জয়ন্তনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
বাড়িতে এসে বাবাকে সব কথা খুলে বলল খেয়ালী। এর আগে হাইকোর্টে যাবার অভিজ্ঞতা কখনও হয়নি। এই প্রথম হাইকোর্টে এসেছিল। আর কন্দর্পনারায়ণও যেন অন্যরকম মানুষ।
এর আগে 'উকিল' বললেই ওর চোখে ভেসে উঠত রাগী রাগী চেহারার, মোটা গোঁফের আর পুরু কাঁচের চশমা পরা একজন মানুষ। কিন্তু, বছর পঁয়তাল্লিশের ছিপছিপে চেহারার এই ভদ্রলোককে যেন প্রথম দর্শনেই ভালো লেগে গিয়েছিল খেয়ালী আর ইচ্ছার।
ধবধবে ফর্সা মুখে যেন একটা হাসি লেগেই রয়েছে। খুব ধৈর্য্য ধরে আর অনেক সময় নিয়ে দুজনের জীবনের গল্প শুনেছিলেন তিনি। চেম্বারে সেদিন অনেক 'ক্লায়েন্ট' ছিলেন। তবু একমনে ওদের দুজনের কথা শুনছিলেন। মাঝে মাঝেই নিজের ঝোলা গোঁফে আঙুল বোলাতে বোলাতে, চেম্বারের ডানদিকে বাহারি সুদৃশ্য কাঠের টেবিলে রাখা রঙিন মাছের অ্যাকোয়ারিয়ামের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিলেন। কখনো আবার নিজের জিভ দিয়ে 'চুক চুক' শব্দ করে খেয়ালী আর ইচ্ছার জীবনে ঘটে যাওয়া, অন্যায় ঘটনার বিরুদ্ধে নিজের সহানুভূতি জানাচ্ছিলেন। তারপর পাশের ঘর থেকে নিজের দুজন 'জুনিয়র'কে ডেকে এনেছিলেন। খেয়ালী আর ইচ্ছাকে দেখিয়ে বলেছিলেন— 'অনেক দূর থেকে ওঁরা আমার কাছে এসেছেন। ওঁদের পাশে দাড়ানো আমাদের নৈতিক কর্তব্য। তোরা দুজনে ওঁদের সাথে আলাদা করে বোস। ওঁদের সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিটা অন্যায় ঘটনার 'নোট' নে। তারপর দুজনের জন্য দুটো 'রিট' মামলার ড্রাফট কর। পুলিশকে জড়িয়ে 'পুলিশ ইন্যাকশন' বা পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে আদালতের হস্তক্ষেপ দাবি করে মামলা রেডি কর।'
তারপর গোটা চেম্বারের সমস্ত 'জুনিয়র' ছেলেমেয়েদের নিজের ঘরে ডেকে এনে খেয়ালী আর ইচ্ছাকে দেখিয়ে বলেছিলেন— 'যদিও শ্রীপর্ণা আর পৃথা এই মামলা দুটোর ড্রাফট রেডি করছে, তবুও, আমি চাই তোদের সবার 'এক্সপার্টাইজ'। তোরা তো জানিস আমাদের চেম্বারের কোনো মামলাই আমার একার নয়, আমাদের সবার। আর তোরা অ্যাক্টিভলি সাহায্য না করলে কোর্টের মধ্যের আইনি লড়াইগুলিতে আমি জিততে পারতাম না।' তারপর একটু থেমে নিজেকে আদর করার ভঙ্গিতে গালে হাত বোলাতে বোলাতে অন্যমনস্কভাবে বলেছিলেন— 'খেয়ালী আর ইচ্ছা, মেয়েদুটির মধ্যে 'স্পার্ক' আছে, ওদের মধ্যে 'অনেস্টি' আছে। ওদের সাথে যে অন্যায় হয়েছে, ওরা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চায়।
সুদূর রায়গঞ্জ থেকে ওরা আমার কাছে এসেছে— স্রেফ অপরাধীকে সাজা দেবে বলে— এটা কম কথা নয়।'
তারপর আবার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জুনিয়র ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন— 'আচ্ছা মানুষ বিপদে পড়লে কোথায় যাবে বলতে পারিস? পুলিশের কাছে গেলে কোনো সাহায্যই পাবে না। পুলিশ সঠিক আর নিরপেক্ষ তদন্ত করা যেন ভুলেই গেছে। উলটে তারা তাকিয়ে থাকছে রাজনীতির কারবারিরা কী নির্দেশ দেয় তার দিকে। ভুরি ভুরি অভিযোগ আসছে যে, টাকা-পয়সার বিনিময়ে পুলিশ সঠিক তদন্ত করছে না— কোথাও তদন্তকে ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে।
পার্টি, ক্লাব, তারা মানুষের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে মানুষকে ভুল পথে পরিচালনা করছে, বলছে— কোর্টে গিয়ে কী হবে? আমাদের কাছে আসুন, টাকা দিন, ঝামেলা সেটল করে দিচ্ছি।'
তারপরই যেন অন্যমনস্ক ভাব কাটিয়ে চনমনে ভঙ্গিতে বললেন— 'এই মামলা দুটোতে তোরা প্রত্যেকেই আমার সঙ্গে থাকবি, অ্যাসিস্ট করবি।'
তারপরই আবার গলার স্বরে আন্তরিকতার ছোঁয়া এনে ডানহাতের আঙুলগুলোকে নিজের বুকের বাঁদিকটাতে রেখে বলেছিলেন— 'মনে রাখিস এই মামলা দুটো আমরা মস্তিষ্ক দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে করব।'
টানা সাতদিন খেটেখুটে দুটো মামলাকেই রেডি করা হয়েছিল। শ্রীপর্ণা আর পৃথার তৈরি করা 'রিট' মামলার ড্রাফট দুটো দেখে কন্দর্পনারায়ণ খুশি হয়েছিলেন, বলেছিলেন— 'চল দেখি এবার কোর্টে, ওরা কতবড় পুলিশ! সাধারণ মানুষকে সাহায্য করা ছাড়া আর কী বড় কাজ ওদের থাকতে পারে? মনে রাখিস, যার কেউ নেই, তার আদালত আছেন। যদি পুলিশ নিজের কর্তব্য ভুলে যায় তাহলে কোর্টের গুঁতো দিয়ে পুলিশকে তাদের কর্তব্য মনে করিয়ে দিতে হবে।'
'পুলিশের ওপর মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। আজকাল পুলিশের সঠিক ট্রেনিং হচ্ছে না। কীভাবে তদন্ত করতে হয় পুলিশ ভুলেই গেছে।'
তারপরই আবার স্বগতোক্তির ঢঙে গলা নামিয়ে বলতে শুরু করেছিলেন— 'অবশ্য শুধু পুলিশকে দোষ দিয়েই বা লাভ কী? পুলিশকে তো নিরপেক্ষ তদন্ত করতে দেওয়াই হবে না। পুলিশ রাজনীতিবিদদের ভয় পায়। আসল অপরাধীকে ধরতে গেলে হয়তো বা দেখা যাবে তাকে বাঁচাতে রাজনীতিবিদরা ছুটে আসছেন। তারপর নিরপেক্ষ তদন্তের পুরস্কার হিসেবে সে পাবে নেতা-নেত্রীদের গালাগালি, থানা ঘেরাও, ভাঙচুর। বহু দূরে সাত-সমুদ্দুর তেরো নদীর পারে পোস্টিং— তার চেয়ে বাবা, কী দরকার, সততা দেখানোর? সময়ের স্রোতে গা ভাসানোই ভালো!'
কন্দর্পনারায়ণ ম্লান হাসির চেষ্টা করেছিলেন।
গতকালই হাইকোর্টে দুটো 'রিট' মামলা দায়ের হয়ে গেছে। একটা করেছে খেয়ালী, আর একটা ইচ্ছা।
খেয়ালীর মামলাতে স্বামী অমিত, দেওর সুমিত এবং মাঝের হাট থানার ও.সি. হিসেবে দ্বিজপদ, সি.আই. শিবব্রত, অ্যাডিশনাল এস.পি নাদিম আখতার ছাড়াও জেলার এস.পি. তো বটেই, তার ওপর ডি.আই.জি., আই.জি., ডি.জি. এমনকী রাজ্যের হোম সেক্রেটারিকেও জড়িয়ে দেওয়া হল।
ইচ্ছার মামলাতে আবার প্রভাত, প্রভাতের কয়েকজন বন্ধুকে জড়িয়ে মামলা দায়ের করা হল। সেই মামলাতেও দ্বিজপদ, শিবব্রত, নাদিম ছাড়াও এস.পি., ডি.আই.জি., আই.জি., ডি.জি., হোম সেক্রেটারিকেও 'পার্টি' করা হল। দুটো মামলাতেই থানার ও.সি. হিসেবে দ্বিজপদর নাম রাখা হল। আর সবই করা হল পূর্বপরিকল্পনামাফিক।
ইচ্ছা আর খেয়ালীর ল'ইয়ার হিসেবে কন্দর্পনারায়ণ বলেছিলেন— 'এমনিতেই এই ধরনের 'রিট' মামলাতে থানার অফিসার-ইন-চার্জকে তার কর্তব্যে গাফিলতির জন্য কৈফিয়ত দিতে হয়। তবে ও.সি. নিজে যদি এতটা সৎ পরামর্শ দিয়ে থাকেন তাহলে, তাঁর সততাকে স্যালুট জানাতে হয় বইকি।'
পাঁচিল ঘেরা ছোট্টো একতলা বাড়ি। বিভিন্ন ধরনের বাহারি গাছ এমনভাবে ঘিরেছে বাড়িটাকে, যে দূর থেকে শুধু গাছই চোখে পড়ে।
আর কী গাছই বা নেই? বোগেনভেলিয়া তো বাড়িটাকে চারিদিক থেকে প্রায় ঢেকেই দিয়েছে। কতরকম তার রং! লাল, কমলা, গোলাপী, সাদা। বাড়ির সামনে বসানো অমলতাস। ফুলে ঢাকা। লোহার গেটের ঠিক বাইরে একটা বিরাট বকুলগাছ। বৈশাখ-জৈষ্ঠ্যের এই সময়টায় বাড়িতে ঢোকা বেরোবার রাস্তাটা ঝরে পড়া বকুল ফুলে সাদা হয়ে থাকে।
পিয়ালী-খেয়ালী দুই বোন যখন ছোটো ছিল, ফুলের সাজি নিয়ে ভোরবেলায় উঠে বকুল ফুল কুড়োতো। ফর্সা-ফর্সা, ছোট্ট শরীরে পড়ে থাকত শুধু সাদা টেপজামা।
বারান্দায় চেয়ারে বসে থাকতেন কৃষ্ণচন্দ্র। দেখতেন, দুই বোন কীরকম পরম যত্নে বকুল ফুল কুড়িয়ে কুড়িয়ে সাজিতে রাখছে।
বসে বসে দুই মেয়ের ফুল তোলা দেখতে দেখতে ভোরের নরম আলোয় কৃষ্ণচন্দ্রের মনে হত দুই দেবকন্যা যেন মর্তে নেমে এসে দেবতাদের পূজোর জন্য ফুল কুড়োচ্ছে।
বকুলগাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে প্রথম রোদ আলতো হয়ে পড়ত, ওদের ঠিক পেছনে। ভোরের আলোয়-ছায়ায় মনে হতো, ওদের ঠিক পেছনেই বোধহয় অপেক্ষা করছে স্বর্গের সোনালি রথ। ফুল কুড়োনো শেষেই বোধহয় দুই দেবকন্যা আবার উঠে পড়বে রথে।
সত্যিসত্যি যদি পিয়ালী-খেয়ালী রথে উঠে চলে যায় দূরে কোথাও? ভাবতে ভাবতে কৃষ্ণচন্দ্রের বুকের মধ্যে গুড়গুড় করে উঠত। এত সুন্দর ফুলের মতো ফুটফুটে দুটো মেয়েকে তিনি সারাজীবন আগলে রাখতে পারবেন তো? কোনো রাক্ষস-শয়তান, মেয়ে দুটোকে তাড়া করবে না তো? এত সব চিন্তা করে কান্না উঠে আসতো গলায়। চোখের কোন দুটো জ্বালা জ্বালা করে উঠত।
কম্পাউণ্ডের মধ্যেই টিউবওয়েল। ট্রেন থেকে নেমেই বাসি-ঘেমো চুড়িদার কুর্তা ছেড়ে একটা নাইটি পড়ে বারান্দার থেকে দুটো সিঁড়ি নেমে টিউবওয়েলে জল নিতে গেল খেয়ালী।
যদিও এখন ঘরে ঘরেই ট্যাপ কলের জল, তবে, এই টিউবওয়েলটা বহুদিনের। আর জলও খুব ঠাণ্ডা থাকে। মে মাসের এই গরমে, সারারাত ট্রেনে কাটিয়ে একটু আগেই ঘরে ঢুকেছে খেয়ালী। যতক্ষণ ভালো করে স্নান না করতে পারবে, শরীরের মধ্যে কিড়কিড়ে অস্বস্তিটা যাবে না। তাই বালতিতে করে টিউবওয়েলের জল তুলে নিয়ে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে স্নান করবে।
টিউবওয়েলের উপর হ্যান্ডেলটা ধরে ঝুঁকে দু-বার পাম্প করতেই হঠাৎ কে যেন পেছনদিক থেকে এসে বাঁ হাত দিয়ে খেয়ালীর মুখটা চেপে ধরল, আর ডান হাত দিয়ে খেয়ালীর কোমরটা জড়িয়ে, এক হ্যাঁচকা টানে খেয়ালীকে মাটি থেকে শূন্যে তুলে ফেলল।
হাড় হিম করা ফিসফিসে একটা স্বর— কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে উঠল— 'হাইকোর্টে গেছিস? হাইকোর্ট তোকে বাঁচাবে? ডাক তোর কোর্টকে, দেখি কেমন বাঁচায়।'
চমকে উঠে খেয়ালী নজর করল কে যেন তাকে পেছন থেকে তুলে ধরেছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবেই খেয়ালী চিৎকার করার চেষ্টা করছে। কিন্তু, কোনো আওয়াজই বেরোচ্ছে না। লোকটার শক্ত বাঁ হাতটা আঁট হয়ে চেপে ধরেছে তার মুখ আর ডান হাতটা উঠে এসেছে খেয়ালীর বুক দুটোর উপর। স্নান করতে যাবে বলে তলায় কিছু পড়েনি খেয়ালী। নাইটিটা উঠে যাওয়ায় ফর্সা পা দুটো শূন্যে ঝটকাচ্ছে শুধু। কার কণ্ঠস্বর এটা? অমিত না? প্রচণ্ড আক্রোশে খেয়ালীকে মাটিতে আছড়ে ফেলল হাত দুটো, কোমরটা ঠুকে গেল মাটিতে। 'উফ মা গো'— যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠল খেয়ালী।
চোখের সামনে আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠল চেহারাগুলো— অমিত, সুমিত, আরো কতগুলো ছেলে। কখন ঢুকল ওরা কম্পাউণ্ডের ভেতরে? গেট কী তালা দেওয়া হয়নি? তার মানে ওরা পাঁচিল টপকে ঢুকেছে ভেতরে। এতক্ষণ সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। টিউবওয়েলের থেকে জল ভরবে বলে খেয়ালী ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ওরা নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে খেয়ালীর ওপর।
খেয়ালী নিজের কনুই দুটোর ওপর ভর দিয়ে পেছন ঘষটে ঘষটে ওদের থেকে দূরে সরে যাবার চেষ্টা করল। অমিত-সুমিতের বন্ধুগুলো পকেট থেকে মোবাইল বের করে ওর ছবি তুলতে তুলতে কুৎসিত ভঙ্গিতে 'হ্যা হ্যা' করে হাসতে লাগল।
ওর খেয়াল হল স্নান করতে যাবে বলে ও নিচে কিচ্ছু পরেনি। নাইটি উঠে এসেছে কোমরের ওপর। ওর গোটা নিম্নাঙ্গ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
অমিত-সুমিত এত্ত নিচে নেমে গেছে? ওর কী রকম গা গুলিয়ে বমি পেয়ে গেল। বাঁ হাতে নাইটিটা নামাবার চেষ্টা করতে করতে শরীরের সব শক্তি এক জায়গায় করে চিৎকার করে উঠল— 'বাবা বাঁচাও, মা বাঁচাও।'
খানিকক্ষণ আগেই সারারাত ট্রেন জার্নি করে ফিরেছে মেয়েটা। চিন্তায় রাতে ভালো ঘুম হয়নি। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মেয়ের কাছ থেকে সব শুনেছেন কৃষ্ণচন্দ্র। হাইকোর্টে অমিত-সুমিতসহ পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে 'রিট' মামলা দায়ের হয়েছে— পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে মামলা। তিনদিনের মধ্যেই শুনানি হবে।
শুনানির দিনে খেয়ালী আর ইচ্ছা আবার কলকাতায় যাবে। উকিলবাবু বলেছেন, নিজেদের মামলার সময় কোর্টে উপস্থিত থাকলে ভালো। মামলা করতে করতে উকিলবাবুর কিছু জানবার দরকার হলে বলে দেওয়া যাবে।
খেয়ালী ফিরে আসায় অনেকটা নিশ্চিন্তবোধ করছেন কৃষ্ণপদ।
এই সময় রেডিওতে সুন্দর সুন্দর গান দেয়— শ্যামাসঙ্গীত। মাধুরী এককাপ চা করে রেখে গেছেন টেবিলে। সঙ্গে একবাটি মুড়ি। কৃষ্ণচন্দ্র গান শুনতে শুনতে চা খাবেন বলে রেডিওটার ভল্যুমটা একটু বাড়াতে, চেয়ার ছেড়ে উঠলেন।
মেয়ের একটা আর্ত চিৎকার কানে এল না? 'বাবা বাঁচাও— মা বাঁচাও?' নাকি ভুল শুনলেন? বড়ো মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। শ্বশুর বাড়িতে ভালোই আছে। যত চিন্তা ছোটো মেয়েকে নিয়েই। রূপও বেশি, যন্ত্রণাও বেশি।
কান খাড়া করলেন কৃষ্ণচন্দ্র। হ্যাঁ, একটা কান্না কান্না চিৎকার কানে আসছে না? অনেকগুলো পুরুষকণ্ঠের মিলিত হাসির আওয়াজ?
লুঙ্গির গিঁটটা টাইট করতে করতে দৌড়ে বাইরে বেরোলেন কৃষ্ণচন্দ্র।
বারান্দায় বেরিয়েই যা দেখলেন, তাতে হাড় হিম হয়ে গেল। হাত-পা অবশ্য হয়ে গেল। মেয়ের কোমর অবধি নাইটি উঠে গেছে। বাঁ হাতটা দিয়ে একবার নাইটিটা নিচের দিকে টানছে, আর একবার ঢাকার চেষ্টা করছে চরম লজ্জা। ছোটো জামাই, তার ভাই আর কতগুলো ছেলে ঘিরে ধরেছে মেয়েকে। মেয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। ছেলেগুলো মোবাইলে খেয়ালীর নগ্ন শরীরের ছবি তুলছে আর হাসছে।
অমিত, ঘাড় ঘোরালো কৃষ্ণচন্দ্রর দিকে। 'হাইকোর্টে গেছে মেয়ে? কী ভেবেছেন? হাইকোর্ট আপনার মেয়েকে বাঁচাবে? বলেছিলাম না, কোর্ট-পুলিশ আমি পকেটে রেখে ঘুরি?'
ডান হাতটা দিয়ে কুৎসিত ভঙ্গি করতে করতে তেড়ে এল কৃষ্ণচন্দ্রর দিকে। পকেট থেকে একটা কৌটো বের করে কৃষ্ণপদকে দেখিয়ে বলল— 'তোর মেয়েকে তাড়ালেও যায় না। অ্যাসিড মারলেও মরে না, তোর মেয়ের তো বেড়ালের জান রে! তবে, এবার মরবে। তোর মেয়েকে বিষ খাওয়াবো।'
অমিত বিষের কৌটোর ঢাকনাটা টোকা মেরে খুলে ডান হাতে তুলে ধরে আবার এগিয়ে গেল খেয়ালীর দিকে।
নিজের কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে চিৎ হয়ে আধশোয়া খেয়ালীর শরীরের দুদিকে পা দিয়ে দাঁড়িয়ে, সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, বাঁ-হাতে খেয়ালীর মুখটা টিপে ধরে হাঁ করিয়ে, ডান হাতে বিষের কৌটোটা ঢেলে দিলো খেয়ালীর মুখের ভেতর।
কৃষ্ণচন্দ্র আর দেখতে পারলেন না। চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললেন।
হঠাৎ 'মাগো বাবাগো' বলে ছেলেগুলোর চিৎকার শুনতে পেলেন।
'ধরো, ওদের মারো' বলে মাধুরীর কান ফাটানো স্বর কানে এল।
চোখ খুললেন কৃষ্ণচন্দ্র। ভাত বসিয়ে ছিলেন মাধুরী, রান্নাঘরে বসেই মেয়ের কান্না আর অমিতের হুমকিভরা কণ্ঠস্বর শুনে, মুহূর্তে নিজের কর্তব্য ঠিক করে নিয়েছিলেন। মেয়েকে বাঁচাতে ডেকচিতে করে নিয়ে এসে ভাতের গরম ফ্যান ছুঁড়ে মেরেছেন ছেলেগুলোকে। এও কী সম্ভব? মাধুরী তো নরম মানুষ। ও কোথা থেকে এত শক্তি পেল? মাধুরী রান্নাঘর থেকে একটা বঁটি নিয়ে লাফ দিয়ে নেমেছেন উঠোনে।
মুহূর্তে কৃষ্ণচন্দ্রের শরীরেও যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। দু-বছর হল রিটায়ার করেছেন। নিজেকে বৃদ্ধ বলেই ভাবেন। কিন্তু মাধুরীকে দেখে কোথা থেকে হাতির বল পেলেন কৃষ্ণচন্দ্র।
এক লাফে উঠোনে নেমে চেপে ধরলেন অমিতকে। সঙ্গে সঙ্গে মাধুরীর হাতের তরকারি কাটা বঁটিটা নেমে এল অমিতের কাঁধে।
বাকী সবার মিলিত কণ্ঠের আওয়াজ শুনলেন— 'পালা, পালা।'
মাধুরী পাগলের মতো যাকে পারছেন তাকেই কোপাচ্ছেন। অমিতের কাঁধের থেকে রক্ত ছিটকে উঠেছে— গিয়ে পড়ছে মাটিতে অসহায়ের মতো পড়ে গোঙাতে থাকা খেয়ালীর বে-আব্রু ফর্সা পায়ে।
কৃষ্ণচন্দ্র দৃশ্যটা দেখে তৃপ্তি পাচ্ছেন। মেয়েকে ওরা জোর করে বিষ খাইয়ে দিয়েছে— মেয়ের মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে— মেয়ে গোঙাতে গোঙাতে কাতরাচ্ছে। তবুও অমিতের শরীরের রক্তের ধারা মেয়ের পায়ে এসে পড়তে দেখে কৃষ্ণপদ বড্ড তৃপ্তি পাচ্ছেন। বড্ড তৃপ্তি। কৃষ্ণপদ আবার চোখ বুজলেন। মাথাটা ঘুরে গেল। চোখের সামনে সিনেমার দৃশ্যের মতো ভেসে উঠল ছোট্ট খেয়ালীর মুখটা। দেবকন্যার মতো ভোরের নরম আলোয় বসে বসে বকুল ফুল কুড়োচ্ছিল। হঠাৎ যেন অন্ধকারের মধ্য থেকে উদয় হল একদল রাক্ষস। দেবকন্যার নরম ছোট্ট শরীরটা ফালা ফালা করে দিল। আর পারছেন না। কৃষ্ণপদর ভারী শরীরটা আছড়ে পড়ল মাটিতে শুয়ে থাকা খেয়ালীর পাশেই।
স্নান সেরে, ঠাকুরকে জল দিয়ে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা আঁচড়াচ্ছিলো ইচ্ছা।
গ্যাসে ভাত চড়ানো আছে। কাল রাতে ট্রেনে প্রায় কিছুই খাওয়া হয় নি। বাবাও কাল দুশ্চিন্তায় প্রায় ঘুমোতেই পারেন নি। সারারাত শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেছেন। বারবারই ইচ্ছাকে মামলা-মোকর্দ্দমায় জড়াতে বারণ করে এসেছেন চিরটাকাল। আর এবারের মামলাটা তো একেবারে কলকাতায়, হাইকোর্টে। অত্ত দূরে মামলার দেখভাল করাও তো মুশকিল। তাছাড়া কীই বা হবে মামলা করে? কবে শেষ হবে তারও ঠিক নেই। শুধু শুধু টাকার শ্রাদ্ধ।
প্রভাত কি সোজা ছেলে? ড্রাগের কারবার চালায়, পর্ণোগ্রাফির ব্যবসা করে। ওদের দলে, প্রচুর গুণ্ডা-বদমাশ থাকে। খুন-খারাপি তো হাতের ময়লা। মেয়ে পাচারের ব্যবসা করে। দেশজোড়া ওদের ব্যবসার জাল ছড়ানো থাকে।
প্রভাতের বিরুদ্ধে তো থানাতে অভিযোগ দায়ের করা রয়েছে, বহুদিন। কী হল? কিছুই তো হয়নি। আর হবেও না।
ইচ্ছাই বুঝিয়েছিল বাবাকে— যার কিছু নেই, তার হারাবারও কিছু নেই। ইচ্ছার জীবনে আর কি আছে? ওর জীবনের যাবতীয় সুখ-এর স্বপ্ন আজ ভেঙে চুরমার। এতদিন ওর লড়াই তো ও একই লড়ছিল। চলতে চলতে ওর সাথে খেয়ালীর দেখা হল। ও এখন আর একা নয়। ওর পাশে আছে খেয়ালী। আর খেয়ালীর পাশে ও। ওরা দুজনে মিলে একটা দল। শুধু তাই নয়। ও আর খেয়ালী একটা প্ল্যান করেছে।
ওরা নিজেরা একটা এন.জি.ও. তৈরি করবে। সারা রাজ্যের দুঃখী, অত্যাচারিতা, নির্যাতিতা মেয়েদের পাশে থাকবে। অনেক এমন মেয়ে আছে যারা ঘরে-বাইরে রোজ নির্যাতিতা হয়, কিন্তু, মুখ ফুটে টুঁ শব্দটি করতে পারে না। ভয় পায়, কোথায় যাবে? কার কাছে অভিযোগ দায়ের করবে? গ্রাম বাংলার প্রচুর মেয়ে বাইরে, ভিন রাজ্যে অথবা ভিন দেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে নিষিদ্ধ পল্লীতে। চারদিকে এখন পর্ণোগ্রাফির ব্যবসার রমরমা। ছোটো ছোটো মেয়েদের নিয়েও কারবার চলছে। কোথাও কোথাও ড্রাগের ব্যবসা চলছে।
নারীপাচার, পর্ণোগ্রাফি, ড্রাগ— এই তিন অসাধু ব্যবসার জালে জড়িয়ে বহু মেয়ের জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ কোথাও অভিযোগ জানাবার জায়গা নেই। কেউ পাশে এসে দাঁড়াবে না— ভয়, ভয়, সর্বত্রই চাপা ভয়। গ্রাম-গঞ্জের যে কী ভয়াবহ অবস্থা, যারা শহরে বা শহরতলীতে থাকে তারা ভাবতেও পারবে না।
এই তো গতকাল হাইকোর্টে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা মেয়ের সাথে কথা হচ্ছিল। তাদের গ্রামে কয়লাখনির টাকা যেন উড়ছে। ছেলেরা পড়াশোনা করে না। ষোলো-সতেরো বছরের ছেলেরা দিনে-দুপুরে নেশা করে বুঁদ হয়ে থাকে। ঘরে ঘরে অল্পবয়সী মেয়েরা তো বটেই, ঘরের বউ-রাও নিরাপদ নয়। কী ভয়ংকর অসহায় অবস্থা মেয়েদের! অথচ এই মেয়েরা থানা-পুলিশেও যেতে সাহস পায় না। থানা-পুলিশ তো, এলাকার গুণ্ডা-বদমাশদেরই হাতে। আর কোর্টে গিয়েই বা কী হবে? যদি ওই খারাপ লোকগুলো একবার জানে যে তাদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করা হয়েছে তাহলে আর দেখতে হবে না। প্রথমে কেস তুলে নেবার জন্য ভয় দেখাবে, তারপর হয়তো জানেই মেরে দেবে।
—এই ধরনের মেয়েদের পাশে দাঁড়াবে ওরা। একথা তো সত্যি যে, আগে একা একা থানায় বা কোর্টে ঢুকতে সাহস পেত না ইচ্ছা। এখন খেয়ালী সঙ্গে থাকায় ওর সাহস অনেক বেড়েছে। একইভাবে খেয়ালীও বলে যে, ইচ্ছা পাশে থাকায় ও নিজেকে অনেক সাহসী মনে করে।
কন্দর্পনারায়ণবাবু, কথা দিয়েছেন যে, আগামী তিন-চার দিনের মধ্যেই শুনানী হয়ে যাবে। প্রভাত আর ওর চক্রের সবকটাকে অ্যারেস্ট করবার অর্ডার উনি বের করবেন।
কে যেন দরজায় কড়া নাড়ছে না? ইচ্ছার চিন্তার জালটা ছিঁড়ে গেল।
এই সময় তো কারো আসার কথা নয়। কে এল? ইচ্ছা গলা তুলে জিগ্যেস করল— 'কে'?
প্রথমে খানিকক্ষণ সব চুপ।
ইচ্ছা আবার প্রশ্ন করল— 'কে? কে?'
চাপা গলায় উত্তর এল— 'আমি, দরজা খোল। একটু দরকার আছে।'
গলাটা যেন চেনা চেনা— ইচ্ছার ভেতর থেকে একটা ভয় চারিয়ে উঠল।
পাশের ঘরে বিছানায় বাবা অকাতরে ঘুমোচ্ছেন। কাল সারারাত টেনশনে ঘুমোতে পারেন নি।
বাবাকে ডাকবে? দরজা খুলে দেখতে বলবে কে এল? নাঃ বাবাকে আর ঘুম থেকে তুলতে ইচ্ছে করল না।
নিজের ভেতর থেকে জেগে ওঠা ভয়টাকে তাড়াতে চেষ্টা করল ইচ্ছা— তাছাড়া এই সকালবেলা ভয় কিসের? রাস্তায় কত্ত লোক চলাচল করছে—
ইচ্ছা সাহস দেখিয়ে বলে উঠল— 'আমি?' 'আমি কে?'
—'আমি প্রভাত।'
ঘরের মধ্যে যেন বাজ পড়ল। ইচ্ছা যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছে না।
'প্রভাত?' 'প্রভাত কেন?' 'একেবারে বাড়িতে চলে এসেছে? এত্ত সাহস?' 'নিশ্চয়ই থানা থেকেই প্রভাতকে খবর দিয়ে দিয়েছে। ও জেনে গিয়েছে যে হাইকোর্টে মামলা ফাইল হয়েছে। আর তারপরই ও বাড়িতে এসেছে ভয় দেখাতে।'
ইচ্ছা দাঁতে দাঁত কামড়ে বলল— 'ভয় দেখাতে বাড়ি অবধি চলে এসেছো? জানোয়ার? এক্ষুণি আমি পুলিশ ডাকছি।'
প্রভাতের কাতর কণ্ঠস্বর শোনা গেল— 'বিশ্বাস করো, তা নয়। তোমাকে আমি ভয় দেখাতে আসিনি। আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। প্লীইইজ, আমাকে ক্ষমা করো।'
'মোটেই না, তুমি যেই জেনেছো যে, হাইকোর্টে মামলা ফাইল হয়েছে,অমনি আমাকে ভয় দেখাতে এসেছো— আমি সব কথা হাইকোর্টে জানাবো— ইতর কোথাকার।' দরজার ওপারের কণ্ঠস্বরটা যেন একটু থমকালো। একটু থেমে আবার বলল— 'তুমি যে হাইকোর্টে মামলা ফাইল করেছো, আমি জানতাম না। জানলে আমি আসতাম না। আমি এসেছি নিজের জন্য— তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে। আমি তোমার সঙ্গে সামনাসামনি বসে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিতে চাই। প্লীইইজ, একবার দরজা খোলো।'
'তুমি এক্ষুনি চলে যাও, নাহলে আমি পুলিশ ডাকব।'
রাগে দাঁত কিড়মিড় করল ইচ্ছা।
'আমি জানি, আমি তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি। আমি ক্ষমা চাইছি। প্লীইইজ, দু-মিনিট আমার সাথে কথা বল— আমি চলে যাচ্ছি।' এবার অসহিষ্ণুর মতো দরজায় চাপড় মারতে শুরু করল প্রভাত।
ইচ্ছা আবার কোমরটা পেছনদিকে বাঁকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশের ঘরের দিকে তাকাল।
বাবা অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। বাবাকে ডাকবে? নাঃ বাবাকে ডাকতে ইচ্ছে করছে না।
কী করবে ইচ্ছা? খেয়ালীকে ফোন করে জানাবে? থানায় ফোন করবে? নাকি হাইকোর্টের উকিলবাবুকে সব কথা জানিয়ে পরামর্শ নেবে?
কিন্তু, প্রভাত যেভাবে দরজা ধাক্কাচ্ছে, তাতে বাবার ঘুম ভেঙে যেতে বাধ্য। আর প্রভাত এসেছে দেখলে বাবা আবার টেনশন শুরু করে দেবেন।
তার চেয়ে দরজাটা খুলবে ইচ্ছা? কী আর করবে প্রভাত? দিনের বেলা, বাড়িতে এসে কীই-বা করতে পারে? বরং যদি দু-মিনিট কথা বলে বিদেয় হয়ে যায়, সেটাই সবচেয়ে ভালো।
খানিকক্ষণ দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ভাবল ইচ্ছা। তারপর এগিয়ে গিয়ে দরজার ছিটকিনি খুলে দিল।
দরজার পাল্লাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকে এল প্রভাত। সঙ্গে আরো তিন-চার জন।
'শালী, কুত্তী, হাইকোর্টে গেছিস? কী ভেবেছিস? আমি জানব না? জানিস না, থানায় আমার লোক ফিট করা?'
প্রভাতের চোখ দুটো যেন জ্বলছে। ডান হাতে ইচ্ছার মুখটা শক্ত করে চেপে ধরেছে, আর বাঁ হাতে গলাটা। উফফ, প্রভাতের হাত দুটো যেন লোহার মতো শক্ত। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ইচ্ছার।
'ধর এটাকে। শোয়া বিছানায়। শশালী রেপের কেস করেছে— কিচ্ছু বলিনি। থানায় গেছে রোজ, তাও কিচ্ছু বলিনি। এত্ত সাহস! হাইকোর্টে গেছে! তোকে বাঁচাবে হাইকোর্ট? ডাক তোর হাইকোর্টকে— দেখি আজ তোকে কেমন বাঁচায়! তোর হাইকোর্ট, আর ওরকম দশটা উকিলকে, আমি আমার পকেটে রাখি।'
প্রভাতের কণ্ঠস্বর হিসহিসিয়ে উঠেছে। দু-জোড়া হাত, ইচ্ছাকে শূন্যে তুলে নিল। আছড়ে ফেলল বিছানায়।
ফড়ফড় করে একটা শব্দ। ইচ্ছা বুঝতে পারল, ওর নাইটিটা উড়ে গেল।
আবার প্রভাতের কণ্ঠস্বর— 'মালটাকে বোঝাবো, রেপ কাকে বলে। প্রথমে আমি— তারপর তোরা— ভিডিও কর— ভিডিও কর— গাঁয়ে সবার মোবাইলে পাঠিয়ে দিবি।'
ইচ্ছার ইচ্ছে-অনিচ্ছে কিছু নেই— 'সত্যি, মেয়েরা বড্ড অসহায়— হে ঈশ্বর, জানি তুমি বাঁচাতে পারবে না— শুধু বাবাকে ঘুম থেকে তুলো না ঠাকুর। বাবা এই দৃশ্য সহ্য করতে পারবেন না— বাবাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখো ঠাকুর। বাবার ঘুম যেন না ভাঙে ঠাকুর—'
ইচ্ছা দাঁতে দাঁত কামড়ে চোখ বন্ধ করে রইল। চোখ দিয়ে শুধু অঝোর ধারায় জল নেমে এল।
'রিট' মামলা শুনানীর ঘরে আজ বড্ড ভীড়।
কন্দর্পনারায়ণ একদম সামনে এগিয়ে এলেন। কয়েকজন জুনিয়র ল'ইয়ার, কন্দর্পনারায়ণকে দেখে সম্ভ্রমের সঙ্গে জায়গা করে দিলেন।
সকাল সাড়ে দশটা। জজসাহেব বসবার সঙ্গে সঙ্গে কন্দর্পনারায়ণ মাথা নিচু করে নমস্কার জানিয়ে বলে উঠলেন— 'মাই লর্ড, আমার আপনার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিবেদন আছে। আমাকে দু মিনিট সময় দিতেই হবে।'
জজসাহেব চশমার ফাঁক দিয়ে কন্দর্পনারায়ণকে দেখে অবাক হলেন— 'কী ব্যাপার? এখনও তো মামলার ডাকই হয়নি? কত নম্বর মামলা আপনার মিস্টার চ্যাটার্জী?'
থমথমে মুখ কন্দর্পনারায়ণের। ফর্সা মুখে জমে উঠেছে ঘাম। কান, নাক, গাল, টকটকে লাল হয়ে রয়েছে— যেন রক্ত ফুটে বেরোবে। কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ঘাম।
'ইট অ্যাপিয়ারস, ইউ আর ভেররি একসাইটেড। হোয়াট হ্যাপেনড মিস্টার চ্যাটার্জী?' জজসাহেব আবার বললেন।
কন্দর্পনারায়ণ কখনও উত্তেজিত হন না— বড় বড় মামলাগুলো করার সময়ও নয়। সুন্দর নম্র ব্যবহারের জন্যই তিনি হাইকোর্টে পরিচিত। জজসাহেবরাও সেটা জানেন। কিন্তু আজকে কন্দর্পনারায়ণের সেই চেনা হাসিমুখ যেন উধাও— দম বন্ধ করে রয়েছেন তিনি— কোর্ট ভরা লোক, কন্দর্পনারায়ণকেই দেখছেন।
কন্দর্পনারায়ণ মুখ খুললেন— 'মাইলর্ড, সাধারণ মানুষ কোথায় যাবেন? আমি সবসময় বিশ্বাস করি, সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা হোলো কোর্ট।
মাইলর্ড, আমাদের দেশে 'উইটনেশ প্রোটেকশন সিস্টেম' বা 'সাক্ষীর নিরাপত্তা' বলে কিচ্ছু নেই। নিরাপত্তা চেয়ে, সুরাহা চেয়ে যে, আবেদনকারী বা আবেদনকারিনীরা কোর্টে আসেন, তাদেরও কোনো 'নিরাপত্তা' প্রশাসন দিতে পারে না।
অসহায় মানুষেরা সুরাহা চেয়ে, নিরাপত্তা চেয়ে, বাঁচতে চেয়ে, কোর্টে এলে তাদের ভয় দেখানো হয়। কেস তুলে নেবার জন্য চাপ দিতে গিয়ে তাদের এমনকী বিষ খাইয়ে দেওয়া হয়, 'গ্যাং-রেপ' করা হয়।'
কন্দর্পনারায়ণ থামলেন। যেন অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসছে তাঁর কথাগুলো। গোটা ঘর চুপ। পিন পড়লেও শব্দ শোনা যাবে। জজসাহেবও একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন তাঁর দিকে।
কন্দর্পনারায়ণ পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ, ঘাড় মুছে, রুমালটা আবার যথাস্থানে রেখে দিলেন। দু-হাত দিয়ে কালো কোটের ওপর পরা কালো গাউনটা টেনে ঠিক করে নিয়ে বলতে শুরু করলেন—
'সাধারণ মানুষ কোর্টে আসতে পারবে না মাইলর্ড? থানায় যেতে পারবে না? অভিযোগ জানাতে পারবে না? বহুবছর আগে থানায় অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও থানা কোনো স্টেপস নেবে না? মানুষ অসহায়ের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঠোক্কর খেয়ে বেড়াবে? তারপর সুরাহা চেয়ে আদালতে এলে তাদের কাউকে বিষ খাওয়ানো হবে অথবা গ্যাং রেপ করা হবে? আর সেই গ্যাংরেপের ভিডিও করে, সেই ভিডিও গোটা গ্রামে ছড়িয়ে দেওয়া হবে? মানুষ কোথায় যাবে মাইলর্ড, মানুষ কোথায় যাবে?' শেষের কথাগুলো বলতে বলতে কন্দর্পনারায়ণের গলা ধরে এল।
জজসাহেব এতক্ষণ মন দিয়ে কন্দর্পনারায়ণের কথাগুলো শুনছিলেন। এবার হাত তুলে ইশারা করে বললেন— 'ডিটেলসে বলুন মিস্টার চ্যাটার্জী। কী চান আমার কাছ থেকে?'
কন্দর্পনারায়ণ, বুক ভরে শ্বাস নিলেন। একদৃষ্টে চেয়ে আছেন জজসাহেবের দিকে— বলে উঠলেন—
'মাইলর্ড, গতকাল 'পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা'র বিরুদ্ধে দুটো 'রিট' মামলা দায়ের করি, আপনার এজলাসে। তিনদিন পরে শুনানী হবার কথা।
এই মামলা দুটি নিছক মামলা নয়, জীবন্ত দলিল। দুটি অল্পবয়েসি মেয়ে। আগে কেউ কাউকে চিনত না। দুজনেই আলাদা আলাদা করে প্রতারিতা, নির্যাতিতা, দুজনেই ভয়ংকর অত্যাচারের শিকার। স্রেফ থানায়, কোর্টে চক্কর কাটতে কাটতে দুজনে এখন দুজনের বন্ধু, পরস্পরের সহায়। দুজনে মিলে এখন দল করেছে, নিজেরাই কোথাও কোনো মেয়ে অসহায়, নির্যাতিতা শুনলে, সেখানে ছুটে যাচ্ছে, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, সাহস যোগাচ্ছে।
প্রথম মেয়েটি নিজেই রেপ ভিক্টিম। অভিযোগ জানাতে থানায় গিয়েছিল বলে তাকে আবার অ্যাসিড ছুঁড়ে মেরে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। মাইলর্ড, তাতেও সে দমে নি।
এতবড় সাহস! প্রথমে রেপ, তারপর অ্যাসিড অ্যাটাকের ভিক্টিম, সুদূর উত্তর দিনাজপুর থেকে ছুটে আসে হাইকোর্টে? সুরাহা চেয়ে? যখন কিনা, অভিযুক্তরা প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছে, যে থানা, পুলিশ, কোর্ট সব তাদের পকেটে!
গতকাল হাইকোর্টে 'জাস্টিস' চেয়ে মামলা করার সাজা হিসেবে আজকে তার বাড়িতে ঢুকে অপরাধীরা প্রথমে তাকে নিগ্রহ করে, তারপর বিবস্ত্র অবস্থায় তার শরীরের ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়।'
থামলেন কন্দর্পনারায়ণ। দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন— 'এতেই শেষ নয় মাইলর্ড। সবশেষে মেয়েটিকে জোর করে হাঁ করিয়ে মুখে বিষ ঢেলে দেওয়া হয়েছে— সে এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে।'
কন্দর্পনারায়ণ ঢোঁক গিলবার চেষ্টা করলেন। গলার কাছে একটা দলা যেন আটকে রয়েছে। চোখ ভিজে এসেছে জলে।
জজসাহেব কী যেন বলতে যাচ্ছিলেন। কন্দর্পনারায়ণ আবার মুখ খুললেন— 'আমার বলা এখনও শেষ হয় নি, মাইলর্ড। আমার আর এক মক্কেলও রেপ-এর শিকার, তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গোপনে ব্যক্তিগত ছবি তুলে ব্ল্যাকমেইলিং, এছাড়াও সেই মামলার মূল অপরাধী ড্রাগ, পর্ণোগ্রাফি ও নারী পাচার জাতীয় অপরাধের সঙ্গে জড়িত বলে আমাদের অভিযোগ।
গতকাল, সেও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার প্রতিবাদে আপনার কাছে মামলা দায়ের করে গিয়েছিল।
সম্ভবত দুটি ক্ষেত্রেই থানা থেকে খবর 'লীক' হয়েছে। আজ তার ঘরে ঢুকে মূল অপরাধীসহ আরো চার-পাঁচজন তাকে গ্যাং-রেপ করে গিয়েছে। আর মোবাইলে ঘটনার ভিডিও করে ভাইরাল করে দেওয়া হয়েছে। রক্তাপ্লুত অবস্থায় তাকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।'
কন্দর্পনারায়ণ চুপ। গোটা কোর্টরুম ভর্তি লোকজন চুপ। জজসাহেবও চুপ করে রয়েছেন।
কয়েকমুহূর্ত পরে জজসাহেব চোখ থেকে চশমাটা খুললেন— সামনে টেবিলের উপর ছুঁড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসলেন— কী যেন ভাবছেন।
কন্দর্পনারায়ণ আবার বলতে শুরু করলেন— 'এবার বলুন মাইলর্ড, সাধারণ লোক কোথায় যাবে?'
জজসাহেব টেবিলের ওপর কনুইয়ের ভর দিয়ে ঝুঁকে বসলেন। একটা পেন তুলে নিয়ে ঠক ঠক করে টেবিলে ঠুকে স্টেনোগ্রাফারকে ডেকে বললেন— 'একটা অর্ডার লিখুন তো—'
স্টেনোগ্রাফার শশব্যস্তে ছুটে গিয়ে জজসাহেবের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে রাইটিং প্যাড নিয়ে দাঁড়াল। জজসাহেব বলে চললেন— 'মিস্টার চ্যাটার্জীর বক্তব্যের অপরিসীম গুরুত্ব বিবেচনা করে দুটি মামলাই বেলা দুটোর সময় শুনানী ধার্য করছি। ঠিক বেলা দুটোয় রাজ্যের পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেলকে এই মামলা দুটোর সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট দিতে হবে।'
একটু থেমে আবার বললেন— 'আজ সকালেই মেয়ে দুটির ওপর ব্রুটাল অ্যাটাক হয়েছে। তার মানে অপরাধীরা কাছাকাছিই আছে। বেলা দুটোর মধ্যে অপরাধীদের অ্যারেস্ট করতে হবে। আর মামলা দুটোর শুনানীর সময়, রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল, গভর্নমেণ্ট প্লীডার, পাবলিক প্রসিকিউটর— সবাইকে আমি আমার ঘরে হাজির দেখতে চাই। এভরিওয়ান মাস্ট বি প্রেজেন্ট অ্যাট মাই কোর্ট। আই ওয়ন্ট দি অ্যাকিউজড পার্সনস টু বি অ্যারেস্টেড— উইদিন টু পি.এম।'
এবার কন্দর্পনারায়ণের দিকে তাকিয়ে বললেন— 'মিস্টার চ্যাটার্জী। আমি ওই মেয়েদুটির জন্য দুঃখপ্রকাশ করছি। কিন্তু, আমি কিছুতেই আদালতের উপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা সরে যেতে দেব না। তার জন্য যা করতে হয় করব। আমি রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিচ্ছি, মেয়ে দুটির চিকিৎসার যাবতীয় দায়ভার রাজ্য সরকারকেই নিতে হবে।
আমিও আপনার মতো বিশ্বাস করি, সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা হলো আদালত। প্লিজ কাম অ্যাট টু পি.এম। আমি দেখি, অপরাধীরা বড়? নাকি আদালত বড়।'
কন্দর্পনারায়ণ মাথা ঝুঁকিয়ে জজসাহেবকে নমস্কার জানিয়ে কোর্টরুম থেকে বেরিয়ে এলেন।
ঘরে উপস্থিত বিভিন্ন চ্যানেল ও খবরের কাগজের সাংবাদিকরাও কন্দর্পনারায়ণের বক্তব্য মন দিয়ে শুনছিলেন।
বাইরে বেরোনো মাত্র সবাই কন্দর্পনারায়ণকে ঘিরে ধরলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।