জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
সকাল ছ'টা, টালিগঞ্জ লেক
কয়েকদিন ধরে এই মেয়েটাকেই টার্গেট করেছে, বান্টিদের টীম। আজকে ওরা এসেছে পাঁচজন— বান্টি নিজে, তোতলা আজাদ, কানা রকি, মেহবুব আর শ্যামল। এই টীমটাকে বান্টি নিজের হাতে তৈরি করেছে। ও নিজে এখন যাদবপুরের কাছে একটা ফ্ল্যাট কিনে থাকলেও বাকী সবাই একেক জন একেক এলাকার। কানা রকি আর মেহবুব, পার্কসার্কাস, আর শ্যামল ক্যানিংয়ের।
ওরা সেই ভোর পাঁচটা থেকে একটা সাদা স্করপিও গাড়ির মধ্যে ঠায় বসে আছে। গাড়িটা বান্টির। গাড়িটা সে টালিগঞ্জ লেকের ঠিক বাইরে দেশপ্রিয় পার্কের উলটোদিকে লেক ক্লাবের আড়াআড়ি একটা গাছের নিচে দাঁড় করিয়ে রেখেছে।
সকাল পৌনে ছটা নাগাদ জগিং করতে করতে মেয়েটাকে লেকের রাস্তা দিয়ে আসতে দেখা গেল।
আজ মেয়েটা পড়েছে, স্লিভলেস কালো টাইট স্পোর্টস গেঞ্জী আর ওই একই ডিজাইনের কালো স্পোর্টস লোয়ার, যা কিনা ওর ফর্সা দুধে-আলতা রঙের কাফ মাসলের একটু ওপরে এসে আটকে গেছে। পায়ে লাল টকটকে স্পোর্টস শু। মাথার রেশমী চুলগুলো, টপনট করে একেবারে উপরে তুলে বাঁধা। হাতে একটা রিস্ট ব্র্যান্ড। স্লিভলেস ছোট্ট টাইট স্পোর্টস গেঞ্জী পরায়, শরীরের উর্ধ্বাংশের অনেকটাই অনাবৃত।
সকালের হালকা রোদ, সেই অনাবৃত ঘাড়, কাঁধ, গলায় এসে পড়ায়, ওই অংশগুলো যেন ঝকঝক করে উঠেছে। ফর্সা, দুটো হাত দিয়ে যেন মাখন চুঁয়ে পড়ছে। নিটোল বুক দুটো, মেয়েটার জগিং করার সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠতে চাইছে।
তোতলা আজাদ এই প্রথম মেয়েটাকে দেখল। বান্টি আর মেহবুব বেশ কিছুদিন ধরে মেয়েটাকে নজরে নজরে রেখেছিল। সাধারণতঃ মেয়েটা পাঁচটা-সোয়া পাঁচটা নাগাদই লেকে জগিং করতে করতে এসে ঢোকে। আজ যেন একটু পরে ঢুকল।
সপ্তাহখানেক হল, বান্টি আর মেহবুব ওর সঙ্গে আলাপ জমিয়েছে। মেয়েটা মডেলিং করে। সিনেমায় নামবে খুব শিগগির-ই।
গোলপার্কের দিক থেকে দৌড়তে দৌড়তে মেয়েটা, লেক ক্লাবের দিকটায় এসে খানিকক্ষণ দাঁড়ায়। এখানে একটা লোক বিভিন্ন ধরনের 'জুস' বিক্রি করে। যেমন— আমলকির রস, অ্যালুভেরা, করলার রস। বান্টি নোটিশ করেছে, মেয়েটা এখানে এক গ্লাস আমলকি আর এক গ্লাস অ্যালুভেরার রস খায়। তারপর মিনিট দশেক এখানে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন রকম ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে আবার দৌড়তে দৌড়তে গোলপার্কের দিকে ফিরে যায়।
ও যখন এক্সারসাইজ করে ওকে দেখতে প্রায় ভিড় জমে যায়। এমনিতেই, ও এমন টাইট পোষাক পড়ে জগিং করে, যে, ওর শরীরের প্রতিটা 'কার্ভ' স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে। তারপর যখন ও ওর শরীরটা বাঁকিয়ে-চুরিয়ে এক্সারসাইজ শুরু করে, তখন ওর দিকে তাকিয়ে বান্টির তলপেটের দিকটা কেমন যেন শুরশুর করতে থাকে। ফিসফিসিয়ে নিজের মনেই বলে ওঠে— 'এই মালটাকে আমার চাই— এই মালটাকে আমার চাই।'
আজ যেন লেকের এই দিকটায় ফালতু লোকের ভিড় একটু বেশি। হয়তো একটু বেশিই বেলা হয়ে গেছে বলে।
এখন সকাল ছটা বাজে।
স্করপিওর দরজা খুলে বান্টি আর তোতলা আজাদ বেরিয়ে এল। মেয়েটাকে দেখে তোতলা আজাদের চোখ রসগোল্লার মতো বড় হয়ে গেছে— 'ক-ক-কেয়া ইয়ার। ইসকো পহলে ম্যায় লে কে যাউঙ্গা।'
—'ফোট শশালা, ইয়ে মেরা হ্যায়'। কানা রকির গলা কানে এল।
বান্টি ফিরে দাঁড়াল। রাগে চোখ দুটো জ্বলে উঠেছে-'পহলে ইসকো লে জানে দে শশালা'। মুখ খিস্তি করে বলে উঠল বান্টি।
'আজ লেক মে ভিড় জ্যাদা হ্যায়। সাবধানিসে কাম লিপট না পড়েগা।' বলেই ফিরল বান্টি— 'চকলেট কিসকা পাস হ্যায়?'
মেহবুব বলে উঠল— 'মেরা পাস'।
'দো চার হি ছোড় না। ভিড় জ্যাদা হোগা, তো হি মেসিন নিকল না। স্রিফ ডরানে কে লিয়ে। মেসিন সে ফায়ারিং বিলকুল নেহি।'
শ্যামল আর কানা রকি শব্দ করে হাসল—
'ভেবো না গুরু। যা দেখছি কয়েকটা বুড়ো মাল আর ভিখিরিই এখানে রয়েছে। ওরা তোমার কাজে বাধা দিতে আসবে না। দুটো চকলেট মারব, সব ভয়েই রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়বে।'
বান্টি একদৃষ্টে মেয়েটাকে 'ওয়াচ' করতে করতে বলল— 'ওগুলোর নাম আমরা চকলেট দিয়েছি। ওগুলো আসলে বোমা— মনে রাখিস। অন্য কাউকে মেরে বসিস না। কোনো ঝামেলা না করে কাজ হাসিল করে বেরিয়ে যাব।'
কানা রকি ছিল গাড়ির চালকের আসনে। বান্টি ঘাড় ঘুরিয়ে বলল— 'পাঁচ মিনিট পর গাড়িটাকে ওই জুসওয়ালার সামনে নিয়ে আসবি। আমরা মেয়েটাকে মুখ চেপে ধাক্কা মেরে গাড়িতে তুলে দেব। তোতলা, তুই বম্ব চার্জ করবি।'
তোতলা আজাদ মুখে হাসি এনে বলল— 'গ-গ-গুরু উসকো লেকে সিটমে হাম ব-ব-বয়ঠেঙ্গে— অ্যায়সে পাকড়কে রাখেঙ্গে।' বলে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরার ভঙ্গি করল।
ওদের ঠিক সামনেই একটা বেঞ্চিতে, একজন সুপুরুষ বয়স্ক ভদ্রলোক হাফপ্যান্ট, টিশার্ট আর স্নিকার পরা— বসে বসে একটা খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
তোতলা আজাদ হড়বড় করে এগোবার চেষ্টা করতেই তাঁর বাড়িয়ে রাখা পায়ে পা জড়িয়ে হোঁচট খেল।
ভদ্রলোক বিরক্ত হয়ে ভুরু কুঁচকে মুখ তুলে তাকালেন। পালটা তোতলাও একটা খিস্তি মারতে গেল। সঙ্গে সঙ্গে বান্টি তোতলার হাত চেপে ধরল— 'আভভি নেহী— আভভি নেহী— ইয়ার।'
মেয়েটা ততক্ষণে একগ্লাস আমলকি আর এক গ্লাস অ্যালুভেরার রস অর্ডার দিয়ে ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ শুরু করে দিয়েছে।
বান্টি আর তোতলা আজাদ মেয়েটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। পেছনে মেহবুব আর শ্যামল। ওদের প্রত্যেকেরই পরনে টিশার্ট, ট্র্যাক স্যুট আর স্নিকার। বান্টিই পরার্শ দিয়েছিল সকালে লেক-এ স্বাস্থ্য সচেতন লোকেরাই আসে। কাজেই টি-শার্ট, ট্র্যাকস্যুট পরে যাওয়াই ভালো। কেউ সন্দেহ করবে না।
'কেমন আছো?' একগাল হাসি নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে এগোল বান্টি।
'হা-আ-আ-ই' মেয়েটা হাত নেড়ে খুব খুশি হবার ভঙ্গি করে বান্টির গায়ের কাছে সরে এল— যেন কতদিনের পরিচিত।
'তুমি বলেছিলে, তোমার চেনা প্রোডিউসার আছে— আলাপ করিয়ে দেবে— দিলে না তো—' আদুরে ভঙ্গিতে বান্টির গা ঘেঁষে দাঁড়ালো মেয়েটা।
'হ্যাঁ, দেবো। এই তো এনেছি— এই যে—' বলে আজাদকে দেখাল।
আজাদ ততক্ষণে একমনে মেয়েটার শরীরের অনাবৃত অংশগুলো জরিপ করছিল— কান, লম্বা গলা, গলার ভাঁজ, ঘাড়, কাঁধ, নরম নরম লম্বা হাত— 'ওহ, জন্নত কা হুর।'
মেয়েটা আজাদের চোখ দুটো ওর শরীরের কোথায় কোথায় ঘুরছে, সেটা বুঝতে পেরে লজ্জা পাবার ভঙ্গি করে হাসল। তারপর আজাদের দিকে হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে হাত বাড়িয়ে দিল।
আজাদ মোহাবিষ্টের মতো, মেয়েটার বুকের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হাত বাড়িয়ে দিল। আজাদের রকম সকম বুঝতে পেরে বান্টি বলল— 'চলো আমরা কোথাও বসে তোমার সিনেমায় নামা নিয়ে ডিসকাস করি— কাছেই আমার ফ্ল্যাট। চলো।' মেয়েটা হ্যান্ডশেকের ভঙ্গিতে আজাদের হাতদুটো ধরে, নরম স্বরে বলল— 'না, আজ না— প্লীইজ, অন্যদিন। আজ আমার খুব চাপ।'
ততক্ষণে কানা রকি স্করপিওটাকে ধীর গতিতে এগিয়ে নিয়ে এসে ওদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। শ্যামল আর মেহবুব মেয়েটার পেছনে এসে দাঁড়িয়ে পোজিশান নিয়েছে। বান্টির কাছ থেকে গ্রীন সিগন্যাল পেলেই ওরা পেছন থেকে ধাক্কা মেরে, মেয়েটাকে গাড়িতে তুলে দেবে। কেউ কিছু বুঝতেও পারবে না। সবাই ভাববে মেয়েটা তার পূর্ব-পরিচিত লোকদের সাথে কথা বলছিল, তারপর তাদের সাথেই গাড়িতে উঠে কোথাও চলে গিয়েছে।
আর যদি মেয়েটা বেগরবাঁই করে তাহলে কানা রকি বম্ব চার্জ করবে। বান্টির কাছে ছোট্ট আধুনিক পিস্তল আছে সেটা তুলে দেখালেই মর্নিংওয়াকে আসা বুড়ো হাবড়ার দল ল্যাজ তুলে পালাবে।
মেয়েটা আদুরী ভঙ্গিতে 'না' বলতেই তোতলা আজাদ খেপে গেল— 'ন-ন-না? না কা মতলব কেয়া? জানা তো তুঝে পড়েগা— আজ তো হাম দোনো সাথ সাথ রহেঙ্গে' বলে মেয়েটার ডান হাত ধরে গাড়ির দিকে টানতেই হঠাৎ তীব্র হুইশলের শব্দ।
মেয়েটা, তোতলার ডান হাতটা ধরে এক হ্যাঁচকা টান দিয়ে যেন আকাশে উড়ে গেল। ডান পায়ে নিখুঁত একটা লাথি মারল বান্টির চোয়ালে।
'খট' শব্দ করে বান্টির চোয়াল ঘুরে গেল। বান্টি চোয়াল চেপে মাটিতে বসে পড়ল।
মেয়েটা মাটিতে বসে পড়েই ডান হাতে তোতলার হাতটা চেপে ধরে এমন ভঙ্গিতে ঘুরিয়ে দিল যে, তার ডান হাতটা কাঁধের পেছনে এসে 'লক' হয়ে গেল। তারপর বাঁ হাতে ক্যারাটের রদ্দার ভঙ্গিতে ঘাড়ের পেছনে এত জোরে মারল যে, তোতলা আজাদ চোখ উলটে অজ্ঞান হয়ে পড়ল।
মেয়েটার পেছনে দাঁড়িয়ে শ্যামল আর মেহবুব যেন নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওইরকম বাম্পার সেক্সি, ফর্সা, মাখন-মাখন চেহারার মেয়েটার এত্ত জোর?
মুহূর্তে মেয়েটা লাফ দিয়ে উঠে কিক-বক্সিংয়ের স্টাইলে দুটো লাথি মেরেছে, শ্যামল আর মেহবুবের বুকে। তারা প্রায় কুড়ি ফুট উড়ে গিয়ে দুটো মোটা গাছের গুঁড়িতে আছড়ে পড়ে স্থির হয়ে গেল।
এর মধ্যেই বেঞ্চিতে বসে থাকা হাফপ্যান্ট, স্নিকার আর টি শার্ট পরা ভদ্রলোক, হাতের খবরের কাগজ ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর হাতে উঠে এসেছে একটা রিভলভার। দৌড়তে দৌড়তে তিনি নির্দেশ দিতে শুরু করেছেন- 'গাড়িটাকে আটকাও— যেন পালাতে না পারে।'
ফুটপাতে দুটো ভিখিরি শুয়েছিল, তারাও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে— তাদের হাতেও পিস্তল।
যে লোকটা এতক্ষণ অ্যালুভেরা, আমলকি আর করলার রস বিক্রি করছিল, সেও যেন কখন হাতে তুলে নিয়েছে পিস্তল।
ওদিকে কানা রকি বিপদ বুঝে গাড়িতে স্পিড তুলে পালাতে যেতেই দুজন ভিখিরির একজন একটা পিস্তল তুলে তার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
রকি একটুও না থেমে পাশ কাটিয়ে পালাতে যেতেই বেঞ্চিতে বসে থাকা সেই বয়স্ক ভদ্রলোক নিখুঁত লক্ষ্যে স্করপিওর টায়ারে গুলি চালালেন— একটা কান ফাটানো আওয়াজ।
তীব্র গতিতে থাকা স্করপিও-র পেছনের চাকা গুলি লেগে ফুটো হয়ে যেতেই গাড়ি একদিকে হেলে গেলো, তারপর ফুটপাথে উঠে গিয়ে উলটে গেল।
ভিখিরির পোষাকে থাকা লোক দুটো গাড়ির ভেতর থেকে কানা রকির ঘাড় ধরে তাকে টেনে বার করল।
অ্যালুভেরার রস বিক্রেতা ভদ্রলোক ততক্ষণে বান্টি আর তোতলা আজাদের হাতে হাতকড়া পড়িয়ে দিয়েছেন।
মেয়েটা এতক্ষণ মারপিট করে যেন কিছুই হয়নি, এমন ভঙ্গিতে পিস্তল হাতে সুপুরুষ ভদ্রলোকের সামনে গিয়ে পুলিশি কায়দায় স্যালুট করে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়াল।
টিশার্টের নিচে হোলস্টারে পিস্তলটা রাখতে রাখতে হাসলেন, আই.জি., সি.আই.ডি., শংকর দত্ত— 'কনগ্র্যাচুলেশনশ।' 'ওয়েল ডান।'
একটা বড় সেভেন সিটার এস.ইউ.ভি গাড়ি এসে দাঁড়ালো শংকর দত্তর সামনে। ভেতর থেকে নেমে এলেন সেই অতি পরিচিত ধবধবে সাদা পাঞ্জাবী আর চোস্ত পায়জামা পরা কন্দর্পনারায়ণ।
শংকর দত্ত-র সাথে হ্যান্ডশেক করে বললেন— 'কনগ্র্যাচুলেশনস— দুর্দান্ত কাজ করলেন। বহুদিন ধরে এই লোকটা জ্বালিয়ে বেড়াচ্ছিল। আমাদের রাজ্য বাঁচল— রাজ্যের মেয়েরা বাঁচল।' তারপরই মেয়েটার দিকে ফিরে বললেন— 'খবরটা বাবাকে জানান। আপনার বাবা খুশী হবেন। তিনবছর ধরে এই দিনটার জন্য তিনি অপেক্ষা করছেন।'
মেয়েটার চোখ ছলছল করে উঠল। আই.জি. শংকর দত্তর দিকে তাকিয়ে বললেন— 'আমি আজই বাড়ি যেতে চাই স্যার। আমি খবরটা বাবার কাছে গিয়ে জানাতে চাই।' শংকর দত্ত হেসে ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলেন।
জমাট ভিড়টার মধ্য থেকে বেরিয়ে এলেন, সি.আই.ডি.র স্পেশাল সুপারিনটেনডেন্ট অর্জুন মিত্র, আর ইন্সপেক্টর বেদান্ত দত্ত। সঙ্গে, ভিখিরি আর অ্যালুভেরার রস বিক্রেতার পোষাকে লালবাজার অ্যান্টিরাউডি স্কোয়াডের রাঘব রডরিগস আর রাজা খাস্তগীর।
কন্দর্পনারায়ণ তাঁদের দিকে তাকিয়েও হাসলেন 'আপনাদের সবাইকে কুর্ণিশ। আমরা এই দিনটার জন্য গত তিনবছর অপেক্ষা করছিলাম।'
পাঁচ মিনিটের মধ্যে মিডিয়ার ভ্যানগুলো চলে এল। সাংবাদিকেরা জানতে চাইছিলেন কী হল? সি.আই.ডি.-র কোনো সিক্রেট অপারেশন ছিল কী?'
ক্যামেরা আর চ্যানেলের বুমগুলোর দিকে এগিয়ে গেলেন শংকর দত্ত। অন্য অফিসারদের দেখিয়ে বললেন—
'আজ রাজ্য পুলিশ, কলকাতা পুলিশ, ও সি.আই.ডি.র অত্যন্ত গর্বের দিন। আপনাদের মনে করিয়ে দিই— প্রায় তিন বছর আগে দুটি অল্পবয়সি মেয়ে নিজেরা রেপ-ভিক্টিম ও অ্যাসিড অ্যাটাক ভিক্টিম হিসেবে মহামান্য কলকাতা হাইকোর্টে, 'পুলিশ কিছুতেই অপরাধীদের ধরছে না, উলটে অপরাধীধের আড়াল করছে'— এই অভিযোগে 'রিট' মামলা দায়ের করে।'
তারপর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা কন্দর্পনারায়ণকে দেখিয়ে বললেন— 'সেই মামলাটি লড়ছিলেন, আমাদের রাজ্যের নামী ল'ইয়ার কন্দর্পনারায়ণ স্বয়ং।
কিন্তু, হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে, শুধুমাত্র এই অপরাধে ওই মেয়ে দুটির ওপর নেমে আসে জঘন্য আক্রমণ। অপরাধীরা এতই বেপরোয়া ছিল যে একেবারে ঘরে ঢুকে একজনকে বিষ খাইয়ে দেয়। তাকে বিবস্ত্র করে মোবাইলে তার ছবি তুলে গোটা এলাকায় 'ভাইরাল' করে দেয়।
আর একজনকে আবার গ্যাং-রেপ করে সেই ছবিও 'ভাইরাল' করে দেয়।
কন্দর্পনারায়ণবাবু সঙ্গতভাবেই দুটি বিষয়ই মহামান্য হাইকোর্টের নজরে আনেন।
ঘটনার গুরুত্ব বুঝে আদালত কয়েকঘণ্টার অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে স্বয়ং রাজ্য পুলিশের ডিজিকে কোর্টে এসে রিপোর্ট পেশ করতে নির্দেশ দেন।
স্থানীয় থানার তৎপরতায় একটি কেসের আসামি অমিতসহ অন্য আসামিরা ধরা পড়ে, কিন্তু অপর কেসের আসামি প্রভাত, পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যায়।
স্থানীয় থানার ও.সি. শ্রী দ্বিজপদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রভাতের আক্রমণের শিকার হন। প্রভাত নিজে তার পিস্তল থেকে তিনটি গুলি করে। তিনটি গুলিই দ্বিজপদ বাবুর শরীরের বিভিন্ন অংশে আটকে যায়। অপারেশন করে গুলি বের করা সম্ভব হলেও দ্বিজপদবাবুর প্যারালিসিস হয়ে যায়। তিনি আর চলাফেরা করতে পারেন না। পঙ্গু অবস্থায় গত তিনবছর তিনি নিজের ঘরেই শয্যাশায়ী।
মাসখানেক আগে বিশিষ্ট ল'ইয়ার কন্দর্পনারায়ণ আমাকে জানান যে, কসবা এলাকায় নারীপাচার, পর্ণোগ্রাফি তৈরি ও ড্রাগ পাচারকারী একটি দল সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তিনিই আমাদের খবর দেন, কুখ্যাত অপরাধী প্রভাত নাম ভাঁড়িয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনে সেখানেই ব্যবসা ফেঁদে বসেছে।
কিন্তু, বিশ্বাস করুন কিছুতেই তাকে ধরতে পারছিলাম না। একেবারে পাঁকাল মাছের মতো সে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল।
তখন কন্দর্পনারায়ণই আমাকে পরামর্শ দিলেন— 'হানিট্র্যাপ' ব্যবহার করতে।'
এবার কন্দর্পনারায়ণ বলতে শুরু করলেন—
'গত তিনবছর ধরে প্রভাতের টিকিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। রাজ্য পুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং সি.আই.ডি.-র অফিসারেরা তন্ন তন্ন করে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
মাস তিনেক আগে আমার কাছে একটি মেয়ে এসে জানায় যে, তার সাথে ফেসবুকে আলাপ হয় একটি ছেলের। যে নিজেকে কলকাতার একটি কলেজের প্রোফেসর বলে পরিচয় দেয়।
আজকাল যেমন হয়, ফেসবুকের মাধ্যমে আলাপ। আর তারপরই ঘনিষ্ঠতা হতে দেরী হয় নি।' কন্দর্পনারায়ণ সামনে উপস্থিত সাংবাদিকদের ভিড়টার দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি হাসলেন।
'ছেলেটি, মেয়েটিকে নিয়ে তোলে তার কসবার ফ্ল্যাটে। সেখানে তারা শারীরিকভাবে ঘনিষ্ঠ হয়।
কিছুদিন পরেই মেয়েটি জানতে পারে যে গোপনে ছেলেটি তাদের শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও তুলে রেখেছে। শুধু তাই নয়, তারপর থেকেই ছেলেটি মেয়েটিকে প্রস্তাব দেয় যে, এখন থেকে নিয়মিত অন্য পুরুষদের সঙ্গে তাকে শারীরিকভাবে মিলিত হতে হবে। সেই ভিডিও সে তুলে বাইরে বিক্রি করবে। মেয়েটি রাজী না হওয়াতে ছেলেটি তাকে তার গোপনে তোলা ভিডিও বাইরে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে ভয় দেখাতে থাকে। আর একটি মেয়ের কাছ থেকে খবর পাই, যে তাকে, সিনেমা সিরিয়ালে সুযোগ পাইয়ে দেওয়া হবে, এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডেকে এনে, পানীয়তে নেশার ওষুধ মিশিয়ে, অচৈতন্য করে, তাকে দিয়ে পর্নোগ্রাফির শুটিং করানো হয়েছে।
এই মেয়েদের কাছ থেকে সব বর্ণনা শুনে আমি যেন ইচ্ছা আর খেয়ালীর সেই ঘটনার সাথে মিল পাচ্ছিলাম। শুধু তাই নয়, দিনের পর দিন, আমি আমার জুনিয়রদের আর আমার সিক্রেট টীমের মেম্বারদের নিয়ে ফাঁদ পেতে অপেক্ষা করতে থাকি। অবশেষে, আমি নিশ্চিত হই, যে প্রভাতই নাম ভাঁড়িয়ে, বান্টি নাম নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে। আমি মিস্টার দত্তর সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে, আমার সন্দেহের কথা বললাম।'
কন্দর্পনারায়ণ, নিজের কথা শেষ করতেই, শংকর দত্ত বলতে শুরু করলেন—
'কন্দর্পনারায়ণের সন্দেহের সাথে আমার সন্দেহও মিলে গিয়েছিল। আমাদের অফিসারেরা কসবার সেই ফ্ল্যাটে রেইড করেন। অল্পের জন্য প্রভাত ওরফে বান্টি আবার পালায়।
তবে কয়েকটি অল্পবয়সি ছেলেমেয়েকে আমরা গ্রেপ্তার করি।
তাদের কাছ থেকে যা জানতে পারি, তা চমকে ওঠার মতো।
দক্ষিণ কলকাতার বেশ কিছু অঞ্চলে সস্তার ফ্ল্যাট কিনে এইরকম চক্র চলছে। কোথাও ফেসবুকের মাধ্যমে আলাপ করে, প্রেমের নাটক করে, মেয়েদের নিয়ে আসা হচ্ছে। আবার কোথাও আবার সিনেমা-সিরিয়াল বা মডেলিং-এ নামানোর টোপ দেওয়া হচ্ছে।
তারপর খাবারে বা পানীয়তে নেশার ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে ওই সব মেয়েদের সাথে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করা হচ্ছে— সেই মুহূর্তগুলো ভিডিও করে, তার সাথে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, বাংলায় ও হিন্দিতে বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনার শব্দ— যাতে মনে হচ্ছে, তারা যেন স্বেচ্ছায় এই ধরনের ভিডিও তুলছেন।
তারপর ওই ভিডিওগুলো বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, বিভিন্ন পর্ণোগ্রাফিক সাইটে।
আমাদের রাজ্যের মেয়েরা জানতেও পারছিলেন না যে তাঁদের অজান্তেই কত বড় বিপদের সম্মুখীন তাঁরা হচ্ছিলেন।'
থামলেন শংকর। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন— 'এবার আমরা ব্যবহার করলাম 'হানিট্র্যাপ'। হাসলেন তিনি।
'অপরাধীরা সি.আই.ডি.-র বেশিরভাগ মহিলা অফিসারকেই চিনত। শুধু আমাদের এই নতুন আই.পি.এস. অফিসারটিকে চিনত না।
ইনফ্যাক্ট, হানিট্র্যাপের বিষয়টা যখন কন্দর্পনারায়ণ আমাদের বলেছিলেন, তখন আমাদের এই অফিসারটি সেখানে আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন— এবং প্রস্তাবটা উনিই আমাদের দেন।
বাকিটা তো আপনারা বুঝেই গেছেন যে, আমরা প্ল্যান করি 'হানিট্র্যাপ' ব্যবহার করব।
আজকে আমি নিজে যেমন ছদ্মবেশে এখানে উপস্থিত ছিলাম, তেমনি রাজ্য পুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং সি.আই.ডি-র অন্য অফিসারেরাও বিভিন্ন রকম ছদ্মবেশে এখানে হাজির ছিলেন।
অবশেষে আজকের বিরাট সাফল্য।'
থামলেন শংকর দত্ত।
একদিন পর
ধীর পায়ে ঘরে ঢুকে এলেন ইন্দুমতী। মেয়েকে দেখেই মা-এর চোখ আনন্দে জ্বলজ্বল করে উঠল। ইন্দুমতীকে জড়িয়ে ধরে বললেন— 'এসেছিস মা? কাল থেকে, তোর বাবা টিভিতে সারাদিন তোর খবরই দেখে যাচ্ছেন।
বিছানা ছেড়ে উঠতে তো পারছেন না— কিন্তু বারবার বলছেন— আমার মেয়ে আমার গর্ব। বাবার উপর গুলি চালানোর শোধ নিল মেয়ে— আমি জানতাম, প্রভাতকে ও ধরবেই।'
ইন্দুমতী মাকে জড়িয়ে ধরে মা-এর গালে চুমু খেয়ে বললেন— 'বাবা ঘুমোচ্ছে মা? আমি দেখা করে আসি।'
তারপর পাশের ঘরে ঢুকে বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে, নিলডাউনের ভঙ্গিতে বসে নিজের মাথার টুপিটা খুলে, বালিশের পাশে রেখে, দ্বিজপদর গালের কাছে ঠোঁট নিয়ে বিড়বিড় করে বললেন— 'আই.পি.এস. ইন্দুমতী ব্যানার্জি রিপোর্টিং বাবা, আই.পি.এস. ইন্দুমতী ব্যানার্জি রিপোর্টিং।'
পুনশ্চ :
খেয়ালী আর ইচ্ছা খুব ভালো আছে। নির্যাতিতা মেয়েদের পাশে এসে ওরা দাঁড়াচ্ছে। আইনি সাহায্য দিচ্ছে। অসহায় মেয়েদের নিয়ে থানায় যাওয়া, অভিযোগপত্র লিখে দেওয়া, মামলার সময় তাদের নিয়ে কোর্টে যাওয়া, তাদের মনোবল বাড়ানো, সাহস যোগানো— সব ওরা করছে।
আপনাদেরও যদি অসহায়, নির্যাতিতা, কোনো মেয়ে জানা থাকে, তাঁকে খেয়ালী আর ইচ্ছার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলতে পারেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।