মানস অভয়ারণ্য – সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

অমরেন্দ্র চক্রবর্তী

মানস অভয়ারণ্য – সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

বাঘের ঘরবাড়ি

এদীনা পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জায়গা তো বিস্তর ৷ কিন্তু মানসে গেলে যেন মরে যেতে ইচ্ছে করে ৷ মরার জায়গা পৃথিবীতে বোধহয় ওই একটাই ৷ মানস ৷ সেটাও বন্ধ হয়ে গেল ৷

সেই ১৯২৮ সাল থেকে মানস সংরক্ষিত বনাঞ্চল ৷ বেশ চলছিল ৷ কেউ যেত না ৷ জানত না ৷ গোল বাধল প্রখ্যাত বনবিশারদ ই-পী-গী ‘ভারতের বন্যপ্রাণী’ (ওয়াইল্ড লাইফ ইন ইন্ডিয়া) নামে বইটি লেখার পর, যা বেরোয় ৫০ দশকের মাঝামাঝি ৷ বন্ধুবর জওহরলাল নেহরু লিখলেন ফোরওয়ার্ড ৷ শ্রীযুক্ত গী ওই বইতে মানস সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় লিখলেন ৷ তিনি লিখলেন, সোনালি লোমে-ভরা দীর্ঘদেহী হনুমানদের কথা (গোল্ডেন লেঙ্গুর) যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই ৷ মানসকে তিনি ঘোষণা করলেন ‘পৃথিবীর সুন্দরতম স্যাংচুয়ারি’ বলে ৷

বাস! রে-রে করে সাহেবরা উড়ে আসতে লাগল, সঙ্গে মেম ৷ যদিও সৌভাগ্যের বিষয়, সাহেবদের পছন্দ হল নদীর ওপারে ভুটান সরকারের মস্ত ও আধুনিক ট্যুরিস্ট বাংলোটি ৷ নদীপাড়ে ক্যাম্প ফেলে থাকতে তাঁরা আরও পছন্দ করেন ৷ তাঁরা প্রাণী-নিরীক্ষণ করেন গোলাকার রাবার বোটে ভেসে যেতে যেতে ৷ অবশ্য, তাঁদের একটা সুবিধা এই যে ভারতীয় বাঘ সম্ভবত সাহেবদের খায় না ৷ নইলে তো, রুদ্রপ্রয়াগের চিতাটা কবেই করবেটকে সাবাড় করে দিত ৷

একবার একজনা লাফ দিয়েছিল বটে করবেটের দিকে ৷ তৎক্ষণাৎ শূন্যে মৃত্যু, থ্রি-নট-থ্রি’র মাত্র একটি গুলিতে ৷ আমি মোহনের মানুষ খেকো’র কথা বলছি ৷

আসলে, সেই কোম্পানির আমল থেকেই ওরা জানে, খাবে তো, কেলেকুলে দেখে খাও ৷ কেউ কিছুটি বলবে না ৷ কিন্তু, সাহেব খেয়েছ কি মরেছ ৷ পুলিশ-দারোগা আসবে ৷ মিলিটারি আসবে ৷ তখন কেলেঙ্কারি! কিম্বা কে জানে, হয়তো সাহেবদের খেতে বিচ্ছিরি ৷ নইলে অত সুযোগ পেয়েও এবং যথেষ্ট ক্ষুধিত থাকা সত্বেও (বিশেষত জালিয়ানওয়ালাবাগের পর) কই, একটা-কেও তো পুড়িয়ে খাইনি আমরা?

মানসে বাঘের সংখ্যা প্রচুর ৷ তাই এ বাঘের কিসসা ৷

বাঘ-সুমারিতে সুন্দরবন ফার্স্ট ৷ মানস দ্বিতীয় ৷ মানসে গেলেন, তবু বাঘ দেখতে পেলেন না, এমনটা হতে পারে ৷ উনি স্বয়ং দেখা না দিলে কেউ তাঁর দেখা তো পায় না! তবে, মানসে তিনদিন থাকলেন, অথচ ব্যাঘ্রগর্জনে রাতের বাংলো একদিনও কেঁপে উঠল না, শার্সি ঝনঝনিয়ে উঠল না, এমন ঘটনা মানসে না ঘটারই সম্ভাবনা ৷

কেননা, মানসের বাংলোটি বনবিভাগের ভাষায়, কোর এরিয়ায় ৷ যেখানে বাঘের ঘরবাড়ি ৷

এক আকাশে চন্দ্রসূর্য

মানসে আমি প্রথমবার যাই ১৯৮১ সালে ৷ সঙ্গী বন্ধুবর পার্থসারথি চৌধুরী ও নিমাই সেন ৷ ‘যাই’ না বলে বলা উচিত ভ্রমপূর্বক অনট প্রত্যয় যোগে (ভ্রম Ô অনট ñ ভ্রমণ) আমরা ওখানে গিয়ে পড়ি ৷ সারা আসাম টো-টো করতে করতে, হঠাৎ ৷ মানস সম্পর্কে আমরা বিশেষ কিছুই তখন জানতাম না ৷

অবশ্য, পরে মানস যাওয়া জলভাত হয়ে গিয়েছিল ৷ বিকেলে হাওড়া থেকে কামরূপ এক্সপ্রেস ৷ পরদিন বিকেলে বরপেটা রোড স্টেশনে ৷ বরপেটা থেকে সেদিনই মানসে-ট্যাক্সিতে ৪০ কিলোমিটার ৷

তখনও নিউ বঙ্গাইগাঁও-এ নেমে, মিটার গেজে যেতে হত বরপেটা রোড ৷ আমরা যখন যাই ৷ রাতে থাকতে হত ওখানে ৷ পরদিন মানস ৷

মানস স্যাংচুয়ারির বাংলো যে-জায়গায়, তার নাম মথানগুড়ি ৷ মথানগুড়িতে দুটি বাংলো ৷ আপার ও লোয়ার ৷ বলা বাহুল্য বাংলোটি কাঠের ৷ আপার বাংলোটি দোতলা ৷ টিলার ওপর ৷ সুসজ্জিত ৷ এমনকী, একটি বিশাল গ্লাস-প্লানেল-ওয়ালা পর্যবেক্ষণ কক্ষও রয়েছে ৷ পাহাড়ি সিঁড়িশ্রেণী নেমে গেছে ৫০০ ফিট নিচে বেঁকি নদী পর্যন্ত ৷ ওপারে ভুটানের পাহাড় ও অরণ্যানী ৷

লোয়ার বাংলো টিলার নিচে ৷ দুই বাংলোতেই অনেকগুলো ঘর আছে ৷ তখন ভাড়া ছিল ৩০ টাকা ৷ এছাড়া আছে নদীর ধারে ল্যা-কেবিন ৷

জানুয়ারি ১৯৮১-র গোড়ায় আমরা তিন হরিহর (আত্মা) যখন এখানে পৌঁছই, তখন বিকেলবেলা ৷ যে সৌন্দর্যের মুখোমুখি হয়েছিলাম, ভাষায় তার বর্ণনা হয় না ৷ সাধে বিভূতিভূষণ বারবার লিখেছেন, ‘এ অপূর্ব দৃশ্য যে না দেখিয়াছে, তাহাকে কী বুঝাইব!’ সেদিন ছিল পূর্ণিমা ৷ তখন ভুটান হিলসের পিছনে চাঁদ উঠে পড়েছিল, যদিও তখনও সূর্যাস্ত হয়নি ৷ একই আকাশে চাঁদ ও সূর্য-তাদের মেশামেশি আলোয় যে রং তৈরি হয়ে ঝরে পড়ছিল, মানস ও বেঁকি নদীর মিলন-মোহনায়, নানাভাবে, তাকে ‘স্বর্গ-রং’ ছাড়া আর কী বলব?

স্বর্গের রাজধানীতে এসে পড়েছি বলে মনে হয়েছিল ৷

ওপারেতে সর্বসুখ

নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস/ ওপারেতে সর্বসুখ আমার বিশ্বাস ৷ নীল নৌকায় চেপে ওপারে ভুটানে গেলে অবশ্য, দীর্ঘশ্বাস সহ, একথা মনে না পড়ে পারে না ৷ নদীতীর ছেড়ে কিছুটা ওপরে উঠলেই দেখা যাবে, কমপক্ষে ফুট পাঁচেক সোনা-লোমের ল্যাজ ঝুলিয়ে (হরিদ্রাভ বা সোনালি নয়) গোল্ডেন লেঙ্গুরের দলবল ৷ ডান দিকে বনপথের প্রবেশমুখে অবিশ্বাস্য পথ-ফলক-To The Bar! সেখানে পৌঁছলে রঙিন ছাতার নিচে বেতের সাদা চেয়ার-টেবিল ৷ পৃথিবীর যাবতীয় খাদ্য ও পানীয়, এক নরমাংস ছাড়া, থরে-থরে সাজানো ৷ ইতস্তত কিছু সোনালি মানব-মানবী ৷ হাজার দুই ফুট নিচে গর্জের (GORGE) মধ্য দিয়ে নেমে আসছে সরু মানস নদী ৷ পাহাড়-কাটা সিঁড়ি তদবধি নেমে গেছে ৷

অথচ, মথানগুড়ির বাংলোয় আরামদায়ক ঘর পাওয়া গেলেও, সুন্দর কিচেন থাকা সত্বেও খাবার-দাবার সেখানে কিছুই পাওয়া যায় না ৷ প্রথম রাতে আমাদের ডিনার বলতে ছিল এক বোতল ভুটানি রাম ও এক কেজি লেড়ো বিস্কুট ৷ আমাদের ফুড পয়েজনিং হয় ৷ যা পরদিন ওপারের সর্বসুখ বিফ স্টেক ও কাঁচা কর্বুশিয়ের খেতে হবে সারে ৷

প্রথম রাতে দুই-বাংলোর একটিতেও আমরা জায়গা পাইনি ৷ মানস এমনিতে আদৌ কোনও ভিড়-ভাট্টার জায়গা নয় ৷ কিন্তু, সেদিন শিলং থেকে নববছরে কলেজের একটা পুরো ক্লাস এসে পড়েছিল ৷

নদীর ধারে সাত-আটটি লজ-কেবিন ৷ এম ভি হর্ষবর্ধনের কেবিনের চেয়ে অনেক ছোট ৷ পাশাপাশি দুটি বাঙ্ক কোনওমতে ৷ মাঝখানে টি-পাই ৷ কমন টয়লেট-কক্ষ ৷ প্রথম রাতে আমরা তিনজনে সেখানেই গুঁজে যাই ৷ কারণ, ওই যে বললাম, কোর-এরিয়া ৷ বাঘের ঘরবাড়ি ৷ (বনবিভাগের জিপে আমরা এসেছি ৷ সঙ্গে ছিল, দিনেরবেলাতেও, একজন রাইফেলধারী ফরেস্ট গার্ড) ৷

ঘুম ভাঙল খুব ভোরে ৷ কেবিন থরথর করে কাঁপছে ৷ ভূমিকম্প? না ৷ বাঘ? না ৷ কেবিনের পোর্ট হোলের হিমাদ্র কাচ হাত-ওয়াইপার দিয়ে মুছে আমরা দেখলাম, একটি চিত্রল পুরুষ-হরিণ তার সুদীর্ঘ বাঁকা শিং ঘষছে কেবিনের গায়ে ৷

সেই থেকে জীবজগতের কাছে আমি ঋণী ৷

মানস, পুনর্বার

মানসে দ্বিতীয়বার ১৯৮৩ সালে ৷

এক আমেরিকা ছাড়া, আমি যেখানেই গেছি, ভালো লাগলে দু’বার করে গেছি ৷ আমেরিকা ভালো লাগেনি ৷

এবার মে মাসের শেষের দিকে ৷

এবার পাকাপাকি ব্যবস্থা ৷ আপার বাংলোর দোতলায় বুক করা ছিল তিন তিনটি ঘর ৷

ছিল তিন দিনের মতো চাল-ডাল, ডিম ও তৈজসপত্র ৷ এবং প্যাকেট-কুড়ি মশলা-ম্যাগি ৷ স্ত্রী-কন্যা সহ আমি আগের দিন থেকে আছি ৷ ২৪ মে রাত সাতটা-কুড়িতে গুয়াহাটি এয়ারপোর্ট থেকে এসে পৌঁছল বন্ধুবর বরুণ চৌধুরী ৷ সঙ্গে স্ত্রী মীনা ও ছেলেমেয়ে জয় আর রাখি ৷ গুয়াহাটি থেকে প্রলয়পয়োধি ঝড় ও বৃষ্টির মধ্যে ১৬৮ কিলোমিটার পথ রাইনো ট্র্যাভেলস-এর ঝরঝরে অ্যাম্বাসাডরে চেপে (ড্রাইভার মাতাল) ওরা সেদিন শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছিল ৷ এটা ঘটনা ৷

মানসে ওদের আবির্ভাবের মুহূর্তটি বরুণ চৌধুরীর ভাষায় এরকম:‘টিলার মাথায় মানস নদীর দিকে পিঠ বেঁকিয়ে ওই সেই স্বপ্নের বাংলো ৷ শুধু পৌঁছবার মইটা কেউ সরিয়ে রেখেছে ৷ ঘনঘোর অন্ধকারে অঝোর বৃষ্টির মধ্যে আকাশ-প্রদীপ (হ্যারিকেন) দুলছে বারান্দায় ৷ ওপরে পৌঁছনোর রাস্তা ছিল না কিছুতেই ৷ রিনা আর সন্দীপের আর্তকণ্ঠ উড়ছে গর্জনকারী হাওয়ায় ৷ তৃণার হাতে দু-সেল টর্চের সিগনাল!

‘শেষ পর্যন্ত রৈ-রৈ ৷ হৈ-হৈ ৷ মহামিলন ৷ ঘড়িতে তখন সাতটা-কুড়ি ৷’

‘রাত আটটায় দুই স্যাঙাৎ আপার বাংলোর ইনস্পেকসান ঘরে ৷ মাঝখানে এক বোতল তরল সোনা ৷ যেন, আজ নয় ৷ চল্লিশ মিনিট আগে নয় ৷ কতকাল এসেছি! রান্নাঘর থেকে রিনার তৈরি খিচুড়ির সুগন্ধ ৷’ (কলকাতার কাউবয়) ৷

পরদিন দুটি হাতির পিঠে চেপে আমরা বন্যজন্তু প্রদর্শনে যাই ৷ তখন দুপুরবেলা ৷ একটিতে মাহুত, আমি, রাখি ও মীনা যথাক্রমে ৷ অন্যটিতে মাহুত, জয়, তৃণা ও রিনা ৷ বরুণ গেল না ৷

বাঘ ছাড়া সবারই দেখা এখানে মেলে ৷ ১৪০ জন তারা ৷ কোথায় যে থাকে! অথচ, সাহেবদের জন্য যথেষ্ট পোজ দিয়েছে ৷ এক বেলজিয়ান বাংলোর রেজিস্ট্রারে লিখে গেছে: ‘টাইগার অ্যাট ফোর পি-এম ৷’ মায়, ফটোও খিঁচেছে ৷ ২৯-৪-৮২’র অপর একটি এন্ট্রিতে দেখলাম: ‘ড্যাড, ইটস স্টিল রেইনিং ৷ -জিম ফুলার ৷ সাউথঅল ৷ লন্ডন ৷’ তার বাবা যখন এসেছিল, সে বহুবছর আগে, বুঝলাম, সেদিনও বৃষ্টি পড়ছিল ৷ মনে হল, ইতিমধ্যে যে ‘ইতি ভাগ্যহীন’ হয়েছে ৷ ডেম এডিথ সিটওয়েলের ক’টি উক্তি আমার মনে না এসে পারে না:

‘স্টিল ফলস দা রেইন

ডার্ক অ্যাজ আওয়ার লস

লাইক নাইনটিন হানড্রেড অ্যান্ড ফিফটি নেলস

আপন দ্য ক্রশ….’

বলা বাহুল্য কবিতাটি ১৯৫০ সালে লেখা ৷

এক অমূল্য চলচ্চিত্র

তো, যা বলছিলাম ৷

যেতে-যেতে গভীর বনের মধ্যে আমাদের এক একা-বাইসনের সঙ্গে দেখা ৷ মানসের একা-বাইসন কুখ্যাত ৷ এদের খুরের ব্যাস দেড় ফুট এবং বৃন্তের পর বৃন্তে গোলাকার শিং সাত ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে ৷ এরা শিঙে তুলে নাকি বাঘও ছুড়ে ফেলে দেয় ৷ (দ্রঃ ই-পি-গী’র গ্রন্থে মানস-অধ্যায়) ৷

মাত্র একশো গজ দূরে সে চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়ে ৷

পিছন থেকে মিনতি-মাখা গলায় মীনা বলল, ‘সন্দীপন, আর-একটু এগিয়ে চল ৷’

মীনা ই-পি-গী পড়েনি ৷ কিন্তু সে তো মাহুতও পড়েনি ৷ সে শুধু মুখে তর্জনী তোলে ৷ অর্থাৎ, চুপ ৷

পাশের হাতি থেকে মেয়ে তৃণার চাপা গলা, ‘বাবা, ফিরে চল ৷’ হাতির মুখ ঘুরিয়ে মাহুতও হাতিকে নিয়ে-যাবার খোঁচা দিল ৷

কিন্তু, মীনার ওই কথা, কথা ৷ যদিও, আরও চাপা স্বরে, ‘আর-একটু এগিয়ে যেতে বল মাহুতকে ৷ আমি আর-একটু কাছ থেকে দেখব ৷’

দেখবার মতো দৃশ্যই বটে ৷ নির্জন নদীতীরে একা-বাইসন, তার মাথায় জড়ানো কতদিনের লতাপাতার মুকুট, পিছনে একটু পরেই সূর্য অস্ত যাবে ৷

কুড়ি গজের মতো এগোতে হল মাহুতকে ৷

‘আর-একটু চল সন্দীপন ৷ ওকে বলো প্লীজ ৷’

কিন্তু, হাতি এবার পা তোলার প্রয়াস করামাত্র-বনের দখল-নেওয়া বিকট এক রণভেরী বাজাল সে, দলছুট একা-বাইসন! সে রীতিমতো চঞ্চল হয়ে উঠেছে ৷ এই চাঞ্চল্য ভয়াবহ ৷ এ-দিকেই যে ছুটে আসবে, তা বোঝার জন্য ই-পি-গী’র দ্বারস্থ হবার আর দরকার পরে না ৷ এবং ছুটে সে কিছুটা এলও ৷ তারপর কী যে হল, কেন সে, কী মনে করে আর এগোল না-তা জানি না ৷ হঠাৎ থেমে পড়ে ও এক প্রবল দীর্ঘশ্বাস ফেলে, পিছন ফিরে হাতি-ঘাসের জঙ্গলের দিকে দিল দৌড় ৷ অগণন নুড়ি ও বোল্ডারের ওপর দিয়ে খুরধ্বনি ও প্রতিধ্বনি তুলে সে ঝাঁপিয়ে পড়ল নদীতে ৷ ওপারে উঠল ৷ তারপর সোজা ছুটতে লাগল ৷ সূর্য অস্ত যাচ্ছিল ওদিকেই ৷ বোধহয় তার শিংয়ে খোঁচা খেয়েই দিগন্তে সূর্যও উঠল ঈষৎ লাফিয়ে ৷

হাকোয়া নদীর জলে ভেসে যাচ্ছে তার মাথা থেকে খসে পড়া লতাপাতার মুকুট ৷ এই অমূল্য চলচ্চিত্র চোখ বুজলে আজও দেখতে পাই ৷

মানস একটি কবিতা

এই তো গেল মানসের গল্প ৷ গল্পই; যদিও প্রকৃত প্রস্তাবে মানস একটি কবিতা ৷ যদি মানসের শাখানদীগুলি, বেঁকি, সাঙ্কোশ ও হাকোয়ার অববাহিকা ধরে বর্তুল সাদা-লাল রাবার-বোটে করে ভেসে যাওয়া যায় ৷ তীরে গাছগাছালি সব দাঁড়িয়ে পড়েছে ৷ অবাক চোখে, আপনি নয়, হরিণ, সম্বর, হাতি, গণ্ডার, বাইসন-মায় কপালে থাকলে বাঘ-বাঘিনীও আপনাকেই যেন দেখতে এসেছে ৷

এবং যদি নির্জন নৌকায় চেপে অপরাহ্নের নদী পেরিয়ে, ওপারে ভুটানে যাওয়া যায় ৷ জল বরফ-নীল ৷ ওখানে শাখায় শাখায় স্বর্ণমৃগ ৷ গোল্ডেন লেঙ্গুর ৷ তারা তো এপারে আসে না ৷ তারা তো কোথাও যায় না ৷ পৃথিবীর আর-কোথাও তারা তো নেই!

আর, ওপারে ভুটানের রাজবাড়িটি! মন্দ্রিয়নের এঁকে যাওয়া আনফিনিশড ক্যানভাস যেন একটি! আজ তার কত কোটি ডলার দাম কে জানে! একবার দেখলে মাথা-গ্যালারিতে জীবনভর ঝুলে থাকবে ৷

তাই বলছিলাম ৷ বেঁচে-থাকার জায়গা? সে তো অনেক ৷ কিন্তু মরে যাবার জায়গা ওই একটাই ৷ মানস ৷ সেটাও বন্ধ হয়ে গেল!

ভ্রমণ মার্চ, ১৯৯৩

সকল অধ্যায়
১.
অর্ধশতাব্দীর আগের বদ্রীনাথ যাত্রা – প্রতাপকুমার রায়
২.
মানস অভয়ারণ্য – সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
৩.
জলদাপাড়া অরণ্য – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
৪.
জলের ধারে ঘর – নবনীতা দেব সেন
৫.
জয়ন্তীর মহাকাল মন্দির – উষা সেন
৬.
তাহিতি – হরপ্রসাদ মিত্র
৭.
মার্কন্ডেয় গঙ্গার উত্স সন্ধানে – অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়
৮.
কেদার বদ্রী – মৈত্রেয়ী চট্টোপাধ্যায়
৯.
তেহরানি হয়রানি – অমিতাভ চৌধুরি
১০.
শোনপুরের মেলায় – বরুণ দত্ত
১১.
এলেম নতুন দেশে – কমলা মুখোপাধ্যায়
১২.
মস্কো থেকে সাইবেরিয়া হয়ে পিকিং – গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩.
পাতাল-ভুবনেশ্বর – বিশ্বদীপ দত্ত
১৪.
ইছামতীর মশা – শঙ্খ ঘোষ
১৫.
নিকোবরের দ্বীপে – তিলকরঞ্জন বেরা
১৬.
তিরতিরে নদী আর শাল জঙ্গলের দেশে – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১৭.
আমার ভ্রমণ – মহাশ্বেতা দেবী
১৮.
সুন্দরবন – হীরক নন্দী
১৯.
ওপারবাংলার সুন্দরবনে – সমীর সেনগুপ্ত
২০.
সাইকেলে পাঁচ বছরে ভূ-পর্যটন – ভূপর্যটক বিমল দে
২১.
আঙ্কোর ভাট – প্রীতি সান্যাল
২২.
হিমালয়ের সাতকাহন – ত্রিদিব বসু
২৩.
স্বপ্নের পথেই যাওয়া যায় – মহাশ্বেতা দেবী
২৪.
ছোট কৈলাস – সুভাষ দত্ত
২৫.
বালতাল হয়ে অমরনাথ – প্রতাপকুমার রায়
২৬.
মধ্য এশিয়া অভিযান – গৌতম ঘোষ
২৭.
পথ হারিয়ে সিকিমের জঙ্গলে – রতনলাল বিশ্বাস
২৮.
নতুন করে পাব বলে – বন্দনা সান্যাল
২৯.
সেবার ব্রেকজার্নি করে – জয়া মিত্র
৩০.
চন্দ্রভাগার উৎস চন্দ্রতাল সুর্যতাল – সুনীলকুমার সরদার
৩১.
ওঙ্কারেশ্বর – বিশ্বদীপ দত্ত
৩২.
সুন্দরবনে দুদিন – পবিত্র সরকার
৩৩.
মণিমহেশ – কমলা মুখোপাধ্যায়
৩৪.
দিকবিদিকে – শক্তি চট্টোপাধ্যায়
৩৫.
তিস্তানদীর উৎসে – শরৎ ঘোষ
৩৬.
পশ্চিমে হাওয়াবদল – মধুপর্ণা দত্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
৩৭.
এক টুকরো নীল চাঁদ – সুমিত মুখোপাধ্যায়
৩৮.
কালিম্পং থেকে তিব্বত – অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়
৩৯.
সাইলেন্ট ভ্যালি – শিবনাথ বসু
৪০.
মির্জা শেখ ইতেসামুদ্দিনের বিলেত যাত্রা এবং আমি – নবনীতা দেব সেন
৪১.
বক্সা বাঘ-প্রকল্প – বুদ্ধদেব গুহ
৪২.
গানতোক থেকে ইয়ুমথাং – সুতপা ভট্টাচার্য
৪৩.
ক্যামেরুন, আগ্নেয়গিরি ও গভীর জঙ্গলের খুদে মানুষেরা – প্রীতি সান্যাল
৪৪.
ডুয়ার্সের দুয়ার এখন খোলা – সমরেশ মজুমদার
৪৫.
ইউরোপে দিন কয়েক – পূর্ণেন্দু পত্রী
৪৬.
রামচন্দ্রের বনবাসের পথ পরিক্রমা – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৭.
আসমুদ্রককেশাস – অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
৪৮.
নিরলংকার ভ্রমণ – শঙ্খ ঘোষ
৪৯.
চেঙ্গিস খানের দেশে – প্রতাপকুমার রায়
৫০.
মিজোরামের নীল পাহাড়ে – দীপঙ্কর ঘোষ
৫১.
সিন্ধুদুর্গ – বিশ্বদীপ দত্ত
৫২.
জিম করবেটের জঙ্গলে – মণিদীপা বন্দ্যোপাধ্যায়
৫৩.
থর মরুভূমিতে ট্রেকিং – শিবনাথ বসু
৫৪.
মরোক্কো ভ্রমণ – হরপ্রসাদ মিত্র
৫৫.
ভাগীরথী, রূপনারায়ণ, নোবেল প্রাইজ – নবনীতা দেব সেন
৫৬.
গন্তব্য মাচুপিচু – প্রতাপকুমার রায়
৫৭.
কই যাইত্যাছি জানি না – শঙ্খ ঘোষ
৫৮.
পারাংলা অভিযান – সুনীলকুমার সরদার
৫৯.
পুশকিন, মলদভা আর কচি পাতার বাঁশিতে মোত্সার্ট – প্রীতি সান্যাল
৬০.
আমাদের ছোট নদী : পার্বতী – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
৬১.
দেবলোকের পথে পথে – অশোক চক্রবর্তী
৬২.
না-ভ্রমণের বৃত্তান্ত – আশাপূর্ণা দেবী
৬৩.
এভারেস্টের পাদদেশে যাত্রা – কমলা মুখোপাধ্যায়
৬৪.
নীল নদে পাঁচদিন – হরপ্রসাদ মিত্র
৬৫.
বারাণসীর ঘাটের কথা – মণিদীপা বন্দ্যোপাধ্যায়
৬৬.
বালফাক্রমের পাহাড়-জঙ্গলে – সুমিত মুখোপাধ্যায়
৬৭.
গৌরীগঙ্গার উৎসব মিলাম হিমবাহ – পুরুষোত্তম বন্দ্যোপাধ্যায়
৬৮.
মরুভূমির দিনরাত্রি – পবিত্র সরকার
৬৯.
ঢাকা : একুশ বছর পর – অন্নদাশঙ্কর রায়
৭০.
ফোকসোমদো হ্রদ – ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত
৭১.
ইন্টারলাকেন থেকে ইয়ুংফ্রাউ – মণিদীপা বন্দ্যোপাধ্যায়
৭২.
কালিন্দী গিরিবর্ত্ম – রথীন চক্রবর্তী
৭৩.
একযাত্রায় ভোরামদেরও আর কানহা – হীরক নন্দী
৭৪.
মদমহেশ্বরের ডোলিযাত্রা – কাজল দত্ত
৭৫.
কেনিয়ায় পাঁচ অরণ্য – প্রতাপকুমার রায়
৭৬.
কোনাডা থেকে রেভুপাল ভরম – রতনলাল বিশ্বাস
৭৭.
চাঁদের দেশ লাদাখ – কমলেশ কামিলা
৭৮.
বোকের তোভ, ইজরায়েল – নবনীতা দেব সেন
৭৯.
বিষ্ণুপুর মুকুটমণিপুর – হরপ্রসাদ মিত্র
৮০.
ডোকরিয়ানি বামক – অনিন্দ্য মজুমদার
৮১.
তাওয়াং থেকে তাসি-চু জং – কমলা মুখোপাধ্যায়
৮২.
মেক্সিকো শহরের একটি দিন – প্রীতি সান্যাল
৮৩.
আকাশচূড়ায় অভিযান – অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়
৮৪.
ভ্রমণের ঝঞ্ঝাট – শঙ্খ ঘোষ
৮৫.
সারেঙ্গেটির জঙ্গলে – হরপ্রসাদ মিত্র
৮৬.
এবারের কুম্ভমেলায় – চিন্ময় চক্রবর্তী
৮৭.
অন্য পথের পথিক – বুদ্ধদেব গুহ
৮৮.
গরুমারা জঙ্গলে – টুটুল রায়
৮৯.
নিশীথ সূর্যের দেশ – প্রতাপকুমার রায়
৯০.
সবুজ নামদাফাতে – সঞ্জয় বন্দ্যোপাধ্যায়
৯১.
পঞ্চকেদার – শিবনাথ বসু
৯২.
গোঁসাইকুণ্ড – কমলা মুখোপাধ্যায়
৯৩.
অমরকন্টক – হীরক নন্দী
৯৪.
আদিম ডুয়ার্সের আধুনিক রূপকথা – সূর্য ঘোষ
৯৫.
পার্বতী উপত্যকায় সার পাস – বিদ্যুৎ দে
৯৬.
মিয়ানমার, ইরাবতীর সঙ্গে – পবিত্র সরকার
৯৭.
রূপসী রিশপ – হীরক নন্দী
৯৮.
হিমবাহের জন্মভূমিতে – শেখর ভট্টাচার্য
৯৯.
ভাবা জোত পেরিয়ে কিন্নর থেকে স্পিতি – অনিন্দ্য মজুমদার
১০০.
ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত – হরপ্রসাদ মিত্র
১০১.
বক্সা দুর্গ – টুটুল রায়
১০২.
সিন্ধু নদের ধারে – রতনলাল বিশ্বাস
১০৩.
মেঘালয়ের দাউকি – সুমিত মুখোপাধ্যায়
১০৪.
আমাদের ছোট নদী : লিডার – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
১০৫.
লাসা – সমীর রায়
১০৬.
২ নম্বর লোভালোয়া স্ট্রিট – অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
১০৭.
অযোধ্যা পাহাড় – বিশ্বদীপ দত্ত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%