শিবব্রত বর্মন
রাতে গভীর ঘুম দেয় ফিরোজ।
তিন রাতের অনিদ্রা সে পুষিয়ে নেয় টানা ১৭ ঘণ্টা ঘুমিয়ে। পরদিন বিকেলে শোবার ঘর থেকে যখন সে বের হয়, চুল আলুথালু, চোখ ফোলা, শরীরজুড়ে ক্লান্তি। সে স্বপ্নাবিষ্টের মতো হাঁটে।
টেবিলে তার জন্য চা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন সালমা। তাঁর হাতে পাকিস্তান অবজারভার। প্রায় পুরো পত্রিকাজুড়ে নির্বাচনী প্রচারাভিযান। খেলার পাতায় একেবারে নিচের দিকে একটা নিউজের শিরোনাম ‘চেস চ্যাম্পিয়ন ডিফিটেড ইন আ চ্যালেঞ্জ গেম।
সালমা বলেন, ‘শুড আই রিড ইট টু ইউ?’
ফিরোজের মধ্যে একটা গা-ছাড়া নির্জীবতা। সে বলে, ‘পড়ো।’
সালমা শব্দ করে পড়তে শুরু করেন, ‘অল পাকিস্তান ন্যাশনাল চেস চ্যাম্পিয়ন ফিরোজ আহসান বেইগ, হু হ্যাজ বিন হোল্ডিং দ্য টাইটেল ফর দ্য লাস্ট থ্রি কনজেকিউটিভ ইয়ারস, লস্ট ইয়েস্টারডে টু আ ম্যান আননোন টু দ্য চেস কোয়ার্টারস। দ্য ইভেন্ট টুক প্লেস…..
ফিরোজ বাধা দেয়, ‘হয়েছে। থামো।’
সালমা বলেন, ‘আর দুটা লাইন পড়ে শোনাই, শেষের প্যারার। কাজী মোতাহার হোসাইন, দ্য চেস লেজেন্ড, হু অলসো হেল্ড দ্য টাইটেল ফর ওভার আ ডিকেইড, সেইড, হি ওয়াজ সারপ্রাইজড বাই দ্য ডিসরাপটিভ ইনসিডেন্ট, হুইচ আনফোলডেড দিস ইভনিং ইন ফ্রন্ট অব হিজ আইজ। ইট ড্রাগস আস টু দ্য আনকমফোর্টেবল কনফিউশন অ্যাজ টু হু ইজ দ্য রিয়াল ন্যাশনাল চেস চ্যাম্পিয়ন নাউ। আমি আবার পড়ি…হু ইজ দ্য রিয়াল চেস…’
ফিরোজ কিছু না বলে ধীর পায়ে উঠে নিজের ঘরে চলে যায়। তাকে দেখে মনে হয় এখনো তার ঘুম ভাঙেনি।
ঘরের ভেতরে প্রবল শব্দে কিছু ভেঙে পড়ে।
পুরো বাড়ি কেঁপে ওঠে
.
সন্ধ্যার পরপর ফিরোজদের ফুলার রোডের বাসায় এসে হাজির হন আফসান চৌধুরী। ফিরোজ দরজা খুলে অবাক হয়ে যায়।
‘আপনি?’
‘ভেতরে আসতে বলবা না?’
ফিরোজ দ্বিধা করে। তাকে একপ্রকার ঠেলে সরিয়ে ভেতরে পা রাখেন আফসান। ঢুকে তিনি অবাক হয়ে যান। সারা বাসা লন্ডভন্ড। বসার ঘর পর্যন্ত একটা যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে আছে। মেঝেতে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে চিনামাটির দামি ফুলদানি। আরও নানান জিনিসপত্র, শোপিস ছড়ানো-ছিটানো। আর মেঝেভর্তি অজস্র বই : কোনোটার কাভার ছেঁড়া, কোনোটার পাতা কুটি কুটি করে কাটা, কোনোটা দেখে মনে হয় আগুন ধরানোর চেষ্টা করা হয়েছে। দেয়ালের প্রায় সব ছবির কাচ ভাঙা।
আফসান হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন।
অতিথির আওয়াজ শুনে হুইলচেয়ারে নিজের ঘরের বাইরে আসেন সালমা। আফসানের পরিচয় তিনি অনুমান করে নেন। বলেন, ‘লুক, হোয়াট হ্যাভ ইউ ডান টু মাই সান, টু আস।’
তারপর জবাবের অপেক্ষা না করে তিনি হুইলচেয়ার চালিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে যান।
আফসান চৌধুরী সাবধানে পা ফেলে, জিনিসপত্রের ঠোক্কর এড়িয়ে সোফায় গিয়ে বসেন।
ফিরোজ বসে পাশের একটা সোফায়।
কিছুক্ষণ দুজনের মধ্যে কোনো কথা হয় না। পুরো বাড়িটা নীরব। একটা ঘড়িও টিকটিক করছে না। সুমি একবার রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে সরে গেছে। সারা বাসায় সে-ই একমাত্র সচল ব্যক্তি।
ফিরোজ নীরবতা ভাঙে, ‘আপনি জিতেছেন। আমি দুঃখিত, আপনাকে অভিনন্দন না জানিয়ে ওভাবে চলে এসেছি। কনগ্র্যাচুলেশনস। পত্রিকাগুলো সবাই আমার পরাজয় নিয়ে লিখেছে। আপনার জয় নিয়ে প্রায় কিছুই লেখেনি। অন্যায়। এখন দয়া করে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।’
আফসান বলেন, ‘সান্ত্বনা আমি দেব না। তবে আমি দাবার বাইরেও কোনো কথা বলব না। আজকের খেলায় আমার কিছু অবজারভেশন তৈরি হয়েছে। সেগুলো তোমাকে বলতে এসেছি। তোমার কাজে লাগবে, হয়তো। কারণ, তুমি কম্পিটিটিভ এরানায় খেলো। আমি না।’
‘হ্যাঁ। আর সেই এরানায় আমি চ্যাম্পিয়ন, আপনি নন।’
‘তুমি আমার কাছে হেরেছ।’
ফিরোজ তাকিয়ে থাকে। কথাটা সে সরাসরি প্রথমবারের মতো শুনল আফসান চৌধুরীর মুখে।
আফসান বলেন, ‘তোমার খেলা আমাকে যদি মূল্যায়ন করতে বলো, আমি বলব, তুমি আমার কাছে যতটা না কৌশলে হেরেছ, তার চেয়ে বেশি হেরেছ অ্যাটিচ্যুডে। দাবার ব্যাপারে তোমার অ্যাপ্রোচটাই ভুল।’
‘কোনটা ভুল?’
‘তুমি প্রতিপক্ষকে শত্রু জ্ঞান করো। দাবা কোনো ব্যাটলফিল্ড না।’
‘দাবা কী তাহলে?’
‘দাবা একটা কনভারসেশন।’
‘বিটুইন?’
‘বিটুইন টু পারসোনালিটিজ।’
ফিরোজ তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, ‘আপনি জিতেছেন। আপনার কথা মানতে হবে।’
দেয়ালে এক সেনা কর্মকর্তার ছবি। উর্দি পরা। লোকটা একটা হেলিকপ্টার থেকে নামছে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে থেকে আফসান বলেন, ‘একটা গেম হোক?’
ফিরোজ প্রস্তুত ছিল না। সে কিছুটা বিব্রতও হয়। বাসায় এ মুহূর্তে কোনো দাবার বোর্ড অক্ষত নেই। আফসান চৌধুরী তাকিয়ে দেখেন মেঝেতে অজস্র দাবার ঘুঁটি পা দিয়ে মাড়িয়ে ছাতু করা হয়েছে। পাথরের ঘুঁটিগুলোরও মাথা ভাঙা।
আফসান মেঝে থেকে একটা ক্ষতবিক্ষত বোর্ড তুলে সেন্টার টেবিলে রাখেন। বলেন, ‘ঘুঁটির দরকার হবে না।’
‘আমি ব্লাইন্ডফোল্ড পারি না।’
‘আমি শিখিয়ে দিব। কিন্তু তার আগে চলো বাইরে হেঁটে আসি। এখানে দম বন্ধ লাগছে।’
.
ডিসেম্বরের সন্ধ্যারাতে ফুলার রোডের সুনসান তরুবীথি চিরে দুটি প্রাণী হাঁটতে বেরোয়। স্ট্রিটলাইট অধিকাংশই জ্বলে না। তার আবছা আলোয় একটা দীর্ঘ নীলচে কুয়াশা উঁচু গাছের ডালপালার ফাঁকে অজগর সাপের মতো শুয়ে আছে। একটাই কুয়াশা যেন টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে আছে বিভিন্ন দিকে।
আফসান চৌধুরী ফিরোজকে শেখাচ্ছেন কীভাবে চোখ বন্ধ করে মনের ভেতরে ৬৪টা ঘর আর ৩২টা ঘুঁটির ছবি এঁকে নিতে হয় আর তারপর প্রতিটি চালের ছবি কীভাবে এক একটা ফ্রেমে সাজিয়ে রাখতে হয় স্মৃতির ভান্ডারে।
‘ব্লাইন্ডফোল্ড দাবা হলো চিন্তা, স্মৃতি আর কল্পনাশক্তির এক অদ্ভুত বিনিময়,’ আফসান চৌধুরী বলেন। ‘তুমি হয়তো ভাবছ, স্মৃতির ওপর চাপ পড়বে এতে। আসলে এটা যতটা না স্মৃতির কাজ, তার চেয়ে বেশি কল্পনাশক্তির ব্যাপার। তোমাকে মনশ্চক্ষে দাবার বোর্ডটা দেখতে পারতে হবে। স্পষ্টভাবে, টলটলে পানির তলে যেভাবে ভেসে ওঠে ওপরের গাছের, ডালপালার ছবি, এমনকি কোনো ডালে যদি কোনো পিঁপড়াও হেঁটে যায়, সেই ছবিও পানিতে পড়বে, যদি পানি পরিষ্কার হয়। মনটাকে যত আয়নার মতো করতে পারবা, তত ব্লাইন্ডফোল্ড দাবা ইজি হয়ে যাবে তোমার কাছে। আর এর জন্য যেটা দরকার, সেটাকে তুমি বলতে পারো ধ্যান।
‘ইন ফ্যাক্ট ধ্যান থেকেই এটার শুরু। দূর অতীতে তিব্বতের কোনো বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়তো হিমালয়ের কোনো সুউচ্চ মঠে কোনো অলস দুপুরে স্রেফ ধ্যানের টুলস হিসেবে এ কৌশল আবিষ্কার করেছিল। ভিক্ষুরা যে নিয়মিত দাবা খেলত, সে উল্লেখ নানান সূত্রে পাওয়া যায়। আমরা তো আট-আট চৌষট্টি ঘরের দাবা খেলি। ভিক্ষুরা দশ-দশ এক শ ঘরের দাবা বানিয়ে নিয়েছিল। আর দাবাকে তারা বলত চান্দারাকি। বোঝা যায় শতরঞ্জ শব্দটার অপভ্রংশ। ভারত থেকেই তিব্বতে দাবা গেছে। দেখবা মারি সাহেব তাঁর দাবার ইতিহাস বইয়ের এক জায়গায় এক ব্রিটিশ অভিযাত্রীর কথা উল্লেখ করেছেন, যিনি মঙ্গোলিয়ার এক দুর্গম, বিরান পাহাড়ে পাশাপাশি ঘোড়ায় চড়ে যেতে থাকা দুই সৈন্যকে মুখে মুখে দাবার চাল দিতে দেখেছেন। তারা ব্লাইন্ডফোল্ড দাবা খেলছিল।
‘মরফির কথা তোমাকে তো বলেইছি। আলেখাইন শিকাগোতে একসঙ্গে বত্রিশ জনের সঙ্গে ব্লাইন্ডফোল্ড চেস খেলছিলেন। চিন্তা করে দেখো। বত্রিশ জন! তবে এদের অনেক আগে ব্লাইন্ডফোল্ডের প্রথম রেকর্ডেড কেস কোথায় পাওয়া যায়, জানো? মধ্যপ্রাচ্যে। সাঈদ বিন জুবায়ের নামের এক মুসলিম দাবাড়ু এটা খেলেছিলেন বলে ওই সময়কার দলিলপত্রে আছে। উনি হজরত মুহাম্মদ-এর (সা.)-এর মাত্র এক শতাব্দী পরের লোক। এখন আসো। শুরু করি। চোখ বন্ধ করো…’
.
সপ্তাহখানেক পর একদিন ভোরবেলা আফসান চৌধুরীর বাসার ডোরবেল বাজে। আফসান ও জাহানারা তখনো ওঠেননি। মিরা উঠে বারান্দার গাছে পানি দিচ্ছিল।
দরজা খুলে মিরা দেখে সফেদ পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা ফিরোজ দাঁড়ানো।
ফিরোজ বলে, ‘আফসান স্যার আছেন?’
আফসান চৌধুরীকে ঘুম থেকে তোলা হয়। তিনি একটা ফতুয়া পরে এসে ফিরোজের সামনে বসেন। বাসায় ততক্ষণে আপ্যায়নের ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে। অতিথি যে চা ও কফি কোনোটাই খায় না, সেটা আর জানানোর সময় পেলেন না আফসান।
ফিরোজ কিছুটা সংকোচের স্বরে বলে, ‘সরি, বেশি সকাল হয়ে গেছে।’
‘ঠিক আছে। আমি এ রকম সময়েই উঠি।’
ফিরোজ এবার সরাসরি আসার হেতুতে চলে যায়, ‘একটা গেম হতে পারে?’
আফসান হেসে ফেলেন, ‘অফকোর্স।’
টি টেবিলে দাবার বোর্ড সাজানো হয়। সেই হারানো নৌকাটা পাওয়া গেছে, বসার ঘরের ডিভানের নিচ থেকে।
ফিরোজ সাদা নেয়। আফসান কালো। কিন্তু চাল দেওয়ার আগে ফিরোজ একটা অপ্রত্যাশিত কাজ করে। চেয়ারটা ঘুরিয়ে দাবার বোর্ডের দিকে পিঠ দিয়ে বসে সে। বোর্ডটাকে সে দেখতে পাচ্ছে না।
ফিরোজ না দেখে চাল বলে। আফসান চৌধুরী মুচকি হেসে ফিরোজের চালটা দেন। তারপর নিজের চাল দিয়ে চালটা উচ্চারণ করেন।
ফিরোজের খেলা দেখার জন্য মিরা পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল। ফিরোজ চেয়ার উল্টো দিকে ঘোরানোয় সে মিরার মুখোমুখি হয়ে যায়। এই প্ৰথম মিরার পূর্ণাবয়ব তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
.
ফিরোজকে ব্লাইন্ডফোল্ডের নেশা পেয়ে বসে।
পরবর্তী দুমাস এ দুজনকে যত্রতত্র দেখা যেতে থাকে বিড়বিড় করে চাল বলতে, যেন ভূতগ্রস্ত দুটি লোক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষক মহলের আলোচনায় সম্প্রতি এ রকম একটি দৃশ্যের কথা প্রায়ই উঠে আসছে, যেখানে এক প্রৌঢ় শিক্ষক ক্লাসরুমে মুর্শিদকুলি খাঁর আমলের বাংলা অঞ্চল পড়ানোর সময় এক পিয়ন এসে তাঁর হাতে ছোট্ট একটা চিরকুট ধরিয়ে দিয়েছেন, যাতে লেখা, ধরা যাক, ‘এন-ডি৭’। প্রত্যুত্তরে ওই শিক্ষক আরেকটি চিরকুটে চাল লিখে সেটা তুলে দিয়েছেন পিয়নকে। পিয়ন ছুটতে ছুটতে কয়েক ভবন পরের একটি ভবনের কোনো একতলার কোনো এক ক্লাসরুমে ঢুকেছে, যেখানে ব্ল্যাকবোর্ডে ইউলারের টপোলজি বোঝাচ্ছেন আরেক তরুণতর শিক্ষক। চিরকুট হাতে নিয়ে এই দ্বিতীয় শিক্ষক আরেকটি চিরকুট লিখে দিয়েছেন। সেটা নিয়ে পিয়ন আবার ছুটেছে প্রথম শিক্ষকের ক্লাসে।
কেউ কেউ বলেন, দৃশ্যটি পুরোপুরি এ রকম নয়। অতিরঞ্জন আছে। তাঁদের মতে, প্রথম শিক্ষককে দেখা গেছে ক্লাস শেষে কলাভবনে শিক্ষক লাউঞ্জের টেবিলে দাবার বোর্ড নিয়ে বসে থাকতে। সাইকেল চালিয়ে আসা এক বার্তাবাহক তাঁর হাতে দাবার চাল লেখা একটি চিরকুট দিলে তিনি চিরকুটের বার্তা অনুযায়ী চাল দিয়ে বার্তাবাহকের হাতে আরেকটি চিরকুট ধরিয়ে দিয়েছেন, ইত্যাদি…
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন