কিডন্যাপিং রহস্য

অরুণোদয় ভট্টাচার্য

ভূমিকা

চেতলা। সবজিবাগান লেন যেখানে সেন্ট্রাল রোডে পড়েছে, ঠিক বাঁকে একটা হলুদ দোতলা বাড়ি। সেটা দত্তদের বাড়ি, সেখানে থাকে সোমেন আর নীরা দত্ত, আর তাদের সাড়ে পাঁচ বছরের চোখের মণি তুলতুলি নামের মেয়েটি। সাউথ পয়েন্ট স্কুলে ট্রানজিশান ক্লাসের ছাত্রী। নাচ শেখে অনীতা সেনের কাছে। আঁকতেও খুব ভালোবাসে তুলতুলি। কিন্তু আপন মানেই আঁকে, কারো কাছে শেখে না।

সোমেন দত্ত একটা MNC-তে ভালো মাইনের অফিসার। নীরা দেবীও এম.কে. ইনস্টিটিউশান ফর গার্লস-এ ইতিহাস পড়ান। মেয়েকে স্কুলবাসেই পাঠান। কিন্তু বাড়িতে তার দেখভালের জন্য একটি মেয়ে রেখেছেন দত্তরা। তার নাম রানি। কিন্তু তার ভাবভঙ্গি, কথাবার্তা সবই একটু খরখরে। শুধু রংটাই যা ফরসা। যাই হোক, সে-ই তুলতুলিকে সাজিয়ে গুজিয়ে স্কুলবাসে তুলে দেয়, আবার বিকেলে বাস থেকে নামিয়ে হাত ধরে বাড়ি আনে। তাছাড়া ছুটির দিন বিকেলে পার্কেও নিয়ে যায়।

সকালে মেয়ে ও স্বামীকে খাইয়ে, নিজেও খেয়ে বেরিয়ে যান নীরা। সন্ধ্যায় মেয়েকে নিয়ে একটু পড়ান, একটু খেলেন, আর একটু টিভি সিরিয়াল দেখেন, যতক্ষণ না সোমেনবাবু অফিস থেকে ফেরেন। তারপর খাওয়ার আগে পর্যন্ত মেয়ে বাপের সঙ্গ ছাড়ে না। অনেক সময় সোমেন-ই মেয়েকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ান।

মোট কথা, সব মিলিয়ে পরিবারটি সত্যিই সুখী।

চেতলায় দত্তদের বাড়ি এক সন্ধ্যায় বেড়াতে এলেন হাজরা দম্পতি, মীনাক্ষী আর প্রবীর। মীনাক্ষী আর নীরার বন্ধুত্ব ওদের স্কুলজীবন থেকে। বিয়ের পর প্রবীরও পারিবারিক বন্ধু হয়ে গেলেন। যাই হোক, সেদিন অনেকটা সময় তুলতুলির নাচ আর ছবি দেখেই কাটল।

কথায় কথায় মীনাক্ষী বললেন, ‘শীত তো চলেই যাচ্ছে। একটা পিকনিক করলে হয় না?’

সোমেন সোৎসাহে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব ভালো হয়।’

নীরা বললেন, ‘আজ মঙ্গলবার। সামনের রোববার করা যেতে পারে। কিন্তু ভেন্যুটা কোথায়?’

মীনাক্ষী বললেন, ‘বলিস তো আমি জামাইবাবুকে বলে বারুইপুরের বাগানবাড়িটা ঠিক করতে পারি। জায়গাটা পিকনিকের পক্ষে আইডিয়াল!’

নীরা খুশি হয়ে বললেন, ‘পারবি একদিনের মধ্যে ব্যবস্থা করতে?’

—‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। তোরা বরঞ্চ একটা রাঁধার লোকের খোঁজ কর। আর, পার্টিতে কে কে যাবে লিস্ট কর।’

সোমেন বললেন, ‘আমার অফিসের দু-একজন কলিগ যাবে মনে হচ্ছে।’ তারপর স্ত্রীর দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমার কলিগ এষাকে বলে দেখ। বেশ চালাকচতুর মনে হয় মেয়েটিকে।’

প্রবীর বললেন, ‘আর এমন একজনকে নিন যে ভালো গাইতে পারে। গান না হলে পিকনিক জমে না। আর লাইভ গায়ক চাই, সিডি বা ক্যাসেট বাজানো চলবে না।’

সোমেন বললেন, ‘নো প্রবলেম। আমাদের এক ক্লোজ নেবার আনন্দ মৈত্রকে নিয়ে যাব। ভদ্রলোকের গলাটি সুন্দর। নানারকম গান গাইতে পারেন। তার মধ্যে নিজের লেখা দারুণ দারুণ প্যারডিও আছে।’

‘তাহলে নেক্সট সানডে, মানে ফিফথ ফেব্রুয়ারি, মোটামুটি ফিক্সড হয়ে গেল। আজ আমরা উঠি।’ বলতে বলতে প্রবীর মীনাক্ষীর সঙ্গে দরজার দিকে এগোলেন।

ওরা যেতেই নীরা সোমেনকে বললেন, ‘দেখেছ, কল্লোল আর কাবেরীর কথাটা ভুলেই যাচ্ছিলাম!’

সোমেন বললেন—‘রাইট! লং-টাইম ফ্যামিলি ফ্রেণ্ড। দে মাস্ট বি পার্ট অব দ্য পার্টি।’

‘আর শোন’, নীরা সোৎসাহে বললেন, ‘রান্নার ভারটা পাল কেটারার্স-এর বরুণকে দিলে হয় না?’

সোমেন বললেন, ‘সেটা দেখতে হবে, ও ওইদিন খালি আছে কি না। ওকে পেলে ভালোই হয়। একজন হেল্পার নিয়ে ও তুলে দিতে পারবে। কটা লোকের তো রান্না!’

—‘তাহলে ওকে এখনই একটা ফোন করো। মেনুও তো ঠিক করতে হবে।’

পিকনিক—প্রথম পর্ব

দেখতে দেখতে রোববার এসে গেল। পিকনিক ফাইনালাইজড। বরুণ পালকে পাওয়া গেছে। অন্য অংশগ্রহণকারীরাও প্রত্যাশামতো রাজি হয়েছেন।

দত্তদের টাটা-সুমো-তে সোমেন, নীরা, তুলতুলি, রানি ছাড়াও উঠলেন আনন্দ মৈত্র আর এষা বাগচি। এঁদের সঙ্গে একটি পাঁচ লিটারের মিনারাল ওয়াটারের পট, আর একটি বড়ো শতরঞ্চি। রান্নার বাসন-কোশনও কিছু তুলে দিল বরুণ ওই গাড়িতে। সে আর তার সহকারী দীপক, লোকেশানটা বুঝে নিয়েছে। ওরা বালিগঞ্জ স্টেশন থেকে বারুইপুর লোকালে দশটার মধ্যে পৌঁছে যাবে।

হাজরা দম্পতি নিজেদের মারুতি-সুজুকিতে রওনা হলেন লেক রোড থেকে। মীনাক্ষীর চেনা জায়গা। প্রবীরবাবুও একবার দেখে এসেছেন। মীনাক্ষী গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন, ‘নীরারা ঠিকমতো আসতে পারবে তো? আমাদের বোধ হয় চেতলা গিয়ে ওদের এসকর্ট করে নিয়ে যেতে পারলেই ভালো হত!’

প্রবীর বললেন, ‘না, অত চিন্তার কিছু নেই। সবই ঠিক হবে। স্টেশানের কাছেই বাড়ি। ডিরেকশান দিয়ে রাখা হয়েছে। একটু খুঁজে নিতে পারবে না? বাচ্চা ছেলে না কি?’

মীনাক্ষী অপাঙ্গে প্রবীরের দিকে চেয়ে বললেন, ‘না, তবে সঙ্গে বাচ্চা আছে!’

দত্তদের পারিবারিক বন্ধু ঘোষ দম্পতিও ওই ডিরেকশনের ভরসায় তাঁদের হাজরা রোডের বাড়ি থেকে বেরলেন নিজেদের পদ্মিনী প্রিমিয়ারে।

সোমেনবাবুর দুই কলিগ, অন্বেষা সেন আর কমলেশ গুপ্ত, দু-জনেই যাদবপুরের লোক। ওঁরা বলেছেন ওঁদের ট্রেনে যাতায়াতই সুবিধের হবে।

দেখা গেল সোওয়া-দশটা নাগাদ সকলেই বাগানবাড়িতে হাজির, কেটারার সুদ্ধু। একেবারে জমজমাট পরিবেশ। স্ফূর্তিতে সকলেরই দন্ত বিকশিত।

আধঘণ্টার মধ্যে বরুণ বাসন-কোসন নামিয়ে স্টোভ জ্বালিয়ে গরম গরম বেগুনি করে দিল। সবাই খেতে লাগলেন বারুইপুরের মুড়ি সহযোগে। তারপর কাগজের কাপে চা। ব্রেকফাস্ট পর্ব সুন্দরভাবে চুকল।

দলের একমাত্র বাচ্চা তুলতুলি একটি উজ্জ্বল নীল রঙের সিল্কের ফ্রক পরেছিল। তার ওপর ধপধপে সাদা স্লিভলেস সোয়েটার। বাগানের সবুজ ঘাসের লনে মহা আনন্দে ছোটাছুটি করতে লাগল সে। বড়োরা একটু ঘুরে ঘুরে দেখলেন বাগানটা। প্রচুর ফুল ও ফলের গাছ দেখা গেল। আম, জাম, পেয়ারা, চাঁপা, শিউলি ইত্যাদি গাছের সঙ্গে তেজপাতা গাছও রয়েছে এ বাগানে। বারুইপুরের পেয়ারা বিখ্যাত। একেকটা ক্রিকেট বলের ডবল আয়তনের। এক পাশে আবার ডালিয়ার চাষ। সারি সারি নানা রঙের ডালিয়ার মেলা। কোনো কোনোটির ব্যাস পুরো এক ফুট। কেয়ারটেকার-কাম-মালি বসন্ত বাবু ও বিবিদের সব ঘুরিয়ে দেখাল। পিছন দিকে একটা পুকুর আছে। শান-বাঁধানো ঘাট। জলে দু-চারটে রুই-কাতলাও খেলা করছে। পুকুরের কাছাকাছি কেয়ারটেকারের ঘর ও বাথরুম। গেস্টদের টয়লেট একটা আমগাছের পাশে। মীনাক্ষী চাবি এনে সেটা খোলালেন, তারপর নিজেই ঘুরে এসে সেটার উদ্বোধন করলেন।

একটি তেঁতুল গাছের তলায় রান্নার প্রস্তুতি হতে লাগল। জামগাছের তলায় শতরঞ্চি পেতে পিকনিককারীরা বসলেন। কেউ কেউ ঘাসেই অঙ্গ ঢেলে দিলেন প্রকৃতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মতলবে। আনন্দবাবু গুনগুনিয়ে উঠলেন, ‘প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন’।

দেখতে দেখতে জোকস চালাচালি, ধাঁধা বলাবলি শুরু হয়ে গেল। অন্বেষা সেন একটি ধাঁধায় সবাইকে চমকে দিলেন।

‘বলুন তো কী করে একটা লোকের মেয়ে তারই বৌদি হতে পারে?’

নীরা বললেন, ‘এমা! সে কি! তাই আবার হয় না কি?’

সোমেন বললেন প্রবীরকে—‘কী প্রফেসার-কাম-ফিলজফার, উত্তর দিন!’

প্রবীর মাথা চুলকে বললেন—‘নো আইডিয়া!’

তুলতুলি বিজ্ঞাপনী ভাষায় বলে উঠল—‘গেট আইডিয়া!’

সবাই হো হো করে হেসে উঠল তার পাকামিতে।

কিন্তু সত্যিই তো, উত্তরটা কী হবে। সকলেরই মাথায় হাত।

অন্বেষা এবার বিজয়িনীর গর্বে চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘তাহলে সবাই সারেণ্ডার করছেন?’

সবাই নেড়ে দিলেন মাথা, তাঁরা সত্যিই জানেন না এর উত্তর।

অন্বেষা বললেন—‘সিম্পল। সবটাই বিবাহসূত্রে সম্ভব। লোকটি এক বিধবাকে বিয়ে করেছে, যাঁর প্রথম পক্ষের একটি টিন-এজেড মেয়ে আছে। তাহলে সে মেয়েটি সম্পর্কে লোকটিরও মেয়ে হল। কিছুদিন বাদে লোকটির দাদা তাদের কাছে বেড়াতে এসে ওই তরুণীটির প্রেমে পড়ে তাকে বিয়ে করলেন। তাহলে যে ছিল মেয়ে সে হয়ে গেল লোকটির বউদি! নয় কি?’

সবাই বললেন, ‘বুঝলাম। এই দুনিয়ায় সবই হয়।’ কল্লোল বললেন, ‘এইরকম একটা বিদেশি গল্প পড়েছিলাম মনে হচ্ছে। এরপর next generation এ আরো সব রিলেশনস গুলিয়ে গিয়ে লোকটা পাগল হয়ে যাবে!’

সোমেন দত্ত বললেন, ‘আচ্ছা, এই জোকটা কেউ শুনেছে আগে? শুনে থাকলে বলব না!’

কমলেশ বললেন—‘এটাই তো একটা জোক! কোন জোক আপনি বললেনই না, লোকে কী করে বলবে আগে শুনেছে কি না?’

সোমেন—আচ্ছা, বলেই ফেলি। প্রবীরবাবু, মজাটা কিন্তু এক অধ্যাপককে নিয়ে। সোসিওলজির অধ্যাপক ড. সেনগুপ্ত ভীষণ ভুলো আর অন্যমনস্ক। একদিন ওঁর পাড়ারই এক ছেলেকে বললেন, ‘তোমাদের বাড়ি গেল-বর্ষায় এনকেফেলাইটিস হয়েছিল না? কে মারা গিয়েছিল? তুমি না তোমার ভাই? ছেলেটি দুষ্টুমি করে উত্তর দিল, ‘আমি’। অধ্যাপক উত্তরটি লক্ষ্য করলেন না। সবিস্ময়ে বললেন, ‘আশ্চর্য! একই পরিবেশে একই এজ-গ্রূপের তোমরা, অথচ তোমার ভাই বেঁচে গেল! ব্যাপারটা নিয়ে রিসার্চ হওয়া দরকার!’

প্রবীরবাবু বললেন, ‘বা:! এটা ছাড়তে হবে তো স্টাফরুমে!’

এষাও সার্টিফিকেট দিল, ‘খুব মজার। আগে শুনি নি।’

সোমেন বাবু মাথা ঝুঁকিয়ে অভিনন্দন নিলেন।

এরপর কিছুক্ষণ অন্ত্যাক্ষরী চলল। শুরুটা ভালোই হয়েছিল কাবেরীর ‘মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে’ দিয়ে। কিন্তু তারপর দেখা গেল কেবল আনন্দবাবু আর কাবেরী ছাড়া কারো গলায় বিন্দুমাত্র সুর নেই। তাই জমল না ব্যাপারটা। শেষমেষ আনন্দ মৈত্রকেই একক আসর বসাতে হল। ভদ্রলোক স্বর্ণযুগের অসাধারণ আধুনিকের ঝুলি খুললেন। শ্যামল মিত্র-র ‘মউল বনে জমেছে মন’, সতীনাথের ‘বালুকাবেলায় কুড়াই ঝিনুক’, ধনঞ্জয়ের ‘এই ঝিরঝির ঝির বাতাসে কী গান ভেসে আসে,’ হেমন্ত-র ‘মেঘ কালো, আঁধার কালো’, ‘বনতল ফুলে ফুলে ঢাকা’, মানবেন্দ্র-র ‘বারে বারে কে যেন ডাকে আমারে’, ‘মুক্তোছড়া নেই কো কন্যা, নেই কো মোতির হার’, ‘আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি’, অখিলবন্ধু-র ‘তোমার ভুবনে ফুলের মেলা আমি কাঁদি সাহারায়’, ‘ও দয়াল বিচার করো’, ‘পিয়াল শাখার ফাঁকে ওঠে’, মৃণাল চক্রবর্তী-র ‘কথা রাখার কথা ছিল’, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চল রীনা, ক্যাসুরিনার ছায়া গায়ে মেখে’ ইত্যাদি ইত্যাদি। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলেন যতক্ষণ না খিদেয় পেট চুঁই-চুঁই হল।

তুলতুলিও সারাক্ষণ রানির সঙ্গে বকর বকর করে, লুকোচুরি, কানামাছি ইত্যাদি খেলে সময়টা কাটিয়ে দিল। শুধু এর মধ্যে বারোটা নাগাদ একটা টিফিন-কেক খেল।

পিকনিক—দ্বিতীয় পর্ব

ঠিক দেড়টায় বরুণ পাল সব রান্না সেরে সবাইকে খেয়ে নিতে বলল।

খিচুড়ি-ইলিশ তো বটেই, নতুন পদ চিকেন-কচৌরিও সবার খুব ভালো লাগল। আর শেষ পাতে মীনাক্ষীর আনা ‘মিঠাই’-এর মিষ্টি দই।

ভোজ শেষ করে কেউ কেউ মশলা চিবোলেন। ঘোষেরা মিঠে পান এনেছিলেন। তাও কয়েকজন নিলেন।

এরপর নীরা আর সোমেন তাসের প্যাকেট বার করলেন। সোমেন বললেন ‘হয়ে যাক টোয়েন্টি নাইন। এনিবডি ইন্টারেস্টেড?’

অন্বেষা তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘ভেরি গুড। আমি তো আছি। আমার পার্টনার কে হবে?’ বলে তিনি কমলেশের দিকে চাইলেন।

কমলেশ সলজ্জ ভাবে বললেন—‘তাসটা আমি খেলি নি কখনো। রং-ই চিনি না।’

অন্বেষা তখন প্রবীরবাবুকে ধরলেন—‘আপনি চলে আসুন। আপনি নিশ্চয়ই রং চেনেন?’

প্রবীর বাবু বললেন, ‘বেশ, আসুন দেখি আমরা দত্তদের বিধ্বস্ত করতে পারি কি না।’

সোমেন বললেন, ‘দ্যাটস দ্য স্পিরিট!’

প্রথম থেকেই জমে গেল টোয়েন্টি নাইন। নীরা হাঁকলেন ঊনিশ। প্রবীরবাবু উঠলেন কুড়ি।

‘আছি’ বললেন সোমেন।

অন্বেষা বলে উঠলেন, ‘আছি বললে হবে না। একুশে উঠুন।’

নীরা—‘ঠিক আছে, একুশ!’

অন্বেষা বললেন—‘ডাবল!’

ব্যস, নীরা ডায়মণ্ড রং করে ঢেকে রাখলেন। ওপরে ডাবলের চিহ্ন হিসেবে একটা তাস ওল্টানো থাকল।

প্রথম চাল দিলেন প্রবীরবাবু ইস্কাবনের গোলাম। গোলাম স্বচ্ছন্দে বেরিয়ে গেল সঙ্গে একটা দশ নিয়ে। মানে চার পয়েন্ট চলে গেল। আবার ইস্কাবনের নয় খেলে ভুল করলেন প্রবীরবাবু। রঙের একটা ছোটো তাস দিয়ে তুরুপ করে পিঠ নিলেন নীরা। তারপর রঙের সাহেব-বিবি অর্থাৎ ‘পেয়ার’ দেখিয়ে দিলেন। অর্থাৎ ওঁদের টার্গেট কমে দাঁড়াল সতেরো। মোটামুটি সহজেই কুড়ি পয়েন্ট পেয়ে প্রথম গেম জিতে গেলেন দত্তরা। দুটো লাল ফোঁটা খুলল।

কল্লোলবাবু খাবার পরেই তৃণশয্যা নিয়েছিলেন। বড়ো বড়ো হাই তুলতে তুলতে তাঁর ঘুম এসে গেল।

তুলতুলি তার ড্রইং খাতায় রং-পেন্সিল দিয়ে বাগানের ছবি আঁকার চেষ্টা করতে লাগল।

আনন্দ মৈত্র পান চিবোনো শেষ করে ইতিমধ্যে কাবেরী আর এষার অনুরোধে তাঁর প্যারডি গান শোনাতে শুরু করেছেন। কমলেশও গুটি গুটি সেই আসরে গিয়ে বসলেন। আনন্দ-র এ পর্যায়ের প্রথম গান রবীন্দ্রসংগীতের প্যারডি: ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’-এর সুরে ‘আমার এই মাস্তানিটাই পছন্দ/লোকে বেশ নিচ্ছে মেনে হলেও আমি মাকুন্দ!’ এরপর নির্মলা মিশ্রর গাওয়া ‘এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না’-এর প্যারডি ‘এমন একটা ওষুধ খুঁজে মিলবে না যাতে দিইনি ভেজাল’। তারপর আশার গাওয়া ‘ময়না, বল তুমি কৃষ্ণ রাধে’-এর সুরে শাশুড়ির প্রশ্ন, ‘বৌমা, বলো তোমার মাইনে কত? অফিসে হচ্ছে যে রাত যত-তত!’ অতুলপ্রসাদী ‘কে আবার বাজায় বাঁশি’র আনন্দকৃত প্যারডি হল ‘কে আবার ফাটায় ক্র্যাকার শহরে রাত বারোটায়?’ আবার ফিল্ম ‘বাজিগর’ এর বিখ্যাত গান ‘এ কালি কালি আঁখে, এ গোরে গোরে গাল’-এর প্যারডি হল

‘‘এই ‘গেল গেল’ বলে চেঁচায় সব পার্টি মিলে

শেষ করে দিল শেষন ভোটের মজা এক কিলে:

ভোটারদের হাতে ফটোসহ আই.ডি. কার্ড দিলে—’’

শ্রোতৃবৃন্দ হেসে কুটিপাটি হতে লাগল এসব গান শুনে।

এদিকে দত্তদের একটি লাল সেট হয়ে গেছে। অন্বেষা-প্রবীরের তিনটি কালো ফোঁটা। এমন সময় একটা দারুণ হাত এল অন্বেষার। একেবারে গোলাম-নয়-টেক্কা-দশ। ডেকে দিল চব্বিশ। দত্তরা ডাবল দিলেন। অন্বেষা বলে উঠলেন ‘রি-ডাবল’! প্রবীরই একটু চমকে গেলেন। কিন্তু ক্লাবস রং করে গেমটা জিতেও নিলেন অন্বেষা। ব্যস, তিনটে কালোর জায়গায় একটা টুকটুকে লাল। এতক্ষণ পরে প্রথম সাফল্য।

ঘটল ঘটনা

এতক্ষণ জেতার মুডে মশগুল হয়ে খেলছিলেন নীরা। হারতেই সেই স্পেলটা ভেঙে গেল। তার পরের গেমেও হাত ভালো এল না তাঁর। তখনি মনে পড়ল মেয়ের কথা। তার তো অনেকক্ষণ খোঁজ রাখা হয়নি। সাড়াশব্দও পাওয়া যাচ্ছে না।

বলে উঠলেন—‘তুতুলটা কোথায় গেল? দেখছি না তো!’

বলেই গলা উঁচু করে ডাকলেন—‘ও তুতুল! কোথায় গেলিরে? তুতুল!’

সোমেন বললেন, ‘দেখ, রানির সঙ্গে কোথায় ঘুরছে।’

প্রবীর বললেন, ‘হুড়োহুড়ি করেছে অনেক। ঘুমিয়েও পড়তে পারে।’

নীরা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। চেঁচাতে লাগলেন—‘এই রানি, রানি! ও তুতুল, তুতুল!’

হাতের তাস ফেলে দৌড়ে গেলেন আনন্দবাবু ও তাঁর শ্রোতাদের দিকে। জিগ্যেস করলেন—‘আপনারা কেউ দেখেছেন আমার তুলতুলি আর রানিকে? কোন দিকে গেল তারা?’

সোমেনও এবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ‘তাই তো! দাঁড়াও, আমি একটু বাগান বাড়ির পেছনটা দেখে আসছি।’

একটু পরেই সবাই মিলে তল্লাশি শুরু করল। ‘তুলতু’, ‘তুলতুলি’, ‘রানি’, ‘এ্যাই রানি’, সরু-মোটা নানান গলায় চিৎকার বাগানবাড়িতে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকল।

মীনাক্ষী কেয়ারটেকার বসন্তকে বললেন চারিধার ভালো করে খুঁজে দেখতে। সে ব্যস্ত হয়ে খুঁজতে চলল।

কিন্তু সবার চেষ্টাই ব্যর্থ হল। বেলা চারটে নাগাদ সকলেই বুঝলেন, রানি আর তুলতুলি এখান থেকে অন্য কোথাও চলে গেছে। সম্ভবত বাগানবাড়ির পিছন দিকের ছোটো গেট দিয়ে, যেখান থেকে পায়ে-চলা পথ বড়ো রাস্তায় গিয়ে পড়েছে।

এখন নীরার মনে হল, তুলতুলির গলার সোনার হারটার ওপর রানির লোভী নজর তিনি অনেকবার লক্ষ্য করেছেন। ভেবেও ছিলেন সোনার হারের জায়গায় রুপোর ওপর সোনার জল দেওয়া হার একটা পরিয়ে রাখবেন মেয়েকে। বললেন, ‘রানি, তুই আমার এতবড়ো সব্বনাশ করলি!...আর আমার তাসের নেশায় বুদ্ধিনাশ হল! মেয়েটার কথা ভুলে কেন মরতে এতক্ষণ খেলতে গেলুম!’ হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন নীরা।

পুকুরপাড়ে এসে হঠাৎ সোমেনের মনে হল, মেয়েটা পুকুরে পড়ে যায় নি তো?

তাঁর পেড়াপেড়িতে বসন্ত পুকুরে নামল। এধার ওধার ডুব দিয়ে খানিকক্ষণ জল তোলপাড় করল। তারপর বলল, ‘না, বাবু, এখানে জলের তলায় কিছু নেই।’

আনন্দ-স্ফূর্তি ঘুচে গিয়ে এক ঘন বিষাদের ছায়া নেমে এল পিকনিক স্থলে।

একটু পরে মাথা ঠিক রেখে সোমেনবাবু বললেন, ‘এখনি যেতে হবে। বারুইপুর থানায় ডায়েরি করতে হবে।’

মীনাক্ষী বললেন, ‘রানির নামে FIR করান!’

সেই সন্ধ্যায় সবই হল। পুলিশ তদন্ত শুরু করল। প্রত্যেকের নাম, এ্যাড্রেস, মোবাইল সেট আর ফিংগার প্রিন্ট সংগ্রহ করা হল।

এষার সঙ্গে সুমনা (অমিত নিয়োগীর সহকারী)-র বন্ধুত্ব। তিনি দত্তদের পরামর্শ দিলেন ওই গোয়েন্দার সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

সোমেনের মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে ডিসি সাউথের ঘনিষ্ঠতা থাকায় শেষ অবধি কেসটা চট্টরাজের হাতে চলে গেল। তবে সি.আই.ডি. ইন্সপেক্টর চন্দন চট্টরাজের সঙ্গে অমিতের ভালোই পরিচয় আছে। দু-জনে একসঙ্গে কাজ করতে তাই কোনো অসুবিধে নেই। যে যার মতো তদন্ত করবেন, ঠিক করলেন ওঁরা। মাঝে মাঝে আলোচনা করে নেবেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ

ঘটনার পরের পর দিন, অর্থাৎ সাতই ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার, ইন্সপেক্টর চন্দন চট্টরাজ পিকনিককারীদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রবৃত্ত হলেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ভবানী ভবনে এলেন এষা, কল্লোল, কাবেরী, মীনাক্ষী, প্রবীর, কমলেশ, অন্বেষা, আনন্দ। তাছাড়া বসন্ত এবং বরুণ ও তার সহকারী দীপক। এষাকেই প্রথম ডাকা হল।

প্রশ্ন—আপনার সঙ্গে নীরা দেবীর আলাপ কত দিনের?

এষা—প্রায় সাত বছর। মানে তুলতুলি হবার আগে থেকেই।

প্রশ্ন—আপনি ওদের বাড়ি যাতায়াত করতেন? তুলতুলির জন্মদিনে যেতেন?

এষা—হ্যাঁ। অনেকদিনই গেছি। মেয়েটাকে আমার এত ভালো লাগত! আপনাকে বোঝাতে পারব না কী কষ্ট হচ্ছে...

প্রশ্ন—পিকনিকের দিন তুলতুলিকে শেষ কখন দেখেছিলেন?

এষা—খাবার সময়। আমিই তো খাইয়ে দিলাম। তারপর ঠিক মনে নেই ও কোন দিকে গেল।

প্রশ্ন—আপনাদের পিকনিক পার্টির সবাইকে আপনি চিনতেন?

এষা—না, সোমেন বাবুর অফিসের লোকজনদের আমি চিনতাম না। আলাপ হয়ে বেশ ভালোই লাগল অন্বেষা আর কমলেশ বাবুকে। তাছাড়া কেটারার যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও আমার অপরিচিত।

প্রশ্ন—কারো আচরণে অদ্ভুত কিছু আপনার চোখে পড়েছে? তুলতুলির কাছঘেঁষে থাকার লক্ষণ, বা তাকে একান্তে নিয়ে কিছু কথা বলছে, এমন কেউ?

এষা—না, তেমন কিছু আমি লক্ষ্য করি নি। তবে কমলেশ বাবু তাঁর নতুন ডিজিটাল ক্যামেরায় থেকে থেকেই তুলতুলির ছবি তুলছিলেন। এটাকে যদি সন্দেহজনক কাজ মনে করেন...(হেসে ফেললেন এষা)

প্রশ্ন—তুলতুলির সঙ্গে সঙ্গে রানিরও অন্তর্ধান কি আপনাকে বিস্মিত করেছে?

এষা—হ্যাঁ। ব্যাপারটা প্রথমে অবাক লেগেছিল। তারপর অবশ্য নীরা হারের কথাটা বলতে মনে হল এটাই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন—কল্লোলবাবু, আপনার সঙ্গে দত্তদের পরিচয় অনেকদিনের তাই না?

কল্লোল—আমি আর আমার স্ত্রী কবেরী পন্ডিচেরিতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেটা বছর পাঁচেক আগে। ওখানেই আলাপ দুই পরিবারের। সেই থেকে পারস্পরিক আকর্ষণ আজও বজায় আছে।

প্রশ্ন—ওই যে বাচ্চা মেয়েটা নিরুদ্দিষ্ট বা কিডন্যাপড হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার কী ধারণা? আপনি কাউকে সন্দেহ করেন?

কল্লোল—কাকে করব, সে বিষয়ে কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। এ রানিরই কাজ। মেয়েটাকে নিয়ে সে উধাও হয়েছে। তবে আপনি যদি বলেন, রানি কা পিছে কৌন হ্যায়? সেটা একটা ভাবার বিষয়।

প্রশ্ন—কিন্তু তুলতুলি মা-বাবাকে কিছু না বলে ওর সঙ্গে যাবে কেন?

কল্লোল—কিছু একটা বলে লোভ দেখিয়েছে। ওর গলায় একটা সোনার হার ছিল শুনলাম। সেটাইতো একটা বড়ো মোটিভ কিডন্যাপ করার।

প্রশ্ন—হ্যাঁ, আপনার কথাটা যুক্তিপূর্ণ। তবে শুধু হারটাই তো চুরি করতে পারত, তাই না? আচ্ছা তুলতুলিকে আপনি শেষ কটা নাগাদ দেখেছেন?

কল্লোল—আড়াইটে নাগাদ ওকে দেখেছিলাম ড্রইং খাতায় কী যেন ছবি আঁকছে। আমি তখন সবে খেয়ে উঠে মুখ ধুচ্ছি।

প্রশ্ন—তাহলে, আপনার কথা অনুযায়ী অন্তত আড়াইটে পর্যন্ত সে বাগানবাড়িতে ছিল।

কল্লোল—হ্যাঁ। ঘটনাটা ঘটেছে ঠিক যখন খাওয়া-দাওয়ার পর ওর মা-বাবা দু-জনেই তাস খেলায় মগ্ন ছিল। মেয়ের কথা ভুলে কী যে কত্তা-গিন্নি দুজনেই টোয়েন্টি নাইনে মাতল!

প্রশ্ন—খাওয়ার পর আপনি কী করছিলেন?

কল্লোল—(ঈষৎ অপ্রস্তুত হেসে) গাছতলায় শুয়েছিলাম। ঘুমে চোখটা জুড়িয়ে এল খানিক বাদে। তারপর সবার গলায় তারস্বরে তুলতুলিকে ডাকাডাকি শুনে ধড়মড়িয়ে উঠলাম...

প্রশ্ন—তুলতুলিকে আপনি কখন শেষ দেখেছিলেন?

কাবেরী—নীরা, সোমেন, প্রবীর আর অন্বেষা তাস খেলছিল খাওয়ার পর। তুলতুলি একধারে ঘাসের ওপর বসে ছবি আঁকছিল। তারপর দেখলাম ও শিউলি গাছটার পাশ দিয়ে পুকুরঘাটের দিকে যাচ্ছে।

প্রশ্ন—একা? না সঙ্গে কেউ ছিল?

কাবেরী—সঙ্গে একজন মহিলা ছিলেন। দূর থেকে দেখেছি, তাঁকে ঠিক আইডেন্টিফাই করতে পারিনি।

প্রশ্ন—আপনাদের পিকনিক পার্টিরই কেউ নিশ্চয়ই? মানে রানি বা মীনক্ষী বা এষা?

কাবেরী—হ্যাঁ। তখন তো তাই ভেবেছি।

প্রশ্ন—তাঁর ড্রেস সম্পর্কে কোনো ইম্প্রেশান আছে?

কাবেরী—শাড়ি পরেছিলেন, এর বেশি কিছু বলতে পারছি না।

প্রশ্ন—তুলতুলির ক্ষতি করতে পারে, এমন কেউ ওই স্পটে ছিল বলে আপনার মনে হয়?

কাবেরী—সন্দেহভাজন বলতে তো এক রানি। আর কেটারার বা কেয়ারটেকার কেউ হারের লোভে ওকে সুদ্ধু চুরি করবে, সেটা অবাস্তব। তাছাড়া যখন জানা গেল মেয়েটা missing, তারা তো সব প্রেজেন্ট ছিল বাগানবাড়িতে!

প্রশ্ন—আচ্ছা, মীনাক্ষী দেবী, আপনি তুলতুলিকে জন্ম থেকে দেখেছেন। আপনার নিশ্চয়ই খুব খারাপ লাগছে মেয়েটা এমন রহস্যজনক ভাবে কিডন্যাপড হয়ে যাওয়ায়?

মীনাক্ষী—ভীষণ খারাপ লাগছে! ওর কথা ভাবলে চোখে জল আসছে! কে যে অমন মেয়েকে চুরি করল!

প্রশ্ন—শুনলাম, পিকনিকের জায়গাটা আপনিই ঠিক করে দিয়েছিলেন?

মীনাক্ষী—হ্যাঁ, আমার জামাইবাবু বাগানবাড়িটার মালিক।

প্রশ্ন—তাহলে এর আগেও আপনি ওখানে অনেকবার গেছেন?

মীনাক্ষী—হ্যাঁ। তাতে কী হয়েছে?

প্রশ্ন—মানে জায়গাটা আপনার খুব পরিচিত। ওখানে কোনো ছেলেধরা বা মেয়েধরার ইনসিডেন্ট আগে ঘটেছে কি না জানেন?

মীনাক্ষী—আমি কী করে জানব, সে তো পুলিশই জানে?

প্রশ্ন—আচ্ছা আপনি পিকনিকের দিন কী পোশাক পরেছিলেন?

মীনাক্ষী—আমি তো শাড়ি ছাড়া অন্য পোশাক পরি না। সেদিন একটা সবুজ রঙের সাউথ ইণ্ডিয়ান সিল্ক পরেছিলাম।

প্রশ্ন—কাবেরী দেবী বলছিলেন খাবার পরে যখন শেষ তুলতুলিকে উনি দেখেন, সে এক মহিলার সঙ্গে পুকুরঘাটের দিকে যাচ্ছিল। আপনিই কি ছিলেন ওর সঙ্গে?

মীনাক্ষী—আমি? না, আমি তো পুকুরের দিকে যাই নি। বোধ হয় তুলতুলিকে যে মেয়েটি দেখাশোনা করে, ওই যে রানি যার নাম, ও-ই হবে!

প্রশ্ন—রানির মোটামুটি বয়স কত হবে?

মীনাক্ষী—সে তো জিগ্যেস করিনি কখনো। দেখে মনে হয় আঠারো-উনিশ।

প্রশ্ন—ও কি শাড়ি পরে এসেছিল পিকনিকে? না সালোয়ার কামিজ?

মীনাক্ষী—মনে হচ্ছে শাড়ি পরেছিল। তবে আমি সিয়োর নই। মানে, ওকে ভালোভাবে নোটিশ করতে হবে, এমন তো আগে বুঝি নি!

প্রশ্ন—খাবার পর আপনি কী করছিলেন?

মীনাক্ষী—আনন্দবাবুর গান শুনছিলাম। ওঃ, ভদ্রলোক এত সুন্দর স্বরচিত প্যারডি গাইছিলেন, কোথায় লাগে মিন্টু দাশগুপ্ত!

প্রশ্ন—প্রবীরবাবু, আপনি তো যাদবপুর ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। কোন সাবজেক্ট?

প্রবীর—ফিলসফি, মানে দর্শনশাস্ত্র।

প্রশ্ন—তা আপনার দার্শনিক মন কী বলে? মেয়েটাকে কিডন্যাপ করার পিছনে কে থাকতে পারে?

প্রবীর—আমার মনে হয় সম্পূর্ণ আউটসাইডার কারো কাজ। বাড়ির উল্টোদিকে একটা গেট আছে, কাছেই রাস্তা। সেখান দিয়ে কেউ এসে মেয়েটাকে একা পুকুরের কাছে দেখে সামহাউ রুমাল-টুমাল শুঁকিয়ে তুলে নিয়ে গেছে!

প্রশ্ন—তাহলে রানির রোলটা কী?

প্রবীর—রানির সঙ্গে লোকটার সাট আছে। বোধহয় ওর ফিঁয়াসে!

প্রশ্ন—যখন ঘটনাটা ঘটে, অর্থাৎ ধরুন আপনাদের খাবার ঘণ্টাখানেকের মাথায়, তখন আপনি কী করছিলেন?

প্রবীর—তাস খেলছিলাম। টোয়েন্টি নাইন। জাস্ট টাইম পাস। আমার পার্টনার ছিল অন্বেষা সেন নামের এক স্মার্ট ইয়ং লেডি। কিন্তু ব্যাড লাক, আমরা হারছিলাম। সোমেন আর নীরাই জিতছিল।

প্রশ্ন—কতক্ষণ খেলছিলেন আপনারা?

প্রবীর—তা ঘণ্টা দেড়েক হবে। তারপর নীরার হঠাৎ খেয়াল হল, অনেকক্ষণ মেয়ের খোঁজ নেয়া হয়নি! তারপর তো সবার মাথায় হাত!

প্রশ্ন—আপনার নাম?

অন্বেষা—অন্বেষা সেন।

প্রশ্ন—মিস?

অন্বেষা—ইয়েস!

প্রশ্ন—আপনি সোমেন দত্তর কলিগ?

অন্বেষা—হ্যাঁ। আমরা দুজনেই ইনকো কেবলস-এ কাজ করি।

প্রশ্ন—আপনি কি সেদিন তুলতুলির মুভমেন্টস লক্ষ্য করেছিলেন?

অন্বেষা—হ্যাঁ, ও-ই তো পার্টিতে একমাত্র বাচ্চা ছিল। খুব ছোটাছুটি করছিল। খেলছিল ওদের কাজের মেয়েটার সাথে। তারপর বসে ছবি আঁকছিল।

প্রশ্ন—খাবার পর আপনি তো তাস খেলছিলেন। আপনার পার্টনার ছিলেন প্রবীর হাজরা?

অন্বেষা—হ্যাঁ, ভদ্রলোক মোটে হিসেব রাখছিলেন না কোন রং কটা বেরিয়েছে। প্রায়ই সেলফোনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিলেন। ফলে আমরা প্রায়ই হারছিলাম।

প্রশ্ন—আপনাদের খেলা চলাকালীন তুলতুলি হঠাৎ অপহৃত হয়েছে। আপনি কিছু আইডিয়া করতে পারেন? কে, কীভাবে ওকে সরিয়ে ফেলল?

অন্বেষা—না, আমার কাছে ব্যাপারটা খুব mysterious মনে হচ্ছে। তবে সন্দেহটা সবার মতো আমারও রানির ওপরই হচ্ছে। ও আর কারো হেল্প নিয়েছে কি না, সেটা তদন্ত সাপেক্ষ।

প্রশ্ন—আপনি কি কাল কোনো সময় পুকুরঘাটের দিকে গিয়েছিলেন?

অন্বেষা—ওই যখন সবাই মেয়েটাকে খোঁজাখুঁজি করতে করতে পুকুরের জল দেখছিল, তখন আমিও ছিলাম অন্যদের সঙ্গে।

প্রশ্ন—আর একটা কথা, পিকনিকের দিন আপনি কী ড্রেস পরেছিলেন?

অন্বেষা—ব্লু জিনস, পিঙ্ক টপ।

প্রশ্ন—কমলেশবাবু, আপনাকে নিশ্চয়ই সোমেন দত্ত ইনভাইট করেছিলেন?

কমলেশ—হ্যাঁ। সোমেন আমাকে খুব লাইক করে।

প্রশ্ন—আপনি ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলেন। ফটোগ্রাফিটা আপনার হবি, না, প্রফেশান?

কমলেশ—সেন্ট-পারসেন্ট শখ। তবে আমি বেশি ভালোবাসি জন্তু জানোয়ারের ছবি তুলতে। তেমন কিছু সুযোগ ছিল না ওই পিকনিকে।

প্রশ্ন—যে বাচ্চাটি কিডন্যাপড হয়েছে, ওই তুলতুলি নামের মেয়েটির অনেক ছবি আপনি তুলেছেন শুনলাম। ছবিগুলো যদি প্রিন্ট করে দিতে পারেন আজকেই, আমাদের কাজে লাগতে পারে।

কমলেশ—বেশ। আমি আজই বিকেলে আপনাকে দিয়ে দেব।

প্রশ্ন—আপনি কি, বাই এনি চান্স, খাবার পর সেদিন পুকুরঘাটের ওদিকে গিয়েছিলেন?

কমলেশ—না। আমি আনন্দবাবুর গান শুনছিলাম। খুব মজার। হঠাৎ তারপর এমন শোকাবহ ঘটনা ঘটবে, কল্পনা করতে পারি নি।

প্রশ্ন—বসন্ত, তুমি এখানে কত বছর চাকরি করছ?

বসন্ত—সাত বছর, স্যার। দারোয়ান, মালি দুরকম কাজই করি।

প্রশ্ন—তোমার দেশ কোথায়?

বসন্ত—দেউলিয়া, চব্বিশ পরগনা।

প্রশ্ন—সেখানে যাও মাঝে মাঝে?

বসন্ত—হ্যাঁ স্যার, বছরে দু-বার যাই। আমার দুটো ছেলে আছে।

প্রশ্ন—তুমি পিকনিকে ছোটো মেয়েটাকে লক্ষ্য করেছিলে?

বসন্ত—হ্যাঁ দেখেছি।

প্রশ্ন—শেষ কখন দেখেছিলে?

বসন্ত—তা প্রায় আড়াইটের সময়।

প্রশ্ন—কোথায়? কী করছিল সে?

বসন্ত—ছবি আঁকছিল পুকুরঘাটের কাছে।

প্রশ্ন—তার সঙ্গে কেউ ছিল?

বসন্ত—আজ্ঞে।

প্রশ্ন—মেয়েটির সঙ্গে তখন অন্য কে ছিল?

বসন্ত—এক ভদ্রমহিলা। বোধ হয় মেয়েটির মা।

প্রশ্ন—মেয়েটি কি বসে ছবি আঁকছিল?

বসন্ত—বসে? না, একটু শুয়ে পড়েছিল।

প্রশ্ন—তুমি তাকে দূর থেকে দেখেছিলে, না, কাছে গিয়েছিলে?

বসন্ত—একটু দূর থেকে।

প্রশ্ন—কী করে বুঝলে সে ছবি আঁকছিল?

বসন্ত—আগেও দেখেছি ওই খাতায় রং-পেন্সিল দিয়ে দাগ কাটছিল দিদিমণি।

প্রশ্ন—তুমি তার সঙ্গে কোনো কথা বলেছিলে?

বসন্ত—না, আমি তাকে কী বলব?

প্রশ্ন—পুকুরঘাটে মেয়েটিকে শুয়ে থাকতে দেখে তুমি কী করলে?

বসন্ত—আমার কাজ করতে গেলাম। ডালিয়ার চারা পুঁততে লাগলাম।

প্রশ্ন—তুমি যখন শুনলে দিদিমণিকে পাওয়া যাচ্ছে না, তোমার কী মনে হল?

বসন্ত—খুব অবাক লাগল, স্যার, ওইটুকু মেয়ে কোথায় চলে গেল একা একা!

প্রশ্ন—তুমি কোনো অচেনা লোককে পুকুরের আশেপাশে দেখ নি? ভালো করে ভেবে বলো।

বসন্ত—(ভাবার ভান করে) না স্যার, আর কেউ ওদিন ওইদিকে আসা-যাওয়া করে নি। আমি যদ্দূর জানি।

প্রশ্ন—তোমার কি মনে হয় না মেয়েটাকে চুরি করা হয়েছে?

বসন্ত—চুরি কে করবে স্যার? এক আমি করতে পারতাম। কিন্তু আপনারা তো আমার ঘর সার্চ করেছেন। সেখানে কি ছিল দিদিমণি? পুকুরেও ডোবে নি মেয়েটা। আমি নিজে অনেকবার ডুব দিয়ে দেখেছি সবার সামনে।

প্রশ্ন—কিন্তু সেদিন নিশ্চয়ই আর কেউ এসেছিল, যে মেয়েটাকে নিয়ে গেছে। তুমি কোনো চিৎকার বা কান্না কিছু শোনো নি?

বসন্ত—না, স্যার। আমি যা জানি সব বললাম। আর কী বলব?

প্রশ্ন—তোমার ঘর সার্চ করে আলমারির মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। ওটা কোত্থেকে পেলে?

বসন্ত—ওটা আমার মাইনে স্যার। তিন তারিখে মালিক দিয়েছেন।

প্রশ্ন—আনন্দবাবু, শুনলাম আপনি সুগায়ক, প্যারডিও লেখেন। পিকনিকে লোকেদের আনন্দ দিয়েছেন গান গেয়ে। আপনি নিজে কতটা enjoy করলেন?

আনন্দ—সবই তো ঠিকঠাক চলছিল। খাওয়াটাও ভালোই হয়েছিল। শেষে তুলতুলির ঘটনাটা ঘটাতে হরিষে বিষাদ হয়ে গেল!

প্রশ্ন—আপনাকে দত্তরাই পিকনিকে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন?

আনন্দ—হ্যাঁ। আমার একটা বাড়ির পরেই ওঁদের বাড়ি। ওঁরা বললেন, একটু গান-টান না হলে পিকনিক জমে? আমারও কোথাও যাবার ছিল না ওই রোববার। তাই...

প্রশ্ন—আচ্ছা খাবার পর আপনি ক-টার সময় গাইতে আরম্ভ করেন? আর কতক্ষণই বা গেয়েছিলেন?

আনন্দ—যদ্দূর মনে হচ্ছে, আড়াইটেয় শুরু করেছিলাম। তারপর আর ঘড়ি দেখি নি।

প্রশ্ন—তুলতুলিকে আপনি শেষ কখন দেখেছেন?

আনন্দ—খাবার আগে হুটোপুটি করে বেড়াচ্ছিল রানি বলে মেয়েটির সঙ্গে। খাবার পর আর ওকে লক্ষ্য করি নি।

প্রশ্ন—আপনার কি মনে হয় রানিই ওকে নিয়ে সটকে পড়েছে?

আনন্দ—হয় তাই, না হয় অন্য কেউ ওদের দু-জনকেই ধরে নিয়ে গেছে। কোনো কিডন্যাপিং গ্যাং-এর সঙ্গে রানির যোগাযোগ অসম্ভব নয়।

প্রশ্ন—পিকনিকে কারো কোনো আচরণ আপনার অদ্ভুত লেগেছে কি? মনে করার চেষ্টা করুন। মনে কিছু পড়লে আমাকে জানাবেন।

কেটারার বরুণ পাল আর তার সহকারী দীপকের ইন্টারভিউ একই সঙ্গে নিলেন ইন্সপেক্টর।

প্রশ্ন—বরুণবাবু, আপনাদের কি সোমেন দত্তই কাজে লাগিয়ে ছিলেন?

বরুণ—হ্যাঁ। আমরা চেতলারই ছেলে। কিছু অনুষ্ঠানে আমাদের রান্না খেয়ে ওনার ভালো লেগেছিল। তাই বললেন, এবার পিকনিকে কেমন খাওয়াও দেখব।

প্রশ্ন—কী ছিল পিকনিকের মেনু?

বরুণ—খিচুড়ি, ইলিশ মাছ ভাজা, কাশ্মীরি আলুর দম, চিকেন কচৌরি, শেষে মিষ্টি দই।

প্রশ্ন—দই-ও আপনারা সাপ্লাই করেছেন?

বরুণ—না, ওটা মিসেস হাজরা, ওই রোগা লম্বা মতো ভদ্রমহিলা...

প্রশ্ন—মানে, মীনাক্ষী দেবী?

বরুণ—হ্যাঁ। উনি দই এনেছিলেন একটা নীল রঙের কুলিং বক্স-এ।

প্রশ্ন—রান্নাবান্নার ফাঁকে এবং তারপর আপনারা কি বাগানবাড়িটা ঘুরে দেখেছেন? মেয়েটাকে লুকিয়ে রাখার মতো কোনো জায়গা কি আছে?

বরুণ—না, সেরকম কিছুই নেই।

দীপক—আমি তো জায়গাটা বেশ ভালো করেই দেখেছি। আর, খাওয়ার পর অন্য বাসনগুলো কলের জলেই ধুয়েছি। শুধু কড়াটা পুকুরঘাট থেকে মেজে এনেছি।

প্রশ্ন—আচ্ছা দীপকবাবু, আপনি যখন কড়া ধুতে পুকুরঘাটে গেলেন, তুলতুলিকে সেখানে দেখেন নি?

দীপক—না, বাচ্চা মেয়েটি বোধ হয় তার আগেই হারিয়ে গেছে, বা ওকে কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে।

প্রশ্ন—কাউকে দেখেন নি ওই জায়গার কাছে?

দীপক—(একটু ভেবে) পুকুরের উল্টো পাড় দিয়ে একটা লোক ঘুরে আসছিল আমার দিকে।

প্রশ্ন—কে সে, চিনতে পেরেছেন?

দীপক—বাগানবাড়ির কেয়ারটেকার মনে হল।

অমিত নিয়োগীর উদ্যোগ

ইন্সপেক্টর চন্দন চট্টরাজ যখন ভবানী ভবনে পিকনিককারীদের বয়ান নিচ্ছিলেন, সে সময় গোয়েন্দা অমিত নিয়োগী তাঁর সহকারিণী সুমনাকে নিয়ে বারুইপুরের বাগানবাড়িতে সরেজমিনে তদন্ত করে গেলেন।

তার আগেই তিনি তুলতুলির বাবা-মার সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিলেন ঘটনার দিন রাত্রে। শোকে মূহ্যমান নীরা দত্ত বারবার বিলাপ করছিলেন, তাঁর তাস খেলায় ওইভাবে মগ্ন থাকাটা ভীষণ অপরাধ হয়েছে। তাসে আসক্তি একটা পাপ। সেই পাপে তাঁকে মেয়ে হারাতে হল। তিনি সজাগ থাকলে কখনো এই কান্ড ঘটতে পারত না। সোমেনবাবু তাঁকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করে বললেন, দোষ তো তাঁর একার নয়, তাঁরা দুজনেই ভুল করেছেন। কিন্তু সে নিয়ে অনুশোচনা করে কোনো লাভ নেই। কী করে মেয়ে উদ্ধার করা যায় সেটাই ভাবতে হবে। আসলে পাহারা দেবার প্রয়োজনটাই তো বোধ করেনি কেউ। এরকমটা যে হতে পারে একটা বাগানবাড়ির মধ্যে থেকে, তা ধারণা করা যায় নি। ঘটনাটা ঘটে যাবার পর এখন কি করা যায়, সেটাই ঠাণ্ডা মাথায় ভাবতে হবে।

অমিত ওঁদের জিগ্যেস করলেন, ‘মেয়েটাকে কেউ বিদ্বেষের চোখে দেখত বলে আপনাদের সন্দেহ হয়? আগে কখনো কেউ ওর ক্ষতি করার চেষ্টা করেছে কি?’

সোমেন দত্ত বললেন, ‘আপনি বললেন বলে মনে পড়ল। সাত মাস আগে যখন তুলতুলির পাঁচ বছর পূর্তিতে জন্মদিনের অনুষ্ঠান হয়, তাতে ওকে চকোলেট গিফট করেছিল চার-পাঁচ জন। তার মধ্যে একটা বাক্সে গিফটারের নাম ছিল না। তুতুল তা থেকে দুটো চকোলেট খেয়ে প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়ে। পেটে যন্ত্রণা, বমি, প্রায় প্রাণ নিয়ে টানাটানি। ওকে হসপিটালাইজ করতে হয়। সেখানে স্টম্যাক পাম্প করে বিষাক্ত পদার্থ বার করতে হয়। পুলিসে একটা FIR করেছিলাম। বাক্সের বাকি তিনটে চকোলেট ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয় টেস্টের জন্য। দুটিতে কিছু পাওয়া যায় নি। একটিতে পয়জনাস ডাস্ট মেশানো ছিল। পরীক্ষায় জানা গেল সেটি চেরি গাছের বীজ এবং স্টম্যাকে তার প্রতিক্রিয়া বিষময় হয়।’

অমিত—আপনাদের কাউকে সন্দেহ হল না? গেস্টদের মধ্যে কে এ কাজ করে থাকতে পারে?

মাথা নেড়ে সোমেন এবং নীরা দুজনেই জানালেন তাঁদের এ ব্যাপারে কোনো ধারণাই হয় নি এবং এখনো তাঁদের কাছে ব্যাপারটা রহস্যময় রয়ে গেছে।

নীরা কান্না-ধরা গলায় জিগ্যেস করলেন—‘অমিতবাবু, আপনার কি মনে হয় সেদিন যে চকোলেটে বিষ মিশিয়েছিল, সেই তুলতুলকে চুরি করেছে?’

অমিত বললেন, ‘অনেক সময় একটা মিস্ট্রির সঙ্গে আর একটা মিস্ট্রির যোগ থাকে। ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো। আচ্ছা, আর একটা কথা। সেদিন তুলতুলি ড্রইংখাতা আর পেন্সিল নিয়ে গেছিল বললেন, সেগুলো কি পাওয়া গেছে?

সোমেন—না। মেয়ের সঙ্গে ড্রইংখাতা আর পেন্সিলও নিখোঁজ।

বারুইপুরে পিকনিক স্পটে গিয়ে অমিত খানিকক্ষণ কেয়ারটেকার বসন্তের সঙ্গে আলাপ করলেন। যেখানে পিকনিককারীরা বসেছিলেন এবং ঘোরাফেরা করেছেন, সেখানকার জমি আতসকাচ দিয়ে পরীক্ষা করলেন। তারপর গেলেন পুকুরঘাটের দিকে। ঘটনাটা শুনে এবং তাই নিয়ে ভেবে ওঁর মনে হল, এখান থেকেই তুলতুলির রহস্যময় অন্তর্ধান ঘটেছে। অন্তত একজন, বসন্ত, বলেছে, সে তুলতুলিকে পুকুরঘাটে দেখেছে। শুয়ে থাকতে দেখেছে। দ্যাটস আ নোটেবল পয়েন্ট। তুলতুলি কি শানবাঁধানো ঘাটে ঘুমিয়ে পড়েছিল...না তাকে অজ্ঞান করে দিয়েছিল কেউ?...

পুকুরঘাটে গিয়ে সুমনারই প্রথম চোখে পড়ল ছোট্ট বাদামি রং-পেন্সিলটি। বসার চাতালের ধারে একটি ফাটলের মধ্যে আধখানা ঢুকে ছিল। ‘ক্যামলিন’-এর পেন্সিল কুড়িয়ে নিয়ে অমিতকে দেখাল ও—‘দেখুন স্যার, মনে হচ্ছে তুলতুলির হাত থেকেই পড়ে গেছে এটা।’

অমিতের চোখ চকচক করে উঠল। বললেন, ‘ইটস আ প্রুফ, তুলতুলি পুকুরঘাটে এসে ছবি আঁকছিল কিডন্যাপড হবার আগে। আর এও বোঝা যাচ্ছে কিডন্যাপার ওর খাতা পেন্সিল সব সরিয়েছে, কারণ সে চায় না তুলতুলি শেষ কোথায় ছিল সে প্রমাণ রাখতে। বাট আই ওয়ান্ট সাম মোর প্রুফস।’

ঘাটের চারধার দেখার পর অমিত ঘাটের পাশে পাড়ের দিকে নেমে গেলেন ডানদিকে। খানিক নীচু হয়ে দেখলেন এখানে ওখানে আতসকাচ চোখে লাগিয়ে। উঠে এসে বাঁ দিকে নামলেন, একইভাবে এ অঞ্চলটা আতসকাচ দিয়ে নিরীক্ষণ করতে থাকলেন। মিনিট দুয়েক পরে সচমক বলে উঠলেন, ‘হোয়াটস ইট?’ কচুরিপানার মধ্যে পড়ে আছে একটি পরিচিত আইসক্রিম কোম্পানির কাপ!

সুমনা খালি চোখে দেখতে পায় নি। শুধোল, ‘কী স্যার?’

সতর্কভাবে রুমালে জড়িয়ে কাপটা তুলে দেখালেন অমিত। ভিতরে তখনো তলার দিকে একটু আইসক্রিম লেগে আছে।

‘ইট মে বি ইউসফুল, সুমনা! ভাগ্যিস দুদিন বৃষ্টি হয়নি!’ বলতে বলতে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগে সন্তর্পণে সেটা চালান করলেন।

সুমনা বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত। মোটে একটা কাপ কেন দেখা যাবে? পিকনিকে তো অনেক লোক এসেছিল। নাকি, এই আইসক্রিম কেয়ারটেকার খেয়েছে?’

অমিত ফিরে যাবার আগে একবার চেঁচিয়ে ডাকলেন কেয়ারটেকারের ঘরের কাছে গিয়ে। বেরিয়ে এল বসন্ত।

অমিত শুধোলেন, ‘তুমি কি কাল বা পরশু আইসক্রিম খেয়েছিলে?’

বসন্ত থতমত খেয়ে বলল, ‘আইসক্রিম? না স্যার, আমি খাই নি, সেদিন বাবুরা হয়তো কেউ খেয়েছে, বলতে পারব না।’

দত্তদের দুর্ভাবনা

প্রথম দু-দিন মনে হয়েছিল দত্তদের এবং পুলিশেরও, যে ফোন আসবে মুক্তিপণ দাবি করে। তারপর বাবা-মা-র ভয় বাড়তে লাগল, একেবারে দেশের বাইরে পাচার করে দিল নাকি ফুটফুটে কচি মেয়েটাকে। উদ্বেগে দুশ্চিন্তায় নীরা এবং সোমেন দুজনেই অস্থির হয়ে পড়লেন।

ঘটনার চতুর্থ দিন সকালে অর্থাৎ ৮ ফেব্রুয়ারি, সোমেন ও নীরা খুব উদ্বিগ্ন মুখে অমিতের বাড়ি এসে হাজির।

দু-জনেরই প্রশ্ন, অমিত কিছু আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন কি না। ওঁরা ভীষণ আপসেট হয়ে পড়েছেন, কারণ কাল রাত অবধি মুক্তিপণ চেয়ে কোনো ফোন আসে নি।

অমিত বললেন, ‘হতে পারে, আপনারা যখন বাড়ি ছিলেন না, তখন ল্যাণ্ডফোনে কোনো কল এসেছে।’

ওঁরা বললেন, ‘না, কেউ ফোন করে নি। তাহলে CLI-তে নতুন নম্বর উঠে যেত। টাকা চাইলে তবু দেখা যায় সেটা জোগাড় করা সম্ভব কিনা, অন্যথায় মেয়ে ফেরৎ পাবার আশা আরো ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।’ মা ভাবছেন, মেয়েকে বোধহয় আর কোনোদিনই দেখতে পাবেন না। হয়তো তাকে মেরেই ফেলেছে। বাবা ভাবছেন, মেয়েকে হয়তো পাচার করে দিয়েছে কিডন্যাপার দিল্লি বা মুম্বইয়ের রেড লাইট এরিয়ায়। কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে দু-জনের।

অমিত বললেন, ‘অত দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনাদের মানসিক অবস্থা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু আমার মনে হয় আপনাদের মেয়ে এই কলকাতা শহরেই আছে। আর তাকে আমরা শিগগিরই খুঁজে বার করব। কিছুক্ষণ পরেই ফোরেনসিকের লোকেরা যাবে আপনাদের বাড়ি। তুলতুলির ব্যবহার করা বই-খাতা, খেলনা ইত্যাদি থেকে ওর ফিংগারপ্রিন্ট সংগ্রহ করতে। ওদের হেল্প করবেন।...আর আমার ওপর ভরসা রাখুন। আমার ইনটুইশান বলছে খুব ডেঞ্জারাস টাইপের লোকের হাতে তুলতুলি পড়ে নি। আমার ধারণা আপনাদের পরিচিত কোনো লোকই এই কিডন্যাপিং-এর পিছনে আছে, আর তার আইডেনটিটি আমি খুঁজে বার করবই।’

তুলতুলির ছবি, আইসক্রিমের কাপ

ওইদিনই ইন্সপেক্টর চন্দন চট্টরাজের জেরার রিপোর্টটা পড়ে দেখছিলেন অমিত। বললেন, ‘প্রত্যেকের ফিংগার প্রিন্ট নেওয়া হয়েছে তো? আর ওইদিন বেলা দুটো থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত মোবাইলে logging-এর হিসেব?’

ইন্সপেক্টর বললেন, ‘হ্যাঁ। SMS sent and received, মিসড কলস, কলস রিসিভড, নাম্বারস ডায়ালড সব হিসেব নেওয়া হয়েছে।’

অমিত বললেন—‘বিশেষভাবে ক্রুশিয়াল টাইম হচ্ছে আড়াইটে থেকে সাড়ে তিনটে।’

ইন্সপেক্টর—হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওই সময়ের মধ্যে কাবেরী ঘোষের একটা কল আসে। বরুণ পালের একটা মিসড কল। প্রবীর হাজরা একটা SMS পাঠান। সঙ্গে সঙ্গে তার উত্তর আসে। খানিক পরে একটা মিসড কল পান ওনার ওয়াইফের ফোন থেকে। তারপর নিজে মিসড কল দেন সেই নাম্বারে যেখানে খানিক আগে SMS করেছিলেন। আরো ঘণ্টাখানেক বাদে সেই নাম্বার 9433704395 থেকে একটি SMS আসে তাঁর নামে। এখন সার্ভিস প্রভাইডারের কাছ থেকে জানতে হবে প্রবীরবাবু কাকে এত ফোন এবং SMS পাঠালেন, এবং তার এ্যাড্রেসটা কী?

অমিত—রাইট। আচ্ছা, আরেকটা কথা। কমলেশবাবু তুলতুলির ছবিগুলোর প্রিন্ট দিয়েছেন?

ইন্সপেক্টর—হ্যাঁ, উনি দিয়েছেন। দশখানা ছবি আছে। দেখুন।

অমিত সেগুলি নিয়ে নিবিষ্ট মনে দেখতে লাগলেন। হঠাৎ তাঁর দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল একটি ছবিতে কয়েক সেকেণ্ড। তারপর দ্রুত অন্য ছবিগুলির ওপর চোখ বুলিয়ে গেলেন। আবার ফিরে গেলেন ওই বিশেষ ছবিটায়। তারপর ইন্সপেক্টর চট্টরাজকে বললেন—

‘হ্যাভ ইউ নোটিশড দিস পার্টিকুলার ফোটো?’

ইন্সপেক্টর সেটা হাতে নিয়ে খানিক লক্ষ্য করে বললেন, ‘হোয়াট এ্যাবাউট ইট?’

—‘সামথিং ইজ মিসিং দেখছেন না?’

আরো খানিক দেখার পর চট্টরাজের ব্যাপারটা স্ট্রাইক করল।

‘তাই তো! এই ছবিতে তুলতুলির গলার হারটা নেই! তার মানে—’

—‘তার মানে তুলতুলি কিডন্যাপড হবার আগেই তার হার চুরি গেছে! হারের লোভে তাকে চুরি করা হয় নি। অর্থাৎ হার চুরি আর কিডন্যাপিং দুটো আলাদা ক্রাইম। এবং রানি কিডন্যাপারদের সঙ্গে সম্ভবত জড়িত নয়!’

একটা কথা অমিতের হঠাৎ মনে পড়ল। চন্দন বাবুকে শুধোলেন, ‘আচ্ছা এনকোয়ারি থেকে সেদিন পিকনিকের মেনু কি ছিল নিশ্চয়ই জেনেছেন?’

—‘হ্যাঁ। কেটারার স্বয়ং জানিয়েছেন তাঁর স্টেটমেন্টে। দেখুন।’

অমিত দেখলেন—খিচুড়ি, ইলিশ মাছ ভাজা, কাশ্মীরি আলুর দম, চিকেন কচৌরি, শেষে মিষ্টি দই।

তারপর দেখলেন—দইটা মীনাক্ষী হাজরা নিজে এনেছিলেন একটা নীল রঙের কুলিং বক্সে।

বললেন—‘মি. চট্টরাজ, দই যখন ছিল শেষ পাতে, তখন আর আইসক্রিম থাকার কথা নয়।’

চট্টরাজ বললেন—‘না, সেকথা তো কেউ বলেও নি।’

অমিত—কিন্তু আমি পুকুরের ধার থেকে একটা আইসক্রিমের কাপ পেয়েছি, পরিচিত কোয়ালিটি ওয়ালসের। তাতে একটু আইসক্রিম হলুদ রঙের লেগেও ছিল। সেটা ল্যাবে টেস্ট করতে পাঠিয়েছি। আমার মনে হয় ওটা থেকে ইমপর্ট্যান্ট কোনো ক্লু পাওয়া যাবে।

চট্টরাজ বললেন—‘গুড ডিসকভারি! উইশ ইউ সাকসেস!’

হারানো হার মিলল

সত্যিই সেদিন সন্ধেবেলা হারানো হার পাওয়া গেল। সোনার দোকানগুলিতে পুলিশ একটি সার্কুলার পাঠিয়েছিল, কেউ, বিশেষ করে কোনো তরুণী, একটি সোনার হার শুধু বেচতে এলে, তাকে যেন ভালোমতো জেরা করে কেন বেচছে সেসব জেনে নেওয়া হয় এবং দরকার হলে তাকে আটকে রেখে যেন পুলিশে খবর দেওয়া হয়।

বউবাজার থানা থেকে খবর পাওয়া গেল, রানি ও তার প্রেমিক সন্টুকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তারা একটা সোনার দোকানে তুলতুলির ওই হারটা বিক্রি করতে এসেছিল। দোকানদারের সন্দেহ হওয়ায় ওদের বসতে বলে পুলিশে খবর দেয়। দত্তরা জানত রানি ওর দিদি-জামাইবাবুর কাছে থাকে পঞ্চাননতলার বস্তিতে। কিন্তু সেখানে গিয়ে পুলিশ তাকে পায় নি। সে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। তার প্রেমিকের বাড়ি লুকিয়েছিল সম্ভবত। তারপর দু-জনে প্ল্যান করেছিল হার বেচে মোটা টাকা নিয়ে কলকাতা ছেড়ে পালাবে।

সন্ধেবেলা সোমেন আর নীরা গেলেন বউবাজার থানায়।

রানি কাঁদতে কাঁদতে স্বীকার করল, হারটার ওপর তার অনেক দিনের লোভ ছিল। বাগানবাড়িতে শিউলিগাছতলায় কানামাছি খেলতে খেলতে সে তুলতুলির গলা থেকে হারটা খুলে নিয়েছিল। তারপর সবাই যখন খাওয়ায় ব্যস্ত, সে সরে পড়েছিল পিকনিকের জায়গা থেকে। বারুইপুর স্টেশন থেকে ট্রেন ধরে সোজা বালিগঞ্জ স্টেশনে এসে নেমেছিল। তারপর সন্টুর বাড়ি গিয়ে ওঠে। পরে দু-জনে পরামর্শ করে হারটা বেচতে এসেছিল বউবাজারে।

হারটা সনাক্ত করে নীরা বার বার শুধোলেন রানিকে, ‘তুই জানিস না তুতুলকে কে নিয়ে গেছে? সত্যি করে বল, রানি! মেয়েকে যদি ফিরে পাই, আমি তোকে হারটা দিয়ে দেব।’

রানি অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি কি বলছ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুলতুলিকে নিয়ে গেছে, মানে, চুরি করে নিয়ে গেছে মেয়েটাকে?’

সোমেন বললেন, ‘হ্যাঁ। আমরা ভেবেছিলাম হারের লোভে তুই-ই তাকে কোথাও লুকিয়ে রেখেছিস।’

—‘না, বাবু, আমি হার নিয়ে পালিয়েছি বাগানবাড়ি থেকে। তুলতুলি তখন খাচ্ছিল। তারপর আর কিছু জানি না। তোমার গা ছুঁয়ে বলছি, মেয়েটার কোনো ক্ষতি আমি করি নি।’

ন-তারিখ দুপুর বেলা। ফোরেনসিক রিপোর্টের অপেক্ষায় ছিলেন অমিত। সুমনা এল এষাকে নিয়ে।

এষাই শুধোল গোয়েন্দাকে—‘কী বুঝছেন স্যার? অপরাধী কে হতে পারে?’

অমিত বললেন—‘এখন তো বলা যাবে না। আমার একটা হানচ আছে। ফোরেনসিক রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছে সেটা ঠিক, না বেসলেস।

সুমনা বলল—‘শুধু কি কাপের ওপর ফিংগার প্রিন্ট আইডেন্টিফায়েড হবে?’

অমিত বললেন—‘আইসক্রিমটা ডক্টরড হয়েছে কি না, অর্থাৎ, ওর সঙ্গে কিছু মেশানো হয়েছে কি না, টেস্টে তাও জানা যাবে। যদি সে রিপোর্ট পজিটিভ হয়, তবে বুঝব আমার ধারণাই ঠিক। আর তখনই আমরা ধরতে পারব কে এই নাটকের গুরু বা গুর্বী। আর, আমার রিডিং যদি ভুল না হয় তো আসল লোকটি নিজের হাতে কিডন্যাপিং করেন নি। এক বা একাধিক এ্যাকমপ্লিসকে কাজে লাগিয়েছেন।

সুমনা বলল—‘স্যার, এই নাটের গুরুর মোটিভটা কি মনে হয়?’

অমিত—এইটাই আমার মাথায় ঢুকছে না। আয়াম ফিলিং ফক্সড। কারণ সে কোনো মুক্তিপণ দাবি করছে না। অতএব টাকা আদায় করার জন্য কিডন্যাপ করেনি। মার্ডার হলে এর চেয়ে সিম্পলার হোত।

ঠিক তখনি একটা ফোন এল অমিতের।

‘হ্যাঁ, বলুন মি. চট্টরাজ। ফোন কল ট্রেসড হয়েছে? আচ্ছা আমি আসছি আপনার অফিসে।’

অমিত বেরিয়ে গেলেন। সুমনা আর এষা রয়ে গেল। অমিতের স্ত্রী শ্রীময়ী এবং অমিতের মার সঙ্গে গল্প করতে লাগল।

চট্টরাজের অফিসে এসে অমিত দেখলেন সেখানে এক যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। শুনলেন এই ছেলেটির নাম মনোজিৎ রায়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর প্রবীর হাজরার আণ্ডারে ফিলসফি বিভাগে রিসার্চ স্কলার।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ পিকনিকের দিন, বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ মনোজিতের সেলফোনে এস.এম.এস. আসে প্রবীর হাজরার ফোন থেকে—প্রগ্রেসিং?

মনোজিত উত্তর দেয়—ইয়েস!

বেলা দুটো চল্লিশে প্রবীরবাবু মনোজিৎকে একটা মিসড কল দেন। বিকেল চারটে দশে মনোজিৎ প্রবীর বাবুকে SMS করে—ডেলিভারড।

চট্টরাজ প্রশ্ন করলেন—‘প্রবীরবাবু কোন প্রগ্রেসের কথা জিগ্যেস করছিলেন?’

মনোজিৎ বলল, ‘আমার রিসার্চের কাজ কেমন এগোচ্ছে, সেটাই জানতে চাইছিলেন। কিছুদিন শরীর ভালো ছিল না বলে পড়াশুনো করতে পারি নি। তাই।’

প্রশ্ন—মিসড কলটার রহস্য?

মনোজিৎ—আমি রাস্তায় ছিলাম। নানান আওয়াজে ফোনের রিং শুনতে পাইনি।

অমিত—আর তোমার ‘ডেলিভারড’ মানে? কীসের ডেলিভারি?

মনোজিৎ—ও একটা, ইয়ে, জার্নাল...স্যারের বন্ধুর বাড়ি পৌঁছে দিতে বলেছিলেন।

চট্টরাজ—বন্ধুর নাম?

মনোজিৎ—শো-শোভনবাবু।

চট্টরাজ—আচ্ছা। তুমি আমাদের না জানিয়ে স্টেশন লিভ করবে না। মনে হচ্ছে তোমাকে আবার ডাকতে হবে।

কমলেশের সন্দেহ

ন-তারিখেই রাত প্রায় ন-টার সময় হঠাৎ কমলেশবাবু এসে হাজির হলেন অমিতের বাড়ি।

‘অমিতবাবু, আপনাকে একটা ইমপর্ট্যান্ট কথা জানাতে এলাম। আমার ভেবে ভেবে মনে হল, এটাই হয়েছে।’

‘কি হয়েছে?’

‘কল্লোল আর কাবেরী ঘোষ এসেছিল একটা পদ্মিনী প্রিমিয়ারে। গাড়িটার জানলায় কুচকুচে কালো কাচ। ভেতরটা কিছু দেখা যায় না। আমার মনে হয় কল্লোলবাবুই কোনো এক সময়ে মেয়েটাকে গাড়িতে তুলে মুখে টেপ লাগিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখেছিল। তারপর যখন তুলতুলিকে খুঁজে না পেয়ে সবাই যে যার বাড়ি রওনা দিল, ওরাও মেয়েটাকে নিয়ে সরে পড়েছে।’

‘কেন? আপনার এরকম সন্দেহ হল কেন?

‘আরে বাবা, এ-তো সোজা কথা। মেয়েটা তো ম্যাজিকে ভ্যানিশ হয়ে যেতে পারে না। পারে কি?’

‘না, তা পারে না! দলে পি.সি. সরকার থাকলে একটা চান্স থাকত।’

‘তবে? তাহলে মেয়েটা গেল কোথায়? যে তিনটে গাড়ি গিয়েছিল তারই একটার মধ্যেই তার থাকার কথা। একটা টাটা-সুমোতে দত্ত ফ্যামিলির লোক ছিল, সেটাতে তুলতুলিকে তোলার কোনো মানে হয় না। একটা মারুতি-সুজুকিতে হাজরারা ছিল। তার জানলা দিয়ে সব কিছু দেখা যায়। তাহলে বাকি রইল ওই সাসপিশাস পদ্মিনী প্রিমিয়ার।’

‘কিন্তু ঘোষ দম্পতির ওপর আপনার সন্দেহটা পড়ল কেন?’

—‘আমি স্যার একটু ফিজিওগনমিকাল স্টাডি করি। মানে, চেহারা দেখে মানুষের চরিত্র কেমন হতে পারে, সেই নিয়ে চর্চা। ওই কল্লোল ঘোষ লোকটিকে লক্ষ্য করে দেখবেন, শক্ত চোয়ালটা কেমন সামনের দিকে এগিয়ে এসেছে। একটা নিষ্ঠুর ভাব। আর ওর বউকে অনেকটা হিন্দি ফিলম-এর ভ্যাম্প বিন্দুর মতো দেখতে। এ স্যার খতরনাক পেয়ার হতে পারে!’

অমিত হাসি চেপে বললেন, ‘আপনার সাজেশশানের জন্য ধন্যবাদ। আমরা অবশ্যই ওদের ব্যাপারে ইনভেস্টিগেট করব। আচ্ছা, গুড নাইট!’

‘গুড নাইট, স্যার। ওদের বাড়ি সার্চ করবেন, গ্যারেজটাও সার্চ করবেন।’

দরজা বন্ধ করতে করতে অমিত আপন মনে হাসলেন। বললেন, ‘এ যে সেকেণ্ড জটায়ু। সবই হাইলি সাশপিশাস দেখছে!’

অপরাধী সনাক্ত

টেনথ ফেব্রুয়ারি ল্যাবরেটারি থেকে রিপোর্ট অমিতের কাছে পৌঁছল।

তৎক্ষণাৎ উনি সুমনা আর ইন্সপেক্টর চট্টরাজকে জানালেন, ‘আই হ্যাভ ডিটেকটেড দা কালপ্রিট!’

সুমনাই আগে এসে হাজির হল অমিতের বাড়ি। এসেই বলল, ‘স্যার বলুন কী ব্যাপার?’

অমিত বললেন, ‘চট্টরাজকে আসতে দাও, একসঙ্গে শুনো। মোদ্দা কথা হল আসল লোকটিকে সনাক্ত করা গেছে।’

সুমনা কৌতূহল চাপতে না পেরে বলল, ‘হু ইজ হি?’

অমিত বললেন, ‘দ্য মেইন কালপ্রিট ইজ আ শী!’

—‘এ্যাঁ!’

—‘হ্যাঁ। একজন প্রমিনেন্ট মহিলা, যিনি পিকনিকের অন্যতম পান্ডা ছিলেন।’

বলতে বলতে চট্টরাজ এসে গেলেন। ঢুকতেই ঢুকতেই বললেন, ‘বলুন স্যার!’

অমিত বললেন, ‘খবর হল আমার দুটো এক্সপেকটেশানই মিলে গেছে। যা আমি আশঙ্কা করেছিলাম, টেস্টে ধরা পড়েছে আইসক্রিমে কড়া ডোজের স্লিপিং পিলের গুঁড়ো মেশানো ছিল। এই হল এক নম্বর। আর দু-নম্বর হল, ফিংগার প্রিন্ট ভেরিফিকেশানে জানা গেছে, ছোটোগুলো তুলতুলির আর বড়োগুলো মীনাক্ষী হাজরার!’

—‘আই সী! তাহলে তো ওই মহিলাকে এখনই কাস্টডিতে নেয়া যায়!’

—‘ইয়েস। কীভাবে ঘটনাটা ঘটেছিল তা এখন অনেকটা আঁচ করতে পারছি। কিন্তু আলটিমেটলি মেয়েটাকে ট্রেস করা এবং উদ্ধার করা দরকার। আমি আঁচ করছিলাম এই মীনাক্ষীই কিডন্যাপের মূলে আছেন। ব্যাপারটা ওনারই প্ল্যান করা। ওনারই ভগ্নিপতির বাগানবাড়িতে পিকনিকটা উনি এ্যারেঞ্জ করেছিলেন। ওই বাড়ি এবং তৎসংলগ্ন এলাকার সঙ্গে উনি ভালোরকম পরিচিত। কেয়ারটেকারের সঙ্গেও উনি ষড়যন্ত্র করেছেন ডেফিনিটলি। একজন বলিষ্ঠ পুরুষ না থাকলে মেয়েটাকে দ্রুত রিমুভ করা মুশকিল হত ওনার পক্ষে। ওনার হাজব্যাণ্ড ওই সময় তাস খেলছিলেন। কিন্তু নি:সন্দেহে তিনি কোনো না কোনোভাবে এ ব্যাপারে জড়িত। ওনার মোবাইলেই সম্ভবত সে রহস্য নিহিত রয়েছে। একটা কথা শুধু বুঝতে পারছি না, এতবড়ো অপরাধটা কেন করতে গেলেন এঁরা? সেটা মীনাক্ষীর নিজের মুখ থেকেই জানতে হবে।’

‘তাহলে এখনই মি. ও মিসেস হাজরাকে এ্যারেস্ট করছি!’ বলে ব্যস্তভাবে উঠে দাঁড়ালেন চট্টরাজ।

অমিত বললেন, ‘আর ওই মনোজিৎ ছোকরাকেও তলব করুন। সেই সঙ্গে কেয়ারটেকার বসন্তকেও জেরার জন্য ডাকুন। ওরা প্রাথমিক জেরায় মিথ্যে কথা বলেছে।’

যাবার জন্য পা বাড়িয়েও ফিরে এলেন চট্টরাজ। বললেন, ‘মি. নিয়োগী, আসল ক্লুটা আপনিই স্পট করেছেন। আপনিও আমার সঙ্গে হাজরাদের বাড়ি এলে ভালো হয়। পার্টি খুব টাফ নাট বলে মনে হয়।’

অমিত বললেন, ‘এক কাজ করুন। একেবারে এ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট হাতে নিয়েই চলুন!’

তাই হল। ঘণ্টাখানেক বাদে পুলিশের গাড়ি এসে থামল হাজরাদের লেক রোডের বাড়ির সামনে।

স্বীকারোক্তি

পুলিশ দেখে মীনাক্ষীই দরজা খুলে দিলেন। নিজেই প্রথমে ঠাণ্ডা গলায় প্রশ্ন করলেন—‘কি? রানিকে ধরা গেছে? তুলতুলিকে পেলেন?’

চট্টরাজ বললেন, ‘রানিকে ধরার সঙ্গে তুলতুলিকে পাবার কোনো লিঙ্ক নেই মিসেস হাজরা। রানি এ্যারেস্টেড হয়েছে, সোনার হারটা পাওয়া গেছে তার কাছ থেকে। কিন্তু সে খবর দেবার জন্য আমরা আপনার বাড়ি আসিনি।’

মীনাক্ষী তীব্র স্বরে বললেন, তবে?

অমিত বললেন, ‘পুলিশ আপনাকে এ্যারেস্ট করতে এসেছে, মীনাক্ষী দেবী! আপনিই জানেন কোথায় তুলতুলিকে লুকিয়ে রেখেছেন।’

মীনাক্ষী এক মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেলেও সামলে নিয়ে গলা চড়িয়ে বললেন, ‘আপনাদের কি মাথা খারাপ হয়েছে? তুলতুলিকে কিডন্যাপ করব আমি! আমিই যদি করব, তা হলে তো তার সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও বাগানবাড়ি থেকে ভ্যানিশ হতে হত। পিকনিকের লোকদের জিগ্যেস করুন, আমি খাবার পর থেকে সারাক্ষণ ওখানেই ছিলাম। আনন্দবাবুর গান শুনছিলাম, যতক্ষণ না জানা গেল যে, মেয়েটাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। আমিই কেয়ারটেকারকে বললুম পুকুরে নেমে দেখতে, যদি মেয়েটা জলে পড়ে গিয়ে থাকে। আর এখন আপনারা বলছেন আমি কিডন্যাপার! আমি মেয়েটাকে চুরি করে আটকে রেখেছি! বেশ তো সার্চ করুন আমার বাড়ি! আশ্চর্য! আমি তাকে কেন ধরে রাখতে যাব? কদিনই বা ধরে রাখতে পারব!...’

কিডন্যাপিংয়ের মূল পান্ডা মীনাক্ষী হাজরাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ...

চট্টরাজ একজন এ.এস.আই. এবং একজন মহিলা পুলিশ নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ইঙ্গিতে তারা বাড়িতে ঢুকে প্রতিটি ঘর তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান চালাল। কিন্তু তুলতুলির কোনো হদিশ মিলল না।

অমিত বললেন, ‘অ্যায়াম সরি, মীনাক্ষী দেবী। আপনার বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ আছে বলেই পুলিশ এ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট নিয়ে এসেছে। আর আপনার সঙ্গে আপনার হাজব্যাণ্ডও কিডন্যাপিং-এর ব্যাপারে জড়িত, একথা বোঝা গেছে। আপনি তুলতুলিকে পুকুরঘাটে নিয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত তাকে বলেছিলেন ওইখানকার সিনারি খুব ভালো ছবি আঁকার মতো। তারপর সে যখন আঁকছিল, আপনি তাকে আইসক্রিমের কাপ বার করে দিলেন। জানতেন সে আইসক্রিম খেতে খুব ভালোবাসে...’

মীনাক্ষী বাধা দিয়ে বললেন, ‘রাবিশ! আইসক্রিম কোত্থেকে আসবে বারুইপুরে! আমরা শেষ পাতে মিষ্টি দই খেয়েছিলাম। যারা ছিল, সবাইকে আপনি জিগ্যেস করে দেখুন। আমিই সেই দই নিয়ে গেছিলাম। আইসক্রিমের কোনো পাট ছিল না।’

অমিত বললেন, ‘ওটাই তো আপনার মাস্টার স্ট্রোক! মীনাক্ষী দেবী, আমরা জানি আপনি মিষ্টি দই নিয়ে গেছিলেন। একটা নীল রঙের কুলিং বক্সে। তাই তো?’

মীনাক্ষী—একজ্যাক্টলি!

অমিত—টু বি মোর এগজ্যাক্ট, সেই কুলিং বাক্সে দইয়ের হাঁড়ির সঙ্গে আপনি কোয়ালিটি আইসক্রিমের একটা কাপও নিয়েছিলেন। আর, সেই আইসক্রিমে আপনি মেহনত করে খুব দক্ষতার সঙ্গে স্ট্রং স্লিপিং ট্যাবলেটের গুঁড়ো মিশিয়ে দিয়েছিলেন। বাচ্চা মেয়েটা তাই খেয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে। আমাদের ভয় হচ্ছে, মেয়েটা এর পর প্রাণে বেঁচে আছে কি না...’

মীনাক্ষী ঠোঁট চেটে ঢোক গিলে বললেন, ‘এসব কী বলছেন আপনি? আমি এসব করেছি এমন প্রমাণ দিতে পারবেন? আমি...আমি আপনাদের এগেন্সটে মানহানির মামলা করতে পারি, জানেন?’

অমিত—আপনি এখন পুলিশ কাস্টডিতে যাবেন। কারণ সেই আইসক্রিমের কাপ, যা আপনি কার্যোদ্ধারের পর পুকুরপাড়ে কচুবনে ফেলে দিয়েছিলেন, সেটি উদ্ধার করা গেছে। ল্যাবরেটরি টেস্টে তাতে লেগে থাকা আইসক্রিমে স্লিপিং ট্যাবলেটের গুঁড়ো পাওয়া গেছে। আর, সবচেয়ে বড়ো কথা, কাপের গায়ে যে ফিংগার প্রিন্ট পাওয়া গেছে সেটা আপনার সঙ্গে বিলকুল ম্যাচ করে গেছে। অতএব প্রথমেই আপনি—’

চট্টরাজ বলে উঠলেন—‘এ্যাটেম্পট টু মার্ডার-এর জন্য IPC 307 ধারায় পড়ছেন, তারপর কিডন্যাপিং এর জন্য IPC 359 আপনার ওপর প্রযোজ্য হবে।’

অমিত বললেন, ‘শুধু এইবার নয়, প্রায় একই রকম modus operandi থেকে বোঝা যাচ্ছে আপনিই কয়েক মাস আগে তুলতুলির জন্মদিনে তাকে বিষাক্ত চকোলেট দিয়ে মারতে চেয়েছিলেন। সেবার আপনাকে সনাক্ত করা যায় নি। মেয়েটি প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় ওর বাবা-মা কেসটা নিয়ে আর পারস্যু করেন নি! একটা কথা আমি বুঝতে পারছি না, মেয়েটার ওপর আপনার এত আক্রোশ কেন? কী ক্ষতি আপনার করেছে ওই দুধের শিশু?’

মীনাক্ষীর চোখ-মুখ হিংস্র হয়ে উঠল। বললেন, ‘হ্যাঁ। মেয়েটা বাটারস্কচ খেতে ভালোবাসে। ওষুধটার রং-ও হলুদ। বেশ মিশে গেল। আমি ওকে আইসক্রিমে স্লিপিং ট্যাবলেটের গুঁড়ো মিশিয়ে খাইয়ে অজ্ঞান করেছি। হ্যাঁ, আমিই ওর চকোলেটে মিশিয়ে ছিলাম চেরিবীজের গুঁড়ো। কারণ নীরা আর সোমেনের এই সন্তানসুখ আমার মতো নি:সন্তানের পক্ষে দুঃসহ। আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে ডিফারেন্স হল, ওদের ফুটফুটে মেয়ে আছে, আর আমার কোনো সন্তান হল না। গাড়ি, বাড়ি, ওদের মতো আমাদেরও আছে। আমার হাজবাণ্ড-ও অনেক টাকা রোজগার করেন। প্রফেসর বলে সম্মানও আছে। কিন্তু আমি হেরে গেছি ওই এক জায়গায়। জানেন না, নীরা আমাকে কী অনুকম্পার চোখে দেখে। কথায় কথায় বলে, তোমরা ঝাড়া-হাত-পা নির্ঝঞ্ঝাট কপোত-কপোতী, মেয়ে থাকার যে কী ঝক্কি তা তো বোঝো না! মায়ের মন যে কী জিনিস, সে আমি কোনোদিন বুঝব না। চিরকাল ওর করুণার পাত্রী হয়ে থাকব। ব্যাপারটা অসহ্য হয়ে উঠেছিল আমার কাছে। সত্যিই ঈর্ষায় আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। তাই ঠিক করেছিলাম, ওই সোহাগের মেয়ে হারালে মায়ের কী অবস্থা হয়, আমি দেখব। হা-হা-হা এই কদিনে আমার সে সাধ মিটেছে। নীরার সমস্ত গর্ব আমি চূর্ণ করে দিতে পেরেছি!...’

অমিত বললেন, ‘এই ঈর্ষার পাগলামি না-করে আপনারা তো কোনো বাচ্চা এ্যাডপ্ট করতে পারতেন—’

এমন সময় বাড়ির সামনে একটা মোটর এসে থামল। তা থেকে নামলেন গৃহকর্তা প্রবীরবাবু। উনি ফিরলেন মার্কেটিং সেরে। ড্রইংরুমে ঢুকেই দৃশ্যটা দেখে থমকালেন। তারপর মুখ দিয়ে বেরুল, ‘কী ব্যাপার?’

চট্টরাজ বললেন, ‘ব্যাপার হল, আপনাদের সব প্ল্যান ফাঁস হয়ে গেছে। আপনার ওয়াইফ কনফেস করেছেন উনি তুলতুলিকে ওষুধ-মেশানো আইসক্রিম খাইয়ে বেহুঁশ করেছিলেন গত রবিবার বাগানবাড়ির পুকুরঘাটে। আর, আপনার মেবাইলের লগ চার্ট থেকে বোঝা গেছে আপনি এরপর একজনকে মিসড কল দেন, যাতে সে অচেতন তুলতুলিকে নিয়ে ওই অঞ্চল থেকে সরে পড়তে পারে। ওই একই নাম্বরে আপনি এর ঘণ্টাখানেক আগে SMS করেছিলেন। আমরা জানতে পেরেছি সেটি আপনার এক রিসার্চ ফেলোর নাম্বার। ছেলেটির নাম মনোজিৎ রায়। তার ঠিকানা জোগাড় করে আমরা তাকে ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। সুতরাং বুঝতে পারছেন দ্য গেম ইজ আপ। আপনাদের দু-জনকেই এখন পুলিশ কাস্টডিতে নেওয়া হবে। এটা আনবেলেবল অফেন্স। একজন অধ্যাপক হয়ে আপনি কী করে এ কাজ করলেন? আপনার উচিত ছিল স্ত্রীকে সাহায্য না করে এই অপরাধ থেকে তাকে যে-কোনো ভাবে নিবৃত্ত করা।’

প্রবীরবাবু অধোবদনে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন নীরবে।

অমিত বললেন, ‘যদিও বসন্তকে উত্তম-মধ্যম দিলে সবই বিশদে জানা যাবে এবং সে ব্যবস্থাও অলরেডি হয়েছে, তবু, মীনাক্ষী দেবী, আপনার মুখ থেকে জানতে ইচ্ছে করছে, তুলতুলি অজ্ঞান হবার পর আপনি কি করলেন?’

মীনাক্ষী বললেন, ‘কাজটা অনেক সহজ হয়ে গেছলো রানি হারটা চুরি করে সটকে পড়ায়। ইন ফ্যাক্ট আমি যাচ্ছিলাম ওর সঙ্গে একটা প্যাক্ট করতে। এমন সময় দেখি শিউলিগাছের নীচে ও তুলতুলির হারটা কুট করে খুলে নিয়ে নিজের জিনসের পকেটে পুরছে। বুঝলাম ও আর তুলতুলিকে গার্ড দেবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওই তল্লাট ছেড়ে পালাবে। আমি বসন্তকে পুকুরের কাছেই থাকতে বলেছিলাম। তুলতুলি ঘুমিয়ে পড়তেই ও মেয়েটাকে উঠিয়ে নিয়ে গেল পিছনের গেট দিয়ে বাড়ির বাইরে।’

অমিত বললেন, ‘আপনি সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যানমাফিক আপনার হাজব্যাণ্ডকে দিলেন একটা মিসড কল।’

—‘হ্যাঁ। আর তাড়াতাড়ি এসে বসে পড়লাম গানের আসরে।

চট্টরাজ বললেন, ‘বসন্তকে কত টাকা দিয়েছেন? পাঁচ হাজার?’

মীনাক্ষী বললেন, ‘হ্যাঁ। আরও দুই দেবার কথা আছে।’

অমিত বললেন, ‘আশ্চর্য! আপনি কি কোনোদিন শোনেননি কথাটা, Crime does not pay? অবশ্য কোন ক্রিমিনালই বা মনে রাখে নীতিকথা! তাহলে তো ক্রাইমই হোত না জগতে!’

আবার মনোজিৎ

চট্টরাজের অফিসে ঢুকেই অমিত দেখলেন মনোজিৎ মুখ নীচু করে বসে আছে।

চট্টরাজ চড়া গলায় বললেন, ‘তোমার সাহস তো কম নয়, ছোকরা, আগের বার দিব্যি হিজিবিজি বলে পুলিশকে ধাপ্পা দিলে! থার্ড ডিগ্রি বলে একটা কথা আছে, শুনেছ? সেটা এবার তোমার ওপর এ্যাপ্লাই করব, যদি সিধে আমাদের তুলতুলির কাছে না নিয়ে চল। কোথায় রেখেছ তাকে? তোমার বাড়িতে?’

মনোজিৎ কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘না, স্যার, আ-আমার বাড়িতে কোথায় রাখব? বাবা, আমি, আর এক বুড়ি ঝি ছাড়া কেউ থাকে না। মা আমার ছোটেবেলায় মারা গেছেন। আমার বাবা নামী ডাক্তার, জানতে পারলে চাবকে আমার মাংস তুলে নেবেন। ...আমার এক বন্ধুর বাড়ি রেখেছি বাচ্চাটিকে। তার একটা ছোটো ছেলে আছে। ওরা বাচ্চা ডিল করতে জানে। তাই ওখানেই গেলাম বিপদে পড়ে।’

চট্টরাজ বললেন, ‘যাতে তারাও বিপদে পড়ে! চমৎকার বন্ধু তুমি! যাক, এখুনি আমাদের সেখানে নিয়ে চলো। জায়গাটা কোথায়?’

—‘সন্তোষপুর। 31B, সাউথ রোড।’

দু-মিনিটের মধ্যে চট্টরাজ, অমিত, মনোজিৎ এবং একজন এ.এস.আই.কে নিয়ে পুলিশের জিপ ছুটে চলল সন্তোষপুরের দিকে।

যেতে যেতে অমিত মনোজিৎকে বললেন, ‘তুমি এই খারাপ কাজটা করলে কেন? প্রফেসর বলল, আর অমনি তুমি রাজি হয়ে গেলে এত বড়ো বে-আইনি এবং অমানবিক কাজের শরিক হতে!’

মনোজিৎ বলল, ‘আপনি জানেন না, স্যার, রিসার্চ ফেলোরা সুপারভাইজারের মর্জির কাছে কতখানি অসহায়। উনি খুশি না হলে কোনোদিন আমি পি.এইচ.ডি. হতে পারব না। দু-একজন exception ছাড়া অধিকাংশ সুপারভাইজাররা তাদের ফেলোদের দিয়ে দোকান-বাজার থেকে ফ্যামিলির সব রকম কাজ করিয়ে নেন। প্রফেসর হাজরা আমাকে কোনোদিন তেমন আনপ্লেজেন্ট বেগার খাটান নি। তাই এই কাজটা আমাকে যখন মিনতি করে বললেন, ‘না’ বলতে পারলাম না। তাছাড়া উনি বললেন, কাজটা করে দিলে ছ-মাসের মধ্যে আমার থিসিসটা উনি এ্যাপ্রুভ করে দেবেন। সো আই হ্যাড টু ডু ইট! আগের দিন আমাকে উনি গাড়িতে নিয়ে এসে দেখিয়ে গেছিলেন, ঠিক কোথায় পার্ক করতে হবে।’

সুকান্ত সেতু পেরিয়ে সন্তোষপুরে ঢুকে জিপটা যখন বটতলায় এল, মনোজিৎ চেঁচিয়ে উঠল—‘থামুন, ড্রাইভার সাব। ওই যে স্যার, আমার বন্ধু নির্মল। চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে। ওর বাড়িতেই আমরা যাচ্ছি।’

ড্রাইভার গাড়ি থামাল। নির্মলকে ডাকল মনোজিৎ। অমিত বললেন, ‘উঠে পড়ুন, আপনার বাড়িতেই যাচ্ছি আমরা।’

নির্মল সমাচার

নির্মল চট্টরাজকে বললেন, ‘আপনারা বাচ্চা মেয়েটির খোঁজে এসেছেন তো? ভালোমানুষ-সাজা আমার বন্ধুটি আমাকে কী সাংঘাতিক বিপদে ফেলেছে, আমি দু-দিন পরে বুঝলাম, খবরের কাগজে ‘শিশুকন্যা অপহৃত’ নিউজটা পড়ে। আমি, ইনফ্যাক্ট, আজই পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতাম। ভালোই হয়েছে তার আগেই আপনারা এসে পড়েছেন। বিশ্বাস করুন, আমি ধারণা করতে পারিনি মনোজিতের মতো ছেলে এমন কাজ করবে। আমাকে এসে বলল, ভাই তোর কাছে এসেছি একটা অনুরোধ নিয়ে। এই মেয়েটিকে দুদিন দেখতে হবে। এর বাবা-মা দুজনেই এ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। শক লেগে মেয়েটি আনকনশাস হয়ে আছে। খানিক বাদে জ্ঞান ফিরে আসবে। প্লিজ তোদের কাছে রাখ দুদিন। তারপর আমি এসে নিয়ে যাব। এই বলে এক মুহূর্ত না-বসে বেরিয়ে গেল আমার বাড়ি থেকে। এদিকে আমরা দেখলাম মেয়েটা একটা ঘোরের মধ্যে রয়েছে, শারীরিক কষ্টও হচ্ছে মনে হল। প্রায় ঘণ্টা তিনেক বাদে জ্ঞান ফিরল। তারপর কান্নাকাটি শুরু করল। কিছু খাওয়াতে পারি না। শুধু বলে, কষ্ট হচ্ছে...আমি কোথায়? বোঝাই যাচ্ছে ভদ্রঘরের ফুটফুটে মেয়ে। ডাক্তার ডেকে আনলাম। উনি বললেন, মনে হচ্ছে কিছু ড্রাগ রিএ্যাকশন হয়েছে। একটা ড্রপ দিয়ে বললেন, দু-ঘণ্টা অন্তর খাওয়ালে ঠিক হয়ে যাবে। দু-দিন, পুরো দু-দিন মেয়েটি বিছানা ছেড়ে ওঠে নি। সবে কাল থেকে একটু নর্মাল হয়েছে। মা-বাবার কাছে যেতে চাইছে। আমার ছেলের সঙ্গে একটু খেলাও করছে।’

চট্টরাজ বললেন, ‘বুঝেছি, আপনার কোনো দোষ নেই। তবে কেসটা তো কোর্টে উঠবে। সাক্ষী হিসেবে আপনাকে তলব করা হবে। তাই আমাদের পারমিশন না-নিয়ে কলকাতার বাইরে যাবেন না।’

অমিত বললেন, ‘যাক বাচ্চাটা ভালো আছে, এটাই বড়ো কথা।’

নির্মলের বাড়ি গিয়ে দেখা গেল, ওঁর স্ত্রী অঞ্জনা নিজের ছেলে আর পরের মেয়ের সঙ্গে মজিয়ে গল্প করছেন। পুলিশ দেখে প্রথমে একটু অস্বস্তি বোধ করলেন অঞ্জনা। তারপর মনোজিৎকে দেখে ব্যাপারটা খানিক বুঝলেন।

অমিত অঞ্জনাকে বললেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ, মেয়েটিকে ভালোভাবে রেখেছেন। এখন অনুমতি করুন ওকে ওর মার কাছে নিয়ে যাই।’

তুলতুলির গাল টিপে বললেন, ‘চল, মামণি, এবার বাড়ি চল।’

অঞ্জনা বললেন, ‘এই ফ্রকটা আমরা কিনেছি ওর জন্য। ওর নীল জামাটা আর ড্রইংখাতা, প্যাস্টেল, এসব আমি একটা ক্যারি ব্যাগে দিয়ে দিচ্ছি।’

প্রায় তৎক্ষণাৎ পুলিশের জিপ তুলতুলিকে নিয়ে রওনা হল চেতলার দিকে। তার আগে একটা ট্যাক্সিতে মনোজিৎকে নিয়ে এ.এস.আই. চললেন পুলিশ কাস্টডিতে। যাবার আগে অমিত বললেন, ‘শোনো মনোজিৎ, তোমার এখুনি জামিন হওয়া মুশকিল, কারণ তুমি মেয়েটাকে গাড়িতে করে সন্তোষপুর অবধি এনেছ। তবে, আসল দোষটা যে তোমার নয়, সেটা প্রমাণ করার জন্য তোমার হয়ে লড়তে একজন ভালো উকিল আমি ঠিক করে দেব। ডোন্ট ওরি!’

বাড়িতে গিয়েই তুলতুলি ঝাঁপিয়ে পড়ল মায়ের বুকে।

সবজিবাগান লেনের দত্ত বাড়িতে ক-দিনের জমা আঁধার কেটে গিয়ে আলোর বন্যা বইল। খুশিতে ডগমগ সোমেন দত্ত। অমিতের দু-হাত ধরে অভিনন্দন আর কৃতজ্ঞতা জানালেন।

অমিত বললেন, ‘আদালত দোষীদের ক-বছর দন্ড শোনাবে জানি না। আমার কাজ সুসম্পন্ন। ভালোয় ভালোয় মায়ের কাছে মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি। ওদের মুখে খুশির হাসি দেখেই আমার বুক ভরে গেছে। এই কেস থেকে আমি কোনো ফিস চাই না!’

অধ্যায় ৬ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%