দেবেশ রায়
ক্রান্তি হাটের হাটখোলায় সন্ধ্যা নেমে গেল। রাস্তার ওপরের মিষ্টির দোকানের হ্যাজাকের আলোতে মাঠের ঐ কিনারাটা উজ্জ্বল দেখায়। অন্য দোকানগুলোতেও আলো জ্বালানো হয়েছে। ফলে সুহাসের, এই বারান্দা থেকে রাস্তার ওপরটাকে, দোকানগুলোর চালাঘরের ওপর দিয়ে উজ্জ্বলতর দেখায়। ধীরে-ধীরে রাস্তার ধারের গাছগুলির নীচের পাতাগুলোতেও আলোর ছিটে লাগে।
সুহাসের বারান্দা থেকে রাস্তার এক অংশ দেখা যায় না, কিন্তু ওপরের আলোর আভা বোঝা যায়। সেটুকু বাদ দিয়ে হাটখোলার বাকি অংশটা সন্ধ্যায় অন্ধকারে দুমড়েমুচড়ে আছে। নড়বড়ে সব বাশের ওপর ভামনির ছাউনিগুলো মাটিতে আরো থুবড়ে পড়ে। সন্ধ্যা যত বাড়ে, মাটি আর আকাশের মাঝখানের ফাঁকটাও ততই বাড়ে।
একদল লোক মাঠটা পার হয়ে হলকা ক্যাম্পের এই ঘরের দিকে আসছে। সুহাস বারান্দায়, বসেছিল। অতজন লোককে একসঙ্গে আসতে দেখে সুহাস অনুমান করে, সার্ভের ব্যাপারে কিছু বলার জন্য দল পাকিয়ে আসছে। সে ঠিক করে ফেলে, কথা বলতে হলে সার্ভের সময় বলতে হবে আর আপত্তি থাকলে লিখিত দিতে হবে-সে সরকারি দলই তোক আর বিরোধী দলই হোক। প্রথম থেকেই সুহাস এ ব্যাপারটায় আইন-অনুযায়ী চলতে চায়, যাতে কারোই কিছু বলার না থাকে।
দলবলটা যখন মাঠের মাঝখানে, সুহাস শুনতে পায়, আপনার এখানে একটু বসব।
শুনেও প্রথমে সুহাস বুঝতে পারে না। চেয়ার থেকে উঠে সিঁড়ির দিকে একটু এগিয়ে যায়। অন্ধকারে তখনো চিনে নিতে পারে না, কে। তারপর হঠাৎ হাঁটার ভঙ্গিটা দেখে বুঝে ফেলে, এম-এল-এ।
ঘরের ভিতর থেকে প্রিয়নাথ এসে আগেই দাঁড়িয়েছিল। সে এবার লণ্ঠনটা, এনে দরজার বাইরে রাখে। আর, এম-এল-এ সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে-উঠতে বলে, আপনার এখানে একটু বসব।
আরে হ্যাঁ হ্যাঁ, আসুন আসুন, বলে সুহাস প্রিয়নাথের দিকে তাকাতেই প্রিয়নাথ ঘরের ভেতর থেকে একটা চেয়ার নিয়ে বাইরে দেয়। চেয়ারটা বাইরে আনতে-আনতেই এম-এল-এ উঠে এসেছে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তা হলে চেয়ারটা দেবে কোথায়? এম-এল-এই সরে জায়গা করে দেয়। প্রিয়নাথ প্রথমে সিঁড়ির মাথাতেই চেয়ারটা রাখে। কিন্তু বোঝে, তাতে ওঠা-নামার অসুবিধে হবে। তাই একটু সরিয়ে দেয়।
এম-এল-এ চেয়ারটা দেখে। তারপর সেটাকে আর-একটু কোনাকুনি করে নিয়ে বসে, পাশে মাটিতে তার ব্রিফকেসটা রেখে। বসে পড়তেই এম-এল-এর ডান পাশে সিঁড়ি, বাপাশে ঘরের দরজা, সামনে বারান্দা, আর কোনাকুনি মাঠটা পড়ে। ঠিক কোথায় বসলে সবটাই তার সামনে পড়বে এ যেন এম-এল-এ অভ্যেসেই ঠিক করে নিতে পারে।
সুহাস প্রিয়নাথকে বলে, একটু চা এনে দেয়া যাবে, প্রিয়নাথবাবু? সে তার ঘরের দিকে যায় পয়সা আনতে। প্রিয়নাথ তার পেছন-পেছন দরজার কাছে সুহাসকে ধরে বলে, স্যার, স্টোভটা জ্বালিয়ে বানিয়ে দেই স্যার? আমাদের ত রান্নাও চাপাত হবে।
জ্যোৎস্নাবাবু–বিনোদবাবুরা কোথায়, জানেন?
কাছাকাছিই আছেন কোথাও স্যার, চলে আসবেন। অনাথ একটু গেছে কাঁঠালগুড়ির মোড়ের দিকে, ওদের দেশের একটা দল নাকি ওখানে থাকে।
আচ্ছা, চা করুন তা হলে।
আপনি খাবেন ত স্যার?
দেবেন এক কাপ, সুহাস কিছু ভাবে, প্রিয়নাথ ফেরার জন্যে ঘুরলে বলে, এখনই রান্না চাপাবেন না, ওঁরা এসেছেন—
প্রিয়নাথ একটু অবাক হয়ে বলে, কেন স্যার?
ওরা কেন এসেছেন বুঝতে পারছি না ত, যদি আমাদের কাছেই কাজকর্ম থাকে।
প্রিয়নাথ একটু হেসে বলে, স্যার, তা হলে ত আপনার কোনোদিনই খাওয়া-ঘুম হবে না, এ ত লেগেই থাকবে।
প্রিয়নাথের হাসিতে অভিজ্ঞতার এমন ছাপ ছিল যে সুহাসকে মেনে নিতে হয়।
প্রিয়নাথ ফিরে যায়।
সুহাস ঠিক বুঝে উঠতে পারে না কী ভাবে তৈরি হবে। হতে পারে, এম-এল-এ তাকে কিছু কাগজপত্র দিয়ে যাবে। সুহাস রেখে দেবে। তারপর সুহাস ভাবে, রশিদও দেবে। এই কাগজগুলোর একটা আলাদা ফাইল করবে। কিন্তু এখানে ত আর অফিসের আর-কেউ নেই। সে নিজেই ফাইলটা রাখবে। যদি জবাব দেয়ার থাকে, জবাবও দেবে। সুহাস যেন বুঝতে পারে, ঐরকম একটা নিয়মকানুনের বেড়া ছাড়া সে নিজেকে বাঁচাতে পারবে না। সুহাস ফেরে। প্রিয়নাথের রাখা লণ্ঠনের লাল আলোতে মেঝেটা চকচক করছে, এম-এল-এর চেয়ারের পায়া আর এম-এল-এর বাঁ পায়ের ওপর ওপর তোলা ডান পায়ের আঙুলগুলোতে আলো পড়েছে। এম-এল-এ পা-টা নাচাচ্ছে বলে বারান্দার সিলিঙে লণ্ঠনের আলোটায় ছায়া পড়ছে আর আলো হচ্ছে। এম-এল-এর মুখটার ছায়া দেয়ালের কোনায় একটু লেগে বাইরে চলে গেছে।
.
এম-এল-এ সুহাসকে জিজ্ঞাসা করে, আপনার এখানে আর গোলমাল হয় নাই ত?
সুহাস একটু আলগা দাঁড়িয়েছিল। চেয়ারটা নিয়ে সে এম-এল-এর কাছে বসে না। আবার, চেয়ারটা এখন যেখানে আছে, সেখানেও যায় না। চেয়ার আর এম-এল-এর চেয়ারের মাঝখানে দাঁড়ায়, ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাস নিয়ে। যদি এম-এল-এ তার কছেই এসে থাকে তা হলে সেটা আগে বলুক। এম-এল-এর কথার জবাবে সুহাস বলে, না-আ, তারপর বোঝে আরো কিছু বলা দরকার, যোগ করে, আমাদের সঙ্গে আর কার কী গোলমাল হবে?
এম-এল-এ একটু জোরে হেসে ওঠে, এই আপনি ভাবছেন নাকি? আপনার সঙ্গেই তো গোলমাল।
কেন? আমাদের সঙ্গে আর গোলমাল লাগবে কি সে, এম-এল-এ কথাটা যে-হালকা চালে বলে সেটা সুহাসকেও ঘেঁয়; যেমন দেখব, তেমন লাইন টানব– এখানে আল, এখানে রাস্তা, এখানে গাছ।
ঐ সব আল, গাছ এইসব দাগ দিবেন কেন? বেশ হাসি-হাসি মুখেই এম-এল-এ জিজ্ঞাসা করে, যেন ধাঁধা।
আছে, তাই দেব।
হ্যাঁ, ঐ ত মজা। ঐটা যদি না থাকে তয় ত একজন বলিবার পারে ঐ জায়গাটায় গাছ নেই।
না থাকলে বলবে, নেই।
না হয়, না হয়। যার সম্পত্তির সীমা ধরেন ঐ গাছ পর্যন্ত, সেইলা ত চাহিবে গাছটা না-থাকুক।
কেন?
কহিবার পারিবে, গাছ নাই ত মোর জমিখানারও সীমা নাই।
সুহাস হেসে ফেলে, তা অবিশ্যি পারে।
আর নিভৃত আলাপের সুরে এম-এল-এ বলে, তা উ ত আপনাকে আসিয়া বলিবে যে ম্যাপে গাছটা দিবেন না।
সুহাস আরো হেসে বলে, হ্যাঁ, তা পারে–
এম-এল-এ তখন হেসে বলে, দেখেন না, এক বিঘত জমি নিয়া খুনাখুনি পর্যন্ত হওয়া ধরে? আর, আপনি ত এই তামান জমির সীমা টানাটানি করিছেন।
সুহাস হাসি-হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে। এম-এল-এ একটু চুপ করে থেকে বলে, গোলমাল তো আপনার সঙ্গেই হইবে, কত গোলমাল।
এম-এল-এর কথার ভেতর নিভৃত আলাপের ভঙ্গি ছিল। তার একটা কারণ, আলাপটা সত্যিই নিভৃত ছিল। আর-একটা কারণ, সুহাস অনুমান করতে চায় কি এই নিভৃত আলাপে এম-এল-এ তাকে কিছুটা সমর্থনই দিয়ে যেতে চায়! ভেবে ফেলেই সুহাস সাবধান হয়, এই সমর্থনটুকুর বদলেই হয়ত যাওয়ার আগে তাকে কোনো ব্যক্তিগত ও দলগত কাজের কথা বলবে। সুহাস আসলে বুঝতে পারছে না–এম-এল-এ তারই বারান্দায় এসে বসল কেন। সেটা না-বোঝা পর্যন্ত সুহাসের অস্বস্তি কাটবে না।
প্রিয়নাথ কাঁচের গ্লাসে চা এনে দেয়। তার পর জিজ্ঞাসা করে, একবার এম-এল-এর দিকে, আর একবার, সুহাসের দিকে তাকিয়ে, একটা বিস্কুট দেব?
দাও, একখান বিস্কুট দাও, এম-এল-এ বা হাতে চায়ের গ্লাশটা নিয়ে ডান হাতটা বাড়িয়ে রাখে। প্রিয়নাথ বিস্কুট আনতে যায়। সুহাস তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করে, আপনাকে কিছু খাবার এনে দেবে?
আরে নানা, প্রিয়নাথ বিস্কুটটা এনে দিলে এম-এল-এ গ্লাশের চায়ে নরম করে করে খায়। সুহাস বিস্কুট নেয় না। চায়ে চুমুক দিয়ে এম-এল-এজিজ্ঞাসা করে, আপনি ত এই প্রথম এই কাজে আসছেন, না?
জবাব দিয়েও সুহাস ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, সে লোকটিকে পছন্দ করছে, না অপছন্দ করছে। লোকটার কথা বলার ভাষাটা এমন–রাজবংশী ভাষার সঙ্গে চলতি বাংলার মিশেলটা নিয়ে কোনো অস্বস্তি নেই। বলতে বলতে বলতে বলতে তার নিজের এই ভাষা তৈরি হয়ে গেছে। সেটা দিয়ে সে। সবার সঙ্গে সব জায়গাতেই কথা বলতে পারে–কলকাতাতে, নিশ্চয় তার পাটিটাটিতে, আবার তার এই সব গ্রামেও নিশ্চয়। লোকটাকে বেশ কাজের লোক বলে মনে হয় তার মুখের কথা শুনেই। আবার চেয়ারটা ভরে বসেছে একেবারে পাইকার-দেউনিয়ার মত, পায়ের ওপর পা তুলে, জামাটা ঘাড়ের পেছনে ঠেলে দিয়ে। চায়ে চুমুক দিয়ে এম-এল-এ আবার বলে, গ্রামের জমিজমার ত ধরেন কেনে দখলই হচ্ছে আইন। দখল যার জমি তার। আপনি যদি একখান লাইন টানি দিয়া আমার জমিখানের ভাগ, ধরেন, আর-একজনের জমির ভিতর ঢুকাইয়া দেন, তা হলি ত আমি পরের দিন লোকজন লাঠিসোটা নিয়া ঐ জমিটার দখল নিয়া নিম। ব্যাস, কথাটা শেষ করে এম-এল-এ বলে, ত আপনার সঙ্গে গোলমাল হবে না? প্রত্যেকদিন গোলমাল হবে আপনার মাপামাপি নিয়া। তবে আপনি ত শক্ত অফিসার। জোতদারদের বাড়ি খাবেন না, বলে দিছেন। জোতদাররা ভয় খাইছে, এম-এল-এ এবার বেশ জোরে-জোরে হেসে ওঠে।
সুহাস যেন নিজের অবস্থাটা বোঝানোর জন্য বলে, আমরা তো আর প্রপাটিরাইট মামে সম্পত্তি কার সে-সব ঠিক করছি না, সে-সব ত সিভিল কোর্টের ব্যাপার।
প্রপাটি রাইট-টাইট ত আপনার গয়ানাথ জোতদার, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট আর আনন্দপুর চা বাগানের ব্যাপার। আর-সব মানুষের রাইট মানে ত এক বর্ষার চাষ। ব্যাস। কোর্টে যাইতে আমাদের সব মানষি ভয় পায়। সেইখানে ধরেন গ্রামের মাতব্বর, কি ধরেন পার্টির নেতা, কি ধরেন আপনাদের মতন, অফিসার যা হুকুম দেন সেটাই সবাই মানি নেয়। মানি নিবার চায় অন্তত। সাধারণ মানুষের কাছে ত সরকার মানেই সরকারি অফিসার–এই ধরেন ডি. সি, এস.ডি.ও, জে এল আর ও, থানার দারোগা আর আপনাদের মতন আরো সব অফিসার। অফিসার ভাল না-হলে ত সরকার বদলি যায়। এই দেখেন না, সাতালডির ব্যাপার। সব ইঞ্জিনিয়ারগুলা মিলি শয়তানি করে।
সুহাস একটু চমকে বোঝে, এই লোকটি এখানকারই এম-এল-এ বটে, কিন্তু সত্যি করেই তার পেছনে অভিজ্ঞতার এমন একটা ভূমি আছে, যেখান থেকে কোনো সময়েই লোকটা সরে না। আর সেই কারণেই এতক্ষণ তার কথায় এমন ঘনিষ্ঠতা বোধ করে ফেলছিল সুহাস। এই লোকটিও কি সেই কারণেই সুহাসের কাছে এসে বসল? সুহাসও এখানকার লোক নয়, তাই তাদের ভিতর, এখানকার অভিজ্ঞতা নিয়ে, এই সব কথা বিনিময় হতে পারে।
সুহাস জিজ্ঞাসা করে, আপনাকে তো নিশ্চয়ই এসেম্বলিতে প্রায়ই বলতে হয়।
মাঝে-মাঝে বলতে হয়, লোকাল ব্যাপার-ট্যাপার থাকলে, আর দু-এক সময় কোশ্চেন জিজ্ঞাসা করতে হয়। আমাদের অন্য কমরেডরা আছেন সব, তারাই বলে দেন।
লোকটি থেমে গেলে.সুহাস জিজ্ঞাসা করে বসে, আপনার ভাল লাগে এসেম্বলি? এম-এল-এচুপ করে যায়। সুহাস বোঝে, সে ভেবে নিচ্ছে কথাটার জবাব দেবে কি দেবে না। নাকি আসলে জবাবটাই ভাবছে, এমন করে কোনো কথা হয়ত তার এর আগে মনে হয় নি? অথবা, কতটা বলবে আর কতটা বলবে না, তার সূক্ষ্ম হিশেব?
এম-এল-এ নীরবে একটু হাসে, আপনি খুব জবর প্রশ্ন করলেন, আবার একটু চুপ করে থেকে বলে, হয় সত্যি জবাব দিব, না-হয় ত চুপ করি থাকব, আবার একটু চুপ করে থেকে বলে, আমিও আপনাকে জিজ্ঞাসা করতে পারি কেন এই কথা জিজ্ঞাসা করলেন। সুহাস বোঝে না এই ভাষায় প্রশ্নটা আসলে করাই হল কি না। এম-এল-এ বলে, কিন্তু সেটা ত আমি জানি, আপনারা কেন এই কথা জিজ্ঞাসা করেন জানি, আমি ঠিক উত্তরটাই দিব।
একটু সময় নিয়ে এম-এল-এ বলে, প্রথম থিকেই বলি। বড় ঘুম পায়।
সুহাস হাসে, আমরা ত তাই শুনি, এসেম্বলিতে ভাল ঘুম হয়।
হ্যাঁ। এয়ার কনডিশন ত। আর কলকাতায় সে গরম। ঘামিটামি ঢুকিলেন আর অনং ঠাণ্ডা। শরীরটা চট করি ছাড়ি দিবার চায়। প্রথম প্রথম ত চোখ দুইখান খুলা রাখাই এক হাঙ্গামা হয়া গেইল। যখনই যাই তখনই ঘুমাই। তার পর ভাত না খাইয়া রুটি খাওয়া ধরিলাম।
এসেম্বলির জন্যে খাওয়া বদলালেন?
না বদলাই করি কী। আমরা ত ভাত খাই, জানেনই, হাইজাম্পের নাখান। অত ভাত খায়া ঐ হলে ঢুকিবার বাদে মরার মতন ঘুম আসে। এখন ঘুমটা কমি গেইসে। ইচ্ছা করিলে ঘুমাবার পারি। ইচ্ছা করিলে জাগি থাকবার পারি। কিন্তু মাথাধরাশান মোর এ্যালায়ও সারে নাই।
মাথা ধরে?
হ্যাঁ।
বক্তৃতায়?
না। ঐ এয়ার কনডিশনে। যখন বাহিরে আসি কেমন গা গোলায় আর মাথা ধরে আর বুকটা ঠাণ্ডা লাগে।
তা হলে যান কেন? আপনাকে ত আর অত ঘন-ঘন বলতে হয় না!
আমাকে বলতে হয় না কিন্তু আমাদের সব প্রফেসর কমরেডরা আছে, উকিল কমরেডরা আছে। ভাল বলে। ইউনিয়নের নেতারাও ভাল বলে। তাদের সব পয়েন্ট দেই, কী কেস বুঝাই, কোর্টের মতন আর কী!
কোর্টের মতন?
ঐ আর-কি। আপনি আমি কি আর কোর্টে গিয়া সওয়াল করতে পারি? তার জন্য উকিল-মোক্তার। লাগে। কালা কোর্ট লাগে। ওরা সব কোর্টের আইন জানে। তেমনি এসেম্বলিরও নিয়ম আছে সব। কখন কোনটা বলা যায়। বললে ঠিকমত লাগবে। কখন কোন কথাটা তুলতে হয়। সেই সব যারা জানে তারাই বলা-কওয়া করে।
আপনিও তো উকিল। মেম্বার
জুনিয়র জুনিয়র বলে এম-এল-এ হো হো করে হেসে উঠে যোগ করে, আপনি আমার ভোটার না ত তাই বলি দিলাম। ভোটারকে বলি আমি না গেলে ত এসেম্বলি অচল বলে এম-এল-এ আরো হাসে। সুহাসও তার সঙ্গে যোগ দেয়। তারপর জিজ্ঞাসা করে, তাহলে যান কেন ওখানে?
এইটা আপনারা কী বলেন? এম-এল-এ হাসি কমাতে কমাতে বলে, পার্টি করি মানে তো ক্ষমতা চাই। এসেম্বলিতে যে-পার্টির মেম্বার বেশি সেই পার্টি ক্ষমতায় আসে। আমরাও ক্ষমতায় আছি। পাটি করিবেন কিন্তু ক্ষমতা নিবেন না এ ক্যানং করি হবে? বিয়া বসিবেন কিন্তু বউয়ের সঙ্গে শুবেন না–এ কি হয়? সে ত হিজড়ারাও কবার পারে–গর্ভ ধরে শুয়াররা আর এক মানষিই পারে হিজড়া হবার। এম-এল-এর হাসি উত্তাল হয়ে ওঠে। সুহাসকে, যেন পরাজিতের মত স্মিত থাকতে হয়।
.
এম-এল-এ-র সঙ্গে যে-দলটা এসেছিল তার কেউ-কেউ চায়ের দোকানে গেছে আর কেউ-কেউ সিঁড়ির ওপর হেলান দিয়ে বসে। প্রিয়নাথের লণ্ঠনে এত কালি পড়েছে সেটার আলোতে আর-কিছু দেখা যায় না, শুধু সেটাকেই দেখা যায়। কিন্তু ক্রান্তি হাটের মত জায়গার একটা আস্ত এম-এল-এ এরকম অন্ধকারে একটা বারান্দায় বসে থাকবে-এটা ত খুব স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। পরন্তু এম-এল-এ আজ দুপুরেই সার্ভে ক্যাম্প দেখে, সেখানে সকলের সামনে একটা বক্তৃতা দিয়ে, ক্রান্তি হাট দিয়ে, আপলাদ ফরেস্ট দিয়ে, সেই ফুলবাড়ি বস্তি চলে গিয়েছিল। আবার, সন্ধ্যাবেলায় ফিরে এসেছে। সঙ্গে ফুলবাড়ির লোকজন। লোকজন অবিশ্যি এম-এল-এর সঙ্গে সব সময়ই থাকে। কিন্তু দুপুরে ক্রান্তি হাট থেকে গিয়ে, আবার সন্ধ্যাতেই ক্রান্তি হাটে ফিরে আসা, এটা খুব সাধারণ ব্যাপার নয়। এম-এল-এরা সব সময় ফোঁড়াখুঁড়ি করে চলে। এদিক দিয়ে ঢুকে ওদিক দিয়ে বেরয়। এই বীরেনবাবু এম-এল-এ ফুলবাড়ি থেকে মানাবাড়ি-ওদলাবাড়ি দিয়ে বেরলে টুরে তার ঐ—-জায়গাটাও দেখা হয়ে যেত, লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা হতে পারত। তা না করে যখন সে ফিরে এসেছে তখন ঘটনা খুব পাকিয়ে উঠেছে, নিশ্চয়। এসে, আবার বারান্দায় বসে আছে? এম-এল-এ কখনো এক জায়গায় বসে থাকে না, মিটিং ছাড়া। এম-এল-এ মানেই চলছে–হয় হেঁটে, নয় গাড়িতে, না-হয় প্লেনে, না-হয় ট্রেনে। মিটিং ছাড়া এম-এল-এ একা-একা বসে আছে, মানে, ঘটনাটাও বসে পড়ার মত।
এই রকম একটা ঘটনা ক্রান্তি হাটেই ঘটে যাবে, আজ সন্ধ্যাবেলায়, এর জন্য কেউ তৈরি ছিল না। এম-এল-এ কাউকে খবর দেয় নি। যাবার সময় বলেও যায় নি, ফিরে আসবে। সোজা হলকা ক্যাম্পে গিয়ে বারান্দায় বসেছে, অন্ধকারে! আর, এখানকার লোকজনকে সে-খবরটা শুনতে হয়, ফুলবাড়ি বস্তির যারা এম-এল-এর সঙ্গে এসেছে, চায়ের দোকানে তাদের কারো কারো কথা থেকে। হাটবার ছাড়া ক্রান্তি হাটের এই চায়ের দোকানে এতগুলো অচেনা মুখের লোক যদি একসঙ্গে বসে চা খায়, তা হলে তাদের কথাবার্তায় কান পাততেই হয়, আর তাতেই খবরটা জানা যায়। তখন তাদের সরাসরি জিজ্ঞাসাও করা যায়–কেন এসেছে, কোথায় আছে, কী ব্যাপার। ফুলবাড়ির ফুলঝোরার ওপরে যে ক্যালভার্টটা তৈরি হচ্ছিল, তাই নিয়ে গোলমাল। এম-এল-এ নাকি রেলিংটাতে এক লাথি মেরেছে আর রেলিংটা ভেঙে গেছে। ইনজিনিয়ারকে ডাকতে মালবাজারে তোক গেছে। ইঞ্জিনিয়ারকে এখানে ধরে নিয়ে আসবে।
দোকানপাতিতে যারা বসে ছিল, তারা ত হাট-কমিটির ঘরের দিকে, এখন হলকা ক্যাম্পের দিকে, হাঁটা দেয়ই, এম-এল-এর পার্টির লোকদের খবর দেয়ার জন্যেও কেউ-কেউ, ছোটে, আর কেউ-কেউ যায় তাদের দেউনিয়াদের জানাতে। গেরিমাটি রঙের জামাপরা ভদ্রলোক সিঁড়ি বেয়ে উঠে মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে বলেন, এইঠে কখন আসি বসিছ?
এই তো অ্যালায় আইচচু।
ফুলবাড়িঠে?
হয়।
ঐঠে কি লাথি দিয়া ব্রিজ ভাঙি দিছ!
না-হয়, না-হয়, বলে এম-এল-এ হাসে।
ত চলো কেনে, ঘরতে চলল, হাত মুখ ধোও, তার বাদে আসি বসিও, এইঠে কি মিটিং দিবেন আজি?
না-হয়, না-হয় মিটিং দিম কেনে?
কায় যে কহিল মালবাজারঠে ইনজিনিয়ার আসিবে।
আসিবে। মোরঠে কাথা আছে।
রাস্তা থেকে একটা দল মাঠে নামে। তাদের পেছনে একটা খুব চড়া আলো ঝুলিয়ে কেউ আসে। আচমকা ভাবটা কেটে গেলেই বোঝা যায়, হ্যাজাক। মাঠের লোকজনের লম্বা-লম্বা ছায়া বারান্দার আর ঘরের দেয়ালের আলোকে অন্ধকার দিয়ে ফালাফালা করতে করতে ক্রমেই ওপরে উঠে যায়। সেই লোজন, আর তাদের পেছনে একজন একটা টিনের থালার মধ্যে কয়েক কাপ চা আর একটা ডিশে মিষ্টি আর সিঙাড়া নিয়ে, এসে দাঁড়ায়। যার হাতে হ্যাজাকটা ছিল সে পেছন থেকে সামনে এসে বারান্দার ওপর আলোটা রাখায় লোকজনের খাড়া ছায়া বারান্দার দেয়াল থেকে বারান্দা গড়িয়ে মাঠে লম্বা হয়ে যায়। হ্যাজাকের পাশেই চা-মিষ্টির থালাটা নামিয়ে রেখে খালি গায়ের ছেলেটি বুড়ো আঙুলে ভর দিয়ে গলা বাড়িয়ে বলে, ঐ দোকানঠে পাঠাই দিছে, এততি
সেই গেরিমাটি-জামা ভদ্রলোক এতক্ষণে বারান্দায় উঠে এসে মিষ্টির ডিশটা তুলে এম-এল-এর সামনে ধরে বলে, ন্যাও; খ্যাও কেনে। একটা সিঙাড়া তুলতে-তুলতে এম-এল-এ সুহাসের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, সাহেবকে দেন।
ভদ্রলোক সুহাসের সামনে নিয়ে যায়। সুহাস একটা ছোট মিষ্টি তুলে নেয়। ভদ্রলোক আবার এম-এল-এর সামনে ধরে বলেন, তুমি খাও ত বীরেন, আত্তিরে রাত্রিতে) এইঠে থাকিবেন ত?
আরে না-হয়, মোক কালি জলপাইগুড়ি যাবা লাগিবে, মিটিং আছে, বলে, এম-এল-এ একটা মিষ্টি তুলে মুখে ফেলে আঙুলটা পায়ে মুছে বলে, মুই আর খাম না, তারপর মিষ্টির ঢোকটা গিলে ফেলে বলে ওঠে, আরে আবার চা-টা কোথায়?
গেরিমাটির জামাপরা ভদ্রলোক মিষ্টির ডিশটা থেকে একটা করে মিষ্টি ভাগ করে করে বিলি করতে করতে বলে, দিছু খাড়াও, তারপর তাড়াতাড়ি এসে ঐ থালাটার ওপর ডিশটা নামিয়ে রেখে, থালায় উপচনো চায়ের জলে আঙুলটা ধুয়ে, একটা কাপ তুলে এনে এম-এল-একে দেয়। এম-এল-এ চায়ের কাপে চুমুকটা দিয়েই বলে, এ-হে, এ তো ঠাণ্ডা হয়া গেইসে–, বলে এক চুমুকে কাপটা শেষ, করে দেয়।
সুহাস একটু আড়ালে চলে গিয়েছিল তার নিজের ঘরের দিকে। এম-এল-এ যে চা-টা মুখে দিয়ে কথাটা বলে ওঠে এতে যেন তাদের দুজনের মধ্যে অভিজ্ঞতার একটা বিনিময় ঘটে যায়, নাগরিক অভিজ্ঞতার। সে জিজ্ঞাসা করে, কী, চা খাবেন নাকি আর-এক কাপ?
সুহাসের কথার ভেতরই ইঙ্গিত ছিল–সে বানানোর কথাই বলছে, দোকান থেকে আনার কথা নয়।
আপনি খাবেন? তা হলে আমিও খাই, বলে এম-এল-এ হাসে।
সুহাস তার ঘরের কাছ থেকে এগিয়ে এসে প্রিয়নাথের ঘরে ঢোকে। প্রিয়নাথ তখন রান্না চাপিয়ে দিয়েছে, প্রিয়নাথবাবু, আপনার হাতের চা ত আমাদের ভাল লেগে গেছে।
বসেন স্যার, আমি দিচ্ছি করে, প্রিয়নাথ তরকারি কুটতে কুটতে বলে।
আপনি একা বঁধছেন?
ওঁরা এসে যাবেন স্যার। ও তো আমাদের ঠিক হয়ে গেছে স্যার।
সুহাস বেরিয়ে আবার তার ঘরের সামনে এসে চেয়ারটিতে বসে পড়ে।
তার মানে, এই এম-এল-এর রুচি-স্বভাবে কলকাতার ছোঁয়া লেগে গেছে? এই অঞ্চলের ভেতর প্রোথিত এই মানুষটির স্বাদে ও অভ্যাসে নাগরিকতা এসে যাচ্ছে? কলকাতা ও নাগরিকতার সেই টানেই কি লোকটি ফুলবাড়ি বস্তি থেকে এসে তার এখানে বসেছে, একই অভিজ্ঞতা বিনিময়ের লোভে?
এই একটু আড়াল থেকে সুহাস মনের এই প্রশ্নগুলি নিয়ে এম-এল-এর দিকে তাকায়। এম-এল-এ তখন তার পা নাচিয়ে-নাচিয়ে হাসতে-হাসতে সামনে মাঠের ভেতর ও পেছনে সিঁড়িতে দাঁড়ানো লোকগুলোর সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
.
আলো ফেলে রাস্তায় একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায়। কিন্তু আওয়াজ করতেই বোঝা যায় মোটর সাইকেল। মোটর সাইকেল চলার সময় যত আওয়াজ করে, দাঁড়ালে আওয়াজ হয় তার চাইতে বেশি। কয়েকবার হেঁচকি তুলে মোটরসাইকেলটা আবার চলতে শুরু করে। আস্তে-আস্তে চলছে বলে হ্যান্ডেলটা নড়ে আর আলোটা ব্যায়ের জঙ্গল আর ডাইনের বাড়িঘরের গায়ে আছড়ায়–যেন কিছু খোঁজাখুজি চলছে। আলোটা মাঠের ভেতর কিছু চলে আসে, আবার ঘুরে যায়। মোটর সাইকেলের আওয়াজটাও # বাড়ে-কমে। তারপরই মোটর সাইকেলের আলোটা এই বারান্দার দিকে পড়ে আর আরো আওয়াজ তুলে এদিকে ছুটে আসে। হেডলাইটের আলো বারান্দা টপকে ঘরের ভেতর চলে যায়, হ্যাজাকের আলোটা মুছে দিয়ে। কিন্তু মোটর সাইকেলটা হঠাৎ থেমে যায়। আওয়াজ বাড়ে, আলো বাড়ে কিন্তু মোটর সাইকেলটা আর এগয় না। সিঁড়ির ওপর থেকে কেউ বলে, ফাঁসি গেইছে। এম-এল-এ বলে ওঠে, দেখেন ত কায়, ঠেলি দিয়া আসেন কনেক। দুজন লাফিয়ে নেমে মোটর সাইকেলের আলোটার দিকেই ছুটে যায়–বলদের গাড়ি কাদোত গাড়ি গেইছে, ঠেলো এ্যালায়। আলোটা একটা আওয়াজ তুলে নিবে যায়।
তখন বারান্দায় হ্যাজাকের আলোতে দেখা যায় মোটর সাইকেলের ওপর একজন বসে আছে, আর-একজন, বেঁটেমত, সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার শুরু করেছে। গয়ানাথ জোতদারকে চিনতে এইটুকু আলোরও দরকার ছিল না, শুধু গলার আওয়াজ শুনলেই হত। সিঁড়ির ওপর থেকে কেউ বলে, ব্যাস, ভটভটি জোতদার আসি গেইল।
তার মানে, এখন এই ভিড়ে শুধু ফুলবাড়ি বস্তির লোকজনই নেই, এখানকার লোকজনও কেউ-কেউ আছে–যারা গয়ানাথকে সকালে ভটভটিয়াতে চড়ে সার্ভের জায়গায় যেতে দেখেছে। গয়ানাথের এই নামকরণ এর আগে কখনো হয় নি। জামাইয়ের ভটভটিয়াতে সে সাধারণত ওঠে না, এমন কি জলপাইগুড়ি যাওয়ার জন্যে বাস ধরতেও না। কিন্তু সকালে সার্ভে পার্টি পৌঁছে গেছে দেখে চড়তে হয়েছিল। আর, এখন এই সন্ধ্যায় আসিন্দিরই গিয়ে খবর দিল এম-এল-এ আবার এসে বসে আছে। একই দিনে দুই-দুইবার ভটভটিয়া চড়ে একই জনসমাবেশে নামলে ত একটা নামকরণ হয়েই যায়। কিন্তু নামটা টিকবে কি না তা নির্ভর করবে ভটভটিয়া সম্পর্কে গয়ানাথের পরবর্তী ব্যবহারে।
গয়ানাথ তখন তার কাপড় এক হাতে তুলে, আর-এক হাত নেড়ে আসিন্দিরকে শাসাচ্ছে, শালো, ভটভটিয়াখান তোর পাছত ঢুকাই দিম। মাঠে চষিবার ধইচছে এই এক দো-চকিয়া। কহিছু মোক আস্তার [রাস্তার ওপর নামি দে, নামি দে। না, চলো কেনে, চলো কেনে, এ্যালায় তো যাছি তর শ্বশুরবাড়ি। শালো, তর কোন জারুয়া [জারজ] বাপ মাঠের ভিতর দিয়া হাইওয়ে বানাই থছে? শালো ডাঙ্গুয়া [প্রৌঢ়া বিধবার যুবক সঙ্গী] ঢেমনা। সিঁড়ির ওপর ও মাঠে যারা দাঁড়িয়ে ও বসে ছিল তারা। হাততালি দিয়ে ওঠে।
এম-এল-এ চিৎকার করে ডাকে, হে গয়ানাথ কাকা, চলি আসেন এইঠে, ও ঠেলি দিবে উমরায়, চলি আসেন।
সেই ডাকে গয়ানাথ এদিকে আসতে শুরু করে বটে কিন্তু দুপা এসেই ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার চিৎকার করে ওঠে, শালো ঢেমনা, তারপর হন হন করে এগিয়ে আসে, যেন এইটুকু গালগালই বাকি ছিল। গয়ানাথ কাছাকাছি আসতেই কেউ বলে, আসিন্দিরের পাছাখান কত ফাঁক হে, একখান আস্ত ভটভটি ঢুকি যাবে?
গয়ানাথ সেদিকে তাকিয়ে আবার চিৎকার করে, তর বাপের পাছত ঢুকিবে–
এম-এল-এ চিৎকার করে বলে, হে কাকা, ক্যানং বুদ্ধি তোমার, জোয়াইঅক [জামাই] কছেন অ্যালাং-প্যালাং?
গয়ানাথ তখন সিঁড়িতে পা দিয়েছে। চিৎকার করে ওঠে, কায় কহিছে ঐ ডেঙ্গুয়া মোর জোয়াই? মুই অক তালাক দিম।
পেছনে এবার হাততালির সঙ্গে চিৎকারও। এম-এল-এ হো হো হাসে। গয়ানাথ গিয়ে বারান্দায় ওঠে। আর তখনই মোটর সাইকেলের আলোটা সগর্জন জ্বলে হু–স করে বারান্দার সামনে চলে এসে আওয়াজটা দুই-চার বার বাড়িয়ে কমিয়ে হো-হো করে হেসে, বাইকটা ঘুরিয়ে, আসিন্দির রাস্তার দিকে চলে যায়। আসিন্দিরের ওপর রাগের ঝোঁকে গয়ানাথ হন হন করে বারান্দার ওপর উঠে এসেছিল। এখন বুঝতে পারছে বারান্দায় তার বসার বা দাঁড়ানোর জায়গা নেই। গয়ানাথ সামনের অফিস বরেও ঢুকতে পারে না, মেঝের ওপর ধপাস করে বসে পড়তেও পারে না। পারে, কিন্তু আর-কেউ ত তেমন বসে নেই। তার চাইতে মাঠে বা রাস্তায় ঘোরাঘুরি করাটাই ভাল ছিল–এম-এল-একে একবার মুখ দেখিয়ে। কিন্তু এম-এল-এ ফিরে এসে এই হা ক্যাম্পেই বসে আছে কেন, সেটা তার জানা দরকার। তখন গয়ানাথের বাঘারুর কথা মনে পড়ে। একবার তাকায়, তাকে কোথাও দেখা যায় কি না। তা হলে ওর সঙ্গে কথা বলে বুঝতে পারত ফুলবাড়ি বস্তিতে কী হয়েছে। কিন্তু বাঘারুকে কোথাও দেখা যায় না। বাঘারুর কথা মনে হতেই গয়ানাথ ভাবে যে তার ত হকই আছে এম-এল-এর, ভালমন্দের খবর নেয়ার, কারণ তার লোকই ত সঙ্গে ছিল নদী পার করে দিতে। গয়ানাথ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই জিজ্ঞাসা করে, কুননা অসুবিধা হয় নাই ত তোমার?
কেনে? কী অসুবিধা? এম-এল-এ জিজ্ঞাসা করে।
এই, ফুলবাড়ি গেলেন, আবার চলি আসিলেন?
ই আর অসুবিধা কী। ঐ ইনজিনিয়ার খবর দিবার গিসে। এইঠে বসিবার সুবিধা, তাই বসি আছি।
উমরায় ঠিক মতন পার করি দিছে ত নদীখান?
কায়?
আরে, ঐ বলদটা, তোমার নগত যায় গিছে ফুলবাড়ি যাওয়ার বাদে।
হয়, হয়, এম-এল-এর মনে পড়ে যায়, বাঘারু। কী বাঘারু? এম-এল-এ মনে আনতে চেষ্টা করে।
গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে, হয় হয়। বাঘারু। ঐটা ফিরে নাই তোমার নগত?
তা ত কহিবার পার না। ফিরিবার পারে। ফিরিবার টাইমে ত নৌকা আছিল। আহা কহেন না কাকা–
কী?
তোমার ঐ মানষিটার নাম, কী, বামারু বর্মন ত?
বর্মন? অর বাপা বর্মন!
আরে, উমরার একখান পুরা নাম, নাম্বা নাম আছে না?
বাঘারুর একখান নাম আছে? তোমাক কহিছে?
কহিছে ত কত কথা। উমরাক তো বাঘ ধরিছিল?
হয়। তোমার তানে কথা কহিছে ঐটা, এত্ত?
সে কি একখান কাথা? কত কাথা? অর জন্মকথা। অর মাই-এর কথা। মানষিটা বড় ভাল হে তোমার কাকা
বলদ।
উমরাক একখান আধিয়ারি দিছেন?
কাক?
উমরাক?
বাঘারুক?
হয়।
বাঘারুক আধিয়ারি?
হয়। এ্যানং কামের মানষিটা–
উ কহিছে তোমাক? আধিয়ারি দিবার কাথা?
না-হয়, না-হয়। মুই কহিছু।
উ তো হালের আগত থাকে। হালের পাছত বান্ধিলে উল্টা চাষ হবা ধরিবে।
কী কহিছেন? চারি পুহে এ্যাত জমি তুমার আর ঐ মানষিটাক একখান আধিয়ারি দিবার না পারেন?
আরে তোমরালা তো মোকই একখান আধিয়ার বানাবার ধইচছেন। মুই আর কাক আধিয়ারি দিম? খাড়াও কেনে। ঘরতে চলল। হাতমুখ ধোও। তার বাদে এইঠে আসি মিটিং দাও। আসিন্দিরক ডাকি, ভটভটিখান নি আসুক। গয়নাথ, হয় কথাটা এড়াতে, নয়, সামাজিকতার তাড়ায় বারান্দা থেকে নেমে রাস্তার দিকে হনহন করে হাঁটে। এম-এল-এ পেছন থেকে চেঁচায়, হে কাকা শুনেন, হে–
.
গাড়ির আওয়াজটা পাওয়া গিয়েছিল আগেই। সেটা ক্রমেই বাড়তে থাকে। তার পর, উত্তরে, কাঁঠালগুড়ির মোড়ে যে এদিকে ঘুরল সেটাও বোঝা যায় আওয়াজ থেকেই। তার পর, আলোটা রাস্তায় পড়ে। আর, সেই আলোটা আর আওয়াজটা বাড়তে থাকে। এই বারান্দায় বসে, এই মাঠটা পার হয়ে রাস্তায় গাড়িটাকে আসতে দেখা, যেন নদীর বান-আসা দেখার মত। কেউ একজন বলেও বসে, আসি গেইছে।
গাড়িটা একটু এগিয়ে আড়াল হয়, যা হওয়ার কথা। ঐ মিষ্টির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নিশ্চয়ই জিজ্ঞাসা করে নিচ্ছে, যা করার কথা। এম-এল-এ শুধু বলে দিয়েছিল, ক্রান্তি হাটের হলকা ক্যাম্প।
গাড়িটাতে আওয়াজ ওঠাপড়া শুরু হয়। তারপরই আলোটাকে দেখা যায় ফাঁক-ফোকর দিয়ে হাটখোলায় পড়ছে আর সরে যাচ্ছে। শেষে এই বারান্দাটাকেও একটু ছুঁয়ে ঘুরে যায়। এইবার গাড়িটা একটা জোর আওয়াজ তুলে মাঠের দিকে ঘোরে। হেডলাইটের আলো এসে বারান্দায় ঝাঁপিয়ে পড়ে।
যে-ভাবে গাড়িটা মাঠ বরাবর মোড় নিয়েছিল তাতে হু-স করে মাঠ পেরিয়ে বারান্দার সামনে এসে দাঁড়াবার কথা। তার বদলে ব্রেক কষে গো-গো করতে থাকে আর মাঠ বরাবর আলোটা শুধু পড়ে থাকে।
গাড়ি থেকে একজন, দুজন, তিনজন, চারজন, পাঁচজন নামে। তারা মাঠটা পার হয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করে। গাড়িটা রাস্তার ওপর উঠে দাঁড়ানোর জন্যে পেছুতে গেলে, এদের ভেতর দুজন হাত তুলে না করে। বারান্দা থেকে সেই হাত-তোলা নিষেধটা ছায়ার মত দেখায়। আলোতে মাঠের কাদা-জল। দেখে-দেখে এরা সাবধানে এই ঘরবারান্দার দিকে এগয়।
এরকম দেখে-দেখে আসে বলেই, সময় নেয়। বা, এদের আসাটা এরকম দেখতে হচ্ছে বলেই মনে হয় সময় লাগছে। তাছাড়া পঁচজন কারা কারা সেটাও এই বারান্দা থেকে সবাই বুঝে নিতে চায়। বারান্দার ওপরে ত এক কোনায় এম-এল-এ চেয়ারে, আর-এক কোনায় সুহাস চেয়ারে। প্রিয়নাথও দরজায় আসে। সিঁড়িতে যারা ছিল তারা উঠে দাঁড়িয়েছে। আর, ঐ পাঁচজনের পেছনে-পেছনে আরো অনেকে ওদিককার দোকানগুলো থেকে বেরিয়ে চলে আসছে। এতক্ষণ সবাই নানা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অপেক্ষা করছিল, এখন জড়ো হয়ে যাচ্ছে।
ঐ পাঁচজনের দলটার ভেতর থেকে কেউ একজন চিৎকার করে ওঠে, হে-ই বীরেনদা, তুমি কি আর মিটিং ডাকার জায়গা পাও নাই নাকি, এই কাদা মাঠ? আরে, মণিদা আসছেন নাকি? এম-এল-এ তাড়াতাড়ি পা নামিয়ে সোজা হয়, তার পর উঠে বারান্দার কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। এবার এম-এল-এই চিৎকার করে ওঠে, আরে মণিদা, আপনি আবার কোথা থিকে আসছেন?
বাঃ বাঃ, এবার পাঁচজনের দলটা একেবারে কাছে চলে এসেছে, সিঁড়ির কাছের লোকজন সরে গিয়ে পথ করে দিচ্ছে, যাতে দলটা বারান্দার উঠে যেতে পারে, তুমি গিয়ে লাথি মেরে সব ক্যালভার্ট ভাঙতে পারো আর আমি এইটুকু আসতে পারি না?
এম-এল-এ হে-হে করে হেসে ওঠে, কিন্তু সে-হাসির আওয়াজটা একটু অন্যরকম শোনায়। তাকে ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রিয়নাথকে বলতে হয়, একটা বিছানা-মাদুর-টাদুর কিছু পাওয়া যাবে, এখানে বসার জন্যে? প্রিয়নাথ ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। সুহাসকে তার ঘরের সামনে চেয়ারটা ছেড়ে দাঁড়াতেই হয়। সে একবার ভাবে, চেয়ারটা এগিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকে যাবে। এই মিটিঙের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। তার থাকাও বোধহয় উচিত নয়।
প্রিয়নাথ ঘরের ভেতর থেকে কয়েকটা চট বের করে আনে। সেগুলো একা-একা বিছিয়ে দিতে চেষ্টা করলে এম-এল-এ সিঁড়ির লোকজনের দিকে তাকিয়ে বলে, এই ধরেন কেনে আপনারা। দুজন তাড়াতাড়ি উঠে এসে চটটা ধরে। গাড়িটা এতক্ষণে রাস্তার ওপর ওঠার জন্যে পেছুতে শুরু করলে মাঠটা ও বারান্দাটা একটু অন্ধকার ঠেকে। হ্যাজাকটাতে একজন এসে পাম্প দিতে শুরু করে।
এম-এল-এ কি ভেবেছিল, সে চেয়ারে বসে থাকবে আর ইনজিনিয়ার-অফিসাররা বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে? তা না-হলে বারান্দার ওপরে একটা বসার ব্যবস্থার জন্যে সে ত অনেক আগেই বলতে পারত।
মণিই প্রথমে বারান্দায় ওঠে–আমি তোমার জন্যে মালবাজারে বসে আছি, আর তুমি এখানে খুব মিটিং করছ, মণি পকেট থেকে সিগারেট-দেশলাই বের করে।
আরে আমি ভাবলাম ত ওদলাবাড়িতে সন্ধ্যাবেলায় একটু দেখাশোনা করি রাত্রিতে মালবাজারে চলি যাব। আপনার ত আজকে মালবাজারেই আসার কথা–কাল জলপাইগুড়ি যেতে হবে না?
সেই জন্যেই ত এলাম। এসে শুনি তুমি নাই।
আরে ফুলবাড়ির ঐ জায়গাটা নিয়ে গোলমাল চলিছেই। আমার ত মাস-দুই-তিন আসাই হবে না, ভাবলাম গোলমালটা আজিকৈ চুকাই দেই।
তা চুকাও। কিন্তু এর পর ত তোমাকে সার্কাসের দলে নিয়ে নেবে–তুমি লাথি দিয়ে ক্যালভার্টের রেলিং ভেঙে দিলে?
সিঁড়ির কাছের ভিড় থেকে কেউ একজন চিৎকার করে বলে, সিমেন্টের বদলে বালি দিলে ত পোলাপানও লাথথি দিয়্যা ভাঙবার পারে। তা হালেই বোঝেন কী দিয়া ব্রিজ বানাইছে?
মণি সিগারেটে টান দিতে দিতে সিঁড়ির ভিড়ের কথাটা শোনে। তার পর আস্তে করে এম-এল-একে জিজ্ঞাসা করে, একটু সময় দিয়ে, কিন্তু সবাইকে শুনিয়ে, আমি ত ভাবলাম, তোমার পা ভেঙেছে তাই এখানে পড়ে আছ, নিয়ে যেতে হবে। তা এঁরা বলছেন, না, উনি ঠিক আছেন–ক্যালভার্ট ভেঙেছে।
এম-এল-একে এবার হেসে উঠতেই হয়। বলতে হয়, আমার কথা ছাড়ি দেন। ফুলবাড়ির মানষিদের সঙ্গে ত ইনজিনিয়ারদের দেখা হওয়ার দরকার।
ইনজিনিয়ারদের ত অফিস আছে।
সে অফিস-টফিস হইয়া গিছে মণিদা, উনি ফুলবাড়ির লোক শুইনলেই কয়্যা দ্যান দ্যাখা হব না, সিঁড়ির ওপর থেকে একজন চেঁচায়।
সে বলবেন, ওঁরা ত এসেছেন, এত চেঁচাচ্ছেন কেন? মণি সিঁড়ির দিকে দু-পা গিয়ে একটু কড়া গলায় বলে।
এই চুপ যা চুপ যা মিটিং শুরু হোক।
না, আমিও ত কথার কথাই কইছি।
দেখি, দেখি, বলে সেই গেরিমাটি রঙের জামাপরা ভদ্রলোক ঢোকেন, পেছনে একজন মাথায় শতরঞ্চি। উনি বারান্দায় উঠে দাঁড়িয়ে লোকটিকে বলেন, টান-টান করি পাতি দেন। এতজন উঠতে থাকার ফলে সিঁড়ির মুখটাতে একটা ভিড় হয়। হাট কমিটির মেম্বার ওপরে ওঠেন। মণি নেমে আসে এম-এল-এ নেমে আসে। আর-একজন সিঁড়ির দুই ধাপ উঠে বলে, নমস্কার, মণিবাবু।
আরে গয়ানাথবাবু, আপনিও এসে গেছেন?
আসিবার নাগে ত, কহেন? আমাদের ক্রান্তি হাটের আজি কত সৌভাগ্য।
কী হল, এত সৌভাগ্য?
এই যে আপনারা সব মিটিং করিবার সেন্টার বানিলেন, সৌভাগ্য না? বলে গয়ানাথ ইনজিনিয়ারদেরও দেখায়। তারা একটু দূরে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। তাদের নিয়ে কিছু বলা হল দেখে একজন একটু হেসে জিজ্ঞাসা করে, কিছু বললেন?
মণি সিগারেট তুলেই না জানায়।
গয়ানাথ মণিকে বলে, হেই মণিবাবু, শুনেন একটু। সিঁড়ি থেকে নেমে একটু সরে দাঁড়ালে গয়ানাথ জিজ্ঞাসা করে, আতিত [রাত্রিতে] কতজন থাকিবেন? পাকাবার শুরু করি?
আরে না, না, আমরা এখনই যাব, এখনই, ও সব করবেন না।
.
হাট কমিটির এই শতরঞ্চিটা এত বড়, সুহাসের দরজা পর্যন্ত প্রায় গেছে। চওড়ার দিকটা মুড়ে দিতে হয়েছে। সুহাসের দরজার কাছে, শতরঞ্চির মাথায় দুটো চেয়ার পাশাপাশি সাজানো। হ্যাজাকটা চেয়ার দুটোর কাছাকাছি রাখা। হাট কমিটির মেম্বার ভদ্রলোক সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে বলে, মণিবাবু, বসেন এইঠে। আগত কহি রাখিলে ত টেবিল-চেয়ার আনা যাইত কিন্তু এ্যালায় ত ইশকুল বন্ধ আর মাস্টার ত থাকে সেই মানাবাড়ি
আরে না না, টেবিল চেয়ার লাগবে কিসে, এ ত আপনারা জনসভার ব্যবস্থা করছেন।
আমাদের আর কতক্ষণের মিটিং হবে? কী? বীরেনদা?
হ্যাঁ। এ ত মিটিং না হয়, কথাবার্তা কহিবার জন্যে, বলতে-বলতে এম-এল-এ বারান্দায় ওঠে। জুতো খুলে হাতে নিয়ে একেবারে হ্যাজাকের সামনে গিয়ে বসে। আর এম-এল-এর পেছনে-পেছনে সব্বাই বারান্দায় উঠতে শুরু করে। যে যার, জুতো খুলে হাতে নিচ্ছে। একটা দল গিয়ে হ্যাজাকের সামনে এম-এল-এর মুখোমুখি, কিন্তু বারান্দার কোনার দিকে বসে। সবাই বসে পড়ার পর দেখা যায় জায়গার তুলনায় তোক অত বেশি নেই। এম-এল-এ ডাকে, মণিদা আসেন, আর দেরি করা যায় না।
মণি স্যান্ডেলটা বারান্দার ওপরে খুলে রেখে আসে। পেছন থেকে ইনজিনিয়ারদের একজন বলে, আপনারা দরকার হলে ডাকবেন, আমরা এখানে আছি।
কেন। কথা হবে আপনাদের সঙ্গে আর আপনারা ওখানে থাকবেন কেন, এম-এল-এ ইনজিনিয়ারদের দিকে তাকিয়ে বলে, যোগ করে, মুখোন পাছত করি করি কথা কহিবার নাগিবে?
ইনজিনিয়াররা এবার একে-একে উঠতে শুরু করে। তাদের প্রথম জনের পায়ে ফিতেওয়ালা জুতো বলে নিচু হয়ে খুলতে হয়। একটু সময় নেয়। পেছনের দু-জন দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই পা তুলে জুতোর বেল্ট, খুলে নেয়। আর-একজনের পায়ে স্যান্ডেল। মণিবাবুর জুতোর পাশে জুতোগুলো খুলে রেখে ওরা একটু এগিয়ে, সকলের পেছনে দেওয়াল ঘেঁষে বসে।
হঠাৎ গয়ানাথ সিঁড়ি ভেঙে বারান্দায় উঠে আসে, তার পর সরু গলাটা তুলে জিজ্ঞাসা করে, মণিবাবু ও আমাদের এম-এল-এ মেম্বার, আমার একটা প্রশ্ন ছিল। সবাই তাকালে গয়ানাথ বলতে থাকে, প্রশ্নটা হছে কি, এই মিটিংটা কি প্রাইভেট দিছেন না জনসভা দিছেন? য্যালায় প্রাইভেট মিটিং হবা ধরে, মোরা থাকিম না। কেনে। না, মোরা আপনার পার্টির মানষি না। আর যদি জনসভা দিছেন ত আমরা থাকিবার চাহি। কেনে। না মোরা জনসভার মেম্বার এবং মণিবাবু ও হামরালার এম-এল-এ মেম্বারের ভাষণ শুনিবার চাহি। কেনে–
গয়ানাথকে থামিয়ে দিয়ে মণি বলে ওঠে, কী, বীরেনদা?
এম-এল-এ গয়ানাথকে বলে, আরে বসেন না বসেন, এ ত সবার কথাই হচ্ছে, আপনি থাকিলে ত ভালই হয়। মোরা কহিবার পারিম গয়ানাথবাবুও এই মিটিঙে ছিলেন। আরে, যার ঘরত আসি বসিলাম, তিনিই নাই, এম-এল-এ দরজার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ডাকে, কই, আপনিও আসেন না।
সুহাস ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে বলে, আমি আর এখানে কী—
আরে, বসুন না, বসুন, মণি ডান হাতটা ডাইনে ছড়িয়ে যেন জায়গা দেখায় ইনজিনিয়ারদেরই দিকে। সুহাস এম-এল-এর সামনে দিয়ে আবার প্রথম দলটার পাশ দিয়ে গিয়ে ইনজিনিয়ারদের কাছাকাছি দেওয়াল ঘেঁষে বসে।
গয়ানাথ আবার বলে, ঠিক আছে। আপনারা আলাপন শুরু করেন। মোর অনুমতিখান ত থাকিল। আপনাদের চায়ের ব্যবস্থা দেখি আসি, বসিম।
এম-এল-এ এমন ভাবে মুখটা তোলে যে সকলেই বোঝে এইবার সে কিছু বলবে। কিন্তু এম-এল-এ হঠাৎ পাশে তাকিয়ে ঘাড় উঁচু করে সিঁড়ির দিকটা দেখে, ঘাড় ফিরিয়ে, চেয়ারের ওপরটা দেখে, বলে ওঠে, আমার ব্রিফকেসটা? সকলেই একবার খোঁজে যেন। প্রিয়নাথ ঘরের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে ব্রিফকেসটা দেয়।
ব্রিফকেসটা পাশে রেখে এম-এল-এ বলে, শুনেন, এখন কথাটা আরম্ভ হওয়া দরকার। এই কথাটা হওয়া উচিত ছিল ফুলবাড়িতে। কিন্তু সেখানে আমাদের এসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার সাহেব ছিলেন না। আর মালবাজারে তার অফিসেও আমি কথাগুলি বলতে পারতাম। কিন্তু একটা মুখোমুখি কথার দরকার ছিল। তাই আমি এইখানে আসার জন্য বলি। উনি দয়া করে আসিছেন। আমাদের জিলা কৃষক সমিতির সম্পাদক কমরেড মণি বাগচিও আসছেন। সুতরাং এখন কথাবার্তা হইতে পারে। তা হলে আমার অনুরোধ ফুলবাড়ির মানষি যারা, এইখানে আছে যারা, তাদেরই উচিত প্রথমে সব বলা। তাদের কী বলার আছে। তার বাদে আমরা ইনজিনিয়ার সাহেবের কথা শুনিব। ত কন, ফুলবাড়ির কমরেডরা, কেউ কহেন।
যে দলটা এম-এল-এর মুখোমুখি বারান্দার কোনার দিকে একসঙ্গে ছিল, তারা নড়েচড়ে বসে। সামনের একজনকে ধাক্কা দিয়ে বলে, হে-ই নকুইল্যা, তুই ক কেনে।
সে ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, কাকা কহেন।
যাকে কাকা বলা হয় সে মাঝামাঝি বসে ছিল। সে বসে থেকে এম-এল-এর দিকে তাকিয়ে উঁচু গলায় শুরু করে, এর মধ্যি এত কওনের-শোননের কী আছে, জানি না। য্যাখন থিক্যা ঐ ফুলবাড়ির ফুলঝোরার উপর একখান ব্রিজ হইব বইল্যা ঠিক হইয়াছে, তখন থিক্যাই নানা গোলমাল লাইগ্যাই আছে। আমরা গিয়্যা খোঁজ নেই, তা কয়, কেডা কইছে ব্রিজ হব, আঁ, লোকটি একবার এম-এল-এর দিকে, একবার মণির দিকে, আর একবার মাথা ঘুরিয়ে ইনজিনিয়ারদের দিকে তাকায়। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে আবার জিজ্ঞাসা করে, কেডায় কইছে ব্রিজ হব, আঁ, কেডায় কইছে? নে বাবা, আমরা ত পইডল্যাম গিয়া সাত হাত জলের তলায় ত ধরেন গিয়্যা, ঐ ফুলঝোরার ব্রিজ নিয়্যাত গত ত্রিশ বচ্ছর ধইর্যাই কত কাণ্ড! আমি যখন ধরেন বিশ বছরের জুয়ান তখন খগেন দাশগুপ্ত মন্ত্রী। আর সেই কী কয়, আরে তখুন মালবাজার জেনারেল সিট, কী নাম, সেই এম-এল-এ, তারে তখুন ত কইলেই কয়, হয়্যা গ্যাল গা, এই ধর সামনের বর্ষার আগেই হয়্যা যাবে নে, একবার ত কাণ্ড।
লোকটি গল্প বলতে-বলতে একবার এম-এল-এর দিকে, একবার মণির দিকে, আর একবার ইনজিনিয়ারদের দিকে ঘাড় বারবার ঘোরাতে-ঘোরাতে নিজেই ধীরে-ধীরে ঘুরে যায়। এখন তার মুখ মণির দিকেই। মণি আর-একটা সিগারেট ধরিয়ে একটু এলিয়ে বসে আছে। মণি হেড়ে লম্বা। ফলে মনে হয় নিজেকে ভেঙেচুরে বসেছে যেন। তার মুখেচোখে বিরক্তির ভাবটা সে গোপনের চেষ্টা করে সিগারেটের ধোয়ার ছলে। লোকটি তখন বলতে শুরু করেছে, হইল কী, আমরা ত সেইবার পূর্তমন্ত্রীরে সবাই মিল্যা বলছি যে ব্রিজ নাই ত ভোট নাই। তাই শুইন্যা মন্ত্রী কয় কী, সে কী? ব্রিজ হয় নাই? আমাদের ত জানা হইয়া গেল ব্রিজ হইছে, তার টাকাপয়সা সুদ্ধ্যা দেয়ানেয়া শ্যাষ। আমরা ভাবলাম, খাইছে। মিথ্যা কইর্যা যদি একবার ব্রিজের টাকা বাইর হয়া থাকে, আবার কি আর হইব ব্রিজ? ব্যাস, খোঁজ-খোঁজ, কোথায় গেল ব্রিজ। অফিসাররা খুঁইজব্যার ধরল জলপাইগুড়ির অফিসের কাগজে-কই গেল ব্রিজ। মন্ত্রী খুঁইজব্যার ধইরল কইলকাত্তার কাগজে–কই গেল ব্রিজ। আর আমরা হককলে যুইজবার লাইগল্যাম এইখ্যানে, কই গেল ব্রিজ। লোকটি থামে। সে জানে এখানে হাসির জন্যে সবাই একটু সময় নেয়। সে নিজে খানিকটা হেসে সেই সময়টুকু দেয়। মণি এম-এল-এর দিকে তাকিয়ে হাতের পাতা একবার উল্টোয়। এম-এল-এর চোখ দেখে বোঝা যায় না, সে সেটা দেখল কিনা। কিন্তু গল্প যে বলছিল সে দেখে ফেলে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, মণিবাবু, আমি তাড়াতাড়ি কয়্যা দিচ্ছি। আচ্ছা, ছাড়ান দ্যান সেই গল্প। এখন কথাটা হইল কি–
পেছন থেকে একটি ছেলে গলাটা তুলে বলে, কাকা, মুই কম? এইবারকার কথাখান মুই কম?
কাকা আবার সকলের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ক না ক্যা, আমি ত তগ কইতেই কই। আমি কথা শুরু কইরলেই সাত কইল্যানা কথা মনে আছে। আর তগ কাম হচ্ছে এই কল্যানা। ধরেন কেনে, আমাগো সময় নেতা ছিল নরেশ চক্কত্তি-পটল ঘোষ, আর এখন আমাগো মণিবাবু লিডার, তারপর কী কয়, বীরেনবাবু এম-এল-এ। এ্যাহন ত তরাই কবিক, ক।
কাকার গলার স্বরটা একটু উঁচুতে। সে টেনে-টেনে, নানা ভঙ্গিতে, স্বর তুলে নামিয়ে গল্পটা যখন বলছিল তখন কিন্তু ধীরে-ধীরে সেই গল্পের একটা আবহাওয়া তৈরি হচ্ছিল। এমন-কি, এইখানে যারা ভদ্রলোক, সুহাস আর ইনজিনিয়াররা আর প্রিয়নাথ, যদি মণিকে নাই ধরা হয়, তারাও যেন গল্পটার একটা টান বোধ করে ফেলছিল। এম-এল-এ এমন বসে ছিল যাতে মনে হয় গল্পটা সারারাত চললেও তার আপত্তি নেই, বা এখন থেমে গেলেও তার আপত্তি নেই, বা একমাত্র সে জানে কখন গল্পটা আপনি থেমে যাবে। একমাত্র মণি বাগচিই অধৈর্যে বারবার সিগারেট ধরাচ্ছিল। কিন্তু এই এলাকাটা বীরেনের। বীরেন এখানে বসে থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ারকে ডাকিয়ে এনেছে। সুতরাং কী-হবে না-হবে সেটা বীরেনই ঠিক করবে। পরে নিশ্চয়ই বীরেনকে সে বলবে, এইভাবে যদি অফিসারদের হ্যারাস করা হয় তা হলে কোনো অফিসার আর-কোনো কাজ করার উৎসাহ পাবে না। কিন্তু মণি জানে, বীরেনও তাকে জিজ্ঞাসা করে বসতে পারে যে এ্যসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার গিয়ে বলল আর মণি অমনি গাড়িতে কেন চড়ে বসল–এটা জেনেশুনে যে বীরেন ক্রান্তি হাটে নিজে বসে আছে। তাতে ত সবার ধারণা হল যে পার্টির ভেতর অফিসারদের খুঁটি হচ্ছে মণিবাবু। কিন্তু এমন আশঙ্কা আছে বলেই মণি ভেবে রেখেছে তার কৈফিয়ৎ। বীরেনবাবু লোকজন নিয়ে ক্রান্তি হাটে বসে থেকে যদি ইনজিনিয়ারদের ডেকে পাঠায় আর তারা যদি প্যানিকি হয়ে মণির সাহায্য চায়, তা হলে ত অফিসারদের মর্যাল রাখার জন্যেই মণিকে অফিসারদের সঙ্গে আসতে হয়। মণি জানে, তাদের পার্টির ভেতর এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, অফিসাররা যেন ডিমর্যালাইজড না হয়, তাতে দু-এক জায়গায় লোকজন একটু ভুল বুঝলে, বুঝবে। মণিব ধারণা, পাটির ভেতরের এই ঝোঁকগুলো বীরেন বুঝে উঠতে পারে না। কিন্তু তাই বলে মণি ত আর বীরেনের এলাকায় নাক গলাতেও পারে না।
.
তখন সেই ছেলেটি দাঁড়িয়ে উঠে বলতে শুরু করে, কমরেডমন।
এম-এল-এ হাতটা তুলে বলে, বসি-বসি বলো হেমেন, বসি-বসি বলো।
কাকা তখন একগাল হেসে একটা হাত তুলে নাড়ায়। কিন্তু হাসির বেগে কথা বলতে পারে না। কাকার ভঙ্গিতে অথবা এম-এল-এর কথায় ঐ দলটা হেসে ওঠে। দলটার ভেতর যে একটা বেশ উত্তেজনা পাকিয়ে উঠছিল, সেটা সত্ত্বেও সবাই হেসে ওঠে। হাসির ফলে উত্তেজনাটা যে একটু শিথিল হয়ে যায়, তা সত্ত্বেও হেসে ফেলে। আর হেমেন দুহাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ে।
আরে, আরে, হল কী, হল কী, বলো, হেমেন, মণি সোজা হয়ে বসে বলে। মণির দাঁতগুলো বড়বড়। ফলে তার সব কথাই একটু রাগী রাগী শোনায়। আর এর মধ্যে কাজের কথার শুরুটাও যে ঘটে না এতে ত মণি একটু বিরক্তই ছিল। ইনজিনিয়ারদের কাছে সে ঘটনাটা শুনেছে। কিন্তু এদের তরফের কথাটা ত শোনে নি। যদিও না-শুনেও সে বুঝে ফেলতে পারে, ঘটনাটা কী হয়েছে। অফিসারদের কথা থেকেই সত্য ঘটনাটা জানা যায়। মণি বুঝতে পারছে না, বীরেন ব্যাপারটাতে কতটা জড়িত! স্বাভাবিক ছিল, মালবাজারে গিয়ে ইনজিনিয়ারের সঙ্গে কথা বলা। বীরেন যখন তা করে নি, তখন মণিকে আগে বীরেনের মনটা বুঝতে হবে। মণির কথাতে একটু বিরক্তি থাকায় এই দলের হাসিটা থেমে যায়। কাকাও হাসি বন্ধ করে বলে, আরে, ঐটা ত তোতলা। কথা কইব্যার পারে না। তাই খাড়া হইয়া ভাষণ দিব্যার ধইরছে। ভাষণ দিলে হেমেন আমাগ তোতলায় না- কাকার কথাতে আবার একটা হাসির দমক ওঠে। কিন্তু হেমেন হাতের ভেতর থেকে মুখ তোলে না।
ছাড়ি দ্যান, মুই কহিছু, জব্বর দাঁড়ায়। ফুলবাড়ির সবচেয়ে বড় জোতদারের ছোট ছেলে। কংগ্রেসের বাড়ি, বড় ভাইরাও সব কংগ্রেস। জব্বর সাতষট্টি সালে প্রথম সি-পি-আই হল। তার পর বছর দুই পর-পর পার্টি বদলিয়ে এখন আবার বামফ্রন্টে ঘুরে এসেছে। টেরিলিনের প্যান্ট আর টেরিলিনের গেঞ্জি পরনে জব্বর দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করে, শুনেন, কথাটা ত সবারই জানা। আমাদের ফুলঝোরার ক্যালভার্টটা তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা প্রথম থিকেই এই ঠিকাদারের কাজে সন্তুষ্ট হতে পারি নাই। আমরা কেউই পারি নাই–আমার বাবাও পারে নাই, আবার জগদীশ কাকাও পারে তাই। এইটা পার্টির কথা না। আমাদের সবাইয়ের কথা। আমাদের ভয় ছিল ব্রিজটা ভাঙি পড়িবে। ত মাজ আমাদের এম-এল-এ সাহেবের পায়ের আঘাতেই সেইটা হল। এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য। কারণ—
জব্বরের কথায় বাধা দিয়ে ইনজিনিয়ারদের ভেতর থেকে কেউ বলে, একটু জোরে বলুন, শুনতে পাচ্ছি না।
জব্বর আঙুল নাড়ায় যত বেশি, তত জোরে কথা বলে উঠতে পারে না। গলাটা একটু তুলে সে বলে, আজ আমাদের সৌভাগ্য এম-এল-এ সাহেব ফুলবাড়িতে গিয়াছিলেন এবং আমাদের অভিযোগ সত্য কি না, ব্রিজ ভাঙি যেতে পারে কি না, সেটা পরীক্ষার জন্য ব্রিজের রেলিঙে নিজেই লাথি মারিলেন এবং ব্রিজের রেলিঙ ভাঙি গেল। অর্থাৎ কিনা, আমরা যদি পরে বলতাম তা হলে ফুলঝোরার মানুষের সবই দোষ হইত যে তোমরা নিজেরাই ব্রিজ ভাঙিছ, বুঝেন, অমাদের ব্রিজ আমরাই ভাঙিব? যে-ব্রিজের জন্য আমাদের কত মানুষের কত কষ্ট গিয়াছে জব্বরের গলা উঠতেই এম-এল-এ হাত তুলে তাকে থামায়।
ঠিক আছে, জব্বর বসে পড়ে। এম-এল-এ পরিষ্কার করার জন্যে দু-তিনবার গলা ঝাড়ে। মুখের, ওপর দুই-একবার হাত বোলায়। বোঝা যায়, নিজেই এবার বলবে। ইনজিনিয়ারদের দলটা দেয়াল থেকে পিঠ সরিয়ে সোজা হয়। মণি আর-একটা সিগারেট ধরিয়ে পা গুটিয়ে সোজা হয়ে বসে। মণি বুঝতে চাইছে, বীরেন কী চায়। আর ব্যাপারটার সঙ্গে এমন আচমকা জড়িয়ে পড়ে মণি একটা সমাধান তাড়াতাড়ি বের করে নিতে চাইছে। বীরেন সমাধান চায়, না, আরো পাকাতে চায়–তা অবিশ্যি মণি জানে না। আর, এখন, এই জব্বর ছোকরার কথা শুনতে-শুনতে মণির মনে হতে থাকে যে সাব-এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ারের কাছে খবর পেয়ে আচমকা এখানে আসতে হচ্ছিল বলেই এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার তাকে বুঝিয়েছে সে ব্যাপারটি মেটাতে চায়, মণিদেরই কথা মত, যদিও মণিদের পার্টির লোকজনের কথা ঠিক নয়। আজকের এই মিটিংটা একবার পার হয়ে গেলে ঐ অফিসারই নানা প্যাঁচ কষতে পারে। যদি প্যাঁচ কষাকষিই চলে, তা হলে বীরেনের প্যাঁচটাই পড়ক আগে। মণি, তার স্বভাব-অনুযায়ী, এতক্ষণ যা ভেবে আসছিল, তার বিপরীত সিদ্ধান্ত নিতে ঝুঁকছে। ততক্ষণে এম-এল-এ কথা শুরু করে দিয়েছে। গয়ানাথ, হাট কমিটির মেম্বারসহ আরো অনেকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এসে শতরঞ্চির মাঝখানটাতে বসে–সুহাসের পাশে, ফুলবাড়ি বস্তির দলের পেছনে। শুদ্ধ্যা– এটা ফুলবাড়ি বস্তির সবাই বলতে পারে যে তারা এই কনট্রাকটারের ব্যাপারে আমাকে, সরকারকে ও ডিপার্টমেন্টকে অনেক চিঠি দিছে। আমার পক্ষ থিকে বলতে পারি যে আমি সেই সব চিঠির জবাব দিতে পারি নাই। কিন্তু আমি স্থানীয় পি-ডবলু-ডির এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ারের অফিসে সেই সব চিঠি পাঠাইছি। আমাদের কি এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার সাহেব একটু আলোচনা করিবেন সেই চিঠিগুলি বিষয়ে যে তিনি পাইছেন কি না, কী করিলেন, এই সব বিষয়?
এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার এই ধরনের মিটিঙে অনভ্যস্ত ত বটেই, একটু ভয়ও পেয়েছে। উঠে দাঁড়ায়। এম-এল-এ বলে, আপনি বসেন, আমরা শুনতে পাব, বসে বসে বলেন।
ইনজিনিয়ারকে একটু সময় নিতে হয় কী ভাবে শুরু করবে স্থির করতে, সভাপতি মহাশয়, না, বন্ধুগণ, না, কমরেডস। কমরেডস বলা চলে না, কারণ বোঝাই যাচ্ছে এখানে সব পার্টির লোকই আছে। আর, জীবনে কোনোদিনই ইনজিনিয়ারকে বন্ধুগণ বলতে হয় নি, বসে বসে বন্ধুগণ বলা যায় কি না বুঝতে পারে না। সভাপতি মহাশয় অবিশ্যি বলা যায় কিন্তু এটা সভাপতির সভা, না, এম-এল-এর সভা? খুব কম সময়ের ভেতর এতগুলো কথা তাকে ভেবে নিতে হয়। আর তখনই শোনে এম-এল-এ তাকে প্রশ্ন করে, আপনি এদের ডেপুটিশন আর আমার পাঠানো চিঠি ত পেয়েছেন?
হ্যাঁ। এই ব্যাপারটা ত আমাদের এস-এ-ই মিস্টার মণ্ডল ডিল করেন। উনি বলতে পারবেন।
ওনার সঙ্গে ত আমাদের কথাবার্তা হইছে। উনিই ত আপনাকে খবর দিছেন। আমি জানতে চাই যে আপনি কখনোই চিঠিপত্রগুলা দেখিছেন, কি দেখেন নাই? এম-এল-এ খুব ঠাণ্ডা ভাবে প্রশ্ন করে। কিন্তু ফুলবাড়ির ভিড়টা এই কথাতে যেভাবে একসঙ্গে মাথা নাড়ে তাতে মনে হয় প্রশ্নটা খুব দরকারি।
ইনজিনিয়ার তখন বলতে শুরু করে, আসলে সরকারি অফিসেও এক-একজন অফিসার এক-একটা কাজের চার্জে থাকেন, সেই সব কাজের করসপনডেন্স ফাইলগুলোও তারাই দেখেন। আমাকে যখন জানান তখন আমি জানতে পারি।
এই কথায় এম-এল-এ হেসে ওঠে, সামান্য, তারপর বলে, আপনার অফিসের জন্যে এই নিয়মটা ত আপনার ভাল নিয়ম। সেটা আমি জানতাম না বলেই সব গোলমাল পাকি গেইছে। কিন্তু এক-এক সরকারি অফিসে এক-এক নিয়ম হইলে আমাদের মত মানষির বিপদ হয়।
সব সরকারি অফিসেই ত মোটামুটি এই নিয়মই হয়, এক-এক ফাইল এক-এক অফিসারের চার্জে। আমি ত ফুলঝোরা ক্যালভার্টের ফাইল সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
সে ত আজ এখন আনবেন, আমরা সব এইখানে বসি আছি, ত আনবেন। কিন্তু আপনি য্যানং সরকারি অফিসের আইন জানেন, আমরাও ত দুটা-একটা জানি। আমি এমন সরকারি অফিসের কথা জানি অফিসের কোনো নতুন বিয়া বসা মেয়ের চিঠি আসিলেও অফিসার নিজে পড়ি দেন–
একটা চাপা হাসির দমক ওঠে। গয়ানাথ ঘন-ঘন মাথা ঝাঁকায়, যেন এ-রকম তারও অনেক জানা। হাট কমিটির মেম্বার চুপচাপ হাসে। আর মণি একটু অবাক হয়ে বীরেনের দিকে তাকায়। বীরেন এত থেমে-থেমে, এত গুছিয়ে-গুছিয়ে, ইনজিনিয়ারকে অপদস্থ করে দিচ্ছে? এসেম্বলিতে বীরেন অবিশ্যি দুটো-না-তিনটে বক্তৃতা করেছে, কাগজে উঠেছিল। বক্তৃতা ও ভাল করে। আর এম-এল-এ হয়েও খাটে সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তাই বলে এতটাই বদলে গেছে?
মণির যেন আর মনে থাকে না সে ইনজিনিয়ারদের কাছে শুনে তবে এখানে এসেছে। তার মনে হয়–বীরেনের এই পরিবর্তন দেখাটাই তার লক্ষ ছিল।
এম-এল-এ বলে, তা হলে এই কথাটা এই মিটিঙে আর তোলার দরকার নাই যে আমরা আপনার চিঠির জবাব কেন পাই না।
না, সেটা আপনারা নিশ্চয়ই বলবেন। কিন্তু আমাদের অফিসে ক্ল্যারিক্যাল স্টাফ মাত্র দুজন। আর, টাইপিস্ট একজন। তিনি মেটার্নিটি লিভ নেয়ায় নতুন রিলিভিং হ্যান্ড আসে নি। আমাদের একজন এ্যাসিস্ট্যান্ট, টাইপের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সেও তিনি কোঅর্ডিনেশন কমিটির মেম্বার বলে–
সে ঠিক আছে। কিন্তু আমি ত আপনাদের এইখানকার এম-এল-এ।
এবারের হাসিতে ইনজিনিয়ারও যোগ দেয়, মণিও হেসে ফেলে। এম-এল-এ তখন বলে, আমি কি আমাদের এই এলাকায় যে-সব কাজ হচ্ছে তা নিয়ে কোনো কথা জানাবার থাকলে আগে জানি নিব কোন অফিসার কোন কাজের চার্জে আছেন, তার পর তার কাছে লিখব?
না সেটা কেন হবে, আপনি আমাকেই লিখবেন।
কিন্তু আপনি ত আমার চিঠিরও কুনো জবাব দেন নাই। আমি আগে আপনাকে চিঠিতে জানালাম যে আজ আমি ফুলবাড়ির ঐ ব্রিজটা দেখতে যাব। কিন্তু ঐখানে দেখি আপনাদের মিস্টার মণ্ডল আছেন। কিন্তু কথা ছিল ত আপনার সঙ্গে।
আমি ওটা বুঝি নি। আমি ভেবেছি মিস্টার মণ্ডল কাজটার চার্জে আছেন, উনি থাকলেই হবে।
আমার যদি আপনার সঙ্গে কোনো কথা থাকত আমি আপনার অফিসে যেতাম। কিন্তু আসলে এই কথাটা ঐ ব্রিজের সামনে হওয়া দরকার। কারণ এই অভিযোগটা হচ্ছে যে কনট্রাক্টার এই কাজটা ঠিকমত করে নাই–
.
এই সব কমপ্লেন যদি একটু স্পেসিফিক না হয়, কী পার্টিকুলার কমপ্লেন, তা হলে ত ডিপার্টমেন্টের পক্ষে এনকোয়ারি করা মুশকিল। এতে আবার সব কাজেরই প্রগ্রেস হ্যামপার করবে। কনট্রাকটাররা ডিমর্যালাইজড হবে।
সে যদি ফুলবাড়ি বস্তির লোকেরা আপনাকে বলতেই পারত যে কী কী দোষ হচ্ছে তা হলে ত ওরাই ইনজিনিয়ার হত। কিন্তু যে কথাটা বারবার হচ্ছিল যে কনট্রাকটার বালি আর সিমেন্টের মিশাল ঠিকমত বানাচ্ছে না। ফুলঝোরা দিয়া বর্ষায় ত বড় স্রোত যায়। ঐ রকম পাতলা মিশাল ভাসি যাবে। এইটা কি আপনাদের কানে যায় নাই?
হ্যাঁ। আমরা শুনেছি, কিন্তু স্পেসিফিক কমপ্লেন ত ছিল না, তাই
মিশালের
ফুলবাড়ি বস্তির ভিড় থেকে কেউ একজন বলে, মশলার।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, মশলার মিশাল কি আপনারা কেউ পরীক্ষা করে দেখছেন?
না। তা করা হয় নাই ঠিক। কিন্তু এইরকম ত কখনো করা হয় না। একজন কনট্রাকটার কেন ওরকম করতে যাবে সমবেত হাসিতে ইনজিনিয়ারের কথাট চাপা পড়ে যায়। ইনজিনিয়ার একটু অপ্রস্তুত হয়ে থেমে যায়।
এইটি আপনি কী বললেন? কনট্রাকটাররা কাজে কেন ফাঁকি দেবে বা চুরি করবে তা আপনি জানেন না? মণি খুব হেসে সিগারেটে টান দেয়।
ঠিকাদার আর ইনজিনিয়ার
দ্যাশখান কইরল ছারখার।
এই বর্ষাকাল আইল, কুথায় কুন ফরেস্টের মধ্যে কুন নদী ভাঙল, ব্যাস, ফেল পাথর। কার পাথর, কেডায় ফ্যালে আর কেডায় হিশাব রাখে, কন! এক-একডা পাথর জলে পইড়লে ঠিকাদারের বার আনি আর সাহেবের চার আনি। আর যে-পাথরডা তুলাও হয় না, ফেলাও হয় না–সেই পাথরের চোদ্দ আনি সাহেবের, দুই আনি ঠিকাদারের।
এই রকম কথা হলে ত মুশকিল।
কাকা, চুপ করেন, এই সব কথা বলবেন না, যদি ধরতে পারেন স্যালায় কহিবেন, এম-এল-এর কথায় ফুলবাড়ির কাকা হো-হো করে হেসে ওঠে, এইডা ভাল কইছেন, তা হালি ত তিস্তাবুড়ির তানে হিশাব লইতে হয়, কী, না, বুড়ি কয়ডা পাথর পাইছ?
আজকা সকালে ঢালাই হল। আমি, ধরেন, সন্ধ্যার মুখে বা তার আগেই পৌঁছাই। আমি পরীক্ষা করার জন্য পা দিয়া একটা ঝাঁকি দিছি। আপনাদের মিস্টার মণ্ডলও ছিলেন। কিন্তু পুরা রেলিং ঝর ঝর করি পড়ি গেল। এইটাও কি প্রমাণ না? আপনার মিস্টার মণ্ডল তখন আমাকে বুঝান যে সব জায়গাতেই নাকি এরকম হয়– এম-এল-এ বলে।
মিস্টার মণ্ডল কিছু বলতে ওঠে কিন্তু ইনজিনিয়ার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেয়, কোনো ঢালাইই ত চব্বিশ ঘণ্টা না গেলে জমে না, সে যত সিমেন্টই দেয়া হোক। বার ঘণ্টার মধ্যে পা দিয়ে ধাক্কা দিলে হিন্দুস্থান কনস্ট্রাকশনের বানানো রেলিঙও ভেঙে যাবে–, ইনজিনিয়ার এতক্ষণে হাসার সুযোগ পায়। ইনজিনিয়ারদের অন্য কারো হাসি তার সঙ্গে মেশে না বটে, কিন্তু বোঝা যায়, ঐ দলটাতে একটা সমর্থনের নড়াচড়া ঘটে। এতক্ষণ এম-এল-এ যেরকম ঠাণ্ডা গলায় কথা বলছিল, ইনজিনিয়ারের গলায়। এতক্ষণে সেই ঠাণ্ডা ভাবটা আসে। তার কথা বলার ভঙ্গিতে বোঝা যায়, এই বিষয়টা তার জানার সীমার মধ্যে আর এ-বিষয়ে তার কোনো ইতস্তত নেই।
এম-এল-এ জানত তার জন্যে এই বিপদটা অপেক্ষা করে আছে আর কথাটা এখানে আসবেই। তার অভিজ্ঞতায় সে জানে, এই নিয়ে আলোচনা যত এগবে, ইনজিনিয়াররা তত বেশি সুবিধে পাবে। আর, এই এম-এল-এ তার কাজকর্মে বারবারই এখানে এসে ঠেকে যায়। তার ঠেকে যাওয়ার আরো অনেকগুলো জায়গা আছে, কিন্তু সে সব কিছুর ভেতর এই জায়গাটা এলে যেন পুরো আটকে যায়। এম-এল-এ মাথা ঠণ্ডা রেখে বলে, শুনেন, এইটা ত তর্ক করি মীমাংসা হবে না। আমাদের সন্দেহ ঠিক কি বেঠিক তার ত একটা পরীক্ষা হওয়ার নিয়ম আছে। সেই নিয়মটা আপনি বলেন আমরা শুনি।
ইনজিনিয়ার ঠাণ্ডা গলাতে জবাব দেয়, ঐ মিকশ্চারের স্যাম্পল নিয়ে স্টেট টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পাঠাতে হবে। তারা রিপোর্ট দেবে।
এই কেসটাতে আপনারা সেটা করতে রাজি আছেন?
আমাদের রাজি-অরাজির ত কোনো কথা নেই। আপনারা যদি করতে বলেন আমরা পাঠাব। কিন্তু তা হলে ত যতদিন রিপোর্ট না আসে ততদিন কাজ বন্ধ রাখতে হবে?
কাজ আর বন্ধ থাকবে কী? রেলিংটা আর বানাবেন না, এই ত? কী? আপনাদের কি রেলিং ছাড়া খুব অসুবিধা হবে?
ঐ ব্রিজ তুমি নি গেলেও হামরালার কুনো অসুবিধা নাই, আজি বাদে কালি ত ভাঙি পড়িবেই, অ যতই ইনজারি বলেন না কেন, ফুলবাড়ির দলের ভেতর থেকে কেউ বলে।
এম-এল-এ ধমকে ওঠে, আজেবাজে কথা ছাড়েন, শুধাছি সেইটার জবাব দেন।
এর ভেতর ইনজিনিয়ারদের ভেতর কিছু কথা হয়। ইনজিনিয়ার বলে, আপনি শুধু রেলিং বলছেন কেন, প্ল্যাটফর্ম আর রোডের মধ্যে আর্থ ওয়ার্কও বাকি আছে, সেটাও হবে না। মানে ব্রিজটা ইউজ করা যাবে না। তা ছাড়া স্যাম্পল ত শুধু রেলিং থেকে নিলে হবে না, সব পার্ট থেকেই নিতে হবে।
খাড়ান, একে একে কন। মানে রাস্তা আর ব্রিজের মাঝখানের ফঁকখান বুজান হবে না, এই ত?
হ্যাঁ।
আপনারা একবেলা কাম করি বুজি নিবার পারিবেন না? ফুলবাড়ির দলটাকে এম-এল-এ জিজ্ঞাসা করে।
হয়। কনট্রাকটার বুজালেও ত আমাগো দিয়্যাই কইরত। এইডাও আমরাই কইরব। বিনা পয়সায়।
মণি বুঝে উঠতে পারে না, বীরেন কোন দিকে যাচ্ছে ও কেন যাচ্ছে। ফুলঝোরার এক দুই-হাতি ক্যালভার্ট নিয়ে কোথায় স্যাম্পল পাঠাবে, আর, এই সুযোগে অফিসার আর ঠিকেদার মিলে এদিককার সব কাজ বন্ধ কর দেবে। তা ছাড়া এই ব্যাপারটা নিয়ে এতদূর কেন যাওয়া হবে, মণি তাও বুঝে উঠতে পারে না। ফুলবাড়িতে তাদের পার্টির লোকজন কোনো কালেই নেই, এই সরকার হাওয়ার পর হয়েছে। সরকার চলে গেলেই চলে যাবে। আর বীরেন এতদূর যাচ্ছেই বা কেন। এর সঙ্গে ত নীতির প্রশ্ন জড়িত। পার্টির ভেতরে বারবার আলোচনা হয়েছে, এমন কিছু কখনোই কেউ করবে না যাতে লোক্যা থানা বা অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, বা গবর্মেন্ট অফিসাররা ছুতো ধরতে পারে। মণি বোঝে, তার এবার কথা বল উচিত। কিন্তু সে ঠিক করতে পারে না, এখানে যা হয় তা হতে দিয়ে, পরে, মানে, এখান থেকে ফিরে মালবাজারেই, ইনজিনিয়ার আর বীরেনকে নিয়ে বসে একটা মিটমাট করে দেবে, নাকি, এখানেই সে কথা বলবে। কিন্তু বীরেনের সঙ্গে আগে ত কথা বলে নি। সে জানে না, বীরেন এতটা রেগে আছে কেন।
তা হলে আজ রাত্রিতে বীরেনের সঙ্গে কথা বলে, কাল সকালে ইনজিনিয়ারকে আসতে বলতে পারে।
আর-একটা কথা কী বলছিলেন?
স্যাম্পল ত সব জায়গা থেকেই নিতে হবে, সেই কথা।
তার জন্যে কি পুরা ব্রিজ ভাঙতে হবে, নাকি?
না, তা কেন, একটু নিলেই হবে ভেঙে।
তা হলে কি তাই ঠিক হবে? এম-এল-এ সবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করে।
.
কনট্রাকটারের পক্ষ থেকে এই লোকটি কিছু বলতে চায়–ইনজিনিয়ার তাদের দলের মধ্যে বসে থাকা একজনকে দেখিয়ে বলে।
হ্যাঁ, বলেন, আপনি ঠিকাদারের লোক? এম-এল-এ জিজ্ঞাসা করে।
লোকটি উঠে দাঁড়িয়েছিল, বলল, হ্যাঁ, স্যার। আপনারা এই মিটিঙে যা ঠিক করবেন সে আমার মালিক বুঝবে, আমি কাল জলপাইগুড়ি গিয়ে মালিককে জানাব। কিন্তু আমাদের নিয়ে ত অনেক কথা এইখানে হল। আমরাও তা হলে কিছু কথা বলতে চাই, সেইটা আপনি বলেন।
বলেন, আপনি কী বলতে চান, বলেন, এম-এল-এ বলে। আপনারা ত কনট্রাকটার এই সব নিয়ে এত কথা বললেন। কনট্রাকটার ত আর এক রক না। আমার মালিক বড় কনট্রাকটার। এই সব ছোট কাজ করেন না। সে এই সাহেবরা জানেন। মণিবাবু জানেন। এম-এল-এ বাবুও জানেন। কিন্তু হল কি, আমি ওর সঙ্গে নানা সাইটে কাজ করছি পাঁচ-সাত বছর। এই রকম ছোট কাজ আমি মালিককে বলে ওনার নামে টেন্ডার দেই। আমার ত আর লিস্টে নাম নাই। আমার মালিকের টেন্ডার থাকলে সেটা ত সবাই জানবেই। আর রেট অনেক লো ছিল। কেন, না আমি নিজেই রাজের কাজ জানি। আমার দুই ভাই আছে, ওরাও জানে। আর কিছু লোক লাগাই। তাতে আমরা লো-তে কাজ তুলে দিয়ে মোটামুটি লাভ করতে পারি। এখন হল কি, মালিক যদি দেখে তার কোম্পানির নাম নিয়ে এইসব গোলমাল হচ্ছে, তাতে মালিকের বদনাম হয়ে যাবে, মালিক আমাকে বরখাস্ত করে দেবে। মানে চাকরি যাবে না ঠিকই, কারণ আমি মালিকের বিশ্বাসের লোক। কিন্তু এই যে আমি ছোট-ছোট কাজ করে নিজের একটা কাজ বানাচ্ছি এইটা আমার একেবারে বন্ধ হয়ে যাবে, লোকটি কথা শেষ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এম-এল-এও তার দিকে তাকিয়ে থাকে। বোঝা যায়, এই লোকটির কথাতে অবস্থাটা আবার বদলাতে শুরু করেছে। মণি ভাবে, এই সুযোগটা সে নেবে। সে সিগারেটটায় টান দিয়ে কথা শুরু করার আগেই এম-এল-এ বলে ওঠে, সেটা তুমি অফিসারদের বলো। আমরা ত তাদের কবে থিকে বলছি যে এই ব্রিজ নিয়া একখান গোলমাল পাকি যাবার ধরিছে। ত অফিসার আমাদের কথার কোনো ত দামই দেন নাই। ত যাউক, টেস্ট-মেস্ট হইয়া আসুক
লোকটি বলে, এইটা নিয়ে আমার কথা আছে। আমি এতদিন বলি নাই। কিন্তু এখন ত আমার বিপদ হয়ে যাচ্ছে। তাই বলতেই হচ্ছে। আমি কারো নাম বলব না। আপনারাও জিগেস করবেন না। আমরা যখন প্রথম এইখানকার কাজ ধরি, মানে সাইটে আসি, তখনই এখানকার কয়েকজন এসে বলেন আমরা সরকারের পার্টির লোক, আমাদের পাঁচ বস্তা সিমেন্ট দিতে হবে। আমি কীভাবে কাজ করি তা ত আপনারা শুনলেন। পঁচ বস্তা সিমেন্ট দিলে আমার আর কী থাকবে। আমি বললাম, ভাই, একটু-আধটু নিতে হয় না, কিন্তু এত সিমেন্ট আমি কোথা থেকে দেব। কিন্তু তারা রাজি হয় না। উনি ওর একটা ঘরের বাইরের জায়গাটা ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাধাতে চান। সেইটা আমি রাজি হই নাই বলেই আমার এই অবস্থা। আগে জানলে আমি দিয়ে দিতাম। কিন্তু তখন বুঝি নাই যে এত কাণ্ড হবে। আমি এতদিন এ-কথা বলি নাই। কিন্তু আজ না বললে আমার বিপদ বলেই বললাম, লোকটি বসে পড়ে। ফুলবাড়ির দলটার মধ্যে কথাবার্তা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু মণি তার আগেই এম-এল-একে আস্তে করে বলে, আমি একটু বলছি। তারপর দাঁড়িয়ে ওঠে।
কিন্তু, সঙ্গে-সঙ্গেই গয়ানাথ উঠে দাঁড়িয়ে বলে, মণিবাবু, আমাদের ত এইটা একখান সৌভাগ্য কিনা তোমরালা সকলে, এম-এল-এ আর এ্যানং সব ইনজিনিয়ার মোর এই ক্রান্তিহাটত আসিছেন। ত হামরা তোমাক চা খিলাবার চাই। যদি বলেন ত এ্যালায় আনিবার কহি।
আনেন, চা খাওয়াবেন সে ত ভাল, বলে মণি অপেক্ষা করে, গয়ানাথ আর হাট কমিটির মেম্বার উঠে নীচে নামা পর্যন্ত, তারপর বলে, আমার এর মধ্যে কোনো কথা বলা উচিত না, আমি হঠাৎ এসে পড়েছি। কিন্তু আমার মনে হল কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে, না হলে এরকম ঘটনা কেন ঘটবে, এত ত ব্রিজ তৈরি হচ্ছে, রাস্তা তৈরি হচ্ছে। একটু আগে সাবধান হলে বোধ হয় এত গোলমাল। হত না। আমাদের ইনজিনিয়ার যদি আমাদের এম-এল-এর চিঠির জবাব দিতেন বা তাদের ভেতর যদি যোগাযোগ হত, তা হলে অনেক আগেই এ সব মিটে যেত। কী বলেন, ইনজিনিয়ার সাহেব?
ইনজিনিয়ার সে-ইঙ্গিত বুঝে ফেলে, বলে, আমার এটা নিশ্চয়ই দোষ হয়েছে। কিন্তু আমি ভেবেছিলাম মিস্টার মণ্ডল
ইনজিনিয়ারকে থামিয়ে দিয়ে এম-এল-এ হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে, আপনার মানষিলার খুব প্রেস্টিজ লাগে, না, সিডিউল সিটের এম-এল-একে পাত্তা দিতে?
মণি হঠাৎ চমকে গিয়ে বলে ওঠে, এই বীরেনদা, কী বলছ? এম-এল-এ মণিকে বলে ওঠে, আপনি চুপ করেন, আপনারা এইসব বুঝবেন না, আপনাদের সঙ্গে ত এরা এরকম করে না। আপনারা ইংরাজি কহিলে ইংরাজি কহিবার পারেন। আমিও এই সব বুঝিতাম না, এম-এল-এ না হইলে। না-হইলে উনি মালবাজারের এক এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার, উমরার সাহস হয় কী করি, মোর চিঠি আগত পাইছেন তবু ঐঠে হাজির না থাকিবার? আর এ্যালায় যদি জলপাইগুড়ি কি ধূপগুড়ির এম-এল-এ চিঠি দিত তার বাদে দশবার গিয়া স্যার স্যার করিতেন। ত হউক কেনে, বিচার হউক। যাউক মশলা টেস্ট করিবার। কিন্তু যদি দোষ বাহির হয়, তবে ঐ একখান গরিব ঠিকাদার আর ঐ আর-একখান সিডিউল কাস্ট মণ্ডলের উপর দোষ চাপানো চলিবে না; ইনজিনিয়ারক দায়ী হওয়া লাগিবে।
এই কথার জবাবে ইনজিনিয়ার বুঝি কিছু বলতে চায়, কিন্তু মণি হাত তুলে থামায়। মণি দাঁড়িয়েই থাকে। সে দাঁড়িয়ে আছে একমাত্র এই কারণে যদি বীরেনদা চুপ করে। মণি যে ইনজিনিয়ারকে থামিয়ে দেয় সেটা দেখে এম-এল-এ আবার বলে ওঠে, উমরাক থামাছেন কেনে, কহিবার দ্যান, আর নতুন কী কহিবেন? য্যালায় দেখিলেন ঐ সব টেস্টমেস্ট বলিয়াও হামরাক ঘাবড়ান গেইল না, স্যালায় ঠিকাদারের মানষিক দিয়া বলিবার ধইরছে যে এই ফুলবাড়ির মানষিগিলাই চোর।
ফুলবাড়ির দলটা একসঙ্গে ফুঁসে ওঠে, নাম কহেন, নাম কহেন, আমরা তাক ডাকি আনিব, দলের ভেতর থেকে দু-চারজন দাঁড়িয়ে উঠে ইনজিনিয়ারদের দলটার দিকে চেঁচায়। মণি তাদের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, বসি পড়েন, এই বসো।
এম-এল-এর রাগ ঠিক সেই সময় চরমে ওঠে, করিবেনটা কী? ঠিকাদারের চুরি ধরিলে আপনাকে চোর বানাবে, ইনজিনিয়ারক ফাঁকি ধরিলে আপনাক ঠক বানাবে, আইন ধরি চলিবার রাজি হইলে আপনাক বেতাইন বানাবে, কালি..গিয়া খবরের কাগজ-এডিওতে প্রচার করি দিবে–আবার ডুয়ার্সে গণআদালত, ইনজিনিয়ারদের বিচার।
মণি নিচু হয়ে এম-এল-একে অত্যন্ত দ্রুত কিছু বলে, তারপর সোজা দাঁড়িয়ে চিৎকার করে, শোনেন, আপনারা যদি না বসেন আমি এ মিটিং এখনই ভেঙে দেব, বসেন বসেন।
ধমকে ফুলবাড়ির দলটা বসে পড়তেই মণি চিৎকার করে বলতে শুরু করে, শোনেন, এমন কিছু হয় নাই যে এখানে একটা দাঙ্গা-হাঙ্গামা বেধে যাবে। এখানকার ইনজিনিয়ারদের ব্যবহারে আমাদের এম-এল-এ খুব দুঃখিত হয়েছেন। এম-এল-এ আমাদের সকলের ভোটের দ্বারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। সুতরাং এমএল-এর দুঃখ আমাদের সকলের দুঃখ। তার দুঃখ আমাদের দূর করতে হবে। কিন্তু তিনি ত কোনো ব্যক্তিগত কারণে দুঃখ পান নাই। দেশের একটা কাজে এরকম একটা গোলমাল হয়ে গেছে বলেই তার দুঃখ। সরকারি কাজকর্মের নিয়মই আলাদা। সেই নিয়মে হয়ত ইনজিনিয়ারসাহেব ভেবেছেন যে ছোট ইনজিনিয়ারই সব বুঝিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু ইনজিনিয়ারসাহেবের উচিত ছিল এম-এল-এ সাহেবের সঙ্গে দেখা করা। কিন্তু এই সব রাগারাগি দিয়ে ত আর আমাদের এই অঞ্চলের কাজকর্ম চলবে না। তার ওপর আমরা ঠিকাদারদের কথাও শুনলাম। সেও একজন অতি ছোট্ট ঠিকাদার। সে যদি আজ আইনের প্যাঁচে পড়ে যায় তা হলে বড় ঠিকাদার তাকে বাঁচাতে আসবে না, সেটাও আমাদের দেখতে হবে। তাই আমি প্রস্তাব দিচ্ছি যে, এই সভায় ত সব খোলাখুলি আলোচনা হল। এখন এইটুকু একটা ব্রিজ নিয়ে হিল্লিদিল্লি করার দরকার নেই। মালবাজারে একদিন এম-এল-এ, ইনজিনিয়ার, ঠিকাদার ও আপনাদের ফুলবাড়ির দুইজন লোক মিলে বসে সব মীমাংসা করে নেন। তাতে ব্রিজের কোনো অংশ ভেঙে যদি আবার তৈরি করতে হয়, তৈরি করে দিতে হবে। আর দুটো-একটা বর্ষায় ব্রিজের কোনো ক্ষতি হয় কিনা সেটা পরীক্ষা করার জন্যেও সময় দিতে হবে।
ঠিক এই সময়, গয়ানাথ আর হাট কমিটির মেম্বার আগে-আগে ও তাদের পেছনে-পেছনে একটি ছেলে একটা বড় কেটলি, আর-একটি ছেলে একটা ঝুড়ি, আর-একটি ছেলে আর-একটা ঝুড়ি নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে বারন্দায় উঠে একেবারে শতরঞ্চির মাঝখানে চলে এলে, মিটিংটা যেন ভেঙে যাবার মত হয়। সেই ভাঙা মিটিঙের ওপর দুটো হাত তুলে মণি জিজ্ঞাসা করে, তা হলে এইটাই ঠিক ত? তা হলে এইটাই ঠিক থাকল?
গয়ানাথ আর মেম্বার মিলে চা দেয় হাতে-হাতে, চা নয়, চায়ের গ্লাশ। আর কেটলি হাতে ছেলেটি গ্লাশগুলোতে চা ঢালে, হেই দেখিস কেনে, ফেলিস না গাওত। ঐটুকু ছেলের অত বড় কেটলি নাড়ানোর অভিজ্ঞতা এমনই যে সে কোনো গ্লাশেই এতটা চা ঢালে না,যাতে উপচে যায়। গ্লাশ দেয়া হয়ে গেলে গয়ানাথ আর মেম্বার মিলে আর-এক ঝুড়ি থেকে প্রত্যেককে একটা করে সিঙাড়া আর একটা করে মিঠা নিমকি হাতে-হাতে দিতে শুরু করে।
এইসব মিটিং যেমন ভাঙে, এই মিটিংটাও তেমনি ভাঙতে শুরু করে। কথাবার্তা, ঝগড়াঝাটি, রাগারাগি, মিলমিশ এই সবের ভেতর দিয়ে বেশ একটা তৃপ্তির ভাব আসে। খুব বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া এত রাতে এতগুলো মানুষ একই সঙ্গে এক জায়গা থেকে বেরচ্ছে এমন ঘটনা ক্রান্তিহাটে খুব হয় না। ফলে, মিটিং ভাঙার মধ্যে একটা নতুন অভিজ্ঞতার আরামও জোটে।
গাড়ি করে যারা মালবাজারে ফিরে গেল, মণি, এম-এল এ ও ইনজিনিয়ার, ঠিকাদার, আর, এখানে সুহাস, এই আরামের ভাগিদার নয়। আর নয় গয়ানাথ, কিছু পরিমাণে।
চা-সিঙাড়া খেতে-খেতে মিটিংটা ভাঙার পর সবাই নানা দলে ভাগ হয়ে যায়। ক্রান্তিহাটের দল মালবাজারের গাড়ি চলে গেলে যে যার বাড়ি চলে যাবে। গয়ানাথ আর হাট কমিটির মেম্বারকে এম-এল-এ বলে, শতরঞ্চিটা রেখে দিতে যাতে ফুলবাড়ির ওরা রাতটা ঘুমতে পারে, আর সুহাসকে বারবার দুঃখ জানায় তার ঘাড়ে এসে মিটিংটা করল বলে। মিষ্টির দোকানদার হ্যাজাক নিয়ে যেতে লোক পাঠায়। সেই লোকটি হ্যাজাক ধরে পথ দেখিয়ে এম-এল-এ, ইনজিনিয়ার ও মণিবাবুকে জিপ গাড়ির সামনে নিয়ে যায়। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে তৈরিই ছিল বলে বিদায় নিতে দেরি হয় না।
গাড়িটা মিনিট দু-এক চলার পরই ইনজিনিয়ার এম-এল-একে বলে, বীরেনবাবু, আমি না বুঝে আপনার সেন্টিমেন্টকে আঘাত দিয়েছি। বিশ্বাস করুন, সত্যি আমি ওরকম কিছু ভেবে কিছু করি নি। আপনি কিছু মনে করবেন না। আর এই ব্রিজের ব্যাপারটা আপনি ভাববেন না, আমি দেখব।
আপনি আগে দেখলেই ত এত গোলমাল হত না। আমিও জানি লোক্যাল ঘটনা সব আছে। ধরেন, ঐ জব্বরের দাদারাই ত কনট্রাকটরি করে। ওরা সব যেই দেখছে এদিকে এই সব কাজ শুরু হইছে–অমনি বলাকওয়া শুরু করে দিছে যে লোক্যাল কনট্রাকটারদের দিয়া কাজ করিবার লাগবে। এই মিটিঙেই সেই কথা তুলত, নেহাত সুযোগ পায় নাই। আবার এই ভদ্রলোক ঐসব বললেন, এই নিয়ে সাত কথা হবে।
আমি স্যার বুঝি নাই, ঝোঁকের মাথায় বলে ফেললাম।
না ঐ কথাটা তুমি বলতে গেলে কেন, তুমি ত আর নামধাম বলবে না, সে কথা কি আর দশ জনের সামনে বলা যায়, সাব-এ্যাসিস্টান্ট ইনজিনিয়ার মণ্ডল বলে।
যাক, ছেড়ে দিন। আসলে এসব লোক্যাল ইস্যু বাড়তে দিলেই বাড়ে। তার ওপর নানা রকম ইন্টারেস্ট আছে। পলিটিক্যাল ইন্টারেস্টই কি কম। আপনারা একটু ট্যাক্টফুলি চলবেন। বীরেনদাও যদি আপনাদের ওপর রাগ করেন, তা হলে আর আপনারা কাজ করবেন কাকে নিয়ে? বীরেনদাইবা অত। রেগে গেলে কেন? আরো যাও লাথি মেরে রেলিং ভাঙতে, এখন পা ব্যথা করছে?
আরে না, না, আমি কি আর জোরে লাথি মারতে গেছি? তবে আপনারা যাই বলেন, ঐরকম পাটকাঠির মতন রেলিং কোনো ব্রিজের থাকে না। আপনি ও নিয়ে ভাববেন না স্যার, আমি কাল সকালে ঠিকাদার আর মণ্ডল দুজনকে নিয়ে গিয়ে দেখে কী ভাবে কী করা যায় ঠিক করে আসব। আমি আপনাকে জানিয়ে দেব।
.
সে শুধুই দর্শক আর শ্রোতা ছিল যে-মিটিংটাতে, তার অভিজ্ঞতা সুহাস নিজের কাছে ছকে নিতে চায় কিন্তু পারে না। শেষ পর্যন্ত ত ধরা পড়ে যায় গ্রামের ভেতরের কোন-একটা ছোট নদীর ওপর তৈরি ক্যালভার্টে নিয়ম অনুযায়ী সিমেন্ট-বালি-লোহা এই সব ব্যবহার করা হয়েছে কি না তা নিয়ে এম-এল-এর এত গভীর উদ্বেগের আসল কারণ তার চিঠি পেয়েও এ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজিনিয়ার না এসে সাব এ্যাসিস্ট্যান্ট এসেছে কেন, আর তাকে স্যার বলা হয় না কেন। যদি ইনজিনিয়ারটি ফুলবাড়িতে যেত, তা হলে ত আর এরকম একটা মিটিং হত না। যদি কোথাও কোনো গোলমাল থাকত তা হলে সেটা ঐ ইনজিনিয়ারের অফিসেই মিটমাট হত–যেমন এখনো হবে। যে-নিয়ম ও আইনকানুনের কথা বারবার ইনজিনিয়ার ভদ্রলোক বলছিলেন, সুহাস তা মেনে ন নিয়ে পারে না, শুধু এই নেহাত ব্যক্তিগত কারণে যে তার কাজের ভেতর এ-রকম হস্তক্ষেপ হলে তারও ত একমাত্র রক্ষাব্যবস্থা সরকারি ঐ আইনকানুনই। আর এত মিটিং-টিটিং সত্ত্বেও সকলের চোখের সামনেই ত ইনজিনিয়ার ওদের কৃষক সমিতির সম্পাদককে গাড়ি করে নিয়ে এল। এটা আর কে না বুঝবে ঐ ভদ্রলোক ইনজিনিয়ারদের। নিরাপত্তার গ্যারান্টিই শুধু ছিলেন না, এমন-কি এম-এল-এর সঙ্গে ঝগড়ারও একমাত্র মীমাংসাকর্তা ছিলেন তিনিই।
এই সরকারি চাকরিতে ঢোকার আগে সুহাস গ্রাম ও কৃষক নিয়ে এক জাগরণের অনির্দিষ্ট অথচ যেন সম্ভাব্য চিন্তায় মগ্ন ছিল। অনির্দিষ্ট বলেই তাতে এমন সব নেহাত বাস্তব ঘটনার জায়গা করে দিতে পারে না সুহাস যে সরকারি পার্টির লোক হবার সুবাদে কনট্রাকটারের কাছ থেকে কিছু সিমেন্ট আদায় করার চেষ্টা আর ঠিকেদারদের কাজের ওপর এমন নজর রাখা একই সঙ্গে ঘটতে পারে। বাস্তবে, ঘটনার গায়ে ঘটনা, কার্যকারণের শৃঙ্খলা ছাড়াও যে লেগে থাকে, আর সেই একটি ঘটনার ভূমিকা যে অন্য ভূমিকার ওপর নির্ভরশীল থাকে না সব সময়, কোনো-কোনো সময় আলাদা ও স্বাধীন হয়ে যেতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা সুহাস ত জানে না। তাই তার ব্যক্তিনিরপেক্ষ মহত্তর-বৃহত্তর কামনাবাসনায় গ্রহণই লেগে থাকে সুহাসের। বীরেন্দ্রনাথ রায়বর্মনের মত এক স্থানীয় এম-এল-এ-র সঙ্গে সরকারি চাকরির ঐতিহ্যবান ইনজিনিয়ারদের এই মোকাবিলায় এম-এল-এ যে ইনজিনিয়ারকে তাদেরই খেলার নিয়মে প্রায় হারিয়ে দিচ্ছিল টেস্ট হাউসে পরীক্ষা করতে পাঠানোয় আরজি হয়ে গিয়ে, সেটা ত সুহাসের কাছে একটা কৌশলমাত্র। সেই কৌশলটা যে এম-এল-এ আয়ত্ত করতে পেরেছে এটা তার কাছে ধরা পড়ে না। এতটা পরিবেশনিরপেক্ষ হলে সুহাসকে নিজেরই চারপাশে পাক খেতে হবে। সুহাস নিজেকে ঘিরে আর-একটা পাক জড়ায়।
গয়ানাথ তার বাড়ির বাইরে উঠোনে ঢুকতে-ঢুকতেই চেঁচায়, হেই বাঘারু, বাঘারু, হেই বাঘারু। গয়ানাথের গলা শুনে ভেতর থেকে একজন একটা লণ্ঠন নিয়ে আসে। সেই লণ্ঠনের আলোতে গয়ানাথের এই বাড়িঘর সর লম্বা হয়ে মাটিতে দোল খায়।
গয়ানাথের বৌ ভেতরে চিৎকার করে ওঠে, নিজের বাড়িত কি ডাকাতি করিবার আইচছেন?
আসিন্দির মোটর সাইকেলটা ঠেলতে-ঠেলতে ভেতরে নিয়ে রাখে। চেঁচায়, এই, কায় আছিস, লণ্ঠনখান ধর এতৃতি। যে লণ্ঠন নিয়ে আসছিল সে দাঁড়িয়ে পড়ে, তারপর পথ দেখাতে উঁচু করে ধরে।
গয়ানাথ আবার চিৎকার করে ওঠে, হে-ই বাঘারু, বাঘারু। তার পর হঠাৎই তার একেবারে সামনে, প্রায় তার ওপরে, বাঘারুকে দেখে চমকে ওঠে, শালো বলদ, জবাব দিবার পারিস নাই? শালা, বোবা ত হাম্বা ডাক কেনে। যা, দূরত যা, দূরত যা।
বাঘারু একটু দূরে সরে যায়। কিন্তু তখনো গয়ানাথ তার চোখের দিকে তাকাতে পারে না। বস ঐঠে, শালো বলদ, বস কেনে, খাড়া হইছে য্যান ফরেস্টের শালগাছ।
গয়ানাথের কথা শুনে বাঘারু বসে পড়ে, মাটির ওপরে। হয়ত রাত্রি বলেই, বসার পর বাঘারুর সামনে গয়ানাথকে যেন আরো ছোট দেখায়। গয়ানাথ তার ফাটা বাঁশের মত চেরা অথচ সরু গলায় চিৎকার করে ওঠে, কী কহিছিস এম-এল-অক?
বাঘারু জবাব দেয়, কিছু কহ নাই।
কহ নাই? যেইলা উমরাক ফুলবাড়িতে নিয়া গিছিস, কী কহিছিস?
মোর নামখান কহিছু।
খুব নাম চিনবার ধইচছিস, না?
মোর জন্মকথাখানা কহিছু। তুই শালো অবতার হবার ধইচছিস, না? নিজের জন্মকথাখান নিজেই শুনাবার ধইচছিস মানুষক? আধিয়ারির কথা কহিস নাই, এম-এল-অক?
কী কাথা?
আধিয়ারির কাথা। এম-এল-এ হামাক কহিল, তুই কহিছিস আধিয়ারির কাথা। এম-এল-এ হামাক কহিল, উমরাক একখান আধিয়ারি দ্যান কেনে। শালো, জমিন মোর, না তোর এম-এল-অর?
মুই কহ নাই।
কহিছিস কি কহিস নাই, বুঝিবু এ্যালায়। তুই কালি সূর্য উঠিবার আগত এই তিস্তাপার ছাড়ি চলি যাবি। হু-ই নাগরাকাটাত ডায়না নদীর চরত মহিষের বাথান আছে, ঐঠে থাকিবু। বুঝলু? আর কান্দুরা ঐঠে আছে। পাঠাই দিবি। বুঝলু?
.
পরদিন, রাত না পোহাতে বাড়ি থেকে নেমে বাঘারু দেখে, আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে, আকাশ ঝকঝকে সবুজ, সেখানে একটা শাদা চাঁদ।
বাঘারু ডাঙা থেকে লাফ দিয়ে নীচে নামে। আর চাঁদটাও তড়াক করে লাফ দিয়ে আপলাদ ফরেস্টের মাথা থেকে তার মাথার ওপর এসে পড়ে। লাফ দিয়ে নেমে বাঘারুকে দাঁড়াতে হয়। চাঁদটাও আকাশে আটকে যায়। বাঘারু মাঠ দিয়ে চলা শুরু করে দক্ষিণ হাঁসখালির দিকে। চাঁদটাও গড়িয়ে-গড়িয়ে চলে। চাঁদটা টাকার জলছাপের মত। চার পাশে আলো ফুটলে আর দেখা যাবে না। আকাশটা এত ঝকঝকে সবুজ, আলো ফুটতে দেরি হবে না।
তিস্তা এখন তার পেছনে। তাকে তিস্তা পার থেকে চলে যেতে হচ্ছে। দেউনিয়া এখনো ঘুম থেকে ওঠে নি। আসিন্দিরজোয়াইও ওঠে নি। ওরা উঠে দেখবে বাঘারু নেই। জানে, বাঘারু থাকবে না। বাঘারুকে ডাকবে না।
বরসোজা উত্তরে-পুবে, এই আনন্দপুর বাগানে ঢুকে ও চাঁদটা আরো বায়ে
এখন নিজের চোখের সামনেটা পরিষ্কার। বিঘাখানেক দূরের জায়গা নজরে আসে না। দূরে, বাড়ি-টাড়ি জলছিটানো কুয়াশায় ঢাকা। এই ধোয়া ধোয়া ভাবটা কাটতে সময় নেয়। সারা দিনই কিছু-না-কিছু লেগে থাকে গাছের মাথায়, নদীর ওপরে। এগুলো আকাশের কুয়াশা নয়–বনের বা নদীর কুয়াশা। সোজা তাকিয়ে হাঁটলে মনে হয় চাঁদের আলোয় হাঁটছে, সামনে কী আছে জানে না। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাঁটলে বেশি দূর দেখা যায়। বাঘারু ঘাড় কাত করে আকাশেই তাকায়।
গোচিমারি থেকে হাঁসখালি পর্যন্ত অনেকখানি ঢাল জমি–তিন পাশের সব জমিই উঁচু, কোনো-কোনোটা ত বেশ উঁচু। এই ঢালটার ওপরে, এই সবুজ আকাশ যেন ঢাকনা। গোচিমারির ঢালের মাঝখানটা কড়াইয়ের মত। সেখানে নামতেই চাঁদটা এক লাফে তার মাথার ওপর এসে পড়ে। চার পাশে উঁচু ডাঙার জন্যে আর-কিছুই দেখা যায় না। দূরে ফরেস্টের গাছগুলোকে মনে হয় পাহাড়ের গায়ে জঙ্গল। সেই খাদের ভেতর বাঘারু আকাশের চাঁদের মুখোমুখি।
বাঘারু চাঁদের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে। হেসে বাঁ দিকে মুখ ঘোরায়-চঁদ ডাইনে সরে। ডাইনে মুখ ঘোরায়, চাঁদ বয়ে সরে। বাঘারু একটা ঢেলা কুড়োয়। সেটা চাঁদের দিকে ছোঁড়ার জন্যে কয়েক পা দৌড়তেই চাঁদটাও তাড়াতাড়ি গড়িয়ে সরে যায়। ঢেলাটা ছুঁড়ে বাঘারু দাঁড়িয়ে পড়ে। চাঁদটাও থেমে যায়। একটু দূরে ঢেলাটা পড়ে যাওয়ার ধুপ আওয়াজ হয়। চাঁদটার দিকে একটু ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে বাঘারু আবার হাঁটতে শুরু করে হাঁসখালির বাঁধের দিকে। চাঁদও গড়াতে থাকে আপলাদের দিকে। এখন বাঘারুকে আবার একটু-একটু করে উঁচুতে উঠতে হচ্ছে–কড়াইয়ের গা বেয়ে। চাঁদটাও একটু-একটু করে ওপরে উঠে যেতে থাকে–আরো উত্তরে। এখন আবার ডাঙার ওপরের গাছগাছড়া দেখা যাচ্ছে। ফরেস্টটা মাটিতে নেমে আসছে। সেই ফাঁকে চাঁদটা আড়ালে সরে যায়। বাঘারু বোঝে, দেখা না-গেলেও কোথাও আছে। সে হাঁসখালির বাধে উঠে পড়ে। আর দেখে, বাঁধ বরাবর সোজা উত্তরে-পুবে, একেবারে তার সামনাসামনি, চাঁদটা আকাশের গায়ে সেঁটে আছে। এই হাঁসখালির বাধ বা হাতির রাস্তাটা সোজা আনন্দপুর বাগানে ঢুকে গেছে। আপলাদের ভিতর দিয়ে যে রাস্তাটা ওদলাবাড়ির দিকে গেছে, সেটা বয়ে রেখে বাঘারু সিধে হাঁটে। চাঁদটা আরো বায়ে ফরেস্টের মাথায় চলে যায়। বাঘারু ফরেস্টের মাথার ফাঁক দিয়ে দিয়ে চাঁদটাকে দেখে। ফরেস্টের ভেতরটায় এখনো অন্ধকার–শেষ রাত্রি। সেই অন্ধকারের ভেতর দিয়ে আকাশটা আরো সবুজ ও চাঁদটা আরো স্পষ্ট দেখায়–সকালের শাদা চাঁদ নয়, রাত্রির জ্বলজ্বলে চাঁদ। এখন, এই হাতির রাস্তাটা ছেড়ে ফরেস্টের ভেতর ঢুকলে চাঁদের সেই আলো পাওয়া যাবে। ফরেস্টের ভেতরের এই রাত্রির আড়ালে-আড়ালে চাঁদটা অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারে। মাঝখানে একটা আগুনলাইনের সড়ক–ফরেস্টটাকে দু-ভাগ করছে। বাঘারু বায়ে ঘুরে, দাঁড়িয়ে পড়ে। ফরেস্টের ভেতরের রাত্রির ওপরে চাঁদটা ডাইনে লেগে আছে। যে-আগুনলাইনের দিকে মুখ করে বাঘারু দাঁড়িয়ে সেটাতে গাছপালা নেই। তাই একটু আলো আছে। কিছুদূর গিয়েই সে আলো আবার আবছা। এখনো আকাশে দিনের আলো এত জমে নি যে এই আগুনলাইনটা পুরো দেখা যাবে। মাঝখানের সেই অন্ধকারের পরে ঐ আগুনলাইনের শেষের আভাস দেখা যায়–আকাশের সবুজ আর নদীর বালির শাদায়। মনে হয়, সেখানে আরো বেশি সকাল হয়ে আছে।
বাঘারু যে-ভাবে আগুনগলির সামনে দাঁড়িয়ে, সেভাবে সাধারণত বনের পশুরা দাঁড়ায়, যেন পথ ঠিক করতে পারছে না। লম্বা হাত দুটো নাড়িয়ে ফরেস্টের বাতাস কেটে বাঘারু গন্ধ শোকে–ফরেস্টের। একবার ডাইনে ঘাড় ঘুরিয়ে হাতির রাস্তা ধরে আনন্দপুরের দিকে তাকায়। আবার, ঘাড় কাত করে আকাশের চাঁদটাকে দেখে। তার পর, ফরেস্টের ভেতরটা একবার দেখে। শেষে, ডাইনে ঘুরে সোজা হাঁটতে শুরু করে বাগানের দিকে।
এখন, বাঘারু যতই বাগানের দিকে এগয়, চাঁদটা ততই গাছের ডালে-ডালে তিস্তার দিকে পেছয়। মাঝেমধ্যেই তাকিয়ে-তাকিয়ে বাঘারু দেখে নেয়। ঘাড়টা তাকে বারবারই বেশি ঘোরাতে হয়। আনন্দপুরে ঢুকে যাওয়ার পর ঘাড় ঘুরিয়েও চাঁদটাকে হয়ত আর দেখা যাবে না। আরো খানিকটা সকাল ত হল– বেশিক্ষণ আকাশ সবুজ থাকবে না। আলো পড়লেই প্রথমে নীল, তার পর শাদা হতে শুরু করবে। তখন ঐ জলছাপ চাঁদ আর দেখা যাবে না। বাঘারুর হাটার বিপরীতেই যখন ঐ চাঁদের গতি আজ, তা হলে চাঁদটা তিস্তার ওপর গিয়ে পড়বে। ওপরে নীলচে শাদা আকাশ, নীচে তিস্তার শাদা ঘোলাটে জল–ও চাঁদ তখন কোথায় মিশে যাবে?
এখন এই ফরেস্ট, খেতবাড়ি, নদী, হাট, বাড়ি-টাড়িবস্তি, এই বাতাস, ভেজা ঘাস, আপথ, বাঁশ ঝাড়, চা-বাগানের ফ্যাকটরির নল, এই-সব কিছু নিয়ে একটা নতুন দুনিয়া তৈরি হয়ে উঠেছে আবার একটা দিনের জন্যে।
সেই নতুন দুনিয়ার এখন পর্যন্ত এক বাঘারু আছে আর ঐ চাঁদ আছে।
.
মাঠে-মাঠে খেতবাড়িতে, জঙ্গলবাড়িতে, ধানবাড়িতে যেমন হাটে বাঘারু, তেমনি হটছে, এখন। নদীর বা ফরেস্টের জঙ্গলের ভেতর আলাদা হাঁটা–ঠেলে-ঠেলে। আর-সব হাঁটাই এক রকম–আকাশের অনেক ওপরে পাখির ডানা-ভাসানো ওড়ার মত ভেসে-ভেসে হাটা, পায়ে-পায়ে খুব বেশি ধুলো ওড়ে না, খুব বেশি দাপাদাপি হয় না–মাটির ওপর নিজের ওজন ছাড়া। তিস্তার খুব টান-টান স্রোতে শালগাছ যেমন হালকা হয়ে যায়, এই বহুদূর পর্যন্ত ছড়ানো মাঠের টানে বাঘারুর লম্বা শরীর, চওড়া বুক-পিঠ, লম্বা-চওড়া, বাহুকজি, শক্ত কাঁধ আর লম্বা পা দুটোর তেমনি সব ভার চলে যায়।
কিন্তু মাঠেরও স্রোত আছে আর বাঘারুও শালগাছ বলে হাঁটাটা মাটির ভেতর গেঁথে যায়। এতটাই, যেন মাটিটা হাঁটে–ফরেস্ট, হাট, টাড়ি-বাড়িসহ এই মাটিটাই। তখন সামনে যাই আসুক, গতি প্রতিহত করা যায় না। হয় বাঘারুকে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গিয়ে নামতে হবে, নয় সামনের বাধাটাই ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়।
বাঘারুর ত আর রাস্তা দিয়ে যাওয়া নয়। রাস্তায় সামনে অনেকখানি দেখা যায়, রাস্তাটাও দু-পাশের সঙ্গে মিশে যায় না, আলাদা থাকে, দু-পাশটাই বদলায়।
কিন্তু তাই বলে ত মাঠজঙ্গল ভেঙে হাতির পাল, মোষের পালের মত যাওয়া বাঘারুর নয়। তার পায়ের একটা আন্দাজ আছে–নির্ভূল। তাকে যদি চালসার পুবে ডায়না নদীর চরে পৌঁছতে হয় তা হলে তাকে প্রায় সিধে উত্তর-পূবে হাঁটতে হবে। এখন থেকে সিধে কোনাকুনি চললে রাস্তা ছোট হয়ে আসবে। কিন্তু রাস্তা ছোট করার জন্যে বাঘারু ত আর তার চেনা লাইন, চেনা জায়গা ছাড়তে পারে না।
আনন্দপুর চা-বাগানে ঢোকার একটা গেট আছে। গেটের আগে জলনিকাশী বড় নালার ওপরে লোহার পাইপ একটু-একটু ফাঁক করে সাজিয়ে তৈরি করা ক্যালভার্ট। গরু-ছাগলে ঢুকতে পারে না, পাইপে পা পিছলে ফাঁকে আটকে যায়। চওড়া বেঁটে গেটের পাশে লোহার খুঁটি সানজির। (দুই আঙুলের মাঝখানের ফাঁক] মত–যাতে মানুষজন যাতায়াত করতে পারে, গেট বন্ধ থাকলে। ওখান থেকেই বাগান ঘেরা তারের বেড়া।
আনন্দপুরের গেটটা পার হতেই সকালটা যেন শুরু হয়ে যায় কেন, বাঘারু বোঝে না। এতক্ষণ যে বাঘারু হেঁটে এল আকাশ আলো-গাছপালা-হাওয়া সব এক হয়ে মিলেমিশে ছিল। আনন্দপুরে সবই সাজানোগোছানো, আলাদা-আলাদা। দু-পাশে চা-বাগানের কাটাছাটা সমান বেড। সেগুলোর মাথার ওপরে ছায়া-দেয়া গাছের সমান মাথা। মাঠের মত সমান চা-বাগানের বেডের ওপরে ছাতির মত সমান। গাছের মাথা। বেড়গুলো তারের বেড়া দিয়ে ঘেরা, ওপাশে গভীর নালা। জল যা যাওয়ার যায়, কিন্তু বেডের ভেতর হাতি ঢুকতে পারে না ঐ নালীর জন্যে। মানুষজনের যাতায়াতের জন্যে মাঝেমধ্যে ইটের সিঁড়ি, কোথাও-বা কাঠেরও সিঁড়ি, দুই-এক জায়গায় আবার আঙুলফাঁক লোহার খুঁটি।
মাঠঘাট বনবাদাড় পেরিয়ে এসে বাঘারুকে এই চা-বাগান আনন্দপূরে শুধু রঙ দেখতে হয়। বাবুদের বাড়ির টিনের চালের সবুজ বাংলোর দোতলা চালের সবুজ, জানলা-দরজার সবুজ–চার পাশের এত সবুজের মধ্যেও এই সবুজগুলো আলাদাভাবেই চোখে পড়ে। রাস্তার মোড়ে-মোড়ে লাল-শাদা রঙের খুঁটিগুলোর বাক অনেক দূর থেকে দেখা যায়। আর, মোড়ের যেন শেষ নেই। একটা মোড় পেরনোর সময় ডাইনোয়ে সামনে-পেছনে তাকালেই দেখা যায় চারদিকে লাইন বেঁধে মোড়ের পর মোড়, মোড়ের পর মোড়। আর মোড় মানেই ত রাস্তা, রাস্তার পর রাস্তা। একই রকম শিরীষ গাছের তলায়, একই রকম চাবাগিচায়, একই রকম রাস্তায়, তার পর একই রকম মোড় হয়ে হয়ে যাওয়ায় সোজাসুজি রাস্তারই একটা গোলক ধাঁধা তৈরি হয়। এত রাস্তা দিয়ে কত লাক হাঁটে। এত রকম বাড়িতেই বা কত লোক আঁটে। ছোট-ছোট বারান্দার বাড়ি, লম্বা-লম্বা বারান্দার বাড়ি, ছাদের বাড়ি, টিনের বাড়ি, ভামনির বাড়ি, কাঠের বাড়ি, দালানের বাড়ি, বেড়ার বাড়ি।
আনন্দপুরের লোকজন এখনো ঘুম থেকে ওঠে নি, অন্তত ফ্যাক্টরি আর অফিসের এই রাস্তায় আসে নি। কিন্তু গোচাবাড়ি থেকে বেরবার পর মাঠে, হাঁসখালির বাধে, হাতির রাস্তায়, আকাশের আর মাটির রঙে সকালটা যেরকম হচ্ছিল আনন্দপুরে তা বদলে যায়। শিরীষ গাছের ছাউনি আর চা-গাছের মাথার মাঝখানে ত আর-কিছু নেই–সমস্তটা ফাঁক। আকাশ নয়, মাটি নয়, আকাশ-মাটির মাঝখানের ঐ জায়গাটা ফাঁকা। আর চা বাগানে ত ঐ মাঝখানের জায়গাটাই আসল। ঐ ফাঁক দিয়ে আলো, আকাশের মতই, ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাঘারু সেই বানানো সকালের মধ্যে, ডাইনে বয়ে করতে করতে, বাগানের পুর সীমার দিকে চলে–বেরিয়ে যেতে। বাঘারু ভেবেছিল পুরগেট দিয়ে বেরিয়ে ডাইনে বেঁকে মাঠ-বরাবর বারঘরিয়ায় উঠবে। কিন্তু একটা মোড় থেকে ডাইনে তাকিয়ে সে বেঁকে যায় মনে হয়, এদিককার বেড়া গলে ওদিকের মাঠে নেমে যেতে পারবে।
কিন্তু এগিয়ে দেখে গলতে হবে না, বেরবার একটা রাস্তা আছে, দু-আঙুলের ফাঁকের মত লোহার খুঁটি।
বাইরে যাবার রাস্তা, এত বর্ষার পরও শক্ত। পায়ে চলা রাস্তাতেও ঘাস গজায় নি। রাস্তার পর রাস্তা, মোড়ের পর মোড়, মোড় থেকে মোড় দিয়ে ঘেরা ছক, ছকের ভেতর মাঠের মত সমান চা-গাছ আর ছাতার মত সমান শিরীষ গাছ–এমন চা-বাগান ছেড়ে বাঘারু এখন, আল বেয়ে, আরো-আরো আল দিয়ে দিয়ে ছক কাটা, অসমান, নানা আল দিয়ে নানা অসমান ছককাটা মাঠে নামে। এই সামান্য একটু উঁচু থেকে বাঘারুর মনে হয়, মাঠটার আলগুলো শীতকালের নদীর মতন; কোথায় শুরু, কোথা দিয়ে বয়, কখনো সরু, কখনো মোটা।
মাঠের ভেতর নেমে এলে আর তেমন লাগে না। তখন মাঠেরই দূরের কোনো অংশ তার থেকে উঁচুতে, আবার সামনের আলটাই ছোট্ট একটা গাছ বেয়ে ওপরে উঠেছে। বাগানের গা-লাগা জমিটা একটা ঢাল। তার পরই ডাঙা। ঢাল জমিটাতে ভাল ধান হয়েছে। কিন্তু তার পরই পাথুরে বরমতল। এখন ত চা বাগান আর ফরেস্ট শুরু হবে। ধানি জমি কমে আসবে। খেতবাড়ি তিস্তাপারেই ভাল।
সেই নিচু জমির আলটা দিয়ে চলতে-চলতেই বাঘারু দেখে,সামনের ডাঙারও ওপারে আকাশটা লাল হয়ে উঠছে, যেন ঐ ডাঙাটা আকাশটারই ঢাল। বাঘারু খুশি হয়ে ওঠে। গোচামারিতে বাড়ি থেকে বেরতে-বেরতেই যদি সূর্যটা উঠত, তা হলে তার পেছনে পড়ত, সে সূর্যোদয় দেখতে পেত না, অবিশ্যি আকাশটাও অনেকক্ষণ তার মাথার ওপর ছিল–সেখানে রঙের খেলা দেখতে পেত। কিন্তু এখন ত তার মুখোমুখি সূর্যোদয়, এই ঢাল পেরিয়ে ঐ ডাঙায় উঠলেই। যেন এই সূর্যোদয়ের কারণেই এই বারঘরিয়ার মাঠে বাঘারুর আসা–এমনই লাফিয়ে লাফিয়ে সে ডাঙাটার দিকে ছোটে।
ডাঙাটাতে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার সামনে কোণাকুনি বারঘরিয়ার মাঠটা ছড়িয়ে গেছে সেই পুব-দক্ষিণে কান্তদিঘি কুমারপাড়া পর্যন্ত। কান্তদিঘি কুমারপাড়ার ঐ দিক থেকে সূর্য উঠছে। এখন, বাঘারুকে যেতে হবে এই সূর্যটাকে ডাইনে রেখে একটু উত্তর বরাবর। কিন্তু, এমন সূর্যোদয়ের মুখোমুখি পড়ে বাঘারু যেন আর নড়তে পারে না। ডাঙার ওপরে উঠেই সে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর, যেন একটা ভাল জায়গা বেছে, শ্যাওড়া গাছটার নীচে গিয়ে দাঁড়ায়। তার সামনে, অর্ধবৃত্তাকার প্রান্তরের শেষে দিগন্তে সূর্যোদয়ের দৈনন্দিন ধারাবাহিকতা শুরু হয়ে গেছে।
.
কান্তদিঘিকুমারপাড়ার দিকে মুখ করে বাঘারু দাঁড়িয়ে। তার পুবে কুমলাই, তার পুবে মাথাচুলকা, মাথা চুলকার পুবে ধূপঝোরা। এই সূর্যোদয়ের ভূগোল বাঘারুর এই পর্যন্তই জানা। সে যেখানে যাচ্ছে, সেই ডায়না নদীর জঙ্গলে ত পুব দিক আছে। সেই সব পুব দিকের নাম তার জানা নেই। সূর্য ত সেখান দিয়েও উঠছে। পুবের রাস্তা, সেখানে, আরো পুবে, আসামের দিকে গেছে। সেই সব পুবদিক দিয়েও এই একই সূর্যোদয়। এখন বাঘারু সেই না-জানা পুবদিকেই চলেছে বলে এই সূর্যোদয় আকাশময় ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে-সঙ্গে সেই জানা-অজা মেশানো সারাটা পুবদিকই বাঘারুর সামনে খুলে যাচ্ছে।
কান্তদিঘি-কুমারপাড়া আর কুমলাইয়ের আকাশটা আগুনরাঙা। সেই আগুন ফরেস্টের বড় বড় গাছগুলোর মাথা উঁল। এতদূর থেকে ফরেস্ট ত সবুজ না, ছাই-ছাই। যেখানে-যেখানে আগুন লাগছে, ছাই ফেটে অন্য রঙ বের হচ্ছে। দূর থেকে দেখায়, ফরেস্টের ভেতর এক-একটা আলগা-আলগা গাছে আগুন লেগেছে, এক-একটা গাছে যেমন বাজ পড়ে।
ফরেস্টের ছাই-ছাই রঙ আর নদীর ওপরে বা মাঠের শেষে দিগন্তের ছাই-ছাই এমনই মিলে গেছে, কোনটা ফরেস্ট বোঝা যাচ্ছিল না, এখন বহু দূরে-দূরে ঐ আগুন রঙ লেগে যাচ্ছে বলে বাঘারুর চোখের সামনে, গাছগাছড়া জলজঙ্গলের রঙগুলো আলাদা-আলাদা হয়ে যায়।
কিন্তু সূর্যের সেই আগুনরাঙা আলো সারা আকাশে ত একই রকম লেপে যাচ্ছে না। গয়ানাথের বাড়ি থেকে তার মাথায়-মাথায় চলে আসছে যে-আকাশ, সবুজ নাগান, সেই আকাশের বহুদূর পর্যন্ত আগুনরঙের ফালি চলে গেলে তার ভেতর থেকে সবজে ফালিগুলোও বেরিয়ে থাকে। আকাশের সবুজের নীচে, কোথাও-কোথাও কিছু-কিছু মেঘ ছিল। সেই সব জায়গায় আকাশের রঙ, মেঘের রঙ, আলোর রঙ মিলে আর নানা রকম রঙ তৈরি হচ্ছিল।
কুন অং [রং] কুখন ফুটে উঠে আর মিলি যায়, না-দেখা যায়, না-বোঝা যায়। চক্ষুর পলকখান একবারে ফেলিবার মধ্যে আকাশখান আর-এক ঝলক বদলি গিছে। আগুনের নাখান অংটা দূরত-দূরত চলি যাছে, হু-ই পচিম পাখত তিস্তানদীর পারত, তার পচিমে জলপাইগুড়ি সদরত, তার পচিমে কোটত কোটত আজগঞ্জ—-সবখানের আকাশ নাল [লাল টকটকা হবা ধরিছে হে। এ্যালায় কুমলাইয়ের পুবত অংখান পাতলা হবা ধরিছে। কায় য্যান ঐ লাল অংটা ধুইবার ধইচচে। আর-হুঁ-ই তিস্তাপারের পচিম পাখ তক পাতলা হয়্যা যাছে। কোটত আলো কোটত যায়।
বন্যার তিস্তায় ঝাঁপ দেওয়ার আগে যেমন সামনে পাশে ঘাড় ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে বাঘারু স্রোতের ছক বুঝে নেয়, জলের ঢক দেখে নেয় আর নিজের মনে-মনে একটা নকশা ভেবে নেয়, তেমনি করে ডাইনে আপলাদের দিকে তাকায়–উচা উচা গাছার মাথত আগুন লাগি গেইসে–পেছন ফিরে মাথার ওপরে শ্যাওড়া গাছটাকে দেখে পাতাগিলা ঝলঝল করিবার ধইচছে য্যান বিষ্টি হবা ধরিছে,–বাঘারু তার নিজের শরীরের দিকে তাকায়—-সারা শরীলখান কায় অং মাখাছে–বাঘারু পায়ের তলার ঘাসের দিকে তাকায়–ঘাস গিলা সব আয়না হয়্যা যাছে
আলোর সেই নিমজ্জনে বাঘারু দাঁড়িয়ে থাকে, খাড়া। এতটা এমন বেগে হাঁটার পর তার গা জুড়ে ঘাম ফুটে উঠতে শুরু করে। সেই বরমডাঙার [ব্রহ্মভাঙা] এক সীমায় দাঁড়িয়ে আর-এক সীমার তাদৃশ্য পেছন থেকে ঘটে যাওয়া সূর্যোদয় দেখতে-দেখতে বাঘারু ঘামে। এই বারঘরিয়ার মাঠটায় ঠিক এই সময় উঠতে না পারলেই ত বাঘারু আর এই সূর্যোদয় পেত না। গোচিমারি থেকে হাঁসখালির পথে ঘটে গেলে ত পেছনে থাকত। হাতির রাস্তা ঘটে গেলে ত কোনাকুনি থাকত। আনন্দপুর বাগানের ভেতর ঘটলেও ডান কোনায় পড়ত। এই বারঘরিয়র মাঠে সে কখন পৌঁছবে তার জন্যেই যদি সূর্যোদয় অতক্ষণ ঠেকে থাকে, তা হলে ত বাঘারুকে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতেই হয়, দেখার জন্য দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘামতেও হয়।
সেই দেখা আর ঘামার মধ্যেই বাঘারুকে এক সময় এইটা বুঝতে হয়, মুই খালি-খালি খাড়া আছি। আর সত্যি যে শুধু তার এই উদোম ঢ্যাঙা শরীরটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেটা তার শরীরের ভারহীনত দিয়ে তাকে বুঝে নিতে হয়। তার কাঁধে লাঙল নেই–গয়ানারে লাঙল। মোর কাঁধত গাছ নাই–গয়ানাথের গাছ। বাঘারুকে গয়ানাথ নির্বাসন দিয়েছে। ডায়না নদীর জঙ্গলে তার মহিষের বাথান আছে–বাঘারু সেখানেই যাচ্ছে। কিন্তু যাচ্ছে ত তার এই শরীরটা নিয়েই শুধু। বরমতলায় সেই সূর্যোদয়ের সামনে নির্বাসনের পথে বাঘারুর শরীরে-মনে কেমন মুক্তির বোধ এসে যায়। আর সেই বোধটাকে নিজে নিজে বুঝে নিতে, নিজেই নিজের শরীরের দিকে ফিরে-ফিরে তাকায়।
কোনো অদৃশ্য আড়াল থেকে উৎক্ষিপ্ত রঙের এই আকাশমাটিব্যাপী বিস্ফোরণে আর নিজের এই শরীরটার এমন মুক্তিতে বাঘারু হাসে। বাঘারু ত তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে দিয়ে আলাদা-আলাদা কাজ করতে পারে না। সে যা করে তার সারাটা শরীর দিয়েই করে। শুধু ঠোঁট দিয়ে হাসতে পারে না ত বাঘারু, তাই সেই আলোর রঙের ধাক্কায় বাঘারুর সারাটা শরীরই হেসে উঠে কাঁপতে থাকে–বাতাস লাগা শিরীষ গাছের মত। বাঘারুর ত শরীর ছাড়া কিছু নেই–তাও আবার এত বড় একটা শরীর যে, শুধু শরীরটাই আছে বললেও তাকে যেন ততটা সর্বস্বহীন বোঝায় না। অত বড় শরীরটা রঙিন আলোর আঘাতে শিহরিত হতে থাকে।
শরীরের এই শিহরণ ত বাঘারুর চেনা নয়। বা, এমন কিছুই ত তার চেনা নয়, যা এই শিহরণের মত ব্যক্তিগত। তাই বাঘারু তার নিজের শরীরের কম্পনে নিজেই হে-হে হাসে। এমন একা-একা হাসা নিজের হাসির আওয়াজে বাঘারু আরো হেসে ওঠে। আর তাতেই তার আরো হাসি উঠে আসে। নিজের হাসির আওয়াজ বাঘারুর ত খুব চেনা নয়।
দুহাতে মুখ ঢেকে বাঘারু হাসিটা ঢাকতে চায়। তার হাত এত শক্ত যে এখন আর আঙুলগুলো বেকানো যায় না। তবু, হাত যখন, একটা তালু থাকে। আর তালু যখন, তখন আঁজলা হয়। বাঘারু মুখ ঢাকতে দুই হাত তুললে, হাতের তালু আলোতে, রঙে ভরে যায়, যেন বাঘারু নিচু হয়ে মাঠ থেকে আঁজলা ভরে আলো আর রঙ তুলে আনল। এখন তার চোখের সামনে দুই অঞ্জলি থেকে সেই রঙিন আলো ঝরঝর ঝরে পড়ে শরীরে।
নিজের হাতের আঁজলায়, নিজের শরীরে, এই প্রথম রঙ-আলো ঢালছে বাঘারু। শরীরটা এই প্রথম তার নিজের হয়ে উঠছে যেন।
হাত দুটো মাথার ওপরে, বা হাতে ডান হাতের মগরা (কজি চেপে ধরে বাঘারু পিঠটা ধনুকের মত বাকায়, পেছনে। কাঁচা বাশের মত তার শরীরটা ঐ রকম হেলে থাকে আর হেলানোর ভার বইতে তার পায়ের মচকা [বাটি], থলমা [উরু] আর পেটের বুকের পেশিগুলো টুকরো-টুকরো হয়ে ফুলে-ফুলে ওঠে। আড়মুড়ি ভাঙছে বাঘারু। আবার, পেছন ফিরে দুই হাত মাথার ওপর তুলে ধনুকের মত বাকায়, সামনে। তার পাথরের চাঙাড়ের মত পিঠটার ঢাল মাটির দিকে নেমে গেলে নড়ডারুর গিঠগুলো প্রখর জাগে, যেন ঐ শিরদাঁড়া বেয়ে এখনই কোনো ঝরনা ঝপাবে। কাঁধে, ঘাড়ে, পিঠে, বাহুতে, কোমরে, উরুতে, কটিতে আলোর স্বাদ পেতে ভালো লাগে বাঘারুর–আলোর উষ্ণ স্বাদ। সে একটু ঘুরে দাঁড়ায়, বায়ে, আলো তার বা পাজর দিয়ে, বা তলবুক থেকে বা তলপেটে চলে যায়। খানিকক্ষণ ও-রকম থেকে বাঘারু ডাইনে ঘোরে, আলো তার ডান পাজর থেকে ডান তলপেট পর্যন্ত লেপটে যায়।
খাড়া হয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাঘারু দেখে, সূর্যের প্রথম আলো তীক্ষ্ণ রেখায় প্রান্তরের অপর প্রান্ত থেকে বাঘারুর দিকে ছুটে আসছে সঁ সঁ। বাঘায়ু আলোর দিকে ছুটে যায় কিন্তু সে পৌঁছনোর আগেই আলোর তীক্ষ্ণ সূচিমুখটা ফেটে যায় আর আলো ছড়িয়ে পড়ে মাঠময়। বাঘারু মাটিতে গড়িয়ে পড়ে মাটি থেকে আলো সর্বাঙ্গে মাখতে থাকে।
.
বারঘরিয়ার মাঠ ছেড়ে বাঘারু নিপুছাপুরের দিকে চলতে শুরু করে। ডান দিক জুড়ে সূর্যোদয়ের অব্যবহিত পরের মাঠের দিকে তাকিয়ে বাঘারু বিড়বিড় গুনগুন করে! আর, একবার করেই থাকেম না। বার বার ঘুরেফিরে করে। করে, আর হাঁটতে-হাঁটতেই দোলে।
উঠেন উঠেন বেলা ঠাকুর চিকচিক্যানি দিয়্যা
উঠেন উঠেন বেলা ঠাকুর আগুন-টকটক হয়্যা
খুলি দিছু দেহবাড়ি ছ্যাকা দিয়্যা যান।
জল যাউক, হিম যাউক, খাড়াউক শরীলখান।
কোলের বাচ্চাদের চপচপ করে তেল মাখিয়ে সূর্যের দিকে ধরে দোলাতে-দোলাতে এই গান মায়েরা গায়। বাঘারুর দুই হাতে কখনো কোনো শিশু দোল খায় নি। আর এখন সূর্যের দিকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দোলানোর মত শিশু যখন বাঘারুর হাতের মধ্যে নেই, তখন বাঘারু নিজেকেই দোলাক। এই কম হাঁটতে-হাঁটতে যতটা দোলানো যায়, দোলাক। আর যতটা বিড়বিড় গুনগুন করা যায়, করুক। বাঘারু এখন তার নিজেরই শিশু।
কিন্তু একবার বলেই ত আর থামতে পারে না বাঘারু, এমন কি, বারকয়েক বলেও না। এই ছড়া একবার মাথার ভেতর সেঁদিয়ে গেলে আর বেরতে চায় না। তার ওপর আবার হাঁটার দোলনটাও ছড়ার সঙ্গে মিশে গেছে। হাটা না থামালে আর এই বিড়বিড়-গুনগুন থামবে না। এই দোলানি আর ছড়ানি কবে সেই জন্মকালে বাঘারুর মাথার ভেতর সেঁদিয়ে আছে–তার ব্যস্ততাহীন নির্জন মাথায়। তারপর পাখির ডাক, জীবজন্তুর মুখ আর আলো-হাওয়ার গতি যেমন.চেনা হয়ে যায় মুহূর্তের মধ্যে, যখনই তেমন সময় আসে, তখনই, এই ছড়ানিগিলা চলি আসিবার ধরে এ্যানং নাম্বা লম্বা হাঁটনে, কামছাড়া গাওছাড়া এ্যানং নাম্বা হাঁটেন, ছড়াগিলা গানগিলা পিপিড়ার মত চলি আসিবার ধরে এককারে লাইন বান্ধি, একোটার পর একোটা, কোটত আসে কোটত যায় কায় জানে।
বাঘারু চলতে-চলতে দোলে আর দুলতে-দুলতে বলে
বেলা ঠাকুরের মাই গে
সিন্দুর ফেল্যান কেনে, সিন্দুর ফেল্যান কেনে?
না ফেলিছু, না ফেলিছু, কৌটা উলটি গেইছে।
দাওয়া লালাইছে তায়।
সূয্যি ঠাকুরের মা, সিঁদুর ফেলেন কেন? ফেলি নাই, সিঁদুর ফেলি নাই, সিদুরের কৌটো উল্টে গেছে। আকাশ তাই লাল।
বেলা ঠাকুরের মাই গে
জল ঢালিছেন কেনে, জল ঢালিছেন কেনে?
না ঢালিছু, না ঢালিছু ছোঁয়াক নোহাইছু
মাটি ভিজেন তায়।
সুয্যি ঠাকুরের মা, এত জল ঢালেন কেন? ঢালি নাই, জল ঢালি নাই, ছেলেকে নাইয়েছি, সেই জলে। মাটি ভেজা।
বেলা ঠাকুরের মাই গে
ঝাঁটা ঝাড়িছেন কেনে, ঝাটা ছাড়িছেন কেনে?
না-ঝাড়িছু, না-ঝাড়িছু, ছোঁয়াক শুকাইছু
বাও উঠেন তায়।
সূয্যি ঠাকুরের মা, সকালে এত ঝাড়েন কেন, হিমেল বাতাস দেয় কেন? ঝাড়ি নাই, ঝাড়ি নাই, আঁচলের বাতাস দিয়ে, ছেলের গায়ের জল শুকাই, তাই বাতাস ওঠে।
বেলা ঠাকুরের মাই গে।
ঘর বোয়া কইচছিস কেনে, ঘর থোয়া কইচছিস কেনে?
না করিছু, না করিছু ছোঁয়াক ছাড়ি দিম
এগিনা ধুছি তাই।
সূয্যি ঠাকুরের মা, ঘরদোর এত বোয়া-মোছা করছেন কেন আকাশ নীল ঝকঝকে? মুছি নাই, ঘর মুছি নাই, ছেলেকে ছেড়ে দেব বলে আঙিনা, আকাশ, ধুচ্ছি।
বেলা ঠাকুরের মাই গে
ছোঁয়াক ছাড়েন কেনে, ছোঁয়াক ছাড়েন কেনে?
মোর ছোঁয়াটার ছ্যাঁক নাগিলে তোর ছোঁয়াটা উঠে
ছোয়াক ছাড়িছু তাই।
সূয্যি ঠাকুরের মা ছেলেকে ছেড়ে দিচ্ছেন কেন? আমার ছেলের ঘঁহ্যাঁকা খেয়ে তোর ছেলে উঠবে, তাই।
হেই গে মোর বেটাখান
হেই গে মোর ছোয়াখান।
হেই গে মোর ছাওয়া-ছোটর ঘরখান
নিন্দ ভাঙ্গি উঠি গেইছে।
হা করিছে, ভ্যা করিছে
আর তোর ছোয়াখানেক দেখি পুটপুটাইয়া হাসিবার ধইরেছে…
আমার ছেলে উঠে গেল, আমার বেটার ঘুম ছুটল, হাই তুলছে, কাঁদছে আর তোমার ছেলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
উঠেন উঠেন বেলা ঠাকুর চিকমিক্যানি দিয়া….
বাঘারুর কবিতার সঙ্গতিতেই আকাশের লাল রঙ ধুয়ে ঝকঝকে নীল রঙ বেরিয়ে পড়ে। আর কান্তদিঘি কুমারপাড়া, কুমলাই, মাথাচুলকার আড়ালে-আড়ালে যে সূর্য উঠছিল সেটা যে এখন সারা দুনিয়াতেই উঠে গেছে, অন্তত বাঘারুর সারা দুনিয়াতে, নিপুছাপুরের ফ্যাক্টরির টানা লম্বা বাঁশিতে তা রটতে থাকে।
সেই দুনিয়ার এক সীমান্ত থেকে আরেক সীমান্তের দিকে বাঘারুর এই চলার সামনে এখন এই বারঘরিয়ার প্রান্তরের ঢাল। ঢাল বেয়ে শিশুর মত গড়াতে গিয়ে বাঘারু তার শরীরের দোলা আর ছড়ার দোলা হারিয়ে ফেলে।
ছড়ায় শিশু ছাড়া সকাল নেই। শিশু ছাড়া কবিতা নেই। বাঘারু এখন তাই নিজেই নিজের শিশু।
.
বাঁশি শুনে নিপুছাপুর চা বাগানের লাইনগুলো থেকে সবাই বেরিয়ে পড়েছে। সবার কাঁধে একটা ছাতা। কাঁধে কাঁধে রুমালের মত থলি, লম্বা ডাণ্ডির মাথায় ছোট চ্যাপ্টা কোদাল, হাতের আঙুলের মত কাটা কোদাল, বাকা দাও, লম্বা কলম ছুরি। যার কাঁধে যেমন ঝোলানো বা আটকানো সে তেমন হাঁটছে। যার কাঁধে রুমাল দোলে সে নিজে যেমন খুশি দুলতে পারে। কোদালগুলো যাদের কাঁধে তারাও খানিক হেলতে পারে। কিন্তু দাও আর ছুরি যাদের কাঁধে লাগানো তারা সেই কাধটা নাড়ায় না।
মরদদের বেশির ভাগেরই পরনে উরু কামড়ে থাকা ছোট হাফ প্যান্ট–সামনে পেছনে অনেক সেলাই ও পকেট। আর গায়ে নানা রকমের গেঞ্জি-গোলগলা, কলার, ভিকলার, কলারের সামনে-পেছনে দাগ, বুকে-পিঠে নকশা। গেঞ্জির রঙ নানা রকম। কিন্তু সব রঙই মরে গেছে, মাঝে-মাঝে আচমকা এক-একটা টাটকা রঙ ছাড়া। বয়স্ক কারো কারো পরনে ধুতি-হাঁটুর ওপর টেনে তোলা, ও গেঞ্জি। কারো কারো খাকি প্যান্টের ভেতর হাফশার্ট গেঁজা। বেশির ভাগই খালি পা। আচমকা দু-একজনের পায়ে মোজাসহ বুটজুতো, চকচকে। তেমন দু-একজনের হাতে ছোট স্টিকও আছে। কেডস-পরাও আছে কয়েকজন। তারা এমন হাঁটে, যেন খেলতে যাচ্ছে। তেল চকচকে কাল চুল পাট-পাট আঁচড়ানোর নানা বাহার–পেছনে বাবরি, দু-পাশে বাবরি, সামনে সিঙাড়া, মাঝখান দিয়ে চিরে চিরে দু-পাশে সিঙাড়া, মাঝখান দিয়ে সমান চিরে আবার মিশিয়ে দেয়া, কপালের ওপর একটু এগনো-ফেল্ট ক্যাপের মত, আবার কপালের ওপর একেবারে ভুরু পর্যন্ত লেপটিয়ে নামিয়ে গোল করে তুলে দেয়। কিন্তু বাহার শুধু সামনের নয়, পেছনেরও। কোনো ঘাড় বাবড়ি, কোনো ঘাড় বব, কোনো ঘাড় মোটা ভাবে হেঁটে তোলা, কোনো ঘাড় ইংরেজি ইউ-এর মত, কোনোটা ইংরেজি ভি-এর মত, কারো দুকান সম্পূর্ণ ঢাকা, কারো অর্ধেক, কারো পেছনটাও সিথির মত চেরা। এরই ভেতর দু-একজন আছে, সম্পূর্ণ ন্যাড়া।
মেয়েদের শাড়ির চড়া রঙ। শাড়িগুলো একটু উঁচু করে পরা। আঁচল নেই। সামনের দিকটা একটু বেশি তুলে আঁচলটা বুক থেকে নেমে এসেছে। কারো কারো আঁচল নেই-ই, পুরো শাড়িটাই বুকের ওপর থেকে গোল হয়ে নেমে এসেছে। চুলের বাহার পরনের বাহারকে হার মানায়। কারো চুল মাঝখানে সিথির দু-পাশে পাট করা। কারো বা দুই বেণী মাথার ওপর তুলে গিঠ দেয়া। কারো আবার ছোট চুল, ঘাড়ের কাছে গিঠ। কারো একটু উঁচুতে ঘেঁপা বাধা। প্রায় সবার চুলেই ফুল। সকালে যে যা হাতের কাছে পেয়েছে, সেই ফুলই খুঁজে দিয়েছে। দু-একজনের মাথায় বড় বড় গাদা। কাল রাত্রিতে বাংলো থেকে তুলে এনে রেখেছে। বেগুনি রঙের ছোট-ছোট ঘাস ফুলও কেউ-কেউ ঝাটার কাঠিতে গেঁথে গুঁজে দিয়েছে। ফুলের কাঠি মাথার ওপর উঠে আছে, চলার সময় কাঁপছে।
মেয়েদের অনেকেরই পিঠের ঝোলায় বাচ্চা। ঝোলার বাইরে বাচ্চার ন্যাড়া মাথা বেরিয়ে আছে। চলার তালে দোলে। পা আর হাত দুটোও বেরিয়ে ঝোলে। বোধহয় চলার দুলুনিতেই, সব বাচ্চাই প্রায় ঘুমিয়ে।
মেয়েরা এত রঙিন বলেই হয়ত শাদা শাড়ি আর জামায় দুএকজন মাঝবয়সিনীকেও রঙিনই দেখায় মাঝে-মাঝে।
কিন্তু মেয়েমরদ, বুড়োবুড়ি, ছোকরাছুকরি–এইরকম ভাগ-ভাগ করে দেখলে কুলি লাইনের রাস্তাটা ধরে এই যে সবাই এক সঙ্গে সকালের বাঁশি শুনে কাজে চলেছে, সেই এক সঙ্গে যাওয়াটাকে ঠিক বুঝে ওঠা যায় না। এখন এই বাঁশি শুনে, এই সকালে, এক সঙ্গে যাওয়াটাই সব চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। তাতে কাউকে আলাদা করা যায় না, সব মিলেমিশে একটা ঘটনা ও একটা দৃশ্য হয়ে ওঠে। পোশাকেআশাকে চলনেবলনে কেউ যদি আলাদা হয়ে যায় সেটাও যেন এই সমগ্রতাকেই স্পষ্ট করে। কত রকমের হটাতেই না এই চলাটা তৈরি হয়ে উঠেছে। তাড়াতাড়ি পা চালাতে গিয়ে কেউ প্রায় দুলে-দুলে চলে, কেউ কোমরটা বেশি নাচিয়ে ফেলে, চুলের গোছার দোলায় কারো হাঁটার ছন্দও অন্য রকম দেখায়, কোনো আধবুড়ো হাঁটুর কাছে ঝোলা হাফ প্যান্টে মাটির দিকে তাকাতে-তাকাতে ছোট-ছোট পায়ে এগিয়ে চলে। এত বিচিত্র হাঁটা সত্ত্বেও কাজের জায়গাতে পৌঁছবার তাড়া যে-গতি আনে সেটাই প্রধান হয়ে ওঠে–সব বৈচিত্র্য সত্ত্বেও।
দুটো নতুন সাইকেল ঠেলে-ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে–অত ভিড়ের মধ্যে। মাঝে-মাঝে বেল বাজাচ্ছে। সাইকেলের হ্যাঁন্ডেলে প্লাস্টিকের দড়ির গুচ্ছ–চালালে ওড়ে। এইটুকু রাস্তা ত চড়লেই ফুরিয়ে যাবে। তার চাইতে সবাইয়ের সঙ্গে হাঁটতে-হাঁটতে সাইকেলটা টেনে নিয়ে যেতে ত অনেকটা সময় লাগবে। এতটা সময়ই তো সাইকেলটা নতুন থাকবে। এখন কিছুদিন চলবে–ঠেলে-ঠেলে কাজের জায়গায় নিয়ে গিয়ে আবার ঠেলে-ঠেলে ফিরিয়ে আনা। সাইকেল আছে বলে বাবু তাকে কোনো জরুরি কাজে পাঠাতে পারে। তেমন হলে, পুরো বাগানটাই টহল দিয়ে আসতে হতে পারে। তখন, একা-একা সাইকেলটা চালাতে খুব ভাল লাগে। দু-পাশের বেডে বা রাস্তায় কাজ করছে যারা, তারা তাকিয়ে দেখে, কে সাইকেল কিনল। চেনাজানা লোক আওয়াজও দেয়। মেয়েগুলো খিলখিল হাসে। আর এই সবে প্যাডেলের জোর বেড়ে যায়। দু-পাশের ঘন সবুজ চা গাছের ভেতর দিয়ে চকচকে সবুজ সাইকেলটা চলে। শুধু রঙের জন্যে পঁচাত্তর টাকা বেশি। হ্যাঁন্ডেলের লাল ঝালরগুলো বাতাসে ওড়ে দু-পাশে। হ্যাঁন্ডেলের সঙ্গে লাগানো দু-দুটো আয়নায় পেছনের চা-বেডগুলো সঁ সঁ সামনে ছড়িয়ে যাবে। দুটো আয়নার জন্যে পঞ্চাশ টাকা বেশি। পেছনের লাল আলো চার পাশের সবুজের ভেতর জ্বলজ্বল করে। যেন আলো দেখেই চিনে নেয়া যায় কার সাইকেল চালাতে হলে সাইকেল ঐরকম চালানোতেই সুখ–যেন, সার্কাসের খেলোয়াড় খেলা দেখাচ্ছে, চার পাশে গ্যালারি, আওয়াজ, হাততালি। আর, যদি এমন হয়, যেখানে চালাচ্ছে, তার দু-পাশে কেউ নেই, তা হলেও ত নিজের কানের দু-পাশে নিজেরই ছোটার হাওয়া লাগে, যত লাগে সাইকেলের গতি তত বাড়ে। চালাতে হলে ঐ রকম সাইকেল চালাতে হয়, না-হলে, ভো শুনে সবার সঙ্গে হেঁটে যাওয়াই ভাল, সাইকেলটাও যেন কাজে যাচ্ছে।
সারাটা মিছিল জুড়েই ট্রানজিস্টার বাজে। চামড়ার ব্যাগে কারো কাঁধে ঝোলানো, ব্যাগছাড় কারো হাতে ঝোলানো, কারো হাতের পাতায় আটা, কানে কানে সাটা। যে যার মত সেন্টার ধরে আছে–বিবিধ ভারতী, সিলোন, করাচি। রাশি রাশি গান বাজছে। এক-একটা গানের পাশে জোট বেঁধে সেই শ্রোতারা ছুটছে। কেউ-কেউ সঙ্গে-সঙ্গে গায়। কেউ হাততালি দেয় তালে-তালে। দু-হাত ওপরে তুলে কেউবা দুই হাতেই তুড়ি বাজায়।
এত গান এত জোরে একসঙ্গে বাজছে যে সেই সব মিলে একটা অর্থহীন কোলাহলের আওয়াজ ক্রমেই বেড়ে ওঠে। এতগুলো লোকেরএকসঙ্গে ছোটা, কথা বলা, গান গাওয়া, হাসাহাসি ইত্যাদির ফলেও সেই আওয়াজ ক্রমেই বেড়ে ওঠে। চোখ বুজে শুনলে মনে হতে পারে একটা অর্থহীন উদ্দেশ্যহীন কোলাহল বাগানের এই রাস্তাটা ধরে ছুটে চলেছে। সেই আওয়াজের কোনো উদ্দেশ্য নেই বলেই তাতে কোনো আকস্মিকতা থাকে না। আর থাকে না বলেই মাঝে-মাঝেই কৃত্রিম নাটকীয়তায় উচ্চগ্রামে উঠে আবার আচমকা নেমে যায়।
কিন্তু যারা এই কোলাহলের মাঝখানে আছে তারা যে-যার মত গান শুনছে, অথবা শুনছে না। যে-যার পছন্দমত গান বেছে নিতেও পারছে। এক গান শেষ হলে, অন্য রেডিয়োর অন্য গান ভাল লাগলে একটু সরেও যাচ্ছে। আর নিজেদের এই ভাল লাগাটা কোনো-না-কোনো ভাবে জানিয়েও দিচ্ছে–গেয়ে, বা হাত-তালিতে, বা তুড়িতে, বা উল্লাসে। যে-ভাললাগার বিষয় নিজেরা কোনো-না-কোনো ভাবে তৈরি করে নি, সে-ভাললাগার ওপর এদের যেন পুরো স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না।
এত কিছুর পরেও এই এত মানুষের ভিড়ের এমনি ছোেটার ভেতর অভ্যাস আর দৈনন্দিনের এক ছন্দ থাকে। কখনোই মনে হয় না–এটা ছুটির দিন। এটাও কখনো মনে হয় না-কাজে যাবার আগের শেষতম মুহূর্তটি পর্যন্ত নিজেদের জীবনযাপনের স্বাভাবিকতাটা আস্বাদ করে নেয়ার স্বাসরুদ্ধকর এক তাড়াতেই এমন হৈ-হল্লা। চা বাগানের কাজকর্মের ভেতর অনিবার্যতই কৃষিকাজের অবকাশ ছড়ানো থাকে কিছু। তাই বাগিচার পাশেই এই সাইকেল দাঁড় করানো থাকবে, রেডিও চা-গাছের ওপর শোয়ানো থাকবে। এই রঙ, এই সাজগোছ, এই গান, এই তালের ভেতর দিয়ে এরা সবাই কাজে চলেছে–রোজকার কাজে, বাগানের বাঁশির সঙ্গে-সঙ্গে। যেন উৎসব। কাজে যাওয়াটা ত শ্রমিকদের রোজকারই উৎসব।
.
বাঘারু এই উৎসবের কেউ নয়। বারঘরিয়ার মাঠ থেকে নেমে নিপুছাপুরে ঢুকে সে এই উৎসবের পথে, উৎসবের ভেতর আটকা পড়ে গেছে। বারঘরিয়ার মাঠ নিচু হয়ে ঢলে পড়েছে নিপুছাপুরেরই বাগিচার বাইরের জমির ওপর। কোম্পানি এগুলো অল্পস্বল্প আধিতেও দেয় কুলিদের। সেই ধানি জমিগুলো দিয়ে তারের বেড়া টপকে কুলি লাইনের ভেতরের রাস্তায় বাঘারু পড়ে। প্রথমে সে বোঝে নি আটকা পড়ে যাচ্ছে। ভো শুনে যে যার মত হাঁটছে, বাঘারুও হাঁটছে। কিন্তু অমন কয়েক পা হাঁটতে-হাঁটতেই রাস্তায় দু-দিকের বাড়িঘর, ফঁকফোকর, ওদিকের বাড়িঘর, ভেতরের ফাঁকফোকর এই সব কিছু থেকে কিলবিল করে মানুষজন বেরতে থাকে। জানলে, তখনো বাঘারু সরে দাঁড়াতে পারত। এরা চলে গেলে, নিজের পথে যেত। কিন্তু ততক্ষণে এই ভিড়টা তৈরি হয়ে গেছে আর ভিড়টা ছুটে চলেছে নিজের বেগে, নিজের নিয়মে। আর বাঘারু নিজে টের পায়, সামনের ও পাশের লোকটি যে-গতিতে ছুটছে, যেমন করে পা ফেলছে, তাকেও সেই গতিতে ছুটতে হচ্ছে ও সেই মত পা ফেলতে হচ্ছে। বাঘারু দু-একবার থেমে পড়তে চেয়েছে। কিন্তু পারে নি। এমন নিজে ভেবে থেমেঘর্তে সে শেখেনি পারে না। যদি পড়ে যেত আর তার ওপর দিয়ে এরা চলে যেত, বা যদি সবাই মিলে ধাক্কিয়ে তাকে বের করে দিত যে সে এই লাইনের লোক না, তা হলেই বাঘারু এই মিছিল থেকে আলাদা হতুে পা-কিন্তু বাঘারু ত কোনোদিনই ঘটনা ঘটিয়ে উঠতে পারে না, তাকে নিয়ে ঘটনা শুধু ঘটে যায়। যতক্ষণ তা না ঘটে, ততক্ষণ বাঘারুকে এই ভিড়ের আর এই মিছিলের চলার সঙ্গে ছুটতে হচ্ছে, এরা যেদিকে যায় সেদিকেই।
তাতেও কিছু হত না। বাঘারু ত মিশেই যেতে পারত এই বিচিত্র মিছিলে। বাঘা যদি একটু ছোটখাট হত কারো নজরই পড়ত না তার ওপর। বা, বাঘারুর অত বড় শরীরটা যদি একটু ঢাকা থাকত। বাঘারু ঐ ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে যখন ভিড়েরই বেগে ছোটে, তখন, তাকে দেখায় যেন ঐ ভিড়ের মাস্তুল। বহু পেছনের মানুষও বাঘারুর মাথা দেখেই দিক ঠিক করবে। কিন্তু সত্যিকারের মাস্তুলের গায়েও অন্তত আলকাতরার বা রঙের যে আবরণটুকু থাকে, বাঘারুর তাও নেই। একটি ছোট, নেংটি তার কোমরের সামনে বাধা। গাছের পাতাতেও এর চাইতেও বেশি ঢাকে। ফলে, সেই একমুখো ভিড়ের সঙ্গে স্রোতের বেগে ছুটলেও বাঘারু স্রোত হয়ে যেতে পারে না। সে স্রোত নয়, স্রোতোবাহিত-তিস্তার স্রোতের টানে. যেমন পড়ানো শালগাছ ছোটে। মেয়েদের যে-দলটা বাঘারুর ঠিক পেছনে গিয়ে পড়ে, তারা বাঘারুকে হঠাৎ দেখে ফেলেই হাসতে শুরু করে দেয়। এমন উৎসবের পথে হাসি ত সংক্রামক, দেখতে-দেখতে হাসিটা ছাড়িয়ে পড়তে থাকে। যারা কাছাকাছি তারা ত হাসির কারণ চোখের সামনেই দেখতে পায়। আর-একটু ভাল করে দেখতে তারা কাছে আসতে চায়। মেয়েদের ভেতর একটা হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। এ ওকে ঠেলে এগতে চায়, পারে না। বাঘারুর পেছনে যারা প্রথম সারিতে ছিল, তারা কিছুতেই জায়গা ছাড়ে না। পেছন থেকে ক্রমে কেউ-কেউ তার ভতরেই ঠেলেঠুলে ঢুকে পড়ে। দেখতে-দেখতে বাঘারুকে ঘিরে একটা ঘের-মত হয়ে যায়; প্রধানত মেয়েদের।
জলে একটা ঢিল পড়লে যেমন জলের কাঁপন চলতেই থাকে, এই ভিড়ে বাঘারুকে নিয়ে হাসির কাপন তেমনি ছড়িয়ে পড়তে থাকে। যারা বেশ দূরে তারা বাঘারুকে ভাল করে না দেখেও হাসতে থাকে। কেউ-কেউ আঙুল তুলে বাঘারুকে দেখায়। আর হাসিটা আরো দূরে-দূরে ছড়ায়। শেষ পর্যন্ত। বাঘারু এই সম্পূর্ণ অথচ ক্রমবর্ধমান মিছিলের অন্তর্গত চলমান দৃশ্য হয়ে পড়ে।
.
প্রতিদিন কাজে যাওয়া মানুষজনের এই মিছিলের ভিড়ের ভেতর পড়ে গেছে বলেই যেন বাঘারুকে কেমন আউলাভাউলা দেখায়। তার চুল জটপাকানো-ধুলো-মাটিতে। সারা গায়ে ধুলোমাটিরই রঙ। যেন ধুলোমাটি থেকে উঠেই সে এমন লাইনে ঢুকে গেছে। এত বড় একটা লাইনের এত মানুষজন বাঘারুতে যেন একটা খেপাবাউড়া পেয়ে যায়। মিছিলের একটা অংশ তাকে ঘিরে খেপাতে-খেপাতে চলছে।
একটা লোক বেশ লাফিয়ে-লাফিয়ে চলছিল। টাইট ছোট প্যান্ট আর টাইট গোল গলার গেঞ্জি, পায়ে মোজাসহ কেডস, হাতে একটা মাথা বাঁধানো স্টিক। সে মাঝে-মাঝেই স্টিকটা দিয়ে কেডসটাতে মারছিল আর নিজেই লাফিয়েলাফিয়ে উঠছিল। সেই লোকটি যেন তার স্টিকার আরো ভাল ব্যবহার খুঁজে পায়, বাঘারুর সামনে এসে পঁড়ায়। তার পর যেন পেছনে পা ফেলে মার্চ করে করে চলছে এই রকম করে পা তুলে-তুলে হাঁটে। বৃঘারুর সারা শরীরে তখন মিছিলের হাঁটা বা ছোটার গতি ধাক্কা দিয়েছে। এমন দলবদ্ধ ছোটায় ত সে অভ্যস্ত নয়। আর তার এত বড় শরীরে ছোটার একটা গতি এসে গেলে, শরীরটার ভারও সেই গতিটাকে ক্রমেই বাড়িয়ে দিতে থাকে, পাথরের পাহাড় গড়ানো যেমন। মাথায় লোকটি বাঘারুর কোমরের কাছ পর্যন্ত। সে যখন বাঘারুর সামনে ঐরকম কদমে কদমে পেছনে পা ফেলে, তখন মনে হয়, বাঘারু যেন কোনো উঁচু মূর্তি, লোকটি তাই দেখছে। আর সেই দেখার যুক্তিতেই সে তার বাধানো স্টিকটা তুলে বাঘারুর বা বাহুতে মারে। হাতে পেলে টিপে দেখত, পাচ্ছে না বলে স্টিক দিয়ে টিপছে। ডান বাহুতেও একই রকম মারে। বাঘারুর পেটে একটা বেঁচা-মত দিতেই যে মেয়েদের দল বাঘারুকে ঘিরে ফেলেছিল তারা হাতগুলি দিয়ে নেচে উঠে কৌতুকে দুই হাত একসঙ্গে ঠোঁটের কাছে তুলে ধরে, আচমকা, বাতাসে-হেলা গাছের মত, হাসির দমকে হেলে পড়ে।
মাথায় ফুল গোজা, রঙচঙে শাড়ি পরা, এমন একদল মেয়ে যদি সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে পড়ে আর এক দিকে হেলে যায়, তা হলে তাদের হাতে-হাতে ধরতেই হয়। আর তেমন ধরলেই, নাচের তাল এসে যায় পায়ে। নিজেরাই বুঝে ওঠার আগে বাঘারুকে ঘেরা এই মেয়েদের সারি পরস্পরের কোমরে হাত দিয়ে নাচের তালে-তালে পা ফেলে দেয় আর আপন মনেই খিলখিল হেসে সেই নাচের সঙ্গত দেয়।
আরে ও রাখোয়াল, তাড়াতাড়ি এসো,
পাহাড় থেকে এক বুনো, ভালুক নেমে এসে
আমাদের নাচের সারি ভেঙে দিল
এই গানের সঙ্গতিতে ঐ লোকটি চট করে বাঘারুর পেছনে চলে আসে, বাঘারু আর মেয়েদের সারির মাঝখানে। মেয়েদের গানের তালে-তালে পা.ফেলে সে বাঘারুর পেছনে-পেছনে চলে। বাঘারুর অত বড় শরীরটার পেছনে লোকটির অতটুকু শরীর আর টাইট ছোট প্যান্টে তার কোমরের অত ঘন-ঘন দুলুনি, কেমন নাচে-গানে অভিনয়ে নটঙ্গী তামাশা-মতই জমে ওঠে। লোকটি তার স্টিক তুলে বাঘারুর পেছনে-পেছন চলে, একবার বা পায়ের বায়ে ডান পা ফেলে, আবার ডান পায়ের ডাইনে বা পা ফেলে। লোকটি স্টিকটা দিয়ে বাঘারুর পায়ের বাটিতে মারে, ডাইনোয়ে, উরুতে মারে, ডাইনোয়ে, পেছনে মারে, ডাইনে বায়ে। আর শেষে পেছনের ফাঁকটাতে, কানিটার ওপরে, লাঠিটাকে সোজা করে ধরে, যেন সেটা বাঘারুর পাছার ভেতরে ঢোকাবে।
এতে হাসি সামলানোর জন্যে হাতগুলো মেয়েদের দরকার হয় বলে নাচের সারি ভেঙে যায়, গান থেমে যায়, আর এই লোকটির পেছনে সারাটা মিছিল হো হো হাসিতে, খিলখিল হাসিতে, ফেটে পড়ে। বাঘারু ত মিছিলটার মাঝখানে পড়ে গেছে, তার সামনেও ত লোকজন আছে। তারাও ফিরে তাকায়, আর বাঘারুকে দেখেই বুঝে নেয়, পেছনের অত হল্লার কারণ কী।
তাকে ঘিরে এই মিছিলটা মেতে উঠেছে–বাঘারু টের পায়। তাকে ঘিরে সারাটা মিছিলে হাসি উঠেছে–বাঘারু বোঝে। তাকে ঘিরে মেয়েদের দল নাচতে শুরু করে–বাঘারু দেখেও খানিকটা। ঐ বেঁটে লোকটা এসে তাকে খোঁচায়। সামনে থেকে আবার পেছনে চলে যায়। কিন্তু বাঘারু বুঝে উঠতেই পারে না, সে কী করবে। বাঘারু এই ভিড়টা থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে পারে, কিন্তু যাবে কোথায়। এই মিছিলের পাশেই ত ঘরবাড়ি, ঘরের দুয়োরে বাচ্চারা ও মুরগি-ছাগল। মিছিলটাকে তছনছ করে দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে সে দাঁড়াবে কোথায়? মিছিলের বাইরে? মিছিলটা চলে যাওয়ার অপেক্ষায়? বন্যায় উৎপাটিত শালগাছের মত বাঘারু অগত্যা মিছিলের টানে চলে–তাকে ঘিরে হাততালি আর নাচগানার হুল্লোড়ের সঙ্গে সঙ্গে।
তাকে ত এক পলক দেখেই বোঝা যাচ্ছিল সে এ-ভিড়ের কেউ নয়। এই সাতসকালে কাজের মিছিলে বাঘারুর শরীরটা বড় বেশি নগ্ন হয়ে গেছে। এতটা নগ্নতা এই মিছিলেরও সয় না। হুল্লোড় বাধিয়ে মিছিলটা তাই বাঘারু থেকে নিজেকে আলাদা করে নিচ্ছে, বাঘারুর এই নগ্ন শরীরটা থেকে নিজেকে তফাত করছে।
অথচ বাঘারুর পায়ের পাতা দুটো এমনই লম্বা-চওড়া, যে মনে হয় এই মিছিলেই প্রোথিত, মাটির ভেতর থেকে উঠে মাটিসহ চলছে। তার শরীরময় শুধু ত সেই নেমে যাওয়া শিকড়ের টান। কয়েক দশক ধরে বেড়ে ওঠা মহীরুহের কাণ্ডের মত তার পিঠটা কোথাও পিছল, কোথাও শ্যাওলাধরা, কোথাও রুক্ষ। অথচ মেরুদণ্ডের দু পাশের পেশিপুঞ্জ এমন ঝরনার মত নেচে-নেচে ওঠেনামে যে বোঝা যায়, এ-শরীরে বৃক্ষের প্রাচীনতা আছে অথচ স্থাণুতা নেই। ঐ কোমর থেকে পায়ের সরল অবতরণ, মূর্তির আকার নেয়, কোথাও কোনো ঢাকা নেই বলেই। যেন, নির্মীয়মাণ কোনো ব্রিজের সদ্য তৈরি দুটো পিলার নদীখাত থেকে উঠে এসে এই মিছিলে ছুটছে। অথচ এই মিছিলে প্রোথিত এই শরীর এই। মিছিলের নয়। বাঘারুর শরীর এখন বাঘারুর বৈরী।
বাঘারুকে ঘিরে নাচতে নাচতে, গাইতে-গাইতে, বাঘারুকে বেঁচাতে-খোঁচাতে এই মিছিলটা একটা চড়াই ভেঙে ওঠে। বাঘারু চড়াইটা দেখতে পায় নিতার আগে এত লোক। কিন্তু পায়ে-পায়ে পায়ের বাটির পেশির টানে, আঙুলের ভরে, টের পেয়ে যায়। চড়াইটায় উঠতেই এই মিছিল থেকে একটা ভিড় আলাদা হয়ে ডাইনে বেঁকে। বাঘারু সরে দাঁড়াতে গেলে আবার সেই মিছিল তাকে সোজা টেনে নিয়ে যায়, সে আর বেরতে পারে না। ফ্যাক্টরি ডাইনে পড়ে থাকে। পাতা শুকোবার শেড পড়ে থাকে। বাঘারুকে নিয়ে মিছিলটা এগিয়ে যায় আর মিছিল থেকে গোছা-গোছা নোক খসে পড়ে, যে-যার কাজের জায়গায়। এখন বাঘারু দেখতে পায় তার সামনে আনন্দপুরের গেটের মতই একটা গেট আর তার ওপরে চা-বাগিচা। সাইকেল আর ট্রানজিস্টার নিয়ে ঐ বাকি মিছিলটা চা-বাগিচায় নামে।
এখন বাঘারুকে নিয়ে মিছিলটা আর ব্যস্ত নয়, কিন্তু বাঘারু মিছিলটাতে আটকা পড়ে গেছে। এই উঁচু থেকে বাঘারু দেখতে-দেখতে নীচে নেমে যায়–তারের বেড়ার ঘের দেয়া চা বাগান, রাস্তার পর রাস্তা, মোড়ের পর মোড়, মাঠের মত সমান চা-গাছের মাথার ওপরে ছাতার মত সমান শিরীষ গাছের মাথা। আর সেই বাগিচা জুড়ে নানা রঙের মানুষ কাজ করছে।
কিন্তু, দেখতে না-দেখতেই মিছিলটা বাগিচার ভেতর নেমে পড়ে বলে বাঘারু আর দেখতে পায় না। সে সমান বেগেই ছোটে–তার শরীর ঘেরা মিছিলটা খসাতে-খসাতে।
.
দুই পাশে চা বাগিচার সারি, মাঝখানে চওড়া সবুজ রাস্তা, বাঘারু দাঁড়িয়ে থাকে, একলা, বাকল খুবলে নেয়া অর্জুন গাছের মত, মিছিলটা যে সম্পূর্ণ ঝরে গেছে, বুঝতে।
বাঘারুর সামনে সব জায়গাতেই কাজ। চা-ঝোপে মেয়েদের বুক পর্যন্ত ঢাকা-যেন স্নানে নেমেছে। মেয়েরা টুকটুক করে পাতি ভেঙে হাতের ভেতরই রাখছে। হাত ভরে গেলে কাঁধে ঝোলানো থলিটাতে ফেলে। আঙুলগুলো আবার গাছের ওপর নেমে আসে। খোঁজাখুজি নেই। আঙুলগুলো জানে, কোথায় পাতা! মুহূর্তে-মুহূর্তে পুটপুট আওয়াজ। ধানখেতের গোড়া নিড়নোর সময় এরকম আওয়াজ খেতময় ছড়িয়ে পড়ে। ধানখেতের কথা মনে হতেই বাগিচার এই কাজ আর তার নিজের কাজের ভেতর কেমন মিল খুঁজে পেয়ে যায়, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই, আর নিজের হাত দুটো নিজের চোখের সামনে মেলে ধরে। তাকে যদি পাতি তুলতে হয়, সে কি একটি পাতিও তুলতে পারবে? নাকি, তার আঙুলগুলো, ষাড়ের জিভের মত, এক গোছ পাতা মুচড়ে আনবে? ডান হাতটা চোখের সামনে মেলে, বুড়ো আঙুলটা বঁকিয়ে, ভেতর দিকে আনার চেষ্টা করে। আঙুল বেঁকে না। বুড়ো আঙুলের তলার মাংসতে দুটো-একটা দাগ পড়ে মাত্র। বাঘারু তখন তার বুড়ো আঙুলটা দিয়ে বাকি চারটি আঙুলের মাথা ছুঁয়ে যায়। বোঝার চেষ্টা করে, হেঁয়াটা সে বুঝতে পারে কি না।
বাঁ-পাশে একদল মরদ বাকানো দা নিয়ে চা-গাছগুলোর ডাল কাটছিল। দা-টা ছুরির মত পাতলা, হাতলটা ছোট্ট। বাঘারু কি তার হাতের মুঠোয় ঐটুকু হাতল ধরতে পারত? বাঘারু আবার তার ডান হাতটা তুলে চোখের সামনে পরীক্ষা করে। অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়ে, তার মুঠোর ফাঁকাটা এতই বড় যে কুড়োল, কোদাল বা লাঙল ধরা যায়, কিন্তু ছুরির মত দায়ের বাট আলগা হয়ে খসে যাবে। বাঘারু ডান হাতটা মুঠো পাকায়। অবলম্বনহীন তার আঙুলগুলো গেঁথে বসতে পারে না, আলগা থাকে। বাঁ দিকে একদল মরদ নালীর মধ্যে নেমে কোদাল দিয়ে নালীর গা থেকে ভেজা মাটি তুলে-তুলে ওপরে ফেলছিল। মাথার ওপর কোদাল তুলে ধরার ভঙ্গি বাঘারুর চেনা। উৎপাটিত সেই মাটির কাল বাঘারুর চেনা। বর্ষার জঙ্গলে বন্ধ নালীটার একটা ছোট অংশের ধীরে-ধারে পরিষ্কার হয়ে ওঠাটা বাঘারুর চেনা।
সামনে তাকিয়ে দেখে, মোড়ে কয়েকজন বাবু। মিছিলটা তাকে এখানে রেখে ঝরে যাওয়ার পর, আবার তার নিজেরই কাছে নিজের গ্রাহ্য হয়ে উঠতে বাঘারুর সময় লাগে। চা বাগিচার চারপাশের এই সব আধোচেনা কাজকর্ম আর সে-সবের সঙ্গে তার নিজের কাজ করার অভিজ্ঞতার বিনিময়–এই সবের ভেতর দিয়ে বাঘারু তার নিজের কাছে ফিরে আসে।
সামনে, বাবুদের দেখতে পেয়ে যেন যাওয়ার একটা জায়গা পায়। বাবুরা ছিল না বলেই বাঘারু এতক্ষণ মিছিলবন্দী হয়ে ছিল। বাবুরা আছে বলেই এখন ত বাঘারুর একটা কাজও জুটে যেতে পারে–এরকম নালী কাটা বা কোদাল কুড়োল চালানো কাজ। কাজ থাকলে মিছিলটা তাকে এরকম তাড়া করে ফিরত না, তার পর তাকে একা ফেলে খসে যেত না। বাঘারু কি মিছিলেই ঢুকতে চায়? বাবুদের সামনে বাঘারু পৌঁছে যায় বটে কিন্তু তার পরই মুশকিল বাধে। বাঘারু এমনি ত যেখানে-সেখানে একা-একা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে কিন্তু এখন যে তাকে এত উঁচু থেকে চোখ নামিয়ে বাবুদের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হয়–সেটাই বড় কষ্টের। শরীরটাই এমন বাঘারুর যে শুধু দাঁড়িয়ে থাকলেও না-দেখে উপায় নেই। বাবুই জিজ্ঞাসা করেন তাকে, কী? কিছু বলছ?
না হয় বাবু, বলে ফেলে তার মনে পড়ে যায় সে ত এইটুকু বলতে চেয়েছিল যে কোদালকুড়োল চালানোর কাজটা সে পারে। সে তাড়াতাড়ি বলে, হয় বাবু
বাবুর বোধহয় একটু সময় ছিল, বাবুদের হাতে যেমন থাকে। জিজ্ঞাসা করেন কী হয়?
বাঘারু আবার ফাঁপরে পড়ে। বাবুরা প্রায় কোনো সময়ই বাঘারুকে কিছু জিজ্ঞাসা করে না। কিন্তু অন্যদের করলে সেটাও ত বাঘারু শুনতে পায়। কখনো কখনো কোনো-কোনো বাবু তার সঙ্গে কথা বলে, যেমন এমেলিয়া বাবু। কিন্তু কখনো কোনো বাবুর কথার কোনো জবাব তার মাথায় এল না। বাবুরা কী জানার জন্যে কী জিজ্ঞাসা করে, বাঘারু, তার আন্দাজ পায় না। তাড়াতাড়ি বলে, না হয় বাবু।
জবাবটা শুনে বাবু খুশি হয়েছেন বোঝা যায়। হাসেন। যেন এই জবাবই তিনি চাইছিলেন। বাঘারু বলতে চায়, সে পাতি তোলার কাজ জানে না, ছুরি চালানোর কাজ জানে না। এর পর সে বলতে চায়, সে কোদাল চালানোর কাজ জানে, সে কুড়োল চালানোর কাজ জানে। এরও পর সে বলতে চায়, বাবু তাকে একটা কোদাল বা কুড়োল দিক।
কিন্তু এই তিনটি কথার কোনটা আগে আর কোনটা পরে বলবে তা নিয়ে বাঘারুর সংশয়ের শেষ নেই। মনেও থাকে না তার, কোনটা আগে আর কোনটা পরে–যদিও সেই ক্রমটা বাঘারুই ঠিক করেছে। বাঘারুর নিজের কাছে কথাটা যেমন পরপর আসে, বাবুর কাছে সেরকম পরপর হয়ত আসে না। এই একটা হয়ত-তে বাঘারু বিপর্যস্ত হয়ে যায়।
বাবু, মুই পাতা তুলিবার না পারি।
শুনে বাবু মুখ তুলে তাকায়। বাঘা ঘাড় ঘোরায় সেই জায়গাটা খুঁজতে, যেখানে মেয়েরা পাতি তুলছিল, এমন ভাবে যেন বুকজলে নেমে আছে। সে জায়গাটা দেখতে পায় না। ফলে বাঘারুকে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, বাবুকে সম্পূর্ণ ভুলে, অথচ, তার কথার প্রমাণের জন্যে বাবুর সামনে ঐ পাতিতোলা কাজটা দেখাতে। বাঘারু কথা দিয়ে কাজ বোঝাতে পারে না, কাজ দিয়ে কথা বোঝায়।
সেই মেয়েদের দেখতে পেয়ে আঙুলটা তুলে বলে, ঐ যে বাবু।
কী?
পাতা তুলিছে বেটিছছায়ার ঘর। মুই না পারি।
হু, বাবু চোখটা ঘুরিয়ে নেন। সেই চোখ ঘোরানোতে কোনো অবজ্ঞাও থাকে না, মাতাল কুলিকামিনের এমন দার্শনিক সংলাপে তার অভিজ্ঞতারই একটা প্রকাশ থাকে মাত্র।
বাবু
হু
মুই ডাল কাটিবার না পারি, বলে বাঘারু বাবুর সামনে তার হাতটা তোলে, বাবুকে ছাড়িয়ে হাতটা বিঘত খানেক এগিয়ে যায়–তার হাতটা এতই লম্বা, ঐ ঠে বাবু।
হু
ঐ ঠে ছুরিখান চালাছে। মুই না-পারি বাবু।
হু
ডাল কাটতে পারে, কিন্তু ঐ কলম ছুরি তার হাতে ধরবে না এত জটিল কথা কী ভাষায় বোঝায় বাঘারু?
বাঘারু চুপ করে যায়। তার আর-কিছু মনে পড়ে না। কিন্তু এটা বোঝে তার কথাটা বাকি আছে। বাঘারুর সাইজের একটা মানুষ এত কাছে দাঁড়িয়ে থাকলে তার ছায়া পড়ে। বাবু যেন অপেক্ষায় ছিলেন, সেই ছায়াটা সরে যাবে। যায় না দেখে মুখ ঘুরিয়ে বলেন, ত হয়েছে ত, এবার যাও।
কোটত বাবু?
যেখানে যাচ্ছিলে।
কোটত বাবু?
সেটা আমি বলব কী করে বাবা, এখানে পাতিটেপা ফাড়ুয়ামারা এই সব হচ্ছে, এ-সব ত তোমার কাজ না, এখন যাও।
বাবুর এই কথাটিতেই বাঘারুর আবার মনে পড়ে যায়, সে তাড়াতাড়ি বলে ফেলে, মনে পড়ার আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে, মুই কোদাল চালাবার পারি বাবু, কুড়িয়াল চালাবার পারি। যা পারে সেটা বলে ফেলতে পেরে এবার তার প্রমাণ দিতে দুই পা ফাঁক করে বাঘারু হাত দুটো ওপরে তুলে কুড়োল-কোদাল নামানোর ভঙ্গিতে বলে, এ্যানং, বাবু।
হু
এই, এ্যানং, যেন কোদাল কুড়োল চালানোটা কথা দিয়ে বাবুকে বাঘারু সম্পূর্ণ বুঝিয়ে উঠতে পারছে না, তাই তাকে দেখিয়ে বোঝাতে হচ্ছে।
পার ত চালাও।
বাঘারু মুহূর্তে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার পর তার চোখ স্থির করতে হয় সেই ফাড়য়া-চালানো দলটার কাছে নালীর মাটি যারা তুলছিল তাদের ওপর। বাঘারু তাদের দিকে ছুটে যায়।
বেড় ও রাস্তার মাঝখানে সরল নালীটা এতটাই গভীর যে সেখানে নেমে যারা কাজ করছিল তাদের ঘাড়টুটু শুধু ওপরে আছে, এতটাই চওড়া, যে অইন বেঁধে এই দলটির কোদাল চালাতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না, এমন কি, ঘুরে দাঁড়িয়ে দেয়াল চাছতেও পারছে। কিন্তু গভীরতা এত বেশি বলেই চওড়াটা চোখে পড়ে না। অভ্যস্ত কাজের ব্যস্ততাহীনতায় ভেতরের জংলা কাল মাটি চেঁছে ওপরে তুলে রাখা হচ্ছিল আর কোদালের ঝিলিক তুলে আবার মাথার ওপর থেকে নামানো হচ্ছিল গর্তের অন্ধকারে।
বাঘারু সরাসরি অনেকটা চলে যায়। যেন তার জন্যে একটা কোদাল বাইরে রাখাই আছে, নিয়ে গর্তে নেমে যাবে–এমন নিশ্চয়তায় সে কোদাল খুঁজে যায়। বেশ খানিকটা গিয়ে আবার ফিরতে-ফিরতে বলতে শুরু করে, মোর কোদালখান কোটত, বাবু কহিল মোক, মোর কোদালখান?
ততক্ষণে বাবু তাকে একটু জোরেই ডাকেন, এই, এই এখানে কী, এই, এদিকে এসো, আরে
মুখ ফিরিয়ে দেখে বাবু তাকেই ডাকছেন, এদিকে এসো, ওখানে কী?
আবার বাবুর কাছে ফিরে যেতে শুরু করে। কাছাকাছি আসতেই বাবু রেগে উঠে বলেন, ওখানে কী করছ? কাজ হচ্ছে, যাও, বাবু বা-হাতটা তুলে বা-দিকটা, বাঘারুর দাঁড়িয়ে থাকা রাস্তাটাই সোজা, দেখিয়ে দেন, সেটাই বাঘারুর বেরবার একমাত্র রাস্তা, আর, বাঘারু সেই রাস্তা ধরে সঙ্গে সঙ্গে চলতে শুরু করে–এমন নির্দেশ পালনের শারীরিক অভ্যাসে! বাবু পেছন থেকে বলে ওঠেন, এ ত বুলডোজার, বাবা।
বাবুর কাছ থেকে বাঘারু একটু সরে যেতেই সে আবার ঐ ঝোপঝাড় আর গাছ-পালার অংশ হয়ে যায়। চা বাগানটায় ঝোপঝাড় আর গাছপালাই ত বেশি, ক-টা জায়গাতেইবা কাজ হয়। কিন্তু এত সাজানো-গোছানো ঝোপঝাড় আর টানা সোজা চওড়া রাস্তায় বাঘারুর এই এত লম্বা শরীরটা এত উদোম হয়ে থাকে।
.
সামনে, কিছু দূরে চা বাগানের শেষে টানা ঝোপের লাইন শুরু, রাস্তার শেষে। ওদিকে নিশ্চয়ই ঝোরা। বা, গর্তের লাইন। বাগিচার সীমানা শেষ। ঐ ঝোপের ফাঁক দিয়ে বাঘারু বাইরে বেরিয়ে যেতে পারবে। বড় জোর একটু এদিক-ওদিক করতে হবে।
ভিড়ের মাঝখানে আচমকা পড়ে, ভিড়ের টানে-টানে এতটা চলে আসতে হয়েছে বাঘারুকে, এই, একেবারে চা বাগানের মাঝখানে। তার পর সেই ভিড় বাঘারুকে আবার একলা ফেলে খসে পড়েছে।
এত ঘন আর এত লম্বা একটা ভিড় তাকে ঘিরে টেনে এতদূর নিয়ে এসে ফেলেছে বলেই কি বাঘারুর,, এখন এই চাবাগানের এমন নির্জনতাতেও, নিজেকে নাংটিয়া লাগে। মাঠে, ফরেস্টে, নদীতে, নদীর পাড়ে ত বাঘারুর এমন লাগে না। সেখানে ত তার শরীরটা একটা গাছের মত, নাগিন (চাপা) গাছ, বাতাসটা ধরার জন্যে, খাড়া। ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে বাতাসের ইশারা দেয়ার জন্যে, খাড়া। বা স্রোতের ইশারা দেয়ার জন্যে, শোয়া। বাঘারুর শরীর যেন সেই ইশারা হারিয়ে ফেলে–মানুষের হাতে পোতা এই হাজারে-হাজারে চা-গাছ আর সারে-সরে শিরীষ গাছ আর ঝোপঝাড়ের মাঝখানে! মাঠের মত সমান চা-গাছের মাথা আর ছাতার মতন সমান শিরীষ গাছের মাথার মাঝখানে মানুষের বানো আকাশ দিয়ে হাওয়া এসে বাঘারুর গায়ে লাগলে সে কুঁকড়ে যায় তার শরীরটা আর-একটু ছোট হলে পারত, বা তার নেংটিটা আর-একটু বড়, এই চা বাগানের ভেতর দিয়ে চলার মত ছোট, বা বড়।
ডাইনে বাঁয়ে না বেঁকে বাঘারু সোজা ঐ ঝোপঝাড়ের দিকেই চলে। ঐ মিছিলটা তাকে অনেকখানি উত্তরে সরিয়ে এনেছে। বেরিয়ে একটু দক্ষিণে গিয়ে তাকে ডেমকাঝোরার রাস্তাটায় উঠতে হবে। দিকের নিশানা ঠিক থাকলে ঐ রাস্তাটাতে গিয়েই ঠেকবে।
সামনে এসে দেখে তরিকা গাছের সারি দিয়ে বেড়া। আনারসের মত মোটা, শক্ত, অথচ অনেক বড়, চ্যাপ্টা পাতা ছড়ানো! বড় বড় গাছগুলোতে আবার একটা ডাল থেকে আর-একটা ডাল বেরিয়েছে। মাথা নিচু করে বাঘারু ফল খোঁজে, ছিঁড়ে নেবে। একটু এদিকে-ওদিকেও তাকায়। এখন ফলের সময় না। তবু গাছ দেখলেই ফল খুঁজতে হয়। গাছো দেখিবেন, ফলো খুঁজিবেন।
ফল না পেয়ে বাঘারু এবার পাতাগুলো দেখে। এখানে কেউ এ পাতা কাটে না। লাগেও না হয়ত কাররা। এখানকার কুলিদের ত ঘর আছে। তা হলে ঐ পাতা দিয়ে আর ছাওয়াবে কী? আর এত এমনিতে হয় নি, লাইন বেধে। চা বাগানের সীমানা দিয়ে পোতা হয়েছে কাটাবেড়া দেয়ার জন্যে।
বাঘারুর ত এই পাতাগিলান নাগে। যেইঠে যাছে বাঘারু, ঐঠে যদি এইলা বড়বড় তরিকা পাতা না মিলে? এ্যানং টিনের নাখান তরিকা পাতা দেখি ক্যানং করি ছাড়ি যাবে বাঘারু? ছাড়া যায়? এ্যানং সাইজের পাতাগিলা, এ, ধর কেনে একখান হবা ধরিবে সিকিখান দশ ফুটি টিন। তা, ধর কেনে, চারখান পাতা জোড়া লাগিলে একখান টিন হয়্যা যাবে। আর দুইখান টিন পাশত দিবেব্যাস, বাঘারুর এই ঠ্যাং দুটা বাদ দিয়া বাকি শরীলখানের উপরে চালা উঠি যাবে
নিজের শরীর আধাআধি ঢাকার মত এমন ছাউনি হাতের নাগালে পেয়ে ছাড়ে কী করে বাঘারু?
কিন্তু এত মোটা, লম্বা পাতা ত আর মুচড়ে ঘেঁড়া যাবে না, কাটতে হবে। দা বা কুড়োল পাবে কোথায়? নিচু হয়ে ঝোপঝাড়ের তলায়-তলায় সুবিধেমত পাথর খোঁজে। এই পাতার ডালগুলোতে রস থাকে। চ্যাপ্টা ধারালো পাথর পেলে সেটা দিয়ে মেরে-মেরে তেলে-তেলে কেটে নিতে পারে। কিন্তু তেমন একটা সুবিধেমত পাথর পায় কোথায়? আর, তাও আবার এদিকে? বাগানের ভেতরে? এখানে পাথর আসবে কোত্থেকে? এলেও ত কুড়িয়ে ফেলে দেবে–বাগান পরিষ্কার রাখতে। বেড়ার ওদিকটায় গেলে পাথর পাওয়া যেত, হয়ত, চ্যাপ্টা ধারালো পাথর।
বাঘারু ঝোপের ফাঁক খোঁজে–বাইরে গলে যাওয়ার ফাঁক। বর্ষায় জল আর মাটির রস খেয়ে গাছগুলোর গোড়া এত ফোলা যে ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে গেছে। তলায় ফেঁকড়িও বেরিয়েছে অনেক। গাছের গোড়ায় মাটি আগের মত উঁচু করে সাজানো-যাতে কোনো ফাঁক না থাকে। অথচ বাঘারু তেমন একটা ফাঁকই খোঁজে-শেয়ালের তৈরি করা ফাঁক। শেয়াল সামনের দুই পায়ের নখে মাটি সরিয়ে-সরিয়ে, পরে চার পায়ের নখে বেড়ার তলায় গর্তবানায়। গর্তের পেছনে টান-টান হয়ে শুয়ে আর ঘষে-ঘষে গলা গর্তের মধ্যে নামায় মাটিরা নিন্দুরের (মেটে ইঁদুর) নাখান। তার পর গর্তের ঢাল বেয়েই বেড়ার অন্য দিকে গলা তুলতে থাকে, যেন শিয়াল কোনো চার পেয়ে খাড়া জন্তু নয়, লেপটানো জন্তু। পেছনটা একবার পেরিয়ে গেলেই লাফিয়ে চার পায়ের ওপর খাড়া হয়ে, গা ঝাড়া দিয়ে ধুলোমাটি ঝরিয়ে নেয়। শিয়ালের ঘোড়া তেমন গর্ত পেলে বাঘারু নিজের দুই হাতে তাকে আরো কিছুটা গভীর করে, গলে যাবে? এই একটু আগে যে বাঘারু নিজের শরীরের বিশালতা ও নগ্নতা নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে কুঁকড়ে যাচ্ছিল সে এখন একটা বেড়া টপকানোর জন্যে নিজের শরীরকে শেয়ালের মত নরম ও নমনীয় ভেবে নিতে পারছে?
কিন্তু বাঘারু করে বসে উল্টোটা। পাথর বা ফাঁক খুঁজতে কোমর ভেঙে ডানদিকের ঝোপটার তলায় তাকাতে-তাকাতে যাচ্ছিল–যেন তার পয়সা হারিয়েছে। একটা জায়গায় এসে দেখে, গাছগুলোর গোড়া তেমন বড় ও মোটা নয়। তা হলে মাথায়ও বাড়ে নি নিশ্চয়। উঠে দাঁড়ায়, দেখতে। কিন্তু, দাঁড়িয়েই, দুই হাতে পাতাগুলোকে দুদিকে একটু কাত করে, নিজে কাত হয়ে প্রথমে বা পা বাইরে দেয়, তার পর ডান পা টানে। হাতি এই রকম ফাঁক বুঝে কাটাগাছ পেরোয়, তলায় কাটাগাছের ঝোপ একটুও না ছুঁয়ে।
বাঁ পা-টা বারু গাছের নীচৈ উঁচু করে দেয়া আলগা মাটির ওপর রেখেছিল। কিন্তু তখনো শরীরের ওজন তার ডান পায়ের ওপর, বাগানের ভেতরে। যেই ডান পাটা তুলে বুকটাকে ঝোপের ফাঁকে গলিয়ে দিয়েছে, অমনি নিজেরই শরীরের ভারে পায়ের তলার মাটি খসে যায়; আর, নদীর পাড়ভাঙার মত, বাঘারুর একেবারে হুড়মুড় করে ধসে যায়।
পাক খেয়ে-খেয়ে গড়াতে-গড়াতে বাঘারু এক জায়গায় আটকে যায়। ঘাড়টা তুলতে গিয়ে আবার একটু গড়ায়, কিন্তু ততক্ষণে লতার মত লম্বা আর পাথরের মত শক্ত পায়ের গিরগিটির মত আঙুলগুলো মাটি পেয়ে গেছে।
সেই পায়ের ভর দিয়ে বাঘারু প্রথমে উঠে বসে। চারপাশে দেখে। এমন কিছু নয়। চা-বাগানটা খাড়াইয়ে, মাটি ভেঙে ঢাল বেয়ে বাঘারু নীচে পড়ে গেছে। এই ঢালটার সামনে খোলা মাঠ।
আর-একবার তাকিয়ে বাঘারু আবিষ্কার করে ঢালটা পাথরে-পাথরে বোঝাই। এই এত পাথর দেখে তার মনে পড়ে, সে পাথর খুঁজছিল। আচমকা পড়ে যাওয়ায়, সে ভুলে গিয়েছিল। মনে পড়ার পর পতনটাই ভুলে গিয়ে বাঘারু খাড়া দাঁড়ায়। বাঘারুর চুল থেকে গোড়ালি পর্যন্ত অসংখ্য কুচো পাথর লেগে আছে, যেন সে আর বাঘারু নয়, বাঘারুর পাথুরে মূর্তি। শরীর তার পেশিতে পেশিতে এমনই খুঁজময় আর ঘাম-ঘামভাবে এমনই আঠালো যে পাথরকুচি তার সারা গায়ে লেগে, ফুটে, থেকে যেতে পারে।
দাঁড়িয়ে উঠে, মাটিতে চোখ ফেলে বাঘারু পাথরগুলোকে একবার দেখে নেয়। পাথর যা আছে, এই ঢালটারই গায়ে। বড় বড় পাথরগুলো ঢাল বেয়ে নিচুতে। তা ছাড়া বোল্ডার আর বড় সাইজের পাথরই বেশি। সেই ফাঁকগুলো পাথরকুচিতে ভরা। বড় পাথরগুলোতে তলার দিকে শ্যাওলা, অনেকদিন ধরে পড়ে আছে। ছোট পাথরগুলো হলদেটে বেশি। কিছু শাদা। চা বাগানের সীমানার ঢাল। জমিটা হয়ত চা বাগানেরই, কিন্তু চায়ের খেত হয়ত ঐখানেই শেষ। মাটি যাতে না ভাঙে সেইজন্যে কোম্পানি প্রতি বছরই পাথর ফেলে।
.
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ দিয়ে বাঘারু তার পাথরটা খোঁজে। যে-কোনো একটা পাথর, হাতে ধরা যায় এমন ছোট, আর কাটা যায় এমন ধারালো। লম্বাটে একটা পাথরের টুকরো তার চোখে পড়ে-কাঠের টুকরোর মত, ধরার সুবিধে। কিন্তু চকচক করছে। তার মানে বালি-পাথর। ভেঙে যায়।
সেটা থেকে চোখ সরিয়ে এপাশ-ওপাশ দেখতে-দেখতে আবার সেটাকেই ফিরে দেখে ফেলে। এখান থেকে দেখে, তার কাজের পক্ষে সবচেয়ে ভাল পাথর ওটাকেই মনে হয়। কিন্তু এত চকচক করছে যখন, রাঘারু জানে, ওটা বালি-পাথর। তবু, একবার যাচাই করে ফেলে না দিলে চোখটা বারবারই ওদিকে যাবে। বাঘারু পাথরটার দিকে পা ফেলে। তার পা ফেলার দোলায় শরীরে লেগে থাকা পাথরকুচি পাথরে ঝরে পড়তে থাকে।
পাথরটা তুলে দেখে–গোটা নয়, একটা দিকে কোনাকুনি ভেঙেছে আর সেই দিকের খানিকটা চটে গেছে। তার ফলে ঐ দিকটাতে একটা ধার আছে। মারলে কেটে যাবে। কিন্তু ধরার জায়গা নেই। সে না-হয় দুই হাতেই ধরল। দুই হাতে ধরে দেখে বাঘা। মনে হয় পাথরের ওপরটা কে যেন খুঁটে রেখেছে। বালি-পাথরগুলো তুললেই এরকম মনে হয়। বোন্ডার পাথরগুলো একেবারে চকচকে গোল। কোনো জায়গায় একটু ওঠা-নামা নেই।
দুই হাত তুলে গাছের গোড়ায় মারলে পাথরটা ভেঙে যাবে কিনা পরীক্ষা করতে, বাঘারু দুই হাতে ধরে দুই দিকে চাপ দেয়। বা হাতে পাথরটা লম্বালম্বি ভেঙে যায়। বাঘারুর দুই হাতই সরিয়ে নিলে পাথরটা তার পায়ের কাছেই পড়ে। তাতে আবার একটা ছোট লম্বা টুকরো হয়। বাঘারু দেখে, তার পায়ের কাছে পড়ে আছে একটা ভাঙা মৃর্তি, পিঠের বাকটার কাছে একটু খোবলানো, গলাটা লম্বা। বেটিছোঁয়াদেও। বাঘারু তার মূর্তি থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। বাঘারু ত গাছতলায় বসাবার পাথর খুঁজছে না, সে ডাল কাটার অস্ত্র খুঁজছে।
আর-একটা পাথর দেখে এগয়। তার শরীর থেকে পাথরকুচি পাথরে পড়ে ঝুরঝুর। কাছে গিয়ে দেখে, বোধহয় গেড়ে আছে। পা দিয়ে পাথরটা নাড়ায়, নড়ে না, তার মানে মাটির অনেকখানি ভেতরে সেঁদিয়ে আছে। বাইরে যেটুকু দেখা যাচ্ছে, তাতে কিছুই বোঝা যায় না। গা ঐ পাথরের ওপরই রেখে আবার পাথর খোঁজে বাঘারু।
পায়ের কাছে একটা ছোট জাম্বুরা [বাতাবি) সাইজের পাথর পড়ে ছিল; কুড়িয়ে নেয়। দুই হাতের চেটোতে সেই গোল, নিটোল পাথরটাকে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখে। দেখতে কী সুন্দর! হেই এটুস ময়লা-ময়লা শাদা, ঠাণ্ডা নাখান, আর ডিমের নাখান একটা দিক গোল, আরেকখান চুখা। বাঘারু চোখা দিকটা এক হাতে ধরে সোজা করে। মানষির মাথার নাখান।
সেটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে বাঘারু দেখে এটা থেকে কত ভাল একটা টুকরো বের করা যেত। করাত দিয়ে কাটলে, মাঝখানের টুকরোটা একেবারে আস্ত একটা দা হয়ে যেত। বাঘারু পাথরটাকে তার হাতের সমস্ত জোর দিয়ে সামনের একটা বড় পাথরের ওপর মারে। আগুনের ফুলকি ছোটার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকটা বন্দুকের আওয়াজ একসঙ্গে হয়। বারুদের গন্ধটা বাঘারুর নাকে এসে লাগে যখন, প্রতিধ্বনিটা তখন আসে বাগানের দিক থেকে। পাথরটা তখনো গড়িয়ে যাচ্ছে।
বাঘারু দেখে, বা দেখেছিল আগেই, এখন ভাবে, বরং এই এত পাথরের মধ্যে খুঁজে বের করার চাইতে, আর-একটু নীচে নেমে, যেখানে ঢাল শেষে হয়েছে, সেখানে ছড়ানো-ছিটনো পাথরগুলোর ভেতর খুঁজে বের করা বোধ হয় সহজ। বাঘারু তাই নীচে নামতে থাকে। একটা বড় পাথর থেকে আর-একটা বড় পাথরে লাফিয়ে, নুড়ি পাথরগুলোর ওপর একটা পা দিয়ে আর-একটা বড় পাথরে উঠে, বাঘারু লাফিয়ে, ঢালটার তলায় নেমে যায়। তার পায়ের ধাক্কায় আর তার এক-একটি লাফে নুড়িপাথর আর ঢিল পাথরগুলো ঝুরঝুর গড়গড় করে গড়িয়ে যেতে থাকে আর যে-দুই জায়গায় সে পা রাখে, সেখানকার পাথর মাটিতে গেড়ে যায়।
যেখানে লাফিয়ে নামে, সেখানে, তার সামনে, বাঘারু দেখে একটা বিরাট উঁচু মানুষের মাথা এলোমলো হয়ে পড়ে আছে। ঘাস, বালি আর বুনো ঝোপের মাঝখানে, যেন কেউ ফেলে রেখে গেছে। বাঘারু নিচু হয়ে মাথাটাকে সোজা করে দিতে চায়, পারে না, এত ভারী। তখন দুই হাতে পাথরটাকে টানে। মাটি আর পাথরের রেখায় বাঘারু বোঝে, এখানে বর্ষার জল নেমে, জমে, আবার বেরিয়ে যায়। আর সঙ্গে নিয়ে আসে ছোট-ছোট পাতলা নুড়ি। মাটির সঙ্গে মিশে শক্ত হয়ে-হয়ে এই মানুষের মাথাটা তৈরি হয়েছে। এখন বাঘারু ওটাকে উল্টে দেয়ায় মানুষের মাথা বলে মনে হচ্ছে না। বায়ারু দুই হাতে ওটাকে তুলে সামনের উঁচু পাথরটার ওপরে বসিয়ে দেয়। দেখে-দেখে হেসে ওঠে। ছিলুমাঠত, শুইয়া, এ্যালায় থাকেন পাথরের ওপর বসিয়া। বাঘারু যেন জানে, ঐ মূর্তিটা সে ওখানে চিরকালের জন্যই গড়ল।
এই যে এতক্ষণ বাঘারু গাছের দিকে পেছন ফিরে, নিচু হয়ে পাথর খুঁজে ফিরছে তাতেই তার মনে হতে শুরু করে দেয়, সে মিছিমিছি পাথর খুঁজে যাচ্ছে। তরিকা গাছের ডাল আর কত মোটা হতে পারে–সেটা মুচড়ে ছেঁড়া যাবে না, বা টেনে তুলে ফেলা যাবে না?
সে এই তলা থেকেই চাবাগানের বেড়াটার দিকে তাকায়। এখান থেকে যেন আরো ভাল দেখা যাচ্ছে, বুনো ঝাড় নয়, যত্ন করে লাগানো লাইন বাধা ঝোপ। আর-কেউ কোনোদিন এই ঝোপগুলো থেকে পাতা কাটেনি বোধহয়। গাছের পাতাগুলো টিনের চালের মত ছাউনি তৈরি করেছে, বেড়াছাড়া ছাউনি, বারান্দার নাখান। এখান থেকে পাতাগুলোকেই, প্রধানত দেখা যায় বলে, মনে হচ্ছে, ঐ পাতাগুলোর নীচে ঘর-সংসার পাতা যায়। দুটো পাতা দু-দিকে দুই ছোট বশের মধ্যে বেঁধে দিলে ছোট বাচ্চাকাচ্চার ঘর হয়ে যাবে। ওদ নাগিবে না, বৃষ্টির ছাট নাগিবার পারে। দুটো লম্বা আর দুটো আড়াআড়ি দিলে একখান বেটিছোঁয়া ঢাকি যাবে। আর তার সঙ্গে আরো দুটোপাতা লম্বা করলে বাঘারুর কোমর পর্যন্ত পুরো ঢাকবে। তা হলে কি বাঘারুকে.এখন তরিকা গাছের ছ-ছটা পাতা কাটতে হবে? একটা নয়, দুটো নয়, ছ-ছটা?
পাতার সাইজ দেখে, হিশেব করে বাঘারুকে নিশ্চিত হতে হয়, এই পাতাগুলো কাটার জন্য তার দা বা ছোট কুড়োল দরকার, মুচড়ে নেয়া অসম্ভব। পাথর তেমন একটা পেলে হয়ত চেষ্টা করা যায় কিন্তু তাতে কতক্ষণে কটা কাটা যাবে তার আন্দাজ এখন চলে না। অর্থাৎমুচড়ে নেয়া ত সম্ভবই নয়। পাথর হল সর্বশেষ অস্ত্র। সুতরাং বাঘারুকে পেছন ফিরে ঐ মাঠের ভেতর একটু এগিয়ে পাথর খুঁজতে হয়।
বাঘারু একটু উদাসীনই এগিয়ে চলে। পাথরটা যে সে পেল না, এই ঘটনাটা যেন কোনো জায়গাতেই শেষ হয় না। সে খুঁজতে-খুজতে এরকম পা ফেলে চলবে। তার চলার সঙ্গে এই খোঁজট মিশে যাবে। তার পর সেই চলার নিয়মেই, কোনো এক সময়, খোঁজাটা শেষ হয়ে যাবে। তখন চলবে কিন্তু আর খুঁজবে না। তার আগেই সে খোঁজার নিয়মে পেয়ে যেতে পারে কিন্তু আর ফিরবে না। সেখান থেকে ফিরে আর কাটা চলে না।
বাঘারু লোহার পাতের একটা বান্ডিল, ছোট, দেখতে পায়। চায়ের বাক্স বাধা হয় এই পাতগুলো দিয়ে মুড়ে। সে দৌড়ে গিয়ে তোলে। তার হাতে উঠে আসতেই কিছুটা ঝরে পড়ে যায়। মরচেতে ঝুরঝুরে হয়ে গেছে। তবু বাঘারু দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বান্ডিলটা খুলতে থাকে। খানিকটা অংশও যদি ব্যবহার্য থাকে।
ছোট পাতের বান্ডিলের একটা মাথা আগে খসে গেছে। কয়েকটা গিঠে গোল-পাকানো আর-একটা মাথা ভেতরে। বাঘারু প্রথমে গিঠগুলো খুলে সোজা করে, তা থেকে একটা টুকরো, সে যত ছোট টুকরোই হোকলোহা ত, বের করতে চায়। কিন্তু গিঠের দু-দিকের পাত ধরে টান দিতেই ঝুরঝুরিয়ে খসে যায়। তখন বাঘারু গিঠ না খুলে তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে যে ভেতর দিকের কোনো-একটা অংশ একটু আস্ত আছে কিনা। নেই। তখন তার এক হাতের মুঠোর ভেতর লোহার সেই পাতটা গুড়ো-গুড়ো ধুলো করে ফেলে দেয়।
কিন্তু মরচে ধরা লোহার পাতই যদি এমন জুটে যায়, এখানে, তা হলে ত মরচে না ধরা খানিকটা তারও অন্তত বাঘারু পেয়ে যেতে পারে। বা, আর-একটা ভাল পাতই, বা পাতের টুকোরই। বাগানের সীমার জমিতে বাগানের ময়লাটয়লা ফেলে হয়ত কখনো কখনো। তাতে একটা ছোেট, আস্ত, লোহার পাত কি আর মরচে না পড়ে, এখন পর্যন্ত, বাঘারুর জন্যে থেকে যেতে পারে না? বা অন্তত তার? দড়ির মত এক টুকরো তার?
তারের কথাটা মনে হতে, পাতের চাইতে তারটাই তার কাছে বেশি কাজের লাগে। শক্ত, নতুন তার যদি হয়, গাছের গোড়ায় গোল করে লাগিয়ে দু প্রান্ত ধরে বাঘারু যদি টানে, গাছের নরম কাণ্ডের ভেতর তারটা বসে যাবে আর গাছটা কেটে আসবে। যদি কাণ্ডটা বেশি মোটা হয়, তা হলে একটা-একটা করে, পাতা কেটে নিতে পারবে।
পাথর শেষ হয়ে এখন ঘাস ঝোপঝাড় চলছে। বাঘারু লোহার পাত, আর তারের সঙ্গে সঙ্গে কাঁচের টুকরোও খোঁজে! বাগানের মানুষরা কাঁচ ব্যবহার করে। তা হলে এখানে ভাঙা কাঁচের টুকরোও পাওয়া যেতে পারে। বোতলভাঙা কাঁচের কোনাটা সব সময়ই ধারালো হয়। বোতলের কাঁচ ত লম্বালম্বিই ভাঙে। একটা দিক ধরে, আর-একটা দিক দিয়ে কাটা যায়। যদি গোল করেও ভাঙে তা হলেও ঘষে-ঘষে কাটা চলে। সুতরাং বাঘারু কাঁচও খোঁজে।
লোহার পাত, বা তার, বা কাঁচকোনো কিছুতেই বাঘারুর কোনো অসুবিধে নেই যেন। টানতে, বা ঘষে ঘষে কাটতে, সেই তার বা কাঁচ তার হাতের তালুতেও কেটে বসে যেতে পারে না যেন!
পাথর শেষ হয়ে যায়।
বাঘারু ক্রমেই মাঠের মাঝ বরাবর চলে আসে। মাঝেমধ্যে ঝোপঝাড়। কিন্তু কোথাওই এমন-কিছু নেই যা মানুষ ব্যবহার করে ফেলে দিয়েছে, এবং এখন বাঘারু ব্যবহার করতে পারে। বা, একটা পাথর, যা বাঘারুই প্রথম ব্যবহার করবে।
.
কিন্তু বাঘারু তার পাথরটা পেয়ে যায়, তারই জন্যে তৈরি পাথরটা। নাকি পাথরটাই বাঘারুকে পায়।
এই পাথরটা পাবে বলেই পাথর দিয়ে বানো ঢালে কোনো পাথর মিলল না! ঢালের শেষেও মাঠের ভেতর পাত, বা তার, বা কাঁচ মিলল না! বাঘারু তখন পায়ে-পায়ে চলে আসছে। চলে আসছে আর মনে-মনে ছকতে শুরু করেছে মাঠটা কোনাকুনি যাবে, যেখানে পাবে ডেমকাঝোরা সেখানেই পার হবে, তার পর, ওপারে উঠে নিজের রাস্তা ধরবে। এরকম ছকে নিতে তাকে দু-একবার ঘাড় তুলে মাঠের শেষটা দেখতে হয়েছে। বোধহয়, পাথরখোঁজা, আর পথখোঁজা, মাঠদেখা আর মাঠ শেষদেখা–এই সবের ভেতর সে ধীরে-ধীরে একটু ভাগ হয়ে যাচ্ছিল বলেই তার বাঁ-পায়ের বঁ-দিকটা হঠাৎ খাড়া ধারালো কিছুর ওপর পড়ে! মনে হল, তার পায়ের মাংসের ভেতর ধারটা একেবারে বসে গেল। তাও আবার বাঘারুর পা, যার চাপে পাথর গুড়ো হয়ে যায়। যদিও বাঘারুর মনে হয়, তার পায়ের মাংসের ভেতরশান-দেয়া কোনো লোহার ধার বসে গেল, তবু, ব্যথায় বসে পড়েও, সে প্রথমে পা দেখে না, কিসে কাটল, সেটা খোঁজে।
কুড়োলের আগার মত ছড়ানো একটা পাথরের ধারালো দিক মাটির ভেতর থেকে উঁচিয়ে আছে। ঠিক ওপরে তার পা পড়েছে। বাঘারু পা দেখে, কাটে নি। কিন্তু ব্যথা তখনো আছে। পা ছেড়ে দিয়ে বাঘারু দুই হাতে পাথরটাকে নাড়ায়, ঢিলে করে নিয়ে মাটির ভেতর থেকে টেনে তুলে ফেলবে বলে। পাথরটা বেশি গাড়া ছিল না। বাঘারু যে-জোরে নাড়া দেয়, তাতেই উপড়ে যায়, আর বাঘারু হুমড়ি খেয়ে পড়ে সামনে। সামলে, দুই হাতে পাথরটাকে নিয়ে দেখে বাঘারু। তারপর, উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে পাথরটাকে আরো ভাল করে দেখে সে, যে-দিকটা মাটির ভেতর ছিল, সেই মোটা :: অংশটা ভেজা ও মাটি লাগা। ওপরের দিকটা চকচকে ধারালো, পাথরের পক্ষে যতটা ধারালো হওয়া সম্ভব-মানুষের হাতের ঘষা ছাড়াই। মানুষের হাতের ঘষা পড়লে এ-পাথরে লোহার শান আসে।
বাঘারু পাথরের আকারটাকে বুঝতে চায়। হাত-দাওয়ের নাখান? গর্তখান নাই ত? কাটিবার গর্তখান? বরং সে দিকটা ভরা। কিন্তু আকারটা যেন তার চেনা-চেনাও ঠেকে। তলার দিকটা সরু। এক মুঠোতেই ধরা যায়। ডান হাতের মুঠোতে পাথরটা ঝুলিয়ে হাতটা দোলায়। পাথরটা দোলে। দোলাতে-দোলাতে হাতটাতে গতি আনে। তার পর, পাথরসহ হাতটাকে বেগে মাথার ওপর তোলে। যেন, কোনো কিছুর ওপর নামাচ্ছে এমন ভাবে পাথরটা যখন বাতাস কেটে খাড়া নামায়, তখন বাঘারুর মনে ঝিলিক দেয়, পাহাড়ি মানষিলার খুরকির নাখান?
বাঘারুর নামানোর বেগে হাতটা পাথরসহ আবার দোল খায়। দুলুনি থেমে এলে দুই হাতে পাথরটাকে ধরে। তার পর আবার পাথরটাকে দেখে, এই পাথরটা হলেই চলে যাবে বাঘারুর, পাতা না-হলেও। কত ভাবেই না পাথরটাকে ব্যবহার করবে সে, ভেবে, দুই হাতে পাথরটাকে মাথার ওপর ট্রন-টান তোলে। তুলে দেখবার জন্যে নিজেই ঘাড় ভেঙে তাকায়।
ঘাড়টা এতই হেলানো বাঘারুর, আকাশের টলটলে নীলটাই শুধু দেখতে পায়, ওপর থেকে তাকে ঢাকা দিয়ে ফেলেছে যেন। দুই হাতে ধরা পাথরটা সেই নীলে উৎক্ষিপ্ত। বাঘারু দেখে, ঐ পাথরের মাথা থেকে, বাঘারুর মুষ্টি, কব্জি, পুরোবাহু ও বাহু পর্যন্ত একটাই পাথর যেন। দেখাটা এমন ঘটে যায় বলেই ঐ নীলে ক্ষোদিত পাথরের আকারটাকে চিনে নিতে পারে বাঘারুতার বাহু, পুরোবাহু, কব্জি আর দুটো হাত নমস্কারের মত জোড়া করা একটা পাথর যেন! পরনামিয়া পাথর।
বাঘারু পাথরসহ হাত দুটি নামিয়ে আনে। তার পর, এক হাতের মুঠোতে যেন এক জোড়া হাত ধরে নাড়তে নাড়তে তরিকা গাছের ঝাড়ের দিকে ছোটে।
ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে বাঘারুর একটু অসুবিধা হয়। সে যেমন তার শরীরের ভারে নেমে আসতে পারে, সহজে, তেমনি, সেই ভারের জন্যেই, নুড়ি আর কুচি পাথরে ভরা ঢাল বেয়ে উঠতে পারে না, পাথরগুলো গড়িয়ে যায়। ঢালের মাথায় পৌঁছে একটা কিছু ধরার দরকার হয়। না হলে, তরিকা গাছের গোড়ায় একটা পা তুলতে আর-একটা পায়ে যে ভর দেবে, তাতেই হড়কে পড়ে যাবে। বাঘারু ঢালের মাথায় পাথরটা রাখে। তার পর মাটির একটা খুঁজ ধরে, হেঁচড়ে ওপরে উঠে পাথরটা নিয়ে দাঁড়ায়।
বাঘারু পাতা বাছতে শুরু করে। পাতা বড় হলেই হবে না, সোজা হওয়া চাই। তরিকা পাতার মজাই এই, টিনের মত খাজ কাটা। একটা পাতার জের ওপর আর-একটা পাতা বসে যেতে পারে। বৃষ্টির জল ঐ খুঁজ দিয়ে গড়িয়ে যায়। পাতা যদি বাকাচোরা হয়, খাজে-খাজে না মেলে, জল ভেতরে গড়িয়ে পড়ে। পাতা খুব বেশি বড় হলে, পাশের দিকটা ছড়িয়ে যায়–কলাপাতার মত। আর নিজের ভারে-ভারে বেঁকে চুরে যায়। বাঘারু তাই এমন একটা পাতা খোঁজে যেটা বড় কিন্তু বুড়ো নয়; কলাপাতার মত দু পাশে ছড়িয়েছে কিন্তু বেঁকে যায় নি। এমন একটা পাতা, যার মাঝখানের খাজটা গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত, নিটোল।
তরিকা গাছের এমন সারিতে, এমন তরতরিয়ে বেড়ে ওঠা পাতার রাশির মধ্যে বাঘারু তার পাতাটি বা পাতাগুলো খুঁজে পায় না, খানিকটা যেন দিশেহারা হয়েই, আর খানিকটা যেন ইচ্ছে করেই, এমন বাছাইয়ের স্বাধীনতা তার আছে বলেই।
দিশেহারা ভাবেই হোক আর স্বাধীন ভাবেই হোক, বাঘারুর এমন বাছাবাছির ভেতর আবার একটা সভয় তাড়াও ছিল।
এই বেড়ার ওপাশেই চা-বাগান। মাঠের মত লম্বা-লম্বা রাস্তা, রাস্তায় রাস্তায় মোড়, মাঠের মত সমান শিরীষ গাছের মাথা। সেখানে পাতি তোলে, নালী কাটে, ডাল ফাড়ে। শেয়ালও যাতে ঢুকতে না পারে, সেইজন্যে এই তরিকা গাছের সারির তলার মাটিচাপা দেয়া আছে! হাতির পাল যাতে ভাঙতে না পারে, সেইজন্যেই তরিকা গাছের কাটা পাতার সারি। পাতা যাতে বড় হয়, বেড়ে ছড়িয়ে পড়ে, সেইজন্যে এই গাছগুলোর ত দেখাশোনাও হয় নিশ্চয়। যে-পাতা এতগুলো কাজের জন্যে রাখা, সেই পাতা বাঘারু কেটে নিচ্ছে! বাঘারুকে যদি ধরতে পারে!
ধরতে পারলে কী হবে, সে-বিষয়ে তার কোনো নিশ্চিত ধারণা নেই। ভয়ও নেই। কিন্তু ধরতে এলে মানুষ পালায়, সেই নিয়মে বাঘারু ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিতে চায় মাঠটার ভেতর চা বাগানের সীমাটা কদ্দূর। যেন তার ওপরই তাকে ধরা বা না-ধরা নির্ভর করে।
আর দেরি করে না। প্রথম পাতাটা খুঁজতেই সে এত দেরি করছে, অথচ তাকে ত, একটা নয়, ছয-ছয়টা পাতা বের করতে হবে।
একটা পাতা বাঘারু পেয়ে যায়। সেটা যেন কাটা পড়ার জন্যেই খাড়া দাঁড়িয়েছিল। কচি, কিন্তু বড়, মাঝখানের খাজটা নিটোল গভীর! কিন্তু পাতার গোড়াটা গাছের ওদিকে। এদিক থেকে কাটতে গেলে হাতটা বাড়িয়ে ওদিকে দিয়ে তবে কাটতে হবে। সেটা দা-মত কিছু দিয়ে করা যেতে পারে। কিন্তু পাথরটাকে ত ওপর থেকে নামাতে হবে। বাঘারু ছেড়ে দেয়।
বেড়ার এদিকে একটা পাতা পেয়ে যায়। গোড়ার দিকটা একটু হেঁতলানো। কিন্তু বাঘারু ঠিক করে এটাকেই কাটবে। তারপর খুঁজতে হলে, আরো পাঁচটা খুঁজবে। পাতাটা ডালের সবচেয়ে নীচে, এদিকে ছড়িয়ে পড়েছে বাঘারুর দিকে যেন গলা বাড়িয়ে দিয়ে আছে। ডালের যে-জায়গাটা থেকে পাতাটা বেরিয়েছে সেখানে কোপটাও দেয়া যায় বাধাহীন।
পাথরটাকে একবার যাচাই করে নেয়–লোহার অস্ত্রের ধার পরীক্ষার মত। তার পর সরু দিকটা দুই হাতের মুঠোতে চেপে মাথার ওপর তোলে। দমটা টেনে পুরো ধার আর ভারটা নামিয়ে আনে পাতাটার ওপর–নিজের শরীরের ভার যোগ করে। পাতাটা ভেঙে নেতিয়ে যায়। বাঘারু দেখে, গাছের কাটার ধারও কমে গেছে অনেকখানি। পাথরের গা থেকে রস, গাছের কাঁচা চামড়া মুছে নিয়ে বাঘারু আর এক কোপ তোলে।
.
এখন বাঘারু মাথায় তরিকা পাতাগুলো, একটার পর একটা,লম্বালম্বি। খাজে-খাজে মিলে আছে। তার পরে, ঠিক বাঘারুর মাথার ওপরে পাথর। পাথরটা একটু এদিক-ওদিক হলে পাথরের ভারে যাতে পাতাগুলো ভেঙে না যায়। এতক্ষণ এক হাতেই পাতাগুলো ধরে হাটছিল। এখন, দুই হাতে ধরে ডেমকাঝোরায় নামছে।
ডেমকাঝোরা ছোট খালের মত নদী, কিন্তু পাড় বেশ উঁচু। মাথায় পাতা আর পাথর নিয়ে বাঘারুকে পা টিপেটিপে নামতে হয়। জলে নামার আগে মাটিতে বসে পড়ে। ডান পা দিয়ে জলে নামার জায়গা পরখ করে, ঘুরে দাঁড়িয়ে বা হাতে পাড় আর ডান হাতে পাতা ধরে বা পাটা ধীরে-ধীরে নামিয়ে, ঘুরে যায়। জলে একবার নেমে পড়ার পর দু হাতে পাতাগুলো ধরে বাঘারু ধীরে ধীরে এগয়।
যদি একটা গামছা বা ত্যানা থাকত, বা রাস্তায় যদি কিছু পোয়াল পেয়ে যেত, তা হলে একটা বিড়ে পাকিয়ে, মাথার ওপর পাতা আর তার ওপর পাথর দিয়ে, দু হাত ছেড়েই হাঁটতে পারত। এক হাতে পাতা, আর-এক হাতে পাথর ঝুলিয়ে হাঁটা যায় না–দুই হাতই আটকে যায়। পথে যদি কোনো ভামনি বন পায়, তা হলে একটা বিড়ে পাকিয়ে নেবে।
জলটা যদি আচমকা কোথাও বেশি হয়ে যায়, তা হলেই বিপদ। সে জন্যেই বাঘারু দুই হাতে পাতাগুলো শক্ত করে ধরে রাখে, যাতে তেমন হলে পাতাগুলো নামিয়ে সামনে ভাসিয়ে, পাথরটাকে এক হাতে নিয়ে সে একটু সাতরে যেতে পারে।
এইবার জলটা কোমর পর্যন্ত ওঠে। বাঘারু এক-পা, এক-পা করে এগয়। আচমকা পাথরটা যদি জলে পড়ে যায় তা হলে ডুবে-ডুবে তুলতে হবে। পাড় সামনে এসে গেছে। এর মধ্যে জলটা আর আচমকা বাড়বে না। তবে জলকে বিশ্বাস নেই। হয়ত পাড়ের কাছেই একটা গভীর গর্ত হয়ে আছে। সামনের পাড় এসে গেল।
বাঘারু আগে পাতা আর পাথর নামিয়ে রাখে, তার পর নিজে ওঠে। সে উঠে দাঁড়াতেই তার গায়ের জলে জায়গাটা কাদা হয়ে যায়। বাঘারু দু হাতে শরীরের জল কাঁচে। এদিক-ওদিক তাকায়। সে আরো একবার তার গায়ের জল কেচে ফেলে। তার পর পাতা আর পাথর মাথায় তুলে, দু হাতে একটু ঠিক করে নিয়ে, আবার হাঁটতে শুরু করে।
হাটের লোকজনের যাতায়াতে ডেমকাঝোরা থেকে হায়হায়পাথার যাওয়ার একটা ছোট কাঁচা রাস্তা। তৈরি হয়ে গেছে। সেই রাস্তায়, সামনে একটা বড় টাড়িও দেখা যায়। তা হলে কি বাঘায় সেখান থেকে একটু দড়ি চেয়ে নেবে, পাটের? না হয় ত, কিছু পোয়াল? পাতা আর পাথর বেঁধে নেবে, বিড়ে পাকাবে।
যে-কাঁচা রাস্তা দিয়ে বাঘারু ঐ টাড়িতে ঢুকছিল, তার ওপর একটা কুকুর শুয়ে ছিল। সামনেই একটা টিনের চালের বড় বাড়ি। ঐ বাড়িতেই ঢুকবে বাঘারু।
বাঘারুর পায়ের আওয়াজ শুনে কুকুরটা শুয়ে থেকেই, চোখ না খুলেই, একবার ডেকে দিল, ঘেউ। তার আওয়াজে বাঘারুর পায়ের আওয়াজ থামে না দেখে, সে আবার ডাকে, ঘেউ। বাঘারু তার পাশ দিয়ে হনহনিয়ে চলে যায়। বাঘারুর মাটিকাঁপানো চলনে কুকুরটা চমকে ঘাড় ঘোরায়। তার পরই ঘেউ-ঘেউ আওয়াজে আকাশ ফাটিয়ে বাঘারুকে তাড়া করে। কুকুরটা বাঘারুর পাশ দিয়ে ছুটে সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আর তার পথ আটকে আকাশ-ফাটানো চিৎকার জুড়ে দেয়। বাঘারু তার গতি একটুও না কমিয়ে হনহন করে এগিয়ে যাওয়ায়, কুকুরটা দৌড়ে সরে যায়, আবার ফিরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে। সামনে ডান হাতে সেই বড় বাড়ি, বাঘারু ঢুকবে। কিন্তু প্রথম কুকুরটার ডাকাডাকিতেই হোক, আর, বাঘারুর চলার গতিতেই হোক, ঐ বাড়িটা থেকেই দশবারটা কুকুর একসঙ্গে বেরিয়ে এসে বাঘারুকে ঘিরে ধরে এমন চেঁচানো শুরু করে, যেন অন্ধকার রাত্রিতে পাড়ায় ডাকাত পড়েছে। কুকুরগুলো বাঘারুকে এমনই ঘিরে ফেলে কিছুতেই এগতে দেবে না। এখন যদি বাঘারুকে ঐ বাড়ির বাহির এগিনায় ঢুকতে হয় তা হলে কুকুরগুলোকে ঠেলে এগতে হবে। বাঘারু আর ঐ হাঙ্গামায় না গিয়ে সোজা হাঁটতে থাকে, একই গতিতে। বাঘারু চলার গতি একটুও কমায় না দেখে কুকুরগুলো সামনের পথটা ছেড়ে দিয়ে তাকে তিনদিক থেকে ঘিরে চেঁচাতে থাকে। টাড়িটার শেষে বাশঝাড়। ডাইনে রেখে রাস্তাটা বায়ে বেঁকেছে। তার বায়ে টাড়ির বুড়িঘর পাটকাঠি দিয়ে তৈরি। কুকুরগুলো ঐখানে দাঁড়িয়ে পড়ে আর বাঘারু বাঁক নেয়। একটা কুকুর তবু ডেকে-ডেকে ওঠে। বাঘারু বাশঝাড়কে ডাইনে রেখে ডাইনে বাক নিয়ে আড়াল হয়ে গেলে, একটু পরে শুনতে পায় কুকুরগুলো আবার একসঙ্গে অলস ডেকে উঠে, ধীরে-ধীরে একে-একে থামতে শুরু করে। মাঝেমধ্যে একটা কুকুরের ঘেউ-ঘেউ ডাক ওঠে। তার পর সেটাও থেমে যায়।
বাঘারু দাঁড়িয়ে দু হাতে মাথার পাতাটা একটু সরিয়ে দেখে, বায়ে তার পেছনে হায়হায়পাথার চা বাগানের সীমা। একটু বুঝে নিতে, আরো একটু দেখতে হয় বাঘারুকে। ডেমকাঝোড়া নদী নিশ্চয়ই ঐখানে একটা বাঁক নিয়েছে। নদীটাকে বায়ে রাখতে এই রাস্তাটা ডাইনে ঘুরে, আবার বায়ে ফিরে, চা বাগানের দিকে গেছে। বাঘারু আর-কিছুতেই চা বাগানে ঢুকবে না। সে রাস্তা ছেড়ে মাঠে নেমে পড়ে। সোজা গিয়ে হায়হায়পাথারের ডাঙা পার হয়ে উত্তরে হাঁটলে শালবাড়িতে উঠবে। শালবাড়িতে–ও উঠতে পারে, দক্ষিণ দিয়ে ফরেস্টে ঢুকে ফরেস্টের ভেতর দিয়ে দিয়েই হাইওয়েতে উঠবে। তার পর হাইওয়ে ধরেই চালসা হয়ে নতুন রোড ধরত পারে। আবার, ফরেস্টের ভেতর দিয়েও যেতে পারে। সে, তখনকার কথা তখন। এখন, সামনে মাল নদী। পাতা আর পাথরটা তার আগে বেঁধে ফেলতে হবে।
বাঘারু উঁচুতে উঠছে। হায়হায়পাথারের সেই নিধুয়া ডাঙা যেন বিশাল একটা খেপা শুয়োর–লেজটা মাটিতে লাগিয়ে মাথাটা সিধে নিয়ে উত্তরের পাহাড়ের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ঘাস নাই, গাছ নাই, চাষ নাই, বাড়ি নাই। শুয়োরের বা পেট বেয়ে বাঘারু উঠছিল, পেছনের বা পায়ের পাশ দিয়ে।
বাঘারুর চোখ এখন পায়ের দিকে লাল-লাল পাথরে ছাওয়া চড়াই। এই রকম পাথর এদিকে দেখা যায় না। এ-পাথর পাহাড় থেকে নদী বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে গোল হয়ে নামে নি। মনে হয় যেন খুব একটা ভাঙাভাঙি হয়েছিল এখানে। সব পাথরই চোখা। বাঘারু ভাবে, এখানে ধারালো পাথর বোধ হয় খুঁজতে হয় না, হাত দিলেই মেলে। পাথর কথাটা মনে হতেই তাড়াতাড়ি তার নিজের পাথরটা মনে আসে। যেইলা একখান পরনামিয়া পাথথর মোর জুটি গেইছে, ঐলা পাথর কোটত মিলিবে?
শুয়োরের ভাঙার পিঠটা ডান দিকের ঢাল বেয়ে নদীর দিকে নামার সময় বাঘারু পা দিয়ে-দিয়ে দু-একটা পাথর গড়িয়ে দিতে চায়, দেখে মজা পেতে। কিন্তু প্রায় কোনো পাথরই নাড়াতে পারে না, দুটো একটা আলগা পাথর ছাড়া। এই সব কি পাথরের গাছ? সব মাটির ভিতরঠে মাথা তুলিছে…! উঁচু থেকে নামছে বলেই বাঘারু এখন অনেকটা দৃশ্য দেখতে পায়–এই পাথরের শেষ, সবুজের শুরু, জলের রেখা, চা-বাগানের সীমা, টাড়িবাড়ির গাছগাছড়া। আরমাল নদীর ওপারে ফরেস্টের ছাইরঙা দেয়াল, দূর থেকে সব ফরেস্টকেই যেমন লাগে, মনে হয় ঢোকা যাবে না। মাল নদীর ওপারে এই যে-ফরেস্ট শুরু হল, এর আর শেষ নেই। মাঝে হাইওয়ে আছে, চা বাগান আছে, রেল লাইন আছে, নদী আছে, নদীর চরও আছে–কিন্তু সে সবই ফরেস্টের মধ্যে। এই ফরেস্টের ভেতরেই একটি জায়গায় গিয়ে বাঘারুকে পৌঁছতে হবে। ডায়না ফরেস্টে।
নামতে নামতে আবার দৃশ্য কমতে শুরু করে। কিন্তু বাঘারুকে একটা কিছু খুঁজতে হবে, এই পাতা আর পাথর বাধতে। তাকে একটু দেখতে হবে, কোথাও দড়ির মত কিছু পাওয়া যায় কিনা।
বাঘারু দাঁড়িয়ে মাথা থেকে পাথরটা ডান হাতে নামায়। বা হাতে পাতা আর ডান হাতে পাথর ঝুলিয়ে সে নামতে শুরু করে।
.
নদীর একটু ওপরে, ঢালের গায়েই বাঘারু মাটির ওপর পাতাগুলো রেখে পাথর চাপা দেয়। তার পর খালি হাতে নামে। ঘাড় ঘুরিয়ে একটু দেখে নেয় পাতা-পাথর ঠিক থাকবে কি না। দড়িদড়া বা পোয়ালা বা লতাগোছের কিছু পায় কি না দেখতে বাঘারু এদিক-ওদিক ঘুরবে। এগুলো বেঁধে না-নিলে মাল নদ পেরনো যাবে না।
নীচে নেমে ফিরে তাকিয়ে বাঘারু দেখে, শুয়োরের ডাঙার এই ঢালের ওপরের দিকে একটা কুকুর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। ডাঙার মাথার দিকে কুকুরের লেজ, ডাঙার লেজের দিকে কুকুরের মাথা। মুখটা এখন এদিকে ঘোরাচ্ছে-ফেরাচ্ছে–ফরেস্টের দিকে ওপারে, বাঘারুর দিকে এপারে, এমন-কি, এই দুইয়ের মাঝখানে নদীর টুকরোটার দিকেও।
বাঘারু তাকে দেখল এটা সে বুঝেছে–জানাতে কুকুরটা ঘাড়ের সঙ্গে সামনের পা দুটোও এদিকে সামান্য একটু ঘোরায়, নদীর দিকে চোখ রেখেই। লেজটাও একটু নাড়ায়। ভাবটা, তারও ওপারেই যাওয়ার কথা।
কিন্তু এই ডাঙার ওপর কুকুর আসবে কোত্থেকে? পথ হারিয়ে ফেলেছে? কুত্তায় আস্তা (রাস্তা) হারায় না। বাগানের দিক থেকে এসেছে? আসিবা পারে, কিন্তু কেনে? তা হলে কি বাঘারুরই পেছন-পেছন কোথাও থেকে চলে আসছে? কোনঠে? বাঘারু ত টের পায় নি। মাথায় পাতা থাকায় বাঘারু অবশ্য পায়ের সামনেটুকু ছাড়া কিছু অনেকক্ষণ ধরে দেখতেই পাচ্ছিল না। কিন্তু কুকুরটা কি একবারও তার সামনে আসে নি। আওয়াজও ত পায় নি। ভোখিবার ধরে নাই, একবারও? না-ও ডাকতে পারে। পেছন-পেছন এসেছে, ডাকতে যাবে কেন। বাঘারু কি একবারও পেছন ফিরে তাকায় নি? পাছত চাও নাই? শেষ কখন পেছনে তাকিয়েছে বাঘারু?
এতটা দূর একা হেঁটে এসে, এমন ডাঙায় ফরেস্টে ঢোকার আগে শেষ নদীটায় ও ওপারে ফরেস্টের গভীর নির্জনতার সামনে বাঘারুর যেন বড় দরকার হয়ে পড়ে, কুকুরটা যে তারই পেছু-পেছু এসেছে, নিজের কাছে সেটা প্রমাণ করার। কুত্তা আর গাই, যা কওয়াবেন তাই।
ডেমকাঝোরা পার হয়ে, পাড়ে পাতা আর পাথর রেখে, বাঘারু চার পাশে তাকিয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। তার পর, আবার মাথায় নিয়ে রওনা দিয়েছে। ঘঁটি আসিছে। হাটি আসিছে। আর ত পেছন ফিরে তাকায় নি। আর ত পাছত না তাকাই। সেই টাড়িটায় একটা বিরাট কুকুরের দল বাঘারুকে ঘিরে ধরল।
এই পর্যন্ত ভাবতেই বাঘারু যেন থই পেয়ে যায়। তখনই এই কুকুরটা তার পেছনে ছিল? সেই জন্যেই টাড়ি বাড়ির কুকুরের পাল এত খেপে গিয়েছিল?- না-হয় তা বাঘারুক দেখি এ্যানং ভোকিবার ধরিবে কেনে? বাঘারু সাহেব না-হয়, বাঘারুর মাথাত্ টুপি নেই, বাঘারুর ভটভটিয়া নাই, বাঘারু ত নিজের এই দুইখান পায়ের উপর খাড়া একখান মানষি। কুত্তালা ত চিনিবার পারে। ত স্যানং ভোকিবার ধরিল কেনে?
নিশ্চয়ই এই কুত্তাটাও তখন পেছনে ছিল আর টাড়ির দল এই দলছুট কুত্তাকে তাড়া করেছিল।
–এইখান ত একবারও ভোকে নাই? তাড়িখোয়া কুত্তার ডোকাভুকি নাই। এইখান ত একবারও সমুখত আসে নাই? সমুখত কায় আসিবে? দুই ঠ্যাঙের ভিতর ন্যাজখান ঢুকাই মোর দুই ঠ্যাঙের ভিতর সিন্ধাইছে? ত মুই দেখ নাই? কোন কুত্তা তাড়িছে আর কোন কুত্তা তাড়ি খাছে? কায় জানে? দেখিছু কিন্তু বুঝিবার পার নাই।
নিজের সঙ্গে এই কথাবার্তার শেষে বাঘারু হায়হায়পাথারের এই শুয়োরের ডাঙার তলা থেকে কুকুরটার দিকে তার লম্বা হাত বাড়িয়ে ডাকে, সিও সিও।
মুহূর্তে কুকুরটা সোজা হয়ে যায়, যেন যাচাই করতে চায় ডাকটা সত্য কি না। সোজা হয়ে লেজ-কান-নাড়ানো বন্ধ করে ওপারের ফরেস্টের দিকে ঘাড় তুলে তাকায়। মোক ঢক দেখাছে? চেহারা দেখাচ্ছে, বাঘারুকে। বাঘারুর অবিশ্যি দেখতে ভালই লাগে কান খাড়া, ঘাড় সিধা, ঠ্যাং সরু-লম্বা, বুক বড়। শালো, ঝাপিবার পাড়িবে। ঝাপাতে পারবে। কিন্তু দৌড়? বাঘারু ত এখনো ওর পিঠ আর পেছন দেখে নি।
বাঘারু আবার তার ডান হাতটা তুলে দেয়, সিও, সিও। এই দ্বিতীয় ডাক শুনে কুকুরটা আর না-নড়ে পারে না। দু পা নেমে দাঁড়িয়ে পড়ে। অন্য দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ায়। যেন, এখন বাঘারুরই এগিয়ে আসার কথা। এই বাঘারু আর এই কুকুরের ত একবারও চোখাচোখি হয় নি, তাদের চামড়ায়-চামড়ায় একবারও ঘষাঘষি হয় নি। এখনো ত তারা দুজন দুজনের ভাষা জানে না। অন্তত একবার জেনে নেয়া দরকার। মাত্র একবারই। কুত্তা আর গাই, যা কওয়াছেন তাই।
বাঘারু কুকুরটার দিকে উঠতে শুরু করে।
কুকুরটা অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একটা নতুন মানুষ তার দিকে উঠে আসছে আর সে দাঁড়িয়েই আছে এই অনিশ্চয়তা তার পক্ষে অসহ্য বলেই যেন ঘাড়টা ফেরানো। কিন্তু বাঘারু মাঝামাঝি পর্যন্ত উঠে এসেছে দেখে সে একবার বাঘারুকে না দেখে পারে না। ততক্ষণে লেজকান ঘাড় নাড়ানো শুরু হয়ে গেছে। খুব দুর্বল ভাবে একবার দেখে নেয় শুয়োরের ডাঙার পিঠটা-পালিয়ে যাওয়ার পথ। বাঘারু কুকুরটার কাছে চলে এসেছে। কুকুর তার গলাটা মাটির ও বাঘারুর দিকে লম্বা করে দু-পা পেছিয়ে যায়। বাঘারু আর দু-পদক্ষেপেই তার একেবারে কাছে এসে পড়ে।
এখন বাঘারু কুকুরটাকে ধরে ফেলতে পারে। কিন্তু ধরে না। এখন কুকুরটা লাফিয়ে পালিয়ে যেতেও পারবে না। লেজটা ঠ্যাঙের মধ্যে দিয়ে কুকুরটা কুঁই কুঁই শুরু করে। না-নড়ে, শুধু হাত বাড়িয়ে ওর গলটা বাঘারু ধরতে গেলে, কুঁই কুঁই করতে করতে একটু সরে যায়। বাঘারু আর এগয় না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, দুই হাত সামনে বাড়িয়ে ডাকে, সিও, সিও। ডাকে, ফিসফিস করে।
ঘাড় লেজ নিচু রেখেই কোনাকুনি তাকিয়ে কুকুরটা যেন বুঝে নিতে চায়, শেষ বারের মত স্বাধীনভাবে, বাঘারুকে। এখন ত সে সবটাই বাঘারুর হাতের সীমানায়। কিন্তু বাঘারু আর এগচ্ছে না। কুকুরটা একবার এগিয়ে ধরা দিয়ে ফেললে তার ফেরার আর-কোনো পথ থাকবে না। তার গৃহহীনতার টান কুকুরটা শেষবারের মত বোধ করছে। বাঘারুকে সে যে চেনে না, সেই ভয়ও তার এখন চরমে। দুটো একসঙ্গেই ছিঁড়বে। ভেঁড়ার সেই শেষতম মুহূর্তের টানে কুকুরটা মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল।
কিন্তু কুকুরটা জানতই তাকেই একটি পা বাড়িয়ে দিতে হবে এবার–যত ভয়ে-ভয়েই হোক। গলাটাও বাড়িয়ে দিতে হবে এবার মাটির সঙ্গে লেপটে হলেও।
কুঁই কুঁই করতে করতে দুপা আসে। বাঘারু কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কুকুরটা লেজ নাড়ে। বাঘারু তাকে ছোয় না। কুকুরটা বোঝে, হেঁয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তখন সে অতি ধীরে-ধীরে তার মুখটা তুলতে থাকে। প্রথমে বাঘারুর দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে সেই নদী-ফরেস্টের চেনা দৃশ্যের দিকে। তার পর, তার সম্মুখতম অচেনা দৃশ্যের গায়ে। কিন্তু তখনো বাঘারু তার হাত অথবা পা কুকুরটায় গায়ে হেঁয়ায় না। কোনো পশুর পক্ষে এতটা সময় নিজের ক্ষমতা প্রয়োগসীমার সম্পূর্ণ বাইরে থাকা সম্ভব নয়। লেজ নাড়ানো বন্ধ করে কুকুরটা বাঘারুর কোমরের দিকে মুখ তোলে। পেছনের পা দুটো দিয়ে মাটি আঁচড়ায়। কিছু নুড়ি-পাথর ঝুরঝুর ঝরে যায়। কুকুরটার মুখের দিকে হাসি-হাসি মুখে একটু তাকিয়ে বাঘারু ডান হাতে খুব নরম করে কুকুরের মুখটা চেপে ধরে। হাতের তালু কুকুরটার ঠোঁটের ওপরে।
সে এই ইঙ্গিতটুকু পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল, তার ভেজা ঠোঁট আরো একটু ঢুকিয়ে দেয় বাঘারুর মুঠোর মধ্যে। বাঘারুর হাতের তালুতে কুকুরের ঠোঁটের জল লাগে। বাঘারু এই ইঙ্গিতটুকু পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। সে দু হাতেই কুকুরের দু গালে আদরের চড় মারে।
.
এতটা সময় যে তাকে ঘাড়-বেজ নামিয়ে মাটির সঙ্গে লেপটে থাকতে হয়েছে, সেটা ভুলে যেতে, মুহূর্তের মধ্যে কুকুরটা বাঘারুর মুঠোর ভেতর থেকে ছিটকে সরে যায় আর পেছনের দুই পায়ের ওপর। ভর দিয়ে সামনের পা দুটো বাঘারুর বুকের ওপর তুলে মুখটা বাড়িয়ে দেয় বাঘারুর মুখের দিকে। বাঘারু মাথাটা সরায়। নাকে কুকুরটার গায়ের গন্ধ লাগে। কুকুরটা বাঘারুর গলার কাছাকাছি নাকটা নিয়ে গিয়ে বাঘারুর গায়ের গন্ধ তার ছোট-ছোট শাসে টেনে নিতে থাকে।
কুকুরটা তার বুকে ভর দিয়ে দাঁড়ানোয় বাঘারুর পা হড়কে যেতে শুরু করে। সে কোমরটা আর ব-পাটা একটু এগিয়ে দিয়ে শরীরের ভর ঠিক রাখে।উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা থেকে এতক্ষণ পর ছাড়া পেয়ে কুকুরটা তার বশ্যতার সম্পূর্ণ শারীরিক তৃপ্তি ছাড়া শান্ত হবে না।
বাঘারু তাড়াতাড়ি কুকুরটার সামনের দুই পায়ের নীচে দুই হাত দিয়ে একটু সামাল দিতে চায়। তারপর বা হাতটা কুকুরটার ঘাড়ের লোমের ভেতর সম্পূর্ণ ঢুকিয়ে দিয়ে ঘাড়ের চামড়ার কাছে নখগুলো বেঁধায়। হয়, হয়, সিও, সিও–এই শান্ত করার ধ্বনিতেও বাঘারুর শ্বাসের উষ্ণতা লাগে।
বাঁ হাতটা কুকুরের ঘাড়ে ঢোকানোয় বাঘারুর বা বাহু ও ঘাড় ওর মুখের নাগালের ভেতর চলে। আসে। কুকুরটা বাঘারুর বাহুটা হাঁ করে কামড়ে ধরে। বাঘারু তার বাহুতে সঁতের ধার টের পায়। ডান হাতটা দিয়ে একটু ঠেলে রেখে তপ্ত শাসে বাঘারু বলে, খাড়ো, খাড়োকনেক, খাড়ো। ডান পাটা একটু সরাতে হয় বাঘারুকে। আর তখনই কুকুরটা এমন তীব্রতায় ডান থেকে বায়ে তার ঘাড় ঘোরায় যে বাঘারুকে পা হড়কে চিৎপাত পড়ে যেতে হয় মাটিতে। কুকুরটা পাশে পড়ে যায় কিন্তু চার পায়ের ওপর ঠিক দাঁড়িয়ে পড়ে। আর এইবার যেন ভাল বাগে পেয়েছে এমন ভাবে বাঘারুর ঘাড়ের খাজটার দিকে হা করে মুখ এগিয়ে দেয়। খাড়ো, খাড়ো, বলে বাঘারু ওকে ঠেকাতে চায়। কিন্তু তবু ও জোর খাটায় দেখে, হেসে ফেলে, বাঘারু দু হাতে ওর ঘাড় ধরে, শা-লো বলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
কুকুরটা বাঘারুর পায়ের দিকে গড়িয়ে যায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। ততক্ষণে, বাঘারু উঠে পড়ার জন্য মাথা থেকে পা পর্যন্ত আকাশের দিকে ধনুকের মৃত তুলে দিয়েছে। সেই ভঙ্গিকে আহ্বান ভেবে তার দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে কুকুরটা বাঘারুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু ও নিচু থেকে ঝাঁপ দেয় বলেই ধপ করে বাঘারুর বুকের ওপর পড়ে যায় আর বাঘারু আবার চিৎ হয়ে পড়ে। এবার কুকুরটা তার ওপরে।
শালো, বার বার কছি খাড়ো, তা শুনিবার চাহে না, বাঘারু তার শক্ত দুই হাতে জড়িয়ে ধরে কুকুরটাকে পাশে কাত করতে নেয়। কুকুরটাও তার শরীরের ওজনে বাঘারুকে চেপে রাখতে পারে খানিকটা। বাঘারু তার দুই হাঁটুকে সঁড়াশির মত করে নিয়ে কুকুরটাকে কাত করে ফেলে। তার পর সেই ঝোঁকেই ওটাকে আরো শাস্তি দিতে চিৎ করে ফেলে। কুকুরটার পাশে উপুড় হয়ে বাঘারু হাত আর পায়ের জোরে কুকুরটাকে চিৎ করে ঠেসে রাখে। আকাশের দিকে চার ঠ্যাং তুলে আর মুখটা একবার ডাইনে আর একবার বায়ে ঘোরাতে-ঘোরাতে কুকুরটা কুঁই কুঁই শুরু করে, ছাড়া পেতে গায়ে আঁকি দেয়। শালো, বার বার কছি, খাড়ো, খাড়ো, শুনিবার চাহে না। বড় গরম দেখাছিস্? এ্যালায় থাক কেনে এ্যানং চিৎ হয়্যা।
যেন তার জবাবেই কুকুরটা কুঁই কুঁই করে ওঠে–অ্যালায় কুঁই কুঁই করিবার ধইচছিস! বাঘারু বা হাতের আর বা পায়ের চাপে ওকে চিৎ রেখে, নিজে যেন বিশ্রামের জন্য নিজের ডান কনুইয়ের ভাজে, কপাল ঠেকায়। কুকুরটা আরো করুণ কুঁই কুঁই শুরু করে আর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়তে চায়। শালো, বলে বাঘারু হাত আর পায়ের চাপটা শিথিল করতেই কুকুরটা এক ঝটকায় সরে যায়। বাঘারুর হাত আর পা ওখানেই পড়ে থাকে। সে আর চোখে খোলে না। মাথা গুঁজে উপুড় হয়ে পড়ে থাকে।
ছাড়া পেয়ে কুকুরটা প্রথমে কয়েকবার গা ঝাড়া দেয়। একবার ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে, যেন বাঘারু ওখানে নেই। শেষে বাঘারুর দিকে তাকায়। বাঘারু অমন চুপচাপ উপুড় হয়ে শুয়ে থাকায়, নড়াচড়া না করায় আর তার বা-হাত বাঁ-পা ঐ রকম ছিটকে থাকায় কুকুরটার যেন কেমন সন্দেহ হয়। সে নরম গলায় ঘেউ ঘেউ ডেকে ওঠে, বাঘারুকে ডাকতে। তবু বাঘারু নড়ে না দেখে মাটি শুঁকতে-শুঁকতে বাঘারুর হাতের কাছে আসে। হাতটা শোকে। বাতাসটা সেঁকে। আর দু পা এগিয়ে এসে বাঘারুর পিঠটা শুঁকতেই থাকে। ওর ঠোঁটের ভেজা ঘেঁয়া বাঘারু সারা পিঠময় পেতে থাকে!
তার পর হঠাৎ কী-একটা দেখে কুকুরটা বাঘারুর পিঠ থেকে মুখটা তুলে ফেলে, যেন ভয় পেয়েছে এমন গলায় চাপা গরুর আওয়াজ করে। তার পর আবার বাঘারুর ডান পিঠের ওপরের জায়গাটা শুঁকতে থাকে। শুঁকতে-শুঁকতে গরুর আওয়াজ করে। তার পর ঠোঁটটা হেঁয়ায়, আওয়াজ বন্ধ হয়। পেছনের পায়ের নখে মাটি আঁচড়ায়। ঘন-ঘন শ্বাস পড়ে কুকুরটার। বাঘারু বোঝে, কুকুরটা তার পিঠে বাঘের থাবার দাগ চিনতে পেরেছে।
বাঘারু টের পায়, এইবার চাটতে শুরু করল। গরম কর্কশ সেই চাটায় বাঘারুর আরাম লাগে। জিভের টানে পুরনো জখমের জায়গাটা শিরশির করে ওঠে। আর..লালায় ভিজে যায়। চেটে-চেটে পরিষ্কার করে নিয়ে কুকুরটা আর-এক জন্তুর পুরো থাবাটার দাগ থাবাহীন মানুষটার শরীরে চিনে নিতে চায়।
.
কুকুরটাকে দেখার আগে বাঘারু যেদিকে যাচ্ছিল, এখন কুকুরটাকে নিয়ে সেই ঝোপঝাড় গাছপালার দিকে যায়। কুকুরটা বাঘারুর পায়ে-পায়ে চলছিল না; নিজের মত চলছিল। মাঝে-মাঝে নিজের লেজ ধরার জন্যে নিজের চারপাশে পাক দিয়েও নিচ্ছিল।
পাতা আর পাথরগুলো বাধার কিছু একটা পেলেই হয়নদীটুকু পেরতে। ওপারে উঠলেই ত ফরেস্ট। একটা ঝোপের ওপরে-লতানো একটা পাতা দেখে বাঘারু টান দিয়ে দেখতে গেলে, ছিঁড়ে যায়। এত কিছুর দরকারই ছিল না, একটু পোয়াল পেলেই হত। সেই একটু পোয়াল পাওয়া গেল না। বা, সারা রাস্তায় একটা ভামনি বন পড়ল না।
একটা পাকুড় গাছ থেকে সরু ঝুরি নেমে এসেছে। দেখে বাঘারু দাঁড়ায়। শুকনো। শক্ত হবে। প্যাঁচ লাগে নি। তা হলে হয়ত ছেঁড়াও যাবে।
ছেঁড়া যায় কি না পরীক্ষা করতে বাঘারু এক হাতে ঝুরিটা ধরে হেঁচকা টান দেয়। টানটা পুরো তার হাতেই লাগে। বাঘারু আবার তার হাতে প্যাচায়। টেনে ছিঁড়তে না-পারলে ঐ পাথরটা এনে তেলে কেটে নেবে। আর-একটা পাথর এনে, তার ওপর, ধরে।
বাঘারু এবারের টানটা আরো যাচকা মারে। তাতে তার মনে হয়, ছেঁড়া যেতেও পারে। এতক্ষণ পর অন্তত এতটা শক্ত একটা লতা যখন পাওয়া গেছে বাঘারু ছাড়ছে না।
বাঘারু এবার দুই হাতে ঝুরিটা ধরে পেঁচিয়ে, হাত দুটো মাথার ওপর তোলে। ফলে ঝুরিটা ঢিলে হয়ে যায়। এখন আচমকা একটা হ্যাঁচকা টান মেরে প্রায় ঝুলে পড়ে। ওপারে পটপট আওয়াজ ওঠে। বাঘারু বোঝে, একটু নেমেও এল। আর দু-একটা টানেই ছেঁড়া যাবে। বাঘারু ঢিলে দেয়।
আবার দু হাতে পেঁচিয়ে নিয়ে, হাতটা মাথার ওপর তুলে, আচমকা এ্যাচকা টান মেরে, বাঘারু ঝুরিটাতে ঝুলেই পড়ে। তার শরীরের ভার দিয়ে বুঝতে পারে ঝুরিটা নেমে আসছে। বড় জোর আর দু-এক টান লাগবে। কিন্তু বাঘারু ঝুরি থেকে নামে না। সে তার শরীরের ওজনটা দিয়ে ঝুলে থাকে। পটপট আওয়াজ তুলে ঝুরিটা ডাল থেকে খসতে শুরু করে। কিন্তু খসে পড়ার আগেই ছিঁড়ে যায়, আর বাঘারু সেই ঝুরিসহ মাটিতে ধপাস করে পড়ে। বাঘারু আগে মাটিতে পড়ে, ঝুরিটা তার ওপর পড়ে। তাকে জড়িয়ে ফেলে।
কুকুরটা এতক্ষণ একটু দূরে দাঁড়িয়ে হাঁ করে নীরবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাতাস থেকে পোকা তাড়াচ্ছিল। বাঘারুকে পড়ে যেতে দেখে, ঘেউ করে ডেকে উঠে লাফিয়ে সামনে চলে আসে। শালো ভোখছে খালি, শালো ভোখা, খাড়া।
বাঘারু ততক্ষণে ঝুরিসহ উঠে দাঁড়িয়ে মাথা-ঘাড় থেকে ঝুরিটা খোলে। বেশ লম্বা ঝুরি। মাঝখান থেকে ছিঁড়ে গেছে। দেখতে-দেখতে লতাটাকে বা হাতের কব্জিতে ডান হাত দিয়ে পেঁচাতে থাকে। বেশ অনেকখানি হয়। বাঘারু এসে পাথর আর পাতার পাশে বসে।
বাঘারু ভাবতে শুরু করে কী ভাবে বাধবে। শুকনো লতা শক্ত বলেই ছিঁড়বে না, কিন্তু আবার, শক্ত বলেই জোরে গিঠ দেয়া যাবে না। একটু ভেবে পাথরটাকে আলাদা করে। তার পর পাতাগুলো দেখে আর হাতের লতাটা দেখে। লম্বালম্বি একটা বা দুটো প্যাঁচ দিলে জলের ধাক্কায় পাতাগুলো বাধনের পাশ। গলিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। আড়াআড়ি বঁধলে ত তুলা দিয়ে গলে যাবে। লতাটা হাতে নিয়ে আর পাতার গোছাটা সামনে নিয়ে বাঘারু একবার হাতের দিকে আর একবার পাতার গোছর দিকে ফিরে-ফিরে তাকায়। সেই প্রক্রিয়াতেই তার হাত যেন বাঁধনের ধরনটা তৈরি করে ফেলে। বাঘারু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে নদীর স্রোতের দিকে তাকায়, কত জোরে ধাক্কা মাররে, সেটারও আন্দাজ পেতে।
বাঘারু পাতাগুলোয় আড়াআড়ি একটা বাধন দেয়–গোড়ার কাছে। এখানে পাতাগুলো সবচেয়ে কম চওড়া, তাই বাধনটা দেয়া যায় বটে, গিঠটা জোর হয় না। লতার জন্যেও বটে, পাতার জন্যেও বটে, পাতাগুলো তা হলে ভেঙে যাবে। এই বাঁধনটা দিয়ে বাঘারু কিছুক্ষণ তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে, লতাটা কাটে না, যেন নিশ্চিত হয়ে যেতে চায়, এটাই ঠিক। তার পর পাথরটা তুলে নেয়। লতাটার নীচে একটা টুকরো পাথর এনে রাখে। এক হাতে পরনামিয়া পাথরটা তুলে লতাটার ওপর মারে। বাঘারুর মুখে হাসি ফোটে। এমন ধার তার পাথরের, এক কোপেই প্রায় কেটে যয়। বাঘারু একটানে থেঁতলানো জায়গাটা ছিঁড়ে ফেলে। এবার, আর-একটা গিঠ দেবে আগার দিকে।
শেষ পর্যন্ত যা হয়, সেটা নিয়ে বাঘারু দাঁড়ায়! দাঁড়িয়ে, ঝোলায়। ঝুলিয়ে, দেখে নেয়। আগায় আর গোড়ায় দুটো আড়াআড়ি, আর সেই দুটো গিঠকে যোগ করে লম্বালম্বি একটা গিঠ। একটা খাঁচার মত হয়ে গেছে। পাতাগুলো স্রোতের ধাক্কায় বেরিয়ে যেতে পারবে না। কিন্তু ঢিলে হয়েছে। এক ভরসা ঐ মাঝখানের খুঁজে-খাজে পাতাগুলো আটকেই আছে। আর পাতাগুলো পিছল নয়।
কিন্তু পাতাগিলা ত ঝুলিবার নাগিবে, হাত বরাবর কাঁধত। কাধ থেকে ঝোলানোর ফাসটা বাঘারু এবার বানায়।
পাথরটা পেঁচানোর জন্যে বাঘারুকে এত কিছু ভাবতে হয় না। সে আন্দাজমত অংশ কেটে নিয়ে চ্যাপ্টা পাথরটাকে আড়াআড়ি লম্বালম্বি পেঁচিয়ে, একটা গিঠ মেরে, খানিকটা ফাঁক দিয়ে, একটা ফাস বানিয়ে নেয়। ব্যাস, মালার মত হয়ে গেল। বাঘারু দাঁড়িয়ে ফাস হাতে নিয়ে ঝোলায়। ব্যাস, ঝুলিও নিগার পারি। বাঘারু ফাসটা গলায় পরে নেয়। পাথরটা তার বুকের কাছে দোলে। সেটা দুলে-দুলে বুকে লাগবে কি না দেখতে কয়েক পা হাঁটে। কিন্তু নদীর ভিতর পাথরখানা দুলিবে কেনে। স্যালায় ত সঁরিবার নাগিবে। বাঘারু থেমে যায়। কিন্তু তার পরই তার মনে আসে, পাড়ে উঠেও ত পাতাগুলো কাঁধে ও পাথরটা গলায় ঝুলিয়ে সে হাঁটতে পারে। বাঘারু পাথরটা গলা থেকে খুলে ফ্লাসটা আর-একটু ছোট করে নেয়, যাতে পাথর দুলে বুকে লাগার বদলে সেঁটে থাকে।
তাও বেশ খানিকটা লতা বেঁচে যায়। বাঘারু কুকুরটার দিকে তাকায়। সেটা তখন নিজের লেজ ধরার জন্য পেছনের দুই পায়ের ভেতর দিয়ে মুখ গলাতে গিয়ে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে। শালো, ভোখা না-হয়, বোকা, হে বোকা এইঠে আয়। কুকুর তার কথা শোনে না। বাঘারু চেঁচায়, এততি আয় বোকা। তার পর বা হাতে কুকুরের ঘাড় ধরে এনে তার গলায় বাকি লতাটা পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে দেয়। থাকুক, কুখন কুন কামে লাগি যায়, কায় জানে।
এইবার বাঘারু নদীর দিকে চলে। বুকে পাথর ঝুলছে। কাঁধে পাতা। পাশে তার কুকুর, গলায় লতা পেঁচানো। বাঘারু সরাসরি নদীর পাড়ে চলে আসে। তারপর পাড় দেখতে-দেখতে হাটে, কোথায় নামা যায়। পাড়টা উঁচু ও ভাঙা। কিন্তু পাথর আছে–ছোট-বড় নানা সাইজের পাথর। পা দিয়ে-দিয়ে নীচে নেমে যাওয়া যায়।
তেমনি একটা জায়গা পেয়ে বাঘারু দাঁড়ায়। তার পর পাড়ের পাথরটিতে পা দিয়ে এক লাফে জলের কিনারের পাথরের ওপর দাঁড়ায়। তার পর একটুও না দাঁড়িয়ে আরো নীচে জলের, আরো কিনারের পাথরটিতে পা দেয়। তার পরেই জলে পা হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যায় আর পাতাগুলো হাতের পাশে ভেসে কাঁধে লাগে, সাঁতার কাটতে ডান হাত নাড়াতে পারবে না। বাঘারু মুহূর্তের মধ্যে ফাস থেকে হাত বের করে নিয়ে ফাঁসটা গলায় পরে নেয়–পাতাগুলো পিঠের ওপর ভেসে থাকে। চকিতে একবার ভাবে, পাথরটা কোমরে বেঁধে নিলে ভাল হত, কিন্তু তার আর সময় নেই। যে-জনপদ সে পেরিয়ে এল সে দিকে একবারও না তাকিয়ে বাঘারু জলের ভেতরে ঢুকে যায়, যেমন ঢুকে যাওয়া বাঘারুর স্বভাব, যেন সে জলের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে, এই পাথর ভাসানো স্রোতের ওপর দিয়ে। ওপারে অরণ্যপদ। সে-অরণ্যের শেষ বাঘারু দেখে নি, জানে না। সেখানে তার নির্বাসন। মাল নদীতে স্রোত ছিল। স্রোত এসে বাঘারুর গায়ে ধাক্কা লাগায়। বাঘারু সে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়। বাঘারু পেছন ফিরে দেখে নি, সেই তার কুকুর, জলে নামল, কি নামল না। ভাসতে-ভাসতে বুঝতে পারে, কুকুরটা–ভোখাবোকা–তার পাতলা শরীরে স্রোতের ধাক্কায় বাঘারুকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল। তার পরই সামনে দেখতে পায়, ভোখাবোকা মাথাটা স্রোতের ওপর ভাসিয়ে রেখে ডাইনে বয়ে ঘোরাচ্ছে। বাঘারুর মাথার পেছনে পিঠের ওপরে পাতার গোছা ভাসে, গলায় পাথর ডোবে আর লোখাবোকার মতই স্রোতে ভেসে থেকে বাঘারু ওপারে, ফরেস্টে, তার নির্বাসনে চলে যায়।
.
সরকারি ফরেস্টে গরুমোষ চরাবার একটা ব্যবস্থা আছে। তার জন্যে গরুমোষপিছু একটা পয়সা দিয়ে লাইসেন্স নিতে হয়।
শীতের শেষে আগুন লাগিয়ে জঙ্গল সাফ করা হয়, যাতে বর্ষার আগে নতুন গাছ পোতা হয়। কোনো-কোনো জায়গায় মরা গাছ কেটে বাদ দেয়া হয়। কোনো-কোনো গাছ এতই মরা যে কাটার খরচ পোষায় না। সেসব গাছও পুড়িয়ে দেয়া হয়।
এই সব আগুনটাগুন লাগিয়ে যখন ফরেস্ট সাফসুরত করা হয় তখনই গরুমেষ চরাবার লাইসেন্স করে রাখতে হয়। এসব লাইসেন্স দেয় বিট অফিস। তবে, সেখান থেকে রেঞ্জ অফিসে গিয়ে সিল লাগিয়ে আনতে হয়।
আগুন লাগানোর পর সারাটা ফরেস্ট কেমন খালি-খালি লাগে। তলায়-তলায় বহুদূর পর্যন্ত চোখ চলে যেতে পারে–এক নদীর পার থেকে আর-এক নদীর আর-এক পার। বর্ষার প্রথম কদিন যায় ফরেস্টের পোড়া দাগটা ধুয়ে যেতে। দেখতে দেখতে পরিষ্কার হয়ে যায়। বেশ তকতকে ঝকঝকে লাগে পুরো ফরেস্টের আঙিনা ঐ আকাশ-ছাওয়া গাছগুলোর তলায়।
কখন এক সময় নতুন ঘাস গজানো শুরু হয়ে যায়। ফরেস্টের মাটি দেখতে-দেখতে কচি-কচি ঘাসে ভরে যায়। দেখতে-দেখতে পোড়া জঙ্গল জুড়ে এই সবুজ নতুন ঘাস লক লক করে ওঠে। সেই সময় গরু আর মোষের বাথানে বিভিন্ন এলাকা ভরে উঠতে থাকে।
বাথানদার প্রায় সারা বছরই ফরেস্টে কাটায়। শীতের শেষে বসন্তের শুরুতে তাদের লাইসেন্সের মেয়াদ আইনত পার হয়ে যায়। তাদের বাথান নিয়ে ফরেস্টের বাইরে চলে আসতে হয়–এটাই আইন। কারণ, তখন জঙ্গল সাফ করার সময়। কিন্তু বাথান নিয়ে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। পঁচিশ-পঞ্চাশ-একশ গরুমোষ নিয়ে কি ফরেস্ট থেকে বেরিয়ে আবার গায়ে ফিরে যাওয়া সম্ভব? এসব গরু-মোষের সঙ্গে গায়ের কোনো সম্পর্কই নেই। বাথানদাররা তাই ঐ সময়েও ফরেস্টের ভেতরেই থাকে। বাথানদাররা জানতেই পারে, কখন কোন জঙ্গল সাফ হবে। সেই অনুযায়ী সরে-সরে যায়। তেমন সুযোগ থাকলে, ফরেস্টের ভেতরে ফরেস্টেরই ভোলা খালি জমিতে, বা নদীর চরে, বা কোনো চা বাগানের বড় মাঠে ঐ কটি দিন কাটিয়ে দেয়। ফরেস্টের মধ্যেই চা বাগানের তেমন-তেমন খোলা জমি থাকলে সেখানে এই কয়েক দিনের জন্যে বিরাট গো-হাটা মোষ-হাটা বসে যায়। কয়েকটা বাথান একসঙ্গে কয়েকদিন থাকে। তেমন সুযোগ থাকলে মালিকরাও এই সময় এসে তাদের বাথান দেখে যায়। কিছু-কিছু বেচাকেনাও চলে। বছরের পর বছর এই একই নিয়মে চলতে-চলতে এখন সবটাই সকলের জানা হয়ে গেছে, কখন কোন বাথান কোথায় থাকে।
সারাটা বছর জুড়েই কেন এই বাথানবাথান গরুমোষ ফরেস্টের ভেতরে-ভেতরে থাকে?
তার দুটো কারণ আছে দু-দিক থেকে। একটা কারণ ফরেস্টের। এত গরুমোষ খাওয়ার পরেও ফরেস্টে এত আগাছা জন্মায় যে নতুন চারার বাড় নষ্ট হয়, পুরনো গাছের শরীর খাক হয়ে যায়। বিশেষত, জলপাইগুড়ির এই ফরেস্টে, যেখানে বার মাসের সাত মাসই বৃষ্টি। এই কারণের ভেতর আরো অনেক ছোট ছোট কারণ জন্মে গেছে, অনেক দিন ধরে। সারা বছরের জন্য গেরুমোষ চরাবার লাইসন্স-ফি মাথা পিছু দশ-বিশ পয়সা। যার বিশটা সে দশটার জন্যে, যার পঞ্চাশটা সে পঁচিশটার জন্যে, যার একশটা সে পঞ্চাশটার জন্যে, লাইসেন্স ফি দেয়। এর অতিরিক্ত গরুমোষের জন্যে ফরেস্ট গার্ড, বিট অফিসার, তেমন বড় বড় বাথানের বেলায় এমন কি রেঞ্জ অফিসারও, একটা পয়সা পায়। সুতরাং ফরেস্টে গরুমেষ চরানোয় ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের স্বার্থ যেমন, কর্মচারীদেরও তেমনই স্বার্থ।
ফরেস্টে বাথান রাখার একটা কারণ আছে বাথানের মালিকদের। ফরেস্টের ভেতর বাথান রেখে দেয়াটা অনেক শস্তা পড়ে। গরুমোষের খাবার খরচই যে বাঁচে তা নয়, এতগুলো গরুমোষ রাখতে যে-পরিমাণ জমি নষ্ট হত, গোয়ালঘর রাখতে আর প্রতি বছর ছাইতে যে-খরচ পড়ত, সেটা বেঁচে যায়।
কিন্তু এই মালিকদের বেলাতেও এই প্রধান কারণটার সঙ্গে আরো অনেক ছোট-ছোট কারণ জড়িয়ে আছে, অনেক দিন ধরে। অনেক ক্ষেত্রে সেই ছোট কারণগুলোর যোগফল, প্রধান কারণের চাইতেও বেশি।
ফরেস্টের জমি ত সর্বত্রই ছড়ানো। গাছগাছড়ার জঙ্গলে বাইরে অনেক জায়গা পড়ে থাকে। কোথাও-কোথাও ত ফরেস্টের ব্লকটার চাইতে এই খালি জায়গাটাই বড়। বাথানের মালিক ঐ রকম মাঠওয়ালা ব্লকের লাইসেন্স জোগাড় করতে পারলে বাথানদার হাল-বিছনও নিয়ে আসে। বাথান বাথানের মত থাকে আর বাথানদার ফরেস্টের জমিতে জোতদারের জন্যে চাষ-আবাদ করে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের যারা এই দিকে থাকে তারাও চাষে সাহায্য করে। কারণ ফসলের একটা অংশ তারাও পায়।
ফরেস্টের জমিতে চাষ লাগানোর, অর্থাৎ জমি ফরেস্টের আর হাল বলদ-বিছন জোতদারের, আর-একটি পদ্ধতিও আছে। ফরেস্টের ভেতরে ফরেস্ট-ভিলেজার বলে এক-একটা দলকে থাকতে দেয়া হয়। তারা শুকনো পাতা, কাঠকুটো আর হাতের মুঠোর জমিটুকুতে কিছু চাষ করা আর থাকার অধিকারের বদলে ফরেস্ট পাহারা দেয়–প্রধানত পোচার ও চোরা কাঠকাটুনিদের খবর বিট অফিসে পৌঁছে দেয়। এরা সারাধারণ এত গরিব যে গরিব রাজবংশী গ্রামেও এদের জায়গা জোটে না। কিন্তু ফরেস্ট ভিলেজার হিশাবে এখন এদের কদর বাড়ছে বাইরের জোতদারদের কাছে। এই ফরেস্ট ভিলেজারদের সামান্য আইনি অধিকার আছে ফরেস্টের জমিতে। কিন্তু সেইটুকু অধিকারের সুযোগেই যদি তাদের হাল আর বিছন দেয়া যায়–বাথানদারদের হাত দিয়ে, আর তাদের ঘরের লাগাও জমি চাষে দেয়া যায় তা হলে ত সেটা আইনসঙ্গত চাষই হয়। জোতদার-দেউনিয়া তার ন্যায্য ভাগটুকু নিলে সেটাও আইনসঙ্গত ভাগই হয়।
এটাকে দুদিক থেকেই দেখা যায়-ফরেস্টের জমিতে জোতদারের আধিয়ারি, বা ডুয়ার্সের গভীর অরণ্যে কৃষিকর্মের বিস্তার।
নানা ভাবে এই প্রক্রিয়া ভারতের সব বনাঞ্চলেই শুরু হয়েছে। ফরেস্টের চাষযোগ্য জমিতে ফরেস্ট আর দখল রাখতে পারছে না। পুলিশ-টুলিশ দিয়ে এই সব জবরদখলকারীদের তুলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু দেখতে-দেখতে গত কয়েক বছর খবরের কাগজে ফরেস্ট স্কোয়াটার্স শব্দটা তৈরি হয়ে গেছে।
ফরেস্টে গেলেই রাশি রাশি জমি আর ফসল ব্যাপারটা যদি এই হত তা হলে ত ফরেস্টেই গ্রাম বসে যেত। হয়ত যেত। কিন্তু এখন ত আর তা সম্ভব নয়। এখন ফরেস্টের ব্যবসা জোতদারের চাষের ব্যবসার চাইতেও অনেক-অনেক গুণ লাভের। জোতদার, বা যে-কোনো ব্যবসায়ীর কাছেই, যে ব্যবসার টাকা তার ঘরে আসে না, সেই ব্যবসাটাই অর্থহীন। কী বা হছে, এ্যানং পাহাড়-পাহাড় আর জিলা-জিলা জঙ্গল রাখি? আরে মানষি থাকিবার পারে না, ত গাছ! তার আবার বাঘক বাঁচাবার নাগে, কুমিরক বাঁচাবার নাগে। তা বাঁচা কেনে, বাঁচা। মানুষজনক ধরি-ধরি বাঘ দে কেনে। বাচুক তর বনজঙ্গল আর বাঘ-হাতি।
নিজেদের ফরেস্ট বানাবার আর কাঠ বেচবার যদি আইন থাকত, তা হলে এরাই ধানগম চাষ তুলে দিয়ে শুধু বনচাষ করত।
কিন্তু উল্টোদিকে আবার ব্যাপারটা অর্থনীতির এমন সরল অঙ্ক নয় যে বাথানের ছুতো করে বন ঢুকে নানা কায়দায় বেআইনি জোতদারি করাটাই এত সব বাথানের উদ্দেশ্য। বাথান রাখার সরাসরি খুব কারণ আছে–দুধ বেচে বিনি খাটুনি বিনি খরচায় দৈনিক লাভের কারণ। কিন্তু তার সঙ্গে কখনো কখনো এই বেআইনি জোতদারিও মিলে যায়। আবার অনেক সময় যায়ও না, নেহাত বনের ভেতর বাথান রেখে দেয়ার সুবিধে বলেই রেখে দেয়া হয়। কথাটা শুধু এই যে বনের জমিতে গরুমোষের বাথান রাখা যেমন একটা ব্যবসা বা রীতি, বনের জমিতে বেআইনি জোতদারিটাও একটা রীতি। প্রথমটা অনেক প্রাচীন রীতি–এখন আবার নতুন ভাবে শুরু হয়েছে। দ্বিতীয়টা একেবারেই নতুন রীতি–এতটাই নতুন যে এখনো রীতি হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে বলা যায় না। ফরেস্টের ভেতরে এত পশুর খাদ্য থাকে, যা বাইরে জোটে না, আর, বাথান নিয়ে থাকা লোকগুলোর পেটে এত সামান্য খিদে থাকে, যা বাইরে মেটে না। তাই বাথান, আর বাথানদার, গাছ-গাছড়া-পশুপাখি, এমন কি, বাঘ-হাতির মত পশুও, একটা সুসঙ্গতিতে থেকে যেতে পারে। সেই সঙ্গতিটাই জোরদারির ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
.
সঙ্গতি নষ্ট হচ্ছে কৃষিকাজের আধুনিকতার ফলে।
শুধু হালবলদে চাষ হতে পারে, বিছন হলেই ফসল হতে পারে। ফসল হলেই ত আর ফলন হয় না। পাকা ও কাটা পর্যন্ত ত সেই ফসল মাঠে রাখতে হয়।
ফরেস্টের ভেতরের জমিতে ফরেস্ট-ভিলেজাররা আগে লাঙল ছাড়া, বলদ ছাড়া, যেটুকু জমি দুই হাতে চষতে পারত, সেটুকুর ফসল দুই হাতে ফলন পর্যন্ত রাখতে পারত। কিন্তু ফরেস্টের ভেতর হালবলদের চাষের বিছন-ছড়ানো ফলন দুই হাতে রক্ষা করা যায় না। প্রধান বিপদ দু-দিক থেকে আসতে পারে।
এক : বনের পাখিরা এতটা খোলা জায়গায় এত ঘন ধানের এত ফলন দেখে নি। ফসল ফলল কি ফলল না, তারা ঝাঁকে ঝাকে নেমে এসে কয়েক দিনের মধ্যেই ধানগুলো খেয়ে ফেলে। ধানছাড়া গাছগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কয়েক দিনের মধ্যে পোয়াল হয়ে গেলে ওড়াউড়ির তাতে কোনো অসুবিধে হয় না।
দুই : ধান গাছও আগুনের মত–নিজের পোকা নিজেই টেনে আনে। দু-হাতের মুঠোয় এটে যায় এমন ফলনে সে-পোকা দু-আঙুলে টিপে মেরে ফেলা যায়। কিন্তু হালবলদের চাষের বিছন-ছড়ানো ধানের পোকা মারতে ওষুধ লাগে। সেই পোকা মারার ওষুধের কোনো অসুবিধেও নেই আজকাল। দেউনিয়া জোতদারদের ঘরে কৌটোয়, জেলিক্যানে, প্লাস্টিকের বস্তায় ভোলা থাকে। পাট, ধান আর আলুর পোকা মারা ছাড়া সে-ওষুধ জোতদাররা অন্য কাজেও লাগায় কখনো কখনো। ঘরেও লাগায়, বাইরেও লাগায়। তাছাড়া আছে চা-বাগান। সেখানে ত এই সব ওষুধের গুদাম। চা-গাছের পাতার দাম ধানগমের চাইতে অনেক বেশি। সে পাতা বাঁচানোর ওষুধের দামও অনেক গুণ। তেমন দরকারে, ফরেস্টেরই ভেতর ছড়ানোছিটনো চা বাগানগুলো থেকে এসব সব ওষুধ আনা যায়। আনা হয়।
ফরেস্টের ভেতরে হালবলদে চষা বিছনছেটানো খেতে, এই সব ওষুধ ছিটিয়ে দেয়া হয়। কতটা ওষুধ কী ভাবে ছেটাতে হয়, সে-সবই আন্দাজ মাত্র। কোনোটাই জানা নয়।
হরিণ, হাতি, গণ্ডার, এরা ধান খেতে ভালবাসে। ধানের খোঁজে পাল বেঁধে ফরেস্টের বাইরেও চলে যায়। ফরেস্টের ভেতরে, হয়ত তাদের যাতায়াতের পথের পাশেই, এমন ধানখেত দেখলে তারাও আসে। হরিণেরা পাল বেঁধে, হাতিরা দল বেঁধে আর বেশির ভাগ গণ্ডার একা-একা।
ওষুধ ছিটনোর পরপরই যদি তারা আসে তা হলে ধানের সঙ্গে সঙ্গে এই সব ওষুধও গিলতে থাকে রাশি রাশি। ফলে, এই পশুর দল বনে ফিরে যাওয়ার পর এই ওষুধের বিষক্রিয়া শুরু হয়। এরা কতটা বিষ খেয়েছে সেই অনুপাতে মরে। সেই মৃত পশুদের মাংস যে-সব শেয়াল, বনকুকুর আর পাখিরা খায়–সেগুলোও মরতে শুরু করে। ফলে, নেহাতই আচমকা, এক-একটা ফরেস্টের এক-একটা জায়গায় মহামারী লেগে যায় যেন। আজকাল, এই সব মহামারী যাতে ছড়িয়ে না পড়ে, তার নানা রকম ব্যবস্থা হয়েছে–কিন্তু সেসব ব্যবস্থাই ত কীটনাশক, জীবাণুনাশক দিয়ে। কীট আর জীবাণুনাশক খেয়েই যে-মড়ক শুরু তা প্রতিরোধের কোনো উপায় নেই। এক ভরসা; কাছাকাছি স্রোতবতী নদী না-থাকলে মড়ক বেশি দূর ছড়াতে পারে না। থাকলে, স্রোতের সঙ্গে বিষ আরো নীচে নেমে যায়। আর-এক ভরসা, যদি বৃষ্টি হয় প্রচুর, তা হলে অত জলে বিষের সক্রিয়তা কমে যায়। কিন্তু ফসল ত পাকে, বর্ষা শেষের রোদেই। তখনই ত পোকা ধরে বেশি, পশুপাখিও ধান খেতে যায় বেশি আর ওষুধও ছেটানো হয় বেশি।
দাক্ষিণাত্যের কোনো-কোনো ফরেস্টে বাথানের গরুমোষ বাঘ মেরে নিয়ে গেলে বাথানদারেরা সেই মারা পশুটাকে খুঁজে বের করত জঙ্গলের মধ্যে। বাঘ ত আর একবারে সবটা খেতে পারে না, পরে খাবে বলে রেখে দিয়ে যায়। সেই মড়াটার ভেতরে এই বীজাণুনাশক ও কীটনাশক ওষুধ গ্রামবাসীরা ঢুকিয়ে দিয়ে আসত। তার পর সেই মাংস খেয়ে বাঘ ত মরতই, শকুন-শেয়াল-হায়নাও মরত। নিজেদের বাথানের গরুমোষ ফরেস্টে নিরাপদে চরাবার জন্য ফরেস্টের মাংসাশীদের সেই ওষুধের বিষে নিকেশ করা হয়। ১৯৭৬ সালেই কেনেথ অ্যাণ্ডারসন বলেছেন, এর ফলে আজ দাক্ষিণাত্যের এই সব বনে কোনো বাঘ নেই, শেয়াল নেই, হায়না নেই. শকুন নেই।
জলপাইগুড়ির ডুয়ার্সে অবস্থা এখনো ততটা খারাপ নয়। কিন্তু লক্ষণটা দেখা দিয়েছে। কয়েক বছর আগে ফরেস্টের এক ব্লকে একটি রাত্রিতে সম্বর হরিণের একটা পাল সারাটা সল্ট লিক জুড়ে শুকনো পাতার মত ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে ছিল। শরীরের ভেতরের অনভ্যস্ত বিষক্রিয়ায় শরীরেরই কোনো এক অজানা নিয়মে জিভ বের করে নুনমাটি চাটতে-চাটতেই মরে যায়। এই মৃত্যুর তদন্ত হয়েছিল। কলকাতা থেকে বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন। পোস্টমর্টেমও হয়েছিল। তার পরে আর-কিছু জানা যায় নি।
বেশ কয়েক বছর আগে ফালাকাটার কাছে যে-গণ্ডারটা মারা যায়, তারও কারণ নাকি বিষ। কেউ-কেউ সন্দেহ করে, সে বিষ মিশিয়েছিল পোচাররাই। দুটো গণ্ডার প্রায় নিয়মিত ধান খেতে আসত সংলগ্ন খেতে। ভোরের আগেই ফিরে যেত। জ্যোৎস্না রাতে অনেকে দেখেওছে, গণ্ডার দুটো সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে–দেখে মনে হয়েছে কোনো কাটা গাছের মোটা গুঁড়ি পড়ে আছে। যারা ঐ খেত চব্বিশ ঘণ্টা দেখছে তারা ত জানে ওখানে কোনো গাছের গুঁড়ি নেই। প্রথম-প্রথম গণ্ডার দুটোকে তাড়িয়ে দেয়ারও চেষ্টা করেছে। ফল খুব একটা হয় নি। শেষে, ধীরে-ধীরে এটা অভ্যাসই হয়ে যায় রাস্তার বা পাড়ার ষাড় যে-নিয়মে চেনা হয়ে যায়। আর, একবার অভ্যাসে এসে গেলে ত এই গণ্ডার দুটো ঐ রাতগুলোর জন্যে ঐ গ্রামটারই বাসিন্দা হয়ে যায়।
কিন্তু অভ্যাসের অন্য একটা দিকও আছে। গণ্ডার দুটোর আসাটা যখন প্রায় নিয়ম হয়ে গেছে, সবার জানা হয়ে গেছে, তেমনি কোনো একদিন দেখা গেল, একটা গণ্ডার মরে পড়ে আছে। বলা উচিত, শোনা গেল। কারণ শেষ রাতে অপর গণ্ডারটির তীব্র চিৎকারেই সবার ঘুম ভাঙে। প্রথমে কেউ চিৎকারটি চিনে উঠতে পারে নি। কিন্তু নিয়মিত ব্যবধানে একই জায়গা থেকে চিৎকারটি বার বার উঠে আসায় বাধ্য হয়ে তোকজনকে বেরতে হয়। বেরনোর পর বোঝা যায় চিৎকারটি একটি গণ্ডারের নয়, দুটো গণ্ডারের। ততক্ষণে একটি গণ্ডার খেতের ভেতর এমন ছুটছে, যেন ভূমিকম্প হয়ে চলেছে। আর-একটি গণ্ডার ছোটে না, দাঁড়িয়ে থাকে। সমস্ত দৃশ্যটা দেখতে হয় বেশ দূর-দূর থেকে। একটা গণ্ডারের মৃতদেহ বেরল সকালে। কিন্তু মাদি গণ্ডারটা তখনো দাঁড়িয়ে। শুধু তখনই নয়, দিনের পর দিন। জায়গাটা থেকে নড়ছিলই না। প্রথম দিকে ঘন-ঘন চেঁচাচ্ছিল। পরের দিকে মাঝেমধ্যে। সে চিৎকারে মাটি ফেটে যাচ্ছে মনে হত। মাদি গণ্ডারটাকে বনে ফিরিয়ে দিতে আর মৃত গণ্ডারটার মৃত্যুর তদন্ত করতে কলকাতা থেকে বিশেষজ্ঞরা এসেছিলেন। গণ্ডারের পেট কাটতে ইলেকট্রিক করাত আনতে হয়েছিল। সে করাত চালাতে জেনারেটারঅলা গাড়ি আনতে হয়েছিল। তার ফলে কী জানা যায়, তা জানা যায় নি।
শোনা যায়, গণ্ডারটা মরেছিল ঐ পোকামারার ওষুধ খেয়ে। সে বিষ নাকি মিশিয়েছিল পোচাররাই। তারা নাকি ঐ জমিতে এত ওষুধ ঢালে যে ঐ জায়গাটা একেবারে পুড়ে যায়। কিন্তু দুটো গণ্ডারের বদলে একটা গণ্ডার ধান খেতে গেল কেন? সেটা ত অনেক সময় হতেও পারে। কেন হয়, তা এক পশুরাই জানে।
অনেকে বলে, যার জমি তার ভুলে এটা হয়েছে। অনেকে বলে, তারই বা পোচার হতে বাধা কোথায়? বা পোচারদের হয়ে এই কাজটুকু করে দিতে?
তবে, গণ্ডারের মৃত্যু এই কীটনাশক থেকে হতে পারে কি না এই নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক আছে। কিন্তু যদি কীটনাশকে মৃত্যু না হয়ে থাকে অথচ কোনো-কোনো লোক যদি সেটাকেই মৃত্যুর কারণ মনে করে, তা হলেই ত বুঝতে হয় এটা একটা সামাজিক বাস্তবতা হিশেবে স্বীকৃত হয়ে যাচ্ছে–পশুপাখি, গাছপালা, নদীনালা, মানুষজন নিয়ে ফরেস্টের সে-সঙ্গতি তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এমনই এক সামাজিক বাস্তবতা হিশেবে।
.
পুরনো জোতদারির নতুন কৃষির মত, নতুন করে বাথানদারিও শুরু হয়েছে।
জলপাইগুড়ি, ডুয়ার্স আর দার্জিলিং পাহাড়ের তলার দিকের অনেক জায়গায় নামই আছে বাথান দিয়ে। গরুবাথান, মহিষবাথান ত বেশ চেনা নাম। ছোট অনেক জায়গায় নামও এরকম আছে। কেন এই নামগুলো এমন হয়েছে তা নিয়ে কিছু-কিছু গল্প আছে। এসব জায়গার লোকবসতি ত খুব বেশি দিনের নয়। সুতরাং সেসব গল্পের ভেতর এখনো পর্যন্ত ইতিহাসই হয়ত আছে।
কিন্তু এখনকার এই বাথানবাথান গরুমোষ রাখা শুরু হয়েছে বড় জোর বছর পনের। ঠিক ভাবে বলতে গেলে, দশ বার বছরও হতে পারে।
১৯৬২-তে চীন-ভারত যুদ্ধ যখন শুরু হল, সকাল-সন্ধ্যা রেডিওতে নতুন-নতুন জায়গার নাম শোনা ছাড়া, ডুয়ার্সের লোকজন যুদ্ধ কিছু বোঝে নি। হাইওয়ের কাছে যারা থাকে তারা দেখেছে, মিলিটারি গাড়ি যাতায়াতের যেন শেষ নেই। কিন্তু সবাই ত সেটাও দেখতে পায় নি। তারাও দেশের অন্যান্য জায়গার লোকের মত রেডিওতে শুনেছে, যারা পড়তে পারে কাগজে পড়েছে। সে যুদ্ধ ত কয়েক মাস পর থেমেও গেল।
যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর সারাটা ডুয়ার্স জুড়ে নানা ঘটনা ঘটা শুরু হল বছরের পর বছর। সরু রাস্তাগুলো চওড়া হয়ে গেল। কাঠের ক্যালভার্টগুলো ঢালাই হয়ে গেল। ছোট-ছোট নদীর ওপর পাকা ব্রিজ হল। জলপাইগুড়ির ওপর তিস্তার ব্রিজ হল। এখন আর শিভক ব্রিজ হয়ে ঘুরে যেতে হবে না। আর, শিলিগুড়ির উত্তরে দার্জিলিং পাহাড়ের তলা থেকে আসাম পর্যন্ত, হাইওয়ের দুপাশে, বনের ভেতরের জঙ্গল পরিষ্কার করে, মিলিটারির ক্যাম্প বসল। সে ক্যাম্পের যেন আর শেষ নেই। বনের ভেতরটা পরিষ্কার করে পাকা বাড়ি, পাকা রাস্তা, অগুনতি গাড়ি আর অগুনতি মানুষজন। ফরেস্টের বড়বড় গাছ থেকেই গেল, তলাটা সাফ করে নেয়া হল।
শুধু জঙ্গলেই নয়, কোথাও-কোথাও শহরের বাইরে আর-এক শহর তৈরি করে ফেলল মিলিটারিরা। সেই সব শহর কোথা থেকে শুরু আর কোথায় শেষ কেউ জানে না। সমস্ত জায়গাটাই কোথাও দেয়াল, কোথাও কাটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা। কখনোকখনো সেই সব ঘেরের ভেতর প্লেন নামে। তা ছাড়া, গাড়ির সারি ত লেগেই আছে। এরকম কত ঘেরা শহর তৈরি হয়ে আছে দার্জিলিং পাহাড়ের তলায়, শিলিগুড়ির উত্তর থেকে, হাইওয়ে ধরে, আসাম পর্যন্ত। কিন্তু এমন টানা ও প্রায় অবিচ্ছিন্ন নতুন সামরিক পত্তনের কোনো পরিচয় স্থানীয় লোকেরা না-জানলেও বহু দূর-দূর জায়গা এরই সূত্রে একত্রিত : হয়ে যায়। কোথায় কোন পাহাড়ের আড়ালে কামানের গোলার শক্তি পরীক্ষায় বা কামান চালনার অভ্যাসে কতদূর পর্যন্ত কেঁপে-কেঁপে ওঠে। এতদিন সেই কম্পনে লোজন অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কামানের গোলার ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হওয়া ছাড়া এই ব্যাপক অঞ্চলের ভেতর এই এত সামরিক ঘটনার কোনো প্রতিক্রিয়াই ঘটে না। তার একটা কারণ নিশ্চয়ই এই সারা এলাকায় জমির তুলনায় বসতি অনেক কম আর বসতির তুলনায় পাহাড়-নদীবন অনেক বেশি। তাই এই এত দূর বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সেনানগর গড়ে উঠতে পারে স্বাধীনভাবে। স্থানীয় কোনো ব্যাপারের ওপর তার কোনো প্রতিক্রিয়া হল না। শুধু, মালবাজারে আর হাসিমারাতে পুরনো ও বাতিল ইউনিফর্মের দুটো দোকান হল। এই দুই জায়গাতে বেশ কটি ফটোর দোকান হল। আর এই দুই জায়গায় ত বুটেই, আরো কোনো-কোনো জায়গার ছোট-ছোট বই আর পত্রিকার দোকান বেশ বেড়ে গেল। মালবাজার আর হাসিমারার মত জায়গায় হিন্দি-ইংরেজি ত বটেই, তামিল, মালয়ালি, তেলেগু ভাষার কাগজ পর্যন্ত দোকানে টাঙিয়ে রাখা। এত ভাষার এত কাগজ সত্ত্বেও সব কাগজের ওপর একই মেয়ের ছবি! বীরপাড়াতে একটা বিরাট দোকান হল–তাতে ওষুধ থেকে শুরু করে জামাকাপড়, স্যুটকেস-সাইকেল-মদ সবই পাওয়া যায়।
কিন্তু সামান্য এই কটি দোকানপাট ছাড়া, এই যে এতগুলো ক্যাম্প যত্রতত্র বসে গেল–শোনা যায় বিন্নাগুড়িতে ত নাকি একটা পুরো ক্যান্টনমেন্টই হয়ে আছে, শুধু এখনো ক্যান্টনমেন্ট বলে ঘোষণা হয় নি এই মাত্র–তার কোনো প্রতিক্রিয়া স্থানীয় বাজারের ওপর হল না। অর্থাৎ বাজারে জিনিশপত্রের বিক্রিবাটরা বাড়বে, আমদানি বাড়বে, লোকের হাতে একটু পয়সা খেলবে, সে-সব হল না। লোকের ভাগ্যে থাকল ঐ ছেঁড়া পোশাক আর কাগজের দোকানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মিলিটারির সুবাদে বিনি পয়সায় নানা ভাষায় ও নানা রঙে একটি মেয়েরই আধা ন্যাংটো ছবি মলাটে দেখা।
এত-এত ক্যাম্পের এত-এত খাবার, সেসব কনট্রাক্টাররা আনে ট্রাকে করে করে বাইরে থেকে। শিলিগুড়িতে একটা ডিপো আছে। কাঁচা তরকারিটরকারি সেখান থেকে কিছু আসে। কিন্তু খাশি আসে বিহার থেকে, একেবারে ট্রাক-ট্রাক লাদাই করে। এখন নাকি কিষনগঞ্জের পরে একটি জায়গায় আর ওদিকে বালুরঘাটে ডিপো হয়েছে। বালুরঘাটের ডিপোর কারণ বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চোরাই-চালান। মিলিটারির কাজকারবার সারা দেশ জুড়ে। আর এই সব মিলিটারি কনট্রাক্টারদের কারবারও যেন তাই। যেন, এইখানে যে-কোম্পানি বদলি হয়ে আসে, তার সঙ্গে-সঙ্গে কোম্পানির কনট্রাক্টাররাও চলে আসে–সে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত থেকেই হোক বা ভারতের পশ্চিম সমুদ্রের পার থেকেই হোক। এতদিনে হয়ত এই-সব কনট্রাক্টাররা এখানে, বিশেষত শিলিগুড়িতে, এখানকার লোকদেরও কিছু-কিছু সাবকনট্রাক্টারি দিচ্ছে কিন্তু আসল কনট্রাক্টের ব্যাপারে কেউ নাক গলাতে পারে না। অর্থাৎ পুরো এলাকা জুড়ে ৬২র যুদ্ধের পর মিলিটারির এত কিছু কাণ্ড হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও স্থানীয় লোকজনের আয়ব্যয়ের ওপর তার কোনো প্রতিক্রিয়া হয় নি। মিলিটারি জাতীয় ব্যাপার বলেই হয়ত তার প্রতিক্রিয়াও জাতীয়-স্তরেই হয়, এত তলায় আর নামতে পারে না।
কিন্তু একটি জিনিশ কনট্রাক্টারদের স্থানীয় ভাবেই সংগ্রহ করতে হত–দুধ। পাউডার মিল্ক বা ঐ-জাতীয় পানীয় সরবরাহে কোনো অসুবিধে হয়ত আছে। বা হয়ত, ঐ ধরনের পানীয়, যা দূরের কোনো জায়গা থেকে একবারে আসে, তার সঙ্গে স্থানীয় ভাবে সংগৃহীত দুধ দিয়েই দৈনিক রেশনের কোটা পূরণ করা যায়। কারণ যাই হোক, মিলিটারি ক্যাম্পের ফলে স্থানীয় ভাবে দুধের চাহিদা শুধু বেড়ে যায় বললেই হয় না, বাড়তে বাড়তে তা ছড়িয়ে পড়ে শিভক ব্রিজ পেরিয়ে সেই পাহাড়ের তলায়, বনে, এমন কি, পাহাড়েও, ব্যাঙডুবি-মিরিক থেকে সেই আসাম সীমা পর্যন্ত। দুধের জন্যেও ত কনট্রাক্টার আছে। তারা আবার ফড়ে লাগায়। ফড়েরা আবার লোক লাগায়। তারা সব দুধ জোগাড় করে আনে বস্তির আর টাড়ির ভেতর থেকে।
প্রথম দিকে এ নিয়ে নানা কাণ্ডও হয়েছে। মিলিটারি ক্যাম্পেক্যাম্পে এই দুধ জোগানোর ব্যাপারে নদী-নালাবন-পাহাড়ের আড়ালের সব বস্তি-টাড়ি পর্যন্ত, রাজবংশী-নেপালী-মদেশিয়া যাবতীয় লোকজন, জড়িয়ে গেছে। বস্তির লোক এক জায়গায় নিয়ে যেত। সেখান থেকে আর-একজন আরেক জায়গায়। সেখান থেকে আর-একজন বড় রাস্তায়। সেখান থেকে ট্রাকে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সে-সমস্ত প্রাথমিক স্তর কেটে গিয়ে এখন একটা পাকাপাকি ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
জোতদাররা বছর তিন-চারেকের মধ্যে কিষনগঞ্জ-পূর্ণিয়াতে তোক পাঠিয়ে, মোষ কিনে এনেছে। সামরিক কারণেই বোধহয়, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টও উৎসাহ দেখায় গরুমোষ চরানোর লাইসেন্স দিতে। দেখতে-দেখতে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এই হাইওয়ের দু-পাশে সেই শিলিগুড়ির উত্তর থেকে আসামের সীমান্ত পর্যন্ত ফরেস্টগুলো গরুমোষ রাখার বাথানে ভরে গেল। দুধের কনট্রাক্টারের সঙ্গে প্রত্যেক বাথানের মালিকের ব্যবস্থা। কনট্রাক্টারকে যেবা যে-যে ক্যাম্পে দুধ সাপ্লাই করতে হয়, সেই ক্যাম্পের রাস্তার কাছাকাছি ফরেস্টে বাথান রাখতে হয় যাতে গাড়ি করে সাতসকালে দুধ সংগ্রহ করে আনা যায়। তাতে অবশ্য অসুবিধে হয় না, কারণ এক মালিকের যেমন একাধিক বাথান থাকে, তেমনি এক কনট্রাক্টারেরও একাধিক ক্যাম্প থাকে। ফরেস্টের ভেতর বড় রাস্তাগুলো জুড়ে সকালে ট্রাক-ট্রাক দুধ ভরে ছোটাছুটি চলতে থাকে। ফানেল আটকানো লম্বা-লম্বা নল গরুমোষের ব্যাটে লাগিয়ে যন্ত্র দিয়ে পাম্প করে দুধ দোয়া হয়ে যায়। ডায়না নদীর ব্রিজের নীচে, ল্যাটারাল রোডের পাশে, গয়ানাথের এমনই এক বাথান।
.
বাঘারুর এই নির্বাসনভূমি দিগন্তজোড়া ধনুকের মত বাকা ও নদীর এক পার থেকে অন্য পারের মত ধূসর।
কলকাতা থেকে আসাম ন্যাশনাল হাইওয়ে চালসার কাছে দক্ষিণে নেমে, আবার ময়নাগুড়ি দিয়ে উত্তরে উঠেছে। যে বিশাল ফরেস্টটা এই প্রায় মাইল পঞ্চাশ লম্বা U-এর বিচ্ছিন্ন দুই প্রান্ত ঘিরে রেখেছে, ফরেস্টের ম্যাপে তার নানা জায়গার নাম আছে–ওপর-চালসা আর নীচ-চালসা, ওপর আর নিচু তণ্ডু, ডায়না রেঞ্জ, ডায়না চর, গরুমারা, খুঁটিমারি। ফরেস্টের ম্যাপের এই নানা নামের ভেতরে একটা নিয়ম আছে–বড় থেকে ছোট হয়ে আসা নাম। ঐ চালসা থেকেই একটা ল্যাটারাল রোড বেরিয়ে এই পঞ্চাশ মাইল U-টার ওপরের দু-মাথা যোগ করে প্রায় সত্তর আশি মাইল বড় একটা গোল 0 বানিয়ে দিয়েছে।
বাঘারুর নির্বাসনভূমি যে-ধনুকের মত বাকা, এই ল্যাটারাল রোডটা সেই ধনুকের ছিলা। ডায়না নদীর ব্রিজটা সেই ছিলার মধ্যবিন্দু। ছিলা আর ধনুকের মাঝখানের শূন্যতা জুড়ে ডায়না নদী। ডয়না-চর ত জঙ্গল। তার পেছনে পাহাড়ের গা বেয়ে ফরেস্ট উঠে গেছে খাড়া ও ধনুকের মত বাকা। তার ওপারে ভূটান পাহাড়। এই ডায়না নদীর কোনো পাড় নেই, নীচে তিস্তার যেমন আছে। এই নদীর তিন দিক জুড়ে পাহাড়–আপলাদের তিস্তার তেমন নেই। এই নদীর চাইতে আপলাদের নদীর বুক বড়। এই ডায়নার খোলা বুকের মাত্র একটা অংশ দিয়ে পাথরে-পাথরে ধাক্কা খেয়ে-খেয়ে এই নদী এমনই বেগে ছুটছে–জল মাটি ছুঁতে পারে না। এত পাথরে ধাক্কা খেয়ে এত মুহুর্মুহু বাক নিয়ে এই ডায়না নদী নামে আর ছোটে যে মনে হয় নদীতে জল নেই, শুধু বুদ্বুদ আছে। বাঘারুর তিস্তায় ফেনা নেই বুদ্বুদ নেই–মাটির কোন অতল পর্যন্ত জল, তিস্তার বুকের ভেতর জল আঁটে না, ফেটে যায়। তিস্তার মত এপার-ওপার করে নয়, ডায়নাকে দেখতে হয় লম্বালম্বি, তলা থেকে ওপরে। কিন্তু লম্বালম্বিও ডায়নার অনেকটা একসঙ্গে দেখা যায় না, পাথর ও পাহাড়ে নদী এমনই হামেশা আড়াল হয়।
নদীর বুকের কিছু অংশে, জলের দু পাশে, বালি। তারপর অনেকটা জুড়ে শুধুই পাথর, যেন মনে হয় পাহাড়কে পাহাড় ভেঙে হঠাৎ ওখানে ছড়িয়ে আছে। ছোট-ছোট পাহাড়ের সমান এমন বড় বড় পাথর নদীর মাঝখানে আলগা পড়ে আছে, যার মাথায় উঠতে মানুষের বুকি,আর বাঘ বা কুকুরের নখ, দরকার। এমন বড় পাথরের খাড়া মাথা মাটির ওপর ঝুঁকে নিজেরই শরীরের ভেতরে এমন গর্ত তৈরি, করে, যেখানে ঝড়বৃষ্টির সময় মানুষ ও পশু আশ্রয় নিতে পারে। কোনো-কোনো পাথর আকাশে সূচ্যগ্র জেগে থাকে। চড়াইয়ে গড়াতে-গড়াতে ঝুলে থাকে কোনো পাথর, যেন এই মুহূর্তে গড়িয়ে নেমে আসবে। কিন্তু সেই পাথরের আড়াল থেকে নামা স্রোতের ধাক্কায়-ধাক্কায় তার তলায় শ্যাওলা পুরু হয়ে আছে। কোথাও-কোথাও কোনো এমন পাথর ঘিরে মানুষ-ডোবা ঘাসের জঙ্গল। সমান পাথরের বেদিতে কোনাকুনি খাড়া হয়ে আছে শাদা পাথরের স্থাপত্য-ধূসর সবুজের সামনে, স্রোতস্বান, ফেনপুঞ্জের পেছনে, বালি আর নুড়ির মাঝখানে।
পাহাড়ের মত এত-এত পাথর, নুড়ির মত ছড়িয়ে আছে বলেই চট করে বোঝা যায় না, নদীর সারাটা বুক বোল্ডারে ঠাসা কেন, যেন বাধানো। বালিভূমি আর নদীখাত জুড়ে এত বোল্ডার পড়ে, মনে হতে পারে, এই পাহাড়-পাহাড় পাথর দিয়ে নদীটাকে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
এই বড় পাথর আর বোল্ডার ছাড়া প্রায় বালির মতই ছড়ানো নুড়ি পাথর। নানা আকারের, নানা রঙের। ডায়না দিয়ে বান বয়ে যাওয়ার সময় এই সব নুড়ি পাথরের ওপর দিয়ে জল নেমে যায় প্রায় ভাঙনেরই টানে। তার পর, জল কমতে শুরু করলে জলের ভেতরে রামধনুর রঙে চমকে-চমকে ওঠে নুড়ি পাথরের এই প্রান্তর। ডায়নার সহসাবিস্তৃত সেই জলরাশিতে মনে হয় আকাশের ছায়া, পড়েছে–এত গভীর আর এত রঙিন সেই নুড়ি-পাথরের জলপথ।
আপনাদের তিস্তায় পাথরের এই বিস্তার নেই। সেখানে মধ্যরাত্রিতে তিস্তার গভীর থেকে কামানের গর্জন উঠে আসে। লোকে বলে, তিস্তার কামান। তিস্তার তলার মাটিতে পাথরে-পাথরে ধাক্কা লাগে। জল এত গভীর, নদী এত ছড়ানো, পাথর মাথা তুলতে পারে না। আপলাদ ত নীচে, সমতলে, সেখানে মাটির ঢাল এত খাড়া নয়।
ডায়না নদীর ঠিক এই জায়গাটিতেই এমন ঘটছে, কারণ এখানেই পাহাড় থেকে নেমে এসে, ডায়না একটু বায়ে বেঁকে, সমতলে চলে গেছে! পশ্চিমে গাটিয়া, আরো কিছু পশ্চিমে জলঢাকাও, গিয়ে নীচে ডায়নায় মিশেছে। ডায়নার ব্রিজে দাঁড়িয়ে দক্ষিণে তাকালে সেই সমতলটা দেখা যায়। বেশ কিছুটা পর্যন্ত ডায়নার চর। তার পর থেকেই লোয়ার তণ্ডুর ফরেস্টের নদীসীমা গাছের দেয়াল দিয়ে গাথা। ডায়নার বুক ক্রমেই চওড়া থেকে চওড়া হয়ে নীচে নেমে গেছে–তিন-তিনটি বড় নদীর জল, আরো অনেক ঝোরা-নালীর জল ঐ বুকে এঁটে যায়। ওখান থেকেই জলঢাকা-গাটিয়া-ডায়না, তিস্তা থেকে পুবে, আরো পুবে সরে-সরে গেছে, শেষে, আরো পুবে কোচবিহারের পাশ দিয়ে। তার নীচে দক্ষিণ-পুবে মোড় নিয়ে রংপুরের কাছে তোর্সার সঙ্গে মিশে তিস্তায় গিয়ে পড়েছে। ডায়নার পুবে আর-কোনো নদী নীচে তিস্তায় পড়ে নি। পশ্চিমে তিস্তা আর পুবে ডায়না–এই ত সম্ভাব্য বিস্তৃততম তিস্তাপার।
ডায়নার এই চরে গয়ানাথের বাথান। এই চরের বাথানটুকু পেতে গয়ানাথকে, তার জোয়াই আসিন্দিরকে লাগিয়ে, ফরেস্টের অফিসে তদবির করতে হয়েছিল। বাথান তাকে রাখতেই হবে, এদিকে। তার কনট্রাক্টার দুধ সাপ্লাই দেয় এই ল্যাটারাল রোডের ওপর, বিন্নাগুড়ির দিকে। সে ত আর ট্রাকের তেল পুড়িয়ে আপলচাদে গিয়ে দুধ দোয়াত না। অবিশ্যি উল্টো দিকে, আপাদে বাথান থাকলে গয়ানাথ ওদলাবাড়ির দিকের কোনো কনট্রাক্টারের সঙ্গে বন্দোবস্ত করত। কিন্তু সেদিকেও যে গয়ানাথের বাথান নেই, তার নিশ্চয়তা কী? তিস্তাপারের পুব সীমা শিভক আর পশ্চিম সীমা এই ডায়নার মধ্যে কোথায় গয়ানাথ আছে আর কোথায় নেই, তা কি সব সময় গয়ানাথেরই জানা?
ডায়নার এই চরটাই বাথানের জন্যে বাছার কারণ একসঙ্গে এতগুলো যে তার ভেতর কোনটা আগে কোনটা পরে বিচার করা শক্ত।
এখানেই, ডায়না, পাহাড় থেকে নেমে, সমতলে চলে যায় বলে ব্রিজের পরে জলটা যেন ফেটে ছড়িয়ে পড়ছে। অথচ বালি আর পাথরের জন্যে এত বড় বুকটাও ত অসমান। ফলে, ডায়নার চরটাকে মাঝখানে রেখে অনেক দূর-দূর দিয়ে দুটো বড় ধারা গড়িয়ে গেছে। কিছু-কিছু ধারা আবার চরের মধ্যেও ঢুকে গেছে। এই মাঝখানের চরটাতে যদি বাথান থাকে, তা হলে দু ধারের জলই বাথানটাকে অনেকখানি বাঁচায়।
এই মাঝখানটাতে থাকার ত অন্য অসুবিধে নেই, কারণ, চরটা উঁচু ঘাসের জঙ্গলে ছাওয়া। যদি নানারকম ঘাস খাওয়াতেই ইচ্ছে হয়, চরটার ভেতর ঘুরতে দিলেই গরুমোষ নিজেই পছন্দমত ঘাস জোগাড় করে নেয়। তার ওপর, এই ঘাসবনের পরেই জঙ্গলবাড়ি। সেখানে ছোটখাটো নানা রকম ঝোপঝাড়, লতাপাতা, গাছগাছড়া। ঘাড় নুইয়ে ঘাস খেতে-খেতে গরুমাষের যদি একটু একঘেয়ে লাগে, তা হলে তাকে জঙ্গলে এক পাক ঘোরানোও যায়। তারও পরে পাথর আর বালি পার হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ফরেস্ট শুরু। পুরো বাথান নিয়ে সেই ধনুকাকার ফরেস্টের বা দিক দিয়ে সকালে ঢুকে, ডান দিক দিয়ে বেরিয়ে বিকেলের ভেতর চরে ফিরে আসা যায়। ফরেস্টের কতকগুলো জায়গা যেমন কতকগুলি কাজের জন্যেই নির্দিষ্ট থাকে, এই জায়গাটি তেমনি যেন বাথান রাখার জন্যেই ঠিক করা। এই সব চরের জঙ্গলবাড়ি-ঘাসবাড়িতে একমাত্র ভয় গোবাঘারুর। কিন্তু তেমন কোনো বাঘ আছে কি না, এ খবর আগেই পাওয়া যায়। তা ছাড়া এতগুলো মোষ নিয়ে গো বাঘারুর মুখোমুখি হওয়ার সাহস না থাকলে তার আর বাথান রাখার দরকারটা কী? ল্যাটারাল রোডটা মাঝখান দিয়ে চলে গেছে বলে গাড়িঘোড়ার আওয়াজে বাঘ এদিকে আসে না। অথচ এই রাস্তা আছে বলেই সকালে কনট্রাক্টারের গাড়ি এসে দাঁড়াতে পারে।
এই ইতিহাস ও ভূগোলের মধ্যে নির্বাসিত বাঘারু, এখন, কোনো এক রাত শেষে, ঘুমিয়ে আছে পাহাড় আর ব্রিজের মাঝখানের ফাঁকাটাতে, নদীর বুকে, একটা ছোট টিলার মত একলা-পাথরের ওপরে।
তিন দিক থেকে তিনটি বনমোরগ একসঙ্গে ডেকে উঠে রাত্রির শেষ ঘোষণা করে দেয়। মোরগ তিনটির একটি বাঘারুর ডাইনে, আর-একটি বায়ে, জঙ্গলের ভেতর। তাদের ডাক দুটো মিশে যায়, কিন্তু প্রতিধ্বনি দুটো মেশে না। আর-একটা মোরগ ডাকে ব্রিজের দক্ষিণে চরের মাঝখান থেকে। তার ডাকটাই হালকা আসে, প্রতিধ্বনি ওঠে না। ফলে, তিনটি মাত্র বনমোরগের ডাকের সাত-আট রকম আওয়াজে জায়গাটা হঠাৎ ভরে ওঠে। আওয়াজগুলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে অনেকটা সময় নেয়। নিঃশেষিত মিলিয়ে যাওয়ার আগেই চরের আর ফরেস্টের ভেতরের নানা আওয়াজ তার সঙ্গে মিশে যায়।
কোনো-কোনো পাখি পাখা নেড়ে ঘুম কাড়ে, গাছের পাতায়-পাতায় মর্মরধ্বনি ওঠে, সে-ধ্বনি গাছ থেকে গাছে চলে যায়। কোনো-কোনো পাখি ডেকে ওঠার অপেক্ষায় গলায় একটা স্বগত ধ্বনি তুলতে থাকে–গলায় উঠে সে ধ্বনি গলার ভেতরে চলে যায়। মহিষের বাথানের এক দিক থেকে আর-এক দিকে কান আর লেজ ঝাঁপটানোর আওয়াজ ওঠে। ঘাসবনে শির শির আওয়াজ টানা চলে যায় দূরে, মাটি ঘেসে-বাতাসের বা শ্বাপদের। ঝিঁঝির আওয়াজ থেকে-থেকে থেমে গিয়ে সেই নৈঃশব্দ্যকে আরো নিঃশব্দ করে তোলে।
সেই পাখিটা জেগে ওঠে-ডায়নার ওপরে, জঙ্গলের ভেতরে, কোনো উঁচু ডালে। তার পাখাঝাড়ার বেশ জোর আওয়াজ নদীপথ ধরে নেমে আসে। পাখিটা ডাল বদল করে। গাছের কয়েকটা পাতা অনেক শব্দ তুলে খসে যেতে থাকে। পাখিটার গায়ের সঙ্গে পাতার ঘর্ষণের আওয়াজও নদীপথ ধরে নামে। সে বসে বসেই আরো একবার পাখা ঝাঁপটায়। তার পর, সেই আধো অন্ধকারে, একটা কাতর ক-অ-অ-ক-ধ্বনি তোলার সময় জুড়ে, নদীপথের আকাশ জুড়ে তার পাখনাটার প্রবল আলোড়নে, উড়ে আসে, এই ফাঁকার ওপরে। এই ফাঁকাটায় সে দুবার পাক খায়, বাঘারুর পাথরটাকেও ঘোরে। তার পর ঝুপ করে নদীর ওপরেই যেন নেমে যায়। কিন্তু উল্টো টানে উঠে এসে বসে বাঘারুরই পাথরের কিনারায়। এই পাথরটায় উড়ে আসার জন্যেই যেন তার নদীতে ঝাঁপ দেয়ার দরকার ছিল।
কিন্তু এসে বসেই বাঘারুকে দেখে, পাখা আর গোটায় না, যেন আবার উড়ে যাওয়ার জন্যেই কাঁপায়, কিন্তু ওড়ে না। ঐ উঁচু পাথরের কিনারায় পাখাটা মেলে রেখে দুটো সরু ঠ্যাঙের ওপর বসে। পাখা-মেলা সেই শরীরের ভারে পা-দুটো কাপে, পাখিটা দোলে। কাপুনি আর দুলুনি থামাতে পাখি ঘোরে। পায়ে-পায়ে এক পাক দু পাক। তার পর পাখা মেলে রেখেই দুটো ছোট-ছোট লাফে সে বাঘারুর দিকে ঘোরে। ঘুরেও পাখাটাকে বন্ধ করে না। ভোলা পাখা নিয়ে স্থির হয়ে বাঘারুকে দেখতে চায়। ঐ স্থিরতার প্রয়োজনেই পাখাটা আস্তে বন্ধ করে মিশিয়ে নেয় নিজের শরীরের সঙ্গে তার পরে লম্বা শরীরটাকে দুলিয়ে বাঘারুর দিকে দুপা এগয়। আগে পাখাটা শরীরের সঙ্গে সম্পূর্ণ মেলে নি, তখন মেলে। ডালের ওপর বসলে যে লেজটা ঝুলে থাকতে পারে, এখানে পাথরের ওপর সেটাকে খাড়া রাখতে হয়।
পাখাটা সম্পূর্ণ গুটিয়ে নিয়ে পাখিটা নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যকে স্পষ্ট করে বাঘারুর শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকে। পাথরেরই ওপর আর-একটা পাথরের মত শুয়ে আছে বাঘারু। বাঘারুর মাথার ওপর দিয়ে পাখিটার গলা উঁচু করা; ফলে বাঘারুর মাথার রেখা, পাখির শরীরের রেখার সঙ্গে মিশে যায়। যেন বাঘারুর মাথাটাই উঁচু রেখায় পাখিটার গলার নরম ঢাল হয়ে ঠোঁট পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এসেছে। সেই রেখাটা ভেঙে দিয়ে পাখি ডাইনে ঘাড় ঘোরায়। দু পা ঘোরে। তারপর কিনারায় সরে এসে বাঘারুর বিপরীতে পাহাড়ের দিকে মুখ করে। লেজটা বাঘারুর মাথায় ঠেকে গেলে উঁচু করে। বুকটা এমনই নিচু হয় যেন তখনই উড়ে যাবে। কিন্তু ওড়ে না। লেজটা বাঘারুর কপালের ওপর ফেলে রেখে ওড়ার ভঙ্গিতে স্থির হয়ে যায়।
বাঘারু জেগে যায়, চোখ খোলে, কিন্তু নড়ে না। পাখিটার লেজ তার কপাল ছাড়িয়ে চোখের ওপর পড়েছে। তবু এত অস্পষ্টতায় বাঘারু বুঝতে পারে না লেজটা কত বড়, কী রকম, শেষে চেরা, না গুটনো, লেজের শেষ দিকে কি অন্য কোনো রঙের ঘের আছে? পাখিটা তাকে যেরকম নিষ্প্রাণ ভেবে কপালের ওপর লেজটার ভর রেখে দিয়েছে, বাঘারু সেরকম নিষ্প্রাণ হয়ে থাকে। নইলে পাখিটা মুহূর্তে উড়ে যাবে। আর যদি বাঘারু পাথরের ওপর পাথরের মতই পড়ে থাকে, তা হলে পাখিটা ঘুরে এমন কোথাও দাঁড়াতে পারে যে বাঘারু তাকে সম্পূর্ণ দেখতে পাবে। তিন দিন ধরে বাঘারু পাখিটাকে একবার দেখতে চাইছে, পারছে না।
বাঘারুর কপালের ওপর লেজটা একটু নড়ল, সুড়সুড়ি লাগল। তা হলে পাখিটা একটু ঘুরল। সুড়সুড়ি লাগছে। লেজটা এখন বাঘারুর ডান চোখটা ঢেকে দিয়েছে। বাঁ হাত দিয়ে এক ঝটকায় বাঘারু পাখিটাকে ধরে ফেলতে পারে। লেজটা বাঘারুর কপাল থেকে উঠে যায়।
বাঘারু পাখার কোনো আওয়াজ পায় না। তা হলে উড়ে যায় নি। বাঘারু তার এই পাথরে পাখির পাতলা নখের কোনো স্পর্শ শোনে না। তা হলে কি নড়ছে না?
তারপরই, বাঘারুর মুখের ওপর পাখার একটা ঝাঁপটা মেরে পাখিটা উড়ে চলে যায় বাঘারুর পায়ের দিকের আকাশে, ব্রিজের কাছটাতে। বাঘারু আবছায়া শুধু উড়ে যাওয়াটুকু বুঝতে পারে। দুই চোখ মেলে রেখে বাঘারু দেখে আকাশে কোনো তারা নেই! সে অপেক্ষায় থাকে পাখিটা আবার কখন উড়ে যাবে। ততক্ষণে পাখিটা ব্যায়ে মোড় নিয়ে আবার নদীর ওপরের ফাঁকাটায় চলে গেছে। বাঘারু উপুড় হয়ে যায়। দেখে, তার উল্টো দিকে, জলের ওপারে, উঁচলো বড় পাথরটার মাথায় গিয়ে বসল।
পাথরটা ছুঁচলো বলেই, পাখির ছায়াখন দেখা যাছে-য্যান একখান পাথরের পাখি। ঘাড় ঘোরাছে। স্যালায় বুঝা যায়, পাথর না হয়, পাখি। ছায়াখান মোরগের নাখান টানটান। বুকখান চিতানা। মাথাত ঝুটি আছে কি নাই, বুঝা না যায়। উপুড় হয়ে দুই হাতের ওপরে থুতনি রেখে বাঘারু তাকিয়ে। বাঘারু একবার পাখিটাকে দেখতে চায়, পুরোটা দেখতে।
পাখিটা ঐ পাথর থেকে উড়ে আবার এই পাথরে আসতে পারে। বা, আবার, নদীখান ধরি ফিরি যাবার পারে জঙ্গলে। পেছনের ঘাসবনেও নেমে যেতে পারে। না-হয়, না-হয়। ঐ পাখিটার এ্যালায় খোয়ায় মন নাই। দোসর চাহে, দোসর চাহে।
তা হলে ত ডেকে উঠতেও পারে, এখন বাঘারুর সামনে ঐ ছায়ামূর্তিতেই। তা হলে বাঘারু অন্তত একবার বুঝতে পারবে, গত তিন দিন যে-ডাকটা এই রাতশেষে আর সেই দিনশেষে পাগল করি দিবার ধইচেছে, সেউ ডাকটা এই পাখি কেনং করি ডাকে। তিন দিন ধরে পাখিটার ডাকের সাড়ায় বাঘারু ডেকে ওঠে। বাঘারু ডেকে উঠলেই পাখিটা চুপ করে যায়। তার পর চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। সেই অনেকক্ষণ কেটে যাওয়ার পর, রাগে জ্বলতে-জ্বলতে তীক্ষ্ণতর স্বরে, ঘন-ঘন ডেকে ওঠে। পাখোয়াল (পাখি) বুঝিবার ধইচছে, অর দোসর এইঠে আছে, ডাকিবার ধইচছে, কিন্তু আসিছে না কেনে? পাখিটার সারা শরীরে সঙ্গীর জন্যে ডাক উঠেছে। যখন ও ডাকে তখন ওর ডাকের কাপনে ওর শরীরে কাপন বোঝা যায়। শরীরের সেই কাঁপনে এমনই বিহ্বল যে বাঘারুর ডাককেই ভাবে সঙ্গীর ডাক?
কিন্তু সত্যি কি তাই ভাবে? বাঘারুকে যদি সত্যিই সঙ্গী ভাবত তা হলে আরো আউরায়বাউরায় চলি আসিত বনের ভিতরঠে। বাঘারু যে ওর সঙ্গী নয়, সেটা বুঝতে পেরেই কি বাঘারুর ডাকের শেষে অত চুপ করে থেকে অত তীক্ষ্ণতর ঘন-ঘন ডেকে ওঠে?, রাত ভাঙতে না-ভাঙতেই পাখি এসে এই ফাঁকটায় উড়ে-উড়ে বেড়ায়। ফরসা হওয়ার আগেই পাখা ঝটপটিয়ে চলে যাবে, জঙ্গলের ভেতর থেকে আরো ভেতরে যেখানে সব সময়েই অন্ধকার। বিকেলের রোদ সরে গেলে আবার পাখি ঝটপটিয়ে উড়ে আসবে এইখানকার আঁধারে। জঙ্গল থেকে নদীতে, পাথরে, আঁধারে-আঁধারে, পাখি তার সঙ্গীতে খুঁজছে। বাঘারুর জকে সেই সঙ্গীর ইশারা পেয়ে, খোঁজে?
বাঘারুর গলার ভেতরটায় একটা ডাক গুরগুর উঠে আবার ভেতরে চলে যায়। ডাকি উঠিবে? বাঘারু ভাবে, পাখি কি তাকেই সঙ্গী ভেবেছে, পাখি ভাবে নাকি তার সঙ্গীটা ডাকে অথচ আসে না কেন? ঐ বাশের নাখান চোখা পাথরের মাথায় বসি নদীর পাথর বুকখান দেখিবার ধইচছে কতক্ষণ ধরি ধরি.ঐ বড় পাথরটার পুরো শরীর একটা পাখির। উড়ে গেলে ঐ জায়গাটা ফাঁকা পড়ে থাকবে।
পাখিটা এখন সোজাসুজি বাঘারুর এই পাথরটার দিকে তাকিয়ে। তাই ওর ঠোঁট-মাথা ঝুঁটির আভাস আর আলাদা-আলাদা চেনা যায় না। পাখিটার পাথরটা থেকে বাঘারুর পাথরের মাথাটা সম্পূর্ণ দেখা যাবে না। তা হলে পাখিটা বাঘারুকে দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু পাথরটাকে দেখছে। এখন হঠাৎ উড়াল দিয়ে এই পাথরটাতে এসে যেতে পারে। বাঘারু স্থির হয়ে থাকে, নড়ে না। থুতনির নীচে তার হাত দুটো। কনুই পর্যন্ত দুই দিকে সমানভাবে ছড়ানো। বাঘারু ধীরে-ধীরে তার শ্বাসপ্রশ্বসটাও কমিয়ে আনে। আর সেই স্থিরতার অপেক্ষা করে, শরীরটাকে কেমন এগিয়ে, গলাটাকে বাড়িয়ে, পাখা দুটো ছড়িয়ে, মাঝখানের এই ফাঁকটুকু ভরে, পাখিটা ঐ পাথর থেকে এই পাথরের মাথায় কোনাকুনি উড়ে এসে বসবে। বাঘারু তার সেই পুরো ওড়াটুকু দেখতে পাবে–এই প্রথম। পাখার ছড়ান দেখে বুঝতে পারবে কত লম্বা, ঠোঁটের চোখ দেখে বুঝতে পারবে পাতলা না মোটা। আর যদি এই পাথরের ওপর বাঘারুর চোখের সামনে এসে বসে–ঘুরে-ঘুরে দাঁড়ায়! বাঘারু পাথরের মত স্থির থেকে যেন, পাথরের চোখ দিয়ে পাখিটাকে সম্পূর্ণ দেখে নিতে পারবে। সেই দেখে নেয়া শেষ হওয়ার পরও যদি পাখিটা বাঘারুর চোখের সামনেই বসে থাকে, তা হলে, বাঘারু খুব নিচু গলায় সেই ডাকটা ধীরে-ধীরে ডাকি উঠিবে। দেখিবার পাবে, তার ডাক শুনি পাখিটা কী করি, ক্যানং করি চুপ করি থাকে, কোন দিকে তাকায়, ঘাড়টা ক্যানং হেলায়। বাঘারু বুঝতে পারে, গুরগুর একটা ডাক তার গলার ভেতরে উঠে শরীরের আরো ভেতরে চলে যাচ্ছে। প্রায় দম আটকে বাঘারু ভাবে–ভোখাটা এখন ভুখে না ওঠে। কোথায় আছে, কে জানে। যদি বাঘারুর পায়ের দিকে নীচের পাথরে থাকে, ডাকবে না। কিন্তু যদি এমন জায়গায় থাকে, যে, পাখিটাকে দেখা যায়?
পাখিটা হঠাৎ উড়ল, কিন্তু সোজা একেবারে আকাশে, যেন কেউ ওটাকে দড়ি বেঁধে টেনে তুলল, প্রায় বাঘারুর সমান উঁচুতে এখন। বাঘারু উপুড় বলে দেখতে পায় না এদিকে আসছে কি না। তার পরই বাতাসে ঝাঁপট তুলে নদীর ওপারটা ধরে বনের সেই ভেতর দিকে চলে যায়–বাঘারুর চোখের সামনে ওর উড়াল শরীরটা পেছনের বনের সঙ্গে মিশে যায়। বাঘারু নড়ে না। আবার ফিরে আসবে। ভাবতে-ভাবতেই আবার নদী ধরেই ফিরে এল। এবার যেন জলে ঝাঁপ দিয়ে, আবার উঠে, বাঘারুর বায়ের ফরেস্টের দিকে উড়ে, মিশে, আবার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে, বাঘারুর পাথরটার ওপর দিয়ে, ঘুরে, নেমে গেল। শালো। পাথরের বনত দোসর খুঁজিবার ধইচছিস? মানষিক দেখিবার পারিস না?
.
বাঘারু এতক্ষণ যেন জেগেও জাগে নি, এখন জাগছে। পাখিটার জন্যে শরীরটাকে এতক্ষণ স্থির করে রাখায় টান ধরেছিল, চিত হয়েপড়ে দুই হাত দুই পা পাথরময় ছড়িয়ে, তার পর দুটো হাত মুঠো পাকিয়ে মাথার পেছনে ছুঁড়ে, ঘাড়টা একটু মুচড়ে, বুকটা পাথর থেকে তুলে, বাঘারু অনেকক্ষণ ধরে আড়মুড়ি ভাঙে। সেই আড়মুড়ি ভাঙার গড়াগড়িতে শরীরটা শিথিল হয়ে যায়। বাঘারু ডান পা-টা টেনে তুলে আনে। বা-হাতটা ছড়িয়ে দেয়। বা ঘাড়টা কাত হয়ে থাকে। পাখিটা যেন বাঘারুর শেষতম ঘুমের ভেতর এসেছিল ও চলে গেছে। বাঘারু নতুন করে দেখে, আকাশে একটাও তারা নেই। বাঘারু নতুন করে ডেকে ওঠে, ভোখা।
বাঘারু না দেখেও বোঝে, ভোখা উঠে এসেছে, এখন তার পায়ের কাছে। ভাবতে-ভাবতেই ডান পায়ের আঙুলে লোখার ঠোঁটের ছোঁয়া পায়। পা-টা ছুঁড়ে বাতাসে লোখাকে খোঁজে। সেটা বুঝেই লোখা একটু এগিয়ে আসে। আর লোখার পিঠে বাঘারু তার বা পা-টা রাখে। সেটা নিয়ে একটু দাঁড়িয়ে লোখা বসে পড়ে। বাঘারুর পায়ের কাছে আবার কুণ্ডলী পাকিয়ে যায়। বাঘারু বহু ওপরের আকাশের দিকে তাকিয়ে খুক করে হাসে, শালো আলসিয়া।
রাত্রির শেষ আর ভোরের শুরুর মাঝখানের এই সময়টাতে সব চেয়ে বেশি অন্ধকার। চাঁদ আর তারার আলো আকাশে থাকে না। ভোরের আলো ফোটে না। ফরেস্টের বড় বড় গাছের মাথা আকাশে, ঝোপঝাড় মাটিতে লেপে যায়। ছায়ামূর্তিগুলোও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে না। অ্যালায়ও ছায়া জাগো নাই। ভোখার পিঠের ওপরে বাঁ পা-টা বাঘারু নাড়ায়–শালো, আলসিয়া। ভুখিবারও চাহে না–নিদ যাবার চাহে। এ ঘুমা। ঘুমা কেনে। শালো নিদুয়া কুত্তা, ঘুমা।
বাঘারু পা-টা টেনে নিয়ে উঠে বসে। দুই হাতে হাঁটু জড়িয়ে বসলে সে দেখে পাখিটা দুটো পালক খসিয়ে গেছে। হাত বাড়িয়ে পালক দুটো ধরতে বা পা-টা তার পড়ে যায়। এখন সে তার ডান হাঁটুর ওপর ডান হাতটা রেখে, বা হাতে পালক দুটো ধরে বা পায়ের ওপর রাখে। মনে রাখা, ভুলে যাওয়া, মনে করা, ভুলে থাকা–এইসব মানসিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়ায় ত বাঘারু খুব অভ্যস্ত নয়। পাখির সেই অনতিক্রম্য প্রমাণের দিকে তাকিয়ে শুধু সে মনে করতে পারে কালিও ফেলি গেইছে দুখান, তার আগের দিন সনঝাত আরো একখান ফেলি গেইছে। বাঘারু সেই পালক হাতে, এবার নদীর দিকে তাকায়। ঠিক নদীর দিকে নয়, তার বাথানের দিকে, বা বাথানসহ নদীর দিকে। আর, এই তাকানোর সঙ্গে-সঙ্গে তার কানে আসে জলের ছুটে যাওয়ার আওয়াজ আর জলের ভেতরে নুড়ি-পাথরের টুঙটাঙ। ঠিক এই সময়টাতে এই আওয়াজ ওঠে। রাত্রিতে বনের নানা আওয়াজ কানে আসে না। দিনের বেলাও তাই। রাত আর দিনের মাঝখানে এই সময়টাতে জলস্রোতের তলায় নুড়ি-পাথরের ধ্বনি কিছুক্ষণ ধরে বাজতে থাকে। এই ধ্বনি অনেক সময় ঘুম ভেঙেই কানে আসে। আর কানে এলেই বাঘারু বোঝে সকাল হতে শুরু করেছে।
আওয়াজগুলো একে-একে শুনে নিয়ে বাঘারু এবার নদী থেকে চোখ সরিয়ে তাকায় তার মোষগুলোর দিকে। এই পাথরটাকে এই জন্যেই বেছেছে বাঘারু। সব চেয়ে উঁচু পাথরটার তিন পাশে মোষগুলো ছড়িয়ে থাকে বালি আর পাথরের ওপর। তাকালেই প্রায় সবটা দেখা যায়। বৃষ্টিবাদলা মা থাকলে বাঘারু এই পাথরটাতেই শোয়। বৃষ্টিবাদলার জন্যে সামনের জঙ্গলের ভেতরে একটা গাম্ভারি গাছের সব চেয়ে তলার ডালটার ফেঁকড়িতে বাঁশ কঞ্চি-কাঠের টুকরো-টাকরা দিয়ে মাচান বানিয়েছে আর তার ওপরে সেই তরিকা পাতাগুলো বেঁধে-বেঁধে, ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে, জোড়া লাগিয়ে একটা ছাউনি বানিয়েছে। গাছটার ঠাসা পাতার ভেতরে তরিকা পাতার ঐ ছাউনির নীচে হাত-পা গুটিয়ে বাঘারু ঘুমোতেও পারে।
মোঘগুলোর দিকে তাকাতেই কানে আসে রোমন্থনের সমবেত আওয়াজ। এই আওয়াজটাও সারারাত ধরে বাড়তে থাকে বটে কিন্তু ফরেস্টের অন্য সব আওয়াজ থেমে না গেলে শোনা যায় না আর যদি শোনা যায় তাহলে মনে হয় জঙ্গলের ভেতরে কোনো একটি জায়গাতে যেন কোনো মাটির গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতগুলো মোষের এই নিজের গলার ঘাস, মুখ না খুলে, নিজেই চিবুনোর আওয়াজের এমনই একটা শরীর আছে যা ফরেস্টের ভেতর মিশে থাকে, ঝিঁঝির আওয়াজের মত। যতক্ষণ বাথান বেঁধে বনের মধ্যে ঘুরে বেড়ায় ততক্ষণ এই বাথান ফরেস্ট থেকে আলাদা; যখনই বনের সীমার বাইরে এই চরে রাত ভোর করে তখনই ফরেস্টের সঙ্গে মিশে যায়।
বাথানটাকেই আর-একটু ভাল করে দেখতে বাঘারু উঠে দাঁড়ায়। মনে হয়, পাথরটা আরো খানিকটা লম্বা হয়ে গেল। বাঘারু যে ছায়ামূর্তি হয়ে উঠতে পারে, তার কারণ বাঘারুকে ঘিরে আকাশ ও অবকাশ ছাড়া আর-কিছু ছিল না।
এই বনে সারাদিন সারারাত ধরে আলোকপাত বদলায়, ছায়াপাত বদলায়। পাথরের, গাছের, কখনো বা মানুষের মাথা–যা কিছু আকাশ ছুঁড়ে ওঠে তারই আকার বদলায়। আকাশরেখার এমন বিরতিহীন বদলেই শুধু সময়ের প্রবাহ বোঝা যায়।, বাঘারু দেখে, বাথান ঠিকই আছে। ভোখা ডাকে নি মানেই, ঠিক আছে। তোখা ঘুমোচ্ছে মানেই, সব ঠিক আছে। বাঘারু ভোখর সামনে গিয়ে ভোখার নরম পেটে তার পায়ের আঙুলগুলো ঢুকিয়ে রোমগুলো একটু নাড়িয়ে দেয়, আদরে, শালো, আলসিয়া, নিদুয়া। লোখা একটুও আওয়াজ না-করে সেই পা-টা জড়িয়ে ধরে আরো কুণ্ডলী পাকিয়ে যায়। কাদায় পা গাড়লে যেমন করে পা তুলতে হয়, সেরকম টানতে গিয়ে বাঘারু হেসে ফেলে, তোখা ছাড়ছে না।ছাড়ি দে, নামিম। বাঘারু টের পায়, লোখার পেটের নরম রোমগুলো তার পায়ের পাতায় নরম লাগে আর গোড়ালির কাছে ভোখার নখ।
পা-টা টেনে বের করে, পাখির পালক ধরা হাতটা মাথার ওপর তুলে, বাঘারু, পাথরের মাথা থেকে লাফিয়ে তার নীচের পাথরে নামে। সেখানে ঘুরে দাঁড়িয়ে আরো নীচের পাথরে। আকাশে বাঘারুর ছায়ামূর্তিটা ধীরে-ধীরে ফরেস্টের অন্ধকারের ভেতরে ডুবে-ডুবে যায়। সব চেয়ে শেষে ডোবে তার হাতের পাখির পালক। বাঘারুর রাত শেষ হল। বাথান এখনো জাগে নি। ফরেস্টের ভেতরে অন্ধকার এখনই সব চেয়ে ঘন।
সবচেয়ে নীচের পাথরটাতে পা দিয়ে একটা ছোট্ট লাফে বাঘারু নদীর বুকে নামে। এতক্ষণ পাথরের মাথায় যে-প্রকৃতির ভেতর বাঘারু ছিল, তা সম্পূর্ণ বদলে যায়। এখন সামনে ফেনার রাশি, নদীব কল্লোল চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
যে-পাথরটার ওপর থেকে বাঘারু নেমে আসে তার তলায় প্রায় পর-পর একটার পর একটা বড় পাথর। টিলার মত পাথটার সঙ্গে খাজে একটা কেমন আশ্রয়ের মত হয়েছে। বাঘারু সেই খাজটার ভেতর ঢুকে, নিচু হয়ে, আর-এক পাথরের সংযোগের মাঝখানের অবকাশটাতে পাখির পালক দুটো রাখে। ওখানে আরো তিনটি পালক আছে। আর, আছে, বাঘারুর সেই পরনামিয়া পাথর।
এই বার বাঘারু নেমে পড়ে নদীর বুকে, পাথর আর বালির ওপরে, তার বাথানের মাঝখানে। মোঘগুলোর পেছন, পেট, মুখ, শিঙ ছুঁয়ে ছুঁয়ে, এঁকেবেঁকে পথ করে নিতে-নিতে, বাঘারু জলের দিকে যায়। মোষগুলো ফোঁস-ফোঁস শ্বাস ছেড়ে বাঘারুকে জানান দেয়, চিনেছে। ঘাড়গুলো দিক বদলায়, কান আর লেজের ঝাঁপট পড়ে গায়ে পট-পট। পাথরের তলা থেকে জলের কিনারা পর্যন্ত আওয়াজে-আওয়াজে মোষগুলোর জানা হয়ে যায়-বাঘারু উঠেছে। রাতে ফেলা গোবরে বাঘারুর দুই পা ভর্তি। নাড়া-খাওয়া গোবরের গন্ধ শেষ রাতের ভারী বাতাসে লেগে যায় কিন্তু ছড়ায় না, বাঘারুর পায়ে তার সঙ্গে ভেজা বালি। মোষের গা থেকে কিছু হাতে লেপটে যায়। ডায়নার জলের কিনারায় চলে এসে বাঘারু একটু দাঁড়ায়।
জল থাকলেই সে-জায়গাটা একটু পরিষ্কার লাগে। জলে আলো খেলবেই। আর, ডায়নার ফেনা-ওঠা জল ত নিজেই আলো ছড়ায় একরকম। বাঘারু তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখে। আরো নীচের তিস্তাপারের মানুষ সে। ওপরের এমন নদী রোজ দেখা ত তার অভ্যেস নেই। তাই ভুলে-ভুলে যায়। তিস্তা ত ফরেস্টের মত, বা একটা বড় ডাঙার মত, বা একটা আকাশের মত।–সেটা ত ঐঠে থাকি যায়, দেখো কি না দেখো। সেখানে ত অভ্যেস হওয়ার কিছু নেই-তুমিই ত সেই নদীর ভেতর আছো; জানো কি না-জানো। কিন্তু জলে ফেনা তুলে এরকম আওয়াজে ডায়নার ছুটে চলাটা এমনই, মনে হয়, যখন আমি দেখব না, তখন এই দৃশ্যটাও থাকবে না। সকাল হওয়ার আগে, রোজই, বাঘারুকে এমন একটু সময় দিতে হয় ডায়নাকে অভ্যেস করে নিতে, ডায়নার সেই চুটন্ত ফেনরাশির দিকে তাকিয়ে বুঝে নিতে যে ডায়না সারা রাত ধরে এমনই রয়েছে।
বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ঐ কল্লোল ও স্রোত বাঘারুর ধাতস্থ হয়। বাঘারু একটু হাসে–ক্যানং নদীখান, ডাইনাং? ডুবিবার চাহিলে ডুবিবার পারো না, কিন্তু জল চলিবার ধইচছে দিন-আতি, আতি-দিন।
বাঘারু নদীতে নামে। পায়ের গোড়ালি ছাপিয়ে জল ওঠে। স্রোত পা বেয়েও খানিকটা উঠতে চায়! বাঘারু পা-টা জলে ফেলেই স্রোতের টান বুঝতে পারে। বাঘারুর পা-টা পেয়েই স্রোতটা একটু সঙ্কুল হয়ে ওঠে, আওয়াজ একটু বলদায়। জলের সারা রাতের উষ্ণতা বাঘারুর পা বেয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়। বাঘারু পা ফেলে। পায়ে লেগে নুড়িগুলো ছিটকে যায়। নদীর মাঝামাঝি একটা চওড়া পাথরের ওপর বাঘারু দাঁড়ায়।
রোজ এই পাথরটাতেই দাঁড়ায় বাঘারু। তার পথ পাথরটাতেই ঘুরে-ঘুরে মুখটা ডায়নার মুখের দিকে ঘোরায়। পাহাড় আর জঙ্গলের ভেতর থেকে বেরিয়ে ঠিক যে-জায়য়াটায় ডায়না প্রায় সমকোণে বায়ে ঘুরেছে, পাথরটা ঠিক সেই জায়গায়। স্রোতের উল্টোমুখে দাঁড়ানো বাঘারুর বায়ে এখন সেই ছুঁচলো পাথর, যার ওপর পাখিটা বসেছিল আর ডাইনে, খানিকটা দূরে বাঘারুর পাথর।
জলের ভেতরের এই পাথরটা খুব স্থির নয়। নুড়িপাথরের ওপর আছে–স্রোতের ধাক্কায় সব সময়ই নড়ছে। বাঘারুর মত ওজন নিয়েই নড়ছে। অথচ এতগুলো দিন গেল, রোজ বাঘারু এই পাথরটার ওপর এসে দাঁড়িয়েছে। এর ভেতর একদিন একটা বড় বান গেল ঠিক প্রথম রাত্রিতে। বাঘারু পাথরটিলায় ছিল। মোষগুলোর প্রায় হাঁটু পর্যন্ত জল উঠেছিল। জলস্রোত এসে ঘা মারছিল পাথরটিলার তলাতেও। কিন্তু তবু সকালে এই পাথরটা এখানেই ছিল। স্রোতের অমন ধাক্কাতেও নড়ে নি।
তার দুটো বিশাল পায়েই ভরে যাওয়া পাথরটুকুর ওপর বাঘারুর দাঁড়ানোটা ত খাড়া, সোজা, কোনো নড়নচড়ন নেই। এইখান থেকেই বাঘারু ডায়নার বেশ খানিকটা একসঙ্গে দেখতে পায়। বাঘারু দেখে, যা রোজ দেখে, কিন্তু প্রতিদিনই যেন সে প্রথম দেখছে এতটাই নতুন সে দৃশ্য তার অভিজ্ঞতায়।
–আন্ধিয়ার দ্যাওয়াত চরক খেলিবার নখান ছুটি আসিছে ডাইনাং ঝোরাখান, শাদা, ফটফটা– অন্ধকার আকাশে বিদ্যুচ্চমকের মত-উদ্ভাসিত শাদা ফেনার একটি চলরেখায় ডায়না ছুটে নামছে। মাটির সঙ্গে জলের যে-ঘর্ষণে জলকল্লোল উঠছিল মনে হয়, তার পেছনে স্রোতের এমনই প্রবল ধাক্কা আছে বোঝা যায় ডায়নার এই প্রপাতের মত নিষ্প্রমণ দেখলে। পাখিখান এই স্রোতের ওপর দিয়া ওর ঘরত যায় আর ডাকো দেয়। ডাকিবু? এ্যালায়? বাঘারু ডায়নাকেই দেখে। ডায়না ত বাঘারুর নদী নয়। কিন্তু প্রতিদিন এই একটি সময় ডায়নার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আরো খানিকটা দেখে নিতে নিতে বাঘারু যেন কোথায় একটা টান বোধ করতেও পারে; সামনের ঐ জঙ্গল-পাহাড় আর খাড়াপথ বাঘারুকে যেন আশ্রয় দিতেও পারে।
তার পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে বাঘারু জলের ওপর ঝুঁকে পড়ে। সেই ফেনরাশিতে দুই হাত ডুবিয়ে দেয়। হাতে ছিটকে জল বাঘারুর চোখে-মুখে বুকে লাগে।
.
নদী ধরেই বাঘারু একটু ওপর দিকে ওঠে। তার পর নদী ছেড়ে উঠে যায়। সে এখন এক সীমা থেকে মোষগুলোকে একবার দেখে নেবে। শুধু দেখেই না। একটু সাজিয়ে নিতে হবে পুরো বাথানটাকে দুধিয়ালগুলোকে নিয়ে যেতে হবে বাঘারুর পাথরটার পশ্চিমে, রাস্তার দিকে অনেকখানি তুলে। দুধে গাড়ি এসে যাওয়ার পর, না হলে, না লাগে। মোষগুলোরও এটা অনেকখানি জানাই। তার এখানে বাঘারুর চেয়ে পুরনো। বাঘারুকেই নতুন করে জানতে হয়েছে। এখন একটু-আধটু ধাক্কা খেলেই মোষগুলো বোঝে কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে। সারাদিন বনেজঙ্গলে চরার পর বিকেলের দিকে বাথান যখন ফেরে তখন যে যেখানে ইচ্ছে দাঁড়ায়, কিংবা বসে। এখন এই সকালে তাদের লাইনবাঁধা শুরু করতে হয়। একবার পাম্প লাগানো শুরু হয়ে গেলে আর খেজাপাতি করা যায় না। এই জায়গাটা খুব ছড়ানো নয় বলে গায়ে গা লাগিয়ে মোষগুলো এক জায়গাতেই থাকে, বাঘারুর পাথরটাকে তিন দিক থেকে ঘিরে। জায়গাটুকুতে জঙ্গল নেই, শুধুই বালি ও পাথর, আর রাস্তার দিকের খানিকটা ঘাস। মোষগুলো বেশি ছড়াতে পারে না।
কিন্তু, তারই ফলে গায়ে গা লাগিয়ে এমন ভাবে থাকে যে ভেতর দিয়ে ঢোকার রাস্তা পাওয়া যায় না। আর বসার এই এক অদ্ভুত অভ্যেস মোষদের যে দুটো মোষ দুদিকে মুখ করে এমন ভাবে এ ওর গায়ে ঢলে থাকে যেন মনে হয় ওদের একটাই শরীর। শুধু বিপরীত মুখেই যে তা হবে, তা নয়, এক দিকেই মুখ করে এমন কোনাকুনি শরীর আর গলা রাখে যে হয় ডিঙিয়ে পেরতে হয়, না হয় ঘুরে যেতে হয়।
সারা রাত ধরে মোষগুলো যে যার ভঙ্গিতে প্রায় স্থির হয়ে থাকে বলেই কি বাঘারু এই বাথানজোড়া মোষের মূর্তিগুলোই দেখতে পায়, যেন, এগুলো মোষ নয়-পাথর। নাকি, সকালের আলো এখনো ফোটে নি বলে মোষগুলোর শুধু ছায়া আছে এখন। পুরো শরীর নেই, শরীরের আভাসটা একেবারে খোদাই হয়ে আছে। তাই তাদের পুরো শরীরের বাইরের রেখা এমন প্রখর হয়ে থাকে।
বাথানের পেছন দিকটাতে পৌঁছতে বাঘারুকে জলের কিনারা দিয়ে, তার পর কিনারা ছেড়ে, ক্রমেই ওপরে উঠতে হয়। মোষগুলোকে একসঙ্গে দেখায় যেন একটা অসমতল পাথুরে ডাঙা। তাতে কোনো-কোনো জায়গায় দুটো-একটার শিং জেগে আছে মাত্র। মাঝখানে, একটা মোষ দাঁড়িয়ে, তার গলাটা আকাশে অনেকখানি বাড়িয়ে কোনো উঁচু গাছের ডালে মুখ দিতে চায় এমন ভঙ্গিতে। শিং দুটো পেছনে হেলে শরীরের সঙ্গে মিশে গেছে, শুধু জেগে আছে তার হাঁ মুখটা মনে হয়, পিঠটাই এগিয়ে হা হয়ে আসে। বাঘারু চেনে–বুড়িয়ালি। শালো বুড়ি হচ্ছে, ঘুম কমি গেইছে। বাঘারু চলতে-চলতে জিভ দিয়ে টাকরায় একটা আওয়াজ তোলে–টট টর রর, টট টর রর।
চলতে-চলতেই আওয়াজ তুলে চলতে-চলতেই তাকায় বলে বাঘারু বুঝতে পারে না, তার ডাকে বুড়িয়াল সাড়া দিল কি না। এখন আরো সরে এসে সে ত বুড়িয়ালের ঐ লম্বা গলার ও মুখের আর-একটা চেহারা পায়। বাঘারু বুড়িয়ালকে একটু ব্যস্ত করতেই যেন, আবার আওয়াজ তোলে, টট টর রর, টট ট র র টরর। তার পর লাফিয়ে একটা মোষের পিঠ টপকে, আর-একটা মোষের পিঠে হাতের ভর দিয়ে একটু পাক খেয়ে সে বাথানের শেষ মোষটার কাছে গিয়ে পৌঁছয়। এইবার বাঘারু পুরো বাথানটাকে জাগাবে। কিন্তু তার আগেই মাঝখান থেকে বুড়িয়াল তার গলাটা আরো বাড়াতে থাকে, যেন ডালটা তার মুখের নাগালে আসছে না। আর তার পরই আঁ-আঁ আঁ করে ওর পুরনো ঘষা গলায় এক হকার তোলে। বাঘারুকে, আওয়াজ শুনে, খুঁজছে। না পেয়ে ডাকছে।
বুড়িয়ালের হাঁক শুনেই ঐ পাথরের মত মোষের মাথাগুলো একটু-একটু ঘোরে, খাড়া হয়। আর তখনই বাঘারু হাঁক দেয়, হে-ই, উঠ, উঠ, উঠ, হেট, উঠ। বাঘারু শেষ মোষটার পেছনে হাঁটু দিয়ে একটা গুতো মারে, হেই, উঠ, উঠ, হেট, উঠ, তার পর মোষটার ঘাড়ে আর পিঠে জোরে-জোরে চড় মারে, হেট, উঠ। বুড়িয়াল সেই মাঝখান থেকে ততক্ষণে মুখ ঘুরিয়েছে বাঘারুর দিকে। গলাটা তার বাড়ানোই থাকে। বাঘারুর হাঁক শুনে নিয়ে আবার একটা ডাক দেয়, আ আঁ–আ-গ। এবারের ডাকটা আর তত লম্বা নয়। বুড়িয়ালি জেনে গেছে, বাঘারু কোথায়। বাঘারু চেঁচায়, খাড়া গে খাড়া, যাছি, খাড়া। তার পর আবার বসা মোষটাকে পেছনে একটা খোঁচা দেয়–হেঁট হেঁট, উঠ, উঠ, টররর-অ, টররর-অ! এতক্ষণে মোষটা তার পেছনের পা দুটো নাড়াতে শুরু করে। বাঘারু তার কানের পিছে জোরে-জোরে দুটো চড় মারে। মোষটা পেছনের পা দুটো সোজা করতেই কানের ঝাঁপটা মারে বাঘারুর হাতে, বুঝে নিতে যে বাঘারুই, বা সাড়া দিতে। তার পর লেজের ঝাঁপটা মারে পিঠে। মোষটার পেছনটা উঁচু হতে থাকে। পেছনের পা দুটো মাঝামাঝি উঠতেই সামনের পা দুটো ঝট করে তুলে মোষটা খাড়া হয়ে যায়। মোটা মাটি থেকে একটু উঠতেই তলা থেকে পেচ্ছাব আর গোবরের গন্ধ উঠে আসতে থাকে। কিছু যেন ধোয়াও। আর গা থেকে বালি আর নুড়ি-পাথর খসে পড়ে।
মোযটার মুখটা এখন বাঘারুর দিকে ফেরানো। বাঘারু তার গলাটা ধরে ঘোরাতে থাকে। একটু ঘোরাতেই মোযটা নিজেই ঘুরতে শুরু করে। এই মোষটার গায়ে গা লাগিয়ে যেটা ছিল, সেটাও, এর মধ্যে বসে থেকেই গলাটা সোজা করেছে। বাঘারু আগের মোষটার গলার তলা দিয়ে ঐ মোষটার কাছে এসে হাঁটু দিয়ে একটা অঁতো মারে, উঠ, উঠ, আর তার পরের মোষটার পিঠে একটা চড় মারে। সঙ্গে সঙ্গে ঐ মোষ দুটো উঠতে শুরু করে। এবার এই মোষটাই চলতে-চলতে অন্য মোষদের উঠিয়ে দেবে।
ইতিমধ্যে পরের দুটো মোষই উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রথম মোষটার পেছন-পেছন সে দুটোও চলতে শুরু করে। বাঘারু তার ডাইনেয়ে এই মোষের লেজ মুড়িয়ে, ঐ মোষকে হাঁটু দিয়ে গুতিয়ে, আর-একটাকে পিঠে চড় মেরে, হেই, উঠ, উঠ, টরর-অ, টর-র-র-অ আওয়াজ দিতে-দিতে এগিয়ে যায়। একটা মোষ যখন উঠছে, তখন পুরো বাথানটাই এখন দাঁড়িয়ে পড়বে। আর পেছনের মোষটা যখন চলতে শুরু করেছে, সেই চলার ধাক্কাতেই সামনের মোষগুলোও চলবে। কিন্তু তার আগে বাঘারু আগে গিয়ে দাঁড়াবে। তার পর দুধিয়ালগুলোকে আগে ছাড়বে, প্রায় লাইন বেঁধে।
এগতে-এগতে বাঘারু বুড়িয়ালের কাছে এসে পড়ে। সামনে দাঁড়িয়ে তার দুই শিঙের মাঝখানে একটু চুলকে দেয়। এমনকি বাঘারুর অতবড় থাবাও মোষটার কপালে কেমন ছোট দেখায়। বাঘারুর স্পর্শ পেয়ে মোটা তার গলাটা বাড়িয়ে দেয়, বাঘারুর কাঁধের ওপর তার গলাটা রাখে। নিজের মাথার পাশে মোষের মাথাটা নিয়ে বাঘারু দুই হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে আর আস্তে-আস্তে কানের পাশে গলকম্বলের নীচে দুই হাত দিয়ে মোষটাকে আরাম দিতে থাকে। বাঘারু শুনতে পায় বুড়িয়ালের গলার ভেতর থেকে একটা গুর, গুরু গুর আওয়াজ উঠে আসছে, খাড়া কেনে, খাড়া, এ্যালায় ত সাকালখান হই। বাঘারু আবার তার কানের পিছে হাত লাগিয়ে সুড়সুড়ি দেয়।
পেছনের মোষরা বাঘারু আর বুড়িয়ালকে মাঝখানে রেখে দু-পাশ দিয়ে এগতে শুরু করেছে। বুড়িয়ালের গলায় সুড়সুড়ি দিতে-দিতেই বাঘারু দেখে, সেই ভর পোয়াতি মোষটাও দুলতে-দুলতে চলেছে–আজি হবে কি কালি হবে। বাথান প্রায় পুরোটাই জেগে উঠেছে। এবার চলতে শুরু করবে। বুড়িয়াল যাবে না। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবে। বাঘারুকে এবার সামনে গিয়ে পঁড়াতে হয়। বাঘারু বুড়িয়ালের ঘাড়ে দুটো চড় মেরে, র কেনে র, আসিছু বলে খুব ধীরে চলমান মোষের দলের পেছন থেকে তাড়াতাড়ি সামনে এগিয়ে চলে।
কিন্তু এগিয়ে চলতে-চলতেই বাঘারু এক-একটা মোষকে গলা ধাক্কিয়ে সরিয়ে পেছনের কোনো মোষকে জায়গা করে দেয়। সেটা ফাঁকের ভেতর ঢুকে গেলে আগের মোষটাকে ছেড়ে দেয়। দুধিয়ালগুলোকে দরকার এখন। বাকিগুলো এখানেই থাক। মাঝখানে একটা বাছুর বড়বড় মোষের ভেতরে যেন পথ হারিয়ে ফেলেছে। বাঘারু সেটার লেজ তুলে এমন মলে দেয় যে, পেছনের দুই পা তুলে এক লাফ মেরে দৌড়তে শুরু করে। আর আগের দলটা যেন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। বাঘারু হেসে উঠে তালি দিয়ে বলে, চল কেনে, টররর।
.
বাঘারু এখন ডায়না ব্রিজের ওপরে–রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। দুটো মোষও ব্রিজটার ওপরে উঠে এসেছে। ঠিক মাঝখানে, শিং উঁচু করে বাঘারুর মতই পুব দিকে সোজা তাকিয়ে। ওদিকে বিন্নাগুড়ি। ঐদিক থেকেই দুধের গাড়ি আসবে। আসার সময় প্রায় হয়ে এসেছে। সময়ের খুব একটা হেরফের হয় না।
এখন বাঘারুর কোনো কাজ নেই, গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া। সুতরাং তার গান আসতে পারে। বাঘারুর গানও পূর্বনির্ধারিত। সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের মত ব্যস্ততাহীন নিয়মে বাধা তার কাজের ভেতরে এই গান যোগসূত্র হিশেবে তৈরিই থাকে। এক কাজ থেকে আর-এক কাজের ভেতর বাঘারুর এত বিচ্ছিন্নতা কখনোই ঘটে না যা গান দিয়ে জুড়ে দেয়া যায় না। যেমন বাঘারুর শরীর কাজ থেকে কাজে, নদী বা গাছের মতই চলে যায়, তেমনি সেই যাওয়ার ভেতরই গানটাও অবধারিত এসে যায়। কাজে কাজে অবিচ্ছিন্নতার সেই গানে এত বিরহ আসে কোথা থেকে?
বাথান বাথান করিসেন মইষাল রে-এ-এ
(অ তোর) বাথান করিলেন ঘর।
বাথান হইলেন আউলা ঝাউলা রে-এ-এ
(অ তোর) বাথান ভরা গোবর।
অ মোর মইষাল বন্ধু রে-এ-এ
বাঘারুর সুর টান করে রাখে। বাঘারু নিজেই মইষাল, নিজেই তার বিরহিণী নায়িকার গান গায়–এখন দুধের গাড়ির জন্যে ডায়না ব্রিজের ওপর অপেক্ষার সামান্য. সময়টুকুর সকালে। হাঁটা বা কথা শেখার মত করে এইসব, গান,জানা হয়ে গেছে–এমন সময়ে গাওয়ার জন্যে। মইষালনির এই বিরহ বাঘারুর, বাঘারুই মইষালনি। বিরহ তার, মইষাল বাঘারুর জন্যেই। বাথান বাঘারুর জানা, মোষও বাঘারুর জানা; মইষাল ত বাঘারু নিজেই। এতগুলো জানা দিয়ে আর মইষালনি-হওয়ার–জানাটুকু পেরতে কী লাগে। বাঘারু তখন নাবাজানো দোতারার ঝোঁকে-ঝোঁকে গাইছে
বাথানে বাবোশ মইষ
ও মোর মইষাল এ্যাকেলা ঘুরেন,
ঘর মোর এই যৈবনখান্
কাপড়ে বান্ধি রাখেন।
অ-মোর মইষাল বন্ধু রে-এ-এ
বাঘারু নিজেই নিজের বিরহিণী।
বাঘারুর গানের উত্তরে, নীচে, চর থেকে লোখা জোরে-জোরে ডেকে ওঠে। বাঘারু গান থামিয়ে হেসে ফেলে বলে ওঠে, শালো। বাঘারু চুপ করে গেলে তোখা আরো জোরে ডেকে নীচে থেকে ছুটে ওপরে উঠে এসে ব্রিজটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে পড়ে সেই ট্রাকের রাস্তার দিকে তাকায়।
ভোখার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতেই সন্দেহ হয়েছিল। বাঘারু থেমে কান খাড়া করে-বহুদূর থেকে ট্রাকের শব্দটা পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম দিকে বাঘারু টের পেত না। কিন্তু এখন ত এই ফরেস্টের আওয়াজগুলো চেনা হয়ে গেছে। কোনটা ফরেস্টের ভেতরের আওয়াজ আর কোনটা বাইরের সেসব এখন একবারেই ধরতে পারে। তার বা-পাশে হৃদয়পুর বস্তি। তার ওপরের, ফরেস্টের ওপার থেকে ট্রাক আসার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। আর-কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে।
আওয়াজটা বাঘারুর যত চেনা, ভোখার তার চাইতে কম ত নয়ই, একটু যেন বেশিই। তাই ভোখাই আগে শুনতে পেয়ে ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু মোষগুলোরও বোধহয় চেনা। সামনের মোষদুটো মাথাটা কেমন বাতাসে তুলেছে, যেন গন্ধ শুঁকছে, ওদের গলকম্বলটা টানটান হয়ে ওঠে।
বাঘারু তখনো দাঁড়ায় না। এখনো দেরি আছে। ট্রাকটা এখান থেকে মাইল কয়েক দূরে এই রাস্তার ওপর উঠে এই দিকে বেঁকবে। একটু আগে আওয়াজটা পাওয়া গিয়েছিল কারণ, ওদিকের রাস্তার একটা জায়গা এই কোনাকুনি–হৃদয়পুর বস্তি, একটা ছোট জলা ও ঐ দিকের পাতলা জঙ্গলটা পেরিয়ে–সোজা। আওয়াজ আসার পথে কোনো বাধা নেই। কিন্তু তার পরই আওয়াজটা বন্ধ হয়ে গেছে। এর পর আবার আওয়াজ শোনা যাবে, ট্রাকটা যখন এই রাস্তায় উঠবে। তখন অবিশ্যি আওয়াজটা ক্রমেই বাড়ে। প্রতিধ্বনিও হয় চার পাশ থেকে। যে-ভূগোল বাঘারুর দেখা নেই, আওয়াজ শুনেই সে সেটা ছকে নিতে পেরেছে।
সেই আওয়াজের পেছন-পেছন ট্রাকটা এসে প্রায় এই ব্রিজটার ওপর পৌঁছয়। ট্রাকটার থামা, দাঁড়ানো ইত্যাদি লোখা ও মোষগুলোর এত বেশি জানা যে ট্রাকটা অত জোরে আসছে দেখেও ওরা ব্রিজ থেকে নড়ে না। একটু সরে যায় মাত্র।
ভোখা বহু আগে থেকেই ট্রাকটার দিকে তাকিয়ে ডাকছিল। ট্রাকটা যত কাছে আসছিল, তত জোরে ডাকছিল। শেষে ট্রাকটা যখন থামল, তখন ভোখা ডাকতে-ডাকতে ট্রাকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রায়। ড্রাইভার ও দুধের লোক, সামনে থেকে একজন আর পেছন থেকে একজন, নেমে এলে তোখা চিৎকার থামায়। তাও ব্রিজটার রেলিঙের কাছে গিয়ে আচমকা ডেকে ওঠে।
মোষদুটো সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়াচ্ছিল। ট্রাকটা থেমে যাওয়ার পর ওরা ব্রিজের ওপর নেমে যায়, দুটোই প্রায় একসঙ্গে। তার পর, ঢালের দিকে চলে যায়, যেখানে অন্য দুধিয়াল মইষানিগুলোকে ঠিক করে রেখে এসেছে বাঘারু।
ট্রাকটা এসে দাঁড়াতেই সেই পাইপটা নিয়ে একজন এগিয়ে আসে। এখন ত বাঘারুই শিখে গেছে। তাকে দুধের লোকটি পাইপটা ধরিয়ে দিলেও কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকে।
লেও, পেট্রল চালাও লোকটি হেসে বলে।
বাঘারু নানড়েই হেসে জবাব দেয়, মোর প্যাটরখান দ্যান আগত।
ওঃ জরুর, জরুর। লোকটি তার প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট দিতে দিতে বলে, আচ্ছা, তোমাকে আমি একটা প্যাকেটই দিয়ে যাব, ব্যস, তা হলে তোমার রোজ পেট্রল লাগবে না।
পাকিট? কিসের পাকিট?
এই। তোমার পেট্রলের।
ড্রাইভার দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে, যা বাবা, তাড়াতাড়ি কর। এ পুরো ট্রিপ ঘুরে আসতেই ত বেলা দশটা বাজবে। ড্রাইভার রেলিঙের ওপর থেকে ঝুঁকে নীচের ডায়না দেখে।
মোক পাকিট দিবেন? পুরা একখান? সিগরিটের?
হাঁ পুরা পেটরোল। বাঘারু একটা সিগারেট বের করে নিয়ে প্যাকেটা আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু হাতের মুঠোয় সিগারেটটা দুমড়ে না ফেলে বাঘারু ঐ কাগজের প্যাকেটটা আটকাবে কী করে? ফলে, তার যেন একটু বিহ্বলতাই আসে, বা হাতে সিগারেট আর ডান হাতে প্যাকেটটা নিয়ে। লোকটি এগিয়ে এসে দেশলাই দিলে বাঘারু একটা সমাধান পায় বটে প্যাকেটটা ভোলা অবস্থাতেই তাকে ফেরত দেয়ার, কিন্তু সেখানেও, দেশলাইটা আগে নেবে, না, প্যাকেটটা আগে দেবে এই নিয়ে আর-এক বিহ্বলতা দেখা দেয়। লোকটি ততক্ষণে দেশলাই থেকে কাঠি বের করে নিজেই জ্বালায়। সে যে এরকম জ্বালাবে, তার জন্যেও বাঘারু তৈরি ছিল না। ফলে, সে তার সিগারেটটা অত তাড়াতাড়ি মুখে দিতে পারে না। কাঠি নিবে গেলে লোকটি আর-একটি কাঠি জ্বালায়। ততক্ষণে বাঘারু সিগারেট ঠোঁটে দিতে পারে। আগুনের শিখার ওপর নত হতে-হতে বাঘারু বোঝে বাতাসে কাঠিটা আবার নিভবে। তখন একসঙ্গে সে একটা জটিল প্রক্রিয়ায় সমাধান ঘটায়–পিঠ দিয়ে বাতাস ঠেকানো, হাত বাড়িয়ে খোলা প্যাকেটটাই ফেরত দেয়া আর শিখার ওপর নত হয়ে সিগারেট ধরানো।
সিগারেটটা ধরানোর জন্যে বাঘারু যে-টান দেয় তাতে, ধরাতে গিয়েই সিগারেটটা একেবারে, শেষ হয়ে যেতে পারে যেন। সিগারেট ধরে যাওয়া ও দেশলাই কাঠি নিবে যাওয়ার পরও তার টান চলতে থাকে। আর, তার পর, শ্বাস বন্ধ করে ধোয়াটা ভেতরে নিয়ে সে যখন ছাড়ে, তখন মনে হয়, তার মুখের ভেতরে ছোটখাট উনুন আছে। ধোয়া বেরনো শেষ হওয়ার আগেই বাঘারু আর-এক টান দেয়। ড্রাইভার হেসে বলে, তোর এই টান দেখে ত আমাদের দম বন্ধ হয়ে যায় বাবা।
বাঘারুর চোখ তখন সিগারেটের নেশায় বন্ধ।
.
ট্রাকটার ওদিকে ক্লিনারটা তখন ভোখার সঙ্গে খেলা জুড়েছে। লোখার নাকের সামনে কী একটা দোলাচ্ছে। ভোখা সেটা ধরতে গেলেই, সরিয়ে নিচ্ছে ভোখার পিঠের ওপরে। ভোখা নিজের মুখ নিজের পিঠের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে গোল হয়ে লাফাচ্ছে আর লাফাতে লাফাতে, গোল হতে-হতে মাটিতে শুয়ে পড়ছে। ছেলেটি তখন হো হো হেসে উঠছে। তার হাসিতে, ও ঐ লাল জিনিশটার দোলা বন্ধ হওয়ায়, ভোখা তার খেলা ছেড়ে কুকুরের সব চেয়ে চেনা ভঙ্গিতে সোজা হয়ে মাটিতে বসে। ক্লিনারটি ড্রাইভারকে বলে, শালা, ভাল কোয়ালিটির জিনিশ দাদা। কোথা থেকে পায় এই সব? বলব, একটা ধরে রাখতে?
ফরেস্ট থেকে নিবি ত একটা বাঘটাঘ নে। ফরেস্ট থেকে কেউ কুত্তা নেয়? বোকা, ড্রাইভার নদীর দিকে তাকিয়েই বলে।
আমার দাদা খুব শখ একটা অ্যালসেসিয়ানের। মালবাজারের বকুলদা বলেছে একটা দেবে।
কোত্থেকে?
তা জানি না। তবে বকুলদা ভাই লিডার লোক। ও ঠিক কোনো বাগান থেকে জোগাড় করে দেবে।
ঐ আশাতেই থাক। ব্যাটা, অ্যালসেসিয়ানের একটা বাচ্চার দাম জানিস?
হ্যাঁ হ্যাঁ জানি।
তোর চাইতে বেশি।
বেশি ত বেশি।
তেমন জিনিশ পেলে, বকুল মিত্তির তোকে দিতে যাবে কেন?
মাঝরাত্রিতে যখন গাড়ি নিয়ে বাগানে যেতে হয়, তখন তুমি যারে?
আমি যাব কেন? আমার অ্যালসেসিয়ানও দরকর নেই, যাওয়ারও দরকার নেই। তুই কি ঐ সব শুরু করেছিস নাকি?
কী?
বকুল মিত্তিরের সঙ্গে গাড়ি নিয়ে যাস? রাত্তিরে? গাড়ি পাস কোথায়?
গাড়ি ত বকুলদার নিজেরই আছে। অত রাত্তিরে চালানোর লোক পায় না। আমি একবারই, গিয়েছিলাম।
তুই ত গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পাস নি, এখনো, তার মধ্যে গাড়ি নিয়ে রাত্তিরে? যাস না।
বকুলদা বলেছে আমাকে একটা অ্যালসেসিয়ানের বাচ্চা দেবে।
জেলে বসে অ্যালসেসিয়ান পুষিস?
কেন?
বকুল মিত্তির রাত্রিতে গাড়ি নিয়ে মার্ডার কেস পর্যন্ত করে তা জানিস?
কে বলল?
তোর তা দিয়ে দরকার কী? ওরকম রাতবেরাতে যাস না।
ছেলেটি একটু চুপ করে থাকে। একটা কুকুরের কথা থেকে যে এতটা এসে যাবে, সে ভাবে নি। তাই ভেবে নিতে তাকে একটু চুপ করেই যেতে হয়। বোঝা যায় না, অ্যালসেসিয়ান কুকুর না-পাওয়ার দুঃখ, আর বকুল মিত্তিরের সঙ্গে রাত্রিতে গাড়ি চালানোর বিপদ–এই দুটোর মধ্যে কোনটাতে সে বেশি চিন্তিত। ছেলেটা এই কথা থেকে সরে যেতেই যেন ব্রিজের মাথার দিকে হাঁটতে শুরু করে। কিন্তু কয়েক-পা গিয়েই ফিরে আসে। ছেলেটির সঙ্গে কথা বললে বলতে ড্রাইভার রেলিঙে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে-বকুলদা ত আমার থাকার জায়গাটা চিনে গেছে।
কী হয়েছে?
যদি পরে আবার আসে?
বলে দিবি, যাবি না।
বাঃ, আগের দিন গেলাম যে
বলিস, আমার লাইসেন্স নেই, রোজ-রোজ যাব না।
মারলে?
খাবি
বকুলদা তাকে অ্যালসেসিয়ান দেবে এই থেকে, বকুলদা তাকে মাঝরাত্রিতে ধরে মারবে, আর সে মার খাবে–এই সত্যটা মেনে নেয়ার ভেতর নিজেকে ও নিজের চার পাশকে উল্টে দেখতে হয়, মাত্র এই সময়টুকুরই ভেতর। এই ছেলেটির পক্ষে সেটা এতই কষ্টকর যে সে সেটা সহজতম করে নেয়। বকুলদা তাকে মারবেই, নিদেন একখানা চড়, এটা সে জানে। আর তাই এই মুহূর্ত থেকেই সেই চড়টা খেতে শুরু করে। পেছন থেকে ড্রাইভার আবার ডাকে, এ-ই।
ছেলেটি দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকায়।
শোন।
ছেলেটিকে আবার ফিরে যেতে হয়। ড্রাইভার রেলিঙের ভর ছেড়ে সোজা হয়ে বলে, শোন্। বকুলবাবু এর পরে কোনোদিন এলে বলবি তোকে থানার দারোগা খুব মেরেছে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাস বলে, আর জিগগেস করেছে বকুলবাবুর গাড়ি চালাস কিনা। শুধু এইটুকু বলবি। তা হলে দেখবি তোকে আর নেবে না।
দারোগার কথা বলব?
হ্যাঁ, ঐ বলবি, দারোগা তোকে বকুলবাবুর কথা জিগগেস করেছে।
এবার ছেলেটি দুধদোয়ানোর জায়গাটার দিকে যায়। তার হাতে লাল রুমালটা ছিলই। সেটা একবার লোফে। দেখেই তোখা লাফিয়ে তার সামনে চলে আসে। কিন্তু সে আর ভোখার সঙ্গে খেলে না।
.
প্রথম দিন পাইপ দিয়ে দুধ দোয়ানো শিখতে বাঘারুর তিন-চার মোষ লেগেছিল। পরে বোঝা গেল, শিখতে গিয়েই সে হাঙ্গামা বাধিয়েছে। আসলে শেখার কিছুই নেই, এমনই যন্ত্র যে লাগিয়ে দিলেই হয়ে যায়। হাতের মত একটা রবারের পাতা। তাতে হাতের পঁহ্যাঁচ আঙুলের বদলে একটু ফাঁকে-ফাঁকে চার আঙুল। আঙুলগুলোর মাথা খোলা। মোষগুলোর বাটের ভেতর একটু ফাঁক করে ঢুকিয়ে দিতে হয়, বেলুনের নাখান। তারপর, ঐ ট্রাক থেকে ত পাম্প হতেই থাকে। আর, দুধের মানষিটা ড্রাম ভরতে থাকে। পাইপটা, কাঁচের মত প্লাস্টিকের। ভেতরটাতে, দেখাই যায়, দুধ পাইপটা ভরে চলে যাচ্ছে। যেন দুধটা জলের মত জিনিশ না, গড়ায় না। যেন, দুধটা শক্ত জিনিশ। এই ব্যাট থেকে ঐ ড্রাম পর্যন্ত লেগে আছে। ঐ যে, ট্রাকের ওপর কী-একটা পাম্প করে, তাতে, বাটের ওপর লাগানো ঐ বেলুনের মত জিনিশটা একবার চিপে ধরে, আর-একবার ছেড়ে দেয়, ঠিক আঙুল দিয়ে দোয়ানোর মত।
প্রথম-প্রথম বাঘারু একটা মোষের বাটে পাইপ লাগিয়ে তার পরের মোষটার বাট একটু টানাটানি করত, দুধটা নিয়ে আসতে। এখন তাও করে না। বাছুরের চোষাতেই এসে যায়।
বাথানে বাছুর থাকে না। কারণ, টাড়িতে বাছুরের কাজ অনেক বেশি থাকে। কিন্তু বাছুর না-দেখলে, আর মাঝে-মাঝে বাছুর না-টানলে, আর মাঝে-মাঝে বাছুরের পিঠ না-চাটলে মোষের দুধ আসা বন্ধ হয়ে যায়। সে কাজ একটা বাছুরই করতে পারে। কিন্তু একটা বাছুর এতগুলো বঁট চুষলে তার চোয়াল আটকে যাবে। আর, এতগুলো মোষ মিলে একটা বাছুরকে চাটলে তার চামড়া উঠে যাবে। তাই চারটি বাছুর বাথানের সঙ্গে থাকে।
ব্রিজের মাথায় বাঘারু রাস্তার ওপরেই বসেছে। এতে কাজের একটু অসুবিধে হয়। ওদিক থেকে একটু চড়াই হয়ে মোষগুলোকে ওপরে উঠতে হয়। অনেক মোষ তা করতে চায় না। নীচেই দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো-কোনো মোষ আবার ঘুরে পেছনে চলে যায়। ওদিকে যদি কেউ থাকত, তা হলে এখানে বসে কাজ করাই সুবিধে–তলা থেকে পাঠিয়ে দিত, এখানে দুইয়ে নিয়ে, বাঘারু আবার তলায় পাঠিয়ে দিত। ভোখাকে দিয়ে বাঘারু খানিকটা করায় অবিশ্যি, মোষগুলোও ভেখার কথা শোনে। কিন্তু যদি কেউ গড়বড় করে তা হলে মোষ-ভোখা এই সব নিয়ে একটা হুলস্থুল কাণ্ড। সেই জন্যে বাঘারু ভোখাকেও বড় একটা ডাকে না। এই বড় রাস্তার ওপর বসে বাঘারু যেকটাকে হাতের কাছে পায়, দুইয়ে নেয়। তার পর, একবার উঠে গিয়ে বাকিগুলোকে তুলে নিয়ে আসে। মুশকিল হয়, তখন যদি কোনো মইষানিকে খুঁজে পাওয়া না যায়। এই জায়গাটার এটাই সুবিধে যে এদিক-ওদিক আলগা হওয়ার সুযোগ কম।
সারা দিনের ভেতরে একমাত্র এই দুধ-দোয়ানোর সময়টাতেই ত পুরো বাথানকে একটা কাজ শুরু আর শেষ করতে হয়। তাই এই সময়টাতে বাথানের ভেতর এমন একটা ভাব আসে যা সারা দিনে অন্য কোনো সময় ঘটে না। এখন দুধিয়ালগুলো সব চেয়ে আগে, তারা জানে একটার পর একটা গিয়ে দুধ দিয়ে আসতে হবে। বাথানের বাছুরগুলোর খিদে কম। বা দুধের খিদে বিশেষ কিছু আর বাকি থাকে না। এতগুলো বাট। প্রত্যেক বাট একবার করে চুষলেই চারটি বাছুরের পেট ঢাক হয়ে যায়। ফলে মইষানিগুলোর বাট ফুলে বোধহয় ব্যথাও করে। পাম্প করে যে দুধটা টেনে নেয় তাতে নিশ্চয়ই শরীরে একটা আরাম ছড়িয়ে পড়ে। তাই মইষানিরা যখন বুঝে যায় যে এবার দোয়ানো হবে তখন তারা কাছাকাছিই থাকে, যেন চায়, দোয়ানোটা একটু আগে হোক।
আর বাছুরগুলো ত আর খিধেয় জ্বালায় চাটে না। বাট টানার নেশা ত দুই-চার বাট টানলেই মিটে যায়। তার পর ঐ চারটি বাছুর মিলে পুরো লাইনটাতে গোলমাল বাধায়। এই দুধিয়ালের পেছনে মাথা ঢোকায়, আর-এক মইষানির পেটের তলায় ধাক্কা দেয়। এমন ছুট লাগায় যেন সামনে কোনো বাধা নেই। তার পর কোনো কিছুতে লেগে পড়ে যায়। আবার গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে, ছোটে।
বাছুর আর দুধিয়াল ছাড়া এই সময় অন্য মোষদের ত কোনো কাজে থাকে না। তাদের কেউ-কেউ, বিশেষত বুড়িয়াল, বলদখান আর দু-একটি বুড়ি মইষানি তলাতেই থাকে। কিন্তু ছোকরাছুকরি মোষগুলো কিছুটা এই রাস্তার ওপর উঠে আসে, আর, কিছুটা ছড়িয়ে যায় আশেপাশে। পিচের রাস্তার ওপর দিয়ে মোষগুলো চলতে গেলে পা ভেঙে যায়। সেই জন্যেই মোষগুলো দাঁড়িয়ে থাকে রাস্তার ওপর, কিন্তু হাটে রাস্তার পাশ দিয়ে।
বাঘারুর মাথা এখন মোষের পেটের তলে। আর এইখানে বসে বসে সে পেটের তলা দিয়ে-দিয়ে। অনেকখানি দেখতে পায়। পেচ্ছাব আর গোবরের গন্ধটা নাকে বেশি লাগার কথা, যদি বাঘারু ঐ গন্ধগুলোকে আলাদা করে চিনতে পারত। এখন, সেই গন্ধের মধ্যে এক বাটে পাইপ লাগিয়ে সে পরের বাটের দিকে হাত দেয়। হাত দিয়েই বোঝে বাছুরের চাট পড়েছে কি পড়ে নি, শক্ত না নরম, শুকনো না ভেজা। বাঘারু জিভের টাকরায় অন্যরকমের আওয়াজ তোলে। আর দু-একটা বাছুর চলে আসে। বাছুরের ঘাড়টা ধরে বাঘারু বাটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। বাছুর ব্যাট থেকে মুখটা সরিয়ে আনতে গেলে বাছুরের কানটা ধরে কাত করে। তারপর এক হাতে বাট আর-এক হাতে বাছুরের মাথা ধরে কাছাকাছি টেনে আনে। যার বাট নিয়ে টানাটানি সেই দুধিয়াল জিভটা বের করে একটু গা চাটতে চায়, পায় না। ডান থেকে বায়ে ঘাড় ঘোরায়। বাটে টান পায়। তৃপ্তি জানানোর আর-কোনো উপায় না পেয়ে দুধিয়াল একটা লম্বা আ-আ-আঁ ডাক ছাড়ে তার স্তন্যের সেই পায়ীর জন্যে যে-এখন তার স্তনলগ্ন। দুধিয়ালটার পেছনের পা দুটো একটু ফাঁক করা–যাতে ভাল ভাবে টানতে পারে। এর ভেতর আগের মোষটার দোয়ানো শেষ হয়ে গেলে বাঘারু বা হাতে সেই পাইপটা খুলে, ডান হাতে বাছুরটাকে ব্যাট থেকে সরিয়ে পাইপটা লাগিয়ে দিতে যায়। বাটে একবার অনিচ্ছুক মুখ লাগালেও বাছুর আর মুখ সরাতে চায় না। বাঘারু এক ধাক্কায় সেটাকে সরায় ও পাইপটা লাগায়। দুধিয়াল পেছনের পা দুটো ফাঁক করেই থাকে। আর পাইপের ভেতর দিয়ে আসা স্পন্দিত টান বাটে বোধ করতে করতে তার তৃপ্তি জানানোর জন্যে একটা লম্বা আ আ আ ডাক ছাড়ে তার স্তন্যের সেই পায়ীর জন্যে যখন সে আর তার স্তনলগ্ন হতে পারে না। দুধিয়ালের সব চেয়ে আরামের সময় এইটাই, যখন তার ব্যাটে টান পড়ে তার শরীরের ভার হালকা হয়ে যায়। বাঘারু তার দুই কর্কশ হাতে তার তল পেটটা হাতিয়ে দেয়, গলাটায় সুড়সুড়ি দেয়, পেটের ভেতরটা চুলকে দেয়। দুধিয়ালটার পেছনের পা বেয়ে শিহরণ খেলে যায়। তার পিঠের চামড়াও চমকে-চমকে ওঠে। একবার পেছনের বা পা মাটিতে ঠোকে। বাঘারু এতক্ষণে পরের দুধিয়ালের ব্যাটে হাত দিয়ে দেখে নেয় বাছুরের চাট পড়েছে কি না।
এরকম দুধ দুইতে আর কতক্ষণ লাগে। বাঘারু ট্রাকটার কাছে এসে দাঁড়ায়। সেই লোকটি একটা কাগজের পেছনে বাঘারুর টিপসই নেয়। টিপসই-এর স্ট্যাম্পপ্যাড তার পকেটেই আছে। সেই কাগজে কী হিশেব লেখা আছে আর বাঘারু তাতে কী টিপসই দিল–সে কোনো কিছুই ত বাঘারুর পক্ষে জানা সম্ভব নয়। সে এটা বোঝে কত দুধ দোয়ানো হল তারই একটা রশিদ ওটা কনট্রাক্টার জোতদারকে দেবে। মাসের শেষে ঐ কাগজ দিয়েই হিশেব হবে। এ ত আর দু-চার সের দুধের ব্যাপার না, যে, এক পোয়া আধ পোয়া হিশেবের গোলমাল হবে। প্রত্যেক দিনই একই সংখ্যক মোষের দুধ একটা পরিমাণেরই হওয়ার কথা। এর মধ্যে দিন তিনেক বাঘারুর একটা দুধিয়ালকে দোয়ায় নি। বাটে ঘা হয়েছিল। সেই কয়েক দিন বাঘারু ঐ রশিদের পেছনে একটা দাগ দিতে বলেছে। তার নীচে সে টিপসই দিয়েছে। সে মুখে বললে দেউনিয়া না-ও বিশ্বাস করতে পারে। কিন্তু অবিশ্বাসই বা করবে কেন? একটা মোষের দুধ না-দুইয়ে বাঘারু করবেটা কী?–খাবে? কত খাবে বাঘারু? বেচিবে? কাক বেচাবে? পাহাড়ক? তা ছাড়া কনট্রাক্টরের লোকটা ত রোজকার হিশেব বুঝে নেয়। সে দেখবে না যে কটা মোষ দোয়ানো হল, কটা বাদ গেল, কেন গেল। কিন্তু সেসব ত কাথার কথা। বাঘারু একখান দাগ দিয়া টিপসই দিছে যে একখান তারিখ দেয়া হয় নাই।
দুধ নিয়ে ট্রাকটা সোজা চলে যায়। ড্রাইভার আর সেই লোকটা হাত বাড়িয়ে বাঘারুকে বিদায় জানায়। ট্রাকের পেছনে ডালার ওপরে সেই ক্লিনার ছেলেটা বসে। তার দিকে তাকিয়ে ঘাড় উঁচু করে ঘেউ-ঘেউ করতে করতে ভোখা ভুকতে-ভুকতে যায়। ছেলেটির লাল রুমাল এখন তার দাতে চেপে ধরা। সে ভোখার ডাক শুনতেই পায় না যেন, কেমন উদাসীন মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তোখা, ডায়না ব্রিজ, এই মোষের পাল, বাঘারু ফরেস্ট ও পাহাড় থেকে সোজা, যেদিকে ট্রাক চলেছে, সেই দিকে। এই সকালের আলোয় তার চোখে এখন মধ্যরাত্রির গোপন হত্যা লেগে গেল?
ট্রাকটার চলে যাওয়া বাঘারু আর মোষগুলো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখে। বেশ অনেকক্ষণ দেখা যায়, এরোপ্লেনের মত ছোট হয়ে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত। তার পরেও আওয়াজটা শোনা যায়। এদিকে পাহাড়, বন, নদী, চাবাগান। সুতরাং এই ছোট ট্রাকের এত আওয়াজ এই সব নানা জায়গার ওপর দিয়ে, ধাক্কা খেয়ে-খেয়ে গড়িয়ে, প্রতিধ্বনিত হয়, চার পাশের আরো নানা আওয়াজের সঙ্গে মিশে-মিশে যায়।
সারা দিনের মধ্যে এই কাজটা সব চেয়ে দরকারি। আর সারাদিনের ভেতর এই একবারই ত এতগুলো লোকের মুখ দেখতে পায় বাঘারু। বাঘারু ছাড়া অন্য লোকের মুখ দেখতে পায় এই এতগুলো মোষ। তাই, তারা চলে গেলে কিছুক্ষণের জন্যে এমন একটা ভাব আসে যে আবার আগামীকাল সকালে এই কাজটা করতে হবে। কিন্তু সে ভাবটা এতই কম সময়ের জন্যে আসে যে আওয়াজটা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই মিলিয়ে যায়।
বাঘারু ব্রিজটার রেলিঙের পাশে বাধানো উঁচু জায়গাটায় বসে। সে ত এই কাল কুচকুচে বাঁধানো রাস্তা আর শাদা ফটফটে বাধানো ব্রিজে দিনে একবারই আসে। তাই তার মনে হয়, যেন অনেক দূরে এসেছে।
এই যে বা থেকে ডাইনে রাস্তাটা এত পরিষ্কার চলে গেছে বনটাকে দুই ভাগ করে, তাতেই কেমন গোলমাল লাগে। যেন কোনো একটা দিক আটকা পড়ে গিয়েছিল, এই রাস্তাটা সেই দিকটা খুলে দিয়েছে। যদিও এই রাস্তা দিয়ে তাকিয়েও দিগন্ত দেখা যায় না, তবু বাঘারু বোঝে এই রাস্তার দু পাশে দুটো দিগন্ত আছে।
বাঘারু যেখানে আছে ডায়নার সেই বনে দিক বা দিগন্ত নেই। এক আকাশ আছে, আর মাটি আছে। বাঘারু যে এসব খুব ভাল মত বোঝে তা নয়। কিন্তু এই ব্রিজেরই তলায়, বা সামনের ফরেস্টে, বা পেছনের চরে, চব্বিশ ঘণ্টা থাকা সত্ত্বেও সকালে এই কিছুক্ষণের জন্যে এই রাস্তায় আর ব্রিজে এসে বহু, দূরে কোথাও এসেছে বলে তার মনে হয়। যা কিছু আমাদের অভ্যাসের বাইরে তাই ত দূর!
.
বাঘারু এখন বাথান নিয়ে ডায়না ফরেস্টের ভেতর।
সেই বুড়িয়ালের ওপর বাঘারু শুয়ে। বুড়িয়াল দুলে-দুলে চলে। আর বুড়িয়ালের পিঠে বাঘারুও দোলে। দুলতে-দুলতে বাঘারু ফরেস্টটাকে উল্টো দিক থেকে দেখে–যেমনটা এমনিতে দেখা যায় না। যেন, এই গাছের পাতার ফাঁকফোকর দিয়ে যে আকাশটা ছিটিয়াল দেখা যায়, সেই আকাশটাতে গাছগুলোর পাতা-ডাল পোতা আর শেকড়কাণ্ড এই সব ওপর দিকে তলা। বাঘারু ত মাটির ওপরের জঙ্গলটা দেখতে পায় না। মাথার ওপরের গাছের পাতার গোল ছাউনি অনেক ওপরে। মাঝখানে নানা মাপের নানা গাছের পাতা ছড়ানো আছে বটে কিন্তু কোনো সময়েই তা মাটির জঙ্গলের মত ঘন নয়। বাথান নিয়ে বাঘারুর বেলা এমনই অলস কাটে এই ফরেস্টের ভেতর, যে সে ফরেস্টটাকেও সোজা দেখে না।
বুড়িয়াল একটা ছোট হাতি-সাইজের মোষ বুড়ি কাছার পাড়ি (বিরাট, বুনোটে, স্ত্রী মোয)। ওর আর বাচ্চা হবে না। দুধ দেয় না। এমনি কোনো কাজে আসে না। কিন্তু বাথানে এমন একটা পাড়ি না থাকলে, সে বাথান ত বাথানই নয়। টানা খাড়া শিং। ফরেস্টের ভেতর যখন চলে নিচু লতা-পাতা, ডালপালা সেই শিঙে লেগে যায়। শিং দুটো তুলে সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, ছোট সাইজের কোনো বাঘকে গুঁতিয়ে দুই শিঙে গেঁথে ঘুরিয়ে ফেলে দিতে পারে। গায়ের নোম লালচে। দুই চোখের মাঝখানে এতটাই জায়গা যেন ডায়না নদী বয়ে যেতে পারে। পুরোপুরি লম্বা হওয়ার আগেই মুখটা থেতলে গেছে। একবার হাঁ করে জিভ নাড়লে কাঠাখানেক জঙ্গল সাফ করে দেবে। কপালের দু পাশে চোখ দুটো নাক থেকে এত তফাতে যেন সব সময়ই একসঙ্গে দুটো জিনিশ দেখছে। একটা জিনিশই দুই চোখ দিয়ে দেখার জন্যে লাল চোখ দুটোর মণি ঘুরপাক খেয়ে নাকের পাশে চলে আসে। হাতির পাল, বা বাঘ, বা ওইকিয়া (একা) গুণ্ডা হাতি যদি এসে দাঁড়ায় তাহলে পুরো বাথানের মধ্যে এক এই বুড়িয়ালই খাড়া শিং আর পুরো বুক তুলে দাঁড়াতে পারে। বাঘারু দেখেছে, ঐ রকম করে যখন দাঁড়ায়, তখন তার গলার নীচে সামনের দুই পায়ের মাঝখানে এতটা জায়গা খুলে যায় যে পুরো বাথানটাই সেখানে ঢুকে গা বাঁচাতে পারে।
এই বাথান ত কিনি-কিনি বনাইছে দেউনিয়া। এই বাথানের কুনো মইষ কুনো মইষের কায়ও না। কিন্তুক দেখিলে মনত খায়, সগায় বুঝি বুড়িয়ালের বাচ্চা। কায়ও না। কিন্তু বুড়িয়াল যখন খাড়ি যায়, স্যালায় মনত খায় কি, তামান মইষ ঐ বুড়িয়ালের প্যাটতঠে বাহিরত আইচচে।
বাথানে যেমন বুড়িয়াল আছে–কায়ও ওর বাচ্চা না-হয়, ও সগারই মাও–তেমনি আবার দু-দুটো বুড়ো মোষ আছে, যেগুলো আগে বাপ-মহিষ ছিল, এখন বুড়ো ও বাতিল হয়ে আছে।
-কুনো মইষানির প্যাটত ও বাচ্চা দিবার পারে না, তবু বাথানে থাকে। এমন বাতিল ও বুড়ো মোষ দেখলে মনে হয় বাথানটা যেন এই ফরেস্টের গাছগুলোর মতই পুরনো। ফরেস্টের ভেতরে যেমন বুড়ো জন্তুও থাকে, চ্যাংড়া জন্তুও থাকে, বাথানেও তেমনি। এটাও ত কিনতেই হয়েছে দেউনিয়াকে। এই সব মোষের দাম কম। কিন্তু বা খানে রাখতে হয়। কোনো-কোনো সময় ত কাজেও লাগে। যদি ফরেস্টের মধ্যেই কোনো বড় শালগাছ পড়ে থাকে–দড়ি বেঁধে এই সব মোষের গলায় বেঁধে দিলে সেটা টেনে রাস্তার কাছে নিয়ে যায়। আর, একটা শালগাছ যদি বেচে দেয়া যায়, তা হলে বাথানের দুধবেচার আর দরকার নেই। এখানে, এই ডায়না ফরেস্টে তার সুবিধে নেই। পহাড়ি জায়গায় গাছ টেনে নেয়া মুশকিল। টেনে নিয়ে গেলেও রাস্তার ধারে কোন ট্রাকে তুলবে? এখানে আর সারা দিনে কটা ট্রাক যায়? সে-সব সুবিধে লাটাগুড়ি-ওদলাবাড়ির দিকে। কিন্তু গয়ানাথের এই বাথান যে আগামী বছরেও এখানেই থাকবে, তা কে বলতে পারে? বা, তেমন হলে ত এই বুড়ো মোষটাকেই গয়ানাথ লাটাগুড়ি ওদলাবাড়ির কাছে নিয়ে যেতে পারে। সেখানে একটা চোরাই শালগাছ রাস্তার পাশে ফেলে রাখলে বেচতে আর কতক্ষণ লাগে? তাই বাথানে এই দু-দুটো বুড়ো মোষকায়ও উমরার বাচ্চা না-হয়, উমরায় সগার বুড়া বাপ।
বাছুর চারটে ত আছেই–নইলে বাট চেটে দুধ আসবে কোত্থেকে। এ চারটে বাছুরের কোনোটাই হয়ত এ বাথানের নয়। হয়ত বাছুরও দেউনিয়া কিনে এনেছে। বা, হয়ত বাড়িতে তার যে-মোষগুলো আছে তাদেরই বাছুর এই কটি। এখন বাথানে পাঠিয়েছে। বাথানে মোষ তাড়াতাড়ি বাড়ে। বাথানে বাচ্চা হলে দেউনিয়া নিয়ে যায়। বেশি বাছুর রাখার চাইতে বেচে দেওয়ায় লাভ বেশি। শুধু নিজের বাথানটা যাতে ভরে ওঠে, ভরা থাকে, তার জন্যে যতগুলো বাছুর রাখার, রেখে, বাকিগুলো বেচে দেয়। –এই বাছুর গিলান কায়ও বাথানের বাছুর না-হয়, কিন্তু সবগুলা মইষানির এই চারিটাই বাছুর, এই চারিটাই।
দুধিয়াল মইষানিগিলাই ত বাথানের আসল জিনিশ। পুরা বাথানখানই ত উমরার তানে আছে। বাঘারুও ত উমরার তানে আছে। যত খিলায়, দুধ হয় তত ভাল। কিন্তু দুধ হওয়ার ভেতরেও ত একটা নিয়ম তৈরি করতে হয়। সবগুলো মইষানি যদি একসঙ্গে দুধ দেয়, তা হলে দুধ বন্ধও ত হবে একসঙ্গে। তাই সবার একসঙ্গে বাচ্চা হওয়া চলে না। কিন্তু যেগুলো দুধ দিচ্ছে, তাদের চালু রাখাটাই বাথানের প্রধান কাজ। তেমন-তেমনি বিপদ হলে ত সব মোষ ছেড়ে ঐ কটি মোষকেই প্রথম বাঁচাতে হবে বাঘারুকে। বাথানের সব মোষই দুধিয়াল না, কিন্তু দুধিয়ালরাই বাথানের সব।
আজি না-হয় দুধিয়ালক দিয়া চালাছ, কালি কী হবে? কী হবা পারে? কাল কী হবে? বাথান ত বছরের পর বছর থাকবে, বছরের পর বছর দুধ দেবে। তোমার ত শুধু এখনকার, এই মাসের, বা এই বছরের হিশেব করলে চলবে না। দুধটা ত কোনো দুধিয়ালের একার না। দুধটা ত পুরা বাথানের। তাই যতগুলো দুধিয়াল আছে, ততগুলো, বা তার বেশিই আছে, এমন মাদিমোষ, যাদের প্রথম বাছুর এখনো হয় নি। সেই ডবকানি মোষগুলো বাথানে আছেই বাথান চালু রাখার একমাত্র উপায় হিশেবে। এ সংখ্যা ত প্রায় সব সময়ই হিশেবে থাকে কটা মোষ গাভিন হল, কটা আরো হবে, তাদের বাছুর হবার দিন কবে, কবে থেকে দুধ দেবে, তার ভেতর কটার দুধ বন্ধ হবে, পরের বছর আবার কটা গাভিন হবে।
এই মোষগুলোকে গাভিন করবার জন্যে সঙ্গে আছে একটা ওয়ালি পাড়া। –সে শালোর ত আরকুনো কাম নাই, ঘাস খায় আর ঝিমায়, ঝিমায় আর ঘাস খায়। চলিবার বলিলে, ঘুমি-ঘুমি চলে। আর য্যালায় জাগিল অমনি উমরা গিয়া একখান মইষানির পাছত দুইখান পাও তুলি দিল। শালোর ঐ তিনখানই কাম-খাওয়া, ঘুম আর–। আর বাঘারুকে সাবধান থাকতে হয় ঐ একটি ব্যাপারেই। সে জানে, এই বাথান কী ভাবে বাড়তে পারে–সংখ্যায় আর দুধে। আর সেই অনুযায়ী ওয়ালি পাড়াকে চালাতে হয়, কখন কার পেটে বাচ্চা বানাবে।
কিন্তু সাবধানতার আর-একটি প্রধান কারণও আছে। বাথানে ওয়ালি পাড়া একটার বেশি রাখা যায় না। কিন্তু এই ফরেস্টের কাছাকাছি কোথাও অন্য কোনো বাথান থাকতে পারে। তাদের ওয়ালি পাড়া এই দলে এসে ভিড়তে পারে। তার পর একটা-দুটো মাদি-মোষকে ভাগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। বা, কাছাকাছি কোথাও যদি কোনো একোই (একা) খুটা অরনা (বুনো) থাকে, সে ত এই বাথানের মইষানিদের ভাগিয়ে নিয়ে নিজের দল বানাতে পারে। বাথানে মোষ-মইষানি একসঙ্গে থাকে–একা থাকতে ভয় পায় বলে। কিন্তু সেই সাহসটা যদি অন্য কোনো মোষ তাকে জোগায় তা হলে তার সঙ্গেও চলে যেতে পারে। মহিষ যদি বাথান ছাড়ি পালবার চাহে, কুনো বাথানদারের কুনো খ্যামতা নাই উমরাক ঠেকাবার পারে। সেই জন্যেই সতর্ক নজর রাখতে হয় কোনো মইষানির শরীর যদি গরম খায়, সে গরম যেন নষ্ট না হয়।
আবার তার সঙ্গে-সঙ্গে একটা লোভও ত থাকে। তেমন গরমের সময় কোনো মইষানি যদি কোনো অরনার (বুনো মোষ) সঙ্গে ভাব করে, তা হলে তার পেটে দোমাচা বাচ্চা হয়–তার গায়ের জোর বেশি, দুধ বেশি। বাথানের মইষানি বাথানেই বাধা থাক, কিন্তু অরনার বাচ্চা পেটে ধরুক।
এই ত বাথান–কায়ও কারো না। সগায় সুগার। যার একোটাও বাচ্চা নাই, সেইলা সগার মাও। যে-বাছুর গিলার একোটার মা নাই, সেইলা সগার বাছুর। যে-মইষানির এ্যালায়ও বাছুর নাই, স্যায়। বুনাক ধরিবে কিন্তু বাথানও রাখিবে। আর এ-সব কিছুই গয়ানাথের।
এই ওয়ালি পাড়া এই কুমারী পাড়া এই অরনা, এই দোমাচা, সব গয়ানাথের। যে-মোষ এই, বাথানে, যে-মোষ ঐ হাটে, যে-মোষ গোয়ালে, সব গয়ানাথের।
যায়লার জন্ম হইছে, যায়লার জন্ম হয় নাই, যায়লা জম্মিবে, যায়লা মরিবে, সব গয়ানাথের।
.
–সগায় গয়ানাথের। এই ডায়নার জঙ্গলখান গয়ানাথের। হু-ই আপলাদের জঙ্গলখান গয়ানাথের। এই ডায়না নদীখান গয়ানাথের। হু-ই তিস্তা নদীখান গয়ানাথের। ঐঠে জমিগিলান গয়ানাথের। এইঠে জঙ্গলখান গয়ানাথের। এই বুড়িয়াল গয়ানাথের, দুধিয়াল গয়ানাথের, পোয়াতিখান গয়ানাথের। এই বাঘারু মইষ্যালখান গয়ানাথের
বাঘারু আকাশময় ফরেস্টের দিকে তাকিয়ে ভাবে। বুড়িয়ালের পিঠের ওপরে চিৎপাত শুয়ে থাকে–দুটো পা বুড়িয়ালের পেট দিয়ে ড্যাং ড্যাং করে নীচে দোলে আর এই ফরেস্টের পাতাগুলোর, মাথাগুলোর নানা নকশা চোখের সামনে সামনে বদলে বদলে যায়, পাতাগুলোর ভেতর দিয়ে বহুবহু। ওপরে ছিটিয়াল আকাশ দেখা যায় বাঘারু গাছের পাতার দিকে তাকিয়ে বুঝে যায়, তারা সেই পোরালি বাড়ির (পোড়া বন) দক্ষিণ দিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি বাঘারু ডাইনে তাকায়, সেই পোড়া গাছগুলোর লাইন দেখতে পাবে। তার ওদিকে ডাইনাং কি বাইনাং-এর ছড়া (শুকনো নদীখাত)।
কুনোবার বানায় জল উঠি আসি ঐঠে গাছগিলানক পুড়ি দিছে হয়ত। জলত ক্ষার আছিল। সেই জলত তামান বনখান মাটিখোলা হয়্যা গেইসে। তার বাদে ফরেস্টের মানষিলা অগুন লাগি পুড়ি দিছে। কেনে? না, ঐঠে আর নতুন মাটি না-পড়িলে নতুন জঙ্গল গজাবে না। তা পুড়ি দাও। যেইলা বন মাটির আগুন পুড়ি যায়, উমরাক আগুন লাগি পুড়ি দাও। তাই ঐঠে পোরালি বাড়ি
কিন্তু এই জায়গাটা ত ভরভরন্ত বন, এই জায়গাটা, যেখানে মোষের পিঠে চিৎপাত হয়ে বাঘারু আকাশের বন দেখে মাটির বনের হদিশ পায়।
গয়ানাথ মোক এইঠে পাঠাছে। বাথান করিবার। মুই আধি চাহ নাই। মোক বাথান দিছে। এইঠে মোক কায়ও খুঁজি পাবেন না। মুইও কাক পাম না। মুই এইঠে আগত আসি নাই রো। মুই এইঠেকার বন চিনি নাই রো। গয়ানাথ মোক এইঠে পাঠাছে। মোর অচিনা জায়গাটাত্ পাঠাছে। মোক উদাস করিবার তানে পাঠাছে–।
বুড়িয়াল বা দিকে একটা নালীর মধ্যে সামনের বা পা দিয়ে ফেলায় বেঁকে যায়। বাঘারু নড়ে ওঠে, কিন্তু উঠে বসে না। সে জানে, হেঁটে গেলেও এমন হেঁচট সে খেতে পারত। বুড়িয়াল জানে, বাঘারু তার পিঠে উঠে বাথানে ঘোরে, এটাই বুড়িয়ালের সব চেয়ে বড় কথা। তাই বুড়িয়াল ঠিক সামলে নেবে।
একটু দাঁড়িয়ে পড়ে বুড়িয়াল। পেছনে বোধহয় একটা ছোেট মোষ ছিল। সেটা যখন পাশ দিয়ে যায় বাঘারুর পায়ে ঘষা লাগে। বাঘারু বা হাতটা বাড়িয়ে মোষটাকে ছুঁতে চায়। কিন্তু পারে না।
ততক্ষণে বুড়িয়াল পেছনের পা দুটো সরিয়ে এনে, সামনের বা পাটাকে তুলে এনে আবার সমান হয়েছে। আকাশজোড়া বনের দিকে তাকিয়ে বাঘারুর নিজেকে নিয়ে এমন কিছু একটা কথা মনে আসে, যার ভাষা তার জানা নেই। তবু তাকে এরকম ভাবতে হয়, এই বুড়িয়ালটা গয়ানাথের। এই বাঘারুখান গয়ানাথের! এই জঙ্গলখান গয়ানাথের। বুড়িয়ালের পিঠত বাঘারু শুই থাকে। গাছ দেখে। আকাশ দেখে। আর দোলা খায়। দোলা। বুড়িয়ালের নাখান এ্যানং চওড়াকিয়া পিঠ আর কার আছে? কায়রো না। কায়রো না। বাঘারু আকাশের দিকে তাকিয়ে বনের গাছগুলো দেখে আর চেনে, এই ঠে কোশল-বাড়ি (হরিতকি গাছের জঙ্গল) শুরু হয়্যা গেইল। তামান বনত এইঠে শুধু, ধর কেনে পঁচিশ-তিরিশখান কোশল গাছ আছে। আর কোটত নাই। কোনামারা পাতাখান, আর গুলটিমারা উঁটখান। পাতা আর ভঁটা সেইঠে মিলে এইঠে একখান ছোট গোল নাখান গুলটি–
বাঘারু ত নীচ থেকে পাতাগুলো দেখছে, পাতার তলাগুলো, ক্যানং লোম-লোম হয়্যা আছে।
বাঘারু জানে সে যদি নীচে নেমে খোঁজে এত কোশল পাবে যে রাখার জায়গা খুঁজে পাবে না। শহরে নিয়ে গেলে কবরেজের দোকানে বিক্রি হয়। হাটে নিয়ে বসলেও বিক্রি হয়-খয়েরি রঙ বানাতে। কিন্তু বাঘারুর ত তার দরকার নেই। বাঘারু এই জায়গাটার নাম দিয়েছে কোশলবাড়ি।
হেঃ গয়ানাথ, মোক এইঠে পাঠাছে অচিনা দেশত্। আর মুই এইঠে একখান বাড়ি বানি নিছু। বাঘারুবাড়ি। কোটত যাছেন? না, কোশলবাড়ি। কুন কোশলবাড়ি? না, ঐ পোরালিবাড়িখানের দক্ষিণে আর হুই যে বড় গর্জালি বাড়ি (বর্ষার ঘাসজঙ্গল), ঐটার পচ্চিম পাখত–নদীর নাম ডাইনাং. থানার নাম নাগরাকাটা, গ্রামের নাম, বাঘারুবাড়ি।
বাঘারু আপনমনে খিক খিক করে হাসে। আর হাসির ফুর্তিতে ডান গোড়ালি দিয়ে বুড়িয়ালের পেটে মারে খোঁচা। আর বুড়িয়াল তার জবাবে ওর লেজ দিয়ে সেই পায়েই মারে ঝাঁপট।
শালো গয়ানাথক গিয়া কহিবু, হে দেউনিয়া, তোমার বাথানখান আছে, ধরো কেনে–ডাইনাং নদীর ডাইনের যে-ঘাসবন, তার পচ্চিম পাশের পাহাড়ের গা দিয়া উঠি, ডাইনে ঘুরত যাবেন। তার বাদে দেখিবেন কনেক-আধেক পাতলা-পাতলা জঙ্গল, তার বাদে বাঘারুবাড়ির পাহাড়। তার মধ্যে কোশলবাড়ি, তার বাদে।
বাঘারু এবার হেসে উঠে বুড়িয়ালের ওপর পিঠ নাচিয়ে ফেলে প্রায়। গয়ানাথের মুখটা তার চোখের সামনে ভাসে। এই ফরেস্টটা গয়ানাথের, বাথানটা গয়ানাথের, বাঘারু গয়ানাথের। কিন্তু গয়ানাথ যদি এখন এই ফরেস্টে, এই বাথানে, এই বাঘারুকে খুঁজে নিতে চায়? খ্যাক খ্যাক করে কোমর নাচিয়ে এমন হাসতে হয় বাঘারুকে! শালো, কোটত খুঁজিবে মোর দেউনিয়া, মোক? আর এই বাথানক?
এটা একবার মনে হওয়ার পর হাসি আর যেন থামতে চায় না বাঘারুর। শেয়াল ডাকার মত খ্যাক-খ্যাক করে হেসেই যায়। বাঘারু ত এমন কিছু বলতে পারে না, যা দেখতে পাচ্ছে না। বাঘারু ত এমন কিছু ভাবতে পারে না, যা সে দেখতে পাচ্ছে না। বাঘারু ত এমন কিছু ভাবতে পারে না যা সে তার শরীর দিয়ে করতে পারে না। তাই বাঘারুর এমন হাসি, এমন থামতে না-চাওয়া হাসি। কারণ, তখন ত সে দেখতে পাচ্ছে গয়া-দেউনিয়াকে, হুই ডাইনাং ব্রিজের উপর, এদিক চাহে, জঙ্গল, ঐ পাখে চাহে, নদী, হু-ই পাখে চাহে পাথর, হেই পাখে চাহে বালুবাড়ি। গয়া-জোতদার জানে এইঠে তার বাথান থাকে। কিন্তু ব্রিজঠে নামিবার পথ পায় না। ত খুঁজ কেনে, খুঁজ। ব্রিজের উপর, আস্তার উপর তোর বাথানখান খুঁজ।
এই দৃশ্যে বাঘারুর হাসি আর থামতে চায় না যে বাথানের সঙ্গে বাঘারু কেমন ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর গয়ানাথ তার নিজের জঙ্গলবাড়ি আর বাথানবাড়ি আর বাঘারু মাইষ্যালক খুঁজি পায় না, খুঁজি পায় না।
খুঁজু কেনে, খুঁজ, খুঁজি-খুঁজি দেখ, কোটত গেইল তোর মাইষ্যাল আর বাথান, বাঘারু দেখে তারা তখন চালতা বনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, আরে রে রে, রররররর আওয়াজ তুলতে-তুলতে বাঘারু উঠে বসে। বুড়িয়ালের পিঠে পা দু-দিকে ঝুলিয়ে বসা যায় না, পেটটা এত চওড়া। বাঘারু মোষের উল্টোদিকে মুখ করে, তাই তাকে বা পা তুলে নিতে হয়। ততক্ষণে বুড়িয়াল থেমে গেছে। বাঘারু বুড়িয়ালের ওপর উঠে দাঁড়ায়। আর পাকা চালতা খোঁজে। ওপরের ডাল ধরে, টর ররর আওয়াজ দিতেই বুড়িয়াল খুব ধীরে হাঁটে। বাঘারু তিন-চারটি চালতা পেড়ে, বুড়িয়ালের পিঠে এবার মুখ সোজা করে বসে, টর দিতেই বুড়িয়াল আবার চলতে শুরু করে। হাত বাড়িয়ে বুড়িয়ালের অন শিংটার আগায় মেরে বাঘারু চালতাটা ফুটো করে নেয়, তার পর হাত দিয়ে ছেলে। পাকা চালতার গন্ধে তার জিভ জলে ভিজে যায়। ডান পা মুড়ে রাখায় মোষের পিঠে যে ফাঁকাটা তৈরি হয় তার ভেতরে বাকি চালতাগুলো রেখে বাঘারু দুই হাতে পাকা চালতা তার মুখগহ্বরে ঠেসে ধরে আর সেই রসে মুখ ভরে যায়। সেই স্বাদে ও গন্ধে হঠাৎই বাঘারুর মনে পড়ে যায় পাকা চালতা বনে হাতির পাল আসে। সে। একবার চোখ তুলে তাকায় এদিক-ওদিক।
.
বাঘারু তার গলাটা সোজা করে সেই পাখির ডাকটা ওঠে আচমকা-অ-অ-অ-অক, ক-অ-অক। ডাকটার সবই হয়, কিন্তু বাঘারুর নিজেরই মনে হয়, কেউ.একজন নকল করে ডাকছে। হয়ত বাঘারু নিজেই অমন ডাকছে বলে তার তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু বাঘারু কি আর ঐ পাখিটার মত কাপিকাঁপ উঠিছে, শরীরের গরমত? তবে বাঘারুর ডাকে শরীরের সেই কাঁপন আসবে কোত্থেকে। বাঘারু আরো একবার সেই পাখিটার ডাক ডাকে–ক-অ-অ-অক, ক-অ-অক। শেষের কৃ-টা যেন শোনাই যায় না, এমনই গভীর খাদে নেমে যায়। ঐখানটাতেই মনে হয়, পাখিটার শরীর কাপি কাঁপ উঠিছে। কিন্তু বাঘারু একবার দেখতে পাবে না, পাখিটাকে, একবার দেখতে পাবে না?
হে-এ-ই, হে-ই, হে, হে, হে-ই, বলতে বলতে বাঘারু সোজা হয়ে বসে আর বুড়িয়ালের পেটে গোড়ালি দিয়ে খোঁচা মারে। বুড়িয়াল হনহন করে চলতে শুরু করে আর বাঘারু দুলে-দুলে ওঠে। হে-এই, হে-ই, হে-হে, বাঘারু বুড়িয়ালের পেটে গোড়ালি দিয়ে আরো এক খোঁচা মারে, তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, সেই ওয়ালি পাড়া (ফাঁড়) সেই ভর-পোয়াতি মইষানিকে ঐ দিকের জঙ্গলটাতে এমন ছুঁসাচ্ছে যে মইষানিটা পড়ে যাবে, এখুনি, আর, পড়ি গেলে ত ঐটা আরো খতম করিবে। হে-ই ভোখা, ভোখা, বাঘারু ততক্ষণে বুড়িয়ালের দুই শিং ধরে উঠে দাঁড়িয়েছে। বুড়িয়ালের পিঠে খাড়া বাঘারুর মাথায় নিচু ডালপালা দুটো-একটা লাগছে। বাঘারু একবার ডান হাতে, একবার বা হাতে সেগুলো, সরিয়ে-সরিয়ে দিচ্ছে। কখনো শিংটা ধরছে। কখনো ধরছে না। ভোখা বহু সামনে কোথাও ছিল। বাঘারুর ডাক শুনে ছুটে এদিকে আসতে-আসতেই তার নজরে পড়ে যায় সেই পোয়াতি মইষানিকে ওয়ালি পাড়াটা জঙ্গলের ভেতর এমন উঁসিয়ে তাড়া করছে যে মইষানিটা মাটিতে পড়ে গেল আর-কি। বাঘারু দূর থেকেই ভোখাকে চিৎকার করে বলে, সিও, সিও। ভোখা ঐ দৌড়ের মধ্যে মুহূর্তে থেমে যায়। আর তার পরই তার বয়ে বেঁকে, ঘুরে, একটু পেছনে, সেই ওয়ালি পাড়াটার দিকে ধেয়ে যায়। জায়গাটায় পৌঁছে লোখা প্রথমে একই বেগে ওয়ালি আর মইষানির মাঝখানে ঢুকে যায় চিৎকার করতেকরতে। কিন্তু ওয়ালি তার শিং নাড়া দিতেই মইষানির পেটের ভেতর দিয়ে বেরিয়ে উল্টো দিকে গিয়ে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ার মত ভঙ্গি করে ও চিৎকার করে পাড়াটাকে ঠেকাতে চায়। পাড়াটাকে যে, ভোখার দিকে দুবার শিং নামাতে হয় তাতেই মইনি নিজের পায়ে সোজা হয়ে একটু সরে যাওয়ার সময় পায়।
ততক্ষণে পিঠে বাঘারুকে নিয়ে বুড়িয়ালও অনেকখানি এগিয়ে এসে পড়েছে। বনের ভেতর কোনো-একটা পথ দিয়ে ত আর পুরো বাথানটা যাচ্ছিল না। একটা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এদিক-ওদিক ঘুরছিল, খাচ্ছিল। তাই বাঘারুর চোখে যখন পড়ে ঐ পাড়াখান ঐ মইষানিকে নিয়ে কী শুরু করেছে তখন সেদিকে ছুটে যেতে ও একটা জায়গায় পৌঁছতেও ত তার সময় লাগে।
বাঘারুর চিৎকার, ভোখার ছোটাছুটি ও চিৎকার, আর শেষে বাঘারুকে নিয়ে বুড়িয়ালের ঐ ছোটায়, কাছাকাছির সব মোষই ঘাড় তুলে তাকায়। যে-মোষগুলো দূরে বা আড়ালে চলে গেছে, দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু শুনতে পেয়েছে, সেগুলোও দূর থেকে আ-আ-আঁক আ-আ-আক ডাকতে শুরু করে দিয়েছে। ফলে বুড়িয়ালের পিঠে বাঘারু সেখানে পৌঁছুবার আগেই ঐ জায়গাটাতে একটা চেঁচামেচি হৈ-হল্লা শুরু হয়ে যায়। বুড়িয়াল তার কর্তব্য অনেক আগেই বুঝে যায়। আর সে কর্তব্য শুধু তার এতদিনের অভিজ্ঞতা আর শক্তির জোরেই ঠিক করে তা নয়। তার চওড়া পিঠে যেসওয়ার দুই শিঙের মাঝখানে শালগাছের মত খাড়া, তার সাহস, শরীর ও শক্তির জোরেও সাব্যস্ত হয়। বুড়িয়ালের এত চওড়া পিঠ, এমন খাড়া শিং আর এই চিতনো বুক এমন সওয়ার তার যৌবনে পায় নি। তার চারপাশের দুনিয়ায় এই সাহস, শরীর ও শক্তি মেপে মেপেই ত পশুকে তার জন্ম থেকে স্বেচ্ছামৃত্যুর বার্ধক্যে পৌঁছুতে হয়।
এত দূর থেকে ছুটে আসার ফলে তার অত বড় শরীরে যে-গতিবেগ তৈরি হয়ে যায়, তা একটুও শ্লথ হতে না দিয়ে বুড়িয়াল বাঘারুকে পিঠে নিয়ে সেই পাড়া আর মইষানির মাঝখানে ঢুকে যায়। বাঘারু চিৎকার করে চলে,তার পক্ষে যতটা জোরে সম্ভব, হে-ই, হে-এ-ই, হে-এ, হেট হেট, হৈ-ই। বাঘারু আর বুড়িয়াল পৌঁছে গেছে দেখে ভোখাও জোর পেয়ে প্রায় পাড়ার গলার তলা পর্যন্ত চলে যায়–ঘেউ-ঘেউ করতে করতে। একসঙ্গে এত দিক আক্রমণে পাড়াটা ওর শিং বাতাসে তুলে ঘাড়টা ঘুরিয়ে নেয়–মইষানিকে ছেড়ে দিয়ে।
বুড়িয়াল যে এই রকম দুই মোষের মাঝখানে ঢুকে যাবে, বাঘারু তা ভাকে নি। সে ভেবেছিল, গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বুড়িয়াল তাকে নামিয়ে দেবে। কিন্তু কাছাকাছি এসেই বুড়িয়াল যখন তার গতিবেগ বাড়িয়ে দেয়, বাঘারু আর তার পিঠ থেকে নামে না। বাঘারুও বোঝে, বুড়িয়াল এই চেহারায়, আর শিঙে, তার গায়ের জোরে ছুটে দুটোর মাঝখানে যদি পড়ে, তা হলে ঐ পাড়াটাকে প্রথমে পেছুতেই হবে। একবার পেছুলে আর এগনো যায় না। এত কিছু ভাবা সত্ত্বেও বুড়িয়ালের পিঠের ওপরে বাঘারু কিন্তু ডান শিং ধরে ডান দিকেই ঝুঁকে থাকে, যাতে, যদি ঐ পাড়া বুড়িয়ালকে আক্রমণই করে, বাঘারু ডাইনে লাফিয়ে পড়তে পারে।
পাড়াটা শিং উঁচিয়ে ঘাড় ঘোরাতেই ও বুড়িয়াল ওদের দু জনের মাঝখান দিয়ে পেরিয়ে যেতেই বাঘারু লাফিয়ে নীচে নামে। মাটিতে হাত বাড়িয়ে যে-ডালটা পায়, সেটাই কুড়িয়ে দুই হাতে তুলে, শালো বলে, সরাসরি সেই পাড়ার বা চোয়াল মারে। ডাল ভেঙে যায়। নিজের হাতের টুকরোটা ফেলে দিয়ে বাঘারু ছুটে আর-একটা ডাল তোলে। বাঘারুর ঐ হাতের পুরো একটা মার ঐ পাড়ার পক্ষেও সহ্য করা সম্ভব নয়। সে তার মুখটা আরো বায়েই ঘোরায়। ততক্ষণে বাঘারুর হাতের ডাল পুরো জোরে আছড়ে পড়ে কিন্তু চোয়ালটা তোলা ছিল বলে এবার একেবারে মুখের ওপরে। পাড়া দু পা পেছিয়ে গিয়েছিল, সামনের পা দুটো একটু উঁচু করে, গলা তুলে, মুখ বাঁচাতে। দ্বিতীয় মারটা খাওয়ার পর মুখ না নামিয়েই যেটুকু ঘুরতে পারে ঘুরে সে ছুট লাগায়। বাঘারু তার পেছন-পেছন কয়েক পা ছোটে, তার পর, শালো, যা কেনে, অরনার (বুনো মোষ) গুতা খাওয়ার তানে যা, বলে দাঁড়িয়ে পড়ে। তোখা সেই পাড়ার পেছনে-পেছনে ছুটতেই থাকে।
বাঘারু এইবার সেই মইষানিটার কাছে আসে। মইষানিটা এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে ছিল। কোথাও জখম হয়েছে কিনা দেখতে বাঘারু শিং ধরে-ধরে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মুখটা দেখে, চোখ দুটো দেখে। তার পা ডাইনে বায়ে ঘুরিয়ে চোয়াল আর গলার সংযোগস্থলের নরম মাংসের জায়গাটা দেখে নেয়। মোষের শরীরের অন্য কোথাও লাগলে কিছু যায়-আসে না।
বাঘারুর হাতের ছোঁয়া পেয়েই মইষানিটার যেন আত্মাদ হয়ে যায়। সে তার গলাটা ক্রমেই উঁচুতে তুলতে থাকে, আস্তে-আস্তে। ছোট মইষানি। গলা অতটা বাড়ালে বাঘারুর মাথা ঘেঁয়। বাঘারু তার গলকম্বলে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, হয়, হয়।
কাছেপিঠের মোষগুলো বুঝে নেয় ব্যাপার মিটে গেছে। ততক্ষণে তারা কেউ-কেউ বসে পড়েছে, যেন এখানে অনেকক্ষণ থাকা যাবে। কেউ-কেউ দাঁড়িয়ে থাকে, চুপচাপ। কেউ-কেউ মাটিতে গন্ধ শোকে আর ঘাসে মুখ দেয়।
বাথান আবার বাথানের মত হয়ে গেছে।
বাঘারু একটু হেঁটে দেখার জন্য এগিয়ে যায়।
.
আওয়াজ শুনে বাঘারু বুঝতে পারে, কোথাও খুব কাটাকুটি চলছে। ফরেস্টে আওয়াজ শুনে দিক ঠিক করা অসম্ভব। কিন্তু বাঘারু জানে, কাঠ কাটতে হলে বা দিকের বনটাতেই হবে। ঐখানে একটা রাস্তা আছে, ফরেস্টের তেভরের রাস্তা যেমন হয়, পাথর বেছানো, কিন্তু তার ওপর পাতা পড়ে-পড়ে নরম হয়ে আছে। ঐ রাস্তা দিয়ে ট্রাকগাড়ি ভেতর পর্যন্ত আসতে পারে। বাঘারু সেদিকেই একটু এগয়, দেখতে।
ফরেস্টের যেসব জায়গায় অনেক গাছ অনেক দিন ধরে কাটা হয়, সেখানে তলার জঙ্গল কেটে সাফ করে নেয় আগে। এই সব জায়গা বেশ অনেক দূর থেকে দেখা যায়। বাঘারু তেমনি দেখতে পায়, তার সামনের অনেকখানি জঙ্গল পেরিয়ে, অনেকগুলো তোক মিলে গাছ কাটছে। গাছ কাটছে না, কাটা-গাছের ডালপালা ছাঁটছে। হই-হাই আওয়াজ, কুড়ল চালানোর, এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। বাঘারু ওখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই দেখে।
দাঁড়িয়ে থাকে বলেই দেখে, শুধু ডালপালা ছাঁটা হচ্ছে না, হাঁটার পর ঐরকম আস্ত গাছের গায়ে দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাঘারু একটা গাছ একটুখানি টানতে দেখে। কী ভাবে টেনে নিয়ে যায়, সে আর বাঘারু নতুন করে কী দেখবে। ওদিকে কোথাও হয়ত ট্রাকগাড়িটা আছে।
কিন্তু অত জন লোক মিলে বাঘারুকে দেখছে। প্রথমে যে-যার মত দেখে নিয়ে, এখন বারেবারে ঘুরেফিরে দেখছে। দেখারই ত কথা। এমন বনে বাঘারুর মত একা মানুষ! বাঘারুর কোনো মোষ ত তার আশেপাশে নেই। থাকলে, ওরাও অত দূর থেকেই বুঝত, বাঘারু কে।
শেষ পর্যন্ত ওরা এত বেশি দেখতে থাকে বাঘারুকে যে বাঘারু আর দাঁড়ায় না। কিন্তু ফিরে আসার জন্যে ঘুরতেই ঐ-জায়গা থেকে হাঁকাহাঁকি শুরু হয়ে যায়, হে-এ-ই, এই, শুনো, এই, শুনো। ডাকটার মধ্যে এমন একটা তাড়া ছিল যে বাঘারুর মনে হয় দাঁড়িয়ে পড়াটা ঠিক নয়। বাঘারু একটু তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করতেই শোনে তার পেছনে কেউ ছুটে আসছে। বাঘারুও দৌড়বার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে ফেলে, খাকি পোশাকে, ফরেস্ট গার্ড। সে দাঁড়িয়ে পড়ে।
তাকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে ফরেস্ট গার্ডটাও আর দৌড়য় না। হাটে। কিছুটা হেঁটে এসে, সম্ভবত যখন সে বাঘারুকে সম্পূর্ণটা দেখতে পায়, তখন, আর হাটেও না। ওখানেই দাঁড়িয়ে হাত তুলে বাঘারুকে ডাকে।
যেখানে কাঠকাটা চলছিল সেখানকার লোকজন তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে। বাঘারু ফরেস্ট গার্ডের দিকে এগিয়ে যায়। ডায়নার এই জঙ্গলে আসার পর এমন একা-একা বাঘারুকে প্রায় কোনো সময়েই এত অচেনা মানুষের সামনে বিদেশীয়ার মত দাঁড়াতে হয় না। সঙ্গে ত তার বাথান থাকেই। সবাই ত তাকে দেখেই মইষ্যাল বলে চিনতে পারে। বাঘারুর নিজের অবাক লাগে যে এরা তাকে চিনতে পারছে না। মাত্র এই কটা দিনেই এই পরিচয় তার নিজের কাছে এত পরিচিত ঠেকে! বাঘারুর কাজের পরিচয়টাতেই সে নিজে এত অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে সেই পরিচয় ছাড়া এই একজনের সম্মুখীন হতেও তার সঙ্কোচ হয়?
বাঘারু যতই তার কাছে আসে, ফরেস্ট গার্ড ততই বাঘারুকে সম্পূর্ণ করে দেখে। আর, বাঘারু তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে, দেখার আর-কিছু বাকি থাকে না। ফরেস্ট গার্ড তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে, একটু পরে জিগগেস করে তুমি, এইঠে কোটত আসিলেন?
মোর বাথান আছে, ঐঠে।
বাথান! কার বাথান?
গয়ানাথ জোতদারের।
অ। কোটে এ্যালায় তোমার বাথান?
হু পাকে, বাঘারু হাত তুলে একটা নির্দেশ দেয়।
এইঠে কী করিছেন?
কিছু না।
বাথান ওইঠে। আপনি এইঠে। কিছু না?
না। ঐ পাকে শুনিলাম গাছ কাটিবার আওয়াজ তাই
তাই কী?
দেখিবার আইচছি, কায় কাটে, কী কাটে।
রাতিত কোটত থাকেন? এইঠে?
ডাইনাং নদীর চরত—
অয়। ঠিক আছে। গার্ডটি যেন আশ্বস্ত হয়, আজ তাড়াতাড়ি চলে যাবেন এইঠে।
চলি যাম? এ্যালায়?
ফরেস্ট গার্ডটি আকাশের দিকে তাকায়, তাড়াতাড়ি যাবেন, গিরহন (গ্রহণ) নাগিবে।
গিরহন? আজি? এ্যালায়?
হ্যাঁ। ধরো কেনে দুই দুপরের বাদে।
দুপুর ত হয়্যা গেইল না?
ফরেস্ট গার্ডটি আবার আকাশের দিকে তাকায়, না, এ্যালায়ও বাকি আছে।
না, মুই এ্যালায়ই যাছি। মোর নামিবার টাইম নাগিবে। গিরহন নাগিবে?
আজি?
ফরেস্ট গার্ডটির সঙ্গে বাঘারুর কথাবার্তা যখন চলছে তখন কাঠকাটার লোকজনের ভেতরে একজন এগিয়ে আসে। তার পোশাকআশাকে বোঝা যায় কাঠকাটার লোক সে নয়, তার লোকরাই কাঠ কাটছে–কনট্রাক্টার। সে কথাবার্তা শুনে গার্ডকে বলে, এর কাছে ত মোষ আছে।
হ্যাঁ। মোষের বাথান।
আমাদের গাছগুলো টেনে দিক না। পয়সা যা লাগে দেব। তা হলে, কাজটা তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। গার্ডটা এই কথা শুনে বাঘারুকে জিজ্ঞেস করে, কী? করিবু?
কী?
তোর মহিষ দুই-চারিখান নিগি আয়। এই গাছগিলান ঐঠে টানি দিবেন।
পাইসা পাবেন। পাইসা।
আপনি যে কহিলেন গিরহন নাগিবে। মোর ত বাথান নিগি নামি যাবার নাগিবে, ডাইনাং-এর চরত। নীচে।
আরে স্যালায় ত ইমরার এ্যানং তাড়াতাড়ি। ই মানষিলা গিরহনের আগত–বন ছাড়ি চলি যাবার চাহে। কাটা-গাছ গিলাকি ফেলি যাবে? এইঠে? কাঠচোরলা চুরি করি নি যাবে না? তুই কাঠচোর?
মুই কাঠচোর না হই। ত নিগি আসিম? মহিষ?
গার্ডটি এবার কনট্রাক্টারকে জিজ্ঞাসা করে, কী? আনিবে? কনট্রাক্টার বাঘারুকে জিজ্ঞাসা করে, কতদূরে তোমার মোষ?
ঐ ত হু পাকে, হু পাকে।
আনিবার পারিবু? ঝট করি?
এ্যালায়, যাম। নিগি আসিম। কটা নাগে বাবু আপনার?
আরে দু-চারটে আনলেই হবে। আমাদের আর বেশি গাছ ত বাকি নেই। টেনে ঐ দিকের নালীটাতে ফেলে দেবে, তার পর আমরা ঢাকাটাকা দিয়ে চলে যাব। কাল সকালেই ত আবার আসব। আজকের রাতটার জন্যেই একটু সাবধান হওয়া।
ও। এইঠে টানি ঐঠে ফেলিবার নাগিবে? ট্রাকত তুলিবার নাগিবে না? মুই আসিছু এইঠে, খাড়ান, বাঘারু যাবার উদ্যোগ করতেই ফরেস্ট গার্ডটি বলে, তুই থাকি যা না আজিকার রাতটা, এইঠে, বাথান নিয়ে, কাঠ পাহারা দিবু। পাইসা পাবু।
বাঘারুকে একটু চিন্তা করতে হয়। না, বাবু, মুই না পারো।
কেনে? পাইসা পাবু।
না বাবু। গিরহন নাগিবে। বনত মোর মোষগুলোর কী হয়, না-হয়।
কী আর হবে? থাকি যা, থাকি যা।
বাঘারুকে যেন প্রায় রাজিই হয়ে যেতে হয়। তখনই তার মনে পড়ে যায় সকালেই দুধের গাড়ি আসবে।
না বাবু। মুই থাকিবার না পারি। সকালত দুধের গাড়ি আসিবে। দুধ দুহি দিবার নাগিবে। মুই মোর মহিষ আনিছু। টানি দিম আপনার গাছ। খাড়ন। আনিছু। বাঘারু আর দাঁড়ায় না। ঘুরে তাড়াতাড়ি ছোটে তার বাথানের দিকে। এরা বাঘারুকে দেখতেই পায়, কেমন ছুটে সে প্রথমে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেটাও পেরিয়ে গিয়ে, আরো একটা জঙ্গলের পেছনে আড়াল হয়ে যায়। তার পরই ওরা বাঘারুর গলা শুনতে পায়–এই, ট র-এ টর-এ।
এই আওয়াজগুলো বারকয়েক নানা রকম হয়ে ওঠে, নামে, আবার ওঠে, আবার নামে। তার পর আর ওঠেই না। কিন্তু একটু পরেই দেখা যায় বাঘারু একটা মোষের ওপর বসে, আর তার পেছনে আরো তিনটি মোষ! বাঘারু একবার এসেছে ও একবার গেছে যে রাস্তা বানিয়ে, সেটা যেন তার কতই চেনা হয়ে গেছে। চার মোষ নিয়ে বাঘারু সেই চেনা রাস্তায় সব দলে চলে আসে। চলে আসে একেবারে কাঠকাটাইয়ের দলের মাঝখানে।
কাঠকাটাইয়ের দলের লোকসংখ্যা কম নয়। একদল কাটা গাছের ডালপালা সাফ করে। আর একদল সেই সাফ করা গাছ টেনে নিয়ে যায়। কিন্তু চার-চারটি মোসহ বাঘারু এখানে এসে গেলে মনে হয় বাঘারুই যেন জায়গাটিকে ভরে ফেলল–এতক্ষণের লোকজনকে তুচ্ছ করে। বাবু, দড়ি নেন, দড়িবাঘারু মোষের পিঠ থেকে নেমে বলে। আর সবাই কাজ থামিয়ে বাঘারুর কাজ দেখতে শুরু করে।
বাঘারু সেই ওয়ালি পাড়া-টাকে এনেছে, বুড়া বলদ মোষ দুটোকে এনেছে আর তাগড়া মইষানি এনেছে একটা। বাঘারু দড়িটার একটা দিক শোয়ানো গাছের মাথায় বেশ খাজ বুঝে বাধে। আর-একটা দিক বেঁধে দেয়, দুটো মোষের বুকের নীচে, পায়ের ওপরে। বেশি দূর ত আর টানতে হবে না। একটু দূরেই লম্বা নালীর মধ্যে ফেলতে হবে। ওর পাশে নিয়ে ফেললেই লোকজন ঠেলে গড়িয়ে দেবে। এখানে ত আর জোয়াল নেই। বুকের ওখানে বেধে দিলেই, যেন গলায় ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এমন ভাবে টেনে নিয়ে যেতে পারবে। দুটো মোষের মাঝখানে গাছটাকে একটু উঁচু করে দিতে হয়, মাটি থেকে।
বাঘারু সেই পাড়াটার সঙ্গে একটা বুড়ার, আর মইষানিটার সঙ্গে আর-একটা বুড়ার জোড় করে দেয়। দুটো জোড়ের গলায় গাছটা বেঁধে দিয়ে সে টররর দিয়ে পেছনে দাঁড়ায়। ফরেস্টের জমির ওপর দিয়ে কোনো কিছু টেনে নেয়া অসুবিধে। উঁচু-নিচু, কাটাগাছের গোড়া, গর্ত, এই সবে আটকে যায়। বাঘারু এদের পেছনে-পেছনে থেকে একবার একটার বাধা সরিয়ে দেয়, আরেকবার আরেকটা আটকে গেলে ছাড়িয়ে দেয়।
এমন ঠেকে-ঠেকে গেলেও, দড়ির ফাঁসে ঝুলিয়ে যে-গাছ নিতে জনা ছ-আট মানুষের আধ ঘণ্টা-পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগে যায়, বাঘারু তার জোড়ামোষে তা নিয়ে যায় অর্ধেক সময়ে, তাও আবার একসঙ্গে দুটো। ফলে, দুবারে চারটি গাছ সরানোর পরেই সমস্ত ঘটনাটা যেন বাঘারুর নেতৃত্বে ঘটছে এমনই দেখায়।
এতক্ষণ বাঘারু আর তার মোষ ছাড়া এই কাঠ-সরানো চলছিল কী করে?
বাঘারু এখন তার পুরো বাথান নিয়ে ফরেস্টের চড়াই ছেড়ে নদীর বুকে নেমে আসছে অতি দ্রুত। বুড়িয়ালের পিঠে সে বাথানের প্রায় শেষে। হাঁটু মুড়ে বসে সে একবার ডাইনে, একবার বায়ে, আর-একবার সামনে; শুধু জিভ আর টাকরায় আওয়াজ করে যাচ্ছে–টররর-অ, টররর-অ, টর বর-অ। আর সেই আওয়াজের সঙ্গতিতে সমস্ত বাথান যেন একটা সৈন্যদলের মত সোজা চলে যাচ্ছে বনবাদাড় গাছগাছড়া ভেঙে, ঢাল বেয়ে। ওরা উঠেছিল পাহাড়ের ডান দিক বেয়ে। নামছে পাহাড়ের বা ঢাল দিয়ে। বুড়িয়াল বুঝে যায়, বাথানকে তাড়াতাড়ি নিয়ে যেতে হবে। সে মাঝে-মাঝে গলাটা সোজা তুলে আকাশে আওয়াজ ছাড়ে-আঁ আঁ আঁ ক, আঁ আঁ আঁ ক! ভোখা, বুড়িয়ালের পাশে পাশে দুলে-দুলে ছুটে-ছুটে চলেছে। বাছুর চারটে মাঝে-মাঝে পেছিয়ে পড়ছে। প্রায় সব সময়ই আছে বাঘারু আর বুড়িয়ালের সামনে। আর, বাঘারু দুই হাত দুই দিকে তুলে বুড়িয়ালের পিঠের ওপর থেকে পুরো বাথানকে তাড়া দিচ্ছে, টররর-অ, টরর-অ।
ঝটত করি চল, ঝটত করি, গিরহন আসিছে, গিরহন, আকাশখান অন্ধকার হয়া যাবে, পাখির দল সঝা হইবার আগত ঘরত ফিরিবেন। বাঘা, হাতি, গণ্ডার আতির (রাত্রির) আগত বাহির হইবার ধরিবে, দিন ফুরিবার আগত বনত আতি নামি আসিবে, টররর-অ, টররর-অ।
বুড়িয়াল এগতে পারে না। সামনের মোষগুলো দাঁড়িয়ে গেছে। গলা উঁচু করে বুড়িয়াল দেখে, কী ব্যাপার। তার শিং ধরে বাঘারু উঠে দাঁড়ায়। দাঁড়াতে হল বলে ভোখা ঘেউ-ঘেউ করে ডেকে ওঠে। কিন্তু তার পরই আবার পায়ে-পায়ে চলা শুরু হয়। গতিটা কমে যায়। বাঘারু বুড়িয়ালের পিঠ থেকে লাফিয়ে নেমে বাথানের মুখের দিকে দৌড়ায়। ভোখা সঙ্গে সঙ্গে তার পিছে ছোটে। বাথান একজোট হয়ে যাওয়ায় ভেতর দিয়ে চলার পথ বন্ধ। বাঘারুকে পাশ দিয়ে ছুটতে হয়।
বাথানের মুখ গিয়ে দেখে ঢালের যে-পাকটা দিয়ে বাথান ডাইনে ঘুরে এই ফরেস্ট আর তলায় নদীর বুকের মাঝখানের জঙ্গলটাতে ঢুকবে, সেখানে একটা বড় গর্ত হয়ে আছে। কিন্তু তাতে কোনো মোষ থেমে নেই। তারা পাশের সরু জায়গাটা দিয়ে সাবধানে পা ফেলে বায়ের মাটি পাথরের দেয়ালে গা ঘষে পেরিয়ে যাচ্ছে। সেই জন্যেই, যত জোরে নামছিল, তত জোরে আর নামতে পারে না। অনেকগুলো মোষ পার হয়ে গেছে। বাঘারু পেছন ফিরে একবার দেখে নেয় কতগুলো বাকি। কিন্তু যেগুলো পার হয়ে গেছে, সেগুলো যদি আলগা হয়ে যায়। আর এর মধ্যে গ্রহণের অন্ধকার শুরু হয়ে গেলে ওগুলো, ভয়ের চোটে এদিক-ওদিক হয়ে যাবে। গিরহনের ভয়, বড় ভয়। বাঘারু লোখাকে সামনের রাস্তাটায় আঙুল দেখিয়ে চেঁচায়, সিও সিও। ভোখা লাফিয়ে সেই গর্ত পেরিয়ে সামনে চলে যায়। ভোখাকে দেখিলে জানিবে বাঘারু আছে। বাঘারু গর্তটার দুদিকে পা দিয়ে দাঁড়ায়। তার পর যে মোষ পার হচ্ছে তার গা-টা একটু ঠেলে রাখে। তাতেই মোষগুলোর ভয় কেটে যায়–হয় বাঘারুর স্পর্শেই, আর নয়ত, ঐ গর্তের পাশে সামান্যতম সাহায্যেই ওদের পেরনোটা সহজ হয়ে যায়। ফলে, তাড়াতাড়িই পার হতে শুরু করে দেয়। পেছনে বুড়িয়ালের হকার শোনা যায়, আঁ আঁ আঁ ক। বাঘারু ঘাড় ঘুরিয়ে আওয়াজ দেয়, এই রো, অ-অ।
সেই পাড়া-টাকে বাঘারু আটকে দেয়। বাথানের মধ্যে থেকে এখন যদি কোনো গোলমাল পাকায়, সরু রাস্তায়? বরং ওটাকে তার সামনা-সামনি রাখা ভাল।
কিন্তু সেই পাড়া আর তার পরে বুড়িয়ালকে পার করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। পাড়াটা তাও যদিবা হেঁচড়ে চলে যেতে পারে–বাঘারু তাকে অন্য দিকের চড়াইটার সঙ্গে ঠেলে ধরে রাখলে, বুড়িয়াল পারে না। তার পেটটা দুদিকেই এত বড় যে ঐ গর্তের পাশ-ঘেঁষা তার পক্ষে অসম্ভব। বাঘারু একবার চেষ্টা করে দুই হাতে সে বুড়িয়ালের একটা দিক তুলে দিতে পারে কি না। কিন্তু বুড়িয়ালের ওজন পাহাড়ের চাইতেও বেশি।
সবগুলো মোষ পেরিয়ে গেছে। সেই বাকের গর্তের সামনে শুধু বুড়িয়াল আর বাঘারু। বুড়িয়াল তার এতদিনের অভিজ্ঞতায় বুঝে যায়–পেছনে একটা কোনো বিপদের তাড়া আছে। বাঘারুর মনে একটা হিশেব খেলে যায়–বুড়িয়ালের ত বাথানে এমনি কোনো কাজ নেই। আর সে একা এখানে থাকলে বাথানের কোনো ক্ষতি নেই। কাল সকালে এসে বুড়িয়ালকে খুঁজে নিলেই হবে। বাঘারু বুড়িয়ালের পিঠে এমন ঠাণ্ডা হাত রাখে যেন সে হিশেব জানা হয়ে যায়। বুড়িয়াল আকাশে মুখ তুলে–আ-আ-আঁক রবে তার সেই ডাক ছাড়ে। বুড়িয়াল আকাশে মুখ তুললে মনে হয়, আকাশই ভেঙে পড়বে।
এদিকে বাথান নীচে নেমে যাচ্ছে। বাঘারু আকাশের দিকে তাকায়, গ্রহণ কি শুরু হয়ে গেল। সে লাফিয়ে ওপরে উঠে ছোটে-মোটা ডাল কয়েকটা পাওয়া যায় কি না। বুড়িয়াল অস্থির পায়ে আকাশে মুখ তুলে বাঘারুর দিকে ঘোরে।
বাঘারু হাতের নাগালে যেকটা ডাল পায়, নিয়ে দৌড়ে এসে গর্তটার ওপর ছড়িয়ে দিয়ে প্রায় শুয়ে পড়ে, দুই হাতে সেই ডালগুলোকে চেপে ধরে ক্যালভার্টের মত করে টাকায় আওয়াজ তোলে, টর–অ, টর–অ।
বুড়িয়াল তার সামনের ডান পাটা আগে দেয়। দিয়ে একটু অপেক্ষা করে। তার পর ডান পাটাকে আরো একটু এগিয়ে নেয়। নিয়ে আবার একটু অপেক্ষা করে। তার পেছনের ডান পাটা তখন গর্তের কাছাকাছি, আর সামনের বা পা মাটিতে শক্ত, পেছনের বা পা, শূন্যে, আর একটু আগে। বুড়িয়াল যেন বাঘারুকে আর-একটু সময় দেয়। ডালগুলোকে আরো জোরে সেঁটে রেখে বাঘারু এবার তার শেষ সঙ্কেত দেয়, টররর-অ, টররর-অ। সঙ্কেত শেষ হতে না-হতেই বুড়িয়ালের সামনে ডান পা-টা যেন পিছলে পেরিয়ে যায় আর পেছনের ডান পাটা ডালগুলোকে ছুঁয়ে কি না ছুঁয়ে চলে যায়।
বাঘারু লাফিয়ে উঠে আসে। বুড়িয়াল দাঁড়িয়েছিল। তার পিঠের ওপর দুই হাত দিয়ে বাঘারু শরীরটাকে ঝোলাতেই সে চলতে শুরু করে দেয়। বাঘারু তার পর বসতে পারে। বুড়িয়াল যতটা সম্ভব ছুটতে শুরু করে। বাথানের বেশি দূর যাওয়ার কথা নয়। বাঘারু একবার তারস্বরে চিৎকার করে ওঠে, হে-এ-এ লোখা। তার চিৎকার শেষ হওয়ার আগেই বুড়িয়াল তার গলা আকাশে তুলে হকার দেয়-আ-আ-আঁক। জবাবে ভোতার ডাক শোনা যায়, কাছেই, বোধহয় বাক দুই নীচে। এখন ত জঙ্গলে নেমে গেছে। ফাঁক-ফোঁকর দিয়ে নদীর বুকটাও মাঝে-মধ্যে দেখা যাচ্ছে। বাঘারু আকাশে তাকিয়ে দেখে, তার সামনে পশ্চিমের পাহাড়ের ওপরে সূর্যটা আর গোল নেই, চাঁদের নাখান খাওয়া গিরহন নাগি গেইল, গিরহন নাগি গেইল, টর বর-অ, টর বর-অ, বুড়িয়াল তার গতি বাড়ায়, যতটা সম্ভব।
সূর্যের দিকে তাকানোর ফলে বাঘারু চোখে অন্ধকার দেখে, কিছু দেখতে পায় না। চোখ বন্ধ করে ফেলে, আন্দাজে বুড়িয়ালের শিং দুটো খোঁজে, ধরতে। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গেই মনে হয় এই সময় শিং ধরলে বুড়িয়ালের নামার অসুবিধে হবে। বুড়িয়াল কানের ঝাঁপট মেরে বাঘারুকে আশ্বাস দিতে থাকে, আর তার দুলুনি বাড়ে।
চোখ বন্ধ রেখেই বাঘারু আ-আ-আঁ– ডাক শুনতে পায়। সে চোখ খুলে ফেলে। একটু অস্পষ্ট, কিন্তু দেখা যাচ্ছে। একটা মোষ ডাকছে। একটা? নাকি পর পর? লোখা? ভোখার ডাক নেই। তা হলে কি ওরাও সূর্যের গ্রহণ দেখে ফেলেছে? বাঘারু জানে সেটা অসম্ভব। আবার সেই আ-আ-আ ডাক। একার। ঐকিয়া (একা) কুন মহিষ ডাকিবার ধইচছে এ্যালায়? পড়ি গেইসে? বাঘারু সামনে দেখতে পায় তোখা দাঁড়িয়ে, গলা উঁচু করে খাড়া, কিন্তু লেজ নাড়ছে। ভয় পায় নি। কিন্তু, কিছু একটা ঘটিছে, ভোখা বোবা বনি গেইছে, তয়? তয়? হঠাৎ বাঘারুর সন্দেহ জায়ে, পোয়াতিটার বাচ্চা হওয়া ধরিল, নাকি? এ্যালায়?
.
বকটা ঘুরেই বাঘারু দেখে যা ভেবেছে, তাই। সেই ভর-পোয়াতি মইষানি পেছনের দুই পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে আর তাকে মাঝখানে রেখে দুই পাশে অন্য মোষগুলো সারি দিয়ে। কয়েকটা মোষ হয়ত আগে নেমে গেছে। এখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে নদীর বুক, ব্রিজ, বাঘারুর সেই পাথর। আর দু-একটা বাক নামলেই তারা নদীতে নেমে যেতে পারত।
বুড়িয়ালের পিঠ থেকে লাফিয়ে নামতে-নামতে বাঘারু একবার দেখে নেয় বাইরে আলোর রঙ মরে এল কিনা। সূর্যে যে গ্রহণ লাগতে শুরু করেছে তা বাঘারু দেখেইছে। আলো মরে আসবে আরো পরে। ছায়া লম্বা হতে-হতে একেবারে কোথায় মিশে যাবে। কিন্তু এখনও শেয়াল বা মোরগ ডেকে ওঠে নি। কোনো রকমে কি ওটাকে আর-দুটো বাক ঠেলেঠুলে নেয়া যায় না? অন্তত নদী পর্যন্ত?
বাঘারু দৌড়ে মইষানিটার কাছে ছুটে যায়। সেটা ঘাড় ঘুরিয়ে আবার সেই একা-ডাক ডাকে। বাঘারু ওর গায়ে, গলায়, মুখে হাত বুলিয়ে পেছনে এসে দেখে, আ-আ-আ, খাইসে, খাইসে, বাছুরের মাথাখান দেখা যাছে, চাদিখান দেখা যাছে। বাঘারু দৌড়ে গিয়ে কিছু গাছগাছড়া ছিঁড়ে এনে তলায় ছড়িয়ে দেয়। বুড়িয়াল এগিয়ে এসে উঁচু থেকে তার সেই মস্ত গলাটা পশ্চিমের পাহাড়ের মাথার দিকে বাড়িয়ে থাকে–যেন পাথরের তৈরি। তার নীচে সেই মইষানি মাটিতে পেছনের পা দুটো ঠুকে আ-আ-আঁ করে আকাশজোড়া ডাক তোলে। বাঘারু তার সেই দুই হাতে মইষানির পা দুটো আরো ফাঁক করে দিয়ে, তার পেছনটা দুই হাতে দুই দিকে ঠেলে ধরে। সেই ফাঁকটা সম্পূর্ণ জুড়ে যায় বাছুরের ছোট গোল মাথায়। মইষানি আবার একটা ডাক দেয়; আঁ-আঁ-আঁ, আর তার সামনের পা দুটোতে ভর দিলে ঘুরে যেতে চায়। বাঘারুর জন্যে পারে না। ফাঁকটাকে আরো একটু বড় করে দিয়ে বাছুরের মাথাটা আরো একটু বেরোয়। কিন্তু এখন বাঘারু ছেড়ে দিলে মাথাটা আবার ভেতরে চলে যাবে। বাঘারু তার শরীরের সমস্ত শক্তি দিলে বাছুরের বেরুবার পথটা আরো একটু ফাঁক করে দিতে চায়, যাতে, বাছুরের মাথাটা অন্তত এইটুকু বেরিয়ে আসে যে সে দুই হাতে সেটা ধরতে পারে। একবার ধরতে পারলে বাঘারু টেনে বের করে আনবে।
ততক্ষণে মইষানির দুই পা বেয়ে রক্ত, জল, আর শ্লেষ্ম গলে-গলে পড়ছে। বাঘারুর দুই হাতের কব্জি থেকে সেই তরল পদার্থ হাত গলে কনুই পর্যন্ত গিয়ে টপ টপ মাটিতে পড়ছে। বাঘারু তার দুই হাতের জোর রাখার জন্যে নিজের দুই পা ফাঁক করে মাটিতে দাঁড়ায় আর সামনে তাকিয়ে দেখে, নদী ও ফরেস্টের ওপর এখনো ছড়ানো আলোতে ছায়া লেগে গেল কি না। চকিতে একবার ভেবে নেয় বাঘারু, বাথানটাকে ঠেলেঠুলে নীচে পাঠিয়ে দেবে কি না, দেখাই ত যাচ্ছে এখান থেকে, সঙ্গে ভোখা যাক, কায়কায় ত চলিও গেইছে। দুই হাতে মইষানির পেছনটা ফাঁক করে ধরে রেখে বাঘারু দুই পাশে তাকায়–তোখা পর্যন্ত চুপচাপ লেজ নাড়ায়, বুড়িয়াল পর্যন্ত খাড়া, সারাটা বাথান সিধা গলা খাড়া করি আছে, ঘাসেও মুখ দেয় না, হকারও তোলে না। এ্যালায় ত বাথানখান বাথান হওয়া ধরিছে। একটা পোয়াতি মইষানি বাছুর দিবা ধইচছে। এইখান ত একোটা কেনা বাথান। গয়ানাথ কিনিছে। এই হাট ঐ হাট ঘুরিঘুরি কিনিছে। বুড়িয়ালখান কেনা। বুড়া বঁড় কেনা। ওয়ালিখান কেনা। তার বাদে ত বাথানও বাছুর হওয়া ধরি। বাছুর হওয়া ধরিলে বাথান বাড়িবে। বাথান চালু থাকিবে। বাছুর হবা ধরিছে। বাছুর। বাথানত বাছুর।
ততক্ষণে মইষানির পেছনের ফাঁকটা বাছুরের মাথায় সম্পূর্ণ ভরে গেছে। এখন বাঘারু ছেড়ে দিলেও, মাথাটা আর ভেতরে ঢুকে যেতে পারবে না। বাঘারু তার বা পা দিয়ে মইষানির তলপেটে একটা ছোট্ট গুলো দেয়, কোথন দে, কোঁথন দে, দে।
সেই গুঁতোতে মইষানি আঁ-আঁ-আঁ-আঁ আর্তনাদ করে ওঠে। সামনের পা দুটো দাপায়। এই মইষানিটা যত চেঁচায় তার গলাটা তত লম্বা হতে থাকে। অন্য মোষগুলো চেঁচায় না, কিন্তু তাদের গলাও ক্রমেই লম্বা হয়। এখন এই জঙ্গলের ভেতর বাঘারুর বা দিকে বুড়িয়ালের বিরাট লম্বা বাড়ানো গলা আর ডাইনে সারি দেয়া মোষের দলের বাড়ানো গলার সারি, আর সামনে তলার সেই নদীর বুক–বাঘারুর মনে হয়, এ্যালায় নাগি যাবে গিরহন, এ্যালায় নাগি যাবে। গেলে যাবে, সেটা আর তত বিপদের নয়। কারণ ফরেস্টের ভেতর থেকে ত সে বেরিয়ে আসতে পেরেছে–কিন্তু এমন জায়গায় মোষের পালটা যদি এলোমেলো হয়ে যায়।
বাছুরের মাথা আরো খানিকটা ঠেলে এসেছে, কিন্তু এখনো বাঘারু দুই হাতে মাথাটা ধরতে পারবে না। বাঘারু তার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে মইষনির ফাঁকের চামড়াটা একটু টেনে দেখে। তারপর দুই হাতের তর্জনী আর মধ্যমা মইষানির ফাঁকের ভেতর ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করে। চামড়ার তলার দিকটা দিয়ে আঙুলগুলো ঢুকিয়ে চাপে বেঁকিয়ে দিতে হয়। মইষানির চামড়া ছিঁড়ে যেতে পারে। গেলে যাবে। এখন সেসব টের পাবে না। দুই হাতের চারটে আঙুল একবার ভেতরে ঢুকে গেলে বাইরের দুই বুড়ো আঙুল বাছুরের মাথায় লাগিয়ে বাঘারু মাথাটা সাড়াশির মত চেপে ধরে।
চেপে ধরেই থাকে। টানে না। একবার পিছলে আঙুল বেরিয়ে এলে আবার ঢোকানো মুশকিল। সেই আন্দাজ বাঘারুকে ধীরেসুস্থে নিতে হয়, ধরা ঠিক হয়েছে কি না, পিছলে যাবে কি না।
নিশ্চিন্ত হয়ে বাঘারু এবার ধীরে-ধীরে টানতে শুরু করে। ধীরে ধীরে টানের জোর বাড়ায়। ধীরে-ধীরে। এখন বাঘারু হাতের দুই তালুর ভেতর মাথাটাকে পেয়ে যায়। তাই তাকে আবার ঠাহর করতে হয় হাত পিছলে যাবে কি না। এখন হাত একবার পিছলে গেলে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে হবে–যখন বেরবার বাছুরই বেরবে। বাঘারু যখন নিশ্চিন্ত হয় যে তার দুই হাতের মুঠোর ভেতর বাছুরের ঐ একটুখানি মাথা পুরো সেঁটে আছে সে তখন ধীরে ধীরে শরীরের সবুটুকু জোর দিয়ে বাছুরটাকে টানে। বাঘারুর যেন হিশেব আছে, কখন, কত ধীরে, আর কখন, কত তাড়াতাড়ি, টানলে, পেটের ভেতরের আস্ত একখান বাছুর জলেরক্তে ভিজি বাহির হয়্যা আসি দুই ঠ্যাঙত খাড়া হবার পারে। সেই মুহূর্তে আকাশে, লক্ষ-লক্ষ গ্রহনক্ষত্রের অসংখ্য আকর্ষণ-বিকর্ষণে তৈরি অগণন কক্ষপথের সাপেক্ষতায় সূর্যের যে আঁধারপাত ঘটে যাচ্ছিল সেকেন্ডেরও ভগ্নাংশের নির্ভুল মাপে, বাঘারুর হাতের মাপ ছিল তার চাইতেও নির্ভুল।
মাথার অনেকখানিই বেরিয়েই এসেছিল। বাঘারু এখন কপাল পেয়ে যেতে পারে দুই হাতের মুঠোয়। বাছুরের শরীরের আর এই মইষানির পেটের প্রত্যেকটা খুঁজ বাঘারুর এমনই জানা যে সে বা হাতটাতে বাছুরের ঘাড়টা ধরে একটু কোনাচে করে নেয় আর ডান হাত দিয়ে মাথাটাকে একটু বায়ে ঘোরাতেই কপাল পেয়ে যায়। মাথা মানেই ত ঘাড় আর কপাল। বাঘারু বা হাতে ঘাড়টা চেপে রেখে, ডান হাতে কপালটা ধরে একবার তলার দিকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে, পরের ঝাঁকুনিতেই ওপরে ঠেললে কপালের হাড়টা.আরো খানিকটা বেরিয়ে আসে। বাঘারুর ঝাঁকুনিতে মইষানি পেছনের একটা পা হড়কে যেতে চায়। কিন্তু সে গেলে যাক, বাঘারু ত এখন তার মুঠো আলগা করবে না। সে মাটির ওপর দুই গোড়ালির চাপ দিয়ে তার শরীরটার ঝোঁক পেছনে ফেলে দুই হাতে ঘাড় আর কপাল ধরে বাছুরের মাথাটা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে চোখের ওপরের হাড়, চোখের পাশের হাড়টা বের করে আনতেই–এটাই মুখের শেষ বাধা-সড়াৎ করে বাকি সরু মুখটা গলা পর্যন্ত বেরিয়ে আসে আর মইষানির পেছনে বাছুরের মাথা ঝুলে থাকে। মইষানি একটু হাল্কা বোধ করে ফেলে হয়ত, সে তার পেছনের একটা পা সরাতে যায়–আর ফাঁক করে থাকতে পারে না। বাঘারু মুহূর্তের সময়ও দেয় না। বা হাতে বাছুরের মাথাটা ধরে রেখে ডান হাতটা তার গলার ফাঁক দিয়ে মইষানির ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। আঙুল নেড়ে দেখে নেয়, মইষানির ভেতরে বাছুরের সামনের পায়ের ভাঁজ ঠিক আছে কি না। তার পর ডান হাতটা দিয়ে পা দুটোকে ভেতরে চেপে দুই হাতে আবার সেই টান দেয়, ধীরে-ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত, বাঘারু পুরো শরীরের ওজন ঝুলিয়ে যেন বাছুরটাকে টেনে বের করে আনবে।
আড়িয়া (ওঁড়ে) বাছুর হলে এই সামনের পা আর কাঁধের জায়গাটাই সব চেয়ে চওড়া আর গাই বাছুর হলে পেছনের পা আর কোমর। বাঘারু বাছুরের মাথাটা ছেড়ে বা হাতটাও ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়, কিন্তু বেশি ভেতরে না, একটু ঢোকাতেই সে ঘাড়টা পেয়ে যায়। বাছুরের মাথাটা বাইরে ঝুল ঝুল করে। আর বাঘারু ডান হাতে মইষানির পেটের ভেতরে সামনের পা দুটো-লেগে-থাকা বুক আর বাইরে বা হাতে, ঘাড় ধরে, মাটিতে দুই গোড়ালির ঠেকনো দিয়ে, ঝুলে পড়ে। মইষানির গলা দিয়ে কেমন একটা গো গো আওয়াজ বেরয়। বাঘারুর বা হাতের আঙুলের গিঠটা মইষানির ফাঁকটাতে ঠেকে যেতেই সে প্রায় একই সঙ্গে বা হাতটা ঘাড় থেকে খুলে আঙুলগুলো সোজা করে টেনে বের করে আনে আর ডান হাতে পুরো টান দেয়। সড়াৎ করে ঘাড়টা বেরিয়ে আসে আর বাছুরের মাথাটা আরো ঝুলে যায়। সড়সড় করে বাছুরের ঘাড়বুক-পা নেমে আসতে থাকে, প্রায় মইষানির হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে পড়ে। কিন্তু সামনের পা দুটো সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসার আগেই বাঘারু বা হাতে ঘাড়টা ধরে আটকে দেয়–যেভাবে গড়িয়ে নামছে, পেছনের পা যদি আটকে যায়। বাঘারু ডান হাতটা আবার ভেতরে ঢোকায়। তখন বাছুরের শরীরটাই নীচে নামার টান পেয়ে গিয়েছে। হড়-হড় করে নীচে নেমে যাচ্ছে। বা হাতে সেটাকে একটু ঠেকিয়ে বাঘারুর ডান হাতে বাছুরের পেছনের পা দুটো একবারেই মুঠো করে ধরতে পারে। তার পর সেই দুই পা ধরে হিড়হিড় করে টেনে নামাতে থাকে। কোমরের হাড়টায় ঠেকে যায়। কিন্তু ততক্ষণে পেছনের পা দুটোর পাতা বেরিয়ে গেছে। একটা ঝাঁকি দিতেই বাছুরের পুরো পেছনটা বেরিয়ে সেই থলির মধ্যে ঝুলতে ঝুলতে নীচে ঘাসের ওপর। বাঘারু হাত দিয়ে বাছুরটাকে শুইয়ে দেয়। মইষানির পেটের ভেতর থেকে ঝিল্লির থলি, জল, রক্ত বেরিয়ে আসতে থাকে।
.
মইষানি তখন থরথর করে কাঁপছে আর বারবার মুখটা পেছনে নিয়ে আসতে চায়। কিন্তু কেন যেন আনে না। বাঘারু এবার সামনের দিকে তাকায়–রোদে কি ছায়া লেগেছে? বাঘারু পশ্চিম পাহাড়ের দিকে তাকায়। পাহাড়ের ছায়াটা কেমন অদ্ভুত ঠেকে, যেমন বাঘারু কখনো দেখে নি। বাথানও তেমনি কিছু বুঝে ফেলে কি না, কে জানে। হঠাৎ অনেকগুলো মোষ একসঙ্গে ডেকে ওঠে। মাটিতে পা ঠোকার আওয়াজ তোলে। ভোখা এতক্ষণ পরে আকাশে মাথা তুলে একটা লম্বা টানা ডাক শুরু করে, বুড়িয়াল তার বিরাট কান দুটো দিয়ে একবার ডান, আর-একবার বা পিঠ ঝাড়ে। গিরহন নাগি গেইল রে, মোর বাথানঠে গিরহন নাগি গেইল।
বাঘারু আর মুহূর্ত দেরি করে না। সে দুই হাতে মইষানির পেটের ভেতর থেকে ঐ রক্ত জলময় লম্বা থলির বাকি অংশ টেনে বের করে। ফুল পড়িল? না, না পড়িল? তার পর নাড়ীটা ছিঁড়ে একটা গিট দিয়ে বাঘারু বাছুরটাকে আলাদা করে ফেলে। ততক্ষণে বাছুর তার পা চারটে মেলে ঘাড়টা তুলছে আর ফেলছে। বাঘারু টাকরায় টর, টর-অ দিয়ে দেয়। সামনের মোষগুলো চলতে শুরু করে দেয়। কিন্তু ওদের শিংগুলো তোলা, লেজটা শক্ত। ডর খাছে? ডর? মোর বাথানত গিরহন আসি গেইল রে, আসি গেইল। বাঘারু টাকরায় আবার আওয়াজ তোলে, টরররর-অ, টরররর-অ, মুখে আওয়াজ দেয়, ঝট কর, ঝট কর, হেঁট হেঁট, টর–অ।
এইসব করতে করতে বাঘারু বুড়িয়ালের গলাটা শুধু একবার ছুঁয়ে দিতে পেরেছে। তাতেই বুড়িয়াল বোঝে তার কিছু করণীয় আছে। সে কয়েক পা এগিয়ে আসে। বিয়ানি মইষানি বাছুর দেখতে না পেয়ে। আঁ আঁ আঁ করে কেঁদে ওঠে।র কেনে। কান্দিবার ধরিস বাদে। বাঘারু দুই হাতে কিছু ঘাসপাতা ছিঁড়ে এনে বাছুরের শরীর থেকে ক্লেদটা মুছে দেয়, মাত্র একবারে যতটা পারে। তার বাথান রওনা দিয়ে দিয়েছে। বাঘারু দুই হাতে বাছুরটাকে কোলে তুলে নেয়। তখনো ত বাছুরটা গর্ভের ভেতরে যেমন ছিল, সেই ভঙ্গিতেই চার পা এক করে ঘাড় নুইয়ে গোল পাকিয়ে আছে। সবে দু-একবার ঘাড়টা তুলেছে মাত্র। এখন বাঘারুর দুই হাতে বাঘারুর বুকের ভেতরে সে সেভাবেই থাকে। যেন বাঘারুর বুক তার দ্বিতীয় গর্ভ। বাঘারু কোলে করে, বুকে করে, দুই হাতে উঁচু করে, বাছুরটাকে তুলে নেয়। নিয়েই বুড়িয়ালকে পায়ের ধাক্কায়, টর-অ দেয়। বুড়িয়াল চলতে শুরু করে। বাঘারু বাছুরটাকে বুকে করে বুড়িয়ালের পাশে-পাশে ছুটতে শুরু করে। ততক্ষণে বিয়ানি মইষানিটাকে ছাড়িয়ে বুড়িয়াল এগিয়ে গেছে। আর বিয়ানি মইষানি বুড়িয়ালের পাশে-পাশে পিছে-পিছে ছুটতে-ছুটতে জিভ বের করে বাঘারুর কোলে বাছুরটার গায়ের যেটুকু পাচ্ছে সেটুকুই চাটছে। তাতে বাঘারুর হাতের অনেকটা চাটা হয়ে যায়।
টর-অ, টররর-অ করে বাঘারু বুড়িয়ালের ডান পাশ দিয়ে ছুটতে থাকে। পুরা বাথান নামি যাছে এ্যালায়, চল, চল, গিরহন নাগিছে, গিরহন নাগি গিসে। চি-ই-রো চি-ই-রো আওয়াজে এক ঝাক পাখি বনের ভেতর থেকে উড়ে এসে, সামনে কোনো অনির্দিষ্ট আশ্রয়ের দিকে ছুটে যেতে গিয়ে, এই দলটাকে দেখে, আচমকা পাক খেয়ে বাঘারুর কোলে সেই নতুন বাছুরের দিকে নেমে, আবার উঠে, বুড়িয়ালের ওপরে একটু নিচু হয়ে, নদীর ওপরে চলে যায়।
গিরহন, গিরহন, পাখিরা বাহির হয়্যা যাছে। ঠুকরিবার পারে, বাছুরক ভোখা, ভোখা। ভোখা পেছন থেকে বাঘারুর ছুটন্ত দুই পায়ের ভেতর মুখ ঢুকিয়ে দেয়। বাঘারু ছুটতে-ছুটতে বুড়িয়ালের পিঠের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ভোখাকে বলে, উঠ, উঠ। বলতে বলতে একটু নিচু হয়, হাঁটুটা ভাজ করে। ছুটতে-ছুটতেই ভোখা বাঘারুর নোয়ানো পিঠের ওপর সামনের দুই পায়ের ভর দিয়ে ওঠে, আর বাঘারু সোজা হতে-হতে লোখা টক করে বুড়িয়ালের পিঠের ওপর উঠে যায়। নিজের পেছনের পা দুটোর ওপর টান-টান বসে পড়ে আকাশে মুখ তুলে ঘেউ-ঘেউ করে পাখি তাড়াতে শুরু করে দেয়। ট র-অ-অ-অ, টর–অ-অ-অ বাথানের একেবারে শেষে বাঘারু, গিরহন নাগি গেইসে, গিরহন নাগি গেইসে, নামি চলল, নামি চললা, ট–অ-অ-অ, ট র-অ-অ-অ।
বাঘারু প্রায় যেন পৌঁছে যায়। সোজা নেমে গেলে ত আর কয়েক পা। তার পর নদীর ভেতর দিয়ে হেঁটে সেই তাদের বাথানের জায়গাটায় পৌঁছতে পারে। কিন্তু বাঘারুদের আর নদীর মাঝখানে এখন সেই খোপ (ঘন ঘাসের জঙ্গল), এ্যালায় তাড়াহুড়ায়, বাথান নিয়া নামা না যায়, হয়ত ভেতরে কোথাও কোনো পাথর আলগা হয়ে আছে, পা দিলেই পিছলে যাবে, বা, ঘাসে ঢাকা গর্তে পা আটকে যাবে। তার চাইতে সোজা যাওয়া ভাল, কে বাঁক ঘুরে। টর–অ-অ-অ, টর–অ-অ-অ।
আলোতে কতটা গ্রহণ লাগল মাপতে বাঘারু ছুটতে-ছুটতে তাকায়। অকাল-গোধূলিতে পশ্চিম পাহাড়ের এক অচেনা ছায়া ডায়না নদীর চরটাকে কোনাকুনি অন্ধকার করছে। সেই দুধের গাড়ি আসে দক্ষিণ-পচ্চিম পাকের যে-জঙ্গল দিয়া, এই একটু উঁচু থেকে দেখা যায়, সেই জঙ্গলের মাথাখান জুড়ি হে-ই মাইল-মাইল ছায়া ছড়ি যাছে হে, ছড়ি যাছে। আলোত কালি নাগি গেইসে, নাগি গেইসে, আন্ধার, আন্ধার, গিরহন, গিরহন–
বাঘারু শেষ বাক নেয়।
পাশে বুড়িয়াল! বাঘারুর কোলে নতুন বাছুর–জলে রক্তে-শ্লেষ্ময় জড়ানো। একবার ঘাসটাস দিয়ে বাঘারু মুছিয়েছিল বলে ঘাস-লতা-পাতা শরীরে সেঁটে আছে, যেন সে-সব জন্মচিহ্ন, ছিটোয়াল মহিষ। বুড়িয়ালের পিঠে খাড়া বসে ভোখা টানা ঘেউ-ঘেউ ডেকে যাচ্ছে। বুড়িয়ালের ধায়ে সেই বিয়ানি-মইষানি–যার বাছুর। বুড়িয়ালের একটু পেছনে, গা ঘেঁষে ছুটতে ছুটতে চলেছে, তার গলাটা লম্বা বাড়িয়ে বাছুরটাকে যতটুকু পারে চাটছে। মইষানির পেছন, পেছনের দুই পায়ের ভেতর দিক, রক্তেজলে থকথক করছে। বুড়িয়ালের ডাইনে বাঘারু। ছুটতে-ছুটতে কখনোও বুড়িয়ালের গায়ে, ধাক্কা লাগে। বুড়িয়াল যেন নতুন বাছুরসহ বাঘারুকে চলমান ঢাকা দিয়ে রেখেছে। ওপর থেকে কিছু, পা থেকে কিছু নতুন বাছুরের ওপর চাপ পড়ে। বাঘারুর থুতনি গলা-বুক-পেট, আর বগল থেকে আঙু পর্যন্ত দুই হাত রক্তেজলে ল্যাদল্যাদ করছে। এই রকম করে ছুটতে ছুটতে ওরা নদীর পাথুরে বুকে ঢুবে যায়।
.
সূর্যের আলো ধীরে ধীরে কমে আসে। জঙ্গল, পাহাড়, পাথরের ছায়াগুলি বদলে যেতে থাকে। আলোতে নরম রঙ লাগে। ডায়নার বুকে অসংখ্য নুড়ি-পাথরের অজস্র রঙের ছায়া লম্বা থেকে লম্বা ছড়িয়ে যায়। কোনো সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তে রঙের এমন কৌণিক প্রপাত ঘটে না। ডায়নার বুকে নুড়ি-পাথরের এইসব রঙিন ছায়ার ওপর বিরাট ছায়াবান পাথরের কালো ছায়া পড়ে।
বাথান এখন বাথানের জায়গায়। কিন্তু কোনো মোষই বসে নি। গায়ে গা লাগিয়ে, গলায় গলা বাড়িয়ে সবগুলো মোষই থমথমে দাঁড়িয়ে যেন নিশ্চিন্ত নয়, তারা ফিরেছে কি না। যেন, তখনই তাদের আবার এখান থেকে সরে যেতে হতে পারে।
বাছুরটা ঐ বাথানের মধ্যে নড়বড়ে পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে আর পা ভেঙে ভেঙে পড়ে যাচ্ছে।
আলো আরো কমে, প্রায় অন্ধকার হয়ে এল। বড় বড় গাছের পাতা কোনাচে। আবছায়া গাছগুলো হঠাৎ লম্বা হয়ে যেতে থাকে। সূর্যের আলোর অভাবে বাঘারুর ঠাণ্ডা লাগতে শুরু করে। সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখে, প্রায় পুরো সূর্যটাই অন্ধকার হয়ে আছে, সুতোর মত এক ফালি বাকি। গিরহন, গিরহন।
পূর্ণ গ্রহণের মুখে মোষগুলো গলা তুলে আঁ আঁ আঁ ডাকতে শুরু করে। লেজ-মাথা দুইই মাটির দিকে নামিয়ে লোখা কান্নার টানা সুর তোলে।
শুধু সেই নতুন বিষয়ানি মইষানি তার বাছুরের গা চেটেই যায়। আর বাছুরটা ঘাড় নড়বড় করতে করতে উঠে দাঁড়ায়। তারপর পা ঘাড় দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে পড়ে। আবার সোজা হতে শুরু করে। এই, এখনই ঘাড় তুলে কয়েক পা ছুটে যেতে না-পারলে যেন ওর জন্ম সম্পূর্ণ হয় না।
বনের ভেতরে ডাল থেকে পাখিদের ওড়ার পাখসাট। ঘাসবনে এক সার জোনাকি জ্বলে জলের মত ঘুরপাক খেয়ে যায়। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হরিণের মত কিছু একপাল ছুটে যায়। গ্রহণের আকাশের অন্ধকার থেকে ঝুপঝুপ নেমে আসে বাদুড়, উড়ে চলে যায়। শেয়াল আর বনমোরগ একসঙ্গে প্রহর ঘোষণা করে দেয়। তাতে, ভোখা মাটির দিকে মুখ নামিয়ে আবার কান্না শুরু করে। আওয়াজটা যেন মাটি খুঁড়ে ভেতরে চলে যাবে। গিরহন, গিরহন, গিরহন পুরা হয়্যা গেইল, পুরা হয়্যা গেইল–তারই পাথরের নীচে, বাথানের মাঝখানে বাঘারু তাকিয়ে আছে, দ্বিতীয় সূর্যোদয় শুরু হয় কখন তার অপেক্ষায়।
প্রথম বার বাঘারু খেয়াল করে না। দ্বিতীয় বারও, অত আওয়াজে যেন পরিষ্কার হয় না। কিন্তু তার পরের বার একেবারে স্পষ্ট, যেন বাঘারুর শোনার জন্যেই, তীক্ষ্ণও। সারাটা শরীর দিয়ে পাখিটা ডাকে, ক-অ-অক, ক-অ-অক। শেষেরটুকু শোনাই যায় না। গলা বুজে আসে। পাখোয়ালখান জঙ্গলের অনেক ভিতরত আছি। এ্যালায় গিরহনের আন্ধার দেখি ছুটি-ছুটি আসিবার ধইচছে। গাওখান ধোকপোকাছেবাঘারু তার না-দেখা পাখির শরীরের সেই বেপথু দেখতে পায়। পাখিটা আবার গাঢ় ও স্পন্দিত স্বরে কুহর দিয়ে ওঠে, ক-অ-অক।
বাঘারুর শ্বাস তখনো স্বাভাবিক হয় নি, ঘাম তখনো মরে নি। হাতপায়ের রক্তক্লেদ তার বোয়া হয় নি। দুটো রক্তমাখা হাত মুখের কাছে তুলে বাঘারু খুব চাপা স্বরে, গলা না তুলে পাখিটার ডাকে সাড়া দেয়। একবার।
পাখিটা আর সাড়া দেয় না। এ্যালায় চুপ করি গেইসে। চুপ করি বসি থাকিবে। বাঘারু আরো একবার ডেকে ওঠে, চাপা, তার ক্লান্ত শ্বাসটায় সেই চাপা খাদের স্বরটা কেঁপে-কেঁপে ওঠে। গলা দিয়ে নয়, বাঘারু শরীর দিয়েই ডাকছে, শরীরের স্বেদ আর শ্বাস দিয়ে। পাখিটা এবার চুপ করে যাবে।
বাঘারু প্রথমে শুনতে পায় না, কিন্তু তার পরই শোনে, চার দিকে গ্রহণের সেই আওয়াজের ভেতর। পাখিটার আরো নরম জবাবি ডাক উঠেছে–ক-অ-অ-অক, ক-অ-অক্। এখন যেন আর পুরোটাও ডাকতে পারে না। ডাকটা তুলতেই গলাটা খাদে নেমে যাচ্ছে। বাঘারু যেন দেখতে পায়, পাখিটা সেই ডালের ওপর দুই পায়ের ভেতর শরীরটা ডুবিয়ে আর ঘাড়ের ভেতর গলাটা টেনে নিয়ে তার দোসরের জন্যে, অপেক্ষায়। কোথায় সে আছে তার সঙ্কেতটুকু জানতে গলা দিয়ে শুধু আওয়াজটা বের করে যাচ্ছে। একবার সে সঙ্কেত জেনে এই অন্ধকারে উড়ে চলে আসবে।
বাঘারুর দুই হাত মুখের কাছে এনে চাপা স্বরে, খাদে, আবার সেই আওয়াজটা তোলে, বুদ্বুদ তোলার মত। বাঘারু আবার ডেকে ওঠে। বাঘারু আবারও ডেকে ওঠে।
দুই হাত মুখের কাছে ধরে ডাকতে-ডাকতে বাঘারু একটু এগিয়ে যায় ডায়নার দিকে। গ্রহণের অন্ধকারে ডায়নার ফেনা পাথর থেকে ছিটকে ছিটকে উঠছে বাঘারু জলে পা দিয়ে ডাকতে-ডাকতে একটু এগয়।
যে বাঁকে নদী ফরেস্টের অন্ধকারের ভেতরে সেঁদিয়ে গেছে-~-উজানে, সেইখানে, বাঘারু দাঁড়ায়। ডায়নার জলের সঙ্গে মিশে, ডায়নার ওপর দিয়ে সেই পাখির কুহর চলে আসতে থাকে। পাখির পুরো শরীরটাই যেন ডাকছে এমন গহন সেই কুহর। বাঘারু তার শুকনো রক্ত-লাগা দুই হাত ঠোঁটের কাছে এনে ডেকে ওঠে গভীর খাদে। সেই ডাকের ভেতর হাপ এসে যায়। বাঘারুও যেন, পাখিটার মতই, পুরো ডাকটা ডেকে উঠতে পারে না। পাখি আর বাঘারুর ডাকাডাকি ঘিরে গ্রহণের অকাল-আঁধার বনজঙ্গলের আওয়াজে ভরে-ভরে ওঠে। এখনই গ্রহণ শেষ হয়ে আবার সূর্যোদয় ঘটবে।
.
সেই সকালে বাঘারু তার বাথান নিয়ে পাহাড়ে উঠেছিল পশ্চিমের চড়াই দিয়ে। এখন বিকেল, বা সন্ধ্যায়, পুবের ঢাল দিয়ে নেমে এল। সূর্যে হঠাৎ গ্রহণ লেগে যাওয়ায় বিকেল বা সন্ধ্যেটা একটু দুবার ঘটে যাচ্ছে, এই যা। নদীর বুক থেকে বাথান নিয়ে বেরিয়ে বাঘারু আবার নদীর বুকেই ফিরে আসে–মাঝখানে তার বাথানে মোষ বাড়ে একটা। এই মিলে বেশ একটা সম্পূর্ণতার ভাব আসে।
এমন কোনো ঘটনাও ত বাঘারুর নেই, যা একটা কোথাও আরম্ভ হয়ে একটা কোথাও শেষ হয়। প্রাকৃতিক কোনো কিছুই ত তেমন হয় না।
বাঘারুর সব ঘটনাই তার আগে থাকতে ঘটে আসছে, আর তার পরেও ঘটে যেতে থাকে। মানবিক সব ঘটনা ত এমুনই ব্যক্তিনিরপেক্ষ।
বাঘারুর সব দিনই ত হুবহু এক। সে ত আর দিন কাটায় না যে একটার পর একটা দিন মিলে তার জীবন তৈরি হবে। বাঘারু জীবন কাটায়, পুরো আস্ত একটা জীবন। একটা দিন ত সে জীবনের অতি তুচ্ছ একটা মাপ মাত্র।
বাঘারুর প্রতিটি দিনই এক-একটা পুরো জীবন। প্রতিটি ভঙ্গিই ত বীরত্বের ভঙ্গি–সে নদী সঁতরানোই হোক আর পাথরে শুয়ে থাকাই হোক, ভোখার সঙ্গে খেলাই হোক আর বুড়িয়ালের পিঠে দাঁড়ানোই হোক। সে মোষের বাচ্চা বের করাই হোক, আর পাখির ডাক ডাকাই হোক।
ভাষা মানেই ত অর্থ। বাঘারুর ত কোনো অর্থ নেই। বাঘারু ত শুধু বাঁচা আর বাঁচা, সে ত শুধু জীবন আর জীবন।
ভাষা মানেই ত কিছু-না-কিছু অলঙ্কার। মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত বাঘারুর সারা গায়ে, মাঝখানে একটা নেংটি ছাড়া, সামান্যতম ঢাকা নেই। বাঘারুর তুল্য এমন নগ্ন ভাষা পাওয়া যাবে কোথায়?
ভাষা মানেই ত নাম। বাঘারুর ত কোনো নাম নেই। সে ত শুধু কাজে কাজে বদলে বদলে যায়কুনিয়া, বাঘারু, পাথরিয়া, মইষাল, তার এই হয়ে ওঠার ত আর শেষ নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন