অরুণোদয় ভট্টাচার্য
প্রথম দৃশ্য
অঝোর ধারে বৃষ্টি চলেছে। রবিবার। দুপুরের আকাশ প্রায় রাতের মতো কালো। ইতিমধ্যে ইঞ্চিসাতেক জল-জমা রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে লোকটা। গায়ে কলার-তোলা ওভারকোট, মাথায় রাবার হ্যাট, পায়ে গাম-বুট, চোখে গভীর কালো সানগ্লাস। জানলা দিয়ে দেখেই একটা শিহরণ জাগল বিবেকের মনে। ঠিক সনাতনী ডিটেকটিভ গল্পের দৃশ্য। রহস্যময় চেহারা, জটায়ুর ভাষায় ‘হাইলি সাশপিশাস’। দেখেই মনে হয় শিগগির কোনো অঘটন ঘটবে। কারো জীবনের অন্তিম মুহূর্ত ঘনিয়ে আসছে ওই লোকটির প্রতিটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপে।
কোটের পকেটে হাত দুটি ঢোকানো। নিশ্চয়ই সে হাত গ্লাভসে ঢাকা। অন্তত একটি পকেটে অবশ্যই সে জিনিসটি রয়েছে—লোডেড রিভলবার...। প্রতাপাদিত্য রোডের বাড়ির গ্রাউণ্ড ফ্লোর জানলা দিয়ে বিবেক দেখলেন, লোকটা খানিক এগিয়ে ডান দিকের রাস্তায় ঢুকল। গন্তব্য কি চন্দ্রমন্ডল লেন? ...ওনার পালস বিট বাড়তে লাগল...উনি বেরিয়ে পড়লেন পথে...আর খানিক পরেই গুলির আওয়াজ শুনলেন বৃষ্টির আওয়াজ ভেদ করে। ...প্রচন্ড বেগে প্রায় দৌড়ে গেলেন, স্রেফ আন্দাজ করে, চন্দ্রমন্ডল লেনের সেই তেতলা বাড়ির দিকে, যার মালিক বিখ্যাত, না কুখ্যাত, ক্রিমিনাল ল-ইয়ার, অজিত সাঁতরা...
দ্বিতীয় দৃশ্য
সাঁতরার খিড়কির দরজাটা, সবাই জানে, সারাদিন খোলা থাকে। মানে ভেতর দিকে একটা আধলা ইঁট দেওয়া থাকে, ঠেললেই ঢোকা যায়। একেবারে রাত এগারোটার পর বন্ধ হয়। সেটা দিয়ে ঢুকে পায়ে পায়ে অদম্য কৌতূহলে সিঁড়ি ধরে দোতলায় উঠলেন বিবেক। ঢুকলেন দক্ষিণের ঘরে। তারপর, একটা অদ্ভুত শিহরণ! নিজের দেহ নিজের বশে রইল না কয়েক মুহূর্ত! ...দেখলেন—
সাঁতরার দেহ খাট থেকে খানিকটা মেঝেতে ঝুলছে! কপালে গভীর ক্ষত থেকে রক্ত ভলভলিয়ে বেরচ্ছে! ...আশ্চর্য! ভয় নয়, প্রচন্ড আনন্দ হল তাঁর! আততায়ীকে মনে হল কলকাতার ব্যাটম্যান। সাবাশ! এই নরাধমকে উপযুক্ত শাস্তি তুমিই দিতে পার!

বৃষ্টির মধ্যে টুপি,সানগ্লাস,ওভারকোট পরা আততায়ী চলেছে অজিত সাঁতরাকে খুন করতে...
এক পলক তার দ্রুত অপসৃয়মান চেহারাটা যেন দেখলেন ঘরের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায়। অবশ্য এত আবরণের আড়ালে কিছুই বোধগম্য হল না, শুধু থুঁতনিটা খুব তীক্ষ্ণ লাগল...এক অস্বাভাবিক উত্তেজনায় মাথাটা ঝাঁঝিয়ে উঠল বিবেকের। কেমন যেন উড়তে উড়তে অকুস্থল থেকে ফিরে এলেন নিজের বাড়িতে।
খবরের রসদ
সারা সন্ধে টিভিতে খুনের ব্যাপারটা নানা চ্যানেলে নানাভাবে পরিবেশিত হতে থাকল। পরদিন খবরের কাগজে স-ছবি বিবৃতি, টালিগঞ্জ থানার ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের বক্তব্য। জানা গেল, লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে গেছে। সেদিন রাতে প্রথম কলকাতা টিভি, তারপর NE বাংলা আর স্টার আনন্দ-তে দুঃসংবাদটা ফাটানো হল। প্রথমটির ঘোষিকা বললেন, দক্ষিণ কলকাতার প্রখ্যাত ফৌজদারি আইনজীবি অজিত সাঁতরা আজ দ্বিপ্রহরে চন্দ্রমন্ডল লেনে নিজের বাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। মৃতদেহ সন্ধ্যায় প্রথম চোখে পড়ে ওনার স্ত্রী শিবানী দেবীর। টালিগঞ্জ থানার পুলিস প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। ও.সি. জানিয়েছেন, বাড়ির প্রৌঢ় সর্বক্ষণের ভৃত্যটি ঘটনার পরই উধাও হয়েছে। আলমারি থেকে বেশ কিছু নগদ টাকাও চুরি গেছে বলে শিবানী দেবীর সন্দেহ।
দ্বিতীয়টিতে ঘোষকের বয়ানে আরেকটি তথ্য পাওয়া গেল—আইনজীবি অজিতবাবুর একমাত্র পুত্র এই মুহূর্তে কলকাতার বাইরে ছুটি কাটাতে গেছেন। তাঁকে খবর পাঠানো হয়েছে।
তৃতীয়টিতে কী বলল, তেমন কান দিলেন না বিবেক। ওরা তো পরে এই নিয়ে নাটক করে দেখাবে, তখন দেখা যাবে!
পরদিন খবরের কাগজগুলোয় বড়ো বড়ো হরফে হেডিং-সহ আরো কিছু বিশদ বিবরণ জানা গেল।
‘দিন দুপুরে নৃংশংস হত্যাকান্ড’, ‘দক্ষিণ কলকাতার নামী উকিল নিহত: এলাকায় আতঙ্ক’, ‘থানার কাছেই বেপরোয়া খুন: পুলিশ অন্ধকারে’, ইত্যাদির তলায় খবর দেওয়া হয়েছে যে অজিত সাঁতরার বয়স ৬১। ফৌজদারি উকিল হিসেবে এ-শহরের প্রথম পাঁচজন সুপরিচিতদের মধ্যে তিনি ছিলেন। একমাত্র ছেলের সঙ্গে তাঁর সদ্ভাব ছিল না। স্ত্রীর সঙ্গেও বনিবনা ছিল না। পাড়ার লোকেও খুব একটা পছন্দ করত না সাঁতরাকে। যাই হোক, এইভাবে মাফিয়া স্টাইলে খাস কলকাতার বুকে যদি হত্যাকান্ড চলে, তবে বুঝতে হবে এ শহরে আইন ও শৃঙ্খলা পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অজিত বাবুর ছেলে পুরী হোটেলে ছিলেন, দুঃসংবাদ পেয়ে আজই কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। শিবানী দেবীর কাছ থেকে জানা গেছে, বাড়ির পলাতক ভৃত্য হরিপদকে ধরার জন্য পুলিশ উড়িষ্যার বারিপাদা অভিমুখে রওনা হয়েছে।
দু-দিন পরে আরো খবর জানা গেল টিভি ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে। লালবাজারের ইনটেলিজেন্স বিভাগ-এর চিফ ইনভেস্টিগেটিং অফিসার এবং তাঁর দুই সহকারী জেরা করেছেন হরিপদকে, শিবানী সাঁতরাকে এবং নিহত ব্যক্তির একমাত্র পুত্র তথা সন্তান অতনুকে।
বিবেক একবার ভাবলেন, তিনি কি কিছু বলবেন যেটুকু দেখেছেন? তারপর ভাবলেন, না বাবা, শেষে আমাকেই জেরবার করবে। তুমি ওখানে কী করছিলে। থানা-কোর্ট-উকিল ওরেব্বাপ!
জেরার প্রথম পর্ব
সি.আই.ডি.-র চিফ ইনভেস্টিগেটিং অফিসার সম্রাট রায় একে একে জেরা করলেন তিনজনকে। তার আগে হরিপদকে সহজেই অ্যারেস্ট করে কলকাতায় এনেছিল পুলিশ। তার দেশের বাড়ি সার্চ করে সাতচল্লিশ হাজার টাকাও উদ্ধার করেছিল।
মি. রায়ের কাছে হরিপদ স্বীকার করল, ‘হ্যাঁ, সার, সাহেবের ওপর আমার ভীষণ রাগ হয়েছিল। আগের সপ্তাহে পকেট থেকে মাত্র দেড়শো টাকা নিয়েছিনু। ধরা পড়তেই এমন গোরু ঠ্যাঙানো ঠ্যাঙাল...তাই আলমারি খোলা পেয়ে টাকাটা নিয়ে চম্পট দিয়েছিনু। কিন্তু খুন আমি করি নাই। জগন্নাথ সাক্ষী! দু-বার গুলির শব্দ শুনিকর কিন্তু কিন্তু করি ঘরে ঢুকে দেখি কি উরি বাস রে! সাহেব খাট হতে ঝুলন্ত হয়ে রহিছেন! কপাল ফুটো করি গুলি ঢুকি গেছিলা! একদম খতম...চমকি দেখি খুনি ধাঁই কিরিকিরি ভাগি গেলা তিনতলা হতে একতলার পানে!’
—‘খুনিকে দেখলে চিনতে পারবে?’
—‘না, হুজুর। সব ঢাকা আছিল মাথা হতে বর্ষার জুতো অবধি। চক্ষুতেও কালো চশমা আছিল।’
—‘লম্বা, না, বেঁটে?’
—‘খেয়াল করি নাই, সার! মোর নজর অর্দ্ধেক আলমারির প্রতি আছিল!’
—‘নচ্ছার কোথাকার!’ বিরক্ত হয়ে বললেন মি. রায়।
শিবানী সাঁতরার বয়স প্রায় পঞ্চাশ। দেখলে অবশ্য অতটা মনে হয় না, কারণ ফিগারটা ভালো রেখেছেন। বেশির ভাগ সময় শাড়ি পরেন, তবে জিনসও মাঝে মাঝে ব্যবহার করেন।
‘আচ্ছা, মিসেস সাঁতরা, অজিতবাবু যখন আক্রান্ত হন দুপুর দুটো নাগাদ—পোর্স্ট মর্টেম-এর রিপোর্ট বলছে দুটো থেকে আড়াইটের মধ্যে গুলি খেয়ে ইনস্ট্যান্ট ডেথ হয়েছে—তখন আপনি কোথায় ছিলেন?’
‘খুব বৃষ্টি পড়ছিল। লাঞ্চের পরেই আমি নিজের ঘরে গিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিলাম।’
‘এক্সকিউজ মি, আপনারা কি এক ঘরে শুতেন না!’
‘না, গত দশ বছর আমি আলাদা বেডরুম ইউজ করছি!’
‘হুঁ। তা কখন আপনার ঘুম ভাঙল? গুলির আওয়াজে?’
‘না। আমি কোনো গুলির শব্দ শুনিনি। চারটের পর আমার ঘুম ভাঙে। তারপর চা করে ওনার ঘরে দিতে যাই। তখনই...ওই ভয়াবহ সিন দেখে আমার হাত থেকে কাপ-ডিস পড়ে ভেঙে যায়। আমি থরথর করে কাঁপতে থাকি।’
‘আপনার কাকে সন্দেহ হয় এই খুনের ব্যাপারে? ওঁর কোনো শত্রু ছিল?’
‘শত্রু হয়তো ছিল বেশ কিছু। কিন্তু আমার প্রথমত হরিপদকেই সন্দেহ হচ্ছে কারণ সে বেপাত্তা হয়েছিল, আর আলমারি থেকে বেশ কিছু টাকাও হাতিয়েছিল।’
‘কিন্তু হরিপদ রিভলভার পাবে কোথায়?’
‘ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়!’
মি. রায় এবার প্রশ্নের চরিত্র বদলালেন।
—‘কিছু মনে করবেন না, আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না মি. সাঁতরার মৃত্যুতে আপনি মুষড়ে পড়েছেন! ভয় পেয়েছেন, কিন্তু দুঃখ তেমন পান নি, তাই না? স্বামী হিসেবে উনি বোধহয় আদর্শ ছিলেন না?’
শিবানী দেবী এবার হুড়মুড় করে তাঁর জীবনের দুঃখের কথা প্রকাশ করলেন। বউ শিবানীকে একদিনও মিষ্টি কথা বলেন নি অজিত। তার বাপের বাড়ির লোকদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে দেন নি। সন্ধেবেলা বউয়ের টিভি-তে সিরিয়াল দেখা বারণ ছিল। ইদানিং এক বন্ধুর বাড়িতে প্রতি সপ্তাহে শিবানীকে জোর করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, যার মুখ দেখলে শিবানীর ঘেন্না হত, আর কথা শুনলে এই বয়সেও গা ছমছম করত।
শিবানী বললেন, ‘উনি যখন ওই হেমেনের নোংরা রসিকতা শুনে হো হো করে হাসতেন, আর ওরা দুজনেই আমার দিকে বিশ্রি ভাবে তাকাত, আমার ইচ্ছে হত দুজনকে একসঙ্গে খুন করতে! অক্ষম রাগে দিতাম ওদের মদের গ্লাস ভেঙে...আর ওঁর মুখে খিস্তির বান বয়ে যেত!...’
আঁচলে মুখ মুছে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে শিবানী ফের শুরু করলেন—‘এ সবই একরকম সয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ইদানীং সুরমা পাল নামে এক মহিলার সঙ্গে যা বাড়াবাড়ি করছিলেন, তা যদি চলতে থাকত, আমিই খুন করে বসতাম এই জঘন্য, স্বার্থপর লোকটাকে—’
মি. রায় বললেন, ‘খানিকটা বুঝলাম। এই সুরমা পালকে আপনি দেখেছেন। থাকেন কোথায় উনি?’
শিবানী—‘দেখব না কেন? নির্লজ্জ বিধবা। জিনস পরে বেড়ায়। বি.এস.এন.এল.-এর অফিসার। এখানে বেশ কয়েকবার হানা দিয়েছে। শুনেছি সন্তোষপুরে নিজের ফ্ল্যাট। গাড়িও আছে।’
মি. রায়—‘ওঁর মোবাইলে একজন সুরমার নম্বর স্টোরড আছে বলে মনে হচ্ছে। একবার বাজিয়ে দেখতে হবে মহিলাকে। থ্যাঙ্কস ফর ইওর ইনফরমেশান। আর কিছু মনে পড়লে জানাবেন।’
অতনু সাঁতরাকে মি. রায়ের প্রথম প্রশ্ন—‘আপনি কেন এই সময় পুরী গিয়েছিলেন? এনি স্পেশাল রিজন?’
—‘না। জাস্ট উইক এণ্ড এনজয় করতে গেসলাম। এমন ফ্যাকড়া হবে কে জানত!’
—‘কিন্তু আপনি তো কোনো চাকরি করেন না?’
—‘না, আমার কম্পিউটার গুডসের বিজনেস।’
—‘কেমন চলছে বিজনেসটা?’
হঠাৎ রেগে গিয়ে অতনু বলল, ‘দ্যাটস নান অব ইওর বিজনেস!’
মি. রায় বললেন, ‘কিন্তু পুলিশ ইতিমধ্যে খোঁজ নিয়ে জেনেছে আপনার e-factor নামে লেক রোডের দু-ঘরা ছোটো অফিসটা আর্থিক লোকসানে উঠে যাবার মুখে। তিন কর্মচারীর কেউই এমাসের মাইনে পায়নি।’
অতনু এবার চুপসে গেল। তার দুচোখে ভয়ের ছাপ দেখলেন মি. রায়। বললেন, ‘তনুশ্রীর সঙ্গে আপনার এ্যাফেয়ার কত দিন চলছে?’
অতনু তোৎলাতে লাগল—‘ত-তো-তনুশ্রী?’
—‘হ্যাঁ। আপনার বন্ধু শুভদীপের স্ত্রী তনুশ্রী, যাকে নিয়ে আপনি পুরী হোটেলে উইক-এণ্ড কাটাতে গেছিলেন!’
—‘ওর সাথে আমার কলেজ থেকেই ইন্টিমেসি হয়েছিল। বাবা জেনে ফেলেছিল। অমনি ফতোয়া জারি করল, আগে রোজগার করে নিজের পায়ে দাঁড়াও, তারপর বিয়ে। ওসব লেকে-নন্দনে প্রেম করার কথা যদি আবার শুনি, বাড়ি থেকে লাথি মেরে বার করে দেব।...ব্যস, আমি লাইন ছাড়তেই শুভ ভিড়ে গেল। হয়েই গেল বিয়ে!’
—‘হুঁ। তো এখন যে আবার লটর-ঘটর করছেন, এখন তো অন্যের স্ত্রী, এবং এই এ্যাডালটারি রীতিমতো সিরিয়াস অফেন্স, পানিশেবল বাই ল...এই সম্পর্ক কি শুধু ফস্টিনস্টি? এর ভবিষ্যৎ কী?’
—‘আমি তনুশ্রীকে বিয়ে করব।’
—‘শুভদীপ ওকে ডিভোর্স করতে রাজি হবে?’
—‘হ্যাঁ স্যার। সেটা কোনো প্রবলেম না। ওতো খাওয়াতে পরাতেই পারছে না বউকে। খালি চোটপাট আর মারধর করে। পাঁচ-দশ হাজার পেলেই ও ডিভোর্স পেপারে সই করে দেবে।’
‘আপনার বাবার তো আপনিই একমাত্র সন্তান?’ মি. রায়ের পরের প্রশ্ন।
‘প্রপার্টির উত্তরাধিকারী আমার মা-ও!’
‘হ্যাঁ, তা তো বটেই! আচ্ছা, আপনার বাবার তো বেশ মোটা রোজগার ছিল, উনি আপনার বিজনেসে কিছু সাহায্য করেন নি?’
—‘না, বাবার হাত দিয়ে পয়সা গলত না, সবাই জানে! ইন ফ্যাক্ট আমি দু-বার টাকা চেয়ে রিফিউজড হয়েছি। সেই থেকে আর ভিখিরির মতো চাইব না, ডিসাইড করেছি!’
—‘অর্থাৎ বাবার মৃত্যুতে আপনার খুব সুবিধে হয়ে গেল, তাই না?’
—‘আপনি কি আমাকেই সন্দেহ করছেন? দেখুন, আমি যে পুরী হোটেলে ওইদিন ছিলাম, সেখানকার ম্যানেজার, স্টাফ সবাই সে কথা হলফ করে বলবে। হোটেলের বিল আমার কাছেই রয়েছে।’
—‘হ্যাঁ। অজিত বাবু খুন হয়েছেন চব্বিশ তারিখ। আপনি বাইশ তারিখ রাতে পুরী গেছেন। কিন্তু এই ‘দুরন্ত’র যুগে লোকে ঝট করে পুরী-কলকাতা অ্যাণ্ড ব্যাক টু পুরী চব্বিশ ঘণ্টায় করতে পারে! পয়েন্ট নাম্বার টু হল, তেমন মতলব থাকলে আপনি কাজটার জন্য ‘সুপারি’ লাগাতে পারেন। সেক্ষেত্রে অ্যাবসেন্সটা আপনার ফুলপ্রুফ এ্যালিবাই হচ্ছে এবং রীতিমতো প্ল্যানড! বাবা মরাতে আপনার দুদিকেই সুবিধে—টাকাও পাবেন, প্রেমও করতে পারবেন বন্ধুপত্নীকে নিয়ে! কী বলেন?’
অতনু এবার নার্ভাস হয়ে পড়ে। বলে, ‘দেখুন, আমি সত্যিই এ-ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্দোষ। বাবাকে আমি লাইক করতাম না ঠিকই, কিন্তু খুনোখুনির কল্পনাও আমার মতো নার্ভের লোক ভাবতে পারে না। প্লিজ, বিশ্বাস করুন!’
চিফ ইনভেস্টিগেটার বললেন, ‘হুঁ। আপনাকে আমি অবিশ্বাস করছি না, অতনুবাবু। করতাম যদি আপনি পিতৃশোক দেখাতে থিয়েটারি মড়াকান্না জুড়তেন! কিন্তু যতক্ষণ তদন্ত সম্পূর্ণ হয়ে প্রমাণসহ অপরাধীকে না সনাক্ত করা যাচ্ছে, আপনি আমাদের সন্দেহভাজন তালিকায় থেকেই যাবেন।’
প্রসঙ্গ বিবেক চৌধুরি
বিবেক চৌধুরি এক নি:সঙ্গ নির্ঝঞ্ঝাট লোক। বাবা-মা অনেকদিন আগে স্বর্গে গেছেন। বিয়ে-থা করেন নি। ছিল একমাত্র সুমন। ওনার চেয়ে বয়সে অনেক ছোটো ভাই। না, না, সুমনের কথা উনি পারতপক্ষে ভাবতে চান না। যেভাবে সে অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়েছে, আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে, তা ভাবলে পাগল হয়ে যেতে হয়! ...উনি এখন একা। কলেজে পড়াতেন। দু-বছর আগে VRS নিয়েছেন। ভালো লাগত না এখনকার ছাত্রছাত্রীদের পড়াতে। ...এখন মাঝে মাঝে গল্প লেখেন। দু-চারটে পত্রিকায় ছাপাও হয়। ডিটেকটিভ বই খুব পড়েন। গড়িয়াহাটের ওল্ড বুক স্টল চত্বরটায় প্রায় রোজই হানা দেন। ইন্টারনেট সার্ফ করেন। পেনসন যা পান, চলে যাচ্ছে।
একা একা খুব বোর লাগলে বিবেক মামাতো ভাই দ্বিজেনের বাড়ি চলে যান এস.আর. দাস রোডে। উনিও পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নেবেন শীঘ্রই। এখন ছুটিতে আছেন। দুজনে মিলে দাবার বোর্ড পেতে বসেন। পলিটিকাল লিডারদের কষে গালাগাল দেন, আর রিয়েলিটি শো-গুলোর গুষ্টির তুষ্টি করেন।
মাসের শেষ শুক্রবার অবশ্য ড. রাহার চেম্বারে একবার হাজিরা দেন বিবেক। তিনি নানারকম অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প করেন তাঁর অভিজ্ঞতার। বিবেককে অনেক হাস্যকর প্রশ্ন করে হাসান। যাতে রাতে ঘুমটা ভালো হয়, তার জন্য ওষুধ দেন। ওজন নেন, প্রেশার মাপেন। বিদেশ থেকে আনা ঘড়ির বাজনা শোনান।
খুব একঘেয়ে লাগছিল বিবেকের দৈনন্দিন জীবনটা। মনে হল একটু কলকাতার বাইরে ঘুরে আসা ভালো। কোথায় যাবেন? হঠাৎ নেতাজির বাণী মনে পড়ল, দিল্লি চলো। ঠিক, হালের রাজধানী একবার দেখে আসা যাক। ইতিহাস আর বর্তমান কেমন পাশাপাশি চলছে। কাটলেন ‘রাজধানী’র টিকিট। আট-ই সেপ্টেম্বর রওনা হয়ে পনেরোই ওখান থেকে রওনা হবেন। রিটার্ন টিকিটও একসঙ্গে করে নিলেন। ডাক্তারকে বললেন, এ সপ্তাহে যাবেন না।
কলকাতা ছাড়ার আগে খবরটা যেদিন দ্বিজেনকে দিতে গেলেন, অন্য দিনের মতো বিবেককে দেখে প্রসন্ন হাসিতে অভ্যর্থনা করলেন না দ্বিজেন। দাবার ব্যাপারেও তেমন উৎসাহ দেখা গেল না। দিল্লিযাত্রার সংবাদ শুনে শুধু একটু অবাক চোখে তাকালেন। তারপর ফেরার তারিখটা শুনে আবার চিন্তামগ্ন হয়ে রইলেন।
বিবেক বললেন, ‘এনি প্রবলেম, ব্রাদার?’
দ্বিজেন বললেন, ‘হ্যাঁ, একটা সিরিয়াস প্রবলেম। ছোটো ঘরের দেরাজ থেকে আমার সার্ভিস রিভলবারটা মিসিং। অথচ আমি ওখানেই রেখেছিলাম। কতদিন ধরে মিসিং তাও ঠিক বলা যাচ্ছে না। আমি তিনদিন আগে লক্ষ্য করলাম। এরকম নেগলিজেন্স-এর জন্য সার্ভিস বুকে একটা লাল কালির দাগ পড়ে যাবে। তাছাড়া ওটাতে দুটো লাইভ বুলেট ছিল...’
বিবেক শুনে ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন একটু।
তারপর বললেন—‘অফিসে জানিয়েছ?’
দ্বিজেন—‘অবশ্যই। ইন রাইটিং।’
বিবেক তারপর হালকা সুরে বললেন—‘ভেবো না, দেখবে বাড়ির অন্য কোথাও জিনিসটা আবার খুঁজে পাবে।...ভুল হতেই পারে, ভায়া, বয়েস হচ্ছে না?’
মি. রায়ের ভাবনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
সম্রাট রায় কেসটা নিয়ে মনে মনে নাড়াচাড়া করছিলেন। ব্যাপারটা কিছু এগচ্ছে না, নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে যাবার লক্ষণ নেই এখনো পর্যন্ত। বুঝলাম, ওঁর ছেলে অতনুর টাকার গরজটা প্রবল আকার ধারণ করেছিল। বাবাকে সরালে বাড়িটাও কব্জা করে লাইফটা ঠিকমতো এনজয় করতে পারবে ভেবেছিল...মোটিভ ওয়াজ দেয়ার। কিন্তু সে যে উইক এণ্ডে পুরী হোটেলে ছিল উইথ হিজ ফিঁয়াসি, সেটাও তো যাচিয়ে দেখা হয়েছে। মজবুত অ্যালিবাই! ...চাকর হরিপদকে ঠেঙিয়েছিলেন অজিতবাবু পকেট থেকে দেড়শো টাকা চুরির জন্য...কিন্তু সে কোত্থেকে রিভলবার পাবে? ...আর সবচেয়ে বড়ো কথা হল, এই মার্ডার ওয়েপন, পয়েন্ট থ্রি এইট ক্যালিবারের রিভলবার, যা পুলিশের স্ট্যাণ্ডার্ড সার্ভিস রিভলবার, সেরকমই একটা দ্বিজেন বসুর কাস্টডি থেকে মিসিং বলে উনি নিজে রিপোর্ট করেছেন। টাইমিংটা অদ্ভুতরকম কাছাকাছি। সে জিনিসটা গেল কোথায়? কে নিয়েছে? নাকি উনি-ই!
প্রায় কুড়ি-পঁচিশ মিনিট এইসব ভেবে সম্রাট রায় ডেকে পাঠালেন সিনিয়র ইন্সপেক্টর দ্বিজেন বসুকে।
উনি আসতেই সরাসরি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার সার্ভিস রিভলবার কি খুঁজে পেয়েছেন?’
—‘না, স্যার। আমি টোটালি পাজলড।’
—‘আপনি যে ড্রয়ারে ওটা রাখতেন, সেটা আপনার বাড়ির লোকে জানত?’
—‘বাড়ির লোক বলতে তো আমার স্ত্রী আর মেয়ে। হ্যাঁ, ওরা জানত। কিন্তু ওরা তো রিভলবারে হাত দেবে না।’
—‘ইউ ক্যানট বি সিয়োর। হঠাৎ কোনো কারণে, কৌতূহল বা ইমপালস-এর বশে মেয়েরা কিছু কিছু কাজ করে বসে। আপনার মেয়ে কত বড়ো? কলেজে পড়ে?’
—‘হ্যাঁ। যাদবপুরে ইউ.জি সেকেণ্ড ইয়ার।’
—‘তবে? আজকালকার ছেলেমেয়েদের চিন্তাধারা ভীষণ অদ্ভুত। আর যাদবপুরে শুনেছি, পড়াশুনোর বাইরে সবরকম চিন্তা ও এ্যাকটিভিটিতে টিচাররা খুব আস্কারা দেয় স্টুডেন্টদের। ওটা হল আমেরিকান ট্রেণ্ড। আপনার মেয়ের বয়ফ্রেণ্ড বলতেই পারে, তোর বাবার রিভলবারটা একদিন আনিস তো, আসল যন্ত্রটা কেমন নেড়েচেড়ে দেখতে ইচ্ছা করে!’
দ্বিজেন বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘না, না, আমার ওয়াইফ মিনতি বা মেয়ে রিজা একেবারেই হুইমজিকাল নয়! রীতিমতো ভীতু টাইপের।’
—‘আর আপনি নিজে? আপনি কি মাঝে মাঝে ইমপালসিভ কিছু করেন না?’
—‘ইউ মিন, আমি ইমপালসিভ হয়ে সাঁতরাকে শুট করে রিভলবার গঙ্গার জলে ফেলে দিয়েছি! আমার কি মোটিভ?’
—‘মাথা গরম করবেন না, মি. বাসু! সাঁতরার বাড়িতে যে .৩৮ ক্যালিবারের রিভলবার থেকে ছোঁড়া বুলেট পাওয়া গেছে, সেটা ওই মেক-এর অন্য গান হতেই পারে। বাট ইওর ওয়েপন মে ওয়েল বি দা মার্ডার ওয়েপন। সে পসিবিলিটি বেশ জোরালো থাকছে। সেক্ষেত্রে আপনার ওপর দায়িত্ব এসে যায় না কি?’
রূপক নামে এক ছোকরা এ.এস.আই.-কে প্লেন ড্রেসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কলা বিভাগের ক্যাম্পাসে নজর রাখতে বলেছিলেন মি. রায়।
সে তিন দিন পরে এসে যা রিপোর্ট দিল বেশ ইন্টারেস্টিং। আই.আর. মানে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশানস-এর ছাত্রী রিজা। তার বয়ফ্রেণ্ড বান্টি হালদার। হয়তো এটা একটা অদ্ভুত কোয়েনসিডেন্স, কিন্তু বান্টির নাম জড়িয়ে গেছে অজিত সাঁতরার সঙ্গে।
অজিত বাবু রোজ ঢাকুরিয়া লেকে মেনকা সিনেমার দিকটায় মর্নিং ওয়াক করতেন। খুন হবার দিন দশেক আগে সকালে লেকের গেট থেকে বেরতেই তিনি একটা মোটর সাইকেলে ধাক্কা খেয়ে পড়েন রাস্তায়। বিশেষ কিছু হয় নি, বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে একটু কালশিটে পড়ে এবং পরে সে জায়গাটা ফুলে ওঠে।
ভূমিশয্যা থেকে উঠেই গর্জন করে তেড়ে যান সাঁতরা বাইক চালক বান্টির দিকে। তার কলার ধরে শাসান—‘রাস্কেল! হুলিগান! জানো কাকে ধাক্কা মেরেছ? এই দুঁদে ল-ইয়ার অজিত সাঁতরার ভয়ে কলকাতার ক্রিমিনালরা সিঁটিয়ে থাকে! ...হাতের যা ছিরি করেছ, বেশ ভোগাবে মনে হচ্ছে! ছাড়ো এখন অন্তত হাজার খানেক!...’ বলতে বলতে ফস করে কোত্থেকে কাগজ-কলম বার করে টু-হুইলারের নাম্বার নোট করে দিলেন। পুলিশি ধমকের সুরে বললেন—‘নাম কী? এ্যাড্রেস বলো?’
যথারীতি রাস্তায় বেশ কিছু লোক অলস কৌতূহল নিয়ে দৃশ্যটা উপভোগ করছে। বান্টি নাম-ঠিকানা বলতেই সাঁতরা ফের বলে উঠলেন—‘ফলস কিছু বলে থাকলে রেহাই পাবে না। আমি ঠিক ভেরিফাই করে নোব।’
বান্টি মিনমিন করে বলে, ‘এখন আমার সঙ্গে হাজার টাকা নেই। আপনাকে কাল সকালে দেব। এইখানে এই গেটের সামনে।’’
—‘বেশ! কাল না পেলেই কিন্তু কেস উঠে যাবে!’
এই অবধি শুনে মি. রায় বললেন, ‘তারপর?’
পরদিন সকালে বান্টির সঙ্গে সাঁতরার নির্দিষ্ট জায়গায় দেখা হয়। সেদিন তার বাইকে এক বন্ধু সঙ্গী ছিল। সে-ই চারটে পাঁচশো টাকার নোট সাঁতরাকে দেয়।
রায় বললেন, ‘যাক। তাহলে তো ব্যাপারটা মিটে গেল।’
রূপক বলল, ‘না, স্যার, ব্যাপারটা বেশ জটিল রূপ নিল। ওই নোটগুলো সব জাল ছিল। সেটা জানার পর সাঁতরা হানা দেয় বান্টির বাড়ি এবং তাকে শাসায় জাল নোট চক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে পাঁচ বছর জেল এবং লাখ টাকা জরিমানা হবে। তা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় সাঁতরাকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বিখ্যাত নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যাঙ্কের ব্যাঙ্ক ড্রাফট দিতে হবে দশ হাজার টাকার।’
—‘আই সি। ব্যাপারটা তাহলে ব্ল্যাকমানি এ্যাণ্ড ব্ল্যাকমেইল-এর দিকে টার্ন নিল!’
—‘হ্যাঁ, স্যার, সাঁতরা লোকটা ভয়ঙ্কর ত্যাঁদোড় এবং ক্রূর প্রকৃতির ছিল।’
—‘হুঁ। এরপর বান্টির মাথায় খুনের আইডিয়া আসাটা খুব অসম্ভব নয়! কেসটা বেশ জমে উঠেছে!...তবে, সাঁতরার বাড়ি কি ও চিনত? এ্যাণ্ড হাউ ক্যুড হি নো দা স্যুটেবল টাইম?’
রূপক বলল, ‘স্যার, এমন তো হতে পারে, সাঁতরাই ওকে আসতে বলেছিল ওই সময় ব্যাঙ্কড্রাফট নিয়ে?’
—‘অব কোর্স! তা হতেই পারে! সুতরাং এখন বান্টিবাবুকে রগড়াতে হচ্ছে!’
বুধবার সকাল আটটা-নাগাদ মি. রায় চলে গেলেন কেয়াতলা রোডে Axis ব্যাঙ্কের পার্ক সার্কাস ব্রাঞ্চ ম্যানেজার অনির্বাণ হালদারের বাড়ি। মি. হালদারই বান্টির বাবা। পিতা-পুত্র দুজনেই বাড়ি ছিল।
‘আমি C.I.D. অফিসার সম্রাট রায়’ বলে তাঁর কার্ডটা দেখালেন মি. রায়।
তাঁকে খাতির করে বসিয়ে দুজনেই তাঁর সামনে বসল অনুগত ভঙ্গিতে।
অনির্বাণ বাবু বললেন, ‘দেখুন অফিসার, আনফরচুনেটলি আমার ছেলে খানিকটা কাকতালীয় ভাবে জড়িয়ে পড়েছে মৃত অজিত সাঁতরার সঙ্গে। একটা সামান্য এ্যাকসিডেন্টের সূত্রে।’
মি. রায় বান্টির দিকে সোজা তাকিয়ে বললেন—‘প্রথমে আমাকে বলো, এ্যাকসিডেন্টটা ঘটল কী করে? উনি না-দেখে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, না তুমি অ্যাবসেন্ট মাইণ্ডেড ছিলে? বাইক চালাতে চালাতে মোবাইলে রিজার সঙ্গে গল্প করছিলে?’
শেষ কথাটায় বান্টি ততটা চমকাল না, যতটা মি. রায় আশা করছিলেন। সে শান্তভাবেই বলল ‘না এ-গুলোর জন্যে নয়। আমাকে হঠাৎ গাড়ির মুখ ঘোরাতে হয়েছিল এক আনাড়ি সাইক্লিস্টকে বাঁচাবার জন্য। তবে আমি এ্যাট ওয়ান্স ব্রেক কষেছিলাম।’
—‘ও। লাস্ট সানডে, মানে চব্বিশ তারিখের দুপুরে তুমি কী করছিলে?’
—‘ঘুমুচ্ছিলাম। অত হেভি রেইনফল, তার ওপর বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল। প্রায় চারটে অব্দি ঘুমিয়েছি।’
অনির্বাণ বাবু বললেন, ‘ওইদিনই মি. সাঁতরা নিজের বাড়িতে খুন হয়েছেন, তাই না?’
—‘হ্যাঁ। দুপুর দুটো নাগাদ ঘটনাটা ঘটে। আচ্ছা বান্টি, তোমার কাছে তো উনি দশ হাজারের ব্যাঙ্ক ড্রাফট চেয়েছিলেন। সেটা কি তুমি করিয়েছিলে?’
—‘না। ব্যাঙ্ক ড্রাফট চাওয়ার পরই আমি বাবাকে সব খুলে বলি।’
অনির্বাণ হালদার বললেন, ‘হ্যাঁ অফিসার, ব্যাপারটা তার আগে আমি কিছু শুনি নি। এবং শোনার পর আমি ঠিক করলাম, লেট হিম গো টু ‘ল’, বাট উই ক্যানট এনকারেজ আ ব্ল্যাকমেলার!’
মি. রায় বললেন, ‘সেটা ঠিকই করেছেন। কিন্তু আপনার পুত্র সাঁতরাকে জাল টাকা দিয়েছিল, সেটাও তো আইনের চোখে বেশ বড়ো অপরাধ। পাঁচশো টাকার চারটি জাল নোট সে কোথা থেকে পেল? আপনার বাড়ি সার্চ করলে হয়তো অনেক গুলোই মিলতে পারে?’
অনির্বাণ বাবু অপ্রত্যাশিত ভাবে হেসে উঠলেন সশব্দে। বললেন, ‘ওগুলো ওর বন্ধু সুমিত দিয়েছিল, মি. রায়। সুমিত ম্যাজিশিয়ান। কাগজের পাতা টুকরো-টুকরো করে ছিঁড়ে তারপর আপনার চোখের সামনে সেগুলোকে কারেন্সি নোট-এর গোছা করে দেখাবে আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে। ওই ম্যাজিকের টাকার সঙ্গে আসল টাকার তফাত শুধু আমরা কেন, অনেক লোকই ভালো করে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবে। সাঁতরার মতো ঝানু লোক তো বটেই। কিন্তু, সাম হাউ, সেদিন নেবার সময় সে লক্ষ্য করে নি। বোধহয় ধরেই নিয়েছিল, বাচ্চা ছেলেটা ওর সঙ্গে কোনো ট্রিক করতে সাহস পাবে না! অথচ, প্রিসাইসলি, বাচ্চা বলেই বান্টি আর সুমিতের মনে হয়েছিল বদ লোকটাকে একটু ঠকানো যাক!’
‘তা বান্টি,’ মি. রায় আবার তাকে তাক করলেন, ‘অজিত সাঁতরা মার্ডার খবর শুনে তোমার কেমন ফিলিং হল?’
—‘হ্যাঁ স্যার, দারুণ রিলিফ ফিল করলাম। যেই করে থাক কাজটা, তার কাছে আমি ওবলাইজড। কিন্তু তারপর দেখছি সাসপেক্ট লিস্টে আমার নাম উঠে গেছে। আপনি স্বয়ং ছুটে এসেছেন!...বিশ্বাস করুন, স্যার, খুন টুনের কথা কখনো ভাবি নি। তেমন ডেসপারেট সিচ্যুয়েশান হলে বরং নিজে স্লিপিং ট্যাবলেট খেয়ে নেব কয়েকটা। যেটা আমাকে সবচেয়ে আপসেট করেছে, এই ঘটনায় আমার কোনো হাত আছে কিনা, এই প্রশ্ন রিজাও করেছে!’
অনির্বাণ বাবু বললেন, ‘সুতরাং আমরা চাইব, যত দ্রুত সম্ভব সাঁতরার আততায়ী যেন সনাক্ত এবং গ্রেফতার হয়। প্রতিটি নির্দোষ লোকের পক্ষে সেটা মঙ্গল।’
পরদিনই আবার মি. রায় এলেন দ্বিজেন বসুর বাড়ি।
বললেন, ‘ওয়েল, মি. বোস, ফ্যামিলির লোক ছাড়া আর কে এসেছে রিসেন্টলি আপনার বাড়ি? আর কারো পক্ষে কি জানা সম্ভব আপনি কোথায় রিভলভার রাখেন?’
একটু ভেবে দ্বিজেন বাবু বললেন, ‘আমার পিসতুতো দাদা, প্রফেসর বিবেক চৌধুরি। উনিই একমাত্র রেগুলার, মানে সপ্তাহে দু-তিন দিন আসেন আমার বাড়ি, আর জানেনও কোথায় আমি রিভলভার রাখি। কিন্তু উনি কেন সেটা আমাকে লুকিয়ে নেবেন!’
—‘যদি ওটা দিয়ে খুন করাই হয়ে থাকে, তা হলে আপনাকে না বলে নেওয়াটাই স্বাভাবিক! চলুন, এখনই একবার কাজিনের বাড়ি ঘুরে আসা যাক!’
—‘কিন্তু বিবেকদা তো এখন কলকাতায় নেই! দিল্লি গেছে।’
—‘দিল্লিতে কোথায় থাকবেন বলেছেন? কলকাতায় কবে ফিরবেন? আমার তো মনে হয় তিনি বেপাত্তা হয়েছেন!’
—‘না, স্যার, অত দুশ্চিন্তার কারণ নেই। ও শেহনাজ হোটেলে উঠেছে। আমার সঙ্গে কাল রাতেও মোবাইলে কথা হয়েছে। আর 15th ও ফিরে আসছে বাই শিয়ালদা রাজধানী।’
মি. রায় হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘বেশ। কিন্তু তার আগেই ওর বাড়িটা সার্চ করে দেখা দরকার। চলুন, এক মুহূর্ত দেরি নয়।’
মি. রায়ের চিন্তা ঠিক পথেই চলছিল। তার প্রমাণ মিলল বিবেক চৌধুরির প্রতাপাদিত্য রোডের বাড়ির তালা ভেঙে ঢুকে খানিক সার্চ করার পরই। চিলেকোঠার ঘরে এলোমেলো জিনিসপত্রের ডাঁই। সেখানেই একটা ওভারকোটের পকেট থেকে বেরল রিভলবারটা! দ্বিজেনবাবু সহজেই সনাক্ত করলেন। তাঁর মুখ দিয়ে অনিবার্যভাবে বেরোলো—‘স্ট্রেঞ্জ! বিবেকদা আমাকে শুদ্ধু ফাঁসাবার মতলব করেছিল!!’
ডা. রাহার অভিমত
নিউরোলজিস্ট ও মনস্তত্ত্ববিদ ডা. সঞ্জীব রাহার সঙ্গে ফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে এসে হাজির হলেন সম্রাট রায়। আগেই বলে রেখেছিলেন—‘একটা মার্ডার কেসের সঙ্গে আপনার এক পেশেন্ট জড়িত বলে আমাদের দৃঢ় ধারণা হচ্ছে। তাই আপনার সঙ্গে একটু আলোচনা দরকার। বলুন কখন আপনি হাফ এ্যান আওয়ার স্পেয়ার করতে পারবেন?’
ডাক্তার বললেন, ‘আর্লিয়েস্ট আজকেই বিকেল পাঁচটায় আসতে পারেন। ছটা থেকে আমার চেম্বার টাইম। শুধু একটা কথা এখনি জানতে চাই—’
—‘পেশেন্টের নাম তো? বিবেক চৌধুরী।’
ডাক্তার একটু অবাক গলায় বললেন—‘আই সি!’
ঘড়ি ধরে পাঁচটাতেই ডা. রাহার বাড়ি পৌঁছলেন মি. রায়। ডাক্তারের চায়ের অফার ‘না’ করে দিয়ে সরাসরি আসল কথা শুরু করলেন।
—‘বিবেক বাবু আপনার কত দিনের পেশেন্ট?’
—‘আট বছর হয়ে গেল। ফিলসফির প্রফেসার। ওনার ভাইয়ের সুইসাইডের পর বেশ কিছুদিন মেন্টাল ব্যালান্স একেবারেই চলে গিয়েছিল। কারণ ভায়ের প্রতি অসাধারণ গভীর স্নেহ এবং অ্যাটাচমেন্ট ছিল ভদ্রলোকের। পাড়ার জেনারাল ফিজিশিয়ান বেহালায় মেন্টাল হোমে পাঠিয়েছিলেন। সেখানেই ওঁকে প্রথম দেখি। তারপর ছ-সাত মাস বাদে উনি অনেকটা নর্ম্যালসি ফিরে পান। কলিগদের উৎসাহে আবার কলেজ যেতে শুরু করেন। পিরিয়ডিক চেক আপ করাতে আমার চেম্বারে আগে সপ্তাহে দুদিন আসতেন, ইদানীং একবার, শুধু শুক্রবার আসেন।’
—‘তো আপনার কি মনে হয়, উনি এখন পারফেক্টলি নর্মাল এবং এই স্যানিটি স্টেডি থাকবে? নাকি, মাঝে মাঝে রিল্যাপস করতে পারে লুনাটিক স্টেটে?’
ডাক্তার বললেন, ‘তার আগে বলুন তো ঘটনাটা কী ঘটেছে এবং তার সঙ্গে আমার পেশেন্টের ইনভলভমেন্ট আপনারা বুঝছেন কী করে?’
মি. রায় বললেন, ‘আপনি কি পেপারে ল-ইয়ার অজিত সাঁতরা মার্ডারের খবরটা পড়েছেন?’
ডাক্তার বললেন, ‘হ্যাঁ। তাতে তো আপনারা চাকর হরিপদকে সন্দেহ করছেন খুনি হিসেবে?’
মি. রায়—‘তাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছিল। সে আলমারি থেকে টাকা চুরি করে পালিয়েছিল। সে টাকা তার কাছ থেকে recover করা গেছে। ইন্টারোগেশান-এ জানা গেছে, rather বোঝা গেছে, মার্ডার করার হিম্মৎ তার নেই। দু-বার গুলির আওয়াজ শুনে সে ঘরে এসেছিল। দেখল, মনিব ডেড।’
ডাক্তার—‘বাট হাউ ডাজ মাই পেশেন্ট কাম ইনটু পিকচার?’
মি. রায়—‘যে ৩৮ ক্যালিবারের রিভলবারের গুলিতে মি. সাঁতরার ডেথ হয়েছে, সেইটা পাওয়া গেছে বিবেক বাবুর ছাদের ঘরে দেরাজের মধ্যে, ওভারকোটের পকেটে। আর, হরিপদর স্টেটমেন্ট অনুযায়ী খুনি একটা ওভারকোট-টুপি-সানগ্লাস-গামবুট-পরা লোক। পোশাকের বাকি আইটেমগুলোও আমরা বিবেকবাবুর ওই ঘর থেকেই পেয়েছি।’
ডাক্তার বললেন, ‘আই সি। বিবেকবাবু তাহলে এখন শান্ত থাকার অভিনয় শিখেছেন? ভেতরের volcano একটুও সাবসাইড করে নি! ...প্রথম-প্রথম, বুঝলেন, আমার কাছে সিটিং-এ হিপনোসিসের ঘোরে অনেকবার বলতেন—ওই জঘন্য লোকটাকে এ্যাটম বম্ব দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া উচিত...যে-মাথায় বদবুদ্ধি খেলিয়ে ও কেস জিতেছে, ও-মাথাটা গুলিতে ঝাঁঝরা করে দাও! ...বলতেন, এ হয় না, হয় না! মিথ্যার জয়জয়কার! আইনের গ্যাঁড়াকল! দেশটা ছারখার হয়ে গেল! বেটার লেট দ্যান নেভার! ...কখনো বা ওর মধ্যে রসিকতা করতেন—লেট, টু লেট, দি লেট করে ছাড়ব!’
মি. রায় বললেন, ‘কেসটা যখন কোর্টে ওঠে—মানে ওঁর ভায়ের এগেন্সটে মার্ডার কেসটা—পুলিশও বুঝতে পেরেছিল। কুখ্যাত মাস্তান ট্যারা ঘেবোই আসলে জোড়া খুন করেছে, নিরীহ সুমনকে বলির পাঁঠা সাজানো হয়েছে। কিন্তু ঘেবো পাওয়ারফুল পলিটিকাল পার্টির আশ্রিত এবং প্রশ্রয়-পাওয়া হিটম্যান। অজিত সাঁতরাকে মালামাল করে দিয়েছিল ওরা কেসটা জেতার পর। ঘেবোকে বাঁচাতে উনি এক অকাট্য অ্যালিবাই আবিষ্কার করেছিলেন। তারপর সুমনের দিকে তর্জনী আস্ফালন করে তার বিরুদ্ধে ভিজে বেড়াল সেজে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করার অভিযোগ সাজিয়েছিলেন। দেয়ার ওয়াজ রিজন ফর বিবেক বাবু টু লুজ হিজ মেন্টাল ব্যালান্স! আচ্ছা, ডা. রাহা, এই যে ওয়ার্কিং অব সাইকোলজি, বছরের পর বছর প্রতিহিংসা মনের মধ্যে পুষে রাখা, এমন নজির আপনি আগে দেখেছেন?’
ডা. রাহা বললেন, ‘তা যদি বলেন, এটা খুব কমন নয়। এ ধরনের মানুষ প্রতিদিনই স্বপ্ন দেখে। রিয়েলিটি আর ইলিউশান-এর মধ্যে একটা মেশামেশি হয়ে যায় এদের মনে। আমার ধারণা বিবেক চৌধুরি প্রায়ই ভাবতেন, যে পাপীর আইনসিদ্ধ পথে সাজা হবে না, তাকে উনি নিজের হাতেই প্রাপ্য শাস্তি দেবেন। কার্যত না-পারলেও তিনি ওই রোলে নিজেকে দেখতেন নিজের স্বপ্নে। কিন্তু আবার ওই স্বপ্ন দেখাটা তাঁর বাস্তব খুনি হওয়াকে অসম্ভব করে তোলে। হ্যামলেটের মতো অবসেশান!’
মি. রায় বললেন, ‘কিন্তু এখন সেই স্বপ্নই বাস্তবে পরিণত হয়েছে মনে হচ্ছে আমাদের। সব প্রমাণই সেইদিকে ইঙ্গিত করছে।’
ডাক্তার বললেন, ‘আপনারা কি তাঁকে দিল্লি থেকে ধরে এনেছেন? এখন কি উনি আপনাদের কাস্টডিতে? আই নিড টু টক টু হিম।’
মি. রায় বললেন, ‘না। ফিফটিনথ সকালে উনি শিয়ালদা এলেই ওঁকে ধরে ইনটারোগাট করা হবে। আপনার সঙ্গে ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা পরে করা যাবে। আপনার মূল্যবান সময় দেবার জন্য মেনি থ্যাঙ্কস! আবার আমরা হয়তো কোর্টে মিট করব!’
ডা. রাহা বিষণ্ণ গাম্ভীর্য নিয়ে বললেন—‘উই হ্যাভ টু ডু আওয়ার ডিউটিজ।’
দিল্লিতে বিবেক
বহুকাল আগে তরুণ বয়সে একবার দিল্লি বেড়াতে এসেছিলেন বিবেক। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলাতে গিয়ে অনেক পরিবর্তন দেখলেন এবং অনুভব করলেন। ডায়েরি লেখার অভ্যাস। যা দেখলেন, শুনলেন, একটা নতুন ডায়রি কিনে লিখতে লাগলেন। দিল্লির পটভূমিতে কোনো গল্প লেখার কাজেও লাগতে পারে। যন্তর-মন্তর, আপ্পুঘর বন্ধ হয়ে গেছে। চিত্তরঞ্জন পার্কে ডা. ব্যানার্জীর নার্সিং হোমটা বেশ ধাঁ-চকচকে হয়েছে। কুতুব সেই কুতুবই আছে। লোকে শুয়ে পড়ে মাথার ছবি তুলছে এখনকার ডিজিটাল ক্যামেরায়। কিন্তু চত্বরের অনেক সৌধ, অলিন্দ, তোরণ ভেঙে পড়ছে কালের ছোঁয়ায়। মাথার ওপর কাছাকাছি এরোড্রোম থেকে প্লেনের আনাগোনা খুব ফ্রিকোয়েন্ট, সেই আওয়াজে মাঝে মাঝে টিয়াপাখির আনন্দকাকলি চাপা পড়ে যাচ্ছে। বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন এবং সাউথ-ইস্ট এশিয়ার মানুষই বেশি চোখে পড়ল।
ইণ্ডিয়া গেট, রাজঘাট, হুমায়ুনের কবর আর লালকেল্লাও প্রায় অপরিবর্তিত। শুধু লালকেল্লার চত্বরে তিনজন ‘ওয়ান্টেড’ ক্রিমিনালের ছবি দেখে মনে হল, হাজার ঘোষণা সত্ত্বেও এই ছবি দেখে কি সত্যিই কোনোদিন কারো পক্ষে এদের সনাক্ত করা সম্ভব, ধরিয়ে দেওয়া তো দূর অস্ত!
নতুন দেখলেন ইন্দিরা গাঁধির ১ নম্বর সফদর জং রোডের বাড়িতে সংরক্ষিত জীবনের শেষ দিনে প্রিয়দর্শিনী যে শাড়ি-জামা-জুতো পরেছিলেন। দেখলেন তাঁর অসাধারণ সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, বিলাসহীন শয্যা, রানি হয়েও সহজ সরল প্রাত্যহিক জীবনের একটা ছবি। বাড়ি থেকে গেট পর্যন্ত যাবার আগে যেখানে তাঁকে দেহরক্ষীরা উপর্যুপরি গুলি করে হত্যা করে, সেই বিশেষ কাচে মোড়া পথটা আর স্ফটিক-চিহ্নিত স্থানটা দেখলেন, যেখানে ইন্দিরাজির দেহ লুটিয়ে পড়েছিল। দেখলেন সুইসাইড-বম্বারের আক্রমণে বীভৎসভাবে মৃত রাজীব গান্ধীর শতছিন্ন জামা প্যান্ট, শুধু তাঁর জুতো জোড়া অক্ষত আছে! অদ্ভুত লাগে, যে তাঁকে মারতে নিজে মরল, তার মাথায় কী নির্মম ভাবে ঢুকেছিল যে, এই জনপ্রিয় ভারতীয় নেতাকে মারলেই মোক্ষম প্রতিশোধ নেওয়া হবে। প্রতিশোধ, হ্যাঁ, প্রতিশোধ! না:! ...এসব কথা বেশি না ভাবাই ভালো!...
বরং বাহাইদের লোটাস টেম্পল-এ গিয়ে অগতানুগতিক প্রার্থনায় যোগ দিয়ে মনে প্রশান্তি আনার চেষ্টা করা যাক।...কিন্তু দশ মিনিট ধরে এই প্রয়াসটাকেও কেমন যেন নিষ্ফল মনে হল।
পালিকা বাজারে একটা সোয়েটার কিনলেন বিবেক। চক্কর-বক্কর ‘মড’ একটা জ্যাকেট দেখে ছ্যাঁৎ করে সুমনের কথা মনে হল...সিনেমার ফ্ল্যাশব্যাকের মতো কিছু দৃশ্য ও ধ্বনি অনিবার্যভাবে মনের পর্দায় ফুটে ওঠে...সুমনের মাউথ অর্গানে ‘রোতে হুয়ে আতে হ্যায় লোগ হাসতা হুয়া তো জায়েঙ্গা’...লোকের কথা আর বডি ল্যাংগোয়েজ হুবহু নকল করে এমন হাসাত যে পেট ব্যথা হয়ে যেত! সেই প্রদীপ ডাক্তারের ছ-ফুট লম্বা মাথাটা তিন ফুট ঝুঁকিয়ে গাড়ি থেকে নামা, ওফ!...‘Put out the light, and then put out the light’ ওথেলো থেকে এই বিখ্যাত লাইনটা আপন মনে আবৃত্তি করে বিবেক ভুলে যেতে চাইলেন ওইসব ফ্ল্যাশব্যাক...
পুরোন দিল্লির রানি ঝাঁসি রোড ধরে দিল্লি ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত ঘুরে এলেন একদিন। রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম। কোনো কোনো জায়গায় কলকাতার চেয়েও অরাজক। সেই যানজটের মধ্যে ‘বয়েল-গাড়ি’ অর্থাৎ বলদে-টানা গাড়িও আছে। নিউ দিল্লি স্টেশানসংলগ্ন হোটেল শেহনাজ-এ ফেরার সময় দিল্লির মেট্রো চড়লেন। টিকিটের বদলে প্ল্যাস্টিকের টোকেন, ঢোকার সময় একটা বৃত্তে ছোঁয়ালে গেট খুলে যায়, বেরোবার সময় টোকেনটা গর্তে ফেললে নির্গমন-পথ উন্মোচিত হয়। সেটা অবশ্য জানতে হল অপটু হিন্দিতে অনেককে প্রশ্ন করে।

অজিত সাঁতরার কপাল থেকে নিঃসারিত রক্ত । তাঁর খাট থেকে ঝুলে পড়া দেহ...
একদিন বৃষ্টির রাতে হঠাৎ আবার দেখলেন, চন্দ্রমন্ডল লেনের সেই বাড়ির দোতলার ঘর। অজিত সাঁতরার কপাল থেকে নি:সারিত রক্ত। তার খাট থেকে ঝুলে পড়া দেহ...! একটা ভয়ার্ত চিৎকার বেরোল মুখ দিয়ে...ঘুম ভেঙে দেখলেন, হোটেলের ঘরে শুয়ে আছেন। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি চলছে, সঙ্গে বিদ্যুতের ঝিলিক, কর্কশ বাজ পড়ার আওয়াজ...
বিস্বাদ বিস্ময়
‘রাজধানী থেকে শিয়ালদায় নামতেই বিবেক দেখলেন, দ্বিজেন তাঁকে নিতে এসেছেন। খুব খুশি হলেন। দ্বিজেন নিজেই ট্রলিতে স্যুটকেশ চাপিয়ে ঠেলে নিয়ে এলেন স্টেশান পেরিয়ে পার্কিং লটে। তাঁর জিপেই চড়িয়ে নিয়ে চললেন।
কিন্তু একি! বাড়ির দিকে না গিয়ে উল্টো টার্ন নিয়ে শিয়ালদার ব্রিজে উঠল কেন?
বললেন, ‘তোমার ড্রাইভার কি জানে না আমি কোন দিকে থাকি?’
দ্বিজেন বললেন, ‘না, মানে, আমার একবার লালবাজার ঘুরে যেতে হবে!’
ব্যাপারটা বিবেকের অদ্ভুত লাগল। বললেন, ‘তোমার যদি লালবাজারে কাজই থাকে, ঘটা করে আমায় নিতে আসা কেন?’
দ্বিজেনের গলার সুর পাল্টে গেল—‘কারণ এখন তোমার বাড়ি পুলিশ সিলড করে রেখেছে। পাহারা বসানো আছে। তারা কাউকে বাড়ির ভিতর ঢুকতে দেবে না!’
—‘কী ব্যাপার? আমি তো কিছুই...!’
—‘বুঝতে পারছ না। আমার রিভলবারটা তোমার বাড়ি পাওয়া গেছে! সেটা নিশ্চয়ই নিজে থেকে উড়ে যায় নি তোমার ছাদের ঘরে? ...জানো, এজন্য অজিত সাঁতরার খুনি হিসেবে আমাকে সন্দেহ করেছে পুলিশ! আমার বউ এবং মেয়েকে অজস্র প্রশ্ন করে হ্যারাস করেছে কদিন ধরে!...এই মুহূর্তে আমাদের গাড়িকে ফলো করেছে আর একটি গাড়ি, যাতে প্লেন ড্রেসে দুজন সি.আই.ডি. অফিসার রয়েছেন। আমার ওপর দায়িত্ব তোমাকে চিফ ইনভেস্টিগেটিং অফিসার সম্রাট রায়ের ঘরে পৌঁছে দেবার। সেখানে অনেক প্রশ্নের জবাব তোমাকে দিতে হবে।’
—‘কিন্তু তোমার রিভলবার আমি নিয়ে...? বিশ্বাস করো, সত্যি আমার কিছুই মনে পড়ছে না! শেষে কি সোমনাম্বুলিস্ট হয়ে ঘুমের ঘোরে...!
দ্বিজেন শুধু একবার গম্ভীর ভাবে তাকালেন বিবেক চৌধুরির দিকে। মুখে কিছু বললেন না।
কুড়ি মিনিট পরেই দ্বিজেনবাবুর জিপ লালবাজারের গেটের মধ্যে ঢুকল। তারপর বিবেককে নিয়ে একটি বিশেষ ঘরের সামনে গিয়ে উনি বললেন, ‘যাও, স্যার ভেতরে আছেন। তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছেন। আমি একটু পরে আসছি।’
বিবেক ঘুরে ঢুকলেন। তাঁকে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে সম্রাট বললেন—‘মি. চৌধুরি, এই চেহারাটায় বসুন, প্লিজ!’ মিনিটখানেক নীরব থাকার পর আসল কথা শুরু করলেন। ‘দ্বিজেন বাবুর কাছে আমি শুনেছি। আপনার চেয়ে দশ বছরের ছোটো ভাই সুমনকে আপনি নিজের ছেলের মতো ভালোবাসতেন। আট বছর আগে সে সুইসাইড করাতে আপনি মেন্টাল ব্যালান্স হারিয়ে ফেলেন...’
বিবেক ওঁকে থামিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন—‘আপনি জানেন না, আপনার কোনো আইডিয়া নেই, কী দুঃসহ লজ্জা, ভয়, অভিমান, প্রতিবাদ সুমনের সুইসাইডের পিছনে ছিল—!’
মি. রায় উঠে এসে বিবেকের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আমি সবই শুনেছি এবং জেনেছি, বিবেকবাবু। ওর প্রতি বিরাট অন্যায় হয়েছিল। মিথ্যে খুনের দায় ওর ঘাড়ে চাপানো হয়েছিল। এবং আমাদের বিচারব্যবস্থায় সেটাই পাশ হয়ে গিয়েছিল।’
বিবেক বললেন, ‘হ্যাঁ। সে বছর এ্যাসেমব্লি ইলেকশানের দিন রাসবিহারী এ্যাভেনিউয়ের এক পোলিং বুথে এম.এল.এ. পানু ঘোষের ডান হাত, ঘেবো, রাইভ্যাল দলের দুটো লাশ নামিয়ে পালাবার সময় ফুটপাতে দাঁড়ানো আমার নিরীহ ভাইয়ের হাতে রিভলবার ধরিয়ে দিয়ে চম্পট দিয়েছিল। বিচারের প্রহসনে সুমন খুনি সাব্যস্ত হয়ে জেলে যায়! আপনি ভাবতে পারেন, একটা প্রমিজিং, সেনসিটিভ ভদ্র যুবকের পক্ষে সেটা কতখানি শকিং?’
রায় বললেন, ‘হুঁ। কোয়াইট আণ্ডারস্ট্যাণ্ডেবল! আমি এও জেনেছি যে তাকে কনভিক্ট করার ব্যাপারে আসল ভূমিকা ছিল ক্রিমিনাল ল-ইয়ার অজিত সাঁতরার। এ ঘটনার পর আপনার ইনস্যানিটি প্রকট হয়। কিছুদিন মানসিক হাসপাতালে কাটিয়ে একটু রিকভার করেন। তবে কাজে আর মন দিতে পারেন নি। তাই শেষ পর্যন্ত VRS নেবার সিদ্ধান্ত নিলেন। এখনও আপনি সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. রাহাকে নিয়মিত দেখিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু আপনি শেষ পর্যন্ত পারলেন না আপনার প্রতিশোধস্পৃহাকে জয় করতে...’
—‘মানে?’
—‘মানে এত বছর পরেও অজিত সাঁতরার প্রতি ক্রোধ, ঘৃণা আপনার এক চুল কমে নি, বরং উত্তরোত্তর বেড়েছে।’
—‘দ্যাটস ট্রু। কিন্তু আপনি কী করে বুঝলেন?’
—‘আপনার কার্যকলাপ থেকে। শেষমেশ আপনি আপনার কাজিন দ্বিজেন বোসের সার্ভিস রিভলভারটা চুরি করে—’
—‘কে বলল?’
—‘বিবেক বাবু, ফাক্টস আর সেল্ফ-এভিডেন্ট। আপনার বাড়ির চিলেকোঠায় একটা দেরাজের মধ্যে সব কিছুই পাওয়া গেছে। .৩৮ ক্যালিবারের রিভলভার, যা থেকে আপনি দুটো বুলেট ফায়ার করেছিলেন। তাছাড়া যে ওভারকোট, দস্তানা, গামবুট আপনি সেদিন ব্যবহার করেছিলেন। সবই ওইখান থেকে মিলেছে। সেই সঙ্গে আপনার এই ডায়রি।’
অবাক হয়ে বিবেক দেখলেন, সত্যিই তাঁর একটা কালো ডায়রি ওঁর হাতে। কতকগুলো জায়গায় উনি পেজমার্ক করে রেখেছেন। তাই খুলে খুলে পড়ে শোনাতে লাগলেন। দ্বিজেন বাবু ইতিমধ্যে এসে ঘরের এক কোণে বসলেন।
‘26th March...মকবুলের সঙ্গে যোগাযোগটা অদ্ভুতভাবে হয়েছিল। আমি শতাব্দীকে পড়িয়ে সবে বেরিয়েছি ওদের ময়রা স্ট্রিটের বাড়ি থেকে, হঠাৎ পুলিশের তাড়া খেয়ে ওই ছিনতাইকারী গুন্ডা আমাকে পাশ কাটিয়ে ওদের গেটের মধ্যে ঢুকে আত্মগোপন করে। কয়েক সেকেণ্ড পরেই এক সার্জেন্ট উদ্যত রিভলবার হাতে ছুটতে ছুটতে এসে আমায় জিগ্যেস করল, ‘কোনো গুন্ডাকে এখান দিয়ে পালাতে দেখেছেন? ডেঞ্জারাস চেহারা, সঙ্গে রিভলবার!’ আমি অবাক হবার ভান করে বললুম, ‘আমি কাউকে পালাতে দেখি নি!...’
বিবেক বুঝলেন, এটা VRS নেবার আগের স্টেজে লেখা। তখন কলেজে ক্লাস করা ছাড়াও দু-একটা প্রাইভেট টুইশান করতেন, অন্য ভাবনা ভুলতে...
মি. রায় বললেন, ‘আপনার ডায়রি খুঁটিয়ে পড়ে আমি জেনেছি যে, কৃতজ্ঞতাবশত মকবুল আপনাকে কিছু দিতে চেয়েছিল। আপনি ওর রিভলবারটা চেয়ে নিয়েছিলেন কিছুদিনের জন্য। ওকে বাড়ির এ্যাড্রেসও দিয়েছিলেন।’
উনি ডায়রির পাতা উল্টে এক জায়গায় দেখালেন বিবেক লিখেছেন—‘হোয়াট আ থ্রিল! একটা জ্যান্ত লোডেড রিভলবার নিয়ে হাতে করে নাড়াচাড়া করা! ঠিক জায়গায় একটা বুলেট! ব্যাস, যে-কোনো শক্তপোক্ত লোকও চিরনিদ্রায় ঢলে পড়বে!’
মি. রায় আবার বক্তব্য শুরু করলেন। ‘মকবুলকে আপনি নিয়মিত টাকা দিতেন। সে আপনাকে রিভলবার ছোঁড়া শেখাত, গুলি সাপ্লাই দিত। ফায়ার করে ফাটানো অনেক বোতলের সারি আপনার বাড়ির ছাদে আমি দেখতে পেয়েছি।’ কয়েক মাস পর একদিন—
আবার একটা পেজমার্ক-করা পাতা খুলে পড়লেন সম্রাট—
‘মকবুল তো আজও এল না। একটি বড়ো গ্যাঙের হয়ে এলাকা ক্যাপচারের জন্য লড়তে হবে। তাই রিভলবারটা নিয়ে গেল পরশু...বোধ হয় নিজেই টেঁসে গেছে ডিউরিং অপারেশান। এসব লোকে তো এইভাবেই মরে! ঘেবোও মরেছিল বেঘোরে। শুধু ওই জ্যান্ত শয়তান সাধু সেজে ঘুরছে!’
মি. রায় আবার তাঁর বক্তব্যে ফিরে গেলেন—‘মকবুল সত্যিই সেবার টেঁসে গিয়েছিল বিপক্ষ দলের গুলিতে। তাই এবার আপনার প্রয়োজন হয়ে পড়ল আর একটা রিভলবারের। আর, যেহেতু বেশ কিছুদিন প্র্যাক্টিসে ছিলেন না, আপনার প্রথম গুলিটি লক্ষ্যে লাগে নি। সেটা খাটের পাশে দেওয়ালে ঢুকেছিল। হরিপদ ঠিকই শুনেছিল দু-বার ফায়ারিং-এর আওয়াজ—’
বিবেক অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে এক মুহূর্ত কপালে আঙুল টিপে বললেন, ‘কিন্তু দ্বিজেনের রিভলবার তো আমি নিই নি! ওতে কি আমার আঙুলের ছাপ আছে?’
—‘না তা নেই। কারণ আপনি গ্লাভস পরেছিলেন। এতো জানা কথা...দেখুন, ওই লোকটা, সাঁতরা, মানুষ হিসেবে জঘন্যই ছিল। তাই আপনার মোটিভকে আমি শ্রদ্ধা করি। বাট মার্ডার ইজ মার্ডার। আর সেইজন্যেই ইণ্ডিয়ান পিনাল কোড ৩০২ অনুযায়ী আপনাকে আমি ওই খুনের দায়ে এ্যারেস্ট করছি! আপনার যা বক্তব্য আদালতে বলবেন।’
‘হা: হা: হা: হা : হা: হা:!’
হঠাৎ পাগলের মতো বিকট হাসতে শুরু করলেন অভিযুক্ত বিবেক চৌধুরি।
দ্বিজেন এবং সম্রাট রায় তাঁর দিকে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইল।
‘হা: হা-হা: হা-হ হা হা!...আমি, আমি, আমি বিবেক চৌধুরি নিজেকে কাওয়ার্ড ভাবতাম। আ—হা:-হা-হা! এখন আমি...আমি হিরো! হা-হা: হা! সু-মন! ওরে সুমন! আমি ভেবেছিলাম, আমি স্বপ্ন দেখেছি! যেমন রোজ দেখি যখন তখন!...হ্যাভ আই রিয়েলি ডান ইট! ও, ইটস গ্রেট! আই ফিল সো প্রাউড! সুমন, ভাইটি, তুই খুশি তো? বল, তুই খুশি হয়েছিস! হবিই তো! আহ-আঃ আঃ আ—’
দ্বিজেন বসু বললেন, ‘বিবেকদার লুনাসি বোধহয় পুরোপুরি রিল্যাপ্স করেছে! কেসটা তাহলে স্যার ৩০৩ ধারায় যাবে মনে হয়!’
গোয়েন্দা অমিত নিয়োগীর প্রবেশ
‘সেটাই তো আপনি চেয়েছিলেন, দ্বিজেনবাবু?’
চমকে উঠলেন দ্বিজেন হঠাৎ পিছন থেকে অপরিচিত কন্ঠে কথাটা শুনে।
ফিরে দেখলেন, এক দীর্ঘকায় সৌম্যদর্শন হালকা অথচ মজবুত চেহারার মানুষ, যাঁর দু-চোখে একই সঙ্গে অদ্ভুত গভীরতা ও প্রখরতা লক্ষ্য করার মতো।
মি. রায় বললেন—‘মি. অমিত নিয়োগী! আপনি এখানে? এই মুহূর্তে!’
অমিত বললেন—‘অনধিকার প্রবেশের জন্য ক্ষমা চাইছি মি. রায়! কাজটা আমাকে করতে হল শুধু ন্যায়ের স্বার্থে!’
মি. রায় অপ্রসন্ন মুখে তেতো সুরে বললেন—‘আপনি ফোনে আমায় বলেছিলেন একবার আসবেন, কিছু আর্জেন্ট কথা আছে। কিন্তু এই মোমেন্টে আমি আরো আর্জেন্ট কাজে ব্যস্ত দেখতেই পাচ্ছেন...’
অমিত—‘সে তো দেখছিই। শখের গোয়েন্দার এখানে কোনো স্থান থাকবার কথা নয়। সেইজন্যই হোম মিনিস্টার তথা চিফ মিনিস্টারের কাছ থেকে লিখিত পারমিশান নিয়ে এসেছি। আপনি বোধহয় জানেন না, ওঁর ছেলে বিবেকবাবুর ছাত্র। স্যার বলতে শ্রদ্ধায় গদগদ। তিনিই আমাকে এ ব্যাপারে তদন্তের জন্য নিয়োগ করেছেন!’
মুখ্যমন্ত্রীর চিঠিটা হাতে নিয়ে বেজার মুখে সম্রাট রায় বললেন, ‘বসুন আপনি।’
বসতে বসতে অমিত বললেন, ‘আসলে এ কেসটা শেষ হয়ে গেছে মনে হলেও শেষ হয় নি। বরং নতুন করে শুরু হতে চলেছে!’
মি. রায় গোমড়া মুখে বললেন—‘আপনি কি বলছেন, আমি ঠিক বুঝলাম না। কারণ আমার বিবেচনায় মার্ডারার হ্যাজ সারেনডারড! দি কেস ইজ কমপ্লিট!’
অমিত—‘মি. রায়, আপনার কর্মদক্ষতা, পর্যবেক্ষণ, যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত, এসবের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু অজিত সাঁতরা মার্ডার কেসটা যতটা সরল ভেবে আপনি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার চেয়ে বেশ একটু জটিল। পাটিগণিতের সিমপ্লিফিকেশান-এর মতো এটাকে ‘বদমাস’ ফরমুলায় ফেলে আসল বদমাশকে ধরতে হবে। আমাদের একটু নিভৃতে কথা বলার প্রয়োজন। আপনি দ্বিজেনবাবুকে এখন বাড়ি পাঠিয়ে দিন। আর—’
প্রচন্ড একটা উত্তেজনার শেষে চেয়ারে একধারে মাথাটা হেলিয়ে জবুথবু হয়েছিলেন বিবেক। তাঁর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে অমিত বললেন—‘আপাতত এই ভদ্রলোককে ডা. রাহার তত্ত্বাবধানে মানসিক হাসপাতালে পাঠাবার ব্যবস্থা করুন। আপনি অবশ্যই সেখানে গার্ড মোতায়েন করবেন।’
নির্দেশ পেয়ে বিস্মিত দ্বিজেন বসু ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়া মাত্র অমিত মি. রায়কে বললেন—‘দ্বিজেন বসুর বাড়ির সামনে এবং ওঁর প্রতিটি মুভমেন্ট ওয়াচ করার জন্য লোক রাখুন। এটা খুব দরকারি। টপ প্রায়রিটি।’
সম্রাট রায় বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন ক্রমশ। নিজেকে জাহির করার জন্য এবার বিরক্তির সুরে বললেন, ‘আপনি কী বলতে চান বলুন তো! বিবেক চৌধুরি সাঁতরাকে খুন করেন নি? ওঁর বিরুদ্ধে প্রাইমা ফেসি সবরকম প্রমাণ ও ডকুমেন্ট রয়েছে— মোটিভ থেকে আরম্ভ করে মার্ডার ওয়েপন, সব পাওয়া গেছে। মায় স্বীকারোক্তি পর্যন্ত!’
অমিত বললেন—‘আপনাকে সব খুলেই বলি। আপনি কীভাবে কেসটায় প্রসিড করেছেন, মোটামুটি সবই আমি জেনেছি। তদন্তের স্বার্থে কাগজে ও চিঠিতে সব ডিটেলস আপনারা ফাঁস করেন নি। কিন্তু ‘সকাল-সকাল’ পত্রিকার এক ঝানু রিপোর্টার আমাকে তথ্যগুলো দিয়ে দিয়েছে। হাউ হি গট দিজ ইজ হিজ ট্রেড সিক্রেট। আপনি মিলিয়ে নিন। এক, বিবেক বাবুর ভাই সুমনকে অন্যায় ভাবে মার্ডার কেসে ফাঁসানো এবং শেষ পর্যন্ত জেলে তার আত্মহত্যার জন্য দায়ী অজিত সাঁতরাকে আধ-পাগল বিবেক বাবু খুন করার জন্য মুখিয়ে ছিলেন, এবং এই মহৎ বদলা নেবার স্বপ্ন দেখতেন। এর জন্য তিনি রিভলবার জোগাড় করে বোতল সাজিয়ে প্র্যাকটিস করতেন। দুই, দ্বিজেন বোস, ওনার মামাতো ভাই, পুলিশি চাকরিতে বিশেষ সাফল্য পান নি। এখন রিটায়ার করতে পারলেই বাঁচেন, এরকম মনোভাব। সাঁতরা মার্ডার হবার দুদিন আগেই তাঁর সার্ভিস রিভলভার রহস্যজনক ভাবে চুরি যায় তাঁর বাড়ি থেকে। তিন, ওঁর মেয়ে রিজার বয়ফ্রেণ্ড বান্টির সঙ্গে সাঁতরার টক্কর কাহিনিও আমি জেনেছি। চার, ওই মার্ডারের কদিন পরেই বিবেক চৌধুরি হঠাৎ দিল্লি চলে যান কিছুদিনের জন্য। তাঁর এ্যাবসেন্সে আপনি ও দ্বিজেনবাবু তাঁর বাড়ির তালা ভেঙে ঢুকে একটা ঘর থেকে একটি হ্যাট, ওভারকোট, সানগ্লাস, দস্তানা, গামবুট এবং দ্বিজেন বোসের সেই হারিয়ে যাওয়া রিভলবার, সব উদ্ধার করেন—’
অমিত নিয়োগীকে বাধা দিয়ে মি. রায় বললেন—‘ইয়েস, সেই সঙ্গে ওনার এই ডায়রি, যা থেকে নি:সন্দেহে বলা যায় উনিই খুনটা করেছেন। ইটস আ কাইণ্ড অব কনফেসান!’
অমিত বললেন—‘আই সী। কিন্তু মি. রায়, ব্যাপারটা কি আপনার খুব বেশি সরলীকৃত মনে হচ্ছে না? বিবেক চৌধুরি দীর্ঘদিন ধরে প্ল্যান করে খুন করার পর সমস্ত এভিডেন্স এত সুন্দর করে এক জায়গায় রেখে দিলেন, যাতে কেউ এসে খুঁজলেই পেয়ে যায়! আর খুন যে করবে সে একবার দিল্লি গিয়ে সেখান থেকে নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট ট্রেনে কলকাতায় আবার ফিরে আসে ধরা দিতে? আরে মশায়, বিবেক যদি সত্যিই করতেন খুনটা, এমন উদাসীন থাকতেন না। লাফাতে লাফাতে এসে আইনের কাছে আত্মসমর্পণ করতেন স্বপ্নপূরণের উল্লাসে!...ডা. রাহার সঙ্গে আপনার কথা হয়েছিল কুড়ি মিনিট। আমার সঙ্গে এক ঘণ্টা আলোচনা হয়েছে বিবেক বাবুকে নিয়ে। আর দ্বিজেন বোসের সার্ভিস রিভলবার হারানোর ব্যাপারটাতেও বেশ একটা খটকা লাগার কথা ছিল আপনার!’
মি. রায় বললেন, ‘আপনি কি মনে করেন, বান্টিই খুনটা করেছে, কিংবা অতনু সাঁতরার নিযুক্ত কোনো লোক? তাহলে বিবেক বাবুর বাড়ি মার্ডার ওয়েপন যায় কী করে?’
অমিত একটু চাপা হাসি সহযোগে বললেন—‘আমাকে দিন-চারেক সময় দিন, মি. রায়। প্লিজ! আমি আশা করি আপনাকে সম্পূর্ণ চিত্রটা দিতে পারব, ঠিক কীভাবে, কীকারণে অজিত সাঁতরা খুন হয়েছিলেন, এবং হু ডান ইট।’
উন্মোচন দৃশ্য
দিন শনিবার। সময় সন্ধ্যা ছটা। স্থান অমিত নিয়োগীর ক্লায়েন্ট তথা মুখ্যমন্ত্রী-তনয়, অনিকেত সেন, আই. এ. এস.-এর বাড়ি। আহুত হয়েছেন অজিত সাঁতরা হত্যা মামলার সঙ্গে অল্পবিস্তর জড়িত বেশ কিছু লোক। পাত্র-পাত্রীদের মধ্যে আছেন বিবেক বাবু, দ্বিজেন বাবু, ডা. সঞ্জীব রাহা, শিবানী সাঁতরা, অতনু সাঁতরা, হরিপদ, দ্বিজেন বাবুর স্ত্রী, রিজা, বান্টি, অঘোর সাহা নামে এক ব্যক্তি, যিনি ‘থিয়েট্রিকাল প্রপার্টিজ’ নামে একটি বিখ্যাত দোকানের প্রোপ্রাইটার।
ইতিমধ্যেই গোয়েন্দাপ্রবর অমিত নিয়োগী তাঁর প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য, কাগজপত্র ও সাক্ষী জোগাড় করে ফেলেছিলেন। সম্রাট রায়কে নিয়ে যখন মি. সেনের ড্রইংরুমে ঢুকলেন অমিত, বিবেক চৌধুরিকে ডিফেণ্ড করা এবং খুনিকে সনাক্ত করার জন্য তিনি তখন সম্পূর্ণ তৈরি।
বিবেক বাবুকে দেখে তাঁর মানসিক অবস্থা ঠিক বোধগম্য নয়। একটু ফ্যালফেলে দৃষ্টি। ডা. রাহা বললেন, ওঁকে সিডেটিভ কোর্স দেয়া হচ্ছে।
সম্রাট রায় কালক্ষেপ না করে অমিত নিয়োগীকে চার্জ করলেন—‘বলুন, আপনি, কী নতুন তথ্য পেলেন এ কেসে, যাতে প্রমাণ হয় বিবেক চৌধুরি এই খুনটা করেন নি?’
অমিত দ্বিজেন বাবুর দিকে ফিরে বললেন—‘আপনি সেদিন লালবাজারে বলছিলেন, ‘বিবেকদা’র লুনাসি রিল্যাপ্স করেছে’...
দ্বিজেন বাবু উষ্মার সঙ্গে বলে উঠলেন—‘তাই শুনে আপনি বলেছিলেন, আমি নাকি তাই চেয়েছিলাম! এ কথার অর্থ? আপনি আমার সম্পর্কে কী জানেন?’
অমিত বললেন, ‘সেই কথাই তো বলতে এসেছি এঁদের সবার কাছে। আমি জানি যে আপনি লোন নিয়ে এবং ধার করে আপনার এস.আর. দাস রোডের ফ্ল্যাটটা কিনেছেন তিন বছর আগে। জানি যে, ছ-মাস বাদে আপনি যে রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট পাবেন, তার প্রায় সবটাই আপনার মেয়ের বিয়ের জন্যে খরচা হবে। জানি যে, আপনি ছাড়া বিবেক বাবুর কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-বন্ধু ছিল না। এবং তাঁর জীবন, স্বভাব ও ভাবনা-চিন্তা আপনার মতো কারো জানা ছিল না। জানি যে, আপনি একটা আইনি চিঠি পেয়েছিলেন যে একমাসের মধ্যেই একটা মোটা অঙ্কের টাকা না দিতে পারলে আপনাকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের নোটিশ যাবে!’
দ্বিজেন বাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এসব আপনি কী আবোল-তাবোল বলছেন?’
সম্রাট রায়ও অধৈর্য স্বরে বললেন—‘কেসের সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক?’
অমিত অবাক হবার ভান করে বললেন—‘ও, এ-কথাগুলো আবোল-তাবোল? অতনুবাবু, ওঁকে দেখান তো স্ট্যাম্প পেপারটা!’
অতনু সাঁতরা দ্বিজেন বসুর দিকে বাড়িয়ে দিলেন একটা সই-সাবুদ-করা দশ টাকার স্ট্যাম্প পেপার। নিতে গিয়ে দ্বিজেন বসুর হাতটা কেমন কেঁপে গেল।
অমিত নিয়োগী বললেন, ‘তিন বছর আগে দ্বিজেন-বাবু যখন তাঁর ওই সুন্দর থ্রি-রুম ফ্ল্যাটটা কেনেন ওই রকম জায়গায়, তখন অনেক টাকা খসেছিল, তাই না! অফিসের পি.এফ. ও ব্যাঙ্ক থেকে লোন নেবার ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও ডাউন পেমেন্টের লাস্ট ডেট-এর মধ্যে তাঁকে বেশ কিছু টাকা, টু বি প্রিসাইস, দু-লাখ ধার করতে হয়। আর, এ টাকা তাঁকে ধার কে দিয়েছিল জানেন? অজিত সাঁতরা। এটি হল তার ডকুমেন্ট। কী, মি. রায়, চমকে গেলেন মনে হচ্ছে! এই কেসের সঙ্গে একটু-আধটু সম্পর্কের আভাস পাচ্ছেন কি?’
অতনু বলল, ‘বাবার গডরেজ আলমারির লকারে এটা পাওয়া গেছে। এতে সাক্ষী হিসেবে যাঁর নাম আছে, তিনি বাবার মুহুরি। ডাকলেই তিনি আসতে পারেন।’
অমিত আবার কাহিনি এগিয়ে নিয়ে চললেন:
‘অত্যন্ত চড়া সুদের শর্তে অজিতবাবু টাকাটা ধার দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিজেনবাবু ভেবেছিলেন এক বছরের মধ্যে মান্ডালা স্টিলের শেয়ারে অনেকটা লাভ করে অজিত সাঁতরার ধার শোধ করে নিতে পারবেন। ওনার দুর্ভাগ্যবশত কোম্পানি হঠাৎ ডুবে যায়, এবং ওঁর সুদে-আসলে বহু টাকা লোকসান হয়। ধার শোধ হয় না, সুদ হু হু করে বেড়ে চলে। সম্প্রতি সেটা আসলের অনেক বেশিতে দাঁড়িয়েছে।
প্রায়ই তাই সাঁতরাকে তোষামোদ করতে দ্বিজেন বাবু যেতেন ওঁর বাড়ি এবং আলিপুর কোর্টে ওঁর সেরেস্তায়। কিন্তু শুধু কথায় ভেজার চিঁড়ে তো ছিলেন না সাঁতরা উকিল। তিনি আলটিমেটাম দিয়েছিলেন চরম step অবিলম্বে নেবার। তাই করলেন। আইনি চিঠি দিয়ে এক মাসের মধ্যে সব বকেয়া টাকা দাবি করলেন। অন্যথায় eviction from the flat এবং জেলের হুমকি। এ চিঠি পাঠাবার তিন দিন আগেই দ্বিজেন বাবু একদিন রাত নটা নাগাদ অজিত বাবুর বাড়ি গিয়েছিলেন। সেখানে দু-জনের মধ্যে সম্ভবত একটা হাতাহাতি পর্যায়ের ঝগড়া হয়। কী দ্বিজেন বাবু? এটা আবোল-তাবোল, না হযবরল? এ ব্যাপারে শিবানী দেবী বোধ হয় কিছু আলোকপাত করতে পারেন!’
শিবানী বললেন, ‘আমি দেখলাম দ্বিজেন বাবু আমার স্বামীর ঘরে ঢোকার পাঁচ মিনিট বাদেই ভয়ঙ্কর উত্তেজিত ভাবে, প্রায় ছুটতে ছুটতে আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। আর উনিও ঘর থেকে চেঁচাতে চেঁচাতে বেরিয়ে এলেন, ‘হারামজাদা! নিজের কবর নিজে খুঁড়লি! এর ফল তোকে ভুগতে হবে সারা জীবন’! কাছে গিয়ে দেখি, ওনার নাক দিয়ে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে।’
অমিত দ্বিজেনের দিকে ফিরে বললেন, ‘কী এমন হয়েছিল যে, আপনাকে হাত তুলতে হল?’
দ্বিজেন এবার ক্রোধে আত্মহারা হয়ে বললেন, ‘ওই নোংরা লোকটা যা বলেছিল, তা শুনলে যে কোনো মেয়ের বাবাই হাত তুলত, পারলে জিভ ছিঁড়ে নিত ওর। জানোয়ারটা আমায় বলল, আপনার অসুবিধে কি আছে? মেয়েটি তো বেশ সুন্দরী হয়েছে, ফিগারটা ছাপ্পুস! পাঠিয়ে দেবেন আমার কাছে মাঝে মাঝে। তাহলে আর ইন্টারেস্ট বাড়বে না!’
অমিত বললেন—‘আইনি চিঠি পেয়েই আপনাকে ঠিক করতে হল, অজিত সাঁতরাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হবে, তাই তো? আর প্রথম স্টেপ হিসেবে আপনি জাহির করে দিলেন, আপনার সার্ভিস রিভলভার খোয়া গেছে। তারপরই জোগাড় করলেন সিরিয়াল-কিলার-সুলভ পোশাক-আশাক, ওভারকোট, কান ঢাকা টুপি, সানগ্লাস, দস্তানা, গামবুট এটসেটরা। আপনাকে হয়তো ওয়েট করতে হত অনির্দিষ্টকাল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে পরের রবিবারই শহর-ভাষা বৃষ্টি নামল, আর, আপনি নেমে পড়লেন কাজে। বিবেক বাবুর ঘরে যে পোশাক ও এ্যাকসেসরি আইটেমগুলো পাওয়া গেছে, ওগুলো তাঁর নিজের কেনা, তাঁর স্বপ্নের পোশাক। কিন্তু খুনের অপরাহ্নে ওগুলো ব্যবহৃত হয়নি, তাই না দ্বিজেনবাবু? আর আপনি যদি সেকথা স্বীকার না করেন, তবে এই অঘোর বাবু সে কথাটা ফাঁস করবেন! কী অঘোর বাবু, বলুন আপনার বক্তব্যটা।’
অঘোর বাবু এবার একটা বড়ো ব্যাগ থেকে ওভারকোট, টুপি, গগলস ইত্যাদি যাবতীয় বস্তু বার করে সেন্টার টেবিলে রাখলেন।
বললেন, ‘গত মাসের বাইশ তারিখ, ফ্রাইডে, এই ভদ্রলোক আমার দোকান, মানে ‘থিয়েট্রিকাল প্রপার্টিজ’-এ এসে এগুলো ভাড়া করেন। বলেন, অফিসের নাটকে লাগবে। তারপর পঁচিশ তারিখ, মানে সোমবার, এসে ওগুলো ফেরত দিয়ে যান।’
মি. রায় আর থাকতে পারলেন না। বলে উঠলেন, ‘এসব তো বুঝলাম, কিন্তু দ্বিজেনবাবুর সার্ভিস রিভলভারটা আমরা কী করে পেলাম বিবেক চৌধুরির ওভারকোটের পকেটে! মি. নিয়োগী, এ রহস্যটা কি আপনি সলভ করেছেন?’
অমিত বললেন, ‘দ্বিজেন বোস আপনাকে বুঝিয়েছেন যে বিবেকবাবু ওঁকে ফাঁসাতে চেয়েছিলেন। আসল ঘটনাটা ঠিক উল্টো। উনি ভীষণভাবে জানতেন যে, বিবেকের রিভেঞ্জ মোটিভ রয়েছে। আর ওঁকে স্কেপগোট করার মতলবটা সম্ভবত পাকাপাকি রূপ নেয় ঘটনাস্থলে বিবেককে দেখে।’
মি. রায় বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘সে কী! তাহলে বিবেক বাবুও মার্ডার স্পটে ছিলেন? তিনি কি এই উদ্দেশ্য নিয়েই গিয়েছিলেন এবং একই রকম পোশাকে?’
অমিত—‘না। বিবেক তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে ওই প্রবাদতুল্য পোশাক-পরা এক রহস্যময় লোককে ঝমঝমে বৃষ্টির মধ্যে নিয়তির দূতের মতো হেঁটে যেতে দেখেন, এবং এক অদ্ভুত টেলিপ্যাথিক যোগাযোগ অনুভব করেন। তাঁর মনে হয় লোকটি সাঁতরার বাড়িতেই চলেছে এবং ওই কাজটি করতেই যাচ্ছে। কি, বিবেকবাবু, আপনি দেখেছিলেন না সেই টুপি-ওভারকোট-গগলস-পরা মূর্তি বৃষ্টির মধ্যে চলেছে?’
বিবেক বললেন, ‘হ্যাঁ। স্পষ্ট দেখেছি। ...তারপরও অনেকবার দেখেছি। আয়নাতেও দেখেছি সাঁতরার বাড়ি!...’
অমিত বললেন, ‘দ্বিজেনবাবু বোধহয় সেদিন ওই এগ্রিমেন্টের স্ট্যাম্প পেপার খানা হাতিয়ে নিয়ে আসতেন। কিন্তু দরজার কাছে হঠাৎ বিবেক বাবুকে দেখে আর রিস্ক নেন নি। তাই না, দ্বিজেন বাবু?’
দ্বিজেন এবার মুখ নীচু রেখেই বললেন, ‘সবই তো বুঝে ফেলেছেন। আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছেন কি?’
অমিত বললেন, ‘তাই বলে আপনি আপনার অসহায় দাদার অবশেসানের সুযোগ এইভাবে নেবেন?’
এইবার বিবেকের ছাত্র অনিকেত বললেন—‘কথায় বলে আপনি বাঁচলে বাপের নাম! এতো নেহাৎ পিসতুতো দাদা!’
অমিত—‘ঠিক কথা! কীভাবে বিবেকের বিরুদ্ধে কেসটা অকাট্য করা যায়, এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন দ্বিজেনবাবু। খুব সুবিধে হল যখন বিবেক ওঁকে বললেন, উনি দিল্লি যাচ্ছেন দিন সাতেকের জন্য।’
মি. রায় আবার বাধা দিয়ে বলে উঠলেন—‘কিন্তু বিবেকবাবুর দরজার লক নিজের হাতে ভেঙে আমি ঢুকেছি দ্বিজেনবাবুর সঙ্গে এবং ওই মার্ডার ওয়েপন তাঁর কোটের পকেটে পেয়েছি। ক্যান ইউ এক্সপ্লেন দিস টু মি, মি. নিয়োগী?’
অমিত মৃদু হেসে বললেন, ‘এই এলিমেন্টারি কথাটাই আপনি ভাবেন নি, মি. রায়। আপনাকে দিয়ে তালা ভাঙানোটা দ্বিজেন বাবুর মাস্টার স্ট্রোক। কিন্তু তিনি যখন বিবেকবাবুর কোটের পকেটে নিজের রিভলবারটা ‘প্লান্ট’ করে আসেন, তাঁকে কোনো তালা ভাঙতে হয় নি। বিবেকবাবু বাড়ির চাবির ডুপ্লিকেট ওঁর কাছেই রেখে যান কোথাও বেড়াতে গেলে। তাই না, মি. বাসু?’
হেঁটমুণ্ড দ্বিজেন বসু আবার যান্ত্রিক ভাবে বললেন, ‘সবই তো জেনে ফেলেছেন আপনি! আর কেন লজ্জা দিচ্ছেন?’
মি. রায় নিজের হাতে ঘুষি মেরে বললেন, ‘লজ্জা আমাকেও কম পেতে হচ্ছে না আপনার জন্য! হাউ কুড আই ওভারলুক সো মেনি সিম্পল পয়েন্টস?’
অমিত বললেন, ‘আপনি ধরে নিয়েছিলেন বিবেক চৌধুরি, একমাত্র বিবেক চৌধুরিই, কালপ্রিট। তাই সেইভাবেই আপনার যুক্তি প্রমাণ সব ঠিকঠাক স্লটে পড়েছে, বলে ভেবেছেন। আমার কাজটা উল্টো দিক থেকে দেখা। বিবেক চৌধুরি না-হলে আর কে করতে পারে খুনটা। কেন এবং কীভাবে। যাই হোক, এখন আশা করি সম্পূর্ণ রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। দ্বিজেনবাবু একরকম স্বীকারোক্তিই করে ফেলেছেন, এবং বিবেকবাবুর মতো হি হিজ নট ইন অ্যান আনসাউণ্ড স্টেট অব মাইণ্ড। ফুল স্টেটমেন্ট দেবার আগে ওনার উচিত নিজের এ্যাডভোকেটের সঙ্গে কনসাল্ট করা।’
অনিকেত বাবু অমিতের হাত দুহাতে নিয়ে গগগদ স্বরে বললেন—‘স্যার, আমার স্যারকে অভিযোগমুক্ত করার জন্য চিরকৃতজ্ঞ রইলাম আপনার কাছে! দক্ষিণার পরিমাণ যা-ই দিই, সে ঋণ শোধ হবার নয়।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন