মৃতেরাও কথা বলে - ২

জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

কন্দর্পনারায়ণের চেম্বারে

অরুণা কন্দর্পনারায়ণের হাত দুটো চেপে ধরলেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন— 'জামাই, আমার মেয়ে আর ফুলের মতো নাতনিটাকে খুন করে পালিয়েছে। আপনি কিছু করুন, প্লী-ই-ইজ, আপনি আমার জামাইকে অ্যারেস্ট করিয়ে দিন'।

কন্দর্পনারায়ণ একদৃষ্টে ভদ্রমহিলার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন।

বড় বড় চোখ দুটো দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছে। কথা বলতে বলতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছেন অরুণা।

এক একটা মামলার ঘটনা, এমন মন-খারাপ করে দেয়— আজ সন্ধ্যেবেলায় চেম্বারে বসে প্রথম মক্কেলই ছিলেন অরুণা মিত্র। লাল অ্যাপয়েণ্টমেণ্টের ডায়েরিতে, সাড়ে ছটায় এই নামেই অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট করা ছিল।

মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ, এর মধ্যেই দিন বেশ বড় হয়ে গেছে। কোর্ট থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে, ফ্রেশ হয়েই চেম্বারে এসে বসা।

গত বাইশ বছর ধরে, কন্দর্পনারায়ণের এটাই রুটিন। সোম থেকে শুক্র, কোর্ট থেকে ফিরে সন্ধ্যেবেলায়, আর শনি, রবি ও ছুটির দিনে, সকাল সাড়ে দশটা থেকে এক্কেবারে রাত পর্যন্ত চেম্বার চলে। তারই মধ্যে উঠে খাওয়া-দাওয়া। ওই দিনগুলোতে বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থেকে খাবার আনানো হয়। চাউমিন বা স্যান্ডউইচ, সঙ্গে চা, কোল্ড ড্রিংকস তো থাকেই।

সব জুনিয়র ল'ইয়াররাও কন্দর্পনারায়ণ-এর সঙ্গে সমানতালে পরিশ্রম করেন। কাজেই শনি-রবি আর ছুটির দিনগুলোতে, দুপুরবেলায় সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া সারেন চেম্বারেই।

মাঝে মাঝে বিশেষতঃ শুক্রবার সন্ধ্যায় বা শনি-রবিবারে, খুব চাপ না থাকলে, চেম্বারের সবাই মিলে বাইরে কোনো রেস্তোঁরাতে খেতে যান হই হই করতে করতে।

আজকে অরুণা মিত্রর ঘটনা শুনে কন্দর্পনারায়ণ-এর মন এতটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, কন্দর্পনারায়ণ আর কথা বলার অবস্থাতেই ছিলেন না।

শুধু ইশারায় পাশের ঘর থেকে পারমিতাকে ডেকে বলেছিলেন, 'একটু চা করো তো'। গলার কাছে একটা কান্নার দলা উঠে এসেছিল। মাথা নিচু করে চুপ করে বসেছিলেন।

পারমিতা, কন্দর্পনারায়ণের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে পাশের ঘরে গিয়ে দ্বৈপায়ন, নাজির আর সুপ্রীমকে ডেকে এনেছিলেন।

দ্বৈপায়ন, এ ঘরে এসে কন্দর্পনারায়ণ-এর পাশের একটা ফাঁকা চেয়ারে বসতে বসতে বলেছিলেন,— 'কী ব্যাপার স্যার? এই তো বৌদি চা করে দিয়ে গেলেন, আবার চা? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?'

একথা ঠিকই, কোর্ট থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে চেম্বারে বসার সঙ্গে সঙ্গে, বসুন্ধরা এক কাপ চিনি ছাড়া লিকার চা আর দুটো বিস্কিট দিয়ে গিয়েছিলেন। এমনিতে সারা দিনে খুব বেশি চা খান না কন্দর্পনারায়ণ।

তবে, অরুণা মিত্রের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনটা অ্যাত্তো খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে, কখন গলার কাছে কান্না উঠে এসেছে, তাঁর নিজের চোখ দুটোই জলে ভিজে এসেছে, তিনি টেরই পান নি।

পাশের ঘর থেকে পারমিতাকে ডেকে চায়ের কথা বলতে গিয়ে তিনি টের পেলেন যে গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না। মাথাটা কেমন যেন প্রবল উত্তেজনায় দপ দপ করছে।

দীর্ঘদিন ধরে ওকালতি করছেন কন্দর্পনারায়ণ। খুন, জখম, অপহরণ, ডাকাতি, 'রেপ' এর কেস তিনি কম দেখেন নি। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, মামলা করতে গিয়ে তিনি বড্ড তাড়াতাড়ি আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন।

লোকে বলে ক্রিমিনাল ল'ইয়ারদের আবেগ থাকতে নেই।

যেই শোনে সেই অবাক হয়। কন্দর্পনারায়ণ-এর মতো দুঁদে ক্রিমিনাল ল'ইয়ার এতো আবেগপ্রবণ!

কিন্তু কন্দর্পনারায়ণ জানেন, তাঁর ভেতরের এই আবেগটাই, তাঁকে কয়েক কদম এগিয়ে দিয়েছে। মক্কেলরা খুশি হন, যখন তাঁরা দেখেন, কন্দর্পনারায়ণ তাঁদের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করে নিয়েছেন। তাঁদের দুঃখের কাহিনি শুনতে শুনতে কন্দর্পনারায়ণ-এর চোখে জল চলে আসাকে তাঁরাও সম্মান জানিয়েছেন।

দ্বৈপায়নের কথা শুনে কন্দর্পনারায়ণ বাঁ হাতের কনুইয়ের উপর ভর দিয়ে, হাতের তালুর উপর নিজের থুতনিটাকে রেখে সামনে চেয়ারে বসে থাকা অরুণা মিত্রকে দেখিয়ে বললেন— 'উনি হলেন অরুণা মিত্র। বালিগঞ্জ গার্ডেন থেকে এসেছেন।'

একটু থেমে আবার বললেন— 'ম্যাডাম, ওরা সব আমারই সৈনিক। আপনার সমস্যা সমাধানে ওদের সাহায্যও আমার লাগবে। আপনি আপনার কথা আর একবার বলুন প্লীজ। ওরাও শুনুক।'

দ্বৈপায়ন, নাজির, সুপ্রীম একসঙ্গে তাকালেন অরুণা মিত্রর দিকে—

প্রায় ষাট-বাষট্টি বছর বয়স হবে ওনার। বব করা ধবধবে সাদা চুল, ফর্সা মুখ দিয়ে যেন জ্যোতি বেরোচ্ছে। বড় বড় টানা টানা চোখ। সাদা খোলের নীল পাড়ের শাড়িতে যেন আরও সুন্দরী হয়ে উঠেছেন। অত্যন্ত অভিজাত চেহারা। ডান হাতে দামি ঘড়ি, বাঁ হাতে একটা হীরে বসানো ব্রেসলেট। মুখে অত্যন্ত বিষণ্ণতার ছাপ থাকলেও বোঝা যাচ্ছে যে, অল্প বয়সে ইনি পরমাসুন্দরী ছিলেন।

কন্দর্পনারায়ণ-এর কথায়, জলভরা চোখ দুটো তুলে, দ্বৈপায়ন, নাজির আর সুপ্রীমকে একবার দেখলেন অরুণা মিত্র। তারপর মাথাটা নিচু করে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—

'আমার নাম অরুণা মিত্র। কলকাতার নামকরা একটা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলাম। আমার স্বামীও ছিলেন খুব খ্যাতিমান মানুষ। বৈজ্ঞানিক ডক্টর মৃন্ময় মিত্র। ভারত সরকারের অধীনে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে কাজ করার পর নিজেই বাড়িতে একটা ল্যাবরেটরি বানিয়ে বিভিন্ন ধরনের গবেষণা নিয়ে মেতে থাকতেন। সপ্তাহ দুয়েক আগে এক বিকেলে তাঁকে তাঁর গবেষণাগারের মধ্যেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।'

'আমি খুনের অভিযোগে মামলা দায়ের করি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নি। পুলিশ মৃতদেহ উদ্ধারের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই প্রেস কনফারেন্স করে জানিয়ে দেয় যে, আমার স্বামী মানসিক অবসাদে আত্মহত্যা করেছেন'।

কন্দর্পনারায়ণ মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন— 'হুঁ, কাগজে পড়েছি। আমারও খবরটা পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল, অতবড় বৈজ্ঞানিক মানসিক অবসাদে ভুগে আত্মহত্যা করতে যাবেন কেন? তাছাড়া আত্মহত্যা করে থাকলেও, তা করলেনই বা কীভাবে? দেহটা ওনার ল্যাবরেটরির অফিসঘরের মাঝখানে মাটিতে পড়েছিল।'

কন্দর্পনারায়ণ থামতেই হাতের দামি তোয়ালে-রুমালে মুখ মুছে একটু জোরে দম নিয়ে আবার বলা শুরু করলেন অরুণা মিত্র— 'আমি পুলিশি তদন্তের প্রতিবাদ করেছিলাম। বলেছিলাম, আমার স্বামী আত্মহত্যা করতে পারেন না। কেন তিনি আত্মহত্যা করবেন? আর কেনই বা তিনি মানসিক অবসাদে ভুগবেন? তাঁর আত্মহত্যা করবার কোনো কারণই নেই।'

তখন ঘটনার তদন্তকারী অফিসার, একদিন আমাকে, আমার মেয়ে আর জামাইকে থানায় ডেকে নিয়ে গেল।

আমাদের প্রচণ্ড ভয় দেখাল। বলল— 'আমরা, আত্মহত্যা দেখিয়ে চার্জশীট জমা দিচ্ছি— আপনারা যদি চার্জশীট চ্যালেঞ্জ করেন বা হাইকোর্টে যান, তাহলে আমরা কোর্টে বলব, আপনি আর আপনার মেয়ে-জামাই খুনটা করিয়েছেন। সারাজীবন জেলের ঘানি টানাব।'

দু-দিন আমার জামাইকে লক আপে রেখে প্রচণ্ড মারধর করল। শেষে মুচলেকা লিখিয়ে নিল যে, আমরা ভবিষ্যতে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করব না।

আমার জামাইকে যখন ওরা থানা থেকে ছাড়ল, তখন আমার জামাই লক আপে, প্রচণ্ড মারধরের ফলে অসুস্থ হয়ে পড়েছে— মাথার জায়গায় জায়গায় ফুলে গিয়েছে, ঠোঁট ফাটা, সারা শরীরে কালসিটের দাগ।'

অরুণা মিত্র, এতক্ষণ মাথা নিচু করেই কথা বলছিলেন, এবার চোখ তুলে কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে তাকালেন, বললেন— 'আমরা তখনই ভেবেছিলাম আপনার কাছে আসব। সব জানিয়ে আপনার কাছ থেকে পরামর্শ চাইব। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সাহস হয়নি।

একে তো স্বামীকে হারিয়েছি। কিভাবে তিনি মারা গেলেন, কে মারল, কেন মারল, তার তো কোনো কিনারা হলই না, উলটে আমাদেরই সবাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল— বলল— যদি আত্মহত্যার তত্ত্ব মেনে না নিই তাহলে পুলিশ আমাদের বিরুদ্ধেই চার্জশীট দেবে, বলবে আমার সঙ্গে আমার জামাইয়ের অবৈধ সম্পর্ক আছে। সেটা ধরে ফেলাতেই আমরা নাকি, সবাই মিলে, আমার স্বামীকে খুন করেছি।'

'বোঝো কাণ্ড, এরা কী?' পারমিতা কখন যেন, ট্রে তে করে, সবার জন্য কাগজের কাপে, চা নিয়ে এসেছেন।

ততক্ষণে অন্য ঘর থেকে মৌমিতা, জয়শ্রী, শ্রীপর্ণা, নন্দিনী, পৃথা, চন্দ্রিমা, দেবর্ষি— সবাই এসে দাঁড়িয়েছেন। মাথা নিচু করে, কনুইটা টেবিলের উপর রেখে, বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে কপালটা টিপে ধরে বসে থাকায় কন্দর্পনারায়ণ টেরই পাননি।

পারমিতার কথায় কন্দর্পনারায়ণ-এর চটক ভাঙ্গল। ডান হাত বাড়িয়ে ট্রে থেকে কাগজের কাপটা নিতে নিতে বললেন— 'এটাই তো আমাদের ট্র্যাজেডি, আমরা শুধু গুণ্ডা, বদমাশ, খুনিদের সঙ্গেই লড়াই করি না। কিছু অসৎ পুলিশের সঙ্গেও আমাদের লড়াই করতে হয়।

অতবড় একজন বৈজ্ঞানিকের আনন্যাচারাল ডেথ, তার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত না করে, মৃতদেহ উদ্ধারের এক ঘণ্টার মধ্যেই বলে দিল যে, এটা মানসিক অবসাদে আত্মহত্যা!'

একটু থেমে চা-এর কাপে চুমুক দিয়ে আবার বললেন— 'মানসিক অবসাদে আত্মহত্যা— হতে পারে না তা নয়। কিন্তু, সে তো একটা নিরপেক্ষ, সৎ তদন্তের পর বোঝা যাবে। কিন্তু, মৃতদেহ উদ্ধারের খানিকক্ষণের মধ্যেই যখন পুলিশ একেবারে প্রেস কনফারেন্স করে একথা ডিক্লেয়ার করে, তখন পুলিশের সততা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে বইকি।'

পারমিতা যোগ করলেন— 'পুলিশ কাউকে জেরা করল না, কারো সাথে কথা বলল না, কারো বয়ান রেকর্ড করল না, এমনকী পোস্ট মর্টেম রিপোর্টও দেখল না— বলে দিল আত্মহত্যা? তাও আবার মানসিক অবসাদে? তাছাড়া যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নিই যে, 'আত্মহত্যা'-র মতো কোনো ঘটনা ঘটেছে, তখনও তো প্রশ্ন জাগে যে, এই আত্মহত্যায় কারো 'প্ররোচনা' নেই তো?'

'ঠিক। মিস্টার মিত্র যে, মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন, পুলিশ বুঝল কেমন করে?' জয়শ্রী যোগ করলেন।

দ্বৈপায়ন বললেন— 'পারমিতাদি, তোমার কথা ঠিক। তুমি বললে, সন্দেহের প্রথম পর্যায়ের কথা। আর সন্দেহের দ্বিতীয় পর্যায় হোলো, পুলিশ যেনতেন প্রকারেণ, মিসেস মিত্র, তাঁর মেয়ে আর জামাইকে, নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া থেকে দূরে রাখতে চাইছিল। পুলিশ কিছুতেই চাইছিল না, নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।

তারা ভয় পাচ্ছিল, পুলিশি তদন্তে খুশি না হয়ে, মিসেস মিত্ররা যদি হাইকোর্টে আপিল করেন, তাই, তারা মিসেস মিত্র আর তাঁর মেয়ে-জামাইকে থানায় তুলে নিয়ে গেল। বিভিন্নভাবে ভয় দেখাল। বলল এই ঘটনা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে মিসেস মিত্রদেরই বিপদ হবে— ওঁদের বিরুদ্ধেই ডক্টর মিত্রকে খুনের অভিযোগ আনা হবে।'

দ্বৈপায়ন থামতেই নাজির বলে উঠলেন— 'স্যার, ভেবে দেখুন, পুলিশ এই ঘটনাটা নিয়ে এতটাই চাপে ছিল যে, তারা মিসেস মিত্রের জামাইকে বে-আইনি ভাবে তুলে নিয়ে গিয়ে লক-আপে রেখে প্রচণ্ড মারধর করল যাতে তিনি এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে বেশি হই চই না করেন।

তাছাড়া পুলিশ হয়তো জানতে পেরেছিল যে সুবিচার চেয়ে মামলা করার জন্য মিসেস মিত্র আর তাঁর মেয়ে-জামাই আমাদের চেম্বারে আসতে পারেন। মিসেস মিত্রর জামাইকে মারধর করে, ভয় দেখিয়ে আমাদের চেম্বারে আসা থেকেও বিরত করা হল।'

এবার মিসেস মিত্র মুখ খুললেন— 'আমি কিন্তু শুধু এই জন্যই কন্দর্পনারায়ণ বাবুর কাছে আসিনি— এতক্ষণ তো আমি শুধু আমার বিপদের প্রথম পর্বটাই বলেছি। আমার বিপদের বাকি অংশটাও শুনুন।'

চেম্বারে উপস্থিত সব জুনিয়র ল'ইয়াররা চমকে উঠলেন— 'অ্যাঁ, এটাই সব নয়? আপনার আরও সমস্যা রয়েছে?'

কন্দর্পনারায়ণ মাথা নাড়লেন— 'তোরা বাকিটাও শোন, ওঁর মুখেই।'

মিসেস মিত্র আবার বলা শুরু করলেন—

'যেহেতু, আমার স্বামীর মৃত্যুর পর আমরা থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করি, এবং তারপর আমাদেরই থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে পুলিশ হেনস্থা করতে থাকে, বিশেষত আমার জামাইকে দু-দিন পুলিশ লক আপে আটকে রেখে খুব মারধর করে, তাই আমার জামাই আমাদের উপর ভীষণ রেগে যায়।

সে মনে করতে থাকে তার এই হ্যারাসমেণ্টের জন্য আমরাই দায়ী। সে আমার মেয়ে এবং নাতনিকে আমার বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দেয়। বলতে থাকে— এই অপমান তার প্রাপ্য ছিল না। বিনা কারণে পুলিশ তাকে মারধর করেছে, কুৎসিতভাবে আক্রমণ করেছে। ইন ফ্যাক্ট তার ট্রমা হয়ে যায়। সে আমার মেয়েকে বলে যে, সে ডিভোর্স চায়। আমার বা আমার মেয়ের সঙ্গে সে কোনোরকম সম্পর্ক রাখবে না।

সে খোলাখুলিই বলে, যে তার পাঁচ বছরের মেয়ের জন্যই সে বেঁচে আছে, না হলে থানার লক-আপেই আত্মহত্যা করত।

আমি তাকে অনেক বোঝাই, আমার মেয়ে বোঝায়, কিন্তু অবস্থা চরমে ওঠে। আমার মেয়ে আর জামাইয়ের মধ্যে তুমুল অশান্তি শুরু হয়ে যায়।' অরুণা মিত্র দম নেবার জন্য থামলেন।

দ্বৈপায়ন অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন। টেবিলে একটা ঘুঁষি মেরে বলে উঠলেন— 'পুলিশের এই ওভার এনথুজিয়াস্টিক অ্যাটিচিউডের জন্য, কত সংসার যে নষ্ট হয়ে গেছে তা গুণে শেষ করা যায় না।

পুলিশ একদম নিরপেক্ষ তদন্ত করতেই চায় না। সবসময় কাট-শর্ট মেথড। একটা মানুষ কত কারণে, কত্ত ভাবে খুন হতে পারেন। কিন্তু, কোথাও কোনো আন-ন্যাচারাল ডেথ-এর ঘটনা ঘটলেই পুলিশ আগে বাড়ির লোককেই হেনস্থা করবে। তাদের মেরে, ভয় দেখিয়ে, বয়ান আদায় করবে, যেন খুনটা তারাই করেছে— আসলে পুলিশ খাটতেই চায় না।'

জয়শ্রী বললেন— 'স্যার সেদিনের ঘটনাটা মনে আছে? ওই যে বাইপাসের ধারের?' চেম্বারে উপস্থিত সবাই উৎসুক হয়ে জয়শ্রীর দিকে তাকালেন।

কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'কোন ঘটনাটা?'

জয়শ্রী বলতে শুরু করলেন— 'ওই যে, গত সপ্তাহে সাদার্ন পার্ক এলাকা থেকে এক ভদ্রলোক এলেন, তাঁর ছেলে আর মেয়ে দুজনেই ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করেন— খুব কৃতী। ছাত্র-ছাত্রী হিসেবেও তাঁরা প্রথম সারির ছিলেন। কলকাতার কলেজ থেকে খুব ভালো রেজাল্ট করে ব্যাঙ্গালোরে চাকরি নিয়ে চলে যান।

এই লকডাউনের পরে, কলকাতায় ফিরে ছেলেটি একদিন সন্ধ্যেবেলায় স্কুটার নিয়ে যাচ্ছিল। পুলিশ রাস্তা আটকে স্কুটারের কাগজপত্র দেখতে চায়। ছেলেটি বলে 'কোভিডের কারণে আমি কাগজপত্র ক্যারি করছি না, কিন্তু মোবাইলে সব ছবি তুলে রাখা আছে। আমি ছবি দেখাতে পারি— আর আমাকে সময় দিলে, আমি বাড়ি থেকে সব কাগজপত্র এনে থানায় নিয়ে গিয়ে দেখাতে পারি।'

পুলিশ রাজী হয় না। তারা প্রায় দশ-বারো জন, ছেলেটাকে ঘিরে ধরে বিভিন্নভাবে ভয় দেখাতে থাকে।'

নাজির বলে উঠলেন— 'পুলিশ ঠিক এরকমই করে। রাস্তা দিয়ে একটা স্কুটারে বা বাইকে চড়ে, হেলমেট না পরে তিন-চারটে অল্পবয়সি ছেলে যখন হুশ হুশ করে ছুটে যায়, বা অনেক রাত্রে পাড়া দাপিয়ে বেড়ায় হেলমেটবিহীন বাইক-বাহিনী, তখন পুলিশ তাদের ধরতে সাহস পায় না।'

কন্দর্পনারায়ণ এতক্ষণ চেয়ারে হেলান দিয়ে সবার কথা শুনছিলেন। তিনি এবার সোজা হয়ে বসে বললেন— 'একদল রোবোটকে যেন সিভিক-ভলাণ্টিয়ার হিসেবে থানায় থানায় নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে সবচেয়ে বেশি। এদের কোনো ট্রেনিং নেই। চাকরিতে স্থায়ীত্ব নেই বলে দায়বদ্ধতাও নেই।

এরা নিজেদের পুলিশের চেয়েও বড় পদাধিকারী মনে করে।

আর দেখবি রাস্তায় গাড়ি, স্কুটার, বাইক এরাই আটকায়। বিশেষত স্বামী-স্ত্রী, সঙ্গে বাচ্চা— একেবারে ঘর-গেরস্থ টাইপ লোকজনকেই ধরে। ভয় দেখায়— টাকা চায়। টাকা না দিলে মিথ্যে কেস দেয়।' থামলেন তিনি।

একটু থেমে আবার বলা শুরু করলেন— 'জয়শ্রী ঠিক বলছিলি, বাইপাসের ধারের সেই ঘটনাটা সত্যিই ভয়ংকর।

ছেলেটিকে বলা হয় 'আপনাকে হাজার টাকা ফাইন দিতে হবে।'

ছেলেটি বোঝাবার চেষ্টা করে— 'ফাইন আমি দেব কেন? ঠিক আছে, একটু সময় দিন, আমি বাড়িতে ফোন করছি, আমার বাবা এক্ষুণি কাগজপত্র নিয়ে আসছেন।'

ছেলেটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা সিভিক ভলান্টিয়ার এবং পুলিশের দল তাকে বিভিন্নভাবে চাপ ও হুমকী দিতে থাকে।

ছেলেটি একা হলেও আজকালকার দিনের এডুকেটেড ছেলে। সেও, পুলিশের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদ জানাতে থাকে।

শেষে পুলিশ ছেলেটিকে মারতে মারতে গাড়িতে তোলে ও থানায় নিয়ে যায়। ওরই ফাঁকে ছেলেটি কোনোরকমে মোবাইল ফোনে বাড়িতে খবর দেয়।

ছেলেটির বাবা আর বোন অত রাত্রে থানায় এসে পৌঁছোন। তাঁরা ছেলেটির উপর মারধরের প্রতিবাদ করেন। অবশেষে তাঁরাও পুলিশের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়েন।'

কথা বলতে বলতে, চোখ থেকে, চশমাটা খুলে টেবিলের উপর রাখলেন, তারপর পকেট থেকে একটা ধবধবে সাদা রুমাল বের করে চশমার কাঁচটা মুছতে মুছতে কন্দর্পনারায়ণ বললেন—

'তারপর যা ঘটল, তা আর কহতব্য নয়— ভাবলেও শিউরে উঠতে হয়।

পুলিশ ছেলেটিকে এবং তার বোনকে মারতে শুরু করে। সেদিন থানাতে কোনো মহিলা পুলিশ ছিল না। পুরুষ পুলিশরা, বাবা আর ভাইয়ের সামনেই মেয়েটিকে তুলে নিয়ে যায় অন্য একটি ঘরে। সেখানে টেবিলের উপর শুইয়ে, তারা মেয়েটির সারা শরীরে হাত দেয়। এমনকী মেয়েটির প্রাইভেট পার্টস-ও বাদ যায়নি।

ওই রাতেই ভদ্রলোক থানা থেকে আমাকে ফোন করেন। সাহায্য চান। আমি দ্বৈপায়নকে ফোন করে তক্ষুণি থানায় যেতে বলি।

দ্বৈপায়ন আর দেবর্ষি বাইকে চড়ে থানায় গিয়ে পৌঁছোয়। আমি ও.সি.র সাথে ফোনে কথা বলি। তিনি তখন তাঁর কোয়ার্টারে ছিলেন। আমি বলি— 'হচ্ছেটা কী?' পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওই ছেলেটি, তার বোন আর বাবাকে থানা থেকে সসম্মানে যেতে না দিলে আমি মিডিয়াকে সব জানাব, তারপর কাল সকালে কোর্টে মুভ করব।'

ও.সি. আমাকে জানালেন যে, তিনি বিষয়টা কিছুই জানেন না, 'তিনি দেখছেন'।

সত্যি সত্যি তিনি তক্ষুণি ওঁদের থানা থেকে ছেড়েও দিয়েছিলেন।

পরের দিন সকালেই ভদ্রলোক আমার চেম্বারে এলেন— সঙ্গে ছেলে আর মেয়ে। তাদের সারা গায়ে দগদগে কালশিটে।

আমি তখন প্রচণ্ড উত্তেজিত। শিরা-ধমনীতে রক্ত যেন টগবগ করে ফুটছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়ে দুটোর উপর পুলিশি অত্যাচারের ঘটনায়, রাগে, আমার মাথা যেন ফেটে যাচ্ছিল।

আমি বললাম, 'মামলা করব। পুলিশি অত্যাচারের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যাব। মিডিয়া ডেকে পাবলিককে জানাব যে, সাধারণ মানুষের উপর পুলিশ কী ধরনের অত্যাচার করে।'

আমার চোখে আজও যেন দৃশ্যটা ভাসে। ঠিক সামনের ওই চেয়ার দুটোয় ছেলে-মেয়ে দুটো চুপ করে বসেছিল— অসহায় শূন্য দৃষ্টি।

ওদের বাবাও চুপ করেই বসেছিলেন, শুধু চোখ দিয়ে জল ঝরছিল টপ টপ করে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ভদ্রলোক যেন ফিসফিস করে বলে উঠলেন— 'কন্দর্পনারায়ণবাবু, কোনো বাবার যেন এমন দুর্ভাগ্য না হয়— কোনো বাবাকে দেখতে না হয় যে তাঁর সন্তানদের বিনা কারণে পুলিশ তুলে নিয়ে পেটাচ্ছে'।

খানিক চুপ করে থেকে চোখের জল মুছে আবার বলেছিলেন— 'কী অপরাধ ছিল আমার ছেলে-মেয়ে দুটোর? ছেলের কাছে স্কুটারের সমস্ত কাগজপত্রের ছবি তোলা ছিল। এই সময়টায় কোভিডের জন্য কাগজপত্রের 'হার্ড-কপি' রাখছিল না, কিন্তু সফট-কপি তো ছিল। আমার ছেলের কাছে লাইসেন্স ছিল, ট্যাক্স, ইন্সিওরেন্স সব কিছু আপ-টু-ডেট ছিল। আমার ছেলে পুলিশকে হাত জোড় করে বলেওছিল, আমাকে একটু সময় দিন আমার বাবা এক্ষুণি সব নিয়ে আসছেন।

পুলিশ শুনল না। আমার ছেলেকে মারতে মারতে থানায় নিয়ে এল।

খবর পেয়ে আমি আর আমার মেয়ে থানায় গিয়ে পৌঁছোতেই আমার মেয়ে ওদের সঙ্গে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ে।

আমার মেয়ে জিজ্ঞাসা করেছে যে, কেন তার ভাইকে আটকে রাখা হয়েছে? কন্দর্পনারায়ণবাবু, আপনি তো খবরের কাগজে আইন নিয়ে লেখালেখি করেন— সাধারণ মানুষকে আইনি পরামর্শ দেন— আপনিই তো বলেন— কাউকে অ্যারেস্ট করতে গেলেও পুলিশকে আইন মানতে হবে। অ্যারেস্ট করবারও নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুন আছে। যেমন, কাউকে অ্যারেস্ট করতে গেলে, তাকে 'মেমো অফ অ্যারেস্ট' দিতে হবে। অ্যারেস্ট করবার সময় দু-জন সাক্ষীর উপস্থিতি ও সই লাগবে। যাকে অ্যারেস্ট করা হচ্ছে, সে চাইলে তার ল'ইয়ারের সঙ্গেও কথা বলতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা যাকে অ্যারেস্ট করা হচ্ছে তাকে জানাতে হবে যে কী কারণে তাকে অ্যারেস্ট করা হচ্ছে।

আমার মেয়ে স্রেফ সেই কথাগুলোই জানতে চেয়েছিল— ব্যস, পুলিশ আমার মেয়েকেও মারতে শুরু করে। আমার চোখের সামনে কয়েকটা সিভিক ভলান্টিয়ার আর কনস্টেবল আমার মেয়েকে তুলে পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে তার সারা শরীরে হাত দিয়েছে।'

এইখানে মেয়েটা তার বাবাকে হাত তুলে থামিয়ে সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে— 'স্যার, ওরা আমার সারা শরীরে হাত দিয়েছে— এমনকী আমার প্রাইভেট পার্টসেও— সেখানেও এখন আমার প্রচণ্ড যন্ত্রণা— স্যার, আমার নিজের ওপর ঘেন্না হচ্ছে— খুব ঘেন্না। ওরা আমাকে নিয়ে যা করেছে, আমি আপনাকে বলতে পারব না। আমি যদি পারতাম তো আমার এই শরীরটা ছেড়ে অন্য শরীর নিতাম।'

বলতে বলতে মেয়েটা দু-হাতে নিজের মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করেছিল।

বাবা-ভদ্রলোক বলে উঠেছিলেন— 'উকিলবাবু আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব— যতদূর যেতে হয় যাব। আপনি 'কেস' রেডী করুন'।

মেয়েটা বাবার দিকে দু-হাত জোড় করে জলভরা চোখে বলেছিল— 'বাবা তুমি তোমার সর্বস্ব দিয়ে আমাদের দুই ভাই-বোনকে লেখাপড়া শিখিয়েছো। আমরা এখন কাজের জন্য ব্যাঙ্গালোরে থাকি।

পুলিশ কাল আমাদের শাসিয়েছে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোমাদেরও মিথ্যে মামলায় ফাঁসিয়ে দেবে।

আমরা কোনো রকম মামলা-মোকর্দ্দমা চাই না বাবা। আমি আজ রাতেই টিকিট কাটছি। কাল ভোরের ফ্লাইটেই ব্যাঙ্গালোর চলে যেতে চাই। যতক্ষণ এখানে থাকব ততক্ষণ গতকাল রাতের স্মৃতি আমাকে তাড়া করে বেড়াবে। আমি জানি, আমি যেদিন মরে যাব, সেই দিন, সেই মুহূর্ত অবধি গতকালের স্মৃতি আমি ভুলতে পারব না, তবু আমি পালাতে চাই বাবা— এখান থেকে পালাতে চাই।'

কন্দর্পনারায়ণ চুপ করলেন। ডানদিকে ঘাড় ফিরিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন কাঠের টেবিলে রাখা অ্যাকোয়ারিয়ামের দিকে।

খানিকক্ষণ সব চুপচাপ। নাজির নীরবতা ভঙ্গ করলেন— 'দ্বৈপায়নদা, তুমি আর দেবর্ষি তো সেই রাতেই থানায় গিয়েছিলে। মেয়েটিকে যে ঘরে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করা হচ্ছিল সেখানে সি সি টিভি ক্যামেরা ছিল না? ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশনের রেকমেন্ডেশন অনুযায়ী, থানার সব ঘরে এমনকী করিডোর গুলিতেও ক্যামেরা বসানো দরকার।'

কন্দর্পনারায়ণ অসহায়ের মতো হাসলেন। 'কী যে বলিস! আমি জানি, থানায় 'ইণ্টারোগেশন রুম' বলে যে বিশেষ ঘরটা থাকে তার ধারে কাছে ক্যামেরা থাকে না। একেকটা থানা এমন আছে যে, তারা ন্যাশনাল হিউম্যান রাইটস কমিশনের নামই শোনেনি, তাদের 'রেকমেন্ডেশন' মানা, তো দূরের কথা।'

'যাই হোক, ওই ছেলে-মেয়ে দুটির হয়ে মামলা আর করা হয় নি। ওরা ব্যাঙ্গালোর ফিরে গিয়েছিল।'

কন্দর্পনারায়ণ এতক্ষণ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। এবার সোজা হয়ে বসে, টেবিলে কনুই দুটোর ভর দিয়ে দু হাতের উপর নিজের থুতনিটা রেখে অরুণা মিত্রর দিকে তাকিয়ে বললেন—'সরি, মিসেস মিত্র, আমরা প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলাম। এবার আবার আপনার কথায় আসি— বলুন, আপনি কী বলছিলেন—'

অরুণা মিত্রও এতক্ষণ একমনে কন্দর্পনারায়ণ আর তাঁর জুনিয়র ছেলেমেয়েদের কথোপকথন শুনছিলেন। তিনিও যেন ঘোর কাটিয়ে জেগে উঠে বলতে শুরু করলেন—

'কয়েক দিন আগে আমার মেয়ে এল নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে। সেদিন ওদের বেশ খুশি খুশি দেখাচ্ছিল। মেয়ে বলল— জামাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আবার আগের মতো ভালো হয়ে গেছে।

ওরা সবাই মিলে একসঙ্গে বেড়াতে যাবে— দীঘা। দিন চার-পাঁচেকের জন্য। হোটেলও বুক করা হয়ে গেছে। কালই সকালে বেরোবে।

আমি তো খুব খুশি হলাম। যাক, মেয়ে-জামাইয়ের মধ্যের অশান্তি সলভড। ওদের মাঝখানে পড়ে আমার নাতনিটা শুধু শুধু কষ্ট পাচ্ছিল। সে তো খুব বুঝদার— ওইটুকু মেয়ে হলে কী হবে— বাবা আর মায়ের মধ্যে যে গণ্ডগোল চলছিল, সে দিব্যি বুঝতে পারছিল।'

'আমি বললাম— সেই ভালো। কটা দিন ঘুরে আয়। মনটাও ভালো থাকবে।'

'মেয়ে যাবার সময় হাতের সোনার চুড়িগুলো, গলার হার, সব খুলে দিয়ে গেল। বলল— মা এগুলো তোমার কাছে রাখো। দীঘা থেকে ফিরে এসে নিয়ে যাব। ট্রেনে করে যাচ্ছি— এতগুলো সোনার গয়না পরে যাব না।

ব্যস, সেই যে গেল, আর কোনো খবর নেই। কোন হোটেলে উঠবে, সেটাও বলে যায়নি। বলেছিল, ভালো হোটেলে উঠে খবর দেবে।'

কন্দর্পনারায়ণ হাত তুলে থামালেন— চিন্তিত মুখে বললেন— 'মোবাইল ফোন ছিল না? ফোন করেছিলেন?'

অরুণা মিত্র শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে বললেন— 'করেছি। সুইচড অফ'।

'ভাবুন একবার আমার অবস্থা! কদিন আগে স্বামী খুন হয়েছেন। একমাত্র মেয়ে, জামাই আর নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে দীঘায় বেড়াতে যাবার পর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না— বারবার ফোন করছি— কোন হোটেলে উঠেছে, কেমন আছে জানার জন্য। অথচ ফোন ধরছে না— আমি একেবারে পাগলের মতো হয়ে গেলাম'।

'আমি যে ছুটে দীঘা চলে যাব, সেটাও পারছি না। বুঝতেই তো পারছেন, বয়স হয়েছে। কদিন আগে স্বামীকে হারিয়েছি, আমিও তো মানসিক দিক থেকে শক্ত নেই!'

থামলেন অরুণা মিত্র। জলভরা চোখে সকলের মুখের দিকে তাকালেন— তারপর বললেন, 'ওরা যাবার তিনদিন পর, টিভিতে দেখলাম দীঘাতে একটি হোটেলের দরজা ভেঙে মা ও মেয়ের দেহ উদ্ধার হয়েছে— তাদের শরীরে তখন পচন ধরতে শুরু করেছে।'

চেম্বারে যেন বাজ পড়ল।

'মাই গ্গড'— সকলে সমস্বরে বলে উঠলেন। অরুণা মিত্র চুপ করে মাথা নিচু করে বসে রইলেন। চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল পড়তে লাগল।

'টিভিতে দেখে আমি যোগাযোগ করি, দীঘা পুলিশের সঙ্গে। তারা আমাকে যত দ্রুত সম্ভব দীঘাতে আসতে বলে। আমি এক প্রতিবেশীকে আর আমার স্বামীর বন্ধু একজন প্রোফেসর ভদ্রলোককে নিয়ে দীঘার উদ্দেশ্যে গাড়ি ভাড়া করে বেরিয়ে যাই।'

'আমরা সরাসরি মর্গে গিয়ে উপস্থিত হই। ততক্ষণে পোস্ট মর্টেম হয়ে গিয়েছে।

ওখানকার থানার ও.সি. ভদ্রলোক আমাকে বলেন— 'চলুন, বডি আইডেন্টিফাই করতে হবে।'

অরুণা মিত্র আবার থামলেন। কন্দর্পনারায়ণ এর দিকে তাকিয়ে বললেন— 'আমার অমন তরতাজা মেয়ে আর চার বছরের ফুটফুটে নাতনি 'বডি' হয়ে গিয়েছে! আমাকে নিয়ে গিয়ে মর্গে রাখা শরীর দুটোর সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।

ততক্ষণে বডি ফুলে ঢোল। চিনবার উপায় নেই। কোনোরকমে সনাক্তকরণের কাজ শেষ করে ওখানেই দাহ করে ফিরে আসি।'

অরুণা মিত্র ধীরে ধীরে হাতের ব্যাগের চেন খুলে একটা খাম থেকে একটা ছোট্ট মেয়ের ছবি বের করে টেবিলের উপর রাখলেন— কন্দর্পনারায়ণ হাঁ হাঁ করে উঠলেন— 'না না, ও ছবি আমি দেখব না। এইরকম বাচ্চাদের ছবি দেখলে আমার মধ্যে খুব প্রভাব পড়ে। খেতে পারি না, ঘুমোতে পারি না। ঘুমের মধ্যেও যেন চোখের সামনে ওই মুখগুলো ভেসে ভেসে ওঠে—'

অরুণা মিত্র কাতর অনুরোধ করলেন— 'একবার দেখুন কন্দর্পনারায়ণ বাবু, কী ফুলের মতো মিষ্টি দেখতে ছিল আমার নাতনি— একবার দেখুন।'

কন্দর্পনারায়ণ তেতো মুখে টেবিলের উপর থেকে পোস্টকার্ড সাইজের ফোটোটা তুলে নিয়ে নিজের চোখের সামনে মেলে ধরলেন— সত্যি, মিষ্টি চেহারার একটা বাচ্চা। টানা টানা কাজল পরা চোখ, টিকোলো নাক, কোঁকড়া কোঁকড়া মাথা ভরা চুল, কাঁধ অবধি এসে থেমেছে। হাসি হাসি মুখে ক্যামেরার দিকে চেয়ে আছে। কোলে একটা কাপড়ের পুতুল।

অরুণা মিত্র কঁকিয়ে উঠলেন— 'নিজের স্ত্রী-কে তো মারলিই, এমন ফুলের মতো মেয়েটাকেও মারলি! তোরই তো নিজের মেয়ে! এমন তোর রাগ যে, মেয়েটাকেও খুন করলি?'

কন্দর্পনারায়ণ এবার তাকালেন অরুণা মিত্রর দিকে— হাই পাওয়ার কাঁচের চশমার আড়ালে, ঝকঝকে চোখ দুটোয় যেন ঝিলিক দিয়ে গেল— 'আপনার জামাই-ই খুন করেছে তাহলে? অন্তত প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ তাই বলছে তো?'

অরুণা মিত্র অবাক হলেন যেন। জোরের সঙ্গে বলে উঠলেন— 'নিশ্চয়ই। জামাই ছাড়া কে মারবে? হোটেলের ম্যানেজার বলছিল— তিনজন চেক ইন করেছিল, বাবা-মা আর মেয়ে। ঘরে ঢুকে তারা আর বেরোয় নি। বাইরে থেকেই খেয়ে-দেয়ে এসেছিল। কাজেই একবার চেক-ইন করে তারা আর বেরোয় নি।

কিন্তু মা আর মেয়েকে খুন করে, ভদ্রলোক কখন যে বেরিয়ে গিয়েছে, সেটা তারা খেয়াল করে নি।'

এই পর্যন্ত শুনে পারমিতা পাশ থেকে বলে উঠলেন, 'কেন? হোটেলে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না? আজকাল তো দীঘাতে ছোটো-বড় সব হোটেলেই সিসিটিভি ক্যামেরা থাকে।'

কন্দর্পনারায়ণ পারমিতার দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকালেন— 'গুড, ভেররী গুড, সিসিটিভির ক্যামেরায় তো কে হোটেলে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে, সব ধরা পড়বে।'

অরুণা মিত্র জোরের সঙ্গে মাথা নাড়লেন—'আমারই দুর্ভাগ্য। আগের দিন রাত্রে ঝড় হয়েছিল। তারপর থেকে গোটা এরিয়ার সমস্ত সিসিটিভিগুলো খারাপ হয়ে গেছিল। তাছাড়া সেদিন সারারাত এলাকায় লোডশেডিং ছিল। যদিও ওই হোটেলে জেনারেটর ছিল, তা সত্ত্বেও জেনারেটর ঠিকমতো কাজ করছিল না। ফলে আলো একবার জ্বলছিল, কিছুক্ষণ পরেই আবার অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল।

সেই সুযোগে আমার জামাই, আমার মেয়ে আর নাতনিকে খুন করে দুজনকে বিছানায় পাশাপাশি শুইয়ে রেখে, হোটেলের দরজা টেনে লক করে দিয়ে পালায়। কেউ টেরই পায় নি।'

কন্দর্পনারায়ণ ডান হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে বললেন— 'পোস্ট মর্টেম রিপোর্টগুলো আছে?'

অরুণা মিত্র হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে চমকে উঠে বললেন— 'হ্যাঁ স্যার আছে। এনেছি।'

তারপর হ্যান্ডব্যাগটার চেন খুলে দুটো ভাঁজ করা কাগজ কন্দর্পনারায়ণের সামনে ধরলেন।

কন্দর্পনারায়ণ কাগজদুটো হাতে নিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে উঠলেন— 'এই হয়েছে জ্বালা! পোস্ট মর্টেম ডাক্তারদের হাতের লেখা উদ্ধার করবে কার বাপের সাধ্যি! কী যে লেখে! কেন যে এত্ত বাজে হাতের লেখা, কে জানে? একে তো ডাক্তারবাবুরা নিজে হাতে পোস্ট মর্টেম করেন না, মর্গের ডোমদের দিয়ে কাটা-ছেঁড়া করান, তার ওপর হাতের লেখাও জঘন্য!'

তারপর ডানদিকে নিচু হয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে বের করে আনলেন, মোষের শিং-এর হাতলওয়ালা একটা সুদৃশ্য ম্যাগনিফাইং গ্লাস। পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দুটো খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলেন—

'বোঝো কাণ্ড! সকাল আটটায় শুরু করেছে, আর আটটা পঁচিশে শেষ! মাত্র পঁচিশ মিনিটে পোস্ট মর্টেম করা হয়ে গেল?'

দ্বৈপায়ন ততক্ষণে আর একটা পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট হাতে তুলে নিয়েছেন। বলে উঠলেন— 'স্যার আপনি বোধহয় মিসেস মিত্রর মেয়ের পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা দেখছেন। ওনার নাতনির রিপোর্টটা আমার হাতে— আশ্চর্য ব্যাপার হল, এই রিপোর্টেও লেখা রয়েছে, পোস্ট মর্টেম করা শুরু হয়েছে, এইট এ.এম.এ, অর্থাৎ সকাল আটটায়। আর শেষ হয়েছে এইট টুয়েন্টি-ফাইভ এ.এম.এ. অর্থাৎ আটটা পঁচিশ মিনিটে।'

কন্দর্পনারায়ণ চোখ কপালে তুললেন— 'বলো কী? দুটো পোস্ট মর্টেম একই সময়ে শুরু হয়েছে আর একই সময়ে শেষ?'

প্রবল হতাশায় দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে কন্দর্পনারায়ণ বলে উঠলেন— 'টোটাল ক্যালাসনেস! ছিঃ ছিঃ! এটা পোস্ট মর্টেম হয়েছে? এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানো হবে, আবার কাউকে বেকসুর খালাস দেওয়া হবে? জজসাহেবেরা এদের রিপোর্টকেই বিশ্বাস করেন!'

তারপরই আবার ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা চোখের নিচে ধরে ডুবে গেলেন পোস্ট মর্টেম রিপোর্টগুলোর মধ্যে।

অনেকক্ষণ সব চুপচাপ। মিনিট দশেক পর, কন্দর্পনারায়ণ পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দুটো থেকে মুখ তুললেন। পাশে বসে থাকা দ্বৈপায়নকে ডেকে বললেন— 'খাতা নাও, নোট করো—'

দ্বৈপায়ন দ্রুত নোট খাতা আর পেন নিয়ে রেডী হয়ে গেলেন।

কন্দর্পনারায়ণ বলতে শুরু করলেন— 'দুটো পোস্ট মর্টেম রিপোর্টই অত্যন্ত অবহেলার সঙ্গে করা হয়েছে। তবু যতটুকু বুঝতে পারছি— নাম্বার ওয়ান, পোস্ট মর্টেম হবার অন্তত ছত্রিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে মৃত্যু হয়েছে। শরীরে পচন শুরু হয়েছিল।

অরুণা দেবীর কথা অনুযায়ী, যেদিন ওনার মেয়ে, ওনার সাথে দেখা করতে আসেন, তার পরের দিন সকালবেলার ট্রেনে ওরা দীঘার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু, হোটেলে ঢোকেন রাত্রিবেলায়।' কন্দর্পনারায়ণ তাকালেন অরুণা মিত্রের দিকে। তিনি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাতেই কন্দর্পনারায়ণ আবার বলা শুরু করলেন— 'হ্যাঁ, এটা তো হতেই পারে। চার বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে গিয়েছেন। সারাটা দিন সমুদ্রের পাড়ে ঘুরে দীঘা বেরিয়ে, একেবারে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলে ঢুকেছেন—'

কন্দর্পনারায়ণ আবার থামলেন। ভুরু কুঁচকে চিন্তা করতে করতে আবার বললেন— 'আমার পয়েন্ট নম্বর টু, শরীরে কোনো রকম ইনজুরি বা আঘাতের চিহ্ন নেই। বলা হচ্ছে, মৃত্যুর কারণ 'অ্যাসফিক্সিয়া', মুখের ওপর বালিশ চেপে ধরলে শ্বাস নিতে না পেরে মানুষ মারা যায় অর্থাৎ 'অ্যাসফিক্সিয়া'তে মৃত্যু হয়। সত্যি সত্যি কারো মুখের উপর বালিশ চেপে ধরলে ধ্বস্তাধ্বস্তি হওয়া স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে শরীরে কিছু না কিছু ইনজুরি তো থাকবেই।

তিন নম্বর, অরুণা দেবীকে পুলিশ বলেছে, তাঁরা একেবারে রাতে খেয়ে দেয়ে ঘরে ঢুকেছিলেন আর বেরোন নি। ধরে নিতে হবে সেই রাতেই তাঁরা খুন হন, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বলছে 'স্টমাক ওয়জ এম্পটি' অর্থাৎ তাঁদের পেটে কোনোরকম খাবারই ছিল না। খাওয়া-দাওয়া করার পর খুন হলে, পাকস্থলীতে আনডাইজেস্টেড খাবার পাওয়া যেতই যেত।

পয়েন্ট নম্বর চার, বাচ্চাটার গায়েও কোনোরকম ইনজুরি নেই। একটা বাচ্চাকে যদি কেউ শক্ত করে চেপেও ধরে তাহলে তার গায়ে চিহ্ন থাকবেই, কারণ তার সফট স্কিনে ছাপ পড়বেই। আর সেটা পোস্ট মর্টেমে ধরা পড়বে। তবে শরীরে পচন ধরতে শুরু করেছিল। সেখানে শরীরে ইনজুরি থাকলে পোস্ট মর্টেমে ততটা ধরা নাও পড়তে পারে।

পয়েণ্ট নম্বর পাঁচ, একসঙ্গে দুজনকে মারা কিন্তু বেশ কঠিন। কারণ একজনকে যখন মারা হচ্ছে, অন্যজন তো তখন আপত্তি করবেই বা বাধা দেবেই। যদি পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট-কে সত্যি বলে ধরতে হয়, তাহলে বলতে হবে দুজনে একই সময়ে মারা গেছেন বা দুজনকে একই সময়ে খুন করা হয়েছে। তাহলে মানতে হবে যে, আপনার জামাই একা নন, সঙ্গে আরও কেউ ছিল।'

জয়শ্রী বললেন— 'স্যার, এমন তো হতে পারে খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে আগে ওদের আচ্ছন্ন করে ফেলা হয়েছিল, তারপর ওদের দুজনকে পরপর মারা হয়েছে।'

কন্দর্পনারায়ণ সম্মতির ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে বললেন— 'ওয়েল সেড, হ্যাঁ, আমরা এরকম অনেক সময়ই দেখি যে, খাবারে ঘুমের ওষুধ বা বিষ মিশিয়ে কাউকে অজ্ঞান করে ফেলা হল, সে নিস্তেজ হয়ে ঝিমিয়ে পড়তেই তাকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলা হল— এরকম আমাদের বেশ কয়েকটা কেস-ও রয়েছে।

তবে এখানে মজাটা হল, ওদের 'স্টম্যাক ওয়জ এম্পটি', অর্থাৎ খাবারে বিষ বা ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়নি।'

নাজির পাশ থেকে বলে উঠলেন— 'এক্সাক্টলি স্যার। খাবার খাইয়ে যদি ওদের মারা হত তাহলে স্টম্যাকে খাবার পুরোটাই থাকত। হজম হবার সুযোগই পেত না।'

কন্দর্পনারায়ণ এবার নিজের ঝোলা গোঁফে আঙুল বোলাতে বোলাতে বলে উঠলেন— 'খাবারে 'বিষক্রিয়া' বা 'ঘুমের ওষুধ' মেশানো হয়েছিল কিনা, সেটা বোঝার জন্য আমাদের ভিসেরা রিপোর্ট আসা অবধি অপেক্ষা করতে হবে।'

'পোস্ট মর্টেম রিপোর্টেও বলছে, যদিও দুটো মৃত্যুই 'অ্যাণ্টিমর্টেম ইন নেচার' অর্থাৎ 'মার্ডার' কিন্তু 'ফাইনাল ওপিনিয়ন' এর জন্য ভিসেরা রিপোর্ট আসা অবধি অপেক্ষা করতেই হবে।

স্টম্যাকের অংশ কেটে নিয়ে ভিসেরা রিপোর্টের জন্য ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আমি আমার অভিজ্ঞতায় জানি, কলকাতায় ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে কোনো কাজই হচ্ছে না, বহু পদ খালি পড়ে রয়েছে সেখানে অনেকদিন। কাজেই ভিসেরা রিপোর্ট কবে আসবে কোনো ঠিক নেই।'

টেবিলের উপর কনুইয়ের ভর দিয়ে কী যেন ভাবছেন কন্দর্পনারায়ণ। তারপর চোখ তুলে মিসেস মিত্রর দিকে তাকিয়ে বললেন— এবারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্ট—মোটিভ।

আপনার জামাই, তাঁর স্ত্রী ও কন্যাকে খুন করতে যাবেন কেন? হ্যাঁ, মানছি, তাঁর শ্বশুরের অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করেছে। তার জন্য তিনি রাগও করেছিলেন, সংসারে অশান্তিও করেছেন। সব মেনে নিলাম। কিন্তু, যে লোক নিজের শ্বশুরকে খুন না করা সত্ত্বেও পুলিশি জেরায় বিরক্ত হয়ে নিজের স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করেন, স্ত্রীর উপর রাগ করেন, অথচ নিজের মেয়ের প্রতি মমত্ববোধ এতটাই যে, স্রেফ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আবার স্ত্রীর সাথে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে নেন, তিনি দীঘায় নিয়ে গিয়ে স্ত্রী-কন্যাকে খুন করে পালাবেন?'

তারপরই ঘাড় নাড়তে নাড়তে বললেন— 'নাঃ ঠিক যেন ক্লিক করছে না! কোথায় যেন গোঁজামিল রয়েছে!'

পারমিতাও একমত হয়ে মাথা দুলিয়ে বললেন— 'ঠিকই বলেছেন দাদা। মোটিভ পার্টটা যেন ঠিক মিলছে না। সাংসারিক অশান্তিতে খুন-খারাপি হয় না তা নয় কিন্তু, এখানে এমন কী কারণ হল, যে বউ-বাচ্চাকে মারতে হল— কোনো এক্সট্রা ম্যারাইটাল অ্যাফেয়ারের গল্পও তো নেই যে, প্রেমিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে বউকে আর নিজের মেয়েকে মেরে ফেলেছেন।'

নাজির বললেন— 'এক্সট্রা-ম্যারাইটাল অ্যাফেয়ারের ব্যাপারটা আমরা জানি না। হতেই পারে, ওনার হয়তো অ্যাফেয়ার ছিল। কারণ স্যারের যুক্তি অনুযায়ী একজনের পক্ষে ওই দুজনকে মারা সম্ভব ছিল না। সি সি টিভি কাজ না করা, লোডশেডিং, জেনারেটর ঠিকমতো না চলা— এ সমস্ত কিছুরই সুযোগ নিয়ে খুনীরা খুন করে পালিয়েছে।'

কন্দর্পনারায়ণ মৃদু হাসলেন— 'এসব ক্ষেত্রে অবশ্য, পুলিশ এত কিছু তলিয়েও দেখে না।

তবে একথা সত্যি যে, হোটেল ম্যানেজারের কথা যদি আমরা বিশ্বাস করি, তাহলে মিসেস মিত্রর মেয়ে, জামাই আর নাতনি একসঙ্গে হোটেলে চেক-ইন করেছিলেন। হোটেলের বোর্ডারদের জন্য যে রেজিস্ট্রি খাতা থাকে, সেটা দেখলেও তা-ই পাওয়া যাবে। তারপরই হোটেলের বন্ধ ঘর থেকে দরজা ভেঙে মেয়ে ও নাতনির মৃতদেহ উদ্ধার হয় এবং সেখানে জামাই-র কোনো হদিশ নেই।

'লাস্ট সিন টুগেদার' থিওরি অনুযায়ী সন্দেহের যাবতীয় তীর, অরুণা দেবীর জামাই-এর উপর পড়ে বই কি। তাছাড়া এভিডেন্স অ্যাক্ট-এর একশো ছ' নম্বর ধারা অনুযায়ীও অরুণা দেবীর জামাই-কে বলতে হবে, সেদিন কী হয়েছিল বা কীভাবে তাঁর স্ত্রী-কন্যার মৃত্যু হল। কারণ তাঁদের মৃত্যুর আগে তিনিই ছিলেন তাঁর স্ত্রী-কন্যার পাশে। আমাদের আইনের পরিভাষায় বলতে হয় 'উইদিন হিজ স্পেশাল নলেজ', থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। মাথা নেড়ে ভুরু কুঁচকে আবার বললেন— 'মোটিভ পার্টে অবশ্য আমি সন্তুষ্ট নই। এত সামান্য কারণে, স্ত্রী-কন্যাকে মারতে আমি দেখি না।'

পারমিতা আবার যোগ করলেন— 'তবে একটা সম্ভাবনা অবশ্য একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।'

সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে পারমিতার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন— 'একটা দিক একট ভেবে দেখবেন দাদা। হয়তো ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল দুজনকেই। মা-কে যখন মারা হচ্ছে তখনই বাচ্চাটার ঘুম ভেঙে যায় বা আচ্ছন্ন ভাব কেটে যায়। সে মাকে মারতে দেখে চিৎকার করে ওঠে। তখন তাকেও মারা হয়।'

কন্দর্পনারায়ণ একমত হলেন— 'হতেই পারে, তবে সেক্ষেত্রে, বাচ্চাটাকে থামাতে বা চুপ করাতে হলে তাকে আঘাত করতেই হত। তার শরীরে কিছু না কিছু দাগ থাকতই। আমাদের ভাষায় যাকে বলে 'ব্রুইস'। আসলে এই বয়সের বাচ্চার সফট টিস্যুতে যে কোন সামান্য আঘাতও দাগ ছেড়ে যাবেই যাবে। এখানে বাচ্চাটার শরীরে কোনোরকম আঘাতের চিহ্ন না থাকাটা আমাকে অবাক করছে। আবার এটাও তো ঠিক। দুদিন আগে মারা যাওয়াতে, যেখানে শরীরে পচন ধরতে শুরু করেছিল, সেখানে শরীরে সামান্য আঘাত ধরবার মতো 'এক্সপার্টাইস' পোস্ট মর্টেম ডক্টরের ছিল কিনা।'

তাছাড়া নিজের স্ত্রী-কন্যাকে খুন করতে হলে তো, নিজের বাড়িতেই করতে পারত। দীঘায় আনবার দরকার কী ছিল? সবাই জানে, অরুণা দেবীর মেয়ে জামাই আর নাতনি একসঙ্গে দীঘায় এসেছেন। দুটো খুন করে উনি নিজে কী বাঁচতে পারবেন?'

এবারে গলার স্বর পরিবর্তন করে গম্ভীর মুখে মিসেস মিত্রর দিকে তাকিয়ে বললেন— 'বলুন ম্যাডাম, আমার কাছে কেন? আমি কিভাবে সাহায্য করব?'

অরুণা মিত্র জলভরা চোখে কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে তাকিয়ে বললেন— 'যখন আমার মেয়ের বাড়িতে অশান্তি চলছিল তখনই আমার মেয়ে আপনার কাছে আসতে বলেছিল পরামর্শ চাইতে। আমার আসা হয়নি।

আমি এলাম, কিন্তু অনেক দেরি করে ফেললাম। সব শেষ হয়ে যাবার পর এলাম আপনার কাছে।'

এবার মিসেস মিত্র হাতজোড় করে মিনতি করবার ভঙ্গিতে বললেন— 'পুলিশ কী করছে জানি না। আমার খুনি জামাই আজও ধরা পড়েনি। আপনি কিছু একটা ব্যবস্থা করে তাকে ধরবার ব্যবস্থা করুন।'

কন্দর্পনারায়ণ অসহায়ের মতো হেসে ঘাড় নাড়লেন— 'ম্যাডাম, এ তো আমার কাজ নয়, অপরাধীকে ধরা পুলিশের কাজ। আপনি পুলিশে আস্থা রাখুন। কিছুদিন অপেক্ষা করুন, তারপর না হয় আমি পুলিশের বদলে, সি.আই.ডি. বা সি.বি.আই. তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে মামলা করব।'

অরুণা মিত্র অসহিষ্ণু হয়ে বলে উঠলেন— 'আমি আর অপেক্ষা করতে চাইছি না। আপনি মামলা রেডি করুন। বেশি দেরি হলে খুনিটাকে হয়তো আর ধরাই যাবে না। অন্য রাজ্যে বা অন্য দেশে হয়তো এতক্ষণে পালিয়েই গেছে। প্লী-ই-ইজ কন্দর্পনারায়ণ বাবু, আপনি মামলা রেডী করুন।'

কন্দর্পনারায়ণ বেশ বুঝতে পারছেন তাঁর গলায় একটা কান্নার দলা বার বার উঠে আসছে। বাচ্চাটার ফোটো দেখা তাঁর উচিত হয়নি, বাচ্চাটার মিষ্টি হাসি হাসি মুখ তাঁকে অনেক রাত্রি ঘুমোতে দেবে না।

তিনি ঘাড়টা ঘুরিয়ে ডানদিকে অ্যাকোয়ারিয়ামের দিকে ফিরিয়ে বললেন— 'এই সপ্তাহে মোট চারদিন ছুটি। দোলের জন্য দু-দিন, তারপর, শনি-রবি মিলিয়ে আরও দু-দিন। আগামীকাল ভোরবেলায় আমরা, আমাদের চেম্বারের সবাই, মন্দারমনি যাচ্ছি— বেড়াতে। কটা দিন থাকব না। তবে চিন্তা করবেন না। মামলা আমি রেডী করছি। সামনের সপ্তাহেই হাইকোর্টে, পুলিশের বদলে সি. আই. ডি. বা সি. বি. আই. অর্থাৎ কোনো স্পেশালাইজড ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি দিয়ে, তদন্ত করানোর দাবিতে মামলা করব।'

তারপর অরুণা মিত্রর বাড়িয়ে ধরা হাতদুটোর উপর নিজের দুটো হাত রেখে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন— 'চিন্তা করবেন না, আমি আছি আপনার পাশে।'

তিনদিন পর, মন্দারমণিতে

মামলাটা মোটামুটি রেডী করে, হাতদুটো মাথার উপরে খাড়া করে তুলে আড়মোড়া ভাঙলেন কন্দর্পনারায়ণ। আজ শনিবার, কাল রবিবার। পরশু সোমবারই হাইকোর্টে এই মামলাটা দায়ের করে দিতে হবে।

যদিও ছুটি কাটাতেই মন্দারমণি আসা। তবুও আসবার সময় ব্যাগের মধ্যে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ মামলার কাগজপত্র ভরে নিয়েছিলেন। ছুটি মানেই তো আর হান্ড্রেড পার্সেণ্ট ছুটি নয়। একজন ল'ইয়ারকে সবসময় রেডী থাকতে হয়, তার পেশা সংক্রান্ত ব্যাপারে। যদিও এবারে ছুটি পাওয়া গেছে মাত্র চারদিন, তবুও সোমবার থেকেই তো আবার কোর্ট। সেখানে মামলার হিয়ারিংয়ের সময় তো আর বলা যাবে না, 'মাই লর্ড, আমরা সবাই মিলে ছুটি কাটাতে মন্দারমণি গিয়েছিলাম, আমরা রেডী হতে পারিনি, আমাদের আরও সময় দেওয়া হোক'। তাই কন্দর্পনারায়ণ ব্যাগের মধ্যে ওই মামলাগুলোর যাবতীয় কাগজপত্র ভরে নিয়ে চলে এসেছিলেন।

মামলার কাগজপত্র আর বইতে যদিও ব্যাগটা একটু বেশিই ভারি হয়ে গিয়েছিল— কিন্তু কী আর করা! তাছাড়া, নিজের গাড়িতে করেই তো যাওয়া আসা।

গত পরশু, বৃহস্পতিবারই সবাই মিলে মন্দারমণিতে এসে পৌঁছেছেন। সবাই বলতে এবারও 'চেম্বারস ফ্যামিলি'-র সকলে— প্রায় কুড়ি জন। দ্বৈপায়ন, তাঁর স্ত্রী কোয়েল, মৌমিতা, তাঁর হাজব্যান্ড ইন্দ্রনীল ছাড়াও নাজির, সুপ্রীম, দেবর্ষি, স্বাগতা, ঋতুশ্রী, নন্দিনী। পারমিতাও এসেছেন, সপরিবারে।

কালকের মতো আজকেও সবাই নেমেছেন সুইমিং পুলে— ঝাঁপাঝাঁপি, চিৎকারের শব্দ তিনতলার ঘর থেকেও কানে আসছে কন্দর্পনারায়ণের।

ঘরে চেয়ার-টেবিল পাতা। টেবিলের উপর এতক্ষণ মামলার কাগজ-পত্র ছড়ানো-ছেটানো ছিল। কন্দর্পনারায়ণ কাগজপত্রগুলোকে মোটামুটি গুছিয়ে ডানদিকে বিরাট কাচের জানালাটার কাছে উঠে গেলেন। দু-হাত দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দিলেন রকমারী কাজ করা ভারী সিন্থেটিক পর্দা।

একটু দূরে বিশাল সমুদ্র। দুপুর বারোটার রোদ্দুর পড়ে যেন ঝলসে উঠেছে। বেশিক্ষণ একনাগাড়ে সমুদ্রের দিকে তাকানো গেল না। আজকে রোদের বড্ড তেজ। ঘরের মধ্যে থেকেও যেন বাইরের উত্তাপ টের পাওয়া যাচ্ছে।

এই গনগনে রোদ্দুরের তাপ সত্ত্বেও দূরে সমুদ্রের পারে এখনো বেশ কিছু মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ সমুদ্রে স্নান করছেন। কয়েকটা ঘোড়াকে নজরে পড়ল। সম্ভবত সওয়ারির সন্ধানে তাদের নিয়ে মালিকেরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। ডানদিকে একটা ছোটো খাঁড়ি মতো রয়েছে। সেখানের জলটা সমুদ্রের জলের মতো ঘোলাটে নয়। বরং ঘন সবুজ। খাঁড়িটার পাড়ে ঝাউবন। তারই ছায়া পড়েছে জলে। তিরতির করে ঢেউ খেলে যাচ্ছে খাঁড়ির জলে।

একটা কুকুর খাঁড়ির ঠান্ডা জলে শরীর ডুবিয়ে রেখে আরাম করছে।

এই রিসর্টটা সমুদ্রের দিকে মুখ করা। কন্দর্পনারায়ণরা যে বিল্ডিং-টায় আছেন তার নিচে বেশ কয়েকটা 'কটেজ' টাইপের ঘর আছে। বাইরে থেকেই বোঝা যায় সুন্দর সাজানো-গোছানো। আধুনিক জীবনের সবরকম উপকরণই সেগুলোকে মজুত রয়েছে। ওগুলোতেও বেশ কয়েকটা ফ্যামিলি রয়েছে।

মাঝখানে একটা ঘন সবুজ লন। চারিদিকে বাচ্চাদের জন্য দোলনা, স্লিপ ইত্যাদি বসানো। বেশ কয়েকটা বাচ্চা ছেলে-মেয়ে সেগুলিতে চড়ছে আর খিলখিল করে হাসিতে ফেটে পড়ছে।

সবাই-ই এসেছেন পরিবার নিয়ে। একটু রেস্ট নিতে, রিল্যাক্স করতে— বেশ কয়েকমাস পর, পরপর চারদিন ছুটি পাওয়া গেছে।

রিসর্টের সুইমিং পুলটা একটু বাঁ-দিক ঘেঁষে। সমুদ্রের দিক থেকে চোখ সরিয়ে কন্দর্পনারায়ণ তাকালেন সুইমিং পুলের দিকে।

নাজিরের কণ্ঠস্বর কানে এল— 'দ্বৈপায়নদা, বলটা আমাকে ছোঁড়ো।' দ্বৈপায়ন আসবার সময় একটা প্লাষ্টিকের বড় বল এনেছেন, সেইটা নিয়েই পুলে ঝাঁপাঝাঁপি চলছে।

পুলের মধ্যে ভীড় করে থাকা চেহারাগুলোর মধ্যে কন্দর্পনারায়ণ নিজের ছেলে পাপাইকেও খুঁজে পেলেন। সে সুইমিং-পুল থেকে উঠে, টাইলস বাঁধানো পাড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। বুঝতে পারলেন, পাপাই ওখান থেকেই ডিগবাজি দিয়ে জলে এসে পড়বে। কন্দর্পনারায়ণ দেখতে পেলেন বসুন্ধরা, পুলের পাড়ে বসে, পাপাই-কে ডিগবাজি দিয়ে জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়তে বারণ করছেন হাত নেড়ে।

পাপাইয়ের ষোলো বছর বয়স। এর মধ্যেই মাথাতেও বেশ খানিকটা লম্বা হয়ে উঠেছে। কর্ন্দনারায়ণের জুনিয়র ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে তার বেশ বন্ধুত্ব। সুইমিং পুলে, সবার সঙ্গে সঙ্গে সেও নেমেছে।

কন্দর্পনারায়ণের বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠল— সত্যিই তো! ওইভাবে ডিগবাজি দিতে গিয়ে পাপাই-এর যদি ঘাড়ে-বুকে চোট লেগে যায়! কন্দর্পনারায়ণ, তিনতলার জানালার স্লাইডিং পাল্লা খুলে, চিৎকার করে পাপাইকে বারণ করবার চেষ্টা করতে লাগলেন, কিন্তু সুইমিং পুলে ভীড় করে থাকা, সবার হই চই এ, কন্দর্পনারায়ণের নিষেধ কেউ শুনতে পেলেন না। পাপাই, শূন্যে শরীরটা ছুঁড়ে দিয়ে একটা ডিগবাজি দিয়ে জলে এসে পড়ল। পুলের জল ছিটিয়ে একটা শব্দ উঠল— 'ঝপাং'।

'তুমি উকিল?'

বাচ্চা মেয়ের কচি গলার আওয়াজ শুনে কন্দর্পনারায়ণ চমকে পেছন ফিরে তাকালেন।

চার-পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে কখন যেন ঘরে এসে ঢুকেছে— কন্দর্পনারায়ণ টেরই পাননি। সত্যি তো! বাচ্চাটা ঘরে ঢুকল কি করে? কন্দর্পনারায়ণের পরিস্কার মনে আছে, নিজে হাতে দরজাটা টেনে বন্ধ করেছিলেন!

তাহলে কি আসলে দরজা বন্ধ হয়নি? কন্দর্পনারায়ণ ভেবেছিলেন, দরজা বন্ধ হয়েছে?

হোটেল-রিসর্টের এই এক হয়েছে প্রবলেম! নিশ্চয়ই শস্তার 'ডোর-লক' ব্যবহার করেছে, তারই কারণে বন্ধ করা সত্ত্বেও দরজাটা হাওয়ায় খুলে গেছে।

তিনতলায় বেশ হাওয়া। কন্দর্পনারায়ণদের রুমের পাশে আর একটাই মাত্র ঘর। সেটা দ্বৈপায়ন আর ওর স্ত্রী, কোয়েলের জন্য বরাদ্দ হয়েছে। তারপর সুন্দর পাঁচিলে ঘেরা টেরেস। সেখানে কয়েকটা চেয়ার ও পাতা রয়েছে। গতকালই রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর কন্দর্পনারায়ণ সেখানে গিয়ে বসেছিলেন। সমুদ্রের দিক থেকে ছুটে আসা হাওয়ায় বেশ ঠাণ্ডা লাগছিলো। শরীর যেন জুড়িয়ে আসছিল।

নিচের ফ্লোরে নাজির-সুপ্রীমদের ঘরে বসে বাকি সবাই আড্ডা দিচ্ছিলেন তখন— দ্বৈপায়ন-কোয়েল, মৌমিতা-ইন্দ্রনীল, সঙ্গে স্বাগতা, ঋতুশ্রী, দেবর্ষি, জয়শ্রী, নন্দিনী। বসুন্ধরাও যোগ দিয়েছিলেন। সবার সমস্বরে কথা বলার শব্দ ভেসে আসছিল কানে।

কন্দর্পনারায়ণ শুধু একা বসে দূরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অত রাতেও দূর থেকে ধবধবে সাদা ঢেউগুলোকে পাড়ে এসে আছড়ে পড়তে দেখছিলেন— একের পর এক, বিরামহীন, সফেন।

কী অদ্ভুত প্রকৃতির রহস্য! কোথা থেকে এত ঢেউ তৈরি হয়? কথায় বলে, 'সময়' আর 'ঢেউ' কারও জন্য অপেক্ষা করে না— চলতেই থাকে, চলতেই থাকে। কেউ সময় দেখুক আর না দেখুক, সময় বিরামহীন। তেমনি ঢেউ ও। কেউ দেখুক আর না দেখুক, গুনুক আর না গুনুক, তারা পাড়ে এসে আছড়ে পড়তেই থাকবে।

গতকাল ছিল দোল পূর্ণিমা। আকাশে পূর্ণিমার বড় থালার মতো চাঁদ দেখেছিলেন বহু দিন পরে। কলকাতায় থাকলে এই সময়টায় কিছুতেই বাইরে বেরিয়ে চাঁদ দেখতে পারতেন না— চেম্বারে কাজ করতে হত।

মনে মনে তিনি জুনিয়র ছেলে-মেয়েদের ধন্যবাদ দিয়েছিলেন। সত্যি ওরা তিন-চার দিনের এই ছুটিটায় জোর করে মন্দারমণিতে আসতে চেয়েছিল বলেই আসা হল, নাহলে এই সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখাই হত না।

কন্দর্পনারায়ণ মাথা তুলে উপরের বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন— নির্মেঘ পরিষ্কার আকাশ। তারা দেখা যাচ্ছিল।

হঠাৎই কন্দর্পনারায়ণ-এর শরীরটা শিরশির করে উঠেছিল— সত্যি কী ব্যপ্তি আকাশের! মাথার উপরে বিরাট আকাশ আর সামনে সমুদ্র! কন্দর্পনারায়ণ-এর মনে হচ্ছিল, আমরা প্রকৃতির কাছে কত তুচ্ছ— সাধারণ। চারিদিকে প্রতিনিয়ত কত কিছু ঘটে চলেছে। যার ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। কেউ দেখুক না দেখুক, কেউ বুঝুক না বুঝুক, তারা ঘটবেই— তারা ঘটে চলবেই।

কন্দর্পনারায়ণ-রা ফিরে যাবেন কলকাতায়। আবার কাজে যোগ দেবেন। ভুলেই যাবেন মন্দারমণির এই সুন্দর মোহময়, মায়াময় রাতের কথা। কিন্তু তাতে প্রকৃতির কিচ্ছু যায় আসে না। নিজের খেয়ালেই তারা চলতে থাকবে— মাথার উপর চাঁদ উঠবে, তারা দেখা যাবে, সমুদ্রের ঢেউ এসে পাড়ে আছড়ে পড়তে থাকবে।

কন্দর্পনারায়ণ এইসব কথা ভেবে যেন কেঁপে উঠেছিলেন।

মেয়েটার হাতে কাপড়ের তৈরি একটা পুতুল। বাচ্চারা কাঁদলে তাদের মায়েরা যেমন কোলে তুলে দোলা দিতে দিতে কান্না থামায়, ঠিক সেই ভঙ্গিতে পুতুলটাকে কোলে নিয়ে দোলাতে দোলাতে কন্দর্পনারায়ণ এর দিকে তাকিয়ে বলল— 'তুমি উকিল?'

কন্দর্পনারায়ণ অবাক হলেন— প্রথমতঃ এই ভর দুপুরে বাচ্চাটা একা একা তিনতলায় উঠে এলো কী করে? ওর মা-বাবা খেয়াল করলেন না? দ্বিতীয়তঃ ওর মুখে 'উকিল' শব্দটা— বাচ্চাটা জানল কী করে যে কন্দর্পনারায়ণ উকিল? তবে কী ওর মা-বাবা ওকে বলেছেন? কিন্তু তাঁরা কোথায়?

কন্দর্পনারায়ণ জানালার কাছ থেকে দু-পা সরে এসে মুখ বাড়িয়ে দরজার দিকে তাকালেন। সত্যি সত্যিই দরজাটা হাট করে খোলা— হাওয়ায় দুলছে। ঘরের ভিতরটা ঠান্ডা হয়ে রয়েছে।

আশ্চর্য তো! বাইরে গনগনে দুপুরে প্রায় লু বইছে— সমুদ্রের দিকে তাকানো যাচ্ছে না— কিন্তু ঘরের মধ্যে কীরকম ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। কন্দর্পনারায়ণ চোখ তুলে তাকালেন— তবে কী এ.সি. চলছে ঘরে? নাঃ এ.সি. তো তিনি চালানই নি!

কন্দর্পনারায়ণ আবার ফিরে এলেন বড় জানালাটার সামনে।

সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন— একটু আগেই সমুদ্রের পাড়ে বেশ কয়েকজন লোককে চলাফেরা করতে দেখেছিলেন— ইতি উতি কয়েকটা ঘোড়া নিয়ে তাদের মালিকেরা সওয়ারির সন্ধানে ঘুরছিল। তারা গেল কোথায়? একেবারে সুনশান সমুদ্রের পাড়!

কন্দর্পনারায়ণ তাড়াতাড়ি স্লাইডিং পাল্লাগুলো ঠেলে সরিয়ে জানালাটা খুলে ফেললেন। তিনতলা থেকে শরীর ঝুঁকিয়ে দিয়ে বাঁদিকে সুইমিং পুলের দিকে তাকালেন। চমকে উঠলেন! পুল ফাঁকা— পুলে কেউ নেই! কন্দর্পনারায়ণ যেন একটা ধাক্কা খেলেন— সব ছেলেমেয়েরা গেল কোথায়? এই তো একটু আগেই সবাই মিলে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে স্নান করছিল! এর মধ্যেই সবাই পুল থেকে উঠে পড়ল?

কন্দর্পনারায়ণ ঘড়ির দিকে তাকালেন। ঘড়ির ছোটো কাঁটাটা চারের ঘরে আর বড় কাঁটাটা বারোটার ঘরে স্থির।

কন্দর্পনারায়ণ যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না— এ কী দেখছেন তিনি! বিকেল চারটে বাজে? এই তো একটু আগেও তিনি ঘড়ি দেখলেন। স্পষ্ট দেখেছেন বেলা বারোটা বাজে। তাহলে? এর মধ্যে চার ঘণ্টা কেটে গেল? তিনি টেরই পাননি?

পাপাই, বসুন্ধরা, কোয়েল, নাজির, দ্বৈপায়ন, অন্য সব ছেলে-মেয়েরা কোথায়? তাঁরা কী সবই লাঞ্চ করতে রেস্তোঁরাতে চলে গেছেন? কন্দর্পনারায়ণকে ডাকেন নি? অথবা ডেকেছেন, কন্দর্পনারায়ণ মামলার পড়াশোনা নিয়ে এতই মগ্ন ছিলেন যে টেরই পান নি?

মেয়েটা ঘরের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে একা একা নিজের মনেই যেন কথা বলে চলেছে— কী বলছে। সেটা অবশ্য কন্দর্পনারায়ণ বুঝতে পারলেন না।

কন্দর্পনারায়ণ প্রশ্ন করলেন— 'কী রে? নাম কি তোর? মা-বাবা কোথায়?'

মেয়েটা উত্তর দিল না। কন্দর্পনারায়ণ বুঝলেন— সেই পরিচিত সমস্যা— দীঘা-মন্দারমণি বা এই ধরনের বেড়াতে যাবার জায়গাগুলোতে যা হয় আর কি? মা-বাবারা নিজেদের আড্ডা, বন্ধুদের সঙ্গে ড্রিংক করা, ইত্যাদি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন, আর বাচ্চারা একা একাই ঘুরে বেড়ায়— এখানেও তাই!

মেয়েটির মা-বাবা নিশ্চয়ই বন্ধু বান্ধব নিয়ে অনেকে মিলে একসাথে এখানে এসেছেন। এখন হয়তো সবাই মিলে আড্ডা মারছেন বা সুইমিং পুলে স্নান করছেন, সেই ফাঁকে মেয়ে একা একাই বেড়িয়ে পড়েছে। এই বিল্ডিং-এর সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসেছে তিনতলায়। তারপর কন্দর্পনারায়ণের ঘরের দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়েছে ভেতরে।

কন্দর্পনারায়ণ মনে মনে নিশ্চিন্ত হলেন। তাই হবে। তাও ভালো, কন্দর্পনারায়ণ-এর ঘরে ঢুকে পড়েছে।

আজকাল যা দিন পড়েছে। আজই সকালবেলায় কন্দর্পনারায়ণ দেখেছেন একটা টাটা চারশো সাত গাড়ি অর্থাৎ ছোটো ট্রাক, রিসর্টের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে আর সেখানে থেকে নামানো হচ্ছে মদের বোতলের পেটি। বাঙালি এখন 'আনন্দ করা' মানে মদ খাওয়াকেই বোঝে।

আর কোনো কোনো মানুষের তো, পেটে মদ পড়লেই তারা পিশাচ হয়ে ওঠে।

আজকাল বাচ্চা মেয়েদেরও নিস্তার নেই। তাদের উপরও নিষ্ঠুর নির্যাতন করে ওই নর-পিশাচরা। বাচ্চা মেয়েদের ওপর নির্যাতন আটকাতে নতুন আইনও হয়েছে- 'প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট' বা সংক্ষেপে 'পকসো'।

যতদিন দিন যাচ্ছে, মানুষ তত নৃশংস পৈশাচিক হয়ে উঠছে— এই তো কিছুদিন আগে শোভাবাজার এলাকায়, একটা নির্মীয়মান বাড়ির সিঁড়ির নিচ থেকে একটা দশ-বারো বছরের বাচ্চা মেয়ের ক্ষত-বিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়েছে— মেয়েটির উপর নৃশংস অত্যাচার করে তাকে খুন করা হয়েছে।

মেয়েটি দেহ যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, সেই ঘটনাস্থল থেকে মেয়েটির ভাঙা দাঁত আর মাথার চুলের অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। অর্থাৎ মেয়েটিকে শুধু 'রেপ'-ই করা হয় নি, নৃশংস আনন্দ উপভোগ করতে করতে সিঁড়িতে মেয়েটির মুখটা ঠুকে দেওয়া হয়েছে বারংবার। যার জন্য গোটা সিঁড়িতে রক্তের দাগ পাওয়া গেছে, গোছা গোছা চুল পাওয়া গেছে। এখানে ওখানে, চুলের গোড়াতেও ছিল রক্তের দাগ। অর্থাৎ টেনে টেনে মেয়েটার মাথার চুলগুলো ছেঁড়া হয়েছে।

পোস্ট মর্টেমে পাওয়া গেছে, মেয়েটার প্রাইভেট পার্টস ছিন্নভিন্ন-রক্তাক্ত। অপরিণত বুকে অন্তত কুড়িটা পূর্ণবয়স্ক মানুষের কামড়ের কারণে দাঁতের দাগ।

'উফ! কী নৃশংস! না জানি, মেয়েটা কত্ত কষ্ট পেয়ে মরেছে!'— কন্দর্পনারায়ণ শিউরে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেললেন।

পুলিশ তদন্তে নেমে ওই নির্মীয়মান বাড়ির সিকিউরিটি গার্ডকেই ধরেছে। সেই নাকি খুনী। আদতে বিহারের বাসিন্দা— মঙ্গলরাম যাদব। বাড়িতে বউ আর দুটো বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে— আট বছর আর পাঁচ বছর বয়সের।

ব্যক্তিগতভাবে কন্দর্পনারায়ণ ফাঁসির সাজার বিরুদ্ধে। মনে করেন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডই যথেষ্ট কড়া সাজা। ভাবা যায় একটা মানুষ তার অপরাধের সাজা হিসেবে সারা জীবন জেলে থাকবে! তাছাড়া নির্ভয়া কাণ্ডের পর 'রেপ' সংক্রান্ত ধারাগুলি এখন আগের চাইতে অনেক স্ট্রং।

নাবালিকাদের 'রেপ' করে, খুন করার ঘটনায় আসামীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড তো বটেই, এমনকী মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। আর 'যাবজ্জীবন কারাদণ্ড' মানে কিন্তু সারাজীবন জেলে থাকতে হবে— আমৃত্যু।

কন্দর্পনারায়ণ চেয়ারে বসে, চোখ বোজা অবস্থাতেই ঠোঁট ওল্টালেন।

শোভাবাজারের ওই ঘটনাটাতে তদন্ত সঠিক হয়েছে কিনা কে জানে? কন্দর্পনারায়ণের পুলিশের তদন্ত পদ্ধতিতে আস্থা নেই একেবারেই। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে পুলিশ একেবারে সিদ্ধহস্ত। কাকে ধরতে কাকে ধরেছে কে জানে? মেয়েটার উপর যেরকম নৃশংস অত্যাচার হয়েছে, তা কোনো একজনের পক্ষে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। কন্দর্পনারায়ণ এক্কেবারে নিশ্চিত। অন্তত খবরের কাগজ পড়ে তিনি যতটুকু বুঝেছেন তা হল, ওই বাড়ির সিঁড়ির ল্যান্ডিং-এ একাধিক মদের বোতল ও গ্লাস পাওয়া গেছে। সঙ্গে প্রচুর বিড়ির টুকরো। আর পাওয়া গেছে সিলভার ফয়েলে আধ খাওয়া চিলি চিকেন। যা সম্ভবত মদের চাট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। অর্থাৎ একেবারে পরিষ্কার যে, ওই নির্মীয়মান বাড়ির সিঁড়ির ল্যান্ডিং-য়ে মদের আসর বসেছিল এবং একাধিক মানুষ সেখানে হাজির ছিল।

অর্থাৎ, একটা কথা ঠিক। মঙ্গলরাম যদি অপরাধটা ঘটিয়েও থাকে তাহলেও সে একা নয়। সঙ্গে আরও অনেকে ছিল। তাছাড়া সে নিজে অপরাধ না ঘটিয়ে থাকলেও হয়তো জানে অপরাধী কারা। কারণ ওই বাড়িটির সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে মঙ্গলরাম তার দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারে না।

নির্যাতিতা মেয়েটি নাকি আসলে নদীয়ার বাসিন্দা। মায়ের সঙ্গে মাসীর বাড়ি শোভাবাজারে এসেছিল দুদিনের ছুটিতে। বিকেলবেলাতেও মাসীর বাড়ির সামনের গলিতে পাড়ার অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে এক্কা-দোক্কা খেলছিল। সন্ধ্যের পর থেকেই তাকে আর কেউ দেখেনি। রাত সাড়ে নটার পর তার নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারটা জানাজানি হয়।

অবশেষে পাড়ারই কিছু ছেলে, খুঁজতে খুঁজতে সেই নির্মীয়মান বাড়িটিতে গিয়ে ঢোকে, এবং মেয়েটির রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখে। দুঃখের কথা হল তখনও নাকি মেয়েটার দেহে প্রাণ ছিল। তাকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতেই মেয়েটার প্রাণবায়ুটা শেষ হয়ে যায়।

আহারে! কী কষ্ট পেয়েই না মেয়েটা মরেছে! যদি ঠিক সময়ে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া যেত, তাহলে হয়তো বেঁচে যেত। চোখ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই কন্দর্পনারায়ণ আবার শিউরে উঠলেন। ফীল করলেন চোখের কোণ দুটো জলে ভিজে যাচ্ছে। বিড়বিড় করে উঠলেন— 'ফাঁসি হোক, ফাঁসি হোক, যারা তোকে এত কষ্ট দিয়ে মেরেছে তাদের ফাঁসি হোক।'

কিন্তু সত্যিই কী মঙ্গলরাম একা একা মেয়েটাকে 'রেপ' করে খুন করেছে? কন্দর্পনারায়ণের দৃঢ় বিশ্বাস সঙ্গে আরও লোকজন ছিল অথবা মঙ্গলরাম নয়, অন্য কেউ— অন্য কেউ। পুলিশ জানে সেটা। যদি এলাকারই প্রভাবশালী কেউ হয়, তাহলে পুলিশ তাকে ধরতে সাহসই পাবে না— এটা জানা কথা। তাই নিজেদের মুখ রক্ষা করতে একটা গরীব-গুর্বো লোককে তুলে নিয়েছে। তারপর মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করেছে যে, 'নাবালিকা ধর্ষণ-খুনে অপরাধী গ্রেপ্তার'। কিন্তু যে কোনো সেন্সিবল লোকই বুঝতে পারবে যে, একা একজন লোকের পক্ষে ওই জঘন্য অপরাধটা করা সম্ভব নয়।

কন্দর্পনারায়ণ চোখ খুলে ফেললেন। দেখলেন যে, বাচ্চা মেয়েটা মাটিতে বসে রয়েছে। একমনে কোলে ধরা পুতুলটার সঙ্গে কথা বলছে।

কন্দর্পনারায়ণ কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করলেন যে, মেয়েটা কী বলছে।

পরিষ্কার শুনতে পেলেন মেয়েটা পুতুলটার দিকে তাকিয়ে বলে চলেছে— 'তোমাকে ওরা মেরেছে? খুব কষ্ট দিয়েছে? আমরাও ওদের ছাড়ব না কেমন?' মেয়েটা বড় বড়, ভাসা ভাসা চোখ দুটো তুলে এবার তাকালো কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে। চোখ ভরা জলে। ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল মেয়েটার— 'সবাই বলে বাপি দুষ্টু। কিন্তু, আমি জানি বাপি ভালো। বাপি আমাকে আর মাম্মাকে খুব ভালোবাসে। আচ্ছা পলু মামা আসে কেন? তুমি বারণ করে দাও।'

কন্দর্পনারায়ণ যেন চাবুকের বাড়ি খেলেন। কী বলছে মেয়েটা? 'তোমাকে ওরা মেরেছে?' 'খুব কষ্ট দিয়েছে?' 'আমরাও ছাড়ব না?' মেয়েটা এসব কথা বলছে কেন? কে মেরেছে? কাকে মেরেছে? এই ছোট্টো ফুটফুটে ফুলের মতো বাচ্চাটাকে কেউ মারল নাকি? ওর মা-বাবা ওকে মেরেছে?

আহা রে! অ্যাত্তো সুন্দর বাচ্চাকে কেউ মারতে পারে? ফর্সা। হাতকাটা একটা ফ্রক পড়া, সোনালী কোঁচকানো এক ঢাল চুল নেমেছে কাঁধ পর্যন্ত। মাটিতে বাবু হয়ে বসে রয়েছে, কোলে পুতুলটা নিয়ে। ছোট্টো ছোট্টো ফর্সা দুটো পা ফ্রকের নিচ দিয়ে বেরিয়ে রয়েছে। পায়ের তলা দুটো এত্ত ফর্সা, যেন আলতা দিয়ে রাঙানো— রক্তলাল। টোকা দিলেই রক্ত ফুটে বেরোবে।

কন্দর্পনারায়ণ বাচ্চাটাকে দেখে মুগ্ধ হলেন। এত সুন্দর মেয়ে যার বাড়িতে থাকে সে না জানি কত্ত ভাগ্যবান!

—'অ্যাই, তোর নাম কি? কোথায় থাকিস? কোন ক্লাসে পড়িস?' খুব মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করলেন কন্দর্পনারায়ণ।

—'গড়িয়া। কেজি টু-এ পড়ি? মেয়েটা অন্যমনস্ক হয়ে কী যেন ভাবতে ভাবতে উত্তর দিল।

—'মা বাবা কোথায়? অনেক বেলা হয়ে গেছে। ভাত খেয়েছিস?'

—'মা দীঘা। বাবা এখানে। না ভাতু খাইনি।'

কন্দর্পনারায়ণ আবার চমকে উঠলেন, মা দীঘাতে, আর বাবা এখানে? মন্দারমণিতে? তাছাড়া এই বিকেল চারটের সময়ও কিচ্ছু খায়নি বাচ্চাটা?

তার মানে কী? তবে কি ওরা আসলে দীঘাতেই উঠেছে সবাই মিলে? মা দীঘাতেই থেকে গেছেন? আর ও, ওর বাবার সঙ্গে দীঘা থেকে এসেছে মন্দারমণিতে? বাবা বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে এখানে এই রিসর্টেরই কোনো ঘরে আড্ডা মারতে- ড্রিংক করতে ব্যস্ত। আর সেই সুযোগে ও, ওদের ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসেছে? তারপর কন্দর্পনারায়ণ-এর ঘরের দরজা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়েছে ভেতরে?

—'আমার বাপি ডিং করে না।'

কন্দর্পনারায়ণ মুহূর্তে চমকে উঠলেন। কী বলল মেয়েটা? 'আমার বাপি ডিং করে না?' মানে 'আমার বাপি ড্রিংক করে না?' আধো আধো স্বরে 'ড্রিংক' শব্দটা পরিষ্কার বলতে না পেরে 'ডিং' বলল? কিন্তু কন্দর্পনারায়ণের মনের কথা ও বুঝল কি করে?

—'মা তোমার কথা বলছিল। দিদাকে বলছিল তোমার কাছে যেতে।'

তারপর একটু থেমে আবার বলল— 'তুমি বড় উকিল?'

কন্দর্পনারায়ণ চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন। বাবু হয়ে বসে থাকা মেয়েটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বললেন— 'না মা, আমি একটুও বড় উকিল নই। আমি খুব সামান্য লোক। তোর একটা জেঠু। তুই খুব মিষ্টি মেয়ে। ভগবানের কাছে আমি বলছি আমাকে যেন পরের জন্মে তোর মতো একটা মিষ্টি মেয়ে দেন।'

মেয়েটা কন্দর্পনারায়ণের দিকে বড় বড় চোখ তুলে তাকালো। মুহূর্তে কন্দর্পনারায়ণ যেন মেয়েটার চোখের মধ্যে দিয়ে সমুদ্রটাকেই দেখতে পেলেন— দুটো চোখ কী গভীর, একটু আগেই জানালার স্লাইডিং পাল্লা ঠেলে সরিয়ে এইরকমই গভীর অতলান্ত সমুদ্র দেখেছিলেন। মেয়েটা আবার লাল গোলাপের পাঁপড়ির মতো নরম ঠোঁট দুটো নেড়ে বলে উঠল— 'আচ্ছা জাস্টিস মানে কি? বাপি বলেছে তুমি আমাদের জাস্টিস পাইয়ে দেবে।'

কন্দর্পনারায়ণ অবাক! এইটুকু মেয়ে বলে কি? 'জাস্টিস?' তার মানে কি ওরা খুব বিপদে পড়েছে? কী বিপদ? ওর বাবা কেন বলেছেন, কন্দর্পনারায়ণ ওদের জাস্টিস পাইয়ে দেবেন?'

কন্দর্পনারায়ণ বোধ ফিরে পেতেই বলতে শুরু করলেন— 'শোন, জাস্টিস মানে 'ন্যায়'। ধরা যাক কারো সঙ্গে অন্যায় কিছু ঘটছে, বে-আইনি কিছু হচ্ছে, তাকে আইনের মাধ্যমে সঠিক বিচার পাইয়ে দেওয়ার নাম জাস্টিস।'

'বুঝলি মা?' কন্দর্পনারায়ণ নরম স্বরে বলে চলেছেন— 'আমাদের দেশে সংবিধান বলে একটা বিষয় আছে। সেখানে বলা আছে, কেউ কারও সঙ্গে অন্যায় করবে না, আইনের চোখে সবাই সমান— এইরকমই অনেক কিছু।'

কন্দর্পনারায়ণ বুঝতে পারছিলেন, চার পাঁচ বছরের একটা বাচ্চার জন্য 'সংবিধান', 'আইন', 'ন্যায়' শব্দগুলো খুব ভারি ভারি হয়ে যাচ্ছে। তবে কন্দর্পনারায়ণ-এর, বাচ্চা মেয়েটার সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগছে।

কন্দর্পনারায়ণ আবার বললেন— 'মা, তোর বাপি কোথায়? চল তোকে বাপির কাছে নিয়ে যাই। অনেক বেলা হয়ে গেছে। তুই তো ভাতু খাসনি। চল ভাতু খাবি।'

কন্দর্পনারায়ণ ইচ্ছে করেই 'ভাত' না বলে 'ভাতু বললেন, তিনি মেয়েটার কাছের হবার চেষ্টা করলেন।

'তাহলে সবাই বলে কেন, বাপি খারাপ? বাপি আমাদের খুব ভালোবাসে, কক্কোনো মারে না।'

একটু থেমে কোলের পুতুলটাকে আদর করার ভঙ্গিতে স্বতস্ফূর্তভাবে আবার বলতে শুরু করল— 'ওরা খারাপ, পাজি, পাজি'।

হঠাৎ-ই ঘরটা যেন নেল পালিশের ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে গেল। কন্দর্পনারায়ণ নজর করলেন, মেয়েটা তার ফ্রকের পকেট থেকে বের করে এনেছে, একটা ছোট্ট নেল পালিশের বোতল।

কোলে ধরে থাকা পুতুলটার হাতটা ধরে তার নখে পরিয়ে দিচ্ছে লাল টকটকে নেল পালিশ। মেয়েটা তার নিজের কড়ে আঙুলটা দেখিয়ে বলে উঠল, 'বাপির এই কুট্টি আঙুলটার নখ বড়। আমি নখে লাল নেল পালিশ পড়িয়ে দিয়েছি। তুমি বাপি-কে চিনতে পারবে?'

কন্দর্পনারায়ণ সম্মোহিতের মতো ঘাড় নেড়ে বললেন— 'নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই পারব। তোর বাপিকে দেখলেই আমি চিনতে পারব।'

মেয়েটা এবার উঠে দাঁড়ালো। কেন যেন মেয়েটাকে তাঁর খুব চেনা চেনা লাগছে। কোথায় দেখেছেন। ঠিক মনে করতে পারছেন না।

মেয়েটা এবার হাতের পুতুলটার দিকে তাকিয়ে বাচ্চাদের বায়না করার ভঙ্গিতে 'আমার জাস্টিস চাই— তুমি আমায় জাস্টিস পাইয়ে দাও' বলতে বলতে ঘরের মধ্যে পাক খেয়ে খেয়ে ঘুরতে লাগল। মেয়েটা যেন 'জাস্টিস' শব্দটা ঠিক উচ্চারণও করতে পারছে না— কন্দর্পনারায়ণ-এর মনে হচ্ছে মেয়েটা বলছে— 'আমার জাত্তিত চাই, তুমি আমায় জাত্তিত পাইয়ে দাও।'

মেয়েটা বনবন করে ঘুরছে। তার ফ্রকটা হাওয়ায় ফুলে ফুলে উঠছে। মেয়েটা কেন যেন খুব রেগে গেছে। ফর্সা মুখটা লাল হয়ে উঠছে।

—'এই তোর মাথা ঘুরবে, ওভাবে ঘুরতে নেই মা— পড়ে যাবি—' কন্দর্পনারায়ণ হাত বাড়িয়ে মেয়েটাকে ধরতে গেলেন।

—'আমার জাত্তিত চাই— তুমি আমাকে জাত্তিত পাইয়ে দাও—'

কন্দর্পনারায়ণের কানের মধ্যে যেন কথাগুলো সজোরে আঘাত করছে— কান ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে— বনবন করে কন্দর্পনারায়ণ-এর মাথা ঘুরতে লাগল।

—'আঃ থাম থাম— আমার মাথা ঘুরছে— আর পারছি না—' কন্দর্পনারায়ণ মাথা ঘুরে সজোরে মেঝের উপর আছড়ে পড়লেন।

কতক্ষণ জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়েছিলেন কন্দর্পনারায়ণ, খেয়াল নেই। চোখ খুলেই তিনি বুঝতে পারলেন যে, তিনি মেঝেতেই উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন।

ধড়মড় করে উঠে বসলেন তিনি। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দেখেও বাচ্চা মেয়েটাকে খুঁজে পেলেন না। খোলা দরজা দিয়ে সমুদ্রের হাওয়া ঢুকে ঘরটাকে যেন উথাল -পাথাল করে দিচ্ছে। জানালার পর্দা, বিছানার চাদর, প্রায় উড়ছে। টেবিলের উপর রাখা মামলার ব্রিফ, অন্য কাগজপত্রে হাওয়া ঢুকে সব ফড়ফড় শব্দ করছে। ঘরের মধ্যে যেন একটা পাগলা ঝড় ঢুকে পড়েছে।

কন্দর্পনারায়ণ মেঝে থেকে উঠে পড়লেন। ছুটে দরজার বাইরে গিয়ে খোলা ছাদে গিয়ে দাঁড়ালেন— নাঃ সেখানেও নেই। তারপর সিঁড়ির কাছে গিয়ে রেলিং দিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে চিৎকার করে ডাকলেন— 'কী রে, কোথায় গেলি তুই?'

সিঁড়ির নিচের দিক থেকে কোনো সাড়া না মেলায় কন্দর্পনারায়ণ আবার দৌড়ে এসে ঢুকলেন ঘরের ভেতরে। ছুটে গেলেন জানালার দিকে— অজানা আশংকায় কন্দর্পনারায়ণ-এর বুকের ভেতর তখন গুড়গুড় করছে। এই ভরদুপুরে বাচ্চাটা গেল কোথায়? কাদের বাড়ির বাচ্চা কে জানে? যদি কোনো বিপদ-আপদ হয়?

স্লাইডিং জানালার পাল্লাটা ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কন্দর্পনারায়ণ প্রায় অর্ধেক শরীর বাইরে বের করে নিচের দিকে ঝুঁকে পড়লেন— সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা বিদ্যুতের শক খেলেন।

ছোট্ট মেয়েটা সমুদ্রের ধার দিয়ে একা হেঁটে হেঁটে ডানদিকে ঝাউবনের জঙ্গলের দিকে চলে যাচ্ছে। তার ফ্রকটা হাওয়ায় উড়ছে। সমুদ্রও যেন অদ্ভূত শান্ত হয়ে রয়েছে। ঘোলাটে জলে রোদ্দুর পরে চিক চিক করে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে, বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যাচ্ছে না।

কন্দর্পনারায়ণ জানালা দিয়ে চিৎকার করে হাত নেড়ে বাচ্চাটাকে ডাকতে চাইলেন— 'এ-ই, তুই কোথায় যাচ্ছিস? ওদিকে জঙ্গল, ওদিকে যাসনা।'

কিন্তু বেশ বুঝতে পারলেন, অতদূরে তাঁর গলা পৌঁছল না।

কন্দর্পনারায়ণ আর দেরি করলেন না। পায়ে চপ্পলটা গলিয়েই দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন। তারপর সুইমিং পুলটা বাঁ হাতে রেখে রিসর্টের মাঝখানে সবুজ মখমলের মতো লনের উপর দিয়ে এসে পড়লেন সমুদ্রের ধারের বালিয়াড়িতে।

মেয়েটা ততক্ষণে বেশ খানিকটা এগিয়ে গিয়েছে। কন্দর্পনারায়ণ জগিং করার স্টাইলে মেয়েটার পেছন পেছন দৌড়োতে লাগলেন, আর চিৎকার করতে লাগলেন— 'এই, তুই ওদিকে একা একা কোথায় যাচ্ছিস? যাসনা ওদিকে? তোর বাবা-মা কোথায়?'

কন্দর্পনারায়ণ-এর পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হলেও, নিয়মিত জগিং করার অভ্যেস আছে। আগে তো তিনি রোজ ভোরবেলায় সমাজগড়ের বাড়ি থেকে দৌড়োতে দৌড়োতে টালিগঞ্জ লেক অবধি যেতেন, সেখানে কিছুক্ষণ ফ্রি-হ্যান্ড একসারসাইজ করে, আবার দৌড়োতে দৌড়োতেই ফিরে আসতেন। আজকাল অবশ্য টালিগঞ্জ লেক অবধি আর যাওয়া হয় না।

সকাল ছটা নাগাদ ফ্রেশ হয়ে টী-শার্ট, ট্রাকস্যুট আর স্নিকার পরে চলে যান গল্ফগ্রীণ সেন্ট্রাল পার্কে। পার্কটাকে চারপাক মেরে দৌড়োতে দৌড়তে চলে যান লর্ডস বেকারীর মোড় পর্যন্ত। সেখান থেকে আবার ফিরে আসেন। ভোরবেলায় রীতিমতো দৌড়োন— আর দৌড়োনোর মধ্যে শান্তি-ভালোবাসা খুঁজে পান কন্দর্পনারায়ণ।

তবে সকালবেলায় মাঠে বা রাস্তায় দৌড়োনো, আর এই মার্চ মাসের মাঝামাঝি দুপুরবেলার কড়া রোদ্দুরে বালির উপর দিয়ে দৌড়োনোতে যে আকাশ-পাতাল তফাৎ, সেটা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারলেন কন্দর্পনারায়ণ। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তিনি ঘেমে-নেয়ে একশা হয়ে গেলেন, পরণের পাঞ্জাবিটা ঘামে সপসপ করতে লাগল। কপালের ঘাম চশমার ফাঁক দিয়ে চোখের মধ্যে ঢুকে, চোখ দুটো জ্বালা করতে লাগল।

মেয়েটার যেন ভ্রূক্ষেপই নেই। সে হাতের পুতুলটাকে জড়িয়ে ধরে আপনমনে হেঁটে চলেছে। কন্দর্পনারায়ণ ও যেন ঘোরের মধ্যে মেয়েটার পিছু পিছু দৌড়ে চলেছেন আর মেয়েটাকে ডেকে চলেছেন— 'এ-এ-এ-ই, তুই কোথায় যাচ্ছিস একা একা? যাস না, ওদিকে যাস না— তোর বাবা-মা কোথায়?'

মেয়েটা যেন উড়ে উড়ে চলেছে, কন্দর্পনারায়ণ কিছুতেই তার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছেন না।

মেয়েটা সমুদ্রকে বাঁ দিকে আর ঝাউবনের জঙ্গলকে ডান হাতে রেখে আপনমনে হেঁটে চলেছে। বেশ দশমিনিট খানেক হাঁটার পর সে ঝাউবনের জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়ল। কন্দর্পনারায়ণও তার পিছু পিছু সেই জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন।

খানিক পরেই, ঝাউবন শেষ হয়ে, মহুয়া গাছের জঙ্গল শুরু হল। মাঝে মাঝে বড় বড় বিলের মতো— কন্দর্পনারায়ণ জানেন, ওগুলোতে মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদি চাষ হয়। কোনো কোনোটা আবার জাল দিয়ে ঘেরা। এদিকটাতে পায়ে চলার মাটির রাস্তা রয়েছে। কন্দর্পনারায়ণ হাঁটতে হাঁটতেই রাস্তার উপর মোটরবাইকের টায়ারের দাগ দেখতে পেলেন— তার মানে এই ভেড়ির মালিকেরাই মোটর বাইকে করে এদিকে যাতায়াত করেন।

আরও খানিকটা যাবার পর দূরে দূরে ছোটো ছোটো মাটির দেওয়াল দেওয়া ঘর দেখতে পেলেন। বেশিরভাগই ভেঙে ভেঙে পড়েছে। একটা বাড়িরও মাথায় খড়ের বা টালির চাল নেই। সব হয় ভেঙে ঘরগুলোর মধ্যে ঢুকে গেছে, না হয় উড়ে গেছে। বাড়িগুলোর হাল এমনই যে, মালিকরাও আর সেগুলো সারাবার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নি। আশে পাশে কোনো লোকজনেরও দেখা নেই।

কন্দর্পনারায়ণ এবার মাটির ঘরগুলোর সামনে এসে কোমরে হাত দিয়ে হাঁফাতে লাগলেন। মেয়েটা এইখানেই এসে যেন ভোজবাজির মতো মিলিয়ে গেছে।

কন্দর্পনারায়ণ-এর সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। পকেট থেকে রুমাল বের করে, চোখ থেকে চশমাটা খুলে, কাঁচদুটো ভালো করে মুছে নিয়ে আবার যথাস্থানে পরে নিলেন।

ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জায়গাটাকে ভালো করে দেখতে লাগলেন কন্দর্পনারায়ণ। এই দিকটায় লোকজন খুব একটা আসে না বোঝাই যাচ্ছে। আগে এই ধরনের ছোটো ছোটো ঘরকে বোধহয় মাছের আর কাঁকড়ার আড়ত হিসেবে ব্যবহার করা হত। এখন আর ঘরগুলো বিশেষ ব্যবহার হয় না। বেশিরভাগ ঘরেরই দরজা-জানালা ভাঙা, সমুদ্রের হাওয়ায় দুলছে। সমুদ্র এখান থেকে আবার বেশ কাছে। খাঁড়ির মতো একটা অংশ, ঘরগুলোর পেছনদিকটায় উঠে এসেছে। সমুদ্রে জোয়ারের জল বাড়লে বোধহয় এই ঘরগুলো অবধি জল উঠে আসে।

কোথা থেকে যেন একটা ঘড়াং ঘড়াং আওয়াজ আসছে। কোনো ধাতব পাতের শব্দ মনে হয়। কন্দর্পনারায়ণ-এর ডানদিকে একটু দূরে একটা ঘর। মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল। আশেপাশের সব ঘরের মধ্যে ওই একটাই ঘর অক্ষত মনে হচ্ছে।

দু-একটা বড় গাছ ছাড়া, চারিদিকে মহুয়া গাছের জঙ্গল। তার মানে, আগে এদিকটায় ছোটো-খাটো বাজার বসত। আয়লা বা ওই ধরনের বড় ঝড়ের পরে বোধহয় এদিকটায় ব্যাপক ক্ষতি হয়, তারপর এদিক থেকে আড়তদাররা সরে গেছেন।

কন্দর্পনারায়ণ একটু এগিয়ে এলেন। ঘরটার গায়ে টিনের রংচটা একটা বোর্ড ঝুলছে— তাতে লেখা— 'শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্র'।

কন্দর্পনারায়ণ কানখাড়া করলেন— ঘড়াং ঘড়াং করে শব্দটা এই ঘরটার পেছন থেকেই আসছে না?

তারপর ঘুরে, ঘরটার পেছনদিকে এসে দাঁড়ালেন— ও হরি! ঘরটার পেছনে, একটা টিনের দরজা। তার একটা পাল্লার ওপরের দিকের কব্জা খুলে দরজাটা অর্ধেক হেলে গেছে। সমুদ্রের জোরালো হাওয়া এসে সরাসরি ধাক্কা মারছে হেলে থাকা দরজায়, আর তার জন্যই একটানা শব্দ উঠছে ঘড়াং ঘং, ঘড়াং ঘং।

কন্দর্পনারায়ণ ঘরটার পেছনের মাটিতে একাধিক মোটর বাইকের চাকার দাগ দেখতে পেলেন। তার মানে এই ঘরটায় লোক আসে? অদ্ভূত! অন্যঘরগুলো দেখে তো মনে হচ্ছে এদিকে কেউ আসে না। শুধুমাত্র এই ঘরটাতে লোক আসে কেন?

কন্দর্পনারায়ণ এবার একটা হাঁটু মুড়ে আর একটা হাঁটুর উপর বাঁ কনুইয়ের ভর রেখে ডান হাত দিয়ে সরু রাস্তার উপর মোটর বাইকের টায়ারের দাগগুলো পরীক্ষা করলেন। মাটিতে হাত দিয়েই বুঝতে পারলেন দাগগুলো টাটকা। দু-একদিনের মধ্যেই কেউ এসেছিল।

কন্দর্পনারায়ণ উঠে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেলেন না।

বাচ্চা মেয়েটা এই ঘরগুলো অবধি এসেই ভ্যানিশ করে গেছে— গেল কোথায় বাচ্চাটা?

কন্দর্পনারায়ণ কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলেন, কী করবেন তিনি এখন?

মাথার উপর একটা গাছের ডালে একটা বড় পাখি ডানা ঝটপটিয়ে এসে বসল।

কন্দর্পনারায়ণ পাখিটাকে ভালো করে দেখার জন্য চোখ তুললেন। বড়ো কোনো সামুদ্রিক পাখি। সাধারণত এত বড় পাখি খুব একটা দেখা যায় না। মুখ আর গলাটা মেরুণ, ডানা দুটো আবার কুচকুচে কালো। এই ধরনের পাখিদের ডানায় খুব জোর থাকে। সমুদ্রের উপর দিয়ে, ডানায় ভর করে, এরা মাইলের পর মাইল উড়তে পারে। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর চোখ আটকে গেল বিদ্যুতের তারে। একটা কালো মোটা তার, দূরে গ্রামের ভেতর থেকে এসে জানালার মধ্যে দিয়ে, ঘরটার ভেতরে এসে ঢুকেছে। কন্দর্পনারায়ণ অবাক হলেন। বিদ্যুতের তার? এই জনমানবহীন পাণ্ডববর্জিত জায়গায়? এই ঘরের ভেতরে? কেন?

একটা হালকা ঘড়ঘড় শব্দ আসছে না? যেন বড় কোনো ফ্রিজ চলছে। কন্দর্পনারায়ণ ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে এলেন। যা ভেবেছিলেন তাই? ঘরটার ভেতরে জানালা ঘেঁষে একটা বড় ফ্রিজ শোয়ানো। কন্দর্পনারায়ণ জানেন আড়তদাররা তাঁদের মাছ বা কাঁকড়া জমিয়ে রাখতে এই ধরনের বড় বড় ফ্রিজই ব্যবহার করেন। শহরের আইসক্রীম-কোল্ড ড্রিংকের দোকানগুলোতেও এই ধরনের বড় বড় ফ্রিজ রাখা থাকে। ওপরে কাঁচের স্লাইডিং ডোর থাকে।

তবে এই ফ্রীজটা বেশ বড়। এবং সেটা চলছে। তারই হালকা ঘড় ঘড় শব্দ শোনা যাচ্ছিল বাইরে থেকে।

কন্দর্পনারায়ণ দু-পা এগিয়ে ফ্রীজটার ভেতরে উঁকি মারলেন, আর যা দেখলেন তাতে তাঁর শরীর হিম হয়ে গেল। মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত যেন নেমে গেল।

ফ্রিজের মধ্যে বরফের ওপরে, একজন লোক শোয়া অবস্থায়। চোখ দুটো খোলা, বিস্ফারিত। মুখের মধ্যে যন্ত্রণার অভিব্যক্তি স্পষ্ট। যেন মৃত্যুর আগে খুব কষ্ট পেয়েছেন। দুটো হাত বুকের উপরে আড়াআড়ি রাখা। আর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের নখটা বেশ বড়। তাতে লাল রঙের নেল পালিশ লাগানো।

কন্দর্পনারায়ণের পা দুটো যেন কেউ আঠা দিয়ে, ঘরের মেঝের সঙ্গে আটকে দিয়েছে। কন্দর্পনারায়ণ লাফ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। তিনি লোকটার দিকে তাকিয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন।

এইভাবে কতক্ষণ কেটেছে খেয়াল নেই। হঠাৎ পেছন থেকে নাজির, দ্বৈপায়ন, সুপ্রীম, সবার হই হই শোনা গেল— 'এই তো স্যার এখানে দাঁড়িয়ে রয়েছেন', 'স্যার এখানে আপনি কী করছেন?' বসুন্ধরার গলার স্বরও শোনা গেল— 'তুমি একা একা এখানে এলে কী করে?' 'কী করছ তুমি এখানে?'

সবার কথার আওয়াজে যেন কন্দর্পনারায়ণ-এর চটক ভাঙল। তিনি চমকে উঠে পেছন ফিরে সবাইকে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। চট করে পেছন ফিরতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়েই যাচ্ছিলেন, দ্বৈপায়ন ধরে ফেললেন। বললেন— 'স্যার কী হয়েছে আপনার? শরীর খারাপ? এত ঘামছেন কেন?'

কন্দর্পনারায়ণ কোনও জবাব দিতে পারলেন না। শুধু ডানহাত তুলে ইশারা করলেন, মাটিতে শোয়ানো বিরাট ফ্রিজটার দিকে।

দ্বৈপায়ন, নাজির, সুপ্রীম, দেবর্ষি সবাই এগিয়ে গেলেন ফ্রিজটার দিকে।

আধঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ এসে পৌঁছল। মেদিনীপুর রেঞ্জের ডিআইজি, প্রদীপ মুখোপাধ্যায় কন্দর্পনারায়ণ-এর পূর্ব পরিচিত। তিনি নিজে ঘটনাস্থলে চলে এলেন। অবশ্য পুলিশ আসার আগেই এই 'শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্র'টি যাঁর নামে, সেই শিমূল রেহমানও চলে এলেন।

সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পরা, মাঝবয়সী ভদ্রলোক। অত্যন্ত বিনয়ী ব্যবহার। তিনি এসেই বললেন— 'এই কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রটা আমার হলেও আমি এইখানের ব্যবসা বন্ধ করেছি বহুদিন হল। আর এই দোকানটাও আমি ব্যবহার করি না। প্রপার মন্দারমণিতেই আমার দোকান আছে। সেখান থেকেই আমি চিংড়ি, কাঁকড়া ইত্যাদি বিক্রী করি।

গত আয়লায় প্রচণ্ড ঝড়ে মন্দারমণির এই দিকটার ব্যাপক ক্ষতি হয়। শুধু আমি নই, এই জায়গাটায় আর যারা ব্যবসা করতেন, সবাই এখান থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই দিকটায় আর আসা হয় না। আজ আমার এই পরিত্যক্ত দোকান ঘরের ভেতর থেকে মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ায় আমি রীতিমতো আতঙ্কিত।

তবে এটাও ঠিক, এই ফ্রিজটা আমারই। খারাপ হয়ে গিয়েছিল— কোনো কাজে আসছিল না বলে এখানেই ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম।'

কন্দর্পনারায়ণ শিমূল রেহমানের কথা শুনতে শুনতে ঘাড় নাড়ছিলেন। বলে উঠলেন— 'তার মানে খুনিরা এলাকারই লোক। আপনি এই দোকান ঘরটা ছেড়ে চলে গিয়েছেন, প্রপার মন্দারমণিতে অন্য ঘর বা দোকান নিয়েছেন, তারা জানত। ভাঙা ফ্রিজটা এখানে পড়ে আছে সেটাও জানত।

তাছাড়া এখানে আসার সময় আমি নোটিশ করেছিলাম যে, এখানে ইলেক্ট্রিসিটি নেই। দূর থেকে হুকিং-এর মাধ্যমে তার টেনে ফ্রিজটা চালানো হচ্ছে।

খুনি জানত যে এই দিকটায় কেউ আসে না। সেই জন্যই ডেডবডি লুকোবার জন্য এই জায়গাটা বেছে নিয়েছে।'

শিমূল রেহমান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন— 'কিন্তু স্যার, এই দিকটায় তো আজকাল কেউ আসেই না। আপনি এখানে এসে পৌঁছলেন কী করে? আপনি তো পেঙ্গুইন হলিডে রিসর্টে উঠেছেন।'

কন্দর্পনারায়ণ অন্যমনস্কের হাসি হাসলেন।

কথা ঘোরানোর জন্য বলে উঠলেন— 'আসলে আমি একটু হাঁটতে হাঁটতে এদিকে চলে এসেছিলাম। তারপর ভাঙা লোহার দরজার ঘড়াং ঘং, ঘড়াং ঘং করে শব্দ শুনতে পাই। শব্দ লক্ষ্য করে আসতেই এই ফ্রিজটা দেখলাম। তারপর ভেতরে উঁকি মারতেই দেখি একটা মৃতদেহ শোয়ানো।'

শুধু শিমূল রেহমান কেন, কন্দর্পনারায়ণের জুনিয়ররা, বসুন্ধরা, উপস্থিত মন্দারমণি থানার ও.সি. থেকে শুরু করে ডি.আই.জি. প্রদীপবাবু কেউই সেকথা বিশ্বাস করলেন বলে মনে হল না।

প্রদীপবাবুকে অত্যন্ত চিন্তিত দেখাল— 'আপনি যেভাবেই বা যে কারণেই এখানে এসে পড়ুন না কেন, এই ঘরে একটা ডেডবডি পাওয়া গেছে, এটাই আসল কথা।

তাছাড়া কন্দর্পনারায়ণবাবু, আপনার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আমরা যারা পুলিশে কাজ করি তারা সবাই পরিচিত। কখনও কখনও কোনো কোনো খুনের ঘটনার অপরাধীকে ধরবার ক্ষেত্রে আমরা আপনার সাহায্যও নিয়ে থাকি।

আপনি যখন এখানে উপস্থিতও আছেন আমি আপনাকে অনুরোধ করব এই রহস্যের উন্মোচনে আপনিই আমাদের সাহায্য করুন।'

কন্দর্পনারায়ণ মুখে কোনো কথা বললেন না। প্রদীপবাবু এবার ওসি-র দিকে তাকিয়ে বললেন— 'আপনি ডেডবডির ছবি তুলে সারা রাজ্যের সমস্ত থানায় পাঠিয়ে দিন, বডির আইডেন্টিফিকেশন জরুরি। তারপর সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে বডি পোস্ট মর্টেমে পাঠিয়ে দিন।'

কন্দর্পনারায়ণ অন্যমনস্কভাবে, ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে একটু দূরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। এবার মুখ খুললেন— 'থানায় থানায় ডেডবডির ছবি পাঠাবার দরকার নেই। আমি বডি আইডেন্টিফাই করে ফেলেছি।'

ঘরে উপস্থিত সকলে চমকে কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে তাকালেন। কন্দর্পনারায়ণ আবার বললেন— 'আমারই মক্কেল অরুণা মিত্রের জামাই।'

জুনিয়ররা সবাই হতবাক। 'কী বলছেন স্যার! অরুণা মিত্র? যিনি বলছিলেন, তাঁর মেয়ে আর নাতনিকে খুন করে জামাই ফেরার!'

কন্দর্পনারায়ণ আবার বললেন— 'খুনি অত্যন্ত ধুরন্ধর। অরুণা মিত্রর মেয়ে-জামাই আর নাতনিকে একই সঙ্গে খুন করা হয়েছে। মেয়ে আর নাতনির মৃতদেহ শুইয়ে রেখে আসা হয়েছে দীঘার হোটেলে। আর জামাইকে খুন করে মন্দারমণিতে নিয়ে আসা হয়েছে। তারপর মৃতদেহটা লুকিয়ে রাখা হয়েছে এখানে।

অবস্থা থিতিয়ে গেলে জামাই-এর মৃতদেহটা অন্য কোথাও ফেলে আসা হত বা এদিকে বালির মধ্যে পুঁতে দিলেই কেল্লা ফতে।

সাপও মরত, লাঠিও ভাঙতো না। লোকে জানত স্ত্রী আর কন্যাকে খুন করে জামাই ফেরার। আবার জামাইকেও মেরে ফেলা হল। আসল খুনিদের আর কেউ খুঁজবেই না। যদি একসঙ্গে তিনটে মৃতদেহই হোটেল থেকে উদ্ধার হত তাহলে পুলিশ বুঝত এই খুনগুলোর পেছনে অন্য কেউ।

খুনিদের প্ল্যান ছিল নিখুঁত। অরুণা মিত্রের মেয়ে আর নাতনিকে খুনের দায় পুরোপুরি চাপিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছিল তাঁর জামাইয়ের উপরেই, এদিকে তো জামাই অনেক আগেই খুন হয়ে গিয়েছেন।'

সেদিন রাতে, রিসর্টের রেস্তোঁরায় সবাই মিলে একসঙ্গে ডিনার করতে ঢুকলেন।

বেশ একটু রাতই হয়েছে। ইচ্ছে করেই কন্দর্পনারায়ণ চেম্বারের সবাইকে নিয়ে দেরী করে ডিনার করতে এলেন।

ওদিকে অরুণা মিত্র-কে খবর দিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর জামাই-এর ডেডবডি রিকভার হবার সঙ্গে সঙ্গেই। তিনি, তাঁর জামাই-এর অন্য আত্মীয় স্বজনকে নিয়ে চলে এসেছিলেন, মন্দারমণিতে একটা গাড়ি ভাড়া করে।

তারপর নিয়মমাফিক বডি আইডেন্টিফাই করে ফিরে এসেছেন। কন্দর্পনারায়ণ সবাইকেই অনুরোধ করেছিলেন, এই রিসর্টেই থাকতে। তাতে সবার সাথে কথা বলতে কন্দর্পনারায়ণ-এর সুবিধা হবে। অরুণা দেবীর জামাই-এর অন্য আত্মীয় স্বজন এই রিসর্টে থাকতে রাজী হলেন না। তাঁরা কাছাকাছি অন্য একটা হোটেলে চলে গেলেন।

আগামী কাল সকালে পোস্ট মর্টেমের পর বডি হ্যান্ডওভার করলে তাঁরা সবাই বডি নিয়ে কলকাতায় ফিরে গিয়ে সেখানেই দাহ করবেন।

অরুণা দেবী অবশ্য কন্দর্পনারায়ণ-এর জোরাজুরিতে এই রিসর্টেই থাকতে রাজী হলেন। তিনিও একেবারে ভেঙে পড়েছেন।

এতদিন জানতেন, তাঁর মেয়ে আর নাতনিকে খুন করে জামাই ফেরার। সেই জামাইকে পুলিশ যাতে তাড়াতাড়ি গ্রেপ্তার করে, সেই অনুরোধ নিয়েই তিনি কন্দর্পনারায়ণ-এর কাছে এসেছিলেন। কন্দর্পনারায়ণ তখন তাঁকে বলেছিলেন, দোলের ছুটিতে তাঁরা সবাই মিলে মন্দারমণি যাচ্ছেন। সেখান থেকে ফিরেই তিনি হাইকোর্টে মামলা করবেন যাতে পুলিশ দ্রুত তদন্ত করে, আর জামাই-কে গ্রেপ্তার করে।

আজ দুপুরে কন্দর্পনারায়ণ-এর করা ফোনে তিনি একেবারে আকাশ থেকে পড়েছেন।

মেয়ে আর নাতনির সঙ্গে জামাই-কেও খুন করে ফেলা হয়েছে, এটা ছিল দুঃস্বপ্নেরও অতীত।

কন্দর্পনারায়ণ-রা যখন রেস্তোঁরায় এসে ঢুকলেন তখন সেখানে আর কোনো বোর্ডার নেই। সবাই খাওয়া-দাওয়া শেষ করে চলে গিয়েছেন। রেস্তোঁরার কর্মীরাও সারা দিনের মতো কাজ শেষ করে প্রায় সবাই বাড়ি চলে গিয়েছেন। দু-একজন বাদে। তাঁরা কন্দর্পনারায়ণদের ডিনার করার জন্যই অপেক্ষা করছেন। এই রিসর্টের বেশিরভাগ কর্মীই অল্পবয়সী ছেলে। কাছাকাছি গ্রামেই বাড়ি। সবারই প্রায় শিফটিং ডিউটি। ভোর ছটা থেকে রাত দশটা, ভাগে ভাগে ডিউটি পড়ে। একজন দুজন আবার রিসর্টেই থেকে যান।

কারোরই খুব একটা খাওয়ার ইচ্ছে নেই। তবু রেস্তোঁরায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। সবাই মোটামুটি বুঝতে পেরেছেন, কন্দর্পনারায়ণ কিছু বলতে চান, হয়তো বা ফিউচার স্ট্র্যাটেজি নিয়েই কিছু আলোচনা করবেন।

অরুণা দেবী কোণের দিকে একটা চেয়ারে চুপ করে বসেছিলেন। মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে চোখ মুছছিলেন।

চেম্বারের ছেলে-মেয়েদের মুখেও কোনো কথা ছিল না। সবাই-ই অপেক্ষা করছিলেন, কন্দর্পনারায়ণ কখন মুখ খোলেন আর কী বলেন সেটা শোনার জন্য।

কন্দর্পনারায়ণ বসেছিলেন কাচের জানালার পাশে। ভুরু দুটো কুঁচকে, বাইরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়েছিলেন। গতকাল দোলপূর্ণিমা গেছে। চাঁদের আলোয় বাইরেটা যেন ধুয়ে যাচ্ছে। কাচের জানালার বাইরেই বালিয়াড়ি, আর বালিয়াড়ির পরেই সমুদ্র। চাঁদের আলো পড়ে গোটা সমুদ্রটাকেই মনে হচ্ছে রুপোলি।

কতক্ষণ সবাই চুপচাপ বসেছিলেন ঠিক নেই। নাজির প্রথম মুখ খুললেন— 'স্যার, আপনি স্পটে পৌঁছলেন কী করে? কী করেই বা বুঝলেন একটা পরিত্যক্ত কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রের ভেতরে রাখা আছে একটা অতি আধুনিক ফ্রিজার? আর সেই ফ্রিজারের মধ্যে রাখা আছে অরুণা দেবীর জামাই-য়ের ডেডবডি?'

কন্দর্পনারায়ণ নাজিরের কথার জবাব না দিয়ে বললেন— 'শুধু তোরা শুধু এটুকু মনে রাখ অরুণা দেবী যখন আমাদের কাছে সাহায্য চেয়ে চেম্বারে আসেন, তখন থেকেই আমি এই কেসটা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছিলাম।

অরুণা দেবী আমাদের তো বলেইছিলেন যে, তাঁর মেয়ে আর নাতনির ডেডবডি পাওয়া গেছে, দীঘার হোটেলে, আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম— দীঘা আর মন্দারমণিতো কাছাকাছি।

আমরা মন্দারমণি যাচ্ছি, সুযোগ পেলে দীঘাতে যে হোটেলে ডেডবডি দুটো পাওয়া গেছে, সেখান থেকেও একবার ঘুরে আসব।

যাই হোক অরুণা দেবীর মেয়ে আর নাতনির হত্যারহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা শুরু করেছিলাম তখন থেকেই। বলতে পারিস অরুণা দেবীর জামাই-এর ডেডবডি উদ্ধার করাটা, তারই একটা পার্ট।'

থামলেন কন্দর্পনারায়ণ, ভুরুটা কুঁচকে মাথা নেড়ে আবার বললেন— 'আমি যে ওই পরিত্যক্ত অঞ্চলটায় ভাঙা বাড়িগুলোর সামনে গিয়ে হাজির হয়েছি, তোরা জানলি কী করে? তোরাই বা আমার পিছু পিছু গিয়ে হাজির হলি কী করে?'

দ্বৈপায়ন এবার বলে উঠলেন— 'স্যার আমরা তো সবাই সুইমিং পুলেই ছিলাম। ঝাঁপাঝাঁপি করছিলাম। হঠাৎ দেখলাম আপনি আমাদের পুলের পাশ দিয়েই প্রায় দৌড়ে সী-বিচের দিকে যাচ্ছেন একা— আর নিজের মনেই বিড় বিড় করছেন। আমরা সবাই আপনাকে চিৎকার করে ডাকলাম— জিজ্ঞাসা করলাম, 'কোথায় যাচ্ছেন?' কিন্তু আপনি কোনো কথার জবাব দিলেন না।'

সুপ্রীম বললেন— 'আপনাকে অমন উদভ্রান্তের মতো ছুটতে দেখে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, নিশ্চয়ই কিছু একটা ঘটেছে। আমরাও সঙ্গে সঙ্গেই পুল থেকে উঠে পড়েছিলাম। কিন্তু আপনি তো প্রায় দৌড়োচ্ছিলেন। আপনার সঙ্গে দৌড়ে আমরা পেরে উঠছিলাম না। শেষে ওই ভাঙা পরিত্যক্ত 'কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্র'টার মধ্যে আমরা আপনাকে খুঁজে পাই।'

কন্দর্পনারায়ণ চুপ করে কী যেন ভাবছেন, পকেট থেকে নোটখাতা বের করলেন। বললেন— 'আমি স্পটে গিয়ে ফ্রিজারের মধ্যে ডেডবডিটা দেখে পাজলড হয়ে গিয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু, তিনটে জিনিস আমার নজর এড়ায় নি। এক, অরুণা দেবীর জামাই-এর বাঁ হাতের কড়ে আঙুল-এর নখটা বড়। দুই, তাতে লাল রঙের নেল পালিশ লাগানো। মনে রাখতে হবে, অরুণা দেবী যখন আমার চেম্বারে এসে নাতনির মৃতদেহের ছবি দেখাচ্ছিলেন, তখনই চোখে পড়েছিল যে, তার হাতের আঙুলগুলোতেও ওই একই— লাল রঙের নেল পালিশ লাগানো ছিল।

অর্থাৎ হয়তো বা দীঘায় এসে তিনজনে খুব আনন্দেই সময় কাটাচ্ছিলেন— অরুণা দেবীর নাতনি নিজেও নেল পালিশ পরেছিলো, আর তার বাবার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের বড় নখটাতেও পরিয়ে দিয়েছিল নেল পালিশ। তারপরই খুনিরা ঘরে ঢোকে। একসঙ্গে তিনজনকেই খুন করে— মেয়ে এবং নাতনির মৃতদেহ হোটেলের ঘরেই বিছানার উপর পাশাপাশি শুইয়ে দিয়ে, জামাই-এর মৃতদেহটাকে কোনোভাবে নিয়ে আসে মন্দারমণিতে।

শিমূল রেহমানের পরিত্যক্ত কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রে ফেলে যাওয়া অকেজো ফ্রিজারটাকে সারিয়ে নিয়ে তার মধ্যে ডেডবডিটা ঢুকিয়ে রেখে যায়।

হয়তো বা পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে বা সবাই যখন নিশ্চিত হত যে, অরুণা দেবীর জামাই-ই তার স্ত্রী আর কন্যাকে খুন করেছে, তখন তারা তার দেহটাকে অন্য কোথাও গায়েব করে দিত।'

কন্দর্পনারায়ণ থামতেই পারমিতা, মৌমিতা আর জয়শ্রী একসঙ্গে বলে উঠলেন— 'স্যার, আর তিননম্বর পয়েণ্টটা?'

কন্দর্পনারায়ণ উত্তর না দিয়ে সুপ্রীমের দিকে তাকালেন। বললেন— 'তোকে যে পুলিশ ঢুকবার আগেই ডেডবডিটার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ছবি নিতে বলেছিলাম— নিয়েছিস?'

সুপ্রীম ঘাড় নেড়ে 'হ্যাঁ' বলে, মোবাইল ফোনের 'ফোটো গ্যালারি'টা খুলে ফোনটা এগিয়ে দিলেন, কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে।

কন্দর্পনারায়ণ ফোনটা তুলে নিয়ে বাড়িয়ে দিলেন অরুণা দেবীর দিকে। বললেন— 'এখানে আপনার জামাই-এর মৃতদেহের বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে নেওয়া ছবি আছে। একটু দেখে বলবেন, কোনো ছবিতে সন্দেহজনক কিছু আছে কিনা?'

অরুণা দেবী মোবাইল ফোনে তোলা ছবিগুলো পর পর ভালো করে খুঁটিয়ে দেখেও কিছুই বুঝতে পারলেন না। শুধু বললেন— 'আপনি ঠিকই বলেছেন। পঙ্কজ, মানে আমার জামাই-এর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের নখটা বেশ লম্বা। আর ছবিতে দেখতে পাচ্ছি, সেই নখটায় লাল নেল পালিশ লাগানো।

রিয়া, মানে আমার নাতনির লাল রঙের নেল পালিশের উপর খুব দুর্বলতা ছিল।'

কন্দর্পনারায়ণ কৌতূহলের সঙ্গে আবার জিজ্ঞাসা করলেন— 'আর কিছু বুঝতে পারছেন না? ছবি থেকে বুঝতে পারছেন কি? কিছু মিসিং?'

অরুণা দেবী ঠোঁট উলটে না বুঝতে পারার ভঙ্গি করলেন।

কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'ওনার ওই বাঁ হাতের কড়ে আঙুলটাতেই একটা ফ্যাকাশে গোল দাগ দেখতে পাচ্ছি। ওই আঙুলটাতে আংটি পরতেন কি?'

অরুণা দেবী চমকে উঠলেন— 'রাইট! ওর বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলে একটা সোনার আংটি ছিল, লাল-পাথর বসানো।'

কন্দর্পনারায়ণ খুশি হয়ে ঘাড় নাড়লেন— 'যাক। আমার ক্যালকুলেশন ঠিক— ওনার ওই আঙুলটাতে একটা সোনার আংটি ছিল। যেটা মিসিং।'

পারমিতা বলে উঠলেন— 'তার মানে কী খুনিরা আংটিটাও নিয়ে গেছে? বাই দি ওয়ে, অরুণা দেবী, আপনার মেয়ে-জামাই-এর পার্স, অন্য টাকা-পয়সা, গয়না-গাঁটি, কিছু কি খোয়া গেছে? অন্ততঃ আপনি জানেন কিছু?'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'যতটা আমার মনে পড়ছে অরুণা দেবী আমার চেম্বারে এসে বলে গিয়েছিলেন যে, দীঘা যাবার আগে অরুণা দেবীর মেয়ে তাঁর গায়ের গয়না-গাঁটি খুলে, অরুণা দেবীকেই রাখতে দিয়ে গিয়েছিলেন। কাজেই টাকা-পয়সা বা গয়না-গাঁটির জন্য এতগুলো খুন বলে তো মনে হয় না।

আবার এটাও ঠিক যে বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলের লাল-পাথর বসানো সোনার আংটিটা মিসিং'।

কন্দর্পনারায়ণ-এর কথা শুনতে শুনতে সবাই ডিনার সারছিলেন। শুধু অরুণা দেবী কিছুই খাচ্ছিলেন না। বসুন্ধরা তাঁকে বার বার অল্প কিছু খেয়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছিলেন। কিন্তু অরুণা দেবী পরিষ্কার জানালেন যে, তিনি তাঁর স্বামী, একমাত্র মেয়ে, জামাই, নাতনি সবাইকেই হারিয়েছেন। কাজেই তাঁর কিচ্ছু খেতে ইচ্ছে করছে না। তিনি একেবারেই ভেঙে পড়েছেন।

তবে যদি একটু চা পাওয়া যায় তাহলে তিনি খেতে পারেন। কন্দর্পনারায়ণ ও শুনে বললেন যে, তাঁরও এক কাপ চা হলে ভালোই হয়।

বসুন্ধরা রিসর্টের রেস্তোঁরায় অনুরোধ করলেন, যদি তাঁরা, দু কাপ চা করে দেন।

রেস্তোঁরার ছেলেগুলো অল্পবয়সী আর খুব চটপটে। তাঁরা উপস্থিত সবাইকে খাবার সার্ভ করতে করতে কন্দর্পনারায়ণ-এর সঙ্গে সবার কথোপকথন শুনছিলেন এবং বুঝতেই পেরেছিলেন যে, অরুণা দেবীর সঙ্গে মস্ত বড় অঘটন ঘটে গেছে। তাই তাঁরা, অতরাত্রেও অরুণা দেবী আর কন্দর্পনারায়ণের জন্য চা করে এনে দিলেন।

ডিনার শেষ করে কন্দর্পনারায়ণ গলার স্বরকে একটু তুলে রেস্তোঁরায় উপস্থিত সব জুনিয়র ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্য করে বললেন— 'দ্যাখ, একথা সত্যি যে আজই দুপুরবেলায় আমাদের মক্কেল শ্রীমতী অরুণা মিত্রের জামাই পঙ্কজ গুহ-র মৃতদেহ আমি নিজে আবিষ্কার করেছি— ঠিক কী করে মৃতদেহটা আমি আবিষ্কার করলাম, বা এক্ষেত্রে কে কে সাহায্য সহায়তা করেছেন, অর্থাৎ খুনিদের লুকিয়ে রাখা মৃতদেহটা আবিস্কার করার ক্ষেত্রে কে আমাকে সাহায্য করেছেন সেটা তোদের আজই আমি বলব না— তবে বলব অবশ্যই।'

কন্দর্পনারায়ণ থামলেন। একটু থেমে সবার মুখের উপর দিয়ে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে আবার বললেন—

'তবু তোদের সবাইকে আমি একসঙ্গে আজকে খেতে ডেকেছি— বলতে পারিস ইচ্ছে করেই তোদের সবাইকে আমি এইঘরে জড়ো করেছি।

অরুণাদেবীকেও আমি আজ অনুরোধ করেছি আজকের রাতটা আমাদের সঙ্গে এখানেই থেকে যেতে।'

কন্দর্পনারায়ণ হাত বাড়িয়ে গরম চা-এর কাপ তুলে নিয়ে ছোট্ট চুমুক দিয়ে বললেন— 'সকলেরই ধারণা হয়েছিল যে ব্যক্তিগত আক্রোশে স্ত্রী ও কন্যাকে খুন করে অরুণা দেবীর জামাই ফেরার হয়ে গিয়েছেন।

ইন ফ্যাক্ট, অরুণা দেবী আমাদের কাছে এসেছিলেনও সেই দাবী নিয়ে যাতে আমরা হাইকোর্টে মামলা করে, সি.আই.ডি. বা অন্য কোনও তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে অরুণাদেবীর ফেরার জামাইকে অ্যারেস্ট করবার ব্যবস্থা করতে পারি।'

কন্দর্পনারায়ণ আবার থামলেন। নিজের মাথার চুলের মধ্যে অন্যমনস্কভাবে ব্যাকব্রাশ করবার ভঙ্গিতে আঙুল চালাতে চালাতে স্বগতোক্তির ঢঙে বলে চললেন— 'কিন্তু নিয়তির খেলাই বল বা উপরওয়ালার অঙ্গুলি হেলন, দোলের ছুটিতে চারদিনের জন্য আমরা সদলবলে চলে এলাম মন্দারমণি।

আমি যদি আজ মৃতদেহটা উদ্ধার না করতে পারতাম, তাহলে সবাই জানত যে, অরুণাদেবীর জামাই-ই নিজের স্ত্রী কন্যাকে খুন করে ফেরার হয়ে গিয়েছেন। আর আসল খুনিরা দিব্যি মাথা উঁচু করে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াত।'

আবার থেমে, চায়ে লম্বা চুমুক দিলেন কন্দর্পনারায়ণ।

তারপর শুরু করলেন— 'তোদের সবাইকে আমি একসঙ্গে ডিনার সারতে অনুরোধ করলাম, কারণ এই সময়টায় তোদের সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করতে চাইছিলাম— আমার কথাগুলো তোদের সবার কাছে পৌঁছোনো প্রয়োজন।'

মৌমিতা আর ওঁর হাজব্যান্ড ইন্দ্রনীল একটু পেছনে একটা টেবিলে খাচ্ছিলেন। কন্দর্পনারায়ণ-এর কথা শুনতে শুনতে ওঁদের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল।

ইন্দ্রনীল বলে উঠলেন— 'স্যার, এই মামলাটার শেষ অবধি আমরা আপনার সঙ্গে থাকছি।' কন্দর্পনারায়ণ মাথা নাড়লেন— 'ধন্যবাদ ইন্দ্র। আমি তো সবসময়ই বলি যে, তোমরা সবাই হলে আমার শক্তি। তোমাদের সাহায্য ছাড়া আমি একপাও এগোতে পারব না। আগেও সব রহস্যের সমাধানেই আমি তোমাদের সাহায্য পেয়েছি। আমার বিশ্বাস এই মামলার বা এই খুনের ঘটনাটার ধুরন্ধর অপরাধীদের ধরবার ক্ষেত্রেও তোমাদের সাহায্য পাব।'

'নিশ্চয়ই স্যার, 'নিশ্চয়ই', একবাক্যে সব জুনিয়ররাই বলে উঠলেন।

কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'আমার সঙ্গে এই রিসর্টের মালিক শ্রী শিমূল রেহমানের কথা হয়েছে। ইন ফ্যাক্ট আজই দুপুরে ওনার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ডেডবডি রিকভারির খবর পেয়েই উনি স্পটে এসে হাজির হন। যে পরিত্যক্ত দোকান থেকে ডেডবডি রিকভার হয় সেটা ওনারই।

আয়লার দাপটে গোটা বাজারটাই নষ্ট হয়ে যায়। রাস্তা-টাস্তাও ভেঙে-চুরে যায়, তারপরই বাজার সমিতি, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজারটাকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু খুনিরা এতই চালাক যে, তারা ওই পরিত্যক্ত ভাঙা দোকান ঘরের মধ্যের ভাঙা ফ্রিজটাকে সারিয়ে নিয়ে ডেডবডিটা তার মধ্যে লুকিয়ে রাখে। যেহেতু শিমূলবাবু এই দোকানটা ছেড়ে দিয়েছেন, তিনি আর ওদিকে আসতেনই না।

ওই এলাকার বিদ্যুতের খুঁটি উলটে, তার ছিঁড়ে, এলাকাও বর্তমানে বিদ্যুৎহীন। কিন্তু খুনিরা ওই ভাঙা ফ্রিজটাকে শুধু সারিয়েই নেয়নি, তারা দূর থেকে হুকিং করে সেটাকেও চালাত।'

এতক্ষণ কোনো কথা না বলে অরুণাদেবী মাথা নামিয়ে চুপ করে বসেছিলেন কন্দর্পনারায়ণ-এর কথা শুনে এবার তিনি ঝরঝর কেঁদে ফেললেন, বলতে থাকলেন— 'আমি তো সব হারিয়েছি। স্বামী, মেয়ে, জামাই, নাতনি সব। আমি বাঁচব কী করে?'

অরুণা দেবীকে হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখে বসুন্ধরা উঠে এলেন। সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে অরুণা দেবীর পিঠে হাত বোলাতে লাগলেন। বসুন্ধরাকে উঠে আসতে দেখে পারমিতা, কোয়েল, পৃথা, মৌমিতা, জয়শ্রীও উঠে অরুণা দেবীর পাশে এসে দাঁড়ালেন।

কন্দর্পনারায়ণ অরুণা দেবীর দিকে একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন— 'হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম। শিমূল বাবুকে আমি অনুরোধ করেছিলাম, যে প্রয়োজনে আমাদের আরো কয়েকটা দিন থাকতে হতে পারে, সেক্ষেত্রে ওনার এই রিসর্টে আমরা থাকতে পারব কিনা।

উনি অবশ্য সানন্দে আমাদের যে কদিন দরকার, থাকতে দেবেন বলে জানিয়েছেন।'

সঙ্গে সঙ্গে সমবেত কণ্ঠে সকলে বলে উঠলেন— 'হ্যাঁ স্যার। আমরা সঙ্গে থেকে যাব, নো প্রবলেম।'

সকলের সমবেত কণ্ঠের হই হই শুনে কন্দর্পনারায়ণ অল্প হাসলেন— 'না না। সকলের একসঙ্গে এখানে থেকে যাওয়া চলে না। তাছাড়া পরশু থেকেই কোর্ট খুলে যাবে। কোর্টের কাজও তো দেখতে হবে।

তাই আমি একটা প্ল্যান করেছি। আমি এখানে থেকে যাচ্ছি।'

কন্দর্পনারায়ণ-এর কথা শুনে বসুন্ধরা আঁতকে উঠলেন— 'একা? বলো কী? না না, তা হয় না।'

কন্দর্পনারায়ণ জোরের সঙ্গে মাথা নাড়লেন— 'পরশু থেকেই তোমারও স্কুল খুলছে, পাপার ও স্কুল খুলবে। তোমরা কলকাতায় ফিরে যাও।' থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। জোরে দম নিয়ে আবার বলা শুরু করলেন— 'আমি কাজের সুবিধার জন্য এই ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য দু-তিনটে টিম করছি। তাদের উপর আলাদা আলাদা দায়িত্ব থাকবে।

আমি নিজে এখানে থেকে যাচ্ছি। খুনিদের ধরতে গেলে আমাকে এখানে কয়েকটা দিন থাকতেই হবে।

তাছাড়া আমার ধারণা খুনিদের একটা কলকাতা কানেকশনও রয়েছে। সেইজন্য আমার একটা টিমকে, কলকাতাতেও রেডি থাকতে হবে। আমার কাছ থেকে সিগনাল পেলেই তাদেরও কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।'

বসুন্ধরা অবশ্য কিছুতেই কন্দর্পনারায়ণকে একা মন্দারমণিতে থাকতে দিতে রাজি নন। তিনি বললেন— 'এরা যে কত ভয়ংকর আর নির্দয় খুনি, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। অরুণা দেবীর চার বছরের নাতনিটাকে পর্যন্ত নৃশংসভাবে খুন করেছে। যেই তারা বুঝবে যে তুমি এই কেসে স্পেশাল ইন্টারেস্ট নিচ্ছো, তখনই তারা তোমার উপরেও আক্রমণ হানবে।'

এই অবধি শুনেই দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীল, নাজির আর সুপ্রীম চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন— 'বৌদি, আপনি কিচ্ছু ভাববেন না। আমরাও বরং স্যারের সঙ্গেই থেকে যাচ্ছি। আপনি কালকে অন্য সবাইকে নিয়ে কলকাতায় ফিরে যান।'

দ্বৈপায়নের স্ত্রী কোয়েল, আর ইন্দ্রনীলের স্ত্রী মৌমিতাও একমত হলেন— 'সেই ভালো। স্যারকে একা রাখা ঠিক হবে না। ওরাও বরং স্যারের সঙ্গে এখানেই থেকে যাক।

তাছাড়া হাইকোর্ট-এর মামলাগুলোও তো দেখতে হবে। আমরা বরং কলকাতায় ফিরে গিয়ে সেই দিকগুলো দেখাশোনা করি।'

বসুন্ধরাও সবার কথা শুনে নিশ্চিন্ত হলেন। ঠিক হল, কালই পোস্ট মর্টেমের পর জামাই-র মৃতদেহ নিয়ে অরুণা দেবী অন্য আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে কলকাতায় রওনা হয়ে যাবেন।

দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীল, নাজির, সুপ্রীম আর দেবর্ষি কন্দর্পনারায়ণ-এর সঙ্গে মন্দারমণিতেই থেকে যাবেন। আর পারমিতা, কোয়েল, মৌমিতা, পৃথা, জয়শ্রী, ঋতুশ্রী-সহ অন্য সবাই বসুন্ধরা আর পাপাই-কে নিয়ে কলকাতায় ফিরে যাবেন। হাইকোর্টে মামলা-মোকদ্দমাগুলো সামলাবেন আর কন্দর্পনারায়ণ-এর কাছ থেকে পরবর্তী নির্দেশ পাবার জন্য অপেক্ষা করবেন।

এই অবধি আলোচনা করে আজকের মতো মিটিং শেষ হল। পারমিতা, জয়শ্রী আর অন্য মেয়েরা অরুণা মিত্রকে তাঁর জন্য নির্ধারিত ঘর অবধি পৌঁছে দিয়ে এলেন।

জুনিয়র ছেলেমেয়েরা যে যার ঘরে ঢুকে গেলেও কন্দর্পনারায়ণ তাঁর ঘরে ঢুকলেন না। তিনি এসে দাঁড়ালেন তিনতলার খোলা টেরেসে।

সমুদ্রের খোলা হাওয়ায় তাঁর পাঞ্জাবি, চুল উড়ছে। তিনি দু-হাত দিয়ে শক্ত করে রেলিং ধরে দাঁড়ালেন। তারপর মাথা তুলে নীল আকাশের দিকে তাকালেন, দোলপূর্ণিমার চাঁদ যেন থালার মতো বড়। ঝকঝকে আকাশে অজস্র তারা যেন ফুল হয়ে ফুটে আছে ইতিউতি।

সামনেই বিরাট সমুদ্র। ছোটো ছোটো ঢেউ আছাড় পড়ছে পাড়ে— বিরামহীন। এখন অনেক রাত। নিঃঝুম, জনশূন্য বালিয়াড়ি।

সমুদ্রের জোলো হাওয়ায় কন্দর্পনারায়ণ-এর শরীর যেন কেঁপে উঠল।

আপনমনে ভাবতে থাকলেন সারা দিনের ঘটনা— কী হল আজ? কাকে বলবেন তিনি? কেই বা বিশ্বাস করবে?

সত্যি সত্যিই কী অরুণা মিত্রের খুন হয়ে যাওয়া চার বছরের নাতনির অতৃপ্ত আত্মা এসেছিল আজ?

কন্দর্পনারায়ণ-কে টানতে টানতে নিয়ে গিয়েছিল সেইখানে, যেখানে তার বাবাকে খুন করে দেহটাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছে? এটা কী বিশ্বাসযোগ্য? সবাই যেহেতু ভাবছিল যে, অরুণা দেবীর জামাই-ই খুনি, তাই তাঁর চার বছরের মেয়ের আত্মা দেখিয়ে দিয়ে গেল যে, তার বাবা খুনি নন— অবিশ্বাস্য— এ যে একেবারে অবিশ্বাস্য!

কন্দর্পনারায়ণ ভাবতে ভাবতে দুহাতে নিজের মাথার চুলগুলো টেনে ধরলেন।

পেছনে কখন যে দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীল, নাজির আর সুপ্রীম এসে দাঁড়িয়েছেন খেয়াল করেন নি।

নাজির আলতো স্বরে ডাকলেন— 'স্যার।' কন্দর্পনারায়ণ-এর চিন্তার জালটা ছিঁড়ে গেল। চমকে উঠে বললেন— 'অ্যাঁ।' তারপর সবাইকে দেখে বললেন— 'ও, তোমরা! এখনো ঘুমোতে যাও নি?' সুপ্রীম বললেন— 'আজ আর ঘুম আসবে না স্যার।' দ্বৈপায়ন বললেন— 'আমরা জানতাম, আপনিও এখন ঘুমোবেন না। ছাদেই পায়চারি করবেন, তাই সবাই মিলে উপরেই উঠে এলাম।'

কন্দর্পনারায়ণ উত্তর দিলেন না।

ইন্দ্রনীল বললেন— 'স্যার, সবার সামনে জিজ্ঞাসা করতে পারছিলাম না। আপনি দুপুরবেলায় প্রায় দৌড়োতে দৌড়োতে যাচ্ছিলেন— আমরা সুইমিং পুল থেকে চিৎকার করে আপনাকে ডাকছিলাম। আপনি শুনতেই পাচ্ছিলেন না।'

দ্বৈপায়ন যোগ করলেন— 'আপনাকে যেন ভুতে পেয়েছিল। আমরাও পুল থেকে উঠে আপনার পেছনে দৌড়োতে শুরু করি।'

সুপ্রীম বললেন— 'খুনিরা যে ওখানে ডেডবডিটা লুকিয়ে রেখেছে আপনি জানলেন কী করে?'

কন্দর্পনারায়ণ আজকে দুপুরের ঘটনাটা খুলে বললেন—কিচ্ছু বাদ দিলেন না।

তারপর বললেন— 'তোরা বিশ্বাস কর আর না কর— এই হচ্ছে ঘটনা।' তারপর মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন— 'আমি একজন ক্রিমিনাল ল'ইয়ার, ভূত বা অতৃপ্ত আত্মা আমার ঘরে এসে আমার সঙ্গে কথা বলে আমাকে নিয়ে তার বাবার মৃতদেহ কোথায় লুকিয়ে রাখা আছে, এটা দেখিয়ে দিচ্ছে, একথা কেউই বিশ্বাস করবে না। যাই হোক, আমি আমার কর্মপন্থা ঠিক করে নিয়েছি।

আমি খুনিদের ধরবই। অ্যান্ড আই নীড ইয়োর হেল্প।'

দ্বৈপায়নের গলা ধরে এল— 'আমরা সবসময় আপনার সঙ্গে স্যার, সবসময়।' কিন্তু হাওয়ার দাপটে কথাগুলো ঠিকমতো শোনা গেল না।

আজ সকালেই ডি.আই.জি. মেদিনীপুর রেঞ্জ, প্রদীপ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছিলেন কন্দর্পনারায়ণ। জানান যে, তিনি একবার দীঘাতে যে হোটেলে অরুণা মিত্রর জামাই পঙ্কজ, মেয়ে শিখা, আর নাতনি এসে উঠেছিলেন, সেই হোটেলটা সরেজমিনে দেখতে চান।

প্রদীপবাবু ও উত্তরে জানিয়েছিলেন যে, কোনো অসুবিধা নেই। তিনি নিজে আজকে বিভিন্ন কারণে ব্যস্ততার জন্য দীঘায় থাকতে পারবেন না। কিন্তু স্থানীয় থানার ও.সি. ও ঘটনার তদন্তকারী অফিসারকে বলে দিচ্ছেন, তাঁরা কন্দর্পনারায়ণ-কে ওই হোটেলে নিয়ে গিয়ে ঘটনাস্থল ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবেন। শুধু তাই নয়, হোটেলের যে ঘর থেকে অরুণা মিত্রর মেয়ে ও নাতনির মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে, সেই ঘরটাও দেখাবেন, তদন্তের স্বার্থে হোটেলের ওই ঘরটা সিল করা থাকলেও ওই ঘরটার তালা খুলে কন্দর্পনারায়ণ-কে ঘরটা দেখানো হবে।

বোঝাই গিয়েছিল প্রদীপ বাবুর নিজস্ব জুরিসডিকশন থেকে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে, একই পরিবারের তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধার হওয়াতে তিনি নিজেও বেশ চাপে রয়েছেন।

তাছাড়া গতকাল মন্দারমণির একটা পরিত্যক্ত জায়গা থেকে অরুণাদেবীর জামাই-এর মৃতদেহ উদ্ধারের ব্যাপারটা তো 'মার্ডার মিস্ট্রি' তে একটা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে, কারণ অরুণা দেবীর মেয়ে ও নাতনির মৃতদেহ উদ্ধারের পর থেকেই পুলিশ বলে বেড়াচ্ছিল ছিল, যে অরুণা দেবীর জামাই পঙ্কজবাবুই নিজের স্ত্রী ও কন্যাকে খুন করে পালিয়েছেন। আর গতকাল সেই জামাই-এরই মৃতদেহ উদ্ধার হবার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের সেই দাবী নস্যাত হয়ে যায়, আর পুলিশি তদন্ত যে কতটা খেলো, ফাঁপা বা ঠুনকো সেটাও প্রমাণ হয়ে যায়।

শুধু তাই নয়, গতকাল পঙ্কজবাবুর মৃতদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত টিভি চ্যানেলগুলোও একেবারে দাঁত-নখ বের করে স্থানীয় পুলিশের অপদার্থটা তুলে ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

ডি.আই.জি. প্রদীপ মুখোপাধ্যায়, কন্দর্পনারায়ণকে আরও জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, কন্দর্পনারায়ণ তাঁর মতো করে এই ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যেতে পারেন যে কোনো প্রয়োজনে তাঁকে একবার ফোন করে দিলেই হবে।

সেই মতো আজ সকাল সকাল কন্দর্পনারায়ণ, দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীলকে সঙ্গে নিয়ে দীঘার উদ্দেশে রওনা দেন। রাস্তা মোটামুটি ফাঁকাই ছিল। মিনিট চল্লিশের মধ্যেই ড্রাইভার উদয়, কন্দর্পনারায়ণ-এর হোন্ডার সেভেন-সিটার-টাকে হোটেলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন।

স্থানীয় থানার ও.সি. মেহতাব আলম এবং এই খুনের ঘটনার তদন্তকারী অফিসার ফটিক পাহাড়ী, হোটেলের বাইরেই অপেক্ষা করছিলেন। কন্দর্পনারায়ণরা পৌঁছোতেই, এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ড-শেক করে আলাপ পরিচয় সারলেন।

কন্দর্পনারায়ণ দেখলেন ও.সি. মেহতাব আলম এবং ইনভেস্টিগেটিং অফিসার ফটিক পাহাড়ী, দুজনেরই মজবুত পেটানো চেহারা, রোদে পোড়া তামাটে রং। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্ম পরা, চোখে সানগ্লাস দুজনেরই।

কন্দর্পনারায়ণ অফিসার দুজনকে দেখে খুশি হলেন। দুজনেরই ধারালো চেহারা— এই ধরনেরই অফিসারদেরই উৎসাহ দেওয়া উচিত। সাধারণত জেলার অফিসারদের এতটা স্মার্ট, ঝকঝকে চেহারা হয় না— কেমন একটা মোটা সোটা, থপথপে ভুঁড়িওয়ালা মতন দেখতে হয়। শুধু তাই নয়। 'তদন্ত' ঠিক কী রকম হওয়া উচিত, বা কীভাবে তদন্ত করতে হয়, সে সম্পর্কে সম্যক কোনো ধারণাও থাকে না। যার প্রভাব পড়ে তদন্তে।

হোটেলের লবিতে বসে অফিসারদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কন্দর্পনারায়ণ-ই বললেন— 'আগে ম্যানেজারকে ডাকুন। বোর্ডারদের রেজিস্টারটা আনতে বলুন। আমি দেখি। পঙ্কজবাবু আর শিখাদেবী তাঁদের চার বছরের মেয়েকে নিয়ে কখন হোটেলে চেক ইন করেছেন।'

হোটেলের ম্যানেজার কাছেই দাঁড়িয়েছিলেন। ও.সি.র কাছ থেকে ইশারা পেয়েই 'রেজিস্টার' নিয়ে হাজির হলেন। তারপর বললেন— 'এগারোই মার্চ, শুক্রবার, ওঁরা দীঘায় আসেন। বোর্ডার'স রেজিস্টার খাতায় সই ওই দিনকারই। সময়টা বিকেল চারটে। সেদিন আবার ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন কি না আমরা আর খেয়াল করিনি। বারোই মার্চ, শনিবার, আমরা ভেবেছিলাম যে, ওনারা হয়তো কাছে-পিঠে বেড়াতে-টেড়াতে গেছেন।'

কন্দর্পনারায়ণ এই সময় হাত তুলে ম্যানেজারকে থামালেন। বললেন— 'আশ্চর্য ব্যাপার। আপনাদের এত বড় হোটেল। এখানে একটা ফ্যামিলি বাচ্চা নিয়ে এসে উঠেছেন। তাঁরা যে দু-দিন ধরে হোটেল থেকে বেরোচ্ছেন না, আপনারা খেয়াল করলেন না?'

ম্যানেজার ছেলেটি অল্পবয়সী। কোট-প্যান্ট, টাই পরা। মাথা নিচু করে বলল— 'স্যার, হয়তো আমাদের খেয়াল করা উচিত ছিল, কিন্তু কী জানেন তো, যেদিন ওঁরা চেক-ইন করলেন, সেই দিনটা ছিল শুক্রবার। পরের শুক্রবার দোল। বৃহস্পতিবার থেকেই হোটেলে সেই উপলক্ষে বিশেষ নাচ-গান-ড্রিংক ইত্যাদির ব্যাপক আয়োজন ছিল। কলকাতা থেকে নাচ-গানের আর্টিস্টরা আসছিলেন। আমরা খুব ব্যস্ত ছিলাম। এমনিতেই শুক্র, শনি, রবি দিনগুলোয় এখানে ভীষণ ভিড় লেগে থাকে। তাছাড়া বেশিরভাগ বোর্ডারই আসেন, ছুটি কাটাতে, রেস্ট নিতে। বার বার ডোরবেল বাজিয়ে কথা বলতে গেলে, এমনকী কিছু লাগবে কি না, জিজ্ঞাসা করতে গেলেও বিরক্ত হন। তাই আমরা তাঁদের প্রাইভেসিতে ডিস্টার্ব করতে চাই না।

তবে, দীঘা-মন্দারমণিতে খুন-খারাপি, রেপ, চাইল্ড মলেস্টেশনের ঘটনা খুব বেশি। আমরা সতর্ক থাকার চেষ্টা করি, এখানে যেমন শনিবার দিনটায় ওনাদের কোনো খবর না পেয়ে রবিবারই ওঁদের দরজায় নক করি। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে পুলিশে খবর দিই।

পুলিশ এসে দরজা ভেঙে মা ও মেয়ের ডেডবডি উদ্ধার করেন।'

কন্দর্পনারায়ণকে ম্যানেজারের কথা শুনতে শুনতে ওঁর দিকে তাকাতে দেখে ও.সি. মেহবুব আলমও সায় দিয়ে মাথা নাড়ছিলেন।

কন্দর্পনারায়ণ চিন্তিত মুখে বললেন— 'প্রথমে সিসিটিভি ফুটেজটা আমাদের ল্যাপটপে চালিয়ে দেখান।'

দ্বৈপায়ন পিঠের রুকস্যাক ব্যাগটা থেকে ল্যাপটপ বের করে 'অন' করতেই ও.সি. মেহবুব আলম পকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করে কন্দর্পনারায়ণকে বললেন— 'আমরা সিসিটিভির হার্ড ডিস্কটা সীজ করে নিয়েছি। তবে, আপনাদের সুবিধার জন্য আমি ফুটেজগুলো এই পেনড্রাইভে কপি করে রেখেছি। এক্কেবারে আন-এডিটেড ভার্সন। আপনি দেখতে পারেন।'

কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় হেলিয়ে সম্মতি জানাতেই দ্বৈপায়ন, ল্যাপটপে পেনড্রাইভটা ঢুকিয়ে চালু করে দিলেন।

ম্যানেজার ফুটেজগুলো দেখিয়ে দেখিয়ে বলতে থাকলেন— 'আমাদের হোটেলের প্রায় সব দিকেই ক্যামেরা লাগানো আছে— একটা-দুটো অ্যাঙ্গেল ছাড়া। মোট বারোটা ক্যামেরা।

সামনে দুটো ক্যামেরা লাগোনা। হোটেলে কেউ ঢুকলে বা বেরোলেই ক্যামেরায় ধরা পড়বে। রিসেপশনে, রেস্তোঁরায়, লাউঞ্জে, গার্ডেন এরিয়ায় এবং করিডোর গুলোতে।'

ম্যানেজার একটু থেমে ল্যাপটপের মনিটরে চোখ রেখে বলতে লাগলেন— 'এই দেখুন গত এগারোই মার্চ, শুক্রবার, সাড়ে তিনটে নাগাদ ওঁরা হোটেলে আসেন। রিসেপশনের ফর্ম্যালিটি পূরণ করতে করতে চারটে বাজে। চারটের সময় তাঁরা করিডোর ধরে তাঁদের গ্রাউন্ডফ্লোরের একেবারে কোণের ঘরে চলে যান।'

ম্যানেজার ফুটেজগুলো দেখতে দেখতে একমনে বলে যাচ্ছেন— 'বাই দি ওয়ে, ওঁরা গ্রাউন্ড ফ্লোর রুমই বুক করেছিলেন— বলেছিলেন, সঙ্গে বাচ্চা আছে। গার্ডেনে খেলা করবে।'

ম্যানেজারের সঙ্গে সঙ্গেই কন্দর্পনারায়ণ, দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীলও এক দৃষ্টিতে মনিটরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সত্যি সত্যিই ফুটেজে দেখা গেল যে, পঙ্কজবাবু আর তাঁর স্ত্রী শিখা, বাচ্চাটার হাত ধরে তাঁদের জন্য নির্ধারিত রুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। পেছনে ট্রলি ব্যাগ নিয়ে হোটেলেরই একজন কর্মচারী।

ম্যানেজার বললেন— 'শুক্রবারের ফুটেজে শুধু এটুকুই। আমরা ভেবেছিলাম রাত্রে ওঁরা ডিনার করতে হোটেলের রেস্তোঁরায় আসবেন। কিন্তু আসেন নি। আমাদের তখন ধারণা হয়েছিল হয়তো বা ওঁরা সারাদিন ঘোরাঘুরি করে বাইরে থেকে খাওয়া-দাওয়া করেই ঢুকেছেন।

যাইহোক আমরাও তখন আর ডিস্টার্ব করি নি। এখন মনে হচ্ছে। আমাদের বোধহয় ডাকাডাকি করাই উচিত ছিল।'

ও.সি. মেহবুব আলম বলে উঠলেন— 'ম্যানেজার ঠিকই বলছেন— আমরাও সিসিটিভি ফুটেজগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। কিন্তু, ওঁদের আর বেরোতে দেখিনি।'

কন্দর্পনারায়ণ পকেট থেকে নোট-খাতা বের করে তাতে কিছু নোট করতে করতে বললেন— 'আশ্চর্য। আপনারা যখন বলছিলেন যে, স্বামীটি অর্থাৎ পঙ্কজবাবু, তাঁর স্ত্রী-কন্যাকে খুন করে ফেরার হয়েছেন, সেই সিদ্ধান্তে এলেন কী করে? হোটেলের ঘর থেকে তো পঙ্কজ বাবুকেও বেরোতে দেখা যায় নি। অন্তত পঙ্কজবাবুই যদি তাঁর স্ত্রী-কন্যাকে খুন করে পালাতেন, তাহলে তাঁকেও তো অন্তত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যেত।'

এবার ঘটনার তদন্তকারী অফিসার ফটিক পাহাড়ী অসহায় মুখে বলে উঠলেন— 'স্যার, ওই রাতেই প্রচন্ড কালবৈশাখী ঝড় হয়। সেইসময় খানিকক্ষণের জন্য কারেন্ট চলে যায়। যদিও হোটেলে জেনারেটর আছে, তবুও কারেন্ট চলে যাওয়ার পরে জেনারেটর চালাতে মিনিট দুয়েক সময় লাগে। আমরা ভেবেছিলাম সেই সময়ের মধ্যেই বোধহয় পঙ্কজবাবু নিজের স্ত্রী-কন্যাকে খুন করে ফেরার হয়েছেন।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'অরুণাদেবী যখন আমার চেম্বারে এসেছিলেন তখন সঙ্গে করে তাঁর মেয়ে এবং নাতনির পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট নিয়ে এসেছিলেন— তাতে পরিস্কার যে, মৃত্যুর সময় 'স্টম্যাক ওয়জ এম্পটি'। অর্থাৎ ওঁরা বাইরে থেকে খাওয়া-দাওয়া করে হোটেলে ঢোকেন নি।'

ইন্দ্রনীল এতক্ষণ চুপ করে বসে সবার কথা শুনছিলেন,— বলে উঠলেন— 'তার মানে ওঁদের প্ল্যান ছিল, হোটেলে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে, খেতে বেরোবেন, সেটা আর হয়নি।

অর্থাৎ চারটের সময় ঘরে ঢোকার পর পরই তাঁরা খুন হয়ে যান। যার জন্য সেই রাতে পেট ভরে খাওয়া-দাওয়া করবার সুযোগ আর তাঁরা পান নি।'

কন্দর্পনারায়ণ নোট-খাতায় কিছু নোট করতে বললেন—'খুনিদের কাছে নিশ্চয়ই খবর ছিল, তাঁরা ওই ঘরেই এসে উঠবেন। পঙ্কজবাবুরা ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের খুন করা হয় এবং রাত্রে কারেন্ট চলে গেলে হোটেলের ঘর থেকে পঙ্কজবাবুর ডেডবডি সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।'

থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। ভুরু দুটো কুঁচকে আবার বললেন— 'হোটেলের লোকেরা খুনিদের সাহায্য না করলে, এটা কিছুতেই সম্ভব নয়।'

কন্দর্পনারায়ণ-এর কথা শুনে ম্যানেজারের মুখ রক্তশূন্য, ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তোতলাতে তোতলাতে বললেন— 'বিশ্বাস করুন স্যার, আমরা কিছুই জানি না।'

কন্দর্পনারায়ণ ঠোঁট দুটোকে বাঁকিয়ে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন— 'আমি এখনও কিছুই বিশ্বাস করছি না, কিছু অবিশ্বাসও করছি না। শুধু সিঁড়িভাঙা অংকের পদ্ধতিতে উত্তর খুঁজছি। কিন্তু, আপনি জেনে রাখুন। আপনার হোটেলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে খুন? তারপর দুটো বডি হোটেলের বিছানায়,তৃতীয় বডি গায়েব?'

খানিক থেমে কন্দর্পনারায়ণ আবার বললেন— 'মিস্টার ম্যানেজার, কী করে হয়? তার মানে কী খুনিরা ওই ঘরেই লুকিয়ে ছিল? তারা জানল কী করে পঙ্কজবাবুরা এতবড় হোটেলের ওই ঘরেই এসে উঠবেন? সবচেয়ে বড় কথা, পঙ্কজবাবুর ডেডবডি তারা নিয়ে হোটেলের বাইরে গেল কী করে? আপনারা কেউ দেখলেন না?'

ও.সি. এতক্ষণ চুপ করে বসে সবার কথা শুনছিলেন। বলে উঠলেন— 'আচ্ছা স্যার, যদি স্বামীটিকে বা পঙ্কজবাবুকে বাইরে মারা হয়? আই মিন এমনকী হতে পারে না যে, পঙ্কজবাবুই নিজের স্ত্রী আর কন্যাকে খুন করে লোডশেডিং-এর সুযোগ নিয়ে পালিয়ে গেলেন আর পরে অন্য কেউ আবার ওনাকে খুন করল।'

কন্দর্পনারায়ণ-এর ভুরু দুটো কুঁচকেই আছে। বললেন— 'পসিবল, সেটাও পসিবল। তবে তাহলেও হোটেলের কর্মচারীরা তাঁকে বেরোতে দেখল না?'

একটা লোক হোটেলের ঘরে ঢুকেই তার স্ত্রী-কন্যাকে খুন করল, তারপর হোটেল থেকে পালিয়ে গেল, পরে আবার সেই লোকটারই ডেডবডি পাওয়া গেল— দীঘা থেকে বেশ খানিকটা দূরে মন্দারমণিতে? মনে রাখবেন, পঙ্কজবাবুর মৃতদেহ, পাওয়া গেছে,একটা পরিত্যক্ত এলাকায়, ভাঙা দোকানঘরের মধ্যে। দোকান ঘরটা এখন ব্যবহার করা হয় না। কিন্তু, তার ভেতরের ফ্রীজারটা চালু অবস্থায় রয়েছে। আর, ইলেক্ট্রিসিটি নেওয়া হয়েছে হুকিং করে। তার মানে, খুনিরা অতিশয় ধুরন্ধর।'

কন্দর্পনারায়ণ নোট-খাতাটা নিজের কোলের ওপর ফেলে রেখে, নিজের গালে হাত বোলাতে বোলাতে আনমনে বলে উঠলেন— 'না হে মশাই, মিলছে না, অংক মিলছে না।'

খানিকক্ষণ পরে কন্দর্পনারায়ণ ও.সি. মেহবুব আলমকে বললেন— 'আপনি পোস্ট মর্টেম রিপোর্টগুলো এনেছেন তো? দেখি একবার।'

ও.সি. তদন্তকারী অফিসারের দিকে তাকিয়ে বললেন— 'পাহাড়ী, কেস ডায়েরির ভেতর থেকে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দুটো বের করুন তো?' ফটিক পাহাড়ী, শশব্যস্তে বলে উঠলেন— 'হ্যাঁ স্যার, আমি রেডীই আছি।' বলে কেস ডায়েরির ভেতর থেকে দুটো পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বের করে কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে বাড়িয়ে ধরলেন।

কন্দর্পনারায়ণ নিজের পাঞ্জাবীর পকেট থেকে মোষের শিং দিয়ে বাঁধানো সুদৃশ্য ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা বের করে রিপোর্টগুলোর উপর ঝুঁকে পড়লেন, বললেন— 'দ্বৈপায়ন, তোমার মনে আছে? আমাদের মন্দারমণিতে আসার আগের দিন অরুণাদেবী যখন চেম্বারে এসেছিলেন, তখন উনিও আমাকে দুটো পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দেখিয়েছিলেন— ওনার মেয়ের আর নাতনির?'

দ্বৈপায়ন বললেন— 'একদম মনে আছে স্যার। সারা শরীরে কোথাও ইনজুরি নেই। 'স্টম্যাক এম্পটি' আর 'কজ অফ ডেথ' বা 'মৃত্যুর কারণ' হিসেবে পোস্ট মর্টেম ডক্টর অর্থাৎ 'অটোপসি সার্জন' ওপিনিয়ন দিয়েছিলেন— 'অ্যাসফিক্সিয়া।'

ইন্দ্রনীল বলে উঠলেন— 'অর্থাৎ অক্সিজেনের অভাবে দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু।'

কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় নাড়লেন— 'অ্যাবসোলিউটলি রাইট। মুখে বালিশ চাপা দিয়ে মারলে দমবন্ধ হয়ে অর্থাৎ অ্যাসফিক্সিয়ার কারণে মৃত্যু হতে পারে। জলে ডুবে মারা গেলেও অ্যাসফিক্সিয়ায় মৃত্যু হয় তবে সেক্ষেত্রে লাংসে জল ঢুকে যায় এবং পোস্টমর্টেমে লাংসে জল পাওয়া যেতে পারে।

জলে ডোবার কারণে অ্যাসফিক্সিয়ায় মৃত্যু হবার কারণটা বাদ দেওয়া যায়। মা ও মেয়েকে এখানে বিছানায় মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে।

আবার বলা হয় যে, গলায় ফাঁস দিয়ে মারলেও অ্যাসফিক্সিয়ায় মৃত্যু হতে পারে। কারণ সেক্ষেত্রেও গলায় ফাঁস দেবার কারণে দমবন্ধ হয়ে গিয়ে অক্সিজেনের অভাবে লাংস ফেটে যেতে পারে।

এক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাটাও সরিয়ে দেওয়া যায়। কারণ মা ও মেয়েকে গলায় ফাঁস লাগিয়ে মারলে গলায় ফাঁসের দাগ বা 'লিগেচার মার্ক' থাকত।

তবে একসঙ্গে দুজনকে মারাটা সত্যি কঠিন। সেক্ষেত্রে বলতে হবে যে, ঘরের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির প্রবেশ ঘটেছিল। আর সেটা হোটেল মালিক বা ম্যানেজার বা অন্য কর্মীদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়।' কন্দর্পনারায়ণ বাঁকা চোখে তাকালেন ম্যানেজারের মুখের দিকে। থমথমে ভয়ার্ত মুখে, ম্যানেজার চোখ নামিয়ে নিলেন।

কন্দর্পনারায়ণ পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দুটো তদন্তকারী অফিসার ফটিক পাহাড়ীকে ফেরত দিয়ে, দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীলের দিকে তাকিয়ে বললেন— 'স্টম্যাক এম্পটি' যখন, তখন একটা বিষয় পরিস্কার যে, অরুণা দেবীর মেয়ে আর নাতনি না খেয়েই অর্থাৎ ভারী লাঞ্চ না করেই বিকেল সাড়ে তিনটে-চারটে নাগাদ হোটেলে এসে পৌঁছন। আর তার পরই তাঁদের মৃত্যু হয়— সেই কারণে তাঁরা আর 'ডিনার' করবার সুযোগ পান নি।

পোস্ট মর্টেম রিপোর্টও তাই বলছে— পোস্ট মর্টেম শুরু হবার অন্তত ছত্রিশ থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।'

তারপর বললেন— 'মিস্টার আলম, চলুন, একবার 'প্লেস অফ রিকভারি অফ ডেডবডি' বা স্পটটা দেখে আসি।'

মেহবুব আলম রেডীই ছিলেন, পকেট থেকে একটা গোদরেজের চাবি বের করে বললেন— 'ঘটনার পর থেকেই ঘরটা আমরা সিল করে রেখেছি। মাঝে মাঝেই ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির লোকজনরা তদন্তের স্বার্থে আসছেন, ওঁদের জন্য খোলা হচ্ছে।'

ম্যানেজারও উঠে পড়লেন। পকেট থেকে রুমাল বের করে ঘাম মুছে বললেন— 'হ্যাঁ স্যার আসুন। এই সামনেই ঘর। এই করিডোর দিয়ে সোজা গিয়ে ডানদিকের শেষ ঘরটা।'

কন্দর্পনারায়ণ ম্যানেজারকে মুখ মুছতে দেখে ব্যঙ্গের স্বরে বললেন— 'আজকে বেশ গরম আছে ঠিকই, কিন্তু আপনি যেন একটু বেশিই ঘামছেন— তাই না ম্যানেজারসাহেব?'

হোটেলের তরুণ ম্যানেজার বিদ্রূপটা বুঝলেও মুখে কিছু বললেন না।

ঘরটার সামনে এসে তালার উপরে লাগানো গালার সিল ভেঙে চাবি ঘুরিয়ে তালা খুলে, দরজায় ধাক্কা মেরে খুলে দিলেন ফটিক পাহাড়ী।

মোটামুটি বড় ঘর। একটাই খাট। তিনজন শোয়া যায়। তিনটে মাথার বালিশ পাশাপাশি রাখা। বড় আয়না, ড্রেসিংটেবিল, দেয়াল ঘেঁষে দুটো প্লাস্টিকের চেয়ার আর একটা টেবিল পাতা। টেবিলে কাঁচের জগে জল। আর দুটো কাঁচের গ্লাস উল্টো করে রাখা। বোঝাই যাচ্ছে জগ আর গ্লাস দুটো কেউ ব্যবহার করেনি।

কন্দর্পনারায়ণ কয়েক পা এগিয়ে এসে বাথরুমের দরজাটা খুলে দিলেন। শুকনো বাথরুম। এমনকি ধবধবে সাদা দুটো তোয়ালে ভাঁজ করে বাথরুমের র‌্যাকে সাজিয়ে রাখা। অর্থাৎ সে দুটোও কেউ ব্যবহার করে নি।

কন্দর্পনারায়ণ বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে মোবাইলে ছবি তুলতে শুরু করলেন আর মাঝে মাঝেই 'আশ্চর্য', 'অতি আশ্চর্য' এই ধরনের শব্দ উচ্চারণ করতে শুরু করলেন।

ইন্দ্রনীল আর দ্বৈপায়ন একটু দূরেই দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিলেন। ইন্দ্রনীল, দ্বৈপায়নের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন— 'স্যারের ভুরু দুটো কুঁচকে রয়েছে— তার মানে, বেশ কয়েকটা বিষয়ে স্যারের খটকা লাগছে।'

মোবাইলে ঘরের বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ছবি তোলা শেষ হলে, কন্দর্পনারায়ণ ডান হাতটা মেহবুব আলমের দিকে বাড়িয়ে বলে উঠলেন— 'ডেডবডি রিকভার হবার সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের পুলিশের ফোটোগ্রাফার এসে ছবি তুলেছিলেন নিশ্চয়ই। ছবিগুলো একবার দেখান প্লিজ?'

মেহবুব আলম সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন— 'নিশ্চয়ই'। তারপর, ফটিক পাহাড়ীর দিকে তাকিয়ে বললেন— 'পাহাড়ী, ছবিগুলো তো স্টুডিও থেকে এসে গিয়েছে। তোমার রেকর্ডেই আছে। ছবিগুলো স্যারকে দাও।'

ও.সি.র কাছ থেকে পারমিশন পেয়েই ফটিক পাহাড়ী একটা মুখবন্ধ খামের ভিতর থেকে ছবিগুলো বের করে কন্দর্পনারায়ণকে দিলেন, কন্দর্পনারায়ণ ছবিগুলো চোখের সামনে মেলে ধরেই 'মাই গড'বলে চোখ বুঁজে ফেললেন। দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীল, 'স্যার কী হল? স্যার কী হল?' বলে এগিয়ে আসবার চেষ্টা করতেই কন্দর্পনারায়ণ হাত তুলে ওঁদের আটকে বললেন— 'পরে বলব'। তারপর, পাঞ্জাবীর পকেট থেকে সুদৃশ্য ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা আবার বের করে সেটা দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবিগুলো দেখতে শুরু করলেন।

মিনিট দশেক পর ছবিগুলো ফেরত দিয়ে বললেন— 'এই ঘর থেকে তদন্তের স্বার্থে যা যা সিজ করেছেন সেই লিস্টটা একবার দেখি।'

কন্দর্পনারায়ণ হাত বাড়াতেই কোনো কথা না বলে ফটিক পাহাড়ী সিজার লিস্টটা কেস ডায়েরী থেকে বের করে এগিয়ে ধরলেন। কন্দর্পনারায়ণ কাচের টেবিলের উপর সেটাকে মেলে ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলেন।

খানিক পরে বলে উঠলেন— 'একটা জিনিস তো মিসিং— নিশ্চিত মিসিং। সেই জিনিসটা কী এই ঘরেই আছে?' বলেই তিনি খাটের আর ড্রেসিং টেবিলের নীচটা দেখবার জন্য প্রায় মেঝের উপর শুয়ে পড়লেন।

তারপর দ্বৈপায়নকে বললেন— 'দ্বৈপায়ন তোমার ব্যাগ থেকে, হাই পাওয়ার টর্চ আর ইম্পোর্টেড আঁকশিটা দাও।'

দ্বৈপায়ন, স্যারের এই ধরনের কার্যকলাপ দেখে অভ্যস্ত। বিনা বাক্যব্যয়ে নিজের পিঠের রুকস্যাক ব্যাগটা খুলে একটা সরু কালো লম্বা টর্চ বের করে দিলেন, সঙ্গে একটা ফোল্ডিং, স্টিলের বাঁকানো মুখওয়ালা আঁকশি।

কন্দর্পনারায়ণ এই লম্বা সরু হাইপাওয়ার টর্চ আর ফোল্ডিং আঁকশিটা কিনেছিলেন, লন্ডনের একটা দোকান থেকে। দোকানটার নাম ছিল 'ফরেন্সিক'। তদন্তে কাজে লাগে এমন সব কিছু সেই দোকানটায় পাওয়া যায়। টর্চটা তো প্রায়ই কন্দর্পনারায়ণ-এর কাজে লাগে আর আঁকশিটাও। ফোল্ডিং হওয়ায় জিনিসটা ক্যারি করাও খুব সহজ। পুরো আঁকশি খুললে প্রায় বারো ফুট লম্বা, আবার ভাঁজ করলে দৈর্ঘ্যে মাত্র একফুট।

অত্যন্ত দরকারী। কন্দর্পনারায়ণ যেখানেই যান সঙ্গে করে ম্যাগনিফাইং গ্লাস, টর্চ, ফোল্ডিং আঁকশি ইত্যাদি সঙ্গে করে নিয়ে যান। বলা তো যায় না কখন কী কাজে লাগে।

প্রথমে ড্রেসিং টেবিলের তলায় টর্চ ফেলেও তিনি কিচ্ছু পেলেন না। তাঁকে ওভাবে শুয়ে পড়ে খোঁজাখুঁজি করতে দেখে, মেহবুব আলম এগিয়ে এলেন।

নিচু হয়ে বজ্রাসনের ভঙ্গিতে কন্দর্পনারায়ণ-এর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে বললেন— 'স্যার কী খুঁজছেন? আমায় বলুন। আমি খুঁজে দেখছি।'

কন্দর্পনারায়ণ শোয়া অবস্থাতেই বুকে ভর দিয়ে খাটের নিচে টর্চের আলো ফেলতেই তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল— অাঁকশি দিয়ে কিছু একটা টেনে বের করতেই দেখা গেল, একটা লাল রঙের নেল পালিশের বোতল।

কন্দর্পনারায়ণ এবার মেঝে থেকে উঠে গায়ের ধুলো ঝেড়ে হাসিমুখে বললেন, 'দুটো জিনিস খুঁজছিলাম। আমার হিসেব মতো এই ঘরেই থাকা উচিত ছিল। আপনার সিজার লিস্টটা মিলিয়ে দেখলাম সেখানে নেই। তার মানে আপনি সিজ করেন নি।

একটা জিনিস পেলাম। এই নেল পালিশের বোতলটা, আপনি আজকে সিজ করেছেন বলে কেস ডায়েরিতে দেখাতে পারেন।

আর একটা জিনিসও থাকা উচিত ছিল। সেটা নেই। পেলাম না।' মেহবুব আলম কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'সেটা কী স্যার?'

কন্দর্পনারায়ণ সামান্য হাসলেন— 'বলব। আর একটু সময় দিন।'

মেহবুব আলম মাথা নেড়ে চুপ করলেন— আর কিছু বললেন না।

ঘরের ডানদিকে বিরাট জানালা, শৌখিন পর্দা দেওয়া। কন্দর্পনারায়ণ এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরিয়ে কাচের জানালা খুলবার জন্য পকেট থেকে রুমাল বের করে হাতে জড়িয়ে নিয়ে হ্যান্ডেলে চাপ দিতেই কী মনে করে হ্যান্ডেল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে রুমালটা নিজের চোখের সামনে মেলে ধরলেন। বললেন— 'সাধারণত এ.সি. চলে যে ঘরগুলোতে, সেই ঘরগুলোর জানালা খোলা হয় না, তাই হ্যান্ডেলে ধুলোর আস্তরণ পড়ে যায়। আর এখানে তো শৌখিন পর্দার আড়ালে থাকা জানালা। নিয়মিত না খোলাই স্বাভাবিক। সেখানে কাচের জানালার হ্যান্ডেলে ধুলো নেই? আমার সাদা ধবধবে রুমালে এক ফোঁটাও ধুলো লাগল না?'

তারপরে ঘাড় ফিরিয়ে মেহবুব আলমকে ডেকে বললেন— 'মিস্টার আলম, আপনার ফরেন্সিক এক্সপার্টরা জানালার হ্যান্ডেল থেকে ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়েছে কি? নাহলে তারা যেন একবার এসে ফিঙ্গার প্রিন্ট নিয়ে যায়।'

মেহবুব আলম এতক্ষণ কন্দর্পনারায়ণ-এর কার্যকলাপ দেখে হাঁ হয়ে গিয়েছিলেন। এবার তাঁর হাঁ আর একটু বড় হল। তারপর ঢোঁক গিলে বললেন— 'ইয়েস স্যার'।

ততক্ষণে কন্দর্পনারায়ণ হাতে আবার রুমাল জড়িয়ে নিয়ে হ্যান্ডেলে জোরে চাপ দিয়ে জানালাটা খুলে ফেলেছেন। বিরাট জানালার কাচের পাল্লা দুটো দু-দিকে খুলে যেতেই কন্দর্পনারায়ণ চিৎকার করে বলে উঠলেন— 'মাই গড, জানালায় লোহার গ্রীল নেই? এখান থেকে একটা পূর্ণবয়স্ক লোকের ডেডবডি পাচার করে দেওয়া কোনো ব্যাপারই নয়?'

পাশেই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা ম্যানেজারের দিকে তাকাতেই তিনি বলে উঠলেন— 'স্যার, খোঁজ নিয়ে দেখবেন, আজকাল কোনো হোটেলের জানালাতেই আর গ্রিল লাগানো হয় না। যাতে হঠাৎ আগুন-টাগুন লেগে গেলে জানালা দিয়ে বেরোতে বা ফায়ার ব্রিগেডেরও কাচের জানালা ভেঙে কাউকে বের করতে অসুবিধা না হয়।'

তারপর একটু থেমে আবার বলা শুরু করলেন— 'স্যার, একটু মনে করে দেখুন, কয়েক বছর আগে দীঘাতেই একটা পাঁচতলা হোটেলে আগুন ধরে যায়। ফায়ার ব্রিগেডের লোকজন এসে জানালা ভেঙেও অনেককেই বের করতে পারেনি।

জানালায় মোটা লোহার গ্রিল থাকায় বোর্ডাররাও জানালা দিয়ে বেরোতে পারেন নি। গ্রিল কেটে, তাঁদের বের করতে করতে অনেকেরই ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু হয়েছিল, তারপর থেকেই আমরা কোনো হোটেলের জানালাতেই গ্রিল দিই না।'

কন্দর্পনারায়ণ চোখের কোণ দিয়ে ম্যানেজারকে ভালো করে দেখে বললেন— 'সে তো জীবন্ত মানুষকে জানালা দিয়ে বের করার জন্য। এখানে তো মনে হচ্ছে মৃত মানুষকে এই জানালা দিয়ে পাচার করা হয়েছে।'

ম্যানেজার আবার ঘামতে ঘামতে রুমাল দিয়ে মুখ মুছতে শুরু করেছেন দেখে, কন্দর্পনারায়ণ চোখটা সরিয়ে নিয়ে, খোলা জানালার উপর উঠে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে ঝাঁপ দিয়ে পড়লেন।

মাঝদুপুরের কড়া রোদ থেকে বাঁচতে একটা গাছের তলায় এসে দাঁড়ালেন কন্দর্পনারায়ণ। বাঁ-হাত দিয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে ডান হাতে পাঞ্জাবীর পকেট থেকে রুমাল বের করে ভালো করে মুখটা মুছলেন।

চাউল খোলার মোড়ে, রাস্তার ওপার থেকে দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীল এসে দাঁড়ালেন কন্দর্পনারায়ণ-এর পাশে। কন্দর্পনারায়ণ চোখের ইশারায় জিগ্যেস করলেন— 'কী বুঝলে?' ইন্দ্রনীল বললেন, 'স্যার, দীঘা থেকে চাউলখোলা এবং এখান থেকে ডানদিকে ঘুরে বেশ খানিকটা গেলে মন্দারমণি। এই পুরো রাস্তাটাতে মোট তেরোটা এসি. টিভি. ফ্রিজ সারাইয়ের দোকান আছে। সব কটাতেই খবর নিয়েছি। সাম্প্রতিক কালের মধ্যে, মাটিতে শোয়ানো বড় ফ্রিজার সারাবার জন্য কোনো লোকই এসে মেকানিকের খোঁজ করেনি।

দ্বিতীয়তঃ শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রে যে ফ্রীজারটাকে আমরা দেখেছি, অতবড় ফ্রীজার নিশ্চয়ই কেউ ভ্যানে করে মেকানিকের দোকানে নিয়ে আসবে না, মেকানিককেই যেখানে ফ্রীজারটা রাখা আছে সেখানে যেতে হবে— তা, কোনো দোকানের কোনো মেকানিক-ই মন্দারমণিতে কোনো মাটিতে শোয়ানো ফ্রীজার সারাতে যায় নি।'

এই দুপুর বারোটার সময়ও চাউলখোলার মোড়ে বেশ ভীড়। বেশ কয়েকটা অটো, রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থেকে অকারণে জ্যাম তৈরি করেছে। অটোগুলোর সামনে আবার কয়েকটা টোটো দাঁড়িয়ে রয়েছে। দোলের ছুটি কাটিয়ে লোকজন আবার কলকাতামুখী। মন্দারমণির দিক থেকে আসা একটা ট্রেকার রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে লোক নামাচ্ছে। কলকাতার দিক থেকে আসা একটা লাক্সারী বাস একনাগাড়ে হর্ণ বাজিয়েই চলেছে।

রাস্তার ভীড়টা দেখতে মোটেই ইচ্ছে করল না কন্দর্পনারায়ণ-এর। চোখটা সরিয়ে নিলেন।

মোড়ে একটা চা-এর দোকান, তার পেছনেই একটা বড় পলাশ গাছ। ফুলে ফুলে লাল হয়ে রয়েছে। কোথায় যেন একটা কোকিল বসে রয়েছে। এক নাগাড়ে ডেকেই চলেছে।

কন্দর্পনারায়ণ সেদিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন— 'শিমূল রেহমান গুল মেরেছে। আমাদের বলল যে, আয়লায় ওনার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উনি দোকান অন্য জায়গায় নিয়ে গেছেন আর সেখান থেকেই উনি ব্যবসা চালাচ্ছেন। মন্দারমণির দোকানের ফ্রীজারটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল উনি সেটা আর সারাননি। যেহেতু উনি মন্দারমণিতে আগের দোকানে আজকাল আর যান না, তাই উনি জানতেনও না যে, অপরাধীরা ফ্রীজারটা সারিয়ে নিয়ে পঙ্কজবাবুর মৃতদেহ তার মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে— এই পুরো ব্যাপারটাই মিথ্যে।

ওনার বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধীরা পঙ্কজবাবুর দেহ লুকোবার জন্য ফ্রীজারটা সারিয়ে নিজেরাই কাজে লাগাচ্ছিল শিমূল বাবুর অজ্ঞাতসারে।

তাই যদি হত কাছাকাছি কোনো দোকান থেকেই মেকানিককে নিয়ে যাওয়া হত,অথবা মেকানিকের দোকানে ফ্রীজারটাকে নিয়ে আসা হত— এখানে কোনোটাই হয়নি, অর্থাৎ শিমূল রেহমান মিথ্যে কথা বলছেন।'

দ্বৈপায়ন ততক্ষণে পাশের দোকান থেকে একটা কোল্ড ড্রিংকের বোতল কিনে গলায় ঢালতে শুরু করছেন। বাঁ হাতের তর্জনী দিয়ে কপাল থেকে ঝরে পড়া ঘাম, মাটিতে ফেলে বললেন— 'একেই বলে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অপরাধীদের ধরতে চেষ্টা করা— যে কাজটা পুলিশের করার কথা ছিল সেই কাজটা আমরা করছি।'

তারপরই সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেন— 'স্যার, আমার ক্যালকুলেশনে অপরাধীরা যদি সত্যি সত্যিই ফ্রীজের মেকানিককে নিয়ে গিয়ে পরিত্যক্ত শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রের ফ্রীজারটাকে সারায় তাহলে তারা লোকাল মেকানিকের হেল্প নেবেই না— তাতে বরং লোক জানাজানির সম্ভাবনা থাকে। ওদের পক্ষে দূর থেকে মেকানিক আনার পসিবিলিটি বেশি— তাতে অন্তত লোক জানাজানি হবে না।'

গলায় আরও খানিকটা কোল্ড ড্রিংক ঢালার পর বাকীটা ইন্দ্রনীলকে দিয়ে দিলেন দ্বৈপায়ন। প্রচণ্ড রোদে গরমে ইন্দ্রনীলেরও গলা শুকিয়ে কাঠ। মার্চের তৃতীয় সপ্তাহেই যেন মেদিনীপুরের মাটি তেতে উঠেছে। গরম হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

দ্বৈপায়নের কথায় সায় দিয়ে কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'ইয়োর ক্যালকুলেশন মে বী রাইট। তবে আমাদের সমস্ত সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতেই হবে।

শুনলাম নতুন দুটো বড় এসি. টিভি-ফ্রীজ সারাইয়ের দোকান খুলেছে কাঁথিতে। আমাদের সঙ্গে তো গাড়ি আছেই। চল একবার কাঁথিতে ঢুঁ মারা যাক।'

দোকানটা বেশ বড়। একটা বড় বাড়ির একতলা জুড়ে। ভেতরে এসি. চলছে। দোকানে ঢুকেই কন্দর্পনারায়ণ, ইন্দ্রনীলকে দেখিয়ে বললেন— 'আমার এই ভাই, মন্দারমণিতে একটা পুরোনো দোকান কিনে সেখানে কোল্ড ড্রিংক-আইসক্রিমের ব্যবসা করতে চায়। আগের মালিকের ফেলে যাওয়া একটা বড় ফ্রীজার খারাপ হয়ে পড়ে রয়েছে। সেটাকে সারাতে হবে।'

দোকানটাতে শুধু এসি-টিভি-ফ্রীজ সারানোই হয় না, বিক্রিও করা হয়। বিভিন্ন ব্র্যান্ডেড কোম্পানির শো রুম সেটি।

দোকানের ম্যানেজারটি একজন অল্পবয়সী সুপুরুষ ভদ্রলোক। ফ্রীজারটার বর্ণনা শুনে বললেন অতবড় ফ্রীজার সারাবার লোক নেই। তবে ওই ধরনের বড় ফ্রীজারগুলি সাধারণতঃ নামী ব্র্যান্ডেড কোম্পানির হয়। কাজেই কোম্পানিতে ফোন করলে তাঁরাই মেকানিক পাঠান। সেক্ষেত্রেও ওই ধরনের একটা ফ্রীজ সারাবার জন্য কোম্পানিতে কমপ্লেইন করলে কোম্পানি সাধারণতঃ এক মাস সময় নেয়। তার আগে কিছুতেই সম্ভব নয়।'

ইন্দ্রনীল কন্দর্পনারায়ণ-এর কথার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেকে ভাবী দোকানদার প্রমাণ করতে গিয়ে বলে উঠলেন— 'না না, ফ্রীজারটা আরও তাড়াতাড়িই সারাতে হবে। আমাদের দু-তিন দিনের মধ্যেই সেটাকে সারিয়ে নিতে হবে।'

ম্যানেজার ঘাড় নেড়ে বলে উঠলেন— 'অসম্ভব। শুধু আমরা কেন, অত তাড়াতাড়ি কোনো মেকানিকই পারবে না। তাছাড়া, আমরা যদি দায়িত্বও নিই, তাহলেও একদিন এখান থেকে মেকানিক গিয়ে দেখে আসবে, ফ্রীজারটা কী কন্ডিশনে আছে। তারপর যদি সারানো পসিবল হয়, তাহলে কয়েকদিন পরে গিয়ে সারিয়ে আসবে।'

কন্দর্পনারায়ণ বলে উঠলেন— 'আচ্ছা, দেখি কী করা যায়, ধন্যবাদ।'

বেরিয়ে আসার ঠিক আগে দোকানের ম্যানেজার বিনয়ের সঙ্গে আবার বলে উঠলেন— 'নতুন দোকান করছেন যখন, নিশ্চয়ই এসিও লাগবে। আমাদের বলবেন, আমাদের দোকানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের এসি আছে। ডিসকাউন্টেড রেট-এ করে দেব।'

তারপর একটু ভেবে আবার বলে উঠলেন— 'আমাদের এখানে এ.সি. সারাবার ভালো মেকানিকও আছে। এসির গ্যাস ফুরিয়ে গেলে গ্যাস ভরে দেব। ভেণ্ট নোংরা হয়ে গেলে ভেণ্ট পরিস্কার করে দেব।'

কন্দর্পনারায়ণ ভুরু কুঁচকে তাকালেন। তারপর কী ভেবে, দু-পা পিছিয়ে গিয়ে, ম্যানেজারের কাছে গিয়ে, তাঁর কানে কানে ফিসফিস করে কিছু বললেন, আর ম্যানেজার ভদ্রলোকও যেন, খুব উৎসাহ পেয়ে, কন্দর্পনারায়ণকে কিছু বোঝাতে শুরু করলেন। মিনিট পাঁচেক পর, ম্যানেজার ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে, কন্দর্পনারায়ণ কাচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন।

বাইরে বেরিয়ে কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'চলো হে, এবার ফিরে যাই। দ্বিতীয় দোকানটায় যাবার আর দরকার নেই, ওরাও একই কথা বলবে।'

সেদিন রাতে, রিসর্টের ঘরে বসে বসে আলোচনা হচ্ছিল। কন্দর্পনারায়ণ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীল, নাজির, সুপ্রীম আর স্থানীয় থানার ও.সি. মেহবুব আলম ও তদন্তকারী অফিসার ফটিক পাহাড়ী।

রেস্তোঁরা থেকে এইমাত্র সবার জন্য দিয়ে গিয়েছে চিনি ছাড়া লিকার চা আর গরম গরম ফিস ফ্রাই।

দ্বৈপায়ন, প্লেট থেকে ধোঁয়া ওঠা একটা ফিস ফ্রাই তুলে নিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'তাহলে স্যার, আপনি কী মনে করছেন দীঘার হোটেলের মালিক আর ম্যানেজারই এই খুনগুলোর সঙ্গে জড়িত?'

কন্দর্পনারায়ণ নিজের নোট খাতায় কী যেন আঁকিবুঁকি করছিলেন। দ্বৈপায়নের কথা শেষ হতেই বললেন— 'আমার প্রথম সন্দেহ হল, হোটেলের ঘরে ঢোকার খানিকক্ষণের মধ্যেই অরুণা দেবীর মেয়ে আর নাতনির মৃত্যু হয়— হোটেলের রিসেপশনে লাগানো সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে এগারোই মার্চ, শুক্রবার বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে চারটের মধ্যে ওঁরা তিনজন নিজেদের রুমের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। তারপর সব চুপচাপ। ওঁরা তিনজন নিজেদের রুম থেকে আর বেরোন নি।

পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী, এগারোই মার্চ, ঐ সময় নাগাদই অরুণা দেবীর মেয়ে আর নাতনির মৃত্যু হয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ আজ দীঘাতে হোটেলের ঘরে দাঁড়িয়ে মৃতদেহের যে ছবিগুলো মিস্টার মেহবুব আলম দেখিয়েছিলেন তা দেখে আমি প্র্যাকটিক্যালি তাজ্জব বনে গেছি। অরুণা দেবীর মেয়ে ও তার নাতনী যেন ঘুমোচ্ছেন। অবশ্য খুব ভালো করে দেখলে তাঁদের মুখে যন্ত্রণার অভিব্যক্তি বোঝা যাচ্ছিল।

আশ্চর্য ব্যাপার হল, বিছানায় চাদরটি অবধি পরিপাটী করে পাতা। তিনটি বালিশ পরপর সাজানো। শুধু দুটো বালিশে মাথা দিয়ে অরুণা দেবীর মেয়ে আর নাতনি যেন শুয়ে আছেন।

ছবিগুলো দেখেই আমি নিশ্চিত হয়েছিলাম, ঘরে ঢুকবার পর পরই তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। আর তারপর অন্য কেউ মৃতদেহ দুটিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে।'

ইন্দ্রনীল বললেন— 'কী রকম স্যার? তার মানে আপনি বলতে চান তাঁরা আক্রমণ প্রতিহত করবার কোনো সুযোগই পান নি? ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই অরুণা দেবীর মেয়ে-জামাই আর নাতনি মারা যান? তারপরে খুনিরা ঘরে ঢুকে অরুণা দেবীর মেয়ে আর নাতনিকে বিছানায় শুইয়ে দেন আর অরুণা দেবীর জামাইয়ের মৃতদেহ ওই কাঁচের গ্রিলহীন জানালা দিয়ে নামিয়ে নেন, সরু গলিপথে। তারপর সেখান থেকে সন্ধ্যে বা রাতের অন্ধকারে নিয়ে আসেন, এই মন্দারমণিতে?'

দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীলের কথায় এতক্ষণ মাথা নাড়ছিলেন। কথা শেষ হতে না হতেই বললেন— 'আরও ভালো করে বললে বলতে হয় ডেডবডিটা নিয়ে শিমূল রেহমানের পরিত্যক্ত কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রের ফ্রীজারে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলেন।'

কন্দর্পনারায়ণ নিজের বাঁ-হাতের তালুতে ডান হাতের মুঠো দিয়ে একটা ঘুঁষি মেরে বললেন— 'ইয়েস। ঠিক তাই।'

তারপর চায়ের কাপ হাতে নিয়ে নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন ঘরের কাঁচের স্লাইডিং জানালার সামনে। এক হাতে চাপ দিয়ে কাঁচের পাল্লা সরিয়ে দিলেন।

সঙ্গে সঙ্গে হু হু করে সমুদ্রের নোনা বাতাস ঘরে এসে ঢুকল।

কন্দর্পনারায়ণ চায়ের কাপে শব্দ করে চুমুক দিয়ে বললেন— 'প্রথমতঃ দীঘাতে হোটেলের বিছানায় অরুণাদেবীর নাতনির দেহটা শোয়ানো ছিল, খাটের একেবারে ধারে। তারপরে ছিল শিখাদেবীর দেহ। তারও পরে দেওয়াল ঘেঁষে একটা বালিশ পাতা ছিল। যেন সেখানেই জামাই পঙ্কজবাবু শুয়েছিলেন। নিজের স্ত্রী আর নাতনিকে খুন করবার জন্য বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়েছেন।

আমার খটকাটা লাগে এখানেই। কোনো বাবা-ই নিজের চার বছর বয়সী মেয়েকে খাটের ধারে শুইয়ে, নিজে দেওয়ালের ধার ঘেঁষে শোবেন না— এটাই স্বাভাবিক। কারণ চার বছরের বাচ্চা মেয়ে, ঘুমের ঘোরে খাট থেকে পড়ে যেতেই পারে। সেইজন্য সাধারণতঃ বাচ্চাকে মাঝখানে শুইয়ে মা-বাবা দু-পাশে শোন। কিংবা বাচ্চাকে দেওয়ালের দিকে শুইয়ে নিজেরা পাশাপাশি শোন। সেক্ষেত্রেও বাচ্চা দেওয়াল ঘেঁষে, তারপরে মা, তারপরে বাবা শোন।

এক্ষেত্রে খুনিরা মাথা না খাটিয়ে চার বছরের বাচ্চাকে খাটের একেবারে ধারে শুইয়ে দেয়, তারপরে শোয়ায় তার মাকে। যে বিষয়টা আমার চোখে খুব বড় হয়ে দেখা দেয়।

শুধু তাই নয়, সিসিটিভি ফুটেজে তাঁদের যে পোশাক পরে একেবারে কলকাতা থেকে দীঘায় পৌঁছে, হোটেলে ঢুকতে দেখা গেছে সেই পোশাকেই তাঁরা বিছানায় শুয়ে ছিলেন? এটাও অস্বাভাবিক। পরিবারে বাচ্চা থাকলে মা-বাবার কর্তব্য, আগে বাচ্চার হাত-পা ভালো করে ধোয়ানো, বাইরের পোষাক ছাড়িয়ে, পরিষ্কার ঘরের পোষাক পরানো, এখানে সেটাও হয়নি।

আমি মৃতদেহ দুটোর ছবি ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে গিয়ে দেখি অরুণা দেবীর নাতনির পায়ে শুকনো কাদা লেগে আছে। অর্থাৎ কলকাতা থেকে দীঘায় পৌঁছেই তাঁরা আগে হোটেলে না ঢুকে সোজা চলে যান সমুদ্রের ধারে। সেখানে সময় কাটিয়ে এসে ঢোকেন হোটেলে অর্থাৎ হোটেল রুমে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু ঘটে, যে তাঁরা আর হাত-পা ধোবার অবকাশ পান নি। তাঁদের মৃত্যু হয়। তারপর খুনিরা তড়িঘড়ি অরুণা দেবীর মেয়ে আর নাতনির মৃতদেহ বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কাচের জানালা পথে জামাই-এর মৃতদেহ নিয়ে গলি দিয়ে বেরিয়ে যায়। খুনিরা অবশ্যই জানতো, যে ঐ গলিপথে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো নেই।

পুরো ব্যাপারটা এমনভাবে সাজানো হয় যাতে সাপও মরে, আর লাঠিও না ভাঙে। সবাই মনে করে যে পঙ্কজবাবুই তাঁর স্ত্রী-কন্যাকে খুন করে পালিয়ে গেছেন।

সুপ্রীম বললেন— 'তার মানে কী খুনিরা আগে থেকেই ওই ঘরে লুকিয়ে ওঁত পেতে ছিল?'

কন্দর্পনারায়ণ চায়ে আর একটা চুমুক দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে, দূরে একনাগাড়ে পাড়ে আছড়ে পড়া সমুদ্রের ঢেউগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন—'পঙ্কজবাবুরা কলকাতা থেকে হোটেল রুম বুক করেই এসেছিলেন। হোটেল রুমের চাবি থাকে ম্যানেজারের কাছে। সেই ঘরে আগে থেকে খুনিরা ওঁত পেতে ছিল?'

একটু থেমে আবার বললেন—'হতেই পারে। কিন্তু, মৃত্যু হল কিভাবে? পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট বলছে, 'অ্যাসফিক্সিয়া।' কিন্তু কেন? মুখে বালিশ চাপা দিয়ে মারলে ধ্বস্তাধ্বস্তির চিহ্ন থাকত, বিছানায় চাদর কুঁচকে থাকত। মুখে যন্ত্রণার ছাপ থাকত।'

নাজির ফিসফ্রাই খেতে খেতে বললেন— 'স্যার, হোটেল ম্যানেজারকে অ্যারেস্ট করতে বলুন। সে ব্যাটা সব জানে।'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'ম্যানেজারটা অবশ্যই অনেক কিছু জানে। ব্যাটা বলছে না। কিন্তু, তাকে এক্ষুণি অ্যারেস্ট করলে আসল মাথা সতর্ক হয়ে যাবে। ম্যানেজার যদি সব জানেও, সে ব্যাটা বোড়ে মাত্র। হুকুম তামিল করেছে শুধু'।

বলেই কন্দর্পনারায়ণ ঘুরলেন, থানার ও.সি.র দিকে— 'আপনি বরং ম্যানেজারটার পেছনে ইনফর্মার লাগিয়ে দিন। ওর ফোনটাকে ট্র্যাক করুন। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে কথা বলছে সব আমার জানতে হবে।'

ও.সি. এতক্ষণ চুপ করেই বসেছিলেন। কন্দর্পনারায়ণ-র কথার উত্তরে বলে উঠলেন— 'স্যার, হোটেলের ঘরে শৌখিন পর্দার আড়ালে থাকা কাচের জানালার হ্যাণ্ডেলে ধুলো নেই। তার মানে হালে ব্যবহার হয়েছে বা গ্রিলবিহীন জানালা পথে পঙ্কজবাবুর মৃতদেহ চালান হতে পারে, এটা আমরা ভাবিইনি।

কিন্তু স্যার, পঙ্কজবাবুর ডেডবডিটা পাচার করল কিভাবে? জানালার বাইরের গলিটা অত্যন্ত সরু। তিনটে লোকও পাশাপাশি যেতে পারবে না।'

কন্দর্পনারায়ণ চায়ের কাপটা ডান হাতে ধরে, বাঁ হাতে, সমুদ্রের হাওয়ায় নিজের এলোমেলো চুল ঠিক করতে করতে ঘাড়টা অল্প ডানদিকে ঘুরিয়ে বললেন— 'গলিপথে গাড়ি হয়তো ঢুকতে পারে না। কিন্তু, মোটরবাইক? ইনফ্যাক্ট ওই গলিপথেই, হোটেলের স্টাফেরা তাদের সাইকেল, বাইক পার্ক করে রাখে। আর বাইক রাখতে রাখতে জায়গাটা কেমন যেন তেলতেলে, পেছল হয়ে গেছে।

আর সেই গলিতেই ঠিক কাচের জানালার নিচে একটা মোটরবাইকের টায়ারের গ্রিপের ছাপ পেয়েছি। বিশেষ ছাপ। আমি আমার মোবাইলে সেই ছাপের ছবিও তুলে নিয়েছি।'

বলেই দ্বৈপায়নকে বললেন— 'আমার মোবাইলটা খুলে গ্যালারিতে যাও। সেখানে দ্যাখো, আমি ওই গলিপথ থেকে পাওয়া বেশ কয়েকটা মোটরবাইকের টায়ারের ছাপ নিয়েছি। তার মধ্যে একটা ছাপ অবিকল, আমি আগেও দেখেছি।

আপনি হয়তো বলবেন ওই গলিপথটা যদি হোটেলের স্টাফের সাইকেল, মোটরবাইক পার্ক করবার জায়গা হয় তাহলে বাইকের টায়ারের ছাপ পাওয়া আর আশ্চর্য কি?

উত্তরে আমি বলব, জায়গাটাতে পেট্রল-মোবিল পড়ে পড়ে বেশ খানিকটা জায়গা কালচে তৈলাক্ত হয়ে উঠেছে। আর বাইকের চাকার দাগ সেখানে আরও প্রমিনেন্ট হয়ে উঠেছে।

ওই একই গ্রিপের টায়ারের দাগ আমি দেখেছি, পঙ্কজবাবুর ডেডবডি যেখান থেকে রিকভার হয়েছে সেই পরিত্যক্ত 'শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্র'-এর বাইরে।'

ও.সি. চোখ কপালে তুললেন— 'বলেন কি? ধন্য আপনার অবজার্ভেশন ক্ষমতা।'

কন্দর্পনারায়ণ মৃদু হাসলেন, সুপ্রীম বললেন— 'কিন্তু স্যার, বাইকে করে ডেডবডি চালান করবে কী করে?'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'ভেবে দ্যাখ, সামনে পেছনে দুজন বসলেন মোটরবাইকে আর মাঝখানে পঙ্কজবাবুর মৃতদেহটাকে বসিয়ে, পেছনে যিনি বসলেন, তিনি যদি শক্ত করে ধরে থাকেন, তাহলে? রাত্রের অন্ধকারে ডেডবডিটা এনে 'শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্র'-এর ফ্রীজারে শুইয়ে দেওয়া কী খুব অসম্ভব?'

কন্দর্পনারায়ণ এবার এগিয়ে এসে ও.সি. মেহবুব আলমের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন— 'যে কোনো রহস্যের উদঘাটন করতে গিয়ে একজন গোয়েন্দার প্রাথমিক কর্তব্য হল, নিজেকে ছাড়া অন্য সবাইকেই সন্দেহ করা। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী আমার উচিত আপনাকেও সন্দেহ করা। যদিও আপনি পুলিশ এবং আপনি স্থানীয় থানার ও.সি., তবুও আমি এক-দুই করে গুণে গুণে বলতে পারি, কতগুলো পয়েণ্টে আপনারা চূড়ান্ত গাফিলতির প্রমাণ দিয়েছেন। আপনাদের আরও নিখুঁত তদন্ত করা উচিত ছিল, কিন্তু আপনারা করেন নি।

আজ আমি স্পটে গিয়ে যে তথ্যগুলো আবিষ্কার করেছি সেগুলো আগেই আপনারা করতে পারতেন।'

থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। একদৃষ্টে ও.সি.র চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন— 'আপনি জানেন যে মেদিনীপুর রেঞ্জের ডি.আই.জি. প্রদীপ মুখার্জী আমার পরিচিত। প্রতি আধঘণ্টা অন্তর তাঁর সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও আজকে সন্ধ্যেবেলায় আমরা যখন মন্দারমণিতে ঢুকছি তখন আমার গাড়ি লক্ষ্য করে কেউ গুলি ছোঁড়ে। বুলেট একদিকের জানালা দিয়ে ঢুকে অন্যদিকের জানালা ফুঁড়ে বেরিয়ে যায়।

অর্থাৎ আমরা কখন কী করছি, কোথায় যাচ্ছি কী আলোচনা করছি, সব খুনিরা জেনে যাচ্ছে। কীভাবে? কেন?'

কন্দর্পনারায়ণ উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন।

কন্দর্পনারায়ণ নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন— 'অবশ্য খুনিরা চাইলেই আমাদের মারতে পারত। যারা একই পরিবারের তিনজনকে মেরে একজনের বডি লোপাট করতে পারে, তাদের কাছে সন্ধ্যের অন্ধকারে আমাদের মারা তো কিছুই নয়।

কিন্তু তারা সেই রিস্ক নেয়নি।'

দ্বৈপায়ন বলে উঠলেন— 'ঠিক বলেছেন স্যার, তারা আপনার মতো হাই-প্রোফাইল সেলিব্রিটি ল'ইয়ারকে মারবার রিস্ক নিতে চায়নি।

আজ মন্দারমণিতে ঢুকবার রাস্তার মুখে গাড়িতে গুলি চালিয়ে আমাদের ভয় দেখাতে চেয়েছিল মাত্র।'

কন্দর্পনারায়ণ সায় দিয়ে বললেন— 'ঠিক বলেছ, আজ আমাদের উপর গুলি চালিয়ে খুনিরা একটা ভুল চাল চেলে ফেলল। তারা বুঝিয়ে দিল, আমরা ঠিক পথেই চলেছি।'

ও.সি. মেহবুব আলম, কন্দর্পনারায়ণ-এর কথায় রাগ করলেন না। থমথমে মুখে বললেন—'স্যার। ওপরওয়ালার দিব্যি খেয়ে বলছি আমি বা পাহাড়ী, কেউই অপরাধীদের সঙ্গে জড়িত নই। হ্যাঁ মেনে নিচ্ছি, তদন্তে খামতি ছিল। কারণ প্রাইমা ফেসী আমরা ভেবেছিলাম, এটা একটা সিম্পল কেস। স্ত্রী আর কন্যাকে খুন করে স্বামী ফেরার হয়েছে। কিন্তু গতকাল পঙ্কজবাবুর ডেডবডি উদ্ধার হওয়ার পর আমাদের চোখ খুলে গেছে।

বিশ্বাস করুন স্যার। আপনি আমাকে যা যা বললেন, তাতে আমার রাগ হতে পারত। আমি অপমানিত হতে পারতাম, কিন্তু কেন হইনি জানেন?

আপনাকে দেখে, আপনার নিখুঁত বিচার-বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা দেখে।

গতকাল থেকে আপনাকে দেখছি। আপনাকে যত দেখছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি স্যার।'

তারপর নিচু হয়ে কন্দর্পনারায়ণকে প্রণাম করে বললেন— 'স্যার, আমি বেশিদিন ও.সি. গিরি করছি না। আমি বা পাহাড়ী, সৎ পুলিশ স্যার। আমরা দু-নম্বরী নই। বিশ্বাস করুন, আমরা আপনার সাথে আছি। আমরা আজকেই দীঘার হোটেলের মালিক বা ম্যানেজারকে অ্যারেস্ট করতে পারি। কিন্তু লোকটা প্রভাবশালী। এলাকায় গোলমাল পাকাতে পারে।'

কন্দর্পনারায়ণ টেবিলের উপর থেকে নিজের নোট খাতাটা তুলে নিয়ে পাতা উল্টে কী যেন দেখে জিগ্যেস করলেন— 'গতকাল ডেডবডি খুঁজে পাবার সঙ্গে সঙ্গে আমি পুলিশে ফোন করি। কিন্তু পুলিশ আসবার আগেই যে লোকটা আসে তার নাম শিমূল রেহমান।

এই রিসর্টের মালিকের নাম শিমূল রেহমান। যে কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রের ফ্রীজারের ভেতর থেকে ডেডবডি পাওয়া গেছে, তার নাম 'শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্র।' তার মালিকের নাম শিমূল রেহমান।

তার খারাপ হয়ে যাওয়া ফ্রীজার অন্য কেউ সারিয়ে তার মধ্যে ডেডবডি লুকিয়ে রেখে দিয়েছে, আর সে জানে না এটা বিশ্বাস করা কঠিন।

তাছাড়া আজ যখন আমাদের গাড়িতে কেউ গুলি চালাল, আমরা তো প্রথমে বুঝতেই পারি নি। শুধু ফট করে একটা শব্দ। তারপরই গাড়ির জানলা ফুঁড়ে সুঁইইই করে একটা বুলেট, এক পাশ দিয়ে ঢুকে, অন্য জানালার কাঁচ ফুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আওয়াজ।

আমি পরে বুঝেছি যে, সাইলেন্সার লাগানো পিস্তল থেকে কেউ গুলি করেছে। কিন্তু আপনারা খবর পেয়ে ছুটে আসার আগেই যে, মোটরবাইক নিয়ে এসে হাজির হল, সে শিমূল রেহমান।

আমি অবাক হয়ে গেলাম, যখন সে আমাকে পরিস্কার বলল যে, 'গুলি চলেছে, গুলি চলেছে, আপনারা এক্ষুণি এখান থেকে চলে যান।'

কন্দর্পনারায়ণ থামলেন। দুটো ভুরু গভীরভাবে বেঁকে ধনুকের মতো হয়ে গেছে। নিজের নোটখাতার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আবার বললেন— 'আমরা তো কাউকেই কিছু বলিনি। তখনও আপনারা এসে পৌঁছননি। ও জানল কী করে যে গুলি চলেছে? আশ্চর্য! তবে কী? তবে কী?'

তারপরই হঠাৎ করে কিছু মনে পড়ে যাবার ভঙ্গিতে চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন— 'বাই দি ওয়ে, মিস্টার আলম, দীঘার যে হোটেলে খুনগুলো হয়েছে, সেই হোটেলটা কার? মালিকের নাম কী?'

মেহবুব আলম কেটে কেটে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন— 'যে রিসর্টে আপনারা আছেন আর দীঘার যে হোটেলে খুনগুলো হয়েছে দুটোর মালিক একই লোক— শিমূল রেহমান।'

কন্দর্পনারায়ণ, দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীল, নাজির, সুপ্রীম, হাঁ করে মেহবুব আলমের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।

অনেক রাত। রিসর্টের প্রায় সবাই খাওয়া-দাওয়া করে শুয়ে পড়েছেন। শুধু কন্দর্পনারায়ণ-এর তিনতলার ঘরে আলো জ্বলছে। ভেতরে চলছে এক বিশেষ মীটিং।

কন্দর্পনারায়ণ নিজের ফোনের ফোটো 'গ্যালারী' থেকে দুটো বিশেষ ছবি, সবার ফোনে হোয়াটস অ্যাপ করে পাঠিয়ে দিলেন বললেন— 'এই দুটো ছবি হল মোটরবাইকের টায়ারের গ্রিপের ছবি। একটা ছবি আমি তুলেছি কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রের পেছনের দরজার বাইরে। মাঝে মাঝেই সমুদ্রের জল উঠে এসে সেখানকার বালিকে বা জমিকে নরম করে দিয়েছে। আর সেই নরম বালিতে সুস্পষ্ট মোটরবাইকের টায়ারের এক বিশেষ গ্রিপের ছাপ।

আবার একই গ্রিপের ছাপ আমি পেয়েছি দীঘাতে হোটেলের যে ঘরে অরুণাদেবীর মেয়ে আর নাতনীর মৃতদেহ পাওয়া গেছে তার গ্রিলবিহীন কাঁচের জানালার বাইরে সরু গলিতে।'

একটু থেকে কন্দর্পনারায়ণ আবার বললেন, 'আমার ধারণা এই মোটরবাইকের মালিক কাছাকাছিই আছে। আমাদের উপর নজর রাখছে। এই মোটরবাইকের মালিককে ধরতে পারলেই রহস্যের সমাধান হবে।'

নাজির বললেন— 'স্যার, আপনি বলছেন পঙ্কজ বাবুর মৃতদেহ যখন আপনি আবিষ্কার করলেন, তার পরপরই আমরা সবাই হুড়মুড়িয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম, আপনি পুলিশে ফোন করেন। কিন্তু পুলিশ আসবার আগেই শিমূল রেহমান সেখানে তাঁর নিজস্ব মোটরবাইক নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন— যে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই সন্দেহজনক। যখন আমরা ছাড়া বাইরের কেউ মৃতদেহ আবিষ্কারের ব্যাপারটা জানে না, তখন শিমূল রেহমান খবর পেলেন কী করে?

দ্বিতীয়তঃ আজকে যখন আমাদের গাড়ি লক্ষ্য করে কেউ গুলি চালিয়েছিল, তখনও সেখানে পুলিশ আসবার আগে মোটরবাইকে চেপে সেখানে উপস্থিত হন শিমূল রেহমান।

সত্যি সত্যিই লোকটার আচরণ সন্দেহজনক। তাছাড়া ওই শিমূল রেহমান লোকটাই দীঘায় যে হোটেলে খুনগুলো হয়েছে সেই হোটেলের মালিক সেই লোকটাই যেখান থেকে পঙ্কজবাবুর মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে সেই কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রেরও মালিক। তা আপনি পুলিশকে শিমূল রেহমানকে অ্যারেস্ট করতে বলছেন না কেন?'

নাজিরের কথা শুনতে শুনতে দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীল আর সুপ্রীম মাথা নাড়ছিলেন। বলে উঠলেন— 'রাইট। সেই লোকটাকে ধরলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়।'

নাজির আবার বলে উঠলেন— 'স্যার, শিমূল রেহমানের মোটরবাইকের টায়ারের গ্রিপটা লক্ষ্য করেছেন? আপনি যে রকম চাইছেন সে রকমই নয় তো?'

কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় নাড়লেন— 'উঁহু, একরকম নয়।' তারপর আবার বললেন— 'চাইলেই শিমূল রেহমানের মতো প্রভাবশালী লোকেদের অ্যারেস্ট করা যায় না। অন্তত সন্দেহের বশে তো নয়ই।

শিমূল রেহমান এলাকার নামী হোটেল ব্যবসায়ী। ভালো লোক বলে পরিচিতি আছে। এখন অবধি আমরা ওনার বিরুদ্ধে এমন কোনো প্রমাণ জোগাড় করে উঠতে পারিনি যাতে আমরা ওকে গ্রেফতার করতে পারি। অর্থাৎ হোয়্যার ইজ দি লিঙ্ক? খুনগুলোর সঙ্গে শিমূল রেহমানের সম্পর্ক কি? তাছাড়া মোটিভই বা কী। শিমূল রেহমান কেন খুন করবে? শুধু অ্যারেস্ট করলেই তো হবে না। কোর্টে অ্যারেস্টের কারণও তো বলতে হবে। তাছাড়া, শিমূল রেহমানের হোটেলের ঘর থেকে দুটো মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে, বা ওর পরিত্যক্ত দোকান ঘরের মধ্য থেকে একটা মৃতদেহ পাওয়া গেছে বলেই, তাকে অ্যারেস্ট করতে হবে? আমাদের দরকার তথ্যপ্রমাণ, যে খুনগুলো,ওই করেছে বা করিয়েছে।'

কন্দর্পনারায়ণ থামলেন। বললেন— 'গলা শুকিয়ে গেছে। একটু চা হলে ভালো হত।'

তারপরই কান খাড়া করে কী যেন শুনে বললেন— 'রেস্তোঁরার একজন স্টাফ আমাদের জন্য চা করে আনছে, নাজির যাও তো, দরজাটা খুলে দাও।'

নাজির উঠে দরজাটা খুলতেই দেখা গেল সত্যি সত্যিই একটি অল্পবয়সী ছেলে রিসর্টের রেস্তোঁরার ইউনিফর্ম পরা— একটি ট্রে তে পাঁচ কাপ চা আর এক প্লেট পকোড়া নিয়ে এসেছে।

সবাই তো অবাক— 'স্যার, আপনি বুঝলেন কী করে, আমাদের জন্য কেউ চা করে এনেছে?' নাজির, সুপ্রীম একসঙ্গে বলে উঠলেন।

কন্দর্পনারায়ণ হাসলেন— 'এর মধ্যে কোনো ম্যাজিক নেই। আমি কারো সিঁড়ি দিয়ে সন্তর্পণে, সাবধানে পা টিপে টিপে ওঠার আওয়াজ পাচ্ছিলাম। তার সঙ্গে চায়ের কাপের পরস্পর ঠুকে গিয়ে ঠুনঠুন শব্দ। তাতেই বুঝেছিলাম কেউ চা নিয়ে আসছে।

তাছাড়া, আয় তোদের সাথে আলাপ করিয়ে দিই। ও হচ্ছে শশীকান্ত গিরি। আমাদের পুরোনো মক্কেল। আসলে তোরা ভুলে গেছিস।

সেই যে বেলদা থানার ডাকাতি কেস। ছজনের জেল হয়েছিল। এই শশীকান্ত ছিল তাদের মধ্যে একজন। আমি ওকে বেকসুর খালাস করিয়ে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনি।

যেদিন আমরা এই রিসর্টে এলাম, সেদিন ওকে আমি দেখেই চিনতে পারি। ও-ও পারে। কিন্তু ও আমার সাথে কথা বলেনি। আমি বুঝতে পারি ও নিজের পূর্ব-পরিচয় গোপন করে এখানে কাজ করছে— তাই আমিও আর ওর সঙ্গে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গিয়ে ওকে বিব্রত করতে চাই নি।

কিন্তু, আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম ও আমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে।

তাই সিঁড়িতে কারও সন্তর্পণে উঠে আসার শব্দ পেতেই বুঝতে পেরেছিলাম যে শশীকান্ত এসেছে।'

ততক্ষণে শশীকান্ত ঘরে উপস্থিত সবাইকে গরম গরম চা আর পকোড়া সার্ভ করে দিয়েছে। তারপর কন্দর্পনারায়ণকে প্রণাম করে বলল— 'স্যার। আপনি আমাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছেন। এখন আমি ভালো রাস্তায় আছি স্যার।'

কন্দর্পনারায়ণ খুশি হয়ে বললেন— 'আমার একটা কাজ করে দেবে শশীকান্ত?'

শশীকান্ত হাত জোড় করে নমস্কার করার ভঙ্গিতে বলল— 'বলুন স্যার— আমি কীভাবে সাহায্য করব?'

কন্দর্পনারায়ণ নিজের ফোন থেকে দুটো ছবি শশীকান্তকে ফরোয়ার্ড করে দিয়ে বললেন— 'একই মোটরবাইকের টায়ারের গ্রিপের ছাপের ছবি। আমার এই মোটরবাইক আর তার মালিককে চাই। যেমন করে হোক।

দরকারে তুমি তোমার বন্ধু-বান্ধবের সাহায্য নাও। এই মোটরবাইকের টায়ার যে বাইকের, সেই বাইক, আর তার মালিককে চাই।'

'আপ্রাণ চেষ্টা করছি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।'— এরপর, কন্দর্পনারায়ণের সঙ্গে ফিসফিস করে মিনিট পাঁচেক কথা বলে, শশীকান্ত নমস্কার করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ভোরবেলায় কন্দর্পনারায়ণ-এর ফোনে ঘুম ভেঙে গেল দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীল, নাজির আর সুপ্রীমের। কন্দর্পনারায়ণ ডাকছেন— 'শীগগির আমার ঘরে আয়। আর্জেন্ট।' কোনোমতে ফ্রেশ হয়ে পড়িমড়ি করে ছুটলেন সকলে। কন্দর্পনারায়ণ-এর ঘরে এসে দেখলেন, অত ভোরেই কন্দর্পনারায়ণ স্নান সেরে রেডী। পরনে সাদা ধবধবে পাঞ্জাবী আর চোস্ত পায়জামা।

স্লাইডিং উইনডোর কাচের পাল্লা সরিয়ে দিয়ে খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে লিকার চা-এর কাপ। মাঝে মাঝে চা-য়ে চুমুক দিচ্ছেন, আর খোলা গলায় গেয়ে উঠছেন— 'ভেঙে মোর ঘরের চাবি / নিয়ে যাবি কে আমারে— ও বন্ধু আমার।'

গত দু-দিন ধরে মুখে যে অশান্তির চিহ্ন ছিল তা উধাও। তার জায়গায় এসেছে প্রশান্তির ছাপ।

সবাই ঘরে ঢুকতেই ঘাড় ঘোরালেন কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'ওই দ্যাখ, টেবিলের উপর তোদের সবার ব্রেকফাস্ট ঢাকা দেওয়া। বাটার টোস্ট, ওমলেট আর কফি। এক্ষুণি শেষ কর। দু মিনিটে মেহবুব আসবে পুলিশের গাড়ি নিয়ে। নাজির-সুপ্রীম, তোরা মেহবুবের সঙ্গে রেইডে যাবি। ফটিক পাহাড়ী অলরেডী স্পটে পৌঁছে গেছে। সেখানে অবশ্য 'আন্ডার কভার' পুলিশ আগে থেকেই বাড়ি ঘিরে রেখেছে।'

দ্বৈপায়ন-ইন্দ্রনীল, সবার ব্যাগই গাড়িতে নিয়ে নে। আমরা এক্ষুণি হোটেল ছাড়ছি।

দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীল, নাজির, সুপ্রীম হাঁ। —'খুনি ধরা পড়েছে? কী বলছেন স্যার?'

কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় নাড়লেন। এখনো সবাই ধরা পড়েনি। একজন তো তার ঘরে ঘুমোচ্ছে। সে জানেও না যে, মাঝরাত থেকেই 'আন্ডার কভার' পুলিশ তার বাড়ি ঘিরে রেখেছে। ভোরবেলাতেই ফটিক পাহাড়ী, সব্জিওয়ালার ছদ্মবেশে তার বাড়ির সামনে ঘুর ঘুর করছে, আর 'সব্জি চা-আ-আ-ই, সব্জি চা-আ-আ-ই' বলে চিৎকার করছে।'

নাজির-সুপ্রীম চোখ কপালে তুললেন— 'তা-আই নাকি? খুনি কে স্যার?'

কন্দর্পনারায়ণ ওঁদের কথায় সাড়া না দিয়ে বলে চললেন— 'কাল মাঝরাতেই শশীকান্ত গিরি ফোন করেছিল। আমার পাঠানো বাইকের চাকার গ্রিপের দাগ, ও ওর সব বন্ধু আর সহকর্মীদের ফরোয়ার্ড করে দিয়েছিল। তাদেরই একজন ওকে জানিয়ে দেয় যে, আমরা যে মোটরবাইকটাকে খুঁজছি, সেটা আসলে কার। মোটরবাইকটা একদম হালে কেনা হয়েছে। মোটা চাকার বড় বাইক। সাধারণতঃ অত মোটা চাকার বাইক আমরা দেখি না। টায়ার ও নতুন। ভারী মোটরবাইক। তাই জমিতে গ্রিপের ছাপ আরো স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল। তাতেই আমাদেরও সুবিধা হল।

শশীকান্ত জানায় যে, ওইরকম মোটা টায়ারের মোটরবাইক এ তল্লাটে একজনেরই আছে। কাজেই ওই মোটরবাইকের মালিককেও খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় নি।'

দ্বৈপায়ন বললেন— 'স্যার আমার তো সন্দেহ হচ্ছিল, শিমূল রেহমানকে— সে কী খুনি নয়?'

কন্দর্পনারায়ণ আনমনে বললেন— 'খুনি কে? নিশ্চয়ই সে জানত। কিন্তু, সে খুনগুলো করে নি বা করায়ও নি। পেছনে আরও অন্য লোক আছে।' তবে, আমার ধারণা। শিমূল রেহমানও দায়িত্ব এড়াতে পারে না। খুন করানোর জন্য, নিজের হোটেল বা ডেডবডি লুকোনোর জন্য, নিজের দোকান ও ফ্রীজ ব্যবহার করতে দেওয়া, 'ফৌজদারী ষড়যন্ত্র' বা 'ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি'র মধ্যেই পড়বে।'

ইন্দ্রনীল বললেন— 'মাই গড'।

নাজির কন্দর্পনারায়ণ-এর টানটান বিছানার দিকে তাকিয়ে বললেন— 'স্যার, আপনি কি সারারাত ঘুমোন নি?'

কন্দর্পনারায়ণ গরম ধোঁয়া-ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে আবার খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন— একটু দূরেই খোলা সমুদ্র। প্রাতভ্রমণকারীদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে সমুদ্রের ধারে। সকালের সূর্যের আলোয় গোটা সমুদ্রটাই যেন ঝিকঝিক করছে।

কন্দর্পনারায়ণের কণ্ঠস্বর যেন দূর থেকে ভেসে আসছে। বলে চললেন— 'কাল সারারাতই আমি এই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। খালি মনে হচ্ছিল চার বছরের সেই মিষ্টি বাচ্চাটা আমাকে বলছে— 'আঙ্কল, তুমি কী হেরে গেলে? আমাকে জাস্টিস দেবে না? আমার জাস্টিস চাই। ওরা আমাদের খুব কষ্ট দিয়েছে।'

শেষের দিকে কথাগুলো বলতে গিয়ে কন্দর্পনারায়ণের গলা ধরে এল।

ডোরবেলের শব্দে সবার চমক ভাঙল। নাজির উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই মেহবুব আলম ঘরে ঢুকে এলেন। কন্দর্পনারায়ণের দিকে তাকিয়ে বললেন— 'স্যার অল সেট। তাহলে বেরোচ্ছি।'

কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় হেলিয়ে 'হ্যাঁ' বলতেই মেহবুব আবার বললেন— 'আমার সঙ্গে কে কে যাচ্ছেন?' নাজির আর সুপ্রীম উঠে দাঁড়াতেই মেহবুব বলে উঠলেন— 'চলুন চলুন বেরিয়ে পড়ি'।

বড় রাস্তা থেকে সরু গলি নেমে গেছে গ্রামের ভেতরে। রাস্তা থেকেই দোতলা বড় বাড়িটাকে দেখা যাচ্ছিল। রাস্তার মুখেই একটা লোক মাটিতে বসে বসে সব্জি বিক্রি করছিল। মাথায় গামছা জড়ানো। একটা লুঙ্গি আর স্যান্ডো গেঞ্জী পরা।

তাকে দেখে নাজিরের চেনা চেনা লাগছিল। মেহবুব আলমের জীপ দাঁড়াতেই সব্জিওয়ালাটা এগিয়ে এল। মেহবুবকে বলল— 'স্যার, আসামী এখনো বাইরে বেরোয়নি।' মেহবুব বললেন— 'চলো, এবার দরজায় নক করি।' সুপ্রীম, নাজিরের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন— 'চিনতে পারলে নাজির দা? ফটিক পাহাড়ী।' নাজির চমকে উঠলেন— 'আরেঃ তাই তো! এমন মেক আপ যে চিনতেই পারি নি। আন্ডার কভার পুলিশ!'

মেহবুবকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে ইতিউতি ছড়িয়ে থাকা আরও কয়েকজন ছদ্মবেশী পুলিশ কর্মচারী এগিয়ে এসে মেহবুবকে স্যালুট করে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়ালেন।

মেহবুব বললেন— 'বাড়ির পেছন দিকটা গার্ড দেওয়া আছে তো? আশেপাশের বড় বড় গাছগুলোর দিকেও নজর রাখিস। দোতলার বারান্দায় দ্যাখ কয়েকটা মোটা গাছের ডাল নেমেছে। বারান্দা দিয়ে গাছের ডাল বেয়ে আবার না পালায়।'

ফটিক পাহাড়ী বললেন— 'কোনো চিন্তা নেই স্যার। পাখি পালাবে না।'

মেহবুব, ফটিক পাহাড়ী ও আরও কয়েকজন পুলিশ কর্মী এগিয়ে গিয়ে বন্ধ সদর দরজায় ধাক্কা দিতে থাকলেন।

খানিক পরে খালি গায়ে, লুঙ্গি পড়ে ঘুম ঘুম চোখে বেরিয়ে এল অল্পবয়সি যুবক। বাঁদিকে গলা আর ঘাড়ের মাঝামাঝি একটা ক্ষত। তুলো আর লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে সাঁটা।

দরজা খুলেই সামনে পুলিশ দেখে হতভম্ব হয়ে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল। তারপর সম্বিত ফিরে পেয়ে দরজা বন্ধ করতে যেতেই মেহবুব, ফটিক পাহাড়ী ও আরও কয়েকজন ওকে এগিয়ে গিয়ে চেপে ধরলেন।

নাজির অবাক বিস্ময়ে ফিসফিস করে সুপ্রীমকে বললেন— 'মাই গড, এতো— এতো—'

কন্দর্পনারায়ণ-এর সেভেনসিটার এস ইউ ভি গাড়িটা যখন কাঁথির রাস্তায়, তখনই ফোনটা করলেন— মেহবুব।

—'স্যার, পাখি ধরা পড়েছে।'

'শাব্বাশ'। 'আচ্ছা দেখুন তো ওর গলার বাঁ দিকে কোন গভীর ক্ষত আছে?'

'আছে স্যার। তুলো আর লিকোপ্লাস্ট লাগানো।'

কন্দর্পনারায়ণ হাসলেন— 'ওকে 'অ্যারেস্ট করুন। আর ওর মোটরবাইকটা পেলেন?'

'হ্যাঁ স্যার, বাড়ির পেছনেই পার্ক করা ছিল। হয়তো সরিয়ে ফেলত কিন্তু, আমরা এত তাড়াতাড়ি রেইড করব, ব্যাটা বুঝতেই পারে নি।'

'আরে, মোটরবাইকটাই তো আমার ইস্কাপনের টেক্কা।' চিৎকার করে উঠলেন কন্দর্পনারায়ণ। তারপর বললেন— 'আপনি মোটরবাইকটার কাছে গিয়ে আমাকে ফোন করুন।'

প্রত্যুত্তরে মেহবুব বললেন, 'আমি একদম মোটরবাইকটার পাশেই আছি। সিজার লিস্ট রেডী করছি।'

কন্দর্পনারায়ণ গাড়ির সামনের সিটে, ড্রাইভারের পাশেই বসেছিলেন। মাঝের সিটে দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীল। মেহবুবের কথা শুনতে শুনতে কন্দর্পনারায়ণ উত্তেজনায় সোজা হয়ে বসলেন।

তারপর নির্দেশ দেবার ভঙ্গিতে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন— 'ভালো করে আমার কথা শুনুন। মোটরবাইকের সিটের কাছে দাঁড়িয়ে দেখুন, সিটের বাঁ পাশের দিকে, সিট কভারে, কোনো ছোট্ট ফুটো আছে কি না?'

ওপার থেকে মেহবুব বলে উঠলেন— 'এক্ষুণি দেখছি স্যার।'

মাঝের সিট থেকে দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীল সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছিলেন উত্তেজনায়— দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠলেন— 'স্যার, ব্যাপারটা কি?'

কন্দর্পনারায়ণ বাঁহাতে, কানে ফোন ধরা অবস্থাতেই বললেন— 'একটা মিসিং লিঙ্ক খুঁজছি রে— ঠিক লোকের বাড়িতেই পুলিশ রেইড করছে, কিন্তু, যেটা খুঁজছি, সেটা পেলেই খুনের সঙ্গে অপরাধীর লিঙ্কটা এস্টাবলিশ হবে।

কিন্তু ভয়ও করছে, যদি লিঙ্কটা না পাই?'

দ্বৈপায়ন ফিসফিস করে বললেন— 'লিঙ্কটা কী স্যার?'

ঠিক সেই সময় ফোনের ওপার থেকে মেহবুব আলমের চিৎকারটা শোনা গেল— 'স্যার, মোটরবাইকের সিটের মাঝামাঝি বাঁদিকে, একটু নিচে, নরম সিট কভারে একটা ছ্যাঁদা পেয়েছি স্যার।'

কন্দর্পনারায়ণ ফোনেই চিৎকার করে উঠলেন— 'হুরররে। এবার দেখুন তো ওই সিট কভারের মধ্যে কিছু আছে কিনা?'

কয়েক মুহূর্ত পর আবার মেহবুবের চিৎকার— 'স্যার গট ইট— গট ইট— একটা সোনায় বাঁধানো লাল পাথরের আংটি।'

এবার গাড়ির সিটে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে কন্দর্পনারায়ণ চোখ বুজে ফিসফিস করে বলে উঠলেন— 'লিঙ্ক এস্টাবলিশড... লিঙ্ক এস্টাবলিশড।' তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীলকে বললেন— 'আমি অন্যতম অপরাধীকে সাসপেক্ট করছিলাম, অনেক আগে থেকেই। কিন্তু আমি একজনকে দেখিয়ে 'এই যে, এই অপরাধী' বললেই তো আর কোর্ট মেনে নেবে না— অপরাধের ঘটনার সঙ্গে অপরাধীর লিঙ্কটাও দেখাতে হবে।'

তারপর শরীরটাকে একটু বাঁকিয়ে মাঝের সিটে বসে থাকা দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীলের দিকে ফিরে বললেন— 'আমার সন্দেহ হচ্ছিল আগে থেকেই। শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রে, ফ্রীজারের মধ্যে যখন আমি পঙ্কজবাবুর মৃতদেহটা আবিষ্কার করি তখনই দেখি, তাঁর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের নখটা বেশ খানিকটা লম্বা আর রীতিমতো ধারালো।

পুলিশ আসার আগেই আমি নখটা ভালো করে দেখতে গিয়ে লক্ষ্য করি নখের মধ্যে মানুষের চামড়া, রক্ত জাতীয় কিছু শুকিয়ে রয়েছে। আমি নিজে তো মোবাইলে ছবি তুলেই নিয়েছিলাম, তাছাড়াও পুলিশকে বলি, ওই 'নেইল ক্লিপিংস' বা নখের টুকরো নিয়ে ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠাতে। আমার বিশ্বাস ওই 'নেইল ক্লিপিং'-এ ওই অপরাধীর স্কিন, ব্লাড ইত্যাদি পাওয়া যাবে।'

একটু থেমে আবার বললেন— 'অপরাধীরা, অরুণা দেবীর মেয়ে আর নাতনিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, গ্রিলবিহীন জানালা পথে পঙ্কজবাবুর দেহটাকে বাইরে চালান করে। জানালার বাইরেও অপরাধীদের দলের লোক অপেক্ষা করছিল।

যে মোটা চাকার মোটরবাইকের চালকের সন্ধান করছিলাম, সেই সেদিন বাইক চালাচ্ছিল।

পঙ্কজবাবুকে মাঝখানে বসিয়ে তাকে পেছনদিক থেকে চেপে ধরে রেখেছিল অন্য কেউ।

মাঝরাস্তাতেই পঙ্কজবাবুর জ্ঞান ফিরে আসে। শরীরের প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আর আক্রোশে, নিজের বাঁ হাত দিয়ে পেছন ফিরে বসে থাকা চালকের ঘাড়টা টিপে ধরেন তিনি। তাতেই চালকের বাঁ দিকে গলা আর ঘাড়ের মাঝখানের অংশে গভীরভাবে নখ ঢুকে যায়। গতকাল দীঘার হোটেলে কোট-টাই পরা অবস্থায় ঘাড়ের ক্ষতটা বুঝতেই পারি নি, আজ সকাল সকাল পুলিশ রেইড করাতে ব্যাটা ক্ষতটা আর লুকোতে পারে নি।'

দ্বৈপায়ন, দম বন্ধ করা অবস্থায় ফিসফিসিয়ে জিগ্যেস করলেন— 'লোকটা কে স্যার?'

কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় না ঘুরিয়েই উত্তর দিলেন— 'দীঘার হোটেলের ম্যনেজার।'

খানিক পরে ইন্দ্রনীল প্রশ্ন করলেন— 'আর মোটরবাইকের সিটের মাঝামাঝি বাঁ দিকে নিচের অংশে কী পেলেন স্যার?'

কন্দর্পনারায়ণ আবার বলা শুরু করলেন— 'পঙ্কজবাবুর জ্ঞান হঠাৎ ফিরে আসতেই যে উনি আক্রমণ করবেন এটা মোটরবাইকের সওয়ারীরা কেউই ভাবে নি।

পঙ্কজবাবুকে চেপে ধরে যিনি পেছনে বসেছিলেন অর্থাৎ বাইক আরোহীদের তৃতীয় ব্যক্তি কোনোরকমে পঙ্কজবাবুর বাঁ হাত ম্যানেজারের ঘাড় থেকে ছাড়িয়ে আনতেই, পঙ্কজবাবু প্রবল আক্রোশে আর শারীরিক যন্ত্রণায় নিজের বাঁ হাতটার নখ ঢুকিয়ে দেন, নরম সিট কভারের মধ্যে। তারপর যখন ওনার বাঁ হাতটা সিটের মধ্যে থেকে ছাড়িয়ে আনা হয় তখন ওই ছেঁড়া সিটের নরম স্পঞ্জে আটকে যায়, ওনার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে থাকা সোনায় বাঁধানো আংটি।

সেদিন শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রের ফ্রীজারের ভেতরেই আমার নজরে পড়েছিল পঙ্কজবাবুর বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলের ফ্যাকাশে গোল দাগটা।'

দ্বৈপায়ন পেছন থেকে বলে উঠলেন— 'সেইজন্যই গত পরশু রাতে ডিনার করবার সময় আপনি অরুণা দেবীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, পঙ্কজবাবু কড়ে আঙুলে আংটি পরতেন কিনা?'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'অ্যাবসোলিউটলি কারেক্ট'।

দ্বৈপায়ন বললেন— 'কিন্তু ম্যানেজার তিন তিনটে খুন করল কেন স্যার? খুনের মোটিভ কি?'

কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'ম্যানেজারই খুন করেছে বা করিয়েছে আমি তো বলিনি—'

দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীল চমকে উঠলেন— 'তার মানে? ম্যানেজার খুনি নয়?'

কন্দর্পনারায়ণ হেসে বললেন— 'সেই যে— কান টানলে মাথা আসার মতো ব্যাপার। ম্যানেজার তো তার হোটেল ঘরটা খুনের কাজে ব্যবহার করতে দিয়েছিল তারপর সে তার বাইকে বসিয়ে পঙ্কজবাবুর দেহটা পাচার করেছিল।

মাঝপথে পঙ্কজবাবুর জ্ঞান ফিরে আসায় তাঁর মাথায় মেরে তাঁকে খুন করা হয়। আর সেটাও করে মোটরবাইকে বসে থাকা তিন নম্বর ব্যক্তি।'

কন্দর্পনারায়ণ থামতেই মেহবুব আলমের ফোন। কন্দর্পনারায়ণ ফোন ধরেই বললেন— 'আর দু ঘণ্টা পরেই আমরা সাঁতরাগাছি ক্রশ করে যাব। তারও এক ঘণ্টা পর আপনি সবাইকে জানাবেন যে অরুণা দেবীর হাজব্যান্ড বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক মৃন্ময় মিত্রের নিজের তৈরি ল্যাবরেটরিতে কিছু এভিডেন্স পাওয়া গেছে কাজেই কলকাতা পুলিশ আজ রাত্রেই ল্যাবরেটরিতে রেইড করবে।

বাই দি ওয়ে, আমরাও যে কলকাতায় চলে এসেছি এটা কেউ যেন না জানতে পারে। রিসর্টের ঘর যে আমরা ছেড়েছি এটা কেউ জানে না। ঘরের চাবিও, রিসেপশনে জমা দিই নি, আর রিসর্টের স্টাফেদের মধ্যে আমার ছেলে আছে। ওদেরও বলে এসেছি। ওরাও ব্যাপারটা লীক করবে না।'

ডক্টর মৃন্ময় মিত্রর ল্যাবরেটরি। কলকাতা

সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা নাগাদ, একটা ছায়ামূর্তি, নিশ্চুপে ল্যাবরেটরির দিকে এগিয়ে এল।

বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক মৃন্ময় মিত্রের ল্যাবরেটরিটা তাঁর বাড়ির পাঁচিল ঘেরা কম্পাউন্ডের মধ্যে হলেও একটু আলাদা। পুলিশ ঘরটা সিল করে দিয়ে গেছে।

ছায়ামূর্তিটা পকেট থেকে একটা ছোট্ট ইলেক্ট্রিক কড়াত বের করে দরজায় লাগানো তালার উপর ছোঁয়ালো— কুড়ড়ড় করে একটা চাপা আওয়াজ, তারপরই হড়াত করে তালা খুলে গেল।

লোকটা দরজাটা অল্প ফাঁক করে স্যুট করে ভেতরে ঢুকে এল। তারপর পকেট থেকে ছোট্ট টর্চ বের করে, তার আলোতে গোটা ঘর কী যেন দেখতে লাগল।

ঠিক সেই সময়ে, ডি. আইজি প্রদীপ মুখোপাধ্যায় সহ অন্য অফিসারদের নিয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে এলেন কন্দর্পনারায়ণ, সঙ্গে দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীল। কন্দর্পনারায়ণ বললেন— 'কী খুঁজছেন পলাশ বাবু? ঘরের আলোটা জ্বেলে নিন, খুঁজে পেতে সুবিধা হবে।' বলেই দরজার ডানদিকের সুইচ টিপে আলো জ্বালিয়ে দিলেন কন্দর্পনারায়ণ।

উজ্জ্বল আলোয় দেখা গেল, ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন, চেনা চেনা চেহারার একজন মানুষ। দ্বৈপায়ন চমকে উঠে বললেন, 'স্যার শিমূল রেহমান।'

কন্দর্পনারায়ণ হেসে বললেন— 'উঁহু, উনি শিমূল রেহমানের যমজ ভাই পলাশ রেহমান, প্রফেসর মৃন্ময় মিত্রের অত্যন্ত প্রিয় গবেষক ছাত্র।'

তারপরই এদিক ওদিক তাকিয়ে, ঘরে থাকা এসির দিকে তাকিয়ে বললেন— 'ঘরে বড্ড গরম পলাশবাবু। এসির সুইচটা অন করি?'

কন্দর্পনারায়ণ তাঁর কথা শেষ করতে না করতেই পলাশ রেহমান— 'না-আ আ' বলে, এসির সুইচের দিকে লাফিয়ে এলেন।

স্থানীয় থানার ও.সি. দুহাত বাড়িয়ে পলাশ রেহমানকে জাপটে ধরলেন।

সাত দিন পর

পূর্ব মেদিনীপুর আদালতে সেদিন থিকথিকে ভীড়।

পলাশ রেহমান তার যমজ ভাই শিমূল রেহমান, দীঘার হোটেলের ম্যানেজার সহ আরো তিনজনকে, কোর্টে প্রোডিউস করেছে পুলিশ।

অভিযুক্ত পক্ষের ল'ইয়ার বলতে শুরু করলেন—'ইয়োর অনার, কোনো 'আই উইটনেস' বা প্রত্যক্ষদর্শী নেই। অভিযোগ হল—দীঘার একটি হোটেলের ঘর থেকে মা ও মেয়ের মৃতদেহ পাওয়া যায়। যে হোটেল থেকে তাঁদের মৃতদেহ পাওয়া যায়, আমার মক্কেল, শিমূল রেহমান তার মালিক এবং সুজয় গিরি, সেই হোটেলেরই ম্যানেজার।

এই ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই দীঘা থেকে সামান্য দূরে, মন্দারমনির একটি পরিত্যক্ত জায়গার, পরিত্যক্ত দোকান ঘর থেকে, আর একটি মৃতদেহ পাওয়া যায়, যেটি ছিল, দীঘার ঐ হোটেল ঘর থেকে উদ্ধার করা মহিলার স্বামীর দেহ। ঘটনাচক্রে, সেই দোকানঘরটি আয়লার ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবে, সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হবার আগে, আমার মক্কেল শিমূল রেহমানই চালাতেন।

সেই ঘূর্ণিঝড়ে গোটা বাজার এলাকাটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সবাই সেই বাজারটিকে ছেড়ে, অন্যত্র সরে যান। আমার মক্কেল শিমূল রেহমানও তাঁর ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দোকানঘরটি ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিলেন।

দোকানটি পরিত্যক্ত। সেই দোকান থেকে, কোনো মৃতদেহ উদ্ধার হলেও আমার মক্কেল, দায়ী থাকছেন না।

একইভাবে দীঘাতে প্রচুর মানুষ বেড়াতে, ছুটি কাটাতে আসেন। তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে বহু বিচিত্র সমস্যা থাকে। কেউ মানসিক যন্ত্রণাতে আত্মহত্যা করেন। বেছে নেন, দীঘার হোটেলকে। আবার কেউ স্ত্রী-কন্যাকে, খুন করবার জন্যও বেছে নেন, দীঘা-মন্দারমনির মতো, নিরূপদ্রব জায়গাকে।

আমাদের আলোচ্য ঘটনাতেও তা-ই হয়েছিল, ইয়োর অনার। এই পরিবারের কর্তা, পঙ্কজবাবু, নিজের স্ত্রী-কন্যাকে খুন করে পালিয়ে গিয়েছিলেন, পরে অবশ্য নিজেই খুন হয়ে যান, খুনীরা তাঁর মৃতদেহটা লুকিয়ে রেখে যায়, মন্দারমণিতে, আমার মক্কেল শিমূল রেহমানের পরিত্যক্ত দোকান ঘরে।

আমার অপর মক্কেল, সুজয় গিরি, দীঘাতে শিমূল রেহমানের হোটেলের ম্যানেজার ছিলেন। তাঁকেও এই হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আর শিমূল রেহমানের ভাই পলাশ রেহমানকে অর্থাৎ আমার অন্য মক্কেলকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়েছে—তার কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ প্রসিকিউশনের কাছে নেই।

প্রসিকিউশনের আশ্চর্য যুক্তি হল, দীঘাতে এই খুনগুলো হবার অব্যবহিত আগেই নাকি কোলকাতায় কোনো একজন প্রোফেসর-বৈজ্ঞানিক খুন হয়ে যান। সেই খুনের সঙ্গে আমার অন্য মক্কেল পলাশ রেহমান জড়িত।

ইয়োর অনার, প্রসিকিউশনের আনা, এইরকম ধারহীন, যুক্তিহীন অভিযোগ আমি জীবনে দেখিনি।'

অভিযুক্তপক্ষের আইনজীবী এতক্ষণ একটানা বলে যাচ্ছিলেন।

কন্দর্পনারায়ণ শুনতে শুনতে আড়চোখে তাঁকে দেখে যাচ্ছিলেন। লোকটার ধারালো চেহারা। গালভাঙা, গালে দু-দিনের না কামানো দাড়ি। কে যেন বলেছিল ওনার নাম বিনয় পাত্র। এই এলাকার সেরা আর অত্যন্ত ধুরুদ্ধর উকিল। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা ছাড়িয়ে, আশপাশের জেলাগুলোতেও তাঁর অত্যন্ত নামডাক।

দীঘার একই হোটেলে, মা-মেয়ের মৃতদেহ উদ্ধার। তারপর মন্দারমনি থেকে আর একজনের মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায়, গোটা পূর্ব মেদিনীপুর জেলা জুড়ে বেশ চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তারপর শিমূল রেহমানের মতো, নামকরা হোটেল ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করায়, সারা দীঘা মন্দারমণি জুড়ে পুলিশের বিরুদ্ধে রীতিমতো সমালোচনার ঝড় বইছে।

বিনয় পাত্রের বলা শেষ হতেই কন্দর্পনারায়ণ উঠে দাঁড়ালেন। মাথা ঝুঁকিয়ে নমস্কার জানিয়ে জজসাহেবকে বললেন—'ইয়োর অনার, আমি এই মামলায়, ডিফ্যাকটো কমপ্লেইন্যান্ট বা অভিযোগ কারিনীর ল' ইয়ার। মাননীয় পি পি সাহেব, বলতে শুরু করবার আগে আমি কিছু বলতে চাই, যদি অনুমতি দেন।

জজ সাহেব, প্রবীণ মানুষ। কাঁচা-পাকা চুল, সামনে ঝুঁকে বসে, এতক্ষণ বিনয় পাত্রের বক্তব্য শুনছিলেন।

তিনি একেবারে, সামনের সারিতে, চেয়ারে বসে থাকা কন্দর্পনারায়ণকে অনেকক্ষণ ধরেই দেখছিলেন।

জজসাহেব সম্মতি দিতেই, কন্দর্পনারায়ণ স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে, পকেট থেকে একটা সাদা রুমাল বের করে, ঘষে ঘষে চশমার কাঁচ দুটো পরিস্কার করে, আবার যথাস্থানে পরে নিলেন।

তারপর অল্প গলা-খাঁকারি দিয়ে, গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে, তাঁর সওয়াল শুরু করলেন।

'ইয়োর অনার, আমি যদি আপনাকে বলি, নিউ দীঘার হোটেলের একতলার একটি ঘর থেকে, মা ও মেয়ের মৃতদেহ পাওয়া গেছে বলে এই মামলার সৃষ্টি হয়েছে তাহলে ভুল বলা হবে।

এই মামলার পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে রহস্য, টুইস্ট। অপরাধীরা অতি ধুরন্ধর। মুখোশধারী। সাধারণত: আমি নিজে অভিযুক্ত পক্ষের হয়েই মামলা করি, অর্থাৎ আমি নিজে একজন ডিফেন্স ল'ইয়ার। কিন্তু এই মামলায় অভিযোগকারিণী একজন অসহায়, মানুষ, যিনি, আমার কাছে, সাহায্য চাইতে আসেন—আমি, এই মামলার গুরুত্ব বুঝে, তাঁর হয়ে, মামলা লড়তে সম্মত হয়েছি।

আর একথাও ঠিক, যে, এই মামলায় স্থানীয় থানার পুলিশ দারুণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে, আসামীদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।

কন্দর্পনারায়ণ-এর বাঁ দিকের চেয়ারগুলোতে পরপর দ্বৈপায়ন, ইন্দ্রনীল, নাজির, সুপ্রীম, দেবর্ষি বসে রয়েছেন। কন্দর্পনারায়ণের কথা শুনে, দেবর্ষি উসখুস করে উঠে, সুপ্রীমের কানে কানে বললেন—'সুপ্রীম দা, স্যার পুলিশকে সব কৃতিত্ব দিচ্ছেন কেন? গোটা ঘটনাটা তো সলভ উনি একাই করলেন।'

সুপ্রীম অল্প হেসে বললেন—'গোয়েন্দাগিরি করে অপরাধীকে ধরেছি, বললে, আদালত তাতে গুরুত্ব দেন না, আদালত, গুরুত্ব দেন এভিডেন্স-কে। আর যাবতীয় এভিডেন্স জোগাড় করার দায়িত্ব ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির বা পুলিশের। এখানে পুলিশই স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী যাবতীয় এভিডেন্স জোগাড় করেছে।'

দেবর্ষি সুপ্রীমের কথায় খুশী হলেন না। ঠোঁট উল্টে বললেন, 'স্যার, এখানে মাথা না খাটালে, পুলিশের ক্ষমতা হত না, এত ধুরন্ধর অপরাধীকে ধরে।'

কন্দর্পনারায়ণ ততক্ষণে বলে চলেছেন—'ইয়োর অনার, কখনো কখনো মূল রহস্যের চাবিকাঠি থাকে, চোখের সামনেই। আমাদের চোখ যেন, সেই চাবিকাঠি, দেখেও দেখতে চায় না। এখানেও আমার প্রথমে সেই অবস্থাই হয়েছিল।

এই মামলার অভিযোগকারিণী, অরুণা মিত্র, আমার কাছে এসেছিলেন, তাঁর মেয়ে এবং নাতনীকে খুন করে জামাই ফেরার হয়েছেন, স্থানীয় পুলিশ, তদন্তে গুরুত্ব দিচ্ছে না—যতদিন যাচ্ছে, অপরাধীর ও আয়ত্তের বাইরে চলে যাবার সম্ভাবনা বাড়ছে, সে রাজ্যের বা দেশের বাইরেও চলে যেতে পারে। তাই আমি যেন হাইকোর্টে মামলা করে, তদন্তের ভার সি.আই.ডি বা সি.বি.আই—এর হাতে তুলে দিই—সেই অনুরোধ নিয়ে।

এরপরই মন্দারমনিতে একটা পরিত্যক্ত দোকানঘরের ভিতরে, অভিযোগকারিণীর জামাই পঙ্কজবাবুর মৃতদেহ একটা বড়ো ফ্রীজারে বরফের মধ্যে শায়িত অবস্থায় পাওয়া যায়।

আমার প্রথম সন্দেহটা হয় সেখানেই। প্রথমতঃ অপরাধী একাধিক হবার সম্ভাবনা বেশি। কারণ খুনগুলো দীঘার হোটেলে হলেও অরুণাদেবীর মেয়ে এবং নাতনীকে হোটেলের বিছানায় শুইয়ে রেখে, জামাই-এর মৃতদেহটাকে দীঘা থেকে মন্দারমনিতে নিয়ে এসে একটা পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে। নিশ্চয়ই একাধিক অপরাধী এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

দ্বিতীয়তঃ অপরাধী স্থানীয় এবং অতি অভাবশালী। প্রথম দিকে পুলিশ ও স্ত্রী-কন্যাকে খুন করে স্বামী ফেরার, এই তত্ত্বে সিলমোহর দেয়।

তৃতীয়তঃ অপরাধী অতিশয় ধুরন্ধর, সেইজন্যই সে অভিযোগকারিণীর মেয়ে ও নাতনীকে খুন করে, জামাই-য়ের উপর দায় চাপিয়ে দিতে দিয়েছিল, জানত, পুলিশ ও যদি একবার বিশ্বাস করে, স্বামী, স্ত্রী-কন্যাকে খুন করে ফেরার হয়েছে, তাহলে কিছুদিন পরেই কেস ধামাচাপা পড়বে, তারপর লুকিয়ে রাখা, পঙ্কজবাবুর দেহটাকে সময়-সুযোগ মতো বের করে, অন্য কোথাও ফেলে দিলে, বা বালির নিচে পুঁতে দিলেই ঝামেলা শেষ। ততদিনে মানুষের মন থেকে, এই ঘটনার স্মৃতি ফিকে হতে হতে মুছে যাবে, আর অরুণাদেবীও সবই অদৃষ্টের খেলা বলে, ভাগ্যকে দোষ দিতে দিতে হার মানবেন।

কিন্তু অপরাধীদের বিধি বাম, অরুণাদেবী এলেন আমার কাছে সাহায্য চাইতে, আর আমি কাজে নেমে পড়লাম।'

জজসাহেব এতক্ষণ আধশোয়া হয়ে, চেয়ার শরীরটা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুঁজে, কন্দর্পনারায়ণ-এর সওয়াল শুনছিলেন। এবারে, উঠে সামনে টেবিলের উপর দুটো কনুই-য়ের ভর রেখে, একটু ঝুঁকে বলে উঠলেন—'ইন্টারেস্টিং। তারপর?'

কন্দর্পনারায়ণ ও সোৎসাহে বলা শুরু করলেন—'এই মামলায় প্রথম টুইস্ট হোলো, পরিত্যক্ত দোকানের ফ্রীজারের মধ্য থেকে পঙ্কজবাবুর মৃতদেহ উদ্ধার। এটা ছিল অপরাধীদের গালে প্রথম থাপ্পড়।

পুলিশ যেমন 'সুরতহাল' করেছে, পাশাপাশি আমিও মৃতদেহটাকে না ছুঁয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম। কতগুলো ইন্টারেস্টিং ফীচার আমার চোখে পড়েছিল—এক মৃত পঙ্কজবাবুর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে একটা ফ্যাকাশে গোল দাগ। সাধারণত বহুদিন ধরে আঙুলে আংটি পড়ে থাকলে যেমন হয়। আমি অরুণাদেবীর কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, সত্যি সত্যি, তাঁর জামাই বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে একটা লাল পাথর বসানো সোনার আংটি পড়তেন।

আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, আংটিটা গেলো কোথায়? অরুণাদেবীর মেয়ে যদিও দীঘা যাবার আগে গয়না গাঁটি খুলে মা-কে দিয়ে গিয়েছিলেন, তবু তাঁর শরীরে, সামান্য যে সোনার হার, বা চুড়ি ইত্যাদি ছিল, সেগুলো বা টাকা পয়সা ইত্যাদি তো কিছুই অপরাধীরা নেয়নি। তাহলে, সোনার আংটিটাই বা কোথায় গেল? অর্থাৎ, অপরাধীরা টাকা-পয়সার লোভে খুন করলে তো, যাবতীয় মূল্যবান জিনিস এমনকী টাকা-পয়সাও নিয়ে যেতো। মোবাইল ফোনও ব্যাটারী খোলা অবস্থায় হোটেলের ঘর থেকে পাওয়া গেছে। অর্থাৎ অপরাধীরা সচেতন ভাবেই অরুণা দেবীর গোটা পরিবারকে শেষ করেছে।

আমার খটকা ছিলো, টাকা পয়সা, গয়না ইত্যাদির জন্য খুন না হয়ে থাকলে, সোনার আংটিটা কোথায় গেলো? সোনার আংটিটা খুঁজে পাওয়া গেলে, অপরাধীদের ধরাটা সহজ হবে।

দুই, মৃত পঙ্কজবাবুর, ঐ বাঁ হাতেই কড়ে আঙুলের নখটা বড়ো এবং ধারালো। নখে লাল রঙের নেইল পালিশ লাগানো আর, নেইল পালিশের খানিকটা যেন কাঁচা অবস্থাতেই ঘষা লেগে উঠে গিয়েছে।

অর্থাৎ যখন নেইল পালিশ লাগানো হচ্ছিল, তখনই এমন কিছু ঘটে, যার জন্য কাঁচা নেইল পালিশ, শুকিয়ে যাবার আগেই ঘষা লেগে উঠে যায়।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, যখন পঙ্কজবাবু, তাঁর স্ত্রী এবং কন্যা হোটেলের ঘরে সুন্দর সময় কাটাচ্ছিলেন, চার বছরের ফুটফুটে মেয়ে যখন বাবার আঙুলে নেইল পালিশ পরিয়ে দিচ্ছিলো, তখনই হোটেলের ঘরে এমন কিছু ঘটেছিলো, যার জন্য পঙ্কজবাবুর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের লম্বা নখে, সদ্য পরা নেইল পালিশ খানিকটা উঠে যায়।'

ঠিক এই সময়, অভিযুক্ত পক্ষের প্রবীণ ল'ইয়ার বিনয় পাত্র উঠে দাঁড়ালেন। মুখটা বাঁকিয়ে, কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে ইঙ্গিত করে বলতে শুরু করলেন—'হুজুর, বলি হচ্ছেটা কী? আমরা কী কোনো সিরিয়ালের গল্প শুনছি? অভিযোগকারিণীর ল'ইয়ার তো গল্প ফেঁদে বসেছেন দেখছি। আমার মক্কেলরা জেলে বসে রয়েছেন। তাঁরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, নামকরা মানুষ, আর আপনি এতক্ষণ ধরে, ওনার মুখ থেকে নাটুকে কথাবার্তা শুনছেন?

জজসাহেব বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন—'আপনার মক্কেলরা জেলে আছেন একথা যেমন ঠিকই, তেমনি একথাও ঠিক যে, অভিযোগকারিণী, তার নিজের পরিবারের চারজনকে হারিয়েছেন। আমি যদি অভিযুক্তপক্ষকে জাস্টিস দিই, তাহলে আমাকে দেখতে হবে অভিযোগকারিণীও যেন জাস্টিস পান।'

কথা শেষ করে, সামনে টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়লেন জজসাহেব। তারপর, বিনয় পাত্রের দিকে, সরাসরি আঙুল তুলে বলতে লাগলেন—'আমি এখানে সব পক্ষের সঙ্গে ন্যায় করব বলেই বসে আছি। আর ন্যায় দেবার জন্য আমি একটা মামলা বহুক্ষণ ধরে শুনতে পারি। সেটাই আমার কাজ।'

জজসাহেব ইঙ্গিতে কন্দর্পনারায়ণকে নিজের সওয়াল শুরু করতে নির্দেশ দিলেন।

'হ্যাঁ ইয়োর অনার, যে কথা বলছিলাম, তিন নম্বর পয়েন্ট হোলো পঙ্কজবাবুর বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলের নখটা আমি খুব কাছ থেকে দেখতে গিয়ে দেখি, নখের মধ্যে সূক্ষ্মভাবে লেগে রয়েছে, কিছু চামড়া ও রক্ত।

আমি এই খুনের ঘটনাগুলোর তদন্তকারী অফিসার ফটিক পাহাড়ীকে, নখের ভিতরে জমে থাকা, চামড়া আর রক্তের অংশকে দেখিয়ে বলেছিলাম, 'নেইল ক্লিপিংস' বা নখের টুকরোগুলোকে ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠাতে এবং অপরাধীদের চামড়া ও রক্তের ডি.এন.এ টেস্ট করিয়ে তার সাথে ম্যাচ করাতে।

প্রথমে আমি অপরাধী কে বা কারা, সেই সম্পর্কে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম। তবে দীঘার হোটেলের ম্যানেজারকে আমি প্রথম থেকেই সন্দেহ করলেও কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না, কারণ আগাগোড়াই আমাদের সামনে তিনি সুটেড বুটেড হয়ে ছিলেন, অবশেষে পুলিশ যেদিন ম্যানেজারের বাড়িতে রেইড করলো, সেদিনই সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল, লুঙ্গি পরে, খালি গায়ে, তখনই তার ঘাড়ের কাছে দেখা গেল গভীর ক্ষত। আমার ধারণা, ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির রিপোর্টে, পঙ্কজবাবুর, নখে লেগে থাকা, চামড়া আর রক্তের ডি. এন. এ প্রোফাইল, ম্যানেজারের চামড়া আর রক্তের ডি.এন.এ প্রোফাইলের সঙ্গে ম্যাচ করে যাবে।'

বলেই কন্দর্পনারায়ণ, পাশে বসে থাকা, সরকারি আইনজীবীর দিকে সম্মতি চেয়ে তাকালেন।

সরকারি আইনজীবী তক্ষুনি, উঠে দাঁড়িয়ে, মাথা ঝুঁকিয়ে জজসাহেবকে জানালেন যে, পঙ্কজবাবুর 'নেইল ক্লিপিংস' এর থেকে পাওয়া চামড়া ও রক্তের নমুনার সঙ্গে, ম্যানেজারের শরীরের চামড়া ও রক্তের নমুনাও ফরেন্সিক টেস্টের জন্য পাঠানো হয়েছে, তবে রিপোর্ট এখনো আসেনি।

কিন্তু এরই মধ্যে একটা অগ্রগতি হয়েছে, ম্যানেজারকে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে, বয়ান দেবার জন্য পাঠানো হয়েছিল। ম্যানেজার ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বয়ানে, অন্য অপরাধীদের নাম যেমন বলেছে, তেমনি খুনের ঘটনাগুলোয় নিজের জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করে নিয়েছে।'

সঙ্গে সঙ্গে কন্দর্পনারায়ণ সামনে থাকা টেবিলে, হালকা চাপড় মেরে বলে উঠলেন, 'ইয়োর অনার, 'দিস ওয়জ দি মিসিং লিঙ্ক।'

কন্দর্পনারায়ণ বলে চললেন— 'শুধু তাই নয়, মন্দারমনিতে শিমূল রেহমানের পরিত্যক্ত দোকানের পেছনের বালির উপর যে মোটরবাইকের বিশেষ চওড়া টায়ারের ছাপ দেখা গিয়েছিল, সেই ছাপই আবার দেখা যায়, দীঘার হোটেলের একতলায়, যে ঘরে পঙ্কজবাবুরা ছিলেন, সেই ঘরের স্লাইডিং উইনডোর ঠিক বাইরে, যেখানে গলির মধ্যে হোটেলের অন্য স্টাফেরাও সাইকেল, মোটরবাইক দাঁড় করিয়ে রাখে, এবং জায়গাটা তেল, মোবিল ইত্যাদি পড়ে পড়ে বেশ তৈলাক্ত হয়ে রয়েছে, সেই তেলতেলে জায়গার উপরেও স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল, মোটর বাইকের চওড়া বিশেষ গ্রিপের টায়ারের ছাপ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, ঐরকম চওড়া টায়ারের দামী মোটর বাইক, গোটা দীঘা মন্দারমনিতে একজনই চালান। তিনি দীঘার ঐ হোটেলের ম্যানেজার।

তবে, ইয়োর অনার, তিন তিনটে খুনের তো একটা মোটিভ থাকতে হবে। স্বামী, স্ত্রী, এমনকী দুধের বাচ্চাটাকেও খুন করল খুনীরা—কিন্তু কেন?

শুধুমাত্র পঙ্কজবাবু, খুন হলে, ধরে নেওয়া যেত, যে তাঁদের সঙ্গে, কারো শত্রুতা রয়েছে, এবং শত্রুতা বশতঃ পঙ্কজবাবু, খুন হয়েছেন।

কিন্তু, যখন পুরো পরিবারটাকে শেষ করে দেওয়া হয়, তখন অন্যরকমভাবে ভাবতে হয় বৈকি।

এই 'অন্যরকমভাবে' ভাবতে গিয়েই মনে হল, যে, এই তিনটে খুনের সঙ্গে কলকাতায় নিজের ল্যাবরেটরির অফিসঘরে খুন হয়ে যাওয়া, ডক্টর মিত্রের খুন হবার কোনো 'কানেকশন' নেই তো? অভিযোগকারিণী অরুণা দেবীকে জিগ্যেস করে জানা গেল, যে, সাধারণত তিনি এবং তাঁর স্বামী বৈজ্ঞানিক মৃন্ময় মিত্র, বিকেলের চা নাকি একসঙ্গে ল্যাবরেটরিতে, অফিস ঘরের টেবিলে বসে গল্প করতে করতে খেতেন—বহুদিনের অভ্যেস।

ডক্টর মিত্র, দুপুরের লাঞ্চ করে, ল্যাবরেটরিতে ঢুকতেন, বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন, তারপর বিকেল পাঁচটা নাগাদ দুপুরের ঘুম থেকে উঠে, অরুণা দেবী, তিন কাপ চা, ট্রে-তে সাজিয়ে, ল্যাবরেটরিতে ঢুকতেন। তারপর একসঙ্গে তিনজনে অফিসঘরে বসে চা খেতেন আর গল্প গুজব করতেন।'

জজসাহেব এতক্ষণ যেন কন্দর্পনারায়ণ-এর কথায় ডুবেছিলেন। ঠিক এইখানে কন্দর্পনারায়ণকে হাত তুলে থামিয়ে জিগ্যেস করলেন— 'তিন কাপ চা? তিনজন? কেন? অভিযোগকারিণী, নিজের ও ডক্টর মিত্রের জন্য চা করে নিয়ে যেতেন। সে তো বুঝলাম, কিন্তু এই তৃতীয় ব্যক্তিটি কে?'

পকেট থেকে রুমাল বের করে, মুখের, কপালের আর ঘাড়ের ঘাম মুছে নিয়ে, রহস্যের হাসি হেসে কন্দর্পনারায়ণ বললেন—'সে কথাতেই আসছি ইয়োর অনার। এই তৃতীয় ব্যক্তিটিও অ্যারেস্ট হয়েছে, মূল অপরাধী।

অরুণা দেবী আমাকে বলেছিলেন, ওইদিন, তাঁর শরীর ভালো না থাকায়, তিনি আর, ল্যাবরেটরিতে চা নিয়ে যাননি, বা চায়ের আড্ডাতেও বসেননি। কাজের মহিলাটি, ল্যাবরেটরির অফিস ঘরের দরজা, বাইরে থেকে ধাক্কা দিয়ে খুলে, টেবিলের ওপর চা, প্লেট দিয়ে ঢাকা দিয়ে, দরজা আবার টেনে আবার বন্ধ করে চলে আসেন, তখন, ডক্টর মিত্র, অন্য ঘরে একাই ছিলেন।

তার কিছু পরেই, ল্যাবরেটরির অফিস ঘরের মেঝেতে, ডক্টর মিত্রকে মৃত অবস্থাতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। চা তিনি মুখেও দেননি। প্লেট দিয়ে ঢাকা দেওয়া অবস্থাতেই রাখা ছিল।

ঘটনাচক্রে, সেদিন, হঠাৎ করেই শরীর খারাপ লাগায়, অরুণাদেবী, অফিস ঘরে, চা খেতে যাননি। গেলেই হয়তো, তিনিও মারা যেতেন।

আমি ভাবতে লাগলাম, যে, এমন কী কারণ থাকতে পারে, যাতে করে, পুরো পরিবারটাকে শেষ করতে হবে? এবং তাতে কার লাভ অর্থাৎ, এই পুরো পরিবারটাকে শেষ করে দিলে, কে সবচেয়ে লাভবান হবে?

অবশেষে এবং বুঝতে পারলাম, ডক্টর মিত্রর অস্বাভাবিক মৃত্যু, অরুণাদেবীর মেয়ে ও নাতনীর দীঘার হোটেলে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকা এবং পঙ্কজবাবুর মৃত্যু আসলে এক সুতোয় গাঁথা—পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।

অরুণাদেবীর মেয়ে ও নাতনির মৃতদেহ বিছানার ওপর শুইয়ে রেখে, খুনীরা যখন, হোটেলের ঘরের জানালা দিয়ে পঙ্কজবাবুর অচৈতন্য দেহটাকে মৃত ভেবে, মোটর সাইকেলে, দুজন আরোহীর মাঝখানে বসিয়ে, পাচার করছিল, তখনই তাঁর জ্ঞান ফিরে আসে, তিনি প্রচণ্ড আক্রোশে, সামনে বসে থাকা ব্যক্তির অর্থাৎ চালকের পেছন দিক দিয়ে তাঁর বাঁ দিকের ঘাড় ও গলার মাঝামাঝি, তাঁর ধারালো নখ ঢুকিয়ে দেন, চালক অর্থাৎ, আমাদের ম্যানেজারবাবু যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠতেই, পঙ্কজবাবুর পেছনে বসে থাকা লোকটি পেছনদিক থেকে ভারী কিছু দিয়ে পঙ্কজবাবুর মাথায় আঘাত করেন, পঙ্কজবাবু, ম্যানেজারকে ছেড়ে দেন।

ফের জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে ফেলতে পঙ্কজবাবু যন্ত্রণায়, ক্রোধে, তাঁর বাঁ হাতের কড়ে আঙুলটা ঢুকিয়ে দেন যে সিটে তিনি বসেছিলেন, সেই সিটের নরম স্পঞ্জের গদির মধ্যে। জোর করে তাঁর বাঁ হাতের আঙুলটা টেনে বের করা হলেও, আঙুলের আঙটিটা সিটের স্পঞ্জের মধ্যে আটকে যায়।

পুলিশ মোটর সাইকেলের স্পঞ্জের ভিতর থেকে পঙ্কজবাবুর একমাত্র খোয়া যাওয়া বস্তু, অর্থাৎ সোনার আংটিটা রিকভার করেছে।

অর্থাৎ, আমাদের দ্বিতীয় মিসিং লিঙ্ক।

এইবার আসি, পর পর ঘটে যাওয়া খুনগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে, অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশে।'

'মোডাস অপারেন্ডি' অথাৎ 'মোডস অফ অপারেশন,' বা অপরাধ ঘটানোর ধরন বা পদ্ধতিতে।

একই পরিবারের পর পর চারজন খুন। তাদের মধ্যে, ডক্টর মিত্র, তাঁর মেয়ে ও নাতনিকে হত্যার ধরণ এক—শরীরে কোনো ইনজুরি নেই। অথচ শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু। যেন ঘুমোচ্ছেন। অ্যাসফিক্সিয়া।

পঙ্কজবাবুর ও লাংসের নব্বই শতাংশ ব্লকড কিন্তু মাথার পেছনে ইনজুরির অংশটুকু বাদ দিলে, সবার ক্ষেত্রেই 'মোডাস অপারেন্ডি' কিন্তু একই।

আমি ভাবতে লাগলাম, সবারই মৃত্যুর ধরন একরকম কেন? অ্যাসফিক্সিয়া, অথচ জলে ডুবে মৃত্যু নয়, গলায় ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যু নয়, মুখে বালিশ চাপা দিয়ে মৃত্যুও নয়। ইয়োর অনার, মনে রাখতে হবে। গলায় ফাঁস লাগিয়ে মৃত্যু বা মুখে বালিশ চাপা দিয়ে মৃত্যুর ঘটনা হলে, ঘরে ধ্বস্তাধ্বস্তির চিহ্ন থাকত। অথচ ডক্টর মিত্র বা তাঁর মেয়ে ও নাতনী—কারো ক্ষেত্রে, ঘরে ধ্বস্তাধ্বস্তির চিহ্ন বা ঘর লন্ডভন্ড ছিল না। তাহলে? তখন আমার মাথায় আসে ডক্টর মিত্রর ল্যাবরেটরি বা দীঘার হোটেলের ঘর, দুটি ক্ষেত্রেই, ঘরে কোনোরকম গ্যাস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়নি তো?

আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ডক্টর মিত্রের প্রিয় ছাত্রের কথা—যিনি, ডক্টর মিত্রের গবেষণাগারে কাজ করতেন। রোজ বিকেলে, ডক্টর মিত্র ও মিসেস মিত্রের সঙ্গে চা খেতেন। অথচ, যেদিন, ডক্টর মিত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে, সেদিন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গিয়েছিলেন, অরুণা মিত্র ও ডক্টর মিত্রর সঙ্গে চা, না খেয়েই। কেন?

আমি, এই বিশেষ ছাত্রটির সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, যে তিনি, স্কুল অফ কেমিক্যাল সায়েন্সেস, ইলিনয়-এর কৃতী ছাত্র ছিলেন। ওখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেমিক্যাল ফর্মুলা চুরির দায়ে, তাঁকে বহিস্কার করা হয়। এবং তিনি কী নিয়ে কাজ করছিলেন জানেন? লীথাল গ্যাস। অর্থাৎ মানুষের শরীরে, বিভিন্ন গ্যাসের ক্ষতিকারক প্রভাব নিয়ে।'

থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। চোখ তুলে সোজা তাকালেন. জজসাহেবের দিকে। বুঝবার চেষ্টা করলেন, জজসাহেব তাঁর কথা শুনছেন তো?

গালে হাত দিয়ে এক মনে কন্দর্পনারায়ণ-এর বক্তব্য শুনছিলেন জজসাহেব, কোনো কথা না বলে চোখ দিয়ে ইশারা করে, কন্দর্পনারায়ণকে সওয়াল চালিয়ে যেতে বললেন।

খুশী হয়ে কন্দর্পনারায়ণ আবার শুরু করলেন—'ইয়োর অনার, আমরা বিভিন্ন ধরনের গ্যাসের প্রভাবের কথা শুনেছি—একটি নাম তো আমাদের বেশ পরিচিত—'মিথাইল আইসোসায়ানাইট' বা 'মিক' গ্যাস। ভূপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির সময়, এই গ্যাস লিক করেই প্রচুর মানুষ মারা গেছিলেন। তবে, এই গ্যাসের বৈশিষ্ট্য হল, এই গ্যাসে সঙ্গে সঙ্গে মানুষ মারা যান না। ভুপালেও তাই হয়েছিল 'গ্যাস লিক হয়েছে' বুঝতে পেরে, মানুষ বাইরে বেরিয়ে আসেন, এবং পরে রাস্তাতেই মারা যান। অর্থাৎ কোনো মানুষ যদি বোঝে, ঘরে কোনো কারণে গ্যাস লিক করেছে, তাহলে তো ছিটকে বাইরে বেরোবার চেষ্টা করবে।

আমি আমারই ছোটোবেলার বন্ধু, নামকরা কেমিস্ট সৌম্যজ্যোতি ঘোষের সাহায্য নিলাম। সৌম্যজ্যোতি আমাকে বোঝালেন—

'অনেক গ্যাসের মধ্যেই মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাব বা 'টক্সিক ইফেক্ট' থাকে। তার মধ্যে কিছু কিছু 'হাইলি লীথাল', 'ডেডলি'। আবার কিছু কিছু গ্যাস পরস্পর, মিশিয়ে আরও ভয়ংকর প্রভাবসম্পন্ন গ্যাস তৈরি করা যায়। যারা 'গ্যাস' নিয়ে হায়ার স্টাডি করেছেন, বা করেন, তাঁদের কাছে এটা সম্ভব।'

'মিথাইল আইসোসায়ানাইট' বা 'মিক' গ্যাস একটা ক্ষতিকারক গ্যাস হলেও এই গ্যাসের প্রভাবে, মানুষ কাশবে, দম বন্ধ হয়ে যাবে, ও বাঁচবার তাগিদে দৌড়োদৌড়ি করবে। আবার ক্লোরিন, ফসজেন ও মাস্টার্ড গ্যাস, সাধারণত বড় বড় যুদ্ধগুলিতে 'বিষ গ্যাস' হিসেবে ব্যবহার করা হয়—এর প্রভাবে মানুষের চামড়ায় ভয়ংকর যন্ত্রণাদায়ক জ্বলন তৈরি হয়—তবু এই গ্যাসের প্রভাবেও মানুষ দৌড়োদৌড়ি করবে। শরীরে চামড়ায় গ্যাসের প্রভাবে পোড়া ক্ষত তৈরি হবে যা, ডক্টর মিত্র বা তাঁর মেয়ে জামাই ও নাতনীর শরীরে ছিল না।

কিছু কিছু গ্যাসে আবার বিশ্রী গন্ধ থাকে—যা থেকে সতর্ক হওয়া যায়। যেমন—হাইড্রোজেন সালফাইড, যেখানে পচা ডিমের গন্ধ পাওয়া যায়। তবে কার্বণ মনোক্সাইড কিন্তু টেস্টলেস, ওডোরলেস, কালার লেস, অর্থাৎ স্বাদ, গন্ধ বা রংবিহীন, নাইট্রোজেন গ্যাসও রংবিহীন।

অর্থাৎ কলকাতায় ডক্টর মিত্রের ল্যাবরেটরিতে এবং দীঘার হোটেলের ঘরে, এমন মারাত্মক কোনো গ্যাস ঢুকিয়ে দিয়ে ঘরটাকে গ্যাস চেম্বারে পরিণত করা হয়েছিল।

এবার প্রশ্ন হল কীভাবে? এবং তার এভিডেন্স কোথায়? আমার বন্ধু সৌম্যজ্যোতি আমাকে বুঝিয়েছিলেন যে, সাধারণভাবে, মানুষ ঘরে বিষগ্যাসের উপস্থিতির কথা টের পেলে, ছুটে বাইরে বেরোতে চেষ্টা করবেই।

দুটি ক্ষেত্রেই ঘর অনেকক্ষণ বন্ধ অবস্থায় ছিল বলে, ঘরের মধ্যে 'অক্সিজেন লেভেল ফল' করেছিল। তার মধ্যে বিষ গ্যাসের আক্রমণ। আর দুটি ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা স্বীকার করেছে, ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কাজেই ডক্টর মিত্র বা তাঁর মেয়ে জামাই-নাতনী ঘরের মধ্যের বিষ গ্যাসের উপস্থিতি টের পাবার পর হয়তো 'রি-অ্যাক্ট' করবার সময়ই পাননি। বা পেলেও হয়তো বাইরে যাবার দরজা টানাটানি করেও খুলতে পারেননি। আস্তে আস্তে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

মাঝখানে দীঘার হোটেলের ঘর থেকে পঙ্কজবাবুকে মৃত মনে করে, মোটরবাইকে চাপিয়ে ট্রান্সফার করবার সময়, তাঁর 'সেন্স' হঠাৎ ফিরে এলে, তিনি তাঁর বাঁ হাতের নখ, পেছনদিক থেকে, চালকের গলায় ঢুকিয়ে দিলেও, তাঁকে পেছনদিক থেকে মাথায় মেরে, খুন করা হয়।

থামলেন কন্দর্পনারায়ণ, একটু থেকে আবার বললেন— 'বাই দি ওয়ে, যে অস্ত্র দিয়ে পঙ্কজবাবুর মাথায় বাড়ি মেরে তাঁকে হত্যা করা হয়, সেটিও উদ্ধার করা হয়েছে, ফোরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে।' আবার থামলেন কন্দর্পনারায়ণ।

তারপর ধীরে ধীরে পরিষ্কার উচ্চারণ বললেন—'অস্ত্রটা আর কিছুই নয়। একটা হেলমেট। যিনি মোটর বাইকের পেছনে বসে পঙ্কজবাবুকে পেছন দিক থেকে জাপটে ধরেছিলেন, তাঁর মাথায় পরা ছিল। পঙ্কজবাবুকে হঠাৎ জ্ঞান ফিরে পেয়ে, চালকের আসনে বসে থাকা হোটেল ম্যানেজারকে আক্রমণ করতে দেখে, পেছনে বসে থাকা ব্যক্তি, নিজের মাথার হেলমেট খুলে, পর পর আঘাত করতে থাকেন, পঙ্কজবাবুর মাথার পেছনের অংশে। পঙ্কজবাবু আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, সম্ভবত সে জ্ঞান আর ফিরে আসেনি, পোস্টমর্টেমে পঙ্কজবাবুর মাথার পেছনে 'ব্লান্ট ওয়েপন' দিয়ে আঘাত করার ফলে, একাধিক ইনজুরি পাওয়া গিয়েছে। সেটির আঘাতেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে পঙ্কজবাবুর মৃত্যু হয়েছে।'

জজসাহেব এবার মুখ খুললেন—'একটা ব্যাপারে আমাকে একটু পরিষ্কার করুন—ঘরের মধ্যে গ্যাস ঢুকিয়ে মারা হয়েছে, বুঝলাম, কিন্তু কিভাবে?'

কন্দর্পনারায়ণ-এর মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো—'প্রথম সন্দেহটা হয় দীঘার হোটেলের ঘরে মৃতদেহ গুলির সুরতহাল রিপোর্ট' আর 'পোস্ট মর্টেম' রিপোর্ট দেখে এবং ঘটনার তদন্তকারী অফিসার ফটিক পাহাড়ীর কাছ থেকে ঘটনাস্থলের ছবিগুলি দেখে।

প্রথমত: মিসেস মিত্রের মেয়ে ও নাতনীর শরীরে কোনো ইনজুরি ছিল না।

দ্বিতীয়ত: ঘরে ধ্বস্তাধ্বস্তির চিহ্নমাত্র ছিল না।

তৃতীয়ত: ঘরে একটা ঢাকনা খোলা লাল রঙের নেইল পালিশের বোতল পাওয়া যায়। মিসেস মিত্রের নাতনী হোটেলের ঘরে ঢূকে নেইল পালিশের বোতল খুলে আগে নিজের নখে নেইল পালিশ লাগায়, তারপর বাবার বাঁ-হাতের কড়ে আঙুল নেইল পালিশ পরিয়ে দিচ্ছিল।

ঠিক সেইসময় ঘটে ঘটনাটা। ঘরে উপস্থিত তিনজনের কেউ একজন এসি চালিয়ে দেন, আগে থেকেই এসির কমপ্রেসরের মধ্যে ভয়ংকর বিষ গ্যাস ভরা ছিল, এসি অন করার সঙ্গে সঙ্গে গোটা ঘর বিষ গ্যাসে ভরে যায়।

হোটেলের ঘর আগে থেকে বন্ধ থাকার জন্য, অক্সিজেন লেভেল কম ছিল। এসির ভেন্টের মধ্যে দিয়ে ঢোকা বিষ গ্যাস, ঘরের মধ্যে ডেডলি কম্বিনেশনের কাজ করে।

ঘরে বিষ গ্যাস ঢুকছে, বুঝতে পেরেই পঙ্কজবাবু লাফ দিয়ে, খাট থেকে নেমে দরজা খুলতে যান, তখনই মিসেস মিত্রর নাতনীর হাত থেকে নেইল পালিশের খোলা বোতল ছিটকে খাটের তলায় ঢুকে যায়। হাত থেকে নেইল পালিশের বোতল পড়ে যাওয়ায় হোটেলের ঘরের মেঝেতেও খোলামুখ থেকে নেইল পালিশ চলকে পড়ে যাওয়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে।

হোটেলের ঘরের পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে পরিষ্কার ধারণা জন্মায়, ঘরের মধ্যে হঠাৎ কিছু ঘটেছে বলেই, ঘরের সদস্যরা রিঅ্যাক্ট করবার সময়ও পাননি।

পরে অপরাধীরা দরজা খুলে ঘরে ঢোকে, মিসেস মিত্রর মেয়ে ও নাতনীকে খাটের উপর শুইয়ে দিয়ে, তারা পঙ্কজবাবুকে মৃত ভেবে, তাঁর দেহ গ্রীলবিহীন স্লাইডিং উইনডোর ফাঁক দিয়ে, হোটেলের ঘর সংলগ্ন সরু গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা, মোটরবাইকে চাপিয়ে পাচার করে।

মন্দারমনিতে পরিত্যক্ত দোকানের ফ্রীজে পঙ্কজবাবু মৃতদেহের বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলের নখের নেইল পালিশ ঘষা লেগে খানিকটা উঠে গেছে, দেখেই আমি বুঝি, যে, যখন তাঁর আঙুলের নেইল পালিশ টাটকা ও কাঁচা ছিল, তখনই অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ঘটে থাকবে।

একইভাবে, কলকাতাতেও ঘটনার দিন, ডক্টর মিত্রকে হত্যার ছক সম্পূর্ণ সাজিয়ে, অর্থাৎ ল্যাবরেটরির অফিস ঘরের এসি-র মধ্যে বিষ গ্যাস ঢুকিয়ে দিয়ে, হত্যাকারী তাড়াতাড়ি ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে যায়।

ডক্টর মিত্র, চা খাবেন বলে, অফিস ঘরে এসে, রিমোট কন্ট্রোলে, এসির সুইচ অন করতেই, ভেন্টের মধ্য দিয়ে সারা ঘর বিষ গ্যাসে ভরে যায়। বয়সের কারণে ডক্টর মিত্রের হৃদযন্ত্র বা ফুসফুস কোনোটাই ভালো কাজ করছিল না, অফিস ঘরে বিষ গ্যাস আছে, বুঝে উঠেও হয়তো রিঅ্যাক্ট করবার সময়ই পাননি।

অথবা ডক্টর মিত্রও হয়তো, ঘরে বিষ-গ্যাস আছে বুঝতে পেরে, দরজা খুলে বাইরে বেরোবার চেষ্টা করেছিলেন, ধূর্ত অপরাধী বাইরে থেকে ছিটকিনি বন্ধ করে, ডক্টর মিত্রর বেরোবার পথ বন্ধ করে দিয়ে কাছাকাছিই অপেক্ষা করছিল। নির্দিষ্ট সময় পরে, 'অপারেশন সাকসেসফুল' হয়েছে বুঝেই বাইরের ছিটকিনি, আবার খুলে সাধারণ অবস্থায় এনে পালিয়ে যায়।

ঘটনাচক্রে সেদিন, মিসেস মিত্র ঐ ঘরে না যাওয়াতে প্রাণে বাঁচেন।'

একটানা এতক্ষণ কথা বলে, থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। গোটা কোর্টরুম নিস্তব্ধ। শুধু মাথার ওপর, পুরোনো ফ্যানটার থেকে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ আসছে।

কন্দর্পনারায়ণ জোরে দম নিয়ে আবার শুরু করলেন—'আপনি তো সবই জানেন ইয়োর অনার, যেসব হত্যার ঘটনায় 'আই উইটনেশ' বা প্রত্যক্ষদর্শী থাকে না, সেখানে 'সারকমস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স' বা 'পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণাদি'র ওপর নির্ভর করে আমাদের এগোতে হয়। আর এই ধরনের কেসে 'মোটিভ' গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।'

আবার থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। তারপর একটু হেসে আবার বলতে শুরু করলেন—'ইয়োর অনার, এই গোটা মামলায়, মোটিভ বার বার বদলেছে। যখন ডক্টর মিত্রর মৃতদেহ, তাঁর ল্যাবরেটরি ঘরের মেঝে থেকে উদ্ধার হয়, তখন খুনের 'মোটিভ' একরকম। দীঘার হোটেলের ঘর থেকে, ডক্টর মিত্র ও অরুণা দেবীর মেয়ে ও নাতনির মৃতদেহ আবিষ্কার করা মাত্র 'মোটিভ' বদলে যায়।

সবশেষে, মন্দারমণিতে, পরিত্যক্ত দোকানঘর থেকে ডক্টর মিত্র ও অরুণাদেবীর জামাই পঙ্কজবাবুর মৃতদেহ আবিষ্কার হবার পর পুরো ছবিটাই বদলে যায়।

এইখানে, আমার বলতে দ্বিধা নেই যে, কয়েকবার আমার সন্দেহের তীর অরুণাদেবীর দিকেও যায়নি, তা, কিন্তু নয়। কিন্তু, যখন আমি জানতে পারলাম যে, ডক্টর মিত্র, যেদিন, মারা যান, সেদিন, মিসেস মিত্রর ও ওই ঘরেই চা-খেতে যাবার কথা ছিল, তিনি জাননি, হঠাৎ শরীর খারাপ লাগায়, গেলে হয়তো তাঁরও ডক্টর মিত্রের দশা হত, তখনই, আমার চোখের সামনে একটা বন্ধ দরজা খুলে গেল, অথচ, এই দরজাটাকে, আমি দেখতেই পাচ্ছিলাম না!

অনেকক্ষণ কথা বলে বলে কন্দর্পনারায়ণের গলা শুকিয়ে গেছে। একটু থেমে, জিভ দিয়ে চেটে, ঠোঁটটা ভিজিয়ে নিয়ে আবার বলা শুরু করলেন—'যে কথা তখন বলছিলাম, ইয়োর অনার, মোটিভ পার্ট নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমি ভাবতে থাকি, পুরো পরিবারটাকে শেষ করে দিলে, কার লাভ সবচেয়ে বেশি। ঘটনাচক্রে, মিসেস মিত্র, প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন, নাহলে, তারও হয়তো, ডক্টর মিত্রর দশা হত।

তবে এটাও ঠিক, এতগুলো খুন ঠিক কীভাবে করা হোলো, প্রথমে আমি ধরতেই পারছিলাম না। শিমূল রেহমানের দোকানের ফ্রীজারটা সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গিয়েছিল কিনা বা কোন মেকানিক সেটা সারিয়েছে, সেই ব্যাপার খোঁজ করতে করতে কাঁথির একটা এসি, টিভি, ফ্রীজ সারাইয়ের দোকানে ঢুকি। সেই দোকানের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে, আমার চোখ খুলে যায়, আমি বুঝতে পারি, এসি-র গ্যাস ভরার জায়গা দিয়ে, বিষ গ্যাস ভরে ভেন্টের মধ্য দিয়ে তা ঘরের মধ্যে পাঠানো যেতে পারে। ঠিক যা করেছিল, পলাশ রেহমান। পরপর চারখানা খুন করবার জন্য—দারুণ ধুরন্ধর— দারুণ ধুরন্ধর।

মিসেস মিত্রর কাছ থেকে জানতে পারি যে, অতি সম্প্রতি ডক্টর মিত্র, এমন কিছু একটা আবিষ্কার করেছিলেন যার মাধ্যমে দেশে চিকিৎসা শাস্ত্রের একটা দিক খুলে যেতে পারত—প্রচুর মানুষ উপকৃত হতেন, আবার সেই আবিষ্কারটিকেই অসৎ উপায়ে ব্যবহার করলে, তা হতে পারত প্রচুর মানুষের মৃত্যুর কারণ।

ডক্টর মিত্র বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর এই আবিষ্কারের ফলে, তাঁর প্রচুর শত্রু তৈরি হয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত সেই শত্রুরা তাঁকে প্রাণেও মেরে ফেলতে পারে।

তাই, খুন হবার সপ্তাহখানেক আগে তিনি সেই আবিষ্কারের ফর্মুলা এবং একটা উইল তাঁর নিজস্ব আইনজীবীর কাছে গচ্ছিত রাখেন।

মিসেস মিত্রর কাছ থেকে, ফোন নম্বর নিয়ে আমি সেই আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। জানতে পারি যে, উইলের একমাত্র এবং মূল শর্তই হোলো, ডক্টর মিত্রের মৃত্যুর পর, তাঁর বাড়ি টাকা-পয়সা, এবং সেই ফর্মুলা পাবেন, তাঁর মেয়ে ও জামাই। তাঁরা ছাড়া, সেই ফর্মুলা কারো হাতে দেওয়া হবে না। শুধু তাই নয়, সেই আবিস্কারের পেটেন্ট নেওয়া ও সেখান থেকে পাওয়া যাবতীয় অর্থ, শুধুমাত্র ডক্টর মিত্রের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক আছে, এমন কেউ পাবেন।

যদি একমাত্র রক্তের সম্পর্কের কেউ জীবিত না থাকেন, তাহলেই পাবেন তাঁর প্রিয়, স্কুল অফ কেমিক্যাল সায়েন্সেস, ইলিনয়ের ছাত্র, শ্রী পলাশ রেহমান। তবে তাঁকে যে ইলিনয়ের ঐ স্কুল থেকে চুরির দায়ে বহিস্কার করা হয়েছিল, সেটা বোধহয় ডক্টর মিত্র জানতেন না।'

শ্রীমতী মিত্র-কে ফোন করে আমি জানতে পারি, সেদিনই সকালে নাকি, একজন এ.সি. মেকানিককে নিয়ে ল্যাবরেটরিতে ঢুকেছিলেন পলাশ রেহমান। ঘণ্টাখানেক এ.সি. সার্ভিসিং-য়ের কাজ করে, সেই মেকানিক আবার বেরিয়ে যান।

পলাশ রেহমানকে জিজ্ঞাসা করায়, তিনি নাকি বলেছিলেন, 'সামনেই গরম কাল। ল্যাবরেটরিতে অনেকগুলো এ.সি. আছে। একবার সার্ভিসিং করিয়ে নেওয়া দরকার।'

ঠিক তখন, পরপর সবকটা খুনের 'মোটিভ' এবং 'মোডাস অপারেন্ডি' আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়।'

একটু থেমে, আবার কথা শুরু করলেন, কন্দর্পনারায়ণ -'হ্যাঁ ইয়োর অনার, আসল অপরাধী হলেন, দীঘা-মন্দারমনির একাধিক হোটেল রিসর্টের মালিক, শিমূল রেহমানের যমজ ভাই পলাশ রেহমান।

ইন ফ্যাক্ট, দীঘা-মন্দারমনিতে যতবার আমার মুখোমুখি হয়েছেন, নিজেকে শিমূল রেহমান বলে, পরিচয় দিলেও, তিনি আসলে, অবিকল এক দেখতে, পলাশ রেহমান।

শিমূল রেহমান কখনই আমাদের মুখোমুখি হননি। শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রে, পঙ্কজবাবুর মৃতদেহ উদ্ধারের সময়, কিংবা, সন্ধ্যেবেলায়, দীঘা থেকে মন্দারমণিতে ঢুকবার সময়, আমাদের উপর গুলিচালনার পরপরই যিনি এসে হাজির হন, তিনি, নিজেকে শিমূল রেহমান বলে দাবি করলেও, আসলে তিনি পলাশ রেহমান।

আমার চোখের সামনের অন্ধকার সরিয়ে দিয়েছিলো, আমার পুরোনো মক্কেল, পেঙ্গুইন হলিডে রিসর্টের স্টাফ-শশিকান্ত গিরি। কথায় কথায় সে আমাকে জানিয়েছিলো যে, তাদের মালিক শিমূল রেহমান, দশদিন আগে,একটা দুর্ঘটনার পরে পা ভেঙে বিছানায় শয্যাশায়ী। ঘরের বাইরে বেরোতেই পারছেন না।

আমি তো শুনে চমকে উঠি। তাহলে? শিমূল কাঁকড়া বিক্রয় কেন্দ্রে বা চাউলখোলার মোড়ে, ভর সন্ধ্যেবেলায় আমাদের উপর গুলি চালনার সময়, কে এসে হাজির হয়েছিলেন, পাজামা-পাঞ্জাবী পরা? অত্যন্ত বিনয়ী ব্যবহার? নিজেকে শিমূল রেহমান বলে পরিচয় দিয়েছিলেন?

শশিকান্ত আমাকে জানায়, শিমূল রেহমানেরা দুই ভাই—যমজ। একভাই দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলেন, বর্তমানে তিনি কোথায়, তা অবশ্য শশিকান্ত বলতে পারে নি।

তবে, গোটা ঘটনায় অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে, শিমূল রেহমানও তাঁর দায় এড়াতে পারেন না, কাজেই, তাঁকেও সঙ্গতভাবেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ডক্টর মিত্রর অস্বাভাবিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে, পঙ্কজবাবুর সংসারে অশান্তি ইত্যাদির কথা, পলাশ রেহমান সবই জানতেন। তিনিই উপযাচক হয়ে, পঙ্কজবাবুকে দীঘা থেকে কয়েকদিন স্ত্রী-কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরে আসবার পরামর্শ দেন। সরলবিশ্বাসে পলাশ বাবুর কথায় পঙ্কজবাবু রাজীও হয়ে যান। পলাশবাবু দীঘার হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে, ও নিজের ভাই শিমূল রেহমানের পরামর্শে পঙ্কজবাবু ও তাঁর পরিবারকে এনে তোলেন, দীঘাতে, নিজেদের হোটেলে। বাকী ঘটনা তো সবারই জানা। আমি আগে সবিস্তারে বলেছি আপনাকে।

পঙ্কজবাবুদের কোনো মূল্যবান জিনিস খোয়া যায়নি, এমনকি পঙ্কজবাবুর মোবাইল ফোনও ব্যাটারি খোলা অবস্থায় ঘরের মধ্যেই ছিল। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পঙ্কজবাবুর সঙ্গে দিব্যি যোগাযোগ ছিল পলাশ রেহমানের। খুনের পর হোটেলের ঘরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লাস্ট কল বা পরস্পর কথোপকথনের প্রমাণগুলো ডিলিট করেন, পলাশ রেহমান নিজেই।

তবে আমি মোবাইল ফোন কোম্পানিতে উকিলি নোটিশ দিয়ে 'লাস্ট কল'-র লিস্ট জোগাড় করেছি। সেখান থেকে পরিষ্কার ধরা যাচ্ছে যে মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে পঙ্কজবাবুর সঙ্গে পলাশ রেহমানের দীর্ঘসময় ধরে কথা হয়েছিল।

কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই পাশে বসে থাকা দ্বৈপায়ন কললিস্টের ফোটোকপিগুলো জজসাহেবকে জমা দিলেন।

শিমূল রেহমান আর তার ভাই পলাশ, দীঘার হোটেলের ম্যানেজার, এমনকি এ.সি. মেকানিক, যার সাহায্যে হোটেলের ঘরে আর ডক্টর মিত্রের ল্যাবরেটরিতে অফিস ঘরে, এ.সি.র ভেন্টের মধ্য দিয়ে বিষ গ্যাস ঢোকানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল, কারোই জামিন হয়নি কোর্টে।

কোলকাতা ফেরার সময় কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'চল সবাই, একবার মন্দারমনির সমুদ্রের পাড়টা ঘুরে আসি। তারপর না হয়, ওখান থেকেই ডিনার করে গাড়িতে উঠব। বরং বেশী রাতে রাস্তা ফাঁকা থাকতে পারে।'

ইন্দ্রনীল, দ্বৈপায়ন একমত হয়েছিলেন—'চলুন স্যার, একবার সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে দাঁড়াই। ক-দিন যা ধকল গেল।'

সবাই মিলে এসে দাঁড়ালেন, সমুদ্রের পাড়ে। চাঁদের আলো পড়ে, গোটা সমুদ্রের জলটাই যেন রূপোলী। পাড়ে কয়েকটা বাচ্চা দৌড়োদৌড়ি করছে। একটু দূরে একটা দরমার বেড়া দেওয়া দোকান, কয়েকজন, দোকানের সামনে পাতা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে, গল্পগুজব করছেন।

দ্বৈপায়ন বললেন—'আজ কোর্টে আপনি গোটা ব্যাপারটা খুব সুন্দর অ্যানালাইজ করলেন স্যার, একেবারে যেন সায়েন্স। প্রশ্ন তুলবার কোনো জায়গাই নেই।'

কন্দর্পনারায়ণ সামনেই বিরাট সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন—'মনে আছে, পঙ্কজবাবুর ডেডবডি, খুঁজে পাবার পরের দিন, আমরা দীঘার হোটেলে গিয়েছিলাম, 'স্পট' দেখতে?'

দ্বৈপায়ন আর ইন্দ্রনীল, একসঙ্গে বলে উঠলেন— 'হ্যাঁ স্যার, মনে আছে।'

কন্দর্পনারায়ণ অন্যমনস্কভাবে বললেন—'ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের কাছ থেকে ডেডবডি দুটোর ছবি চেয়ে নিয়ে, সেগুলোর দিকে তাকাতেই, আমি প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খাই।

সেই বাচ্চাটা-ফুটফুটে, কোঁকড়া চুল, বড় বড় চোখ, টিকোলো নাক, একটা ফুলফুল ছাপা ফ্রক পড়া—যে আমার ঘরে ঢুকেছিল—আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল—জাস্টিস মানে কী? আমাকে জাস্টিস পাইয়ে দাও।

সেই বাচ্চাটাই শুয়ে আছে বিছানায়—এ কী করে হয়? যে বাচ্চাটা চার-পাঁচদিন আগে খুন হয়ে গেছে, সে কী করে, আমার ঘরে আসতে পারে? আমাকে নিয়ে দেখিয়ে দিতে পারে, সেই জায়গাটা, যেখানে তার আদরের 'বাপি'কে খুন করে মৃতদেহটা রেখে দেওয়া হয়েছে।

শুধু তাই নয়, সে আমাকে খুনীদের সম্পর্কেও জানিয়েছিল, বলেছিল— 'পলুমামা আমাদের বাড়িতে আসে কেন? তুমি বারণ করে দাও'।

সবাই চুপ করে, কন্দর্পনারায়ণ-এর কথা শুনে যাচ্ছেন। কন্দর্পনারায়ণ যেন একটা ঘোরের মধ্যে, থেকে কথাগুলো বলে যাচ্ছেন, সব কথা স্পষ্ট শোনাও যাচ্ছে না, সমুদ্রের দিক থেকে ছুটে আসা হাওয়া, কিছু কিছু কথাকে ভাসিয়েও নিয়ে যাচ্ছে।

কন্দর্পনারায়ণ আবার বলতে শুরু করলেন—'এখন আমি দিব্যি বুঝতে পারছি, পলু মামা বলতে, বাচ্চাটা পলাশ রেহমানকেই ইঙ্গিত করছিল। তাছাড়া, পলাশ রেহমানই যে, পঙ্কজবাবুর সঙ্গে বন্ধুত্বের ছলে, তাঁকে এই হোটেলে এনে তুলেছিল, সেটাও তো, পঙ্কজবাবু আর পলাশ রেহমানের ফোনের 'কল লিস্ট' থেকে প্রমাণিত।'

তারপর আবার বললেন—'গোটা ব্যাপারটা আমার এক মনস্তত্ত্ববিদ বন্ধুকে ফোন করে জানিয়ে তাঁর মতামত চেয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন— এই ব্যাপারটা, একধরনের হ্যালুসিনেশন আর ডিলিউশন। তুই যদি কোনো ব্যাপার নিয়ে খুব ভাবিস বা বুঁদ হয়ে, তার মধ্যে ডুবে থাকিস, তাহলে এই ধরনের হ্যালুসিনেশন-ডিলিউশন হতেই পারে।

ধর, তুই দুপুরে তোর বিছানায় ঘুমোচ্ছিস, তোর হঠাৎ মনে হল, কেউ এসে বোধহয় তোর ঘরের কলিং বেল বাজিয়ে তোকে ডাকছে। তুই ধড়মড় করে, বিছানায় উঠে বসলি, তারপর বেরিয়ে দেখলি, কেউ আসেনি বা কেউ কলিং বেলও বাজায়নি।

আবার ধর, তোর ফোনটা বাজেনি, কিন্তু বার বার তুই শুনতে পাচ্ছিস, যে তোর ফোনটা বাজছে।'

অনেক সময়ই, আমাদের চোখের সামনে যেন এমন কোনো ঘটনা ভেসে ওঠে, যেগুলো আদপেই ঘটেনি।'

একটু থেমে আবার বললেন—'তোদের মনে আছে, মিসেস মিত্র, যেদিন আমাদের চেম্বারে এসেছিলেন, সেদিন, উনি ওনার নাতনির ছবি দেখিয়েছিলেন আমাদের? একরকম জোর করেই? আমি দেখতে চাইনি—বলেছিলাম— দেখাবেন না, আমার মনের ওপর প্রচণ্ড প্রভাব পড়ে।

উনি জোর করে, ওনার মেয়ে-জামাই-নাতনির ছবি দেখিয়েছিলেন। হয়তো, আমার অবচেতন মনে, কোথাও বাচ্চাটার ছবি দাগ কেটে গিয়েছিল বা ছাপ ছেড়ে গিয়েছিল। ঘটনাচক্রে আমরা এসে হাজির হয়েছিলাম, দীঘার কাছেই মন্দারমনিতে। তোরা যখন, সুইমিং পুলে, সবাই মিলে ঝাঁপাঝাঁপি, হুল্লোড় করছিলি, সেই সময় হোস্টেলের ঘরে বসে, আমি, মিসেস মিত্রর জন্যই মামলা রেডি করছিলাম।

মিসেস মিত্রর মেয়ে আর নাতনির হোটেলের ঘরের মধ্যে খুন হয়ে পড়ে থাকা, যাবতীয় সন্দেহের তীর, তাঁর জামাইয়ের উপর এসে পড়া। পুলিশের তদন্তে আগ্রহ না দেখানো—এই বিষয়গুলো আমাকে হন্ট করছিলো। সেখান থেকেই এই হ্যালুসিনেশন-ডিলিউশনের ব্যাপারটা আসতেই পারে। আবার এটাও তো ঠিক, যে বিজ্ঞানের, যুক্তির বাইরেও কিছু ঘটে।'

দু-হাত বুকের সামনে আড়াআড়ি করে রেখে, বিবেকানন্দের ভঙ্গিতে চুপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কন্দর্পনারায়ণ। সমুদ্রের জোরালো, জোলো হাওয়া, মুখে যেন ঝাপটা দিয়ে যাচ্ছে। ক'দিন, দৌড়ঝাঁপ খুব গেছে। তাছাড়া, আজকেও কোর্টে সারাদিন অনেকক্ষণ সওয়াল করেছেন, খুব ক্লান্ত লাগছে। কিন্তু, এই সন্ধেতে, সমুদ্রের ধারের হাওয়া যেন সবাইকে অদ্ভুত শান্তি এনে দিচ্ছে। খানিক পরে, কন্দর্পনারায়ণ আবার বললেন— 'একটা মৃত বাচ্চার অতৃপ্ত আত্মা, আমাকে, এই চার-চারটে খুনের রহস্য উদ্ঘাটনে সাহায্য করেছে, একথা বললে কেউ বিশ্বাসও করবে না। কাজেই, আমি নিজে এই ব্যাপারটাকে মনস্তত্ত্বের একটা জটিল দিক বলেই ধরেই নিয়েছি।'

থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। একটু থেমে, বাঁদিকে দূরে ঝাউবনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বলে উঠলেন—'যেমন, এখনও হয়তো তোরা কেউ আমার কথা বিশ্বাস করবি না। আমি যেন, খোলা চোখে দেখতে পাচ্ছি, এক বয়স্ক ভদ্রলোক একটা বাচ্চা মেয়ের হাত ধরে, তাঁর দুপাশে, দুজনকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, ঝাউবনের দিকে। এতদূর থেকে যেন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ভদ্রলোকের চোখে চশমা, সাদা চুল, দুপাশের দুই ভদ্রলোক ভদ্রমহিলার বয়স যেন খুব বেশি নয়। বাচ্চাটার ফ্রক আর ভদ্রমহিলার শাড়ির আঁচলও যেন হাওয়ায় উড়ছে। অল্পবয়সী ভদ্রমহিলা, সুপুরুষ ভদ্রলোকের হাত ধরে রয়েছেন।'

কন্দর্পনারায়ণ থামতেই, নাজির, সুপ্রীম, দেবর্ষি, বিড়বিড় করে অস্ফুটে বলে উঠলেন—'স্যার, শুধু আপনিই নন, আমরাও দেখছি, স্বামী-স্ত্রী, দাদু আর নাতনি, যেন হাত ধরাধরি করে সমুদ্রের ধার ধরে ঝাউবনের দিকে হেঁটে চলেছেন।'

কিন্তু, নাজির, সুপ্রীম, দেবর্ষি—কারো কথাই স্পষ্ট শোনা গেল না। সমুদ্রের জোরালো হাওয়া, ওঁদের কথাগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গেল।

অধ্যায় ৭ / ৭
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%