শিবব্রত বর্মন
এর মধ্যে একদিন দুপুরবেলা সালমা বেগ ডেকে পাঠান রওশন আরাকে। ফিরোজ তখন ইউনিভার্সিটিতে।
রান্নাঘর থেকে সুমি এ দুজনের কথোপকথন শুনেছে।
সালমা বেগ কফি সেধেছিলেন রওশন আরাকে। সে ‘ইটস ওকে’ বলায় সালমা বেগ ঠিকমতো বুঝতে পারছিলেন না কফি খেতে সম্মতি জানানো হয়েছে কি না। ফলে তিনি সুমিকে চা দিতে বলে জিজ্ঞেস করেন, ‘ফিরোজের চেয়ে তুমি সিনিয়র, তাই না?’
রওশন আরা বোঝার চেষ্টা করে আলোচনা কোন দিকে যাচ্ছে। সে বলে, ‘হ্যাঁ। আমি অলরেডি প্রফেসর।
‘মানে বয়সে বড়, তাই তো?’ সালমা আবার বলেন।
‘ও, হ্যাঁ। তা তো বটেই।’
নিজের কণ্ঠ যতটা পারা যায় কর্কশ করার চেষ্টা করে সালমা বলেন, ‘কত সিনিয়র হবা তুমি, বয়সে?’
‘আমি ঠিক…নো আইডিয়া।’
‘সরি, তোমাকে তুমি করে বলছি…’
জবাবে রওশন আরা ভদ্রতাসূচক বা সম্মতিসূচক কিছু বলে না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। দুজনে অস্বস্তি নিয়ে বসে থাকে।
‘তোমার কোনো ধারণা আছে, কেন ডেকে পাঠিয়েছি?’
‘না। কোনো ধারণা নাই।’
‘কোনো অনুমান?’
রওশন ঠিক করে আর বেশি সৌজন্য দেখানো যাবে না। সে বলে, ‘অনুমান কেন করব, আপনি তো সামনেই বসা।’
‘আমার ছেলেকে ছেড়ে দেও।’
রওশন আরা রেডি হয়ে ছিল কথাটার জন্য। আপসেট হলো না। শান্ত স্বরে, যেন কোনো দোকানে দর-কষাকষি করছে, বলল, ‘দিতে পারি। দিতেই পারি। কিন্তু তার আগে বলতে হবে, কেন…’
‘কেন মানে?’
‘মানে কেন ছাড়ব।’
সুমি চা ও বিস্কুট এনে রাখে দুজনার মাঝখানের টেবিলে। সালমা তার চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে বলেন, ‘ছাড়বা, বিকজ ইউ আর নট আ গুড ম্যাচ ফর দ্য ফ্যামিলি।’
‘গুড ম্যাচ না কেন? সেটা কি আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের জন্য?’
‘ব্যাকগ্রাউন্ড ম্যাটারস, তা তোমরা এ যুগের ছেলেমেয়েরা যতই খাটো করে দেখো না কেন।’
‘ওকে। ফিরোজের বাবা বেগ পরিবারের ছেলে বুঝলাম। দাদাবাড়ি লাহোর। বনেদি। কিন্তু ম্যাডাম, নিজের দিকে একবার তাকিয়েছেন? আপনার নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড কী? কেরানীগঞ্জে আপনার জ্ঞাতিগুষ্টিরা এখনো পাথরের ব্যবসা করে। কিসের এত অহংকার আপনার?’
সালমা চিৎকার করে ওঠেন, ‘আই উইল নট টেক অ্যানি হোর ফর মাই ডটার-ইন-ল, হু হ্যাজ স্লেপ্ট উইথ এভরি অল্টারনেটিভ মেল টিচার্স অব দিস ইউনিভার্সিটি।’
সুমি ছুটে আসে চিৎকার শুনে। সালমা তাকে হাতের ইশারায় ফেরত পাঠান।
রওশন মোটেই বিচলিত হয় না। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘বাট, আপ কি তাকদির মে ইয়েহি লিখা হুয়া হ্যায়। ক্যায়া ক্যারে।’
.
রাত সাড়ে ১০টার দিকে রওশন আরার দরজা নক করে ফিরোজ। কেউ দরজা খোলে না।
ফিরোজ জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে থাকে।
বাসা তিনতলায়। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে উল্টো দিকে আরেকটা বাসার দরজা। এ রকম হই-হাঙ্গামার আওয়াজে সেই দরজা খুলে লুঙ্গিপরা মাঝবয়সী এক লোক বেরিয়ে আসে। ফিরোজকে সে চিনতে পারে। সিঁড়িতে উঠতে-নামতে একাধিকবার দেখা হয়েছে। লোকটা বলে, শুরু করলেন, ভাই? ভিতরে কেউ নাই তো মনে হইতাছে।’
ফিরোজ লোকটার কথার কোনো জবাব না দিয়ে লাথি কষে দরজায়।
লোকটা ভয় পেয়ে নিজের দরজা লাগিয়ে ভেতরে চলে যায়।
আওয়াজে নিচের দুটি ফ্লোর থেকে লোকজন উঁকি দিতে শুরু করেছে। একজন অর্ধেক সিঁড়ি উঠে জিজ্ঞেস করে, ‘কোনো প্রব্লেম, ভাই? থানায় ফোন দিব?’
ফিরোজ তাদেরকেও কোনো জবাব দেয় না।
একপর্যায়ে রওশন আরা দরজা খোলে। বলে, ‘ফাক অফ। বাস্টার্ড! এখানে কী?’
রওশন আবার দরজা লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে ফিরোজ জোর করে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই রওশনকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে সে। রওশন নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
‘মায়ের আঁচলের তলায় শুয়ে থাকো, যাও।’
রওশন রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। গিয়ে সে এটা-ওটা কাজ করতে থাকে।
ফিরোজ রান্নাঘরের দরজায় এসে বলে, ‘সমস্যাটা কী?’
‘ইটস ওভার, ফিরোজ। লাভ নাই।’
‘মা তোমাকে কিছু বলেছে?’
রওশন কোনো জবাব না দিয়ে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে শোবার ঘরে ঢোকে। ফিরোজ পেছন পেছন আসে।
মিক জ্যাগার একটা নিচু ওয়ার্ডরোবে গোল হয়ে বসে থেকে পুরো বিষয়টা দেখছিল।
আমি ছোট ঘরের হতে পারি,’ রওশন আরা বলে, ‘কিন্তু আমারও মান-মর্যাদা আছে। আমাকে যা ইচ্ছা তা বলা যাবে? আমার কোনো ইগো থাকতে পারবে না? সস্তা পাইছে আমাকে?’
‘মায়ের কথা ধোরো না।’
‘আমি বুঝে গেছি ফিরোজ, তুমি আমার জন্য দাঁড়াবা না। আমার ডিগনিটি তুমি প্রটেক্ট করবা না।’
ফিরোজ আরেকবার জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে রওশনকে। বলে, ‘আমার কথা শোনো…’
রওশন এবার চিৎকার করে ওঠে, ‘আমার কথা শোনো তুমি। আমি তোমাকে একটা চান্স দিচ্ছি। ওনাকে ছেড়ে আসতে হবে তোমাকে।’
‘মানে?’
‘ওই বাসা ছেড়ে তোমাকে এখানে উঠতে হবে। পারবা? আমি যদি তোমার সব হই, তোমাকে প্রমাণ দিতে হবে। পারবা? ইয়েস অর নো?
ফিরোজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।
‘ইয়েস অর নো?’
ফিরোজ একটা কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। সে কিছু একটা বলতে যাবে, তখন প্রচণ্ড শব্দে পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। বাইরে কামান আর মর্টারের আওয়াজ।
মিক জ্যাগার ওয়ার্ডরোব থেকে লাফিয়ে নেমে চৌকির তলায় ঢুকে যায়।
রওশন ‘মাগো!’ বলে ছুটে এসে ফিরোজকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে নিজেকে সংবরণ করে।
ফিরোজ কিছুই বুঝতে পারে না। সে বলে, ‘হোয়াট দ্য হেল!’
.
রাত পৌনে ১১টায় হাবিবুল্লাহ ফোন করে জাহানারাকে জানান, পলাশীতে ট্যাংক দেখেছে সোহরাব সাহেব। বাসার ভেতর থেকে কেউ যেন বের না হয়। মিরা তখন বাসায় ছিল না। আফসান চৌধুরী তার খোঁজে বের হন। মিরা কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে উল্টো আফসান চৌধুরীকে খুঁজতে বের হয়। তখন মিরাকে খুঁজতে পাঠানো হয় আলীকে। এক অস্থির দুর্যোগপূর্ণ রাতে সবকিছু এভাবে জট পাকিয়ে যেতে থাকে।
ঘণ্টা দেড়েক পর আফসান চৌধুরী ফিরে এসে বাথরুমে ঢুকে হড়হড় করে বমি করতে থাকেন। কোথায় ছিলেন, কী দেখেছেন, জিজ্ঞেস করা হলে তিনি পাথরের মতো বসে থাকেন।
পরদিন হাবিবুল্লাহ এসে জানান, ওই রাতে আফসান চৌধুরীকে জগন্নাথ হল আর ইকবাল হলের মাঝখানে ফুলার রোড ধরে হেঁটে আসতে দেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন স্টাফ।
এদিনের পর থেকে আফসান কেমন নিশ্চুপ হয়ে যান। বাসা থেকে বের হওয়া কমিয়ে দেন। ইউনিভার্সিটি ক্লাবে প্রায় যান না বললেই চলে। সন্ধ্যার পর তিনি কোয়ার্টারের দেয়ালঘেরা মহল্লায় যে হাঁটতে বেরোতেন, সেটাও বন্ধ করে দেন। তাঁর পুরোনো একটা অভ্যাসই শুধু টিকে থাকে—দাবা। তা-ও শুধু ফিরোজের সঙ্গে। কখনো সশরীর ফিরোজ আসে, কখনো টেলিফোনে চলে খেলা। মিরা তার মাকে আড়ালে বলে, ‘দেখেছ, দেশের কী অবস্থা! অথচ এই দুটা লোকের কোনো বিকার আছে?’
জুলাই মাসের মাঝামাঝি একদিন সন্ধ্যার আগে আগে বসার ঘরে নিচু স্বরে কথা বলছিল মিরা, তার বন্ধু মামুন ও সৌগত। তাদের সঙ্গে রাজিব নামের আরেকটি ছেলে যোগ দিয়েছে। সৌগতের তথ্য অনুযায়ী, রাজিব আগরতলা সীমান্ত দিয়ে ওপারে চলে গিয়েছিল। দুমাস পর জয়পুরহাট সীমান্ত দিয়ে আবার দেশে ঢুকেছে।
এ সময় নিয়াজকে সঙ্গে নিয়ে শাহীন হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে ভেতরবাড়িতে জাহানারার বিছানায় আছড়ে পড়ে। তার অসংলগ্ন বিলাপবাক্য থেকে এটুকু বোঝা যায়, আর্মির পোশাক পরা এক দল লোক ঘণ্টাখানেক আগে এসে হাবিবুল্লাহকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গেছে।
আফসান জানতে চান কোথায় নিয়েছে।
‘কিছু বলে নাই।’
মিরার বন্ধুরা একে অপরের দিকে তাকায়। নিয়াজ বিছানার এক কোনায় দাঁড়িয়ে ছিল। সে এসে আফসানের হাত ধরে।
‘তুমি আমার চাচার খবর এনে দেও।’
মামুন ও সৌগত তক্ষুনি বেরিয়ে যায় যা কানেকশন আছে, খোঁজ লাগাতে। রাজিব ছেলেটা কী যেন চিন্তা করে। সে মিরাদের বাসা থেকে কয়েকটা জায়গায় ফোন করে। রাত আটটা পর্যন্ত কোনো খোঁজ না পেয়ে আফসান চৌধুরী আর থাকতে পারেন না, তিনি নিজে বের হন। কোথায় যাবেন, তিনি জানেন না।
ধানমন্ডি থানার ওসি মারগুব হোসেন বলেন, ‘আমরা খুঁজব? বলেন কী! দেশ কারা চালাইতেছে, দ্যাখেন না, স্যার? বোঝেন না? আমরা তো স্ট্যাম্প পেপার।’
আফসান তাঁকে বলেন, ‘লোকটাকে কোথায় খুঁজব, এটুকু অন্তত বলে দেন।’
‘জানি না। এমপি হোস্টেলে দেখতে পারেন। অনেকরেই তো ওইখানে নিতেছে শুনলাম।’
এমপি হোস্টেল সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই আফসানের। এটা যে পার্লামেন্টের এমপি হোস্টেল, তিনি জানতেন না। খোঁজখবর করে রিকশায় চেপে রওনা দেন তিনি। পথে দুই জায়গায় চেকপোস্টে তাঁর তল্লাশি নেওয়া হয়। রাত ১০টার দিকে তেজগাঁওয়ে পার্লামেন্ট ভবনের কোনায় রিকশাওয়ালা তাকে নামিয়ে দিয়ে এমনভাবে জানায় সে আর যাবে না, যেন এর পর থেকে একটা শ্বাপদসংকুল অরণ্যের শুরু। মূল সড়ক থেকে একটা ধনুকের মতো বাঁকা পার্শ্বসড়কে ঢুকে কিছু দূর এগোলে আফসানের সামনে ভেসে ওঠে উঁচু পাঁচিলঘেরা একটা তিনতলা ভবন।
‘মনে হলো একটা অদ্ভুত দুর্গের সামনে দাঁড়িয়েছি,’ পরদিন ফিরোজকে বলেছেন আফসান। ‘লোহার উঁচু গেটগুলো নিষেধের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নীরব, ভীতিকর। তার ওপাশে যেন একটা গা ছমছমে নিষিদ্ধ জগৎ। চারপাশটা সুনসান। পাখিও ডাকছে না। একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার যেন দম আটকে পড়ে আছে দেয়ালের ওপাশে, ভবনটার ভেতর। গেটের কাছ পর্যন্ত যেতে পারলাম না। তার আগেই উর্দি পরা দুই সোলজার আটকে দিল। ভবনের কাছে যাওয়া নিষেধ। দূরে থাকতে হবে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। তাকিয়ে থাকলাম ভবনটার দিকে। থাকতে থাকতে একবার কী মনে হলো জানো…তুমি কীভাবে নেবে জানি না…মনে হলো, ভবনটাও তাকিয়ে আছে আমার দিকে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।’
‘কিন্তু ওনাকে কেন ধরে নিয়ে গেল?’ ফিরোজ জানতে চায়। সে তখনো ঘোর কাটাতে পারেনি। ভোরবেলা ডোরবেল বাজার পর দরজা খুলে আফসান চৌধুরীকে দেখে বিস্মিত হয়েছে সে। আর দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে কোনো ভূমিকা ছাড়া আফসান চৌধুরী বলেছেন, ‘হাবিবুল্লাহকে আর্মি ধরে নিয়ে গেছে, জানো তো?’
ফিরোজ বলেছে, ‘সে কী!’ ঘটনার ভয়াবহতা ফিরোজ সরাসরি অনুধাবন করতে না পারলেও আফসান চৌধুরীর বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থা থেকে সে পরোক্ষভাবে আঁচ করতে পারছিল। সে আবার বলেছিল, ‘ধরে নিয়ে যাবে কেন?’
‘কী করে বলব! মনে হয় জিজ্ঞাসাবাদ করতে।’
‘কিসের জিজ্ঞাসাবাদ?’
‘বোঝা যাচ্ছে না। হাবিবুল্লাহর কিছু কানেকশন আছে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে। সেটা একটা কারণ হতে পারে। আর লোকটা একটু ভোকাল এসব ব্যাপারে। আর কোনো দোষ তার নাই।’
ফিরোজ ‘আচ্ছা’ বলে সোফায় বসে পড়েছে। তবে তখনো সে ঠিক বুঝতে পারছিল না আফসান তার কাছে কেন এসেছেন।
আফসান বলেছেন, ‘আমি অনেক খোঁজখবর করলাম। অনেক জায়গায় গেলাম। ইউনুস সাহেবের ভায়রা আছেন আর্মিতে। ওনাকে গিয়ে ধরলাম। আসলাম সাহেবকে ধরলাম। বললাম, খবরটা শুধু এনে দেন। কোথায় আছে। শেষে পেলাম। এমপি হোস্টেলে।’
‘সেটা কী?’
‘তেজগাঁও। শুনেছি, ওরা একটা ক্যাম্পমতন করেছে ওখানে। অনেক গুজব শোনা যায়।’
‘কী রকম গুজব?’
‘তুমি কিছু শোনোনি?’
‘খোঁজখবর একটু কম রাখি আমি, এসব ব্যাপারে। যা কিছু ঘটছে, এনাফ টু মেক অ্যানি ওয়ান সিক অ্যান্ড টায়ার্ড।’
আফসান বলেছে, ‘ওরা বলে, ওটা নাকি…একরকম… কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। ওয়ানওয়ে জার্নি।’
ফিরোজ বিস্মিত হয়ে বলেছে, ‘মাই গড!
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আফসান বলেছিলেন কথাটা : তুমি আমাকে হেল্প করো, ফিরোজ।’
‘আমি? আমি কীভাবে হেল্প করব?’
‘চাইলে তুমি পারবা, ফিরোজ। তুমিই পারবা।’
এ কথায় আত্মপ্রসাদ লাভের বদলে বিব্রত হয়েছে ফিরোজ। একটা কল্পিত সুবিধাজনক অবস্থা তাঁকে যেন একটা সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য রেখার ওপারে রেখে দিচ্ছে। সে বলেছে, ‘কীভাবে?’
‘তোমাদের ফ্যামিলির আর্মি কানেকশন আছে। থাকার কথা। ইয়োর ফাদার ওয়াজ ডেকোরেটেড, ফর হিস হেরোইক কন্ট্রিবিউশন ইন দ্য ওয়ার।’
ফিরোজের চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল। সে বলেছে, ‘হি ইজ আ মার্টার। আ প্যাট্রিয়ট।’
‘সেটাই বলছি। তুমি কি একটু দেখবা, ফিরোজ?’
ফিরোজ চুপ করে ছিল। সে কী যেন ভাবছিল তখন।
.
সালমা এহতেশাম বেগ ব্লাউজ পরছিলেন, একটা হাত অবশ হওয়ার কারণে কষ্ট হচ্ছিল তাঁর, তখন ফিরোজ দরজায় এসে দাঁড়ায়। সালমা দরজার দিকে পিঠ দিয়ে ব্লাউজের হুক লাগানোর চেষ্টা করেন। তাঁর হাত কাঁপে I
ফিরোজের একবার মনে হয়, মাকে সে সাহায্য করে। কিন্তু এ দ্বিধা সে কাটাতে পারে না। সে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।
ব্লাউজ পরা শেষে সালমা বুকের ওপর আঁচল টেনে দিলে ফিরোজ বলে, ‘কারফিউর জন্য নার্স মনে হয় আর আসতে পারবে না। ঢাকার ভিতরেই আরেকটা খুঁজছি। পেয়ে যাব। তোমার কষ্ট হচ্ছে।’
সালমা চুপ করে থাকেন। তিনি কী যেন ভাবছেন। ইশারায় ছেলেকে কাছে ডাকেন। বসতে বলেন বিছানায়। ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি, ফিরোজ। উনি কি ইদানীং ঘনঘন আসছেন?’
ফিরোজ বলে, ‘কে?’
‘তোমার বাবা।’
ফিরোজ কোনো কথা বলে না।
‘এবার কবে থেকে?’
ফিরোজ চুপ।
‘হেরে গেছ যেদিন, ওই লোকটার কাছে, সেদিন থেকে, না?’
ফিরোজ বাধ্য কিশোরের মতো মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে।
‘আমার মনে হয়, আই শুড টেক ইউ টু লাহোর। ড. সাকলায়েনের সঙ্গে আবার একটা সেশন দরকার। আগেরবার তো উনিই দেখেছিলেন।’
‘আই ডোন্ট নিড অ্যানি কাউনসেলিং, মা।’
সালমা ছেলের গালে হাত বুলিয়ে দেন, ‘ইউ নিড, বেটা।’
কিছুক্ষণ চুপচাপ।
সালমা বলেন, ‘অথবা আর একটা পথ খোলা আছে।’
‘কী সেটা?’
সালমা চুপ করে থাকেন। বেশ কিছুক্ষণ দুজনে কোনো কথা বলে না।
‘ওই লোকটা, আফসান চৌধুরী…’
‘হি ইজ ইয়োর ফ্যান, মা। রেডিওতে নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন।’
‘তুমি কি তাঁকে বন্ধু মনে করো?’
‘না।’
‘শত্রু মনে করো?’
ফিরোজ চুপ করে থাকে।
‘তুমি কি কিছু ভাবছ, ফিরোজ?’
ফিরোজ চুপ করে থাকে।
‘আমি জানি, তুমি কী ভাবছ। যা করতে ইচ্ছা করে, সেটা করে ফেলো, ফিরোজ। না হলে তুমি শান্ত হবে না। তোমার বাবার আসা বন্ধ হবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন