হানি ট্র্যাপ - দ্বিতীয় পর্ব

জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

হাইকোর্টের চীফ পি.পি. সাহেব হলেন অজিতেশ গোস্বামী। রোগাটে-লম্বা চেহারা। মার্জিত বাচনভঙ্গি। কখনোই রেগে যান না। দ্বিজপদ আগেও কয়েকবার কাজে এসে দেখা করেছেন ওনার সঙ্গে।

আজও অজিতেশ বাবু তাঁর নিজের ঘরেই ছিলেন। বেশ কয়েকজন ল'ইয়ার ওনাকে ঘিরে বসে, আজকের বিভিন্ন মামলা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। দ্বিজপদ নিজের পরিচয় দিয়ে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়ালেন। অজিতেশ বাবু পাশে বসে থাকা একজন বয়স্ক ল'ইয়ারকে দ্বিজপদর কাছ থেকে মামলার কেস ডায়েরীটা নিতে বলে, দ্বিজপদকে টেবিলের উলটোদিকের চেয়ারে বসতে বললেন। তারপর বললেন— 'আমাকে সংক্ষেপে ঘটনাটা বলুন। আপনি যা জানেন, তা-ই বলুন। আশা করি, সত্যি ঘটনাটাই বলবেন। তবে এটুকু বুঝতে পারছি, বিয়ের কয়েকবছরের মধ্যে শ্বশুরবাড়িতেই গৃহবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যু। 'মার্ডার' কেস চালু করলেন না কেন? এখানে দেখছি ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের তিনশো চারের 'বি' ধারার সঙ্গে, তিনশো ছয় ধারা অর্থাৎ বিয়ের সাত বছরের মধ্যে পণের দাবীতে গৃহবধূর অস্বাভাবিক মৃত্যুর সঙ্গে, 'আত্মহত্যায় প্ররোচনা'-র ধারা যোগ করেছেন। কেন?'

কথা শুরু করবার আগেই অজিতেশ বাবু আবার দ্বিজপদকে থামিয়ে দিয়ে বললেন— 'আমি কিন্তু আশা করব আপনি সত্যি কথাই বলবেন। আমি কিন্তু অকারণে বা মিথ্যে অভিযোগে, কাউকে জেলে ভরে রাখার পক্ষপাতী নই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি একজন গৃহবধূ অনেক কারণেই, অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হতে পারেন। সবসময়ই যে, গৃহবধূদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর জন্য স্বামী, শ্বশুর-শ্বাশুড়িরাই দায়ী, তা না-ও হতে পারে। বাই দি ওয়ে, মামলার তদন্তকারী অফিসার কে?'

দ্বিজপদ উলটোদিকের চেয়ারে বসে অজিতেশ বাবুকে দেখছিলেন— ভদ্রলোককে দেখেই সম্ভ্রম জাগে। নরম কণ্ঠস্বরে কথা বলেন। মনে হল, ওনাকে বিশ্বাস করা যায়।

দ্বিজপদ, গোবিন্দ পালের কেসের পুরো ঘটনাটা খুলে বললেন— গোবিন্দর স্ত্রীর, সঞ্জয় পাইন বলে, একট ছেলের পাল্লায় পড়া, তারপর খবরটা জানাজানি হতেই ঘরে অশান্তির সূত্রপাত হওয়া, গোবিন্দর স্ত্রীর আত্মহত্যা করা। সমস্ত ঘটনা শুনবার পর, অজিতেশবাবু বললেন, তাহলে তো, পণের দাবীতে মৃত্যু অর্থাৎ ডাউরী ডেথ আর আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগও আসছে না, তাহলে অ্যারেস্ট করলেন কেন?'

'স্যার, সেই মুহূর্তে অ্যারেস্ট না করে উপায় ছিল না। শুরুতে, খবর রটে ছিল যে, হাউজওয়াইফকে স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ী আর অবিবাহিতা ননদ মিলে, অত্যাচার করে, গলায় দড়ি দিয়ে, মেরে ঝুলিয়ে দিয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে স্পটে ছুটে যাই। সেখানে গিয়ে আসল ঘটনাটা জানতে পারি। সুপিরিয়র অফিসারেরা চাইছিলেন, যাতে 'মার্ডার' কেস সাজানো হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে। কিন্তু, কেসের তদন্তকারী অফিসার হিসেবে, সেটা আমি করিনি। আমি তো পারলে, আমি ওদের এখনই সব অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়ে 'ডিসচার্জ' করে দিই। কিন্তু, সেটা আমার মতো, প্রোমোশন পেয়ে সাব-ইন্সপেক্টর পোস্ট পাওয়া ও.সি.দের সাজে না। স্যার, তাছাড়া সার্কেল ইন্সপেক্টর, অ্যাডিশনাল এস.পি. সবাই তো, এই কেসটাকে 'মার্ডার' কেস-এ কনভার্ট করার জন্য আমাকে প্রেশার দিচ্ছেন।'

অজিতেশবাবু আঁতকে উঠলেন— 'খবরদার না। মিথ্যে অভিযোগে কেস কখনোই সাজাতে যাবেন না। আদালতগুলি সেটা ভালো চোখে দেখেন না। হাইকোর্ট তো না-ই। মিথ্যা মামলায় কাউকে জড়িয়েছেন জানলে, কোর্টগুলি আপনাদের ছেড়ে কথা বলবে না। তাছাড়া আজকাল মানবাধিকার রক্ষা সংগঠনগুলিও খুব স্ট্রং।'

তারপর মিটি মিটি হাসতে হাসতে বললেন— দু ধরনের অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে খুব পাই— 'পুলিশ ইন্যাকশন' আর পুলিশ ওভার অ্যাকশন'— আমরা বলি 'রিট' মামলা, দুটো ক্ষেত্রেই হাইকোর্ট খুব কড়া মনোভাব নিয়ে থাকেন।

কেউ যদি আপনাদের ওই সি.আই. আর অ্যাডিশনাল এস.পি.র বিরুদ্ধে 'রিট' মামলা করে দেয়, তাহলে, ঘুষ নিয়ে, মিথ্যা মামলা সাজানোর মজা টের পাইয়ে দেবেন হাইকোর্ট।'

একটা সুন্দর ছবির মতো সওয়াল। প্রথমেই একটা বাস্তব চিত্র তুলে ধরলেন কন্দর্পনারায়ণ— 'সারা দেশে একধরনের মানুষের লোভ-লালসার শিকার হয়ে যাচ্ছেন, অল্পবয়সী গৃহবধূরা। স্বামী কাজে বেরিয়ে যাবার পর, বাড়িতে দুপুরের কাজ শেষ হয়ে গেলে তাঁরা যখন একটু অবসর পান তখনই এই ধরনের শিকারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের লক্ষ্যবস্তুর উপর। প্রথমে ফেসবুকের মাধ্যমে বন্ধুত্ব, তারপর ফোন নম্বর আদান-প্রদান, তারপর দুপুরে বা সন্ধ্যেবেলায় যখন কেউ ঘরে থাকে না, সেই সময়টা জেনে নিয়ে ফোন করে কথা বলা, তারপর দুর্বল মুহূর্তে ফোনের মাধ্যমে, ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়া— পুরো ছকে ফেলা যেন। আস্তে আস্তে গৃহবধূটির কাছ থেকেই তার ব্যক্তিগত ছবি চেয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেইল শুরু করা— এ এক নতুন ধরনের অপরাধ।

এই মুহূর্তে সারা পৃথিবীতে, পর্ণোগ্রাফিক সাইটগুলির রমরমা কারবার চলছে আর সেখানে বাঙালি তথা ভারতীয় মেয়েদের চাহিদা খুবই। সেই চাহিদা মেটাতে আসরে নেমে পড়েছে এক ধরনের অপরাধী। তারা হোটেলের ঘরগুলোতে, বড় বড় শপিং মলগুলোর ট্রায়াল রুমে, রেখে দিচ্ছে লুকোনো ক্যামেরা। আর সেই লুকোনো ক্যামেরায় ধরা পড়া ছবি, ভিডিও, বিক্রী হয়ে যাচ্ছে চড়া দামে। কারা যে এই অপরাধের পেছনে, কিছুতেই ধরা যাচ্ছে না। কোথায় বসে বসে এই অপরাধ তারা পরিচালনা করছে, সেটাও দেখা যাচ্ছে না। এ যেন একেবারে মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধ করে যাওয়ার মতো।

মাইলর্ড, আমি এতক্ষণ আপনাদের একটা দীর্ঘ প্রেক্ষিত বললাম, তার কারণ আজকের আমার এই মামলার ভিক্টিম যে গৃহবধূ তিনিও তাঁর অজান্তেই এই অপরাধের শিকার হয়েছেন।

অথচ আসল অপরাধীদের ধরতে না পেরে পুলিশ যথারীতি ধরে এনেছে, ওই গৃহবধূটির স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ী আর অবিবাহিতা ননদকে। পুলিশের ইন্টেলিজেন্স লেভেল একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। আর পুলিশকে ঠিক দোষও দেওয়া যায় না। আমাদের হাতে অপরাধীদের সঙ্গে লড়বার অস্ত্র বলতে তো সেই আঠেরোশো ষাট সালের ভারতীয় দণ্ড বিধি। যার অনেক ধারাই এখন অবলুপ্ত হয়ে গেছে।

এই ধরনের অপরাধগুলির মোকাবিলা করার জন্য একটা আইন তৈরি হয়েছে বটে, যেটার পোষাকী নাম— ইনফর্মেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট বা তথ্যপ্রযুক্তি আইন। তা সেই আইনটা সম্পর্কে কোনো সঠিক ট্রেনিং-ই রাজ্য পুলিশের নেই। মাইলর্ড, আমাদের রাজ্যের প্রত্যন্ত প্রান্তের ছোটো ছোটো থানাগুলিতে রেকর্ড মেইনটেইন করার জন্য একটা কম্পিউটারও দেওয়া সম্ভব হয় নি। থানাগুলির তদন্তকারী অফিসারদের এই অতি আধুনিক অপরাধ, যেগুলিকে আজকাল আমরা 'সাইবার ক্রাইম' বলে থাকি, সেগুলিকে আটকাবার মতো ট্রেনিং-ই দেওয়া সম্ভব হয় নি।'

পি.পি. অজিতেশ গোস্বামী মামলা চলাকালীন তাঁর ঠিক পেছনেই কেস-ডায়েরী হাতে দ্বিজপদকে দাঁড়িয়ে থাকতে বলেছিলেন। দ্বিজপদ, অজিতেশ বাবুর পেছনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কন্দর্পনারায়ণ বাবুর মামলা করা শুনছিলেন। আর প্রতিটি কথায় একমত হচ্ছিলেন। সত্যি তো, ওই ছোট্টোথানার ও.সি. হিসেবে দ্বিজপদ যে কী কষ্ট করে থানা চালান, তা তিনিই একমাত্র জানেন। সঠিক তদন্ত বলতে যা বোঝায়, কটা কেসে তা করা সম্ভব হয়?

সুপিরিয়র অফিসারেরা শুধু নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থ, প্রোমোশন, ভালো ভালো পোস্টিং-এর চিন্তাতেই ব্যস্ত হয়ে থাকেন। একটা থানা চালাতে গেলে মিনিমাম যে জিনিসগুলোর প্রয়োজন, সেই জিনিসগুলোও সাপ্লাই করা হয় না।

থানায় একটা ডেডবডি রাখার জায়গা নেই। সাধারণতঃ দুর্ঘটনা বা কোনোরকম অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণে যে লাশগুলিকে আনতে হয়, সেগুলো থানার বারান্দার বা ভেতরের ঘরের মেঝেতে ফেলে রাখলে বড়ো বড়ো মেঠো ইঁদুরে সেগুলি ছিঁড়ে যাবে, তাই লাশগুলিকে বস্তায় ভরে, থানার গায়ে লেগে থাকা বড়ো বড়ো গাছগুলোর ডাল থেকে ঝুলিয়ে রাখতে হয়। তারপর দিনের আলো ফুটলে সেগুলোকে গাছ থেকে নামিয়ে, বস্তা থেকে বের করে ভ্যানে চাপিয়ে, ময়না তদন্তের জন্য সরকারি হাসপাতালে পাঠাতে হয়। দ্বিজপদর থানায় একটা ভালো মালখানা অবধি নেই। বৃষ্টিতে ছাদ চুঁইয়ে জল পড়ে, বিভিন্ন কেসের কানেকশনে 'সীজ' করে আনা অর্ধেক জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যায়।

এইসব সমস্যার কথা বার বার উঁচু মহলে জানিয়েও লাভ হয় নি। হুঁঃ, সাইবার ক্রাইমের সমাধান! ছোটো ছোটো থানার এ. এস. আই, এস. আই. রা সাইবার ক্রাইম কী জিনিস তা জানে?

—জোরে শ্বাস ছাড়লেন দ্বিজপদ।

'মাইলর্ড, আমার এই মামলায়, শ্বশুর বাড়িতে একটি মেয়ে আত্মহত্যা করেছে— এ নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। স্বামী, প্রতিবেশীদের নিয়ে, শোবার ঘরের দরজা, বাইরে থেকে ভেঙে, ওড়না গলায় জড়িয়ে, ঝুলন্ত অবস্থায় স্ত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার করেছেন— এ কথা নিয়েও কোনো বিতর্ক নেই।

ভারতীয় দণ্ডবিধির তিনশো চারের 'বি' ধারায় বলা আছে— 'বিয়ের সাত বছরের মধ্যে যদি কোনো গৃহবধূ গায়ে আগুন লেগে, বা, শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে বা অন্য কোনোভাবে, অস্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হন, এবং যদি দেখা যায় যে, মৃত্যুর ঠিক আগে ওই গৃহবধূ, স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অন্য আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে যদি পণের দাবীতে অত্যাচারিতা বা নিগৃহীতা হন তাহলে,ওই অস্বাভাবিক মৃত্যুটি পণের দাবিতে মৃত্যু বলে বিবেচিত হবে।'

'মাইলর্ড, মাননীয় পাবলিক প্রসিকিউটরের কাছ থেকে কেস ডায়েরীটা নিয়ে আপনি দেখুন, আমার ধারণা মৃতার কোনো আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী এমনকী আসামিদের প্রতিবেশীরাও কেউ বলেনি, যে ওই গৃহবধূ কোনোদিন পণের বা টাকা-পয়সার দাবীতে, কোনোরকম অত্যাচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এমনকী ওই গৃহবধূর মা-ও পণের দাবীতে কোনোরকম অত্যাচার হয়েছে বলে, থানায় অভিযোগ দায়ের করেননি। সত্যি সত্যি মেয়ে যদি শ্বশুরবাড়িতে, কোনোরকম অত্যাচারের শিকার হতেন, তাহলে আর কেউ না জানুক ওই গৃহবধূর মা অন্ততঃ জানতেন।'

কন্দর্পনারায়ণের সওয়াল শুনতে শুনতে, দ্বিজপদ একমত হয়ে, নিজের মনেই ঘাড় নাড়ছিলেন। সার্কেল ইনসপেক্টর শিবব্রত আর অ্যাডিশনাল এস.পি. নাদিম আখতার বহুবার চাপ দিয়েছেন যে, 'কেসটাকে মার্ডার কেস হিসেবে সাজিয়ে তুলুন, তবে আমাদের ঘরেও কিছু আসবে'। কিন্তু, দ্বিজপদর অন্তর তাতে কিছুতেই সায় দেয়নি, অপরাধের তদন্তকারী অফিসার হিসেবে, তিনি চাইলেই নিজের মতো করে অভিযোগের পর অভিযোগ সাজিয়ে, মিথ্যে বয়ান, সমস্ত সাক্ষীদের মুখে বসাতেই পারতেন। ফৌজদারী কার্যবিধিতে,অর্থাৎ ক্রিমিনাল প্রসিকিওর কোডের, একশো একষট্টি ধারায় তদন্তকারী অফিসার হিসেবে, এই অন্যায় সুবিধা নিতে পারতেন। অনেক তদন্তকারী অফিসার এই ধরনের অনাচার করেও থাকেন— কিন্তু, দ্বিজপদর মন চায় নি। দুজন সুপিরিয়র অফিসারের নির্দেশের বিরোধিতা করেও সততার পথ আঁকড়ে চলাকেই শ্রেয় বলে মনে করেছেন।

কন্দর্পনারায়ণ এক নাগাড়ে বলে চলেছেন—

'শুধু তাই নয়, আর একটি বিশেষ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে কেস চালু হয়েছে— সেটি হল, 'আত্মহত্যায় প্ররোচনা'-র ধারা।

মাইলর্ড, কেস ডায়েরীটা দেখুন, শ্বশুর-শাশুড়ী বা অবিবাহিতা ননদের বিরুদ্ধে, তো প্ররোচনা দেবার কোনো অভিযোগ-ই নেই। মৃতা গৃহবধূর পাড়া-প্রতিবেশী, মা, অন্য আত্মীয়-স্বজনেরাও কেউ বলেন নি, যে ওই গৃহবধূটিকে, কোনোরকম মানসিক চাপ বা প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে, আর তার ফলেই উনি আত্মহত্যা করেছেন।

অন্যদিকে, অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য হল, এখানে গৃহবধূটির সঞ্জয় পাইন বলে একটি লোকের সাথে ফেসবুকের মাধ্যমে আলাপ হয়। তারপর সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং সঞ্জয় পাইনের কথামতো, নিজের ব্যক্তিগত মুহূর্তের কিছু ছবিও তিনি সঞ্জয় পাইনকে পাঠিয়ে দেন। সঞ্জয় পাইন সেই ছবিগুলিকে বিভিন্ন পর্ণোগ্রাফিক সাইটে ভাসিয়ে দেবে বলে, ভিক্টিম মহিলাকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে।

ঘটনার রাতে, এই ব্যাপারটাই মৃতার স্বামী জানতে পেরে যান। এই নিয়ে দুজনের মধ্যে বচসা হয়। মৃতার স্বামী, স্ত্রী-কে চড় মারেন।

মাই লর্ড, এই ব্যাপারটা আমি নিশ্চয়ই সমর্থন করছি না। তবু যা হয়েছে তো কখনোই 'আত্মহত্যায় প্ররোচনা' নয়।

মাইলর্ড, বেশ কিছুদিন হল, আমার মক্কেলরা জেলে আছেন। তাদের এক্ষুণি জামিন দেওয়া হোক।'

কন্দর্পনারায়ণের যুক্তির সঙ্গে দ্বিজপদ একমত হলেন। ঠিকই তো, অনেক সময়ই স্বামীদের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেবার অভিযোগ ওঠে বটে, কিন্তু, এই ঘটনায় অন্তত স্বামী বা অন্য সবার বিরুদ্ধে, আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেবার কোনো অভিযোগ উঠছে না।

মামলাটা হচ্ছিল, দুজন জজসাহেবের ডিভিশন বেঞ্চে। যেসব অভিযোগের সাজা সাত বছরের বেশি, সেই সব অভিযোগে যদি কেউ গ্রেপ্তার হন আর তারপর ওই অভিযুক্তরা যদি হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন, তাহলে ওই ধরনের জামিনের মামলা, দুজন জজসাহেবের ডিভিশন বেঞ্চেই হয়ে থাকে।

দুজন জজসাহেব-ই এতক্ষণ, চুপ করে কন্দর্পনারায়ণের সওয়াল শুনছিলেন।

এবার সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে পাবলিক প্রসিকিউটর অজিতেশ গোস্বামী কাছে, মামলার কেস-ডায়েরীটা চাইলেন— 'পি.পি. সাহেব, কেস ডায়েরীতে কী আছে? আজকে আমাদের কাছে জামিন চেয়ে চারজন আবেদন করেছেন। স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ী আর অবিবাহিতা ননদ। আমরা বরং শেষের থেকে শুরু করি— আগে ননদের বিরুদ্ধে ওই গৃহবধূকে 'আত্মহত্যায় প্ররোচনা' বা 'আরো পণ চেয়ে অত্যাচার' যার জন্য ওই গৃহবধূকে মরে যেতে হল, এই ধরনের কোনো অভিযোগ আছে?'

এবার পাবলিক প্রসিকিউটর অজিতেশবাবু উঠে দাঁড়ালেন এবং মাথা ঝুঁকিয়ে জজসাহেবদের অভিবাদন জানিয়ে অত্যন্ত মার্জিত ভঙ্গিতে বললেন— 'মাই লর্ড, সরকারি আইনজীবী মানেই যে, সমস্ত মামলায় তিনি অকারণে আপত্তি করবেন বা সমস্ত জামিন চেয়ে করা মামলাগুলোয় তিনি 'অবজেকশন' দেবেন, তেমনটি কিন্তু, হওয়া উচিত নয়।

আমি এই কেস ডায়েরীটি দেখেছি, এবং এতে শুধু অবিবাহিতা ননদ-ই নন, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী, কারও বিরুদ্ধেই আমি এমন কোনো অভিযোগ পাইনি। যাতে করে আজ আমি জামিনের মামলার বিরোধিতা করতে পারি। অন্যদিকে, পুলিশের কাছে দেওয়া মৃতা গৃহবধূর মা-য়ের জবানবন্দীও আমি দেখেছি, তাতে কিন্তু তিনি পরিস্কার জানিয়েছেন যে, তাঁর কন্যা, ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ হওয়া একজনের সঙ্গে একটি বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সে প্রায়ই ব্ল্যাকমেইল করত বলে তাঁর কন্যাটি, সবসময়ই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকতেন। অবশেষে ঘটনার দিন রাতে তাঁর জামাই ওই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের কথা জানতে পেরে যান, এবং এই নিয়ে বচসা হয়। তাঁর কন্যাটি লোকলজ্জার ভয়ে, আত্মঘাতী হন। এখানে তাঁর জামাইটি বা তার অন্য আত্মীয়স্বজন, আত্মহত্যায় কোনোরকম প্ররোচনা দেন নি। পণের দাবীতে বা টাকা চেয়েও তাঁর কন্যার শ্বশুরবাড়ির লোকজন কখনো কোনোরকম চাপ, তাঁর কন্যাকে বা তাঁকে কখনোই দেন নি।'

জজসাহেবরা ঠোঁট উলটিয়ে কাঁধ ঝাকিয়ে অবাক হবার ভাব দেখালেন— 'তাহলে, এতদিন গ্রেপ্তার করে রাখা হল কেন?'

অজিতেশ বাবু নাকের ওপরে নেমে আসা চশমাটা চোখের যথাস্থানে রেখে বললেন— 'মাইলর্ড, আজকে এখানে এই মামলার তদন্তকারী অফিসার উপস্থিত আছেন। তাঁর সঙ্গে আমার বিশদ আলোচনা হয়েছে। ঘটনার পরই পাড়া প্রতিবেশীরা উত্তেজিত হয়ে অভিযুক্তদের বাড়ি ভাঙচুর করতে শুরু করে এবং স্বামীকে ল্যাম্প-পোস্টে বেঁধে মারতে শুরু করেন। শ্বশুর-শাশুড়ি-ননদকেও তারা হেনস্থা করে। এই অবস্থায়, উনি স্পটে হাজির হন, অভিযুক্তদের রেসকিউ করেন। যদিও স্থানীয় জনতার দাবী ছিল যে, একেবারে তিনশো দুই ধারায় হত্যার অভিযোগে মামলা রুজু করতে হবে। তবুও ওই থানার অফিসার-ইন-চার্জ, এই মামলার তদন্তকারী অফিসার, নিজস্ব বিচার-বিবেচনার প্রয়োগে যদিও 'আত্মহত্যায় প্ররোচনা' ও 'পণের দাবীতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ধারায় তদন্ত শুরু করেন।'

অজিতেশবাবুর ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে, সওয়াল শুনতে শুনতে দ্বিজপদ মনে মনে হাসছিলেন, শুধু কি পাড়া-প্রতিবেশীরা? সার্কেল ইন্সপেক্টর শিবব্রত বাবু আর অ্যাডিশনাল এস.পি. নাদিম আখতারের চাপও কি কম ছিল, দ্বিজপদর উপর। কারো কথা না শুনে, তদন্ত করে যা পেয়েছেন, তা-ই কেস-ডায়েরীতে এনেছেন। জীবনে কখনো অসততার পথ নেননি, আর চাকরি-জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ওই 'দু-নম্বরি' তো আরো করবেন না।

অজিতেশবাবু দ্বিজপদ-র প্রশংসা করে বলে চললেন— 'মাই লর্ড, আমি ধন্যবাদ দিচ্ছি, এই মামলার তদন্তকারী অফিসার দ্বিজপদ বন্দ্যোপাধ্যায়কে,তাঁর সৎ ও সাহসী তদন্তের জন্য। একজন ইনভেস্টিগেটিং অফিসার বা আই. ও.-র কাছে তো আমরা তা-ই আশা করি।

তবে, ইন্টারেস্টিং পার্ট হল, তদন্ত করতে করতেই আই.ও. দেখতে পেয়েছেন, মৃতা গৃহবধূকে যদি কেউ আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়ে থাকে, তাহলে সে হল, এই ঘটনায় অন্যতম অভিযুক্ত সঞ্জয় পাইন। তার সঙ্গেই ভিক্টিম গৃহবধূর বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল— মূলত সে সমস্ত ছবি, পর্ণোগ্রাফিক সাইটে ছড়িয়ে দেবে বলে ভয় দেখানোতেই, ওই গৃহবধূটি আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হন।'

জজসাহেবরা উৎসুক হয়ে উঠলেন— 'দ্যাটস গুড। আমরাও ওই কথাই বলতে চাইছিলাম। গৃহবধূর আত্মহত্যার পেছনে, মূল প্ররোচনাকারী তো ওই লোকটি। ও কেন এখনো ধরা পড়লো না?'

কন্দর্পনারায়ণ আবার উঠে দাঁড়ালেন— 'মাই লর্ড, মামলা করবার জন্য বিশেষতঃ আসামি পক্ষের বা অভিযুক্তপক্ষের আইনজীবী হিসেবে আমাকে সারা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন আদালতে যেতে হয়। আমি দেখেছি, প্রধানত ছোটো ছোটো থানাগুলির 'ইনফ্রাস্ট্রাকচার' বলে কিছু নেই। তদন্তকারী অফিসারেরা তদন্ত করবেন কী করে? এই মামলায় 'ইনফর্মেশন টেকনোলজি অ্যাক্ট' বা 'তথ্যপ্রযুক্তি আইন' জড়িয়ে আছে, আমি তদন্তকারী অফিসারকে আক্রমণ করছি না বা ছোটো করতে চাইছি না, তাঁর সৎ, সুষ্ঠ আর নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য তাঁকে কুর্নিশ জানিয়েও বলছি, ওই আইনটার কোনো বিশেষ শিক্ষা বা ট্রেনিং কী আছে তাঁর বা থানার অন্য অফিসারদের?

ছোটো ছোটো থানাগুলি খুবই অবহেলিত মাই লর্ড। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, হয়তো বা ওই থানাতে, কোনো ডেস্ক টপ কম্পিউটার বা ল্যাপটপ-ও নেই, হয়তো বা যথাযথ ইন্টারনেট কানেকশন বা ওয়াই-ফাই সিস্টেম নেই। হয়তো বা থানার লক-আপের অবস্থাও কহতব্য নয়। মাই লর্ড, তদন্তকারী অফিসারকে জিগ্যেস করলে দেখা যাবে, যে দীর্ঘদিন ওনাদের পিস্তল বা বন্দুক চালাবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় নি। ইনফর্মার পুষতে খরচ দেয় না প্রশাসন। জং ধরা আদ্যিকালের গাদা বন্দুক নিয়ে হয়তো বা এখনও আসামি ধরতে যেতে হয়। থানার একমাত্র গাড়িটা হয়তো বা খারাপ হয়ে, অচল হয়ে পড়ে থাকে বেশিরভাগ দিন।'

দ্বিজপদ অবাক বিস্ময়ে হাঁ করে তাঁর সওয়াল শুনছিলেন আর প্রতিটি কথায় মনে মনে সায় দিচ্ছিলেন। কী চমৎকার সাবলীলতার সঙ্গে, দ্বিজপদ আর ওর মতো ছোটো অফিসারদের সমস্যার কথা হাইকোর্টের জজসাহেবদের কাছে তুলে ধরছেন এই উকিলবাবুটি।

'মাইলর্ড, আমরা কী করে আশা করি যে, এই ভেঙে পড়া ইনফ্রাস্ট্রাকচার নিয়ে, এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এই অতি-আধুনিক যুগের অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশ লড়াই করবে? মনে রাখতে হবে অপরাধীরা ছুটছে, দ্রুত ছন্দে, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে, নিত্যনতুন অপরাধের রাস্তা বের করছে তারা, আর পুলিশ বা অন্য তদন্তকারী সংস্থাগুলি চলছে পেছন পেছন, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে।

মাইলর্ড, আমি তো শুনেছি সুন্দরবন অঞ্চলের এক একটা থানায় নাকি, পুলিশ কর্মীরা নিজেরাই নিরাপত্তাহীন। রাত হলেই তাঁরা থানার ভেতর থেকে তালা ঝুলিয়ে, নিজেরাই ভেতরে, ভয়ে সিঁটিয়ে বসে থাকেন। মাঝে মাঝেই নাকি নদীর ওপারে বাংলাদেশ থেকে ডাকাতের দল থানা আক্রমণ করে। থানায় থাকা রাইফেল পিস্তলগুলোই তাদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু। ওগুলো লুঠ করতেই, মাঝে মাঝে ডাকাতরা থানা আক্রমণ করে।'

আবার ইন্দুমতীর কথা মনে পড়ে গেল দ্বিজপদর। ইন্দুমতীও যদি উকিল হত! কী ভালোই না হত, ওইরকম পোষাক পড়ে— কোট, গাউন, গলায় সাদা ব্যান্ড— হাইকোর্টের জজসাহেবদের সামনে আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে মামলা করত— এইরকমই ইন্দুমতীর কণ্ঠস্বরও গোটা কোর্টরুমের আনাচে-কানাচে খেলে বেড়াত। সবাই সম্ভ্রমের চোখে, কোর্টরুমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মামলা শুনত। একদিন, সেই রায়গঞ্জ থেকে, দ্বিজপদ আর ইন্দুমতীর মা-ও আসতেন, মেয়ের সওয়াল-জবাব করা শুনতে। একেবারে পেছনের দিকে, একটা বেঞ্চিতে বসে বসে মেয়ের মামলা করা শুনতেন। অথবা জজিয়তির পরীক্ষা দিয়ে, মেয়ে জজও হতে পারত। তাহলেও ওরা দুজনে মেয়ের এজলাসের এককোণে বেঞ্চিতে বসে বসে মেয়ের জজিয়তি করা দেখতেন।

তা না, মেয়ে আই.পি. এস. হতে যাচ্ছে! না-না, আই.পি.এস. তো হতে পারলে খুবই ভালো— সে তো স্বপ্ন ঠিকই— কিন্তু, সেই তো চোর ডাকাতের পেছনেই ছুটে বেড়াতে হবে। তাছাড়া শিবব্রত জোয়ারদার বা নাদিম আখতারের মতো খারাপ অফিসারও তো ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের সামলানো কী চাট্টিখানি কথা?

এখনও দ্বিজপদ রাত্রে, রেইড-এ বেরোলে ইন্দুমতীর মা, না খেয়ে ঘরে বসে থাকেন। যতক্ষণ দ্বিজপদ না ফেরেন, একঠায় বসে থাকেন, দুশ্চিন্তা করেন, নিশ্চিন্তে-নির্বিঘ্নে দ্বিজপদ ঘরে ফিরলে তবে দুজনে একসঙ্গে খেতে বসেন। দ্বিজপদ-র মা-ও বেঁচে থাকাকালীন না খেয়েই বসে থাকতেন সারাজীবন। পুলিশের ঘরের মা-বাবা, বউ আর ছেলে-মেয়ে প্রত্যেককেই চিন্তায় কাটাতে হয়, প্রতিটি মিনিট। ঘরের লোকটা ঘরে ফিরলে তবেই সে দিন বা সে রাতের মতো নিশ্চিন্ত।

ইন্দুমতী আই. পি.এস. পরীক্ষায় পাশ করে গেলে একইরকমভাবে, দ্বিজপদ আর ইন্দুমতীর মা-কেও দিনের পর দিন, রাতের পর রাত মেয়ের জন্য দুশ্চিন্তা নিয়ে জেগে থাকতে হবে— এটাই ভবিতব্য। জোরে একটা শ্বাস ছাড়লেন দ্বিজপদ।

জজসাহেবরা বেশ খানিকক্ষণ ধরে নিজেদের মধ্যে নিচুস্বরে আলোচনা করলেন। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন— 'প্রথমতঃ, আমরা চারজন অভিযুক্তকেই জামিন দিচ্ছি। তাঁরা, তদন্তকারী অফিসারকে সবরকমভাবে তদন্তে সহায়তা করবেন। দ্বিতীয়তঃ, আমরা মনে করছি যে, সমাজে এই ধরনের সাইবার ক্রাইম বেড়ে চলেছে। এই ধরনের 'স্পেশালাইজ ক্রিমিনাল'দের সঙ্গে কমব্যাট করতে, 'স্পেশালাইজড ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি' দরকার। আমরা চাইলে পুরো তদন্তটাই সি.আই.ডি-কে হ্যান্ডওভার করতে পারতাম। কিন্তু, সেটা করছি না। আমরা একটা 'সিট' বা 'স্পেশাল ইনভেস্টিগেটিং টীম' তৈরি করে দিচ্ছি। অবশ্যই সে ব্যাপারে আমরা পি.পি. সাহেবের পরামর্শ চাইছি।'

একটু থেমে আবার বললেন— 'পি.পি. সাহেব, আপনি আমাদের বলুন, সিটের প্রধান হিসেবে কাকে চাইছেন?'

এবার পি.পি. সাহেব উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে, জজসাহেবদের উদ্দেশ্যে নমস্কার জানিয়ে বললেন— 'মাইলর্ড, সাইবার ক্রাইম সামলানোর ক্ষেত্রে, এই মুহূর্তে বেস্ট ব্রেইন, সি.আই.ডি-র ইন্সপেক্টর জেনারেল শংকর দত্ত। সিনিয়র অফিসার, কিন্তু, খুবই এন্থুজিয়াসটিক, সাইবার ল' নিয়ে দুর্দান্ত নলেজ। তাঁকে সিটের প্রধান করুন। এছাড়া আমার পছন্দের আর দু-জন অফিসার হলেন সি.আই.ডি.র স্পেশাল সুপারিনটেনডেন্ট অর্জুন মিত্র ও ইন্সপেক্টর বেদান্ত দত্ত। তবে আমার আর একটা অনুরোধ আছে। স্থানীয় থানার ও.সি. হিসেবে, দ্বিজপদবাবুকেও রাখা হোক— এই মামলায়। স্থানীয় এলাকাটাও নিশ্চয়ই ওনার হাতের তালুর মতো চেনা— 'সিট'-এর অফিসারদের উনি ভালোভাবেই অ্যাসিস্ট করতে পারবেন।'

দ্বিজপদ যেন আনন্দে একটা শক খেলেন। চাকরি জীবনের প্রায় উপান্তে এসে স্বয়ং হাইকোর্টের পি.পি. এবং জজসাহেবদের কাছ থেকে পুরস্কার! তাঁর মতো চির অবহেলিত একজন অফিসার এরকম পুরস্কার তো ভাবতেও পারেন নি। আনন্দে তাঁর চোখে জল এসে গেল।

জজসাহেবরা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন— 'আমাদের কোনো আপত্তি নেই।'

জজসাহেবরা নিজেদের মধ্যে আর এক প্রস্থ আলোচনা সেরে পিপি সাহেবকে আবার বললেন—

'এই মামলাটা আমরা 'ডিসপোজ অফ' বা শেষ করছি না। এই মামলাটা বেঁচে থাকবে। প্রতি মাসে, একবার করে এই মামলাটা হাইকোর্টের 'ডেইলি কজ লিস্ট' বা শুনানির জন্য নির্ধারিত মামলাগুলির লিস্ট-এ আসবে।

রাজ্যসরকারের পক্ষ থেকে সেই দিনে একটা 'মান্থলি প্রসিডিং রিপোর্ট' কোর্টে জমা দিতে হবে।

রিপোর্ট সন্তাোষজনক না হলে পুলিশকে 'ফার্দার ইনভেস্টিগেশন' বা পুনরায় তদন্ত করতে হবে।'

কন্দর্পনারায়ণ এবার উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে জজসাহেবদের অভিবাদন জানাবার ভঙ্গিতে বললেন— 'অর্থাৎ 'কোর্ট মনিটরড ইনভেস্টিগেশন'। তার মানে, কোর্টের নজরদারিতে এই মামলার তদন্ত চলতে থাকবে।

মাইলর্ড, আমি ঠিক এটাই চাইছিলাম। সারা দেশে, সারা রাজ্যে, 'সাইবার ক্রাইম' বা এই ধরনের অপরাধ এখন এত বেড়ে গেছে, যে অপরাধ দমন করতে মহামান্য আদালতকেই অত্যন্ত দ্রুত এবং দৃঢ় পদক্ষেপ করতে হবে।

তবে তাই নয়, আমার ধারণা, এই ধরনের অপরাধগুলি আন্তঃরাজ্য অপরাধ। অর্থাৎ অন্য রাজ্যেও এই অপরাধের বীজ লুকিয়ে আছে। 'সিট'-এর সদস্যদের প্রয়োজনে অন্য রাজ্যেও যেতে হতে পারে।'

কন্দর্পনারায়ণের কথা শুনে, দুজন জজসাহেব-ই একমত হলেন। নির্দেশ দিলেন— 'সাতদিনের মধ্যে 'সিট'-এর সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বসে তাঁরা কীভাবে তদন্তপদ্ধতিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন, সেটা ঠিক করে নেবেন। আপাততঃ সি.আই.ডি-র আই. জি. শংকর দত্ত, এস. এস. পি. অর্জুন মিত্র, ইন্সপেক্টর বেদান্ত দত্ত, স্থানীয় থানার ও.সি. দ্বিজপদ ছাড়াও লালবাজার অ্যান্টি-রাউডি স্কোয়াডের অফিসার রাঘব রডরিগস আর রাজা খাস্তগীরকেও টীমে নেওয়া হল। প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। আশা করা যায় এই কাজটাও তাঁরা কৃতিত্বের সঙ্গেই উতরোবেন।

এক মাস পরে এই মামলার তারিখ দেওয়া হল— সেই দিন 'সিট'-এর কর্ণধার হিসেবে স্বয়ং শংকর দত্ত, একটা মুখবন্ধ খামে, তদন্তের যাবতীয় অগ্রগতির খতিয়ান, আদালতে জমা দেবেন।'

কলকাতা স্টেশন থেকে রাতের ট্রেন, রাধিকাপুর এক্সপ্রেস ধরে রায়গঞ্জ নামতে নামতে ভোর পাঁচটা দশ। ঘরে ঢুকে হাতমুখ ধোবার আগে, ইন্দুমতীর মায়ের বাড়িয়ে দেওয়া হাত থেকে চা-এর কাপ-টা নিতে নিতে, ফোন করলেন, ইচ্ছাকে।

বললেন, 'খেয়ালী-কেও কনফারেন্স কল-এ নে— আর্জেন্ট কথা আছে।' তারপর দুজনকেই একসঙ্গে বললেন— 'দ্যাখ, তোদের দুজনকেই একটা ফোন নম্বর দিচ্ছি। কলকাতার এক উকিলের। তাঁর মামলা করা, আমি নিজে হাইকোর্টে দেখে এসেছি। তোরা নিজেরা তাঁর সঙ্গে কথা বল— অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে দেখা কর— তোদের ওপর কিছু চাপিয়ে দিচ্ছি না। যদি ওনাকে তোদের 'ভালো উকিল' বলে মনে হয়, তোরা ওঁকে দিয়ে হাইকোর্টে মামলা কর।

এই ধরনের মামলাকে বলে 'রিট' মামলা। 'পুলিশ আমাদের করা অভিযোগকে গুরুত্ব না দিয়ে ফেলে রেখেছে। ঠিকঠাক তদন্ত করছে না'

—এই অভিযোগে, পুলিশকে জড়িয়ে 'পুলিশ ইন্যাকশন'-এর মামলা কর। একে বলে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে মামলা।'

তারপরই গলা নামিয়ে ফিসফিস করে কথা বলার ভঙ্গিতে বললেন— 'পুলিশ আর কাউকে ভয় না করুক, হাইকোর্টকে খুব ভয় পায়। কাজেই তোরা পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা কর। সেই মামলায় আমাকেও জড়াবি। না হলে সি. আই. শিবব্রত আর অ্যাডিশনাল এস.পি. নাদিম আখতার আমাকেই সন্দেহ করবে। ভাববে তোদের পেছনে পরামর্শদাতা হিসেবে আমিই আছি।'

ইচ্ছা আর খেয়ালী দুজনকেই ফোনের ওপারে, চুপ করে থাকতে দেখে আবার বললেন— 'কোনো ভয় নেই রে। হাইকোর্ট আমাকে ডাকলে যা রিপোর্ট দেবার আমিই দেব।'

একটু থেমে দ্বিজপদ আবার বললেন— 'দ্যাখ, আমারও একটা মেয়ে আছে— তোদের বয়সি বা বয়সে তোদের থেকে হয়তো একটু ছোটো। মেয়ের বাবা হিসেবে আমি বুঝি তোদের বাবা-মায়েদের কষ্ট।

আমি ছোটো থানার ছোটো পুলিশ। বেশিদিন চাকরিও নেই। রিটায়ারমেন্টের আগে, তোদের উপর যারা অন্যায় করেছে তাদের সাজা দিয়ে যেতে চাই। কিন্তু, এই থানার ও.সি. হিসেবে, আমার হাত-পা বাঁধা। মাথার ওপর অন্য অফিসাররা আছে। আমাকে তারা কাজ করতে দেয় না।

তাছাড়া আছে রাজনৈতিক চাপ। কাউকে অ্যারেস্ট করতে গেলে, এম.পি., এম.এল.এ., তো বটেই, গ্রামের প্রধান, উপপ্রধান-কেও জিগ্যেস করতে হয়। তারা পারমিশন না দিলে, আমি কাউকে অ্যারেস্ট করতেও যেতে পারি না।'

থামলেন দ্বিজপদ। কান খাড়া করে শুনবার চেষ্ট করলেন, ফোনের ওপারে ইচ্ছা আর খেয়ালী, তাঁর কথা শুনছে কি না।

ফোনের মধ্য দিয়ে দুজনেরই শ্বাস পড়ার শব্দ শুনতে পেয়ে আবার বলা শুরু করলেন— 'কাল আমি কলকাতা হাইকোর্টে ছিলাম। উকিলবাবুটার মামলা করা শুনলাম— খুব ভালো লাগল। মনে হল, এঁকে দিয়েই হবে। ফোন নম্বরটা যোগাড় করেছি। তোদের দিলাম। তোরা ভেবে দ্যাখ। যদি মনে করিস তোদের 'অভিযোগ দায়ের করার পর এতগুলো বছর কেটে গেছে। তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয় নি। আসামিরা আজ অবধি অ্যারেস্ট হয় নি'—এই অভিযোগ জানিয়ে, তোরা হাইকোর্টে মামলা করবি, তাহলে এই উকিলবাবুটার সাথে কথা বলিস।'

ফোন ছেড়ে দিলেন দ্বিজপদ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%