অরুণোদয় ভট্টাচার্য
যুগপৎ মা-শিশুর অস্বাভাবিক মৃত্যু
দিনের যেকোনো সময় পঞ্চাশ মিনিট যোগাসনের অভ্যাসটা চালিয়ে যান অমিত নিয়োগী। ফেব্রুয়ারির প্রথম সন্ধ্যায় তারই শেষে দীর্ঘ শবাসনে রিল্যাক্স করছিলেন। হঠাৎ ভাইব্রেটারে রাখা সেলফোনটা টেবলে ভোঁ-ভোঁ চাপা আর্তনাদ করতে করতে এপাশ-ওপাশ অস্থিরভাবে নড়তে লাগল। যেন মারাত্মক আঘাতে লুটিয়ে পড়া কোনো মুমূর্ষু লোকের অন্তিম ছটফটানি।
শয্যা ছেড়ে উঠে ফোন ধরলেন গোয়েন্দা।
‘হ্যালো!’
‘অমিতবাবু বলছেন তো?’
‘হ্যাঁ। আপনি?’
‘আমি প্রকাশ রক্ষিত। কোলাঘাট থেকে। আপনি লাস্ট ইয়ার আমাদের এখানে পিকনিকে...’
‘ও, হ্যাঁ, হ্যাঁ। খুব এনজয় করেছিলাম। আর আপনার হসপিটালিটির তো কোনো তুলনা হয় না। যা ইলিশ খাইয়েছিলেন... বলুন কী খবর? এনিথিং ইন মাই লাইন?’
‘হ্যাঁ, অমিতবাবু, খুব ট্র্যাজিক ঘটনা। কাল গড়িয়ায় আমার একমাত্র বোন এবং কচি ভাগনে নিজেদের ফ্ল্যাটের মধ্যে ভীষণ দুঃখজনক পরিস্থিতিতে মারা গেছে, একই সঙ্গে। আমি এইমাত্র মর্গে বডি দেখে এলাম। ...ঘটনাটা ওপর ওপর যা মনে হচ্ছে, তা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না...’
‘আপনি কি ফাউল-প্লে সাসপেক্ট করছেন?’
‘সাসপেক্ট নয়, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওদের খুন করা হয়েছে। তাই পুলিশ নয়, আপনার সাহায্যের প্রয়োজন। আমি কি এক ঘন্টা বাদে আসতে পারি আপনার বাড়ি, বিস্তারিত কথা বলার জন্য?’
এক পলক ঘড়ির দিকে চেয়ে অমিত বললেন, ‘ও, সিওর! আপনি অ্যাড্রেসটা চিনতে পারবেন তো? একডালিয়ার মোড়ে যে-কোনো দোকানে আমার নাম বললেই দেখিয়ে দেবে!’
ফোনটা ডিসকানেক্ট করে অমিত কয়েক মুহূর্ত ভাবলেন, কলকাতা শহরে জন্ম-মৃত্যুর রেসিয়োটা এখন কত: ৬০-৪০ না ৭০-৩০? অবশ্য তিনি জানেন এর ঠিক উত্তর কোথাও মিলবে না, কারণ অফিসিয়াল হিসেবের বাইরে অনেকটা থেকে যায়, আর, অফিসিয়াল কাজটাও তো এ মহানগরে তিরিশ শতাংশ হয় কিনা সন্দেহ!
ভাবনাটাকে সরিয়ে রেখে সুমনার নাম্বারটা বার করে কল করলেন। (যাঁরা আগে অমিত নিয়োগীর রহস্যকাহিনি পড়েছেন, তাঁরা জানেন, সুমনা গুপ্ত, তাঁর তরুণ সহকারিনী, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে এম. এ. করেছে এবং রিসার্চরত। বিশ্বসাহিত্যে ক্রাইম ডিটেকশান নিয়েই সে থীসিস করতে চায়। অমিত মাঝে মাঝে তাকে ‘কিটি’ সম্বোধন করেন, কারণ তার প্রিয় ডিটেকটিভ চরিত্র এক সময়ের সিরিয়াল-খ্যাত করমচাঁদ, যাঁর সহকারিনীর ওই নাম ছিল।)
সুমনা ফোন ধরে বলল, ‘হ্যাঁ, স্যার। কেমন আছেন?’
অমিত বললেন, ‘নতুন কেস। জোড়ামৃত্যু। কাপল নয়, মা-ছেলে। ক্লায়েন্ট আসছে আমার বাড়ি। এক ঘণ্টার মধ্যে আসতে পারবে?’
‘এক্ষুনি যাচ্ছি, স্যার। আমি চিন্তায় পড়ছিলাম, আড়াই মাস কোনো ডাক পাইনি আপনার!’
সন্দেহের তির
সুমনা গোয়েন্দাগৃহে পৌঁছোবার মিনিট দশেক পরেই প্রকাশ রক্ষিতও এসে গেলেন সেখানে। তাঁকে একটু জিরিয়ে নিতে দিলেন অমিত। কারণ, দেখে বোঝা যাচ্ছে, তিনি একটা জোর মানসিক আঘাত পেয়েছেন এই অঘটনে, যার প্রভাব তাঁর শারীরিক অবস্থাতে পড়েছে। তারপর অমিত বললেন, ‘এবার আপনি ঘটনাটা পরিষ্কার করে বলুন!’
প্রকাশবাবু শুরু করলেন।
‘আমার একমাত্র বোন মৌমিতার সম্বন্ধ করে বিয়ে হয় সমীরণ রায়ের সঙ্গে। সুঠাম, স্বাস্থ্যবান চেহারা, গায়ের রংটা একটু কালো। সিমেন্সে মোটা মাইনের ইঞ্জিনিয়ার। ছ-বছর আগে ওদের বিয়ে হয়। একটি ফুটফুটে ছেলে। তার সুন্দর নামও রেখেছিল ওরা, রৌমক। ন্যাচারালি, ভাগনের ডাক-নাম ধরেই ডাকতাম আমি—ডুডু!’
চোখ দুটো ছলছলিয়ে এল প্রকাশবাবুর। গলাটাও বুজে এল সাময়িক ভাবে। একটু ঢোক গিললেন...
‘জানেন, অমিতবাবু, প্রিম্যাচিওর বলে একটু আণ্ডারওয়েট হয়েছিল বাচ্চাটি। বরাবরই ডেলিকেট কনস্টিটিউশানের, কিন্তু চোখ দুটো এমন dreamy... ওর মুখটা বারবার ভেসে উঠছে আমার মনে... এত সুন্দর পাঁচবছরের শিশু... এভাবে হঠাৎ শেষ হয়ে গেল!...’
অমিত আর সুমনার চোখে-মুখে নীরব সমবেদনা। ওঁরা প্রকাশ বাবুকে সামলে নিয়ে আবার গল্পের খেই ধরার সময় দিলেন। ...‘ওরা লাস্ট ইয়ারে নতুন ফ্ল্যাট নিয়েছিল আর. কে. পল্লি গড়িয়ায়। মজুমদার কনস্ট্রাকশান প্রজেক্টে একটি আটতলা বাড়ি হয়েছে, নাম ‘আহ্লাদে আট’। ছ-তলায় পুবদিকে ওদের ফ্ল্যাট নাম্বার ৪৩। বাইরে থেকে দেখতে খুব সুখী পরিবার। বাবা ব্যস্ত রোজগেরে, অফিসের কাজে প্রায়ই কলকাতার বাইরে যেতে হয়। মৌ বিখ্যাত ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ‘ট্রাই পয়েন্ট’-এ বাংলা পড়ায়। আর ডু-ডু ওই স্কুলের প্রেপ ক্লাসে পড়ে। কিন্তু বোন মুখ ফুটে বিশেষ কিছু না বললেও ভাগনের কাছে আমি খবর পেতাম। মাঝেমধ্যেই ওর বাপ-মার মধ্যে তুমুল ঝগড়া হয়। তখন তাকে বোর্ডিং-এ পাঠাবার প্রসঙ্গটা বারবার তোলে সমীরণ। আর মৌমিতা প্রাণপণে সে প্রস্তাব নাকচ করে। এসব দেখেশুনে বাচ্চাটার মন খারাপ হয়, আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে গিয়ে কেঁদেও ফেলেছে দু-একদিন!’
অমিত বললেন, ‘একটু ইন্টারপ্ট করছি। আপনার কি মনে হয়, সমীরণ তাঁর ছেলেকে ভালোবাসতেন না?’
‘আমাদের সামনে তেমন কিছু প্রকাশ পায়নি। খেলনা-ট্যালনা প্রচুর কিনে দিত। তবে, সামহাউ, যাকে বলে স্বতঃস্ফূর্ত স্নেহের উষ্ণতা, তার অভাব ছিল, বলে আমার মনে হয়েছে।’
—এর কোনো সম্ভাব্য কারণ কি আপনি ভেবেছেন?
—হ্যাঁ, আমার মনে হয়েছে জেলাসি!
—মানে? ছেলে বাবার চেয়ে মাকে বেশি ভালোবাসত বলে?’
প্রকাশবাবু একটু গলা ঝেড়ে নিয়ে বললেন— ‘না। ব্যাপারটা অধীপ সেনকে নিয়ে। অধীপ খুব ভালো ভদ্র ছেলে। ফ্রিলান্স জার্নালিস্ট। মৌ-য়ের কলেজজীবন থেকে বন্ধু। আমিও দেখেছি তাকে বহুবার, মনটা ওর খোলামেলা। ডু-ডু বলত, অধীপকাকু মাঝে মাঝে এসে ওর সঙ্গে অনেক গল্প করে, চকোলেট দেয়, বল খেলে। কিন্তু বাবা বাড়ি থাকলে মা অধীপকাকুর সামনে হাসে না, খুব কম কথা বলে। একদিন সমীরণ ভীষণ বদমেজাজ দেখিয়েছে। তারপর বহুদিন অধীপ আর আসেনি ওদের বাড়িতে।’
সুমনা এবার একটা প্রশ্ন করল— অধীপবাবু বুঝি এখনো ব্যাচিলর?
প্রকাশ বললেন— ‘হ্যাঁ। উনি সংসারী সং সাজতে চান না। তবে যদ্দূর জানি সংযত জীবনযাপন করেন।’
সুমনা— ‘তার মানে, সমীরণবাবু অধীপবাবুকে মৌমিতাদি-র লাভার হিসাবে ধরে জেলাসি ফিল করতেন, তাই কি?’
প্রকাশ মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলেন।
অমিত বললেন, ‘ওথেলো সিনড্রোম। অবশ্য আমরা যদি ধরে নিই যে, সমীরণই স্ত্রী-পুত্রকে মার্ডার করেছেন। আপনি তো তাই ভাবছেন, প্রকাশবাবু?’
প্রকাশ বললেন, ‘সে যদি নিজে হাতে না করে থাকে, কাউকে দিয়ে করিয়েছে।’
সুমনা গভীরতর আগ্রহ সহকারে বলল, ‘সুপারি-কিলার! ওয়াও!’
অমিত— ‘আপনার যদি এ ধারণা হয়, পুলিশ কেন তা ভাবছে না? ঘটনাটা কীভাবে ঘটেছে, এবার বলুন।’
প্রকাশ রক্ষিত বিবৃতি দিলেন : ‘আমি খবর পেলুম লালবাজারের ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর মি: বটব্যালের কাছ থেকে। পুলিশ মৌমিতার মোবাইল থেকে আমার নম্বর পেয়েছে। গড়িয়া থানার পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী বন্ধ ফ্ল্যাটের মধ্যে মা ও ছেলের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। মৌমিতার দেহ সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছিল। ডুডুকে শ্বাসরোধ করে মারা হয়েছে মুখে বালিশ চেপে। প্রাথমিক পোস্ট-মর্টেম বলছে, মৃত্যুর সময় দুপুর একটা থেকে আড়াইটের মধ্যে। কাউকে বাইরে থেকে ঢুকতে দেখা যায়নি। সমীরণ অফিসের কাজে দিল্লি ছিল কয়েকদিন। সেদিনই বিকেলে সাড়ে তিনটে নাগাদ সে ফেরে। কিন্তু তার ফ্ল্যাটের চাবি সে কোথায় হারিয়ে ফেলেছে বলে কেয়ারটেকারকে জানায়। ফলে, অনেকবার বেল দিয়ে ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে, এবং মোবাইল ফোনে রেসপন্স না পেয়ে, সে কেয়ারটেকার ও দারোয়ানের সাহায্যে দরজা ভেঙে ফ্ল্যাটে ঢোকে, এবং ওই দৃশ্য দেখে পুলিশে খবর দেয়।’
‘ইন্টারেস্টিং!’ বলে উঠলেন অমিত— ‘সমীরণবাবুর ওই দিনই ফেরাটা হতেই পারে। কিন্তু সেই সঙ্গে চাবি হারানোটা একটু রেয়ার কয়েনসিডেন্স মনে হচ্ছে!’
—‘হ্যাঁ। আমারও তা মনে হয়েছে। এ বিষয়ে কেয়ারটেকার বাদল দত্তকে আমি খুঁটিয়ে জিগ্যেস করেছিলাম। তিনি বলেছেন, সমীরণকে ভীষণ হেল্পলেস উদভ্রান্ত দেখাচ্ছিল। সত্যিই নাকি দিশাহারা চোখমুখের চেহারা হয়েছিল!’
—হতেই পারে এরকম অবস্থায়! তারপর?
প্রকাশবাবু আবার ফিরে গেলেন তাঁর বিবৃতিতে।
‘হ্যাঁ। মৌমিতার দেহ শাড়ি পেঁচিয়ে ঝুলছে সিলিংফ্যান থেকে। কাঠের টুলটা মেঝেতে উলটে পড়ে আছে। তা থেকে পুলিশ অনুমান করছে, প্রায় সিদ্ধান্তই করছে যে, আমার বোন সুইসাইড করেছে, এবং তার আগে নিজেই নিজের ছেলেকে শেষ করেছে। মানে, উন্মাদ হয়ে সে এমন অস্বাভাবিক ভায়োলেন্সের পথ বেছে নিয়েছে। তারা এও বলছে যে, ছেলের জন্য প্রবল মায়াই হয়তো তাকে প্ররোচিত করেছে আত্মহত্যার আগে নিজের হাতে তাকে সরিয়ে দিতে এই কঠিন জগত থেকে! ...ছেলের অবশ্য সত্যিই মা-অন্ত প্রাণ ছিল!
—‘দাঁড়ান, দাঁড়ান, দাঁড়ান!’ থামিয়ে দিলেন অমিত। ‘মৌমিতার মধ্যে উন্মাদের লক্ষণ কিছু ছিল বলে আপনি জানতেন বা শুনেছিলেন?’
—মৌ ডিপ্রেশান-এ ভুগত। তার জন্য ট্রানকুইলাইজার জাতীয় ওষুধ খেত এটুকুই শুনেছি। তবে এ নিয়ে ওর চেয়ে সমীরণেরই বেশি কনসার্ন ছিল। আমাকে একদিন জানিয়েছিল, মো নাকি ঘুমের মধ্যে চলা-ফেরা করে মাঝে মাঝে!
—সমনামবুলিজম! ডাক্তার দেখায়নি?
—হ্যাঁ। নিউরোলজিস্ট-কাম সাইক্রিয়াটিস্ট প্রবীর গুহর কাছে নিয়ে গেছিল সমীরণ। তাঁর ট্রিটমেন্টেই ছিল মৌমিতা।
‘হুমম!’ চিন্তান্বিত গলায় অমিত বললেন, ‘তাঁর সঙ্গে অবশ্যই কথা বলতে হবে। আপনি কনট্যাক্ট নাম্বারটা জানেন?’
—না, আমাদের G.P.-র কাছ থেকে জেনে আপনাকে দেব।
—‘আর, যদি পারেন অধীপ সেনের—’ বলতে বলতে অমিত ‘কল’ পেয়ে নিজের সেলটা কানে তুললেন।
খানিকক্ষণ শোনার পর সাগ্রহে বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। অফকোর্স! আমি কাল সকাল ন-টার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছি!’
ফোন রেখে প্রকাশবাবু ও সুমনার দিকে চেয়ে বললেন, ‘লালবাজারের মি: বটব্যাল। আপনার অভিযোগের ভিত্তিতে কেসটা একটু ভেবে দেখতে চাইছেন!’
সুমনা খুশি মুখে বলল, আপনার হেলপ চাইছেন?
—‘ইয়েস! সো কাইণ্ড অব হিম!’
প্রকাশবাবু বললেন, ‘দেখুন, মি: নিয়োগী, যে যাই বলুক, সুইসাইড করা এবং নিজের বাচ্চা ছেলেকে গলা টিপে মারার মতো বদ্ধ উন্মাদ মৌমিতা কখনোই হতে পারে না। এর মধ্যে একটা ভয়ংকর চক্রান্ত আছে।.... যাই হোক, মি: বটব্যালের কাছেই আপনি সব রেলিভেন্ট কন্ট্যাক্ট নাম্বারগুলো পেয়ে যাবেন। আর, আমার যা আশঙ্কা তা যদি সত্যি প্রমাণ করতে পারেন, আমি আপনাকে আমার সীমিত ক্ষমতায় যতটা পারি দক্ষিণা দেব। এটা আমার কর্তব্য।’
—থ্যাঙ্ক ইউ, প্রকাশবাবু, ইওর কেস ইজ অ্যাকসেপটেড!
প্রকাশ রক্ষিত চলে যাবার পর সুমনা বলল, ‘স্যার, মৌমিতা রায় ‘ট্রাই পয়েন্ট’ স্কুলে বাংলার টিচার ছিলেন। এক্ষেত্রে আমি বোধ হয় আপনাকে একটু সাহায্যে করতে পারব। ওই স্কুলেই আমার পিসতুতো দিদি অদ্রিজা মুখার্জি হিস্ট্রি পড়ায়। সে নিশ্চয়ই মৌমিতা সম্পর্কে, বিশেষ করে তার স্বভাব, আচরণ, সাংসারিক প্রব্লেম, এসব ব্যপারে ইনফরমেশান দিতে পারবে।’
অমিত সাগ্রহে বললেন, ‘দ্যাটস ওয়াণ্ডারফুল! ভাগ্যিস তোমার মতো অ্যাসিস্টান্ট পেয়েছি! লেগে পড়ো তাহলে, যদি পারো আজই স্কুলে হানা দাও’।
অমিতবাবুর মা ড্রইংরুমে বেরিয়ে এসে বললেন, ‘যেখানেই যাও, আগে দুটো ভাত খেয়ে যাও। দু-জনকেই বলছি, রান্না রেডি আছে!’
অকুস্থল দর্শন: একটি ক্লু
গড়িয়া থানার লাগোয়া ও.সি. নাগেশ্বরের রেসিডেন্সিয়াল কোয়ার্টার্সে অমিতকে নিয়ে গেলেন মি: বটব্যাল। বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে কেসটার বিবরণ শুনতে লাগলেন ডিটেকটিভ। মূল ঘটনাটি যা শুনেছিলেন প্রকাশ রক্ষিতের কাছে, সেই রকমই। মৌমিতা আর রৌমক ছাড়া ঘরে কেউ ছিল না। সমীরণ অফিসের কাজে দিল্লি গিয়েছিলেন দুর্ঘটনা ঘটার পর ফিরেছেন। ভিতর থেকে লকড ফ্ল্যাটে ঢোকার চাবি আর কারো কাছে ছিল না। সম্ভাব্য সময়সীমার মধ্যে বাইরের কাউকে আসতেও কেউ দেখেনি। বিকেল চারটেয় ব্যাঙ্কের চিঠি নিয়ে এক কুরিয়ার আসে, কিন্তু তার মধ্যেই দরজা ভেঙে দুটি ডেড বডি আবিষ্কৃত হয়েছে। সুতরাং বহিরাগত কেউ এ কাজ করেছে বলে মনে করার পক্ষে যুক্তি নেই।
বটব্যাল প্রাথমিক বক্তব্য শেষ করলেন এই বলে: ‘যেহেতু এটা মেন্টাল ডিসব্যালান্স-জনিত ভায়োলেন্স, তাই কোনো সুইসাইড নোট এক্সপেক্টেড নয়!’
অমিত এবার বললেন— ‘কিন্তু, মি: বটব্যাল, ইউ কানট বী সিওর অন দ্যাট পয়েন্ট। এই ইয়েল লক জিনিসটা খুব ডিসেপটিভ। এটা খিল বা ছিটকিনি নয়। আপনি বাইরে থেকে এসে ভিতরে যা খুশি করে বেরিয়ে বাইরে থেকে দরজা টেনে দিলেই লকড। মনে হবে কোনো আউটসাইডার আসেনি। তাই নয় কী?’
বটব্যাল একটা ভুরু ব্রিজের মতো বাঁকিয়ে তুলে বললেন, ‘মানে, আপনি বলতে চাইছেন...?’
—‘হ্যাঁ। কোনো কারণে মৌমিতা হয়তো দরজা খুলেছিলেন। নিজে বাইরে থেকে ফ্ল্যাটে ফিরে হোক বা কোথাও বেরোবার জন্য, বা কারো কলিং-বেল শুনে। আর তখনই আততায়ী ঢুকেছে, কাজ সেরে চলে গেছে। অথবা—’
—অথবা?
—‘অথবা কেউ বাইরে থেকে চাবি দিয়ে খুলেই ঢুকেছে! যে চাবিটা সমীরণবাবু lost বলে জানিয়েছেন, সেটা হয়তো stolen, এবং মার্ডারার সেটা use করেছে!’
গম্ভীর গলায় অমিত এই কথাটা বলতেই নড়েচড়ে বসলেন বটব্যাল। বিস্মিত হয়ে বললেন— ‘তাহলে কেসটা হোমিসিডাল হতে পারে? ...কিছুক্ষণ পরে ফাইনাল পোর্স্ট মর্টেম রিপোর্ট পেলে এই ব্যাপারে আর একটু সিওর হওয়া যাবে। ...কিন্তু, ইফ ইট ইজ মার্ডার, কে করবে? অধীপ সেন সেদিন আসেননি, উই হ্যাভ ভেরিফায়েড। ইনফ্যাক্ট উনি জানতেনই না এই ট্র্যাজিক মিসহ্যাপের কথা। ইন্টারোগেশান-এর সময় তাঁকে যেরকম শকড অ্যান্ড স্টানড দেখলাম, অ্যাক্টিং হলে তার উলটো হত। মি: নিয়োগী, আমরা অনেক ক্রিমিন্যাল দেখেছি। বডি ল্যাংগুয়েজ থেকে বুঝতে পারি, কার কতটা এ্যাপটিচ্যুড। ওঁকে অবশ্য এক মাস স্টেশান লীভ করতে নিষেধ করা হয়েছে। আর আমাদের লোক ওনার গতিবিধির ওপর নজর রাখছে। আপনিও ভদ্রলোককে জেরা করে দেখতে পারেন। ওঁর সেল-নাম্বার দিয়ে দিচ্ছি।’
এরপর থানার জীপে বটব্যাল ও ও.সি.-র সঙ্গে অমিত ঘটনাস্থল দেখতে গেলেন।
সত্যজিৎ-হরফে ‘আহ্লাদে আট’ নামটা বাড়ির কপালে সুন্দর দেখাচ্ছে গেট থেকে। এই বাড়িটার শেষে রাস্তাটা একটা বাঁক খেয়ে চলে গেছে রেলস্টেশনের দিকে।
পুলিশের জিপ দেখে কেয়ারটেকার দৌড়ে এলেন। ‘আসুন, স্যার, আসুন!’ বাদল দত্তর বয়স চল্লিশ থেকে সাতচল্লিশ-এর মধ্যে মনে হল অমিতের। নতুন ফ্ল্যাটবাড়িতে এরকম ‘A+’ দুর্ঘটনার ধাক্কায় চোখে-মুখে একটা দুশ্চিন্তার এবং ভয়ের ছাপ পড়েছে।
বটব্যাল তাঁকে বললেন, ‘আজ সন্ধ্যায় ফ্ল্যাটের লোকেদের বয়ান নোব। সবাইকে থাকতে বলবেন সেক্রেটারির ঘরে। এখন যান, লাগলে ডাকব।’
ফ্ল্যাটের দরজা ‘সিল’ করা ছিল। সামনে এক পাহারাদার। সে উঠে দাঁড়িয়ে স্যালুট দিল। ফোনে ওপরওয়ালাকে জানিয়ে সাবধানে সিল খুলে অমিতকে নিয়ে ঢুকলেন বটব্যাল।
‘ওইখানে বাচ্চাটার সাফোকেটেড বডি-টা ছিল!— আঙুল দিয়ে দেখালেন বটব্যাল। বিছানার চাদরটা অন্তিম ছটফটানিতে প্রচন্ড কুঁচকে বিধ্বস্ত হয়ে আছে।
গাইডের মতো বলে গেলেন বটব্যাল— ‘বালিশটা ফোরেনসিক টেস্টে গেছে। —আর এই পাখাটা থেকে মৌমিতা রায়ের গলায়-শাড়ির ফাঁস দেয়া বডি ঝুলছিল।’
অমিত বারান্দার দিকের বন্ধ জানলা অবধি গিয়ে কাচের ভিতর দিয়ে দেখলেন ফ্ল্যাট-বাড়ির ঠিক পিছনের দিকটা। নাতি-উচ্চ পাঁচিলের ওপারে কিছুটা আগাছার জঙ্গল। তারপর জমিটা ঢালু হয়ে একটা এঁদো ডোবার সঙ্গে মিশেছে। বাইরে থেকে কেউ ছ-তলার বারান্দা বা জানলা দিয়ে ঢোকার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে রেন-ওয়াটার পাইপ যদি এর খুব কাছে থাকে, তবে ছাদ থেকে...।
আপাতত সে-ভাবনায় ছেদ টেনে অমিত বললেন— ‘থ্যাঙ্ক, ইউ, মি: বটব্যাল। এবার নীচে চলুন। কম্পাউণ্ডটা একটু দেখব ঘুরে।’
তীক্ষ্ণ চোখে মাটির দিকে লক্ষ্য করছিলেন ডিটেকটিভ। বাড়ির পিছন দিকে যেতেই যা খুঁজছিলেন, পেয়ে গেলেন।
‘দেখুন, ও.সি. সাহেব, লাকিলি কাল লাইট রেন হয়েছিল, আর আজও চড়া রোদ ওঠেনি!’
নাগেশ্বরকে অমিত দেখালেন, নরম মাটিতে বুট জুতোর কিছু স্পষ্ট দাগ। বাড়ির বাঁপাশ থেকে পাঁচিলের দিকে গেছে।
‘এ জিনিস কি কাল দেখেছিলেন?’
অমিতের প্রশ্নে একটু লজ্জিত হয়ে ও.সি. বললেন— ‘না, কাল গ্রাউণ্ডটা একজামিন করার চিন্তা মাথায় আসেনি। সমীরণবাবু যখন বললেন, ওনার স্ত্রী অ্যাকিউট ডিপ্রেসানের রুগী...’
বটব্যাল বিরক্ত হয়ে অর্ডার দিলেন— ‘আচ্ছা, এখন এর প্রিন্টটা নেবার ব্যবস্থা করুন।’
এতক্ষণে অমিত বলেন— ‘ওয়েল, সমীরণবাবু এখন কেথায়?’
বটব্যালের জবাব— ‘সুইট সোলেস নার্সিং হোম। কালকের দৃশ্যটা দেখেই নার্ভাস ব্রেকডাউন হয় ভদ্রলোকের। ...কেবিনের সামনে অবশ্য আমাদের লোক পোস্টেড আছে।’
অমিত বললেন— ‘থাকলেই ভালো, এবং সে যদি সজাগ থাকে। কারণ আমার মনে হচ্ছে সমীরণবাবুর অ্যালিবাই খুব ভালো করে যাচাই করা দরকার... আর আপনি ওই জুতোর দাগ যেখানে শেষ হয়েছে, তারপর পাঁচিলের ওপারের গ্রাউণ্ডটা তন্নতন্ন করে সার্চ করান। দরকারি কিছু মিলতে পারে। ফাইনাল p.m. কখন পাচ্ছেন?’
বটব্যাল— ‘থ্রি পি. এম., আই হোপ!’
অমিত— ‘এ্যাণ্ড আই অ্যাম অ্যাফ্রেড ইট মে শো দ্যাট মৌমিতা ওয়াজ স্ট্র্যাwগলড অ্যাণ্ড দেন হাংগ আপ!— সমীরণের মোবাইলটা সিজ করেছেন তো?’
—‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। দু-জনেরটাই আমাদের হেফাজতে আছে।’
—‘বেশ, আমি এখন বাড়ি যাব। আপনি কাইণ্ডলি আমাকে স্টেশানে নামিয়ে দিন। আপনাকে যা বললাম। ওই কাজগুলো সেরে ফেলুন। আমাকেও কিছু জরুরি খবর জোগাড় করতে হবে।’
ডা: প্রবীর গুহ-র মতামত
ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে ডা. গুহর এলগিন রোডের চেম্বারে যখন গেলেন অমিত, হঠাৎ ঝপ করে লোডশেড হয়ে গেল ওই এলাকায়। সৌভাগ্যক্রমে এখনো কলকাতায় গরমটা পড়েনি তেমন ভাবে। ইমার্জেন্সি আলো জ্বালিয়ে ডাক্তার গোয়েন্দার ইমার্জেন্সি মিটিং শুরু হল।
‘সরি টু ডিস্টার্ব ইওর বিজি সিডিউল, ডক্টর। কিন্তু আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন আপনার পেশেন্ট মৌমিতা রায় হ্যাজ মেট অ্যান আনন্যাচারাল ডেথ। ওনার ভাই প্রকাশ রক্ষিত আমাকে ইনভেস্টিগেট করে জানতে বলেছেন এটা সুইসাইড, না ফাউল প্লে। শুনলাম আপনি বছর খানেক ওঁর মানসিক চিকিৎসা করছিলেন। আপনি বলতে পারবেন উনি কি মানসিক ভাবে এতটাই ডিসব্যালান্সড হয়ে পড়েছিলেন যে, নিজের একমাত্র বাচ্চা ছেলেকে মুখে বালিশ চেপে দমবন্ধ করে মেরে, তারপর সুইসাইড করবেন?’
ডা. গুহ কথাটা শুনে দৃশ্যত চমকে উঠলেন।
‘সে কী! এতো হাইলি ইমপ্রব্যাবল মনে হচ্ছে আমার। শিক্ষিত, সেনসিটিভ মহিলা। এরকম ভায়োলেন্সের প্রবণতা আদৌ তাঁর মধ্যে ছিল বলে আমার কখনো মনে হয়নি।... ডিপ্রেশন ছিল, সে তো আজকাল নাইনটি পারসেন্ট লোকের কিছু-না-কিছু থাকেই। আর, ছেলের সম্পর্কে তার স্বাভাবিক স্নেহ যতদূর জানি কোনো মায়ের চেয়ে কম ছিল না। ইফ ইট ইজ আ ফ্যাক্ট, আমার কাছে তা হবে শকিং সারপ্রাইজ!’
—‘আচ্ছা, ডা. গুহ, কী ধরনের সিম্পটমের চিকিৎসার জন্য মৌমিতা আপনার কাছে আসতেন?’
—‘খুব কমন টাইপের ailment... ভুলে যাওয়া, মানে, টেম্পোরারি অ্যামনেশিয়া। বলতেন, বিশেষ করে প্রপার নেমস ঠিক সময় মনে আসে না, ফলে মাঝে মাঝে খুব অপ্রস্তুতে পড়তে হয়। আর, মাঝে মাঝে দু-তিন দিন পারসিসটেন্ট হেডেক থাকত। ...ওনার নিজের চেয়ে ওনার হাজবাণ্ডেরই বেশি উদ্বেগ ছিল ওঁর শরীর নিয়ে। আমাকে একদিন মি: রায় এসে চিন্তিত মুখে বললেন—কাল রাতে মৌমিতা ঘুমের ঘোরে হাঁটছিল প্রায় আধঘণ্টা। শূন্য দৃষ্টিতে এঘর-ওঘর করে আবার নাকি বিছানায় এসে শুয়ে পড়ে রোগী। উনি বার বার জিগ্যেস করলেও কোনো সাড়া পাননি। ...আমি পরের দিন মৌমিতাকে সে কথা বলতে উনি বিস্ময়ে আকাশ থেকে পড়লেন! ...অবশ্য সমনাম্বুলিস্টদের এরকমই হয়। চোখ খোলা থাকলেও তাদের চেতনা গভীরভাবে ঘুমন্ত থাকে।’
অমিত মনোযোগ দিয়ে ডাক্তারের বক্তব্য শুনে শুধলেন— ‘আপনি মৌমিতাকে কী ধরনের ওষুধ দিয়ে ট্রিটমেন্ট করছিলেন ইদানীং, আমার মতো layman-এর বোধগম্য করে যদি বলেন?’
ডাক্তার একটু ভেবে বললেন— ‘পনেরো দিন আগেও তাঁকে দেখেছি। আদৌ তিনি উন্মাদ ছিলেন না, একথা আমি জোর দিয়ে বলব। তাঁর চোখ, পালস, কথাবার্তা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে এরকম কোনো ভয়োলেন্ট এ্যাকশানের ইণ্ডিকেশান পাইনি। ...ইউজুয়াল অ্যান্টি ডিপ্রেশান দুটো ট্যাবলেট দিয়েছিলাম। আর ব্রেন ফাংশান ভাল রাখার জন্য মেনোস্প্রিন আর প্যান্টোডাক। মানে কোনোটাই হ্যাবিট-ফার্মিং নয়। ...আপনি জিগ্যেস করলেন বলে মনে পড়ল, সমীরণবাবু বলেছিলেন, ওনার মা নার্ভ প্রব্লেমের জন্য গার্ডিনাল খেতেন, সেটা আমি যদি ওনার wife-কে প্রেসক্রাইব করি। কিন্তু ওটার লং-টার্ম-এফেক্ট ভেরি হার্মফুল প্রুভড হয়েছে, এবং ড্রাগটা ব্যানড হয়ে গেছে। ...আমি উলটে ভদ্রলোককে বলেছিলাম, যান না বউকে নিয়ে ক-দিন হলিডে করে আসুন কোনো সুন্দর স্পটে। দেখবেন অনেক cheerful লাগবে ওঁকে। আমার অ্যাডভাইসমতো ওনারা ঘুরেও এসেছিলেন সপ্তাহখানেক। আর তারপর সত্যিই refreshed দেখেছিলাম ওঁকে! এ ধরনের set back ওয়াজ টোট্যালি আনএক্সপেক্টেড!’
অমিত সাক্ষাৎকার গুটিয়ে আনলেন এই বলে :
‘আপনাকে ধন্যবাদ, ডা. গুহ। যদি এটা হোমিসাইড কেস হিসেবে কোর্টে ওঠে, আশা করি আপনি আইনকে যথাসম্ভব সাহায্য করবেন?’
—‘সে তো করবই। এর আগে চারবার আমাকে উইটনেস বক্সে উঠতে হয়েছে!’
বলতে বলতে চেয়ার ছেড়ে উঠে ডা. গুহ অমিতকে সি-অফ করলেন।
অদ্রিজার আলোকপাত
ইতিহাস-শিক্ষিকা অদ্রিজা মুখার্জি ফার্ন রোডের একটা প্রশাখার কোনায় পুরোনো এক বাড়িতে থাকেন। তাঁর শ্বশুরের যৌবনে করা এ বসতবাড়ি পাড়ার অন্যতম প্রাচীন বনেদি বাড়ি।
সেদিন স্কুল থেকে ফিরেই অদ্রিজা দেখলেন, মামাতো বোন সুমনা বসে আছে চায়ের কাপ হাতে। সামনে সিঙাড়ার প্লেটও রয়েছে। অর্থাৎ কাজের লোক নীরু মাসি অতিথি সৎকারে তৎপর হয়ে নারায়ণ সুইটস পর্যন্ত ছোটাছুটি করেছে।
ওঁকে ঢুকতে দেখে নীরবে চোখে হাসল সুমনা।
—‘বাব্বা, আজ কোন দিকে সূর্য উঠল? অ্যাদ্দিন বাদে মনে পড়ল আমায়!’ সুমনা বলল, ‘দিক না হলেও সূর্য অ্যাংগল পালটায়, সেটা ভূগোলেও বলে। আর, হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেল্ফ! অর্থাৎ, তুমিও আমার অন্যান্য বারের মতো আসতে দেরি করার অপরাধ ক্ষমা করে দেবে!’
—কথায় তো খুব শান দিতে শিখেছিস। হ্যাঁ রে, তুই নাকি ডিটেকটিভ হয়ে উঠেছিস আজকাল?
—তুমি কোত্থেকে জানলে?
—কেন, তুই নিজেই তো বলেছিলি মামার মার্ডারের সময় থেকে তুই অসিত না অজিত ব্যোমকেশের চ্যালা হয়েছিস?
—অসিত, অজিত নয়, গোয়েন্দাপ্রবরের নাম অমিত নিয়োগী। হ্যাঁ, কথাটা ঠিক। আমার সেই সহকারী পদ বহাল আছে। আর আজ তোমার কাছে এসেছি প্রধানত ওই ধরনের কাজে।
পাঁচ সেকেণ্ড বিস্ফারিত চোখে ওর দিকে চেয়ে অদ্রিজা বলে উঠলেন— ‘মৌমিতা?’
—ইয়েস! পুলিশ ভাবছে ভদ্রমহিলা পাগল হয়ে গিয়ে নিজের কচি ছেলেকে নিষ্ঠুরভাবে মার্ডার করে নিজে সুইসাইড করেছেন। তুমি তো ওঁকে বহুদিন intimately জানো, ডু ইউ বিলিভ ইট?
—না। কাগজের রিপোর্ট পড়ে আমি স্তম্ভিত! মৌমিতা মাঝে মাঝে ডিপ্রেশানে ভুগত ঠিকই। রোজ এতগুলো বাচ্চাকে ট্যাকল করা। আর কাঁড়ি কাঁড়ি হোমওয়ার্ক দেখার পর সব স্কুল টিচারের পক্ষেই সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু এরকম ভায়োলেন্ট এক্সট্রিম স্টেপ ওর মতো মেয়ের পক্ষে নেয়া জাস্ট ইমপসিবল! তাছাড়া ডুডুকে ও ভীষণ ভালোবাসত। ...আমার মনে হয়, আ অ্যাম অলমোস্ট সিওর, এর পিছনে ওর বর সমীরণের কারসাজি আছে!
—তুমি কেন ভাবছ, ওর হাজবাণ্ড এ ব্যাপারে ইনভলভড? ওনার দাদার এরকমই সন্দেহ। কিন্তু তুমি...
ওকে থামিয়ে দিয়ে অদ্রিজা উত্তেজিত ভাবে বললেন— ‘আরে ভদ্রলোকের হাবভাব, কথাবার্তা, কাজকম্ম, সবই আমার বেশ সাসপিসাস মনে হয়—’
সুমনা অবাক কন্ঠে বলল, ‘তুমি অত কী করে জানলে?’
—‘ও, তুই তো জানিস না, আমরা রিসেন্টলি পূজোর ছুটিতে একসঙ্গে হায়দরাবাদ ঘুরে এলাম। তাই সমীরণ বাবুকে স্টাডি করার সুযোগ পেয়েছিলাম।’
সুমনা উত্তেজিত হয়ে বলল— ‘তাই নাকি? এতো দারুণ খবর। তুমি চেঞ্জ করে চা খেয়ে নাও। তারপর ভালো করে শোনাও রায় ফ্যামিলির সঙ্গে হায়দরাবাদ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।’
—‘কাল খবর পাবার সঙ্গে সঙ্গে কনডোলেন্স মিটিং হয়ে স্কুল ছুটি হয়ে গেল’— বলতে বলতে অদ্রিজা ব্যাগ চেয়ারে রেখে বাথরুমে গেলেন।
সুমনার এতক্ষণে মনে হল, মুকুল দা-র কথা কিছু জিজ্ঞাসা করা হল না। অদ্রিজার স্বামী মুকুল মুখার্জি লাইফ ইনসিওরেন্স ইণ্ডিয়া-র অফিসার। হাসিখুশি ঠাণ্ডা মস্তিষ্কের লোক। ওদের জীবনে একটাই দুঃখ, বিয়ের সাত বছর পর এখনো কোনো সন্তান হল না। অদ্রিজার বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি তৃতীয় প্রজন্মের মুখ না দেখেই পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন।
অদ্রিজা বাথরুম থেকে বেরতেই সুমনা বলল, ‘মুকুল দা-র খবর কী গো? এখনো ছবি তোলার হবিটা আছে তো?’
—‘তোদের মুকুলদাকে নিয়ে একটাই সমস্যা, এখনো কাজে ফাঁকি দেয়াটা শিখে উঠতে পারল না। মানে, লোকটা একই রকম আছে।’
বললেন এমন ভাবে যেন অভিযোগ করছেন, কিন্তু অদ্রিজার মুখের হাসিটা থেকে সুমনা স্পষ্ট বুঝল, এতেই সে গর্বিত স্বামীর জন্য।
পোশাক পালটে চা-সিঙাড়া খেয়ে অদ্রিজা রিল্যাক্স করে খাটে আধ-শোয়া হলেন। সুমনাও ওঁর পাশে লম্বা হল। শুরু হল বেড়ানোর গল্প, অদ্রিজার বয়ানে।
হায়দরাবাদ ভ্রমণকালে কিছু ঘটনা
ডেস্টিনেশান হায়দরাবাদ মৌমিতারই পছন্দ ছিল। সমীরণ রায় বৌকে খুশি করার জন্য বেড়াতে যাবার প্রস্তাব করেন, আর ওর ওপরই ছেড়ে দেন জায়গা নির্বাচনের ব্যাপারটা। আমাকে একদিন মৌমিতা বলল, হায়দরাবাদ গেলে কেমন হয়? শুনে বললাম, খুব ভালো, অনেক কিছু দেখার আছে। এখন বেস্ট সিজন। জায়গাটার ঐতিহাসিক আকর্ষণও যথেষ্ট, আবার I.T. city হিসেবেও দারুণ প্রোগ্রেস করেছে। সাত দিনের মতো একটা ছোট ট্যুর হলে কর্তাদেরও বেশি অফিস কামাই করতে হয় না। ঠিক হল আমি আর মুকুল ওদের ফ্যামিলির সঙ্গে যোগ দেব। সেইমত দু-পিঠের রেলওয়ে রিজার্ভেশান করা হল AC-3 তে।
একাদশীর সকালে সাতটা পাঁচ-এ হাওড়া ছাড়ল আমাদের ফলকনামা এক্সপ্রেস। প্রথম আলাপেই সমীরণবাবুকে বেশ গোমড়া বিরস লোক মনে হল। শুনেছিলাম আমাদের সঙ্গে আসাটা নাকি ওনার মনঃপুত হয়নি। মৌমিতাকে বলেছিলেন ‘কলিগ বগলে নিয়ে বেরলে ফ্রিলি এনজয় করা যায় না চেঞ্জটা!’
ট্রেনে যেতে যেতেই অবশ্য রায় সাহেবের মুড চেঞ্জ হল। তার জন্য আমার কর্তাও একটু চেষ্টা করেছিলেন। দু-জনের একই ব্র্যাণ্ডের সিগারেট-প্রীতিও একটা কারণ। রাতে খাবার আগে আমরা খানিকক্ষণ কার্ডস খেললাম, ওই ব্রে আর টোয়েন্টি নাইন, খুব মডারেট স্টেকে। ক্রমশ দেখলাম, সমীরণ একটু-আধটু রসিকতাও জানেন। আমাদের স্কুলের একসেন্ট্রিক ভাইস-প্রিন্সিপল মিসেস ধিংড়ার গল্প শুনে শুনে উনি নাকি একদিন স্বপ্ন দেখেছেন, ধিংড়ার সঙ্গে উনি ভাংড়া নাচছেন! আর, আমাকে পার্টনার করে খেলায় জেতার পর কমপ্লিমেন্ট দিয়ে বললেন, ‘কেট উইন্সলেট উইথ আ ব্রেন!’...
নামে ‘সুপারফাস্ট’ হলেও দু’ ঘণ্টা লেট করে পরদিন বারোটা বারোতে পৌঁছোল ফলকনামা এক্সপ্রেস সেকেন্দ্রাবাদ জাংশানে। আমরা দুই ফ্যামিলি দুটো অটো নিয়ে চললাম হায়দরাবাদ। ওখানে আবার এক অটোতে তিন জনের বেশি লোক অ্যালাউ করে না।
বেশ কয়েকটা ফ্লাই-ওভার পেরিয়ে ঘন্টা খানেক বাদে যে-জায়গাটায় এলাম সেটা পানজাগুট্টার মোড়। কাছাকাছি একটা রাস্তায় মুকুলের জানা শবনম নামে একটা থ্রি-স্টার হোটেলে চেক-ইন করলাম। ডেইলি চারশো পঁচিশ রেটে ভালো নন এসি রুম পাওয়া গেল। তলায় রেস্টুরেন্টটাও দেখলাম। ভালো হায়দরাবাদি বিবিয়ানি পাওয়া যায়। এমনকি হালিমও।
কয়েকদিন সাইট-সীয়িং, আর এ্যাবিডস থেকে চারমিনার চত্বরে কেনাকাটা করে ভালই কাটল আমাদের।
সবচেয়ে ডিস্যাপয়েন্টিং মুসি নদী, যেটা আমাদের টলির নালার চেয়েও পচা নোংরা, স্টিঞ্চিং। আর সবচেয়ে ভালো বিড়লা মন্দিরের টপ থেকে শহরের View টা, ইনক্লুডিং লেক অ্যাণ্ড দা বুদ্ধমূর্তি ইন ইট!
শুনলাম জুবিলি হিলস-এ আজহারউদ্দিনের বাড়ি। একদিন হাইটেক সিটি ঘুরতে গেলাম বানজারা হিলস পেরিয়ে। পথে পড়ল এম.এফ. হুসেন-এর নীলরঙা বাড়ি। ঠিক বাড়ি বলা যায় না, ওর ছবির মতোই খাপছাড়া উদ্ভট স্ট্রাকচার! আর, সানিয়া মির্জার নাম তো অটোঅলারা শোনেইনি! ...তবে তোর পক্ষে যেটা ইন্টারেস্টিং এবং ইম্পর্ট্যান্ট হতে পারে, সেরকম কিছু ঘটনা ঘটেছিল তিনটি বিখ্যাত জায়গায়।
প্রথমটা গোলকুণ্ডা ফোর্টে। আমি অন্য ডিটেলস-এ যাচ্ছি না। জানিস তো ফোর্টটা এক উঁচু পাহাড়ের ওপর কনস্ট্রাকটেড। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে বেশ কষ্ট হয় আর, টপ-এ যেতে গেলে আমাদের ঘণ্টা দুই লেগে যাবে। শর্টকাট রাস্তাও আছে, ওখানকার লোকেরা জানে। আমরা দুপুর থেকে বিকেল অবধি কয়েক তলা উঠে বেশ কিছু দ্রষ্টব্য দেখার পর ক্লান্ত হয়ে সিঁড়িতে বসে জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। এনার্জি রিকভার করে নামব। তারপর বিখ্যাত ‘লাইটস অ্যাণ্ড সাউণ্ডস’ প্রোগ্রামটা ছ-টার ‘শো’-তে দেখে হোটেলে ফিরব।
সমীরণবাবু আর ডুডু আর একটু ওপরে গিয়েছিল। হঠাৎ উনি একা আবির্ভূত হয়ে উত্তেজিত ভাবে বললেন— ‘ডুডুকে পাওয়া যাচ্ছে না!’
মৌমিতা লাফিয়ে উঠল— ‘মানে! কী বলছ! তোমার সঙ্গেই তো ছিল!
—‘হ্যাঁ। আমরা hide and seek খেলছিলাম। কোথাও লুকিয়ে পড়েছে। আর সাড়া দিচ্ছে না!’
মুকুল ত্রস্ত হয়ে বলল, ‘না, না, নতুন জায়গা। তারপর পাহাড়ের গুহা, খাঁজ। সন্ধে হয়ে আসছে। চলুন, চলুন, কোথায় লাস্ট ছিলেন আপনারা?
ওরা হন্তদন্ত হয়ে এগল। মৌমিতা আর আমিও চললাম যথাসম্ভব জোর কদমে।
সবাই মিলে চিৎকার করে ডাকলাম— ডুডু-উ-উ! ...ডুডু সাড়া দাও! আমরা বাড়ি যাব-ও-ও-ও! ...ডুডু বেরিয়ে এসো, খেলা শেষ!...
মৌমিতা দুটি টুরিস্ট ছেলে-মেয়েকে ব্যগ্র হয়ে জিগ্যেস করল— ‘আপনারা একটা বাচ্চা ছেলেকে দেখেছেন? লাল সোয়েটার নীল প্যান্ট পরা?’
মিনিট দশেক এরকম উদবেগে কাটার পর দেখলাম, মুকুল আর সমীরণের সঙ্গে ডুডু নেমে আসছে। তারপর মা-ছেলে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কী কান্না!
পরে মুকুল বলল, ডুডু একটা উঁচু প্যারাপেট থেকে নামতে পারছিল না। ওর বাপিই নাকি ওখানে তুলে দিয়েছিল ওকে, মজা হবে বলে!
শুনে খুব চটে আমি বললাম, সমীরণবাবু, এরকম প্র্যাকটিকাল জোক আর কখনো করবেন না আমার বন্ধুর সঙ্গে!
অপ্রত্যাশিত ভাবে বুড়ো মদ্দ নিজের দু-কান ধরে বললেন, ‘এক্সকিউজ মি, আন্টি, আর কোনোদিন করব না!’
আমরা হেসে ফেলাম বটে, কিন্তু ভালো লাগার সুরটা কেটে গিয়েছিল। ‘লাইটস অ্যাণ্ড সাউণ্ডস’-এ জগজিৎ সিং-এর গান, অমিতাভের ‘ভয়েসওভার’, অপুর্ব লাইটিং-এ ইট-পাথরের রূপকথা হয়ে যাওয়া, আর এফেক্ট মিউজিক যোগে ইতিহাসের জীবন্ত রেজারেকশান, তেমন ভাবে এনজয় করতে পারলাম না।
দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটে সালারজং মিউজিয়ামে। নিশ্চয়ই শুনেছিস কী দুর্দান্ত ওখানকার কালেকশান। খুঁটিয়ে দেখতে তিনদিন লেগে যায়। বেলা বারোটায় যে-বিখ্যাত ঘড়িটার বাজনা দেখতে লোকে সেন্ট্রাল ইয়ার্ডে ভিড় করে, সেটাই বরং ভীষণ ছোটো, এবং স্ক্রিনে এনলার্জড প্রজেকশানের পরও তত ইমপ্রেসিভ নয়। মৌমিতা তো বলেই ফেলল, ‘এ যে ওয়ার্ডসওয়ার্থের Yarrow Visited!’ ...যাই হোক, অনেক মূর্তি, প্রাচীন ঐতিহাসিক মুদ্রা, তৈজসপত্র, পোশাক, বিখ্যাত চাইনিজ ব্লু পর্সেলিন, মেরি আঁতোয়ানেতের লেখার টেবল, রবি বর্মা, অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল, এম-এম. বোস ইত্যাদির অসাধারণ পেন্টিংস দেখে মন ভরে গেল। তারপর ওয়েস্টার্ন পেন্টিং সেকশানে যখন আমি আর মৌমিতা সেই আশ্চর্যজনক ছবিটা দেখছি যেটা সামনে থেকে সুন্দরী মেয়ে আর উলটো দিকে দাড়িঅলা মেফিস্টোফিলিস— হঠাৎ মিউজিয়ামে অ্যালার্ম বেজে উঠল!
সঙ্গে সঙ্গে সেন্ট্রিরা ছুটে এল এধার-ওধার থেকে রাইফেল হাতে। ...আমরা আতঙ্কে স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মৌমিতা ডুডুকে কোলে তুলে নিয়েছিল। ...ওরা গ্যালারির এদিক-ওদিকে তীক্ষ্ণচোখে কী খুঁজতে লাগল। ...মুকুল যেই সামলে নিয়ে জিগ্যেস করল, ‘ক্যা হুয়া?’ ওরা পাল্টা শুধল— ‘দেখা হ্যায়? কোই পাগল ইধার আয়া থা?’ সমীরণবাবু নির্বকার ভাবে একটা সিঁড়ির দিকে নির্দেশ করে বললেন, ‘সায়েদ উধার গ্যয়া।’ একজন গার্ড সন্দিগ্ধভাবে বলল, ‘আপকো ক্যায়সে মালুম উসকা হুলিয়া ক্যায়সা হ্যায়? কাঁহাসে আয়ে হ্যায় আপ?’ সমীরণবাবু বললেন, ‘লে হালওয়া, কোলকাতা সে আয়া হ্যায় হাম সব। ইয়ে মেরা বিবি-বাচ্চা হ্যায়। তুম ক্যা মুঝে পাগল সমঝা?’
গার্ডবাবাজি অন্য দিকে সটকে পড়ল। শোনা গেল পরে, মিউজিয়ামে কে বুঝি ফোন করে বলেছে, এই মুহূর্তে এক ডেঞ্জারাস আর্মড লুনাটিক তোমাদের বিল্ডিংয়ের ভিতর আছে।
আমরা ভেবে পেলাম না, কেউ আর্মড অবস্থায় ঢুকবে কী করে? মেটাল-ডিটেক্টর রয়েছে!
উপস্থিত সবাইকে আবার খুঁটিয়ে সার্চ করা হল। তেমন কাউকে শেষপর্যন্ত পাওয়া গেল না।
হোটেলে ফিরে মুকুল হাসতে হাসতে সমীরণবাবুকে জিগ্যেস করেছিল, ‘এটাও আপনার প্র্যাকটিকাল জোক নয় তো? মোবাইল থেকে কল করলে কিন্তু ট্রেস করে বার করবে পুলিশ!’
উনি করুণ মুখ করে বললেন, ‘আর কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দেবেন না। আমার মোবাইল অটো থেকে উঠতে-নামতে কখন যে পকেট থেকে রাস্তায় পিছলে পড়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি!’
মৌমিতা চমকে উঠল: ‘সে কী! বলো নি তো?’
সমীরণবাবু বললেন, ‘ধূর! গেছে ভালো হয়েছে! খুব পুরোনো হয়েছিল সেটটা, বেচলে একশো টাকা পেতাম না। এখন নতুন ক্যামেরাঅলা সেট অনেক সস্তা। কলকাতা ফিরে একটা নিয়ে নেব।’
তৃতীয় ঘটনার লোকেশান রামোজি সিটি। কয়েক বছর ধরে এটাই টপ ট্যুরিস্ট অ্যাট্রাকশান হায়দরাবাদের। আমরা ব্রেকফাস্ট করে সকাল ন-টা নাগাদ স্পেশাল বাস ধরলাম। সোয়া দু-ঘণ্টা বাদে পৌঁছোলাম রামোজি সিটির প্রধান প্রবেশপথের সামনে। তারপর টিকিট কেটে, একটা করে লাল ব্যাজ লাগিয়ে ভিতরে ঢুকতেই— এক আলাদা জগতে!
বি-শাল এরিয়া। পায়ে হেঁটে কেউ সবটা ঘুরতে পারবে না। ওর ভিতের সেন্ট্রাল টার্মিনাস থেকে বিভিন্ন লোকেশান দেখতে বিভিন্ন রুটের বাস চাপতে হবে। সবই এক রকম লাল রং, গায়ে ‘রামোজি’ লেখা, শুধু নম্বর আলাদা।
কত যে প্রাসাদ, ফিলম আর সিরিয়াল শ্যুটিং-এর জন্য উপযোগী বাংলো, বাড়ি, রাস্তা, কত রকমের ফুল-ফলের বাগান, ঝরনা, ডিজাইনড পিলার, মূর্তি, গোনা যায় না। তাজমহল থেকে যাবতীয় মোগলাই স্থাপত্যের নকল দেখলাম। মাঠে এক দিকে একটা এয়ারোপ্লেনও আছে। আবার ভূত দেখার ব্যবস্থাও আছে একটা ডার্ক টানেলে!
ঘাস আর পাথর-টালির ডিজাইন-করা একটা বিশাল উঠোন আছে। তার এদিক-ওদিক কয়েকটা লাইফ-সাইজ যক্ষিণী মূর্তি। বাহারি সিঁড়ি উঠে গেছে পাঁচ-ছতলা উঁচু এক মাথা-ঢাকা ছাদে। সেখান থেকে সব এরিয়াটা অনেক দূর দেখা যায়। রোদের তাপ বাঁচিয়ে সেখানে বসে কোল্ড ড্রিংকস খাওয়া হল পপকর্ন সহযোগে। লোকে তো খালি ক্যামেরা ভর্তি করছে ছবি তুলে তুলে।
সিঁড়ি দিয়ে উঠোনে নেমে এলে দু-ধারে প্রকান্ড দুই শ্বেত পাথরের শুঁড়তোলা হাতি, পিঠে সবুজ ঘাসের মোটা হাওদা। সেখানে দাঁড়িয়ে আমরাও কয়েকটা ছবি তুললাম। ডুডু একবার বলল, ‘মা হাতির পিঠে চড়া যায় না?’
রামোজি চত্বরের যত্রযত্র অজস্র অডিটোরিয়াম। এক-এক রকম অনুষ্ঠান হচ্ছে সারাদিন ধরে। কোথাও টিকিট কাটতে হয়, কোথাও আবার ফ্রী এনট্রান্স। চিলড্রেনস ওয়ার্ল্ড -এ ঢোকার গেটটা দেখে ডুডু একেবারে হাঁ হয়ে গেছিল। একটা হিউজ মনস্টারের ব্লু মুখ, মস্ত হাঁ, লাল জিভ বার করে আছে, শুধু ওপর পাটিতে দুটি দাঁত। জিভটাই ঢোকার রাস্তা, আর হাঁ -এর মধ্যে দিয়েই ঢুকতে হবে! ভিতরে মন-মাতানো নীল লেকের ফোয়ারা, তাতে আবার আলপনার কারুকাজ ফুটে উঠছে থেকে থেকে।
সেখানে আইসক্রিম খেয়ে বেরিয়ে এসে আমি, মুকুল আর সমীরণবাবু লাইন দিলাম ভার্টিকাল নাগরদোলা চড়ার জন্য। যাদের টার্ন চলছে, তারা ওপরে উঠে যেই উলটে যাচ্ছে, অমনি বীভৎস চিৎকার করে কানে তালা লাগাচ্ছে! এটাই মজা! মৌমিতা রইল বাইরে। নিজেও উঠবে না, ছেলেকেও উঠতে দেবে না।
আমরা ‘রাইড’ শেষ করে মিনিট কুড়ি পরে এনক্লোজারের বাইরে এসে মা-ছেলেকে ধারে-পাশে দেখতে পেলাম না। মুকুল বলল, দেখো কোন ফুডস্টলে গেছে কেক খেতে।
প্রায় আধ ঘণ্টা বাদে, যখন আমরা সত্যিই ভাবছি ফেরার সময় হল, এবং রামোজির কোনো অফিসিয়ালকে জানাব আমাদের পার্টির দু-জনকে পাওয়া যাচ্ছে না, এমন সময়—
আমাদের দিকে ছুটে আসতে আসতে একটি মুখোশ-পরা বাচ্চা চেঁচিয়ে উঠল— ‘বাপি! আন্টি! দেখো, কে এসেছে!’
বোঝা গেল ডুডু। তার পিছনে হাত নাড়তে নাড়তে এগিয়ে এল মৌমিতা। সঙ্গে এক অজানা ভদ্রলোক।
সমীরণবাবুর মুখখানা হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। ঠোঁঠ চেপে বলেন— ‘এখানে অধীপ কখন এল?’
ওরা কাছে আসতে বললাম, কোথায় ছিলে তোমরা? আমরা অনেকক্ষণ অ্যাংজাইটিতে ভুগছি!
মৌমিতা বলল, ‘দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বোর হয়ে ওই চত্বরটায় গিয়েছিলাম। ওখানে জুডো খেলা হচ্ছে। হঠাৎ দেখি বাঁদিকের লাল বাড়িটা থেকে অধীপ বেরোচ্ছে...আলাপ করিয়ে দিই। আমার কলিগ, ইতিহাস-বিশারদ অদ্রিজা মুখার্জি, ওর প্রাণেশ্বর, মুকুলবাবু। আমার বহুদিনের জার্নালিস্ট-রাইটার বন্ধু, অধীপ সেন।
সমীরণ রায় এবার বললেন, ‘অধীপবাবু তো আমাদের সঙ্গেই আসতে পারতেন মৌ? তুমি ওঁকে আগে জানাওনি আমাদের ট্রিপের কথা?’
অধীপ বাবু বললেন— ‘না-না। হঠাৎ একটা conference কাভার করতে আসা আমার। ভাবলাম এই সুযোগে রামোজি সিটি দেখে যাই।’
মুকুল ভদ্রতা করল— ‘আ প্লেজেন্ট কোয়েনসিডেনস। আপনার সঙ্গে আমাদেরও পরিচয়ের সুযোগ হল!’
সমীরণবাবু একটু সামলে নিয়ে বললেন, ‘লাইফ ইজ অল কয়েনসিডেন্সেস, প্লেজেন্ট অর আনপ্লেজেন্ট। অধীপবাবু, কোথায় উঠেছেন?’
—‘একটা ছোটো হোটেলে। লকড়ি কা পুলের কাছে।’
শুনেই সমীরণ বললেন, ‘তো চলে আসুন আজ রাতে আমাদের শবনম-এ। চুটিয়ে ব্রিজ, খেলা যাবে!’
অধীপ ডিপ্লোম্যাটের মতোই জবাব দিলেন, ‘অবশ্যই সুযোগটা ছাড়তাম না। কিন্তু আজ রাত আটটার ফ্লাইটেই কলকাতা ফিরতে হচ্ছে!’
রামোজি থেকে ফিরে সেদিন রাতে সমীরণবাবু অনেকটা ড্রিঙ্ক করেছিলেন। ওদের ঘর থেকে ঝগড়ার আওয়াজে আমরা রীতিমত এমব্যরাসড হয়েছিলাম।
অদ্রিজার বাড়ি থেকে বেরোতে সেদিন একটু রাতই হয়ে গেল সুমনার। তাই একটা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা নিজের বাড়ি ফিরে গেল।
বটব্যালের তৎপরতা
পরদিন সকালে অমিতের বাড়ি রিপোর্ট দিতে এল সুমনা। অদ্রিজার বিবৃতি সংক্ষেপে জানিয়ে বলল, ‘ওথেলো-সিনড্রোমটা এ থেকে আরো জোরাল হচ্ছে, তাই না?’
অমিত বললেন, ‘রাইট! পাজলের অনেক ঘরেই ঠিক ঠিক খুঁটি বসে গেছে। ইমপর্ট্যান্ট জিনিস হারানোটা সমীরণের নিয়মিত হ্যাবিট! সেলফোনই হোক, বা ফ্ল্যাটের চাবিই হোক। তবু...’
সুমনা বলে উঠল, ‘আপনি বোধ হয় অধীপ সেনকে একটু বাজিয়ে নিতে চাইছেন?’
—‘একজ্যাকটলি!’ খুশি ফুটল অমিতের চোখে— ‘একেই বলে ওয়োম্যানলি ইনসটিঙ্কট!’
এমন সময় কলিং বেলের আওয়াজ। দরজা খুলে বটব্যালকে দেখে একটু অবাক হবার সঙ্গে সঙ্গে খুশিও হলেন অমিত।
—‘আরে, আপনি স্বয়ং! আমাদের মধ্যে কে পর্বত আর কে মহম্মদ? যাক, বুঝতেই পারছি everything is on right track! বসুন, বসুন! কফি খেতে খেতে সব শুনছি!’
সুমনা উঠল —‘আমি তাহলে আসি, স্যার। সময়মত ডাকবেন।’ দরজা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেল।
বটব্যাল বললেন, খবর অনেক আছে, আর সব কটাই এক দিকেই ইণ্ডিকেট করছে। ফাইনাল পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেয়েছি। মাথার পিছনে আঘাতের চিহ্ন আছে। সী ওয়াজ হিট আনকন্সাস অ্যাণ্ড স্ট্র্যাংগলড । আমি এখন অলমোস্ট সিওর, সমীরণ রায় ইজ দা কিলার অব হিজ ওয়াইফ অ্যাণ্ড সন। আপনার সঙ্গে পয়েন্টগুলো আলোচনা করেই আমি ওকে অ্যারেস্ট করব।
অমিত বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফর নট অলরেডি অ্যারেস্টিং হিম। যুক্তি মতে সব সন্দেহের তিরই ওঁর দিকে, ঠিকই। তবু একটা পয়েন্টে আমি সিওর হতে পারছি না। আচ্ছা, আগে বলুন, জুতো পেয়েছেন পাঁচিলের বাইরে?’
বটব্যাল জানালেন— ‘হ্যাঁ। একপাটি ঝোপের ধারে, আরেক পাটি ডোবার জলে। আর, ওই ডোবাতেই আরেকটা জিনিস পেয়েছি। কী বলুন তো?’
অমিত বললেন, ‘এখনো দুটো জিনিস মিসিং। এক, ফ্ল্যাটের চাবি, দুই, এক জোড়া গ্লাভস বা দস্তানা।’
বটব্যাল একটু চুপসে গিয়ে বললেন— ‘আপনি, মশায়, বড্ড কুইকলি সব ভেবে ফেলেন! হ্যাঁ ফ্ল্যাটের চাবিটা পেয়েছি ডোবায়। ওইটাই কালপ্রিটকে ডুবিয়ে দেবে। কিন্তু গ্লাভস-এর তো কোনো হদিশ পেলাম না!’
অমিত ওঁর কাঁধ চাপড়ে বললেন, ‘কনগ্রাচুলেশান! ইউ হ্যাভ ডান আ ফ্যানটাস্টিক জব। যেটুকু বাকি, সব হয়ে যাবে। ডোন্ট ওরি! শুধু বলুন, সমীরণের পায়ে যে-বাটার জুতো এখন দেখছেন, সেটা ব্র্যাণ্ড নিউ তো?’
বটব্যাল আবার একটু চমকিত কিন্তু আশ্বস্ত হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, সেটা লক্ষ্য করেছি। মানে, ওই বুট জোড়া ফেলার পরই এটা পরতে হয়েছে!’
‘ব্রিলিয়ান্ট!’ অমিত উৎসাহ দিলেন, ‘এইবার জাস্ট দুয়ে দুয়ে চার করতে হবে। আমাদের একটা ছোট্ট আউটিং দরকার। তবে তার আগে হাতে আধঘণ্টা সময় আছে। ফ্ল্যাটের লোকেদের জেরা করে কী জানলেন, একটু শোনান!’
বটব্যাল তাঁর লিখিত রিপোর্টটাই অমিতকে দেখতে দিলেন। সেটাতে চোখ বুলিয়ে অমিত জানলেন, মৌমিতাদের ঠিকে ঝি বাসন্তী ওইদিন ছুটি নিয়েছিল। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ খবর— ৩৯ নম্বর ফ্ল্যাটের তপন মুখার্জি নামে এক মাঝ-বয়সি ভদ্রলোক দুপুর পৌনে দুটো নাগাদ লিফটের দিকে যেতে যেতে ৪৩ থেকে বাচ্চাগলার তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনেছিলেন। চিৎকার হঠাৎ ওঠার পরই থেমে যায়। কান পেতেও আর কিছু শুনতে পাননি।
অমিত বটব্যালকে শুধোলেন— ‘ওয়াচম্যান মনিন্দর দুবে বলেছে, ডিউটি দিতে দিতে সমীরণকে সে দিল্লি থেকে ফিরে গেট দিয়ে ঢুকতে দেখেছে অ্যাট থ্রি-থার্টি পি.এম.। বেলা একটা থেকে দুটো পর্যন্ত সে কোথায় ছিল, বলেছে কি?’
বটব্যাল বললেন— হ্যাঁ, ওই সময়টা ও লাঞ্চ করে।
অমিত বললেন ‘অর্থাৎ ওই সময় যে কেউ বাইরে থেকে এসে বিল্ডিং -এর ভিতর ঢুকে পড়ার সবচেয়ে সুবিধেজনক সময়। অ্যান্ড হু নোজ ইট বেটার দ্যান সমীরণ রায়! ...চলুন, এবার আমরা বেরই। উদ্ধার-করা জুতো জোড়া কোথায় রেখেছেন?’
‘আপাতত গড়িয়া থানাতেই আছে, আণ্ডার লক অ্যাণ্ড কী। আপনি কি দেখবেন?’
‘হ্যাঁ। দেখতেও হবে, দেখাতেও হবে!’
‘দেখাবেন আবার কাকে? সমীরণকে?’
‘চলুন না, আপনি তো সঙ্গেই থাকছেন!’
টুপটাপ ঝরে ক্লু
অমিত আর বটব্যালকে নিয়ে জিপটা গড়িয়া থানায় পৌঁছোতেই ও.সি. নাগেশ্বর বেরিয়ে এসে দু-হাত প্রসারিত করে বললেন— আসুন, স্যার!
তারপর বিশেষ ভাবে অমিতের দিকে চেয়ে বললেন, ‘স্যার ওই জুতোর ছাপ থেকে এক ঢিলে জুতো, চাবি দুই-ই মিলে গেল। যাকে বলে, হোয়াট অ্যান আইডিয়া, স্যার!’
বটব্যাল অফিসিয়াল সুরে বললেন, ‘মি: নাগেশ্বর, জুতোর ব্যাগটা নিয়ে আমাদের সঙ্গে আসুন। নেক্সট স্টেপ অব আওয়ার ইনভেস্টিগেশান স্টার্টস নাউ!’
‘ইয়েস, স্যার!’ বলে নাগেশ্বর একটা ব্যাগ তুলে নিলেন। তাতে লেখা: ‘Exhibit No. 3’।
অমিতের নির্দেশে জিপ প্রথমে এসে থামল ‘আহ্লাদে আট’-এর পাশে। সেখান থেকে সরু পায়ে-চলা পথ বিল্ডিংটার পিছনে আড়াআড়ি চলে গেছে। কয়েক পা বাঁয়ে গিয়ে থেমে গিয়ে নাগেশ্বর অমিতকে দেখালেন, ডানদিকের ঢালু জমিতে কোথায় আগাছায় আটকে ছিল এক পাটি ট্রটার, আর বাকি পাটিটা ডোবার কোন জায়গা থেকে তোলা হয়েছিল। বললেন আরো, ‘লাকিলি, স্যার, ওই সেকেণ্ড জুতোটার মধ্যেই চাবিটা পেয়ে গেলাম!’
অমিত পাঁচিলের দিকে ফিরে বললেন, ‘তার মানে, এই জায়গাতেই ভিতরের উঠোন থেকে খুনি পাঁচিলে লাফিয়ে উঠেছে, এবং লক্ষ করেছে মাটিতে তার জুতোর ছাপ তারপর এধারে নেমেই সঙ্গে সঙ্গে সেই জুতো জোড়া ফেলে দিয়ে নিজেকে সেভ করতে চেয়েছে। ব্যাড লাক। একটা জুতো ঝোপে আটকে সহজেই আরেকটার দিকে লোকের নজর টেনেছে! ...তারপর সে কোতায় গেল? অবশ্যই অবিলম্বে নতুন এক জোড়া জুতোর খোঁজে। এখান থেকে নিয়ারেস্ট বাটার দোকান কোথায়?’
নাগেশ্বর বললেন, স্টেশান রোডে।
তৎক্ষণাৎ তিনজন চললেন সেখানে।
দোকান খুলতে-না-খুলতে পুলিশ দেখে উদবিগ্ন মুখ করলেন বাটার দোকানে কর্মচারীরা।
বটব্যাল বললেন, ‘এক জন ক্রিমিনালকে খুঁজছি আমরা। যা প্রশ্ন করা হবে, ঠিক ঠিক উত্তর দিন!’
অমিত এবার দু-জন সেলসম্যানের মধ্যে একটু বয়স্ক লোকটিকে শুধোলেন, ‘গত একত্রিশে জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার, বেলা দুটো আড়াইটে নাগাদ আপনাদের মধ্যে কে ছিলেন দোকানে?’
—‘আমরা সবাই। মানে, আমি আনন্দ ঘোষ, ইনি যতীন বসু, আর ক্যাশিয়ার উদয় ভড়।’
—‘বেশ। ওই সময় কোনো কাস্টমার এসেছিল? জবরদস্ত স্বাস্থ্যবান ভদ্রলোক।
—‘হ্যাঁ। আমিই ওঁকে এক জোড়া জুতো সেল করি।...’
—‘বাটা সিটিরাইডার, আট নম্বর?’
আনন্দ অবাক চোখে তাকালেন। বললেন, ‘ঠিক তাই! ভদ্রলোককে আমার মনে থাকবে, কারণ উনি একটা রিকশা থেকে নেমেছিলেন শুধু মোজা পায়ে! কেমন যেন ইমার্জেন্সি অবস্থা!’
পাশ থেকে যতীন নামে লোকটি বলল, ‘আর বাক্সটার কথা বলুন!’
—‘হ্যাঁ। জুতো পরে উনি চলে গেলেন। বললেন বাক্স আর লাগবে না। পরে আমরা বাক্সটা খুলে দেখি, তার মধ্যে এক জোড়া গ্লাভস!’
—‘গ্লাভস!’ গাম্ভীর্য ভুলে উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন বটব্যাল— ‘মিল গ্যয়া! আচ্ছা, অমিতবাবু, কী করে আপনি সব বুঝে ফেলেন, বলুন তো!’
অমিত ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে ওঁকে সংযত হতে বললেন। গ্লাভসসহ বাক্সটা হাতিয়ে দোকান-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘দরকার হলে লোকটিকে আইডেন্টিফাই করতে হবে আপনাদের!’
বাঁশের-চেয়ে-কঞ্চি-দড় নাগেশ্বর আঙুল আস্ফালন করে বললেন, ‘এটা নাগরিক ও আইনি কর্তব্য, মনে রাখবেন!’
জিপে ফিরে বটব্যাল অমিতকে শুধোলেন, এবার কি আমাদের গন্তব্য সুইট সোলেস?’
অমিত বললেন, ‘না, লেট আস বী ডাবলি সিওর। কসবা কানেকটার এ সিমেন্স অফিস চলুন।’
সিমেন্স-এ গিয়ে সমীরণ রায়ের ডিপার্টমেন্ট সহজেই বার করা গেল। সেখানে তাঁর এক সহকর্মী রজত পারেখ, সমীরণের নাম শুনে এগিয়ে এলেন কথা বলতে।
বটব্যালকে উনিই জিগ্যেস করলেন, ‘কী ব্যাপার? কী হয়েছ সমীরণের? দু-দিন অফিসে দেখছি না!’
বটব্যাল পালটা শুধোলেন, ‘আপনি নিশ্চয়ই সমীরণ রায়কে বেশ ভালোভাবে চিনতেন?’
—‘হ্যাঁ। আমরা চার বছর এক সঙ্গে কাজ করেছি, মানে, করছি।’
নাগেশ্বর জুতোর ব্যাগটা খুলে Exhibit No. 3 দেখিয়ে বললেন, ‘দেখুন তো, এই জুতো আপনি চিনতে পারবেন?’
—‘হ্যাঁ। এতো সমীরণের জুতো বলেই মনে হচ্ছে। ওর কি অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে?’
বটব্যাল বললেন, ঠিক তা নয়। হি ইজ সাসপেক্টেড ইন আ মার্ডার কেস!
শুনে রজতবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। যেন ব্যাপারটা ঠিক মাথায় ঢুকল না!
তদন্তকারীরা বেরিয়ে এলেন অফিস থেকে।
নাগেশ্বর সোৎসাহে চেঁচিয়ে উঠলেন— ‘তাহলে, স্যার, আমরা এখনি কালপ্রিটকে অ্যারেস্ট করতে পারি!’
বটব্যালও পূর্ণ সমর্থন করলেন তাঁকে— ‘ডেফিনিটলি। এখন আর কোনো ইফস অ্যাণ্ড বাটস নেই! কী বলেন, মি: নিয়োগী?’
অমিত বললেন, ‘ইয়েস। এই কেসে হু ডান ইট, ও নিয়ে গোড়া থেকেই ধাঁধা তেমন ছিল না। সেই জন্যই কোনোরকম স্টান্ট লুকিয়ে আছে কিনা, সেন্ট পারসেন্ট দেখাটা দরকার।...আমাকে আর কয়েক ঘণ্টা সময় দিন, প্লিজ!’

সমীরণ ও অধীপের মধ্যে সপুত্র মৌমিতা....
বটব্যাল একটু বিরক্ত হলেও ফিকে হাসলেন: ‘আপনি, মশাই, বড্ড পারফেকশানিস্ট, একেবারে ট্রিপলি সিওর হতে চান। ঠিক আছে, কাল আর্লি মর্নিংয়ে শুভকাজ সম্পন্ন করা যাবে।’
‘ধন্যবাদ। চলি এখন!’ অমিত একটা ট্যাক্সি নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন। ট্যাক্সিতেই অধীপ সেনের নাম্বারটা প্রেস করলেন। ‘দা ভোডাফোন নাম্বার ইউ হ্যাড কলড জি এ্যাট প্রেজেন্ট বিজি!’ শুনে কাট করতেই অমিতের মোবাইল বেজে উঠল। হ্যাঁ, অধীপই ওঁকে চেষ্টা করছিলেন একই সময়ে। তৎক্ষণাৎ ভদ্রলোককে তাঁর বাড়িতে আসার নির্দেশ দিলেন গোয়েন্দা।
‘ইট ইজ দ্য কজ!’
অধীপ সেনের চোহারাটা লম্বা ছিপছিপে, রোমান্টিক ধরনের। সিনেমার নায়ক না হলেও নায়কের বন্ধু হতেই পারতেন। তবে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ভদ্রলোকের মুখে একটা বিষাদের ছায়া পড়েছে।
নমস্কার-প্রতিনমস্কার পালা শেষ হতেই সরাসরি আসল বক্তব্যে চলে গেলেন অধীপ। বললেন, ‘এই ট্র্যাজেডির জন্য নিজেকে খানিকটা দায়ী মনে হচ্ছে!’
অমিত— কেন একথা বলছেন? আপনি জানেন কে খুন করেছে?
অধীপ— ‘মৌমিতার হাজবাণ্ড সমীরণই তাকে আর বাচ্চাটিকে মার্ডার করেছে আমার দৃঢ় ধারণা, আর কেন করেছে, তাও আমার অজানা নয়। আমি যদি মৌমিতার সঙ্গে সম্পর্ক না রাখতাম, ওর জীবনের এই বিপর্যয় ও দুঃখজনক পরিণতি হত না।’
অমিত— আপনার সঙ্গে মৌমিতার সম্পর্কটা কি প্রেমিক-প্রেমিকার ছিল?
অধীপ— বলছি। সব কিছু আপনাকে খুলে বলব বলেই আজ এসেছি।
আমরা প্রেসিডেন্সি কলেজে ফার্স্ট ইয়ারেই পরস্পরের প্রেমে পড়েছিলাম। আমি প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ হয়েছিলাম। ও কয়েক মাস পরে রেসপণ্ড করতে শুরু করে। তারপর যেমন হয়, আমরা ক্লাস পালিয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিতাম কফি হাউস, রেস্তোরাঁ, ইডেন গার্ডেন, গঙ্গার ধার, নন্দন চত্বর। মাঝে মাঝে ছুটির দিনে কলেজের ছুতো করে বেরিয়ে গান্ধীঘাট, ব্যাণ্ডেল চার্চ, ডায়মণ্ড হারবার, হর্টিকালচার, এবং অবশ্যই সিনেমা। বাবা-মাকে অকালেই হারিয়েছি; তবে বাবা আমার জন্য যা রেখে গেছেন তাতে এ জীবনে আর্থিক দুশ্চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু জানেন অমিতবাবু, আমি সেইসব হতভাগ্য লোকেদের একজন, যাদের জীবনে সবকিছুই নর্ম্যাল এক্সসেপ্ট দেয়ার সেক্স লাইফ!... যৌবনে পা দেবার পরই দেখতাম, খুব সহজেই আমার উত্তেজনা হয়, কিন্তু স্টিফনেসটা কয়েক সেকেণ্ডের বেশি থাকে না। ওর মধ্যেই স্খলন হয়ে যায়। আমার পক্ষে যৌন মিলনে পেনিট্রেশান অসম্ভব। সিমেন টেস্ট করিয়ে দেখেছিলাম, ভীষণ দুর্বল স্পার্ম। আমি এক ইমপোটেন্ট ইয়ংম্যান! কিন্তু মৌকে আমি ভীষণ ভালোবাসতাম, পাগলের মতো। যখন দেখা হোতো না, তখনো ওর কথা ভাবতাম। কলেজে তিন বছরে ওর অন্তত তিনশো ছবি তুলেছি। ওদের কোলাঘাটের বাড়িতেও বহুবার গেছি। ওর দাদার সঙ্গেও আমার ভালো দোস্তি আছে। কিন্তু যখনই মৌ ভবিষ্যত বিবাহিত জীবনের ইঙ্গিত দিয়েছে, আমি গুটিয়ে যেতাম একেবারে গুটি পোকার মতো। শেষে একদিন কনফেস করতে হল। এম. এ. ক্লাসে পড়তে পড়তে এক্সকারশান-এ গিয়েছিলাম আমরা শিলং। সেখানে এক দুর্বল মুহূর্তে মৌ তার দেহ-মন-যৌবন সব আমাকে উজাড় করে দেবার জন্য আকুল হয়েছিল... সে যে কী যন্ত্রণা, কী লজ্জা! ...আমি ওকে সব খুলে বললাম। আর বললাম, আমার মতো লোককে কোনো মেয়ের বিয়ে করা উচিত নয়। একটা ভালো সম্বন্ধ ঠিক করতে বলো দাদাকে। ...ভেবেছিলাম, এরপর ও আর কোনো সম্পর্ক রাখবে না আমার সাথে। সব ভালোবাসা প্রবল ঘৃণায় রূপান্তরিত হবে। কিন্তু আপনি ভাবতে পারবেন না হাউ গ্রেট শী ওয়াজ! শী ফেল্ট ডীপলি সিমপ্যাথেটিক টু মী। ...অনেক সেক্সলজিস্ট দেখিয়েছি। হরমোন ট্রিটমেন্ট, হোমিয়ো, কবিরাজি কিছু বাদ রাখিনি। কিন্তু আমার ইমপ্রুভমেন্ট হয়নি। এই দেখুন, আমার লেটেস্ট সিমেন রিপোর্ট। আপনাদের কেসে ডকুমেন্ট হিসেবে দরকার হতে পারে, মনে করে আনলাম। ...মৌমিতা কিন্তু কাউকে আমার এই অপৌরুষের খবর বলেনি। বিয়ের আগে ওর দাদাকে শুধু বলেছিল, অধীপ চিরব্যাচেলর থাকবে, আমার জন্য ভালো পাত্র খোঁজো। তারপর সম্বন্ধ করে সমীরণ রায়ের সাথে ওর বিয়ে হলো। সে বিয়েতে আমিই সব ব্যাপারে মোড়লি করলাম। জীবনের পরিহাস দেখুন, ইমপোটেন্ট, তবু ইমপরট্যান্ট! ...বিয়ের পরও ওর বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি দু-বাড়িতেই বন্ধু হিসাবে আমার আনাগোনা ছিল। সমীরণবাবু মাঝে মাঝে বাঁকা কথা শোনালেও তেমন একটা সীন ক্রিয়েট করেননি।
কিন্তু বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে মৌ যখন কনসীভ করল, আর বাচ্চাটা প্রি-ম্যাচুরলি আট মাস চার দিনে হয়ে গেল, তারপর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে অশান্তির ছায়া ছড়িয়ে পড়ল। ছেলে দেখে খুশি না হয়ে সমীরণ তার অপুষ্ট দেহ দুর্বল স্বাস্থ্য নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করতে লাগলেন। মা হবার খুশি ম্লান হয়ে গেল যখন মৌকে ক্রমশঃ বুঝতে হ’ল, বর সন্দেহ করছে বাচ্চাটার আসল বাবা আমি। ওকে বলেছেনও সমীরণ, ‘আমার ছেলে এত দুবলা-পাতলা হতেই পারে না। এসব প্রি-ম্যারিটাল মিশ্চিফের ফল!’ আমি তারপর বহুদিন মৌকে বলেছি, আমার ইমপোটেন্সির ফ্যাক্টটা সমীরণকে জানাতে, দরকার হলে রিপোর্ট দেখাতে। কিন্তু ও বলেছে, ‘তোমার লজ্জা আমার লজ্জা। পৃথিবীতে আর কাউকে জানাব না। তুমিও বলবে না কাউকে, আমায় ছুঁয়ে শপথ করো।’ এটা নর্ম্যাল না অ্যাবনর্ম্যাল, বলবেন মনস্তাত্ত্বিকরা, কিন্তু আমার মাঝে মাঝে বেশ মজা লাগত যে, সমীরণ আমাদের দু-জনকে এক শয্যায় কল্পনা করে হিংসেয় জ্বলছে!... আজ অনুতাপ হচ্ছে, অমিতবাবু, একথাটা যদি সমীরণকে জানাতাম, আমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হত, কিন্তু মৌ মরত না, আর ওই নিষ্পাপ, অসহায় ডুডুকে এমন নিষ্ঠুর ভাবে প্রাণ দিতে হত না!...
অধীপ সেনের গলা বুজে এল। নীরবে মাথা নীচু করে বসে থাকলেন খানিকক্ষণ। অমিত ওঁকে সামলে নেবার সময় দিয়ে বললেন— ‘শুনলাম হায়দরাবাদে মৌমিতাদের সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিল?’
অমিত জানেন, দেখে একটু অবাক হলেন অধীপ। বললেন, ‘হ্যাঁ, কিন্তু সেটা পিওর কয়েনসিডেন্স। আমাকে একটা প্রফেশানাল কারণেই ওই সময় হায়দরাবাদ যেতে হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এই ঘটনাও সমীরণবাবুর সন্দেহে ইন্ধন জুগিয়েছে!’
অমিত বললেন, ‘কিন্তু উনি তো আপনাকে ওঁদের হোটেলে আসার জন্য ইনভাইট করেছিলেন। আপনি সেরাতের ফ্লাইটে কলকাতা ফিরে গেলেন!’
অধীপ বিষণ্ণ হাসলেন। তারপর বললেন— ‘রামোজি সিটিতে যখন উনি মৌমিতা আর ডুডু-র সঙ্গে আমাকে হঠাৎ দেখলেন, তখন ওনার চোখের চাউনিতে আমি দেখেছিলাম জ্বলন্ত গ্রিন জেলাসি। ওঁনার দৃঢ় ধারণা হয়েছিল, আমাদের মূলাকাৎটা আগে-থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনুযায়ী। আরেক দম্পতি ওঁদের সঙ্গে ছিলেন। তাঁদের সামনে ভদ্রতা বজায় রাখতে ইনভিটেশানটা জানিয়েছিলেন। মনে মনে আমার মুন্ডপাত করছিলেন! তাই আমি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলাম এক্সকিউজ দেখিয়ে, যদিও আমার ফ্লাইট ছিল পরদিন সকালে।’
অমিত একটু ভেবে বললেন, ‘এই দুর্ঘটনার ঠিক আগে সমীরণবাবু দিল্লি গেছিলেন অফিসের কাজে। সেসময় কি আপনি ৪৩ নম্বর ফ্ল্যাটে এসেছিলেন?’
অধীপ একটু চমকিত হলেন। বললেন, ‘আপনি তো সবই আঁচ করতে পারেন মনে হচ্ছে! আমার অবশ্য লুকোবারও কিছু নেই। হ্যাঁ, আমি এসেছিলাম ঘটনার দু-দিন আগে, বিকেলে। আমি থাকতে থাকতেই দিল্লি থেকে সমীরণের ফোন আসে। রিং শুনে ফোন ধরতে একটু দেরি করে মৌমিতা। ফোনেই সমীরণ জিজ্ঞাসা করেছিল ঘরে আর কে আছে? মৌ বলেছিল, কে আবার থাকবে? বিশ্বাস করেনি ওর বর। পরে শুনেছিলাম, মৌমিতাকে নাকি আরো জেরা করেছিল, বসন্তের কোকিল আসে নি? এই তো সময় কাকের বাসায় আসার?...’
‘ধন্যবাদ, অধীপবাবু’— অমিত সাক্ষাৎকার শেষ করার ইংগিত দিলেন— ‘আমকে সব কথা খুলে বলে খুব ভালো করেছেন। আর, আপনার মেডিক্যাল রিপোর্টটা আমি এখন রাখছি আমার কাছে। ...খুনির আইডেন্টিটি নিয়ে প্রথম থেকেই সংশয় বিশেষ ছিল না। কিন্তু মোটিভ সম্পর্কে একটু ধন্ধে ছিলাম। এখন আর আমার মনে কোনো কিন্তু নেই। এইবার অবিলম্বে সমীরণকে গ্রেফতারের ব্যবস্থা করা হবে। মৌমিতার দাদা প্রকাশবাবুকেও জানিয়ে দেব। হয়তো এরপর আমাদের কোর্টে দেখা হবে। গুড নাইট!’
প্রস্তুতি সম্পূর্ণ
অধীপ বাবুকে বিদায় দিয়ে তৎক্ষণাৎ সুমনাকে ‘কল’ করলেন অমিত। ও সাড়া দিতেই বললেন— ‘শোনো, কিটি, ইনভেস্টিগেশান ইজ কমপ্লিট। অধীপ সেন একটু আগে আমার কাছে এসেছিনেল। ফুল স্টেটমেন্ট দিয়ে গেলেন। কাজেই আমি ট্রিপলি সিওর হলাম অ্যাবাউট আওয়ার থিয়োরি অব ওথেলো সিনড্রোম ইন দিস কেস। শুধু বাকি আছে খুনির স্বীকারোক্তি— যেহেতু কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই উনি নিজে ছাড়া। অধীপবাবুর নিজের জীবনের আরেকটা ট্র্যাজিক ফ্যাক্ট আমাকে জানিয়ে গেছেন— যেটা তোমাকে সাক্ষাতে বলব—সে-সত্য জানার পর খুনির কী রিয়্যাকশান হবে, সেটাও দেখতে হবে। কাল ভোরেই সমীরণ রায়কে নার্সিং হোম থেকে অ্যারেস্ট করবে বটব্যাল এ্যাণ্ড কোং। তবে আমার মনে হয় সীনটা মোটেই প্লেজেন্ট হবে না। লোকটা নিজেও ভাগ্যের পরিহাসে ট্র্যাজিক ক্যারাক্টার হয়ে গেছে। যাই হোক, অ্যারেস্টের গল্পটা পরে শুনো কালকে বিকেলে এসে! গুড নাইট!’
লাইন কাট করেই বটব্যালের নাম্বার টিপলেন অমিত।
ওপার থেকে শুনলেন— ‘কী মশাই, আবার নতুন কোনো সূত্র পেলেন নাকি?’
অমিত সহাস্যে বললেন— ‘না, না, ভয় পাবেন না। এভরিথিং ইজ কনফার্মড। আরে বাবা, এ তো সীজনড ক্রিমিনাল নয়, প্রতি পদে ভুল করে প্রমাণ ছড়িয়ে গেছে। কাল সকাল সাতটায় অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট নিয়ে সুইট সোলেস-এ আমাদের ‘বিটার’ অভিযান!’
৫ই ফেব্রুয়ারি সকাল ছ-টা পঁচিশে মি: বটব্যাল-এর টাটা সুমোর মতো সাইজের স্পেশাল পুলিশ-কার অমিতের বাড়ির সামনে এসে হর্ন দিল। সঙ্গে একজন ইন্সপেক্টর, দু-জন কনস্টেবল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সিঁড়ি দিয়ে নামলেন নিয়োগী। কিন্তু এ ধরনের অভিযানে যে-উৎসাহ এবং প্রত্যশাজনিত উত্তেজনা অনুভব করেন গোয়েন্দারা, আজ অমিতের মনে সেরকম কোনো অনুভূতি রইল না!
ওদিকে মাথায় টুপি, কোমরে রিভলবারসহ পুরো ইউনিফর্মে শোভিত বটব্যালের ফিগার রোদে ঝকঝক করছিল। গাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভদ্রলোক, অমিতকে নামতে দেখেই সোৎসাহে ‘গুড মর্নিং’ বলে দরজা খুলে ধরলেন।
অমিতের দিক থেকে উচ্ছ্বসিত সাড়া না পেয়ে একটু অবাক হলেন বটব্যাল। গন্তব্যের দিকে ছুটল গাড়ি।
একটু পরে নিজেই অমিত বলে উঠলেন— ‘আপনি বোধহয় ভাবছেন, আমি এই মুহূর্তে উৎসাহে টগবগ করছি না কেন। আসলে, সমীরণবাবু বউ-ছেলেকে মার্ডার করেছেন ঠিকই, কিন্তু এ কেসে কোনো রিয়েল ভিলেন নেই, যাকে ফাঁসিতে ঝোলাতে পারলে আমি আপনার মতো খুশি হতাম। গোটা ব্যাপারটা খুব ট্র্যাজিক...’
বটব্যাল অধৈর্য হয়ে বললেন, ‘ট্র্যাজিক তো বটেই। মহিলারই বা কী বয়েস, আর ওইটুকু বাচ্চা ছেলে! কিন্তু আপনি এই নৃশংস ডাবল-মার্ডারের পরও ভিলেন নেই, বলছেন কী করে?’
অমিত বললেন, ‘আপনি পুরো কাহিনি জানেন না, এবং সেভাবে ভাবার চেষ্টা করেননি। তাহলে বুঝতেন, এ ট্যাজেডিটা চারজনের।’
—‘আমাদের প্রফেশানে, মশাই, অত সেন্টিমেন্টাল হলে চলে না!’ বলে গম্ভীর হয়ে গেলেন বটব্যাল।
বাকি রাস্তাটা আর কোনো কথাবার্তা হল না, যতক্ষণ-না গড়িয়ায় ঢুকে নাগেশ্বরকে তোলা হল গাড়িতে।
না জানা-ই ছিল ভালো
নার্সিং হোমে ঢুকে সোজা সেকেণ্ড ফ্লোরে এগারো নম্বর ঘরে হানা দিল পুলিশ। আগে রিভলবার হাতে বটব্যাল সাহেব। তাঁর পিছনে অমিত নিয়োগী। তারপর ইন্সপেক্টর চোবে এবং নাগেশ্বর, এবং সব শেষে দুই কনস্টেবল।
দরজা আনলকড ছিল। নব ঘুরিয়ে ঢুকেই বাঁধা গতে বলে গেলেন C I D প্রবর—‘হ্যাণ্ডস আপ! সমীরণ রায়, ইউ আর আণ্ডার অ্যারেস্ট অন দা চার্জ অব মার্ডারিং মৌমিতা রায় অ্যাণ্ড হার চাইল্ড রৌমক রায়, আণ্ডার ইণ্ডিয়ান পিনাল কোড অ্যাক্ট...
একটা দেয়াল ঘেঁসা চেয়ারে বসে ছিলেন সমীরণ। বটব্যালের পিছনে দলবল দেখে প্রথমে একটা আতঙ্কের ছায়া নামল তাঁর চোখে-মুখে।
তারপরই সামলে নিয়ে বললেন— অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আছে আপনার সঙ্গে?
—‘ডিটেকটিভ সুপারিনটেণ্ডেন্ট হরিহর বটব্যাল যখন অ্যারেস্ট করতে আসেন, তখন ওয়ারেন্ট নিয়েই আসেন। আরো অ্যাডিশানাল ডকুমেণ্টও আমাদের সঙ্গে আছে।’
অমিতের মুখে একথা শুনে তাঁর মুখের দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সমীরণ রায় বললেন, ‘আপনি?’
এবার উত্তরটা বটব্যালই দিলেন— ‘উনি আমাদের ব্যোমকেশ বক্সী, মানে, প্রাইভেট ডিটেকটিভ অমিত নিয়োগী।’
এই বিপর্যয়েও কিন্তু সমীরণের বিদ্রুপ-বোধ সক্রিয় থাকল। বললেন, ‘ও তা পাবলিক-প্রাইভেট মিলে আপনাদের কি প্রমাণ আছে আমিই আমার বউকে খুন করেছি?’
অমিত বললেন— ‘করেছেন সে আপনিও জানেন, আমরাও জানি। আর যেহেতু আপনি নেহাত অনভিজ্ঞ ক্রিমিনাল, প্রমাণ আপনি প্রতি পদে ছড়িয়ে গেছেন। একটা বাচ্চা ছেলেও সেগুলোর সূত্র ধরে আপনার কাছে পৌঁছে যেত একসময়।’
বটব্যাল সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘আই-উইটনেস ছাড়া সব রকম প্রমাণই আমাদের হাতে আছে। প্রথম প্রমাণ, আপনার আট নম্বর ট্রটার জুতো, যার ছাপ কম্পাউণ্ডের মাটির ওপর পড়েছিল বলে আপনি ছুঁড়ে ফেলেছিলেন বাড়ির পিছনে ডোবায়। কিন্তু জুতো জোড়ার একটি পথের ধারে ঝোপেই আটকে গিয়েছিল, ফলে অন্যটাকেও ট্রেস করতে সুবিধে হল।’

সমীরণকে ইন্সপেক্টর বটব্যাল বলছেন, ‘হ্যান্ডস আপ’....
সমীরণ শুনে মুষড়ে না পড়ে তর্কের সুরে বলল, ‘আট নম্বর ট্রটার হলেই আমার জুতো হবে, এটা কেমন যুক্তি?’
বটব্যাল রেগে উঠে বললেন— ‘পুলিশের সঙ্গে এসব ছেলেমানুষি চালাকি চলে না, চাঁদু! আমরা আপনার জুতো আপনার কলিগ রজত পারেখকে দিয়ে আইডেন্টিফাই করিয়েছি। স্নিফিং ডগ লাগালে এখানে এসে আপনাকেই কামড়ে ধরত!’
তাতেও খুব একটা বিচলিত না হয়ে সমীরণ বললেন, ‘তা আমার জুতো যদি আমি ফেলে দিয়ে নতুন জুতো কিনি, তার জন্য খুনের চার্জে আমাকে অ্যারেস্ট করতে পারেন না!’
এবার অমিত বললেন, ‘অবশ্যই না। তবে কিনা, এক পাটি জুতোর মধ্যে আপনার ফ্ল্যাটের চাবিটাও পাওয়া গেছে!’
নাগেশ্বর যোগ করলেন— ‘যেটা আপনি পুলিশের কাছে ফলস স্টেটমেন্টে বলেছিলেন আপনি হারিয়ে ফেলেছেন, এবং যার জন্যে ফ্ল্যাটের লক ভেঙে ঢুকে ডেড বডি দুটো ডিসকভার করতে হল!’
সমীরণের চোখে-মুখে ভয়টা আবার ফিরে এল।
বটব্যাল খেই ধরলেন— ‘শুধু তাই নয়, যে বাটার দোকান থেকে আপনি আপনার এই নতুন বুটজোড়া কিনেছেন, তাদেরই জুতোর বাক্সে আপনার দস্তানা দুটি পাওয়া গেছে, খুনের সময় যা আপনি ব্যবহার করেছেন। তাছাড়া, সিলিং ফ্যান থেকে মৌমিতা দেবীর দেহটা ফাঁস লাগিয়ে ঝোলাবার আগে এঁর মাথার পিছন দিকে যে পর্দার রড দিয়ে মেরে ওঁকে অজ্ঞান করেছিলেন, সেটিও আমাদের exhibits-এর মধ্যে আছে। আপনি সেদিন আগেই দেড়টা নাগাদ ফ্ল্যাটে ফিরে মার্ডার সেরে পিছনের পাঁচিল টপকে চলে যান। দ্বিতীয় দফায় সাড়ে তিনটের সময় ঢুকে চাবি হারানোর নাটক করেন! ক্যান ইউ ডিনাই ইট?’
হঠাৎ গর্জন করে উঠলেন সমীরণ: ‘হ্যাঁ আমি মৌমিতাকে মার্ডার করেছি! মেরেছি তার ছেলেকে। ঠিক করেছি! প্রবঞ্চিত হয়ে আমি অনেক সহ্য করেছি!...
উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল সমীরণের শরীরটা।
নিয়ম অনুযায়ী বটব্যাল একবার বললেন— ‘হোয়াটএভার ইউ সে, মে বী রেকর্ডেড অ্যাণ্ড ইউজড এগেন্সট ইউ!’
কিন্তু সেকথায় কান না দিয়ে সমীরণ হুড়হুড় করে মনের কথা খুলে বললেন ‘বরাবরই মৌমিতা ভালোবাসত অধীপকে। নিশ্চয়ই আমাদের বিয়ের আগে ও প্রেগনান্ট হয়েছিল। নইলে আট মাস পরেই বাচ্চা হয় কী করে! ওই রুগণ ছেলে ওর বাপের frail constitution ইনহেরিট করেছিল। দেখেই আমি বুঝেছিলাম, ও আমার ছেলে নয়। তবু যথাসম্ভব generous হয়ে আমি অ্যাডজাস্ট করতে চেয়েছিলোম মৌমিতার সঙ্গে। ও কিন্তু কিছুতেই আরেকটা বাচ্চা করার ব্যাপারে রাজি হল না। হাজারটা টিপিক্যাল ওজুহাত দেখিয়ে বরাবর কন্ট্রাসেপটিভ পিল খেয়ে গেল। আর, বিয়ের এত বছর পরেও সমানে চালিয়ে গেল বয়ফ্রেণ্ডের সঙ্গে illicit relation-টা! এমনকি হায়দরাবাদে পর্যন্ত দু-জনে মিট করেছে বাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট! দিল্লি থেকে ক-দিন আগেই আমি যখন ফোন করি, পরিষ্কার বুঝলাম, অধীপ তখন আমার ফ্ল্যাটেই রয়েছে। অ্যাট ওয়ান্স আই ডিসাইডেড আই মাস্ট ডু ইট! ...এখন আমার ফাঁসি হোক, লাইফ-টার্ম হোক, আই ডোন্ট কেয়ার!’
অমিত এবার বললেন, ‘সমীরণবাবু, আই রিয়েলি পিটি ইউ, বউয়ের প্রতি আপনার এই ক্রোধ জ্বলে উঠেছে একটা ভুল ধারণা থেকে। আপনাকে মৌমিতা এবং অধীপ সেন হয়তো ঠকিয়েছে একটা সত্য গোপন করে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি ঠকিয়েছে আপনার ভাগ্য। হ্যাঁ, আপনি স্ত্রীর মন পুরাপুরি পাননি কোনো দিন। কিন্তু মৌমিতা অধীপ পরস্পরকে ভালোবাসলেও ওদের প্রেম ছিল প্লেটনিক, কখনো ওদের শারীরিক মিলন ঘটেনি! ডুডু-র বার্থ প্রিম্যাচিওর, মানছি, কিন্তু ও আপনার নিজেরই ছেলে ছিল। সুশ্রী দম্পতিরও কুৎসিত সন্তান হতে পারে, বলবান পিতারও দুর্বল পুত্র হয়!’
চমকে উঠে সমীরণ বললেন— ‘হোয়াট! ইউ মাস্ট বী জোকিং! অ্যান্ড ইটস দা ক্রুয়েলেস্ট জোক পসিবল!’
অমিত বললেন, ‘সত্যিই নিষ্ঠুর। কিন্তু জোকটা আমি করিনি, করেছে আপনার ভাগ্য, আপনার জেলাসির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে। অধীপ সেন ইমপোটেন্ট বলেই মৌমিতাকে ভালোবেসেও বিয়ে করেননি। তার জীবনটা নষ্ট করতে চাননি। অথচ সেটাই হল। মৌমিতা প্রেমিকের এই দুর্বলতার কথা কাউকে বলেননি, এমনকি আপনার কাছেও গোপন রেখেছিলেন। আর সেটাই তাঁর fatal blunder হয়েছিল। এই দেখুন, অধীপ নিজে আমার কাছে কনফেস করে তাঁর সিমেন টেস্টের রিপোর্টটা আমাকে দিয়ে গেছে proof হিসেবে।’
রিপোর্টটা অমিতের হাত থেকে নিয়ে দেখলেন সমীরণ।
একটা বিহ্বল, অসহায় দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে চাইলেন শূন্যে।
নীচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরলেন... হাত থেকে কাগজটা খসে পড়ল!...
তারপর—
অধৈর্য বটব্যাল যেই বললেন— ‘এবার আসুন আমাদের সঙ্গে...’ আচ্ছন্ন ভাবটা এক ঝটকায় সামলে নিয়ে সমীরণ বললেন, ‘হ্যাঁ। যেতে আমাকে হবেই!’
নাগেশ্বরের হাতে-ধরা হ্যাণ্ডকাফের দিকে হাত শিথিল ভাবে বাড়াতে গিয়েও কেমন যেন ঘোর-লাগা চোখে বটব্যালের দিকে চেয়ে সমীরণ বললেন, ‘এক মিনিট। একবার টয়লেট ঘুরে আসি!’
ইন্সপেক্টর বললেন, ‘এক মিনিটের বেশি দেরি করবেন না!’
লাগোয়া বাথরুমের দরজা বন্ধ হল।
না, মোটেই বেশি দেরি হয়নি। দেড় মিনিটের মধ্যে একটা ভারী জিনিস পড়ার জোরদার আওয়াজ, আর সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালের পাশে মেইন রোডে হই হই চিৎকার সকলকে চমকে দিল!
কিছুক্ষণের মধ্যে সবই জানা গেল— কীভাবে এক লহমায় সমীরণ নার্সিং হোমের তিনতলার বাথরুমের জানলা দিয়ে হেঁটমুন্ড ঊর্ধ্বপদ হয়ে সোজা নীচের রাস্তায় মরণ ঝাঁপ দিয়েছেন। না, পালাবার জন্য নয়, নিশ্চিত সুইসাইডের জন্য। আর সে ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ সাফল্য লাভ করেছেন। বীভৎস ভাবে খুলি ফেটে রক্তে-ঘিলুতে রাস্তার চার বটর্গফুট জায়গা চিহ্নিত করে দেহটা পড়ে আছে, দেখলেন অমিত ও তাঁর সঙ্গীরা। নি:সন্দেহে ইনস্ট্যান্ট ডেথ!
উপসংহার
সেদিন বিকেলে সুমনাকে নিজের বাড়িতে ঘটনাটা শুনিয়ে অমিত বললেন, ‘এ নাটকের এণ্ডটাও ‘ওথেলো’র মতোই ট্র্যাজিক হল!’
সুমনা বলল, ‘সমীরণবাবু কিন্তু ওথেলোর মত অতটা অনেস্টি দেখাননি। নিজের অপরাধ ঢাকতে চেষ্টা করেছেন।’
—হ্যাঁ। আরেকটা বিরাট পার্থক্য তো রয়েইছে: ওথেলো তো আর বাবা ছিল না! আমি বুঝতে পারছি, উনি শেষ মুহূর্তে সত্যটা জেনে কী যন্ত্রণা পেয়েছেন! কেসটা যে মানুষের কোর্টের এবং কারাগারের গন্ডির বাইরে চলে গেছে, এতে আমি খুশি!’
সুমনা বলল, ‘আপনি কি এরকম কিছু আঁচ করেছিলেন?’
অমিত— ‘না। আমি তো সর্বজ্ঞ নই। শুধু বুঝেছিলাম এ ট্র্যাজেডিতে কোনো ইয়াগো নেই! খুনিকেও সিমপ্যাথি দেখানো যায়!’
শুনে সুমনা বিষণ্ণভাবে মাথা নীচু করে রইল।
অমিত একটু পরে ওকে মাথায় আলতো আঙুলের ঠেলা দিয়ে বললেন, ‘চিয়ার আপ, কিটি, লাইফ মাস্ট গো অন! আর আমাদের হাতে বেশি সময় নেই! এখুনি বেরোতে হবে!’
বিস্মিত সুমনা বলল, কোথায়?
—‘প্রথমে উন্মন টিভি, সাড়ে ছ-টায়। তারপর ‘অনবরত’ চ্যানেল। বটব্যাল আর আমার সঙ্গে তুমিও থাকবে এই কেসটার ‘লাইভ’ ডিসকাশান হবে। ফোনে থাকবে দর্শকরা।’
সুমনার মুখে হাসি ফুটল। বলল, ‘জাস্ট আ মিনিট, করমচাঁদ সাব, শাশ্বতকে জানিয়ে দিই আমাদের প্রোগ্রামের কথাটা। প্রথমে উন্মন তারপর অনবরত এই অর্ডারে তো?’
অমিত সস্নেহ হাসলেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। সে হতভাগা তো মেহবুবাকে সশরীরে-দেখতেই পায়নি কয়েকদিন। অন্তত পর্দায় দেখুক!’
পাঁচ মিনিট পর। ট্যাক্সিতে যেতে যেতে অমিত জানালেন আরো কিছু খবর তাঁর সহকারিণীকে :
‘বেচারা অধীপ আবার স্টার বাংলার খপ্পরে পড়েছে। ওরা ওকে নিয়ে এক্সক্লুসিভ প্রোগ্রাম করছে— মৌমিতা হত্যাকান্ডে ত্রিকোণ প্রেম-রহস্য। কারো সর্বনাশে এইসব চ্যানেলগুলোর পৌষমাসের ধুম পড়ে! ...তুমি এক কাজ করবে, আমাদের কেসগুলো কালেক্ট করে যে-বইটা বার করতে চাইছ, সেটার কথা আজই টিভিতে দর্শকদের বলে দিয়ো। আমিও গলা মিলিয়ে আবেদন জানাব। পয়লা বোশেখ রিলিজ করার টার্গেট করতে হবে। শুনছি, ইদানীং বইমেলা ‘ঘেঁটে’ যাওয়াতে পাবলিশাররা নববর্ষটাকেই নতুন বই রিলিজের সময় হিসেবে ফিরিয়ে আনতে চাইছে!’
সুমনা সকৌতুকে বলে— ‘বাব্বা! আপনি এসব খবরও জানেন?’
অমিত মজার সুর বজায় রেখেই উত্তর দিলেন— ‘জানতে হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন