জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
কন্দর্পনারায়ণ-এর চেম্বার
অনেকক্ষণ ধরেই, ক্লায়েন্টদের ভীড় জমে উঠছিল। পাশের ঘরে, জুনিয়র ছেলেমেয়েরাও উশখুশ করছিলেন। জয়শ্রী বললেন—'একে রবিবার, সকাল থেকেই বিভিন্ন লোককে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া রয়েছে। বেলা এগারোটা বেজে গেল। স্যার কী করছেন বলো তো?'
সুপ্রীম বললেন—'রবিদাকে দিয়ে, আজকের সবকটা বাংলা-ইংরেজি খবরের কাগজ কিনে আনিয়েছেন। তারপর সেই ভোর থেকে কাগজে মুখ ডুবিয়ে বসে আছেন, আর কী সব নোট নিচ্ছেন।'
দ্বৈপায়ন, চেম্বারের মুহূরী রবিকে ডেকে বললেন—'রবি, আজ সকালে স্যার তোমাকে বাজারে পাঠিয়েছিলেন? কেন? কিছু বলেছিলেন?
রবি বলল—'হ্যাঁ দাদা, ঘুম থেকে উঠেই স্যার বললেন—রবি, আমি জগিং-এ বেরোচ্ছি, তুই, বাজারে গিয়ে, খবরের কাগজওয়ালাদের কাছ থেকে, আজকের সব কটা ইংরেজি-বাংলা খবরের কাগজ কিনে এনে, টেবিলে রাখ। আমার লাগবে। তারপর, জগিং থেকে ফিরে এসে, স্নান সেরে, রেডী হয়ে সে-ই যে চেম্বারে বসেছেন, এখনও, খবরের কাগজ থেকে মুখ তোলেননি। আর মাঝে মাঝে খাতায় কী সব নোট নিচ্ছেন।'
দ্বৈপায়ন বললেন—'নিশ্চয়ই, কালকে বড় কোনো ঘটনা ঘটেছে, স্যার খবরের কাগজের রিপোর্টিং থেকে সেই খুঁটিনাটি পয়েন্টগুলোরই নোট নিচ্ছেন।'
নাজির বলে উঠলেন—'বাইরের ঘরে কিন্তু ভীড় বাড়ছে দই-দা, এরপর, সব ক্লায়েন্ট ছাড়তে ছাড়তে তো সেই সন্ধ্যে হয়ে যাবে।'
চেম্বারের জুনিয়রদের মধ্যে, পারমিতাই সবচেয়ে বড়—তিনি বললেন—'মনে হয়, নতুন কোনো ইন্টারেস্টিং কেস হাতে পেয়েছেন স্যার, ক্লায়েন্টও হয়তো আসবেন এক্ষুণি, তার আগে, নিজেকে প্রিপেয়ার করে নিচ্ছেন। যাই, আমি গিয়ে স্যার-কে জিজ্ঞেস করি, ব্যাপার কি?'
জয়শ্রী বলে উঠলেন—'ঠিক বলেছো, পারমিতা দি, চলো, সবাই মিলে স্যারের ঘরে গিয়ে ঢুকি। জিজ্ঞেস করি, নতুন কোনো, ইন্টারেস্টিং কেস এলো নাকি?'
দ্বৈপায়ন বললেন—'সবার যাবার দরকার নেই। পারমিতা দি আগে যাও। স্যারের সঙ্গে কথা বল। তারপর সব ঠিকঠাক থাকলে, আমরাও যাব', সবাই একমত হলেন।
পারমিতা, ঘরে ঢুকেই বলে উঠলেন—'দাদা, দশটার ক্লায়েন্ট অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন, ওনাকে ডাকব?'
কন্দর্পনারায়ণ কোনো কথার জবাব না দিয়ে, টেবিলের উপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খবরের কাগজগুলো ধীরে ধীরে ভাঁজ করে, টেবিলের একপাশে সরিয়ে রেখে দিলেন। তারপর বললেন, 'ওঘর থেকে সবাইকে ডাকো, আমার কিছু আলোচনা আছে। দশ মিনিটে আলোচনা শেষ হয়ে যাবে, তারপর, ক্লায়েন্টদের ডেকো।'
দরজার ওপারে, সবাই যেন এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন, দরজা ঠেলে সবাই হুড়মুড়িয়ে ঘরে এসে ঢুকলেন, নতুন কোনো রহস্যের গন্ধ পেয়ে, সবারই চোখ উত্তেজনায় চকচক করছে।
কন্দর্পনারায়ণ, ডানদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে, সুদৃশ্য র্যাকে রাখা, অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙিন মাছগুলোর খেলা দেখতে দেখতে বলা শুরু করলেন—
'আমার এক বহু পুরোনো, সাংবাদিক বন্ধু কাম ভাই আছেন, নাম প্রকাশ সিনহা। তোমরাও তাকে চ্যানেলে দেখেছ—খুবই বেপরোয়া, ডাকাবুকো ছেলে। খবর সংগ্রহের জন্য, যেকোনো বিপদের মুখোমুখি হতেও পিছপা হন না। তিনি আমাকে একটা খবর দেন যে, গতকাল কসবা থানার পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে, দুটি অল্প বয়সি বাংলাদেশি ছেলেকে গ্রেপ্তার করে, এবং তাদের কাছ থেকে এক বিশেষ ধরনের ড্রাগ উদ্ধার হয়েছে, প্রচুর পরিমাণে। কিন্তু, আশ্চর্য ব্যাপার, তারা কিছুতেই পুলিশের কাছে মুখ খুলছে না যে, কেন তারা ওই ড্রাগ অত বিপুল পরিমাণে মজুত করেছিল।'
দ্বৈপায়ন অবাক হলেন—'এতে আশ্চর্যের কী আছে স্যার? ড্রাগের কারবারিরা, ড্রাগ তো মজুত করবেই—তাছাড়া, তারা ড্রাগ মজুত করছে বিক্রির জন্য, আর কি?'
কন্দর্পনারায়ণ নিজের ঝোলানো গোঁফে, আঙুল বোলাতে বোলাতে মাথা নাড়লেন—'অত সহজ নয়। এটা ঠিকই, ড্রাগ বিভিন্ন ধরনের হয়—তোরা তো জানিসই। একধরনের ড্রাগ, যা, চাষ করা হয়, যেমন—গাঁজা, হেরোইন ইত্যাদি, যাদের বলে, নারকোটিক ড্রাগ। আর এক ধরনের ড্রাগ 'তৈরি' করা হয়, মানে, আমরা মানুষেরা কেমিক্যাল ল্যাবরেটরিতে তৈরি করি, তাদের বলে 'সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্স।'
ল্যাতিন আমেরিকাতে, নাকি, সবচেয়ে বেশি ড্রাগের উৎপাদন হত। কিন্তু, এখন, বিশ্বের আরও অনেক দেশেই ড্রাগের উৎপাদন হয়। বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের কিছু কিছু অঞ্চলে, বিপুল পরিমাণ সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্স তৈরি করা হচ্ছে।'
কন্দর্পনারায়ণ থামলেন। সুপ্রীম বলে উঠলেন—'স্যার, ল্যাতিন আমেরিকায় মূলতঃ বিভিন্ন ধরনের ড্রাগের চাষ হয়। গাঁজা, আফিম, হেরোইন সব কিছুর রমরমা ওখানে। তবে, একথা ঠিকই, বিশ্বের অন্য অনেক দেশ এখন, নার্কোটিক ড্রাগ ও সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্সের ব্যবসায় ল্যাতিন আমেরিকাকে ছাপিয়ে গেছে।'
দ্বৈপায়নও একমত হয়ে বললেন—'বলা হয়, আমাদের দেশও কিছু কম যায় না। তবে, আমাদের দেশের আইন বেশ কড়া।'
কন্দর্পনারায়ণ খুশি হলেন। বললেন, 'ওই যে, আমার সাংবাদিক বন্ধু কাম ভাইটির কথা বললাম, তিনি আমাকে বলেছেন, ওই বাংলাদেশি ছেলেগুলির সঙ্গেই, কসবার কয়েকটি অল্প বয়সি ছেলেকেও ধরা হয়েছে, যাদের একজনের বাবা-মা, এক্ষুণি আমার কাছে আসবেন। ওঁরা আসবার আগে, আমি তাই, আজকের বিভিন্ন খবরের কাগজ কিনিয়ে এনে ঘটনাটা সম্পর্কে একটু স্টাডি করে নিচ্ছিলাম।'
তারপরই হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন—'ওহো, যে কথা বলছিলাম, দ্বৈপায়ন ঠিকই বলেছে, ড্রাগের কারবারিরা ড্রাগ মজুত করবে, এতে আবার অবাক হবার কী আছে?
কিন্তু, যে, বিশেষ ধরনের ড্রাগটা রিকভার করা হয়েছে, সেগুলোর বাজার চলতি নাম হল, 'ডেট রেপ ড্রাগ।' এই ড্রাগটা সম্পর্কে, আমি বিশেষ কিছু জানতাম না।
সকালে, আমি ফোন করেছিলাম, কলকাতা পুলিশের 'নার্কোটিক সেল'-র নামী অফিসার অমিত মুখার্জীকে।'
বলেই থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। দ্বৈপায়ন, নাজির, সুপ্রীমের দিকে তাকিয়ে বললেন—'তোরা তো ওনাকে চিনিস—'
সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন—'হ্যাঁ, স্যার, আমরা সবাই চিনি, ওনার সঙ্গে আপনার খুব সুসম্পর্ক।'
কন্দর্পনারায়ণ হাসলেন—'হ্যাঁ, ডিফেন্স ল'ইয়ার হিসেবে, সাধারণত পুলিশের সঙ্গে, আমাদের সম্পর্ক ততটা সুমধুর হয় না, তবে, এত বছরের ওকালতি জীবনে, অনেকের সঙ্গেই আমাকে কাজ করতে হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে কারও কারও সঙ্গে সম্পর্ক খুবই ভালো। কলকাতা পুলিশের নার্কোটিক সেল-এর ইন্সপেক্টর অমিত মুখার্জীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক, একেবারে দাদা-ভাই-এর মতন। উনি আমাকে দাদা বলেই ডাকেন।'
বলেই মূল আলোচনায় ফিরলেন, কন্দর্পনারায়ণ—'অমিতবাবুকে ফোন করায়, উনি আমাকে কতগুলো তথ্য দিলেন। যেমন—এই 'ডেট রেপ ড্রাগ' গুলি মূলত 'ডায়াজেপাম' প্রজাতির ওষুধ। সাধারণত অচৈতন্য করার কাজে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, খাবারে, বা পানীয়ে, যেমন কোল্ড ড্রিংক ইত্যাদিতে মিশিয়ে দিলে, মানুষ অচৈতন্য হয়ে পড়বেন এবং ওই সময়টার তাকে নিয়ে যা খুশি করা যাবে।
উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, অচৈতন্য থাকা-কালীন, তিনি কী করছেন, সেটা তাঁর মনেই থাকবে না। অর্থাৎ, ওই ড্রাগটা কাউকে খাইয়ে দিলে, প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টার জন্য তাঁর স্মৃতি লোপ পাবে।'
পারমিতা প্রায় আর্ত চিৎকার করে উঠলেন—'কী বলছেন দাদা? কাউকে ওই ড্রাগটা খাইয়ে দিয়ে, তাঁর সঙ্গে যা কিছু করা হোক না কেন, তাঁর মাথায় কিছু রেজিস্টারই করবে না? তাঁর অন্তত বাহাত্তর ঘণ্টার স্মৃতি মনেই থাকবে না?'
কন্দর্পনারায়ণ, হাতের নোট খাতাটার দিকে তাকিয়ে বললেন—'ইয়েস পারমিতা, ইয়েস। অমিতবাবু আমাকে বললেন—গোটা কলকাতা তথা, পশ্চিমবঙ্গে, এই ধরনের ড্রাগ ছড়িয়ে পড়ছে।
সাধারণভাবে, ভাবতে গেলে, বলতে হয়, এই ধরনের ড্রাগ, মানুষের নার্ভাস সিস্টেমকে অকেজো করে দেয়। তবে, ওভারডোজে কিন্তু মৃত্যুও হতে পারে।
আমার সাংবাদিক বন্ধু প্রকাশ আমাকে আরও একটা খবর দিয়েছেন, যাতে আমি স্তম্ভিত। কলেজে কলেজে এই ড্রাগের খুব কদর, আজকাল তো ফ্রি-মিক্সিং-এর যুগ। একধরনের ছেলেরা, প্রথমে বান্ধবীদের বিশ্বাস-আস্থা অর্জন করে নিচ্ছে, তারপর, নিজেদের ফাঁকা ফ্ল্যাটে বা হোটেলে রিসর্টে ডেকে, বান্ধবীদের, খাবারে, জলে, বা কোল্ড ড্রিংকেও এই ওষুধটা মিশিয়ে তাঁদের অচৈতন্য করে দিয়ে, তাঁদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করছে।'
জয়শ্রী, গালে হাত দিয়ে অবাক হবার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন— 'বলেন কী স্যার?'
কন্দর্পনারায়ণ মৃদু হেসে বললেন—'এখনও অবাক হবার অনেক বাকি আছে, জয়শ্রী, পুরোটা শোন।'
তারপর আবার বলতে শুরু করলেন—'যেহেতু, ওই ড্রাগের প্রভাব প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা থাকে, কাজেই, সেন্স ফিরে এলেও ওই বাহাত্তর ঘণ্টায় সে কী কী করেছে, বা তার সঙ্গে কী কী করা হয়েছে, কিংবা তার সঙ্গে কোনোরকম সেক্সুয়াল রিলেশনশিপ তৈরি করা হয়েছে কি না, তার কিছুই মনে থাকছে না।'
দ্বৈপায়ন মুখ খুললেন—অর্থাৎ, তাকে যদি রেপও করা হয়ে থাকে, তার কিছুই মনে পড়বে না।'
কন্দর্পনারায়ণ উত্তেজনায় টেবিলে ঘুঁসি মেরে বলে উঠলেন—'রাইট।'
সুপ্রীম বললেন—'বাংলাদেশি ছেলেগুলো নিশ্চয়ই পুলিশ কাস্টডিতে?'
কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় দোলালেন—'স্বাভাবিক, কিন্তু ওরা এখনও মুখ খোলেনি।
এই কেসটায়, আমি একটু বিশেষ ইন্টারেস্ট নিচ্ছি। মনে রাখিস আমরা নিশ্চয়ই ডিফেন্স ল'ইয়ার। অর্থাৎ, আমরা অভিযুক্ত পক্ষের আইনজীবী—অভিযুক্তের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের কর্তব্য, তবু কখনও কখনও মনে হয়, সমাজের প্রতি ও আমার বিপুল কর্তব্য রয়েছে।
তোদের সবার সাহায্যই, এই কেসটায় আমার লাগবে।'
সবাই একমত হলেন। কন্দর্পনারায়ণ বললেন—'আপাতত কে কে এসেছেন— এক এক করে ভেতরে পাঠা, সবার সঙ্গে কথা বলে নিই। ওই ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা এলে, তোদের আবার ডেকে নেবো।'
প্রায় তিনটে নাগাদ ওঁরা এলেন। ভদ্রলোকের বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ হলে, ভদ্রমহিলার বয়স পঁয়তাল্লিশ। ভদ্রলোক দামী স্যুট পরে রয়েছেন আর ভদ্রমহিলাও অত্যন্ত দামী চুড়িদার পরা, সুন্দরী, ববকাট চুল, তাঁদের কথাবার্তা-আদবকায়দায় মনে হল, তাঁরা সমাজের বেশ উচ্চস্তরে বাস করেন।
ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকেই সব জুনিয়রদের দেখে অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন— 'আমরা আপনার সঙ্গে প্রাইভেটলি কথা বলতে চাই। এই ঘরের অন্য সবাইকে চলে যেতে বলুন।'
ভদ্রমহিলা অত্যন্ত রূঢ়ভাবে কথাগুলো বললেও, কন্দর্পনারায়ণ হাসিমুখে উত্তর করলেন—'ম্যাডাম, এঁরা প্রত্যেকে ল'ইয়ার। অনেকদিনের প্র্যাকটিস এঁদেরও। এঁরাই আমার সৈনিক। আমার প্রতিটা কাজে, ওঁদের সাহায্য আমার লাগে। আপনি নিশ্চিন্তে সবার সামনেই কথা বলুন। এঁরা প্রত্যেকেই আমাদের আলোচনার গোপনীয়তা রক্ষা করবেন।'
ভদ্রলোক অবশ্য কন্দর্পনারায়ণ-এর কথায় একমত হলেন এবং বললেন—'ঠিক আছে। তবে তাই হোক।'
তারপর কন্দর্পনারায়ণ এর দিকে তাকিয়ে হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন—'বাই দি ওয়ে, আমি, অশোক বোস, আই এ এস, বর্তমানে ভারত সরকারের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে আছি।' তারপরই নিজের ডানদিকে দাঁড়িয়ে থাকা রীতিমতো স্টাইলিশ চেহারার ভদ্রমহিলাকে দেখিয়ে বললেন—'উনি আমার স্ত্রী, চান্দ্রেয়ী। একটা সরকারি কলেজের অংকের প্রফেসর।'
কন্দর্পনারায়ণ হাত জোড় করে, প্রতি নমস্কার জানিয়ে বললেন 'নমস্কার, বসুন। নিশ্চিন্তে সমস্ত সমস্যার কথা বলতে পারেন, আমি সাধ্যমতো সমাধানের চেষ্টা করব।'
নাজির, দ্বৈপায়নের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল—'হুঁ, আমাদের অন্য ঘরে যেতে বলছে! চিন্তা করো দই-দা, সাহস কত! আর অংকের প্রফেসর! নিজেদের জীবনের অংক মেলাতে পারলে, আর স্যারের সামনে, হাত জোর করে বসে থাকতে হত না।'
কন্দর্পনারায়ণ অবশ্য, নাজিরের মুখের দিকে তাকিয়ে ওঁর ঠোঁট নাড়ার ভঙ্গিতে, সবই বুঝতে পারলেন, এবং ভুরু কুঁচকে তাকাতেই, নাজির আর দ্বৈপায়ন দুজনেই লজ্জা পেয়ে গেলেন।
কন্দর্পনারায়ণ, চেয়ারে সোজা হয়ে বসে, সরাসরি অশোক বোসের দিকে তাকিয়ে বললেন—'হ্যাঁ, মূল আলোচনায় আসুন।'
কন্দর্পনারায়ণ-এর ইঙ্গিত পাওয়ামাত্র, অশোক বোসকে থামিয়ে, তাঁর স্ত্রী, বলে উঠলেন—'পুলিশ কাল আমাদের একমাত্র ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে।'
কন্দর্পনারায়ণ অবাক হয়ে তাকাতেই, চান্দ্রেয়ী বোস অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে হাত নেড়ে বলে উঠলেন—'মিথ্যে কেসে ফাঁসিয়েছে। আমার স্বামী কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি করেন। রাজ্য পুলিশের, আমাদের ওপর রাগ, তাই, পুলিশ ফাঁসিয়ে দিয়েছে।'
কন্দর্পনারায়ণ বলে উঠলেন— 'কিন্তু, সকালে, যখন আপনি আমাকে ফোন করলেন, তখন যে বলছিলেন, কয়েকজন বাংলাদেশি ছেলেকে, পুলিশ বে-আইনি ড্রাগ-পাচার কেসে ধরেছে, তাদের সঙ্গে, আপনার ছেলেকেও ধরা হয়েছে!'
অশোক বোস এবার নিজের স্ত্রীকে, থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন—'আঃ তুমি থামো! আমাকে বলতে দাও।' তারপর কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন—'কন্দর্পনারায়ণবাবু, আমাদের একটিই ছেলে। অনেক সাধে, অনেক যত্নে, তাকে বড় করে তুলছিলাম। কিন্তু, এত বড় বিপদ যে আসবে, ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করিনি।'
আমাদের ছেলের নাম আরিয়ান। প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংলিশে অনার্স নিয়ে পড়ছিল। সুপুরুষ, খেলাধূলোয় ভালো। বিশেষ করে ক্রিকেটটা তো বেশ ভালো খেলে।
কিন্তু, কখন যে খারাপ পাল্লায় পড়ে গেছে আমরা বুঝতেই পারিনি। আমি কেন্দ্রীয় সরকারি চাকুরে, আমার স্ত্রী প্রফেসর, আমরা ভেবেছি, আমরা আমাদের ছেলের প্রতি অতিমাত্রায় সচেতন —আজ তারই ফল আমাদের ভুগতে হচ্ছে।'
কন্দর্পনারায়ণ বুঝতে পারলেন, অশোক বোস বড় চাকুরে হলেও, তাঁর মুখের বা চেহারার আপাত কাঠিন্যের পেছনে লুকোনো আছে একজন নরম বাবা। আর আজকে একজন অসহায় বাবাই তাঁর ছেলেকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ছুটে এসেছেন কন্দর্পনারায়ণ-এর কাছে।
কন্দর্পনারায়ণ একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন, অশোক বোসের দিকে, হঠাৎ, পাশ থেকে খুঁক খুঁক করে কান্নার আওয়াজে, মুখ ঘুরিয়ে তাকাতেই, দেখলেন, চান্দ্রেয়ী বোস রুমালে মুখ চেপে কাঁদছেন।
মুহূর্তে, ঘরের পরিবেশ ভারী হয়ে উঠল। খানিক বাদে, একটু ধাতস্থ হয়ে, চান্দ্রেয়ী দেবী মুখ খুললেন—'হঠাৎই কাল রাতে, পুলিশ ওকে ডাকে, ও দরজা খুলে বেরোতেই, ওকে অ্যারেস্ট করে নেয়।'
কন্দর্পনারায়ণ ভিন্নমত হবার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন—'পুলিশ ডাকল, আর ছেলে দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই অ্যারেস্ট করে নিল?'
তারপর দুদিকে মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন—'না ম্যাডাম, এমন তো হয় না। পুলিশ স্ট্রং এভিডেন্স না থাকলে, ড্রাগের কেসে, কোনো প্রভাবশালী পরিবারের ছেলেকে ধরতে সাহস পাবে না।
মিস্টার বোস, আপনি নিজে একজন আই এ এস অফিসার, আপনার স্ত্রী একটি সরকারি কলেজে পড়ান। পুলিশ নিশ্চয়ই আটঘাঁট বেঁধেই আপনাদের ছেলেকে ধরতে এসেছিল।
দেখি এফ আই আর-এর কপিটা আছে? কী অভিযোগ দিয়েছে ওখানে?'
কন্দর্পনারায়ণ সামনের দিকে হাতটা বাড়াতেই, অশোকবাবু, হাতে ধরে থাকা একটা ফাইল কন্দর্পনারায়ণের দিকে এগিয়ে দিলেন।
কন্দর্পনারায়ণ ফাইলে রাখা কাগজগুলোয় চোখ বোলাতে বোলাতে বলে উঠলেন—'প্রথমে একজনকে ধরে, তার বয়ান রেকর্ড করে। সেই বয়ানের ভিত্তিতেই, পুলিশ আপনার বাড়ির সামনে জাল বিছিয়ে ওয়েট করছিল, অবশেষে, আপনার ছেলে সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ ড্রাগ পাচারের উদ্দেশ্যে, পকেটে ড্রাগ নিয়ে বাইরে বেরোতেই, তাকে ড্রাগ সমেত গ্রেফতার করা হয়।
শুধু তাই নয়, আপনার ছেলের বয়ানের ভিত্তিতে, মূল পাচারকারী বা ড্রাগের ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের কাছ থেকেও বিপুল পরিমাণ ড্রাগ উদ্ধার হয়েছে, বেশিরভাগই 'ডায়াজেপাম' প্রজাতির ড্রাগ।'
কন্দর্পনারায়ণ থামলেন। ঘরে উপস্থিত, জুনিয়র ল'ইয়ারদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তখন ঠিক এই প্রজাতির বে-আইনি ড্রাগগুলো নিয়েই আলোচনা করছিলাম, চলতি কথায়, এই ড্রাগগুলোকেই বলে, 'ডেট রেপ ড্রাগ।'
পারমিতা বললেন, 'বিপুল পরিমাণ, এই ড্রাগকে ধীরে ধীরে গোটা শহরে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরাও এই ড্রাগে আসক্ত হয়ে উঠছে।'
কন্দর্পনারায়ণ আবার মুখ খুললেন—'তবে, আশার কথা, আপনার ছেলের কাছ থেকে, খুবই কম পরিমাণ ড্রাগ সিজ করা হয়েছে, অর্থাৎ, ব্যবসা করার জন্য যতটা পরিমাণ রাখা দরকার, ততটা নয়, সামান্য পরিমাণই তার কাছ থেকে পাওয়া গেছে।'
চান্দ্রেয়ী বোসের মুখ, মুহূর্তে ঝকঝক করে উঠল। বলে উঠলেন—'তাহলে, আমার ছেলের জামিনটা কালকেই হবে তো? কালই ওর বেল-টা করে দিন, প্লিইজ।' তাঁর গলা দিয়ে মিনতি ঝরে পড়ল।
কন্দর্পনারায়ণ দুদিকে মাথা নাড়লেন, 'উঁহু, নট পসিবল, এত তাড়াতাড়ি নয়, অপেক্ষা করতে হবে, এই যা কেস—আই মিন, কলকাতা পুলিশ যা কেস সাজিয়েছে, তাতে, আপনাকে অপেক্ষা করতেই হবে। তবে ধৈর্য ধরুন, জামিন করাবোই, তবে কিছুদিন পর।'
কন্দর্পনারায়ণ কথা শেষ করতে না করতেই, 'আঁ আঁ আঁ' শব্দে, একটা আর্তনাদ করে, চান্দ্রেয়ী বোস, চোখ উল্টে অজ্ঞান হয়ে চেয়ারেই এলিয়ে পড়লেন, মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মুখটা এবং হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে বেঁকে যেতে লাগল।
অশোক বোস, নিজের স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে, 'এই কী হল? চোখ খোলো, চোখ খোলো,' বলে কাতর স্বরে চীৎকার করে উঠলেন।
কন্দর্পনারায়ণ চেয়ারে যে অবস্থায় ছিলেন, সেই অবস্থাতেই বসে রইলেন, শুধু ইশারায়, পারমিতাকে ডেকে বললেন— 'গ্লাসে করে জল এনে ওঁর চোখে-মুখে ছিটিয়ে দে। আসলে, ছেলের অ্যারেস্ট হয়ে যাওয়ার শকটা উনি নিতে পারেননি।'
পারমিতা, জয়শ্রী, দ্বৈপায়ন, নাজির, সুপ্রীম, সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, ভদ্রমহিলার শুশ্রূষা করার জন্য।
কন্দর্পনারায়ণ ওঁদের বললেন—'ব্যস্ত হোস না, উনি এক্ষুণি ঠিক হয়ে উঠবেন, ওঁকে একটু জল খাওয়া'।
চেম্বারের মুহূরী রবি, একটা গ্লাসে করে, জল এনে দিল অশোকবাবুকে, তিনি গ্লাসের থেকে জল নিয়ে চান্দ্রেয়ী দেবীর চোখেমুখে দিতেই, উনি আস্তে আস্তে ধাতস্থ হয়ে সোজা হয়ে বসলেন।
কন্দর্পনারায়ণ, অশোক বোসের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বললেন—'একটু আগে, আমার এক জন জুনিয়র বলছিল, আপনার স্ত্রী, কলেজে অংক করান-জীবনের অংক মেলাতে পারলে, আমার কাছে ছুটে আসতে হত না।
এই যে, আপনাদের একমাত্র ছেলের প্রতি, মায়া, মমতা, বাৎসল্যবোধ, এটা খারাপ নয়, শুধু ছেলেকে সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেননি। পারলে, আজকে এই দিন দেখতে হত না।'
তারপরই, গলায় কাঠিন্য এনে বললেন—'শুনুন মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বোস। কলকাতা পুলিশ রীতিমতো, ফাঁদ পেতে আপনাদের ছেলেকে ধরেছে। তারপর, তার বয়ানের ভিত্তিতে অন্য মূল আসামীদের ধরেছে। তাদের কাছ থেকে, 'কমার্শিয়াল কোয়ানটিটি' বা বে-আইনিভাবে মজুত করে রাখা বিপুল পরিমাণ ড্রাগ রিকভার করেছে।
ভাগ্য ভালো, যে, আপনার ছেলেকে, মূল আসামী হিসেবেও দেখায়নি, বা তার কাছ থেকে, বেআইনি মজুতও দেখায়নি। জামিন আমি নিশ্চয়ই করাব, তবে ধৈর্য আপনাকে ধরতেই হবে।'
একটু থেমে স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে আবার বলা শুরু করলে— 'এই মুহূর্তে ড্রাগের কারবার, গোটা সমাজকে ঘুন পোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে। ভদ্র, শিক্ষিত পরিবারের ছেলেমেয়েরাও তাতে জড়িয়ে পড়ছে।
ড্রাগের কারবারের সঙ্গে যারা জড়িয়ে পড়ছে, তাদের প্রতি কোনো সহানুভূতি আমার নেই।
আমি নিশ্চয়ই আপনার ছেলেকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনব, তবে, আমার নিজস্ব উৎসাহেই আমি ছাড়ব। কারণ, ওর কাছ থেকেই আমায় জানতে হবে, আর কে কে আছে এর পেছনে।
পুলিশ অবশ্যই তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে তদন্ত করবে, কিন্তু, মনে রাখতে হবে, পুলিশ অল-আউট অ্যাটাকে যেতে পারবে না। তাদের বাধ্যবাধকতা আছে। পলিটিকাল প্রেশার আছে। ওপরওয়ালাদের নিজেদের ভেতরে পলিটিকস আছে—বিভিন্ন ধরনের ইকোয়েশন আছে। যা আমার নিজের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নয়। সমাজের প্রতি আমার ও কিছু কর্তব্য আছে। সেই তাগিদ থেকেই, আমি আমার মতো কাজ করব।'
সাত দিন পর বিকেল তিনটে
প্রেসিডেন্সি কারেকশনাল হোমের ওয়েলফেয়ার অফিসার শুভদীপ মুখার্জির অফিস ঘরে, আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রাখাই ছিল। ঠিক তিনটের সময় আরিয়ান বোসের সঙ্গে ইন্টারভিউ-এর জন্য নির্ধারিত।
কন্দর্পনারায়ণ, স্বয়ং আই জি (প্রিজন) অভয় পাণ্ডের সঙ্গে কথা বলে ইন্টারভিউ-এর জন্য সময় নিয়েছিলেন।
ল'ইয়াররা, সংশোধনাগারে গিয়ে, তাঁদের ক্লায়েন্টদের সঙ্গে মামলার বিষয়ে বিভিন্ন রকম আলোচনা ও শলা পরামর্শ করতেই পারেন। এটা একজন অভিযুক্তের আইনি অধিকারের মধ্যেই পড়ে।
মিস্টার অশোক বোস ও মিসেস চান্দ্রেয়ী বোসের ছেলে আরিয়ান বোসকে, প্রেসিডেন্সি কারেকশনাল হোম-এ এনে রাখা হয়েছে। কলকাতা পুলিশ আরিয়ান বোসের জন্য দশদিন পুলিশ কাস্টডি বা পুলিশ হেফাজত চেয়েছিল। কিন্তু, আলিপুর জেলা আদালতের স্পেশাল বেঞ্চ পাঁচদিন পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেন। তারপর থেকে, তার জেল হেফাজতের নির্দেশ হয়। সেই অনুযায়ী, পুলিশ হেফাজতের মেয়াদ শেষ হবার পর, আরিয়ানকে নিয়ে আসা হয়, প্রেসিডেন্সি জেল-এ বা প্রেসিডেন্সি কারেকশনাল হোম-এ।
'জেল' কথাটা এখন উঠেই গেছে, এখন বলা হয় কারেকশনাল হোম বা সংশোধনাগার। একজন অভিযুক্ত, এখানে এসে, সংশোধিত হবেন, তাঁকে, বিভিন্ন ধরনের ট্রেনিং, যেমন ভোকেশনাল ট্রেনিং ইত্যাদি দেওয়া হবে, তারপর তিনি আবার সমাজের মূলস্রোতে ফিরে যাবেন, সেটাই, আইন রচয়িতাদের উদ্দেশ্য।
হেফাজতে থাকাকালীন, পুলিশ, আরিয়ান বোসকে দীর্ঘ জেরা করেছে, কিন্তু, প্রায় কিছুই জানতে পারেনি। তবে, এটাও ঠিক, তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, সে কার বা কাদের কাছ থেকে, ড্রাগ কিনত, তখন সে ওই দুজন বাংলাদেশির নাম বলে, যাদের পুলিশ পরে অ্যারেস্ট করেছে, এবং তাদের কাছ থেকে, পুলিশ বিপুল পরিমাণ ড্রাগ বাজেয়াপ্ত করেছে। এছাড়া, তদন্তে, সেরকম উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি কিছুই হয়নি।
ভবানীভবনের সামনের রাস্তাটা সোজা বেশ খানিকটা এগিয়ে, দু-ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছে। একটা রাস্তা, বাঁদিকে, ন্যাশনাল লাইব্রেরি, চিড়িয়াখানার দিকে ঘুরে গিয়েছে। আর একটা রাস্তা, ঢুকে গিয়েছে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের দিকে। ওই রাস্তাটাই আবার, একটু আগে, ঘুরে গিয়ে, এস এস কে এম হাসপাতালের পেছনের রাস্তায় গিয়ে পড়েছে।
আজ, বিকেল তিনটে বাজার কিছু আগেই, নাজির আর সুপ্রীম-কে সঙ্গে নিয়ে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের মূল দরজার বাইরে পৌঁছে গিয়েছিলেন, কন্দর্পনারায়ণ।
নাজির আর সুপ্রীম, আগে কখনও প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারের ভেতরে ঢোকেননি তাঁরা অবাক চোখে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সংশোধনাগারের ভেতরটা দেখছিলেন।
ওয়েলফেয়ার অফিসার শুভদীপ মুখার্জির সঙ্গে কন্দর্পনারায়ণের সুসম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তিনি, খবর পেয়েই, একজন সিকিউরিটি গার্ড-কে দিয়ে, ওঁদের ভেতরে ডেকে নিলেন, তবে, সংশোধনাগারের ভেতরে ঢুকবার আগে, বাইরে, গার্ডদের ঘরে, ওঁদের তিনটে মোবাইল ফোন জমা দিয়ে যেতে হল।
শুভদীপবাবু, কন্দর্পনারায়ণকে দেখে, খুশি হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করলেন, কন্দর্পনারায়ণও হাতজোড় করে প্রতি নমস্কার করলেন।
শুভদীপ বাবুই তিনকাপ চিনি ছাড়া লিকার চা-এর অর্ডার দিয়ে, কথা শুরু করলেন—'কী ব্যাপার, কন্দর্পনারায়ণবাবু, আপনার সঙ্গে আমার বাইশ বছরের পরিচয়। খুব কম ক্ষেত্রেই, আসামীর সঙ্গে কথা বলতে, আপনি স্বয়ং জেল-এর ভেতরে ঢুকেছেন। শুধু তাই নয়, আই জি প্রিজন, নিজে, আমাকে জানিয়েছেন, যে, আপনি আসবেন, আমি যেন আপনার খেয়াল রাখি, আপনাকে যত্ন করি।'
হাসতে শুরু করলেন, শুভদীপ বাবু, —'আসলে, উনি তো আর জানেন না, যে, আমার চাকরি জীবনের শুরু থেকে আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়।'
কন্দর্পনারায়ণও হাসলেন, 'ঠিকই, আপনার সঙ্গে, আমার বহু বছরের পরিচয়, আর সেখান থেকে বন্ধুত্ব। বহু মামলার ক্ষেত্রে আপনি আমাকে সাহায্য করেছেন।'
শুভদীপবাবু, কন্দর্পনারায়ণকে থামিয়ে দিয়ে বলতে শুরু করলেন— 'ওয়েলফেয়ার অফিসার হিসেবে, জেল-এর মধ্যে কাজ করতে করতে দেখেছি, কত অসহায়, দরিদ্র মানুষ, বিনা বিচারে জেল খাটছে বছরের পর বছর, অথবা, ভালো ল'ইয়ার না রাখতে পারায়, মামলায় হেরে গেছে। আমি যখনই, আপনাকে অনুরোধ করেছি, আপনি বিনা পারিশ্রমিকে তাদের হয়ে মামলা করে দিয়েছেন।'
কন্দর্পনারায়ণ, শুভদীপবাবুর মুখ থেকে নিজের তারিফ শুনে, লজ্জা পাবার ভাব করলেন। কথা ঘোরাবার জন্য বললেন—'হ্যাঁ, আপনার কাছ থেকে, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া সত্ত্বেও, আমি আই জি, মিস্টার অভয় পাণ্ডেকে জানিয়ে রেখেছিলাম, যে, আমি আজ প্রেসিডেন্সি জেলে আসছি। ইচ্ছে করেই, পুরো ব্যাপারটা অফিসিয়াল রাখতে চেয়েছিলাম।' কন্দর্পনারায়ণ থামলেন।
শুভদীপ বাবুর অফিস ঘরটা খুব সুন্দর সাজানো। বড় টেবিলে পুরু কাচ পাতা। সবুজ কার্পেটে মোড়া গোটা ঘরটা। দরজা-জানালায় সবুজ মোটা কাপড়ের পর্দা। ঘরে গান্ধিজির একটা বড় ছবি টাঙানো। উল্টোদিকের দেওয়ালে, একটা বড় ঘড়ি। টেবিলে ফ্লাওয়ার ভাসে, এক থোকা সাদা গন্ধরাজ ফুল, গোটা ঘরকে যেন সুরভিত করে তুলেছে। উঁচু ছাঁদ থেকে ঝোলানো বড় বড় টিউব লাইটের আলো, ঘরটাকে উজ্জ্বল করেছে।
কন্দর্পনারায়ণ ঘাড় ঘুরিয়ে গোটা ঘরটাকে দেখতে দেখতে বললেন— 'আপনার রুচির তারিফ না করে পারছি না, শুভদীপবাবু, কী সুন্দর সাজানো আপনার ঘরটা।'
বড় টেবিলের একপাশে, কাঠের গদিমোড়া চেয়ারে বসে রয়েছেন শুভদীপবাবু, উল্টোদিকেই, সুন্দর কাঠের চেয়ারে বসেছেন, ওঁরা তিনজন, কন্দর্পনারায়ণ, আর তাঁর দুপাশে নাজির এবং সুপ্রীম।
সাজানো ঘরের প্রশংসা শুনে শুভদীপবাবু বললেন—'প্রতিদিন, আমার এই ঘর যে, সুন্দর করে সাজানো হয়, তার কৃতিত্ব কিন্তু আমার নয়। আমার অফিসে যে ছেলেটি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করে, তার নাম, ময়ূখ। খুব ভালো ছেলে—লাইফার।'
কন্দর্পনারায়ণ শুভদীপবাবুর কথা শুনতে শুনতে নাজির আর সুপ্রীমের দিকে তাকিয়ে বললেন—'লাইফার মানে, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা পাওয়া আসামী। অর্থাৎ, যাদের 'লাইফ ইমপ্রিসনমেন্ট', সাজা হয়েছে। এইসব সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা, 'কারেকশনাল হোম'-এর ভেতরেই কাজ করে, তাদের 'রোজকার পারিশ্রমিক' যোগাড় করেন, সেই টাকাটা, তারা এখানেই জমাতে পারেন, আবার ল'ইয়ারের খরচ, মামলা চালাবার খরচ হিসেবেও ব্যয় করতে পারেন। বাড়িতেও পাঠাতে পারেন। টাকাটা হয়তো খুব একটা বেশি নয়। তবে, অনেক বছরের রোজগার জমিয়ে তুলতে পারলে, এককালীন মন্দও হয় না।
আর, যে সব, 'কনভিক্ট' বা সাজাপ্রাপ্ত আসামী, এই ধরনের অফিসে, যেমন ধর, এই কারেকশনাল হোমগুলোর ফ্রন্ট অফিসে বা ডেস্কে কাজ করেন বা জেল সুপার বা ওয়েলফেয়ার অফিসারের ঘরে লেখালেখির কাজ করেন, কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করেন, তাদের বলে 'রাইটার'।'
কন্দর্পনারায়ণ-এর কথা শেষ হতে না হতেই একটি অল্পবয়সি ছেলে, হাতে, কাচের ট্রেতে, সাদা কাপে করে তিনকাপ চা নিয়ে, দরজার বাইরে ঝোলানো মোটা পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
শুভদীপ বাবু, ছেলেটিকে দেখেই, মুখে খুশির ভাব দেখিয়ে বলে উঠলেন— 'কন্দর্পনারায়ণ বাবু, ওর কথাই বলছিলাম—ওর নাম ময়ূখ। একটা রেপ-এর কেসে যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে।'
বলেই, ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন—'ময়ূখ, নমস্কার করো। হাইকোর্টের উকিলবাবু। ঘর সাজানোর প্রশংসা করছিলেন। আমি বললাম— তুমি রোজ, আমার ঘর সাজিয়ে দাও—পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দাও।'
শুভদীপবাবু, এবার কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে তাকিয়ে বললেন—'ওর একটা শখ আছে—বাগানকরা।'
টেবিলের ওপর, কাচের ভাসে রাখা গন্ধরাজ ফুলগুলো দেখিয়ে বললেন—'এই ফুলগুলো, ওরই করা বাগানের গাছের ফুল। রোজ, বাসি ফুল ফেলে, আবার নতুন-তরতাজা, ফুল, দিয়ে যায় ও।'
কন্দর্পনারায়ণ অবাক চোখে, তাকালেন ময়ূখের দিকে—বড়জোর পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়স। ফর্সা, গালে হালকা দাড়ি, সাদা একটা হাফ শার্ট আর সাদা পাজামা পরা—মিষ্টি চেহারার একটা ছেলে।
বললেন—'এত মিষ্টি চেহারার একটা ছেলে। যার মনের মধ্যে এত সুন্দর শিল্পী সত্তা, যে ফুল ভালোবাসে, গাছ ভালোবাসে, তার বিরুদ্ধে, 'রেপ'-এর চার্জ!'
ময়ূখ, কন্দর্পনারায়ণ-এর কথা শুনে যেন একটু থমকালো। তারপর মাথা নিচু করে, পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ দিয়ে, কার্পেটটা খুঁটতে খুঁটতে বলল—'স্যার, আপনাকে কে না চেনে? টিভিতে আপনাকে প্রায়ই দেখা যায়। বড় বড় মামলা করেন। তবে আপনাকে বলতে লজ্জা নেই—আলিপুর কোর্ট আমায় সাজা দিয়ে দিয়েছে। আমি মামলায় হেরে গেছি। কোর্টের বিচারে আজ আমি দোষী, রেপিস্ট। আজ আর আমার কথার দাম নেই। কেউ বিশ্বাসও করবে না। আমি জানি স্যার, আপনিও বিশ্বাস করবেন না।
তবে, এটা ঠিক, ওই মেয়েটার সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক ছিল, অনেকদিন ধরেই। ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র দিন, ওদের বাড়িতে কেউ ছিল না, আমাকে ফোন করে আসতে বলে। আমি গিয়েছিলাম। সেখানে, ওর সম্মতিতে, আমাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়।
ও সেদিন, কোথা থেকে ট্যাবলেট যোগাড় করেছিল। সেটা খেয়ে আমাদের হুঁশ ছিল না। কিন্তু, হঠাৎ করেই ওর মা-বাবা এসে পড়েন, আমরা ধরা পড়ে যাই। প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা আমাদের সেন্স ছিল না। আমরা দুজনে যে ঠিক কী করেছি, আমাদের খেয়ালই নেই।
পুলিশ আমাকেই অ্যারেস্ট করে। ওকে ওর বাবা-মা চাপ দিয়ে বলিয়ে নেয়, আমি ওকে, কোল্ড ড্রিংস-এনেশার ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে, ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে, ওকে 'রেপ' করেছি।'
ময়ূখের কথা শুনতে শুনতে কন্দর্পনারায়ণ অস্ফূটে বলে উঠলেন—'মাই গড! ডেট রেপ ড্রাগস!'
ময়ূখ চমকে উঠল—'স্যার? আপনি জানলেন কী করে?'
কন্দর্পনারায়ণ ময়ূখের কথার গুরুত্ব না দিয়ে বললেন—'আপনার বাড়ি কোথায় ভাই? আপনার গার্ল ফ্রেন্ডের বাড়িই বা কোথায়?'
ময়ূখ বলে উঠল—'কসবা এলাকায়।'
পাশ থেকে সুপ্রীম বলে উঠলেন—'যত কাণ্ড কসবায়?'
কন্দর্পনারায়ণ মাথা নেড়ে বলে উঠলেন— 'রাইট—'যত কাণ্ড' কি না জানি না, তবে, কসবা অঞ্চলে যে, একদল কুখ্যাত অপরাধী ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে, বেশ কিছুদিন ধরে, সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। পুলিশ হয়তো বা এতটা তলিয়ে দেখছে না।' ময়ূখ আবার বলে উঠল, 'স্যার, আপনি তো আমার বাগান করার প্রশংসা করছিলেন, বিশ্বাস করুন, আমি বাগান করি, শখে নয়, দুঃখ ভুলতে। আমি খারাপ ছেলে নই। আমি ভালো বাড়ির ছেলে, বাবা-মা, দুজনেই ডাক্তার, আমি কলকাতার নামী কলেজে পড়াতাম, কিন্তু, আজ আমি সব হারিয়েছি।'
ময়ূখের কথা শেষ হতে না হতেই, একজন সিকিউরিটি গার্ড, ঘরের পর্দা সরিয়ে, ভেতরে উঁকি মেরে বললেন—'আসব স্যার?'
শুভদীপবাবু বলে উঠলেন—'যোগেনবাবু, ওকে নিয়ে আসুন।'
আরিয়ানকে নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন যোগেনবাবু।
কন্দর্পনারায়ণ ভালো করে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জরিপ করলেন আরিয়ানকে। এর আগে আরিয়ানের হয়ে জামিন 'মুভ' করার সময়, তাকে কোর্টে 'প্রোডিউস' করা হয়েছিল। তখন ভালো করে দেখবার সুযোগ পাননি।
এক মাথা ঝাঁকড়া চুল, গালে দাড়ি, ছিপছিপে চেহারা, জেল-র নির্দিষ্ট পোশাক, সাদা জামা আর সাদা পাজামা পরা, মুখের মধ্যে একটা ছেলেমানুষি যেন এখনও লেগে রয়েছে।
কন্দর্পনারায়ণ-কে দেখেই ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল আরিয়ান—'আঙ্কল, আমাকে বের করুন। আমি এখানে আর থাকতে পারছি না, প্লিইজ আমাকে বের করে বাড়িতে নিয়ে যান। আমি ড্রাগের ব্যবসা করি না।'
কন্দর্পনারায়ণ এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, আরিয়ানের কাঁধে হাত দিয়ে, সান্ত্বনা দেবার সুরে বললেন—'আমি তোকে নিশ্চয়ই জেল থেকে ছাড়িয়ে মা-বাবার কাছে নিয়ে যাব। কিন্তু, তার আগে বল, তুই আমাকে সত্যি কথা বলবি?'
আরিয়ান, কাঁদতে কাঁদতেই বলল—'আঙ্কল, পুলিশ আমাকে যা যা জিজ্ঞেস করেছে, সব প্রশ্নের সত্যি জবাব দিয়েছি। তবু ওরা আমাকে প্রচণ্ড মেরেছে। বুট পরে লাথি মেরেছে। যেই আমি মাটিতে পড়ে গেছি, ওরা আমার বুকে লাথি মেরেছে। আমার প্যান্ট নামিয়ে পেছনে কাঁচা লংকা ডলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আমি যা যা জানতাম সব সত্যি কথা বলেছি।'
কন্দর্পনারায়ণ ভুরু কুঁচকে শুভদীপ বাবুর দিকে তাকালেন—'পুলিশ, ওকে কাস্টডিতে থাকাকালীন মেরেছে? অভিযুক্তর ওপর ফিজিক্যাল টর্চার তো আইনবিরুদ্ধ।'
শুভদীপবাবু ও একমত হবার ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়লেন—'হ্যাঁ, পুলিশ কাস্টডি থেকে, জেল কাস্টডিতে আনবার আগে, আমরা ওর মেডিক্যাল টেস্ট করাই, সেখানে, ওর গায়ে, একাধিক ইনজুরি পাওয়া গেছে।'
কন্দর্পনারায়ণ নিজের বাঁ হাতের তালুতে, ডান হাত দিয়ে সজোরে ঘুঁসি মেরে বলে উঠলেন—'আমাকে জানাসনি কেন? আমি কোর্টে, পুলিশকে মজা টের পাওয়াতাম।'
আরিয়ান ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই বলল—'পুলিশ আমাকে ভয় দেখিয়েছিল। বলেছিল, মারার কথা কাউকে জানালে, আরও মারবে।'
কন্দর্পনারায়ণ পরম মমতায় আরিয়ানের পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন— 'কাঁদিস না। তোকে আমি জেল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাব। কিন্তু আমাকে বলতো, তোকে যেদিন অ্যারেস্ট করে, সেদিন ঠিক কী হয়েছিল?'
ময়ূখ ততক্ষণে, একটা জলের বোতল এনে, আরিয়ানের দিকে বাড়িয়ে ধরেছে। আরিয়ান জলের বোতল থেকে, জল খেয়ে, ধাতস্থ হয়ে, মোটামুটি যা বলল, তা হল এই—
'ওদের বন্ধুদের একটা গ্রুপ আছে, বিভিন্ন কলেজের। ওরা মাঝে মাঝেই একসঙ্গে সবাই মিলে পার্টি করে। সেই সব পার্টিতে প্রায়ই সবাই, কোনো না কোনো রকম ড্রাগ নিয়ে থাকে। কোকেন, হাসিস, ব্রাউনসুগার, সব রকম ড্রাগই সেখানে চলে।
তবে, সবচেয়ে বেশি চলে 'ইয়াবা' বলে এক ধরনের ট্যাবলেট'।
কন্দর্পনারায়ণ এই পর্যন্ত শুনেই, আরিয়ানকে থামিয়ে নাজির আর সুপ্রীমের দিকে তাকিয়ে বললেন—'ডেডলি কমবিনেশন অফ মেথামফেটামাইন আর ক্যাফেইন, একটা খুব শক্তিশালী অ্যাডিকটিভ স্টিমুল্যান্ট, বেআইনি ড্রাগ। এই ধরনের ড্রাগকেই বলে সাইকোট্রপিক সাবস্ট্যান্স। থাইল্যান্ডে, এই ধরনের স্টিমুল্যান্টকে বলে 'ক্রেজি মেডিসিন।'
নাজির ঘাড় নেড়ে বললেন—'ভয়ংকর ব্যাপার স্যার। মূলত দক্ষিণ আর দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ব্যাপক প্রচলন। আজকাল, এমনকী কলকাতার রেভ পার্টিগুলোতেও এই ধরনের নেশার ওষুধগুলোরই রমরমা।'
কন্দর্পনারায়ণ ঠোঁট উলটে বললেন—'শুনতেই তো পাচ্ছিস, এখন কলকাতার অনেক কলেজ ছাত্ররাই, বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ নিচ্ছে, স্রেফ মজা করবার জন্য। এই 'ইয়াবা' ট্যাবলেটগুলো এখন খুব জনপ্রিয়, কলেজের ছেলেমেয়েদের কাছে।'
কন্দর্পনারায়ণ আবার তাকালেন, আরিয়ানের দিকে—'কিন্তু, সেদিন তো, তোর কাছ থেকে, অন্য ধরনের ড্রাগ পাওয়া গিয়েছিল—ইয়াবা তো পাওয়া যায়নি। অন্তত কলকাতা পুলিশের তৈরি করা সিজার লিস্ট, তাই বলছে।'
আরিয়ান মাথা নিচু করল—'হ্যাঁ, গত কয়েকদিন ধরে, আমার গার্ল ফ্রেন্ডের সঙ্গে ফিজিক্যাল রিলেশন তৈরি করছিলাম। ওর বাবা-মা কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছিলেন। ও বাড়িতে একাই ছিল। আমাকে ডাকত, আমি যেতাম, তারপর লুকিয়ে, ওর ড্রিংকে এই ড্রাগটা মিশিয়ে দিতাম। খুব সামান্য। তাতেই ওর কোনো হুঁশ থাকত না। আমি ওকে নিয়ে যা খুশি করতাম। ও বাধা দিত না। ইনফ্যাক্ট, ও টেরই পেত না যে, ওর সঙ্গে কী করা হচ্ছে।'
কন্দর্পনারায়ণ হাঁ করে রইলেন—'ডেট রেপ ড্রাগস'!
আরিয়ান, মাথা নিচু করেই উত্তর দিল—'হ্যাঁ স্যার, পুলিশ যে ফাঁদ পেতেছে, আমি বুঝিনি, আগে আমার বন্ধু কুনালকে তোলে, কুনালকে, টাটা সুমোতে বসিয়ে, আমার বাড়ির নিচে আসে। কুনালকে দিয়ে জোর করে আমাকে ফোন করায়।
কুনাল পুলিশের গাড়িতে বসেই আমাকে ফোন করে, বলে—'ইয়ার, আমার, আর্জেন্টলি, ট্যাবলেট দরকার। এক্ষুণি লাগবে।' আমি জবাব দিই, আমার কাছে বেশি নেই। কাল আমার নিজের লাগবে। আমি গার্লফ্রেন্ড মীট করতে যাব।
কুনালকে দিয়ে পুলিশ বলায়, ওরও একটুখানি হলেই হবে। ওর ঘরেও, ওর গার্লফ্রেন্ড আসছে। ও ফিজিকাল রিলেশন করবে। ও আমাকে বলে, অল্প একটু দিলেই হবে।
আমি ট্যাবলেট নিয়ে, বাইরে বেরোতেই, পুলিশ আমাকে ধরে নেয়। আমাকে মারতে মারতে লালবাজারে নিয়ে আসে। আমি, মা-বাবাকেও খবর দিতে পারিনি।'
নাজির বললেন—'দিস ইজ ইললিগাল, পুলিশ তো এভাবে অ্যারেস্ট করতে পারে না। আগে গেজেটেড অফিসারকে খবর দিতে হবে। তিনি আসবেন, সাক্ষীদের সামনে, অভিযুক্তকে সার্চ করতে হবে। বে-আইনি ড্রাগ ওজন করাতে হবে। গ্রেপ্তার করার সময়, 'মেমো অফ অ্যারেস্ট' তৈরি করতে হবে। আরও কত কী।'
কন্দর্পনারায়ণ শব্দ করে হাসলেন— 'এগুলো সবই আইনের বইতে লেখা আছে। এই কথাগুলো, আইনের বইতেই মানায় ভালো। পুলিশ কটা ক্ষেত্রে আর, এই কথাগুলো মেনে চলে?'
কন্দর্পনারায়ণ এবার তাকালেন শুভদীপ বাবুর দিকে—'আপনি তখন জিজ্ঞেস করছিলেন, এই মামলাটার মধ্যে এমন কী আছে, যে, আমি নিজে, কারেকশনাল হোম-এ চলে এলাম, অ্যাকিউসড-এর সঙ্গে কথা বলতে?'
একটু থেমে আবার বললেন—
আছে, সামাজিক দায়বদ্ধতা। আমি অবশ্যই আরিয়ানের ল'ইয়ার, তাকে জেল থেকে ছাড়াব, কিন্তু, একটা কথা ঠিক, বে-আইনি ড্রাগের ছোবলে, ইয়ং-জেনারেশন শেষ হয়ে যেতে বসেছে। কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বে-আইনি নেশার ওষুধ ছড়িয়ে পড়েছে।'
থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। অসহায়ের মতো, নিজের ডানহাতের বুড়ো আঙুল, আর তর্জনী দিয়ে, কপালের দু-পাশের রগ-দুটো টিপে ধরে, স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলেন—'আপনি, আরিয়ানের একটা কথা ফলো করেছেন, ওরা এই 'ডেট রেপ ড্রাগস'টা নিয়মিত ব্যবহার করছে, নিজেদের বান্ধবীদের সঙ্গে, শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করবার সময়।
ভেবে দেখুন, এরা কতবড়ো প্রতারণা করছে। গার্লফ্রেন্ডরা জানতেই পারছে না। অথচ, তাদের পানীয়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এই ভয়ংকর ড্রাগ। তার ফলে, এদের গার্ল ফ্রেন্ডরা চলে যাচ্ছে, এই খারাপ ছেলেগুলোর কন্ট্রোলে। বান্ধবীদের শরীরগুলো নিয়ে, এরা যা খুশি তাই করছে।'
কন্দর্পনারায়ণ যেন নিজে নিজেই কথা বলতে বলতে ছটফট করে উঠলেন—'এরা মেজর-সাবালক। স্বেচ্ছায় শারীরিক সম্পর্ক করতেই পারে। আমরা বলার কে? কিন্তু, এই আরিয়ানের মতো ছেলেগুলো, তাদের বান্ধবীদের ঠকাচ্ছে—প্রতারণা করছে। বলতে পারেন, ওষুধ খাইয়ে, বেহুঁশ করে, যা-খুশি তাই করছে।'
একটু থেমে, আবার শুরু করলেন কন্দর্পনারায়ণ—'কিন্তু আমার ধারণা, শুধুমাত্র, ওষুধ খাইয়ে, বান্ধবীকে বেহুঁশ করে, তার শরীর ভোগ করেই এরা থেমে নেই—এদের অপরাধের মাত্রা আরও সুদূর প্রসারী।'
শুভদীপ বাবু উৎসুক হলেন—'কী রকম?'
কন্দর্পনারায়ণ সোজা তাকালেন আরিয়ানের চোখের দিকে। কন্দর্পনারায়ণ-এর ভুরু দুটো কুঁচকে ধনুকের মতো বেঁকে গেছে, কান দুটো লাল হয়ে উঠেছে, চশমার কাচের আড়ালে, চোখ দুটো যেন জ্বলছে। কেটে কেটে স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন—'দ্যাখ, তোকে আমি জেল থেকে বের করব। তবে, তুই যদি সত্যি কথা বলিস, তাহলেই। না হলে, আমি তোর জন্য কোর্টে দাঁড়াব না।'
আরিয়ান হাত জোড় করে, জলভরা চোখে কন্দর্পনারায়ণকে বলল—'আঙ্কল, আপনি যা জিজ্ঞেস করবেন, সব সত্যি কথা বলব।'
কন্দর্পনারায়ণ বলে চললেন—'তোদের মোবাইল ফোনগুলো পুলিশ সিজ করেছে আমি জানি। ওরা তোদের 'কল হিস্ট্রি' চেক করছে, তাও জানি। কিন্তু, তোদের ফোনের 'ফোটো গ্যালারি' চেক করছে কিনা জানি না।
আমার ধারণা, তোরা তোদের বান্ধবীদের বেহুঁশ করে, তাদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করার সময় তোরা গোটা ব্যাপারটা ভিডিও করে রাখছিস। তারপর, সেই ভিডিও তোরা বাইরে চড়া নামে বিক্রি করছিস।'
ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকে চমকে উঠলেন।
শুভদীপবাবু বলে উঠলেন—'কী বলছেন? ওরা এত্ত নীচ? জন্তু?'
কন্দর্পনারায়ণ শুভদীপবাবুর দিকে না তাকিয়েই, একদৃষ্টে আরিয়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন—'শুভদীপবাবু, জন্তুদের এত নিচে নামাবেন না। আমি পশুপ্রেমী, আমার কুকুর আছে। আমি, রাস্তার কুকুরদের খেতে দিই। তাদের মানসিকতা এত ঘৃণ্য নয়।'
কয়েক মুহূর্ত সব চুপচাপ। কন্দর্পনারায়ণ চোখের পলক না ফেলে তাকিয়ে আছেন আরিয়ানের মুখের দিকে। আরিয়ানের চোখের ঠিক নিচের পেশীগুলো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। হাতের চেটো দিয়ে কপালের বিন্দু বিন্দু ঘামগুলো মুছতে চেষ্টা করল আরিয়ান। কন্দর্পনারায়ণ খেয়াল করলেন, আরিয়ানের হাতের আঙুলগুলো কাঁপছে।
আরিয়ান আর পারল না, দু-হাতে, নিজের মুখ ঢেকে আবার কাঁদতে শুরু করল— 'আমাকে বাঁচান, আমাকে বাঁচান, আমি কিছু বলতে পারব না, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে.'
কন্দর্পনারায়ণ এবার, দু কদম পিছু হেঁটে, নিজের চেয়ারে এসে বসলেন, শুভদীপ বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন—'ঠিক এই কথাগুলো জানব বলেই, আমি এখানে এসেছি। আমি চাইলে, ও যখন পুলিশ লক-আপে ছিল, তখনই ওর সঙ্গে দেখা করে, এই বিষয়গুলো জানতে চেষ্টা করতে পারতাম। কিন্তু, সেক্ষেত্রে, খুব সম্ভাবনা ছিল, পুলিশের এই নতুন অপরাধটার কথা জেনে যাবার।
পুলিসের মধ্যে আবার, অপরাধীদের সঙ্গে, সাঁট থাকে অনেকসময়ই। তেমন হলে, এই বিষয়টাও হয়তো লিক হয়ে যেতে পারত। আমরা আসল অপরাধীদের ধরতে পারতাম না।'
নাজির আর সুপ্রীম অবাক বিস্ময়ে, অস্ফূটে বলে উঠলেন—'তার মানে, আরিয়ানের দেওয়া বয়ানের ভিত্তিতে, পুলিশ যে দুটো বাংলাদেশিকে ধরেছে, তারা আসল অপরাধী নয়?'
কন্দর্পনারায়ণ বলে চললেন—'এই অপরাধচক্র শুধু কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের বে-আইনি ড্রাগ কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই চক্রের মধ্যেই লুকোনো আছে, আর একটা অপরাধের চক্র।
সেই লুকোনো চক্রের মাথারা, কলেজের ছেলেমেয়েদের শুধুমাত্র ড্রাগ বিক্রির মধ্যেই নিজেরা থেমে থাকেনি। তারা, যেসব ছেলেমেয়েদের এই 'ডেট রেপ ড্রাগ' বিক্রি করে, তাদেরই প্রস্তাব দেয়, যে, তাদের বন্ধু বা বান্ধবীর সঙ্গে শারীরিক মিলনের ঘটনাগুলি লুকোনো ক্যামেরায় বা মোবাইলের মাধ্যমে ভিডিও করে রাখতে, তারপর ওদের কাছেই বিক্রি করতে।
আর এতে, আরিয়ানের মতো ছেলে-মেয়েরাও খুশি। তাদের ড্রাগ কেনার টাকাটা, বন্ধু বান্ধবীদের সঙ্গে, শারীরিক মিলনের ভিডিও বিক্রি করেই উঠে আসছে।'
শুভদীপবাবু, চোখ কপালে তুললেন—'বলেন কী? এত মারাত্মক অপরাধ!'
কন্দর্পনারায়ণ চিন্তিত মুখে বললেন—'প্রায় তিন বছর আগে, দুটি অল্পবয়সি মেয়ে আসেন, আমার কাছে, উত্তর দিনাজপুর এলাকা থেকে মামলা করাবার জন্য। সেখানে অপরাধীদের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ ছিল, ড্রাগের ব্যবসা, সেক্স র্যাকেট চালানো আর পর্ণোগ্রাফির ব্যবসা চালানো।
আমার কাছে, মেয়েদুটি আসে, তারা তাদের অভিযোগ জানায়, এবং আমি সুরাহা চেয়ে, হাইকোর্টে মামলা করি।
অপরাধীরা, এতটাই দুর্ধর্ষ ছিল যে, 'কেন তারা আমার কাছে এসেছে, বা কেন তারা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছে'—স্রেফ এই কারণে, তাদের মধ্যে একজনের ঘরে ঢুকে, তাকে 'গ্যাং রেপ' করে এবং আর একজনকে জোর করে মুখের মধ্যে বিষ ঢেলে দেয়। তাদের নগ্ন ছবি, ভিডিয়ো করে ভাইরাল করে দেয়।
আমি ফের বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনি, হাইকোর্ট, রাজ্য পুলিশের ডিজিকে, সেইদিনই, আদালতে তলব করেন, অপরাধীদের অ্যারেস্ট করতে নির্দেশ দেন। পুলিশ সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, কিন্তু, অপরাধীদের মাথা, প্রভাত জাল কেটে পালিয়ে যায়।'
থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। একটু থেমে আবার শুরু করলেন— 'গত তিন বছর, পুলিশ, মূল অপরাধীকে ধরবার জন্য কি কি করেছে জানি না, কিন্তু, আমি থেমে নেই। আমি সারা বাংলায়, আমার মতো জাল বিছিয়ে রেখেছি।'
আপনি তো জানেন, গত চব্বিশ বছর ধরে আমি মূলত ক্রিমিনাল মামলাই করছি। বহু আসামীকে আমি জেল থেকে ছাড়িয়েছি। আসামীরা, জেল থেকে বেরিয়েই, আগে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা বলেন, 'স্যার, জেল থেকে বের করলেন। কিন্তু, কে আমাকে কাজ দেবে? খাব কি? আপনি আমাকে কাজ দিন।'
সত্যি সত্যিই, আপনি তো জানেন, শুভদীপবাবু, জেল খাটা আসামীদের কেউ কাজ দেয় না।'
শুভদীপবাবু ঘাড় নেড়ে একমত হলেন—'ঠিকই বলেছেন, অফিসার হিসেবে, জেলের ভেতরে থাকা কয়েদিদের ভালোমন্দ দেখি, তাদের ভোকেশনাল ট্রেনিং দিই—যাতে তারা, জেল থেকে বাইরে বেরিয়ে, সমাজের মূল স্রোতে ফিরতে পারে, তার ব্যবস্থা করি। তবুও, আমি জানি, যে, জেল খাটা আসামীদের কেউ কাজ দিতে চায় না।
ক'দিন আগেই, উলুবেড়িয়া গিয়েছিলাম, একটা পারিবারিক কারণে। ফেরার সময়, স্টেশনে, ট্রেনের জন্য দাঁড়িয়ে আছি, একজন ভিখিরি এসে পা জড়িয়ে ধরল। পরিচয় দেওয়ায় চিনতে পারলাম, এই জেলেই ছিল— ইব্রাহিম লস্কর। সে নিজেই বলল, তার জীবনের কথা—জেল থেকে বেরিয়ে অনেক কাজের সন্ধান করেছে, কেউ তাকে কাজ দেয়নি। শেষে, পেট চালাতে, ভিক্ষে শুরু করেছে। এখন, উলুবেড়িয়া স্টেশনে বসে ভিক্ষে করে।'
কন্দর্পনারায়ণ বললেন, 'শুভদীপবাবু, আপনি জানেন কি না জানি না। এই প্রেসিডেন্সিতেই ছিল মহাবীর। মার্ডার কেস-এর আসামী। ওকে আমি, হাইকোর্ট থেকে বেকসুর খালাস করাই—যাবার জায়গা ছিল না—কেউ কাজও দিচ্ছিল না, ও এখন আমার চেম্বারে ক্লার্ক হিসেবে কাজ করে।
সাতটা ব্যাংক ডাকাতির আসামী ছিল, খালেক মহম্মদ, তাকেও জেল থেকে বের করি—কোথাও যাবার জায়গা ছিল না, এখন আমার কাছেই কাজ করে।'
তারপর একটু থেমে আবার বলা শুরু করলেন—'হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম—যে আসামী বা কয়েদীদের আমি জেল থেকে ছাড়িয়ে এনেছি, তাদের অনেকেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, প্রয়োজনে আমি তাদের দিয়ে কাজ করাই। সমাজের কোথায় কী অন্যায় হচ্ছে, তারা আমাকে খবর দেয়। প্রয়োজন বুঝলে, আমি হাইকোর্টে 'পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন' বা 'পিল' মামলা করে, সমাজের বুকে ঘটতে থাকা ওই অন্যায় বিষয়গুলো, কোর্টের নজরে নিয়ে আসি।
আমার এক মক্কেল, জেল থেকে ছাড়া পাবার পর, এখন, ভ্যান রিকশায় করে, সবজি বেচে—মূলত কসবা-রাজডাঙা এলাকায়। সে-ই, আমাকে প্রথম খবর দেয় যে, ওই এলাকায়, কিছু লোক, সিনেমা-সিরিয়াল বা ওয়েব-সিরিজের শুটিং-এর নাম করে, মেয়েদের নিয়ে এসে, তাদের দিয়ে পর্ণোগ্রাফিক ভিডিও বানিয়ে বাজারে ছাড়ছে।
অথচ, যে, মেয়েগুলোকে দিয়ে, ওইসব অশালীন ভিডিও বানানো হচ্ছে, তাদের কিছুই মনে থাকছে না। যেন কিছুই হয়নি।
আমি, আমার, বেশ কিছু, জেল ফেরত মক্কেলদের নিয়ে একটা টীম বানিয়ে, তাদের ছড়িয়ে দিই, দক্ষিণ কলকাতার ওইসব অঞ্চলে—যেমন, কসবা, সন্তাোষপুর, বাঘাযতীন, যাদবপুর অঞ্চলে।
আমার টীম নজর রাখতে থাকে—কেউ সবজি বিক্রেতা, কেউ মাছওয়ালা, আবার কেউ ছাতা সারাইওয়ালা বা কেউ মুচির বেশে।
আমি খবর পেলাম যে, ওইসব মেয়েদের প্রথমে একধরনের ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হয় গোপনে। তারপর তাদের দিয়ে বিভিন্ন রকমের ব্লু-ফিল্মের শুটিং করানো হয়। অথচ, ওই মেয়েগুলো বুঝতেও পারে না, যে, তাদের দিয়ে কী জঘন্য কাজ করানো হচ্ছে! নার্কোটিক সেলের ডাকাবুকো অফিসার অমিত মুখার্জীও এই ড্রাগগুলোর সম্পর্কে আমাকে আগেই জানিয়েছিলেন।
ক'দিন আগে, আমার ওই সবজি-বিক্রেতা ইনফর্মার, আমার কাছে, একটি অল্প বয়সি মেয়েকে নিয়ে আসে—সন্ধ্যের অন্ধকারে। মেয়েটি প্রথমে আমার কাছে আসতেই চাইছিল না। শেষে, নিজের নাম পরিচয় গোপন রাখতে হবে, এই কড়ারে, আসতে রাজি হয়।
মেয়েটি এসে আমাকে জানায়, যে প্রথমে, তাকে, সিনেমা-সিরিয়াল ওয়েব সিরিজে, নায়িকার ভূমিকায়, অভিনয়ের সুযোগ দেওয়া হবে বলে প্রলোভন দেখানো হয়। মেয়েটি রাজি হলে, কসবার একটি পাঁচতলা বাড়ির দোতলায় তৈরি স্টুডিওতে আসতে বলা হয়। মেয়েটি শুটিং-এর জন্য গেলে, তাকে পানীয়তে, 'ডেট রেপ ড্রাগস' মিশিয়ে দেওয়া হয়, এবং তাকে দিয়ে ব্লু-ফিল্মের শুটিং করানো হয়। প্রায় বাহাত্তর ঘণ্টা, সে বেহুঁশ ছিল, তাকে দিয়ে যা খুশি তাই করানো হয়। অচৈতন্য অবস্থায় সে কিছুই বুঝতে পারেনি।
শুধু তাই নয়, তার সেন্স ফিরে আসার পর সে যে, ওই বাহাত্তর ঘণ্টায় কি কি করেছে, সে সম্পর্কে তার কিছুই মনে ছিল না।
কিছুদিন পর ওই অপরাধীরা, তাকে আবার ডাকে। ওই ব্লু-ফিল্মের ভিডিও দেখায়, এবং ব্ল্যাকমেইল শুরু করে, বলে আরও পর্ণোগ্রাফিক ভিডিওতে অভিনয় করতে হবে নাহলে, তাকে দিয়ে করানো, ওই ভিডিওগুলো সোশ্যাল সাইটে ছেড়ে দেওয়া হবে।
মেয়েটি আমাকে বলে, যে, তার আত্মহত্যা ছাড়া আর উপায় নেই।
আমি তাকে আশ্বস্ত করি, এবং বলি, আমরা খুব তাড়াতাড়ি এই অপরাধের মূল চক্রীদের ধরতে পারব। তখন, ওই মেয়েটির সাক্ষ্য আমাদের লাগবে। কাজেই সে যদি চায়, সমাজে, তারই মতো অন্য কোনও মেয়ে যাতে, ওই অপরাধীদের পাতা জালে, ধরা না পড়ে, তাহলে, সে যেন আমাদের সাহায্য করে।
অবশেষে, মেয়েটি রাজি হয়েছে। সে আড়ালে থেকেই বিভিন্ন ধরনের খবরাখবর দিয়ে আমাকে সাহায্য করছে।'
শুভদীপবাবু খুশি হলেন—'যাক বাবা, আপনি যখন ওদের পেছনে লেগেছেন, ওরা তখন ধরা পড়বেই।'
নাজির বলে উঠলেন, 'তার মানে, স্যার, এই অপরাধীরা শুধু ড্রাগের চক্র বা শুধু পর্ণোগ্রাফিক ভিডিও ব্যবসার চক্র চালাচ্ছে না, তারা একই সঙ্গে ড্রাগ আর পর্ণোগ্রাফিক ভিডিওর ব্যবসাও চালাচ্ছে।'
কন্দর্পনারায়ণ যেন অন্যমনস্ক, শুভদীপবাবুর ঘরের ডানদিকের পর্দা টানা জানালার ফাঁক দিয়ে জেলের ভেতরের অনেকটা দেখা যাচ্ছে, সে দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বললেন—'আরিয়ানের মা-বাবা যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, তখনই আমি প্ল্যান করে নিয়েছিলাম, যে, আমি আরিয়ানের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলব, এবং এখানে এসে, আরিয়ানের সঙ্গে কথা বলে আমি নিশ্চিত যে, সেও প্রভাতের গ্যাং-য়ের খপ্পরেই পড়েছে।'
কন্দর্পনারায়ণ একটু থেমে, শুভদীপবাবুর দিকে তাকিয়ে, আবার বললেন, 'তবে আমি আপনাকে ধন্যবাদ দেব, যে, আপনি আমাকে আজ আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট ময়ূখের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিয়েছেন।
আজকে আমি একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে, ময়ূখ, বা আরিয়ান, কেউই অ্যাকিউসড বা অভিযুক্ত নয়, ওরা দুজনেই ভিক্টিম, প্রভাতের গ্যাং-য়ের ছড়িয়ে রাখা জালের শিকার।
ময়ূখও কিন্তু, কসবা এলাকারই ছেলে, ওর বান্ধবীও কসবা, যাদবপুর এলাকারই মেয়ে, আমার ধারণা, ওর বান্ধবী, প্রভাতের গ্যাং-য়ের কাছ থেকেই 'ডেট রেপ ড্রাগস' কিনে এনেছিল।'
চেয়ার ছেড়ে উঠলেন কন্দর্পনারায়ণ। হ্যান্ডশেক করার জন্য শুভদীপবাবুর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন— 'ময়ূখ চাইলে, হাইকোর্টে ওর জন্য আমি আপীল মামলা করতেই পারি।'
তারপর, আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে বললেন—'তোকেও আমি খুব শিগগিরই, জেল থেকে বের করে আনব'।
একটু থেমে আবার বললেন—'কিন্তু, তোদের দুজনকে জেল থেকে ছাড়ানোর চাইতেও অনেক বড় কাজ আমার সামনে—সমাজটাকে বাঁচানো—অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের বাঁচানো।'
শুভদীপবাবুর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে, প্রেসিডেন্সি সংশোধনার থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন কন্দর্পনারায়ণ। সঙ্গে সুপ্রীম আর নাজির।
একমাস পরে রাত দশটা
গড়িয়াহাট থেকে যে রাস্তাটা সোজা ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের দিকে চলে গেছে, সেই রাস্তাটার ধারে, থানা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরে, একটা মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং-এর ঠিক নীচেই, ফুটপাথের ওপর টেবিল পেতে মোমো বিক্রি করছিল লামা।
রাস্তার ঠিক উলটোদিকেই, একটু দূরে, একটা ঝুপসি মতো গাছের নীচে, অন্ধকারে, একটা হন্ডা সেভেন সিটার গাড়ি অপেক্ষা করছিল অনেকক্ষণ ধরেই। ভেতরে, কয়েকজন বসে রয়েছেন, নিশ্চল, নিশ্চুপে। রাত দশটা নাগাদ, দ্বৈপায়ন নেমে এলেন, মাঝখানের দরজাটা খুলে।
রাস্তায় দাঁড়িয়ে, কোমরটা সামনে-পেছনে বাঁকিয়ে, আড় ভাঙবার চেষ্টা করলেন, তারপর রাস্তাটা পার হয়ে ওপারে ফুটপাথের ওপর এসে দাঁড়ালেন। অনেকটা রাত হওয়া সত্ত্বেও, এখনও বেশ গাড়ি চলাচল রয়েছে, তবে, ফুটপাথ দিয়ে, সাধারণ মানুষের চলাফেরা অনেকটা কমে এসেছে।
জায়গাটা, থানার কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও বেশ অন্ধকার। লামা তার টেবিলের পাশেই একটা ছোটো টুল নিয়ে বসে রয়েছে। টেবিলে রাখা রয়েছে, তার মোমো ভরা পাত্র।
গত দিনসাতেক হল লামা এখানে মোমো বিক্রি করতে বসছে। প্রথম দিনই থানা থেকে একজন সিভিক ভলান্টিয়ার এসে, ওকে থানার ডিউটি অফিসারের সঙ্গে দেখা করতে বলে গিয়েছিল।
সেদিনই রাতে, ও থানায় গিয়েছিল দেখা করতে। অফিসার ওর গালে সজোরে চড় মেরে বলেছিলেন—'কার হুকুমে ও রাস্তায় মোমো বিক্রি করছে। ও সি-র পারমিশন নিয়েছে কিনা।'
লামা হাঁটু গেড়ে বসে, ডিউটি অফিসারের পা ধরে নিয়েছিল, তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল— ওর বাবা, গড়িয়াহাটে একটা দোকানে রান্না করার কাজ করে। ও কাজের সন্ধানে দার্জিলিং থেকে কলকাতায় এসেছে। কসবাতেই ও আর ওর বাবা, একটা এক কামরার ঘর ভাড়া নিয়ে থাকে। বাবা ওকে মোমো বানানো শিখিয়ে দিয়েছেন, নিজের হাত খরচা তোলার জন্য ও মোমো বিক্রি করে।
অনেক হাতে পায়ে ধরে, অফিসারদের কাছ থেকে, ও ফুটপাথে বসে মোমো বিক্রি করার অনুমতি পেয়েছিল, বিনিময়ে ওকেও কথা দিতে হয়েছিল, যে প্রতি সন্ধ্যায় থানার স্যারেদের তিরিশটা করে মোমো দিয়ে আসবে।
কন্দর্পনারায়ণ অবশ্য একথা শুনে খুবই অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন, বলেছিলেন— 'থানার নাকের ডগায়, ড্রাগ আর পর্ণোগ্রাফির রমরমা ব্যবসা চলছে, তাদের ধরতে পারছে না, উলটে, একটা গরিব বাচ্চার ভাত মারছে।'
সত্যি কথা বলতে কি, কন্দর্পনারায়ণ স্যারের ডাকেই ও দার্জিলিং থেকে ছুটে এসেছে কলকাতায়। এই স্যারই ওকে একটা ডাকাতি কেস থেকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন, তখন ওর বয়স মাত্র উনিশ, সেই থেকে ও কন্দর্পনারায়ণ স্যারের ন্যাওটা। স্যার মাঝে মাঝে ওকে কাজ দেন, সেই কাজ ও করে দিতে পারলে, মোটা বখশিশ পায়।
গত সাতদিন ধরে ওর কাজ যেমন, থানা থেকে কয়েকটা বাড়ি পরে, এই মাল্টি-স্টোরিড বিল্ডিং-এর দোতলার একটা স্টুডিও-র ওপর নজর রাখা। এই স্টুডিওটাতে, বিজ্ঞাপনের জন্য শুটিং হয়। নতুন নতুন উঠতি মডেলরা আসা যাওয়া করে। কন্দর্পনারায়ণ স্যার, বিশেষভাবে, নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, যারা ঢুকছে, বেরোচ্ছে, তাদের প্রতিটি মুভমেন্টে নজর রাখতে। সেই মতো, ও প্রতি আধঘণ্টা অন্তর, হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে যাচ্ছে, কন্দর্পনারায়ণ স্যারকে।
তবে, আজ অবধি স্টুডিওর মালিকের দেখা ও পায়নি, বা, লোকটা কেমন দেখতে, সেটাও ও বুঝতে পারেনি। স্টুডিওতে যারা রোজ আসে, তারাও প্রায়ই লামার কাছ থেকে মোমো কিনে খায়। আজ বিকেলের দিকে, তাদের মধ্যে কয়েকজন, লামার কাছ থেকে মোমো কিনতে এসেছিল, আর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিল, আজ 'দাদা' আসবেন।
লামা সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করে জানিয়ে দেয়, কন্দর্পনারায়ণকে। তারপরই, কন্দর্পনারায়ণ-এর সদলবলে কসবায় আগমন, এবং সেই সন্ধ্যেবেলা থেকেই নিজের গাড়ির মধ্যে বসে অপেক্ষো করছেন কন্দর্পনারায়ণ, 'দাদা'-র দেখা মেলে।
লামা জানে, তার মোমোর টেবিলের উল্টোদিকে একটা ঝাঁকড়া গাছের নীচে অন্ধকারে, মেরুণ রঙের হন্ডা বড় গাড়িটাতে সামনের সীটে বসে রয়েছেন, কন্দর্পনারায়ণ স্যার। গাড়িতে আরও কেউ কেউ রয়েছে, তবে, তারা কারা সেটা লামা জানে না।
তার কাজ হল, কন্দর্পনারায়ণ স্যারের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা।
পৌনে দশটা নাগাদ, লামা কন্দর্পনারায়ণকে মেসেজ পাঠালো। 'স্যার অর কিতনি দের? ঘর যাঁউউ?'
উলটোদিক থেকে, মেসেজেই উত্তর এল—'আভি নেহি।'
তারপরই দ্বৈপায়ন গাড়ি থেকে নেমে, রাস্তা পেরিয়ে লামার দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। পকেট থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে, লামাকে দিয়ে বললেন 'এক প্লেট মোমো'।
লামা তখন, নিজের মোবাইলে একটা গেম খেলছিল। চোখের সামনে, বিরাট বলশালী চেহারা নিয়ে দ্বৈপায়নকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, তার মুখে, এক চিলতে হাসি খেলে গেল।
লামাকে হাসতে দেখে, দ্বৈপায়ন ইশারায় তাকে হাসতে বারণ করলেন, আর নিজে, মোমোর প্লেটটা নিয়ে ফিসফিসিয়ে লামাকে বললেন—'স্যার নে মুঝে তেরে পাস ভেজা, অর বোলা, ও আদমী আভভি তক নেহী নিকলা?'
লামা জবাব দিল—'নেহী দাদা, আজ দো-পহরকো, চার-পাঁচ-লেড়কী সাজ-ধাজকে অন্দর ঘুসা—তবসে কোঈ বাহার নেহী নিকলা।'
দ্বৈপায়ন, মোমোর প্লেটটা নিয়ে আবার রাস্তার এপারে ফিরে এলেন, গাড়ির দরজা খুলে, কন্দর্পনারায়ণ-এর দিকে মোমোর প্লেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন—'স্যার, মোমো খান, আর কতক্ষণ ওয়েট করবেন?'
কন্দর্পনারায়ণ গাড়ির সামনের সীটে বসেছিলেন, দ্বৈপায়নের কথায় ফিসফিস করে বলে উঠলেন—'ধৈর্য, ধৈর্য, ধৈর্য, আমি এখানে অপেক্ষা করতে পারি, সারা রাত। ও বেরোবেই, বেরোবেই। আমার মন বলছে, ও আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বেরোবে।' তারপর কী যেন চিন্তা করে, আবার বললেন—'তুমি বরং লামার স্টলের সামনে যাও। একটু আড়ালে দাঁড়িয়ে, মোমো খাবার ভান করো, লোকটা বেরোলে, যেন ফোন এসে গেছে, এমন ভাব করে, পকেট থেকে ফোন বার করে, লোকটার ছবি তোলো। তারপর ছবিটা আমাকে হোয়াটস অ্যাপ করো।'
কন্দর্পনারায়ণ-এর ক্যালকুলেশনই ঠিক হল। পাঁচ মিনিটের মাথায় লোকটা বাড়িটা থেকে বেরিয়ে এল। সঙ্গে, অল্পবয়সী চার পাঁচটা ছেলেমেয়ে। তাদের যেন, খুব বিধ্বস্ত লাগছে, মেয়েগুলো ঠিক চলতেও পারছে না।
লোকটা বেরিয়ে, ফুটপাথের ওপর এসে দাঁড়ানো মাত্র, কোথা থেকে একটা কালো ইনোভা গাড়ি এসে হাজির হল। আর সঙ্গে থাকা ছেলেগুলো, মেয়েদের নিয়ে গাড়িতে উঠে, সাঁ করে বাইপাসের দিকের রাস্তায় বেরিয়ে গেল।
গাড়িটা চলে যাবার পর লোকটা ধীরে ধীরে হেঁটে একটা সিগারেটের দোকান থেকে, সিগারেট কিনে ধরিয়ে টানতে টানতে লামার দোকানের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল —'তু ইহাঁ মোমো বেচতা হ্যায়? পহলে তো নেহী দেখা—'
লামা, মুখে হাসি এনে চটপট উত্তর দিল—'মোমো খাবেন স্যার? খুব টেস্টি। ম্যায়নে খুদ বনায়া।'
লামার চোখ-মুখ কুঁচকে কথা বলার ভঙ্গিতে লোকটা হেসে ফেলল। ততক্ষণে লামা এক প্লেট মোমো নিয়ে লোকটার দিকে বাড়িয়ে ধরেছে।
পিং পিং পিং, কন্দর্পনারায়ণ-এর মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপ মেসেজ ঢুকছে। কন্দর্পনারায়ণ তাড়াতাড়ি হোয়াটস অ্যাপ খুলে দেখলেন, দ্বৈপায়ন, লোকটার মুখের বিভিন্ন ভঙ্গিমার ছবি তুলে পাঠিয়েছে।
কন্দর্পনারায়ণ সঙ্গে সঙ্গে মেসেজগুলো ফরওয়ার্ড করে দিলেন।
ওপার থেকে মুহূর্তে রিপ্লাই এল। কন্দর্পনারায়ণ-এর মুখে হাসি ফুটে উঠল—'ইচ্ছা, গ্রীন সিগনাল দিয়েছে। এই ব্যাটাই প্রভাত। নাম আর হুলিয়া বদলে, এখানে এসে ড্রাগ আর পর্ণোগ্রাফির ব্যবসা ফেঁদে বসেছে।'
তারপর পেছনে বসে থাকা নাজিরকে বললেন—'নাজির, দ্বৈপায়নকে ডেকে নাও, আমাদের কাজ আজকের মতো শেষ।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।