দেবেশ রায়
গয়ানাথ জোতদার সাত-সকালে আসিন্দিরের মোটর সাইকেলের পেছনে বসে জলপাইগুড়ি শহরে তার উকিলবাবুর বাড়ি যাচ্ছিল। এখনো ঠিক আছে, ফেরার সময় বাসে ফিরবে, আসিন্দির তার কাজে চলে যাবে। সেই যে তিস্তা ব্যারেজের সেটলমেন্টের সময় শুরু হয়েছিল–এখন সে ব্যারেজ গত কয়েক বছরে নদীর মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে গেছে–আসিন্দির তার শ্বশুর গয়ানাথের ড্রাইভারই হয়ে গেছে অনেকটা। গয়ানাথ জোতদারের মত বিখ্যাত লোকের নাম এখন লাটাগুড়ি রামসাই-ওদলা বাড়ি-ক্রান্তিহাট-মৌলানি, এমন-কি ময়নাগুড়িতেও, ভটভটি জোতদার বলেই চালু হচ্ছে। প্রথম-প্রথম লোকে আড়ালে বলত, এখন অনেকে তাকে এ ভটভটি দেউনিয়া বলে ডেকেও ফেলে। গয়ানাথ এই নিয়ে রাগারাগি ছেড়ে দিয়েছে।
মোটর সাইকেল ত আসিন্দিরের অনেক কালই আছে। কিন্তু আগে গয়ানাথ কখনো তার পেছনে উঠত না, ওঠার দরকারও পড়ত না। জলপাইগুড়ি শহরে তার বাবার আমলের বাধা উকিলবাবু আছেন। তার বাবা থেকে তার সময়ের মধ্যে বুড়া উকিলবাবুর ছোঁয়া উকিল হল, বুড়া উকিলবাবু মারাও গেলেন, এখন সেই ছোঁয়া উকিলবাবু হয়েছেন। তেমন দরকারে উকিলবাবুই লোক পাঠিয়ে ক্রান্তিহাটে খবর দিতেন, পরদিন সকালের বাসে জলপাইগুড়ি গিয়ে উকিলবাবুর সঙ্গে কথা বলে বিকেলের মধ্যে গয়ানাথ ফিরে আসতে পারত।
কিন্তু তিস্তা ব্যারেজের সেই-যে স্পেশ্যাল সেটলমেন্ট শুরু হল, তারপর থেকে গয়ানাথের যেন আর বিশ্রাম নেই। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে তার অংশের খতিয়ান নিয়ে মামলা, ব্যারেজের জন্যে জমি নিয়ে নেয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে মামলা, ক্ষতিপূরণের হারের বিরুদ্ধে মামলা-যেন মামলার কুরুক্ষেত্র। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বিরুদ্ধে মামলায় ত কিছু স্টে অর্ডার গয়ানাথ বের করেত পেরেছে। কিন্তু ক্ষতিপূরণের মামলা আর জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে মামলা কলকাতার হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। জলপাইগুড়ির উকিলবাবুর লোকই কলকাতার উকিল ধরে দিয়েছে। গয়ানাথকে যেতে হয় নি, কিন্তু প্রথম বার, উকিলবাবুর লোকের সঙ্গে আসিন্দিরকে যেতে হয়েছিল। তার পর সে মামলা চলছে ত চলছেই। একবার একটা ক্ষতিপূরণের মামলা গয়ানাথ জিতেছে–সরকারও সেই আদেশের বিরুদ্ধে কোনো আপিল করে নি। বরং কোর্টের রায় অনুযায়ী নতুন হিশেবনিকেশ করে পাওনাগণ্ডা সাত-তাড়াতাড়ি মিটিয়ে দিয়েছে। গয়ানাথ যখন দেখল সরকার আপিল করল না, তখন সে আরো বেশি ক্ষতিপূরণের জন্যে আপিল করতে চাইলে তার উকিলবাবু বুঝিয়েছিলেন যে ওরকম আপিল করা যায় না। গয়ানাথ বুঝে ফেলে সরকার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যারেজটা শেষ করতে চায় বলেই কোর্টের হুকুম মাথা পেতে নিচ্ছে। তা হলে ব্যারেজটা হচ্ছেই–এটা গয়ানাথ বুঝে নিয়ে আরো অস্থির হয়ে ওঠে।
আগে আসিন্দির তার মোটর সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াত আর গয়ানাথ তার জোতজমিতে হেঁটে বেড়াত। কিন্তু ঐ স্পেশ্যাল সেটলমেন্টের পর থেকে গত কয়েক বছরে আসিন্দির, তার মোটর সাইকেল, আর গয়ানাথ এক হয়ে গেছে। ময়নাগুড়ির চৌপত্তি দিয়ে গয়ানাথ-আসিন্দিরের যাওয়ার কথা নয়। ভারতী সিনেমার কাছে ডান দিকের রাস্তা ধরে তারা বেরিয়ে যেতে পারত। কিন্তু ময়নাগুড়িতে মরণচাঁদের দোকানে মিষ্টি আর চা খাবে বলে তারা চৌপত্তিতে আসে। মোটর সাইকেলের পেছন থেকে নেমে গয়ানাথ চাদরটা ঝাড়ে। তারপর একবার তাকিয়ে দেখে, চেনাজানা কাউকে পায় কি না। সামনে, রাস্তার ওদিকে একটা মিনিবাসের ভেতরে লোজন, গাড়িটা আরো দু-চারজন প্যাসেঞ্জার নেওয়ার জন্যে দাঁড়িয়ে। যতক্ষণ আসিন্দির তার মোটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে মরণচাঁদের দোকানে ঢুকে দুই জায়গায় দুইটা করি বোল্ডার, দুই কাপ চা, বলে বসে, তার মধ্যে গয়ানাথ রাস্তা পেরিয়ে ঐ মিনিবাসটায় একটা পাক দিয়ে আসে–চেনা কাউকে পায় না। কিন্তু ফেরার সময় চৌপত্তিজোড়া ফেস্টুনটা তার নজরে পড়ে। উত্তরখণ্ড সম্মিলন হচ্ছে ময়নাগুড়িতে। গয়ানাথের কাছে ওরা একবার গিয়েছিল। কিন্তু গয়ানাথ এ-সবের মধ্যে যায় নি। রাস্তা পেরবার জন্যে এদিক-ওদিকে তাকাতে গিয়ে গয়ানাথ দেখে উত্তরখণ্ডের অনেক পোস্টার।
মরণচাঁদের দোকানে ঢুকে, আসিন্দিরের পাশে বসতে বসতে গয়ানাথ বলে, হেপাখে এই উত্তরখণ্ড মানষিগিলান খুব মিটিং দিবার ধরিছেন। তারপর বিরাট সাইজের লালচে রসগোল্লা চামচ দিয়ে কাটে–রসগোল্লার ওপর থেকে মাছিগুলো উড়ে যায়।
আসিন্দিরের রসগোল্লা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। সে চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, তোমাক কহিলাম জয়েন দেন। বোম্বাইঠে সিনেমার বেটিছোঁয়া আনিবার ধরিছে।
প্রথম বার চামচে যতটা মুখে দিতে পেরেছিল সেটা চিবিয়ে গয়ানাথ গেলে। রস তার দাঁতে লাগলে সিড়সিড় করে। তাই কৌশল করে রসগোল্লার টুকরোটা টাকরার পেছন দিকে নিয়ে জিভ দিয়ে চিপে খেতে হয়। একটু সময় লাগে।
দ্বিতীয় টুকরোটা মুখে ফেলার জন্যে চামচে তুলতে-তুলতে গয়ানাথ আসিন্দিরকে বলে, মোক কি বেটিছছায়ার নখত নাচিবার নাগিবে এলায়?
আসিন্দির চা শেষ করে জিভ দিয়ে দাঁত খোঁচাচ্ছিল শব্দ করে। সেটা থামিয়ে জবাব দেয়, আপনাক নাচিবার কায় কহে? ইমরায় ত রাজবংশীর তানে পার্টি খুলিছে। এলায় ত কংগ্রেস নাই, সগায় উত্তরখণ্ড হবা চাহে। তোমরালাইবা হবেন না কেনে? কত ত মামলা ঠুকিছেন সরকারের তানে কী হইল?
কথাটা বলতে বলতে পকেট থেকে সিগারেট-দেশলাই বের করে আসিন্দির দোকানের বাইরে চলে যায়। বাইরে গিয়ে সে সিগারেট ধরায় আর ভেতরে গয়ানাথ অনেকক্ষণ ধরে দ্বিতীয় রসগোল্লাটা শেষ করে। পুরো এক গ্লাশ জল খায়। ততক্ষণে তার চায়ে পুরু সর পড়েছে। কিন্তু সেই চাটাও গয়ানাথ তারিয়ে-তারিয়ে খায়। এই সমস্ত ত একা-একাই করতে হয়–উত্তরখণ্ডে যোগ দেয়ার ব্যাপারে আসিন্দিরের প্রস্তাবটায় অতক্ষণ নীরব থেকে।
পয়সা দিয়ে গয়ানাথ বাইরে আসতে-আসতেই আসিন্দির মোটর সাইকেলের ওপর বসে স্টার্ট দেয়। গয়ানাথ তার চাদরটা বুকের ওপর আড়াআড়ি দিতে-দিতে আবার সেই নীল ফেস্টুন ও পোস্টারগুলো দেখে। দুপা এগিয়ে যায় মোটর সাইকেলের পেছন দিকে। আবার বলে, খুব জোর শুরু করিবার ধরিছেন হে তোমার উত্তরখণ্ড। কিন্তু মোটর সাইকেলের আওয়াজে কথাটা শোনা যায় না। আসিন্দির পেছন দিকে হাত বাড়িয়ে পান, আর চুন-লাগানো বোটা, দেয়। গয়ানাথ সেটা নেয় না। আগে পাদানিটার ওপর ভর দিয়ে আসনে বসে, নড়েচড়ে ঠিক হয়, তারপর পানটা ধরে। গয়ানাথ পানটা নিতেই আসিন্দির মুখ বাড়িয়ে পিক ফেলে মোটর সাইকেলটা চালাতে শুরু করে। আসিন্দিরের পেছনে মোটর সাইকেলে বসতে এতই অভ্যস্ত হয়ে গেছে গয়ানাথ যে সে পানটা ঝেড়ে মুখে ঢোকাতে পারে। দাঁতটাত পড়ে যাওয়ায় গয়ানাথের মুখটা এতই চুপসানো যে পানটায় তার মুখটা একেবারে ভরে যায়।
মোটর সাইকেলে চলতে-চলতে ত আর দুজনের কোনো কথা হতে পারে না কিন্তু গয়ানাথের মনে নানা প্রশ্ন উঠছিল উত্তরখণ্ড নিয়ে। সে-সব কথা আসিন্দিরকে বলা যায়, কিছু খবর জানা যায়। কিন্তু এখনই কথাটা না বলে, পরে, ধীরেসুস্থে আলাপ-আলোচনার অভ্যেস ত গয়ানাথের নেই। তাই কথাগুলো তখন বলতে না পারায় সেটা তার নিজের সঙ্গেই সংলাপ হয়ে দাঁড়ায়। বরাবর কংগ্রেসের লোক গয়ানাথ, কংগ্রেসকেই ভোট দিয়ে আসে। কিন্তু গয়ানাথ জোতদারের মত বিখ্যাত লোক ত শুধু একজন ভোটার হতে পারে না–জোতজমিতে বসত দেয়া কয়েকশ লোক তার কথাতেই ত ভোট দেয়। নইলে তার সম্মান থাকে কোথায় যদি সে একা গিয়ে শুধু নিজের ভোটটাই দিয়ে আসে? ভোটের আগে তেমন কোনো আদেশনির্দেশ গয়ানাথকে কখনো দিতেই হয় নি–সবাই জানে কী করতে হবে। কিন্তু সবাই ত জানত ফরেস্টটা গয়ানাথের। সেই জানায় ত তার কোনো লাভ হল না। তা হলে, গয়ানাথ আর মানষির দল কংগ্রেসেরই পাকে থাকিবেন এই কথাটার ত কোনো লাভ নাই। তা হইলে এই সব মানষিক নিয়া গয়ানাথ নিজের জোরখান ত দেখাবার পারে।
উকিলবাবুর বাড়ির সামনের মাঠটুকুতে মোটর সাইকেল থেকে নামার আগে গয়ানাথ নিজেকে এই পর্যন্ত বোঝাতে পারে।
.
উকিলবাবুর বাড়ির সামনের মাঠটাতে আসিন্দিরের মোটর সাইকেলের পেছন থেকে নেমে গয়ানাথ হাতদুটো মাথার ওপর তুলে আড়মুড়ি ভাঙে। আসিন্দির মোটর সাইকেলটা ঘুরিয়ে নিতে নিতে বলে, আসিছু। কিন্তু রওনা হয়েও আচমকা থেমে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে–এইঠে আসিম, না চলি যাম? আড়মুড়ি ভাঙার টানেই হাতদুটো পেছনে নিয়ে গয়ানাথ ঘাড়টা নিচু করে। শরীরের শক্ত টানটান ভাবটা শিথিল হওয়া পর্যন্ত রাস্তায় আসিন্দির ভটভট করতে করতে দাঁড়িয়ে থাকে। গয়ানাথ মুখ খুলে জবাব দেয় না ডান হাত তুলে আঙুল দিয়ে দেখায়। আসিন্দির তার অর্থ বোঝে–কোর্টে যেতে হবে। গয়ানাথ এবার উকিলবাবুর সেরেস্তার দরজায় সোজাসুজি গিয়ে দাঁড়ায়। উকিলবাবু বা তার মুহুরি তাকে একবার দেখে নিলেই গয়ানাথের কাজ শেষ। যখন দরকার, উকিলবাবুই তাকে ডাকবেন বা কোনো খবর দেয়ার থাকলে মুহুরিকে বলে পাঠাবেন। মুহুরিবাবু হয়ত গয়ানাথকে বলবে–কোর্টে দেখা করতে। ততক্ষণে গয়ানাথ এই মাঠটাতে দাঁড়িয়ে বা ঘুরেফিরে একটু-আধটু রোদ পোয়াতে পারে। বাইরের বারান্দার বেঞ্চির ওপরও বসে থাকতে পারে। এমন-কি, উকিলবাবুর সেরেস্তার কাজ শেষ হয়ে যাবার পর, সব লোকজন চলে যাবার পর, মুহুরি বাবুও সাইকেলে তার বাড়িতে চলে গেলে, গয়ানাথ হয়ত এখানে বসেই থাকবে। উকিলবাবু মানখাওয়াদাওয়া সেরে রিক্সায় কোর্টে রওনা হওয়ার সময় হয়ত বলবেন, কী গয়ানাথ বাবু! চলেন, কাছারিতে চলেন। উকিলবাবুর সঙ্গে রিক্সায় কোর্টে যাওয়ার অন্য লোক থাকলে হয়ত বলবেন, কী গয়ানাথ বাবু, আসেন, কোর্টে আসেন। গয়ানাথ তখন হাঁটতে-হাঁটতে কোর্টে রওনা দেবে।
গয়ানাথ তার বাবার সঙ্গে এই উকিলবাবুর বাড়িতে এসেছে। তখন এই উকিলবাবুর বাবা বুড়া উকিলবাবুর সেরেস্তা। তিস্তা ব্রিজ হয় নি। ডুয়ার্স থেকে সকালে এসে বিকেলে ফিরে যাওয়া খুব কঠিন। তখন উকিলবাবুদের এই নতুন দালানঘর ওঠে নি। এখানে চেগারের বেড়ায় টিনের দরজা ছিল বাড়ির ভেতরের সঙ্গে বাড়ির বাইরের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এই মাঠটার পশ্চিম কোণে একটা কুয়ো ও পায়খানা ছিল। গয়ানাথ তার বাবার সঙ্গে আসত শীতের সময় গরুর গাড়ি নিয়ে মার নৌকোয় তিস্তা পার হয়েও এসেছে। এই মাঠে ইটের উনুনে রান্না হত। আর সন্ধ্যার পর সেরেস্তার বারান্দার চৌকিতে তারা শুয়ে থাকত। কোর্টকাছারির কাজ শেষ করে দু-একদিন পর আবার রওনা দিত। তখন, জলপাইগুড়ি শহরে একবার ঘুরে গেলেই মনে হত যেন দেশান্তরে বেরিয়ে এল। আর এখন, এই ত সকালে বাড়ি ছেড়ে এসেছে, দুপুরে গিয়ে আবার বাড়িতে ভাত খাবে। জলপাইগুড়ি শহরটাকে আর দেশান্তর মনে হয় না। আগে বছরে দু-একদিন কোর্টকাছারির কাজ ছিল কি ছিল না, এখন রোজ এলে রোজই কাজ থাকে।
গয়ানাথ উকিলবাবুর সেরেস্তায় ওঠে–দরজার কাছে গিয়ে মুহুরিবাবুকে বলবে যে উকিলবাবুকে যেন জানায় গয়ানাথ এসেছে। কিন্তু মুহুরিবাবু দেখার আগেই উকিলবাবু গয়ানাথকে দেখে ফেলেন, আরে গয়ানাথবাবু, আসেন, আসেন।
উকিলবাবু তার হাতের কলমটা কাগজের ওপর ফেলে হাতদুটো মাথার ওপর তুলে এমন আড়মুড়ি ভাঙেন যে মনে হয় তিনি গয়ানাথবাবুর জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন। গয়ানাথ দু জন ভদ্রলোককে ছাড়িয়ে গিয়ে খালি চেয়ারটাতে বসেন। উকিলবাবু বলেন, কলকাতার উকিল চিঠি দিয়েছেন, এখান থেকে কয়েকটা কাগজ কপি করে পাঠাতে হবে। উকিলবাবু এবার মুহুরির দিকে তাকান, সন্তোষ, তোমার কাছে লিস্টটা আছে ত?
মুহুরিবাবু জানান, হ্যাঁ, আছে।
উকিলবাবু এবার আবার গয়ানাথের দিকে তাকিয়ে বলেন, তা হলে আপনি কোর্টে গিয়ে সন্তোষের সঙ্গে দেখা করে যা করার করে দেবেন।
গয়ানাথ উকিলবাবুর দিকে তাকিয়ে বলে, আপুনির শরীরখান ভাল ত?
উকিলবাবু, হ্যাঁ, ভালই আছি, বলে হাতদুটো কাগজের ওপর নামান বটে কিন্তু কলমটা ধরেন না। কলমটা ধরে ফেললে গয়ানাথ আর কথা বলতে পারবে না অথচ যত দরকারই থাকুক, গয়ানাথের পক্ষে ত আর উকিলবাবুকে সরাসরি কিছু জিজ্ঞাসা করা সম্ভব নয়। গয়ানাথ এবার পাশের দুই ভদ্রলোকের দিকে তাকায়। ঠিক তার বাঁ পাশের ভদ্রলোককে সে দেখতে পায় না, কিন্তু প্রথম চেয়ারটির ভদ্রলোক উকিলবাবুর টেবিলের ওপর দুই হাতের কনুই রেখে হাত দুটো ঠোঁটের কাছে এনে রেখেছেন। চিনতে পারে না গয়ানাথ। এখানে আসতে-আসতে উকিলবাবুর অনেক ভদ্রলোক-মক্কেল গয়ানাথের মুখ চেনা হয়ে গেছে। গয়ানাথ একটু সঙ্কোচ বোধ করে, এদের সামনে উকিলবাবুকে আর কী জিজ্ঞাসা করবে। উকিলবাবুও চেয়ারে সোজা হচ্ছেন। এখন তিনি আবার কলমটা তুলে নেবেন। গয়ানাথবাবুর সঙ্গে তার এর বেশি কথা আর কবে হয়েছে। গয়ানাথ চেয়ার ছেড়ে ওঠে না। উকিলবাবু কলমটা তুলে নেয়ার আগেই বলে ফেলতে পারে, উকিলবাবু, কলিকাতার কুনো খবর কি পাওয়া গেল? কথাটা গয়ানাথ টেবিলের ওপর একটু এগিয়ে, একটু হেসে, খুব নিচু গলায় বলে যাতে পাশের ভদ্রলোক শুনতে না পান। কিন্তু উকিলবাবুও সম্পূর্ণটা শুনতে পান নি। তিনি চেয়ারে হেলান দিয়ে বলেন, হ্যাঁ? কী বললেন? কিসের খবর? গয়ানাথ এবার চেয়ারে আরো একটু এগিয়ে আসে, টেবিলের ওপর তার হাতদুটি আঙুলে-আঙুলে জড়িয়ে শুইয়ে রেখে। একটু হেসে বাধিত হওয়ার ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করে, বলিছি, কলিকাতার হাইকোর্টের মামলাখান শ্যাষ হইবার কুনো আন্দাজ কি পাওয়া গেইসে? ওদিকে ত ব্যারেজের থাম্বাগিলান নদীখানক অর্ধেক করি দিবার ধরিছে।
সে ত হবেই। আপনার জমির মামলার জন্যে ত আর ব্যারেজের কাজ আটকে থাকবে না। তাও ত আপনার কাছে অন্তত একটা ভাল খবর পাওয়া গেল যে তিস্তা ব্যারেজের কাজ তাড়াতাড়ি হচ্ছে। আমাদের ত একটা রাস্তা রিপেয়ার করতেই আঠার মাস। উকিলবাবু কথাটা শেষ করেন ভদ্রলোক দুজনের দিকে তাকিয়ে। উকিলবাবু, সম্ভবত যিনি প্রথম চেয়ারটিতে বসে ছিলেন, তার কাজই করছিলেন, ফলে, তিনি একটু বিরক্তির সঙ্গেই হেসে গয়ানাথের দিকে তাকান। গয়ানাথও হাসে–ভদ্রলোকদের সঙ্গে কোথাও বসলে ভদ্রলোকরা যা করেন তারও তাই করার অভ্যেস। হেসেও সে বলে, কিন্তু ব্যারেজ শেষ হয়্যা গেইলে মোর জমির কী হবে উকিলবাবু।
উকিলবাবু বলেন, আপনার ত ক্ষতিপূরণের মামলা। জিতলেনও ত একটা। সেরকমই হবে। কিন্তু ব্যারেজ যে-জমি নিয়েছে সেটা কি-আর ফেরত দেবে নাকি?
হামরালা ত কহিছি–মোর ক্ষতিপূরণ না নাগে, মোর পুরানা ভেস্ট জমিঠে সমপরিমাণ জমি ফেরৎ দিক সরকার। মামলার আলোচনা শুরু হতেই গয়ানাথ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারে।
হ্যাঁ। সে রিট ত করা হয়েছে। আপনার কথার মধ্যে ত সত্যি একটা যুক্তি আছে। হাকিম একথা মানতেও পারে। কিন্তু মামলার ব্যাপার। তার জন্যে ত আর ব্যারাজের কাজ আটকে থাকবে না। উকিলবাবু একটু জোরে-জোরে বলেন, যেন গয়ানাথ কানে একটু খাটো।
গয়ানাথ একটু চুপ করে থেকে বলে, কাছারিও ত সরকারেরই অফিস, হাকিম ত সরকারেরই মাহিনা পাছেন। একবার ব্যারেজঘান বান্ধা হই গেলে কি আর হামলার মামলার কথা হাকিম ভাববেন?
উকিলবাবু একটু চুপ করে থাকেন, তারপর তার সামনের কাগজের ওপর চোখ নামিয়ে বলেন–তার গলার স্বর এবার উঁচুতে ওঠে না, গয়ানাথবাবু আপনাদের ত কয়েক পুরুষের জোতদারি, জোতদারি কত পালটি গেছে, দেখেন না? আপনাকেও পুরানা জোতদারি ভুলতে হবে। কোর্ট-হাইকোর্টও বদলে গেছে। একটা ব্যারেজ তৈরি হবে+সেটা সরকারের কাজ। সেটা বন্ধ করে আপনার জমি উদ্ধার করে দেবে এটা আর ভাববেন না। কিন্তু ক্ষতিপূরণ যেন ন্যায্য হয়, বা, আপনি যা বললেন, ক্ষতিপূরণের বদলে কেউ যদি এই ব্যারেজের জন্যে নেয়া জমিটাকে ভেস্ট করে দিয়ে পুরনো ভেস্ট ফেরৎ পায় সেটা নিশ্চয়ই কোর্ট দেখবে, উকিলবাবু সোজা হয়ে বসে কলমটা তুলে নেন, এই পর্যন্ত আইনের কথা আর তা না হলে ত আপনাকে পার্টি বানাতে হয়, উত্তরখণ্ড পার্টি। তারা ত কামতাপুর রাজ্য চায়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে আলাদা রাজ্য। সেই রাজ্যের হাইকোর্ট হলে হয়ত আপনার পক্ষে রায় দেরেব্যারেজ ভেঙে গয়ানাথবাবুর জমি গয়ানাথ বাবুকে দিয়ে দাও। ময়নাগুড়িতে ত বিরাট কনফারেন্স হচ্ছে। না?
গয়ানাথ মাথা হেলথ বাবুকে দিয়ে দাওলে হয়ত আপনার।
আপনি আছেন নাকি উত্তরখণ্ডে?উকিলবাবু লেখা শুরু করতে করতে জিজ্ঞাসা করেন। গয়ানাথ বোঝে না, কী জবাব দেবে। উকিলবাবুর কথা থেকে সে এটা বুঝে গেছে উত্তরখণ্ড উকিলবাবুর পছন্দ –কিন্তু গয়ানাথের জমির কথা যদি উকিলবাবুর বদলে উত্তরখণ্ড বেশি জোর দিয়ে বলে, তা হলে গয়ানাথ উত্তরখণ্ড হবেইনা কেন? গয়ানাথ একটা জবাব ভাবতে-ভাবতে দেখে উকিলবাবু লেখা শুরু করে দিয়েছেন। সে আস্তে করে চেয়ার ছেড়ে ওঠে, খুব নিচু স্বরে নমস্কার বলে চেয়ারের পাশ দিয়ে পেছনে চলে যায়। পেছনে তক্তপোশের ওপর মহুরিবাবু বসে আছেন। গয়ানাথ হাতের ভরে তার দিকে এগিয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞাসা করে, কী কী নকল করিবার নাগিবে, কহেন।
বসেন, বলে মুহুরিবাবু তার ডায়রির পাতা উল্টে অনেক ভাজ করা কাগজ খুলে-খুলে দেখে। শেষে না পেয়ে বলে, আপনি আসছেন ত কোর্টে, আমি বের করে রাখছি। গয়ানাথ এবার জিজ্ঞাসা করে, যে-দলিলগিলা নকল করিবার নাগিবে সেগিলা কি আপনার কাছে, না মোর কাছে?
মুহুরি বলে, দেখতে হবে। আপনি কোর্টে আসেন ত। আমি বের করে রাখব। গয়ানাথ আস্তে করে উকিলবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে!
.
গয়ানাথ বারান্দায় বসে। এ-রকম বসাটাই তার অভ্যেস, তারপর উকিলবাবুর সঙ্গে, বা পেছনে-পেছনে কাছারি যাওয়া। গয়ানাথ ত কখনো ঘড়ি দেখে কাজ করে না–সারাটা দিনের হিশেবে কাজ করে। সকালে উঠে যেখানে যাওয়ার কথা সেই জোতের উদ্দেশে রওনা দিল। রাস্তায় আরো দু-চার জায়গা ঘুরেও যেতে পারে। দুপুরে খাওয়ার জন্যে তাকে ফিরতেই হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। আর ফিরবে না, এমন কোনো কথাও নেই। ফিরল ত ফিরল। ফিরল না, ত ফিরল না। এখন সন্ধ্যার পরে বড় একটা কোথাও যায় না সেই নাকশালিয়া হাঙ্গামার সময় থেকে রাতে বেরনো বন্ধ। একটা অভ্যেস নষ্ট হলে আর ফিরে আসে না।
জলপাইগুড়িতে এলে এটাই তার একটা অসুবিধে। ঘণ্টাখানেক পরে আসবেন, বা, সাড়ে বারটা নাগাদ দেখা করেন, এই সব কথা অনুযায়ী নিজের যাতায়াত ঠিক করাটা তার পক্ষে একটু অভ্যেসের বাইরে। তা ছাড়া, শহরে তার এত বেশি কাজ হাতে থাকে না যে এক কাজ সেরে ফেলার মাঝখানে আরো একটা কাজ সেরে ফেলবে। অথচ জোতজমিতে চলাফেরার সময় ঘড়ি ছাড়াই গয়ানাথ সময়ের মাপ রাখে বৈকি। শহরে সে-মাপটাও হারিয়ে যায়। সে বুঝতে পারে না যে এখন যদি ধীরে-ধীরে হেঁটে কাছারিতে গিয়ে বসে থাকে, তা হলে, সেটা কত আগে পৌঁছুনো হবে।
উকিলবাবুর বারান্দায় বসে গয়ানাথ একটু ভাবেও বটে। উকিলবাবু যা বলেছেন সে যে তা মনে-মনে ভাবে নি, তা নয়। যে-সাংঘাতিক ব্যারেজ তৈরি হচ্ছে তাতে গয়ানাথের জমি ত নস্যি। কিন্তু যত বড় ব্যারেজই হোক, গয়ানাথের জমি ত গয়ানাথের জমি। সরকার একটা দাম ধরে ক্ষতিপূরণ দিলেই ত আর সেই ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে গয়ানাথ নতুন কোনো জমি কিনতে পারছে না। আর, কিনতে পারলেই ত আর পুরনো জমি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ক্ষতিটা পূরণ হয় না। জমি কি সরকারি অফিসের লোকদের মাইনে নাকি যে প্রত্যেক মাসের পয়লাতারিখে একই মাইনে পাবে? এমনিই ত জোতজমি রাখার আর-কোনো আইন নেই। সব আইনই জোতজমি ছাড়ার। আধিয়ারকেও জমি রেকর্ড করতে দিলে আর জোতদারের হাতে খতিয়ানটুকুর কাগজ ছাড়া থাকেটা কী? তাই হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে। গয়ানাথের জোতদারির-সময়টা ত এতেই গেল। জোতদারের থাকবে খতিয়ান আর জমি খাবে বারখান ভূত।
এই রাগের হিশেবনিকেশের মধ্যে গয়ানাথ ভোলে নি যে জমি তার হাত থেকে যতই চলে যাক না–জোতদারি তার বাবার আমল থেকে অনেক বেড়েছে। সেইখান ত হবা ধরিছে চাষের তানে। এ্যালায় চাষ কতখান বাড়ি গিছে। সার কতখান বাড়ি গিছে। পতিত জমি কত কমি গিছে।
কিন্তু সেটাও যে এই সরকারেরই সমর্থনে, নিজের সঙ্গে নিজের গোপন আলাপেও গয়ানাথ সেটা মানতে চায় না, এ্যালায় হামরালায় পুরা জমি থাকিলে ক্যানং ফলন হবার ধরিত। কিন্তু এখনকার এই চাষ কি অত জমিতে করা সম্ভব হত, এবং এই ত বেশ ভাল ব্যবস্থা হয়েছে–জমি একটু কমেছে বটে কিন্তু চাষ অনেক বেড়েছে। গয়ানাথ এটা জানে, না-জেনে উপায় নেই বলে। কিন্তু নিজের কাছেও তার না মানলে চলে, তাই মানে না।
মানে ত নাইই বরং গয়ানাথ মনে-মনে উকিলবাবুর কথাগুলোকে নিজের মত করে সাজিয়ে নেয়। জোতদারি আর আগের নাখান চলিবে না। হাকিম বদলি গেইছে। আইন বদলি গেইছে। ব্যারেজের জমি আর ফেরৎ পাওয়ার না-হয়। এই সরকারের আইনে ফেরৎ পাওয়ার না-হয়। কামতাপুরী রাজ্য করেন। স্যালায় নতুন রাজ্যের নতুন আইনত ফেরৎ পাইবেন। জমি ফেরৎ পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলে ত গয়ানাথই উত্তরখণ্ডের নেতা হয়ে বসত। কিন্তু তারা এখানকার কিছু লোক মিলে গোটা একটা রাজ্য বানাতে পারবে–এটা গয়ানাথ বিশ্বাসই করে না। অথচ, তার চলাফেরায় সে বুঝে ফেলেছে উত্তরখণ্ড পাছে হয়ে যায় সেজন্যেও সরকার অনেক কিছু দিতে রাজি আছে। উত্তরখণ্ড পাছে হয়ে যায়, এটা নিয়ে সরকার প্রায় সব সময়ই ভয়ে-ভয়ে থাকে। ভয়ে-ভয়েই যখন আছে তখন ভয় দেখাতে আর আপত্তি কী? আর, ভয় দেখালেই যদি সরকার ভয় পায় তা হলে গয়ানাথই বা একটু ভয় দেখাবে না কেন?
তবুও উত্তরখণ্ড দলে যোগ দিতে গয়ানাথের যেটুকু সঙ্কোচ তা রাজনীতি না করার সঙ্কোচ। তার বাবার আমল থেকে সে দেখে আসছে এই সব পার্টিপুর্টি মানেই জোতদারির ক্ষতি।সে কংগ্রেসরই ঘর হোক আর কমিনিস্টের ঘরই হোক। যায় জোতদারি করে স্যালায় জোতদারি করে, স্যালায় পার্টি ধরিবার টাইম না পায়। স্যালায় পার্টি করিবার ধরিলে, স্যালায় জোতদারি উঠি যায়। স্যালায় জাতদারি ছাড়ি দেউনিয়াগিরি করিবার ধরে। দেউনিয়াগিরির পয়সা বেশি, নগদ পয়সা, কিন্তু জোতদারি নাই।
অভিজ্ঞতা ও জীবনদর্শন মিশিয়ে গয়ানাথ এই ধারণাটা বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সে যে বানিয়ে ফেলেছে, তা সে জানে না। তথ্য দিয়ে এ কথা সে প্রমাণ করতেও পারবে না, পার্টি করলে জোতদারি টেকানো যায় না। এটাও প্রমাণ করতে পারবে না, পাটি করা মানেই দেউনিয়াগিরি করা। বরং, হয়ত উল্টোটাই সত্য। তার ধারণার পক্ষেও খুঁজে পেতে কিছু সাক্ষ্যপ্রমাণ জোগাড় করা যায়। কিন্তু গয়ানাথের এই ধারণা তৈরি হওয়ার পেছনে এরকম সাক্ষ্য প্রমাণ বা অভিজ্ঞতা কাজ করে নি। গয়ানাথ এমনই আপাদমস্তক জোতদার যে সে জমি ও চাষের নিয়মের বাইরের যে-কোনো নিয়মই অপ্রয়োজনীয় ভাবে। সেই ভাবনাকে তার জীবনদর্শন বলা যায়। তার জোতদারি তাকে কখনো কংগ্রেস করতে দেয় নি–ভোটাভুটির সময় লোকজন নিয়ে গিয়ে একটা ভোট দিয়ে আসা সেটা ত বিয়েশাদির নেমতন্ন খাওয়ার মত ব্যাপার। সেই জীবনদর্শনেই তার বেধেছে উত্তরখণ্ডে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে। কিন্তু গয়ানাথ যেন গন্ধ পাচ্ছে তাকে যোগ দিতেই হবে, সে যোগ দেবেও।
এ্যালায় টাইম পড়ি গেইসে পাবলিকের। যে কাম তোমরালা পাবলিক জোগাড় করি করিবেন না, সেকাম হবার না-হয়। আধিয়ারগিলা পাবলিক হয়্যা গিছে, সেইলার কাম হছে। জোতদারগিলারও পাবলিক হবা নাগিবে–স্যালায় কাম হবে।
কিন্তু নিজের সঙ্গে এই সংলাপে গয়ানাথ এসে ঠেকে এই প্রশ্নে, কিন্তু মোর কামটা কী?
এই প্রশ্নের কোনো সদুত্তর সে নিজের ভেতর থেকে টেনে বের করতে পারে না; তার কারণ, গয়ানাথ নিজে নিজের সেই উত্তরের সবটুকু জেনে নিতে চায় না। উত্তরখণ্ড করিলে কি ব্যারেজত মোর যেই জমিগিলা গিসে, স্যালায় ফিরি আসিবে? গয়ানাথ এর জবাব নিশ্চিত জানে, না। তাই সে প্রশ্নটাকে এভাবে তুলতে চায় না। তবু জমি, তোমার বাপ-ঠাকুর্দার জমি, যদি কেউ নিতে আসে তাকে বাধা দিতে হয়, আটকাতে হয়। লাঠিসোটা নিয়ে দখল করতে এলে লাঠিসোটা নিয়ে বাধা দিতে হয়। আল কেটে জমির ভেতর ঢুকতে চাইলে আল বেঁধে আটকাতে হয়। ফসল তুলে জমির ওপর চাষ কায়েম করতে এলে, উপড়ে ফেলে বাধা দিতে হয়। সরকার নোটিশ জারি করে নিতে এলে কোর্টের নোটিশ দিয়ে বাধা দিতে হয়। গয়ানাথ তা দিচ্ছেও। পাট্টিপুট্টি যদি পাবলিক করি জমি নিবার আসে, স্যালায় পাবলিক করি বাধা দিতে হয়। উত্তরখণ্ড গয়ানাথের পাবলিক।
গয়ানাথ যে এরকম উদাহরণ পরম্পরায় নিজের যুক্তিকে শক্ত করে, তা নয়। কিন্তু সে যখন বোঝে তাকে উত্তরখণ্ডে যেতেই হচ্ছে তখন তাকে তার জীবনদর্শন থেকেই ত যুক্তি সংগ্রহ করতে হয়। এমন যদি হত সে উত্তরখণ্ড করাটাকে বরাবরই জরুরি ভাবছে–তা হলে ত সে প্রথম থেকেই সেখানে থাকত। বরং গয়ানাথ বোঝে যে চাষ-আবাদের কাজে সরকারের সঙ্গে সাগাইকুটুমের মত সম্পর্করাখা ভাল। এখন যা চাষ-আবাদ দাঁড়িয়েছে তাতে সরকারের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক না থাকলে চাষ-আবাদ করাই সম্ভব নয়। বরং উত্তরখণ্ড-টণ্ড এই সব পাট্টিপুট্টি ধরলে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। আর গয়ানাথের মত একজন জোতদারের সমর্থন পেলে উত্তরখণ্ডিলা চাহিবে মোক উশুল করিবার, আর, লাল পার্টি চাহিবে মোর মানষিগিলাক উশুল করিবার। তাতে ত গণ্ডগোল আরো বাড়বে। কিন্তু গয়ানাথের যে একটা পাবলিক দরকার, সেই পাবলিক সে পাবে কোথায়, এক উত্তরখণ্ড ছাড়া?
গয়ানাথ উকিলবাবুর বারান্দা থেকে নেমে কাছারির দিকে হাঁটা শুরু করে। রাস্তায় রিক্সা সাইকেল ভটভটিয়া নেমে গেছে–লোকজন অফিসে যাচ্ছে। ধীরে-ধীরে রওনা দিলে সে সময়মত কাছারিতে পৌঁছতে পারবে। মুহুরিবাবুর কাছ থেকে লিস্টটা নিলেই ত কাজ শেষ। তার মধ্যে আসিন্দির এলে হয়।
.
|| গয়ানাথের উত্তরখণ্ডে যোগদানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা ||
গয়ানাথ যখন উকিলবাবুর বাড়ি থেকে বেরয় তখন তার মনে অন্য একটা হিশেবও ছিল। মুহুরিবাবু কোর্টে গিয়ে যদি অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তা হলে গয়ানাথকে সেই বিকেল পর্যন্ত বসিয়ে রাখবে।
সন্তোষ মুহুরি হয়ত রাখতও তাই। গয়ানাথকে দেখেই সে সামনের লোকজন দেখিয়ে বলে, গয়ানাথবাবু, এদের সবার কেস উঠেছে, আপনি একটু বসুন, এদের বিদায় করেই আপনার কাজে হাত দেব।
গয়ানাথ হাতজোড় করে, আজি মোক ছাড়ি দিবার নাগিবে। যাবার তানে ময়নাগুড়ি থামিম। আপুনি মোর কাগজখান দেন। আর যদি না-দেন পাঠি দিবেন।
গয়ানাথ জোতদারকে সাধারণত বসিয়ে রাখা যায় বটে কিন্তু সেরেস্তার এমন পয়সাঅলা মক্কেল যখন কাজটা করে দিতে বলে তখন সন্তোষ মুহুরি কেন, তার উকিলবাবুরও ক্ষমতা নেই কাজটা না করার। গয়ানাথ তার নিজের এই ক্ষমতা সবটুকু জানে না। কিন্তু সে অন্তত এটুকু বোঝে যে ময়নাগুড়িতে নামতে হলে এখানে বিকেল পর্যন্ত থাকলে চলবে না।
মুহুরিবাবু বলে, আপনি বসেন, বসেন, ঐ চেয়ারটাতে বসেন, একজন সেই হাতলভাঙা চেয়ারে বসে ছিল, সন্তোষ তাকে উঠিয়ে দিতে-দিতে নিজের বুকপকেট থেকে একগাদা কাগজ বের করে নানা, রকম ভাজ করা কাগজ, একটা ছোট নোটবইসহ। প্রায় প্রত্যেকটা কাগজই দেখে সন্তোষ, কিন্তু অত্যন্ত দ্রুত। তার দেখার সঙ্গে তাল রেখেই জিভ দিয়ে দই খাওয়ার মত আওয়াজ ওঠে।নেই বলে সন্তোষ সেই কাগজগুলি আবার বুকপকেটে ভরে, এই, গয়ানাথবাবুকে চা দাও, এই এক কাপ চা আনো ত, সন্তোষ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে বলে। তারপর নিজের সেই বড় ডায়রিটার পাতাগুলো উল্টে যায়। প্রায় প্রতিটি পাতাই উল্টোয় ও দই খাওয়ার শব্দ করে। উল্টোতে-উল্টোতে হঠাৎ থেমে যায় সন্তোষ, মুখের আওয়াজটাও বন্ধ হয়। যে-পর্যন্ত উল্টেছিল সেখানে একটা আঙুল রেখে সন্তোষ ডায়রির মলাটের খাপটার ভেতর দেখে। তার পর হাসি মুখে গয়ানাথের দিকে তাকিয়ে বলে, পেয়েছি, পেয়েছি।
গয়ানাথ বলে, কী, কী নাগিবে দেখেন।
ডায়রির ভেতর থেকে একটা ইনল্যান্ড বের করে খুলে পড়ে সন্তোষ বলে, আপনার ঐ ২৩১ নম্বর দাগের পর্চাটা।
সে ত আপনার প্রথমঠে আপনার কাছেই
অ্যাঁ? তা হলে বোধহয় আর-এক কপি লাগবে। নাকি এটা ২৩৩ নম্বর দাগ?
২৩৩ নিয়া ত কুনো মামলা নাই।
সে না থাকলেও লাগতে পারে।
সন্তোষ যে-লোকটিকে পাঠিয়েছিল সে এককাপ চা এনে গয়ানাথকে দেয়। গয়ানাথ চায়ে একটা চুমুক দিলে সন্তোষ বলে, গয়ানাথবাবু, আপনি বরং এই চিঠিটা নিয়ে যান, কাউকে দেখিয়ে নেবেন কী কী লাগবে, সেগুলো নিয়ে আসেন, আমি তখন দেখে নেব। এদের সবার কেসের ডাক পড়বে, এখনি।
আচ্ছা, আচ্ছা আমাকে দিয়া দ্যান, সন্তোষের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে সেটা ভাজ করে পকেটে ঢোকাতে গয়ানাথকে চায়ের কাপটা টেবিলে রাখতে হয়; কিন্তু যদি কুনো কুনো দলিল আপনারঠে থাকে?
সে ত আমি যখন পাঠাব, তখন দেখেই দেব, সন্তোষ না-তাকিয়ে বলে।
চাটা আর-এক চুমুকে শেষ হয়ে যায়। গয়ানাথ উঠে বলে, আচ্ছা মুহুরিবাবু, নমস্কার।
সন্তোষ মুখ তুলে হ্যাঁ, নমস্কার, বলে আবার টেবিলের ওপর ঘাড় নামিয়ে ফেলে।
গয়ানাথ রাস্তায় নেমে ভাবে, আসিন্দিরের জন্যে কোথায় পঁড়াবে? সেটা ভাবতে-ভাবতেই আসিন্দিরের আসার পথের বাকটা দিয়ে বড় রাস্তার দিকে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে গয়ানাথ ঠিক করে ফেলে সোজা পি-ডবলু-ডির মোড়ে গিয়ে অপেক্ষা করবে।
পি-ডবলু-ডির মোড়ে স্কুলবোর্ডের অফিসের সামনে অনেকগুলো চায়ের দোকান। তার বাইরের দিকের একটা বেঞ্চের এক কোণে সে বসে। রোদের আচ গায়ে লাগে–কিন্তু সে ত আর চা খাবে না তাই আর ভেতরে বসছে না। শহরের ভেতর থেকে সব বাস-মিনিবাসই এখান থেকে তিস্তাব্রিজের দিকে বাক নিচ্ছে, এখানে দাঁড়াচ্ছেও কিছুক্ষণ। যে-কোনো গাড়িতে উঠলেই আধঘণ্টার মধ্যে ময়নাগুড়ি। গয়ানাথ এক-একবার ভাবে সে বরং মুহুরিবাবুকে বলে বাসে করে ময়নাগুড়িতে চলে যাক! মুহুরিবাবু আসিন্দিরকে ময়নাগুড়ি চৌপত্তিতে মরণ ঘোষের দোকানে পাঠিয়ে দেবে। গয়ানাথ ইতিমধ্যে উত্তরখণ্ডের সভাপতি পঞ্চানন মল্লিকের সঙ্গে দেখা সেরে ফেলবে।
তা করতে হলে তাকে আবার কাছারিতে গিয়ে মুহুরিবাবুকে বলে আসতে হয়। কিন্তু গয়ানাথ আন্দাজ করছে যে আসিন্দির এখন যে-কোনো সময় এসে যেতে পারে। ময়নাগুড়িতে পঞ্চানন মল্লিকের সঙ্গে দেখা করার কথাটা তার মাথায় আসার ফলেই গয়ানাথের মনে হচ্ছে যে আসিন্দির দেরি করছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে বোঝেও, আসিন্দির যে-কোনো সময় এসে যাবে এখন। গয়ানাথ চায়ের দোকানের বেঞ্চিটাতে বসেই থাকে। এদিক-ওদিক তাকায়, বাস-মিনিবাস দেখে, বড় ব্রিজ দিয়ে যে-সব রিক্সা কাছারির দিকে মোেড় নিচ্ছে সেটাও দেখে।
আসিন্দিরের যে কথাটা শুনে গয়ানাথ চমকে তাকিয়ে দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আসিন্দির ভটভটিয়াতে আওয়াজ করছে তা হল–নিদ যাছেন নাকি বাপা হে? গয়ানাথ চমকে উঠে দেখে আসিন্দির তার ভটভটিয়ার ওপর বসেই হো-হো হাসছে। আসিন্দিরের হাসি দু-একজন দেখে আর গয়ানাথ বেঞ্চ থেকে উঠে চাদর ঠিক করতে-করতে নিজের অপ্রস্তুতি কাটায়।
হাসি থামিয়ে আসিন্দির বলে, এইঠে তোমার চক্ষুর ওপর দিয়া গেছু আর তোমরালা দেখিবার পাও না? ঐঠে কোর্ট তোমরা নাই রো। মুহুরিবাবু কহে উ ত চলি গেইছে। ত, ভাবিছু-কি, বাপোটা মোর ঠিক পি-ডবলু-ডির মোড়টা বসি আছে। এইঠে আসি তোমাক দেখি প্যাক প্যাক দিছু, শোন নাই। ডাকিছু। শোন নাই—
আসিন্দিরের এই কথা জুড়ে গয়ানাথ তার পেছনে ওঠে, বসে, চাদর ঠিক করে। আসিন্দির গাড়ি চালানো শুরু করলে তার কথা থামিয়ে দিয়ে বলে, ময়নাগুড়িত্ পঞ্চানন মল্লিকের ঘরত যাম।
গাড়ি থামিয়ে আসিন্দির ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, পঞ্চানন মল্লিক? বাপো, উত্তরখণ্ড ধরিবেন নাকি হে? তারপর রাস্তায় ওঠার মুখে মোটর সাইকেলটা থামিয়ে দেয়।
আচমকা থামানো মোটর সাইকেলটা কাঁপছে, তার ওপর গয়ানাথও কাঁপছে, আসিন্দির দু দিকে মাটিতে পা নামিয়ে দিয়েছে, তার ঘাড় ঘোরানো। এরকম অবস্থায় গয়ানাথ তার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে, ধরিম ত, উত্তরখণ্ড ধরিম। মুই না ধরো, ত তোক দিয়া ধরাম। না ত তোর এই কোর্ট আর হাকিম করি আর-জোতজমি সামলিবার পারিবেন না হে।
আসিন্দির তার ডান হাতটা তুলে হ্যাঁণ্ডেলের ওপর ফেলে চেঁচিয়ে ওঠে, তাই কহ, বাপা আমারস এ্যালায় লিডার হওয়া ধরিবে, বাপা আমার লিডার হবে এ্যালায়, উত্তরখণ্ডের লিডার। সে গাড়ি ছাড়ে।
একটু পরে পেছন থেকে গয়ানাথ চিৎকার করে, শুন, এ্যালায় মুই না যাও, তুই যা কেনে–
আসিন্দির কথাটা স্পষ্ট শুনতে পায় না। গতি না কমিয়ে ঘাড়টা ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করে, কোটত যাম? ময়নাগুড়িত যাছি ত।
আসিন্দিরের পিঠে স্পর্শ দিয়ে গয়ানাথ বোঝায়–ঠিকই যাচ্ছে। সামনে তিস্তা ব্রিজের মাথা আকাশে।
আসিন্দির ঘাড় ঘুরিয়ে চিৎকার করে, কী? কহিছেন কী?
আবার আসিন্দিরের পিঠে হাত দিয়ে গয়ানাথ চিৎকার করে, কহিম, কহিম। এ্যালায় চল কেনে ময়নাগুড়ি। গলাটা আরো উঠিয়ে বলে, আগত চৌপত্তিতে নামিবু।
.
|| শব্দের অর্থ নিয়ে পঞ্চানন-গয়ানাথের বিচার ও সিদ্ধান্ত ||
ময়নাগুড়িতে পঞ্চানন মল্লিকের বাড়িতে যাওয়ার আগে চৌপত্তিতে মরণাদ ঘোষের দোকানে দুকাপ চা খেতে-খেতে গয়ানাথ ও আসিন্দিরের মধ্যে একটা আলোচনা হয়। গয়ানাথ বলে, প্রথমেই তার যোগ দেয়াটা ভাল হবে না। সে যোগ দিলে সরকার তার মামলা-মোকদ্দমা ডিসমিস করে দিতে পারে। তা ছাড়া, সেইবা একেবারে প্রথম থেকে পুরোপুরি যাবে কেন। সামনে ভোট আসছে। গয়ানাথের হাতে ভোট ও নেহাৎ কম, নেই। আসিন্দির গেলে–সব পার্টিই ভয় পাবে যে জামাই শ্বশুরকে টেনে নিতে পারে। কিন্তু গয়ানাথকে কেউ জিগগেস করলে সে বলতে পারবে–মোর জোয়াইখান ত জোতদারি না করে, কনট্রাক্টারি করে। মোর কথা ও না শুনে।
গয়ানাথের একথার আসিন্দির বলে, মোক হাউলি খাটাবার চাছেন? আসিন্দিরের ধারণা–এ-সবে এখন আর কেউ ভোলে না। সবাইই বুঝবে, গয়ানাথ নিজে না গিয়ে আসিন্দিরকে হাউলি খাটাচ্ছে। তাতে জাতও যাবে, পেটও ভরবে না। যেতে হলে গয়ানাথ-আসিন্দির দুজনেরই যাওয়া উচিত। তাতে সবাই একটু নাড়া খেতে পারে। লিডারি করিবার চাহেন ত লিডারি করিবার নাগিবে। লিডারি কি হাউলি দিয়া হয়? না হয়।
গয়ানাথ কিছুটা দুর্বলভাবেই বলে যে এদের লিডারটিডার সব ঠিক হয়েই আছে, সে গেলেই কি তাকে লিডার বানাবে নাকি।
আসিন্দির তাতেও তাকে বলে বসে, কহেন কী? গয়ানাথ জোতদার জয়েন দিলে সেইটা ত একখান জোর খবর হবা ধরিবে উত্তরখণ্ডের পাকে। তোমরালা কি চ্যাংড়ার ঘর যে ভলান্টিয়ার করিবেন? তোমরালা জয়েন দিলেই লিডার। ফলে, চা শেষ করে মোটর সাইকেলে চড়ে যখন পঞ্চানন মল্লিকের বাড়িতে যায়, তখন তারা কিছুটা দ্বিধার আছে। উত্তরখণ্ডে যোগ দেবে–এই পর্যন্তই ঠিক। আসিন্দির যেমন বলছে গয়ানাথ যোগ দিলে হৈ-হৈ বাধবেই, গয়ানাথ তেমনি চাইছে–অত হৈ-হৈ-এর দরকার কী?
পঞ্চানন মল্লিক দুপুর বেলা ঘুমুচ্ছিলেন। তার দারিঘরে গয়ানাথ ও আসিন্দিরকে বসানো হয়। একটি ছোট ছেলে একটা কাসার ঘটিতে জল আর স্টেইনলেস স্টিলের গেলাস দিয়ে যায়। পঞ্চানন মল্লিকের দারিঘরে একটা বড় তক্তপোশ আছে, আবার একটা টেবিল আর কিছু চেয়ারও আছে। দারিঘরে ঢুকে তাকিয়ে গয়ানাথ যেন স্থির করতে পারে না কোথায় বসবে। পেছন থেকে আসিন্দির বলে, চেয়ারঠে বসেন, মুই পাছত বসিছু। আসিন্দির গিয়ে তক্তপোশটায় বসে। গয়ানাথ চেয়ারে বসলে আসিন্দির পেছনে পড়ে যায়, গয়ানাথ চেয়ারটা একটু-একটু ঘুরিয়ে বসে। কিন্তু হেলান দেয় না। গয়ানাথ যেন এখনো উঠে যেতে পারে–তার মুখচোখে সেই রকম অনিশ্চয়তা। আসিন্দির-জিজ্ঞাসা করে, তোমরালা চেনেন ত পঞ্চানন মল্লিক?
একথার জবাব দেবার সময় গয়ানাথ পায় না। তার আগেই দারিঘরের দাওয়ার নীচে পঞ্চানন মল্লিক এসে যান। দারিঘরটা উঁচু মাটির। দুটো দরজা, নীচে কাঠের একটা গুঁড়ি। সেটা অনেকদিন ধরে সিঁড়ি হিশেবে ব্যবহৃত হতে-হতে এই মাটির ঘরের সঙ্গে মিশে গেছে। দুই দরজা মুখোমুখি বলে ঐ দরজা দুটো জুড়ে রোদ। ঘরের বাকিটুকু আবছায়া। তবে ভামনির বেড়ার ফাঁক দিয়ে বাইরের উজ্জ্বলতা দেখা যায়।
ঘরের ভেতর উঠবার জন্যে দরজা ধরতে হয় পঞ্চানন বাবুকে। তার পরনে গেঞ্জি ও ধুতি। গেঞ্জির ফাঁক দিয়ে পৈতে দেখা যাচ্ছে। ঘরের ভেতর উঠে তিনি নমস্কার করেন গয়ানাথকে। গয়ানাথকে পার হয়ে তাকে টেবিলে বিপরীত দিকের চেয়ারে বসতে হয়। সেখানে বসেও তিনি আসিন্দিরকে দেখতে পান না–দেখতে পান গয়ানাথের ওপর থেকে চোখ সরাতে গিয়ে।
গয়ানাথই কথা শুরু করে, গেছিল জলপাইগুড়ির কোর্টত। যাবার তানে দেখি উত্তরখণ্ড সম্মিলন হবা ধরিছে। ত ভাবিছু–আপনার নখত কনেক দেখা করি যাই। এত হামরালারই সম্মিলন, রাজবংশী মানষিলার।
পঞ্চাননবাবু গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে ধীরেসুস্থে বলেন, বলেন, প্রধানত রাজবংশীদের। কেন? না, রাজবংশীরাই উত্তরবঙ্গের প্রধান। কিন্তু উত্তরখণ্ড দল সব মানুষের। যারা কামতাপুর নামে স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি সমর্থন করে তাদেরই দল উত্তরখণ্ড।
নিশ্চয়, নিশ্চয়, সে ত হবাই নাগিবে। আপনারা কি তিস্তা ব্যারেজের তানে কিছু ভাবনাচিন্তা দিবার চাহেন? গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে।
হ্যাঁ, এ্যা। উত্তরবঙ্গের সব বিষয়েই ত আমাদের বলতে হবে। আপনার ত অনেক জমি চলি গিছে।
সেই কথাখানই কহিবার চাহি। আমার সঙ্গে সরকারের ত মামলা চলিবার ধরিছে কলিকাতার হাইকোর্টত আর জলপাইগুড়ির কোর্টত। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট কোর্ট স্টে-অর্ডার দেন নাই। কিন্তু ক্ষতিপূরণের একখান মামলা জিতি গেইছি। এ্যালায় মোর এই কাথাখান কহিবার আছে যে যেইলা জোতদারের জমি আগত ভেস্ট হয়া গেইসে, সেইলার সেই ভেস্ট জমিঠে, এখন ব্যারেজের তানে যে নতুন জমি অধিগ্রহণ করা হই তার সমপরিমাণ জমি, জোতদারকে ফিরি দিবার নাগিবে।
পঞ্চানন একটু ভেবে বলে, এইটা ত খুব ভাল প্রস্তাব। কিত জোতদার কহা না যায়।
কেনে? জমি ত জোতদারের ভেস্ট হইছে। গয়ানাথ বলে।
তা হইছে। কিন্তু আমাদের পার্টিকে ত সরকারের লোক, কমিনিস্টিরা, জোতদারের পার্টি বলে। সেই কারণে আমাদের প্রস্তাবে কি বক্তৃতায় জোতদার না বলিয়া কৃষক বলিবার কথা। আমরা কৃষকের স্বার্থের কথা বলিব।
গয়ানাথ চুপ করে যায়। চুপ করে থেকে তাকে শব্দার্থের এই গণ্ডগোলটা বুঝতে হয়। এতদিন সে শুনে এসেছে ও জেনে এসেছে, কৃষক মানে পাটির মানষি, লাল পাটির মানষি। কৃষক একপাখে। আর জোতদার একপাখে। কিন্তু পঞ্চানন মল্লিক বলিছেন জোতদারক কৃষক হবা নাগিবে।
কিন্তু কৃষক ত উমরালা কছে কমিনিস্টের ঘর, কৃষক সমিতি জিন্দাবাদ, কৃষকের দখল দিতে হবে দিতে হবে, কৃষক উচ্ছেদ না চলিবে না চলিবে না।
পঞ্চানন এই প্রশ্নটির জবাব দিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। বোধ হয়, ভালও বাসেন–কৃষক কথাটি ত সংস্কৃত। যে কৃষি কাজ করে সে কৃষক। জোতদাররা ত চব্বিশ ঘণ্টা কৃষি কাজ করে। জমি আপনি কেন চাহেন? কৃষি করিবার তানে। সেই কারণে আমরা নিজেদের কৃষক বলিব। কমিনিস্টের ঘর কৃষক কথাখান সম্পত্তি করিয়া নিছে। আর জোতদার কথাখান গালি বানাইছে। উত্তরখণ্ড দল কৃষক কথাখানের আসল অর্থ সবাইকে জানাইবে। আমরা ত কৃষক, সগায় কৃষক–সে আধিয়ার হউক, দেউনিয়া হউক আর খাঁটিবার মানষি হউক।
এটা বুঝে নেয়ার জন্যে একটু সময় গয়ানাথ চুপ করে থাকে। তার কাছে কৃষক কথাটিকে খুব সম্মানজনক ও জোতদার কথাটিকে গালাগাল মনে হয় না। সে যেন জোতদারই থাকতে চায়। উত্তরখণ্ড যে তাকে কৃষক হতে বলবে এর জন্যে সে যেন তৈরি ছিল না।
আসিন্দির তক্তপোশ থেকে উঠে এসে বলে, বাপা হে, যেইলা জোতদার ঐলাই কৃষক। উত্তরখণ্ডের কৃষক আর লাল পার্টির কৃষক এক নহে, আলাদা। আসিন্দিরের নেতিবাচক বাক্যে পঞ্চানন মাথা দোলান আর আসিন্দিরের ইতিবাচক বাক্যে ঘাড় হেলান। যেন, কথাগুলি আসিন্দিরের, ভঙ্গি পঞ্চাননের।
মানষিরা বুঝিবেন ক্যানং করি? লালপাটি কহিবেন, কৃষককে উচ্ছেদ দেয়া চলিবেন না, আপনারাও কহিবেন, কৃষক উচ্ছেদের অধিকার দিতে হবে মানষির নখত ত সব কথা গণ্ডগোল হবা ধরিবে। মুইও কৃষক, মোর এই জোয়াইও কৃষক, মোর মানষি সেই বাঘারুখানও কৃষক?
শুনেন গয়ানাথবাবু, আমরা ত একটা দল গড়িবার চাই–উত্তরখণ্ড দল। তার উদ্দেশ্য কী? পশ্চিমবঙ্গ হইতে আলাদা রাজ্য গঠন। কোন রাজ্য? কামতাপুর রাজ্য। সেই রাজ্যের দাবিতে ত সকল মানুষকে আসিতে বলিতে হবে। রাজ্যে ত অনেক মানুষ থাকিবে। কৃষক বলিলে সবাইকে বুঝায়। জোতদার বলিলে ত সবাইকে বুঝাইবে না। কিন্তু লোকে যখন শুনিবে যে উত্তরখণ্ড দল বলেভেস্ট জমি হইতে ব্যারেজের জমি ফেরৎ দাও–তখন সগায় বুঝিবে যার ভেস্ট জমি ছিল, আমরা শুধু সেই মানষিদের কথা বলিবার চাহি।
গয়ানাথ এবার মাথা হেলিয়ে বলে, হ্যাঁ, এই কাথাটা ঠিক কহিছেন। মানষি আনিবার নাগিবে। জোতদার বলিলে ত মানষি আসিবে না। আর, ভেস্ট জমি বলিলে লোকে বুঝি নিবে জোতদারির কথা হছে।
তা কেন বলেন? শুধু জোতদারির কথা নহে, ন্যায্য কথা, ধর্মের কথা। পঁচখান টাড়ি (গ্রাম) দিলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ হইত না আর সরকার আপনার এতগিলা জমি প্রথমে ভেস্ট নিল, পরে আবার এতগিলা জমি ব্যারেজের জন্যে অধিগ্রহণ করিল। পঞ্চানন মহাভারতের উদাহরণ দিয়ে কী বোঝাতে চাইলেন, তিনি নিজেও বোঝেন না, গয়ানাথ ত বোঝেই না।
আপনাদের কামতাপুরী রাজ্যে এই তিস্তা ব্যারেজ কী থাকিবে? গয়ানাথের এই সরল জিজ্ঞাসায় পঞ্চানন গম্ভীর হয়ে যান। এই প্রশ্নের জবাব তিনি ভাবেন নি। আসলে, গয়ানাথের মত বড় জোতদার উত্তরখণ্ড যোগ দিলে তার স্বার্থে এই তিস্তা ব্যারেজ সংক্রান্ত প্রস্তাব নিতেই হবে। কিন্তু সে-প্রস্তাব নিলেও পঞ্চানন এখন কী করে বলবে কামতাপুর রাজ্যে তিস্তা ব্যারেজ থাকবে কি থাকবে না।
পঞ্চানন বলে, ব্যারেজ নিয়া ত আপনার কুনো অভিযোগ নাই। আপনার অভিযোগ জমি অধিগ্রহণ বিষয়ে। কামতাপুরে দরকার হইলে ব্যারেজ করিতে হইবে কিন্তু কখনোই কৃষকের জমি অধিগ্রহণ করা হইবে না। নদীর জমি দিয়া নদীর ব্যারেজ বান্ধো। পঞ্চানন এত সুন্দর ভাবে কথাটির জবাব দিতে পেরে খুশি হন।
গয়ানাথ পাল্টা প্রশ্ন করে, আর, ফরেস্ট ডিপাটমেন্ট? কামতাপুরেও কি ফরেস্ট ডিপাটেমন্টে থাকিবে?
পঞ্চানন জবাবের যেকায়দা বের করেছেন সেটা ছাড়তে চান না, গয়ানাথবাবু, আমাদের কামতাপুর রাজ্য ত ভারতের মধ্যে একটি রাজ্য হইবে। ভারতের সব রাজ্যের যে-নিয়মকানুন, কামতাপুরেও তা, থাকিবে কিন্তু তা কখনোই কৃষকের বিরুদ্ধে যাইবে না, কৃষকের স্বার্থে থাকিবে।
কৃষক মানে লালপার্টির কৃষক না হয়, উত্তরখণ্ড দলের কৃষক? নিশ্চয়ই। কৃষক বলিতে শুধু হালুয়ামানষি আধিয়ারমানষিক বুঝাবেন কেন? যার জমি সেও ত কৃষক। শুনেন গয়ানাথবাবু, আপনি উত্তরখণ্ডে যোগ দিলে সেটা আমাদের গৌরব। এই ডুয়ার্সের সগায়, কোচবিহারের সগায়, তরাইয়ের সগায় আমাদের পুছিবার ধরে–গয়ানাথবাবু কেন আসেন নাই? আপনারা কয়েক পুরুষের মধ্যস্বত্ব ভোগী। আপনি আসিয়া আপনার বক্তব্য বলেন, আমরা সেসব নিয়া আলোচনা করি, দশজনের সঙ্গে আপনি বসেন।
গয়ানাথ একটু চুপ করে থেকে বলে, সেই তানেই ত আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবার আসিছু। কিন্তু মোর ত এতগিলা মামলা চলিছে। স্যালায় মুই আগত যাম না। মোর পক্ষে মোর জোয়াই এই আসিন্দির উত্তরখণ্ড করিবে। মুইও আপনাদের তামান কাম করিম কিন্তু মুই নাম লিখিবার আগে দুই-চারি মাস দেখিবার চাহি।
কী দেখিতে চান? আমাদের কাজকর্ম?
না-হয়, না-হয়। মোর মামালা-মোকদ্দমাগিলা কোটত দাঁড়ায়?
মামলা চলিবে মামলার মত, তাতে আপনার উত্তরখণ্ড করিবার বাধা কোথায়? আপনি ত চাহেন তিস্তা ব্যারেজের বিষয়ে আমরা সম্মিলনে কথা তুলি? আপনি নিজে না-আসিলে কে তুলিবে? কী তুলিবে? ব্যারেজের ব্যাপারখানে ত আপনাকে নেতৃত্ব দিতে হবে আমাদের। আপনি আমাদের লিডার হবেন।
আসিন্দির গয়নাথের পাশে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে, মুই ত কহিছু বাপাক। তোমার কি এ্যালায় লুকি থাকিবার বয়স, নাকি, ভলান্টিয়ার বানিবার বয়স? তোমাক এ্যালায় লিডার হবা নাগিবে। লিডার হও কেনে, বাপা, লিডার হও। গয়ানাথ একটু চুপ করে থেকে বলে, আচ্ছা, ব্যারেজের তানে সুই আসিম। কিন্তু অন্য কাজ সব আসিন্দির করিবে।
তারপর আবার কী ভেবে বলে, না, মুই আসিলে আসিন্দিরকে বাদ দ্যান। দুইজন মিলিযোগদান হইলে সগায় ভাবিবে হামরালা সরকারের বিরুদ্ধ যুদ্ধ ঘোষণা দিছু।
তাহলি জামাইঅক আমাদের সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পার্টনার করি দ্যান।
সেইখান কী?
পঞ্চানন দু হাত তুলে বলে, এক কাজ করেন। আপনি ঘরে ফিরিয়া যান। দু-এক দিনের মধ্যে আমি আর আমাদের সম্পাদক বীরেন্দ্রনাথ বসুনিয়া আপনার সঙ্গে দেখা করিম।
.
ময়নাগুড়িতে নিখিল বঙ্গ উত্তরখণ্ড সমিতির প্রথম সম্মিলনের আয়োজন জমে উঠেছে। কিন্তু সেটা উত্তরখণ্ড সমিতির সম্মিলনের জন্যে, নাকি সম্মিলনের শেষে প্রত্যেক সন্ধ্যায় আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যে, তা বোঝা যাচ্ছে না, কারণ এখনো বোঝার সময় আসে নি। কিন্তু সম্মিলন আর অনুষ্ঠান যখন শুরু হবে তখন সম্মিলনের কথা যে কারো মনে থাকবে না– তা এখনই আন্দাজ করা যায়। অবিশ্যি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যদি সত্যিই এতটা সফল হয় তা হলে সেটাও ত উত্তরখণ্ড সম্মিলনেরই সাফল্য হিশেবে ধরা হবে। ইতিমধ্যেই ত এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নাম লোকের মুখে-মুখে উত্তরখণ্ড ফাংশন হয়ে গিয়েছে।
সম্মিলনে আসার জন্যে কোনো পয়সা দিতে হবে না–সকলে দলে-দলে যোগদান করুন। কিন্তু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্যে টিকিট আছে–ফার্স্টক্লাশ পনের টাকা, সেকেণ্ডক্লাশ দশ টাকা, থার্ডক্লাশ পাঁচটাকা। চেয়ারগুলো ডোনারদের জন্যে ও কমপ্লিমেন্টারি কার্ড যাদের দেয়া হবে তাদের জন্যে।
সম্মিলন হবে সকালে আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে বিকেলে। দুদিন নবরঙ্গ অপেরার কুলটার কুল ও প্রমোদতরণী। এতে তিনজন ফিল্ম এ্যাকটর আছে–সানু ব্যানার্জি, এলবার্ট সেন আর মোনা গুপ্তা। মোনা গুপ্তা সিনেমাতেও নাচে, যাত্রাতেও নাচবে। আছে হিন্দি বাংলা গানের আসর। তাতে মান্না দে থেকে অনুপ জালোটা। চিত্রা সিং-এরও আসার কথা আছে, এখনো পাকা হয় নি। আছে–কলকাতার একটি গ্রুপ থিয়েটারের সামাজিক নাটক। একদিন সারা রাত ভিডিওতে চারটি ফিল্ম দেখানো হবে। আর শেষ দিনে, ও সেটাই চরম দিন,বম্বের ফিল্ম আর্টিস্ট শ্রীদেবীর প্রোগ্রাম। পরদিন সকালে সম্মিলন বা অনুষ্ঠান মণ্ডপ থেকে বিরাট শোভাযাত্রা যাবে জল্পেশ মন্দিরে। সেখানে জল্পেশ্বর শিবের সামনে শপথগ্রহণ।
উত্তরখণ্ড সম্মিলনের জন্যেই এরকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে তা নয়। বরং সম্মিলনটাই নতুন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রতি বছরই কোথাও-না-কোথাও হয় পুজোর পর, এ-রকম সময়ে। অনকে বছর ধরে হতে-হতে ওটার একটা সংযোগ ব্যবস্থাও তৈরি হয়ে গেছে। আসাম থেকে ফিরতি পথে ডুয়ার্সের নানা জায়গায় শিল্পীদের পক্ষ থেকে বা কোম্পানীর পক্ষ থেকে উদ্যোক্তাদের কাছে লোকজন আসা-যাওয়া শুরু করে। ডুয়ার্সের কোথাও বা শিলিগুড়ি শহরে এরকম অনুষ্ঠান হয়। যারা অনুষ্ঠান করায় তারা ব্যবসার ভিত্তিতেই করে। ফলে কাছাকাছি দুটো অনুষ্ঠান হয় না বা একই জায়গায় পর-পর, দুবছর হয় না। যেখানেই হোক, বড় আর্টিস্ট থাকলে আসাম-বিহার থেকেও লোকজন আসে। উত্তরখণ্ডের ফাংশনে শ্রীদেবীর প্রোগ্রামের দিন ত এসব জায়গা থেকে প্রচুর লোক আসবে আশা করা হচ্ছে।
উত্তরখণ্ড সম্মিলন এই বছরই প্রথম হচ্ছে অথচ এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামই হয়ে গেছে উত্তরখণ্ড ফাংশন। তেরজন মিলে শেয়ার কিনে ফাংশন করছে তাদের সঙ্গে সম্মিলনের সরাসরি যোগ নেই। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পোস্টার লাগানো হয়েছে উত্তরবঙ্গের সর্বত্র দার্জিলিং থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত, এমনকি কিছু-কিছু পোস্টার বহরমপুর পর্যন্তও। শিলিগুড়ি-কোচবিহার-ডুয়ার্স পোস্টারে-ফেস্টুনে ছেয়ে দেয়া হয়েছে। যে বাসগুলো তিস্তা ব্রিজ পার হয়ে আসাম যায়, তার পেছনে পোস্টার ত আছেই, তা ছাড়াও বঙ্গাইগাও, চুটিয়াপাড়া, পাণ্ডু ও গৌহাটিতে ফেস্টুনও ঝুলছে। আবার আসাম থেকে কিষনগঞ্জ হয়ে পূর্ণিয়ার দিকে যে-সব ট্রাক যাতায়াত করে সেগুলোতেও পোস্টার সঁটা। কিন্তু ট্রাকে পোস্টার থাকে না, ছিঁড়ে যায়। তাই কলকাতা থেকে কিছু প্লাস্টিক শিট ছাপিয়ে এনে ট্রাকের সামনের কাঁচে লাগানো হয়েছে। কিষনগঞ্জ-ডালখোলার রিক্সার পেছনেও পোস্টার। কথা আছে, ফাংশনের দু-একদিন আগে ময়নাগুড়ি আর জলপাইগুড়ির রিক্সাওয়ালাদের গেঞ্জি দেয়া হবে–শ্রীদেবীর ছবি ছাপিয়ে।
সেই আসাম, বিহার, পাহাড়, ডুয়ার্স জুড়ে এত প্রচার–আসামি, হিন্দি, নেপালি ভাষায়। পাণ্ডুতে একটা বাংলা ফেস্টুনও লাগানো হয়েছিল–পরীক্ষার জন্যে। কেউ ঘেঁড়ে নি দেখে আরো কয়েকটা ঝোলানো হয় রেলওয়ে কলোনির ভেতরে। কিষনগঞ্জে হিন্দি পোস্টার ও ফেস্টুন। ডালখোলার মোড়ে হিন্দি বাংলা দুই পোস্টারই আছে, ডুয়ার্সেও তাই।
ডালখোলার মোড়ে তিনটি দোকানে, কিষনগঞ্জের ছটি দোকানে, পাণ্ডুতে একটি দোকানে, বঙ্গাইগাঁওয়ের হুইলারে, চুটিয়াপাড়ার সিনেমা হলে, গৌহাটির তিনটি দোকানের, আলিপুর দুয়ারের, একটি মিষ্টির দোকানে ও আলিপুর দুয়ার জংশনে একটি অফিসে, দার্জিলিঙের একটি অফিসে ও দুটি দোকানে, কার্শিয়াঙের ট্যাক্সিস্ট্যাণ্ডে, শিলিগুড়িতে এয়ারভিউ হোটেলের মোড়ে ছাতার নীচে, জলপাইগুড়িতে নিরালা হোটেলে, পূর্ণিয়ায় এক ডাক্তারখানায়, কোচবিহারে একজন একাই কন্ট্রাক্ট নিয়েছে, ডুয়ার্সের নানাজায়গায় টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা আছে। কিন্তু অনুষ্ঠানের পাঁচ দিন আগে বাইরের এই সব টিকিট বিক্রির জায়গা থেকে টিকিট ফেরৎ নিয়ে এসে শুধু কয়েকটা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে বিক্রি করা হবে। লক্ষ-লক্ষ টাকা খাটানো হয়েছে এই অনুষ্ঠানে। সে-টাকা তুলে তার ওপর লাভ করতে হবে। এক ও একমাত্র উপায় টিকিট বিক্রি করা। উদ্যোক্তারা তাই প্রচারের ওপর যেমন জোর দিয়েছে, তেমনি জোর দিয়েছে টিকিট সব জায়গায় ছড়িয়ে দেয়ার ওপর। টিকিটের জন্যে কেউ অনুষ্ঠানে আসতে পারল না–এটা যেন না হয়। যদিও ছদিন ধরে অনুষ্ঠান ও ছদিনের টিকিটই যারা নিচ্ছে তাদের পাঁচ দিনের দাম দিতে হচ্ছে, কিন্তু সব ব্যবস্থাই শেষ দিনে শ্রীদেবীর অনুষ্ঠানের জন্যে। শ্রীদেবীর নাচ দেখতে কত লোক যে আসবে তার হিশেব করাও মুশকিল! এই শেষ দিনের অনুষ্ঠানের টানেই অন্য দিনের টিকিটগুলি এমন বিক্রি হয়ে যাচ্ছে! শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান আসাম-বিহার-ডুয়ার্স থেকে লোক যদি আসে তা হলে লাভ বেশ ভাল হবে।
দূর থেকে যারা আসবে তারা নিজেরাই ট্রাকবাস ভাড়া করে আসবে। এমন-কি চা বাগান থেকেও যারা আসে, তারা চা বাগানের ট্রাকেই আসে। কিন্তু পাশাপাশি ১৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকা থেকে অনুষ্ঠানের নিয়মিত দর্শকরা আসবে–এটা আশা করা যায়। তাদেরও অনেকেই গরুর গাড়িতে আসে বটে কিন্তু অনুষ্ঠানের শেষে কতকগুলি রাস্তায় কিছুদূর পর্যন্ত অনন্ত দুটি-একটি বাস যাওয়ার আশ্বাস থাকলে অনেকেই ভরসা পায়। সেই জন্যে প্রাইভেট বাস বা হাট বাসের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে।
এই অনুষ্ঠানে আসার জন্যে আসামে, বিহারে, দার্জিলিঙে, তরাইয়ে নানা রকম ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। অনেকে শুধু শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান দেখাবার জন্যে ডিলাক্স বাসে যত জনকে আনা সম্ভব তত জনের টিকিট কেটে নিয়ে গিয়ে তার সঙ্গে বাস ভাড়া ইত্যাদি মিলিয়ে একটা রেটে বিক্রি করছে। বাসওয়ালাদের মধ্যে ডিলাক্স বাস, অর্ডিনারি বাস যেমন আছে, তেমনি ডি-লাক্সের মধ্যে ভিডিও বাস আলাদা। তারা যাওয়ার সময় ও ফেরার সময় ভিডিওতে শ্রীদেবীর ফিল্ম দেখাবে। দুরত্বের ওপর নির্ভর করে, কোনো-কোনো বাসে একটা বড় খাওয়া, দুটো ছোট খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। কোনো-কোনো বাসে খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থাই নেই। আবার অনেকে নিজেরাই বাসট্রাক ভাড়া করে আসছে।
ফলে, এই শেষ দিনের অনুষ্ঠানে, ময়নাগুড়ি শহর পুরো জ্যাম হয়ে যেতে পারে। এইটুকু ত শহর, রাস্তাগুলোও সরু সরু। যদি একবার কোনো গাড়ি আটকে যায়, সেটা বের করা প্রায় অসম্ভব। সেইজন্যেই পুলিশের ওপর পুরো নির্ভর। অনুমতি ত নেয়া হয়েইছে–পুলিশই বিভিন্ন মাসে বাস ও ট্রাস পার্কিঙের ব্যবস্থা করে দেবে। কোম্পানীকে শুধু সেই মাঠে ঢোকার রাস্তা বানিয়ে দিতে হবে। আসাম থেকে আসা গাড়িগুলোকে চৌপত্তির আগেই পার্ক করাতে হবে আর বিহার বা তিস্তাব্রিজ পার হওয়া গাড়িগুলোকে পশ্চিম দিকে পার্ক করাতে হবে। মাঠগুলো বেশ বড় বড় আছে, এই যা বাঁচোয়া। শ্রীদেবীর নাচের জন্যে ময়নাগুড়ির মত এইটুকু থানা শহরে সর্বভারতীয় ব্যবস্থা গড়তে হচ্ছে, যেন আসামের গাড়ির সঙ্গে বিহারের গাড়ি মুখোমুখি না হয়, ডুয়ার্সের গাড়ির সঙ্গে তরাইয়ের গাড়ি মিশে না যায়–সব গাড়িরই মুখ যেন থেকে শ্রীদেবীর মঞ্চের দিকে, কিন্তু নানা দিক থেকে।
.
বীরেন্দ্রনাথ বসুনিয়া থানার বড়বাবুর কাছ থেকে চিঠিটা পেয়ে যান সেদিন বিকেলের মধ্যেই।, বীরেনবাবুকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সম্পাদক হিশেবে জানানো হয়েছে, যে-তেরজন আর্থিক দায়িত্ব নিয়ে ও একটি কমিটি তৈরি করে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন তাদের জলপাইগুড়ি সার্কিট হাউসের সভায় উপস্থিত থাকতে জানানো হচ্ছে। ঐ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্যাণ্ডেলে একই সঙ্গে নিখিলবঙ্গ উত্তরখণ্ড সম্মিলন নামে যে-সম্মিলন হচ্ছে ও যে-সম্মিলন সম্পর্কে সরকারকে এখনো পর্যন্ত কিছু জানানো হয় নি তাদের সংগঠকদেরও যেন সাংস্কৃতিক সম্মিলনের উদ্যোক্তারা নিয়ে আসেন–এই নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে মাননীয় পর্যটনমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী ও বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী দয়া করে এই মিটিঙে উপস্থিত থাকবেন।
বীরেনবাবু চিঠিটা বার দুয়েক পড়ে ফতুয়ার পকেটে রেখে আবার তার কপি খেতে নেমে যান। শীতকালের শুরুতে বাড়ির পাশের ও পেছনের পড়ে থাকা বিরাট জমির মাত্র কিছু অংশেই পালং, ফুলকপি-বাঁধাকপি, মটর শাক করেন বীরেনবাবু। তার কয়েকটা গরু আছে–সেই রাখালটাই বাগানের দেখাশোনা করে থাকে। বীরেনবাবু সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে চারাগুলোর ওপর কলাগাছের খোল কেটে বানানো ছোট-ছোট আড়ালগুলো দিয়ে দেন। আবার বিকেলের শেষ দিকে বীরেনবাবু সেই কলার খোলের আড়ালগুলো সরিয়ে চারাগুলোকে খুলে দেন। এদিকে এত শিশির আর হিম পড়ে যে এই একেবারে কচি চারাগুলো সারা রাত খোলা থাকলে সেই হিমে ভিজে ঝরঝরে হয়ে ওঠে। এই সকালে ও বিকেলে তার লোকটি গরুগুলোকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তা ছাড়া মাত্র বছর তিনেক আগেও বীরেনবাবু নিজে হাতেই এই খেতটা করতেন। কিন্তু তিন বছর আগে বুকে শ্লেষ্ম জমায় আর ব্লাডপ্রেশার বাড়ায় তাকে জলপাইগুড়ি হাসপাতালে দিন দশেকের জন্যে ভর্তি হয়ে হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বীরেনবাবু আর আগের মত কাজে ফিরে যেতে পারেন নি। বোধহয় চান না। তার কিছু খেতি জমি আছে, তাতে বাড়ির সারা বছরের খাবার হয়ে, সরকারের লেভি শোধ করেও কিছু বিক্রয়যোগ্য উদ্বৃত্ত ফসল থেকে যায়। চার মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ছেলে জলপাইগুড়ি কলেজ থেকে বিএ পাশ করে বাড়িতেই থাকে, জমিজমা দেখাশোনা করে, পুকুর কেটে মাছচাষের ব্যবসায় নেমেছে। সে ছেলের একটিই মেয়ে। ছোট ছেলে কলকাতায় ওকালতি পড়তে। এখন অবিশ্যি নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিতেও ল ফ্যাকাল্টি হয়েছে, জলপাইগুড়িতেও ল কলেজ আছে, সন্ধ্যায় ক্লাশ করে রাতে ময়নাগুড়িতে ফিরে আসে অনেকেই। কিন্তু বীরেনবাবু চেয়েছিলেন তার ছেলে ওকালতি যখন পড়ছেই তখন কলকাতাতেই পড়ক। সেই ছোট ছেলের জন্যেই এখনো সেরেস্তা আঁকড়ে আছেন বীরেনবাবু। নইলে হয়ত ওকালতি ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে বসে থাকতেন। ওকালতি পেশার ওপর বীরেনবাবুর যা টান, তার চাইতে অনেক বেশি টান তার নিজের তৈরি এই সেরেস্তার ওপর। তিনি ময়নাগুড়িতে বসেই বরাবর প্র্যাকটিশ করে আসছেন জলপাইগুড়ি কোর্টে। আগে জলপাইগুড়িতে একটা ছোট বাড়ি ভাড়া করে থাকতেন। তিস্তা ব্রিজ হয়ে যাওয়ার পর সেই বাড়িটা ছেড়ে দেন। বীরেনবাবু ওকালতি পেশাটাকে ভালবাসেন। আইনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নানা বিচার-বিশ্লেষণে তার আগ্রহ আছে। বেশির ভাগ উকিলেরই তা থাকে না, থাকার দরকারও হয় না। এমন কি জজকোর্টেও মাত্র দু-চারজন উকিলই ঐ সব ল-পয়েন্ট-টয়েন্ট নিয়ে মাথায় ঘামায়। ওকালতির ভাষা জানলেই একজন উকিলের মোটামুটি চলে যায়। কিন্তু বীরেনবাবু শুধু জামিনের উকিল হতে চান নি, ফৌজদারি মামলা তিনি জীবিকার জন্যে করতেন–বেশিই করতেন, কিন্তু তিনি তার সেরেস্তা তৈরি করতে চেয়েছিলেন প্রধানত সিভিল কেসের ওপর। আর সেইখানেই তার সারাটা জীবন তিনি সবচেয়ে বেশি বাধা পেয়েছেন, যেন, রাজবংশী উকিল বলেই তার বুদ্ধিসুদ্ধি কিছু কম, মারদাঙ্গার মামলা যদিবা করতে পারেন, তাই বলে সম্পত্তির মামলায় তার ওপর ভরসা করার মক্কেল পাওয়া যেত না। রাজবংশী সমাজের লোকরাই তাকে মামলা দিতে চাইত না। তার কম বয়সে তিনি প্রথম একটা বড় মামলা পান বাকালির গোলাম মুস্তফার কাছ থেকে। গোলাম মুস্তফা মুসলমান রাজবংশী-বিরাট জোতদার, জলপাইগুড়ি শহরের নতুন পাড়ায় তার বাংলো বাড়ি বাকালি হাউস সকলে চেনে। জলপাইগুড়ি শহরের বড়বড় উকিলরা তার মামলা করেন। তিনিই একদিন তার বাকালির বাড়িতে বীরেনবাবুকে ডেকে পাঠিয়ে একটা মামলার দায়িত্ব নিতে বলেন, কারো জুনিয়ার হিশেবে নয়, পুরো দায়িত্ব, তবে বীরেনবাবু যদি মামলার দরকারে কোনো সিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলতে চান বা সিনিয়ারকে দিয়ে ড্রাফট করাতে চান সেটা বীরেনবাবুর ব্যাপার। কিন্তু, মামলায় হারা চলিবে না, স্যালায় হাইকোর্ট করিবার নাগে করিবেন, কিন্তু জিতিবার নাগিবে। গোলাম মুস্তফা সাহেব হেসে বলছিলেন, চেককাটা লুঙি আর ধবধবে গেঞ্জিতে কাঠের হাতাওয়ালা ও হেলান দেয়া লম্বা বেঞ্চের কিনার থেকে পিক ফেলে বলেছিলেন, হো-হো করে হেসে পিক ফেলে বলেছিলেন, হারিবার চাহিলে ত হামার ভদ্দরমানষি ভাটিয়ার ঘর উকিল আছে–ননিলী ঘোষ, মকবুল হোসেন, খগেন। মহলানবিশ–কিন্তু এই মামলাটা মুই হামার রাজবংশী উকিল দিয়া জিতিবার চাহি–জিতন কেনে ভাই, জিতি আনেন।
মামলাটা এমন কিছু না–জেতারই মামলা। তখনকার আইনকানুনও ছিল অনেক সোজা। কিন্তু গোলাম মুস্তফা, কে, বীরেন বসুনিয়াকে উকিল রেখেছেন–এ থেকেই তার পশার বাড়তে শুরু করে। মুস্তফা সাহেবই বীরেনবাবুকে বলেছিলেন, হাময়ালার বাহের ঘর তোমাক মামলা দেয় না কেনে, কহেন ত? তারপর নিজেই উত্তর দিয়েছিলেন, এই আইনকানুন সম্পত্তি কোর্টকাছারি এইগুলা সব ভাটিয়ার ভদ্দরমানুষের তৈরি। তা সগায় ভাবে–এই সব মামলা মোকদ্দমা ভাটিয়ার ঘরই ভাল বুঝে, তোমার রাজবংশীয় ঘর কি আর অনং ইংরাজি কহিবার পারে হাকিম সাহেবের মুখত? মুস্তফা সাহেব পাকিস্তানে যান নি অনেক দিন, বোধহয় যাবেন নাই ঠিক করেছিলেন, কিন্তু সুতান্ন সালের একটা ছোট দাঙ্গার পর হঠাৎ সমস্ত সম্পত্তি বিনিময় করে চলে গেলেন। মুস্তফা সাহেবের দৌলতেই বীরেনবাবু তার সেরেস্তা তৈরি করতে পেরেছেন। তার ধারণা মুস্তফা সাহেব দাঙ্গার জন্যে ইন্ডিয়া ছেড়ে পাকিস্তানে যান নি। তিনি হঠাৎ বুঝতে পেরেছিলেন, ইন্ডিয়ার জোতদারি-জমিদারির দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে। এ কথা কোনো-দিন কাউকে বলেন নি বীরেনবাবু। কিন্তু মনে-মনে এটাই তিনি এখনো বিশ্বাস করেন যে মুস্তফা সাহেব প্রথমত ছিলেন একজন জোতদার, দ্বিতীয়ত ছিলেন একজন রাজবংশী আর তৃতীয়ত ছিলেন একজন মুসলমান। নইলে সেই লিগ আমলে গোলাম মুস্তফার মত একজন মুসলমান ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান অন্তত হতে পারতেন কিন্তু লিগ না করেই মুস্তফা সাহেব চালিয়ে গেছেন। একবার বীরেনবাবুকে বলেছিলেন, তোমরালা বাহের ঘর ক্ষত্রিয় সমিতি বানাইছেন, ভাল, কিন্তু দেখেন ত কেনে তোমার মহাভারত মুসলমান ক্ষত্রিয় আছে কি নাই। না-থাকিলে হামরালা যাম কোটত-হামরালা বাহে মুসলমানের ঘর, যাম কোটত, কহেন!
বীরেনবাবুও কি গোপনে-গোপনে প্রথমত একজন রাজবংশীই? নইলে উত্তরখণ্ড দল যখন তাকে সম্পাদক করে এই সম্মিলনের ব্যবস্থা করল তিনি রাজি হয়ে গেলেন কেন? আবার, নাগরিক কমিটিরও তিনিই সম্পাদক- যারা এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করছে। নইলে তিনি এখনো তার সেরেস্তাটা ছোট ছেলের জন্যে রক্ষা করতে নিয়মিত কোর্টে যাতায়াত করছেন কেন, একথা জেনেও যে তার ছেলে ময়নাগুড়ি বা জলপাইগুড়িতে বসে প্র্যাকটিশ করবে না হয়ত, হয়ত কলকাতাতেই বসবে? বসুক, এটা যেন বীরেনবাবু চানও, না-জেনেই চান। আজকাল প্রায় কোনো মামলাই জজকোর্টে নিকেশ হয় না, সব মামলাই হাইকোর্ট পর্যন্ত চলে। তা যদি চলে, তা হলে, একজন রাজবংশী উকিল তার এই সেরেস্তার মামলা দিয়েই তার প্র্যাকটিশ শুরু করতে পারে–তার সেই ভাবী এ্যাডভোকেট ছেলের জন্যে বীরেনবাবু সেরেস্তা আগলাচ্ছেন।
বীরেনবাবু সবগুলো কপিচারার ওপর কলার খোলের ঢাকনি দেয়া শেষ করেন। কাজটা করতে তার একটু সময় লাগে। দাঁড়িয়ে কোমর বেঁকিয়ে সরাতে গেলে তাড়াতাড়ি হত, কিন্তু তাতে তার কোমরে ব্যথা হয়। সেজন্যে তিনি উটকো পায়ে-পায়ে এগিয়ে যান। এতেও ব্যথা হয়–হাঁটুতে। কিন্তু এক-একটা সারির শেষে উঠে দাঁড়িয়ে পাটা টানটান করে নিলে ব্যথাটা থাকে না।
বীরেনবাবু তার জমির ছোট দুই টুকরোয় এখন তরকারি লাগান–বাকি প্রায় বিঘে দেড়েক জমি.ত পড়েই থাকে–গোয়াল, পোয়ালবাড়ি এ-সব সহ। আজকাল অবিশ্যি এদিকে একটা নতুন ব্যবসা চালু হচ্ছে। এরকম বড় জমির ওপর বাড়ি যাদের তাদের কাছে তরকারি চাষিরা এসে ঐ বছরের জন্যে জমিটা নিতে চায়। সমস্ত খরচ চাষির। তরকারি যা হবে তার একটা অংশ জমির মালিকের। কতটা জমির মালিকের আর কতটা চাষির তা এখনো স্থায়ী ভাবে স্থির হয় নি, কারণ এক-একজন এক-এক নিয়মে জমি, যদি দেয়, দিতে রাজি হয়। কেউ আধিভাগে দেয়–তা হলে অবিশ্যি ফলনের খরচাও বার আনি-চার আঁনি ভাগ হবে। বীরেনবাবুর কাছেও এই প্রস্তাব দিয়ে দু-তিন বছর হল লোক আসছে। কিন্তু তিনি রাজি হননি। তিনি রাজি হন নি ওকালতি বুদ্ধিতে–একই জমিতে পর-পর দু-তিন বছর একই লোক তরকারি ফলালে একটা সম্পর্কে গড়ে ওঠেই, তারপর তাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া তার অতটা দরকারও নেই। কিন্তু যাদের দরকার আছে–আগে সম্পন্ন পরিবার ছিল, এখন নানা কারণে পড়ে গেছে, অথচ বাড়িটা দু-বিঘে তিন-বিঘে জমির ওপর তাদের কাছে ত এটা উপার্জনের উপায়। বীরেনবাবু চোখের সামনেই জিনিশ দেখছেন। এক বছর দু-চারের মধ্যেই শহরের বাড়িঘরের এই সব জমির ওপর তরকারি চাষিদের একটা দখল অন্তত আশ্বিন থেকে মাঘের শেষ পর্যন্ত, কায়েম হয়ে যাচ্ছে। আর, দুই? এই তরকারি চাষিদের অনেককেই টাকার যোগান দিচ্ছে ডুয়ার্স ও জলপাইগুড়ি শিলিগুড়ির কাঁচা তরকারির বড়বড় আড়তদাররা। বীরেনবাবুর হিশেব, আর দু-এক বছরের মধ্যেই এখানে আলু চাষ হবে, আলু রাখা যায় বেশি দিন, কোল্ড স্ট্রোরেজও হবে। পুরনো বাড়ি ছাড়া কাদের আর দু-তিন বিঘে বাস্তু জমি থাকবে। সে-সব বাড়ির প্রায় চোদ্দ-পনের আনাই ত রাজবংশী বাড়ি। ময়নাগুড়ির মত শহরে যদি এই বাস্তুজমিতে তরকারি চাষের দাদন চলতে থাকে তা হলে দশ বছরের মধ্যে বাস্তুজমির ঐ অংশ বেচে দিতে হবে। আগে, জলপাইগুড়ি শহরে যত রাজবংশী পরিবার থাকত, এখন আর তা থাকে না। ময়নাগুড়িতেও বাস্তুজমির রাজবংশী মালিকানার অনুপাত কমে যাবে, দ্রুত। জলপাইগুড়ি শহরে রাজবংশী বাড়ি কমে যাওয়ার একটা বড় কারণ তিস্তা ব্রিজ, বাস-মিনি-ট্যাক্সির এরকম বাড়। আগে, জলপাইগুড়ি শহরে যেতে হলে তিস্তায় খেয়াপার হয়ে, হেঁটে, সঁতরে, ট্যাক্সিতে চেপে যেতে হত। অথচ স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, অফিস, কাছারি সবই জলপাইগুড়িতে। তখন স্কুল বলতে ত যজ্ঞেশ্বর রায়ের রাঙ্গালিবাজনার স্কুল, দোমহানির রেল স্কুল আর ময়নাগুড়ির। আর, এখন কলেজইত একটা ফালাকাটায়, একটা ধূপগুড়িতে। স্কুলের ত কথাই নেই। কমার্স কলেজ আর ল কলেজের ছেলেরা রাত আটটায় শহরে ক্লাস শেষ করে ডুয়ার্সে ফিরে যেতে পারে। তারপর যারা ঐ মোটর সাইকেল কিনছে তাদের ত কথাই নেই। জলপাইগুড়িতে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্যে একটা বাড়ি রাখা ত খরচের ব্যাপার। সে-খরচ কেউ করবে কেন আর? বীরেনবাবুরই ত আগে শহরে একটা বাড়ি ছিল, এখন নেই। সুতরাং জলপাইগুড়ি শহরে রাজবংশী পরিবারের আনুপাতিক সংখ্যাহ্রাসের কারণটা বোঝা যায়।
কিন্তু সেসব কোনো কারণই ত ময়নাগুড়িতে নেই। এরকম একটা জংশন-গঞ্জের মত জায়গা ময়নাগুড়ি, যেখান থেকে শিলিগুড়ি হয়ে পাহাড়-বিহার, ধুবড়ি হয়ে আসাম পর্যন্ত ঘণ্টাকয়েকের মধ্যে মালপত্র পাঠানো যায়, সেখানে পুরনো রাজবংশী পরিবাররা দু-বিঘে চার-বিঘে জমির বেশির ভাগটাই ফেলে রেখে দুটো-একটা ছোট টিনের ঘরে মাত্র বসবাস করবে, তা তরিতরকারির আড়তদাররা চলতে দেবে কেন? শুধু নগদ টাকার স্বাদ দিয়েই ত এ জমিগুলো তারা হাতিয়ে নেবে। এখনো নেয় নি বটে, কিন্তু জলপাইগুড়ির জজ কোর্টে গত পঁয়ত্রিশ বছর প্র্যাকটিশের অভিজ্ঞতা থেকে বীরেনবাবু বুঝতে পারছেন ময়নাগুড়ি, ধূপগুড়ি, ফালাকাটার মত জায়গায় ভূসম্পত্তির মালিকানার এই বদল আসন্ন, সাত-আট মাসের পোয়াতির মত আসন্ন। ডুয়ার্সে রাজবংশীরা সংখ্যালঘু হয়ে যাবে–সম্পত্তির মালিকানাতেও। আইনের পথে একে ঠেকানোর আর-কোনো উপায় নেই– একমাত্র উপায় সমস্ত রাজবংশীকে এক করে আসামের মত কোনো আন্দোলন। তা হলে গোলমালের ভয়ে ভূসম্পত্তি এখনই কেউ কিনতে চাইবে না হয়ত। কিন্তু তাতেও ত স্থায়ী সমাধান হবে না। স্থায়ী সমাধানের জন্যে আসামের মত বিদেশী খেদাও আন্দোলন হয়ত করা যাবে না, কিন্তু, অন্তত এটাও আদায় করা যায় যে রাজবংশীদের কাছ থেকে কোনো সম্পত্তি অরাজবংশী কেউ কিনতে পারবে না। অর্থাৎ আদিবাসী-উপজাতি অঞ্চলের এই নিয়ম জলপাইগুড়ি ও ডুয়ার্সেও প্রয়োগ করতে হবে। তার মানেই রাজবংশী-অঞ্চলের জন্যে কিছু স্বতন্ত্রতা দাবি করা। তার নাম হয়ত আপাতত দেয়া হয়েছে উত্তরখণ্ড। সে নাম পরে বদলাতেও পারে। কিন্তু রাজবংশী বা উত্তরবঙ্গের আদিবাসীদের স্বার্থরক্ষার জন্যে আর-কোন্ বিকল্প রাস্তা আছে? না হলে এটা মেনে নিতে হয়–সারা দেশে যা হচ্ছে এখানেও তাই হোক; সেখানে রাজবংশীর কথা আলাদা ভাবে তোলা কেন? তরকারি খেতের কাজ বীরেনবাবুর হয়ে গিয়েছিল। তিনি সেখান থেকেই কুয়োপাড়ে গেলেন–জল তোলাই ছিল, একটা ঘটিতে তুলে খানিকটা মুখে দিলেন, খানিকটা পায়ে। বারটা সিঁড়ি ভেঙে তাকে বারান্দায় উঠতে হয়। আগেকার দিনের বাড়িগুলো এরকম দেড়তলার মত উঁচু হত। বীরেনবাবুও গল্প শুনেছেন–বাঘের ভয়েই নাকি উঁচু করা। কাঠের বাড়ি, রাতে মইটা তোলা থাকত। কিন্তু তার আমলেই ত কাঠের বাড়ি বদলে ইটের হল, কই তিনি ত উচ্চতা কমান নি। এক-এক ধরনের বাড়িতে থাকা অভ্যেস হয়ে যায়। বীরেনবাবুদের অভ্যাস এরকম উঁচু বাড়িতে থাকা।
বারান্দায় টাঙানো তারে গামছা ছিল, তাতে মুখ আর পা মুছে, বীরেনবাবু ঘরে ঢোকেন। বাগানের কাজ করার সময় ধুতিটা একটু তুলে নিয়েছিলেন, এখন ঘরে এসে নামালেন। তারপর ফতুয়ার ওপর গরম কাপড়ের পাঞ্জাবি ও তুষটা নিয়ে, পাম্প শুটা পরে বেরিয়ে এসে একটু উঁচু গলায় স্ত্রীকে বললেন, আমি উত্তরখণ্ডে যাচ্ছি। সম্মিলন আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জায়গাটা এখন এই নামেই চলছে।
হঠাৎ সরকারের চিঠিটা পেয়ে তার ওকালতি জীবনের স্মৃতি, তার ছোট ছেলের কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাকটিশের স্বপ্ন, আর জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সে রাজবংশীদের সম্পত্তিহ্রাস যে বীরেনবাবুর ধারাবাহিক মনে পড়ে গেল, তা নয়। তিনি উত্তরখণ্ড ও শ্রীদেবীর অনুষ্ঠানের কর্মকর্তা হলেন কী করে–ঐ স্মৃতিসহ প্রত্যাশা তারই যেন কারণপঞ্জি। বীরেনবাবুর মনে ঐ সব কথা একসঙ্গে এখন এই বৃত্তান্তের প্রয়োজনের সুযোগমত এসে যায় নি। বীরেনবাবুর নিজের কাহিনী, রাজবংশী হয়েও উকিল হিশেবে প্রতিষ্ঠার কাহিনীই ত একটা আলাদা বৃত্তান্তের লোভনীয় বিষয় হতে পারে। তার মত লোক কেন উত্তরখণ্ডের মত আন্দোলনে ঢুকে পড়েন সে-সবের আভাস দেয়ার জন্যেও বীরেনবাবু সম্পর্কিত এই সব কথা ওঠে নি। কিন্তু বীরেনবাবুর মত একজন উকিল মানুষ, ও বয়স্ক লোক, যিনি সারাটা কর্মজীবন কাটিয়েছেন জেলা। শহরের কেন্দ্রে, জেলার রাজনীতি ও প্রশাসনের মাঝখানটিতে, তার কাছে, দারোগার এই চিঠিটা কী করে ও কেন লেখা হল সেটার জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায় চিঠি পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই। ওরা চাইছে সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের মধ্যে একটা ভাগাভাগি ঘটিয়ে সম্মিলনটাকে বন্ধ করাতে ও অনুষ্ঠানটা করাতে। বামফ্রন্টের সরকার ও সরকারের পার্টিগুলির কাছে বম্বের কোন সিনেমাওয়ালি শ্রীদেবীর নাচ অনেক নিরাপদ। কিন্তু রাজবংশীরা আলাদা ভাবে বসে কিছু কথাবার্তা বলাটা অনেক বেশি বিপজ্জনক–উগ্রপন্থী, বিচ্ছিন্নতাবাদী। তিনি অত্যন্ত কম কথা বলেন বলেই অমন চিঠি পেয়েও সেটা ফতুয়ার পকেটে ভরে ফুলকপির চারা থেকে কলার খোল খুলে দেয়ার কাজটা অব্যাহত রেখে, চিঠিটাকে উপেক্ষা ও অপমান করে, নিজের ও নিজেদের বহু বহু প্রাচীন উপেক্ষা ও অপমানের শোধ নেন। তার জীবনের এই খবরগুলি সেই সব উপেক্ষা অপমানেরই প্রাসঙ্গিক।
.
বীরেনবাবুর বাড়ি থেকে সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের জায়গায় যেতে বেশ কিছুটা হাঁটতে হয়। তিনি হেঁটেই, যান, রিক্সা নেন না। কিন্তু হাঁটার পক্ষে এই রাস্তাটা আর ভাল নেই। সব সময় ট্রাক, বাস আর মিনি যাচ্ছে। রাস্তাটাও ছোট, দোকানপাট বসায় সেটা আরো ছোট হয়ে গেছে। একটু যে পাশ দিয়ে যাবেন, তেমন পাশও নেই। প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে ব্লক অফিসের পাশে। এখন পুরোদমে কাজ হচ্ছে-সকলকে সেখানেই পাওয়া যাবে। তবু যাওয়ার সময় চৌপত্তিতে মরণচাঁদের দোকানটাতে একবার উঁকি দিলেন–অনেক সময় ওরা সন্ধ্যায় এখানে বসে। কিন্তু এখন কেউ নেই।
প্যান্ডেলে নকুলকে পেয়ে গেলেন। পেয়ে যাবেন–সেটা আশাই করেছিলেন। নকুলকে খবর দিলে ঐ ছোটাছুটি করে সবাইকে জড়ো করবে।
পাঞ্জাবির নীচে ফতুয়া, ফতুয়ার ভেতরে-পকেট। সেই পকেটের ভেতর থেকে চিঠি বের করতে বীরেনবাবুকে কিছুটা সময় নিতে হয়। তবে বীরেনবাবুকে সব কাজেই কিছুটা সময় দেয়াটা সকলের অভ্যেস হয়ে গেছে।
বীরেনবাবুকে দেখে, আসেন, কাকা বলে নকুল সিগারেটটা ফেলে পায়ের তলায় দলে দেয় আর গিরিজা একটা ভাঁজ করা চেয়ার এগিয়ে দেয়। চিঠিটা বের করে নকুলের দিকে এগিয়ে দিতে-দিতে বীরেনবাবু বসেন। নকুল চিঠিটা না-নিয়ে জিজ্ঞাসা করে–কাকা কি আমাকে এই বয়সে আবার ক্লাশ পালানো শেখাবেন? সেই যে ক্লাশ এইটে জানলা দিয়ে পালিয়েছি আর দরজা দিয়ে কখনো মা সরস্বতীর সামনে দাঁড়াই নি। টেন্ডার নোটিশ পড়তে পারি না আর আপনি আমাকে চিঠি দেখাচ্ছেন? মা সরস্বতী লজ্জা পাবেন বলে সরস্বতী পুজোর দিন না খেয়ে থাকি কিন্তু অঞ্জলি দেই না।
বীরেনবাবু চিঠিটাসহ হাতটা কোলের ওপর রেখে নকুলের পেটের দিকে তাকিয়ে বলেন, জলপাইগুড়ির সার্কিট হাউসে মিটিং, নর্থ বেঙ্গলের মন্ত্রীরা থাকবে, তোমাদের তেরজনকে থাকতে হবে আর উত্তরখণ্ডের লোকদের সঙ্গে নিতে হবে।
মানে? কবে? নকুল যেন আকাশ থেকে পড়ে, সে হাঙ্গামা, সেদিন থানার মিটিঙে মেটে নি? তারপর ত ওরা আর-কিছু জানায় নি, কাকা? এখন ত চারদিনের মাথায় ফাংশন-এখন মিটিং? মন্ত্রীরা আসবে? নকুল থেমে যায়, দুপা হাটে, ফিরে আসে, তারপর জিজ্ঞাসা করে, কবে?
পরশুদিন। বীরেনবাবু জবাব দিয়েও আবার খাম থেকে কাগজটা খুলে মিলিয়ে নিয়ে কাগজটা ভাজ করে খামে ভরে রাখেন।
পরশু? মানে, বুধবার? আর শনিবার উদ্বোধন? এ সবের মানে কী? কী, চায় কী?
বীরেনবাবু হাত তোলেন-নকুলকে থামানোর ভঙ্গিতে। নকুল থেমে গেলে আবার তার পেটের দিকে তাকিয়ে বীরেনবাবু বলতে থাকেন, উত্তেজিত হয়ো না। সরকারের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার-উত্তরখণ্ড সম্মিলনটা হতে দেবে না। তাও প্রথম দিকে ওসব হতে দিতে আপত্তি নেই। সরকার শেষ দিনের জল্পেশ্বর অভিযান ও তিস্তা বুড়ি পূজাটাকে ঠেকাতে চায়। সুতরাং উদ্বোধন-টুদ্বোধন নিয়ে ভেবো না। তোমরা, কাঠের মিস্ত্রির হাতুড়ি ঠোকার আওয়াজে বীরেনবাবু থেমে যান। নকুল সেদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, এই থামাও ত তোমাদের হাতুড়ি। হাতুড়ির আওয়াজ থামলে বীরেনবাবু বলেন, আগে ফাংশনের ও কনফারেন্সের যারা রিয়্যাল লিডার তারা বসো, পারলে আজ রাতেই, আবার ওখানেও বসতে পারো। অন্তত, যে-কজন অ্যাভেইলেবল। তারপর তোমাদের তের জনের ও উত্তরখণ্ডের এক্সিকিউটিভ কমিটির একটা জয়েন্ট মিটিং করতে হবে-কাল বিকেলেই। সেখানে ফর্মাল প্রস্তাব নিতে হবেনা-হলে যারা ঐ মিটিঙে যাবে তারা বলবেটা কী?
নকুল হঠাৎ হাত জোড় করে উটকো হয়ে বসে পড়ে, কাকা, আমাকে ছেড়ে দেন। এই মিটিং-মুটিং প্রস্তাব-ট্রস্তাব শুনলে আমার মাথা ঘোরে। আমি চললাম। যা টাকা এর মধ্যে দিয়েছি তা ফেরৎ চাই না–ও আমি একটা টেন্ডার পেলে সরকারের কাছ থেকে দশগুণ উশুল করে নেব। কিন্তু এ আমি পারব না কাকা। এলাম, একটু ফুর্তি করতে, আর এ ত শালা ফেঁসে যাচ্ছি মিটিঙে।
বীরেনবাবু চুপ করে থাকলেন। প্যান্ডেলের অন্যান্য জায়গায় আরো দু-চারজন যারা ছিল, তারা, হাতুড়ির আওয়াজ থামার পরে নকুলের চেঁচামেচি শুনে এগিয়ে আসে। নবীন দূর থেকেই বলে, কী। হইল? নকুলদা নিজেই যাত্রা ধরিলেন নাকি?
এবার নকুল দাঁড়িয়ে তাদের দিকে ফিরে বলে, এই ত ভাই, তোমরা আছ–উত্তরখণ্ড-শ্রীদেবী যা-ইচ্ছে বুঝে নাও, আমাকে ছাড়ো ভাই, আমার সাধ মিটে গেছে।
ততক্ষণে ওরা এদের কাছে পৌঁছে গেছে। কী হল আর জিজ্ঞাসার দরকার হয় না। কিন্তু বীরেনবাবু কোনো কথা না বলায় নকুলকেই বলতে হয়–পরশুদিন জলপাইগুড়ির সার্কিট হাউসে মন্ত্রীরা মিটিং ডেকেছে, উত্তরখণ্ড আর এই ফাংশন নিয়ে কথা বলতে হবে। সবাইকে যেতে হবে।
নবীনের পাশে ছিল তিলক। সে জিজ্ঞাসা করে, কী কথা হবে?
কী আর কথা হবে। গবমেন্ট চায় না উত্তরখণ্ড হোক, কিন্তু চায় শ্রীদেবী হোক।
বীরেনবাবু মুখটা তোলেন কিছু বলতে কিন্তু তার আগেই তিলক বলে ওঠে, সে ত ভালই। কাইল কাগজে একখান বিজ্ঞাপন ছাড়েন যে সরকারের নির্দেশে শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান বাতিল করা হইল। আমাদের কোনো কারণ জানানো হয় নাই। যাহারা কারণ জানিতে চান তাহারা মন্ত্রীদের কাছে যান–তা হলেই লোকে মন্ত্রীদের শ্রীদেবীর নাচ নাচাইয়ে ছাড়বে–একেবারে মিস্টার ইন্ডিয়া। তাতে সামান্য যে সমবেত হাসি ওঠে তাতেও তিলকের কথার নিহিত রাগ চাপা পড়ে না। কিন্তু তিলকের কথা শোনামাত্র বীরেনবাবু তিলকের মুখের দিকে তাকাল। যেন, তিনি যাচাই করতে বলে এরকম একটা বিকল্প দেয়ার বাস্ততটা কতটা?
তাতে বীরেনবাবু হাত তোলেন, সকলে একটু কাছে আসে। বীরেনবাবু সোজা তাকিয়ে তার নিম্নস্বরে বলতে থাকেন, শোনো, পরশুদিন সকালে মিটিং, মন্ত্রীরা থাকবেন, মিটিঙে তারা নিশ্চয়ই নির্দিষ্ট প্রস্তাব দেবেন, তোমাদের সেই প্রস্তাবের জবাবে নির্দিষ্ট কথা বলতে হবে, হ্যাঁ কি না, বা নির্দিষ্ট প্রস্তাব দিতে হবে। সেটা তোমাদের নিজেদের মিটিং করে লিখিত প্রস্তাব নিতে হবে যে এই প্যান্ডেলে উত্তরখণ্ড সম্মিলন করতে দিতে সরকার যদি আপত্তি করে তা হলে শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান, মানে কালচারাল ফাংশন, হবে কি হবে না। এক-একজন এক-এক মত দিলে হবে না। ঐ মিটিঙেও এক-একজন এক-এক রকম কথা বললে হবে না। এখন একটা লিস্ট করে যাদের-যাদের পার, খবর দিয়ে দাও।
নকুল নবীনকে বলে, এই, লিস্ট বানাও, নবীন।
নবীন বীরেনবারুকে বলে, কাকা, আমরা যদি মিটিঙত না যাই কী হয়?
বীরেনবাবু মুখ তুলে নবীনকে দেখেন–যেন, তিনি যাচাই করতে চান এরকম একটা বিকল্পের বাস্তবতা কতটা?
নবীন বলে যায়, কী করিবে? পুলিশ আসি উত্তরখণ্ডক বাধা দিবে আর শ্রীদেবীকে ছাড়ি দিবে–তা কেমন করি করিবে? আর যদি গ্রেপ্তার করে, ত করুক। আমরা গ্রেপ্তার হন।
বীরেনবাবু হঠাৎ উঠে দাঁড়ান, তোমরা তা হলে লিস্ট বানিয়ে খবর দাও। আর এদেরও মিটিঙে আসতে বলল, কথাটা নকুলকেই বললেন তিনি, তোমরা রাত্রিতে আমার বাড়িতে এসো, কী হল শুনব। নকুল পাশে-পাশে হাঁটে, অন্যরা পেছনে-পেছনে। বীরেনবাবু হঠাৎ দাঁড়িয়ে নকুলকে বলেন, তোমাদের তের জন পার্টনারের মধ্যে কারো এটা বলা ঠিক হবে না কিন্তু নকুল, যে, উত্তরখণ্ড শেষ দিনের জল্পেশ্বর অভিযান আলাদা জায়গায় নিয়ে যাক।
নকুল একটু চুপ করে থাকে, যেন সে বীরেনবাবুকে আভাসে জানাতে চায় সেরকম কেউ-কেউ ভাবতেও পারে। কিন্তু নীরবতাটা ভেঙে সে বলে, সে আগে হলে না হয় ভাবা যেত, থানার মিটিঙো হলে কথা ছিল। কিন্তু এখন হলে ত মনে হবে সরকার জোর করে উত্তরখণ্ডকে শাস্তি দিচ্ছে আর আমরা, তার সুযোগ করে দিলাম। সবাই সব জায়গায় একসঙ্গে কাজ করছে কে উত্তরখণ্ড আর কে শ্রীদেবী তা কে ঠিক করবে? আর তা হয় কী করে কাকা, এখন আর তা হয় না।
উত্তরখণ্ডের ফাংশনের আলোচনা–দুই
বীরেনবাবুর বাড়িতে রাত সাড়ে নটা নাগাদ নকুল, জগদীশ, সুরেন, নবীন, তিলক, তরণীবাবু আসতে পারলেন।
বীরেনবাবু মাঝের ঘরটাই তার কাছারি ঘর। সে-ঘরে ওকালতির কাগজপত্রে ভর্তি টেবিলের সামনে গোটা চারেক কাঠের চেয়ার, আর এক পাশে একটা লম্বা কাঠের বেঞ্চি–হেলান দেয়া ও হ্যান্ডেলওয়ালা। বীরেনবাবু আলো জ্বেলে পড়ছিলেন, এরা ঘরে ঢোকার পরও চোখ তোলেন না। কিন্তু চেয়ার-বেঞ্চে এরা বসে যাবার পর বইটার ভেতরে একস্টা কাগজ দিয়ে পাশে সরিয়ে রেখে তিনি বেঞ্চ ও চেয়ারে যারা বসে আছে তাদের সবাইকে দেখে নেন।
নকুল বলল, বেণীবাবুর শরীরটা খারাপ বলে আসতে পারলেন না, কাল প্যান্ডেলের মিটিঙে নিশ্চয়ই আসবেন।
বীরেনবাবু কোনো কথা বলেন না, সামনে তাকিয়ে থাকেন।
সুরেন বলল, বীরেনকাকা, এখন এত রাতে আপনাকেও ত বেশিক্ষণ বসিয়ে রাখা যাবে না। আমরা মেটামুটি কথাবার্তা বলতে বলতে এলাম। একটা জিনিশ আমরা ঠিক করেছি–উত্তরখণ্ড সম্মিলন আর আমাদের অনুষ্ঠানটাকে যদি আলাদা করে চায় আমরা তাতে রাজি হব না।
কথাটা শুনে বীরেনবাবু আবার সকলের মুখ দেখেন যেন যাচাই করতে যে যারা এসেছে তাদের মধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা ক-জন, আছেন। সম্মিলন আর অনুষ্ঠানকে আলাদা করার ব্যাপারে অনুষ্ঠানেই যারা টাকা খাঁটিয়েছে তাদের সমর্থন থাকতে পারে কিন্তু উত্তরখণ্ডী কারো সমর্থন ত থাকবে না। বীরেনবাবু এটাতে আশ্বস্ত হন যে যারা এসেছে অনুষ্ঠানের সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক বেশি।
সুস্থিরকে ত দেখছি না, বীরেনবাবু জিজ্ঞাসা করেন।
ও ত সম্মিলনের কাজেই সব জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাতেই ফিরে আসবে। কালকের মিটিঙে থাকবে। নকুল জানায়।
রামকিশোরের ময়নাগুড়ি বাজারে ব্যবসা আছে। সে বলল, স্যার, আমরা একটা কথা ভাবছিলাম। এই সরকারের মিটিঙে যদি বিলকুল সব লোগ আমরা গিয়ে হাজির হই ত কাজের কথা কেইসে হবে। আর আমরা ব্যবসায়ী লোগ। এই সব পাটিটাটির মিটিঙে গেলে কে গুসা হবে, কে খুশ হবে–আমাদের এই সব করা চবে না। আমাদের ছেড়ে দেন স্যার।
বীরেনবাবু কথাগুলো শুনছিলেন টেবিলের দিকে তাকিয়ে। শেষ কথাটা শোনার পর চোখ তুলে রামকিশোরকে দেখেন, তুমি ত ঐ তেরজন পার্টনারের মধ্যে নেই।
না স্যার, তা নাই, লেকিন কমিটিতে আছি।
মানে, তুমি কমিটি ছেড়ে দিতে চাচ্ছ?
না, না, স্যার, কমিটিতে আমি থাকব, আছি রামকিশোর তাড়াতাড়ি বলে। তাকে থামিয়ে দিয়ে তরণীবাবু বলে ওঠেন, আমরা বলছিলাম বীরেনদা, আমরা যেমন আছি, থাকব, আপনারা যা ঠিক করবেন আমরা তাই মেনে নেব, আপনারা যে মিটিং-টিটিং ডাকবেন তাতেও থাকব, মানে যেমন ছিলাম থাকব। কিন্তু এই সরকারি মিটিঙে আমরা যেতে চাই না। আমরা ত কথাও বলতে পারব না, মাঝখান থেকে ভিড় বাড়বে আর ঐসব পার্টির লোকজন আমাদের ওপর খেপবে। আমাদের ত ব্যবসা করেই খেতে হয়।
ময়নাগুড়ি বাজারে তরণীবাবুর বড় সাইকেলের দোকান। আরো নানা রকম জিনিশের এজেন্সি আছে। তরণীবাবুর কথা শুনে বীরেনবাবু রঘুনাথের দিকে তাকান–তারও দোকান আছে, তারও নিশ্চয়ই একই মত।
কাকা, আমরা কথা বলে এটা বুঝে গেছি যে সরকারের প্রস্তাবে কেউ রাজি হবে না, কেউ ভয়ও পাবে না। আমাদের তের জন পার্টনারের পাঁচজনকে আপনি কোনো সময়েই পাবেন না। তারা টাকা দিয়ে খালাশ আর টাকা পেলেই খুশি। আর, ঐ পঁচজনের কেউ-কেউ কেটেও পড়তে পারে হাঙ্গামার ভয়ে। কিন্তু সেসব দু-একজনের জন্যে ত আর আমরা পেছিয়ে যেতে পারি না। তাই আপনি বরং ঠিক করুন কাকে কাকে নিয়ে ঐ মিটিঙে যাবেন, নকুল বলে।
তোমাদের তেরজনকেই কিন্তু মিটিঙে ডেকেছে। আমাকে সেক্রেটারি হিশেবে চিঠি দিয়েছে। ঐ তেরজনকে খবর দিয়ে এই চিঠিতে তাদের সই নিয়ে রাখবে। কিন্তু ঐ তেরজনকে মিটিঙে অন্তত একবার মুখ দেখাতে হবে। সেটা দেখো তোমরা। আর উত্তরখণ্ডের পক্ষে যারা ভাল করে কথা বলতে পারবে শুধু তাদের পাঠাও, বীরেনবাবু বলেন।
আমিও সেই বলছিলাম কাকা, জগদীশ বলে, তা হলে, আপনি ত আছেনই, কিন্তু আপনি একা-একা কত কথা কহিবেন। স্যালায় জুনিয়ার উকিল দুই-একটা যদি নিগি যাওয়া যায় ত ভাল হয়। জুনিয়াররা চিল্লামিল্লি করিবার পারিবে–আপনি শ্যাষ কথাটা কহি দিবেন।
নকুল হেসে উঠে বলে, আরে কাকার ত মুখ তুলতে হবে, হাত তুলতে হবে, গলা পরিষ্কার করতে হবে–তার পরে কথাটা বলবেন। তার মধ্যে ত সরকারি পার্টির লোকরা জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ করে দেবে। সকলে হেসে ওঠে। একটু মৃদু হেসে বীরেনবাবু বলেন, তোমরা কি কারো কথা ভেবেছ? রাজি হবে?
ভাবছিলাম দেবনাথ মাস্টারের কথা আর শিলিগুড়ির উমা উকিলের কথা, নকুল বলে বীরেনবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে। বীরেনবাবু একটু ভাবেন। তারপর চোখটা নামিয়ে বলেন, ওরা রাজি হবে?
শুনে ওরা চুপ করে থাকে।
বীরেনবাবু যোগ করেন, দেবনাথ উপস্থিত থাকলে খুব ভাল হয়। রাজবংশী সমাজের একমাত্র পি-এইচ-ডি। কিন্তু সে ত ইউনিভার্সিটিতে চাকরির চেষ্টা করছে, সে কি এ-সবে জড়িয়ে পড়তে চাইবে? আর উমাপদও খুব ভাল কিন্তু ওরা ত কংগ্রেসের ছিল।
কংগ্রেস ত কাকা, উত্তরখণ্ডের বেশির ভাগই। জগদীশ বলে।
না, কিন্তু তাদের ত সবাই চেনে না। উমাপদ শিলিগুড়ি কোর্টে অনেক দিন ধরে প্র্যাকটিশ করছে। এখন সরকার যদি প্রমাণ করে দেয় যে উত্তরখণ্ডের পেছনে কংগ্রেস আছে তা হলে ত সেটা এমন প্রচার করবে যে তোমরা আর কথা বলতে পারবে না। বীরেনবাবুর কথার পরে সবাই চুপ করে থাকে।
বীরেনবাবু আবার বলেন, কিন্তু তোমরা এটা ভাল ভেবেছ। এক কাজ করো, দেবনাথকে রাজি করাও, তাকে কোনো কথা বলতে হবে না। কিন্তু আমরা দরকার হলে তার কথা বলব। বীরেনবাবু একটু থেমে যান, তারপর বলেন, দেবনাথকে বলো, এতে তার চাকরির সুবিধেই হবে। আর কোচবিহারের সন্তোষকে আনো।
সন্তোষ মানে সন্তোষ মোক্তার? সুরেন জিজ্ঞাসা করে।
এখন এ্যাডভোকেট। কিন্তু সন্তোষের সঙ্গে তোমাদের কি আগে কথাবার্তা হয় নি? আমি ত যতদূর জানি ও এব্যাপারে সাপোর্টই করবে। সন্তোষ যদি সবটা না জানে, তা হলে ও রাজি নাও হতে পারে। ও এলে তোমরা যেটা চাইছ সেটা খুব ভাল হত–খুব স্ট্রংলি আরগু করতে পারত। তোমরা কালই চলে যাও। আমার নাম করে বলো। ওকে আনো। বীরেনবাবু থেমে যান। সবাই একটু চুপচাপ থাকে। তারপর তরণীবাবু বলেন, যেন বসে আছেন বলেই বলেন, নইলে বলতেন না–একটা কিছু উপায় ভেবে গেলে হত না?
উপায় মানে? সুরেন জিজ্ঞাসা করে।
ধরেন, সরকার বলল–উত্তরখণ্ড করা চলবে না আর আপনারা বললেন উত্তরখণ্ড আর ফাংশন দুটোই করতে হবে এতে ত আর সমাধান হবে না। আমি বলছিলাম–শেষদিনের মিছিলটা শুরু হওয়ার জায়গাটা যদি বদলাতে রাজি থাকেন তা হলে সরকার হয়ত আর-কিছু বলতে পারবে না, মানে ইচ্ছে থাকলেও বলতে পারবে না।
মিছিল মানে জল্পেশ্বর অভিযান? তিলক জিজ্ঞাসা করে।
হ্যাঁ, তরণীবাবু বলেন।
মানে, মিছিল হবে না? তিলক জিজ্ঞাসা করে।
না, না, মিছিল হবে। ধরেন, আপনারা রাজি হলেন যে ঐ শ্রীদেবীর নাচ থেকে মিছিল বের না হয়ে চৌপত্তি থেকে হবে, তাতে ত আর-কোনো ক্ষতি নেই। তরণীবাবু বলেন।
সে রকম আপোশের কথা ভাবতে হবে বৈকি। তা হলে তোমরা এসো, কালকে ঘোরাঘুরি করে কী হয় জানিও, বীরেনবাবু উঠে দাঁড়ান।
.
জলপাইগুড়ি সার্কিট হাউসে মিটিঙের ঘরটা খুব ছোট। আসলে এটা মিটিঙের ঘরই নয়, খাওয়ার ঘর। একটা ছোট্ট পার্টিশন দিয়ে বসার জায়গা আলাদা করা। সেই ইংরেজ আমলে টুরে আসা গরমেন্ট অফিসারদের জন্যে এরকম বাংলো ধরনের সার্কিট হাউসটা তৈরি হয়েছিল। জলপাইগুড়ি শহর জেলার সদর, তদুপুরি কমিশনার জলপাইগুড়িতেই থাকেন। সুতরাং জেলার অফিসারদের টুরে আসার। কোনো সুযোগই ছিল না। এক আসতেন কলকাতা থেকে গবর্মেন্টের সবচেয়ে বড় কর্তারা। অন্য জেলা থেকে অফিসাররা কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে বা জেলা কোর্টে সাক্ষী দিতে আসতেন। ভারতীয় অফিসাররা স্বাধীনতার আগে এই সার্কিট হাউসে বোধ হয় খুব একটা উঠতেন না–তাঁরা বরং স্টেশনের কাছে ডাকবাংলোটা পছন্দ করতেন। সার্কিট হাউস প্রধানত ছিল সাহেবদেরই জন্যে। সাহেবদের কথা ভেবেই জায়গাটা বাছা হয়েছিল। এখন এই রাস্তার পুবে, তিস্তার পাড়ে কমিশনারের, ডিস্ট্রিক্ট জজের, ডেপুটি কমিশনারের ও ডিভিশন্যাল ফরেস্ট অফিসারের বিরাট-বিরাট বাংলো–লাল ইট, ঢালু ছাদ আর বিঘে-বিঘে বাগান। রাস্তার পশ্চিমে বিরাট জামবাগানের মাঠ, তার পাশে করলা নদী। এই করলা নদীর পাড়ে, জামবাগানের মাঠের দক্ষিণ সীমায়, একতলা ছিমছাম এই একটেরে সার্কিট হাউস।
এর স্থাপত্যও বাংলোগুলো থেকে আলাদা। তিনদিকে–সামনে, বয়ে ও ডাইনে চওড়া বারান্দা, খিলান দেয়া। নিচু মেঝে–এতটা নিচু মেঝে এদিকে দেখাই যায় না। সামনের বারান্দা দিয়ে ঢুকে বসার জায়গা আর পার্টিশন দিয়ে ভাগ করা খাবার জায়গা। সেই ঘরটার দিকে মুখ করে পেছনে তিনটি মাত্র বড় শোয়ার ঘর। খিলানের সঙ্গে মিল রেখেই, ছাদটা একঢালাইয়ের নয়, বারান্দাগুলোর ওপর একটা ছাদ আর তার এক ধাপ ওপরে ঘরগুলোর ওপর আর-একটা ছাদ। ওপরের ছাদের মাঝখান দিয়ে একটা চিমনির বাধানো নল। সেটা এখন আর কোনো কাজে আসে না–শীত কমেছে বলে নয়, শীতে কাঠের আগুন জালানোর লোক আর-নেই বলে। কিন্তু রাস্তার বিপরীতের বাংলোগুলো ও এই সার্কিট হাউসের সারিতেই পরে, কোর্ট বিল্ডিঙের ইন্ডিয়ান রেড রঙের বিপরীতে এই ছিমছাম বাড়িটির আবছা হলদে রঙ এখনো যখন ফেরানো হয়, তখন এই চিমনির রঙও বদলায়।
সার্কিট হাউস এখনো সার্কিট হাউসই। মন্ত্রীরা, বড়বড় অফিসাররাত এখানে এসে ওঠেন। কিন্তু মন্ত্রীদের আসার সুবাদেই সার্কিট হাউসের ব্যবহার একটু বদলেছেও। মন্ত্রীদের সঙ্গে মিটিঙগুলো সার্কিট হাউসেই হয়–সে-মিটিং অফিসারদের সঙ্গেও হতে পারে, তা সর্বদলীয় মিটিঙও হতে পারে। মিটিঙের জন্যে কোনো হল না থাকায় খাওয়ার জায়গায়, খাওয়ার লম্বা টেবিলটাকে ঘিরেই মিটিং বসে। অনেক সময়ই তাতে জায়গা কুলোয় না–তখন দ্বিতীয় সারি চেয়ার সাজাতে হয়। কিন্তু এই খাবার ঘরটার টেবিল ও এক সারি চেয়ারের পেছনে দ্বিতীয় সারি চেয়ার সাজালে নড়াচড়ার আর-জাগয়া থাকে না। ভেতর থেকে কেউ বাইরে বেরতে গেলে স্টিলের চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ার ভাজ করে জায়গা দিতে হয়। তাই বেশির ভাগ সময়ই তেমন বড় মিটিঙের ভিড়টা ঘর থেকে বারান্দায় উপছে আসে। বারান্দার দরজায় লোজন ভিড় করে থাকে। তা ছাড়াও বসার জায়গা ও খাওয়ার জায়গাটা ভাগ করে যে-পার্টিশন আছে, সেই পার্টিশনের কাছেও লোকে ভিড় করে আসে।
সেদিনের মিটিঙে ভিড় অতটা হয় নি কারণ বিষয়টা শহর নিয়ে নয়, ময়নাগুড়ি নিয়ে। কিন্তু শ্রীদেবীর ফাংশন বাতিল হতে পারে এরকম একটা কথা মাত্র একদিনের মধ্যে জলপাইগুড়ি শহরে সামান্য একটু রটেছিল। ফলে, ব্যাপারটা কী জানতে কেউ-কেউ এসেছিল। কিন্তু মিটিঙের ভেতরে যাবে না অথচ মিটিঙে কী হচ্ছে সে ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ময়নাগুড়ির লোকজন অনেকেই চলে এসেছে। যারা এসেছে তাদের মধ্যে এই উত্তরখণ্ড সম্মেলন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নানা ধরনের কর্মী ত আছেই, তা ছাড়াও যারা টিকিট কিনেছে–ফাংশন দেখতে যাবে, তাদেরও একটা বড় অংশ আছে।
কর্মীদের মধ্যে যারা মিটিঙে ঢুকতে পারে নি তারাই যে শুধু বাইরে আছে, তা নয়। এমন অনেকেই বাইরে বারান্দায় ঘোরাফেরা করছে বা বারান্দার কিনারে মাটিতে পা ঝুলিয়ে বসে আছে, যারা এই সম্মেলন অনুষ্ঠানের কর্মকর্তা ও তাদের সঙ্গে আলোচনার জন্যেই এই মিটিঙ ডাকা হয়েছে। কিন্তু এই কর্মকর্তারা যেন মিটিঙের দায়িত্ব অন্যদের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজেরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে–মামলা-মোকদ্দমার সময় যেমন এজলাশের বাইরে থাকে, উকিল-মোক্তাররা ভেতরে মামলা লড়ে।
যারা বাইরে বসে ছিল ও ঘোরাঘুরি করছিল, তাদের চোখের ওপর দিয়েই সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের পোস্টারমারা বাস কোর্টের দিকে যাচ্ছিল, কোর্ট থেকে ফিরছিল। এমন-কি, একটা মিনি বাসের পেছনে মিস্টার ইন্ডিয়া ফিল্মে শ্রীদেবীর একটা নীচের রঙিন ছবি টাঙানো।
জলপাইগুড়ির এম-এল-এ আর কোচবিহারের নাটাবাড়ির এম-এল-এ মন্ত্রী। ডুয়ার্সের আর-এক এম-এল-এ বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী। এদের কাউকে বাইরে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু ময়নাগুড়ির এম-এল-এ বাইরে এসে অনেকের সঙ্গেই কথা বলছিলেন। এম-এল-এ যখন প্রথম বাইরে এসেছিলেন তখন তার হাতে একজন নিজের কাজের কথা বলেই তিনটি কাগজ ধরিয়ে দেয়। সেই কাগজগুলি পাকিয়ে এম-এল-এ ডানমুঠোতে আলগা করে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু সেই ডান হাতটাই তিনি এত নাড়াচ্ছিলেন কখনো মাথার পেছনে নিয়ে যাচ্ছিলেন, কখনো কারো পিঠে আলতো করে রাখছিলেন, কখনো কাউকে ছোট কিল মারছিলেন যে মনে হচ্ছিল, ঐ কাগজগুলো পাকিয়ে হাতের মুঠোয় না রাখলে তিনি হাতটা অত ব্যবহার করতে পারতেন না। এম-এল-এর জামাকাপড়ের রঙটা আধ-ময়লা, গলায় একটা চাদর জড়ানো। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, এ-মিটিঙের সঙ্গে তার সম্পর্ক সবচেয়ে দূরের। অথচ আসলে, এ-মিটিঙের সঙ্গে তার সম্পর্ক দুদিক থেকে নিবিড়। ঘটনাটা ঘটছে ময়নাগুড়িতে। সুতরাং সরকার পক্ষের আশা, যে, তিনি আগে কথাবার্তা বলে কোনো সমাধান ঠিক করে রাখবেন। আবার, অনুষ্ঠানকর্তাদেরও আশা যে তিনি একটা উপায় বালাতে পারবেন। কিন্তু এম-এল-এর কথাবার্তায় ও চলনবলনে কোনো উদ্বেগই ধরা পড়ছিল না।
এম-এল-এ বারান্দার ওপরে কিন্তু সিঁড়ির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলেন, ফলে সবাই তাকে ঘিরেই গোল হয়ে কথা বলছিল। এম-এল-এ একটি পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ছেলের কাঁধে হাত দিয়ে তাকে বলেন, এ ক্যানং কথা কহিছিস তুই? উত্তরখণ্ড পার্টি করিবারও ধরবু আবার মোর পার্টিও করিবার ধরব? ছেলেটা হেসে বলে, কেনে ধরবু না, কহেন?
বোঝা যায় এরা একটু রসিকতা করেই রাজবংশী ভাষায় পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছে।
এম-এল-এ হেসে উঠে বলেন, মোক ধাঁধা ধইচছিস? টিভির কুইজ? আচ্ছা, মুই তোক ধরছু, তুই ককেনে। হামরালার কমিউনিস্ট পার্টি চাহে এই সারা দুনিয়ার বদল, আর তোর এই উত্তরখণ্ডটা চাহে এই তোর তিস্তা পারের বদল। ত, দুনিয়াটা বদলি গেলে ত তিস্তাপারটাও বদলিবে। কিন্তু তিস্তাপারটা বদলি গেলে কি দুনিয়াটা বদলিবে, ক কেনে, ক।
ছেলেটি দুটো হাত মুখের কাছে এনে একটু-একটু হাসছিল। তার হাসির লজ্জায় অথচ তার সপ্রতিভার ঔজ্জ্বল্যে তাকে খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। কোথায় যেন একটা মিল ছিল–ঐ এম-এল-এর জামাকাপড়ের মলিনতা আর পরিশ্রমী শরীরের স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে এই যুবকের সৌন্দর্যের। কিন্তু কোথাও একটা অমিলও যেন ছিল–এম-এল-এর মুখমণ্ডলের নিশ্চয়তাবোধের সঙ্গে এই যুবকের সলজ্জ অনিশ্চয়তাবোধের। এমএল-এর কথার শেষে একটু হাসির গমক ওঠে। সেটা শেষ হয়ে গেলে, যুবকটি বলে ওঠে, সেই তানে ত দুনিয়া বদলিবার কাজে লালঝাণ্ডা করি তোমাক এম-এল-এ বানাছু, আর উত্তরবঙ্গের কাজে উত্তরখণ্ড পাকড়িছু। একথায় হাসিটা আরো বেড়ে যায়–এম-এল-এ ছেলেটির কাধ থেকে হাত নামিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে তার পেছনে একটা ঘুসি মারেন। যুবকটি নাচের ভঙ্গিতে সরে যায়। ভিড়টা বদলে যায়।
পেছন থেকে একজন এগিয়ে এসে বলে, হে হেমেন দাদা, আজেবাজে কথা বাদ দাও। এই ফাংশন বাতিল করা ধরিলে কিন্তুক কুরুক্ষেত্র হবা ধরিবে। একখান বুদ্ধি করেন।
এম-এল-এ হেমেনদা হেসে বলেন, আরে, কুরুক্ষেত্ৰখান বন্ধ করিবার তানেই ত মিটিংখা ডাকাছি। তা তোমরালা করিছেন উত্তরখণ্ড আর আনিবার ধইচছেন সেই বোম্বাইঠে শ্রীদেবীক।
স্যালায় আবার মাদ্রাজের বেটিছোঁয়া। এ ক্যানং উত্তরখণ্ড তোমরালার-ময়নাগুড়ি-মাদ্রাজ-বোম্বাই?
পেছন থেকে একটা লুকনো গলা শোনা যায়, তোমরালা যা শিখাছেন–দুনিয়ার মজদুর এক হো।
কায় রে? বলে এমএল-এ সমবেত হাসির মধ্যে মাথা নিচু করে লুকনো গলাটিকে খোঁজেন।
এই কায় রে? যে প্রথম কথাটা তুলেছিল সে ঘাড় ঘুরিয়ে ধমক দিয়ে আবার এম-এল-একে বলে, এখন আপনি মিটিঙের আগত একখান বুদ্ধি করি দেন, তারপর মিটিঙে যান।
বুদ্ধি আর আমারঠে কোটত। কংগ্রেসের তামান মানষিলা ত উত্তরখণ্ড করিবার ধরিছেন। য্যালায় বুঝি গেইছে পশ্চিমবঙ্গত আর কংগ্রেসের সরকার হওয়ার কুনো আশা নাই, স্যালায় এইঠে উত্তরখণ্ড বানি, ঐঠে গোখাল্যান্ড বানি, ঐঠে ঝাড়খণ্ড বানি বামফ্রন্টের সরকারক বাশ দিবার ধইচছে। বুদ্ধি ন্যান কেনে কংগ্রেসের দেউনিয়ারঠে। হামারঠে বুদ্ধি কোটত? এম-এল-এ হাসতে-হাসতেই কথা শুরু করেছিলেন, কিন্তু কথাটা শেষ করেন একটু রাগ মিশিয়েই। যে-লোকটি কথা শুরু করেছিল, সে বলে–আচ্ছা ধরেন কেনে, কংগ্রেসই সম্মিলনও করিছে, শ্রীদেবীকও নাচাছে। স্যালায় ত তোমরালা কিছু করিতেন না। এই হেমেনদা, একখান বুদ্ধি করো।
ঘরের ভেতর থেকে ডাক আসে, হেমেন, এসো।
এতক্ষণ পর্যটনমন্ত্রী তৈরি হচ্ছিলেন। সকালে তৈরি হতে ওঁর কিছুটা সময় লাগে। তার ডাক আসতেই এম-এল-এ ঘরের দিকে ঘোরেন, ভিড়টা ছড়িয়ে যায়, অনেকে এম-এল-এর সঙ্গে-সঙ্গেই ঘরের ভেতরে ঢোকে। কেউ-কেউ আবার বারান্দা থেকে মাঠে নেমে যায়। দু-একজন মিটিঙের ঘরের জানলার কাছে দাঁড়ায়।
.
টেবিলটা ঘিরে সকলের বসতে একটু সময় যায়। ডেপুটি কমিশনার, এ্যাডিশন্যাল ডি-সি, এ্যাডিশন্যাল এস-পি, সদর এস-ডি-ও, ডি-এস-পি, এরা বসার জায়গার সোফাতে, ও ময়নাগুড়ির ও-সি, ভেতরে যাবার দরজার পাশে একটা কাঠের চেয়ারে বসে ছিলেন। পর্যটনমন্ত্রী বেরন নি বলে মিটিঙটা শুরু হচ্ছিল না বটে কিন্তু তার আগেই শিল্পমন্ত্রী বেরিয়ে এসে, কই, সুবিমলদার হল, বলে দাঁড়াতেই অফিসাররা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শিল্পমন্ত্রী তাঁদের বসুন বললেও তাঁরা বসেন না। কিন্তু তার লোকজন তাকে খাবার জায়গার ওদিকে মিটিঙের জায়গার দিকে ডেকে নিয়ে যেতেই অফিসাররা আবার বসে পড়েন। এর কিছুক্ষণ পর বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী বেরিয়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে একটু এদিক-ওদিক তাকান। ময়নাগুড়ি থানার ওসি দাঁড়িয়ে পড়েন। একটু পরে এস-ডি-ও। কিন্তু ডি-সি আর এ-ডি-সি ওঠার ভঙ্গিমাত্র করেন।
কিছু একটা মনে পড়ায় এস-ডি-ও, তাঁর কাছে গিয়ে বলেন, স্যার, এটা একেবারেই অন্য মিটিঙ বলে ডি-এফ-ও আসেন নি। কিন্তু উনি ওঁর অফিসে আছেন। আপনার সময় হলে বলবেন। আমি ওঁকে ফোন করে দেব।
সময় ত আপনাদের হাতে। মিটিঙ যখন শেষ করবেন, তখন। আচ্ছা, বলে তিনি আবার ভেতরে চলে যান।
আরো কিছুক্ষণ পর পর্যটনমন্ত্রী বেরন। ওঁর একটু হাঁফানির কষ্ট আছে। খুব পাতলা ধুতির ওপর মোটা গরম পাঞ্জাবি, তার ওপর শাদা গরম চাদর-তুষ। তবু যেন মুখচোখ একটু ফোলা ফোলা লাগছিল! তিনি এসে দাঁড়াতেই সবাই উঠে দাঁড়ান, অফিসাররা বেরিয়ে আসেন, এবার মিটিং শুরু হবে। পর্যটনমন্ত্রী মিটিঙের জায়গার দিকে যেতে গিয়ে ঘুরে জিজ্ঞাসা করেন, হেমেন কোথায়? তারই ত ব্যাপার।
এস-ডি-ও বলেন, উনি বাইরেই আছেন স্যার।
পর্যটনমন্ত্রী বাইরের দরজার দিকে দুপা গিয়ে জোরে ডাকেন, হেমেন, এসো। তারপর তিনি মিটিঙের জায়গায় গিয়ে টেবিলের মাথার চেয়ারটিতে বসে পড়েন। তার পেছনে-পেছনে অফিসাররা এসে পর্যটনমন্ত্রীর বা দিকের চেয়ারগুলোতে বসেন–একটা চেয়ার শিল্পমন্ত্রীর জন্যে খালি রেখে। প্রথমে ডি-সি, তারপর এ-ডি-সি, এ-ডি-সির পাশে এ-এস-পি, তার পাশে এস-ডি-ও, ডি-এস-পি। ময়নাগুড়ি থানার ওসি, ডি-এস-পিকে জিজ্ঞাসা করেন, স্যার, আমি তাহলে ওদিকে অপেক্ষা করি, দরকার হলে ডাকবেন।
না, না, আপনাকেই ত ব্রিফ করতে হবে, এখানে বসুন বলে নিজের পাশের চেয়ারটি দেখান। ও-সি চেয়ারটা একটু সরিয়ে ভেতরে ঢোকেন, আরো একটু সরিয়ে বসেন। কিন্তু চেয়ারটা টেবিলের প্রায় শেষ প্রান্তে বলে বোঝা যায় না তিনি চেয়ারটা একটু সরিয়ে বসলেন। মনে হতে পারে, তিনি পর্যটনমন্ত্রীর মুখোমুখি হওয়ার জন্যে একটু কোনাচে হলেন মাত্র।
এরা সব বসতে বসতেই বাইরে যারা ছিল, তারা ভেতরে ঢুকতে থাকেন। শিল্পমন্ত্রী ঢোকেন। শিল্পমন্ত্রী জলপাইগুড়ির এম-এল-এ। তাঁকে অফিসারদের পেছন দিয়ে এসে টেবিলের মাথায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়। তিনি দেখেন, তার জন্যে একটা চেয়ার খালি রাখা হয়েছে। সে-চেয়ারটাকে টেনে তিনি একটু সরিয়ে এনে টেবিল থেকে একটু দূরে কিন্তু পর্যটনমন্ত্রীর প্রায় পাশে নিয়ে যান। তাতে ওদিক দিয়ে যাতায়াতের একটু অসুবিধা হবে কিন্তু তিনি ওখানেই বসে পড়েন। সাধারণত রীতি আছে, জেলায় এ-ধরনের মিটিঙে জেলার কেবিনেট মন্ত্রী কেউ থাকলে তিনিই সভাপতিত্ব করেন। শিল্পমন্ত্রীরই সেক্ষেত্রে সভাপতিত্ব করার কথা। কিন্তু সুবিমলবাবু যে-কোনো মিটিঙেই প্রধান আসনটিতে গিয়ে বসেন। সেটা তার বয়সের জন্যেও বটে আবার হয়ত পার্টির সুবাদেও অনেকটা। অবিশ্যি এক্ষেত্রে ত আর সভাপতির নাম কেউ প্রস্তাব করে না। বিবরণ যদি লেখা হয়, তাতে মন্ত্রীদের নাম পরপর থাকবে। কিন্তু তবু সভা পরিচালনার একটা নিয়ম থাকেই। তা ছাড়া, এই ঘটনাটার সঙ্গে সুবিমলবাবু জড়িতও নন। ঐ চেয়ারটা যে সভাপতির চেয়ার তাও ঠিক করা নেই। তবু শিল্পমন্ত্রীরই ঐ চেয়ারে বসার কথা। তিনি যদি আগে এই জায়গাটিতে আসতেন তা হলে ঐ চেয়ারটাতেই বসতেন। কিন্তু এখন সুবিমলবাবু ঐ চেয়ারটাতে বসে যাওয়ায় তিনি তার চেয়ারটাকে একটু সরিয়ে এনে নিজের বসার জায়গাটাকে বিশিষ্ট করতে চাইলেন।
সুবিমলবাবুর ডান দিকের প্রথম চেয়ারে বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী ভুবনমোহন রায়–উনিই একমাত্র রাজবংশী মন্ত্রী। তাঁর পাশে ময়নাগুড়ির এম-এল-এ হেমেনবাবু। তারপর থেকে উত্তরখণ্ড ও অনুষ্ঠানের লোকজন বসেছেন। কিন্তু তাদের সবার জায়গা হয় না, তখন প্রথম সারির পেছনে স্টিলের চেয়ার পাততে হয়। সেই দ্বিতীয় সারির সবার বসা শেষ হওয়ার আগেই সুবিমলবাবু একবার ডাইনে-বাঁয়ে তাকিয়ে বলেন, নিন শুরু করুন, বেশিক্ষণ মিটিঙ করা যাবে না, আপনাদের যা সমস্যা সেগুলো প্রথমে বলুন।
কথাটা কে শুরু করবে তা নিয়ে একটু ইতস্তত দেখা যায়। ডি-সি তাকান ডি-এস-পির দিকে, ডি-এস-পি তাকান ওসির দিকে। সেটা ও-সি দেখতে পান না, কারণ তিনি ভেবেছেন উত্তরখণ্ডীরাই কথা আগে শুরু করবে, সেই জন্যে বীরেনবাবুর দিকে তাকান। বীরেনবাবু টেবিলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন বলে ওসির তাকানো দেখতে পান না। কিন্তু নকুল সবার দিকেই তাকাচ্ছিল বলে বুঝে ফেলে ও-সি বীরেনবাবুকে শুরু করতে বলছেন। নকু বীরেনবাবুর পাশে, সন্তোষবাবুর পরে। সন্তোষবাবুর পেছন দিয়ে বীরেনবাবুর পিঠে একটা ছোেট খোঁচা দিতেই বীরেনবাবু ধীরে মাথা ঘোরান। নকুল মাথার ইশারায় শুরু করতে বলে। বীরেনবাবু খুব ধীরে সন্তোষবাবুকে বলেন, সন্তোষ, বলো।
সন্তোষবাবুকে কোচবিহার থেকে আনা হয়েছে। তিনি গলা খাকারি দিয়ে বলেন, অনারেবল মিনিস্টারস, আমরা ত প্রপার পারমিশন নিয়ে ফাংশন করছি। আজ বুধবার। শনিবার আমাদের ফাংশন শুরু। শুধু যে লাখ-লাখ টাকা ইনভলভড তাই না, হাজার-হাজার লোক আসবে। এখন এই মিটিং ডাকা হল কেন আমরা বুঝতে পারছি না। সন্তোষবাবুর গলার জোর আছে। সে-জোরটা এতই বেশি যে এইটুকু ঘরে এই ক-জনের মিটিঙে বেখাপ্পা শোনায়। এ-মিটিঙে পরে ওরকম চড়া গলায় কথা হতে পারে বটে কিন্তু শুরু হওয়ার কথা ছিল যেন আরো অন্য রকম ভাবে।
সুবিমলবাবু শাদা চাদরে মুখ ঢেকে ছিলেন। মুখ থেকে চাদরটা নামান না কিন্তু চাদরের ভেতর থেকে হাতটা সরান যাতে তার কথাটা স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি তার স্বাভাবিক স্বরেই কথা বলেন কিন্তু তার স্বাভাবিক স্বরটাই খুব ভারী। তাই সন্তোষবাবুর চড়া কথার জবাবে তার কথাটা চড়া শোনাল না বটে কিন্তু কঠিন শোনাল, তোমাদের ত কিছু বলা হয় নি। তোমরা যে-ফাংশনের জন্যে পারমিশন নিয়েছ সেই ফাংশনটাই করবে। কিন্তু যারা পারমিশন নেন নি তারা তোমাদের ফাংশনের সঙ্গে মিশে কোনো ফাংশন বা কনফারেন্স করতে পারবে না।
সন্তোষবাবুর কথা ও সুবিমলবাবুর জবাবের পর সবাই হঠাৎ চুপ করে যায়। কেউই বোঝেন না কোন কথা দিয়ে সভাটা আবার চালু হবে। সুবিমলবাবু চাদরের ভেতরে তার হাতটা আবার মুখের কাছে নিয়ে এসেছেন।
সুস্থির একটু পরে বলে ওঠে, আমাদের একটা কথা বলার ছিল। যেন কেউ তাকে অনুমতি দেবে। সুস্থির এমন একটু অপেক্ষা করে। তারপর বলে, তা হলে আমাদের এই মিটিঙে ডাকার কোনো দরকার। ছিল না। সরকার আমাদের জানিবার পারিতেন যে উত্তরখণ্ড সম্মিলনের পারমিশন নাই। আমরা স্থির করি নিতাম সরকারের নিষেধ সত্ত্বেও আমরা সম্মিলন করিব কি না করিব। সুস্থিরের কথার সমর্থনে পেছনের সারি থেকে গুঞ্জন ওঠে। গুঞ্জনটা ওঠে এমন স্বরে যেন মনে হয় সেটাকে থামিয়ে দেয়া হবে। কিন্তু অফিসাররা ও সুবিমলবাবু শুধু সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। ফলে গুঞ্জনটা আরো একটু ওঠে। তারপর থেমে যায়।
তারও একটু পরে সুবিমলবাবু বলেন, এবার চাদরটা মুখ থেকে সরিয়ে, উত্তর খণ্ড কি কোন্ খণ্ড কোথায় কী সম্মিলন করবে তা নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। যদিও আইন অনুযায়ী এই সম্মিলনের জন্যেও পুলিশের পারমিশন নিতে হয়। কিন্তু ফাংশনের জন্যে যে-জায়গার অনুমতি দেয়া হয়েছে, সেখানে ও-ধরনের কোনো রাজনৈতিক সম্মেলন হলে আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে। সেই জন্যেই সরকার বলছে, ফাংশনের জায়গায় ফাংশনই হবে, কোনো সম্মিলন-টম্মিলন করা চলবে না। এটাই সোজা কথা।
.
|| শ্রীদেবীর নাচ ও জল্পেশ অভিযান নিয়ে আরগুমেন্ট ||
মিটিঙটা আবার চুপ করে যায়। কিছুক্ষণ পর ডি-সি ডাকেন, স্যার। সুবিমলবাবু ডি-সির দিকে তাকান। এই সব কালচারাল ফাংশনের ব্যাপার বলে আমরা দুজনকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছি আসতে–উপেনবাবু আর সমীরবাবু। উপেনবাবুর শরীরটা খারাপ
পেছন থেকে শিল্পমন্ত্রী বলেন, উপেনবাবু মানে উপেনদা? মানে, উপেন বর্মন মশাই?
ডি-সি সেদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলেন, হ্যাঁ, স্যার।
তিনি কি এসবের মধ্যে আছেন নাকি?
না স্যার। কিন্তু জেলার ওল্ড সিটিজেন হিশেবে তার কথার ত একটা বিশেষ মূল্য থাকতে পারে। তিনি দুপুরের দিকে একবার আসার চেষ্টা করবেন বলেছেন। কিন্তু আমাদের কাছে বলেছেন, এই সব কালচারাল ফাংশনের সঙ্গে কোনো পলিটিক্যাল ব্যাপার যুক্ত করা উচিত নয়। ডি-সি ঘাড় ঘুরিয়ে কথাটি শিল্পমন্ত্রীকে বলেন বলে মিটিঙে সবাই সেটা শুনতে পায় না। কিন্তু কথাটা শুনে শিল্পমন্ত্রী সোজা হয়ে বলেন, সেটা মিটিঙে বলুন যে উপেন্দ্রনাথ বর্মনের মত সিনিয়ার লোকও বলেছেন যে ফাংশন হোক কিন্তু সম্মিলন-টম্মিলন যেন না হয়। শিল্পমন্ত্রী এত জোরে বলেন যে মিটিঙের সবাই নড়েচড়ে বসে। যেন উপেনবাবুর কথার পর এ নিয়ে আর-কোনো কথা হতেই পারে না, মিটিঙ যেন শেষ হয়ে গেল। উপেন্দ্রনাথ বর্মনের নামের একটা প্রতিক্রিয়া বিশেষত উত্তরখণ্ডীদের মধ্যে হয়। রাজবংশী সমাজে আর-কোনো লোক সারা দেশে এত সম্মানিত নন। কিন্তু তার জীবনের এই সাফল্য সত্ত্বেও তিনি কখনো নিজের রাজবংশী পরিচয়কে ছোট করে দেখেন নি। রাজবংশী সমাজের আর-যারা দেশের নানা জায়গায় নানা ভাবে কিছু কিছু সম্মান পেয়েছেন তারা হয় আর রাজবংশী নেই, বা, রাজা প্রসন্নদেব রায়কতের মত জমিদার। উপেন্দ্রনাথকে অস্বীকার করার কোনো উপায় উত্তরখণ্ডীদেরও নেই, সরকারেরও নেই।
সন্তোষবাবু বীরেনবাবুর সঙ্গে কানে কানে কথা বলে নিয়ে তার পক্ষে যতটা আস্তে সম্ভব ততটা আস্তে বলে দেন, তা হলে অন্তত এটুকু প্রমাণ হল যে কংগ্রেসিরা উত্তরখণ্ড করছে না। কারণ, উপেনবাবু চিরকাল কংগ্রেসি।
সন্তোষবাবুর কথাটা সবাই শুনতে পায়, সবাইকে শোনানোর জন্যেই তিনি বলেছেন। হয়ত তার আসল উদেশ্য ছিল–উপেনবাবুর নাম করায় মিটিঙে সরকারের বক্তব্যের পক্ষে যে-সমর্থন তৈরি হয়ে যাচ্ছিল সেটা নষ্ট করে দেয়া।
শিল্পমন্ত্রী মাথা ঝাঁকিয়ে বলে ওঠেন, সন্তোষবাবু, উপেনদাকে এ-সব কথার মধ্যে টানবেন না। আফটার অল হি ইজ অ্যাবাভ পেটি পলিটিক্স। আমাদের সকলেরই শ্রদ্ধেয়। উনি যদি আসেন খুব ভাল
সন্তোষবাবু বলে ওঠেন, আরে, আমরা কখন উপেনদার নাম করলাম, আপনারাই ত করলেন। উনি ত এ-সবের কিছু জানেনই না। আপনারা কী ব্রিফ করেছেন তা আপনারাই জানান। এখন আপনারা তার নাম করে একটা ডিসিশন আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।
সুবিমলবাবু একটু হেসে, তোমার মত এ্যাডভোকেটকে কুচবিহার থেকে ধরে এনেছে ডিসিশন কি আর সহজে হবে?
সন্তোষবাবুও একটু হেসে বলেন, সে ত তোমাকেও ভাই কুচবিহার থেকেই ধরে এনেছে। তা হলে তুমিও কথা বলো না, আমিও বলব না–এরা জলপাইগুড়ির ব্যাপার এখানে বসেই মিটিয়ে নিক।
ময়নাগুড়ির এম-এল-এ হো হো করে হেসে ওঠেন। অফিসাররাও হেসে ফেলেন। সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের লোকজনের মধ্যেও একটা গুঞ্জন ওঠে–সমর্থনের। এই হাসাহাসির ফলে মিটিঙে যে-একটা তাপ জমেছিল সেটা কেটে যায়।
সেই হাসাহাসিটা থামলে বীরেনবাবু গলা পরিষ্কার করেন কিন্তু কেউ খেয়াল করে না। তিনি একটা হাত তোলেন। সেটাও কেউ খেয়াল করে না। হঠাৎ সন্তোষবাবু ইংরেজিতে বলে ওঠেন, মিস্টার মিনিস্টার্স, দয়া করে একটু মনোযোগ দিন, বীরেন্দ্রনাথ বসুনিয়া, এই জেলার একজন প্রথম শ্রেণীর উকিল, কলকাতা হাইকোর্টও যার দ্বারা উপকৃত হতে পারত এবং শ্রদ্ধেয় উপেনবাবুর মতই যিনি শ্রদ্ধেয়, যদিও আপনাদের কাছে এখনো সম্ভবত অজ্ঞাত, কিছু কথা বলতে চান। এবং আপনাদের অবগতির জন্যে এই সুযোগে জানিয়ে রাখি যে আজ আমাদের মধ্যে দেবনাথ রায়ও আছেন-রাজবংশী সমাজের প্রথম পি-এইচ-ডি।
ময়নাগুড়ির এম-এল-এ হেমেনবাবু ও বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী ভুবনমোহনবাবু টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে বীরেনবাবুর দিকে তাকান। বীরেনবাবু টেবিলের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি হয়ত ওঁদের দেখতে পান না। হেমেনবাবু বলেন, কাকা, বলেন। ভুবনমোহনবাবুও বলে ওঠেন, দাদা, বলেন, বলেন। সবাই চুপ করে যায়। বীরেনবাবু গলাটা আবার পরিষ্কার করে বলেন, আমার একটা কথা জানার আছে–এটাকে কি আমরা আইনের দিক থেকে দেখছি, নাকি রাজনীতির দিকে থেকে দেখছি, নাকি প্রশাসনিক আইন-শৃঙ্খলার দিক থেকে দেখছি।
বীরেনবাবু থেমে যান। তার নিচু স্বরের কথা শোনার জন্যে অফিসাররা টেবিলের ওপর এগিয়ে আসেন, সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের লোকরাও মাথা এগিয়ে দেয়, শিল্পমন্ত্রী তার চেয়ারে বসে থেকেই এগিয়ে আসেন। সন্তোষবাবুই একমাত্র চেয়ারে হেলান দিয়ে হাসিমুখে সকলের মুখের দিকে তাকান। যেন, তিনি জানেন বীরেনবাবু কী বলবেন ও তা বলার ফলে অবস্থাটা কী রকম বদলে যাবে। বা, বীরেনবাবুর একেবারে পাশে বসে তিনি কথাগুলো সবচেয়ে ভাল শুনতে পাচ্ছিলেন আর সেই কারণেই শোনার জন্যে তাকে কোনো অতিরিক্ত চেষ্টা করতে হচ্ছিল না। বীরেনবাবু যেন একটু সময় দেন তার প্রশ্নের জবাবের জন্যে, তারপর আবার শুরু করেন।
মানমীয় পর্যটনমন্ত্রী এই মিটিঙের শুরুতে বলেছেন যারা অনুমতি নিয়েছেন তারা ফাংশন করতে পারবেন। তার সঙ্গে সম্মেলন করা যাবে না। তা হলে এটা আইনের প্রশ্ন। আর, তারপরে আবার নানা কথায় মনে হল, সরকার সম্মিলন ও অনুষ্ঠান এক জায়গায় হলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে আশঙ্কা করছেন। আমরা সম্মিলনই করি আর অনুষ্ঠানই করি শান্তিপূর্ণ ভাবে করতে চাই। তা ছাড়াও, এখানে কংগ্রেস ও উত্তরখণ্ডের কথা উঠেছে। সেটা রাজনীতির প্রশ্ন। আমরা কোনটা আলোচনা করব সেটা আগে ঠিক করে না নিলে, এ মিটিঙে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাবে না। বা, আমাদের মনে হতে পারে, যে, সরকার যেভাবেই হোক তাদের ইচ্ছা আমাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। বীরেনবাবু থেমে যান। কিন্তু তার ভঙ্গি একটুও বদলায় না। সবাইকেই অপেক্ষা করতে হয় যে তিনি আরো কিছু বলেন কিনা।
শিল্পমন্ত্রী চেয়ারটা একটু এগিয়ে আনেন। সুবিমলবাবু চেয়ারের ওপর কনুই রেখে হাতদুটো খাড়া রাখেন আর পাদুটো নাড়াতে থাকেন। ময়নাগুড়ির এম-এল-এ মুখটা বাড়িয়ে বলেন, কাকা, আপনিই বলেন না কেন, আইনের কথা বাদ দেন, কিন্তু এক দিনে শ্রীদেবীর নাচ আর আপনাদের সম্মিলন হলে ত সাংঘাতিক অবস্থা হবে, পুলিশ দিয়েও ত সামলানো যাবে না, শ্রীদেবীর নাচে ত শুনছি আসাম বিহার থেকেও লোক আসবে ট্রাক-ট্রাক।
সুবিমলবাবু পা নাড়াতে-নাড়াতেই মুচকি হেসে বলেন, সন্তোষই ত কুচবিহার থেকে দুই ট্রাক লোক নিয়ে আসবে।
সন্তোষবাবু সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠেন, দুই ট্রাক কেন? তুমি যে সেদিন ফোন করে বললে তোমার একটা আলাদা ট্রাক চাই কিন্তু মন্ত্রীর নামে ভাড়া করলে খারাপ দেখায়, আমি যেন ভাড়া করে রাখি, সেটা ধরলে তিন ট্রাক।
সকলে, এমনকি অফিসাররাও, হো হো করে হেসে উঠতেই হেমেনবাবু দাঁড়িয়ে একবার সুবিমলবাবুর দিকে, আর-একবার সন্তোষবাবুর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জোরে বলে ওঠেন, এই সুবিমলদা, সন্তোষদা, আপনাদের দুই বন্ধুর ফ্রেন্ডলি ম্যাচ থামান ত। মিটিঙটা ত শেষ করতে হবে। কাকা, বলেন।
বীরেনবাবু গলা পরিষ্কার করে নিয়ে হাতটা তোলেন। সন্তোষবাবু সেই হাতটার দিকে তাকিয়ে একটু হাসেন। বীরেনবাবু যখন এজলাশে তার সবচেয়ে শক্ত যুক্তিগুলো দেন তখন বা হাতটা এরকম একটু খাড়া রাখেন। টেবিলের দিকে তাকিয়েই বীরেনবাবু বলেন, ময়নাগুড়ির এম-এল-এ যে কথা বললেন সেটাই যদি এই মিটিঙের আলোচ্য হয় তা হলে তার জবাব খুব সোজা-শ্রীদেবী রোজ নাচছেন না, আর রোজ আমাদের সম্মেলন বেলা একটার আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তার পঁচঘণ্টা পর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হচ্ছে। সুতরাং সম্মিলনের লোক আর অনুষ্ঠানের লোক কোনো সময়ই এক হচ্ছে না।
বীরেনবাবু থামামাত্র হেমেনবাবু বলে ওঠেন, বাঃ, সেইটা নিয়েই ত ক্রাইসিস, শ্রীদেবীর নাচ হবে রাত্রিতে আর আপনাদের জল্পেশ্বর অভিযান হবে সকালে। তা হলে?
বীরেনবাবুর দিকে সবাই তাকায়। তিনি তার ভঙ্গি একটুও বদলান না, গলার স্বর একটুও তোলেন না। অপরিবর্তিত স্বর ও ভঙ্গি দিয়ে তিনি সবচেয়ে বেশি মনোযোগ অনায়াসে টেনে নেন। কোনো-কোনো সময় এটাকে তার কৌশলই মনে হয়–যখন প্রতিপক্ষ তাদের আক্রমণ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। কিন্তু অনেক সময় এটা তার স্বভাবই মনে হয়–যখন প্রতিপক্ষকে তিনি সরাসরি আক্রমণ কখনোই করতে পারেন না। বীরেনবাবু বলছিলেন, আমাদের কর্মসূচি অনুযায়ী শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান হবে রাত নটা থেকে সাড়ে এগারটা। অনুষ্ঠানের সময় বেড়ে যাবার কোনো আশঙ্কা নেই। কারণ, অনুষ্ঠান শেষ করে শ্রীদেবী তার থাকার জায়গা শিলিগুড়িতে ফিরে যাবেন। তা ছাড়াও, এমন-কি অনুষ্ঠান দেরি করে শুরু হলেও শ্রীদেবী সাড়ে এগারটাতেই তার অনুষ্ঠান শেষ করবেন। প্রতিটি বেশি মিনিটের জন্যে আমাদের অতিরিক্ত এত টাকা দিতে হবে যা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। রাত সাড়ে এগারটায় আমাদের অনুষ্ঠান শেষ আর সকাল ছটায় জল্পেশ্বর শিবের মন্দিরের দিকে যাত্রা। মাঝখানে সাড়ে ছ-ঘণ্টা সময়। সুতরাং শ্রীদেবীর নাচের ভিড় আর জল্পেশ্বর শিবমন্দিরের যাত্রীদের ভিড় কোনো সময়ই মিলে যেতে পারে না। তা ছাড়াও, এখানকার লোক হিশেবে আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, বছরের এই সময় জল্পেশ্বর শিবের দিকে নানা জায়গা থেকে নানা তীর্থযাত্রীর দল আসে। তার সঙ্গে কোনো অনুষ্ঠান বা সম্মিলনের সম্পর্ক নেই। আমরা আমাদের সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের শেষ দিন সেই চিরাচরিত তীর্থযাত্রায় যোগ দেব বলে স্থির করেছি। তীর্থযাত্রার জন্যে সরকারের অনুমতি কোনো কালে দরকার হয় না। বরং তীর্থযাত্রীদের যাতে অসুবিধে না হয় সেজন্যেই সরকার যথাযোগ্য ব্যবস্থা করে থাকেন, এ বছরও করছেন ও নিশ্চয়ই আরো করবেন।
সবাই একেবারে চুপ করে বীরেনবাবুর নিচু গলায় এই কথাগুলি শোনে। একজন কেউ জোরে-জোরে শ্বাস ফেলছিল, পাশের লোকটি তাকে খুঁচিয়ে থামিয়ে দেয়। বীরেনবাবুর কথা শেষ হওয়ার পর যে-অতিরিক্ত সময়টুকু চুপ করে থাকতে হয়, তার কথা শেষ হয়েছে কি না বুঝতে, সেটুকু সময় কেটে গেলে, সন্তোষবাবু ঘাড় দোলান, ওস্তাদি গানে বাহবা দেবার ভঙ্গিতে, আরগুমেন্ট, আরগুমেন্ট, চাপা স্বরে বলে ওঠেন, সুবিমল, কতদিন ধরে বলছি হাইকোর্টের একটা বেঞ্চ এখানে বসাও, বীরেনদার মত এই সব লিগ্যাল টেলেন্টকে কাজে লাগাতে পারতে! তোমার উত্তরখণ্ডও হত না, কামতাপুরীও হত না। কী লিগ্যাল টেলেন্ট! আরগুমেন্ট, আরগুমেন্ট!
.
শিল্পমন্ত্রীকে চেয়ারটা টেনে টেবিলের কাছে আনতে হয়। তারপর টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে তিনি বলেন বীরেনদা, আপনার কথা অঙ্কের হিশেবে ত ঠিক কিন্তু বেঅঙ্কের হিশেবটা মেলাবে কে?
শিল্পমন্ত্রী বীরেনবাবুকে চেনেন না। রাজনীতির ব্যাপারেও ওঁর পরিচয় তিনি কখনো পান নি। কিন্তু তিনি বুঝে গেছেন–ইনিই পারেন অবস্থাটা সামাল দিতে। তা ছাড়া ডেপুটি কমিশনার একটা কাগজ আগেই দেখিয়েছিলেন–তাতে পার্টনারদের নাম ও পরিচয় ছিল। অনুষ্ঠানের ও সম্মিলনের সম্পাদক হিশেবে সেখানে এই বীরেন্দ্রনাথ বসুনিয়ার নামই আছে।
অতিরিক্ত একটা উদ্দেশ্যও শিল্পমন্ত্রীর ছিল। বীরেনবাবুর কথাগুলি যে প্রভাব ফেলেছিল, সেটা কিছু নষ্ট করা।
অথবা হয়ত অভিজ্ঞতার জোরেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, মিটিঙের সামনে সমাধানের একটা মুহূর্ত এসেছে, ওটাকে কাজে লাগানো উচিত। সুবিমলবাবু বা হাঁটুর ওপর ডান পা তুলে ডান হাঁটু নাচাচ্ছেন–শাদা চারদরটা ঠোঁট পর্যন্ত ভোলাই কিন্তু একটু বায়ে কেতরে বসেছেন। ওঁর চোখেমুখে বেশ একটা প্রশংসার হাসি। আর, এই সবের ফলে যে সুবিমলবাবু স্বনির্বাচিত সভাপতি হয়ে বসেছিলেন, মিটিঙের এই চরম মুহূর্তে তাকেই সভার বিষয় থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী মনে হয়। এমন-কি, তাকে বিপক্ষের, প্রতি কিছু সহানুভূতিশীলও ঠেকে যায় যেন।
শিল্পমন্ত্রীর জিজ্ঞাসার জবাবে বীরেনবাবু চোখ তুলে তাকান। সন্তোষবাবু জিজ্ঞাসা করেন, বেঅঙ্কের হিশেবটা কী সেটা বলুন।
শিল্পমন্ত্রীর কথার ভঙ্গিতে উত্তরখণ্ডীরা ও অনুষ্ঠানের লোকজন হঠাৎ যেন বুঝে যায় যে সম্মিলন বা অনুষ্ঠান বাতিল হচ্ছে না, বীরেনবাবু মোক্ষম যুক্তি দিয়েছেন। বা বীরেনবাবুর যুক্তিকে মোক্ষম বলে মন্ত্রীরা মেনে নিয়েছেন।
শিল্পমন্ত্রী সেটা ইচ্ছে করেই বুঝতে দিলেন কি না–সেটা বোঝাও যাবে না, জানাও যাবে না। অতটা সূক্ষ্ম হিশেব করে কথা বলা হয়ত সম্ভবও নয়। কিন্তু শিল্পমন্ত্রীর একটা স্কুল হিশেব ছিল যে আজ বাদে কাল সম্মিলন ও অনুষ্ঠান, কোনো অবস্থাতেই কিছু বাতিল করা যাবে না। যদি কোনো রকমে জল্পেশ্বর অভিযানটা ঠেকানোযায় বা পেছুনো যায়, বা সম্মিলনটাই একটু পেছিয়ে দিতে এদের রাজি করানো যায় তবে তাই যথেষ্ট।
শিল্পমন্ত্রী বলেন, আমরা কেবল একেবারে আইন-শৃঙ্খলার দিক থেকেই শ্রীদেবীর নাচ ও আপনাদের ঐ মিছিলটা এক রাত্রিতে হবে এটাতে আশঙ্কা করছি। নানা জায়গার লোক আসবে, আপনাদের মিছিলেরও লোক আসবে, সারা রাতে ত সব লোক চলে যেতে পারবে না, বেশির ভাগ লোকই থেকে যাবে, যে-কোনো মিসক্ৰিয়ান্ট একটা গোলামল পাকিয়ে দিতে পারে।
সে ত যে কোনো দিনই পারে, সন্তোষবাবু বলেন। তা পারে।
কিন্তু শ্রীদেবীর সিনেমা এলে কলকাতায় হলের কাছে এজন্য পুলিশ পোস্টিং করতে হয় শুনি, আর এ একেবারে স্বশরীরে আবির্ভাব। আমি অবশ্য দেখি নি। কিন্তু যা রিপোর্ট পেলাম সে নাকি সেক্স সিম্বল। আপনারাই বা আপনাদের রাজনৈতিক সম্মিলনের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে এরকম আর্টিস্ট আনলেন কেন বুঝলাম না। যা-হোক, আপনারা মিছিলটা এক দিন পেছিয়ে দিন।
মিছিল, মানে জল্পেশ্বর অভিযান? সন্তোষবাবু জিজ্ঞাসা করেন।
সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের জায়গা থেকে সমবেত আপত্তির গুঞ্জন ওঠে। সন্তোষবাবু পেছন ফিরে একবার দেখেন। তারপর পাশে নকুলবাবুর সঙ্গে কথা বলে জেনে নিতে চান এটা কতটা সম্ভব বা কতটা অসম্ভব। সন্তোষবাবু তার ওকালতি বুদ্ধিতে মুহূর্তে অনুমান করে ফেলেন যে শ্রীদেবীর। নাচ ও জল্পেশ্বর অভিযানের দিনক্ষণ অপরিবর্তনীয়। এই বিষয়ে কোনো আপোশ হবে না। অন্য কোনো বিষয় নিয়ে হতে পারে।
সুস্থির দাঁড়িয়ে বলে, মাননীয় মন্ত্রী মহাশয়ের কাছে আমরা উত্তরখণ্ডীরা একটা অনুরোধ করছি যে শ্রী বীরেন বসুনিয়া যে-যুক্তিগুলি দিলেন তার প্রত্যেকটি ধরি-ধরি আলোচনা করেন আর না-হয় ত আমরা যে-ভাবে সম্মিলন ও ফাংশন করিবার চাহি করিতে দিন। আমরা আমাদের কর্মসূচির কোনো পরিবর্তন করিব না।
ময়নাগুড়ির এম-এল-এ হেমেনবাবু চট করে উঠে দাঁড়ান। তার গলার চাদরটা অর্ধেক তার গলায়, অর্ধেক চেয়ারে। তিনি ডান হাত দিয়ে চারদটাকে চেয়ারের ওপর ফেলে দিয়ে বলেন, শুনুন, আমি একটা কথা বলছি। বীরেনকাকাই কথাটি তুলেছেন। আমি দাঁড়িয়েই বলি, কারণ সবার মুখ দেখতে চাই। বীরেনকাকা বলেছেন বিষয়টির তিনটি দিক আছে–আইনগত দিক, আইনশৃঙ্খলার দিক ও রাজনীতির দিক। রাজনীতির দিকটা আমরা এখনো কেউ আলোচনা করি নাই কিন্তু করা উচিত। উত্তরখণ্ড আন্দোলন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন কিনা, উত্তরবঙ্গ পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে বাঁচবে নাকি বাইরে আসি বাঁচবে–এগুলি রাজনীতির কথা, এবং এ সব কথারই আলোচনা করতে হবে। এই মিছিলে না হোক, বাইরের মিটিঙে। পাবলিক মিটিঙে। বৈঠক মিটিঙে। সব জায়গায় এসব আলোচনা করতে হবে। আমাদের পার্টির পক্ষ থেকে আমরা সেই রাজনৈতিক প্রচারে নামব। আপনারাও নামেন। কিন্তু শিল্পমন্ত্রী মশায়ের ভাল প্রস্তাব আপনারা প্রত্যাখ্যান করলেন। আপনাদের মিছিল একদিন পিছি দিলে আপনাদের কী ক্ষতি হত? কিন্তু আপনারা তাতে রাজি না হন। তা হলে আপনারাই বলেন–সরকারই বা কী করে ময়নাগুড়ি ও পাশাপাশি অঞ্চলের সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নীরব থাকবে? আপনারা কাদের নিয়ে এই অনুষ্ঠানের টাকা তুলছেন? কারা এর পার্টনার? রামগোপাল আগরওয়ালা–সারা উত্তরবঙ্গে নেপালের সঙ্গেযে-চোরাবাজারের ব্যবসা চলে তাতে প্রধান টাকা খাটায় যে সে কমিটিতে আছে। এতে উত্তরখণ্ডীদের মধ্যে একটু গুঞ্জন উঠতেই হেমেনবাবু তার গলা আর-একটু চড়িয়ে দেন। তাতে তার বক্তৃতায় জনসভায় ভাষণের ভাব আসে। অফিসাররা মাথা নিচু করে শোনেন। আপনাদের আর-একজন পার্টনার সুখরাম বর্মন। সে তামাকের স্মাগলিঙে এখন বোধ হয় লক্ষপতি হয়ে নিজের নাম পর্যন্ত বদল করে ফেলেছে। এখন সে অমিতাভ বচ্চন। আপনাদের আর-একজন পার্টনার আসিন্দির রায়–গয়ানাথ জোতদারের জামাই। গয়ানাথ জোতদার সেটেলমেন্টের বিরুদ্ধে মামলা করে তিস্তা ব্যারেজের কাজ বন্ধ করার ষড়যন্ত্র করি যাচ্ছে আর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে মামলা করি ফরেস্টের গাছ কেটে বেচে নতুন বড়লোক হচ্ছে। আপনাদের পার্টনারদের অনেকেরই ত এই পরিচয়। আপনারা যদি উত্তরখণ্ড সম্মিলনই করবেন তা হলে আপনারা এই সব লোকদের ওপর নির্ভর করছেন কেন? কারণ, আপনাদের টাকার দরকার। এরা আপনাদের টাকা দিচ্ছে। এরা আপনাদের টাকা দিয়ে বম্বে থেকে শ্রীদেবী আনি দিচ্ছে আর আপনারা সেই টাকা সেই লোক নিয়ে জল্পেশ্বরের শিবের নামে সরকারবিরোধী মিছিল নি যাবেন। সরকারবিরোধী হলে আমাদের আপত্তি নাই। কিন্তু আমরা জানি আপনারা জল্পেশ্বরের পবিত্র নামকে সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করিবেন। সেখানে তিস্তাবুড়ির পূজা অনুষ্ঠান হবে। সেই পূজার শেষে আপনারা শপথ নিবেন তিস্তা ব্যারেজের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্যে। কী? না গয়ানাথ জোতদার বংশানুক্রমে যে-সব জমি বেআইনি ভাবে ভোগদখল করি আসছে গোচিমারিতে, বাসুসুবায়, গাজোলডোবায় সেই সব জমি তিস্তা ব্যারেজে নেয়া চলিবে না। তিস্তা ব্যারেজে হলে লাখ-লাখ কৃষকের উপকার। আপনারা সেইটা চাহেন। আপনারা চাহেন গয়ানাথ জোতদারদের, রামগোপাল আগরওয়ালা আর অমিতাভ বচ্চনদের মত জোতদার, কালবাজারি আর চোরাকারবারিদের উপকার। বীরেন কাকা এই সব কথার বিচার করেন। যা সাফ কথা, তা সাফ-সাফ হওয়াই ভাল। আপনারা শ্রীদেবীর নাচ দেখবেন কি হেমামালিনীর নাচ দেখবেন–তা দেখেন। কিন্তু ঐ নাচের নাম করি হাজার-হাজার মানুষকে জল্পেশ্বরের মত ধর্মস্থানে নি যাবেন আর তিস্তা ব্যারেজের বিরুদ্ধে অভিযান করিবেন তা আমরা হতে দিব না। আমরাও তাহলে পাল্টা মিছিল করিব। আমরা জানি মাসখানেকের মাথায় তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন করিবেন আমাদের মুখ্যমন্ত্রী। সেই উদ্বোধনে বিক্ষোভ দেখাবার জন্যে উত্তরখণ্ড কামতাপুরী গোখাল্যান্ড সবাই জোট বাঁধছে। আপনাদের এই সম্মিলনের উদ্দেশ্যও সেই কারণে তোক জোগাড় করা। আমরাও ধানের বিচি খাই। আমরা জানি, বম্বের শ্রীদেবী আর কলকাতার যাত্রা আনতে কত খরচা হয়। আর এ-টাকা কোখিকে আসে। বীরেন কাকা খুব ভাল যুক্তি দিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু আমরা সোজাসুজি বলতে চাই কথাটা আইনশৃঙ্খলারও না, আইনেরও না, কথাটা রাজনীতির। আপনারা রাজনীতি করিছেন, আমরাও তাই রাজনীতি করব।
.
শেষ কথাটা হেমেনবাবু ধপ করে চেয়ারে বসে বলেন। বসেই তিনি চারদটা টানেন। কিন্তু নিজেই চাদরের ওপর বসে পড়ায় চাদরটা বেরয় না। ফলে হেমেনবাবু একটু উঠে চাদরটা টেনে বের করে নিয়ে ঘাড়ের ওপর ফেলেন।
হেমেনবাবুর বক্তৃতার শেষে সমস্ত মিটিঙের আবহাওয়া বদলে যায়। তার পুরো বক্তৃতার সময় ধরেই অবস্থাটা বদলাচ্ছিল বটে কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল না কতটা বদলাবে। বীরেনবাবুর কথাগুলির পর মিটিঙের পরিস্থিতি যেমন বদলেছিল, এ বদল তেমন নয়। বীরেনবাবু মিটিঙের নিয়মকানুনের মধ্যে, মন্ত্রী ও অফিসারদের কথার ভেতরই একটা শক্ত পাল্টা যুক্তি খাড়া করেছিলেন। সেই পাল্টা যুক্তির জোরটা মেনেই শিল্পমন্ত্রী একটু নরম হয়ে মীমাংসার একটা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সে-প্রস্তাবটা মেনে নিলে হেমেনবাবু হয়ত কিছুই বলতেন না। কিন্তু মেনে না নেওয়ায় হেমেনবাবু মিটিঙের এতক্ষণের সব আলোচনা নস্যাৎ করে দিয়ে সেই সব কথাই তুললেন যে কথাগুলি এতদিন ও এতক্ষণ এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সম্মিলন ও অনুষ্ঠানের লোকজন অনেকখানি উদ্বেগ নিয়েই মিটিঙে এসেছিল। কিন্তু মিটিঙের পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে তারা একটু জোর পেয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত সম্মিলনও হবে, অনুষ্ঠানও হবে। কিন্তু শিল্পমন্ত্রীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর হেমেনবাবু অবস্থাটা যে এরকম বদলে দেবেন এটা কেউই ভাবতে পারে নি।
হেমেনবাবু বসে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গেই সুস্থির উঠে দাঁড়ায়, হেমেনবাবু এম-এল-একে ধন্যবাদ যে তিনি আমাদের বিরুদ্ধে তার সমস্ত কথাই বলি দিছেন। কিন্তু শিল্পমন্ত্রী হঠাৎ তার চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে সুস্থিরকে বলেন, আপনি বসুন, বসুন, এখন কোনো কথা হবে না, বসুন।
আপনারা আমাদের মিটিঙে ডেকে এনে কথা বলতে দেবেন না? বলে সন্তোষবাবু দাঁড়িয়ে ওঠেন, হেমেনবাবু যা ইচ্ছে তাই অভিযোগ করে যাবেন? আমাদের রাজবংশীদের ঐতিহ্য, ধর্ম, কালচার সব কিছু নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন? তখন শিল্পমন্ত্রী, সুস্থির ও সন্তোষবাবু তিনজন দাঁড়িয়ে কিন্তু সন্তোষবাবু লম্বা বলে ও তার গলার জোর বেশি বলে কথা বলে যাওয়ার সুযোগটা নিয়ে নেন, হেমেনবাবুর রাজবংশীদের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি এখন পছন্দ না হতে পারে; তিনি কমিউনিস্ট হয়ে এখন জল্পেশ্বর মন্দিরের মাহাত্ম্য ভুলে যেতে পারেন, তিনি তিস্তাবুড়ির পুজোকে কুসংস্কার ভাবতে পারেন কিন্তু আমাদের কাছে জল্পেশ্বর সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা। তিস্তাবুড়ি আমাদের কাছে মা গঙ্গা। তিস্তা নদী নয়, তিস্তা দেবতা। হেমেনবাবুর যদি ইচ্ছে হয় তিনি তিস্তা ব্যারেজের পুজো করতে পারেন কিন্তু আমরা তিস্তা বুড়িরই পূজো করব। তাতে যদি আমাদের অপরাধ হয়, অপরাধ হবে। কিন্তু এই ভাবে আমাদের–
হঠাৎ খাবার জায়গায় পার্টিশনের কাছে কিছু যাওয়া-আসা শুরু হয় আর ডেপুটি কমিশনার চট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে শিল্পমন্ত্রীর কানেকানে কিছু বলে বেরিয়ে যান। উপেন বাবু, উপেনবাবু কথাটা শোনা যায়। শিল্পমন্ত্রী বসার জায়গার দিকে একবার মুখটা বাড়িয়ে সন্তোষবাবুকে বলেন, উপেনদা এসেছেন, এখন আপাতত এই আলোচনা একটু বন্ধ থাক। উপেনদার সঙ্গে আমরা সবাই একটু কথা বলে নেই। তারপর, আবার আলোচনা শুরু হবে। ফলে, সন্তোষবাবুকে বসে পড়তে হয়।
সুবিমল বাবু পা নামিয়ে বসেন, বনবিভাগের রাষ্ট্রমন্ত্রী উঠে পড়েন, শিল্পমন্ত্রী বসার জায়গার দিকে চলে যান, ডি-সি ও এস-ডি-ওও তার সঙ্গে যান, ফলে মিটিঙটা ভেঙেই যায়। উত্তরখণ্ডের কেউ-কেউ বসার জায়গার দিকে যান উপেনবাবুর সঙ্গে দেখা করতে, কেউ দরজা দিয়ে বাইরে চলে যান। বীরেনবাবু তার জায়গাতেই বসে থাকেন।
কিছুক্ষণ পরই মিটিঙটা ভেঙে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে, বসার জায়গায় উপেনবাবুকে ঘিরে মন্ত্রীরা, মিটিঙের টেবিলে বাকি অফিসাররা ও অন্যান্যরা কেউ-কেউ, বাইরে বারান্দায় ও মাঠে উত্তরখণ্ড ও অনুষ্ঠানের নোকজন এক-একটা দল পাকিয়ে উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে।
এরকম একটা দলে সুস্থির চিৎকার করে নকুলকে বলে, আপনাদের যাকে ইচ্ছা তাকে নাচান, আমরা সম্মিলন করব, আমরা আর এই মিটিঙে থাকব না।
সন্তোষবাবু হঠাৎ সুস্থিরের ঘাড়টা বা হাত দিয়ে চেপে ধরে ডান হাতের আঙুল নাচিয়ে বলে ওঠেন, তোমাদের মত ফায়াররইটারদের জন্যেই আমাদের উত্তরখণ্ড মার খাবে। প্রথমত, তোমরা একটা বেআইনি কাজ করেছ–পারমিশনই নাও নি কনফারেন্সের। তার ওপর পারমিশন নিয়েছ কালচারাল ফাংশনের, করছ পলিটিক্যাল কনফারেন্স। গবর্মেন্ট যদি ইচ্ছে করে তোমাদের কনফারেন্স এক মিনিটে বন্ধ করে দিতে পারে। তার প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা আন্দাজ করতে পারছে না বলেই বন্ধ করার সাহস পাচ্ছে না। সরকারের সবগুলি দল যদি তোমাদের এগেইনস্টে নামে তোমরা কী করতে পারবে? তার চাইতে এখনি একটা কমপ্রোমাইজে রাজি হয়ে যাও। জল্পেশ্বর অভিযানটা করা দিয়ে কথা–সেটা যদি করতে না পার তাহলে ওকনফারেন্সের কোনো মানেই নেই। তার জন্যে যদি একটা দিন পেছতে হয় বা জায়গাটা বদলাতে হয়–একটা চেঞ্জে রাজি হও। তোমরা যদি কিছু না ছাড়ো, তা হলে ওরাইবা রাজি হবে কী করে? ডাকো, সবাইকে ডাকো, বীরেনদা কোথায়?
সন্তোষবাবু সুস্থিরের কাধ থেকে হাতটা তুলে নেন। সুস্থির সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে–তার কাঁধে ঝোলা, বা হাতটা কনুইয়ের সমকোণে ভেঙে পেট আর বুকের মাঝখানে, ডান হাতটা খাড়া ঠোঁটে, মুখে সামান্য দাড়ি। সেই মুহূর্তে তাকে খুব একা লাগে, যেন, সুস্থির বুঝে গেল যে বীরেনবাবু, নকুলবাবু, সন্তোষবাবু এরা সব একমত হয়ে গেলে তার আর-কিছু করার নেই। তখন সুস্থির শারীরিক ভাবেও একাই-সন্তোষবাবু তার সামনে দাঁড়িয়ে মাত্র, অন্য সবাই দৌড়ে গেছে আরো কয়েকজনকে ডেকে আনতে যাতে মিটিংটা শুরু হওয়ার আগে তারা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে নিতে পারে।
নকুল-জগদীশ মিটিঙের ঘর থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে। এসে বলে, বীরেন কাকাকে ডেকে নিয়ে উপেনবাবু গল্প করছেন। আমাদেরই ঠিক করতে হবে। এখানেই বসুন। ততক্ষণে সুরেন, শান্তি, ভূপেনবাবু এদিকে এসে এদের সঙ্গে মাঠের মধ্যেই বসে যান। এখানে এদের এতজনকে মাঠের মধ্যে গোল হয়ে বসতে দেখে যারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল তারাও এসে গোল হয়ে বসে। এখানে চাপা স্বরে একটা পুরো দস্তুর মিটিঙ শুরু হয়ে যায়।
খানিকক্ষণ পর সার্কিট হাউসের বারান্দা থেকে ডাকাডাকি শুরু হয়,–সগায় আইসেন, মিটিঙ-মিটি।
শুনে ওরা একসঙ্গে উঠে পড়ে মিটিঙের ঘরের দিকে চলে। নতুন লোক কেউ আসে নি বরং দু-একজন চলে গিয়ে থাকতে পারে। কে কোথায় বসেছিল সে জায়গা নির্দিষ্ট হয়ে আছে। ফলে, মিটিঙটা আবার আগের অবস্থায় আসতে দেরি হয় না। শুধু এইটুকু তফাৎ-শিল্পমন্ত্রী বীরেনবাবুর বক্তব্য শোনার পর তার চেয়ারটাকে যেখানে টেনে এনেছিলেন সেখানে উপেনবাবু বসে আছেন। আর উপেনবাবুর পাশের চেয়ারে শিল্পমন্ত্রী। অফিসাররা সবাই একটা করে চেয়ার সরে গেছেন।
শিল্পমন্ত্রী দাঁড়িয়ে বললেন, আমরা উপেনবাবুকে অনুরোধ করেছিলাম আজকের সভায় থাকতে। কিন্তু তিনি খুব অসুস্থ। তাই সবার সঙ্গে একটু দেখা করে গেলেন। এখনই উনি চলে যাবেন। তাই আপনাদের সবাইকে উনি দেখতে চাইলেন।
উপেন্দ্রনাথ দাঁড়িয়ে নমস্কার করেন। সুস্থির ও আরো অনেকে দুই চোখ বড় বড় করে দেখে সেই কিংবদন্তির নায়ককে। সেকালের একজন রাজবংশী এম-এ বি-এল শুধু নন–দেশের যে-দায়িত্ব তিনি পেয়েছেন সেখানেই নিজের কৃতিত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন, দিল্লি, কলকাতা, লন্ডন, লস এঞ্জেলস; এই রাজ্যের বিধান পরিষদ একদিন পরিচালিত হয়েছে এই রাজবংশীর নির্দেশে, আর জীবনে তিনি কোনো সময় ভুলে যান নি তিনি রাজবংশী। এখনো উপেন্দ্রনাথের লেখা জল্পেশ্বর মন্দিরের ইতিহাস প্রচার করছে সুস্থিররা তাদের জল্পেশ্বর অভিযানের জন্যে। উপেন্দ্রনাথের মোটা তুষ চাদর বা কাধ আর ডান বগলের তলা দিয়ে ঘোরানো। মাথায় সামান্য চুল, গোটা দুদিকে সরু ও লম্বা–প্রায় সবটাই পাকা। মুখে স্মিত হাসিবিনয়ের ও আত্মবিশ্বাসের। চোখ তুলতে পারেন না–একটু যেন লাজুক। পাঞ্জাবির ঢোলা হাতা ঝুলিয়ে সকলকে নমস্কার করে আস্তে বলেন, আমি যাচ্ছি। আপনাদের নমস্কার।সকলে মিলেমিশে একমত হয়ে সব ঠিক করেন। আচ্ছা বলে একটু ঘুরে দাঁড়ান। শিল্পমন্ত্রী চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, সঙ্গে-সঙ্গে সবাই নমস্কার করে উঠে দাঁড়ান। শিল্পমন্ত্রী দুপা এগিয়ে যান, ডি-সি পেছন থেকে বলেন, স্যার, আমি ওঁকে তুলে দিয়ে আসছি, আপনি মিটিঙে বসুন। উপেন্দ্রনাথ একটু ঘুরে নমস্কার করে ধীর পায়ে বেরিয়ে যান। শিল্পমন্ত্রী এসে তার পুরনো চেয়ারেই বসেন।
শিল্পমন্ত্রী এসে বসতেই সন্তোষবাবু জিজ্ঞাসা করেন, উপেনদাকে আবার এটা বলেন নি ত যে শ্রীদেবী নাচবে?
সকলে হো হো করে হেসে ওঠায় সুবিমলবাবু বলেন, উপেনদাকে দিয়ে শ্রীদেবীর নাচটা ওপেন করালে কেমন হয় হেমেন?
এতে আর-এক চোট হাসি ওঠে, যেন, এখানে সবাই পারিবারিক বয়োজ্যেষ্ঠের কাছে গোপন করে কোনো নিষিদ্ধ আনন্দ ভোগ করছে–সেখানে তাদের মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। ডি-সি এসে তার চেয়ারে বসেন। ফলে, শিল্পমন্ত্রী আর ডি-সির মাঝখানে একটা চেয়ার খালি পড়ে থাকে।
সন্তোষবাবু তার লম্বা হাতটা তুলে বলেন, সুবিমল, দেখো, আমার একটা প্রপোজাল আছে। এনাফ হিট হ্যাঁজ বিন জেনারেটেড বাই দি ফায়ারি ওরাটরি অব আওয়ার এসটিমড এম-এল-এ ফ্রম ময়নাগুড়ি।
তার পাল্টা আরো তাপ বিকিরণ করার জন্যে আমাদের জ্বালাময়ী বক্তা সুস্থির উঠে দাঁড়িয়েছিল বটে কিন্তু উপেনদার উপস্থিতি আমাদের এ যাত্ৰা বাঁচিয়েছে। সন্তোষবাবু কথা বলছিলেন সকলের দিকে মুখ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে, বিশেষ করে উত্তরখণ্ডীদের দিকে, নিজে একটু হাসছিলেন। তাঁর পাশে নকুল হাসি-হাসি মুখ করে বসেছিল, যেন তার হাসি দিয়েই সে সন্তোষবাবুর প্রস্তাবটাকে যতটা পারে সাহায্য করতে চায়।
সন্তোষবাবু বলে যান, আইনশৃঙ্খলার ব্যাপার নিয়ে সরকারের উদ্বেগ দেখে আমরা প্রস্তাব দিচ্ছি যে উত্তরখণ্ড সম্মিলন যেখানে যেমন হচ্ছে সেরকমই হোক, কিন্তু শেষ দিন জল্পেশ্ব অভিযান সম্মিলনের জায়গা থেকে শুরু না হয়ে, চৌপত্তির এদিক থেকে শুরু হোক।
হেমেনবাবু সঙ্গে-সঙ্গে বলেন, অভিযানটা বাদ দেন না, আর সবই করেন। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার জন্যে অভিযান পরিত্যক্ত। চৌপত্তিতে দাঁড়াবে কোথায় লোজন?
হেমেনবাবু ও সন্তোষবাবু হেসে ওঠেন বটে ও মুহূর্তে বোঝা যায় এই প্রস্তাবটা সকলে মেনে নেবে কিন্তু হেমেনবাবু অভিযান বাদ দেয়ার কথাটা নিয়ে আরো রগড়াবেন কি না এই নিয়ে একটি চাপা উদ্বেগও থাকে।
হেমেনবাবু বলেন, তার চাইতে জল্পেশ্বরের দিকে আর-একটু এগিয়ে আসুন, আপনারা বরং টাউনের বাইরে জমায়েতটা করুন।
বেশ, তাই হবে, বলে নকুল হাত তুলে দেয়। আর-কেউ কোনো আপত্তি না করায় নকুল দাঁড়িয়ে উঠে বলে, আমরা যারা এই কালচারাল ফাংশনের পার্টনার তাদের পক্ষ থেকে মাননীয় পর্যটন মন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, বনমন্ত্রী ও এম-এল-এ সাহেবকে অনুরোধ করছি এই ফাংশনে, বিশেষত শেষ দিন, সপরিবার উপস্থিত থাকতে।
আরে থাকব বলেই ত তোমাদের এত করে বললাম উত্তরখণ্ডটা সরাও, শ্রীদেবীটা রাখো, তা তোমরা শুনলেই না, বলে সুবিমলবাবু অনেকক্ষণ ধরে চেয়ার ছেড়ে ওঠেন।
.
ময়নাগুড়ি ব্লক অফিসের পাশের মাঠে বিরাট প্যান্ডেল-হেশিয়ানের। ভেতরে খড়ের ওপর ত্রিপল ও হেশিয়ান বিছিয়ে বসার ব্যবস্থা। সামনের দিকে, একটু কোনাকুনি, স্টিলের ও কাঠের ভাজ করা চেয়ার–সেগুলো গিয়ে শেষ হয়েছে হেশিয়ানেরই বেড়ায়। ঐ চেয়ারগুলির জন্যে দর্শকদের কোনো অসুবিধা হবে না। খড়ের ওপর বেছানো হেশিয়ানের আসন আবার বাশ দিয়ে তিন ভাগ করা-ফাস্ট, সেকেন্ড, থার্ড ক্লাশ। পুবদিকে কোন গেট নেই। পশ্চিমদিকে তিনটি বড় গেট, কিন্তু তাতেও পর্দা ঝুলছে। এই পুরো প্যান্ডেলটিকে ঘিরে চারদিকেই টিনের বেড়া, বেশির ভাগই কাঁচা বাঁশের কাঠামোতে। স্টেজের পেছন দিকে ও পাশে কাঠের কাঠামো–তাতে টিনগুলো ভ্রু দিয়ে আঁটা। টিনের বেড়ায় ঢোকার রাস্তা বেশ চওড়া। সেই রাস্তাগুলি আবার বাঁশ দিয়ে দুভাগ করা–পুরুষদের ও মহিলাদের জন্যে। স্টেজের পেছনে স্টেজের চাইতে একটু কম উচ্চতায় কাঠের পাটাতন বিছিয়ে গ্রিনরুম। সেই গ্রিনরুম ও স্টেজ কাঠের কাঠামোতে টিন দিয়ে আলাদা করে ঘেরা। ঢোকার জন্যে দুদিকে দুটো কোল্যাপসিবল গেট-সেটা দিয়েই স্টেজে ঢোকা যায়। গ্রিনরুমের জন্যেই আবার একটা কাঠের দরজা–সেটা প্রয়োজনে ভেতর থেকে বন্ধ করা যায়।
এই প্যান্ডেলের বাইরের মাঠটাতে নানা রকম দোকান বসেছে। বেশির ভাগই খাবারের। একটা বেশ লম্বা দোকানের উনুনটা বাইরের দিকে। সেখানে জিলিপি আর সিঙাড়া ভাজা হয়। সেই দোকানটিতে ভেতরে বসার ব্যবস্থা আছে। অনেকে বসেও বটে, কিন্তু বেশির ভাগই বাইরে উনুনের সামনে দাঁড়িয়ে গরম-গরম জিলিপি আর সিঙাড়া খবরের কাগজের টুকরোর ওপর নেয়। তাই দোকানটাতে দুটো ক্যাশ বাক্স, একটা দোকানের ভেতরে আর একটা ঐ উনুনের পাড়ে। এই দোকানটি ছাড়া ছোট ও মাঝারি দোকানও আছে। শুধু একটা টেবিল ও একটা উনুনি নিয়ে চায়ের দোকান। মাঠের ওপর প্লাস্টিকের চাদর বিছিয়ে চিনির রসে পাকানো শুকনো মিষ্টি। এলুমিনিয়ামের সসপ্যানে রসগোল্লা আর লাড্ড নিয়ে বসে একজন একটা টুলের ওপর। মাথার ওপর ভামনির ছাউনি দিয়ে তার তলায় শোয়ানো কাঁচের শো-কেসে মেয়েদের নানা রকম নকল গয়না কাগজে সঁটা। পেছনে কাঠের তাকে প্লাস্টিকের নানা রকম খেলনা। একটা দোকানে প্লাস্টিকের বালতি-গামলাও বিক্রি হচ্ছে। খোলা মাঠের মধ্যে পেছনে টাঙানো একটা পর্দায় সারি-সারি বেলুন। একটু দূরে একটা টেবিলের ওপর রাখা একটা খেলনা বন্দুক। ঐ বেলুনগুলিতে নম্বর দেয়া আর নীচে সারি সারি প্রাইজেও নম্বর দেয়া। কুপির আলো জ্বালিয়ে চানাচুর বাদামওয়ালা আর তিলেরখাজাওয়ালা। রাস্তা দিয়ে ঢুকলে বায়ে-ডাইনে দু-দুটো পান-সিগারেটের দোকান–চৌকির ওপর। ঢোকার সময় ডান দিকের পান-সিগারেটের দোকানের পেছনে সাইকেল, মোপেড, স্কুটার ও মোটর সাইকেল রাখার জায়গা।
এই মাঠটা ব্লক অফিসের পাশে কিন্তু রাস্তা থেকে এই মাঠে আসার কোনো ব্যবস্থা নেই। রাস্তাটা মাঠ থেকে অনেক উঁচু। রাস্তা থেকে মাটি ভাঙতে-ভাঙতে গড়াতে-গড়াতে বিরাট নালায় এসে পড়েছে। নালাটার ভেতর এখন এই শীতে ভেজা কাল মাটি আর সেই মাটির ওপর সবুজ শ্যাওলার আস্তরণ। কিন্তু সব জায়গায় সমান নয়। কোথাও কাল ভেজা মাটির ঢিবি, কোথাও কাল ভেজা মাটির গর্ত। এই নালীটা সরকারি জমি। তাই এখান থেকে যে যার খুশিমত মাটি কেটে নিয়ে নিজের জমি উঁচু করে নিয়েছে। ফলে, রাস্তার পাশে টানা একটা শুকনো খালের মত নালীটা পড়ে থাকে।
রাস্তা থেকে সরাসরি খাল পেরিয়ে মাঠে উঠে আসা সম্ভব নয় আর এই খালটার ওপর বাশ বা কাঠের কোনো অস্থায়ী সঁকো তৈরি করা হয় নি। কিন্তু শ্রীদেবীর গাড়ি ঢোকানোর জন্যে সাধারণের পক্ষে নিষিদ্ধ একটা কাঠের কালভার্ট তৈরি করা হয়েছে। ব্লক অফিসে ঢোকার বড় ক্যালভার্টটাই প্রধান প্রবেশ পথ। সেই ক্যালভার্ট দিয়ে খালটা পেরিয়ে ব্লক অফিসের দেয়াল ডান হাতিতে রেখে বেঁকলেই মাঠটাতে ঢোকা যায়। সেখানে যে একটু-আধটু গর্ত ছিল খালের মাটি কেটে সেগুলো ভর্তি করা হয়েছে। দু-চার ট্রাক বালি ঢেলে লেবেল করে দেয়ায় ঐ জায়গাটাকে প্রায় সদর রাস্তার মতই লাগছে–এক ঐ ব্লক অফিসের দেয়ালের পাশের জায়গাটা একটু সংকীর্ণ, তবু সেখান দিয়েও মোটর সাইকেল চলে আসছে।
কিন্তু সদর রাস্তার ওপর এই সম্মিলনের জন্যেই পাবলিকের একটা সঁকো তৈরি না হওয়ায় বেশ জুতমত একটা গেট বানানো যায় নি। নিখিল বঙ্গ উত্তরখণ্ড সম্মিলন লেখা নীল রঙের ফেস্টুন–একটা টাঙাতে হয়েছে প্যান্ডেলের পেছনের হেশিয়ানের ওপর রাস্তার দিকে মুখ করে। আর, একটা টাঙানো হয়েছে পান-সিগারেটের দোকানটায় পাশে কোনাকুনি, সেটাও রাস্তার দিকে মুখ করে। কিন্তু গেট না থাকায় সেই ফেস্টুন দুটো কেমন আলগা হয়ে ঝোলে। রাস্তা থেকে ও-দুটো দেখা যায় ঠিকই, বাসের লোকজনও দেখতে পায়, কিন্তু এই সম্মিলনের লোকজনের চোখের আড়ালেই থেকে যায় ফেস্টুনদুটো। টিনের বেড়ার গায়ে দড়ি দিয়ে আর-একটা ফেস্টুন ঝোলানো আছে কিন্তু দড়িগুলো টানাটান হয় নি বলে সেটাতে এত নানা রকম ভাজ পড়েছে যে ঠিক পড়া যায় না। তা ছাড়া, টিনের ওপর কাগজে লেখা নানা পোস্টার আছে–কোন দিন কী অনুষ্ঠান হবে সে-সব জানিয়ে, সেগুলোই বেশি চোখে পড়ে।
গেট একটা বানানো হয়েছে ময়নাগুড়ির চৌপত্তিতে, পেট্রল পাম্পের কাছে, একেবারে ন্যাশন্যাল হাইওয়ের ওপরে! হাইওয়ের ওপর বলেই গেটটা উঁচু করতে হয়েছে, যাতে আসাম থেকে ও আসামের দিকে যে-সব ট্রাক পাহাড়প্রমাণ মাল নিয়ে যায় সেগুলোর মাথা না ঠেকে। অত উঁচু করার জন্যে ইলেকট্রিক ও ফোনের তারের ওপরে গেটটাকে তুলতে হয়েছে বটে কিন্তু তারও ওপরে হাই ভোল্টেজ লাইন থেকে অনেকটা নামিয়ে রাখতে হয়েছে। অত বড় রাস্তার এপার-ওপার জুড়ে গেটটা এত চওড়া আর উঁচু হয়েছে যে চোখে পড়লে তাক লেগে যায়। মাথার ওপর লেখা নিখিল বঙ্গ উত্তরখণ্ড সম্মিলন, ময়নাগুড়ি। কিন্তু চোখে পড়াটাই মুশকিল। গেটটার পুরো মাথাটা যত বড়, এক-একটি স্তম্ভ তত মোটা নয়। দুই স্তম্ভকে যুক্ত করেছে আড়াআড়ি মাথার ওপরের যে-অংশ সেটাও সরু। ফলে, গেটটা কেমন দু-পাশের ও মাথার ওপরের দোকানপাট, বাড়িঘর, গাছপালার সঙ্গে মিশে আছে। এতই মিশে আছে যে ট্রাক বা বাস থেকে নজরে ত পড়েই না, এমনকি রিক্সায় চড়ে যেতেও চোখে পড়ে না। কিন্তু একবার যদি নজরে পড়ে যায়, তা হলে বারবারই দেখতে হয়–হ্যাঁ, গেট একখান হইছেন বটে। সাত দিনের এই সম্মিলনে যারা আসে-যায় তাদের আর এই গেট না দেখে উপায় কী আছে? কিন্তু সম্মিলনের মূল জায়গায় রাস্তার ওপর কোনো গেট না থাকায়–চৌপত্তির এই গেটটা যে ঐ সম্মিলনেরই গেট তা বোঝা যায় না।
সম্মিলনের মাঠের ভেতর সাইকেল, মোপপড, মোটর সাইকেল, স্কুটার রাখার ব্যবস্থা হয়েছে বটে কিন্তু গরুর গাড়ি রাখার কোনো জায়গা নেই। যদি রাস্তা থেকে সঁকো একটা তৈরি করা যেত, তা হলে অত বড় মাঠের একটা দিক গরুর গাড়িতে ভরে যেত, যেমন সব হাটে হয়। সঁকো না-থাকায় গরুর গাড়িগুলোকে রাস্তার পাশেই লাইন দিয়ে দাঁড় করাতে হয়। তাতেও অসুবিধে। ন্যাশন্যাল হাইওয়ে হলেও রাস্তাটা তত চওড়া নয়। আপ-ডাউনের গাড়ির রাস্তা ছেড়ে দিলে আর কতটুকু জায়গা থাকে? সেখান থেকেই ত খালের ঢাল। সে-ঢালে গরুর গাড়ি নামিয়ে দিলে ভোলা মুশকিল। অথচ, গরুর গাড়ির সংখ্যাও ত নেহাৎ কম নয়। সন্ধ্যাবেলার ফ্যাংশন দেখার জন্যে সেই দুপুরের পর থেকেই। পাশাপাশি গায়ের মেয়েরা বাচ্চারা হেঁটে, রিক্সায় ও গরুর গাড়িতে আসতে শুরু করে। ফাংশন শুরু হওয়ার আগেই মাঠ রাস্তা মিলে একটা মেলার মত হয়। এক-একটা বড় গাছের নীচে রাস্তার ওপর, গরুর গাড়িগুলোকে রাখা হয় আর গরুগুলোকে, হয় গাড়ির চাকার সঙ্গে, আর না-হয় খুঁটি পুঁতে তাতে, দড়ি ছোট করে বেঁধে দেয়া হয়। মেয়েরা ও বাচ্চারা নানা রঙিন শাড়ি-জামায় সেই গাছতলাতেই অপেক্ষা করে–যতক্ষণ ভেতরে নিয়ে যাবার জন্যে দেউনিয়া না আসে।
.
|| উদ্বোধন অনুষ্ঠানের বিভিন্ন বক্তৃতার সংক্ষিপ্তসার ||
শনিবার সকালে সম্মিলনের উদ্বোধন হল। সময় ছিল সকাল আটটা। কিন্তু মোটামুটি লোকজন জমতে-জমতেই বেলা নটা হয়ে গেল। সকালে শুধু পতাকা উত্তোলন ও কয়েকজন বিশেষ বক্তার বক্তৃতা ছিল। পতাকা তুললেন রাজবংশী সমাজের প্রধান নেতা পঞ্চানন মল্লিক। আর বক্তৃতা করলেন আসাম ও দার্জিলিং থেকে আসা দুই প্রতিনিধি আর কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। স্থানীয় যারা বললেন তারা সরাসরি উত্তরখণ্ড আন্দোলনে যোগ দেন নি, কেউ-কেউ পার্টিতেও নেই, কিন্তু বিভিন্ন পেশায় ও রাজনীতিতে নিজেরা প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত অত বড় প্যান্ডেলে শ-দেড়েক মত উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে অনেকেই বিকেলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত কর্মী। সুস্থিরের সঙ্গে কাজ করেন এমন কয়েকজন প্রাথমিক শিক্ষক সংগঠিত ভাবে এসেছিলেন। আর, ময়নাগুড়ি বাজারের যে ব্যবসায়ীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত তাদেরও কেউ-কেউ। এ-ছাড়া বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিলেন কয়েকজন–তাঁদের প্রতিনিধিই বলা যায়–যেকদিন সম্মিলন চলবে সেই ক-দিনই তাঁরা থাকবেন। এ ছাড়াও সম্মিলনে উপস্থিত ছিলেন কয়েকজন যারা রাজবংশী নন, কোনো ভাবেই উত্তরখণ্ড আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত নন। তাদের একজন ৭০-৭১ সালে লাটাগুড়ি এলাকায় কৃষকদের মুক্ত এলাকা তৈরি করতে গিয়ে কৃষকদের হাতে মার খেয়ে হাসপাতালে যান, হাসপাতালের বেডেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, তার বেডের পাশে কয়েকজন পুলিশ বসে, কিছুদিন পর তাকে কলকাতার এক হাসপাতালে বদলি করা হয়, সেখানে হাড়টাড়ের ওপর অনেক অপারেশন হয়, তারপর জেলেও থাকতে হয়। সব মিলিয়ে সাত-আট বছর পর ছাড়া পান। দাড়ি তখনো ছিল, এখনো আছে। কিন্তু সে-দাড়িতে এখন বেশির ভাগই শাদা ছোপ। এখন থাকেন জলপাইগুড়ি শহরেই, বাবার বাড়িতেই। কিছু করেন না। কিন্তু মাঝেমধ্যে এখানকার স্থানীয় নানা আন্দোলনে উপস্থিত থাকেন। তার কিছু করারও নেই কিন্তু এই ধরনের স্থানীয় সমস্যার ব্যাপারে তার যেন এক ধরনের আগ্রহ আছে। ইনি এসেছিলেন সঙ্গে একজন বন্ধুকে নিয়ে। কেউ তাকে নিমন্ত্রণ করেছে কি না বা আসতে বলেছে কি না–সেসব প্রশ্ন ওঠেই না। পাজামা-পাঞ্জাবি-দাড়ি আর একটা চাদরে এমন পরিচিত একজন ভদ্রলোককে দেখলে এসব সম্মিলনে একটু জোর আসে।
এরকমই এসেছিলেন ধূপগুড়ি ও বীরপাড়া অঞ্চলে কংগ্রেস নেতা বলে পরিচিত দুজন–অনিল রায় ও দেবকান্ত ক্ষত্রিয়। জেলাতে কংগ্রেস নেতা বলে এদের কেউ তেমন চেনে না কিন্তু স্থানীয়ভাবে কংগ্রেস নেতা বলে এদের যে-প্রতিপত্তি সেটা বিশেষত ভোটর সময় কাজে লাগে। কংগ্রেসের সরকার থাকলে স্থানীয় ব্যাপারস্যাপার নিয়ে এঁদের একটা ভূমিকা থাকে। এখন বয়স হয়ে গেছে। নিজেদের জমিটমি কিছু আছে কিন্তু এদের প্রধান একটা আয় হত নানা লোকের মামলা মোকদ্দমা বা সরকারের কাছে নানা কাজকারবারের ছোটখাট তদ্বির-তদারকি থেকে। এমন কিছু বড় কাজ নয়–এই সব কাজকেই খারাপ অর্থে এ-দেশী ভাষায় বলা হয় দেউনিয়াগিরি। এখন অনেক দিন সেই আয়টা নেই, সেই ভূমিকাটাও নেই। কংগ্রেসের সরকার থাকলে রাজনৈতিক মাতব্বরির যে-আত্মবিশ্বাস এদের চেহারার ফুটে ওঠে তাও নেই। ওরা স্থানীয় ভাবে নেতৃত্ব দিতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন। পঞ্চায়েত-উঞ্চায়েত হয়ে গ্রামে নতুন সব নেতা তৈরি হয়ে গেছে। সেই নতুন নেতৃত্বের এরা কেউ নয়। অথচ পঞ্চায়েত যখন ছিল না তখন এরাই ছিল পঞ্চায়েত। উত্তরখণ্ডের আন্দোলন প্রধানত গ্রামাঞ্চলকে কেন্দ্র করেই হবে বলে আশা। সে কারণেই এদের চোখেমুখে যেন কিছু অসহায় ভরসা যে উত্তরখণ্ড : তাদের পুরনো নেতৃত্ব ফিরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু উত্তরখণ্ড যেরকম মিছিল, মিটিঙ, সম্মিলন, দাবিদাওয়া–এসব করছে, তাতে তারা অভ্যস্ত নয়। বরং এ-সব থেকে তারা দূরেই থাকতে চায়।
উদ্বোধনের দিনের বক্তৃতাগুলো নানা রকম। উত্তরখণ্ডের নিজস্ব দলীয় পতাকা তোলা হল। লাল তেকোনা কাপড়ের মাঝখানে শ্বেত পূর্ণ সূর্য। পরে, এই নতুন পতাকা ব্যাখ্যা করে সভাপতি পঞ্চানন মল্লিক বলেছিলেন–ঠিক বলেন নি, তার ছাপানো সভাপতির ভাষণে ছাপা হয়েছিল, কামতাপুর রাজ্যের মুক্তির আন্দোলনের এই মুহূর্তে পতাকা রক্তবর্ণ ত্রিকোণ এবং মধ্যে মধ্যাহ্নকালীন খেত সূর্য ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরখণ্ড দল প্রাচ্যদর্শনে বিশ্বাসী। পৌরাণিক যুগ থেকে প্রাক ঐতিহাসিক যুগ পর্যন্ত ত্রিকোণ পতাকা প্রচলিত। ত্রিকোণ অর্থ ত্রিগুণ–সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ। রক্তবর্ণ মাতৃরজঃ সুতরাং শক্তির প্রতীক। শ্বেতবর্ণ পিতৃওজঃ বীজ সুতরাং জ্ঞানের প্রতীক অর্থাৎ সূর্য জ্ঞানের প্রতীক। শক্তি ও জ্ঞানের সমন্বয়েই উন্নয়নের পথ। জৈবিক ত্রিগুণাত্মিক ত্রিকোণ শ্বেতসূর্যসমন্বিত পতাকা সম্পূর্ণ অহিংস গণতান্ত্রিক পথে জ্ঞানের আলোকে দলের বিপ্লবাত্মক চিন্তাধারাকে লক্ষ্যে পৌঁছানোর দৃঢ়তা ঘোষণা করে।
সভাপতি, উদ্বোধক ও প্রধান নেতা পঞ্চানন মল্লিকের বক্তৃতাতেও এই বিষয়টিই প্রাধান্য পেল–ভারতীয় হিন্দুদর্শনে বিশ্বাস, ভারতের সংবিধানের প্রতি বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি বিশ্বাস ও কলকাতার নেতৃত্বের প্রতি সম্পূর্ণ অনাস্থা। তার বক্তৃতাতেই স্বাধীন কামতাপুর রাজ্য প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা হল। সেই দাবির সমর্থনে ইতিহাস থেকেও কিছু-কিছু যুক্তি এসেছে বটে কিন্তু বারবারই নিজেদের উপজাতীয় অস্তিত্বের স্বাতন্ত্র ঘোষণার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল বর্ণ হিন্দু সমাজের প্রতি আনুগত্যের সংস্কার।
তার বক্তৃতা শুরুই হল গীতার উদ্ধৃতি দিয়ে, তাও অনুবাদে নয়, সংস্কৃতে,
হতে বা প্রাপ্যসি স্বর্গং।
জিত্বা বা ডোক্ষ্যসে মহীং।
তস্মাদুত্তিষ্ঠ কৌন্তেয় যুদ্ধায় কৃতনিশ্চয়ঃ
সুখদুঃখে সমে কৃত্বা লাভালাভৌ জয়াজয়ে
ততো যুদ্ধার যুজ্যস্ব নৈবং পাপমবাসি।
তিনি প্রথমেই বলে নেন, ভারতবর্ষ মাতৃভূমি। ভারতবর্ষের অখণ্ডতা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করায় প্রতিটি ভারতবাসীর মত আমরাও সর্বপ্রকার ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত আছি। তারপরই যোগ করেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তরাংশের মানুষের সর্বাঙ্গীন উন্নতির জন্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আজ পর্যন্ত যা করার দরকার ছিল, তা করেন নি।….সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত ও শোষিত হচ্ছেন এখানকার বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজবংশী, সংখ্যালঘু মুসলমান, বাস্তুহারা নমশূদ্র, বহু উপজাতি ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষ। এই সকল অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে উত্তরখণ্ড দল। উত্তরখণ্ড দলের উদ্দেশ্য হল উত্তরবঙ্গকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে পৃথক করে ভারতীয় সংবিধানের ৩নং ধারা অনুযায়ী কামতাপুর নামে এক ভারতভুক্ত সমৃদ্ধিশালী অঙ্গরাজ্য গঠন করা এবং কলকাতা কেন্দ্রিক রাজনৈতিক কুচক্রী পুঁজিবাদী নেতাদের শোষণের থেকে উত্তরবঙ্গবাসীকে রক্ষা করে তাদের মুখে হাসি ফোঁটান।…আপনারা জানেন যে ভারতবর্ষের প্রাচীনকালে কামরূপ নামে এক রাজ্য ছিল। এই কামরূপ রাজ্যের পশ্চিম অংশে গঠিত হয় কামতাপুর রাজ্য। মহারাজা নরনারায়ণের রাজত্বকালে এই কামতা রাজ্যের সীমা আসাম ও উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত হয় কিন্তু কালক্রমে কামতা রাজ্যের সীমা কিছু পরিবর্তিত হয়ে সমস্ত উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে।…. উত্তরবঙ্গের কোনো অংশ সিরাজদৌল্লার শাসনাধীন ছিল না। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন পলাশি প্রান্তরে সিরাজদৌল্লা ইংরাজের হাতে পরাজিত হলে বাংলাদেশ ইংরাজ শাসনাধীন হয় কিন্তু একথা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে কামতা রাজ্য কোনোকালেই বঙ্গদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। স্বাধীনতা লাভের পর ভারত সরকার উত্তরবঙ্গকে পৃথক ভাবে শাসন করার জন্যে চেয়েছিলেন। ভাষা ভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন উত্তরবঙ্গে এলে সেই কমিশনের কাছে উত্তরবঙ্গকে কামতাপুর নামে এক রাজ্য হিশাবে ঘোষণা করার দাবি জানানো হয় ১৯৫৫ সালের ১৩ই মে তারিখে। এই কমিশনের মাননীয় সদস্য হৃদয়নাথ কুঞ্জরু, মিঃ পানিকর ও অন্যান্য সদস্যগণ কামতাপুর রাজ্য গঠনের যৌক্তিকতা স্বীকার করেন এবং প্রস্তাব গ্রহণ করেন। কিন্তু তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে নানা ভাবে বুঝিয়ে কামতা রাজ্যকে পশ্চিমবঙ্গের ভেতরে রাখেন। এরপর বোম্বাই ভেঙে মহারাষ্ট্র ও গুজরাট গঠন (১৯৬০), আসাম ভেঙে নাগাল্যাণ্ড (১৯৬২), পাঞ্জাব ভেঙে হরিয়ানা (১৯৬৬), আসাম ভেঙে মেঘালয় ও অরুণাচল (১৯৭১), মাদ্রাজ ভেঙে অন্ধ্র (১৯৫৩),এই সব উদাহরণ দেন।
কিন্তু পঞ্চাননবাবুর বক্তৃতার প্রধান অংশ খানিকটা আলগা ভাবে এই ইতিহাসের ওপরই নির্ভরশীল হয়ে থাকল। বর্তমান অবস্থার বিশেষত্বের প্রসঙ্গে তিনি বিশেষ কিছু প্রায় বললেনই না।
সেটা বরং একটু বেশি মাত্রায় স্পষ্ট করে দিলেন নকশালবাড়ি থেকে আসা সম্পৎ রায়। প্রথম যখন নকশালবাড়ি হয় তখন সেখানকার নকশাল-আন্দোলনের বিরুদ্ধে সম্পৎ রায় জোতদারদের একটা কৃষক সমিতি তৈরি করে নকশালপ্রভাবিত কৃষকদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধ নেমে পড়েন। তখন সম্পৎ রায়ের বয়স বছর চল্লিশ, এখন বছর ষাট। চারু মজুমদার, কানু সান্যালের নেতৃত্বে নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলন শুরুতে ত ছিল কৃষকদের ন্যায্য ভাগের আন্দোলন, কোথাও-কোথাও আধিয়ারির দখলের আন্দোলন। ও-সব এলাকায় কোনোদিনই গোলমাল-টোলমাল হত না, ফলে থানাপুলিশের ব্যাপার ছিল বললেই চলে। সম্পৎ রায়ই প্রথম স্থানীয় জোতদারদের দ্রুত সংগঠিত করে পূর্ণিয়া থেকে ভাড়া করে লোক নিয়ে এসে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। সম্পৎ রায় মাইক ফাটিয়ে বললেন, অনেকে বলেন এটা রাজবংশীদের দল–এই উত্তরখণ্ড দল। আমি এ কথা মানি না। উত্তরবঙ্গে রাজবংশী বেশী–যা কিছু করবেন তাতেই রাজবংশী বেশি হবে। কমিউনিস্টরা যখন মিছিল করে তখন সেখানেও রাজবংশী বেশি থাকে–তাকে ত কেউ রাজবংশী পার্টি বলে না। আবার চা বাগানের মজুরদের নিয়ে সিটু বা আই-এনটিইউসি যখন আন্দোলন করে, তখন তাকে ত কেউ মদেশিয়া আন্দোলন বলে না–কিন্তু তাতে ত মদেশিয়ারাই বেশি থাকে। আপনারা ভাবেন উত্তরবাংলায় রাজবংশীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ অথচ দেখেন, কোনো জায়গায় রাজবংশীরা চাকরি পায় না, রাজবংশী কৃষক ব্যাঙ্কের লোন পায় না। গত চল্লিশ বছর দেশ স্বাধীন হল–তাতে রাজবংশীদের কোন উপকার হল? প্রত্যেক সরকার একজন করে রাজবংশী মন্ত্রী রাখে। আগে পুরা মন্ত্রী রাখত, এখন আধামন্ত্রী একজন রাখে। তাতেই রাজবংশীদের বাপঠাকুর্দা উদ্ধার হয়ে গেল। কিন্তু আমাদের এ-আন্দোলন–উত্তরবঙ্গের সকলের জন্যে আন্দোলন, শুধু রাজবংশীদের আন্দোলন এটা নয়। আমরা চাই উত্তরবঙ্গের সবাই আমাদের সঙ্গে আসেন।
আসাম থেকে যিনি এসেছিলেন তিনি আসামের কোন পার্টির প্রতিনিধি বা কেন এসেছেন সেটা বোঝা গেল না। কিন্তু তার বক্তব্যটা খুব নির্দিষ্ট ছিল। তিনি বললেন, ভারতবর্ষের রাজনীতিতে একটা গুরুতর পরিবর্তন ঘটছে। এতদিন পর্যন্ত দিল্লি থেকে সারা ভারতের শাসন চালানো হত, কিন্তু এখন একটা সময় এসেছে যখন আঞ্চলিক শক্তিগুলিই আলাদা-আলাদা অঞ্চল থেকে মিলিভাবে ভারতবর্ষ চালাবে। কেন্দ্রে একটা সরকার থাকতে পারে, থাকবেও, থাকা দরকার। কিন্তু সে-সরকারকে চলতে হবে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ওপর নির্ভর করে। এইভাবে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলির সঙ্গে কেন্দ্রের একটা লেনদেনের সম্পর্ক তৈরি হবে। কেন, সে সম্পর্ক এখনই তৈরি আছে। তামিলনাড়ুর কথাই ধরুন। সেখানে কত দিন হল স্থানীয় ডি-এম-কে বা এ-আই-এ-ডি-এম-কে দলের সঙ্গে কেন্দ্রের কংগ্রেসের একটা বোঝাপড়া হয়ে আছে। রাজ্যে ডি-এম-কে বা এ-আই-এ-ডি-এম-কে ক্ষমতায় থাকবে–সেখানে কংগ্রেস কোনো ভাগ বসাবে না, কেন্দ্রে কংগ্রেসকে ক্ষমতায় থাকতে এরা সাহায্য করবে–সেখানে এরা কোনো ভাগ চাইবে না। একবার কংগ্রেস হিশেবে ভুল করেছিল, রাজ্যে ক্ষমতার কে আসবে! সেবার কংগ্রেসও সেই ভুলের খেশারত দিয়েছে। শুধু কংগ্রেস নয়, কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় যারাই থাকবে তাদেরই রাজ্য বা আঞ্চলিক দলগুলির সঙ্গে এরকম বোঝাপড়া করে নিতে হবে। ধরুন, ১৯৭৭ সালের ভোটে তামিলনাড়ুতে এ-আই-এ-ডি-এম-কে ভোটে জিতল আর সারা ভারতে কংগ্রেস হারল। এই এ-আই-এ-ডি-এম-কের সঙ্গে কেন্দ্রের জনতা পার্টির আপোশ-সমঝাওতা হল। ১৯৮০-তে ইন্দিরা গান্ধী ফিরে এলেন, তামিলনাড়ুর এ-আই-এ-ডি-এম কে সরকারকে কংগ্রেসবিরোধী বলে বরখাস্ত করে ডিএমকের সঙ্গে সন্ধি করলেন। ছ মাস পরের ভোটের কংগ্রেস ডুবল, ডি-এম-কেও ডুবল। এ-আই-এ-ডি-এম-কে জিতে গেল। ইন্দিরা গান্ধী তার ভুল বুঝতে পেরে সাত তাড়াতাড়ি এ-আই-এ-ডি-এম-কের সঙ্গে রফা করে নিলেন রাজ্য তোমাদের, কেন্দ্র আমাদের। এই রাজনীতির ধরনটাই এখন ভারতে নতুন ভাবে এসেছে আপনাদের উত্তরখণ্ড আন্দোলনকে সেইভাবে পরিচালিত করতে হবে।
এই আসামের প্রতিনিধি রাজনীতির কায়দাকানুন নিয়ে আর-একটা কথা বলেন, এতদিন ভারতের রাজনীতি এই রকম ভাগে ভাগ হয়ে এসেছে কংগ্রেসবিরোধী ও কংগ্রেসসমর্থক। বা, এটাকে উল্টেও বলতে পারেন– কমিউনিস্টবিরোধী ও কমিউনিস্টসমর্থক। বা, এটাকে আর-এক ভাবে বলতে পারেন–কংগ্রেস কমিউনিস্টবিরোধী ও কংগ্রেস কমিউনিস্টসমর্থক। কংগ্রেস ভেঙে যে-সব দল তৈরি হয়েছে সেই সব দল ও বিজেপি, কংগ্রেস কমিউনিস্ট বিরোধী। এ রকম শাদায়কালয় রাজনীতিকে ভাগ হতে হবে কেন? কেন একদলকে কংগ্রেস ও কমিউনিস্টদের সমর্থক বা বিরোধী হতেই হবে? এই দুই দল কিন্তু সেরকম কোনো বাধানিষেধ মানে না। এরা যখন যার সঙ্গে ইচ্ছে রফা করে, যখন যার বিরোধিতার ইচ্ছে তার বিরোধিতা করে। আমরাও সেভাবেই চলব। আমরা কংগ্রেসও না, কমিউনিস্ট না। প্রত্যেকের সঙ্গেই আমাদের লেন-দেনের সম্পর্ক। এখন কমিউনিস্টরা এখানে ক্ষমতায় আছে। কমিউনিস্টরা যদি আপনাদের দাবি মেনে নেন–রাজবংশীপ্রধান অঞ্চলে যদি রাজবংশীদের প্রাধান্য স্বীকার করে নেন, যদি রাজবংশীদের চাকরির ব্যবস্থা করেন, বা, রাজবংশী ভাষার প্রাধান্য দেন, তা হলে আপনাদের আপত্তি কী? তেমনি আবার এই সব দাবি আদায়ের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকারের কংগ্রেস যদি আপনাদের সাহায্য করে তা হলে আপনারা কেন্দ্রীয় সরকারের বা কংগ্রেসের সাহায্য নেবেন। গোর্খাল্যাণ্ড হবে কি হবে না সেটা এখনই বলা যায় না বটে কিন্তু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যখন গোখাল্যাণ্ডের নেতা ঘিসিংকে জাতিদ্রোহী বলেছিলেন, কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী তার বিরোধিতা করেছিলেন। আবার রাজীব গান্ধী যখন দার্জিলিং সফরে গেলেন, তখন ঘিসিং হরতাল ডেকে দিলেন। এটাই হওয়া উচিত। আপনাদের পক্ষে যা-কিছু যীক কাজে লাগানো, আপনাদের বিপক্ষে যা-কিছু তার বিরোধিতা করা। তার জন্যে কংগ্রেস বা কমিউনিস্টের স্থায়ী সমর্থক বা স্থায়ী বিরোধী হাওয়ার কোনো দরকার নেই। দেশের ভেতরে কি কংগ্রেস আর কমিউনিস্টই আছে–আর-কিছু নেই? দেশের বেশির ভাগ মানুষই কংগ্রেসও নয়, কমিউনিস্টও নয়। আপনাদের এই আন্দোলনকে সেই কংগ্রেস কমিউনিস্ট বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
দার্জিলিং থেকে যিনি এসেছিলেন, তার বক্তৃতার পর জানা গেল তিনি অধ্যাপক। তিনি সম্পূর্ণ নতুন কথা বললেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ তৈরি করার প্রতিশ্রুতি কংগ্রেস দিয়েছিল, সব দল সেটা সমর্থন করেছিল। কেন? না, ব্রিটিশরা তাদের নিজেদের দরকার অনুযায়ী। দেশটাকে যখন যেমন ইচ্ছে ভাগ করে চালাত। মাদ্রাজ ছিল বিরাট একটা প্রদেশ। এখনকার কেরালা বা কর্ণাটক ছিলই না। ত্রিবাঙ্কুর-কোচিন, পেপসু এসব প্রদেশ বা রাজ্য হয়েছিল। বাংলা-বিহার-ওড়িশা একসঙ্গে ছিল, আবার আলাদা হয়ে যায়। উত্তরপ্রদেশ ছিল না, ছিল ইউনাইটেড প্রভিন্স। স্বাধীনতার পরে রাজ্যসীমা পুননির্ণায়ক কমিটি নতুন নতুন রাজ্য তৈরির সুপারিশ করেন, ভাষার ভিত্তিতে নতুননতুন রাজ্য তৈরি হয়। ভাষার ভিত্তি মানে ত জাতি-ভিত্তি। জাতি ও ভাষাগত এক-একটা রাজ্য–এটাই ভারতীয় সাধারণতন্ত্রের আদর্শ। যেমন, পাবলিক সেকটর ভারতীয় শিল্পনীতির আদর্শ। যেমন, পরিকল্পনা ভারতীয় উন্নয়নের আদর্শ। একটার পর একটা পাবলিক সেকটরের কারখানা তৈরি হয়। একবার কতকগুলি কারখানা তৈরি করে দিয়েই ত আর বলা হয় নি যে, ব্যাস এই হয়ে গেল আমাদের পাবলিক সেকটর। তেমনি, একটা পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করেই ত আর বলা হয় নি, ব্যাস এই হয়ে গেল আমাদের পরিকল্পনা। তা হলে রাজ্যসীমা পুননির্ণায়ক কমিটিই বা চিরকালের জন্যে একবার। সব রাজ্যের সীমা ঠিক করে দিয়ে কেন বলবে, ব্যাস এইগুলিই আমাদের একমাত্র রাজ্য। ভারতবর্ষের নিজেরই সীমা গত চল্লিশ বছরে কত বদলে গেছে, বলুন। সিকিম আগে ভারতের মধ্যে ছিল না, সিকিমের বাইরে দিয়ে এখন ভারতের সীমা চলে গেছে। তেমনি আকসাই চীন কার্যত আমাদের হাতে নেই, কার্যত ভারতের মধ্যে নেই। এক আমাদের সার্ভে অব ইন্ডিয়ার মাপেই এসব জায়গাকে ভারতের জায়গা বলে দেখানো হয়, পৃথিবীর আর-সব দেশের ম্যাপে এ-সব জায়গাকে চীনের বলে দেখানো হয়, যেমন, আজাদ কাশ্মীরকে দেখানো হয় পাকিস্তানের জায়গা বলে। তা হলে, ভারতের সীমাই যদি এরকম বদলাতে পারে তা হলে রাজ্যের সীমাইবা বদলাবে না কেন? যখন ১৯৫৩ সালে রাজ্য সীমা স্থির হয়েছিল তখন বিহারের ও বাংলার আদিবাসীরা কিছুই জানত না, গোখারাও কিছু জানত না, আপনারাও কিছু জানতেন না। এখন আমরা যদি জেনেবুঝে বলি আমাদের ভাষা ও জাতির জন্যে আলাদা রাজ্য দাও, তার মধ্যে দোষটা কোথায়? বাঙালিরা তখন বলেছিল, বিহারের কিছু জায়গায় বাংলা ভাষা চালু আছে, যারা থাকে তারা বাঙালি, সেই জায়গাটা পশ্চিমবাংলায় দিয়ে দাও। দিয়ে দেয়া হল। এখন আমরা যখন বলছি যে যারা নেপালি ভাষা বলে তাদের একটা রাজ্য করে দাও–তখন আমাদের বলা হল, বিচ্ছিন্নতাবাদী। আপনারা যদি বলেন আমরা রাজবংশীরা একটা আলাদা রাজ্য চাই–তা হলে বলা হবে বিচ্ছিন্নতাবাদী। আমরা ত আসলে এখনই বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি–নিজের ভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন, নিজের হকের জায়গা থেকে বিচ্ছিন্ন, নিজের হক থেকেই বিচ্ছিন্ন। আর যাই হোক, এ কথা ত কেউ বলছে না যে নেপালিরা বাঙালি। তা যদি না বললো, তা হলে আমাদের আলাদা রাজ্য হবে না কেন। আপনাদের আলাদা রাজ্য হবে না কেন? রাজ্য পুননির্ণায়ক কমিটি আবার কাজে হাত দেবে না কেন? নাকি তা হলে পশ্চিমবাংলা ছোট হয়ে যাবে। তা হলে এ কথা ত ব্রিটিশরাও বলতে পারত বাংলাকে ভাগ করলে ছোট হয়ে যাবে, সবটাই পাকিস্তানে যাক। ১৯৫৩ সালে যখন রাজ্য ভাগ বাটোয়ারা হয় তখন আমরা ছিলাম না। ছিলাম না বলে আমাদের কাকা-জ্যাঠারা আমাদের সম্পত্তি দেখাশোনা করেছেন। এখন সাবালক হয়ে যখন আমরা সম্পত্তিতে আমাদের ভাগ চাইছি তখন সেই কাকা-জ্যাঠারা বলছেন-এ ছেলেটা বড় বেয়াদপ, আমাদের সুখের সংসারটাকে ভেঙে আলাদা হতে চাইছে। তা আমরা বলি, কাকা শোনো, জ্যাঠা শোনো, সংসারটাও তোমাদের, সুখটাও তোমাদের, আমার থাকল কী? ছেলে লায়েক হলে তার বিয়েশাদি দিয়ে তাকে সংসার তৈরি করে দিতে হয়। ত, আমার ত দাড়ি গজিয়ে এখন পাকতে শুরু করেছে, গোফ পাকার ভয়ে গোফ ছেটে দিয়েছি, কিন্তু তবু ত আমাকে বিয়েশাদি দিয়ে সংসার করানোর দিকে আপনাদের মন নেই। এ কেমন ব্যবহার। তা, এতদিন। যে আমাদের দেখভাল করলেন তার জন্যে আপনাদের প্রণাম করছি, কিন্তু এখন আমার দেখভাল আমাকেই করতে দিন। আপনারা রাজ্যের সীমা নতুন করে ঠিক করার কমিটি আবার চালু করুন, তার রায় মেনে নিন।
.
জলপাইগুড়ি শহর থেকে যে-দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক কৃষকদের মুক্ত এলাকা তৈরির জন্যে অনেক বছর জেল খেটেছেন তাকে বক্তৃতা করতে ডাকা হয়। কিন্তু তার সঙ্গে এই সম্মিলনের সম্পর্কটা নিয়ে কেউই নিশ্চিত নয়–কে তাকে নেমন্তন্ন করেছে, এখন ইনি কী করেন। সাধারণ ভাবে এ-রকম ভদ্রলোকদের নাকশালিয়া বলেই ডাকা হয়। নাকশালিয়াই হোক আর যাই হোক একজন ভদ্রলোকের ছেলে, বা পড়াশোনাজানা একজন ভদ্রলোকই, যদি এরকম সম্মিলনে হাজির থাকেন তা হলে তাকে কিছু না বলতে দিলে হয়? কিন্তু ভদ্রলোক সবচেয়ে দরকারি কথা বললেন একেবারে উত্তরখণ্ড আন্দোলনের বর্তমান কর্মসূচির প্রধানত বিষয়টি নিয়ে। সরকার জানিয়ে দিয়েছেন আর-মাসখানেকের মধ্যেই তিস্তা ব্যারেজের প্রাথমিক উদ্বোধন হবে। মুখ্যমন্ত্রী উদ্বোধন করেন। তার জন্যে সেদিন সারা উত্তরবাংলা থেকে বামফ্রন্ট মিছিল নিয়ে আসবে। উত্তরখণ্ড দাবি করেছে যে তিস্তা ব্যারেজ এখন উদ্বোধন করা চলবে না। কৃষকদের জমি অধিগ্রহণ করা চলবে না, যে-জমি ব্যারেজের জন্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে তার ক্ষতিপূরণের বদলে সমপরিমাণ জমি কাছাকাছি এলাকায় সরকারি খাশজমি থেকে কৃষকদের দিতে হবে, যে কৃষকদের জমি ব্যারেজের জন্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে তাদের মধ্যে যদি এমন কেউ থাকে যার অন্য জমি ইতিপূর্বে ভেস্ট হয়ে গেছে, তাহলে অধিগৃহীত জমির সমপরিমাণ জমি তার সেই ভেস্ট জমি থেকে ফিরিয়ে দিতে হবে। এই সব দাবির ভিত্তিতে উত্তরবঙ্গের, বিশেষত জলপাইগুড়ি জেলার, নানা জায়গা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যাওয়া হবে তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের দিন। উত্তরখণ্ডের এই সম্মিলন থেকে বলা হচ্ছে আগামী একমাস ধরে সেই বিক্ষোভ মিছিল সংগঠনের জন্যে। এই নাকশালিয়া ভদ্রলোক এই বিষয়টি নিয়েই বললেন, শুধু এই বিষয়টি নিয়েই। ভারতে ভাকরা-নাঙ্গাল হয়েছে, হীরাকুঁদ বধ হয়েছে, নাগার্জুনসাগর হয়েছে, আরো কত-কত জায়গায় কত নতুন-নতুন ড্যাম হয়েছে, বাধ হয়েছে। এই পশ্চিমবঙ্গেই দামোদর হয়েছে, ময়ূরাক্ষী হয়েছে, মাইথন হয়েছে, পাঞ্চেৎ হয়েছে। কিন্তু যেখানেই হোক না কেন তাতে সর্বনাশ হয়েছে এই সব জায়গায় গরিব অধিবাসীদের, বিশেষত আদিবাসীদের। কেন? এই সব ব্যারেজ, ড্যাম ইত্যাদির জন্যে বাছা হয় পাহাড় ও জঙ্গলের এমন দুর্গম জায়গা যেখানে বন্য পশুর সঙ্গে লড়াই করে পশুর মতই জীবনযাপন করে আদিবাসী মানুষজন, গরিব মানুষজন। কেন? না, ঐ রকম দুর্গম জায়গায় তারা এই ভদ্রলোকদের শোষণের হাত থেকে বাঁচবেন। কিন্তু যখন ব্যারেজ বা ড্যামের জন্যে জমি বাছা হয় তখন সেই জমি থেকে এদের উচ্ছেদ করা হয় প্রথম। উচ্ছেদ করে ঐ ব্যারেজ বা ড্যামেই শ্রমিক হিশেবে নিয়োগ করা হয়। তারপর, ঐ ব্যারেজ বা ড্যামের জলে যখন জমিতে ফসল ফলাবার অবস্থা তৈরি তখন সেই জমির দাম ত সোনার দাম। তখন বড় বড় ব্যবসায়ীরা সেই জমিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবুজবিপ্লব তৈরি করে। ভারতে একটা উন্নয়ন পরিকল্পনার নাম বলুন, যেখানে একটা ব্যারেজ বা ড্যামের ফলে আদিবাসীদের বা গরিব মানুষদের এক ফোঁটা উপকার হয়েছে। আপনাদের এখানে এতদিন এই উপদ্রব ছিল না। তিস্তা ব্যারেজের চেহারায় সেই উপদ্রব শুরু হল। তিস্তা ব্যারেজের জলে নাকি লক্ষ-লক্ষ জমি উর্বর হবে, তাতে চাষ হবে, তাতে সোনা ফলবে, সেই সোনা বেচে কৃষকরা বড়লোক হবে, কিন্তু তার আগেই, ঐ ব্যারেজ থেকে এক ফোঁটা জলও কৃষির কাজে লাগার আগেই কৃষকরা জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, কৃষকের জমি নামমাত্র মূল্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যে কৃষককে জমির মালিক থেকে তিস্তা ব্যারেজের শ্রমিকে পরিণত করা হয়েছে সেই কৃষককে কি ব্যারেজের জল সোনার ফলন দেবে? ব্যারেজ হওয়ার আগে তাও কৃষক তিস্তার জল আজলা ভরে খেয়ে নিজের খিদে চাপা দিতে পারত, তিস্তার চরে বাঘভালুকের সঙ্গে লড়াই করে দু-এক মুঠো ধান ফলাতে পারত, ব্যারেজ হওয়ার পর কৃষক তাও পারবে না, কারণ আগে ত তিস্তার জল ছিল আকাশের বাতাসের মত–যার খুশি নিশ্বাস নাও। কিন্তু এখন ত তিস্তার জল সরকারি ব্যারেজের জল, এখন ত সে-জলের দাম আছে, যার ইচ্ছে সে ত এখন এই জল দুহাত ভরে তুলে নিতে পারবে না, খাওয়ার জন্যেও নিতে পারবে না। তিস্তার চর ত আর পতিত জমি নয় যে হাল যার ফলন তার। ব্যারেজের ফলে তিস্তার দামও ত হুহু করে বাড়ছে। এ কেমন উন্নয়ন যেখানে নদীর জলের ওপর তার স্বাভাবিক অধিকার কৃষক হারাবে? চরের জমির ওপর তার স্বাভাবিক দখল সে হারাবে? বনের জমির ওপর বাঘভালুকের স্বত্ব আছে কিন্তু সে-জমি কৃষক চাষ করলেই হয়ে যাবে স্কোয়াটার বা অনধিকারী দখলদার। এতদিন ভারতের মানুষকে বোকা বানিয়ে এই সব ব্যারেজ, ড্যাম তৈরি করা হয়েছে কিন্তু নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে লোকজন শিক্ষা নিয়েছে। ওড়িশাতেই দুটো ঘটনা ঘটেছে–একটা বালিয়াপোলে, আর-একটা কোথায় আমার মনে পড়ছে না। বালিয়াপোলে সরকার কামানের গোলা পরীক্ষার জন্যে সমুদ্রের ধারের জমি অধিগ্রহণ করেছে। কিন্তু সেখানকার লোকজন তাদের দখল ছাড়ছে না। সেখানে তুমুল আন্দোলন চলছে। সরকার এখনো তার দখল নিতে পারছে না। আর-একটি জায়গায় এক পাহাড়ে নতুন একটি উদ্যোগ নেয়া হলে সেখানকার আদিবাসীরা প্রবল প্রতিরোধ তৈরি করে বলেছেন তারা এই উদ্যোগ চান না। আপনাদের উত্তরখণ্ড আন্দোলনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আপনাদের হাতে। সে বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। কিন্তু মাসখানেক পরে তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বিক্ষোভ দেখাবার যেকর্মসূচি আপনারা নিয়েছেন–সেই কর্মসূচিকে সমস্ত শক্তি দিয়ে সফল করুন। আপনারা যদি চেষ্টা করেন, তা হলে তিস্তা ব্যারেজ বন্ধ করে দিতে পারবে, যা হয়েছে তাও অকেজো করে দিতে পারেন। সেটাই হবে আপনাদের প্রধান সাফল্য।
ভদ্রলোক যে এরকম বক্তৃতা দেবেন তা সভার উদ্যোক্তারা নিশ্চয়ই জানতেন না। তারা, ভেবেছিলেন, গয়ানাথ জোতদারকে দিয়েই তিস্তা ব্যারেজ সম্পর্কিত কথা বলবেন। গয়ানাথ জোতদার উত্তরখণ্ডে যোগ দিয়েছেন তার এই কথাটা উত্তরখণ্ডকে দিয়ে বলাবার জন্যেই, কিন্তু এই ভদ্রলোকই যখন সেকথা তুলে দিলেন, তখন তার পরেই সভার সভাপতি পঞ্চাননবাবু গয়ানাথ জোতদারের নাম ডেকে দিলেন এইটুকু যোগ করে যে গয়ানাথবাবুরা এই ডুয়ার্স অঞ্চলে পুরুষানুক্রমিকভাবে বসবাস করে আসিতেছেন এবং তিস্তা ব্যারেজের বিষয়ে তিনি অনেক কিছু জানেন।
গয়ানাথ কোনোদিন বক্তৃতা করে নি। নাম শোনার পর থেকেই তার বুক ধুকপুকুনি শুরু হয়। নাম ডাকার সঙ্গে ঐটুকু জুড়ে দেবার জন্যে যে সময় লাগে তাতে তার বুকটা একটু শান্ত হয় বটে কিন্তু গলা শুকিয়ে যায়। অথচ ইতিমধ্যেই তাকে পাশ থেকে দু-একজন বলে, গয়ানাথবাবু যান।
গয়ানাথ যেখানে বসে ছিল সেখানে বসে থেকেই যদি বলত, হয়ত তার খুব অসুবিধে হত না, কিংবা অসুবিধেটা সামলে নিত। শেষ পর্যন্ত ত তাকে উঠে মঞ্চে যেতে হয় ত মাইকের সামনে দাঁড়াতে হয়। গয়ানাথ তার কথা তাড়াতাড়ি শেষ করে দেবার বাস্তব বুদ্ধি থেকে প্রথমেই চিৎকার করে ওঠে, মোর কিছু কহিবার নাই। মোর একোটা কাথাই কহিবার আছে। গয়ানাথ এত জোরে চিৎকার করে যে মাইকে কুঁই কুঁই আওয়াজ শুরু হয়, মাইকওয়ালা তাড়াতাড়ি আওয়াজটা কমিয়ে দেয়। তখন গয়ানাথ বলে চলেছে, এই সব সরকারগিলান ভাবিবার ধরিছেন যে ধান, চাল, আলু, কুমড়া সব নদীর জলত ভাসি আসে। তার তানে জমির কুনো দরকার নাই। যেইলার ঘরত যতখান, জমি আছিল সব ত সরকারের ঘরত সিদ্ধাইছে। ত সরকারই চাষ করিবার ধরুক কেনে ঐ সব জমি। এ্যালায় একখান নতুন ঢক ধরিছে তিস্তা ব্যারেজের নামত। যার ঐঠে জমি আছিল, সব জমি নদীর ভিতর সিদ্ধাই নিছে। আগত মানষিলা নদীর ভিতর চরত গিয়া চাষ করিবার ধরিতেন। এ্যালায় তিস্তা ব্যারেজের তানে ডাঙ্গা জমি নদীর ভিতর টানি নিবার ধরিছে। তা, চাষ করো কেনে। তিস্তা নদীর জলত ধান চাষ করো। এইলা মানষিগিলা কোটত আসিছেন হে? হামার তিস্তাত্ যে কুনোকালে ব্যারেজবুরেজ না আছিল, তাহাতে ধান চাষ হইল কি না হইল। এ্যালায় জমিও টানিবার ধরিছে, নদীও টানিবার ধরিছে। মুই এইসব ব্যারেজবুরেজ না চাও। এইখানই মোর কাথা। গয়ানাথের বক্তৃতার শেষে হাততালি পড়ে। এতক্ষণ বক্তৃতাগুলো কেমন বানানো ও কঠিন মনে হচ্ছিল, গয়ানাথের বক্তৃতাটা সিধে ও সরল মনে হয় শ্রোতাদের কাছে।
.
এইভাবেই উত্তরখণ্ড সম্মিলন শুরু হয়। ছ-দিন ধরে চলতে থাকে। একদিকে পঞ্চানন মল্লিকের মত প্রবীন লোকজন যাদের কাছে উত্তরখণ্ড বলতে এক অস্পষ্ট অতীতের কিছু আনুমানিক গৌরবের দিন ফিরে যাওয়া বোঝায়–কিন্তু কী ভাবে সে-প্রত্যাবর্তন বা পুনরাগমন ঘটবে সে-বিষয়ে কোনো ধারণাই নেই। অন্যদিকে, সুস্থির রায় বর্মনের মত টগবগে তরুণ যারা উত্তরখণ্ড বলতে বোঝায় তাদের আদিবাসীসত্তার এক লড়াকু সংগঠন–যে-সংগঠন নিজেদের কৌম-সংহতির জোরে আদায় করে নেবে রাজশক্তির কাছ থেকে তাদের নিজস্ব ভূমিখণ্ড। পঞ্চানন মল্লিক আর সুস্থিরের মধ্যে সম্ভবত এই মিল ঘটে যায় যে তাদের উভয়েরই দরকার রাজবংশী অতীতের এক গৌরবময় লোককথা যা ইতিহাসে সমর্থিত। সেই হাজোর কাহিনী, শিশু-বিশুর কাহিনী, সেনাপতি চিলা রায়ের দিগ্বিজয়ের কাহিনী। তাদের চোখের সামনে এই প্রবল বর্তমানটা ত সব সময়ই হাজির থাকে যে কোচবিহারে এক রাজবংশী রাজবংশ সেই ১৫১০ থেকে ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত স্বাধীনভাবে, তারপর ১৯৪৯ পর্যন্ত করদ দেশীয় রাজ্য হিশেবে, ক্ষমতা ভোগ করেছে প্রায় মোট ৪৪০ বছর। পূর্ব আর পশ্চিমবঙ্গ মিলিয়ে আর-কোথাও এমন আর-কোনো দেশীয় রাজ্য ছিল না, নেই। এখনো সেরাজপ্রাসাদ দাঁড়িয়ে আছে। সেই রাজবংশেরই আর-একটি ভাগ বৈকুণ্ঠপুরের জমিদারি স্বাধীন রাজত্বের মতই ভোগ করেছে প্রায় এই পুরো সময়টাই। সেই সুবাদেই ত মালদহ থেকে দার্জিলিঙের তরাই পর্যন্ত এই বিরাট জনগোষ্ঠী নিজেকে রাজবংশী বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু পঞ্চানন মল্লিক আর সুস্থিরের মধ্যে এই মিল সত্ত্বেও এই অমিলও যে-কোনো উপলক্ষে বেরিয়ে পড়ে যে পঞ্চাননের কাছে এই অতীত গৌরব বিষয়ে আত্মসচেতনতাই রাজবংশী সমাজের পক্ষে অনেকখানি বা প্রধান অবলম্বন–জনগোষ্ঠীর আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্যে। আর সুস্থিরের কাছে এই অতীত গৌরব রাজবংশী সমাজের নিজস্ব ভূমি-অধিকারের একটা অবলম্বনমাত্র, একটা অবলম্বনই-তার বেশি কিছু নয়।
এই উত্তরখণ্ডের আওতার মধ্যে এসে যেতে চায় সম্পৎ রায়–যে নকশালবাড়ি আন্দোলনের মুখেই ভূমিহীন আদিবাসী কৃষকের ভূমিদখলের অভিযানের বিরুদ্ধে নিজস্ব এক সৈন্যবাহিনী তৈরি করে ছিল প্রায় বিশ বছর আগে, আর, জলপাইগুড়ির সেই ভদ্রলোকের নকশালিয়া ছেলে-যে নকশালবাড়ি কলকশন আন্দোলনের মধ্যেই এখনো খুঁজছে ভারতীয় কৃষকের অধিকার অর্জনের উপায়। সম্পৎ রায়ের কাছে উত্তরখণ্ড আন্দোলন শুধুমাত্র রাজবংশী সমাজের আন্দোলন নাও হতে পারে–সে চায় উত্তরবঙ্গের রাজবংশী জোতদারের হাতে যে-টাকা আছে তা এই উত্তরবঙ্গেই নানা ভাবে খেলাবার হক, সম্পৎ রায় পাঞ্জাব রাজস্থানের সবুজ বিপ্লবের এনট্রেনিয়ুর কৃষিবিনিয়োগকারীর উত্তরবঙ্গ সংস্করণ। সে আলাদা রাজ্য চায় না, আলাদা কিছু অধিকার চায়–যেসব তার কাছে তুচ্ছ, যেমন, পুরনো কামতাপুরী রাজত্বের গৌরবগাথা তার খুব দরকারে লাগে না। তার হাতে অনেক টাকা ও তার আরো অনেক টাকা আসছে–সে সেই সব টাকার বিনিয়োগক্ষেত্র:চায়, সেই বিনিয়োগক্ষেত্রের নাম যদি উত্তরখণ্ড হয় ত উত্তরখণ্ডই থোক। আর তার সঙ্গে অনায়াসে মতৈক্য ঘটে যায় সেই নাকশালিয়া ভদ্রলোকের কারণ, সম্পৎ-এর বিদ্রোহ সেই ভদ্রলোকের কাছে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। কারণ, সম্পৎ এখানে কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সেই কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থায় দিল্লিতে কংগ্রেস আর কলকাতায় বামফ্রন্ট, এ-পার্থক্য তার কাছে পার্থক্যই নয়। যে-কোনো রকম বিদ্রোহ ও নৈরাজ্যের প্রতি আবেগে ও বুদ্ধিসর্বস্ব সমর্থনে সে সম্পকে তার মিত্র মনে করে আর শত্রু ভাবে, একই রকম শত্রু ভাবে, দিল্লির সরকারকে ও রাজ্যের সরকারকে। সম্পৎ জানে যে তিস্তা ব্যারেজের জলের পুরো লাভ সে ঘরে তুলতে পারবে কিন্তু তিস্তা ব্যারেজের জন্যে যে-সব জোতদারের কিছু কিছু জমি সরকার নিয়ে নিয়েছে। তাদের যদি দলে রাখতে হয় তা হলে তিস্তা ব্যারেজের বিরুদ্ধেই প্রধান আওয়াজ তুলতে হবে। তিস্তা, ব্যারেজ সম্পৎ-এর কাছে হয়ে ওঠে রাজবংশীদের, জোতদার ও কৃষক রাজবংশীদের, কাছে একটা গ্রহণযোগ্য প্রতীক। কবে জল বেরোবে, সেই জলে এক বিঘেজমিতেই দশ বিঘের ফলন উঠবে, এ-হিশেবের চাইতেও অনেক বেশি প্রত্যক্ষ ঐ এক বিঘে জমির অধিগ্রহণ। আবার, সেই একই তিস্তা ব্যারেজ ঐ নকশালিয়া ভদ্রলোকের কাছে ভারতের মুস্ফুদ্দি পুঁজির আরো এক কারখানা যা দিয়ে গ্রামের গরিব মানুষকে আরো গরিব করে ফেলা যায়। অথচ মুছুদি খোঁজার অন্ধতায় সম্পদৎ রায়কে আর মুস্ফুদ্দি মনে হয় না বরং সম্পৎ রায়ের মত জোতদারও যদি রাজবংশী-আদিবাসীদের ভেতর একটা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন তৈরি করে তুলতে পারে তা হলে সম্পৎ রায়ের সঙ্গে কিছুদূর চলতেই বা আপত্তি কিসের? যা কিছু কেন্দ্রীয় শাসনক্ষমতাকে আঘাত করে আর যা-কিছু আদিবাসীদের সংগঠিত করে তাই তার কাছে গ্রহণীয়।
এর সঙ্গে প্যান-বোরো সংস্কৃতির একটা ছোঁয়াও লাগছে যাতে উত্তরপূর্ব বা নর্থইস্টের বিরাটতর একটা অঞ্চল জুড়ে সংস্কৃতিক ঐক্য খোঁজ হচ্ছে।
এই সব কিছুর মধ্যে কোনো দৃঢ় মিল নেই, অনেক সময় এর ভেতর বৈপরীত্যও আছে। উত্তরখণ্ডের ভেতরে এমন কোনো লোক নেই যে বা যারা এই আন্দোলনকে সংগঠিত একটা তত্ত্বের ভিত্তি দিতে পারে। বীরেন বসুনিয়া বা কোচবিহারের সন্তোষবাবুর মত লোজন উত্তরখণ্ডকে কোনো-কোনো সময় বৃহত্তর সমাজে বা প্রশাসনে যোগ্যতার সঙ্গেই দাঁড় করাতে পারে কিন্তু সেটা ত আন্দোলনের একটা ছোট অংশ মাত্র, পুরো অংশও নয়। তাদের পক্ষে ত জননেতা হওয়া সম্ভব নয়।
আবার হয়ত উত্তরখণ্ড আন্দোলনের মত ঘটনা এ-রকম নানা পরস্পরবিরোধী স্বার্থ মিশিয়েই তৈরি হয়। কখনো এই স্বার্থ, কখনো ঐ স্বার্থ প্রাধান্য পায়। কিন্তু রাজবংশী জোতদারের নতুন টাকার যোগ্য বিনিয়োগক্ষেত্র খোঁজার জন্যে এ-ধরনের আন্দোলন এখন অনেক দিন পর্যন্ত তৈরি হয়ে উঠবে, তৈরি থাকবে। বৃহত্তর ভারতে ব্যবসা ও শিল্পের বাড়তি, হিশেববহির্ভূত, অসংখ্য টাকায় যে-সামাজিক শ্রেণী তৈরি হয়ে গেছে রাজবংশীরাও তা থেকে আলাদা নয়। ভারতের অর্থনৈতিক নিয়মেই তাদের সমাজের ভেতরে এখন তাদের বোরো ও কোচ রক্তের শুদ্ধতা জোর এই ঝোঁক সংগঠিত হচ্ছে, যেমন ভারতের অর্থনীতির নিয়মেই শিখরা আরো কত ভাল শিখ হতে পারে সেটা একটা রাজনৈতিক বিষয় হয়েছে; যেমন, সেই একই নিয়মে তেলুগুরা কত বেশি তেলগু সেটাই রাজনীতি হয়ে উঠেছে; যেমন সেই একই নিয়মে অহোমরা অহোম-ঐতিহ্যের প্রাগেতিহাস থেকে তাদের আত্মপরিচয় জোগাড় করে ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ঢুকছে। ইতিহাসেরও অতীত, বর্তমানে এই কাজে লাগছে, রাজনীতির-অর্থনীতির ভারতীয় ভবিষ্যতের প্রয়োজনে।
কিন্তু নিজেদের উপজাতিত্বের অতীতকে বর্তমানের মধ্যে আবিষ্কার করার মধ্যে, অন্তত রাজবংশীদের ক্ষেত্রে, একটা এমন গোজামিল আছে, যা মীমাংসা করা অসম্ভব। রাজবংশীরা রাজবংশীও থাকবে, আবার কোচ-বোরো উপজাতিও হবে–এ ব্যবস্থা কোনো ভাবে সম্ভব নয়।
কেউ যদি বলেন, এখন আর রাজবংশীদের উপজাতিত্ব নির্ণয় করা যাবে না, তাই তাদের পক্ষে উপজাতিত্বে প্রত্যাবর্তন সম্ভব হবে না–তা হলে সে কথা ধোপে টিকবে না। কারণ ধোপটা দিচ্ছেন রাজবংশীরাই। তারা নিজেদের যে-উপজাতিত্ব স্বীকার করবে, সেই উপজাতিত্বই তাদের পরিচয়। তাতে হজসন, ডালটন, বেভারলি, হান্টার, রাউনি, বোয়লো, ম্যাগোঁয়ার, ওডোনেল, রিজলি, গ্রিয়ারসন, গেইট, ওমেলি, টমসন-এ-সব সাহেবদের লিস্ট করা জাতি-উপজাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে মিল হল কি হল না। সেটা অবান্তর। কারণ, এই সব সাহেব যে-লিস্ট বানিয়ে দিয়েছে সেটা কোনো নতুন স্মৃতিশাস্ত্র নয় যে তাতে গাই-গোত্র মিলিয়ে তবে একটি উপজাতিকে উপজাতি হতে হবে।
কিন্তু এই উপজাতির-পরিচয় পুনরুদ্ধারের পথে বাধা রাজবংশীরা নিজেরাই। কারণ, তারা এতদিন ধরে নিজেদের এই উপজাতি-পরিচয় অস্বীকার করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হিন্দু হতে চেয়েছে, হিন্দু হয়ে উঠেছে।
কোচবিহারের রাজপরিবার আর জলপাইগুড়ির বৈকুণ্ঠপুরের রায়কত পরিবার ত রাজবংশীদের প্রধান ঐতিহাসিক প্রতিনিধি। কোচবিহারের আদি পুরুষ বিশু বা বিশাই। সেই বিশাইই হয়ে গেল বিশ্বসিংহ। এই বিশাই পুবে ব্রহ্মপুত্র থেকে পশ্চিমে ঘোরাঘাট পর্যন্ত নিজের রাজত্ব কায়েম করলে ব্রাহ্মণরা. তাকে হিন্দু বানিয়ে ফেলল। পাজি-পুথি ঘেঁটে তারা আবিষ্কার করল যে আসলে বিশাই ও তার জাতির লোজন ক্ষত্রিয়, পরশুরামের ভয়ে তাদের পৈতে ছিঁড়ে ফেলে তারা এই বনে পালিয়ে আসে। আর বিশাই হরিয়া চাড়ালের ছেলে নয়, আসলে শিবের ছেলে। তেমনি বিশাইয়ের ভাই শিশাইও শিবের ছেলে। বিশ্ব সিংহ সিলেট থেকে একদল ব্রাহ্মণ আমদানি করে কামরূপী ব্রাহ্মণ বলে একটি শ্রেণীই তৈরি করল। বিশ্ব সিংহের পর থেকে কোচবিহারের রাজপরিবার নারায়ণ পদবী ব্যবহার করে। তারা মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি বানায়। আর জলপাইগুড়ির রায়কতরা হয়ে যায়, বৈকুণ্ঠপুরের অধিবাসী।
কিন্তু এটা কেবল রাজপরিবারের ব্যাপার নয়। রাজপরিবার সেই জনগোষ্ঠীর প্রধান পরিবার হিশেবেই এই ব্যবস্থা নিয়েছে এবং সেই জনগোষ্ঠীও নিজেদের রাজবংশী বলেই পরিচয় দেবে বলে ঠিক করে নেয়। সেটাই হয়ে দাঁড়ায় তাদের গৌরবের পরিচয়, তাদের উপজাতিত্ব অস্বীকারের পরিচয়, তাদের বৃহত্তর হিন্দু জাতির ভেতর ঢুকে পড়ার প্রধান ছাড়পত্র। তিনশ বছরের বেশি সময় ধরে এই হিন্দু পরিচয় রাজবংশী সমাজের এত ভেতরে সেঁদিয়ে যায় যে উনিশ শতকের শেষ থেকে এই হিন্দু ক্ষত্রিয় আত্মপরিচয় হয়ে দাঁড়ায় তাদের একটা আন্দোলনেরই বিষয়। সেটা ১৯২১ সাল নাগাদ, আদমশুমারির সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় পর্যন্ত। ১৮৯১-এর আগেই বৈকুণ্ঠপুরের জমিদারি নিয়ে একটা মামলা প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত গড়িয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, বৈকুণ্ঠপুর পরিবারের প্রধানের নাম রায়কত, এরা বাংলার উত্তর-পূর্ব সীমান্তের কোচ উপজাতির অন্তর্গত এবং হিন্দু নয়। ১৮৯১-এর সেন্সাস রিপোর্টেও রাজবংশীদের কোচচরিত্র স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। কিন্তু এই ১৮৯১-এর রিজলি মন্তব্য করেছেন, উত্তরবঙ্গের কোচ অধিবাসীরা নিজেদের রাজবংশী ও ভঙ্গক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দেয়। তাদের ব্রাহ্মণ আছে, তারা ব্রাহ্মণ্য রীতিনীতি অনুসরণ করে ও ব্রাহ্মণদের গোত্র গ্রহণ করতে শুরু করেছে।
কিন্তু ১৯১১-তেই এই দ্বিধার ভাব চলে গেছে। ওমেলি তার সেন্সস রিপোর্টে লেখেন, নিজেদের ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দেওয়ার অধিকার চেয়ে উত্তরবঙ্গের রাজবংশীদের মধ্যে একটা স্থায়ী ও গভীর আন্দোলন চলছে। তারা কোচদের থেকে পৃথকভাবে বর্ণিত হতে চায়। শুধু তাই নয়, তারা নিজেদের ক্ষত্রিয় নামে নির্দিষ্ট করতে চায়। প্রথম অনুরোধটি কোনো ইতস্তত না করেই রক্ষা করা হয়েছে। কারণ তাদের উৎপত্তি কী ভাবে হয়েছে সে-প্রশ্ন নিরপেক্ষভাবেই, এ কথা এখন সন্দেহাতীত সত্য রাজবংশী ও কোচ আলাদা জাত (কাস্ট)। যাই হোক, তারে বংশোৎপত্তিগত উপাধি ও প্রাচীন পদবী ক্ষত্রিয় নামে তাদের চিহ্নিত করার কোনো প্রশ্নই আসে না। ১৯২৩-এর সেন্সস রিপোর্টে টমসন লেখেন, ১৯০১-এ অনেক কোচ নিজেদের রাজবংশী বলে চিহ্নিত করেছে, এবং এখন রাজবংশীরা। অনেকেই নিজেদের ক্ষত্রিয় পরিচয় লিপিবদ্ধ করানোর জন্যে শক্তি প্রয়োগ পর্যন্ত করে। এই ১৯২১-এই রাজবংশীদের ভেতর পৈতে পরা ও ক্ষত্রিয় সমিতি আন্দোলন এরকম ছড়িয়ে পড়ে যে, তাদের ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দিতে না দিলে রঙপুর থেকে কোচবিহার পর্যন্ত আদমশুমারি অচল হয়ে পড়ত। এই ক্ষত্রিয় পরিচয় অর্জনের আন্দোলন স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও অনেকখানি যুক্ত। যেন, নিজেদের হিন্দু পরিচয় প্রমাণ করাটা নিজেদের ভারতীয় পরিচয় প্রমাণ করারই সমার্থক। যেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভারতীয় জনসাধারণের যে-একটা পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল, নিজেদের হিন্দু বলে বর্ণনা দিলে সেই পরিচয়ের অন্তর্গত হওয়া যায়। তেমনি, আবার ততদিনে হিন্দু মধ্যবিত্তের প্রতিষ্ঠা হিন্দু মধ্যবিত্ত আদর্শকে রাজবংশীদের গ্রাহ্য করে তুলেছে। সেই পরিচয় যেন তাদের সামাজিক মর্যাদা পাওয়ার ছাড়পত্র। ক্ষত্রিয় সমিতি আন্দোলন–রাজবংশী সমাজের সবচেয়ে ব্যাপক ও গভীর আন্দোলন। তার ফলে রাজবংশী পরিবারের গঠন ও জীবনযাপন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয়।
রাজবংশী সমাজের ঐতিহাসিক কাল জুড়ে নিজেদের উপজাতি পরিচয়কে জাতি পরিচয়ে এমনভাবে মিশিয়ে দেবার চেষ্টা সত্ত্বেও সেই উপজাতির স্মারক থেকে গেছে তাদের চাপা নাক, ছোট চোখ, একটু ফর্শা রং ও চিবুকের উঁচু হাড়ে। যে বৃহৎ হিন্দু সমাজের সঙ্গে মিশে যেতে রাজবংশী সমাজের এমন শত-শত বছরব্যাপী চেষ্টা সেই বর্ণ হিন্দু সমাজ তার দরজা কোনো সময়েই রাজবংশী সমাজের জন্যে খুলে দেয় নি। নরনারীর যে-সম্পর্কের ভেতর দিয়ে রক্তের মেলামেশায় উপজাতি পরিচয় খসে যেতে পারত শরীর থেকে, সে-সম্পর্ক কোনো সময়ই তৈরি হয় নি বর্ণ হিন্দু সমাজের লোকজনের সঙ্গে রাজবংশী সমাজের লোকজনের। যে-দুই রাজপরিবার রাজবংশী সমাজের প্রধান পরিবার তারা নানাভাবে নিজেদের বর্ণ হিন্দু করে ফেলতে পেরেছে, বর্ণ হিন্দু সমাজও তাদের নিজেদের ভেতর নিয়ে নিয়েছে। অত বড় বড় রাজপরিবারে বা জমিদার পরিবারে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে কারই বা আপত্তি হবে? তখন ত তাদের রাজা হিশেবেই দেখা হয়, রাজবংশী হিশেবে দেখা হয় না। কালাপাহাড় যে কামাক্ষা মন্দির ধ্বংস করে দেন (১৫৬৩), কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণ সেই কামাক্ষ্যা মন্দির পুননির্মাণ করেন ও সেখানে দুর্গাপ্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে নিজের হিন্দু হওয়ার পথ তৈরি করেন। এই উপলক্ষে ১৫০ জন মানুষকে বলি দিয়ে তাম্রপত্রে মন্দিরের দেবীদের সামনে দেয়া হয়। রাজবংশী বা কোচ থেকে হিন্দু হওয়ার এমন রক্তপিচ্ছিল পথ সকলের পক্ষে বা সাধারণের পক্ষে সুলভ ছিল না। রাজারা কখনো রক্ত ঢেলেছেন, কখনো রক্তের প্রতীক সিঁদুর ঢেলেছেন। লক্ষ্মীনারায়ণ বলে কোচবিহারের কে রাজা আকবরের সেনাপতি মানসিং-এর সঙ্গে তার এক মেয়ের বিয়ে দেন (১৫৮৫)। আর-এক রাজা প্রাণনারায়ণ (১৬২৫-১৬৬৫) তার বোন রূপমতীর বিয়ে দেন নেপালের রাজা প্রতাপমল্লর সঙ্গে। ১৮৭৮-এ কোচবিহারের রাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে বিয়ে হল ব্রাহ্মসমাজের কেশবচন্দ্রের কন্যা সুনীতি দেবীর। নৃপেন্দ্রনাথের বড় ছেলে জিতেন্দ্র নারায়ণের বিয়ে হল বরোদার ইন্দিরা দেবীর সঙ্গে। তার মেয়ে গায়ত্রী দেবীর বিয়ে হল জয়পুরের মহারাজার সঙ্গে। আর-এক বোনের বিয়ে হল আগরতলার রাজার সঙ্গে। ভারতীয় রাজার স্বীকৃতির মূল্য হিশেবে কোচবিহারের রাজা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করলেন নিজের রাজবংশী পরিচয়।
বৈকুণ্ঠপুরের রাজপরিবারের ইতিহাসও প্রায় একই রকম। কিন্তু তারা ত দেশীয় রাজ্য হিশেবে স্বীকৃত নয়, তাই, অন্যান্য দেশীয় রাজারা তাদের পরিবারের সঙ্গে বিয়েশাদি দেন নি। কিন্তু টাকা দিয়ে বর্ণ হিন্দু। ঘর থেকে জামাই ও মেয়ে তারাও জোগাড় করেছেন।
রাজবংশী পরিচয়ের সুবাদে যে রাজ্য ও প্রায় রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাজবংশী পরিচয় অবলুপ্তির মধ্যে দিয়ে সেগুলি নিজেদের হিন্দু সমাজের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়েছে। কিন্তু ঠিক বিপরীত পদ্ধতিতে বর্ণ হিন্দু সমাজ এই রাজবংশীদের দূরে ঠেলে রেখেছে। ফলে তারা গত প্রায় পাঁচশ বছর এক অদ্ভুত বিপরীত জীবন যাপন করে আসছে। তাদের সমস্ত অবয়বে কোচ জন্মচিহ্ন, তাদের পোশাক-আসাকে কোচ উপজাতির অভ্যাস, তাদের অলঙ্করণে কোচসংস্কার, তাদের তৈজসপত্রে কোচঐতিহ্য, তাদের পরিবারের লোকজনের ভেতরকার সম্পর্ক কোচঐতিহ্য সম্মত, তাদের বাড়িঘর কোচরীতি অনুযায়ী তৈরি হয়, অথচ তারা কিছুতেই নিজেদের কোচ বলে স্বীকার করে না, কোচপরিচয় তাদের পক্ষে প্রায় নিকৃষ্ট অপমান।
বিশাই বা বিশ্বসিংহকে (১৪৯৬-১৫৫৩) যদি ঐতিহাসিক কালে কোচদের সংগঠিত আত্মপ্রকাশের প্রথম চরিত্র বলে ধরে নেই তা হলে পাঁচশ বছর ধরেই রাজবংশী মানুষ নিজের এই দুটি জীবন মেনে নিয়েছে। সে নিজেকে মনেপ্রাণে হিন্দু মনে করে। তার পরম দেবতা জল্পেশ্বর শিব। কিন্তু বর্ণ হিন্দুরা তাকে হিন্দু মনে করে না, তাই বর্ণ হিন্দু সংস্কৃতিও সে আয়ত্ত করে নিতে পারে নি।
এখন ভারতের অর্থনীতির রাজনীতির নিয়মে এই রাজবংশী তার কোচপরিচয় পুনরুদ্ধার করতে, চাইছে। যে-হিন্দুত্ব ছিল তার আদর্শ, সেই হিন্দুত্ব থেকে সে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শরীরে ও সংস্কৃতিতে যে-কোচ সে থেকেই গেছে, সেই কোচই সে হয়ে উঠতে চায়। আর, এই কোচপরিচয়ের সুবাদেই ভারতের রাজনীতি-অর্থনীতিতে ভারতীয় হিশেবে সে তার বিশেষ সুবিধে আদায় করে নিতে চায়। হিন্দু হওয়ার পাঁচশ বছর পর সে অহিন্দু হতে চাইছে। কিন্তু এই অহিন্দু হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তার কোচঐতিহ্যের গৌরববোধ থেকে ও চৈতন্য থেকে জন্মাচ্ছে না, জন্মাচ্ছে তার টাকাপয়সার নগদ হিশেব থেকে। যে-কোচ পাঁচশ বছর ধরে রাজবংশী থেকেছে সে কি আর ইচ্ছে করলেই আজ কোচ হতে পারে?
হতে পারার একটা উপায় অবিশ্যি তার ছিল। হিন্দু সমাজের প্রত্যাখ্যানের ফলেই সে তার কোচ জীবনযাপনের যে-অভ্যাস অব্যাহত রাখতে পেরেছে সেই অভ্যাসটাকে প্রায় আক্রমণের ভঙ্গিতে হিন্দু সমাজের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারত। কিন্তু তা হলে ত তাকে অস্বীকার করতে হয় এই রাজবংশী নামটিই। কোনো রাজপরিবারের সঙ্গে উপজাতি পরিচয়ের ঐক্যসূত্রে সে তার কোচপরিচয় ফিরে পাবে না। সেই রাজপরিবারের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক অস্বীকার করলেই তার উপজাতিপরিচয় সে ফিরে পেতে পারে। কিন্তু ১৮৯০ থেকে শুরু করে ১৯৩০-৩৫ পর্যন্ত যে নিজেকে শুধু রাজবংশী নয়, ক্ষত্রিয় বলে পরিচয় দিতে চেয়েছে, সেই পরিচয়ই তার সামাজিক আন্দোলনের প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে, সে কী করে এখন নিজেকে রাজবংশী না বলে কোচ বলবে? কোচ ত নয়ই, রাজবংশীও নয়–হিন্দু ক্ষত্রিয়–এই পরিচয় এখন উল্টে যাবে কী করে–হিন্দু ত নয়ই, রাজবংশীও নয়–কোচ?
উল্টে যেতে পারত যদি সত্যি আত্মপরিচয়ের এক প্রখর বেদনায় ও অভিমানে এই সমাজ নিজের ওপর বদলা নিতে চাইত, নিজের পঁচশ বছরের হিন্দু হওয়ার ইতিহাসের বদলা নিতে চাইত, নিজেকে আঘাতে-আঘাতে পর্যদস্ত করতে চাইত। তা হলে এক উদ্ভট প্রতিক্রিয়ায় সে নিজের সংস্কৃত নাম ত্যাগ করত, সে এমন-কি রায় বা বর্মন উপাধিও ছেড়ে দিত, সে বিয়ে-শাদি-শ্রাদ্ধে পুরুত বামুনকে আসতে দিত না, উদ্ধার করে আনত নিজের পিচশ বছরের পুরনো কোনো রীতি, এমন-কি জল্পেশ্বর শিবকেও অস্বীকার করত, এমনকি কোচবিহারের মদনমোহনকেও অস্বীকার করত, কামাক্ষ্যা মন্দিরের বিগ্রহকেও অস্বীকার করত–বদলে গড়ে তুলত নিজের নতুন তীর্থ, তা হলে সেই অভিযান এই বিরাট রাজবংশী সমাজকে ইতিহাসের এক অবাস্তব পুনরাবৃত্তির প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে ফেলত ঠিকই কিন্তু সেই পুনরাবৃত্তি হয়ত নতুন একটা আরম্ভও ঘটাতে পারত। এই উত্তরখণ্ড আন্দোলন ত তা নয়ই, বরং তার উল্টো।
কংগ্রেসের আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বলে কংগ্রেসের যে-জনভিত্তি গ্রাম-গ্রামান্তরে আছে, সেই জনভিত্তির ওপর তৈরি হচ্ছে এই ধরনের আঞ্চলিকতাবাদী আন্দোলন। কিন্তু এটা হয়ত পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ পরিস্থিতি। পশ্চিমবঙ্গ বাদ দিয়ে সারা ভারতেও ভারতীয়তার বিপরীত যে রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এর সঙ্গে হয়ত তারও সম্পর্ক আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের সেই নির্দিষ্টতা বাদ দিলেও, আসলে ভারতের অর্থনীতিতে মুনাফা ভাগাভাগি এত স্পষ্ট চেহারা নিয়েছে যে উত্তরবঙ্গের রাজবংশী জোতদারও তার ভাগ চায়।
এমন একটা সম্মিলন যেমন হওয়ার কথা তেমনিই হতে লাগল। ছদিন ধরে এই সম্মিলন সকালের দিকে প্রতিদিনই ঘন্টা দু-তিন করে হয়েছে। কিন্তু তাতে প্রতিদিন একই বক্তৃতা হয়েছে। এমনকি প্রতিদিন বক্তৃতা করার লোক পাওয়া যায় নি। পুরো সম্মিলনটা একদিনেই শেষ হতে পারত-যদি একটু সাজানো যেত। কিন্তু সেরকম সাজানোর লোকও নেই, সেরকম সাজানোর কোনো উদ্দেশ্যও ছিল না। মাঝখানে, একদিন দেবনাথ রায় পি-এইচ-ডি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগের, কয়েকজন অধ্যাপককে এনে উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির ওপর একটা আলোচনা সভার ব্যবস্থা করে। তাতে বরং এমন কিছু শোনা গিয়েছিল, যা সম্মিলনের অন্যান্য বক্তৃতায় আসে নি। ।
সম্মিলন সকালে শুরু হতে-হতে প্রায় দশটা হয়ে যেত, তারপর বারটা-সাড়ে বারটার মধ্যেই শেষ। দু-একদিন এমনও হয়েছে যে দশটাতেও আরম্ভ করা যায় নি। কিন্তু একটি অধিবেশন সম্পূর্ণ বাদ দেয়া ঠিক নয় বলে যে-কেউ একটা বক্তৃতা করে অধিবেশন শেষ করে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত জানা যায় যে সম্মিলনে অনেকগুলি প্রস্তাব নেয়া হয়েছে। তার মধ্যে এইগুলি আছে। এক : উত্তরবঙ্গের রাজবংশী অধ্যুষিত এলাকাকে স্বতন্ত্র অধিকার দিতে হবে, প্রয়োজনে এর জন্যে রাজ্য সীমা পুননির্ণায়ক কমিটিকে নিয়োগ করতে হবে। দুই : উত্তরবঙ্গে সমস্ত সরকারি কাজকর্মে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেডিক্যাল কলেজে, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে রাজবংশী ছাত্রদের জন্যে শতকরা অন্তত ৫০ ভাগ আসন নির্দিষ্ট রাখতে হবে ও তাদের ভর্তির জন্যে প্রবেশিকা পরীক্ষার ব্যবস্থা তুলে দিতে হবে। তিন : তিস্তা ব্যারেজের জন্য অধিগৃহীত জমির সমপরিমাণ জমি খাশ জমি থেকে কৃষকদের দিতে হবে এবং আর-কোনো জমি অধিগ্রহণ করা চলবে না। চার : কৃষিপণ্যের সর্বোচ্চ দাম ও লেভির বাধ্যতা উত্তরবঙ্গের প্রযোজ্য হবে না, কারণ উত্তরবঙ্গে কৃষির জন্যে কোনো সেচ ব্যবস্থা নেই ও এখানকার ফলন কম।
কিন্তু এগুলি ত নীতিমূলক প্রস্তাব। কার্যকরী প্রস্তাব নেয়া হয়েছে দুটো।
প্রথম প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে-যে-ভাবে তিস্তা ব্যারেজ তৈরি হচ্ছে তাতে এই সম্মিলন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারে না। সরকার যদৃচ্ছভাবে জমি অধিগ্রহণ করেছেন। অধিগ্রহণের সময় এমন-কি জমির দাঁড়ানো ফসল পর্যন্ত বিবেচনা করা হয় নি। অথচ যদি তিস্তা ব্যারেজ কোথা দিয়ে যাবে তার একটা মানচিত্র আগে প্রচার করা হত তা হলে কৃষকরা আগেই সতর্ক হতে পারতেন ও অধিগ্রহণের আশঙ্কা আছে এমন জমিতে ফসল বুনতেন না। তদুপরি তিস্তা ব্যারেজের কাজে স্থানীয় লোকজনদের নেয়া হয় নি। তা ছাড়াও তিস্তা ব্যারেজের ফলে কোথায় কী ভাবে জল যাবে তার কোনো হিশেব জনসাধারণকে দেয়া হয় নি। ফলে, এরকম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে যে তিস্তা ব্যারেজের ফলে উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্যের ধারা ব্যাহত হবে। অথচ এই আশঙ্কা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার তাড়াতাড়ি তিস্তা ব্যারেজ চালু করতে চাইছেন। অতি শীঘ্র পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তিস্তা ব্যারেজের প্রথম পর্যায়ের উদ্বোধন করবেন বলে যে-ঘোষণা করা হয়েছে তাতে সম্মিলন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ না করে পারছে না। তিস্তা ব্যারেজের কাজ কতটা এগিয়েছে সে-বিষয়ে জনসাধারণকে কিছু না-জানিয়েই সরাসরি উদ্বোধন করে দেয়া অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক। পরন্তু, তিস্তা ব্যারেজের কাজ এখনো উদ্বোধনের পর্যায়ে আসেই নি। এমতাবস্থায় সম্মিলন উত্তরবঙ্গবাসীকে সতর্ক করে দিচ্ছে–এই উদ্বোধনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠুন। তাই সম্মিলন আহ্বান করছে–মুখ্যমন্ত্রী তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধন করতে এলে আপনারা নির্দিষ্ট দিনে সারা, উত্তরবঙ্গ থেকে মিছিল নিয়ে এসে এই উদ্বোধনের প্রতিবাদ করুন, মুখ্যমন্ত্রী যাতে এই উদ্বোধন না। করতে পারেন।
দ্বিতীয় প্রস্তাবটি আরো দূরপ্রসারী। তাতে বলা হল–উত্তরবঙ্গের উন্নতির প্রতি কোনো রাজ্য সরকারই কোনোদিন মনোযোগ দেন নি। অথচ উত্তরবঙ্গ থেকে চা, তামাক ও কাঠের শুল্কবাবদ রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার কোটি-কোটি টাকা পেয়ে থাকেন। উত্তরবঙ্গের প্রতি এই উপেক্ষার প্রতিবাদে সম্মিলন আহ্বান করছে যে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে উত্তরবঙ্গবাসী যোগ দেবেন না। সম্মিলনের পক্ষ থেকে উত্তরবঙ্গবাসীকে আহ্বান করা হচ্ছে, তার যেন বিধানসভায় ভোট বয়কট করেন। উত্তরবঙ্গের কেউ প্রার্থী হবেন না। উত্তরবঙ্গের কেউ ভোেট দেবেন না। সম্মিলনের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে উত্তরখণ্ড হিংসায় বিশ্বাস করে না, তাই কোনো হিংসাশ্রয়ী উপায়ে ভোট বন্ধ করার আহ্বান দেয়া হচ্ছে না। সম্মিলন শুধু শান্তিপূর্ণ উপায়ে আগামী বিধানসভা নির্বাচন বয়কট করার আহ্বান দিচ্ছে।
.
শনিবার ছিল কলকাতার নবরঞ্জন অপেরার কুলটার কুল আর রবিবার ঐ একই অপেরার প্রমোদতরণী। সোমবার ছিল গানের আসর। তাতে চিত্রা সিং শেষ পর্যন্ত জোড়ায় আসেন নি, একাই এসেছেন। কিন্তু অনুপ জালোটা এসেছিলেন, মান্না দে ছিলেন, তা ছাড়া অন্যান্য আর্টিস্টরা ত ছিলেনই। মঙ্গলবার কলকাতার গ্রুপ থিয়েটার নামে একটা দল ব্রেখটের ককেসিয়ান চক সার্কল করে। বুধবারের অনুষ্ঠানটা সন্ধ্যায় শুরু হয় নি, শুরু হয়েছে রাত আটটায় আর শেষ হয়েছে সকাল চারটেয়–সারা রাত ধরে ভিডিওতে চারটি ফিল্ম দেখানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার একটিই অনুষ্ঠান ও সেটিই সম্মিলনের শেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-শ্রীদেবীর নাচ।
এর ভেতর যাত্রার অনুষ্ঠানটা দুদিনই খুব জমে গিয়েছিল। তবে একটা পৌরাণিক হলে আরো ভাল হত। দুটোই খানিকটা ঐতিহাসিক আর খানিকটা সামাজিক। নবাবি আমলে একটি মেয়ে কুলত্যাগিনী হয়ে কী করে অত্যাচারী নবাবের প্রতিরোধ সংগঠন করেছিল তার কাহিনী–কুলটার কুল। মেয়েটি। হিন্দু, হিন্দু জমিদারের গায়ে থাকে। সে একটি যুবকের সঙ্গে এক রাত্রিতে বাড়ি ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। সে জন্যেই সে কুলটা। কিন্তু পরে ধীরে-ধীরে জানা যায় ঐ হিন্দু জমিদার ঐ হিন্দু মেয়েটিকে মুসলমান মনসবদারের কাছে ভেট দিতে চায় এই খবর পেয়ে মনসবদারের এক যুবক সৈন্যাধ্যক্ষ পালিয়ে এসে মেয়েটিকে বাড়ি থেকে সরিয়ে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে রক্ষা করে। কিন্তু ইতিমধ্যে সেই জমিদার, মনসবদারের ঐ ছেলেটিকে তনখাইয়া ঘোষণা করে, তার খোঁজে সমস্ত জায়গায় সৈন্য পাঠায় ও গ্রামে-গ্রামে সেই সৈন্যরা অত্যাচার শুরু করে। বিশেষত মেয়েদের ওপর। এক-একদল মেয়েকে ধরে আনা হয়–জমিদারকে দেখানোর জন্যে যে তার ভেতর সেই মেয়েটি আছে কি না। আর, আত্মগোপন করে গ্রাম থেকে গ্রামে পালিয়ে বেড়াতে-বেড়াতে সেই ছেলেটি ও মেয়েটি হঠাৎ একটা সময় থেকে নবাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের সংগঠক হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ঐ মুসলমান সেনানী ও হিন্দু নারীর নেতৃত্বে স্বতঃসংগঠিত গ্রামবাসীদের বাহিনী গেরিলা যুদ্ধে সেই মুসলমান মনসবদার ও হিন্দু জমিদারের ভাড়াটে সৈন্যদের পর্যদস্ত করে ফেলে।
খানিকটা দেবী চৌধুরানীর আদল আসে, জোয়ান অব আর্কও একটু আছে। যারা ঐতিহাসিক নাটক ভালবাসে তাদের কাছে মনসবদার, জমিদার আর ঐ গ্রামের মেয়েটি কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচিত হয়ে যায়। আর, তারপরই হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের ওপর মাঝেমধ্যেই কথাবার্তা আসতে থাকে। গেরিলা যুদ্ধের ব্যাপারে নকশালদের খতম অভিযান-এর কথা মনে পড়ে আবার পাঞ্জাবের সন্ত্রাসবাদীদের কথাও মনে আসে। এই সব মিলিয়ে যাত্রাটি প্রায় সব রকম দর্শকের কাছে অনায়াসে পৌঁছে যায়। এমন-কি আধুনিক ছেলেপিলে, যারা ইতিহাসের ততটা ধার ধারে না, তারাও অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের সংগঠিত বিদ্রোহের কাহিনীতে নিজেদের বিষয় পেয়ে যায়। একদিকে মনসবদার ও জমিদারের অত্যাচার দেখানোর সুযোগ নরনারীর কিছু ঘনিষ্ঠ দৃশ্যও ছিল, সেখানে হিন্দি গজল গানই গাওয়া হয়েছে, সঙ্গে মেয়েটি নেচেছেও। এই মোনা গুপ্তা মেয়েটি ফিল্মে ক্যাবারে নাচের জন্যে খুব নাম করেছে। মনসবদারের এক মদ্য পানের দৃশ্যে মোনা গুপ্তার ক্যাবারে নাচ ছিল। এই নাচটা যে আছে তা অনেকেই জানত। আসলে, এই নাচটার জন্যেই কুলটার কুল যাত্রা হিশেবে হিট করেছে। ক্যাবারের বেশ কিছুটা জুড়ে বেলিডান্স। শেষের দিকে এক সময় মেয়েটা প্রায় আর্চ করে স্টেজের মাঝখানে ঘোরে, তার পেটের ওপর, তলপেটের ওপর আর বুকের ওপর আলো পড়ে, অন্য সব আলো নিবে যায়, মেয়েটিকে ঐ আর্চ করেই স্টেজজুড়ে ঘুরতে হয়, যাতে সব দিকের দর্শকরা দেখতে পায়, দর্শকদের ভেতর থেকে হাততালি, চিৎকার, শিস ওঠে। যখন যেদিক থেকে তার পেট আর বুক দেখা যায়, তখন সেদিক থেকেই হাততালি, চিৎকার আর শিস ধ্বনিত হয়। কিন্তু এ-স্টেজ ত যাত্রার মত চারদিক খোলা নয়, থিয়েটারের মত একদিক খোলা। মোনা গুপ্তার শরীর ঘোরানোর ফলে সব দর্শকই তার বুক ও পেটের নতুন নতুন দৃশ্য পায়। ফলে, তারাও হাততালি, চিৎকার আর শিস দেয়। এই দৃশ্য একটু যেন বেশি সময় ধরেই হয়। তারপরই বাইরে বোমার আওয়াজ, চকিত অন্ধকারে মোনা গুপ্তা উঠে দাঁড়ায়, হাত বাড়িয়ে নেয়া একটা কাল কাপড়ে সে নিজেকে সম্পূর্ণ আবৃত করে নিতে-নিতেই আলো সম্পূর্ণ জ্বলে ওঠে ও সেই নায়ক-নায়িকার গেরিলাবাহিনী স্টেজে ঢুকে পড়ে। তখন বোঝা যায়, ঐ নর্তকীও ছিল ছদ্মবেশী গেরিলা। সেখানে মনসবদারের পরাজয় ও হত্যাতেই যাত্রার সমাপ্তি–তার আগে কিছু · ছোটাছুটি ও সংক্ষিপ্ত তলোয়ার খেলা আছে।
প্রমোদতরণী-ও এরকমই কিছুটা ঐতিহাসিক ও কিছুটা সামাজিক। কুলটার কুল-এ যে রকম, প্রমোদতরণীতেও সেরকম, নায়ক-নায়িকার সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট হয় না–অর্থাৎ ভাইবোন, স্বামীস্ত্রী, প্রেমিক-প্রেমিকা–এ রকম নির্দিষ্ট পরিচয়ের চাইতেও তাদের একসঙ্গে থাকা ও বাঁচাটাই প্রধান ব্যাপার। প্রমোদতরণীর বেশ অনেকটা জুড়ে প্রথমেই মোনা গুপ্তাসহ অন্যান্য মেয়েদের নাচ আছে। মোনা গুপ্তা এখানে মাইক হাতে নিয়ে পাশ্চাত্য ফিল্মের কায়দায় ঘুরে-ঘুরে গানও গায়। নীলকর সাহেবের বাংলোতে বড়দিনের উৎসব ছিল এরকম দীর্ঘ ও সমবেত নাচের উপলক্ষ। সেখানেও নীলদর্পণ-এর তোরাপের মত চরিত্র আছে, সংখ্যায় কিছু বেশি। ক্ষেত্রমণির ধর্ষণ দৃশ্য আছে বার দুয়েক–একবার সাহেব করে, একবার নায়েবগোছের বাঙালি একজন। কিন্তু ঐরকম কিছু অংশ ছাড়া নীলদর্পণ আর মনে পড়ে না। সেখানেও দেখা গেল অনেকেই ঐ আরম্ভের সমবেত নারীনৃত্য ও ভেতরের ধর্ষণের দৃশ্যের কথা জানে। তাই সেই নৃত্যের পরই প্যান্ডেল থেকে অনেকে বেরিয়ে যায়, আবর ধর্ষণের আগে ঢোকে। নাচের সময় আলো খুব চড়া, রঙিন ও ঘুরন্ত–ফলে সেই ঘূর্ণনের একটা মাদকতা আসে। সেই মাদকতা দর্শকদের মধ্যে ছড়ায় বটে কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে কাহিনীর ইঙ্গিত বুঝে নিতে হয় বলে এতটা ছড়ায় না যে দর্শকরা নিজেদের আসন ছেড়ে উঠে নাচতে থাকবে! সেটা বরং ঘটে ধর্ষণ দৃশ্য দুটিতে। দুটি দৃশ্যই একটু বিস্তারিত ভাবে দেখানো হয়। সেখানেও আলো খুব পরিকল্পিত ভাবে ব্যবহৃত হয়। ধর্ষণদৃশ্য দুইবার কেন, তার একটা জবাব কাহিনী থেকে পাওয়া যায়–পালাকার দেশীয় তাঁবেদার শ্রেণীর, চরিত্রও দেখিয়েছেন। সেটা অবিশ্যি অন্যভাবেও দেখানো যেত। কিন্তু দর্শকদের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, প্রথম বারের ধর্ষণটা কিছু প্রত্যাশিত ও কিছু দুর্ঘটনা। সেখানে অত্যাচারের আবহ সম্পূর্ণ লুপ্ত হয় না। কিন্তু একই মেয়ের দ্বিতীয় ধর্ষণের দৃশ্য দর্শকদের নাটকীয় ও অপ্রত্যাশিত ঠেকে। শরীরজীবিনী কোনো মেয়ের শরীরের ওপর কোনো যৌন আঘাত এলে যেমন দর্শকের শারীরিক পবিত্রতাবোধ আহত হয় না, তেমনি, একবার ধর্ষিতা মেয়েকে দ্বিতীয়বার ধর্ষিতা হতে দেখলে দর্শকদের সামাজিক নিরাপত্তাবোধ হয়ত ব্যাহত হয় না। বরং, এই দ্বিতীয় ধর্ষণটাকে যাত্রার দৃশ্য হিশেবে অনেক নিরপেক্ষভাবে ভোগ করা যায়। সেই ব্যাপারে আলোকসম্পাতের সাহায্যও পাওয়া যায়। প্রথমবার ঘটনা ঘটে সাহেবের কুঠিতে। সেখানে ততক্ষণ বেশ প্রকাশ্য আলো থাকে যতক্ষণ সাহেব সেটা চায়, আর সাহেব বেশ অনেকক্ষণ ধরে। সেখানে অজ্ঞাত কোনো উৎস থেকে সাহেবি বাজনাও বাজে ধর্ষণের আয়োজন জুড়ে। আর দ্বিতীয়বার ধর্ষণ ঘটে মেয়েটির নিজের ঘরে, অন্ধকারে। সেখানে দর্শকরা নটনটীর শ্বস, দীর্ঘশ্বাস, কাতরতার আওয়াজ বেশ ভালভাবে শুনতে পায়।
প্রত্যেকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেই দেখা গেল যে দর্শকদের বড় একটা অংশ প্রায় সবটাই আগে থেকে জানে। সেই অংশটা সংখ্যার দিক থেকে বড় কিনা তা বলা যাবে না। বরং অনুমান হয়, তা নয়। কারণ প্যান্ডেলভর্তি অত মানুষের মধ্যে কত মেয়ে এসেছে কাছাকাছি গ্রাম থেকে, অনেক দর্শক এসেছে দূর থেকে বাসে করে। তাছাড়া সে রকম পুরুষের সংখ্যাও কম নয়। তারা এ সব যাত্রা, থিয়েটার ফিল্ম আগে দেখে নি। তারা এ-সব গান বরং কিছুটা রেডিওতে আগে শুনেছে। কিন্তু সংখ্যার দিক থেকে, এ-সব দেখা বা জানা দর্শকের সংখ্যা বেশি না হলেও, ঐ দর্শকরাই অত বড় প্যান্ডেলের ভেতরে প্রধান। তারা নানা জায়গায় বসে থাকে বটে, কিন্তু ঢোকে আর বেরয় প্রায় একসঙ্গেই। তাদের বয়সের সীমাটাও বেশ বড়–বিশ-বাইশ থেকে চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ পর্যন্ত। এদিককার আলোর ভোল্টেজ কম। সেই ক আলোয় খুব পরিষ্কার বোঝাও যায় না এরা সবাই স্থানীয় ছেলে কি না। তার ওপর এ অনুষ্ঠানের টিকিট বিক্রি হয়েছে পাহাড়ে, আসামের কাছাকাছি এলাকায়, বিহারের এলাকায়, বালুরঘাট রায়গঞ্জ শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ি এই সব শহরেও। সুতরাং হিমঝরা রাত্রির আধো-আলোর এই অনুষ্ঠানে স্থানীয় রাজবংশী যুবকের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল চা বাগানের মজুরদের মদেশিয়া মুখ, গোখা মুখ, বিহারী বা আসামী মুখ। পলিথিনের জ্যাকেট, টুপি আর একই ধরনের জুতোয় শহরের যুবকদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল ট্রাক বা বাসের ড্রাইভার-ক্লিনাররা বা ট্রাকভর্তি করে দূর থেকে আসা নানা পেশার নানা মানুষ। এই ভিড়টাই কিন্তু দর্শকদের প্রধান অংশ–তারাই যেন ঠিক করছিল কোথায় কতটা শিস বাজবে, কতটা আওয়াজ উঠবে, কোথায় একজনের একটা মন্তব্য শোনা যাবে, কোথায় হাততালি অর চিৎকার একসঙ্গে চলবে।
.
দর্শকদের এই অংশের অনুষ্ঠানগুলো সম্পর্কে পূর্বজ্ঞানই এই সাংস্কৃতিক অধিবেশনগুলির প্রধান দিক। শিশুরা যেমন শোনা গল্পটাই একাধিকবার শুনতে চায় ও গল্প শুনতে-শুনতে তার মনের পরিচিত প্রতিক্রিয়াটাই আস্বাদ করতে করতে এগয়, এই দর্শকরাও সে রকম অনুষ্ঠানটির পরিচিত অংশগুলিই বারবার শুনতে চায়, দেখতে চায়। এমন হতে পারে যে এই দর্শকদের মধ্যেও বড় একটা অংশ ফিল্ম দেখে, টিভি দেখে, বা নানা জায়গায় এই সব অনুষ্ঠান দেখে-দেখে পাকা দর্শক হয়ে গেছে।
দর্শকদের অনুষ্ঠান সম্পর্কে এই পূর্বজ্ঞানই সবচেয়ে বেশি বোঝা গেল গানের আসরে। কারণ, এমন-কি মেয়েদের মধ্যেও অনেকে এই সব গায়কের গলার সঙ্গে ও তাদের নির্দিষ্ট গানের সঙ্গে পরিচিত। মেয়েদর্শকদের ভিড়ও অবিশ্যি পুরুষদর্শকদের মতই বিচিত্র। সংখ্যায় অনুপাতে সেখানে রাজবংশী ও মদেশিয়া মেয়েদেরই ভিড় বেশি। কিন্তু এই গানের অনুষ্ঠানে শহরের মেয়েরাও অনেকে এসেছে–জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি, ধূপগুড়ি, আলিপুর দুয়ার থেকেও। গায়কের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না–চিত্রা সিং, অনুপ জালোটা, মান্না দে। তা ছাড়া আরো তিনজন, তত খ্যাতনামা নয় এমন, গায়ক। তাদের দিয়েই অনুষ্ঠান শুরু হয়, ভিড় তখনো জমাট নয়। অনেকেই বাইরের মাঠে, এমন কি রাস্তাতেও, জটলা পাকায়, চা-সিগারেট খায়। একটা ছোট্ট তাড়ির দোকান বসেছে মাঠের ভেতর সেই ইমিটেশন গহনার দোকানের পেছনে। অনেকেই একটু এলোমেলো হাঁটতে-হাঁটতে অন্ধকারের দিকে গিয়ে সেই তাড়ির দোকানে এক পাক ঘুরে আসছে। বাইরের দলগুলি অত গা ঢাকাও দেয় না। তারা বেশ হৈ-হৈ করতে-করতে সেদিকে যায়, ফিরে আসে।
মান্না দে-কে দিয়েই অনুষ্ঠান আসলে শুরু হল। একটা ভজন দিয়ে শুরু করলেন। তারপর, একটা রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইলেন। এই দুটো গানের পর একটু বিরতি নিলেন, কিছুক্ষণ হার্মনিয়াম বাজালেন, তবলা, গিটার এগুলো একটু বাধাৰ্বাধি হল, তারপর একটু গুনগুন করলেন–সেটাও মাইকে শোনা গেল, তারপর একেবারে হঠাৎ একটা কলি গেয়ে উঠে থেমে গেলেন, দর্শকরা হাততালি দিয়ে উঠল। হাততালি শেষ হলে তিনি গানটা গাইবার মত করে গাইতে আরম্ভ করেন মাইক থেকে মুখটা একটু সরিয়ে। সে-গানটা খুব তালের গান নয়, কিন্তু টানা সুরের চলন আছে। উঁচু পর্দায় টানা সুরের সেই চলনে একটা উত্তেজনা ছড়াচ্ছিল। ছড়াচ্ছিল কিন্তু পুরো ছড়াতে না-ছড়াতেই গানটা, যেন খানিকটা আচমকা শেষ করে দিয়ে বানলা লোকসঙ্গীতের সুরে একটা আধুনিক গানের প্রথম স্তবকটি গেয়ে দেন। প্রথম চরণটি শুরু হতেই দর্শকদের ভেতর ই-স এরকম একটা আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সেই আওয়াজের ভেতর আকস্মিকের উত্তেজনার চাইতে হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ার বিস্ময় ছিল। সেই প্রাথমিক উচ্ছ্বাসের পর দর্শকরা গানটা যেন আস্বাদ করে। আর, এই গানটাতেই মান্না দে যেন বুঝে যান, দর্শকদের একটু অন্য রকম ভাল লাগছে। গানটা তিনি ফিরে-ফিরে গান আর সেই ফিরে-ফিরে গাওয়ায় প্রক্রিয়ায় দ্রুত হওয়া সত্ত্বেও গানটা থেকে নাটক ঝরে যেতে থাকে।
মান্না দের পরে এলেচ চিত্রা সিং। কিন্তু দলবলসহ মান্না দের প্রস্থান, তারপর পর্দা নেমে আসা, দর্শকদের অনেকেরই বাইরে বেরিয়ে আসা, এই সব মিলে একটা বিরতির মতনই হয়। বেশ কিছুটা পরে, চিত্রা সিং মঞ্চে বসলে পর্দা ওঠে। তারপর যন্ত্রপাতি বাধাবাধি শুরু হয়। তখন বোঝা যায় দর্শকরা বেশ স্থির হয়ে বসেছে, তখন, চিত্রা সিং মাইকেই একটু গুনগুন করে নেন। বেশ নরম গলার সেই গুনগুনানিতে সাড়া প্যান্ডেল ভরে যায়। তারপর গুনগুনানি থামে, বাজনাগুলো হঠাৎ জোরে একসঙ্গে বেজে উঠে একটা সুর বাজিয়ে ফেলে আধ মিনিটটাক। সেটা থেমে গেলে মাইকে ঘোষণা শোনা যায়, শ্রোতাদের কাছে শ্ৰীমতী চিত্রা সিং-এর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধ তারা যেন এই অনুষ্ঠান ক্যাসেট বা টেপ না করেন। যদি এরকম করা হয় তাহলে তিনি তখনই অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেবেন। এই ঘোষণাটা দুবার করা হয়। চিত্রা সিং হার্মনিয়ামটা একটু জোরে বাজিয়ে নিয়ে দু হাত তুলে নমস্কার করেন। তারপর তার প্রথম গানটি ধরেন।
শুরু করতেই মেয়েদের ভেতর থেকে আবছা একটা গুনগুনানি ওঠে, সমবেত গুনগুনানি। উঠেই থেমে যায়। কিন্তু তাতে বোঝা যায়, গায়িকার সঙ্গে-সঙ্গে অনেকেই মনে-মনে সুর ভাজছে। চিত্রা সিং-এর অনুষ্ঠানেরই মাঝামাঝি এই মনে-মনে সুর ভঁজাটা প্রকাশ্য হয়ে পড়ল। মনে হয়, গায়িকা কিছুটা উৎসাহই দিলেন দর্শকদের এই সক্রিয়তায়। একটু মৃদু হাসলেন। তারপর সে-গানটা শেষ হতেই একটা দ্রুত লয়ের ভজন গেয়ে উঠে, দর্শকদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন, আপনারাও গান, তারপর একটা লাইন গেয়ে যেন অপেক্ষা করেন দর্শকদের প্রতিধ্বনির জন্যে। আর প্রতিধ্বনি ওঠেও। একটু ধীরে বটে কিন্তু বেশ উল্লসিত প্রতিধ্বনি। আরো দু-তিন রণ এরকম গাইবার পর চিত্রা সিং হঠাৎ হার্মনিয়াম ছেড়ে উঠে দাঁড়ান-ভজনের ছন্দে-ছন্দে দু হাত দু দিকে প্রসারিত করে নিজে ত যেন প্রায় ভজনতাড়িত হয়ে ওঠেনই, সঙ্গে সঙ্গে দু-হাতের ইঙ্গিতে দর্শকদের গাইতে বলেন, উইং থেকে ছুটে এসে একজন তার হাতে একটা মাইক ধরিয়ে দেয়, তিনি বা হাতে মাইকটা নিগে, ডান হাতে বাতাসে হাততালি দেন, মাথাটা তালে-তালে দোলান, তাঁর নিমীলিত চোখে ভজনের ঘোর বোঝা যায়, তার চুলের দোলনেও সেই একটু চাপা নেশা। দর্শকরা প্রথমে তার মাথার দোলনের সঙ্গে তাল রেখে মৃদু হাততালি দিতে থাকে, কিন্তু গানের দ্রুততার সঙ্গতিতে সে-হাততালি উচ্চকিতও হয়, দ্রুতও হয়, অনেকটা কীর্তনের আসরের মত, চূড়ান্ত পর্যায়ে তিনি অনেক সময় চুপ করে শুধু মাথা দুলিয়ে যান আর দর্শকরা হাততালি দিয়ে গাইতে থাকে। সেটাও আরো একটা পর্যায়ে উঠে সেই চুড়াতেই শেষ হয়। চিত্রা সিং দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আনত হন। ধীরে ধীরে পর্দা নেমে আসে। সমস্ত আসরটা যেন একটু আচ্ছন্ন হয়ে থাকে।
সেই আচ্ছন্নতা কাটতে একটু সময় লাগে কিন্তু দর্শকরা বড় একটা বাইরে যান না, মোটামুটি যে যার আসনে বসেই থাকেন! পর্দাও তাড়াতাড়িই ওঠে। স্টেজের আলো ও চিত্রা সিং-এর পোশাক একটু বদলেছে! এবার তার গলাতে অন্য সুর খেলা করে–একটু আদরকাড়া সুর, বালগোপালকে নিয়ে। কিন্তু সে বালগোপালও দর্শকদের চেনা। এটাও যেন তাদের জানা যে এই দ্বিতীয় বৈঠকে তাদের গলা মেলানো বারণ, গানগুলোও গলা মেলানোর নয় অবিশ্যি।
অনুপ জালোটার বেলায় দর্শকদের এই পূর্বজ্ঞানই প্রকাশিত হয় অন্য ভঙ্গিতে। চিত্রা সিং-এর পর তার আসর বাসার আগেও একটা বিরতি-মত হয়। পর্দা ওঠার পর তিনিও কিছুটা সময় নেন দর্শকদের সঙ্গে তার উপস্থিতির একটা সংযোগ তৈরি করতে। বারবার হার্মনিয়াম বাজান আর দর্শকদের দিকে তাকান, যেন চেনা লোক খুঁজছেন এমন ভঙ্গিতে। কিন্তু ওটা একটা ভঙ্গিই মাত্র। মঞ্চের সব আলো তারই ওপর। সেই আলোর পর্দা ভেদ করে তার পক্ষে দশর্কদের কাউকে দেখা সম্ভবই নয়! কিন্তু দর্শকরা ত তার এই ভঙ্গি দেখছিল ও সেই ভঙ্গিতে সাড়াও দিচ্ছিল গানের জন্যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ। তৈরি করে। অনুপ জালোটা ঐ রকম আঁতিপাতি খুঁজতে-খুঁজতেই খুব চাপা স্বরে একটা উর্দু গজল ধরেন, যেন গাঢ় স্বরে কেউ নিভৃতে নিজের সঙ্গে কথা বলছে। ময়নাগুড়ির মত একটা জায়গায় প্রধানত রাজবংশী শ্রোতাদের সামনে উর্দু শায়েরের মেজাজে অনুপ জালোটার সেই গান কেমন মোহ তৈরি করে। যতই কেন না আসাম-বিহারের দর্শক আসুক, যতই কেন না শিলিগুড়ি-বালুরঘাটের দর্শক আসুক–এদের মধ্যে বড় জোর কেউ-কেউ হিন্দিভাষী। কিন্তু উর্দুর সূক্ষ্ম রসিকতায় আপ্লুত হয়ে যায় উর্দু ভাষা থেকে এত দূরবর্তী এই দর্শক আর গায়ককে বাহবাও জানায় উর্দুরীতিতেই। অনুপ জালোটা যে এই উর্দু গজলেই আটকে থাকেন তা নয়। কিন্তু প্রথম দুটি গজল ঐ ধরনের গেয়ে যেন ভুলিয়েই দেন একটু আগে চিত্রা সিং এখানে আর-এক রকম গানে কী রকম মোহ তৈরি করেছিলেন শ্রোতা-দর্শকদের মধ্যে। অনুপ জালোটা এরকম দুটি গান গাওয়ার পর মৃদু হেসে হিন্দিতে বলেন, আমি আপনাদের সেবার জন্যে এখানে এসেছি। আপনাদের হুকুম মত গাইব। কিন্তু সবাই মিলে হুকুম করলে ত শুনতে পাব না। আমার একটা গান শেষ হলে আমিই জানতে চাইব। তখন আপনাদের যার গুলা আমার কানে পৌঁছবে, তার ফরমায়েশ মত আমি গাইব। অনুপ জালোটা তার এক-একটা গানে দর্শকদের স্তব্ধ করে দিয়ে, রুমালে মুখে মুছে, হেসে বলেন, ফরমাইয়ে। সমবেত চিৎকার শেষ হওয়ার আগেই তিনি একটা গান ধরে বসেন। হয়ত গানটি তার আগেই ঠিক করা ছিল কিন্তু দর্শকদের ঐ ফরমায়েশের অধিকারের ফলেই অত বড় প্যান্ডেলভর্তি হাজার-হাজার দর্শকের সঙ্গে গায়কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। যতক্ষণ গান হয়, ততক্ষণ দর্শক গায়কের এই সম্পর্কেরই নানা দিক উন্মোচিত হতে থাকে। কখনো তিনি হেসে দর্শকদের দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দেন। কখনো মাথা ঝাঁকিয়ে একটা লাইন ফিরে-ফিরে গাইতেই থাকেন এক নিশ্চয়তায় যে, যে-দর্শকদের তিনি দেখতে পাচ্ছেন না তারা কী ভাবে তাকে ও তার গানকে নিচ্ছে।
.
এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে ত উত্তরখণ্ড সম্মিলন উপলক্ষেই–যদিও যারা অনুষ্ঠান করছে তারা উত্তরখণ্ডী নাও হতে পারে। কিন্তু উত্তরখণ্ডের সঙ্গে তাদের কোনো এক ধরনের সহানুভূতি যদি না থাকত তবে ত তারা নিজেরাই আলাদা ভাবে টাকা খাঁটিয়ে এরকম অনুষ্ঠান করতে পারত। সে-সহানুভূতি হয়ত রাজনৈতিক নয়, বা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়। সে-সহানুভূতি হয়ত তৈরি হয়েছে। এই উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ব্যবসাপাতি বা কাজকর্মেরই সূত্রে। এমন-কি, হয়ত ব্যক্তিগত চেনাজানারই সূত্রে। কিন্তু যে-সূত্রেই হোক, সহানুভূতিটা ত সত্য। আবার উল্টো দিকে উত্তরখণ্ডের এত বড় একটা সম্মিলন যারা সংগঠিত করেছে তারা ত জানে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এই সম্মিলনেরই একটা অংশ। একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করলে উত্তরখণ্ড সম্মিলনের কথা সারা উত্তরবঙ্গে অন্তত সবাই ভালভাবে জানতে পারবে–প্রচারের এমন সহজ উপায় হিশেবেও তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটিকে দেখে থাকতে পারেন।
কিন্তু প্রথম ধাক্কায় মনে হয় উত্তরখণ্ড সম্মিলন আর এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেন পরস্পরের বিপরীত কাজ করছে। সম্মিলনে উত্তরখণ্ড বলতে বোঝায় রাজবংশীদের স্বাতন্ত্র্য, অতীত গৌরব, বর্তমান বঞ্চনা, বিক্ষোভ, ভবিষ্যতের কর্মসূচি। আর সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে চলতে থাকে প্রধানত হিন্দি-উর্দু গান বা অন্তত বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হিশেবে ঐতিহাসিক নাটকের ধারায় যাত্রা, বা, এমনকি ব্রেখটের নাটকের বাংলা অনুবাদ, তা ছাড়া ভিডিও ফিল্ম। এর প্রত্যেকটাই ত দর্শকদের ভারতের বৃহত্তর সত্তা, এমনকি বিশ্বের সত্তার কথাও মনে করিয়ে দেয়, অন্তত সেরকমই মনে করিয়ে দেয়ার কথা। তা যদি হয়, তা হলে সকালে সম্মিলনে যে-স্বাতন্ত্র্যের দাবি তোলা হচ্ছে, সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে ত সেই স্বাতন্ত্রের দাবিই নাকচ হয়ে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যই আরো বেশি করে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তা হলে, এই সম্মিলনের সঙ্গে এমন অনুষ্ঠান যুক্ত হল কেন?
কথাটাকে আরো একটু বাড়িয়েও ভাবা যায়। অনুষ্ঠানগুলিতে দর্শকদের পূর্বজ্ঞানের ব্যাপারটি এতই প্রতিষ্ঠিত যেন মনে হয় এই অনুষ্ঠানগুলি না হলেও দর্শকরা এ গুলিতেই সব সময় আবিষ্ট থাকে। তাই যদি হবে, তা হলে এই উত্তরখণ্ডের ত কোনো ভিং গাড়বার মত মাটিই নেই।
নাকি কোথাও কোনো সংযোগ অদৃশ্য থেকে যাচ্ছে? কোথাও কোনো সংযোগ আরো দৃঢ় হচ্ছে–অদৃশ্য? পরিচিত ঐতিহাসিক কাহিনীর ভেতর বম্বে ফিরে দেখা ক্যাবারে আর বেলিডামে, জায়গা হয়ে যায় যে-প্রক্রিয়ায়, খবরের কাগজে গণধর্ষণের রিপোর্ট পড়তে অভ্যস্ত দর্শকের সামনে একই মেয়ে দুবার দুভাবে ধর্ষিত হয় যে কারণে, চিত্রা সিং-এর ভজন গানের উন্মাদনা আর অনুপ জালোটার দরবারি গানের কারুকাজ দর্শকের ভাল লেগে যায় গান শোনাবার যে-বৈষয়িক কৌশলে, এমনকি ভিডিওর মত আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার এই পশ্চাত্তম অঞ্চলে ঘটে যায় যে-স্বাচ্ছন্দ্যে–সেই প্রক্রিয়া, কারণ, কৌশল ও স্বাচ্ছন্দ্যের ভেতরই নিহিত থাকে বিচ্ছিন্নতার এক প্রবল টান। নদীতে যেমন অনেক সময় ওপরের স্রোত যত বেগে ছেটে, তার নীচে এক স্রোত তত বেগেই তার বিপরীতে ছোটে, সমাজবদ্ধ মানুষের বেলাতেও হয়ত তেমনি। এই সব যাত্রা-গানবাজনা যত বেশি সমস্ত মানুষকে এক করে ফেলে, ততই বেশি মানুষ নিজের ভেতর গুটিয়ে যেতে চায়। শামুকের মত নয়, কারণ, শামুকের গুটিয়ে যাওয়ার মধ্যে আত্মরক্ষাই মাত্র থাকে, কোনো প্রতি-আক্রমণের হিংস্রতা থাকে না।
সারা রাত্রি ধরে ভি-সি-আর-এ চারটি ফিল্ম দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল বুধবার। পরদিন শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান। আগের দিনটা এতে একটু হালকা থাকে। কারণ, ভিডিও-ফিল্ম দেখতে দূরের– দর্শকরা নিশ্চয়ই আসবে না, গ্রামের দর্শকরাও আসবে না–স্থানীয় দর্শকরাই সারা রাত ধরে যতটুকু পারে দেখবে। একটা দিন বাদ দিলেই ভাল হত, কিন্তু বাদ দেওয়াটা নেহাৎ খারাপ দেখায় বলেই ভিডিও ফিল্মের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। একটা ইংরেজি–ড্রাকুলা। দুটো হিন্দি–শোলে আর শাহেনশা। একটা বাংলা–প্রতিকার। এখন জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সে হাট অনেক বেড়েছে। বড়বড় কয়েকটি হাটে ভিডিও-পালারও হয়েছে। প্রথমে কথা ছিল, কলকাতায় কোনো ভিডিও-পার্লারের মালিকের সঙ্গে ব্যবস্থা করা হবে। সবই যখন বাইরে থেকে আসছে, ভিডিওটাকে আর লোক্যাল রেখে কী হবে? কিন্তু হলদিবাড়ি হাটের ভিডিও-পার্লারের মালিক-ভদ্রলোক এখানে এসে ধরাধরি করেন। ভদ্রলোকের বাবা হলদিবাড়ির বিখ্যাত জোতদার ছিলেন। ছেলেরা জমিজায়গা বিক্রি করে দিয়ে প্রায় সবাই বাইরে চলে গেছে। এক ছেলে ত বিদেশেই থাকে। এক এই ভদ্রলোকই এখানে থেকে গেছেন। পৈতৃক বাড়ির অংশ আছে। নানা রকম ব্যবসা নানা সময় করেছেন–কিছুদিন হল এই ভিডিও-পার্লার খুলেছেন ওদের পরিবার বীরেনবাবুর পুরনো মক্কেল–এখন যদিও মামলা-মোকদ্দমার কোনো ব্যাপার নেই। ভদ্রলোক এসে বীরেনবাবুকে ধরেন। বীরেনবাবু তাঁকে, নকুলবাবুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। উনি কথা দেন, এদের লিস্ট অনুযায়ী কলকাতা থেকে নতুন প্রিন্ট নিয়ে আসবেন। উদ্যোক্তারাও চাইছিলেন না ভিডিও-ফিল্ম ব্যাপারটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করতে। শেষে, এই ভদ্রলোকের প্রস্তাবেই রাজি হন।
কিন্তু কী কী ফিল্ম আনা হবে–এটা ঠিক করতে অনেক সময় যায়। একটা গোপন প্রস্তাব নিয়ে কিছু নাড়াচাড়া হয় যে শেষের দিকে একটা ব্লু ফিল্ম দেখানো হোক। অত রাতে তেমন কেউ থাকবেও না, যদি থাকেও ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু, শেষে, গোপন ভাবেই ঠিক হয়ে যায় যে ব্লু ফিল্ম আনা হবে না কারণ পুলিশ ঝামেলা করতে পারে। তার চাইতে এ্যাডাল্ট-হরর অনেক নিরাপদ। খানিকটা ব্লু থাকে কিন্তু টানা হয়, মাঝে-মাঝে হঠাৎ। তা ছাড়া হররটাই প্রধান। কিছু এ্যাডাল্ট-হরর ছবি নিয়ে কথাও হয়। শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় ড্রাকুলাই ভাল। ঐ ভিডিওর ভদ্রলোকই খবর দেন, এটা নতুন ড্রাকুলা, সম্পূর্ণ নতুন ভাবে শুধু ভি-সি-আরের জন্যেই তৈরি। শশালের ব্যাপারে মতৈক্য হয় সবচেয়ে দ্রুত। ভদ্রলোকই জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যদি শাহেনশার একটা প্রিন্ট পান, আনবেন কি না। অমিতাভ বচ্চনের শাহেনশার পোস্টার বারবার দেয়া সত্ত্বেও, মুক্তির তারিখ বারবার স্থির হওয়া সত্ত্বেও কিছুতেই মুক্তি করতে দেয়া হচ্ছে না। বাংলা ছবির বেলায় কোনো পছন্দ ছিল না–এমন একটা ছবি হলেই বেটা সবার ভাল লাগে, মেয়েরা এলে ত ঐ প্রথম ফিল্মটা দেখেই চলে যাবে।
শেষ পর্যন্ত এই চারটি ফিল্মই এসে যায়। ঐ ভদ্রলোকই ঠিক করে দিলেন, প্রথমে বাংলা ফিল্মটাই হোক, তারপর শোলে। তারপর ড্রাকুলা। শেষে শাহেনশা। কিন্তু পরে এটা বদলাতে হল। শোলে লম্বা ছবি, অনেকের দেখা। সেটা বরং শেষে থাকুক। শাহেনশা একেবারে নতুন ছবি–সেটাই বরং আগে দেখানো হোক। শেষে তাই ঠিক হল। কিন্তু সে-ঠিক হওয়ার পথেও নানা বাধা। কারণ, বেশ জাগ্রন্থ অবস্থায় শোলের ঐ পরিচিতি সংলাপগুলি শোনার ইচ্ছে অনেকেরই ছিল। শেষ রাতের ঠাণ্ডায় ঘুমের মধ্যে শোলে জমবে না। তখন যেন রাত কাটানোর জন্যেই ঝিমুতে-ঝিমুতে দেখা।
শোলে আগে দেখার পেছনে আর-একটা মতলব ছিল। তাড়ির দোকানটা তখন পর্যন্ত চালু থাকবে। মদ খেতে-খেতে শোলে দেখা–এ রকম সুযোগ ভাবা যায় না। কিন্তু শাহেনশার পক্ষেই মত বেশি হল। যারা শোলের পক্ষে ছিল, তারাও রাজি হয়ে যায়। যাই হোক অমিতাভ বচ্চনের স্না-দেখা ছবি! কত আর খারাপ হবে?
বাংলা ফিল্মটা সাড়ে দশটার মধ্যেই শেষ হয়ে গেল। মাঝখানে কোনো ইন্টারভ্যাল দেয়া হয়নি। বাংলা ফিল্মটা মেয়েরাই বেশি দেখল। কিন্তু সে-ফিল্ম শেষ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই প্যান্ডেল প্রায় ভরে যায়। এত লোক হবে এটা আশা করা যায় নি। টেলিভিশন সেটটা একটু উঁচু টুলের ওপর বসানো হয়েছে–টিনের বেড়ার ওপরের স্কু আটার জন্যে সে-টুলটা বানানো হয়েছিল। কিন্তু স্টেজের ওপর না রেখে, টুলটা রাখা হয়েছে প্যান্ডেলের মাঝামাঝি–পুব দিকের বেড়া ঘেষে। দর্শকরা বসেছে টিভিটা ঘিরে। সামনের দিকে যারা, তারা বেশি পাশে যেতে পারে নি, কিন্তু পেছনে যারা তারা পাশেও অনেকটা ছড়িয়েছে।
ঐটুকু স্ক্রিনের আলো থেকে প্যান্ডেলের ভেতরে মুহূর্তে-মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ভারতবর্ষের নানা প্রান্তরের নানা দৃশ্য, পাহাড় থেকে সমদ্র মধ্য যুগ থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত বিস্তারিত হয়ে যায়। আর সেই প্রায় তিন ঘন্টা ব্যাপী বাস্তবের ওপরেই নেমে আসে মধ্যযুগের এক পাশ্চাত্য প্রাসাদ–তাতে মৃত্যুর পর নির্বিকল্প এক মুখোশের মত মুখ নিয়ে এক দীর্ঘদেহী মানুষ, তার বয়স বোঝা যায় না, তার চোখের দৃষ্টিতে পলকের ছায়া পড়ে না। ময়নাগুড়ির ঐ প্যান্ডেলের মাথায় শেষ রাতের শিশির পড়ে টুপ টুপ, অঝোরে, আর, প্যান্ডেলের ভেতরে দর্শকদের নিদ্রালু চোখের সামনে একটার পর একটা হত্যা ঘটে যায়। প্রত্যেকটা হত্যাকাণ্ড দেখানো হয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে। যাকে খুন করা হচ্ছে তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ নানা ক্লোজ-আপে দর্শকের সামনে ঘোরাফেরা করে। হত্যার পর হত্যার পর হত্যা, রক্তের পর রক্তের পর রক্তে মানবশরীর যখন অবান্তর হয়ে যায়, তখন সেই যান্ত্রিক অবান্তরতায় মেয়েদের শরীর মোমের শরীরের মত পর্দা জুড়ে শুধু ঘোরে। যেন, কোনো উচ্চারণ নেই, কোনো ভাষা নেই, বোমায় বিধ্বস্ত কোনো নগরের মত নারীশরীর আছে; শুধু শরীর। সেই সম্পূর্ণ অচেনা কাহিনীর শেষে গব্বর সিং-এর চিরপরিচিত কণ্ঠস্বরে ড্রাকুলাও উত্তরখণ্ড সম্মিলনের আত্মীয় হয়ে ওঠে।
.
বৃহস্পতিবার সকাল দশটা নাগাদ মনে হল ময়নাগুড়ি শহরটা পুলিশ দখল করে নিয়েছে। তিস্তা ব্রিজ থেকে যে রাস্তা ময়নাগুড়িতে ঢুকেছে, আর ময়নাগুড়ি থেকে যে রাস্তা দুটো মালবাজারের দিকে ও আসামের দিকে চলে গেছে–সেই তিনটি রাস্তাতেই পুলিশভর্তি গাড়ি চলে গেল। মালবাজারের রাস্তায় একটি, আসামের রাস্তায় তিনটি, আর ব্রিজের রাস্তায় দুটি। তা ছাড়া একটা জিপ গাড়ি নিয়ে ডি-এস-পি সাহেব চৌপত্তিতে দাঁড়িয়ে থাকলেন। আসামের রাস্তায় চলে গেলেন ময়নাগুড়ি থানার ওসি আর জলপাইগুড়ির দিকে থাকলেন জলপাইগুড়ির ও-সি। বেলা দশটা থেকে বারটা এই সব ছোটাছুটিতেই কাটল। বেলা বারটার পর থেকেই বোঝা গেল পুলিশ সমস্ত ট্রাফিকের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে। আসামের রাস্তায় মাইল,তিন আগে থেকে, জলপাইগুড়ির রাস্তায় তিস্তা ব্রিজ পর্যন্ত, কোনো গাড়িকে দাঁড়াতে দিচ্ছে না কিন্তু কোনো গাড়ি আটকাচ্ছেও না। মিনি বাস বা লাইনের বাসগুলোকে স্পিড়ও কমাতে দিচ্ছে না–প্যাসেঞ্জার নামানো-ওঠানোর জন্যে অনুষ্ঠানের জায়গায়, চৌপত্তিতে, চৌপত্তির পরে এক জায়গায় মাত্র এক মিনিটের জন্যে দাঁড়াতে দিচ্ছে। মালবাজারের দিকে গাড়িগুলোকে টাউনের ভেতর ঢুকতেই দিচ্ছে না–ভারতী সিনেমার কাছ থেকে বের করে দিচ্ছে। ফলে, ময়নাগুড়ির চৌপত্তির অন্য দিনের তুলনায় গাড়ির ভিড় প্রায় নেই বললেই চলে যদিও মানুষের ভিড় অনেক বেড়ে গেছে। অনেকটা হরতালের দিনের মত লাগছে।
বেলা একটা-দেড়টা থেকে বাইরের ট্রাক বাস আসতে শুরু করে। পুলিশ কোনো ট্রাক বাসকেই শহরের ভেতরে ঢুকতে দেয় না। অনুষ্ঠানের জায়গা থেকে মাইলখানেক দূরে আসামের রাস্তায় একটা বড় মাঠে সেই ট্রাক-বাসগুলোকে ঢোকানো হচ্ছে। সারি দিয়ে দাঁড়ানো ট্রাকবাসগুলোকে একটা টোকেনও দেয়া হচ্ছে–গাড়ির নম্বর ও ড্রাইভারের নাম লিখে রাখা হচ্ছে। প্রথম দিকের কয়েকটা বাসট্রাকের পারমিট আছে কিনা দেখা হয়েছিল। তা নিয়ে একটু গোলমাল দেখা দিতেই ডি-এস-পি সাহেব এসে ময়নাগুড়ির ওসিকে বলে দেন, পারমিট দেখতে হবে না। ডি-এস-পি সাহেব চলে যাওয়ার পর দুই হেড কনস্টেবল মাঠের ভেতরে সারি দিয়ে দাঁড়ানো গাড়িগুলোতে গোপনে পারমিট দেখতে চায়। পারমিটের বদলে তারা দশটা টাকা দেয়। পাঁচটাকাই দিতে চেয়েছিল কিন্তু কনস্টেবলরা তাদের বোঝায় কত ভাগ করতে হবে। তখন থেকে দশ টাকাই ঠিক হয়ে যায়। কয়েকটা ট্রাক-বাস আসতে-আসতেই এই সব হাঙ্গামা মিটে যায়। নতুন গাড়ি মাঠে ঢুকেই জেনে যায়–কনস্টেবলকে দশ টাকা দিতে হবে। ঐ দুই কনস্টেবলকে আর-কেউ ডাকাডাকি করে না, তারা ওখানে একটা বাসের ছায়ায় পাতা শতরঞ্জির ওপর বসে থাকে।
তিস্তা ব্রিজ দিয়ে প্রথম গাড়ি আসতে শুরু করে আর-একটু পর, বেলা তিনটে নাগাদ। ওদিকে কাছাকাছির মধ্যে খালি মাঠ না থাকায় গাড়িগুলোকে একটু বেশি দূরে, প্রায় মাইল দেড়েক দূরে এক মাঠের ভেতর ঢোকানো হয়। সে মাঠটাও নিচু। ফলে রাস্তা থেকে মাঠের ভেতর নামতে গাড়িগুলোকে একটু সামলাতে হয়। মাঠটা বড় হলেও একটু দূরেই জংলা গাছপালা শুরু হয়ে গেছে। সেদিকে কোনো ট্রাক বা বাসই যেতে রাজি হয় না।
তিস্তা ব্রিজের দিক থেকে প্রাইভেট গাড়ি ও ট্যাক্সি অনেক বেশি আসতে থাকে। তারা ঐ মাঠে নামতে অস্বীকার করে আর ঐ মাঠে নেমে অতটা হেঁটে যেতেও তাদের আপত্তি। সেখানেও বেলা চারটে নাগাদ বেশ একটা গোলমাল পেকে ওঠে। ডি-এস-পি সাহেবকেও আসতে হয়। যারা ডি-এস-পি সাহেবের সঙ্গে কথা বলেন তারা অনেকেই দার্জিলিং, শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ির ব্যবসায়ী বা চাকুরে। কলেজের শিক্ষকরাও দুটো ট্যাক্সিতে এসেছে। ব্যাপারটা পাকিয়ে ওঠার আগেই ডি-এস-পি বলে দেন, দেখুন, ট্রাক, বাস বা মিনিবাসকে এখানে নামতে হবেই, প্রাইভেট গাড়ি ও ট্যাক্সির জন্যে সামনে একটা পয়েন্ট আমরা করে দিচ্ছি ঐ পয়েন্টে গিয়ে প্যাসেঞ্জারদের নামিয়ে আবার এখানে চলে। আসতে হবে। এতে আপনারা রাজি থাকলে, বলুন, নইলে, সবাইকেই এখানে নামতে হবে।
সমর্থন ও আপত্তির একটা গুঞ্জনের মধ্যে হঠাৎ একজন জিজ্ঞাসা করে, তার মানে ফেরার সময়। আবার এখানে এসে উঠতে হবে? এতটা হেঁটে এসে?
ডি-এস-পি ধমকে ওঠেন, বাস-ট্রাকের প্যাসেঞ্জারদের যে এখান থেকেই হাঁটতে হচ্ছে সেটা দেখছেন না। আপনারা সময় নষ্ট করবেন না, যা করার এখনি করুন। এর মধ্যে আবার একটা কণ্ঠস্বর শোনা যায়, অত রাতে এতটা রাস্তা হেঁটে আসার সময় ছেনতাই-টেনতাইয়ের দায়িত্ব কে নেবে।
ডি-এস-পি সাহেব বলেন, রাস্তায় কাল সকাল পর্যন্ত পুলিশ থাকবে। বলে রাস্তার ওপর দাঁড়ানো একটা মারুতিকে সোজা চলে যেতে বলেন। মারুতির ড্রাইভার অত কিছু না বুঝে সোজা চলে যায়। তার পেছনে দাঁড়ানো গাড়িগুলোও না জেনে তার পেছন-পেছন যায়। জলপাইগুড়ির ও-সিকে সেই আগের পয়েন্টে পাঠিয়ে দিয়ে ডি-এস-পি তার গাড়িতে ওঠেন।
জলপাইগুড়ির ও-সি তার জিপগাড়িটা রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে নামে–তারপর ডি-এস-পির এগিয়ে আসা জিপের দিকে হাটে। ডি-এস-পি গাড়ি থামাতেই ও-সি বলে, স্যার, আগে যে ব্যবস্থা ছিল সেটাই রাখুন স্যার, না-হলে এইটুকু রাস্তায় সেই মানুষ আর গাড়িতে গোলমাল বেধে যাবে।
ডি-এস-পি গাড়ি থেকে নামেন! তারপর ওসিকে নিয়ে আবার আগের জায়গায় আসতে থাকেন হেঁটে। প্রাইভেট গাড়ির ধুলোয় রাস্তা অন্ধকার হয়ে আসে। ডি-এস-পি চাপা গলায় বলেন, ঠিকই বলেছেন, গাড়িকাড়ি মিলিয়ে একটা স্ট্যামপিড হয়ে যাবে।
সেই পার্কিঙের মাঠটাতে এসে ডি-এস-পি হাত দেখিয়ে বাকি প্রাইভেটগাড়িগুলোকে আটকে দিয়ে মাঠে ঢুকতে বলেন। সেই সব নতুন গাড়ির লোকরা জানেও না যে ইতিমধ্যে এখানে কী হয়েছে। ফলে তারা মাঠে ঢুকে যায়। আর যে-সব প্রাইভেট গাড়ির লোকজন ওখানে নামতে আপত্তি করেছিল, তারাও অনেকে মাঠে নেমে গেছে। কারণ, গাড়ির ভেতর কারো কারো ফ্লাস্কে চা আছে, কারো কারো মদের বোতলও আছে। গাড়ি তাদের খানিকটা দূর এগিয়ে আবার যদি ফিরেই আসে তা হলে লাভটা কী? তার চাইতে বরং এখানে এই মাঠের মধ্যেই গাড়িটা রেখে হেঁটে-হেঁটে যাওয়া ভাল–এ রকম ভেবে তারাও মাঠের ভেতরই ঢুকে যায়। এ নিয়ে আর-কোনো গোলমাল হয় না। যে-গাড়িগুলোকে প্রথমে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল, সেগুলো ফিরে এলেডি-এস-পি, ওসিকে বলেন, আপনি এখানেই থাকুন।
ততক্ষণে যে-তিনটি দিক থেকে ট্রাক বাস গাড়ি আসছিল সেই তিনটি দিকই সংগঠিত হয়ে গেছে। আকাশ থেকে যদি তাকানো যেত, তা হলে দেখা যেত তিস্তাব্রিজ থেকে, আসাম রোড থেকে, ডুয়ার্সের রাস্তা থেকে আর এ-ছাড়াও মাঠ দিয়ে, মেঠো পথ দিয়ে, যেন এইটুকু জায়গার সব দিক থেকে পায়ে হটা মানুষ একটা কেন্দ্রের দিকে চলছে। এই এত সব পথ দিয়ে এত হাজার-হাজার মানুষ আস্তে-আস্তে হেঁটে-হেঁটেই সেই কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছে খুব বড় মেলায় তীর্থ যাত্রীরা যেমন হাঁটে। তাতে ধুলো উড়ছে। আকাশ আর মাটির মাঝখানে ধুলোর একটা পর্দাও তৈরি হচ্ছে। সেই পর্দার আড়ালে মানুষজনকে একটু অস্পষ্টও-দেখাচ্ছে। কিন্তু অত মানুষের একসঙ্গে এক গতিতে একটি কেন্দ্রের দিকে হাটার সঙ্গে সেই ধুলোওড়াটুকু মানিয়েও গেছে। এত আর ট্রাক বা বাসের ধুলোর ঝড় নয়, মানুষের পায়ে-পায়ে ওড়া ধুলো। একই কেন্দ্রের দিকে এত মানুষ যায় বলে ধুলোরও যেন একটা প্রবাহ পথ তৈরি হয়।
.
ময়নাগুড়ির কাছেই জল্পেশে প্রতি বছরই শিবরাত্রিতে মেলা বসে। জল্পেশের কাছাকাছি ময়নাগুড়িই সবচেয়ে বড় শহর আর জল্পেশের মেলাও চলে প্রায় মাসখানেক। ফলে নানা জায়গায় তীর্থযাত্রীরা। ময়নাগুড়ির ওপর দিয়ে যায়, ময়নাগুড়ির মাঠেঘাটে, বারান্দায়, গাছের তলায় অস্থায়ী ডেরা বাধে। শিবরাত্রির দিন ময়নাগুড়ির ওপর দিয়ে আগে পায়ে হাঁটা তীর্থযাত্রীরা যেত, এখন বাস-মিনিবাসের ভিড় লেগে যায়। এসব দেখার অভিজ্ঞতা ময়নাগুড়ির লোকজনের আছে।
কিন্তু শ্রীদেবীর নাচের অনুষ্ঠানটির দিন বেলা চারটে থেকে ময়নাগুড়ি ও তার আশেপাশের যে-চেহারা হল তা সেই বাৎসরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে কণামাত্র মেলে না। মনে হল, ময়নাগুড়িতে ও তার আশেপাশে কয়েকটা জল্পেশ মেলা একসঙ্গে বসেছে।
আসাম ও বিহারের দিক থেকে যারা ট্রাক-বাসে এসেছে তাদের ট্রাকে ও বাসেই খাবারদাবার পোশাক-আশাক বিছানাপত্র। ডিলাক্স বাসের যে-যাত্রীরা কোনো কোম্পানির দায়িত্বে এসেছে তাদের ত বাসটায় ঘরবাড়ি। ফলে, মাঠের ভেতর গাড়িগুলোকে ঢুকিয়ে দেয়ার পর গাড়ির যাত্রীরা নিজেদের পরিবারের লোকজন বা বন্ধুবান্ধব নিয়ে দুটো-একটা শতরঞ্জিতে আলাদা-আলাদা হয়ে ছড়িয়ে যায়। কোথাও টিনের মুখ খুলে ডালপুর, আচার, ডালমুট, চানাচুর, প্যারা বেরচ্ছে। শালপাতার ঠোঙাও সঙ্গে আছে, আর আছে জেলিক্যানে জল। কোথাও পাম্প দেয়া কেরোসিন স্টোভের সা-সঁ আওয়াজের ওপর কড়াই চাপানো হয়েছে–লুচি ভাজা হচ্ছে। এমন-কি মাত্র এই স্বল্প অবকাশেও কোথাও-কোথাও তাসের আসর বসে গেছে। মেয়েরা আছে কিন্তু সংখ্যায় তত বেশি নয়–এরকম সব অনুষ্ঠানে। মেয়েদের সংখ্যাই যেমন বেশি থাকে, তেমন নয়। তবে লুচি ভাজা, টিনের বাক্স থেকে খাবার বের করে দেয়া এ-সবের জন্যে ত মেয়েদেরও দরকার হয়। কোনো-কোনো ডিলাক্স বাসে মেয়েদের সংখ্যা বেশ বেশি। সেখানে বড়-বড় কলসীর সাইজের ফ্লাস্কে চাও আছে, ঠাণ্ডা জলও আছে।
ট্রাক, বাস, গাড়ি পার্কিঙের জায়গায় খাবারের গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে, তার সঙ্গে মিশে আছে একটু-আধটু মদের গন্ধও। কিন্তু খাবারের গন্ধ এত জটিল যে মদের গন্ধটাও তার সঙ্গে মিশে গেছে–আলাদা করা যাচ্ছে না। অথচ আওয়াজগুলোকে আলাদা করা যাচ্ছে। মেলার মত খুব হৈ-হৈ নেই–মানুষজন নিজেদের ভেতরই কথা বলছে। সে-আওয়াজ আরকতটা দূরেই বা যেতে পারে। দোকানপাটের চিৎকার নেই, গাড়িঘোড়ার আওয়াজ নেই। মানুষজনের গলার স্বরের সঙ্গে ভেসে বেড়াচ্ছে ক্যাসেটে শ্রীদেবীর সব বিখ্যাত গান। ক্যাসেট প্লেয়ারগুলো কাঁধে বা হাতে ঝুলিয়ে লোজন চলাফেরা করছে বলে এক একটা গানের সঙ্গে অন্য গান চকিতে মিশে আবার আলাদা হয়ে যাচ্ছে। কোনো-কোনো ক্যাসেটে অন্য গানও বাজছে। কেউ-কেউ খালি গলায় এই সব গানের সঙ্গে গলায় মেলাচ্ছে। কিন্তু তবুও কোনো হট্টগোল তৈরি হচ্ছে না। এমনকি ক্যাসেটও কেউ যেন খুব জোরে বাজাচ্ছে না। কিংবা, হয়ত জোরে বাজানো সত্ত্বেও এতটা বড় জায়গা ও এত মানুষজনের ফলে আওয়াজগুলো চাপা পড়ে থাকছে। এত মানুষজন, এত গাড়িঘোড়ার সঙ্গে আজকাল মাইকের আওয়াজটা এমন অভ্যস্ত হয়ে গেছে, যে, শুধু মাইকটা না-থাকার ফলেই মনে হচ্ছে সব কেমন চুপচাপ।
এই হাজার-হাজার মানুষ অপেক্ষাকৃত শান্ত অনুত্তেজিত হয়ে ঘোরাফেরা করছে, ধীরস্বরে ক্যাসেট বাজিয়ে যাচ্ছে, খাওয়াদাওয়া-তাসখেলার মধ্যেও একটু আনমনা হয়ে আছে, চায়ে বা মদে গলা একটু ভেজালেও তাতে কখনোই মজে যাচ্ছে না, তার কারণ, এই হাজার-হাজার মানুষ একটা স্থায়ী ও অনাটকীয় প্রত্যাশার আবহের ভেতরে ঘোরাফেরা করছে। যদি সম্পূর্ণ অজ্ঞাত কোনো কিছু নিয়ে গড়ে উঠত, তা হলে সেই প্রত্যাশাটাকে এতটা ধীর ও নিশ্চিত লয়ে তাতিয়ে তোলা যেত না–একটা অনিশ্চয়তার উদ্বেগে সে-প্রত্যাশা ফেটে পড়ত। কারণ, শ্রীদেবী এই ভিড়ের প্রায় কারো কাছেই অপরিচিত নয়। শ্রীদেবীর ফিল্ম দেখে, নাচ দেখে এই ভিড় আজকের অনুষ্ঠানে কী দেখতে পারে তা নিশ্চিতভাবেই জানে। এমন-কি, এই ভিড় তার সেই দেখা ও চেনা শ্রীদেবীকেই রক্তমাংসে দেখতে চায়। এমন-কি, যেন শ্রীদেবী যদি এই রাস্তা দিয়ে খোলা গাড়ির ওপর দাঁড়িয়ে চলে যায়, তাতেও এই ভিড়ের অনেকটা তৃপ্তি ঘটবে এটুকু জেনে যে শ্রীদেবীর একটি রক্তমাংসের শরীর আছে। শ্রীদেবী তার রক্তমাংসের শরীর নিয়েই এই সব মানুষের কাছে পরিচিত। সেই রক্তমাংসের শরীর থেকে যে-যৌনতা সিনেমাহলের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ে এই ভিড় সেই যৌনতার টানেই এসেছে। এই ভিড়ের যেন এরকম একটা কাণ্ডজ্ঞানও আছে যে, ছবি থেকে বিচ্ছুরিত যৌনতার একটা মানবিক উৎস আছে এটুকু জানাই যথেষ্ট। কিন্তু সেই কাণ্ডজ্ঞানেরও সীমা একটা খুব শিথিল আছে। এই ভিড়ের ভেতর এমন একটা অসম্ভবের প্রস্তুতিও যেন থাকে যে সিনেমার পর্দা ছাড়াও মঞ্চের বাস্তবতায় রক্তমাংসের শ্রীদেবীকে দেখা ত তার ঐ সিনেমা হলের অভিজ্ঞতারই সম্প্রসারণে, তেমনি, হতেও ত পারে শ্রীদেবীর রক্তমাংসের শরীরকে ছুঁয়ে ফেলা যাবে বা, প্রায় ছুঁয়ে ফেলা যাবে। সিনেমার পর্দায় শ্রীদেবীর বাহুমূলের ভাঁজ বা পিঠের তিনকোনা হাড়ের ওপরকার পেশীর কম্পন পর্যন্ত যার চেনা, সে সেই শরীরটাকে অতটা স্পর্শাতীত নাও ভাবতে পারে–যদি সুযোগ পাওয়া যায়। তাই এই ভিড়ের শান্ত বা অনুত্তেজ প্রত্যাশার ভেতরে একটা হিংস্রতার ইচ্ছাও যে মিশে থাকে না তা নয়। এতটা শান্ত ও অনুত্তেজিত না থাকলে সেই হিংস্রটাও অনুমান করা যেত না।
অথবা, সে-হিংস্রতাটাকে সব সময়ই সত্য বলে ধরে নেয়া হয়।
তাই, পুলিশের পরামর্শ অনুযায়ীই শ্রীদেবী শিলিগুড়ির হোটেল থেকে তার তিন গাড়ি নিয়ে জলপাইগুড়ি হয়ে তিস্তা ব্রিজ দিয়ে ময়নাগুড়িতে এলেন না। কারণ, এই রাস্তা দিয়েই দর্শকরা আসছে। যে-কোনো জায়গায় গাড়ি আটকে যেতে পারে, মানুষজন শ্রীদেবীকে চিনে ফেলতে পারে। শ্রীদেবী ময়নাগুড়িতে এলেন শেবক ব্রিজ হয়ে, ওদলাবাড়ি পার হয়ে, চালসার মোড় দিয়ে, লাটাগুড়ির ওপর দিয়ে। কারণ এই রাস্তাতেই দর্শকদের গাড়ি সবচেয়ে কম, যা আসছে তাও চা বাগানেরই। রাস্তাটাও একটু চওড়া, অনেকটা পাহাড়, ফরেস্ট ও চা বাগান। ফলে হঠাৎ চিনে ফেললেও লোকজন জমে যাওয়ার ভয় ততটা নেই।
শ্রীদেবীর তিনটি গাড়ির প্রথমটিতে তার দেহরক্ষীরা, দ্বিতীয়টিতে তিনি নিজে এবং হয়ত আর-কেউ। সে-গাড়ির কাল কাঁচ তুলে দেয়া। তৃতীয়টিতে তার অন্যান্য সহকারীরা, যারা যন্ত্রপাতি বাজাবে, যারা মেক-আপ দেবে। এই তিন গাড়ি থেকে একটু দূরত্ব রেখে পুলিশের একটা জিপও ছিল।
ময়নাগুড়ির কাছাকাছি এসে পুলিশের গাড়ি আর-দূরে থাকে না–প্রথম গাড়িটার আগে-আগেই চলে। ময়নাগুড়ির রাস্তায় তখন হাজার-হাজার লোক চলছে। পুলিশের গাড়িটা সাইরেন বাজিয়ে দেয়। সেই উচ্চকিত সাইরেনের আওয়াজের সঙ্গে মিলে চার-চারটি গাড়ির হেডলাইট এই রাস্তাভর্তি মানুষজনের গায়ের ওপর হামলে পড়ে। আর, এত মানুষজন এত বেগে রাস্তার দু পাশে ছিটকে যায় যে পাড়িগুলোকে কোথাও বেগ কমাতেই হয় না। চার-চারটি গাড়ি সেই একই বেগে অনুষ্ঠানের জায়গায় এসে নতুন তৈরি ক্যালভার্ট দিয়ে প্যান্ডেলের বা পাশে একেবারে গ্রিনরুমের গেটের সামনে গিয়ে পৌঁছয়। পুলিশের গাড়িটা সরে যায়, তার পেছনে প্রথম গাড়িটাও সরে যায়। দ্বিতীয় কাতোলা গাড়িটা এগিয়ে আসে। তৃতীয় গাড়ির দরজা খুলে কয়েকজন নামে, নেমে দাঁড়িয়েই থাকে। কেউ বুঝতেই পারে না দ্বিতীয় গাড়িটার দরজা খুলে শ্রীদেবী কখন কোল্যাপসিবল গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে গেছেন। গাড়িগুলো থেকে তখন নানা যন্ত্রপাতি নামাচ্ছে নানা লোক।
.
শ্রীদেবী যে এসেছেন এটা বোঝার আগেই শ্রীদেবী গ্রিনরুমের ভেতরে কয়েকটা কোল্যাপসিবল গেটের আড়ালে চলে যান। শুধু সবচেয়ে বাইরের কোল্যাপসিবল গেটটায় শ্রীদেবীর ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের সঙ্গে উত্তরখণ্ড সম্মিলনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের একজন দাঁড়িয়ে থাকেন–ভেতরে ও বাইরে আর-সর্বত্রই শ্রীদেবীরই লোকজন। গ্রিনরুমের বা স্টেজের প্রধান দরজা প্যান্ডেলের যে-পুব দিকে সেদিক দিয়ে প্যান্ডেলের ভেতরে ঢোকার কোনো পথ নেই। বাইরের বড় রাস্তার নীচের নালার ওপরে যে-কালভার্টটা দুদিনের মধ্যে বানাতে হয়েছে সেটা দিয়ে শুধু এই পুব দিকটাতেই আসা যায়। এখন এই পুব দিক দিয়ে গিয়ে স্টেজ-গ্রিনরুমের পেছন দিয়ে ঘুরে আবার প্যান্ডেলের পশ্চিমে যাওয়া যায় বটে কিন্তু সেটা অনেক ঘুরপথ। একটা গাড়ি রাস্তার দিকে মুখ করে গ্রিনরুমের প্রধান কোল্যাপসিবল গেটের সঙ্গে লাগানো। আর একটা যে-ছোট গেট আছে গ্রিনরুম থেকে বেরবার, ঠিক এর বিপরীত দিকে, সেখানেই বাকি দুটো গাড়ি পার্ক করা। কয়েকটি পুলিশ ও একজন অফিসার গোছের ভদ্রলোক এই পুরো এলাকাটাতে ঘোরাফেরা করছে।
গাড়ি তিনটি ও পুলিশের গাড়িটি এই ক্যালভার্ট দিয়ে ঢুকে যাবার ও লোকজন নেমে যাবার পর সারা রাস্তায় একসঙ্গে আওয়াজ ওঠে–এসে গেছে, এসে গেছে, শ্রীদেবী এসে গেছে। শ্রীদেবী ঐ ভিড়ের মধ্য দিয়েই এসেছেন, পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়েছে, লোকজন তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে জায়গাও দিয়েছে–কিন্তু তখন তারা বুঝতে পারে নি যে শ্রীদেবীই আসছেন। কারণ, এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দর্শক হিশেবে আসার পর থেকে লোকজনকে আজ যে-অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে সে-অভিজ্ঞতা তাদের আগে কখনো হয় নি। ফলে, ময়নাগুড়িতে পৌঁছুনোর পর শ্রীদেবী ব্যাপারটি আর তাদের কাছে প্রধান ছিল না, তাদের কাছে প্রধান হয়ে ওঠে এই ব্যবস্থাটিই। কোথায় বাস বা ট্রাক দাঁড়াবে, কোথায় নামতে হবে, কখন হাঁটতে হবে, কোথা দিয়ে হাঁটতে হবে, কোথা দিয়ে ঢুকতে হবে ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থাটা এমনই প্রাধান্য পেতে থাকে যে লোকজন যেন ভুলেই যায় তারা এখানে একটা বিশেষ অনুষ্ঠানে এসেছে–মাত্র গান শুনতে আর নাচ দেখতে। এ যেন হয়ে দাঁড়ায় সারা দেশের খুব বড় কোনো নেতার মিটিঙ শুনতে আসার মত ব্যাপার। বাড়ি থেকে বেরনো আর বাড়িতে ফেরা পর্যন্ত সমস্তটাই ঐ মিটিঙের উদ্যোক্তাদের ব্যাপার–তার সঙ্গে মিছিলের বা মিটিঙের লোকের কোনো সম্পর্ক নেই। যে রাস্তায় আজ যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ সে রাস্তায় যখন তিন-তিনটি গাড়ি ও পেছনে-পেছনে একটা পুলিশের গাড়ি একই গতিতে ছুটে আসে আর লোকজনকে মুহূর্তে সরে গিয়ে জায়গা করে দিতে হয়, তখন সে-গাড়িতে আর-কে থাকতে পারে, একমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া যার জন্যে এই রাস্তায় বাকি যানবাহন আজ নিষিদ্ধ, যার জন্যে এই রাস্তায় শুধু মানুষ আর মানুষ? এই সোজা হিশেবটি আর মানুষের মাথায় ঢোকে না।
কিন্তু একবার যখন রটে যায় যে শ্রীদেবী এসে গেছেন, তখন রাস্তায় একটা হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। রাস্তায় এমনিতে কোনো লাইন ছিল না–সকলেই যে-যার মত হেঁটে যাচ্ছে। প্রায় সব রাস্তাই কার্যত ওয়ান ওয়ে হয়ে গেছে বলে লোকজনের কোনো ধাক্কাধাক্কিও নেই। আসামের রাস্তার লোকজন আসছে পুব থেকে পশ্চিমে। তিস্তাব্রিজের রাস্তার লোকজন আসছে পশ্চিম থেকে পুবে। আর ডুয়ার্সের রাস্তায় লোকজন আসছে উত্তর থেকে দক্ষিণে।
কিন্তু সবাইকেই ত ব্লক অফিসের ক্যালভার্টটা দিয়ে সম্মিলনের মাঠে ঢুকতে হচ্ছে। সম্মিলনের তিনটি গেট থেকে লাইন রাস্তায় বহু দূর পর্যন্ত গেছে। রাস্তার লোকজনকেও লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। ফলে রাস্তায় যারা হেঁটে একমুখো আসছে তারাও আসলে পাঁচ-ছ জনের সারির একটা লাইনেই থাকে। শ্রীদেবী এসে গেছে রটে যাওয়ার পর রাস্তার ওপরের এই লাইনগুলোতে ঠেলাঠেলি পড়ে যায় যেন, এখানে ঠেলাঠেলি করলে তাড়াতাড়ি প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকে যাওয়া যাবে।
এত মানুষ যেখানে সেখানে সামান্য ঠেলাঠেলিতেই একটা হুল্লোড় বেধে যায়। কিন্তু প্যান্ডেলের কাছে ও রাস্তায় পুলিশ অফিসাররা খুব দৌড়োদৌড়ি করছিলেন। এক জায়গায় একটু ধাক্কাধাক্কি শুরু হতেই তারা তিনজন ব্যাটনগুলো ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে লোকজনকে ঠেকিয়ে দেন, তারপর ঠেলে একটু সরিয়েও দেন। ডি-এস-পি সাহেবও সেখানে পৌঁছে যান। তিনি জিজ্ঞাসা করেন–পুলিশের মাইকটা কোথায়?
সে ত পেট্রল পাম্পে স্যার, ঐ দিকে।
ডি-এস-পি নিজেই দৌড়ে চলে যান। এ-দিকের ধাক্কাধাক্কিটা অবিশ্যি থেমে যায়–লোকজন আবার চলতে শুরু করে। একটু পরে মাইকে শোনা যায়–পুলিশের পক্ষ থেকে বলছি। আপনারা হুড়োহুড়ি করবেন না। লাইন ভাঙবেন না। লাইন রাখুন। আপনারা প্রত্যেকে নিজেদের জায়গায় বসার আগে অনুষ্ঠান শুরু হবে না। আপনারা ঠেলাঠেলি করলে আপনাদেরই ঢুকতে দেরি হবে। এরপর গলাটা একটু ওঠে, প্রায় চিৎকার করে বলা হয়, গেটে যারা টিকিট চেক করছেন তারা তাড়াতাড়ি কাজ করুন, দেরি করবেন না, রাস্তায় ভিড় জমে যাচ্ছে, গেটে যারা টিকিট চেক করছেন তারা তাড়াতাড়ি কাজ করুন, দেরি করবেন না, রাস্তায় ভিড় জমে যাচ্ছে।
পুলিশের নাম শুনেই লোকজন ঠেলাঠেলিটা বন্ধ করেছিল। টিকিট তাড়াতাড়ি দেখে দেয়ার নির্দেশে লোজন যেন আশ্বস্ত হয় যে পুলিশ তাদের তাড়াতাড়ি প্যান্ডেলের ভেতরে ঢোকাতেই ব্যস্ত।
ডি-এস-পি সাহেব পুলিশের গাড়ি থেকে নেমে আবার সেই জটলার কাছে আসেন–ব্লক অফিসের ক্যালভার্টের ওপরে যেখানে তিন দিক থেকে আসা লোকজন মিলছে। সেখানে ইতিমধ্যে আরো দু-জন সেকেন্ড অফিসার এসে গেছেন। তারা তিনদিকের লোকজনকে একটা লাইনে ফেলে ছাড়ছেন আর মাঝে-মাঝে এক-একদিকের লোক আটকাচ্ছেন। ডি-এস-পিকে দেখে একজন বলে ওঠেন, স্যার, স্যার, এখনো এত লোক বাইরে, যদি তাড়াতাড়ি না ছাড়ে তা হলে ত এখানে আটকে যাবে।
ডি-এস-পি বলেন, দাঁড়াও, আমি গেছে দেখছি, দাঁড়াও, আমি এসে বলছি। ডি-এস-পি ঐ লাইনের পাশ দিয়ে, ভেতর দিয়ে, মাঠের মধ্যে পৌঁছে যান। তিনি সবচেয়ে শেষের গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলে গেটের ছেলেটি তাকে না দেখে আটকায় আর গেটের কনস্টেবলটি ছেলেটির হাত তুলে দেয়। ছেলেটি দেখেই সরি স্যার জিভ কাটে। তাড়াতাড়ি করুন, তাড়াতাড়ি করুন, বলে ডি-এস-পি ভেতরে ঢোকেন জায়গার অবস্থা দেখতে। তাকে দেখে নকুল রায়, বটুক বর্মন ছুটে আসে।
শুনুন, আপনারা আমাদের যা একাউন্ট দিয়েছেন তার বাইরে কোনো টিকিট বাজারে ছাড়েন নি ত? ডি-এস-পি জিজ্ঞাসা করেন।
না, স্যার। একথা জিগেস করছেন কেন স্যার? নকুল বলে।
না, না, অন্য কারণে না। বাইরে লোক ত দেখেছেন, এ্যাকমোডেশন হয়ে যাবে ত?
হ্যাঁ, স্যার এখনো ত অর্ধেক প্যান্ডেল খালি স্যার। আমরা ত স্যার আপনাদের স্কোয়ার ফুটের হিশেব দিয়েছি স্যার, প্ল্যান জমা দিয়েছি স্যার।
আরে মশাই, সে-সব আপনাদের কে জিগেস করছে। বাইরে লোকজন একটু ইমপেশেস্ট হয়ে পড়তে পারে, কত দূর-দূর থেকে এসেছে, তাই বলছিলাম আপনারা জায়গার তুলনায় যদি আমাদের গোপন করে বেশি টিকিট ছেড়ে থাকেন তবে কিন্তু কেলেংকারি হবে। আপনাদের ত সিট নাম্বার নেই? ডি-এস-পি বলেন।
না স্যার, আপনাকে সত্যি বলছি স্যার আপনাদের যা বলেছি সেই টিকিট ছেড়েছি স্যার। এ রিস্ক স্যার কে নেবে? নকুল প্রায় ডি-এস-পির হাত ধরে। ডি-এস-পি বলেন, তা হলে টিকিট পাঞ্চ করছেন কেন? প্রত্যেককে টিকিট হাতে তুলে দেখিয়ে ঢুকে যেতে বলুন–তা হলে দেখবেন বাইরের প্রেসারটা কমে যাবে।
নকুল বটুকের দিকে তাকায়। বটুক বলে, স্যার, ভেতরে ঢুকে যদি টিকিট বাইরে পাঠিয়ে দেয়?
আরে, কেউ ঢুকতেই পারছে না মশাই আর টিকিট বাইরে পাঠিয়ে দেবে? আমরা এ্যানাউন্স করে দিচ্ছি কাউকে বাইরে বেরতে দেয়া হবে না। আপনারাও এ্যানাউন্স করে দিন।
আপনারাই যা করার করেন স্যার। আমাদের ত স্যার স্টেজে উঠতেই দেবে না। নকুল বলে।
কে দেবে না?
স্টেজ ত এখন স্যার শ্রীদেবীর কন্ট্রোলে, কাউকে ঢুকতে দেবে না স্যার, বটুক বোঝায়। ডি-এস-পি হেসে বলেন, আপনাদের এখান থেকে শ্রীদেবীর কী দেখা যাবে আর?
থার্ড ক্লাশ থেকে স্যার এর বেশি দেখা যায় না, নকুল হে-হে করে হাসে। ডি-এস-পি বলেন, তা হলে গেটকে বলে দিন শুধু টিকিটটা তাকিয়ে দেখে ছাড়তে, আমরা বাইরে মাইকে বলে দিচ্ছি।
নকুল, বটুক আর ডি-এস-পি বাইরে বেরিয়ে যান। ডি-এস-পি আবার লোকজনের ভেতর দিয়ে-দিয়ে পথ করে নিয়ে রাস্তায় উঠে যান। তারপরই মাইকে শোনা যায়, পুলিশের পক্ষ থেকে বলছি। যারা গেটে টিকিট পাঞ্চ করছেন তারা টিকিট পাঞ্চ করবেন না। দর্শকদের হাতে টিকিট দেখে ছেড়ে দিন। এই ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গে একটা আওয়াজ ওঠে। সেটা থেমে গেলে মাইকে আবার শোনা যায়, দর্শকদের কাছে অনুরোধ। আপনারা আপনাদের হাতে টিকিটটা উঁচু করে ধরে নির্দিষ্ট গেট দিয়ে প্রবেশ করুন যাতে যারা টিকিট দেখছেন, তারা দেখতে পান। এই ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গে আবার একটা সমবেত আওয়াজ ওঠে–সমর্থনের। মাইকে শোনা যায়, লাইন ভাঙবেন না, হুড়োহুড়ি করবেন না, নিজের টিকিট নিজের হাতে উঁচু করে ধরে নির্দিষ্ট গেট দিয়ে প্যান্ডেলে ঢুকুন। প্যান্ডেলে ঢোকার পর কাউকে বেরতে দেয়া হবে না। মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, প্যান্ডেলে ঢোকার পর কাউকে বেরতে দেয়া হবে না।
এই ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই লাইনটি বেশ তাড়াতাড়ি এগতে থাকে। ঘোষণার পর লোকজনের মধ্যে দু-ধরনের ব্যস্ততা দেখা যায়। বড়বড় দলে যারা এসেছে বা শুধু বাড়ির লোকজন নিয়েও যারা এসেছে, তারা সব টিকিট একজনের কাছে জমা রেখেছিল। এই ঘোষণা শুনে যার-যার টিকিট তার-তার হাতে দেয়া শুরু হয়ে যায়। এত হাজার-হাজার লোকের হাতে টিকিট বিলি একটা ঘটনা ত বটেই। আর, প্যান্ডেলে ঢুকলে আর বেরতে দেয়া হবে না শুনে হঠাৎ-হঠাৎ লাইন ভেঙে পেচ্ছাব করতে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে পড়া বা বসে পড়া শুরু হয়। এত হাজার-হাজার মানুষের মধ্যে এ-হিড়িক পড়লে সেটাও একটা ঘটনা বটে।
.
শ্রীদেবীর নাচের অনুষ্ঠানটা শুরু হয়ে যায় কিন্তু খুব সহজ ভাবে। শুরুর ধরন দেখে মনেই হয় না যে এই অনুষ্ঠানের জন্যে গত মাস দুই ধরে এত প্রচার, বাংলা-বিহার-আসাম জুড়ে দর্শকদের আসার নানা আয়োজন, প্রায় মাসখানেক ধরেই রাজনৈতিক স্তরে ও প্রশাসনের স্তরে মিটিঙ, কলকাতা থেকে মন্ত্রীদের আসা আর এখন এই প্রায় লক্ষ দর্শকের উপস্থিতি। অনুষ্ঠানের শুরু দেখেই হতাশ হওয়ার জন্যে ত এত দর্শক আসে নি, তাই দর্শকরা হতাশ হয় না নিশ্চয়ই। শুরু থেকেই এই সমস্ত দর্শক শ্রীদেবীকে তাদের মধ্যে পেয়ে যাবে–এমন একটা আবহ হয়ত আলাদা-আলাদা ভাবে কোনো-কোনো দর্শকগোষ্ঠীর মধ্যে ছিল। কিন্তু এই প্যান্ডেলের ভেতর বসার পর দেখা যায় দর্শকদের একটা বেশ বড় অংশই রাজবংশী ও চা বাগানের মদেশিয়া। এদের মধ্যে শ্রীদেবী সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট প্রত্যাশা ছিল না, ফলে শুরু দেখে তারা হতাশ হয় নি। সেই কারণে, অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই প্যান্ডেলটা চুপ করে যায়। সেই নীরবতার মধ্যে কিছু সম্ভ্রমও ছিল।
বোধ হয়, এ-ধরনের অনুষ্ঠান নানা জায়গায় নানা ধরনের সমাবেশে করতে করতে অনুষ্ঠানের প্রধান শিল্পী, যিনি পয়লা নম্বরের ফিল্মস্টার ও হিন্দি ফিল্মে যাকে যৌন বিষয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, একটা পদ্ধতি-প্রক্রিয়া তৈরি করে ফেলতে পেরেছেন। তাই তার প্রথম চেষ্টা হয়, তাকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে যদি কোনো জ্বরের মত তাপ তৈরি হয়ে থাকে, সেটাকে নষ্ট করা।
স্টেজটার পর্দা খুলে যাওয়ার পর ধীরে-ধীরে খুব কম আলো দর্শকদের বাঁ দিক থেকে স্টেজের পেছনে দর্শকদের ডান দিকে পড়ে। পুরো স্টেজটা কিছুক্ষণ খালি পড়ে থাকে শুধু এই গবাক্ষ পথে আসা আলোটুকু নিয়ে। সেই সময়টুকু জুড়ে দর্শকরা ধীরে-ধীরে চুপ করতে থাকে ও যে যার দেখার রাস্তা ঠিক করে নেয়। ঠিক যখন মনে হতে শুরু করেছে যে স্টেজে দেখার কিছু নেই তখনই একটি ঘুঙুরের আওয়াজ শোনা যায়। তারপর একটি মেয়ের প্রবেশ অনুসরণ করতে করতে বোঝা যায় স্টেজে এতক্ষণে আবছা একটা আলোও ফুটে উঠেছে যে-আলোতে মেয়েটি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। মেয়েটিকে দেখেই প্যান্ডেলে শ্বাসপতনের আওয়াজ হয়। কিন্তু এই দর্শকদের ভেতর ত এমন কয়েক হাজার আছে। যারা শ্রীদেবীর দৈর্ঘ্য জানে, শ্রীদেবীর হাটার ছন্দ চেনে। তাদের প্রতিক্রিয়াতে বাকি সবাই মুহূর্তে বুঝে যায়, এ মেয়েটি শ্রীদেবী নয়। কিন্তু সেই জানাটুকুসহই সবাই দেখে মেয়েটি সেইখানে হাঁটু গেড়ে বসে যেখানে এতক্ষণ আলো ফেলে রাখা হয়েছিল। সে একটা দেশলাই কাঠি জ্বালে, তাতে একটি প্রদীপ জ্বলে ওঠে, স্টেজের আলো একটু বেড়ে যায় আর দেখা যায় মেয়েটি নটরাজের ছোট মূর্তির সামনে প্রদীপ জ্বালাচ্ছে। প্রণাম সেরে মেয়েটি প্রায় পূর্ণ আলোকিত মঞ্চ ছেড়ে চলে যায়, ঘুঙুরের আওয়াজ তুলতে-তুলতেই। আর, সে-আওয়াজ মিলিয়ে যেতে দেয়া হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আর-একটা ঘুঙুরের আওয়াজ স্পষ্ট হতে থাকে–কেউ হেঁটে আসছে। দর্শকদের বা দিক থেকে স্টেজের একেবারে সামনে দিয়ে ঢুকে শ্রীদেবী দর্শকদের দিকে একবারও না তাকিয়ে কোনাকুনি স্টেজটা হেঁটে পার হয়ে গেলেন স্টেজের পেছনে দর্শকদের ডান হাতি কোণে, যেখানে প্রথমে আলো পড়ে ছিল অনেকক্ষণ, পরে, প্রদীপ জ্বালানো হয়েছিল। সেখানে শ্রীদেবী হাটু গেড়ে বসে কোমর থেকে মাথা মাটির ওপর হেলিয়ে নটরাজকে প্রণাম করেন। তাঁর প্রণামের ভঙ্গি জুড়ে, স্টেজের আলো কমে আসে কিনা বোঝা যায় না, কিন্তু তার লম্বা পিঠটুকু জুড়ে একটা অতিরিক্ত আলো মাথা দিয়ে গলে হাতটুকু দিয়ে মাটিতে মিশে যায়। লম্বা বেণীটা তার গলা থেকে ডাইনে দর্শকদের দিকেই পড়ে থাকে।
ফিল্মে-ফিল্মে যারা শ্রীদেবীকে চেনে, তারা তার এই হাঁটার ভঙ্গি, তার ডান হাতটা হাঁটার সময় কনুইয়ের কাছে একটু ভাজ ফেলে যে শরীরের বাইরে থাকে, তার শরীরের উর্ধাঙ্গ যে হাঁটার তালে-তালে একটু-একটু দোলে, তিনি প্রণাম করার সময় যে এরকম বেণী লুটিয়েই প্রণাম করেন–এ-সবই চেনে। ফলে শ্রীদেবী ঢোকামাত্র তারা শ্বাস বন্ধ করে প্রায় মিলিয়ে নেয় ফিল্মের প্রাণহীন শরীরের চলাফেরা এই প্রাণময় শরীরে সবটুকুই উপস্থিত।
প্রণাম সেরে উঠে শ্রীদেবী স্টেজের মাঝখানে এসে দাঁড়াতে-দাঁড়াতে ঘাড়ের একটা ভঙ্গিতে লম্বা বেণীকে পিঠে ফেলেন–এ ভঙ্গিটাও কতবার চেনা। তখন স্টেজের সব আলো জ্বলে উঠেছে, একটুও ছায়া নেই। শ্রীদেবী দুই হাতে নমস্কার করে একটু হাসেন। সেই হাসিটা সহই তিনি দর্শকদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে তাকানবায়ে, ডাইনে, বায়ে, ডাইনে ও নমস্কার করেন। শ্রীদেবীর দিঘল চেহারার ওপর ছোট মুখটাতে ছোট ঠোঁটে হাসিটা খুব খোলামেলা নয়। কিন্তু এই যে-হাসিতে মুখটা ছড়িয়ে যায় না, সেই হাসিটাতেই তিনি তার দর্শকদের এত পরিচিত। সেই পরিচয়ের কথা মনে পড়িয়ে দিতেই শ্রীদেবী তার খুব পরিচিত আর-একটা ভঙ্গিতে মাথাটাকে একটু হেলান, কপালে কয়েকটা ভাজ ফেলেন, যেন ঐ ভঙ্গি দিয়ে দর্শকদের জানাতে চাইছেন, আরে, আমিই, আমিই। দর্শকরা হাততালি দিয়ে ওঠেন, হাততালি যেন থামতে চায় না। শ্রীদেবী দুই হাত ওপরে তুলে থামাতে বললে হাততালি আরো বেড়ে যায়। তখন তিনি দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে ছোট্ট একটা কাধঝাঁকুনি দেন—-মিস্টার ইন্ডিয়াতে এরকম কাঁধঝাঁকুনি তিনি প্রায়ই দিয়েছেন। দর্শকদের হাততালি বেড়ে ত যায়ই, তার সঙ্গে হাসি মেশে, বেশ উচ্চকিত হাসি। যেন তারা এতক্ষণে পেয়ে গেছে, ছবিতে-ছবিতে তাদের এত পরিচিত নায়িকাটিকে পেয়ে গেছে। আর এটাই যেন শ্রীদেবীর প্রাথমিক দায় ছিল–দর্শকদের চেনা ফিল্মের শ্রীদেবীর সঙ্গে নিজেকে মেলানো। তারপরই তিনি স্টেজ থেকে চলে যান। হাততালিও ধীরে ধীরে কমে আসে। সম্পূর্ণ থেমে যাবার আগেই মাইকে একটু গম্ভীর গলায় ঘোষণা করা হয় যে শ্রীদেবী প্রথমে আপনাদের সামনে ভরতনাট্যম পেশ করবেন। এই ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গেই মাইকে সংস্কৃত শ্লোক আবৃত্তি শুরু হয় আর শ্রীদেবী মাথায় মুকুট পরে পোশাক সামান্য বদলে মঞ্চে ঢোকেন।
শ্রীদেবী প্রথম প্রবেশ, নটরাজ প্রণাম ও নমস্কারের নানা ভঙ্গির মধ্যে দিয়ে দর্শকদের স্মৃতি জাগিয়ে দিয়েছিলেন, এবার ভরতনাট্যমের নানা ভঙ্গি দিয়ে স্মৃতির সেই পরিচয় নষ্ট করতে লাগলেন। কোনো-কোনো ফিল্মে শ্রীদেবী ভরতনাট্যম নেচেছেন হয়ত, কিন্তু দর্শকদের সঙ্গে তিনি তার ভরতনাট্যম দিয়ে বাধা নন, যেমন ছিলেন একসময় বৈজয়ন্তীমালা, বা তার পরে এমনকি হেমামালিনীও। ফলে ভরতনাট্যমের নান্দীমুখ থেকেই যতই তিনি অভিনয়ের প্রবলতার মধ্যে ঢুকছিলেন ও মাইকের তবলা-মৃদঙ্গবাদ্য ও বোলের সঙ্গে-সঙ্গে নিজের ক্ষমতার জোর দেখাচ্ছিলেন, ততই এই দর্শকদের মধ্যে তার সম্পর্কে সম্ভ্রম তৈরি হচ্ছিল। প্রথম পরিচয়ে নিজেকে দর্শকদের কাছে তাদের পরিচিত নায়িকা হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করে প্রথম কর্মসূচিতেই তিনি নিজেকে আলাদা করে নেন। সিনেমায় তাকে একই নাচের রকমফেরে বারবার দেখে-দেখে, তার শরীরের নানা প্যাঁচঘোচ বারবার দেখে-দেখে যে-দর্শক তার যৌনতাকেই প্রধানত বা একমাত্র চিনে নিয়েছে, সেই দর্শক এই ভরতনাট্যম দেখে হতাশ হবে। ভরতনাট্যমটা বেশ খানিকক্ষণ ধরেই হয়। কিন্তু কোনো সময়ই একঘেয়ে হয় না–শ্রীদেবী এতই পরাক্রমে আলোময় স্টেজটাকে দখল করে রাখেন। সেই পরাক্রম দেখানোর সময় তিনি যেন প্রতিশোধের মত করে দর্শকের মধ্যে তার সম্পর্কে যা কিছু স্মৃতি আছে সব কিছুকে মুছে দেন-যে-শ্রীদেবীকে তোমরা দেখো আমি সে শ্রীদেবী নই।
কিন্তু শ্রীদেবী নাচতে নাচতে স্টেজের বাইরে চলে যান না। নাচটা তিনি স্টেজের ওপরই থামান। থামান, স্টেজের পেছন দিকে। তারপর, সেখান থেকে হাঁফাতে-হাফাতে হাঁটতে-হাঁটতে আসেন স্টেজের একেবারে সামনে। একটু দাঁড়িয়ে থাকেন। সবাই দেখে, যেমন অনেক ফিল্মেই দেখেছে, বড় চেনা শ্রীদেবীকে–ঘামছেন, বুক ওঠানামা করছে, ঠোঁটটা একটু ফাঁক, কপালে চূর্ণ চুল। ভরতনাট্যমের বাধা ভেঙে ফেলে দর্শকদের শ্রীদেবীসংক্রান্ত স্মৃতি হুহু করে ফিরিয়ে এনে নমস্কার করে শ্রীদেবী স্টেজ থেকে চলে যান।
.
এত-এত টাকার টিকিট কিনে এত কাছ ও দূর থেকে যারা শ্রীদেবীর নাচ বা শ্রীদেবীকেই দেখতে এসেছে, আর এত টাকা খাঁটিয়ে যারা শ্রীদেবীকে দেখানোর অনুষ্ঠান করছে তারা ত আর মাত্র কিছু সময়ের এই কার্যসূচিতে আসল শ্রীদেবী তাদের চেনা শ্রীদেবী থেকে কত আলাদা তা দেখতে বা দেখাতে চায় না–তারা ছবির শ্রীদেবীকে রক্তমাংসের হিশেবে মিলিয়ে নিতে চায়। সেই মিলিয়ে নেয়া কতটা সম্ভব তা জানা নেই, জানা নেই বলে ইচ্ছেটাই প্রবল। শ্রীদেবীরও নিশ্চয় এ হিশেবটা খুব ভাল জানা। তিনি যদি নিজেকে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে না পারেন তা হলে ছবির বাইরে এই লাখ-লাখ টাকার অনুষ্ঠানের অর্ডার তিনি পাবেন কেন? কিন্তু ছবির পর্দায় যা দেখানো যায় তা ত আর স্টেজে সকলের চোখের সামনে দেখানো যায় না। তারও কখন কোন নাচটি নাচবেন, তার হিশেব আছে। সেই হিশেব হল দর্শককে একটু চিনিয়ে দেয়া, আর একটু অচেনা রাখা। মাত্র এইটুকু সময়ের একটা অনুষ্ঠানে দর্শক তার নিজের মত করে বুঝে নেবে–ক্যামেরার লেন্স দিয়ে শ্রীদেবীর যতটা দেখা যায়, ফিরে-ফিরে দেখা যায়, নিজের দুটো চোখ দিয়ে ততটা দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু দর্শককে ত সেই লোভের জায়গা পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে যাতে তারা বোঝে ফিল্মের শ্রীদেবী আরো কত লোভনীয়। তাতে শ্রীদেবীর ফিল্মগুলো হিট। হবে, সুপার হিট হবে, সুপার-সুপার হিট হবে। ফিল্মের পর্দা থেকে মঞ্চে দেখার লোভ জাগানো, আর মঞ্চ থেকে ফিল্মের পর্দায় দেখার লোভ জাগানো–এর ভেতরেই শ্রীদেবীর নিজেকে দেখানোর হিশেব-নিকেশ কাজ করে।
ভরতনাট্যমের পর একটু বিরতি যায়, পর্দা অবিশ্যি পড়ে না। তারপরেই স্টেজের নিজস্ব মাইক্রোফোনে গান বেজে ওঠে, হাওয়া খাওয়া ই। বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই হাততালি, চিৎকার, দু-চারটে সিটি–মিস্টার ইন্ডিয়ার গান। দর্শকদের চোখের সামনে মিস্টার ইন্ডিয়া শ্রীদেবীর সেই দৃশ্যটি ভেসে ওঠে যাতে মনে হচ্ছিল শ্রীদেবী কাল একটা ব্রার ওপর দিয়ে গোলাপি একটা ওড়না ফেলে পর্দা জুড়ে ওড়াচ্ছিলেন। ছবির গানটিতে শ্রীদেবীর কথার পর বাচ্চারা কোরাসে উই উই উই উই উই আওয়াজ করে ওঠে। মাইক্রোফোনের গানটিতে সেই জায়গাটি আসতেই, তখনো শ্রীদেবী মঞ্চে ঢোকেন নি, দর্শকরা কোরাসে গেয়ে ওঠে, উই উই উই উই উই। আর, সঙ্গে সঙ্গে স্টেজের একেবারে সামনে দিয়ে শ্রীদেবী গোলাপি ওড়না উড়িয়ে নেচে যান-হাওয়া খাওয়া ই। আবার হাততালি, চিৎকার ও সিটি। সেটা শেষ হতে না-হতে শ্রীদেবীর স্টেজে দু-চক্কর ঘোরা হয়ে যায়। দর্শকরা একটু ঠাণ্ডা হয়ে যেন তাড়াতাড়ি দেখে নিতে চায় ফিল্মের মতই মঞ্চেও শ্রীদেবীর কাল ব্রাটা দেখা যাচ্ছে কিনা। কিন্তু নানা জায়গায় বসে নানা দর্শক একই ব্রা একই রকম ভাবে দেখবে কী করে? অথচ যে যার জায়গায় বসে ঐ ব্রাটুকুই খুঁজতে চায়–তার ওড়নার আড়াল থেকে কাল কাপড়ের সীমানায় তার গলাটুকু যে দেখা যায়। কিন্তু এ-নাচটি ত ছোটাছুটির নাচ। শ্রীদেবীর সারা স্টেজ জুড়েই ছুটছেন। ফিল্মে যেমন মনে হয়েছিল সেই হলঘর, বাগান সব কিছুর ওপর দিয়েই শ্রীদেবী উড়ে বেড়াচ্ছেন–হাওয়া খাওয়া-ই, আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চারাও সমবেত স্বরে উই-উই-উই করে উঠছে, এখানে তেমনি শ্রীদেবী পুরো মঞ্চটা জুড়ে ছুটছেন, উড়ছেন। মঞ্চের ওপরের অংশটাতে তার গোলাপি ওড়না উড়তে থাকে, উড়তে-উড়তে আবার তার কাছে চলে আসে। ফিল্মে শ্রীদেবীর ছোটাছুটিটাকে এত স্পর্শগ্রাহ্য মনে হয় নি, যদিও তার কাল ব্রাটি অনেক বেশি দৃশ্য ছিল। দর্শকরা সমবেত স্বরে বাচ্চাদের উই উই উই করে ওঠে আর শ্রীদেবী দর্শকদের দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে বাহবা দিয়েই পরের লাইনকটি নাচেন।
ঐ দ্রুততাতেই নাচটা শেষ করে দিয়ে শ্রীদেবী মঞ্চ থেকে চলে যাওয়া মাত্রই আবার হাততালি, চিৎকার, সিটি। দর্শকরা গরম হয়ে উঠছে। চিৎকার থামে না। নানা জায়গা থেকে আওয়াজ ওঠে, সোলভা সঁওন, নগিনা, মিস্টার ইন্ডিয়া। সে সব চিৎকার থামতে না-থামতেই স্টেজের মাইক্রোফোনে একটা গানের মুখ যন্ত্রে বেজে ওঠে। একটু হতচকিত বিশৃঙ্খলা হাততালি পড়তে-পড়তেই গানের মুখটার সঙ্গে-সঙ্গে ঘাঘরা পরা শ্রীদেবী মঞ্চে লাফিয়ে ঢুকে একটা চক্কর মেরে দেন–ঘাঘরা ফুলে ওঠে, শ্রীদেবীর গায়ের চুমকি বসানো জামা ঝলসায় আর ঘোমটা হিশেবে চুলের সঙ্গে ঝোলানো ওড়না বাতাসে ওড়ে। আউলাদ আউলাদ–চিৎকার করে দর্শকরা জানিয়ে দেন যে তারা চিনতে পেরেছেন। শ্রীদেবী একটা ছোট্ট লাফে দর্শকদের দিকে মুখ করে দাঁড়ান, বা পাটা এগিয়ে দেন, ঘাঘরাটা ঘের খায়, আর শ্রীদেবী বা হাতের তালুর ওপর ডান হাতের তালু রেখেই আবার একটা পাল্টা পাক খান। আউলাদ ফিল্মের প্রথম দিকে রাস্তায় নেচে-নেচে সওদাবেচার দৃশ্য আছে। মঞ্চে রাস্তা নেই, সওদা নেই কিন্তু শ্রীদেবীর পোশাকটা এবার অবিকল ফিল্মের মতই। চুমকি বসানো জামায় আলো ঠিকরে পড়ছে। শ্রীদেবী যখন স্টেজের উইঙ থেকে উইঙে যাচ্ছেন দর্শকদের দিকে নিজের শরীরের পার্শ্বরেখাঁটিকে ধরে রেখে আর মুখটা কখনো শরীরের রেখার সঙ্গে মিলিয়ে, কখনো মুখটাকে শরীর থেকে সমকোণে দর্শকদের দিকে ঘুরিয়ে, তখন, বুকের ওপর থেকে চুমকি চমকায়, সেই চমকে সেই বুকের দোলন বোঝা যায়। দর্শকরা প্রবল হাততালিতে ফেটে পড়ে। দর্শকদের হাততালি দেওয়ার ক্ষমতা শেষ করে দিতেই যেন শ্রীদেবী আবার বিপরীত উইঙ থেকে ঘুরে আসতে শুরু করেন। দর্শকরা যেন তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী দেখে নিতে পারে, যতটা ইচ্ছে ততটা! সেই হাঁটাটুকু শেষ হয়ে গেলেই শ্রীদেবী একলাফে পেছন থেকে এগিয়ে আসেন, তার পর দুটো পাক খেয়ে স্টেজের একেবারে সামনে এসে দর্শকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েন। তখন সেই ফেরিওয়ালির গানের দ্রুত লয়ের সঙ্গে তাল রেখে শ্রীদেবীর বুকদুটো দর্শকদের সামনে ওঠে, নামে। দর্শকরা যেন এতটা আশাই করে নি। তারা ভুলে যায়–ফিল্মটাতে এতটাই ছিল কিনা, এ যেন ফিল্ম থেকেও বেশি। শ্রীদেবী তার নমনীয় দীর্ঘ শরীরকে আনত করে গানের তালে-তালে তালি দিতে-দিতেই উইঙ দিয়ে বেরিয়ে যান। সঙ্গে সঙ্গে দর্শকদের বেশির ভাগই উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিতে দিতে প্রায় যেন নেচেই ওঠে। কেউ-কেউ চিৎকার করে শ্রীদেবীর গানটাই হাততালি দিয়ে দিয়ে গেয়ে ওঠে, কেউ-কেউ আবার সেই হাততালির সঙ্গে মিলিয়ে নেচে ওঠে। সেখানে নাচের সঙ্গে-সঙ্গে আবার হাততালি পড়তে থাকে। মনে হয়, অনুষ্ঠান যেন ভেঙেই গেল। কিন্তু এই সবই হতে থাকে প্যান্ডেলের ভেতরে, প্যান্ডেল থেকে কেউ বাইরে যায় না। রাজবংশী মেয়েদের ভেতর কেউ-কেউ খানিকটা বিহ্বল হয়ে দর্শকদের এই হাততালি, গান আর নাচ দেখতে থাকে। তাদের চোখেমুখে, ভয় যদি নাও হয়, একটু অনিশ্চয়তা দেখা যায় যেন। মঞ্চে আলোেগান, নাচ–এটা তারা বুঝতে পারে। কিন্তু দর্শকদের নাচ-গান বুঝতে পারে না। বরং চা বাগানের মদেশিয়া মেয়েরা দর্শকদের নাচ দেখে খিলখিল হেসে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়ে; তাদের মধ্যে কেউ-কেউ হাততালিও দিয়ে ফেলে।
এই অবকাশে পুলিশের লোকজন আর উদ্যোক্তারা মিলে প্যান্ডেলের একেবারে পেছনের টিনের বেড়াটা দ্রুত খুলতে শুরু করে। তাতে আওয়াজও হতে থাকে–টিন থেকে পেরেক খোলার আওয়াজ। দর্শকদের নাচগান তাতে থেমে যায়। দর্শকরা নিজের জায়গা থেকে নড়তেও চায় না অথচ এরকম অদ্ভুত আওয়াজের ব্যাপারটা জানতেও চায়। সামনের দুদিকে কোনাকুনি চেয়ারে জেলার সব অফিসারদের আর হর্তাকর্তা লোকদের বসে থাকতে দেখে দর্শকরা কিছুটা আশ্বস্তও হয়। এর মধ্যেই সবাই জেনে যায়–পেছনের বেড়াটা পুলিশ সাহেবের নির্দেশে খুলে দেয়া হচ্ছে! সেজন্যেই স্টেজও খালি।
টিকিট কেনা দর্শক ছাড়াও নতুন দর্শনার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে বাড়তে এমন একটা অবস্থা হয়েছে যে তাদের দেখার ব্যবস্থা করাটা অনিবার্য হয়ে ওঠে। ডি-এস-পি সাহেব উদ্যোক্তাদের বলেন–টিকিট বিক্রি করা চলবে না, কারণ প্যান্ডেলে একটুও জায়গা নেই। তখন ঠিক হয় অনুষ্ঠান মাঝামাঝি হয়ে গেলে পেছনের বেড়াটা খুলে দেয়া হবে। শ্রীদেবীর লোকজনকেও তাই জানানো হয়।
.
অঘোষিত ঐটুকু বিরতির পর শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান আবার শুরু হয়। আর চলতেও থাকে সেই খানিকটা ঠাণ্ডা খানিকটা গরম–এই ছন্দে। দুটো-একটা নাচগানের পর শ্রীদেবী তার সুপারহিট ফিল্ম নগিনার একটা গানের সঙ্গে স্টেজে কিছুটা হাঁটেন–ভুল যায়ে তুম এক কহানী। ফিল্মে এই জায়গাটিতে ভাঙা শিবমন্দিরের প্রাসাদের সিঁড়ি দিয়ে, অলিন্দ দিয়ে, মাঠ দিয়ে শ্রীদেবী কখনো পুঁতে রঙের, কখনো গোলাপি রঙের পোশাকে আপাদমস্তক নিজেকে ঢেকে, শুধু মুখটুকু বের করে রেখে গেয়ে-গেয়ে যান ঈষৎ বিলম্বিত লয়ে, ভুল যায়ে তুম এক কহানী। এ যেন জন্মান্তরের কাহিনী মনে পড়িয়ে দেয়া। ফিল্মে এই দৃশ্যে শ্রীদেবীর পাশে-পাশে ঋষিকাপুর ছুটে-ছুটে যান। আর শ্রীদেবী কখনো আধো ঘোমটা খুলে, কখনো বা না-খুলে, তাকে জন্মান্তরের কাহিনী শুনিয়ে যান। এখানে মঞ্চে শ্রীদেবী একা–শিবমন্দিরের অলিন্দ নেই, প্রাসাদ নেই, ঋষিকাপুরও নেই। কিন্তু শ্রীদেবী এমন ভাবে টেন আর হাঁটাটাই এমন নাচ হয়ে ওঠে, আধো ঘোমটা খোলেন বা খোলেন না যে দর্শকদের মনে হতে শুরু করে যে তারাই ঋষিকাপুর। এ গানটিতে সেই উল্লাস নেই, বরং যেন বিষণ্ণতা আছে।
এরকম আরো দুটো-একটা নাচগানের পর স্টেজের আলো কমে আসে। ফলে প্যান্ডেলটাতেও আবছায়া ছড়িয়ে পড়ে। দর্শকদের অনেকের জানাই আছে যে শ্রীদেবী, মোট কত ঘণ্টার অনুষ্ঠান করবেন, সব মিলিয়ে রাত নটা থেকে সাড়ে এগারটা, তার মানে আর বড় জোর দুটো-তিনটে নাচগান হবে। দর্শকরা এর মধ্যে হিশেব-নিকেশও একটা করে ফেলেছে যে অনুষ্ঠানটিতে যা তারা চেয়েছিল, তা পেয়েছে কি না। এখন যেন সেই প্রত্যাশাটা চরমের দিকে যাচ্ছে–আলো কমে আসায় ও সেই আধা-আলোর স্টেজ খালি ও নীরব থাকায় প্রত্যাশাটা এমনই পর্যায়ে ওঠে যে দর্শকরা কোনো কথা পর্যন্ত বলে না। হঠাৎ খুব চাপা স্বরে মাইকে অত্যন্ত দ্রুত লয়ে একটা বাজনা বেজে ওঠে। একটু পরে তার সঙ্গে আরো চাপা গলায়, যেন ফিসফিসিয়ে গাওয়া হচ্ছে–থাকা থাকা ট্রি-ই-ম, থাকা থাকা দ্রি-ই-ম। মাইকে কানে কানে কথা বলার মত করে এই আওয়াজটা ছড়িয়ে পড়ে। চাপা আলো, চাপা স্বর আর ঐ ছন্দিত দ্রুত লয়ে দর্শকদের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে যেন-থাকা থাকা ট্রি-ই-ম, থাকা থাকা দি-ই-ম। কেউ-কেউ হিসিয়ে ওঠে–হিম্মৎ ঔর মেহনৎ। শ্রীদেবী সেই আধো আলোর সঙ্গে মিশে মঞ্চে একটা বিড়ালীর মত উঁচু লাফে ঢোকেন। তার গলা থেকে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত টাইট একটা পোশাক রংটা ঐ ধোয়াটে আলোয় বোঝা যায় না। বিড়ালীর মত দুটো-একটা লাফ মেরেই শ্রীদেবী হাঁটুতে আর কোমরে বিপরীত মোচড় দিয়ে নিজেকে গানের তালে-তালে কাঁপাতে থাকেন।
আলো বাড়ে না, গানের আওয়াজটাও বাড়ে না। শ্রীদেবী মঞ্চের এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় যান এক-একটা লাফ দিয়ে। তারপর আবার সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে কোমরে মোচড় দিয়ে নিজের সারা শরীরকে কাঁপাতে থাকেন। স্টেজের একটু পেছন দিকেই এখনো তিনি লাফালাফি করেন। দর্শকরা খুব একটা স্পষ্ট দেখতেও পায় না। কিন্তু তার জন্যে কোনো আওয়াজ দিয়ে ওঠে না। যেন দর্শকরা জানেই–এটা তত স্পষ্ট দেখা যাবে না। জানে বলেই দর্শকদের ভেতর যতখানি দেখা সম্ভব ততখানি দেখে নেয়ার জন্যে একটা টানটান উত্তেজনা সঞ্চারিত হয়। আলো একটু হয়ত বাড়ে কিংবা হয়ত দর্শকরাই একটু বেশি দেখতে পায়–তখন দেখা যায় শ্রীদেবী স্টেজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, কোমরে সেই একই মোচড়, কিন্তু শরীরের সেই কম্পনের ফলে কখনো তার স্তন দুটি শরীর থেকে আলাদা হয়ে কাঁপছে–কিছুটা ছায়ায় স্তনের রেখা এত খোদাই হয়ে ওঠে যেন সে-স্তনের কোনো আবরণ নেই। আবার, কখনো থাকা-থাকা দ্রিইম-এর তালে-তালে শ্রীদেবীর নিতম্ব ছায়াতে খোদাই হয় ওঠে। সেই নিতম্বের কম্পনে মনে হয় ঐ শরীরে কোনো আবরণ নেই। অত বড় প্যান্ডেলে ঐ প্রায় লক্ষ লোকের মধ্যে নীরবে একটা চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, যেন, এইটির প্রত্যাশাতেই তারা এতক্ষণ ছিল। আলো একটু বাড়ে অথবা দর্শকরাই আরো একটু বেশি দেখতে পায়। শ্রীদেবী হাত দুটো মাথার ওপরে সোজা তুলে ফেলেন, তার শরীরের সব রেখা দর্শকদের চোখের সামনে খোদিত হয়ে যায়। তারপর দর্শকদের মুখোমুখি সেই শরীরটা যেন এক অনন্ত রমণের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই নিজেকে মোচড়ায়। শ্রীদেবীর কোমর থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সেই রমণে আবর্তিত হতে থাকে, আবর্তিত হতে থাকে। এর যেন আর শেষ নেই। মাইকের সেই চাপা স্বর শীৎকারের মত শোনায়–থাকা থাকা ট্রি-ই-ম, থাকা থাকা দি-ই-ম।
প্যান্ডেলের ঐ প্রায় লক্ষ মানুষ তখন পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে গিয়ে সমবেত এক বিচ্ছিন্ন নিষিদ্ধ সম্ভোগে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সকলে কেমন অধৈর্য হয়ে ওঠে–এই সম্ভোগের জন্যে আর-বেশি সময় হাতে নেই যেন। মাইকের চাপা শীৎকারে আর দ্রুত শ্বাসপতনের আওয়াজে এই দৃশ্যের নিষিদ্ধ ব্যক্তিগত যেন আরো সার্বজনীন হয়ে ওঠে। একটি বাচ্চা হঠাৎ চেঁচিয়ে কেঁদে ওঠে–সে এই চাপা আলো, চাপা স্বর, মঞ্চের আধা স্পষ্ট দৃশ্য আর তার চারপাশের চাপা উদ্বেগে ভয় পেয়ে গেছে। বাচ্চাটি একবারই মাত্র চিৎকার করে উঠতে পারে। তার মা তীব্র চাপা স্বরে হিসিয়ে ওঠে, চুপ যা চুপ যা কেনে। মায়ের হাতচাপা তার কান্না থেকে একটা নিশ্বাসের আকুলতা শুধু ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু তাতেই দর্শকদের অনড়তা ভেঙে যায়। কয়েকজন ছায়াচ্ছন্ন যুবক দূরে শ্রীদেবীর নাচের সঙ্গে মিলিয়ে প্যান্ডেলে রমণনৃত্যে মেতে ওঠে। থাকা থাকা ট্রি-ইম, থাকা থাকা ট্রি-ইম। আরো একদল যুবক আর-এক কোণে নাচ শুরু করে। তাতে কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটে না। হিম্মৎ ওঁর মেহন্নত ফিল্মে এই দৃশ্যে শ্রীদেবী নেচেছিলেন জিতেন্দ্রর সঙ্গে। এখন মঞ্চে তিনি একা নাচছেন। এই প্যান্ডেলের নানা কোণে অনেকে তাদের আসন ছেড়ে উঠে ঐ চাপা শীৎকারের তালে-তালে মঞ্চের শ্রীদেবীকে সঙ্গ দিতে চায়।
মাইকে রমণের কাল্পনিক ধ্বনিপুঞ্জ দ্রুত ছন্দে তখন আরো চাপা স্বরে বেরিয়ে আসছে—থাকা থাকা দ্রি-ইম, থাকা থাকা ট্রি-ইম। চাপা নিশ্বাস, দ্রুত নিশ্বাস, পশুধ্বনি। শ্রীদেবী মঞ্চের আরো সামনে চলে এসেছেন। এখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তিনি কোমর থেকে তার শরীরের ওপরের অংশটাকে আর্চের মত বঁকিয়ে দিয়েছেন–তাতে তার স্তন দুটির বাক তীব্র হয়ে ওঠে, আর কোমর থেকে নীচের অংশটি এগিয়ে দিয়েছেন–তাতে তার উরু দুটি শক্ত ও প্রখর দেখায়! সেই অবস্থাতেও তার শরীরে ঐ শীৎকারের প্রবল আন্দোলন। সে-আন্দোলনের মধ্যে কোনো বৈচিত্র্য নেই, কিন্তু সে-আন্দোলন যেন কখনোই থামবে না।
একটা দল প্যান্ডেলের একেবারে পেছন থেকে বেড়াটা খুলে দেয়ায় এখন ত রাস্তা পর্যন্ত প্যান্ডেল-বাঘারুকে মাঝখানে নিয়ে নাচতে নাচতে এগিয়ে আসে। গয়ানাথ আর আসিন্দির সপরিবার অনুষ্ঠান দেখতে এসেছে–কাজকর্মের জন্যে বাঘারুকে সঙ্গে আনা। বাঘারু অনুষ্ঠানের ভেতরে ঢোকে নি–সে রাস্তার ওপরেই ছিল কিন্তু যেন তাকে অনুষ্ঠানের ভেতরে টেনে আনার জন্যেই পেছনের বেড়াটা খুলে দিয়ে রাস্তাটাকেও প্যান্ডেলের ভেতর নিয়ে আসা। কিছু যুবক রাস্তার ওপর ও রাস্তার ঢালে বসেবসে গোপনে দ্রুত মদ খেতে-খেতে অনুষ্ঠান দেখছিল। এইবার তারা তাদের, জ্যাকেট ও জিনসসহ রাস্তার ওপর রাস্তার ঢালে জেগে ওঠে–থাকা থাকা ট্রি-ইম। তারা কোনো আওয়াজ করে না কিন্তু নিজেদের শরীরের দ্রুততম আবর্তনে নেচে ওঠে রাস্তায় ও রাস্তার ঢালে। বাঘারু সেই দলের মধ্যে পড়ে যায় কিংবা সেই দলটাই বাঘারুকে নিজের মধ্যে টেনে নেয়। অত দ্রুত অতটা মদ খাওয়ায় তাদের পা টলছিল বা রাস্তা ও রাস্তার ঢালে ঐ নাচ নাচছিল বলে তারা গড়িয়ে নীচে নেমে যায় দ্রুত-বাঘারুকে নিয়েই। নীচে যাওয়া মানেই প্যান্ডেলের ভেতরে ঢুকে পড়া। তখন ত প্যান্ডেলের ভেতরেও নানা জায়গায় নানা দল নাচছে, নীরবে নাচছে, মাইকের চাপা থেকে চাপা শীৎকারের সঙ্গে নাচছে। এই দলটি বাইরে থেকে নাচতেনাচতে সেই সব নাচের সঙ্গে মিশে যায়। মিশে যায় আর এগিয়ে যায় মঞ্চের দিকে। তাদের মাঝখানে আপাদমস্তক প্রায়নগ্ন বাঘারু।
বাঘারুকে নিয়ে দলটা প্যান্ডেলের প্রায় মাঝামাঝি চলে আসে। আরো অনেকে অনেক জায়গাতেই নাচছিল বলে এই দলটার এগিয়ে আসায় তেমন কোনো বিশৃঙ্খলাও দেখা যায় না, যেন এদের এতটা চলে আসার জন্যে জায়গা প্রস্তুতই ছিল।
কিন্তু বাঘারু কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। এই দলটা ত তাকে টেনে হিঁচড়ে নিজেদের মাঝখানে নিয়ে আসে নি। এমনকি দলটা যেন জানেও না বাঘারু তাদের মধ্যে আছে–এমনই তাদের মাতাল পা ফেলা। তারা কোনো চিৎকার চেঁচামেচিও করছে না। বাঘারু তার শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা খুঁটির মত আর সেই খুঁটি ঘিরে এই ছেলেরা ঘুরে-ঘুরে নেচে চলেছে।
বাঘারু দেখে, মঞ্চে তখন চিকুরের নাখান (বিদ্যুতের মত) আলো চলকাছে। আর সেই চিকুরের আলোত বেটিছোয়াখান (মেয়ে) শুই পড়িছে। শুই পড়ি উমরার শরীলখান আথাল-পাথাল করিবার ধইচছে। আথাল-পাথাল করিছে আর বেটিছোয়াখান ঘুরপাক খাছে। ঘুরপাক খাছে আর উমরার তলপেটখান মাটিথে উপরত উঠি আসিবার চাছে। থাকা-থাকা ট্রি-ইম, থাকা থাকা ট্রি-ইম। মাইকের চাপা শীৎকার দ্রুততায় এখন এমন চরমে উঠেছে যে বোঝা যায় স্বরটা যে-কোনো মুহূর্তে থেমে যেতে পারে। মঞ্চে শ্রীদেবী তখন শুয়ে-শুয়ে ঘুরপাক খাচ্ছেন। তার তলপেটের ওপর আলোর ঝিলিক–সেই তলপেট সঙ্গমের কাল্পনিক আশ্লেষে উঠছে-পড়ছে। যে-কোনো মুহূর্তে ঐ শরীর থেমে যেতে পারে। থেমে যেতে পারে, কিন্তু যাচ্ছে না। ঐ মাইকের শীৎকারও থেমে যেতে পারে। ফলে প্যান্ডেলের ভেতরের সেই রাজবংশী-মদেশিয়া-নেপালি ও বর্ণহিন্দু বাঙালি ভিড়ের কিছু অংশ উত্তেজনার চরম বিন্দুতে বসে বসে শক্ত হয়ে যাচ্ছে, আর-এক অংশ নাচকে উত্তাল করে দিচ্ছে।
বাঘারু ঐখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শ্রীদেবীকে দেখতে-দেখতে ভুলে যায় তাকে খুঁটির মত দাঁড় করিয়ে রেখে একদল ছেলে নাচছে–যেন ঐখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তার শ্রীদেবীর ঐ আক্ষেপ দেখারই কথা। বাঘারু ও-রকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাকে ঘিরে ছেলেদের নাচ ভেদ করে মঞ্চে শ্রীদেবীকেই যেন শুধু দেখে। দেখে, বেটিছোয়াখান ক্যানং তলপ্যাটখান উঠাছে-নামাছে, উঠাছে-নামাছে। এই ভঙ্গির একটা অর্থ যেন বাঘারুর আপাদমস্তক প্রায় নগ্ন রাজবংশী শরীরে ঢুকতে চায় কিন্তু মঞ্চের ঐ শরীরের ওপর আলোর খেলা, মাইকে আরো চাপা ও আরো দ্রুত শীৎকার আর চারপাশে নীরব শরীরমন্থন সেই অর্থটা তার শরীরে সঞ্চারিত হতে বাধা দিচ্ছে। তাই বাঘারু মেয়েটির শরীরের আর্তনাদ দেখতে-দেখতে কেমন বিমূঢ় বোধ করতে থাকে। সেই বিমূঢ়তায় সে তার শরীরের ভেতর যেন এমন-কি ঐ মঞ্চের আহ্বানও বোধ করে ফেলতে চায়। বাঘারুর ঐ শালপ্রাংশু রাজবংশী শরীরের নগ্নতার সঙ্গে মঞ্চে বম্বে ফিল্মের যৌন প্রতীক নায়িকা শ্রীদেবীর জ্যান্ত শরীরের একটা অর্থগত সংযোগ প্রতিষ্ঠা হওয়ার মুহূর্তে গানটা হঠাৎ থেমে যায়, অনেকক্ষণ আগেও যেমন থামতে পারত। শ্রীদেবী এতক্ষণে মঞ্চের ওপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, হেঁটে মঞ্চ থেকে চলে যান, মঞ্চের আলো জ্বলে ওঠে, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দর্শকরা উত্তেজনা মোচন করে অথচ বাঘারু যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। এখন মঞ্চের আলোতে ও প্যান্ডেলের বাইরে থেকে আসা আলোতে দেখা যায়-বাঘারু প্যান্ডেলে ঐ লক্ষ লোকের মাঝখানে তার উদোম শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে, পরনের নেংটিটুকু যেন থেকেও নেই। বাঘারুই যখন দৃশ্য হয়ে ওঠে, তখন অনেকে তাকে দেখেও দেখে না। কিন্তু দেখেও না দেখে থাকার সময়টা পেরিয়ে যায়–সকলে বসে আছে যেখানে সেখানে নিজের নগ্নতা নিয়ে বাঘারু এমনই বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। যে-কোনো মুহূর্তে পরের কর্মসূচি ঘোষিত হবে, তখন বাঘারু অবান্তর হয়ে যাবে–এই সময়টাও পার হয়ে যায়। তখন শ্রীদেবীহীন মঞ্চের শূন্যতাটাও যেন বাঘারুর এই নির্লজ্জ নগ্নতায় অপমানিত হতে শুরু করে। এই মাত্র যে-নাচটি শেষ হল, সেনাচে ত পুরো প্যান্ডেলটাই মঞ্চ হয়ে উঠেছিল। বাঘারুর ঐ নগ্নতা যেন তাই দর্শকদেরও অপমান। বাঘারু নিজের ঐ নগ্নতা নিয়ে মঞ্চের দিকে এমনই অনড়, যেন ঐ দাঁড়িয়ে থাকাটাই একটা বিদ্রোহ। শেষ পর্যন্ত যখন মনে হতে শুরু করে যে ঐ নির্লজ্জ রাজবংশী নগ্নতার জন্যেই মঞ্চটা এমন শূন্য পড়ে আছে, শ্রীদেবী ঢুকছেন না, যেন ঐ নগ্নতার সামনে শ্রীদেবীর পক্ষে মঞ্চে প্রবেশ সম্ভব নয়–তখন ডি-এস-পি সাহেব পেছন থেকে এসে বাঘারুর কাঁধে দূর থেকেই তার ব্যাটনটা ছুঁইয়ে বলেন, বসসা, বসো। কিন্তু বাঘারু সে-ইঙ্গিতও না বোঝয় ডি-এস-পি সাহেবকে অগত্যা হাত ধরে বাঘারুকে টেনে আনতে হয়, পেছনে। টুপি থেকে বুট পর্যন্ত পুরো ইউনিফর্মের ডি-এস-পি সাহেবের পাশে-পাশে হাঁটতে হাঁটতে ঐ চিড়ের ভেতর দিয়ে বাঘারু প্যান্ডেলের বাইরে চলে যায়।
মাইকে শোনা যায়, এইবার আজকের সন্ধ্যার শেষ অনুষ্ঠান পরিবেশন করবেন বম্বের প্রখ্যাত চিত্রতারকা শ্রীদেবী। তার সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের উত্তরখণ্ড সম্মিলনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও শেষ হবে। আগামীকাল সকালে জল্পেশ্বর শিবমন্দির অভিযান। আপনাদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ যে আপনারা এই শোভাযাত্রায় দলেদলে যোগ দিয়ে উত্তরবঙ্গের পবিত্রতম তীর্থ জমেশ্বর মন্দিরে যাবেন ও জলের শিবের পূজা দিবেন। আমাদের অনুরোধে শ্রীদেবী তার এই শেষ অনুষ্ঠানে নাগিনা সিনেমার শেষ দৃশ্যে তিনি শিবলিঙ্গের সামনে যে-নৃত্য পরিবেষন, করেছিলেন সেই নৃত্যটি পরিবেষন করবেন। পুলিশ কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করেছেন যে-ভাবে আপনারা প্যান্ডেলে ঢুকেছেন সেভাবেই লাইন করে অনুষ্ঠানের শেষে বাইরে যাবেন।
ঘোষণার সঙ্গে-সঙ্গেই মাইকে গান বেজে ওঠে, ম্যায় তেরি দুষমন, দুষমন তু মেরা। ম্যায় হ্যায় নাগিন, তু সাপেরা। গানের মুখটা দুবার হয়ে যাওয়ার পর শ্রীদেবী মঞ্চে ঢোকেন। এখন মঞ্চভর্তি আলো। শ্রীদেবীর পরনে ফিল্মের সেই সাপের খোলশের মত টাইট পোশাক নেই–একটা আলখাল্লা-মত পরা, তাতে খোপ-খোপ ঘর আঁকা। শ্রীদেবী ফিল্মের নাচটাও পুরো নাচেন না, বরং একটু ভজনের মত নাচতে থাকেন। মাঝে-মাঝে হাততালি দিয়ে ওঠেন। মাঝে-মাঝে দুলে-দুলে গান। এই গানটির সুরের ভেতরও সেই উপাদান ছিল। মঞ্চে কিছুক্ষণ এ রকম ঘোরাফেরা করার পর শ্রীদেবী সামনের দিকে মাঝামাঝি বসেই পড়েন–জোড়াসনে, তারপর মাথা দুলিয়ে গানের তালে-তালে শুধু হাততালিই দিয়ে যান। সেই সময়ই একটি মেয়ে মাথায় একটা থালা নিয়ে ঢোকে। শ্রীদেবীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে সে-থালাটা খুব ভক্তিভরে তার সামনে নামিয়ে রাখে। তখন দেখা যায়, থালাটির ওপর একটি বড় শিবলিঙ্গ, একটি সাপ শিবলিঙ্গের ওপর ফনা মেলে আছে। সম্ভবত টিন বা ও-রকম কিছু কেটে করা। নগিনা ফিল্মটিতেও শিবলিঙ্গ ছিল। মেয়েটি আবার প্রণাম করে উঠে যেতেই ধীর গম্ভীর একটি আওয়াজ ওঠে, জয় বাবা জল্পেশ্বর। দর্শকরা করজোড় কপালে তোলে। এর মধ্যেও গানটা হয়ে যেতে থাকে–ম্যায় তেরি দুষমন দুষমন তু মেরা। ম্যায় হ্যায় নাগিন তু, সাপেরা। সেই গানের তালে-তালে শিবলিঙ্গের সামনে শ্রীদেবী হাততালি দিয়ে যান, চোখ বুজে, মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে, যেন ঐ গানটি জল্পেশ্বরের ভজন–এরকম ভাবে দর্শকরাও চোখ বুজে হাততালি দিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু গানটার সঙ্গে তেমন কেউ গলা মেলাতে পারে না। গানের নিয়মে গান শেষ হয়। কিন্তু শ্রীদেবী মঞ্চ ছেড়ে যান না। তিনি শিবলিঙ্গের সামনে নত হয়ে প্রণাম করেন, তারপর উঠে দাঁড়ান। একটু কৃতজ্ঞ হাসি ঠোঁটে রেখে শ্রীদেবী দাঁড়িয়ে বায়ে, ডাইনে, সামনে, আবার বায়ে, আবার ডাইনে নমস্কার করেন। দর্শকরা তুমুল হাততালি দিয়ে ওঠে। শ্রীদেবী আবার ঘুরে-ঘুরে নমস্কার করেন। দর্শকরা আবার হাততালি দিতে-দিতে উঠে দাঁড়ায়। শ্রীদেবী এবার নত হয়ে শিবলিঙ্গটা মাথায় তুলে উইঙের দিকে হাঁটা দিতেই জয় বাবা জল্পেশ্বর ধ্বনিতে প্যান্ডেল ভরে যায়। শূন্য, আলোকিত মঞ্চের ওপর পর্দা নেমে আসে।
.
পরদিন শুক্রবার সকালে জল্পেশ অভিযানের জন্যে জনসমাবেশ শুরু হয়ে যায় সকাল সাতটা নাগাদ। বৃহস্পতিবার রাতে শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান শুনতে স্থানীয় যারা এসেছিল তাদের একটা অংশ এই দুটো কার্যসূচিই মাথায় রেখে এসেছিল, বা, এই দুটো কাৰ্যসূচির জন্যেই তাদের অনেককে আনা হয়েছিল। তারা অনুষ্ঠানের শেষে বাইরে এসে খাওয়া-দাওয়া সেরে আবার ঐ প্যান্ডেলে গিয়েই ঘুমিয়ে থাকে। সকালে উঠে এখন জমা হচ্ছে জল্পেশ অভিযানের জন্যে।
জল্পেশ অভিযানের জন্যে যারা থেকে গেছে তাদের প্রায় সবাই উত্তরখণ্ডের নেতাদের প্রভাবিত এলাকার লোকজন। উত্তরখণ্ডের নেতাদের প্রায় প্রত্যেকেই কিছু-কিছু জমি-জিরেতের মালিককারোকারো ত এক-এক অঞ্চলে জোতদার বলে প্রতিষ্ঠাই আছে। বিশেষত গয়ানাথ জোতদার ও তার জামাই আসিন্দির উত্তরখণ্ডে যোগ দেয়ায় সম্মিলনের ঠিক মুখেমুখে ডুয়ার্সে উত্তরখণ্ডীদের প্রতিপত্তি বেশ বেড়ে যায়। কিন্তু ফালাকাটা, আলিপুরদুয়ার, সাঁওতালপুর ব কোচবিহার পর্যন্ত নানা জায়গাতে উত্তরখণ্ডের বড় বড় নেতারা যতই থাকুন, সেখান থেকে ত তার জলেশ অভিযানের জন্যে বেশি লোক নিয়ে আসা সম্ভব নয়। নকশালবাড়ির সম্পৎ রায় ত বড় নেতা, কিন্তু জল্পেশ অভিযানের জন্যে নকশালবাড়ি থেকে সব মিলিয়ে জনা পঁচিশ-তিরিশের বেশি আসে নি। তাও আসত না–যদি কাল শ্রীদেবীর অনুষ্ঠান না থাকত।
এটা অবিশ্যি উত্তরখণ্ড নেতাদের খানিকটা জানাই ছিল। তাই তারা বিশেষ জোর দিয়েছিলেন ময়নাগুড়ি, বাকালি, পদমতী, জোড়পাকুড়ি, বানেশ এই সব জায়গা থেকে এই অভিযানের লোকসংগ্রহ করতে। সাংগঠনিক দিক থেকেও ময়নাগুড়িই উত্তরখণ্ড আন্দোলনের কেন্দ্র। ময়নাগুড়িকে কেন্দ্র করে লোকসংগ্রহ করা তাই সহজও।
প্রচারের সময়ও এই কথাই বেশি বলা হয়েছিল–শ্রীদেবীর নাচ দেখি প্যান্ডেলত থাকি যাবেন, জল্পেশ করি ঘরত ঘুরিবেন। কথাটা ধরেওছিল ভাল। এই পাশাপাশি এলাকার লোকজনের পক্ষে আজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাল দুপুরে ফিরে আসা বেশ লোভনীয়, বিশেষত, ময়নাগুড়িতে থাকার জন্যে প্যান্ডেলটা যখন পাওয়াই যাচ্ছে।
শুধু যে সুবিধে তাই নয়। যদি পরদিন জল্পেশ অভিযান নাও হত তা হলেও এরা সবাই ত আর রাত্রিতেই ফিরতে পারত না রাতটুকু তাদের ময়নাগুড়িতে কাটাতেই হত। জল্পেশ অভিযানের কর্মসূচি ঘোষিত থাকায়–প্যান্ডেলটাতে রাত কাটানো, তারপর দল বেঁধে জল্পেশে যাওয়া এটা ব্যবস্থার মধ্যেই চলে আসে। কে আর এখানে এমন আছে যে জল্পেশ যাওয়ার সুযোগ পেলে যাবে না।
উত্তরখণ্ডের নেতারা চেষ্টা করলে যে দূর-দূর জায়গা থেকেও কিছু-কিছু লোক আনতে পারতেন না, তা নয়। প্রথম দিকে তারা হয়ত সেরকম ভেবেও থাকবেন। কিন্তু গয়ানাথ জোতদার যোগ দেয়ার পর তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের দিন বিক্ষোভ মিছিল সংগঠনের দায়দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। জল্পেশ অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল-উত্তরবঙ্গের প্রাচীনতম ও পবিত্রতম তীর্থের নাম আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে উত্তরখণ্ডের দিকে সবাইকে টেনে আনা। সেই প্রচারের জন্যে শ্রীদেবীকেও আনা। যদিও শ্রীদেবীকে আনাটা ব্যবসার মত করেই হয়েছে কিন্তু উত্তরখণ্ড সম্মিলনের সঙ্গে যুক্ত করেই ত তাকে আনা। মাসখানেকের মাথায় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তিস্তা ব্যারেজ যখন উদ্বোধন করবেন, তখন নানা জায়গা থেকে ট্রাকে করে, বাসে করে মিছিল নিয়ে আসা হবে–এটা স্থির হয়ে যাওয়ার পর জল্পেশ অভিযানের জন্যেও বাইরে থেকে তোক নিয়ে আসার কথা আর-কেউ ভাবে না। মাত্র মাসখানেকের মধ্যে দু-দুটো মিছিল ত আর করা সম্ভব নয়।
সরকারি মিটিঙে উত্তরখণ্ডের পক্ষ থেকে যুক্তি হিশেবে যেটা বলা হয়েছিল, পুলিশ সেটা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করে। অর্থাৎ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ামাত্র বাইরের সমস্ত ট্রাক ও বাসকে ময়নাগুড়ি ছাড়তে হয়। তাদের রাখাই ত হয়েছিল এমনভাবে যাতে উত্তরখণ্ড সম্মিলমের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক তৈরি না হয়। শ্রীদেবীর নাচের জন্যে এসেছ, শ্রীদেবীর নাচ দেখে চলে যাও। রাত তিনটের মধ্যে ময়নাগুড়ি প্রায় খালি করে দেয়া হয়। উত্তরখণ্ড সম্মিলনের নেতারা আশা করেছিল যে আসাম ও বিহারের দিক থেকে যারা এসেছে, তাদের একটা অংশ এই সুযোগে জল্পেশ পুজো দেয়ার জন্যে জল্পেশ অভিযানে যোগ দিতে শ্রীদেবীর নাচের পর থেকে যাবে। থাকতও হয়ত। কিন্তু জল্পেশ অভিযানের প্রচারের সেরকম কোনো সুযোগ বৃহস্পতিবার উত্তরখণ্ড পেলই না।
সবটা যে পুলিশের দোষ তাও নয়। শ্রীদেবীর অনুষ্ঠানে হাজার-হাজার লোক আসবে–এটা জানা কথাই। কিন্তু কথাটা জানা এক ব্যাপার আর সেই হাজার-হাজার লোক দেখা আর-এক ব্যাপার। বৃহস্পতিবার সারাদিন ও সারা রাত ময়নাগুড়ির মত ছোট শহরের যে-অবস্থা তাতে উত্তরখণ্ডের নেতারাও পরস্পরের সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলতে পারে নি। বরং অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর, প্যান্ডেলের ভেতর ও বাইরে নেতারা নিজেদের মধ্যে কিছুটা কথা বলতে পেরেছে। তারা যদি প্যান্ডেলের ভেতরে বা রাস্তায় জল্পেশ্বর অভিযানের কথা বলতে চাইত তা হলে নিশ্চয়ই পুলিশ বাধা দিতে আসত না। আসলে, এই জনসমুদ্র দেখে নেতারাও এমন অভিভূত হয়ে পড়ে যে তারা আর-কোনো কথা মনে করতেই পারে নি।
জল্পেশে যাবার জন্যে যারা তৈরি ছিল তারা ভোর না-হতেই মিছিলের জায়গায় এসে জমা হয়ে গিয়েছিল। সাতটা নাগাদ মিছিল সাজানো শুরু হয়। তখন দেখা যায়, এর মধ্যে অনেকে আবার বাসে জল্পেশে গিয়ে সেখানে মিছিলে যোগ দেয়ার কথা ভাবছে। ময়নাগুড়ি থেকে জল্পেশ বাসে যাওয়ার কথা আগে ভাবাই যেত না, বাসও ছিল না। আজকালও বাস খুব বেশি নয়। কিন্তু একটা লাইনের বাস এই সকালেই ছাড়ে। আর, ময়নাগুড়িতে কালকের ফাংশন উপলক্ষে কিছু মিনিবাস এসে জুটেছিল, তারা দুটো-একটা সাটল ট্রিপের আশায় জল্পেশ-জল্পেশ বলে চেঁচাচ্ছিল।
একটা গেরুয়া ফেস্টুন মাটিতে পোতা ছিল–তাতে লেখা, নিখিল বঙ্গ উত্তরখণ্ড সমিতি। উত্তরখণ্ড দলের একটা বড় তেকোনা নিশান পোতা আছে–একটা বড় বাঁশের মাথায় পতাকাটা দুলছে। আরো কিছু ছোট-ছোট পতাকা আশেপাশে মাটিতে পোঁতা।
মনে হচ্ছিল, সবাই যেন কোনো কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছে। সেই আলগা-আলগা জোটের মধ্যে আগের রাতের অনুষ্ঠান নিয়েই কথা হচ্ছিল বেশি। এক জায়গায় একজন বেশ রেগেই ওঠে, আরে তোমরালা না-হয় সিনেমাখান দেখিছেন, মুই ত দেখো নাই, স্যালায় কি করি বুঝিম কোন ফিল্মের কোনখান গান আর কোনখান নাচ!
তোমার খেপিবার কী আছে ভাই! তোমরালা সিনেমা দেখে নাই ত দেখেন নাই, এ্যালায় নাচোখান দেখো।
কী দেখিম? মাটিত পড়ি গড়াগড়ি যাছে, য্যান্ দেও ধরিছে। তোময়ালা কহিছেন–আহা-হা, মুই ত বুঝিবারই পারো না।
যাকে বলা সে হো হো করে হেসে ওঠে, আরে, মাটি পড়ি একখান জোয়ান বেটিছোঁয়া ঐনং আলাংপালাং করিছেন কেনে, বুঝো না ত চুপ করি থাকো কেনে। বুঝিবার কী আছেন হে। দেখিবার জিনিশ দেখো কেনে। কী? দেখিবার কি খারাপ নাগিছে? হ্যাঁ। উত্তরখণ্ড পার্টির এ্যালায় এক্কেরে জয়জয়। কংগ্রেসের ঘর পারো নাই, কমুনিশের ঘর পারো নাই, এই উত্তরখণ্ডটা পারিছে–স্যালায় বম্বাইঠে শ্রীদেবীক এইঠে ময়নাগুড়িত আনিবার। উত্তরখণ্ড পার্টিটা শ্রীদেবীর পার্টি হয়্যা গেইছে। লোকটি হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে শ্রীদেবীর পার্টি জিন্দাবাদ।
কেউ সাড়া দেয় না–সাড়া দেয়ার জন্যে কেউ তৈরি ছিল না বলে। কিন্তু সেই অপ্রস্তুতির কারণেই সবাই হেসে ওঠে, হাততালি দেয়, যেন লোকটি আর-একবার চিৎকার করলে সবাই সাড়া দিত।
.
একটু পরেই দূর থেকে একটা আওয়াজ ভেসে আসে, সবাই উঠে দাঁড়িয়ে তাকায় আওয়াজটা কোত্থেকে আসছে দেখতে। কয়েকটা মোটর সাইকেল ও সাইকেল নিয়ে সুস্থির এগিয়ে আসছে–উত্তরখণ্ড পার্টি জিন্দাবাদ।
সুস্থিরের দলটা এসে পড়া মাত্রই সাজো-সাজো পড়ে যায়। সুস্থিরে দলে গোটা পঞ্চাশেক সাইকেল, মোটর সাইকেল খানদশেক-মোপেড-স্কুটারসহ। দলটা এসে রাস্তার ওপর দিয়ে চলে গিয়ে সেই ফেস্টুনটা পেরিয়ে থামে, কিন্তু স্টার্ট বন্ধ করে না, থামেও না। একটা মোপেডের পেছন থেকে সুস্থির নেমে চিৎকার করতে করতে আসে, মিছিল সাজান, মিছিল সাজান।
সুস্থির বড় ফ্ল্যাগটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে দাঁড়ায়, আসেন আসেন, কায়ো জোয়ান মানষি আসি ধরেন ঝাণ্ডাখান। পঞ্চাননবাবু আর গয়ানাথ জোতদার এসে সুস্থিরের পাশে দাঁড়ান। সুস্থির চেঁচিয়ে ওঠে, হে ই নবীন, ফেস্টুনখান ধরি খাড়া কেনে, মিছিল সাজো, মিছিল সাজো।
নবীন আর তিলক ফেস্টুনটা মাটি থেকে তুলে এনে রাস্তার ওপর আড়াআড়ি দাঁড়ায়। সুস্থির চিৎকার করে, আরে, তোমরালা ধরিলেন কেনে, দুইখান বেটিছোঁয়াক ধরি দেন, এই, দুইখান বেটিছোঁয়াক ডাকেন কেনে। পঞ্চাননবাবু এগিয়ে যান। সুস্থির এবার গয়ানাথকে বলে, আরে একখান জোয়ান মানষিক আসিবার কহেন না, ঝাণ্ডাখান ধরিবে।
গয়ানাথ তাড়াতাড়ি মিছিলের জন্যে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের দিকে গিয়ে চিৎকার করতে থাকে, হে-এ বাঘারু, বাঘারু হে-এ। কিন্তু বাঘারুকে কাছাকাছি কোথাও দেখা যায় না। গয়ানাথকে তখন আরো খানিকটা যেতে হয়, হে-এ বাঘারু, বাঘারু হে-এ।
এখানে বেশির ভাগই এদিককার লোকজন। তারাও গয়ানাথকে চেনে না, নাম হয়ত জানে আর গয়ানাথও এদের মুখ চেনে না। ফলে, গয়ানাথের ডাক শুনেও কেউ বাঘারুকে খুঁজে দিতে এগতে পারে না। গয়ানাথকেই রাস্তাটা ধরে হে-এ বাঘারু, বাঘারু হে-এ ডাকতে-ডাকতে এগিয়ে আবিষ্কার করতে হয় যে বাঘারু সব জায়গাতেই যেমন একা দাঁড়িয়ে থাকে, এখানেও তেমনি বলদের নাখান দাঁড়িয়ে আছে। গয়ানাথের ডাক সে শুনতে পায় না, বা, শুনলেও বুঝতে পারে না তাকে ডাকা হচ্ছে। গতকাল গয়ানাথের বাড়ির লোকজনকে নিয়ে এখানে আসার পর থেকেই বাঘারু খানিকটা অলসভাবে ঘোরাঘুরি করছে। এখানে তার ত কোথাও নির্দিষ্ট কোনো কাজ নেই। তাই সে স্রোতে ফেলে দেয়া কাঠের মত যেখানে-সেখানে পড়ে থাকছে।
বাঘারুকে দেখে গয়ানাথ একটু দূরেই দাঁড়িয়ে পড়ে অভ্যেসে। বাঘারু তার চাইতে এত লম্বা যে সামনে গেলে গয়ানাথকে ঘাড় বেঁকিয়ে কথা বলতে হয়।
হে–এ বাঘারু, এইঠে খাড়ি-খাড়ি কী করিবার ধইচছিস? বাঘারু চমকে তাকাতেই বলে, চলি আয় হিপাখে, গয়ানাথ এবার একেবারে দ্রুত পা ফেলে মিছিলের মাথার দিকে এগিয়ে যায় আর গয়ানাথের ডাকে চমকে বাঘারু গয়ানাথের পেছনে-পেছনে হাঁটতে শুরু করে।
এতক্ষণে মিছিলের মাথায় সুস্থিরের মোটর সাইকেল বাহিনী রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে একটু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। সামনে দুইটি ফোতাপরা মেয়ে ফেস্টুনটা ধরে আছে–সেই দুজনের পেছনে-পেছনে সবাইকে লাইন করে দাঁড় করাচ্ছে নবীন আর তিলক। মেয়েরা প্রথমে, ছেলেরা তার পরে।
সুস্থির বড় ঝাণ্ডাটি তুলে, মাটিতে দাঁড় করিয়ে ডান হাতে ধরে রেখেছিল। তার সামনে গিয়ে গয়ানাথ আঙুল দিয়ে বাঘারুকে দেখিয়ে বলে, ইমরাক নিশানখান দেন। সুস্থির তখন ডাইনে ঘাড় ঘুরিয়ে কথা বলছিল। গয়ানাথের কথা শুনতে পায় না। গয়ানাথকে দাঁড়াতে হয় সুস্থিরের কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত। সুস্থির ঘাড় সোজা করলে বলে, ইমরাক দিয়া দেন নিশানখান।
.
হ্যাঁ? বলে সুস্থির বাঘারুর নেংটিপরা বিশাল চেহারাটা দেখে। দেখবার জন্যে তাকে বাঘারুর মাথা থেকে পা আর পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বোলাতে হয়। সে রকম দেখার পরও সুস্থির ঝাণ্ডাটা দেয়, যেন কিছু ভাবে। বাঘারুর এমন লম্বা পেশল নগ্ন চেহারা রাজবংশী সমাজে এত দুর্লভ নয় যে সুস্থিরকে এমন দেখে যেতে হবে। এই রাজবংশী মিছিলটা রাজবংশী সমাজে এখন নতুন। রাজবংশী বলেই এই মিছিলটাতে এরা এসেছে এবং এখানে এসে এমন কিছু শ্লোগান দেবে যা অন্য মিছিলে দেয়া যায় না। সুতরাং রাজবংশী সমাজের এমন নিজস্ব মিছিলটাকেও সুস্থির সাজাতে চায় শহরের অন্যান্য পার্টির বড় বড় মিছিলের মত করে। অন্যান্য পার্টির মত মিছিল সাজাতে পারলেই উত্তরখণ্ড একটা পার্টি হয়ে উঠতে পারবে যেন। অন্য কোনো পার্টি কি এই রকম মিছিলে বাঘারুর সাইজের নেংটিপরা একটা লোককে মিছিলের শুরুতে প্রধান ঝাণ্ডা দিয়ে দাঁড় করাত? বাঘারু নেংটিপরা বলে সুস্থিরের কিছু মনেই হয় নি। বাঘারুর এত বড় শরীরটা দেখেও সুস্থিরের কিছু মনে হয় না। কিন্তু মিছিলের শুরুতে বাঘারুকে কতটা মানাবে এটা নিয়ে আরো যেন একটা গোপন বিচার করতে হয়। যদি উত্তরখণ্ড পার্টির এরকম মিছিল করা অভ্যেস থাকত তাহলে সুস্থির ভাবত না। কিন্তু সেই অভ্যেসটা এই মিছিলগুলি থেকে তৈরি হবে বলেই সুস্থিরের ভাবনা। সুস্থির যতক্ষণ ভাবে, তার মধ্যে মিছিলটা বেশ তাড়াতাড়ি সাজানো হয়ে যায়। সবাই যখন বোঝে কী ভাবে দাঁড়াতে হবে, তখন সবাই নিজের মত করে দাঁড়িয়ে যায়।
গয়ানাথ বলে, নিশানখান ইমরাক দেন কেনে, এ ধবিবার পারিবে। সুস্থির বাশটা বাঘারুর দিকে এগিয়ে দেয়। বাঘারু ধরে না। সুস্থির বলে, ধরেন কেনে। বাঘারু যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে থেকেই বাশটা ডান হাতে ধরে। সে ঘাড় তুলে দেখেও না সেই বাঁশের মাথায় কোন ঝাণ্ডা ঝুলছে।
বাঘারুকে বাঁশটা ধরিয়ে সুহির নেতাদের ডাকতে শুরু করে, এই কাকা, কাকা, অমনী কাকা, এইঠে আসেন। সুস্থিরকে গিয়ে হাত ধরে নেতাদের টেনে-টেনে এনে সেই ফেস্টুনের সামনে দাঁড় করাতে হয়। নেতারাও লাইন দিয়ে দাঁড়ান। তখন মিছিলের একটা চেহারা এসে যায়। সামনে মোটর সাইকেল বাহিনী। তার পর নেতারা। তারপর ফেস্টুন। তারপর মেয়েরা। তারপর পুরুষরা। সুস্থির যেন এখানো ঠিক করতে পারে না, ঐ অত উঁচু বাঁশের মাথায় নিশানটা কোথায় থাকবে, নিশানটা বাঘারুর হাতেই থাকবে কিনা, যদি থাকেই তা হলেই বা বাঘারু কোথায় দাঁড়াবে। সুস্থির চিৎকার করে বলে, মোটর সাইকেল সগায় খানিকখন আস্তে-আস্তে চলিবে। তার বাদে-সাইকেল মিছিলখান আগত চলি যাবে শ্লোগান তুলি-তুলি আর হাঁটা মিছিলখান পাছত-পাছত যাবা ধরিবে। জল্পেশত হামরালা শপথ নিম আর তিস্তাবুড়ির একখান পূজা করিম। থেমে সুস্থির মিছিলটা একবার দেখে ও কিছুটা অন্যমনস্ক ভাবেই বাঘারুকে হাত ধরে টেনে মিছিলের সামনে, নেতাদেরও সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। নিশানটির ত ঐখানেই থাকার কথা, মিছিলের মাথায়। মোটর সাইকেলগুলো চলে গেলে বাঘারুই থাকবে এই এত বড় ঝাণ্ডা হাতে মিছিলের শুরুতে, তারপর নেতারা, তারপর ফেস্টুন, তারপর মেয়েরা, তারপর পুরুষরা।
সুস্থির আওয়াজ তোলে–উত্তরখণ্ড পার্টি জিন্দাবাদ। কোন শ্লোগানের কী উত্তর হবে সেটা যারা, জানে তারা মিছিলের নানা জায়গায় ছড়িয়ে আছে বলে মিছিল থেকে শ্লোগানটা তত জোরে ওঠে না। কিন্তু সাইকেল আর মোটর সাইকেলের লোকজন শ্লোগান খুব ভাল জানে। তারা চিৎকারে-চিৎকারে শ্লোগানগুলো জমিয়ে দেয়। কামতাপুর রাজ্য, কায়েম করো, কায়েম করো। উত্তরখণ্ড দিচ্ছে ডাক, ভোটের বাক্স খালি যাক। কৃষকের জমি কাড়ি তিস্তা ব্যারেজ চলিবে না। তিস্তা ব্যারেজের মিছিলে, যোগ দিন, যোগ দিন।
.
ময়নাগুড়ি ছাড়াতে না-ছাড়াতেই মিছিলটা তিন টুকরো হয়ে যায়। শ্লোগান দিতে-দিতে মোটর সাইকেলওয়ালারা আগে-আগে ছুটে যায়। সাইকেলওয়ালারা প্রাণপণে সাইকেল চালিয়ে মোটর সাইকেলওয়ালাদের সঙ্গে থাকতে চায়। কিন্তু তাদের সবার পক্ষে অত জোরে সাইকেল চালানো সম্ভব হয় না। ফলে তারা মোটর সাইকেল আর পায়ে হাঁটা মিছিলের মধ্যে ভাঙা সাঁকোর মত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকার অনেক জায়গায় বর্ষার শুরুতে এরকম ভাঙা সঁকো দেখা যায়। কনট্রাক্টারদের ভাষায় যাকে বলে ফেয়ার ওয়েদার ব্রিজ, বর্ষার প্রথম চোটেই তা ভেঙে নদীর বুক জুড়ে এরকমই ছড়িয়ে থাকে।
কিন্তু ময়নাগুড়ির বাইরে জল্পেশের দিকের এখনকার পাকা রাস্তায় মিছিলটাকে অতটা টুকরো-টুকরো দেখায়ও না যেন। রাস্তার দুপাশে খেতবাড়ি, মাঠ, চাষের কাজ একটু-আধটু শুরু হয়েছে, কিন্তু বেশির ভাগ জমিই ফাঁকা। রাস্তাটা একেবেঁকে যেভাবে গেছে তাতে বহুদূর পর্যন্ত ফাঁকা রাস্তাটা একসঙ্গে দেখা যায়। যদি বা কোথাও কোনো টাড়ির বাড়িঘরে বা গাছপালায় রাস্তাটা আড়ালে পড়ে তা হলেও, সেটুকু বাদ দিয়ে তার পরের অংশটা দেখা যায়। এই এত দীর্ঘ, প্রায় পুরো রাস্তাটা একবারে দেখা যায় এই মিছিলের গোটাটাসহই। এতবড় রাস্তাটা একসঙ্গে যে দেখা যাচ্ছে তাতেই মিছিলের টুকরোগুলো জোড়া লেগে যায় কারণ রাস্তায় আর-কোনো গাড়ি নেই, আর-কোনো লোকও নেই। এতগুলো মোটর সাইকেলের আওয়াজে কোথাও-কোথাও কিছু-কিছু লোক বেরিয়ে আসে কিন্তু তারা রাস্তায় ওঠে না। নানা পাড়ার কুকুরগুলো মোটরসাইকেলের আওয়াজে সেই আওয়াজ ছাপিয়ে চিৎকার করতে করতে ছোটে তাদের স্বনির্ধারিত সীমানা পর্যন্ত। কিন্তু তারপর নতুন এলাকার কুকুর চেঁচাতে শুরু করে। পুরনো এলাকার কুকুর তখন ফিরে আসতে-আসতে সাইকেলওয়ালাদের দিকেই ঘাড় উঁচু করে চেঁচায়। কিন্তু সাইকেলওয়ালারা এতটা রাস্তা জুড়ে এতটাই ছড়ানো যে কুকুরগুলো ঘাড় নিচু করে ফেলে দাঁড়িয়ে পড়ে, মূল মিছিলটা পৌঁছুবার আগেই পাড়ায় ফিরে যায়।
মূল মিছিলটা কিন্তু ভাঙে না। ঠিক যেভাবে ময়নাগুড়ি থেকে বেরিয়ে জল্পেশের রাস্তায় উঠেছে, সেভাবেই জল্পেশের রাস্তা ধরে এগিয়ে যায়। মিছিলের হাঁটার যেন একটাই ছন্দ তৈরি হয়ে যায়। সে-ছন্দটা কেউ ভাঙে না। এরকম ছন্দ অবিশ্যি দূরের রাস্তার মানুষদের ভেতর তৈরি হয়ে যায় রাস্তার নিয়মে বা হাঁটার নিয়মে। হাট বা মেলায় যাওয়ার সময় বা হাট বা মেলা থেকে ফেরার সময় বড় আলপথে মানুষের চলার এই ছন্দ দেখা যায় প্রত্যেকেই নিজের মত করে হাঁটছে কিন্তু মনে হয় সবই মিলে হাঁটছে। ময়নাগুড়ি থেকে জল্পেশের এই রাস্তাটাও প্রায় বড় একটা আলের মতই। এই রাস্তাটা বাধানো-আলের সঙ্গে এইটুকু তফাত। কিন্তু আলের ওপর দিয়ে যেমন গাড়িঘোড় গিয়ে মানুষের চলমান সারিকে ভাঙতে পারে না, এই রাস্তাতেও কোনো গাড়ি ত আর মিছিলের ভেতর দিয়ে যায় না। অনেক মানুষ অনেক দূরের পথ একসঙ্গে বাধাহীন পার হতে পারলে এরকম মিছিলেরই মত দেখায়।
এই রাস্তাটাতে মিছিলটা কীরকম মানিয়েও যায়।
পুরো রাস্তাটা না-হলেও তার অনেকখানিই যে দেখা যায় তাতেই এই এতগুলো মানুষের একসঙ্গে হেঁটে আসার যেন একটা মানে আসে। এরা কতটা দূরত্ব হবে তা সকলে দেখতে পায়। যে-বেটিছোঁয়া-দুজন ফেস্টুন ধরেছিল তারা ফেস্টুনটা টান-টান রাখতে পারে না। কিছুক্ষণ পরই তাদের হাত পরস্পরের দিকে নেতিয়ে যায়। কেউ কিছু না বলায় হাত দুটো আরো নেতিয়ে পড়ে। ফেস্টুনের কাপড়টা পেছনের দুই সারির মাঝখানে প্রায় গড়িয়েই পড়ে কিন্তু বাতাসের জন্যে পুরো গড়িয়ে যায় না। ফেস্টুনটা ওভাবেই চলে। তাতেও একটা দৃশ্য তৈরি হয়। ফেস্টুনটা যদি ঝাণ্ডার মত একজনের হাতে থাকত তাহলে এতটা বাতাসে সেটা সেই একজনের হাত থেকে পুরো মিছিলের মাথার হাতখানেক উঁচুতে স্রোতের মত উড়ত।
বাঘারুর হাতেই ঝাণ্ডাটা শুরুতে যেমন, শেষেও তেমন। ঐ লম্বা বাঁশের মাথায় তেকোনা ঝাণ্ডা আর বাঘারু বাঁশের গোড়াটা ধরে আছে দুই হাতে, কাঁধের ঠেকনো দিয়ে। যেরকম বাতাস, এমন খোলা মাঠে এমনই বাতাস ওঠে অবিশ্যি, তাতে বাঘারুর চাইতে কম জোরালো কেউ ঝাণ্ডাটা এমনি সোজা রেখে ময়নাগুড়ি থেকে জল্পেশ নিয়ে আসতে পারত না। এই মিছিলটার কাজ ত হেঁটে-হেঁটে জল্পেশ পৌঁছানো। এক বাঘারুরই কাজ এই বাঁশটাকে এত বাতাসের মুখে খাড়া রাখা। ফলে মিছিলের মাথায় তার নেংটিপরা শরীরটা এমনই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে যে সেই সূত্রে বাকি মিছিলটা অর্থ পায়। বাঘারুর শরীরের এই অর্থটা বুঝে ওঠা, অন্তত দেখে ওঠাও, সুস্থিরের হয় না, কারণ, সুস্থির মোটর সাইকেলে আগে জল্পেশে চলে গেছে–শপথ গ্রহণ ও তিস্তাবুড়ির পূজা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাদির জন্যে। মিছিলটা বাঘারুর শরীর থেকেই বেরচ্ছিল। বাঘারুর পেছনে আর ফেস্টুনের সামনে ছিলেন পঞ্চানন মল্লিক, বীরেন বসুনিয়া, গয়ানাথ জোতদার, দেবমোহনবাবু, নবীন, তিলক, ধৈৰ্যমোহনবাবু, সম্পৎ রায়। এরা ছাড়াও আরো জনা ছয়-সাত। এদের সঙ্গে মিছিলের বাকি অংশের তফাতটা পোশাকেই ধরা পড়ছিল। জামা-পরা বা জুতা-পরা আরো অনেক ছিল বটে কিন্তু যাদের জামা আছে তাদের অনেকেরই ধুতি নেই, যাদের ধুতি আছে তাদের অনেকেরই জামা নেই। ময়নাগুড়ি ছাড়িয়ে এই রাস্তায় পড়তেই মিছিলটার পোশাক অনুযায়ী এই দুই ভাগ ধরা পড়ে যায়।
বাঘারুটা মিছিলের মাথায় থাকে বলে ও তার পেছনে-পেছনে এমন-কি এই জোতদার-দেউনিয়া। লোকজনও যাচ্ছে বলে মিছিলটাকে যেন রীতিনীতি মেনে চলা একটা পুজোটুজোর মতই ঠেকে। নইলে বাঘারু অতটা আগে থাকে কী করে? বাঁশের ওজনটা আন্দাজ করলে এর একটা সহজ জবাব পাওয়া যায় বটে, কিন্তু ঐ অত জন জোতদার আর দেউনিয়া যেরকম পায়ে-পায়ে বাঘারুর নেতৃত্ব মেনে নেয় তাতে ঐ সঙ্গে জবাবটাও জটিল হয়ে যায়। কোনো-কোনো পূজা যেমন শুধুই মেয়েদের–মেচেনি খেলা বা হুমার নাচ, কোনো-কোনো পূজা যেমন শুধু চ্যাংড়াদের-দোলখেলার দ্বিতীয় দিন কাদাখেলা, তেমনি যেন এই মিছিলের আচারই এই যে বাঘারুর তার বাহু, কব্জি, বুকপিঠের পেশিগুলোকে এই রকম স্পষ্ট করে এই ঝাণ্ডা বইবে আর তার পেছনে-পেছনে এই বড় বড় মানষির ঘর চলে।
বাঘারু ত কোনদিন মিছিলে চলে নি। কিন্তু তাকে ডেকে এনে তার গিরি জোতদার এই বাশটা তার হাতে ধরিয়ে দিতেই সে মিছিলের লোক হয়ে যায়। এখন দুপাশে এই নাড়া খেতের মাঝখান দিয়ে পড়ে থাকা এই রাস্তাটায় বাঘারু মিছিলের পরিচালক। পরিচালনার জন্যে তার কোনো বিশেষ ভূমিকা নেই–যদি না এই ঝাণ্ডা ধরে রাখাঁটি বিশেষ ভূমিকা হয়। কিন্তু এই মিছিলের পরিচালক হওয়ার জন্যে তার কোনো বিশেষ ভূমিকার তত প্রয়োজনও ছিল না–প্রয়োজন ছিল, যারা তার পেছন-পেছন আসছে তাদের বিশেষ বিশেষ ভূমিকা। বাঘারুর ঠিক পেছন-পেছন যারা আসছে তারা ঠিক করেছে বলেই বাঘারু তাদের সামনে হাঁটছে, বাঘারু এই মিছিলের পরিচালকই হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাদের মধ্যে, একজনও যদি ইচ্ছে করে তাহলে যে-কোনো মুহূর্তে সে বা তারা বাঘারুর আগে এসে দাঁড়াতে পারে। সেই এগিয়ে দাঁড়ানোর জন্যে তাদের এক পাও নড়তে হবে না। বাঘারুকে পেছনে চলে যেতে বললেই তারা সামনে পড়ে যাবে।
কিন্তু তা ত এখন আর বলা যায় না। এখন এই মিছিল যে-অর্থে নিজেকে অর্থবান করে তুলতে চায় তার সঙ্গে বাঘারুর এই সবার আগে থাকাটা মিশে গেছে। সেই মিশ্রণটা এই মিছিলের পক্ষে খুব দরকারি। সেই মিশ্রণটাকে এখন আর নষ্ট করা যায় না। তাই, বাঘারু না-জেনেও এই মিছিলের প্রতীক হয়ে ওঠে, প্রতিনিধি হয়ে ওঠে। জল্পেশ পর্যন্ত দূরত্বটুকু সেই প্রতীক ও প্রতিনিধিকে রক্ষা করতে হয়।
বাঘারুর হাঁটার মধ্যে কোনো নতুনত্ব ছিল না। তাকে যে এরকম মিছিলে জীবনে কখনো হাঁটতে হয় নি; মিছিলের একেবারে মাথায় হাঁটা ত দূরের কথা, তা তার হাঁটার স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বোঝা যায় না। একটু অসুবিধে তার হয় না, তা নয়। পিচ রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটা ত তার অভ্যেস নেই, ফলে পায়ের তলায় লাগছিল। মাইল-মাইল বিস্তার যে এক-একদিনে পায়ে হাঁটে তার পায়ের তলায় ঐ কাকর, ছোটখাট পাথর, ফুটে যাচ্ছিল। কিন্তু বাঘারুকে বাঁচিয়ে দেয় ঐ নিশানের বাশটাই। শুধু তার নিজের শরীরটার ভার বইতে হত যদি বাঘারুকে এখানে এই আলের মত ফাঁকা পিচ রাস্তায়, তা হলে অনেক বেশি পাথর ফুটত তার পায়ে। একে অনভ্যস্ত বাধানো রাস্তা, তায় অনভ্যস্ত ভারহীনতা। বাঁশের ভারটা থাকায় ও এত লম্বা বাশটাকে সোজা রাখতে বলপ্রয়োগ করতে হয় বলে, বাঘারু কিছুক্ষণের মধ্যেই এই পথটাকে অভ্যস্ত ভঙ্গিতে দলতে পারে, এই নিশানও অভ্যস্ত ভঙ্গিতে ওড়াতে পারে। তার মানে, এমন মিছিলের নেতৃত্ব দেয়ার অভূতপূর্ব ব্যাপারটাকেও বাঘারু তার অভ্যাসের মধ্যে নিয়ে নিতে পারে। তার পেছনে যে তারই জোতদার, আর অনেক জোতদারের সঙ্গে তাকে অনুসরণ করে আসছে–এটা তার মগজেই ঢোকে না।
বাঘারুকে নেতা সাজিয়ে যে-নেতারা তাকে অনুসরণের ভঙ্গিতে হাটছিল তারাও কেউ হাঁটায় কম যায় না। তাদের প্রায় প্রত্যেককেই মাইল-মাইল হাঁটতে হয় রোজ। তাদেরও বরং অসুবিধে এই পিচের রাস্তা বলেই। তাদের সবারই পায়ে এখন জুতোক্যামবিসের, রবারের, চায়নিজ। একটু কমবয়েসিদের পায়ে স্যান্ডেলও আছে। তাই কাকর লাগে না। কিন্তু তারা মাঠ দিয়ে, আল দিয়ে মাইল-মাইল হাটে যখন, তখন মাটিতে পা ফেললে বোঝা যায় মাটিতে পা ফেলছে। মাটিটা একটু দেবে যায়, বা বালিটা একটু সরে যায়, বা ঘাসগুলো নুয়ে পড়ে। কিন্তু এই পিচের রাস্তায় পা ফেললে পা-টা সেরকম কোনো সাড়া পায় না। নিজের পায়ের আন্দাজে বোঝা যায় না–তারা হাঁটছে। ……
তবু ত হাটছেই। হাঁটছে বাঘারুর পেছনে-পেছনে, বা বাঘারুবাহিত নিশানের নির্দেশ অনুসারে। বাঘারুর নিশানটা যে কত উঁচুতে উঠে আকাশে পতপত করে সেটা এই নেতারা খুব ভাল দেখতে পায় ও দেখে। তাতে তাদের একটা বেশ গর্বও হয়। রাজবংশী সমাজের ভেতরে কয়েক শ বছর ধরে জমা হয়ে আছে বর্ণহিন্দু সমাজের সঙ্গে তুলনা থেকে আসা এক হীনম্মন্যতা। এখন এই বাঘারুর হাতে ধরা নিশানাটার পেছনে সেই তরাইয়ের সম্পৎ রায় থেকে পুণ্ডিবাড়ির কালিপ্রসন্নর বড় ছেলে পর্যন্ত যে এমন ফাঁকা মাঠের ভেতর দিয়ে এমন একসঙ্গে হেঁটে যাচ্ছে তাতেই যেন তাদের অভীষ্ট অনেকটা সিদ্ধ হয়ে যায়। অন্তত এখানে ত তাদের রাজবংশী পরিচয় ছাড়া আর কোনো পরিচয় নেই। এই পরিচয়টুকু নিয়ে ত তারা গত কয়েকদিন ধরে সম্মিলন করে আসতে পারল, কাল রাত্রিতে ঐ রকম এক শ্রীদেবীকে এনে এমন অনুষ্ঠান করে ফেলতে পারল ও এখন এতটা রাস্তায় মিছিল করে জমেশে যেতে পারছে।
.
|| মিছিলহারা ঝাণ্ডা নিয়ে তিস্তাবুড়ির পূজা দেখতে-দেখতে বিব্রত বাঘারু ||
কিন্তু জল্পেশে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ও তিস্তাবুড়ির পুজো তেমন জমল না।
মিছিলে বেশির ভাগই ছিল এদিককার লোক। যাদের গা বা টাড়ি রাস্তায় পড়েছে তারা মিছিল থেকে সরে গেছে। গা টাড়িপিছু হয়ত দু-একজন করে থেকে গেছে। জল্পেশ পার হয়ে যে-সব গা বা টাড়িতে যেতে হয় সে-সবের লোকজন অবিশ্যি জল্পেশ মন্দিরে বসে, চলে যায় না। সুস্থিরের মোটর সাইকেলের দলটারও অনেকে মোটর সাইকেল চালানোর আনন্দে জল্পেশ ছাড়িয়ে আরো দূরে চলে গেছে। তাদের কেউ-কেউ ফিরে আসে বটে কিন্তু তাদের সঙ্গে ত এই মিছিল বা অনুষ্ঠানের কোনো সম্পর্কই তৈরি হয় না। এক সাইকেলওয়ালারা সবাই এতটা এসে হাঁফিয়ে পড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বিশ্রাম নেয়। যখন মূল মিছিলটা বাঘারু ও নেতৃবৃন্দসহ জল্পেশ পৌঁছয় তখন মনে হয় এখানে এসে পড়াটাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল, এর পর আর-কোনো অনুষ্ঠান নেই।
কিন্তু সুস্থির সমস্ত ব্যবস্থা করে রেখেছিল। মিছিলটা সোজা জল্পেশের মন্দিরের দিকেই হাঁটে, তার জন্যে সুস্থির বাঘারুকে প্রায় হাত ধরে পথ দেখায়। বাঘারু এর আগেও জল্পেশ্বর মন্দিরে হয়ত এসেছে গয়ানাথের দরকারে কিন্তু সে যে শিবলিঙ্গ পর্যন্ত যেতে পারে এটা তার ধারণাই ছিল না। অথচ তার বাহু ধরে টানতে-টানতে সুস্থির একেবারে মন্দিরের সিঁড়ি পর্যন্ত নিয়ে যায়। মন্দিরের সিঁড়ির গোড়ায় যখন বাঘারু প্রায় পৌঁছে গেছে, তখন তার মনে হতে শুরু করেছে শেষ পর্যন্ত সুস্থির কি তাকে সিঁড়িগুলো দিয়ে ওপরেও তুলবে নাকি? যদি তোলে তা হলে ঝাণ্ডাটা কী করবে, একথাটা যেমন সে ভাবে, তেমনিভাবে, সে উঠবে না। কিন্তু ঐ সিঁড়ির গোড়াতে এসেই সুস্থির তাকে ছেড়ে দেয়, সঙ্গে-সঙ্গে জয় বাবা জল্পেশ্বর আওয়াজ ওঠে। বাঘারু দুই হাতে বাশটা ধরে সেই বাঁশের গোগাড়াতেই নত হয়ে ভক্তিভরে কপাল ঠেকায়। বাঘারুকে হামেশা এমন কপাল ঠেকাতে হয় না বলে সে বোঝেও না কতক্ষণ কপাল ঠেকিয়ে রাখবে। বুঝলেও যে খুব সুবিধে হত তা নয়, কারণ, তার সময়ের বোধ অত সঠিক নয়। কিন্তু এতটা পথ এত বড় মিছিলের আগে-আগে ঝাণ্ডা বয়ে আনার প্রতিক্রিয়াতেই হয়ত তার মনে হতে শুরু করে যে তার বোধহয় একটু বেশি সময়ই প্রণাম করা উচিত। একে বাবা জল্পেশ্বর, তাতে মিছিল, তাতে মিছিলের নিশান। তা ছাড়া জল্পেশ্বর মন্দিরে এমন একটা মাথা নোয়ানোর সুযোগ ত সারা জীবনে তার আর নাও আসতে পারে। বাঘারু যে মাথা নিচু করে তার গত ও আগামী জীবনের পরিপ্রেক্ষিত ভেবে ফেলে তা নয়–সে বেশ অনেকক্ষণ ঝাণ্ডার বাশটা দুই শক্ত হাতে ধরে বাঁশের গোড়ায় মাথাটা নুইয়ে রাখে। যখন সে মাথাটা তোলে তখন পাশাপাশি কাউকে দেখতে পায় না, পেছনেও কাউকে দেখতে পায় না। এতক্ষণ চোখ বুজে থাকায় চোখটা আঠা-আঠা লাগে। সে একটা হাত আলগা করো চোখটা একটু কচলে নেয়। কিন্তু তারপরও পাশে বা পেছনে কাউকে পায় না।
বাঘায়ু এবার তার মিছিলের ঐ অত লম্বা বাঁশের মাথায় নিশান নিয়ে একা-একা, যেন মিছিলটা খোঁজে। পেছনে তোক নেই অথচ নিশানটা এমন পতপত করে উড়ছে এটা খুব বেমানান ঠেকে। বাঘারুর কাছে। এই বাশ আর ঝাঙাটা থাকায় সেও একা-একা হাঁটার মত করে হাঁটতে পারছে না। মিছিলের বাশ আর ঝাণ্ডাখান মোর কাঁধত রাখি কোটত গেইল হে গয়ানাথের মিছিল? মন্দিরের প্রধান এলাকা থেকে বাঘারু বাইরে বেরয়।
বেরতেই দেখে মিছিল বলে আর চেনার উপায় নেই, পুকুরের পাড়ে এমনই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে সব। বাবারু ত ঐ মিছিলের কারোই মুখ দেখে নি। সে শুধু মিছিলটাকেই দেখেছে। মিছিলে যে-মুখগুলি ছিল সেগুলিকে সে মিছিলের বাইরে চিনবে কী করে? কিন্তু তবু যে বাঘারু আন্দাজ করতে পারে যে পুকুরের পাড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকা এই মানুষগুলি মিছিলেরই লোক তার কারণ মন্দিরের মাঠে মিছিল ছাড়া আর-কোনো লোক ছিল না। . বাঘাক ঐ বাশটা ধরে কোনদিকে যাবে বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে থাকে, বাশটা ধরেই। সেখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই সে দেখে ও শোনে একটু দূরে একটা জায়গায় গয়ানাথ, আসিন্দির, আরো সগায় দেউনিয়ার ঘর খাড়ি আছে, আর একদল মেয়ে, বেটিছছায়ার ঘর ঘুরি-ঘুরি গান গাবার ধরিছে। একটু দাঁড়িয়ে শুনতেই বাঘারু বোঝে, তিস্তাবুড়ির পুজো হচ্ছে। ওখানে নিশ্চয়ই পাটকাঠি দিয়ে তিস্তাবুড়িও একটা বানানো হয়েছে। গানগুলো খুব মন দিয়ে যে শোনে বাঘারু তা নয়, কিন্তু জন্ম থেকে শুনতে-শুনতে এ গান এতই জানা যে শুনতে না-চাইলেও শোনা হয়ে যায়।
সঙ্গ হতে নামি তিস্তাবুড়ি
মনচে দিয়া পাওঁ।
মনচ হতে নামি তিস্তাবুড়ি
চ্যাতন করি গাও
কাঁচা দুধ আলোয়া ক্যালো
ভইক্ষণ করো।
দেখতে-দেখতে তিস্তাবুড়ির পুজো শেষ হয়ে যায়। এসব পুজো যেমন চলতেই থাকে, চলতেই থাকে, তেমন কিছুই হয় না। পঞ্চানন মল্লিক উঠে বলেন, তিস্তাবুড়ি আমাদের দেবতা হন। সেই তিস্তাবুড়িকে বান্ধা আমরা সহ্য করিব না। আর এক মাস পরে তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধনের দিন আমরা প্রতিবাদের মিছিল নিয়া ঐ তিস্তা ব্যারেজের কাছে যাইব Fআপনারা সব জায়গা হইতে সেদিন মিছিল লইয়া তিস্তা ব্যারেজে যাইবেন। তিস্তা ব্যারেজে প্রতিবাদ করার জন্যে আপনারা আজি হইতে এক মাস নিজের নিজের টাড়িতে, হাটে, গায়ে, গঞ্জে প্রচার করিবেন ও সেদিন সব জায়গা হইতে মিছিল লইয়া যাইবেন। এখন শপথপত্র পাঠ হইবে। আমি পড়িব, আপনারা সঙ্গে সঙ্গে পড়িবেন। জয় বাবা জল্পেশ্বর। জয় তিস্তাবুড়ির জয়।
এখানে মিটিঙের মত সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়ে নেই। যে যার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মাইকও নেই। ফলে কী বলা হচ্ছে, কী পড়া হচ্ছে সেটা কেউ একটা খুব খেয়ালও করে না। যেখানে তিস্তাবুড়ির পুজো হচ্ছিল সেখানে নেতারা যে কয়েকজন ছিল, গয়ানাথও ছিল, তারা একসঙ্গে কিছু পড়ে বা বলে। তবে যখনই একটু উঁচু গলায় জয় বাবা জল্পেশ্বর আর জয় তিস্তাবুড়ির জয় ধ্বনি উঠছিল তখন যে যেখানেই থাকুক সাড়া দিচ্ছিল। সে-সাড়া খুব জোরে না উঠলেও, উঠছিল।
উত্তরখণ্ড সম্মিলনের সবাই যে-নাটকীয় পরম্পরায় এই কর্মসূচিটি ভেবেছিল, সেটি ঘটে উঠল না। পরপর ক-দিন সম্মিলন, তাতে নানারকম আলোচনা। পর-পর কদিন অনুষ্ঠান, তাতে নানারকম প্রোগ্রাম। শেষের দিন শ্রীদেবীর নাচে একটা চূড়ান্ত নাটক। তার পরদিন জল্পেশ্বর অভিযানে উত্তরখণ্ডের আরো চূড়ান্ত নাটক।
কিন্তু জল্পেশ্বর অভিযান, শপথগ্রহণ, তিস্তাবুড়ির পূজা, এসব কথা কাগজে ছাপার হরফে যেরকম দেখায় বা বক্তৃতায় মুখের কথায় যেরকম শোনায়, বাস্তবে সে-রকম দেখায় না বা শোনায় না। শ্রীদেবীর নাচটুকু ছিল বলে, তাতে এদিক থেকে এত লোক গিয়েছিল বলে, আর তাদের প্যান্ডেলে থাকার জায়গা দেয়া হয়েছিল বলে–এই মিছিলটা ময়নাগুড়ি থেকে জল্পেশ পর্যন্ত হেঁটে আসতে পারল। নইলে তাও হত না। তাহলে সুস্থিরের সাইকেল বা মোটর সাইকেল মিছিল পর্যন্ত হয়ত হত। কিন্তু সাইকেল বা মোটর সাইকেলে মিছিল করে এসে ত আর তিস্তাবুড়ির পূজা, জল্পেশ্বরের পূজা, শপথবাক্য পাঠ এসব করা যায় না। করা যাবে না কেন, যায়, কিন্তু সেটা যারা করল তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর-দশজনের মধ্যে প্রচারিত হবে না। কিন্তু এখানে এই জল্পেশ্বর অভিযান আর তিস্তাবুড়ির পূজা আর শপথবাক্য পাঠ যাই হোক না কেন, খবরের কাগজের রিপোর্টারদের কাছে এগুলো বললে এর চেহারাই অন্যরকম হয়ে যাবে।
উত্তরখণ্ডের নেতারা এখানে জল্পেশ্বর মন্দিরের নিভৃতিতে খবরের কাগজের জন্যে একটি খবর তৈরি করছিলেন মাত্র।
সব যখন শেষ হয়ে যায় তখন বাঘারু বোঝে না যে এখন এই বঁশ ও বাঁশের মাথায় ঝাণ্ডা নিয়ে কী করে। নিজের ভেতর সে একটা যুক্তি পায়–মিছিল না থাকিলে ঝাণ্ডাখান কেনে থাকিবে? মিছিল নাই ত ঝাণ্ডা নাই। সে জল্পেশ মন্দিরের একটা গাছের গায়ে ঐ বাশটা হেলান দিয়ে রেখে দেয়।
.
বাঘারু যদিও জল্পেশ মন্দিরের গায়ে উত্তরখণ্ডের লম্বা ঝাণ্ডাটা রেখে দিয়েছিল কিন্তু পরের এক মাস ঐ ঝাণ্ডা তাকে ছাড়ে না।
তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধন উপলক্ষে বিক্ষোভ দেখানোর জন্যে উত্তরখণ্ড দলের মিছিল সাজামোর সব দায়দায়িত্ব যেন গয়ানাথ আর আসিন্দিরের ওপরই এসে পড়ে। অথবা, তারা নিজেরাই সে দায় মেনে নেয়। অন্যদের কাছে তিস্তা ব্যারেজ ত খবর, বিক্ষোভ দেখাতে এসেও নদীর ভেতরে অত বড় কাণ্ডকারখানার দিকে হা করে তাকিয়ে না-থেকে পারবে না। কিন্তু গয়ানাথ-আসিন্দিরের কাছে ত তিস্তা ব্যারেজ সেরকম ব্যাপার না–সেই বছর দশ-বারর আগের সেটলমেন্ট থেকে শুরু করে এই বছর দশ বারর নানা মামলা-মোকদ্দমা পর্যন্ত এই ব্যারেজটা ত তাদের চোখের সামনেই ঘটে গেছে আর যত ঘটে গেছে ততই যেন সেটা তাদের উল্টো দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই উল্টো ঠেলায় এতদিন পর্যন্ত মামলা-মোকদ্দমাই চলছিল, এখন এই উত্তরখণ্ডের সুযোগে আর তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধনের উপলক্ষে তারা যেন হাতের কাছে নতুন একটা উপায়ই পেয়ে যায় তিস্তা ব্যারেজকে ঠেকানোর জন্যে। তিস্তা ব্যারেজ যে ঠেকানো যাবে না, সেটা গয়ানাথ-আসিন্দির তাদের নিজেদের বৈষয়িক বুদ্ধিতেই বুঝে ফেলে। তিস্তা ব্যারেজ যে ঠেকানো গেল না, এটা ত তারা নিজেদের চোখেই দেখতে পায়। তিস্তা ব্যারেজ ঠেকিয়ে যে মামলাগুলি জেতা যায় না–সেটা বুঝতে ত আর বেশি বুদ্ধির দরকার হয় না। তবু তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন নিয়ে গয়ানাথ আর আসিন্দির যে এতটাই মেতে ওঠে তার একটা কারণ হয়ত এই যে উত্তরখণ্ড সম্মিলনে এই প্রথম তারা, বিশেষত গয়ানাথ, একটা স্বাদ পেল যে অনেক মানুষকে জড়ো করতে পারলে একটা কাজ আদায় করে নেয়া যায়।
এতদিন এই মানুষকে একসঙ্গে মেলানোর ব্যাপারটাকে গয়ানাথ সন্দেহ করেই এসেছে। এমন-কি, কংগ্রেস ছাড়া ভোট দেয়ার কেউ না-থাকলেও গয়ানাথ এই মানুষজনকে নিয়ে হৈ-হৈ করার ব্যাপারে কংগ্রেসকেও বিশ্বাস করে না, অন্য পাটিদের ত করেই না। কিন্তু এখন, এই মানুষগুলোকে একসঙ্গে করে আন্দোলনের ব্যাপারটা সে বুঝে ফেলে নতুন ধরনের পদ্মা, আই আর এইসব বিছন দিয়ে ধান চাষ করার নিয়মে। গয়ানাথ ত আর সরকারের হাতে তামাক খেতে যায় নি। সে যখন চোখের সামনে দেখেছে যে এই সব হাইইল চাষে সময় কম লাগে, ফলন বেশি হয়, তখন সে তার জমিতে এই বিছানে; চাষ লাগিয়েছে। সে যখন বুঝেছে মানুষ ছাড়া তার উপায় নেই তখনই উত্তরখণ্ডে যোগ দিয়েছে আর তিস্তা ব্যারেজ বন্ধ করো, বন্ধ করো, শুরু করেছে।
কিন্তু শুরু করলেও এই সব মিছিল-মিটিঙের নিয়মকানুন ত আর গয়ানাথের জানা নেই। উত্তরখণ্ডের চ্যাংড়া নেতারা তার এই বাড়িতে বসে মিটিঙ করে তাকে বলে গেছে, অন্তত কাছাকাছি প্রত্যেকটা হাটে হাটের দিন যেন মিছিল ভোলা হয়। তার একটা লিস্টিও করা হয়। আজকাল যেখানে-সেখানে হাট, বসে যাচ্ছে। কোন হাটে মিছিল তোলা যাবে আর কোন হাটে যাবে না তা ঠিক করতেই সময় যায়। গোচিমারির হাটটা পুরনো আবার কুমারপাড়ার হাটটা নতুন হলেও বড়। শেষ পর্যন্ত দেখা যায় সবসুদ্ধ প্রায় বিশটা হাটে মিছিল তুলতে হবে।
মিছিল ত তুলিবেন, নেকচার করিবেন কায়? গয়ানাথের এমন প্রশ্নের জবাবে সেই চ্যাংড়া নেতারা কথাবার্তা বলে ঠিক করে যে অন্তত সাতটা হাটে তারা কেউ এসে বক্তব্য রাখিবেন। আখিবেন ত আখিবেন আর তেরডা হাটত কি বলদ দিয়া হাম্বা ডাকাম? গয়ানাথের এমন চড়া প্রশ্নে আবার এক দফা আলাপ-আলোচনার পর ঠিক হয় যে এই এলাকার দু-জনকে জোগাড় করা হবে। কিন্তু তাতেও গয়ানাথের প্রশ্ন ছিল-ঐ সব কাথা তিস্তাপাড়ত্ ফেলান! একখান মাস্টার মানষি দ্যাও, সাইকেলআলা। স্যালায় এই দিন গিলা হাটত মিছিল তুলিবেন, নেকচার করিবেন আর স্যালায় ঐ মিটিঙের দিন মিছিল নিগাবেন। হামরালা তোমা মানষি দিবা পারি, সেই মানষিগিলার মিছিল বানিবার না পারি। মোর মানষি নিয়া মিছিল, বানিবার নাগিবে তোমরালাক।
গয়ানাথের বাড়ির এই মিটিঙে সুস্থির ছিল। শেষ পর্যন্ত তার কথামতই ঠিক হয় প্রথম কয়েক দিন তিলক রায়বর্মন গয়ানাথের বাড়িতে থেকে কয়েকটা হাটে মিছিল তুলবে, তারপর সুস্থির নিজেই এসে থাকবে, সঙ্গে আরো দু-একজন আসতে পারে–একেবারে উদ্বোধনের দিন বিক্ষোভ মিছিল তোলার পর সুস্থির ফিরে যাবে, তার আগে নয়।
তিস্তা ব্যারেজের বিক্ষোভ মিছিলে লোক প্রধানত গয়ানাথের এলাকা থেকেই জড়ো করতে হবে–এটা সুস্থির ও তার দলবল বুঝে গিয়েছিল।
তারপর থেকেই শুরু হল তিলক রায়বর্মনের নেতৃত্বে কাছাকাছি সব হাটে গয়ানাথের মানষিলার মিছিল তোলা।
আর গয়ানাথের মানষিলা মানেই ত সর্বপ্রথম বাঘারু। নেওড়াবস্তির হাটের দিন তিলক তার সাইকেল নিয়ে আর বাঘারু তার ঝাণ্ডা নিয়ে গয়ানাথের বাড়ি থেকে বেরয় বেলা একটা নাগাদ। গয়ানাথের নির্দেশ অনুযায়ী বাঘারু তিলককে এক-এক পাড়ার ভেতর দিয়ে-দিয়ে নিয়ে যায়। সে-সব পাড়ায়, টাড়িতে বাঘারু সরু বাঁশের, বা মোটা কঞ্চি বলাই ভাল, মাথায় তিনকোনা এক লম্বা নিশান ধরে দাঁড়িয়ে থাকে আর তিলক সাইকেলটা এক জায়গায় হেলান দিয়ে রেখে এক-এক ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ডাকে। নতুন গলার এরকম ডাকাডাকিতে সবই বেরিয়ে আসে। তখন তিলক তাদের প্রায় নির্দেশের মত করেই বলে, যে, হাটে গিয়ে সবাই যেন বাঘারুর হাতে ধরা ঝাণ্ডাটার কাছে জড়ো হয়। তারপর, হাটমিছিল হবে।
তিলককে প্রায় কেউই চেনে না কিন্তু বাঘারুকে ত সবাই চেনে। সুতরাং গয়ানাথের নির্দেশ বুঝতে কারো কোনো অসুবিধে হয় না। বাচ্চারা ত চলবে না, চলবে না শুরুই করে দেয়। কিন্তু হাটে বাঘারুর ঝাণ্ডার কাছে কেউ জড়ো হয়ে থাকে না, তিলকও কাউকে চেনে না যে হাট ঘুরে ডেকে-ডেকে আনবে। তাই খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর তিলককে তার সাইকেল নিয়ে বাঘারুর সঙ্গে হেঁটে-হেঁটেই হাটে ঘুরতে হয়।
বাঘারুর কাঁধে ঝাণ্ডা। সুতরাং তাকে আগে যেতে হয়। আর, তার পেছনে-পেছনে সাইকেল ঠেলতে-ঠেলতে তিলক। তিলক শ্লোগান দেয়–তিস্তা ব্যারেজ চালু করা, কিন্তু বাঘারু তার জবাবে কিছু বলে না। প্রথম হাটে দু-একবার বাঘারুকে বলা সত্ত্বেও বাঘারু বলতে না-পারায় তিলক একাই পুরো শ্লোগান দিতে থাকে–তিস্তা ব্যারেজ চালু করা চলবে না, চলবে না, তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন, যোগ দেন। এরকম ঝাণ্ডাসহ একজনের মিছিল বেরলেও হাটে লোক জুটে যায়। সে রকম লোক তিলক বাঘারুর যুগ্ম মিছিলেও জোটে। সন্ধ্যা হওয়ার মুখে বাঘারু ও তিলকের এই গোটা মিছিলটাই একা-একা গয়ানাথের বাড়িতে ফেরে। বেলা একটা-দেড়টায় বাঘারুর হাতে যে ঝাণ্ডাটা জ্বলজ্বল ও পতপত করে, সন্ধ্যার পর সেটা কলাপাতার মত নেতিয়ে যায়। কিন্তু আলে-আলে বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়–সেই ঝাণ্ডাটা আরো দূরে চলে যাচ্ছে। গোলাবাড়ির ঢাল বৈয়ে ওপরের বরমতলে ওরা উঠলে তিলকের সাইকেলের স্পোকগুলোও ছায়ার মত দেখায়, বাঘারুর পুরো শরীরটাকে আকাশে খোদাই করা মনে হয়।
এরকম প্রথম দু-চারটি হাট থেকে ফিরতে-ফিরতে তিলক ও বাঘারুর কিছু কথাবার্তা হয়। কোনো এক সন্ধ্যাতেই যে সামান্য এই কটি কথা হয়েছিল তা নয়। ঐ–চার সন্ধ্যা জুড়েই নানা সময়ে কথাগুলি হয়ে থাকবে। কিন্তু সেরকম টুকরো-টুকরো উপলক্ষের মধ্যে কথাগুলি ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ এখন আর এ বৃত্তান্তের নেই। তাই একসঙ্গেই সবটুকু দেয়া হল। তাতে এই কথোপকথনের মধ্যে থেকে কোনো নতুন অর্থ তৈরি হয়ে উঠবে না, আশা করা যায়। এই কথোপকথন বাদ দিলেও হত, কিন্তু তা হলে, এই দু-চার হাটের অভিজ্ঞতার পর গয়ানাথ ক্রান্তিহাটে কী করল বোঝা যেত না।
.
তোমরালার মানষিলা আসিছেন না কেনে হে? তিলক জিজ্ঞাসা করে।
হামরালার কুনো মানষি নাই, বাঘারু জবাব দেয়।
এই জিজ্ঞাসা ও জাবাবের ভেতর কোনো নাটকীয় অবস্থান নেই। আলপথে-পথেই তাদের ফিরতে হয়। আলপথে একবার যে আগে যায় তাকে আগেই যেতে হয়। বাঘারুর হাতে ঝাণ্ডা আছে বলেই হয়ত বেশির ভাগ সময় বাঘারুকে আগেই থাকতে হয়। তাছাড়া, তিলক ত এই জায়গার নোক নয়, তাই কোন-কোন আল দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি হবে সেটা বাঘারুই ভাল জানে। কথাবার্তা যখন হয় তখন সব সময় প্রশ্নোত্তরের ভঙ্গিতেই হয়, তাও নয়। একজনের কথার জবাবে আর-একজন হয়ত নীরবই থাকে। পরস্পর কথাবার্তা বলতে বলতে যে এরা প্রায় একটা আলোচনা করে ফেলে, তাও নয়। অনেক সময়ই কথাগুলো পরস্পর নিরপেক্ষ ও স্বাধীন।
এইঠেকার মানষিলা গয়ানাথবাবুর কথা না-শোনে?
হামরালার কুনো মানষি নাই।
গয়ানাথবাবুর ত মানষি আছে? এ্যানং বড় জোতদার!
আছে, গয়ানাথের মানষি আছে।
তোমরালা ত গয়ানাথের মানষি।
হয়। হামরালা গয়ানাথের মানষি।
তোমরালা একা-একা ঝাণ্ডাখান খাড়ি করি এ্যালায় টারিঠে বাহির হবা ধরছু, আর এ্যালায় হাট শেষ করি টারিত ফিরিবার ধই একা-একা। তোমরালার আর কুনো মানষি নাই?
মোর আর কুনো মানষি নাই। মোর একেলা মুই আছো।
তোমরালা কি উত্তরখণ্ডিত জয়েন দিছেন?
হামরালার কুনো খণ্ড নাই, কুনো জয়েন নাই।
না, না, কহিছু, তোমরালার জোতদারখান ত জয়েন দিবার ধইচছে।
না জানো।
না জানোত ঝাণ্ডাখান কান্ধত করি একেলা-একেলা হাট-হাট ঘুরিবার ধরিছেন কেনে?
মোর গয়ানাথ কহিছে তাই ঘুরিবার ধরিছু। মোক ত আগতও ঝাণ্ডা দিচ্ছে গয়ানাথ।
আগতও ঝাণ্ডা দিছে? কোটত?
স্যালায় জল্পেশত—
তোমরালা জল্পেশত গেইছু হে? স্যালায় ত তোমরালা পুরাপরি উত্তরখণ্ড পার্টি হে।
নাই রো। মোর খণ্ডটণ্ড নাই, মোর পার্টি-টার্টি নাই।
নাই, ত ধরিলেন কেন ঝাণ্ডা জল্পেশত?
গয়ানাথ দিছে।
আরে, গয়ানাথ ত দিছে, ধরিছেন ত আপনি, স্যালায় ঝাণ্ডাখান ত আপনার।
না-হয়। মোর ঝাণ্ডা নাই।
ত ছাড়ি দে ঝাণ্ডার কাথা। ক কেনে, চ্যানং করি মানষি জুটাবার যায়। মিছিল তুলিবার নাগে। তিস্তা ব্যারেজ খুলিবার দিন মিছিল নিগিবার নাগে।
গয়ানাথক কহেন। মিছিল নিগিবার কহিলে গয়ানাথ নিগাবে।
ত গয়ানাথ তোমাক ছাড়ি আর কাহাকও কহে না?
না জানো।
গয়ানাথ কহিলে সব মানুষ মিছিল ধরিবে–হাটত?
ধরিবে।
গয়ানাথ কহিলে সব মানুষ মিছিল ধরিবেতিস্তা ব্যারেজের দিন?
ধরিবে।
এর বাদে কুন হাট বড় হাট?
ক্রান্তির হাট।
মুই কম গয়ানাথক ঐ হাটত থাকিবার?
কহেন।
গয়ানাথ ঐ তিস্তা ব্যারেজের দিন মিছিলত থাকিলে মানষিলা আসিবে?
আসিবা পারে।
ত কহিম গয়ানাথক। কিন্তু তোমরালা জয়েন দিবেন না উত্তরখণ্ড পার্টিত?
মোর জয়েন নাই।
আরে তোমরালাও ত একটা আলাদা মানষি। রাজবংশী মানষি।
মুই রাজবংশী না হও।
ধূৎ বোকা! এইঠে হামরালা যত মানষি আছি, এইঠেকার আদিবাসী আছি
মুই এইঠেকার না হয়।
ধুৎ বোকা। তুই এইঠেকার না হন, কি বিলাতের মানষি হবার ধরিছেন?
না হই, মুই বিলাতের না হয়।
বিলাতের না হন ত এইঠেকার হন ত? এইঠেকার রাজবংশী?
মুই রাজবংশী না হও।
ধুৎ বোকা, রাজবংশী না হবি ত তুই কি ভাটিয়া হবা ধইচছিস?
না হও। মুই ভাটিয়া না হও।
ধুৎ বোকা–একখান ত তোর হবা নাগিবেই, হয় রাজবংশী, না-হয় ভাটিয়ার ঘর।
না হও। মুই রাজবংশী না হও। মুই ভাটিয়া না হও।
হয়, হয়। তুই একো একো পার্টি? রাজবংশী না হন, ভাটিয়া না হন! আর ঘাড় করি। উত্তরখণ্ডের ঝাণ্ডাখান ধরি জল্পেশ যাবার ধরিছেন! ঝাণ্ডাখান ধরি ধরি হাট-হাট ঘূরিবার ধরিছেন। এইঠে ত সগায় জানে তোমরালাই উত্তরখণ্ড পার্টি!
না জানে। মোর কুনো পাটি নাই। মোর কুনো মানষি নাই।
হ-অ-য়। ঠিকেই কহছেন, তোর শুধু একখান ঝাণ্ডা আছে হে।
না হয়। মোর কুনো ঝাণ্ডা নাই।
হ-অ-য়! ঠিকেই কহছেন, তোর শুধু একখান ঝাণ্ডা আছে হে।
না হয়! মোর কুনো ঝাণ্ডা নাই।
হ-অ-য়! ঝাণ্ডাখানের তুই আছিস।
এ-সংলাপ এভাবে আরো কিছু নিশ্চয় হয়ে চলতে পারে। কিন্তু, এটুকুতেই ত তিলক আর বাঘারুর নানা হাটে ঘোরাফেরার ঘটনা বোঝা যাচ্ছে। সে-বোঝার চাইতেও বেশিবাঘারুকে গত দশ বার বছরে মাত্র এই তৃতীয়বার আত্মপরিচয় সংক্রান্ত সংলাপে বাধ্যত অংশ নিতে হল। দশবার বছর আগে এক এম-এল-একে নদী পার করাবার সূত্রে বাঘারু স্বেচ্ছাপ্রণোদিত এক দীর্ঘ-দীর্ঘ আত্মপরিচয় দিয়েছিল। তখন তার একটা ছোট দাবিও ছিল, এম-এল-এ যেন তার নামটা ছোট করে দেয়। কিন্তু এম এল-এ সে-বিষয়ে কিছু করতে পারে নি। আর বাঘারুর নামটা আরো-আরো বদলেছে। তিস্তার এক বন্যার সময় চার-চারটে গাছ নিয়ে বাঘারু যখন রংধামালির কাছে বাধে গিয়ে ওঠেন, তখন তাকে এক অফিসারের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদে ঢুকতে হয়। সেখানে অফিসার শুধু তার নাম-ঠিকানা জানতে চেয়েছিল। কিন্তু বাঘারু সেটুকুও দিতে পারে না। আবার এখন উত্তরখণ্ড পার্টির সময় উত্তরখণ্ডের নেতাদের সঙ্গে তাকে এরকম একটা কথাবার্তায় ঢুকতে হয়। এবার বাঘারু যেন তার নিজের সম্পর্কে কিছু আরো বলতে পারে না। এখন সে শুধু বলতে পারে সে কী কী নয়, তার কী কী নেই। দশবার বছরে মাত্র তিন-তিনটি সংলাপ–তাও ক্রমসংক্ষিপ্ত! দশ বার বছরে মাত্র তিন-তিনটি সংলাপ-তাও ক্রমেই নেতিবাচক। বাঘারু কি তার জীবনে ক্রমেই নিজের কাছে নিজে অবান্তর হয়ে পড়ছে–ধারাবাহিকভাবে?
.
ক্রান্তিহাটে গয়ানাথ নিজে হাজির ছিল। সে আসার আগেই ঝাণ্ডা কাঁধে বাঘারুকে হাটের নিমগাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। পরে, তিলকও এসে সেখানে দাঁড়ায়। হাট শুরু হয়ে যায় অনেকক্ষণ আগে–বাঘারু দাঁড়িয়েই থাকে, তিলকও। নিমগাছটা হাটের একদিকে–সেই হাট কমিটির ঘরের লাগোয়া মাঠ আর হাটের সীমান্তে–যেখানে হাড়িয়া বিক্রি হয়। বাঘারুর দিকে তাকিয়ে হাটের লোকজন হাটে চলে যায়। এমন-কি, তিলকও মুদিখানা দোকানের পাশে তার সাইকেলটা তালা আটকে রেখে বাঘারু থেকে অনেক দূরে মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। বাঘারুর সঙ্গে যেন এই হাটের, এই হাটের মানুষজনের কোনো সম্পর্ক নেই। সে নিমগাছের তলায় আর-একটা গাছের মতই দাঁড়িয়ে থাকে। তার ঝাণ্ডা নারকেল গাছের ডালের মত বাতাসে দুলতে থাকে।
গয়ানাথ ঐ মিষ্টির দোকানের সামনের রাস্তা দিয়ে হনহন করে এগিয়ে এসে বাঘারুকে বলে, মানষিলা কই, যেইলা মিছিল তুলিবে?
বাঘারু তার ভঙ্গি অপরিবর্তিত রেখে বলে, কায়ও না আসে।
কায়ও না আসে? শালো বলদের দল! তোর সেই উত্তরখণ্ডের চ্যাংড়াখান কোটৎ!
গয়ানাথকে দেখে তিলক ততক্ষণে এগিয়ে এসেছে। তাকে দেখে গয়ানাথ চিৎকার করে, এইঠে আসিছেন কি খাড়ি থাকিবার তানে? মিছিল তুলিবে কায়? মুই? আর আপনি লিডার হবার ধরিবেন?
তিলক বলে, আমি ত কাউকে চিনি না। কায়ও ত আসে না!
আসে না? শালো বলদের দল! গয়ানাথ এসে পড়ায় ও চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করায় ছোট একটা ভিড় জমে যায়। সেদিকে তাকিয়ে গয়ানাথ চিৎকার করে একজনকে ডাকে, এই কানকাটু, যা কেনে, হাটত য্যায়লা আসিছে সগাক ডাকি নিয়া আয়, শালো বলদের দল!
কানকাটু হাটের দিকে দৌড়ায়। গয়ানাথ বলতে চেয়েছে, তার যে সব লোক হাটে আছে তাদের ডেকে আনতে। কিন্তু পেছন থেকে একজন মুখ লুকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, হাট ভাঙি সগায় চলি আইসেন, ভটভটি জোতদারের মিছিল নাগিবে।
শালো, তোর বাপের বলহরির মিছিল নাগিবে, গয়ানাথ ভিড়টার দিকে চিৎকার করে বলে।
তিলক বাঘারুকে হাত ধরে এগিয়ে এনে এক জায়গায় দাঁড় করিয়ে দেয়, তারপর ভিড়টার দিকে তাকিয়ে বলে, লাইন নাগান, লাইন নাগান, মিছিল করিবার নাগিবে।
তিলক একটা ভুল করেছিল। সে ভেবেছে এই ভিড়টার সবাই মিছিলে যাবে। কিন্তু ভিড়টা জমা হয়েছিল গয়ানাথকে দেখে, গয়ানাথের চেঁচামেচিতে। তা ছাড়া ক্রান্তি হাটে উত্তরখণ্ডের মিছিল উঠবে–এর ভেতর একটা উত্তেজনাও ছিল। সেই ভিড়ের দু-একজন এসে বাঘারুর পেছনে দাঁড়ায় বটে, কিন্তু বাকিরা একটু-আধটু সরে যায়। তা ছাড়া, যারা ছিল তাদের তিলক যখন আবার ডাকে, আসেন আসেন, মিছিল করিবার নাগিবে, তখন তাদের একজন ঠাণ্ডা গলায় বলে দেয়, হামলা উত্তরখণ্ড না হই। বামফ্রন্ট।
গয়ানাথ ভিড়টার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে, শালো, ফন্ট? কাম নাই কুত্তার নহরে সার। বামফ্রন্ট। ত এইঠে কী? শালো, বাম? পাছাত বাশ সিন্ধাইছে–স্যালায় বান?
যে নিজেকে বামফ্রন্ট বলে পরিচয় দিয়েছিল সে একই রকম ঠাণ্ডা গলায় বলে, এ্যাল্যাং-প্যাল্যাং কথা না কহেন দেউনিয়া। তার এই প্রতিবাদে দৃঢ়তা ছিল বটে কিন্তু একটু যেন দ্বিধাও ছিল, গয়ানাথ জোতদারের একেবারে মুখোমুখি তাকে অপমানকর কিছু বলার দ্বিধা।
এর মধ্যে হাটের ভেতর থেকে কিছু লোক বেরিয়ে গয়ানাথের দিকে আসতে শুরু করেছে। তাদের প্রায় প্রত্যেকের হাতেই বাজারের থলি বা ঝুড়ি। তারা আসে বটে, কিন্তু কেউই এসে বাঘারুর পেছনে লাইনে দাঁড়ায় না, একটু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। কেউ-কেউ বসে পড়ে।গয়ানাথ বা থেকে ডাইনে মাথাটা ঘুরিয়ে তাদের সবাইকেই বলে, শালো, বলদের ঘর, সব এইঠে আসিছেন বাপের বিয়া দেখিবার তানে? লাগা কেনে, মিছিল লাগা, লাগা। গয়ানাথ একদিকে মারমুখো হয়ে এগিয়েই যায় কিন্তু লোজন ছড়িয়ে ছিল বলে দিকটা ঠিক করতে পারে না।
গয়ানাথের এ-চিৎকারে যারা বসেছিল তারা শুধু উঠে দাঁড়ায়, আর যারা দাঁড়িয়ে ছিল তারা মুখটা ঘুরিয়ে বাঘারুর দিকে দু-এক পা আসে কি আসে না।
গয়ানাথ এবার তিলককে বলে, এইঠে খাড়ি-খাড়ি করিছেনটা কী? সগাক দাড়ি করি ধরেন মিছিল।
তিলক আগে একবার অপ্রস্তুত হয়েছে। কিছুটা সঙ্কোচের সঙ্গেই একজন আলগা দাঁড়ানো লোককে গিয়ে বলে, খাড়ি যান, লাইন নাগান। সে লোকটি তিলকের নির্দেশ অনুযায়ী গিয়ে লাইনে দাঁড়ালে, আরো কয়েকজন তার পাশে ও পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
হেই ভাদই, হেই কাতুরা, ঐঠে কি বাংকুয়াখান ধরি, তোর ধোকর বাপের সম্পত্তি বেচিবার ধরিছিস? ভাদই ও কাতুরা একটু অন্যমনস্ক পায়ে এসে লাইনে দাঁড়ায়। তাদের হাতে বাক। হয়ত কিছু বেচার জন্যে বাকে করে নিয়ে এসেছিল–নয়ত কিছু কিনে বঁকে বয়ে নিয়ে যাবে। এখন বাকটা তারা হাতে ঝুলিয়েই রাখে।
গয়ানাথ হুকুম দেয়, চিৎকার ধরেন, মিছিল শুরু করি দেন, আর য্যালায় আছে স্যালায় সব হাটের ভিতর যোগদান দিবে।
তিলক খুব জোরে শ্লোগান দেয়, উত্তরখণ্ড পার্টি। তার উত্তরে কেউ কোনো সাড়া দেয় না। গয়ানাথ চিৎকার করে লাইনাধা ঐ কটি মানুষের মধ্যে ঢুকে পড়ে, শালো, বামের নামে ত জিন্দাবাদ করিবার ধরিস, এ্যালায় মূক-উঁদরার (বোবার মত) নাখান চুপ করি আছিস। গয়ানাথের এই পুরো বাক্যটাই যেন শ্লোগানের প্রথমাংশ, এমন ভাবে এই লোকগুলি ক্ষীণ এক সমবেত স্বর তোলে–জিন্দাবাদ।
তিলক আবার চিৎকার করে, উত্তরখণ্ড পার্টি। কিন্তু যেন তারই জবাবে যে-ভিড়টা এতক্ষণ এই মিছিলের প্রস্তুতির পাশে জমা হয়ে উঠেছে তার ভেতর থেকে একজন দক্ষ উঁচু নিশ্চিত গলায় হেঁকে ওঠে, বামফ্রন্ট জিন্দাবাদ। সেই জিন্দাবাদ-এর সঙ্গে আরো দু-একটি গলা মিশে যায়।
গয়ানাথ তিলককে বলে, মিছিল হাটের ভিতর নিগান। হে-ই বাঘারু হেট, হেট– বামফ্রন্ট জিন্দাবাদ, চিৎকারে মিছিলটা তাড়াতাড়ি চলতে শুরু করতেই পেছনের সেই ভিড়টা থেকে নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাসে কেউ আহ্বান দেয়, হে-ই সগায় বামফ্রন্টের মিছিল সাজাও, মিছিল সাজাও। উত্তরখণ্ড পার্টির মিছিল চলিবে না, চলিবে না। সেই আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে ঐ ভিড়টার অনেকে দৌড়ে সেই মিষ্টির দোকান আর মুদির দোকানের মাঝখানে, হাটের পাকা রাস্তাটার দিকে ছোটে।
গয়ানাথ মিছিলটা থেকে একটু দূরে মিছিলের পেছনে হাটে ঢোকে। মিছিলটাতে আরো কিছু লোক ঢুকিয়ে সে কোনো দোকানে বসবে। কিন্তু হাটের ভেতরে ঢোকার পর মিছিলটার গলা যেন শোনাই যায় না-এক বাঘারুর লম্বা ঝাণ্ডাটার জন্যে এটা যে মিছিল সেটা তাকিয়ে অনুমান করতে হয়। উত্তরখণ্ড পার্টি জিন্দাবাদ, তিস্তা ব্যারেজ বন্ধ করো, ব্যারেজ বিরোধী মিছিলে যোগ দিন–এ সমস্ত নির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত শ্লোগান মিছিলটা থেকে কেমন অর্থহীন হয়ে ঝরে যায়।
.
এদিকে সারা হাটে মুহূর্তের মধ্যে রটে যায় যে উত্তরখণ্ড মিছিল বের করেছে, এইবার বামফ্রন্ট মিছিল করবে। রটে যাওয়ায় হাটের ঐ চেঁচামেচির ভেতবেও এক-একদিকে দৌড়োদৌড়ি শুরু হয়ে যায়। কিন্তু কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারে না–উত্তরখণ্ডের মিছিলটা কোথায়। সেই অনিশ্চয়তার ভেতরই হাটের এক কোণ থেকে হৃষিকেশ চিৎকার করে, তিস্তা ব্যারেজ জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ আর দেখতে-দেখতে কাছাকাছি জায়গা থেকে অনেক লোক দৌড়ে এসে হৃষিকেশের পেছনে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করে দেয়। বেঁটে একটা লাঠিতে একটা লাল ঝাণ্ডাও কোথা থেকে এসে যায়। রাধাবল্লভ আর আলবিশ ভগৎ রাস্তার পাশে এক পান-সিগারেটের দোকানের বেঞ্চিতে বসে ছিল। একজন দৌড়ে এসে তাদের বলে, মিছিল, মিছিল, উত্তরখণ্ড মিছিল দিবার নাগিছে। রাধাবল্লভ আর আলবিশ চকিতে উঠে দাঁড়িয়ে চার পাশে তাকায়। বামফ্রন্টের আর-একটা ছোট মিছিল সুধন সাহারা বের করে ফেলেছে। রাধাবল্লভ আর আলবিশ প্রায় দৌড়ে সেই মিছিলের সামনে চলে যায়। মিছিলের সামনে গিয়েই রাধাবল্লভ তার ছাতাটা বা বগলে নিয়ে ডান হাতের কনুই ভেঙে আঙুলগুলো মাথার ওপর দিয়ে পেছনে নিয়ে চিৎকার করে বসে, বন্ধুগণ। সুধন সাহা তাকে টেনে মিছিলের ভেতর এনে বলে, বন্ধুগণ পরে, এখন মিছিল তোলেন, মিছিল তোলেন। রাধাবল্লভ মুঠি আকাশে তুলে হাঁক দেয়, ক্রান্তি হাটে উত্তরখণ্ড চলবে না চলবে না। শ্লোগানটা মুহূর্তে ধরে যায়, যেন, মিছিলটা এই মুহূর্তে এরকম একটা কথাই বলতে চাইছিল। রাধাবল্লভ দ্বিতীয় শ্লোগান তোলে, গয়ানাথ জোতদারের বামফ্রন্ট-বিরোধী চক্রান্ত খতম করো, খতম করো।
এর মধ্যে হাটের আরো কয়েকটি জায়গা থেকে চা বাগানের শ্রমিকরা, ফুলবাড়ি বস্তির লোকজন ইত্যাদি আরো সবাই যে যেখানে ছিল বামফ্রন্টের মিছিল বের করে দিয়েছে। সেসব মিছিলের ক্ষিপ্রতা, দক্ষতা ও নিশ্চয়তা এত বেশি, সে-সব মিছিলের শ্লোগানগুলি রাজনৈতিক ভাবে এত নির্দিষ্ট যে অত বড় ক্রান্তি হাট জুড়ে শুধুই বামফ্রন্টের মিছিল উঠেছে, মনে হয়।
উত্তরখণ্ডের মিছিলটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এমনিতেই গয়ানাথের চিৎকার-চেঁচামেচিতে যেকটি লোক জুটেছিল, বামফ্রন্টের এতগুলো মিছিলের এত হৈ চৈ-এ তারা ভয় পেয়ে সরে যায়। ভয় পাওয়া সত্ত্বেও তারা হয়ত সরতে পারত না যদি গয়ানাথ তাদের পাশে থাকত। কিন্তু গয়ানাথ তাদের একটু পেছনে ছিল–তার পক্ষে ত আর মিছিলে হাটা সম্ভব না। কিন্তু সে একে-ওকে ডেকে মিছিলে পাঠাচ্ছিল, তারা গিয়ে মিছিলে পাড়াচ্ছিলও। এর মধ্যে বামফ্রন্টের এতগুলো মিছিল যে হাটে নেমে পড়েছে তা গয়ানাথ, তিলক বা তাদের লোকজন টেরও পায় নি। কারণ, তারা এই মিছিলটা নিয়েই ব্যস্ত ছিল–শ্লোগান কী দিতে হবে কেউ জানে না, হাঁটতেও ঠিকমত পারে না, শুধু বাঘারুর ঘাড়ের ঝাণ্ডাটার জন্যে তাও মিছিলটাকে মিছিল বলে তারা নিজেরা চিনতে পারছিল। কিন্তু সেই সরু লম্বা বাঁশের মাথার লম্বা তিনকোনা ঝাণ্ডাটাও কম ঝামেলা করে না। হাটের দোকানগুলোর মাথার প্লাস্টিক যা চটের ছাউনির দড়ি এদিক-ওদিক করে বাধা। তার তলা দিয়ে বস্তা মাথায় মানুষ না-হয় যেতে পারে, কিন্তু এত বড় ঝাণ্ডা কাঁধে কারো পক্ষে যাওয়া অসম্ভব। হাট মিছিলের জন্যে দরকার ছোট ঝাণ্ডা। আর, বাঘারুর কাঁধের ঐ লম্বা ঝাণ্ডা মাঝে-মাঝেই নামিয়ে মাটির সমান্তরালে ঝুলিয়ে এক-একটা বাধা পার হতে হয়। আর, দু-পা ফেলতে না-ফেলতেই ত সেরকম আরো সব বাধা আসে। এই সবের ফলে উত্তরখণ্ডের মিছিল বা গয়ানাথের মিছিল কখন শুরু হয় আর কখন ভেঙে যায় সেটা বোঝাই যায় না। বামফ্রন্টের নানা মিছিল যখন সেই গোহাটা থেকে এই হাড়িয়াহাটা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে আর আত্মবিশ্বাসে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তখন তামাকহাটি আর গামছাহাটির মাঝখানের মোড়টায় বাঘারু একা ঝাণ্ডাটা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যেমন সে নিমগাছের তলায় ছিল। এখানে ঝাণ্ডাটা অবিশ্যি খাড়াই ছিল। তার একটু দূরে তিলক দাঁড়িয়ে। আরো একটু দূরে গয়ানাথ দাঁড়িয়ে। এই তিনজনের দাঁড়ানোর মধ্যে কেনো যোগসূত্রও থাকে না–এটুকু ছাড়া যে তিনজনের দাঁড়ানোর জায়গা একটু অদ্ভুত। বামফ্রন্টের কোনো-কোনো মিছিল উত্তরখণ্ডের ঝাণ্ডাটার দিকে প্রায় ছুটতে-ছুটতে এসে দেখে-কোমরে দেড়হাতি ত্যানা জড়ানো একটা লোক ঝাণ্ডা নিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে। যেন, কোনো বটগাছের উঁচু ডালে কেউ মানতের ঝাণ্ডা বেঁধে গিয়েছে। দু-একজন যে বাঘারুকে দুটো-একটা ধাক্কা দেয় না, তা নয়, কিন্তু বাঘারু দৃশ্যতই এত অবান্তর যে সে-ধাক্কাতেও কোনো জোর ছিল না। তার চাইতে গয়ানাথ জোতদারকে, দেখে সেদিকে মিছিলটা নিয়ে যাওয়া অনেক লোভনীয় ঠেকে। গয়ানাথ কিন্তু দাঁড়িয়েই থাকে।
.
তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের দিন উত্তরখণ্ড চ্যাংমারি ব্যারেজের রাস্তাটাই বেছে নেয়, কারণ, ক্রান্তি হাটের পাকা রাস্তা সেদিন বামফ্রন্ট ও সরকারের দখলে। গয়ানাথের যা লোজন তা ত প্রধানত এই রাস্তাটারই এদিক-ওদিক। এর বাইরে দূরে-দূরে গয়ানাথের জোতজমির লোকজনের সঙ্গে ত আর তার রোজ দেখা হয় না, তাই, সেসব লোক আর গয়ানাথের মানষি নেই।
সুস্থিররা নানা জায়গা থেকে ছেলেপিলে জোগাড় করে একটা সাইকেল মিছিল নিয়ে আসে। খান পঞ্চাশেক সাইকেল দেখতে বেশ লম্বাই হয়। সেই মিছিলটা চ্যাংমারি হাটের পাকা রাস্তা ধরে, চ্যাংমারি ফরেস্টের পাশ দিয়ে, গোলাবাড়ি আর পশ্চিম দোলাইগাওয়ের মাঝখান দিয়ে, নেওড়াবস্তির ওপর দিয়ে, সোজা ব্যারেজের দিকে যায়।
আর শ-খানেক লোকের একটা মিছিল পায়ে হেঁটে এই দিকেই চলে, কিন্তু তারা পায়ে হেঁটে যাচ্ছে বলে পাকা রাস্তা অনুসরণ করার কোনো বাধ্যতা তাদের নেই। তারা পাকা রাস্তা ছেড়ে মাঠের মধ্যে দিয়ে পশ্চিম দোলাইগাও থেকে বায়ে ঘুরে নেওড়াবস্তিতে গিয়ে ওঠে। নেওড়াবস্তিতে সাইকেল মিছিল আর পায়ে হাঁটা মিছিল মিলে খানিকটা যায়। কিন্তু তার পর সাইকেল মিছিলটাকে সোজাই যেতে হয়, আর পায়ে হাঁটা মিছিলটা ব্যয়ে সোজা তিস্তার দিকে পুরনো সিদাবাড়ির মুখে চলে যায়। সেখান থেকে তিস্তার পাড় দিয়ে-দিয়ে হেঁটে আপলাদের মুখে পৌঁছয়। সেখানে আবার সাইকেল মিছিল আর পায়ে হঁটা মিছিলটা মেলে। তারপর আপলাদের ভেতর দিয়ে একসঙ্গে গাজোলভোবা-তিস্তা ব্যারেজের দিকে চলে।
মিছিলের কাহিনী ত এক কথাতেই শেষ করে দেয়া যায়, কারণ, শেষ পর্যন্ত ত কেউ জানলই না উত্তরখণ্ডের মিছিল একটা এরকম হয়েছে। আর, তা ছাড়া এই মিছিলটা যাচ্ছিলই প্রায় চুরি করে। সারা জেলা আজ মেতে উঠেছে। ন্যাশনাল হাইওয়ে ল্যাটার্যাল রোড, ক্রান্তি মোড়-ওদলাবাড়ির রাস্তা ধরে ট্রাকে-ট্রাকে মানুষ যাচ্ছে। আর এরা সেখানে যেন সবচেয়ে গোপন রাস্তা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে কোনো রকমে বিক্ষোভ দেখাতে যাচ্ছে। কিন্তু মিছিলপর্বের শেষ অধ্যায়ে আমাদের জানা দরকার বাঘারু কোথায় ছিল? এই মিছিলেও উত্তরখণ্ডের সেই বিরাট তেকোনা ঝাণ্ডা লম্বা বাঁশের মাথায় বাঘারুর কাঁধেই ছিল।
মাত্র শ-খানেক লোককে ঐ নেওড়াবস্তির বরমতলে বা সিদাবাড়ির তিস্তাপাড়ে কী তুচ্ছ মনে হয়। আর তাও ত এরা কোনো লাইন করে যাচ্ছিল না। একমাত্র বাঘারু ও তার সেই লম্বা ঝাণ্ডাটাই ঐ বিশাল ছড়ানো প্রকৃতিতে এই লোকগুলিকে একটা অর্থে গেঁথে দিচ্ছিল।
আপলচাঁদের ভেতরে ঢুকে দুই মিছিল এক হয়ে যায়। এরাও নিজেদের একটু মিছিলের মত সাজিয়ে নেয়। সবচেয়ে আগে বাঘারু ঝাণ্ডাসহ। তারপর পায়েহাটা মিছিল। শেষে সাইকেল। সাইকেলের অনেকে নেমে সাইকেল হটিয়েও নেয়।
আপলচাঁদ বাঘারুর। বাঘারু আপলচাঁদের। তার পায়ের চাপে এর শুকনো পাতা ভেঙে যায়। তার হাত নাড়ালে এ-ফরেস্টের আপাতদুর্ভেদ্য বাধা দূর হয়ে যায়। এই ফরেস্টের ভেতরই কোথাও তার জন্ম হয়েছিল। এই ফরেস্টের ভেতরই কোথাও বাঘ তার পিঠে ও উরুতে সিল মেরে দিয়েছে যে সে আপলচাঁদের। এতগুলো লোক তার পেছনে থাকা সত্ত্বেও বাঘারু আপলচাঁদে যেন একা-একাই হাঁটে। শুধু কাঁধের অত বড় ঝাণ্ডাটার জন্যে তার চলার ছন্দটা একটু আলাদা হয়ে যাচ্ছে।
তিস্তার পাড় দিয়ে দিয়েই ত বাঘারু অনেকটা এল-এখন তিস্তা দুপাড় থেকেই অনেকটা সরে গেছে। বালি চমকায়, জল চমকায়, আর বাতাস তিস্তার মতই ধীরে বয়ে আসে। আপলাদের ভেতর থেকে এক-একটা ফাঁক দিয়ে কখনো কখনো সেই তিস্তাই দেখা যাচ্ছিল। আবার তিস্তা ঢেকে যাচ্ছিল। কিন্তু তিস্তার ওপর দিয়ে বাতাস অব্যাহত বইছিল।
এরকম যেতে-যেতে–বাঘারুর জন্মস্থান, বা দেশ, বা বাঘারুর পৃথিবীই বলা যায় যে-আপলচাঁদকে, তার ভেতর দিয়ে যেতে-যেতে-বাঘারুর চোখে পড়ে যায় তিস্তা ব্যারেজ। বাঘারু আপলাদের সব, দৃশ্যই ত চেনে। কিন্তু এ দৃশ্য তার চেনা নয়। একবার দেখা যাবার পর থেকে সে-দৃশ্যও মাঝে-মধ্যে ঢাকা পড়ে যাচ্ছিল কিন্তু ক্রমশই বেশি স্পষ্ট হচ্ছিল। তারপর, সেটা চোখের সামনেই থাকে–তিস্তার ভেতরে আড়াআড়ি বিরাট প্রাচীর, তিস্তার নতুন একটা পাড়ই যেন, তাতে নানা রঙের গেট, নানা রঙের নিশানের মত কিছু উড়ছে।
এমন দৃশ্যে বাঘারু থমকায় না। আপলাদের ভেতরে কোনো নতুন দৃশ্যই বাঘারুকে থমকে দিতে পারে না। তার শুধু একটু সময় দরকার–দৃশ্যটাকে আপনাদেরই অংশ হিশেবে গেথে নেয়ার। শরীর.. ছাড়া ত কিছু নেই বাঘারুর। সেই শরীর দিয়ে যে আপলচাঁদ আর ঐ তিস্তা ব্যারেজটাকে মিলিয়ে নিতে চায়। বাঘারুর কাছে কোনো দৃশ্যই আপাদে অসংলগ্ন থাকতে পারে না। সে ব্যারেজকে। আপলাদের ও নিজের সংলগ্ন করে নিতে চায়।
এই প্রক্রিয়াটা কিছুক্ষণ ধরে চলছে আর বাঘারু মিছিলটা নিয়ে ঐ নতুন প্রাচীর, নানা রঙের ঝাতা, নানা রঙের মঞ্চের দিকেই এগচ্ছে। এগতে-এগতে রাস্তাটা প্রায় শেষ হয়ে আসে, সামনে যদিও। ফরেস্টের গাছ-গাছালি আরো একটু ছড়ানো, তবু ওখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় তিস্তা ব্যারেজ। একটু ডাইনে। পাহাড়ের মত প্রাচীর। তার ওপর প্রায় আকাশের কাছাকাছি মঞ্চ। লাল-নীল কত রং। কত গেট। মানুষজন ততটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে না কারণ এটা ত প্রায় পেছন দিক। নিশ্চয়ই সামনে মানুষজন থৈ থৈ করছে। এত বড় গেট আর মঞ্চ দেখলেই ত বোঝা যায়, তার সামনে কত লোক থাকতে পারে।
সুস্থির পেছন থেকে চেঁচায়, এইঠে খাড়ান। তারপর সাইকেলটাতে দুবার প্যাডল করে মিছিলে সামনে আসতে-আসতে বলে, ভাল করি খাড়িবেন আর শ্লোগানগিলা একটু প্র্যাকটিস করি নেন। সাইকেলটা বা হাতে ধরে সুস্থির ডান হাত আকাশে তুলে শ্লোগান দেয়, উত্তরখণ্ড পাটি, জিন্দাবাদ।
সুস্থির বলে ওঠে, দেখিলেন না ক্যানং বড় মিটিং হবা ধরিছে? আরো বড় করি কহেন–উত্তরখণ্ড। ঐ মঞ্চ, নিশান এইসব এদের উৎসাহিত করে থাকবে। বেশ জোর গলায় তারা জবাব দেয়, জিন্দাবাদ।
তিস্তা ব্যারেজ বন্ধ করো, বন্ধ করো।
বামফ্রন্টের পৌষ মাস, রাজবংশীদের সর্বনাশ।
তিস্তা ব্যারেজের জলে ভাসিবে কায়, রাজবংশী সমাজ হায়-হায়।
তোমার আমার সর্বনাশ, তিস্তা ব্যারেজ নিপাত যাক।
সবগুলো শ্লোগান যখন তারা বেশ রপ্ত করে নিচ্ছে এরকম ভাবে, তখন ঐ মঞ্চের দিক থেকে একটা জিপ ছুটে আসে। এরা নিজেদের শ্লোগানের আওয়াজ শুনছিল বলে হয়ত গাড়ির আওয়াজ শুনতে পায়নি। তিস্তার এমন আরণ্যক পাড়ে গাড়ির আওয়াজ-টাওয়াজ তেমন বোঝাও যায় না।
গাড়িটা একেবারে বাঘারুর সামনে এসে দাঁড়ায়। সুস্থির বাঘারুর একটু পেছনে দাঁড়িয়ে মিছিলকে শ্লোগান দেয়াচ্ছিল। গাড়িটা থামামাত্রই গাড়ির পেছন থেকে লাঠি ও বন্দুক হাতে কয়েকজন পুলিশ নেমে এগিয়ে আসে আর ড্রাইভারের পাশ থেকে এক অফিসার নেমে ড্রাইভারকে পেছিয়ে খোলা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতে বলে ব্যারেজের দিকে আঙুল তুলে। জিপগাড়িটা পেছিয়ে গিয়ে তিস্তার পাড়ে ডাইনে ঘোরে, ঘুরে আবার একটু পেছিয়ে তিস্তা ব্যারেজের দিকে মুখ করে দাঁড়ায়, স্টার্ট বন্ধ করে কিনা বোঝা যায় না। আর, সেই অফিসার এসে বাঘারুর সামনে কিন্তু একটু বয়ে সরে দাঁড়িয়ে সুস্থিরকে বলে, মিছিল এখনই ভেঙে দিন, শ্লোগান দেবেন না।
এমন আচমকা পুলিশ, লাঠি, বন্দুক দেখে মিছিলটা কেমন নড়ে ওঠে। সুস্থির পুলিশ অফিসারের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে মুঠো পাকানো ডান হাত তুলে চিৎকার করে ওঠে, উত্তরখণ্ড পাটি। মিছিলের মাত্র কয়েকজন যেন অভ্যেসে জিন্দাবাদ বলতেই পুলিশ অফিসার দুপা পেছিয়ে গিয়ে বা হাতের আঙুল নেড়ে পুলিশদের নির্দেশ দেয়। বন্দুক হাতে পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে কিন্তু দুপা এগিয়ে আসে। আর লাঠি হাতে পুলিশ দুটে আসে–লাঠি উঁচিয়ে নয়, বরং লাঠি নামিয়ে। মিছিলের দু-এক জন দৌড়ে পালাতে হবে বুঝতে না বুঝতেই পুলিশরা মিছিলের দুপাশে দাঁড়িয়ে পড়ে লাঠি মাথার ওপর তুলে মিছিলের দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে পিটুতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে মিছিলটা ছত্রখান হয়ে যায়–যে যেদিকে পারে দৌড়ায়, সাইকেলওয়ালারা সাইকেল ফেলে দৌড়য়। আর, পুলিশরা বেশি ছোটাছুটি করে না বটে কিন্তু প্রায় সবাইকেই লাঠির নাগালে টেনে আনে আর এক-এক মারে মাটিতে শুইয়ে দেয়। সেই অফিসার এক পুলিশকে ডেকে সুস্থিরকে দেখায়। সে বেশ তাগ করে সুস্থিরের পিঠের মাঝখানে লাঠিটা মারে। সুস্থির উপুড় হয়ে পড়ে গেলে পুলিশটা লাঠি দিয়েই তাকে চিৎ করে নিয়ে লাঠিটা মাথার ওপর তুলে সুস্থিরের হাঁটুটাতে প্রচণ্ড জোরে মারে। মাত্র মিনিট কয়েকের মধ্যে ফরেস্টের ঐ জায়গায়, তিস্তা ব্যারেজের অত কাছে, উদ্বোধন মঞ্চের পেছনে অতগুলো মানুষ কেমন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে। কোনো চিৎকার চেঁচামেচি পর্যন্ত হয় না। একটা জিপে আর কটা পুলিশ আঁটে? সেকটাও ছিল কিনা সন্দেহ! তারা মাত্র কয়েক মিনিটে উত্তরখণ্ডের স্বতন্ত্র রাজ্যের দাবি আপলৰ্চাদের এক টুকরো জমির ওপর মেরে, ভেঙে, থেঁতলে ফেলে দিয়ে চলে যায়।
.
বাঘারু যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকে। ঝাণ্ডাটা তার কাঁধেই থাকে। সে পালাতে পারে না, বা, পালাতে পারেনি, বা, পালায়নি, বা, পুলিশের সামনে তার শরীরের পালানোর প্রতিক্রিয়া ঘটেনি। জিপটা তার একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। অফিসারও তার সামনে তার একটু বায়ে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশ তাকে এড়িয়ে পেছনের মিছিলটাকে ধরেছে, যেমন, পেছনের মিছিলটাকে ধরতে একটা বা দুটো গাছও এড়াতে হয়েছে। এড়িয়ে যেতে-যেতেও তারা বাঘারুকে লাঠি দিয়ে মেরে গেছে। কিন্তু কখনোই বাঘারুকে প্রধান লক্ষ্য করে নি। হয়ত, বাঘারু, অত লম্বা বলেই পুলিশদের লাঠি তার শরীরের তেমন কোনো লোভনীয় অংশকে লাঠির আওতায় আনতে পারে নি। হয়ত, বাঘারু, তার ঐ অত লম্বা একটা ন্যাংটো শরীরে, এমনকি পুলিশের পক্ষেও অযোগ্য ঠেকেছে। মিছিল উপলক্ষে গয়ানাথ তাকে অন্তত একটা জামা আর খাটো ধুতি দিলেও পুলিশ হয়ত, তাকে চিনে নিতে পারত।
পুলিশ বাঘারুকে মারেনি বা মারের প্রধান লক্ষ্য করেনি। বাঘারুও পুলিশের লাঠিবন্দুক-গাড়ি দেখে পালায়নি। হয়ত এটা আপলচাঁদ বলেই পালায়নি। এই আপলাদের, এই জংলাজমির, এই গাছ-গাছালির সবটুকু তার এত বেশি চেনা যে সে বুঝেই উঠতে পারে না এখানে সে কোথার আত্মগোপন করতে পারে। একটা মানুষ ত তার বাড়িতেই লুকনোর কোনো জায়গা পায় না–সমস্তটাই তার কাছে এত প্রকাশ্য। তাই তাকে পুলিশ আর মিছিল সব মিশিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। গয়ানাথ তাকে ঝাণ্ডা দিয়ে দাঁড় করিয়েছে। ঝাণ্ডার পেছনে মিছিল। সে-মিছিল এমন তছনছ হয়ে গেলেও বাঘারু দাঁড়িয়েই থাকে।
মিছিলপর্ব এখানেই শেষ হোক। এর পরের পর্বে পুলিশদের পেছন-পেছন যাওয়া যাবে–পুলিশ কেন আসে, কোত্থেকে আসে।
মিছিলের লোকজন যে-যার মত ফিরে গিয়েছে। সাইকেলওয়ালারা সাইকেল নিয়েই ফিরে গেছে। কেউ বাঘারুকে কিছু জিজ্ঞাসা করে নি। কিন্তু এই সব প্রস্থান ঘটে যাওয়ার পর এই আপলচাঁদ, গাছ-গাছালি, জংলাজমি, সামনের তিস্তা আবার বাঘারুর কাছে পুরোপুরি ফিরে আসে। শুধু তিস্তার ভেতরে ঐ বিরাট প্রাচীর, প্রাচীরের ওপর অত গেট আর মঞ্চ, গেটে আর মঞ্চে এত ঝাণ্ডা–এই সব ঐ তার স্বদেশের সঙ্গে ঠিক মেলে না।
কিন্তু মেলাতে ত হবে। বাঘারুকেই মেলাতে হবে। এখানে এই আপাদে বাঘারু না-দেখলে একটা বিরাট লাম্পাতি গাছের বাড় আটকে যায়। কী লাভ বেড়ে যদি বাঘারুই না দেখে? এখানে এই আপাদে একটা লতার কুঁড়ির ফুল হওয়া আটকে যায় বাঘারু না-দেখলে। কী লাভ বেড়ে যদি বাঘারুই না দেখে? এখানে এই তিস্তার একটা স্রোতের একটু উদাসীন সরে যাওয়াও থমকে যায় বাঘারু না-দেখলে। কী লাভ সরে গিয়ে যদি বাঘারুই না দেখে? আর, এই আপলাদের পাশে এই তিস্তা নদীর ভেতর এমন একটা আড়াআড়ি পাহাড় পুঁতে দিয়ে উত্তর আর দক্ষিণের নদীটাকে আলাদা করে দেয়া হবে বাঘারু না-দেখতেই? সেই পাহাড়ের গায়ে এত গেট আর এত মঞ্চ আর এত স্টেজ হবে বাঘারুকে না-দেখিয়েই? এই আপলচাঁদ ফরেস্ট আর তিস্তা দিয়ে তৈরি তার স্বদেশে ঐ তিস্তা ব্যারেজটাকে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে বাঘারু সেই উদ্বোধন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যায়। দুপা গিয়েই বোঝে কাঁধে তার ঝাণ্ডাটা তখনো আছে। সে বা হাত বাশটা থেকে সরিয়ে নেয় আর বা কাঁধে একটা ঝাঁকি দেয়। ঝাণ্ডাটা মাটিতে পড়ে যায়, বাঁশের গোড়াটা পড়ে বাঘারুর পরবর্তী পদক্ষেপের নীচে। সেটা মাড়িয়ে বাঘারু এগিয়ে যায়।
এবার বাঘারুর দুই হাত খালি, কাধ খালি, সারা শরীর হাল্কা। একটুকরো নেংটি ছাড়া তার আর-কোনো আবরণ নেই। এখানে, আপলচাদে, তিস্তার পাড়ে, যেমন পা ফেলতে সে আজন্ম অভ্যন্ত সেই ছন্দে তার শরীরটা দুলে ওঠে। দোলে। বাতাসে দুলতে-দুলতে বাঘারু তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধনের ঐ রঙচঙে স্টেজ আর প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে–দেখিবার নাগে ঐঠে কি সত্যিই একখান নতুন নদী বানিবার ধরিছে, নাকি, ময়নাগুড়ির ঐ বেটিছোয়াখানের নাখান নাচানাচি নাগাবার ধরিছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন