মোটিভটা কী?

অরুণোদয় ভট্টাচার্য

পূর্বকথা

কলকাতায় তিনপুরুষ কাপড়ের ব্যাবসা ভিণ্ডিওয়ালাদের। পরিবারের এক শরিক অবশ্য ইলেকট্রনিক্স গুডস-এও জমিয়ে বসেছে। কিন্তু পঁচিশ বছর ধরে বাঙালিদের সঙ্গে পড়াশুনো, খেলাধুলো সব করে, অর্থাৎ ঘনিষ্ঠভাবে মিশে মনোজ নামক যুবকটি একটি কুলাঙ্গার হয়েছে ভিণ্ডিওয়ালাদের সমাজে। ব্যাবসাতে তার মাথা খেলছে না। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে বেশ কয়েক লাখ টিভি সিরিয়ালে ঢেলেছিল। ভরাডুবির পর রীতিমতো ডিপ্রেশানে ভুগছিল।

রাসবিহারী অ্যাভেনিউতে রাস্তার ওপর ওদের যে কম্পাউণ্ড-অলা বিশাল বাড়ি, সেখানে গেট দিয়ে ঢুকেই একটি শিবমন্দির আছে বাঁ দিকে। তার সামনে একদিন সকালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সাত-পাঁচ ভাবছিল মনোজ। ভাবতে ভাবতে হঠাৎই একটা আইডিয়া এসে গেল মাথায়। রোজই টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখে, ‘An idea can change your life!’ এই আইডিয়াটা আসতেই ‘জয় শিবশম্ভু!’ বলে উঠল মনোজ, ‘ইউরেকা!’ না-বলে!

ক-দিন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর এক মেধাবী ছাত্রর সঙ্গে গভীর পরামর্শ করল মনোজ ভিণ্ডিওয়ালা। মাসখানেক বাদে দেখা গেল, সেই মন্দির-অলা বাড়ির গেটে জনতার দৃষ্টি-আকর্ষণকারী এক হোর্ডিং বসেছে—‘Talk to God direct!’

কী ব্যাপার? তোমার মোবাইলের সঙ্গে বিগ্রহের পাশে একটা সুইচ বোর্ডের সকেট-এ তারের সংযোগ করো। Call বোতাম টেপো। দেখবে, ঠাকুরের কানের কাছে এক অদ্ভুত উজ্জ্বল নীল আলো জ্বলে উঠেছে। অমনি তোমার সিমকার্ডটা সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ ইনএ্যাকটিভ হয়ে যাবে। কারণ ইউ আর কানেক্টেড টু গড! শুধু আলোকিত থাকবে ভিউস্ক্রিনটা। এবার বলে যাও যা কিছু তোমার নিবেদন করার আছে জগদীশ্বরকে। ক্ষমা চাও কৃত অপরাধের জন্য, বর চাও, প্রতিবেশী বা শত্রুর সর্বনাশ চাও। খুলকে চাও। প্রাইভেসির জন্য ছোট্ট কিউবিকল করা। চার্জ, ইণ্ডিয়ানদের মিনিটে মাত্র একশো টাকা। বিদেশিদের কুড়ি ইউ.এস. ডলার।

যুক্তি-চিন্তাবাদীদের মনে হবে, লোকে এ টোপ খাবে কেন? কিন্তু কৃষ্ণ বা শিব বা যিশু বা নিরাকার যেভাবেই বিধাতাকে ভাবুক মানুষ, সবই তো বিশ্বাস-নির্ভর, ‘তর্কে বহুদূর’। অজস্র ধর্মস্থানে নিষ্প্রাণ বিগ্রহ বা প্রতীকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম ও প্রার্থনা জানাবার জন্য লোকে শারীরিক কৃচ্ছØসাধন এবং অর্থব্যয়, দুইই চূড়ান্তভাবে করে যাচ্ছে আবহমানকাল। বরাবর মানুষ তো একতরফাই কথা বলে এসেছে ভগবানের সঙ্গে, কোনো উত্তর বা নির্দেশ ঐশ্বরিক কন্ঠ থেকে পাবার দুরাশা না-করে! তাহলে এমন ঘনিষ্ঠ ওয়ান-টু-ওয়ান সংযোগ-এর বিশ্বাসে তারা তো সাড়া দেবেই! তাছাড়া, সমস্যা হাজারো গুণ বাড়ছে প্রত্যেক মানুষের জীবনে। ভন্ড জ্যোতিষী, তাবিজ, তাগা, পাথর, জড়িবুটি, মন্ত্রতন্ত্র, গুরুদেব, এসবের-ই লক্ষগুণ চহিদা বেড়ে গেছে। সীমাহীন পাপ, টোয়েন্টিফোর-সেভেন মতলববাজি, এসবের জন্য একটা দৈবী সাপোর্ট চাই না? জবরদস্ত ম্যাগনাম সেলিব্রিটিরাও, তাদের গলদঘর্ম ব্যস্ততার মধ্যেও, মন্দিরে-মসজিদে অক্লান্ত ঘুরছে।

সুতরাং গপাগপ এ টোপ খেতে লাগল লোকে, বয়স-জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ নির্বিশেষে। এবং ছ-মাসে কোটিপতি হয়ে গেল মনোজ ভিণ্ডিওয়ালা। তার চোখ-ধাঁধানো অভ্যুত্থান দেখে ইনকাম ট্যাক্স, কর্পোরেশন, স্থানীয় সিপিএম মাতব্বরেরা যখন আঘাত হানার প্রস্তুতি নিল, ঠিক তার আগেই সে কানাডায় চলে গেল হুস করে। এখন তার রমরমা বিশ্বজোড়া এক্সক্লুসিভ বিজনেস! চারশো বিশটি ব্রাঞ্চ! মাঝখানে আড়াই বছর কেটে গেছে।

বর্তমান ঘটনা

মাসখানেক হল মনোজ সসম্মানে ইণ্ডিয়া এসেছেন। গ্রেট রিটার্ন অব দা নেটিভ। সাময়িক অবশ্যই, মাস দুইয়ের জন্য, কারণ এদেশে পাকাপাকি থেকে বিজনেস করার বিস্তর হ্যাপা। পিছনে লাগার লোক এবং সংস্থা অনেক। আইনত তাকে দন্ডনীয় হিসেবে প্রমাণিত করা যাবে না, যেহেতু ক্লায়েন্টরা স্বেচ্ছায় তার কাছে আসে। এটি একটি বিজনেস। তবে এর জন্য লাইসেন্স ম্যানেজ করতে হবে। ট্যাক্স ইত্যাদি নিয়ে যৎপরোনাস্তি মেলার সৃষ্টি করতে পারে সরকারি মেশিনারি। পুলিশ কর্তারা যখন তখন ঘুস চাইবে। পরশ্রীকাতর ব্যাবসাদাররা আরও গভীর ষড়যন্ত্র করতে পারে।

তাও যুক্তিবাদী সমাজ তাদের দু-বছর আগে ফাইল-করা পাবলিক লিটিগেশান মামলাটা পুনর্জীবিত করার কথা ভাবল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও হয়তো কোমর বেঁধে ভিণ্ডিওয়ালার পেছনে পড়ত। কিন্তু সেসব ধামা চাপা দেওয়া হয়েছে। কারণ দু-একজন মন্ত্রীও মনোজের ক্লায়েন্ট হিসেবে ঈশ্বরের সঙ্গে একান্তে গোপন কথা বলার সুযোগ নিয়েছিলেন। তাঁদের পরিচয় রেজিস্টারে লিখতে হয়েছিল। পরমাত্মার সঙ্গে এ্যাপয়েন্টমেন্টে তো লুকোছাপা চলে না।

মনোজ সেদিন হোটেল মুমতাজ-এ এক বিশাল পার্টি থ্রো করলেন। রাজ্যপাল, মন্ত্রী, ফিল্মস্টার ও টিভি-মুনদের সঙ্গে মুম্বইয়ের ফাটাফাটি কিছু সিংগারকে আনা হয়েছিল সে অনুষ্ঠানে, মনোরঞ্জনের জন্য।

পার্টি শেষ হল এক সময় মাঝরাত পেরিয়ে। চলে গেল যে যার বাড়ি।

পরদিন সকালবেলা। হোটেলের এক সুইপার তিন নম্বর সুইটের টয়লেট পরিষ্কার করতে এসে দরজায় নক করল। রেসপন্স না-পেয়ে দরজা ঠেলতেই সেটা খুলে গেল। তারপরই—

চোখের সামনে এক রক্তাক্ত শব দেখে জমাদার আর্ত চিৎকার করে উঠল— বাপ রে! খুন! খুন! হত্যা হো গয়া! গার্ডসাব! গার্ডসাব! ঝাঁটা ফেলে সে ছুটল হোটেলের গার্ডরুমের দিকে।

প্রতিক্রিয়া

সারা শহরে চাঞ্চল্যকর ভীতির শিহরণ জাগল। পুলিশে ছেয়ে গেল হোটেল। সংলগ্ন রাস্তা কর্ডন করে দেওয়া হল। সকাল থেকে টিভি চ্যানেলগুলো রে-রে করে লাফিয়ে পড়ল ঘটনাস্থলে। লং শট, মিড শট, ক্লোজ আপে হোটেল মুমতাজের লবি, সেই বাথরুম, যেখানে ‘বডি’ ছিল সেই মার্ক-করা জায়গাটার ছবি। গন্ধশোঁকা কুকুরির নায়িকা-ভঙ্গিতে এদিক-সেদিক বিচরণ এবং মুখ-চোখ-কানের নড়াচড়া দেখানো চলল ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

লালবাজারের ভারাপ্রাপ্ত CID অফিসার মি. মাথুরকে স্টুডিয়োতে আমন্ত্রণ করে আনতে লাগল সবাই। সেইসঙ্গে কয়েকজন সেলিব্রিটি জোগাড় করে প্যানেল বসানো হল। মুখরোচক প্রশ্নোত্তর, কার কী ধারণা এই হত্যাকান্ড সম্পর্কে, নানা পরামর্শ, উদ্বেগ প্রকাশ, হোটেল মালিকের বিরুদ্ধে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ, ইত্যাদি ইত্যাদি। সেলিব্রিটিদের অনেককেই দেখা গেল ‘তারা’ থেকে ‘আনন্দ’ হয়ে ‘কলকাতা টিভি’ ঘুরে বেড়াচ্ছেন সকাল থেকে রাত্তির।

কেমন হবে এই টি.আর.পি. বর্ধক অনুষ্ঠানগুলো। দেখা যাক একটি চ্যানেলে চোখ রেখে খানিক।

সঞ্চালকসহ আটজন উপবিষ্ট স্টুডিয়োতে। তাদের একজন অবশ্যই মাথুর সাহেব। তাছাড়া বিখ্যাত মডেল মল্লিকা, সংক্ষেপে মল্লি (অনেকে আড়ালে বলে ‘মরলি’)। টপ সিরিয়াল অভিনেতা প্রভু ডাটা (না, এঁর গুঁড়ো মশলার ব্যাবসা নেই)। সর্বজ্ঞ ফুটবল কোচ ভি.কে.—মানে বরুণ কাশ্যপ, প্রবীণা রবীন্দ্রসংগীত গায়িকা আরাধনা পুরকায়স্থ, বুকফেয়ার-থ্রব কবি অবনীশ পাল এবং পটার-রোলিং-এর যোগ্য প্রতিপক্ষ ডিটেকটিভ লেখিকা সুমায়া সেন।

সংলাপের নমুনা

মল্লি—আচ্ছা, মাথুর বাবু, আপনারা যে স্লিফার ডগ মীনাকে কাজে লাগাচ্ছেন, সে কি কোনো ক্লু পেয়েছে?

মি. মাথুর—মীনা বাথরুম থেকে লিফট করে নেমে পিছনের প্যাসেজ দিয়ে হোটেলের বাইরে রাস্তা তক গেছে। তারপর, আপনারাও দেখেছেন পিকচারে, সে বাতাসে বা মাটিতে আর কোনো স্মেল-টেল পেল না! মানে কী, সেখান থেকেই মার্ডারার কোনো কার-এ উঠে গেছে।

সুমায়া (জেরার ভঙ্গিতে)—জাস্ট আ মিনিট, মি. মাথুর, আপনি কী করে সিয়োর হচ্ছেন, আততায়ী একজন ছিল, একাধিক নয়?

ফুটবল-কোচ (মাথুর জবাব দেয়ার আগেই ঝাঁপিয়ে পড়ে)—বাথরুমের ছোট্ট জায়গাতে একাধিক লোক এ্যাটাক করতে গেলে জটলা হয়ে যাবে, ক্লিন গোল হবে না!

মি. মাথুর—রাইট। মার্ডারার খুব পাকা হাতে রিবকেজ আর এ্যাবডোমেন-এর মাঝখানে ক্লিন স্ট্যাব করেছে।

সুমায়া—কতগুলো উণ্ড হয়েছে? পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট পেয়েছেন? মোটিভ অব মার্ডার কিছু বুঝছেন?

সঞ্চালক—এসব ইম্পর্ট্যান্ট প্রশ্নের উত্তর শোনার জন্য আমরা সবাই উদগ্রীব। তবে তার আগে একটা ছোট্ট ব্রেক।

বিজ্ঞাপনের পর ফিরে এসে

প্রভু—আশ্চর্য কোয়েনসিডেন্স, জানেন, ‘মার্ডার এ্যাট তাজ-বাথ’ নামে আমি একটা টেলিফিল্ম বানানোর কথা ভাবছিলাম লাস্ট এক মাস ধরে। সেটাতে অবশ্য ভিকটিম হবে কোনো সুন্দরী মহিলা, লাইক মল্লিকা দেবী!

মল্লি—(আতঙ্কের অভিনয় করে) আঁ—ই-ইক! স্যাডিস্টিক!

সঞ্চালক—হ্যাঁ, মি. মাথুর, আপনি আমাদের যদি পোস্ট-মর্টেম রিপোর্টের ব্যাপারটা বলেন।

সুজিতের মৃতদেহ আবিস্কার...

মাথুর—ফুল রিপোর্ট পেতে আরও কয়েক ঘণ্টা ওয়েট করতে হবে। আমরা দু-জন ডক্টরকে দিয়ে সেপারেট একজামিনেশান করাচ্ছি। আপনাদের কাল জানাতে পারব। তবে উণ্ড একটাই পাওয়া গেছে।

সুমায়া—আচ্ছা, একটা কথা, ফোরেনসিক এক্সপার্টরা ফিংগার প্রিন্ট কি পেয়েছে? আর, ঘটনাস্থল থেকে সন্দেহজনক কোনো জিনিস মিলেছে?

কবি অনীশ—(মাথুর বলার আগেই, হঠাৎ যেন ঘুম থেকে উঠে)—আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি, যে লোকটাকে নিষ্ঠুরভাবে পৃথিবীর আলো-হাওয়া থেকে হঠাৎ নির্বাসিত করে চিরতরে অন্ধকারের রাজত্বে পাঠিয়ে দেয়া হল, তার কথা কেউ ভাবছে না! শুনছি, মরেছে একটি ছেলে, কে সে? শুধুই লাশ-কাটা ঘরে একটা লাস? নাম-ধাম, জীবিকা কী ছিল তার, জানা গেছে?

সঞ্চালক—অবশ্যই, অবশ্যই, এসব জানার আছে। আইডেনটিফিকেশানের জন্য টিভিতে তার ছবিও দেখানো হচ্ছে। কিন্তু আমাদের মধ্যে আরাধনাদি এতক্ষণ কিছু বলেন নি। ওনারও নিশ্চয়ই অনেক প্রশ্ন আছে। আমরা শুনে নিই, তারপর মি. মাথুর উত্তর দেবেন। বলুন, আরাধনাদি!

আরাধনা—আমি, মানে, ঠিক বুঝতে পারছি না, আমাকে কেন এরকম আলোচনায় ডাকা হল। তবে এলাম যখন, আমার যা কাজ একটু করতেই হয়। রবীন্দ্রনাথ সব পরিস্থিতির জন্যই গান লিখে গেছেন। এরকম অবস্থার উপযোগী একটি গানের দু-কলি গাইছি:

‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব

ঘোর কুটিল পন্থ তার, লোভজটিল বন্ধ—’

সঞ্চালক—অপূর্ব! কবিগুরুর গানের মধ্য দিয়েই আরাধনাদি তাঁর স্পর্শকাতর মনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। আর, এর মধ্য দিয়েই আমরা কেসটার জটিলতার সন্ধান পাচ্ছি। এরপর অবশ্যই একটি ব্রেক নেওয়া উচিত! সবাই রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা করুন!

গোয়েন্দা অমিত নিয়োগী

টিভি বন্ধ করে সেলফোনটা রিসিভ করলেন বিখ্যাত প্রাইভেট গোয়েন্দা অমিত নিয়োগী।

হ্যাঁ, ফোনটা তাঁর অনুসন্ধান-সহকারী সুমনার, যার কাছে তিনি ‘করমচাঁদ’, আর সেই সূত্রে যাকে তিনি ‘কিটি’ সম্বোধন করেন।

‘হাই কিটি!’

‘স্যার, মুমতাজ-এর কেসটা দেখছেন? ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে না?... ইনভেস্টিগেশানে কি আপনার ডাক পড়েছে?’

‘না, এখনো তেমন কিছু হয় নি। টিভিতে দেখছি তোমার মতো। সান্ধ্য ‘‘আজকাল’’টা পড়লাম। কালকের পেপারগুলোয় আরো ডিটেলস জানা যাবে।’

—‘আপনার কি মনে হয় পুলিশ পারবে মিস্ট্রিটা সলভ করতে?’

—‘ওয়েল, কিটি, এ-ব্যাপারে আমাদের একটা ক্রনিক পেসিমিসম আছে। ব্যাবসার খাতিরেই আমরা চাইব ওদের ব্রেন একটু ভোঁতা থাকুক। নইলে আমাদের হেল্প চাইবে কেন?’

এ কথায় দুজনেই খানিক হেসে নিলেন। তারপর অমিত বললেন, ‘কতটা সফল হবে পুলিশ তা এই স্টেজে বলা সম্ভব নয়। এখনো ফুল p. m. আসেনি। মোটিভ-এর ব্যাপারে কোনো আলোকপাত হয়নি। মানে, স্ক্রিনে কোনো তির-চিহ্নই ফোটেনি। কোথায় মাউস ক্লিক করবে?’

সুমনা বলল, ‘তবু, স্যার, আপনার ইনটুইশান নিশ্চয়ই কিছু বলছে? কোনো একটা আইডিয়া...?’

—‘কাল বিকেল সাড়ে চারটের সময় ফ্রি আছ? ...চলে এস, কফি খেতে খেতে কথা হবে।’

সেলফোন রেখে অমিত সান্ধ্য আজকাল-এর রিপোর্টটা আর একবার খুঁটিয়ে পড়লেন—

শহরে চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ড: ‘মুমতাজ’-এর বাথরুমে যুবকের মৃতদেহ আবিষ্কার

১ ডিসেম্বর, কলকাতা: আজ ভোর ছ-টা পঁয়ত্রিশ নাগাদ ‘হোটেল মুমতাজ’-এর একটি সুইটে বাথরুমের মধ্যে ছুরিকাঘাতে নিহত এক যুবকের মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয়। এই বীভৎস ঘটনার ফলে সারা শহরে প্রচন্ড চাঞ্চল্য ও বিপুল ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশ সমগ্র অঞ্চলটি কর্ডন করে রেখেছে। বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

নিহত ব্যক্তির বয়স ২৪-২৫ অনুমান করা হচ্ছে। সুশ্রী এবং পরনের জামাপ্যান্ট দামি ও রুচিসম্পন্ন। মৃতের পকেটে কিছু টাকা পয়সা ছিল, একটি বলপেনও ছিল। কিন্তু সনাক্তকরণের কাজে লাগে এমন কোনো কার্ড বা সেলফোন পাওয়া যায় নি। পুলিশের ধারণা, সেলফোন এবং কিছু কাগজ আততায়ী/আততায়ীরা হস্তগত করেছে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে। উগ্রপন্থীদের এ হত্যার ব্যাপারে জড়িত থাকার সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ।

জমাদার মহিন্দার-ই রক্তাক্ত দেহটি প্রথম আবিষ্কার করে। পুলিশ তাকে জেরা করে বিশেষ কিছুই সূত্র পায় নি। হোটেলের বাকি লোকেদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অন্তরীণ রাখা হয়েছে। গত রাত্রে মি. মনোজ ভিণ্ডিওয়ালা নামক N. R. I. ব্যাবসায়ীর জমকপূর্ণ পার্টি ওই হোটেলে গভীর রাত অবধি চলেছিল, বলে খবরে প্রকাশ। তার সঙ্গে এই খুনের কোনো সংযোগ থাকার সম্ভাবনা আছে বলে পুলিশের অনুমান। ইতিমধ্যেই নাকি মনোজ পুলিশের জেরার সম্মুখীন হয়েছেন।

মৃতদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। কার লাশ, তা জানা না যাওয়া পর্যন্ত খুনের অভিসন্ধি বোঝাও সম্ভব হচ্ছে না এবং তদন্তও বেশিদূর অগ্রসর হতে পারবে না। এই কথাই আমাদের জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত সি.আই.ডি. ইন্সপেক্টর পি. কে. মাথুর।

পরদিন বিকেলে সুমনা আসতে প্রথমে তার সম্ভাব্য কেরিয়ার প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন তুললেন অমিত।

‘কম্পারেটিভ লিটারেচারে এম.এ. তো করে ফেললে, এবার কী করবে? চাকরি, না রিসার্চ?’

‘চাকরি, মানে টাকার গরজ তো বাস্তব। রিসার্চটা মনের চাহিদা। কী আর করব? হয় কাগজ, নয় টিভি। নিদেনপক্ষে সেক্টার ফাইভে একটা কনটেন্ট রাইটারের কাজ জোটাতে হবে। আর, জানেন তো, অন্য জায়গায় ‘বস’-রা আপনার মতো নয়। মেয়ে দেখলেই exploit করতে চায়। আবার তাঁরা খুশি না হলে একচুল ইনক্রিমেন্ট হবে না স্যালারির।’

—‘হোয়াট এ্যাবাউট টিচিং?’

—‘এখানকার কলেজে তো C.L. নেই, হয় পিয়োর বাংলা বা পিয়োর ইংলিশ লিটারেচার। আমরা যদিও ওয়ার্ল্ড-এর অন্য অনেক লিটারেচারের সঙ্গে এ দুটোও যথেষ্ট চর্চা করেছি, কিন্তু আমাদের কলেজ লেকচারার হিসেবে কোনো চান্স নেই। না ঘরকা, না ঘাটকা! আর J.U. তে itself পোস্টের সংখ্যা খুব লিমিটেড। পি.এইচ.ডি. করে চান্স পেতে পেতে, ইট মে বি টেন ইয়ার্স। আর সব সময় ডিপার্টমেন্টের সকলের সঙ্গে good touch-এ থাকতে হবে।’

অমিত মৃদু হেসে বললেন, ‘ভেরি গ্রিম সিচ্যুয়েশন!’

সুমনা হি হি হেসে বলল, ‘তার চেয়ে মার্ডারের আলোচনা অনেক চিয়ারফুল এ্যাণ্ড এক্সসাইটিং! বলুন, নতুন কিছু ভাবলেন এই কেসটার ব্যাপারে?’

অমিত বললেন, ‘আমার ভাবায় কী এসে যায়? কেসটা তো আমার নয়, যিনি তদন্ত করছেন, সেই মাথুর সাহেব কী ক্লু পেলেন তার ওপরই নির্ভর করছে খুনের কিনারা। তবে কমনসেন্স বলে, ভিণ্ডিওয়ালার পার্টি-র সঙ্গে মার্ডারটার একটা ঘনিষ্ঠ যোগ আছে। কাকতালীয় ভাবে ওই রাতে ঘটনাটা ঘটে নি।

সুমনা ঘন-ঘন চারবার মাথা নাড়ল— ‘আমার-ও কিন্তু মনে হচ্ছে, এটাই রাইট লাইন। হয়তো পুলিশ এতক্ষণে পার্টিতে আসা লোকদের জেরা করছে।’

অমিত—‘অবশ্যই করবে, ইনক্লুডিং দা হোস্ট হিমসেল্ফ। কারণ, এর মধ্যে দুটো ভাইটাল ইনফরমেশান পাওয়া গেছে। আজকের টিভি চ্যানেলে ‘‘ব্রেকিং নিউজ’’ দেখেছ, আশা করি?’

সুমনা—‘না, আজ দেখা হয় নি—’

অমিতের ডান দিকের ভ্রু ঈষৎ কোনাকুনি উঠে গেল। চোখে একটা ঝিলিক। বললেন, ‘শাশ্বত’র সঙ্গে এ্যাপো ছিল?’

সুমনা ঢুকঢুক করে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। ‘হর্টিকালচারে ফুল দেখতে গিয়েছিলাম।’

‘গুড! তাহলে শোনো। এক নম্বর হল, পোস্ট মর্টেম জানাচ্ছে খুন হয়েছে রাত একটা থেকে দুটোর মধ্যে। সম্ভবত তখনো পার্টি চলছিল। দুই, স্ট্যাব করার আগে ভিকটিমকে সম্ভবত ক্লোরোফর্ম soak করা রুমাল মুখে চেপে অজ্ঞান করা হয়েছিল। ফলে scuffle ও চেঁচামেচির শব্দ হতে পারে নি। তিন, পুলিশের সচিত্র ঘোষণায় সাড়া দিয়ে মর্গে গিয়ে নিহতের বডি আইডেনটিফাই করেছে তার ভাই। মৃতের নাম সুজিত ঘোষ। যাদবপুর থেকে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করে বেরিয়েছে বছর দুই আগে। টাটা-র এক ইউনিটে ফ্যাট স্যালারি পাচ্ছিল ইদানীং। সল্টলেকে বাড়ি।’

গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনে সুমনা বলল—‘এতটা ডিটেলস খবরে বলল?’

অমিত হাসলেন। ‘গুড অবজারভেশান, কিটি, ইউ হ্যাভ গেসড রাইট। মাথুর ফোন করেছিলেন।’

সুমনার মুখ আলোকিত হল খুশিতে। ‘তাহলে তো এনকোয়েরির অনেকগুলো দিক খুলে গেল।’

অমিত চিন্তিত মুখে বললেন—‘হ্যাঁ। কিন্তু সবথেকে ইম্পর্ট্যান্ট ক্লু যে সোর্স থেকে পাওয়ার কথা, সেটাই মিসিং!’

—‘কী সেটা?’

—‘সুজিতের সেলফোন। আজকাল তো লোকে ডায়রি-ফায়রি লেখে না। যা কিছু এ্যাপয়েন্টমেন্ট, ইন্টারএ্যাকশান উইথ আদারস এ থেকেই গ্যাদার করতে হয়। কনট্যাক্টস সবই মোবাইল রেকর্ড করে রাখে। ন্যাচারালি খুনি সেসব লোপাট করবে আইনের হাত থেকে নিজেকে এবং সন্দেহভাজনদের আড়াল করার জন্যে।’

—‘কিন্তু স্যার, সুজিতকে কে বা কারা খুন করতে পারে, আই মিন, তার কোনো শত্রু ছিল কি না, সে ব্যাপারে তার বাড়ির লোকজন, কলিগ, বন্ধু, এদের সঙ্গে তো কথা বলতে হয়!’

—‘অব কোর্স এবং সবচেয়ে আসল প্রশ্ন হল, কেন সে ওই পার্টিতে এ্যাট অল এসেছিল, ওয়াজ হি ইনভাইটেড আর নট? ...তুমি রাইট ট্র্যাকেই ভাবছ। আমিও সেই মতই সুজিতের ভাই-বোনের সঙ্গে একটা আলোচনার সময় ফিক্স করেছি। কাল রোববার বেলা তিনটের সময় আমরা সল্ট লেকের বি ডি ব্লকে যাচ্ছি।’

প্রবল উৎসাহে ঘাড় নেড়ে সুমনা উঠে পড়ল।

রবিবার সকালে অমিত সবে চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়েছেন, মোবাইলের রিং টোন বেজে উঠল: ‘হ্যায় তুঝে ভি ইজাজৎ, করলে তু ভি মহব্বৎ...’

—‘মর্নিং! মি. মাথুর! এনিথিং আর্জেন্ট?...আচ্ছা!...গুড!...হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমি আসছি লালবাজারে...সাড়ে আটটা হবে! থ্যাঙ্কস আ লট! বাই!’

মা বললেন, ‘অমনি সাত সকালে নাওয়া-খাওয়া ফেলে যত রাজ্যের খুনে-গুন্ডাদের পেছনে ছুটবি তো? আমার কপালে ভগবান শান্তি লেখে নি। রোববার, পুজো-পার্বণ, রাত-বিরেত, কিছুই কিছু না তোর কাছে। কোথায় ভাবলাম, আজ লাউ-চিংড়ি আর কমলালেবুর পায়েস করব—’

অমিত বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে বললেন—‘বেশ তো, করো না! এবেলা তুমি আর বাবা খাও। ওবেলা আমি পুষিয়ে দেব।’

মা তবু গজগজ করতে লাগলেন—‘তবে আর কি, উদ্ধার হলুম! এত করে বলছি, এবার একটা সুলক্ষণা বউ নিয়ে আয়...’

ইন্টারোগেশান রুমের বাইরে এক সিপাই দাঁড়িয়েছিল। অমিত নিয়োগীর ভিজিটিং কার্ডটা দেখে স্যালুট মেরে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল।

ওঁকে ঢুকতে দেখে মাথুর আহ্বান জানালেন, ‘আসুন অমিতবাবু।’

যে লোকটি ইন্সপেক্টরের উল্টো দিকে জোর আলোর নীচে বসে আছে, তাকেই হাতে-নাতে ধরা হয়েছে সল্টলেকে সুজিত ঘোষের বাড়িতে কাল রাতে বার্গলারির অভিযোগে। অমিতের পরামর্শমতো মাথুর প্লেন-ড্রেসড ওয়াচ রেখেছিলেন কাছাকাছি। পৌনে তিনটে নাগাদ তারা দু-জনকে বাড়ির পাঁচিল টপকে ঢুকতে দেখে। তারপর মিনিট পনেরো বাদেই পুলিশের একজন ফ্রন্ট ডোরের বেল বাজিয়ে বাড়ির লোককে জাগিয়ে তোলে। আর একজন পাঁচিলের সামনে পাহারায় দাঁড়ায়। হঠাৎ দুই চোরই পাঁচিল থেকে রাস্তায় লাফিয়ে পড়ে। একজন বিদ্যুৎবেগে ছুটে পালায়। আর, এই লোকটার পা মচকে যাওয়ায় ধরা পড়ে যায়।

বিবরণ দিয়ে মি. মাথুর বললেন, ‘পুরোনো পাপী। আগেও দু-চারটে খুচরো কেসে আমাদের গেস্ট হয়েছিল। নাম আকমল। ওরিজিন বাংলাদেশ। আমি যেটুকু জানলাম, ওর ফেরার সঙ্গীটি বেশ ডেঞ্জারাস চীজ—তিন-আঙুল ফকির! নাম শুনেছেন?’

অমিত বললেন, ‘বিলক্ষণ! ও আর বিল্টু তো একবার ইলেকশানের সময় এক ক্যাণ্ডিডেটকে কিডন্যাপ করেছিল! দশ বছর বয়সে বোমা বাঁধতে গিয়ে ডান হাতের তর্জনী আর মধ্যমা উড়ে গিয়ে তিন-আঙুল নামটা হয়েছিল...তা ওকে আর ধরা গেল না?’

মাথুর মুখে চুক-চুক শব্দ তুলে আপশোষ করে বললেন, ‘ব্যাটা খনিক দূরে রেসিং সাইকেল রেখেছিল। স্যাট করে হাওয়া হয়ে গেছে!...একে নিয়ে আমি আর দত্ত বিস্তর ঘসাঘসি করলাম। পেটি আদমি, ল্যাংবোট করে এনেছিল। দেখুন, আপনাকে কিছু বলে কি না...’

অমিত গিয়ে আকমলের মুখোমুখি বসলেন। প্রায় মিনিটখানেক ওকে ভালো করে নিরীক্ষণ করে বললেন, ‘দেখ, আকমল, আমি তোমাকে দুটো কথা জিগ্যেস করব, সত্যি বলবে তো?’

চোখ পিটকি মেরে আকমল বলল, ‘ছার, আমি ছত্তিই বলচি, আমারে পাঁচছ টাকা দেবে বলল বলি ফকিরদার সাথে আইসিলাম!’

অমিত ওর ‘স’-এর উচ্চারণ শুনে স্মিত হেসে বললেন—‘তুমি ধর্মপুত্তুর কি না, সে তোমার উত্তর শুনে আমি বুঝব। এবার বলো, তোমাকে কে ভাড়া করেছিল? ফকির? না, কোনো ভদ্দরলোক ছিল পেছনে?’

আকমল একটু ইতস্তত করতেই ধমকে উঠলেন মাথুর—‘খুলে বল—বাচ্চা!’

অমিত চোখের ইঙ্গিতে তাঁকে নিরস্ত করে আকমলকে বললেন—‘তোমার কোনো ভয় নেই। সত্যি কথা বলো। সেইটাই সবচেয়ে সোজা কাজ। না বললে তোমার নিজেরই দুর্ভোগ বাড়বে। কে তোমাদের অর্ডার দিয়েছে?’

আকমল এবার ঢোক গিলে বলে, ‘চিনি না। এক রোগা ঢ্যাঙা লোক, পয়ছাঅলা মনে হয়।’

অমিত—‘তুমি মনোজ ভিণ্ডিওয়ালাকে চেন?’

আকমল নির্দ্বিধায় ঘাড় দুদিকে নেড়ে দিল নেতিবাচক ভাবে।

—‘নাম শুনেছ?’

সেই একই প্রতিক্রিয়া।

—‘আচ্ছা, এবার বলো, তোমরা ওই বাড়িতে ঢুকেছিলে কাউকে মারতে, না, চুরি করতে?’

—‘আমি, ছার, মাডার, কিটন্যাপ কেছ থেকে হাজার গজ দূর দে যাই! ছুদু চুরি ছভাবটা...’

—‘ছাড়তে পার না। বেশ! কী চুরির প্ল্যান ছিল? টাকা, না দামি জিনিস?’

এই প্রশ্নটা বোধহয় আকমল একদমই ভাবতে পারেনি। তার মুখে একটি অদ্ভুত লজ্জা-লজ্জা ভাব ফুটল। শেষে কোনোরকমে বলল, ‘কইসিল ছোটোখাটো দামি জিনিচ ছরাতে!’

—‘যেমন?’

—‘ক্যামেরা, হাতঘড়ি...’

—‘মোবাইল, মানে, সেলফোন?’

আবার একটু চমকিত চাউনি দেখা গেল আকমলের চোখে।—‘হ্যাঁ, ওটাও নিতি কইসিল!’

অমিত শেষ প্রশ্ন করলেন—‘তোমার কাছে তো কিছু পাওয়া যায় নি। ফকির তিন আঙুলে কী হাতিয়েছিল বল তো?’

—‘ঘড়ি, ছেলফোন, ছব নিয়েছিল ও।’

সুকন্যা ও সুনির্মল

কথামতো ওইদিন বিকেলে সল্টলেকে সুজিতদের বাড়ি পৌঁছলেন অমিত সুমনাকে নিয়ে।

সুজিত ঘোষের ভাই সুনির্মল দরজা খুলে ওঁদের রিসিভ করল। সে Transuperb নামের একটা কোম্পানিতে মেডিকাল ট্রান্সক্রিপশানিস্ট। ড্রইং রুমে বোন সুকন্যাও বসেছিল ওঁদের প্রতীক্ষায়। দামি CBSE স্কুলে ফাইনাল ইয়ারের ছাত্রী।

সেই প্রথম অভিযোগের সুরে বলল, ‘দেখুন, ডিটেকটিভ, একে আমরা এক্সট্রিম শকড কণ্ডিশানে আছি, তার ওপর চোর এসে আমার মোবাইলটা নিয়ে পালাল! ইমপসিবল সিচ্যুয়েশন! আমার টিচার, ফ্রেণ্ডস কাউকে কনট্যাক্ট করতে পারছি না। তাছাড়া আমার ইম্পর্ট্যান্ট ডাটা, পারসোনাল ফটো, সব ছিল ওতে, সেগুলো যা-তা মিসইউসড হতে পারে...!’

অমিত কোমল গলায় বললেন, ‘ভেরি স্যাড! বাট ডোন্ট বি সো আপসেট! থানায় FIR আর মোবাইল কোম্পানিকে ইনফর্ম করা হয়েছে তো?’

সুনির্মল বলল, ‘হ্যাঁ। সে তো করতেই হয়।’

অমিত আশ্বাস দিলেন—‘আমার মনে হয়, সুকন্যা, সেকেণ্ড হ্যাণ্ড মোবাইল স্টোর থেকে পুলিশ তোমার সেটটা অবিলম্বেই উদ্ধার করতে পারবে। কারণ, তোমার ফোন চুরি করার জন্য ওরা আসে নি। এসেছিল তোমার দাদার সেলফোনের খোঁজে! সেটা কী বাড়িতে ছিল?’

সুনির্মল বলে, ‘সেটা তো ওই রাতে দাদার পকেটেই থাকার কথা। সেখান থেকেই হাতিয়েছে মার্ডারার।’

সুমনা এবার বলে, ‘তাহলে কি আর কাল এ বাড়িতে চোর হানা দিত?’

অমিত বললেন, ‘হুমম! রহস্য ডাজ নট মুভ ইন আ স্ট্রেট লাইন!’

সুনির্মল বলল, ‘কী জানি? ব্যাপার তো কিছু বুঝতে পারছি না। শুধু দেখছি, সবদিক থেকেই আমাদের ফ্যামিলিতে ঘোর দুঃসময় চলেছে। গত বছর কাশ্মীর বেড়াতে গিয়ে বাবা-মা দুজন একসঙ্গে এ্যাকসিডেন্ট-এ মারা যাওয়া থেকে শুরু হয়েছে!’

অমিত বললেন, ‘খুবই দুর্ভাগ্য। ইউ হ্যাভ ফেসড এভরিথিং ব্রেভলি! মানুষ তার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারে না। তবে আমি আশা করছি, সুজিতের সেলফোনে কিছু দামি খবর রেকর্ডেড আছে। সেটার গুরুত্ব বুঝে হয়তো সে মোবাইলটা নিজের সঙ্গে না রেখে কোনো নিরাপদ জায়গায় রেখে গিয়েছিল। ও কোন ঘরটায় থাকত, একটু দেখা যাবে?’

ও সিয়োর!—একসঙ্গে বলে উঠল সুনির্মল আর সুকন্যা।

সুজিতের ঘরে একটা কম্পিউটার দেখে অমিতের মনে হল, সেলফোন না পেলে ওইটার ডকুমেন্ট খোঁজা যেতে পারে। কিন্তু জানা গেল ওটা সুনির্মলেরই P.C., আর কেউ ব্যবহার করে না। অগত্যা তখনকার মতো টেবিলের ড্রয়ার, ওয়ার্ডরোব, আর ওয়াল ক্যাবিনেট পরীক্ষায় মন দিলেন।

দেয়ালে ফিট করা বুক র‌্যাকে একটি বেস্ট-সেলার বইয়ের পাতা ওল্টাতে গিয়ে সুমনারই নজরে পড়ল, একটি মেয়ের ফটো রয়েছে। পাঞ্জাবি-চুড়িদার পরা, চুড়ো করে বাঁধা চুল, বেশ আকর্ষণীয় কাটা-কাটা চোখ-মুখ, ছিপছিপে ফিগার। ফটোর পিছনে বলপেন দিয়ে লেখা: To my love—Siluka।

অমিতের হাতে দিতে, তিনি এক নজর দেখে সুনির্মল ও সুকন্যাকে দিলেন। তারপর শুধোলেন—অবভিয়াসলি সুজিতের গার্লফ্রেণ্ড। একে তোমরা চেন? ওরা কি এনগেজড ছিল?

ভাই-বোন একটু চোখ চাওয়া-চাওয়ি করল। সুনির্মল বলল, ‘দাদা একদিন বাড়িতে এনেছিল আলাপ করাতে। ভদ্রমহিলা কমার্স গ্র্যাজুয়েট। বিজ্ঞাপনে মডেলিং করেন।’

সুকন্যা বলল, ‘আর এক দিন আমি দাদা আর সিলুকার সঙ্গে INOX-এ একটা ফিলম দেখেছি। আই থিঙ্ক সী ইজ সুইট বাই নেচার।’

অমিত—ওর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউণ্ড?

সুনির্মল—ওদের গোল্ড জুয়েলারির ফ্যামিলি বিজনেস। আহুজা গোল্ড মার্চেন্টস-এর নাম শুনেছেন বোধহয়।

অমিত খোঁজ নিলেন ওরা সিলুকার কনট্যাক্ট নাম্বার জানে কি না। ওরা নেতিবাচক ঘাড় নাড়ল।

ড্রইংরুমে ফিরে আবার ওদের উদ্দেশে বললেন—‘পুলিশ তো মেইনলি ভিণ্ডিওয়ালাকে সাসপেক্ট করছে। কারণ, তার পার্টিতে ইনভাইটেড হয়ে গিয়েছিল সুজিত। ওদের দুজনের মধ্যে কী একটা বিজনেস টার্মস ছিল। তোমরা কি এই রিলেশানশিপ-এর ব্যাপারে দাদার মুখ থেকে কোনো ডিটেলস শুনেছ? তোমাদেরও কি মনে হচ্চে, মনোজ ভিণ্ডিওয়ালা ওকে মার্ডার করিয়েছে?’

সুকন্যা বলল, ‘নাথিং ইমপসিবল! কেউ তো একটা ভিলেনি করেছে...’

—আর কাউকে সন্দেহ হয় তোমাদের?

সুকন্যাই আবার উত্তর দিল, ‘না, ডেফিনিট কিছুই বলার মতো নেই। তবে ভিণ্ডিওয়ালা নাও হতে পারে...’

অমিত একটু খর চোখে তাকালেন ওর দিকে। কিছু পড়ার চেষ্টা করলেন ওর চোখ-মুখে। একটু যেন দ্বিধার ছাপ দেখলেন। বললেন, ‘ভালো করে ভেবে দেখো, তারপর আমাকে জানিও। অনেক সময় অনেক কিছু মনে হয় নিতান্ত তুচ্ছ। ইররেলিভ্যান্ট। কিন্তু তার সঙ্গে সাংঘাতিক কনসিকোয়েন্সের লিঙ্ক থাকে। আমার কার্ডটা রাখো, তেমন কিছু মনে পড়লে জাস্ট টেল মি!’

সেদিন রাত সাড়ে দশটা। অমিত দু-গ্রাস মুখে দিয়ে তারিয়ে তারিয়ে লাউচিংড়ির স্বাদ নিচ্ছিলেন। ওঁর মা পায়েসের বাটিটা এনে টেবিলে সবে রাখলেন। সেলফোন ঝংকৃত হয়ে উঠল ‘লাইফ ইন মেট্রো’-এর সুরে।

মা বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন—শান্তিতে খেতেও দেবে না তোকে!

অমিত ‘এ্যাকসেপ্ট’ বোতাম টিপে সেল কানে ধরলেন। হ্যালো।

‘স্যার, আমি সুনির্মল বলছি। একটা কথা তখন বলতে ভুলে গেছি।...’

—হ্যাঁ। বলো।

—দাদা, হাতে একটা দামি আংটি পরত ইদানীং। সম্ভবত স্যাফায়ার। সেটা কিন্তু ডেডবডির আঙুলে পাওয়া যায় নি!

—তাই নাকি! স্যাফায়ার, মানে, নীলা? কতদিন ব্যবহার করেছে?

—ঘটনার পাঁচ-ছ দিন আগে প্রথম পরেছিল। বোধহয় ওই ভদ্রমহিলাই প্রেজেন্ট করেছিলেন।

—পুলিশ কি আংটির কথা কিছু বলে নি?

—না, ওরা দাদার আর সব জিনিস আমাদের দেখিয়েছিল। তখন আংটিটার কথা আমাদেরও মনে ছিল না...স্যার, সুকন্যা আর একটা কথা আপনাকে বলতে চায়।

এদিকে অমিতের মা চাপা গলায় ছেলেকে বললেন—খাওয়াটা শেষ করে যত খুশি কথা বল না!

সুকন্যা অমিতকে জানাল যে, সেদিন Inox-এ ফিল্ম দেখে যখন ওরা বেরোচ্ছিল, একটা অপ্রিয় ঘটনা ঘটেছিল। এক দাড়িঅলা যুবক ওর দাদাকে কীসব আজেবাজে কথা বলে অপমান করে। সিলুকার কাছ থেকেই ও জেনেছে যে লোকটা নাকি ডাক্তার দীপক সেন। ‘ওরিয়ন’ নার্সিং হোমে সিলুকার একটা টিউমার অপারেশন করেছিল এবং তারপর থেকে পেশেন্ট-এর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিল। সুজিত তার আচরণে তেতে গিয়ে সেদিন লোকটার গালে এক থাপ্পড়ও কষিয়েছিল।

‘সেল’ বন্ধ করে অমিত ভাবতে লাগলেন, লাভ ট্র্যাঙ্গেল মোটিভটা হঠাৎ বেশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে!... তার ওপর নীলাঙ্গুরীয়... নীলা সত্যিই সকলের সয় না!

মাথুরের ধারণা

মি. মাথুর স্বভাবতই খুব চিন্তিত। এখনকার দৈনন্দিন জীবন বড্ড বেশি সেলফোন-নির্ভর হয়ে পড়েছে। অনেক সময় সেলফোনই অবশ্য ক্রিমিনাল ধরতে সাহায্য করছে। সুজিতের মোবাইলটা তাই খুনি সরিয়ে ফেলেছে, হয়তো বা একেবারে ডেস্ট্রয় করে দিয়েছে। যত ভাবছেন, ততই তাঁর এই ধারণা পোক্ত হচ্ছে। তবে একটা সুখবর, ‘তিন-আঙুল’ ধরা পড়েছে এবং তার কাছ থেকে সুকন্যার মোবাইলটা রিকভার করা গেছে। সে কবুলও করেছে, ভিণ্ডিওয়ালাকে সে চেনে। কিন্তু বলছে কখনো তার কাছ থেকে সে ‘সুপারি’ নেয় নি! দেখা যাক, থার্ড ডিগ্রি চালিয়ে...

ভিণ্ডিওয়ালাকে পুলিশ দেশ ছেড়ে যেতে বারণ করেছে। কড়া নজর রাখা হচ্ছে তার গতিবিধির ওপর। কিন্তু তার মতো টাইকুনকে গ্রেফতার করার মতো কোনো জোরদার এভিডেন্স পাওয়া যাচ্ছে না, এটাই মাথুরের আপশোস। মোটিভেশানটা বেশ আলগা। জেরার সময় মনোজ খুব সহজভাবেই স্বীকার করেন, তিনি সুজিত ঘোষের কাছ থেকে টেকনোলজিকাল সাহায্য নিয়েছিলেন বিজনেস শুরু করার সময় এবং তাকে কোয়ার্টারলি বেশ কয়েক হাজার টাকা দিচ্ছিলেন। সম্প্রতি সুজিত টাকার অঙ্কটা ডবল করতে বলে। মনোজ তাতে রাজি হন নি। পার্টির রাতে এ নিয়ে দুজনের বচসা এক সময় বেশ চড়া গলায় উঠেছিল। দু-একজন প্রত্যক্ষ শ্রোতাও পেয়ে যাবে পুলিশ, যদি ভিণ্ডিওয়ালার বিরুদ্ধে কেস সাজানো হয়।

এইসব কথা মাথুর জানালেন অমিত নিয়োগীকে।

‘উই ক্যান গিভ হিম আ টাফ টাইম! চাপে পড়ে কনফেস করতেও পারে!’—বলে মাথুর উৎসাহিত মুখে অমিতের দিকে চাইলেন সমর্থনের আশায়।

কিন্তু সে আশায় ভিজে বালি ঢেলে দিলেন অমিত।

বললেন, ‘কেসটা দাঁড়াবে বলে মোটেই মনে হচ্ছে না। গলা চড়িয়ে প্রকাশ্যে ঝগড়া করার পর সে রাতেই সুজিতকে সেই হোটেলেই খুন করবে বা করাবে, এত বোকা মনোজ ভিণ্ডিওয়ালাকে ভাবা যাচ্ছে না। কিন্তু দা ইনসিডেন্ট মে বি সিগনিফিক্যান্ট!...’

বেশ চিন্তিত দেখাল অমিতকে।

মাথুর বললেন, ‘আপনি কি অন্য কোনো সাসপেক্ট খুঁজে পাচ্ছেন? ডু ইউ সী এনি ক্রুকেড শ্যাডো?’

অমিত হঠাৎ পকেট থেকে দুটো আমেরিকান কিটক্যাট চকোলেট বার করে একটা মাথুরকে অফার করলেন—হ্যাভ আ ব্রেক। তারপর নতুন করে ভাববেন। একটা আইডিয়া আসছে, মনে হচ্ছে!...

সরাসরি সিলুকা

পরের রবিবার ঘটনা অনেকটা এগোল। সুমনা অমিতের কাছ থেকে একটি জরুরি এস.এম.এস. পেল। কারণ তার সেলটা সেসময় বন্ধ ছিল। তাতে লেখা Com2 Delight Lunch@12Mt Ms Siluka।

অবশ্যই তার আগে অমিত সিলুকার ফোন পেয়েছিলেন। স্ক্রিনে নতুন নাম্বার দেখে একটু উদাসীন ভাবেই ধরেছিলেন। কথোপকথন এইরকম হল:

‘ডিটেকটিভ অমিত নিয়োগী বলছেন?’

‘হ্যাঁ। আপনি কে, জানতে পারি?’

‘আপনি ঠিক চিনবেন না আমাকে। কিন্তু আপনি সুজিত ঘোষ মার্ডার কেসে পুলিশের সঙ্গে কো-অপারেট করছেন শুনলাম। আপনাকে আমি কিছু জানাতে চাই, যেটা ঠিক পুলিশকে ডিরেক্টলি বলতে চাই না। আমি সুজিতের...’

অমিত নারীকন্ঠকে ইতস্তত করতে শুনে বলে উঠলেন—‘আপনি ওর ফিঁয়াসি মিস সিলুকা আহুজা, ইফ আয়্যাম নট মিসটেকন!’

—ঠিক বলেছেন! এইজন্যেই পুলিশের চেয়ে আমার প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটারের ওপর বেশি ভরসা। আমি চাই খুনি ধরা পড়ুক। তার প্রপার পানিশমেন্ট হোক।

—গুড! কী বলতে চান আপনি আমাকে?

—ওভার দা ফোন এসব কথা না বলাই ভালো। আপনার যদি অসুবিধে না থাকে, আপনি প্লিজ 12 noon ডিলাইট রেস্তোরাঁয় লাঞ্চ করবেন আমার সাথে?

অমিত প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। সেইসঙ্গে জানিয়েও দিলেন, তিনি তাঁর সহকারিণী সুমনাকে নিয়ে যাবেন। যেন তিন জনের টেবিল বুক করা হয়।

সিলুকাকে খুব সুন্দরী হয়তো বলা যায় না, কিন্তু নি:সন্দেহে আকর্ষণীয়া, স্মার্ট। অমিতের মনে হল হাইট পাঁচ-দশ। চমৎকার ফিগার। মুখের সঙ্গে মানানসই চুলের শোভা। নাকটা একটু চাপা, কমপ্লেকশান শ্যামলা। কিন্তু লাবণ্য নামক যে এক্স ফ্যাক্টরটা পুরুষের মন টানে, অনেক রমণীরও, তার কোনো অভাব নেই।

বারোটা দশ-এ ডিলাইটে নির্দিষ্ট টেবিলের কাছে গিয়ে পৌঁছোলেন অমিত, সুমনাকে নিয়ে। পরিচয় দেবার আগেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সৌজন্য দেখাল সিলুকা।

‘গুড আফটারনুন, অমিতবাবু! ইনি—?’

—‘আমার ওয়ারদি এ্যাসিস্ট্যান্ট, সুমনা। করমচাঁদের যেমন কিটি। এর সামনে সব কিছু খুলে বলতে পারেন।’

—হাই সুমনা!

—হাই সিলুকা!

ইতালিয়ান আর থাই ডিশের জন্য জনপ্রিয় ‘ডিলাইট’। মেনু কনসাল্ট করে দুটোরই একটি করে পদ অর্ডার দিল সিলুকা। অমিত এবার তাকে বললেন, ‘তাহলে শুরু করুন আপনার কথা!’

—‘হ্যাঁ। আমি আবার খুব সিসটেমেটিকালি কথা বলি না। আপনি দরকার মতো সিকোয়েন্স সাজিয়ে নেবেন। কিছু মনে হলে কোয়েশ্চেন করবেন।...সুজিতের সাথে আমার আলাপ হয় ঠিক দু-বছর আগে। তখন আমি কলেজের ফাইনাল ইয়ারে। আপনারা বোধহয় জানেন না, সুজিত খুব ভালো গাইত। না, প্রফেশনাল নয়, রেকর্ডও করেনি কিছু। কিন্তু ভীষণ রোমান্টিক গলা। শখ করে দু-একটা ফাংশানে হিন্দি ফিল্মসংস গাইত। আমাদের কলেজ ফেস্টে ওকে কে যেন এনেছিল। সেই গান শুনে আমার এ্যাপ্রিশিয়েশান জানিয়েছিলাম। পরে জানলাম, ওর আসল ট্যালেন্ট। ‘টক টু গড ডাইরেক্ট’ প্রজেক্টে ওর কনট্রিবিউশান।...’

কাহিনিতে একটু ছেদ পড়ল। সবাই একটু এ্যাপেটাইজার সুপ-এ গলা ভিজিয়ে নিলেন। সেই ফাঁকে সুমনা একটি কমপ্লিমেন্ট দিল সিলুকাকে—‘তোমার ফটোটা আমিই সুজিতবাবুর একটা বইয়ের মধ্যে ডিসকভার করলাম। বাট ইউ লুক মোর গরজাস ফেস টু ফেস!’

একটু খুশির হাসি দেখা গেল সিলুকার মুখে। পরমুহূর্তেই সেটা মিলিয়ে গেল। সে আবার বলতে লাগল—

‘কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের সম্পর্কটা বেশ ইন্টিমেন্ট হয়ে গেছিল। সর্ট অব মেড-ফর-ইচ-আদার ফিলিং আমাদের মধ্যে গ্রো করছিল। কিন্তু এই love থেকে ম্যারেজ পর্যন্ত পৌঁছনো সহজ হবে না, বুঝছিলাম। ...হ্যাঁ, প্রবলেমটা, মানে, ওয়ান অব দা প্রবলেমস বলতে পারি...ইতিমধ্যে আর একজন আমাকে বলল, আমাকে ছাড়া নাকি সে বাঁচবে না! জাস্ট এ্যাজ উই সী ইন ফিল্মস। আমি এ্যাভয়েড করতে চাইলেও রোজই ফোন করে বিরক্ত করত। মাঝে মাঝে আমাকে রাস্তায় ফলো করে খানিকক্ষণ কথা বলতে বাধ্য করত। ফিল্ম-থিয়েটারের টিকিট কেটে এনে সঙ্গে যাবার জন্য জবরদস্তি করত। আবার আমার মডেলিং-এর ব্যাপারে খুব উৎসাহ দেখাত...’

অমিত বললেন, ‘আপনি বোধহয় ড. দীপক সেনের কথা বলছেন?’

একটু অবাক হয়ে তাকাল সিলুকা—‘কী করে বুঝলেন? আপনাদের সত্যি দারুণ ক্ষমতা!’

অমিত বিনীতভাবে জানালেন—‘মোটেই না। তাহলে তো এতক্ষণ কেসটা সলভ করে সুজিত বাবুর মার্ডারারকে হাতকড়া পরাতাম। এ ইনফরমেশানটা আমি সুকন্যার কাছ থেকে পেয়েছি।’

সিলুকা মাথা নেড়ে বলল, ‘ও হ্যাঁ, ওর সামনেই তো একদিন সুজিতের সঙ্গে ডাক্তারের হাতাহাতি হল! ...দ্যাট ওয়াজ ডিসগাস্টিং!’

সুমনা এবার বলল, ‘সিলুকা, তোমার কি মনে হয় প্রেমে রাইভালরি-র জন্যে এই ডা. দীপক সেন মার্ডারটা করতে পারেন?’

সিলুকা বলল, ‘আমার ইন্সটিঙ্কট তা বলছে না। কিন্তু সাসপেক্ট হিসেবে ওঁকে বাদ দেওয়াও যায় না।’

অমিত ওকে সমর্থন করে বললেন, ‘রাইট। প্রথমে সবাইকে সন্দেহ করে ক্রাইম ডিটেকশান প্রশেস স্টার্ট করে, তারপর থরো ইনভেস্টিগেশান করতে করতে এক-একজন করে সে লিস্ট থেকে বাদ যায়। বিশেষত প্রেমঘটিত মোটিভটা মোটেই অবহেলা করা যায় না মার্ডারের ব্যাপারে! ...তা, এখন ডাক্তারবাবুর রিএ্যাকশান কী? আপনার সঙ্গে আর যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন?’

—‘না, আমার মনে হয় দীপক এই সিচ্যুয়েশানে নার্ভাস হয়ে পড়েছে। অবশ্য যদি সত্যিই এতে তার কোনো হাত না থেকে থাকে!...’

চিন্তিতভাবে অমিত বললেন, ‘হুঁ। ব্রেনকে চাঙ্গা করতে একটু খেয়ে নেওয়া যাক ভালো জিনিস!’

কিছুক্ষণ নি:শব্দে চর্বণ চলল তিনজনের। ডানদিকের কোণের টেবিলে নীল জ্যাকেট-পরা লোকটা মাঝে মাঝে কীরকম ভাবে যেন চাইছে ওঁদের টেবিলের দিকে, মনে হল অমিতের। অমন তো সব সময়ই মনে হয়। তাছাড়া সিলুকার আকর্ষণীয় চেহারাটা তাকাবার পক্ষে যথেষ্ট কারণ।

সুমনাই আবার কথার খেই ফিরিয়ে ধরল—

‘তোমাদের বিয়ের পথে এই দীপক সেন ছাড়া আর কোনো অন্তরায় ছিল না?’

আহুজাদের গয়নার দোকানে দূর্বৃত্তদের হানা...

সিলুকা চমকে মুখ তুলল প্লেট থেকে। হেসে বলল, ‘আই এ্যাম গ্ল্যাড আমার সিলেকশান ঠিক হয়েছে। অমিতবাবু, আপনার ‘কিটি’ সত্যিই ইনটালিজেন্ট। আর, আপনাদের কিন্তু এই মুহূর্তে আমি এনগেজ করলাম প্রোফেশনাল ক্লায়েন্ট হিসেবে। খুনিকে ধরিয়ে দিলে আমার সাধ্যমতো পারিশ্রমিক আমি দেব!’

অমিত বললেন, ‘বেশ, সে নয় দেবেন। এখন ওই প্রেম-কণ্টকের সেকেণ্ড পার্টটা শোনান।’

সিলুকা এক ঢোক জল খেয়ে বলতে লাগল—

‘ভাই-বোনেদের মধ্যে আমিই ছোটো। একে মেয়ে, তাও লাস্ট চাইল্ড। আর, আমার জন্মের পরই মা মারা যায়। পাপা, ন্যাচারালি, আমাকে কোনোদিন বকেনি। বরং আদর দিয়ে মাথা খাওয়া বলে না? তাই করেছে। অন্তত প্রীতম ভাইয়ার মতে।’

সুমনা বলল, ‘তিনি কী তোমার ছোটো দাদা, না বড়ো?’

সিলুকা বলল, ‘তোমরা যাকে ছোড়দা বল, তাই।’

অমিত টুক করে ছুড়ে দিলেন—‘আর বড়দা?’

—‘বড়া ভাইয়া হেমন্ত-এর সাথে আমার এজ ডিফারেন্স প্রায় দশ বছর। ছোটা কা সাথ ওনলি থ্রি। হেমন্ত দাদা খেয়ালই রাখে না আমি কী করি। কিন্তু স্কুলের গন্ডি পেরতেই প্রীতম আমার ওপর কড়া নজর রাখতে শুরু করল। যেন ওই আমার গার্জিয়ান। সময়মতো বাড়ি না-ফিরলে সওয়াল করে অস্থির করত। আমার মডেলিং-এর এগেনস্টে ওর স্ট্রং অবজেকশান ছিল। কিছু করতে পারে নি, কারণ পাপা সব সময় আমাকে সাপোর্ট দিয়েছে। তো একদিন সুজিতের সঙ্গে আমাকে একটা সিনেমা হলে দেখে ফেলে প্রীতম ভাইয়া। তারপর বাড়ি ফিরতে খুব চেঁচামেচি। আমাকে ওয়ার্নিং দিয়ে বলল, ওই লোফারটার সঙ্গে আর যদি মাখামাখি করি, ফল খুব খারাপ হবে; বলল, হি উইল গো টু দি এক্সট্রিম! পাপার সঙ্গে ঝগড়া করল ও আমাকে মাথায় তোলার জন্য। ফোরকাস্ট করল, আমার জন্য ফ্যামিলিতে ব্ল্যাক স্পট পড়বে।...’

আবার কাহিনিতে ছেদ দিয়ে ওরা খাবারটা শেষ করল। কফির অর্ডার দেওয়া হল। অমিত বললেন—তারপর?

‘বাপ-বেটার আমাকে ঘিরে বচসা চরমে উঠেছিল সুজিত মার্ডারড হবার ঠিক পনেরো দিন আগে। এ আর এক এপিসোড। আমাদের দুটো বড়ো জুয়েলারি শো-রুম আছে—আহুজা গোল্ড মার্চেন্টস, জানেন বোধ হয়। হাতিবাগানের কাছে যে শো-রুম, সেখানে নিয়ে গিয়ে পাপা আমাকে জন্মদিনের গিফট পছন্দ করতে বলল। আমি এক পেয়ার হালকা ডায়ামণ্ড রিং নিলাম নিজের জন্যে। কিন্তু নজর পড়ল একটা জেন্টস আংটির ওপর। ফ্যাসিনেটিং ব্লুইশ গ্লো বেরোচ্ছিল সোনার ওপর সেট করা স্টোন থেকে। পাপা বলল, ওটা রেয়ার স্যাফায়ার, ইজিপ্সিয়ান অরিজিন। রিসেন্টলি এক ফরেনার বিক্রি করে গেছে মাত্র ফিফটি থাউজাণ্ড ইণ্ডিয়ান কারেন্সিতে! আমি পাপার কাছে আব্দার করে ওটা নিলাম সুজিতের জন্যে...’

হঠাৎ কান্নায় গলাটা ধরে নিল সিলুকার—‘মাই গড! তখন কী জানতাম ওটা কার্সড!’

সুমনা ওর কাঁধে সান্ত্বনার হাত রাখল। কয়েক সেকেণ্ডে নিজেকে সামলে নিয়ে সিলুকা ফের কাহিনি এগিয়ে নিয়ে চলল।

‘আমার বেডরুমে একটা লকড ড্রয়ারে আংটিটা রাখলাম। কারণ, পাপা বলেছিল, নীলা সবাই স্ট্যাণ্ড করতে পারে না। কারো খুব লাক ফেভার করে, কেউ আবার ডুমড হয়ে যায়। নিজের পার্সে ক্যারি করাও ডেঞ্জারাস হতে পারে।

ওকে হঠাৎ থেমে যেতে দেখে, অমিত বললেন, ‘ভেরি ইন্টারেস্টিং! নেক্সটা কী হল?’

‘পরদিন রাতে। দোকান বন্ধ হবার ঠিক আগেই কাস্টমার সেজে ঢুকে দুজন লোক আর্মস দেখিয়ে hold up করে রাখল কর্মচারীদের। ইনক্লুডিং ম্যানেজার কাকা। বেশি কিছু নেয় নি, কিন্তু শো-কেস ভেঙে গয়না ছড়িয়ে চলে গেল! প্রবাবলি নীলার আংটিটাই খুঁজছিল। পাপা সেদিন দোকানে যায় নি। খবর পেয়ে থানায় FIR করল। ...এরপর প্রীতম ভাইয়া আমাকে ডিরেক্ট চার্জ করল, আমি কেন নীলার আংটিটা নিয়েছি আমার বয়ফ্রেণ্ডের জন্য? বলল, ‘ওসব মতলব ছাড়। আমাকে ওয়াপস কর। আমি ওটার জন্য টু ক্রোরস অফার পেয়েছি!’ আমি বললাম, পাপা আমাকে দিয়েছে। যদি পাপা বলে তবেই আমি ওয়াপস করব। মুখ লাল করে প্রীতম ভাইয়া তখনি পাপার ঘরের দিকে ছুটল। তারপর বহুক্ষণ দুজনে তুমুল তর্কাতর্কি। ভাইয়াকে এও বলতে শুনলাম—‘জয়েন্ট বিজনেস মে মেরা ক্যা কাম? সব সেপারেট হয়ে যাক!’

পরদিনই আমি সুজিতকে নীলার আংটিটা দিলাম। দেখেই ওর মুখ-চোখের যা এক্সপ্রেশান হয়েছিল, কোনোদিন ভুলতে পারব না! ও নিতে চাইছিল না, আমি জোর করে ওর আঙুলে পরিয়ে দিলাম এ্যাণ্ড ইট ফিটেড পারফেক্টলি! ...তখন কী জানতাম আমার জন্য ওর এমন ট্র্যাজিক এণ্ড হবে! ...দু-দিন বাদে সুজিত আমাকে জানাল, ও একটা নাইটমেয়ার দেখেছে। এক খতারনাক চেহারার লোক ওকে ছোরা নিয়ে চেজ করছে একটা ব্লাইণ্ড লেনে, আর, ও কিছুতেই কোনো পালাবার রাস্তা পাচ্ছে না! ...মার্ডার্ড হবার আধঘণ্টা আগে লাস্ট ওর সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। খুব প্যানিকি লাগছিল ওর গলাটা। বলল, ঠিক স্বপ্নে দেখা চেহারার মতো একটা ভয়ঙ্কর লোককে ও সত্যিই দেখেছে হোটেল মুমতাজ-এ। এও বলল যে, নীলার আংটিটা তার প্রচন্ড অশুভ বলে মনে হচ্ছে। পরদিনই সে আমাকে ওটা দিয়ে দেবে। ...কিন্তু সে সুযোগ আর পেল না।’

অমিত ওকে থামিয়ে দিয়ে বললেন—আপনাদের সোনার দোকানে ওই আংটিটার খোঁজে দুই ক্রিমিনাল হানা দিয়েছিল, বল্লেন। আপনি কী জানেন, দোকানের মধ্যে ‘থার্ড আই’, মানে, লুকোনো ক্যামেরা, বা অন্তত ক্লোজড সারকিট টিভি, আছে কি না, এবং সেটা তখন এ্যাকটিভ ছিল কি না?

সিলুকা বলল, ‘সিসি টিভি আছে, জানি। কোনো কনসিলড ক্যামেরার কথা আমি বলতে পারব না। পাপার সঙ্গে আপনার এ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দেব। যা জিগ্যেস করার আছে, করে নেবেন।’

রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়েই অমিত নিয়োগী একটা কল করলেন মাথুরকে। নীলার আংটির সূত্রটা দিয়ে দিলেন। কলটা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে একটি অজানা বি.এস.এন.এল. নাম্বার থেকে ফোন পেলেন। Caller এক পুরুষ-কন্ঠ। গোয়েন্দাকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলল, ‘সিলুকা আহুজার ব্যাপারে মাথা ঘামালে ঘিলু মাথা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় ছিটকে যাবে!’

অমিতের মুখটা শক্ত হয়ে যেতে দেখে সুমনা শুধোল, ‘থ্রেট-কল, স্যার?’

অমিত ওর দিকে ফিরে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন। তারপর বললেন, ‘হুমম! আমার চিন্তার ডিরেকশানটা ঠিকই আছে তাহলে। তোমার এখন ছুটি। আমি মাথুরকে এক ঘণ্টা পরে আসতে বলেছি আহুজাদের হাতিবাগান শো-রুমে। ...পরে খবর পাবে!’

বিজয় ও হেমন্ত

এ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুসারে মাথুর আর অমিত শোরুমে সিনিয়র পার্টনার বিজয় আহুজার মুখোমুখি হলেন। সেখানে আর একজন সৌম্যকায় ভদ্রলোককে দেখলেন তাঁর পাশে।

অমিত নিজের এবং মাথুরের পরিচয় দিতেই বিজয় আহুজা সাগ্রহে করমর্দন করে বললেন, ‘ইনি আমার বড়ো ছেলে হেমন্ত।’ হেমন্ত হাত তুলে নমস্কার করলেন।

তারপর বিজয় জানালেন, ‘হ্যাঁ, তাদের ক্লোজড সারকিট টিভিতে সেদিন রাতে যারা হামলা করেছিল, তাদের ছবি আছে। থানার ইন্সপেক্টরকে সে ছবির copyও দেওয়া হয়েছে। এখনও কোনো কিনারা করতে পারে নি।

মাথুর বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি ওই অফিসারের সঙ্গে কথা বলে দেখব ঠিকমতো ইনভেস্টিগেশান হচ্ছে কি না!’

অমিত বললেন, আপনার মেয়ে সিলুকার কাছে জানলাম, একজন বিদেশি আপনাকে একটি দামি নীলার আংটি বেচেছিল ফিফটি থাউজাণ্ড-এ। সেই লোকটির ছবিও তো CCTV-তে থাকার কথা?

বিজয় বললেন—নিশ্চয়ই আছে। আমার মনে আছে সেদিন ছিল 17th November। চলুন আপনাদের দেখাই।

সেদিনের রিল দেখতে দেখতে এক জায়গায় স্টপ করলেন মি. আহুজা। ‘এই সেই ফরেনার। হাতে দেখুন সেই আংটি।’

ক্লোজ আপ করে দেখা গেল দাড়ি-গোঁফ সমন্বিত এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম ভদ্রলোক।

অমিত বললেন—জেনুইন সেলার বলেই মনে হচ্ছে। বোধ হয় ইমারজেন্সি ক্যাশের প্রয়োজন হয়েছিল। নাম কিছু বলেছিলেন?

—আলম মহম্মদ। ঠিকানা দিয়েছিলেন পার্ক হোটেল।

অমিত, মাথুরকে বললেন—‘নিশ্চয়ই এতদিন সেখানে নেই। তবু একটা খোঁজ নেবেন। 17th November এই নামে কোনো বোর্ডার ওখানে ছিলেন কিনা।’

বিজয় আহুজার দিকে ফিরে বললেন—‘এবার সেদিন রাতে যারা raid করেছিল, তাদের ছবি দেখান দিকি!’

এল অমিতদের সামনে সেই ফুটেজ। দুজন কালপ্রিটের মধ্যে একজনের হাতে রিভলভার, তার বেশ পলিশড চেহারা। আর একজন ঝকঝকে ছোরা বাগিয়ে ধরেছে বাঁ হাতে। প্রায় সাড়ে ছ-ফুট লম্বা, ভয়ংকর দর্শন।

তার দিকে আঙুল তুলে অমিত বললেন, ‘মি. মাথুর, আই বিলিভ হি ইজ ইওর ম্যান! এ-ই সুজিত ঘোষকে স্ট্যাব করে মার্ডার করেছে, তার নীলার আংটি ও সেলফোন হাতিয়ে উধাও হয়েছে! আপনাদের পোর্স্ট মর্টেম রিপোর্টে কী কাজটা লেফট হ্যাণ্ডারের, এমন কিছু আভাস দিয়েছেন ডাক্তাররা?’

মাথুর উত্তেজিত ভাবে বললেন, ‘একজ্যাক্টলি! দুটি রিপোর্টের একটিতে এই ধারণা recorded হয়েছে। আমি এখুনি লোকটার ফটো দিয়ে রেড এ্যালার্ট জারি করছি অল ওভার ইণ্ডিয়া। ইন্টারপোলেও ম্যাসেজ পাঠাচ্ছি।’

অমিত বললেন, ‘একটা কথা বুঝতে পারছি না। এরা কী করে জানল যে আংটিটা সুজিতের পজেশানে আছে?’

এতক্ষণ চুপ করে থাকা হেমন্ত আহুজা বললেন— ‘সেটা প্রীতম দিয়ে থাকতে পারে। ইদানীং ও বেশ কিছু সন্দেহজনক লোকের সাথে involved হচ্ছে, লক্ষ্য করেছি। আর সিলুকা-সুজিতের লাভ রিলেশানটা ও স্ট্রংলি অপোজ করত।’

অমিত বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইউর সাজেশশান।’

মাথুর, অমিতকে ফিসফিস করে বললেন, ‘প্রীতম আহুজা কিন্তু সেদিন ‘‘মুমতাজ’’-এর পার্টিতে ইনভাইটিদের মধ্যে ছিল!’

সোনার দোকান থেকে বেরিয়ে অমিত চাপা গলায় খানিক আর্জেন্ট কথা বললেন মাথুরের সঙ্গে। মাথুর ঘাড় নেড়ে ‘O.K.’ বলে ব্যস্ত পায়ে চলে গেলেন পুলিশের গাড়িতে। ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ি ফিরে চললেন অমিত। আজ HBO-তে রাত এগারোটার স্লটে একটা ভালো ফিলম আছে, মনে পড়ল। একবার হঠাৎ মনে হল একটা বাইক তাঁকে ঢ়তভর করছে। কিন্তু কয়েক সেকেণ্ড বাদেই সেটা তাঁর ট্যাক্সিকে ওভারটেক করে বাঁদিকের রাস্তায় হুশ করে বেরিয়ে গেল। তখুনি সেল-এ বেজে উঠল, ‘হ্যায় তুঝে ভি ইজাজৎ...’। দেখলেন, সুমনা কলিং। রিসিভ করতেই সে কলকলিয়ে উঠল, ‘কী স্যার? কতটা এগোল মিশন?’ অমিত বললেন, ‘আমিও নঃদভঢ়নধ, অনেকটা ডেভলপ করেছে এ্যাকশান। ফিংগার ক্রস করে আছি। শেষ অঙ্ক কালকেই অভিনীত হতে পারে। তোমাকে ঠিক সময় খবর দেব। বাই!’

দীপক সেনের প্রবেশ

বললেন বটে ছিপ গুটিয়ে এনেছেন প্রায়। কিন্তু সত্যান্বেষী অমিত নিয়োগীর মনটা এখনো খচখচ করছে দু-একটা প্রশ্নের খোঁচায়। বাড়ি ফিরে কফির কাপে গম্ভীর মুখে চুমুক দিচ্ছিলেন, আর ভাবছিলেন। এমন সময় ডোর-বেল বেজে উঠল দ্রুত কতকবার।

কাপ রেখে নির্দিষ্ট ড্রয়ার থেকে নিজের রিভলভারটা বার করে বাঁ হাতে নিয়ে, সাবধানে দরজাটা খুললেন অমিত।

খানিকটা ত্রস্ত- ব্যস্তভাবে একটি সুবেশ ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়িযুক্ত লোক ড্রইংরুমে ঢুকে এসে বললেন, ‘আই হোপ ইউ আর প্রাইভেট ডিটেকটিভ অমিত নিয়োগী।’

তাকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে অমিত মৃদু হেসে বললেন, ‘আই থিঙ্ক ইউ আর ড. দীপক সেন?’

লোকটির বিস্ময় উপভোগ করে গোয়েন্দা আবার বললেন—‘গ্ল্যাড টু মীট ইউ। বলুন, আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি। তার আগে বসুন, একটু জিরিয়ে নিন। কফি চলবে?’

অপ্রস্তুত ভাবে ‘থ্যাংকস’ বলে সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন দীপক।

তারপর তড়বড় করে বললেন—‘সুজিত ঘোষ মার্ডার কেসে পুলিশ আমাকে সন্দেহ করছে। আমার এগেনস্ট-এ নাকি ভালোরকম মোটিভ পেয়েছে তারা!’

অমিত বললেন, ‘স্বাভাবিক। রাইভ্যালরি-ইন-লাভ মার্ডারের অন্যতম প্রাইম মোটিভ প্রমাণিত হয়েছে বহুবার। তাছাড়া, আপনার সঙ্গে সুজিতের পাবলিক প্লেসে জনতার সামনে ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে—’

দীপক প্রতিবাদ করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, অমিত তাঁকে হাতের ইঙ্গিতে নিরস্ত করে বললেন—‘তাছাড়া, মার্ডারের সময় ক্লোরোফর্ম এবং তীক্ষ্ণ ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা সার্জনের স্ক্যালপেল হতে পারে।’

দীপক এবার আঁতকে উঠলেন—‘ও মাই গড! আয়্যাম বিয়িং ফ্রেমড! বীভৎস conspiracy চলছে আমাকে ফাঁসাবার জন্যে! বিশ্বাস করুন, আমি সুজিতকে খুন করি নি! আমি ওই দিন বা ওই রাতে হোটেল মুমতাজের ধারে কাছে ছিলাম না।’

—‘আমি যদিও করি, পুলিশ কেন করবে? আপনাকেই তো উল্টে প্রমাণ দিতে হবে। ফুল প্রুফ এ্যালিবাই আছে আপনার? ওইদিন রাত একটায় নার্সিং হোমে কোনো অপারেশন করছিলেন কী?’

দীপক সেন হতাশ এবং ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন—‘না, রাত-দুপুরে নর্মাল লোক যা করে, তাই করছিলাম। নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিলাম নিজের বাড়িতে!’

—‘অর্থাৎ নো এভিডেন্স, নো এ্যাকসেপ্টেবল উইটনেস! সো, দীপকবাবু, সারকামস্ট্যান্সিয়াল এভিডেন্স স্ট্রংলি এগেনস্ট ইউ!’

—‘সেইজন্যেই তো আপনার কাছে ছুটে এলাম, অমিতবাবু। যে-কোনো মোমেন্টে আমাকে এ্যারেস্ট করবে পুলিশ! ওঃ! প্রীতম আহুজার কথা শুনে সুজিতকে ওপেনলি চ্যালেঞ্জ করে কী ভুলই করেছি!...’

সচকিত হয়ে অমিত শুধোলেন—‘সিলুকার দাদা বুঝি সুজিতের সঙ্গে বচসায় আপনাকে উস্কে দিয়েছিলেন?’

—‘হ্যাঁ। আমাকে বলল, ওই লোফারটার চেয়ে তোমাকে আমি বোনের হাজবাণ্ড হিসেবে প্রেফার করি। তোমার রাইট নিয়ে লড়ে যাও।’

একটু ভেবে অমিত, দীপককে আশ্বাসবাণী দিলেন, ‘ঠিক আছে, দীপকবাবু আমার মনে হচ্ছে আপনি নির্দোষ। পুলিশকে আমি বুঝিয়ে বলব। মীনহোয়াইল যদি আপনাকে এ্যারেস্ট করে, আপনার উকিলকে বেল-এর ব্যবস্থা করতে বলবেন। আর, মাথা ঠাণ্ডা রাখুন। ডু নট ট্রাই টু এ্যাবসকণ্ড!’

পরদিন ভোর পাঁচটায় মাথুরের ফোন এল।

‘অমিতবাবু, গুড নিউজ। আপনার কথামতো কাজ হয়েছে। উই হ্যাভ স্পটেড দি ক্রিমিন্যালস...এবার ফাইনাল টাচ দেবার পালা। এ্যাকচুয়াল খুনি ইজ ডেড বাই এ্যাকসিডেন্ট। তার বডি থেকে নীলার আংটিটা রিকভার করা গেছে। আপনি এক ঘণ্টার মধ্যে লালবাজার চলে আসুন। আমি আহুজাকে তুলে এনেছি।’

—‘আমার এ্যাসিস্টান্টকে সঙ্গে নিতে পারি?’

—‘জরুর! আই নো, সী ইজ হেল্পফুল টু ইউ!’

—‘থ্যাঙ্কস!’

রহস্যের ব্যাখ্যা

শেষ দৃশ্যের যবনিকা উঠল লালবাজারের ইন্টারোগেশান রুমে। অমিতকে দেখেই ফুঁসে উঠলেন প্রীতম আহুজা—‘হাউ ডেয়ার ইউ! শুনলাম আপনার পরামর্শে পুলিশ আমাকে এই মার্ডার কেসে প্রাইম সাসপেক্ট বলে ধরেছে! কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে?’

—‘বলছি, মি. আহুজা। আপনি শুনুন। আমার যদি কোথাও ভুল-ত্রুটি হয় বা কোনো পয়েন্ট বাদ পড়ে যায়, সেইগুলি ধরিয়ে দেবেন! মি. মাথুর, আপনি সালুজাকে রেডি রেখেছেন তো?’

মাথুর বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। পাশের ঘরে মজুত আছে।’

প্রীতমের চোখে একটা অস্থিরতা ফুটল। কিন্তু তিনি তবু তড়পে উঠলেন—‘কই? বলুন!’

অমিত বললেন, ‘প্রথম কথা, আপনি সুজিত ঘোষকে বিষ নজরে দেখতেন। আপনার বোনের সঙ্গে ওর সম্পর্কটার ডেড এগেন্সট-এ ছিলেন।

প্রীতম গর্জে উঠলেন—‘ডেফিনিটলি। ওই দু-কড়ির ছোকরা, আমাদের ফ্যামিলির দামাদ হবে? দ্যাট ওয়াজ আনএ্যাকসেপটেবল! সো হোয়াট? তাতে প্রমাণ হয়ে গেল আমি ওকে খতম করেছি।’

অমিত—‘নিজের হাতে এসব করে না আপনাদের মতো বড়োলোক। কিন্তু করিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।’

প্রীতম—‘হাউ ফানি। আপনি আপনার যা খুশি মনে করতে পারেন। Will law accept it?’

অমিত—‘You are perfectly right! অতএব দেখা যাক, আইনকে বোঝানোর মতো আর কী ইনফরমেশান এবং এভিডেন্স আমাদের ঝুলিতে আছে। মি. আহুজা, আপনি তো হাইলি ইনটালিজেন্ট। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এ-কেসে পুলিশের প্রথম সাসপেক্ট কেন ছিল মনোজ ভিণ্ডিওয়ালা?’

‘অফ কোর্স!’ চেঁচিয়ে উঠলেন প্রীতম। ‘আমি নিজে পার্টির রাতে ওদের তুমুল ঝগড়া করতে শুনেছি, দেখেছিও। সে ইনসিডেন্টের কিছুক্ষণ বাদেই মনে হয় সুজিতকে মার্ডার করা হয়। অন্য গেস্টরাও আই উইটনেস ছিল এ ব্যাপারে।’

অমিত বললেন, ‘ভেরি গুড পয়েন্ট! মনোজ কি সুজিতকে ভয় দেখিয়েছিল?’

কথাটা লুফে নিলেন প্রীতম আহুজা—‘সিওর। রীতিমতো থ্রেটনিং দিয়েছিল, ওর কাছ থেকে যত খুশি টাকা খিঁচতে চাইলে আর এগ্রিমেন্ট ভেঙে অন্য কোম্পানিকে টেকনোলজিকাল হেল্প দিলে, সুজিতকে খতম করে দেবে!’

অমিত সঙ্গে সঙ্গে বললেন— ‘এরকম ওপেনলি হুমকি দেবার একটু পরই সত্যিই সুজিতকে খুন করল বা করাল মনোজ ভিণ্ডিওয়ালা! জীবনটা কি এতই সোজা sum of simplification, মি. প্রীতম আহুজা?’

—‘মানে? আপনি কী বলতে চাইছেন? কে তাহলে এই মার্ডারের জন্য লজিকালি রেসপন্সিবল?’

—‘দেখুন, মি. আহুজা, ভিণ্ডিওয়ালার একটা বিজনেস মোটিভ ছিল ঠিকই, কিন্তু সুজিতকে সরাবার ব্যাপারে আপনার ডবল মোটিভ রয়েছে! একটা তো আপনি স্বীকারই করেছেন, আপনার বোনের সঙ্গে বিয়ের সূত্রে যাতে সে আপনাদের ফ্যামিলির সার্কলে ঢুকতে না পারে। এর জন্যে আপনি অনেক কিছু করতেই তৈরি ছিলেন। আর এজন্য প্রথমে আপনি দীপক সেনকেও ওর বিরুদ্ধে তাতিয়েছিলেন। ঠিক কি না?’

মুখটা শক্ত হয়ে গেল প্রীতমের। ঝাঁঝিয়ে বললেন—‘তা যদি হয়ও, ডাবল মোটিভ আপনি কোথায় পেলেন?’

অমিত স্মিত মুখে বললেন—‘আমাদের বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, হয়তো শুনেছেন, চোরের মায়ের বড়ো গলা! আপনার দ্বিতীয় মোটিভটা আরো সিরিয়াস—মোটিভ অব গ্রীড। নীলার আংটিটা যে সুজিতের কাছে আছে, সে খবরটা তো আপনিই দিয়েছিলেন মার্ডারারদের?’

—‘হোয়াট ননসেন্স! আপনার যা খুশি আজগুবি থিয়োরি দিয়ে আমার এগেন্সটে চার্জশিট আনবে পুলিশ? দিন দিন কোথায় চলেছে আমাদের ডেমোক্রেসি?’

অমিত জিভ চুকচুক করে আফশোষ প্রকাশ করলেন, তবে দেশের জন্য নয়, প্রীতম আহুজার নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার ভ্রান্ত প্রচেষ্টা দেখে। বললেন, ‘আনফরচুনেটলি, শুধু সুজিতের সঙ্গে নয়, আপনার নিজের ফ্যামিলি মেম্বারদের সঙ্গেও সম্পর্কটা ভালো নয়!’

প্রীতম আবার চেঁচিয়ে উঠলেন—‘দ্যাটজ নান অব ইওর বিজনেস!’

অমিত গম্ভীর গলায় বললেন, ‘Control yourself, মি. আহুজা! নীলার আংটিটার জন্য কে আপনাকে দু-কোটি টাকা অফার করেছিল?’

হঠাৎ ফ্যাকাসে লাগল আহুজার মুখ। মরিয়া হয়ে বললেন, ‘সব বাজে কথা! কেউ আমাকে টাকা অফার করে নি!’

—‘আপনি না বললেও আমরা জানি। মুম্বইয়ের বিখ্যাত ফিল্ম প্রডিউসার অরবিন্দ মেহরা।’ বলে অমিত মি. মাথুরকে চোখের ইঙ্গিত করলেন।

মাথুর একটা বেল টিপতেই এক সান্ত্রী ঘরে ঢুকল একটি মাঝবয়সী মাঝারি আকৃতির ভদ্রলোককে নিয়ে। তাকে দেখেই আহুজার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল আতঙ্কে। অমিত চিনলেন, গয়নার দোকানে লুটের ছবিতে এই লোকটিরই হাতে রিভলভার ছিল।

অমিত চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, ‘চিনতে পারছেন, মি. আহুজা? ইনি অরবিন্দ মেহেরার এজেন্ট সঞ্জয় সালুজা। দুবাই থেকে আসা এক ভদ্রলোক আপনাদের দোকানে এক স্যাফায়ার রিং কমপারেটিভলি কম দামে বেচে গেছেন, সে খবর ইনি রাখতেন। তাই ইনিই আপনাকে অফারটা দিয়েছিলেন। কথাটা ভুল বললাম?’

প্রীতম আহুজা দু-চারবার নিজের ঠোঁট চেটে বললেন, ‘আমার ল-ইয়ারের সঙ্গে কনসাল্ট না করে আমি আপনাদের কোনো কথার জবাব দোব না।’

মাথুর খুশিমাখা কন্ঠে বললেন, ‘বেশ তাই করবেন। কিন্তু আপনার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কথাটা বিলকুল সাচ!’

অমিত আবার বললেন, ‘সুজিতকে খুন করানোর জন্য আপনি যথেষ্ট পরিমাণ দায়ী। সেদিন পার্টিতে গিয়ে মনোজের সঙ্গে ওর ঝগড়া আপনি কাছে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন ও শুনেছিলেন। তখুনি মতলবটা আপনার মাথায় আসে। ভিণ্ডিওয়ালার হুমকি শোনার পরই আপনি সেটা সঞ্জয় সালুজাকে ডেকে জানিয়ে দেন। বলেন যে, এই সময় খুন করলে সুজিতের মার্ডারের দায় মনোজের ওপরই চাপবে। তাই না?...ও, আপনি তো মুখ খুলবেন না! তবে ইচ্ছে হলে ডিটেলস কারেকশান করতে পারেন, কিংবা fill in the blanks...যেমন তিন-আঙুল ফকিরকে আপনি কত দেবেন বলেছিলেন যদি সে বাইচান্স সুজিতের মোবাইলটা আনতে পারে?...’

প্রীতম আহুজা শুধু কটমট করে চাইলেন ডিটেকটিভের দিকে।

অমিত বলে চললেন—‘খুনটা যে নিজের হাতে করেছে, সে প্রফেশনাল সুপারি-কিলার, রামিজ আলি। আহুজাদের সোনার দোকানে হানা দেবার সময় তার ছবি উঠে যায় সি.সি.টিভি.তে। পুলিশ তাকে সহজেই সনাক্ত করে। তৎক্ষণাৎ সব স্টেটের পুলিশকে এ্যালার্ট করে দিয়েছিলেন মি. মাথুর। আজ শেষ রাতেই মুম্বই থেকে খবর এসেছে, রামিজ সেখানে এক হোটেলে ইলেকট্রোকিউটেড হয়ে মারা গেছে। নীলার আংটিটা পাওয়া গেছে তার জ্যাকেটের ইনসাইড পকেটে। মি. সালুজা, রামিজ আলির তো আপনাকেই আংটিটা দিয়ে বাকি টাকা নেবার কথা ছিল, তাই না?’

সালুজা বললেন—‘হ্যাঁ। লেইকিন ও কাম খতম করকে মেরা পাস নেহি আয়া। হোটেল সে ভাগা! আই ফেল্ট পাজলড। মুঝে কুছ পতা নহি থা। উসকা সেলফোন হামেশা কে লিয়ে সুইচড অফ হো গ্যয়া!’

অমিত বললেন, ‘হুমম! রামিজের আপনাকে আংটি দিয়ে টাকা নেবার কথা ছিল। আর, আপনার প্রীতমকে টোয়েন্টি ল্যাক দেবার কথা ছিল। সব ভেস্তে গেল। পাঁচরতি নীলার আংটি দেখে রামিজের মাথা ঘুরে গেছিল। সুজিতের মোবাইলটা সম্ভবত মাঝগঙ্গায় ফেলে ব্যাটা চম্পট দেয়। আর, এইভাবে মরাটাই ওর নিয়তি ছিল!...যাক, মি. মাথুর, আমার মনে হয় না মি. সালুজাকে রাজসাক্ষী করে কেস সাজাতে আপনার খুব অসুবিধে হবে। প্রীতম আহুজার কয়েক বছর জেলের আদর-যত্ন খাওয়া কপালে আছে। হয়তো তাতে ওঁর মেজাজটা ঠাণ্ডা হবে, যদিও আহুজা পরিবারে কলেঙ্কের দাগ লাগবে।’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%