাবে বোঝা যায় কোথাও থেকে একটা আলো আসছে, নিশ্চিতই আসছে। রাত তিনটের সময় এই আলো থাকবে না। কিন্তু তখন যদি সকলে মিলে জিনিশপত্তর নিয়ে পারের দিকে যেতে হয়, তা হলে? চারটের সময়, চারটে কেন, পৌনে চারটের সময়ই এই সমস্যা আর থাকবে না। কিন্তু ফ্লাডের ঐ জল ত এক-ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট দেরি করে আসবে না। তাহলে?

ঘুরে-ফিরে তারা আবার সেই একই সমস্যার সামনে এসে পড়ে। ট্রেন এই ব্রিজের ওপর দিয়ে শেষ কখন গেছে তা গজেনের মনে পড়া সত্ত্বেও বন্যা আসার সময় নির্ণয় করা যাচ্ছে না।

গজেন হঠাৎ বলে, হরে নিতাই, ফ্লাড চারিটায় আসিলে কি তোর হাতত পাখনা গজাবে, পাখির নাখান উড়ি যাবি, পারত?

কী হইছে ক না, শালা পালা গাবার ধরছে, নিতাই ধমকে ওঠে।

না, কহিবার ধইরছি কি, সকালেও ত যাবার নাগিবে, পারত, স্যাল্যায় ক্যানং যাবি?

সাঁতরি যাবে, দিনের আলোয় আবার কী, সব ত দেইখব্যার পাব।

হে-ই ধর সুখরঞ্জনের মাও, কানকাটুর মাও, আর তালইয়ের শাশুড়ি–সগায় সাঁতরি যাবার পারিবে? না, উমরাত বিসর্জন দিয়া যাম–, গজেন বেশ প্যাচানো যুক্তি পায়।

দে, দে, বিসর্জন দিয়া দে; ঐ বুড়িক নিব্যার জইন্যেই ফ্লাড আসিবার দে, এ্যাহন ঘাও দিয়্যা এ্যামন গন্ধ ছাড়ে যে ঘরে থাকন যায় না, জগদীশ বারুই হাত তুলে বলে। তার শাশুড়ি অসুখ নিয়ে এখানে মৃত্যু শয্যায়।

তা কইব্যার চাস কী, কয়্যা দে না, নিতাই ধমকে উঠেও যেন গজেনকে মিনতি করে। সমস্যার সমাধানটা এখনই দরকার।

এক কাম ধরো কেনে, সিগন্যাল য্যালায় দিবার ধইচছে, ফ্লাডের জল নামিবার ধইচছে, কী, কও, ধইচ্ছে কি ধরে নাই, গজেন প্রশ্নোত্তরে নিজের কথা গুছিয়ে নিতে চায়।

হয়, ধইচছে, ধইচছে, কেউ একজন সায় দেয়, নিম্ন স্বরেই, যেন জানাই আছে, এটুকু সায়েই গজেন কথাগুলো বলে যেতে পারবে। জগদীশ মাথা ঝাঁকায় সম্মতি জানিয়ে, এমনকি যেন গজেনের পরের কথাটাতেও সে আগাম সম্মতি জানাচ্ছে।

সেই তোমার রাইত তিন ঘড়িত আসুক আর ধরো কেনে কালি সকালত আসুক?

গজেন আবার প্রশ্ন করে।

হয়, আসুক, সেই প্রায় শোনা যায় না গলায় আবার ধুয়ো ওঠে। জগদীশ মাথা নাড়ে।

পাহাড়ঠে যে ফ্লাড নামিবার ধইচছে, স্যালায় ত আর হারি যাবার না পারে?

না পারে

এইঠেই নামিবার নাগিবে, এই ঠেই, এই তোমার চরত আসি ধাক্কা মারিবেই।

মারিবেই

স্যালায় হামাক এসকু (রেসকিউ) হবা নাগিবে?

নাগিবে

ও এসকু হবার তানে কী নাগিবে? নৌকা নাগিবে।

নাগিবে

নৌকা ত নাই রো—

নাই রো।

এক আছে রংধামালির হাটের ভাঙা নৌকাখান–সেইটা কুনো কাজে লাগিবার না হয়।

না হয়

হামরালা যেইলা এসকু হয়্যা যাম তার পাছত মিলিটারির নৌকা নামিবে।

নামিবে

এ্যালায় এসখু আছে, নৌকা নাই।

নাই

স্যালায় নৌকা আছে, এসকু নাই।

নাই

নিতাই দু হাতে তার পাশের লোকজনকে একটু সরিয়ে দিয়ে নিজে দুই পা পেছিয়ে যায়। তারপর গজেনের পেছনে এমন জোরে লাথি কষায় যে গজেন উল্টো দিকে রাবণের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়তে যায়। রাবণ সরে যেতেই সে ভেজা বালির মধ্যে গিয়ে পড়ে। নিতাই তার দিকে আবার ধেয়ে যায়, শালা, হিন্দি সিনেমা দেইখ্যা দেইখ্যা জোকার করা শিখছে; তর কথা কওয়ার নাম নাই; এইডা হয়, না হয়, এইডা না হয়, হয়। কিন্তু নিতাই ধেয়েই যায়, আর মারে না। ততক্ষণে গজেন সোজা হয়ে গেছে, উঠে দাঁড়াতে পারে নি। এক হাতের কনুইয়ে মাটির ওপর ভর রেখে আর-এক হাত তুলে, গজেন বলে, ছাড়ি দে, ছাড়ি দে, কহিছু, কহিছু এ্যালায় ভেলা বানাবার ধরি চল দুই চারিখান।

গজেনের কথায় নিতাই সোজা হয়ে জিজ্ঞাসা করে, আর?

গজেন এবার উঠে বসার সুযোগ পায়, আর কহিছু দুই-চারখান পাট প্যাচি মশাল বানি রাখ কেনে, যদি কামত নাগে।

সমস্যার এমন সহজ সমাধানে নিতাই চিৎকার করে ওঠে, ত, উঠ কেনে।

.

বালিয়াড়ির মাথায় কে?

এতক্ষণ এত আলাপ আলোচনা যেন হয়ই নি এমনভাবে নিতাই রওনা দেয়, যেন বহু আগে থেকেই ঠিক করা আছে যে আজ রাত্রিতে ভেলা বানানো হবে। নিতাই দু-এক পা হাঁটতেই বাকি সবাই তার পিছন পিছন-পিছন চলতে শুরু করে।

সবাই মিলে কথাবার্তা যতক্ষণ চলছিল, ততক্ষণ যেন বাতাসটা আড়ালে-আবডালে ছিল। বা, এরা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে বাতাসটাকে এক রকম রুখে রেখেছিল, নিজেদের ভেতর কথাবার্তা সারার জন্যে। কথাবার্তার সময় তারা নিজেদের মাথা এত নাবিয়ে আনে, ঝুঁকিয়ে আনে, যে মাথার ওপর আকাশটাও যেন আকাশের মত ওপরে উঠে যেতে পারে। প্রলয়ের ভেতর আত্মরক্ষার চেষ্টায় যে এক ধরনের বিচ্ছিন্ন প্রকার নিজের চারপাশে তৈরি করে নেয়া যায়, সেই রকম অস্থায়ী প্রাকার নিজেরাই ভেঙে ফেলে এরা হাঁটতে শুরু করলে তিস্তা থেকে আকাশ জোড়া জলকুয়াশা আর বাতাস মুহূর্তের মধ্যে এদের ঘিরে ধরে, এদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দু-চার পা যেতেই মনে হয় যেন এরা এতক্ষণ অন্য ভূমণ্ডলে ছিল, এখন এইমাত্র এখানে পা ফেলেছে। আকাশ একেবারে মাথার ওপর নেমে আসে। দুই হাতে সেই আকাশ সরিয়ে সরিয়ে ওদের পথ করে নিতে হয়। কিন্তু বাতাসের ধাক্কায় আবার পেছিয়ে আসতে হয়, বা দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। বাতাস যেন এতক্ষণে এতগুলো মানবশরীর পেয়ে এই শরীরগুলোর ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এই শরীরগুলোর প্রত্যেকটিকে ঘিরে যেন আলাদা-আলাদা ঘূর্ণি, চলমান। এদের চলার সঙ্গে সঙ্গে ঘূর্ণিগুলিও চলছে। এই শরীরগুলোকে বাদ দিয়ে বাতাসের আর কোনো অবলম্বন নেই যেন এখানে।

সত্যি করে নেইও। মাইল চারেক লম্বা আর মাইল তিন চওড়া এই চরের এই দক্ষিণ সীমা ঢালু হয়ে নদীতে মিশেছে। এই জায়গাটা বালুবাড়ি মাঝখানের উঁচু ডাঙা থেকে গড়িয়ে-গড়িয়ে জলে নেমেছে। এমন হতে পারে যে এখান দিয়েই চরটা প্রথম নদীর ভেতর থেকে সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উঠে এসেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছিল নদীর ভেতরের বালি, পাথর। তারপর, এখানে বসতি হল, চাষ হল কিন্তু এর বালি আর ঘোচে নি।

ওরা এখানে এসেছিল পশ্চিম পারের রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে। এখন ওদের ফিরতে হচ্ছে পুবদিক বরাবর হেঁটে। ফিরতে হচ্ছে, প্রথমত, বাতাসের বাধা সঙ্গে নিয়ে। দ্বিতীয়ত, পায়ের তলায় ভেজা বালিতে পা গেড়ে যাচ্ছে ও তোলার সময় পিছলেও যাচ্ছে। তৃতীয়ত, এই জায়গাটা একটু চড়াই–সেই চড়াইটাই ওদের ঠেলতে হচ্ছে।

নিতাই হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে, নরেশুয়া আর নকু তোরা টর্চ হাতে এইঠে থাকি যা। কিছু দেইখলে দৌড় পাড়া খবর দিবি।

এইঠে দৌড়াবে ক্যানং করি গজেন চিৎকার করে হাসে, জল..দিয়া যাস কেনে, সাঁতরিয়া।

নরেশ আর নকু পেছনে দাঁড়িয়ে যায়, তারপরে ফিরতে শুরু করে।

একটু দূর থেকে বা ওপর থেকে যদি এই কজনকে দেখা যেত তা হলে তেমন দৃশ্যঅভিজ্ঞ কারো মনে হতে পারত, বালিরই কতকগুলি স্তম্ভ বাতাসের টানে এগিয়ে চলেছে। জলকুয়াশার অস্পষ্টতা আর বালির অস্পষ্টতা মিলে একাকার হয়ে গিয়েছে এমন, সমস্ত দৃশ্যটাকেই একটা মাত্র দৃশ্য মনে হয়। কিন্তু পায়ে-পায়ে সেই দৃশ্যের বৈচিত্র্য টের পাওয়া যাচ্ছিল, বাতাসের ধাক্কায় অন্ধের মত পথ চলতে চলতেও।

কারণ, বৃষ্টিতে সমস্ত বালি ভিজে যাওয়ার আগেই বাতাসে বাতাসে এই বালির ভূগোল পরিবর্তমান থেকেছে। জলের তল থেকে শুশুকের মত উঠে আসা কোনো বাতাসে নীচের থেকে বালি আকাশে উঠে ঝুরঝুর করে জমা হয়ে গেছে একটু ওপরে বা আকাশের ভেতর থেকে চিলের মত নেমে আসা কোনো বাতাসে ওপরের কোনো স্কুপের মাথা ঝুরঝুর করে ভেঙে ছড়িয়ে গেছে। চারদিকে বালির ডাঙার মাঝখানে একটুখানি কালো জল টলটল করত-বাচ্চারা সাঁতার কাটতে পারে এ রকমই জল-এই ক-দিনের বাতাসে সে পুকুর ভরে গেছে, আর ফলে, জায়গাটিই হয়ে গেছে ফুটবল মাঠের মতন সমান। এই পরিবর্তনের পর বৃষ্টি নেমে তাকে পরবর্তী কয়েক দিনের রো পর্যন্ত একটা স্থায়িত্ব দেয়।

ফলে, এরা যেন এদের পায়ের পক্ষে অপরিচিত এক ভূখণ্ড দিয়ে হাঁটছিল। সাধারণভাবে, ত এদের প্রায় চোখ বুজে চলে যাওয়া উচিত, এই চরের প্রতিটি অংশ পায়ের তলায় তলায় এমনই চেনা। কিন্তু গত মাত্র দু-তিন দিনে একেবারে পারের এই বালুবাড়ি এমন অচেনা হয়ে গেছে যে যদি বাতাস না থাকত, যদি আলো এমন ছায়াহীন ধূসর না হত, তা হলেও ওদের পক্ষে সোজা হেঁটে যাওয়া সম্ভর হত না।

কে, বোঝা যায় না, কিন্তু, একজন ওদের চাইতে একটু বেশি লম্বা হয়ে যায়। পেছনের সবাই দেখতে পায় সে ধীরে ধীরে উঁচুতে উঠছে। আর, একটু উঁচুতে উঠেছে বলেই হয়ত বাতাস থেকে মুখটা একটু সরাতে পেরেছে। বালিয়াড়ির চড়াই ওভাবে ভাঙায় নীচ থেকে মনে হচ্ছে যেন পুরো বালিয়াড়িটাই যেন হাঁটছে। ধূসরতায় বালি আর মানুষ একে হয়ে গেছে। শুধু মানুষের মাথার চুল, তার পদক্ষেপের ভঙ্গি, তার শরীরের বিন্যাস বুঝিয়ে দেয় ওখানে একটা শারীরিক আলোড়ন আছে, বাধার সামনে মানুষের শরীরের আলোড়ন।

ঐ বালিয়াড়িতে যে উঠেছিল, সে টের না পেয়ে উঠেছে। সব জায়গাতেই ত বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে, সব জায়গাতেই ত পা ডুবে যাচ্ছে। সামনের পায়ের ওপর ভর দিয়ে পেছনের পা তুলতে গেলে, সামনের পা ডুবে যাচ্ছে। পায়ের বাটিতে টান লাগছে। দুই পায়ের সমতা ঠিক রাখতে না পেরে টলে যেতে হচ্ছে। আর টলে যাওয়ার ফলে দিক বদলে যাচ্ছে। এরকমভাবে এই আচ্ছন্নতার ভিতর পথ চলতে গেলে কারো কী আর পায়ে-পায়ে টের পাওয়ার কথা যে সে চড়াইয়ে উঠছে, তাও আবার বালিয়াড়ির চড়াইয়ের মত পিচ্ছিল চড়াইয়ে? সে টের পায় না। তাকে ঐ পুরো চড়াইটা ভাঙতেই হয়। কিন্তু, নীচে যারা ছিল তারা ত চলমান ঐ বালিয়াড়ি দেখে বুঝতে পারে কেউ একজন বালিয়াড়ি ভাঙছে, ওখানে বালিয়াড়ি আছে। সুতরাং তারা বায়ে ঘুরে যেতে চেষ্টা করে–যতটা বায়ে ঘোরা সম্ভব, যতটা চেষ্টা করা সম্ভব। বায়ে ঘুরতে গিয়ে আর-একটা চড়াই ওরা ডিঙবে কী না সে বিষয়েও নিশ্চয়তা। নেই। কিন্তু সামনে একজন বালিয়াড়ির মাঝখান থেকে যখন জানান দেয় যে ওখানে বালিয়াড়ির চড়াই, তখন আর-সবাইকে একটু ডাইনে বায়ে সরে যেতেই হয়–বালিয়াড়ি না ডিঙিয়ে শুধু বালিয়াড়িটাকে ঘের দিয়ে ঘুরলেই ওপারে যাওয়া যাবে। ডানদিকে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না–বাতাস ওদিক থেকেই আসছে। বরং বাঁয়ে ঘুরে গেলে ঐ বালিয়াড়িতেই বাতাস থেকে একটু বাঁচা যাবে। একটু হলেও সে ত। সঁচাই।

যে চরটাকে নিজেরা হাসিল করে আবাদের জায়গা বানিয়েছে, বসবাসের জায়গা বানিয়েছে, সেই জায়গাটা দিয়ে এমন অন্ধের মত হাঁটায় একটা পরাজয় আছে। সেই পরাজয় মানতে-মানতে ওদের হাঁটতে হয়। বাতাসের ধাক্কায় নিজেদের চলার গতির আন্দাজ মেলে না–কতক্ষণে কতটা পৌঁছানো। যায়, বোঝা যায় না। বালির পেছুটানে নিজেদের হাঁটার গতির আন্দাজ মেলে না–কতটা হাঁটলে কতটা পৌঁছানো যায় টের পাওয়া যায় না। জলকুয়াশা-দৃষ্টির গতির আন্দাজ মেলে না–কতটা এল আর কতটা যেতে হবে হিশেব পাওয়া যায় না।

যারা নীচে ছিল তাদের ভিতর একজন চিৎকার করে, সগায় মিলি ফিরিবার ধইচছি, এ্যালায় ঐটা কুনটা আকাশত উঠিবার ধরিছেন হে?

স্বরে চেনা যায়, কথাটা রাবণের। কোনো জিজ্ঞাস নেই–কেবল মন্তব্য, একজন আকাশে উঠে যাচ্ছে।

আকাশখান এইঠে বালিত মিশি আছে, কায় জানে? কথাটা নিতাইয়ের, বালিয়াড়ির মাথা থেকে।

ঐঠেও কি বানা আছে হে? রাবণ রসিকতা করে।

বালিয়াড়ির মাথায় নিতাইয়েরও হাসি শোনা যায়–এইহানে ব্রিজের নাগাল লাইট জ্বলিছেন।

দেইখ্যা লাভটা কী হবে হে? এতক্ষণ ত গাড়ি-গাড়ি আলো দেইখলেন না? গজেন বলে। মনে হয়, নিতাই আরো এক ধাপ উঠেছে। এখন যদি বালিয়াড়ি ভেঙে ওখান থেকে পড়ে যায়, নিতাইকে তাহলে আর পুরোটা ঠেলতে হয় না।

রাবণ বালিয়াড়ির ভিত দিয়ে একটু ঘুরতে পারে।

সেখান থেকে মাথা উঁচু করে বলে, ঐ আলো দেখি ত জানলু বানা আসিবার ধইচছে, নয় ত নিন্দির মাঝত বানভাসি হবার ধইরত রাবণ বোধহয় বালিয়াড়ির একটু আড়াল পায়, তার কথাগুলো স্পষ্ট শোনা যায়।

তা ঠিক, ঠিক, ঠিক কথা, জগদীশ বারুইয়ের ছানিচোখের অবলম্বনহীনতা তার স্বরে শোনা যায়। কিন্তু বোঝা যায় না, আরো যে কজন বালিয়াড়ির ভিত ধরে এগচ্ছে তার ভেতর কোনটা জগদীশ।

সগায় ত জানে হামরালা এইঠে আছি, নৌকা আসতি পারে, গজেন বলে।

কেউ জবাব দেয় না বলে সে আরো যোগ করে, মিলিটারি নামিবার পারে, নৌকা আসিবার পারে, রিসকু করিবার তানে।

রিসকু আসিলে কি ফিরি যাবে না ডাকি-ডাকি তুলিবার ধইরেব? রাবণ বলে।

ক্যানং করি মিলিটারি মানষি বুঝিবার পারে এ্যানং বালুবাড়ি আর ধান্ধিনা পাথারের পাছত একখান চর আছে।

.

মিলিটারির নৌকা ত ভটভটি নৌকা, শুইন্যা ঘর থিক্যা আসা যায়, নিতাই বলে।

ভটভটি নৌকা চলব্যার পারে না, কাদা টুইক্যা যায়, জগদীশ হে হে করে আনন্দ জানায় হঠাৎ, যেন, এই জলে মোটরবোট না-চলায় তার কোনো আনন্দের ব্যাপার আছে। নিতাই বালিয়াড়ির মাথার ভেতরে হঠাৎ ডুবে যায়। তাকে আর দেখা যায় না। তারপর সম্পূর্ণ নৈঃশব্দ্যে সেই বালিয়াড়ির মাথা থেকে বালির ভেতর ডুবে তল দিয়ে বেরিয়ে আসে। নিতাই যখন দাঁড়ায় তখন তার ভেজা শরীরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভেজা বালি সেঁটে যায়।

শালা, নিতাই উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত ঘষে রালি ঝাড়ে, তারপর দু চোখের পাতা থেকে বালি ঝরিয়ে দেয়।

বালিয়াড়ি ঘিরে সামনে দুজন এসে গেছে। নিতাই বলে, শালা, সিধ্যা হাঁটতে হাঁটতে উঠছি বালুবাড়ির মাথায়।

নিতাই আবার হাঁটতে শুরু করে।

.

বানা, জাগরণ ও ঘুম

হেই, দেখ কেনে, জগদীশ আবার তিস্তার ভিতরত সিন্ধি না যায়, রাবণ এগিয়ে যেতে-যেতে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে।

তুই চল না, শালো, পাহাড়ের নাগাল কুয়াশা নাড়ি-নাড়ি চইলব্যার লাগছে, রাবণের ঠিক পেছনেই জগদীশ ছিল, এটা রাবণ বুঝতে পারে নি।

বালিয়াড়িটা পার হতেই এদের একটা লাইন হয়ে যায়। পায়ে আলের মাটি পাওয়া মাত্র পায়ের আঙুলগুলো মাটি আঁকড়ে ধরতে পারে, চেনা মাটি আঁকড়ে ধরতে পারে যেমন অভ্যস্ত আঙুল। এই সব আলে ওদের পায়ের চিহ্নগুলো থেকে গেছে। নিজেদের সেই প্রাচীন পদচিহ্নের ওপর ওরা পা ফেলে, আন্দাজে কুয়াশায়। এই কুয়াশায় পায়ের মাটি স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু পা দিয়ে মাটি অনুভব করা যায়। চরের উঁচু ডাঙা শুরু হয়ে গেছে। এখন সামনে ধানি জমি। তাতে অশ্বিনী রায় ভাদই পাকাচ্ছে বিঘা পাঁচ জমিতে। এবারের ফলন খুব ভাল ছিল। আজ শেষ রাত্রে পাকা ধান জলে ভাসবে।

অশ্বিনী রায়ের খেতের আগেই সরু-সরু ফালিতে সিঁড়ির মত উঠে গেছে নতুন চাষের ধান। এখন ধান গাছগুলো তলার জমি থেকে আল পর্যন্ত ওঠে নি। বাতাসে গত তিন দিন ধরে জলের মত উথালপাতাল খাচ্ছে। আর জলকুয়াশার ভারে নেতিয়ে প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে আছে। এই বাতাস আর বৃষ্টি দুটোই এই ধানের পক্ষে ভাল। যদি এরকমই চলে আরও দু-একদিন তাও মন্দ না। তারপর এক বেলা রোদ পেলেই মাটিতে শোয়া ধানখেত চাঙা হয়ে আকাশে, নীল আকাশের তলায় মাথা তুলবে অন্তত বিঘৎখানেকের কাছাকাছি লম্বা হয়ে। ধানখেতের এই লম্বা হওয়াটা বোঝা যায়, এরকম টানা বাতাসজলের পর ত আরও বোঝা যায়। বাচ্চারা যেমন হাত-পা ছাড় দিলে কেমন লম্বা আর রোগা হয়ে যায়, ধানখেতটাকেও সেরকম লাগে। এরপর যখন টানে নুয়ে যাবে তখন মোটা লাগবে। কিন্তু এই ধানখেতগুলো আর লম্বাও হবে না, মোটাও হবে না। আজ শেষ রাতে কাঁচা খেত ভাসবে।

এদিক থেকে প্রথম পড়বে–দুই নম্বর মিস্ত্রিপাড়া। এখান থেকেই চরের বসতি শুরু। মাঝখান দিয়ে রাস্তা আর দুই পাশে খেত। সেই বসতের পেছনে আবাদ। মনে-মনে ভাবলে পাহাড়ের মত লাগে। নীচের ধাপে বালুবাড়ি, পরের ধাপে খেত, মাথার ধাপে বসত। কিন্তু তাই যদি হত, পাহাড়ের মত উঁচুই যদি হত তাহলে ত নিজেদের বাড়িতে বসে বসে পাকা ধান, কাঁচা খেত সব জায়গায় জলঢোকা, বানভাসা দেখতে পারত। কিন্তু তিস্তার বন্যার কাছে এ উঁচুনিচুটা কোনো ব্যাপার নয়।

মিস্ত্রিপাড়ায় ঢুকে কিছুটা এগলেই কুয়াশা হালকা। দুই দিকে বাড়িঘর থাকায় বাতাস আর কুয়াশা ভেতরে ঢুকতে পারে না। কিন্তু বাড়ি ঘরের ওপরে ত জলকুয়াশা লেগেই আছে। আকাশের আলোত আর সে-সব ভেদ করে নীচে নামতে পারে না। তবু, মিস্ত্রিপাড়ার ভেতরে খানিকটা এগিয়ে ঐ মধ্যরাত্রিতে ওরা যেন পরস্পরকে দেখতে পায়, প্রায় ভোরের আলোতেই। নিতাই দাঁড়ায়। নিতাইয়ের মালকোচামারা কাপড় তার ঊরুতে সেঁটে আছে, তার শরীরের জল আর বালি কেমন চমকায়। নিতাই তার বাবরি চুলের গোছা সামনে আনে, তারপর এক ঝটকায় পেছনে ঠেলে দেয়। চুলের বালি আর জল ঝেড়ে ফেলে। রাবণ দাঁড়ায়। রাবণ সবচেয়ে বয়স্ক, সবচেয়ে লম্বা। তার মাথায় চুল নেই, একেবারে গোড়া হাঁটা। তাকে ঐ আবছায়ায় গাছের মত লাগে। তার লম্বা শরীরের অতটা দৈর্ঘ্য, জুড়ে জলবিন্দু চমকে ওঠে–তার পরনে শুধু একটা নেংটি। পা থেকে মাথা পর্যন্ত রাবণকে মনে হয় ঐ জলে প্রতিবিম্বিত আলো দিয়েই আবছায়া তৈরি সে তার দুই চওড়া হাতে, মুখের, গায়ের ও হাতের প্রতিবিম্ব মুছে ফেলে।

জগদীশ সবচেয়ে খাটো যে সেটা বোঝা যায় রাবণের পরে সে আর গজেন পর পর দাঁড়িয়ে গেলে। তার ধুতি, কোমরে খুঁট দিয়ে পরা, আবার খানিকটা গোটানো। তার ওপর কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত অংশটা থাকে-থাকে বসানো। বড় মাথা ছোট ঘাড়ের ওপর যেন আলগা করে রাখা আর সেই মাথার জায়গা করে দিতেই ঘাড় দুটো দু পাশে উঁচু হয়ে আছে, যেন হালবওয়ার মত উঁচু। জলবিন্দু সেই সব। উঁচুনিচু জায়গা, চওড়া বুক, বুকের খাজ, ছোট মেদহীন পেট ভরে রেখেছে। জগদীশের শরীরের সবটা এই অস্পষ্টতায় দেখা যায় না কিন্তু জলে আলোর আবছায়া প্রতিফলনেও বোঝা যায়, তার শরীরের দৈর্ঘ্যের অভাব, প্রস্থে সামলানো হয়েছে-পেশিবহুল প্রস্থে। জগদীশ খুট থেকে অনেকখানি কাপড় বের করে, ভেতরে গোঁজা ছিল। সেই শুকনো কাপড়ে সে মাথা, ঘাড়, মুখ মোছে, দুই হাতে। তার মুখ দিয়ে একটু তৃপ্তিরও আওয়াজ হয়, যেন, এইমাত্র স্নান সেরে উঠল।

গজেন দাঁড়িয়ে পড়ে এক পায়ের ওপর ভর দিয়ে, যেন ঐ ছোটখাট পাতলা শরীরের ওজন একটি পায়ের পক্ষেও যথেষ্ট নয়। সে এমন ভাবে দাঁড়ায় যেন এতটা রাস্তা বাতাস ঠেলে, বালি ঠেলে, আসে নি, যেন এই রাস্তাটুকু আসতে তার সারা শরীরের পেশিগুলো যদিও দলিত হয়েছে–সে আরো এমন অনেকখানি রাস্তা যেতে পারে। গজেনের মাথা থেকে পা খালি, শুধু মাঝখানে একটুখানি নেংটি। সে তার শরীরের কোনো জলকণা মোছে না, যেন ওগুলো জলকণা নয়, তার শরীরের ভেতর থেকে বেরিয়েছে। সেই জলকণার আবছায়া প্রতিফলনে গজেন নিজের শরীরকে নিজের শরীরে খোদাই করে দাঁড়িয়েছিল–তার কিশোরের মত শরীরকে খোদাই করে।

হগলরে আইসতে কবা, না, চিল্ল্যায়্যা কয়া দিবা? নিতাই জিজ্ঞাসা করে।

গজেন হেসে ওঠে, নিতাইচন্দ্র সরকার এ্যালায় ভাষণ দিবার ধইরবেন। আপনারা দলে দলে যোগদান দ্যান।

গজেন একটু জোরেই কথা বলে ওঠে। পাশের বাড়ির ভেতর থেকে নিদ্রা ও শ্লেম্মাজড়িত গলা শোনা যায়, কে রে? কে?

জগদীশ চিৎকার করে বলে, শালো, উইঠ্যা দ্যাখ তোর বাপ আইসছে, মানষির আওয়াজ পায়্যাও উঠার নাম নাই। বাড়িটা রমণী সরকারের।

রাস্তার ওপর থেকে আওয়াজে বোঝা যায়, ভেতরে রমণী সরকার উঠছে।

রাবণ বলে, হ্যালায় কি হামরালার মাইয়্যার বিয়া বইচছে–সাগাই কুটুমক নেমন্তন দিবার ধইচছি? রমণীর ত উঠিবার মাগিবে আধাঘণ্টা, তারপর বিড়ি ধরিবে তারপর লণ্ঠন জ্বালিবে, তারপর ঘর খুলিবে, চিল্লি কহি দেন না কেনে–

নিতাই চিৎকার করে, হে-এ কাহা, লাল সিগন্যাল দিয়া দিছে, শেষ রাতত বানা আসিবে; ভেলা বানি রাখো, হামরালা হরিসভাত আছি, এই চলো কেনে।

ওরা আবার রওনা হতেই ঘরের ভেতর থেকে রমণী চিৎকার করে ওঠে, এই খাড়া, খাড়া।

গজেন পেছন থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, আর খাড়াবেন কায়, তোমরালা আইস।

রাবণ বলে, এই তোমার লাল সিগন্যাল, মানষিলা সগায় ঘুমাছে।

জগদীশ হ্যাঁ হ্যাঁ করে হেসে বলে, হালা সম্বন্ধীর বাপরা বুঝবেনে যখন ঘুমের মইধ্যে ফ্লাড ঢইকবে, বলেও জগদীশ হ্যা হ্যাঁ করে হাসে, যেন সে একটা মজা দেখার অপেক্ষায় আছে।

জগদীশকে বেশ ব্যস্ত দেখায়। নদীর পাড়ে তাকে অস্থির লাগছিল, যা হওয়া উচিত তা যেন হচ্ছে না। কিন্তু যখনই জানা গেছে লাল সিগন্যাল পড়ে গেছে, পাহাড় থেকে বন্যা নামছে, শেষ রাতে বন্যা এখানে পৌঁছে যাবে, তার জন্যে এখন থেকে ভেলা তৈরি করতে হবে–তখনই জগদীশ স্থির হয়ে গেছে। সেই স্থিরতায় সে তাদের মধ্যে বয়সে সবচেয়ে বড় হয়েও, প্রায় কিশোরের মত উৎসাহে টগবগ করছে। শেষ রাতে ঘুমের ভেতর তিস্তার মাঝখানে জেগে উঠে রমণীর কী হবে, তা ভেবে সে আপন মনেই খ্যাক খ্যাক করে হাসে। হাসে আর দৌড়ে-দৌড়ে ঘটে। তাকে দৌড়ে-দৌড়েই ঘটতে হয়, কারণ, নিতাই আর রাবণ লম্বা-লম্বা পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

মিস্ত্রিপাড়াটা মূল বসতি এলাকার বাইরে। ধানি জমির মাঝখানে এই একটা পাড়া, তারপর আবার অনেকখানি ধানি খেত, তার শেষে আবার নাউয়াপাড়া। এখান থেকে বসতি জমাট। মিস্ত্রিপাড়া থেকে নাউয়াপাড়ার মাঝখানে দুপাশে ধানখেত, তারপরে এক বিরাট বাশবনের মধ্যে দিয়ে রাস্তাটা, এই রাস্তাটা, সমকাণে পশ্চিমে বেঁকে গেছে। এর পর থেকে নাউয়াপাড়া। নাউয়াপাড়ার পরে ছোট এক খাল, তিস্তার পুরনো বেনো জল আটকে গেছে, এখন জল সবুজ। সেই খালের ওপারে মাহিন্দরপাড়া, তার ডান পাশে আবার একটা বাশঝাড়। তার পরে সরকারপাড়া দুই নম্বর। এই ভাবে ধীরে-ধীরে চর যেন আর চর থাকে নি, হয়ে উঠেছে ভরভরন্ত গ্রাম, কাল শক্ত মাটির গ্রাম, বড়-বড় গাছের আড়ালে ছায়ার নীচে প্রবীণ সব গ্রাম। সে গ্রামের ভেতর ঢুকে কারো মনে হবে না আর-মাত্র ঘণ্টা দুই-তিন পরে এই সমস্ত কিছুর ওপর দিয়ে তিস্তার ঘোলা জল তীব্র আবর্তে বয়ে যাবে আর এই গ্রামের কিছু চিহ্ন সেই জলের ওপরে নিশানা দেবে। বাতাস এখানে কম ছিল, কিন্তু তাতে বাশবনের প্রায় মাটির কাছাকাছি নেমে এসে ছিলাছেঁড়া ধনুকের মত উঠে যাওয়া ঠেকে না। বাশপাতাগুলো এই বাতাসে এত আওয়াজ করে যেন মনে হয় আড়ালে কোথাও জলের স্রোত বইছে। বাশগুলো হেঁচকি তোলার মত মুচড়ে ওঠে–সে আওয়াজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

নাউয়াপাড়ার বাক নিয়েই ওরা দেখে এক হ্যাজাক জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে দীননাথের মুদিখানায় আর তার সামনের মাঠটুকুতে মরা মানুষের মত ফেলা কলাগাছের ধড়। একপাশে পাতার প। আলোতে অন্তত জনা ছয়-সাত কাজ করতে লেগে গেছে। দূর থেকে দেখে নিতাই বলে, আরে এগুলাও রেডিওর খবর পাইয়া গিছে, যাউক বাঁচাইল, হে-এ অমূল্যা।

ওদের হাঁক শুনে সবাই এদিকে তাকায়। কিন্তু কেউই কিছু দেখতে পায় না, আরো ওদের মুখের ওপরই পড়ে চোখ ধাধিয়ে দিয়েছে। হাতে কারো কারো দা, আর-এক হাতে কলাগাছ ধরে থাকা, কেউ শুধু হাতে, কারো হাতে উঁচলো লাঠি, সবাই এই বঁশবনের দিকে তাকিয়ে।

তারপর ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ চেঁচায়, কে হয়।

ততক্ষণে ওরা আলোর সীমানার ভেতর ঢুকে গেছে। নিতাই আগে-আগে, হাসতে-হাসতে।

দক্ষিণে, পশ্চিমে-জাগো, আইস

তাও কেউ নিতাইকে চিনতে পারছে না দেখে সে চিৎকার করে ওঠে, আরে, সব ভূত দেইখছে নাকি?

আরে নিতাই? জগদীশ কাহা? আরে, তোমরা কুথায় গিছিল্যা? কলাগাছ ফেলে দিয়ে সবাই এগিয়ে আসে। ঐ আলোতে এদের চেহারা দেখলে মনে হয় অনেকদূর থেকে এল–প্রত্যেকের হাঁটু পর্যন্ত বালি। নিতাইয়ের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত বালি। ভিজে সে বালি গায়ের সঙ্গে লেগে গেছে। তাকে দেখাচ্ছে যেন বালির তলা থেকে বালি ফুড়ে উঠে এল। রাবণের অত লম্বা শরীরটায় বৃষ্টি আর বাতাস যেন বেশি লেগেছে। সেই অনেক বেশি বৃষ্টি আর বাতাস বহন করে সে কুঁজো হয়ে গেছে। জগদীশ পেছন থেকে লাফিয়ে ওঠে, সেই ধরো উত্তর পাক থিক্যা দক্ষিণ পাক পর্যন্ত জল মাইপ্যা আসছি, তিস্তা ব্রিজে সারা রাত্তির লাইট জ্বালাইয়া থুইছে।

আরে বস আগে। কও কী, ক্যান?

তোমরা ভেলা বানাও ক্যান? নিতাই হাসে।

রেডিওয় ত কইল, শুইনল্যাম, তা ভাবল্যাম, যা-হয় তা-হয়, কয়ডা বানাইয়্যা রাখি।

নিজেগার খুব ভাইবছ, চরের কথা কেডা ভাইবব? জগদীশ বলে।

যারা ভাইব্যা ঘুইর‍্যা অ্যাল, তারাই ভাবব। ত আমাগো কাম কী আগাইয়্যা থুল, নাকি পিছাইয়্যা থুল সেইডা কও। আর কী দেইখলা কও।

ঘোড়ার মাথা আর গাধার ডিম। চুপ যা। ঐদিকের পাড়ায় খবর দিছিস না দ্যাশ নাই? নিতাই সামনের লোকটাকে ধমকে ওঠে। নিতাইয়ের এই ধমকটাই হচ্ছে ওর সামাজিক সম্ভাষণ। সবাই একবার হেসে উঠল।

যাকে বলল সে বলে, আরে সারা চর ঘুইর‍্যা আইল্যা, এ্যাখন কি তোমরাই আবার খবর দিব্যার ছুইটব্যা নাকি? পোলাপান আছে কোন কামে? তোমরা বসো। এই ভোলা, সাইকেল বাইর কর খানদুই, না, খানতিন–

নিতাই দোকানের বারান্দায় গিয়ে বসে। তারপর হেসেই বলে আরে অমূইল্যা, তর মাথাত কী আছে একবার একসূরে করি দেখি আসিস ত।

অমূল্যর হাতে তখন দা। সে সেটা হাতে নিয়ে ঘোরাতে-ঘোরাতে বলে, ক্যান, কী কইরল্যাম?

কী কইরলি মানে? আরে, বানা আইসব তরা ত শুনছিস শেষ নিউজে।

হয়।

তা তহন আর কত রাইত? একবার সবাইক খোঁজডাক কইর‍্যা নিস ন্যাই?

এইহানে ভেলা বানাইস আর ঐহানে রমণী কাহা এমন ঘুমাইছে ঠেলা মাইর‍্যা তুলা যায় না। বন্যাতে ভাসি গেইলেও ত টের পাইব না–

এই নীলমোহন, যা ত রমণী কাকাক ডাইক্যা নিয়্যা আয়, অমূল্য বলে।

আর ডাইক্যা আইনতে হবে না, সে এতক্ষণে দৌড় দিয়্যা আসত্যাছে, জগদীশ একটা ঘরের দাওয়ায় বসে ছিল, সেখান থেকে বলে।

সাইকেল আনতে যাকে বলা হয়েছিল সে ও আরো দুজন সাইকেল নিয়ে এসে দাঁড়ায়। অমূল্য বলে, দাদা, ভোলারা আইছে, কয়্যা দ্যাও কুথায় কী খবর দিবে।

নিতাই একটু থেমে বলে, এক কাম কর, সিধ্যা ঘুইর‍্যা আয়। যদি দেখিস আর সব পাড়ায় সবাই জাইগ্যা আছে কয়্যা দিস আমরা এইখানে আছি, আর যদি দেখিস কুনো পাড়া চুপচাপ আছে ডাইক্যা জাগায়্যা দিস।

জগদীশ ডাকে, এই ভুলা, শুন্।

কন।

তর জেঠিরে কয়্যা দিস, আমি এইখানে আছি।

ত আপনার আর থাকনের কাম কী, ভুলার সাইকেলের পিছনে বইস্যা চইল্যা যান। ভুলারা ঘুইর‍্যা আইসলে আমরাও যাব নে, নিতাই বলে।

তাই যাব? জগদীশ কিছু ভাবে।

যাবেন না ক্যান, আপনার কি কালরাত্তির নাকি? গেলে ত ঐ পাড়াটার একটা বিলিবন্দবস্ত দইখবার পাইরবেন–নিতাই বলে।

তালি যাই, কী কস? জগদীশ ভোলার দিকে এগিয়ে যায়। ভোলা সাইকেলটা সোজা করে ধরে। জগদীশ সাইকেলের পেছনের ক্যারিয়ারে দুপা দুদিকে ঝুলিয়ে বসে। তার ওঠার মধ্যে এমন স্বাচ্ছন্দ্য ছিল যাতে বোঝা যায় সে এরকম চড়তে অভ্যস্ত। ভোলা শক্ত হাতে সাইকেলটা ধরে বলে, তিনজনই কি একদিকে যাব নাকি?

একদিকেই যা, দরকার হইলে একজন আইস্যা খবর দিতে পারবি নে, নিতাই বলে।

এখানে একটা হ্যাজাক জ্বালানো হয়েছে বলে আলোর একটা কেন্দ্র দেখা যাচ্ছে মাত্র। হ্যাজাকের আলোটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নি–গোল হয়ে স্থির আছে, যেন হ্যাজাকটাকেই দেখানোর জন্যে হ্যাজাকটা জ্বালানো হয়েছে। সেই আলোর মধ্যে এসেই সবাই কাজকর্ম করছে–তার বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, যেন, হ্যাজাকের আলোটাই আলোর পেছনটাকে আড়াল করে রেখেছে। সেই আড়ালের দিকে তাকিয়ে নিতাই জিজ্ঞাসা করে, অমূল্য, কয়ডা বানাইছিস?

তিনখান বানাইছি। কিন্তু গরুগুলার জন্যে একড়া বড় করি বানাইব্যার ধরছি।

ধুর বোকা, ভেলার উপুরে খাড়াইব্যার পারব না, শুয়্যা পড়ব নে, এক-এক ভেলায় এক-এক গরু ভাইসব্যার ধরবে নে

অমূল্য ওর গাই-বদলগিলাফ ভাসান দিবার ধরিবে, স্যালায় উমরার পাছত-পাছত গিয়া ধরিবে, কোন রত ঠেকিছে– গজেন বলে।

তোমরা কী দেইখল্যা, বানা আইসবেই? নিতাই, কত বড় বানা? অমূল্য হঠাৎ কাতর হয়।

রেডিও শুইনলি ত তুই, আমরা ত তখন ব্রিজের দিকে চাইয়্যা আছি বালুবাড়িতে, তুইই ক না। কইছে? কত বড় বানা?

ও শালা এত গলা কাঁপাইয়্যাকাঁপাইয়্যা কয়, মনে হয় পাহাড়গুলা সব হাঁটা দিছে এই দিকে। ক কত জল, কত কিউসেক, সেই সবের বালাই নাই।

সগাক সরিবার কহিছে-নদীপারঠে? রাবণ শ্লেষ্মাজড়িত স্বরে বলে।

হে রাবণকাকা, তুমি এ বাড়িতে যাও না, কত আর ঘুইরব্যা? বাড়ির জিনিশপত্র গুছাবেনে কেডা? নিতাই বলে।

সে মোর তানে ফেলি রাখিছে নাকি হে, যেন রাবণ আগে থাকতেই জানে,, গোছানোর কথা আগে থাকতেই ঠিক হয়ে ছিল।

আরে কাকি খবর পাইছে কি পায় নাই, তয়? নিতাই বলে।

সারা চর জাগি আছে, আর তর কাকির যদি বেউলার ঘুম হয় ত হক কেনে?

এই অমুল্যা, বলে নিতাই উঠে দাঁড়ায়, চল ত পশ্চিম ঘাটাখান দেইখ্যা আসি, এ্যাখন জল কতখান বাইড়ছে–কম থাইকলে গরুবলদগুলাক পার করি দে।

নিতাই তাড়াতাড়ি রওনা দেয়। গজেন আর রাবণ ছুটে তার সঙ্গ নেয়।

এখান থেকে সোজা রাস্তা ধরে কিছুটা গেলে বাঁ দিকে পশ্চিমের ঘাটে যাবার রাস্তা। নিতাই যেতে-যেতেই অমূল্যা বলে ডাক দিয়ে এগিয়ে যায়। এখানে বসে থাকতে-থাকতে হ্যাজাকের আলোটা কেমন আড়ালের মত লাগছিল, হ্যাজাকের আলোটাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেলে বোঝা যায় ঐ আলো একটু ছড়িয়ে গেছে। সেই ছড়ানো আলো জুড়ে নিতাইয়ের ছায়াটা ক্রমেই লম্বা হয়, মাটিতে শোয়, কিছু একটা বেয়ে খাড়া হয়, ছায়ার ঘত্ব কমতে থাকে, তারপর আকাশের দিকে উঠে ছায়াটা মিলিয়ে যায়। রাবণের ছায়া নিতাইয়ের শরীরটা আড়াল করে দেয়, আর বেঁটে গজেনের ছায়া লম্বা বারণকে ছাড়িয়ে ওঠে। মাত্র কয়েকবার এই তিনটি ছায়ার কাটাকুটি চলতে থাকে। তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে নিতাইয়ের চিৎকার ভেসে আসে–অমূল্যা, এই অমূল্যা।

হ্যাজাকের কাছাকাছি থেকে অমূল্য চিৎকার করে বলে, যাই যাই, আগাও, ধইরত্যাছি।

নিতাই অন্ধকার থেকে হাঁক দিয়ে বলে, গাইবদল বাছুরগুলাক লাইন বাইন্ধ্যা ঘাটে নিয়্যা আইসবার কয়্যা দে হককলরে

অমূল্য জিজ্ঞাসা করে, এহনই?

নিতাই গলা এত তুলে কথা বলছিল যে তার ধমক বোঝা যায় না, কিন্তু তার কথা যারা জানে তারা বুঝে নেয় নিতাই ধমকই দিল, অহনই, অহনই।

এই রাস্তাটা চরের ভেতরের রাস্তা। শক্ত আল, বৃষ্টিতে ভেজা ও পিছল, কিন্তু কাদা নেই। ফলে, ওরা প্রায় দৌড়ে-দৌড়ে যেতে পারছিল। বাতাস এখন পেছনে। মাঝে-মাঝে ধাক্কা মারছিল। কিন্তু তখনো ওরা বাড়িঘর, গাছপালা, বনবাদাড়ের ভেতর দিয়েই ছুটছে–ফলে বাতাসটা বেঁকে যাচ্ছে, ওদের গায়ে লাগছে না। পশ্চিমঘাটে যেতে বেশি সময় লাগবে না, কাজেই। কিন্তু সেজন্যে ওরা এত তাড়াতাড়ি ছুটছে না। ঐ দক্ষিণের বালুবাড়ি থেকে যে বাতাস ও বালি ঠেলে ওরা গায়ে ঢুকেছে, তার তুলনায় নাউয়াপাড়া থেকে পশ্চিমঘাটে যাওয়াটাতে যেন আরামই লাগে।

পেছন থেকে গজেন বলে, খাড়া কেনে নিতাই, একখান বিড়ি খা।

গজেন আর রাবণ এসে দেখে নিতাই দাঁড়িয়েছে। ওরা তিনজন মিলে গোল হয়ে দাঁড়ায়, নিতাই কাপড়ের অনেক গভীর থেকে শালাই বের করে। তিনজন যখন আগুনের ওপর ঝুঁকে পড়েছে, পেছনে চিৎকার শোনা যায়, নিতাই, খাড়া, আইসত্যাছি।

.

নদী এখনো পুরনো

নিতাই, রাবণ, গজেন আর অমূল্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এখন নদীর দিকে চেয়ে। ওপারে একেবারে সামনে রংধামালি-রায়পুরের বাধ। এখন দেখে মনে হচ্ছে বন্যা যদি আসে তা হলেও এইটুকু এক খালের মত তিস্তা পার হয়ে ওপারে উঠতে আর কতক্ষণ। এ ত এখন যা অবস্থা তাতে দুই ডুব দিলেই পার। কিন্তু ওরা জানে, বন্যার জল একবার এখানে ঢুকে গেলে আর এই খাল সহজে পার হওয়া যাবে না। পার ত হতেই হবে। এই দিক দিয়ে পার হওয়া ছাড়া ত গতি নেই। কিন্তু এখন ত এখানে নদী পার হওয়ার জন্যে কয়েক পা যেতে হবে, ওপারেও এরকমই কয়েক পা উঠতে হবে। তারপরই ত বাঁধের বোল্ডার। কিন্তু একবার যদি এই খালে বন্যার জল ঢুকে যায় তা হলে ঐ বাধ থেকে বেরনো লম্বালম্বা পারগুলো ধাক্কা দিয়ে-দিয়ে স্রোত ঠেলে দেবে এই চরেরই দিকে, যাতে স্রোতের ধাক্কা গিয়ে বাধে না লাগে। তখন, এখান থেকে ওপারে যাওয়ার মানে এত বেগে ছুটে আসা বন্যার স্রোতের বিপরীতে যাওয়া, স্রোত ঠেলে যাওয়া। স্রোতের গায়ে যদি গা ভাসিয়ে দেয়া যায়, তা হলে সোজা এক টানে সেই দক্ষিণের পাকে নিয়ে যাবে–ব্রিজের দিকে। অভিজ্ঞতায় এরা একটা বিষয় জেনে গেছে–স্পারগুলোর ধাক্কায় স্রোতে এ দিকেই সব ছুটে আসে বলে, স্রোতে ভেসে গেলেও এই চরের এদিকে কোথাও ঠেকে যাবে। কিন্তু সেটা কতক্ষণ? যতক্ষণ, এই খালটা চওড়ায় মাত্র ততটুকুই থাকবে, যাতে, স্পার-এর ধাক্কায় স্রোত উল্টে এই পারের কাছাকাছি পর্যন্ত আসতে পারে। কিন্তু এই খালটা ত বন্যার জল ঢোকামাত্র এমন চওড়া হয়ে যাবে যে, এই এখন যেখানে নিতাইরা দাঁড়িয়ে আছে, সেসব প্রথম ধাক্কাতেই ডুবে জল উঠে যাবে, ঐ খানখেতের কাছে। তাতেই ত স্রোতের উল্টো ধাক্কা জলের মধ্যে কোথায় মিলিয়ে যাবে। তখন সবটাই ত তিস্তা। তখন জলের একটাই স্রোত, একটাই টান। সেই স্রোতের মধ্যে কেউ পড়লে, সেই টান থেকে সে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না।

নিতাই, রাবণ, গজেন আর অমূল্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নদীটাকে মাপে, একটু কোনাকুনি। এখন গরুগুলোকে এখানে ছেড়ে দিলে কানচি মেরে ওপারে গিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু, এখন এই আবছা আলোতে ওদের এই সব হিশেবনিকেশে কোনো ভুল হচ্ছে না ত?

কয়ডা বাজে রে অমূল্যা, নিতাই আপন মনে জিজ্ঞাসা করে।

খাইছে, ঘড়ি দেখি নাই, অমূল্য বলে।

নিতাই আকাশের দিকে তাকায়। এখানে আকাশ যেন একটু উঁচু, সেই কুয়াশার ভার যেন একটু কম। বৃষ্টি কমে থাকতেও পারে, কিন্তু এখানে বাতাস ত আসছে অনেকটা বাধা পেয়ে-পেয়ে। যে-জোর বাতাসের বাকি থাকে, সে-জোর নিয়ে ওপারের বাঁধের ওপর হামলে পড়ছে। ফলে, মনে হয় বাতাসটা যেন এদের মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।

সামনের বাঁধের ওপর দিয়ে ওদিকে রায়পুর রংধামালির আকাশের দিকে তাকালে উজ্জ্বল লাগে একটু, ওখানে ইলেকট্রিক লাইট আছে।

নিতাই কয়েক পা এগিয়ে বলে, গজেন, নাববি নি? নিতাই জলে পা দেয়, তার পায়ে স্রোতের টান লাগে, একটু গরম জল, বানার জল ঢোকে নাই এ্যাহনও, জল গরম।

নিতাইয়ের পেছন-পেছন ওরা একটু এগিয়ে আসে, টান কী রকম? অমূল্যও জলে পা ছোঁয়াতে-ঘেঁয়াতে জিজ্ঞেসা করে।

নিতাই হাঁটু জলে নেমে গিয়ে বলে, সকালে ও ত এ্যামনিই ছিল, জলের ওপর নিচু হয়ে নিতাই পায়ের বালি পরিষ্কার করতে শুরু করে। জলের ভেতরে তাকে কনুই ছাড়িয়ে ডোবাতে হয়। মুখটা প্রায় জলের ওপর নেমে আসে। জলের গন্ধ পায়। নিতাই গন্ধ শোকার জন্যে নাক নামায় নি। কিন্তু নাকে জলের গন্ধটা ঠেকলে তার নিজেরই মনে আসে–এটা বন্যার জলের গন্ধ না, রোজকার জলের গন্ধ। এই জায়গার জলটা পার হতে নৌকো লাগে ঠিকই, কিন্তু একদিকে বধ, আর-এক দিকে চরের মাঝখানে এই জলটায় কেমন মানুষের গায়ের গন্ধ লেগে থাকে, জলের ভেতরে মানুষের কাজের গন্ধ। এখন এই রাত্রিতে সে গন্ধ অনেকটা পাতলা, কারণ নিতাইয়ের মাথার ওপর দিয়ে সেই ঝা বয়ে যাচ্ছে ওপারের দিকে;কারণ, গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে এই খালের মত তিস্তার সোঁতার জলও কিছুটা বেড়েছে। ফলে, গন্ধটা তরল হয়েছে। কিন্তু তবু নিতাই গন্ধ পায়, অনিবার্যভাবেই পায়। রাত এখন বন্যার দিকে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। আর, ঘণ্টাখানেক থেকে ঘণ্টা দুইয়েকের মধ্যে পাহাড় থেকে নামা বন্যায় এই খালটা একেবারে রামকান্তর জোত পর্যন্ত উঠে যাবে। কিন্তু রামাকান্তর জোত পর্যন্ত কেন? এই চরটা পুরোই জলের তলায় চলে যেতে পারে। পুরোটা? এই পুরোটা চর?

নদীর ভেতর থেকে নিতাই এই চরের দিকে মুখ করে তাকায়। ডাইনে মুখ ঘোরায়-দক্ষিণের বাঁক পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। বায়ে মুখ ঘোরায়-বেশি দূর দেখা যায় না, এই দিকটাতে মাটি জলের মধ্যে অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। নিতাই ঐ খালের বাকটার দিকে তাকায়, বেশ বড় বাক নিয়ে ঘুরে গেছে। ঐখানটাতে আলো আর একটু পরিষ্কার মনে হয়। নিতাই এক আঁজলা জল তুলে ঠোঁটের কাছে ধরে। তারপর ভেজা হাত সারা মুখে বোলাতে গিয়ে বলে, হে-এ, বালি এককারে কিচকিচ করত্যাছে

নিতাই মাথাতেও হাত দেয়, হে, বালি কিচকিচায়।

জলের ভেতর থেকে নিতাই ডাকে, গজেন।

ক কেনে।

নামবি? জলে?

তুই ত নামিই আছিস।

আমি ত এইখানে খাড়য়্যা আছি, অমূল্যা, গরুগুলাকে আইনতে কইছিস?

এতক্ষণ রওনা দিয়্যা সারছে।

ত দ্যাখ, কোথা দিয়্যা পার করবি? দ্যাখ। একটু বিরতি দিয়ে নিতাই বলে, এ্যাহনও পুরানা নদীই আছে

হয়?

গজেন জিজ্ঞাসা করে।

হয়। এ্যাহনও পুরানা নদীই খানিকটা জল তুলে বুকেপেটে লাগায় নিতাই, যেন বালি পরিষ্কার করছে।

নতুন জল ঢুকে নাই? অমূল্য জিজ্ঞাসা করে।

দেখি বুঝিবার পার না? শুধাবার ধরছেন? রাবণ এমন ভাবে পায়ের ওপর বসে পড়ে যেন বন্যার স্রোতের ধাক্কায় এখনি একটা গাছ উপড়ে আকাশটা খালি করে দিল। রাবণ নদীর দিকে তাকিয়ে দেখে আরো, আরো বুঝে যায়।

নিতাই হাঁটু জলে ছিল, একটু উঠে আসে। পেছনে বা হাত দিয়ে কাছাটা খুলে খুব সাবধানে দুই পায়ের ভেতর দিয়ে সামনে গলিয়ে ডান হাতে ধরে। তারপরে আবার বা হাতে তুলে কাঁধের ওপর রাখে। তার পর দুই হাত দিয়ে ধুতিটার পাজা খুলতে থাকে। খোলার পর প্রথমে দুই হাতে দুদিক থেকে গুটিয়ে নিয়ে, ডান কাঁধে রেখে, হাত নামিয়ে কোমরের গিট খুলে দেয়। দুই হাতে কাপড়টাকে মাথার ওপর দিয়ে তুলে পোটলা পাকায়। পোটলাটা দুই হাতে বুকের কাছে ধরে। একটু পরেই বোঝা গেল নিতাই হিশেব কষছিল–ওখান থেকে কাপড়টা ছুঁড়ে দিলে পাড়ে পৌঁছবে নাকি বাতাসের ধাক্কায় জলে পড়ে যাবে। নিতাই বুকের কাছে তার কাপড়টা ধরে ঐ কয়েক পা হেঁটে এসে ভেজা বালুচরে ধুতিটা ফেলে দেয়। মাটিতে পড়ার আগে ধুতিটা একটু খুলে যায়। পাড়ে এলিয়ে পড়ে থাকে।

ততক্ষণে নিতাই পেছন ফিরে জলের ভেতরে হেঁটে যাচ্ছে।

সামনেই ওপারে বাঁধের পটভূমি ছিল বলে, নাকি, এখানে জলকুয়াশা নেই বলে, নাকি, আলো একটু হালকা বলে–জলের ভেতরে হেঁটে-হেঁটে আরো ভেতরে নিতাই যখন চলে যায়, তখন, নদীর মধ্যে–ঠিক নদীর মধ্যে নয়, নদী আর আকাশের মধ্যবর্তী আকাশ জুড়ে–তার শরীরের পরিণাহরেখা ক্ষোদিত হয়ে ওঠে ছায়াময়–তার মাথার ওপরে বাবরির সামান্য ঢেউ আর কাঁধের দুপাশে সেই বাবরির ফুলে ওঠা; তার ঘাড় বাবরিতে ঢাকা; সেই ঢাকা ঘাড়ের দুপাশ দিয়ে কাঁধের তরঙ্গিত বয়ে যাওয়া, বাহুর গোল, বাহু থেকে কনুই পর্যন্ত ঢেউ, কনুইয়ের চওড়া ক্রমে সরু হয়ে আঙুরে বিচ্ছিন্নতায় জলের ওপর দোলে। নিতাই হেঁটে যায়। আর এই চলন্ত রেখা নীচ থেকে জলে ডুবে যায়।

নিতাই হেঁটে-হেঁটে জলের ভেতর থেকে ভেতরে চলে যায়।

এখন হেঁটে যাওয়ার একটি উপলক্ষ ত নিতাই-এর আছেই। গরুগুলো রওনা দিয়েছে। বন্যা আসার আগে সেগুলোকে ওপারে পৌঁছে দিতে পারলে অনেকটা নিশ্চিন্ত। এখনো এখানে পুরনো নদী, পুরনো জল। গরুগুলোকে চেনা পথে ওপারে নিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু পথটা আগে ঠিক করা ভাল। গজেনকে তাই জলে নামতে বলছিল নিতাই। জলে নেমে নিতাইও যেন সেই পথটাই পাকাপাকি ঠিক করছে।

নিতাইয়ের এখন গলাটুকু জেগে আছে, গলা মানে বাবরিটুকু। পাড় থেকে মনে হচ্ছে, প্রায় মাঝখানে। কিন্তু অভিজ্ঞতায় জানা আছে, এটা ঠিক মাঝখান নয়, মাঝখান আরো একটু দূরে। কিন্তু, এতদূর পর্যন্তও যদি হেঁটে যেতে পারে, নিতাই, তা হলে গরুগুলোকে সহজেই পার করে দেয়া যাবে, এখনো।

অমূল্য জিজ্ঞাসা করে, হে রাবণ কাহা, শুইনবার পান? গরুগুলা বাহির হইছে?

রাবণ মাটির ওপর তার প্রায়নগ্ন শরীর নিয়ে বসে ছিল নদীর দিকে মুখ করে। তার বা হাঁটু মাটিতে শোয়ানো, ডান হাঁটু খাড়া। দুই হাতে সেই হাটুটা জড়িয়ে থাকে বারণ, মুখটা পায়ের মাঝামাঝি। যেন ওটা তার নিজের হাঁটু নয়, কোনো গাছটাছ। সে নদীর দিকে মুখ করে বসে ছিল বটে কিন্তু তার ঘাড়ের ভেতর মাথাটা এমনই সেঁদানো আর তার বাহুর গোড়ার হাড় দুটো লম্বা হয়ে তার কান পর্যন্ত এমনই উঠেছে যে বোঝা যায় না সে নিতাইয়ের দিকে তাকিয়ে, নাকি নিতাইকে ছাড়িয়ে বধের দিকে, নাকি সামনে, একটু দূরের, মাটির দিকে।

হয়। বাহির হছে মনত খায়, রাবণ আস্তে বলে।

বাতাস পুর্ব থেকে পশ্চিমে আসছে। রাবণ এখন এই রাত-পেরনো নদীর তীরে মাটিতে এমন স্থির বসে যে, সে হয়ত বাতাসের নিহিত আওয়াজ শুনতে পাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছে–তিস্তার ভূখণ্ড বদলানো যেবন্যা পাহাড় থেকে নামছে এই চর, ও এই রকম আরো অনেক চর, বা, গ্রাম, বন, ভাসিয়ে নতুন রকমে ভূখণ্ডটাকে সাজাতে, সেটা পৌঁছবার আগেই চরের প্রথম উদ্বাস্তুর পাল অনভ্যস্ত সময়ে চার পায়ে পথে নেমে প্রায় অন্ধের মত এই নদীতীরে ছুটে আসছে। এ রাস্তায় তারা রাতে আসতে অভ্যস্ত নয়। তাদের অভ্যস্ত পথে তারা আর-কোনোদিন এই চরে ফিরে না-আসতেও পারে।

নিতাই তার ডুবজলে পৌঁছে ভেসে ওঠে। দেখা যায়, সে তার বাবরি চুল ঘাড়ের এক-এক দোলায় ঝাপটাচ্ছে। ভেজা বাবরি তার মাথার ওপরে ঝলসে উঠছে।

জল নতুন চুকিবার ধইরছে? ঐঠে পাস? রাবণ তার ভঙ্গি না বদলে বলে। নিতাইকে বলে। নিতাইয়ের যেন একটা ছুততা দেওয়ার দরকার হয়–কেন সে এতটা দূরে, এতটা জলে, এতটা তৃপ্তি পাচ্ছে। ওখান থেকেই সে বলে, সারা মাথা-গা বালি কিচকিচাছে–

গরুর পালকে কোথা দিয়ে ওপারে তুলবে সেই পথনির্ণয়, নিতাইয়ের এই জলমগ্নতার কারণ হিশেবে যথেষ্ট ছিল না।

এই লেগুন-এর মত খালটুকু তিস্তারই অন্য কোনো বন্যায় তৈরি হয়েছিল।

তিস্তার মূলস্রোতের মাঝখানে বিচ্ছিন্ন সামান্য বালুচর, তার পাশ দিয়ে জলের ছোট রেখা কখনোকখনো বহমান থাকে। এই খালের মত তিস্তাটুকু পেরিয়েই এই চরের জীবনযাত্রাকে শহরের, বাজারের, পঞ্চায়েতের, ভোটের, সরকারের জীবনযাত্রার সঙ্গে গ্রথিত থাকতে হয়। সেই সামান্য বালুচর আর-কিছুক্ষণের মধ্যে হাজার-হাজার কিউসেক জলের আঘাতে কোথায় উবে যাবে, হয়ত, এই খালটুকু, লেগুন-এর মত খালটুকু, খালের মত তিস্তাটুকু সেই প্রবল মুহূর্তে এই প্রতিদিনের ইতিহাস থেকে উপকথায় চলে যাবে, এই চুর, এই মানুষজন, এই গাইবলদ, এই আবাদ, বালুচরে বসে থাকা ঐ বৃদ্ধ–যে তার শরীর দিয়েই শুধু জানে আর বোঝে, শরীরের বাইরে যার আর-কোথাও মন নেই–এই সব সহ, সব সহ।

পুরানা, পুরানা, এইঠে সব পুরানা, মাঝনদী থেকে নিতাইয়ের গলা ভেসে আসে রাবণের কতক্ষণ আগে করা প্রশ্নের জবাবে। সে তখন স্রোতের টানে গা ভাসিয়ে দক্ষিণে যাচ্ছে। খানিকটা গিয়েই নিতাই একট সরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে–আরে, রে, রে, অতগুলা মশাল জ্বালাইয়া মিস্তিরি পাড়ার দক্ষিণ পাকে.. বলতে বলতে থেমে যায় নিতাই। সে চিনতে পেরে যায়, এই খালের তিস্তার ভেতর থেকে ঐ দক্ষিণ পাড়া দেখা যাচ্ছে, ঐ তিস্তা ব্রিজ দেখা যাচ্ছে লাইট জ্বলে আছে, ঐখানে নরেশ আর নকু বাতাসের মধ্যে, জলকুয়াশার মধ্যে পাহারা দিচ্ছে তিস্তা ব্রিজের দিকে তাকিয়ে। নিতাই চেঁচায়, অশ্বিনী রায়ের জমিতে পাকা ভাদই কাইটতে নামছে..

এই চর জুড়ে তিস্তার বন্যার ছোঁয়া লেগে গেছে, এখন বন্যাটা আসাটুকুই বাকি। খেতের দাঁড়ানো পাকা ধান যতটুকু পারা যায় কেটে নেয়া।

নিতাই সেই জলের ভেতর থেকে দেখে–এই চরটার ওপর দিয়ে তিস্তা বয়ে যাচ্ছে। নিতাই সেই জলের ভেতর থেকে দেখে-আর-কোনো একটা নতুন চর তাকে খুঁজতে হচ্ছে। নিতাই সেই জলের ভেতর থেকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে একটু ভেসে গেলেই ওপারে রংধামালি রায়পুরের বাধে উঠে সে বসে বসে আর-কিছুক্ষণের মধ্যে এই চর ডোবানো, এই খালের মত তিস্তা ভাসানো, নতুন জলের ফ্লাড় দেখতে পাবে।

নিতাই সেই মশালের আলো থেকে চোখ শেষবারের মত সরিয়ে নিয়ে উত্তর দিকে সাঁতার কাটে, এই খালের স্রোতটুকুর বিপরীতে, পাহাড়ের ফ্লাড ঐ দিক দিয়েই ত আসবে। এখনো এই পুরনো জলে, এই প্রতিদিনের জলে, এই জীবনযাত্রার জলের ভেতর দিয়ে সঁতরাতে-সঁতরাতে নিতাই হাঁক দেয়, গজেন, অমূল্যা, আয়, ফ্লাড দেইখ্যা আসি, কতদূর আইসল, আয়…

এতক্ষণে নিতাই সম্পূর্ণ উপলক্ষহীন হয়ে আত্মসমর্পণ করতে পারে–এই চরের আসন্ন সম্ভাব্য ধ্বংসের মুখে সে চরের সঙ্গে এক আসঙ্গে লিপ্ত হয়ে যেতে চায়।

সে এই চর আর জল জন্মসূত্রে পায় নি। প্রবাসী বলেই বোধহয় এ জলের টান এত বেশি, এত গাঢ়। এই জল ধ্বংস হওয়ার আগে নিতাই বোঝে এই জল তার শরীরেরই অংশ। এই শরীরে ও এই জলে তখন শেষ স্মৃতি ছিল বন্যার আগের শেষ স্মৃতি।

গজেন আর অমূল্য দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের নেংটি আর ধুতি পাড়ে খুলে রেখে–সাঁতার কেটে কোনাকুনি নিতাইয়ের দিকে চলে স্রোতের উজানে এগিয়ে, বন্যাঢোকার সম্ভাব্য মুখে। এখানে জলকুয়াশা ছিল না, আকাশের আলো একটু হালকা ছিল, ওরা জলের মধ্যে মাছের মত বয়ে চলে এই পুরনো জলে, প্রতিদিনের জলে, জীবনযাত্রার জলে। ..

পাড়ে অনড় রাবণ শুনতে পায়, বংশানুক্রমে পাওয়া তার এই নদী বেয়ে যেবান ধারাবাহিক এসেই যাচ্ছে, সেই এখনো অনুপস্থিত বন্যার সামনে, চরের মাটি ছেড়ে প্রথম উদ্বাস্তুর পাল, শেষ রাত্রিকে বা প্রথম সকালকে হাম্বা রবে চকিত করে ছুটে আসছে।

.

অকাল গোষ্ঠ

বাঁধের ওপর গরু ভোলা মানেই বন্যা স্বীকার করে নেওয়া। গোয়াল থেকে গরু বের করে সারাটা চর পেরিয়ে সোঁতাটা কিছু হেঁটে, কিছু সাঁতরিয়ে, বাঁধের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠে পড়া মানেই ঘর ভাসল। মুখে যতই বলা যাক না কেন যে গরুগুলোকে আগে তুলে দিলে ত আর ক্ষতি নেই, বন্যা যদি নাই আসে বা নেহাৎ ছোটখাট বন্যা যদি আসে, তা হলে নামিয়ে আনলেই হবে–গরুকে একবার ঘর ছাড়া করলে সে ঘরে আর টেকা যায় না। এমনি গরু আশেপাশে চরছে, বা, পাল করে গরুগুলোকে মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়েছে–সে এক কথা। সে ত জানাই আছে-কখন সে গরু ফিরবে। বাড়ির সবচেয়ে ছোট ছেলে যদি সারা সকাল এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে বেড়ায় তা হলেও যেমন বাড়ি ভরাই থাকে। কিন্তু গোয়াল শূন্য করে, গরুর পালকে পাড়া ছাড়িয়ে, চর ছাড়িয়ে, নদী ছাড়িয়ে একেবারে বাঁধের মাথায় তুলে দেয়া–আর তারপর সেই ঘরবাড়িতেই থাকা–এ অসম্ভব। গোয়ালঘরের দড়িটা, গোয়ালঘরে গরুর মুখ থেকে খসে পড়া পোয়াল,আর ঘাস গরুর চোনা আর গোবরের গন্ধে বাড়িতে আর তিষ্ঠনো যায় না, কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। যেন সারা পাড়াতেই কোনো শোক নেমেছে, বা, একটা কোনো বাড়ির শোকই সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।

হিশেব অনুযায়ী পাহাড়ের বন্যা এখানে আর দু-এক ঘণ্টার মধ্যেই এসে যাচ্ছে যখন, তখন গরুর পালের সঙ্গে গরুগুলোকে তাড়াতে-তাড়াতে বাড়ির ও পাড়ার বাচ্চাকাচ্চারাও ছুটতে থাকে। রাতশেষের বানাবাতাসে আর বৃষ্টির ছাটে বিদ্ধ এ চরে গরুর পালের সেই সমবেত হাম্বার যেন চরের ভেতর থেকে জেগে ওঠে। মানুষের স্বরের সঙ্গে মেশানো হাম্বা ডাকে কেমন এক স্বস্তি থাকে। কিন্তু মানুষের স্বরের সমর্থনহীন এই রাত শেষ করা হাম্বায় মানুষের বসত উৎখাত হয়ে যায়। নদীর পথে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় পাল বেঁধে গরুরা ছুটে আসছে। অথবা হয়ত স্পষ্টও হয় না–ঐ জলকুয়াশা সরে সরে যায় আর সেই অবকাশ জুড়ে জেগে ওঠে ধাবমান গোষ্ঠের চলমূর্তি। যখন গ্রাম থেকে আরো দূরে যায়, তখন দেখা যায় সেই পালের ভেতর গরুর গায়ে গা লাগিয়ে পেছনে-পেছনে, ভেতরে-ভেতরে গায়ের বাচ্চারাও ছুটে আসছে। তাদের এক-এক হাত তোলা। কোনো কোনো হাতে কঞ্চি বা লাঠি আছে। কিন্তু সে কঞ্চি বা লাঠি কোনো গরুর পিঠে পড়ে না, গরুর পাল এতটাই সারি বেঁধে ছুটছে, ছুটছে অথচ সারি থেকে সরছে না।

গাঁয়ের এই রাস্তা এই গরুগুলোর চেনা, এই বাচ্চাগুলোরও চেনা। এই রাস্তা দিয়ে এতটা বড় পালে না হলেও, ছোটখাট পালে এই গরুগুলোত প্রায় রোজই ঘরে ফেরে, যায়-আসে। কখনো কখনো কোনো-কোনো গরু ত বাধা বাছুরের হাম্বা শুনে ছোটেও বটে। এত বড় গায়ে, এক-একটি এত বড় পাড়ায় কোনো-না-কোনো গরুর ত দুধের বাছুর থাকেই–গরুদের ত আর পরিবার পরিকল্পনা হয়নি–দুধের বাছুরের ডাক শুনে কোনোনা-কোনো গরুকে ত ছুটতেও হয়। কিন্তু তাই বলে এমন ছোটা? তাও এই রাত শেষ হওয়ার আগেই? মানুষের গলার স্বরের গরমে কুয়াশা কেটে যাবারও আগে? তাও আবার এত তাড়াতাড়ির আঙুলে খোলা দড়ি ফেলে? গলায় পিঠে মানুষের হাতের ছোঁয়া না নিয়েই?

এই রাস্তা ত মানুষের ও গরুর পায়ে-পায়ে এরকম পাল বেঁধে পালানোর জন্যে তৈরি হয়নি। তাই এত গরুর সঙ্গে ঐ গরুটার পেটের ধাক্কা লেগে যায়। একটা গরু একটু সরে গেলে তার একটু পেছনের গরুটার কাঁধে ধাক্কা লাগে। সেটা একটু পেছিয়ে গেলে তার পেছনের গরুর গলা এসে আগের গরুটার কোমরের হাড়ের ওপর ওঠে। একটু জোয়ান হয়ে ওঠা বাছুর এই সুযোগে একে ধাক্কা দিয়ে, ওকে সরিয়ে, আরো সামনে এগিয়ে যেতে চায় আর তার মা তাকে ধরবার জন্যে আর-একটু জোরে ছুটতে গিয়ে ধাক্কা খায়। যে-বাছুর এখনো বাট ছাড়ে নি সে এই সুযোগে পেছন থেকে মায়ের সারা রাত ধরে ভরে ওঠা বাটে মুখ ঢুকিয়ে টান দেয়–সেই টানের আবেশে মায়ের গলা লম্বা আর পা চারটে শিথিল হতে না-হতেই পেছনের গরুটার ধাক্কায় বাছুরটা ছিটকে যায়। মার বাটে মুখ ঢোকানোর জন্যে ওর ঘাড়টা নোয়ানো ছিল আর নোয়ানো ঘাড়ের ভারে সামনের পা দুটোর কুঁচকিতে ভাজ পড়ে। সেই ভাজের ঝোঁক সামলাতে পেছনের পা দুটো ফাঁক হয়ে থাকে, হাঁটু দুটোতেও একটু ভাজ পড়ে। পেছনের গরুর ধাক্কা খেয়ে তাই সে বাছুরটা প্রথমে ডাইনে ছিটকে যায়। ছিটকোতে-ছিটকোতে তার সামনের পা দুটো ভেঙে যায়, সেটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে, পড়ে কাত হয়ে যায়। পেছনের গরুগুলোর ধাক্কায় তার মা চলে যায়, তার মার বোটা থেকে প্রথমে সরু ধারায়, তারপর ফোঁটায়-ফোঁটায় দুধ মাটিতে পড়তে থাকে–অনেকক্ষণ। বাছুরের পেছনের গরুগুলো তার ওপর এসে পড়ে না। তাকে পাশ দিতে বায়ে সরে যায়। ফলে, সবচেয়ে বায়ের গরুটা রাস্তা থেকে গড়িয়ে পড়তে গিয়ে মাথাটা নীচে নামিয়ে পেটটাকে রাস্তার ওপর এনে ফেলে। এর মধ্যেই পেছনের গরুটা তার জায়গা নিয়ে নেয়। সে এবার মাথাটা তুলে গলাটাকে ভিড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, তারপর পেটটাকে। ততক্ষণে বাছুরটা সামনের দুই পায়ের ওপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে পেছনের পায়ের ওপর ভর দিয়ে গড়ায়, দৌড়য়, হা-স্বা, গরুর পালের ভেতর থেকে অনেকগুলো গভীর হাম্বা ওঠে। কার বাছুরের সাড়া কে দেয় বোঝা যায় না। প্রফুল্ল পালের গাইটা বুড়ি হয়েছে, মোটা হয়েছে। সেটা জোরে ছুটতে পারে না। কিন্তু পালের মাঝখানে তাকে জোরে ছুটতেই হয়। তার অত বড় পেটটার দোলনে সে নিজেই হাঁফিয়ে ওঠে। তার নাক দিয়ে ফেনা গড়ায়। দেড়া গজেনের গাইটা দুদিন আগে বিইয়েছে। তার বাছুরটা ছুটতে পারে না। তাকে তুলে দেয়া হয়েছে জগদীশের মোষের পিঠে। বাছুরটাকে নিয়ে মোষটা বেশ তালে-তালে দুলে-দুলে ছোটে পালের মাঝখানে। তার গায়ের ধাক্কায় অন্য গরুগুলো দু পাশে সরে যায়। কিন্তু বাছুরটা বারবারই পিঠের ওপর উঠে দাঁড়ানোর জন্যে সামনের পা দুটো কোলের ভেতর থেকে বের করতে চায় আর মোষের চলার দোলায় ও বেগে সঙ্গে-সঙ্গে তার ঘাড়টা নুয়ে পড়ে। সে আবার পা দুটোকে গুটিয়ে নিয়ে ঘাড়টা সোজা করে। তার মা-গাই মোষটার পেছন-পেছন ছোটে। বাছুরটাকে বসিয়ে দেয়া হয়েছে পেছন দিকে মুখ করে। তার মা জিভ বের করে গলা তুলে বাছুরটাকে চাটতে চায়। কিন্তু মোষের অত উঁচু পিঠ পর্যন্ত তার জিভ যায় না। তার বাছুরচাটা এখনো শেষ হয়নি।

গাঁয়ের বসতসীমানা ছেড়ে পালটা এবার চাষের সীমানায় আসে। এও ঠিক রাস্তা নয়। একটি বড় আল, দুপাশে মোটা ঘাস, মাঝখানে কাল মাটি জলে পিছল। রাস্তা থেকে দুপাশের জমি কোথাও বেশ ঢালুতে, কোথাও তার থেকে সামান্য উঁচু। পিছলে গেলে ঐ মাঠেই পড়ে যেতে হবে। পালটার গতি একটু কমে আসে। ছুটছে কিন্তু পদক্ষেপগুলো একটু ছোট হয়ে এসেছে যাতে পিছলে গেলে সামলানো যায়। আর হুড়োহুড়িটাও যেন কম। সঙ্গের ছেলেগুলো লাঠি বা কঞ্চি উঁচিয়ে দু পাশের খেতে নেমে গেছে। সেই ঢাল থেকে তারা কঞ্চি বা লাঠির ঘা মারছে রাস্তায়–হেই হেই হেই আওয়াজে–গরুর পা যেন পিছলে না যায়। গরুর পাল ছুটছে আর মাঠ দিয়ে ছেলেগুলোও ছুটছে। এখন আর দুপাশে গাছ বা বাড়িঘরের সারি নেই, যেন এতক্ষণ সেই সারি এই প্রায় ভোরে, এই শানশান বাতাসে, এই জলে খানিকটা আশ্রয় দিচ্ছিল। কিন্তু এই খেতিজমিও ত চেনাই। এই মাটি আর ঘাসপাতার ভেজাগন্ধও ত চেনাই। এই দু পাশের অবকাশ দিয়ে নদী ও নদীর বাঁক দেখাও ত এই পালের অভ্যন্তই। কিন্তু তারও ত একটা সময় আছে। এখন রোদ নেই, এখন ঘাসে মুখ দেয়া নেই, এখন কালো মাটির ওপর পেট ঢেলে দিয়ে শোয়া নেই, এখন গলা তুলে ভেতরের ঘাস মুখে নিয়ে আসা নেই। এখন ছোটা, ছোটা।

.

গরুর পালের পাড়ে ও জলে নামা

জলের একটা গন্ধ আছে–গরুরা সে গন্ধ, চেনে। কিন্তু এখন জলের কোনো গন্ধ পাচ্ছিল না। বাতাস এলোমেলো ঝাঁপটে বইছিল, আর বাতাসের সঙ্গে মিশে ছিল সুচের মত জল। ধীরে-ধীরে গরুগুলোর বা দিকের পিঠের লোম ভিজে ওঠে বাতাসের ঝাপটা ঐ দিক থেকেই আসছিল। তাদের গায়ের লোমগুলো বাতাসের ঝাপসায় সরে-সরে যায় আর সেই ফাঁক দিয়ে জল একটু-একটু গড়ায়। তাদের বা মুখের লম্বা পাশটার নোমও সেরকম ফাঁক হয়ে থাকে আর সেই ফাঁক দিয়ে জল গড়িয়ে গলার দিকে নামে। বা দিক থেকে আসা বাতাস আর জলের ঝাপটা থেকে মুখটা বাঁচাতে পুরো পালটাই একটু ডান দিকে মুখটা ফিরিয়ে রাখতে চাইছিল। তাদের পা সোজা যাচ্ছে, তাদের শরীর সোজা আছে কিন্তু তাদের মুখগুলো একটু ডাইনে ফিরতে চাইছে। তাতে তাদের গতি এই খেতবাড়িতে আরো একটু কমে আসে। আর তাদের নাক থেকে জলের গন্ধ ক্রমেই হারায়। যতই তারা নদীর কাছাকাছি হয়, যতই তাদের বা চোখ, মুখ ও নাকের বা পাশ জলে ভিজে ওঠে, ততই তারা জলের গন্ধ থেকে দূরে সরে–যেন তারা জলের বিপরীতে ছুটছে। ..

খেতবাড়ি শেষ হয়ে যায়–পালের ক্ষুর পড়ে নদীর পাড়ের বালিতে! এখন আর পড়ে যাওয়ার ভয় নেই, এখন আর পিছলে যাবার ভয় নেই বালুবাড়িতে পা দিতে না-দিতেই পালটা যেন ছড়িয়ে পড়তে চায়। পুরোটা পালের ভেতর যে-একটা উদ্বেগ কাজ করছিল, বালুবাড়িতে পেঁছে সে উদ্বেগটা যেন আচমকা ও অতর্কিত শেষ হয়ে যায়, যেন তাদের এই বালুবাড়িতেই পৌঁছনোর কথাছিল। বালির ওপর দিয়ে হাঁটা যায় না, পায়ের ফাঁকে বালি ঢুকে যায়। সেই কারণে যে পালের গতি কমে আসে তাই নয়, বালিতে হটার জন্যে পালটা ছড়িয়ে যেতে চায়, গরুগুলো যে যার মত হাঁটতে চায়। কিন্তু সেই বাচ্চাগুলি এখন তাদের কঞ্চি আর লাঠি উঁচিয়ে সামনে এসে গেছে। দুদিক থেকে লাঠি আর কঞ্চি গরুর পালের ওপর নেমে আসতেই গরুগুলো দাঁড়িয়ে পড়ে মুখ সরিয়ে নেয় আর পায়ে-পায়ে আরার পুরনো লাইনে ফিরে আসে। সেই ছেলেরা আর এগয় না, ঐ জায়গায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে গরুগুলোকে লাইনে রাখে। তারপর বালির ওপর ধীর পায়ে পালটা যখন নদীর দিকে একটু টলতে-টলতেই এগয় তখন সেই ছেলেরা আরো পেছিয়ে গিয়ে চেঁচায় হেট হেট। পালটা এখন এই বালুবাড়িতে যেন একটা লাইনের মত দাঁড়িয়ে গেছে। দুপাশে নদীর খাত দিয়ে সারা রাতের বাতাস দক্ষিণ থেকে পূর্ব থেকে উত্তরে আর। পশ্চিমে শান-শানকরে ওড়ে আর সেই নদীখাতের অবকাশেই এই গরুরা যেন একটার্সাকো বা বাধ। নিতাই, গজেন, আর অমূল্য পাড়ের কাছের জলে ছিল। রাবণ সেই পাড়েই বসে ছিল। গরুর পাল দেখে জল থেকে উঠে নিতাই, গজেন, অমূল্য ছুটতে শুরু করে। জল ছেড়ে উঠেই ওরা পাড়ে ফেলে রাখা ধুতি-নেংটি এক পাক দিয়ে পরে নেয়। একে বালি, তায় ভেজা, বাতাসের বিপরীতে ওরা এগতে পারে না। নিতাই কিছু একটা বলে চেঁচায়–সে চেঁচানি বাতাসে উল্টো দিকে উড়ে চলে যায়। নিতাই একটু এগিয়ে ছিল অমূল্য তখনো জল থেকে যেন পুরো উঠতে পারে না। হঠাৎ অমূল্য জল থেকে না উঠে, আবার জলের দিকে চলে যায়, তারপর ডুব জলে পৌঁছে সাঁতার দেয়। নিতাই এ গজেন বলে ডাক দিয়ে পেছন ফিরতেই দেখে অমূল্য আবার জলে সাঁতার কাটছে। নিতাই দাঁড়িয়ে পড়ে কোমরে হাত দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, এহন তর সাঁতার দেওনের টাইম? জলে ত তখনো বান ঢোকেনি। অমূল্য চিত হয়ে হাত মাথার দিকে ছুঁড়ে দেখায় সে ওপারে যাচ্ছে।

নিতাই বুঝে নেয়। ভালই ত করছে অমূল্য। গরুর পালকে নদী পার করানোর সময় ওপারে ত থাকতেই হবে কাউকে। কিন্তু একা অমূল্য কি পারবে। সে গজেনকে বলে, যা, তুইও যা ওপার–দেইখা আয়, কুনখান দিয়া পার করাই?

নিতাইয়ের কথায় গজেন জলে ফেরে কিন্তু সে অমূল্যর দিকে যায় না। পাড়ের কিনারা ঘেঁষা জলে ছপছপ করতে করতে সে এলোমলো পায়ে হাঁটতে থাকে। বালি দিয়ে হাঁটার সুবিধে অনেক। কিন্তু জলতল ত সমতল নয়। গজেন খানিকটা ছপছপ করে হেঁটে যাওয়ার পরই তার এক পা গর্তে পড়ে যায়–সে কাত হয়ে জলের মধ্যে পড়ে, তারপর হাতের ভরে আবার সোজা হয়ে হাঁটে। এবার সে পাড় ছেড়ে দিয়ে আর-একটু গভীরে যায়–সেখানে তার হাঁটু জল। খানিকটা মাটি শক্ত পায় গজেন–সে একটু আন্দাজের চেষ্টা করে শক্ত মাটির ঢালটা কোন দিকে। অন্তত হাঁটার আরামটুকু পাক। কিন্তু সেই মাপ নিতে গিয়েই গজেন আবার পড়ে, পড়ে গিয়ে সে আর ওঠে না–মাথাটা জলের তলায় নিয়ে যায়, অন্তত জলের তলায় ত আর ঐ বাতাস আর বৃষ্টির সুচ নেই! ভস করে মাথা তুলে গজেন একবার এপার-ওপার দেখে বটে, চুল থেকে জল ঝেড়ে ফেলেও বটে। হাত দিয়ে মুখচোখের জল সরিয়ে গজেন দেখে অমূল্য ওপারে উঠে হেঁটে-হেঁটে এদিকে আসছে। গরুগুলো যেখানে এখন দাঁড়িয়ে তার সোজাসুজি পশ্চিমের পাড়ের দিকে একটা জায়গা ঠিক করে গজেন আবার জলে ডুব দেয়।

ততক্ষণে বালুবাড়িতে গরুর পালটা এসে পড়েছে। আলগা দু-একটা গরু পেছনে আসছে। নিতাই সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচায়–হেই বালিশ-সালিশ–তোরা দুইডা দুই পাকে খাড়াবি আর ঐ বলরামের ছোঁয়াটাক কয়্যা দে পাছত যাইতে, পাছত। ভয় পাস না। বানার জল এখনো আসে নাই, কোনোটা এদিক-ওদিক হইলে হইব না, চিল্লাচিল্লি করিস না।

সেই গরুর পালের মাঝখানে, সবচেয়ে উঁচুতে মোষের কালো কুচকুচে পিঠের ওপর বাদামি বাছুরটা আবার পায়ের ওপর উঠতে যায় আর তার ঘাড় ভেঙে যায়। মোষটা তার গলা উঁচু করে। শিঙ দুটো বাতাসকে বেঁকিয়ে দেয়। সেই কানো শিঙ এতই বাঁকানো যে তলার দিকটা ভিজে কাল হয়ে গেছে কিন্তু উঁচলো বাকটার নীচে জল লাগতে পারছে না, সেটা ধূসরই আছে! মোষটা যেকারণেই হোক একটু অস্তির হয়ে ওঠে–হয়ত ও বুঝেছে তার একটা বিশেষ দায়িত্ব আছে, হয়ত তার মালিকের কোনো হদিশ পাচ্ছে না বলে একটু অনিশ্চিত ঠেকছে তার। সে তার লেজের ঝাঁপট মারে। যার বাছুর সেই গাইটা দাঁড়ানোর সুযোগে জিভটা বাড়িয়ে তুলে বাছুরটাকে চাটতে চাইছিল। দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হচ্ছিল, বুঝিবা পেরে যাবে। মোষের লেজটা তার মুখে ঝাপটা মারে। বোধহয়, চোখেও লাগে। গাইটা চোখ কুঁচকে মুখটা নামিয়ে বা দিকে ঘুরিয়ে নেয়। পালটা এইটুকু মাত্র দাঁড়িয়ে আছে, তার মধ্যেই মাঝখানে এক এঁড়ে সামনের গরুটার ওপর দুই পা তুলে দেয় আর গরুটা সামনে হুমড়ি খায় এক বাছুরের ওপর। এঁড়ে পড়ে যায়। কিন্তু বাছুরটা গিয়ে পড়ে আর-এক বাছুরের ওপর। সে বাছুরটা ভাবে, আগের বাছুরটা তাকে টিসচ্ছে। সেটা শিঙ নামিয়ে তেড়ে যায়। পালের ঐ জায়গাটাতে একটা ধাক্কাধাক্কি পড়ে যায়।

নিতাই হঠাৎ লাফিয়ে সালিশের হাত থেকে তার লাঠিটা কেড়ে নিয়ে এড়েটার দিকে ধেয়ে যায়। এড়েটা বুঝতে পেরেছিল। সেটা প্রথমে ডান দিকে মুখ ঘোরায়, তারপর মুখ গলিয়ে একটু ফাঁক তৈরি করে উল্টো দিকে দৌড় দেয়। নিতাই ছিল পালের বায়ে, আর এঁড়ে দৌড়য় ডাইনে। ফলে নিতাই তার পেছনে ছুটতে পারে না। সে লাঠিটা উঁচিয়ে চেঁচায়–বাদ দে, ওটাক নিবার লাগিবে না, শালা, গরম খাইলেই হই! বানা নাই, ভাসা নাই, শালো বলদা!

কিন্তু বালিতে এডেটা দৌড়তে পারে না। ওদিক থেকে বালিশ দৌড়ে সেটাকে ধরে ফেলে।

নিতাই পালটার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায়, নদীর দিকে পেছন করে–যেন একবার দেখতে চায় কোনো নতুন ব্যবস্থা নিতে হবে কিনা। সে একবার ডাইনে তাকায় নদীর ওপরটা অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার কিন্তু পারে এখনো আবছা অন্ধকার। নিতাই আকাশের দিকে তাকায়–আকাশ একেবারে মাটির বুকের ওপর নেমে এসেছে। পারের ঐ অন্ধকার আর আজ যাবে না। কদিন পর যাবে–এখন তাও বলা মুশকিল। বন্যাটা যেন উত্তরে, নিতাইয়ের বায়ের পাহাড় থেকে নামছে না–সমস্তটা আকাশই বন্যা হয়ে যেন এই চরের পৃথিরীর ওপর এসে পড়েছে। একেবারে পিষে মেরে ফেলবে। নিতাই আবার ডাইনে তাকায়, পুবে। তার লম্বা বাবরি চুলগুলো তার মাথা থেকে সমকোণে উড়তে থাকে। সে বা হাত দিয়ে চুলগুলোকে মুঠো করে ধরে কিন্তু ঘাড় ঘোরায় না। তার চোখে-মুখে জল আর বালির সুচ এসে বেঁধেনিতাই ঘাড় ঘোরায় না। ওদিক থেকে বান আসবে না, কিন্তু ওদিক থেকেই ত বাতাস আসছে, বৃষ্টি আসছে আর চরের পৃথিবীটাকে ঢেকে ফেলে নীচে নামা এই যে-মেঘ তার ওপর দিয়ে, তার ভেতর দিয়ে দিয়ে, আরো বহু মেঘ হু হু করে এদিকে ছুটে আসছে, ছুটে যাচ্ছে আরো উত্তরে। আরো বৃষ্টি হবে, আরো বন্যা আসবে। নিতাই সেই আগামী বৃষ্টি আর আগামী বন্যার আন্দাজ করতে, সামনের গরুর পালটা ভুলে গিয়ে শুধু তার ঘাড়টা ডাইনে ঘোরায়, আকাশে তোলে, আবার নামায়। নিতাইয়ের ধুতিটা যেন তাকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চরে ফেলে দেবে এরকম ভাবে তার গায়ে সঁটে আর খসে।

নিতাই গরুর পালটার ওপর দিয়ে একবার চোখটাকে মেলে দেয়–পালের পেছনে, সেই খেতবাড়ির রাস্তায়, আরো পেছনে গ্রামের সেই রাস্তায়। এত কাছে গ্রামের সেই গাছগাছড়া। অথচ এখান থেকে দেখাচ্ছে যেন ঐ আকাশটাই নেমে এসে গ্রামের বেড়া হয়ে গেছে।

নিতাইয়ের মনে হয় সে এই গ্রামটাকে কি শেষবারের মত দেখছে? ঐ যে-গ্রামটা এখন তার চোখের আড়ালে চলে গেছে, বৃষ্টি আর বাতাসের ধূসরতায় যে-গ্রামটাকে সে দেখতে পাচ্ছে না ভাল করে-সেই গ্রামটাব গাছগাছালি বাড়িঘর জোতজমি সব, সব নদীর ঘোলা জলের তলায় চলে যাবে? নাকি, সে চলে যাওয়া শুরু হয়েই গেল? এখনো চর ডাঙাই আছে, এখনো এই নদীতে বানা ঢোকে নি কিন্তু আকাশ আর বাতাসের যা চেহারা তাতে ঐটুকুই মাত্র বাকি, বাকিটুকু ঘেরা হয়ে গেছে। নিতাইয়ের জীবনে প্রথম স্বাদ যে-নদীর তার ধাত আলাদা, জল আলাদা। আর এ-নদী ত নিতাইয়ের পুরো বয়সের নদী। জলের ভাষা নিতাই তার জলের তৈরি শরীর দিয়ে বোঝে।

নিতাই গরুর পালের দিকে তাকায়। পুরো পালটা যেন তার জন্যে অপেক্ষা করে আছে–সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে। বন্যার ভয়ে গরুগুলোকে বাধে তুললেও অনেক বার হয়ত বন্যা আসে নি কিন্তু গরু সনো মানেই ঘর ভাঙা। এই গরুর পাল ওপারে উঠিয়ে দিয়েই গ্রামের মানুষগুলোকে বাধে তুলতে হবে। কিন্তু নিতাই কেন তুলবে? সকলেই ত আকাশ দেখছে, বাতাস দেখছে। না। নিতাই কাউকে ডাকার আগেই হয়ত দেখা যাবে গ্রামের কিছু-কিছু লোক এখানে এসে জড়ো হয়েছে। হোক। এমনিতেই হবে। নজের গরুর গন্ধ ছাড়া আর কতক্ষণ এই চরের ঘরে বসে থাকতে পারবে?

নিতাই দেখে গরুগুলো পা বদলাচ্ছে। না, আর দেরি করা যায় না। সে সামনের গরুটির গলার দড়ি ধরে নদীর দিকে এগুতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। গরুটাকে ছেড়ে দেয়। তারপর চিৎকার করে বলে, হে-এ সালিশ, মইষটাক নিয়া আয় এইঠে।

বালিশ-সালিশ দু জনেই পালের ভেতরে ঢুকে, হাতের লাঠি আর কঞ্চিটাকে ওপরে তুলে এ-গরুকে সরিয়ে, ও-গরুর পাশ দিয়ে মোষটার কাছে পৌঁছে যায়। তারপর বালিশ মোষের গলার দড়িগাছটা ধরে সেটাকে পাল থেকে বাইরে আনতে চায়। মোষটা মুখ নাড়িয়ে বালিশের হাতটা সরিয়ে দেয়। বালিশ দাঁড়িয়ে মোষের নাক ঘেঁয় মাত্র। সে হাতটা আবার মাথার ওপর তুলে আবার মোষের গলার দড়ি ধরে টেনে সরু গলায় চেঁচিয়ে ওঠে, চল, কেনে, চ-ল, আগত চল্।

মোষটা এবার মাথা ঝাঁকিয়ে বালিশকে সরায় না বটে কিন্তু মুখটা একটুও নড়ায় না। বালিশ চল কেনে, চল বলতে বলতে টানতে-টানতে দড়ি ধরে প্রায় ঝুলে পড়ে কিন্তু মোষের গলার মাংসপেশীতে দড়িটা আরো বসে যায় মাত্র। মোষটা ঘাড় আর-একটু তুলে দেয়–বালিশের নাগালের বাইরে। বালিশ দড়ি ছেড়ে দেয়। মোষটা তার লেজ ঝাপ্টায়।

সালিশ হঠাৎ একটা লাফ দিয়ে দড়িটা ধরে ঝুলে পড়ে চেঁচায়, হে–এ বালিশ, পাছত খোঁচা মার কেনে, হেট, হেট, আগত-আগত।

ঠিক সেই সময়ই নিতাই সামনে থেকে টাকরায় ভি ঠেকিয়ে টরররর আওয়াজ তোলে বার দুয়েক আর চেঁচায়–হে-এ-এ-এ, আয় কেনে–এ-এ-এ। বাতাসের ঝাপ্টায় সে-আওয়াজের অনেকটা ভেসে চলে যায় বটে কিন্তু সেটুকু অন্তত পৌঁছে যায়, যাতে মোষটা বুঝতে পারে তাকে ডাকা হচ্ছে। সে ধীর পায়ে সালিশের টান অনুসরণ করে সারি থেকে বাইরে বেরতে ঘাড় ঘোরায়।

মোষটা খুব ধীর পায়ে চলে, তার পিঠের ওপর বাছুরটা দাঁড়াতে গিয়ে আবার পা মুড়িয়ে ফেলে আর মোষটার পেছন-পেছন গাইটাও বাছুরের দিকে গলা তুলে সারি থেকে বেরিয়ে আসে। সেই সারির পাশ দিয়ে তারা নিতাইয়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। নিতাই মোষের গলার দড়িটা ধরে তাদের বলে, যা, আস্তে-আস্তে পার হবি, হাল্লাগুল্লা করিস না। নিতাই আর দাঁড়ায় নামোষের দড়িটা ধরে নদীর দিকে হাঁটে। এখনো বানার জল ঢোকে নি কিন্তু গত কয়েক দিনের বৃষ্টির জলে ত এই চেনা নদীটাতেও অচেনা গন্ধ লেগে গেছে। জল ঠাণ্ডাও বটে। সারা রাত গোয়ালের গরমে কাটিয়ে জলে পা দেয়া মাত্র যদি গরু বা মোষ ভয় খেয়ে যায় তা হলে সারাটা পালই ছত্রখান হয়ে যাবে, এদিক-ওদিক দৌড়তে শুরু করবে, কোনো-কোনোটা জলে গিয়েও পড়তে পারে। পেটে জল লাগলেই ভয় পেয়ে যাবে–ভাবতে পারে তাকে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

নিতাই জলে নেমে যায়, তার হাতটা মোষের দড়িতে, মোষটাও জলে নেমে কয়েক পা এগিয়েছে, হঠাৎ নিতাই গর্তে পড়ে যায়–পড়ে যাওয়ার আগে সে মোষের দড়ি ছেড়ে দেয়-না হলে মোষটাও পড়ে যেত। নিতাই, ধুস শালা বলে উঠে পেছিয়ে আবার পাড়ে উঠে আসে। পাড় থেকে একটা লাঠি মত তুলে সে আবার তাড়াতাড়ি মোষটার কাছে চলে যায়। মোষটার পা যদি আচমকা গর্তে পড়ে, তা হলে ওর পিঠ থেকে বাছুরটাও পড়ে যেতে পারে একেবারে নদীর মধ্যে। এখন লাঠিটা দিয়ে গর্ত বুঝে-বুঝে নিতাই হাঁটে আর মোষটাকে টানে–নিতাইয়ের বা হাতে লাঠি, ডান হাত মোষের গলার দড়িতে।

মোষটা যেন বুঝেই যায় তাকে খুব আস্তে-আস্তে বুঝেশুনে পা ফেলতে হবে। নিতাই লাঠি ফেলে দেখে পা ফেলে এগবার পর সে পা ফেলে এগয়। সাঁতার জল পর্যন্ত গেলেই মোষটা ভেসে যেতে পারবে। একটু কি বেশি ঠাণ্ডা লাগছে জল, এখন? বানার জল কি ভেতরে-ভেতরে ঢুকে গেছে। মোষটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে–আ-আ-আ-আঁ আওয়াজ তোলে। মোষ জলে ভয় পায় না, বরং আরাম পায়। সে জন্যে মোষটাকে দিয়ে এই পাল পার করানোর সুবিধে অনেক। হে-এ টরররর তালু দিয়ে আওয়াজ তোলে নিতাই। কিন্তু মোষটা নড়ে না। নিতাই পেছিয়ে গিয়ে মোষের পিঠের বাছুরটাকে দেখে-বেটা একটা পা পিঠ ছাড়িয়ে বাইরে বের করে দিয়েছে, ফলে তার শরীরটাও গড়িয়ে এসেছে, তার ঠিক পেছনে সেই গাই। এটা পেছনে আছে বলেই গোলমাল হচ্ছে। নিতাই লাঠিটা দিয়ে গাইটার মুখে মারে–শালো, গা চাটিবার ধরিছেন?

গাইটা ঘাড় নামিয়ে মুখটা সরিয়ে নেয়। নিতাই জলের মধ্যেই উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে পা-টা সহ বাছুরটাকে ভেতরে ঠেলে দেয় আর সঙ্গে-সঙ্গে মোটা চলতে শুরু করে। শুরু করে কিন্তু থেমে যায়। নিতাই আবার সামনে গিয়ে বা হাতে মোষের দড়ি ধরে। টাকরায় আওয়াজ তোলে–টবর রর-অ। মোষটা আবার পা ফেলে।

কিন্তু লাঠিসহই নিতাই একেবারে হুড়মুড় করে পড়ে যায়। পড়ে গিয়ে বোঝে ডুবজল। লাঠি ফেলে দিয়ে জলে হাতটা মারতেই সে স্রোতের টানে সরে যায়–আইস্যা গেছে রে, বান ঢুইক্যা গিছে। কিন্তু একটা ডুব দিয়েই নিতাই তার শরীরটাকে কজা করে ফেলে। সে চেঁচায় না। ভয় পেয়ে যাবে সবাই। এখন পালের অর্ধেকটাই জলে। এইবার মোষটা ডুবজলে নামবে। স্রোত ঢুকেছে কিন্তু জল এমন কিছু বাড়ে নি। নিতাই পা দিয়ে আন্দাজের চেষ্টা করে, যেখান থেকে সে পড়ে গিয়েছে সেই জায়গাটা কোথায়। পায় না। মোষটা দাঁড়িয়ে আছে একেবারে ডুবজলের কিনারায় হাঁটুজলে। নিতাই কী করে বোঝাবে, আর-এক পা পরেই ডুবজল, স্রোতের জল। যদি বোঝানো যেত তা হলে মোষটা সে ভাবেই নিজেকে ভাসিয়ে দিত। কিন্তু বোঝাবে কী করে নিতাই? মহিষটা ত ভাবব্যার ধরছে আস্তে-আস্তে ভাসব্যার লাগবে। গজেনকে ডাকবে? কিছু ঠিক করতে না পেরে আর স্রোতের ধাক্কায় সে যাতে সরে না যায় সে জন্যে, নিতাই হঠাৎ মোষটার বা পাটা হাটুর নীচে চেপে ধরে, যেন ওটা একটা খুঁটি। মোষটা তাতে কিছু বোঝে। সে আ-আ-আ-আঁ করে একটা ডাক ছেড়ে নিতাইয়ের হাতসহ বা পাটা তোলে, ও, নিতাই বোঝে, ডুবজলের দিকে এগিয়ে দেয়। সেই পা ভোলার ভঙ্গিতেই নিতাই বুঝে ফেলে মোষটা জেনে গেছে আর-এক পা পরেই ডুবজল। সে মোষের গলার তলা থেকে টরররর-অ করে ডেকে ওঠে। ডাকতে-ডাকতে নিতাই দেখে মাথার ওপর নেমে আসা আকাশটাতে নিজের মেঘের মত গলাটা বাড়িয়ে দিয়ে মোষটা তার ডান পাটাও ওঠাল আর নিমেষে চওড়া কাধটাকে জলের ভেতরে আরো চওড়া করে গলাটা তুলে ফেলল। সামনের পাদুটোকে যে জলের মধ্যেই একটু উঁচু করে জলে ভেসে উঠল, তাতেই তার পেছনের পা দুটো লম্বা হয়ে গেল, পিঠের উচ্চতা কমে গেল আর জলের মধ্যে সেই পিঠের ওপর বাদামি বাছুরটা ভাসতে-ভাসতে চলল, তার একটুও ঝাঁকি লাগে না। নিতাই মোষটার গলা জড়িয়ে ভেসে ওঠে, তারপর তার পাশে-পাশে সাঁতার কাটে–জিভে আওয়াজ তোলে–টরররর-অ।

.

গরুর পালের পাড়ে ও বাঁধে ওঠা

মাঝখানের এই গভীর খাতটুকু বেশি চওড়া নয়। মোষটার পাশে-পাশে সাঁতার দিতে-দিতে নিতাই বোঝে, নিশ্চিতভাবেই তার আগের বোঝাটা বোঝে-বানার জল ঢুকে গেছে। সামনের মোষটা এরকম ভেলার মত ভেসে যাওয়ায় পেছনের গরুগুলোও গা এলিয়ে ভেসে থাকে। কিন্তু, নিতাই যেমন তার শরীর দিয়ে বোঝে, এই এতগুলো পশু তাদের এতগুলো শরীর দিয়ে নিশ্চয়ই তার মতই, বা তার চাইতেও বেশি করে বুঝছে এতক্ষণ তারা হাঁটু জল দিয়ে হেঁটে এসে এই যে-গভীর জলে পড়ল সেটার রকম-সকম আলাদা। কিন্তু সেটা বুঝে উঠতে-উঠতেই মাঝখানের সোঁতাটা শেষ হয়ে যায়। মোষটা পায়ে মাটি পায়, মাটি পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, কিন্তু পাড়ে ওঠার জন্যে পা তোলে না। নিতাই একটু এগিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, দাঁড়িয়ে পা দিয়ে দিয়ে অনুভব করে এখানেও জলের নীচে পাড় ভেঙেছে। সে দাঁড়িয়ে দেখে, এই গরুর পালের গায়ে লেগে সোঁতার জলটা একটু আবর্তিত হচ্ছে আর ফেনা উঠছে। গরুগুলোর ফাঁক দিয়ে বা থেকে ডাইনে জল বয়ে যাচ্ছে–একটু ফেনা তুলে।

নিতাই পায়ে-পায়ে পাড়ের আন্দাজ নিয়ে পালটা থেকে একটু উত্তরে সরে। সেখানে জায়গা পেয়ে যায়। নিতাই সেখানে দাঁড়িয়েই ডাকে আয়-আয়, আর জিভে টর-র-র-র আওয়াজ তোলে।

মোষটা প্রথমে তাকিয়ে দেখে-ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে, তারপর আস্তে ডাইনে ঘোরে। তার পেছন-পেছন গরুগুলোও পা ফেলে। একটু ফাঁক হতেই একটা শব্দ তুলে স্রোতের জল বেরিয়ে যায়–এতটা স্রোত এই সোঁতায় কখনোই থাকে না। নিতাই জলের বেরিয়ে যাওয়া দেখে অনুমান করে কতটা বেগে জল এখানে ঢুকছে। বানা এসে গেছে।

নিতাই একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মোষটা কাছে এসে পঁড়াতে সেই অন্যমনস্কতা নিয়েই সে তার গলার দড়িয়ে হাত দিয়ে আবার স্রোতের দিকে তাকায়–পালের গরুগুলোর গায়ে কত জোরে স্রোতটা আছড়ে পড়ে, যেন সেটা আন্দাজ করতেই। মোষটা তার মাথা ঝাঁকিয়ে নিতাইকে মনে পড়িয়ে দেয়–তাদের এখন পাড়ে ওঠার কথা। নিতাই তাড়াতাড়ি মোষটার আড়াআড়ি দাঁড়ায়, দুহাত দিয়ে ওপরের বাছুরটাকে ধরে, চেঁচিয়ে ওঠে, হে এ গজেন, অমূল্যা, ধর, এইখানে আয়।

নরেশ নিচু স্বরে জানায়, তুল না তুই, আছি।

নরেশ কখন সেই দক্ষিণ পাড় থেকে এই এতটা রাস্তা পার হয়ে এসে এপারে উঠে গেছে? তা হলে তিস্তা ব্রিজেও কি বানের ধাক্কা লাগতে দেখে এসেছে নরেশ? নিতাই ভাবে বটে কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে পারে না।

মোষটা আস্তে করে তার সামনের বা পা তোলে। একটু সময় নিয়ে সে ডান পাটাও পাড়ে তুলে দেয়। তার পর একটু সময় নিয়ে, বা, বাছুরটাকে সামলাবার জন্যে নিতাইকে একটু সময় দিয়ে, অত বড় শরীরটাকে একটা ঝাঁকিতে পাড়ের ওপর তুলে, পেছনের পা দুটো দ্রুত টেনে বোল্ডার আর জলের মাঝখানের সঙ্কীর্ণ জায়গাটাতে দাঁড়িয়ে পড়ে।

জলের সোঁতাটা, বা নদীর শাখাটা পেরবার চাইতেও নদীর পাড় থেকে বাঁধের ওপর ওঠাটা গরুর পালের পক্ষে কঠিন। বাঁধের মাটি বৃষ্টিতে যাতে ক্ষয়ে না যায় আর স্বাধ আর নদীর মাঝখানের পাড়টুকু যাতে স্রোতে না ভাঙে সেজন্যে বোল্ডার দিয়ে পুরোটা বাধানো-সে বোন্ডার আবার তারের জালে ঢাকা। পাড়ের বোন্ডার আর জলের সীমানাটুকুতে একফালি জমি। অনেক জায়গায় সে জমি ভেঙে গেছে, অনেক জায়গায় জলসহ বোল্ডার একেবারে জলের মধ্যে ঝুলে পড়েছে। ঐ সঙ্কীর্ণ জায়গা দিয়ে গরুর পালটা চলতে পারবে না। আর বোল্ডারের ওপর পা দিয়ে গরুগুলো এমনিতেই উঠতে পারবে না–তাদের ক্ষুর বোল্ডারে পিছলে যাবে; তারের জালের জন্যে আরো পারবে না–তারে পা আটকে যাবে।

গজেন আর নরেশ আগেই একটা ডাঙার কাছে দুটো সমতল বোল্ডার পাশাপাশি দিয়ে সিঁড়ির মত করে রেখেছে। সেটা দিয়ে উঠে তারের জালে আটকানো বোল্ডারগুলোর দুটো সারি পেরতে পারলেই একটা বোল্ডারহীন নালী পাওয়া যাবে। নালীটার ওপরের দিকে আবার বোল্ডার ও তারের জাল। একমাত্র এই পথটা দিয়েই গরুর পালটাকে তোলা যাবে। গজেন আর নরেশ মোষটাকে সেদিকেই নিয়ে যায়–গজেন মাটিতে মোষের গলার দড়িটা-ধরে, আর নরেশ বোল্ডারের ওপর দাঁড়িয়ে দেখে কোনো মোষটা আবার পাড় ভেঙে পড়ে যায় কি না।

জায়গাটা এতই সরু যে এমনি দেখলে মনেই হত না ওখান দিয়ে কোনো গরুর পক্ষে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু গরুগুলো পা ফেলে ঘেঁষে-ঘেঁষে–তাতে তাদের পায়ে-পায়ে একটু লেগেও যায় বটে কিন্তু এতই আস্তে যাচ্ছে যে কোনো গরু হুমড়ি খায় না। তারা বোল্ডার ঘেঁষেই চলেপেটটা বোল্ডারে ঘষে যায়, এইমাত্র। নরেশ কোমর ভেঙে গরুগুলোর পিঠ ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেয়।

জলের ভেতর থেকে নিতাই চিৎকার করে বলে, হে-এ নরেশ, একখান্ বোল্ডার ফেল্যা এইখ্যানে, মাটি ভাইংগ্যা গিছে। নরেশ দেখে, প্রফুল্ল পালের বুড়ি ও ধুমসো গরুটাকে নিতাই পাড়ে তোলার চেষ্টা করছে–সে গরুটার সামনে, বালিশ আর সালিশ দুই পাশে আর বলরামের ছেলেটা পেছনে। বাকি গরুগুলো জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে।

আরে আরে–খাইছে রে খাইছে–ঐ বুড়িটারে তুললি ত এই ফালি দিয়্যা এক পাও আগাইবার পারব না, হে-হে-হে, বলতে বলতে নরেশ বোল্ডার থেকে ফালিটুকুতে নামে আর নেমে চেঁচায়–এই ন্যাতাই, আরে বুড়িটা পাশে রাখ, শ্যাষে তুলিস, চেঁচাতে-চেঁচাতে নরেশ গরুগুলোর পিঠে হাত ছুঁইয়েই যায়, ঘাড় নদীর দিকে ঘুরিয়ে রেখে।

নিতাই নরেশের কথার কোনো জবাব দেয় না। বাচ্চা দুটোকে বলে–সরায়্যা নে; সরায়্যা নে। জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে বালিশ-সালিশ দু জনেই দু দিকে টানে। বুড়ি গরু বোধহয় নির্দেশটা বুঝতে পারে–সে সালিশের দিকে দু পা এগিয়ে যায়। নিতাই বলরামের ছেলেটাকে বলে–আ, ওগুলারে আ-ন। বলরামের ছেলে পেছনের গরুটাকে এগিয়ে দেয়। ঐটুকু বিরতিতে নিতাই দেখে, গরুগুলোর পায়ের চাপে পাড়টা এত ভেঙে ও ভিজে গেছে যে-কোনো গরু পড়ে যেতে পারে। সে বালিশকে বলে, আউগা, আর এটটু আউগা। সালিশ দড়ি ধরে টেনে দুই পা যেতে না-যেতেই ধপ করে গভীর জলে পড়ে যায়। বালিশ তীব্র শিশুকণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে, অ কাহা, সালিশ পইড়্যা গিছে, আগাই কুথায়?

নিতাই খাড়া বলে কিন্তু তাকিয়েও দেখে না, প্রফুল্ল পালের বুড়িটাও দাঁড়িয়ে যায়। সালিশ উঠে আসে। নিতাই দু পা পরে এক জায়গায় নতুন করে গরুগুলোকে পাড়ে তুলতে গিয়ে দেখে পাড়ের গরুগুলো এগচ্ছে না, দাঁড়িয়ে আছে, এখন কোনো গরু তুললে সেটা দাঁড়ানোরও জায়গা পাবে না।

নিতাই তার বাবরি চুলের রাশি বা থেকে ডাইনে ফেলে চিৎকার করে ওঠে, তুরা কি ঐখানে সঁজা টাইনবার ধরছিস নাকি, এই নরেইশ্যা।

নরেশ আধখানা ঘাড় ঘুরিয়ে বা হাত তুলে নিতাইকে থামতে বলে। নরেশ ঘাড় উঁচু করে দেখে পিঠের বাছুরটাকে নিয়ে মোটা ঐ নালী বেয়ে উঠতে পারছে না। আরে, শালা গজেন, তুর মাথা না শালকাঠ? বলতে বলতে নরেশ এক লাফে বোল্ডারের ওপর উঠে ঐ দিকে ছুটে যায়, শালা, পেরেক ঢোকে না মাথায়? বাছুরটাকে নামায়্যা থো বোল্ডারের উপর।

নরেশের চিৎকার শুনে গজেন পেছন ফিরে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল। নরেশ গিয়েই মাটিতে নেমে তার লম্বা হাতে বাছুরটাকে টেনে মোষের পিঠের কিনারায়, আনে, গজেনকে বলে, ধর মাথা।

আরে, হাত দিয়্যা ঘ্যার পাই না, যে– গজেন বলে।

আরে শালা বাইটকুল, নরেশ হেসে ফেলে, টান, বোল্ডারের কাছে টান, টাইন্যা আন।

গজেন মোষের গলার দড়ি ধরে টেনে বোস্তারের কাছে নিয়ে আসে। নরেশ আর গজেন বোল্ডারের। ওপর উঠে পড়ে মোষের পিঠ থেকে বাছুরটাকে এক টানে নামাতে গিয়ে বোঝে পিছলে যেতে পারে। পেছনে সেই মা-গাইটা হঠাৎ হা-স্বা ডেকে ওঠে। নরেশ মোষটার পিঠে তার ডান পাটা দিয়ে দু বার চাপ দিয়ে যখন বোঝে মোষটাও বিপরীত চাপে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন ওয়ান টু থ্রি বলে এক ঝুঁকিতে বাছুরটাকে বোল্ডারের ওপর এনে আস্তে করে নামায়। পেছন থেকে বাছুরটার মা-গাই হামলে পড়ে–এতক্ষণে সে বাছুরটাকে জিভের আওতায় পেয়েছে। গজেন মোষের দড়ি ধরে নালী বেয়ে বাঁধের ওপরে উঠে যায়। নরেশ ছুটে যায় নিতাইয়ের দিকে।

.

এই নালীটা তৈরি হয়ে গেছে একটু অদ্ভুত কারণে। সাধারণ ভাবে বাঁধের ওপর থেকে কোনো জল স্রোতের মত গড়িয়ে পড়া নিষেধ। যদি তেমন স্রোত কোথাও কোনো-কোনো কারণে তৈরি হয়ে যায়, তা হলে সেটা তখনই বন্ধ করে দেয়ার কথা। নইলে বাঁধের মাটি ক্ষয়ে যাবে, বাঁধের তলার মাটি আলগা হয়ে যাবে। কিন্তু এই নালীটা তেমন কোনো স্রোতের ধাক্কায় তৈরি হয় নি বরং বাঁধের গা এখানেও তারের জালে আঁটা বোল্ডার দিয়ে বাঁধানো।

নদীর স্রোত বন্যার সময় যাতে সরাসরি বাঁধের গায়ে ধাক্কা না মারে, সে জন্যে, বিশেষ বিশেষ জায়গায় শালখুটির লম্বা খাঁচা নদীর ভেতর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে–যাকে বলে স্পার। সেই স্পারগুলোর ভেতরটাও বড়বড় বোল্ডার দিয়ে ভরা। জলস্রোত সেখানে ঘা খেয়ে ঘুরে যায়, ঘুরে যাওয়ার সময় কিছুটা বালি ও মাটি ফেলে রেখে যায়। তাতে পাড়টা আর-একটু চওড়া হয়, নদী একটু দূরে সরে যায়। যখন নদীতে বন্যা আসে তখন এসব ব্যবস্থার সুফল বোঝা যায়–অনেকক্ষণ পর্যন্ত স্পারের ধাক্কায় নদীস্রোত উল্টোদিকের চরে, নিতাইদের চরে গিয়ে ধাক্কা মারে।

কিন্তু ৫৮ সালে বাঁধ তৈরির পর ৬২-৬৩ সালে দেখা গেল–আর সব জায়গা থেকে জল সরে গেলেও এই জায়গাটিতে একটা ছোট্ট খাড়ির মত থেকে যাচ্ছে। তাতে কারো কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না–কারণ জল সরে গেলে এরকম একটা তিরিশ-পঁয়তিরিশ হাত খাড়ি থাকলেই বা কী আর না থাকলেই বা কী। কিন্তু তার পরের বৎসর বন্যায় এই খাড়ির ভেতর দিয়েই স্রোত গিয়ে:বাঁধের গায়ে সরাসরি ঘা মারল। সেবার বৃষ্টি বেশি হয় নি। সেই শীতকালেই বোল্ডার দিয়ে নদীর পাড়টাকে বাধিয়ে দেয়া হল–যাতে খাড়ির ভেতর জল ঢুকতে না পারে। খাড়িটা একটা জলহীন নালীর মত থেকেই গেল! ধীরে-ধীরে বুনো গাছগাছড়ায় ভরে গেল। কিন্তু একেবারে বুজে গেল না।

এখন জগদীশের মোট তার পিঠের বোঝা নামিয়ে সেই খাড়ি বা নালীর পাশ দিয়ে পা ফেলে-ফেলে উঠতে লাগল। গজেন মোষটার গলার দড়ি ধরে আগে-আগে যাচ্ছিল। দড়িতে কোনো টান লাগছিল না। মোষটা তা হলে নিজের মত করেই ধীরেসুস্থে উঠছে। গজেন দড়িটা ছেড়েও দিতে পারে।

কিন্তু ছাড়ে না। তারের জালেঘেরা বোল্ডার আর খাড়ির সীমানার মধ্যে জায়গাটা, মানে যে-জায়গাটা দিয়ে পালটা উঠবে, সেটা তত চওড়া নয়, যদিও নদীর পাড়ে আর বোল্ডারের মাঝখানের যে-পথটুকু ওরা পার হয়ে আসছে, তার থেকে চওড়া। তার ওপর আবার চড়াই ত বটেই। কোনো গরু বা বাছুর যদি এখান থেকে ঐ গর্তটার মধ্যে পড়ে যায় তা হলে সেটাকে ঐ গর্ত থেকে ভোলা সাত হাঙ্গামা। একেবারে ঘাড় মটকে যদি না পড়ে তা হলে মরবে না হয়ত, কিন্তু ঠ্যাংট্যাং ভেঙে যেতে পারে। ঘাড়ও যদি না মটকায়, ঠ্যাঙও যদি না ভাঙে তা হলে কোনো গরুর অবিশ্যি ওখানে থাকতে আপত্তি হবে না-গাছগাছালিও আছে, জলও আসবে না। কিন্তু এখন, চর খালি করার এই শুরুতেই এসব গোলমাল শুরু হওয়া ভাল নয়।

গজেন মোষটার সঙ্গে-সঙ্গে আধাআধি পর্যন্ত উঠেছে, তখন ফিরে তাকিয়ে দেখে গরুর পালটা মন্থর গতিতে পেছন-পেছন আসছে বটে কিন্তু তাদের গা থেকে এত জল ঝরছে যে পুরো চড়াইটা ভিজে গেছে। ভেজার রং দেখে বোঝা যায়–পিছল হয়ে গেছে। এই খাইসে, এ্যালায় ত গর্তত পড়ি যাবা ধরিবে, গজেন মোষটাকে থামিয়ে দেয়, তারপর নদীর দিকে মুখ করে দাঁড়ায়। নিতাই আর নরেশ এখনো নদীর পাড়ে। গজেন আর মোষটা থেকে শুরু করে সেই পাড় পর্যন্ত একটা করে গরু বা বাছুরের লাইন। নদীর মধ্যে পালের আরো কিছু গরু-বাছুর। এই পুরো লাইনটা এগনোর সঙ্গে-সঙ্গে পাড়ে একটা-একটা করে উঠছে।

হে-এ-এ নিতাই, গজেন চিৎকার করে ওঠে। সে চিৎকারটা বাঁধের ওপর দিয়ে বিপরীত দিকে চলে যায়। তা হলে কি মোষটাকে দাঁড় করিয়ে রেখে বলে আসবে? শালা অমূল্যা কোটত গেইল? গজেন এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে বালিশ-সালিশ, বলরামের ছোঁয়া, আরো গোটা তিনেক ছাওয়াহোটর ঘর বাঁধের ওপর গরুর খোটা পোতা শুরু করেছে। আর, বোল্ডারের ওপর দিয়ে মাথায় ঘাসপোয়ালের বস্তা নিয়ে দুইটা আখোয়াল বাধে উঠছে। গজেন চিনতে পারে–অশ্বিনী রায়ের মানষি আর অমূল্যাদের মানষি। গজেন সেখানে দাঁড়িয়ে চেঁচায়–হে-ই বাউ, এইঠে আসেন কেনে। লোকদুটি গজেনের কথা শুনতে পায় না কিন্তু মুদ্রা দেখতে পায়। তারা বোল্ডার ভেঙে বাধে উঠছিল, গজেনের ডাক শুনেসিধে ডাইনে ঘুরে গজেনের দিকে আসতে শুরু করে। বাঁধের ঢাল দিয়ে আড়াআড়ি হাঁটা কঠিন। ওদের ডান-পাটা নীচে, বাঁ-পাটা ওপরে।

কিন্তু মোষটা দাঁড়িয়ে পড়ায় গরুর লাইনটাই ত দাঁড়িয়ে পড়েছে। ফলে, পাড়ে আর নতুন গরু তোলার জায়গা না পেয়ে নরেশ ঘুরে তাকায়, নিতাইয়ের চুল নদীর ভেতর থেকে জেগে ওঠে। ওরা তাকিয়ে কিছু বুঝতে চায়। গজেন হাত তুলে অপেক্ষা করতে বলে। লোকদুটি এগিয়ে আসে। নরেশের চিৎকার বাতাসের সঙ্গে এসে ঝাপটা মেরে উঠে যায়–ঐখানে খাড়ায়্যা-খাড়ায়্যা কি মৃতব্যার ধরছিস নাকি?

গজেন সে কথার কোনো জবাব না দিয়ে লোকদুটিকে বলে–এইঠে পিছল হয়্যা যাছে, খাড়ি করি ছাড়িবার ক, যা কেনে। লোকদুটি ওখান থেকে ঢালটার দিকে একবার তাকিয়েই সমস্যাটা বুঝতে পারে। গজেনের কথা শেষ হওয়ার আগেই দুজনে বোল্ডার দিয়ে সরসর করে নেমে যায়। অশ্বিনী রায়ের মানষিটা, আষাঢ়, নেমেই যায় কিন্তু অমূল্যাদের মানষিটা আবার উঠে আসে। সে বাঁধের ওপর উঠে মাথার বস্তাটা ফেলে আবার বোল্ডার দিয়ে নদীর দিকে ছোটে।

আষাঢ়ু নরেশকে গিয়ে বলতেই নরেশ হাতের ইশারায় জানায়, ঠিক আছে, এখন গজেন মোষটাকে নিয়ে উঠুক। আষাঢ়, আব অমূল্যার মানষিটা আবার বোল্ডার দিয়ে গরুর লাইনের দিকে আসে। আষাল্ড অমূল্যার মানষিটাকে কিছু বলে, সে তড়াক করে মাটিতে নেমে পাড়ে দাঁড়ানো গরুগুলোর পা থেকে জল কাচিয়ে ফেলতে শুরু করে আর আষাঢ় বোল্ডারের ওপর, বাঁধের ঢালুতে যে-সব আগাছা জন্মেছে সেগুলো ছিঁড়ে-ছিড়ে ঢালটাতে একবার ছড়িয়ে দিয়ে দ্বিতীয়বার আনার জন্যে পেছন ফিরতেই গজেনের হা-হা, হাসির আওয়াজে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে গরুগুলো সেই সব ঘাসপাতা জিভে তুলে চিবুতে শুরু করে দিয়েছে। সে তখন আবার ঘুরে, হেঁটে, এই লাইনটার দিকেই এগয়–গজেনের দিকে জিজ্ঞাসু মুখ তুলে। গজেন হাতের ইঙ্গিতে তাকে বাঁধের ওপর যেত বলে। মোষের দড়িটা ধরে নিজে পা বাড়ায়।

বাঁধের ওপর থেকে খোটা পোঁতার আওয়াজ মৃদু আসছে–আওয়াজের বাকিটা ত বাতাসে রংধামালির দিকে চলে যাচ্ছে। এখন ত গরুবাছুরগুলো এসে বাধে উঠল। এখনই যে-হ্যাঁর গরু-বাছুর আলাদা করে নেবে, আলাদা খোটায় পুঁতবে। যাদের অনেকগুলো গরু, নানা রকমের নানা কাজের গরু–তারা সেই অনুযায়ী গরুগুলোকে ভাগ করে খোটায় পুঁতবে। অমূল্যা আর অশ্বিনী রায় ত মানষি পাঠিয়েই দিয়েছে, জগদীশ বারুই এরকম পাঠায় না–সে জানে তার গরুমোষ দেখার লোকের অভাব হবে না। কিন্তু ঐচরে প্রতিদিনের কাজে যাদের সঙ্গে দেখা হয় না, তারা বন্যার মুখে এই বাধে গরুবাছুর পরিবারসহ এসে উঠলেও ত আর একেবারে মিলেমিশে যেতে পারবে না। শেষে দেখা যাবে-পাড়া অনুযায়ী এখানেও ভাগ হয়ে আছে। কিন্তু গরুর বেলায় পাড়াভাগে চলবে না–যার-যার গরু সে আলাদা-আলাদা করে নেবে। প্রথমে এল গরু। তারপরই আসছে গরুর খাবার আর দেখাশোনার লোক–যার মানষি আছে তার মানষি, যার ছাওয়াছোট আছে তার ছাওয়াছোট। যার-যার গরু তারার মত আলাদা হয়ে যাবে।

ভেঙে পড়া দিগন্ত থেকে উচ্ছন্ন বাতাস আর লোপাট আকাশ থেকে বৃষ্টির তীরে বিদ্ধ হতে-হতে এতক্ষণ যে গরুমোষবাছুরের পাল সমবেত এক বাঁচার প্রয়াসে এই বাঁধ পর্যন্ত ছুটে এল, তাদের ওপর ব্যক্তিস্বত্বের ভাগাভাগি কায়েম রাখতে বাঁধের ওপর খোটা পোতা হচ্ছে। সেই খোটা পোতার আওয়াজ বন্যার বাতাসে বাহিত হয়ে উড়ে যাচ্ছে।

গজেনের হতে ধরা জগদীশের মোষের বাকা শিং আকাশের ধূসর মেঘে জেগে ওঠে।

.

চর দুই নম্বর

নিতাইদের চর থেকে নদী হয়ে মাইল আট আর জলপাইগুড়ি শহর হয়ে মাইল বার ভাটিতে এই দুই নম্বরটাও ত চর–লোকের মুখে-মুখে। আসলে এটা তিস্তার এই খাত বছরে আট মাসই শুকনো থাকে। বাকি চার মাসও শুকনো থাকতে পারে যদি তিস্তা অন্যদিক দিয়ে বয়ে যায়। তেমন পরপর তিন বছর গেল বলেই না এইখানে লাঙল নামল, মানুষজন নামল; তারপর ঘরও উঠল, কলাগাছও ফাপল, আর একসারি সুপুরি গাছও সাইসাই করে বাড়ল। কিন্তু, তারপরই আবার একবার তিস্তা আর-সব খাত ছেড়ে দিয়ে এই একটা খাতের দিকেই ছুটল। এরকম করতে করতে গত বছর দশেকে এখন এই নিচু চরের কোনো-কোনো জায়গা উঁচু হয়ে গেছে, কোনো-কোনো জায়গা ভোবা হয়ে আছে। আর দশ বছরে জমির ভাগাভাগিটাও পরিষ্কার। শীতকালে পুরো জমিতেই রবিচাষ হয়। গমও আজকাল ভাল হচ্ছে। যদি এরকম ভালই হয়, তা হলে অন্য রবি চাষ না করে গমই করবে সবাই। উঁচু জায়গাগুলো থাকে আমনের জন্যে। উঁচু, মানে এই চরের নিচু জমির চাইতে উঁচু কিন্তু, নদীর পাড়ের অনেক নিচু।

জমির উঁচুনিচুর হিশেব যদি কষা যায়, তা হলে এই দুই নম্বর আসলে তিস্তারও নীচে। কিন্তু তিস্তার বড় খাত আর দুই নম্বরের মাঝখানে বিরাট চওড়া কচুয়া–সেখানে পাকা বাড়ি পর্যন্ত আছে। জমির ঐ আড়ালটা থাকায় এখানে নদীর তলায় বসে নদী চাষ করা যায়। পাহাড়ের বৃষ্টিতে যদি ধস নামে, বন্যা নামে, তা হলে ওপর থেকেই তিস্তার জল আরো নানা খাত দিয়ে ছড়ায়। এই খাত দিয়েও। ওপরের বন্যার জলেই এই খাতে বান ডাকে। এর সঙ্গে বড় তিস্তার কোনো যোগ নেই। সে যোগ হলে তিন-চার গুণ লাল নিশানাতেও কুলোবে না। তেমন যে হয় না, তা নয়, অন্তত পনের যাদের বয়স তারা এখনো তেমন দেখে নি।

নদীর জমি যখন চাষে আসে তখন ষোল আনার ওপর আঠার আনা লাভ। কারণ, এ জমির কোনো মালিক নেই। যখন জমি জলে ভেজা, পা রাখলে দেবে যায়, থাকার জন্যে একটা বাঁশের মাচান বানাতে বঁশ পোতা যায় না, বাঁশ মাটির ভেতরে সেঁদিয়ে যায়, জল শুকোয় নি, একটু আঁচড়ালেই নীচের জল বেরিয়ে পড়ে, তখন যে গিয়ে প্রথম জমিটাতে নামে তার চোখের হিশেব আর মনের হিশেব হতে হয় নির্ভুল। এক কোনো পাগল-ছাগল যেতে পারে–চার পুরুষ ধরে জমি হারাতে-হারাতে এখন বটগাছের তলা ছাড়া যার নিজস্ব কোনো ছায়া নেই সে এই জমিটাকে নিজের জমি বলে ভাবতে পারে। তার পাগলামির সঙ্গে জমির একটা কার্যকারণের যোগ ঐতিহাসিক বলেই এটা সম্ভব হতে পারে, হয়ও অনেক সময়।

আর, নয় ত ঠিক এর উল্টো। তিস্তা কবছর পর-পর খাত বদলায় তার একটা আন্দাজি হিশেব যার বাপ-ঠাকুর্দার কাছ থেকে জানা আছে বা পর-পর কবছর এই খাতে জল কত পরে এসেছে ও কত আগে বেরিয়ে গেছে–এ হিশেব যার মনে আছে–তেমন হিশেবনিকেশ টাকাপয়সার মানুষ, আধপাগলা কাউকে দু-চার টাকা দিয়ে, এখানে বসিয়ে দিতে পারে জায়গাটার সম্ভাব্য দখল রাখতে।

চরের জমির ত কোনো মালিক নেই–তাই যেন, ভগবানের জমি। যে আগে দখল নিতে পারবে, জমি তার। যে যতটা দখল নিতে পারবে, ততটাই তার। মণ্ডলঘাট আর কচুয়ার মাঝখানে দুই নম্বর। এখন মণ্ডলঘাট পর্যন্ত তিস্তার বড় বাধ দেয়া হয়েছে–একেবারে পুরনো পাহাড়ে হাট-এর মাঝখান দিয়ে। মণ্ডলঘাট চৌপত্তি থেকে এই বাধ একটা গোল হয়ে গেছে যেন। এ বাধটা যেন চৌপত্তিরই একটা অংশ। বাধে ওঠা যা, চৌপত্তিতে ওঠাও তাই। মাঝখানে জলাজঙলা কিছু জায়গা আছে। বানবন্যা ছাড়া এ বাধে কেউ আসে না, আর বানবন্যাতেও আসে ত দুই নম্বরের মানুষজনই। বাধটা ফাঁকা বলে, জঙ্গলটঙ্গল পরিষ্কার করে এখানেই ক্যাম্প হয়। এ চরের দখল রাখলে পরে এটা মণ্ডলঘাটেরই অংশ হয়ে যেতে পারে। আর কচুয়ার পশ্চিম দিয়ে আর-একটা বাধ_গেছে সেই বোয়ালমারির দিকে। তার মানে দুই নম্বরটা পড়ল একেবারে দুই বাঁধের মাঝখানে।

দুই বাঁধের মাঝখানে ত এক নদীই থাকতে পারে। ইনজিনিয়াররা নাকি দুই দিকে বাঁধ দিয়ে ইচ্ছে করেই এই জায়গাটিকে শুকনো রেখে দিয়েছে যাতে সাংঘাতিক বন্যার সময়, যখন পাহাড় ভেঙে নীচে নামবে, পাহাড়ের মাথা দিয়ে জল ঢুকে তলা দিয়ে বেরিয়ে আসবে, ফরেস্টকে ফরেস্ট উপড়ে আসবে, যখন বোল্ডারগুলো গড়াতে-গড়াতে নামে যেন ভূমিকম্প আসছে, যখন গোটা সাতেক লাল নিশানা রেডিওতে বাজে, ও স্থানীয় সংবাদে হেলিকপ্টার ওঠে ও মিলিটারি নামে তখন নদী বেরবার একটা রাস্তা পায়।

এ রকম একবার ঘটেছিল বটে আটষট্টিতে কিন্তু আবার কবে ঘটবে কেউ জানে না। ততদিন নদীর জন্যে এই খোলা পথটা আটকে দিয়ে আবাদ হবে। যেখানে জমি, যেখানে চাষ-আবাদ সেখানেই মালিকানা, দখল, ভাগাভাগি। নদী নিয়েও সেই মালিকানা, সেই দখল, সেই ভাগাভাগি, আছে। শুকনো হলেও এ ত নদীই।

কিন্তু নদী হলেও এ ত মাটিও বটে। মাটি ত আর নদী নয় যে বয়ে যাবে। মাটি মানে ত গাছ। তাও ছোটখাট ফুললতাপাতা না, কাটাগাছ না, ঝোপঝাড়ও না। মাটি মানে মহীরুহ গাছ–যেখানে আছে, সেখানেই আছে, বাকলের ওপর বাকল জমে, সেখানেই ডালে ঝুরি নামে, সেখানেই ডালে-ডালে সব পরগাছা বাসা বাধে, সেখানেই মাটির ওপর মাটি পড়ে, সেখানেই মাটি উঁচু থেকে আরো উঁচু হয়, লোকে বলে মাটির বুক, সেখানেই উঁচু নিচুতে নানা রকম বাসা বাধা হয়, চাষ চষা হয়–মাটি নিয়ে মানুষের কাজেরও আর শেষ নেই। তার পর কোন এক সময় কারো মনেও থাকে না এই মাটি আসলে মাটি নয়, নদী, বা বড়জোর নদীর জন্যে খুলে রাখা পথ–সে পথে নদী আর কখনো ঘুরে আসে নি। তখন ধীরে-ধীরে সেই নদী জনপদের প্রাক্তন এক উপকথায় পরিণত হয়, জনপদবাসীর পুরুষানুক্রমিক মুখে-মুখে। ধীরে-ধীরে তেমন মানুষ কমে আসে, যারা নিজেদের অতীতকে গৌরবান্বিত করতে এক নদীর ক্রমবিস্তার ঘটায়–সে কী নদী। ধীরে-ধীরে তেমন মানুষ কমে আসে, যাদের স্মৃতিতে নদী বহমান থাকে। ধীরে-ধীরে তেমন মানুষ কমে আসে, যারা নদীকে ডাকনামে ডাকে। সেই কোনো এক সময় এই জায়গাটিকে আর দু দিক বাঁধ বাধা বলে চেনা যাবে না। তখন নদীর প্রবহমাণ জলের জন্যে অন্য কোথাও নতুন ধাধের দরকার হবে।

এই জায়গাটি, এই দুই নম্বরটি, এখনো সেই পথে পৌঁছয় নি-যেমন ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে সেই পাহাড়ের তলার মঞ্জুলি, তার নীচে প্রেমগঞ্জ বা বাসুসুবার চর, দোমোহনি বা পদমতীর চর, বা তারও নীচে কোচবিহারের পুবে মেখলিগঞ্জ পশ্চিমে হলদিবাড়ির মাঝখানে নুয়াপাড়া থেকে দহগ্রামের বহু পুরনো চর। বা, তার আগেই এই কাশিয়াবাড়ি, বোয়ালমারি, এমন-কি কচুয়াও। তাই এখনো এই খাতে নিয়ে নদীর সঙ্গে কিছু-কিছু দখলের লড়াই চলছে। মানুষজন এখনো চাষে-চাষে এই নদীপথকে নদীর পক্ষে দুরধিগম্য করে তুলতে পারে নি। নদী এখনো জলে-জলে এই মাটিকে চাষের পক্ষে অযোগ্য করে তুলতে পারে নি। তাই এখনো বছরে কয়েকবার, বা দু-এক বছরে একবার চলে মানুষ আর নদীর দখলের লড়াই।

এই লড়াইটাতে মজা আছে। হঠাৎ জলের ধাক্কায় মাটির ভাগাভাগি বন্ধ হয়ে যায়। তিস্তার জল ঢুকে আলগুলোকে ঢেকে দিলেই, আলে-আলে ভাগ করা মালিকানাও ঢেকে যায়। তখন জল হয়ে পড়ে সকলেরই শত্রু। যেন জল সরে গেলে, মাটি বেরলে, এই মানুষজনের পুরনো কয়েকটি দখলের লড়াই আবার শুরু হতে পারবে; তার আগে পর্যন্ত, যতক্ষণ জল উঁচুনিচু, শুখা-দোআঁশলা, ঢাল-চড়াই জমির ভেদ লোপ করে দিতে থাকে, ততক্ষণ, এই সব জমির দখলদাররা, চাষীরা, মালিকরা, ভুলে থাকতে পারে, জলের নীচের মাটির অসমতলতা বা এই টানা জমির মাটির পরতে-পরতে বালি, চুনপাথর, এই সবের মিশেলের বৈচিত্র্য।

ঐ অসমতলতা আর ঐ মিশেলের রকমফেরের জন্যে জমির দাম বাড়ে কমে, দখল কায়েম হয়, হাতবদল হয়-সম্পত্তির মামলা ত মানুষের সঙ্গে মানুষেরই হয়। কিন্তু, এখন, এমন সব ঋতুবিপর্যয়ে, যখন পাহাড় থেকে ঢল নেমে নদীকে ক্রমেই করে তুলছে যে-কোনো আয়তনের পক্ষেই অনেক বড়, যখন জলের চেনা রং বদলে গেছে, জলের ওপর হুমড়ি খেয়ে তার একেবারে ঘোলাটে মেঘের মত শাদা রং, ফেনা, আর ফেনা কেটে গেলে আচমকা কাদাগোলা জল চিনতে হয়, যখন জন্ম যেন নদী বয়ে, আসছে না-নদীময় পাতাল থেকে উথলে উঠছে, তখন বাঁধের ঠিক নীচেই নদীর গভীর ভেতর থেকে ভাদই চিৎকার করে ধমকে ওঠে বাঁধের ওপর মহেশ্বর জোতদারকে বাবা গে, বঁশ ফেলি দাও, বাঁশ ফেলি দাও—

ভাদইয়ের সারা জীবনে মহেশ্বরকে ডাকার কোনো উপলক্ষই থাকার কথা নয়। আর কচ্চিৎকদাচ যদি হয়ও, তা হলেও দেউনিয়া কথাটিই কত-না শ্লেষ্মায় জড়িয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু তিস্তার বানার মধ্যে দাঁড়িয়ে দেউনিয়া বড় দীর্ঘ শব্দ। আর এই তল্লাটের সবচেয়ে বড় জোতদারের একজন, মহেশ্বর দেউনিয়া, ভাইয়ের হুকুম মত বাঁধের ওপর জমিয়ে রাখা বাশ একটা তুলে বাঁধের ঢাল বেয়ে ধীরে-ধীরে নেমে জলের ভেতরে ভাইয়ের দিকে ছুঁড়ে দেয়। ভাদই সেই বাশটা ধরে ফেলে চিৎকার করে, আরো দ্যাও কেনে, আরে দ্যাও, যেন, এইমাত্র তিস্তার বন্যায় মানবেতিহাসে শ্রেণীসংগ্রামের চরম নিষ্পত্তি ঘটে গেল।

.

বন্যার মুখে শয্যা

জল এসেছে সেই বুধবার থেকে। কিন্তু এখানে অন্তত সেদিন বৃষ্টি ছিল না। ফলে মনে হচ্ছিল, যেমন এসেছে, তেমনি চলে যাবে। কিন্তু আজ শনিবার, কাল গেল শুক্রবার, তার আগের দিন বৃহস্পতিবার থেকে এখানে ঝড়ো বাতাস আর বৃষ্টি শুরু হল। বৃহস্পতিবার সকাল দশটা-এগারটা নাগাদ থামলও একটু। রাস্তাঘাট শুকিয়ে গেল। রোদ উঠল না। কিন্তু আকাশের রোদটাকা মেঘে জল বেশি ছিল না। তাই রোদের আভা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দুই নম্বরের নদীর জল একটু-আধটু বেড়েও ছিল, যেমন বাড়ে, এ রকম ঝড়ো বাতাসে।

কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে ঝড়জল দ্বিগুণ হয়ে উঠল। বৃহস্পতিবার রাত দশটায় প্রথম, তারপর শুক্রবার সকাল জুড়ে রেডিওতে বারবার কমলা সঙ্কেতের কথা বলা শুরু হল। যারা নদীর চরে বা বাঁধছাড়া পারে বসবাস করেন তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ ঘন-ঘন দেয়া হল। সিকিমে কোন একটা জায়গায় বিরাট ধসের খবর পাওয়া গেছে কিন্তু বিস্তৃত বিবরণ এখনো মেলে নি। হেলিকপ্টার ও সৈন্যবাহিনীর কথা রেডিওতে শুক্রবার রাত দশটার আগে বলে নি, তার মানে কোথাও তখনো বন্যা শুরু হয় নি।

কিন্তু শুক্রবার রাত দশটাতেই বলা হল–সিকিমের কিছু খবর পাওয়া গেছে, কয়েকটি জায়গায় প্রবল ধসের ফলে নদীর মুখ আটকে গিয়ে কৃত্রিম হ্রদ সৃষ্টি হয়েছে। এই হ্রদগুলি ফেটে গেলে নদীর নিম্ন এলাকায় আকস্মিক ও প্রবল বন্যার আশঙ্কা দেখা দেবে। জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের জেলা কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়ে সর্বত্র কমলা সঙ্কেত দিয়েছেন। নদীর চরে ও বাধছাড়া পারে যারা বসবাস করেন তাদের এই মুহূর্তে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তা ছাড়াও সকলকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

রেডিওর এই ঘোষণাতেই যেন হাওয়া তিস্তার ওপরের শূন্যতা থেকে পারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যেন, জলস্রোত পাড় ভেঙে ফেলে লাফিয়ে উঠে আসতে পারছে না বলেই, হাওয়া, জল বেয়ে ধেয়ে এল ওপরে, একসঙ্গে, এক পরাক্রান্ত আক্রমণে, যা কিছু দাঁড়িয়ে ছিল তাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে। নিশ্চয়ই মিশে গেল, উড়ে গেল অনেক কিছু। বৃষ্টি ছিল, কিন্তু বাতাসের বেগে সে বৃষ্টি মাটিতে পড়তে পারে না–মাটির সমান্তরালে তীক্ষ্ণ ছুটে যায়।

সুতরাং শুক্রবার রাতটা ত প্রায় অন্ধের মতই কাটানো। শনিবার ভোর হয় যেন নেহাৎ ভোর হতে হয় বলে। ছাইরঙা আকাশ নদীর ওপর নেমে এসেছে আর ঘোলাটে নদী ধাধ বেয়ে উঠে গেছে অনেকটা। নদীর ভেতরে এই উঁচু ডাঙাটায় জল এখনো ওঠে নি বটে, কিন্তু কাল সন্ধ্যার তুলনায় সারা রাতে বেড়েছে প্রায় দেড় গুণ। বাতাস যেরকম তাতে মনে হয় যেখানে পাহাড়ে ধস নামছে, সেখানে আরো ধস নামবে। কিন্তু সেই ধসের ফলে কোথায় কোন পাহাড়ে নতুন-নতুন হ্রদ গোপনে-গোপনে তৈরি হয়ে আছে, সেগুলো যদি একসঙ্গে ফেটে যায় তা হলে বাধ ত বাধ, বাঁধের ওপর থেকে সরে যেতে হবে মণ্ডলঘাট স্কুলে। যদি সেই সব হ্রদের জল একসঙ্গে না বেরিয়ে এক-এক বারে, বা চুঁইয়ে চুঁইয়ে, বেরয় তা হলে এখানে বন্যা হবে না।

দেখতে-দেখতে বাঁধের ওপর কিছু-কিছু লোকজন আসা শুরু করে।

সবচেয়ে আগে আসে আবদুল–এই দুই নম্বরের বাঁধে।

তার রকমসকম দেখে মনে হয় সে সাগাই খেতে এসেছে। আকাশের মেঘ, বাতাস বা বৃষ্টির চাপ ও বেগে বা তার চোখের সামনে তিস্তার ঘোলাটে জলের ক্রমবিস্তারে আবদুলের যেন কিছুই যায় আসে না সে এমনভাবে তার একটা খুব সযত্ন ভাজকরা বিছানা, একটা ভাঙা ছাতাও সেই বিছানার সঙ্গে বাধা, একটা এলুমিনিয়ামের মগ, আর একটা এলুমিনিয়ামের হাড়ি নিয়ে এসে ভেজা ঘাসের মধ্যেই বসে পড়ে। কোন জায়গায় যে বসবে সেটা আবদুলকে একটু ভাবতে হয় বই-কি। সে একবার দুই নম্বরের এই গোলর্বাধটা চক্কর দেয়। পুরোটা চক্কর দিতে পারে না, উত্তরের দিকে এতটাই জংলা যে আবদুলও ফিরে আসে। তা ছাড়া বাধে বসলেও নদীর দিকে মুখ করেই ত বসতে হবে। শেষ পর্যন্ত আবদুল একটা ঝাকড়া কুলগাছের নীচের ডালটা বেছে নেয়। ঝোলানোর জন্যে বিছানাটা সে প্রথমে খোলে। ততক্ষণে বাধে যারা ছিল তারা নদীর দিকে পেছন ফিরে আবদুলের দিকে মুখ করে। আবদুলের বিছানাটা আসলে একটা তুলোর কম্বল–এরকমই কোনো বন্যার সময় রিলিফে পেয়েছিল। সেটার তুলো অনেক জায়গায় উঠে গেছে, কোনো-কোনো জায়গা ফেঁসেও গেছে, কিন্তু এমন নিপুণ ভজ আবদুলের যে বাইরে থেকে বোঝাই যায় না। সেই কম্বল খুলে তার ভেতর থেকে আবদুল একটা পাটের দড়ি বের করে। বের করে দড়িটাকে পাশে রেখে, আবার কম্বলটাকে ভাজ করে। কম্বলটা খোলা হয় যতটা, ভাজ তার চাইতে বেশি। সেই ভাঁজের ওপর দাগ পড়ে গেছে–বেশ মোটা দাগ। ঐ দাগগুলো ছাড়া অন্যভাবে আর একম্বল এখন ভাজ করাই যাবে না। কিন্তু আবদুল একবার লম্বালম্বি ভাজ করে আবার খোলে। পুরো কম্বলই দোর্ভাজি করে সে উঠে দাঁড়ায়, তার মাথা ধরে সামনে ঝুলিয়ে ঝাঁকায়, তারপর খুব ধীরে সেটাকে মাটিতে ছোঁয়ায় আর আস্তে করে শোয়াতে শোয়াতে, নিজে কোমর ভেঙে. নিচু হতে-হতে এগিয়ে কম্বলটাকে একেবারে মাটির ওপর মেলে দেয়। তারপর আবার যেখান থেকে সে শুরু করেছিল, সেই জায়গাটিতে ফিরে আসে, যেন কম্বলের, লম্বা করে শোয়ানো কম্বলেরও মাথা আর পা আছে। জল দেখতে আসা যে-ভিড়টা তখন আবদুলকে দেখছিল, তার ভেতর কেউ বলে, আবদুল, এ্যাখন শুইয়া পড়, রাত্তিরে ত বানা আইসলে জায়গতে হবে।

আবদুল সেকথার কোনো জবাব দেয় না। এমন-কি ফিরেও তাকায় না। সে এবার কম্বলের দুটো দিক ধরে আবার ধীরে-ধীরে এগতে থাকে, নিচু হয়ে। কম্বলটাকে তলার ভঁজের ওপর শুইয়ে সে এবার মাটির ওপর উবু হয়ে বসে দুহাত দিয়ে কম্বলটাকে সমান করে। এবার ডান দিক থেকে তুলে বা দিকের তলার ওপর ফেলে। তারপর আবার তার দিক থেকে তুলে ওপর দিকে ভাজ ফেলে। আবার দু হাতে ঝাড়ে আর দু হাতে কম্বলটাকে একটু চাপে। এবার সে উঠে দাঁড়ায় কম্বলটাকে ওখানে রেখেই। তার পরনে একটি খাকি ফুলপ্যান্ট–একটু ছোট কিন্তু খুব ঢোলা, গায়ের শার্টটা তার ভেতর গোজা, শার্টের ওপর একটা সোয়েটার। যে-ভঙ্গিতে রাস্তার মোড়ে গোল করে দাঁড়ানো ভিড়ের মধ্যে মাদারিকা খেল দেখানোর সময় মা বা বাপ ভিড়টার এক পরিধির একপ্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্তে পেশাদারি নিশ্চয়তায় হেঁটে আসে, আবদুলও সেরকমই হেঁটে এসে পাটের দড়িটা তুলে নেয়। সে ভাজ করা কম্বলটা ওখানে না এনে, ওখান থেকে ফিরে এসে দড়িটা নিয়ে যে আবার কম্বলের কাছে ফিরে যায় তাতেই বোঝা, যায়কম্বলটা খোলা, ভাজ করা ও বাধা এই কাজটার চাইতেও কাজের প্রক্রিয়াটা তার কাছে বড়। আর, তার মুখচোখে একটা স্মিত হাসি লেগেই ছিল–সকলে তাকে দেখছে এই ঘটনাতে সে বেশ। অভ্যস্ত।

আবদুল গিয়ে কম্বলটার সামনে এক হাঁটু গেড়ে, আর-এক হাঁটু তুলে বসে দড়িটা বাণ্ডিলটার নীচে লম্বালম্বি দেয়। দুদিকে ধরে দড়িটা টানটান করে। একবার বাণ্ডিলটা তুলে সেটাকে ফেলে এমন করে বসায় যেন দড়িটা ঠিক মাঝখান দিয়ে যায়। উঠে গিয়ে ডান হাতি দড়িটাকে টানটান করে, আবার, বা দিকে গিয়ে বাঁ হাতি দড়িটাকে টানটান করে। তারপর বাণ্ডিলটার সামনে আগের ভঙ্গিতে বসে দুদিকের দড়ি দু হাতে ধরে একই টানে মাঝখানে নিয়ে এসে একটা গিঠ দেয়। হাঁটুটা দিয়ে সেই গিঠটা চেপে ধরে এবার সে দড়িটাকে পাশাপাশি ঘুরিয়ে দেয় আর বাণ্ডিলটাকে উল্টে দেয়। দড়িটাকে বাণ্ডিলের অপর দিক দিয়ে ঘুরিয়ে এসে সে আবার বাণ্ডিলকে উল্টে দেয়। এবার দড়ির দুটো প্রান্তকে আগের গিঠটার ভেতর দিয়ে গলিয়ে একটা গিঠ দেয় ও তার ওপর আবার একটা এমন ফাস বানায় যাতে বাণ্ডিলটাকে সে হাতে বা লাঠিতে ঝুলিয়ে নিতে পারে। এবার সে উঠে দাঁড়ায় ও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাণ্ডিলটাকে দেখে। দেখারও যেন একটা সময় ছিল, সেটা পেরিয়ে গেলে সে নিচু হয়ে বাণ্ডিলটা তুলে গাছের তলাটায় আবার চলে আসে। একবার তাকিয়ে ভাঙা ডালের অংশটা দেখে, তারপর, রোজই সে যেন এই গাছটাতেই বাণ্ডিলটা ঝুলিয়ে রাখে এমন ক্ষিপ্রতায় বাণ্ডিলটার ঐ হাতলের মত ফাঁসটাকে ঐ ভাঙা ডালে ঝুলিয়ে দেয়। বাণ্ডিলটা একটু দোলে। সে দুলুনি থামার আগেই আবদুল ওর ডেকচির ভেতর মগটাকে ঢুকিয়ে কুলগাছটার যে-জায়গাটা থেকে ডালপালা বেরতে শুরু করেছে, সেখানে ঐ হাঁড়িটাকে ঢুকিয়ে দেয়। হাঁড়ির সামনে দুই ডালের ওপর ওর লাঠিটা সেঁদিয়ে আবদুল দুই হাত ঘষে, তার কাজ শেষ।

.

বন্যার মুখে জিপগাড়ি

আবদুল এ-এলাকার পরিচিত পাগল। বা, পাগলও নয়, হয়ত। তার এমনিতে কোনো পাগলামি নেই। কথা প্রায় বলেই না। পোশাক-আশাকও যে তার এরকম হোমগার্ডদের মত, তার কারণ সে তার নিয়মিত চক্করের মধ্যে নগর বেরুবাড়ির বর্ডার ক্যাম্পে একবার যায়, অন্তত মাসে একবার। ওখানে গেলে টানা দিন সাতেক বা দিন পনেরও থেকে যায়। গিয়ে তার জন্যে কাজ যেন ঠিক করাই আছে এরকম দ্বিধাহীনতায় তরকারির বাগানে কাজ করতে লেগে যায়। ক্যাম্পের কিচেনে খায় আর একটা বারান্দায় ঘুময়। বারান্দার বাটামে তার বিছানা ও হাঁড়ি বাধা থাকে। কেউ আপত্তি করে না। তারপর। আবার একদিন ক্যাম্প ছেড়ে হাঁটা দেয়। সেটাও আগের মুহূর্তে বোঝা যায় না। কুয়োপাড়ে যায়, হাতমুখ ঘোয়, তারপর বারান্দায় এসে লাঠিটার ডগায় বাণ্ডিলটা ঢুকিয়ে, আর-এক দড়ির ফাসে হাঁড়িটাকেও লাঠির মাথায় গলিয়ে সে হাঁটা দেয়, যেন তরকারির বাগানের কাজটুকু করে দেয়ার জন্যেই সে এসেছিল, বা, সে এখানে রোজ খাটে, এখন দিনের শেষে বাড়ি ফিরছে।

আবার এরকম চক্কর মারতে-মারতেই মণ্ডলঘাটের চৌপত্তিতে, ঘুঘুডাঙার হাটে, কাদোবাড়ির হাটে যায়। কিন্তু কখনো কারো বাড়িতে বা কোনো পাড়ার মধ্যে যায় না। এতই চেনা আবদুলের গন্ধ যে রাতবিরেতে সে কোথাও ঢুকলেও কুকুররা ডাকে না, একবার এসে শুঁকে যায় মাত্র। যেখানে যায় সেখানেই তার খাবার জুটে যায় বটে কিন্তু খাবার কখনো চায় না আবদুল। বরং যেখানেই যায় সেখানেই সে সারা দিন ধরে এত কাজ করে যে মজুরি ধরলে তার একটা ভাল আয়ই হতে পারে। কিন্তু রোয়াগাড়াই হোক আর ধানকাটাই হোক–আবদুল কারো খেতে কখনো কাজ করে না। মনে হয়, যেন মানুষের সঙ্গেই ও থাকতে চায়, অনেক মানুষের সঙ্গে, মানুষের ভিড় কিন্তু কোনো একজন বা দুজন মানুষের সঙ্গে নয়। তাই আবদুল হাটে, চৌপত্তিতে, ক্যাম্পে ঘোরে কোনো বাড়িটাড়ির কাছে ঘেঁষে না।

আবদুল এসে ধাধের ধারে দাঁড়িয়ে, কোমরে হাত দিয়ে নদীর দিকে তাকায়। তিস্তায় বন্যা হবে, চরের সব মানুষ এসে বাধে উঠবে, এখানে ক্যাম্প বসবে, ত্রিপল টাঙানো হবে, সাধুসন্ন্যাসীরা আর অফিসাররা আসবে-যারে–আগামী কয়েক দিন এখানে অনেক কাজ আবদুলের। কুলগাছের ডালে বিছানা, হাঁড়ি আর লাঠি ঢুকিয়ে সে এখন সেই অত কাজের জন্যে তৈরি।

চৌপত্তির দিক থেকে একটা আওয়াজ ওঠে আর এই বাঁধের ভিড়টা প্রায় দৌড়েই চৌপত্তির দিকে ছোটে। বাচ্চাদের গলায় চিৎকার ওঠে, আসি গেইল, আসি গেইল, জিপগাড়ি আসি গেইল। আবদুল প্রায় একাই দাঁড়িয়ে থাকে। আবদুল ছাড়া আর দাঁড়িয়ে থাকে এ এলাকার সবচেয়ে বড় জোতদার মহেশ্বর রায়। তার প্রায় বিশ-ত্রিশটা গরু দুই নম্বরে থাকে। সে গরুগুলোর খোঁজখবর করতে এসেছে।

যে-ভিড়টা চৌপত্তিতে ছুটে গিয়েছিল সেই ভিড়টাই এখন চুপচাপ ফিরে আসে, হাঁটতে-হাঁটতে-মইনুদ্দিন ডিলার, গামবুটপরা দারোগার মত দেখতে একজন, আর একজন অফিসারের পেছনে-পেছনে। ওরা তিনজন সামনে সামনে ছিল, পেছনের ভিড়ের মধ্যেও শহর থেকে আসা আরো দু-একজন ছিল। মইনুদ্দিন ডিলারের পরনে লুঙি আর পাঞ্জাবি। সে এদের মধ্যে সকলের চেয়ে লম্বা আর অফিসারটি সবচেয়ে খাটো। আবদুল যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই যে এরা এসে দাঁড়ায় তার কারণ হতে পারে যে আবদুল একা দাঁড়িয়ে থাকায় অফিসারটির মনে হয়েছে–এটাই দাঁড়াবার জায়গা। আবদুলের খাকি প্যান্ট দেখে তার মনে হয়ে থাকতে পারে–সে সরকারি কাজই করছে। এত বড় ভিড় ও অফিসারদের দেখে আবদুলের সরে যাওয়ার কথা কিন্তু সে যে সরে না আর মাত্র একবার তাকিয়েই আবার নদীর দিকে মুখ ফেরায় সেটাই বোধহয় তার পাগলামো।

মইনুদ্দিন ডিলার সবার ওপর দিয়ে গলা তুলে হাত বাড়িয়ে মহেশ্বর জোতদারকে ডাকে, এই যে মহেশ্বরবাবু, এইখানে আসেন। বাতাসে মইনুদ্দিনের গলা শোনা যায় না কিন্তু মহেশ্বর তার আহ্বানটা বোঝে। সে এগিয়ে আসে, ভিড়টা তাকে জায়গা ছেড়ে দেয়। সে অফিসারদের পাশে এসে দাঁড়ায়।

এই যে ডি-সি সাহেব আসছেন, বলেন, এখানকার পরিস্থিতি কী?

মহেশ্বর নমস্কার করে দু হাত দু দিকে ছড়িয়ে বলে, পরিস্থিতি ত সগায় দেখিছেন– যেন মহেশ্বরের দু হাতেই বন্যা।

ঐ চরে যারা থাকেন তারা সব উঠে এসেছেন ত? ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন।

কায় আর উঠিবে? গাইগরুগিলাই এখন ঐঠে থাকি গেইল! মহেশ্বর সেই একই ভঙ্গিতে বলে।

মানে? রেডিয়োতে এতবার করে অ্যানাউন্সমেন্ট করা সত্ত্বেও আপনারা লোকজনকে সরান নি? এরপর ক্যাজুয়ালটি হলে তার দায়িত্ব কে নেবে? এখানকার পঞ্চায়েতের লোকজন নেই? ডেপুটি কমিশনার ঘাড় ঘুরিয়ে ভিড়টাকে জিজ্ঞাসা করেন।

পঞ্চায়েত আর কী করিবে, কহেন? এই ত মাস্টার আছে, মেম্বার। মহেশ্বর বলে।

কই? কে মেম্বার? ডেপুটি কমিশনার বলেন।

মাস্টার, মাস্টার, একটা গুঞ্জন ওঠে। ডেপুটি কমিশনার ঘুরে দেখেন-লুঙি ও গেঞ্জিপরা এক যুবক নমস্কার করে এগিয়ে এল।

কী? আপনারা রেডিয়োতে এতগুলো এ্যানাউন্সমেন্ট শুনেও চরের লোকদের পাড়ে তোলার কোনো ব্যবস্থা করেন নি? ডেপুটি কমিশনার একটু চেঁচিয়েই বলেন কিন্তু বাতাসের বেগ এতে বেশি যে বোঝা যায় না, তিনি রাগ করে জোরে বলছেন, নাকি এই বাতাসের জন্যে তাকে বাধ্য হয়েই জোরে বলতে হচ্ছে।

মাস্টার মৃদুস্বরে বলে, স্যার, আমরা ভাবছিলাম জল নেমে যাবে, তাই আর-কিছু করা হয় নি।

ডেপুটি কমিশনার নিজের মত করে বুঝে নেন এই মেম্বার পঞ্চায়েতের সভ্য নিশ্চয়ই কিন্তু এখানকার নেতা নয়। নেতা হলে জিপগাড়ি থেকে তার সঙ্গে আসত। কিন্তু পঞ্চায়েতকে না-জড়িয়ে কিছু করাও ঠিক হবে না। এবার ডেপুটি কমিশনার নদীর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে ডাকেন, সান্যাল।

মইনুদ্দিন ডিলার ভাবে ডেপুটি কমিশনার তাকে বুঝি কিছু বলবেন। সে তার লম্বা ঘাড় ডেপুটি কমিশনারের কাছাকাছি এনে জিজ্ঞাসা করে, আমাকে কিছু বললেন স্যার?

ডেপুটি কমিশনার তার বিপরীত মুখটা ঘুরিয়ে বললেন, না। আমাদের ডিস্ট্রিক্ট পঞ্চায়েত অফিসার মিস্টার সান্যাল

কথা শেষ হওয়ার আগেই মিস্টার সান্যাল পেছন থেকে এগিয়ে এসে বলেন, হাঁ স্যার।

এখানে এ্যাভেইলেবেল পঞ্চায়েত মেম্বারদের মিট করুন পঞ্চায়েত অফিসে, আমি আসছি। আর, তার আগে নৌকো পাঠান; এখুনি, শেষ কথাটা ডেপুটি কমিশনার বলেন মোবাইল সিবিল এমার্জেন্সির অফিসারকে।

মিস্টার সান্যাল আর সিবিল এমার্জেন্সির অফিসার বাঁধ ছেড়ে চৌপত্তির দিকে যান। তাঁদের সঙ্গে ভিড়ের অনেকেও সেদিকে যায়। বাকি ভিড়টাকে নিয়ে ডেপুটি কমিশনার দাঁড়িয়ে থাকেন। সেই ভিড়টার ভেতরে থেকেও সেই ভিড়টার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল আব্দুল সে প্রথমে যেখানে দাঁড়িয়ে লি সেখান থেকে এক পাও সরে নি। তার আশেপাশে, প্রায় গায়ে গা লাগিয়ে এই ভিড়ে যারা ছিল তাদের সবারই মুখ ডেপুটি কমিশনারের দিকে ফেরানো। ডেপুটি কমিশনারের পেছনে যারা তাদের মুখ নদীর দিকে কিন্তু তারা তাকিয়ে আছে ডেপুটি কমিশনারের দিকেই। আবদুল যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখান থেকেই তার উচিত ছিল ডেপুটি কমিশনারের দিকে তাকানো।

.

বন্যা 'ঘোষণা'-হল কি হল না?

এখন অবিশ্যি আবদুলের দাঁড়ানোটার একটা মানে আসে, কারণ, ডেপুটি কমিশনারও নদীর দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। জলের রং ঘোলা থেকে ঘোলা, স্রোতের বেগে সেই বিরাট বিস্তারের কোথাও একটা কুঞ্চন পর্যন্ত নেই। মাইল-মাইল বিস্তৃত সেই জল ধাতুপাতের মত পড়ে আছে স্রোতের বিভ্রম জাগিয়ে। সেই পশুটে বিবর্ণতা আকাশ থেকে নদী আর ডাঙায় ফোঁসফোঁস করছে। বুঝি, কোথাও কিছু ঘটে গেছে, বা এখনই ঘটবে।

তা হলি আপনি স্যার চলেন, ঐখানে বসি সব কথাবার্তা হোক-মইনুদ্দিন ডিলার গলাটা ডেপুটি কমিশনারের কানের কাছে এনে বলে।

ওখান যখন যাবার যাব। আপনি এক কাজ করুন–এখানে কি চিড়ে, আর গুড় পাওয়া যাবে?

এখানে পাওয়া যাবে না স্যার, ঘুঘুডাঙ্গাতে তা হালে রিক্সা পাঠাই?

হ্যাঁ, এখুনি পাঠান।

হ স্যার, বলে মইনুদ্দিন ডিলার ভিড় থেকে বেরতে গেলেই, ডেপুটি কমিশনার বলেন, শুনুন, এখন আবার রিক্সা ভাড়া নিয়ে দরদস্তুর করতে যাবেন না, যা চায় তাই দিয়ে পাঠিয়ে দিন।

মইনুদ্দিন বেরতে-বেরতে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, স্যার, ক্যাম্প কি তা হলে আজ থেকেই স্টার্ট হবে?

না, না, ক্যাম্প না। তবে লোকজন চরটর থেকে আসবে, সবাই ত আর রান্না করতে পারবে না। তাদের জন্যে স্টক করুন। ওয়েদার ফোরকাস্ট খারাপ। পাহাড়ে ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছে। জল আরো বাড়বে।

আরো বাড়িবে স্যার? মহেশ্বরের জিজ্ঞাসায় কোনো উদ্বেগ নেই যেন।

বাড়বে না? পাহাড়ে ত ধস নামছে। আপনাদের ত আজকাল এত রেডিয়ো হয়েছে। গত তিন দিন। ধরে শুনছেন না?

শুনছি স্যার, মহেশ্বর স্বীকার করে।

শুনছেন ত লোকজন সরান নি কেন?

রেডিয়োতে কথা ত সব সময় বিশ্বাস না যায়, সেই তানে স্যার।

স্যার, সিবিল মোবাইল এমার্জেন্সির অফিসারটি এসে পেছন থেকে বলে, এখানে ত একটা নৌকো পেলাম স্যার।

একটা নৌকোয় কী হবে? ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন। তারপর বলেন, নৌকো কি আছে। এখানে? তা হলে সেগুলো নিয়ে নেয়াই ত ভাল। দরকারের সময় কোথায় পাবেন?

অফিসারটি মহেশ্বরকে দেখিয়ে বলেন, ওঁর একটা নৌকো আছে স্যার, কিন্তু উনি দেবেন না।

মহেশ্বর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ডেপুটি কমিশনার একবার মহেশ্বরের দিকে, একবার অফিসারের দিকে তাকিয়ে বলেন, উনি ত তখন থেকে এখানেই দাঁড়িয়ে আছেন, নৌকো দেবেন না বললেন কখন?

স্যার, নৌকো ত রাইস মিলের সামনে আছে। ওখান দিয়েই এদিকে বেরবে। ওর লোকজন আছে। তারা বলল, তিনি নৌকো কাউকে দিতে না করেছেন। ডেপুটি কমিশনার একটু বুঝে নেন, তারপর বলেন, কী? আপনার নৌকো দেবেন না নাকি?

না স্যার।

ডেপুটি কমিশনার একটু অবাক হন। কিন্তু অভিজ্ঞতার জোরে বোঝেন তিনি রাগারাগি করলে হিতে বিপরীত হবে। যদি এর নৌকো থাকে তা হলে পঞ্চায়েতের লোকজনরাই সে নৌকো নিয়ে নেবে।

সে কি, লোকজনকে রেসকিউ করতে হবে না?

আমার গরুমানষিকও এসকু নাগিবে স্যার। আপনারা সেনাবাহিনী আনেন স্যার।

ডেপুটি কমিশনার আসার সুযোগটা নিয়ে বলেন, আচ্ছা, এক কাজ করুন। যে-নৌকোটা পেয়েছেন এটা এখনই চরের দিকে ছেড়ে দিন। আর ওরটা ত থাকলই। এখানকার একজন কাউকে সঙ্গে নেবেন। অফিসার চলে যান।

আবদুল বাঁধ থেকে নেমে জলের কিনারায় চলে যায়–ও নৌকোয় যাবে। তার দিকে আঙুল দেখিয়ে ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন-ও যাবে নাকি? যে ভিড়টা তখনো ছিল তার ভেতর থেকে হাসি ওঠে। মহেশ্বরও হেসে বলে, পাগলা।

তা হলে ওকে যেতে দিচ্ছেন কেন?

না, না, ও খুব ভাল পারিবে স্যার।

আবার ওঁদের অপেক্ষা করতে হয়। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখা যায় একটা নৌকো ওঁদের বা দিক থেকে বেরিয়ে কুটোর মত দক্ষিণ দিকে ভেসে যাচ্ছে কিন্তু পঁচজন লোক লগি দিয়ে নৌকোটাকে উল্টো দিকে ঠেলছে। আবদুল তার জুতোজামা-সোয়েটারসহ জলে ঝাঁপ দিয়ে স্রোতের টানে মুহূর্তে নৌকোটার কাছে পৌঁছে যায়।

ডেপুটি কমিশনার পঞ্চায়েতের মিটিঙের জন্যে পেছন ফেরেন। তিনি অন্তত বলতে পারবেন–ফাস্ট রেসকিউবোটটা স্টার্ট করে দিয়েছেন।

ডেপুটি কমিশনারের পেছনে-পেছনে মোবাইল সিবিল এমার্জেন্সির অফিসারও হাঁটতে-হাঁটতে বাইরে আসে। এতক্ষণ তাদের সঙ্গে লোকজনের যে-ভিড়টা ছিল সেটা খসে গেছে। কাউকে কাউকে ডেপুটি কমিশনারই কাজে পাঠিয়েছেন আর বাকিরা এখন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে নৌকোটাকে দেখবে।

দুটো দোকানঘরের ফাঁক দিয়ে ওঁরা চৌপত্তিতে এসে যান। ওঁদের জিপগাড়িগুলো উল্টো দিকে দাঁড় করানো। তাদের দেখে ড্রাইভাররা একটু এগিয়ে আসে। কিন্তু ড্রাইভাররা ডেপুটি কমিশনারের কাছে পৌঁছনোর আগেই দুদিকের দোকান থেকেই অনেকে বেরিয়ে আসে। আসামের সিল্কের চাদর গায়ে, লুঙিপরা একজন এসে নমস্কার করে বলে, আসেন স্যার, একটু বসে যাবেন।

ডেপুটি কমিশনার যদিও বলেন, না, এখন আর বসব কী? একটু পঞ্চায়েতে গিয়ে দেখি। কিন্তু দুইহাত মাথার পেছনে দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন, যেন একটু কথা বলতেই চান।

আপনি নিজে এসে গেলেন স্যার-সেই সিল্ক-চাদর গায়ে ভদ্রলোকই আবার বলেন।

না এসে আর উপায় কি? ডেপুটি কমিশনার হেসে বলেন, আমি ত জানিই আপনাদের যত নোটিশই দেয়া হোক, রেডিয়োতে যতই বলা হোক, আপনারা কিছুতেই চর ছেড়ে ডাঙায় উঠবেন না। এতগুলো ফ্লাড কাটালাম আপনাদের সঙ্গে–আর এটুকু বুঝব না?

ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে অন্য সবাইও হেসে ওঠে। একটি বাচ্চা ছেলে একটি কাপডিশ নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। সে বোঝে না কাকে দিতে হবে। একজন তার হাত থেকে কাপডিশটা নিয়ে, ডিশের চাটা ফেলে ডেপুটি কমিশনারকে এগিয়ে দেয়। ডেপুটি কমিশনার কাপটা নিয়ে ছোট্ট একটা চুমুক দেন। ইতিমধ্যে একজন বলে, স্যার, নিজের ঘরবাড়ি ছাড়ি আসিবার মন চাহে না। মনত খায়, দেখি কেনে আজি সকালটা, আজি রাইতটা

সে ত দেখলেন, তারপর জলে ভাসলে ত সব হবে সরকারের দোষ। আপনাদের পঞ্চায়েতও ত কিছুই করে নি। পঞ্চায়েত অফিসটা কোন দিকে?

এই যে স্যার, এই যে, আসেন–একজন সরে গিয়ে ডেপুটি কমিশনারকে পথ করে দেয়।

ডেপুটি কমিশনার চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে কাপডিশটা কোথাও রাখার ভঙ্গি করতেই একজন হাত বাড়িয়ে নিয়ে নিলে, দেখি, একটু পঞ্চায়েতে গিয়ে, বলে ডেপুটি কমিশনার এগিয়ে যান।

.

বন্যার মুখে পঞ্চায়েত

ডেপুটি কমিশনার কয়েক পা হাঁটতেই তার ড্রাইভার পেছন থেকে দৌড়ে এসে বলে, স্যার, গাড়িটা নিয়ে আসি?

ডেপুটি কমিশনার দাঁড়িয়ে পড়ে ড্রাইভারের দিকে ঘুরে বলেন, না, না, তুমি এখানেই থাকো। চাটা খেয়েছ?

ড্রাইভার দাঁড়িয়ে পড়ে ঘাড় হেলায়। ডেপুটি কমিশনার হাঁটতে-হাঁটতে দোকান ঘরগুলো পার হয়ে যান। বায়ের বিস্তীর্ণ বালির চড়ার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলেন, এই জায়গাগুলো খুব ভাল ধানি জমি ছিল। আটষট্টির ফ্লাডে সব নষ্ট হয়ে গেল। এদিককার ধান ত খুব ভাল ছিল।

যারা সঙ্গে আসছিল, তাদের ভেতর একজন বলে, আপনি স্যার তখন ছিলেন স্যার এখানে?

হাঁটতে-হাঁটতে একটু ঘাড় ঘুড়িয়ে ডেপুটি কমিশনার বলেন, আমি তখন প্রবেশনে ছিলাম, সে বছরই ফ্লাড। তাই জলপাইগুড়িতে এলেই মনে হয় ফ্লাড হবে। আপনারা তখন ছিলেন, এখানে?

এ প্রশ্নের কোনো একটি জবাব হয় না–কেউ-কেউ ছিল, কেউ-কেউ তখন অনেক ছোট ছিল। কিন্তু সকলেরই কিছু-কিছু জানা আছে। সকলে মিলেই জবাব দিতে যায়–ডেপুটি কমিশনারও একবার বায়ে, একবার ডাইনে ঘাড় ঘুরিয়ে যেন সকলের কথাই শুনতে চান। শেষ পর্যন্ত তার পাশে যে ছিল সেই কথাটা চালিয়ে যেতে পারে–আটষট্টির বন্যার পর ত স্যার মণ্ডলঘাটের চেহারাই বদলি গিসে। কোটত সে পাহাড়ের হাট? কোটত সে সরকার পাড়া?

পঞ্চায়েত অফিস এসে যায়। ডেপুটি কমিশনারকে স্যার, এইখানে স্যার বলেই পাশের লোকটি দৌড়ে পঞ্চায়েত অফিসের ভেতরে চলে যায়। কিন্তু সে ঢুকবার আগেই পঞ্চায়েত অফিসের ভেতর থেকে অনেকে বেরিয়ে আসে, বারান্দায়। যারা তার সঙ্গে এসেছিল, তাদের দিকে ঘাড়টা একটু হেলিয়ে ডেপুটি কমিশনার বলেন, ঠিক আছে। এখন একটু এদের সঙ্গে বসি। আর আপনারা নিজেরা সব সাবধানে থাকবেন। জলপাইগুড়ির বন্যা শুনলেই ভয় হয়! সবাই একটু হেসে উঠলে ডেপুটি কমিশনার পঞ্চায়েত অফিসের বারান্দায় ওঠেন।

কী? আপনারা কজন মেম্বার আছেন? জিজ্ঞাসা করে, ডেপুটি কমিশনার বারান্দা থেকে পঞ্চায়েত অফিসের ভেতরে ঢোকেন।

ঢুকে তিনি দাঁড়িয়ে পড়েন, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অফিসের বেড়াগুলো দেখেন। দরজার মুখোমুখি বাঁশের বেড়াটাতে লেনিনের একটা রঙিন ছবি বানো। ডান দিকে সেক্রেটারিয়েট টেবিল, পাশে স্টিলের আলমারি। সেই টেবিলের পেছনের বেড়ায় ওপরে বামফ্রন্ট সরকার জিন্দাবাদ লেখা একটি পোস্টার। ডেপুটি কমিশনার যেখানে দাঁড়িয়ে তার বয়ে বেড়ার ওপরে রবীন্দ্রনাথের একটা রঙিন ছবি সম্ভবত কোনো ক্যালেন্ডার থেকে কাটা। বাধানো সেই ছবিতে একটা শুকনো মালাও দুলছে।

স্যার, বসেন স্যার, সেক্রেটারিয়েট টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারটাকে একটু এগিয়ে দেন একজন।

চেয়ারটাতে বসতে বসতে ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন, কী, আপনাদের মেম্বার কে কে আছেন, এখানে?

দরজার কাছের ভিড়টা থেকে একজন এগিয়ে আসে, স্যার, আমরা কয়েকজন মাত্র আছি স্যার, আর দুই জন মেম্বারের বাড়িতে সাইকেল দিয়া লোক পাঠানো হইছে স্যার। কিন্তু তারা এইখানে আছে না টাউনে গেইছে– মেম্বার বাক্যটি শেষ করতে পারে না।

এর মধ্যে আরে দুজন এগিয়ে এসেছে। ডেপুটি কমিশনার বলেন, আপনারা বসুন।

সেক্রেটারিয়েট টেবিলের সামনের চেয়ারের বা দিকের বেড়া ঘেঁষে একটা বেঞ্চ পাতা ছিল। মেম্বাররা সেই বেঞ্চটাতেই বসে। পাশের একটা ঘর থেকে একজন একটা চেয়ার এনে রাখে দেখে ডেপুটি কমিশনার জিজ্ঞাসা করেন, ওদিকেও একটা ঘর আছে নাকি?

হ্যাঁ স্যার, ছোটঘর একখান আছে। একটা ঘর ত ভিড় হয়্যা যায়, অফিসের কাজকর্মে বাধা হয়, স্যালায় ঐঠে কাজ হয়।

ডেপুটি কমিশনার আবার ঘরটার বেড়াগুলোতে চোখ বুলিয়ে বলেন, পঞ্চায়েত অফিসগুলোতে এখনো নতুন ঘরের গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? সকলে একটু হাসে। ডেপুটি কমিশনার আবার বলেন, ঘরটর নোংরা হতে দেবেন না। আর কাগজপত্র জমতে দেবেন না। যা বাজে জিনিস, সঙ্গে সঙ্গে নষ্ট করে ফেলবেন। একবার যদি নোংরা জমতে শুরু করে, তা হলে আর কোনো দিন পরিষ্কার করতে পারবেন না। আমাদের কাছারি দেখেন না? এখন হোয়াইট ওয়াশও করা যায় না। হ্যাঁ বলুন। আপনাদের এখানে ত দেখছি আপনারা কোনো ওয়ার্নিঙেই কান দেন নি। এরপর বড় একটি এ্যাকসিডেন্ট হয়ে গেলে, তখন কৈফিয়েত দেবে কে?

স্যার, বোধ হয়, এব্যাপারে কথা বলার জন্যেই আপনার কাছে আজ যাওয়া হয়েছে, একজন মেম্বার বলে।

এখনো যদি আমার কাছে ছোটেন তা হলে আর পঞ্চায়েত করে লাভ কী হল।

আপনাদের এলাকায় বন্যা হলে আপনাদেরই ব্যবস্থা নিতে হবে—

না স্যার। হামারালার ত জানা নাই টাকাপয়সার খরচা কতখান চলিবে আর কতখান চলিবে না–

প্রথমেই ফান্ডের কথা আসে কোত্থেকে। সেসব ত পরে পঞ্চায়েত অফিসার এসে আপনাদের সঙ্গে কথা বলে ঠিক করবেন। তার আগে ত বাঁধের ওপারে, নদীর দিকে যারা আছেন, তাদের নিয়ে আসতে হবে। তারা ত দেখলাম ভাবছে ফ্লাড় আসবে না। শেষে মাঝরাতে যদি লোক সরাতে হয় তখন কী করবেন? ঐ বাঁধের ওপর একজন ভদ্রলোকের নৌকো চাইলেন আমাদের সিবিল এমার্জেন্সির অফিসার, তিনি আমাকে বলে দিলেন নৌকো এখন তার কাজে লাগবে, নৌকো দেবেন না

কে স্যার?

সে আমি কী করে বলব। দেখুন ত আমাদের সিবিল এমার্জেন্সির অফিসার বাইরে আছেন কি না।

একজন মেম্বার উঠে দরজায় যায়। দরজা থেকেই ডাকে, এইঠে আসেন, আপোনাকে স্যার ডাকিছেন।

সিবিল এমার্জেন্সির অফিসার ঘরে এলে ডেপুটি কমিশনার বলেন, আপনি এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন? ওখানে যান, দেখুন নৌকোটা ঠিক মত ফাংশন করছে কিনা।

হ্যাঁ স্যার বলে ভদ্রলোক বেরিয়ে যান।

মহেশ্বর জোতদারের নৌকোর কথা কহিছেন স্যার? উমরায় নৌকো দেয় নাই?

কে দেয় নি তার নাম আমি জানি না। আমি একটা রেসকিউ নৌকো স্টার্ট করিয়ে দিয়েছি, এবার আপনারা দেখুন আর কোন-কোন পয়েন্টে লোক থাকতে পারে। যদি দরকার হয়, ঐ আর-একটি নৌকোও নিয়ে নিন। অন্তত আজ সন্ধের মধ্যে নদীর দিকে যেন কেউ না থাকে। এই কথাটি বলার জন্যেই আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। ডেপুটি কমিশনার চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েন। দরজার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে বলেন, আপনাদের লিডাররা কেউ নেই বলে দেরি করবেন না। তারা এলে বলবেন, আমি আপনাদের বলেছি। আর ঘুঘুডাঙা থেকে চিড়েগুড় আনতে গেছে, সেগুলো এসে গেলে যা করার করবেন। ডেপুটি কমিশনার বারান্দায় এসে দাঁড়ান। সেখানে তখনো অনেকে দাঁড়িয়ে, বসে। রাস্তার দিকে তাকিয়ে ডেপুটি কমিশনার বলেন, গাড়িটাকে একটু আসতে বলুন না।

বন্যার কার্যকারণের সেই মুহূর্তটি

অফিসাররা স্বাধটা ফাঁকা করে দিয়ে চলে গেলে জানা জিনিশই আর-একবার জানা হয়, নৌকো করে সরিয়ে আনার মত বিশেষ কিছু দুই নম্বরে আর নেই। মেয়েরা ও বাচ্চারা ত উঠেই এসেছে, চৌপত্তিতে ঘোরাফেরা করছে, পুরুষমানুষরাও আসছে-যাচ্ছে। এখন, ধীরেন সাহার নৌকোটা একবার যায়, তাতে কোনো বাড়ির জিনিশপত্র কিছু কিছু আনাও হয়। কিন্তু তারপর নৌকোটা কোথাও নিয়ে যাওয়া হয় যেন বেঁধেছেদে তৈরি রাখবার জন্যেই সিবিল এমার্জেন্সির অফিসারের অনুমতিসহ। যতদিন জল থাকবে, মানুষজনকে যাতায়াত করতে হবে, ততদিনই নৌকোটা সরকারের ভাড়া পাবে। অফিসারের ভাড়া করা নৌকো ত আর পঞ্চায়েত খারিজ করতে পারবে না।

কিন্তু এই অফিসারদের আসা, সিবিল এমার্জেন্সির লাল গাড়ি, নৌকো ভাড়া করা; ঘুঘুডাঙা থেকে চিড়ে আর গুড় আনতে রিক্সা পাঠানো, এর ফলে, যেন বন্যাটা ঘোষণা হয়ে গেল। এই ক-দিনের ঝড়বৃষ্টিতে ও হাঁটুজল থেকে কোমর জলে ডুবেও বন্যাটা যেন ততখানি বন্যা ছিল না, এখন এটা সরকারি বন্যা বলে সাব্যস্ত হয়ে গেল। আরো যদি বাড়ে, তাহলে হেলিকপ্টার আর সৈন্যবাহিনীর কথা আসবে। কোনো বন্যায় কেউ কখনো হেলিকপ্টার দেখে নি, একজন সৈন্যও দেখে নি। কিন্তু মোটামুটি এটাই ঠিক হয়ে গেছে–ঐ দুটো দিয়ে বন্যার আর-এক অবস্থা বোঝানো হবে।

অফিসারদের আসা-যাওয়ায় নদী-আকাশের চেহারাটা যেন আরো সত্য হয়ে ওঠে। নদীর কোনো পার থেকে বাতাসের ছুটে আসা দেখা যায় না, অত প্রবল বাতাসে আকাশের সমস্ত মেঘ তছনছ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু যেন মেঘে তৈরি নয়–এমনই অনড় থাকে এ আকাশ। আর আকাশেও প্রত্যাহত বাতাস এসে আছড়ে পড়ে এই বাধে দাঁড়ানো মানুষগুলোর গায়ে।

বাতাসের বিপরীতে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে একা-একা মহেশ্বর জোতদার চিৎকার করে ওঠে, এ্যালায় ত গরুগিলাক আনিবার নাগে হে, হে-এ এ ভাদই-ভাই কোথায় না জেনেই।

মহেশ্বর এমন ঘোষণা করেছিল একথা সত্য। বিপরীত ঝঞ্ঝার সেকথা ভাদইয়ের দিকে না এসে পশ্চিম থেকে পশ্চিমে চলে গেছে–এই ঘটনাও সত্য। সেই মুহূর্তে ভাদই, কান্দুরা আর কানকাটু বাঁধের ঢাল বেয়ে জলে নেমে যায়–এ ঘটনাও সত্য। এই তিনের মধ্যে কার্যকারণের কোনো সংযোগ না-ও থাকতে পারে। কিন্তু থাকতেও পারে।

এখন ত এখানে রিলিফ ক্যাম্প প্রায় হয়েই গেল–চিড়ে আসছে, গরুর খাবারও নিশ্চয় আসবে, সুতরাং গরুগুলোকে নিয়ে আসা উচিত।

অথবা, শনিবারের বিকেলের এই মুহূর্তে, মহেশ্বর-ভাদই কান্দুরা কানকাটু একসঙ্গে বুঝে ফেলে এই মুহূর্তটি আত্মরক্ষার শেষ সময়, যেন তারা সেই অদৃশ্য পাহাড়ের অজ্ঞাত সব নতুন হ্রদের গায়ের ফাটলচিহ্ন দেখতে পেয়ে গেছে, জলের রঙে হঠাৎ যেন তারা মৃত্যু দেখতে পায়, অথবা অনির্দিষ্ট নদীপার থেকে উত্থিত বাত্যার আওয়াজে শুনতে পায় ধ্বংসের ধ্বনি। অফিসারের আসা থেকে ভাইদের জলে নেমে পড়ার ভিতর হয়ত কোনো কার্যকারণ ছিল না। কত কাকতালীয়কেই ত আমরা কার্যকারণ বলে ভুল করি। অথবা কত কার্যকারণকে আমরা কাকতালীয় মনে করি।

ভাদই, কান্দুরা আর কানকাটু জলে মেনে যায়। জলের বাধাটুকু বাদ দিয়ে, তাদের হাঁটায় কোনো অনিশ্চয়তা থাকে না। পা পায়ের অভ্যাসে পায়ের তলার মাটি চিনে নেয়। কখনো উঁচু, কখনো নিচু, কখনো কোনো গর্তের ভেতর হঠাৎ কোমর পর্যন্ত ডুবে যায়, তারপরই আবার হাঁটু জেগে ওঠে। ওদের তিনজন একই জায়গায় নেমেছিল–কিন্তু ছড়িয়ে গেল তিন দিকে। ভেতরে ছড়ানো উঁচু ডাঙাগুলিতে গরুগুলো ছড়িয়েছিটিয়ে বাধা ছিল, সেই সব জায়গা থেকে হা-স্বা ডাক দীর্ঘায়িত এক কোরাসে ছড়িয়ে পড়ে, যেন ওরা জেনে গেছে এরা তিনজন আসছে। সেই কোরাস থেমে যাওয়ার পর আবার কোনো একক গাভীস্বর মেঘের চাপা ডাকের মত নদীর পারের দিকে ছড়িয়ে পড়ে–সেই সব মেঘের ডাক, যেগুলো আমাদের দেখতে পাওয়া মেঘেরও অনেক ওপরে থাকে। বানভাসি গরুরা বুঝে গেছে, এবার তাদের সরানো হবে। তারা দড়িতে শিং ঘষে মাটিতে ক্ষুর ঠুকতে শুরু করে।

এক গোছা পাটের দড়ি গলায় জড়িয়ে ভাদই আবার ফিরে আসতে হটে। জলের ভেতর ভাইকে যেন আর অত ছোট দেখায় না, শুধু তার খাটো শরীরে কাঁধের আর হাতের পেশিগুলো ফুলে-ফুলে ওঠে–জল কাটানোর জন্যে ত ভাইকে দুটো হাত নাড়িয়ে যেতে হয়। ভাদই কোথায় সঁতরায় আর কোথায় হাঁটে সে ত বোঝাই যায় না, জলে তার এই একবার ওদিকে যাওয়া, আর একবার এদিকে আসা এমনই, যেন, সে জল চষে বেড়াচ্ছে।

বাঁধের তলায় এসে ভাদই মহেশ্বর জোতদারকেই হুকুম করে–বাশ ফেলাও কেনে, বাশ ফেলাও।

মহেশ্বর বাঁশের গোছ থেকে একটি বাঁশ নিয়ে বাঁধের ঢাল বেয়ে নেমে জলের কিনারা থেকে ভাইয়ের দিকে ছুঁড়ে দেয়। সেটা জলে পড়তেই ভাদই আবার চিৎকার করে, আরা ফেলাও কেনে, আরো ফেলাও

মহেশ্বরকে আবার উঠতে হয়। আবার একটা বাশ নিয়ে সে ঢাল বেয়ে নীচে নামে, এবার জল কিনারা পর্যন্ত যায় না, সেখান থেকেই গড়িয়ে দেয়–জলে পড়লে ভাদই নিয়ে নেবে। কিন্তু বাশটা দুটো কাটা গাছে এমনই আটকে যায় যে মহেশ্বরকে আরো খানিকটা নেমে পা দিয়ে সেটাকে গড়িয়ে দিতে হয়।

সেই বাঁশটা ধরতে ভাইকে বেশ কিছুটা এগিয়ে আসতে হয়, তার কোমর থেকে জল ধীরে-ধীরে নেমে যায়, আর বাঁধের একেবারে কাছাকাছি এসে ভাদই মহেশ্বরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, কায় একখান একখান করি বাঁশ আনিবার ধরিছেন, ফ্যালান কেনে, বাশ ফ্যালান। জলের ভেতর থেকে ভাদই তার এক হাত বাড়িয়ে দেয়। ভাদই বাতাসের দিকে পেছন ফিরে ছিল, তাই তার কথাগুলো বাতাসের বেগে এসে এই বাধটিতে আছড়ে পড়ে। মহেশ্বর এমন ভাবে তার কাপড়টা তুলে হাঁটু ভেঙে বাধ বেয়ে ওঠে, যেন মনে হয়, ভাইয়ের হুকুম এই মুহূর্তে অমান্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।

মহেশ্বর যখন একবার-দুবার, বাঁধময়, ও দূরেও, তার চোখ ঘোরায় এমন কাউকে দেখতে যে বঁশগুলো নীচে জলে ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসবে, তখন নীচে, জলের অনেক অভ্যন্তর থেকে কান্দুরা ডাকে–ভাদইগে। ভাদই বাঁধের নীচের জলে আজানু দাঁড়িয়ে হঠাৎ ঘাড়টা ঘুরিয়ে হক, দেয়

হে-এ-এ

ছাড়ু কি না ছাড়?

না ছাড়ু, না ছাড়ু।

ভাদইয়ের না-ছাড়ু, আওয়াজটা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যে প্রলম্বিত ও তীব্র হয় তা প্রতিধ্বনিও হতে পারে। কিন্তু এত বিপরীত বাতাসে প্রতিধ্বনি আসে না। তা হলে হয়ত কান্দুরাই কথাটাকে আর-একটু দূরে কানকাটুর কাছে ছড়িয়ে দিল এখন গরুগুলিকে ছেড়ো না।

বন্যার জল যখন আসে, তখনও তার আসাটা দেখা যায় না, আসে ত থিতু জলের সঙ্গে বা স্রোতের সঙ্গে মিশে। জলটা শুধু উঁচুতে উঠতে থাকে–কোনো আওয়াজ নেই, কোনো ভাঙন নেই, পাতালের জল যেন উথলে ওঠে। কিন্তু বাতাস ত তেমন নীরবে, অব্যাহত আসে না। একে ত এখন তিস্তার এপার-ওপার সত্যি দেখা যায় না ঝকঝকে রোদের দিনেও দেখা যায় না। জল বা বালির ঝিকমিকে দৃষ্টি আটকে যায়। এখন ত আরো দেখা যায় না–ছাই রঙের আকাশ নদীর একেবারে ওপরে নেমে মাঝখানে যেন নদীর ওপর দেয়াল হয়ে আছে। আর বাতাস সেই অদৃশ্য দেয়ালের পেছন থেকে তিস্তার এত বড় বিস্তারটা পার হয়ে যায় প্রায় যেন নীরবেই, অথবা, জলের যে-শব্দটা এখন আলাদা করে চেনা যায় না সেই শব্দের সঙ্গে মিশে আত্মগোপন করে। তারপর বাঁধের ওপর আছড়ে পড়ে সংহত সমস্ত শক্তিকে একসঙ্গে মুক্ত করে দিয়ে।

কিন্তু ভাদই কান্দুরা কানকাটু যেখানে, নদীর সেই শুকনো খাত, আসলে বড় তিস্তার বুকের চাইতেও নিচু। সেখানে এই বাতাস নেই, এই আওয়াজ নেই। সেখানে জলের আওয়াজ মাটির ভেতর থেকে উঠে আসছে, তারপর ছড়িয়ে পড়ছে এই জলের ওপরেই, বাতাসের সঙ্গে মিশছে না।

মহেশ্বর সেই বাতাসে তছনছ হয়। সে কাউকে দেখতে পায় না। বাধে কেউ নেই, সব চৌপত্তিতে। অথবা এই বাতাসে মাথার চুল, কাপড়চোপড়, সমস্ত এমন এলোমেলো হয়ে আছে যে একবার চোখ বুলিয়ে কাউকে চেনা যায় না। মাথার ওপরে এমন বাতাস আর পায়ের নীচে এমন জল না থাকলে মহেশ্বর জোতদারের উচিত একবার চোখ তুলেই হুকুম করার লোক পাওয়া। কিন্তু নীচে জলের মধ্যে ভাদই হাত বাড়িয়ে আছে বাঁশের জন্যে, যে গরুগুলোকে তুলে আনা হবে, তার ভেতর মহেশ্বরের গরুরই সংখ্যা বেশি, এদের দিয়েছে ফসলের ভাগ পেতে। ফসলের ভাগ পেয়ে গেলে জমির ভাগ কায়েম হয়।

কিন্তু মহেশ্বর এখন ত কাউকে পায় না বাশগুলো বাঁধের ওপর থেকে, নীচে ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিতে। ভাদই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে। অগত্যা তাকে দুটো বাশ দু হাতে নিয়ে এগতে হয়। বাঁধের কিনারায় এসে ঢালের দিকে ছুঁড়ে দেয়। কোথায় পড়ল না দেখে আবার ফিরে যায়। আবার দুটো বাশ এনে ঢাল বেয়ে গড়িয়ে দেয়। কোথায় পড়ল না দেখে আবার ফিরে যায়।

মহেশ্বর যখন বোঝে, তাকেই হাতে করে করে বাশগুলো নিয়ে-নিয়ে ভাইয়ের হাতে দিতে হবে, তখন সে ঠিক করে ফেলে, একটা-একটা করে বাশ নেয়ার বদলে বরং সবগুলো বাশই বাঁধের ঢালে ছড়িয়ে দিয়ে, পরে, পা দিয়ে দিয়ে গড়িয়ে দেবে। কিন্তু বাঁধের উত্তর দিক থেকে গামবুটু আর খাকির মোবাইল সিবিল এমার্জেন্সি চিৎকার করে হাত তোলে। বাতাসে চিৎকারটা শোনা যায় না, হাত তোলাটা দেখা যায়। মহেশ্বর দাঁড়ায়। তারপর দু পা গিয়ে বাঁধের একেবারে মাথায় যে ধাশগুলো পড়ে ছিল সেগুলো পা দিয়ে ঢালে নামিয়ে দেয়। দিয়ে, দেখে, একটা বাশও জলে পড়ল না।

জলের ভেতর থেকে ভাদই চিৎকার করে ওঠে, আরে কী করিছেন, তাড়াতাড়ি দেন কেনে বাশ, তাড়াতাড়ি দেন–

অগত্যা মহেশ্বরকে ঢাল বেয়ে নামা শুরু করতে হয় জলের দিকে, নামতে নামতে পা দিয়ে বাঁশগুলোকে সে গড়িয়ে দিতে থাকে। বাশগুলো যেন ডাঙায় নেই, জলে আছে–এমন ভাবে ঘুরে-ঘুরে যাচ্ছে। মহেশ্বরকে একবার ডাইনে, একবার বয়ে গিয়ে বাশগুলোকে পা দিয়ে ঠেলতে হয়। হয়ত একটু রেগে গিয়েই থাকবে মহেশ্বর। সে বাশগুলোকে বেশ জোরে-জোরে লাথি মারে। আর তাতেই দু-একটা বাশ ভাইয়ের হাতের সীমানায় গিয়ে পড়ে। ভাদই দুটো লম্বা বাশ তার আগে ভাসিয়ে দিয়ে নিজে সেগুলোর পেছনে ভাসে।

ঠিক সেই সময়ই মোবাইল এমার্জেন্সি বাঁধের ওপর থেকে চিৎকার করে ওঠে, এ আপনি কী করছেন, বাশগুলো আমাদের লাগবে-কাওশেড করার জন্যে।

মহেশ্বর বাঁধের ঢাল থেকে মাথা তুলে চিৎকার করে বলে–এইলা তোমার বাবার তালই রাখি গেইসে এইঠে?

শোনা গেল না বলে, নাকি মানে বোঝা গেল না বলে, মোবাইল এমার্জেন্সি কানে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, কী বললেন?

একটা বাঁশ হাতে নিয়ে এমার্জেন্সিকে মারার জন্যেই যেন তুলে মহেশ্বর পেছনে ছুঁড়ে দেয়। বাশটি যে জলে পড়ল তার কোনো শব্দও ওঠে না। মহেশ্বর আঙুল এমার্জেন্সির দিকে তুলে জিজ্ঞাসা করে তোমার বাবায় আনিছে এই বাশ? তোমার বাবায়? যেন এমার্জেন্সির বাপ বাঁধের ওপরে এমার্জেন্সির পাশেই দাঁড়িয়ে আছে।

এমার্জেন্সি তখনো কানের পেছনে একটা হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করে, কী বলছেন?

একটা রাগ দু বারের বেশি তিনি বার করা যায় না। মহেশ্বর এমার্জেন্সিকে আঙুল দিয়ে বাঁশগুলো দেখিয়ে, নদীর ভেতর ভাইকে দেখায়। তারপর আবার বাশগুলোকে লাথি দিয়ে দিয়ে গড়াতে চায়।

বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে এমার্জেন্সি দেখে।

তারপর, বাঁধের ওপর থেকে দুটো বাশ নিয়ে বাঁধের ঢালের দিকে নামে। দু-এক পা নেমে বা হাতের বাশটা মাটিতে নামিয়ে রাখে আর ডান হাতের বাশটা মাথার ওপর তুলে, দুই হাতে ধরে। তার সামনে যেন কোনো লক্ষ আছে। সেই লক্ষ সে এই ওপর থেকে বিদ্ধ করবে, এমন ভাবে তাক করে। ভাল করে তাক করতে বা-পাটা একটু পেছিয়ে দেয়। বোঝে যে এই ঢালে এর চাইতে শক্ত ভাবে পা রাখতে পারবে না। মোটা শরীরটাকে একটু দুলিয়ে জলের দিকে বাঁশটা ছুঁড়ে দেয়। বাশটা বেশ খানিকটা ওপর থেকে বাঁধের ঢালেই চলে যায়, কিন্তু লম্বালম্বি পড়ে বলে একটা ডিগবাজি খেয়ে জলে পড়ে, ভাইয়ের বা দিকে, পেছনে। জলে যদি সে বাশ ভেসে যায় সেই ভয়ে ভাদই লাফিয়ে এদিকে আসে, একটু যেন সাঁতার কেটেই।

.

জলগোধূলি

এখন এই নির্জন বাধে, নির্জন বন্যায় ও নির্জন ঝড়ে-জলের ভেতর দাঁড়িয়ে, হেঁটে সাঁতার কেটে ভাদই একটা বাঁশের সঙ্গে আর-একটা বাঁশকে জুড়ে-জুড়ে লম্বা করছে, আর বাঁধের ওপর থেকে মহেশ্বর জোতদার আর এমার্জেন্সি অফিসার ঠেলে-ঠেলে তাকে বাশ জোগান দিয়ে যাচ্ছে বাঁধের ঐ ঢাল বেয়ে, কখনো পা দিয়ে বাশ গড়িয়ে, কখনো হাত দিয়ে ছুঁড়ে, কখনো জলের কাছে গিয়ে ভাসিয়ে দিয়ে। ভাদই একটার পর একটা বাশ জুড়ে যাচ্ছে আর পাটের দড়ি দিয়ে গিঠ দিচ্ছে। বাশটা হাতে যাওয়ার পর জোড়া দিয়ে গিঠ, বাধতে তার খুব বেশি সময় লাগছিল না। পিঠের কাছে যে তার কাস্তে গেঁজা ছিল, অথবা, কান্দুরা বা কানকাটু কারো ছিল-সে নিয়ে এসেছে, তা বোঝা যায় যখন ভাদই গিঠ বাঁধার পর দড়ি কাটে। এই রকম করে বাশ বেঁধে ভাদই নিয়ে যাবে, অন্তত কাছাকাছি কোনো একটা উঁচু জায়গা পর্যন্ত। দু লাইনে বাধা বাশ বন্যার জলের সঙ্গে সঙ্গে ভাসবে। এখন গরুগুলোকে এই দুই সারির মাঝখানে ছেড়ে দিলে সবগুলো সিধে বাধে উঠবে। না হলে এমন জলেভরা জায়গাটা তাদের এতই অপরিচিত যে একসঙ্গে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে চলে যেতে পারে বড় স্রোতের দিকে। তখন এই জলের মধ্যে ভাদই কান্দুরা কানকাটুর সাধ্যও নেই গরুর পালকে বাঁচায়। দুই দিকে বাঁশের নিশানা থাকলে গরুর পালের ভুল হবে না। তা ছাড়াও, জল আরো বাড়লে, সব ডুবে গেলে, এই বাঁশের নিশানাটা অন্তত থাকবে–সব ডোবার আগে এই নিশানা ধরেই ত যাতায়াতের দরকার হতে পারে।

ভাদই এই বাঁশের লাইন টেনে নিয়ে গেল সামনের উঁচু ডাঙাটিতে–সেটার ওপরও এখন জল উঠেছে। সেখানে একটা পাতলা বাশ কাদায় এমনভাবে গাড়ে যাতে একটু স্রোতেই সেটা নুয়ে যায়। নুয়ে গেলে উপড়ে যাবে না। আর যদি যায়, তাহলে বাঁশের লাইনের ওদিকের মাথাটা বাধা থাকছে বাঁধের ঢালে। জল উঠলে সেই বাঁধনকে ভোলা যাবে। তখন যদি দরকার হয়, আর, জলের ভেতরের এই পাতলা বাশটাও যদি উপড়ে যায় তা হলে, বাঁধ থেকে এই বাঁশের লাইনটা ধরে অন্তত এই ডাঙাটা পর্যন্ত ত আসা যাবে।

কিন্তু তখন আসার দরকারটা কী? এখন না হয় গরুগুলোকে ঠিক ভাবে নিয়ে যাওয়ার জন্যে লাইন দরকার। যখন সারা তল্লাট জলে ডুবে যাবে, এমন কি বাধ থেকেও লোক সরানোর দরকার হতে পারে, তখন, এই বাঁশের লাইন ধরে জলেব তলের ঘরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার কী দরকার হবে?

দরকার হোক না-হোক, বাঁশের এই নিশানা ধরে ত সবাই বুঝতে পারবে ঐখানে জলের নীচে তাদের ঘরবাড়ি, জমিজিরেত।

এখনই সেই সব সম্পত্তির ওপর নদী। উঁচু উঁচু ডাঙাগুলোতে ঘরবাড়ির চাল দেখা যাচ্ছে, বেড়াগুলোও। নিচু জমির ঘরগুলোর চালের টুই জেগে আছে। জলের চেহারা ভাল নয়। আজ সারারাত এই বাতাস চলবে, বৃষ্টি চলবে, তাতে এই জল ফুলে উঠবে। সকালে দেখা যাবে–এখানে আর বাড়িঘর বলতে কিছুই নেই, শুধু নদী। তার ওপর এখনো ধস নেমে চলেছে। এমন সব পাহাড়ের গর্তেগুহায় জল জমে-জমে যে-হ্রদ হয়ে আছে, সেগুলো একসঙ্গে ফেটে গেলে পাহাড়ের জলে এখানে নতুন নদী তৈরি হবে। ভাদই কান্দুরা কানকাটু সেই নতুন নদীর জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নিকটতম একটু ডাঙাতে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত ডুবিয়ে ভাদই একটানা লম্বা ডাক দেয় বা থেকে ডাইনে তার মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে–হে-এ-এ কান-দূরা-আ-আ-কা-আনকা-আ-টু-উ-উ-উ। নদীর ওপারের বাতাস সে আহ্বানকে এই পারে পৌঁছে দেয়, তছনছ করে, যেন ভাইয়ের আহ্বান এদিকেই ছিল। কিন্তু নদীর ভেতরটা ফাঁকা বলে, ভাইয়ের বাতাসবিরোধী ডাক কান্দুরা কানকাটুর কাছে পৌঁছে যায় ঠিকই।

ডেকে ভাদই ওদিককার জলে নেমে পড়ে। সেখানে ডুব জল ও স্রোতের টান। তাতে ভাদই তার ছোট্টখাট্ট কোমল শরীরটাকে একটা কাঠের মত ভাসিয়ে দিয়ে আরো দূরের ডাঙাগুলোর কোনো একটাতে চলে যায়, কান্দুরা ও কানকাটুর মতই।

দু রাত্রির বাসি এই ঝড় ও বন্যায় আজকের এই প্রায় শেষবেলায় ওরা যেন শেষবারের জন্যে খতিয়ে নিচ্ছে এই বসতির সীমা-সরহদ্দ–মানুষের দখল থেকে যে-জমি নদী পুনর্দখল করেছে। সেই সীমার সবটুকু নয়, কিন্তু বেশ ছড়ানো-ছিটনো অনেকখানিতে, মাত্র তারা তিন জন এখন জলে সাঁতার কাটছে বা হাটছে বা দাঁড়িয়ে আছে।

তারপর, সেই সব উঁচু ডাঙায় বেঁধে রাখা গরুগুলোকে নিয়ে তারা একসঙ্গে জলে নামে। এগিয়ে আসে সেই উঁচু ডাঙাটার দিকে, যেখানে ভাদই বাশ বেঁধে রেখে গেছে।

তারা তিন দিক থেকে আসছিল। কান্দুরা ছিল দক্ষিণের ডাঙায় আর ভাদই ছিল উত্তরের ডাঙায়। কানকাটু মাঝের ডাঙা থেকে গরুগুলোকে জলে নামায়। তিনদিক থেকে জলে নেমে পড়ায় এই এক স্বস্তি যে গরুর পালগুলিকে অন্তত কিছুটা সামলাতে পারবে, চট করে কোনো একটা পাল এদিক-ওদিক চলে যেতে পারবে না। যদি উত্তরের দিকে চলে যায় তাহলেই বিপদ। এদিকে গেলে ত তাও বাধ পাবে।

এই তিন-তিনটি পালকে একদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে হেট হেট হুট হুট করার কোনো দরকার ছিল না, তবু, ভাদই, কান্দুরা আর কানকাটু মাথার ওপর ছড়িমত কিছু একটা ঘোরাচ্ছিল আর জিভ দিয়ে টাকরায় আওয়াজ তুলছিল যেন তারা মাঠ বা রাস্তা দিয়ে পালগুলিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেই আওয়াজেই হোক, আর, তাদের সামনে উঁচু বাধে এই গৃহপালিত গরুগুলো মাটির ইশারা পায় বলেই হোক, তারা যতটা সম্ভব দ্রুতগতিতে ঐ বাঁধের দিকেই ছুটছিল।

ছোটায় একটাই অসুবিধে ছিল। এই গরুর পালও এই নদীখাত এমন সরাসরি পেরতে অভ্যস্ত নয়। তা ছাড়া, কোথাও, তাদের কারো কারো বুক জল, কোথাও, কোনো-কোনো বাছুর ডুবে যায়, কোথাও-বা গাভিনের হাঁটু জেগে ওঠে ও সেই জলস্রোতের মধ্যেও জলস্থলের পার্থক্য না-বোঝা বাছুর, মায়ের বাটে হামলায়, পর মুহূর্তেই বাছুরসহ সেই গাই প্রায় পিঠ পর্যন্ত জলের ভেতরে চলে যায়।

কোনো একটি গরুও হাম্বা ডাকে না, যেন, এই গরুর পাল জানে যে তাদের সমবেত ডাকে, আকাশ আর জলজোড়া বাতাস বৃষ্টি আর সেই দূর পাহাড়ের গোপন সব হ্রদ সঙ্কেত পেয়ে যাবে। যত দ্রুত সম্ভব তারা এই নতুন নদী পেরিয়ে পুরনো মাটিতে পা রাখতে চায়।

কিন্তু ভাদই, কান্দুরা আর কানকাটুর হয়ত কিছু সাহসের দরকার হয়, একটু অতিরিক্ত সাহসের। একা-একা এই পাহাড়-ভাঙা জল ডিঙতে সে-সাহসের দরকার হয় না, কিন্তু এই এতগুলো গরু নিয়ে এত দিক থেকে এই দৈনন্দিনের বাইরের জলরাশি পেরতে তাদের হয়ত দরকার হয় সেই সাহসের অতিরিক্ততাটুকু। তারা, নদীর ঐ ক্রমবিস্তারের মাঝখানে, পায়ে-কোমরে বুকে-পিঠে, আর, কখনো সারা শরীরে; ঐ জলরাশির আবর্তনের মাঝখানে, দেখে, এ-আকাশ যেন নদীর ওপর চেপে বসেছে, এরপর যেন নদী ও আকাশের মাঝখানে কোনো রেখাও থাকবে না। ভাদই হকার দিয়ে ওঠে, পার্থক্য এখনো এটুকু আছে এইটি নিজেকে বোঝাতে-হে-ই, হে-ট, হেট, খবোরদা–আ-রো-হে, খবোরদার, কান্দুরা চেঁচায়–কানকাটু বায় মারি দে, বয়ে মার।

যে-জলমগ্ন ডাঙায় ভাদই বাশ বেঁধে রেখে গিয়েছিল, গরুগুলো সেখানে উঠে পলমাত্র দেরি না করে হু হু বেগে সেই দুই বাঁশের লাইনের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এতক্ষণ যেভাবে আসছিল, তেমন ছড়িয়ে নয়, দুই বাঁশের ভেতরের সেই জায়গাটুকুতে গায়ে গা লাগিয়ে এই এতগুলো গরু যেন একটা অগ্রসরমাণ সঁকো হয়ে যায়, মাঝখানে ছড়িয়ে-ছড়িয়ে থাকে কান্দুয়া, ভাদই আর কানকাটু। আচ্ছন্ন আকাশেও এক অদৃশ্য সূর্যাস্ত ঘটছিল। সেই অভ্যস্ত গোধূলিলগ্নে, সেই বিকেলে, সেই প্রবল ঝঞ্ঝায় এই যেন অপ্রাকৃত জলরাশি ভেদ করে ভাদই কান্দুরা কানকাটু তাদের ধেনুদল নিয়ে প্রায় ফিরে আসে–

.

'সীমান্তবাহিনী'র দুই অর্থ

তিস্তার মধ্যে নোয়াপাড়া, মেচিয়াপাড়া, সয়েদপাড়া, দহগ্রাম–এই চারটি চর বা ছিটমহল। এ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত হয়েছে, কারণ, এই চারটি জায়গা আগেকার পূর্ব পাকিস্তান ও এখনকার বাংলাদেশকে কোনো এক চুক্তি অনুযায়ী দিয়ে দেয়া হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে পাটগ্রাম থানা ছিল জলপাইগুড়ি জেলার মধ্যে। তিস্তা এখানে বরাবরই সীমান্তবাহিনী। মণ্ডলঘাটের পর তিস্তা পুব পারে মেখলিগঞ্জ আর পশ্চিমপারে হলদিবাড়ি এই দুই জায়গার মধ্যে দিয়ে তখনকার কোচবিহার রাজস্টেট, এখনকার কোচবিহার জেলা, পার হয়ে পাটগ্রামের পশ্চিম সীমা দিয়ে রংপুরের দিকে চলে যেত। তখন পাটগ্রামের পশ্চিমের এই নদীই ছিল রংপুর আর জলপাইগুড়ির মাঝখানের সীমান্ত। এই নদীর একেবারে মাঝখানে, পাটগ্রামের একেবারে ভেতরে নোয়াপাড়া, মেচিয়াপাড়া, সয়েদপাড়া, দহগ্রাম ও আরো অনেক নাম-না-থাকা চর আসলে ছিল কোচবিহার রাজ্যের ছিটমহল ও সেই কারণে কোচবিহারের ভারতভুক্তির পর ভারত ইউনিয়নের ও পশ্চিমবঙ্গের অংশ। কিন্তু সে ত ম্যাপের অংশ। অন্য একটা রাষ্ট্রের একেবারে ভেতরে এই কয়েকটি চরের মত ছিটমহলে ভারত ইউনিয়ন বা পশ্চিমবঙ্গ তার নিত্যিনৈমিত্তিক দখল কায়েম রাখবে কী করে? কেনই বা রাখবে? যে-সব স্থায়ী জায়গা, নদীর গতিপথ বদলানোয়, অনেক দিন ধরে কার্যত নদীর চর হয়ে গেছে অথচ সেটলমেন্টে সেসব জায়গা মূল ভূখণ্ডের অংশ, তাদের জুরিসডিকশন লিস্ট নম্বর আছে, সেই সব জায়গাই ত ছিটমহল। এই সব মহল ত নদীর ভাঙাচোরায় ছিট হয়ে গেছে। কোথাও এক নম্বর আর পাঁচ নম্বর হয়ত ভারতের, দুই তিন চার হয়ত বাংলাদেশের। আবার কোথাও হয়ত আট নম্বর আর নয় নম্বর বাংলাদেশের, ছয়, সাত আর দশ ভারতের। এই রকম এক-একটা চর নিয়ে এক-একটা রাষ্ট্র হয়ে থাকা দুই রাষ্ট্রের পক্ষেই অসুবিধের। সেই জন্যেই দুই দেশের মধ্যে কিছু লেনদেন সেরে ছিটমহলগুলোকে যতদূর সম্ভব একটু সাজিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু সাজিয়ে নেয়া হলেও ত নদী নদীই থাকে। চর চরই থাকে। আর, নদী নদী থাকলেও বা চর চর থাকলেও ত সেখানে রাষ্ট্র থাকে, রাষ্ট্রের সীমান্ত থাকে, সীমান্তে বর্ডার আউটপোস্ট থাকে। কাস্টমসের লোকজন থাকে, সীমান্তবাহিনী থাকে, বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের ক্যাম্প থাকে, সেই ক্যাম্পের নিজস্ব অস্ত্রভাণ্ডার থাকে। তেমনি, আগে যেমন পাকিস্তানের • থাকত, এখন তেমনি বাংলাদেশেরও বর্ডার আউটপোস্ট থাকে, কাস্টমসের লোকজন থাকে, বাংলাদেশ রাইফেলসের ক্যাম্প থাকে, সেই ক্যাম্পের নিজস্ব অস্ত্রাগার থাকে।

কিন্তু এত কিছু ব্যবস্থা যে-সীমান্তকে রক্ষা করার জন্যে সে সীমান্তটিই এখানে থাকে না। দুই দেশের আইনসঙ্গত বা বেআইনি যাত্রীরা কেউই এত বর্ডার থাকতে এই চরের বা নদীর জলের বর্ডার পেরতে চায় না। অথচ এই বর্ডার বা নদীর চরে যে-সব মানুষজন থাকে তারা তাদের বাজারের জন্যে বা খাবারদাবারের জন্যে কাছাকাছির বন্দর এলাকায় বা হাটেই ত যায়। না গিয়ে উপায় থাকে না বলেই যায়। এমনকি ভারতীয় বর্ডার আউটপোস্টের খাবারদাবারের জন্যে, রবি আর বৃহস্পতি, সয়েদের হাটে নৌকো নিয়ে না গিয়ে উপায় থাকে না। সয়েদের হাটটা বসেই একটা অদ্ভুত জায়গায়–ওটা ত পুরোপুরি পাটগ্রাম, কিন্তু ঠিক হাটখোলায় নদীর সঙ্গে লাগানো একটা ফালি আছে ভারত ইউনিয়নের, কারণ, দেশভাগের সময় এই ফালিটা কোচবিহারের ছিটমহলের মধ্যেও আবার ছিল জলপাইগুড়ি জেলার ছিটমহল। সয়েদের হাটটা বসে এই সীমান্ত জুড়ে–তাই হাট করতে-করতেই ভারতীয় ইউনিয়নের বর্ডার আউটপোস্ট আর বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের লোকজন বাংলাদেশে ঢুকে যায় ও বাংলাদেশের বর্ডারের লোকজন ভারত ইউনিয়নে চলে আসে। হাটটা চলেই ত প্রধানত দুই বর্ডারের লোকজনের জন্যে-নইলে এত একটেরে হাটে কি এত পাঠা, খাশি বা মুরগি আসে?

হাটখোলটার পশ্চিম দিকটা বাংলাদেশের আর পুব দিকটা ভারতের। ঠিক আধাআধি নয় বাংলাদেশেরটাই আসল কিন্তু ভারতের দিকে, রাজকিশোরী পাড়ার অংশটাতে, মুরগিহাটা। ওদিকেই পাঠা-মুরগি, এমন-কি দু-চারটে গরু বাছুরও বিক্রি হয়। দু-এক সময় গরুবাছুর নিয়ে গোলমালও বাধে বর্ডারের চোরাই গরু ধরা পড়ে যায়। দু-একবার বাংলাদেশের চোর, ভারতে গিয়ে গরু চুরি করে এনে বেচছে, ভারতীয় বর্ডারের লোকরা ধরে ফেলেছে হাটে, তারপর হাটের ভেতরে ভারতের এলাকায় নিয়ে এসে প্রচুর মার দিয়েছে। বাংলাদেশ বর্ডারের লোকজনও এসে সে মারে হাত লাগিয়েছে। আর-একবার এক চোরকে বাংলাদেশেরই বর্ডারের লোকরা ধরে ফেলেছিল কিন্তু সে এক দৌড়ে ভারতীয় এলাকায় গিয়ে নিজেকে ভারতের লোক বলে ঘোষণা করল। এক দেশের নাগরিকতা ত্যাগ ও আর-এক দেশের নাগরিকতা গ্রহণের মত নাটকীয় ঘটনাও কেমন হাসির বিষয়ে হয়ে ওঠে–উমরায় ত কুচলিহাটার চোরাবলাই। চোরা বলাই সম্ভবত স্বনামখ্যাত বলেই আত্মরক্ষার জন্যে এমন একটা উপায় ভাবতে পারে। কিন্তু এই ঘটনায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের একজন চোরা বলাইয়ের ঘোষণাকে মেনে নিয়ে তাকে ভারতীয় নাগরিকের স্বীকৃতি দিয়ে ঘাড় ধরে টেনে এনে তার পাছায় একটা লাথি কষায়–এতটাই জোরে যে সে হাটের এক তরকারিঅলার ঘাড়ে গিয়ে পড়ায় তার কুমড়োগুলো চারদিকে গড়িয়ে যায়। কুমড়োগুলোর কোনো-কোনোটা বাংলাদেশে চলে যায়, কোনো-কোনোটা ভারত ইউনিয়নের ফালি জমির আরো গভীরে। কুমড়োঅলা সেগুলের পেছনে-পেছনে দুই রাষ্ট্রের ভেতরে ছুটোছুটি করবে নাকি পেছন থেকে হঠাৎ তার ঘাড়ে যে চোরা বলাই এসে পড়ল তাকে চেপে ধরবে এটা সাব্যস্ত করতে না করতেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী এসে চোরা বলাইয়ের চুল ধরে তাকে সঁড় করায়। এদিকে বাংলাদেশ বর্ডার ফোর্সের লোজন বলাইকে নিতে এলে ভারতীয়রা বলে, দাদা, একে কয়েক দিনের জন্যে ধার দেন, আমাদের ঠাকুরের এসিস্ট্যান্টটা ভেগেছে।

বাংলাদেশ বর্ডারের লোকজন বলল, নিয়্যা যান কেনে দাদা, আপনাদের ক্যাম্পে ফাটক দেওয়া গেইল। চোরা বলাইয়ের মাথার ওপর নেমে আসে হাট করার বিরাট ঝুড়ি, এতক্ষণ সেটা এক জোয়ান দড়ি বেঁধে টানতে-টানতে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও একটা সতর্কতা থাকে। সীমান্তের কাছে কোনো হাট সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে না, তার অন্তত ঘণ্টা দু-তিন আগে শেষ হতে হবে, যাতে, হাটের লোজন সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে যেতে পারে ভারতীয় বর্ডারের এ-নিয়ম এই হাটেও মানা হয়, যদিও এ হাটটাকে বাংলাদেশের হাট বলার আইনি সুযোগ অনেক বেশি। কিন্তু এই নিয়মটা মেনে নিয়ে দুই বর্ডারের সরকারি লোকজন যেমন তাদের নৌকো করে সেই সয়েদপাড়া-দহগ্রামের ছিটমহল-চরমহলগুলোতে সীমান্ত পাহারা দেয়ার জন্যে ফিরে যায়, তেমনি, এই বড় চর এলাকার বাসিন্দারাও নিজ-নিজ জায়গায় ফেরে। হাটে ত শুধু চরের লোকরাই আসে না, পাশাপাশি গায়ের লোজনও আসে–তারাও হাটশেষে তাদের গ্রামে পৌঁছয়। সয়েদের হাটের হাটখোলা, হাটের লোজন, দুই বর্ডারের সেপাই-জোয়ান, গরু-পাঠা-মুরগি, এমন-কি চোররাও, দুই রাষ্ট্রের এই সীমান্তকে মেনে নিয়েই সীমান্ত লঙ্ঘন করে। তিস্তা এখানে প্রকৃত সমতলের বিস্তার পেয়েছে। সেই সমতলে, ও সেই বিস্তারে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জায়গাগুলিতে, সীমান্ত ত একেবারে অনতিক্রম্য ও সুনির্দিষ্ট। তিস্তা সেই অনতিক্রম্যতা ও নির্দিষ্টতাকে অন্য সময় একটা আকারও দেয়। তখন তিস্তার চরের মধ্যে টিনের লাল রং দেখে ভারতীয় বর্ডার ক্যাম্প ও টিনের সবুজ রং দেখে বাংলাদেশ বর্ডার ক্যাম্প চিনে নেয়া যায়। তখন চরের ওপর কাটাতারের যে-বেড়া একটা সীমান্তের সঙ্কেত হয়ে থাকে, সেটা মেনে নিয়ে তিস্তাও যেন নিজের ভেতরে একটা অঘোষিত কাটাতারের বেড়া তোলে।

কিন্তু এখন বন্যার তিস্তা সেই সমস্ত সীমান্তচিহ্নকে লোপাট করে দেয়। যেমন সূর্যের আলো বা রাত্রির অন্ধকার সীমান্ত মেনে চলে না, তিস্তাও এখন সেরকম। আজ শনিবারের বিকেল। চারপাশ থেকে তিস্তা এই চরগুলোর ওপর উঠে আসছে, কোনো একটি চরের ওপর নয়–সেই নাউয়াপাড়া থেকে ঐ নীচের ছয় নম্বর দহগ্রাম পর্যন্ত সবগুলো চরের ওপর দিয়ে তিস্তা বয়ে গিয়ে ছিটমহল, চরমহলের আন্তর্জাতিক সমস্যা দূর করে দেবে। বুধবার থেকে জল বাড়ছে। কিন্তু এখানকার বৃষ্টি ত থেমেও গিয়েছিল। বৃহস্পতিবার শেষ রাত থেকে হঠাৎ আকাশ ক্রমেই বিবর্ণ হতে শুরু করে আর বাতাস যেন খুবলে মাটি তুলে ফেলতে চায়। এখন এই শনিবারের বিকেলে ঘোলা আকাশ আর ঘোলা তিস্তা মিলে যেন একটা সুড়ঙ্গের মত হয়েছে।

.

বাংলাদেশের দূত ইন্ডিয়ায়

ভারতের সীমান্ত চৌকিতে রেডিও-টেলিফোন বেজে ওঠে। এক্সচেঞ্জে কেউ ছিল না। এখন ডিউটি কিশোরীচাঁদের, সে কম্যান্ড্যান্টের ঘরের সামনে অন্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়েছিল। একটা এল-প্যাটার্ন ব্যারাকের মাথায় কম্যাভ্যান্টের ঘর আর তার সমকোণে, শেষে এক্সচেঞ্জ-সুতরাং ফোন বাজলে শুনতে পাওয়ারই কথা। কিন্তু বাতাসটা বিপরীত দিকে ধেয়ে যাচ্ছিল আর কম্যান্ড্যান্টের ঘরে এরাও নিজেদের মধ্যে জোরে জোরে কথা বলছিল–তাই ফোনের বাজনা আর শোনা যায় না।

ওপরে ভামনির ছাউনি আর পাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে এই একটাই ব্যারাক–এই ব্যারাকের দক্ষিণ আর পুবের দিকটা অফিস আর পশ্চিম ও উত্তর দিকটা প্রাইভেট। আসলে ভামনির ঘর একটা–সেই ঘরটা দুভাগ করা, বাঁশের বাতার পার্টিশন দিয়ে। এই প্রাইভেট-দিকে অবিশিষ্ট একটা ঘর খুব লম্বা–সেখানে জওয়ানরা থাকে। অফিসের দিকের মাঠটা পরিষ্কার–এক দিকে ভলি আর ফুটবল খেলার মাঠ, তারও পরে অনেকটা দূর পর্যন্ত মাঠটা ঘাসেঘাসে ছড়িয়ে গেছে। সেখানকার ঘাসগুলো বড়কয়েকদিনের বৃষ্টিতে নেতিয়ে আছে। তারও পরে কাটাতারের বেড়া। প্রাইভেট-দিকটাতে একটা আলগা ঘর রান্নার জন্যে। আর-একটা ছোট আলগা ঘর- ইটের দেয়াল, চুনকাম করা, লাল টিন, একটা বারান্দা, একটা কোল্যাপসিবল গেট, তার পেছনে একটা কাঠের দরজা–এই ঘরটাতেই বন্দুক ও হয়ত আরো কিছু অস্ত্র থাকে। বারান্দায় দুজন শাস্ত্রী পোশাক পরেই পাহারা দিচ্ছে।

এই ছোট ঘরটা ও শাস্ত্রীরা ছাড়া আর-কোথাও রাষ্ট্রব্যবস্থার কোনো পরিচয় নেই। এমনকি কমান্ড্যান্টের অফিসের সামনে লোহার যে-ফ্ল্যাগস্টাফটিতে ভারতের জাতীয় পতাকা রোজ সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত ওড়ে, সেই ফ্ল্যাগস্টাফটি ভিজে ও তার গায়ের দড়িটি স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে! বৃষ্টির জলে ফ্ল্যাগস্টাফের রং অনেকটা ধুয়ে গেছে–শাদা রঙের মাঝে-মাঝেই লোহার দাগ। ফ্ল্যাগস্টাফটা একটা সিমেন্ট বানো বেদির ওপরে। বেদিটাকে গোল করে ইটের কেয়ারি-এক দিকে একটু ফাঁক। ২৬ জানুয়ারি ও ১৫ আগস্ট ওখান দিয়ে গিয়ে কম্যান্ড্যান্ট পতাকা উত্তোলন করে। অন্য দিন নাইট ডিউটির সেন্ট্রি পতাকা তুলে দিয়ে ডিউটি থেকে অফ হয়। গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ফ্ল্যাগস্টাফের কেয়ারি কাদায় ঢাকা পড়েছে। ফ্ল্যাগ গত কয়েকদিন ভোলা হচ্ছে না। প্রথম দিনের বৃষ্টিতেই এত ভিজে গেছে। যে কম্যান্ড্যান্টের অফিসের বেড়ায় শুকোবার জন্যে গুঁজে দেয়া হয়েছিল। বুধবারে শুকয় নি। বৃহস্পতিবারে দিনের বেলায় শুকবার আশা ছিল, কিন্তু তারপরই ত এই বৃষ্টি বাতাস শুরু হল। এখনো, ফ্ল্যাগটা শুঁকতে দেয়াই আছে–কিন্তু একটা ছোট লাঠিতে ফ্ল্যাগটা ঝুলিয়ে দিয়ে লাঠিটা বেড়ায় খুঁজে দেয়া, যেন বাইরে বৃষ্টি বলে অফিসের ভেতরে ফ্ল্যাগ তোলা হয়েছে। ফ্ল্যাগটা একটা বড় ভেজা ন্যাতার মত নেতানো। রংগুলোও একটু মিশে গেছে। গেরুয়াটার ভেতরে সবুজের ছোপ, বা সবুজের ভেতরে গেরুয়ার ছোপ অত চোখে নাও পড়তে পারে কিন্তু শাদার ভেতরে গেরুয়া আর সবুজের ছোপ খারাপ লাগবে। ক্যাম্পে আর স্পেয়ার নেই। নতুন ফ্ল্যাগ চাইতে হবে।

এখন চরের মত হয়ে গেলেও আসলে ত এটা ছিটমহল, এখানকার মাটি তাই পুরনো ও শক্ত, তিস্তার বেলেমাটির মত আলগা নয়। গাছগাছড়ায় পুরো গ্রামটি ঘেরা। শুধু ঘেরাই নয়, ভরাও। সীমান্তের নিয়মঅনুযায়ী এই আউটপোস্টের ভেতরের প্রায় সমস্ত গাছ কেটে ফেলা হয়েছে–যে দুটি-একটি গাছ এদিকে-ওদিকে ছড়ানো সেটাও ক্যাম্পের দরকারেই। একটা বিরাট আমগাছ-কম্যান্ড্যান্টের প্রাইভেট-এর সোজা পশ্চিমে, প্রায় নদীর কাছাকাছি। ওখানে চাঁদমারি হয়। আর-একটা বড় সিসু গাছ থেকে গেছে ঐ বন্দুকের পাকা ঘরের পেছনে সিধে উত্তরে। কেন, তা এখন আর অনুমান করা যায় না। কিন্তু এরকম দু-একটি গাছ বাদে ক্যাম্পের চারপাশ, চারপাশেই অন্তত মাইলখানেক জায়গাও, একেবারে খোলামেলা। সেই ঘাসবনের সীমানায় কাটাতারের বেড়া ঘেঁষে খুটির ওপর গার্ডরুম–একটা পুবে, একটা পশ্চিমে। সেখানে দুই শাস্ত্রীর রাতদিন বাইনোকুলার নিয়ে পাহারা দেয়ার কথা। কোনো দিনই কেউ ওখানে একা-একা বসে থাকে না। যার নাইটডিউটি থাকে সে আর কাউকে সঙ্গে নিয়ে রাতটা ওখানে ঘুমিয়ে আসে। এখন ত কোনো কথাই নেই–ক্যাম্প ভাসতে বসেছে, এখন আবার গার্ডরুম কী?

ভারতের সীমান্ত চৌকিটাই এ রকম একটু বেখাপ্পা ও একটেরে, কারণ, এখানে দেশ নেই কিন্তু সীমান্ত আছে তিস্তার যে-ঘোলাটে স্রোত এই সীমান্তের ওপর আছড়ে পড়ে বায়ে-ডাইনে ভাগ হয়ে যাচ্ছে সেটাকে যদি দেশ বলে ধরা যায়, তা হলে অবিশ্যি দেশ আছে। কিন্তু শীতের সময় যদি পাতলা, শুকনো, মাঝে মাঝে বালি-বেরনো ঐ নদীটাকে দেশ বলে মনে হতেও পারে, এখন ত মনে হচ্ছে ঐ নদীর মুখ থেকে ভেতর দিকে যত সরে যাবে তত বাঁচবে–সেই ভেতরটাই যেন দেশ। কিন্তু এই দ্বীপের মত ছিটমহলেরও মাত্র একটা অংশে ইন্ডিয়া, বাকি সবই ত বাংলাদেশের।

ফলে, বাংলাদেশের সীমান্ত চৌকিটার প্রাধান্য অনেক বেশি। তারা ত নিজেদের দেশের ভেতরে বসে বসে নিজেদের সীমান্ত পাহারা দিচ্ছে। তাদের ত আর কোনো সময় মনে হয় না যে তারা দেশের বাইরে গিয়ে দেশকে পাহারা দিচ্ছে। এমন-কি, এখন যে তিস্তার বন্যা সেই ইন্ডিয়া থেকে এত জল নিয়ে এই বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসছে, আজ এই শনিবার বিকেলে আর ভরসা হচ্ছে না যে রাতের ঘন্টা কটা নিরাপদে কাটবে, আর এখন তাড়াতাড়ি, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই একটা কিছু উপায় ভেবে রাখতে হচ্ছে–তাতেও ত ভারতের সীমান্তচৌকির সমস্যা আর বাংলাদেশের সীমান্তচৌকির সমস্যা এক নয়। বাংলাদেশের ওরা হয়ত সবাই মিলে এতক্ষণ নৌকোয় ডাইনে-বায়ে কোথাও পার হয়ে গেছে। ইন্ডিয়ার ত পার হওয়ারও জায়গা নেই, পার হতে হলে সেই বাংলাদেশেরই কোথাও যেতে হবে। সপ্তাহে একদিন বা দুদিন কয়েকজন মিলে হাট করে আনা এক জিনিশ, আর সেখানও ত আইনের এই ছুতোটুকু থাকে যে হাটটা অর্ধেক ভারতে বসে, সুতরাং বেআইনি চালান বন্ধ করার জন্যে তারা রাউন্ডে যায়। কিন্তু তাই বলে পুরো ক্যাম্প তুলে দিয়ে বাংলাদেশেরই এক জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নেয়া ত আর যায় না। আবার, না নিয়ে উপায়ই বা কী?

কমান্ড্যান্ট বলে, এক কাজ করো। তোমরা এখন নৌকোটা নিয়্যা ওপার যাও। কয়েকটা শিফটে যত জন পারো যাও। আমি বাকিদের নিয়্যা এইখানে থাকি। রাত্তিরে যদি জল ঘরে ঢোকে, তখন আমরাও নৌকায় চইড়া বসব।

বিভূতি ঘোষ বয়স্ক লোক। সে বলে, কথাটা মন্দ বলেন নি। তা হলে রাতে না গিয়ে এখনি চলে যান না!

কোথায় যাব? কম্যান্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে।

রাতের ঐ অন্ধকারের মধ্যে, তখন পুরো ফ্লাড, যেখানে ভেসে যাবেন।

কমান্ড্যান্ট তার চেয়ারে হেসে দুলে-দুলে ওঠে, ঘোষের কথা শুনো।

তা হলে আর এত মিটিংটিটিঙের দরকার নাই, যা হওয়ার তা হবে, বটুক বর্মন বলে ওঠে।

কী হবে তা ত বোঝাই যাচ্ছে। কী নিত্যানন্দ, বলল আবার, গায়ের লোকজন কী করছে?

নদী ত দক্ষিণের গায়ে তখনি ঢুকে গেছে–আমি ত সেই সকালে দেখে এসেছি।

তারপর জল ত আরো বাড়ল। দক্ষিণের লোকজন বলছিল–তাদের গরুবাছুর ক্যাম্পের মাঠে এনে রাখবে।

তা আনে নাই যখন, জল কমতেও পারে, কম্যান্ড্যান্ট বলে, কী বলো বিভূতি ঘোষ?

আপনার ত দেখছি বেশ আমোদ হয়েছে। এখন ইলিশমাছ আর খিচুড়ি হলেই হয়।

আরে ফ্লাডেই যদি মরতে হয় ইলিশমাছ খায়্যা মরাই ভাল, কম্যান্ড্যান্ট চেয়ারের মধ্যে হেসে ওঠে।

এমন সময় আপাদমস্তক ওয়াটার পুফে মোড়া একজন একটা সাইকেলে চড়ে হুড়মুড় করে এসে নামে। সাইকেলটাকে সিঁড়িতে রেখে লোকটি বারান্দায় ওঠে। বারান্দায় উঠে সে তার ওয়াটারপ্রুফের টুপি খোলার পরও কেউ চিনতে পারে না। তারপর ওয়াটারপ্রুফের বোম খুলতেই বটুক বর্মন বলে ওঠে, আরে আজিজ, তুমি?

আর আজিজ? রেডিও-টেলিফোন বাজি বাজি হয়রান হই গেসি। স্যালায় সাইকেল নিগি রওনা দিছু। উঃ কী বাতাস। কম্যান্ডার পাঠি দিসে।

.

ইন্ডিয়া বাংলাদেশ বার্তাবিনিময়

সে কী? তোমরা ফোন করছিলা নাকি? কম্যান্ড্যান্ট চেয়ার থেকে পা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করে। আজিজ তখন ভেজা ওয়াটারপ্রফুটা কোথায় রাখবে সেই জায়গা খুঁজছিল, শেষে আর জায়গা না পেয়ে ফিরে গিয়ে তার সাইকেলের সিটের ওপরই রাখে। এমনভাবে ভাজ করে রাখে আজিজ, যাতে বাইরের দিকটা বাইরে থাকে।

আজিজের পরনে লুঙি, স্যান্ডো গেঞ্জি আর গামবুট। লুঙিটা ভাজ করে কোমরে গোজা। এইবার আজিজ কম্যান্ড্যান্টের দিকে তাকিয়ে বলে তোমরালার টেলিফোন কি অফ করি রাখিছেন?

কেন? অফ কেন? কার ডিউটি ছিল? কম্যান্ড্যান্ট তার চেয়ারের দুই হাতল ধরে জিজ্ঞাসা করে একটু উঁচু গলায়। কিশোরীচাঁদ ভিড়ের ভেতর থেকে এক্সচেঞ্জের দিকে সরে যায়। কিন্তু তাড়াতাড়ি হেঁটে বা দৌড়ে যায় না। তা হলে ত ধরাই পড়ে যাবে ডিউটি তার ছিল। তা ছাড়া বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে এই দুর্যোগে মেসেঞ্জার এল কেন সেটাও সে জেনে যেতে চায়। এমনিতে এ ক্যাম্পে কে কোথায় কখন ডিউটি করছে তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই-রুটিন কাজগুলো হয়ে গেলেই হল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে ফোন করে না পাওয়াটা সাধারণ ব্যাপার না। তার ওপর আবার ফোন না পেয়ে সাইকেল চড়ে মেসেঞ্জার এসেছে।

আজিজ তখন বলছে, স্যার, ক্যাভার সাহেব জানিবার চাহেন তোমারালার পাছত কোনো ফ্লাড ওয়ার্নিং আসিছে কি আসে নাই?

কেন? তোমাদের কাছে কিছু এসেছে নাকি? কম্যাভ্যান্ট একটু ঝুঁকে পড়েন।

সে ত বাবু কহিবার পারিম না। মোক কহি দিছে তোমারালার ওয়ার্নিং আসিছে কি আসে নাই পুছিবার তানে, আজিজ বলে। কম্যান্ড্যান্ট একটু ভাবে, তারপর হঠাৎ জিজ্ঞাসা করেন–এই, এক্সচেঞ্জে কে আছে? কোনো ওয়েদার মেসেজ আসছে না কি?

ততক্ষণে কিশোরীচাঁদ এক্সচেঞ্জের কাছে চলে গেছে। সেখান থেকে সে জবাব দেয়, না, আসে নাই।

তুমি ত ফোনের কাছে ছিলাই না, জাইনল্যা কেমন কইর‍্যা? কম্যান্ড্যান্টের গলায় আধা-তিরস্কার।

আমি ত এখানেই ছিলাম, কিশোরীচাঁদ এক্সচেঞ্জের দরজা থেকে গলা তুলে বলে।

ছিল্যা ত ছিল্যা। এখন দেখো, কোথাও ফ্লাডের কোনো খবর পাও কিনা–কোচবিহার দেখো, জলপাইগুড়ি হেডকোয়ার্টাস দেখো। আজিজ, তোমাদের কোনো খবর নাই? কম্যান্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা। করে।

খবর আর কোটত পাম? এ্যালায় ত দুই নম্বর ভাসি গেইসে।

দুই নম্বর? ভাইস্যা গিছে? কম্যান্ড্যান্ট দাঁড়িয়ে পড়ে, সেখানে ত তোমাগো অনেক লোক।

হ্যাঁ, সগায় আসি ক্যাম্পত ভিড় করিবার ধরেছে।

তোমাদের ক্যাম্পে দুই নম্বরের লোকজন আইস্যা গিছে? সাইরছে। তা হালি ত এই ক্যাম্পতেও আইসবার ধরব, কম্যান্ড্যান্ট এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়, এ-ই দ্যাখোত দক্ষিণপাড়ার খবর কী? কম্যান্ড্যান্ট চিৎকার করে বলে। এখানে যে-ভিড়টা জমে ছিল সেটা ধীরে-ধীরে কেমন সরে যায়। এক বিভূতি ঘোষ দাঁড়িয়ে থাকে। কম্যান্ড্যান্ট বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই বৃষ্টির ছাটটা আচমকা বাতাসে এদিকে ফেরে, কম্যান্ড্যান্ট তাড়াতাড়ি পেছিয়ে আসে, আজিজ দেয়ালের দিকে মুখ করে আর ঘোষ ঘরের ভেতর ঢোকে।

স্যার, কম্যান্ডার কহি দিছেন, আপনার সঙ্গে ফোনে কথা কহিবার চান। উমরায় ফোনের পাশতই আছেন আপনি ফোন ধরিলেই কাথা কহিবার পারিবেন।

আরে, তাই নাকি, খাড়াও, তা হইলে কথা কয়্যাই নেই, কম্যান্ড্যান্ট ফোনের দিকে হাত বাড়াতেই আজিজ বাধা দিয়ে বলে, স্যার, আমার আর-একখান ম্যাসেজ আছে স্যার, সেইটা শুনি ফোনখান ধরেন।

আছে নাকি? কও, কও।

স্যার, কম্যান্ডার বলিছেন, এ্যালায় রাতিভর পানি বাড়িবার ধরিবে, এ্যানং বাতাস দিবা ধরিছে, তোমরালার ক্যাম্পের সায় হামলার ক্যাম্পে আজি রাতিত্ সাগাই নিমন্ত্রণ খাইবেন।

অ্যাঁ? সাগাই দিছে তোমার কম্যান্ড্যার? হে-হে করে হেসে ওঠে কম্যান্ড্যান্ট।

হ্যাঁ, স্যার, সগায় আজি হামরালার ক্যাম্পত চলেন, ওইঠে রাতিটা থাকিবেন, কালি সকালে বাও-জল কমিলে এইঠে আসিবেন। আজিজ তার মেসেজ শেষ করে।

আরে শুইনছ বিভূতি ঘোষ, সারা ক্যাম্পড়া তুইল্যা যাইতে হবে, কাম দেখছনি?

বলে কম্যান্ড্যান্ট আবার হে-হে করে একচোট হেসে ওঠে। তার হাসিতে মনে হয়, এটা বাইরের দুর্যোগের কোনো ব্যাপার নয়, ফুর্তির ব্যাপার।

আপনি ত চিল্লিয়েই যাচ্ছেন, ও যে আপনাকে একটা ফোন করতে বলল, বিভূতি ঘোষ কম্যান্ড্যান্টকে মনে করিয়ে দেয়।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলোত কানেকশন করতে, কম্যান্ড্যান্ট ফোনের দিকে আঙুল দিয়ে দেখায়। বিভূতি ঘোষ রিসিভারটা তুলে বলে, বাংলাদেশকে কানেকট করো, তারপর কম্যান্ড্যান্টকে বলে, ধরুন। কম্যান্ড্যান্ট তখন আজিজকে বলছিল, তোমরা কি পাঠাটাঠা কাইট্যা সাগাই ডাইকতে বারাইছ? এই কথাটা শেষ করতে করতে হাতটা বাড়িয়ে দিলে বিভূতি ঘোষ রিসিভারটা ধরিয়ে দেয়।

রিসিভারটা একটু ধরে থেকে কম্যান্ড্যান্ট চিৎকার করে ওঠেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, তারপর গলাটা নেমে আসে, ইয়েস, ইন্ডিয়া স্পিকিং, ইন্ডিয়া স্পিকিং, ইন্ডিয়া স্পিকিং। হ্যালো, কম্যান্ড্যান্ট ইন্ডিয়ান বর্ডার আউটপোস্ট, দহগ্রাম, স্পিকিং। তারপর হঠাৎ গলা চড়িয়ে দেয় কম্যান্ড্যান্ট, যেন ভিড়ের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে, যাকে খুঁজছিল তাকে পেয়ে গেছে, আরে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মোতাহার ভাই? আরে, আজিজ আইসছে ত, কয়, সবার নাকি সাগাই খাওগার কথা হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ, কম্যান্ড্যান্ট হাসতে থাকে। বিভূতি ঘোষ নিচু স্বরে বলে, উনি কী বলতে চাইছেন, সেটা আগে শুনে নিন, তারপর হাসুন। শুনে, কম্যান্ড্যান্ট হাসি থামিয়ে বলে ওঠে, হ্যাঁ,বলেন,কী হইল? তারপর রিসিভারে শুধু , ই করে যায়। টেলিফোন থেকে একটা গো গো আওয়াজ সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের বাতাস কোনো বাধার সামনে আচমকা পড়ে গিয়ে আওয়াজ তোলে, আবার কোথাও প্রয়োজনের চাইতে বেশি চওড়া পথ পেয়ে কেমন হা-হা করে ওঠে। ফোনে বাংলা দেশের কম্যান্ডারের গলা বাইরে থেকেও বোঝা যাচ্ছিল, ঘোষ সেটা কান পেতে শোনে।

গো-গো আওয়াজটা থেকে যায়। এবার ভারতের কম্যান্ড্যান্টকে জবাব দিতে হবে কিন্তু কম্যান্ড্যান্ট চট করে যেন জবাব খুঁজে পায় না। একটু চুপ করে থাকে, তারপর বলে, হ্যালো, মোতাহার ভাই? ওদিক থেকে আবার সেই গো গো আওয়াজ আসে–একটু সময়ের জন্যে। কম্যান্ড্যান্ট আবার একটু সময় নেয়, তারপর বলে, মোতাহার ভাই, আমাদের হেডকোয়ার্টাসে ত ফোনের কোনো লাইনই পাচ্ছি না, আপনি বলতেছেন ক্যাম্প, মানে আমাদের ক্যাম্প ভাসিবেই? আবার সেই গো-গো আওয়াজ। কম্যান্ড্যান্ট যেন হঠাৎ জবাবটা পেয়ে যায়।

হ্যালো মোতাহার ভাই। আমি এডু সবার সাথে কথা বইল্যা নেই, দেখি জলপাইগুড়ি বা কোচবিহারের সঙ্গে কনট্যাক্ট করা যায় কিনা। তারপর আপনারে ফোন দিব নে।

বাংলাদেশ থেকে আবার গো গো আওয়াজ আসে।

না, না, হাফ অ্যান আওয়ার, না, ধরেন ফিফটিন মিনিটস পরে আপনারে ফোন করব। না। বুঝছি ত, দেরি হয়্যা গেলে সব দিকেই লোকন। তবে, আমার একটা রিকুয়েস্ট। যদি আমাগো আপনাদের ঐখানে শিফট কইরতেই হয়, তা হলে আমাগো র‍্যাশন আমরা সঙ্গে নিয়্যা যাব।

বাংলাদেশ থেকে আরো একটা সংক্ষিপ্ত গোগোর পর কম্যান্ড্যান্ট আবার হে হে হাসি শুরু করে কিন্তু শেষ করতে পারে না, আচ্ছা, রাখি। রিসিভারটা রেখে দিয়ে রিসিভারে হাত রেখেই কম্যান্ড্যান্ট ঘোষকে বলে–সবাইরে ডাকো। ওরা শিফট কইরবার কয়। ফ্লাড নাকি সামনে বাড়তেছে। রাত্তিরে নাকি এই ক্যাম্পে জল ঢুইকবে।

.

ইন্ডিয়ার গোপন আলোচনা

কম্যাণ্ড্যান্ট টেবিলের সামনে তার চেয়ার ছেড়ে টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে এসে বসে দরজা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে। বিভূতি ঘোষ সবাইকে খবর দিতে যাওয়ায় এখন কম্যাণ্ড্যান্টের চোখের সামনে ক্যাম্পের মাঠটুকু, মাঠটুকুর শেষের ঘাসবন, ঘাসবনের শেষের গাছগাছালি। কিন্তু সেই গাছগাছালি দেখাচ্ছে যেন দিগন্তসীমা বাতাসে বৃষ্টির ছাঁট এত ছড়াচ্ছে। এমন কি সামনের ঐ ঘাসবনটাই যেন অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাঝেমধ্যে। ক্যাম্পের এই মাঠটুকুতে ঘাস বা গাছ নেই বলে বাতাস আর বৃষ্টির পাক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। বাতাস এত জোরে আছড়ে পড়ে এত দ্রুত পাক খাচ্ছে যে বৃষ্টির জল কুয়াশার মত জমাট বেঁধে বাতাসের ধাক্কায় আবার আবর্তের মত হয়ে যাচ্ছে। কমান্ড্যান্ট যেন এই প্রথম বৃটিাকে বুঝতে চায়।

দরজা থেকে আজিজ বলে, স্যার, মুই যাছ? তার গায়ে ওয়াটার প্রুফ, মাথায় টুপি

অ্যাঁ? হা, হা। তোমার সাহেবরে সালাম দিও আজিজ।

হ্যাঁ স্যার, দিম।

কম্যাণ্ড্যান্ট তাকিয়ে দেখে আজিজ সাইকেলটা ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, বাতাস সাইকেলের হ্যান্ডেলটা ঘুরিয়ে দিচ্ছে যেন। যাবে কী করে, আসার সময় ত বাতাসটা পিঠে ধাক্কা দিয়েছে, এখন তা বুকে দেবে।

কম্যাণ্ড্যান্ট সেটা দেখতে-দেখতেই আজিজ তার চোখের আড়ালে চলে যায়। আজিজকে সারাটা রাস্তা হেঁটেও যেতে হতে পারে। হতে পারে না, হেঁটেই যেতে হবে। সাইকেলটা এখানে রেখে গেলে পারত; তা হলে তাড়াতাড়ি যেতে পারত।

বিভূতি ঘোষ ঘরে ঢুকে কম্যাণ্ড্যান্টের পেছনে চলে যায়, তারপর কোণ থেকে একটা টুল টেনে নিয়ে বসে বলে, ওরা বলল কী, ফ্লাড আসবেই?

হু।

আমাদের রেডিয়াতেও ত তাই বলছে।

হুঁ।

তা হলে ত শিফট করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

তা হলে আবার সবাইকে ডাকলেন কেন?

কম্যাণ্ড্যান্ট কোনো জবাব দেয় না। আসলে সে একটা দ্বিধার মধ্যে পড়েছে। যদি ক্যাম্প তুলে দিয়ে। ওদের ওখানে শেলটার নিতে হয়, সেটা তারই সিদ্ধান্ত। ক্যাম্পের আর সবাইও বলবে-কম্যাণ্ড্যান্টের হুকুমে গিয়েছি। কিন্তু গেলে ত ওই কয়েক ঘণ্টার জন্যে বা রাত্তিরের জন্যে ইন্ডিয়ার সীমান্তে কোনো পাহারা থাকবে না।

ক্যাম্পের অন্য অনেকে একে-একে এসে যায়–অনেকে বলতে জনা দশবার মাত্র। তার মধ্যে। কাস্টমসের একজন আছে। কেউ-কেউ ঘরের ভেতর এসে দাঁড়ায়, কেউ-কেউ দরজার বাইরে। যারা। দরজার বাইরে তারা চিৎকার করে, কী বলবেন স্যার বলুন, বৃষ্টিতে, দাঁড়ানো যাচ্ছে না এখানে।

তা ওখানে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আর কথা কইবা কী কইর‍্যা, ভিতরে আস, ভিতরে আস, বলে, চেয়ার থেকে উঠে কম্যাণ্ড্যান্ট নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে। কম্যাণ্ড্যান্ট এতক্ষণ যে-চেয়ারে বসে ছিল, সেটা বিভূতি ঘোষ টান দিয়ে পেছনে নিয়ে যায়। কাস্টমসের ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকে সেই চেয়ারটিতে গিয়ে বসে। তার পেছন-পেছন আর-সবাইও ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। কম্যাণ্ড্যান্ট বলে, দরজাটা বন্ধ কইর‍্যা দ্যাও।

দরজার কাছে যে-ছিল সে দরজাটা আবজে দেয়।

শুইনছ ত সব, তা হইলে কও তোমরা, কী করা যায়?

এর আবার বলা কওয়ার কী আছে? ফ্লাড আইসলে ত সামনের উঁচু ডাঙায় উঠতেই হবে।

তোমরা শুইনছ ত, বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যার আমাদের অনুরোধ কইরছে আইজ রাইত তাদের ক্যাম্পে কাটাইতে।

ত তাই চলুন। যেতে হলে ত এখনই যেতে হবে। না হলে সন্ধ্যা হয়ে গেলে ত আরো বিপদ।

পুরা ক্যাম্পে তালা মাইরা চলা যাব সবাই? কম্যাণ্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে, আসলে জলপাইগুড়ির সঙ্গে একটা কনট্যাক্ট হইলেই আর-কোনো ঝামেলা হইত না। কিন্তু হেডকোয়াটার্সের পার্মিশন ছাড়া ক্যাম্পটা এরকম বন্ধ কইর‍্যা দিব? কম্যাণ্ড্যান্ট চুপ করে, অন্যরাও সমস্যাটা নিয়ে ভাবে।

এই, কে ছিলা এক্সচেঞ্জে? কম্যাণ্ড্যান্ট সবার দিকে তাকায়।

আমি ছিলাম, কিশোরীচাঁদ বলে। বাতাসের ধাক্কায় দরজাটা এত জোরে খোলে যে পাল্টা ধাক্কায় আবার বন্ধ হতে যায়। এবার একজন দরজাটা এটে বন্ধ করে ছিটকিনিটা লাগিয়ে দেয়। ফলে, বাতাসের আওয়াজটা কম আসে।

কী? কোনো মেসেজ দিব্যার বা নিব্যার পারল্যা?

না, না। কিসের? অল ডেড।

কোচবিহারও ডেড?

যাহা কোচবিহার, তাহা জলপাইগুড়ি। স্যার, এই রকম ফ্লাডে আবার কবে আমরা মেসেজ পাই? সব জায়গাতেই ত জল।

হ্যাঁ। আর মনেই বা রাইখছে কেডা যে এইখানে তিস্তার মুখে একখান ইন্ডিয়া আছে? কম্যাণ্ড্যান্টের গলায় যেন একটু বিষাদ। সেই বিষাদে সে একবার দরজা দিয়ে বাইরে তাকাতে চায়। দরজাটা বন্ধ থাকায় বাইরেটা দেখা হয় না বটে কিন্তু তার তাকানোটা থাকে।

তা হলে করবেনটা কী, সেটা ত আপনাকেই ঠিক করতে হবে, টাইমও ত আর নেই, বিভূতি ঘোষ টুল থেকে বলে।

আচ্ছা, এই নিয়ে এত ভাবার কী আছে? এখানে ফ্লাডের জল আসছে- আপনারা কি ফ্লাডে ভাসবেন নাকি? যদি ভাসতে চান, ভাসুন, আর যদি ভাসতে না চান বাংলাদেশের ক্যাম্প চলুন, কাস্টমসের লোকটি বলে।

কম্যান্ড্যান্ট তার দিকে একটু তাকিয়ে থাকে। তার তাকানোতে বোঝা যায় সে অন্য কিছু ভাবছে।

আপনি ত ভাবছেন ইন্ডিয়া ছেড়ে বাংলাদেশে গিয়ে উঠবেন কিনা। তা এখানে ত আপনার বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশই নেই। উঠবেন কোথায়? কাস্টমসের ভদ্রলোক আবার বলে।

কম্যাণ্ড্যান্ট তার দিকে তাকিয়েই ছিল। এবার তার ঠোঁটে একটু হাসি দেখা যায়।

আর ক্যাম্প ছাড়ছেন কোথায়? বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে টর্চ ফেললেই ত দেখা যাবে। রাতে না হয় একবার এসে দেখে যাবে কেউ, কাস্টমসের লোকটিই আবার বলতে থাকে, ব্যাপারটা ত রাতের কয়েক ঘণ্টা, এই নিয়ে এত ভাবার কী আছে?

যদি হেডকোয়াটার্স থিক্যা কোনো মেসেজ আসে? কম্যাণ্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে।

নো রিপ্লাই হবে। বুঝবে ফ্লাডে সব নষ্ট হয়ে গেছে, বটুক বর্মন জবাবটা দেয়।

কম্যাণ্ড্যান্ট সোজা হয়ে বসে, শোনো, তা হলে এখনই মুভ করো। সবাই ফুল ইউনিফর্মে– ইউনিফর্ম ভিজে ত ঢোল হয়ে যাবে, বটুক বর্মনই বলে।

ক্যান? তোমাদের ওয়াটারপ্রুফ নাই নাকি? না। ইউনিফর্ম ছাড়া বাংলাদেশের ক্যাম্পে যাওয়া যাবে না। ফুল ইউনিফর্ম উইথ আর্মস।

আর্মস নিগি করিবেনটা কী?

এতগুলা আর্মস আমি কি এইখানে খালি রাইখ্যা যাব নাকি? তা হালে যাওনের কাম নাই। কম্যাণ্ড্যান্ট তার সিদ্ধান্ত জানায়।

আমরা নেয়ার পরও ত থাকবে–সেগুলো?

সে-সব আমি অর্ডার দিচ্ছি। তিনজন এক্সট্রা সেন্ট্রি ডিউটিতে থাকব আর্মারির ছাদে, ঐখানে ত্রিপল ফিট করো। কুইক। আর সবাই ইন ফুল ইউনিফর্ম উইথ আর্মস টু বাংলাদেশ ক্যাম্প, কম্যাণ্ড্যান্ট উঠে দাঁড়ায়।

.

'টু বাংলাদেশ উইথ আর্মস' : আয়োজন

গত কয়েকদিন ধরে সারাটা ক্যাম্প এই বৃষ্টি আর বাতাসে যেন ধীরে-ধীরে চাপা পড়ে গিয়েছিল। বুধবারের কথা ছেড়ে দিলেও বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে এই বৃষ্টি ক্যাম্পটাকে যেন গিলে ফেলল। বোধহয় এর ভেতরে একটা নিয়ম সকলের অজ্ঞাতেই কাজ করে। সাধারণত রাতভর বৃষ্টি হয়ে সাকালে রোদ ওঠে। তাতে কারো কিছু এসে যায় না, বরং রাতের বৃষ্টিতে একটু আরামে ঘুমনো যায়। সারা বর্ষাকালে দু-চারবার রাতের বৃষ্টি সকালে ছাড়ে না, সারা দিন হয়ে সন্ধের দিকে হয়ত ধরল, বা, সে রাতেও হয়ে, তার পরদিন সকালে বেশ পরিষ্কার হল। তাতেও কারো কোনো কাজ আটকায় না–বর্ষার মধ্যে অন্তত দু-চারবার এরকম বৃষ্টি না হলে চলবে কেন? কিন্তু দুরাতেও যে বৃষ্টি থামে না, তৃতীয় রাত্রির দিকে গড়িয়ে যায় আর সে রাত পোহানোর পরও দেখা যায় আকাশটা নেমে এসেছে, বাতাসের জোর আরো বেড়েছে আর বাতাসের বেগে বৃষ্টির জল আকাশেই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে-সে বৃষ্টি তখন ধীরে-ধীরে পুরো ক্যাম্পটাকে দখল করে নেয়। এমনিতেই ত কাজকর্ম কিছু নেই। তবু সকালের পি-টি, সপ্তাহে একদিন রুট মার্চ, তরি-তরকারির বাগান করা, ডিউটি শিফট, দিনরাত ধরে এক-একটা গ্রুপের সীমান্ত এলাকায় চৌকি দেয়া–এসব কাজের মধ্যে দিনটা ত একরকম ব্যস্ততাতেই কেটে যায়। কিন্তু এরকম বৃষ্টিবাতাসে সেই সব কাজই একে-একে বন্ধ হয়ে যায়। পি-টি সবচেয়ে আগে বন্ধ হয়, রুটমার্চের কথাই ওঠে না, ডিউটি-শিফট নিয়মমত হয় বটে কিন্তু আমারির বারান্দায় ছাড়া অন্য কোথাও সেটা বোঝাও যায় না, দু-একটা গ্রুপ ওয়াটার প্রুফ চাপিয়ে ছোটখাট চৌকিতে বেরয় বটে কিন্তু সে শরীরের খিল ভাঙবার জন্যে। খাওয়াদাওয়াও একঘেয়ে হয়ে আসে। রাতদিন শুয়ে বসে বা তাস খেলে সময় আর কিছুতেই কাটে না। এক এক সময় মনে হয়–এক্যাম্পে বোধহয় জনমনিষ্যি থাকে না। আলসেমি কাটানোর জন্যে হঠাৎ-হঠাৎ কারো চিৎকার-চেঁচামেচি ছাড়া মানুষজনের স্বাভাবিক স্বর শোনাই যায় না।

কম্যাণ্ড্যান্ট হুকুম দেয়া মাত্র হঠাৎ সারাটা ক্যাম্প যেন জেগে উঠল। বাতাসের ভেতরও যাতে শোনা যায় এমন চড়া গলায় ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকি শুরু হয়ে গেল। যে-মাঠটা গত কয়েক দিন ধরে খালি পড়েছিল, সেখান দিয়ে ওয়াটার প্রুফ মাথায় দৌড়ে চলে যায় কেউ। কেউ আবার পিঠের দিকটাতে ওয়াটার পুফের ঢাকনি দিয়ে জলের ছাট আটকে বারান্দায় কোনো কাজ সারে। পেছনের দিক থেকে নানা রকম চিৎকার আর আওয়াজ উঠতে শুরু করে। বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে নিমন্ত্রণ অন্তত পুরো ক্যাম্পটাকে জাগিয়ে দিল।

উপেন, রামাশিস আর আসিন্দির আর্মারির ছাদে উঠে ত্রিপল খাটাচ্ছিল। ছাতের ওপরেই লোহার পাইপ থাকে, সে পাইপ ফিট করার জন্যে ছাদের মধ্যে বড় নল লাগানো আছে। সেই নলগুলোর মধ্যে। পাইপগুলো ঢুকিয়ে নাটবল্ট লাগাতে হয়। উপেন নাটবল্ট লাগাচ্ছিল আর টাইট দিচ্ছিল। আর রামাশিস ও আসিন্দির তলা থেকে কাঠের মই বেয়ে ত্রিপল টেনে তুলছিল। ত্রিপলটা ভারী–মাঝখান দিয়ে একটা ছোট বাশ চালিয়ে দু জনে কাঁধে করে সেটা তুলছিল। রামাশিস ওপরে, আসিন্দির নীচে। মইয়ের মাঝামাঝি উঠতেই রামাশিসের দিক থেকে ত্রিপলটা গড়িয়ে আসিন্দিরের দিকে চলে যায়। ফলে ত্রিপলের পুরো ওজনটাই আসিন্দিরের ওপর চাপে।

খাড়া কেনে, খাড়া কেনে, বলতে বলতে আসিন্দির ডান হাত দিয়ে বাঁশটা উঁচু করে ধরে চেঁচায়, তিরপলখান টানি নে রামাশিস, টানি নে।

রামাশিস মইয়ে হেলান দিয়ে ডান হাতে বাঁশটাকে ধরে রেখে, বাঁ হাতে ত্রিপলটা টানে কিন্তু নাড়াতে পারে না। আর-একবার জোরে টানে, তাতেও ত্রিপলটা নড়ে না।

কিয়া? তিরপল ঠিক হ্যায় ত রে? রামাশিস জিজ্ঞাসা করে।

আরে ঠিক না-ঠিক সে ত টাঙিবার তানে দেখিম, এলায় বাশখান নামি দাও কেনে। আসিন্দিরের কথা শুনে রামাশিস তার দিকের বাশটাকে মইয়ের ওপরে রেখে এবার মইয়ে হেলান দিয়ে দুই হাতে ত্রিপলটাকে টানে। প্রথম টানটা একটু সাবধানে দেয়। তার গায়ে ওয়াটার প্রুফ, পা খালি। জোরে টান দিলে যদি পিছলে যায়, তা হলে মই থেকে উপুড় হয়ে ত্রিপল-আসিন্দির সব নিয়ে একেবারে মাটিতে পড়বে। প্রথম টান দিয়ে একটু বুঝে নিয়ে সে দু হাতে দ্বিতীয় টানটা দিতেই ত্রিপলটা সড়াৎ করে সরে আসে।

ঠারো, ঠারো, বলে রামাশিস এবার তার বাশটাকে মইয়ের আরো উঁচুতে তুলে দিয়ে ত্রিপলের পাশ দিয়ে দু ধাপ নেমে, ত্রিপলের তলা দিয়ে ধাশটা ধরে।

হাঁ, ঘোড়াসে টান লাগাও, বলে সে বাশটাকে পেছনে টানে, আসিন্দিরও বুঝে বাশটা ধরে থাকে। এবার রামাশিস বা হাতে বাশটাকে উঁচু করে ধরে, উঠো, আভি উঠো, বলে মইয়ের সিঁড়ি ভাঙে।

এরকম করে রামাশিস তিনটি সিঁড়ি ভাঙতেই বাঁশের মাথাটা ছাতের ওপর উঠে যায়। রামাশিস বলে, থোড়াসে নামাও, আসিন্দির নীচে নামায়। মাথার বাশটা ছাতের ওপর পড়ে। রামাশিস চেঁচায়, এ উপীন, পাকড়ো ভাইয়া, জলদি। উপেন এসে বাঁশের মাথায় পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তার হাতে রেঞ্চ আর প্লায়ার্স। আসিন্দির আর রামাশিস এবার বাশটাকে উঁচু করতে করতে মইয়ের সিঁড়ি ভাঙে। তাদের দিকের বাশটা উঁচু হতে থাকে। ত্রিপলটা গড়িয়ে গিয়ে হাতের ওপর পড়ে। উপেন বাশটা ধরে নেয়। বাশটাকে ছাতের ওপর ফেলে দিয়ে সে আবার নাটকটু টাইট করতে যায়।

ছাতের পুব সীমায় আর পশ্চিম সীমায় তিনটে-তিনটে ছটা টিউব দাঁড় করানো, মাঝখানেরটা উঁচু, দুপাশে সমান মাপের নিচু। এই ছটা লাগানো হয়ে গেলে আবার আড়াআড়ি তিনটে লাগানো হবে–তার ওপর দিয়ে ত্রিপলটা ফেলা হবে। উপেন খাড়া টিউব সবগুলোই লাগিয়ে ফেলেছিল। রামাশিস সেগুলো নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখে আবার পুবের দুটো টিউবের গোড়া টাইট করে। ততক্ষণে আসিন্দির আর উপেন আড়াআড়ি টিউবটা নিয়ে প্রথম লাইনের খাড়া টিউবের সঙ্গে লাগাতে থাকে। এই লাগানোর জন্যে টিউবের মাথাগুলির মাঝখানে কাটা ও দুদিকে ফুটো। নাটকগুলো উপেনের পকেট। সে পকেটে হাত দিয়ে একটা নাট বের করে টিউবগুলোর মধ্যে দিয়ে ঢুকিয়ে হাতে কন্টু লাগায়। সেজন্যে আসিন্দিরকে বিপরীত দিকে টিউবটা উঁচু করে ধরে রাখতে হয়।

এক দিকের বন্টু লাগিয়ে আসিন্দিরের দিকে এসে সে-দিকের টিউবগুলোতে নাটবল্ট উপেন লাগানো শুরু করতেই রামাশিস এসে উপেনের হাত দিয়ে লাগানো নাটক টাইট দিতে থাকে।

আসিন্দির গিয়ে ত্রিপলটার ভাজ লম্বালম্বি খুলতে শুরু করে। খুলতে গিয়ে তাকে ত্রিপলটা দু হাতে একটু টেনে আনতে হয়–তার পর ভাজ খুলে-খুলে এগিয়ে যায়। ভাজটা খুলে ফেলার পর আসিন্দির দেখে দড়ি নেই। এখন ত্রিপলের দুই মাথায় আর মাঝখানে দড়ি বেঁধে টিউবের ওপর ফেলে ওদিক থেকে টানতে হবে। আসিন্দির মইয়ের দিকে যেতে-যেতে বলে, খাড়াও কেনে, মুই দড়ি আনিবার যাছু।

আসিন্দির নাইলনের দড়ি নিয়ে আসতে-আসতেই রামাশিস আর উপেনের টিউব ফিট করা হয়ে যায়। তারপর দড়ি বেঁধে টেনে তুলতে গিয়ে ত্রিপলটা ঠেকে যায়। আসিন্দির দড়িটা পরের টিউবের সঙ্গে বেঁধে ত্রিপলটাকে বাশ দিয়ে খোঁচাতেই সেটা টিউবের ওপর উঠে যায়। তখন আবার তার পরের টিউবে, যেটা একটা উঁচু সেটাতে তুলতে হয়।

আর্মারির ছাতে ত্রিপলের ছাউনি উঠে যায়।

.

বাংলাদেশ অভিমুখে কুচকাওয়াজ

ইতিমধ্যে সেই ফ্ল্যাগ তোলার মাঠে বা পি-টির মাঠে একে-একে সবাই এসে জড়ো হচ্ছে। এখন আর-কেউ বৃষ্টির জন্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নেই, বরং, সকলেরই বারান্দা ছেড়ে মাটিতে নামার তাগাদা যেন বেশি। প্রত্যেকেই ইউনিফর্ম পরে নিয়েছে, পায়ে গামবুট আর গায়েমাথায় ওয়াটারপ্রুফ। বিভূতি ঘোষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হুইসল বাজাচ্ছে।

বটুক বর্মন, পরশমণি সুন্দাস, আষাঢ়, সুভদ্র আর পঞ্চানন টানতে-টানতে ও ঠেলতে-ঠেলতে একটা ঠেলাগাড়ি নিয়ে আসছে পেছন থেকে। গাড়িটা দেখতে অনেকটা জিপগাড়ির সঙ্গে লাগানো ট্রেইলারের মত। বড় বড় টায়ারের চাকা, সামনে কাঠের দুটো উঁচু দণ্ড, জোয়ালের মত–সেটা ধরে টানা যায়, বা গাড়ির পেছনে লাগিয়ে নেয়া যায়। ওরা গাড়িটা টেনে এনে রাখে। তারপর আবার ফিরে যায়।

এবার ওরা একে-একে কাঁধে করে করে আনতে থাকে দুটো পাঠা, দুবাণ্ডিল কলাপাতা, পলিথিনের চাদর দিয়ে মোড়া হোট-ছোট কিছু প্যাকেট। পাঠাদুটো গাড়ির মধ্যে প্রথমে এদিক-ওদিক তাকায়, তারপর পাশের ঢাকনাটা পা দিয়ে টপকাতে চায়। কিন্তু বারকয়েক পিছনে গিয়েই বোঝে যে ওখানে ওঠা যাবে না। তখন গাড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভ্যা-ভ্যা করে বারকয়েক চেঁচিয়ে চুপ করে যায়। বোধহয় ঐটুকু সময়ের মধ্যে ওদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন না হওয়ায়, বিপদের আশঙ্কাটাও ওদের কেটে যায়। তবু চাপা গলায় একটা ছোট ভ্যা-ভ্যা ডেকে দেয়, একসঙ্গে নয়, একটার পর আরেকটা।

অনেকেই ততক্ষণে বৃষ্টির মধ্যে এসে দাঁড়িয়ে পড়ছে। বাতাস তাদের গায়ের ওপর হামলে পড়ছে, বৃষ্টির ছাট তাদের মুখের ওপর এসে সুচ বেঁধায় কিন্তু তৎসত্ত্বেও তাদের যেন এই বৃষ্টিতে ও হাওয়াতে দাঁড়াতেই ভাল লাগছে। এতগুলো লোকের এই বৃষ্টিতে মাঠে এসে দাঁড়ানোর মধ্যেই যেন বৃষ্টি ও বাতাসকে অস্বীকার করা আছে।

কম্যাণ্ড্যান্ট তার ঘর থেকে নীচে নামে, সিঁড়ি দিয়ে, একটু ধীরে-ধীরে। তার গায়েমাথায় কোথাও ওয়াটারপ্রুফ কিছু ছিল না। সিঁড়িয়ে পা দিতেই বৃষ্টি আর হাওয়ার মধ্যে পড়ে যায়। এক জওয়ান দৌড়ে গিয়ে কম্যাণ্ড্যান্টের ঘরের মধ্যে ঢুকে ওয়াটারপ্রুফ নিয়ে বেরিয়ে আসে। তখন বৃষ্টি আর হাওয়ার মধ্যেই কম্যাণ্ড্যান্ট সেই গাড়ির দিকে খানিকটা এগিয়ে গেছে। জওয়ানটি পেছন থেকে ওয়াটারপ্রুফটা মেলে ধরে ডাকে, স্যার। কম্যাণ্ড্যান্ট দাঁড়িয়ে হাত দুটো পেছনে মেলে দেয়, এ বৃষ্টি কি আর এই কোটে ঠেকবেনে? বলতে বলতে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কম্যাণ্ড্যান্ট কোর্টটা পরে, কিন্তু বোম লাগায় না, তারপর টুপিটা নিয়ে ভেজা মাথায় চাপাতে গেলে জওয়ানটি বলে ওঠে, স্যার, মাথাটা মোছেন।

কম্যাণ্ড্যান্ট হাত বাড়ায়। সে দৌড়ে গাড়িটার কাছে গিয়ে একটা পলিথিনের ব্যাগ থেকে তোয়ালে নিয়ে ছুটে আসে। কম্যাণ্ড্যান্টও দু পা এগিয়েছে। দাঁড়িয়ে পড়ে মাথাটা মুছে টুপিটা চাপায়।

কী ঘোষ? চলো, স্টার্ট দাও। তোমার ব্যবস্থা-ট্যাবস্থা কী কইরল্যা?

আমারিতে ডিউটি দেবে তিনজন না, ছয় জন। আর্মারির ওপরে ত্রিপল টাঙানো হয়েছে। জল যদি আর্মারিতে ঢোকে তা হলে আর্মস এমিউনেশন হাতে তুলে রাখবে। এই ত ব্যবস্থা। আর সবাই যাচ্ছি।

তা হলে চলো, আর দেরি কইর‍্যা লাভ কী?

গাড়িটার ভেতর থেকে একটা পাঠা নিচু স্বরে ডেকে ওঠে, ভ্যা-অ্যা। অন্য পাঠাটি যেন সেই ডাকের সঙ্গত রাখার জন্যে আরো নিচু স্বরে আরো সংক্ষিপ্ত ডাকে, ভ্যা।

কী? ফল ইন করাব নাকি? ঘোষ জিজ্ঞাসা করে।

করো, বেশ মার্চ কইরতে কইরতে যাওয়া যাবেনে, কম্যাণ্ড্যাট বলে।

ফল ইন করলে ঐ গাড়ি নেয়া যাবে কী করে? বটুক জিজ্ঞাসা করে।

কম্যাণ্ড্যান্ট ঘোষের দিকে তাকায়। কম্যাণ্ডাণ্ট বলে, তা হালি এমনিই চলল।

ঘোষ হুইসল মুখে দিয়ে হুইসল নামিয়ে আনে, না। ফল ইন করতে হবে। ফল ইন করে আমারিতে গিয়ে আর্মস নেয়া হবে, তারপর আবার ফল ইন। তারপর ডিসপার্স।

কম্যাণ্ডাণ্ট ঘাড় হেলাতেই ঘোষ চেঁচিয়ে হুকুম দেয়–ফ-অ-ল ইন।

যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা দুজন করে দাঁড়িয়ে পড়ে। যারা তখনো ঘরে ও বারান্দায়, তাদের ভেতর। একটা তাড়াহুড়ো পড়ে যায়। কেউ-কেউ বারান্দা থেকে লাফিয়ে মাঠে নামে, নেমেই দৌড়য়। বাতাসের আওয়াজের চাইতেও গামবুটে কাদা ভেঙে দৌড়নোর আওয়াজ প্রবল হয়। সেই আওয়াজের মধ্যেই ঘোষের হুকুম আবার শোনা যায়–অ্যাটেনশন।

তখনো ভেতরের দিক থেকে কারো কারো দৌড়ে আসার আওয়াজ বাধানো বারান্দা দিয়ে ধপধপ করতে-করতে ছুটে আসে, তারপর আচমকা থেমে যায়। বারান্দা থেকে মাঠে লাফিয়ে নেমে তারা লাইনের পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। ঘোষের হুকুমে লাইনটা চলতে শুরু করে। ঘোষ পাশে-পাশে হাঁটতে-হাঁটতে লেফট লেফট করতে করতে আর্মারির দিকে এগয়। লাইনটা যখন আর্মারির সামনে পৌঁছয় তখনো একজন এক হাতে এক জোড়া গামবুট ঝুলিয়ে খালি পায়ে জলের মধ্যে দৌড়তে-দৌড়তে লাইনের শেষে এসে দাঁড়ায়।

আর্মারি থেকে যে-যার রাইফেল নিয়ে বেরিয়ে এসে আবার লাইনে দাঁড়ানো শুরু করে। আমারির ভেতরে লাইন বেঁধেই সবাই একে-একে ঢোকে, যেখানে যার রাইফেল থাকে, সেখান থেকে রাইফেলটা তুলে কাঁধে ঝুলিয়ে আবার লাইনে এসে পঁড়াতে-দাঁড়াতে বারকয়েক ঝাঁকি দিয়ে রাইফেলটাকে কাঁধের ওপর ফিট করে নিচ্ছে। এমন-কি লাইনে দাঁড়ানোর পরও কাধ ঝাঁকিয়ে রাইফেলটা ঠিক করে নিতে হয়।

এই লাইনের প্রতিটি লোকের কাঁধে বন্দুক ওঠা মাত্রই পুরো লাইনটার চেহারা যেন পাল্টে যায়। এতক্ষণ ছিল ওয়াটারপ্রুফ, গামবুট আর টুপির লাইন। তাকালেই বৃষ্টিবাদলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বন্দুক কাঁধে উঠতেই বৃষ্টিবাদল অবান্তর হয়ে যায়। এমনকি এই যে বাতাস এই ধাঁধা লাইনের গায়ে হামলে পড়ছে আর টুপির আচ্ছাদনের ভেতরেও বৃষ্টির ছুরি বিধছে সেসব যেন রোদের মতই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিকতা মেনে নিয়েই এই পুরো লাইনটা রাইফেল কাঁধে তুলে নিয়েছে, আর, রাইফেল কাঁধে ওঠা মাত্রই এই বাহিনীর পেশাগত পরিচয় যেন প্রধান হয়ে ওঠে–ইন্ডিয়ার সীমান্তরক্ষার কাজ।

কম্যাণ্ড্যান্ট ঘোষকে বলে, মার্চ করাই খানিকটা নিয়া যাও, তারপর ছাড়ো।

এক জওয়ান এসে কম্যাণ্ড্যান্টের সামনে দাঁড়িয়ে তার বেল্টসহ রিভলবারটা মেলে ধরে। কম্যাণ্ড্যান্ট ওয়াটার প্রুফটা ফাঁক করলে জওয়ানটি নিচু হয়ে কম্যাণ্ড্যান্টের কোমরে বেল্টটা বাধতে থাকে। ঘোষ নির্দেশ দেয়, এই তোমরা চারজন গাড়িটা নিয়ে এসো। এ-টেনশন।

এদের পায়ে বুট ছিল না বলে খট শব্দটি উচ্চকিত হল না। কিন্তু এখানে আর সেই আগের বারের মত দৌড়োদৌড়ি হুড়োহুড়ি পড়ল না। সবাই যে-যার জায়গায় দাঁড়িয়েই ছিল। ঘোষের নির্দেশে পুরো লাইনটা এক ছন্দে চলতে শুরু করল। তাদের ডান ঘাড়ের ওপরের শূন্যতায় মাথার পাশে রাইফেলের নল দুলে ওঠে, দলের চলার ছন্দ মেনে দুলে ওঠে।

পুরো লাইনটা ঘাসবনের দিকে চলে। ঘাসবনের ভেতরে তাদের প্রথম পা ফেলামাত্র বৃষ্টিতে নুয়ে পড়া ঘাসে ঢাকা-পড়ে-থাকা পথটা পায়ে-পায়ে তৈরি হয়ে যেতে থাকে।

.

বন্যার বাতাসের মুখে দুটি পাঁঠা

ঘাসবনের ভেতর পুরো লাইনটা ঢুকে গেলে ঘোষ অর্ডার দেয়া বন্ধ করে। লাইনটা কিন্তু চলতে থাকে যেন অর্ডার দেয়া হচ্ছে এমন তালে-তালেই। এই পথটাতে লাইন ভেঙে চলার মত জায়গা নেই। এইটুকু সময় তালে-তালে পা ফেলার অভ্যেস কিছুক্ষণ থাকে। ধীরে ধীরে বাতাসের ধাক্কায় ওয়াটারপ্রুফের কলার আর ঝুল ফতফত করে আছড়ে পড়ার আওয়াজ ওঠে। ধীরে-ধীরে তাদের পা ফেলার একটা সমবেত আওয়াজ শোনা যায়। এবং আরো ধীরে এই লাইনটার শাস ফেলার একটা। আওয়াজও এই বাতাসের মধ্যে আলাদা হতে থাকে।

যে রাস্তাটা এখন ঘাসে ঢাকা সেটা পায়ে চলা রাস্তা নয়। বর্ডার ক্যাম্প থেকে পাথর আর ইটের টুকরো ফেলে পিটিয়ে রাস্তাটা তৈরি করা হয়। বছরে একবার রাস্তাটার মেরামত হওয়ার ফলে ভৈঙেচুরে যায় না। লাইনের পেছনের গাড়িটা দুজন ঠেলছে, দুজন টানছে। তাদের বন্দুকগুলো গাড়ির ভেতর রাখা হয়েছে। গাড়িটার ওপরে ত্রিপলের ঢাকনাটা বাতাসে ফুলে ওঠে বটে কিন্তু ওড়ে না-এক-এক দিকে তিনটে স্কুর মধ্যে পাত দিয়ে মোড়া ত্রিপলে ফুটোগুলো ঢুকিয়ে দেয়। পাঠাদুটো সেই ত্রিপলের তলা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, তাই ত্রিপলটা বাতাস ছাড়াও নড়ছে। বাতাসের ধাক্কায় ত্রিপলটা একটু উঁচু হয়ে যাওয়ায় তার ভেতরে বাতাস ঢুকে পড়ছে–তারপর কিছুক্ষণ পাঠাদুটো চুপচাপ।

জলে ভেজা ঘাস নুয়ে পড়ে এই যে রাস্তাটাকে ঢেকে রেখেছে সেটা শেষ হওয়ার আগেই তিকার আওয়াজ কানে আসে। কম্যাণ্ড্যান্ট লাইনের পেছনে-পেছনে যাচ্ছিল। লাইনের মাঝ থেকে ঘোষ সরে দাঁড়ায়, তারপর কম্যাণ্ড্যান্টের দিকে ঘুরে বলে, নদীর আওয়াজ শুনছেন?

কম্যাণ্ড্যান্ট তখনো অত স্পষ্টভাবে নদীর আওয়াজটাকে আলাদা করতে পারে নি, সে জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে ঘাড়টা দোলায়। ততক্ষণে লাইনটা আরো খানিক এগিয়ে গেছে। ঘোষ তাও চেঁচিয়ে বলে, নদীর আওয়াজ। এবার কম্যাণ্ড্যান্ট সম্মতিতে ঘাড় দোলায়।

ঘাসবনের শেষে সেই কাঠের খুঁটি দিয়ে তৈরি উঁচু সেন্ট্রি বক্স। আসলে একটা ঘরই–দরজাও আছে। দরজাটা বাতাসে একবার বন্ধ হচ্ছে, আর খুলছে। কম্যাণ্ড্যান্ট একবার তাকিয়ে চেঁচায়–এই, ঐ দরজাটা আটক্যাইয়্যা দিয়্যা অ্যাসো। বলে, কম্যাণ্ড্যান্ট থামে। আবার বলে, লাস্ট কে ডিউটিতে ছিল্যা? দরজা খোলা রইখ্যাই সব চল্যা অ্যাসো? লাইনের সবচেয়ে পেছনে, কম্যাণ্ড্যান্টের সামনে যে-দুজন ছিল, তাদের বা দিকের জওয়ানটি লাইন থেকে বেরিয়ে মইয়ের মত সিঁড়ি বেয়ে উঠে যায়। সে উঠতে-উঠতেই আরো দুবার দরজাটি খোলে ও বন্ধ হয়। কিন্তু এই সেন্ট্রি বক্সগুলো বড়বড় কাঠ। আর খুঁটি আর বড়বড় পেরেক আর নাটবল্ট দিয়ে এমন ভাবে তৈরি যে ঘরটা বাকাচোরা হয়েই থাকে। সেই কারণেই এত বাতাসেও দরজাটা খুব জোরে পড়ে না।

সেন্ট্রি বক্সের তলায় কাটাতারের বেড়ার ভেতর গেট–যে-দুজন সামনে ছিল, তার গেটের সঙ্গে খুঁটির পেঁচানো তারটা খুলে গেটটা ঠেলে দেয়। সেই ফাঁক দিয়ে দলটাকে একটু বায়ে বেঁকে বাইরে বেরতে হয়। সে রকমভাবে বেরতে গিয়ে লাইনটা ভেঙে যায়। বেরিয়ে গিয়ে কেউ আর লাইনে দাঁড়ায় না। গেট দিয়ে বেরিয়েই কেউ-কেউ ঘুরে দাঁড়ায়, কেউ হাত দুটো ওপরে তুলে আড়মুড়ি ভাঙার ভঙ্গি করে আর কেউ-কেউ ডাইনে ঘুরে হাঁটতেই থাকে–থামে না।

এই জায়গাটায় একেবারেই কাঁচা ঘাস আর ঘাসের মধ্যে কাদা। ডাইনে না বেঁকে সোজা গেলেই নদী। ঘাসবনের ভেতর দিয়ে আসার সময় বাতাসের যে-আওয়াজ উঠছিল, গেটটা পেরনোর পরই সেই আওয়াজটা যেন বদলে যায়। কিন্তু বদলাবার ত কথা নয়–একটা কাটাতারের বেড়ায় আর বাতাসের আওয়াজ বদলাবে কেন। বাতাসটা একই রকম ভাবে বইছে, বৃষ্টির ছাটও একই রকম ভাবে পড়ছে, কিন্তু এদের হাঁটাটাও বদলে গেল। এতক্ষণ লাইন বেঁধে হাঁটার একটা আলাদা আওয়াজ লি, সেটা এখন আর নেই। ঘাসে ঢাকা পথ কিছুটা দেখে-দেখে আসতে হচ্ছিল, এখন তাও করতে হবে না। ফলে, নদীর আওয়াজ আর বাতালের আওয়াজ মিলে যে ঝারব তৈরি হচ্ছে সেটা কানে আসে। আর, কান একবার এলে ত ঐ আওয়াজটাই থাকে-আর-কোনো আওয়াজ শোনা যায় না।

গাড়িটা এসে গেটে আটকে যায়। যে-চারজন গাড়িটা নিয়ে আসছিল তার ভেতর থেকে একজন এসে গেটটা ঠেলে দেয়, কিন্তু গেটটা বেশি খোলে না। আর একবার আর-একটু জোরে ঠেলতে গেটের ওপর দিকটা নড়ে, তলার দিকটা সরে না। এই গেটও ত ঐ ভাবেই তৈরি, তাছাড়া গেটটা পুরো খোলার ত দরকারও পড়ে না সাধারণত। উপেন এগিয়ে গিয়ে মাটিটা দেখে চেঁচায়, ঠেলিলেই খুলিবে নাকি? এইঠে ত মাটি উচ্যা হয়্যা আছে।

মাটিটা ক্যাটা দাও, কম্যাণ্ড্যান্ট বললে উপেন গেটটা ধরে দাঁড়িয়ে পা দিয়ে মাটিটায় লাথি মারে। তাতেই নরম মাটি একটু গর্ত হয়ে যায়, গেটটা টান দিতেই কিছুটা খুলে যায়, সঙ্গে সঙ্গে পেছনের জোয়ানরা ধাক্কা দিয়ে গাড়িটা গেটের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়, একটু গেলেই গাড়িটা আটকে যায়। উপেনের পাশে তখন বটুক বর্মন গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সে দেখে চেঁচায়, এই গেটখান উঁচু করি ধরো কেনে, ধরো উঁচু করি। বলে সে নিজেই গেটটা ধরে টেনে তোলে, উপেন হাত লাগায়, উপেনের বন্দুকটা দুলে সামনে চলে এলে সে সেটাকে পেছনে ঠেলে দেয়, আর দু-জন এসে হাত লাগাতেই গেটটা বেশ খানিকটা উঁচু হয়, পেছনের জোয়ানরা গাড়িটা ঠেলে দেয়, গাড়িটা এগিয়ে আসে কিন্তু চাকাটা আটকে যায়। উঁচু করে ধরে থেকেই উপেন চেঁচায়, ঐ দিকোটা টানি নেন আর এই দিকোটা ঠেলেন। গাড়ির বাঁ দিকটাকে ভেতরে ঢোকানোর জন্য দুই জোয়ান-টানে কিন্তু গাড়িটা কাত হয় না। কমান্ড্যান্ট গিয়ে উল্টোদিক থেকে ঠেলা দিতে শুরু করে। কমাণ্ড্যান্টের সঙ্গে আরো দুজন হাত লাগাতেই গাড়ির জোয়ালটা হট করে বায়ে ঘুরে যায়-কারো মাথায় লাগতেও পারত, কিন্তু গাড়ির ডান চাকাটা গেট গলে বেরিয়ে আসে। এবার সবাই মিলে জোয়ালটা ধরে টানতেই গাড়িটা বা দিকে মুখ করে গেট পেরিয়ে যায়।

কম্যাণ্ড্যান্ট বলে, গেটখানা বন্ধ কইর‍্যা দ্যাও।

ঘোষ বলে, হ্যাঁ। নইলে ফ্লাডের জল ঢুকে যাবে।

কম্যাণ্ড্যান্ট বলে ওঠে, সব কথারই ত জবাব আছে ঘোষ। এই গেটটেটগুল্যা ত রোজই ভোলা বন্ধ হওয়ার কথা। সে হয় না ক্যান?

ততক্ষণে গাড়ি ঘোরানো হয়ে গেছে। আবার হাটা শুরু হয়। যারা এগিয়ে গিয়েছিল, তারা এদের এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঘুরে আবার এদিকেই আসছে। কিন্তু গাড়িটা দেখে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপর ঘুরে সোজা চলতে থাকে।

ঘোষ, সবারে কয়্যা দাও বাংলাদেশের ক্যাম্পের আগে যেন আবার লাইন হয়, মার্চ কইর‍্যা টুইকতে হবে,কম্যাণ্ড্যান্ট বলে। ঘোষ এক জোয়ানকে খবরটা দিয়ে আগের দলের কাছে পাঠায়। সে দৌড়তে শুরু করে বটে কিন্তু ওয়াটার প্রুফ আর বাতাসের ধাক্কায় এগতে পারে না।

ঘোষ, চলো নদীটা দেইখতে-দেইখতে যাই, বলে কম্যাণ্ড্যান্ট একটু কোনাকুনি নদীর দিকে হাটা শুরু করে।

এখন দলটা চার টুকরো। আগে একদল চলে গেছে। যারা গাড়িটা বের করার জন্যে গেট খোলাখুলিতে ব্যস্ত ছিল তারা একটা দল হয়ে এগয়। কম্যাণ্ড্যান্ট, ঘোষ আর দুই জোয়ান নদীর দিকে যায়। আর গাড়ি নিয়ে এখন ছয়জন চলে। যে-জোয়ানটিকে ঘোষ পাঠিয়েছিল আগের দলটাকে খবর দিতে সেই এক দলছুট ছুটছিল।

ভারতের এই সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবাংলার নানা জেলার লোজন আছে, নদীয়ারই বেশি। তা ছাড়া কমান্ড্যান্ট যেন পশ্চিমবাংলারই নয়, বাংলাদেশের। নেপালি আছে কয়েকজন, বেশ কয়েকজন বিহারিও আছে। পাঞ্জাবি ছিল জনা তিন, তারা সবে ট্রান্সফার হয়ে গেছে। দহগ্রামের এই এমন এক ইন্ডিয়াতেও–যেটাকে ইন্ডিয়াই ফ্লাডের সময় ভুলে গেছে–বোঝা যাচ্ছে ইন্ডিয়াটা অনেক বড় দেশ।

.

দেশের জন্যে দুঃখ

নদীর কাছ পর্যন্ত কম্যাণ্ড্যান্টকে আর যেতে হয় না, তার আগেই কোনো-কোনো জায়গায় নদী তাদের কাছে চলে আসে। এই মাঠ ত আর সমান না, কোথাও বেশ নিচু, কোথাও উঁচু। সেই সব নিচু জায়গায় নদীর জল ঢুকে গেছে। আর সেইসব জায়গায় জল যেরকম তোড়ে ঢুকছে তাতে মনে হয়, আর-কিছুক্ষণের মধ্যেই এই পাড় একেবারে ভেসে যাবে। কম্যাণ্ড্যান্ট এরকম এক জায়গায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখে নদীর জল এসে ঐ নিচু জমির কিনারায় ঘা মেরে আবার ফিরে যাচ্ছে, আবার নতুন স্রোত এসে ঘা মারছে।

ঘোষ, দেইখছ কাণ্ডখান!

হ্যাঁ, এখানে এরকম জল, মানে আমাদের ক্যাম্পের উত্তরে দক্ষিণপাড়া ত ভেসে গেছে এতক্ষণ?

কই, ওরা যে ক্যাম্পে আইস্যা উইঠবে কইল, এ্যালো না ত!

বুঝে গেছে যে ক্যাম্পও ভাসবে, তাই অন্য কোথাও গিয়ে উঠেছে হয়ত!

আর কুথায় উইঠবে? আর ত সব ফরেন ল্যাণ্ড?

ফরেন ল্যাণ্ডেই গেছে এতক্ষণ! না গিয়ে ভাসবে নাকি?

ওরা নদীর আরো কাছে যাবার জন্যে দু-চার পা এগিয়েই থেমে পড়েনদীর এপার-ওপার ত দূরের কথা, সামনে একটু দূরেই নদীটা আর দেখা যাচ্ছে না। নদীর খোলা বুকের ওপরে আকাশ আর নদী এখন আলাদা করা যায় না-বাতাস সেই অবকাশ দিয়ে হু হু করে বয়ে যাচ্ছে নদীর মতই বেগে কিন্তু বিপরীত মুখে। সেই বাতাসে বৃষ্টির ধারাপাত আর মাটিতে নামছে না বাতাসে কাত হয়ে যাচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে, আকাশেই আবর্ত তৈরি করছে। আর তাতে নদীর বুকের ওপর এমন কুয়াশা তৈরি হয়েছে যে, কিছু দেখা যাচ্ছে না। নদীর স্রোত চলছে মাটির ঢাল অনুযায়ী। অত জল অতখানি ঢাল বেয়ে যখন গড়াচ্ছে তখন তার একটা আলাদা আওয়াজ ওঠে, আকাশ গমগম করে। কিন্তু এখন ত সে আওয়াজটাও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বিপরীতমুখী বাতাসের ধাক্কায়। বাতাসের স্রোত.আর জলস্রোতের সংঘর্ষে যে-আওয়াজ উঠছে তাতে মনে হয় নদী তার খাত থেকে উঠে এসে নতুন খাত তৈরি করে ফেলবে।

দূর থেকে একটা চিৎকারের মত ভেসে আসে। কম্যাণ্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে, কিসের চিৎকার? একটু কান পেতে শোনে ঘোষ, তারপর বলে, চিৎকার না, গান গাইছে, আমাদের ছেলেরা।

তা হালে তাড়াতাড়ি চলো, না হইলে আবার অন্ধকার হইয়্যা যাব। তোমাদের সঙ্গে টর্চ লাইট আছে ত? কম্যাণ্ড্যান্ট জিজ্ঞাসা করে।

হা স্যার, আছে, একজন জোয়ান ওয়াটারপ্রুফের বোতাম খুলে টর্চটা দেখাতে গেলে কম্যাণ্ড্যান্ট বলে, থাক, থাক, থাইকলেই হইল।

ওরা নদীর পাড় ধরেই একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করে। তাড়াতাড়ি হাঁটতে গেলে বাতাসের ধাক্কা জোরে লাগে, পা পেছিয়ে যায়, বুক আর ঘাড়টা এগিয়ে আসে। ওরা ঘাড়টা নিচু করে হাঁটে-মুখে যাতে বৃষ্টির ছাট কম লাগে। কম্যাণ্ড্যান্ট হাত দিয়ে একবার মুখ মুছে নেয়। এই বাতাস আর বৃষ্টির বিপরীতে এদের ঐ চলা দেখে বোঝা যায় এদের প্রত্যেকেরই স্বাস্থ্য কী রকম পেটানো। সেই স্বাস্থ্যই নিশ্বাসের আওয়াজে প্রমাণিত হয়ে ওঠে–চারজনের নিশ্বাসের আওয়াজ এই বাতাসনদীর আওয়াজের ভেতরেও শোনা যায়। কখনো কখনো তাদের ছোট-ছোট খাড়িমত পার হতে হচ্ছিল নদীর জল যেখানে ছোট-ছোট নালী দিয়ে ঢুকে পড়ছে।

একটু এগিয়ে তারা গাড়িটা গায়। পাঠাদুটো তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। তাদের আর গাড়িটার মাঝখানে বেশ খানিকটা মাঠ। চেঁচালে শুনতে পাবে না। ঘোষ বলে, পাঠাদুটোকে বোধহয় ত্রিপল চাপা দিয়েই মেরে ফেলল। এই, ওদের গিয়ে বলো ত ত্রিপলের ঢাকনাটা খুলে দিতে।

একজন জোয়ান ছুটে গেলে কম্যাণ্ড্যান্ট ডাকে, ঘোষ।

ঘোষ কোনো জবাব দেয় না। কিন্তু কম্যাণ্ড্যান্ট যখন কিছু বলে না, ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, কিছু বলছিলেন নাকি?

কম্যাণ্ড্যান্ট হাঁটতে-হাঁটতে ঘোষের দিকে তাকায়। কিন্তু কিছু বলে না। এরা বেশ তাড়াতাড়িই হাঁটছিল। শ্বাসের আওয়াজ উঠছে জোরে-জোরে। কম্যাণ্ড্যান্ট কিছু ভাবছে।

কম্যাণ্ড্যান্ট আবার ডাকে, ঘোষ।

এবার ঘোষ বলে, বলুন।

আজ ত পাঠাটাঠা কাইট্যা পিকনিক হবে নে। হ্যাঁ। তা ত হবে। ওরা ত নেমন্তনই করেছে। আমাদের পাঠা কি আর আমাদের খাওয়াবে?

সেই জোয়ানটা গাড়ির কাছ থেকে ফিরে আসছে। এবার বাতাস পেছনে বলে, একটু তাড়াতাড়িই।

হ্যাঁ। আজ না হয় অগ পাঠাই খ্যাইলা। কাইল ত তোমাগো পাঠা খাইতে হব। অগ ত আর পঁঠার ফরেস্ট নাই।

হ্যাঁ। তা, নাই। বলছেন কাল দুপুরেও এ-বৃষ্টি ছাড়বে না?

না-ছাড়লে ত বাইল্যা। বাংলাদেশের ক্যাম্পেই থাইক্যা যাবা নে। ছাইড়লে যাবা কোথায়? জল দেইখল্যা না? রাত্তিরের মধ্যে সব ভাইস্যা যাবে।

হ্যাঁ। সেরকমই ত মনে হয়। এদিককার নদীগুলো বড় গোলমেলে। আমাদের ওদিকের নদীগুলো দেখে আপনি বুঝতে পারবেন, টাইম পাবেন। কিন্তু এ ত একেবারে ট্রেচারাস। কোনো আন্দাজই পাবেন না।

আরে, তোমাগো দ্যাশে বৃষ্টির জলে ফ্লাড়, আর এ্যাখন ডিভিসির জলে।

এখানে ত ডিভিসিও নাই, শুধুই বৃষ্টি।

ওরা দ্বিতীয় দলটাকে পেরয়। কম্যাণ্ড্যান্ট, ঘোষ, দুই জোয়ান যাচ্ছে নদীর পাড় দিয়ে আর উপেনদের দলটা যাচ্ছে আর-একটু ভেতরে দিয়ে। কম্যাণ্ড্যান্টদের চলার গতি দেখে ওরাও তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করে।

এখানে পাহাড় আছে। পাহাড় ভাইঙ্গ্যা জল এখানে নামে। শোনো, কই কি, এই গাড়িটা আবার ফেরত পাঠাও। চাইল আর ডাইল আর আলুগুলা নিয়্যা আসুক। এদের ক্যাম্পে কয়দিন থাইকতে হব, কে জানে? আর আমাগো ক্যাম্পে জল ঢুইকলে ত চাইল সব নষ্ট হইয়া যাবে নে।

সব চাল আনতে বলেন?

পারলে তাই। না-পারলে, যা পারে।

ঘোষ একবার পেছন ফিরে দেখে, তারপর সামনে তাকায়, এই কাদামাটিতে অত লোড নিয়ে কি এই গাড়ি আসতে পারবে? ফেঁসে যাবে।

কম্যাণ্ড্যান্ট কোনো জবাব না দিয়ে হেঁটে যায়। তারপর বলে, গাড়িতে যেকয় বস্তা পারবে গাড়িতে আনুক, আর না-হয় ত জোয়ানরা কাঁধে কইর‍্যা আনুক।

এতটা রাস্তা?

যা পারে তাই আনুক ত।

ওরা সামনের দলের কাছে পৌঁছে যায়। তারা দাঁড়িয়েই ছিল। একটু দূরে বাংলাদেশের ক্যাম্প, সবুজ টিন দেখা যাচ্ছে–সেন্ট্রি বক্স। এখান থেকেই লাইন করতে হবে। সবাই মিলে পেছনের লোকজনের জন্যে অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করে আর বাংলাদেশের ক্যাম্পের দিকে তাকিয়ে দেখে। ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী মাত্র এইটুকু দূরত্বে এসে যেন কিছুটা অসহায় বোধ করে ফেলে, এবার সত্যি সত্যি তাদের দেশ ছেড়ে যেতে হচ্ছে। এরা যেমন, সামনে, বাংলাদেশের ক্যাম্পের দিকে তাকায়, তেমনি, পেছনে, তাকায় যে-পথটা দিয়ে তারা এল, সেই পথের দিকেও। ঐ পথেই ত ইন্ডিয়া, তাদের দেশ।

বাংলাদেশে ইন্ডিয়ার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী

প্রায় সকলেরই ওয়াটারপ্রুফ আর টুপির সামনেটা ভেজা, পেছনটা সে-তুলনায় শুকনো। বন্দুকগুলো এবার আর কাঁধে ঝোলানো না, হাতে চেপে ধরা। ঘাড় সোজা, মুখ শক্ত। সবার আগে কম্যাণ্ড্যান্ট। সবার পেছনে ঘোষ। তারও পেছনে গাড়িটা। ঘোষের লেফট-রাইট-লেফট-এর তালে-তালে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বাংলাদেশের ক্যাম্পে এসে ঢোকে।

তাদের দেখতে পেয়েই বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যার লুঙি পরে খালি গায়েই বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু ভারতীয় বাহিনীর এরকম কুচকাওয়াজে তাড়াতাড়ি ভেতরে গিয়ে খাকি জামাটা পরে আসে। জামাটা পরতে-পরতেই প্যান্টের দিকে হাত যায়, কিন্তু প্যান্ট মানেই জুতো। তাতে ত আবার একটু সময় লাগবে। সুতরাং বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যান্ট লুঙির ওপর জামাটা চাপিয়েই বেরিয়ে আসে আবার। একজন তার ওপর ছাতা খুলে ধরে সঙ্গে যায়। কিন্তু একটু যেতে না যেতেই বাতাসে ছাতাটা উল্টে গেলে সে তাড়াতাড়ি আর-একটা ছাতা আনতে ছোটে।

ইতিমধ্যে ঘোষের নির্দেশে ভারতীয় বাহিনী এ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে আবার স্ট্যাণ্ড এ্যাট ইজ হওয়া মাত্র ভারতীয় কম্যাণ্ড্যান্ট গিয়ে বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যারকে জড়িয়ে ধরে। বাংলাদেশের কম্যাণ্ডার ভারতীয় কম্যাণ্ড্যান্টকে জড়িয়ে ধরে বলে, আরে দাদা, আপনি ত আমারে ডর খাওয়াইয়্যা দিবার ধরিছেন, এলায় রাইফেল কাঁধে মিলিটারি মার্চ করি ঢুকি পড়িসেন। এ ত সীমান্তে গুলিবিনিময় হওয়া ধরিত, চলেন, চলেন, বলে কম্যাণ্ড্যান্টকে জড়িয়ে বারান্দার দিকে এগতে গিয়ে কম্যাণ্ড্যার হাত দিয়ে একটা ভঙ্গি করে যাতে সকলকেই আসতে বলা হয়। বারান্দায় ওঠার আগে কম্যাণ্ড্যান্ট হঠাৎ দাঁড়িয়ে বলে, আরে ভাই, দাঁড়াও। ঘোষ।

ঘোষ আসতেই বলে, ঐগুলো কিচেনে পাঠাও।

সে কী? কিচেনে আবার কী? কম্যাণ্ডার জিজ্ঞাসা করে।

আরে দুইডা ভাতে সিদ্ধ দেয়ার মতন পাঠা ছিল। ওদের ঐখানে রাইখ্যা আইলে ত সর্দি লাইগ্যা। মরত। তার থিকা ভারতবাংলাদেশ মৈত্রীর ভোগে লাগুক, চলো, চলো, এবার কম্যাণ্ড্যান্টই আগে পা বাড়ায়।

কম্যাণ্ড্যান্ট আর কম্যাণ্ড্যার বারান্দায় উঠতে না-উঠতেই বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে সবাই হৈ হৈ করে মাঠে নেমে যায়, ভারতীয় জওয়ানদের প্রায় হাতে ধরেধরে বারান্দায় তুলে নিয়ে আসে। বারান্দাতে উঠেই ভারতীয় জোয়ানরা প্রথম মাথার টুপি খুলে ফেলে, তার পর ওয়াটারপ্রুফের বোতামে হাত দেয়। বাংলাদেশের প্রায় সবারই পরনে লুঙি, কারো কারো গায়ে গেঞ্জি। তাই এই সময়টুকুতে সত্যি মনে হতে থাকে যে ভারতীয় বাহিনী এই ক্যাম্পে নিমন্ত্রণ খেতেই এসেছে।

ভেজা ওয়াটারপ্রুফগুলো বারান্দার বাটামে ঝোলানো, ভেজা গামবুটগুলো খুলে একপাশে রাখা–এই সবে প্রথম দিকের কয়েকটি মিনিট যায়। এর মধ্যে গাড়ির ভেতরে প্যাকেট করে নিজেদের লুঙি বা পাজামা, গামছা ইত্যাদি জোয়ানরা নিয়ে আসে, এক জোয়ান গিয়ে কম্যাণ্ড্যান্টের প্যাকেটটা দিয়ে আসে কম্যাণ্ড্যারের ঘরে। এই নানা ছুটোছুটি হৈহৈ-এর মধ্যে যখন ভারতীয় জোয়ানরাও কিছুক্ষণ পর লুঙি বা পাজামার ওপর গেঞ্জি চাপিয়ে গল্প করতে বা তাস খেলতে বসে যায় তখন দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে চেহারাগত আর-কোনো পার্থক্য থাকে না। বাংলা ভাষার উচ্চারণের বৈচিত্র্য বাংলা দেশের বাহিনীর ভেতরে যতটা, ভারতীয় বাহিনীর মধ্যেও ততটাই। রামাশিস আর পরশমণি শুধু আলাদা। বাংলাদেশের ক্যাম্পে কোনো হিন্দিভাষী ছিল না, নেপালি ত নয়ই। রামাশিস আর পরশমণি এক ফাঁকে কিচেনে গিয়ে জেনে আসে, মাংস-ভাত ছাড়া কিছু হচ্ছে কিনা।

কিচেনে এখানে বাংলা দেশের সীমান্তরক্ষীরাই রান্না করছে। তারা বলে, কেন্ দাদা, ডাইল হইব, ছোলার ডাইল।

রামাশিস বলে ব্যস, ব্যস, হামলোগ ভেজ খায়গা, দোঠো আলু কি বেগুন সিদ্ধ লাগাবেন, ব্যস।

কিচেনের লোকরা প্রথমে ভেজটা বুঝতে পারে না। বোঝার জন্যে তাদের একটু ভাবতে হয়, নিরামিষ খাবেন? মাংস খাবেন না? ক্যা?

পরশমণি বলে, না, হামরা ত খাই না। এমনি ভেজই খাব।

বাংলাদেশের একজন হঠাৎ বুঝতে পারে, আরে দাদা বলে গিয়ে রামাশিসকে জড়িয়ে ধরে হে-হে করে হেসে ফেলে। তারপর তার অন্যান্য সহকর্মীর দিকে তাকিয়ে বলে, দাদারা ভাইবছে আমরা বড় গোস্ত খাওয়াইয়্যা দিব নে–হে-হে-হে-হে।

এত বড় একটা খবর ত আর চেপে রাখা যায় না। রামাশিস আর পরশমণিকে নিয়ে কিচেনের সবাই গিয়ে বারান্দায় ওঠে। তারপর যে-হলঘরটাতে সবাই মিলে গুলতানি করছে তার দরজায় দাঁড়িয়ে একজন চিৎকার করে–এই শুনো ভাই সবাই।

এতজন লোক দরজায় এসে চেঁচামেচি করায় সকলেরই নজর পড়ে এদিকে। তখন কিচেনের সেই কর্মীটি রামাশিস আর পরশমণিকে দেখিয়ে বলে, ইন্ডিয়ার এই দাদারা কিচেনে গিয়া কয় কি, লোকটি ভেজ শব্দটি মনে করতে পারে না, নিরামিষ খাইব। ক্যা? না, দাদারা ভাইবছে আমরা বড় গোস্ত খাওয়াইয়্যা দিব নে।

সকলে মিলে হেসে ওঠায় রামাশিস দু হাত তুলে বলে, আরে না, না, আমরা ভাবলাম কিয়া পাকা হ্যায়, দেখভাল করে আসি। পরশমণি আর রামাশিস বসে পড়ে। কিচেনের লোকজন আবার কিচেনে যাওয়ার জন্যে ঘুরে দাঁড়ায়। একজন মুখ বাড়িয়ে বলে, দাদার মুরগাটার চারটা ঠ্যাংই রাইখ্যা দিব।

ভেতর থেকে একজন তাদের পেছনে চিৎকার করে–ল্যাজ আর শিংখানও দিস দাদারে।

পরশমণি আর রামাশিস তাড়াতাড়ি একটা তাসের দলের পেছনে ভিড়ে যায়।

এখন এই ঘরটার চারদিকে তাকালে চট করে বাংলাদেশীদের আর ভারতীয়দের আলাদা করা যাবে না–সবাই এমনই মিশে গেছে। মানুষরা মিশে গেলেও তাদের পোশাক-আশাক এবং আনুষঙ্গিক কিছু-কিছু জিনিশ মিলছিল না। এখানে এই ঘরের দেয়ালে দুই রক্ষীবাহিনীর বন্দুকই সার দিয়ে দাঁড় করানো। কিন্তু বন্দুকগুলো দেখতে একরকম নয়। এই ঘরের ভেতরে টাঙানো দড়িতে দুই বাহিনীরই কিছু-কিছু ইউনিফর্ম ঝুলছে। তার রং আলাদা। দেয়ালে, জানলায় ও দরজার কপাটে, সিনেমার নায়ক-নায়িকার ছবি সাঁটা–তার ভাবভঙ্গি আর চেহারা ভারতীয়দের পরিচিত না। তাস খেলতে-খেলতে বা নেহাৎ শুয়ে-শুয়েই কোনো জোয়ান হিন্দি গান গুনগুন করে। বাংলাদেশের কেউ বলে, আরে দাদা জোরে করেন না, শুনি। দুইদেশের সিগারেট প্যাকেট আলাদা।

এই দুই ক্যাম্পের লোকজন পরস্পরের চেনা। অনেকেই অনেককে নাম ধরে ডাকে। হাটে দেখা হয়। ডিউটি করতে গিয়ে দেখা হয়। চৌকি মারতে গিয়ে দেখা হয়। সেই ঘনিষ্ঠতা না থাকলে বাংলাদেশের সীমান্ত ক্যাম্পের কম্যাণ্ড্যারের পক্ষে কি আর সম্ভব হত বন্যার মুখে তাদের আমন্ত্রণ করে নিয়ে আসা?

কিন্তু সেই ঘনিষ্ঠতায় ত কোনোদিন এরকম এক জায়গায় থাকাখাওয়া হয়নি। তাই যেটুকু আনন্দ হচ্ছে–সেটা পিকনিকের আনন্দের মত। সেই আনন্দটুকুকেই সবাই একটু বাড়িয়ে নিতে চাইছে।

বাংলাদেশের কম্যাণ্ড্যার ভারতীয় কম্যাণ্ড্যান্টকে জিজ্ঞাসা করে, দাদা, একডা স্কচ রাইখছি আপনার তানে। বাহির করি?

কম্যাণ্ড্যান্ট আধশোয়া হয়ে বলে, করেন।

.

দুই সেনাপতির সংলাপ

কম্যাণ্ড্যারের ঘরে দুটো ক্যাম্পখাট পাতা–দুটোর মাঝখানে দেয়াল ঘেঁষে একটা টেবিল, টেবিলের ওপর একটা লণ্ঠন, আর পায়ের দিকে দুটো দরজা–দু দিকের বারান্দায় যাওয়ার। ঘরটাতে দুটো খাটই পাতা থাকে। আর-এক জন যে থাকে সে হয়ত আজ অন্য কোথাও শোবে, বা, হয়ত দুটো খাট পাতা থাকলেও ব্যবহার হয় একটাই।

কম্যাণ্ড্যান্ট লুঙি আর স্যাণ্ডো গেঞ্জি পরে উত্তর দিকের খাটটাতে বসে। তার রিভলবারসহ বেল্ট খুলে বালিকাকেশ টেনে বের করে। খাল। ডালাটা পুরো খুলতে ওপর রেখে, তালা বন্ধ খুলে বালিশের পাশে রাখা। কম্যাণ্ড্যার টেবিলের ওপর দুটো গ্লাশ রাখে, তারপর চৌকির তলা থেকে এক টিনের সুটকেশ টেনে বের করে। আবার উঠে টেবিলের ড্রয়ারের ভেতর থেকে একগোছা চাবি নিয়ে কোমর ভেঙে সুটকেশের তালাটা খোলে। ডালাটা পুরো খুলতে হয় না, বা হাতে তুলে রেখে ডান হাতটা ঢুকিয়ে একেবারেই বোতলটা বের করে হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রেখে, তালা বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়ায় কম্যাণ্ড্যার। তারপর চাবিটা ড্রয়ারে রেখে পা দিয়ে সুটকেসটা আবার খাটের তলায় ঠেলে দেয়।

আপনাদের ভাই এই একটা বড় সুবিধা–সিগারেট, পান ফার্স্ট ক্লাশ, মদও পান ফার্স্ট ক্লাশ, বেনসন এ্যান্ড হেজেস-এর প্যাকেটটা হাতে তুলে কম্যাণ্ড্যান্ট বলে।

সে ত দাদা আপনাদেরই বা কম কেনে? যারা স্কচ খাওয়ার তারা স্কচই খায়, কম্যাণ্ড্যার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বোতলের ছিপি খোলে।

আরে যারা খাওয়ার, তারা ত খাইবেই, আপনাদের এখানে যারা না খাওয়ার তারাও ত খাইতে পারে, ইচ্ছা কইরলে।

উল্টাটাও ত আছে দাদা।

উল্টাটা আবার কী?

যেইলা স্কচ চায় না, দেশী চায়, স্যালায় খাবেটা কী?

অ। ফরেন লিকার তৈরি হয় না?

হয় এখন একটা ডিস্টিলারিতে। কিন্তু আসলে হামরালার বেশিটাই একেবারে খাঁটি ফরেন।

তা যাই কন। খাইতে চাল্যে ত খাইতে পায়। আর এই সিগারেট–এ ত আপনাদের সব দুকানেই পাওয়া যায়।

আরে ইন্ডিয়ার য্যাম ক্যাপস্টান-ট্যাপস্টান, এইঠে. স্যানং এই সব সিগারেট।

কিন্তু ঐযে কইল্যাম খাঁটি ফরেন। আমাদের ত নিজেদের ফ্যাক্টরি, ফরেন পাব কুথায়?

হামলার একটা স্টেট এক্সপ্রেসের ফ্যাক্টরি আছে কিন্তু সেও ত পুরা ফরেন।

কম্যাণ্ড্যান্টের সামনে গ্লাশটা এগিয়ে দিয়ে কম্যাণ্ড্যার গ্লাশটা নিয়ে নিজের চৌকিতে বসে। কম্যাণ্ড্যারের বয়স বেশি নয়, রংপুরের রাজবংশী ছেলে, তার কথার মধ্যে রাজবংশী ভাষা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা আছে। কিন্তু রংপুরেরই এই বর্ডারে কাজ করছে বলে সে-সুযোগ খুব একটা বেশি পাচ্ছে না। ভবিষ্যতে যদি যশোহরের দিকে বদলি হয়, তা হলে বেশ খানিকটা কাটিয়ে উঠতে পারে। কম্যাণ্ড্যান্টের বয়স বেশি–সেই সুবাদে এর আগেই দুজনের দাদা-ভাইয়ের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে বটে কিন্তু তা না হলেও কম্যাণ্ড্যান্ট এই দুজনের মধ্যে সব সময়ই বড়র স্বীকৃতি পেত। কম্যাণ্ড্যান্ট এখানে লুঙিগেঞ্জি পরে বসে আছে ত অত বড় একটা দেশ ইন্ডিয়ারই লোক হিশেবে-বাংলাদেশের কাছে সেটা একটা মহাদেশই বটে। গ্লাশটা তুলে ধরে কম্যাণ্ড্যান্ট বলে, কী? টোস্ট করব্যান নাকি? কী কইবেন? ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী?

কম্যান্ড্যার একটু হাসে, সে যাদের করার করিবার দেন। আপনি ত আর এই ফ্লাড না হইলে আসিতেন না। ফ্লাডের নামে টোস্ট করি।

হে-হে করে কম্যাণ্ড্যান্ট হেসে ওঠে, আরে, আপনার ত বুদ্ধি আছে খুব। ত কোন ফ্লাডের নামে কইরবেন–যে-ফ্লাডের ভয়ে এইখানে আসছি, না যে-ফ্লাডের চোটে এইখানে আরো দুই দিন থাকব?

কম্যাণ্ড্যার হো-হো হেসে ফেলে-কোন ফ্লাড কায় জানে। গ্লাশটা তুলে এগিয়ে দেয়, কম্যাণ্ড্যান্টও গ্লাশটা তার গ্লাশের সঙ্গে মেলায়, কম্যাণ্ড্যার বলে–থ্রি চিয়ার্স ফর ফ্লাড়।

কম্যাণ্ড্যান্ট চুমুক দিয়ে গ্লাশটা রেখে বলে, আপনাগ এইখানে নাকি ফ্লাডের লোকজন আইস্যা উইঠছে? কোথায়?

কম্যাণ্ড্যার তার মাথার দিকের বেড়াটা দেখিয়ে বলে–ঐ দিকে, রান্নাঘরের পাছত ত্রিপলের দুইখান ছাউনি ফেলি দিছি। বিকালে ত শুনিলাম শ-খানেক হবা পারে, এ্যালায় আরো বাড়ি গিছে নিশ্চয়। ইন্ডিয়ার লোজকনও ত আসিছে শুনিছু। বিকালের টাইমত ইন্ডিয়াই বেশি আসিছে। এখনো।

তা ইন্ডিয়ার ক্যাম্পসুষ্ঠু আইসছি, মানষেরা যাবে কোথায়? আপনারা কি ক্যাম্প খুইলছেন নাকি?

আরে না না, ত্রিপলের ছাউনি কিছু, মাথাখান বাঁচিবে আর জল নামিলে ত চলি যাবে। এই ডাঙাখান ত অনেক উচা।

এইখানে টিভি নাই?

হ্যাঁ, আছে ত। দেখিবেন? এখন তে লেকচার হছে। খাড়ান, ফিল্ম হবার সময় যাম। কটা বাজে এখন?

কম্যাণ্ড্যার বালিশের তলা থেকে ঘড়ি বের করে দেখে বলে, সাত। কম্যাণ্ড্যান্ট নিজের ঘড়ি দেখে সময়টা মেলাতে গিয়ে আবার দেখে, সাড়ে সাত, তোমার ঘড়ি শ্লো নাকি?

আরে না, মোর ঘড়ি রোজ মিলাই।

আমার ঘড়ি ত ভাই ফাস্ট যায় না।

একটু পরে কম্যান্ডার হো হো হেসে বলে, আরে আপনার ত ইন্ডিয়ার টাইম, হামরালার ত বাংলাদেশের টাইম। এইঠে নটায় ফিল্ম দিবে। দেখব।

আমাদের নর্থ বেঙ্গলে ত বাংলাদেশের টিভিই সবাই দেখে, তোমাদের আর দিল্লির। কলকাতা ত রাই যায় না।

আমাদের সাউথ বেঙ্গলে কলকাতাখান দেখা যায়, শীতকালে।

টিভি এক, নদী এক, ফ্লাড এক, শুধু টাইমটা আলাদা?

কেনে? কহিলেন যে সিগারেট আলাদা, মদ আলাদা

নদীডাও আলাদা হইব।

কোন নদী? তিস্তাবুড়ি?

বুড়ি না ছুড়ি কে জানে। আমাদের ইন্ডিয়ায় ত পাহাড়ের তলায় বিরাট তিস্তা ব্যারাজ বান্ধানো হইচ্ছে।

তিস্তার বাঁধ?

বাধ। স্লুইস গেট। ফ্লাড হবার পারব না। জল আটক থাকব। শীতের সময় ছাড়া হয়। বিরাট নাকি ব্যারাজ-তিস্তার মাঝখান দিয়্যা।

স্যালায় আমরা জল পাম কোটত?

জলের কি অভাব পড়ছে তোমার? প্রতি বছরই ত ফ্লাড পাও।

ফ্লাড হবার তানেই ত রংপুরের এইঠে, পাটগ্রামে, এ্যালায় ফলন ভাল হয়। এ ফ্লাডত আপনাদের মানষি মরে, আর আমাদের ফসল বাড়ে।

সেই জন্যই ব্যারাজ হচ্ছে, তিস্তা ব্যারাজ। ফ্লাডও নাই, মানষে মইরবেও না।

কিন্তু নদীখান ত ভাগ হবা ধরিবে। আপনাদের হাত চাবি–জল দিলে জল পাব, না দিলে শুখা।

শুখা ত শুখা। তখন এক টিভিটাই এক থাইকব-তোমরা কলকাতা দেখবা, আমরা রংপুর দেখব। আর সব আলাদা-নদী আলাদা, ফ্লাড আলাদা, টাইম আলাদা।

আলাদাখান এত বাড়া ভাল না হয়, কম্যান্ড্যার কম্যান্ডান্টের গ্লাশ আবার ভরে দিয়ে, নিজের গ্লাশটাও ভরে নেয়।

.

ঘোষের ইণ্ডিয়ায় একবার প্রত্যাবর্তন

ঘোষ একেবারে একলা হয়ে যায়।

বাংলাদেশের ক্যাম্পে জোয়ানরা জোয়ানদের সঙ্গে মিশে গেছে, কাস্টমসের লোক কাস্টমসের ঘরে গিয়ে উঠেছে। ফোনের লোক ফোনের লোকের ঘরে। কিন্তু ঘোষেরই যেন কোনো ঘর ছিল না।

আসলে আছে নিশ্চয়ই। বাংলাদেশের ক্যাম্পে কি কমাণ্ডার আর জোয়ানদের মাঝখানে আর-কেউ নেই নাকি? কিন্তু ঘোষের সঙ্গে তাদের পরিচয় হওয়ার সময় হয় নি। বাংলাদেশের ক্যাম্পে পৌঁছে, কোনো রকমে এক কাপ চা খেয়েই সে ছজন জোয়ানের সঙ্গে গাড়িটা নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েছে। চালডাল যে কবস্তা পারে নিয়ে আসতে হবে-কম্যাণ্ড্যান্ট যেমন বলে দিল।

ঘোষ ও তার লোকজন বাতাসের সঙ্গেই যাচ্ছিল। তাদের ওয়াটারপ্রুফের পিঠ ভিজছিল বুকটা শুকনো ছিল। পিঠে হাওয়া নিয়ে হাঁটার সুবিধে। তাছাড়া, তাড়াও ত একটা ছিল। এখন যদি তাড়াতাড়ি যেতে পারে, ফেরার সময়ের দেরিটা তা হলে পুষিয়ে যাবে। গাড়ি বেশি ভারী হলে টানা মুশকিল হবে।

চালডালটা যদি নষ্ট হত তা হলে তাদের কোনো ক্ষতি ছিল না, বরং লাভ ছিল। হেডকোয়ার্টার থেকে নতুন রেশন আসত, এগুলো কম দামে বেচে দিয়ে কম্যাণ্ড্যান্টও সে ভাগ করে নিতে পারত। ফ্লাডের পর এ-সব জিনিশের চাহিদা থাকে। কিন্তু নতুন রেশন আসতে দেরিও হতে পারে। দেরি হবেই। অন্তত সেকদিনের রেশন বাঁচাতে হবে। ঘোষ মনে-মনে হিশেব কষতে কষতে হটেকত বস্তা চাল বাঁচালে নতুন রেশনের সময় পর্যন্ত চালানো যাবে অথচ বেচার মত অন্তত কয়েক বস্তা ভেজা চাল থেকে যাবে। নদীতে জল যা দেখেছে তাতে আজ তাদের ক্যাম্পে জল উঠবেই। জলটা কতদিন থাকবে–সেটা অবিশ্যি এখনই বোঝা যাচ্ছে না। ঘোষ মাঝেমধ্যে নদীর দিকে টর্চ মারে কিন্তু টর্চের আলো জলের কুয়াশায় বেশিদূর যায় না।

জোয়ানরা গাড়িটা টানতে-টানতে প্রায় দৌড়ে-দৌড়ে আগে চলে যাচ্ছে। ঘোষকে একা-একাই হাঁটতে হয়। ওরা আগে পৌঁছেও দাঁড়িয়ে থাকবে–গুদামের চাবি তার কাছে।

ঘোষ পায়ের কাছে ও আশেপাশে দু-একবার টর্চ মেরে বুঝতে চেষ্টা করে যাওয়ার সময় কম্যাণ্ড্যান্টের সঙ্গে সে যে হ্যাঁড়িগুলোতে তিস্তার জল ঢুকতে দেখেছিল সেগুলো কোথায় গেল। সে ও কম্যাণ্ড্যান্ট ত সে রকম নিচু জায়গা বারকয়েক পেরল।

টর্চ নিবিয়ে বা দিকে তাকিয়ে ও আকাশের দিকে চেয়ে ঘোষ আন্দাজের চেষ্টা করে-সেই খুঁড়িগুলো পেরিয়ে এল কি না। সে আর কম্যাণ্ড্যান্ট ত তাদের ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে নদীর ধারে গেল, তারপর নদীর পাড় দিয়ে এগল। তা হলে কি ওগুলো আসলে খুঁড়ি ছিল না? নদীর পাড়ই ছিল? কিন্তু তখন তা হলে সেটা নজরে পড়ল না? সে আর কম্যাণ্ড্যান্ট ত ঐ খুঁড়ির জল দেখলও কিছুক্ষণ।

ঘোষ দাঁড়িয়ে পড়ে। তার পথ ভুল হওয়া সম্ভব নয়। সোজা হাটছে।

কিন্তু আরো কয়েক পা গিয়ে তার মনে পড়ল–ওগুলো যদি খাড়িই হবে তা হলে গাড়িটা সেখান দিয়ে নামিয়ে তোলা হল কেমন করে? তা হলে নিশ্চয়ই খাড়ি ছিল না–পাড়টাই ভেঙে আর-একটু ভেতরে ঢুকে গেছে। কিন্তু সে আর কম্যাণ্ড্যান্ট ত সে-সব জায়গা দিয়ে হাঁটলও। তা হলে গাড়িটা চলেছে কিন্তু সে টের পায় নি নাকি? তার রাস্তা ভুল হচ্ছে না ত? ঘোষ দাঁড়িয়ে পড়ে।

দাঁড়িয়ে পড়ার পর সে পেছন থেকে হামলে পড়া বাতাসের আওয়াজ দুই কানের পাশে পায়। কিন্তু বৃষ্টি পায় না। তার ওয়াটারপ্রুফের ওপর বৃষ্টির ছাট লাগার আওয়াজ সঁ সঁ করে কানে বাজে। বৃষ্টিটা বোধ করার জন্যে সে ঘুরে দাঁড়ায়। মুখের চামড়ার ওপর বৃষ্টির ছাটগুলো একসঙ্গে এসে বেঁধে। ঘোষ আবার ঘোরে ও হাঁটতে শুরু করে। আর, কয়েক পা হাঁটতেই সে যেন চেনা জায়গার একটা আভাস পায়। সে দাঁড়িয়ে পড়ে টর্চটা জ্বেলে বাঁ দিকে আরো কয়েক পা হাটে, হ্যাঁ, তাদের ক্যাম্পের কাটাতারের বেড়া শুরু হল। সে তা হলে পথ হারায় নি। কিন্তু খাড়িগুলো গেল, কোথায়।

সেন্ট্রিবক্সের গেটটা খোলাই ছিল–গাড়ি গেছে। গেটটা পেরতেই ছপ করে জলে পা পড়ল। ঘোষ পায়ের কাছে টর্চ জ্বালে, গামবুটের নীচে ঘোলা জল, টর্চের আলোতে পাতলা দেখাচ্ছে। ফ্লাডের জল তা হলে ক্যাম্পে ঢুকে গেছে। টর্চ নিবিয়ে কয়েক পা ছপ ছপ করে হাঁটে ঘোষ। আকাশে খোলা চাঁদনি–তাতে মেঘ দেখা যায় বা মেঘের আভাস পাওয়া যায় মাত্র। এখন মাটির দিকে তাকালে জলে সেই মেঘের আবছায়া পাওয়া যায়। ঘোষ আবার টর্চ জ্বালিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার টর্চের আলোকবৃত্তের মধ্যে জলের দ্রুত সরলরেখাগুলো পরস্পরের সঙ্গে না মিশে বা থেকে ডাইনে যাচ্ছে আর বৃষ্টির ছাটে। নুয়েপড়া ঘাসগুলো জলের টানে সোজা হয়ে যাচ্ছে।

টর্চটা বাতাসে নাড়িয়ে ঘোষ আঁকে, এই, তোমরা এসে গেছ?

ক্যাম্পের বারান্দা থেকে টর্চ জ্বলে ওঠে, দু-তিনটে। ওরা চিৎকার করে কিছু বলে শোনা যায়, বোঝা যায় না। মাঠটা পেরিয়ে ঘোষ একেবারে গুদামের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় বারান্দার নীচেই গাড়িটা লাগিয়ে রেখেছে।

সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠতে-উঠতে ঘোষ বলে, জল ত ঢুকে গেছে।

জোয়ানদের একজন বলে, হ্যাঁ স্যার। ওরা ত কেউ নামল না, আর্মারির বারান্দা থেকে। টর্চটা ধরো ত, গুদামের তালা খুলতে-খুলতে ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, কী, জল কি বারান্দায় উঠবে নাকি?

তা ত উঠিবার পারে স্যার, যাওয়ার তানে ত জল না আছিল, আর এলায় ত সপসপাছে।

গুদামের দরজা খোলামাত্র বাতাসের ধাক্কায় কপাটটা পুরো খুলে আবার সেই খোলার বেগের প্রত্যাঘাতে ঘোষের মুখের ওপর বন্ধ হয়ে যায়। গুদামের ভেতরে কোনো খালি টিন ছিল হয়ত–সেটা খুঁটির গায়ে লেগে ঝন ঝন আওয়াজ ওঠে। একসঙ্গে অনেকগুলো টর্চ জ্বলে ওঠে। ওরা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে।

শোনো, তোমরা যা টানতে পারবে, তাই নাও, শেষে রাস্তায় ফেলে দিতে না হয়।

স্যার, এলায় ত নিগিবার কষ্ট হবে। একবস্তা চাউল আর একবস্তা আটা নিগিবার পারি।

তা হলে তাই নাও। আর ডালের ছোট বস্তা নাও একটা।

জোয়ানরা দু জন করে এক-এক বস্তা মুহূর্তে তুলে নেয়। একজন দরজাটা ধরে থাকে, দুটো বস্তা নিয়ে বারান্দার কিনারায় রাখে। ঘর থেকে ওরা বেরিয়ে গেলে ঘোষ টর্চ জ্বেলে দেখে কেরোসিনের একটা সিড় টিন নীচে আছে। একবার ভাবে, জোয়ানদের রওনা করে দিয়ে টিনটা তার ঘরে রেখে দেবে কিনা। মুহূর্তের মধ্যেই আবার ভাবে, পরে দেখা যাবে।

এই শোনো, ঘোষ দরজার দিকে টর্চ ফেলে। একজন জোয়ান এগিয়ে আসে।

এই টিনটা ঐ বস্তাগুলোর ওপর রেখে দাও, ঘোষ টর্চের আলো দেখায় জোয়ানটিকে। সে টিনটা তুলে চালের বস্তার ওপর রেখে ঠেলে দেয়।

জোয়ানরা সবাই নীচে নেমে গিয়েছিল। ঘোষ গুদামের দরজাটা বন্ধ করার জন্যে টানতেই বাতাসের ধাক্কায় একটা কপাট তার হাত থেকে ছিটকে যায়।

এই, একটু ধরো ত।

এক জোয়ান বারান্দার ওপর ভর দিয়ে উঠে আসে। সে দরজার কড়াদুটো টেনে ধরলে ঘোষ তালা লাগাতে পারে। জোয়ানটা আবার লাফিয়ে নীচে নামে। গাড়ির জোয়ালটা ততক্ষণে দু জন উঁচু করে তুলেছে, আর দুজন পেছনে হাত দিয়েছে।

এই, তোমরা বস্তা তোলার পর গুদামে ক বস্তা থাকল? ঘোষ বারান্দা থেকে সিঁড়ির দিকে যেতে-যেতে জিজ্ঞাসা করলে এরা থেমে যায়। কিন্তু কেউ আর-কিছু বলে না। একটু পর একজন হেসে ফেলে বলে, কিছু ত দেখি নাই রো, খপ করি ধইচছি, গট করি বাহির হছি। বলেও সে হে-হে করে হাসে, আরো দু-একটি অস্পষ্ট হাসির সঙ্গে নিজের স্বর মিলিয়ে।

আচ্ছা, আচ্ছা, যাও, আমি একটু আর্মারিটা দেখে যাই।

ওরা একটা হ্যাঁচকা টানে গাড়িটা চালু করে, তারপর এগিয়ে যায়। আর ওদের দিকে পেছন ফিরে ঘোষ একবার বারান্দা ও সার-সার ঘরের দরজার ওপর দিয়ে টর্চটা ফেলে। বাতাসের আঘাতে দরজাগুলোতে আওয়াজ উঠছে। অথচ জনমনিষ্যি নেই। মাত্র এই একটু আগেও ত তাদের ক্যাম্পটা কী রকম গমগম করছিল, না?

সামনের মাঠটায় দাঁড়িয়েই ঘোষ আর্মারির দিকে টর্চ ফেলে, এই তোমরা ঠিক আছ ত?

বারান্দা থেকে টর্চ জ্বলে, ঘোষ শুনতে পায়, হ্যাঁ স্যার, ঠিক আছি।

ঘোষ টর্চটা জ্বেলেই একটু এগিয়ে যায়। তারপর গলা তুলে বলে, কাল সকালে তোমাদের বদলি এলে তোমরা বাংলাদেশের ক্যাম্পে চলে যেও।

জল ত বাড়িবার ধরিছে। জল বাড়িলে বদলি আসিবে ক্যানং করি স্যার?

ঘোষ একটু ভাবে। তারপর আবার আর্মারির দিকে কয়েক পা এগিয়ে টর্চটা ফেলে দাঁড়ায়। পেছন থেকে একটা আওয়াজ পেল–গাড়িটা বোধহয় সেন্ট্রি বক্স পেরল।

শোনো, জল বাড়লেও কেউ-না-কেউ আসবে। আর বারান্দায় জল উঠলে তোমরা ছাতে চলে যেও। ঘোষ ছাতে টর্চ ফেলে–ভিজে ত্রিপলের ঢাকনাটা অন্ধকারের মত দেখাচ্ছে।

আমরা ঠিক আছি স্যার, ভাববেন না, বারান্দা থেকে জবাব আসে। ঘোষ এবার ঘুরে তাড়াতাড়ি গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করে।

.

|| বন্যার মুখে একটু ভেজা ধর্ষণ দিয়ে চরপর্বের শেষ অধ্যায় ||

ঘাসবনে পা দিয়ে জলের ওপর টর্চটা ফেলে ঘোষ দেখে এখন জলের তলায় পুরো রাস্তাটা দেখা যাচ্ছে-ঘাসগুলো সোজা হয়ে গেছে। এইটুকুর মধ্যেই কি জল আরো বাড়ল? ঘোষ ছপছপ করতে করতে গেটের কাছে পৌঁছয়। গেটটা খুলেই রেখে গেছে ওরা। বেরিয়ে গেটটা বন্ধ করার জন্যে ঘুরতেই সেন্ট্রিবক্সের তলা থেকে কেউ বেরিয়ে এসে ডাকে, বাবু।

ঘোষ চমকে যায়। টর্চটা জ্বালতেই মেয়েটি গেট দিয়ে বাইরে চলে আসে। গেটটা আর ঠেলে না দিয়ে টর্চটা জ্বালিয়ে রেখেই ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, কী ব্যাপার?

না বাবু, মুই ক্যাম্পত যাম, তোমার নখত।

ক্যাম্প? কিসের ক্যাম্প?

বানভাসির ক্যাম্প বাবু। মোর গাঁওখান ভাসি গেইসে।

ও, ঘোষ গেটটা ঠেলে দিয়ে হাঁটতে শুরু করে, মেয়েটিও তার পেছন-পেছন চলে। গাড়িটা বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে, বাতাসে আওয়াজ আসছে। এতক্ষণ বাতাস পিছে নিয়ে আসতে-আসতে তাড়াতাড়ি পা ফেলাটা যেন রপ্ত হয়ে গিয়েছিল। সেই ভাবে পা ফেলতে গিয়ে বাতাসের প্রথম ধাক্কায় একটু পেছিয়েই যায় ঘোষ। তারপর বুকটা ঝুঁকিয়ে হাঁটতে শুরু করে। আর মাঝে-মাঝে টর্চ ফেলে।

কয়েক পা যাওয়ার পর তার সন্দেহ হয় মেয়েটা কি আসছে। ঘাড় ঘুরিয়ে টর্চ ফেলে দেখে, মেয়েটা ত আসছেই। সঙ্গে একটা কুকুরও।

হাঁটতে-হাঁটতে ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, তুমি কোন গাঁয়ের?

দক্ষিণপাড়ার বাবু।

তুমি একা-একা এই রাত্তিরে যাচ্ছ কেন? তোমার বাড়ির সবাই কোথায়?

মোর ত বাড়ি নাই বাবু। মোর মানষিও নাই। মুই নিদ গেছু। আর-সব মানষি জল দেখি কোটত চলি গেইছে!

মেয়েটির কথা ঘোষ শুনতে পায় না। সে আর-একটু আস্তে হাঁটে, মেয়েটি প্রায় তার পাশাপাশি চলে আসে। তারও প্রায় পাশাপাশি সেই কুকুরটি।

তুমি গ্রামের লোকের সঙ্গে গেলে না কেন?

মোক ত ডাকছি। কিন্তুক মুই যেইলা গেইছি, দেখি নৌকা নাই।

ও। তোমাদের লোকজন নৌকো করে ক্যাম্পে গেছে? ঘোষের যেন খুব খারাপ লাগে না একা-একা যাওয়ার বদলে গল্প করতে করতে যেতে।

সব নৌকা করি চলি গেইল। তার বাদে মুই হাঁটা ধরিছু।

তুমি ওদের সঙ্গে গেলে না কেন, যারা গাড়ি নিয়ে গেল– ঘোষ হাত তুলে সামনেটা দেখায়।

ডর খাইছু বাবু। অত মানষি চিল্লাছে। ভাবিছু উমরায় আগত যাক, মুই পাছত-পাছত যাম। ত দেখি, তোমরালা একেলা আসিবার ধরিছু। স্যালায় ভাবিছু, এলায় এই বাবুটার সাথত যাম।

তুমি কি ইণ্ডিয়ার?

না বাবু, মুই কারো না হয়।

না। তোমাদের গ্রামটা কি ইণ্ডিয়ায় না বাংলাদেশে?

না বাবু। মুই কারো না হয়।

তোমার বাড়ি নেই?

না বাবু। বাড়ি নাই রে।

তোমার কোনো লোকজনও নেই?

না বাবু। মোর কুনো মানষি নাই।

তোমার ইণ্ডিয়া বাংলাদেশও নেই?

না বাবু। মুই কারো না হয়।

এ ছিটমহলের কোথায় কতটুকু ভারত, আর কোথায় কতখানি বাংলাদেশ বোঝা মুশকিল। মেয়েটি ইণ্ডিয়ারই কিনা সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্যে একটু ভেবে ঘোষ জিজ্ঞাসা করে, তুমি কার নাম শুনেছ রাজীব গান্ধী না এরশাদের?

না বাবু, মুই শুনো নাই রো। মুই নাম শুনো নাই।

তোমার ওখানে ভোট ফর হয়? পঞ্চায়েত হয়?

হবা পারে বাবু। ভোট হবা পারে। হবা পারে।

ঘোষ বাঁয়ে তাকায়–ঘোলাটে চাঁদনি তিস্তার জলের ওপর পড়ে আছে এমন, মনে হচ্ছে তিস্তাটা একটা দেয়ালের মত আকাশে উঠে গেছে। ঘোষ ডাইনে তাকায়–দুই সীমান্তের মাঝখানে মালিকানাহীন প্রান্তর এখন জলে ডুবছে। বাংলাদেশের দিক থেকে ভারতের দিকে বাতাস ফ্লাডের মতই ছুটে আসছে। ঘোষ মেয়েটির ওপর টর্চ ফেলে, দাঁড়িয়ে। মেয়েটিও দাঁড়িয়ে পড়ে। সে প্রথমে টর্চের দিকে তাকায়, তারপর চোখ কোচকায়। কুকুরটা মেয়েটির পায়ের কাছে টর্চের আলোর বৃত্তের মধ্যে এসে দাঁড়ায়।

কী দেখিলেন বাবু? মোক দেখিসেন?

টর্চ নিবিয়ে ঘোষ আবার হাঁটা শুরু করে। এত সপসপে ভিজে গেছে মেয়েটি যে দেখেও কিছু বোঝ যায় না। বাতাসের বেগ ঠেলে যেতে হচ্ছে বলেই হোক, বা অন্য কোনো কারণেই হোক, ঘোষের গতি একটু কমে আসে। ক্যাম্পে তার ঘরে নিয়ে যেতে পারলে মেয়েটিকে একটু শুকিয়ে দেখে নেয়া যেত। ক্যাম্পটা ত এখন সুনসান। যাওয়া যায়। কিন্তু আমারির বারান্দা থেকে ওরা যদি টর্চ ফেলে? ঘোষ আগে গিয়ে, মেয়েটিকে পরে আসতে বলতে পারে। কিন্তু মেয়েটি যদি তখন না আসে? সেন্ট্রি বক্সটায় যাওয়া যায় অবিশ্যি।

ঘোষ একটা ঢোক গিলে জিজ্ঞাসা করে, ক্যাম্পে তোমার কে আছে।

কায়-না-কায় ত থাকিবে বাবু।

তোমার ত বাড়ির কেউ নেই বললে?

না বাবু। মোর বাড়ি নাই রো।

না। বাড়ির লোকজনও ত কেউ নেই বললে?

না বাবু। মোর মানষি কুনো নাই রো।

ইণ্ডিয়া বাংলাদেশও নেই?

না বাবু। মোর ঐলা কিছু নাই রো।

তোমার দেশ নেই? একটা?

না বাবু। মোর দেশ নাই রে।

তা হলে ক্যাম্পে আর তোমার কে থাকবে?

মানষিলা ত থাকিবে বাবু, বানভাসি মানষিলা।

গাড়ি টেনে নিয়ে যাওয়া জোয়ানদের অতর্কিত চিৎকার ঘোষ আর শুনতে পায় না। ওরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বা, তিস্তার আওয়াজটাই এখন প্রবলতর। তা হলে কি পায়ে-পায়ে ওরা তিস্তার কাছেই চলে এসেছে, পাড়ে? ঘোষ বায়েটর্চ ফেলে মাটিতে ঘোলাটে জল, তারপর তিস্তার ওপরের ঘোলাটে কুয়াশা। সেই আলোটাই ঘুরিয়ে মেয়েটার ওপর আবার ফেলে। মাথায় চুল থেকে সারাটা শরীর সপ সপ করছে, নিংড়োলে জল বেরবে। মেয়েটি এবার মুখ তুলে আবার জিজ্ঞাসা কর, কী দেখিসেন বাবু? নদীতে বান উঠিছে?

টর্চটা জ্বালিয়ে রেখেই ঘোষ মেয়েটির দুই কাঁধে হাত দিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়ায়। মেয়েটির ঘাড়ের পেছন থেকে টর্চের আলো সীমান্ত-অন্তবর্তী এলাকায় অকারণ ছড়িয়ে থাকে। তাতে দেখা যায় কুকুরটা অন্যদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে। এতদিন সীমান্তে সীমান্তে চাকরি করছে ঘোষ–সে নিশ্চিতরূপে জেনে যায় এই মেয়েটিও বর্ডারের আরো অনেক তাদের মত, যাদের বাড়িঘর নেই, মানুষজন নেই। এমন-কি। দেশটেশও নেই।

ঘোষ সেই আপাদমস্তক ভেজা মেয়েটাকে স্রোতের মত বাতাসের ভেতর ভেজা মাটিতে শোয়ায়।

চরপর্বটা এখানেই শেষ করা যায়। এর পর ত এই মেয়েটি ক্যাম্পে যাবে। সেখানে সে আরো সব বানভাসি মানুষের সঙ্গে থাকবে। সেই বানভাসি মানুষদের বেশির ভাগেরই পরিবার আছে, ঘরবাড়ি আছে, বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ত আছেই। আবার, এই মেয়েটির মত দু-চারজনও আছে। সেখানে মেয়েটি আবার ঘুমিয়ে পড়তে পারবে। ঘোষ যে তাকে এই ভেজা শরীরে ভেজা মাটিতেই শোয়াল–সেটা তার জীবনে এতই ঘটেছে যে গল্প করার কিছু নেই।

পর্বের শেষ অধ্যায় হিশেবে ধর্ষণটা ঠিক লাগসই হল না। এ যেন প্রায় পরস্পরের সম্মতিতেই ঘটল। তবুও ত একটা ধর্ষণই, অসম্মতির কোনো সুযোগই যেখানে নেই। ক্যাম্পের বানভাসি লোকজন ত খানিকটা জানাই–সেখানে আর ফিরে যাওয়ার দরকার নেই।

বরং চরপর্ব এখানেই শেষ হোক।

.

পাহাড়ের তলা থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সীমানা পর্যন্ত তিস্তার ভেতর ত কতই চর। কোনো চর ডাঙার চেয়েও স্থায়ী। কিন্তু ডাঙা যেমন ভাসে, এই সব চরও ত তেমনি ভাসতে পারে। প্রতি বছরই নানা বন্যার সময় এই সব চরে মানুষকে ঘরছাড়ার ভয় পেতে হয়।

চরে যারা আবাদ করে তারা জল আর মাটির সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্কটাকেই বড় করে দেখে। তেমন। ভাবনাচিন্তা করে দেখে না, শরীরের অভ্যাসে দেখে। ভাল মাটি, যদি খাটা যায় ফসলও পাওয়া যাবে। আর, সব জমিরই নিজস্ব ফসল আছে। সেইটি বুঝে নিতে হয়–কোন জমিতে কী ফলবে? আগে কেউ কখনো শুনেছে তিস্তার বালুবাড়িতে এত ভাল তরমুজ হয়?

জলের সঙ্গেও সেই মৈত্রীর সম্পর্কটাই অটুট থাকে। তুমি জলের একেবারে ভেতরে এসে ডাঙার ফসল ফলাচ্ছ–জল তার জায়গা ছেড়ে দিয়েছে বলেই না ফলাচ্ছ!

কিন্তু বছরের এই কয়েকটি মাসজলের সঙ্গে সেই মৈত্রীর সম্পর্কটা ভেঙে যায়। জল যে সব সময়ই তার হারানো জায়গার দখল নেয়, তা নয়। জলের শক্তি তখন মানুষের শক্তির চাইতে অনেক গুণ বেশি। তখন জলের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখতে যাওয়ার মানে মৃত্যু, শত্রুতা করতে চাওয়ার মানেও মৃত্যু। তখন জলকে পথ ছেড়ে দিতে হয়। অনেক সময়ই দেখা যায়, জল নেমে গেলে মানুষ আবার তার পুরনো, ঘরবাড়ি ফিরে পায়। কিন্তু দু-একটা চর আর চর হয়ে জাগতে নাও পারে। সেই অনিশ্চয়তাটুকু থেকেই। যায়। তা থেকে পরিত্রাণ নেই, তা থেকে উদ্ধারও নেই। সেই কারণেই চরের মানুষ চর ছাড়তে-ছাড়তেও ছাড়ে না, যেন, না-ছাড়লেই চরটা তাদের থেকে যাবে।

জল, আকাশ, এর কোনো কিছুই ত দেশীয় সীমান্তের উর্ধ্বে নয়। বাতাসের আর, আলোর কোনো সীমানা নেই–তা ছাড়া সব কিছুরই আছে। সেই সীমানা যখন লোপাট হয়ে যায়, তখন সেই সীমানানির্ধারক শাসনকাঠামোও লোপাট। সীমানায়-সীমানায় এত ভাগাভাগি আঁটাআঁটি সত্ত্বেও ত কত মানুষমানুষীই আছে যাদের কোনো দেশই নেই, কোনো সীমান্তই নেই। সীমান্ত শুধু তাদের ধর্ষিত জীবনকে আরো একটু বিড়ম্বিত করে মাত্র! সে বিড়ম্বনা থেকে তিস্তা-পারেরও দেশহীন মানুষেরও কোনো মুক্তি নেই।

মুক্তি যখন নেইই, তখন চরপর্বের কাহিনী শেষ হোক-নদীর মত তরল মাটিতে নদীর মতই ভেজা মেয়েকে যখন সীমান্ত ভেঙে শুতে হয়।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%