শোধ – ৫

শিবব্রত বর্মন

ঘূর্ণিঝড় দক্ষিণাঞ্চল লন্ডভন্ড করে দেওয়ার সপ্তাহখানেক পর মিরাদের বসার ঘরে গিটার স্ট্রামিং করতে থাকে জাফর। প্রিসলির ‘কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ’ গাওয়ার চেষ্টা করে সে। জাফরের গলা ভালো। সে মিরার মনোযোগ পাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু মেয়েটার মনোযোগ মামুনের ওপর থেকে সরছে না। মামুন রাজনীতি করে এবং ভোলা ঘুরে এসেছে বলে এ মুহূর্তে এমনিতেও মনোযোগ তারই পাওনা। তা ছাড়া মামুন এসেই একটা নাটকীয় ঘোষণা দিয়েছে। বলেছে, এ নির্বাচন যে পেছাতেই হবে, সে বিষয়ে এখন আর তার কোনো সংশয় নেই। পারলে সারা দেশে। না হলে ওই সব দুর্গত এলাকায়।

মামুনের সহপাঠী সৌগত বলল, সে চায় নির্বাচন সময়মতো হোক। এমনিতে বন্যার কারণে এক দফা নির্বাচন পিছিয়েছে। ১৪ বছর পর দেশে ইলেকশন। ঝড়ঝাপ্টা, বন্যা এই দেশে নতুন তো না।

মামুনের গলার স্বর তীক্ষ্ণ। সে প্রায় চেঁচিয়ে বলে, ‘ভোলা গেলে এ কথা বলতে পারতি না। আমি তজুমদ্দিন গেছি। আমি দেখছি কী অবস্থা! নদীতে কচুরিপানা যেভাবে ভাসে, সেইভাবে মানুষ ভাসতেছে। এক শ-দুই শ লোকের ব্যাপার না। দোস্ত, পাঁচ লাখ।

মিরা বলে, ‘কিন্তু ওরা তো অনেক কম বলে।’

‘বলুক। লাখ লাখ ভুখা লোক। এক ফোঁটা ত্ৰাণ নাই।’

‘পিছিয়ে দিলে যদি আর নির্বাচন না হয়?’

সৌগত ভিন্ন একটা সুর ধরে। সে বলে, ‘কিংবা ধর, পশ্চিম পাকিস্তানে হলো। এখানে পিছিয়ে দিল।’

জাফর বুঝতে পারে, ঝড়ের প্রভাব এখনো শেষ হয়ে যায়নি। এই ঝড় তার ঘূর্ণিতে মিরাকে একটু একটু করে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দুদিন আগেও মিরা গিটারে প্রবল আগ্রহী ছিল। জাফর আর না পেরে বলল, ‘মিরা, এই জায়গাটা দেখ, “ডার্লিং সো ইট গোউজ, সাম থিংস আর মেন্ট টু বি…” এই জায়গাটায়, বি-ফ্ল্যাটের জায়গায় আমি কী করছি…“সো ইট গোউজ”..দেখ আমার ইমপ্রোভাইজেশন…’

মিরা যেন ঘোরের মধ্যে আছে। সে শুনতে পায়নি এমনভাবে মামুনকে বলে, ‘ভুট্টো কী বলে বেড়াচ্ছে শুনেছিস…? ক্যাম্পেইনে সে এখনই “আমরা-ওরা” বলা শুরু করছে।’

জাফর আহত হয়। আজ সকালে গাড়িতে করে তারা যখন বেইলি রোড থেকে ফিরছিল, তারা দুজন, জাফর তখন তাদের ট্রান্সফারের খবরটা মিরাকে জানিয়েছে। রাওয়ালপিন্ডি যাচ্ছে তারা। বাবা প্রমোশন পেয়ে লাইভস্টকে জয়েন্ট সেক্রেটারি হয়েছে। এ যাওয়া কত দিনের জন্য, সে জানে না। জাফর ভেবেছিল, মিরা খুব কষ্ট পাবে। কিন্তু মিরা জানালা দিয়ে বাইরে একটা নির্বাচনী মিছিলের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিল, ‘যখন ফিরবা, দেখবা ঢাকা অনেক বদলে গেছে।’

মিরার কথায় কি কোনো ইঙ্গিত লুকানো আছে? জাফর স্ট্রামিং থামিয়ে খালি গলায় গেয়ে ওঠে :

শ্যাল উই স্টে?

উড ইট বি, উড ইট বি আ সিন?

ইফ আই কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ উইথ ইউ।

বসার ঘরের খুব কাছেই বারান্দায় একটা চেয়ারে বসেছেন আফসান চৌধুরী। তিনি জাফরের গান শুনছেন। তাঁর গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, কাঁধে তোয়ালে। আলী হোসেন ঘুরে ঘুরে তাঁর চুল কেটে দিচ্ছে।

জাহানারা বারান্দার তারে একটা চাদর নেড়ে দিতে দিতে বলেন, ‘মহল্লার নাপিতের দোকানে যেতেও তোমার কুঁড়েমি?’

আফসান মুচকি হাসেন। বলেন, ‘আলী এ মুহূর্তে ঢাকা শহরের বেষ্ট হেয়ারড্রেসার। আমার প্রশিক্ষণ।’

জাহানারা বলে, ‘তা তোমার মোগল বাদশাহরা কীভাবে চুল-দাড়ি কাটত বলো দেখি, শুনি ইতিহাস।’

আফসান জাহানারার ঠাট্টার সুরটা ধরতে পারেন। বলেন, ‘মোগল বাদশাহরা দাড়ি রাখতেন। তারপরও দাড়ি সাইজ করার জন্য শেভ তাঁদের করতে হতো। ওদের যে ক্ষুর, সেটা আসত খোরাসান থেকে। তখন সারা দুনিয়ায় সবচেয়ে ভালো স্মিথের কাজ হতো ইরানে আর রোমানিয়ায় রোমানিয়া মানে বলকান তখন অটোমানদের অংশ ছিল।’

আলী বলে, ‘ক্ষুর দিয়াই চুল কাটত?’

‘আরে ধ্যাৎ! কাঁচি ছিল। কাঁচি দুই হাজার বছরের প্রাচীন যন্ত্র। মোগল দরবারে কাঁচি আসত চীনের হ্যাংঝাউ থেকে। সেই যুগে ওরা সারা দুনিয়ায় কাঁচি সাপ্লাই দিত। সম্রাটের নাপিত কারা ছিল, জানিস?’

‘কারা, ভাইজান?’

সুরাটের একটা পার্টিকুলার কায়স্থ ফ্যামিলি, যাদের টাইটেল ছিল দেব। সম্রাটের নাপিতরা নিচুজাতের ছিল না মোটেও। দশ পুরুষ ধরে তারা রাজদরবারের নাপিত। ওই ফ্যামিলি এখন ইন্ডিয়ান ক্যাবিনেটে। তোর কি মনে হয়, তুই যেভাবে আমার চোয়ালটা ধরেছিস, ওইভাবে ওরা, মনে কর, আওরঙ্গজেবের চোয়াল ধরত? ধরার সাহস ছিল?’

‘কেমনে ধরত?’

‘স্পর্শ করত না। তারা দাঁড়াত সম্রাটের পিছনে।’

‘এহ্! পিছন থেকে কেমনে সম্ভব?’

‘খুব সম্ভব। দেখাব?’

এ সময় মিরা বারান্দায় উঁকি দেয়, ‘বাবা, নির্বাচন কি পিছিয়ে দেওয়া উচিত, তুমি কী মনে করো?

আফসান ইশারায় আলী হোসেনকে থামিয়ে বলেন, ‘কোন নির্বাচন?’

জাহানারা ফোড়ন কাটেন, ‘মোগল রাজদরবারের নির্বাচন।’

.

ঝড়ের রাতের পরের কয়েকটা দিন ফিরোজ একপ্রকার ছায়ার মতো আফসান চৌধুরীকে অনুসরণ করেছে। লোকটা কাঁচাবাজারে গেলে সে একটু দূরে ভিড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে থেকেছে। ক্লাবে হাবিবুল্লাহর সঙ্গে আফসান যখন তাঁর নিয়মিত বৈকালিক তিন গেমের দাবায় বসেছেন, ফিরোজ রিডিং রুমে এমনভাবে বসে একটা ম্যাগাজিন খুলে রেখেছে, যাতে কৌণিকভাবে তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে দেখা যায়। এমনকি ক্লাসে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহর আমল পড়ানোর ফাঁকে আফসান অনুভব করেছেন পেছনের দরজায় পাল্লার আড়ালে ওপাশে করিডরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।

এই অনুসরণ যদি তৃতীয় কোনো ব্যক্তি লক্ষ করে থাকত, তাহলে তার মনে এই সন্দেহ উঁকি দেওয়া বিচিত্র ছিল না যে প্রথমজন দ্বিতীয়জনের প্রেমে পড়েছে। তবে আফসানের পক্ষে এভাবে অনুসৃত হওয়ার উপলব্ধি অস্বস্তির পাশাপাশি একধরনের উদ্বেগেরও জন্ম দিচ্ছিল, প্রতিদ্বন্দ্বীর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগ। এত দূর থেকেও আফসান লক্ষ করতে সক্ষম হচ্ছিলেন ফিরোজের ক্রমশ ঘোলাটে হয়ে আসা দৃষ্টি আর অবিন্যস্ত চুল। অন্তত দুবার তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে উল্টো দিকে হাঁটা দিয়েছিলেন, যাতে সৌজন্য বিনিময়ের ছলে হলেও লোকটার সঙ্গে কথা বলা যায়। ফিরোজ সরে গেছে।

এভাবে একটা লোককে অনুসরণ করার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা ফিরোজের নিজের কাছে কখনো প্রয়োজন হয়নি। কেউ ব্যাখ্যা চাইলে সে অনায়াসে বলে দিতে পারত, এ ছাড়া তার কাছে অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। অন্য কী করা যেতে পারে, তা সে তখনো ভেবে বের করতে পারেনি। কিন্তু এ ব্যাপারে সে নিশ্চিত যে শ্রেষ্ঠত্বের দৌড়ে একটা লোকের কাছে হেরে যাওয়ার চেয়েও বহুগুণে অপমানজনক কিছু জগতে থাকতে পারে, আর এ কথাটা আগে জানা ছিল না তার।

সন্দেহ নেই এভাবে অনুসরণ করতে গিয়ে ফিরোজ আফসান চৌধুরী সম্পর্কে এমন অনেক তথ্য জেনেছে, অন্য অনেকের পক্ষে যা জানা সম্ভব নয়। লোকটার দৈনন্দিন অভ্যাস, এ শহরে তাঁর পরিচয়ের চৌহদ্দি কিংবা তাঁর পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে জানার ভিন্ন আর কী উপায় থাকতে পারে এ রকম নিবিড় অভিনিবেশ ছাড়া? সমস্যা একটাই : এসব তথ্য কোনো সুবিন্যস্ত ক্রমে সাজানোর সক্ষমতা ফিরোজের নেই। সেই মানসিক স্থিরতা তার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়।

.

যুক্তিহীন, বেপরোয়া অনুসরণের অষ্টম দিনে রওশন আরার বিছানায় একটা কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থেকে ফিরোজ বলল, ‘আফসান চৌধুরীর চাল আমি ধরে ফেলেছি, রওশন।’

জানালার পাশে একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে রওশন তখন ডি এইচ লরেন্সের সানস অ্যান্ড লাভারস পড়ছিল। তার কোলে একটু আগে মিক জ্যাগার বসে ছিল। সে চলে যাওয়ার পরও একটি গুটলি পাকানো উষ্ণতা থেকে গেছে।

ফিরোজ আসলে নিজের মনে কথা বলছিল। কিন্তু সে তা বলছিল রওশনের সঙ্গে কথোপকথনের ভঙ্গিতে।

রওশন একবার মুখ তুলে তাকালেও কোনো কথা না বলে পড়ায় ফিরে গেল। একটু আগে তাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছে। বসার ঘরে অ্যাশট্রেতে পার্লামেন্টের একটা ফিল্টার পড়ে থাকতে দেখে সে সরাসরি জানতে চায়, পরিমল কেন এসেছিল।

এখন কম্বলের তলা থেকে ফিরোজ বলে চলল, ‘লোকটা মিখাইল তাল নয়। ক্যাপাব্ল্যাংকাও নয়। লোকটা আসলে ইমানুয়েল লাসকার। আর এইখানেই ট্রিকটা। লাসকার মিডগেমে তুখোড়। কিন্তু এন্ডগেমে না। ফলে আমাকে আসলে যেটা করতে হবে, ওকে কোনো না কোনোভাবে এন্ডগেমে টেনে আনতে হবে। তাহলেই…’

রওশন আরা বই থেকে মাথা না তুলেই কথা বলে, ‘মিডগেম পার হবা কীভাবে?’

‘স্যাক্রিফাইস।’

.

বিকেলবেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাউঞ্জে লোক কম। আগের দিন ক্যাম্পাসে একটা মিছিলে পুলিশ গুলি চালানোর পর থেকে পরিবেশ থমথমে। শিক্ষকেরা আজ ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে গল্পগুজব করছেন। আফসান চৌধুরী আর হাবিবুল্লাহ বরাবরের মতো এক কোনায় বসে নিবিষ্টচিত্তে দাবা খেলছেন। হাবিবুল্লাহ গল্প করতে করতে চাল দিচ্ছেন। দুজনেরই মনোযোগ কথায় কম, দাবায় বেশি। ফলে তাঁদের বাক্যগুলো ছোট ছোট, অসংলগ্ন।

হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘সিন্ডিকেটের মিটিং ডেকেছেন ভিসি।’

‘তাই নাকি। কারণ? হাতিটা সামলাও।’

‘আইনশৃঙ্খলা।’

‘অবনতি?’

‘হ্যাঁ। সরিয়ে নিলাম।’

‘মারামারি?’

‘কে করবে? এনএসএফের গুন্ডারা তো আর নাই। পাসোপার্তু মরে ভূত।’

‘পাসোপার্তু কে?’

ঠিক এ সময় তাঁদের টেবিলের পাশে ফিরোজ এসে দাঁড়াবে দুজনার কেউ তা প্রত্যাশা করেনি।

আফসান ফিরোজকে ইশারায় গেমে বসতে আহ্বান জানান। কিন্তু ফিরোজ না বসে একটা অপ্রত্যাশিত কাণ্ড করে বসে। সে করতালি দিয়ে লাউঞ্জের সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খুব বেশি লোক সেখানে ছিল না। তবু ফিরোজ উঁচু গলায় বলে, ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন, একটা ঘোষণা দিতে চাই। আগামী ২ ডিসেম্বর আফসান চৌধুরীর সঙ্গে বিশেষ একটা গেমে বসতে চাই আমি।’

পাশে বসা আফসান অপ্রস্তুতভাবে বলে ওঠেন, ‘আরে, এটা কী!’

ফিরোজ তাঁকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে বলতে থাকে, দিস ইজ অফিশিয়াল। দাবা ফেডারেশনকে বলা হয়েছে। দেশের প্রধান দাবাড়ুরা থাকবেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকেও দুজন ফিদে মাস্টার আসবেন।’

আফসান উঠে দাঁড়ান; বলেন, ‘পাগল নাকি!’

ফিরোজ একই সুরে বলে, ‘এটা একটা চ্যালেঞ্জ গেম। দাবার ডুয়েল। তিন গেমের টুর্নামেন্ট। আবার বলছি, দিস ইজ অফিশিয়াল। বাকি আয়োজন দাবা ফেডারেশন করবে।’

এটুকু বলে যেভাবে ঝটিকা এসেছিল, সেভাবেই চলে যায় ফিরোজ। আফসান তাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘কিন্তু তার আগে আমাকে তো খেলতে রাজি হতে হবে।’

তাঁর কথা ফিরোজের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। সে ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে।

আফসান তাকান হাবিবুল্লাহর দিকে।

হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আপনি খেলছেন।’

আফসান চৌধুরীর কাছে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে অপমানের লাগে তা হলো তাঁর অনুমতির তোয়াক্কা না করা। শুধু এই কারণেই তিনি এ খেলায় অংশ নেবেন না বলে ঠিক করেন। রাতে সবাই মিলে তাঁকে জেঁকে ধরলেও তিনি অনড় থাকলেন। একটা কথাই তিনি ঘুরেফিরে বললেন, ‘আমি ডুয়েল লড়তে রাজি হয়েছি নাকি?’ শুধু মিরার বন্ধু মামুনের একটা কথায় তিনি টলে গেলেন।

মামুন এক কোনায় চুপ করে কিছু একটা পড়ছিল। সে উঠে এসে বলে, ‘লোকটা ইচ্ছা করেই আপনার কনসেন্ট নেয়নি, স্যার, যাতে আপনি খেলতে রাজি না হন। এর আগে উনি পাবলিকলি হেরেছিলেন না আপনার কাছে? এখন সেটার পাল্টা নিতে চান। পাবলিক জড়ো করে দেখাবেন, আপনি হাজির হননি। কাট মেরেছেন। লোকটা দেখতে পাগলাটে, আসলে শ্ৰুড।’

মাঝরাতের দিকে সাব্যস্ত হয়, আফসান খেলবেন।

.

সন্ধ্যারাতে ঘরের মূল লাইট নিভিয়ে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছে ফিরোজ। তাতে ঘরটাকে একটা গুপ্ত উপাসকের ডেরা বলে মনে হচ্ছে। বিছানার ওপর আধশোয়া ফিরোজ। পরনে পায়জামা আর হাফ হাতা স্যান্ডো গেঞ্জি। গালে বেশ কয়েক দিনের শেভ না করা দাড়ি।

বিছানার সামনে একটা চেয়ারে কর্নেল মঈনুদ্দিন বসা। একই রকম ঋজু ভঙ্গিতে বসে আছেন। তাঁর ইউনিফর্ম কয়েক জায়গায় ছেঁড়া। মাথায় টুপি নেই। চুল আলুথালু, তাতে কয়েকটা শুকনা পাতা ও ঘাস লেগে আছে।

কর্নেল আজ চুপ মেরে আছেন।

কোনো দিকে না তাকিয়ে বিড়বিড় করে বাংলায় বলছে ফিরোজ, ‘কোনো ইন্ডিয়ান সোলজার ধরা পড়ে নাই, বাবা। গুরবত সিংয়ের ব্যাপারটা তোমার বানানো। আমি জানি। এটা একটা ইনভার্স মেমোরি। কী হয়েছিল আমি বলি। অফিশিয়াল রেকর্ড থেকে বলছি। পাঞ্জাব ফ্রন্টে সীমান্তের ওপারে পাকিস্তানের সতেরো সোলজার ধরা পড়েছিল। তাদের মধ্যে একজন অফিসারও ছিল। ইন্ডিয়ান ক্যাম্পে সেই অফিসারকে ইন্টারোগেট করা হয়। মানে টর্চার। যিনি ইন্টারোগেট করেছিলেন, তাঁর নাম ছিল মেজর গুরবত সিং। আরও শোনো…না, মাথা ঝাঁকিয়ো না, শুনতে হবে…যে-পাকিস্তানি অফিসারকে টর্চার করা হয়, তার নাম কর্নেল মঈনুদ্দিন। উপাধি বেগ। কোনোভাবে মঈনুদ্দিনের স্মৃতিটা উল্টে গেছে। যুদ্ধে এমন হয়, বাবা। স্মৃতি রিভার্স হয়ে যায়।’

প্রবলভাবে মাথা নাড়লেও কর্নেল মঈনুদ্দিন চুপ করে শুনতে থাকেন। ফিরোজ আরও কিছু বলত। থেমে যায়। হুইলচেয়ার চালিয়ে ফিরোজের দরজায় এসে থেমেছেন সালমা।

ফিরোজ বলে, ‘কী, মা?’

সালমা বলেন, ‘লোকটাকে চ্যালেঞ্জ করে ঠিক করিসনি ফিরোজ। ইফ ইউ লুজ, ইউ লুজ এভরিথিং।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%