অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
হিমালয়ের গভীরে তিব্বত সীমানার প্রায় গা ছুঁয়ে হরদৌল ও ত্রিশূলী শৃঙ্গের কোলের মধ্যে ১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ মিলাম তুষারস্রোত ৷ এর গহ্বর থেকে জন্ম নিয়েছে দুর্বার গৌরীগঙ্গা ৷ অপ্রতিরোধ্য গতির তোড়ে ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে বড় বড় পাথর ও বরফের চাঙরগুলোকে ৷ গৌরীগঙ্গার উৎসমুখে গ্লেসিয়ারের বিস্তৃতি ৩৯ মিটার ৷ তুষারশুভ্র গ্লেসিয়ারের দেহের ওপর হিমানী সম্প্রপাতের ফলে মাটির ধূসর আস্তরণ ৷ অজস্র ফাটলের ফাঁক দিয়ে গৌরীগঙ্গা মাঝে মাঝে স্পষ্ট হয় ৷ গ্লেসিয়ারের পিছনে শ্বেতশুভ্র ত্রিশূলী ও হরদৌল ৷ মেঘের আস্তরণ সরে যেতেই সূর্যের আলোয় জ্বলজ্বল করতে থাকে সাদা ধবধবে এই তুষারশৃঙ্গদ্বয় ৷
গ্রামের নাম থেকেই হিমবাহের নামকরণ হয়েছে মিলাম ৷ বহু আগে গ্রাম পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি ছিল ৷ এখন প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সরে এসেছে ৷ ভারত-তিব্বত বাণিজ্যিক সম্পর্কের যুগে মিলাম গ্রাম, মার্তোলি, পাঁচুগ্রাম, বুরফু জাঁকজমকপূর্ণ জনপদ ছিল ৷ মিলামের সমৃদ্ধি ছিল সবচেয়ে বেশি ৷ কাঠখোদাই করা গৃহসম্পদ, বিরাট বিরাট দরজা-জানলায় নানা ধাতুর কারুকার্য লুণ্ঠনকারীদের দৃষ্টি এড়াতে পারেনি ৷ ভগ্নস্তূপের মধ্যে এখনও রাজবাড়ি, স্কুলঘর, বিচারালয়, কয়েদখানার প্রাচীরগুলো দাঁড়িয়ে আছে ৷ ১৯৬২ সালের আগে পর্যন্ত প্রাণচঞ্চল ছিল এই হিমবাহের ধারেকাছের বাণিজ্যকেন্দ্রগুলো ৷ মানস কৈলাস যাত্রীদের আনাগোনা ছিল এই পথেই ৷ যেদিন তিব্বত চিনের অন্তর্গত হল, বন্ধ হল সীমান্ত পথ, তখনই এদের ঐতিহ্য ও কৌলীন্য হারিয়ে গেল ৷ সেই প্রাণস্পন্দন আজ নেই বললেই চলে ৷
পিথোরাগড় থেকে সর্পিল সংকীর্ণ ফিতে পথ ধরে বাস চলছে ৷ দেবদারু, পাইনের অরণ্য ভেদ করে ওগল, আসফোট, দিদিহাট হয়ে থলে এলাম ৷ পথের বাঁকে, পরিচ্ছন্ন নীল আকাশের বুকে ভেসে ওঠে শ্বেতশুভ্র নন্দাদেবী, ত্রিশূল, নন্দাকোট, চৌখাম্বার গগনচুম্বী শৈলশৃঙ্গগুলি ৷ তেজাম পেরিয়ে বাস থামে ৬,৫০০ ফুট উঁচু গিরগাঁওয়ে ৷ এরপর একটানা চড়াই পথ শুরু হয় ৷ সেই দমবন্ধ করা চড়াই পথের শীর্ষে কালামুনিপট (৯,৫০০ ফুট) ৷ পাহাড়ের চূড়ায় নাগাবাবার ঘণ্টামন্দিরের সামনে বাস থামে ৷ এরপর ক্রমশই উতরাই পথে ১৫৪ কিলোমিটার দূরে মুন্সিয়ারি (৭,২০০ ফুট) ৷ পৌঁছতে সন্ধে হয়ে যায় ৷
৮ জুন আমাদের ট্রেকিং শুরু হল ৷ আজ একটানা ১৪ কিলোমিটার উতরাই ৷ আজকের গন্তব্য লিলাম গ্রাম (৫,১২০ ফুট) ৷
মুন্সিয়ারির বাজার, দোকান পার হয়ে গ্রামের মধ্য দিয়ে টানা ৫ কিলোমিটার হাঁটাপথে (উতরাই) সরলাপানি বাস স্টপেজ ৷ মাটিও পাথরের তৈরি বাসরাস্তাটা বেশ কয়েকবার ডাইনে বাঁয়ে ঘুরে ঘুরে পাহাড়ের গা বেয়ে চলে গেছে ৷ এই পথেই পিথোরাগড় ভায়া মটকোট বাস যাতায়াত করে ৷ মুন্সিয়ারি বাসস্ট্যান্ড থেকে সকালে ৫টা ৩০ মিনিটে বাস ছাড়ে ৷ বাসের সুযোগ নিতে পারলে ৫ কিলোমিটার হাঁটাপথ যাওয়া ও ফেরার সময় দুবারই কমানো সম্ভব ৷ ফেরার সময় সরলাপানিতে বাস পৌঁছয় দুপুর ২টো নাগাদ ৷
সরলাপানি থেকে ঢালু পায়ে চলা রাস্তা গ্রামের বাড়িঘরের মধ্য দিয়ে নেমে গেছে ৷ আড়াই কিলোমিটার দূরে সুরিনগড় গ্রাম ৷ পথে পাহাড়ি গ্রাম্যবধূর দেখা মেলে ৷ শিশুরা খেলা ছেড়ে ছুটে আসে ৷ নমস্তে বলেই হাত প্রসারিত করে লজেন্স ও টফির আশায় ৷ নিচে জঙ্গলের আড়ালে পাহাড় স্পর্শ করে বয়ে চলেছে গৌরীগঙ্গা ৷ কাঠের সেতু পার হতেই এক অতি রমণীয় ঝরনা ৷ ডানহাতে বাঁশের তৈরি বিশ্রামগৃহে একটু চা খেয়ে প্রায় সমান্তরাল পথে ২ কিলোমিটার হাঁটলে জিমিঘাট ৷ সামান্য চড়াই ভেঙে ৩ কিলোমিটার এগোলেই লিলাম গ্রাম (১,৮১০ মিটার) ৷ রাস্তার গায়ে সাইনবোর্ডে লেখা ২৫০ মিটার চড়াই পথে পাহাড়ের ওপর পি ডাব্লু ডি-র বিশ্রামগৃহ ৷ নিচে রাস্তার ওপরেও থাকার জায়গা আছে ৷ সূর্য ততক্ষণে পশ্চিম আকাশে সবেমাত্র ঝুঁকেছে ৷ চা-জলখাবার খেয়ে বাকি সময়টুকু সবুজ প্রাকৃতিক অরণ্যের মধ্যে ঝরে পড়া রডোডেনড্রনের মোটা সবুজ পাতা, নাম না-জানা অসংখ্য পাখির কলতান, নিচে পাহাড় জঙ্গল কাঁপিয়ে গৌরীগঙ্গার দাপাদাপি উপভোগ করেই চলে গেল ৷ রাতের আহার আশ্রয়গৃহের মালিকের দোকানেই সমাধা করলাম ৷ চড়াই ভেঙে ওপরে পি ডাব্লু ডি-র বাংলোর পরিবেশ আরও মনোরম ৷ প্রশস্ত লনে টেন্ট পাতার সুব্যবস্থা আছে ৷ বাংলোর দুটো ঘর খুবই ভালো, চৌকি আছে দুটোতেই ৷
আজকের পথ চড়াই ৷ গন্তব্য ১৩ কিলোমিটার দূরের বুগডিয়ার (৮,৬০০ ফুট) ৷ রডোডেনড্রনের লাল, নদীর আওয়াজ আর সবুজের মধ্য দিয়ে ৩ কিলোমিটার পথ এগোলেই রূপসীঘাট ৷ পাথর দিয়ে বেদি করে পাহাড়ি পথে ক্লান্তি কাটানোর আয়োজন করা আছে ৷ ডানদিকে উঁচু পাহাড়টার মাথা টপকে দুগ্ধফেনিল জলস্রোত পিলতীফলস ঝাঁপ দিয়েছে গৌরীগঙ্গার উদ্দেশে ৷ জলকণা মিশ্রিত আর্দ্র বাতাস ৷ এই সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মনে হল জ্যোৎস্নার প্লাবনে এই রূপসীঘাট কী অপরূপ রূপসী হয়ে ওঠে ৷
প্রথম দিনের পথের পারিপার্শ্বিকতা আজ বদলে গিয়েছে ৷ গ্রাম আজ আর নেই, তবে মাঝে মাঝে গ্রামবাসীর চলমান সংসার পাহাড়ের পথে চলেছে ৩-৪ মাসের জন্য অস্থায়ী বাসস্থানের প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে ৷ তাদের প্রফুল্ল সম্ভাষণ-নমস্তের বিনিময়ে প্রতিনমস্কার জানিয়ে চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে সাড়ে চার কিলোমিটার পার হয়ে পৌঁছে যাই রডগাড়ি ৷ বাঁশ, পাথর ও টিনের ছাউনি দেওয়া প্রাসাদের বেতের মাচায় বসামাত্রই প্রাসাদের মালিক গরম চা পরিবেশন করেন ৷ এখানে আহার ও রাত্রিবাসের ব্যবস্থা আছে ৷ রালাম হিমবাহ থেকে উদ্ভূত রালাম নদী এখানে গৌরীগঙ্গায় মিশেছে ৷
এরপর গৌরীগঙ্গার ধার ধরে কষ্টদায়ক জনবিরল চড়াই পথ ৫ কিলোমিটার অতিক্রম করে হাঁপাতে হাঁপাতে বুগডিয়ার (২,৪৫০ মিটার) পৌঁছে গেলাম ৷ বুগডিয়ার নামের অর্থ ‘বাঘের গুহা’ ৷ দুই কামরার পি ডাব্লু ডি-র বিশ্রামগৃহ, ভারত-তিব্বত সীমান্তবাহিনীর ২-৩টি ছাউনি ছাড়া রাস্তার ওপরে পাথর বাঁধানো প্রশস্ত পরিসরে দুটো দোকানঘর নিয়ে বাঘের গুহার বর্তমান অবস্থান ৷ ডানদিক দিয়ে প্রচণ্ড বেগে গৌরীগঙ্গার দাপাদাপি, বাঁদিক দিয়ে পোটিংনালার ঢল নেমে এসে মিলিত হয়েছে বাংলোর ঠিক পিছনে নিবিড় জঙ্গলে ৷ ১৯৮৯ সালের ৭ জানুয়ারি এক ভয়াবহ তুষার সম্প্রপাতে সামনের উঁচু পাহাড়ের বেশ কিছু অংশ ভেঙে পড়ে ৷ ১৩ জন জওয়ান চাপা পড়েন ৷ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বড় বড় পাথরের চাঙরগুলো ও নির্মিত স্মৃতিফলকগুলো পরিবেশটাকে বেশ মর্মস্পর্শী করে রেখেছে ৷
আজ ১৭ কিলোমিটার চড়াই ভেঙে রিলকোট হয়ে মার্তোলি গ্রাম যাব ৷ মার্তোলি গ্রামের উচ্চতা ৩,২৬০ মিটার ৷
বাঘের গুহায় নিশ্চিন্তে রাত কাটিয়ে পোটিং নালার কাঠের পুল পেরিয়ে তিন কিলোমিটার চড়াই পার হতেই ১,০০০ ফুট খাড়া মসৃণ পাহাড়ের গা ঘেঁসে গৌরীগঙ্গার প্রশস্ত তটে সমতল সবুজ তৃণক্ষেত্র নাহারদেবী ৷ এক সময় ওই খাড়া পাহাড়টার গা ঘেঁসে গৌরীগঙ্গা নেমে আসত ৷ তখন পাহাড়ের গায়ে খিলান কেটে কাঠের পাটাতন লাগিয়ে মাচা করে বেশ বিপদের ঝুঁকি নিয়ে এই পথ অতিক্রম করতে হত ৷ আজ গৌরীগঙ্গা সরে গেছে অনেকটা ৷ নতুন রাস্তাটা পাহাড়ের গা ঘেঁসে এগিয়ে গেছে নদীর বক্ররেখার সঙ্গে তাল রেখে ৷ ছোট একটা ঘরে নাহারদেবীর মন্দির স্থাপিত হয়েছে ৷ অজস্র বিভিন্ন রঙের টুকরো টুকরো কাপড় ঝুলিয়েছে মানুষ ৷ তাদের কামনা বাসনার প্রতীক ৷
পাহাড়ের গা বেয়ে উদ্বৃত্ত তুষার সম্প্রসারিত হয়ে নদীর গহ্বর পর্যন্ত নেমে এসেছে ৷ হেঁটে সেগুলি পার হয়ে তিন কিলোমিটার এগোলেই পৌঁছে গেলাম চিরকানি ঝরনা ৷ বনবীথি ধীরে ধীরে ফাঁকা হতে থাকে ৷ তীব্র রুক্ষ বাতাসের দাপট বাড়তে থাকে ৷ দুই কিলোমিটার পার হতেই চলে এলাম মাপাং (১০,১৩০ ফুট) ৷ মাধ্যাহ্নের আহার এখানেই করে নেওয়া ভালো ৷ ব্যবস্থা অন্যান্য জায়গার তুলনায় সুবিধাজনক, খাবারের বৈচিত্র্যও সম্ভব ৷ সময় নষ্ট না করে গায়ের ঘাম শুকিয়ে রওনা দিলে ৪ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিয়ে ১২,২০০ ফুট উঁচুতে মুক্তাঙ্গন, রিলকোট ৷ পাহাড়ের কোলে হেলান দিয়ে ছোট একখণ্ড মালভূমি ৷ ভারত-তিব্বত সীমান্তবাহিনীর স্থায়ী ছাউনি, কয়েকটা পরিত্যক্ত ভাঙা পাথরের বাড়ি, একটা স্থায়ী চা ও খাবারের দোকান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৷ রাস্তার ডানদিকে ৫-৭ ফুট নিচে গৌরীগঙ্গার নদীগর্ভ ৷ বিপরীত দিক দিয়ে বয়ে আসা তীব্র বাতাসে ও মালভূমির ঢাল কম হওয়ায় এখানে নদীর গতি বেশ কিছুটা স্তিমিত ৷ তরুলতাহীন নগ্ন রুক্ষ প্রকৃতির মধ্য দিয়ে দুই কিলোমিটার টানা কষ্টদায়ক চড়াই ৷ বাতাস এখানে তীব্রতর, পিঠের বোঝা নামিয়ে সবুজ ঘাসে গা এলিয়ে দিতে বাধ্য হলাম রিলকোট ধার-এ ৷
এক কিলোমিটার পথ এগোলেই রাস্তার ওপর সাইনবোর্ড, Martoli Village–3 K.M. মিলাম যাবার দুটো পথের একটা মার্তোলি গ্রাম হয়ে বুরফু পৌঁছয় ৷ অপরটি বাইপাস ধরে বুরফু পৌঁছয় ৷ বুরফু থেকে মিলাম ১৪ কিলোমিটার ৷ নন্দাদেবী অভিযাত্রীদের মার্তোলির পথেই বেসক্যাম্পে যেতে হয় ৷ সামান্য চড়াই পার হতেই বিস্তীর্ণ সবুজ তৃণক্ষেত্র ও পাহাড়ি ফুলের সমারোহ ৷ চারদিক দিয়ে অজস্র উচ্ছলধারা নেমে এসেছে ৷ মুহূর্তের মধ্যে চাঙ্গা করে তুলল আমাদের ক্লান্ত দেহকে ৷ মার্তোলি পৌঁছতে সন্ধে হয়ে যায় ৷ ৩ জুন আন্তঃরাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীর সম্মিলিত যে অভিযাত্রী দলটি নন্দাদেবীর শীর্ষে বিজয়কেতন উড়িয়েছে, তারা মুন্সিয়ারিতে আজই ফিরে গেছে ৷ তাদেরই সাহায্যকারী দলের একটা অংশ তখনও মার্তোলিতে থেকে গিয়েছিল ৷ তাই স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশি প্রাণচঞ্চল লাগল মার্তোলিকে ৷ পরিত্যক্ত পাথরের বাড়িগুলোর মেরামতি হয়েছে ৷ রাতে চাঁদের আলোয় খুব সুন্দর লাগছিল মার্তোলিকে ৷ এদের থেকেই জানলাম, পশ্চিমপ্রান্তে পাহাড়ের গায়ে নন্দাদেবীর পাথর বাঁধানো মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে সূর্যোদয় দেখা যাবে ৷
সূর্যদেবকে নন্দাদেবীর মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে স্বাগত জানাবার উদ্দেশ্যে ভোরের আলো ফোটবার আগেই চড়াই ভেঙে ওপরে উঠলাম ৷ দিনের প্রথম আলোয় বেশ কয়েকটা অচেনা অখ্যাত গিরিশৃঙ্গ উদ্ভাসিত হল ৷ হঠাৎ মেঘ ছেয়ে ফেলল সমস্ত আকাশ, মেঘের আস্তরণের মধ্য দিয়ে অর্ধস্ফুট চিত্ররেখার মতো নন্দাদেবীকে দেখলাম ৷ মনের সাধ অপূর্ণ রেখেই বেরিয়ে পড়তে হল শেষ গন্তব্য, মিলামের উদ্দেশে ৷ মার্তোলি গ্রাম থেকে বুরফু হয়ে মিলাম গ্রাম ১৪ কিলোমিটার পথ ৷
পাহাড়ের গা বেয়ে অপ্রচলিত, গ্রামবাসীর পদচিহ্নের রেখা ধরে ১,৫০০ ফুট নিচে মার্তোলি গঙ্গার মুখে নেমে এলাম ৷ গৌরীগঙ্গার সঙ্গে মার্তোলিগঙ্গা এখানে মিলিত হয়েছে ৷ কাঠের সেতু পেরিয়ে বাইপাসের রাস্তা ধরে ৩ কিলোমিটার অল্প চড়াই ৷ তারপর দড়ির ঝোলাসেতুর সাহায্যে, এই প্রথম গৌরীগঙ্গাকে অতিক্রম করে, নদীকে বাঁদিকে রেখে বুরফু গ্রামের সীমান্তে পৌঁছলাম ৷ নদীর পাড় ধরে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে গেছে মিলামের পথ ৷ অপর পথটি বুরফু গ্রামে প্রবেশ করেছে ৷ বুরফু গ্রামের ঠিক পিছনেই বুরফু হিমবাহ, বেলা ১০টার সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে ৷
এই বুরফু গ্রাম হয়ে, ডানদিকে পথ চলে গেছে রালাম হিমবাহের দিকে ৷ ব্রিজগঙ্গাটপ ডিঙিয়ে যেতে হয় ৷ ফেরবার পথে রালাম হয়ে যাবার বাসনা অপূর্ণ থেকে গেল ৷ সীমান্তবাহিনীর জওয়ান ও বুরফুর গ্রামবাসীরা জানালেন, ব্রিজগঙ্গাটপ (১৬,৫০০ ফুট) তখনও ৮-১০ ফুট বরফে আবৃত ৷ কোনও পোস্টম্যান ও ভেড়াচালক দল ওই পথে তখনও আসেনি ৷ সেপ্টেম্বরের শেষে ও অক্টোবরের প্রথমদিকে ছাড়া ওই পথে যাওয়া বিপদসঙ্কুল ৷ বুরফু গ্রামে এক অস্থায়ী আবাসিকের আঙিনায় বিশ্রাম নিয়ে আমরা রুটি, আচার, চানার তরকারি খেয়ে যাত্রা শুরু করলাম মিলামের দিকে ৷
গৌরীগঙ্গাকে বাঁদিকে রেখে চড়াই পথে সাড়ে তিন কিলোমিটার গেলেই বিলজু গ্রাম ৷ ছোট গ্রাম, অস্থায়ী আবাসিকরা তাদের পরিত্যক্ত বাড়িতে তখনও এসে পৌঁছয়নি ৷ রুক্ষ পথ এগিয়ে চলে ৷ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল ঝোড়ো হাওয়া টুপি, মাফলার উড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকে বার বার ৷ পথে মাটি আর পাথরের ঝুড়ো ৷ সামনে ছুঁচলো, শীর্ণ পাহাড়শীর্ষ ৷ বীভৎসভাবে ধসে যাওয়া খাদের পাশ দিয়ে পায়ে হাঁটা পথের চিহ্ন ধরে ৩ কিলোমিটার বিপদজনক চড়াই পথ হঠাৎ নেমে চলে নিচে গোয়াংখ্যানালার অববাহিকায় ৷ খরস্রোতা গোয়াংখ্যা গৌরীগঙ্গায় মিশেছে ৷ নালার ওপর কাঠের তক্তা ফেলে স্বল্পপরিসর সেতুটি ৷ সেতু পেরিয়ে আবার প্রাণান্তকর পাথুরে ঝুড়ো মাটির চড়াই ৷ হঠাৎই দৃশ্যপথে ভেসে উঠল শহিদস্মারক স্তম্ভগুলি ৷ একটা ধাপ আরও উঠতেই রাজনীতির বলি, প্রকৃতির ধ্বংসলীলার শিকার মিলাম গ্রামের ভগ্নাবশেষ এবং এরই প্রহরায় নিযুক্ত সীমান্তবাহিনীর ক্যাম্প আর ডাকবাংলো ৷ এক কিলোমিটার প্রায় সমতল পথ পেরিয়ে বন্ধ ডাকবাংলোর বারান্দার মেঝেতে গা এলিয়ে দিলাম ৷ এখানে অস্বস্তিকর প্রবল হওয়াটাকে আড়াল করে বসা যায় ৷
বাংলোর চৌকিদার মধ্যাহ্নের অবকাশে আহারাদি সারতে মিলাম গ্রামে তাঁর নিজের বাড়িতে গিয়েছিল ৷ পোর্টার মারফত খবর পেয়ে, এসে বাংলোর ঘর খুলে দিলেন ৷ বাংলোর দুটো স্যুট, প্রতিটি অংশে ২টি করে ঘর, সংলগ্ন বাথরুম ৷ বড় ঘরদুটিতে মোটা সতরঞ্চি পাতা ৷ ছোট ঘর দুটোর প্রতিটিতে ২টি করে চৌকি আছে ৷ বাইরে দুটো পৃথক রান্নাঘর ৷ অল্প বাসনকোসনও আছে ৷ জ্বালানি হিসাবে কাঠ অথবা কেরোসিন (যদি নিজেরা নিচ থেকে সঙ্গে এনে থাকেন) ব্যবহৃত হয় ৷ সীমান্তবাহিনীর ব্যারাকে জল সরবরাহের ব্যবস্থা আছে ৷ তার সুযোগ বাংলোর অধিবাসীরাও সীমিতভাবে পেয়ে থাকেন ৷ গ্রামের রেশন ও দোকান থেকে চাল, চিনি, আলু, পেঁয়াজ কিনে নিতে পারেন ৷
গোয়াংখ্যানালার ধার থেকে যে মালভূমিটা দেখা যায় তার বিস্তৃতি লম্বায় প্রায় আড়াই কিলোমিটার ও চওড়ায় আধ কিলোমিটার হবে ৷ মালভূমির ডান সীমান্ত দিয়ে রাস্তা এগিয়ে গেছে, রাস্তার ডানপাশে মালভূমির প্রায় শুরুতেই পাহাড়ের গা ঘেঁসে বাংলো ৷ বাংলোর চারপাশ পাথরের বেড়া দিয়ে ঘেরা ৷ পাকা দেওয়াল, টিনের ছাউনি, নুড়ি বিছানো চত্বর ৷ গৌরীগঙ্গা মালভূমির বাঁ সীমান্ত দিয়ে পাহাড় প্রাচীরের কোল বেয়ে নেমে এসেছে ৷ চা খেয়ে বাইরে এলাম ৷ বাতাস অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে, এখন বিকেল ৫টা ৷
বাংলোর সামনে বেশ কিছুটা ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দিয়ে ভারত-তিব্বত সীমান্তবাহিনীর দপ্তর ও ছাউনি ৷ সৌরশক্তির সাহায্যে বৈদ্যুতিক চাহিদা মেটাবার ব্যবস্থা ও জেনারেটর আছে ৷ ওয়ারলেস টাওয়ার, অফিসঘর ও ব্যারাকের ডানদিক দিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে তিব্বত সীমান্তের পথ উঠে গেছে ৷ বাঁদিকের সীমানা দিয়ে নদীর খাদের পাশ দিয়ে পথ মিলাম গ্রাম হয়ে হিমবাহে চলে গিয়েছে ৷ পরদিন মিলাম যাওয়ার অনুমতি আদায়ের জন্য ব্যারাকের অফিসে গিয়ে ৫ জন সঙ্গীসহ গ্রুপলিডারের নাম নথিভুক্ত করিয়ে নিলাম ৷ মুন্সিয়ারির অনুমতিপত্রটা দেখিয়ে তাদের সম্মতি পাওয়া গেল ৷ পরদিন হিমবাহ দেখে ফিরে অফিসে সই করে যেতে হবে ৷ আমরা গ্রামের রাস্তায় চৌকিদারের বাড়িতে গেলাম ৷
নিজেদের প্রয়োজনে যে সব ওষুধ আমরা সঙ্গে এনেছিলাম সেগুলি পাহাড়ি পথে মহৎ উদ্দেশে কাজে লাগছে ৷ আমাদের সহযাত্রীরা প্রতিদিনই আশ্রয়স্থলে পৌঁছনোর পর বেশ কিছু গ্রামের লোকজনদের অসুখের ওষুধ ঠিক করে ৷ চৌকিদার তাঁর নাতির চিকিৎসার জন্য আমাদের আরেকদিন মিলামে থাকতে বললেন ৷ তাঁর সেই নিরুপায় সরল বিশ্বাস ও নির্ভরতা আমাদের প্রত্যেকের মনে প্রশান্তি এনে দিল ৷ তাছাড়া পরদিন সারা দুপুর বৃষ্টি হওয়ায় আরও একটা রাত মিলামে থাকতে বাধ্যই হলাম ৷
ভোরবেলা মিলাম হিমবাহের উদ্দেশে রওনা হয়ে ব্যারাক পর্যন্ত আসতেই ঘন মেঘ চলে এল ৷ স্থায়িত্ব স্বল্পক্ষণের ৷ গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে কিছুটা এগোতেই পথ হারিয়ে গেল পাহাড়ের ভগ্নস্তূপে ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথর-নুড়ির মধ্যে ৷ এ যেন ঝুরো পাহাড় ও ভগ্নস্তূপের সমুদ্র ৷ পোর্টারকে অনুসরণ করে অবিন্যস্ত পদে এগিয়ে চললাম ৷ ত্রিশূলী ও হরদৌলের চুড়োদ্বয় মেঘের আড়ালে অস্পষ্টভাবে ভেসে উঠেছিল মাঝে মাঝে ৷ যে হিমস্রোত ওই পাহাড়ের গা থেকে ১৯ কিলোমিটার প্রসারিত, তাকে দূর থেকে ভগ্নস্তূপের সমুদ্র মনে হচ্ছিল ৷ এই দৃশ্য উপভোগ করতে করতে গৌরীগঙ্গার উৎসমুখে এসে হাজির হলাম ৷ মুহূর্তের জন্য চরম ও পরম পাওয়ার তৃপ্তিতে আত্মহারা হয়ে গেলাম ৷ গৌরীগঙ্গার স্রোতে বাহিত গোলাকৃতি মসৃণ পাথরটি তুলে এনে শিব প্রতিষ্ঠা করে ধূপ জ্বেলে কাজু, কিসমিস ও খেজুর প্রসাদ দেওয়া হয়েছে ৷
পোর্টার সঙ্গী আমাদের নিয়ে বাংলোয় ফিরল ৷ খাবার তৈরি ছিল ৷ আহার সমাধা হতেই প্রচণ্ড বৃষ্টি নামল ৷ পূর্ণিমার চাঁদ ঢাকা পড়ে থাকল কালো মেঘে ৷ সারারাত বৃষ্টি হল ৷ এরপর সেই রাতটা বুরফুতে কাটিয়ে ফেরার পালা ৷ একই পথে হেঁটে ১৮ জুন পৌঁছে গেলাম মুন্সিয়ারি ৷ ফেরার পথে দেখে নিলাম বনকাটিয়া হিমবাহ ৷
আন্তর্জাতিক সীমান্ত অঞ্চলে প্রবেশ করতে হলে সরকারি অনুমতির প্রয়োজন হয় ৷ মিলামের পর্যটকদের অনুমতি দেন মুন্সিয়ারির সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট ৷ দুকপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি ও পরিচিতিপত্র প্রয়োজন ৷ মুন্সিয়ারিতে একটা দিন থেকে পদযাত্রীদের পোর্টার ও রেশন গোছগাছ করার ফাঁকে অনুমতিপত্র আদায় করে নিতে হবে ৷
লখনউ থেকে নৈনি এক্সপ্রেস রাত ৯টা ১৫ মিনিটে ছাড়ে ৷ পিলভিট পৌঁছয় রাত ৩টে ৩০ মিনিটে ৷ টনকপুরের বগি এখানে রেখে যায় ৷ সকাল ৬টায় রওনা হয়ে ৮টা ৩০ মিনিটে টনকপুরে পৌঁছয় ৷
পিলভিট স্টেশন চত্বর থেকেই পিথোরাগড়ের প্রথম বাসটি ছাড়ে সকাল ৫টায় (নিয়মিত ডাক নিয়ে যায়) ৷ টনকপুর, লোহাঘাট হয়ে যায় ৷ টনকপুর স্টেশন থেকে বাসের গুমটি প্রায় ১ কিলোমিটার ৷ বেশ কয়েকটা দূরের বাস টনকপুর হয়ে সকালের দিকে পিথোরাগড় যায় (৯টা ৩০ মিনিট ও ১১টা ৩০ মিনিট) ৷ ভাড়া ৫৬ টাকা ৷ পিলভিট থেকে টনকপুর ৬০ কিলোমিটার, টনকপুর থেকে লোহাঘাট ৯১ কিলোমিটার, টনকপুর থেকে পিথোরাগড় ১৫১ কিলোমিটার ৷
পাহাড়ি পথে ৮-৯ ঘণ্টা সময় লেগে যায় পিথোরাগড় পৌঁছতে ৷ এইসব বাসগুলি লোয়ার পিথোরাগড়ের বাসস্ট্যান্ডে থামে ৷ আপার ও লোয়ার উভয় বাসস্ট্যান্ডেই রাত্রিবাসের উপযুক্ত হোটেল ও খাবারের দোকান আছে ৷ আলমোড়া জেলা থেকে পৃথক হয়ে পিথোরাগড় এখন বেশ সমৃদ্ধ জেলাশহর ৷ মুন্সিয়ারির প্রথম বাসটি লোয়ার পিথোরাগড় থেকে সকাল ৫টায় ছেড়ে আপার পিথোরাগড় বাসস্ট্যান্ডে ২০-২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে সব্জি, চিঠি ও যাত্রী তুলে মটকোট হয়ে মুন্সিয়ারি বাজারের বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছয় বিকেল ৪টেয় ৷ দ্বিতীয় বা শেষ বাসটি আপার পিথোরাগড় স্ট্যান্ড থেকেই ছাড়ে সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে ৷ ভাড়া ৫৮ টাকা ৷
হাওড়া থেকে কাঠগোদাম এক্সপ্রেসে এলে আলমোড়া হয়ে যেতে পারেন ৷ আলমোড়া থেকে মুন্সিয়ারির বাস সকাল ৫টা ৩০ মিনিটে ছাড়ে ৷ বাগেশ্বর, চৌকরি, থল হয়ে মুন্সিয়ারি পৌঁছয় সন্ধে ৬টায় ৷
ডাকবাংলোর সামনে যাত্রী নামিয়ে বাস চলে যায় নিচের বাসস্ট্যান্ডে ৷ বাংলোর দৈনিক ভাড়া ৩৬ টাকা ৷ দিদিহাট থেকে অগ্রিম বুকিং নিতে হয় ৷ পাহাড়ের ঢালে দুটো স্তরে বাংলোর অবস্থিতি ৷ ওপরের ধাপে ভি আই পি স্যুট ও নিচের ধাপে পর্যটকদের থাকার স্যুট দুটো ৷ একটা বড় হলঘর আছে, প্রয়োজনে এটিও ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয় ৷ বাংলোর সামনে মরসুমি ফুলের সুসজ্জিত লনে পা রাখলেই চোখের সামনে পঞ্চচুল্লির পাঁচটা চুড়ো ৷
পথ নেমে গেছে নিচের মুন্সিয়ারির আধা-শহর আধা-গ্রাম্য জনপদে ৷ এখানে স্কুল, বাজার, দোকান, পোস্ট অফিস, এস ডি এম-এর অফিস, ব্যাঙ্ক, ধর্মশালা ও হোটেল, রেস্টুরেন্ট, স্থানীয় লোকেদের বসবাস ৷ মিলাম যাবার হাঁটাপথের সরঞ্জাম মেলে এখানে ৷ পোর্টার, গাইড, ঘোড়া, রেশনদ্রব্যের জোগান এখানেই ৷ পোর্টারের খরচ ৬০-৮০ টাকা আহারাদি সহ ৷ গাইড হবার যোগ্যতাসম্পন্ন অভিজ্ঞ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া কষ্টসাধ্য ৷ এছাড়া এই পথে গাইডের প্রয়োজন মোটেই নেই, পোর্টারই সব চেনে ও জানে ৷
ভ্রমণ মার্চ, ১৯৯৬
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন