বৃক্ষপর্ব : বাঘারুর প্রত্যাবর্তন

দেবেশ রায়

আপলচাঁদ ফরেস্টে রাত তিনটে

শনিবার রাত তিনটের সময় আপলাদের ভেতরে তিস্তার পাড়ে দাঁড়িয়ে গয়ানাথ ও আসিন্দির তিস্তার ফ্লাড দেখছিল, ঠিক রাত তিনটেয়। আসিন্দিরের এক হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ, আর-এক হাতের কব্জিতে সিকো ঘড়ি ঢলঢল করে। সেই বাতাস, বৃষ্টি আর ফ্লাডের মধ্যেও আসিন্দিরের কব্জিতে নীল সময় দপদপ করছিল, যদি আকাশে তখন তারা থাকত, তবে সে তারাও দপদপ করত আসিন্দিরের সিকো ঘড়ির মতই। বাঘারু ফ্লাড দেখছিল না। সে গয়ানাথ আর আসিন্দিরের একটু পেছনে দাঁড়িয়েছিল। তিস্তার ওপরে ঘোলাটে আকাশ, ঘোলাটে আলো। কিন্তু পাড়ে, অত গাছগাছড়া থাকায় অন্ধকার। সেই অন্ধকারে বাঘারু আর-একটা গাছের মতই দাঁড়িয়েছিল।

আপলচাঁদ ফরেস্টের ভেতরে গাজোলডোবা যেখানে, সেখানে, শনিবার বিকেল থেকেই তিস্তা পাড় ভাঙছিল। ভাঙতে-ভাঙতে রাত বারটা নাগাদ সেখানে একটা ছোট সোঁতামতই যেন হয়ে যায়। এমন সোঁতা নয় যে তিস্তার জল ওখান দিয়ে হু হু করে ঢুকে আপলাদের ভেতর দিয়ে ছুটবে। কিন্তু এমন একটা সোঁতা যে তিস্তার ফ্লাডের জল এখন ওখানে এসে ধাক্কা মারবে ও আরো মাটি খাবে। পরে, তিস্তার ফ্লাড যখন সরে যাবে–এ সোঁতাটাও শুকিয়ে যাবে। দেখতে-দেখতে গাছগাছালি বা জঙ্গলে গর্তটা বুজে যাবে। এক বছর পরে আর বোঝাও যাবে না যে এখানে তিস্তার একটা সোঁতা ঢুকেছিল।

আসিন্দিরের হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ কিন্তু সে সেটা জ্বালায় না। গয়ানাথ আর আসিন্দির পাড়ে দাঁড়িয়ে তিস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে-যেন তিস্তা থেকে কেউ উঠে আসবে।

গয়ানাথ বলে, কয়টা গাছ পড়িছে দেখ কেনে।

আসিন্দির বলে, কয় দফা দেখিবার নাগে? স্যালায় ত চারিখান পড়িছে, আর পড়ে নাই।

গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে, তর মনত খায় কী? অর্জুন গাছটা পড়িবে কি না পড়িবে?

আসিন্দির পাল্টা জিজ্ঞেস করে–তোমরালার মনত কী খায় বাপা? জল কি আরো ধাক্কা মারিবার ধরোছে? না, ছাড়ি দিছে?

এ কথার জবাবে গয়ানাথ তিস্তার স্রোতের দিকে আরো নিবিষ্ট তাকায়। এখন তিস্তার জল আর আকাশের মেঘ একই রকম ঘোলাটে। তাতে তিস্তার জলের আলাদা গতি, বোঝা যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু গয়ানাথ আর আসিন্দির সেই রাত বারটা থেকে দেখে যাচ্ছে। এতক্ষণ ধরে দেখতে-দেখতে তারা তিস্তার জল চোখ দিয়ে মাপার কতকগুলি পদ্ধতি তৈরি করে নিতে পেরেছে। অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে থেকে তারা এখন বুঝতে পারছে, কোন একটা জায়গায় স্রোতটা মোটা হয়ে বয়ে মোড় নিয়ে এই পাড়ের দিকে চলে আসছে। সেই বাকটাতে এই মরা আলোও একটু চকচকায়। স্রোতের আবর্তে যখন বেশি জল ঢুকে পড়ে আর আরো বাক নেয় তখন সেখানে আলোটা আরো একটু বেশি চকচকায়।

তেমন একটু দেখেই গয়ানাথ ডাকে, হে-এ বাঘারু, দ্যাখত জল বাড়ি গেইছে কি না। বাঘারু তখন পাড় থেকে ঝপ করে নতুন সোঁতায় লাফিয়ে পড়ে। জল মাপবার জন্যে সেখানে বাঘারু একটা ডাল পুঁতে রেখেছে। জলের ভেতর ঝাঁপিয়ে পড়ার আওয়াজ উঠলে আসিন্দির একটু ঘুরে টর্চটা জ্বালায়। টর্চের আলোপথ জুড়ে দেয়ালির পোকার মত বৃষ্টির ছাট। বাতাসে সেই আলোময় বৃষ্টি তোলপাড় হয়–টর্চের ঐটুকু আলো জুড়েও। বাঘারু নিচু হয়ে দেখে তার আগের বারের দাগ জল ছাড়াল কি না? সে জন্যে জলের কিছু স্থিরতা ফিরে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়-জলের যে সামান্য তোলপাড় সে কি নতুন স্রোতের ঘায়ে নাকি বাঘারু লাফিয়ে পড়ায়? আসিন্দির একবার নিবিয়ে আবার আলো জ্বালে। বাঘারু সেই আলোর মধ্যে নিজের ঘাড়টা পেতে দিয়ে নিচু হয়ে দেখে বলে, নাই রো। তারপর দাঁড়িয়ে থাকে। আলো নিবে যায়। বাঘারু একটা অর্জুন গাছের শেকড় ধরে উঠে আসে।

গয়ানাথ আর আসিন্দির অপেক্ষা করে আছে এই অর্জুন গাছটা কখন পড়বে। কিন্তু অর্জুন গাছটার গোড়ার মাটি প্রায় অর্ধেক ক্ষয়ে গেলেও গাছটা সোজা হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে একবার গয়ানাথ বাঘারুকে দিয়ে গাছটা ঠেলিয়েও ছিল। বাঘারু জানে এখানে স্রোতটা যত জোরে লাগছে তাতে অর্জুন গাছটা কোনোদিনই হয়ত পড়বে না। ওর শেকড় ওদিকে অনেকখানি ছড়িয়ে আছে। এখানে স্রোতের টানের জোর এত কিছু নয় যে সেই শেকড় খেয়ে নিতে পারে। বরং উল্টনো এই অর্জুন গাছটার জন্যেই হয়ত স্রোতটা এখানে ঠেকে থাকবে, বা, ডাইনে বেঁকবে নরম মাটি খেয়ে।

আসিন্দির বলে ওঠে, আর দেরি করিবার কাম নাই, ভাসি দেন, বাপই, ভাসি দেন। গয়ানাথ আবার সেই জলের বাকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেও বলে ওঠে, তা হয় ত দে কেনে, ভাসি দে, বাঘারুক বল, কুড়ালিয়াখান নিয়া আয়।

আসিন্দির, বাঘারুকে ডাকে না। ঘুরে, টর্চটা আর-একবার জ্বালিয়ে বাঘারুর দিকে যায়। তার পরনে। লুঙি, পায়ে গামবুট। একটু গিয়েই তার চোখে কেমন ধাঁধা লাগে। কিন্তু চোখের সেই ধাঁধা দূর করতে টর্চ না জ্বেলে সে গাছ-মোচড়ানো বাতাসে অন্ধকারে ডেকে ওঠে, হে-এ বাঘারু, খানিকটা চমকে ডেকে ওঠার মত। বাঘারু আসিন্দিরের ঘাড়ের ওপর শ্বাস ফেলার ঘনিষ্ঠতায় কথা বলে ওঠে, কন কেনে। তখন আসিন্দির টর্চ জ্বালায়। টর্চ জ্বালিয়ে বাঘারুকে আপাদমস্তক একবার আলোকিত করে। সেই প্রক্রিয়ায় বাতাসে গাছগাছড়ার পাক খেয়ে যাওয়া ও ভেজা জঙ্গলও চকিতে দেখা যায়। আসিন্দির তিস্তার দিকে টর্চ মেরে তার শ্বশুরকেও দেখে নেয়। মাত্র এই কয়েক পা এসেই তার মনে হল হারিয়ে যাচ্ছে–হাতে একটা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ থাকতেও? বাঘারুকে নিশ্চিত ভাবে দেখে নিয়ে সে বলে, কুড়ালিগা নিয়া যা, বুড়া ডাকিছে।

অন্ধকারে বাঘারু দু পা গিয়ে অভ্রান্ত হাত মেলে এক গাছের কাণ্ডে বিধিয়ে রাখা কুড়ালটি এক ঝটকায় তুলে নেয়। ঝপ করে ঝোপের মধ্যে কিছু পড়ে যায়। বাঘারু ভুলে গিয়েছিল কুড়ালের সঙ্গে নাইলনের দড়ির দুটো বাণ্ডিল ঝোলানো ছিল। সেটা ঝোপ থেকে তুলে সে গয়ানাথের দিকে যায়। গয়ানাথ নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে। আসিন্দির একটু ভেতরে। কুড়োল হাতে গয়ানাথের দিকে বাঘারুর হটাটা দেখে আসিন্দির একটু ভয় পেয়ে ওঠে–আবার। সে তার নাইলনের জামার বুক পকেট থেকে সিগারেট আর লাইটার বের করে।

গয়ানাথ টের পায় না বাঘারু পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। সে তখনো স্রোতের সেই বাকের দিকে কিয়ে। বাঘারু ডাকে দেউনিয়া।

অ্যাঁ? আসিছিস? নে, ভাসি দে, ভাসি দে।

বাঘারু নদীর পাড়ে দাঁড়ায়। তারপর, জেলেরা জাল ফেলার সময় জালটা মাথার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে জলে ফেলার আগের মুহূর্তে হাঁটুটা যেমন সামান্য ভেঙে দেয়, বাঘারু সেরকম ভঙ্গিতে নদীর দিকে তাকায়। নদীর বিস্তারের দিকে নয়, যে-নদীটা এখন বন্যাবাহিনী তিস্তা সেই নিশীথ জলরাশির দিকে নয়, বাঘারু তাকিয়ে থাকে ঠিক তার পায়ের তলার জলগুলোর দিকে, যেন ঐ জল, নেহাৎই বাঘারুর শোল-মাগুর জিয়নো ডোবার জল, তার সঙ্গে ঐ জলরাশির প্রবলতার যেন কোনো সম্পর্কই নেই, বা, থাকলেও তাতে বাঘারুর কিছু যায়-আসে না।

.

বাঘারুর বৃক্ষকর্তন

বাঘারু ডান দিকে ঘুরে পাড় দিয়ে জঙ্গলের আরো ভেতরে চলে যায়। সেখানে একটা মাঝারি সাইজের শালগাছ জলের মধ্যে পড়ে গেছে কিন্তু তার শেকড়টা এখনো মাটিতে। বাঘারু বা হাত দিয়ে কুড়ালটা তার নেংটির পেছনে খুঁজে নেয় কুড়ালের কাঠটা তার মেরুদণ্ডে বাঁজের সঙ্গে মিশে যায় আর কুড়ালটা একটু আলগা হয়ে থাকে। নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলটার মাঝখানের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে সে বাণ্ডিলটাকে বা কাঁধে তুলে নেয়; কাঁধে পুরোটা ওঠে না, বাহুতে ঝুলে থাকে। তারপর সে শালগাছটার উৎপাটিত শেকড়টা ধরে টেনে একবার আন্দাজ নিয়ে গাছটার কাণ্ডে পা দেয়–সেই কাণ্ডের নীচেই তিস্তার জল। বাঘারু ব-পাটা কাণ্ডের ওপর দেয় কিন্তু ডান পা-টা মাটি থেকে তুলতে গিয়ে বোঝে শরীরের পুরো ওজনটা এক ধাক্কায় সে বাঁ-পায়ের ওপর নাও তুলতে পারে। সে বা-পাটা নামিয়ে নেয়। শেকড়টা ছেড়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। এবার সে ঘুরে গাছটার উল্টো দিকে যায়। বা হাতে তাকে ঐ একই শেকড় ধরতে হয়। এবার ডান পা-টা কাণ্ডের ওপর তুলতেই বাঘারু বুঝে ফেলে নদীর ভেতর পড়ে থাকা গাছটির অবস্থান ও তার লাফিয়ে উঠে ডালপালার কাছে চলে যাওয়ার মধ্যে একটা সঙ্গতি এসে গেল। এটা প্রথমে বুঝে তারপর যে বাঘারু ডান পায়ের ওপর শরীরের ভর দিয়ে নদীর ভেতর সঁকোর মত ঐ গাছটাতে ওঠে, তা নয়! সে বা হাতের মুঠোতে শেকড় ধরে ডান পা-টা কাণ্ডটির ওপর নিয়ে একবার মাত্র পায়ে একটা ঝোঁক দিয়েছে, তারপরেই গাছটা বেয়ে উঠেই সে ডান হাতে তলার ডালটা ধরে ফেলে, শেকড় থেকে বা-মুঠোটা খুলে শূন্যের ওপর দিয়ে হাতটাকে নিয়ে এসে তলার আরো একটা ডাল ধরে ফেলে। ঐ কয়েকটি সেকেণ্ডে বাঘারু জলের ওপর দিয়েই যেনে হেঁটে গেল চিলের ডানার মত তার দুই হাত ছড়িয়ে দিয়ে। সেই তলার ডালদুটোর কাছে পৌঁছেই বাঘারু দু দিকে দু পা দিয়ে গাছটার মধ্যে বসে পড়ে। নাইলনের বাণ্ডিল দুটো বেঁধে একটা বাণ্ডিল করা আছে। সে বাণ্ডিলটা বের করে না, কিন্তু তার মাথাটা যেখানে গেঁজা ছিল সেখানে একটা ঝটকা দিয়ে মাথাটা বের করে এনে গাছটার তলার ঐ ডাল দুটোর ফেঁকড়ির ভেতর দিয়ে দড়িটা চালিয়ে দেয়। বাঘারু কাণ্ডটাকে পেঁচিয়ে দু দিকের দুই ডালের ফেঁকড়ির ভেতর দিয়ে ৪-এর মত এক গিট দিয়ে ফেলে। দড়িটা কাটবার জন্যে বা হাতটা ঘুরিয়ে কুড়োলটায় হাত দিয়েও সে হাত সরিয়ে আনে। তারপর তার শরীরটাকে লম্বা করে সে গাছটার ডালপালার আরো ভেতরে মাথাটা নিয়ে যায়। পাতার ভেতর দু-হাতের দশটা আঙুল চালিয়ে আর-একটা ডাল খুঁজে বের করে কিন্তু সেটাতেও গিট দিতে গিয়ে দেখে সে ত মাথাটাকে আগের গিঠেই বেঁধে দিয়েছে। বাঘারু তখন বা বাহু থেকে বাণ্ডিলটাকে গড়িয়ে হাতের আঙুলে আনবার জন্যে ওখানে শুয়ে-শুয়ে বা হাতটা আস্তে-আস্তে ঝোলায়, কব্জিটা বেঁকিয়ে রেখে, যাতে বাণ্ডিলটা ঝপ করে জলে পড়ে না যায়। কব্জির কাছে বাণ্ডিলটা এসে গেলে বাঘারু হাতটাকে নাচিয়ে বাণ্ডিলটাকে আঙুলে নিয়ে আসে, এইবার বাণ্ডিলটাকে গাছটার তলা দিয়ে হাতে চালান করে আবার ওপর দিয়ে বা হাতে নিয়ে আসে। পেঁচানো হয়ে গেছে, এবার গিট দিতে হবে। কিন্তু পুরো বাণ্ডিল দিয়ে ত আর গিট দেয়া যাবে না। বাঘারুর ডান হাতটা পিঠের দিকে বেঁকিয়ে কুড়োলটা খোলে। দড়িটা কাণ্ডের ওপর তার চোখের ঠিক নীচে। সে কুড়োলেরই পেছনটা ধরে খুচ করে একটা ঘা দিতেই দড়িটা কেটে যায়–এখন তার ডান হাতে কুড়োল, হাতে বাণ্ডিল। সে আগে কুড়োলটা পিঠে গেজে, ডানহাতে বাণ্ডিলদড়ির আলগা মাথাটাকে আর গিটের আলগা মাথাটাকে ধরে রেখে বাণ্ডিলটাকে বা হাতের আঙুল থেকে কনুইয়ের দিকে নিয়ে যায়। তারপর দশ আঙুলে গিঠটা দেয়। গাছে পিঁপড়ে ছিল। গিঠ দেয়ার সময় পিঁপড়েগুলো তাকে এত কামড়ায় যে গিঠ দেয়া হয়ে গেলে তাকে আগে হাত দুটো ঝেড়ে তারপর সোজা হতে হয়। পাড়ে ফিরে আসার জন্যে বাঘারু দু দিকের ডাল ধরে দাঁড়ায় আর তারপর একটা পা এগিয়ে দিয়ে মাটিতে লেগে থাকা শেকড়টার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার সঙ্গে-সঙ্গে নাইলনের দড়িটা গাছের মাথা থেকে পাড় পর্যন্ত দোলে। সেটাকে আরো একটু দুলিয়ে বাঘারু ফরেস্টের আর-একটু ভেতরে ঢুকে যায়। সেখানে একটা গাছের কাণ্ডে কয়েকটা প্যাঁচ দিয়ে বাণ্ডিলটাকে গাছটার গোড়ায় ফেলে রেখে ডান হাতে পিঠ থেকে কুড়োলটা খুলে নিয়ে জলে পড়া শালগাছটার কাছে এসে নিচু হয়ে উৎপাটিত শেকড়ের যে-অবশিষ্ট অংশ তখনো গাছটাকে আটকে রেখেছিল, সেটুকুর ওপর ঝুঁকে পড়ে। বাঘারু কিছু দেখতে পায় না। সে ডানহাত দিয়ে আন্দাজ নিতে চেষ্টা করে। কিন্তু আন্দাজও কিছু পায় না। তখন সোজা দাঁড়িয়ে কুড়োলটা মাথার ওপর তুলে সেই শেকড়টার ওপর নামায়। কোপটা পড়তেই বাঘারু বোঝে ঠিক জায়গায় পড়েছে। তার পরের কোপগুলো সেই নিশ্চয়তাতেই নেমে আসতে থাকে। গাছটার ভেতর থেকে একটা আওয়াজ একটু-একটু করে উঠে সারা গাছেই ছড়িয়ে যায়। তারপর গাছের মাথা থেকে জলের আওয়াজটা বদলে যায়। বাঘারু বোঝে গাছটা আরো ঝুলে গেছে। আরো দু কোপ দিতেই গাছটা একটা সংক্ষিপ্ত তীব্র আওয়াজ তুলে জলের ভেতর পড়ে যেতে থাকে। জলের আওয়াজটা হঠাৎ বেড়ে উঠে আবার কমে যায়। ঝুপঝুপ করে কিছু মাটি পড়ার শব্দ ওঠে, গাছটার শেকড়টা তারও পরে নাইলনের দড়িটাকে টানটান করে তিস্তার জলে ভেসে ওঠে। বাঘারু তাড়াতাড়ি কুড়োলটা পিঠে খুঁজে, সেই গাছের গোড়ায় গিয়ে দড়ি ধরে টানতেই বোঝে গাছটাকে স্রোত টানছে। সে তাড়াতাড়ি বাণ্ডিলটা তুলে নিয়ে প্যাঁচটা একে একে খোলে। প্যাঁচ খোলার আগেই যেন ভেসে যাচ্ছে–স্রোতের এত টান। শেষ প্যাঁচটা খোলে না বাঘারু–তা হলে তাকেই জলে টেনে নিতে পারে। সে একটা প্যাঁচ গাছের সঙ্গে রেখে একটু-একটু করে দড়ি ছাড়তে থাকে। বেশ খানিকটা ছাড়ার পর বাঘারু বোঝে সে জলের টান সামলাতে পারবে। তখন গাছ থেকে শেষ প্যাঁচটা খুলে সে স্রোতে ভাসা গাছের সঙ্গে সমান বেগে দৌড়ে গয়ানাথ আসিন্দির যেখানে আছে সেদিকে ছোটে। কিন্তু দু পা ছুটেই আবার একটা গাছের সঙ্গে দড়িটাকে লাগিয়ে দেয়। একটু অপেক্ষা করে আবার দু পা ছোটে। এই প্রথম গাছটাকে ভাসানোর আগে তাকে একটু বুঝে নিতে হয়–বাতাসের বেগ, স্রোতের। ধার আর তার নিজের জোর। তাকে আরো তিনটে গাছ এরকম করে ভাসানোর জন্যে বেঁধে এনে, তারপর চারটেকে একসঙ্গে ভাসিয়ে দিতে হবে।

এখানে, এই ওপরে, ফরেস্টের ভেতর, বাতাস আর বৃষ্টির ধরনটা আলাদা। নদীর ওপর দিয়ে বৃষ্টি আর বাতাস এই আবছা আলোতে নদীর স্রোতের মত বেগে স্রোতেরই বিপরীতে পাহাড়ের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়তে পারছে না। কিন্তু সেই বাতাসই আবার হু হু করে ফরেস্টের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। এই নিশুত রাতে, তারাহীন, বা বলা যায় আকাশহীন রাতে, হঠাৎ বাধভাঙা বন্যার জলের মত বাতাস নদীর ভেতর থেকে ফরেস্টের ভেতর ঢুকে আর বেরতে পারছে না। গাছের পাতায়-পাতায় আকাশটা এত ঢাকা যে বাতাস আকাশে বেরিয়ে যেতে পারে না। গাছের নীচে মাটির ওপরে এত বেশি ঘাস আর জঙ্গল যে বাতাস সেখানে ঢুকে হেঁটেও বেরিয়ে যেতে পারে না। ফলে, নদীর বুক থেকে হু হু ঢুকে কাণ্ড বেয়ে, ডালপালা বেয়ে, গাছের সংলগ্ন অন্যগাছের ডালপালা দিয়ে ফরেস্টময় স্রোতের বেগে ছড়িয়ে অপর কাণ্ড বেয়েই ছুটে নেমে আসে। মাটির ওপরের জঙ্গলগুলির ভেতর, লুকনো একপাল পশুর মত সে বাতাস ছুটে গিয়ে ঢোকে কিন্তু বেরিয়ে আসতে গিয়ে সাত পথে হারিয়ে যায়। আর সেই বাতাসের বেষ্টনীতে আপাদমস্তক ফরেস্টটা মুচড়ে-মুচড়ে ওঠে।

.

গয়ানাথ মাটি-গাছ-জলের স্বরে কথা বলে ওঠে

গয়ানাথ বলে, হে-এ আসিন্দির, দেখ ত কনেক, অর্জুন গাছটা খাইছে কি খায় নাই?

আসিন্দির টর্চ জ্বালে আর বলে, ঐ অর্জুন গাছটোর তানে তোমাক শালগাছ গিলা ছাড়িবার নাগিবে, বলে সে টর্চটা নিবিয়ে দেয়। আবার দু জনে চুপ করে থাকে। এখন দু-জনই বসে আছে–একই গাছের গুঁড়ির ওপর। গয়ানাথ তিস্তার দিকে মুখ করে, আসিন্দির ফরেস্টের ভেতরের দিকে মুখ করে। ফরেস্টের সেই ভেতর থেকে আওয়াজ আসছে–বাঘারু শেষ গাছটাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে জলে ভাসিয়ে এই বাকি যে-তিনটি গাছ গয়ানাথের সামনের পাড়ের নীচে তিস্তায় রাখা আছে, সেগুলোর সঙ্গে আঁটি বাধার জন্যে টেনে আনবে। অত বড়-বড় গাছের ডালপালা জলের ভেতর থেকে পাড়ের ওপর উঠে এসেছে-একেবারে গয়ানাথের পা পর্যন্তই প্রায়। আবছা আলোয় সেই ডালপালাগুলো কিছুটা ছায়া-ছায়া বলেই অনেক বড় দেখাচ্ছে। এখান থেকে গয়ানাথ তিস্তার ভেতরে জলের, যে উজ্জ্বলতা দেখে জলের তোড় আন্দাজ করছিল–সেই জায়গাটি আর দেখা যাচ্ছে না। তিন-তিনটি গাছের ডালপালা তিস্তাকে প্রায় সম্পূর্ণ আড়াল করে রেখেছে। তিস্তা আড়ালে পড়ার পর তিস্তার আওয়াজটা এখন গয়ানাথ আর আসিন্দিরের কানে আসছে। গুমগুম আওয়াজ তুলে তিস্তার জল বয়ে যাচ্ছে–আওয়াজেই যেন বোঝা যায় পেছনে আরো নদী-নদী জল এমন চণ্ড বেগে এই জলটাকে ভাটিতে ঠেলছে। তিস্তার বন্যার সঙ্গে যাদের কিছু পরিচয় আছে তারাই জানে–তিস্তার জল যখন জলের মত ছলছল খলখল শব্দ না করে, বড়-বড় বোন্ডারের সঙ্গে বোন্ডারের ঘর্ষণের মত গুমগুম আওয়াজ তোলে তখন পাতাল থেকে তিস্তার জল উঠতে থাকে, সে জল সব ভাসিয়ে দেবে–গা-গঞ্জ, বাড়ি-টাড়ি সব। এই শেষ রাতে তিস্তার ভাঙনে ফরেস্টের পড়ে যাওয়া গাছ বেঁধেছেদে তিস্তায় ভাসিয়ে, কয়েকদিন পর জল নামলে, ভাটিতে যেখানে ঠেকে থাকবে সেখানে গিয়ে দখল নিয়ে স মিলের কাছে বেচে হাজার-হাজার টাকা লাভের ব্যবসায়ী নেমেছে জামাই-শ্বশুর। কিন্তু, এখন, গাছগুলো ভাসিয়ে দেয়ার ঠিক আগে, এই গাছের থেকেও এই তিস্তার বন্যা তাদের কাছে বেশি সত্য হয়ে উঠল হঠাৎ–যে বন্যা ফরেস্টের এমন-এমন আকাশছোঁয়া গাছকে তাদের পঞ্চাশ-আশি-একশ বছরের শেকড়সুদ্ধ উপড়ে দেয়, সেই বন্যা আসিন্দির আর গয়ানাথকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে চোখের পলক ফেলার আগেই। উৎপাটিত গাছের ডালপালার আড়াল থেকে তারা সেই সর্বনাশের আওয়াজ শোনে।

কিন্তু এ গাছগুলোতে গয়ানাথের এক ধরনের হকও ত আছে!

গাজোলডোবার কাছে তিস্তা আপলাদের পাড় ভাঙতে শুরু করে শনিবার সকাল থেকেই। এক সময় সেখানেই ফরেস্টের সঙ্গে গয়ানাথের পৈতৃক একখতিয়ানের জমি ছিল। শেষ সেটলমেন্টে সাব্যস্ত হয়ে গেছে–সেখানে গয়ানাথের আর-কোনো জমি ফরেস্টের সঙ্গে নেই, সব জমিই ফরেস্টের খতিয়ানভুক্ত করে দেয়া হয়েছে। গয়ানাথ সেই সেটলমেন্টের বিরুদ্ধে আপিল করে। সেটলমেন্টের সব আপিলেই রায় বহাল থাকে। তখন গয়ানাথ জলপাইগুড়ির কোর্টে সিবল মামলা ঠোকে ও ফৌজদারি কোর্টের কাছে দরখাস্ত করে যে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পূর্বাবস্থা বহাল থাকুক। আদালতও একটা সময় পর্যন্ত কার্যকর রাখার জন্যে এই আদেশ দেন। কিন্তু সেই সময় পার হয়ে যাওয়ার পর গয়ানাথ আবার দরখাস্ত করলে আদালত আর একটু বিশদভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখেন যে ওখানে পূর্বাবস্থা বহাল রাখলেও গয়ানাথ বা সরকারের কারো কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি হচ্ছে না। তা হলে আপনারা পূর্বাবস্থা বহাল রাখতে চান কেন–আদালতের এই প্রশ্নের জবাবে গয়ানাথের উকিল জানান যে তাদের ভয় ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট তা হলে এই জায়গায় সব গাছ কেটে নেবে। কথাটায় আইনি প্যাঁচ ছিল। যে-সম্পত্তির মালিকানা এখনো আদালতে সাব্যস্ত হয় নি সেই সম্পত্তির ভোগ্রদখল যদি অপরপক্ষ করে বসে তা হলে বাদীর সমূহ আর্থিক ক্ষতি। বিশেষত, যে-জমির মালিকানা নিয়ে মামলা, সে-জমির প্রধান আর্থিক সম্পদ ফরেস্টের এই গাছ। আদালত রঙ্গরসিকতা করে গয়ানাথের উকিলবাবুকে বলেও ছিলেন–আরে ওটুকু না-হয় গয়ানাথবাবু সরকারকে খয়রাৎ করে দিন। আদালতের সম্মান রাখার জন্যে উকিলবাবুও গয়ানাথবাবুকে কানে কানে কথাটা জানান। গয়ানাথবাবুর কথামত উকিলবাবু আদালতকে জবাবে জানান যে স্যার যদি হুকুম দেন তা হলে গয়ানাথবাবু তার নিজ খতিয়ানের যে-কোনো দাগ থেকে মামলাধীন জমির সমপরিমাণ জমি সরকারকে খয়রাৎ করতে রাজি আছেন কিন্তু এখানে ত সম্পত্তির মালিকানার মামলা, সেই মালিকানা ঠিক না হলে গয়ানাথবাবু খয়রাৎকরার কে, তা হলে বরং স্যার রায় দিয়ে দিন যে ঐ জমিতে গয়ানাথেরও অংশ আছে, তার পরে গয়ানাথবাবু ওটা সরকারকে খয়রাৎ করে দেবেন। আইনের প্যাঁচ হাকিমের চাইতেও ভাল জানেন গয়ানাথবাবু উকিল–তিনি জেলার এক নম্বর উকিল। কিন্তু উকিলের চাইতেও ভাল জানে গয়ানাথবাবু নিজেই–তার বাপঠাকুর্দার কাছ থেকে জমির আইন তার শেখা। সরকার পক্ষের উকিল একবার অন্যমনস্ক ভাবে বলেছিলেন, স্যার, এখানে এ-অর্ডার দিলে তিস্তা ব্যারেজ তৈরি করার অসুবিধে হবে। আদালত একটু খুশি হয়েই বলেন, তা হলে তিস্তা ব্যারেজের প্ল্যানটা দেখান আর ওরা এই জমির এলাইনমেন্টে কী করবে সেটা বলুন। কিন্তু সরকারি উকিলের কাছে সে-সব কিছুই ছিল না। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে আদালতকে জানান–স্যার ঠিক আছে, এবারও অর্ডার যদি দিতে চান দিন, আমরা পরের ডেটে তিস্তা ব্যারেজের মাস্টার প্ল্যান ও এই জমির ব্যাপারে ইনজিনিয়ারদের রিপোর্ট আদালতে পেশ করব। সরকারি উকিলের কথাতে, পরে, গয়ানাথ হাতে চাঁদ পেয়ে গিয়েছিল। যে-তারিখেই এই দরখাস্ত ওঠে, গয়ানাথের উকিলবাবু বলেন যে স্যার সরকারপক্ষ তাদের কথামত কাজগপত্র জমা দেন নি, সুতরাং পূর্বাবস্থা বহাল রাখার আদেশ বহাল থাকুক। সরকারি উকিলের হাতে আরো জরুরি মামলা। এখন এই এক চিলতে জমির জন্যে কে মাস্টার প্ল্যান আর ইনজিনিয়ারদের রিপোর্ট জোগাড় করবে? ফলে সিবিল কোর্টে জমির মালিকানার মামলা চলতে থাকে আর ঐ জমির ব্যাপারে পূর্বাবস্থাও বহাল থাকে।

সোম-মঙ্গলবার থেকে ক্রান্তিহাট-গাজোলডোবা-আপলাদের আকাশও ভারী হয়ে নীচে নেমে আসে; বাতাস আর বৃষ্টি বইতে থাকে। কিন্তু ভাটির বৃষ্টি আর বাতাসের চাইতে ওপরের বৃষ্টি আর বাতাসের প্রকৃতি আলাদা। ভাটিতে বাতাস আকাশ থেকে বা আকাশের সীমান্ত থেকে, অবলম্বনহীন ছুটে আসে। আর ওপরে, এই ফরেস্টের কাছে বাতাসটা মাটির ভেতর থেকে উঠে আসে। খ্যাপা হাতির ত পাল হয় না। তা হলে বলা যেত–এ বাতাস খ্যাপা হাতির পালের মতন।

এরকম বাতাস আর বৃষ্টি থাকলে তিস্তার জল বাড়বেই। কিন্তু কতটা বাড়বে, কত দিন থাকবে তার ত আর-কোনো আন্দাজ পাওয়া যায় না। গয়ানাথ জোতদারের জমিজমা চারদিকে ছড়ানো। সে এই অংশ-জমির মালিকানা নিয়ে সিবিলকোর্টে মামলা করতে পারে, সে এই জমিতে পূর্বাবস্থা বহাল রাখার জন্যে ফৌজদারিও করতে পারে কিন্তু তাই বলে তার সব কাজকর্ম ফেলে সে ত আর এই জমিতে পাহারা দিতে পারে না।

পাহারা দিক আর না-দিক, শুক্রবার বিকেলেই গয়ানাথের কাছে খবর আসে আরো ওপরে তিস্তা ভাঙছে। তাতেও গয়ানাথের কিছু যায়-আসে না। কারণ, ওদিকে গয়ানাথের জমি নেই আর গয়ানাথের বাড়িঘর তিস্তা থেকে দূরে। কিন্তু শনিবার দুপুর নাগাদ গয়ানাথ যখন খবর পায় তিস্তার ভাঙন গাজোলডোবায় শুরু হয়েছে সে তার জামাইকে ডেকে বলে, ভটভটিখান বাহির কর, জমিখান দেখি আসি।

আসিন্দিরের পেছনে বসে গয়ানাথ তার পূর্বাবস্থাবহাল জমির হাল তিস্তা কোনোভাবে বদলে দিচ্ছে কি না দেখতে গিয়ে দেখল–ফরেস্টের অত ভেতরে, বাড়িটাড়ি থেকেঅত দূরে তিস্তা ফরেস্টের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। একটা জায়গায় জমি এতটাই খেয়ে ফেলেছে যে সেখানে আলাদা খাড়ি তৈরি হয়ে যাচ্ছে।

তখনই মাথায় বুদ্ধিটা খেলে গেল গয়ানাথ জোতদারের। তার চোখের সামনে একটা অন্তত বছর সাতেকের শালগাছ উপুড় হয়ে পড়ে আছে।

বাঘারুক নিগি আয়, আর টর্চখান, গয়ানাথ সেই স্বরে জলে কথা বলে ওঠে যে-স্বর এখানকার মাটি-গাছপালা-জলের সঙ্গে মেশানো। গয়ানাথ যদি এই হাওয়ার আর এই জলের আওয়াজ বোঝে, তা হলে এই জল আর হাওয়াও গয়ানাথের গলার আওয়াজ বোঝে। সেই তরুণ শালতরুর শেকড়ের ওর পা রেখে গয়ানাথ তার জামাইকে আদেশ দেয়–ভটভটিখান নিগি যা, টর্চ আনিবু, তোর বড় টর্চখান, বাঘারুক আনিবু, ভাল একখান কুড়ালিয়া আনিবু, নাইলনের দড়ি আনিবু এক বাণ্ডিল কি দুই বাণ্ডিল, মোটা নাইলন–তিস্তার দিকে তাকিয়ে গয়ানাথ তার ছোট-ছোট হাতের রোগা আঙুলগুলোর মাথা বুড়ো আঙুলের সঙ্গে মিলিয়ে কত মোটা সে চায় তার একটা আন্দাজ দেয়, দুই হাতের আঙুলগুলো দিয়েই আন্দাজ দেয়। আসিন্দির পেছন ফিরলে ঘাড় ঘুরিয়ে গয়ানাথ বলে দেয়–চিড়াগুড় আনিবু, সারা রাইত থাকা নাগিবা পারে।

আসিন্দির চলে যায় আর গয়ানাথ একা-একা সেই প্রবল বৃষ্টি আর বাতাসের মধ্যে তিস্তার ফ্লাড় আর ফরেস্টের গাছ পাহারা দেয়। সেই কিছুক্ষণ, কয়েক ঘন্টা তিস্তার জলের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে গয়ানাথ সেই লক্ষ-লক্ষ কিউসেক জলের তলার মাটিটাকেও যেন দেখে নেয়–দেখে নেয় সে মাটির ঢাল কোনদিকে কতটা, সে ঢালে বালি আর পাথর জমে আছে কিনা। সেই কিছুক্ষণ, কয়েকটি ঘন্টা ঐ বাতাসের দিকে তাকিয়ে-তাকিয়ে গয়ানাথ সেই বায়ুর বেগ মেপে নেয়–মেপে নেয় আকাশের যে-শূন্যতা পূর্ণ করতে এই বাতাস পুর থেকে ছুটে আসছে সে-শূন্যতা আরো কত গভীর; এই বায়ুনিহিত জলরাশির ভেতর আরো কত মেঘ আছে, মেঘে আরো কত জল আছে। তিস্তা, বাতাস, বৃষ্টি আর ফরেস্ট মিলিয়ে গয়ানাথ এই নদী-অববাহিকার আগামী কয়েকদিনের আবহাওয়ার কর্মসূচি ঠিক করে নেয়।

সেই ফ্লাড গয়ানাথের নির্দেশ অনেকটাই মানল–যে-জায়গাটায় ভাঙন ধরেছিল সেখান দিয়ে তিস্তার জল সত্যিই ঢুকল, সেই স্রোতের পথে আরো দুটো গাছ জলেও পড়ল।

আসিন্দির বাঘারুকে মোটর সাইকেলের পেছনে প্রায় বেঁধেই নিয়ে আসে–কারণ চালানোর সঙ্গে সঙ্গে বারবারই বাঘারু পড়ে যায়। বাঘারুর সঙ্গে কুড়োলও আসে, নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলও আসে। আরো একটা গাছ জলে পড়ে। কিন্তু অর্জুন গাছটা আর পড়ল না।

বাঘারু চতুর্থ গাছটিকে ভাসিয়ে আগের তিনটি গাছের কাছে নিয়ে আসে।

.

'বাঘারু হে, তুই ভাসি যা'

বাঘারু নদীর পাড়ে দাঁড়ায়, তার বা বাহুতে নাইলনের দড়ির একটা বাণ্ডিল, বা হাতের মুঠোতে ধরা দড়ি-গাছগুলোকে টেনে রেখেছে, ডানহাতে কুড়োলটা ঝুলছে। দড়িটা বাঘারুর মুঠোতে ছাড়াও যে-গুড়িটার ওপর গয়ানাথ আর আসিন্দির বসেছিল, সেই গুঁড়িটাতে জড়িয়ে রাখা। গয়ানাথ বললেই বাঘারু তার মুঠোর দড়িটা ছেড়ে দেবে, তখন স্রোতের টানে গাছগুলো কিছুটা দূরে চলে যাবে, তার পর গুঁড়িটা থেকে দড়িটা খুলে দিলেই ভেসে যাবে। বাঘারু দাঁড়িয়ে থাকে, গয়ানাথ কখন ছাড়ি দে বলে তার অপেক্ষায়।

গয়ানাথ আসিন্দিরকে জিজ্ঞাসা করে–কয়ড়া বাজিছেন হে?

আসিন্দির চকিতে ঘড়িটা দেখে বলে–চারিডা।

চারিডা? গয়ানাথ নিজের মনেই বলে ওঠে।

নদীর ওপরে যে-আবছা আলো ছিল সেটা হঠাৎ মুছে যেতে থাকে। অথবা অনেকক্ষণ ধরেই মুছে যাচ্ছিল, এতক্ষণে তাদের নজরে পড়ে। দশমী-একাদশীর চাঁদ হঠাৎ কাল মেঘে ছেয়ে গেলে যে-রকম হঠাৎ আধার ঘনায়, এখন আলোটা সেরকম হয়ে উঠল। বাঘারু আকাশে তাকায় নি। গয়ানাথ আর আসিন্দির তাকায়। তাকিয়ে বোঝে, চঁদ ডুবে গেছে, এখন অন্ধকার আরো বাড়তে থাকবে, যতক্ষণ না সূর্য ওঠে। কিন্তু সূর্য কখন উঠছে, কয়েক দিন ধরে সেটা বোঝাও যাচ্ছে না। না গেলেও আকাশটা আবার ঐরকম আবছা আলোয় ভরে যাবে, রাতের চাইতে আর-একটু কম আবছা।

এতক্ষণ ঐ আবছা আলোটা নদীর ওপরের ফাঁকটায় ছিল। সেই ফাঁক থেকে ফরেস্টে যেটুকু নদীর পাড়ে, সেই অংশটাতেও একটু ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু আর-একটু ভেতরে ঢুকতে সে-আলো আর পারে নি। এখন নদীর ওপর থেকে ঐ আবছা আলোটাও মুছে গিয়ে আঁধার ছড়িয়ে পড়ল। সেই ফাঁকা থেকে ফরেস্টের নদীর কিনারাতেও ঐ আধার ছড়াল। ফরেস্টের ভেতরটা হয়ে উঠল আরো অন্ধকার। নদীর ওপরে ঐ আঁধারটা ছড়িয়ে পড়তেই নদীর জলটাও যেন বদলে গেল। এতক্ষণ নদী আর আকাশ জুড়ে ছিল একটাই ঘোলা স্রোত। সেই ঘোলা স্রোত জলের ধাক্কায় মাঝেমধ্যে চলকাচ্ছিল, এই-যা। এখন আকাশের অন্ধকার নদীতেও ছায়া ফেলে। কিন্তু সেই অন্ধকারের ফলেই যেন ঘোলাটে ভাবটা কেটে গেল বলে একটা বিভ্রম হয়। নদীর জলটা হঠাৎ ঘোলাটে থেকে স্বচ্ছ হয়ে ওঠে যেন, যেন জলের মধ্যে জল রুপোলি চলকায়। আর নদীর অন্য পাড়টাও যেন দেখা যাচ্ছে। সবই বিভ্রম, বিভ্রম।

আসিন্দির অধৈর্য হয়ে ওঠে, এ্যালায়ও যদি না ছাড়েন, তা হালি আর আইত (রাত) জাগিবার কামটা কী আছিল?

হ্যাঁ, ছাড়ি দিম, ছাড়ি দিম, বলে গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে, বানার ক্যানং টান, কোনঠে গিয়া ঠেকিবে আন্দাজ করিবার নাগে।

এ্যালায় কী আন্দাজ করিবেন? কালি মোটর সাইকেল নিয়া দেখিবার নাগিবে। নাইলনের দড়ি দিয়া বান্ধা আছে, সগায় বুঝিবে কারো সম্পত্তি নাগে। আর ঠেকিলে ঠেকিবে ত চরত, মানষি সব ত চর ছাড়ি চলি গেইসে। ভয় না খান। কায়ও তোমার সম্পত্তি না নিবেবাপা। না-হয় ত গাছের গাওত লিখি দাও কেনে গয়ানাথ এণ্ড কোম্পানি।

গয়ানাথ আসিন্দিরের কথার কোনো জবাব দেয় না। সে তিস্তার ওপরের অন্ধকারটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এখন তিস্তার ফ্লাডটা আন্দাজ করার জন্যে ঐ অন্ধকার ছাড়া আর-কোনো অবলম্বন নেই। এখানে দাঁড়িয়ে বাতাস আর বৃষ্টির যে-ধাক্কা তারা খাচ্ছে সেটা গত নদশ ঘন্টায় শরীরেরই অংশ হয়ে গেছে। এ্যানং করি গাছগিলাক বান্ধা গেইল, এ্যালায় ভগোয়ানের নাম করি ছাড়ি দিম এই বানার মুখত? তারপর কোটত খুঁজি বেড়াম রে? গয়ানাথ বেশ জোরেই বলে, কিন্তু তার স্বরের মধ্যে স্বগতোক্তি ছিল। আসিন্দির হয়ত গয়ানাথের কথা সব শুনতেও পায় না–সে ত পেছনে দাঁড়িয়ে। শুনতে পারে বাঘারু, কারণ গয়ানাথ কথাগুলো বাঘারু আর তিস্তার দিকে তাকিয়েই বলে।

য্যালায় গিয়া গাছগিলা ঠেকিবে, স্যালায় হয়ত কায়ও নাই, তার পুব-পশ্চিম দিয়া বানা বহি যাছে, কায় আর দেখিবে?

এ গাছগুলো যেন ভেলা, সেই ভেলায় এ প্রলয়ে গয়ানাথ যেন তার প্রিয়তম কাউকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। কোথায় গিয়ে এ-ভেলা এই বন্যায় ঠেকবে? কী করে খুঁজে পাবে গয়ানাথ যদি এই বন্যা পুবপশ্চিম সব পাড়ই ভাসিয়ে নেয়? চার-চারটি গাছে কত-কত হাজার টাকা তা হলে লোকসান? যেন, এই হাজার-হাজার টাকা গয়ানাথ তার কাছার গিট থেকে খুলে বন্যায় ভাসাচ্ছে! এই চার-চারটি গাছ বন্যার এই রাত ধরে তার তেমনই আপন হয়ে গেছে, তেমনই আপন।

মউয়ামারির চরচরুয়াগিলান আছে, প্রেমগঞ্জের চর, ভাটিয়াগিলান আছে, বাকালির চরত মুসলমানের ঘর আছে, কশিয়াবাড়ি পার হইয়া এই বৃক্ষগিলান কি পাকিস্তান চলি যাবার ধরিবে?

বাতাসের আওয়াজের সঙ্গে গয়ানাথের হাহাকার মিশে যায়। এই গাছগুলো যেন তার ময়ূরপঙ্খী, এখন হারা উদ্দেশে সেই ময়ূরপঙ্খীটাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে, কোনো দিন আর দেখতে পাবে কি না কে। জানে। জলের তোড়ে গাছগুলোর ডালপাতা গয়ানাথকে ঘেঁয়। বাতাসের বেগে স্পর্শটা বোঝা যায় না।

গয়ানাথ এবার চিৎকার করে ওঠে, হে-এ বাঘারু, যেন বাঘারু তার সামনেই দাঁড়িয়ে নেই, নদীর অপর পারে তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। গয়ানাথ আবার চিৎকার করে ওঠে, বাঘারু হে-এ।

বাঘারু সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো জবাব দেয় না। দেউনিয়ার ডাকের জবাবে বাঘারু সামনে হাজির হতে পারে, জবাব দিতে ত পারে না। সে এখন ত সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। কিছুটা তিস্তার দিকে মুখ, কিছুটা গয়ানাথের দিকে মুখ। সে গয়ানাথের দিকে আরো একটু ঘোরে–তার হাতের মুঠোয় গাছবাধা দড়ি টানটান হয়ে ওঠে। স্রোতের ধাক্কা গাছগুলোকে পাড় থেকে ভাসিয়ে নিতে টানছে।

বাঘারু হে, তুই যা কেনে গাছগিলার সাথত। এ্যানং অমূল্য বৃক্ষ, কোটত না কোটত ভাসি যাবে, কার না কার ভোগত নাগিবে! তুইও ভাসি যা গাছগিলার সাথত, গাছগিলাক পাহারা দিয়া নিগি যা।

গয়ানাথের চিৎকারের পরবর্তী নীরবতা জুড়ে বাতাস হামলে পড়ে উৎপাটিত গাছগুলোর ডালপাতায় আর স্রোতের টান প্রায় অনিবারণীয় বেগে এসে লাগে বাঘারুর পাঞ্জায়, কব্জিতে, হাঁটুতে। কুড়োলটা মাটিতে ফেলে বাঘারু নরম মাটিতে গোড়ালি পুঁতে গাছগুলিকে টেনে রাখে।

বাঘারু হে, গাছত উঠ কেনে। যেইঠে ঠেকি যাবু, থাকিবু। হামরালা গাছগিলাক আর তক খুঁজি নিম।

গয়ানাথ সেই মুহূর্তে গাছে ওঠা কথাটির অর্থ আমূল বদলে দেয়। বাঘারু তার হাতের দড়িটা আস্তে-আস্তে ছাড়ে। তার ছাড় বোঝামাত্র স্রোত যেন একটানে গাছগুলোকে ভাসিয়ে নিতে চায়। বাঘারু খুব ধীরে ধীরে আর-একটু ছেড়ে, পেছিয়ে, সেই গাছের গুঁড়িটার কাছে যায়। সেখানে সে গুঁড়িটাতে হাটু ঠেকিয়ে দড়িটাকে আরো টেনে এনে তার শরীরের সমস্ত পেশির শক্তি সংহত করে অত্যন্ত ধীরে সেই শক্তি প্রয়োগ করে গুঁড়িটাতে প্যাঁচ দেয়–দুটো-তিনটে। গাছগুলো পাড়ের কাছাকাছি চলে আসা আবার। খালি হাতে বাঘারু সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তারপর দু পা এগিয়ে কুড়োলটা তুলে পিঠের ভঁজে ঢুকিয়ে নেংটিতে গেঁজে। এবার পাড়ে দাঁড়িয়ে-সঁড়িয়ে একটা শক্তমত ডাল সে খোঁজে। তার বাহু থেকে নাইলনের দড়ি শূন্যতায় ঘনঘন দোলে। বাঘারু একটা ডাল পেয়ে যায়। পাখি যেভাবে ডাল পা রাখে বাঘারু সেই ভাবে ডালটার ওপর হাত দুটো রেখে আকাশ-আঁকড়ানো বন্যার আকাশে ঝাঁপ দেয়। ভাসমান গাছের মাথা যেন অতিরিক্ত ঝড়ে কেঁপে ওঠে।

খুলি দে, খুলি দে, দড়িখান খুলি দে–গয়ানাথ চিৎকার করতে করতে গাছের গুঁড়িটার দিকে ছুটে যেতে গিয়ে ফিরে আসে। নদীর পাড়ে তখন নাইলনের দড়ি ঝুলছে–গাছের ভাসমান মাথার ভেতর থেকে যে-গুঁড়িটাতে দড়ি পেঁচানো ছিল, সেই গুঁড়ি পর্যন্ত। সেই দড়ির শেষেই বাঘারু কোনো ডালের ভেতর ঢুকে গেছে। তার উদ্দেশে গয়ানাথ জোতদার চিৎকার করে বলে, হে-এ বাঘারু, অর্জুন গাছখান পাছত ভাসি গেইলে বান্ধি ফেলিস। বাঘারু, অর্জুন গাছখান বান্ধি ফেলিস

আসিন্দির বোঝে নি, বাঘারুও গাছের সঙ্গে ভেসে যাবে। সে বাঘারুকে গুঁড়িটাতে আরো গোটা কতক প্যাঁচ দিয়ে দড়িটাকে আটকাতে দেখল, দড়ি দুলিয়ে পড়ে যেতে দেখল, পাড় থেকে নদীর ভেতরের গাছেও যেতে দেখল। তখন সে বুঝে থাকতেও পারে, নাও পারে। গয়ানাথ যখন চিৎকার করে তাকে গুঁড়িটা থেকে দড়িটা খুলে দিতে বলে তখন আসিন্দির টর্চ জ্বালিয়ে দেখে। হাতে টটটা নিয়ে, ডান হাতে দড়িটা ধরে টান দিতেই ওপরের প্যাঁচটা খুলে আসে। পরের প্যাঁচটা আর একটানে খোলে না, কিন্তু টর্চটাকে মাটিতে রেখে দু হাতে টানতেই খোলেস্রোতের টানে গাছগুলো পাড় থেকে সরে যায়। এই প্যাঁচদুটো বাঘারু শেষে দিয়েছিল। পাড়ছাড়া স্রোতে গাছগুলো যেন আন্দোলিত হয়, সেটা বাঘারু ডালে-ডালে জায়গা খুঁজছে বলেও হতে পারে, স্রোতের ধাক্কাতেও হতে পারে। শেষের প্যাঁচগুলো আসিন্দির দু হাতে টেনে খুলতে পারে না। গয়ানাথও ডান হাত লাগায়। কিন্তু গাছের বাকলের কোনো খুঁজে দড়িটা আটকে গেছে। দড়ি ছেড়ে দিয়ে গয়ানাথ বলে, আঠিয়াল মাটি আনি ঢুকা কেনে। গয়ানাথ এবার টর্চটা ধরে–আসিন্দির সেই অর্জুন গাছের গোড়াতে যায়। শিকড়ের তলাত হাত দে–গয়ানাথ টর্চ ধরে। দু হাতের মুঠো ভরে পাড় থেকে ভেজা মাটি তুলে আনতে আসিন্দিরের সিকো ঘড়ির নীল ডায়াল চমকায়। সেই মুঠোভরা মাটি ঐ দড়ির ওপর দিতেই গুঁড়ির গায়ে লেগে থাকা জলে গুঁড়িটা পিছল হয়ে যায়। কাদামাখা হাতে আসিন্দির দড়িটা ধরে হ্যাঁচকা একটা টান মারতেই দড়িটা অনেকখানি উঠে আসে। বুঝতে পেরে, আর-একটা হ্যাঁচকা টান দিতেই আসিন্দির মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, চোখের সামনের পাহাড়ের মত আড়াল মুহূর্তে সরে যায়, গুচ্ছগুলো ও বাঘারু চোখের পলক না-ফেলতেই দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে যায়, আর তিস্তার বন্যা আবার বাধাহীন পাড়ে ধাক্কা মারে।

.

অন্ধকার ও জলস্রোতের মাঝখানে

পাড় থেকে গাছের ডাল ধরে ঝুলে নদীর স্রোতে ভাসা চারটে গাছের ভেতর সেঁদিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাঘারু বুঝে ফেলে সে ডালটা সমেত জলে ডুবে যাচ্ছে। এমন আচমকা ডুবে গেলে তাড়াতাড়ি আরো ওপরের ডাল ধরে ভেসে ওঠার কথা বা তাড়াতাড়ি ডালপালা মাড়িয়ে পাড়ে উঠে আসার কথা। কিন্তু বাঘারু যখনই বোঝে সে যে-ডালটায় দাঁড়িয়ে, সেই ডালসমেতই ডুবছে, তখনই একেবারে দাঁড়িয়ে যায়, যেন মেপে নিতে যে আচমকা তার ওজনে এ ডালটা কতটা ডুবে যায়। বাঘারু নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে না কোনোভাবেই। তাড়াতাড়ি পাড়ে উঠে আসার উপায় যে তখনো আছে তা যেন তার জানাই নেই। বা, ওপরে উঠে যাবার মত ডাল যে নেই এটা তার বড় বেশি জানা আছে। এর একটা কারণ হতে পারে যে বাঘারু জানেই জলেভাসা গাছের ওপর চাপ দিলে তা জলে ডোবে। আর একটা কারণ এও হতে পারে যে বাঘারু আসলে জানেই না কী করে নিজেকে বাঁচাতে হয়। পশুপাখি নিজেকে যেমন বাঁচাতে জানে তেমনই স্বাভাবিক আত্মরক্ষার শক্তি, অথবা পশুপাখি যেমন টের পায় না তার মরণফাঁদ কোথায়, তেমনই স্বাভাবিক আত্মহত্যার শক্তি–এর ভেতর কোনো শক্তির ওপর ভর করে বাঘারু ডালসমেত জলে ডুবে যেতে থাকে তা আন্দাজ করেও বলা মুশকিল। তখন ত বাঘারুকে আর দেখা যাচ্ছিল না। দিনের বেলা হলেও দেখা কঠিন হতচার-চারটি গাছের ডালপালা এমনই ঘন আর ছড়ানো। আর, তখন ত কথাই নেই। নদীর ওপর নেমে আসা ছাইরঙামেঘের আড়ালে দেখতে না-পাওয়া সঁদও অস্তে চলে গিয়ে বাতাস আর বৃষ্টিকে আরো অন্ধকারময় করে তুলেছে। আসিন্দির আর গয়ানাথ মিলে গাছের গুঁড়ি থেকে প্যাঁচগুলো একটার পর একটা খুলে দিয়ে যখন ফিরে যায় তখন বাঘরু ঐ জলের তলায় ডুবে মরে থাকতেও পারত। তার মত সাঁতারুও, বন্যার তিস্তার চার-চারটে শক্ত করে বাধা গাছের ডালপালায় চাপা পড়লে বেরতে পারত না। তার চুল, বা তার শরীরে চামড়ার মত লেগে থাকা নেংটিটাও কোনো ডালে আটকে তাকে জলের তলে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলতে পারত।

কিন্তু বাঘারু দড়ির বাণ্ডিলটা তাড়াতাড়ি গলায় ঝুলিয়ে নিতে নিতে বোঝে, ডালটা খানিক ডুবে আর ডুবল না। তার হাটু পর্যন্ত জল। অর্থাৎ, ডালটা ওখানে পাড়ের মাটি পেয়েছে। সেই সুযোগে সে গাছের ডালের ওপর শুয়ে পড়ে ডালটার সঙ্গে মিশে যেতে চায়–মিশে গিয়ে পাদুটো আর হাতদুটো দিয়ে ডালটাকে জড়িয়ে ধরতে চায়, যেন সে এই গাছটারই একটা ডাল। তখন চকিতে বাঘারুর একবার মনে হয়েছিল নাইলনের দড়িটা দিয়ে ডালের সঙ্গে সে নিজেকে বেঁধে নিলে পারে! কিন্তু সে ত মাত্র মনে হওয়াই।

ইতিমধ্যে আসিন্দির একটা প্যাঁচ খুলে দিতেই ঐ চার-চারটি গাছ পাড় ছেড়ে স্রোতের ভেতরে ঢুকে পড়ে, মুহূর্তে সেই ডালটা আরো তলিয়ে যায়, বাঘারুর পিঠের ওপর দিয়ে তিস্তার স্রোত বয়ে চলে। এখন গাছগুলোর তলায় মাটি নেই–গাছগুলোর ভেতর দিয়ে জলস্রোত এত জোরে বইতে থাকে যেন সেই স্রোতের ধাক্কায় গাছগুলো আবার সোজা হয়েও যেতে পারে। বাঘারুর মনে হয়–এ-অবস্থাটাই অপরিবর্তিত থাকলে সে ভেসে যেতে পারবে কারণ তার পা থেকে কোমর পর্যন্ত যতটা জল বইছে, কোমর থেকে পিঠের ওপর দিয়ে ততটা জল বইছে না। তার মানে, এই ডালটার যেদিকে তার মাথা সেটা উঁচু ও মোটা। তার মানে, এই গাছটা যখন খাড়া ছিল তখন কাণ্ডের যে-জায়গাটা থেকে ডাল বেরিয়েছিল, সেই মোটা জায়গাটাতেই তার মাথা।

ততক্ষণে, আসিন্দির আর গয়ানাথ মিলে আরো একটা প্যাঁচ খুলে দিতেই আর-এক ধাক্কায় গাছগুলো নদীর আরো কিছুটা ভেতরে চলে যায়। সেই ধাক্কাতেই থোক, আর যেখানে গিয়ে গাছগুলো পড়ল সেখানকার স্রোতের জন্যেই তোক গাছটা ঘুরে যেতে থাকে। জলের নিয়মে এখন গাছটা ত জলের ভেতরে ঘুরতে থাকবে। বাঘারু ডালটার তলায় পড়ে যাবে। তখন বাঘারুর ওজনে ডালটা আরো তলিয়ে যাবে। সেই ডালটা যেভাবে ঘুরছিল, তার বিপরীত মুখে একটু ঘুরে বাঘারু ডান হাতটা মাথার দিকে বাড়িয়ে দেখে হাতে আন্দাজ মত কোনো মোটা ফেঁকড়ি পায় কি না। এ যেন এমন কোনো গাছে ওঠা যার ডালপাতাগুলো মাটিতে পোতা আর শেকড়টা আকাশে। বাঘারু উল্টোপথে সেই শেকড়টার দিকেই যেতে চায়। ভবিষ্যৎ না-ভেবেই যেতে চায়–কারণ ডালের চাইতে কাণ্ড মোটা। মোটা বলেই সেখানে সে বেশি আশ্রয় পেতে পারে। কিন্তু মোটা বলেই সেই কাণ্ডটা যদি জলের নিয়মে পাক খেতে শুরু করে তা হলে বাঘারু সেই কাণ্ডটাকে সামলাতে পারবে না। কিন্তু সামলাতে না পারলেও ত সে জলে ভেসে যেতে পারবে। এই ডালপালার ভেতর চাপা পড়বে না। বাঘারু এই ডালপালার চাপ থেকে বেরতে চাইছিল। সে এমন একটা জায়গা খুঁজছিল যেখান থেকে সে নদীটাকে দেখতে পাবে।

ডানহাতের আঙুলে সে ফেঁকড়িটা পেয়ে যায় কিন্তু সেটা আঁকড়ে ধরতে না-ধরতেই পাড় থেকে আরো একটা প্যাঁচ খোলা হয়, আর সেই ধাক্কায় বাঘারুর ডালটা প্রায় সম্পূর্ণ ঘুরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে বাঘারু ডালের ওপর পায়ের একটা ধাক্কা দিয়ে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে দু হাতে, সেই ফেঁকড়ির আন্দাজ যেখানে পেয়েছিল সেই জায়গাটা ধরে, ঝুলে পড়ে। সম্পূর্ণ ঝুলে যেতে সে পারে না কারণ অন্য ডালপালায় তার দু পা আটকে যায়। সেই সব ডালপালার ওপর শরীরের সবটুকু ভর দিয়ে বাঘারু ওপরের ডালটাতে উঠতে যায়। নদীর মধ্যে, স্রোতের মধ্যে মড়মড় আওয়াজে ডালপালা ভেঙে যায়, বাঘারু তার দুই হাত কনুই পর্যন্ত দু দিকের ডালে দিয়ে ঝুলতে থাকে।

এই অবস্থায় সে কিছু সময় পায়। গাছের গুঁড়িতে নাইলনের দড়ির বাধন আটকে গিয়েছিল। সেটাকে এঠেল মাটি দিয়ে পিচ্ছিল করে নিচ্ছিল আসিন্দির। সেই ফাঁকে নিজের দুই হাতের ওপর জোর দিয়ে বাঘারু নিজেকে ঐ গাছপালার ভেতর থেকে বন্যার আকাশের ভেতর উত্থিত করে, সেখানে সেই উত্থানের মধ্যেই গভীর একটা শ্বাস নেয়, আর সেই শাসের জোরেই যেন ওপরের সেই কাণ্ডটার দুদিকে নিজের দু পা ছড়িয়ে দিয়ে বসে পড়তে পারে। এমনভাবে বসে পড়তে হয় বাঘারুকে যে গাছের মাথাগুলো তার পেছনে পড়ে যায় আর তার সামনে থাকে শুধু নদী। তখন অন্ধকার এতই যে বাঘারু ঠাহর করতেও পারে না সবগুলো গাছের শিকড় কাণ্ডই একদিকে কি না। সেটা সে তখন ঠাহর করতে চায় না। সে দেখে, তার সামনে নদী এবং দিকটা খোলা। তেমন বিপদে সে ত এখান থেকে বায়ে, এবং সামনে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্রোতে ভেসে যেতে পারবে। গাছের ডালপাতার চাপ থেকে মুক্তি পেয়ে বাঘারু যেন আশ্বস্ত হয়।

কিন্তু তখনই পাড়ের শেষ প্যাঁচটাও খুলে যায় আর বাঘারুকে দু হাতে দু দিকের ডাল চেপে নিজেকে সামলাতে-সামলাতে বুঝতে হয় সে বাতাসের আর বৃষ্টির দেয়াল ভেদ করে সামনের আরো অন্ধকারের দিকে ছুটে যাচ্ছে।

.

জলস্রোতে বৃক্ষবাহন

প্রথম কয়েকটি মুহূর্ত বাঘারুর নিজেকে সামলাতেই যায়। যেন যে কোনো মুহূর্তে পড়ে যেতে পারে এমন একটা আশঙ্কায় তাকে হাতদুটো দিয়ে গাছের কাণ্ডটাকে শক্তির সর্বস্বসহ আঁকড়ে থাকতে হয়। সে নিজেও টের পায় না, তার পাদুটোও হাঁটুতে বেঁকে গিয়ে কাণ্ডের সঙ্গে মিশে আছে। নদীর ঐ স্রোতটাকে সে শরীর দিয়ে বুঝছিল বাতাসের বিপরীত বেগ শরীর দিয়ে ঠেকাতে-ঠেকাতে। অন্ধকার ত ছিলই, কিন্তু তার সঙ্গে ঐ বাতাস আর বৃষ্টিতে তার দৃষ্টিতে এতই আচ্ছন্নতা আসে যে প্রতিটি মুহূর্তে তার ভয় হয়, সামনে কোনো বিরাট পাথরের সঙ্গে সে ধাক্কা খাবে আর তার মাথাটা চুরমার হয়ে যাবে। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে এই ভয়টা তাকে এমনই পেয়ে বসে সে বা হাতটার কনুই তার চোখে চাপা দেয়, মাথাটা নিচু করে। কিন্তু তাতেও মনে হয় সামনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকলেও বুঝি বাঁচার কিছু সম্ভাবনা আছে। সে আবার বা হাতটা নামিয়ে নিজের বুকমুখ দিয়ে সামনের অন্ধকারটা ভাঙতে-ভাঙতে এগয়, তার নিজের ইচ্ছেয় নয়–নীচের স্রোতের টানে, সেই স্রোতের ওপর কোনোভাবেই বাঘারুর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। সে সেই মুহূর্তে চাইছিল কোনো এক কারণে এই স্রোতটা একবার একটু থামুক অথবা এই গাছের পাজা কোথাও ঠেকে যাক, অন্তত একটু সময়ের জন্যে ঠেকে যাক। বায়ে-ডাইনে, ওপরে নীচে-সামনে-কোনোদিকে বাঘারু কোনো পরিচিত চিহ্ন দেখতে পায় না, যেমন সে দেখতে অভ্যস্ত, আকাশের তারাদের দিকবদল, অথবা ধানের খেতে বা ফরেস্টে বাতাসের হঠাৎ মোড় নেয়া। রাত্রির নদীও ত বাঘারুর চেনাই, নদীর স্রোতও ত বাঘারুর চেনাই, এই অন্ধকার, এই বাতাস, এই বৃষ্টিও ত তার চেনাই কিন্তু সে ত এই সবকিছুকে এমন একসঙ্গে নদীর মাঝখান থেকে কখনো দেখে নি। এর আগে গয়ানাথের গাছ নিয়ে বাঘারুকে কখনো ভাসতে হয়নি।

বাঘারু একবার ডাইনে তাকায়–তার কাটা অন্য গাছগুলো দেখলে যেন কিছুটা ভরসা পাবে। যদিও সে বোঝে যে গাছগুলো একটু আগুপিছু করেও একই বেগে ভেসে চলেছে কিন্তু কোন গাছটা কোথায় তা টের পায় না। বরং যেন মনে হয় সে যে-গাছটায় শেকড়ের ওপর বসে সেটাই সবচেয়ে আগে ছুটছে।

দু দিকের দুই ডাল শক্ত করে ধরে বাঘারু তার পাদুটো ঝুলিয়ে দেয়। তার পায়ে জল লাগে না। কিন্তু ডান দিকে হেলে পাটা আর-একটু ঝোলাতেই স্রোতের টানে পা-টা যেন তার শরীর থেকে ছিঁড়ে যেতে চায়। বাঘারু পা-টা তুলে আনে।

কিন্তু জলের ছোঁয়ায় বাঘারু যেন একটু সাহস পেয়ে যায়। এতক্ষণ যে তার মনে হচ্ছিল সে আকাশপথে বৃষ্টি আর বাতাসের মধ্যে দিয়ে উড়ে যাচ্ছে সেই ভয়টা তার কেটে যায়। পায়ে যে জল আর স্রোতের ধাক্কা লাগল সেটা ত তার চেনা। কিন্তু জলটা এত নীচে কী করে গেল?

বাঘারু আবার দুই হাতের দু দিকের ডাল শক্ত করে ধরে পাদুটো সোজা নামিয়ে বুড়ো আঙুলটাও টানটান করে রাখে। কিন্তু জল ছুঁতে পারে না। হাতের ওপর ভর দিয়ে সে একটু গড়িয়ে নামে। কিন্তু কোনো পায়ের বুড়ো আঙুলেই জল পায় না। হাতের ভরে পেছনে আর-একটু গড়াতেই সে হড় করে গাছের একটা গর্তের মধ্যে পড়ে, আর সঙ্গে সঙ্গে তার দু পা জলের তোেড় সামনে টেনে নেয়। তার পায়ের পাতা পুরোটাই জলে। গর্তের মধ্যে পড়ে সে খানিকটা সেঁটে গিয়েছিল। তাতে হাতের ওপর ভরসা না রেখেও সে যেন বসতে পারে। ঐ ভাবে সেঁটে গিয়ে বাঘারু গাছটাকে চিনতে চায়। এটা সেই বড় খয়ের গাছটাই হবে। মাটি থেকে সোজা খানিকটা উঠে বায়ে বেঁকে আরো খানিকটা যাওয়ার পর ডালপালা বেরিয়েছে। গাছটা খুব বড়। আর, এখন ঐ বাকের ওপরের দিকটা জলের ওপরে আছে। অর্থাৎ বাকটা আকাশের দিকে। এতক্ষণ বাঘারু ছিল সেই বাকেরও ওপরে। তাই পায়ে জল পাচ্ছিল না। এখন সে গড়িয়ে নেমে গেছে ঠিক সেই বাকের খাজটাতে! তাই আটকে গেছে। কিন্তু জলের তোড়ে এখন যদি গাছটা ঘুরে যায় তাহলে বাঘারু জলের তলায় চলে যাবে। তেমন হলে, তার আত্মরক্ষার উপায় কী হবে সেটা স্থির করতেই বাঘারু হাত দিয়ে গাছের উল্টো দিকটা দেখেকের পিঠেই ত কুঁজ থাকার কথা, কুঁজটা আছে কি না। বাঘারু যেন পেয়ে যায়–সে যে-গর্তের ভেতর সেঁটে আছে তার ভেতর দিয়েই গাছটা যেন উল্টো দিকে ফুলে উঠেছে। বাঘারু আশ্বস্ত হয়। গাছটা উল্টে গেলে সে আলগোছে নিজেকে সোজা রাখবে-তারপর গড়ানো শেষ হলে আবার বসবে।

এখন গাছটার কাণ্ড ও শেকড় তার সামনে–নৌকোর গলুইয়ের মত খানিকটা। এখন যদি কোথাও ধাক্কা লাগে তা হলে বাঘারুর মাথাটা অন্তত ফাটবে না–বাঘারু সেটুকু আড়াল পেয়েছে। আর মাঝে-মাঝে পা-দুটো ঝুলিয়ে বাঘারু স্রোতটাকে যে আন্দাজ করতে পারছে এতেও তার ভেতরে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস চারিত হয়ে যায়। পাড়ের বাধন সম্পূর্ণ উৎপাটিত হওয়ার পর এই অন্ধকারে বাতাসের বিপরীতে ঐ বেগে ভেসে যেতে-যেতে বাঘারু ভয় পেয়ে গিয়েছিল–এমনই ভয়, যাতে সে নিজেকে সামলাতে পারছিল না। কিন্তু এখন এই একটু তলায় নেমে এসে, এই একটা গর্তে সেঁটে গিয়ে, পা দিয়ে জল পেয়ে, গাছটাকে হাতিয়ে-হাতিয়ে চিনতে পেরে ও গাছটা উল্টে গেলে সে কী করবে তা পর্যন্ত ঠিক করে ফেলতে পেরে বাঘারুর ভয়টা কেটে যায়। শুধু যে ভয়টাই কেটে যায় তা নয়, সে অবস্থাটা অনেকখানি ঠাহর করে ফেলতেও চায়। তিস্তার বন্যা না হয় গাছ চারটিকে মাটি থেকে টেনে জলে নামিয়েছে কিন্তু ভাসিয়ে ত আর নেয় নি। বাঘারু ত নিজে হাতে প্রত্যেকটা গাছের শেকড় কেটে, সেগুলোকে দড়িতে বেঁধে, এক জায়গায় এনে, জলে ভাসিয়েছে। সুতরাং বাঘারু ত জানে, এই গাছগুলোর এত ডালপালা, এত পাতা যে বাঘারু যদি হিশেব মত তার ভেতর সেঁদিয়ে যেতে পারত তা হলে এই বাতাস ও বৃষ্টি তার গায়ে লাগতই না–গয়ানাথের যে-ঘরে সে শোয় সেই ঘর থেকে তিস্তার ভেতরের এই উপড়নো গাছে আশ্রয় অনেক বেশি। কিন্তু এখন এই অন্ধকারে বাঘারু সেরকম একটা জায়গা খুঁজে বের করবে কেমন করে? এখন ত সবচেয়ে বেশি অন্ধকার। আরো অনেকক্ষণ এই অন্ধকার থাকবে–কতক্ষণ সে-হিশেব তার জানা নেই। কিন্তু সে জানে এই অন্ধকারটা দিয়েই রাত শেষ হয়। সূর্য উঠবার আগের আলোতেই এই অন্ধকারটা কাটতে শুরু করবে। গত কয়েকদিনের মধ্যে সূর্যের মুখ দেখা যায় নি। যেন, সারাটা দিনই সঁঝবেলা। কিন্তু মুখ দেখা না-গেলেও আলোটা ত থাকবেই। তাকালে ত কোনটা আকাশ, কোনটা নদী, কোনটা মেঘ, কোনটা জল, কোনটা গাছ, আর কোনটা পাড় তা চেনা যাবে। তখন ত বাঘারু তার নিজের হাতে কেটে ভাসিয়ে দেয়া এই গাছগুলোর ডালপালার ভেতরে কোথায় ঢোকা যায়, আর কোথায় ঢোকা যায় না, তার একটা হিশেব কষতে পারবে।

তার আগে বাঘারুর এখন অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকা।

.

দুই আঘাতের মাঝখানে

এরকমই সময় কেটে যায়।

কিন্তু সে সময় কতটা তার কোনো অনুমান বাঘারুর আসে না। সময়ের সঙ্গে ত বাঘারুর শরীর বাধা। বাতাসের ছোঁয়ায় সে বোঝে বেলা কত হল, ছায়ায় গাঢ়তায় সে টের পেয়ে যায় বেলা কত হেলল, শোয়ানো ঘাস দেখলে সে পায়ের স্পর্শে শেষ রাতেও আন্দাজ পায় সূর্য উঠতে আর দেরি কত, এমন-কি গয়ানাথের গোয়ালিয়া ঘরে বা বাইরের এগিনায় (আঙিনায়) গভীর ঘুমিয়ে থাকলেও তার শরীর তার অজ্ঞাতেই জেনে যায় রাত কতটা ফুরিয়েছে। কিন্তু এখন তেমন কোনো অনুমান বাঘারুর আসে না। কতক্ষণ আগে গাজোলডোবা থেকে গাছগুলোর সঙ্গে সে ভেসেছে তার আন্দাজ পাবে কী দিয়ে। পাড় ছাড়ার পর থেকে জলস্রোতে গাছগুলো য়ে-বেগে ভেসে যাচ্ছে তার কোথাও কোনো ছেদ নেই। নদীর এই খোলা আকাশের ভেতর দিয়ে যে-বেগে হাওয়া আর বৃষ্টি বয়ে আসছে তারও কোনো ছেদ নেই। তা হলে বাঘারু সময় মাপবে কী দিয়ে? একটু যদি আবছা আলোও থাকত তা হলে বাঘারু অন্তত চেষ্টা করতে পারত ডাইনে বায়ে তাকিয়ে দুই পাড়ের বা কোনো চরের ইশারা খুঁজতে। দেউনিয়া যখন গাছগুলোর সঙ্গে তাকে ভাসতেই বলল, আর-একটু আগে বলল না, কেন–মেঘের আড়ালে-আড়ালেও যতক্ষণ একটা চাঁদ ছিল। দেউনিয়া ঐ অর্জুন গাছের আশায়-আশায় বসে থাকল। এতই যদি তোমরালার অর্জুনগাছখানের শখ, হামাক বলিলেন না কেনে? যে-টাইমত মোক জোয়াইটা ভটভটিয়াত্ বান্ধি আনি ফেলাছে, ঐ অর্জুনগাছখান ত কাটি ফেলাবার পারছু।

বাঘারু একটু যেন হেসে ফেলতে পারে।

মোর দেউনিয়াখান অর্জুনগাছখান চাহিবার পারে, কিন্তু কাটিবার না দিবে। কাটিবার ত টাইম নাগিবে। কাটিবার ত আওয়াজ উঠিবে। স্যালায় কায় জানে কোটত কোন ফরেস্টের গার্ড আসি খাড়ি যাবে। স্যালায় অর্জুনগাছে কুড়ালিয়ার দাগ ত আর মুছি ফেলা না যায়। মোর দেউনিয়াখান সারা রাত বসি থাকি, কিন্তু কহিল্ না, বাঘারু হে কাটি ফেল, অর্জুনগাছখান কাটি ফেলা। এক অর্জুনগাছোখান মোর চাঁদখান ডুবি দিলা। এ্যালায় এই আন্ধারত মুই না জানো কতখন ভাসি যাছি, জানো না কতখন ভাসি যাম। চাদাডোবা আন্ধার ত বেশি টাইম থাকিবার কথা না হয়। মোর ত মনত খাছে কি সারা রাতি এই আন্ধার দিয়া ভাসিছু। বাঘারু খুক করে হাসে।

ভাসি যাছু, না, মোর ভটভটিখান চড়ি যাছু। বাঘারু আবারও খুক করে একটু হাসে। আসিন্দির জোয়াইয়ের ভটভটিখান ডাঙার উপর দিয়া যাছে, মোর ভটভটিয়াখান জলের উপর দিয়া যাছে। বাঘারু টাকরায় জিভ লাগিয়ে মোটর সাইকেলের মতন একটা আওয়াজ তুলতে চায়। আওয়াজের কথা ভেবে আবার একটু হাসে বটে, তবে আওয়াজটা তোলে না। জিভটা টাকরা থেকে নামিয়ে নেয়। কিন্তু দু দিকের ডালটা ধরে, যেন মোটর সাইকেলের হ্যান্ডেল।

একটু পরে সেরকম মনে হওগার খেলাটা শেষ হয়ে যায়। তখন বাঘারুর মনে হয়, তাকে তার দেউনিয়া যে বলদ বলে ডাকে সেটা কতটা সত্য। সে এই গর্তটা পেয়ে যেন বতুতে গেছে, হাতের ভেতর ডাল পেয়ে যেন আশ্রয় জুটে গেছে তার। কিন্তু সে এরকম ভটভটিয়া চালাবার মত করে ডালের ওপর বসে আছে কেন? এই গর্তটাতে সেঁটে থেকেই ত সে উল্টে যেতে পারে, পা দুটো ডাল বরাবর ছড়িয়ে দিতে পারে, মাথাটা ডালে হেলিয়ে দিতে পারে-তাতে তার এক রকমের শোয়াই ত হতে পারে। এমন-কি, সে চোখও বুজিতে পারে। তারপর যখন অন্ধকার কাটবে, কাটবে।

গর্তটার ভেতর বাঘারু এমনই হেঁটে গিয়েছিল যে নিজেকে ঘোরাতে তার অসুবিধে যেটুকু হয় সেটা এই কারণে, নিজে ঘুরতে গিয়ে গাছটাকে যেন দুলিয়ে না দেয়। এই স্রোতের মধ্যে গাছে যদি সে ঝাঁকি দিয়ে ফেলে তা হলে গাছটা ঘুরে যেতে পারে। তাতে, যেটুকু জায়গা গুছিয়ে নিতে পেরেছে বাঘারু, সেটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।

বাঘারু দুদিকের ডাল ছেড়ে এই ডালটার মাথাটা ধরে কোমরটাকে তোলে, তারপর পা দুটোকে আস্তে করে ডালের সঙ্গে লেপ্টে লম্বা করে দেয়। মাথার ওপর লম্বা করে দেয়া হাত আর ডালের সঙ্গে লম্বা করে দেয়া পা–এতেই তার এতটা আরাম হয় যে বাঘারু ভাবে কী দরকার আর চিত হওয়ার, বরং এরকম উপুড় হয়ে থাকা যেন তার অভ্যেস হয়ে গেছে, কী দরকার আবার একটা নতুন ভঙ্গিতে যাওয়ার? বরং এই ভঙ্গিতে থাকলে, দরকার হলেই সে সোজা হয়ে বসে পড়তে পারবে।

কিন্তু যে-গর্তটার জন্যে সে বসার একটা জায়গা পেয়েছিল, সেই গর্তটার জন্যেই সে অমন উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে পারে না। কোমরটা গর্তের ভেতরে ঢুকে যায়। বাঘারু তখন কোমরটা উঁচু করে ডালটার ওপর কাত হয়–বা দিকে। কাত হয়েও সে ডালের ওপর লম্বালম্বি থাকতে পারে। একটু থাকেও। তার এই চিত হওয়ায়, কাত হওয়ায় ডালটা বা গাছটা সামান্য একটু নড়লেও, তারপরই স্থির হয়ে যায়। বাঘারু এবার গর্তটার ভেতর তার পেছনটাকে চিত করে দেয় প্রথমে, একটু অপেক্ষা করে, তারপর জলস্রোতের তালে-তালে নিজেকে চিত করে ফেলে। তার পা দুটো ডালের সঙ্গে লম্বা করে ছড়ানো, এখন হাত দুটো দুদিকে ছড়িয়ে ডালের ওপর রাখা। যদি তেমন দরকার হয় তা হলে সে চট করে বসতে পারবে। কেমন করে পারবে সেটা বোঝার জন্যে পা দুটো দ্রুত গুটিয়ে আনে। হ্যাঁ, পারবে। আবার পা দুটো মেলে দেয়। আর তখন পিঠে গোজা কুড়োলটা পিঠে লাগে।

প্রথমে বাঘারু সেটাকে অগ্রাহ্য করতে চায়। কিন্তু স্রোতের দোলায় যখনই ডান দিকে হেলে তখনই কুড়োলের ধ্বরটা তার চামড়ায় লাগে। সে বোঝে, জোরে একটা ধাক্কা লাগলে কুড়োলটা মাংসের ভেতর সেঁদিয়ে যেতে পারে। সে ডান হাতটা বেঁকিয়ে পিঠের দিকে নিয়ে যায়; তারপর কুড়োলের লোহাটা ধরে সেটাকে তুলে নিয়ে আসে। এনে,দু হাতে কুড়োলটাকে চোখের সামনে মেলে ধরে। এত অন্ধকার দিয়ে ক্ষণ, নিজে ঘুরতে গিমনই হেঁটে গিয়েছিলরে। তারপর যৎ

যে কুড়োলের ধারটাও চমকায় না। লোহাটার ওপর হাত বোলায় বাঘারু। ভিজে গেছে। বাঁ হাতে কুড়োলটা ধরে ডান হাতের পাতা দিয়ে কুড়োলটা মোছে। তারপর শুয়ে-শুয়েই পা দুটো ফাঁক করে, শুয়ে-শুয়েই কুড়োলের কাঠটা ধরে, শুয়ে-শুয়েই কুড়োলটাকে বাতাস আর বৃষ্টির ঝাঁপটের মধ্যে তোলে আর নিজের দুই পায়ের মাঝখানে ডালটার ওপর নামিয়ে আনেকুড়োলটা গভীর গেঁথে যায়। বাঘারু পা দুটো আবার ডালের ওপর লম্বা করে দেয় মাঝখানে কুড়োলের লোহাটা বেষ্টন করে। হাত দুটো দু দিকের ডালে ছড়িয়ে রাখে। এইবার যেন সে একটু চোখ বুজতে পারে। বাঘারু চোখ বোজে।

যেন এতক্ষণ চোখ খোলা ছিল বলেই বাতাসের আর বৃষ্টির গর্জন সে শুনতে পাচ্ছিল না। চোখ বুজতেই তার শরীরের তলা থেকে জলের অন্তর্ঘাতী কল্লোল উঠে এসে তার শরীরের ওপরে হাওয়ার পরাক্রান্ত আক্রমণের সঙ্গে মিশে যায়। এই দুই আঘাতের মাঝখানে চোখ বুজে বাঘারু ভেসে থাকে। ভেসে থাকতে-থাকতে সেই দুই আওয়াজও তার শরীরের সঙ্গে মিশে যায়। সে আর-কোনো আওয়াজ। শুনতে পায় না।

এর পর, কতক্ষণ পর বোঝা যায় না, সে আওয়াজ পায় পাখির ডাকাডাকির–অন্ধকার কেটে যাচ্ছে, সে আওয়াজে বোঝা যায়।

.

জলস্রোতে নিদ্রাভঙ্গ

বাঘারু পাখির ডাক শুনে চোখ খোলে না। পাখির ডাকটা কোনো আওয়াজের মত করে তার কানে পৌঁছয় না। যেন অনেকক্ষণ ধরেই এক-আধবার আওয়াজটা হচ্ছে, তারই মধ্যে এক-আধবার সে শুনতে পাচ্ছে, এক-আধবার শুনতে পাচ্ছে না, যেমন রোজই হয়। তারপর, এক সময় সে শুনতেই পায় পাখি ডাকছে। মানে, ভোর হয়েছে। ভোর হওয়ার কথাটা মনে হতেই বাঘারু চোখ মেলতে চেয়েছিল বটে, কিন্তু মেলে নি। আর এই না মেলার সময়টুকুর ভেতরেই বাতাসের বিপরীত ঝাঁপট আর স্রোতের কল্লোলের উঠে আসা তার কানে বাজে। তা হলে কি সে একটু ঘুমিয়েও গিয়েছিল? কিন্তু চোখখোলা আর ডাল থেকে হাত সরিয়ে কুড়োলের হাতলটা ধরার মধ্যে কোনটা আগে ঘটে বোঝা যায় না। বাঘারু দেখে তার কিছুটা ওপরে গাছের পাতাভরা ডাল, সে-ডালে দু-একটা পাখি।

এতক্ষণ পর, বাঘারুর সচেতনতা পুরো ফিরে আসে। সে কুড়োলের হাতলে হাত দিয়ে মাথার ওপরের সেই ডালটার দিকে, বা ডালের পাতাগুলোর ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্ধকারটা কাটে নি কিন্তু এখনই শুরু হল সূর্য ওঠার আগের আলোর আভাস ছড়ানো। এখনো বাঘারু তার মাথার ওপরের পাতার রং দেখতে পাচ্ছে না, শুধু আকারটা দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু পাখি? তা হলে কি গাছটাছ নিয়ে সে কোথাও ঠেকে গেছে? কোনো পাড়ে কিংবা কোনো চরে? তার নীচে ত সে স্রোতের আওয়াজ পাচ্ছে। সে ত কোথাও ঠেকে গেলেও পাওয়া যেতে পারে। যে-ডালটায় সে শুয়ে আছে সেটাও ত দুলছে। তাও ত কোথাও ঠেকে গেলে দুলতে পারে। বাঘারু তার মাথার ওপরের ডালগুলোকে দেখে-দুলছে। সেও ত কোথাও ঠেকে গেলে বাতাসে দুলতে পারে। কিন্তু কোথাও ঠেকে না-গেলে পাখিগুলো ডেকে-ডেকে উঠছে কেন? নাকি এগুলো এই গাছেরই পাখি–গাছগুলোর সঙ্গেই ভেসে আসছে? নাকি এগুলো এই পাড়ের বা চরের পাখি–গাছের ডাল পেয়ে উড়ে এসে বসেছে?

বাঘারু যেন নিজের সঙ্গে একটা খেলাই পায়। তার ত এখন কিছু করার নেই। অন্ধকারটা কাটছে মানে, তার প্রায় আর-কোনো বিপদ থাকল না–এখন ত সে সব কিছু দেখতেই পাবে, ভাসমান গাছের কোথায় পা দিতে পারবে সেটা দেখেই বুঝবে। এখন ত সে দড়ি দিয়ে টেনে-টেনে গাছগুলোকে আরো কাছাকাছি এনে ফেলতে পারবে–প্রায় ভেলার মত। সে সারাটা রাত টেরই পেল না–তার মাথার ওপর এত পাতাওয়ালা একটা ডালের আচ্ছাদন ছিল? আর এখন সে বুঝতেই পারছে না সে কোথাও ঠেকে আছে, না ভেসে যাচ্ছে?

বাঘারু শুয়ে থেকেই তার পা দুটো দুদিক থেকে ঝুলিয়ে দেয়। জলের ছোঁয়া লাগে–স্রোত পা-টা টেনে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সে ত কোথাও ঠেকে গেলেও হতে পারে। পাখিগুলো আবার ডাকে, কেটু বেশি সমবেত ডেকে ওঠে–যেন তারা তাদের পরিচিত পরিবেশেই আছে। কিন্তু যত পরিচিতই হোক, এই গাছটা ত তাদের চেনা হতে পারে না। তা হলে সেই গাজোলডোবার ফরেস্ট থেকে এই খয়ের গাছ, শালগাছ আর বাঘারুর মত, তারাও, ভেসে আসছে রাতভর? বাঘারু দুদিকের ডালে সামান্য ভর দিয়ে উঠে বসে। দড়ির বান্ডিলটা তার বুকে দোলে। সে দেখে তার সামনের, নদীর পেছনের অন্ধকার থেকে তার এখনকার পেছনে নদীর সামনের দিকে, হু হু করে ছুটে যাচ্ছে। রাতের সেই অন্ধকার জুড়ে বাঘারু এ রকম বেগেই ছুটে এসেছে কিন্তু দেখতে পায় নি। এখন, আধার আবছা হয়ে যাওয়ায় সে স্রোতের সেই গতির দারুণ টান যেন প্রথম বোধ করে।

বোধ করতেই, বাঘারু সেই গতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে চায়। সে পেছন থেকে কোনো গতির সঙ্গে নিজেকে মানাতে পারে না–জিপগাড়ির পেছন থেকে ফরেস্টের ভেতর ঢুকতে যেমন তার দিকজ্ঞান নষ্ট হয়ে যায়, এখানেও স্রোতের বিপরীত দিকে মুখ করে সে স্রোতটাকে সামলাতে পারে না। সে কুড়োলটা তুলে পিঠে গোজে, দড়ির বাণ্ডিলটাকেও পিঠের দিকে ঠেলে দেয়, তারপর সেই গর্তটার ভেতর বসেই ঘুরে যায়–স্রোতের টানে নোঙরছেঁড়া কোনো নৌকোর মত গাছগুলো সোজা ভেসে যাচ্ছে। সামনে, বেশি দূর দেখা যাচ্ছে না কিন্তু জলের ওপরকার অন্ধকারটা আবছা হচ্ছে, যেন সেই আবছা অন্ধকারটা এই গাছগুলোর আঘাতেই দূর হচ্ছে। : বাঘারু দেখে কাল সে এই ডালটারই মাথাতে বহুক্ষণ ভয়ে এঁটে ছিল। এখন বোঝে ঐখানেই বিপদ ছিল সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি কোনো ডাল নেই–হাত পিছলে গেলে জলে ত পড়তই, এই গাছগুলোর নীচে চাপাও পড়ত। এই গাছগুলো যে-স্রোতের টানে ভাসছে, সেও সেই স্রোতের টানেই ভাসত, ফলে, গাছগুলোর তলা থেকে বেরতে পারত না। বাঘারু ঘাড় ঘুরিয়ে গাছের ডালপালাগুলো একবার দেখে যেন আশ্বস্ত হতে চায়, সে ঐ উঁচু ডাল থেকে জলে পড়ে গেলেও ডালপালা ধরে আবার জল থেকে মাথা তুলতে পারত! কাল রাতে সে একেবারে মরে যেতে পারত–এমন ধারণাটা তাড়াতে না পারলে যেন বাঘারুর এখনকার বেঁচে থাকা সম্পূর্ণ হবে না।

ততক্ষণে ঐ গাছগুলোর ডাল থেকে উড়ে আবার গাছের ডালে ফিরে বসা আর ডাকাডাকি করা পাখির সংখ্যা বেড়ে গেছে। এই পাখিগুলোর বাসাসমেতই গাছগুলো জলে পড়েছিল। এই পাখিগুলোর বাসা জলে ভাসে নি বা ভেজে নি। ফলে, অন্ধকারে অন্ধের মত তারা বাসা ছাড়ে নি। এখন স্রোতের টানে গাছগুলোর সঙ্গেই ভেসে যাচ্ছে।

বাঘারু একটু দাঁড়িয়ে দেখতে চায় বসে যা দেখছে তার চাইতে বেশি কিছু দেখা যায় কি না, আর, গাছগুলো কী ভাবে বাধা আছে, কোনো গাছ ত খসেও গিয়ে থাকতে পারে!

বাঘারু জানে, কোনো গাছের বাধন আলগা হয়ে গেলে সে বুঝতে পারতই– কারণ গাছগুলোকে ত খুব ভালভাবে বাধা যায় নি, একটা বাধন আলগা হলে সব বাধনই ঢিলে হয়ে যেতে পারত। সব বাধনের মূল ত তার গলায় দড়ির বাণ্ডিলে। যদি জলের ভেতর কোনো স্রোতের বিপরীত টানও থাকত তা হলে স্রোতের আড়াআড়িতে বাধন ঢিলে হয়ে যেতে পারত। এই এত জল এমন টানে একদিকে চলছে যে গাছগুলো ঘুরছে না পর্যন্ত। কিন্তু তবু বাঘারু একবার দাঁড়িয়ে দেখতে চায়।

যে-গর্তটার ভেতর সে বসে আছে সেখানে পা রেখে এই ডালটাতেই ঝুঁকে হাতের ভর দিয়ে খানিকটা দাঁড়াতে পারে বটে কিন্তু সেটা ঠিক খাড়া দাঁড়ানোত হবে না। এমন ভাবে খাড়া দাঁড়াতে চায় বাঘারু যাতে সবগুলো গাছ আলাদা-আলাদা করে চেনা যায়, দরকার হলে নতুন করে আবার গাছগুলোকে বাধা যায়। কিন্তু আসিন্দিরের ভটভটিয়ার মত করে ডালটার ওপর বসে থেকে একবার সামনের আবছা আঁধার আর একবার ঘাড় ঘুরিয়ে অন্যান্য গাছের দিকে তাকিয়ে বাঘারু বোঝে এখনো অন্ধকার ততটা কাটে নি যাতে সে দাঁড়ানোর জায়গা খুঁজতে পারে, বা যদিও পায়, সেখানে দাঁড়িয়ে সে গাছগুলোকে বা গাছের বাধনগুলোকে আলাদা করে দেখতে পারবে না। তার জন্যে এই আঁধার আরে কিছু কাটা দরকার। পাখিগুলো যেরকম বেশি-বেশি ডাকছে তাতে বোঝা যায়–আঁধারটা কাটছে।

.

বাঘারু ও পাখিদের জাগরণ

বাতাস আর বৃষ্টি সেই একইরকমভাবে নদীস্রোতের বিপরীতে আকাশ দিয়ে বয়ে আসছে। বাঘারু স্রোতের বেগে ধেয়ে যাচ্ছে আর তার গায়ের ওপর বাতাসের ও বৃষ্টির পাল্টা ঝাপ্টা এসে লেগেই যাচ্ছে–এই অবস্থাটা এতই অপরিচিত যে বাঘারু মনে আনার চেষ্টাও করে না যে কতক্ষণ আগে সে গাজোলডোবায় ঐ ফরেস্ট থেকে জলে ভেসেছিল।

এ ক্যানং বসি থাকা বেলা ঠাকুরের তানে? আতির (রাত্রির) আন্ধার কনেক কনেক করি কাটিবার ধরিবে আর পুবপাখে বেলাঠাকুর উঠিবার আগত নাল, হলদিয়া রংগিলা উঠিবে আর মুছিবে। সেগিলা অঙের (রঙের) ছাও পড়িবে জলের উপরত। আর নদীর জল টলটল করিবার ধরিবে অঙত। এ্যানং, চলিবা থাকিবে অঙের খেলা আকাশত্ নদী আর মাঠঘাট, ফরেস্টত। তার বাদে সব অঙ মুছি যাবার ধরিবে। কায় মুছিছেন কায় জানে। য্যাঁলায় রঙগিলা মুছি গিয়া, ধরো কেনে, সারাখান আকাশ গোবরমোছা এগিনার (আঙিনা) নাখান নাগে, য্যান, এ্যালায় সিদ্ধ ধান শুখাবার তানে ঐঠে মেলা দিবার লাগিবে, স্যালায় বেলঠাকুরখান উঠিবেন, লাল টকটক বন্ন ধরি নদীখানের মাঝঠে। বেলাঠাকুর যেইঠে উঠেন সেইঠে মাঝঠে উঠেন। মাঠ দেখো, বেলাঠাকুর মাঠের মাঝতৃটে উঠিবার ধরিবেন। নদীত দেখো, বেলাঠাকুর নদীর মাঝতুঠে উঠিবেন। ফরেস্ট দেখো, বেলাঠাকুর ফরেস্টের মাঝতটে উঠিবেন। আর, এ কী হবা ধরিছেন? আতি আর দিনত বৃষ্টি আর বাও, বাও আর বৃষ্টি। দিনের বেলা আতির নাখান আবছা, আতির বেলা দিনের নাখান আবছা। এ্যালায় থাকো এইঠে বসি–এ আন্ধার পাতলা হওয়ার তানে। থাকো বসি।

বাঘারু যেন অস্থির হয়ে ওঠে এই স্রোত, বাতাস, বৃষ্টির ভেতরে এই গাছগুলো নিয়ে তার ভেসে যাওয়ার নির্দিষ্ট একটা ভূমিকা তৈরি করে নিতে। কাল রাতের শেষে সে যখন গাজোলডোবার পাড় ছেড়েছে তারপর থেকে প্রতিটি মুহূর্তই যে-ডাল হাতেপায়ে পেয়েছে, সেই ডাল তাকে অন্ধের মত আঁকড়ে থাকতে হয়েছে, একটা আন্দাজ পর্যন্ত পায় নি–কোথায় কতটুকু পা সরাতে পারবে বা হাত নাড়াতে পারবে। আন্দাজে-আন্দাজে একটা বসার জায়গা পেয়ে ডাল বরাবর শুয়ে সে হয়ত একটু ঝিমিয়েও নিয়েছে। কিন্তু সেসব যেন মাঝরাতের অন্ধকারে হঠাৎ জলে পড়ার মত। বাঘারুর কিছু করার ছিল না। অথচ বাঘারু ত গয়ানাথের চার-চারটে গাছ কেটে, বেঁধে, ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অর্জুনগাছটা পড়লে পাঁচটা গাছ হত। বাঘারুর এই গাছগুলো এক-একটাই ত এক-একটা ফরেস্ট যেন। শাল আছে একটা, খয়ের আছে একটা। বাকি দুটো গাছ খুব ভাল করে দেখেও নি ত বাঘারু। এই গাছগুলো দিয়ে গয়ানাথ তাকে ভাসিয়ে দিয়েছে। তাকে কোথাও গিয়ে ঠেকতে হবে। কোথায়, তা সে জানে না, গয়ানাথও জানে না। এক, নদীর এই ফ্লাড জানলেও জানতে পারে। তার, বাঘারুর কাজ, এই গাছগুলোকে নিয়ে সেই কোথাও ঠেকে যাওয়ার, ঠেকে থাকার। তারপর আসিন্দির আর গয়ানাথ ভটভটিতে করে তাকে খুঁজে বের করে গাছগিলাক আর হামা যা করিবার করিবে। কিন্তু সেইজন্যে ত এখন এই সকাল থেকে এই গাছ আর বানা আর বাতাস আর বৃষ্টি নিয়ে বাঘারুর সচেতন ও সক্রিয় হয়ে ওঠার কথা। তা না, এখনো তাকে এই ডালের ওপর বসে থাকতে হচ্ছে প্রায় অন্ধের মতই।

বাঘারু চোখ মেলে চারদিকে তাকায়। আকাশের দিকে তাকালে সেই ছাই-ছাই মেঘগুলো কোথাও কোথাও দেখা যায়, নদীর জলও দূরে কোথাও-কোথাও চলকায়। কিন্তু এই যে-গাছগুলোর সঙ্গে সে ভেসে যাচ্ছে তার পাতাগুলো কিছুতেই স্পষ্ট হচ্ছে না, তার রঙও না। এর মধ্যে পাখিগুলি চারটে শোয়ানো গাছের ডালে বসে নদীর জল অথবা কোনো অনির্দিষ্ট সকালের দিকে তাকিয়ে আছে। সকালের পাখি সাধারণত আলোর দিকে মুখ করে থাকে। কিন্তু গাছগুলো এমন কাত হয়ে পড়ায়, ডালপালার যে-বিন্যাসের সঙ্গে পাখিগুলো পরিচিত ছিল, সেটাই কেমন বদলে গেছে। ফলে, তারা যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, কোন ডালে বসে কোন দিকে তাকালে তাদের পরিচিত আলো দেখতে পাবে। নীচের জলস্রোতের ঐ বেগটাও তাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় নেই। তাদের অভ্যাস এতটা ভেঙে যাওয়াতেও কিন্তু পাখিগুলো নিজেদের মত করে একটা রোজকার অভ্যেসে ফিরে যায়–চার-চারটে গাছের মেলানো-মেশানো ডালপালার মধ্যে উড়তে-উড়তে। চার-চারটে গাছ এমনি জটপাকিয়ে আছে যেন মনে হয়–একটাই কোনো এমন বড় গাছ, যে-গাছে সূর্য আড়ালে পড়ে যেত। একটা গাছের সরু মোটা নানা ডালে নানা ভাবে ছোটাছুটি করতে করতে পাখিগুলো হঠাৎ-হঠাৎ একসঙ্গে ভয় পেয়ে ডেকে উঠছে। বাঘারু বুঝে উঠতে পারে না–ভয়টা ওরা পাচ্ছে কেন, এমনই সমবেত ভয়।

বাঘারু গাছটা দিয়ে গড়িয়ে আরো খানিকটা নীচে নামে। তার পায়ের পাতা ত জলে ডুবেই যায়, গোড়ালি ভেঙে জল উঠতে থাকে। এইখানে বাঘারু পাশে আর-একটা মোটা ডাল পায়। কিন্তু সেটা ধরে বসেবসেই এই ডাল থেকে ঐ ডালে যেতে বাঘারু পিঠে একবার হাত ঘেঁয়ায় কুড়োলটা আছে ত? এতই বেশি মিশে গেছে কুড়োলটা শরীরের সঙ্গে যে বাঘারুর প্রায় মনেই থাকছে না। মনে ত না-থাকবারই কথা। শুধু কাজের সময় হাত বাড়ালেই যেন পাওয়া যায়। নতুন ডালটাতে পা দিতেই ডালটা ভোস করে জলে ডুবে যায় আর বাঘারু তাড়াতাড়ি আগের ডালটাতেই ফিরে আসতে যায়। ডালটা আচমকা ধাক্কায় আবার ডুবে যায়, আর বাঘারু এতটাই তলিয়ে যায় যে তাকে পুরনো গাছের ডালটায় পা দেয়ার বদলে দুই হাত দিতে হয়। কোমর পর্যন্ত ভিজে গিয়ে সেই পুরনো ডালটা দুই পা দিয়ে জড়িয়ে ধরে বাঘারু–তার পিঠে জলের ছোঁয়া লাগে। এখন যদি সে একটা ঝাঁকি দিয়ে নিজেকে ডালের ওপর তুলতে যায়, যা হলে এই ডালটাও ঘুরে জলের তলায় চলে যেতে পারে। ফলে বাঘারুকে ওরকম ঝুলেই থাকতে হয়। কিন্তু রাতের শেষ কয়েক ঘণ্টা ঐ ডালটার ওপরেই ভর দিয়ে এসেছে বলে ডালটাকেও সে একটু বেশি চিনেছিল। বাঘারু নিজেকে জলের ভেতর আরো খানিকটা ছেড়ে দেয়-ফলে তার শরীরটা হাল্কা হয়ে যায়। সেই হাল্কা শরীরটাকে জলের ভেতর দিয়েই সে ওপরে নিয়ে যায়–যেখানে সে বসেছিল সেই জায়গাটিতে। ঝুঁকি লাগলেও ঐ জায়গাটিতে ঘুর লাগবে না।

ভেজা শরীরে বাঘারু আবার তার পুরনো গর্তের ভেতর বসে পড়ে। সেখানে সেঁটে যেতেই বাঘারুর একবার মনে হয়–তার এখান থেকে নড়ার দরকারটা কী? যেখানে গিয়ে ঠেকবে সেখানে তার নামার মত জায়গা থাকলে, নামবে। এ-ছাড়া ত তার কিছু করারও নেই।

পাখিগুলো চিরকাল যেমন, এখনো তেমনি, বাঘারুর নাগালের বাইরে ওড়াউড়ি করে যাচ্ছে। কিন্তু আজ যে বাঘারু আর তারা একটা গাছে চড়ে যাচ্ছে সেটাও অবান্তর হয়ে যায় এই গাছগুলোর উঁচু ডাল-নিচু ডালের পার্থক্যে। পাখিগুলো নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে না যে তারা আর বাঘারু একই গাছে ভেসে আছে।

পাখিগুলো আবার আচমকা ডেকে উঠল–একসঙ্গে, ভয়ার্ত।

বাঘারু এবার ঐ ডাল বেয়েই একটু পেছিয়ে যায়। গাছগুলো পাড় থেকে ছাড়ার সময় সে হাত-পা বুক-পেট দিয়ে ডালের যে-অংশটাকে জড়িয়ে এটে বসেছিল, সেই জায়গাটাতে পৌঁছয়। সেখান থেকে তাকিয়ে বোঝবার চেষ্টা করে–পাখিগুলো সব কটি গাছ জুড়েই এরকম ভয় পাচ্ছে, নাকি, একটা জায়গাতেই। ঐ একটু উঁচু ডাল থেকে বাঘারু দেখে চারটি উৎপাটিত গাছে কত পাখি ও তাদের কত ওড়াউড়ি চলছে সবগুলো গাছ জুড়ে। ফিরে-ফিরে ওড়া কিন্তু বাতাসের ধাক্কা সইতে না পেরে আবার পাতার ভেতর ঢুকে যাওয়া।

কিন্তু পাখিগুলোর ভয় দূর করার দায়িত্ব বাঘারুকে কে দিল?

গাছগিলা গয়ানাথের, পাখিগিলা গাছের, পাখিগিলা গয়ানাথের না হয়। গাছগিলার চামড়ার নাখান পাখিগিলা গাছের ডালত বাসা বান্ধির ধরেছে। যেইল বাও দিবার ধরে, ঝড়ের নাখান বাও দিবার ধরে, বাওড় গাছগিলার ডালপালা ওলটপালট খাবার ধইচছে–এ্যানং ওলটপালট য্যান গাছের মাথাগিলা মাটিত নামি আসিবে আর গাছের শিকড়খান আকাশত উঠি যাবে–স্যালায় বৃক্ষের কুনো প্রাণী বৃক্ষ ছাড়িবেন না। পাখ-পাখাল ডালপালা আঁটি ধরি থাকিবেন, পিপিড়া গাছের গাওত সিন্ধি যাবে, সাপখোপ গাছের গর্তত ঢুকি যাবে। সেই বৃক্ষখান যদি ঝড় উলট খায়, পড়ি যায়, স্যালায়ও বৃক্ষের কুনো প্রাণী বৃক্ষ ছাড়িবেন না। তারপর বাও থামিবেন, বৃষ্টি থামিবেন, বৃক্ষের পাতা পচি খসি যাবার ধরিবেন–স্যালায় পাখপাখাল, সাপপিপিড়া নতুন গাছত বাসা বান্ধিবার ধরে। গয়ানাথের ঝড় গয়ানাথের গাছক উপড়ি দিছে। গয়ানাথের বাঘারু মুই, গয়ানাথর গাছক ভাসি দিছি। গায়ানাথের বাঘারু মুই গয়ানাথর গাছ নিগি ভাসিছু। তিস্তার এই বানাত ভাসি যাছু। তিস্তার বানার নাখান এই ঝড় আর বৃষ্টির বানাত ভাসি যাছু। গয়ানাথর বাঘারু মুই গয়ানাথর গাছ নিগি ভাসি যায় গয়ানাথর জোয়াই আর গয়ানাথ ভটভটিয়াখান চড়ি সদর আস্তা (রাস্তা) দিয়া তামান চর আর কায়েম দেখি-দেখি খুঁজিবার ধরিবেন–কোটে গিয়া ঠেকি গয়ানাথর গাছ আর গয়ানাথর বাঘারু। মোর আর কী কষ্ট? বসি আছু, খাড়ি আছু, তিস্তার বানা মোক টানি নিয়া যাছে। গয়ানাথ দেউনিয়াখানের বড় কষ্ট। আসিন্দির জোয়াইখানের বড় কষ্ট। এ্যালায় এ্যানং বানা। কোটৎ চর, কোট টাড়ি। আর এ্যানং ঝড়। এ্যানং বৃষ্টি। কোটত মোক খুঁজি-খুঁজি বেড়িবার লাগিবে। মুই চিল্লি পারি–হে দেউনিয়া মুই এইঠে। কিন্তুক কায় শুনিবেন সেই চিৎকার। কী আর করিবেন রে দেউনিয়া? তোমরালার গাছগিলা আর বাঘারুক য্যালায় ভাসি দিছেন, স্যালায় ত তুলি নিবার নাগিবে। না-হয় ত সবখানই তোমার লস্, পুরাখান লস, এই চারিখান গাছ ল, এই বাঘারুখান লস্। জ্বালিয়া যেইলা জালখান নদীতে ফেলেন, স্যালায়, ত গুটিবার নাগিবেই। না হয় ত জালখানই লস্,। তোমরালার গাছ গিলাক আর বাঘারুখানক যেইলা ভাসি দিছু স্যালার গুটিবার নাগিবেই। এই ঝড়ত, এই বৃষ্টি তোমায় ভটভটিয়াখান নিগি বাহির হওয়া নাগিবে। কিন্তু গাছের এই পাখিগিলা ত গয়ানাথ দেউনিয়ার না-হয়। পাখিগিলা গাছের। গাছখান ফ্লাড়ত ভাসিরার ধরিছে ত পাখিগিলাও ভাসিবার ধরিছে। এ্যালায় ঝড়ত কাঁপছে, বৃষ্টিত ভিজিছে কিন্তুক পাখিগিলাই আন্ধার কাটি দিছে। পাখিগিলার কুনো গয়ানাথ নাই রো, কিন্তুক পাখিগিলার ত বাঘারু আছো, মুই আছো। মোক দেখিবার নাগিবে না কেনে ভয় খাছে পাখিগিলা? এই সব কথাবার্তা ভাবনাচিন্তার ভেতরই সেই বৃষ্টিপাত-ও ঝড়ো হাওয়া আক্রান্ত সূর্যোদয়ের আচ্ছন্নতার সময় জুড়ে বাঘারু ব্যস্ত থাকে। সেই ব্যস্ততায় সে থই হারিয়ে ফেলে কখন ও কেমন করে গাছের পাতাগুলোর সবুজ, দৃশ্য হয়ে ওঠে, এবং এমন-কি খয়ের গাছের পাতার সবুজের সঙ্গে শালগাছের পাতার সবুজের পার্থক্যও, এমন-কি, একই গাছের বিভিন্ন পাতার আকার ও রঙের পার্থক্যগুলিও। বাঘারুর চিন্তায় তরপরম্পরা যেমন আছে, আরো সব মানুষের মতই, তেমনি তার চিন্তার পরম্পরাহীন। জট পাকিয়ে যাওয়াও আছে, আরো সব মানুষের মতই, কিন্তু সেই আর-সব মানুষ থেকে তার পার্থক্যও আছে। গয়ানাথের জমিতে হাল দিতে-দিতেই হোক, গয়ানাথের বাথানের মোষ-গরুগুলিকে নিয়ে চলতে-চলতেই থোক আর গয়ানাথের গাছগুলো নিয়ে জলে ভাসতে-ভাসতেই হোক–বাঘারুকে আজও সব মানুষের মতই একা-একা ভাবতে হয় বটে, কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে তাকে কথাও বলতে হয়। একা-একাই। যদি সে কথা বলে উঠতে পারে তা হলে তার মাথার ওপরে আকাশ, পায়ের তলায় মাটি বা জল থাকলেই যথেষ্ট। এর আগে তার কোনো-কোনো বাক্যোদগমের সময় কখনো কোথাও কোনো অনির্দিষ্ট অফিসার বা নির্দিষ্ট এম-এল-এ থাকতে পারে, এখন তেমনি এই নতুন দিনে তিস্তার বন্যার সীমান্ত ধরে-ধরে গাছগুলোকে খুঁজবে যে-আসিন্দির আর গয়ানাথ, সেই তারাও তার কথা বলার উপলক্ষ হতে পারে। হয়ও।

হয় বটে, কিন্তু সে-জন্যে বাঘারুর পক্ষীসন্ধানে কোনো ছেদ পড়ে না। সে ঐ মাস্তুলের মত গাছের কাণ্ড থেকে দেখে, পাখিগুলো আসলে এই নতুন অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে কখনো কোথাও-কোথাও এক সঙ্গে ভয় পাচ্ছে। তারা গাছের ডালপাতার মত স্থায়ী ও অনড় আশ্রয়েই আছে, অথচ বন্যার স্রোতে ঐ বেগে ভেসে যাচ্ছে–এর ভেতর মিলটা কোথায় তারা বোঝে না। ফলে, সকালবেলার অভ্যস্ত ছোটাছুটি করতে করতে গাছগুলোর পাতার ভেতর দিয়ে একেবারে জলের কাছ। পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে, এমন-কি জল ছুঁয়েও ফেলছে–আর তার পরই ভয়ে চিৎকার করে ওপরে উঠে আসছে।

এই প্রক্রিয়াটি আবিষ্কার করে যখন বাঘারু, তখন সে বুঝে উঠতে পারে না–কিছুপাখি স্রোতে পড়ে ভেসে গেছে কিনা। যদি স্রোতে ডানা লেগে থাকে তা হলে আর উঠতে পারে নি, ভেসেই গেছে)। কিন্তু বাঘারু কী করে পাখিগুলোকে এই গাছগুলোর ডালপালার ভেতরে যাওয়া থেকে আটকাবে? নীচের ডালপাতার ভেতরে ঢুকে গেলে নীচের বন্যায় তাদের ভেসে যাওয়া ঠেকাবে কী করে বাঘারু? পাখিগুলোও কখনো দেখে নি, ডাল থেকে ডালে গেলে জলে পড়তে হয়।

বাঘারু জলস্রোতের কাছ থেকে পাখিগুলোকে বাঁচাতে চায়। সে হেট হেট করে গাছটার ডালে ঋকি দেয়। তাতে ওপরের ডালের পাখিগুলো ডাল ছেড়ে আকাশে উড়ে আবার ডালে বসে। বাঘারু, দেখে, পাখিগুলো যেন বেশি করে ডালপালার ভেতর দিয়ে জলের কাছাকাছি যেতে চায়। কেন চায়, সেটা বাঘারু বুঝে ফেলে–ডালপাতার অত ভেতরে গেলে ঝড়ো বাতাসের ও বৃষ্টির ঐ ঝাপ্টা থেকে বাঁচছে। কিন্তু পাখিগুলো বাতাস আর বৃষ্টি চেনে, বন্যার স্রোত ত আর চেনে না। তাই জলের কতটা ওপরে থাকলে তারা আত্মরক্ষা করতে পারবে হিশেব করতে পারে না।

বাঘারুর চোখের সামনে এতক্ষণে স্পষ্ট হল–একটা শাল, একটা খয়ের, একটা সিসু, আর-একটা গাছ এখনো সে চিনতে পারছে না–একেবারে পরস্পরের সঙ্গে মিশে আছে। কিন্তু নীচের যে-গাছটাকে সে চিনতে পারে না সেটা আড়াআড়ি এই তিনটি গাছের তলায় লেগে আছে স্রোতের ধাক্কায় নাকি নাইলনের দড়ির বাধনে। যাতেই হোক, লেগে ত আছে। বাঘারু সেদিক থেকে একেবারে বা দিকের গাছটার সীমার ডালে দাঁড়িয়ে। সে যদি মাঝখানের শালগাছটারও মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াবার একটা জায়গা পেত তা হলে সেখান থেকে সে সবগুলো গাছকেই ও সেই গাছের পাখিগুলোকে দেখতে পেত।

বাঘারু ঠিকই করে ফেলে সে ঐ গাছগুলোর ঠিক মাঝামাঝি যে-শালগাছটা তারও মাঝখানে যাবে। এখন চারপাশ ফরশা হয়ে আছে। বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকেও দেখা যাচ্ছে। তিস্তার স্রোত–যতদূর পর্যন্ত চোখ যায়, ততদূর পর্যন্ত একই রকম ঘোলাটে। তাকালে মনে হয় না, এই বিরাট জলপ্রান্তরের কোনো স্রোত আছে। কিন্তু বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে স্রোতের সেই বেগে মাথা ঘোরে।

খয়ের গাছের ঐ বাকা কাণ্ডটা বেয়ে বাঘারু তরতর করে নীচে নেমে ঐ জলটা ধরে জলেই নেমে যায়। স্রোতের ধাক্কায় তার শরীরটা ডালের সমান্তরালে ভাসে-দেখিছু ক্যানং সোঁতা হে। কিন্তু এতে তার শালগাছের ডালটা ধরতে সুবিধেই হয়। সে ডালটা ধরায় যে ঝাঁকুনি লাগে, তাতে পাখিগুলো কিচিরমিচির করে ওপরে উঠে যায়। বাঘারুর মনে হয়, শালগাছটাতে পুরো ভর দিলে গাছটা জলের ভেতরে ডুবে যেতে পারে। কিন্তু তা নাও যেতে পারে যদি তলার সেই না-চেনা গাছটার ডালপালা শালগাছটার তলায় থাকে। একবার ডান হাতের ওপর বেশি ঝোঁক দিয়ে দেখে নিতে চায়। সেই ঝোঁকটা দিতে-দিতেই তার বা হাতটা খয়ের গাছ ছেড়ে দেয়। দুই হাতে শালগাছটা ধরতে-ধরতেই শালগাছটা তলিয়ে যায়-বাঘারু সেটাকে আরো একটু তলিয়ে নিয়ে শালগাছের ওপর উঠে বসলে তার হাঁটু পর্যন্ত জলে ডুবে থাকে।

.

মাচাননির্মাণ

ডালের ওপর বসে বাঘারু একটু অপেক্ষা করে যে ওপরে তার উঠে বসার ধাক্কা সামলে ডালটা আবার ভেসে ওঠে কিনা। জলের স্রোত তার হাঁটুর পেছনের গর্তটায় সামান্য ধাক্কা মারে কিন্তু স্রোত এতই খর যে জল উছলে ওঠে না। ডালটা একটু ভেসে ওঠে বটে কিন্তু পুরোটা ভেসে ওঠে না। বাঘারু তার ডানে তাকিয়ে আর একটা এমন ডাল খোঁজে যেটা কাণ্ড থেকে ওপরের দিকে উঠে গেছে। সে তেমন একটা ডাল বাছাই করতে পারে বটে কিন্তু সেটা আবার একটু পেছনে। এই ডাল থেকে ঐ ডালে যাবার হাঙ্গামা পোষাবে কিনা সেটা মাপতে বাঘারু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ডালটা ত দেখেই, তার সঙ্গে-সঙ্গে ডালের আশপাশটাও দেখে নেয়। তারপর সেই ডালটায় যাবার জন্য একই সঙ্গে ডান হাত ও পা বাড়িয়ে দেয়। তাতে এই ডালটা আবার জলে ডুবে যায় বটে কিন্তু তাতে বা হাত, বা পা-টা ঐ ডাল থেকে সরিয়ে আনতে বাঘারুর সুবিধেই হয়। এবার সে অনেকগুলো ছোট-ছোট ডালপালা ভেদ করে, আবার সেগুলোকেই ধরে একটা উঁচু ডালের ওপর দাঁড়াতে পারে ও চারদিকে তাকাতে পারে। একটা উঁচু জায়গায় উঠে যেমন চারদিকে তাকাতে হয় তেমনি তাকিয়েছিল বাঘারু কিন্তু তাকানোর পর, অতটা ফরশা সকালেও সে বুঝে উঠতে পারে না কোথায় এসে পড়েছে, কোন পাড়ের কাছ দিয়ে যাচ্ছে। বাঘারুকে কখনো তিস্তার ওপর দিয়ে তিস্তার দুই পাড় চিনতে-চিনতে যেতে হয় নি, তার পক্ষে নদীর ভেতর থেকে নদীর পাড় চিনে নেয়া এমনিতেই মুশকিল হত। আর, এ নদী তার সারা বছরের চেনা নদীই নয়। সারাটা বছরের মধ্যে দু-চার-দশ দিন এই নদী বাঘারুর অপরিচিত হয়ে ওঠে আর নদী অপরিচিত হয়ে ওঠায় এই নদীর সঙ্গে জড়িত দুই পারের সব বাড়িটাড়ি গাছগাছড়াও অচেনা হয়ে যায়। বছরের তেমনি দু-চার দশ দিন এখন চলছে।

বাঘারু ডাল থেকে ডালে চলে আসায় এই গাছগুলোর ডালপালায় যে-আলোড়ন উঠেছিল তাতে পাখিগুলো মাঝে-মাঝেই একটু উড়ে উঠে আবার নতুন জায়গায় বসে পড়ছিল। বাঘারু উঁচু ডালটাতে দাঁড়িয়ে যে-সময়টুকু চারপাশ দেখে, পাখিরা সেই ফাঁকে চার-চারটি গাছের ডালপাতার ভেতরে-ভেতরে ঢুকে যায়। এক-একটা ঝাঁকিতে পাখিগুলো কিন্তু গাছ ছেড়ে বেশি দূর উঠতে পারে না–সেখানে বাতাসের ঝাঁপট লাগে। কিন্তু সেটা পুষিয়ে নিতেই আবার জলের বিপজ্জনক কিনারা পর্যন্ত চলে যায়। বাঘারু ঠিক ভেবে উঠতে পারে না, কী করে পাখিগুলোকে জল আর বাতাস থেকে সমদূরত্বের নিরাপদ ডালপালাগুলিতে ফিরিয়ে আনবে।

কিন্তু এই ডালটা বাঘারুর পছন্দ হয়ে যায়। সবচেয়ে না হলেও, এই ডালটা বেশ উঁচুই। চারদিক দেখা যায়। চারটি গাছের মাঝখানেও। একটাই অসুবিধেমাথার ওপর বড় ভারী কোনো ডালপালা না-থাকায় জল আর হাওয়ার ঝাপটা সরাসরি বাঘারুর গায়ে এসে পড়েছে। বাঘারু আবার তার বায়ে তাকিয়ে দেখে ওদিকে আর-একটা নিচু কোনো ডাল পাওয়া যায় কিনা যেখানে দরকার হলে সে বৃষ্টি আর বাতাসের ধাক্কা থেকে বাঁচার জন্যে গিয়ে মাঝেমধ্যে বসতে পারে।

কিন্তু তেমন কোনো ডাল খুঁজে পাবার আগেই বাঘারু তার পিঠ থেকে কুড়োলটা তুলে আনে। এই ডালটার ওপর একটা মাচান মত বানিয়ে নিতে চায় সে।

মোক ত ভাসিবা নাগিবে, যত দিন এই ফ্লাড চলিবে, তত দিন এই গাছগিলা নিয়া মোক ভাসিবার নাগিবে। যত দিন আসিন্দির জোয়াই আর গয়ানাথ দেউনিয়া মোক খুঁজি না পায় তত দিন মোক ভাসিবার নাগিবে। গয়ানাথ এই ফ্লাডের নদীর ভেতর কোনঠে মোক খুঁজিবার পাবে হে? যেইলা ফ্লাড থামিবে, হেই পাহাড়ভাঙা ফরেস্ট ভাঙাজলগিলা সব নদী খালি করি বহি যাবে, যে-চরগিলা টাড়িগিলা ফ্লাডত ঢাকা পড়ি যাছে, স্যালায় সেগিলা আবার দেখি যাবার পাম, স্যালায় মুই এই গাছগিলাক নিয়া কোটত ঠেকি থাকিম আর গয়ানাথ আর আসিন্দিরজোয়াই মোক খুঁজি পাবে। তত্ত দিন ত মোক ভাসিবার নাগিবে–

এই সব কথা কখনো কখনো ভাবার জন্যেই বলতে বলতে বাঘারু তার কুড়ালিয়া দিয়ে ছোট-ছোট নানা ডাল কেটে যায়। কাটা ডালগুলো ওখানেই ঝুলে থাকে, দুটো-একটা ডাল পড়ে গিয়ে নীচের ডালে আটকে যায়। কাটার সময় বাঘারু কোন ডালই কুড়োয় না। সে কখনো বা হাতে একটা ছোট ডাল নামিয়ে এনে তার গোড়ায় ডান হাতে কোপ দেয়–একটা। তারপর বা হাতটা ছেড়ে দেয়। কাটা। ডালটা আটকে থাকে। কখনো বাঘারু ডান হাতটা একটু লম্বা করে দূরের কোনো ডালের গোড়ায় কোপ দেয়। সেটা এক কোপে না নামলে, আর একটা কোপ তাকে দিতে হয়। কিন্তু তার দুই হাতের সমবেত শক্তি প্রয়োগ প্রয়োজন হয় এরকম কোন ডাল সে কাটে না।

দেখতে-দেখতে বাঘারু নিজের জন্যে যেন আকাশটাকে পরিষ্কার করে ফেলে। তাতে বৃষ্টি আর হাওয়ার ঝাঁপটের মুখে সে আরো পড়ে যায় বটে কিন্তু চারদিকটা বেশ পরিষ্কার হয়ে যায়। সেই শেষ রাতের অন্ধকার থেকে সে যেন এই চার গাছের সঙ্গে আরো একটা গাছ হয়ে ভেসেছে–এতক্ষণে সে গাছ আর নদীস্রোতের ওপর তার প্রভুত্ব দেখাবার মত একটা আসন তৈরি করতে পারছে।

কুড়ালিয়াটাকে আবার পিঠে খুঁজে নিয়ে বাঘারু কাটা ডালগুলো টেনে আনতে শুরু করে। ততক্ষণে এই ডালটার ওপর তার হাঁটাচলা এতই স্বাভাবিক হয়ে যায় সে অনেক সময় দুই হাতেই কাটা ডালগুলো, তুলে এনে এখানে এই ডালটার ওপর আড়াআড়ি ফেলে। ফেলতে-ফেলতে একবার তাকিয়ে দেখে যথেষ্ট ছোট ডাল কাটা হয়েছে কিনা।

বারু এবার নীচের একটা ডালে নেমে যায়। সেখানে দাঁড়িয়ে সে দুই হাতে ঐ ছোট ডালগুলোকে ওপরের বড় ডালের ও পাশাপাশি আরো নানা ডালের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি মেলে দেয়। মেলে দিতেই একটা মাচানের মত হয়ে যায়।

এইবার বাঘারু নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলটা গলা থেকে খুলে সামনে এনে একটু ভাবতে বসে। এই ছোট ডালগুলোকে বড় ডালটার সঙ্গে বেঁধে না দিলে ডালগুলো ত খসে পড়ে যাবে কিন্তু এত মোটা গাছ বাধা নাইলনের দড়ি দিয়ে সে ঐ টুকু টুকু ডাল বাধবে কেমন করে? সুতলি থাকলে হত। বাঘারু সামনে দাঁড়িয়ে গাছগুলোর দিকে তাকায় যেন ওখানে কোথাও পাটের সুতলি থাকতে পারে। একটু দূরে একটা লতা মত দুলছিল। বাঘারু হাত বাড়িয়ে সেটা ধরতেই ছিঁড়ে যায়। সেটা বাঘারুর হাতেই লেগে থাকে। ততক্ষণে সকালের আবছা আলোয় ঘোলাটে আকাশ ও ঘোলাটে নদীস্রোতের ওপর দিয়ে নিজের দৃষ্টিটা একবার বুলিয়ে নিয়ে আসে–কোথাও কি পাটের সুতলি থাকতে পারে? অগত্যা বাঘারু তার হাতের নাইলন দড়ির বাণ্ডিলটার দিকেই তাকায়। এই চার-চারটি গাছের সব বাধন এই বাণ্ডিলটার সঙ্গে বাটা। কোনো গাছ কোথাও আটকে গেলে বা সরে গেলে সে এই বাণ্ডিলের টানে বুঝতে পারবে। এই বাণ্ডিলটা থেকে একটা টুকরো কেটে নিয়ে তার প্যাঁচ খুলে-খুলে ছোট-ছোট সুতলির মত দড়ি হয়ত বের করা যেত কিন্তু তা হলে ত বাণ্ডিলটাকে কাটতে হয়। কাটলে সে কী করে টের পাবে–গাছগুলো ঠিক আছে কিনা। গয়ানাথকে যেমন বাথান বুঝিয়ে দিতে হয়, তেমনি ত এই ফরেস্টও বুঝিয়ে দিতে ইর।

.

পাখিরা জলে ঝরে যায়

শেষে বাঘারু একটা বুদ্ধি বের করে।

বুদ্ধিটা যে বের করে তা নয়–হাতে আছে এক মোটা নাইলনের বান্ডিল, সুতরাং যা করার তাকে এই দড়ি দিয়েই করতে হয়। ঐ ছড়িয়ে রাখা ছোট ডালগুলোর ওপর দিয়ে নীচ দিয়ে সে নাইলনের দড়িটাকে দু দিকের মোটা ডালগুলোর সঙ্গে আড়াআড়ি বাধে। মোটা ডালগুলোর সঙ্গে দড়িটা পেচিয়ে দেয়াতে ঐ মাচানটা যেন নাইলনের মোটা দড়ির জালে আটকা পড়ে যায়। তাতে ঐ ছোট ডালগুলো খুব শক্ত করে বাধা হল না বটে কিন্তু ঐ মাচানের ওপর থেকে বাঘারুর পড়ে যাওয়ার ভয় আর-থাকল না–দড়ির জালে আটকে যাবে।

নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলটাকে আবার গলায় ঝুলিয়ে বাঘারু ডালের ওপর পা দিয়ে তার মাচানের ওপর উঠে গিয়ে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে চারপাশে সামনে-পিছনে, ডাইনেয়ে, ওপরে-নীচে তাকায়। দাঁড়িয়ে ও তাকিয়ে তার এত ভাল লাগে যে সে একবার ঐ মাচানের ওপর বসে পড়ে, তারপর সেখানে আধশোয়াও হয়, তারপর আবার উঠে দাঁড়ায়।

দাঁড়ানো, বসা বা শোয়ার সময় বাঘারুকে একটু সাবধান হতে হয় বটে যাতে ডালগুলো সরে না যায়, কিন্তু তাতে তার আনন্দ কিছু কমে না। এতক্ষণে সে যেন এই বন্যা, এই বৃষ্টি, এই হাওয়া ও এই গাছগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ পায়। সে ছোটখাট ডালগুলো কাটায় তার দৃষ্টিপথও অনেকটা খুলে গিয়েছিল। সে দেখতে পাচ্ছিল, স্রোত ঠেলে তার এই চার গাছের বহর প্রায় একটুও না হেলে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। স্রোত এই গাছের বহর ও তাকে যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে সেদিকেই যেতে হচ্ছে বটে কিন্তু এই মাচানের ওপর বসে চারপাশ দেখতে পাওয়ায় বাঘারুর মনে একটা ভাব আসে যে সে গাছগুলোকে, এবং স্রোতটাকেও, অনেকখানি নিজের খুশিমত চালাতে পারছে।

নিজের এই মনে হওয়ার সমর্থনের জন্যে বাঘারুর একটা লাঠি দরকার–বেশ লম্বা ও সোজা একটা লাঠি, এখান থেকে যে-লাঠি দিয়ে জল ঘেঁয়া যাবে, আবার দরকার হলে যে-লাঠি আকাশেও ভোলা যাবে। আকাশে তোলার কোনো দুরকার বাঘারু ভাবে না–কিন্তু লাঠি একটা থাকলে সেটা ত আকাশে তোলাই যায়, নইলে আর সেটা লাঠি কেন?. এ অভাবটা বাঘারু রাখতে চায় না।

সে-কুড়ালিয়া খান আবার পিঠ থেকে খুলে এনে, ডান হাতে ঝুলিয়ে, স্রোতের দিকে মুখ করে মাচানের ওপর দাঁড়িয়ে, নিজের চারপাশের ডালপালা-ঘঁটা ফাঁকায় দাঁড়ায় আর এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুরিয়ে লাঠি বানানোর মত একটা ডাল খোঁজে। যে-খয়ের গাছটাতে সে রাত কাটিয়েছে সেটাকে এখন মনে হয় কত দূরের–তার ডালপালাগুলোকেও মনে হয়, ঘন। সিসু গাছটাও ত পাশেই; সেটার পাতাগুলো গায়ে গা লাগানোবাতাসের ধাক্কায় সব একদিকে হেলে আছে। বাঘারু সেদিকে তাকিয়ে ভাবে–সিসুগাছের ডালাপালুর মধ্যে সে তার পছন্দমত একটা লম্বা সরু ডাল পেয়ে যেতে পারে। এবার সে স্রোতের উল্টোদিকে তাকায় যে-গাছটাকে সে আগে চিনে উঠতে পারে নি সেই গাছটা দেখতে। কিন্তু, কুড়ালিয়া হাতে ঝাপানোর জন্যে প্রস্তুত ভঙ্গিতে সে বোঝে ঐ গাছটাতে পৌঁছনো অনেক হাঙ্গামার ব্যাপার।

সে মাচানটি থেকে পাশের সিসু গাছটাতেই যাবার জন্যে পা বাড়িয়ে দেখে তলায় একটা ডাল উল্টো হয়ে পড়ে আছে, কাটা দিকটা ওপরে। আগাটা কোথায় গিয়ে পড়েছে দেখা যাচ্ছে না। সে কুড়ালিয়াটা পেছনে খুঁজে ঐ ডালটাকে টেনে তোলে। আর বেশ ভেতর থেকে উঠে আসে লম্বা একটা হিলহিলে ডাল। বাঘারু ডালটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করে–আগার দিকটা একটু বেশি সরু কিন্তু আপাতত তার কাজ চলে যাবে। সে মাচানে ফিরে এসে বসে। পিঠ থেকে কুড়ালিয়াটা খুলে ডালটাকে পরিষ্কার করে। সব পাতাটাতা ঝরিয়ে দেবার পর ডালটাকে বেশ একটা চাবুকের মত দেখায়। বাঘারু লাঠিটাকে সামনে ধরে দেখে। গায়ের চামড়াটা খুলে দিলে ভেতরের রঙটা বেরিয়ে পড়ত। কাঁচা সিসু কাঠের ভেতরের রং সরষের তেলের মত ঝকঝক করে। কুড়ালিয়ার হ্যান্ডেলটা ডান বগলে চেপে ধরে সে গোড়া থেকে একটু-একটু চাছতে শুরু করে। এতক্ষণে, ঐ ঝড়ো বাতাস সত্ত্বেও ফরেস্টের কাঁচা সবুজের গন্ধ বাঘারুর নাকে আসে—ডালটার চামড়ার ভেতর থেকে উঠে আসছে। এই গন্ধটাতে বাঘারু নিজের অজ্ঞাতেই একটু স্বস্তি পায়। গাছের ওপর এ রকম একটা মাচান পেতেছে, তার হাতে ডালের রস লাগছে, নাকে ফরেস্টের গন্ধ-বাঘারু যেন বন্যায় ভেসে যাচ্ছে না, ফরেস্টেরই ভেতর দিয়ে হাঁটছে, বা চা বাগানের ভেতর দিয়ে।

একটা হ্যান্ডেলমত তৈরি হয়ে যাওয়ার পর বাঘারু ছাল ছাড়ানো বন্ধ করে। কুড়ালিয়াটা পাশে রেখে হাত তুলেই আবার হাত দিয়ে চেপে ধরে–যদি জলে পড়ে যায়। সে সেটা পিঠে গোজে।

তারপর দাঁড়িয়ে উঠে, দুই পা ফাঁক করে বাঘারু দুই হাতে লাঠিটা মাথার ওপরে বৃষ্টি আর বাতাসের ভেতর ঘোরায়। ঘোরাতে-ঘোরাতে তার বেশ মজাই লাগে–যেন তার লাঠিটা দিয়ে বৃষ্টি আর হাওয়ার ঐ তোড়টা ভেঙে দেয়া যাচ্ছে। সেই মজাতেই বাঘারু লাঠিটাকে নামিয়ে আনে যেন আরো বাস্তব প্রতিরোধের সঙ্গে লড়ে আনন্দ পেতে আর গাছের ডালপালাগুলোর ওপর মারতে থাকে-হে-হে-হে-হে–এই রকম আওয়াজ তুলে।

হঠাৎ লাঠির ঘায়ে ডালগুলো থেকে, এবং আরো নীচের ডাল থেকেও, পাখিগুলোর একটা ঝাক বাঁচার তাড়নায় ফরফর করে আকাশে উঠে যায়। সে যে পাখিগুলোকে নীচে জলের কাছ থেকে ওপরে তুলে আনতে চেয়েছিল সেটা বাঘারুর মনে পড়ে যায়। সে এতক্ষণে সম্বোধনের সুযোগ পায়, উঠি আয় কেনে, জলের কাছতঠে উঠি আয় বলে সে লম্বা লাঠিটাকে আরো নীচে ডাইনোয়ে চালায়।

তেমন চালায় বলেই আর মাথা তুলে দেখে না। তলা থেকেও পাখিগুলো ডাকতে-ডাকতে ওপরে আসে, তারপর ডাল ছেড়ে আকাশে উঠে যায়।

তখন বাঘারু দেখে, তার লাঠির ভয়ে পাখিগুলো আওয়াজ করতে করতে ডাল ছেড়ে বড় বেশি ওপরে উঠে গেছে–এতটা ওপরে যেখান থেকে তারা আর নামতে পারছে না, ঝড়ো বাতাসের ধাক্কায় তাদের স্রোতের বিপরীতে চলে যেতে হচ্ছে আর চার-চারটি গাছের বহর নিয়ে বাঘারু তাদের তলা থেকে স্রোতের টানে সরে আসছে। সেই বাতাসের ভেতর পাখিগুলোর তলায় জল ছাড়া কোনো আশ্রয়। নেই। এ পাখিগুলো হাওয়ার বিপরীতে উড়ে এই গাছের কাছে ত আসতে পারছেই না, হাওয়া এত জোরে বইছে যে অনুকূলে পাখা মেলেও থাকতে পারছে না। নদীর ওপরে হাওয়ার, ভেতরে পাখির আঁকটা কেমন শুকনো পাতার মত ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। বাঘারু আরো সরে যেতে-যেতেও দেখতে পায়–দুটো একটা পাখি যেন আকাশ থেকে নদীতে পড়ে গেল, ঐ শুকনো পাতার মতই।

বাঘারু বিহ্বল হয়ে ঘুরে সামনে যত দূর চোখ যায় তত দূর ঘোলা জলের দিকে তাকিয়েই মাচানের ওপর আবার ঘুরে পেছনে বাতাসের ভেতর পাখিগুলোর ঝরে পড়ার দিকে তাকায়। কিন্তু তখন সে আরো দূরে সরে এসেছে।

বাঘারুর বিষাদ

সকাল আরো কিছুটা বাড়তেই বাঘারু মাচানে বসে দেখতে পায়, তার ডান হাতের, মানে তিস্তার পশ্চিম দিকের, পাড়। বাঘারু বিমর্ষ হয়ে বসে ছিল তার মাচানে–দুই হাঁটু দুই হাতে জড়িয়ে, তার লাঠিটাকে পাশে শুইয়ে। গলায় নাইলনের দড়ির বাণ্ডিল আর পেছনে কুড়ালিয়াখানও ছিল–কিন্তু বাঘারুর বসার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছিল সেসব আর সে কখনোই ব্যবহার করবে না। না বুঝে, না ভেবে অতগুলো পাখিকে গাছ থেকে ঝড়ের বাতাসের ভেতর উড়িয়ে দিয়ে যে সে মেরে ফেলল, তারপর থেকে বাঘারুর আর নড়াচড়া করে না। প্রথমে ত তার মনে হয়েছিল গাছের সবগুলো পাখিকেই সে উড়িয়ে দিয়েছে। পাখিগুলো ঐ বাতাসে ভেসে যেতেও পারল না, গাছগুলোর ওপর ফিরে আসতেও পারল না। তারপর অবিশ্যি বাঘারুর খানিকটা সান্ত্বনা জুটেছে–এই শালগাছটাতে ও আরো তিন-তিনটি গাছে আরো পাখি থেকে গেছে দেখে। একটা ঝাকই অমন আচমকা উড়ে গিয়েছিল। কিন্তু আর বাঘারুর পাখিদের সঙ্গে নেই। পাখিরা ডালপালার ভেতর দিয়ে দিয়ে ওড়াউড়ি করতে করতে যদি জলে পড়ে ভেসে যায়, যাক। তাদের বাঁচানোর চেষ্টা বাঘারু আর করতে যাচ্ছে না। এমন-কি, তাকে যদি এ গাছ থেকে ও গাছে যাতায়াত করতে হয় তাহলেও সে পাখিদের দিকে ফিরে তাকাবে না। সে না-তাকালেই পাখিগুলো তাদের মত উড়বে, থাকবে, ভাসলে ভাসবে, মরলে মরবে। বাঘারু তাই তার মাচানের ওপর স্রোতের দিকে মুখ করে দুই হাতে দুই হাঁটু জড়িয়ে দেখে তার ডান হাতে তিস্তার পশ্চিমপাড়ের ফরেস্টটা দেখা যাচ্ছে আর মাঝেমধ্যে বাধ, মাঝেমধ্যে বাড়িঘর।

বাঘারু ও-সব চেনে না। কিন্তু সে বোঝে যে-স্রোত গাছসহ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেটা পশ্চিম পাড়ের দিকেই ছুটছে। এই স্রোতটাকে ঐ পাড়ে নিয়ে গিয়ে ঠেকিয়ে দিতে পারে। আবার ওদিক থেকে আর-একটা স্রোত তাকে পশ্চিম পাড় থেকে টেনে সরিয়েও নিতে পারে। বাঘারুর হাতে যদি লম্বা সরু লগি থাকত তা হলে পাড়ের কাছাকাছি গেলে সে সেই অল্প জলে লগি ঠেলে পাড়ে ভিড়বার চেষ্টা করতে পারত। একটা পাড়ে আটকে গেলেই তার কাজ শেষ। বাকি কাজ ত গয়ানাথ আর আসিন্দিরের–মোক খুঁজিবার আর গাছ খুঁজিবার। ঠিকেই খুঁজি পাবে। গয়ানাথ গন্ধ পাবার পারে–কোটত গাছ আর বাঘারু।

বাঘারু বা দিকে, তিস্তার পুব পারে, তাকায়। কিছু দেখা যায় না। সূর্যটা যে ঐ দিক থেকেই উঠেছে সেটা বোঝা যায় ঘোলা আকাশে মেঘের আঞ্চলিক উজ্জ্বলতা থেকে। আর, দেখা যায় রেল লাইনের একটা ডিসট্যান্ট সিগন্যাল আর খুর আবছা কিছু গাছপালা। কিন্তু এসব জুড়েই তিস্তার জল ছড়িয়ে গেছে, এখনো ছড়িয়ে যাচ্ছে যেন। বাঘারুর মাচান থেকে মনে হয়, সমস্ত বন্যাটা ছড়িয়ে পড়ছে তিস্তার পুব পারে। মাচানে বসে সামনে জলের স্রোতের দিকে তাকিয়েও মনে হয় সেই দূরের পুব দিকেই জলস্রোত ধেয়ে যাচ্ছে। জল যাছে পুব পাখে, মুই গাছগিলা নিয়া যাছ পশ্চিম পাখে বাঘারু যেন রহস্যে পড়ে যায়, কিন্তু সে রহস্য নিয়ে আর-কোনো দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগ নেই। মোক ত ভাসি দিছে, গয়ানাথ ভাসি দিছে, মোক, যেইটে নিগাবে, মুই যাম।

কিন্তু আর-কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঘারুকে উঠে দাঁড়াতে হয়। কারণ, ততক্ষণে তিস্তার পশ্চিমপাড়ে চা বাগানের ফ্যাক্টরির চোঙা আর বাধ দেখা যায় ব আর, আরো একটু পরে বাঘারুর চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তিস্তার মাঝখানে কিছু গাছের মাথা আর টিনের চাল। সেই গাছ আর চালগুলোর গলা পর্যন্ত জল-চর আছিল, মানছিলা চলি গেইছে। বাঘারুর গাছের বহর সেই চরের দিকেই ধেয়ে যাচ্ছে। বায়ারুকে তার মাচানের ওপর দাঁড়িয়ে প্রস্তুত থেকেও ভাবতে হয় সে কি ঐ চরের জেগে থাকা টিনের চাল আর গাছের মাথায় গাছগুলোকে বাধবার চেষ্টা করবে?

বাঘারু তার মাচানে দাঁড়িয়ে যখনই এই ভাবনা শুরু করে, তার মনে হয় জলস্রোত যেন তখনই আরো তীব্র হয়ে সেই চরের দিকে ধেয়ে যায়, এই গাছগুলোসহ তাকে সেখানে আছড়ে ফেলার জন্যেই যেন এই জলরাশি ছুটছে। যতক্ষণ, এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেবার ছিল না, ততক্ষণ এই জলস্রোতের গতির তীব্রতা বাঘারু যেন বুঝতেই পারে নি–এক কাল অন্ধকারে ভেসে যাবার মুহূর্ত ছাড়া, কিন্তু তারপর, বিশেষত রাত শেষ হওয়ার পর থেকে, এই স্রোতের সঙ্গে বাঘারুর যেন একটা সহাবস্থানই চলছে। যদিও বাঘারু স্রোতে ভেসে যাচ্ছে–তবুও যেন তার এই ভেসে যাওয়া স্রোতনিরপেক্ষ। তেমনি এই স্রোতও বাঘারুনিরপেক্ষভাবেই বয়ে চলেছে। কিন্তু এখন বাঘারু যখন একটি সিদ্ধান্তের মুখোমুখি তখন হঠাৎই যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যে-সিদ্ধান্তই নিক বাঘারু তা কার্যকর করতে হবে এই জলস্রোতের সঙ্গে লড়ে। বাঘারু প্রতিপক্ষ হিশেবে জলস্রোতের দিকে তাকাতেই জলস্রোতের বেগ ও শক্তি তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর, অনেক, অনেকক্ষণ পর বাঘারু জলের উচ্চকিত কল্লোল শুনতে পায়। এতক্ষণ এই কল্লোল ওপরে বাতাসের সঙ্গে মিশে একটাই আওয়াজ হয়েছিল–সেই একটা আওয়াজ ভেদ করে বাঘারু তার গাছ নিয়ে যাচ্ছে।

তবু, কখনো কখনো বরং, হাওয়ার আওয়াজটা আলাদা করে সে বুঝতে পেরেছ। গাছের ডালে দাঁড়িয়ে ত তাকে হাওয়ার ঝাঁপটই সামলাতে হয়েছে। স্রোতটাকে ত সেরকম ভাবেও কখনো সামলাতে হয় নি। তাই স্রোতটা আছে, স্রোতের জন্যেই এই গাছগুলো নিয়ে সে ভাসছে, ও-সব সত্ত্বেও স্রোতটাই যেন কেমন অবান্তর হয়ে গিয়েছিল।

কিন্তু এখন, যে-মুহূর্তে বাঘারু বুঝে ফেলে এই স্রোত তাকে সামনের ঐ চরের ভেতর নিয়ে যেতে পারে এবং ঐ চরের গাছ বা টিনের চালে সে নিজেকে গাছসহ আটকে দিতে পারে, সেই মুহূর্তে, তার পায়ের তলা থেকে জলের প্রবল শক্তি কল্লোলিত হয়ে উঠে আসে। বাঘারু তার পায়ের তলার জলরাশির দিকে তাকায় না বরং সে তাকিয়ে ছিল একটু দূরেই। সেই দূরের জল দেখেই সে আন্দাজ করতে চাইছিল যদি তাকে এই জলে ঝাঁপ দিতে হয়, তা হলে স্রোতের অনুকূলে ভেসে যেতে চাইলেও কি তার শরীর ঐ স্রোতের তীব্রতার অনুকূলতা করতে পারবে? নাকি, এ জলস্রোতের বেগের কাছে সমর্থন বা বিরোধিতার কোনো আলাদা মূল্য নেই, ভাসিয়ে নেয়ার বেগে এ স্রোত সব কিছুকেই তলিয়ে নেবে? আর,এক হতে পারে বাঘারু এই নাইলনের দড়িতে ফাস বানিয়ে তৈরি থাকল, যদি ঐ চাল আর গাছগুলোর কোনো একটার পাশ দিয়ে তাদের ভেসে যেতে হয়, তাহলে, সেই ফাসটা ছুঁড়ে দেবে। যদি ফাস আটকাল, ভাল। যদি না আটকায়, তাতেও ক্ষতি নেই। কিন্তু এই বিকল্প ভাবতে-ভাবতেই বাঘারু বোঝে সেভাবে আটকানো যাবে না। তাকে জলস্রোতের সঙ্গে একটা সংঘাতে যেতেই হবে যদি সে এই চরে নিজেকে আটকাতে চায়। কিন্তু কী ভাবে সে-সংঘাত তৈরি হবে তার কোনো আন্দাজ বাঘারু করতে পারে না, অথচ তার প্রস্তুত শরীরের সামনে ঐ গাছ আর টিনের চালগুলো ক্রমেই কাছে চলে আসছে, দ্রুত, দ্রুততর।

.

অস্থায়ী নোঙর

বিশ বাইশ ঘন্টা আগে যে-চর থেকে নিতাইগজেননরেশরা গরুবাছুরগুলোকে বন্যার ভয়ে বাঁধে তুলেছিল, বাঘারু তার ফরেস্ট নিয়ে সেই চরের দিকেই ভেসে যাচ্ছিল। এখন, জলস্রোতে সেখানে। বসতির চিহ্ন জেগে আছে মাত্র দুটি-চারটি গাছের মাথায় আর টিনের চালে।

বাঘারু এখন সেই চরের দিকে ভেসে যেতে-যেতে দেখতে পায় রায়পুর রংধামালির বাঁধের গায়ে মানুষ আর গরুর সারি। তারা বাঘারুর দিকেই তাকিয়ে আছে কি না, বা, ওখান থেকে বাঘারুকে দেখা যায় কিনা–তার কোনো কিছুই বাঘারু বোঝে না। কিন্তু বন্যায় যে-মানুষ বাঁধের ওপর সংসার নিয়ে ভাসছে, সে নদী ছাড়া আর কোন দিকে তাকিয়ে থাকবে?

জলের ভেতর ঐ গাছের মাথা আর টিনের চাল বাঘারুকে একটা আশ্রয়ের ইঙ্গিত দিয়েছিল মাত্র, কিন্তু বাঁধের ওপর মানুষ আর গরুবাছুরের সারি, ত্রিপলের উড়ন্ত ছাউনি, আর প্লাস্টিকের চাদরের ওড়া দেখে বাঘারুর ভেতর নিজের অজ্ঞাতেই সিদ্ধান্ত তৈরি হয়ে যায়, এই চরটাতেই সে গাছগুলোসহ নিজেকে বাধবে। এটা প্রাকৃতিক ভাবেই ঘটে। এই বাতাস আর বৃষ্টি যেমন প্রাকৃতিক নিয়মে কয়েক দিন ধরে বয়ে চলেছে, এই জলস্রোত যেমন প্রাকৃতিক নিয়মে প্রতিদিনই এই এত জলরাশি নিয়ে এমন বয়ে চলেছে, তেমনি বাঘারু বাঁধের ওপর মানুষ আর জলের ভেতর টিনের চাল দেখে সেখানেই নিজেকে আটকানোর জন্যে সক্রিয় হয়ে ওঠে প্রায় কোনো কার্যকারণ ছাড়াই। পাড়ে, বাঁধের ওপরে মানুষ আর গরু দেখার পর বাঘারুর কাছে ঐ জলকল্লোল তুচ্ছ হয়ে যায়। সে যেমন কয়েক ঘণ্টা আগে গাজোলডোবার ফরেস্টের অন্ধকারে গয়ানাথের একটি কথায় ভাসমান গাছগুলোর ভেতর অন্ধকার জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, এখনো তেমনি অত মানুষ আর গরু দেখামাত্র সে বুঝে যায় তাকে এখানেই নামতে হবে। জলস্রোত যতই তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাক–সে এই গাছের মাথায় বা টিনের চালে নিজেকে আটকাবে।

বাঘারু সেই মুহূর্তে কিন্তু এটা ভাবে না যে সে এই চরের মধ্যে কোনো ভাবে নিজেকে আটকাতে পারলে পশ্চিম পাড়ের বাধে গিয়ে উঠতে পারবে। কিন্তু এতগুলো মানুষ আর গরুর এত কাছ থেকে বাঘারু এই সম্ভাব্য আশ্রয় ছেড়ে চলে যায় কী করে? এরপর তার আরো নিরাপদ ও আরো প্রচুর মানুষ জুটতে পারে কিন্তু সেই অনির্দিষ্ট আশায় বাঘারু এমন হাতের কাছের মানুষদের ছাড়ে কী করে? এখানে তার গাছ বাধলেও ত সে বাধটাকে দেখতে পাবে।

বাঘারু এত দ্রুত তার মাচান থেকে নেমে আসে আর ডাল বেয়ে-বেয়ে এই গাছগুলোর পেছন দিকে চলে যেতে থাকে যেন এমন পরিস্থিতিতে তাকে কী করতে হবে সেটা তার বহু অভিজ্ঞতায় জানা। পশু যেমন শুধু তার শারীরিক অনুভবশক্তিতে জেনে যায় তার শরীরকে অনাহত রাখতে, বাঘারু সেরকম ভাবেই যেন জেনে গেছে যে এই গাছগুলোর আগে ঝাঁপিয়ে নয়, গাছগুলোর পেছনে, গাছের ডাল ধরে জলে ভাসলেই সে হাতের কাছে কোনো কিছু পেয়ে যেতে পারে। যদি সেই কোনো কিছু না পাওয়া যায়, বা সেই কোনো কিছু থেকে তার হাত ফসকে যায়, তা হলে ত এই দড়ি ধরে স্রোতের টানেই আবার সে নিজের গাছে ভেসে ফিরে আসতে পারবে।

বাঘারু যে গাছগুলোর ডাল বেয়ে-বেয়ে পেছন দিকে যায় তাতে গাছগুলো দুলে ওঠে, পাখিগুলো আবার ডেকে-ডেকে ওড়ে কিন্তু বাঘারু এখন গাছটা উল্টে যাবে কিনা, ডালটা তার ভার বইতে পারবে কিনা এসব হিশেবনিকেশের মধ্যেই নেই। এমনকি পা হড়কে জলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও তার নেই। কারণ সে ঐ পেছনের গাছ থেকে জলে নামতেই যাচ্ছে। যখন বাঘারু ডাঙা ছেড়ে এই গাছের ডাল ধরে ভেসেছে, তখন, ডালপালার সঙ্গে তার শরীরের যে-সাযুজ্য মেপে-মেপে তৈরি করেছিল, এখন সেই সাযুজ্য ভেঙে-ভেঙেই সে এই গাছগুলোর পেছন দিকে যাচ্ছে।

বাঘারু তার মাচান থেকে শালগাছটারই নীচের ডালে নামে, সেখান থেকে হাত বাড়িয়ে সামনের একটা উঁচু ডাল ধরে ঝুলে নীচের একটা ডালে নামার পর বোঝে এটা পাশের সিসু গাছটা। সেই ডালটা ধরে মাথাটা নুইয়ে তরতর করে খানিকটা এগিয়ে যাবার পর বাঘারু আবার ডান দিকের একটা ডালে, শালগাছের, পা দেয়। শালগাছের ডালগুলো এত শক্ত যে বাঘারুর ওজনে জলে তলিয়ে যেতে পারে কিন্তু নিজে বেঁকে না। সেই ডালটা ধরে হেঁটে, আরো তলায় নেমে যেতে, বাঘারুকে সামনে নুয়ে সিসু গাছের ডালের ওপর হাত রাখতে হয়। শালের ডালটা ডুবে জল তার পা ছাপিয়ে ওঠে। বাঘারু এবার শালগাছটা ছেড়ে দিয়ে সিসু গাছটার তলার দিকের একটা মোটা ডাল ধরে জলে নামে। ডালটা জলের গায়ে লেগে ছিল। বাঘারু ঝুলে পড়ায় আরো তলে ডুবতে থাকে। বাঘারুর শরীরটা স্রোতের ধাক্কায় ডালটার সমান্তরালে ভাসে। সমান্তরাল সেই শরীরে সে ডালটা ধরে ধরে আরো তলার দিকে নামে। নেমে গিয়ে একেবারে তলায় যে-গাছটা আড়াআড়ি ছিল তার সামনে পড়ে। এই গাছটা সে এতক্ষণ চিনতে পারে নি। এখন সিসুগাছটার ডাল ছেড়ে ঐ গাছটার যে-কোনো একটা ডাল ধরার জন্যে হাত বাড়িয়েই চেনে, চাপা গাছ।-যে-ডালটাতে তার হাত পড়েছিল সেটা নেহাৎই পাতলাধরতে না-ধরতেই বাঘারু জলের তলায় ডুবে যায়। ডুবতে-ডুবতেই হাত বাড়িয়ে আর-একটা ডাল ধরে মাথাটা তোলে। তার মাথা অনেকগুলো পাতলা ডালের ভেতর আটকে গেলে বাঘারু আবার ডুব দেয়। জলের তলাতেও তাকে আটকে দেয়ার মত আগডাল ছিল কিন্তু বাঘারু দুই হাতে সেগুলো সরিয়ে ও ভেঙে চাপা গাছটাকে পেরিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। এটা গাছটার মাথার দিক-বাঘারু স্রোতের ধাক্কায় তখন চাপা গাছটার সঙ্গে লেপ্টে আছে, সে গাছটার শেকড়ের দিকে সরে যায়, তারপর গাছটার ওপর উঠে বসে। তার মাচান থেকে বাঘারু এই বন্যার স্রোতের ভেতর দিয়ে এমন ভাবে এই চাপা গাছের গোড়া পর্যন্ত চলে আসে, যেন, আসার পথটা তার প্রতিদিনের অভ্যাসে চেনা।

বাঘারু দেখে একটা পোয়ালের বাশ পেরিয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে বুঝে ফেলে সে চরটাতে ঢুকে পড়েছে। মাত্র কয়েকঘণ্টা আগে এখানে মানুষের বসতি ছিল। জলের ঠিক তলায় কোথায় কী উঁচিয়ে আছে তা বলা যায় না। বাঘারু জলে নামতে গিয়ে নামে না। কিন্তু নাইলনের ছড়ির বাণ্ডিলটা অনেকটা খুলে স্রোতের বিপরীতে প্রায় প্রস্তুত হয়ে থাকে যে একটা কোনো শক্ত গাছের ডাল পেলেও ঝুলে পড়বে। বাঘারু দেখে, একটু দূরে-দূরে দুটো-একটা টিনের চাল জেগে আছে কিন্তু সে-সব চালে পৌঁছুনো যাবে না। হঠাৎ গাছগুলো আটকে যায়। গাছের তলার জল ফুলে ওঠে। কোথাও আটকে গেছে। বাঘারু সুযোগটা নিতে চায় কিন্তু সে নড়াচড়া করলে ত বাধাটা সরেও যেতে পারে। বাঘারু কোনো রকমে একটা সরু ডাল ধরে দাঁড়িয়ে দেখে দু-তিনটে সুপুরি গাছের ভেতর গাছগুলো আটকা পড়েছে। কিন্তু স্রোতের বেগে এই চাপা গাছটাই ঘুরে সামনে চলে যাচ্ছে। বাঘারু প্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। চাপা গাছটা আর-একটু ঘুরতেই দেখে, সুপুরি গাছগুলোর পশ্চিমে একটা টিনের চাল। বাঘারু বসে পড়ে জলে তার দুই পা নামিয়ে দেয়। যেই সুপুরি গাছগুলোর কাছাকাছি আসবে সে জলে ভেসে ঐ টিনের চালে উঠবে একটা সুপুরি গাছের সঙ্গে দড়িটা পেঁচিয়ে দিয়ে। কিন্তু চাপা গাছটা আর ঘোরে না, থেমে যায়। বাঘারু কোনাকুনি জলে ঝাঁপ দিয়ে মুহূর্তে একটা সুপুরি গাছের মাথা জড়িয়ে ধরে হেলে পড়ে।

নিতাইদের চরে বাঘারু তার গাছগুলো নিয়ে থেকে যাওয়ার জায়গা পেয়ে যায়। কারো একটা সুপুরি বনে গাছগুলো আটকে গেলে জলের ওপর জেগে থাকা সুপুরি গাছের মাথায় উঠে পড়ে বাঘারু, তারপর এক সুপুরি গাছ থেকে আর এক সুপুরি গাছ করে এই টিনের চালের মাথায়। বাঘারুর পক্ষে বাছাই করা মুশকিল–গাছগুলোর ভেতরে বানানো মাচানে বসে থাকা, সুপুরি গাছের আগায় ওঠা আর এই টিনের চালে পা ছড়ানোর মধ্যে কোনটা বেশি লোভনীয়। কিন্তু এখানে ত আর তার কোনো পছন্দের ব্যাপার ছিল না। যেন এখানে আটকে যাবার জন্যেই গয়ানাথ তাকে ভাসিয়ে দিয়েছিল–গাছগুলো এমনই এখানে আটকে যায়। আর, এত বাছাবাছিরই বা কী আছে? টিনের চালে বসে থাকতে খারাপ লাগলে সুপুরি গাছের মাথায় চলে যাবে। সেখানে ঝুলে থাকতে খারাপ লাগলে আবার দোল খেয়ে গাছের মাচানে ফিরে যাবে নাইলনের ঐ দড়ি দিয়ে গাছগুলোকে এমনই প্যাচাতে-প্যাচাতে এসেছে বাঘারু যে এখান থেকে সেগুলো আর ভেসে যেতে পারবে না।

বাঘারু টিনের চালের ওপর পা ছড়িয়ে বসেছিল রায়পুর রংধামালির বাঁধের দিকে তাকিয়ে। সেই একই হাওয়া, একই বৃষ্টি, একই বন্যা অথচ এই চালের থেকে ঐ বাধটাকে কত রঙিন দেখাচ্ছে। এমন-কি মানুষজনের চলাফেরা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গরুগুলোর রঙও আবছা চিনতে পারছে বাঘারু। একটা বা দুটো মোষও আছে। মেয়েদেরও চেনা যাচ্ছে। শুধু এদের কারোরই মুখ বোঝা যাচ্ছে না। এই টিনের চালের ওপর বসে বসে শুধু জল ছাড়া ওপরের বাঁধের এই সব দৃশ্য দেখাটা ত খুব আরামের।

বাঘারুর পক্ষে কোনো দৃশ্য দেখে ক্লান্ত হওয়া সম্ভব নয়, কারণ সে সব সময়ই দৃশ্যের অংশ। এই এত বনা আর এত জল দেখেও সে ক্লান্ত নয়। কিন্তু ক্লান্ত না হলেও সে ত দৃশ্যান্তর বোঝে। এখন, এই টিনের চাল থেকে ঐ বাধ একই দৃশ্যান্তরের কাজ করে যাচ্ছে। তা ছাড়া, একটা কাজও ত শেষ হল। তাকে গাছের সঙ্গে গয়ানাথ ভাসিয়ে দিয়েছিল ত কোথাও এরকম আটকে যাওয়ার জন্যেই। আটকে থাকার জন্যেও। এখন আসিন্দির জোয়াই-এর ভটভটিয়ার পেছনে বসে গয়ানাথ তাকে যখন খুঁজে পাবে তখন পাবে। বাঘারুর আর-কিছু করার নেই।

এখনো ত জল বাড়ছেই, হাওয়া বাড়ছেই। চারদিকে কোথাও কোনো ইশারা নেই, যা দেখে আন্দাজ করা যায় যে বন্যাটা এবার কমবে। কিন্তু এখন আন্দাজ পাওয়া না গেলেও বন্যা ত একদিন কমবেই। তখন, জলের সঙ্গে-সঙ্গে বাঘারু তার গাছগুলো নিয়েও নামতে থাকবে–এই জলের তলায় কার ঘরবাড়ির আঙিনায় কে জানে? জল নামলেও তখন বাঘারুকে এখানেই অপেক্ষা করতে হবে–গয়ানাথ কবে তাকে খুঁজতে পাবে তার অপেক্ষায়।

কিন্তু তখন, এই চারপাশের দৃশ্যও ত বদলে যাবে। এখন ত মনে হচ্ছে চারদিকে শুধু জল। এর একটা সুবিধে আছে নানা রকম জিনিশে চোখ আটকে যায় না। কিন্তু তখন ত ডাঙা জেগে উঠবে। ডাঙা মানেই জমি। জমি মানেই আল। আল মানেই মালিক। মালিক মানেই বাড়ি। বাড়ি মানেই টাড়ি। টাড়ি মানেই গাও-গঞ্জ-শহর। তখন চারদিকে কত জিনিশ, কত উঁচুনিচু, কত বাকাচোরা, কত সোজাউল্টো। সে ত রোজ যেমন থাকা তেমনি থাকা। এখন ত রোজকার মতন থাকা না। সেই রোজকার দিনটা এখন জলে ঢাকা পড়ে আছে। জলের কোনো মালিক নেই। তাই জলের কোনো আল নেই। আল থাকলেও বাঘারুর কিছু যায়-আসে না, আল না থাকলেও কিছু যায়-আসে না। কিন্তু এখন এই টিনের চালের ওপর বসে আলহীন জল দেখতে খুব ভাল লাগছে। আরো ভাল লাগছে, এই কথা ভাবতে যে এ-জলে কেউ আল বাধতেও পারবে না। বাঘারুর তাই বেশ মজা লাগে এই ভেজা টিনের চালের মাথায় বসে সামনের একটা জলের ওপারে পশ্চিম পাড়ের বাঁধের লোজন দেখতে।

কিন্তু এটাও একটা টিনের চাল। এখানে ত একটা সুপুরি বাগান। আরো কয়েকটা টিনের চাল, আরো কিছু গাছগাছালি দেখা যাচ্ছে। আবার, এখান থেকে তাকিয়েই বোঝা যায় এরকম কিছু চাল, কিছু গাছগাছালির পর তিস্তার বন্যা তিস্তার বন্যার মতই বয়ে চলে। সেই দূরের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার এই দুটো-চারটে গাছগাছালি টিনের চালের ওপর চোখ ফিরিয়ে আনলে মনে হয়–এগুলোও যেন তিস্তার বন্যায় ভাসছে, যেমন গাছ নিয়ে ভাসতে-ভাসতে বাঘারু এসে গেছে। বাঘারু যে-জলটা অন্ধকারে, আবছা আলোয়, হাওয়ায়, বৃষ্টিতে পেরিয়ে এসেছে, আর এই চালে আর সুপুরি বাগানে আটকে না গেলে সামনের ঐ জলের ধারালো যে-স্রোতে সে এখনো ভেসে যেত-সেই দুইয়ের মাঝখানে তার গাছের বহরকে বেঁধে রেখে এই টিনের চালের ওপর বসে এটা বুঝতে পারে এখানে বাড়ি ছিল, যেমন মানুষের থাকে, এখানে সুপুরি বাগান, খেত, ধানবাড়ি, গোয়ালিয়া ছিল যেমন মানুষের গা-গঞ্জে থাকে। এই জল, এই বন্যা, সেই বাড়িস্টাড়ি গা-গঞ্জকে ঢেকে দিয়েছে শুধু। বাঘারুর ত কোনো বাড়ি নেই, টাড়ি নেই, বাঘারুর কোনো গাছ নেই, আল নেই। বাড়ি আছে গয়ানাথের, টাড়ি আছে। গয়ানাথের, ফরেস্টের গাছ আছে গয়ানাথের, ফরেস্টে গরুমোষের বাথান আছে গয়ানাথের। এই যেখানে সে বসে আছে সেখানেও জলের তলায় গয়ানাথের বাড়ি, টাড়ি, বাগান, ফরেস্ট, ধানবাড়ি, গোয়ালবাড়ি, গরু মোেষ আছে। জল যখন নেমে যাবে–গয়ানাথ তাকে খুঁজে বের করবে, তার ফরেস্টের চারটি গাছের হিশেবনিকেশ বুঝে নেবে, গয়ানাথের বাঘারু আবার গয়ানাথের কাছে ফিরে যাবে। জল যখন নেমে যাবে–এই এখানকার জলের তলায় জমি জেগে উঠবে, বাড়িটাড়ি জেগে উঠবে, ফরেস্ট জেগে উঠবে। এখন এখানে এই ভেজা টিনের চালের ওপর বৃষ্টি আর হাওয়ার মধ্যে বসে ঘালাটে জলস্রোতের ওপর দিয়ে ঐ পাড়ের মানুষজন, গরু মোষের দিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে বাঘারু যেন ভৈবে ফেলতে চায়–এই জলটাই থাকুক, সব আলবাড়িটাড়ি-ফরেস্ট-গরুবাছুর ডোবানো এই জলটাই থাকুক, যে-জলটা দিয়ে বাঘারু ভেসে এল সেরকম জল দিয়েই বাঘারু আরো ভেসে যাক, এতই ভাসুক যে গয়ানাথ আর আসিন্দির আর তাকে খুঁজে পাবার সুযোগ পাবে না।

বাঘারু যে ঠিক এরকমই ভেবে ফেলতে পারে, তা নয়। ঠিক এতটা এরকম করে ভেবে ফেলার মত অভ্যেসও তার নেই। সে ত ভাবতে পারে কেবল তার শরীর দিয়ে। সেই শরীরেই আসলে বাঘারু এই জলের মধ্যে বসে থাকতে ক্লান্ত বোধ করে না, একাকিত্বও বোধ করে না বরং তার শরীরের ভেতরে কোথাও যেন ভবিষ্যতের এক কুণ্ঠা আগে থাকতেই দানা পাকিয়ে ওঠে যে আবার তাকে কোনো এক দিন এই চাল থেকে মাটিতে নামতে হবে। তার শরীরের ভেতরেই বাঘারু এই মাটিঢাকা, বাড়িটাড়িঢাকা, জমিজিরেত-সুপুরি বাগান-গাছগাছালিঢাকা বন্যার জলের সঙ্গে আত্মীয়তা বোধ করে ফেলে আর সেই আত্মীয়তাবোধ থেকেই জলের তলার মাটি থেকে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাও তার শরীরে এসে যায়।

জলে ভেসে যাওয়া থামতেই, আর এই এখানে এসে নিজেকে বেঁধে ফেলতেই, বাঘারুর শরীর জানান দেয়। তার খিদে পাচ্ছে। বাঘারুর ত এমনি খিদে পাওয়ার অভ্যেস নেই। গয়ানাথের বাড়িতে যখন তাকে খেতে দেয়, তখন তার খিদের একটা অংশ মেটে, কিন্তু এখানে ত বাঘারুকে কেউ ভাত দেবে না। বাঘারু এই সব গাছগাছালির মাথার দিকে তাকায়–সেখান থেকে কিছু খাবার পাওয়া যায় কিনা খুঁজতে। একটা সুপুরি গাছে পাকা সুপুরি আছে, অন্য গাছগুলোতেও কাঁচা সুপুরির গোছা। কিন্তু বাঘারুর খিদে কি এত সুপুরিতেও মিটবে?

.

জলের দিগবিদিক

রবিবার ভোর হতে না-হতেই রংধামালি রায়পুর চা বাগানের বাধ থেকে দেখা যায়, পুবপারে তিস্তা একের পর এক গঁ ও বন্দর ছাড়িয়ে প্রায় ময়নাগুড়ির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তার মানে, দোমোহনি ততক্ষণে তিস্তার প্রায় মাঝখানে। জলপাইগুড়ি শহরের কাছারির বাধ থেকে দেখা যায় তিস্তা সেই বানেশ বন্দর ছাড়িয়ে ল্যাটার্যাল রোডের কাছাকাছি চলে গেছে। আবার, তিস্তার পুব পারের বাকালি-পদমতী, বা আরো ভাটির জোড়পাকড়ি থেকে দেখা যায় বুড়ি তিস্তার খাতের মধ্যে তিস্তা ঢুকে যাচ্ছে।

পুব পার থেকে পশ্চিম পারের, বা, পশ্চিম পার থেকে পুব পারের তিস্তা দেখার বা বন্যা মাপার প্রধান। নিরিখ হচ্ছে তিস্তার মাঝখানের কোন-কোন চর অদৃশ্য হয়ে গেল সেই হিশেব : নদীর এক পার থেকে অন্য পারের দৃশ্য ত সারা বছর দেখতে-দেখতে মানুষের চেনা হয়ে যায়। দোমোহনির পুরনো ডিসট্যান্ট সিগন্যাল, নিতাইদের চরের কোনো বড় গাছ, জলপাইগুড়ির কমিশনারের বাড়ির পেছনের অর্জুন গাছ, বার্নেশের সামনে ভামনি বনের চরটা, কাশিয়াবাড়ির কাছে নদীর তিনমুখো ধারার মাঝে-মাঝেই চিকচিকে বালির চরগুলো–এই সবই মোটামুটি ভাবে নদীটার সীমা সরহদ্দ ঠিক করে রাখে। রবিবার সকালে সূর্য উঠতে না উঠতে দেখা গেল–এই সব সীমাচিহ্নই লোপাট, যতদূর চোখ যায় তিস্তার ঘোলাটে জল ছড়িয়ে গেছে।

রাতের অন্ধকারে জলটা ছড়াল আর ভোরে সূর্যের আলোতে সেটা সকলের চাক্ষুষ হল–তা ত নয়। এখন শুক্লপক্ষ চলছে, সুতরাং রাতে তত অন্ধকার ছিল না। কিন্তু সেই যে বৃহস্পতিবার থেকে আকাশের ঘোলাটে মেঘ জল-ডাঙা মিলিয়ে চরাচরকে ঢেকে দিয়েছে, আর ঝড়ের মত বাতাস বৃষ্টির সঙ্গে বয়েই চলেছে–তার ভেতর দিয়ে কতটুকু আলো আর গলতে পারে? তবু, সারা রাতই রাতের শেষ প্রহরের মত একটা আবছা ভাব ছড়িয়ে ছিল। সেই আবছায়ায় অবিশ্যি আরো বেশি মনে হতে থাকে যে এমন-কি আকাশের ভেতরেও তিস্তার বান ঢুকে গেছে। ভোর হওয়ার আগে সেই আবছা আলোটা মুছে যায়। চঁদ ডোবা আর সূর্য ওঠার মাঝখানে কিছু সময়ের একটা অন্ধকার বিরতি ছিল। সেই বিরতিটা সূর্যোদয়ে একেবারে কাটে তা না, কারণ, ঐ ঘোলাটে আকাশের কোন তল্লাটে সূর্য উঠেছে। তার হদিশ পাওয়া ভার। কিন্তু সেই অন্ধকারটা কাটতে না কাটতেই ধীরে ধীরে যেন বোঝা যায় সারা রাতের মধ্যে তিস্তার জল একটুও কমে নি। তারপর আলো আর-একটু স্পষ্ট হলে বোঝা গেল, জল পাড় ছাপিয়ে উঠে এসেছে। নিজের পাড়ে তিস্তার জলের বাড় দেখে তখনো আশা থাকে, জল তাহলে এদিকেই গড়িয়েছে বেশি, অন্য পাড় তাহলে এখনো ভাসে নি। ঘোলা আলো আর-একটু বাড়তে না বাড়তেই দেখা যায়, শনিবার সন্ধ্যায় চিরকাল দেখা যেসব গাছগাছালি, বা ডিসট্যান্ট সিগন্যাল, বা বালি, বা বাক একে-একে অদৃশ্য হতে-হতে তিস্তার অপর পারটাকে মুছে দিল সেগুলোর কিছুই আর ভোরের আলোতেও দেখা যাচ্ছে না। যেন রাতের আবছা আলোতে তিস্তার দুই পাড় তিস্তার বন্যায় ভেসে-ভেসে নতুন কোনো জায়গায় এসে পৌঁছেছে-নদীর মাঝখান থেকে নতুন সেই দুটো পাড়। দেখতে হচ্ছে। যেন, কেউ আর নদীর এক পাড়ে দাঁড়িয়ে নেই-সকলেরই সামনে-পেছনে নদীর দুই পাড়। আলো আরো একটু বাড়লে প্রথম দেখার সেই বিভ্রমটুকুও কেটে যায় আর চোখের হিশেব দিয়ে তখন মাপতে-জুগতে হয়-তিস্তা কোন পারে কোথায় কদ্দূর ঢুকল। রাতের আবছায়ায় তিস্তার এই এমন আক্রমণের ভেতর যেন কোথাও অবিশ্বস্ততা আছে, বা, নিজেদের অপ্রস্তুতির ভেতর আছে অসহায় আত্মসমর্পণের অনিবার্যতা–সেটা কেটে যায় আলো আরো একটু বাড়তেই। তখন বোঝ যায়–আকাশ যেমন ছিল সেই বৃহস্পতিবার থেকে, রবিবার সকালেও তেমনই আছে, বৃষ্টি যেমন ছিল সেই বৃহস্পতিবার থেকে, রবিবার সকালে তেমনই। আর তখনই দিনের আলোয় এই হিশেবটা কঠিন সত্য হয়ে ওঠে–জলও ত তা হলে যেমন সেই বৃহস্পতিবার থেকে বাড়ছে, তেমনি বাড়তে থাকবে। আর তেমনি বাড়তে থাকলে কী হবে?

এই হিসেবনিকেশের একটা স্তরপরম্পরা আছে। তিস্তা যদি সেই বৃহস্পতিবার থেকে এই একই বাতাস আর একই বৃষ্টির সঙ্গে একই বেগে বেড়ে থাকে, তা হলেও গত তিন দিনের সেই বাড়া আর এখন এই রবিবারের বাড়ার অর্থ এক নয়। বৃহস্পতিবার থেকে তিস্তা বাড়ছিল প্রথমে নিজের খাতটা ভরে ফেলে, তারপর সেই খাতের মধ্যে ছোটখাট নানা চরজমি ভাসিয়ে, তারপর আরো একটু চর ভেঙে, কখনো পুব কখনো পশ্চিম পাড়ে ছোটখাট ভাঙচুর ঘটিয়ে। তারপর শুক্রবার রাত্রি থেকেই ত শুরু হয়ে গেছে–পুরনো কায়েম চরও ভাসানো। কিন্তু তারও একটা হিশেব ছিল। তিস্তার জলের তলার মাটির ঢালের হিশেব। সে হিশেবের কোনো মাথামুণ্ডু নেই। কারণ কেউ কি জানে, কয়েক বছর ধরে কোন জায়গায় পাহাড়ের বালি, পাথর, মাটি জমিয়ে তিস্তা তার তলদেশকে উঁচু করে ফেলেছে কতটা? বা, পাহাড়ের খাজে-খাজে যেসব হ্রদে জল জমে থাকে সেগুলো ভেঙেচুরে তিস্তায় বৃষ্টির জল ছাড়াও বাড়তি জল ঢুকেছে কতটা? কিন্তু মাথামুণ্ড না থাকলেও ত সবাই একটা আন্দাজ করতে চায়। সেই আন্দাজের, কাল শনিবারের সন্ধ্যা পর্যন্তও, একটা মানে ছিল। এমনকি কাল রাতেও ছিল। তখন ত আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না যে তিস্তা সব আন্দাজ কেমন ভাসিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু আজ রবিবার ভোর হতে না-হতেই, তিস্তার জলপ্রান্তর ঐ নিচু আকাশের তলায় দৃশ্য হতে না-হতেই বোঝা গেল, তিস্তা আর-কোনো হিশেবের মধ্যে নেই, কোনো আন্দাজ দিয়ে আর বোঝা যাবে না জল কী ভাবে বাড়বে, কী ভাবে ছড়াবে। নদী এখনো দু পাড়ের বাঁধের অনেক নীচে, বোল্ডারের জালের অনেক দূরে। বোন্ডারের জালের নীচে, পাড়ে, যদিও জল এসেছে, তাহলেও বোঝা যায়, ওটা স্রোতের ধাক্কায় আসা জল। ঐ জায়গাগুলো এখনো বানের জলে ভরে নি। কিন্তু বানের জল ঢোকার জন্যে ত ঐ জায়গাগুলোই মাত্র এখনো বাকি আছে। পাড়ের ঐ জায়গাতেও যদি জল ঢুকে যায়, তা হলে ত এখন বাকি থাকবে বোল্ডারে জাল। ঐ বাধা পাথরের সঙ্গে এখন স্রোতের ধাক্কাধাক্কি শুরু হবে। কিন্তু তার আগেই ত কোথাও, কোনো নিচু পাড়ে বন্যার জল ঢুকে বোল্ডারের ফাঁকগুলো দিয়ে বাঁধের গোড়ায় চলে যেতে পারে। এই এত জলের এত স্রোত কোথাও যদি বাধে এক চুল ভাঙন ধরাতে পারে তা হলে সে বাধ রক্ষা করে সাধ্য কার? সেরকমই ত হয়েছিল, আটষট্টিতে। সেই রবিবারের সকালে তিস্তার ওপর আটষট্টি সালের স্মৃতি যেন বাস্তব হয়ে উঠল।

তিস্তার এই জলপ্রান্তরে এখন কোনো কিছু দাঁড়িয়ে নেই, নিজের দিকচিহ্নগুলো উপড়ে ফেলেছে তিস্তা, এখন সে সব তিস্তার জলের অংশ। ঘরের চাল, গাছ, সব ভেসে যাচ্ছে। কচুরিপানার মত সবুজের আভাস দিয়ে ধূসর জলে চকিতে ভেসে যায় ফরেস্টের গাছ। ওপরে কোথাও তিস্তা কোনো ফরেস্টের ভেতর ঢুকে পড়েছে। তা হলে তিস্তা কি নতুন কোনো ফাঁক পেয়ে গেছে? সেখান দিয়ে এই জল অনেকটা বয়ে যেতে পারবে? তা হলে এই ভাটিতে জল পাড় না-ভাঙতেও পারে? নাকি ঐ ওপর থেকেই তিস্তা সব পড়াতে-ওপড়াতে আসছে? কাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ত জলে ফরেস্টের গাছ দেখা যায় নি! রাতে কখন শুরু হল–এই ফরেস্ট-উৎপাটন?

.

কমলেকামিনীদর্শনতুল্য চালে বাঘারুদর্শন

এরকম অবস্থায় রায়পুর রংধামালির বাঁধের ওপর থেকে দেখা গেল নিতাইদের চরের একটা টিনের চালের ওপর একটা লোক এদিকে মুখ করে বসে আছে। ঐ চালটা অশ্বিনী রায়ের বাড়ি। বাঘারু তার গাছের বহর নিয়ে যখন ঐ চরে ঢুকেছিল সেটা কারো চোখে পড়েনি-চোখে পড়ার কথাও নয়। সকাল থেকেই ত মাঝনদী দিয়ে ফরেস্টের গাছ ভেসে যাচ্ছে। বাঘারু তার গাছগুলোর ভেতরে যে-ভাবে মাচানে বসে ছিল, গাছগুলো নিয়ে যেভাবে চরে ঢুকল, সুপুরি গাছে যে-ভাবে গাছগুলোকে বাধল–সে সব এই রায়পুর-রংধামালির বাঁধের ওপর থেকে দেখা যেত। কিন্তু কেউই ত সে রকম ভাবে ওদিকে তাকিয়ে থাকে নি। বরং তিস্তা আরো কত নতুন-নতুন দিকে ছড়িয়েছে সে-সব আঁচ করাটা ছিল দরকারী। কিন্তু লোকটা যখন অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর পা ছড়িয়ে বসে এদিকেই তাকিয়ে থাকে তখন সেই লোকটা আর বাধটার মাঝখানে কোনো বাধা থাকে না। তাকে দেখতেই হয়–এই বাঁধের ওপর থেকে সবাইকে এক সঙ্গেই দেখতে হয়। আর দেখামাত্রই কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে, মানষি ভাসি যাছে, মানষি ভাসি যাছে।

এই কথাটা ভয়ঙ্কর। তিস্তা তার পাড়ের ফরেস্ট উপড়ে আনছে–সেটা বোঝা যায়। কত জায়গাতেই ত তিস্তা আর ফরেস্ট পাশাপাশি, গায়ে গা লাগানো। সেখানে ফরেস্টের দু-চারটে ব্লক এমন ফ্লাডে ভাসতেই পারে। কিন্তু গাছ নয়, মানুষ ভেসে আসছে, মানে ওপরের কোথাও কাল রাতে সকলের অজান্তে তিস্তা টাড়িতে গায়ে ঢুকে গেছে, বস্তি ভাসিয়ে দিয়েছে। মানে, ওপরে কোথাও আটষট্টি ঘটে গেছে। নিশ্চয়ই এমন কোথাও ঘটেছে, যেখানকার মানুষ এমন ঘটবে ভাবে নি। নইলে মানুষ ভাসবে কেন? কিন্তু চোখের সামনে ত এই দেখাই যাচ্ছে, আপাদমস্তক একটা মানুষ তিস্তার জলে ভেসে এসে অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর বসে আছে।

বাঁধের লোকজন ব্রাঘারুর ওপর থেকে চোখ সরিয়ে তিস্তা ধরে উত্তরে তাকায়–আরো মানুষ ভেসে আসছে কিনা দেখতে। মানুষ ভাসলে ত আর একটা মানুষ ভাসতে পারে না। কিন্তু এ মানুষটিকে যেমন ভাসতে দেখা যায় নি, একবারেই অশ্বিনী রায়ের চালে দেখা গেছে–তেমনি অন্য মানুষদেরও হয়ত কেবল তখনই দেখা যাবে যখন তারা এরকম কোনো গাছের মাথায় বা চালের মাথায় উঠবে।

কিন্তু তার ভেতরই ছোটদের মধ্যে কেউ চিৎকার করে ওঠে, ঐ একখান ভাসি আসিছে, ঐ একখান।

কোটত কোটত?

নিতাই চিৎকার করে ওঠে, কেডা দেখছে রে? কায় দেখিছে? দেখা।

জগদীশ বারুই নিজের কপালের ওপর বা হাত দিয়ে চেঁচায়, কেডা দেখলিরে? কয়ডা মানুষ? বেটাছেলে না মেয়েছেলে?

জগদীশের কথায় কেউ-কেউ হেসে ওঠে। কে একজন বলেও, আরে আপনার সেই মানাবাড়ির মাগিটাই ত ভাইস্যা আইসছে। এহন সামলান গিয়া।

জগদীশ রাগ করার সময় পায় না কিন্তু তার ছানিপড়া চোখেও নিবিষ্টভাবে দেখতে চায়। নিতাই আবার চিৎকার করে, কেডা দেখলি রে? দেখা।

ছোটদেরই আর-একজন কেউ বলে, ঐ ত, আরে ঐ ত, ঐ যে, মাথাখান দেখা যায়। এই পাকে, এই পাকে। বাঁ হাত দিয়ে সে দিক বোঝায়।

সকলেই চুপচাপ খুঁজে বের করতে চায়। একজন বলেও, হয়। মাথোখান ডুবিছে আর ভাসিছে, ডুবিছে আর ভাসিছে।

নরেশ পেছন থেকে বলে, আরে, কিছু দ্যাখব্যারই পাই না, তুরা এহেবারে ডোবা ভাসা শুধধ্যা দেইখ্যা ফেললি?

নিতাই হঠাৎ হাত তুলে বলে, খাড়া, খাড়া, এই কুনটা ডুবে-ভাসেরে, এইডা? এই যে ভাসি যায়, এইডা? নিতাই তার আঙুলটা দিয়ে নদীর ভেতরের একটা জায়গা দেখায়।

একটা অনির্দিষ্ট গলায় অনিশ্চিত জবাব আসে, তাই ত, ঐডাই

নিতাই নিজের সন্দেহটা আরো জোর দিয়ে জানায়, ঐডাই ত?

এবার কেউ জবাব দেয় না। নিতাই একটু পরে বলে, মানষি না, কাঠ। কাঠ। কিন্তু নিতাইয়ের কথায় কোনো জোর ছিল না। বলার পরও সে দেখে যায়। এবং যা দেখছিল সেটা দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যাচ্ছে যখন তখন বলে ওঠে, কাঠই ত মনে হইল! তগ কি মানষি মনে হইল রে?

নিতাই কাকে জিজ্ঞাসা করল, সে নিজেই জানে না। কিন্তু বাধসুষ্ঠু সবাই আবার নতুন করে খোঁজে, নদীর সেই ভেতরের জল দিয়ে কোনো মানুষ ভেসে যায় কি না! নিতাইও যেখানে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে।

নরেশ পেছনে ছিল। সে কিছুই দেখতে পায় নি, কোনো সন্দেহও প্রকাশ করতে পারে নি। সে হঠাৎ পেছন থেকে নিতাইকে ডেকে বলে, এ নিতাই। অশ্বিনীদার চালের উপর যেইডা বসি আছে, সেইডা ত মানষি, নাকি ঐটাও কাঠ?

তখন সবাই আবার বাঘারুর দিকে তাকায়। বাধ থেকে বাচ্চারা চিৎকার করে হাত নাড়ে। কিন্তু বাঘারু তার কোনো সাড়া দেয় না। বাচ্চারা চিৎকার বাড়ায়। তাতেও বাঘারু সাড়া দেয় না বা হাত নাড়ায় না। অমূল্য ধমক দিয়ে ওঠে, থামা ত চিল্লানি, পাশের মানুষের কথা শুনা যায় না এমন হাওয়া আর ওরা চিল্লাবার ধরছে। তারপর গলা নামিয়ে ডাকে, নিতাইদা।

অমূল্যর ডাক শুনে নিতাই প্রথমে পেছনে তাকায়, তারপর সেখান থেকে অমূল্য নরেশের কাছে চলে আসে।

অমূল্য জগদীশকেও ডাকে, কাহা।

কী কস? বলে জগদীশও এগিয়ে আসে, রমণী সরকারকে ডাক।

আরে থামেন ত। কিছুর মধ্যে কিছু নাই, এর মধ্যি ডাকাডাকির কী হইল?

আপনে আইসেন না এই দিকে। কী কস্ অমূল্যা?

অমূল্য বলে, কই কি–নিতাইদা ডেপুটি কমিশনারকে একটা ফোন কইর‍্যা দ্যাও রায়পুর বাগান থিক্যা।

কী কব?

কবা, এইখানে দেখতাছি তিস্তা দিয়া মানুষ ভাসি আইস্যা চরের চালে বইস্যা আছে।

নিতাই একটু ভাবে। নরেশ বলে, যা নিতাই, ফোন কইরা দে, মানুষ ত সত্যি-সত্যি বইস্যা আছে।

জগদীশ বারুই কাপড়ের গিঠ থেকে দুটো বিড়ি বের করে একটা নিতাইকে দিয়ে বলে, যা, কইর‍্যাই দে ফোন।

নিতাই বিড়িটা ধরিয়ে চুপ করে টানে। অমূল্য বলে, ভাবো কী, নিতাইদা।

নরেশ নিতাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আন্দাজ করার চেষ্টা পায় নিতাই কী একটা ভাবছে।

না। কই কী–আমি ভাবছিলাম এ্যাইন ভোলারে নিয়্যা সাইকেল কইর‍্যা, নিতাই সাইকেল চড়তে জানে না, ভোলা তাকে নিয়ে যাবে, শহরে যাব রিলিফের জইন্যে। খাওয়া লাগব ত এতগিলা মানষির। এ্যাহন যদি ডেপুটি কমিশনারকে ফোন কইর‍্যা বলি মানুষ সব উপুর থিক্যা ভাইস্যা আসতেছে তা হালি রিলিফের কথা আর শুইনবে কেডা? সব ত তখন রেসকুতে লাইগবেনে। আমাগো কি এ্যাহন বানভাসি মানষি খুঁইজব্যার লাগব, না নিজেগার চাইল-ডাইল-গম-চিড়া জোগাড় কইরব্যার লাগব? নিতাই বিড়িটা টানতে-টানতে বলে।

কিন্তু মানুষ একখান যে ভাইস্যা আইসছে? জগদীশ স্বগতোক্তির মত বলে।

সে ত মোটে একখান মানষি, কোটত ভাসি আসছে কায় জানে, নিতাই যুক্তি খোঁজে।

.

বাঘারুর কমলেকামিনীতুল্য অন্তর্ধান

শেষ পর্যন্ত অবিশ্যি বোঝা যায় সমস্যাটা এমন কিছু কঠিন নয়। ঠিক হয়, ভোলাকে নিয়ে, নিতাই যেমন ভেবেছিল, তেমনি জলপাইগুড়ি শহরে যাবে রিলিফের খোঁজে। এখান থেকে তাকে পার্টি অফিসে যেতে হবে। সেখান থেকে পার্টির কোনো নেতাকে ধরে যে-অফিসারের কাছে গেলে রিলিফের ব্যবস্থা হবে তার কাছে যেতে হবে। আজ রবিবার–সুতরাং রিলিফ বললেই ত আর রিলিফ হবে না। চাল-ডাল-চিড়া-গুড় জোগাড় করতে হবে। বৃষ্টির রকমসকম অর ফ্লাড দেখে ব্যবসায়ীরা সেসব গুদামে লুকিয়ে রাখতেও পারে। তার ওপর সরকার এখন রিলিফ ঘোষণা করবে কী না সেটাও দেখতে হবে। কংগ্রেসের সরকার হলে না হয় মিছিল নিয়ে গিয়ে ঘেরাও দেয়া যেত। কিন্তু এখন ত সব বুঝেশুনে কাজ করতে হয়। রিলিফ একবার দেয়া শুরু করলে ত সব জায়গাতেই দিতে হবে। শহরে গেলে ফ্লাডের খবরও কিছু পাওয়া যেতে পারে। সুতরাং নিতাই শহরেই যাক–আজ না হলেও, কাল অন্তত রিলিফ পাওয়া যাবে।

নিতাইয়ের চরের যারা এই বাধে উঠেছে তারা ত আগে থাকতে সাবধান হয়েই উঠতে পেরেছে। ফ্লাড আসার আগেই তারা সব কিছু নিয়ে আসতে পেরেছে–ফলে অবস্থা এমন না যে সরকারি চালডাল না-পেলে না-খেয়ে থাকতে হবে। যার যা সংসার বাঁধের ওপর সেই সংসারই বহাল আছে। সকাল থেকে বাঁধের পশ্চিম চালে বাতাস থেকে আগুন বাঁচিয়ে রান্নাটান্নার কাজ শুরুও হয়েছে। তবু ফ্লাড হলে, বাঁধে উঠতে হয়, বাধে উঠলে রিলিফ চাইতে হয়। যে কদিনের রিলিফ পাওয়া যায়, সে কদিনেরই লাভ।

কিন্তু সেই অনির্দিষ্ট রিলিফের চাইতে এই চোখের সামনে অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর বসে থাকা মানুষটি অনেক বেশি কাছের। লোকটিকে প্রথম দেখার পর নদীর স্রোতে যে আরো মানুষ খোঁজা হচ্ছিল, তাতে এখন আর কেউ ব্যস্ত নেই। কিন্তু অন্তত একটা মানুষও ত সারা রাত ধরে ভেসে এসে এই চালে উঠে বসে আছে! তা হলে ওপরে কোথাও কোনো বড় রকমের ভাঙন হয়েছে। সেই কথাটি এই লোকটির মুখ থেকে জানা দরকার। তাই দুই জনকে সাইকেল দিয়ে রায়পুর বাগানের ম্যানেজারবাবুর কাছে পাঠানো হল–ম্যানেজারবাবু যেখানে যেখানে ফোন করার ফোন করে জানাক যে রায়পুরে সামনের বাঁধের উল্টোদিকের চরে একটা মানুষ, জ্যান্ত মানুষ, ভেসে এসে একটা টিনের চালের ওপর বসে আছে–তাকে রেসকু করা এখনই দরকার। ম্যানেজারবাবুই ভাল বুঝবেন, রবিবার দিন কোথাও ফোন করলে কী কাজ হবে।

বাঘারুকে নিয়ে যখন বাঁধের ওপর এই সব নানারকম আলাপ-আলোচনা চলছে, তখন সে এই বাঁধের সামনে আরো বেশি করে একটা দৃশ্য হয়ে যায়। বাঁধের লোকজনের সামনে এখন তিস্তার বন্যা মাপা ছাড়া বাঘারুকে দেখাটাই একটা বড় আকর্ষণ হয়ে ওঠে, যেন, তিস্তা দিয়ে কী বন্যা এখন আসছে সেটা তিস্তার জল দেখে যতটা বোঝা যাবে, তার চাইতে অনেক বেশি বোঝা যাবে বাঘারুকে দেখে।

বাঁধ থেকে বাঘারুকে যতটা দেখা যাচ্ছিল, নদীর ভেতর চালের ওপর থেকে বাঘারু যেন বাধটাকে ততটা ভাল করে দেখতে পাচ্ছিল না। বাঘারুর কাছে বাধটা একটা বড় দৃশ্য–যেমন তিস্তাটা একটা বড় দৃশ্য। সেখানে কোনো একটা বিশেষ কিছু ত আর বাঘারু দেখতে পাচ্ছে না। অতগুলি মানুষের নড়াচড়া, কিছু রং, বাঘারু দেখতে পাচ্ছিল বটে, কিন্তু তার বদলে বাঁধের মানুষজনও বাঘারুকে পুরোটাই দেখতে পাচ্ছিল।

তাই বাঘারু যখন চালের ওপর থেকে উঠে সুপুরি গাছে চড়ে, তখন অশ্বিনী রায় নিজের মনেই বলতে থাকে–গেইল, গেইল, মোর তামান গুয়াবাড়িটা গেইল। অশ্বিনী রায় চিৎকার করে বলে নি, কিন্তু এই একটা কথাই ঘুরে-ঘুরে সবাইকে বলে যেতে থাকে, সে নিজে ভাল করে দেখতেও পাচ্ছে না। বাঁধের অন্য সকলে ততক্ষণে এইটুকু বৈচিত্র্যে উত্তেজিত হয়ে উঠেছে যে লোকটি বন্যার ঐ নদীর মধ্যে এক টুকরো চালের ওপর থেকে সুপুরি গাছে উঠে গেছে এবং উঠে যাওয়ার পর আর নামছে না। এই উত্তেজনার মাঝখানে কেউ একজন অশ্বিনী রায়কে ধমকেও ওঠে, তোমরালার গুয়াবাড়িখান কি ফ্লাডত ভাসি গেইছে, না ঐ মানুষটা খাইছে? এই এক ধমকেই অশ্বিনী রায় চুপ করে যায়।

কিন্তু লোকটা চালের ওপর থেকে সুপুরি গাছে উঠলই বা কেন আর উঠলই যদি, তা হলে আবার চালে নেমে আসছে না কেন? বাঘারু চালের সঙ্গে লাগানো সুপুরি গাছটা থেকে পাশের সুপুরি গাছ ধরে সেখান থেকে যে তার গাছের মাচানে চলে গেছে সেটা এই বাধ থেকে দেখাও যায় না, বোঝাও যায় না। রবিবারের ভরদুপুরে যতই ঝড়বৃষ্টির অন্ধকার নদীর ওপরের আকাশকে আচ্ছন্ন করে রাখুক, বাঁধের এই এতগুলো লোক ত স্পষ্ট দেখতে পেল অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর একটা লোক বসে আছে,, চলাফেরা করছে, তারপর একটা সুপুরি গাছের ওপর উঠে চলে গেল, আর নামল না। সুপুরি গাছের। ওপর কেউ বসে থাকতে পারে না। আর, টিনের চালের মত এত প্রশস্ত জায়গা থাকতে হঠাৎ সে সুপরি, গাছের মাথায় উঠতেইবা যাবে কেন। আর, যদি কোনো কারণে ওঠেই, তাহলে উঠে আর ফিরে নামবে না? এই বাঁধের ওপর থেকে দেখা গেল–জ্বলজ্যান্ত একটা লোক ভেসে এসে উঠল, বেশ অনেকক্ষণ বসে থাকল, তারপর, সুপুরি গাছে উঠে হাওয়া হয়ে গেল?

সুপুরি গাছ থেকে বাঘারুর নেমে আসার সময়টা যখন সব হিশেবের বাইরে চলে যায়, আর চোখের সামনে তিস্তার জলস্রোত নতুন বেগে ফুলে উঠছে মনে হয়, তখন, গত কদিন ধরে একঘেয়ে এই ঝড়ো বাতাস, মাটির প্রায় সমান্তরাল বৃষ্টি ও আবছা আকাশের মধ্যে যেন নতুন অর্থ একটা সঞ্চারিত হতে থাকে। এই বাতাস ও এই বৃষ্টি যেমন চলছে, তেমনই চলবে–কোথাও তার কোনো বিরতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। যে-জল নদী বেয়ে আসছে, তারও কোনো বিরতি নেই, যেন অনন্তকাল ধরে এই জল বয়ে আসবে। প্রতিদিনের যে-মানচিত্রের ভেতর এই নদীর বয়ে যাওয়া সেই মানচিত্রটি এমন ভাবে বদলে গেছে, যে এখন আর কোনো বদলও চেনা যাচ্ছে না। আর-মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর রাত্রি আসবে। সেই রাত্রিতেও এই ঝড় বইবে, এই বৃষ্টিবাতাস ভেজাবে, নদীর এই জল বাড়তে থাকবে। অথচ একটা মানুষকে সামনে ডুবে থাকা চরের একটা জেগে থাকা চালে দেখা গেল, আর সে সুপুরি গাছ বেয়ে উঠে আর নামল না–এমন একটা ঘটনাকে মেনে নিতে হচ্ছে, এতগুলো মানুষকে এক সঙ্গে মেনে নিতে হচ্ছে? তিস্তার এমন বন্যায় কোথাও কোনো গাছের মাথায় একা-একা বাঁচতে বাঁচতে কেউ-কেউ কখনো কখনো এমন কোনো-কোনো দৃশ্য দেখে থাকতে পারে। কিন্তু, এখানে রাত জেগে, রেড়িয়ে শুনে, ফোন:করে, পাহাড়ের জলের হিশেব কষে, চর থেকে যে-মানুষজন বাধে গরুবাছুর ঘরসংসার নিয়ে এসে উঠেছে তাদের সবার পক্ষে ত এটা মেনে নেয়া শক্ত। কারণ, এমন একটা ঘটনা মেনে নিলে, বুঝতে হবে, এই বন্যাটা স্বাভাবিক বন্যা নয়, এই তিস্তাও রোজকার তিস্তা নয়–কোনো দৈবী খেলা চলছে এই বন্যায়, জল আর হাওয়ায়। যে-মানুষটা চোখের সামনে ঐ টিনের চালের ওপর ছিল, সে টিনের চাল থেকে উধাও হয়ে যাবে–এমন ঘটনা দেখলেও মেনে নেয়া যায় না।

বাঘারুর অন্তর্ধান এই বাঁধের লোকজনের মধ্যে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। আর দেখতে-দেখতে এমন লোকের সংখ্যাই বেশি হয়ে যায় যারা বাঘারুকে চালের ওপরও দেখে নি। তারা জিজ্ঞাসা করতে থাকে-তোরা দেখিছিলু ত? মানষিডা ছিল, না, ছি-না?

.

ফোনে বাঘারুউদ্ধারের আহ্বান

বেলা আড়াইটে নাগাদ বাঁধের ভিড়টা প্রায় ছোটখাট একটা হাটের ভিড়ের মত হয়ে গেল।

রায়পুর বাগানের বাবুরা, বাবুদের বাড়ির মেয়েরা, চাবাগানের কুলিকামিনরা, রংধামালি বন্দরের লোজন, রংধামালি হাটের দোকানদাররা, দল বেঁধে-ফ্লাড দেখতে এখানেই এসে ওঠে।

তিস্তা দেখার জন্যে এদের এতদূর না এলেও চলত। এমন-কি রায়পুর বাগান থেকেও ত উত্তরে বাঁধের যে-কোনো একটা জায়গায় উঠে তিস্তা দেখে নেয়া যায়। আর হাটের লোকজন ত বাঁধের পারেই। কিন্তু এখানে এলে তিস্তার ফ্লাড ও সেই ফ্লাডে ভেসে আসা এই চরের লোকজনকে একসঙ্গে দেখা যাবে–সেটা নদীর পারের এদের এতদিনে জানা হয়ে গেছে। প্রত্যেক বছরই বন্যায় রায়পুরের উল্টোদিকের এই চর যে ভাসে, তা নয়–কোন চর ভাসে, কোন চর ভাসে না, তা নির্ভর করে তিস্তার জল কোন দিক দিয়ে যাবে তার ওপর। কিন্তু যদি তিস্তা পশ্চিম পাড় ঘেঁষেই বয়, তা হলে এই চরটা ভাসবে আর চরের লোকজন এসে বাঁধের ওপর উঠবে–এটা জানা কথা।

জানা কথা হলেও ত সব সময় জানা যায় না।

আজ সকালে বাঁধ থেকে দুটো ছেলে সাইকেলে রাইপুর বাগানে গিয়ে খবর দিয়েছিল, তিস্তার বন্যায় এখন জ্যান্ত মানুষ ভেসে আসতে শুরু করেছে; এসে, তাদের ডোবাচরের গাছগাছালি ও টিনের ওপর আটকে আছে; এদের রেসকু করার জন্যে যাতে মিলিটারির নৌকো আসে সে জন্যে টাউনে ডি-সিকে যেন ফোন করে দেয়া হয়। রায়পুর বাগানটি ঐ চরের লোকজনের অপরিচিত নয়। রংধামালির হাটে বাবুদের সঙ্গে মুখচেনাও আছে অনেকের। ফলে, তারা যখন এই খবর দেয়, তখন বাবুদেরও কেউ-কেউ তাদের খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করতে চায় তাদের চর কখন ভাসল, তারা কখন বাধে উঠল, কখন থেকে তিস্তার লোক ভেসে আসতে দেখেছে তারা। এ ঘটনা জেনে নিতে চায় বাবুরা–ফ্লাডের মত একটা ঘটনা আর মানুষ ভেসে আসার মত আরো বড় ঘটনা যদি তাদের হাতের নাগালে কিন্তু চোখের আড়ালেই ঘটে গিয়ে থাকে, তাহলে অন্তত এই ছেলেগুলোর মুখ থেকে তার কিছু প্রত্যক্ষ বিবরণ শুনে নেয়া উচিত।

কিন্তু রায়পুর বাগানে গিয়েছিল অমূল্যদের পাড়ার সুবল আর ছিদাম। যে কারণেই হোক, তাদের দুজনের কেউই খুব একটা বিশদ বিবরণ দিতে চায় না। সুবল আর ছিদামের বদলে আর-কেউ হলে হয়ত বাবুদের এই এত প্রশ্নের সুযোগে বেশ সবিস্তার কাহিনীই বলতে বসত। সুবল-ছিদামও যে তেমন গল্প বলতে পারত না, তা নয়। কিন্তু নিজেদের চর ছেড়ে, ঘর ছেড়ে, ভোলা বাঁধের ওপর তাদের একটা রাত কেটেছে, এবং মাত্র একটা রাত। আজ হাওয়ার আর নদীর যা-চেহারা তাতে আর করাত কাটাতে হবে, তারা জানে না। সারা শরীরে ঐ জল আর হাওয়ায় তাদের ইতিমধ্যেই একটা একঘেয়েমি এসে গেছে। যে বন্যার মধ্যে আছে, সেই বন্যা নিয়ে আর কথা বলতে তাদের ভাল লাগছিল না। তা ছাড়া সুবল-ছিদামের যা বয়স, তাতে বাঁধের ওপর তাদের আর-কিছু করার ছিল না–এখন শুধু বসে বসে সময় কাটানো। রিলিফ-টিলিফ এই সব করার জন্যে ত নিতাইকাকারই আছে। গরুবাছুরও আছে বাধা। তারা তাই রায়পুর বাগান থেকেই সাইকেলে টাউনে গিয়ে দুপুরের শোতে একটা সিনেমা দেখে বিকেলে বাঁধে ফিরে আসবে। ডি-সিকে ফোন করার কথাটুকু তারা জানাতে চায় শুধু–এর চাইতে বেশি কথার মধ্যে জড়িয়ে পড়তে চায় না। বাবুদের কথার উত্তরে ছোটখাট ঘ দিয়ে তারা সাইকেলে চড়ার ভঙ্গি করে। কিন্তু সাইকেলে চড়ার আগে বাবুদের একবার মনে করিয়ে দেয়, ফোনটা কইর‍্যা দিবেন বাবু, মিলিটারিনৌকা য্যান পাঠায়।

ফলে, সুবল-ছিদাম চলে যাবার পর বাবুদের মুখে-মুখে কথাটা বাগানে ছড়ায়, বাগানের কুলিকামিনদের কাছেও কিছু খবর আসে, দুপুরে বাবুরা বাড়িতে খেতে গেলে বাড়িতেও খবরটা পৌঁছে যায়। রায়পুর বাগানের লোকজনের কাছে এটা আর-কোনো খবর না যে চরের লোকজন বাধে উঠেছে। কিন্তু সেই বানভাসি লোকেরা এসে খবর দিয়ে গেছে যে তিস্তা দিয়ে তোকজন ভেসে আসছে–এটা একটা খবর বটে। কত লোক, কখন ভাসল, কোথায় উঠল, মিলিটারির নৌকো কখন আসবে-এর কোনো কিছুই জানা নেই বলে কৌতূহল আরো বেড়ে যায়। এদের মধ্যে অনেকেই ত বন্যায় যে মিলিটারি নামে তা শুধু রেডিয়োতে শুনেছে, অন্য জায়গার বন্যার খবরে টিভিতেও দেখেছে। কিন্তু তাদেরই বাধ থেকে মিলিটারির নৌকো ছাড়বে–এটা প্রায় যেন অবিশ্বাস্য ঠেকে। এমন আশাও কারো কারো মনে আসে যে মিলিটারি যখন নামবে তখন কি আর টিভিতে দেখাবে না? টিভিতে দেখানো না-হলে কি মিলিটারি নামবে? একেবারে তাদেরই বাঁধের ওপর থেকে মিলিটারিরা যাবে আর সেটা আবার তাদের টিভিতেই দেখা যাবে–এ রকম একটা অসম্ভবও সম্ভব হতে পারে ভেবে দুপুরের খাওয়া কোনো রকমে সেরে রায়পুর বাগানের বাবুরা, গিন্নিরা, বাচ্চারা বাঁধের ওপর এসে ওঠে।

বাঁধের দিকে আসতে-আসতে রঘু ঘোষ একবার ম্যানেজারের বাংলোতে হাঁক দেয়–কী ম্যানেজারবাবু, খবর পেলেন নাকি মিলিটারির নৌকো কখন আসবে?

ম্যানেজারবাবু খাওয়াদাওয়ার পর শুয়ে ছিলেন। তিনি জানলায় পর্দা সরিয়ে ঘাড়টা একটু তুলে বলেন, কী, তুমিও যাচ্ছ নাকি বাধে?

করবটা কী? সবাই যাচ্ছে। আপনি যাবেন না?

তোমরা আগাও। আমি একটু শুয়ে, পরে যাচ্ছি।

তা একটা ফোন করেন জ্যোতিদাকে, মিলিটারি কখন আসবে।

ম্যানেজারবাবু পর্দা ফেলে দেন। রায়পুর চা-কোম্পানির অফিস জলপাইগুড়ি শহরে। তাদের সেক্রেটারিকেই ম্যানেজারবাবু ফোন করে জানিয়েছিলেন তখন। তারপর আর-খবর নেন নি। তাঁর আর খবর নেয়ার আছেই বা কী? এখন জ্যোতিবাবুকে ফোন করলে অবিশ্যি জানা যায় কী হয়েছে।

ম্যানেজারবাবু পর্দা তুলে বলেন, এই রঘু, জ্যোতিবাবু একটা ফোন নম্বর দিলেন। মোবাইল সিবিল এমার্জেন্সির। তাদের কাছে জানতে হবে, কখন আসবে। তুমি এসে ফোন করে দেখো ভাই।

করেন-না ফোন, রঘু ঘোষ রাস্তার ওপর থেকেই বলে।

ও-সব মিলিটারির ব্যাপারস্যাপার ভাই, তুমি করলে করো, না করলে ছেড়ে দাও, তোক ভাসছে ত ভাসুক, ম্যানেজারবাবু জানলার পর্দা ফেলে দিয়ে আবার শুয়ে পড়েন।

আপনাকে নিয়ে যে কী হবে, একটা ফোন করতে এত ভয় পান- বলতে বলতে রঘু ঘোষ ম্যানেজারের বাংলোর বাগানের গেট ঠেলে ঢোকে। দরজা খোলাই ছিল। ফুলবাগান থেকে বারান্দায় উঠে পর্দা ঠেলে ঘরে ঢোকে রঘু ঘোষ। ম্যানেজারবাবু যে-চৌকিটাতে শুয়েছিলেন তার পাশেই, টেবিলে ফোন। ম্যানেজারবাবুর চৌকিটাতে রঘু ঘোষ বসতেই ম্যানেজারবাবু বলেন, করো, দেখো কী বলে। আজ রবিবারে দেখবে মিলিটারিও নাই, পুলিশও নাই।

রঘু ঘোষ লাইনটা পেয়ে যায়, হেলো, হ্যাঁ, শোনেন আমি রায়পুর চা বাগান থেকে বলছি, হা, ও, হ্যাঁ, বলতে বলতে রঘু ঘোষ থেমে যায়। ম্যানেজারবাবু চোখের ওপর থেকে হাতটা নামিয়ে তাকিয়ে থাকেন। রঘু ঘোষ বলে ওঠে, আচ্ছা, আপনারা তা হলে আধ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবেন? রঘু ঘোষ আরো কিছু শুনে, আচ্ছা বলে ফোনটা রেখে দিয়ে বলে, আরে ওঠেন, ওঠেন, আধঘণ্টার মধ্যে মিলিটারির নৌকা আসবে। চলেন। জ্যোতিদা আবার ফোন করেছিলেন। ম্যানেজারবাবু বলেন, আরে, আমাকে ছেড়ে দাও, তোর্মরা ত যাচ্ছই।

রঘু ঘোষ দাঁড়িয়ে উঠে বলে, আরে চলেন ত, আপনাকে নিয়ে আর পারা যায় না।

ম্যানেজারবাবু অগত্যা ওঠেন। ধুতি ওঁর পরাই ছিল। উনি আলনা থেকে শাদা ফুলশার্টটা গায়ে চড়ান আর স্যাণ্ডেলটা খুলে রবারের চটিটা পরে ছাতাটা হাতে নেন। দরজা দিয়ে বেরতে-বেরতে ম্যানেজারবাবু বলেন, এই রঘু, ঐ মিলিটারিরা এসে যদি জিজ্ঞাসা করে কে খবর দিয়েছে, কী হয়েছে, সে-সব কিন্তু ভাই তোমরা সামলিও।

হে-হে করে হাসতে-হাসতে রঘু ঘোষ বলে, আরে, আচ্ছা-আচ্ছা, চলেন।

ম্যানেজারবাবুকে নিয়ে রঘু ঘোষ যখন বাধে পৌঁছয় তখন ভিড় একেবারে জমজমাট। রঘু ঘোষ বাধে উঠে ওদের বাগানের দলটাকে খোঁজে। ওদিকে ম্যানেজারবাবুকে দেখে হাটের লোক দু-একজন নমস্কার করে এগিয়ে আসে। রঘু ঘোষ বলে, এই আসার আগে ফোন করলাম। আধঘণ্টার মধ্যে মিলিটারির নৌকো এসে যাবে। এতক্ষণে টাউন থেকে রওনা হয়ে গেছে?

রায়পুরের গুদামবাবু আগেই এসে গেছেন। উনি এদের দেখে কাছে আসতে-আসতে বলেন, আরে, আর প্রেসকিউ করবে কাকে? যে ভেসে এসেছিল সে নাকি কিছুক্ষণ পর একটা সুপুরি গাছের ওপর উঠে উধাও হয়ে গেছে।

মানে? সে আবার কী? রঘু ঘোষ জিজ্ঞাসা করে।

ঐ যে দেখছেন টিনের চাল ভেসে আছে, গুদামবাবু আঙুল দিয়ে অশ্বিনী রায়ের চাল দেখান, ঐখানে নাকি একটা লোক ভেসে এসে উঠেছিল। এরা সবাই দেখেছে। গুদামবাবু বেশ জোরে-জোরে কথাগুলো বলছিলেন–ফলে তাদের ঘিরেই ভিড়টা জমাট বেঁধে যায়। তা ছাড়া এই জায়গায় এই ভিড়ের মধ্যে এখন রায়পুরের ম্যানেজারবাবু, গুদামবাবু, ফ্যাক্টরিবাবুই (রঘু ঘোষ) সবচেয়ে প্রধান ব্যক্তি। রায়পুরের এক শ্রমিক এসে ম্যানেজারবাবুর হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে তার মাথায় ধরে রাখে। গুদামবাবু বলেন-তারপর নাকি লোকটা হঠাৎ একটা সুপুরি গাছে চড়ে। ওরা সবাই দেখেছে। কিন্তু সুপুরি গাছ থেকে আর নামে নি। আর, নামবেই বা কোথায়?

সুপুরি গাছ ত পিছল হয়ে আছে। পড়ে যায় নি ত গাছ থেকে? ম্যানেজারবাবু বলেন।

পড়ে গেলে ওরা দেখত না? গুদামবাবু জিজ্ঞাসা করেন।

তা, লোকটা কি হাওয়া হয়ে গেল? রঘু ঘোষ পাল্টা জিজ্ঞাসা করে।

.

বন্যার উপকথা

সে আমি কী করে বলব, আমি ত আর দেখি নি, কিন্তু এরা ত সব এক কথা বলছে! গুদামবাবু ডান দিকে হাত দেখান।

চলুন ত দেখি, রঘু ঘোষ সেদিকে পা বাড়িয়ে ম্যানেজারবাবুর দিকে ঘুরে তাকায়। ম্যানেজারবাবু কথা বলছিলেন। হাত তুলে রঘু ঘোষকে এগিয়ে যেতে ইঙ্গিত করেন। রঘু ঘোষ আর গুদামবাবু ঘিরে ধরা ভিড়টাকে ভেঙে এগিয়ে যায়। ভিড়টার কেউ-কেউ গুদামবাবু আর রঘু ঘোষের পেছন-পেছন যায়, কেউ-কেউ ম্যানেজারবাবুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে।

গুদামবাবুর পেছনে-পেছনে রঘু ঘোষ যেখানে গিয়ে দাঁড়ায় সেখান থেকেই বানভাসিদের অস্থায়ী আবাস শুরু। এর মধ্যেই বানভাসিদের আলাদা করে চিনে নেয়া যায়। তারা বেশির ভাগই বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে এক-এক দঙ্গলে জড়াজড়ি করে আছে। চব্বিশ ঘণ্টার ওপর হাওয়া আর বৃষ্টি তাদের শরীরের ওপর দিয়ে গেছে–সেটা দেখেই বোঝা যায়। বাতাসের ধাক্কায় কোনো আড়াল বা ঢাকনা থাকছে না। কিন্তু এরই মধ্যে বড় বড় বোল্ডারের পাশে পাথরের আড়ালে অনেকে নিজেদের শরীর বাঁচাচ্ছে। কেউ-কেউ আবার সংসারের জিনিশপত্র পাজা করে রেখে তার আড়ালে বাতাস আর বৃষ্টি থেকে মাথা বা শরীরের কোনো অংশ বাঁচাচ্ছে। পাশেই গরুগুলো দাঁড়িয়ে বসে। তাদের সারা শরীর সপসপে ভেজা। গোবরের গন্ধে বাতাস ভারী। এক বুড়ি একটা তক্তার ওপর কাত হয়ে শুয়ে, তার মাথার ওপর একটা ঝুড়ি চাপা দেয়া বৃষ্টি ঠেকানোর জন্যে।

রঘু ঘোষ আর গুদামবাবু যে-জায়গায় এসে দাঁড়ায়, সেখান থেকেই বানভাসিরা নিজেদের আলাদা করে রাখা শুরু করেছে বটে কিন্তু ঐ শুরুর জায়গাটাতেই যা ভিড়। তারপর জিনিশপত্র আর গরুবাছুরে বাকি বাধটা এমন ঠাসা যে যারা ফ্লাড দেখতে এসেছে তাদের পক্ষে সেদিকে এগনো মুশকিল। ফলে, ঐ প্রথম দলটার কাছেই ভিড়টা একটু বেশি। সবাই যেন তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে যে বন্যায় নিজেদের বাড়ি ছাড়তে হলে কী রকম দেখায়।

এই দেখার মধ্যে যে কৌতূহলের আলস্যই ছিল তা নয়, অনেকের পক্ষে এই দেখাটা স্মৃতিচারণও বটে। এই ভিড়ের মধ্যে অনেকে আছে যারা আটষট্টির বন্যায় কোনো রকমে বেঁচেছে। আবার এমনও অনেকে আছে যারা দু-এক বছর আগের কোনো বন্যায় ভেসেছে। তবু যে সবাই মিলে বানভাসিদের দেখছে, তার কারণ, বানে যে ভেসে আসে শুধু তাকেই দেখে না, তার ভেতর দিয়ে বন্যাটাকেই দেখে। কিন্তু সেই বা কতক্ষণ দেখা? তাই মানুষজন দেখছিল, আবার সরেও যাচ্ছিল। রায়পুরের দলটাও এখানেই ভিড় করে দাঁড়িয়েছিল। গুদামবাবু রঘু ঘোষকে এসে বলেন, এই যে এদের জিজ্ঞাসা করুন। এরা সবাই দেখেছে যে লোকটা টিনের চালের ওপর বসেছিল।

কী, তোমরা দেখেছ নাকি? সত্যি একটা লোক ভেসে এসেছিল? রঘু ঘোষ একটু হেসে, একটু জোরে বলে। কিন্তু বানভাসিদের যে-দলটাকে সে জিজ্ঞাসা করে, তারা জবাব ত দেয়ই না, এমনকি রঘু ঘোষের দিকে ফিরেও তাকায় না! বোধহয় বহুক্ষণ ধরে এই প্রশ্নটা তাদের করা হয়ে আসছে। কেউ জবাব দিল না দেখে অফিসবাবুর বড় শালী রঘু ঘোষের দিকে তাকিয়ে বলে, সত্যি একটা লোক ভেসে এসেছিল, তারপর নাকি সুপুরি গাছে চড়ে উধাও হয়ে গেছে জলের ভেতর থেকে?

রঘু ঘোষ আবার একটু হে-হে করে হাসে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে। তারপর অফিসবাবুর বড় শালীকে বলে, চলেন, আপনাকেও ঐ চালের ওপর রেখে আসি, তারপর বিনা পয়সায় সুপুরি গাছের প্লেনে উঠবেন।

অফিসবাবুর স্ত্রীর প্রায় সব সময়ই অসুখ। তার বড় শালীই চিরদিন তাদের সংসারের দেখাশোনা করে আসছেন। সেই সুবাদে অফিসবাবুর অন্যান্য সহকর্মীর সঙ্গেও তার এক রকম সস্নেহ রসিকতার সম্পর্ক।

আর-একটু পরেই দেখা যাবে, কে টিনের চালে উঠেছে, আর কে সুপুরি গাছে উঠেছে, রঘু ঘোষ ঘোষণা করে।

কেন? মিলিটারি আসবে নাকি? গুদামবাবু জিজ্ঞাসা করেন।

এই ত আসার আগে ফোন করলাম। জ্যোতিদা ফোন করে দিয়েছিলেন। ওরা রওনা হয়ে গিয়েছে, যে-কোনো সময়ই এসে পড়বে, রঘু ঘোষ প্রায় ঘোষণার মত করে বলে।

রঘু ঘোষের কথাটা চকিতে বিধময় ছড়িয়ে যায় যে মিলিটারিরা টাউন থেকে রওনা দিয়েছে, ৫-কোনো সময়ই এসে পড়বে। এমনকি বানভাসিদের মধ্যেও একটু নড়াচড়া দেখা দেয়। তারা অনেকেই বহুক্ষণ নদীর দিকে তাকায় নি, এখন, কেউ-কেউ আবার তাকিয়ে নেয়। কখনো এক ঝলক, কখনো তাকিয়ে থাকে–চোখ আর ফেরায় না। তেমন তাকিয়ে থাকা কাউকে দেখলে হঠাৎ মনে পড়ে যায় দুদের বাড়িঘর, খেতিবাড়ি, ফসল, সব কিছুর ওপর দিয়ে তিস্তার এই জল দিগন্তগুলিকে ঠেলতে-ঠেলতে ছুটছে। নিজেদের সর্বস্ব এই জলের তলায় রেখে লোকগুলো বাঁধের ওপর বসে আছে কি আবার ওখানে ফিরে যাওয়ার আশায়?

রঘু ঘোষের বৌ লিলি আর রঘু ঘোষের ভাগ্নী গোপা পেছন থেকে এসে রঘু ঘোষকে ডাকে। রঘু ঘোষ তার সেই অপ্রস্তুত হাসি নিয়ে বলে, কী?

গোপা জিজ্ঞাসা করে, মিলিটারি নাকি সত্যি আসবে?

হ্যাঁ ত—

লিলি বলে, তুমি ফোন করেছিলে?

হ্যাঁ।

হা? আরে, সকালে ত ম্যানেজারবাবু জ্যোতিদাকে ফোন করেছিলেন। জ্যোতিদা ওদের বলে দিয়েছে। আমরা ফোন করাতে বলল, এখনই যাচ্ছি।

কী করবে, এসে?

সে আমি কী করে বলব? থাকো, নিজেরাই দেখতে পাবে।

ঐ যে বলছে, একটা লোক নাকি সুপুরি গাছ দিয়ে ভ্যানিশ হয়ে গেছে বলেই লিলি খিলখিল করে হেসে ওঠে। রঘু ঘোষও হেসে ফেলে তাড়াতাড়ি বলে, এই কী হচ্ছে, ম্যানেজারবাবু আছেন। ততক্ষণে গোপাও মুখে আঁচল চাপা দিয়েছে।

এখন এই ঘটনাটি আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগের ব্যাপার মাত্র নেই। তিস্তার বন্যায় একটা লোক ভেসে এসেছিল–তেমন ভেসে আসতে পারেই, প্রায় প্রতি বছরই আসে। লোকটা অশ্বিনী রায়ের চালের মাথায় উঠে বেঁচেছে–তেমন বাঁচতেও পারে, ফ্লাডের ভেতর এরকম করেই বাঁচতে হয়। লোকটা অশ্বিনী রায়ের সুপুরি গাছে উঠেছিল–তেমন উঠতেও পারে, তাকে ত কিছু একটা খেতে হবে কিন্তু সে আর সুপুরি গাছ থেকে নেমে আসে নি।

এই শেষ জায়গাটায় ঘটনাটি যেন আর ঘটনা থাকে না–আজকে সকালেরই একটা ঘটনা। লোকটির সুপুরি গাছে ওঠা আর নেমে না-আসা যেন তিস্তা নদী নিয়ে কত অসংখ্য কাহিনীর একটি হয়ে যায়। তিস্তা যেন আর নদীমাত্র থাকে না–সে তার প্রাচীন অস্তিত্বে ফিরে যেতে চায় এই একটিমাত্র কাহিনীকে অবলম্বন করে। তিস্তার দুই পাড় দিয়ে বাঁধ বাধা হয়েছে। সেই বাঁধের ওপর সবাই দাঁড়িয়ে। একটা ট্রানজিস্টারের আওয়াজও মাঝে-মাঝেই পাওয়া যায়–বোধহয় বানভাসিদেরই ভেতর থেকে। কিন্তু তিস্তা আর তিস্তানদী না থেকে তিস্তাবুড়ি হয়ে ওঠে। সেই তিস্তাবুড়ির মূর্তি পাটকাঠি আর পাট দিয়ে বানিয়ে লোকে পুজো করে। সেই তিস্তাবুড়ি, এখনো পারে তার বুকে ভাসমান একটা লোককে আকাশে উধাও করে দিতে।

বন্যার উপকথা জন্মাচ্ছিল–নতুন।

.

বাঘারু উদ্ধার সংক্রান্ত অনুসন্ধান

বাঁধের ওপরে বানভাসি মানুষের ভিড়টা এই নতুন কথার সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন করে দর্শনীয় হয়ে ওঠে। বর্ষায় তিস্তায় বারকয়েক ফ্লাড ত হবেই, কোনো-কোনোবার তার মধ্যে একটা ফ্লাড বড় হয়ে যায়। বৃষ্টি যদি তেমন পড়ে তবে একটা ফ্লাডই গোটা তিনেক ফ্লাডের সময় জুড়ে বহাল থাকে। এবার যেমন বৃষ্টি হচ্ছে গত প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে তাতে এরকম একটা ফ্লাড ত প্রত্যাশিতই ছিল। কিন্তু সেই হিশেবের বাইরে যদি ফ্লাড়টা চলে যায়, তা হলেই সকলে নড়েচড়ে বসে।

এবারের এই ফ্লাডটা এখন দ্বিতীয় সপ্তাহে ঢুকছে। আজ, এই পরিবারের দিকটা সেদিক থেকে খুব দরকারী দিন। এখন এই বিকেলের দিকেও হাওয়া আর বৃষ্টির বেগ কিছুমাত্র কমে নি। কিন্তু সকলেরই মনে একটা হিশেব ছিল যে আজ দুপুরের পর থেকে এই বেগটা কমতে শুরু করবে। এখনো অনেকেই মনে মনে হিশেব কষছে যে বাতাস আর বৃষ্টির বেগ হয়ত একটু কমেছে, কিন্তু এখনই সেটা বোঝা যাচ্ছে না, রাতের মধ্যে নিশ্চয়ই বোঝা যাবে। এরকম ভাবাটাও অনেকটা মনে-মনে সান্ত্বনা পাওয়ার মত। এই সান্ত্বনাটুকু না থাকলে এখনই সকলকে প্রস্তুত হতে হয় যে কালও যদি এই বাতাস আর বৃষ্টি অব্যাহত থাকে তা হলে তিস্তার এই ফ্লাড হিশেবের বাইরে চলে যাবে। গেলে, তাদের কী করতে হবে–তা, এই বানভাসি মানুষজন, বা তখন যাদের নতুন করে বানে ভাসতে হবে, তারা, জানে না। কোনো ইস্কুলটিস্কুলে ক্যাম্প তৈরি হবে? বাঁধের ওপর থেকেও লোক সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে? ওপরে, বা নীচে, হয় ত এখানেই, বাধ ভাঙবে?

কিন্তু বাতাস আর বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল সেই অনুমানের আড়ালেও যেন আর মাথা বাঁচানো যায় না–যখন সত্যি করেই চোখের সামনে একটা লোককে তিস্তার জলে ভেসে এসে অশ্বিনী রায়ের চালে উঠতে দেখা যায়। সেটা ছিল, যেন সমস্ত হিশেবের বাইরে। এরকম বৃষ্টি আর বাতাস থাকলে মঙ্গলবার নাগাদ ওরকম একটা ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারত।

ফলে, বাঘারুর পরে আর নতুন লোকজন যখন সারে-সারে ভেসে আসে না এই প্রায় বিকেল পর্যন্ত, তখন ফ্লাডের হিশেব আবার প্রত্যাশিত সীমার মধ্যেই থাকে। একটা লোকই ভেসে এসেছে–তেমন ত যে-কোনো সময়ই হতে পারে। ঐ একটা লোক টেলিফোনে-টেলিফোনে যতই কেন না আরো অনেক লোক হয়ে যাক, মিলিটারির নৌকোর জন্যে যত ডাকাডাকিই হোক না কেন-বন্যার জলের বাড়া কমার সঙ্গে যাদের মরণর্বাচন জড়িত, তারা কিছুটা আশ্বস্তই হয়।

আবার সেই লোকটিও যখন নাকি সুপুরি গাছ বেয়ে উধাও হয়ে যায়, তখন তা নিয়ে যত হৈচৈই হোক না কেন, যত গল্পকথাই রটুক না কেন-ফ্লাডটার হিশেব তাতে আরো বেশি করে হিশেবের মধ্যে আসে। লোকটিকে যখন দেখা যাচ্ছে না, তখন ওরকম একটা লোক ভেসে এসেছিল সেটাও যেন আর তত সত্য থাকে না। ফ্লাডের তিস্তায় ওরকম হয়। কেউ হয়ত ঘরের চালের মায়া কাটাতে না পেরে চালের সঙ্গেই ভেসে যায়। কেউ হয়ত বাড়ির কাঁঠাল গাছের মায়া কাটাতে না পেরে সেই গাছের সঙ্গেই ভেসে যায়। এও হবে তেমনি কিছু একটা। তা ছাড়া পাগল-খ্যাপাও কেউ হতে পারে–সুপুরি গাছের ওপর নিজেকে বেঁধে রাখতেও পারে। সে যাই হোক না কেন–ফ্লাডের হিশেবের মধ্যে তাকে না নিলেও চলে।

তাই, এই বিকেলের দিকে এই বাঁধের ওপরের ভিড়টায় অলক্ষে দুটো ভাগ হয়ে যায়। চর থেকে যারা উঠে এসেছে তারা নিজেদের মত আলাদা হয়ে থাকে। কেউ-কেউ বৃষ্টিবাতাস থেকে একটু আড়াল বানিয়ে বাড়ির সবাইকে নিয়ে মাথা বাঁচায়, কেউ আবার এই ভিড়ের মধ্যেই ছড়িয়েছিটিয়ে থাকে। হাটের বা বাগানের লোকজনের কাছে গল্পটা ক্রমেই প্রধান হয়ে ওঠে। হতে-হতে শেষ পর্যন্ত দাঁড়ায়, যেন তারা ঐ গল্পের জন্যেই এখানে অপেক্ষা করছে।

মোবাইল সিভিল এমার্জেন্সির গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল একটু আগেই বাঁধের ওপর লোজন-গরুমেষ দেখে। দুজন সেপাইকে নিয়ে অফিসার বাঁধের ওপর উঠে দেখে–তারা যে-সীমায় এসে উঠেছে, তাদের সামনে গরুবাছুর, মানুষজন, সংসারের আরো নানা জিনিশ নিয়ে বানভাসি লোকজন। তারা গরুবাছুরের সারির মাঝখান দিয়ে, কিছু-কিছু শুয়েবসে থাকা লোকজনের পাশ দিয়ে, এই ভিড়টার দিকে আসতে শুরু করে। এর মধ্যে ছোটখাট ত্রিপল আর প্লাস্টিকের চাদরের ঢাকনা কেউ-কেউ দিয়েছে, তাই অফিসারকে দূর থেকে দেখাও যায় না। নইলে টুপি, ওয়াটারপ্রুফ আর গামবুটে তাকে দূর থেকে দেখেই সবাই এগিয়ে আসত। ভিড়টার দিকে এগতে-এগতে অফিসার জিজ্ঞাসা করতে থাকে, কী, কোথায় লোক ভেসে এসেছে? কে ভেসে এসেছে? কোথায়? কে দেখেছে? ওদিক থেকে যে কেউ আসতে পারে সেটা, যারা শুয়েবসে ছিল তারা বুঝতে পারে নি। ফলে, আচমকা অফিসারকে তার লোকজনসহ দেখে তারা হকচকিয়ে উঠে বসে, বা দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর অফিসারের প্রশ্নটা শোনে। কিন্তু শুনেও বুঝে উঠতে পারে না। বোঝার পর যখন জবাব দেবার জন্যে অফিসারের দিকে দৌড়ায়, তখন অফিসার আরো খানিকটা এগিয়ে গেছে।

এই করতে করতে অফিসার যখন বান দেখতে আসা ঐ ভিড়টার মধ্যে গিয়ে পড়ে, তখন তার পেছনেও একটা বেশ বড় ভিড় তৈরি হয়ে গেছে। অফিসারকে দেখেই রায়পুর চা বাগানের ম্যানেজারবাবু একটু পেছিয়ে যান। অফিসারের কাছে যাওয়ার তাড়ায় লোকজন ম্যানেজারবাবুকে অফিসার থেকে আলাদা করে দেয়।

অফিসার জিজ্ঞাসা করে, কী? আপনাদের এখান থেকে ফোন করা হয়েছে, লোকজন ভেসে এসে চরের চালে উঠে বসে আছে। কোথায় ভেসে এসেছে? কখন? বলুন, বলুন, দেখি নদীটা দেখতে দিন, সামনে থেকে সরে যান

অফিসারের এই কথাতে সেপাইদুটো একটা কাজ পায়। তারা অফিসারের সামনে থেকে তোকজনকে দুদিকে সরিয়ে দেয়, লাঠিগুলো দিয়ে সেই ফাঁকটাকে বহালও রাখে। এখন অফিসারের সামনে সরাসরি নদী থাকে। সেই নদীর দিকে মুখ করে অফিসার দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করেই যায়।

যদি অফিসার একবার জিজ্ঞাসা করেই থামত, তা হলে হয়ত কেউ-না-কেউ একটা জবাব দিতে পারত। কিন্তু উত্তরের জন্যে অপেক্ষা না করে কথাগুলো সে বলেই যাচ্ছিল, ফলে, কেউ আর-কোনো কথা বলার সুযোগই পায় না।

কী? বলুন? কোথা থেকে কে ভেসে এসেছে? বলুন? ফোন গেল ত এখান থেকে। এখানে ফোন কোথায় আছে?

এবার যেন জবাব দেয়ার মত একটা প্রশ্ন পাওয়া যায়। ভিড়ের ভেতর থেকেই কেউ বলে, রায়পুর চা বাগান।

ও? রায়পুর? বলে অফিসার যে-ভাবে ঘাড় ঘুরিয়ে রায়পুরের দিকে তাকায়, তাতে বোঝা যায় রায়পুর বাগানটা চেনে। তার এই ঘাড় ঘোরানোর অবকাশে ভিড়ের ভেতর থেকে আর-কেউ বলে দেয়–ম্যানেজারবাবু ত আছেন।

কোথায় ম্যানেজারবাবু? অফিসার জিজ্ঞাসা করে।

ঐ ত ম্যানেজারবাবু। ম্যানেজারবাবু, ম্যানেজারবাবু।

ম্যানেজারবাবু আরো একটু পেছিয়ে গিয়েছিলেন। বাগানের শ্রমিকটি তার মাথায় ছাতা ধরেই ছিল। তিনি যে ইচ্ছে করে ক্রমেই পেছিয়ে পড়ছিলেন, তা হয়ত নয়, কিন্তু অফিসারকে ঘিরে অফিসারের পেছনের ভিড়টা এত বাড়ছিল যে তাকে পেছতেই হচ্ছিল।

ডাক শুনেও ম্যানেজারবাবু এগিয়ে আসেন না। অফিসার ঘাড় ঘুরিয়ে ম্যানেজারবাবু কোথায় তা দেখার চেষ্টা করে। তার চেষ্টার মধ্যেও সেই অপেক্ষা ছিল যে ম্যানেজারবাবু নিশ্চয়ই এবার এগিয়ে আসবেন। কিন্তু ম্যানেজারবাবু এগিয়ে না আসায় তাকে আরো একটু ঘুরে ম্যানেজারবাবুকে খুঁজতে হয়। ফলে অফিসার ও ম্যানেজারবাবুর মাঝখানের ভিড়টা দু ভাগ হয়ে যায়। অফিসার নদীর দিকে পেছন ফিরে ম্যানেজারবাবুর দিকে যখন ঘুরে দাঁড়ায় তখন ভিড়টা অফিসারের পেছনে চলে যায়। অফিসার ম্যানেজারাবাবু বলতে কাকে বোঝাচ্ছে তা বুঝতে পারে। সেখানেও একটা ইতস্ততের মধ্যে কিছুটা সময় যায়। অফিসার অপেক্ষা করে থাকে যে ম্যানেজারবাবু এবার এগিয়ে আসবেন। ম্যানেজারবাবু যে এগিয়ে আসছেন না এটা বোঝার পর অফিসার ম্যানেজারবাবুর দিকে এগিয়ে যায়।

নমস্কার। আপনাদের বাগান থেকে ফোন করা হয়েছিল এখানে এই বাধে লোজন ভেসে এসে চালের ওপর উঠে আছে, রেসকিউ করতে হবে। আমাদের একটু রিপোর্ট করুন।

ম্যানেজারবাবু সরাসরি অফিসারের মুখের দিকে তাকান না। পাশের শ্রমিকটিকে বলেন, রঘুবাবুকে ডা। তারপর রঘুবাবুকে খুঁজতেই সেই ভিড়ের ওপর দিয়ে চোখ বুলিয়ে বলে যান, আমরা ত কিছু দেখি নি, আমরা ত এখন এলাম। এদেরই দুটো ছে,ে ফালে গিয়ে বলল, লোকজন ভেসে আসছে, ফোন করে দিতে। দাঁড়ান, আমাদের মধ্যে যে জানে তাকে ডেকে আনছে, সে সব বলতে পারবে।

ম্যানেজারবাবু তখনো ভিড়ের ওপর দিয়ে রঘু ঘোষকে খুঁজছেন। পেছন থেকে রঘু ঘোষ এসে বলে, কী হল?

আরে, তুমি কোথায় গিয়েছিলে? এই দেখো, এরা কী জানতে চাইছেন? ম্যানেজারবাবু আধ পা পেছনে যান, যেন রঘু ঘোষকে জায়গা দিতে। রঘু ঘোষ পেছন থেকেই বলে, ঐ ত ঐ চালের ওপর নাকি একটা লোক ভেসে এসে উঠেছে। কোন চালটা? অফিসার আবার নদীর দিকে ঘোরে, রঘু ঘোষ তার পাশে এসে দাঁড়ায়। অফিসার আর রঘু ঘোষ কয়েক পা এগিয়ে যায়। সেপাই দুটো সামনের লোকজনকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু কখন সরতে হবে লোকজন এর মধ্যেই তা শিখে গেছে।

রঘু ঘোষ নদীর দিকে আঙুল তুলে বলে, ঐ ত ঐ সব চালের কোথাও হবে। তারপর ভিড়ের দিকে তাকিয়ে গলা তুলে বলে, আরে, আপনারা বলছেন না কেন? আপনারা দেখেছেন, আপনাদের জায়গা, আপনারা বলেন। কে আছেন ঐ চরের?

জগদীশ বারুইয়ের গলা শোনা যায়, আরে, নিতাইডা ত আইল না এহনো। এই গজেন, নরেশ, অমূইল্যা, দ্যাখ না কী কয়?

নরেশ ভিড়ের ভেতর থেকেই বলে, কওনের কী আছে? ঐ ত ঐ চালডার উপুড় একখান মানুষ ভাইস্যা আস্যা উঠল, সকলেই দ্যাখছে।

অফিসার আঙুল দিয়ে নদী দেখিয়ে বলে, ঐ চালটার ওপর, ঐ সুপুরি গাছের ভেতরে যে-চালটা?

হ্যাঁ। নরেশ জবাব দেয়। নরেশ এগিয়ে আসে না, কিন্তু সে লম্বা বলে ভিড়ের ভেতরেও তাকে আলাদা করা যায়।

কই? কেউ নেই ত! অফিসার জিজ্ঞাসা করে।

আরে সেইডাই ত কথা, ভিড়ের আড়াল থেকে জগদীশ বারুইয়ের গলা ভেসে আসে, সকলে দেইখল্যাম, ভাইস্যা আইল, আবার সকলে দেইখল্যাম, নাই।

নাই মানে? আবার ভেসে গেল নাকি? অফিসার একটু উদ্বেগের সঙ্গেই জিজ্ঞাসা করে। তাদের আসতে একটু দেরি হয়েইছে। এর মধ্যে যদি কোনো লোক ভেসে এসে আবার ভেসে গিয়ে থাকে আর এ নিয়ে যদি কোনো গোলমাল বাধে, তা হলে, সে ফেঁসে যেতে পারে।

কেডা জানে? ভাইসল না উইড়ল না কোথায় গেল? হেই সকালের ব্যাপার। আপনারা আইলেন এতক্ষণে। তা লোক কি এতক্ষণ ধইর‍্যা সঁতরাব নাকি? জগদীশ বারুই আড়াল থেকে বলে ওঠে।

অফিসার গলাটা নরম করে বলে, আমাদের ত আরো দশ জায়গায় দৌড়তে হচ্ছে। কী করা যাবে বলুন। এখন বলুন, কী করতে হবে।

জগদীশ বারুইয়ের কথার ভঙ্গিতে নরেশও একটু সাহস পায়, আমরা ত ফোন কইর‍্যা কইল্যাম মিলিটারির নৌকা পাঠাইতে? তা আপনারা কি নৌকা নিয়্যা আইসছেন?

ফোন করলেই ত আর নৌকা তুলে আনা যায় না, আপনারা বলুন কী হয়েছে, তারপর নৌকো লাগবে কি কী লাগবে ঠিক করা যাবে।

এক কথাই ত কয়্যা আইসত্যাছি সকাল থিক্যা। মানুষ ভাইস্যা আস্যা উঠছে। এহন আপনার জিপগাড়ি নিয়্যা যান নদীর ভিতরে–দেইখ্যা আসেন মানুষ আছে কি নাই।

নরেশের কথায় সবাই হেসে ওঠে। অফিসার একটু এদিক-ওদিক তাকায়। তার সামনে বাঁধের বোল্ডার জল পর্যন্ত নেমে গেছে। সেই বোল্ডারের পরেই বন্যার তিস্তা। নরেশের কথায় রাগ ও অভিযোগ প্রকাশ হয়ে পড়েছে। ভিড়ের ভেতর থেকে ঠাট্টাবিদ্রূপ শুরু হয়েছে। নরেশের কথায় সবাই হেসে ওঠায় এই ভিড়ের মেজাজের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাকে এখন এখানে কিছু কাজ দেখাতেই হবে, নইলে এরা হয়ত ফিরে যেতে দেবে না। অফিসার রঘু ঘোষের দিকে তাকিয়ে গলাটা একটু নামিয়ে বলে, কিন্তু এখন ত চালের ওপর কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

রঘু ঘোষ হে-হে করে হেসে বলে, আরে সেটাই ত সমস্যা। লোকটা নাকি এসেছিল, এখন আর নেই। তারপর আবার একটু হেসে নরেশকে বলে, কী? সবটা বলো–

কইল্যাম ত সবডা? আবার কী কব?

যাঃ। শুনলাম যে সুপুরি গাছে উঠেছিল লোকটা!

সুপুরি গাছে উঠেছিল মানে? ঐ সুপুরি গাছে? অফিসার জিজ্ঞাসা করে।

তা সুপুরি গাছেই উঠুক, আর গাবগাছেই উঠুক, সেইডা ত দেইখবার নাগব, না, কী? আড়াল থেকে জগদীশ বারুই বলে।

না। তা ত হবেই। আপনারা বলুন, কী হয়েছে। আমাকে ত সেই অনুযায়ী কন্ট্রোল রুমে জানাতে হবে। তারপর তারা ব্যবস্থা করবে। আমি ত আর পকেটে করে নৌকো আনতে পারব না।

যেই পারব, তারে পাঠাইলেই পারতান। নরেশ বলে।

না, সুপুরি গাছের ব্যাপারটা কী? অফিসার জিজ্ঞাসা করে।

তার কথায় কেউ জবাব দেয় না। রঘু ঘোষ বোঝে, চরের বানভাসি এই লোকজন ঐ কথাটি অফিসারকে বলতে চাইছে না যে, ভেসে আসা লোকটি সুপুরি গাছে উঠে উধাও হয়ে গেছে। এটা বললে, তাদের সমস্ত বক্তব্যটাই হালকা হয়ে যাবে। অথচ লোকটি যদি ঐ চালের ওপর এখনো বসে থাকত তাকে উদ্ধার করার জন্যে এদের এত মাথাব্যথা হত না। তিস্তার এই ফ্লাডে যে ভেসে এসে একটা চালে উঠতে পারে সে নিজেকে বাঁচাতেও পারে। কিন্তু তাকে আর দেখা যাচ্ছে না বলেই নৌকো করে ওখানে গিয়ে দেখে আসা দরকার, এদের আসল ইচ্ছে সেটাই।

শুনুন, বলে রঘু ঘোষ হাসে, আমরা এসে শুনলাম ঐ লোকটি সুপুরি গাছে উঠেছে কিন্তু আর নামে নি। এখন আপনারা মিলিটারির নৌকো নিয়ে এসে ওখানে দেখুন লোকটি আছে কি নেই।

হয়, একটু সমবেত স্বরে শোনা যায়।

ফ্লাডের ভেতর চালের ওপর একটা লোককে দেখতে-দেখতে দিন কাটানো যায়, না দেখতে-দেখতেও রাত পোয়ানো যায়। কিন্তু লোকটা সুপুরি গাছে উঠে উধাও হয়ে গেলে, ফ্লাডের তিস্তায় একটা লোক সুপুরি গাছ বেয়ে উধাও হয়ে গেলে, তাদেরই চর থেকে উধাও হয়ে গেলে, তারা এই বাঁধের ওপর বসে থাকবে কোন ভরসায়? না হয় এখন তাদের বাড়িজমির ওপর দিয়ে কয়েকমানুষ-ডোবা জল এই বেগে বয়ে যাচ্ছে। তবু তারা ঐ চরের মুখোমুখি এই বাধে তাদের গরুবাছুর, ছাওয়াছোট, বেটিছোয়া নিয়ে ত অপেক্ষা করে আছে যে জল একদিন নামবে ও তারা আবার কাদামাটি ভেঙে তাদের চর চিনে নিতে পারবে। এর মধ্যে কিছু অনিশ্চয়তা ত আছেই–তিস্তা ঐ চরটাকে খেয়ে দিয়েছে কি না তা ত জল না নামলে বোঝা যাবে না, কিন্তু এখন ঐ জলঢাকা চরে কি আরো এমন কোনো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, যার ওপর তিস্তার ফ্লাডেরও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই? যে-লোকটার ভেসে আসা তাদের দেখা, টিনের চালের ওপর বসে থাকা তাদের দেখা, সুপুরি গাছ বেয়ে ওঠাও তাদের দেখা-সূপুরি গাছ থেকে সেই লোকটার না-নামাও ত তাদের দেখা। তা হলে তাদের চরের ওপর দিয়ে তিস্তার বন্যাই যে বয়ে যাচ্ছে তা নয়, সুপুরি গাছের মাথা দিয়ে যাদের যাতায়াত তারাও কি এসে চরটার দখল নিয়ে নিল নাকি? সেইটি যাচাই করার জন্যেই মিলিটারি দরকার, মিলিটারির নৌকো দরকার। কিন্তু সেই দাবিটা যে অফিসারের কাছে করা যায় না, তা এরা বোঝে।

.

বাঘারুউদ্ধার সংক্রান্ত বাজেটবিতর্ক

মানে? লোকটা সুপুরি গাছে উঠেছে, আপনারা দেখেছেন? অফিসার ভিড়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে।

হয়, ভিড়টা মাথা নাড়ে।

তারপরে আর নামে নি, সেটাও দেখেছেন?

হয়।

গাছের ওপর থেকে পড়েটড়ে যায়নি ত?

কেউ কোনো জবাব দেয় না।

আপনারা দেখেছেন, পড়েটড়ে যায়নি ত?

আবারও সেই একই নীরবতা। একটু পরে আড়াল থেকে জগদীশ বারুই বলে ওঠে, পইড়লে ত অবার উইঠত চালে?

সুপুরি গাছের মাথাটা জল থেকে খুব বেশি উঁচুতে নয়। সেখান থেকে পড়ে গেলে স্রোতের টানে লোকটি ভেসে যেতে পারে, কিন্তু ভেসে যেতে-যেতে আবার ঐ চালটাতে, বা, ঐ দিকের আর-একটা সুপুরি গাছে বা আরো দু-একটা চালে উঠতেও পারে–এই দুইয়ের মধ্যে কোনটা বেশি সম্ভাব্য অফিসার সেটা মনে-মনে যাচাই করে। যাচাই করতে গিয়ে সে জগদীশ বারুইয়ের প্রশ্নটার সামনে পড়ে যায়–লোকটি যদি কোনো রকমে ভেসে যাওয়া থেকে নিজেকে ঠেকাতে পারত, তা হলে ত তাকে আবার দেখা যেত। ঐখানে গিয়ে যাচাই করে না এলে কী করে জানা যাবে, লোকটি আছে কি নেই। অফিসার মনে-মনে খুব সতর্ক হিশেব কষে। তারা একটু দেরি করে এসেছে এই আন্দাজ থেকেই যে এর মধ্যে এখানকার লোকজন নিজেদের মত একটা ব্যবস্থা করে নেবে। দুপুরের পর দ্বিতীয় ফোনটা পেয়ে তাদের ঠিক করতে হয় যে এখানে আসতে হবে। কিন্তু এটা অফিসারের আন্দাজের মধ্যে ছিল না যে, সত্যি করেই এখানে এখন নদীতে নৌকো ভাসাতে হবে। অফিসার এটা বোঝে যে এই চারপাশের ভিড়টা তাকে কিছু না করে চলে যেতে দেবে না। এক, ফোন করব বলে গাড়ি নিয়ে রায়পুরে গিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে পারে–এখানে সেপাইদুটোকে রেখে। এখন যদি সে সত্যি কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে কথা বলে তা হলেও নতুন কোনো ব্যবস্থা সন্ধ্যার আগে করা সম্ভব নয়। মিলিটারির নৌকো ব্যাপারটা ভুয়ো। তাদের কিছু রাবারের নৌকো আছে–সে-নৌকো নিয়ে স্রোতের এ বেগ সামলানো যাবে না। অফিসার ঘড়ি দেখে-সাড়ে তিনটে বেজে গেছে, তার হাতে আর বড় জোর ঘণ্টা খানেক-ঘণ্টা দেড়েক সময় আছে। এখান থেকে কোনো নৌকো ভাসালে সেটা ফেরার পথে বিপদে পড়তে পারে, ততক্ষণে অন্ধকারও হয়ে যাবে।

অফিসার একটু অনিশ্চিত স্বরে বলে, আপনারা যারা ঐ চরের লোক, তারা ত সবাই চলে এসেছেন?

অফিসারের কণ্ঠস্বরে প্রশ্নটা খুব স্পষ্ট ছিল না বলেই হয় ত কেউ. কোনো জবাব দেয় না। একটু অপেক্ষা করে অফিসার বলে, মানে, আপনাদের কেউ ত আর ওখানে নেই? চরে?

না। তা নাই। আমরা ত এখানে ওঠা শুরু করছি শুক্রবার শেষ রাইত থিক্যা– জগদীশ বারুই আড়াল থেকে বলে।

সে ত ভালই করেছেন যে অপেক্ষা করেন নি। তাই গরুবাছুর সবই আনতে পেরেছেন।

সে আমাগো হিশাব আমাগো কাছে। আপনাদের উপর ভরসা করলে আর ধাধে উইঠতে হইত নরেশ মেজাজ দেখিয়ে বলে।

অফিসার একটু চুপ করে থেকে জিজ্ঞাসা করে, আপনারা কী চান, সেটা বলুন, আমাকে ত কন্ট্রোলে জানাতে হবে। ঐ লোকটি ওখানে আছে কিনা সেটা দেখতে চান?

সেই লগেই ত সকাল থিক্যা ফোন করা হইল, নরেশ বলে।

শুনুন, অফিসার একটা সিদ্ধান্ত নেয়ার ভঙ্গিতে বলে, আপনাদের এখানে কি কারো নৌকো আছে?

আমাগো নৌকা নিয়্যা যাবার উপায় থাইকলে আপনাগো ফোন কইরতে যাব কুন কামে? নরেশ জবাব দেয়।

কন্ট্রোলে ফোন করে এখানে নৌকোর ব্যবস্থা করতে করতে ফ্লাডের জল নেমে যাবে–অফিসার স্পষ্ট জানায়।

তয় যে রেডিওতে-টিভিতে এত মিলিটারি দেখান? একটা মেয়েলি গলায় পেছন থেকে কেউ বলে।

সে কোথায় কী দেখায়, সে-সব আমি বলতে পারব না। আমি আপনাদের কাজের কথা বলছি। আপনারা যদি কন্ট্রোলে জানাতে বলেন, আমি রায়পুর বাগানে গিয়ে ফোন করে দিতে পারি। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। তার বেশি আমার ক্ষমতার বাইরে। সেখানে ডি-সি ঠিক করবেন। আর, যদি আপনারা এখান থেকে কোনো নৌকো আর মাঝি দিতে পারেন, তা হলে আমি এখনই সেটা রিকিউজিশন করতে পারি।

কী কইরব্যার পারেন? অমূল্য নরেশের পাশ থেকে জিজ্ঞাসা করে।

আমরা এখনই ভাড়া করে নেব।

আগে কইলেন নৌকা চাই, এ্যাহন কইলেন মাঝি চাই। তা আপনারা রেসকুটা কী কইরবেন? জগদীশ বারুই স্পষ্ট গলায় আড়াল থেকে বলে।

না। আমরা গবমেন্ট থেকে নৌকোর ভাড়া দেব, মাঝিদের ওয়েজ দেব মানে মাঝিদের টাকা দেব।

অফিসারের কথার পর হঠাৎ সবাই চুপ করে যায়। ঠিক বোঝা যায় না, এই নীরবতার অর্থটা কী? রঘু ঘোষ একটু অপেক্ষা করে বলে, কী? এখানে নৌকো আছে কারো?

আরে এহানে যে-নৌকা সেকি এই জলের টান সামলাবার পারব? আর নৌকাড়া নিয়্যা যাবেনে কে? কত টাকা দিবেন যে মানষি এই জলে ভাইসবে? জগদীশ প্রশ্ন করে।

এই অবস্থায় টাকা নিয়ে ত আর দরাদরি করব না আপনাদের সঙ্গে। আপনারা কত চান, বলুন না। নৌকো আছে এখানে?

আবার সবাই চুপচাপ। সেই নীরবতার মধ্যেই ভিড়টা যেন একটু আলগা হয়ে যায়। অমূল্য আর নরেশ প্রায় কানে কানে কথা বলতে-বলতে বাঁধের কিনারার দিকে একটু আড়ালে চলে যায়। আরো কিছু-কিছু এমন কথা হয়। আর, মাত্র কিছুক্ষণের মধ্যেই অফিসার কেমন একা হয়ে যায় যেন, তার সঙ্গে সকলের কথাবার্তা শেষ হয়ে গেছে। আরো একটু অপেক্ষা করে অফিসার গলাটা তুলে বলে, শুনুন, আর দেরি করা যাবে না। হয় আপনারা নৌকো দিন, আর না-হয় আমি রায়পুর বাগানে গিয়ে কন্ট্রোলে ফোন করব। তারপর কন্ট্রোল যা করার করবে। ম্যানেজারবাবু, অফিসার পেছনে তাকায়।

রঘু ঘোষ হে-হে করে হেসে বলে, ম্যানেজারবাবু চলে গেছেন। আমরা আছি, আপনি গেলে চলুন।

আপনি বাগানের?

হ্যাঁ।

নরেশ আর অমূল্য ফিরে আসে, এসে দাঁড়িয়ে থাকে। অফিসার তাদের দিকে তাকিয়ে বলেন, কী হল? নৌকো পাওয়া যাবে?

তা যাবেনে। আমরা চারজন যাবার পারি। কিন্তু মাথাপিছু আড়াইশ টাকা দিবার লাগব। নৌকার ভাড়া আলাদা, নরেশ বলে।

নরেশ কথাটা বলে ফেলার পর হঠাৎ যেন চারপাশের সবাই চুপ করে যায়। শুধু বাতাস আর বৃষ্টির আওয়াজটা বেড়ে ওঠে। এই ভিড়ের ভেতর যারা বাগানের আর হাটের তারা হয়ত এখন একটা দরকষাকষির উত্তেজনাতেই চুপ করে যায়। আর, ঐ চরেরই যে বানভাসিরা ভিড়ের মধ্যে ছিল, তারা নরেশের কথাতেই হঠাৎ বুঝে ফেলে, তাদের নিজেদেরই চরে গিয়ে ফিরে আসার দাম এখন এতটাই বেড়ে গেছে।

অফিসারই প্রথম কথাটা বলে, সে কী হে? তোমাদের একটা লোক নাকি ওখানে চালের ওপর পড়ে আছে। তোমাদেরই ত উচিত ছিল এতক্ষণ নৌকো করে লোকটাকে নিয়ে আসা। আমরা খরচা করতে রাজি আছি শুনেই হাজার টাকা দর হাঁকলে–কথাটা শেষ করে অফিসার এদিক-ওদিক তাকায়, তারপর রঘু ঘোষের চোখ পেয়ে যায়। রঘু হে-হে করে হেসে অফিসারের কথাটাতে অন্য জোর সঞ্চার করে দেয়।

কিন্তু রঘু ঘোষের হাসির পরও এই ভিড়ের নীরবতা ভাঙে না। একটা গোহাটে যেমন গরু কেনাবেচার সময় একটা গরু নিয়ে সারা দিন ধরেই দর কষাকষি চলতে থাকে, এখন বাঁধের ওপর যেন সেরকম একটা পরিস্থিতিই তৈরি হল। নরেশ-অমূল্য ভিড় থেকে একটু সরে গিয়ে মাটির ওপর উবু হয়ে বসে পড়ে–কিন্তু নিজেদের মধ্যেও কোনো কথা বলে না। ভিড়টা একটু আলগা হয়ে যায়–কেউ-কেউ অফিসারকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ-কেউ আবার সরে গিয়ে নরেশ অমূল্যর কাছে দাঁড়ায়। ভিড়টা একটু আলগা হওয়ার পর বোঝা যায়, অফিসারের ডান দিকে পেছনে জগদীশ বারুই মাটিতে বসে।

বললে যে, নৌকো পাওয়া যাবে, নৌকো কোথায়? অফিসার বলে কিন্তু সে কথার জবাব কেউ দেয় না। একটু অপেক্ষা করে অফিসার এবার গলা তুলে ও ঘাড়টা ঘুরিয়ে বলে, কী? এখানে নৌকো কার আছে? কোথায়?

অফিসারের কথার কেউ জবাব দেয় না। এবার একটু অধৈর্য হয়েই অফিসার বলে, বাঃ। তোমাদের হাজার টাকা দিতে রাজি হলে নৌকো পাওয়া যাবে আর তা না-হলে পাওয়া যাবে না? ফ্লাডের সময় এরকম করা কিন্তু বে-আইনি।

এবারও কেউ কোনো কথা বলে না কিন্তু অনেকেই নরেশ-অমূল্যর দিকে তাকায়। সেই চাহনি অনুমান করেই বুঝি নরেশ-অমূল্য মাথা নিচু করে মাটিতে কাঠি দিয়ে আঁকিবুকি কাটে। অশ্বিনী রায় পেছন থেকে এসে অফিসারকে বলে, স্যার, আমারই ঐ চালটা। লোকটা আমার গুয়াগাছটা উঠি আর নামিল না।

পেছন থেকে জগদীশ বারুই হেসে দুই হাত ঘুরিয়ে বলে, কিসের মধ্যে কী, পান্তাভাতে ঘি। কথা হব্যার ধইরছে রেসকুর, উনি কন উনার গুয়াবাড়ির কথা। জগদীশের মন্তব্যে একটুআধটু হাসিমশকরা। শুরু হওয়ার কথা, কিন্তু যারা হাসতে পারত বা পাল্টা মন্তব্য করতে পারত তারা মুখ খোলে না। পরিস্থিতিটা একটু বেশি গম্ভীর হয়ে যায়। অশ্বিনী রায় তার সঙ্গে কথা বলায় অফিসারও যেন একটা অবলম্বন পেয়ে যায়। সে অশ্বিনী রায়কেই জিজ্ঞাসা করে, আমি ত তখন থেকে চেঁচাচ্ছি এখানে নৌকো কার আছে, আপনারা ত তার কোনো জবাব দিচ্ছেন না। তা আমি কি সাঁতার কেটে গিয়ে লোকটাকে ধরে আনব? এখানে নৌকো কোথায় আছে? অফিসার রঘু ঘোষের দিকে ফিরে বলে, আপনারা জানেন নাকার নৌকো আছে?

আমরা কী করে জানব। আমরা কি রোজ এখানে আসি নাকি? রঘু ঘোষ হে-হে করে অফিসারের মুখের ওপরই হাসে।

আপনাদের বাগান নদীর এত কাছে, আপনারা নৌকো রাখেন না কেন একটা? অফিসার আচমকা রঘু ঘোষকেই জিজ্ঞাসা করে। রঘু ঘোষ প্রশ্নটা শুনে প্রথমে অ্যা বলে ফেলে, তারপর তার সেই হে-হে হাসিটা এবার অনেকক্ষণ ধরে হাসে। সেই হাসিটা শেষ করে জামার হাতায় মুখ মুছে সে বলে, বাঃ, আপনাদের বছরে-দু বছরে কখন দরকার হবে সেই জন্যে কোম্পানি বাগানে নৌকো পুষবে?

জগদীশ বারুই পেছন থেকে বলে ওঠে, হয়। আপনারা নৌকা রাইখবেন, আলকাতরা মাখাইবেন, গাব ঘইষবেন আর উনারা আইস্যা বছরে একবার জিপে কইর‍্যা নৌকোবিলাস কইরবেন।

অশ্বিনী রায় নরেশ-অমূল্যর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। নরেশ-অমূল্য কেউই তার দিকে চোখ তুলে তাকায় না। অশ্বিনী রায় একটু দাঁড়িয়ে থেকে সেখানেই উটকো হয়ে বসে। যেন তার পা ধরে গিয়েছে তাই বসেছে, এমন ভাবে বসে থাকে। একটু পরে নরেশের দিকে তাকিয়ে বলে, পুছিবার ধইচছে নৌকাখান কার? তা ক কেনে, কয়ি দে। সরকারের অফিসার

নরেশ বলে, আপনে কয়্যা দ্যান না, আমাগো কাছে আইছেন ক্যান? আমাগো ত নৌকা নাই।

নরেশ একটু জোরেই বলে–অনেককে শুনিয়ে। কথাটার মধ্যে একটু ঝাঁঝ ছিল–সেটা অশ্বিনী রায় বুঝতে পারে। তাই এমন মুখভঙ্গি করে বসে থাকে যেন কথাগুলো তাকে বলা হয় নি।

জগদীশ বারুই তার জায়গা থেকে উঠে নরেশের পাশে এসে বসে খুব নিচুগলায় বলে, সাতশতে রাজি হয়্যা যা, আমি কয়্যা দিচ্ছি, তগ মাথা পিছু দ্যাড়শ, আর একশ আমারে দিবি।

আপনে আবার এর মধ্যি বাসায় চাট মাইরবেন! দ্যাড়শতেও রাজি হবনে না। নরেশও প্রায় শোনা যায় না এমন স্বরে বলে।

তরা রাজি কি না সেইডা ক। অফিসার রাজি হয় কি না-হয় আমি বুঝব নে। অমূল্যরে জিগা।

নরেশ অমূল্যর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে কথা বলে যায়। তারপর জগদীশের দিকে ঘুরে জানায়, অমূইল্যা মাথাপিছু দুইশর কমে রাজি না। আর আপনার আবার কমিশন কিসের?

জগদীশ শ্লেষ্মাজড়িত হাসি হেসে বলে, তগই ভাল হইত। আমারে একশ দিতি। না-দিস ত আমিই অফিসারের কনট্রাক্ট নিব–তহন পঞ্চাশ টাহাও পাবি না, কথাটা বলে জগদীশ বারুই দাঁড়ায়–দুই হাতের আঙুল জড়িয়ে মাথার ওপর তুলে মটকায়, আওয়াজ করে একটা হাইও তোলে।

ততক্ষণে আর-একটু বিকেল হয়েছে, যদিও বিকেলটা তেমন বোঝাই যায় না। জগদীশ বারুই তাদের মগ্ন চরের দিকে একবার তাকায়। একটু তাকিয়ে থেকে বলে, মানষিডা চোখের সামনে ভাইস্যা আইসল, আর সুপুরি গাছে চইড়্যা চইল্যা গেল?

বাঘারুর সেই নিরুদ্দেশ নিয়ে এখানে দরকষাকষি শুরু হয়। সে দরকষাকষি এই বাতাস আর বৃষ্টির সঙ্গে মিশে যায়। বাঘারু জানবে কী করে যে সে সুপুরি গাছের মাথায় চড়ে আছে না ভেসে গেছে শুধু এইটুকু দেখে যাওয়ার জন্যে সরকারের অফিসারের সঙ্গে দরদাম নিয়ে কথাবার্তা চলছে। বন্যাতে অনেকেরই অনেক কিছু ভেসে চলে যায়, আবার অনেকের কাছেই ত অনেক কিছু ভেসে আসেও। জগদীশ, নরেশ ও অমূল্য বুঝতে পারে না–তাদের কাছে সত্যি কিছু ভেসে আসছে কিনা। তারা ভাসিয়ে আনতে চাইছে।

অফিসার বলে, দেখুন, আমি ত এখানে সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না। আমি দেখলাম–কোনো লোক রেসকিউ করার নেই। আমি সেই কথাই রিপোর্ট করব। আর, তা না হলে আপনারা নৌকো কোথায় বলুন–আমরা রেসকিউয়ের ব্যবস্থা করছি।

.

১৪০

বাঘারুউদ্ধার নিয়ে আলোচনাসভা ত্যাগ ও পরে মতৈক্য

অফিসার একটু অপেক্ষা করে। কিন্তু অবস্থা কিছু বদলায় না। ভিড়টা আলগা হয়েই আছে, এখন যেন আরো আলগা হয়ে যেতে পারে। জগদীশ বারুই বাঁধের কিনারে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নরেশ-অমূল্যকে ঘিরে যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারাও একটু-আধটু তফাতে সরে যায়। অফিসার নদীর দিক থেকে ঘুরে দাঁড়ায় উত্তর মুখো। বানভাসি লোকদের দুটো-চারটে গরু বাধা আছে কিন্তু তারপর ফাঁকা। খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে অফিসার নদীর দিকে একেবারে পেছন ফিরে সোজা হাঁটা দেয়।

অফিসারের পেছনে একটা ছোট ভিড় ছিল। অফিসার যে হাঁটা দেবে এটা কেউ বোঝে নি। ফলে দু-একজনকে হাত দিয়ে সরিয়ে অফিসার এগিয়ে যায়। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে ভিড়ের লোজন তাকে পথ করে দিয়ে তার দিকেই তাকিয়ে থাকে। রঘু ঘোষ অফিসারের পেছনে দু-এক পা গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

কেউই বুঝতে পারে না–অফিসার কোথায় যাচ্ছে। প্রথমে ভাবে–বোধহয় সঁহ্যাঁড়ানোর জায়গা বদলাচ্ছে। তারপর ভাবে, পেচ্ছাব করতে যাচ্ছে। পেচ্ছাব করতে হলে ত বাঁধের ওপরই উত্তর দিকে দু-পা গেলে হত। কিন্তু হয়ত বাঁধের ওপর থেকে অফিসারের পেচ্ছাব করা চলে না। ততক্ষণে অফিসার বাঁধের নীচে নেমে তার জিপের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। বাঁধের নীচে নেমে অফিসার চলে যাচ্ছে।

অশ্বিনী রায় ক্ষীণ স্বরে বলে, এ নরেইশ্যা, আরে অফিসার যে চলি যাছে রে, দেখ কেনে।

শুনে নরেশ-অমূল্য উঠে দাঁড়িয়ে সেখান থেকেই গলা উঁচিয়ে দেখে। কিন্তু বুঝতে না পেরে আঙুলের ওপর ভর দিয়ে তাকায়। পেছন থেকে জগদীশ বারুই মাথার ওপর দুই হাতের তালি বাজিয়ে বলে ওঠে, নেরে অমূইল্যা, তগ হাজার টাকা জিপে চইড়্যা চইল্যা গেল। এহন নিজের হাত নিজে চাট বইস্যা বইস্যা।

নরেশ গোড়ালি মাটিতে নামিয়ে জগদীশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, চইল্যা গেল! মানে? আপনারা কি এহানে বইস্যা বইস্যা তামাশা দেইখতেছেন? চলেন, জিপটারে আইটক্যান। এই পর্যন্ত বলে নরেশ জগদীশের দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে বাতাসে হাত ঘুরিয়ে বলে, এই চলো সবাই, জিপ আটকাও, জিও আটকাও।

বলে নরেশ, অমূল্যর আর পাশে যাকে পেল তার, হাত ধরে টেনে বাধ থেকে হুড় হুড় করে নীচে নেমে অফিসারের দিকে দৌড়তে শুরু করে। তাদের সঙ্গে-সঙ্গে আরো দু-একজন নামে। তারও পরে কিন্তু একটু বেশি পেছনে, আরো দু-একজন হেঁটে নামে, হেঁটে-হেঁটেই জিপগাড়ির দিকে যায়। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। বানভাসিদের বেশির ভাগই বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কেউ-কেউ নদীর দিক থেকে রাস্তার দিকে গিয়ে লাইন বেঁধে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। যারা নিজেদের জিনিশপত্রের আড়ালে শুয়েবসে ছিল, তারা সেখান থেকে যায় না।

সকালে যখন অশ্বিনী রায়ের চালের ওপরে বাঘারুকে প্রথম দেখা গিয়েছিল তখন বাধসুন্ধু মানুষই, এক নিতাই ছাড়া, ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এখন, যখন তাকে উদ্ধার করে আনবার জন্যে শহর থেকে অফিসার এসে কিছু না করে ফিরে যাচ্ছে, তখন কারো আর সে ব্যাপারে কোনো উৎসাহ নেই। বাঘারুকে আর দেখা যাচ্ছে না, লোকটা ওখানে আছে কি নেই তাইই বোঝা যাচ্ছে না, ভেসে গেলে ত ভেসেই গেছে–এরকম একটা যুক্তি ত ইতিমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে। লোকটা সুপুরি গাছে চড়ে উধাও হয়ে গেছে–এর ভেতরকার রহস্য ও ভয় ইতিমধ্যে এই এত বৃষ্টিতে, হাওয়ায় ও কথায় অস্পষ্ট হয়ে এসেছে। ফ্লাডের তিস্তায় এমন ভৌতিক দৃশ্য, এখন অবান্তর অথচ ভবিষ্যতের প্রাসঙ্গিক, গল্প হয়েই থাকল। সারা দিনের মধ্যে হাওয়া আর বৃষ্টি যে একটুও কমল না–সেটা আরো বেশি বাস্তব ভয়ের কারণ হয়ে উঠছে এই বিকেলে। আজও সারা রাত এই বৃষ্টি আর হাওয়া যদি চলে তা হলে ফ্লাডের চেহারা কী হবে তা এরা কেউ ভেবে উঠতে পারছে না। ভাবতে চাইছেও না হয়ত! কিন্তু সেই ভাবতে না-চাওয়ার মধ্যেই নিজেদের প্রস্তুত করে তুলছে আরো বিপদের জন্যে।

তা ছাড়াও এই ভিড়ের ভেতর আর-একটা অনিশ্চয়তাবোধ এই বিকেল থেকেই ছড়াতে শুরু। করেছে। এদের হিশেব অনুযায়ী আজই ফ্লাডের চরম দিন হওয়ার কথা। কিন্তু এই ফ্লাড় যদি আরো বাড়তেই থাকে, তা হলে কি তাদের চরের আর কিছু বাকি থাকবে? যেন তারা জানত, এই আজকে দুপুর পর্যন্ত যত জল এসেছে তার তলায় তাদের চরটা তাদেরই থেকে যাবে। কিন্তু এর পরও জলের যে-ঢল নামছে তাতে তাদের চরের জমিও নদীর সঙ্গে মিশে যেতে পারে। তা হলে? আবার কে। কোথায় ঘর খুঁজবে? জমি খুঁজবে?

এ-সব কথা এখনো কেউ মুখে বলে নি, বলবেও না। কিন্তু কথাগুলো ভেতরে-ভেতরে তৈরি হয়ে গেছে। যখন তারা এই ঘটনার মুখোমুখি পড়ে যাবে তখন হয়ত সকলে প্রস্তুত হয়ে যাবে–একটা চর ডোবা মানে ত আর-একটা চর জাগা! কিন্তু সেই প্রস্তুতির জন্যেও ত একটা সময় দরকার। যখন অফিসার এসে কথা বলছিল, ফ্লাড় দেখতে আসা রায়পুর রংধামালির লোকজন ভিড় করেছে, তখনই, বানভাসি মানুষদের ভেতরে-ভেতরে বৃষ্টি আর হাওয়া আর নদীর জলের হিসেবনিকেশ শুরু হয়ে গেছে। তাই তারা এ-সব দর্শনার্থীদের সম্পর্কে কিছুটা উদাসীন হয়ে পড়ে।

তাও অফিসার পালিয়ে যাচ্ছে, তাকে ধরার জন্যে নরেশ হাঁক দিয়ে দৌড়ল, নরেশের সঙ্গে-সঙ্গে বা পেছনে-পেছনে তাদেরও ছোটারই কথা। অন্তত তাদের চরের ওপরই ত লোকটাকে সকালে দেখা গিয়েছিল, সুতরাং লোকটাকে উদ্ধার করা যেন তাদের চরেরই একজনকে উদ্ধার করা।

কিন্তু অফিসার নৌকোর ভাড়া আর মাঝির টাকা দেবে শুনে নরেশ মাথাপিছু আড়াইশ, তার মানে চার জনের এক হাজার, নৌকোর ভাড়া আলাদা, বলল যখন, তখন থেকেই যেন চরটাও আর তাদের থাকল না, চরের ঐ মানুষটাও আর তাদের মানুষ থাকল না। এরকম ফ্লাডে, এরকম বিপদের মধ্যে নৌকো নিয়ে যারা যাবে তারা তাদের খুশিমত টাকা চাইতেই পারে। এ ফ্লাডে নৌকো ভাসানোর বিপদও ত কম না! সে টাকা যে দিতে পারবে সে পারবে, যে পারবে না সে পারবে না। কিন্তু এটা ত সরকারি টাকা। নরেশ আর অমূল্য প্রথমে রাজি হয়ে সাহস করে বলতে পারল বলেই টাকাটা তারা পাচ্ছে–এটাতে চরের অন্য সব লায়েক মানুষের ত একটু দুঃখ হতেই পারে। সরকার যদি নিজের নৌকোয় নিজের মাঝি নিয়ে রেসুক করত সেটা হত সরকারের ব্যাপার। কিন্তু তিস্তার বন্যায় ভাসল একটা লোক, কে তা কেউ জানে না; সে নিজেই সাঁতরে উঠল অশ্বিনী রায়ের চালে; তারপর নিজেই সুপুরি গাছ বেয়ে উঠে গেল–এখন সেই লোকটার নাম করে নরেশ-অমূল্য আর-দু-জনকে নিয়ে হাজার টাকা পকেটে ভরবে–এটা কেউ ভাবতেই পারে নি। সকালে যখন এ নিয়ে শোরগোল পড়েছিল, তখন ত সবাইই লোকটাকে দেখে অস্থির হয়ে উঠেছে। তাই তে ফোনাফুনি। কিন্তু সকালের এই শোরগোল বিকেলবেলা নরেশ-অমূল্যর ব্যবসা হয়ে উঠবে, তা কে জানত? এখন নরেশ-অমূল্য যদি অফিসারকে ঘেরাও দিয়ে নৌকোর টাকা আদায় করতে পারে ত করুক। কিন্তু চরের মানুষরা নরেশ-অমূল্যর জন্যে হয়ত তে যাবে কেন? করতে পারে ত

হয়ত নিতাই থাকলে এ সব ঘটত না। পঞ্চায়েতের লোক হিশেবে অফিসারের সঙ্গে নিতাইই কথা বলত। আর, নিতাইয়ের সঙ্গে কথা হলে এই সব টাকা-পয়সার কথা হয়ত উঠতেই পারত না। বিনি পয়সাতেই নিতাই হয়ত নৌকা ভাসাত। কিংবা, এ নিয়ে মাথাই ঘামাত না। কিন্তু নিতাই ত সারাদিন শহরে–রিলিফের খোঁজে।

অফিসার জিপের কাছে পৌঁছনোর আগেই নরেশরা অফিসারকে ধরে ফেলে। ধরে ফেলে মানে অফিসারই ওদের দৌড়নোর আওয়াজে পেছন ফিরে ওদের দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সোজাসুজি ঘুরে দাঁড়ায় না, বাঁধের দিকে মুখ করে ওদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অফিসার অবিশ্যি নরেশের চিৎকার আগেই শুনতে পেয়েছে, ওরা যে দৌড়ে তার দিকে আসছে সেটাও টের পেয়েছে কিন্তু তার মনে হয়েছিল আগেই জিপের কাছে পৌঁছে যাবে। খানিকটা আসার পর তার সেপাই দুজনের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মাথায় এই যুক্তিও চলে আসে সে আসলে সেপাই দু-জনকে ওখানে পোস্টিং করে এসেছে কোনো লোক নদীতে ভেসে আসে কি না তার ওপর নজর রাখতে। কিন্তু আরো খানিকটা এগিয়ে তার মনে হয়, এভাবে জিপে চড়ে চলে গেলে ব্যাপারটা খারাপ হতে পারে। আবার এখান থেকে ডি-সিকে হয়ত ফোনটোন করবে, মাঝরাতে তাকে আবার হয়ত এখানে পাঠাবে। তখন ত তার পক্ষে এখানে কিছু করাও মুশকিল হবে। এত কিছু ভেবে অফিসার দাঁড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু নরেশ-অমূল্য যেভাবে তার দিকে ছুটে আসছে, তাতে সে একটু ভয়ও পায়। বেশির ভাগ লোক বাঁধের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে দেখে আবার একটু ভরসাও পায়–এরা নিশ্চয়ই তাকে কিছু করবে না। তার ত কোনো দোষ নেই। এরা প্রায় দেড়-দু হাজার টাকা চেয়ে বসেছে, পঁচশ টাকার বেশি খরচ করার ক্ষমতাই তার নেই। কিন্তু তার বোধহয় এরকম আচমকা চলে আসাটিও ঠিক হয় নি। এখন যদি এরা এসে তাকে ধরে নিয়ে যায় সেটা আরো খারাপ হবে, সে আর এখান থেকে ফিরতেই পারবে না। অফিসার আবার জিপের দিকে হাঁটতে শুরু করে–এবার একটু আস্তে-আস্তে।

জিপের কাছে পৌঁছুবার আগেই নরেশ-অমূল্য, আর তাদের সঙ্গে যারা দৌড়চ্ছিল তারা, তার পেছনে এসে পড়ে। অফিসার দাঁড়ায় না, ঘাড়ও ঘোরায় না। নরেশ-অমূল্য তার কাছাকাছি পৌঁছে পেছনে-পেছনে হাঁটে আর জোরে-জোরে শ্বাস ফেলে কিন্তু কিছু বলে না।

অফিসার জিপের ড্রাইভারকে গাড়ি ঘোরাও, ঐদিক দিয়ে রায়পুর যাব, বলে গাড়ি ঘোরানোর জন্যে অপেক্ষা করে।

তখন নরেশ বলে, আপনি কি চইল্যা য্যান নাকি?

তাদের দিকে মুখ না ঘুরিয়ে অফিসার বলে, শুনলেই ত কী বললাম?

তা ঐ লোকটার রেসকুর কী হবে নে?

ওখানে ত কোনো লোক দেখলাম না। তোমরা বলছ লোক আছে। বললাম, লোক দাও, নৌকো দাও, টাকা দেব, তোমরা ভাবলে এই সুযোগে পঁহ্যাঁও মারবে। তা এসব ত আমি ঠিক করতে পারব না। আমি কন্ট্রোল রুমে জানাব। তারা যা করতে বলে, তাই করব।

নরেশ বা অমূল্য অফিসারের সঙ্গে এসব নিয়ে যুক্তি দিয়ে কথা বলার লোক না। তা ছাড়া বানভাসি সবাই যদি তাদের সঙ্গে আসত, তারা একটা চিৎকার-চেঁচামেচি তুলতে পারত। আবার, একথাও ঠিক যে তারা পঁও মারার মতই টাকা চেয়েছে। ফলে, অফিসারকে ধরার জন্যে তাদের এতটা ছুটে আসাটা কেমন তাদের নিজেদের কাছেই অনর্থক ঠেকে। জিপ গাড়িটা ঘুরে অফিসারের সামনে দাঁড়ায়। অফিসার ড্রাইভারের পাশে উঠে বসলে নরেশ এটুকুই একটু জোর দিয়ে বলার চেষ্টা করে, আপনি কি ফিরা আইসবেন, না, বাগান থিক্যাই ফিরা যাবেন শহরে?

অফিসার বলে, দেখো ভাই, আমার ক্ষমতা পঁচশ টাকা খরচ করার। তোমরা যদি তার মধ্যে করতে পারতে তা হলে আমি এখনি করে দিতাম। আমি এখন কন্ট্রোলে ফোন করব। এখন তা আর কন্ট্রোল থেকে খবর দিয়ে আর্মির নৌকো পাঠানো যাবে না। যদি হয় তাও কাল দুপুরের আগে না। তা ছাড়া কাউকে ত দেখাই যাচ্ছে না। রেসূক করবে কাকে? যাক গে। অত কথায় কাজ নেই। আমি ফোন করে তোমাদের এখানে ফিরে আসব। কন্ট্রোল আমাকে কী বলল, সেটা তোমাদের জানিয়ে চলে যাব। আমার আর-কিছু করার নেই। চলো।

ড্রাইভার গাড়িটা চালানো শুরু করতেই নরেশ বলে ওঠে, খাড়ান, খাড়ান। ড্রাইভার গাড়ি থামায়। নরেশ এগিয়ে এসে বলে, শুনেন স্যার। এই নদীর মইধ্যে আপনার মিলিটারিও নামার সাহস পাবেনে না। জলের একখান এমন-অমন ধাক্কা যদি লাইগ্যা যায়, তাহলি নৌকা উল্টায়্যা যাবে। আপনারও আর কষ্ট কইর‍্যা ফোন করার কাম নাই–ঐটা এক হাজার কইর‍্যা দ্যান নৌকার ভাড়া ধইর্যা, আমরা এহনি নৌকা ভাসাই।

তোমরা এখনি যাবে? নৌকো কাছাকাছি আছে?

হ্যাঁ। ঐ রংধামালি হাটের বগলে

তা হলে শোনো–আমি তোমাদের সাড়ে সাতশ টাকা দিতে পারি। কিন্তু এখন পঁচশ, কাল আমাদের অফিসে গিয়ে বাকি আড়াইশ আনতে হবে। আমাদের একটা ঘটনার জন্যে একবারে পাঁচশ টাকার বেশি খরচ করায় আইন নেই। আড়াইশ কাল তোমাদের দেব।

নরেশ হেসে-হেসে মাথা চুলকোর্তে-চুলকোতে বলে, কাইল আর-একডা রেসকু যখন বানাইবেনই ত সেডারেও পাঁচশ টাকার রেসকু দ্যান স্যার। বাড়িঘর জমিজমা ত সব দেইখলেন, ভাইস্যা গেল।

এবার অফিসার সস্নেহ ধমক দেয়, ওঠো ত গাড়িতে, এরপর আর তোমার নৌকো ভাসানোরও টাইম থাকবে না। ওঠো। চলো, নৌকা কোথায়, সেখানে যাব। আর কাকে কাকে নেবে, নিয়ে যাও। গাড়ি ঘোরাও।

নরেশ একবার তাদের পেছনের ভিড়টার দিকে তাকায়। তারপর এই বালিশ, শোন, বলে একটা। ছেলেকে ডাকে, দৌড়ায়্যা যা, অশ্বিনী কাকারে কবি অর মানষিডারে হাটের বগলে পাঠাইতে। নরেশ গিয়ে জিপের পেছনে ওঠে। অমূল্য যখন ঢুকছে তখন বালিশ পেছন থেকে বলে, মোক গাড়ি নিগাও কেনে।

নরেশ ধমকে ওঠে, কইল্যাম দৌড়ায়্যা যা।

আরে নাও না ওকে তুলে। তারপর কাকে নেবে তাকেও গাড়িতেই তুলে নাও, হেঁটে যেতে ত সময় লাগবে, অফিসার বলে।

বালিশ পেছনে উঠে পড়ে। গাড়ি বাঁধের তলা দিয়ে ঐ বানভাসিদের অস্থায়ী আবাসের দিকে চলে। নরেশ বলে, না, নৌকা যেইখানে আছে ঐ তক ত গাড়ি যাইব না। ও বাঁধ বরাবর গেলে আগে যাবে নে।

বলতে বলতেই গাড়ি পৌঁছে যায়। বালিশ পেছন থেকে টুক করে নেমে পড়ে। বাঁধের লোজন বুঝতে পারে না, কী হল। অফিসারই নরেশ আর অমূল্যকে ধরল, নাকি নরেশ আর অমূল্যই অফিসারকে ধরল–সেটা বোঝা যায় না। নরেশ আর অমূল্যর ছুটে যাওয়া, তারপর, অফিসারের গাড়িতে চড়ে তাদের এখানে ফিরে আসা–এর ভেতর কোথাও তাদের কোনো বিপদের আশঙ্কা আছে কিনা, এই নিয়ে বাঁধের লোকজনদের ভেতর একটা অনিশ্চয়তা থাকে।

নরেশ অফিসারের পাশ দিয়ে মুখ বের করে বাঁধের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে, অশ্বিনী কাহা, কাদাখোয়ারে পাঠাইয়্যা দ্যান হাটের বগলে– তারপর মুখ ঢুকিয়ে বলে, চলেন। নরেশের কথা বলার গরম ভাপ অফিসারের ডান কানের পেছনে ও ঘাড়ে লাগে। নরেশ মাথাটা সরালে তিনি রুমাল বের করে ঘাড় মুছে নেন। গাড়ি সোজাই চলছিল।

ঐ হাওয়ায় নরেশের কথা বধের ওপরে পৌঁছেছিল কি তা বোঝা যায় না। যদিও নরেশ যেখান থেকে কথাটা বলেছে সেখানে বাতাস প্রায় ছিলই না বাধে ঠেকে গিয়েছে।..কিন্তু বাঁধের ওপর ত বাতাস একই রকম। ততক্ষণে বালিশ বাঁধের ওপর উঠে ঘোষণা করে দিয়েছে–নৌকো ভাসবে, কাদাখোয়াকে পাঠাতে বলেছে।

কাদাখোয়া, অশ্বিনী রায় জোতদারের মানষি, চরের সবচেয়ে ওস্তাদ মাঝি।

কাদাখোয়ার নিদ্রাভঙ্গ

অফিসারের জিপগাড়ি নরেশ-অমূল্যকে নিয়ে চলে যাওয়ার পর অশ্বিনী রায় কাদাখোয়াকে গিয়ে ডাকে–হে বাউ। কাদাখোয়া অশ্বিনী রায়ের গরুগুলো যে-খুঁটিতে বাধা, তার নীচে বাঁধের পশ্চিম ঢালুতে শুয়েছিল। সেদিকে বোল্ডারের মধ্যে একটা সমতল জায়গা সে খুঁজে বের করেছিল। তারা সারা শরীরে শুধু একটা নেংটি পরনে, আর একটা গামছা, মাথার ওর ঢাকনির মত দেয়া। বাঁধের জন্যে হাওয়াটা এখানে অত জোরে বইছে না বলে কাদাখোয়র উপুড় করা মাথার ওপর থেকে ওটা উড়ে যায় নি। কাদাখোয়া অবিশ্যি গামছাটা দিয়ে গলা পর্যন্ত মাথাটা এমন করে জড়িয়ে রেখেছে যে গামছাটা উড়ে যাওয়া সম্ভবও ছিল না। তার সারাটা শরীর এমন উলঙ্গ যে মাঝখানের নেংটিটুকুও চামড়ার সঙ্গে মিশে থাকে। মানুষের যেখানে কাপড়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সেখানে কাদাখোয়ার কোনো কাপড়ের রকার নেই। আর, যেখানে মানুষের কাপড়ের কোনো দরকার নেই, সেই মাথাটাকেই কাদাখোয়া গামছা দিয়ে ঢেকে প্রায় বেঁধে রেখেছে এমন করে যে চট করে দেখলে তাকে মানুষ মনে নাও হতে পারে। বন্যার সময় বাঁধের ওপর ওরকম কাঠ, গাছ কত পড়ে থাকে।

অশ্বিনী রায়ের গলার স্বর নিচুতে। বাঁধের ওপর থেকে তার ডাক কাদাখোয়া শুনতেই পায় না। অশ্বিনী রায় তখন বসে বসে বাঁধের একটা বোল্ডার থেকে আর-একটা বোল্ডারে পা দিয়ে দিয়ে নামে আর ডাকে, হে বাউ, বাউগে-এ। কাদাখোয়া তাও শোনে না। ততক্ষণে অশ্বিনী কাদাখোয়র কাছে পৌঁছে গেছে। গিয়ে বোঝে কাদাখোয়া ঘুমুচ্ছে। গামছায় মোড়া তার মুখের ভেতর থেকে আওয়াজ বেরচ্ছে। অশ্বিনী আরো একটু এগিয়ে কাদাখোয়ার মাথাটা ধরেই মৃদু ঝাঁকায়–হে বা, বাউ গে–ডাকতে-ডাকতে।

বাঁধের ওপর থেকে জগদীশ বারুই চেঁচায়–বোল্ডার দিয়্যা মারো মাথায়, ঐডা ত মরার নাখান ঘুমায়, ধাক্কা দ্যাও, ধাক্কা।

অশ্বিনী রায়ের মুখোচোখে সব সময়ই একটু অসহায়তার ভাব। সে জগদীশের দিকে তাকায়–যেন জগদীশের কথা না শুনলে জগদীশ রাগ করবে। তারপর আর-একটু এগিয়ে দুই হাতে কাদাখোয়ার পাথরের মত চওড়া পিঠটা ধরে নাড়ায় হে বাউ, বাউ গে-এ।

কাদাখোয়ার অত বড় পিঠ অশ্বিনী রায় তার ঐটুকুটুকু হাতে নাড়াতে পারে না। কিন্তু কাদাখোয়া যে জেগে উঠেছে তা বোঝা যায় তার হাতদুটো গুটিয়ে আনায়। এতে অশ্বিনী রায় গলা আর-একটু তুলে ডাকে–হে বাউ, বাউ গে-এ।

এবার কাদাখোয়া তার গোটা শরীরটাকে চিৎ করে। এক জায়গাতেই নয়–সে গড়িয়ে চিৎ হয়। ফলে বোল্ডারের ওপর যে-ছোট-ছোট গাছগাছালি ছিল সেগুলো তার বুকের ওপর লেগে থাকে, লেগে থাকে কুচিকুচি পাথরও। এখন, তার মাথাটা বোল্ডার থেকে সরে গিয়ে একটা ফাঁকের মধ্যে পড়ে পেছনে হেলে যায়-গলাটা টান-টান হয়ে থাকে। পা দুটো ফাঁকই থাকে। দেখে, কোনো জীবন্ত মানুষ মনে হয় না।

বাঁধের ওপর তখন একটা লাইনই হয়ে গেছে। রঘু ঘোষ চেঁচায়–আরে মাথায় জল ঢালেন, জল ঢালেন।

রঘু ঘোষের ভাগ্নী গোপা জিজ্ঞাসা করে–কী? নেশা করেছে নাকি?

রঘু ঘোষের বউ লিলি বলে–কোথায় টিভির নৌকা দেখব, তা না ঐ মিঠুন চক্রবর্তীকে দেখতে হচ্ছে। বলেই খিলখিল হেসে উঠতেই রঘু ঘোষও হেসে ফেলে বলে, মিঠুন চক্রবর্তী ও রকম নেংটি পরে নাকি?

এমন টাইট প্যান্ট পরে যে নেংটির মতই, বলে লিলি আর-এক দফা হাসে।

তোমার কাদাখোয়র জাগরণ ত কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ। খোয়া দ্যাও, খোয়া দ্যাও, নয় ত জাইগবে না, জগদীশ ওপর থেকে বলে।

আরো একবার তাকে ডাকার জন্যে অশ্বিনী হাত বাড়াতেই কাদাখোয়া দু হাত মুখের কাছে টেনে আনে। অশ্বিনী হাত সরিয়ে ডাকে, এই কাদাখোয়া, ঝট করি উঠ কেনে, ঝট করি উঠ, নৌকা ভাসিবার নাগিবে।

কাদাখোয়া উঠে বসে। সে যেভাবে গামছাটা মাথায় জড়িয়েছিল সেটা তার চিৎ হওয়ায় পাক খেয়ে গেছে। সে খুলতে পারে না। গামছায় জড়ানো মুখটা নিয়েই উঠে বসে। বসেও দু হাতে গামছার কোণটা পায় না। তখন গামছায় জড়ানো মুখটা নিয়েই উঠে দাঁড়ায় আর হাত দিয়ে গামছার কোনা খোঁজে। না পেয়ে, সে বাঁধের ওপরে উঠবার জন্যে গামছায় জড়ানো মুখ নিয়েই পা ফেলে। শেষে, গামছার কোনা না-পেয়ে গলার কাছ থেকে গামছাটা টেনে ওপরে তোলে। গামছার ভেতর থেকে তার ঠোঁটটা বেরয় কিন্তু গামছাটা নাকে আটকে যায়। অবশেষে বাঁধের ওপর উঠে একটা টান দিতেই গামছাটা খুলে যায়। গামছাটা হাতে নিয়ে সে মুখটা মোছে। তারপর অশ্বিনী রায়কে খোঁজে।

অশ্বিনী রায় তখনো বাঁধের ওপর উঠতে পারে নি। কিন্তু কাদাখোয়া গামছা খুলে ফেলতে পেরেছে দেখে চিৎকার করে বলে, হাটের বগলত চলি যা, নরেশুয়া আছে, নৌকা ভাসিবার লাগিবে।

কাদাখোয়া গামছাটা দিয়ে মুখটা আর-একবার ডলতে-ডলতে বাঁধের ঐ ভিড়ের মধ্যে দিয়ে বাঁধের পুব দিকের ঢালের বোল্ডারের ওপর লম্বা লম্বা পা ফেলে কোনাকুনি জলের দিকে নেমে যায়, তারপর জলনিকাশী নালীটা এক লাফে ডিঙিয়ে জালঘেরা বোল্ডারের ওপর পড়ে বাক নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

কাদাখোয়া এই এত ভিড় দেখে না, এই এত হাওয়াবৃষ্টি দেখে না, নদীর এই এত জল দেখে না। সে যেন ঘুমতে-ঘুমতেই হেঁটে চলে গেল এমনই তার ভঙ্গি। বাঁধের ওপর থেকে নীচে লাফিয়ে লাফিয়ে নামার ফলে তার গা থেকে পাথরের কুচি ঝরে যায় কিছু-কিছু, সব নয়।

রংধামালি হাটের কোথায় নৌকাটা থাকে সেটা সবাইই জানে। নৌকোর একটা মালিকও আছে বটে কিন্তু সাধারণ সময়ে নৌকোটা চরের লোকজন তরি-তরকারির বোঝা হাটে নিয়ে আসার জন্যেই ব্যবহার করে। ঠিক খেয়া না হলেও হাটের দিন খেয়ার মতই নৌকোটা ব্যবহার করা হয়। চরের যারা নৌকোটা ব্যবহার করে তারা হাটের দিন মালিককে কিছু পয়সা ধরে দেয়। নৌকোর মালিকের একটা ছোট মনোহারী দোকান আছে। নৌকোর দেখাশোনা, ছোটখাট মেরামত চরের লোকেরাই করে নেয়। কাদাখোয়া ঘুমের মধ্যেই নৌকা শুনে জেগে উঠে কোথায় যেতে হবে তা বুঝে যায়।

তেমনি বুঝে যায় বাঁধের লোকজনও। চরের মানুষরা ত বটেই, হাট ও বাগানের মানুষও। তারা জানে নৌকোটা কোথায় বাধা আছে–এখান থেকে উত্তরে বাধটা যেখানে বাঁয়ে ঘুরেছে সেই কোণটাতে। অফিসার গাড়ি নিয়ে নরেশ-অমূল্যকে ঐ বাকটায় নামিয়ে দেবে আর কাদাখোয়া এদিক দিয়ে ঐ বাকটাতে গিয়ে পৌঁছুবে।

কিন্তু নৌকোটা ছাড়তে একটু প্রস্তুতির সময় লাগবে–এটাও বধের লোকজন জানে। এমনিতেই ভাঙাচোরা নৌকো-ঐটুকু জল পার হতেই নড়বড় করে। তার ওপর বৈঠা হিশেবে একটা বাঁশের সঙ্গে পেরেক সাঁটা একটা চওড়া কাঠ, থাকতে পারে, নাও পারে। এই ফ্লাডের জলে নৌকো ভাসানোর আগে, হাতুড়ি পাওয়া না যাক, অন্তত পাথর দিয়ে দুটো-একটা জায়গা ঠুকে নিতে হবে। আর, যেকজন যাবে, তিনজন ত হল, তাদের প্রত্যেকের হাতেই লম্বা লগি চাই, লগি ছাড়া এই জলের স্রোতে নৌকো সামলানো যাবে না। ভাল নৌকোই সামলানো যায় না, আর এ নৌকোর কথা কে বলবে?

বাঁধের লোজন নদীর দিকে এসে দাঁড়িয়ে ছিল। উল্টোদিকে অফিসারের জিপ থামার আওয়াজ পাওয়া যায়। তখন আবার কেউ-কেউ উল্টো দিকে যায়। ততক্ষণে অফিসারই উঠে এসেছে।

.

অপারেশন বাঘারু

বাঁধের ওপর উঠে এসে সোজা নদীর দিকে মুখ করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে অফিসার বলে, এখুনি ছেড়ে দেবে। তারপর বাঁ দিকে তাকায়–নৌকোটা যেদিক দিয়ে আসবে। তার দেখাদেখি অন্যরাও বা দিকে তাকায়।

এখন নৌকোটার আসাই প্রধান ব্যাপার। তাই বাঁধের ভিড়টা কিছুটা উত্তর দিকেও ছড়িয়ে পড়ে–সেখানে যে-দুটো-চারটে গরু বাধা ছিল সেগুলোকেও ছাড়িয়ে। আর, জিনিশপত্র পাজা করে যেখানে চরের লোকজন সংসার পেতেছে–মেয়েরা সেখানেই দাঁড়িয়ে গেছে।

অফিসার একটু ডাইনোয়ে তাকিয়ে বলে, নৌকোর যে কনডিশন দেখলাম, যেতে পারবে ত?

অফিসার বোধ হয় কোনো একটা উত্তর প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু উত্তর না পেয়ে সে আবারও ডাইনে বায়ে তাকায়। আবার, বা দিকে নৌকোর প্রবেশপথের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিয়ে অফিসার একটু ঘুরে কাউকে খোঁজে। তারপর নদীর দিকে পেছন ফিরেই ঘোরে, আরে, সেপাই দুটো গেল কোথায়? অফিসার যখন সেপাই দুটোর খোঁজে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে তখনই বাঁধের মানুষজনের মধ্যে চাপা আওয়াজটা বাতাসের বিপরীতে খেলে যায়–আইসছে, আইসছে। প্রথম দেখতে পেয়েছিল–যারা বাঁধের উত্তরদিকটাতে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার পরে যারা ছিল তারা দেখবার জন্যে হুড়মুড় করে এগিয়ে যেতে-যেতে বাঁধের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে যেতে থাকে ততক্ষণে নৌকোটা একটা টুকরো কাঠের মত স্রোতের মুখে এই বাঁধের লোকজনের মুখোমুখি এসে পড়েছে। বাঁধের বাকি অংশ থেকেও সবাই হুড়মুড় করে নীচে জলের একেবারে কিনারায় নেমে যায় বাঁধের ওপর থাকে অফিসার, রঘু ঘোষ, লিলি, গোপা, অফিসবাবুর বড় শালী, গুদামবাবু, হাটের কেউ-কেউ। বানভাসিদের দিকেও দু-একজন বয়স্কা আর নীচে নামেনি। গরুগুলি কী রকম বুঝতে পারে নদীতে কিছু ঘটছে, তারা নদীর দিকে মুখ করে গলা বাড়িয়ে দেয়। একটা গরুর গলায় দড়ি পেঁচিয়ে যায়। স্রোতের ধাক্কায় নৌকোটা স্রোতের মুখে বেঁকে গেছে। পাড় থেকে মনে হচ্ছে যে-কোন সময় ঐ দিক দিয়ে উল্টে যেতে পারে। কিন্তু নরেশ, অমূল্য আর কাদাখোয়া সেদিকে তাকাতেও পারছে না। নৌকোটা আর সোজা নেই, বেঁকে গেছে। এটাই নৌকোর পক্ষে বিপদ-সোজা না-থাকলেই নৌকো ডোবে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে যেতে-যেতেই নরেশ, অমূল্য আর কাদাখোয়া তাদের সমবেত শক্তিতে নৌকোটাকে সোজা করার জন্যে জলের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়েছে–নৌকোর ওপর দাঁড়িয়ে থেকে যতটা হুমড়ি খাওয়া সম্ভব। নৌকোর মাথার দিকে একটু আগুপিছু দাঁড়িয়ে নরেশ আর অমূল্য লগি মারছে আর তুলছে, মারছে আর তুলছে। তারা স্রোতের বিপরীতে লগি মারছে যাতে স্রোতের মুখে নৌকোর গতি বাধা পায়। কাদাখোয়া নৌকোর পেছন দিকে দাঁড়িয়ে স্রোতের দিকে মুখ করে সেই একই কাজ করছে। কিন্তু তাকে একা দুজনের কাজ করতে হচ্ছে–সে লগিটা তুলে একবার ডাইনে মারছে, একবার বায়ে মারছে। তিনজনেরই কাজ নৌকোটাকে স্রোতের বিপরীতে রাখা। আর সেই চেষ্টার ফলেই নৌকোটা স্রোতে ভেসে যায় না, কিছুটা এদের লগির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণটা আসে এরকম স্রোতের মুখে বেশ কিছুটা গেলে। স্রোতের মুখে নৌকোটা ছেড়ে দেয়ার পর প্রথম কাজ নৌকোটা সোজা রাখা। সোজা রাখতে পারলে কিছুক্ষণের মধ্যেই এই লগিফেলা-লগিতোলার মধ্যে একটা ছন্দ তৈরি হয়। তখন এমন স্রোতের মুখেও নৌকোটা আর ডোবে না। কিন্তু এখানে সেই সময়টা নিতে গেলে ঐ চর ছাড়িয়ে নৌকো চলে যাবে। তখন নৌকো ফেরানো অসম্ভব। বাধ থেকে ঐ চরের দূরত্বটা এখন জলে-জলে এতই কম যে কোনো রকমে নৌকোটাকে ঠেলে একটু সরিয়ে নিতে পারলেই নৌকোটা চরের কোনো চালে বা গাছে ঠেকে যাবে। কিন্তু এই স্রোতের বেগ ঠেলে সেই সামান্য সরিয়ে নেয়াটুকুও সম্ভব নয় যেন।

বাঁধের মুখোমুখি এসে নৌকোটা প্রায় বেঁকে যায়, অর্থাৎ স্রোতের অনুকূলে তার মাথা ও লেজ না থেকে, স্রোতের প্রায় আড়াআড়ি হয়ে যায়। এটা যদি ঠেকাতে না পারে, তা হলে নৌকোটা দুটো-একটা পাক খেয়ে স্রোতের ধাক্কায় কাত হয়ে যাবে।

কাদাখোয়া একবার ডাইনে একবার বায়ে মেরেও মেরেও নৌকোটিকে আর এটুকু সোজাও রাখতে পারে না, এদিকে অশ্বিনী রায়ের গুয়াবাড়ি প্রায় পার হয়ে যায়-যায়। হঠাৎ কাদাখোয়া বায়ে লগিমারা বন্ধ করে ডাইনেই পরপর তিনবার লগি মারে। সে লগিমারা যেন জলের মধ্যে বর্শা বেনো আর তোলা। নৌকোটা মুহূর্তের মধ্যে পাক খেয়ে যায়। বাধ থেকে একটা সমবেত আওয়াজ ওঠে, গেইল, গেই। কিন্তু ততক্ষণে নরেশ আর অমূল্যর মুখ চরের দিক থেকে বাঁধের দিকে ঘুরে আসতে থাকে আর কাদাখোয়া নৌকোর মাথায় চলে যায়। কাদাখোয়া নৌকোর দু-দিকে পা দিয়ে, যেন মাটি খুঁড়ছে, বা কোদাল মারছে এমন ভঙ্গিতে সেই লগি দু হাতে তুলে জলে বিদ্ধ করতে থাকে। জলে পড়তে না-পড়তে লগি কাত হয়ে যায়। কাত হতে না-হতেই লগি তুলে এনে আবার জলে বিধিয়ে দেয় কাদাখোয়া। নৌকোটা কোনাকুনি চরের দিকে ধেয়ে যায়–ঐ একখান সোঁতা পাইছে, পাইছে। ওখানে কোনো স্রোত চরের দিকেই যাচ্ছে। সেই স্রোতের বেগ ত চরের ওপর দিয়ে গেলেও কিছু কম নয়। কিন্তু ওরা নদীটা পার হয়ে চরে পৌঁছে গেছে। এখন চরে নৌকোটাকে আটকাতে পারবে কি না সেটা অন্য ব্যাপার। নৌকোটা ততক্ষণে অশ্বিনী রায়ের গুয়াবাড়ি ছাড়িয়ে সোজা দক্ষিণের স্রোতের দিকে যাচ্ছে। মাঝে-মাঝে জেগে থাকা এক-একটা চালের আড়ালে পড়ে যাচ্ছে।

এই, এই, এই, আটকিছে, আটকিছে, বাধে একটা সাড়া পড়ে যায়।

কী হল, কী হল? বলে অফিসার দু-পাশে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে। কেউই জবাব দেয় না।

অফিসার, তাড়াতাড়ি বাধ বেয়ে নীচে নামতে শুরু করে। তার সঙ্গে সঙ্গে রঘু ঘোষ, তার বৌ, ভাগ্নী, অফিসবাবুর বড় শালী, গুদামবাবু, হাটের লোকজনও নামতে থাকে। নামতে নামতেই লিলি জিজ্ঞাসা করে, কী, নৌকোটা উল্টে গেছে?

গোপা বলে, বাবা, গেল কী করে? এখন ফিরবে, না ওখানেই থাকবে?

লিলি বলে, ওখানে কি ওদের জন্যে বাগানের ইনস্পেশকশন বাংলো বানিয়ে রেখেছে নাকি?

জলের ধারে পৌঁছে ওরা পেছনে পড়ে যায়। ওদের দিকে কেউ তাকায় না। অফিসার পেছন থেকে এমন কাউকে খোঁজে যার সঙ্গে আগে কথা বলেছে। কিন্তু তেমন কাউকে না পেয়ে সে একজনের জামা ধরে টানে। সে ঘাড় ঝাঁকিয়ে জামাটা ছাড়িয়ে নেয়। কিন্তু অফিসার আবার তার জামাটা টেনে ডাকে, শুনুত ত অফিসারের গলা শুনে লোকটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই অফিসার জিজ্ঞাসা করে, কী? হলটা কী? নৌকোটি কি পৌঁছেছে?

হয়, হয়, আটকি গেছে, আটকি গেছে, বলে লোকটি আবার নদীর দিকে মুখ করে।

পেছন থেকে জগদীশ বারুই এসে অফিসারকে বলে, কী? দেখসেন? পৌঁছায়্যা গিছে?

অফিসার নদীর দিকে পেছন ফিরে জগদীশকে জিজ্ঞাসা করে, কী ব্যাপার? নৌকোটা উল্টেটুপ্টে যায় নি ত?

জগদীশ চিৎকার করে বলে ওঠ, উন্ট্যাবে ক্যান? কাদাখোগারে কন না, ঐ নৌকা নিয়া কাশিয়াবাড়ি চইল্যা যাবে। আর আমাগো নরেইশ্যা আর অমূল্যরও জোর আছে। জগদীশের ভঙ্গিতে একটা অধিকারের ভাব আসে যেন নরেশ, অমূল্য আর কাদাখোয়ার এই রকমের সাফল্যের পেছনে তারই প্রধান ভূমিকা।

অফিসার একটু অসহায় ভাবে বলে, এখন ফিরবে কখন?

জগদীশ খুব নিশ্চিত স্বরে বলে, ক্যান? এহনই? দেরি করব ক্যান?

.

নৃত্যভাষায় সংলাপ

অশ্বিনী রায়ের চালের বা সুপুরি গাছের কাছে নৌকোটা ভেড়ে না, সেগুলোকে বায়ে রেখে নৌকোটা কোনাকুনি চরের মধ্যে ঢুকে গিয়ে একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায় প্রায়। নরেশ গাছটাকে জড়িয়ে ধরলে নৌকো হঠাৎ টাল খেয়ে গাছটাকে ঘুরে স্রোতের মুখে চলে যায়। নরেশকে গাছ আর নৌকোর মাঝখানে ঝুলতে হয় কিন্তু ততক্ষণে কাদাখোয়া এক হাতে নৌকোটাকে আর-এক হাতে গাছটাকে ধরে জলে ঝাঁপ দিয়েছে। তাতেই নৌকোটা গাছের সঙ্গে সেঁটে যায়।

সমস্ত ঘটনাটা ঘটে যেন একেবারে সময়ের ছন্দে। বন্যার তিস্তার স্রোতে ভেসে এই গাছে এসে নৌকো লাগানোটা যেন অমূল্য, নরেশ আর কাদাখোয়র, প্রতিদিনের ফেরি পারাপারের মত দৈনন্দিন কাজ, যেন তাদের জানাই আছে স্রোতটার কোন জায়গায় এক দিক থেকে লগি তুলে নিলে নৌকোটা পাক খেয়েও ডুববে না, না-ডুবে সোজা এই চরের দিকে চলে আসবে, এবং অশ্বিনী রায়ের চালটাকে বায়ে রেখে কোনাকুনি এই গাছটাতে পৌঁছুবে।

আসলে ত এই নদীর, এই বন্যার এই স্রোতের সামান্য এক আঙুল জায়গাও তাদের চেনা বা জানা নয়। বন্যার জল কখন আসবে সেই হিশেবনিকেশ করে যাদের বাড়িঘর ও দাঁড়ানো ফসল ছেড়ে বাধে উঠে আসতে হয়েছে এবং সে-জল তাদের চোখের সামনে প্রতি মুহূর্তেই প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে উঠতে উঠতে বসবাসের চরে তাদের ফিরে যাওয়াটাই অনিশ্চিত করে তুলেছে–তারা কী করে আগে থাকতে জানতে পারবে এই দিনরাত রাতদিন ধরে বয়ে আসা জলস্রোত কোথায় কোন মোড় নিচ্ছে। তবু যে তারা একটা আধভাঙা নৌকো নিয়েও এই এমন স্রোতে এমন অনায়াসে ভেসে পড়তে পারে, তার কারণ এইটুকু স্থির বিশ্বাস যে খালি হাতপায়ে ভেসে গেলেও তারা শরীর নিয়ে কোথাও না কোথাও গিয়ে ঠেকে যেতে পারবে, জলে ডুবে মরবে না। নিজের ওপর এই বিশ্বাসটা স্থির–যতটা স্থির হওয়া সম্ভব। আবার, এই নদীর এখনকার অনিশ্চয়তাও সেরকমই স্থির। জলে ভেসে যাবার পর কিন্তু অমূল্য, নরেশ আর কাদাখোয়া তিনজনেরই একটা মাত্র ভয় মনের ভেতরে কাজ করে, যদি নৌকো উল্টে যায় তবে তারা এই জলের সঙ্গে ভেসে আর বেঁচে থাকতে পারবে না। কিন্তু তবু যে মৃত্যুভয়ে তারা অস্থির হয়ে ওঠে না–গায়ে আগুন লাগলে যেমন অস্থির হয়ে ছোটাছুটি করে ফেলে সবাই তার কারণ, তারা ত দেখেশুনে ভেবেচিন্তেই নৌকোটা ছেড়েছে, স্রোতটা কত খর বেগে বইছে তার একটা হিশেবও তাদের জানা আর স্রোতে কী ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে সেটাও তাদের আন্দাজ ছিল। তাই ঐটুকু প্রস্তুতি তাদের সামাল দেয়। কখনো একটা পায়ের ঝোঁকে, কখনো একটা হাতের চাপে নৌকোর টালমাটাল সামলাতে-সামলাতে তারা চরটাতে এসে যায়। নরেশ যে গাছটা জড়িয়ে ধরবে তা সে পূর্ব মুহূর্তেও জানত না, আর নরেশ গাছটা জড়িয়ে ধরলেই যে কাদাখোয়া গাছটা ধরে জলে ঝাঁপ দেবে তাও ঠিক ছিল না। এসব ত আর সেরকম ভাবে ঠিক থাকতে পারে না। এমন হতেই পারত যে নরেশ গাছের ডাল ধরে ঝুলে থাকল আর নৌকো তার পায়ের তলা থেকেও সরে গেল। তা হলে, নৌকো আর নরেশের পায়ের তলায় ফিরিয়ে আনা কারো পক্ষেই সম্ভব হত না। নরেশকে তা হলে ঐ গাছের ওপর উঠে বসে থাকতে হত।

কিন্তু নরেশ গাছটা জড়িয়ে ধরলেই যে কাদাখোয়া ঝাঁপ দিয়ে জলে পড়ে সেটা এক অদ্ভুত রহস্যনদীর স্রোত আর সেই স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার বহু কালব্যাপ্ত এক অভিজ্ঞতা আর অভ্যাসের ফল, সমবেত অভিজ্ঞতা ও সমবেত অভ্যাসের ফল। অথচ এর পরের কাজটার সমর্থন ছাড়া আগের কাজটা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে যায়। কাদাখোয়া ঝাঁপ দিলেই নরেশের ঝাপটার একটা অর্থ আসে। সে-অর্থ আসবে কি আসবে না, না-জেনেই নরেশকে ঝাপটা দিতে হয়, তারপর অর্থটা বুঝতে হয়। নরেশ ঝাঁপ দেবে কি দেবে না, সেটা না-জেনেই কাদাখোয়া ঝাপটা দেয়। এমন হতেও পারত যে কাদাখোয়াই আগে ঝাঁপ দিল, নরেশ পরে গাছটা ধরল। কিন্তু এই দুটো কাজ কোনো এক ভাবে গাথা হয়ে যায় এই বিকেলে, এই আসন্ন আকাশের নীচে, এই অঝোর বৃষ্টি আর বাতাসের অভ্যন্তরে। রংধামালির হাটের কাছে যে-পচা পাটের দড়িটা দিয়ে নৌকোটা বাধা থাকে, এই ভরা ফ্লাডে অমূল্য সেই দড়িটা দিয়েই গাছের ডালের সঙ্গে নৌকোটাকে বাধে। তারপর, তারা সকলে বাঘারুকে দেখতে পায়।

বাঘারু তার গাছগুলোর মধ্যে মাচানের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। সে বসেই ছিল–হঠাৎ ঐ চালটার ওপাশে মানুষের এমন ভেসে আসা স্বরে সে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। নরেশ আর অমূল্য তাকে আগেই দেখতে পারত, আর গাছগুলোর পাশ দিয়েই ত কোনা মেরে নৌকোটা ঢুকল। কিন্তু সেই সময় ত নরেশ বা অমূল্যর আর-কিছু দেখার দিকে চোখ ছিল না। বাঘারু যখন দেখে, ওরা তাকে দেখেছে, সে বসে পড়ল। এদের দিকে মুখ করে দুই হাঁটু জড়িয়ে ধরে বসে থাকল।

এখন এই নৌকো আর বাঘারুর গাছের মধ্যে মাত্র কয়েক হাত জল, জল না থাকলে এখানে অশ্বিনী রায়ের বেড়ার পরের খালি জমি। সেই খালি জমি, বাঁশের বেড়া, লাউয়ের মাচা, মটর শাকের ওপর কয়েক মানুষ সমান জলের মাথায় এই নৌকো আর ঐ মাচান। মাটিতে গাছের যে-ডালটা ঘাড় হেলিয়ে দেখতে হত, সেই ডালটাতে হাত লাগিয়ে নরেশ এখন তাকিয়ে বোঝে অশ্বিনী রায়ের চালের কাছে সুপুরি গাছের মাথাটা ঐ লোকটার ঐ মাচানে নামার সিঁড়ির মত। সুপুরি গাছে উঠে ও নেমে এসেছে–আর নরেশরা বাধ থেকে দেখল, নোকটা সুপুরি গাছে উঠল অথচ নামল না।

বাঘারু তার মাচানে বসে বোঝে, এই জায়গাটায় তা হলে আরো অনেকেই এসে পড়বে। এসে পড়ারই কথা। জলভোবা তিস্তায় ত এতগুলো চাল আর গাছ এক জায়গায় পাওয়াই মুশকিল। এখন এই জায়গাটাকে নদীটার মাঝখানেই মনে হচ্ছে বাঘারু জানে না আসলে কতটা মাঝখানে। বাঘারু দেখে–এর তিনজন তোক একটা নৌকো নিয়ে এসেছে কিন্তু কোনো গাছ নিয়ে আসে নি।

তাদের দাঁড়ানো জলের তলার ঘরবাড়ি খেতখামারের ওপর দিয়ে নরেশ চিৎকার করে–আরে, তুমি ঐ চালের উপুর বইস্যা ছিলা? সেই তখন?

কথাটা কী রকম অবান্তর হয়ে যায়। বাঘারু তার গাছগুলোর মধ্যে মাচানে আর এরা তিনজন এই একটা নৌকোয় একটা গাছ জড়িয়ে-মাঝখানে কয়েক হাতের তফাত। কিন্তু এই কয়েক হাতের ওপর দিয়ে জলরাশি বাকি জলস্রোতের মতই তীব্র, ঘোলাটে, ঘূর্ণিময় ও প্রায় ঢেউহীন। মাত্র এই কয়েক হাত জলের দূরত্ব তারা ঘোচাতে পারে না। কিন্তু সেই জলে গাছ ধরে ঝুলে থাকার প্রাণান্তিক ভঙ্গিতে নরেশ এমন কাতর স্বরে এই সামাজিক জিজ্ঞাসা ছাড়া আর-কিছু উচ্চারণ করতে পারে না। ঐ পাড় থেকে নরেশ আর অমূল্য যখন নৌকো নিয়ে ভেসেছে তখন তাদের লক্ষ্য ছিল এখানে এসে কোনো লোক থাকলে তাকে নৌকোতে তুলে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু ঐ নৌকোটা জলে ভাসা মাত্র তাদের সেই লক্ষ্য। তারা ভুলেই যায়। তখন তাদের প্রাণপণ চেষ্টা কোনো রকমে এই সুপুরি গাছ আর টিনের চালের কাছে পৌঁছনো। যখন পৌঁছয়, তাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য তারা ভুলেই যায়। বাঘারুকে প্রায় আবিষ্কারের মত দেখে, আবার তাদের সেই কথা মনে পড়ে যায়। তখন ত তারা তিস্তার সেই দিগন্তব্যাপ্ত স্রোতের মুখে একটা কুটোর মত ভাসছে। নরেশের গলা থেকে ঐ অবান্তর সামাজিক জিজ্ঞাসা ছাড়া কিছু বেরয় না।

কিন্তু বাঘারু বোঝেই না কথাটা তাকে বলা হল। সে এদের দিকে তাকিয়ে থাকে। লোকগুলো যখন একটা গাছ ধরতে পেরেছে তখন কোনো একটা ব্যবস্থা করে নেবে। বাঘারু তার দড়ি আর কুড়োলের কথা ভাবে বটে কিন্তু সেটা ওদের কোনো কাজে লাগবে কিনা আন্দাজ করতে পারে না।

নরেশ দেখে, তাদের আবার কোন জলস্রোত ভাঙতে হবে। সে চিৎকার করে বলে, অমূইল্যা, জিগ্যাইবার পারস না?

অমূল্য নৌকোর ওপর থেকে বাঘারুকে ডাকে, শুইনছেন? এই দেউনিয়া, শুইনছেন? বাঘারু ওদের দিকেই তাকিয়ে, দেখেও যে ওরা কিছু বলছে, কিন্তু কোনো জবাব দেয় না। সে বুঝতেই পারে না, ওরা তাকে ডাকাডাকি করছে! অমূল্য এবার একহাতের আঁজলায় নদীর জল তুলে বাঘারুর দিকে ঘেঁড়ে। সে জল বৃষ্টির সঙ্গে মিশে তাদের গায়েই পড়ে।

আরে, বোবা নাকি? ফিইরতে হব না? নরেশ বাঘারুর দিক থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে সেই ফেরার অনিশ্চয়তাটা একবার মাপে। লোকটাকে নৌকোতে তুলে সেই স্রোতের মুখে আবার নৌকোটা ছাড়তে হবে।

অমূল্য লগিটা নিয়ে বাঘারু ও তাদের মাঝখানে যে-জল তাতে মারে। একটু জল ছিটকোয় বটে, লগিটা স্রোতের এক ধাক্কায় অমূল্যর পেছনে চলে যায়। অমূল্য লগিটা তুলে আনে।

বাঘারু বুঝে উঠতে পারে না–এরা তিনজন কী করছে। তোকগুলি এসে গাছটা জড়িয়ে ধরার পর সেই অবস্থাতেই আছে। গাছের ওপরও উঠছে না, গাছটাতে তেমন করে দড়িও বাধছে না। হাঁপি গেইছে, জিরাবার ধরিসে! এরকমই ভেবে নিয়েছিল বাঘারু। তারপর, ওদের জল ছিটনো, জলে বাশ মারা এগুলোর কোনো অর্থ তৈরি করতে পারে না। কিন্তু তার জীবনে, বা দৈনন্দিনেই যে কাজের সঙ্গে তার শরীরের সম্পর্ক তৈরি হয় নি, সে কাজের কোনো অর্থ তার কাছে তৈরি হয় না। বোঝার চেষ্টা না করার মধ্যে তার কোনো সিদ্ধান্ত নেই। শরীর ছাড়া সে কী দিয়ে বুঝবে? এমন কি, যেখানে তার শরীর থাকেও সেখানেও অনেক কিছু তার বোঝার বাইরে চলে যায়।

কিন্তু নরেশ আর অমূল্য অস্থির হয়ে ওঠে। তাদের কাছে এখন বাধে ফিরে যাওয়াটা খুব অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সেই অনিশ্চয়তার সামনে এখানে এই লোকটির এমন বোবা ও অথর্ব হয়ে বসে থাকাটা অসহ্য ঠেকছে। লোকটাকে এই নৌকোয় তোলার একটা সমস্যা আছে। কিন্তু সে-সমস্যাটা ত পরের কথা। লোকটির সঙ্গে কথাই ত এখনো বলতে পারল না।

হঠাৎ মরীয়া হয়ে অমূল্য আর নরেশ একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে, কী, শুইনব্যার পারেন না? বোবা কালা?

কাদাখোয়া গাছের ডালটা জড়িয়ে নৌকোর ওপরই বসেছিল–যে-দড়ি দিয়ে নৌকোটা বাধা সেটা স্রোতের একটানে ছিঁড়ে যাবে। নরেশ আর অমূল্য যে-ভাবে নৌকোর মধ্যে টলমল করতে করতে বাঘারুর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে, তাতে বাঘারু বুঝে ফেলে ওরা তার কাছে কিছু একটা চাইছে। সে লাফ দিয়ে দাঁড়ায়, তার কুড়োলটা নিয়ে। সেটা হাতে তুলে বাঘারু চিৎকার করে, নাগিবে?

নৌকোটা দুলে ওঠে। নরেশ আর অমূল্য একটু টাল খায়। তাড়াতাড়ি ঘাড় ফিরিয়ে সেই স্রোতপথ দেখে নেয়, গাছ থেকে আলাদা হয়ে গেলে যেখান দিয়ে তাদের ভেসে যেতে হবে।

নরেশ আর অমূল্য ঘাড় ঘোরাতেই বাঘারু নাইলনের দড়ির বাণ্ডিলটা তুলে ধরে চেঁচায়, নাগিবে? এইখান নাগিবে?

অমূল্যর মাথায় বুদ্ধি এসে যায়। সে দু হাত দিয়ে বোঝায় দড়িটা তাদের চাই। অমূল্যর ইঙ্গিত বুঝতে পেরে বাঘারু তাড়াতড়ি বাণ্ডিলটা থেকে দড়ি খুলতে থাকে। সেই প্রক্রিয়াটা ওদের দেখতে হয়–ঐ জলের ওপর দাঁড়িয়ে বাঘারু তার গলা থেকে পায়ে সোনালি দড়ির স্রোত নামিয়ে দিচ্ছে।

নরেশ বলে–এ কে রে? একেবারে কুড়াল নিয়া, দড়ি নিয়া, আমাগো রেসকু দিব্যার ধইরেছে। বলেই নরেশ আবার চিৎকার করে, হে-এ দাদা, হে-এ দাদা। দুহাতে দড়ি নিয়ে বাঘারু তাকায়। নরেশ হাত তুলে তাকে থামতে বলে। বাঘারু থামে। নরেশ অমূল্যকে বলে, হে-এ অমূইল্যা, বুঝ্যায়া দে, দড়িখান কাটার কাম নাই, ভাসায়্যা দিক, ঐ মাথা ধরা থাকুক। আমরা দড়ি ধরা টাইন্যা ওর বগলে যাই। নয়ত বুঝাবি ক্যামনে যে আমরা অকনিব্যার আইসছি? অমূল্য হাততালি দিয়ে বাঘারুকে ডাকে। তারপর এক হাত বাতাসে তুলে রেখে আর-এক হাত জলে লাগিয়ে তুলে আনে, যেন জল থেকে কিছু তুলে আনল এমন ভঙ্গিতে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অমূল্য নিজের বুকে দুই হাত দু-তিনবার ছুঁয়ে বাঘারুর দিকে মেলে দেয়। দু তিনবারের পর, আরো দু-তিনবার। অমূল্য বোঝে, সে যদি এই কথাটা বোঝাতে পারে যে ওরাই বাঘারুর কাছে যেতে চাইছে, তা হলে বাঘারু দড়ি ভাসিয়ে দেবে। তাই সে দড়ি ভাসানোর অনুরোধ জানানোর ভঙ্গির আর পুনরাবৃত্তি করে না। অমূল্য যেন নিজেও নিশ্চিত নয় যে এক হাত জলে আর একহাত বাতাসে রেখে সে তার কথা বোঝাতে পারবে কিনা। কিন্তু তার চাইতে এ ভঙ্গিটা অনেক বেশি নিশ্চিত–দুই হাতে নিজের বুক ছুঁয়ে, হাত দুটি বাঘারুর দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই ভঙ্গির দ্বিতীয় কোনো অর্থ হতে পারে না। বাঘারু দু হাতে নাইলনের দড়িটা ঝুলিয়ে অমূল্যর দিকে তাকিয়ে থাকে। সে অর্থটা বুঝতে চায়। বন্যার তিস্তায় কোন ভঙ্গির কী অর্থ তা যেন আগে থাকতেই ঠিক হয়ে থাকে। এমন জলের মধ্যে যদি এমন সাক্ষাৎকার ঘটে যায় তা হলে সেখানে অর্থবিনিময়ে দেরি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তবু যে ঘটছে তার কারণ বাঘারুর আজীবন অর্থবোধহীনতা, এমনকি অন্যের শরীরের ভাষা বোঝার অক্ষমতা, শরীরেরও অক্ষরজ্ঞানহীনতা। বাঘারু তার নিজের শরীর দিয়ে একটার পর একটা এমন কাজ করে যেতে পারে–যার অর্থ, একেবারে নিকট অর্থ, হয়ত তার কাছে ধরা পড়ে, বা, যারা দেখে তাদের কাছে হয়ত একটা দূরার্থও এসে যায়। এই যেমন, বাঘারুকে যখন গয়ানাথ গাছগুলোর সঙ্গে ভেসে যেতে বলেছিল, তখন, বাঘারুর কাছে তার অর্থ ছিল ফ্লাডের জল আর স্রোত আর ভাসমান ঐ চারটি গাছের সঙ্গে নিজের শরীরটাকে জুড়ে দেয়া আর গয়ানাথ আসিন্দিরের কাছে তার অর্থ ছিল জল নেমে গেলেও গাছগুলো নিরাপদ থাকবে। এখন তার এই চারটে গাছের মধ্যে বানানো মাচানটাতে দাঁড়িয়ে বাঘারুর বর্ণপরিচয় ঘটছে, অমূল্যর ইঙ্গিত বুঝতে বুঝতে বর্ণপরিচয় ঘটছে। তাই এ সাক্ষাৎকারে এমন অকারণ দেরি ঘটে যাচ্ছে।

কিন্তু বিকেল আর-বেশিক্ষণ নেই। ঝুপ করে অন্ধকার শুরু হলে এখান থেকে তারা আর ওপারে যেতে পারবে না। বৃষ্টি বাতাস কিছুই কমে নি। তিস্তায় এখনো এত জল আসছে যে তা মাপার মত কোনো দিগন্তও চোখের সামনে নেই। আজ রাতে এখানে গাছের ডালে, বা টিনের চালে, বা এই নৌকায়, বা ঐ মাচানে থাকা যাবে না। সারা রাতের মধ্যে এসব ভেসে যেতে পারে। নরেশ আর অমূল্যর পক্ষে সেটা আরো কঠিনফ্লাড আসার আগে যারা নিরাপদে গাই-গরু-সংসার নিয়ে বাধে উঠেছে, তাদের এখন এই ভরা ফ্লাডের ভেতর নিজের চরের চালে বা নিজের চরের গাছের ডালে রাত কাটাতে হবে? বাঁধের ওপর থেকে এই জেগে থাকা গাছ আর টিনের চালগুলোকে কত আপন লাগছিল তাদের, আর সেই চর-ডুবনো- এই জলরাশির ভেতরে ঐ গাছটাকেই, তাদের নিজেদের, চরের গাছটাকেই, কত অপরিচিত লাগছে। তিস্তার বন্যা যে তাদের সত্যি বসবাসহীন করে দিল–এটা বোঝার জন্যে কি এই বিকেলে কয়েকশ টাকার জন্যে নৌকো ভাসানো তাদের ঠিক হল? নরেশ আর অমূল্য যখন এমনই গৃহকাতর ও অস্থির হয়ে ওঠে তখনই অমূল্যর ভঙ্গির অর্থ বাঘারু বুঝে ফেলতে পারে। সে দড়ি ফেলে দিয়ে দুই হাত আকাশে তুলে তাদের আশ্বস্ত করে–আনছে, আনছে, তাদের এখানে আনছে। বাঘারু একথার পর মাচানটা দেখে, তারপর চালের টিনটা দেখে।

.

বাঘারু ও উদ্ধারকারীদল

বাঘারু চট করে একটা হিশেব করে নেয়। মাচান থেকে দড়ি জলে ফেললেই ওরা ধরে ফেলতে পারবে। তারপর সেই দড়িটায় টান দিয়ে দিয়ে এই গাছগুলোর তলায় পৌঁছে যেতে পারে। কিন্তু এই গাছগুলোর ডালপালা, এই মাচান কি চার-চারটি লোকের ভার বইতে পারবে? ওরা এক সঙ্গে এর কোনো ডালে পা দিলেই ত সে ডাল ডুবে যাবে। তার চাইতে টিনের চালটাতে ওদের ভোলা যায়। সুপুরি গাছ দিয়ে ওরা চালে উঠে যেতে পারবে।

বাঘারু ডাল বেয়ে-বেয়ে সুপুরি গাছটার কাছে গিয়ে সুপুরি গাছটাকে জড়িয়ে ধরে দু ধাক্কাতেই মাথায় উঠে যায়, তারপর একটু ঝুলে অশ্বিনী রায়ের চালে পা দেয়। যে-দড়িটুকু সে খুলেছিল, সেটুকু তার শরীর থেকে সেই জলের ওপরের শূন্যতায় ঝোলে, দোলে ও তার শরীরের গতির সঙ্গে সঙ্গে ঘুরপাক খায়।

বাঁধের লোকজন দেখে সুপুরি গাছের ওপর থেকে লোকটা আবার অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর নেমে এসেছে।

নাইমছে, নাইমছে, চিৎকার ওঠে।

ক্যানং করি নামিবে, এতগিলা টাইম কায় পারে সুপুরি গাছের উপর বসি থাকিবার? ভাল করি দেখ, নরেশুয়াখান ঐঠে উঠিছে নাকি? কেউ একটু সন্দেহ জানাতেই সবাই এই বাধ থেকে মাপার চেষ্টা করে টিনের চালের ওপর লোকটা নরেশ কি না।

অফিসার দু পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, কী? এই লোকটাই ভেসে এসেছিল নাকি? কিন্তু তার কথার কোনো জবাব কেউ না-দেয়ায় সে আবার দু পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, অ্যাঁ?

লিলিও এই একই প্রশ্ন করে রঘু ঘোষকে। রঘু ঘোষ ঘাড় না-ফিরিয়ে জবাব দেয়, তা আমি জানব। কী করে? তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে যোগ করে, সেই লোকটাই কী না, তা দিয়ে তোমার দরকারই বা কী? তোমার ত ঐ চালে একটা লোক দরকার–সে যোই হোক না।

অফিসবাবু পেছনে বাঁধের ওপর থেকে ডাকেন, এই রঘুবাবু, কী বলছেন? কে ওখানে?

রঘু ঘোষ হাত তুলে আঙুলগুলো ঘুরিয়ে দেয়।

না, না, কেডা কইছে নরেইশ্যা? নরেইশ্যা ত ফুলপ্যান্ট পইর‍্যা গিছে? এই লোকটার ত নেংটি। কেউ একজন নিশ্চিত স্বরে জানায়।

এতডা জল ঠেইল্যা গেলে ফুলপ্যান্টও নেংটি হয়্যা যায়, আর-একজন সেই নিশ্চয়তা মুহূর্তে ভেঙে দেয়।

তয়; কাদাখোয়া, হবা পারে, আর-একটা নতুন প্রস্তাব আসে।

এইবার আবার একটু সবাই চুপ করে যায়। এত দূর থেকে চালের ওপর লোকটার চলাফেরা আর দৈর্ঘ্যটাই কিছু বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু নরেশও ত লম্বাই–যদিও এতটা লম্বা ঠিক মনে হয় না। তা হলে কাদাখোয়া হতেই পারে। কিন্তু লোকটি যে-ভঙ্গিতে চালের ওপর চলাফেরা করছে, হাত নাড়ছে সেটা কাদাখোয়ারই কিনা তা চিনে নেবার মত গভীর ভাবে কে কবে এখানে কাদাভোয়াকে কাজ করতে দেখেছে? চালের ওপরের লোকটি কাদাখোয়াই কিনা এটা যাচাই করতে করতেই এই ভিড়ের কাছে চেনা কাদাখোয়া অচেনা হয়ে যায়।

হবা পাবে, কাদাখোয়া হবা পারে।

কাদাখোয়া হবা পারে নরেশুয়াও হবা পারে।

ঐ মানসিডাও হব্যার পারে। না হইলে রেসকু করবেন কারে?

অফিসার দু পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, লোকটিকে পেয়েছে ত, নাকি? কিন্তু অফিসারের কথার কোনো জবাব কেউ দেয় না। অফিসার আবার ঘাড় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, পেয়েছে নাকি?

বাঘারু টিনের চালের কিনারে এসে দাঁড়ায়, তারপর তার পেছনে নাইলনের যে-দড়িটা ঝুলছে সেটা টেনে-টেনে এনে জড়ো করে। এই দড়ির ত কোনো আগা নেই, সবগুলো গাছই দড়িতে-দড়িতে বাধা। বাঘারুর হাতে টান লাগে, আর-দড়ি আসে না। তখন সে ঐ সবটা দড়ি পা দিয়ে নীচে ফেলে দেয়, জলে। জলে পড়া মাত্রই দড়িটা অনেকগুলো দড়ির মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়েই সোজা হয়ে যায়। দড়ির মাঝখানের বৃত্তটা বড় হয়ে যায়। কিন্তু নরেশদের নৌকোর কাছে দড়িটা পৌঁছয় না। অমূল্য একটা লগি দিয়ে দড়িটা টেনে নেয়।

নরেশ আর অমূল্য যেন বাঘারুকে উদ্ধার করতে আসে নি, বাঘাই যেন তাদের উদ্ধার করছে—অমূল্য এমন ভাবে দড়িটা টেনে পরীক্ষা করে। দড়িটাতে টান দিতেই তাদের নৌকোতেও টান লাগে, নৌকোটা চালের দিকে ঘোরে। কাদাখোয়া জিজ্ঞাসা করে, খুলি দিম? অমূল্যর সঙ্গে নরেশও দড়িটায় হাত লাগিয়ে আস্তে বলে, দে কেনে। কিন্তু নরেশের কথায় কিছু একটা সংশয় ছিল। কাদাখোয়া দড়ি খোলে কিন্তু গাছ ছাড়ে না।

দড়িটা বিপরীত দিকে কিসের সঙ্গে বাঁধা তা ত আর ওরা জানে না, ফলে ওরা দড়িটাতে জোরে টান দিতে ভরসা পায় না। যেখানে দড়িটা বাঁখা আছে সেটা যদি তাদের টানে খুলে যায় তা হলে স্রোতের একটা টানে নৌকোটা এমন ছিটকোবে, তারাও সেরকম ছিটকে জলে গিয়ে পড়তে পারে। সেই ভয়ে তারা নৌকোর ওপর দাঁড়িয়ে জোরে-জোরে টেনে পরীক্ষা করারও সাহস পাচ্ছে না। চালের ওপর থেকে বাঘারু চিৎকার করে, টানেন, টানেন, না-ছিড়িবে, না-ছিড়িবে, কিন্তু সেটুকু বলেই বাঘারু বসে থাকে না, সে দড়ির আর-একটা দিক চালের ওপর থেকে হাতে তুলে নেয়, দড়িটাকে সমান করে নিয়ে জোরে টানে। সেই টানের জোরে অমূল্য আর নরেশ বোঝে দড়ি খুলে যাবার কোনো ভয় নেই। খুলি দে, খুলি দে, কাদাখোয়াকে নরেশ বলে।

কাদাখোয়া দড়িটা খুলতেই নৌকোটা গাছ থেকে সরে যায়, দড়িটা টানটান হয়ে পড়ে আর জলস্রোত এসে নৌকোর সামনে উছলে ওঠে। মাত্র কয়েক হাতের সেই দূরত্ব স্রোতের বিপরীতে যেতে তার সমস্ত জোর হাতে এনে দড়িটা ধরে টানে। কাদাখোয়ও হাত লাগায়। কিন্তু তাদের তিনজনই বুঝে ফেলে স্রোতের বিপরীতে একটা হেঁচকা টানে এই দূরত্বটা পার হতে গেলে স্রোত ফুলে উঠে নৌকো উল্টে দিতে পারে। তা ছাড়া, দড়িটাতে হাত লাগিয়ে শরীরটা ঝুলিয়ে দিয়ে যে-টান দেয়া যায়, তার জন্যে ত গোড়ালি রাখার একটা জায়গাও দরকার। এ নৌকোতে তেমন কোনো জায়গা নেই। স্রোতের মুখে নড়বড় করতে করতেও যে-নৌকো এ পর্যন্ত এসে গেছে, স্রোতের বিপরীতে সে-নৌকোর তলার তক্তা ফাঁক হয়ে যেতে পারে।

কিন্তু মাত্র ত কয়েক হাতের ব্যাপার। তাই আস্তে-আস্তে টানলেও তারা ঐ গাছগুলোর কাছে পৌঁছে যায়। বাঘারু চালের ওপর হুমড়ি খেয়ে তলার বটমে হাত দিয়ে দড়িটা গুঁজে দেয়। কাদাখোয়া বাঘারুর গাছগুলোর একটা মোটা ডালে দড়িটা বেঁধে দিয়েও ডালটা ধরে থাকে।

সুপুরি গাছটা ধরার জন্যে এই গাছগুলোর একটা ডালে একটু পা দিতেই হয়। অমূল্য পা দিয়েই বোঝে, ঝোঁক দিলে ডালটা ডুবে যাবে। সে আলগোছে ডালে পা দিয়ে সুপুরি গাছটায় যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে। সুপুরি গাছ বেয়ে অমূল্য চালে নামতেই নরেশ তার লম্বা হাতে নৌকোর ওপর থেকেই সুপুরি গাছটাকে জড়িয়ে ধরতে পারে। ওরা দুজন নেমে গেলে নৌকোটা জলের ওপর আরো হালকা হয়ে যায়। কাদাখোয়া নৌকোর ওপর বসে বসে এই ডাল ঐ ডাল ধরে নৌকোটাকে ডালপালার আরো ভেতরে নিয়ে যায়। সেজন্যে তাকে বাধনটা খুলতেও হয়। নতুন বাধনে নৌকোটা আরো একটু ভালভাবে আটকা পড়ে। কাদাখোরা সামনে হেলে সুপুরি গাছটাতে হাত দেয়। কিন্তু কী মনে করে ঝাঁপ দেয় না–ধাক্কা দিয়ে হাতটা সরিয়ে আনে। তার ত চালের ওপর কোনো কাজ নেই, বরং এখানেই থাকুক, মুই এইঠে থাকি, নৌকোর ভিতর, এইঠে। সে নৌকোর ভেতর বসে পড়ে।

.

বাঁধের ওপর তর্কবিতর্ক

বাঁধের ওপর থেকে দেখা যায়—আরো দু-জন চালের ওপর নেমে এল। অমূল্যকে সবাই চিনে ফেলে–সবার চেয়ে খাটো বলে। কিন্তু যে আগে চালের ওপর দাঁড়িয়েছিল সে, নরেশ, না কাদাখোয়া, এ নিয়ে সন্দেহ ছিল। এখন, অমূল্যর সঙ্গে যে নামল, তাকে যদি নরেশ বলে ধরে নেয়া যায়, তা হলে আগের লোকটা ত কাদাখোয়াই হয়। তা হলে, যে-লোকটিকে উদ্ধার করার জন্যে এরা এখান থেকে নৌকো নিয়ে রওনা হল, সে লোকটা কোথায়? সুবুরি গাছে চড়ে সে লোকটা কি সত্যি-সত্যি উধাও হয়ে গেল নাকি?

অ্যাঁ? আরে, যে-মানুষডারে রেসকু কইরব্যার গেল, সেই মানুষই ত নাই, এহন অগরে রেসকু করার জন্যে আর একখান নৌকা ছাড়ো। অ্যাঁ?

কথাটা শুনে অফিসার ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সে কী? লোকটি নেই? লোকটি নেই নাকি? কী? আপনারা লোকটিকে দেখতে পাচ্ছেন না?

পেছন থেকে একটা গলা শোনা যায়, চালের উপর কয়খান মানষি দেখিছেন?

দেখছি ত তিনজন, তিনজন, বলে অফিসার আবাব চালের দিকে তাকিয়ে মিলিয়ে নেয়, হ্যাঁ, তিনজনই।

এইঠে কয়ডা মানষিক নৌকা করি ছাড়ি দিলেন? আবার প্রশ্ন।

ওরা ত দুজন ছিল, আর-একজন ত এখান থেকে যাওয়ার কথা, সে গিয়েছে ত? অফিসার একটু ব্যস্ত হয়ে এপাশ-ওপাশ ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে। তার কথাতে সবাই একসঙ্গে হেসে ওঠে। হাসিটার কোনো অর্থ অফিসার বুঝতে পারে না, কিন্তু তার কথার সঙ্গে এই হাসির সম্পর্ক অনুমান করে আবার এদিক-ওদিক তাকায়। হাসিটা থামার পর জগদীশ বারুই বলে ওঠে, এইখান থিকা আপনার চোখের সামনে কয়জনরে দেইখলেন নৌকা কইর‍্যা যাতে?

তিনজন, তিনজন, তিনজনই ত ছিল– অফিসার জগদীশ বারুইকে খুঁজতে-খুঁজতে জবাব দেয়।

হয়? ঐ তিনজনই ছিল, তিনজনই, আছে, জগদীশ বারুই বিড়ি টানে সশব্দে।

তালই কি দেখব্যার পারতিছেন অগ? তয় না শুনি আপনার ছানি পড়ছে, খুব নিচু স্বরে কেউ বলে।

জগদীশ বারুই হাসতে গিয়ে কেশে ফেলে। তারপর, কাশিটা বাড়তে থাকে। বুক থেকে কফ তুলে কাশিটা শেষ। তারপরও জগদীশ বারুইকে গলা পরিষ্কার করতে হয়। এর মধ্যে একজন বলে, ঐটা কাদাখোয়া। কাদাখোয়াই আগত্ চালে উঠিছে, নরেশুয়ার গাওত ত জামা আছে

হয়, হয়, নরেশুয়া, অমূল্যা, কাদাখোয়া–এই তিনো মানষি। আর সেই মানষিডা নাই। কথাটা প্রায় সিদ্ধান্তের মত শোনায়।

অ্যাঁ? লোকটা নেই? যাকে রেসকিউ করতে গেল, সেই লোকটাই নেই? আর আপনারা এখানে এমন চেঁচামেচি শুরু করলেন যেন ওখানে কত লোক ভেসে এসে উঠেছে। তারপর আবার হাজার। টাকা-দেড় হাজার টাকা নিয়ে দর কষাকষি শুরু করলেন। এখন ত আমাকে এক্সপ্ল্যানেশন দিতে হবে-লোক না দেখে নৌকো পাঠালাম কেন? বলতে বলতে অফিসার সরে আসে আর রঘু ঘোষকে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে চিৎকার করে, কী মশাই? আপনারাই ত বাগান থেকে ফোনের পর ফোন করলেন যে লোক ভেসে আসছে। এখন লোক কোথায়? দিন।

রঘু ঘোষ হে-হে করে হেসে ওঠে, আরে, আপনি আমার ওপর রাগারাগি করছেন কেন? আমি কী করলাম?

আপনারাই ত বাগান থেকে ফোন করেছেন–সকালে একবার, বিকেলে একবার।

সে ম্যানেজারবাবুকে বলুন, রঘু ঘোষ দায়িত্ব অস্বীকার করে, এখানকার লোক গিয়ে বলেছে তাই। ফোন করা হয়েছে।

তাই বলে না দেখে ফোন করবেন নাকি?

অফিসারের সঙ্গে রঘু ঘোষের কথাবার্তা শুনে বাগানের লোকজন পায়ে-পায়ে একদিকে জড়ো হতে শুরু করে–গুদামবাবু, অফিসবাবুর বড় শালী, লিলি, গোপা, আরো দু-একজন। গুদামবাবু জিজ্ঞাসা করে, কী? কী হয়েছে?

রঘু ঘোষ একটু সরে এসে বলে আরে, ওখানে লোক পাওয়া যায় নি সেটা কি আমাদের দোষ? ফ্লাডের সময় কেউ যদি এসে বলে নদী দিয়ে তোক ভেসে যাচ্ছে, ফোন করে দিন, তা হলে আমরা কী করব, ফোন করব না?

লিলি আস্তে বলে, অত চৈঁচাচ্ছ কেন?

গুদামবাবু বলে, ঠিক আছে, ঠিক আছে, ওঁদের কিছু বলার থাকলে হেড-অফিসে জানান, আমাদের বলে কী লাভ?

অফিসবাবুর বড় শালী বলেন, চলুন, চলুন, এখন ফিরে চলুন।

এদিকে বাগানের বাবুদের ও বাবুদের বাড়ির মেয়েদের এক জায়গায় জড়ো হয়ে এরকম কথাবার্তা বলতে দেখে বাগানের যেকুলিকামিনরা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে ছিল, তারাও এসে এখানে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে একজন একটু এগিয়ে এসে রঘু ঘোষকে জিজ্ঞাসা করে, কী, হোগেলাক হে, অফিসবাবু!

রঘু ঘোষ তার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে হেসে বলে, তোরা আবার কোত্থেকে এসেছিস? যা

তা তুইও চলেক একটা মেয়ে পেছন থেকে বলে ওঠে, হে বৌদি, অফিসবাবুকে লিগেলা?

কে রে? বলে রঘু ঘোষ হাসতে-হাসতে মেয়েদের দলটার দিকে চোখ পাকায়। অফিসার ততক্ষণে ভিড়টার পেছনে চলে গেছে। সেখানে দেখে জগদীশ বারুই আর অশ্বিনী রায় বোল্ডারের ওপর উবু হয়ে বসে বিড়ি খাচ্ছে আর মাঝেমধ্যে ঘাড় উঁচু করে ভিড়ের পেছনটা দেখছে। অফিসার তাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলে, এই যে আপনারা এখানে! তখন ত খুব বললেন, কত লোক ভেসে আসছে, এখনি নৌকো পাঠাতে হবে, মিলিটারি চাই। মিলিটারি এলে ত আপনাদেরই এখন জলে ভাসাত

অফিসার দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বলছিল, ফলে, জগদীশ বারুই আর অশ্বিনী রায় বোঝে না কথাটা তাদেরই বলা হচ্ছে। তারা বিড়ি খেয়েই যায়। জগদীশ বারুই একবার মুখ তুলে জিজ্ঞাসা করে, কীরে, কিছু হইল নাকি?

অফিসার বলে ওঠে, হবেটা আবার কী? লোক থাকলে ত আনবে। লোক না থাকলে কোত্থেকে আনবে? আর আপনারা এদিকে ত বলছিলেন কত লোক ভেসে আসছে–

অশ্বিনী রায় ঘাড় তুলে অফিসারকে দেখে উঠে পঁড়ায়। জগদীশ বারুই অশ্বিনীকে দাঁড়াতে দেখে ঘাড় তুলে দেখে–তারপর সেও দাঁড়ায়। অশ্বিনী রায় একটু সরে যাওয়ার চেষ্টা করে! জগদীশ বারুই তার হাত ধরে টেনে অফিসারকে জিজ্ঞাসা করে, কী কন?

বলছি, তখন ত খুব লোক ভাসাচ্ছিলেন, এখন ত ওখানে একটা লোকও পাওয়া যাচ্ছে না। মিলিটারি এলে কী হত?

সে কী হইত, আপনারা জানেন। লোক না থাইকলে কি লোক পয়দা কইর‍্যা ভাসায়্যা চালের উপর থুইয়্যা আইসব নাকি? তাও ত দশমাস লাইগব। সকাল বেলায় জ্বলজ্যান্ত মানুষরে সাগলে দেইখল চালের উপর, আর, সুপুরি গাছে চইড়া গেল কুথায়? সেইডা জিগান না?

গেল কোথায়, সেটা কি আমি খুঁজে বের করব নাকি? অফিসার রেগে সরে যায়। ওরকম রেগে-রেগে অফিসার ক্রমেই ভিড়টার পেছনে সরে এসেছিল। সে প্রায় বাঁধের নীচে গিয়ে দাঁড়ায়। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতেই একটা ইতস্ততের ভাব ছিল, যেন সে বাধ বেয়ে উঠে, ওদিক দিয়ে নেমে গিয়ে জিপে চড়ার একটা উপলক্ষ খুঁজছে। কিন্তু সেটা ঠিক পেরে উঠছে না।

অফিসার আবার ভিড়টার মধ্যে এসে, দু-একজনকে সরিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। তখন দেখা যাচ্ছে, সেই টিনের চালের ওপর ওরা তিনজন মিলে কথাবার্তা বলছে। অমূল্য চালের একদিকে বসেই পড়েছে, আর নরেশ কাদাখোয়া কথা বলে যাচ্ছে। কথা বলাটা বোঝা যায়, দু জনের দাঁড়ানোর ও হাত-পা নাড়ার ভঙ্গি থেকে।

অমূল্যা করে কী ঐখানে বইস্যা বইস্যা?

কাদাখোয়ার তানে এ্যাত কথা কী কছে নরেশুয়া?

এই দুটি জিজ্ঞাসা নিয়ে এ-পাড়ের ভিড় খুব বিব্রত হয়ে ওঠে।

.

শীর্ষ বৈঠক

চালের ওপর নেমে নরেশ বাঁধের দিকে তাকায়। বাঁধের ওপর থেকে এই চালটাকে যত কাছে মনে হচ্ছিল, চালের ওপর থেকে বাধটাকে তত কাছের ত লাগেই না, একটু যেন দূরের লাগে। বাতাস আর বৃষ্টির কুয়াশায় আর তিস্তার জলস্রোতের শীকরে এই দূরত্বটার মধ্যে একটা পর্দার মত তৈরি হয়েছে ত বটেই, যেমন হয় ভোর রাতে, কিন্তু তা ছাড়াও বাধটাকে যেন দূরেরই ঠেকে, নরেশের। একটু ঠাহর করতেই সে ভিড়টাকে প্রায় চিনে নিতেই পারে, এমন কি, আর-একটু নজর করলে লোকজনকেও চিনতে পারে–তবু অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর উঠে নরেশ বাধটাকে আর কাছের দেখে না। অথচ, অশ্বিনী রায়ের যে-ঘরটা এখন জলের তলে, যেসুপুরি গাছগুলো জলের ওপর শুধু মাথাটা তুলে জেগে আছে, সেই ঘর, সেই সুপুরি গাছের পেছন দিয়ে, তলা দিয়েও, নরেশ ত তার এই এতগুলো বয়স ধরে সামনের এই বাধটাই দেখে এসেছে। তার জন্ম যদিও এখানে নয়, কিন্তু এই চরটাতেই ত জোয়ান হয়ে উঠেছে সে। বাঁধের ওপর থেকে এই চরটার দিকে সারা জীবন যতক্ষণ তাকিয়েছে নরেশ, তার চাইতে অনেক বেশিক্ষণ তাকিয়ে থেকেছে চর থেকে বাধটার দিকে। অথচ, এখন নরেশের মনে হয় স্বাধটাতেই তার বাড়িঘর, কত তাড়াতাড়ি সেখানে ফিরে যাবে! অশ্বিনী রায়ের বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে নরেশের বাড়ি দেখা যায় না। অশ্বিনী রায়ের চাল থেকে কি দেখা যেত? নরেশ একবার বাঁধের দিকে পেছন ফিরে জলের তলার এই চরে তার বাড়ি যেদিকে থাকার কথা, সেদিকে ঘোলা জলের ওপর দিয়ে তাকিয়ে জলের তলায় যেসব গাছ, বাড়ি, বাগান, গোয়ালবাড়ি ডুবে আছে সেগুলোকে একবার দেখে নিতে চায়। অশ্বিনী রায়ের বাড়ি আর তাদের বাড়ি আলাদা পাড়ায়। মাঝখানে একটা ছোট খালও আছে। দেখা না-যাওয়ারই কথা। কিন্তু নরেশদের ঘরটা খুব উঁচু-তার টিনের চালটা হয়ত দেখা যেতে পারে। নরেশ দেখে-চারিদিকে ধু ধু করছে শুধু জল। এখন যদি নরেশকে জলের তলায় নিয়ে গিয়ে তার বাড়ি খুঁজে নিতে বলে কেউ, নরেশ পারবে না। বাঁধের ওপর থেকে এই জল দেখেও মনে ভরসা থাকে যে জল নেবে গেলে চরে ফিরবে। কিন্তু এখানে এই চরেরই ওপর দাঁড়িয়ে সেরকম কোনো ভরসা ত নরেশ পায়ই না, বরং বাধটার দিকে তাকিয়ে সে ফিরে যাওয়ার একটা তাড়া বোধ করে। একটু ভয়ও যেন পায়। নরেশ বাঘারুকে জিজ্ঞাসা করে-তুমিই সকালে এই চালে উঠছিল্যা না?

হয়।

তারপর সুপুরি গাছে উইঠ্যা ভ্যানিস? আর নামার নাম নাই।

গাছত আছিল।

আর, আমরা ভাবতাছি তুমি মানুষ, না ফ্লাডের ভূত। এ্যাহন চলো, চলো।

কোটত যাম? বাঘারু সোনালি দড়ি গুছোতে-গুছোতে বলে।

ঐঠে, বাধে যাব্যার নাগবে। আমরা ত তোমাক এসকু কইরব্যার আসছি।

মুই না যাও, বাঘারু তাদের দিকে পেছন ফিরে বলে। নরেশ রেগে যায়, নাযাও কি? তোমার বাবার আহ্লাদ। যাবার লাগব। তোমা এসকু করিবার তানে নৌকা নিয়্যা দুইবতে-ডুইবতে আসছি, আর এ্যাহন না যাও! চলো- নরেশের গলায় একটা বিরক্ত হুকুমের স্বর আসে বটে কিন্তু সেই স্বরে কোথায় যেন এই প্রস্তুতিও ধরা পড়ে যায় যে নরেশ যেন জানত, বাঘারু যেতে চাইবে না।

অমূল্য অশ্বিনী রায়ের চালের ওপর বসে পড়েছিল, বাঁধের দিকে মুখ করে। অমূল্যদের বাড়ি অশ্বিনী রায়ের বাড়ির পশ্চিমে, বাঁধের আরো সামনে, একটু কোনাকুনি, কিন্তু আলাদা পাড়ায়। অমূল্য নিজের সেই বাড়ির দিকে মুখ করেই বসে ছিল। অশ্বিনী রায়ের এই চালটা ভেসে থাকবে, সেখানে তারা এসে উঠবে ও বসবে, অথচ অমূল্যর বাড়ির, অত বড় বাড়ির, একটা মাথাও দেখা যাবে না, সমস্তটা জুড়ে শুধু। ঘোলা জল আরো ঘোলা জল উথলে বয়ে যাবে–এর ভেতর একটা অবিচার আছে, অমূল্যর ওপর একটা ব্যক্তিগত অবিচারই যেন। অমূল্যর ঘরজমির যে কোনো ইশারা পর্যন্ত পাচ্ছে না অমূল্য তাতে অন্যদের বাড়িঘর জমিজিরেত যেন ডাঙা হয়ে ওঠে। যেন, আর কারোই কিছু ডোবে নি, যা ডোবার তা এক অমূল্যরই ডুবল! অশ্বিনী রায়ের চালে উঠে যেমন বাধ দেখছে অমূল্য, সেরকম ত নিজের চালের ওপর বসেও দেখতে পারত–তাতেও বোঝা যেত, তার বাড়িটা আছে। কিন্তু যে-চরটায় তাদের বাড়িঘর, সেই চরটাতেই দাঁড়িয়ে বা বসে তারা শুধু জলই দেখে চারদিকে, সেই এক ঘোলা জল, এমন-কি আকাশ থেকে যেন সেই ঘোলাটে বৃষ্টিই হচ্ছে। অমূল্য বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে ওঠে, না-যায় ত যাক, চল, আমি আর থাকইব না–

নরেশ অমূল্যর দিকে তাকিয়ে কী বুঝে নেয়, তারপর গলার স্বর নীচে নামিয়ে বলে, কস কী? এডারে নিয়্যা না গ্যালে তরে টাকা দিব কেডায়?

না দিক। কেডায় জানত এড়া এহানে আছে

না-জানতি ত আলি ক্যা?

তুই টাকার তাল তুললি, শালা। টাকা? দেহিস না চাইরপাশে? তিস্তার তলে তর খাড়া জমিতে বালুবাড়ি হবার ধইরছে।

নরেশ বাঘারুকে বলে, এই দেউনিয়া শুনেন—

বাঘারু ততক্ষণে সোনালি দড়ি গুছিয়ে ফেলেছে। সে নরেশের দিকে তাকিয়ে বলে, মুই দেউনিয়া না হই। গয়ানাথা জোতদার মোর দেউনিয়া।

তোমরালার ঘর কোথায়?

ঐ বাঘারু যে-তিস্তা পেরিয়ে এসেছে, সেই পুরো তিস্তাটাকেই দেখায়। নরেশ ভেবেছে সে কিছু দেখাচ্ছে। তাই, বাঘারুর অঙ্গুলিনির্দেশে ঘাড় ঘুরিয়ে সেই একই জল দেখে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, আরে, তোমার গাও কুথায়?

বাঘারু সেই একই তিস্তার ওপর দিয়ে হাত ঘুরিয়ে আনে–ঐঠে।

নরেশ আবার চুপ করে কিছু ভাবে। তারপর বাঘারুকে বলে, জলে ভাইস্যা গিছে তোমাগ গ্রাম?

বাঘারু ঘাড় নাড়ায়, না, ভাসে নি।

তা, তুমি ভাইস্যা আইল্যা কোথথিক্যা মণি?

গয়ানাথর ফরেস্ট তিস্তা চুকি গিছে।

তয়?

গাছ ভাঙি গিছে।

তয়?

গয়ানাথ গাছগিলাক আর মোক ভাসি দিছে।

তয়?

হামরালা ভাসি আসিছু।

আসিছু ত আসিছু। বাবা, এহন বাধে যাবার লাগব! অফিসার আইসছে। আমাগো পাঠাইছে। চলল, চলোনরেশ একটু এগিয়ে বাঘারুর হাত ধরে। বাঘারু বাধা দেয় না। নরেশ হাত ধরে টানে, বাঘারু নড়ে না। নরেশ হাত ছেড়ে দেয়, বাঘারুর হাতটা পড়ে যায়।

গয়ানাথ কহিছে, বাঘারু, গাছগিলার নগত ভাসি যা, য্যালায় বানা কমিবে তক খুঁজি নিম।

তা তোমার গাছগুল্যা নিয়্যাই চলো বাবাঐখান থিক্যাই তোমার দেউনিয়া তোমাক খুঁজি নিবে।

বাঘারু চুপ করে বাঁধের দিকে তাকায়। এই যুক্তিটা তার ভাল লেগে থাকতে পারে যে বাঁধের ওখানেই গয়ানাথের পক্ষে তাকে খুঁজে বের করার সুবিধে। আবার, ঐ পশ্চিম দিকে তাকিয়েই সে হয়ত রাত্রির আসন্নতা বুঝতে পারে। বাঁধ, বাঁধের মানুষজন, কিছু চলাফেরা–এসব তাকে টেনে থাকতেও পারে।

নরেশ বলে, চলো, চলো, গাছগিলা নিয়্যাই চলল, চল্ অমুইল্যা।

অমূল্য উঠে দাঁড়ায়। তারপর নরেশ সুপুরি গাছের দিকে এক পা বাড়ায়। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, বাঘারু নড়ে না।

.

কাদাখোয়ায় নৌচালনা

নরেশ ঘুরে সঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে বলে, কী হইল?

বাঘারু বাঁধের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, না যাম। মুই এইঠে থাকিম।

নরেশ গলা আরো তুলে বলে, আরে তোমা ত তোমার দেউনিয়া কইছে যেইখানে ঠেইক্যা যাবি সেইখানে গাছগুলো নিয়্যা থাকবি, তক আমরা খুঁইজা নিব। এই কইছে ত?

হয়। কহিছে।

তা, তোমার দেউনিয়া আসি যদি ঐ বাঁধের উপর খাড়ায় আর তুমি যদি তোমার ঐ গাছের মাচানের উপর বইস্যা থাক, তমার দেউনিয়া তোমাক দেইখবে ক্যামন কইর‍্যা?

বাঘারু বাধ থেকে চোখ সরিয়ে নরেশের ওপর আনে। নরেশ তার চোখ দেখে অনুমান করে–এই যুক্তিটা যেন তার মনে ধরছে। সে যুক্তিটাকে আর-একটু জোর দিতে চায়।

তোমার দেউনিয়া তোমাক বাধ দিয়্যা খুঁইজব না জল দিয়্যা খুঁইজব?

বাধত খুঁজিবে।

তা বোঝ ত সবই, কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা। বাধ দিয়া খুঁইজব ত বাধে চলো। এহানে খাবাডা কী? দেউনিয়া চিড়ামুড়ি কিছু দিছে?

নাই রো।

সারাদিন কিছুই খাও নাই?

খিদ্যা পায় নাই?

হয়।

নরেশ অমূল্যর দিকে তাকায়। তারপর নরেশ আর অমূল্য দুজন এক সঙ্গে বাঘারুর দিকে তাকায়। তারা বুঝে ফেলে–ঐ দেউনিয়া গাছগুলোকে বাঁচানোর জন্যে এই লোকটাকে গাছের সঙ্গে ভাসিয়ে দিয়েছে। যদি এখানে না ঠেকত তা হলে লোকটা আরো দূরে-দূরে ভেসে যেত। এই ফ্লাডের তিস্তা থেকে সে এক আজলা জলও ত পেত না। বাঘারুর দিকে তাকিয়ে এতক্ষণে নরেশ আর অমূল্য তাকে উদ্ধার করার জন্য আবেগ বোধ করে–জলে ভাসা ক্ষুধার্ত একটা মানুষকে উদ্ধার করার আবেগ। অফিসারটা এসে গেল বলে না-হয় নরেশ টাকার কথা বলেছে। কিন্তু অফিসারটা যদি না আসত আর এই লোকটাকে যদি এই চালের ওপর তারা বসে থাকতে দেখত, তা হলেও, তারা ঐ নৌকো নিয়ে এরকমই বেরিয়ে পড়ত। অমূল্য চালের ওপর দিয়ে হেঁটে, নরেশকে পেরিয়ে, বাঘারুর কাছে যায়। তারপর বাঘারুর হাত ধরে বলে, চলেন ত। এইঠে জলের মইধ্যে বইস্যা বইস্যা শুখায়্যা মইরবেন নাকি? চলেন। রাইতটা থাকেন। খান। ঘুমান। তারপর না হয় আপনি আপনার গাছ নিয়্যা ভাইস্যা যাইবেন।

ভোখ পাইছে, কিন্তু ঐঠে ত অফিসার আছে।

আরে, শুনেন, আমরা এই চরের মানষি। এই চরে আমাদের খেতি-ঘর সব অমূল্য বলে।

চরুয়া?

হয়, হয়, চরুয়া। এই যে-চালডার উপর খাড়ায়া আছেন–এইডার যে-মালিক স্যায় ঐ বাধে আছে। আমার বাড়িখান ঐ দিকে। এর বাড়িখান ঐ দিকে। ফ্লাডের জইন্যে আমরা সব গিয়্যা ঐখানে বাঁধে উঠছি। আমরা কব, আপনি আমাগ মানষি, চরে আটকা পড়ছিলেন, আমরা তুইল্যা আনল্যাম, ত অফিসার করব কী?

গাছগিলা? গয়ানাথ দেউনিয়ায় নখত অফিসারের ঝগড়া কাজিয়া।

নরেশ হেসে ওঠ, কিছুট অকৃত্রিম, কিছুটা বানানো, তিস্তার বানাভাসা গাছের আবার আফিসার আছে নি? আরে চলেন ত! নরেশ গিয়ে বাঘারুর সেই হাতটাই ধরে যেটা অমূল্য ধরেছিল।

বাঘারুকে এমন হাত ধরে টানাটানি করে কেউ কোথাও কখনো সাধে নি। তার সন্দেহটাও সেখানেই। কিন্তু তার খিদেটা বড় বেশি সত্য হয়ে উঠছে। রাতটা কাটানোর পক্ষে এই জলের চাইতে ঐ বাঁধ নিশ্চয় ভাল। তা ছাড়া সে ত গাছগুলো নিয়ে যে-কোনো সময়ই ভেসে যেতে পারে। বাঘারু পা বাড়ায়।

নরেশ বাঘারুর হাতটা ছেড়ে দিয়ে আগে সুপুরি গাছে যায়। অমূল্য বাঘারুর হাতটা ধরেই ঘোরে, যেন, পেছনে মাঠ আছে, ছেড়ে দিলে বাঘারু দৌড়ে পালাবে। সুপুরি গাছের সামনে এসে অমূল্য বলে, নামেন আগে। বাঘারু হাতের ইশারায় অমূল্যকে নামতে বলে। অমূল্য সুপুরি গাছে ঝাঁপ দেয়। নীচে নেমে চেঁচায়, নামেন এহন। বাঘারু সুপুরি গাছে ভর দেয়। বাতাসে সুপুরি গাছটা এত বেশ দোলে যে বাঘারুর শরীরের ওজনে সেটা আর নতুন করে দোলে না।

নীচে নেমে এখন সমস্য হল–গাছ আর নৌকো নিয়ে চারজন কী করে যাবে। নৌকো করে চারজন চলে যেতে পারত–গাছগুলো এখানে রেখে। কিন্তু নরেশ বা অমূল্যর সেটা বলার সাহসই হয় না। বাঘারুর গলায় সেই নাইলনের দড়ির বান্ডিল–যে-দড়িতে এই গাছগুলোর সঙ্গে বাঘারু আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা। কিন্তু হাতে আর-সময় নেই। তাদের এখনই ভাসতে হবে। এখান থেকে তারা ত আর সরাসরি উল্টো দিকে যেতে পারবে না–স্রোতের মুখে তাদের কোনোকুনি ভাসতে হবে–তারপর ওপারে যেখানে গিয়ে ঠেকে। সেখান থেকে আবার পাড় দিয়ে নৌকো টেনে বাঁধের কাছে নিয়ে যেতে হবে।

হে কাদাখোয়া–এই গাছগিলা কি নৌকাত বান্ধা যাবে? নরেশ জিজ্ঞাসা করে।

না হয়। নৌকাত গাছের ধাক্কা নাগিলে ডুবি যাবে, কাদাখোয়া বলে।

তোমরালা নৌকাত যাও কেনে, মুই গাছত যাছি, বলে বাঘারু আলগোছে তার মাচানে উঠে যায়। সেই মুহূর্তে এটাকে একমাত্র উপায় মনে হয়। নরেশ আর দেরি না করে বলে, তা গাছ ছাড় আগে, কুথায় তোমার নোঙর বাইন্ধছ? নরেশ হেসে ফেলে। বাঘারু একটা গাছের ডাল থেকে দড়ির পাক খুলতে হাত দেয়। নরেশ ঘেঁজে আর-কোথায় বাধন আছে–দেখে, অশ্বিনী রায়ের চালের টঙে।হে কাদাখোয়া, খোল কেনে, ঐখান খোল।

কাদাখোয়া তাকিয়ে একবার দেখে। তারপর গাছের ডালে-ডালে সে ওপরে উঠে যায়। কাদাখোয়া আর বাঘারু দুজনের ওজনে গাছগুলো দুলে ওঠে, দুলতে থাকে, কিন্তু ডোবে না। মনে হয় যেন ওরা দুজনই ভাসমান গাছগুলোর ডালে ওঠার সময় নিজেরা মাধ্যাকর্ষণের টান অতিক্রম করে গেছে। নীচের নৌকোয় দাঁড়িয়ে নরেশ আর অমূল্য বাঘারু আর কাদাখোয়ার শরীরের চেহারার মিলটাও আবিষ্কার করে। আপাদমস্তক নগ্ন শরীর থেকে তাদের হাতগুলো ডালের মত আকাশে উঠে যাচ্ছে আর নেমে আসছে।

দুদিকের বাধন খোলা সত্ত্বেও গাছগুলো নড়ে না। বাঘারু নীচে নেমে এসে কাদাখোয়াকে বলে, ঐঠে একখান আছে, ঐ নৌকাখানের কাছত। কাদাখোয়া সেই তলার বাধনটা খোঁজে, পায় না। বাঘারু ততক্ষণে উল্টোদিকের নীচের বাধনটা খুলে দিতে শুরু করেছে। আর সেই বাধনটা ঢিলে হওয়া ও খোলার সঙ্গতিতে গাছের বহর স্রোতের টানে নড়ে ওঠে।

কাদাখোয়া বলে ওঠে, নাই রো। বাঘারু, খাড়ান কেনে, বলে তার বাধনটা খুলে দেয়। গাছের বহর স্রোতের টানে অশ্বিনী রায়ের ঘরের সঙ্গে লেগে যায় আর সেই ধাক্কায় নৌকোটা যেন গাছগুলোর ভেতর ঢুকে যায়। বাঘারু আবার ডালে-ডালে এদিকে চলে আসে। নরেশ আর অমূল্য নৌকাতেই দাঁড়িয়ে ছিল লগি হাতে। কাদাখোয়াকে বাঘারু বলে, নৌকাত যান, এটা খুলিলেই ত সোতের মুখে ভাসি যাবে। কাদাখোয়া নৌকায় যায়। নৌকাটা গাছগুলোর এত ভেতরে সেঁদিয়ে গেছে যে এই গাছগুলো ভেসে গেলে নৌকাটা কী করে যাবে, ঠিক বোঝা যায় না।

হঠাৎ কাদাখোয়া বলে ওঠে, খাড়ি যান, খাড়ি যান।

বাঘারু দাঁড়িয়ে পড়ে। কাদাখোয়া নৌকোর বাঁধনটা খুলে দেয় আর স্রোতের ধাক্কায় নৌকোটা গাছগুলোর ভেতর সেঁদিয়ে গিয়ে আটকে যায়, এমন, যেন ওটাও একটা গাছ। নরেশ একটু ভয় পেয়ে বলে ওঠে, হে কাদাখোয়া দেখিস কেনে, গাছ চাপা পইড়লে নৌকা ত ডুইব্যা যাবে নে।

কাদাখোয়া কোনো জবাব দেয় না। সে নৌকোটাকে আরো একটু ঠিক করে নিয়ে অমূল্য আর নরেশকে বলে, লগি ধরেন, লগি ধরেন। নরেশ আর অমূল্য লগি ধরলে কাদাখোয়া বাঘারুকে বলে, খুলেন কেনে, খুলেন।

এদিকের বাধনটা যেখানে দেয়া ছিল, জল বেড়ে যাওয়ায় সেটা জলের তলায় চলে গেছে। . বাঘারুকে একটা ডাল বা হাত ধরে, ঝুঁকে ডান হাতে জলের তলার ঐ বাধনটা খুলতে হয়। প্রথম গিঠটা খুলতেই স্রোতের তোড় গাছের বহরকে একটু টেনে নেয়। বাঘারু বা হাতের ডালটা শক্ত করে ধরে একটা হ্যাঁচকা টান মারতেই গাছগুলো স্রোতের মুখে ভেসে যেতে গিয়ে আটকে যায়, ঘরের কোনায় একটা গাছের বড় ডাল আটকে গেছে। বাঘারু সেটা খোলে না। বরং সেই সুযোগে সে নৌকোর ওপর চলে আসতে পারে। আর, সেই ঝাঁকিতেও বটে, স্রোতের টানেও বটে, অশ্বিনী রায়ের গুয়াবাড়ির নোঙর ছেড়ে সেই বহর ঘোলাটে আকাশের নীচে তিস্তার ঘোলাটে স্রোতে উচ্ছন্ন বেগে ভেসে যায়। বাতাসের বিপরীত ধাক্কায় গাছের পাতায়-পাতায় এক ভাসমান ঝড়ের অলৌকিকতা সঞ্চারিত হয়।

লগি মারেন, লগি মারেন, আঁকতে-হাঁকতে কাদাখোয়া তার লগিটা নিয়ে বাঘারুর গত রাত্রির অন্ধকারে হাতড়ে-হাতড়ে পাওয়া অভিজ্ঞতা আত্মসাৎ করে বেড়ালের মত পায়ে বাঘারুর মাচানে গিয়ে ওঠে আর সেইখান থেকে শুধু তার বায়ে লগি মারতে থাকে, এবার আর আগের মত বর্শা দিয়ে জল বিধবার মত করে নয়, লগিটা মেরে ঠেলছিলও একটু। বারকয়েক লগি মেরেই কাদাখোয়া চেঁচায়, এই গাছুয়ামানষিখান, উঠি আসেন, এইঠে, উঠি আসেন। বাঘারু নৌকো থেকে ডালে-ডালে তার মাচানে চলে যায়। এইঠে লগি মারেন, লগি মারেন, বলে কাদাখোয়া তার লগিটা বাঘারুর হাতে ধরিয়ে দেয়। বাঘারু লগি মারতে থাকে, কাদাখোয়া দাঁড়িয়ে সামনে তাকায়। যেন–গয়ানাথের এক বাঘারু এখন দুটো মানুষ হয়ে গেছে, তিস্তার ওপরে ঐ গাছের মাচানে তাদের এতই মিল।

আসলে, যে-হিশেব কষে কাদাখোয়া হঠাৎ নৌকোটাকে গাছগুলোর মধ্যে সেঁদিয়ে দিয়েছিল সেটা অদ্ভুত মিলে গেল। এতগুলো গাছ এমন জড়ো করে বাধা যে জলস্রোত গাছের ভেতরে পুরো জোরে লাগে না। সেই গাছগুলোর ঢাকনায় নৌকোতে নরেশ আর অমূল্য লগি মারার এমন সুযোগ পায় যাতে স্রোতের ভেতরেও এই বহর স্রোতটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ক্রমাগত বায়ে লগি মারায় ওরা খুব বেশিদূর ভেসে না গিয়েই কোনাকুনি বাঁধের দিকে যেতে থাকে। ইস্, আর-একখান লগি থাকিলে সিধা পার হওয়া ধরিতাম হে, কাদাখোয়া তিস্তার ঘোলা স্রোতের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে।

.

সন্দেহ ও সংশয়

বাঁধের ওপর থেকে দেখা যায়, অশ্বিনী রায়ের চাল থেকে অমূল্য, নরেশ আর কাদাখোয়া সুপুরি গাছে চড়ার একটু পরে সেই গুয়াবাড়ির দক্ষিণ দিয়ে নৌকোর বদলে একটা বিরাট গাছের বহর নদী দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। নৌকোটা গাছগুলোর এত ভেতরে যে বাধ থেকে দেখা যায় না। এমন-কি, কাদাখোয়া আর বাঘারু যে মাচানের ওপর দাঁড়িয়ে, সেটাও গাছের ডালপালায় আড়াল হয়ে থাকে। বন্যার সময় তিস্তা দিয়ে এরকম গাছ ত ভেসে যেতে পারেই, কিন্তু ওরা চাল থেকে সুপুরি গাছে উঠল আর তারপরই ঐ ফাঁক থেকে নৌকোর বদলে বেরল গাছের এই প্রকাণ্ড বহর–তাতেই সবার নজরে পড়ে যায়। তাও নজরে পড়ত না যদি গাছগুলো অশ্বিনী রায়ের গুয়াবাড়ির ফাঁকটা দিয়ে সোজা চলে যেত। কিন্তু সোজা বেরিয়েও গাছগুলো ঐ স্রোতটা থেকে আড়াআড়ি কোনাকুনি বয়ে আসে। কয়েকদিন ধরে এই খাতটাকে জলে ভরে উঠতে দেখে-দেখে স্রোতের ধারাটা এদের প্রায় সবারই চেনা হয়ে গেছে। তারা বোঝে, ঐ গাছ শুধু গাছ হতে পারে না, যদি হত তা হলে নদীস্রোতে সেটা অন্য রকম ভাসত। গাছগুলো বেরবার পরও বাঁধের লোকজন অপেক্ষা করে-নৌকোটা কখন বেরয়। কিন্তু প্রতীক্ষিত, সময়ের মধ্যে নৌকোটাও বেরয় না, গাছগুলোও সোজা না গিয়ে একটু কোনাকুনি হয়ে যায় তখন তারা এই দুইয়ের ভেতর যেন একটা সম্পর্ক থাকতে পারে বলে সন্দেহ করে। প্রথম কথাটা অশ্বিনী রায়ই বলে ওঠে, খাইসেন, খাইসেন, হামার কাঁঠাল আর লিচু গাছখান কায় কাটি দিসে হে, কায় কাটি দিসে।

কথাটা শোনার পরও সবাই একটু চুপ করে থাকে। এটা কি ঠিক হওয়া সম্ভব?

নরেশ-অমূল্য নৌকোর ওপর আছে। এই সময় যদি কেউ ঐ গাছ কেটে নিয়ে যায়, তা হলে তারা কি বাধা দিত না? এরকম অবিশ্যি এমন কাছাকাছি চরে হতেও পারে। বন্যার সুযোগে কেউ-কেউ নৌকো করে এসে গাছটাছ কেটে নিয়ে যায়। কিন্তু এই চরে তা করতে হলে এই বাধ থেকেই যেতে হবে। নাকি, যে-লোকটাকে সকালে দেখা গিয়েছিল সেই লোকটাই এই সব গাছ কেটে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে অপেক্ষা করছিল+অমূল্য আর নরেশ গিয়ে তাকে ধরেছে? কিন্তু তাই যদি হয়, তা হলে গাছগুলোকে কি এমন ভাসিয়ে দেবে? তা যদি হয়, তাহলে ত নৌকোটা পেছনে-পেছনে বেরবে!

কেউ একজন বলে ওঠে, অশ্বিনী কাহার কাঠল আর লিচু গাছ কি ফ্লাডের জল খাইয়্যা শালগাছের নাগান বাইড়া গিছে? দ্যাহেন না, গাছ না, য্যান একখান ফরেস্ট!

এত দূর থেকেও চোখের আন্দাজে বোঝা যায় এ গাছগুলো অশ্বিনী রায়ের বাড়ির গাছ নয়। সেকথাটা একজন বলে দেয়ার পর সকলেরই মনে হতে থাকে। জগদীশ বারুই গাছের আভাস পায়, কিন্তু পরিস্থিতিটা বুঝতে পারে না। সে নদীর দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে চিৎকার করে বলে, আরে, গেল তিনজন মানুষ একখান নৌকায় আর তরা কত্যাছিস গাছের কথা? গাছের কথাডা আইল কোথ থিক্যা, অ্যাঁ? গাছের কথাডা আইল, কোথ থিক্যা?

জগদীশ বারুই চীৎকার করে বললেও, তার কথার কোনো জবাব কেউ দেয় না। বরং চাপা গলায় কেউ বলে ওঠে, হ্যাঁ, পাড়ের দিকেই ত আসে, হ্যাঁ, পাড়ের দিকেই আসত্যাছে।

সেই চাপা স্বরে বিস্ময়টা আরো পরিষ্কার হয়। তারপরই এই ভিড়টা থেকে অনেকে বাধ ধরে ওপরে উঠে যায়, প্রায় দৌড়ে বাঁধের ওপর উঠে তারা বাধ ধরে দৌড়তে থাকে দক্ষিণে। নৌকোটা চর থেকে যখন ফিরবে, তখন আরো ভাটিতে গিয়েই লাগবে, তারপর পাড় ধরে ধরে এখানে ফিরে আসবে–এটা সবারই জানা। কিন্তু নৌকোর বদলে এত বড়-বড় গাছ একসঙ্গে স্রোতে ভেসে বেরিয়ে এল, আর স্রোত কাটিয়ে একটু আড়াআড়িই পার হল–এটা তাদের হিশেবের বাইরে। তাই বাঁধের ভিড়টা ভেঙে যায়। অনেকেই বাঁধের ওপর দিয়ে ছুটতে শুরু করে, যেখানে গাছগুলো এসে ভিড়বে সেখানে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্যে। বাঁধের ভিড়টা ভেঙে যায়, দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়, এই সব মিলিয়ে যেন একটা রহস্যের আভাস আসে। সকালে লোকটা চালের ওপর থেকে উধাও, বিকেলে তিন-তিনটে মানুষ নৌকোসুদু উধাও, তার বদলে এতগুলো গাছের স্রোত বেয়ে আসা– সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে পড়ে।

কিছু লোক বাধ বেয়ে উঠেছে আর কিছু লোক বাঁধের ওপর গিয়ে দাঁড়িয়েছে বলে পাড়ের বোল্ডারের ওপরের ভিড়টা আলগা হয়ে যায়। অফিসার বাঁধের ওপর উঠতে-উঠতে বলে, মশাই, মনে হচ্ছে ফ্লাড এক আপনাদের এখানেই হয়েছে। এক জায়গায় এসে যদি এতক্ষণ আটকে থাকতে হয় তা হলে অন্য জায়গায় যাব কখন?

রঘু ঘোষের পেছন-পেছন উঠতে-উঠতে লিলি বলে, চলোনা, ঐ দিকে যাই–দেখি কী হল?

রঘু ঘোষ পেছন না-ফিরেই বলে, আর ওখানে যেতে হবে না। এতক্ষণ এই বৃষ্টি আর বাতাসে আছো, সারা রাত ত বসে বসে খাস টানবে। এখন বাগানে চলো। অনেক দেখা হয়েছে।

গুদামবাবু বধের ওপর আগেই উঠে গিয়েছিলেন। উনি বলেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ। চলুন। এ-সব হাঙ্গামায় আর জড়িয়ে লাভ নেই।

রঘু ঘোষ বলে, হাঙ্গামা আবার কী?

গুদামবাবু–বাঃ, একটু আগে ত আপনাকেই দোষ দিচ্ছিল। এরপর দেখুন, ঐ গাছ না কী তাই নিয়ে আবার কী গোলমাল হয়?

অফিসার এদের কাছেই ছিল, বলে, আরে মশাই, এদের ত রেসকিউয়ের নামে একটার পর একটা গোলমাল বেড়েই চলেছে। নৌকোটা গেল কোথায়?

এরকম সময় সেই গাছগুলো একটু ঘুরে যায়, আর তাতেই ডালপালার ফাঁক দিয়ে বাঁধের এই জায়গাটা থেকে দেখা যায়–গাছের ওপরে কাদাখোয়া দাঁড়িয়ে আছে। একবারমাত্র দেখা যায় কিন্তু যারা দেখে তারা চিনে ফেলতে পারে–কাদাখোয়া, কাদাখোয়া, গাছগিলার মাথা কাদাখোয়া। গাছগিলার মাথাত কাদাখোয়া। ঐ দিকে গাছগুলো পাড়ের কাছাকাছি চলে এসেছে। যারা ওদিকে দৌড়ে গেছে, তারা নিশ্চয়ই আরো স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাচ্ছে। এখানকার লোজন বাঁধের ওপর দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। এর মধ্যে গাছগুলো আরো ঘোরে। দেখা যায়, সত্যি কাদাখোয় দাঁড়িয়ে আছে। গাছগুলো আরো ঘোরে। দেখা যায়, কাদাখোয়র পাশে আর-একজন, কাদাখোয়ার মতই, দাঁড়িয়ে। কিন্তু নরেশ-অমূল্য নেই। সবাই গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে–কোনো ফাঁক দিয়ে নরেশ-অমূল্যকে যদি দেখা যায়। নরেশ-অমূল্য চরে যদি আটকে গিয়ে থাকে? কোনো বিপদ ঘটেছে নাকি? একা কাদাখোয়া ফিরে আসছে? সঙ্গে একটা লোক আছে, সে নিশ্চয়ই সকালের সেই লোকটাই? নাকি, নরেশ-অমূল্য পরে নৌকো নিয়ে আসবে? এ স্রোতে দুজনে একটা নৌকো চালাবে কী করে?

গাছগুলো পাড়ের আরো কাছাকাছি চলে এসেছেকাদাখোয়া আর ঐ লোকটাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এইবার গাছগুলো এই বাঁধের তাড়ালে চলে যাবে। ওখানে বাঁধের একটা বাক আছে, ডাইনে। গাছগুলো সেই বাকটার আড়ালে চলে যাবে। এখান থেকে কী করে জানা যাবে–গাছগুলো ওখানেই থাকবে, নাকি টানতে-টানতে এখানে নিয়ে আসা হবে।

বাঁধের ওপর যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল তারা আরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। কেউ-কেউ বাধ ধরে দক্ষিণের সেই বাকটার দিকে হাঁটা শুরু করে। বানভাসি যে-মেয়েরা এতক্ষণ বাঁধের ঢালের নানা জায়গায় দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল, তারা এখন বাঁধের ওপর উঠে এসে গরুগুলোর পাশে, দাঁড়িয়ে বা একটু এগিয়ে কপালে হাত দিয়ে বাঁধ বরাবর তাকায়। এখন রোদ নেই। হাওয়া ও বৃষ্টি অব্যাহত। কিন্তু দূরে তাকাবার জন্যে মেয়েদের ভঙ্গি ঐ একটাই। গরুগুলোও এতক্ষণ নদীর দিকে তাকিয়েছিল। তারাও শরীর না ঘুরিয়ে শুধু ঘাড়টা ডান দিকে ফেরায়। ব্যবধান রেখে মাঝে-মাঝে এক-একটা গরু হা-স্বা ডেকে ওঠে, গম্ভীর, প্রলম্বিত হাম্বা। তারই মধ্যে, বাতাসে ঐ বাকের আড়াল থেকে মানুষের সমবেত চিৎকার শোনা যায়। এখানকার সবাই কান পেতে বুঝতে চায়, চিৎকারের ভেতর বিপদের কোনো সঙ্কেত আছে কিনা।

.

বাঘারু ও কাদাখোয়ার সংবর্ধনা

চিৎকারটা উঠে নেমে যায় বটে, কিন্তু থামে না। বাতাসটা ওদিক থেকে এদিকে আসছিল বলে ওখানকার চেঁচামেচি এখানে শোনা যাচ্ছিল। বোঝা যায়, খারাপ কিছু ঘটে নি। মাঝে-মাঝেই চিৎকারটা আবার বাড়ছিল।

তারপরই দু-একটি বাচ্চা ওদিক থেকে বাঁধ দিয়ে দৌড়তে-দৌড়তে এদিকে আসে। আর, তাদের সেই দৌড়ের সঙ্গে ছন্দ রেখেই ওদিককার চিৎকারটাও এগতে থাকে–বাধ ধরে নয়, বাঁধের একটু নীচ দিয়ে, নদীর পাশ দিয়ে, বোল্ডারগুলোর ওপর দিয়ে। বাঁধের এখানে যারা দাঁড়িয়েছিল, তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কোন দিকে তাকিয়ে থাকবে–এখান থেকে নদীর দিকে কোনাকুনি, নাকি বাঁধের ওপর দিয়ে সোজাসুজি। যে বাচ্চাগুলো দৌড়ে আসছিল তারা পেছনে ফিরে কিছু দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপর আবার দৌড়তে শুরু করে।

তখনই দেখা যায়–সেই গাছগুলো বাকটা পেরিয়ে এদিকে আসছে, মানে পাড় দিয়ে গাছগুলোকে টেনে আনা হচ্ছে। গাছগুলো আর-একটু এগতেই দেখা যায়–গাছগুলোর সামনে নৌকোটা আর তাতে নরেশ আর অমূল্য দাঁড়িয়ে। পাড়টা উঁচু বলে নৌকোটা এতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। নরেশ আর অমূল্য যে দাঁত বের করে হাসছে, সেটাও এখান থেকে দেখা যাচ্ছে।

নরেশ আর অমূল্যর মাথার ওপরে, গাছের ডালের মধ্যে কাদাখোয়া আর সেই লোকটি দাঁড়িয়ে। দুজনেরই কোমরে হাত। একটা সোনালি দড়ি সেই গাছের ডালের মাথায় কাদাখোয়া আর লোকটির ভেতর থেকে পাড় পর্যন্ত ঝুলছে আর সেই দড়ি ধরে নৌকো আর গাছগুলোকে সবাই টানতে-টানতে নিয়ে আসছে। নৌকোর ওপর অমূল্য আর তার মাথার ওপরে ডালের মধ্যে কাদাখোয়া লগি দিয়ে দিয়ে পাড়ে মারছে–যাতে গাছগুলো পাড়ে ঠেকে না যায়। তাতেও পুরোটা সামলানো যাচ্ছে না, কারণ, গাছের পেছনের ডালপালা পাড়ে লেগে যাচ্ছে। এতজন দড়িটা ধরে টানছে যে–গাছগুলো আবার পাড় থেকে সরে যাচ্ছে। যারা টানছিল তারা কেউ-কেউ বোল্ডারের ওপর, কেউ-কেউ বোল্ডার আর নদীর মাঝখানের সংকীর্ণ পথটা দিয়ে আগে-আগে আসছে। তারা দড়ি টানছে না, যেন, গাছগুলো আর নৌকোটাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসছে।

কতটুকু আর দূরত্ব? দেখতে-দেখতে এরা সবাই বাঁধের এই অস্থায়ী ক্যাম্পের জায়গাটায় পৌঁছে যায়। পৌঁছনোর আগেই সবাই দেখতে পায়–সেই নতুন লোকটির গলায় নাইলনের দড়ির বড় বান্ডিল–আর সেই দড়িটাই পাড়ের লোকজনের হাতে। তারা ঐ দড়ি ধরেই গাছ আর নৌকো টানতে টানতে নিয়ে আসছে।

বহরটা এসে দাঁড়ায় সেখানে, যেখানে সবাই প্রথমে ভিড় করেছিল। নদীর ভেতরে নৌকোয়, পাড়ের একটু নীচে, নরেশ আর অমূল্য, আর পাড় থেকে অনেক ওপরে, নদীরও অনেক ওপরে কাদাখোয়া আর সেই নতুন লোকটি।

পাইছে, পইছে, গুয়াবাড়ির মানষিটাকে পাইছে।

সেই ফরেস্টঠে সারা রাতি ভাসি আসিছে।

সারা রাতি গাছের উপর ভাসি-ভাসি আসিছে।

ভাইস্যা আসত্যাছিল, গাছগিলা পায়্যা ধইরছে।

এত বড় দড়ি পাইল কোথ থিক্যা? জলে ভাইসব্যার আগে কি গলায় দড়ি দিছিল নাকি?

এ-সব নানা প্রশ্নোত্তরের মধ্যে নরেশ আর অমূল্য পাড়ে উঠে আসে। কাদাখোয়া আর বাঘারু নামে না–তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, তারা এখন নামবে কি না। নরেশ পাড়ে নেমেই জিজ্ঞাসা করে, কই, স্যার কই?

নরেশের কথার প্রতিধ্বনিতে আরো দু-চারজন জিজ্ঞাসা করে, কই, অফিসার কই?

আর, এর মধ্যেই কেউ নরেশকে বলে দেয়, অফিসার বাঁধের ওপরেই আছে। নরেশ বাঁধের ওপর উঠতে থাকে। তার পেছনে-পেছনে আরো অনেকে উঠলেও, সামনে কেউ থাকে না। সেই ঢাল বেয়ে নরেশের উঠে আসার জন্যেই যেন ঢালটা ফাঁকা। সেই ফাঁকার শেষ বাঁধের ওপরে অফিসার এসে দাঁড়ায়। বাঁধের ওপরে পৌঁছনোর আগে হঠাৎ পেছন ফিরে নরেশ হাত নেড়ে চিৎকার করে ওঠে, এই, দড়িখান বাইন্ধ্যা রাখ কোথাও, ছাইড়া দিস না, ভাইস্যা যাবে নে তালি। চিৎকারটা শেষ করে বাধে পা দিয়েই নরেশ দেখে সামনে অফিসার। এক পা পেছনে গিয়ে, বা হাতটা তার কোকড়ানো চুলের পেছনে দিয়ে, নরেশ তার শাদা দাঁতগুলো বের করে হাসে, তারপর, আইনছি স্যার, ঐ যে, বা হাতটা নামায় বাঘারুকে দেখাতে, চলেন স্যার, বা হাতটা নামিয়ে অফিসারকে পথ দেখায়। সেই পথ দেখানোর জন্যেই, নরেশের পেছনে যারা ছিল তারা, দুদিকে সরে যায়। মাঝখানে একটা পথের মত হয়ে যায়।

নরেশ ঐভাবে হাত দেখানোর জন্যেই হোক, অথবা নরেশের পেছনের লোকগুলো দুদিকে সরে গিয়ে পথ করে দেয়ার জন্যেই হোক, অফিসার নরেশের পিঠে সস্নেহ হাত রাখে। তারপর নরেশের দেখানো পথে বোল্ডারের ঢালে নামার জন্যে পা বাড়িয়ে একবার দুদিকে তাকায়, হাসিমুখে, যেন এই সময় ওখানে টিভি ক্যামেরা, অন্তত প্রেসের ফটোগ্রাফারদের থাকার কথা ছিল। না-থাকলেও, তারা আছে এমন এক বিশ্বাসে অফিসার ধীরে-ধীরে ঢালটা বেয়ে বোল্ডারের পাড়ে নামে। সামনে নদী। বোল্ডারের পাড় পেরিয়ে নদীর ধারে গাছগুলো আর নৌকোর সামনে গিয়ে অফিসারকে দাঁড়াতে হয়। যেন এই ঢাল আর বাঁধ ধরে এতক্ষণ সে বারবার ওঠানামা করছিল না, যেন এইমাত্রই সে গাড়ি থেকে নেমে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল।

অফিসার আর নরেশ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে, তাদের পেছনে ভিড়। সামনে, প্রায় মাথার ওপরে কাদাখোয়া আর বাঘারু। তারা বোঝে না তাদের কী করতে হবে। নরেশ চেঁচিয়ে ওঠে, আরে, নাইমা আসেন, দ্যাহেন না স্যারে আইছে।

শুনে, বাঘারু মাচানের ওপর থেকে তার কুড়ালিয়াটা নিয়ে পেছনে নেংটির ওপরে গেজে। কাদাখোয়া লগিটা নিয়ে নীচের ডালে পা দেয়, তারপর বাঘারু একটু নিচু হয়ে কাদাখোয়াকে ডাল থেকে পাড়ে উঠতে সাহায্য করে ও নিজে মাচান থেকে নীচের ডাল, ডাল থেকে পাড়ে উঠতে সাহায্য নেয়। বাঘারুকে টেনে নেয়ার জন্যে পাড়ে নেমে কাদাখোয়াকে অফিসারের দিকে পেছন ফিরতে হয়, তারপর বাঘারু নামলে দুজনে এক সঙ্গে অফিসারের সামনে দাঁড়ায়। বাঘারুর গলায় হলুদ দড়ি দোলে। অফিসার ঠিক বুঝে উঠতে পারে না তাকে কী করতে হবে। নরেশ ওদের দেখিয়ে বলে, স্যার, ভাইস্যা আইসছে সেই ফরেস্ট থিক্যা–গাছগাছালি নিয়্যা।

এরপর যেন অফিসারের একটা কাজ করাই বাকি থাকে। সে বাঘারুর হাতটা ধরে।

অফিসার হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতেই হাতটা এগিয়েছিল। কিন্তু বাঘারু হাতটা না বাড়ানোয় সে বাঘারুর শরীরের পাশে ঝুলে থাকা হাতের কব্জিটা ধরে ঝাঁকায়। তারপর ছেড়ে দেয়। এবার কাদাখোয়র দিকে আর হাত বাড়ায় না–একবারেই কব্জিটা ধরে ঝাঁকায় ও ছেড়ে দেয়। অফিসার হয়ত ভেবেছে এই দুজনই ভেসে এসেছে–দুজন এমনই একরকম দেখতে। অথবা, দুজন এমনই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যে তাদের সঙ্গে একই ব্যবহার করা ছাড়া অফিসারের আর-কোনো গতি নেই। কিন্তু কাদাখোয়াকে ত বাঁধের বানভাসিরা সবাই চেনে। অফিসার তার হাত নেড়ে দেয়ায় সবাই মজা পেয়ে হাততালি দিয়ে ওঠে। অফিসার সেই হাততালির দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা নাড়ায়।

.

সংবর্ধনার পরে বাঘারু ও কাদাখোয়া

বাঘারু আর কাদাখোয়া বোঝে না তাদের এখন কী করতে হবে–নরেশ বা অফিসারও বোঝে না। সবাই হাততালি দিয়ে ওঠায় নরেশ সেদিকে তাকিয়ে হাসে। এর মধ্যে অমূল্য এসে নরেশের পাশে পঁড়ায়। অফিসার আবার হাসিহাসি মুখে কাদাখোয়া আর বাঘারুর দিকে, তাদের পেছনে নদীর দিকে, বায়ে নরেশ-অমূল্যর দিকে, ও এমন-কি, ঘাড় ঘুরিয়ে বাঁধের দিকে তাকিয়ে নেয়। বাঁধের ওপর যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা নীচে হাততালি শুনে ঢাল বেয়ে নীচে নামতে শুরু করে। অফিসার নরেশের দিকে তাকিয়ে এতক্ষণে বলে, তা হলে ত তোমাদের রেসকিউ হল। এবার তা হলে আমার ছুটি, কী বলো?

নরেশ আবার মাথা চুলকে বলে, হ্যাঁ স্যার, আপনার কষ্ট হইল কত!!

বাঁধে উঠবার জন্যে ঘুরতে-ঘুরতে অফিসার বলে, আরে, আমার ত এইই কাজ, এতে আবার কষ্ট কী? এই কথাটা শেষ করার জন্যে অফিসারকে হাত দিয়ে নরেশের কাঁধ ছুঁতে হয়। কিন্তু নরেশ এতটাই লম্বা যে-তার কাধ ধরতে হলে অফিসারের হাতটা টানটান করতে হয়। তাই, অফিসার তার পিঠের ওপর হাতটা রেখে নামিয়ে নেয়। সেই সুযোগে নরেশ ঘাড়টা নামিয়ে অফিসারকে বলে, স্যার, আমাগো পেমেন্টটা?

হ্যাঁ, চল, এখনই পিচশ দিয়ে দিচ্ছি। আর কাল আমার অফিসে এসো

স্যার, আপনার অফিস ত চিনি না, নরেশ সোজা হয়ে, অপরাধীর ভঙ্গি করে।

দীপ্তি টকিজ চেনো ত?

হ্যাঁ, স্যার।

আর-একটু সোজা গেলেই ফায়ার ব্রিগেড

চিনি সার, পেছন থেকে অমূল্য বলে।

তার পাশেই, এবার অফিসার হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু নরেশ আবার বলে ওঠে, স্যার, আপনারে জিপ পর্যন্ত আগাইয়া দেই, ঐখানেই পেমেন্ট দিবেন।

জিপ ত ঠিক বাঁধের ঐ পাড়ে এনে রেখেছি। ঠিক আছে চলো অফিসার বাধে উঠতে শুরু করেন, পেছনে-পেছনে অমূল্য আর নরেশ। তার পেছনে ভিড়ের লোকজন। বাঁধের ওপর থেকে যারা নেমেছিল তারাও এদের সঙ্গে মিশে যায়। কাদাখোয়া আর বাঘারু বোঝে না–তাদের কী করতে হবে। কিন্তু তাদের যখন গাছ থেকে নামতে বলা হয়েছে তখন তাদেরও নিশ্চয় বাঁধের ওপরই উঠতে হবে–এ-রকম একটা সহজ ধারণা থেকে তারাও এই ভিড়ের সঙ্গে বাঁধের ওপর উঠতে শুরু করে। বাচ্চারা ততক্ষণে কাদাখোয়া আর বাঘারুর ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে, তারা ওদের দুজনকে ধাক্কা দিয়ে-দিয়েই এগিয়ে যায়। বাঘারু আর কাদাখোয়া পেছনে পড়ে যায়। তারা ভিড়ের পেছনেই বাঁধের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে।

একটু ওঠার পরই বাঘারুর গলা থেকে সেই হলদে দড়ি, গাছ পর্যন্ত, দুলতে থাকে। যারা এতক্ষণ দড়ি ধরে টেনে এনেছিল, তারা ত দড়িটাকে বোল্ডারের ওপর ফেলে রেখে বাঁধের ওপর নীচে ভিড়ের। নানা অংশে মিশে যায়। এখন বাঘারু যত উঁচুতে উঠছে, দড়িটাও তার সঙ্গে মাটি ছেড়ে ততটা উঠছে। আর, শেষে বাঁধের মাথা থেকে নদী পর্যন্ত ঝুলে থেকে দোলে।

বাঁধের ওপর উঠে কাদাখোয়া আর বাঘারু আবার দাঁড়িয়ে পড়ে। অফিসারকে নিয়ে ভিড়টা ঢাল বেয়ে বাঁধের বিপরীত দিকে নেমে যাচ্ছে। তারাও সেই ঢাল বেয়ে নামবে কিনা বুঝতে পারে না। কারণ, বেশির ভাগ লোকই আর নামছে না, তারা বাকি ভিড়টার নামা দেখছে। কাদাখোয়া আর বাঘারুকে সেই ভিড়টাতে আটকা পড়ে যেতে হয়। তারা একবার অফিসারের চালের দিকে, আর একবার নদীর ঢালের দিকে এলোমেলো তাকায়। এমন সময় অশ্বিনী রায় ভিড়ের মধ্যে এসে ডাকে, হে-এ কাদাখোয়া। কাদাখোয়া অশ্বিনী রায়ের ডাক শুনে সেদিকে এগিয়ে যায়।

অশ্বিনী রায় তাকে জিজ্ঞাসা করে, কী দেখি আসিছু রে? ঘরবাড়িখান ঠিকো আছে, না নাই?

কাদাখোয়া প্রশ্নটার মানে না বুঝে বলে, ঐঠে ত জল।

জল ত, ঐ মানষিখান গুয়াগাছের মাথাত কী কইরবার ধইচছিল?

অশ্বিনী রায়ের প্রশ্ন শুনে ভিড়ের অনেকের মনে পড়ে ঐ লোকটি সুপুরি গাছে চড়ে আর নামে নি কেন সেট দেখার জন্যেই এখান থেকে নৌকো ভাসানো হয়েছিল। হঠাৎ কাদাখোয়া আর অশ্বিনী রায়কে ঘিরে ভিড়টা জমে ওঠে। তাদের ভেতর থেকে একজন জিজ্ঞাসাও করে, কী দেখিলুরে কাদাখোয়া, ক কেনে।

কিছু দেখি নাই রো—

কী দেখলু নাই? ঐঠে যে এই মানষিডা আছিল, দেখলু নাই?

হয়। মানষিডা আছিল।

কোটত আছিল?

ঐঠে আছি, জলের ভিতর আছিল।

জলের ভিতরত ভাসি আছিল? না খাড়া আছিল?

বসি আছিল। বসি আছিল।

ঐটাক ছাড়ি দাও কেনে। নরেশুয়াখান আসুক কেনে, তার বাদে সবখান শুনা যাবে।

লোকজনের এই সব কথা থামতেই অশ্বিনী রায় একটু যেন ব্লেগেই জিজ্ঞাসা করে, এই মানষিডার গুয়াগাছে উঠিবার কামখান কী আছি?

অশ্বিনী রায়ের এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে কাদাখোয়া একবার শূন্যে তাকায়–যেন সেই শূন্যে অশ্বিনী রায়ের চাল, আর একবার মাটির দিকে তাকায়, যেন ঐ মাটিতে ফ্লাডের জল আর তাতে গাছগুলোর সঙ্গে বাঘারু ভাসছে। কিন্তু এই কথাটা বলার ভাষা না পেয়ে সে তার ডান হাতটা আকাশে তুলে ধরে বলে, ঐঠে ত চাল, আর এইঠে ত জল!

উঠিসেন ত উঠিসেন। স্যালায় আবার গুয়াগাছখানত উঠিবার কামটা কী?

অশ্বিনী রায় তার রাগ বজায় রাখার চেষ্টা করে। নরেশ তার কথার জবাব দেবে না, বা তার সব প্রশ্ন সে সাহসে ভর দিয়ে নরেশ বা অমূল্যকে করতে পারবে না। তাই তারা আসার আগেই সে তার ব্যক্তিগত কথাগুলো তার ব্যক্তিগত মানষিডার কাছ থেকে জেনে নিতে চায়। কিন্তু কাদাখোয়া জানাতে পারে না। সে আবার আকাশের দিকে তাকায়, যেন এখানে অশ্বিনী রায়ের চাল। সে আবার মাটির দিকে তাকায়, যেন ওখানে ফ্লাডে বাঘারু ভাসছে। আর, তারপর ডান হাতটা আকাশে তুলে সে শুধু আবারও বলতে পারে-ঐ ঠে ত চাল আর এইঠে ত জল।

গুয়াগিলা আছে কি নাই? অশ্বিনী রায় কাদাখোয়র কাছে তার সুপুরি গাছগুলোর ফলের হিশাব চায়। কাদাখোয়া অশ্বিনী রায়ের প্রশ্ন শুনে সকলের মাথার ওপর দিয়ে বাতাস আর বৃষ্টি ভেদ করে সেই চরের দিকে তাকিয়ে দেখে নিতে চায় সপুরি গাছের সুপুরিগুলো আছে কি নেই।

অশ্বিনী রায় যতটা পারে গলা তুলে বলে, দেখিবার মনত খায় নাই?

কাদাখোয়া সেই চরের ওপর থেকে অশ্বিনী রায়ের চোখের ওপর তার দৃষ্টি ফিরিয়ে আনে। অশ্বিনী রায় গলাটা আর-একটু তুলে বলে, যা কেনে; গরুগিলাক খোয়া দে, সে আঙুল তুলে দেখায়ও কাদাখোয়াকে কোন দিকে যেতে হবে। সেই অঙ্গুলিনির্দেশিত পথে কাদাখোয়া চলে যায়।

বাঘারু যেখানে এসে উঠেছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। বাঁধের ওপরের ভিড়টা দুভাগ হয়ে গেছে–একটা ঢাল বেয়ে নীচে অফিসার, নরেশ আর অমূল্যর সঙ্গে, আর-একটা অশ্বিনী রায় কাদাখোয়র সঙ্গে। ফলে, বাঘারু একটু নির্জনেই পড়ে যায় বা দুটো ভিড়েরই পেছনে। ভিড়দুটোর বাইরেও কিছু লোক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। দু-একজন বাঘারুকে আপাদমস্তুক দেখেওছে। দু-একজন বাঘারুর গলার দড়িটাও দেখেছে। কিন্তু বাঘারুকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করে না। বাঘারু যেমন দাঁড়িয়েছিল, তেমনি দাঁড়িয়ে থাকে। তার সামনে বাঁধের নীচে ও তার পাশে বধের ওপরে নানা কথাবার্তার মধ্যে বাঘারুর গলা থেকে নদীর ভেতরে ভাসমান গাছ পর্যন্ত হলুদ রঙের মোটা নাইলনের দড়ি বন্যার বাতাসে দোল খায়।

.

বাঘারুর দ্বিতীয় সংলাপ

বাঁধের নীচে অফিসার নরেশকে বলে, আরে, ঐ লোকটার নাম-ঠিকানা ত নেয়া হল না, আমাকে ত রিপোর্ট করতে হবে।

নরেশ পেছনে ঘাড় ঘোরায়, তারপর নিজেই বাধ বেয়ে ওপরে উঠতে থাকে বাঘারু ডাকতে। মাঝামাঝি উঠতেই দেখে বাঘারুকে একা-একা দাঁড়িয়ে আছে। আর না-উঠে বাঘারুকে নরেশ ডাকতে থাকে, হেই শুনিছেন, হে-ই শুইনছেন, আরে হে-ই

বাতাসের আওয়াজ, চারপাশে নানারকম কথবার্তা, এই সব কারণে বাঘারু নরেশের ডাক শুনতে পায় না। অথবা, তাকে যে ডাকা হতে পারে সেটা সে ভাবেই নি। অগত্যা, নরেশকেই আবার পা বাড়াতে হয়। পা বাড়িয়েও সে ডাকতে থাকে, হে-ই গাছুয়ামানষি, আরে এই গাছুয়ামানষি।

বাঘারু তখন বাঁধের ঢাল বেয়ে অফিসারের গাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল, যেমন সে নানাদিকেই অলস তাকাচ্ছিল। অফিসারের গাড়ি থেকে চোখ সরিয়ে আবার বাঁ দিকে চোখ সরাতে গেলে নরেশ তার নজরে পড়ে যায়। বাঘারু যদি সোজা তাকিয়ে, সোজাই বা দিকে ঘাড় ঘোরাত তা হলে নরেশকে দেখতে পেত না। কিন্তু অফিসারের গাড়িটার দিকে সে তাকিয়ে ছিল বলে তাকে মাটি থেকে কোনাকুনি চোখটা বায়ে বাঁধের ওপর তুলতে হচ্ছিল। তাই নরেশ তার চোখে পড়ে যায়।

নরেশ তখন হাত দিয়ে তাকে ডাকতে-ডাকতে চেঁচায়, আরে কানে শুনেন না নাকি? আসেন এইখানে, স্যার ডাইকতেছে।

নরেশের কথাটা বাঘারু শোনে কি না বোঝা যায় না, শুনে থাকলেও সেই কথার মানে বোঝার জন্যে তাকে আবার অফিসারের গাড়ির দিকে তাকাতে হয়। সেই গাড়ির কাছ থেকে সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে। নরেশ আবার চেঁচায়, আরে, এই মানষি কালা নাকি। আরে, আসেন, স্যারে, ডাইকতেছে।

এবার বাঘারু বোঝে। সে ঢাল বেয়ে নামতে শুরু করে। সে দু-এক পা নামার পর নরেশ পেছন ফেরে। নরেশ দু-এক পা নেমে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নেয় বাঘারু নামছে কিনা।

বাঘারু গিয়ে অফিসারের সামনে দাঁড়ায় না। বাঁধের ঢালটার পরে যেখানে জিপের সামনে ভিড় শেষ হয়েছে সে সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। ততক্ষণে নরেশ অফিসারের সামনে পৌঁছে গেছে। সে পেছন ফিরে দেখে, তার পেছনের লোকজনের ওপরে বাঘারুর মাথা।

আরে এইখানে আসেন না। স্যার, আইসছে, নরেশ হাত দিয়ে তার পেছনে দাঁড়ানো লোকজনকে দুদিকে সরিয়ে দেয়, বাঘারুর আসার জন্যে পথ করে দিতে। কিন্তু পথ হওয়া সত্ত্বেও বাঘারু এগয় না–যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে।

অফিসার জিপের ভেতর বসেছিল। সেখান থেকে গলা বাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে, এখানে আসুন, আপনার নামটা কী? জিজ্ঞাসার জন্যে অফিসার হাত দিয়ে নরেশকে সরিয়ে দেয়। এখন জিপের ভেতর অফিসার আর মাটিতে বাঘারু সোজাসুজি, কিন্তু দুজনের মাঝখানে হাত পাঁচ-ছয় তফাত।

বাঘারু কোনো জবাব দেয় না। ইতিমধ্যে অফিসার বুকপকেট থেকে ডটপেন ও একটুকরো কাগজ বের করে ডান উরুর ওপর রেখেছে। শুনে, লিখবে বলে অফিসার মাথা নিচু করেছে, কিন্তু শোনার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর তাকে আবার চোখ তুলতে হয়! চোখ তুলে বাঘারুকে দেখে নিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, আপনার নাম কী? তারপর নরেশকে বলে, দড়িটা কিসের?

বাঘারুর গলা থেকে সেই হলুদ দড়িটা বাঁধের ঢাল বেয়ে উঠে আড়ালে চলে গেছে। এখানে বাঁধের ঢালের জন্যে বাতাসে আর সে-দড়ি দুলছে না।

নরেশ বলে, ও স্যার, ওর গাছবান্ধা দড়ি।

গলার সঙ্গে বাঁধা?

নরেশ হেসে ওঠে, গাছগুলো বাইন্ধ্যা গলায় ঝুল্যায়া রাইখছে।

অফিসার নরেশকে বলে, নামঠিকানাটা জিজ্ঞাসা করুন ত।

নরেশ বাঘারুর কাছে গিয়ে বলে, আরে, আপনারে না স্যার ডাইকতেছে, এহানে খাড়ায়্যা আছেন ক্যান? আপনার নামঠিকানা কন, স্যারে জিগায়। স্যারের লিখবার লাগব। আপনার নামঠিকানা কী?

মোর নামঠিকানা নাই রো। মোর দেউনিয়া। গয়ানাথ জোতদার বাঘারু এতক্ষণে বলতে পারে।

শুনে নরেশ হেসে উঠে মুখে হাত চাপা দেয়। অফিসার জিজ্ঞাসা করে, কী, হল কী?

স্যার, কয় যে এই মানিষডার কুনো নাম নাই। গয়ানাথ জোতদারের নাম লিখবার কয়।

অন্যান্য লোকজনের চাপা হাসিটা শেষ হওয়ার পর অফিসার বলে ওঠে, আচ্ছা, গয়ানাথ জোতদারের ঠিকানাটা জিজ্ঞাসা করুন না। তা হলেই ত ওর ঠিকানা জানা যাবে, কেয়ার অব গয়ানাথ জোতদার। অফিসার কাগজের ওপর মাথা নোয়ায়।

নরেশ বাঘারুকে জিজ্ঞাসা করে, গয়ানাথ জোতদারের ঠিকানাটা কন তালি।

মুই জানো না। লিখি দেন গয়ানাথ জোতদার।

আরে তা ত, লিখ্যাই ফেইলছে। সে জোতদার থাকে কই? ঘরডা কুথায় সেডা কইবেন ত?

সবঠে থাকে। এইঠে আসিবে।

বাঘারুর কথা শুনে নরেশ আবার হেসে ওঠে, মুখে হাত চাপা দিয়ে। এবার অফিসার জিজ্ঞাসা করে না, কী হল। হাসি শেষ করে নরেশই বলে, স্যার, বলে, অর জোতদার গয়ানাথ সব জায়গাতেই থাকে, এইহানেও থাকে।

অফিসার একটু ভাবে, গয়ানাথের নাম ত সবাইই জানে। ও কোথায় নদীতে পড়ল সেটা জিগগেস করো, তাহলেই হবে।

নরেশ বাঘারুকে বলে, আপনে কোথ থিক্যা নদীত পইড়লেন, সেইডা কন।

বাঘারু একটু ভাবে। নরেশ তার নীরবতাকে মনে করে উত্তর দেওয়ায় আপত্তি। সে তাই আবার প্রশ্নটা করে, সেইডাও গয়ানাথ জানে নাকি? ভাইসলেন আপনে, আর জাইনবে গয়ানাথ?

ততক্ষণে বাঘারু নরেশের প্রশ্নটির জবাব পেয়ে যায়, মুই নদীত, পড়ো নাই।

এতক্ষণে বোধহয় বোঝা হয়ে গেছে যে বাঘারু আধপাগলার মতই জবাব দিয়ে যাবে, আর তাতে সবাইকে হেসে উঠতে হবে। নরেশের হাসিটাকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বাঘারু তার জবাবের বাকিটুকু বলে, মুই ফ্লাড ভাসিছু।

হাসি থামিয়ে নরেশ বলে, স্যার, বলতেছে নদীতে পইড়্যা যায় নাই, ফ্লাডে ভাইসছে।

অফিসার যেন একটা ইশারা পায়। তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, হ্যাঁ, তাই ত, কোথায় ভেসেছে ফ্লাডে সেটা বলুক। আর নামটা?

অফিসারের কথা অনুযায়ী নরেশ বলে, ফ্লাডে ভাইসলেন কোখন? বলে নরেশের মনে হয়, এ ভাষাটা বাঘারু নাও বুঝতে পারে। সে রাজবংশী ভাষা মিশিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, কোটত ভাসিলেন ফ্লাড

বাঘারুর সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়, গাজোলডোবা। বাঘারুর উত্তর দেয়ার মধ্যে এমন একটা ভাব আসে যেন সে সব প্রশ্নেরই জবাব দিতে পারে, প্রশ্নটা যদি ঠিক ভাবে করা হয়।

একটা জায়গার নাম পেয়ে নরেশ উৎফুল্ল হয়ে এক লাফে অফিসারের কাছে এসে বলে, স্যার, কইছে, কইছে।

কী বলেছে?

জায়গার নাম কইছে।

বলেছে ত বলছ না কেন? কৈাথা থেকে ভেসে এসেছে?

গাজোলডোবা।

অফিসার উচ্চারণ করে করে কাগজের টুকরোটাতে লেখে, জি, এ, জে, এ, এ, না, ও, এল, তারপর নরেশকে বলে, নামটা বের করো। ডি, ও, বি, এ। নরেশ আবার বাঘারুর কাছে ফিরে আসে–শুনেন। আপনার নামটা কয়্যা দ্যান, তাহালিই স্যার চইল্যা যাবার পারে। ঐডা ত লিখ্যা নিছে–গয়ানাথ জোতদার, গাজোলডোবা। এইবার আপনার নামডা কন।

গয়ানাথ জোতদার গাজোলডোবা না থাকে–বাঘারু বলে।

খাইছে। এই না কইলেন, আপনে গাজোলডোবা ভাইসছেন।

মুই ভাসিছু। গয়ানাথ না থাকে।

গয়ানাথ যেইখানে খুশি থাকুক গিয়া–আপনে ত গাজোলডোবার থিক্যা ফ্লাডে ভাইসছেন? তা হলিই হবে।

কী এক গাজোলডোবা-গাজোলডোবা করছ, ওটা ত হয়েই গেছে, অফিসার গলা তুলে নরেশকে বলে, এখন যদি বাঘারু আবার কিছু বলে গাজোলডোবা নামটা প্রত্যাহার করে নেয় তা হলে যেটুকু পাওয়া গেছে, সেটুকুও হারাতে হবে। অফিসারের দরকার ছিল একটা জায়গার নাম–সেটা সে পেয়ে গেছে। নামটা বের করতে পারো কিনা সেটা দেখোনইলে ছেড়ে দাও। যেন গাজোলডোবা থেকে একটা মানুষ ভেসে যাচ্ছিল, গাছগাছালির সঙ্গে ভেসে যাচ্ছিল, তাকে উদ্ধার করে আনা হয়েছে–অফিসারের রিপোর্টের পক্ষে এইটুকুই যথেষ্ট। এতক্ষণ ধরে এতটা দূরত্ব যে-ফ্লাডের ভেতর ভাসতে-ভাসতে এসেছে, সে ত এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে বা শক্ত হয়ে থাকতে পারে যে নিজের নামটা আর বলতে পারে না।

আপনার নামডা কন, নামডা, স্যার লিখবেনে। বাঘারু চুপ করে থাকে।

একটু সময় নিয়ে নরেশ বলে, কী, কইবেন না নামডা?

বাঘারু বলে, মোর নাম নাই রো।

নরেশ এবার না হেসে রেগে যায়, ফ্লাডে ভাইস্যা আসার আগে একখানা নাম দিবার পারেন নাই নিজের? ত এইখানে কম্বল, কাপড়, তিরপল, চিড়াগুড়–এইগুল্যা কুন নামে দিব আপনারে? না, এইগুলান লাগব না?

নরেশ আশা করেছিল, বাঘারু এত জিনিশের সম্ভাবনায় লোভী হয়ে উঠে নামটা বলে দিতে পারে। কিন্তু বাঘারু বলে, গয়ানাথর নাম দেন কেনে।

আরে–গয়ানাথ আবার? রিলিফ দিব আপনাক, আর নাম লিখব গয়ানাথের?

মোর না নাগে।

অফিসার ততক্ষণে গয়ানাথ জোতদারের জমিতে কর্মরত একজন কৃষিশ্রমিক কথাকটি লিখে ফেলে, ড্রাইভারকে বলে, চলো, আর নরেশকে বলে, ছেড়ে দাও। কার তোমরা যখন অফিসে যাবে তখন শুনে যেও।

.

|| দেড় হাতি ত্যানার বন্ধন, নাইলনের দড়ির বন্ধন ও টিভি ক্যামেরা ইত্যাদি নিয়ে বৃক্ষপর্বের শেষ অধ্যায় ||

বৃক্ষপর্ব এখানেই শেষ হতে পারে। বৃক্ষপর্বে ত বাঘারু কী করে গয়ানাথের গাছগুলোর সঙ্গে ভেসে এসে নিতাইদের চরে উঠল ও সেখান থেকে রংধামালির বাধে উঠল তার কাহিনী। রংধামালিরাধে সেদিন বিকেলে নরেশকে অফিসার যা টাকা দেয়ার দিয়েছে। পরদিন অফিসে যেতে বলেছে। আর-একটা রশিদে আরো কিছু টাকা দিয়ে দেবে। বাঘারু যে তার নামটা বলে উঠতে পারেনি সেটা সেদিক থেকে ভালই হয়েছে–অফিসার নিজের মত কিছু একটা লিখে নিতে পেরেছে। একটা লোক, বাঘা, অথচ সে দুবার রেসকু হয়েছে–তা হলে ত তার একটা নাম নতুন হতেই হয়। বেশি লোক রেসকিউ করতে পারলে সেটা ত অফিসারের সার্ভিস ফাইলে লেখা থাকবে।

বাঘারু তার গাছগুলোকে নিয়ে একটু সরে গিয়েছে। সেখানেই বেঁধেছে। সে এই বাঁধের চরুয়াদের একজন নয়, কিন্তু আবার তাদেরই একজন। সে তার মাচানেই থাকে। মাঝেমধ্যে বাঁধের ওপরও ওঠে। কাদাখোয়ার সঙ্গে বাঘারুর আর দেখা হয় না। দেখা হয় না, মানে কথা হয় না। ওদের দুজনের পরস্পরকে বলার মতো কোনো কথা নেই। কাদাখোয়ার ত কাজকম্ম আছে–যদিও এখন কাজকৰ্ম্ম কমই। বাকি সময় সে গামছা দিয়ে মাথা মুড়ে বোল্ডারের ওপর ঘুমবে। বাঁধের লোকজন কোনো সময় বাঘারুকে কাদাখোয়া বলে ও কাদাখোয়াকে গাছারু বলে ডেকে ফেলে।

বাঁধে এসে বাঘারু এই নতুন একটি নাম পেয়েছে, গাছারু। সে তার নাম বলেনি কিংবা বললেও বাধসুদ্ধ লোক তা জানতে পারত না। তারা তাকে নিজেদের একটা ডাকনাম দিতই। বাঘারুর গলার নাইলনের দড়ির বান্ডিলটা নিয়ে সেনামটা তৈরি হতে পারত। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। অতগুলো গাছ আর সেই গাছের সঙ্গেই বাঘারুর শরীর বাধা, আবার, সেই গাছের মাচানেই বাঘারুর শোয়াবসা–এই সব কারণে গাছারু নামটাই চালু হয়ে গেছে। এ-চরে পূর্ববঙ্গের লোকরা অনেকে আছে–সেদিক থেকে গাছুয়াই হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ভাষাতত্ত্বের বহির্ভূত কারণে নামকরণ ইত্যাদির ব্যাপারে পূর্ববঙ্গের এই লোকরাও তিস্তাপারের আদি নিয়মকানুনই মেনে ফেলে।

বাঁধে বাঘারু, গয়ানাথ ও আসিন্দিরের জন্যে অপেক্ষা করে। এই অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর-কোনো কাজ নেই। এই বন্যা, হাওয়া, বৃষ্টি থামতে-থামতে আসিন্দিরের ভটভটিয়াতে চড়ে গয়ানাথ ঠিক এসে যাবে। বেশি খুঁজতে হবে না গয়ানাথকে–ঠিক জেনে যাবে বাঘারু রাংধামালির বাঁধে এসে ঠেকেছে।

কিন্তু সেসব কোনো কিছুতেই বাঘারুর কোনো ভূমিকা নেই। তাকে দূর থেকে নিয়ে এসে গাজোলডোবা থেকে ফ্লাডে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল। সে বিশ্বস্তভাবে ভেসে এসেছে। সে যেখানে ঠেকে যাবে সেখানেই যেন থেকে যায়। সে ফ্লাডের ভেতর ঐ চরে আটকে গিয়েছিল–এখন এই বাধে এসে আটকে আছে। এখন আর তার শরীর এই ফ্লাডের সঙ্গে জড়িয়ে নেই। গয়ানাথের জন্যে অপেক্ষা দিয়ে এই বৃক্ষপর্ব শেষ হতে পারে।

নিতাই যে-রিলিফের ব্যবস্থা করে ফেরে–তার ভাগ বাঘারুও পায়। এরকম বানভাসি রিলিফে ত প্রত্যেকের নামে আলাদা করে চিড়েগুড় লিখতে হয় না–তাই মোট হিশেবের মধ্যে বাঘারু ঢুকে যায়। কিন্তু ফ্লাড, হাওয়া ও বৃষ্টি না কমলে চালগমের ব্যবস্থা হবে, ফ্লাডের জন্য নেমে যাওয়ার পরও নিতাইদের চর না শুকলে কাপড়, জামা, কম্বল ও ক্যাশডোলেরও ব্যবস্থা হবে–তখনো যদি বাঘারুকে চরুয়াদের একজন হয়ে থাকতে হয় তা হলে তার পুরনো নামধাম দরকার হবে, নতুন ডাকনামে চলবে না।

কিন্তু সে-সম্ভাবনা দুই কারণে কম। চরের লোকজন ঐ চরেরই লোক বলে যে বিশেষ সুযোগসুবিধে পাবে তাতে বাঘারুকে ঢোকাতে চাইবে না। এই সব সুযোগসুবিধে দেয়া হয় পরিবারের ভিত্তিতে। বাঘারু চরের কারো পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নয়। তৎসত্ত্বেও ফ্লাড়ের তিস্তায় অনেকে যেমন ভেসে-আসা টিনের চাল পর্যন্ত পেয়ে যেতে পারে, বা, শালের খুঁটি, ভামনির চাল, বাঁশের খুঁটি ত পেতেই পারে–তেমনি বাঘারুর মত ভেসে-আসা জোয়ান কাজের মানষিও পেয়ে যেতে পারে। নরেশ বা অমূল্য তা হলে বাঘারুকে নিজেদের পরিবারভুক্ত দেখাতেও পারত ও বাঘারুর প্রাপ্য জামাকাপড়, কম্বল, চালগম এ-সব পেতেও পারত। কিন্তু বাঘারু বড় বেশিবার গয়ানাথ জোতদারের নাম বলে বলে এটা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে-তার একখান দেউনিয়া আছে, সেই দেউনিয়ার গাছগুলোই সে সঙ্গে নিয়ে এসেছে (এই শেষের কথাটি অবিশ্যি কোনো সময়ই খুব স্পষ্ট হয়নি)। তাছাড়া, অতগুলো গাছ ত একটা সম্পত্তির মত। বাঘারুকে দেখেই বোঝা যায়, এ-সম্পত্তি তার ত হতেই পারে না, বরং এই গাছগুলোর যেমন মালিক আছে, তারও তেমনি মালিক আছে। চরের লোকজন সম্পত্তির নিয়মকানুন জানে। তাই, নরেশ বা অমূল্যর মত সম্পত্তির মালিক, বাঘারু ও গাছের সম্পত্তির মালিকের সম্পত্তিতে ভাগ বসায় না। বাঘারু চরুয়াদের একজন হয়ে যেতে পারে না, এটা তার একটা কারণ। তাই চরুয়া বানভাসি হিশেবে তার নাম রেকর্ড হয় না।

দ্বিতীয় ও আর-একটি কারণ হল-বাঘারুকে ও গাছগুলোকে গয়ানাথ এতদিন এখানে কখনোই ফেলে রাখবে না। সে এই বৃষ্টি-হাওয়া ও বন্যার মধ্যে এসেই বাঘারুকে ও গাছগুলোকে ধরে ফেলবে। বাঘারু গয়ানাথের যেমন তেমনি গয়ানাথেরই থাকবে। বরং গাছগুলো গয়ানাথ এখানেও বেচে দিতে পারে। কিন্তু বাঘারুকে আবার তার জায়গায় পাঠিয়ে দেবে।

এখন দেখে বোঝার উপায় থাকে না মাত্র দু-চারদিন আগেও তিস্তা এরকম ছিল না, সামনে নিতাইদের চরে ভরভরন্ত গ্রাম ছিল, এই বাধটা ফাঁকা ছিল। এখন দেখে মনে হয়, তিস্তায় যেন সারা বছরই এ-রকম ফ্লাড় থাকে আর এই লোকজন এই বাঁধেরই বাসিন্দে। এরা সব এক গ্রামেরই লোক, ফলে বাধে এসে ওঠার পর সেই গ্রামের নিয়মেই বসবাস চালিয়ে যেতে কোনো অসুবিধে হয়নি। শুধু প্রতিদিনের কাজটা নেই–সেই কাকডাকা ভোর থেকে কাকের বাসায় ফেরা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ। তার বদলে অবিশ্যি কেউ-কেউ রিলিফ-টিলিফ নিয়ে কিছু ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কেউ-কেউ আবার শহরের জীবনযাপনের আস্বাদ ভোগ করতে থাকে। সিনেমা দেখা ত আছেই, তা ছাড়াও শহরের মধ্যেই ঘোরাফেরা। কেউ-কেউ আবার দিনবাজারের কাছে মেয়েদের পাড়ায় যাতায়াত করছে। ফলে, কখনো কখনো যেন মনে হয়–এরা যেন এই বাঁধের স্থায়ী বাসিন্দে, তেমনি কখনোকখনো আবার মনে হয়–এরা গ্রামসুদ্ধ লোক যেন ছুটি কাটাতে এখানে এসে উঠেছে। এর মধ্যে অনেক দিন ধরে জমিয়ে রাখা সর্ষে, বা তক্তা, বা বাঁশের জিনিশপত্র দিনবাজারে নিয়ে বিক্রি করার সুযোগ কারো কারো এসে যায়।

বাঘারু অতগুলো গাছ নিয়ে বাঁধেরই এক কোণে, এদের মধ্যেই অথচ এদেরই একজন না-হয়ে যে দিন কাটাচ্ছে তাও নজরে পড়ে যায় কারো। এমনি বাঘারু যদি থাকত, তা হলে তাকে কেউ দেখত না, কিন্তু সে যে অতগুলো গাছ আগলে বসে আছে তাতেই যাদের দেখার তারা তাকে ও তার গাছগুলোকে দেখে ফেলে। তাদের কেউ-কেউ এসে বাঘারুর সঙ্গে কথাবার্তাও বলে।

রংধামালি হাটের এক কাঠের আড়তদার এসে বাঘারুর গাছগুলোর পাশে অনেকক্ষণ বসে ছিল এর আড়তটা ছোট, কোনো ইলেকট্রিক করাত নেই। কিন্তু একটা করাতে গাছ কেটে তক্তা বানায় জনা তিন বিহারি মজুর। তার আড়তে আস্ত-আস্ত কিছু গাছ আছে আর একটা শেডের তলায় থাকে বিভিন্ন সাইজের তক্তাগুলো। লোকটি কোন দেশী তা জানা যায় না, নাম চরণ রায়। কথায় একটা বিদেশী টান আছে, চেহারায় নেপালি ধাচ আছে, রাজবংশীও মনে হতে পারে। সে একদিন গাছগুলো দেখে যাওয়ার সময় বাঘারুকে বলে, মোর স-মিলত আসেন না কেনে বাউ? দিনরাতি এইঠে নদীর পাড়ে করিবেনটা কী? রাতিত ঐঠে ঘুমাবার পারেন।

বাঘারু যেন কথাটার কোনো মানেই বোঝে না। কথাটা যেন আর কাউকে বলা, সে এমনই চুপ করে থাকে। কিন্তু লোকটা আবার এসে জিজ্ঞাসা করে–আরে ক্যানং মানষি হে আপনে? সাগাই (নেমন্তন্ন) দিছু, তাও না গেলেন। বাঘারু একথারও কোনো জবাব দেয় না। লোকটা তখন বিড়ি টানতে-টানতে জিজ্ঞাসা করে, তোমরালার জোতদারের স-মিল আছে কি নাই?

বাঘারু অন্য দিকে তাকিয়ে জবাব দেয়, না, জানো।

বাঘারুকে লোকটা একটা বিড়ি দেয়। সেটা নিতে বাঘারুকে গাছ থেকে নেমে আসতে হয়, তার জ্বালানো কাঠি থেকে বিড়িটা ধরাতে তার কাছাকাছি যেতে হয় ও বিড়িটা ধরিয়ে তার কাছাকাছিই বসতে হয়।

লোকটা তখন বলে, এত ফরেস্টের গাছ হে! তুমি ভাসি নিয়া আইচছেন।

বাঘারু চুপ করে থাকে। লোকটি বলে, পুলিশ দেখিলে ধরিবে।

কাক ধরিবে?

তোমরাক ধরিবে। তোমরার গাছ, তোমরা ধরিবে।

হামাক?

হয়, তোমাক ধরিবে।

লোকটার কথাটা নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতেই বাঘারু যেন আরো গভীর ভাবে বিড়ি টানে। তার পর লোকটাকে বলে, মোক আর-একখান বিড়ি দাও কেনে। লোকটি দিলে সেই বিড়িটা কানের পেছনে গুঁজে রাখে বাঘারু।

লোকটি বলে, গাছগিলা মোক বেচি দেন, মুই আড়তবাড়িত্ রাখি দিম। কায়ও জানিবার পারিবে না। স্যালায় তোমার জোতদারের ঘর আসিলে মোর পাকে নিগাও। টাকা দিয়া দিম।

বাঘারু বিড়ি টানে। লোকটি নিজে বিড়ি ধরাবার আগে বাঘারুকে দেয়। বাঘারু সেটা আর-এক কানের পেছনে গোজে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ নিয়ে কোনো কিছু ঠিক হয় না। লোকটি উঠে যাওয়ার সময় যদিও বলে যায়, কালি আসিম মোর করাতিয়ার ঘর নিয়া–, কিন্তু সত্যি-সত্যি সে আসে না।

তার বদলে এসেছে জগদীশ বারুই। এসেছে বলা ঠিক নয়, কারণ জগদীশ বারুই ত এই বাঁধের ওপরই থাকে, সে আর আসবে কোথা থেকে? কিন্তু বাঁধের ওপরে বা ঢালে যখনই বাঘারুর সঙ্গে জগদীশের দেখা হয়, তখনই সে বাঘারুকে একটা বিড়ি দিয়ে ফিসফিস করে বলে, আরে, তোর জোতদার কি গুইন্যা রাখছে কয়ডা গাছ তুই ধরছিস? একখান বেইচ্যা দে, ঐ চাপাগাছখানই দে, আর টাকা নিয়্যা লুকাইয়্যা থো। তারপর নিজের মনেই হেসে বলে, টাকা থুবিই বা কনে? আছে ত ঐ একখান নেংটি। তা থুস, ঐ হানেই থুস, নেংটির মইধ্যে? কী, রাজি ত? জগদীশ বলে। খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে, শালা বোগদা, বলে আবার সরে যায়।

মানুষ যেখানেই থাক, সেখানকার পরিবেশ-পরিস্থিতি, তাকে বুঝে নিতেই হয়। বাঘারুও বুঝে নেয় যে ঐ স-মিলের মালিক আর জগদীশ তাকে গাছগুলো, অন্তত একটা গাছ, বেচে দিতে বলছে। গয়ানাথের নানারকমের ব্যবসা, দশ রকমের জোতদারি। তার জোতজমি আছে, ডায়না নদীর পাহাড়ে তার মোষের বাথান থেকে মিলিটারিদের দুধ যায়, তার ফরেস্ট আছে, তার হাট আছে, তার নদী আছে। আর এই সব জায়গাতে কোনো-না-কোনো কাজে ত বাঘারুকে যেতে হয়, ঘুরতে হয়। তাকে অফিসারের পেছনে-পেছনে চেয়ার নিয়ে ছুটতে হয়, তাকে এম-এল-একে ঘাড়ে করে নদী পেরুতে হয়, তাকে বনের মধ্যে মোষের বাথান চরাতে হয়। গয়ানাথের এত কিছু করে যে বাঘারু, সে কি আর বোঝে না যে এই চারটি গাছের মধ্যে একটি গাছ, ঐ চাপা গাছটাই, বেচে দিয়ে গয়ানাথকে বলে দেয়া যায়-অন্ধকারে কখন গাছটা খসে গেছে সে বুঝতেই পারে নি? গয়ানাথ এই কথা শুনে রাগতে পারে, গালাগাল করতে পারে, মারতেও পারে–কিন্তু তার বেশি আর কী করবে? টাকা যদি নেংটির মধ্যে নাও রাখে, এত বোল্ডার চারদিকে–কোনো একটা পাথরে ঢাকা দিয়েও ত রাখতে পারে। বাঘারু খুব ভাল করেই জানে–এ-সব হয়, এ-সব করা যায়। বাঘারুর মাও ছিল গয়ানাথের, বাঘারু গয়ানাথের। দুই-দুই পুরুষ ধরে গয়ানাথের সঙ্গে থেকে-থেকে বাঘারু এটুকু শেখেনি যে গয়ানাথের একটা গাছ বেচে দেয়াটা কত সহজ? ফরেস্টের ভেতর থেকে বন্যার তোড়ে আলগা হয়ে স্রোতে পড়ে যাওয়া গাছ কেটে বন্যার জলে ভাসিয়ে দেয়ার চাইতেও কত সোজা? বাঘারু একবার নিগাও কেনে বললেই ত ঐ আড়তদারের লোকেরা এসে গাছ কেটে নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু বাঘারু আড়তদারের আর জগদীশের দেয়া বিড়ি কানের পেছনে গোঁজে আর বুকে নাইলনের দড়ির বান্ডিল ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কেন বাঘারু নিগাও কেনে বলে না, তা বাঘারুও জানে না। কিন্তু বাঘারু বলে না, বলার কথা ভাবেও না। বলা যায় এটা জেনেও, বলবে কি বলবে না এই নিয়ে, এমনকি কোনো মানসিক দ্বন্দ্বের মধ্যেও যেতে পারে না বাঘারু। এতে মনে হতে পারে যে তার মন নেই, তাই মানসিক দ্বন্দ্বও নেই। তা মেনে নিলে বলতে হয়, তার মন নেই কিন্তু শরীর আছে-তার প্রতিদিনের বাঁচা এই শরীরের সর্বস্বতা দিয়েই বাঁচা। যদি বাঘারু তার নাইলনের দড়ির সঙ্গে বাঁধা চারটে গাছের মধ্যে একটা গাছ বেচে দেয়, তা হলে ঐ চারটে গাছ একসঙ্গে বেঁধে এই ফ্লাডের তিস্তায় তার শরীরের যে বাঁচা, তা থেকে ত একটা গাছ কম গড়বে! দ্বন্দ্বে দীর্ণ হওয়ার মন পর্যন্ত নেই যে বাঘারুর, শুধু শরীরটুকুই আছে যে বাঘারুর, এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে তৈরি মানুষের এত পোশাক-পরিচ্ছদের মধ্যে মাত্র দেড় হাতি এক ত্যানা লেগে আছে যে বাঘারুর সম্পূর্ণ মানবশরীরটিতে, সেই দেড় হাতি ত্যানাতেই মাত্র যে বাঘারু মানবসভ্যতার সঙ্গে বাধা–সেই বাঘারু, প্লাবিত নদীতে, বৃষ্টিতে, ঝড়ে ও অন্ধকারে এতটা বন্যা পেরিয়ে আসা এই শরীরটা থেকে একটা গাছের বাঁচা বেচে দেবে কী করে? বাঘারুর যেমন মন নেই, তেমনি হয়ত মাথাও নেই। তাই সে কোনো কিছু করার পক্ষে যেমন যুক্তি জোগাড় করতে পারে না, তেমনি কোনো কিছু না করার পক্ষেও যুক্তি বানাতে পারে না। সে হয় একটা কাজ করে ফেলতে পারে অথবা না করতে পারে। যুক্তির প্রয়োজনীয় জোগান দেয়ার মত একটা মাথা পর্যন্ত নেই যে-বাঘারুর সে কী করে জগদীশ বারুইকে বা সেই কাঠের আড়তদারকে না করবে? সে শুধু ঐ চারটি গাছের সঙ্গে নিজেকেও বেঁধে ঐ নাইলনের দড়ির বান্ডিলটা গলায় ঝুলিয়ে বাঁধের ওপর কখনো কখনো দাঁড়াতে পারে, পাথরের আঙিনার ওপর দিয়ে কখনোকখনো হাঁটতে পারে, নিজের গাছগুলোর মাঘনের ওপর শুতে পারে। কুড়ালিয়াটা এখন বাঘারু সব সময় পেছনে গুঁজে রাখে না–একটা গাছের একটা ভেতরের ডালে কোপ বসিয়ে রেখে দিয়েছে।

এরকম ভাবেই বাঘারু এখানে, এই রংধামালির বাধে গয়ানাথের, ও ফ্লাড কমে যাওয়ার, অপেক্ষায় দিন কাটায়।

বন্যা ত আর অনন্তকাল ধরে চলে না–একদিন না-একদিন শেষ হয়। কিন্তু কবে শেষ হয় তার ওপর নির্ভর করবে খবরের কাগজ, টেলিভিশন এ-সব এই বন্যার কথা কতটা বলবে,কতটা দেখাবে। বিদ্যুতের মত এসে বজ্রপাতের মত মৃত্যু ঘটাতে পারে যদি কোনো ফ্লাড, তবে দীর্ঘস্থায়ী না হলেও সেটা খবর হতে পারে। তিস্তার সেবারের বন্যাটাও খবর হয়ে উঠল–বেশ ক-দিন থেকে গিয়ে। ফলে কলকাতা থেকে কাগজের ফটোগ্রাফাররা আর টিভির ক্যামেরাম্যান এসে পড়তে পারে। কিন্তু তাদের সব সময়ই তাড়াতাড়ি ফেরার তাড়া থাকে। সেই জন্যে জেলার তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তর থেকে। শহরের পাশের এই দুটো জায়গা দেখিয়ে দেয়া হত। জলপাইগুড়ি শহর থেকে আট মাইল ভাটিতে মণ্ডলঘাটের দুনম্বর চর আর মাইল চার-পাঁচ উজানে এই রংধামালির বাঁধ। দুই জায়গাতেই কিছু বানভাসি পরিবার উঠে এসেছে, গরুবাছুরও আছে, গবর্মেন্টের ত্রিপলও আছে। রংধামালি হাটের বিশেষ সুবিধে এই যে দেখেই সোজা তিস্তা ব্রিজ দিয়ে ডুয়ার্সে চলে যাওয়া যায়।

এ-রকম সব সময়, বিশেষত টিভির লোকজন যখন এসেছিল, তখন ক্যামেরাম্যান ও কাগজের ফটোগ্রাফাররা বাঘারুকে আবিষ্কার করে ফেলে। জেলা তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তর অবিশ্যি একটা তালিকা দিয়েছে। তাতে কোথায় কত লোককে উদ্ধার করা হয়েছে তার হিশেব ছিল। কিন্তু সে হিশেবের মধ্যে বাঘারুর কোনো আলাদা পরিচয় ছিল না। ততদিনে, সেদিন সন্ধ্যার বাঘারুউদ্ধার কাহিনী সরকারি সংখ্যাতত্ত্বের ভেতর একটা সংখ্যামাত্র হয়ে গেছে, বা তাও হয়েছে কিনা সন্দেহ। ফটোর লোকজনেরা বাঘারুকে আবিষ্কার করেছে নিজেদের গুণেই।

এমনি ত তিস্তার জল পেছনে রেখে বুড়োবুড়ি, মোষ, গরুমাছরু, বাচ্চাকোলে মা, জলের বিস্তার–এ-সব ছবি তোলা হচ্ছিলই। বাঘারু যে জায়গায় তার গাছ বেঁধেছিল সেখানে ফটোর লোজনদের পৌঁছুনোরই কথা নয়। কিন্তু টিভির ক্যামেরাম্যান একটা দূরদৃশ্যে বাধ থেকে তিস্তাটাকে গোল করে বা থেকে ডাইনে ফিরে আসতে-আসতে ভিউফাইন্ডারে বাঘারুকে পেয়ে যায়–বাঘারু দাঁড়িয়ে আছে, দড়ির বান্ডিল গলায়, গাছের মাচানে, গাছপালার মধ্যেই, মনে হচ্ছিল যেন জল থেকে কুঁড়ে বেরচ্ছে। প্যানিং শেষ হলে ক্যামেরা নিয়ে ক্যামেরাম্যান বাঘারুর সামনে চলে যায়, বাঁধ থেকে ঢাল বেয়ে নেমে বোল্ডারের শেষ পাড়টুকুতে জলের কিনারে হাঁটু গেড়ে বসে সে জলের ভেতর থেকে শাল গাছ-চাপা গাছ-খয়ের গাছ-সিসু গাছ সহ এক প্রায়-ফরেস্ট নিয়ে উত্থিত বাঘারুকে মেঘাচ্ছন্ন আকাশের সামনে দাঁড় করাতে চায়। অতটা না পেলেও, অনেকটা পায়। সে যতটা চাইছিল ততটা পেতে গেলে তাকে জলের ওপর শুয়ে ক্যামেরা আকাশের দিকে তুলে ছবি তুলতে হত। সে অবিশ্যি বাঘারুকে একট মুভ করতে বলে, কিন্তু বাঘারু নড়ে না। ফলে ছবিটাকে স্থিরচিত্র মনে হতে পারে বলে তার ভয় হয়।

টিভির ক্যামেরাম্যানের পেছনে-পেছনে কাগজের ফটোগ্রাফাররাও এসে দৌড়তে-দৌড়তে ছবি তুলতে থাকে। টেলি ও ওয়াইডে বাঘারুর নেংটিপরা শরীর, মুখরেখা ও বধসহ বন্যার পরিধি ধরা পড়ে যায়। তারাও বাঘারুকে ঘুরেফিরে দাঁড়াতে বলে কিন্তু বাঘারু স্থিরই দাঁড়িয়ে ছিল। ফটোগ্রাফারদের মধ্যে ভাল ভিসুয়ালের জন্যে প্রতিযোগিতার উত্তেজনার মধ্যেই এমন রসিকতাও চলছিল,লোয়ার পার্টে টেলি ফেলো না, দেখিস, আবার নেংটির ভেতরের লোমটোমসুষ্ঠু তুলে ফেলিস না, ইত্যাদি। এতটা নগ্ন অথচ এতটা গোটা একটা শরীরকে লেন্সে সামলানো শক্ত। টিভির ক্যামেরাম্যান অবিশ্যি একেবারে তলা থেকে আকাশ পর্যন্ত একটা দারুণ প্যানিং করেছে–বন্যার জল, ক্লোজ-আপে আবর্ত, গাছের ডালপালায় জলের স্রোতের আঘাত, আরো ডালপালা, বাঘারুর দুটো পা-ক্লোজ-আপে, ধীরে-ধীরে হাঁটু, উরু, কোমর, নেংটি। মিডিয়াম শটে পেট, বুক, তারপর মাথা। সেখান থেকে বাঘারু ধীরে-ধীরে, দিগন্ত থেকে দিগন্তে, আকাশে নদীতে, স্থাপিত হয়।

.

গয়ানাথের আসা পর্যন্ত এ-সবের মধ্যেই বাঘারুর বৃক্ষপর্ব কাটে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%