অন্ত্যপর্ব : মাদারির মায়ের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র

দেবেশ রায়

মাদারির মায়ের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র

হাট থেকে ফিরে মাদারি বলে, মা, কাল জলুশ হবে, হাটত ট্রাক আসিবে।

জলুশ, বা মিছিল হতে পারে, আর মিছিল হলে তা ট্রাক আসেই। লোজন, না-হলে, যাবে কী, করে? মাদারির মার তাই আর-কিছু জিজ্ঞাসার থাকে না। মাদারির আর-কিছু বলারও থাকে না।

হাটের দিন তাদের ঘুমিয়ে পড়তে বোধহয় একটু দেরিই হয়। হাটফেরতা গরুর গাড়িগুলো কঁকাতে কঁকাতে রাস্তা দিয়ে যায়। তাদের যাওয়াও যেন ফুরয় না, কঁকানিও যেন ফুরয় না। সন্ধে থেকে কঁকানি শুরু করে, কতক্ষণ চলে তা মেপে দেখে কে?

মাদারির মার ঘর ফরেস্টের সীমায় রাস্তা থেকে দেখলে ওটাকে ফরেস্টের সীমা মনে হতেই পারে। ন্যাশন্যাল হাইওয়ের পরে খানিকটা জমি তারপর ফরেস্ট। ফরেস্ট ত আর এরকম নদীর মত পাড় মেনে চলে না। কিন্তু সে যা-হোক, এখানে ঐ চাষের জমিটুকুরছাড় থাকায় ফরেস্টটা হাইওয়ের ওপর একেবারে উঠে আসে নি। ঠিক এই জায়গাটাতে মনে হয়, ফরেস্টের সঙ্গে ন্যাশন্যাল হাইওয়ের একটা ভদ্রগোছের দূরত্ব আছে। কিন্তু এর দুদিকেই ফরেস্টের জঙ্গল রাস্তার ওপর এমন উঠে এসেছে যে ভয় হয় সেই জঙ্গল থেকে একটা বাঘ, লাফিয়ে পড়তে পারে, বা, হাতির একটা শুড় এগিয়ে আসতে পারে, বা, গণ্ডার ঠিক ঐ মুহূর্তেই ছুট লাগাতে পারে। এমন গা ছমছম অবস্থা থেকে একটু স্বস্তি জোটে মাদারির মার ঘরের সামনেই, এই জায়গাটিতে। মনে হয়, বা, ভুল হয়, ফরেস্টের হাত থেকে বাঁচা গেল। কিন্তু এই ঢালটা পেরিয়ে একটু উঁচুতে উঠে খানিকটা এগলেই ফরেস্ট আবার রাস্তায় উঠে আসে।

এই ঢালের জন্যেই বোধহয় এই ফাঁকাটা তৈরি হয়েছে। জমির ঢাল ত বোঝা যায় না, রাস্তার ঢাল বোঝা যায়। ঠিক ঐ-জায়গাটিতেই রাস্তাটা বেশ ঢালু হয়ে অনেকখানি নেমে আবার অনেকখানি উঠে, রাস্তার স্বাভাবিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। এই জায়গার পুরো জমির ঢালটাই রাস্তায় ধরা পড়েছে। জমি-জঙ্গল, শালগাছ-খয়েরগাছসহ পুরো জমিটাই এখানে ঢালে নেমে গেছে। তার একটা কারণও আছে। ফরেস্টের ভেতর থেকে একটা ছোট ঝোরা বয়ে এসে এখানে রাস্তা পেরিয়েছে। সারা বছর ঝোরার খাত থাকে, শুধু বর্ষাকালে জল থাকে, বা জল আসে। রাস্তাটা তাই এমন করা যাতে বর্ষার জল ফরেস্টের ভেতর দিয়ে বয়ে এসে রাস্তার ওপর দিয়ে চলে যেতে পারে। রাস্তার অপর দিকে আবার ঝোরার খাত, তাই রাস্তার ওপর কোনো সময়ই জল জমে থাকে না, কিন্তু রাস্তাটা সব সময়ই ভেজা থাকে, শুধু ভেজাই নয়, রাস্তার ওপর দিয়ে সারাটা বর্ষাই তিরতির করে স্রোত বয়ে যায়। ফরেস্টের ভেতর দিয়ে কিছু রোদ মাটিতে এসে পড়লে, বা, রাতে ট্রাকের হেডলাইটে, সেই স্রোতের ছোট-ছোট রেখা বেশ দূর থেকে দেখা যায়। বেশ লোভনীয় দেখা যায়। রাস্তাটাও এই জায়গায় চওড়া, বেশ চওড়া। একটা ট্রাক সাইড করে রাখলেও বাকি রাস্তাটায় দুটো ট্রাক পরস্পরকে সাইড দিতে পারে। অনেক সময় অনেক ড্রাইভার সেরকম করেও। গাড়ি থামায়। গাড়িতে একটু জল ভরে। নিজেরাও নেমে ঝোরার জল একটু চোখেমুখে দেয়, তারপর চলে যায়। স্টার্ট বন্ধ করার মত বেশি সময় নয়, ঐ একটুখানি দাঁড়ানো, তাও ক্কচিৎ।

তবে, শুধু বর্ষাকাল মানেই ত ছমাস থেকে আটমাস। আসলে, জল থাকে না, বা রাস্তাটা ভেজা থাকে না–খুব শীতের ঐ মাস চার-পাঁচ মাত্র। মাদারির মা, রাস্তার ঠিক পাশে, ঝোরার ভেতর থেকে ওঠা একটা শ্যাওড়া গাছের তলায় কয়েকটা পাথর বসিয়ে একটা বেদিমত বানিয়েছে। গাছটা উঠেছে ঝোরাটা যেখানে ফরেস্টের জমি ছেড়ে রাস্তায় পড়েছে ঠিক সেই জায়গাটায়। সাধারণভাবে গাছটা ওখানে থাকার কথা নয়, বা, মাটি ক্ষয়ে গিয়ে অমন সীমান্তে গাছটার চলে যাওয়ার কথা নয়। এমন হতে পারে, ওখানে হয়েছে বলেই গাছটা ওখানে আছে, এর বেশি কোনো কারণ নেই। আর-এক হতে পারে রাস্তা তৈরির সময়ই গাছটা ওখানে ছিল; যারা রাস্তা তৈরি করেছে, তারা ওর গায়ে হাত দেয়নি। শ্যাওড়া গাছ কাটতে নেই। আর, এখানে, রাস্তাটাকে এতটা ঢালু করতে এতটা চওড়া করতে, ঝোরার মুখ আর ঐদিকে ঝোরা যেখানে নতুন ঢালুতে গেছে রাস্তার সেই মুখটিকে, সিমেন্ট বাধাই করতে–রাস্তা-তৈরির লোকজনকে বেশ কিছু দিন এখানে থাকতে হয়েছে। হয়ত সেই কারণেই সামনে এতটা জমি ফাঁকা–হয়ত ওখানে রাস্তা-তৈরির লোকজনের তাবু গাড়া হয়েছিল। এত পোড়া গাছের গুঁড়িও হয়ত সে কারণেই–জ্বালিয়ে রাখা হত, রাতে, হাতির দল যাতে না আসে। রাস্তার উল্টোদিকে পিচ গলানোর জন্যে দুদিকে হাড়িকাঠের মত পোতা দুটো গাছের পোড়া ডাল এখনো পোতাই আছে, তাদের মাঝখানে গর্তের মধ্যে এককালে জ্বালানো আগুনের ভস্মাবশেষ, বা অঙ্গারাবশেষ, চিরকালীন।

মাদারির মা তখন কোথায় ছিল সেটা মাদারির মা-ই জানে না। কিন্তু সে যখন এখানে এসে। ডালপালা পাতা দিয়ে ঘর ছেয়ে বসবাস শুরু করে, তখন তার কাছে, আর, যে কারো কাছেই, জায়গাটা। শ্যাওড়াঝোরা বলেই পরিচিত হয়ে যেতে পারে; ঝোরার মুখে শ্যাওড়া গাছটার একাকিত্ব ঐ নির্জনেও এতই একাকী।

শ্যাওড়া গাছের বয়স বোঝা যায় না-যে-গাছ দেখে মনে হয় চারা, সেটা আসলে কয়েক দশকের পুরনো। এ-গাছটা মোটেই তত তরুণ ছিল না। বরং ফরেস্ট থেকে অতটা আলগা, রাস্তা থেকেও একটু বিচ্ছিন্ন ঐ গাছটাকে চোখে পড়ে যায়, তার অবস্থানের জন্যে ত বটেই, কিন্তু অনেকখানিই তার অবয়বের জন্যে। নইলে, ঐ অবস্থানে গাছটা হারিয়ে যেতে পারত। গাছটা যে শুধু বেড়েই উঠেছে, তা নয়, তার একটা শাখা রাস্তার দিকে এগিয়ে এসেছে। এগিয়ে আসার পর আবার সেখান থেকে একটা শাখা ওপরের দিকে বেড়ে গেছে, একটা মাত্র সরল রেখায়। আর-একটা শাখা নীচের দিকে বেড়ে গেছে, আর-একটু ঝাপটা হয়ে, জলের দিকে। সেটার মাথাটা জলের ওপর দোলে, হয়ত কোনো-কোনো সময় জল ঘেঁয়ও। আর ওপরের ডালের মাথাটা বাতাসে দোলে। এই ফরেস্টে, এই রাস্তায়, এমন একটা কোণে, আকাশে বেড়ে ওঠা কোনো দোলা দেখলেই হাতির কথা মনে না হয়েই পারে না। আবছায়ায়, পেছনে ফরেস্টের একীভূত আঁধার, আর মাথার ওপরে পাতাচেরা আকাশের নীল-ঐ একাকী গাছের শাখার অমন নিঃসঙ্গ আন্দোলন দেখলে হাতি বলে ভয়ও হতে পারে আচমকা। জল, জলে ছায়া, বিচ্ছিন্নতা আর অবয়ব নিয়ে শ্যাওড়া গাছটা যেন বৃক্ষদেবতা বা পথদেবতা হওয়ার জন্যে তৈরি হয়েই ছিল-কে চিনতে পারে, তার অপেক্ষায়।

মাদারির মা চিনতে পেরেছিল–কতটা গাছটাকে দেখে, আর কতটা ওখানে মাঝে-মাঝে ট্রাক দাঁড়ায় বলে, তা নির্ণয় করা যাবে না। কিন্তু সে দুহাতে তোলা যায় এমন সব পাথর এনে-এনে জলের ভেতর গাছের গোড়ার কাছে পেতে দিয়েছে। সেই পাথরের স্তর জলের ওপরও উঠে এসেছে-পর-পর বসানো, গোল করে সাজানো, যে-ভাবে প্রাচীন মিশরীয়রা ওবেলিস্ক বানাত, বা এখনো এদিককার পাহাড়ের লোকরা মহাযানী বৌদ্ধচৈত্য বানায়। জলে-জলে সেই পাথরের তূপের তলার দিকটা পুরু শ্যাওলায় ছেয়ে গেছে। শীতেও সে-শ্যাওলা ঘোচে না।

.

শ্যাওড়াঝোরা-রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য

মাদারির মা ভেবেছিল, এরকম দেবতার মত দেখতে শ্যাওড়া গাছটাকে যদি পাথর দিয়ে ঘিরে সত্যি দেবতা বানানো যায়, তা হলে চলতি ট্রাক-বাস থেকে ড্রাইভাররা দু-চার পয়সা ছুঁড়ে দেবে। সে দেখেছে, ড্রাইভাররা এরকম ছোড়ে, বাসের লোকজনও ছোড়ে। এ রাস্তায় বাস যায় বটে কিন্তু তারা হয়ত নতুন করে একটা পয়সা দেয়ার জায়গা বাড়াতে চাইবে না, তবে এত যে ট্রাক যায় এদিক থেকে ওদিক ওদিক থেকে এদিক, মাদারির মা এটাও জানে আসাম থেকে কলকাতা আর কলকাতা থেকে আসাম, তারা ত এখানকার সব কিছু জানে না, তা হলে, এরকম দেবতার মত দেখতে গাছটাকে দু-দশ পয়সা তারা ছুঁড়ে দেবে না কেন?

এমন একটা ফরেস্টের কিনারায়, শ্যাওড়া গাছটার মতই, মাদারির মা কেন থাকে, তার কোনো ইতিহাস নেই। আর-কোথাও থাকার জায়গা নেই, তাই থাকে। কিন্তু এখানে এসে বসবাস শুরু করার পর সে এই শ্যাওড়া গাছটাকে দেবতা বানাবার কাজে সর্বক্ষণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তখন মাদারি হয়নি। মাদারির আগের ভাই, কিংবা তার আগের ভাই, কে তখন মাদারির মার সঙ্গে, সেটা মনে করে ওঠা খুব কঠিন। কিন্তু সেই ছেলেকে মাদারির মা খুব শিখিয়েছিল কয়েক মাইল দূরের গণেশমোড় থেকে গণেশের মূর্তিটা চুরি করে আনতে। মাদারির মা তখন তার যে-ছেলের নামে পরিচিত ছিল, সে, প্রায় করেই ফেলেছিল। কিন্তু পরে তার মাথায় বুদ্ধি গজায় যে মাত্র কয়েক মাইল দূরের গণেশমোড় থেকে মূর্তি আনলে ত সবাই টেরই পেয়ে যাবে।

তা হলে? আর-কোনো উপায় মাদারির মার হাতে বা মাথায় ছিল না। পরপর কয়েক বছর গণেশের মোড়ে হাতির পাল রাস্তা আটকানোয় ওখানে মাটির গণেশ মূর্তি বসিয়ে পুজো হল, এখন ট্রাক-বাস সব কিছু থেকেই ওখানে পয়সা ঘেঁড়ে। মাদারির মা ত আর ফরেস্টের হাতির পালকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলতে পারে না, তোমরা এখানে এসেও রাস্তা আটকাও। অন্তত এই ঢালটাতে যদি দুটো-একটা ট্রাক ওল্টাত তা হলেও তোকজনের একটু ভয়-ভক্তি হত, তা হলে তারা হয়ত দেবতার মত দেখতে শ্যাওড়া গাছটাকে পয়সাও ছুঁড়ত। কিন্তু মাদারির মা অত, বড়বড় ট্রাক ওল্টায় কিসে, তা কী করে জানবে? সেগুলো রাস্তা দিয়ে গেলে তার ঘরের মাটি থরথরিয়ে কাপে।

কিন্তু খুব ভ্যাপসা গরমের বিকেলে মাদারির মা যখন পথে এসে বসে, দেখে-আসন্ন গোধূলিতে শ্যাওড়া গাছের ওপরের শাখাটা হাতির গুঁড়ের মতই নড়ে। নিশ্চিত নড়ে। কায়ও দেখিবার না পায় রো, কায়ও দেখিবার না পায়।

মাদারির মা কী ভেবেছিল, সেটা মাদারির মা-ই জানে। কিন্তু তার ভাবনারও ত একটা সীমা আছে। সারা দুনিয়ায় এত জায়গা ছেড়ে যাকে এসে থাকতে হয় এই ফরেস্টের কাছে, বাঁ, ভেতরেই, এমন একটা অস্পষ্ট ঝোরার পাশে, ন্যাশন্যাল হাইওয়ে বানানোর সময় ফাঁকা করা খানিকটা জমিতে, তার ভাবনার জোর নিশ্চয়ই খুব বেশি নয়।

কিন্তু ঐ ঝোরা, ঐ শ্যাওড়া গাছ আর এই মাদারির মা–এই তিনটির কোনটির সুবাদে এই ফরেস্টের মধ্যে মাইল-মাইল চলা ন্যাশন্যাল হাইওয়েটার এখানকার নাম হয়ে যায় শ্যাওড়াঝোরা?

শ্যাওড়া গাছটা ত আছেই, ঝোরাটাও আছে, কিন্তু, এখানে এই একটু ফাঁকাতে, নানা পাতায় ছাওয়া মাদারির মার ঐ ঘরটা না-থাকলে, সেই ঘরের সামনে একটু জমিতে গাছের ডালপালায় বেড়া-মত দেয়া না থাকলে, কি এই ঝোরার বা এই শ্যাওড়া গাছের নামকরণ প্রয়োজন হত? ঐ ঘরটাকে যারা হঠাৎ ঘর বলে চিনতে পারে, তারাই হয়ত এখানে ট্রাক গাড়ি থামায়, গাড়িকে একটু জল খাওয়ায়, নিজেও একটু হাতেমুখে জল দেয়। তাদেরই মুখে-মুখে হয়ত এই জায়গার একটা নামকরণের দরকার হয়েছিল।

কিন্তু এত কিছু সত্ত্বেও, মাদারির মা যা চেয়েছিল সেটা কিছুতেই ঘটে ওঠে না। বেদিসহ শ্যাওড়া গাছটাকে দেবতার জায়গা বলে মনে হয় না। যদি এক নজরেই মনে হত, তা হলে দশ-বিশ পয়সা ছুঁড়ে দিতে তাদের কারো আপত্তি হওয়ার কথা নয়, যারা হাজার-হাজার মণ মাল নিয়ে দেশের এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্তে এমন নদীর মত ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু মাদারির মা কিছুতেই এই জায়গাটিকে দেবতার জায়গা বলে চিনিয়ে দিতে পারে নি।

অগত্যা, গাড়ি থামলে মাদারিকেই দৌড়ে যেতে হয়। পাহাড়ের মত গাড়িটার চাকার মাঝখান থেকে সে আকাশের দিকে ঘাড় হেলিয়ে হাত পাতে, প্রার্থীর সনির্বন্ধ হাত। ঐটুকু এক শিশুকে ঐ বনের মধ্যে কেমন অনৈসর্গিক বোধ হয়, যেন, আকাশে ডানা মেলে নেমে এল বা মাটি ফুটে উঠে এল। তার ঐ ছুটে আসাটুকুকেই, মাদারির মায়ের ঘর থেকে সেই ছোট্ট ঢাল পেরিয়ে এই রাস্তায় নেমে আবার রাস্তার ঢাল দিয়ে এই ট্রাকের কাছে ছুটে আসা–কেমন অপ্রাকৃত ঠেকে। কিন্তু তারপর, ট্রাকের, পাহাড়প্রমাণ মালবোঝাই ট্রাকের প্রায় চাকার তলা থেকে তার বাড়িয়ে দেয়া সনির্বন্ধ একজোড়া কাঠির মত হাত দেখলেই সে বড় বেশি চেনা ঠেকে, বড় বেশি চেনা, বিশেষত তাদের কাছে যারা সারা দেশের এমন বন, নদী, পাহাড় সমুদ্রপার চিরে-চিরে ছুটছে। হাতমুখ ধোয়ার পর, ট্রাককে জল খাওয়ানোর পর, ড্রাইভার। তার বিরাট বুকপকেট থেকে কিছু খুচরো পয়সা মাদারির হাতে দেয়। তারপর, আবার গাড়িতে উঠে স্টার্ট দেয়ার আগে তাকিয়ে দেখে, ফিরবার সময় মাদারি রাস্তার চড়াইটা বা মাঠের উঁচুটা দৌড়ে উঠতে পারে না, তেঁ ই ওঠে, ধীরে-ধীরে। মাদারির মায়ের ঘরটার সামনে মাদারির মাকেও দু-এক সময় দেখা যায়। সারা দেশের নানা দৃশ্য দেখতে-দেখতে যে-ড্রাইভার বন, নদী, সমুদ্রপার চিরে-চিরে ছুটছে, তার পক্ষেও এই দৃশ্যটা সম্পূর্ণ না দেখে গাড়ি ছেড়ে দেয়া সম্ভব হয় না–মাদারি গাড়ির তলা ছেড়ে এই ন্যাশন্যাল হাইওয়ের দীর্ঘতায়, এই ঘন ফরেস্টের বনস্পতিগুলির নীচে কেমন সাবালক পদক্ষেপে ধীরে-ধীরে চড়াই ভেঙে, মাঠের ডাঙা ভেঙে উঠে যাচ্ছে, উঠে যাচ্ছে।

কিন্তু এমন ট্রাক থামা, এখানে, এই শ্যাওড়াঝোরাতে, এতই অনিশ্চিত। যদি আরো একটু নিয়মিত, থাকত, যাতে মাদারি পয়সাটাও আর-একটু নিয়মিত পেতে পারত!

কিন্তু, তা হলে ত আর মাদারিকে চাকার তলায় দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে পয়সা চাইতে হত না। মাদারি এখন ত হাটের দিন, মিষ্টির দোকান থেকে একটা ন্যাকড়া চেয়ে নিয়ে দাঁড়ানো ট্রাকগুলোর অত বড় শরীরে কিলবিল করে। ট্রাকটার অত বড় বনেট দুহাতে রগড়েরগড়ে মোছে, বনেটের ওপর উঠে ট্রাকের মাথার নকশা মোছে, কাঁচ মোছে, ড্রাইভারের দরজা মোছে, চাকার ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ট্রাকের গা মোছে। প্রথম দিকে ট্রাকের ক্লিনার তাকে তাড়িয়ে দিত। কিন্তু ধীরে-ধীরে, মাদারি এই কাজটা প্রায় আদায় করে নিয়েছে। দুই হাটেই আসে এক চা-বাগানের ট্রাকগুলো। চা বাগানে ট্রাকে মাল আসে না, মানুষ আসে। সেগুলো মুছলে কেউ পয়সা দেয় না। সেগুলোকে বাদ দিলেও মাদারির ট্রাকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। এক-একটা হাটে সে চার-পাঁচ টাকা পর্যন্ত পেয়ে যায়। তার মধ্যে কতকগুলি ট্রাক ত যেন তার নিজের–এম-পি-সিং-এর ট্রাক, হরিয়ানার ট্রাক, জনের ট্রাকজন ক্লিনার। শ্যাওড়াঝোরায় নিয়মিত ট্রাক দাঁড়ালে মাদারি ত সেগুলোও মুছতে পারত।

.

মাদারিহাটে জলুশের ঢোলাই

জলুশের কথা হাটেই শুনেছিল মাদারি। টিন পিটিয়ে-পিটিয়ে হাটে ঢোলাই দিচ্ছিল লাল শুকরা। হাট তখনো বসে নি। মাদারি তার পেছন-পেছন খানিকটা ঘোরে। লাল শুকরা টিন পেটাচ্ছিল আর বলছিল-কাল তিস্তা ব্যারাজ যাবার লাগেক, জলুশ হবে।

শুকরার গলা কফে ঘরঘর করে আর এই কথাগুলো লোকজনকে শোনানোর জন্যে সে গলা তুলছিলও না। ফলে কী যে সে বলছে সেটা কিছুটা শোনা গেলেও, বোঝা যায় না। হাটের লোকজনের অবিশ্যি তা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না হয় তারা সব কিছুই জানে, নইলে তারা কোনো কিছুই জানতে চায় না।

কিন্তু জলুশ শব্দটি শুনে মাদারি আর শুকরার পেছন ছাড়তে পারে না। সে জানে জলুশ-এর নানা রকম আছে। শুধু হাটের মধ্যে ছোট জলুশ ওঠে। চা বাগানের জলুশ ওঠে–সেখানে মাদারির কিছু করার থাকে না। আর বড়বড় জলুশ মাঝে-মাঝে হয়–তখন ট্রাকে করে শহরে নিয়ে যায়, কখনো আলিপুরদুয়ার, কখনো জলপাইগুড়ি। গতবছর মাদারি একবার আলিপুরদুয়ার শহরে, এরকম জলুশ-এর সঙ্গে গিয়ে, জলুশ-এর সঙ্গেই ফিরে এসেছিল। জলপাইগুড়ি শহর তার দেখা হয়নি।

লাল শুকরা খুব রোগা, মনে হয় যেন হাঁটতে গেলে পড়ে যাবে। তার ওপর সকালেই হাড়িয়া খেয়েছে। নেশা বা শরীরের জন্যেই তার পা ঠিকমত পড়ছিল না। কিন্তু সেই টলমলে পায়ে ঘড়ঘড় গলায় সে বলে যাচ্ছিল, জলুশ হবেক, জলুশ হবে। দেখে মনে হতে পারে, জলুশের কথাটা তার নেশার কথা।

লাল শুকরার পেছনে-পেছনে ঘুরতে-ঘুরতে মাদারি তার সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, বড় জলুশ না ছোট জলুশ? আর-একবার সামনে গিয়ে বলে, ট্রাক আসিবে, ট্রাক?

এসব জিজ্ঞাসার সময় সে খানিকটা দূরত্ব রাখে, অভ্যাসেই। কারণ, উত্তরের বদলে শুকরার হাতের কাঠি তার পিঠে পড়তে পারে। শুকরা এমনিতেই আধা পাগলা, আধা মাতালকী যে করবে, কেউ বলতে পারে না।

কিন্তু দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসার পরই শুকরা একটা অদ্ভুত কাজ করেছিল। সে টিনটা আর কাঠিটা মাদারির দিকে বাড়িয়ে দেয়। মাদারি আরো খানিকটা পেছিয়ে যায়। লে লে বলতে-বলতে টলটলায়মান শুকরা তার পেছনে দু-এক পা আসতে-আসতেই কেশে ফেলে। তারপর টিন আর কাঠি-ধরা বাড়িয়ে রাখা হাতেই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কাশে, কেশে যায়। তার ঠোঁট বেয়ে লালা গড়াতে থাকে, চোখ দুটো যেন বেরিয়ে আসবে এতটাই বড় হয়ে যায়।

শুকরার হাত থেকে টিনটা আর কাঠিটা নিলে সে অন্তত একটু স্বস্তি পেতে পারে এই আশায় মারি এগিয়ে গিয়ে টিন আর কাঠিটা নিয়ে নেয়, কিন্তু, তাতেও শুকরা তার দুই বাড়ানো হাত শরীরের পাশে নামিয়ে নিতে পারে না–এমনই তার দুর্দম কাশি।

সেটা থামলে, ঢোঁক গিলে, হাত দুটো নামিয়ে, বা হাতের পাঞ্জা দিয়ে মুখের ঘাম একবার মুছে ফেলে, ডান হাতটা তুলে সারা হাটের ওপর বুলিয়ে শুকরা বলে, যা হে মাদারি, ঢোলাই দে, কালি তিস্তা ব্যারাজমে জলুশ হবেক, মিনিস্টার আবেক, ট্রাক আবেক–।

ট্রাক আসিবে? মাদারি জিজ্ঞাসা করে।

জরুর আবেক। ট্রাক জরুর আবেক। সব কোইকো যাবার লাগেক। যাও, ঢোলাই লাগাও মাদারি। বলে শুকরা ডান দিকে ঘুরে মাটির হাঁড়ির দোকানগুলোর পেছনে গাছতলায় প্রথমে গা এলায়, তারপর শুয়ে পড়ে।

আর, মাদারি লাফাতে লাফাতে টিন বগলে নিয়ে কাঠি পেটায়–জলুশ জলুশ, কালি জলুশ, ট্রাক আসিবে, সগায় যাবেন, সগায় যাবেন।

মাদারির বগলে টিনটা আঁটছিল না। তাকে বারবার হাত বাড়িয়ে টিনটা তার শরীরের সঙ্গে চেপে রাখতে হচ্ছিল। আর সেই বাকা অবস্থায় কাঠি দিয়ে পিটতে হচ্ছিল। কিন্তু সে এত তাড়াতাড়ি দৌড়ে-দৌড়ে, সারা হাটে ঘুরছিল যে মনে হচ্ছিল সে কোথাও থেকে টিন পেয়ে শখ করে পিটিয়ে বেড়াচ্ছে। তার কচি গলার চিৎকারে জলুশ, জলুশ আওয়াজটা তখনো নাবসা হাটের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছিল–পাখির চিৎকারের মতন।

হাট তখনো বসেনি, তাই দোকানের সারির ভেতর দিয়ে দৌড়োদৌড়ি করা সম্ভব হচ্ছিল। দোকানিদের সামনে সাজানো দোকানে তখনো প্রায় হাত পড়েনি। তারাও মাদারির এই ঢোলাইয়ে অংশ নিতে পারে। ফলে, মাদারি একটু মজাই পাচ্ছিল।

কিন্তু মজা পেতে-পেতে ঘোমশাইয়ের মিষ্টির দোকানের সামনে আসতেই ঘোমশাই চিৎকার করে ডাকেন, এ-ই মাদারি। নিজের টিনের আওয়াজে মাদারি সে-ডাক শুনতেই পায় না। ফলে ঘোষমশাইকে আরো জোরে হাঁক দিতে হয়, এ-ই মাদারি।

সে-হাঁক শুনে মাদারি চমকে, থেমে, ঘুরে, মিষ্টির দোকানের দিকে তাকায়। দেখে, ঘোমশাই চোখ গরম করে তার দিকে তাকিয়ে। সে বগল থেকে টিন নামিয়ে দুই হাতে টিনটা সামনে ধরে, পায়ে-পায়ে ঘোষমশাইয়ের সামনে যায়।

ঘোষমশাই ধমকে ওঠেন, কে দিয়েছে তোকে, ঢোলাই দিতে?

শুকরা।

কোন শুকরা?

লাল শুকরা।

যা, এখনই দিয়ে আয় তার টিন। ঢোলাই দিচ্ছে! জলুশ হবে কি না-হবে তাতে তোর কী? যা, টিন দিয়ে এসে কাপ ধুয়ে রাখ–

মাদারি চড় খাবে–ভয় পেয়েছিল। না-খাওয়ায় দৌড়ে লাল শুকরার খোঁজে গিয়েছিল। গিয়ে অবিশ্যি তাকে বেশি খুঁজতে হয় না। লাল শুকরা সেই গাছটার তলাতেই শুয়ে আছে আর হাপরের মত শ্বাস ফেলছে।

মাদারি আস্তে-আস্তে পা ফেলে শুকরার কাছে যায়। একটু দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর লাল শুকরা আর গাছটার মাঝখানের একটা ফাঁক দেখে সেইখানে টিনটাকে রেখে দেয়, সাবধানে, যাতে, কোনো আওয়াজ না-হয়, যাতে, লাল শুকরার গায়ে ধাক্কা না লাগে, যাতে, লাল শুকরা জেগে না ওঠে। টিনটা সে ঠিকমত রাখতে পেরেছিল। তারপর কাঠিটা টিনের ওপর রেখেছিল। কিন্তু কাঠিটা টিনের ঠিক মাঝখানটাতে রাখতে পারে না। খানিকটা বেরিয়ে থাকে। সে কাঠিটা ঠিকমত রাখতে আবার হাত বাড়াতেই কাঠিটা গড়িয়ে লাল শুকরার পেটের ওপর পড়ে তার শ্বাসের সঙ্গে ওঠানামা করে। ততক্ষণে মাদারি দৌড়ে আবার ঘোমশাইয়ের দোকানে।

ঘোষমশাইয়ের দোকানে মাদারি দুই হাটবারে দরকারের সময় কাপডিশ ধুয়ে দেয়। দু-এক সময় চাও, দেয়, খদ্দেরদের। চা বানায় বাহাদুর–সে বলেছে, মাদারিকে চা বানানো শিখিয়ে দেবে। ঘোষমশাই তাকে সব সময়ই দু-চার পয়সা দেন। যদি বাহাদুর সত্যি মাদারিকে চা বানানো শিখিয়ে দেয়, তা হলে, সে ঘোমশাইয়ের দোকানে চাকরিও পেতে পারে। কিন্তু চা বানানোর টেবিলটা এখনো তার থুতনি পর্যন্ত। চা বানানো শেখার আগে তাকে আরো লম্বা হতে হবে।

হাট শেষ হওয়ার আগে দেখা গেল–জলুশ একটা না, অন্তত দু-তিনটি। হাতুড়িপার্টি বাগানের লোকজন এনে মিছিল তুলে দিল, আর পাহাড়িরা ফরেস্ট থেকে লোকজন এনে মিছিল সাজাল। দেশি মানষিরও একটা মিছিল উঠল। সবাইই বলে–কাল তিস্তা ব্যারেজে জলুশ।

.

তিস্তা ব্যারেজ কী করে হল

এ গল্পটা জলুশের সঙ্গে তিস্তা ব্যারেজেই যাবে। তাই, তিস্তা ব্যারেজের কথাটা এখানে সেরে নেয়াই ভাল।

তিস্তা ব্যারেজের পরিকল্পনা কী, কবে থেকে তার কাজ শুরু হয়েছে, কাজ শুরুর আগে কী গোলমাল হয়েছে, রাজ্যের কোন সরকার আর কেন্দ্রের কোন সরকার কী করেছে–সে-সব ত সাতকাহন কথা। তিস্তার জল কোথাও আটকে সেখান থেকে জলবিদ্যুৎ বানানো যায় কিনা-এ নিয়ে নানারকম কথাবার্তা নানা সময়ই হয়েছে। সরকারের ঘরে কাগজপত্রও কিছু কম জমা হয় নি, সে-সুবাদে। কিন্তু জলঢাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের হালের পর কারো ঘাড়ে আর দুটো মাথা ছিল না যে উত্তরবঙ্গের এই সব পাহাড়ি নদী নিয়ে কোনো কথা জোর দিয়ে বলে।

কিংবা, তাও হয়ত নয়। কারণ, জলঢাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিপর্যয়ের পর কারো গর্দানই কাটা, যায়নি। সরকারি কোনো প্রকল্পেই কোনো একজনকে দায়ী করা যায় না। এত নানা স্তর দিয়ে, এত নানা লোক, এত বিভিন্ন পর্যায়ে একটা প্রকল্পের রূপ দেয় যে কোনো এক স্তরের কোনো একজনকে কোন একটি কাজের জন্যে দায়ী করা যায় না। জলঢাকায় সব হিশেবই ঠিক ছিল–জল বছরে কোন-কোন সময় কত পরিমাণ আছে, জলের বেগ কত থাকে, সেই বেগের আঘাতে টারবাইন কত জোরে ঘুরতে পারে, তাতে কতটা শক্তি তৈরি হতে পারে–এ-সব হিশেবের কোনো জায়গায় কোনো ভুল ছিল না। পৃথিবীর সব জায়গায় যে-অঙ্ক মিলিয়ে বিখ্যাত-বিখ্যাত সব জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হয়েছে, জলঢাকাতেও সেই অঙ্ক ছিল নির্ভুল। কিন্তু পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের অঙ্ককষা বইগুলিতে শুধু ছিল না এখানকার পাহাড়ের বৈশিষ্ট্যের লোকাল ফ্যাক্টার। তাই সেই স্থানিক উপাদান অঙ্কের হিশেবে ধরা হয়নি। এখানকার পাহাড়ে পাথরের চাইতে মাটি অনেক বেশি। জল যখন পাহাড় বেয়ে নীচে নামে, স্বাভাবিক খাতে বা ঢলে, তখন জলের সঙ্গে সঙ্গে নামে পাহাড়ের মাটিও। পাহাড় থেকে মাটি অত খসে যায় বলেই এদিকের পাহাড়ে এত ধস নামে। আর সেই মাটি, জলে গোলা মাটি টারবাইনের ঘূর্ণন যে থামিয়ে দিতে পারে, তা জানা গেল যখন টারবাইন থেমে গেল, তখনই।

জলঢাকার এই অভিজ্ঞতার ফলে উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি নদী সম্পর্কে সবাই একটু অনিশ্চিত হয়ে যায়। এরা ঠিক চেনা নদী নয়। এদের স্বভাবও সব সময় বই-পড়া নদীবিজ্ঞানের সঙ্গে মেলে না। বা, এই ধরনের ভৌগোলিক অবস্থানের নদীর বৈশিষ্ট্য নিয়ে তেমন কোনো বইপত্র এখনো লেখা হয়ে ওঠেনি। সুতরাং যতদিন তা না হয়, অর্থাৎ এই সব নদীর ধর্ম পাকাপাকি জানা না যায়, ততদিন নদীগুলো নদীগুলোর মতই থাকুক। মে থেকে অক্টোবর, মৌসুমি বাতাসের প্রথম অভিঘাত থেকে সে-বাতাসের প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত ছয়-ছয়টি মাস, নদীগুলি নানা খাতে বয়ে যাক, নানা ধরনের বন্যায় নানা জায়গা ভাসাক, একই নদীতে ছোট-বড় নানা বন্যা আসুক। বরং, বন্যার হাত থেকে মানুষজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করা ভাল, বন্যার মানুষজনের যা ক্ষতি তা পূরণ করে দেওয়া নিরাপদ, কিন্তু, নদীর গায়ে হাত দেয়ার দরকার নেই।

এই সংস্কার কবে কাটল তার সাল-তারিখ খোঁজার দরকার নেই। মোটামুটি বলা যায় ১৯৬৮ সালে তিস্তার সব চাইতে বড় বন্যার পর, ৬৯ সালের দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের সময় তিস্তাপ্রকল্প কথাটা প্রথম খবরের কাগজের পাতায় আসে। তিস্তা-মহানন্দা মাস্টার প্ল্যান কথাটিও সেই সময়ের। কিন্তু তখন এ-সব কথা কাগজে উঠতে-উঠতেই যুক্তফ্রন্টের সরকার চলে যায়। তারপর, আর এ-নিয়ে বিশেষ সাড়াশব্দ হয় নি।

তারপর, আবার উঠল বছরছয়েক পরে। তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের কাজে প্রথম হাত দেয়া হবে, তিস্তা-মহানন্দা মাস্টার প্ল্যান এক-একটা পর্যায় ধরে রূপায়িত হবে, তিস্তা ব্যারেজ ডিভিশন তৈরি হয়ে গেল–এই সব খবর খুব ঘন-ঘন কাগজে তখন বেরতে শুরু করে এক কেচ্ছার সূত্রে। মালদার এক মন্ত্রী ছিলেন এই সবের দায়িত্বে। তিনি নিউ জলপাইগুড়িতে তিস্তা ব্যারেজের এক অফিস আর কোয়ার্টার খুললেন আর তিস্তা ব্যারেজের প্রধান অফিস খুললেন মালদায়।

এই নিয়ে কেচ্ছা তখন বেশ জমে উঠেছিল, কারণ, নিউ জলপাইগুড়ি বা মালদা কোথাওই তিস্তা নেই! যেখানে তিস্তা নদীর নামগন্ধ নেই, সেখানে প্রকল্পের মূল অফিস খোলার একটাই উদ্দেশ্য, যাতে, মন্ত্রীর জায়গার লোক এই প্রকল্পে বেশি চাকরি পায়। সুতরাং জলপাইগুড়ি-কোচবিহার থেকে প্রতিবাদ শুরু হল যে ব্যারেজের অফিস নদীগুলির জেলাতে করতে হবে।

কিন্তু মন্ত্রীর যদি ইচ্ছাই হবে যে তার জেলার বা শহরের লোকরা কাজ পাক, তা হলে ত তিনি মহানন্দা ব্যারেজের কাজেই আগে হাত দিতে পারতেন। তা ত তিনি দেননি। আসলে, মালদায় মূল অফিস হলে তিনি নিয়মিত দেখাশুনা করতে পারবেন। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে উত্তরবঙ্গের, তথা, পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ নদী তিস্তার প্রকল্পটি যাতে দ্রুততম বেগে ও অল্পতম সময়ে সম্পূর্ণ হয়–তাই তিনি প্রকল্পের মূল অফিসটি মালদা শহরে বসিয়েছেন। তা ছাড়া অফিসে আর ক-জন লোক কাজ করে? নতুন লোক ত নেয়া হবে ব্যারেজ যেখানে হবে, সেখানে। আর লোক ত নেবে, কনট্রাকটাররা। তাতে মন্ত্রীর কী করার আছে?

এই দুই মতের মাঝখানে একটা তৃতীয় মতও ছিল। তারা বোধহয় বিশ্বাস করে না যে কোনো কিছু নিজ অধিকারে পাওয়া যায়। তাই তারা বলে–যেখানে খুশি সেখানে অফিস হোক, ব্যারেজটা ত তিস্তাতেই হচ্ছে। তিস্তায় ব্যারেজ করে মন্ত্রীর কী লাভ? সে তাই অফিসটুকু মালদায় নিয়ে গেছে। মন্ত্রীর এইটুকু লাভ মেনে নিলে ব্যারেজটা হয়ত হত। আর, তা না হলে, মন্ত্রী হয়ত ব্যারেজটাই তুলে নেবে, রাগ করে আর কাজে হাত দেবে না।

কিন্তু এ-সব ঝগড়াঝাটি, তর্কবিতর্ক শেষ হওয়ার আগেই জরুরি অবস্থা, ৭৭-এর ভোট ও ইন্দিরা গান্ধীর হার। কংগ্রেসই যদি কেন্দ্রে হেরে যেতে পারে, প্রধানমন্ত্রী যদি ভোটে গড়াগড়ি খায়-তা হলে তিস্তা ব্যারেজই বা কী? মহানন্দা ব্যারেজই বা কী? ১৯৭৭ সালের ভোটে রাজ্যে বামফ্রন্টের সরকার হল। ৬৭ আর ৬৯-এর রাজনীতির ধারাবাহিকতা যেন আবার ফিরে এলমাঝখানের দুটো-একটা ভোট আর দুটো-একটা সরকার যেন এলেবেলে হয়ে গেল, যদিও এলেবেলে হতে বছর দশেক লেগেছে।

স্পেশ্যাল সেটলমেন্টের জরিপের কাজ শুরু হল ৭৭-সাল নাগাদই। মালদায় ব্যারেজ-অফিস হওয়ার কোনো প্রশ্নই আর ওঠে না। কিন্তু একটা অফিস নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের কাছে থাকল, কোয়ার্টার-টোয়ার্টারও হল। সংযোগ রাখা, জিনিশপত্র আনা, কলকাতায় ছোটাছুটি, এ-সবের জন্যে এরকম একটা জায়গায় এরকম একটা ক্যাম্পাস দরকার বোধ করল সবাই। বিশেষত ব্যারেজ শেষ হলে তার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও ত আছে।

এ-সবের মধ্য দিয়ে তিস্তা-মহানন্দা মাস্টার প্ল্যানের একটা পর্যায় হিশেবে তিস্তা ব্যারেজের কাজটা কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই হতে লাগল। গাজোলডোবা গ্রাম হয়ে উঠল প্রধান কর্মকেন্দ্র। দেখতে-দেখতে, এপারে গাজোলডোবা আর ওপারে বৈকুণ্ঠপুর ফরেস্টের মাঝখানে, চওড়া-চওড়ি, তিস্তার মাঝখান দিয়ে ব্যারেজ তৈরি শুরু হয়ে যায়। স্লুইস গেট, রিজার্ভেয়ার সহ, তিস্তা ব্যারেজ। সেকাজ এখনো শেষ হয় নি। কিন্তু তার উদ্বোধন এখনই করা হচ্ছে, অন্তত আংশিক উদ্বোধন। সেই উদ্বোধনেই এত জলুশ যাচ্ছে।

.

শেষ-না হতেই উদ্বোধন

কিন্তু অসম্পূর্ণ ব্যারেজ উদ্বোধনের দরকারটাই-বা পড়ল কেন?

সেটাই সাম্প্রতিক ইতিহাসের ব্যাপার এবং এ গল্পের পক্ষে জরুরি।

এত বড় একটা কর্মযজ্ঞে স্থানীয় লোকজন কিছু সুযোগ-সুবিধে পেয়েই থাকে। কিন্তু সেই সুযোগ-সুবিধের ব্যাপারেই প্রথম থেকে গণ্ডগোল। কাজটা হচ্ছে নদীর ভেতরে চওড়া-চওড়ি। এই ব্যারেজের ফলে তিস্তার জলকে তার মূলখাতে শাসনে রাখা যাবে। এ বর্ষায় এক খাত, পরের বর্ষায় অন্য খাত, বা, একই বর্ষায় প্রথম দিকে বাঁ-পাড় ঘেঁষে, শেষ দিকে ডান-পাড় ঘেঁষে–এই সব আর চলবে না।

কিন্তু ফলে, তিস্তার এই স্বভাবের ফলে, তিস্তার যে-খাত বিরাট হয়ে গেছে, তার মাঝখানে-মাঝখানে অনেক চর তৈরি হয়েছে। সে-সব চর প্রায় ডাঙার মত উঁচুও হয়ে গেছে। তিস্তা ব্যারেজের ফলে নদীখাতের এই সব চরে ত আর বসতি বা চাষবাস চলবে না কারণ, তিস্তাকে তার মূলখাতেই রাখা হবে। সঞ্চিত জল যখন ছাড়া হবে, তখন সেই জলস্রোতের ধাক্কায় এই মধ্যবর্তী চরগুলো ভেসে যাবে।

এই সব চরে প্রধানত পূর্ববঙ্গের নমশূদ্র চাষিরা বসতি করেছে, আবাদ করেছে। কোনো-কোনো জায়গায়, যেমন মউয়ামারির চরে, তাদের কোঅপারেটিভ পর্যন্ত আছে। তিস্তা ব্যারেজের জল কবে ছাড়া যাবে সে-হিশেব এখনো কেউ কষছে না বটে কিন্তু যখনই ছাড়া হোক, এসব চরবসতি তার আগে উঠে যাবে। ইতিমধ্যেই এরা হয়ত অন্যকোনো জায়গায় খোঁজ-খবর করছে। সরকারের সঙ্গেও কথাবার্তা চলছে–এদের আর-কোথাও পুনর্বাসন দেয়া যায় কিনা।

ভবিষ্যতের ব্যবস্থা কী হবে, সেই সব নিয়ে নানা চেষ্টার মধ্যেও ত এরা বর্তমানকে ছেড়ে দিতে পারে না। তাই তিস্তা ব্যারেজের শুরুতেই তাদের দাবি হল–যে ব্যারেজের ফলে তাদের উচ্ছেদ হতে হবে, সেই ব্যারেজের কাজে তাদেরই নিতে হবে। বিশেষ করে মাটিকাটার প্রাথমিক কাজে।

ব্যারেজ কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কিছু বলার নেই। কারণ, কাজ করাবে কনট্রাকটার। সে কোথা থেকে লোক এনে কাজ করাবে, এটা সম্পূর্ণতই তার ব্যাপার। কিন্তু তবু যাতে কাজের শুরুতেই কোনো গোলমাল না বাধে সেইজন্যে সরকারি ইনজিনিয়াররা একটা আপসের চেষ্টা করে।

আপসের পথে বাধা ছিল। কারণ একনস্ট্রাকশন কোম্পানির সারা ভারত জুড়ে কাজ। তাদের সাবকনট্রাকটার, লেবার, এ-সব বাধা। এমনকি তারা এসে গাজোলডোবার জঙ্গল পরিষ্কার করে তাবু গেড়ে ফেলেছে, ইলেকট্রিক লাইন টানবার জন্যে শালগাছের ডালপালা ঘেঁটে দিয়েছে। এই অবস্থায় তাদের অভ্যস্ত ব্যবস্থা বদলাতে কোম্পানি কেন রাজি হবে? একথা আগে ওঠেনি। ফলে, কোম্পানির সাবকনট্রাকটাররা তাদের লোকজনকে আনতে টাকা-পয়সা নিয়ে নানা জায়গায় চলে গেছে। প্রতিদিনই বেশ কিছু মজুর এসে পৌঁছচ্ছে। আপলচাঁদ ফরেস্টের মধ্যে তাদের অস্থায়ী আস্তানার সীমা প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে। এমন-কি, ট্রাক আসার জন্যে যে রাস্তাটা এখন কিছুটা মাত্র তৈরি হয়েছে, তার পাশে, খানিকটা জায়গা জুড়ে ছোটখাট একটা বাজারও কিছুদিন থেকে বসতে শুরু করেছে। এই অবস্থায় এই সব লোককে বসিয়ে রেখে কোম্পানি কি চরের লোকদের কাজ দিতে যাবে?

আসলে, কোম্পানি একটা গোপন হিশেব করে ফেলেছিল। ব্যারেজের কাজে আসতে পারে কাছাকাছি চরের বাড়তি লোজন, যারা কৃষিকাজে খাটে না। দূরের চর থেকে কেউ এ কাজে আসবে না। আর, এই কাছাকাছির চরগুলো থেকে যত সংখ্যক লোক ব্যারেজের কাজে আসতে পারে, অন্য জেলা থেকে সাবকনট্রাকটারদের সূত্রে তার চাইতে অনেক বেশি লোক কোম্পানির নিজের হাতেই চলে আসবে। এই সব চরের লোকরা যদি বাধা দিতে চায়, শুধু সংখ্যাতেই তারা হেরে যাবে। এই পরিস্থিতির জন্যে কোম্পানির আরো কিছু দিন সময় দরকার ছিল। ইনজিনিয়ারদের সঙ্গে কথা বলে, চরের লোকদের সঙ্গে কথা বলে, পরে কথা বলার দিন ঠিক করে–কোম্পানি এই সময়টা নিচ্ছিল।

এই কোম্পানি ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় এই রকম বিরাট-বিরাট কাজ বছরের পর বছর ধরে করে থাকে। এরকম সমস্যা মেটানোর ব্যাপারে তাদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা দুইই যথেষ্ট আছে।

সেই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাও তারা কাজে লাগায় সাবকনট্রাকটারদেরও নীচের স্তরে।

সাব-কনট্রাকটারদের কাজের জন্যে আবার কিছু সাবকনট্রাকটার দরকার, বা, বলা ভাল, এক-একটি কাজের জন্যে এক-একজন সাপ্লায়ার দরকার হয়। এসব সাপ্লায়ার লোক্যাল লোক হওয়া ভাল ও নিরাপদ। কারণ স্থানীয় ভাবে কোথায় কোন জিনিশ পাওয়া যায়, তারা ভাল জানে, জোগাড়-করে নিয়েও আসতে পারে, একজন না পারলে আর-একজন সাহায্যও করে।

স্থানীয় ছোটখাট কনট্রাকটারদের হদিশ করে তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলার কাজে কোম্পানি সাবকনট্রাকটারদের লাগিয়ে দেয়। মাটিকাটার কাজের শুরুতেই বাশ লাগবে গাড়ি-গাড়ি। শালবরগা লাগবেকত তার শেষ নেই। পাথর ফেলতে হবে পাহাড়-পাহাড় জলের স্রোতের ধার ভাঙতে। এই রকম একটা ব্যারেজের কাজের একটা অংশেরও অংশে শুধু বাশ, বা শাল-বরগা, বা পাথর সরবরাহের কাজ যদি স্থানীয় কোনো কনট্রাকটার পায় সে ত হাতে চাঁদ পেয়ে যাবে।

সাবকনট্রাকটাররা সেই মালবাজার, ওদলাবাড়ি, জলপাইগুড়ির সব কনট্রাকটারদের সঙ্গে এই নিয়ে কথাবার্তা বলে। আর, তাদের প্রত্যেকেই জেনে যায়, ব্যারেজের কাজ শুরু করতে দিচ্ছে না চরের লোজন। কোম্পানির এহিশেবটা পাকা ছিল যে এসব জায়গার জনাপঞ্চাশ, বা শ-খানেক, বা শ-দেড়েক কনট্রাকটারকে সাপ্লাইয়ের কাজ দেয়া যাবেই।

এই সব কথাবার্তার সূত্রে জেলার এই কনট্রাকটাররাও কোম্পানির সমর্থনে এসে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে যাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাও কিছুটা আছে, তারা চরের লোকজনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবও খাটাতে থাকে যে এত বড় একটা কাজে ওরকম বাধা দেয়া ঠিক হচ্ছে না।

কিন্তু কোম্পানি সবচেয়ে দক্ষতা দেখায় স্থানীয় গ্রামাঞ্চলে বাজবংশীদের একটা সংগঠন প্রায় তৈরি করে ফেলায়। চরের নমশূদ্রদের সঙ্গে রাজবংশীদের সম্পর্ক কোনোদিনই খুব ভাল নয়। কী করে একথা কাছাকাছি সব গ্রামে রটে যায়–সেই ক্রান্তির হাট ছাড়িয়ে, সেই ওদলাবাড়ি ছাড়িয়ে যে চরের লোকরা কোম্পানিকে বলেছে তাদের কাজে নিতে হবে, রাজবংশীদের কাজে নেয়া চলবে না।

ব্যাপারটা আইন-শৃঙ্খলার মধ্যে গিয়ে পড়ে।

কোম্পানি পরিষ্কার জানায় যে—চরের লোকদের কাজ দিলে রাজবংশীরা দাঙ্গা বাধাবে। রাজবংশীদের কাজ দিলে চরের লোকরা দাঙ্গা বাধাবে। দু-দলকে কাজ দিলে কাজের জায়গায় দাঙ্গা বাধবে। সুতরাং কোম্পানি সরকারের অনুমতি অনুসারে নিজের লোকদের দিয়ে কাজ শুরু করে দেয়।

.

ব্যারেজের আগেও ইতিহাস আছে

কিন্তু সে ত কাজ শুরুর ব্যাপার। তার সঙ্গে এই এখনকার উদ্বোধনের সম্পর্ক কী। উদ্বোধন মানে ত কাজ শেষ। আংশিক উদ্বোধন মানে অন্তত আংশিক কাজ শেষ। কিন্তু এই ব্যারেজ ছাড়াও ইতিহাস আছে। সে-ইতিহাস ত প্রতিদিন, প্রতি বছরের নানা ঘটনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখন যেমন তিস্তায় ব্যারেজ বেঁধে তিস্তার খাত পাকাপাকি স্থির করা হচ্ছে, সেভাবে ত আর ইতিহাসে ব্যারেজ বেধে ইতিহাসের খাত ঠিক করা যায় না। ইতিহাসের খাত সব সময়ই মুক্ত তিস্তার মতন। কখনো সে ডাইনে পাড় ভাঙে, কখনো বয়ে। একই বর্ষার শুরুতে সে তার পুরনো চর উৎখাত করে বয়ে চলে। সে বর্ষার শেষে নতুন চর ফেলে সরে যায়। সে-ইতিহাস এই গোটা ভারতেরই হোক, বা, এই তার এক রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেরই হোক, অথবা, পশ্চিমবঙ্গেরই একটা অংশ এই উত্তরবঙ্গেরই হোক। খবরের কাগজ, বা রেডিও, বা টিভি পড়ে শুনে দেখে মনে এই ধারণা প্রায় অনড় হয়ে ওঠে যে ইতিহাসের মত বড় ব্যাপার দিল্লি-বম্বের মত বড় শহরে, বা কলকাতার মত রাজধানীতেই ঘটে উঠতে পারে, তারপর সেখান থেকে অন্যত্র ছড়াতে পারে। কিন্তু কোনো-কোনো সময় দেখা যায় উত্তরবঙ্গের মত এক অনির্দিষ্ট ভূখণ্ডেও ইতিহাস একটা নির্দিষ্ট আকার পেতে চায়। বা হয়ত সব খণ্ড অংশেরই একটা নিজস্ব ইতিহাসের গতি আছে। বড় ইতিহাসের গতির সেটা অনুকূলও হতে পারে, প্রতিকূলও হতে পারে। বড় ইতিহাস নিজের বড়ত্বের চাপে কখনো বা সেই প্রতিকূলতাকে দুমড়ে-মুচড়ে দিতে পারে, কখনো বা সেই প্রতিকূলতাকে নানা মোড়ে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে অনুকূলতার স্রোতে মিশিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কখনো কখনো দেখা যায় সেই আঞ্চলিক খণ্ডের ইতিহাসের বাকা পথ কিছুতেই আর সোজা হচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত তা হয়ে দাঁড়ায় মূল ইতিহাসের অসম কিন্তু প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। তিরিশের দশকের মাঝামাঝির আগে কেউ কখনো ভাবতেও পারে নি যে ভারতীয় ইতিহাসের মূল ধারার বিরুদ্ধে মুসলমানের একটা বিচ্ছিন্ন ধারা কোথাও কোনো স্বীকৃতি পেতে পারে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনে সেই বিচ্ছিন্নতার ধারাকে আরো বড় প্রবাহপথ দেওয়া হল। আর তারই ফলে মাত্র দশ বছরের মধ্যে পাকিস্তানের দাবি হয়ে উঠল স্বাধীনতার দাবিরই সমতুল্য। ১৯৪৭-এ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে পাকিস্তানের সেই দাবির বয়স মাত্র সাত বছর–১৯৪০-এর মার্চে লাহোরের সম্মিলনে পাকিস্তানের দাবি প্রথম তোলা হয়–অথচ তা মাত্র এই সাত বছরেই অখণ্ড ভারতের অখণ্ড স্বাধীনতার প্রায় একশ বছরের স্বপ্ন, কল্পনা ও প্রয়াসের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পেরেছিল।

তিস্তা ব্যারেজ সেরকম একটা আঞ্চলিক খণ্ড ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছে। সেই আঞ্চলিক ইতিহাসের চেহারাটাও এক রকমের নয় কিন্তু সব চেহারাতেই তার আঞ্চলিকতার চরিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট।

যেমন, মালদহ-দিনাজপুরের পোলিয়া রাজবংশী থেকে শুরু করে কোচবিহার-জলপাইগুড়ির রাজবংশী পর্যন্ত মিলিত ভাবে নিজেদের আদিবাসীসত্তার প্রাধান্য চেয়ে বাস মাঝে-মাঝেই।

সেই উত্তরখণ্ড পার্টি বা, পার্টি, না বলে উত্তরখণ্ড আন্দোলনের কিছুটা বিবরণ ত আমরা এর আগের পর্বেই পেয়েছি। সেই উত্তরখণ্ড আন্দোলন বা পার্টি কখনোই খুব বড় হয়ে উঠতে পারবে কিনা সেটা আলাদা প্রশ্ন। বরং সে-আন্দোলনের ভেতর এত নানা ধরনের স্বার্থ ও উদ্দেশ্য এসে মিশেছে তাদের সব নেতার একসঙ্গে কাজ করাই মুশকিল। কিন্তু যত মুশকিলই হোক, তেমন দরকারে ত বষের ফিল্ম-আর্টিস্ট শ্রীদেবী আর জল্পেশ মন্দিরের শিবলিঙ্গ–একাকার করে দিয়ে এরা এমন একটা অবস্থা তৈরি করে তুলতে পারে যাতে মনে হয় সত্যি বুঝি এদের পেছনে অনেক লোক আছে। লোকবল, বা, জমায়েতই যদি শক্তি দেখানোর প্রধান উপায় হয়, সে-উপায় ত নানা ভাবেই ব্যবহৃত হতে পারে।

প্রাচীন ইতিহাস, জনবৈশিষ্ট্য এই সব নিয়ে একটি অঞ্চলের বিশিষ্টতা যখন তার বিচ্ছিন্নতার উপাদান হয়ে ওঠে, তখন, ইতিহাসের কোনো উপাদানই অব্যবহৃত থাকে না। উত্তরবঙ্গ শুধু সমতল নয়–তার বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল পশ্চিমবঙ্গেরই অংশ। সেই পার্বত্য অঞ্চল প্রধানত দার্জিলিং জেলার মধ্যেই ছড়িয়ে, আর-একটা অংশ জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরভাগ দিয়ে অনেকখানি নেমে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে, জলপাইগুড়ি জেলা যত উত্তরে গেছে ততই তার জনমণ্ডলীর চেহারা বদলে যায়। প্রায় মাঝখান দিয়ে যদি পূর্ব-পশ্চিমে একটা রেখা টেনে জলপাইগুড়ি জেলাকে দুভাগ করা যায়, তা হলে ওপরের ভাগের তিন ভাগের দুই ভাগ রাজবংশী এলাকার বাইরে। এই ভাগে প্রধানত চাবাগান–সেই সূত্রে কোল-মুন্ডা-সাঁওতালরাই প্রধান অধিবাসী। আরো একটু উত্তরে গেলে, নেপালি অধিবাসীরাই প্রধান। এই উত্তরের জলপাইগুড়ির সঙ্গে জলপাইগুড়ির জনবসতিগত পার্থক্য নির্বাচন কমিশনও পরোক্ষে মেনে নিয়েছেন। দার্জিলিঙের লোকসভা আসন বলে যা পরিচিত, তার মধ্যে জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরাঞ্চলের অনেকটা পড়ে। অর্থাৎ জলপাইগুড়ি জেলার উত্তরের নেপালিরা, কোল-মুন্ডা-সাঁওতালরা দার্জিলিং লোকসভা আসনের ভোটার। এ ব্যবস্থা দু-তিনটে ভোট ধরে চালু হয়েছে। ফলে পার্বত্য এলাকার সঙ্গে জলপাইগুড়ির একটা সম্পর্ক প্রায় স্থায়ী হয়ে গেছে।

.

পাহাড় থেকে সমতল

ভৌগোলিক আরো একটা কারণ আছে জলপাইগুড়ির মধ্য দিয়ে পাহাড় আর সমতলের এই সংযোগের।

দার্জিলিঙের সঙ্গে শিলিগুড়ির সমতলভূমির সম্পর্কটাই চোখে পড়ে বেশি, সেই সম্পর্কটাতেই অভ্যস্ততাও বেশি। শিলিগুড়ি থেকে হিলকার্ট রোড দিয়েই দার্জিলিঙের সঙ্গে প্রধান সংযোগ। কিন্তু সেটাই পাহাড়ের সঙ্গে সমতলের একমাত্র সংযোগ নয়। জলপাইগুড়ি জেলার ওদলাবাড়ি থেকে গরুবাথানের রাস্তা সোজা উঠে গেছে লাভা-আলগাড়া হয়ে কালিম্পং। দার্জিলিং পাহাড় থেকে কালিম্পং পাহাড় আলাদা। আর, এই কালিম্পং পাহাড়ের সঙ্গে জলপাইগুড়ির সংযোগ অনেক প্রাচীন। এই গরুবাথানের রাস্তায়, বা লাভা-আলগাড়ার রাস্তায়, বা সরকারি ভাষায় ওল্ড মিলিটারি রোডে জলপাইগুড়ির অনেক চা-বাগান ধীরে-ধীরে ধাপে-ধাপে পাহাড়ে উঠে গেছে, পাহাড়ের আনাচে-কানাচে ঢুকে গেছে, পাহাড়ের আড়াল থেকে গড়িয়ে নেমে এসেছে। পাথরঝোরা, শুড়িবাড়ি, ছোট ফাগু, বড় ফাগু। আবার, এই সব পাহাড় জুড়েই উঠে গেছে জলপাইগুড়ি ডিভিশনের অধীনে ফরেস্টের নানা রেঞ্জ। কোনো একটা জায়গায় জলপাইগুড়ির জেলা শেষ হয়ে দার্জিলিং জেলা শুরু হয়ে যায় বটে, কিন্তু বাইরে থেকে তা বোঝাই যায় না। সর্বত্রই নেপালি শ্রমিক, নেপালি অধিবাসী। মানুষের মুখ আর মুখের ভাষায় কোনো ছেদ ধরা পড়ে না।

সেই নিরবচ্ছিন্ন মুখ আর ভাষার সূত্রেই সম্প্রতিকালে পাহাড়ি মানুষদের এক স্বাতন্ত্রের দাবি পাহাড়, থেকে জলপাইগুড়ির এই সমতলে নেমে এসেছে। সে-দাবিকে কাগজে কাগজে গোখাল্যান্ডই বলা হচ্ছে। বটে যেহেতু পাকিস্তান, খালিস্তান, ঝাড়খণ্ড ইত্যাদির পর যে-কোনো স্বাতন্ত্রের দাবিকেই–স্তান বা ল্যান্ড দিয়ে বোঝানোনা সহজ, কিন্তু আসলে সেই স্বাতন্ত্রের দাবির ভেতর নিহিত আছে–পশ্চিমবঙ্গের এই পার্বত্য এলাকার প্রতি দীর্ঘ-দীর্ঘ দিনের উপেক্ষা, পশ্চিমবঙ্গের বৃহত্তর সমাজে পাহাড়ের মানুষদের যোগ্য ভূমিকার অভাব, নিজেদের মাতৃভাষার অস্বীকৃতি আর, সবচেয়ে বড় কথা, আহত আত্মসম্মানবোধ।

আত্মসম্মান একবার আঘাত পেলে তার নানা বিকার দেখা দিতে পারে যেমন তেমনি আবার সেই আহত আত্মসম্মানবোধ থেকেই আত্মপরিচয় লাভের সুযোগও খুলে যেতে পারে।

পাহাড়ের মানুষ যখন হিশেব দাখিল করে যে পার্বত্য এলাকা থেকে কত কাঠ, কত চা, নীচে যায় আর সেই বাবদ সরকার কত টাকা আয় করে অথচ পাহাড়ের মানুষজনের জন্যে মাথা পিছু কত কম ব্যয় করে–তখন তার ভেতর নিহিত থাকে রাজ্যের সরকারেরই ভাষা ও বচন।

রাজ্যের সরকারও ত প্রায় একই ভাষায় হিশেব দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে কত টাকা সরকার, কেন্দ্রীয় সরকার, পায়, অথচ পশ্চিমবঙ্গকে কত কম ফিরিয়ে দেয়। রাজ্যের সরকার যখন মাতৃভাষার গৌরব প্রচার করে, মাতৃভাষাকে এ রাজ্যের সব কাজের ভাষা হিশেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি স্মরণ করে, মাতৃভাষাকে উচ্চতম শিক্ষার বাহন করতে চায়, তখন, এই রাজ্যের একটি অঞ্চলের প্রধান যে-অধিবাসীদের ভাষা বাংলা নয়, তারা ত নিজের উপেক্ষিত ভাষার জন্যে দুঃখ বোধ করতেই পারে।

আর, এরকম উদ্ভট সময়ে পাহাড় অঞ্চল থেকে কথা ওঠে–তিস্তা ব্যারেজের আসল মতলব পাহাড়ের নদীর জল সমতলের জন্যে টেনে নেয়া।

একথার কোনো যুক্তি নেই কারণ পুরো পাহাড় এলাকা পেরিয়েই ত ব্যারেজের জায়গায় জল আসছে। একথা ইতিহাসের দিক থেকেও ঠিক নয় কারণ উত্তরবঙ্গে সবচেয়ে বেশি নদী নিয়ে প্রকল্প তৈরি হয়েছে দার্জিলিং জেলাতেই। একথা পাহাড়ের স্বার্থেও ঠিক নয় কারণ তিস্তা প্রকল্পে ত পাহাড়ি অঞ্চলও উপকৃত হবে।

কিন্তু কথাটা রাজনীতির দিক থেকে বড় বেশি লাগসই কথা।

চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে, নীচে তিস্তার জলকে এক জায়গায় আটকে, তিস্তাকে একটা মূলখাতে বইয়ে দেয়ার কাজ চলছে, কাজ এগচ্ছে। দেখতে দেখতে ফরেস্টের ভেতর, এক নির্জন জায়গার চেহারা বদলে গেল সেই কাজের বেগে। দেখতে-দেখতে তিস্তার বুকে অন্ধকার রাত্রিতে আলো জ্বলে উঠল–রাতেও কাজ চলছে। সেদিকে আঙুল দেখিয়ে বলা যায়–ঐ দেখো, তিস্তা ব্যারেজের কাজ চলছে; তিস্তা ত পাহাড়ের নদী, কালিম্পঙের নদী, আমাদের নদী; কিন্তু এই যে আমাদের নদী সে যতক্ষণ পাহাড়ের ভেতর বয়ে যাচ্ছে ততক্ষণ তার দিকে রাজ্য সরকারের নজর নেই; এমন-কি সেই ইংরেজরা তিস্তার ওপর যেকটা সঁকো পাহাড়ে তৈরি করেছিল তারপর দেশী সরকার একটি কোও তৈরি করে নি; অথচ দেখো, নীচে, সমতলে কত বড় তিস্তা ব্রিজ তৈরি হল; ওরা আমাদের নদীও লুটে নিচ্ছে; আমরা এ হতে দেব না; তিস্তা ব্যারেজ ভাঙতে হবে।

এই সব যুক্তি বড় তাড়াতাড়ি লোকের মনে ধরে। বঞ্চিত মানুষ বড় তাড়াতাড়ি হিংসুটে হয়ে উঠতে চায়, তাতে তার মনে একটা সান্ত্বনা অন্তত পায়। আর, চোখের সামনে গড়ে ওঠা একটা জিনিশকে ভাঙার আহ্বান দিলে লড়াইটা একটা প্রত্যক্ষতা পায়। তাই পাহাড় থেকে পাহাড়ি মানুষের আওয়াজ উঠেছে–তিস্তা ব্যারেজ ভাঙতে হবে। সে আওয়াজ হাজার-হাজার বছরের প্রাচীন রাস্তা বেয়ে জলপাইগুড়ির সমতলে যে-পাহাড়ি মানুষ আছে তাদেরও মুখে উঠে এল–তিস্তা ব্যারেজ ভাঙতে হবে।

উত্তরখণ্ড, কামতাপুর, গোর্খাল্যান্ড ও পুরনো চরের নমশূদ্রদের সংগঠন–এই এতগুলো আন্দোলনের বিরোধিতার সামনে সরকার তিস্তা ব্যারেজের কাজের গতি বাড়িয়ে দিল। প্রথমত, এই এতগুলো বিরোধিতার মধ্যে কোনো ঐক্য নেই। প্রত্যেকেরই আলাদা-আলাদা কারণ আছে এবং সে কারণগুলি পরস্পরের বিরোধী। উত্তরখণ্ড চায় ভাটিয়া তাড়াতে। নমশূদ্ররা চায় উপযুক্ত পুনর্বাসন। উত্তরখণ্ড চায় স্বতন্ত্র রাজ্য। কামতাপুর চায় আসামের একটা অংশের সঙ্গে মিলন। গোর্খাল্যান্ড চায় স্বাতন্ত্র-আলাদা রাজ্য হিশেবে হলেই ভাল হয়।

প্রতিপক্ষদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া অসম্ভব, সুতরাং রাজ্য সরকার তার নিজের রাজনৈতিক শক্তিকে সংহত করতে পারে। বামফ্রন্টের ভেতরকার পার্টিগুলো ত আছেই, বাইরের পার্টির মধ্যে কংগ্রেস-এর পক্ষে রাজনীতিগত ভাবে এই সব দলের কোনোটিকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়া অসম্ভব। সুতরাং. এই অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঐক্যের সঙ্গে তিস্তা ব্যারেজের আংশিক কাজ সম্পূর্ণ করে যদি উদ্বোধন ঘটানো যায়, তা হলে উত্তরবঙ্গের লোক হাতেনাতে প্রমাণ পাবে যে এই সরকার তাদের কথা কতটাই ভাবছে।

এরই সঙ্গে-সঙ্গে সরকার, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলার চা বাগানগুলিতে, যেখানে-যেখানে তাদের ইউনিয়ন আছে সেখান থেকে, প্রধানত পাহাড়ি মানুষদের একত্রিত করেছে। জলপাইগুড়ি-কোচবিহারে তাদের কৃষক সংগঠনগুলিকে প্রচারে নামিয়েছে। তারা রাজনীতির দিক থেকে অনেক সুসংহত। তারা পাহাড়ের মানুষজনের ও রাজবংশীদের মধ্যে প্রায় এক বছর ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদ-এর বিরুদ্ধে প্রচার করে আসছে। এবং সংখ্যার দিক থেকে তারাই গরিষ্ঠ।

তাই, তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন উপলক্ষে–উত্তরখণ্ড, কামতাপুর, গোর্খাল্যান্ডের দল আজ বিক্ষোভ করছে বটে কিন্তু সে-বিক্ষোভ তিস্তা ব্যারেজ পর্যন্ত পৌঁছবে না, পৌঁছতে দেওয়া হবে না। সরকারের দলগুলিও সারা জেলা থেকে মিছিল নিয়ে ব্যারেজে যাচ্ছে সমর্থন জানাতে। কেন্দ্রীয় সরকারের জলবিষয়ক রাষ্ট্রমন্ত্রী, রাজ্য সরকারের সেচমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং আসছেন উদ্বোধন করতে। আর এরই ফলে ব্যারেজ ঘিরে, পুলিশ, সি-আর-পি, বিএসএফের পাকের পর পাক, পাকের পর পাক।

.

নির্বাচন ও উদ্বোধন

তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন তাই একটা সরকারি প্রকল্পের উদ্বোধনমাত্র নয়, হয়ে উঠেছে একটা রাজনৈতিক ঘটনা।

সরকার ও সরকারের অন্তর্ভুক্ত দলগুলি পরিষ্কার শক্তিপরীক্ষায় নেমেছে। তারা এটা প্রমাণ করে দিতে চায় যে এই সব কামতাপুর, উত্তরখণ্ড, নমশূদ্র সমিতি, গোখাল্যান্ড ইত্যাদির কোনো রাজনৈতিক ভিত্তিই নেই। নেহাত, সরকারে পক্ষে এদের দমন করাটা একটা কৌশলগত প্রশ্ন, তাই, দু-পাঁচজন লোক এক হয়েই একটা স্তন বা ল্যান্ডের শ্লোগান দিতে পারে। তারা ত শ্লোগান দিয়েই খালাশ। সরকারের পক্ষে ত আর সব সময় তাদের জেলে ভরা সম্ভব নয়। জেলে ভরলে ত তাদের নেতা বানিয়ে দয়া হবে। আর-এক হয়, হাঠে-মাঠে যেখানেই তারা মিটিং-মিছিল করবে–সেখানেই পুলিশ দিয়ে মেরে ছাতু করে দেয়া। পুলিশের মারের অনেক সুফল আছে। কিন্তু মার দিতে বললে পুলিশ ত আর রয়ে-সয়ে মার দেবে না। তাতে যদি দু-একটা মারা যায়, তা হলে তাই নিয়ে সারা দেশে গোলমাল বাধবে। মারা না গেলেও, পুলিশের মারের খবর কাগজে-পত্রে এমন ফলাও হয়ে বেরবে যে আন্দোলন থামার বদলে চাগিয়ে উঠবে।

তার চাইতে বরং এরকম কর্মসূচিই ভাল। দীর্ঘদিন ধরে সরকারের দলগুলি প্রচার করেছে, নিজেদের কথা লোকজনকে বুঝিয়ে বলেছে, সরকারের দলগুলির নানা নেতা নানা জায়গায় নানা দফায় মিটিং করেছে। একই সঙ্গে তিস্তা ব্যারেজের পর্যায়ক্রমিক কাজের মধ্যে অদলবদল ঘটানো হয়েছে, চিফ ইনজিনিয়ার ও মন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে–এক বছরের মধ্যে উদ্বোধন করা হবে সাব্যস্ত হয়েছে। রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এই নিয়ে কথা বলেছে। সরকারের দলগুলির প্রথমে ইচ্ছে ছিল প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করানো। তা হলে কামতাপুর, উত্তরখণ্ড, নমশূদ্র সমিতি, গোর্খাল্যান্ডের পেছনে যে কংগ্রেসি জনসাধারণের সমর্থন আছে, তারা দ্বিধায় পড়বে। কারণ ঐ মঞ্চ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে বলতেই হবে। প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী রাজনীতিগত ভাবে একই কথা বললে, তার একটা অন্য ধরনের প্রভাব পড়বেই। কিন্তু এই প্রস্তাবে বাদ সাধেন রাজ্যের বড়বড় অফিসাররা দু-চারজন। তারা প্রথমে বলেছিলেন–এরকম সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্ব ও-রকম ভৌগোলিক অবস্থানে রাজ্য সরকারের পক্ষে পালন করা সম্ভব হবে না। বা, সে দায়িত্ব, নেয়া উচিত হবে না। আর, প্রধানমন্ত্রীকে দিয়ে উদ্বোধন করালে এই ঘটনা একটা জাতীয় গুরুত্ব পাবে। সেই গুরুত্বের কারণেই আন্দোলনকারীরা নতুন ভাবে উৎসাহিত হতে পারে। সেই সুবাদে তারা হয়ত সত্যি একটা সক্রিয় বিক্ষোভ দেখিয়ে বসতে পারে। বিশেষত, গোখারা। পরন্তু হাসিমারায় সেনাবাহিনীর এয়ারস্ট্রিপেই নামুন আর বাগডোগরা এয়ারপোর্টেই নামুন–প্রধানমন্ত্রীকে গাড়িতে করে এতটা পথ জঙ্গল ও পাহাড়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে, সেসব পাহাড় ও জঙ্গলের গাছে কোনো গোপন আততায়ীর লুকিয়ে থাকা অসম্ভব নয়।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ত হ্যাঁলিকপ্টারে চড়ে একেবারে তিস্তা ব্যারেজের ওপরেই নামতে পারেন।

এতখানি আলোচনার পর দু-চার জন অফিসার তাদের আসল বক্তব্য পরস্পরের আড়ালে মুখ্যমন্ত্রীকে জানান–তিস্তা ব্যারেজের মত এত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কৃতিত্বের ভাগ কেন্দ্রকে দেয়া রাজনীতিগত ভাবে ঠিক নাও হতে পারে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করলে তার ওপরই মিডিয়া নজর দেবে বেশি। এখন, বিশেষত নির্বাচনের যখন মাত্র কয়েক মাস বাকি, এরকম কিছু করা অনুচিত হবে।

নির্বাচনটা এসে যাচ্ছে বলেই, তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন, সেই উদ্বোধন নিয়ে জনসমাবেশ, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আলাদা-আলাদা সমাবেশের মিলিত সংখ্যার চাইতেও বড় সমাবেশ করে সরকারের ও সরকারি দলগুলির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা–এগুলো এতই জরুরি। সরকারি দলগুলি স্থির করেছে যে তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধন আসলে হবে নির্বাচনী অভিযানের শুরু। এই সমাবেশের শক্তিকে, তিস্তা ব্যারেজের সাফল্যকে এমন ভাবে সেদিন তুলে ধরতে হবে যে সেই ধাক্কায় সামনের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। উত্তরবঙ্গের মোট আসন সংখ্যা যদি সরকারি দলগুলি রাখতে পারে–দুটো-একটা সিটের অদলবদলের দুর্ঘটনা সত্ত্বেও–তা হলেই যথেষ্ট। আর, যদি সেই সিটের সংখ্যা দুটো-একটাও বাড়াতে পারে, তা হলে ত কথাই নেই। সেটা একমাত্র সম্ভব যদি সরকার ও সরকারি দলের রাজনৈতিক অভিযান তীব্র করে তুলে, কংগ্রেসের সঙ্গে এই সব বিচ্ছিন্নতাবাদীদের প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য কোনো আপস-সমঝাওতা অসম্ভব করে তোলা যায়। নির্বাচনী কৌশলের দিক থেকে, এই সব উটকো দলগুলির ফলে, তা হলে, বামফ্রন্ট ও তার অন্তর্গত দলগুলির উপকারই হবে। কংগ্রেস-সমর্থক ভোট যদি সরকারি কংগ্রেস প্রার্থী ও এই সব উটকো দলের প্রার্থীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়, তা হলে, বামফ্রন্ট গতবারের চাইতেও বেশি আসন পাবে–উত্তরবঙ্গে। সুতরাং, তিস্তা ব্যারেজ উদ্বোধন উপলক্ষে বামফ্রন্ট তার দলগুলির ও তার সরকারের সমস্ত শক্তি বিনিয়োগ করেছে।

কোথায় ভুটান সীমান্তের চা-বাগানের কোল-মুন্ডা সাঁওতাল শ্রমিক–সেই সাঁওতালপুর, কালচিনি, রাঙ্গালিবাজানা, রাজভাতখাওয়া থেকে তারা রাজবংশীদের সঙ্গে ট্রাকে-ট্রাকে মিছিল করে আসবে। একটা মস্ত বড় সুবিধে হয়েছে, চা-বাগানগুলি নিজেরাই ট্রাক দিয়েছে। অন্য দিকে জয়ন্তীর রাস্তা ও বিন্নাগুড়ি থেকে শুরু করে ঐ তল্লাটের সব উজাড় করে আনা হবে। ময়নাগুড়ি থেকে শুরু করে একদিকে লাটাগুড়ি পর্যন্ত লোকজন ত মিছিল করেই আসবে–তাদের ত ঘরের ব্যাপার। মাদারিহাট-বীরপাড়া-হাসিমারা থেকে ট্রাক আসবে ল্যাটারাল রোড ধরে। মেটেলি থেকে শুরু করে মেটেলির পেছন দিয়ে সেই মাইল-মাইল দূরের গরুবাথান রোডের চা-বাগানগুলির ভেতর থেকে নেপালি শ্রমিকদের খুব সংগঠিত ভাবে আনা হবে।

রাজবংশী বা মদেশিয়া জনসাধারণ জুটে যাবে, কিন্তু নেপালিদের সংগঠিত ভাবে নিয়ে না-এলে নিজে থেকে জুটে নাও যেতে পারে। ওদিককার পাহাড়ি চা বাগানগুলির আয়তন ছোট-ফলে নেপালি শ্রমিক থাকলেও সংখ্যা খুব বেশি নয়। সেই জন্যে সরকার ও সরকারি দলগুলি অন্য ব্যবস্থাও নিয়েছে। কয়েক বছর আগে ফরেস্টের পতিত জমি দখল করার জন্যে নেপালিরা প্রায় মিছিল করে এক-একটা ফরেস্টে ঢুকেছিল। তখন এ নিয়ে খুব হৈ-হৈও হয়েছিল। পরে, সরকার চুপ করে যায়–ভাবখানা যেন এদের জবরদখল মেনেই নিল। আসলে, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টকে নির্দেশ দেয়া হয়, মাস তিন-চার পর থেকে নতুন গাছ লাগানোর কর্মসূচি হিশেবে জবরদখলকারীদের তারা তুলে দেবে। সব জায়গায় একসঙ্গে নয়। বড় জবরদখল কলোনিতে আগে নয়। এমনকি পর-পরও নয়। যেন জবরদখলকারীরা মনে করে যেন গোলমালে দরকার নেই বরং একই ফরেস্টের নতুন জায়গায় বসতি করা নিরাপদ। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট দরকার হলে পুলিশের সক্রিয় সাহায্য নেবে। এই পদ্ধতিতে নতুন জবরদখল ঠেকানো গেছে, কিন্তু পুরনো জবরদখলকারীদের সব জায়গা থেকে তুলে দেয়া এখনো শেষ হয়নি। নির্বাচনের আগে একাজ আর করাও হবে না। এমন জবরদখলকারীর সংখ্যা এখনো কয়েক হাজার। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের ও ফরেস্টের কনট্রাকটারদের অসংখ্য ট্রাকে এই জবরদখলকারীদের ব্যারেজে নিয়ে আসা হচ্ছে। তাদের আশা, সরকারকে সমর্থন করলে স্থায়ী বসবাসের পাট্টা মিলতে পারে।

সরকার ও সরকারি দলগুলি এই অভিযানে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যেন কোনো বিক্ষোভ প্রদর্শনের মত সাহসও না পায়।

.

মাদারির মা জলুশে যায় কেন

কিন্তু যার জলুশ যেখানেই যাক, মাদারির মা জলুশে যায় কেন? মাদারি হাট থেকে জুলুশের খবর নিয়ে এসেছে বলেই ত আর মাদারির মা জলুশে যেতে পারে না? যে-জুলুশে লোক দরকার, লোক বাড়ানোর দরকার, সে-জলুশের মাতব্বরদেরও ত মাদারির মাকে মনে পড়বে না। এই এত-এত বাড়ি-টাড়ির মধ্যে মাথা গোজার একটা ঠাই জোগাড় করার ক্ষমতা যার নেই, এই এত ঘন এত বড় ফরেস্টের মধ্যে কোন এক জায়গায় কোনো ঝোরার পাশে যাকে একটা শ্যাওড়াঝোরা বানাতে হয়, তার কোনো জলুশ থাকে না। এক দিন জলুশে যাবার অর্থ ত তার কাছে একটি দিন না-খেয়ে থাকা। একটি দিন না-খেতে পাওয়া বা না-খেয়ে থাকা মাদারির মায়ের কাছে কোনো অদ্ভুত ব্যাপার নয়। এমনও নয় যে সে তার একটা পুরো দিন নষ্ট হওয়াটা মাপতে পারে হাজিরা কত নষ্ট হল তার হিশেব দিয়ে। পেটের খিদে বা শ্রমের পয়সা–এর কোনোটাই মাদারির মায়ের দিনযাপনের মাপ নয়। তাহলে তার দিন নষ্ট হল কি হল না সেটা মাপা যায় কী করে?

এই ফরেস্টে, এই শ্যাওরাঝোরায় তাকে প্রতিদিন, প্রতিটি দিন, নিজের খাবার জোগাড়ে বেরতে হয়–যেভাবে ফরেস্টের মুরগি বেরয়, পাখি বেরয়, বড় বড় জীবজন্তু–যেমন হাতি, গণ্ডার–এরাও, বরয়। আর, তার নিজের খাবারের পরিমাণটা ত ঠিক করা নেই যে সেইটুকু সংগ্রহ হয়ে গেলেই তার কাজ ফুরিয়ে যাবে। সারা দিন ফরেস্টের ভেতরে-ভেতরে তাকে ঘুরে বেড়াতে হয়–ঘুরে বেড়াতে হয় মাটিতে চোখ রেখেই। ফরেস্টের ভেতরে ত আর মাটি দেখা যায় না, শুধু বুনো লতা-পাতা আর ঘাস। কখনো সে-লতা-পাতা আর ঘাসে মানুষ ডুবে যেতে পারে, ঠেলে এগনো যায় না। কখনো আবার, ছোট-ছোট খোলা রাস্তা পাওয়া যায়। এসব ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বানানো রাস্তা–জীবজন্তুদের যাতায়াতের সুবিধের জন্যে,, ভেতরের গাছ কেটে জমা রাখার সুবিধের জন্যে। এরকম বেশ মাঠের মত চওড়া বড় রাস্তাও ফরেস্টের ভেতরে-ভেতরে আছে। সেই সব রাস্তা দিয়ে ট্রাক ঢোকে, হাতির পালদেরও অভ্যেস হয়ে যায় এরকম রাস্তা দিয়ে হাঁটা। মাঝে-মাঝে আবার মাটির ছোট-ছোট ঢিবলি লবণ দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়। জীবজন্তুরা এসে সেগুলো চাটে।

মাদারির মায়ের তাই দুটো জিনিসের কখনো অভাব হয় না–উনুন জ্বালাবার জন্যে শুকনো, পাতলা, ছোটখড়িকাঠের, আর লবণের। কিন্তু সেই শুকনো খড়িকাঠে আগুন দেবার জন্যে তার কাছে কোনো দেশলাই থাকে না, সেই আগুনের ওপর দেবার জন্যে একটা ভাঙা পাত্র তার কাছে আছে বটে কিন্তু সেই পাত্রের ভেতর দেয়ার কিছু থাকে না। এত নুন পেতে পারে মাদারির মা, কিন্তু নুন নিয়ে মাখবে এমন কিছু সে রোজ পায় কোথা থেকে?

সকাল থেকে ফরেস্টের ভেতর মাটির দিকে তাকিয়ে ঘুরে বেড়ানোরও ত একটা মানচিত্র আছে। বেশি বনবাদাড়ের মধ্যে ঢুকলে খোঁজা যায় না, জঙ্গল চারদিক থেকে এমন চেপে ধরে যে জলের মধ্যে শাস নেয়ার জন্যে যেমন নাক উঁচু করে রাখতে হয় তেমনি নাক উঁচু করে চলতে হয়। তা হলে আর মাটির দিকে তাকাবে কী করে? ঐ সব বনবাদাড়ের ভেতরই কিছু চট করে পেয়ে যাওয়ার আশা থাকেবনমুরগির ডিম, বা বনমুরগির ডিম থেকে বেরনো অথচ দৌড়তে না-শেখা ছোট ছানাই গোটা একটা, মেটে ইঁদুরের গর্তের ভেতর হাত ঢুকিয়ে ইঁদুরের ছোট-ছোট বাচ্চাও জুটে যেতে পারে। সুতরাং বনবাদাড়ের ভেতর না ঢুকে ত মাদারির মায়ের কোনো উপায় নেই। তার শরীরের অভ্যাসও কেমন এই বনবাদাড়ের সঙ্গে মানিয়ে গেছে। মুখটা একটু উঁচুতে রাখলেও সে ঠিক জঙ্গলের মাটি দেখতে পায়, দেখতে-দেখতে খুঁজতেও পারে। মাদারির মার চোখদুটো থুতনির নীচে থাকলে ভাল হত।

এটাই ত তার সারা দিনের কাজ। হাতে একটা শক্ত লাঠি থাকে, বেশ ভারী, শালগাছের ডাল–ভেঙে নেয়া। খুব খিদের সময় লাঠিটাকে তার ভার মনে হয়। তা ছাড়া ঐ লাঠিটাই ত অস্ত্র। লাঠিটার তলার দিকটায় একটা কোণ আছে। ঐ কোণটুকু রেখেই লাঠিটা ভাঙা হয়েছে। ফলে, লাঠির আওতায় যদি কোনো ছোট প্রাণী পড়ে যা মাদারির মার খাদ্য হতে পারে, তা হলে ঐ লাঠি নিশ্চিত তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ে। কোনো-কোনো সময় চলতে-চলতেই লাঠিটাকে বর্শার মত বিধিয়ে দেয়–যেভাবে মাছ মারে। আর কোনো-কোনো সময় মুহূর্তে লাঠিটাকে মাথার ওপর তুলে এনে শরীরের সমস্ত জোর দিয়ে সেটাকে নামিয়ে নিয়ে আসেকুড়ুলের মত। সেই সমস্ত সময় মাদারির মায়ের পুরো শরীরটা + জেগে ওঠে। ফরেস্টের ঐ আবছায়ায়–শাল-সেগুন-খয়ের-অর্জুনের পরিপ্রেক্ষিতে মাদারির মাও যেন একটা গাছই হয়ে ওঠে এমনই তার হাত দুটো ঋজু উঠে যায় মাথার ওপরে আর খর নেমে আসে, যেন, ঝড়ে কোনো গাছ হঠাৎ প্রাণ পেয়েছে। সেই দাঁড়িয়ে ওঠায় আর নেমে আসায় মাদারির মার এই শরীর ক্ষোদিত হয়ে যায়, যে-শরীর শুধু শরীরের জোরেই বেঁচে আছে, যে-শরীর শুধু শরীরের জোরেই আটটা না-দশটা সন্তানের জন্ম দিয়েছে।

আসলে এই ফরেস্টে খুব ভাল সাপ পাওয়া যায়। সাপের মাংসে তেল খুব আর ঝলসে নিতে আগুনের তাপও লাগে কম। চার পেয়ে মুখ-উঁচু সাপ পেলে ত কথাই নেই–অমৃত। কিন্তু ছোটখাট সাপও ত নেহাত কম নেই। মাদারির মা বিষধর সাপ চেনে। তাই চোখের সামনে পিঁপড়ে না-ধরা কোনো টাটকা মরা খরগোশ বা ধেড়ে ইঁদুর পেলেও সে ঘেঁয় না, এমন-কি লাঠি দিয়ে উল্টেও দেখে না। ফরেস্টে যা মরে তাকে মাটির সঙ্গে মিশে যেতে দিতে হয়। মরা জীবজন্তু খেয়েই বেঁচে থাকে এমন পাখি-পোকামাকড়ও ত ফরেস্টে থাকে।

ট্রাকমোছা আর ঘোমশাইয়ের দোকানে কাপডিশধধায়া বাবদ মাদারি ত আজকাল ভাজ করা টাকাও আনে, মাঝে-মাঝেই, প্রায় এক হাট বাদে বাদে ত বটেই। মাদারির মা তাই কোনো-কোনো হাটে চাল কিনতে পারে–চা বাগানের যে-মজুররা রেশনের চাল এনে হাটে বেচে দিয়ে হাড়িয়া খেয়ে গান। গাইতে-গাইতে বাগানে ফিরে যায়, তাদের কাছ থেকে।

কিন্তু চাল কেনা যত সহজ, আগুন কেনা তত সহজ নয়। একটা আস্ত দেশলাই কেনা আর একটা আস্ত আগ্নেয়গিরি কেনা ত মাদারির মার কাছে একই কথা। চাল সে পেতে পারে, কিন্তু আগুন সে পাবে কোথায়?

মাদারির মাকে তার জন্যে কত কৌশল করতে হয়।

হাটে কোনো একটা জায়গায় সে চুপচাপ ঠেস দিয়ে থাকে। সাধারণত, একটা বড় গাছের তলায় ছোটখাট দু-তিনটে দোকান বসে। তৎসত্ত্বেও সেখানে, সেই গাছের গুঁড়িতে, মাদারির মায়ের ঠেস দেবার মত জায়গা বাকি থাকে। মাদারির মা সেখানে ঠেস দিয়ে বসে। বসেই থাকে। ঠিক বসা নয়, আধশোয়া হয়ে থাকে। ফরেস্টের ভেতর রোজ সারাদিন যে মুরগির মত সাবধানী, গুইসাপের মত নিভৃতচারী, গোখরোর মত কালান্তক, সে কিনা এখানে, এই হাটে তিনকাল-পেরনো এক বুড়ির মত শিথিল শরীর এলিয়ে দেয়।

মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা তৈরি হয় বা ঘুচে যায় রহস্যময় সব কারণে। মানুষের সমাজ থেকে সরতে সরতে যে এখন ফরেস্টের ভেতর সেঁদিয়ে গেছে, সে এতক্ষণ একই গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে আছে এই সুবাদে দোকানির আত্মীয় হয়ে যায় আর দোকানি, তার দিকে না-তাকিয়েই, একটা বিড়ি বাড়িয়ে দেয়–হাতটা পেছনে ছড়িয়ে। দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে নিজেরটা ধরিয়ে একটু কোমর বেঁকিয়ে মাদারির মারটাও ধরিয়ে দেয়। কাঠি নিবে গেলে, নিজের জ্বালানো বিড়িটাই এগিয়ে দেয়। এরকম বার-দুই বিড়ি খেয়ে মাদারির মা তার কাছ থেকে দেশলাইয়ের বাক্সের গায়ে বারুদের ভাঙা একটা টুকরো আর দুটো কাঠি চেয়ে নিতে পারে। এরকম চাওয়ার ফলে পঁচ-সাতটা কাঠিসমেত একটা আস্ত বাক্সই কেউ-কেউ দিলে তখন দুশ্চিন্তা আসে এই কাঠিগুলো সতেজ থাকতে-থাকতে ব্যবহার করার সুযোগ পাবে ত? কেউ তার প্রথম বিড়িটা লাইটারে জ্বালিয়ে দিলে মাদারির মা তার ঠেস দেয়ার গাছ বদলায়। আর, নেহাত যদি দেশলাই না পায় সেদিন মাদারি ঘোমশাইয়ের দোকান থেকে বেশ খানিকটা আগুন নিয়ে যায়।

.

মাদারি কী করে আগুন নিয়ে যায়

এই আগুন নিয়ে যাওয়ার বিশেষ একটা পদ্ধতি আছে মাদারির।

কলাপাতা বা কচুপাতায় সে ছোট-ছোট কয়লার কুচি প্রথমে ছড়িয়ে দেয়। তারপর কয়লার কুচি দিয়ে গতি মত বানায়। তার ওপর গনগনে দুটো কয়লা বসিয়ে, আবার গুড় কয়লায় ঢেকে কুচো কয়লা ছড়িয়ে দেয়। দুই হাতে সেই কলাপাতার কয়েকটি টুকরো বা কচুপাতার ওপরে আগুন নিয়ে তারা মা-ছেলে হাটখোলা থেকে শ্যাওড়াঝোরার দিকে রওনা হয়।

এটা তাকে করতে হয় ঘোমশাই দোকান ছেড়ে চলে যাবার পরে অর্থাৎ হাট ভেঙে গেলেই শুধু নয়, হাট খালি হয়ে গেল। বাহাদুর উনুনের আঁচ ফেলে দেয়। তারপর, বাহাদুরই একটু সাহায্য করে গনগনে কয়লাটা বাছতে।

কিন্তু আগুনটা এমন দুই হাতের পাজায় এতগুলো মাইল নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টকর। হাত ধরে আসে–সেটা বড় কথা নয়। আসলে বিপদ আগুনটাকে বাঁচিয়ে রাখা। বৃষ্টিবাদল হলে ত গেল। তবু কচুপাতার ঢাকনার নীচে আগুনটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলে। যদি একটু বাতাস থাকে, বা এমনকি পাশ দিয়ে একটা ট্রাক চলে যাওয়ার ফলেও যদি বাতাস লাগে, কয়লার কুচি উড়ে যায়, গায়ে পড়ে, চোখে লাগে, আগুন বেরিয়ে পড়ে। তাই তখন মাদারিকে বাতাসের দিকে পিঠ ফেরাতে হয়, বা, সামনের ট্রাকের দিকে। ট্রাক চলে গেলে আবার সোজা হওয়া যায় কিন্তু বাতাসের দিকে পিঠ ফেরালে ত সেই সারা রাস্তাটাই আগুন বাঁচাবার জন্যে পেছন ফিরে হাঁটতে হয়। তাতে সময় অনেক বেশি লাগে। এক ঘুম পাওয়া ছাড়া তাতে আর মাদারির আপত্তি কী? তার কাছে ঘরে গিয়ে আগুনটাকে বাঁচানোর কাজ যেমন কঠিন, রাস্তাতে আগুনটাকে বাঁচিয়ে রাখার কাজও ততটাই কঠিন। এরকম করে বয়ে নিয়ে যাওয়া আগুনের পরিণতি নানারকম হতে পারে–নিভে ছাই হয়ে যাওয়া ছাড়াও। বাতাসের কী ট্রাকের আসা-যাওয়ায় ওপরের কয়লায় তাড়াতাড়ি আগুন লেগে যেতে পারে। তাড়াতাড়ি আগুন লাগা মানেই তাড়াতাড়ি ছাই হওয়া। আর আগুন যদি একবার ভেতর থেকে এরকম ওপরে উঠে আসে, তা হলে জ্বলন্ত কুচি কয়লা আর গুড়ো কয়লা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ওড়া শুরু করে, তখন ফেলে দেয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আর-এক বিপদ হতে পারে, ঠিক এর বিপরীত পদ্ধতিতে। আগুন তাড়াতাড়ি নীচের দিকে নেমে গেল আর নীচের গুঁড়ো কয়লা আর কুচি কয়লায় লেগে আগুন ত পাতার ওপরে চলে আসে। তখন অবিশ্যি মাদারি তার মাকে বলে, রাস্তার ধার থেকে কিছু পাতা ছিঁড়ে আনতে। নীচে পাতার পলেস্তারা আরো বাড়িয়ে দিলে হাতে আগুনের আঁচ লাগে না।

যে-ন্যাশন্যাল হাইওয়ের ওপর দিয়ে এই দেশ ভারতবর্ষের কোনো এক রাজ্য থেকে আর-এক রাজ্যে মাল নিয়ে দিনরাত ট্রাক চলে–কত নতুন-নতুন সঁকো পেরিয়ে, কত নতুন-নতুন রাস্তা দিয়ে পথ ছোট করে করে, কত নতুন-নতুন পদ্ধতিতে গতি বাড়িয়ে বাড়িয়ে–সেই ন্যাশনাল হাইওয়ের স্বাদেশিক বিস্তারের অতি ক্ষুদ্র বা আণবিক এক ভগ্নাংশে পূর্ব গোলার্ধের এই রাত্রির কয়েকটি মাত্র ঘণ্টা জুড়ে এক মা তার সন্তানের সঙ্গে আগুন দিয়ে পথ হাঁটে, বা এক অগ্নিবহ বালক মায়ের সঙ্গে তার অরণ্যনিবাসে ফিরে চলে। কাল ন্যাশন্যাল হাইওয়ে কালই থাকে কিন্তু চারপাশের অন্ধকারে সেই রাস্তাটা আর দেখা যায় না, কেবল পায়ের তলায় অনুভব করা যায়-জলের ভেতর দিয়ে হাঁটলে যেমন জলের ভেতরের মাটিটুকু শুধু পা দিয়ে অনুভব করতে হয়। মাটিতে এমন অন্ধকার থাকলে সাধারণত আকাশের নক্ষত্রের দীপ্তি বেড়ে যায়, এতই বেড়ে যায় যে মনে হয়, নক্ষত্রের আলো পৃথিবীর মাটি পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এক্ষেত্রে, সে সুবিধাটাও থাকে না। কারণ ভারতবর্ষের গভীরতম এক অরণ্য দিয়ে ভারতবর্ষের জাতীয়– এই পথ গেছে। ঠিক সেই পথটুকুতেই এই রাত্রিতে মা ও ছেলে হাঁটছে। দুপাশের আকাশ-ঢাকা গাছ থেকে অন্ধকার পড়ছে। সেই গাছের পাতার ঘন বুনটের ভেতর দিয়ে আকাশটাকে কোথাও কোথাও আলোয়-আলোয় বুটিদার দেখায় বটে কিন্তু সে যেন নদীর অন্য পারের মত, যার বাস্তবতার সঙ্গে এই বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই, একেবারে কোনো সম্পর্কই নেই। বরং এই সময় আকাশের দিকে দু-একবার চোখ তুলে তাকানো বিপজ্জনক। পরে, চোখ নামালে এই অন্ধকারে আর-কিছুই দেখা যায় না। রাস্তার দুপাশ থেকে, ফরেস্টের গাছ-গাছালির ভেতর থেকে যে-অন্ধকার আড়াআড়ি উঠে আসছে সেটা বরং এদের কাছে কিছুটা পরিচিত। এই নিশ্চিদ্র কালর মধ্যে এই মাদারির হাতে শুধু কমলা রঙের একটা চাপা আগুন। এই আগুনটা যদি শ্যাওড়াঝোরা পর্যন্ত পৌঁছয় তা হলে মাদারির মায়ের আনা • শুকনো খড়িকাঠ লেলিহান জ্বলে উঠবে আর ঘরের সেই একটি মাত্র পাত্রটি নিয়ে মাদারি ঝোরা থেকে জল নিয়ে আসবে। সেই আগুনে, ধোয়ায়, চাল সেদ্ধ হওয়ার এক আদিম মানবিক গন্ধ ঐ আরণ্যক রাত্রিকে হঠাৎ কোমল করে তুলবে, অন্ধকার তত আর অন্ধকার থাকবে না। সেই আগুনের শিখার পাশে ছেলের সঙ্গে মায়ের আর-এক সংলাপ শুরু হতে পারে। কিন্তু সেই আর-এক সংলাপের কাছে পৌঁছনোর জন্যে এই রাস্তার কয়েক মাইল তাদের দুজনের সহযাত্রিক নীরবতা এই রকম নানা কথা দিয়ে দিয়েই খচিত হতে থাকে, নইলে, তাদের নীরবতাও ত প্রাকৃতিক হয়ে যেত।

মাই গে।

হয়

হে-এ মাদারি

হয়।

মাই গে

হয়,

মুই ভুলি গেইছু রে–

কী ভুলিছিস?

লড্ডু আর নিমকি–

কায় দিছে তোক?

ঘোষমশাই কইছিল দোকান বন্ধ করিবার আগত একখান লাড়ু আর একখান নিমকি নিবার তানে। কইছিল। মুই নিবার ভুলি গেইছু।

কেনে? ভুলি গেইছিস কেনে?

তোর এই আগুনটার তানে—

আগুনটার তানে লাড্ড খোয়র কথা ভুলি গেছিস? লাড্ডু ত মিঠা লাগে।

হয়। খুব মিঠা। তক খোয়াম মুই সামনের হাটবার।

সব হাটবারত তক লাড়ু দেয়, খোয়ার তানে?

না দেয়, শুধু একখান হাটত দেয়। তোক খোয়ব সামনের হাটবার।

মাদারির মা তার জিভের স্বাদের স্মৃতিতে মিষ্টি কাকে বলে তার এক সন্ধান চালায়।

মাই গে

হয়।

বাহাদুরদাখান কইছে মোক চা বানিবার শিখাবে।

কী হবে তার বাদে?

মোক চাকরি দিবে, চায়ের দোকানত—

ত শিখায় না কেনে?

টেবিলখান এ্যালায়ও মোর মাথার উপরত।

মাদারির মা সেই অন্ধকারে ছেলের দৈর্ঘ্যের মাপ যেন প্রথম পায়। টেবিলের উচ্চতা পর্যন্ত গেলে মাদারি এখানে থাকবে না। মাদারির দাদারা, মাদারির মায়ের আরো আট-না দশ সন্তান কেউ থাকেনি। থাকে না। তা হলে মাদারির মা জলুশে যাবে কেন?

মাদারির মা কতবার মা

মাদারির মা এখন মাদারির মা, বড় জোর আট-দশ বছর, তার আগে সে আরো অনেকবার আরো অনেকের মা হয়েছে। কতবার কত মাদারির মা, তা এখন হিশেব কষে বের করতে পারবে না। এখানে, এই শ্যাওড়াঝোরায় মাদারির মা কত বছর আছে সে হিশেবও তার জানা নেই। কিন্তু মাদারির জন্মের আগে থেকে মাদারির মাকে চেনে এমন লোকজন মাদারিহাটে এখনো অনেকেই আছে। চেনে, মানে, মুখটা চেনা–এই পর্যন্তই। তাই চাইতে গভীর ভাবে আর মাদারির মাকে কেউবা চিনবে। যাদের তার মুখটা মনে আছে, তারাও এই হিশেব দিতে পারবে না, কতদিন থেকে চেনা। মাদারির মার মুখ এমন নয় যার সঙ্গে চেনা-পরিচয়ের ইতিহাস মনে থেকে যায়, দরকার হলে মনে পড়াবার জন্যে মনে থেকে যায়। দেখলে চেনা লাগে-বড় জোর এই পর্যন্ত। তারাও এখন মনে করতে পারবে না, মাদারির মা, মাদারি হওয়ার আগে আর কার কার মা ছিল। অথবা, তাদের পক্ষে মনে করা সম্ভবই নয়। কারণ, তারা জানবে কী করে যে মাদারির মার সঙ্গে যে-মাদারি এখন ঘোরাফেরা করে, বা, একা-একা হাটে আসে, সে, সেই ছেলেটিই নয়, যে, মাদারির জন্মের আগে তার মার সঙ্গে চলাফেরা করত? তা হলে ত শুধু। মাদারির মাকে চিনলেই হয় না, তার ছেলেপুলে ইত্যাদিও সবাইকেই জানতে হয়। তেমন জানা কি সম্ভব?

কিন্তু মাদারির মার ত সব সময়ই একটা না একটা ছেলে দরকার। একটা প্রমাণ সাইজের পুরুষমানুষ তার সব সময় দরকার কী না সেটা কখনোই তার মনে আসেনি। কিন্তু একটা ছেলে তার নেহাতই প্রয়োজন। আর, মায়ের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এমন ছেলে ছাড়া কে তার সঙ্গে থাকবে?

মাদারির মায়ের একটা মাপ আছে। সে জানে ঐ মোটামুটি যখন চায়ের দোকানের টেবিলের সমান মাথা হয়, বা নিজে থেকেই ট্রাকের চাকার ওপর ভর দিয়ে ট্রাকের পেছনে উঠতে পারে, বা, যা পয়সা পায় তার সবটা মাকে আর দেয় না তার কিছুদিনের মধ্যেই সে-ছেলে এই শ্যাওড়াঝোরা ছেড়ে চলে যায়। কোথায় যায় তা খুব ঠিক করে মাদারির মা জানে না। কিন্তু আন্দাজে জানে যে তারা মাদারিহাট থেকে বীরপাড়া বা হাসিমারায় যায়। সেখানে বাসট্রাকের ডিপো বা অন্য কোনো কাজ একটু-আধটু শিখতেও পারে। মিলিটারির বিরাট ছাউনি আছে এ-সব জায়গায়। সেখানে চোরাই মালের আড়তে এমন অনেক ছেলেরই নাকি কোনোনা-কোনো কাজ জুটে যায়। সেখান থেকে সেই ছেলেরা একই পদ্ধতিতে শিলিগুড়ি পৌঁছয়। সেখানে আরো বড় চোরাই চালানের আড়ত হয়ত আছে। আরো বড় বড় ট্রাকে আরো বেশি-বেশি মাল হয়ত আসে। তা ছাড়াও আছে রেলের ইয়ার্ড, ওয়াগন–এই সব। সেখানে ছেলেগুলো হয়ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়। কেউ-কেউ নাকি, এমন-কি, নেপালে চলে যায়, সেখান থেকে অনেক নতুন মাল এনে অনেক-অনেক টাকায় বেচে। সে-সব মাল ভদ্রলোকরাও কেনে। তার কিছু কিছু জিনিশ, এই যেমন গায়ে দেয়ার জামা, ছাতা এই সব, মাদারিহাটেও ওঠে।

মাদারির আগে তার কটা ছেলে এরকম মাথায় একটু টান দিতেই, বা, ট্রাকে একা-একা চড়তে পেরেই চলে গেছে, তা তার মনে নেই। তবে, তেমন চলে যাওয়ার আগে ছেলেগুলো রোজ ফেরা ছেড়ে দেয়। প্রথমে ছাড়ে খাবার খুঁজে বেড়ানো। তারপর, হাটখোলাতেই সারা দিন-রাত থাকতে শুরু করে দেয়। অনেক দিন না ফিরলে মাদারির মা বুঝে নেয়, চলে গেছে।

কিন্তু তার ত ছেলে ছাড়া চলবে না। তাই এক ছেলে লম্বা হওয়া শুরু করতেই সে আর-এক ছেলে আনে, যাতে, আগের ছেলে খাবার খুঁজে বেড়ানো বা ঝোরায় আচমকা দাঁড়ানো ট্রাকের কাছে হাত পেতে দাঁড়ানো বন্ধ করার সঙ্গে-গেই পরের ছেলে একটা বয়সে পৌঁছে যেতে পারে।

এত হিশেব-নিকেশ করে ছেলে পেটে ধরতে হেলে ছেলের একটা বাপ ত মাদারির মার হাতের কাছে সব সময় বহাল থাকা দরকার।

প্রথম দিকে তার কোনো অসুবিধে হয়নি। আর, তখন সে ত এই শ্যাওড়াঝোরা পর্যন্ত পৌঁছয়ও নি। প্রথম ছেলেটার কথা তার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন মনে আছে, কারণ, তখনো তার জানা হয়ন যে ছেলেও চলে যায়, ছেলের বাপও চলে যায়। এক নেপালি আধবুড়োর একটা মুদিখানা দোকান ছিল হাটের ঠিক উল্টো দিকে। তার কোনো বউবাচ্চা ছিল না। সেই দোকানের লম্বা বারান্দায় তখন মাদারির মা পৌঁছে গেছে। নিজে থেকেই বারান্দা-টারান্দা ঝাড় দিত। দোকানি তাকে দোকানের ভেতরটাও একদিন ঝাড় দিতে বলল। আরো একদিন একটা সাবান দিয়ে বলল, ভেতরের কুয়োপাড়ে গিয়ে ভাল করে স্নান করতে। তার পরেও তাকে সাবান মাখতে হয়েছে বটে, কিন্তু, সেসব সেই দিনের সাবান মাখাটার মত রোমাঞ্চকর ঠেকেনি। স্নানের পর সে শাড়িজামাও পেয়েছিল। সেই রাত থেকেই দোকানি তাকে নিয়ে প্রথম রাতে বিছানায় শুত। পরে, তাকে দোকানির বিছানা ছেড়ে নিজের বিছানায় চলে আসতে হত। অত ছোট বিছানায় দোকানির ঘুম আসত না–আর-এক জনের সঙ্গে শুলে। কিন্তু তার প্রথম বাচ্চা হওয়ার পর দোকানি নিজেই একটা বড় চৌকি এনে জোড়া লাগিয়ে নেয়। বাচ্চা নিয়ে দোকানির সঙ্গে তখন সে অনেকগুলি দিন ও কিছু বছর কাটল। দোকানিটাও ছেলেটাকে এত ভালবাসত যে দোকানে গদির ওপর বসিয়ে রাখত। মাদারির মার সময়ের বোধের সঙ্গে ত আর দিন-মাস-বছরের হিশেব মেলে না। কত দিন পর কে জানে দোকানি দোকানটোকান বেচে, একটা বাক্স নিয়ে বলল, চললাম রে। ছেলেটাকে একটু আদর করে গিয়ে বাসে উঠল। আর-সব লোকজন গিয়ে তাকে হেসে-হেসে বিদায় জানাল। মাদারির মা বুঝেছিলবাস পর্যন্ত তার যাওয়া চলে না।

কিন্তু সে এটা বোঝেনি, দোকানের সঙ্গে তার ব্যবস্থাও নতুন মালিকের হাতে গেল কি না। বুঝতে অবিশ্যি বেশিক্ষণ লাগেনি। নতুন মালিকের নোক এসে সে রাত্রিতেই দোকানে তালা লাগিয়ে তাকে বলে গেল, আজ রাত্রিটা থাকো, কাল সকালে জিনিশপত্র বাচ্চা নিয়ে চলে যেও।

অতদিন বাড়ির খেয়ে, বাড়িতে থেকে, তার চেহারা ভাল হয়ে গিয়েছিল। নতুন মালিকের যে-লোকজন তাকে আগের রাত্রিতে বলে গিয়েছিল সকালে চলে যেতে, তাদেরই একজন, সহরাই উরাও, পরদিন কাক না-ডাকতে তাকে এসে বলে চল, আমার সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে থাকবি।

লোকটার ঘর গিয়ে ওঠার দুদিন পর সে বুঝতে পারে লোকটি স-মিলে কাজ করে, স-মিলের মালিকই দোকানটার নতুন মালিক হয়েছে। লোকটি আগে কাজ করত চা বাগানে। সেখান থেকে ঘাটাই হয়ে স-মিলে এসেছে। লোকটার ঘর ছিল শাল বাকলা দিয়ে তৈরি। শীতকালে হাওয়া দিত। আর-একটা বাচ্চা হওয়ার পর লোকটা কাঠের ছোট-ছোট টুকরো দিয়ে ফাঁকগুলো বন্ধ করে দিয়েছিল।

সহরাই আগে চলে গেল, নাকি, তার প্রথম ছেলেটি–সে আর তার মনে পড়ে না।

সেই ঘরটাতে কিন্তু সে অনেক দিন থেকে গিয়েছিল। স-মিলের মালিক তাকে উঠে যেতে বলেনি। অনেক বৃষ্টিতে, রোদে, শীতে সেই কাঠগুলো পচে যেতে লাগল; যে-পাতলা কাঠগুলো ঘরের চাল হিশেবে ছিল তার কিছু পচে খসে গেল, কিছু উড়ে গেল; ঘরের পাটাতন নিজে থেকেই একে-একে খুলে গেল। এই সব হতে-হতে ত কয়েক বছরই যায়। এই ঘরটায় শেষ পর্যন্ত যতদিন সে থাকতে পেরেছে তাতে এক রাজবংশী বুড়ো জোতদার সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যাবেলায় আসত, এক চা বাগানের বাঙালিবাবুও কয়েক দিন এসেছিল, এক মিলিটারি এসেছিল এক দিন, আর তার বাচ্চারা তখন নিয়মিতই হয়ে যাচ্ছে আর চলে যাচ্ছে। ততদিনে সে-ঘর কবে যে ভেঙে গেছে।

.

মাদারির মা-র ও মাদারির ঘুম ভাঙে

মাদারির মার ঘরে মাদারির আর তার মার ঘুম ভাঙে সাত-সকালে মুরগির ডাকে আর ময়ূরের ডাকে। ঠিক শ্যাওড়া গাছটা বরাবর ঝোরার ওপর দিকে একটা শুকনো খটখটে গাছে ময়ূরটা রাত কাটায় আর সকালবেলা ওদের ঘুম ভাঙিয়ে চলে যায়। গরমের সময় কোনো-কোনো সন্ধ্যায় দেখা যায় ময়ূরটা সন্ধ্যা হওয়ার একটু আগে ঐ মরা গাছটাতে এসে বসে আছে। মরা গাছটারও অনেক দিন আগেই মরার কথা, কিন্তু, ময়ুরটার জন্যেই যেন মরে না, বছরের পর বছর বেঁচেই থাকে।

আর বনমোরগবনমুরগি ত প্রায় তাদের ঘরের মধ্যেই এসে ডাক দিয়ে যায়।

শীতকালে কষ্ট হয়। ঐ পাতার ঘরের ভেতর কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালানো যদি সম্ভব হয়, সম্ভব কবতেই হয়, তা হলেও সেল-আগুন শেষ রাতে নিবে আসে। সূর্যের আলো এই ফরেস্টের মধ্যে সোজাসুজি কোথাও ত ছড়িয়ে পড়ে না। কিন্তু কোনো একটা ফাঁকফোকর দিয়ে রাস্তার উল্টোদিকের ঢালটাতে রোদ আসে। সে-রোদ না-আসা পর্যন্ত তারা ঐ পাতার ঘর ছেড়েও বেরতে পারে না, পাথরের মত যেখানে পড়ে থাকার সেখানেই পড়ে থাকে।

এখন বর্ষা শেষ হয়ে গেছে প্রায়, শীত আসেনি। আকাশ শাদা হয়েই আসছে কিন্তু আচমকা বৃষ্টিপাত ঘটে যাচ্ছে যখন-তখন। দুপুরবেলায় ফরেস্টের ভেতর থেকে পচা জলের বাতাসে দম বন্ধ হয়ে আসে। এই সময় শরীর খুব গরম হয়ে যায়। আর, সকালে, সমস্ত গাছপালা যেন বৃষ্টিভেজা হয়ে থাকে, হিমে। সেই হিমেল সকালে মাদারি জেগে ওঠে, হে মা, চল্ যাবি কেনে, জলুশে।

মাদারি এখনো জানে, মা গেলেই তার যাওয়া হবে। মাদারির মা একবার ভাবে, বলে দেয়, তুই যা কেনে, মুই না যাও। কিন্তু, তা হলে ত মাদারি তার মায়ের কাছ থেকেই প্রথম জেনে যাবে যে এখন মা। ছাড়া জলুশে, এত বড় জলুশে যেতে পারে। যতদিন মাদারি সেটা নিজের থেকে না বোঝে ততদিন মাদারির মা তাকে বোঝাতে চায় না, এখন। এইবার বোধহয় তার হিশেবের গোলমাল হল। আর একটা ছেলে পেটে না-আসতেই, এই ছেলেটা চলে যাবার মত লম্বা হয়ে গেল। কিন্তু পেট ত তার আছে, সে এখন এই শ্যাওড়াঝোরায় ছেলে পেটে আনার জন্যে ছেলের বাপ পায় কোথায়? গাছ থেকে, বনমোরগ থেকে, ময়ূর থেকে ত আর মানুষের পেটে বাচ্চা হয় না। কিন্তু, এমন ত হতেও পারে যে তার আর বাচ্চার দরকার হল না। মাদারিকে বাহাদুর চা বানানো শিখিয়ে দিলে ঘোমশাইয়ের দোকানে সে একটা চাকরি পেয়ে গেল–চা বানানোর চাকরি। বা, ট্রাক মোছামুছিটা তার আরো খানিকটা বাড়ল, এই হাটেই।

এতগুলো কথা এতটা পরপর সাজিয়ে যে সে ভেবে উঠতে পারে তা নয়, কিন্তু, এমন ভাবনা তার মাথা বা মনের চারপাশে জমা হয়েই থাকে।

তাই মাদারি ডাক দিতেই সে সাড়া দেয়, যাবু নাকি তুই, সত্যিই?

মাদারি শুয়ে-শুয়েই তার মাকে ডেকেছিল! মার এই জিজ্ঞাসাতে ধড়ফড় করে উঠে বসে, কহিছিস কী মাই গে? কালি হাটত কতবার মারামারি আর কতখান ঢোলাই। তিনচারি ট্রাক যাবার ধরিবে। এ্যালায় নাকি সগায় যাবার ধরিবে, মারামারি হবে।

মাদারির মাও উঠে বসে, একটু হেসে বলে, তুই কি মারামারি করবু না মার খাবু? কায় মারে? মোক? ঘোষমশাইঅক ছাড়ি দাও, কায়ও মারিবার পারিবেন না, চল চল, ট্রাক চলি যাবে। মাদারি ঘরের ভেতর দাঁড়ায় আর মাদারির মা সেই আবছায়ায় দেখে স্বস্তি পায় মাদারি দাঁড়ালে এখনো এই ঘরে এটে যায়। মাদারির মা শুয়ে থাকে আর মাদারি বাইরে গিয়ে পেচ্ছাপ করে। করতে করতেই চিৎকার করে–মা গে।

অয়

কুয়া (কুয়াশা) দিছে, ঘন কুয়া।

ত চলি আয় ভিতরত—

এই কুয়ার ভিতরত ট্রাক আসিবা পারিবে? মাদারি দুই হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি রেখে বা হাতে ডান কাধ ধরে, ডান হাতে বা কাধ ধরে একটু কেঁপে নেয়। মাদারির মা মনে-মনে ততক্ষণে জলুশে যাবার জন্যেই তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু, সে এটা বুঝতে পারে তাদের আগে-আগেই রওনা হতে হলেও–এতগুলো মাইল হেঁটে ত তাদের হাটখোলায় পৌঁছতে হবে–এত আগে নিশ্চয়ই নয়। সেও জলুশে যাবে–এটাতে তারও মনে একটু ফুর্তি আসছে বটে, কোথাও যাওয়ার ফুর্তি। কিন্তু, সেই যাওয়ার প্রস্তুতির জন্যে সে এখনি ব্যস্ত হতে রাজি নয়। নিজেকে ব্যস্ত করে তোলার পক্ষে এখনো কিছু সময় তার হাতে আছে।

মাদারি, এইঠে শুই থাক্‌ কেনে, এ্যালায় দেরি আছে।

মুই চলি যাও, তুই আয় কেনে পাছত, পেছন ফিরে ঘরের প্রবেশপথের দিকে তাকিয়ে, আরো একবার কেঁপে উঠে মাদারি বলে।

তয় মুই না যাও, মাদারির মা বলে।

মাদারি তার মায়ের কাছে চলে এসে বলে, আচ্ছা, আচ্ছা, মুই এইঠে আসিছু, যাবি ত মাই?

মাদারির মা কোনো জবাব দেয় না।

মাই গে-এ

অয়

কখন যাবু?

খাড়া কেনে, এ্যালায় ত রাতি পোহায় নাই। তোর জলুশ কি আন্ধারত হবে?

না। রাতি পোহাইছে। কুঁয়া। চারিপুহে কুঁয়া।

কনেক আলো ধরুক। না-হয় ত ঐঠে হাট বসি থাকা নাগিবে।

কালি মুই শুনি আসিছু এইঠে ট্রাকগিলা আগত ছাড়ি দিবে, অনেক-অনেক দূর যারা নাগিবে ত! এইঠে দেরি বা ধরিলে আর পৌঁছিবে কখন?

কোটত যাবা নাগিবে? তুই চিনিস?

মুই ক্যানং করি চিনিম? স্যাই তিস্তা নদীর মুখত, বান্ধ বান্ধিবার তানে সব মন্ত্রী মানষিলা আসিবে। তা এইঠে তাড়াতাড়ি রওনা না ধরিলে পৌঁছিম ক্যানং করি।

পৌঁছিবে, পৌঁছিবে, ট্রাকগাড়ি কত জোরত যায় দেখিস না?

হয়। ট্রাকগাড়ি জোরত- যায়। দেখিছু।

মাদারি চুপ করে যায়। ট্রাক গাড়ির সঙ্গে মায়ের চাইতে তার সম্পর্কই ত বেশি। সে এখন চুপ করে সেই ট্রাকগাড়ির গতি কল্পনা করে। তার এই ঘর থেকে, তার ঘরের সামনের রাস্তা থেকে, হাটের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে ত এই ট্রাকগাড়ি কত জোরে ছোটে তা দেখে। পাশ দিয়ে চলে গেলে, গায়ে বাতাসের একটা ঝাপটা লাগে। অনেক সময় ঘাড় ঘুরিয়ে ঝাঁপট সামলাতে হয়। মাদারি তার মায়ের পাশে, রাশি রাশি শুকনো পাতার ওপর ফেলে দেয়া চটের ওপর, যেন ট্রাকের ঝাপটা সামলাতে ঘাড় ঘোরায়। ঘোরাতেই সে পাতার নরম শয্যায় ডুবে যায়। এইটি এ-ঘরের গোপন এক বিলাসিতা। শুকনো পাতা এনে গদি বানানো। পাতাগুলো যখন ভেঙে যায় তখন কিছুটা ফেলে দিয়ে আবার নতুন শুকনো পাতা ছড়িয়ে দেয়া হয়। তাহলে মাটি থেকে শীতের ঠাণ্ডা ওঠে না। বর্ষার জলও মাটি থেকে ভেজায় না।

পাশ ফিরে মাদারি বোধহয় তার ট্রাকের কথা ভাবতে-ভাবতেই একটু ঝিমিয়ে পড়ে। কিন্তু তার মার যেন আরো কিছু জানার ছিল। সে একবার ডাকে, আস্তে, হে মাদারি। কিন্তু মাদারি জবাব না দেয়ায় চুপ করে যায়। চুপ করে বাইরের আওয়াজ শোনে। জোর বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর জঙ্গলের ভেতর। থেকে টুপটাপ আওয়াজটা অনেকক্ষণ ধরে শোনা যায়। যে এই আওয়াজ জানে না, তার মনে হতে পারে বৃষ্টিরই আর-এক ছন্দ। সেই আওয়াজের নানা আয়তন আছে–কত ওপর থেকে কোন গাছ বা পাতার ওপর পড়ছে তার ওপর সেই আয়তন নির্ভর করে। মাদারির মা শোনে-জঙ্গলের ভেতর থেকে সেই টুপটাপ আওয়াজ উঠছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে আসছে। হিম পড়ছে। সে আরো দুটো-একটা আওয়াজের অপেক্ষা করে রওনা হওয়ার জন্যে।

.

মাদারি প্রথম চা বানায়

কিন্তু এত করেও মাদারি আর মাদারির মা এতগুলো মাইল হেঁটে যখন হাটখোলায় পৌঁছয় তখন হাটখোলাতে একটা বড় ট্রাক শিশিরে ভিজে দাঁড়িয়ে আছে বটে, আর-কোনো জনমনিষি নেই। এতটা খালি দেখে মাদারি দূর থেকেই বলে ওঠে, হেই মাই গে, জলুশ চলি গেইসে।

মাদারির মা বলে, একখান মানষিও নাই আর তোর জলুশ চলি গেইল, ক্যানং তোর জলুশখান? ঐ ত ঐঠে একখানা ট্রাক কুঁয়াত ভিজি খাড়া হয়্যা আছে।

মাদারি তার মাকে ধমকে ওঠে, তুই চুপ কর, ঐখান ত এইঠেই থাকে, সিঙ্গিবাবুর ট্রাক, কাঠ নিগায়।

মাদারির মা বলে, চল, কনেক বসি; দেখিবু, মানষি আসিবার ধরিবে। তোক বারবার কহিছু এ্যালায়ও টাইম হয় নাই, টাইম হয় নাই।

এরকম কথা বলতে বলতে ওরা হাটখোলায় ঢোকে। ঢুকতেই দেখে ঘোমশাইয়ের দোকানের ঝাপটা আধখোলা। মাদারি দৌড়ে উল্টো দিকে গিয়ে দেখে বাহাদুর টিউবওয়েলের সামনে উবু হয়ে বসে আঙুল দিয়ে দাঁত ঘষছে।

হেই গে বাহাদুর দাদা, জলুশ কখন যাবা ধরিবে?

মুখের ভেতর থেকে আঙুল বের করে বাহাদুর মাদারিকে চোখের ইশারায় টিউবওয়েল টিপতে বলে। এই টিউবওয়েলের হ্যান্ডেলটা শক্ত, ওপরেই থাকে, একবার নামালে ধাক্কা মেরে উঠে আসতে চায়। বাহাদুরের ইঙ্গিত পাওয়া মাত্র মাদারি দৌড়ে এসে হ্যান্ডেলটা ধরে। হ্যান্ডেলটা একটু লম্বা ও একটু উঁচু। লোকের হাত যে-জায়গাটায় পড়ে, সেটুকু বাদে বাকিটুকুর রং কালচে-ব্যবহারের উজ্জ্বলতাসহ কালচে। লোকের হাত যতটা জায়গাকে ইস্পাতের মত রুপালি করে রেখেছে, মাদারির হাত, তার একটা খুব ছোট অংশেরই ওপর পড়ে।

মাদারি হ্যান্ডেলটাকে তার মাথার ওপর থেকে নামানোর জন্যে একটা হ্যাঁচকা টান দেয়। কিন্তু প্রথম টানে হ্যান্ডেলটা নামে না। তখন মাদারি আর-একটা টান দিতেই হ্যান্ডেলটা কিছুটা নেমে আসে আর মাদারি তার পেট দিয়ে হ্যান্ডেলটার ওপর ঝুলে পড়ে, তার বা পায়ের আঙুলগুলো মাটিতে ছোঁয়ানো থাকে, ডান পাটা শূন্যে উঠে যায়, তার প্যান্টটাও কোমর থেকে নেমে যায়, হ্যান্ডেলটা নেমে আসে আর টিউবওয়েলের বড় মুখ দিয়ে হড়হড় করে জল পড়ে। এই টিউবওয়েলটার এটাই মজা। হ্যান্ডেল একবার চালাতে পারলেই প্রায় এক বালতি জল হয়ে যায়। বাহাদুর জলের কাছে এগিয়ে যায়, তারপর দু-আঁজলা মিলিয়ে জল নিয়ে সারা মুখে ছড়ায়, মুখের ভেতরে টানে, জোরে-জোরে কুলকুচি করে, হ্যাঁক থুঃ বলে জোরে-জোরে গলা ঝাড়ে আর মাদারির হাতের হ্যান্ডেলটা খটাস করে ওপরে উঠে যায়।

মাদারি আবার দুই হাতের এক হ্যাঁচকা টানে হ্যান্ডেলটাকে নামায়, এবার এক টানেই হ্যান্ডেলটা নেমে আসে, আবার পেটের ভর দিয়ে হ্যান্ডেলটার ওপর ঝোলে আর শরীরের ভর দিয়ে হ্যান্ডেলটাকে নামিয়ে এনে নামিয়ে রাখে। হড়হড় করে জল পড়তে শুরু করলে বাহাদুর মুখপোয়া শেষ করে হাতেরও কিছুটা ধুয়ে ফেলে উঠে দাঁড়ায়, কলপাড় থেকে সরে আসে। মাদারি হ্যান্ডেলটা ছেড়ে দিলে একটা আওয়াজ করে সেটা ওপরে উঠে যায়। আনাড়ি লোক এই কল চালাতে গিয়ে থুতনিতে, বা কপালে, হ্যাঁন্ডেলের ধাক্কা খায়।

মাদারির মা ততক্ষণে পায়ে-পায়ে রাস্তার ওপরেই এদিকে সরে এসে দাঁড়িয়েছে যেখান থেকে এই কলতলাটা সোজা দেখা যায়। মাদারির মা এদিকে তাকিয়ে ছিল না–সে তার বাঁ দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে ছিল। ঐ দিক থেকেই তারা এসেছে। ঐ রাস্তাটাই তার বেশি চেনা।

বাহাদুর দোকান ঘরের ভেতর ঢুকে যায়; পেছন-পেছন মাদারি। আর, মাদারির মা রাস্তা ধরে আবার খানিকটা আনমনা হেঁটে আড়ালে সরে যায়। মাদারি বাহাদুরকে জিজ্ঞাসা করে, হে-এ বাহাদুরদা, জলুশ কখন যাবে?

বাহাদুর একটা ছোট তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে-মুছতে বলে, যাবে, যাবে তর জলুশখান কি পাখা মেলি উড়ি যাবে? মানষিলা উঠিবে, চা-পানি খাবে, খোয়াদোয়া করিবে, স্নান করিবে, চুলখানা বান্ধিবে এ্যানং-এ্যানং করি, তারপর ত জলুশ ধরিবার তানে হাটত আসিবে। নাকি তোর নাখান ঘুম থিকা উঠি দৌড় ধরিবে, এ্যা? এই সব বলতে বলতে বেড়ায় গোজা একটা ছোট আয়নার সামনে বাহাদুর অনেকক্ষণ ধরে চুল আঁচড়ায়, চিরুনিটাতে বুড়ো আঙুল চালিয়ে একটা আওয়াজ তোলে, তারপর চিরুনিটা তার ছোট হাফপ্যান্টের পেছনের পকেটে খুঁজে দেয়।

হে-এ মাদারি, ঐঠে দেখ, চুল্লির উপর, গরম জল ফুটিবার ধরিছে, চা বানিবার ধর, তিন কাপ, তর মায়ের তানে একখান বলে দোকানের আর-এক জায়গায় গেঁজা একটা পোটলা নামিয়ে বাহাদুর একটা রঙচঙে কাপড় বের করে। সেটা ফাঁক করে গলায় ঢুকিয়ে দেয় এমন কায়দায় যে তার চুলে স্পর্শ লাগে না। তারপর হাত ঢোকায়। কোমর পর্যন্ত নামিয়ে নেয়ার পর বোঝা যায় এটা একটা খুব রঙচঙে ছবি আঁকা গোল গলার গেঞ্জি।

আবার সেই আয়নাটার সামনে এসে মাথাটা নিচু করে বাহাদুর নিজেকে একটু দেখে।

জল ত ফুটি গেইছে, হে-এ বাহাদুরদা–মাদারি নিবন্ত আঁচের যে-চুল্লিতে রাতভর জল ফুটছে তার পাশ থেকে জিজ্ঞাসা করে।

টেবিলের উপর দেখ, কেনে মখগান আছে, ঐঠে জল ঢাল আধাআধি, বলে বাহাদুর দোকানের আর-এক কোনায় গিয়ে ওপরের বাতায় গেঁজা একটা ফুলপ্যান্ট নামায়, তারপর সেখানে দাঁড়িয়েই ফুলপ্যান্টটা পরতে থাকে। প্রথমে টেনে তোলে কোমর পর্যন্ত, তারপর ফুলপ্যান্টটাকে শরীরের সঙ্গে মিলিয়ে নেবার জন্যে কোমরটা একবার ডাইনে বেঁকায়, একবার বয়ে বেঁকায়, একবার সামনে এগিয়ে আনে। চিরুনিটা হাফপ্যান্টের পকেট থেকে বের করে হাতে রাখে। তারপর সে কোমরে বোতামটা আটকে চেনটা টানতে পারে ও চিরুনিটা পেছনের পকেটে খুঁজতে পারে। সেই সময় মাদারি তার পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে টেবিল থেকে মগটা আনে। সেই হাঁড়ি থেকে আধ মগ জল সে তুলতে পারে একটা এলুমিনিয়ামের গ্লাশের সাহায্যে। দুই গ্লাশ ঢালতেই তার মনে হল আধাআধি হয়ে গেছে। সেই মগটার সামনে থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে দোকানের ভেতর দিকে তাকিয়ে সে বলে, হে-এ বাহাদুরদা, এ্যালায় কী করবু?

বাহাদুর তখন তার কোমরে একটা চকচকে চওড়া বেল্ট লাগাচ্ছিল। সেই বেল্টটা টাইট দিতে-দিতে সে বলে, খাড়া, আইচছু। তারপর বেল্টটা আটতে-আঁটতেই চুল্লির দিকে এগিয়ে আসে। তাকে দেখে মাদারি চিৎকার করে, হে এ বাহাদুর দাদা, তোমাক ত মিলিটারির নাখান দেখাছে।

বাহাদুর একটা কৌটো তুলে এনে একটু নিচু হয়ে মগটার মধ্যে তিন-চার চামচ চিনি ফেলে দেয়, তারপর একটা কড়াই থেকে একটা ছোট হাতভর্তি দুধ তুলে মাদারির পাশ দিয়ে মগটাতে ঢালে। হাতটা কড়াইয়ের ভেতর রেখে দিয়ে বাহাদুর একটা চায়ে ভেজা মরচে রঙের ন্যাকড়ার ভেতরে একটা কৌটো থেকে খানিকটা ডাস্ট চা ঢেলে পোটলা করে মাদারির হাতে দেয়–এটা নিয়া নাড়া কেনে। চায়ের রঙ যেইলা ধরিবে স্যালায় তুলি ফেলি চামচ নাড়াবি।

চামচা কোটত?

টেবিলের উপর, বলে বাহাদুর আবার দোকানের ভেতর দিকে চলে যায়। মাদারি চায়ের পোটলা হাতে আবার টেবিলের কাছে যায়, আঙুলে ভর দিয়ে এলুমিনিয়ামের একটা চামচ নিয়ে আসে। তার কাছে চামচটা খুবই জরুরি। মগে ঐ চামচের আওয়াজ তুলেই বাহাদুর তার কাছে এমন মাহাত্ম্য পেয়েছে। আজ জলুশের সুযোগে এই প্রথম সে চামচ নাড়ার অধিকার পেল।

চায়ের পোটলা সেই দুধ-চিনি ভেজানো গরম জলে মেশানো হল কি হল না, মাদারি চামচের আওয়াজ তোলা শুরু করে। বাহাদুর যে-রকম দ্রুত ও উচ্চ শব্দ তোলে, সেরকম। তাতে মগ নড়ে গিয়ে খানিকটা চা মাটিতে পড়ে যায়। তখন সে মগটাকে বা হাতে আরো জোরে চেপে ধরে।

.

বাহাদুরের সাজসজ্জা ও সমবেত চা পান

হে-এ বাহাদুরদা, গেলাসে ঢালিম? চা? তার চামচ নাড়ানোর তৃপ্তির পর মাদারি জিজ্ঞাসা করে।

খাড়া কেনে, না ঢালিস, মুই যাছ, বাহাদুর চিৎকার করে বলে।

মাদারি একটু চুপ করে থাকে, মগে তার তৈরি চায়ের দিকে তাকায়, সত্যিই বাহাদুরদার তৈরি চায়ের মতই রঙ হয়েছে। সে বাহাদুরের দিকে তাকায়, তারপর আবার চিৎকার করে, টেবিলের উপর রাখি দিম? মগখান?

দে, রাখি দে, বাহাদুর আস্তেই বলে।

ঘোষমশাইয়ের দোকানটা একটু বড়। খড়ের দোচালা, মাটির ভিটে, শুধু চুল্লি আর এই আলমারি রাখার জায়গাটা বাধানো। বাঁধানো বটে, কিন্তু মাটিতে-মাটিতে এখনই এমন ময়লা যে সিমেন্ট আর দেখা যায় না। দোকানে সারি-সারি বেঞ্চি পাতা, একটা উঁচু বেঞ্চি, একটা নিচু–ইস্কুলের ক্লাশের মত। সেই চালের বাতার এক-এক জায়গায় এক-একটি জিনিশ গোজা। নামিয়ে নামিয়ে বাহাদুর সাজগোছ করছি। ঘরের ঐ দিকগুলোতেও ঝাঁপ আছে। সেগুলো খুলে দিলে মনে হয় যেন মাথার ওপরেও কোনো চাল নেই। শুধু পেছনের ঝাপটা হাটের দিন খেলা হয় না–পাছে কেউ পয়সা না দিয়ে পেছন থেকেই কেটে পড়ে। এখন ঝাঁপগুলো সব নামানো। শুধু এই চুল্লির পাশের ছোট ঝাপটা ভোলা! ফলে, এত বড় দোকানের ভেতরটা অন্ধকারই লাগছে। সেই কারণেই বাহাদুর আর মাদারি এমন চিৎকার করে কথা বলছে।

অথবা, হাটের দিন দোকানের ভেতর এরকম চিৎকার করে কথা বলার অভ্যেস থেকেই এখনো। বলে যাচ্ছে।

মাদারি মগটা দুই হাতে তোলে। তারপর, আবার নামিয়ে রাখে–মগটা নিয়ে উঠতে গেলে যদি চলকে পড়ে যায়। মাদারি দাঁড়িয়ে মগটার ওপর নিচু হয়ে তার কানায় দুহাত লাগিয়ে তোলে। কিন্তু, সোজা হওয়ার আগেই আবার নিচু হয়ে মগটা রেখে দিল। কানা ধরে এরকম করে তুলে সে ত টেবিলের ওপর রাখতে পারবে না। সেখানে ত তাকে আবার আঙুল উঁচু করতে হবে। এবার নিচু হয়ে সে মগটার দুটো পাশ বাইরে থেকে চাপ দিয়ে ধরে, তারপর তোলে। গরম আছে, তবে চা ত আধা-আধি, হাতে অত লাগছে না। ডান হাতটা একটু পিছলে নেমে যায় বটে কিন্তু ঐ ভাবেই মাদারি কয়েক পা হেঁটে টেবিলের কাছ পর্যন্ত যেতে পারে। সেখানে গিয়ে সে একটু দাঁড়ায়, তারপর মগসহ হাত দুটো নিজের মাথার ওপর তুলে ঠক করে মগটা টেবিলের ওপর নামায়।

নিজের হাত দুটো নিজের শরীরের দুপাশে ঝুলিয়ে মাদারি বয়স্ক লোকের মত একটা শ্বাস ফেলে। তারপর নাক টেনে আবার চেঁচায়, হে-এ বাহাদুরদা

বাহাদুর এবার যেন খুব কাছ থেকে বলছে এমন স্বরে বলে, ক কেনে।

রাখিছু। মগখান টেবিলত রাখিছু।

খাড়া। আসিছু–

মাদারি, যেখানে বসে চা বানিয়েছিল সেই জায়গাটার দিকে তাকায়। দেখে, চামচটা পড়ে আছে। চামচটা তুলে এনে টেবিলের ওপর রাখতেই গটগট আওয়াজ তুলে বাহাদুর এসে হাজির। মাদারি যেন তার এত সাধনায় তৈরি চা ভুলে যায় মুগ্ধ হয়ে দেখে বাহাদুরের টেরি, গোল ছবি-আঁকা গেঞ্জি, লোহার নাল লাগানো চওড়া বেল্ট, নীল রঙের সরু প্যান্ট ও পায়ে একটা বড় জুতো। বড়, মানে, জুতোটা যেন গোড়ালি থেকে অনেকটা উঁচু পর্যন্ত পা ঢেকে রেখেছে। এর মধ্যে বাহাদুরের টেরিটাই একমাত্র তার চেনা। বাহাদুরকে এত অচেনা লাগে মাদারির যে দু-এক পা পেছনে সরে গিয়ে বাহাদুরকে দেখে।

বাহাদুর এসে তিনটে কাঁচের গ্লাশ সাজিয়ে মগ থেকে চা ঢেলে ভর্তি করে দেয়। একটা গ্লাশ শুধু হাত বাড়িয়ে, শরীর না ঘুরিয়ে, মাদারির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, তোর মাক দিয়া আয়

মাদারি পাশ দিয়ে বেরতে গেলে বাহাদুর বলে, খাড়া কেনে।

তারপর মিষ্টির আলমারির তালাটা খুলে ঘোমশাইয়ের চৌকির ওপর রেখে, তালাটার চাবি ছিল না, ভেতর থেকে একটা প্লাস্টিকের বয়ম বের করে, খুলে, একটা লম্বা কুকিস বিস্কুট মাদারির হাতে দিয়ে বলে, যা, মাক দিয়া আয়।

গ্লাশ আর বিস্কুটটা নিয়ে দুপা গিয়ে মাদারির কেমন সন্দেহ হয় যেন, সে দাঁড়িয়ে পড়ে, না ঘুরে, মাথাটা একটু হেলিয়ে বলে, চা আর বিস্কুট দুইখানই মাইঅক দিম?

হয়, হয়। আর তোরটা এইঠে থাকি, বলে বাহাদুর তার চায়ের গ্লাশ আর বিস্কুট নিয়ে সেই ছোট ঝাপটা দিয়ে বাইরে বেরয়।

ঘোষমশাইয়ের দোকানটা হাটখোলার একেবারে দক্ষিণ সীমায়, বড় রাস্তার প্রায় গা ঘেঁষে। বলা উচিত দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায়। কিন্তু টিউবওয়েলটা দোকানেরও দক্ষিণে। এই দক্ষিণ দিকটা দোকানের পেছন দিক হয়ে যেত টিউবওয়েলটা না থাকলে। এখন সেদিকের ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে দোকানটা ঘুরে ওদের হাটখোলা রাস্তা এ-সবের ভেতরে পড়তে হয়।

সেই বাইরে এসে বোঝা যায়–হঠাৎ যেন সকালটা অনেক বেড়ে গেছে। কোথাও কুয়াশা নেই। রোদ এসে পড়েছে হাটখোলার নানা ভাঙা চালে, নানা খোলা ভিটেয়, রাস্তায়। হাটের অসমতল ধুলো, মানুষের পায়ে-পায়ে এলোমেলো ধুলো, হিমে ভিজে নেতিয়ে। মাদারির মা রাস্তায়, একটু রোদে বসে। রাস্তাতেই আরো দু-চারজন লোক ঘোরাফেরা করছে। হাটখোলার একটা ভিটের ওপর জনাদশবার লোকের একটা ভিড় দাঁড়িয়ে আছে, রোদেই।

এই রকম প্রকাশ্য জায়গা দিয়ে, এত লোক পেরিয়ে, এতটা হেঁটে মাদারি তার মাকে চা-বিস্কুট দিচ্ছে–এটা যেন মানায় না। মানায় কি না-মানায় সেটা না-জেনেই মাদারি ঘোমশাইয়ের দোকান ঘুরে এদিকে এসে তার মাকে খুঁজতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কেমন অপ্রস্তুত বোধ করে। কেন অপ্রস্তুত বোধ করে সেটা ত সে বোঝে না। তাই মাকে খুঁজে পেয়ে চায়ের গ্লাশ আর বিস্কুট নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যায়।

মাকে চা দিয়ে মাদারি বলে, মুই বানাইছু, বাহাদুরদা মোক শিখাইছে।

চা নিয়ে মাদারির মা বলে, টেবিল? যেন এটা জানা তার পক্ষে সবচেয়ে জরুরি যে হঠাৎ আজ জলুশের সকালে মাদারি মাথায় চা বানানোর টেবিলের সমান উঁচু হয়ে গেল নাকি?

মাদারি হেসে বলে, না। মাটি। এইঠে ত চুল্লিটা, তার সমুখত, মাটিত- সে যেন তার মাকে ঘরের অবস্থানটা খুব ঠিক করে বোঝাতে চায়।

মাদারির মা বিস্কুটটা তাকে এগিয়ে দেয়। মাদারি কোমরে দুহাত দিয়ে বলে, এইটা তোর, বাহাদুরদা দিছে, তুই খা কেনে, মাই, খা, বাহাদুরদা দিছে, বিস্কুট, আর মুই বানাইছু চা, খা। মায়ের চা খাওয়া দেখাটাই যেন তার প্রধান কাজ এমন অনড় হয়ে থাকে সে।

মাদারির মা চায়ে বিস্কুট ভিজিয়ে একটা কামড় দেয় আর তার মুখটা চায়ের ঈষদুষ্ণ তরল স্বাদে ভরে যায়, সহজে শূন্য হয়ে যায় না। মুখের সেই বিবর ভরে থাকে বিস্কুটের নরম অথচ তখনো অখণ্ড টুকরোয়। সে চিবয় না। মুখের ভেতরের সব অঙ্গ দিয়ে–তালু, মাড়ি, দাঁত, জিভের পাশ, মাথা দিয়ে সেই নরম অখণ্ড টুকরোটা আস্বাদ করতে থাকে। বাহাদুর হক দেয়, হে-এ মাদারি, তোর চা নিগা।

সেই ভিড়টা থেকে একজন জিজ্ঞাসা করে, চা পাওয়া যাবু নাকি?

বাহাদুর তার হাত তুলে ঘোষণা করে দেয়, আজ জলুশ, আজ দোকান বন্ধ।

.

হাটখোলায় নাচ গান

সকাল আটটা-সাড়ে আটটা নাগাদ পুরো হাটখোলার কম্যান্ড যেন বাহাদুরের হাতে চলে যায়।

তখন থেকেই লোক জুটতে শুরু করেছে। রাস্তা জুড়ে সারি দিয়ে ত লোক আসছেই, রাস্তা ছাড়াও নানা দিক থেকে লোক উঠে আসে। হাটখোলার উত্তরের রাস্তা দিয়ে গান গাইতে-গাইতে দেবপাড়া বাগানের মেয়ে-মজুররা ফরেস্ট উতরে আসে। তাদের পেছনে ঢোল বাজাতে বাজাতে মরদরা। প্রায় প্রত্যেকেই স্নান করেছে, অন্তত তেল মেখেছে প্রচুর। মেয়েরা মাথার চুলে ফুল গুঁজেছে–হাতের কাছে যে-ফুল পেয়েছে তাই। কিন্তু হাতের কাছেও সবাই ফুল পায়নি, তখন পাতা গুঁজেছে-হাতের কাছে যে-পাতা পেয়েছে তাই। দু-একজনের মাথায় চা পাতার তোড়া। তারা নদী, টিলা আর ফরেস্ট পেরিয়ে যে এল সেটা বোঝা যায় পায়ের দিকে তাকালে। কিন্তু হাটখোলায় এসেও তাদের নাচ থামে না বরং এতক্ষণ যেন ফরেস্টের ভেতর দিয়ে আসতে-আসতে তারা নাচার ঠিক জায়গা পায়নি। তা ছাড়া, সময় মত হাটখোলায় পৌঁছবার তাড়াও ছিল। এখন এখানে এসে যখন দেখছে, হাতে সময় আছে, হাটখোলায় জায়গাও আছে প্রচুর, আর তাদের পায়ে নাচও জমা আছে–তারা গাইতে-গাইতে নাচতে শুরু করে দেয়। আর, তাদের পেছনে-পেছনে মরদরা ঢোল বাজায় আর দোলে, দোলে আর ঢোল বাজায়। একজন একটা বাঁশিও এনেছে। কিন্তু এতটাই হাড়িয়া খেয়েছে যে কিছুতেই বাঁশিটা ঠোঁটে লাগাতে পারে না। সে ঠোঁটে লাগাতে গিয়ে একবার থুতনিতে, একবার গালে, এমন-কি একবার গলায় লাগায়। লাগিয়ে ফুও দেয়। যখন বাজে না, তখন বাঁশিটা তুলে এনে তাকিয়ে পরীক্ষা করে। আবার বাঁশি ঠোঁটে লাগাতে চায়।

দেবপাড়ার দলের সঙ্গে কখন যে মিরপাড়া, খয়েরবাড়ি, মুমবাড়ির মজুররা মিশে যায় তা কেউ টেরও পায় না। একটা দল বেশি বড় হয়ে গেলে আর একটা দল তৈরি হয়ে যায়। তাদের ঢোল বাজতে থাকে, বাজতেই থাকে। বুড়িহোরসার চর থেকে একদল সাঁওতাল এসেছে, তারা চা-বাগানের এদের কাউকে চেনে না, কিন্তু ওদের নাচ আর ঢোল বোঝে-তারাও এদের সঙ্গে নাচতে শুরু করেছে। মনে হয়, আজ হাটখোলায় নাচ হবে–এটাই কথা ছিল।

পাশাপাশি গ্রাম থেকে রাজবংশীরাও উঠে এসেছে। তারাও তাদের সবচেয়ে পরিষ্কার জামা কাপড় পরে সেজেছে। মেয়েরা আর বয়স্ক পুররুষরা, মনে হয়, মান করেই এসেছে-নইলে মাথায় মুখে তেল মেখেছে। তাদের নাচ নেই–তারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে এই নাচ দেখে যাচ্ছে।

বাহাদুর একটা ব্যাটনও জোগাড় করেছে।

সে সেই ব্যাটন নিয়ে নাচ যারা দেখছে তাদের লাইন রাখতে ব্যস্ত। লম্বা-লম্বা পা ফেলে মিলিটারির, মত হাঁটছে। আর বাচ্চাদের বসিয়ে দিচ্ছে, মেয়েদের এক পাশে সরিয়ে দিচ্ছে, অকারণে এই পাছত যাও, পাছত যাও বলে চেঁচিয়ে উঠছে। বাহাদুরকে এরা প্রায় প্রত্যেকেই চেনে। তাই তার এই পরিবর্তনকেই সবচেয়ে নাটকীয় লাগে–নাচ আর ঢোল ত তারা প্রায়ই দেখে থাকে।

ভিড়ের ভেতর থেকে কে চিৎকার করে, হে-এ বাহাদুর, ঘোমশাই ডাকোছে।

বাহাদুর তার দিকে ব্যাটন উঁচিয়ে বলে, আইজ দুকান বন্ধু, আইজ জলুশ।

হঠাৎ একটা হৈ-হৈ আওয়াজে সবাই পেছনে তাকিয়ে দেখে তিনটি ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে, রাস্তার ওপর, ভর্তি মেয়ে-পুরুষ, একটা ঝাণ্ডা-মতও কী আছে, তারা নাচ আর ঢোলের আওয়াজ পেয়ে ট্রাকের ভেতরই যেন নেচে উঠতে চায়। বাহাদুর দৌড়ে তাদের কাছে যায়। একজন ড্রাইভারের পাশের আসন থেকে গলা বাড়িয়ে কী জিজ্ঞাসা করে, বাহাদুর তাকে জবাব দেয়, ট্রাক ত এ্যালায়ও আসে নাই, আসিবার টাইম হই গিছে। সেই ট্রাক একটু আওয়াজ তুলে চলে যায়। বাহাদুর পেছনে ট্রাকটার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। আর ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে যেন বলে–চলি যান, মোরা যাছি। তৃতীয় ট্রাকটাকে সে হাত তুলে চালাতে নিষেধ করে, তারপর রাস্তাটা পেরিয়ে গিয়ে ব্যাটনটা তুলে চালাবার নির্দেশ দেয়। সেই ট্রাকটা চলে গেলে বাহাদুর চিৎকার করে ওঠে, হাপাড়া টি এস্টেট চলি গেইছে, এ্যালায় লঙ্কাপাড়া আসিবার ধরিছে–

তা তোমারখান কখন আসিবার ধরিবে হে বাহাদুর? বুড়োমত ছোটখাট একজন এসে বাহাদুরকে জিজ্ঞাসা করে।

উমারায় সব বাগানের মানষি, নিজের ট্রাক, উঠি বসিছে, স্টার্ট দিছে, আর তোমার এ্যালায় কুন কনট্রাকটর আসি ট্রাকগাড়ি দিবে, ছাড়িবে, তার বাদে তোমরালা জলুশত যাবেন। স্যালায় জলুশ ফরসা। হ-য়, পক পক করি মুখ্যমন্ত্রী আসিবেন মোর বনমন্ত্রীখানও থাকিবে। আর হামরালা য্যালায় যাম, দেখিম বাশ গিলান খাড়া আছে–মন্ত্রীও নাই, তিস্তাও নাই। তোর্সর মানষির তিস্তা নাই রো, তিস্তা নাই-বাহাদুর আবার সেই নাচের দলটার দিকে চলে যায়। যারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল তাদের ভিড়টাও একটু আলগা হয়ে গেছে। পেছন থেকে বাহাদুর চিৎকার করে ওঠে, হে-ই, লাইন ঠিক রাখো কেনে, লাইন ঠিক বানাও, এই ছাওয়া-ছোটর দল, মারিব একখান, ব্যাস, ট্রাক আসি গেলে সব লাইন দিয়া উঠিবেন, ওয়ান-টু-থ্রি।

এখন এই ভিড় দেখে মনে হতে পারে, জলুশ বোধহয় একটাই হচ্ছে আর এর মধ্যে কামতাপুর, উত্তরখণ্ড, গোৰ্খাল্যান্ড, নমশূদ্র সমিতি–এই সব ভাগাভাগিও যেন কিছু নেই। সরকার ও সরকারের দলগুলি যে-ভাবে তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন অনুষ্ঠানকে আগামী নির্বাচনের প্রথম মিটিঙে পরিণত করতে চাইছে তাতে ঐ সব খুচরো দলের পাত্তা পাওয়াই মুশকিল। তার ওপর, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের, এগ্রো ইন্ড্রাস্ট্রিজের আর চা বাগানের ট্রাক সারা জেলা থেকে লোকগুলোকে তুলে নিয়ে সেই ব্যারেজ ফেলবে। সকাল হতে না-হতেই সে কাজ শুরু হয়েছে। লোক জড়ো করাই যদি সরকারের ও সরকারের দলগুলির একমাত্র উদ্দেশ্য হত তা হলে তিস্তা ব্যারেজের কাছাকাছি জায়গাগুলো থেকেই ত যথেষ্ট লোক আনতে পারত। কিন্তু সরকার ও সরকারের দলগুলি চায়, এই সমাবেশ থেকে সবাই যেন নিশ্চিত হয়ে যায় যে এই জেলায় ঐসব খুচরো দলের কোনো অস্তিত্ব ত নেইই, এমন-কি কংগ্রেসও নেই। সেই জন্যেই এত দূর-দূর থেকেও তোক নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু এই সব ট্রাকে করে যারা যাচ্ছে তাদের ভেতর কামতাপুর, উত্তরখণ্ড, নমশূদ্র সমিতি বা গোর্খাল্যান্ডের লোকজনও দু-চারজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে পারে। এভাবে ত তাদের বাছাও যাবে না। এমন-কি উত্তরখণ্ড বা গোখাল্যান্ডের লোকজনের সরকারি ব্যবস্থায় যাওয়া অনেক বেশি নিরাপদ বোধ হতে পারে। এখানে, এই হাটখোলায় সেই ভাগাভাগি নিয়ে কোনো উত্তেজনা নেই, বা, পরস্পরের কোনো সন্দেহও নেই-যে-উত্তেজনা ও সন্দেহ থাকে তোটের দিন, সে পঞ্চায়েতের ভোটই হোক আর লোকসভার ভোটই হোক। দুটো আলাদা অফিসই যে তৈরি হয়ে যায় গাছতলায়, তাই নয়। এক-একটা ভোটকেন্দ্রে মাত্র সাতশ-আটশ ভোটারের মধ্যে হয়ত ভোট দেয়, বড় জোর সাড়ে তিনশ-চারশ জন; কিন্তু সেই ক-জন ভোটারের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে পুরো এলাকাটাতেই একটা উদ্বেগ-উত্তেজনা, কোনো সময় বা হিংস্রতা ছড়িয়ে পড়ে। তা সব সময় চাপাও থাকে না, বিশেষত চা বাগান এলাকায় প্রকাশ্য হয়েও যায়।

তাছাড়া, কামতাপুর-গোর্খাল্যান্ড-উত্তরখণ্ডনমশূদ্র সমিতি এই সবের সঙ্গে তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধনের ঘটনার ভেতরের সংযোগ কোথায়, তা ত এদের জানার কথাও নয়, এরা জানেও না। কিন্তু, না-জানলেও, চা বাগানের আন্দোলন বা জমি-জিরেতের নানা গোলমালে সরকার ও সরকারের দলগুলি সম্পর্কে যে-মনোভার তৈরি হয়ে আছে, তা থেকেই ত এরা নিজেদের ভূমিকা যথাস্থানে ঠিক করে নিতে পারবে।

আটটা বেজে যাওয়ার পর ধূপগুড়ির ভটচাজদের দুটো হাটবাস আর সিংজির একটা বিরাট বড় ট্রাক এসে দাঁড়ায়।

.

বাসে-ট্রাকে মিছিল ওঠে

ট্রাকটা আর বাস দুটো প্রথমে এসে রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে পড়ে। ড্রাইভার মুখ বাড়িয়ে লোকজনকে কী জিজ্ঞাসা করে।

বাহাদুর তখন ছিল নাচের ওখানে, ভিড়ের পেছনে। বোধহয়, তারও একটু ক্লান্তি লেগেছিল। সে বাস আর ট্রাক দাঁড়াতে দেখে ছুটে রাস্তার দিকে যায়, ডান হাতে ব্যাটনটা তুলে। তার পেছন-পেছন বাচ্চাকাচ্চাদের একটা দলও ছোটে। ততক্ষণে বাসদুটোর ছোকরা দুজন রাস্তায় নেমে পেছনের ট্রাকটাকে একটু পেছিয়ে যেতে ইশারা করছে, আর বাসের গায়ে চড় মারছে একটা করে। পেছনের ট্রাকের ছোকরাটা ট্রাকের ওপর থেকেই ড্রাইভারের মাথার টিনে একটা চড় মারে, তারপর আস্তে-আস্তে চড় মারতেই থাকে। ট্রাকটা একটু পেছয়, তারপর রাস্তার উল্টোদিকে পেছনের চাকা চালায়। এর মধ্যে দ্বিতীয় বাসটাও একটু পেছিয়ে যায়।

বাহাদুর এসে রাস্তা আর হাটখোলার মধ্যে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ব্যাটনটা তুলে চিৎকার করে, এইঠে, এইঠে, ব্যাস, ঠিক আছে, সিধা, সিধা, সিধা

ট্রাক ও বাস দুটো ততক্ষণে রাস্তার ওপর পেছন ঘুরিয়ে এমন ভাবে দাঁড়িয়েছে যে একে-একে হাটখোলার সামনের জায়গাটুকুতে এসে ঢুকবে। বাহাদুর ব্যাটন উঁচু করে বাচ্চাদের দলটাকে তাড়া করে–এই হট, হট, বাস ঢুকিবার রাস্তা দে কেনে, সরি যাও, সরি যাও।

ট্রাক আর বাসগুলো সত্যিই যেন বাহাদুরের নির্দেশ মেনে-মেনেই নিজেদের মুখ ঠিক করে। তারপর রাস্তার ঢালে এসে দাঁড়ায় আর প্রথম বাসটা ধীরে ধীরে হাটখোলায় নেমে আসে, ধীরে-ধীরে খানিকটা এসে দাঁড়ায়, ড্রাইভার জানলা দিয়ে মাথা গলিয়ে পেছনে কী দেখে আবার খানিকটা এগিয়ে নিয়ে যায়।

পেছনের বাসটা ততক্ষণে, প্রথম বাসটার চাকার দাগ ধরে-ধরেই যেন, ঢাল থেকে হাটখোলায় নামে। প্রথম বাসটার পেছনে দাঁড়িয়ে বাহাদুর দুহাত উঁচু করে তাকে নির্দেশ দিতে থাকে–তার ডান হাতে ব্যাটন।

ট্রাকটা একটু তফাতে ছিল। সেটা একটা বেশ বড় ধরনের আওয়াজ করে বাঁ দিকে নেমে যায়, এই বাসগুলোর সঙ্গে ট্র্যাক রেখে বা দিকে। তারপর আরো একটা আওয়াজ তুলে থেমে যায়।

বাস আর ট্রাক যতক্ষণ রাস্তা থেকে মাঠে নামছিল ততক্ষণ এই ভিড়া নাচগুলোর দিকে পেছন ফিরে স্থির হয়ে দেখছিল। এক নাচের দলগুলোই যেন নেশায় নেচে চলে, যেন এই বাস-ট্রাক ইত্যাদির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই, যেন এই ভিড় চলে গেলে যে-নির্জনতা পড়ে থাকবে তাতে তারা নাচের আরো গভীরে চলে যেতে পারবে।–

কিন্তু বাস আর ট্রাকগুলো যেই দাঁড়িয়ে গেল, সবগুলো নাচের দল পরস্পরের বাধা হাত মুহূর্তে খুলে ফেলে এই বাস আর ট্রাকগুলোর দিকে ছুটে গেল। গ্রামের রাজবংশীদের ভিড়টা ত নাচের বাইরে, এই বাস-ট্রাকগুলোর চারপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। তারা কিছু বুঝে উঠবার আগেই নাচের মেয়েরা তাদের ফাঁক দিয়ে দৌড়ে বাস আর ট্রাকে উঠে পড়ে। তারপর তারা নিজেরা এক-একটা জায়গায় বসে পড়ার আনন্দে হেসে ওঠে। যে যখন জায়গা পাচ্ছে তখন হেসে উঠছে। একলা নয়, কয়েক জন। এক সঙ্গে ত আর তারা জায়গা পায় না। তাই কিছুক্ষণ শুধু হাসি ওঠে আর থামে। এত মাইল-মাইল হেঁটে এসে, এত ঘণ্টা-ঘণ্টা নেচে, এমন দৌড়ে বাসে-ট্রাকে ওঠায় তাদের হাসির মধ্যে একটু হাফছাড়া শ্বাসও ছিল।

এই মেয়েরা বাসে-ট্রাকে উঠে যাবার পর বাকিরা বুঝতে পারে ওরা তাড়াতাড়ি ভাল জায়গা নিয়ে নিল। তখন গ্রামের লোকজন, ছেলেপিলে, বেউবুড়িরাও দৌড়ে বাস আর ট্রাকের ভেতর উঠতে শুরু করে। উঠতে গিয়ে একজনের সঙ্গে আর-একজনের ধাক্কা লেগে যায়, একজনের ছাতা আর-এক জনের পেটে লাগে, কারো হাত থেকে বাচ্চাছেলে খসে গেছে বাচ্চাটা তারস্বরে কাঁদে।

আর, বাহাদুর তার ব্যাটন উঁচিয়ে একবার প্রথম বাসটার সামনে দাঁড়ায়-এই খবরদার, সাবোধান, লাইন লাগাও,–আর এই একই কথা বলতে বলতে একবার দ্বিতীয় বাসটার সামনে, আর-একবার ট্রাকটার সামনে গিয়ে, লাফায়।

ততক্ষণে পুরুষমানুষরা বাসের ছাদে ও ট্রাকের ভেতরে ওঠা শুরু করেছে-ট্রাকের ভেতরে তখনো কিছু জায়গা ছিল।

এর মধ্যে আবার বাসের ও ট্রাকের ভেতর থেকে ডাকাডাকি শুরু হয়েছে। যে যার নিজের লোকদের জন্যে জায়গা রেখে ডাকছে। এক বাড়ির লোক এক জায়গায় গায়ে গা লাগিয়ে বসতে চায়, এক পাড়ার লোকও এক জায়গাতেই থাকতে চায়।

কিন্তু গাড়িতে ওঠার সময় ত আর কেউ পেছনে ফিরে তাকায় নি–তখন যে যার মত আগেভাগে জায়গা নিতে চেয়েছে। এখন তাই বাসের ভেতর-বাহিরে এরকম সব আওয়াজ উঠছে–

হে-এ-ই মাই গে, এইঠে আয় কেনে

কাকা গেই, হে-এ-ও কাকা, কাকা গেই

হে-এ বাহাদুর, বাহাদুর, মোর বিটিখান কোটত উঠিল এটু দেখি দে।

চাপি বসেন, চাপি বসেন, আরো লোক সিন্ধাবার নাগিবে।

এইঠে উঠিলেন আবার এইঠে নামি যাছেন?

আরে উঠিবার দেন, উঠিবার দেন, মোর বহিন নাগে, উঠিবার দেন।

যায় যেইঠে আছেন, নড়িবেন না, স্যালায় ব্যারাজত গিয়া বাছি নিবেন।

ছাদের উপর সাবধান, ডালত ধাক্কা না খান।

কিন্তু, এত কিছু সত্ত্বেও দুটি বাসে আর একটি ট্রাকে, জায়গা কুলোয় না। তখনো অনেকে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে–তার মধ্যে বাচ্চা আছে, বুড়ি আছে, কয়েকজন ধুতি-শার্ট পরা, ছাতা হাতে, দেউনিয়া মানুষ আছে যাদের পক্ষে বাসের ছাদে ওঠা সম্ভব নয়।

রাস্তার ওপর দুজন শহরের ছেলে যে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল, তা কারো যেন খেয়ালেই পড়েনি। এখন তারা এগিয়ে আসতে বোঝা যায়, তারা এই বাস-ট্রাকের সঙ্গে এসেছে। তারা এসে ট্রাকের কাছে দাঁড়ায়। একটি ছেলে চাকা বেয়ে ওপরে উঠে যায়। উঠেই ধমকাতে শুরু করে- কী, নিজেরা বসলেই হবে, আর কাউকে উঠতে দিতে হবে না? নিন, সরে বসুন, এগিয়ে যান, এগিয়ে যান। দেখি, এই যে বুড়িমা, আপনি এই কোনায়, হ্যাঁ এই কোণে বসুন, তা হলে আর লোকের চাপ লাগবে না।

ছেলেটি বুড়িমাকে পেছন থেকে ধরে একটু উঁচু করে কোনাকুনি বসিয়ে দেয়। তাতে একটু হাসির রোল ওঠে। ছেলেটি বলে, হ্যাঁ, হাসতে-হাসতে এগিয়ে যান, এগিয়ে যান।

মেয়েদের সম্পর্কে তার স্বাভাবিক সমবোধ থেকে সে তাদের হাত দিয়ে ঠেলতে পারে না, কিন্তু সরে যান, সরে যান বলতে বলতে সে যে-ভাবে এগিয়ে যায় তাতে তার হাটুর খোঁচায় অনেকে সত্যি একটু সরে বসে।

ছেলেটি হঠাৎ মুখ বাড়িয়ে নীচের ছেলেটাকে বলে, বাসের ভেতর বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বসা ত, দেখবি জায়গা হয়ে যাবে।

এই ছেলেটি ট্রাকের ওপর এক-একটা বাচ্চাকে তুলে ধরে বলে, এ কার বাচ্চা।

বাচ্চার মা এই-যে, এই-যে করতেই সবাই হেসে ওঠে। বিশেষত বাগানের মেয়েরা। তারা ত হেসেই আছে। বাগানে আজ করার সূত্রেই তারা ভদ্রলোকের ছেলেদের কথার ধারধোর ধরতে পারে কিছুটা।

এদিকে অন্য ছেলেটি বাসদুটোর জানলা দিয়ে চেঁচায়–বাচ্চাদের কোলে বসান, বাচ্চাদের কোলে বসান। তারপর বাহাদুরকে ডেকে বলে, বাচ্চাদের কোলে বসাতে বলুন, আর, এই বাচ্চাদের বাসে তুলে দিন কয়েকটি বাচ্চাকে মাঠ থেকে টেনে এনে সে বাহাদুরের সামনে দেয়। কিন্তু সে সরে যেতেই বাচ্চাগুলো তাদের বাবা কাকা মা-মাসির কাছে ছুটে চলে যায়। বাহাদুর অবিশ্যি ততক্ষণে বাসের জানলা দিয়ে তার ব্যাটন চালাচ্ছে-হেই ছোঁয়া, সিট ছাড়, তর মায়ের কোলত বস্।

ট্রাকের পেছন দিকে তখন খানিকটা জায়গা বেরিয়েছে। সেই দেউনিয়া চেহারার কয়েকজন এবং মেয়েরা ট্রাকে উঠে যেতে পারে।

.

মাদারির মায়ের ট্রাকারোহণ

মাদারির মা কোথাওই উঠতে পারে না। মাদারি যে-কোনো জায়গাতেই উঠতে পারত, কিন্তু মাকে ছাড়া। ওঠে কী করে।

জলুশ মানেই ত দল বেঁধে যাওয়া। বাড়ির লোকরা দল বাধে, টাড়ির লোকরা দল বাধে, বস্তির। লোকরা দল বাধে, বাগানের লোকরা দল বাধে। কেউ ছুটে গেলে দলের লোকরাই তাকে ডেকেডুকে নিয়ে নেয়।

কিন্তু মাদারির মার দল বাধা ত তার এইটুকু ছেলের সঙ্গে। তার ত আর কোনো টাড়ি নেই যে মাদারির মা বলে কেউ ডাকবে। সে বাসটার দিকে না গিয়ে যদি ট্রাকটার দিকে ছুটত তা হলে হয়ত একটা জায়গা পেয়ে যেত। কিন্তু বাসটাতে ত সে একটা বসার জায়গা পেয়েছিলও। একটা মোটামত বেটিছোয়া এসে তাকে ধমকে বলে, এইটা ত ধূপগুড়ির ভটচাজদের বাস, আমাদের জন্যে পাঠাইছে, তোমরা কেন উঠছ, নামো, নামো।

মাদারির মা তার কথাকে সত্য বলে মানে বটে কিন্তু নামে না।

সে-মহিলা একটু পেছিয়ে চেঁচাতে শুরু করে, এ-এ-ই বিশ্বাস, দেখ ত এইখানে কে বসে আছে? তারপর, আবার মুখটা মাদারির মার দিকে ঘুরিয়ে এনে বলে, নামো, নামা সিট থিকে, এবার সে মাদারির মায়ের হাত ধরে টানও দেয়।

এই উঠো না কেনে, তোমরালা যেইঠে আসিছেন সেই বাসত যান, হামরালার বাসত উঠিছেন কেনে। এই ওঠো, নামো–মাদারির মায়ের দুপাশ থেকে এই কথা শুরু হলেও মাদারির মা নড়েনি। কিন্তু এই সমর্থন পেয়েই মহিলা মাদারির মার একটা হাত ধরে এমন হ্যাঁচকা টান দিল যে মাদারির মা উঠে পড়ে। মহিলার এটা হিশেবে ছিল না। আরো গোটা কয়েক টান দিলে মাদারির মা উঠবে, এরকম ভেবেই তার টানাটানি শুরু। কিন্তু তার প্রথম টানের মাঝামাঝিই মাদারির মা উঠে পড়ে। মহিলা হঠাৎ হুড়মুড় করে পেছনে পড়ে যায়। তবে বাসে এতই গাদাগাদি ভিড় যে কাউকে পড়ে যেতে হলেও বাচ্চাকাচ্চার ওপর, বা, উল্টো দিকের বেঞ্চে যারা বসে আছে, তাদের ওপর পড়তে হবে। মহিলা পড়ে যাওয়া মাত্রই হে-ই মাই গে বলে কান্নাকাটির একটা আভাস তৈরি হতেই, মাদারির মা বাস থেকে নেমে যেতে পারে, আর মহিলাকে পেছনের মেয়েরা ঠেলে সোজা করে বাসের ভেতর দাঁড় করিয়ে দেয়। বাসের ভেতর ত আর দাঁড়ানো যায় না। মহিলার মাথাটা কাঠে একটু ঠক করে লাগতেই মাথায় হাত দিয়ে নিজের পায়ের ওপর সোজা হয়ে গিয়ে, ঘুরে, মাদারির মায়ের ফাঁকা জায়গাটাতে বসে পড়ে।

মাদারি বাসের বাইরে মাকে জিজ্ঞাসা করে মাই গে, নামিবার ধরিছিস কেনে?

মাদারির মা খুব আস্তে বলে, মোক নিছে না, নামি দিছে।

কায় নামি দিছে? মাদারি তার মায়ের সামনে এসে, তার পেটে হাত রেখে জিজ্ঞেস করে।

সগায় ত নামি দিছে–কহিছে এ-বাসত হামরালাক নিবে না, মাদারির মা নিরাসক্ত ভাবে তার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে, যেন সে তাকে নামিয়ে দেয়ার যুক্তিটা বোঝে। জলুশ মানে ত সবাই মিলে একসঙ্গে যাওয়া। মাদারির মা ত সেখানে সত্যি একা, তার ত আর কোনো দল নেই। যাদের দল আছে, তারা ত তাকে নাও নিতে পারে। মাদারির মা ত আর কোনো বস্তিতে থাকে না–তাকে বস্তির লোকরা দেখেই ভাবে কোনো বাগানের লোক। কেউ যদি তার সঙ্গে কোনো কথা বলত, তা হলেও কি তারা, গ্রামের লোকরা, বুঝতে পারত সে তাদেরই লোক? শুধু কথা শুনেই কি আর তারা মেনে নিত?

মাদারি ব্যস্ত হয়ে ওঠে, তুই জলুশত যাবু না?

মাদারির মা একটু হেসে বলে, ক্যানং করি যাম? কোনো বাস নাই রে।

মাদারি হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে তার হাত ধরে টানে, চ, মোরা ঐ বাসঠে যাই—

মাদারির মা তার সঙ্গে-সঙ্গে যায়। কিন্তু সেই বাসের পেছনের দরজায় মানুষ ঝুলে আছে, বাস ছাড়ার আগেই! জানলা দিয়ে বাগানের মেয়েরা কিছুটা মুখ বাড়িয়ে আছে। মাদারি তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, হে-এ দিদি, মোর মাইটা আর হামাক নে কেনে, হে দিদি, মোক নে কেনে, মোর মাইটা নে কেনে।

এত চেঁচামেচির ভেতর মাদারির কথা কারো কানে ঢোকে না। কিন্তু একটা মেয়ে হাত বাড়িয়ে বলেই ত বাগানকা বাস হলেক, ঐ ট্রাকমে চড়ি যা, সে আঙুল দিয়ে ট্রাকটা দেখায়ও।

মাদারির মাকে দেখে বাগানের মেয়েরা ভেবেছে, গ্রামের থেকে এসেছে। মায়ের হাত ধরে টানতে-টানতে মাদারি তখন ট্রাকের দিকে ছোটে। সে ছোটে বলেই তার মাকেও একটু ছুটেই হাঁটতে হয়। আবার প্রথম বাসটা পেরিয়ে ট্রাকটার কাছে যেতেই মাদারি দেখে বাহাদুর। ব্যাটন হাতে বাসের ওপরে লোক তুলছে।

হে-এ বাহাদুরদা, এক হাতে মার হাত ধরা, আর এক হাতে বাহাদুরের বেল্ট ধরে মাদারি টানে, হে-এ বাহাদুরদা, হে-এ

বাহাদুর মাথা না ঘুরিয়ে চিৎকার করে, চোপ যাও, তারপর বাসের সিঁড়ির মাঝামাঝি পর্যন্ত যে-লোকটা উঠেছে, কিন্তু, বাসের ছাদে আর পা রাখার জায়গা পাচ্ছে না, তার পেছনে ব্যাটনের খোঁচা দিয়ে বলে, উঠো, উঠো কেনে, উঠো।

লোকটি বিপদে পড়ে। সে সত্যিই পেছনে ব্যাটনের খোঁচা খেয়ে বাসের ছাদে একটা পা রাখে তাড়াতাড়ি। পাটা একজনের গায়ের ওপর পড়ে, সে কায় রে বলে পাটা সরিয়ে দেয়, কিন্তু পাটা পড়ে ছাদের ওপরই। লোকটা তাড়াতাড়ি হামাগুড়ি দিয়ে উঠে পেছন ফিরে বাহাদুরকে বলে, পাছত কাঠি সিন্ধাইছেন কেনে?

বাহাদুর নীচে থেকেই চিৎকার করে, যান, ভিতরত যান।

লোকটার তখন হামাগুড়ি-দেয়া অবস্থা, সে পায়ের ওপরে বসতে গেলে গড়িয়ে পড়ে যাবে, কিন্তু সামনেও বসার জায়গা নেই।

বাহাদুর উঠো উঠো করে ব্যাটন ঘুরিয়ে পেছন ফিরেই দেখে, মাদারি। দেখে সে চিৎকার করে ওঠে, হেই গে, এ্যালায়ও উঠিস নাই গে।

মাদারি বাহাদুরের দিকে মুখ তুলে বলে, মোক নামি দিছে, মাঅক নামি দিছে, মোর যাইবার বাস নাই রো

কায় নামি দিছে? বাহাদুর চিৎকার করে ওঠে। কিন্তু ততক্ষণে ওদিককার বাসটা স্টার্ট দিয়েছে। এই বাসের ক্লিনার গাড়ির গায়ে জোরে-জোরে চড় মারে। বাহাদুর হঠাৎ সচকিত হয়ে বলে, খাইছে, খাইছে, সব স্টার্ট নিবার ধরিছে, চল কেনে, চল্।

বলেই বাহাদুর ব্যাটনটা বা হাতে নিয়ে, ডান হাতে মাদারির হাত ধরে টানে আর মাদারি তার মার হাত ধরে টানে। বাহাদুরের টানে তাদের, মাদারি ও তার মাকে, দৌড়তে-দৌড়তেই ট্রাকের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হয়।

ট্রাকের পেছনের ডালা তখন উঠে গেছে। বাহাদুর সেই ডালার ওপর তার ব্যাটন মেরে চিৎকার করে, হে-ই খুলি দাও কেনে, মানষি পড়ি আছে, খুলি দাও, খুলি দাও।

ট্রাকটায় তখন অনেকে দাঁড়িয়ে, বাগানের অনেক ছোকরা তিনটি ডার্লর ওপর বসে। নীচে থেকে। কে চেঁচাচ্ছে, সেটা শোনার মত অবস্থাও কারো নেই। বাহাদুর আবার মাদারির হাত ধরে সামনে চলে আসে, ড্রাইভারের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলে, আরে মানষি পড়ি আছে, তুলি নেন কেনে।

ওদিকের প্রথম বাসটা ততক্ষণে পেছনে চলতে-চলতে রাস্তায় উঠে দাঁড়িয়ে আছে। স্টার্ট চালুইবোঝা যাচ্ছে না, বাকি বাসটা ও ট্রাকটার জন্যে অপেক্ষা করছে, নাকি এখনি ছেড়ে দেবে। বাকি বাসটা আর পেছচ্ছে না, মাঠের মধ্যেই একটু-একটু করে গাড়িটা রাস্তার দিকে মুখ করে নিচ্ছে। ট্রাকের ড্রাইভার সিটে বসে স্টিয়ারিঙে হাত দিয়েছে—বাসটা রাস্তাতে উঠলেই সে স্টার্ট দেবে।

ড্রাইভার বাহাদুরকে ওপর দিকে হাত দেখায় আর তখনই ওপর থেকে সেই ছেলেটি গলা বাড়িয়ে ধমকে ওঠে, কী ব্যাপার, চেঁচাচ্ছেন কেন?

ঘাড় হেলিয়ে বাহাদুর বলে, ইমরাক ফেলি যাছেন, কায়ও উঠিবার দিছে না।

এতক্ষণে সময় হল? দিন, ছেলেটিকে তুলে দিন–ছেলেটি হাত বাড়ায়। বাহাদুর ব্যাটনটা মাটিতে ফেলে মাদারিকে মাথার ওপর তুলতেই মাদারি পায়ের এক দুলুনিতে পায়ের ট্রাকের তলায় ডালা পেয়ে যায়। ওঁকে এখান দিয়ে তুলুন, ড্রাইভারের দরজার পাশে লোহার ধাপ দেখিয়ে দেয় ছেলেটি।

.

ট্রাকে শ্লোগান ও নির্জনতা

রাস্তার ওপর উঠে রওনা হতেই ছেলেটি ট্রাকের ওপর শ্লোগান দেয়–ইনকিলাব জিন্দাবাদ। এই শ্লোগানটার জবাবে সবাই-ই জিন্দাবাদ দিতে পারে, বেশ জোরেই। তার পরেও চেনাজানা শ্লোগানই ওঠে, বামফ্রন্ট জিন্দাবাদ। গরিবের সরকার বামফ্রন্ট সরকার। পঞ্চায়েত আইন করল কে, বামফ্রন্ট সরকার আবার কে? গ্রামের মানুষের বন্ধু সরকার, বামফ্রন্ট সরকার।

বেশ খানিকক্ষণ ট্রাকের ওপর থেকে উৎসাহের সঙ্গে হাত নাড়িয়ে নাচিয়ে শ্লোগান চলে। যারা শ্লোগানগুলো জানে না, কয়েকবারের পর তারাও শ্লোগান ধরতে পারে। ট্রাকটা জোরে চলছে, মাথার ওপর দিয়ে বাতাস বইছে, দুপাশের ফরেস্টের গাছ-গাছড়া কোথাও-কোথাও মাথার ওপরই প্রায় ঝুঁকে আসে। বিশেষত বাশগাছের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বাসের মাথার লোকজনকে পরস্পরের পিঠের ওপর মাথা রাখতে হয়। শ্লোগান দিতে খুব ভাল লাগে। আর এত মানুষের গলায় শ্লোগানও এত, বাতাসে যেন মুহূর্তে উড়ে চলে যায়, ভারী হয়ে আটকে থাকে না।

সেই ছেলেটি শ্লোগানগুলোকে ধীরে-ধীরে সাধারণ থেকে নির্দিষ্টে নিয়ে আসে। এই শ্লোগানগুলি নতুন, তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধন উপলক্ষেই তৈরি। সরকারি দলগুলো টাড়িতে-টাড়িতে, বাগানে-বাগানে, বস্তিতে বস্তিতে গত মাসখানেক ছোট-ছোট মিটিং করেছে, স্কোয়াড তুলেছে, ইউনিয়নের সভা, হাট মিটিং, হাট স্কোয়াড করেছে। ফলে, এই নতুন শ্লোগানগুলিও কিছু লোকের জানা হয়ে গেছে। কিন্তু স্থায়ী শ্লোগানগুলি যেমন না-জানলেও বলা হয়ে যায়, এই শ্লোগানগুলি তেমন নয়। এগুলো মনে রেখে বলতে হয়। আর, মনে যদিবা রাখা যায়, বলতে গেলেই একটার পিছে আর-একটা চলে আসে।

ছেলেটি এই সব শ্লোগান প্রথমে পুরোটাই নিজে নিজে দিচ্ছিল। একটা-একটা করে। প্রথমবার দিয়ে হাতের ইশারা করছিল, পরের বার সবাই যেন একসঙ্গে দেয়। তারপর খানিকক্ষণ সেই শ্লোগানটিই পর পর চলে মুখস্থ করানোর মত। তারপর আবার সেই বামফ্রন্ট সরকার জিন্দাবাদ,…আবার কে এই সব স্থায়ী শ্লোগানের পর আবার নতুন শ্লোগান।

ছেলেটি বলে, উত্তরাখণ্ড-গোখাল্যান্ড নাহি চলে গা নাহি চলে গা। হিন্দি শ্লোগান বলেই বাগানের লোকজন আগে গলা মেলায়। গ্রামের লোকজন প্রথমে একটু ইতস্তত করে এটা তাদের শ্লোগান কিনা বুঝে নিতে। তা ছাড়া, এই একই শ্লোগান গ্রামে দেয়া হয়েছে, উত্তরাখণ্ড-গোর্খাল্যান্ড চলবে না চলবে না। যারা সেটা জানে তারা বাংলাতেই জবাব দেয়। ছেলেটি এই শ্লোগান খানিকক্ষণ চালানোর পর এই একই বিষয় নিয়ে নতুন শ্লোগানে যায়, উত্তরবঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদ রুখবোই রুখবো। একই ছন্দে এই শ্লোগানের একটা হিন্দি চেহারাও আছে রুখনে হোগা, রুখনে হোগা।

কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদ এই একটি আওয়াজের জন্যে শ্লোগানটা যেন জমে না। পরের শ্লোগানটা হিন্দিতে-বাংলায় দুটোতেই জমে যায়, বাংলাকো পাঞ্জাব বানানা রোখনা হি রোখনা। রুখবই রুখব।

এদের শ্লোগান বলার নিজস্ব একটা ধরন আছে–সে গ্রামেরই লোক হোক আর বাগানেরই হোক। প্রথমে কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে গরম-গরম ভাব হয়ত কিছু ছেলেছোকরা এনে দেয়। কিন্তু যখনই দরকার হয়ে পড়ে অনেকক্ষণ ধরে টানা শ্লোগানের, তখনই এদের গলা একটা অদ্ভুত খাদে নেমে আসে, আর প্রায় গুনগুনের চাইতে সামান্য একটু উঁচু গ্রামে শ্লোগান চলতেই থাকে, চলতেই থাকে, কখনো না-থামার মত করে চলতে থাকে। এক দিকে যেমন সেই স্বরগ্রামকে কিছুতেই উঁচু করা যায় না, তেমনি, যেন এদের শ্লোগান দেয়া থামানোও যায় না।

ছেলেটি এবার তার শ্লোগানগুলোকে আরো নির্দিষ্টতায় আনতে চায়। সে সেই স্থায়ী শ্লোগানগুলি আউড়ে এবার বলে, তিস্তা ব্যারেজ করল কে, বামফ্রন্ট সরকার আবার কে? তিস্তা ব্যারেজকা পানিলেক নয়া দিন আগেলাক, পাহাড় ও সমতলের ঐক্য জিন্দাবাদ, গোখা-রাজবংশী ভাই ভাই জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ, গোখা-দেশিয়া-মদেশি একাই, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ, চা বাগিচা কা মজদুর বস্তিলোককা দোস্ত ভুলো মত, ভুলো মত।

কিন্তু এই শ্লোগানগুলির মধ্যে এমন রাজনীতি নিহিত আছে যে কিছুতেই স্বচ্ছন্দ হতে চায় না। বেশ খানিকক্ষণ শ্লোগান চালানোর পর ছেলেটি থামে, পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মোছে। সে থেমে যাওয়ার পরও কিন্তু ট্রাকের ভেতর থেকে শ্লোগানের দোহারকির গুঞ্জন উঠতেই থাকে–সে যে থেমে গেছে ওটা টের না পেয়ে কেউ-কেউ জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ নাহি চলেগা নাহি চলেগা বলেই যায়। এ-রকম দু-চারবার বলবার পর তারা বোঝে শ্লোগান থেমে গেছে।

সেই নাচার দলের বাঁশিওয়ালা এই ট্রাকেই উঠেছিল। সে এই শ্লোগান পরবর্তী নীরবতার সুযোগে হঠাৎ হাত উঁচু করে বলে ওঠে, জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ, তারপর আবার চুপ করে যায়। কিন্তু, সে হয়ত আশা করেছিল আবার কিছুক্ষণ শ্লোগান চলবে। তেমন শ্লোগান চলছে না দেখে সে যেন কিছু করার উৎসাহ পায়। সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে কিন্তু পা দুটো এক করতেই বসে বসে টলে যায়। সে বসে ছিল মেয়েদের কাছে–টলে পড়তেই বাগানের এক বুড়ি তার পিঠ ধরে সোজা করে দিয়ে বলে, বাঁশি বাজাগে, বাজা। আর মেয়ের দল খিলখিল হেসে ওঠে। বুড়ি পেছন থেকে লোকটার বাঁশি ধরা হাতটি তার ঠোঁটের কাছে তুলে বলে, হে-ই আওয়ারা বাঁশি বাজাগে, বাজা, হামরামন নাচ করবেক, বাজা।

লোকটি বাঁশি ধরা হাতটি সরিয়ে নিয়ে বলে, হাম বাঁশি নাহি বাজায়গা, হাম লেকচার দেগা, বড়া লেকচার।

তো দে কেনে, লেকচার দে, বৈঠকে দে ঝুবরু, বৈঠকে দে, বুড়ি পেছন থেকে আস্তে-আস্তে তাকে সমর্থন দেয়।

হ দেগা। হামরামন ইউনিয়ন তোেড় দেগা। কাহে? না, হামরামন আউর ই লাল ইউনিয়ন নাহি করেগা। হামরামন আদিবাসী হ্যায়। আদিবাসীরাজ কায়েম করনে হোগা। হামরামন ঝাড়খণ্ড পাটিকা মদত করেগা। বুঝলেক? দেবপাড়া বাগানমে সব কোই ঝাড়খণ্ড হো গেলাক। হলেক কি না-হলেক, কহ, কহ, হলেক কি না-হলেক?

সেই বুড়ি পেছন থেকে বলে, হলেক, হলেক, ব্যাস, লেকচার খতম কর দে।

একটা মেয়ে বলে ওঠে, হে ঝুবরু, খাড়া হোকে লেকচার লাগা দে।

ঝুবরু তার বাঁশিসহ হাত বাতাসে খেলিয়ে বলে, নাহি, হাম আউর লেকচার নেহি দেগা, আভি হাম প্রেসিডেন্ট হোগেলাক, অউর ইউনিয়ন বাবু লেকচার দেগা। ইউনিয়ন বাবু, বোল দেও, লেকচার দেও। বলতে বলতে কুবরু নেতিয়ে পড়ে। পেছনের বুড়ি একটু সরে গিয়ে তাকে আরো নেতিয়ে পড়ার কিছুটা জায়গা দেয়। ঝুবরু পুরো শোয়ার জায়গা পায় না বটে কিন্তু এর হাতের ফাঁক দিয়ে, ওর পায়ের ফাঁক দিয়ে নিজের শরীরটাকে এলিয়ে দিতে পারে। সকালের হাড়িয়ার নেশা এই আধো ঘুমে কেটে যাবে, বিশেষত ট্রাকের ওপরের এই বাতাসে, যদি যেখানে নামবে সেখানে পৌঁছেই আবার হাড়িয়া না খায়।

শ্লোগান থেমে যাওয়াতেই খানিকটা যেন দূরযাত্রার একঘেয়েমি ট্রাকটার মধ্যে এসে গিয়েছিল। অনেক দূর যেতে হবে, তাই কারো কোনো উত্তেজনা নেই। বুবরুর বক্তৃতার আয়োজনে একটু বদল আসতে না-আসতেই শেষ হয়ে যায়, কুবরু যে এত তাড়াতাড়ি তার বক্তৃতা শেষ করে দেবে, তা যেন ঠিক প্রত্যাশিত ছিল না। এখন এই ট্রাকের ভেতরকার ঝাঁকি, ট্রাকের ওপরের ঝোড়ো বাতাস, মাঝে-মাঝে ডালপালা থেকে বাঁচাতে মাথা নুইয়ে ফেলা–বিশেষত তাদের যারা ড্রাইভারের ছাদে বসেছে, এমন-কি বাগানের মেয়েদের একটু-আধটু হেসে ফেলাও, যেন একঘেয়ে হয়ে এসেছে, এরই মধ্যে।

প্রথম প্রথম বাস দুটোর পেছন-পেছন ট্রাকটা যাচ্ছিল, আস্তে-আস্তেই। কিছু দূর চলার পরই বোঝা গেল-বাসদুটোর পক্ষে আর-গতি বাড়ানো সম্ভবই নয়, আর ঐ গতিতে গেলে তিস্তা ব্যারেজে পৌঁছবে যখন, তখন, সবাই ফেরার ট্রাকে বাসে উঠছে। এটা বুঝে ফেলার পর ট্রাক ড্রাইভার কয়েকবার হর্ন দিয়ে বাসদুটোকে পেরিয়ে এগিয়ে যায়। তখন দুই বাস থেকেই আবার আওয়াজ ওঠে, হাত দেখানো হয়, বিশেষত বাসের ছাদে যারা বসে আছে তারা হাত নাড়ায়। তারপর থেকে এই ট্রাকটা একাই যাচ্ছে।

দলগাঁও পেরিয়ে গেল।

.

চা বাগান ঘিরে মিলিটারি

গয়েরকাটার কাছাকাছি এসে ডান দিকে মোড় নিয়ে ন্যাশন্যাল হাইওয়ে ছাড়তে হল। এটা চামুর্চির রাস্তা–বিন্নাগুড়ি-বানারহাট হয়ে চামুর্চি গেছে। এই রাস্তা ধরে অনেকখানি গিয়ে ট্রাক বায়ে ঘুরবে। আবার কিছুটা গিয়ে ল্যাটার্যাল রোড ধরবে–দুই ন্যাশন্যাল হাইওয়েকে যুক্ত করেছে যে-ল্যাটার্যাল রোড।

এই রাস্তাটা সরু, বোধহয় গর্তটৰ্তও একটু বেশি। তাই ট্রাকটাও আস্তে-আস্তে চলে, ঝাঁকি আর। দুলুনিও একটু বেশি লাগে। কিন্তু একেবারে ফাঁকা। যতদূর চোখ যায় ঝকঝকে রাস্তা চলে গেছে, সামনে কিছুই নেই। মাঝেমধ্যে উল্টো দিক থেকে দুটো-একটা ফাঁকা ট্রাক আসে–বাগানের। সেই ট্রাকের দু-একজন কুলি মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এই লোকভর্তি ট্রাকটাকে দেখে। কোনো বিস্ময় নেই। কিন্তু এত প্রাকৃতিক দৃশ্যের বিস্তৃতির মধ্যে মানুষকে নিয়ে দৃশ্য বড়,কম। তাই, কোথাও একজন মানুষ দেখলেও তাকাতে হয়।

রাস্তার পাশ দিয়ে গয়েরকাটা নদী অনেক দূর পর্যন্ত চলে। নদী বলে বোঝা যায় না, তা ছাড়া ঝোপঝাড়ে ঢাকাও থাকে অনেকখানি। হঠাৎ এক-একটা জায়গায় ঝোপঝাড়হীন, খোলা, ছোট নালার মত নদীটাকে দেখা যায়, একটু উঁচু জায়গা থেকে বেশ মোটা ধারায় নীচে ঝরে পড়ছে, আর সেখান থেকে জল নিয়ে কেউ-কেউ কোথাও-কোথাও যাচ্ছে। খানিকটা এমন খোলামেলা বয়ে গিয়ে নদীটা আবার ঝোপঝাড়ে ঢেকে যায়।

কিন্তু নদীর ঐ খাতটা মাঝেমধ্যে দেখেই চমকে বুঝতে হয়, গাড়িটা একটু ওপর দিকে উঠছে, ঠিক পাহাড়ে না হলেও পাহাড়ের তলার দিকে যেন। নদীটার উল্টো দিকে ট্রাকটা চলেছে, তাই যেন আরো বিশেষ করে বোঝা যায় কী ভাবে জমির একটু পাথুরে ঢাল বেয়ে নদীটা অত কম জল নিয়েও, অত সরু খাত দিয়েও লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে, আয়তনের চাইতে একটু বেশি খর বেগে।

মাদারি বসে ছিল ড্রাইভারের চালের ওপরে আরো অনেকের সঙ্গে। সে বাচ্চা বলে, তাকে একটু পেছনে সকলের মাঝখানে বসানো হয়েছে, যাতে আচমকা ধাক্কায় সামনের দিকে হোঁচট না খায়, বা ট্রাকটা গর্তটর্তের মধ্যে পড়ে দুলে উঠলে পিছলে না যায়। পেছন দিকে গেলে ত লোকের মাথায় পড়বে, কিন্তু সাইডে হড়কালে ত রাস্তায়।

ট্রাকে বাসে যেমন হয়-চলার আগে মনে হয় আর-একটা লোকও আটবে না, আর চলা শুরু করলে দেখা যায় প্রত্যেকেই একটু না-একটু জায়গা পেয়েই গেছে আর কিছুটা জায়গা যেন ফাঁকা থেকে যায়। কিন্তু সবটাই ঘটে, একটা সীমার মধ্যে। যেমন, যারা ট্রাকে ডালার ওপর বসে আছে লাইন দিয়ে, তারা ডালাটাকে দুই হাতে চেপে, সামনে ঝুঁকে ট্রাকের ঝাঁকুনি সামলাচ্ছে। সে-ভাবে খানিকটা যাওয়া যায় কিন্তু এরকম মাইলের পর মাইল কি আসা যায়? গয়েরকাটা পর্যন্তই ত প্রায় বিশ মাইল, তার পর এই রাস্তা আরো কত মাইল কে জানে। ডালার ওপর বসে থাকতে-থাকতে ব্যথা লাগে। তখন পা-দুটো ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হয়। ছড়িয়ে দেয়ার জায়গাও আছে। কিন্তু তারপরই ট্রাক এমন ঝাঁকি খায় যে পা গুটিয়ে এনে শরীরের ভার সামলাতে হয়। এর মধ্যে দু-একজন ডালার ওপর থেকে পিছলে পাটাতনের ওপর বসে পড়েছে। জায়গাও হয়ে গেছে। অনেকে দাঁড়িয়ে পড়েছে–সামনের কারো ঘাড় ধরে টাল সামলাতে-সামলাতে। কিন্তু ট্রাকের ওপর দাঁড়িয়ে টাল সামলানো মুশকিল–একটা লোহার শক্ত কিছু থাকলে ভাল হয়। ড্রাইভারের কেবিনটার পেছনের দেয়ালে হেলান দিয়ে যারা ট্রাকের মাথার দিকে বসেছে তারা ঐ লোহার রডগুলো ধরতে পারে, যা দিয়ে ট্রাকের ডালাগুলো এটে রাখা।

রাস্তায় এমনি ট্রাক বাসের চাইতে মিলিটারির গাড়ি যেন বেশি। খাকি রঙের মিলিটারি ট্রাকগুলো ছুটতে-ছুটতে ফাঁকা চলে যাচ্ছে। একটা জায়গায় মিলিটারির তাঁবু পড়েছে, অনেকগুলো ট্রাক মাঠটার একপাশে লাইন দিয়ে; এক জায়গায় মিলিটারিরা গোল হয়ে বসে, আর একটা মিলিটারি কিছু বলছে।

বিন্নাগুড়ির কাছাকাছি আসতেই রাস্তার চেহারা বদলে যায়, আরো ঝকঝকে আর চওড়া। রাস্তার মুখে-মুখে চায়ের বড় বড় পেটির মত কাঠের বাক্স উপুড় করা, তার ওপর আবার একটা তেকোনা কাঠের ফলকে কী সব লেখা। এই সব বাক্স আর লেখা প্রায়ই দেখা যায়, ঘন-ঘন। বেশ খানিকটা মাঠ পরিষ্কার ঝকঝক করছে, তাতে রঙিন খুঁটি পোতা–এক-একটাতে এক-একভাবে। রঙ যেন সদ্য লাগানো হয়েছে এতই জ্বলজ্বলে। এরকম মাঠ প্রায়ই দেখা যায়।

বিন্নাগুড়ির মোড়েই আর-একটা রাস্তা পুবে বেরিয়ে এসেছে, যে-মাদারিহাট থেকে এই ট্রাক এল সেই মাদারিহাটেরই দিকে, কিন্তু নিশ্চয়ই মাদারিহাট থেকে খানিকটা উত্তরে। এই রাস্তাটি অনেক প্রাচীন। জলুশ ছাড়া, বাস ছাড়া, এমন-কি হাটবার ছাড়াও যাদের বন-নদী এই সব পেরিয়ে-পেরিয়ে এই সব জায়গায় ঘুরতে হয়েছে কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো সাইকেল ঠেলে, তারা জানে, এই রাস্তা গেছে দেওবুড়াপাড়া, শোভারাম দিয়ে, তিনি নদী, বানগুড়ি নদী পেরিয়ে টোপাভাসা। এখন এখানে নেমে গেলে এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে-হেঁটে মাদারিহাট পৌঁছে যাওয়া যাবে। এই পথে মাদারিহাট থেকে নিয়মিত যাতায়াত করেছে এমন লোক এই ট্রাকে দু-চারজন আছে। আজকাল এ রকম যাতায়াত লোকজনের কমে আসছে। এখন বাসরাস্তা অনেক বেড়েছে। এক বাস থেকে আর-এক বাস ধরে লোকে যাতায়াত করতে চায়।

কিন্তু অনেক দিন ধরেই নাকি এই রাস্তাটা পিচ ঢেলে বড় করার কথা চলছে। তা হলে বিন্নাগুড়ির সঙ্গে হাসিমারার একটা সরাসরি আলাদা রাস্তা চালু হতে পারে–আরো ফাঁকায়-ফাঁকায়, আরো গোপন। বিন্নাগুড়িতে, হাসিমারাতে–দুই জায়গাতেই দরকারে এমন-কি প্লেনও নামে। যদি এই রাস্তাটা তৈরি হয়ে যায় তা হলে আর ন্যাশন্যাল হাইওয়ে দিয়ে সেই সব দরকারে চলাচল করতে হয় না। বরং সকলের চোখের আড়ালে সহজেই এই রাস্তাটা ব্যবহার করা যায়।

আর, তাতে ত শুধু বিন্নাগুড়ি-হাসিমারা সংযোগই হবে না। আসলে সেই চালসার মোড় থেকে ল্যাটারাল রোড ধরে বিন্নাগুড়ি পর্যন্ত এসে যেসব কনভয়ের যাবার দরকার, সোজা হাসিমারা চলে যেতে পারে কারো চোখে না পড়ে। শিবক পাহাড়ের পরে তিস্তার পশ্চিম পারে ফরেস্টের মধ্যে বিরাট ক্যাম্প ফরেস্টের ভেতর দিয়ে-দিয়ে সেই বাগডোগরা প্লেন ঘাটির কাছে ব্যাঙডুবি পর্যন্ত গেছে। পশ্চিমে ব্যাঙডুবি আর পুবে হাসিমারা–শিলিগুড়ির কাছ থেকে জলপাইগুড়ির প্রায় পুব সীমার কাছাকাছি পর্যন্ত সেনাবাহিনীর কর্তৃত্বাধীন অঞ্চলটা তাহলে নিজেদের রাস্তাঘাট ও যানবাহন নিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে যেতে পারে। এখন বিন্নাগুড়ি পর্যন্ত সেই স্বাবলম্বন ঘটেছে কিন্তু তার পুরে আর এগতে পারছে না। বা, হয়ত ইচ্ছে করেই এগচ্ছে না। শোনা যায়, কয়েকটা নদীর ওপর ব্রিজের জন্যে নাকি রাস্তাটা আটকে আছে। এদিকের কোনো রাস্তাই ত ব্রিজ ছাড়া, ক্যালভার্ট ছাড়া তৈরি করা যায় না। মিলিটারি ইচ্ছে করলে ডাবড়ব আর শুখাতিতির মত নদীর ক্যালভার্ট বানাতে কতক্ষণ?

বিন্নাগুড়ি দেখলে চোখ একটু জুড়োয় সত্যি। কিন্তু এদিককার ফরেস্টে-ফরেস্টে বা বাগানে-বাগানে যারা ঘোরে, কাজ করে, এই ফরেস্ট আর বাগানই যাদের জীবিকা জোগায়, তাদের কাছে নতুনত্ব যা তা মিলিটারির খাকি রঙে। বাকিটা অনেকখানিই চেনা। ফরেস্টের রেঞ্জ অফিস, রেঞ্জার ও অন্যান্যদের কোয়ার্টারগুলো ত এরকমই দেখতে ঝকঝকে। এগুলো ইটের, সিমেন্টের, ওগুলো কাঠের। কিন্তু প্রত্যেকটিরই সামনে তারের বেড়া, কাঠের দেয়ালে বছর বছর রঙ পড়ে, টিনে লাল রঙ।

বরং মিলিটারি ক্যাম্পগুলো যেন অনেকটা চা বাগানের মতই দেখতে, ফরেস্টের মত ততটা নয়। চা বাগানগুলোতে দেয়াল ইটের আর সিমেন্টের, চালের টিন লাল রঙের। স্কুল, হাসপাতাল, ফ্যাক্টরি অফিস, ওজনের জায়গা–এই সবের সামনেই অনেকখানি করে সবুজ মাঠ, তার দিয়ে ঘেরা। দু-একটা জায়গায় ফুলবাগানও। রাস্তাগুলোও পিচ ঢালা, বা অন্তত কাঁকর ঢালা।

একই রকম দেখতে এই চাবাগানগুলোই মিলিটারি ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে রেখেছে, নাকি, মিলিটারি ক্যাম্পগুলোই চা বাগানগুলোকে ঘিরে রেখেছে?

.

ট্রাকের ভেতরে নির্জনতার গান

গয়েরকাটা থেকে ডান দিকে ঘুরে এই রাস্তাটা ধরতেই কিছুক্ষণের মধ্যে যেন ট্রাকটার ওপর নির্জনতা। চেপে বসে–যে-নির্জনতা থাকে দূরযাত্রী ট্রেনের কামরায়। ন্যাশন্যাল হাইওয়ে দিয়ে, আসতে-আসতে নানা গাড়ির পাশ কাটাতে হয়, তাদের পাশ কাটিয়ে নানা গাড়ি যায়, উল্টো দিক থেকে কত গাড়ি গায়ে বাতাস ছুঁড়ে দিয়ে চলে যায়। কিন্তু এ রাস্তায় তেমন কিছুই নেই, প্রায় একা-একা মাইলের পর মাইল যাওয়া, মাইলের পর মাইল। কখনো কখনো পাওয়া বাগানের ট্রাক আর মিলিটারির ট্রাকে সেই একাকিত্ব ঘোচে না। বরং মনে হতে থাকে যে তারা এই নির্জনতা দিয়ে আরো নির্জনতায় যাবে। ফরেস্টের ভেতর দিয়ে একা-একা মাইলের পর মাইল হাঁটতে এরকম নির্জন লাগে, বা পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসতে, বা, এমন-কি চা-বাগানের ভেতর দিয়ে ভেতর দিয়ে কোথাও যেতে, বা বর্ষায় জল এসে ভাসায় এমন এক শুখা নদীর খাত ধরে-ধরে নিধুয়া কোনো পাথার পার হতে। এই ট্রাকে উঠে। যারা এখন দল বেঁধে তিস্তা ব্যারেজে যাচ্ছে, তাদের সবাইই এমন নির্জনতায় আজন্ম অভ্যস্ত। তারা নিজের নিজের মত করে জানে, এই নির্জনতা কেমন করে কাটাতে হয়। যে-মেয়েগুলো হাটখোলাতে নাচছিল, তারা এখন পরস্পরের কাঁধে মাথা দিয়ে হেলে থাকে। কেউ-কেউ আবার পরস্পরকে জড়িয়ে.. ধরে ট্রাকের টাল সামলায়। চোখ খোলা রাখে যেখানে চোখ যায় সেখানে। সেরকম ভাবেই কেউ একজন গান ধরে কেমন গুনগুন কান্নার মতন সুরে। কে গায় বোঝা যায় না, কিন্তু সুরটা বোঝা যায়। সেই সুরটা যেন দীর্ঘ একা যাত্রার সঙ্গ দেয়।

এই ট্রাকের ঝাঁকানিতে গানের সুর কেটে যায়, হঠাৎ একটা জায়গা উঁচু হয়ে যায়, আর একটা জায়গা পড়ে যায়, কিন্তু তা সত্ত্বেও সুরটা সুরই থাকে। যে গানটা শুরু করেছিল, তার গলা থেকে কখন আর-একজন সুরটা নিয়ে নিয়েছে বোঝাই যায় না–গুনগুনানি কান্নার সুরের পার্থক্য এতই কম। কিন্তু, তারও পরে, কখন, দেবপাড়া চা বাগানের এই সব মেয়েরাই একে অন্যের পিঠে বা ঘাড়ে মাথা হেলিয়ে ট্রাকের ওপর দুলতে-দুলতে একসঙ্গে কান্নার সুরে সেই গানটা গেয়ে যায়।

মাসি, তুই আর ভাল কম্বল খুঁজিস না,
সব কম্বলে–একই লোম,
সব লোমে একই উকুন,
সারা রাত জেগে থাকি আর উকুন কুটুস কুটুস করে কামড়ায়,
নাকি উকুন কামড়ায় বলেই সারা রাত জেগে থাকি।
মাসি তুই আর হাট থেকে।
উকুন মারা তেল আনিস না।
নইলে, সারা রাত আমাকে কামড়াবে,
এমন উকুন আর আমি কোথায় পাব?
এমন উকুন আর আমি কোথায় পাব?

এই গান অনেকক্ষণ ইনিয়ে-বিনিয়ে চলে। কখনো দশজন গলা দেয়, কখনোবা দশজনই এক সঙ্গে থেমে যায়, নতুন দুজন নতুন লাইনটা গেয়ে ছেড়ে দেয়; আবার হঠাৎ সবাই মিলে পুরনো লাইনটাতেই ফিরে যায়–সবাই যেন ডুকরে ওঠে উকুনের শোকে, আবার সবাই একজনের কাছে গানের সুতো ছেড়ে দেয়। এ যেন তাদের অলস সময়ের খেলা–দীর্ঘপথ হাঁটতে-হাঁটতে যে-আলস্য আসে।

হঠাৎ একটা মেয়ে সোজা হয়ে বসে বলে, চা বাগানের গ্যামাক্সিন এখন আবার উকুনও খেয়েইছে, থাকার জন্যে পোকারা এখন গাছের পাতাও পায় না, হায় রে এর পর পোকাগুলো থাকবে কোথায়?

মেয়েটি কথা বলার মত করেই বলে, বলেই তার মাতৃভাষায় সে গানটি গায়। কিন্তু সে-ভাষা শোনা যেতে পারে মাত্র, তার অর্থ ত বুঝতে হবে এই বৃত্তান্তপাঠকের নিজের ভাষায়। হায়, সেই মেয়েটি ত এ বৃত্তান্তের পাঠক নয়। মেয়েটির মুখের কথার মানেটা গানের মানের সঙ্গে এমনই এক হয়ে যায় যেন মনে হয় মেয়েটা তার মা-ঠাকুমা, ঠাকুমার ঠাকুমার কাছে মধ্যপ্রদেশ থেকে বিহার পর্যন্ত অরণ্য-পাহাড়ে ছড়ানো এই যে-গানটি পেয়েছিল সেটাতে নতুন লাইন যোগ করে দিচ্ছে। অথবা হয়ত এই ট্রাকে সেই প্রাচীন গানটাও একঘেয়ে লাগছে, সেই গান গেয়েও আর একঘেয়েমিটা কাটছে না। তাই সে আসলে ঐ পুরনো গানটাকেই বাতিল করছে এই কথাগুলো বলে। গানের সম্প্রসারণ, না, বর্জন, তা বুঝতে না-দিয়ে, বা নিজেরাও না বুঝে, মেয়েদর দলটা একসঙ্গে হেসে ওঠে, হেসে উঠতে-উঠতে সোজা হয়ে বসে, আবার হাসে, তাদের গায়ে গা ঘষা একাকিত্বেই।

কিছুক্ষণ দল বেঁধে হেসে মেয়েরা গানটা ছেড়ে-ছেড়ে দেয়। এখন, তারা গানের চাইতে হাসতে যেন আনন্দ পায় বেশি। তারপর এক সময়ে সেই হাসিটাও থামে। ট্রাকটার ভেতরে কিছুক্ষণের জন্যে যে-পরিবর্তন এসেছিল, তা বাতাসে বাতাসে ঝাঁকুনিতে ঝাঁকুনিতে শেষ হয়ে যেতে থাকে। আবার সেই দোলা, পা ছড়ানো, পা গুটানো, কিছু ধরে নিজের শরীর সামলানো। আবার সেই নির্জনতার ভেতর ট্রাকটা ঢুকে যায়।

রাজবংশী মেয়েরা বসে ছিল ট্রাকের পেছন দিকটাতে। সেখান থেকে সেই একক গুনগুনে একটা গানের মত আওয়াজ ওঠে। গানের সুরে সবাই ভাবে, দেবপাড়ার মেয়েরাই বুঝি আবার গান ধরল। কিন্তু সুরটা একটু এগতে-পেছতেই বোঝা যায় না, এখন গাইছে রাজবংশী মেয়েরা। গলার কী একটা খাজে তারা ধরা পড়ে যায়। দেখতে-দেখতে সে-গানটাতেও সুরের পর সুর এসে জড়ো হয়। মাথা নিচু করা, মাথায় ঘোমটা দেয়া ঐ ভিড়টা থেকে গানটা যেন ওপরে উঠে আসে। একটা মেয়ে মার কোলে শুয়ে পড়েছিল, সেও উঠে গান ধরে।

আকাশ ত পরিষ্কার হয়ে গেল,
কাল মুরগিটা শাদা হয়ে গেল,
নাকি কাল মুরগিটাকে ঢাকা দিয়ে।
শাদা মোরগটা তার পাখনা মেলে দিল
আর ঝুঁটিটা ফোলাল।
আর সারা রাতের পর তোর সময় হল রে বিদেশিয়া বন্ধু,
পান-সুপুরি নিয়ে আমার গোসা ভাঙানোর?

চাপা কান্নার সুরে এই গোসা-ভাঙানো চলতেই থাকে ট্রাকে আঁকি-দুলুনির সঙ্গে-সঙ্গে। কিন্তু বানারহাট আসতেই গোসা ভেঙে যায়। ডান দিক দিয়ে সোজা চামুর্চির রাস্তা চলে গেছে, সামনে বানারহাট বাজার, রেল স্টেশনের ইশারা পাওয়া যায়, প্যাক প্যাক করে কিছু রিক্সা যায়, তারপরই খোলা মাঠে তিনটি ট্রাক আর অনেক লোক, ঝাণ্ডা, ফেস্টুন। এই ট্রাকটাকে দেখেই মাঠের লোকরা দৌড়ে রাস্তার পাশে আসে, চিৎকার করে হাত নাড়াতে থাকে-এই ট্রাকটার গতি একটু কমে আসে। এতটাই কমে যে ট্রাকের আর মাঠের লোকজনের মনে হয়, ট্রাকটা বোধহয় থেমেই যাবে। ট্রাকের লোকজনও দাঁড়িয়ে পড়ে মাঠের লোকজনের দিকে হাত নাড়ায়।

মাঠে ঢোকার ক্যালভার্টটা পেরিয়ে যেতেই বোঝা গেল ট্রাকটা দাঁড়াবে না। তখন মাঠের লোকজন আবার দৌড়ে এগিয়ে এসে হাত নাড়ে। মাঠের ভেতর থেকে হঠাৎ শ্লোগান ওঠে, বামফ্রন্ট সরকার জিন্দাবাদ, চলো, চলো, ব্যারেজ চলো, ব্যারেজমে আজ কিয়া হোগা, লহর লহর লহর দেগা।

ট্রাকের লোকজনও দাঁড়িয়ে উঠে শ্লোগান দিতে থাকে। কে কোন শ্লোগান দিচ্ছে বোঝা যায় না, কিন্তু অতগুলো মানুষের সমবেত গলার আওয়াজে এতক্ষণকার নির্জনতা ভেঙে যায়। একে বানারহাটের আধা-শহুরে চেহারা, তার ওপর সারি দিয়ে উঁড়ানো একই মিছিলের ট্রাক, মাঠভর্তি লোক–সব মিলিয়ে হাটখোলার সকালের অবস্থাটা যেন ফিরে আসে-সবাই মিলে যেন কোথাও যাওয়া হচ্ছে, কিছু করা হচ্ছে। এই ট্রাকের এতগুলো মানুষ এতক্ষণ যেন বড় একলা ছিল, এখন তাদের সেই একলা ভাবটা কেটে যায়। বানারহাটটা পেরনোর পর আবার চা-বাগান শুরু হয়। সেই চা বাগানের পাশ দিয়ে একটা ট্রাক রঙে ঝলমল করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। যেমন নদীতে হয়, পেছনের নৌকো সামনের নৌকোর সঙ্গ নিতে চায়, এই ট্রাকটা গতি বাড়ায়। আর ট্রাকের ওপরের লোকজন শ্লোগান ধরে—…জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ। কিন্তু বাতাস ত ট্রাকের শ্লোগান পেছনে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

মাদারির মা মানুষের গন্ধ শোঁকে, আওয়াজ শোনে

সেই শুরু, বাকি পথটা আর তাদের কখনো সঙ্গীর অভাব হয় না। বানারহাট থেকে সোজা গিয়ে ল্যাটারাল রোডে উঠতে হবে। বানারহাটের পর থেকেই তারা দেখে সামনে দূরে কোনো ট্রাক যাচ্ছে, বা, তাদের পেছনে কোনো ট্রাক আসছে। গয়েরকাটা থেকে ল্যাটারাল রোডের মাইল পনের-ষোলর দূরত্বে বানারহাট পার হয়ে দূরে দূরে ছড়ানো-ছিটনো ট্রাকের সঙ্গ সংখ্যার দিক থেকে হয়ত তেমন কিছু নয় কিন্তু আর-একটা ট্রাক দেখলেই কেমন উৎসাহ আসে। সবগুলো ট্রাক একই দিকে যাচ্ছে, সবাই একই শ্লোগান বলছে, যে-কোনো ট্রাকের সঙ্গে যে-কোনো ট্রাক বদল করে নিলেও কিছু এসে যাবে না–এতে দূরত্ব আর দূরত্ব থাকে না। মাদারির মার খুব ভালো লাগে।

তাকে ট্রাকে তুলে যেখানে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল, সে সেখানেই বসে আছে। এটা দেবপাড়ার মেয়েদের ভেতরেই একটা কোণ। কোণ হওয়ায় মাদারির মার খুব সুবিধে হয়েছে। সে ড্রাইভারের কেবিনের পেছনের দেয়ালটাতে হেলান দিতে পারছে। নইলে, সে হেলান দেয়ার জন্যে আর-একটা ঘাড় পেত কোথায়? আর, মাদারিটা আছে তার মাথার ওপরে–ইচ্ছে করলেই ডেকে মুখটা দেখে নিতে পারে, বা দাঁড়িয়ে ছুঁয়ে আসতে পারে।

এই এত লোক, এত ট্রাক, এত মিছিল, এত আওয়াজ, এত কথা–এর ত কোনো মানেই নেই তার কাছে। তাকে যেমন কেউ আজকের মিছিলে যেতে ডাকত না, তেমনি সে-ও ত আজকের মিছিলে আসত না, কোনোভাবেই আসত না। মিছিলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। ফরেস্টের অজস্র লতাপাতা, গাছ, ঝোরা–এর সঙ্গে তার সম্পর্ক এমন সর্বাঙ্গীণ ও দৈনন্দিন যে সেই সম্পর্কের বাইরে তার পক্ষে আসা সম্ভবই নয়। নেহাত মাদারি জেদ ধরল। আর মাদারির মা এখনই মাদারিকে একা-একা মিছিলে যেতে দিতে চায় না। এখনই যদি মিছিলে চলে যায় মাদারি, তা হলে সে আর-একটা ছেলে পাবে কোথায়? একটা ছেলে ছাড়া ত তার চলবে না। আজ না-হয় সে সঙ্গে এল কিন্তু আর বড় জোর বছর দুয়েক, তারপর ত মাদারি চলে যাবেই–হাসিমারা, শিলিগুড়ি বা নেপাল–তখন? তখন মাদারির মা ছেলে পাবে কোথায়? একটা ছেলে পাবে কোথায়? একটা ছেলে হতে ত বছর লাগে না, কিন্তু আবার একটা ছেলে পেটে নেয়া যেন তার পক্ষে ক্রমেই কঠিন হয়ে গেছে।

আরো একটা কথা মাদারির মায়ের মনে এসেছে। সে কোনোদিন এত দূরে আসেনি, এত বড় মিছিলে আসেনি! এত দূর-দূর থেকে যখন এত-এত লোক আসছে, তার মধ্যে ত তার আট-না-দশটা ছেলেও থাকতে পারে, অন্তত কয়েকটা ত থাকতেই পারে। তারাও ত দূরে-দূরেই গেছে।

মাদারির মায়ের কাছে এই এত মিছিল, এত মানুষজন, এত হৈ-চৈ একদিক থেকে অর্থহীন হলেও সেই হাটখোলা থেকেই তার কেমন ভাল লাগছিল। প্রথম দিকে না–যখন সে আর মাদারি চা খায়। কিন্তু দেবপাড়ার দলটা এসে যাওয়ার পরই ঐ ভিড়ের মধ্যে ঘুরে-ঘুরে বেড়াতে তার ভাল লাগছিল। প্রত্যেকদিনই ত সকাল থেকে তাকে এরকম হটাই হাঁটতে হয় কিন্তু সে ত গাছপালার লতাপাতার গা ঘেঁষে-ঘেঁষে। আর যদি, সে ফরেস্টের ভেতর ঢুকতে কোনো-কোনো দিন একটু দেরিও করে, ঐ শ্যাওড়াঝোরায় তার ঘরের মধ্যেও ফরেস্টের গন্ধটা ত তাকে ছাড়ে না, এমন-কি ঘুমের মধ্যেও ছাড়ে না। সবুজের তীব্র এক কষা গন্ধ, তার সঙ্গে মিশে যায় ফরেস্টের ভেতর কত পচনের গন্ধ-শুকনো পাতা পচে, মৃত পশু পচে, কাল রাতে গাছ চাপা পড়া লতা পচে। তার সঙ্গে থাকে এমোনিয়ার ঝাঁঝ। আর মাদারির মাকে সেই মিশ্র গন্ধের মধ্যে সব সময় শ্বাস টানতে হয়।

সে যে এই গন্ধ সম্পর্কে সচেতন, তা নয়। এমনকি গন্ধটা যে আছে, তাও তার খেয়াল থাকে না। এরকম অপ্রয়োজনীয় খেয়াল রাখার অবকাশ তার জীবনযাপনে নেই। কিন্তু সেই হাটখোলা থেকেই এত মানুষের ভিড়ে ঘুরতে-ঘুরতে তার কখন যেন হালকা লাগতে শুরু করে, একটু হালকা ভাবে শ্বাসও টানতে পারে যেন। তার পর এই ট্রাকে এত মানুষজনের ভেতরে বসে রাস্তা দিয়ে মাইলের পর মাইল চলে আসতে-আসতে তার শাসটা আরো হালকা হয়, আরো হালকা। তার জীবন কাটানোর নকশা এমন নয় যে একটু দুঃখবিলাস করে, শ্যাওড়াঝোরার কথা তার মনেও আসে না, বা, তার বর্তমান এই মুক্তির সঙ্গে সে শ্যাওড়াঝোরার তুলনাও করতে যায় না, কিন্তু, তার বড় ভাল লাগে এত মানুষের সঙ্গ, এত মানুষের চামড়ার গন্ধ।

মাদারির মা ত মানুষের এই সঙ্গটাই পায় না। এখন, এই মিছিলে, এই ট্রাকে মানুষই তার কাছে প্রধান। যে-মানুষের কাছ থেকে তার দৈনন্দিনের আহার জোটে না বলেই সে ফরেস্টে গিয়ে গাছপালা পশুপাখি কীটপতঙ্গ আর নদীঝোরার সঙ্গে থাকে, সেই মানুষেরই গায়ের গন্ধ তাকে এক মুক্তির স্বাদ দেয়, তার এখনকার দৈনন্দিনের গন্ধের চাপ থেকে তাকে সরিয়ে আনে। সেই সরে আসাটা আস্বাদ করতে মাদারির মা, মাঝে-মাঝে গভীর শ্বাস টানে। একজন লোকও নেই যার সঙ্গে সে এখানে কথা বলতে পারে। হাটের দু-চারজন দোকানদার এলে হয়ত তাকে মাদারির মা বলে অন্তত চিনত, এখন, এক বাহাদুরই চেনে বা দরকার হলে ডাকতে পারে। তার নাম ধরে ডাকতে পারে এমন একজনও না থাকা এই ভিড়ে তাকে ত চুপচাপই বসে থাকতে হয়, এক কোণে। বা, হাটখোলায় যেমন ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, এই জলুশ যেখানে নামবে সেখানেও হয়ত একা-একা ঘুরেই বেড়াবে অথচ সঙ্গ পাবে, মানুষের।

যেমন মানুষের গায়ের গন্ধ থেকে মাদারির মা সঙ্গ পায়, তেমনি সঙ্গ পায় মানুষের আওয়াজ থেকে। ফরেস্টের প্রত্যেকটা আওয়াজ ত তার জানা। শুধু শ্যাওড়াঝোরায় তার পাতার ঘরের চারপাশের আওয়াজ নয়, তার ঘর থেকে অনেক দূরে ফরেস্টের ভেতরের আওয়াজগুলোও তার চেনা-মাদারির শ্বাসের মতন চেনা। ফরেস্টে কোনো আওয়াজ অকারণ ঘটে না। প্রত্যেকটা আওয়াজের একটা কারণ। থাকে, ইতিহাস থাকে। ফরেস্টের পশুপাখি পোকামাকড় এই প্রতিটি আওয়াজের কারণ ও ইতিহাস জানে, বোঝে। তাদের শরীর দিয়ে জানে, শরীর দিয়ে বোঝে। আর, শরীর দিয়েই সেই আওয়াজের অর্থের সঙ্গতিতে নিজেকে বদলায়। শরীর দিয়ে যে ফরেস্টের আওয়াজ চেনে না আর শরীর দিয়ে সে-আওয়াজের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে না–সে ফরেস্টে থাকতে পারে না। কিন্তু মাদারির মা ত আর পশুপাখি কীটপতঙ্গ নয়। তার মানুষের শরীরে ফরেস্টের ঐ আওয়াজ নিশিদিন গ্রহণবর্জনের ত একটা শারীরিক সীমাও আছে। কত লক্ষ বছর আগে মানবজাতির শরীর থেকে যে-আওয়াজ শোনার অভিজ্ঞতা লুপ্ত হয়ে গেছে, এক মাদারির মার শরীরে তা ত আর সঞ্চিত রক্ষিত থাকতে পারে না, শুধু এই সুবাদে যে গ্রাম-শহর ইত্যাদি কোথাও কোনো মানববসতিতে তার জায়গা জোটেনি এবং এক ফরেস্টই তাকে জায়গা দিতে পেরেছে। সব বাদর ত আর মানুষ হয়ে যায়নি, তেমনি, সব মানুষই ত আর গ্রামশহরে চলে যায়নি–এই যুক্তিতে মাদারির মা ত আর নিজের শরীরে লক্ষ বৎসর আগের আরণ্যক স্মৃতি বহন করে যেতে পারে না। মিছিলের এই মানবিক কলরোল তার ভাল লাগে। এই যে সবাই মিলে একটা কথা ধরে গানের মত চেঁচিয়ে ওঠে–তার ভাল লাগে। বর্ষার নদীর চাইতেও, বা আকাশের মেঘের চাইতেও, গমগমিয়ে এই আওয়াজ যে আকাশে উঠে যাচ্ছে–তার ভাল লাগে। এত মানুষের গলার এত কথা–তার ভাল লাগে।

রাতদিন, দিনরাত, মাসবছর, বছরমাস ঝিঁঝির ডাকে আচ্ছন্ন তার কানে এই মানবিক সমবেত স্বর এক পরিচিত বিভ্রম আনে, জেগে-জেগে স্বপ্ন দেখার মত বিভ্রম। এই এত মানুষের এত আওয়াজ তাকে সেই বিভ্রমে জাগায়।

আর, এখন যেন এই আওয়াজটা আরো দূরে-দূরে ছড়িয়ে যাচ্ছে। একটা পাহাড়ের ইশারা মাঝেমধ্যে সামনের ফরেস্টের গাছপালার ওপর দিয়েও কখনো কখনো দেখা যায়। ট্রাকের চাকার তলার মাটিটা ইতিমধ্যেই হয়ত চড়াই ধরেছে। হঠাৎ-হঠাৎ ডাইনে বায়ে:একটু উঁচু দিয়ে যেন একটা ট্রাক চলে যায়। চা বাগানের সবুজ বা মাঠের সবুজের সঙ্গে ট্রাকের সবুজ মিশে থাকে, শুধু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে কোনো-কোনো ট্রাকের ওপরের ঝাণ্ডা আর মানুষজনের রঙিন পোশাক। মাঝখানে সবুজের পার্থক্য রেখে এই ট্রাক আর দূরের সেই ট্রাকটা যেন অনেকক্ষণ সমান্তরালে চলে।

তারপর আড়ালে পড়ে যায়।

.

পাহাড়, খাদ, নদী, ব্রিজ

ট্রাকটা একটা আওয়াজ করে খানিকটা উঁচুতে ওঠে, তারপর বা দিকে ঘুরে যেতেই সামনে চকচকে এক কাল রাস্তা আর ডান দিকে, হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় এমন দূরত্বে পাহাড়, নীল পাহাড়। মাদারি, তার সানে যারা বসেছিল তাদের দুজনকে দুহাতে একটু সরিয়ে মাঝখান দিয়ে মাথাটা গলিয়ে দেয়, তারপর ডান দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পাহাড় দেখে, আর একবার রাস্তা দেখে। মাদারি যেন বুঝে উঠতে পারে না, তার পক্ষে কোনটা বেশি আকর্ষণীয়। রাস্তা ত তার কাছে নতুন কিছু নয়, ফরেস্টের মতই চেনা, তবু এ রাস্তাটা নতুন লাগে কেন? খোলা রাস্তা–ওপরে আকাশ আর নীচে রাস্তা, এটা ত সে সেই বিন্নাগুড়ি থেকেই দেখে আসছে। কিন্তু এখানে রাস্তাটা যেন আরো খোলা হয়ে যায়–কারণ বা দিকে খাদ, সেই। খাদের ভেতর দিয়ে নদী বয়ে যায় মাঝে-মাঝেই, আর, সেই খাদটা দিয়ে বহুদূরে তাকানো যায়–বহুদূরে নীলচে ফরেস্ট। সঙ্গে সঙ্গে ডান দিকে মেঘের মত পাহাড়। খানিকটা যেতেই মাদারি বোঝে পাহাড়টা, খুব কাছাকাছি নয়। কিন্তু পাহাড়ের গা বেয়ে যে-থিকথিকে জঙ্গল নেমে এসেছে সেটা বোঝা যায় অথচ তার সবুজ রঙ চেনা যায় না। ট্রাকটা নতুন রাস্তায় এত জোরে চলে যে মনে হয় সঙ্গে সঙ্গে পাশের পাহাড়টাও দিক বদল করছে। মাদারি সামনের দুজনের ফাঁক দিয়ে তার গলা এতটাই বাড়ায় যে দুই। হাত দিয়ে তাকে সামনে ভর সামলাতে হয়। বায়ের যুবকটি বলে, কী দেখিছিস রে?

পাহাড়, পাহাড়

আগত দেখিস নাই কোটত?

না দেখি। এই এত উঁচা পাহাড়ত কায় থাকে?

মানষি থাকে—

নামিবার নাগে না? ঐঠে ঢুকে ক্যানং করি? এ্যানং ফরেস্ট যে নদীও সিন্ধাবার পারিবে না, নদীও ঢুকতে পারবে না–এমন জঙ্গল মাদারি বলে। লোকটি হাসে, এইঠে দেখাছে এ্যানং। ঐঠে তুইও যাবার পারবু।

মাদারি নিজে এরকমই একটা ফরেস্টের একেবারে ভেতরে থাকে কিন্তু সে ত কোনো দিন এতটা দূর থেকে সে-ফরেস্ট দেখেনি।

পারবু? মাদারি, যেন সম্ভাবনাটাকে যাচিয়ে দেখতে চায়। তারপর সেই পাহাড়ের দিকে তাকিয়েই গভীর প্রশ্ন করে, নামিবু ক্যানং করি, এ্যানং উচা?

পথ আছে, পথ ধরি নামিবু, ঐঠেও ত মানষি থাকে—

থাকে? মানষি? ঐঠে? মাদারি জিজ্ঞাসা করে, তারপর একটু চুপ করে গিয়ে নিজে অপরিবর্তিত থেকেই চেঁচায়, হে মা, মা-ই-গে-এ।

মাদারির মা সোজা হয়ে বলে, ক কেনে। কিন্তু মাদারি শুনতে পায় না। সে ওপর থেকে চেঁচায়, হে মা, মা-ই-গে-এ, পাহাড় দেখছু, উচা পাহাড়?

মাদারির কথায় ট্রাকের সবাই হেসে ওঠে। মাদারির মা আস্তেই জবাব দেয়, দেখছু। মাদারির জিজ্ঞাসায় সকলেই মাদারির মায়ের দিকে একবার তাকিয়ে নেয় যেন। মাদারির মা একটু অস্বস্তি বোধ করে–এতগুলো লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে চোখ নামায়, আবার চোখ তোলে।

মাদারির মা যেখানে বসেছিল সেখান থেকে দেখায় যেন পাহাড়গুলো পেছন থেকে ছুটে আসছে। তাতে অনেক সময়ই পাহাড়ের চূড়া দেখা যায় না, মনে হয় আকাশ পর্যন্ত ঢাকা পড়ে আছে পাহাড়ে। আবার, কোনো-এক সময় পাহাড়ের দেয়ালটা ভেঙে যায় যেন। বরং বা দিকে তাকালে সে দেখে টানা খাদ চলেছে, আর সেই খাদের ভেতরে, নদী, ঝোরা, চা-বাগান, চষা খেত, দূরে দূরে ফরেস্ট। নাগরাকাটার কাছাকাছি আসার পর দেখা যায়, আরো দুটো-একটা ট্রাক একই ভাবে চলেছে। তাদের কোনোটাকে এই ট্রাক পার হয়ে যায়, আবার কখনো পেছনের একটা ট্রাক, এই ট্রাকটাকে পার হয়ে যায়। পার হওয়ার সময় সেই আগের মতই হাত তুলে হৈ হৈ হচ্ছে, কখনো শ্লোগান বিনিময়ও হচ্ছে, কিন্তু, এই ট্রাকের লোকজন ত ততক্ষণে মাইল চল্লিশেক পার হয়ে এসেছে, প্রায় ঘণ্টা দেড়েক হল, ফলে এরা অনেক সময় হাত তুলেই সারছে।

বানারহাটের পর দূরে-দূরে ট্রাক দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু, এই রাস্তায় ওঠার কিছুক্ষণ পর মনে হল সব ট্রাকই এই রাস্তা দিয়ে চলেছে। অনেক জায়গায় দাঁড়ানো ট্রাকের পাশেও লোকজন দাঁড়িয়ে। তারা ট্রাকে করে ব্যারেজেই যাবে, নাকি কোনো হাটে, নাকি ওখানকার পাতি তুলে ট্রাকে করে ওজনের জায়গায় যাবে, তা বোঝা যায় না। কিন্তু হাত নাড়ানাড়ি, একটু চেঁচামেচি হয়েই যায়।

সেই মাদারিহাট থেকে বেরিয়ে এই রাস্তাটায় পড়ার পর মনে হচ্ছে তারা সেই তিস্তানদীর ব্যারেজের কাছাকাছি যেন চলে আসছে। তিস্তা ব্যারেজের উদ্বোধনের দিন এই জলুশের কথা তারা যখন থেকে শুনেছে, টাড়ির বৈঠকে, লাইন মিটিঙে, হাট মিটিঙে, তখন থেকেই ত এই নদী, বাঁধ, জলের একটা কল্পনাকে তারা লালন করেছে। এই ট্রাকটা ত আসছে তোর্সা পার থেকে। তোর্সা থেকে তিস্তা। তিস্তার সঙ্গে ত তাদের দৈনন্দিন চেনাজানা নেই। সে-নদী তোর্সা থেকে বড় ও ভয়ংকর–পাহাড়টাহাড় ভেঙে, বনজঙ্গল উপড়ে, গ্রাম-শহর ভাসিয়ে চলে যায়। প্রত্যেক বছরই তাদের তিস্তার বন্যার কথা শুনতে হয়। সেই সব শোনা থেকে তাদের কাছে তিস্তা ব্যারেজের যে কল্পনা প্রশ্রয় পেয়েছে, এই পাহাড় আর এই খাদ, এই অপরিচিত প্রকৃতি যেন সেই কল্পনাটিকে সত্য করে তুলেছে। মনে হতে শুরু করেছে যে এই সব পাহাড়েরই একটা ব্রাক থেকে তিস্তা একেবারে আকাশ ছাপিয়ে নামছে, তাদের ট্রাকটা হঠাৎ সেদিকে মুখ করে ঘুরে দাঁড়িয়ে যাবে আর তাদের দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে হবে, তিস্তা, এই পাহাড়গুলির মতই, তিস্তা ব্যারেজ।

তারা যে তিস্তা ব্যারেজের কাছে চলে আসছে, সেটা মনে হওয়ার আর-একটা কারণ এই রাস্তাটায় নদীর পর নদী, ব্রিজের পর ব্রিজ। ডান দিকটাতে পাহাড় আর চড়াই, বা দিকটাতে খাদ। ফলে, একটু পর-পরই দেখা যাচ্ছে ডান দিক থেকে শাদা ফেনা-তোলা জল বড় বড় পাথরে ধাক্কা খেয়ে লাফিয়ে উঠে এক-একটা রঙিন ব্রিজের তলা দিয়ে বা দিকে খাদের মধ্যে গিয়ে পড়ে বয়ে যাচ্ছে। এতগুলো নদীর ঝর্না হয়ে ঝরা আর নদী হয়ে বওয়া দেখতে-দেখতে এক-একটা ব্রিজ সঁ সঁ করে পেরিয়ে যায়–লংতি, চুয়া পাথাং, ডায়না, জলঢাকা, মূর্তি, নেওরা, জুর্তি। মনে হয়, এই রাস্তা গিয়ে থমকে শেষ হবে যেখানে তিস্তা পাহাড় থেকে পাহাড় ভেঙে নামছে।

চালসার মোড়ে পুলিশ ট্রাক থামাল। মাদারিহাট ছাড়ার পর সেই প্রথম থামা। সামনেও অনেকগুলি ট্রাক। থামল বলেই অনেকে উঠে দাঁড়িয়ে হাত-পা ছড়ায়। দু-এক জন নামতেও গিয়েছিল কিন্তু পুলিশ দেখে আর নামে না।

পুলিশ এসে জিজ্ঞাসা করে–কোথ থেকে আসছে ট্রাক? কোথা থেকে? গলার স্বরে ব্যস্ততা বোঝ যায়।

যারা ডালার ওপর বসে ছিল, তারা তখন দাঁড়িয়ে, প্রায় এক সঙ্গেই বলে ওঠে, মাদারিহাট।

ড্রাইভার কোথায়? পারমিট দেখি–পুলিশ ড্রাইভারের কেবিনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ড্রাইভার একটা কাগজ হাতে-হাতে এগিয়ে দেয়। সেটা দেখে ফেরত দিতে-দিতেই চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করে, লিডার কে আছে, ট্রাকে, লিডার কে। এর জবাব কী হবে বোঝার জন্যেই পুলিশ যেদিক থেকে কথা বলছে সেদিকে বসা লোকজন সেই ছেলেটির দিকে তাকায়। ছেলেটি দাঁড়িয়েছিল উল্টোদিকে, সে মেয়েদের ভিড়ের মধ্যে সাবধানে একটা পা দেয়, তারপর আর-একটা পা দেয়ার জায়গা খুঁজতে-খুঁজতে সামনের একজনের ঘাড় ধরে মুখ বাড়িয়ে দেয়–কী ব্যাপার?

আপনি নিয়ে যাচ্ছেন? নাম বলেন—

সুখেন্দু রায়

বাগানের লোক সব, নাকি বস্তির লোক—

দুইই আছে—

একটু নাম দিতে পারবেন?

কী? এই প্রত্যেকের নাম?

না। গ্রামের আর বাগানের। আচ্ছা, বাদ দেন। ওদলাবাড়িতে যদি চায় দেবেন। নেন, এই শিপটা রাখেন–পুলিশের বাড়ানো হাত থেকে একজন কাগজটা নেয়।

.

শতাব্দী-সহস্রাব্দীর স্বাদ

চালসার মোড়ে পুলিশ সব গাড়ি আটকে চেক করে বলে গাড়ির একটা ভিড় হয়ে যায়। এই ল্যাটার্যাল রোডে আর ওদিককার ন্যাশনাল হাইওয়েতে গাড়ির লাইন পড়ে যায়–মাটিয়ালির দিকের রাস্তাটা ফাঁকাই। আর সব গাড়িই ত সোজা মাল হয়ে ওদলাবাড়ি যাবে–তাই ওদিক থেকে যে-সব গাড়ি এদিকে আসছে, সেগুলোকে পুলিশ আটকাচ্ছে না।

পুলিশ অবিশ্যি গাড়িগুলো বেশিক্ষণ আটকায় না। মিছিল-ছাড়া কোনো গাড়ি থাকলে সেটাকে রাস্তার পাশে সাইড করতে বলে মিছিলের গাড়ি ছেড়েই দেয়। কিন্তু ঐখানে দাঁড়ানোর ফলে আর পুলিশের শ্লিপ নিয়ে ছাড়ার ফলে চালসা থেকে মালবাজার পর্যন্ত রাস্তা মিছিলের ট্রাকেই ভর্তি হয়ে যায়। মনে হয়, আজ এ রাস্তায় আর-কোনো কিছুই ঘটবে না। আর, এতগুলো ট্রাক একসঙ্গে যাচ্ছে, এখন আর কেউ কাউকে পেরিয়েও যাচ্ছে না, তাতে মনে হয় যেন ট্রাক দিয়েই মিছিলটা সাজানো হচ্ছে। মালবাজারের ভেতরে ত আর এই ট্রাকের মিছিল ঢোকে না–ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে সোজা বেরিয়ে যায়। মালবাজারের মোড়ে বিরাট গেট বানানো হয়েছে, তার ওপর বামফ্রন্টের লাল ঝাণ্ডাই উড়ছে। আর মোড়ের মাথাতেও লোকজন সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে। সেখানেও কিছু-কিছু ট্রাক, কিছু-কিছু মিছিল তৈরি হচ্ছিল বটে কিন্তু তখন রাস্তার মিছিলটাই প্রধান হয়ে উঠেছে। মালবাজার থেকেই আবার শ্লোগান শুরু হল।

কিন্তু এবারের শ্লোগানের জোর আলাদা। এক-একটা ট্রাকে কেউ বসে নেই–সবাই দাঁড়িয়ে, গায়ে গা লাগিয়ে, এক হাতে পরস্পরের কাধ ধরে ট্রাকের ঝুঁকি সামলাচ্ছে, আর-এক হাত আকাশে তুলে শ্লোগান দিচ্ছে। এমন ভাবে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে যে তাদের মুখটা বাইরের দিকে ঘোরানো। শ্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে নাচের ভঙ্গিতে কোমরের ওপর অংশ আর হাঁটু দোলাচ্ছে।

কোনো-কোনো ট্রাকে আবার শুধুই মেয়েরা। তারা তীব্র স্বরে গান গেয়ে যাচ্ছে, শ্লোগানেরই গান কি না কে জানে কিন্তু এই সারি-সারি ট্রাকের নানা ধরনের শ্লোগানের ফাঁকে সেই সমবেত স্বরের তীব্রতা বাতাস চিরে দিচ্ছে।

দু-তিনটি ট্রাকে এন-সি-সিরা পপাশাক পরে যাচ্ছে। দু-তিনটি ট্রাকে ইস্কুলের ছেলেমেয়েরা তাদের পোশাক পরে।

এখন মনে হচ্ছে তারা সেই ব্যারেজের কাছাকাছি চলে এসেছে–সবাই মিলেই সেখানে পৌঁছনো হবে। আর, এই পৌঁছনোর একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা আছে, একটা ছন্দ আছে–ইচ্ছে করলেও সেই শৃঙ্খলা বা ছন্দ কেউ এড়িয়ে যেতে পারবে না। মাদারিহাটের ট্রাকের ভেতর ওরা মালবাজারের পর থেকেই একটা বৃহৎ ব্যাপারে নিজেদের একটু-একটু করে হারিয়ে ফেলতে শুরু করে।

ওদলাবাড়িতে এসে ট্রাকটা থামে–কারণ, আগের ট্রাকটা থেমেছে। থামার পর এই ট্রাকের ওপর থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখা যায়, আরো সামনেরটাও থেমেছে। চালসার অভিজ্ঞতাটা আছে বলেই হয়ত এখানে একজন ট্রাক থেকে চাকা বেয়ে নেমে যেতে সাহস পায়। কিন্তু এগয় না। ট্রাকের কাছেই রাস্তার পাশে পেচ্ছাপ শুরু করে। করে আর মাঝে-মাঝেই উদ্বিগ্ন ভাবে বায়ে তাকায়–আগের ট্রাকগুলো চলতে শুরু করল কিনা। ট্রাকের ভেতর থেকে একজন চিৎকার করে–হে বেঙ্গু, কলখান খুলি রাখি চলি আয়। আর-এক জন প্রায় নিদ্রিতস্বরে যোগ করে, বেঙ্গুর কলখান পাবলিক হেলথের কল না-হয়, ঘোষমশাইয়ের টিউবওয়েল, হ্যান্ডেল খাড়াই থাকে, নামিবার না-পারে। যে-স্বরে এই মন্তব্য আসে তা শ্লেষ্মজড়ানো। কিন্তু বেঙ্গুর পেচ্ছাপ শেষ হতে না-হতেই আরো কয়েকজন ট্রাক থেকে নামে–কেউ ডালার ওপর দিয়ে লাফ মেরে, কেউ চাকা বেয়ে, কেউ পেছনের ডালা ধরে ঝুলে। একজন বুড়োমত দেউনিয়া নামতে পারে না। সে চাকার ওপর পা রাখতে পারে না, উঠে আসে, আবার ডালা ধরে ঝুলতেও পারে না। নীচের থেকে একজন বলে, হে-এ তালই, তোমার নামিবার নাগিবে না, ঐঠে ছাড়ি দাও, মায়ের কোলত ছাওয়াছোটর আর নাজ্জা কী?

সেই ছেলেটি ডাকে, এদিক দিয়ে নামুন, বলে মাদারির মার কোণ দিয়ে, ড্রাইভারের দরজার পাশ দিয়ে নামার রাস্তাটি দেখায়। দেউনিয়া একটু লজ্জিত মুখেই মেয়েদের ভিড়ের ভেতর দিয়ে পা ফেলে-ফেলে সেই কোণটায় আসে তারপর ঝুঁকে দেখে নেয় কী ভাবে নামতে হবে। তার সামান্য হাসিতে বোঝা যায়, এই পথটা তার কাছে নিরাপদ ঠেকেছে। ডান হাতে ড্রাইভারের চালের পেছনটা আর বা হাতে ড্রাইভারের দরজার ওপরটা ধরে দেউনিয়া যেই দুই ধাপ নেমেছে, সামনের ট্রাকটা চলা শুরু করে। এই ট্রাকের লোকজন চিৎকার শুরু করে–হে তালই, উঠি আসেন, উঠি আসেন। দেউনিয়া তাড়াতাড়ি আবার যেই ড্রাইভারের দরজার ওপরটা ধরে ধাপে বা পা দিয়েছে, তার পায়ের ধুতিটা পেছনে আটকে যায়। ততক্ষণে সেই ছেলেটি মুখ বাড়িয়ে বলে, আপনি যান, গাড়ি যাবে না, যান। দেউনিয়াকে প্রধানত ধুতির কারণেই নামতে হয়। ছেলেটি আশ্বাস দেয়ায় রাস্তায় নেমে একটু সরে গিয়ে বসে পড়ে।

ততক্ষণে সামনের ট্রাকটা অনেকখানি চলে গিয়ে বা দিকে ঘুরে গেল। পেছনের ট্রাক হর্ন বাজাচ্ছে। সামনের পুলিশ হাত দিয়ে ডাকছে। ছেলেটি ডালার ওপর উঠে দাঁড়িয়ে পুলিশকে হাত দেখিয়ে ইশারা করে।

ট্রাকের ভেতর থেকে আবার চিৎকার ওঠে, হে-এ তালই, বাকিখান এইঠে করিবেন, চলি আসেন। রসিকতা করে ড্রাইভারই বুঝি হর্ন দিয়ে বসে। আর, দেউনিয়া উঠে দাঁড়ায়, তাড়াতাড়ি ঘুরে ট্রাকের দিকে মুখ করে কাপড় নামায়। তারপর দৌড়ে এসে ড্রাইভারের দরজা ধরে পাদানিতে ওঠে।

দেউনিয়া ট্রাকের ভেতর নামলে সেই লিডার ছেলেটি হাত বাড়িয়ে ড্রাইভারের দরজার ওপরের টিনে আওয়াজ করে বলে, চালান।

একটু চালিয়ে ক্যাম্পটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। পুলিশ এসে বলে পারমিট? :

ছেলেটি এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে চালসার শ্লিপ দেখায়। কতজন আছেন, একজ্যাক্ট নাম্বারটা বলুন–পুলিশের লোকটি না-তাকিয়ে বলে। ছেলেটি সেখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই গুনতে শুরু করে। গোনা হচ্ছে এটা বোঝার পর সকলেই একটু সোজা হয়ে বসে। একবার গোনা শেষ হলে ছেলেটি জিজ্ঞাসা করে, কেউ নীচে নেই ত? ড্রাইভারের ওখানে কজন আছে? বলে, আর-একবার গোনা শুরু করে–সাতাশি। তারপর মুখ বাড়িয়ে বলে, এইটি সেন।

পুলিশ পাশের ছেলেটিকে বলে, এইট্টি সেন। তারপর একটা বড় কাগজ এগিয়ে দেয়, এইটা, কাঁচে লাগিয়ে নেবেন, নইলে ট্রাক ঢুকতে দেবে না। ছেলেটি হাত বাড়াতেই পুলিশের পারে ছেলেটি একটি ব্যাজের বান্ডিল এগিয়ে দিয়ে বলে, প্রত্যেককে পরে নিতে বলবেন, নইলে এনক্লোজারের ভেতর ঢুকতে দেবে না। আর, একটু দাঁড়ান।

সেই ফাঁকে পুলিশ বড় কাগজটি ছেলেটির হাতে ধরিয়ে দেয়। পুলিশের পাশের ছেলেটি একটা ঝুড়ি, তুলে ধরে বলে, টিফিন। সাতাশিটা আছে, নামিয়ে নিয়ে ঝুড়িটা দিন, ঝুড়িটা দিন।

ছেলেটির হাত থেকে ট্রাকের কয়েকজন ঝুড়িটা তুলে নেয়। তারপর ইতস্তত করে, কোথায় রাবে। সেই লিডার ছেলেটি বলে, ওখানেই ঢেলে রেখে ঝুড়িটা ফেরত দিয়ে দিন।

ট্রাকের ভেতর একটু জায়গা করে দেয় সবাই। ওরা ঝুড়িটা উপুড় করে বাইরে ফেরত দেয়। ট্রার্কের ভেতরটা আলু আর আটার গন্ধে ভরে যায়। ট্রাক চলতে শুরু করে। মানাবাড়ির ধাক নেয়।

ট্রাক যখন আপলচাঁদ ফরেস্টের ভেতর ঢোকে মাদারি ও মাদারির মার মনে হয় তারা যেন আবার শ্যাওড়াঝোরায় ফিরে আসছে।

সেই সময় মাদারির মা ব্যাজ পায়, সঙ্গের সেফটিপিন দিয়ে সেটা ফোতার ওপর বুকের কাছে এটে নেয়। টিফিনের ঠোঙা পায়। কয়েক শতাব্দী পর যেন মাদারির মা তার জিভে মানুষের তৈরি গম ও সেই গম থেকে তৈরি আটার স্বাদ পায়। কয়েক সহস্রাব্দী পর মাদারির মা জিভ দিয়ে জানে–পৃথিবীতে স্বাদের বৈচিত্র কতটাই। মাদারির মার মুখের ভেতরে আলু আর রুটির টুকরো মুখবিবরের সহস্র গ্রন্থিমুখ থেকে নিঃসৃত লালায় যখন ভিজছে, ভিজছে, আর মুখের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক তখন সে দেখে আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত এক নদীকে আড়াআড়ি ভাগ করে এক দেয়াল যেন আকাশের দিকেই ছুটে যায়। তিস্তা ব্যারেজ।

.

নেতা আর মিছিল

ব্যারেজের চারটে স্লুইস মাত্র সম্পূর্ণ হয়েছে। তাতেই এখন এই উদ্বোধন করাতে হচ্ছে ব্যারেজের সবগুলো স্লুইস না-হলে তার কোনো অর্থই নেই কিন্তু এখানে উদ্বোধনের জন্যে তিস্তা ব্যারেজকে সাজানো হয়েছে বেশ কৌশল করে।

তৎসত্ত্বেও লোকজনকে স্লুইস খোলার ঘটনাটা দেখানো দরকার যাতে সবাই বোঝে তিস্তাকে আটকে তার মূলখাতে ফিরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা বলতে আসতে কী বোঝায়। কিন্তু সারা বর্ষা ত তিস্তা নির্দিষ্ট খাতেই বয়ে গেছে। এখন ত আর উদ্বোধনের সুবিধের জন্যে তার জলকে ভাটি থেকে ফিরিয়ে এনে যাকে বলে রিজার্ভেয়ার সেখানে ঢোকানো যাবে না।

সেই কারণে, উদ্বোধন-অনুষ্ঠানের জন্যেই বিশেষ করে, ব্যারেজের উত্তরদিকে তিস্তার জলকে কৃত্রিম বাঁধ দিয়ে দিয়ে পুব পারের দিকে, আপলচাঁদ ফরেস্টের দিকে, সরিয়ে আনা হয়েছে। উদ্বোধন হয়ে গেলে, এই বাধ ভেঙে আবার জল ছড়িয়ে দিতে হবে, নইলে ব্যারেজের কাজ এগবে না। বাধ মানে, বন্যা-ঠেকানো বাধ নয় জল-সরানোর বাধ। সেজন্যে গত প্রায় মাসখানেক, বিশেষত দিনবিশেক, ব্যারেজের সব কুলিকে এই বাঁধের কাজে লাগানো হয়েছে। একটু ওপর থেকে কোনাকুনি এনে বাঁধের মুখটাকে ব্যারেজের প্রথম দুটি সুইসের দিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে। চারটে স্লুইস সম্পূর্ণ হলেও, স্লুইস, দিয়ে জলের প্রবাহ যদি দেখাতে হয় তা হলে দুটো স্লুইস দিয়েই জল ছাড়তে হবে। চারটে স্লুইস দিয়ে সমান তোড়ে ছুটে হারিয়ে যাবে–তিস্তায় এখন এত জল, নেই।

ব্যারেজটা যত উঁচু, ততটা উঁচু দেখায় না–তার কারণ তিস্তার মাইল-মাইল বিস্তার, আর পাড়ে এমন আকাশসমান ফরেস্ট। আকাশের কত কাছাকাছি গেছে, তাই দিয়েই ত একটা উচ্চতা মাপা হয়। এখানে সবাইকে আকাশসমান শালগাছের তলায় দাঁড়িয়ে ব্যারেজটাকে দেখতে হয়। পাড়ের কাছে ব্যারেজের ওপরে বিরাট এক স্টেজ বানানো হয়েছে, এত উঁচু যে ঐ উঁচু পাড় থেকেও চোখ একটু তুলে দেখতে হয়। নানা রঙের কাপড়ে স্টেজটা ঝলমল করছে। স্টেজের দুদিকে দুটি বড় জাতীয় পতাকা আর মাঝখানে সরকারি দলগুলির নিজস্ব পতাকা। স্টেজের বাঁ দিকে আবার একটু বেশি উঁচু মঞ্চ। সেখান থেকে বক্তৃতা হবে। ডান দিকে ঐ একই সাইজের আর-একটা মঞ্চ–ওখান থেকে বোম টিপে স্লুইস গেট খোলা হবে। তিস্তার বুকে সব সময়ই জোর বাতাস থাকে। সেই বাতাসে স্টেজের কাপড়চোপড়গুলো ফুলে-ফুলে ওঠে, ঝালরগুলো বা থেকে ডাইনে ওড়ে, জাতীয় পতাকাদুটিসহ অন্যান্য সব পতাকাই বা থেকে ডাইনে ওড়ে, যেন, মনে হয়, এই যেদিকে মুখ করে মঞ্চ বানানো হয়েছে সেটা সোজা দিক নয়, সোজা দিকটা তিস্তার ভাটি বুকের মধ্যে।

তিস্তা ব্যারেজে আসার রাস্তা একটাই–ঐ মানাবাবাড়ির মোড় দিয়ে। আর-এক আসা যায় লাটাগুড়ি থেকে ক্রান্তিহাট হয়ে আপলচাঁদ ফরেস্ট দিয়ে। কিন্তু ব্যারেজ-উদ্বোধন মানে ত এসে ফিতে কাটা বা বোম টেপাই নয়। ঐ ক্রান্তিহাটের রাস্তায় লোকজন দেখবে কী করে যে মন্ত্রীরা ব্যারেজ উদ্বোধনে আসছেন।

কিন্তু ভিআইপিদের জন্যে ত আর স্বতন্ত্র রাস্তার ব্যবস্থা করা যায়নি। পুলিশ জেলা কর্তৃপক্ষকে বারবার একটা কথাই বলেছে যে কোনো অবস্থাতেই যেন ভি-আই-পিদের আসার সময়টা বদলানো না হয়। শেষ মুহূর্তের সময়বদল সামলানোর মত ব্যবস্থা করা এই তিস্তার চরে, পাহাড়ের তলায়, ফরেস্টের মধ্যে সম্ভব নয়।

সেই নির্দিষ্ট সময়েই ভি-আই-পিদের কনভয় জাতীয় সড়ক ধরে বেশ জোরেই আসে–সামনে ছয় মোটর সাইকেলের এসকর্ট ছুটে গেলে রাস্তায় যত জোরে গাড়ি চালানো যায়।

নির্দিষ্ট সময়ের আধঘণ্টা আগে চালসার মোড়ের সব দিকেই মিছিলের ট্রাক সাইডে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়। রাস্তার পাশে রাইফেল কাঁধে পুলিশ দাঁড়িয়েই ছিল– ট্রাকগুলো দাঁড়ানো মাত্র এক-একজন এক-এক ট্রাকে উঠে পড়ে রাস্তার দিকে রাইফেল তাক করে দাঁড়িয়ে পড়ে।

চালসার মোড়ে টিলার ওপরে গাছপালার সবুজের সঙ্গে মিশে কিছু কম্যান্ডো ফোর্স ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে–বিশেষত চালসা থেকে মাটিয়ালি যাওয়ার পথের দুপাশে। পুলিশের দিক থেকে এই দুটো পয়েন্টেই সিকিউরিটি রিস্ক আছে–দাঁড়ানো ট্রাকের পাশ দিয়েই ত ভি-আই-পিদের গাড়িগুলো আসবে।

ভি-আই-পিদের কনভয়টা চালসার মোড়ে পৌঁছনোর আগেই এসকর্টের মোটর সাইকেলগুলো যেন গতি বাড়িয়ে দেয়। আর সেই বর্ধিত গতির সঙ্গতি রেখে কনভয়ের সব গাড়ির গতিই বেড়ে যায়। সেই প্রবল গতিতে চালসার মোড়ে ছটি মোটর সাইকেলের পেছনে অন্তত চল্লিশটি গাড়ি বাঁক নেয় রাস্তার সঙ্গে টায়ারের সংঘর্ষে একটা আওয়াজ কয়েক সেকেন্ড পরপরই উঠতে থাকে। সমকোণে দাঁড়িয়ে থাকা যাওয়ার মিনিট তিন পর যখন পথ খুলে যায়, তখন নেতাদের পেছনে-পেছনে মিছিল যাচ্ছে–এই বোধটা ফিরে আসে আর সব ট্রাক থেকেই শ্লোগান উঠতে থাকে।

মানাবাড়ির মোড়ে একই ঘটনা। সেখানে একই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সময়ের মিনিট পনের আগে সব ট্রাককে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে। মানাবাড়ি থেকে তিস্তা ব্যারেজ পর্যন্ত ফাঁকা রাস্তায় সেই চল্লিশটি গাড়ি ও ছটি মোটর সাইকেলকে বাধ্যতই একটু ধীর গতিতে বাক নিতে হয় রাস্তাটা ছোট। কিন্তু তৎসত্ত্বেও দাঁড়িয়ে থাকা মিছিলে কোনো শ্লোগান ওঠে না। একটা গাড়ির জানলা দিয়ে কোনো একজন নেতা হাত বাড়িয়ে খানিকটা নাড়ান। তাতেও রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে দেয়া মিছিল বুঝে উঠতে পারে না তাদের কাছে এখন কোন ব্যবহার প্রত্যাশিত। এক অদ্ভুত ধাঁধায় এই মিছিলও পড়ে গেছে আর নেতাদের নিয়ে আসা চল্লিশটি গাড়িও পড়ে গেছে। মিছিলের অংশ হবেন বলেই নেতারা মিছিলের পাশ দিয়ে, বা, ভেতর দিয়ে, বা, মিছিলের সঙ্গেই যেন ব্যারেজে আসতে চেয়েছেন, তাই ত এই পথ বেছে নেয়া। আর, উত্তরবঙ্গের পক্ষে বৃহত্তম এই কর্মযজ্ঞ উপক্ষে বৃহত্তম এই সমাবেশেরও ত উল্লসিত হয়ে ওঠার কথা তাদের নেতাদের পেয়ে। কিন্তু, কার্যত মিছিল আটকে, রাইফেলধারী পুলিশ আর গোপন কম্যান্ডো বাহিনীর পাহারায় তাদের দাঁড় করিয়ে দেখে, নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। সেটা ত সমর্থনযোগ্যই–উত্তরখণ্ড বা গোর্খাল্যান্ড-এর লোকদের হাত থেকে নেতাদের বাঁচানোর দায়িত্ব ত নিতেই হবে। কিন্তু এমনই মানবস্বভাব যে কাউকে যখনই সন্দেহ করা হবে, বা,সন্দেহের সীমার মধ্যে যখন কাউকে টেনে আনা হবে, সে তখনই সন্দেহজনক হয়ে পড়ে। নিজেরই কাছে। সত্যি ত এই এত বড় মিছিলের যে-কোনো ট্রাকে বা বাসে এক দল বা একজন আততায়ী আত্মগোপন করে থাকতে পারে। কিন্তু সেই সত্য আশঙ্কারই আবোরা একটা অর্থ ত এই যে এই আমাদের এই মিছিলের ভেতরই আততায়ী লুকিয়ে থাকতে পারে। একবার এই সত্য পরিষ্কার হয়ে। গেলে মিছিলের মূলে টান পড়ে, তখন নেতাদের চল্লিশ গাড়ি আর মিছিলের শশ ট্রাকের মধ্যে দূরপনেয় পার্থক্য ঘটে যায়। মিছিলের জন্যেই এসেছেন নেতারা, নেতাদের জন্যেই মিছিল আসছে, একই কর্মকাণ্ডের শরিক হবেন নেতারা ও মিছিলের মানুষ, তারপর এই কর্মকাণ্ডের বাণী এই মিছিলই। উত্তরবঙ্গের কোণে-কানাচে নিয়ে যাবে, যাতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সত্যি করেই করব দেয়া যায়, তাদের কাল হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া যায়। কিন্তু কার্যত নেতাদের জন্যেই মিছিল আটকে রাখা হয়, নেতাদের জন্যেই মিছিলকে উদ্যত ও গোপন রাইফেলের সামনে অন্তত কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকতে হয়, মিছিল থেকে নেতাদের নিশ্চিত ও নিরাপদ দূরত্বে নিয়ে যাওয়া যতক্ষণ শেষ না হয়, ততক্ষণ, পুলিশ অন্তত এই মিছিলকেই তার সন্দেহের একমাত্র লক্ষ্য করে রাখে। মিছিল, তার নেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, নেতারা তাদের মিছিলের আশ্রয়ে নিশ্চিত থাকতে পারে না–ঐ চল্লিশটি গাড়ি অনেক বেশি নিরাপদ থাকে মিছিল আর নেতাদের মাঝখানে দাঁড়ানো পুলিশের পাহারায়। নেতা আর মিছিল আলাদা। হয়ে গেছে।

.

নদীর বুকের ওপর দিয়ে হাঁটা

মানাবাড়ি থেকে আপলচাঁদ পর্যন্ত রাস্তা ফাঁকা রাখা হয়েছে।

ভি-আই-পিদের নিয়ে চল্লিশটা গাড়ি, ছটি মোটর সাইকেলের পাহারায় সেই সরু রাস্তায় ঢুকে যায়। এখানে পাহাড় নেই ও জঙ্গলও নেই। ফলে নিরাপত্তার প্রশ্ন কিছুটা সরল। মোটর সাইকেলের পুলিশরা তাদের গতি একটু কমিয়ে আনে। এখানে ভি-আই-পিরা একটু অলস ভাবে প্রকৃতি ও পরিবেশ দেখতে পারেন। পেছনের গাড়িগুলোর গতিও স্বাভাবিক ভাবেই কমে আসে। একটা শিথিলতা অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে পুরো কনভয়টাতেই ছড়িয়ে পড়ে–অবকাশের শিথিলতা।

আপলচাঁদের কাছে পৌঁছে রাস্তাটা দুভাগ হয়ে যায়। একটা রাস্তা সোজা চলে যায়, আর-একটা ডাইনে। এই ডাইনের রাস্তাটা নতুন বানানো হয়েছে– ব্যারেজের জন্যে। সোজা রাস্তাটাও ব্যারেজেই গেছে, ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে একটু ঘুরে। ভি-আই-পিদের গাড়িগুলো ব্যারেজের নতুন রাস্তা ধরে আলাদা হয়ে গেলে–মানবাবাড়ি থেকে ট্রাকগুলো ছাড়া হয়। মিছিলের ট্রাক পুরনো রাস্তা ধরে ব্যারেজের কাছে নির্দিষ্ট জায়গায় যাবে।

ভি-আই-পিদের কনভয় সোজা ব্যারেজের মুখে চলে যায়। গাড়ি থেকে নেমে তাঁরা মঞ্চে যাবার রাস্তায় পা দেন। আর গাড়িগুলো সোজা গিয়ে গাড়ি রাখার নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে। ছোট-ছোট প্ল্যাকার্ডে জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে–সি-এমস কার, ইউনিয়ন মিনিস্টার অব স্টেটস কার ইরিগেশন মিনিস্টারস কার, পি-ডব্লু-ডি মিনিস্টারস কার ইত্যাদি।

গাড়ি থেকে মঞ্চে যাবার রাস্তাটা নতুন করে বানানো হয়েছে এই উদ্বোধন অনুষ্ঠানের জন্যে। তিস্তার শুকনো খাত থেকে ছোট নুড়ি পাথর তুলে এনে বিছিয়ে দেয়া হয়েছে। জলের নীচে থাকলে এগুলোর আলাদা-আলাদা রঙ দেখা যায় কিন্তু রোদে সে রঙ নষ্ট হয়ে যায়। যাতে অন্তত কিছুটা রঙ থাকে, সেজন্যে কাল রাতে এই সব পাথর তোলা ও বেছানো হয়েছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টও কাল রাতেই দুট্রাক গাছ দিয়েছে, সেগুলো রাস্তার দুপাশে পুঁতে দেয়া হয়েছে। সে-সবই গোটা-গোটা গাছ-দুদিনের মধ্যে শুকিয়ে মরে যাবে, কিন্তু, এখন দেখাচ্ছে যেন কত শুশৃষায় এই সব গাছকে বড় করা হয়েছে। গাছ ত আর রাতারাতি বড় হয় না–তাই একটা গাছ বহু বছরের যত্নের প্রমাণ দেয়।

ওঁরা নেমে একটু দাঁড়ান। অনেকে দুহাত ওপরে তুলে আড়মোড়া ভেঙে নেন সশব্দ হাই তুলে। দু-একজন একটু চারপাশে তাকান–প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার তৃপ্তি পেতে। মুখ্যমন্ত্রী একটু অন্যমনস্ক ভাবে তৈরি থাকেন–নিশ্চয়ই কেউ এসে বলবেন কী করতে হবে। সেই মুহূর্তেই ইনজিনিয়াররা এসে প্রত্যেকের বুকে বড় বড় ব্যাজ এঁটে দেন। মুখ্যমন্ত্রীর ব্যাজটা সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে রঙিন।

ওতে খানিকটা সময় যায়। কেন্দ্রের জলপথমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এসে জানতে চান পাহাড় এখান থেকে কত দূর হবে, মানে কোন জায়গায় নদী সমতলে নেমেছে। মুখ্যমন্ত্রী নদীর ওপারের দিকে তাকান। ওপারটা দেখতে তাকে কোনাকুনি তাকাতে হয়, কারণ সোজা পথটা আটকে রেখেছে মঞ্চ। তারপর একটু আনমনা ভঙ্গিতে ডান হাতটা দিয়ে একটা দিক দেখান। উত্তরটা খুব সম্পূর্ণ হল না ভেবে হাতটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে জানান–পশ্চিমবঙ্গের পাহাড় অঞ্চল, সিকিম ও ভুটান এই জায়গাটিকে ঘিরে রেখেছে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তার চোখ দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর হাত অনুসরণ করে ইংরেজিতে বলেন, এই জায়গাটি দেখতে একেবারে গাড়োয়ালের মত। আপনি গাড়োয়ালে গেছেন?

মুখ্যমন্ত্রী হেসে বলেন, এত বয়স হয়েছে যে ভারতের কোনো জায়গায় আর যাওয়া বাকি নেই। গাভোয়ালে ত গিয়েইছি। সেবার বহুগুণার ইলেকশনে অনেকগুলো মিটিং করলাম, ইলেকশন মানে স্থগিত ইলেকশনে, মিসেস গান্ধীর প্রেস্টিজ ইলেকশনে। আপনি কি গাড়োয়ালের? না ত?

না, না, আমি ত সমতলের লোক। কিন্তু গাড়োয়ালে গিয়েছি, থেকেছিও।

কেন?

আমার কাকার বড় ফলের খেত আছে।

ইনজিনিয়ারদের একজন, মুখ্যমন্ত্রী বুঝে নেন ইনিই নিশ্চয় ব্যারেজের প্রধান ইনজিনিয়ার, এসে বলেন, স্যার, ডায়াসে ওঠার আগে একবার ব্যারেজটা দেখে নিন।

হ্যাঁ। গাভোয়ালে ফলের শিল্প খুব বেড়েছে, হিমাচল প্রদেশেও খুব বেড়েছে। এই শিল্পটা ওখানকার পাহাড়ি লোকদের একটা অর্থনৈতিক ভিত্তি দিয়েছে। সে জন্যে দেখবেন, উত্তর প্রদেশের পাহাড় অঞ্চলে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নেই–ওরা প্রধান ভূখণ্ডের সঙ্গে থাকতে চায়, তাতেই ওদের লাভ, বলতে বলতে মুখ্যমন্ত্রী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে নিয়ে এগিয়ে যান।

তা আপনি বলতে পারেন না–আর্থিক দিক থেকে সবচেয়ে উন্নত রাজ্যেই ত খালিস্তান শ্লোগান উঠল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন।

নুড়ি পাথর এত গভীর করে ঢালা যে হাঁটা মুশকিল, জুতো হড়কে যায়। পেছন থেকে একজন মন্তব্য করেন, এত পাথর ঢেলেছেন কেন, মন্ত্রীদের আছাড় খাওয়াবার জন্যে?

একটু আস্তে-আস্তে হাঁটুন স্যার, আমরা ত বাঁধিয়ে দিতে চেয়েছিলাম, সিকিউরিটি বলল পাথর ঢালতে, একজন ইনজিনিয়ার ব্যাখ্যা করেন।

মুখ্যমন্ত্রী আর কেন্দ্রীয় মন্ত্রীই সবার আগে-আগে যাচ্ছিলেন, ধীরে-ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত ভাবে, যেন, ওঁদের একটু বিশেষ ভাবে জানা আছে নুড়ি পাথরে কী করে হাঁটতে হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পাঞ্জাব ত আসলে আপনাদের পার্টির কেলোর কীর্তি। আপনারা আকালি রাজনীতির ভেতর ঢুকলেন আর তার সঙ্গে পাকিস্তান জড়িয়ে গেল।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কোনো জবাব দিলেন না। নুড়ি পাথরের স্তূপ তারা প্রায় পেরিয়েই এসেছেন।

মঞ্চের তলা দিয়েই তাদের ব্যারেজের ওপর যেতে হবে। মঞ্চের তলাটাও তাই কাপড় দিয়ে মোড়া ও পেছনে, যেখান দিয়ে তারা ব্যারেজে ঢুকবেন, সেই জায়গাটায় পর্দা ঝোলানো। দুই ইনজিনিয়ার দুদিক থেকে পর্দাটা সরিয়ে ধরেন আর মুখ্যমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ব্যারেজের ওপর পা রেখে দাঁড়ান।

মঞ্চের পেছনে টিভি ক্যামেরাম্যান, প্রেস ফটোগ্রাফার ও রিপোর্টাররা তৈরি হয়েই ছিলেন। যে-পর্দা ঠেলে ওঁরা ঢুকলেন তারই দুপাশে রিপোর্টাররা, মাটির ওপর উবু হয়ে বসে ফটোগ্রাফাররা, একটু দূরে টিভি ক্যামেরা, তার বায়ে সরকারের প্রচারবিভাগের ক্যামেরা, এই দুই-এর মাঝখানে আর-একটু পেছনে ফিল্ম ডিভিশনের দল। একটা ক্যাসেট-রেকর্ডার কাঁধে ঝুলিয়ে লম্বা একটা মাইক্রোফোন নিয়ে অল ইন্ডিয়া রেডিও।

মুখ্যমন্ত্রীও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এসে দাঁড়াতেই একসঙ্গে ফ্ল্যাশ জ্বলে, টিকটিক করে মুভি ক্যামেরা তিনটি চলতে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী একটু ডান দিকে তাকান যেদিকে তিস্তার জল ফুলে-ফুলে উঠছে। তারপরই কয়েক পা এগিয়ে যান কারণ ততক্ষণে পেছনের পর্দা ঠেলে বাকি ভি-আই-পিরাও এসে গেছেন, তার মধ্যে জনাকয়েক মন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী মাঝখানে যেখানে দাঁড়িয়েছিলেন, দাঁড়িয়ে থাকেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তার পাশে। অন্য মন্ত্রী কজন এদের দুপাশে নিজেদের জায়গা করে নেন, পেছনে অফিসাররা দাঁড়িয়ে পড়েন। কেউ কিছু বলার আগেই গ্রুপ ছবির মত করে সবাই দাঁড়িয়ে যান এবং মাত্র কয়েক সেকেন্ড পরই এই পুরো দলটা হাঁটতে শুরু করে।

যারা ছবি তুলছেন ও যাদের ছবি তোলা হচ্ছে এই দুই দলের মধ্যেই অদ্ভুত বোঝাপড়া কাজ করে। প্রত্যেকেই জানেন, কখন কী করতে হবে। এমন-কি প্রেস ফটোগ্রাফাররা এগিয়ে গিয়ে ছবি তোলার সময়ও সচেতন থাকেন যেন যারা মুভি তুলছেন তাদের ক্যামেরার পথে বাধা না হন। প্রায় দৈনন্দিন অভ্যস্ততায় তারা এই অনভ্যস্ত পথে হাঁটছিলেন, তিস্তার বুকের ওপর দিয়ে তিস্তা পেরচ্ছিলেন, অথচ যেন সেই কথাটা কেউই খেয়াল করেন না।

.

অভিনয়ে স্লুইস গেট খোলা

উদ্বোধন অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়।

উত্তরবঙ্গের এমএল-এরা কেউ-কেউ বলবেন—-দার্জিলিং থেকে মালদহ পর্যন্ত। উত্তরবঙ্গের এম-পিরা বলবেন। কংগ্রেসের কোনো এম-পি আসেননি, বলবেন প্রধানত রাজ্যের সরকারি দলের এম-পিরা। তারপর যার-যার দপ্তর এই কাজের সঙ্গে জড়িত, তারা বলবেন রাজ্যের সেচমন্ত্রী, পি-ডবলু-ডি মন্ত্রী। শেষে বলবেন বিশেষ অতিথি কেন্দ্রের মন্ত্রী। আর তারপর মুখ্যমন্ত্রী বলবেন ও বলার শেষে, আর-এক মঞ্চ থেকে বোম টিপে স্লুইস গেট খুলবেন। বেলা দুটোর মধ্যে সমস্ত প্রোগ্রাম শেষ করতে হবে। তারপর ভি-আই-পিরা চলে যাবেন, তারপর মিছিলগুলো ফিরতে শুরু করবে।

মিছিল জড়ো হয়েছে ব্যারেজের দক্ষিণে, ভি-আই-পিদের গাড়ি রাখার জায়গার পেছন থেকে তিস্তার পাড় ধরে–যতদূর চোখ যায়। জায়গাটা আগেই পরিষ্কার করা ছিল কিন্তু এতটা জায়গা নয়। ব্যারেজের জলের জন্যে এখানটা খোলা রাখারই কথা। পরে এই খোলা জায়গাসহই এই অংশটাকে নিশ্চয়ই কাটাতার দিয়ে ঘিরে দেয়া হবে অথবা অন্য কোনো ভাবে পাহারাধীন রাখা হবে কারণ মানুষের পক্ষে এই জায়গাটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। স্লুইস খুললে এখান দিয়েই ত সবচেয়ে জোরে জল বইবে–প্রায় জলপ্রপাতের বেগে। তা ছাড়া ব্যারেজের নিরাপত্তার জন্যেও এত কাছে কাউকে আসতে দেয়া হবে না।

দুদিন ধরে ফরেস্টের নীচের জঙ্গল কেটে ঐ মাঠটাকেই আরো বড় করে দেয়া হয়েছে। ওরও পেছনে এক জায়গায় সারি দিয়ে ট্রাকগুলোকে দাঁড় করানো হচ্ছে। মঞ্চ থেকে দেখাচ্ছে, যেন মানুষের মাথা আর ফরেস্টের গাছ মিশে গেছে। মঞ্চে একজন ইনজিনিয়ারের হাতে মেড-ইন হংকং একটা বাইনোকুলার ছিল–সেটাই সবার হাতে-হাতে ঘুরছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখলেন। তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে দিলেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীটি তরুণ। তিনি ঠিক এত বড় সমাবেশের সঙ্গে খুব পরিচিত নন। এই সমাবেশ গড়ে তুলতে যে-শ্রম, নিষ্ঠা, ও ধৈর্য দরকার, তার দলের কাজকর্মের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেটা মেলে না। ঠিক বুঝে উঠতেও পারেন না, ব্যাপারটা কী। তিনি ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখে বাইনোকুলারটি ফেরত দেয়ার জন্যে হাত বাড়ালে পেছন থেকে একজন নিয়ে নেন। মুখ্যমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তিনি মন্তব্য করে ফেলেন, আপনার জনপ্রিয়তা যে এতটাই আমার ধারণা ছিল না।

মুখ্যমন্ত্রী স্মিত মুখে তার দিকে তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আবার সমাবেশের দিকে তাকান। সমাবেশের শ্লোগান, হৈ-হৈ সব শোনা যাচ্ছে কিন্তু মানুষের মুখ দেখা যাচ্ছে না, মঞ্চটা এতই উঁচু আর সমাবেশটা এতই দূরে। কোথায় একটু বিষণ্ণতা এসে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে তিনি একটু জোর দিয়ে বলেন, আপনাদের জন্যেই আমাদের এই সমাবেশ সংগঠিত করতে হল। আমাদের ও সমাবেশ কথা দুটির ওপর মুখ্যমন্ত্রী একটু অতিরিক্ত জোর দিলেন। তারপর যোগ করেন, পশ্চিমবাংলাকে ত আমরা পাঞ্জাব হতে দিতে পারি না। এ-কথাটার মধ্যেও জোর ছিল, যেন, মুখ্যমন্ত্রী তার বক্তৃতার লাইন বলছেন। তাঁর বক্তৃতার এই জোরটাই বৈশিষ্ট্য, শুনলে আত্মবিশ্বাস আসে যেমন, তেমনি, ওঁর ওপর নির্ভরতাও আসে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীর কথাটাকে একটু বুঝে নেন। মনে হয়, মুখ্যমন্ত্রীর কথার মধ্যে তাদের দলের বা সরকারের বিরুদ্ধে যে-সমালোচনার ছোঁয়া ছিল সেটা আর তিনি ঘটাতে চান না। বিষয়টা তিনি জানেনও না, আর, মুখ্যমন্ত্রীর কথা তিনি শুনেছেন অনেক, সকলেই ত বেশ শ্রদ্ধা করেন। এই প্রথম তার সঙ্গে আলাপ। মিছিমিছি একটা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসে তিনি বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়তে চাইছেন না। ইংরেজির কুশলতায় তিনি কথাটা-এড়িয়ে যেতে চাইলেন, মন্ত্রী হওয়ার পর আমার সবচেয়ে বেশি সময় কিসে লাগছে, আপনাকে বলতে ইচ্ছে করছে।

মুখ্যমন্ত্রী ঘাড় ঘুরিয়ে বলেন, বলুন না। আপনি কি নতুন মন্ত্রী হলেন?

হ্যাঁ। আমার এখন সবচেয়ে বেশি সময় যায় মধ্যমপুরুষ বহুবচনের অর্থ বুঝতে। মানে, কখনো আমাকে বলা হয় তোমাদের কথা ছাড়ো, তোমরা ত ভারতের নয়া শাসক। তখন বুঝতে হয়, আমি ইউ-পির লোক। কখনো বলা হয় প্রধানমন্ত্রীর নতুন ছেলেরা। তখন বুঝতে হয়, আমি প্রধানমন্ত্রীর লোক। কখনো বলা হয়–তোমরা ব্রাহ্মণ। এই পর্যন্ত বলেই মন্ত্রী থেমে যান।

মুখ্যমন্ত্রী সামান্য একটু হেসে বলেন, আপনাদের দলের ত একটা রাজনৈতিক সমস্যা আছেই-এ রাজ্যে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের মত পশ্চাদপদ জায়গায় সমস্যাটা অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে। আপনাদের লোকজন সব দলে-দলে গোখাল্যান্ড, উত্তরখণ্ড, এই সব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের দিকে চলে যাচ্ছে। আর আপনাদের স্থানীয় নেতারা তাদের সঙ্গে-সঙ্গে যাচ্ছে। তাতে একটা বিপদ দেখা দিচ্ছে।

মঞ্চের ওপর থেকে মাইকে শ্লোগান দেয়া শুরু হয় আর দেখতে-দেখতে সামনের সমাবেশ জমাট বেঁধে যায়। মঞ্চের শ্লোগানের জবাবে সমাবেশের হাজার-হাজার মানুষ একসঙ্গে হাত তুলে, শ্লোগান তুলছে। এত মানুষের গলার আওয়াজ এক সঙ্গে কী প্রবল শক্তি হয়ে ওঠে, মুহূর্তে, তা শ্লোগান ওঠার পূর্ব মুহূর্তেও যেন ভাবা যায়নি। এই শ্লোগানই যেন এই মঞ্চ, এই ফরেস্ট, এই নদীর সঙ্গে এই মানুষকে জুড়ে দেয়। এত মানুষ যেখানে এমন সরবে এতটা সমর্থন জানাতে চায় তখন রাজনীতির তত্ত্ব যেন দুই হাতে ধরা যায়, ছোঁয়া যায় এমন এক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা পায়।

মঞ্চের এই নেতারা ত সব সময়ই মিটিং করেন। আর বছরে দুবছরে অন্তত একবার ব্রিগেডের জনতা তারা মঞ্চ থেকে দেখে থাকেন। কিন্তু এখানে, এই সমাবেশে, সেই সব অভিজ্ঞতার বাইরের একটা ব্যাপার ঘটে যায়। তিস্তার একটা গম্ভীর ধ্বনি সব সময় শোনা যাচ্ছিল। সেই গাড়ি থেকে নামার পর থেকেই সব সময় সেই আওয়াজটা পরিবেশের সঙ্গে লেগে আছে। অনেকটা যেন দিগন্তের মেঘ-গর্জনের মত। তার সঙ্গে প্রবল বাতাস–তিস্তার জলময় বুক থেকে প্রবল উঠে এসে বয়ে যাচ্ছে। নদীস্রোতের সমান্তরালে অত বড় আকাশের নীচে সে যেন বাতাসের আর-এক তিস্তা। আর, এরই সঙ্গে আছে ফরেস্টের ভেতর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার অবিরল দীর্ঘশ্বাস, বিরতিহীন, পতনহীন। সেই তিস্তার, ফরেস্টের, বাতাসের আওয়াজের সঙ্গে মিশে শ্লোগানের নাদ বদলে গেছে। আদিবাসী উচ্চারণে শ্লোগানে যেন মাঝে-মাঝে টঙ্কারও জাগছে। এ-শ্লোগানের ভেতর যেন এক বিষাদও মাখানো থাকে–পাহাড়ের বা জঙ্গলের বা নিধুয়াপাথারের গানে যে-বিষাদ থাকে।

যারা ফিল্ম তুলছিলেন, তাদের কয়েকজন গুটিগুটি মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারের পেছনে এসে দাঁড়ান, কিছু বলতে। টের পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান। বয়স্ক-মত একজন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সুবাদে যার মুখ মুখ্যমন্ত্রী চেনেন, বলেন, স্যার, একটা বিপদে পড়েছি।

কী হল?

আসলে আমরা ত একটা করে ক্যামেরা এনেছি। আর এরা ডায়াস এমন ভাবে বানিয়েছে যে আপনার বোম টেপার শট নেয়ার পর দৌড়ে নেমে আর স্লুইস খুলে যাচ্ছে সেই শট নেয়া যাবে না।

ত, কী, করতে হবে কী?

সুইসের শট নেয়ার জন্যে ত এখন থেকেই ওখানে ক্যামেরা ফিট করে রাখতে হবে। ঐ শট স্যার ঐ মিছিলের ভেতর থেকেই নিতে হবে। ধাক্কাটাক্কা লেগে যেতে পারে।

ফিট করে রাখুন গিয়ে।

ভদ্রলোক এবার আর-একটু হেসে বলেন, আপনি যদি স্যার এখান থেকে একবার হেঁটে ঐ বোতাম টেপার ডায়াস পর্যন্ত যান, ওখানে গিয়ে একবার দাঁড়ান, তা হলে আপনার বোতাম টেপার শটটা এখনই নিয়ে আমরা নীচে চলে যেতে পারি।

ও। এ্যাকটিং করতে হবে? যান, আপনারা যন্ত্রপাতি লাগান গিয়ে।

আমরা লাগিয়েই এসেছি স্যার। শুনে, মুখ্যমন্ত্রী দাঁড়ান, তারপর দ্রুত পায়ে ডাইনের সেই মঞ্চের দিকে হেঁটে যান, বোতাম টিপছেন–এরকম একটা ভঙ্গি করেন। অনেকগুলো ঘড়ি একসঙ্গে চললে যেমন আওয়াজ হয় সেরকম সমবেত টিকটিক শব্দে ফিল্ম চলতে থাকে। স্যার, হাতটা একটু নাড়ান স্যার। মুখ্যমন্ত্রী হাত নাড়ান।

.

মাদারির মায়ের সন্তান সন্ধান

বক্তৃতায় বক্তৃতায় মিটিং জমে ওঠে।

মঞ্চে এক-একজন বক্তা আসছেন, কেউই বেশিক্ষণ বলছেন না, কিন্তু পর-পর বলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে একটা বক্তৃতাই যেন অনেকক্ষণ ধরে চলেছে।

নদীর কল্লোল, হাওয়ার গর্জন আর ফরেস্টের প্রবল মর্মর যেমন শ্লোগানের ধ্বনি বদলে দিচ্ছিল, তেমনি বক্তৃতার আওয়াজও বদলে দিচ্ছে। বাতাসটা বইছে নদীর স্রোতের অনুকূলে পুব থেকে পশ্চিমে। আর বিরাট-বিরাট, স্পিকারের মুখগুলোও পশ্চিম দিকে। সেই চোঙাগুলো দিয়ে আওয়াজ বেরনো মাত্র বাতাস সে–আওয়াজ উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে সমাবেশের ওপর দিয়ে, ভেতর দিয়ে। তা ছাড়া, নদীর ওপরের বাতাস ত আর জলস্রোতের মত মাটির ঢাল বেয়ে-বেয়ে যায় না। পুবের বাতাস নদীর ওপরের অতটা অবকাশে এলোমেলো বয়ে যায়। যে-সব চোঙ লাগানো হয়েছে তার আওয়াজগুলো এরকম বাতাসের ধাক্কায় এলোমেলো বয়ে যাচ্ছে। ফলে বক্তার একটা কথাই বিভিন্ন চোঙ থেকে বিভিন্নভাবে এসে সেই সমাবেশের ওপর পড়ছে, তারপর মুহূর্তে ভেসে যাচ্ছে তিস্তার জলে কুটো পড়লে যেমন ভেসে যায়।

মাদারির মা মিটিঙের ভেতরে ঘুরে-ঘুরে বেড়ায়। এত মানুষ এসেছে যেন মনে হয় দশটা মাদারিহাট এই মিটিঙের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে। হাটে ত তাও দোকানের জন্যে জায়গা ছাড়তে হয়, খদ্দেরদের চলাফেরার জন্যে রাস্তা রাখতে হয়। কিন্তু এখানে ত মানুষে-মানুষে কাধ লাগিয়ে বসে আছে, দাঁড়িয়ে আছে–ফরেস্টের গাছের মত, একটা গাছের সঙ্গে আর-একটা গাছের কোনোনা-কোনো একটা সংযোগ থাকেই।

মানুষই ত ভালবাসছিল মাদারির মা, মানুষের আওয়াজ, মানুষের চামড়ার গন্ধ, মানুষের সব কিছু। যেন, সে যখন এই জলুশটাতে এসে পড়েইছে, এত মানুষের ভেতরে এতক্ষণ যখন সে থাকতে পারছেই, তখন, তার এই ভাল লাগাটা সে পুরো উশুল করে নেবে।

কিন্তু মানুষকে ভালবাসতে বাসতে, মানুষের আওয়াজ শুনতে-শুনতে, মানুষের গন্ধ শুঁকতে-শুঁকতেও মাদারির মা তার ছেলেদের খুঁজছিল। এখানে ত সারা দুনিয়ার মানুষ এসেছে। এত মানুষ এক সঙ্গে কোনো দিন মাদারির মা দেখেনি। তার বাকি জীবনে সে আরো একবার এত বড় মিটিঙে কখনো আসতে পারবে না। আজকের জলুশ যে এতই বড় আর, তাদের যে সেই মাদারিহাট থেকে এই এত দূরে আসতে হবে–তা সে ভাবেও নি। এই জায়গাটাকে যদিও তার তত অপরিচিত ঠেকে না–এমন বড় নদী না দেখলেও ত সে তোসর জল ও চর দেখেছে আর নদীর পাশের এই ফরেস্ট। কিন্তু আসতে-আসতে রাস্তাটা দেখে তার মনে হচ্ছিল সত্যি তারা এত দূরে যাচ্ছে যে আর শ্যাওড়াঝোরায় ফেরা যাবে না। দেশ বোঝে না মাদারির মা, কিন্তু বিদেশ বোঝে। এত দূর বিদেশেও সে কি আর-কোনো দিন আসবে? তা হলে সে তার ছেলেদের একবার খুঁজে দেখবে না, এখানে? তার আটটি কি দশটি সন্তানের মধ্যে দুটি-একটি ত এই মিটিঙে এসে থাকতেই পারে।

মাদারির মা যে খুব একটা নিয়ম মেনে খোঁজে, তা নয়। এই মিটিঙে কোন-কোন জায়গা থেকে লোক এসেছে, তা ত সে জানতে পারবে না। তার ছেলেরা কোথায়-কোথায় চলে গেছে, তাও সে জানে না। তা হলে আর জায়গা মিলিয়ে-মিলিয়ে সে খুঁজবেই বা কেমন করে? তাকে এই হাজার-হাজার মানুষের মধ্যে ধীরে ধীরে ঘুরে বেড়াতে হয়, হেঁটে বেড়াতে হয়, যেমন সে প্রতিদিন ঘুরে বেড়ায় ফরেস্টের মাটির দিকে চোখ রেখে তার খাদ্যের সন্ধানে। এমন একা-একা হাটা আর খোঁজা, খোঁজার জন্যে হাঁটাই ত তার রোজকার জীবন।

কিন্তু এখানে ফরেস্টের অন্ধকার নেই, এখানে পচা শুকনো পাতা নেই, এখানে লতাপাতার জঙ্গলের আড়াল নেই, এখানে ভেজা মাটি নেই। এখানে, আকাশ থেকে রোদ মাটিতে সম্পূর্ণই আসছে–একটা মেঘের ছায়ার বাধাও নেই। এত বড় আকাশ থেকে এত রোদ এত দূর পর্যন্ত ঝরে পড়ছে যে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না। এখানে, সামনে আকাশ পর্যন্ত চওড়া একটা নদীকে দু-টুকরো করে শুকনো খটখটে সিমেন্টের দেয়াল সেই আকাশ পর্যন্তই ছড়িয়ে গেছে। এখানে পায়ের নীচে শক্ত মাটি, সবুজ ঘাসের মাটি। এখানে এই রোদে আর এই হাওয়ায়, এই নদী আর এই জলের সামনে এই হাজার-হাজার মুখ। সব মুখ একই দিকে উঁচু করা–সামনে মঞ্চের দিকে তাকাতে ঘাড়টা একটু হেলাতেই হয়। মঞ্চের মানুষগুলোর চোখ এখান থেকে দেখা যায় না, কিন্তু, তাদের হাত নাড়ানোটা বোঝা যায়। সেই হাজার-হাজার একটু উঁচু করা মুখের প্রায় প্রত্যেকটা খুঁটিয়ে দেখার এমন সুযোগ মাদারির মা আর-কোথায় পাবে?

তাই মাদারির মা হাঁটে, তার প্রতিদিনের হাটা-হাঁটে। প্রতিদিনের মত বেগেই হাঁটে। ধীরে-ধীরে। তাড়াহুড়ো নেই। যা খুঁজছে তা খুঁজে যেতে হয়, তাড়াহুড়ো করলেই পাওয়া যাবে, তা নয়। শুধু বেঁচে থাকার জন্যে দরকারি খাদ্যটুকু ফরেস্টের ভেতর থেকে জোগাড় করতে যে-প্রয়াসহীন ক্লান্তিহীন হাঁটা হাঁটতে হয়–তেমনি ভাবে সে হাটে। শুধু তার হাতে অস্ত্র হিশেবে সেই লাঠিটা নেই, তলার দিকে। সমকোণ হয়ে যাওয়া সেই লাঠিটা, যা মাথার ওপর তুলে সে খঙ্গের মত নামিয়ে আনতে পারে, নির্ঘাত। এখন তার হাতে কোনো অস্ত্র নেই, শুধু চোখদুটো আছে, চোখের সেই দৃষ্টিটুকু আছে। এত রৌদ্রভাসিত, বায়ুতাড়িত মুক্ত জায়গায় এত মানুষের ভিড়ে চোখের দৃষ্টি সে অত তীব্র না করলেও পারত।

মাদারির মা হটে আর সেই ব্যগ্র মুখগুলির দিকে চাপা তীব্রতায় চেয়ে যায়। কতগুলো গর্ভ সে ধরেছে তার একেবারে ঠিক হিশেব তার পক্ষে দেয়া সম্ভবই নয়। কোনোদিন ত সেভাবে সন্তানদের হিম্পূের্বাব্লাখেনি। কিন্তু, একটা ছেলে ছাড়া ত তার কোনো সময়ই চলেনি। আর, ছেলেরা মাথায় একটু লম্বা হলেই ত চলে গেছে। ততদিনে ত আর-একটি ছেলে এসে গেছে।

মাদারির মা এখন তার সেই সব ছেলেদেরই খুঁজছে।

সে একের পর এক মুখ দেখে যায়–এই মুখগুলি তার চেনা রাজবংশী মুখ। একটা আন্দাজ ত তার আছে তার ছেলেদের বয়স এখন কত হতে পারে-ওপরের দিকে। তাই সেই আন্দাজি বয়সের চাইতে বয়স্ক মুখগুলো এক পলক দেখেই সে সরে যায়। আর, তার ছেলেদের আন্দাজি বয়সের সীমার মধ্যে পড়তে পারে এমন যে-কোনো মুখের দিকেই সে নিবিড় ভাবে এক পলক চায়।

এরকম চাইতে-চাইতে মনে-মনে সে তার ছেলেদের কথাটা একবার যাচাই করে নেয়। নেপালি জ্যেষ্ঠপুত্রের কথা আর তার পরের মদেশিয়া ছেলের কথা পরপর মনে আসে। কিন্তু তারপর সব গোলমাল হয়ে যায়। কোন ছেলে আগে–সেই মিলিটারি, নাকি সেই রাজবংশী দেউনিয়াসে নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারে না। তার বাকি সব ছেলে যে-কোনো বয়সী হতে পারে।

মাদারির মা একের পর এক গোখা মুখ দেখে যায়।

বড় বেশি চেনা এই সব ছোট-ছোট মুখ, প্রবল চিবুক আর তীব্র হনু। বয়স খুব একটা বোঝা যায় না বলে সে প্রায় কোনো মুখই বাদ দিতে পারে না আর হঠাৎ-হঠাৎ এক-একটা মুখ দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে। কোথায়, কত দূরে তার ছেলেরা গেছে যে দুনিয়ার মানুষের এই মিছিলেও তারা কেউ আসে না! তার একটা-দুটো ছেলে এ মিটিঙে আছেই, শুধু খুঁজে যেতে হবে, প্রতিদিনের খাদ্য খোঁজার মত ধীরে, অত্যন্ত ধীরে, দৃষ্টিটাকে তীক্ষ্ণ অভ্রান্ত রেখে, এই রৌদ্রভাসিত প্রান্তরেও অভ্রান্ত রেখে।

এর ভেতর প্রবল জয়ধ্বনির মধ্যে, স্লুইস গেটের অবকাশ দিয়ে কৃত্রিম বাঁধে ধাধে প্রবাহিত তিস্তার জল তার স্বাভাবিক গতির চাইতে বহুতর গুণ বেগে নিজেরই খাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আকাশে ফেনা ছুঁড়ে, ছুটে যায় এই মিটিঙের হাজার-হাজার মানুষের সামনে ভবিষ্যতের প্রতীক হয়ে। মাদারির মা সেই মুক্ত সফেন জলরাশির দিকে তাকায় না। তার কাছে এই ব্যারেজ, এই স্লুইস গেট, এই নদীনিয়ন্ত্রণ, এই মঞ্চ,. এই জয়ধ্বনি অবান্তর। তিস্তার জল এমনিতেও তার শ্যাওড়াঝোরায় যায় না। ব্যারেজ হলেও যাবে না। কিন্তু এই জলরাশিকে, এই নতুন তিস্তাকে অভিনন্দন জানানো জয়ধ্বনিমুখর মুখগুলো তার পক্ষে বড় বেশি প্রাসঙ্গিক। এই মুখের অরণ্যে তার ছেলেদের মুখগুলো আছে। খুঁজতে হবে। মাদারির মাকে ধীরে পায়ে খুঁজতে হবে। ফরেস্টের ভেতর যে-পদক্ষেপে সে রোজ তার খাদ্য খোঁজে, সেই পদক্ষেপে খুঁজতে হবে।

মাদারির মা একের পর এক মদেশিয়া মুখ দেখে যায়–তার ছেলেদের সমবয়সী মুখ বড় বেশি চেনা এই মুখের লম্বা ধাচ, চওড়া কপাল, চোয়ালের চওড়া হাড়।

.

|| মাদারির মায়ের স্বরাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন-অন্ত্যপর্বের শেষ অধ্যায় ||

রাত মাঝামাঝি কাবার হয়ে যাবার পর একটা ট্রাক ন্যাশন্যাল হাইওয়ে দিয়ে ছুটতে ছুটতে এসে মাদারিহাটের হাটখোলায় দাঁড়িয়ে পড়ে, কিন্তু স্টার্ট বন্ধ করে না। ট্রাকভর্তি মেয়েপুরুষ ঐ আচমকা থামার ঝাঁকুনিতে ঝিমুনি থেকে জেগে ওঠে। ট্রাকের ভেতরের এক কোণ থেকে ক্লিনার নিদ্রিত গলায় বলে ওঠে, কে নামবেন, মাদারিহাটে, নামেন।

মাদারির মা ট্রাকের পেছনে বসে ছিল। সে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে তাকিয়ে মাটির দূরত্ব দেখে নেয়। ক্লিনার আর-একটু কম নিদ্রিত গলায় বলে, এদিক দিয়ে নামেন, এদিক দিয়ে। বলে ক্লিনার উঠে দাঁড়ায়! পুরো ট্রাকটা পার হয়ে মাদারির মাকে সামনে দিয়ে নামতে হবে।

সে বা পাশ দিয়ে এগতে-এগতে চাকার কাছে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর ডালাটা ধরে বা-পাটা নামিয়ে চাকার ওপর রাখে, আরে, আরে পড়ে যাবেন, পড়ে যাবেন, ক্লিনারের এই কথা শুনতে-শুনতে ডান পাটাও সে চাকার ওপর নামায়, তারপর চাকার ওপর থেকে বা পাটা মাটির দিকে নামায়–ট্রাকের ডালা ধরে থাকা হাত টানটান করে যতটা ঝোলা সম্ভব ঝুলে হাত ছেড়ে দেয় আর রাস্তার ওপর ধুপ করে বসে পড়ে। ক্লিনারটি ওদিক থেকে এদিকে এসে উঁকি দিয়ে দেখে, ততক্ষণে মাদারির মা দাঁড়িয়ে পড়েছে। ক্লিনার ভাল করে তাকে দেখে নিয়ে ড্রাইভারের কেবিনের পেছনে চড় মারে। রাতময় একটা আওয়াজ তুলে ট্রাকটা সোজা বেরিয়ে যায়–আওয়াজের প্রতিধ্বনিকে দীর্ঘ, দীর্ঘ করে। বাঁক নিতেই ট্রাকের লাল আলোটা আর মাদারির মা দেখতে পায় না, কিন্তু আওয়াজটা অনেকক্ষণ ধরে শুনতে পায়। এবং-শোনে।

মাদারির মা তার গাড়ি হারিয়ে ফেলেছিল। শেষে এক ভদ্রলোকের ছেলে, তাকে নিয়ে খুঁজে-খুঁজে এই ট্রাকটাতে তুলে দিয়েছে, ট্রাকটা মাদারিহাটের ওপর দিয়ে ফালাকাটার দিকে যাবে।

ট্রাক চলে যাবার পর মাদারির মা সেই নিশুতরাতের মাদারিহাটের একই জায়গায় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকায়। মাদারি আগে এসে কোথাও বসে থাকতে পারে, সে যাতে তাকে দেখে মাই গে বলে ডেকে উঠতে পারে সেজন্যে মাদারির মা নিজেকে দৃশ্যমান করে রাখে—-ঐ রাতে ঐ অন্ধকারে যতটা দৃশ্যমান করে রাখা সম্ভব।

মাদারি যদি তার অপেক্ষায় কোথাও বসেই থাকত এই হাটখোলায় তাহলে ট্রাক থামলেই চলে আসত। অবিশ্যি ঘুমিয়ে পড়ে থাকতে পারে।

মাদারির মা রাস্তা ছেড়ে রাস্তার পাশের দু-একটা দোকানের বারান্দা দেখে। ঘোমশাইয়ের দোকানের ঝাঁপ বন্ধ। তার বাইরে থেকে মাদারির মা ডাকে-হে-এ মাদারি, মাদারি, হে-এ মাদারি। একটা কুকুর অন্ধকারের ভেতর থেকে নিঃশব্দে এসে মায়ের কোমরের দিকে তার নৈশ গ্রীবা তুলে দেয়। তার ঘন নিশ্বাসের বাতাস মাদারির মায়ের কোমরে, উরুতে, লাগে। সে কি খাবার চায়, নাকি সঙ্গ, নাকি আক্রমণই করতে চায়–বোঝা যায় না।

মাদারির মা ডাকে, হে-এ মাদারি, মাদারি গে, মাদারি।

এবার ভেতর থেকে বাহাদুরের ঘুমজড়িত স্বরে জবাব আসে, মাদারি গাড়িত আসে নাই।

মাদারি আসে নাই। এলে ত বাহাদুরের গাড়িতেই মাদারি আসবে। নাকি মাদারি আর বাহাদুরও ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল? কুকুরটার আরো ঘন শ্বাস মাদারির মায়ের গায়ে লাগে। মাদারির মা ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করে, মাদারি কোটত গেইল? একবারই জিজ্ঞাসা করে। সে জানে এই প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যাবে না, তাই একটু দাঁড়িয়ে থেকে সে আবার রাস্তায় ওঠে।

এখন সে শ্যাওড়াঝোরার দিকে হাঁটে। তার প্রতিদিনের হাটার মত করে নয়, কারণ এখন তাকে ত কিছু খুঁজতে হয় না–এই নিশুতিতে, অন্ধকারে। এখন তাকে মাইল-মাইল হেঁটে শ্যওড়াঝোরায় ফিরতে হবে–ততক্ষণে রাত আরো কয়েক ঘণ্টা ফুরুবে। কত মাইল তাকে হাঁটতে হয়, সে জানে না–যতক্ষণ না পৌঁছয় সে হেঁটে যাবে।

সে বোঝে কুকুরটা তার সঙ্গে-সঙ্গে চলেছে–কিসের গন্ধে, কে জানে? একবারও ডাকেনি। মাঝে-মাঝে দু-এক পা পেছিয়ে পড়ছে, মাটি শুঁকছে বোধহয়–সেটা মাদারির মা অনুমান করে রাস্তার ওপর কুকুরটির শাস ফেলার প্রতিধ্বনিতে। মাঝে-মাঝেই তার গলাটা লম্বা করে মাদারির মায়ের গায়ের গন্ধ শোকে।

মাদারি ফেরেনি। বাস বা ট্রাক গোলমাল করে থাকতে পারে–যেমন মাদারির মা নিজেই করেছে। তা হলে, মাদারির মায়ের মতই কি সে আর-কোনো গাড়িতে এসে পড়ত না? বাহাদুরের সঙ্গ মাদারি ছাড়ল কেন? এমনিই ছাড়াছাড়ি হয়ে থাকতে পারে। বা, মাদারিকে দেখেশুনে ফেরত নিয়ে আসছে–সে-দায়িত্ব ত বাহাদুরকে কেউ দেয়নি।

এক হতে পারে–মাদারি চলে গেল, আর-কোনোদিনই ফিরবে না। এত জায়গা থেকে এত গাড়ি এসেছে, এত মানুষ, এত কাজ। পাহাড় বেঁধে নদীর বন্যাকে আটকে দেয়া হচ্ছে, আবার ইচ্ছে মত বন্যা ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, বন্যার জলও নদীর খাত ছেড়ে যেতে পারবে না–এই সব একবার দেখে ফেলার পর, মাদারি আর ফিরতে পারে না। তার ছেলেরা হাসিমারা, শিলিগুড়ি, নেপাল–এই সব দূর-দূর জায়গায় চলে গেছে। মাদারিকে, আর সেভাবে যেতে হল না–সে তার মায়ের সঙ্গেই সেই দূরের একেবারে ভেতরে গিয়ে সেখানেই থেকে গেছে।

রাস্তাটা যেখানে ফরেস্টে ঢুকে পড়ল, সেখানে ফরেস্টের গাছগুলোও যেন রাস্তার ওপর উঠে এসেছে। পাতায়-পাতায় ছাওয়া সেই রাস্তাটাকে একটা গুহার মত লাগে, আরো অন্ধকার গুহা। সেইখানে, প্রায় সীমান্তে, কুকুরটা দাঁড়িয়ে গেল। মাদারির মায়ের নাকে এসে লাগে ফরেস্টের তীব্র ভেজা গন্ধ, সবুজের, এমোনিয়ার। কুকুরটাও সে-জন্যেই দাঁড়িয়ে যায়–এই গন্ধের ভেতর মানুষের সঙ্গে সঙ্গে থাকা কুকুর ঢুকতে ভয় পায়। ঐ গন্ধের ভেতর অনেক বেশি ছায়া, অনেক বেশি আওয়াজ, অনেক বেশি গন্ধ। মাদারির মায়ের গায়ে কুকুরটি সেই কোন আরণ্যক জন্মান্তরের গন্ধ পেয়েই কি কুকুরটা সঙ্গ নিয়েছিল?

সেই অন্ধকার গুহার মত রাস্তা দিয়ে তরতরিয়ে মাদারির মা চলে যায়। ঐ গন্ধের ভেতরে, আরো ভেতরে, ঢুকে যায়। তার নিজের পায়ের সঙ্গে রাস্তার ঘর্ষণের আওয়াজ এমনই তীব্র হয়ে কানে আসে যে জঙ্গলের আওয়াজগুলো তার কানে আসে না। সে খুব একটা কানও দেয় না।

রাত্রির পশুর মত খর অথচ সতর্ক পায়ে মাদারির মাকে সেই ঢাল আর বাক পেরিয়ে তার তৈরি, শ্যাওড়াঝোরার জলেভেজা ন্যাশন্যাল হাইওয়েতে দাঁড়াতে হয়। তার সামনের অন্ধকারটা, একটা পাথরের মত গোটা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলে সেই পাথরটা, অন্য আকার পায়। তার শ্যাওড়া গাছটার যে-ডালটা ওপরের দিকে উঠে গেছে তা অন্ধকারে দাঁড়ানো হাতির গুঁড়ের মত দোলে আর যে-ডালটা নীচে নেমে গেছে তা অন্ধকারের হাতির মত ঝোরা থেকে জলপান করে।

এই জাতীয় সড়ক দিয়ে ভারতবর্ষ যাতায়াত করে, রোজ। আজ মাদারির মা দেখে এল মানুষ পাথর। বেঁধে-বেঁধে নদী বানাল, নদীর বন্যা বানাল, তৈরি করা বন্যার সে-জলও খাত মেনে চলে–উপছোয় না।

মাদারির মায়ের কাছে এই সবই অবান্তর–এই জাতীয় সড়ক, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করা ভারতবর্ষ, ঐ নদী, ঐ ব্যারেজ, ঐ বন্যা। সে জাতীয় সড়কের পাশেই তার নিজের নদী, নিজের বৃক্ষ, নিজের পাথর দিয়ে নিজের শ্যাওড়াঝোরা তৈরি করে নিয়েছে। তার নিজের তৈরি শেষ মানুষটিও ছিল, আজ থেকে আর-থাকল না বোধ হয়।

মাদারির মা কোমর বেঁকিয়ে চড়াইটা পেরিয়ে তার পাতার ঘরের দিকে উঠতে শুরু করে।

বহু-বহু মাইল দূর থেকে সেই কুকুরটার প্রবল কান্না এতক্ষণে একটানা ছুটে আসে অন্ধকার গুহার মত সেই জাতীয় সড়ক দিয়ে–এই ফরেস্টে এখন মনুষ্যপালিত কোনো পশুরও প্রবেশ নিষেধ।

বাকি রাতটুকুর জন্যে মাদারির মা তার পাতার ঘরে প্রবেশ করে।

.

এ বৃত্তান্ত এখানেই শেষ করা ভাল-সব বৃত্তান্তই ত একটা যোগ্য জায়গায় শেষ করতে হয়। এবৃত্তান্তের পক্ষে এটা বেশ যোগ্য জায়গা। মাদারির মায়ের পক্ষে দূরতম ভ্রমণশেষে ঘরে ফিরে আসা–একা। মাদারি ফেরে না।

শেষ না করলে ত এ বৃত্তান্ত চলতেই থাকবে–পরদিন, তার পরদিন, তার পরদিন।

কারণ, মাদারির মা ভারতবর্ষের প্রায় আশি কোটি মানুষের মধ্যে সেই ছ-সাত কোটির এক জন, যারা, বনের পশুর নিয়মে বাঁচে। দারিদ্র্যসীমা, পশ্চাদপদ অংশ, ইত্যাদি ইত্যাদি শব্দ তাকে ঘেঁয় না।

ফলে, মাদারির মায়ের প্রতিদিনের বাঁচাই এক স্বাধীন, সার্বভৌম, স্বরাষ্ট্র, স্বাবলম্বী বাঁচা! সেই বাঁচা, দিনের পর দিন বেঁচে থাকা নয় মাত্র, প্রতিটি দিনই একটা পুরো জীবন বাঁচা, একটা গোটা মানবজীবন বাঁচা। সেই বাঁচার নিয়মেই সে তিস্তা ব্যারেজ, কাবেরী ব্যারেজ, হীরাকুঁদ ড্যাম, ভাকরানাঙ্গাল এই সবের বিরুদ্ধে তার নিজের এক শ্যাওড়াঝোরা বানাতে পারে। সেই ধাচার নিয়মেই নিশিদিন ভারতবর্ষ যাতায়াত করে এমন একটা সড়কের পাশে নিজের এক রাষ্ট্র কায়েম করতে পারে।

কিন্তু এ-নিয়ে গৌরব করারও কিছু নেই। মাদারির মায়ের দারিদ্র্যের মধ্যে ত কোনো গৌরব নেই, বড় বেশি অপমান আছে।

সেই অপমানের বিচ্ছিন্নতাকে বিদ্রোহের বিচ্ছিন্নতা বলে ভাবার মধ্যে, তার সাতকাহন বৃত্তান্ত রচনার মধ্যে, মিথ্যা কিছু থেকেই যায়। ভারতবর্ষে যারা কালিকলম ব্যবহার করতে জানে, আমাদের মত, তারা জানে না ভারতবর্ষের দরিদ্রতম ছ-সাত কোটির কথা কোন অক্ষরে লেখা যায়। তাই অক্ষরজ্ঞানহীন এই বৃত্তান্ত যত লেখা হবে, ততই মিথ্যা হবে—সে কহে বিস্তার মিছা, যে কহে বিস্তর।

এ বৃত্তান্ত তাই এখানেই, এমনই একটা যোগ্য জায়গায়, শেষ হোক।

মাদারির মা তার পাতার ঘরে রাত্রির বাকি কয়েক ঘণ্টা শেষপুত্রহীন কাটাক।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%