শোধ – ১

শিবব্রত বর্মন

দাবা এক হিংস্র খেলা। যে বোঝে সে জানে।

বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। দুটি লোক মুখোমুখি বসা। চুপচাপ। নিশ্চল। যেন পাথরে খোদাই দুটি সৌম্য মূর্তি। অথচ তাদের মগজ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। সামনে ছড়িয়ে থাকা ঘুঁটিগুলো এমনই ধুন্ধুমার লড়াইয়ে অবতীর্ণ যে সেগুলোর হাতে তরবারি থাকলে ঝনঝন আওয়াজ উঠত, কামান ও গোলাবারুদ থাকলে প্রকম্পিত হতো চারদিক।

এ দেশে একদা আফসান চৌধুরী ও ফিরোজ আহসান বেগ নামের দুই দাবাড়ু ছিলেন। তাঁদের কথা ভুলে যাওয়া কঠিন। দাবার বোর্ডে তাঁদের লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত সুবিদিত। কেউ কেউ বলেন, রেকর্ড রাখা হলে তাঁদের অনেক গেম ক্ল্যাসিকের মর্যাদা পেত। কিছু চাল মিখাইল তালকেও তাক লাগাত। কিছু পাতা ফাঁদ ভুরু কুঁচকে দিত পল মরফির। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের ভেতরে জন্ম নেওয়া কিংবদন্তি। অনেকে জানে। অনেকে জানে না। তবে যে কথাটা নিশ্চিতভাবে সবার অগোচর, তা হলো, দুজনার এ দ্বৈরথ শেষ পর্যন্ত আর দাবার বোর্ডে সীমিত থাকেনি। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাঁদের জীবনে জন্ম দিয়েছিল তিক্ত রেষারেষির। সেটা অনেক দূর গড়িয়েছিল। দেশে তখন একটা রক্তাক্ত যুদ্ধ চলছিল বলে কেউ তা লক্ষ করেনি। আবার এ-ও ঠিক, যুদ্ধের কারণেই এ দ্বন্দ্ব এত রক্তমাখা হয়েছিল।

আফসান চৌধুরীর সঙ্গে ফিরোজ বেগের প্রথম দেখা ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাসে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের প্রশস্ত হলরুমে। সেই সাক্ষাৎ কম নাটকীয় ছিল না। শীত পড়তে তখনো দেরি হলেও আফসান চৌধুরী তাঁর খয়েরি কুর্তার ওপর একটা গেরুয়া-ধূসর আলোয়ান জড়িয়ে ছিলেন। প্রশস্ত কক্ষে দরজা থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী কোনায় নিচু সোফায় বসে একটু সামনে ঝুঁকে তিনি দাবা খেলছিলেন নিয়াজ নামের ১১ বছরের এক বালকের সঙ্গে। সে অর্থে সেটা কোনো গেম ছিল না। নিয়াজকে দাবার কিছু কৌশল শেখাচ্ছিলেন আফসান চৌধুরী। সামনে কাঠের ছোট তেপায়া টেবিলে একটা বড় চামড়ার বোর্ড টায়েটোয়ে এঁটে যায়। তার ওপাশে একটা টুলে বসা নিয়াজ। একটা হাই-নেক ফুল স্লিভ টি-শার্ট পরা শিশুটির মধ্যে এই বয়সেই দাবার প্রতিভা উঁকি দিতে শুরু করেছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে গুঞ্জন। ফলে তাকে আফসান চৌধুরীর সান্নিধ্যে আনার কাজটি প্রায় নিয়মিত করছেন তার অভিভাবক। নিয়াজকে পছন্দ করতে শুরু করেছেন আফসান চৌধুরী।

এ দুই অসমবয়সী দাবাড়ুকে ঘিরে একটা অর্ধবৃত্ত রচনা করে দাঁড়িয়ে ও বসে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষক। দুজন কর্মচারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের কয়েকজন শিক্ষার্থীও ছিলেন সেখানে শিক্ষার্থীরা রাজনীতিতে সক্রিয় এক শিক্ষকের সঙ্গে জরুরি কাজে দেখা করতে এসে কৌতূহলী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তাঁদের সবারই যে দাবায় উৎসাহ এমন নয়। ঘটমান যেকোনো কিছুকে ঘিরে ধরাই বেশির ভাগের মূল প্রণোদনা।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানো ফিজিকসের মির্জা হাবিবুল্লাহ অবশ্য দাবা বোঝেন। তিনিই নিয়াজের অভিভাবক। একটু ঝুঁকে গভীর অভিনিবেশে তিনি খেলা দেখছিলেন। অন্য দিনে বিকেলবেলা আফসান চৌধুরীর সঙ্গে তিনটি করে গেম খেলেন তিনি। বেশির ভাগ দিন তিনটিতেই হারেন। কোনো কোনো দিন একটি ম্যাচ ড্র হয়। সেই ড্রয়ের পেছনে হাবিবুল্লাহর কোনো অবদান থাকে না। তৃতীয় গেমটিতে আফসান চৌধুরী খুব বেপরোয়া নিরীক্ষামূলক কিছু চাল দেন। দুম করে মন্ত্রী বা নৌকা খেতে দেন। ক্যাসলিং না করে রাজার সামনের বড়ের সারি অরক্ষিত করে ফেলেন। গেম যখন হাতের নাগালের বেশ খানিকটা বাইরে চলে যায়, তিনি রাশ টানেন। শেষ মুহূর্তে চেষ্টা করেন গেমটাকে বাঁচাতে। সেই গেমগুলো ড্র হয়। এ রকম বেপরোয়া চালে প্রতিপক্ষের অহম্ আহত হওয়ার কথা। তবে হাবিবুল্লাহ সমীহ-মাখানো কণ্ঠে বলেন, ‘প্রতিভার বিপুল অপচয়।’ কাঠের ঘুঁটিগুলো কৌটায় তুলে রাখতে রাখতে মাথা দুলিয়ে কয়েকবার বলেন তিনি কথাটা, তাতে মনে হয় দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে কথাটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

আফসান চৌধুরী কৌতুকের স্বরে বলেন, ‘অপচয় কেন?’

হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আপনার টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া উচিত। ন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল।’

হাবিবুল্লাহর অবশ্য ধারণা নেই দাবার জাতীয় বা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট কোথায় হয়, কীভাবে হয়। তবে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, দেশে এমন কোনো দাবাড়ু নেই যে আফসান চৌধুরীকে হারাতে পারে।

হাবিবুল্লাহর ভাইয়ের ছেলে নিয়াজ। তাকে তিনি আফসান চৌধুরীর কাছে নিয়ে আসতে শুরু করেছেন মাসখানেক ধরে, যদি আফসান চৌধুরীর জ্বলন্ত প্রতিভার কিছু স্ফুলিঙ্গ ছেলেটার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়।

এ মুহূর্তে নিয়াজের সঙ্গে মকশো গেমটা প্রায় মাঝামাঝি পর্যায়ে। আফসান চৌধুরী একটু পরপর চাল ফিরিয়ে দিচ্ছেন। দু-তিন চাল পরপর সম্ভাব্য আক্রমণ বুঝিয়ে দিচ্ছেন। কোনো ফাঁদ পাতলে সতর্ক করছেন।

দাবার সেটটা শৌখিন ও দামি। এটার মালিক হাবিবুল্লাহ। তাঁর এক আত্মীয় মাসখানেক আগে করাচির জয়নাব মার্কেট থেকে এ সেট কিনে এনেছেন। ইয়র্কশায়ারের এক কোম্পানির বানানো। প্রথম দিন ক্লাব লাউঞ্জে বক্স খোলার পর ঘুঁটিগুলো একটা একটা করে হাতে নিয়ে আফসান চৌধুরী জানালার আলোর দিকে তুলে ধরে এমন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছিলেন, যেন জহুরি অলংকার দেখছে।

নিয়াজকে আজ সাদা ঘুঁটি দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর রং মোটেও সাদা নয়, কমলা হলুদ, সাহেবরা যাকে স্কুলবাস কালার বলে। আফসান চৌধুরী খেলছেন কালো নিয়ে। তাঁর ঘুঁটিগুলোর রংও কালো নয়, লালচে খয়েরি। সাহেবরা একে বার্গান্ডি কালার বলে, ঘুঁটি হাতে হাবিবুল্লাহকে প্রথম দিন বলেছিলেন আফসান চৌধুরী। এগুলো যে একাশিয়া কাঠের, সেটাও তাঁর কাছ থেকেই জানা। ইউরোপের বেশির ভাগ ঘুঁটি রোজউড অথবা মেহগনি কাঠ দিয়ে বানানো হয়।

ঘুঁটিগুলোর নকশা লক্ষ করেন,’ আফসান চৌধুরী আরও বলেছিলেন, ‘ঘোড়ার ঘাড় নরমালের চেয়ে লম্বা, একটু ডানে কাত করা। রুশ বিপ্লবের আগে পর্যন্ত এটা ইস্ট ইউরোপের দেশগুলোর ট্র্যাডিশন ছিল। রাজার মাথার মুকুটটা দেখেন। কোনো ক্রুশ নেই। তার বদলে তিনটা ত্রিভুজাকৃতি চূড়া। অনেকটা বাইজান্টাইন সম্রাটদের মুকুটের মতো। খোঁজ নেন, এই কোম্পানির মালিকের অরিজিন ইস্ট ইউরোপের কোথাও।’

প্রথম দিনের গর্বিত প্রদর্শনীর পর হাবিবুল্লাহ সেটটা আনা বন্ধ করেন। পল্টনের দোকান থেকে কেনা পুরোনো সেটটাই আবার তাঁর বগলে দেখা যেতে থাকে, যেটার ঘুঁটিগুলো প্লাস্টিকের। আফসান চৌধুরী খোঁটা দেওয়ায় পরের সপ্তাহ থেকে তিনি দামি সেটটা আবার আনতে শুরু করেন বটে, তবে কালো চামড়ায় মোড়ানো সুদৃশ্য কেসের বদলে ঘুঁটিগুলো কাউ অ্যান্ড গেট নামে একটি গুঁড়া দুধের টিনের কৌটায় ভরে আনেন। এ নিয়ে আফসান চৌধুরীর অজস্র খোঁটা হাবিবুল্লাহকে আর উদার করতে পারেনি।

আফসান চৌধুরী আরেকটু ঝুঁকে এসে ঘোড়া দিয়ে নিয়াজের রাজার দিককার হাতিটাকে ধরলেন। চাল দেওয়ার সময় তিনি অনবরত বিড়বিড় করে কথা বলছেন, ‘নাও, এখন হাতি সরাও। কোথায় সরাবা দেখি।’

নিয়াজ প্রথমটায় বুঝতে পারল না সমস্যাটা কোথায়। সে ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘হাতি সরানোর তো অনেক জায়গা।’

‘অনেক জায়গা। সরাও না। তারপর কী হয়, দেখবা।’

‘কী দেখব?’

‘দেখবা।’

নিয়াজ সোজা হয়ে বসে। চাচার দিকে তাকায় একবার, যেন সাহস চায়। তারপর বলে : ‘আবার ট্র্যাপ?’

ট্র্যাপ তো বটে। তোমার মন্ত্রী খাব, নিয়াজ। আর চার চালে।’

‘ওহ্। তাহলে আমি হাতি সরাচ্ছি না।’

‘তাহলে হাতিও যাবে, মন্ত্রীও যাবে।’

‘তাহলে?’

‘ঠিক করো। বাঁচার একটাই চাল আছে। ভাবো।’

নিয়াজ মনোযোগ দিয়ে বোঝার চেষ্টা করে কোন চালটা সে দেবে। একবার সে হাতিটা ধরে। আরেকবার মন্ত্রী সরাবে বলে ঠিক করে।

এমন সময় ভিড়ের মধ্য থেকে একটা প্রসারিত হাত নেমে এসে নিয়াজের মন্ত্রীর সামনে একটা সাদা ঘোড়া রাখে। সেই হাতের কবজিতে পান্নারঙা ডায়ালের টাইমেক্স ঘড়ি। হাতের মালিক বলল, ‘নাইট জি-ফাইভ।’

আফসান চৌধুরী অবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকান। ধূসর জ্যাকেট পরা লোকটা প্রায় ছয় ফুট লম্বা। স্বাস্থ্যবান। ভিড়ের লোকজনকে সরিয়ে বছর চল্লিশেক বয়সী লোকটা কখন ঝুঁকে খেলা দেখতে শুরু করেছে, কেউ খেয়াল করেনি। যারা খেয়াল করল, তাদের মুখে শ্রদ্ধা মাখানো একটা বিস্ময়ধ্বনি। হাবিবুল্লাহ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘ফিরোজ বেগ। কী সৌভাগ্য আমাদের!’

এভাবে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে ফিরোজ আহসান বেগ নিজেকে হাজির করে আফসান চৌধুরীর সামনে। ভিড়ের অনেকে তাকে চিনেছিল। কেননা দুদিন আগে কয়েকটি পত্রিকার ভেতরের পাতায় ফিরোজের ছবি এসেছে। করাচিতে তৃতীয়বারের মতো পাকিস্তান ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়ের পর সে যে দম্ভোক্তি করেছে, তা দাবা কমিউনিটির বাইরে জনপরিসরেও মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মুলতানের দাবাড়ু হাসান তাওহিদ ঈমামকে শেষ গেমে ২৬ চালে মাত করে চেস ক্লকের স্টপ বাটনে চাপ দিয়ে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করে ফিরোজ নাকি ইংরেজিতে বলেছে, ‘চেস ইজ বিকামিং আ বোরিং গেম ফর মি।’

আফসান চৌধুরী ফিরোজকে চেহারায় না চিনলেও হাবিবুল্লাহর মুখে নাম শোনামাত্র বুঝতে পারলেন। তিনিও উঠে দাঁড়িয়ে হাত মেলালেন। বললেন, ‘আপনি আমাদের ইউনিভার্সিটির গর্ব।’

ফিরোজের চেহারায় একটা দুর্বিনীত ভাব আছে, তা আফসান চৌধুরীর নজর এড়াল না। তার পোশাক কেতাদুরস্ত হলেও পরিপাটি নয়, অযত্নের ছাপ আছে। গলায় বেঁধে রাখা নেকারচিফের বাঁধুনি শিথিল। মাথার চুল অবিন্যস্ত। গালে মিহিদানার মতো লেগে থাকা দাড়ি জানাচ্ছে লোকটা শেভ করে না রোজ। আর সবচেয়ে বেশি যা চোখে পড়ে, তা লোকটার অস্থির চাহনি। কেমন ফাঁপা চাহনি, যেন তাকাচ্ছে, কিন্তু দেখছে না।

আফসান চৌধুরী দীর্ঘদেহী লোকটাকে বসতে বললেন। আর বললেন, ‘ম্যাথমেটিকস, রাইট?’ তিনি লোকটার ডিপার্টমেন্টের প্রসঙ্গে কথাটা বলেছেন।

ফিরোজ দাঁড়িয়ে থেকেই বলল, ‘রাইট। দ্য ফ্যাক্ট ইজ, দাবা যতটা না ইতিহাস, তার চেয়ে বেশি গণিত।’ মন্তব্যটা স্পষ্টত আফসান চৌধুরীর বিভাগের প্রতি ইঙ্গিত।

হাবিবুল্লাহ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, ফিরোজ তার আগে বলে উঠল, ‘একটা গেম হোক।’ তার বলার মধ্যে কোনো চ্যালেঞ্জের সুর ছিল না। আবার পুরোপুরি অনুরোধও ছিল না সেটা। আফসান চৌধুরী ও হাবিবুল্লাহ অনুভব করলেন, প্রস্তাব, অনুরোধ আর চ্যালেঞ্জের মাঝামাঝি কিছু একটা ধ্বনিত হয়েছে রবাহূতের কণ্ঠে।

পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াচ্ছে, আফসান চৌধুরী অনুমান করতে পারলেন না। এমন অকস্মাৎ বিকেলে দাবার দিগবিজয়ী বীরের সঙ্গে খেলতে বসার কোনো অভিলাষ তাঁর ছিল না। তিনি অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, ‘এখন?’

‘হোয়াই নট?’

আফসান চৌধুরী আজ আগেভাগে উঠবেন ঠিক করেছিলেন। সিদ্ধেশ্বরীতে বিয়ের দাওয়াত আছে। সে কথাটা তিনি বললেন আমতা- আমতা করে।

হাবিবুল্লাহ লাফিয়ে উঠলেন, ‘চুলায় যাক বিয়ে। গেম হবে। আপনি বসেন।’

ফিরোজ মুখে একটা মৃদু, প্রায় অদৃশ্য হাসি ঝুলিয়ে রেখে বলল, ‘ওয়ান গেম। বেশিক্ষণ লাগবে না।’ এবার তার কণ্ঠে অনুরোধের সুর থাকলেও তাতে মেশানো প্রকট তাচ্ছিল্য কারও নজর এড়াল না।

এরপর হাবিবুল্লাহর উদ্দীপ্ত সক্রিয়তা শুরু হলো। টুলসহ ভাতিজাকে সরিয়ে সেখানে একটা চেয়ার পাতার ব্যবস্থা করলেন তিনি। বোর্ডে ঘুঁটিও তিনিই সাজাতে শুরু করলেন, যেন তিনি এই গেমের অঘোষিত রেফারি।

ফিরোজ চেয়ারে বসামাত্র সবাই হাততালি দিতে থাকে। কেন, কিসের এ হাততালি, কেউ বলতে পারবে না। তালির শব্দে আরও কিছু কৌতূহলী লোক এসে জটলা বাড়াল।

আফসান চৌধুরী বিব্রত হয়ে চারদিকে তাকান। দাবার কম্পিটিশন এবং তাঁকে ঘিরে আয়োজন পরিহার করেন তিনি। এমনকি ইউনিভার্সিটির ইনডোর গেমসে তিনি শুধু যে অংশ নেন না তা-ই নয়, সেগুলো দেখতেও যান না।

ফিরোজ খুব আচার মানা ভঙ্গিতে একটা সাদা ও একটা কালো বড়ে হাতে নিয়ে সেটাকে হাতের তালুতে শাফল করে দুই মুঠোয় দুটো বড়ে লুকিয়ে হাত ক্রস করে আফসান চৌধুরীর দিকে ধরে।

আফসান চৌধুরী একটা মুঠোয় টাচ করেন। ফিরোজ মুঠো খুললে দেখা যায় সেটায় একটা কালো বড়ে।

হাবিবুল্লাহ সাজানো বোর্ড ঘুরিয়ে কালো ঘুঁটির দিকটা আফসান চৌধুরীর দিকে এনে দেন।

ফিরোজ ঘড়ি দেখে। বলে, ‘দুই ঘণ্টায় ৪০ মুভ। চলবে?’

ঘড়ি ধরে দাবা খেলার অভ্যাস আফসান চৌধুরীর নেই। একবার তিনি ভাবেন উঠে হাঁটা দেবেন। বিয়ের দাওয়াতের অজুহাত তত মামুলি নয়। অথচ তিনি যন্ত্রচালিতের মতো মাথা নেড়ে সায় দেন।

ফিরোজ তার জ্যাকেটটা খুলে চেয়ারের পেছনে ঝুলিয়ে রাখে। ফুল স্লিভ শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটায়, যেন দাবার ম্যাচ নয়, সে নেমে পড়েছে বক্সিং রিংয়ে।

অধ্যায় ১ / ১৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%