অরুণোদয় ভট্টাচার্য
এই সময়
‘সম্রাজ্ঞী’, দিশি ফাস্টফুডের দোকান। গরমাগরম সিঙাড়া, রাধাবল্লভী, এগরোল, জিলিপি ইত্যাদির আকর্ষণে সত্যেন দত্ত রোডের মোড়ে ফুটপাতে ছন্দময় জমায়েত সান্ধ্য-টিফিন ভোক্তাদের। অদূরে এই গোত্রের আর একটি দোকান ঘিরেও উৎসাহী খাদকের সংখ্যা ৩০-৩৫ হবে কম করে।
হঠাৎ শোনা গেল একটা চিৎকার—‘টাইম বোম! পালান!’
জনতার মধ্যে থেকে প্রশ্ন—‘কোথায়?’
একজনের উত্তর—‘ওই বাক্সটায় আছে। ওই যে, কালো কুচকুচে পেপার-বক্স...ওখানে রেড লাইট ব্লিঙ্ক করছে! জল, জল! বম্ব স্কোয়াডে খবর দিন!...’
শুনেই কয়েকজন পড়ি-মরি দৌড় লাগাল। কিছু মহিলা ককিয়ে উঠলেন ভয়ে।
তারপর এক লম্বা, স্লিম কিন্তু সতেজ চেহারার পথচারী একেবারে বাক্সটার কাছে গিয়ে কী দেখলেন। হাসি খেলে গেল তাঁর ঠোঁটে, যখন তিনি উলটো দিকের বাড়ির মাথাটা তাকিয়ে দেখলেন। জনতার উদ্দেশে ভদ্রলোক বললেন, ‘ভয়ের কিছু নেই। ওদিকে ওপর থেকে নিওন সাইনের আলো রিফ্লেক্ট করছে এর glossy কাগজে। ভিতরে বোম নেই। তবে, আমার মনে হয়, ছোটো কোনো প্রাণী আছে। তাই খচখচ শব্দ করছে।’
দেখা গেল সত্যিই তাই। ফুটপাতবাসী একটি ছেলে তখনি উদয় হয়ে জানাল, ওর পোষা ইঁদুর আছে ওই বাক্সে। তারপর পরম যত্নে সেই আতঙ্কজনক বাক্সটা বুকে তুলে নিল। এই তো কলকাতার অবস্থা। লোকে সদাই প্যানিকের শিকার!
একই বিপজ্জনক গতি ও ঝাঁকুনিময় রোলারকস্টার-এ আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের ভারতবর্ষ চড়ে বসেছে। অর্থনীতি, শেয়ার বাজারের অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি, বাজারে খাদ্যের আগুন দর, এ-হল একটা দিক। গ্লোবাল আতঙ্কবাদ আর এক দিক। উগ্র ইসলামিক আত্মঘাতী জঙ্গিরা পৃথিবীর যে-কোনো শহরে ব্যাপক ধ্বংসলীলা এবং চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে থেকে-থেকে। এর জন্য বাছা-বাছা কয়েকটি দেশে শিক্ষাকেন্দ্র খোলা হয়েছে তাদের মগজ ধোলাই করে এবং পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ দিয়ে যমদূত করে তুলতে। টাকার কোনো অভাব নেই। সবচেয়ে উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র, রাসায়নিক ধ্বংসকারী দ্রব্যের জানকারি তাদের হাতের মুঠোয়। তাই কখনো ইতস্তত বিস্ফোরণে মরছে দশ-বিশটা লোক, কখনো গোটা ট্রেন, প্লেন বা জাহাজ হাইজ্যাক করছে; উড়িয়ে দিচ্ছে, কখনো বা বড়ো হোটেল, এমনকী একটি গোটা শহরকে পণবন্দি করে ফেলছে এরা। গোদের ওপর বিষফোড়া। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা, অন্ধ্র এবং আরও কিছু অঞ্চলে নতুন করে বেপরোয়া সহিংস নকশালী কার্যকলাপ শুরু হয়েছে। নিরন্তর খুনোখুনি লেগেই আছে।
হাজার হাজার লোক যদি যখন তখন মরতে থাকে, একটা লোকের মৃত্যুর গুরুত্ব অনেক কমে যায়। আর সেই সঙ্গে রাহাজানি, বলাৎকার, কিডন্যাপ, টাকা-গয়না চুরি, প্রতারণা, ব্ল্যাকমেল ইত্যাদি সেই অনুপাতে অবহেলিত হয় অপরাধ হিসেবে। ফলে এইসব অপরাধীরা সংখ্যায় দিন দিন বাড়ছে। তারা ক্রমে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আর ক্রমেই তাদের দমনে পুলিশের অক্ষমতা প্রকট হয়ে পড়ছে। ফুটবল ম্যাচের আয়োজন, পথশিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা, বসে আঁকার প্রতিযোগিতা, এসবের মাধ্যমে পুলিশের জনসংযোগ বাড়িয়ে তোলার প্রচেষ্টা তেমন কাজে আসছে না। সব দিক থেকে যেন ঘনিয়ে আসছে দুঃসময়। সেটা আরো ত্বরান্বিত করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অযোগ্য নেতাদের সঙ্কীর্ণ এবং দেশপ্রেমহীন দৃষ্টিভঙ্গি। এক শতাব্দী আগেই রবীন্দ্রনাথ যা বলে গেছেন, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন কিন্তু অসহায় মানুষরা এখন ঠিক তাই অনুভব করছেন—
‘মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে
দিক দিগন্ত অবগুন্ঠনে ঢাকা—
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি অন্ধ বন্ধ কর না পাখা!’
ফণীমনসা চক্র
বেশ কিছুদিন ধরেই কলকাতার নানা অঞ্চলে পোস্টার দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন খবরের কাগজে বড়ো আকারে বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশিত হচ্ছে। টিভি চ্যানেলেও মাঝে মাঝে লক্ষ্য করছেন দর্শকরা। ভাষার এদিক-ওদিক হলেও বক্তব্য মোটামুটি একই। মানুষকে তৈরি হতে বলছে অন্য ধরনের জীবনের জন্য। বলছে, দেখ এই সরকার মিছিল অবরোধ সরাতে পারে না। অন্যায়, অবিচার, হিংসা, রাজনীতির নামে নিষ্কর্ম-কুকর্ম থামাতে পারে না। এদের মগজ নষ্ট হয়ে গেছে, কোনো যোগ্য নেতা নেই। পুলিশের ইন্টেলিজেন্স বিভাগটি থাকা, না-থাকা সমান। এভাবে কি রাজ্য চলা উচিত? যারা উন্নত, সুস্থ, সক্ষম প্রশাসন চায়, তাদের জন্য ফণীমনসা চক্র। যোগাযোগ বাঞ্ছনীয়।
ভবানীপুরে আশু বিশ্বাস রোডের যে ঠিকানাটা দেওয়া থাকে, সেটা খুব পুরোনো তেতলা বাড়ি। সিঁড়ির তলায় অফিসঘর। সবই মলিন, বউবাজারের ট্রাভেল এজেন্টদের মতো। শুধু একটা নতুন কমপিউটার আছে। ছিপছিপে চেহারার এক যুবক, আর স্যার আশুতোষের মতো গোঁফঅলা এক বর্ষীয়ান লোক এখানে থাকেন।
যারা একটু ঘনিষ্ঠভাবে জেনেছে এই সংস্থাকে তারা বাইরের লোকের কাছে এ-নিয়ে তেমন গল্প করে না। খুব অন্তরঙ্গদের খানিকটা আভাস দেয় এর প্রকৃতি সম্পর্কে। এদের নীতি মাওবাদ-নকশালবাদ নয়। কিন্তু কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিআই, সিপিএম, ফব, বিজেপি, এসইউসি, সব চলতি রাজনৈতিক দলের পন্থা ছেড়ে এরা বলে, মানবতা, যুক্তি ও বুদ্ধির ওপর প্রতিষ্ঠা করতে হবে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যাপারটাকে। রেজিস্টার্ড নয় এই চক্র। ওদের পাণ্ডারাও সঠিক নামে পরিচিত নন। ফণীমনসা চক্র-এর ইংরেজি ইনিসিয়াল PMC।
এদের সমর্থকদের মধ্যেও এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলে। একটি থিয়োরি হল, ফণীমনসা যদিও একরকম কাঁটাগাছের নাম, আসলে এটি ফণী ও মনসা দুটি লোকের নাম মিশিয়ে হয়েছে। ফণী হল ফণীভূষণ সেন নামক এক অতি মেধাবী ex-IITian, আর, মনসা হল মনসা গাঙুলি, কয়েক বছর আগে জে.এন.ইউ.-তে অর্থনীতির অধ্যাপনা করত। এক রেপিস্টকে আত্মরক্ষার জন্য লড়ে খতম করেছিল এবং চাকরি হারিয়েছিল। এরা দুজনে মিলে নাকি এই চক্র পরিচালনা করে।
আর একটা থিয়োরি হল, ‘চক্র’ মানে ‘সার্কল’ বা মন্ডলী নয়, এটা আর একটা নামের প্রতীক। তবে সেটা বাঙালি চক্রবর্তী, না উড়িয়া চক্রধারী বা চক্রপাণি সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া মুশকিল। গোটা ব্যাপারটা চালাচ্ছে এই ত্রিমূর্তি।
তৃতীয় ধারণাটি হল, ‘C’ মানে Company, ‘M’ মানে মনসা ওরফে মঞ্জুষা। কিন্তু আসল লোক, অর্থাৎ ‘P’, ফণী নয়, প্রমিত। এই প্রমিত সেন হায়ার সেকেণ্ডারিতে সেকেণ্ড হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্সি থেকে ইকনমিকসে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন। তারপর দশ বছরের ইতিহাস কেউ জানে না সঠিক। তবে শোনা যায় কিছু রাজনীতির পাঠ আর কিছু মার্শাল আর্ট চর্চা করে কাটিয়েছেন নানান দেশে। ওনার সঙ্গিনী মঞ্জুষা কম্পিউটার সায়ান্স নিয়ে গভীর চর্চা করেও চাকরি বা ব্যাবসায়ে আগ্রহী নয়। বরং হ্যাকিং করে খুব আনন্দ পায়।
গোয়েন্দার কর্মসমস্যা
সামগ্রিক ভাবে সাধারণ মানুষের জীবনের দাম কমে যাওয়ায় এবং লোক ব্যক্তিগত ভাবে ন্যায়বিচারে অনুৎসাহী হয়ে পড়ায় প্রাইভেট গোয়েন্দারা আগের মতো ক্লায়েন্ট পাচ্ছেন না। একটা মৃত্যু খুন কি না, এ নিয়ে আর মৃতের আত্মীয়বন্ধুরা আগেকার মতো সত্য জানতে দায়বদ্ধতা মানছে না। সে ব্যাপারে অনুসন্ধানে টাকা খরচ করতে চায় না।
অমিত নিয়োগীর এখন প্রধান কাজ সরকারি উদ্যোগে প্রকাশিতব্য An Encyclopaedia of Crime and Detection-এর যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে তথ্য সংকলন এবং লেখালেখি। এর মধ্যে এক আধটা প্রোমোটার খুন, ব্ল্যাকমেলিং জাতীয় কেস আসে। ইন্সিওরেন্স কোম্পানিও মাঝে মাঝে ক্লেইম ভেরিফাই করতে গোপন তদন্তের অনুরোধ পাঠায়।
এবার বোধ হয় সত্যিই মায়ের ইচ্ছেটা পূর্ণ করতে পারবেন অমিত। আর এ-ব্যাপারেও তাঁর প্রফেশনাল সহকারিণী সুমনার সাহায্যের প্রয়োজন।
গোয়েন্দা-মাতা স্বয়ং তাকে একদিন ডেকে পাঠালেন আলোচনার জন্য। তাঁর বক্তব্য শেষ করে উঠে যাবার পর সুমনা-অমিতের মধ্যে নিম্নোক্ত কথোপকথন হল:
সুমনা—যাক, এত দিনে আপনার সুমতি হয়েছে। তো, জনাব, আমাকে একটু মন খুলে বলুন কেমন বউ চাই করমচাঁদ সাহেবের?
অমিত—দেখ, কিটি, আমার নেচার তোমার চেয়ে ভালো কোনো নারী বুঝবে না। কিন্তু আমার এজ-স্যুটিং তোমা-হেন মেয়ে পাব কোথায়? ...ম্যাচিওরড মনের কালচার্ড কিন্তু উগ্র আধুনিকতামুক্ত এবং সেন্স অব হিউমার আছে, এমন মহিলা খোঁজো।
সুমনা—বুঝলাম। কিন্তু দেখতে কেমন বললেন না?
অমিত—সে বিচার তোমার ওপর পুরোটাই ছেড়ে দিলাম।
সুমনা (একটু ভেবে)—অকাল-বিধবায় আপত্তি আছে?
অমিত—সিরিয়াসলি বলছ? অন্য সব কিছু ফেবারেবল হলে স্বচ্ছন্দে চলতে পারে।
সুমনা অবিলম্বেই বন্ধুদের দিদিদের এবং ওদের J. U. তে অনূঢ়া শিক্ষিকাদের ‘সাউণ্ড’ করতে শুরু করেছে বেছে বেছে। সকলেই প্রথমে প্রশ্ন করেছে, অমিতবাবুর বয়স ঠিক কত? ও গলায় রহস্য মাখিয়ে বলেছে, ‘গোয়েন্দাদের সঠিক বয়স বলা বারণ...still young, তারুণ্যের এ্যাডভান্সড স্টেজ বলা যায়!’ সে উত্তরে ঠিক সন্তুষ্ট না হলেও ছবি দেখে দু-একজন বেশ খানিক তাকিয়ে থেকে চাপা নি:শ্বাস ফেলেছে।
ইতিমধ্যে কম্পারেটিভ লিটারেচার-এর এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে পেপার পড়তে সুমনা দিল্লি গেল। তার পরদিনই দক্ষিণ কলকাতার এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের লকারে গিয়েছিলেন এক মন্ত্রীর স্ত্রী। তাঁকে ইথার প্রয়োগে অজ্ঞান করে লকার থেকে আনুমানিক সত্তর লক্ষ টাকার গয়না চুরি করে পালিয়েছে এক দূর্বৃত্ত ! চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি পরদিন খবরের কাগজে চোখ-টানা হরফে বেরতেই ব্যাঙ্কে বিক্ষোভ দেখাল ক্লায়েন্টরা নিরাপত্তার শোচনীয় অভাবের প্রতিবাদে। পথ-অবরোধও চলল কয়েক ঘণ্টা। মন্ত্রীর পার্টির ফ্ল্যাগধারী লোকেরা রাস্তায় বসে বক্তৃতা ও শ্লোগান দিল। বিরোধী দলগুলিও স্থানীয় বাজার-বন্ধ ডাকল প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার প্রতিবাদে। অবিলম্বে মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ পর্যন্ত দাবি করা হল। অর্থাৎ, যা যা হবার সব রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও প্রক্রিয়া সুসম্পন্ন হয়ে মহাঅশ্বডিম্ব প্রসূত হল।
‘আমি আগন্তুক, আমি বার্তা দিলাম’
‘শঙ্খবেলা’ ফিলমের জন্য পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এই গানটার কথা মনে পড়ল অমিত নিয়োগীর। মান্না দে-র গলায়, উত্তমের লিপে গাওয়া। পরের লাইনটা ছিল, ‘কঠিন অঙ্ক এক কষতে দিলাম।’ সেইসঙ্গে গল্পে পড়া আরো অনেক ধাঁধার কথা। যেমন, রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত
পায়ে ধরে সাধা
‘রা’ নাহি দেয় রাধা,
শেষে দিল ‘রা’
‘পাগল’ ছাড় ‘পা’!
আর্থার কোনান ডয়েলের ‘Sign of Four’, ‘Five Orange Pips’। আর সত্যজিতের ‘ত্রিনয়ন ও ত্রিনয়ন, একটু জিরো’, এসবও মনে হল। অমিত ভাবলেন, এখনকার সুপারহিট ড্যান ব্রাউন এ্যাকশান-মিস্ট্রি থ্রিলারগুলোও তো সিম্বলিক ধাঁধা, সে দা-ভিঞ্চি কোড-ই হোক, বা ইলিউমিনাটিদের রহস্যই হোক।
এটা কিন্তু একটু অন্যরকম।
লকার-চুরি ঘটনার পর পাঁচ দিন গড়িয়ে গেছে। হঠাৎ রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছ থেকে বিশেষ দূত এসে অমিত নিয়োগীকে এক অতি জরুরি চিঠি দিয়ে গেল। সেদিনই বিকেল পাঁচটায় রাইটার্সে মুখ্যমন্ত্রীর ঘরে ওই চুরির কিনারা খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠকে হাজির থাকতে বলা হয়েছে গোয়েন্দাকে। অমিত অনুমান করলেন, মুখ্যমন্ত্রীর সচিব পি. চক্রবর্তীই তাঁর নাম সুপারিশ করেছেন। কারণ ওঁর শ্যালককে একবার খুব বড়ো বিপদ থেকে বাঁচিয়েছিলেন অমিত।
যথাসময় রাইটার্সে নির্দিষ্ট ঘরে এক সিকিউরিটি অফিসার অমিতকে ঢুকিয়ে দিয়ে গেলেন। উনি দেখলেন মুখ্যমন্ত্রী, মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশ কমিশনার, সিআইডি প্রধান, ডিসি সাউথ মিটিং-এ হাজির। সেই সঙ্গে আর একজন লাল টুপি, কাঁচা-পাকা লম্বা দাড়িঅলা লোক। শুনলেন, উনি জয়ন্তীলাল, বিখ্যাত নিউমেরলজিস্ট।
সকলের সঙ্গে পরিচয় পর্ব মেটার পর মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘আপনারা নিজেদের ব্যস্ততার মধ্যে সময় করে এই মিটিং-এ ঠিক সময়ে উপস্থিত হয়েছেন, দেখে খুব ভালো লাগছে। খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক সমস্যা—বলা যেতে পারে চ্যালেঞ্জ-এর মুখোমুখি হয়েছে সরকার। আশা করি আপনাদের সহায়তায় তার উপযুক্ত মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। ব্যাপারটা কী ঘটেছে, আপনারা কমিশানার অব পুলিশের কাছে শুনুন।’
সিপি গম্ভীর গলায় শুরু করলেন—‘আপনারা মিডিয়ার কল্যাণে জানেন, লাস্ট ফ্রাইডে আমাদের মাননীয় এক মন্ত্রীর ব্যাঙ্ক-লকার খুলে ওনার ওয়াইফ যখন গয়না বার করছিলেন, আচমকা দুই দুষ্কৃতী ঢুকে পড়ে লকার-রুমে। মিসেস কর্মকারকে কিছু শুঁকিয়ে সেন্সলেস করে সব কটি অলঙ্কারপূর্ণ বাক্স নিয়ে পালিয়ে যায়। কাউকে ধরা যায় নি। মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা থাকায় তস্করদের আইডেনটিটির কোনো হদিশ দিতে পারে নি চাক্ষুস দর্শকরা।’ জলের গেলাসে একটা চুমুক দিয়ে উনি আবার বলতে লাগলেন—
‘এরপর কাল বেলা আড়াইটে নাগাদ লালবাজারের মেইন গেটের কাছেই ফুটপাতে একটি ছোটো এ্যাটাচি কেস আনক্লেমড পড়ে আছে, খবর আসে। এ্যাট ওয়ান্স আমাদের বম্ব ডিফিউজিং স্কোয়াডে এবং ফায়ার ব্রিগেডে খবর দেওয়া হয়। স্নিফার ডগ সেখানে পৌঁছে যায়। জায়গাটা কর্ডন করে দেওয়া হয়। এরপর নিয়মমাফিক প্রচুর জল দিয়ে, এক্সপ্লোশান-প্রিভেনটিভ বাঙ্কার দিয়ে বাক্সটিকে ঘিরে এবং যথেষ্ট প্রিকশান নিয়ে, আমাদের এক্সপার্টরা ঘণ্টাখানেক স্টাডি করে। কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা গ্যাজেট নেই, নিশ্চিত হয়ে তাঁরা এ্যাটাচি কেসটা খোলেন। নাথিং হ্যাপেনড। দেখা যায়, তার ভেতর ট্রান্সপারেন্ট প্ল্যাস্টিক কভারে একটি মেসেজ রয়েছে। ফোরেন্সিক পরীক্ষা করার পর সেটি হেড কোয়ার্টার্সে রেখে দেওয়া হয়েছে। সেই ম্যাসেজটারই হুবহু কপি লালবাজারে by email এসেছে। তার প্রিন্ট-আউট আপনাদের দেখার জন্য আনা হয়েছে। প্রত্যেকের জন্য একটি Xerox কপি করা হয়েছে।’
অমিত এবার জিগ্যেস করলেন—‘সেকেণ্ড ম্যাসেজটা কখন পাওয়া গেছে?’
সিপি বললেন, ‘রাত আটটা নাগাদ। ইমেলটির subject ছিল In case you have not received our message। আর কিছু আলোচনার আগে আপনারা messageটা ভালো করে পড়ে দেখুন।’
মিটিং-এ আহুত সবাই ‘কপি’ নিয়ে নিজের নিজের কাগজের দিকে দৃষ্টি ও মনোনিবেশ করলেন। মাথায় PMC সিল মারা প্রত্যেকের কাগজেই একটা বার্তা। ভাষা চলিত বাংলা। কোনো সাক্ষর নেই শেষে।
‘পরীক্ষায় বসুন, সরকার মশাই। আমরা লোককে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চাই বুদ্ধি এবং কর্মক্ষমতা, সব দিক থেকেই এই প্রশাসন দেউলিয়া। সেদিন CRS ব্যাঙ্ক থেকে যে মাল আমরা লুট করেছি, সেটার অনেকটা উদ্ধার করার একটা সহজ সুযোগ দিচ্ছি আপনাদের পুলিশ বিভাগকে। সংগৃহীত অলঙ্কারের ৬০% একটি নীল কাপড়ের ব্যাগে ভরে প্রকাশ্য এবং সুগম্য জায়গায় রাখা থাকবে আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টা, অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বিকেল পাঁচটা অব্দি। স্থানটি হল এমন একটা রাস্তা, যা নাম পাল্টেও অপয়া ১৩-এর খপ্পর থেকে বেরতে পারেনি। আর বাড়ির নম্বর শতাধিক নেলসন সংখ্যা।’
ঘরের সাময়িক নীরবতা ভঙ্গ করে মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘ক্রিমিনালদের এত বড়ো অড্যাসিটি, আমাদের পরিষ্কার চ্যালেঞ্জ করছে! কারা এই PMC, কিছু বার করতে পেরেছেন আপনারা?’
প্রশ্নটা ডিসি সাউথকেই সরাসরি করলেন সি.এম.। সুতরাং উনি বললেন, ‘স্যার, আমরা এখনো সিওর হতে পারিনি। তবে কিছুদিন ধরে ‘ফণীমনসা চক্র’ নামে এই রহস্যময় সমিতি সরকার-বিরোধী অপপ্রচার করছে। ওদের ইনিসিয়াল তিনটে লেটার মিলেই সম্ভবত PMC নামটার উদ্ভব। আমরা দু-দিন আগেই ওদের ভবানীপুরের অফিস রেইড করেছিলাম। মাঝবয়সী এক ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তুলে আনা হয়েছে। কিন্তু বিশেষ কিছু খবর তার মুখ থেকে পাওয়া যায় নি। হি লুকস হোপলেসলি হার্মলেস!’
‘ওটাই তো ঘুঘু ক্রিমিনালদের বৈশিষ্ট্য!’ বলে মুখ্যমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রসচিবের দিকে ফিরলেন—‘তো এখন আমাদের line of action কী হবে? হাতে সময় খুব অল্প...’
স্বরাষ্ট্রসচিব মি. সেন খুব ব্রিলিয়ান্ট ছিলেন ছাত্র হিসেবে। তাঁর ওপর সি.এম.-এর অনেক আস্থা।
মি. সেন বললেন—‘স্যার, দুটো মেইন পয়েন্ট আছে এই ধাঁধায়। দুটো puzzle সলভ করতে পারলে আমরা booty উদ্ধার করতে পারব, অবশ্য যদি ভিলেনরা সত্যিই তাদের কথামতো গয়না সেখানে রেখে থাকে। এক নম্বর হল, রাস্তার নামটা বার করা। যে রাস্তার নাম তেরো অক্ষরের আগেই ছিল, নাম পাল্টাবার পরও আছে। আর দু-নম্বর হল ডোর নাম্বার, যেটা relates to Nelson number...’
মুখ্যমন্ত্রী বললেন—‘অক্ষরের ধাঁধার সমাধানের জন্য আমরা নিউমেরোলজিস্ট...(ফিসফিস করে মি. সেনকে বললেন, ‘ওনার নামটা?’ মি. সেন বলে দিলেন ফিসফিস করে। যদিও সকলে শুনতে পেল) হ্যাঁ, মি. জয়ন্তীলালকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি। ওনার কী বক্তব্য শোনা যাক।’
জয়ন্তীলাল বললেন—‘আই এ্যাম অনার্ড টু বি ইনভাইটেড টু দিস ইমপর্টান্ট মিটিং। দেখুন, আমরা সংখ্যাবিশেষজ্ঞরা কিন্তু প্রত্যেক এ্যালফাবেটকে, মানে, লেটারকে, সমান ওয়েট দিই না। আমাদের বিচারে কোনো জায়গার বা রাস্তার নাম 18 মূল্যের হলে সেটা অমঙ্গলজনক। দেখুন Srilanka নামটাতে letter আছে আটটি, কিন্তু এগুলোর যোগফল আমাদের বিচারে 18। আবার Calcutta-তে 8টি লেটার, কিন্তু এর যোগফল 25, আর Kolkata এই নামের সাতটি লেটারের যোগফল 20, যেটা উন্নয়নসূচক। আবার যদি এটাকে দুটো t দিয়ে লেখেন Kolkatta, লেটারগুলোর যোগফল হবে 24, যেটা শান্তিসূচক।’
সকলে একটু বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন দেখে জয়ন্তীলাল তাড়াতাড়ি বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করে বললেন—‘এখন দেখতে হবে এই ম্যাসেজে 13টি এরিথমেটিকাল যোগফল, না, নিউমেরোলজিকাল। আমাকে রাস্তার নাম দিন, আপনাদের বার করে দেব সেটা নিউমেরোলজিকাল বিচারে 13 ছিল এবং আছে কি না। তাছাড়া আপনাদের চিফ ইনভেস্টিগেটার-এর নাম দিন, আমি স্টাডি করে দেখব তাঁর নামের স্পেলিং-এ যে কটা এ্যালফাবেট যে অর্ডারে আছে, তাতে তাঁর এই Case-এ সাকসেসফুল হবার চান্স আছে কি না! সেটা নেগেটিভ হলে কোনো লেটার বাড়িয়ে কমিয়ে তাঁকে আরো ভাগ্যশালী করে তুলতে হবে! বাট এই মেগাসিটিতে সেভেরাল হানড্রেড রোডস আছে। Probable রাস্তার নাম বার করতেই তো আপনাদের পাঁচ দিন কেটে যাবে!’
মুখ্যমন্ত্রী বেজার মুখে বললেন, ‘আপনার বক্তব্য শুনলাম। ধন্যবাদ। পীযূষ বাবু, এঁর বাড়ি যাবার ব্যবস্থা করে দিন। প্রয়োজন হলে আবার খবর দেওয়া হবে।’
জয়ন্তীলালকে ঘরের বাইরে সিকিউরিটি পুলিশের কাছে দিয়ে মিটিং-এ ফিরে এলেন সি.এম.-এর পি.এ.।
ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রসচিবকে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন করেছেন, ‘আচ্ছা, সেন, এই নেলসন ফিগারটা কী?’
মি. সেন বললেন—‘হিস্ট্রিতে পড়েছিলাম ভাইকাউন্ট হোরাশিও নেলসনের কথা। বিখ্যাত ব্রিটিশ ন্যাভাল কমাণ্ডার। ক্যালভি-র যুদ্ধে ওঁর ডান চোখ নষ্ট হয়েছিল, আর স্যান্টাক্রুজের যুদ্ধে ডান হাতটা খুইয়েছিলেন। ট্রাফলগার-এর নৌযুদ্ধে নেপোলিয়নের বাহিনীকে উনি পরাজিত করেন, কিন্তু নিজেও নিহত হন। আর একটি যুদ্ধে বোধহয় ওনার একটা ‘টেস্টি’ কাটা গিয়েছিল। তবে ক্রিকেট কমেন্ট্রিতে শুনেছি 111 ফিগারটিকে নেলসন বলে। ভীষণ অশুভ সংখ্যা মনে করে অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যাণ্ডের প্লেয়াররা। আম্পায়ার শেপার্ড তো স্কোরবোর্ড-এ ওই score দেখলেই মাঠের মধ্যে অস্থির হয়ে হাস্যকর আচরণ করতেন। কখনো নিজের ডান পা, কখনো বাঁ পা তুলে তুড়ুক তুড়ুক করে লাফিয়ে নিতেন থেকে থেকে, যতক্ষণ ব্যাটিং টিমের রান ওই সংখ্যা টপকে না যায়! তা না করলে যেন তাঁর নিজের নেলসনের মতো ভয়ঙ্কর দশা হয়ে যেতে পারে!’
পীযূষবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। টিভিতে দেখেছি, এই সময় ক্যামেরাম্যান ডেভিড শেপার্ডের পায়ের ক্লোজ-আপ দেখায়।’
পুলিশ কমিশনার চিন্তান্বিত ভাবে প্রায় স্বগতোক্তি করলেন—‘বলছে এ শহরে শতাধিক বাড়ি আছে যাদের নাম্বার ওয়ান-ওয়ান-ওয়ান...আমার তো মনে হয় আরো বেশি আছে...’
ডিসি সাউথ হতাশ ভাবে বললেন—‘না, আমরা বোধ হয় ঠিক ধরতে পারছি না ধূর্ত ধাঁধাটাকে!’
মুখ্যমন্ত্রী এবার অমিতকে বললেন—‘পীযূষের কাছে আপনার ট্যালেন্ট-এর কথা শুনেছি। পারবেন এই টাইম-লিমিটের মধ্যে প্রব্লেম সলভ করে আমাদের মুখ রক্ষা করতে?’
অমিত বললেন, ‘আমি যথেষ্ট আশাবাদী, স্যার। ক্রিমিনাল যদি তার কথা রাখে, ওই নীল ব্যাগের হদিশ পাওয়া যাবে টাইম-লিমিট শেষ হবার আগেই।’
পুলিশ কর্তারা তাঁর দিকে একটু কটমট করে চাইলেন।
‘লেট আস হোপ সো!’ বলে মুখ্যমন্ত্রী সভা ভঙ্গ করলেন।
তার আগে অবশ্য ইমার্জেন্সি যোগাযোগের জন্য সবাই ফোন-নাম্বার আদান-প্রদান করে নিলেন।
দিল্লিতে সুমনা
সুমনা গুপ্ত দিল্লি গিয়েছিল জে.এন.ইউ.-তে আফ্রিকান লিটারেচার সংক্রান্ত সেমিনারে যোগ দিতে। তার পেপারও একটা ছিল, যদিও এটা তার রিসার্চ এরিয়া নয়। তুলনামূলক সাহিত্যে এরকম হয়। অস্ট্রেলিয়ান বা ক্যানাডিয়ান সেমিনারেও মাঝে মাঝে আফ্রিকান স্কলাররা সক্রিয় যোগদান করেন, প্রধানত সারকিট-এ মুখ চেনানোর জন্য। জে.ইউ. থেকে ওদের ব্যাচের নিখিল, যশোধরা, মঞ্জিরা, ফারহাদও গিয়েছিল।
সুমনা অবশ্য ওদের সঙ্গে হস্টেলে বেশি সময় কাটায় নি। ওর ছোটো মামা দিল্লিতে বড়ো সরকারি অফিসার। তাঁর R.K. Puram-এর বাংলোতেই গিয়ে উঠেছিল। তবে সারা দিন তো অডিটরিয়ামে পেপার শুনে, এর-ওর সঙ্গে ‘হাই’ বলে, আর আড্ডা দিয়ে কাটত। লাঞ্চ ছাড়াও কফি-স্ন্যাকস-এর ঢালাও ব্যবস্থা। তৃতীয়, তথা শেষ দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। আফ্রিকান ডান্স, সোলো এবং গ্রূপ দুর্দান্ত হয়েছিল। ওদের প্রতি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কথা বলে তালে তালে। সেইসঙ্গে ড্রাম, আর অদ্ভুত সুরে অশান্তি ভাষার গান কেমন যাদুময় পরিবেশ গড়ে তুলেছিল সফিস্টিকেটেড এ্যাকাডেমিক চত্বরে। ভারতীয় সংস্কৃতির নমুনা হিসেবে দুটি লোকনৃত্য ছিল। আর শেষে সমবেত কন্ঠে রবীন্দ্রসংগীত, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’। তাতে সুমনাও গলা মিলিয়েছিল।
সেমিনার করা, মামি ও মামাতো বোন রাইমার সঙ্গে শপিং করা, এসব ছাড়াও দিল্লিতে সুমনার আর একটা কাজ ছিল। শ্রীময়ীদির সঙ্গে দেখা করে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া। শ্রীময়ী কলকাতার কারমেল গার্লস স্কুলেই পড়ত। সুমনার দু-বছরের সিনিয়র। তবু বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল স্কুলজীবন থেকেই এবং এখনও সেটা অটুট আছে, যদিও শ্রীময়ীর জীবনে ইতিমধ্যে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে এবং প্রবল দুর্ভাগ্যের ঝড় বয়ে গেছে।
শ্রীময়ীর বাবা রণবীর দত্ত কলকাতা হাইকোর্টের সফল সিনিয়র এ্যাডভোকেট। ওই একমাত্র সন্তান। ঢাকুরিয়ায় ওদের ছিমছাম দোতলা বাড়ি। ফাইনাল গ্রাজুয়েশন পরীক্ষার যেদিন রেজাল্ট বেরল—ও ম্যাথসে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হল—সেইদিনই ওর জীবনে আর একটা স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছিল। গল্পের মতো নাটকীয়। রাত আটটায় যাদবপুরের স্টেট ব্যাঙ্কের ATM থেকে কিছু টাকা তুলে বেরল শ্রীময়ী। তৎক্ষণাৎ নির্জনতার সুযোগে একটি লোক ওর হাত থেকে ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে ছুটে পালায় উল্টোদিকের ভিতরের রাস্তায়। ঠিক সেই মুহূর্তে সুজয়, মানে, কর্নেল সুজয় সিং, বাইকে যাচ্ছিলেন সেই জায়গা দিয়ে। উনি শ্রীময়ীকে তুলে বাইকের পিছনে বসালেন এবং ‘চোর’ ‘চোর’ চিৎকার করতে করতে ধাওয়া করলেন ছিনতাইকারীকে। সে ঘাবড়ে গিয়ে আছাড় খেয়ে রাস্তায় গড়াগড়ি খেল। ব্যাগ উদ্ধার হল। যাদবপুর থানায় তাকে জমা করে দিয়ে শ্রীময়ীকে ওদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গেলেন সুজয়।
ঠিক দুমাস পরেই ওদের বিয়ে হয়ে গেল। শ্রীময়ী স্বামীর সঙ্গে দিল্লি চলে গেল। সুমনাকে চিঠি লিখত নিয়মিত মালভিয়ানগর থেকে। খুশির উচ্ছ্বাসমাখা সে চিঠিগুলো যে শীঘ্রই কী বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে উঠবে, তা ভাবতেও পারে নি সুমনা।
বিয়ের পর ছ-মাস পেরয়নি। ওরা স্বামী-স্ত্রী বেঙ্গালুরু বেড়াতে গিয়েছিল ছুটিতে। সেই অভিশপ্ত রাতে মাইশোর রোডের এক রেস্তোরাঁয় ডিনার করছিল। হঠাৎ দুটি লোক বচসা শুরু করল এবং একজন রিভলভার বার করে এলোপাথাড়ি চালিয়ে দিল কয়েক রাউণ্ড। একটা বুলেট সুজয়ের কপালে গিয়ে লাগল! ...কীভাবে যে রক্তাপ্লুত দেহটাকে অটোতে তুলে ভিক্টোরিয়া হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিল শ্রীময়ী, সেই দুঃস্বপ্ন আজও তাকে অনেক রাতে জাগিয়ে তোলে!...
বৈধব্যের পর কলকাতায় ফিরে বাবা-মার সঙ্গে কিছুদিন কাটিয়েছিল শ্রীময়ী। কিন্তু তারপর তাঁদের হাজার অনুনয় সত্ত্বেও সে ফিরে যায় মালভিয়ানগরের বাড়িতেই। ওখানেই এক স্কুলে শিক্ষিকার কাজ নেয়। ছুটিতে আসে কলকাতায়। বাবা-মা, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করে যায়।
অমিত নিয়োগীর সহকারী হিসেবে প্রায় চার বছর কাজ করছে সুমনা। এই ক-বছরে শ্রীময়ী ওর কাছে অমিতের প্রচুর গল্প শুনেছে। ওদের অনেক কেসের লিখিত বিবরণও শ্রীময়ীদিকে পাঠিয়েছে সুমনা। তাই তার মনের ক্যানভাসে গোয়েন্দাপ্রবরের একটা প্রশংসনীয় ইমেজ তৈরি হয়েছে, এ ব্যাপারে সুমনার সন্দেহ নেই। দুজনেই তার কাছে একই সঙ্গে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ। তাই এদের দুজনকে যদি পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারে, তবে ও সত্যিই পরম আনন্দ পাবে। একটা ফ্যাক্টর সে সম্ভাবনার পথটা খোলা রাখতে সাহায্য করেছে। শ্রীময়ী বিয়ের ছ-মাসের মধ্যে গর্ভবতী হয়নি। সে একা, ঝাড়া হাত-পা।
ফোনে একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট করে সুমনা লম্বা অটো-রাইড করে বেলা এগারোটা নাগাদ গিয়ে পৌঁছল তখনো-কুয়াশামাখা মালভিয়া নগরে নির্দিষ্ট বাড়িটার সামনে।
শ্রীময়ী ওকে জড়িয়ে ধরে খুশি জানাল। বাড়ির ভিতরে নিয়ে গিয়ে প্রথমেই বলল—‘আজ থেকে যাবি তো?’
সুমনা দ্বিধার ভান করে বলল, ‘আজ?’ তারপরই হাসতে হাসতে বলল, ‘আজ তাড়িয়ে দিলেও যাচ্ছি না! গ্যাঁট হয়ে বসে গল্প করব!’
শ্রীময়ীও প্রাণ খুলে হাসল। বলল—‘বোস! চা রেডি! সেই সঙ্গে নিমকি।’
আসল গল্প হল অনেক পর। স্নান ও মধ্যাহ্ন আহার শেষ করে।
সুমনা বলল, ‘আমার এবারের আসা কিন্তু শুধু বন্ধু হিসেবে নয়। একটা খুব সিরিয়াস বিজনেসে এসেছি, যাতে আমার ভূমিকা দূতীর!’
শ্রীময়ী সন্ধিগ্ধ চোখে তাকাল। বলল, ‘আই স্মেল সামথিং নটি! তোর চোখেমুখে একটা স্পাই-সুলভ ঝিলিক দেখছি! বল তোর মতলবটা কী?’
সুমনা এবার আবেগ ঢেলে বলল—‘তুমি তো জান, শ্রীময়ীদি, আমাদের করমচাঁদ সাহেব, মানে, অমিতদা-র অবস্থা! বেলা বয়ে যায়, ওঁর জীবনের হাল ধরার লোক মিলছে না। নিজের খোঁজার সময় নেই, কিন্তু ইচ্ছে আছে। আমাকে সরাসরি মাসিমা, মানে, ওনার মা ঘটকি করে ছেড়েছেন। আর স্বয়ং গোয়েন্দাপ্রবর বউ পছন্দের ব্যাপারে আমাকে ঢালাও স্বাধীনতা দিয়েছেন। তোমার সম্বন্ধে ওনারা সবকিছু জানেন। দে এ্যাডমায়ার ইওর পার্সোনালিটি। তোমার জীবনের ট্র্যাজেডির ওঁরা সহমর্মী।’
সুমনা একটু থেমে শ্রীময়ীর প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করল। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে বলল, ‘এখন সবকিছুই তোমার ওপর ডিপেণ্ড করছে। তুমি ছাড়া অমিত নিয়োগীর উপযুক্ত ম্যাচ আমি কাউকে ভাবতে পারি না! আমি জানি তোমার মনে অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকবে আবার বিয়ের ব্যাপারে। কিন্তু, প্লিজ, তুমি আমার রিকোয়েস্টটা ফট করে রিজেক্ট করো না!’
সুমনার হাতের মধ্যে শ্রীময়ীর হাত একটু কেঁপে উঠল।
একটু সময় নিয়ে ও বলল, ‘তোকে কী বলব, আমি জানি না, সুমনা! মানুষের মনের অনেকটাই যুক্তির ধার ধারে না। ...শুধু স্মৃতি নিয়ে সারাজীবন কাটানো হয়তো উচিত না। কিন্তু নতুন করে আর কাউকে আমার অভিশপ্ত জীবনে জড়াতেও ইচ্ছে করে না!’
সুমনা পরিস্থিতি সহজ করার জন্য বলে, ‘এমা, তুমি এসব কুসংস্কার মান নাকি? মাঙ্গলিক না কী সব বলে লোকে! না না, এত দুর্বল মন তোমার নয়। বলি কি, একটু সময় নাও! এবার কলকাতায় গেলে দু-জনে একটু কথা বলে নাও! ভবিষ্যত রাস্তার দিশা পেয়ে যাবে। কী? ভুল বললাম?’
শ্রীময়ী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্ষীণ হাসল—‘তুই আজকাল প্রফেশানাল কাউন্সেলিং শুরু করেছিস, দেখছি!’
তেরো খোঁজা না গোরু খোঁজা
যেদিন সকালে সুমনা দিল্লি থেকে কলকাতা ফিরল, তার আগের দিনই রাতে অমিত নিয়োগী রাইটার্সের মিটিং থেকে ফিরেছেন PMC-এর ধাঁধাময় ম্যাসেজের কপি নিয়ে এবং লুট হওয়া গয়না উদ্ধারের দায়িত্ব নিয়ে।
শিয়ালদা স্টেশানে নেমেই সুমনা ওঁকে কল করল। অমিত সাড়া দিতেই জরুরি সুরে বলল, ‘স্যার, দারুণ খবর আছে একটা।’
উত্তরে অমিত বললেন, ‘তার চেয়েও জরুরি খবর আছে তোমার জন্যে। যত তাড়াতাড়ি পারো, আমার এখানে চলে এসো!’
—‘নতুন কেস বুঝি?’
—‘হ্যাঁ। ক্লায়েন্ট স্বয়ং পশ্চিমবঙ্গ সরকার!’
—‘সবে স্টেশানে নামলাম। সাড়ে বারোটার মধ্যে আসছি।’
সুমনা অমিতের স্টাডিতে ঢুকে দেখল, উনি কম্পিউটারে বসে আছেন, যেটা প্রায় বিরল দৃশ্য। কাছে গিয়ে লক্ষ্য করল, এপাশে-ওপাশে ছড়ানো রয়েছে Calcutta Street Map, Recent Guide to Kolkata নামে একটা বুকলেট, টেলিফোন ডাইরেক্টরি। একটা রাইটিং প্যাডের পাতায় কয়েকটা রাস্তার নাম লেখা। সেগুলোর প্রতিটি লেটার দাগ কেটে কেটে আলাদা করা হয়েছে।
নীরবে খানিকক্ষণ অবলোকন করে মন্তব্য করল—‘আর যাই হোক, কোনো খুনের কেস নয় বলেই মনে হচ্ছে। কিডন্যাপ নাকি স্যার?’
অমিত এবার মনিটর থেকে মুখ ফিরিয়ে ওকে দেখলেন। বললেন, ‘ওয়েলকাম টু আ ব্রেন-গেম! খুব তাড়াতাড়ি একটা সংকেত থেকে একটা পার্টিকুলার এ্যাড্রেস বার করতে হবে! আমাদের হাতে আর মাত্র আটাশ ঘণ্টা আছে!’
—‘কী ব্যাপার, একটু খুলে বলুন!’
‘এটা পড়ে দেখো, বাকি প্রয়োজনীয় কথা পরে বলছি!’ বলে অমিত ওকে জেরক্স করা ম্যাসেজটা দেখালেন।
সুমনা চ্যালেঞ্জ-বার্তাটা দু-বার ভালো করে পড়ল। বলল, ‘সব রহস্য তো লাস্ট সেন্টেন্সটায় দেখছি—এমন একটা রাস্তা যা নাম পাল্টানো সত্ত্বেও অপয়া তেরো অক্ষরের রয়ে গেছে, আর, সেই রাস্তার শতাধিক নেলসন সংখ্যার বাড়িতে জিনিসটা আছে। আমার মনে হয়, আগে এই নেলসন সংখ্যাটা কী সেটা জানা দরকার।’
অমিত বললেন, ‘সেটা বোঝা যাচ্ছে। নেলসন ফিগার হল 111, একশো এগারো। ইংরেজ নৌ-সেনাপতি নেলসন সব যুদ্ধে জিতেছেন। এমনকি, মরার আগে নেপোলিয়নের বাহিনীকেও হারিয়েছিলেন ট্রাফলগারের যুদ্ধে। কিন্তু তিনি এইসব ভয়ঙ্কর যুদ্ধে বিভিন্ন সময় ডান চোখ, হাত এবং testicle-এর এক অংশ হারিয়ে one-eyed, one-handed, one-balled হয়ে গেছিলেন। তাই এই 111 নাম্বার খুব অশুভ। বিশেষ করে বোধ হয় ক্রিকেট ব্যাটিং সাইডের কাছে। কারণ 111 লিখলে bail-হীন তিনটে ন্যাড়া স্টাম্পের মতো দেখায়! ...কিন্তু এখানে একটা অতিরিক্ত ফ্যাকড়া আছে। যে রাস্তার আগের নাম তেরো অক্ষরের ছিলো নাম পাল্টেও তেরো অক্ষরের আছে, এমন রাস্তার সংখ্যা এই শহরে ‘শতাধিক’ হতে পারে না! অর্থাৎ—’
অমিতকে শেষ করতে না দিয়ে সুমনা বলে উঠল—‘শতাধিক’ মানে প্লাস হান্ড্রেড হতে পারে!
‘একজ্যাক্টলি!’ খুশি হয়ে সমর্থন করলেন অমিত—‘এইটাই পুলিশ কমিশানারের মাথায় কাল ঢুকছিল না! PMC-এর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেবার কারণটা বেশ বোধগম্য! ...তাহলে নম্বরটা দাঁড়াচ্ছে একশো এগারো প্লাস একশো, ইকুয়াল টু 211, তাই না?’
সুমনা বলল, ‘হাঁ। লজিকালি তাই হওয়া উচিত।’
অমিত বললেন, ‘গুড! তাহলে আমাদের তেরো প্রব্লেমটাই শুধু ট্যাকল করতে হবে। দেখো, কিটি, তোমাকে এই রোড ডাইরেক্টরি থেকে প্রথমে তেরো অক্ষরের সব কটা রাস্তার নামের লিস্ট করতে হবে। তারপর এদের মধ্যে যেগুলোর নাম চেঞ্জড হয়েছে, সে-কটা Changed Road Names-এর লিস্ট ধরে মেলাতে হবে। আমি আমার copy থেকে একই কাজ করে যাচ্ছি। তুমিও করো, যতক্ষণ না পুরোনো থার্টিন-লেটার রোডের চেঞ্জড নামেও ওই তেরো লেটার পাওয়া যায়। সময় থাকলে ব্যাপারটা শারীরিক খাটনি ছাড়া কিছু নয়, যে কোনো কেরানি করতে পারত। কিন্তু সমাধানটা খুব তাড়াতাড়ি বার করতে হবে। লোকে বলে, ‘কম্পিউটার ব্রেন’, আরে বাবা কম্পিউটারকে ঠিকমতো ডেটা ফিড করাতে হবে তো, নইলে সে কী ফল দেখাবে? এটার জন্য ইনটুইশান আর কুইক ব্রেন রিফ্লেক্স দুটোই দরকার!’

অমিত নিয়োগী ও সুমনা ভাবছে কোন রাস্তার কত নম্বর বাড়ি...
সুমনা বলল, ‘কিন্তু স্যার, আমার তো এসব ক্যালকুলেশান খেলে না মাথায়। আপনার এক্ষেত্রে দরকার একজন ম্যাথমেটিকাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। এবার আমি দিল্লি গিয়ে সেইরকম একজনকে জোগাড় করার ব্যবস্থা করেছি। তাই এসেই বলছিলাম, জরুরি খবর আছে!’
অমিত হঠাৎ এরকম প্রসঙ্গের জন্য তৈরি ছিলেন না। কয়েক সেকেণ্ড পর সামলে উঠে বললেন, ‘আমি তো ভাবতাম আমিই তোমার পেট্রন, এখন কি আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক উল্টে যাচ্ছে? সেসব হবার আগে যা বললাম মন দিয়ে করো। প্রেস্টিজ এ্যাট স্টেক! পুলিশের আগে আমাদের ধাঁধার উত্তরটা বার করতেই হবে!’
‘জরুর, স্যার! কিন্তু এই PMC রাস্তার নামের অক্ষরসংখ্যা তেরো ধরেছে ইংরেজি ভাষা অনুসারে, না বাংলা?’
—‘সেটা আমি আগেই ভেবে রেখেছি। ইট মাস্ট বি ইংলিশ। বাংলায় রাস্তার নাম লিখলে অক্ষরের সংখ্যা অনেক কমে যায়। তুমি এ্যাভারেজ আট বা নয়ের বেশি অক্ষর পাবে না। এই ধরো, অক্ষয় মুখার্জি রোড, আটটা। পূর্ণ দাস রোড, ছ-টা। জহরলাল নেহরু রোড, দশটা। যে-গুলো দেখতে বিরাট, যেমন ধরো ‘মহাত্মা শিশির কুমার সরণি’ বা ‘অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সরণি,’ তাতেও গুণে দেখো বারোটার বেশি ক্যারাক্টার নেই। ...তাছাড়া আর একটা ফ্যাক্টর ইংরেজির দিকে আঙুল দেখাচ্ছে। অপয়া তেরো-র ধারণাটা, মানে যাকে বলে ‘ট্রেসকাইডেকাফোবিয়া’ সেটা বাঙালি নয়, ইউরোপীয়দের মধ্যেই প্রবল। এ নিয়ে প্রচুর গল্প, সিনেমা হয়েছে। ফ্রাইডে আর 13 একত্র হলে তো কথাই নেই!’
সুমনা বলল, ‘তার ওপর আবার অপয়া নেলসন সংখ্যার সোহাগা! একে মা মনসা, তার ওপর ধুনোর গন্ধ! ...তাহলে আমি প্রতিটি রাস্তার নাম ইংরেজি এ্যালফাবেটে লিখব?’
—‘হ্যাঁ, এবং পুরোটা লিখবে। স্ট্রিট, এ্যাভেনিউ, রোড, বীথি, সরণি, সব স্পেল আউট করে লিখে সংখ্যা কাউন্ট করবে।’
—‘ওকে বস! এখন বাড়ি গিয়ে একটু জিরিয়ে নিয়ে কাজ শুরু করব। আপনাকে রিপোর্ট দেব সন্ধে সাড়ে সাতটায়!’
সুমনা ওঘর থেকে বেরতেই অমিতের মা ওকে পাকড়ালেন—‘আগে আমার কাছে রিপোর্টটা দিয়ে যাও!’
‘সে আপনি না চাইলেও আমি দিতাম অবিলম্বে’—বলতে বলতে মাসিমার সঙ্গে সুমনা পাশের ঘরে গেল।
পুলিশি তৎপরতা
একের পর এক সম্ভাব্য রাস্তার নাম লিখে প্রত্যেকটার পাশে অক্ষর সংখ্যা লিখছিলেন অমিত। আবার কয়েকটা ক্রস আউট করে দিচ্ছিলেন। কখনো কাউন্ট করে ১৩ দেখে উৎসাহিত হয়ে আবার ভেরিফাই করে Changed Road Names-এর লিস্টে সেই রাস্তার কোনো খোঁজ না পেয়ে চুপসে যাচ্ছিলেন। কখনো বা পূর্ব নাম ১৩, পাল্টানো নাম ১৭ দেখে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে উদাস চোখে ভাবছিলেন। এত বেশি তন্ময় হয়েছিলেন যে, এক সময় চমকে উঠলেন মায়ের চিৎকারে—‘কীরে, কফিটা কখন দিয়ে গেছি, জুড়িয়ে জল হয়ে গেল যে! এই অপদার্থ গভরমেন্টের কাজ করতে গিয়ে তুই নিজেই দিশাহারা হয়ে পড়লি দেখছি!’
‘ন্না:, একটু রিল্যাক্স করা দরকার। নইলে আসল কনসেন্ট্রসান আসে না! কাজের কাজও হয় না!’ অমিত নিজেকে বললেন—‘প্রকৃতির ফাণ্ডামেন্টাল প্রিন্সিপল, strain and ease করতে হয় পালা করে, একবার এটা, একবার ওটা। এভাবেই পাখি ডিমে তা দেয়, তবেই ডিম ফুটে ছা বেরয়!’
আমজাদ আলি খাঁর কলাবতী রাগের সিডি চালিয়ে দিয়ে অমিত ইজিচেয়ারে নিজের শরীরটা এলিয়ে দিলেন। আলাপের আমেজ কান দিয়ে ঢুকে যেন কপালে, ঘাড়ে মৃদু মাসাজের মতো কাজ করতে লাগল।
হঠাৎ বেজে উঠল সেলফোন। সুরের আবেশ খানখান হয়ে গেল!
ধরেই অমিত শুনলেন—‘কমিশনার অব পুলিশ বলছি। অমিতবাবু, দা ভিলেন ইজ টেকিং আস ফর আ রাইড! আমাদের লেজে খেলাচ্ছে, হিজিবিজি ধাঁধা দিয়ে আর ফলস প্রমিস করে!’
নিয়োগী বললেন—‘একটু খুলে বলুন, মি. কমিশানার! কী ডেভেলাপমেন্ট হল? আপনারা কিছু এ্যাকশান নিয়েছেন?’
—‘হ্যাঁ। আমরা দু-জায়গায় রেইড করেছিলাম। দুটি রাস্তার ১১১ নম্বর বাড়ি।’
—‘কোন কোন রাস্তা?’
—‘ক্যানিং স্ট্রিট আর কলেজ স্ট্রিট। ক্যানিং স্ট্রিটে ওটা সিনেমা-হল। তার দোতলার ব্যালকনির এক কোণে নীল রঙের একটা বস্তাও ছিল। খুলে দেখা গেল তাতে কাঁকড়া ভরতি। জাস্ট ইমাজিন, কাঁকড়া, মাঝারি সাইজের!’
অমিতের মুখে কৌতুক উপছে পড়ল। তবু গলাটা নিপাট ভালোমানুষের মতো করে বললেন, ‘আর কলেজ স্ট্রিটে?’
—‘আর বলবেন না! ওটা একটা কাউন্সিলার-এর বাড়ি। সে তো পুলিশের চোদ্দ পুরুষ উদ্ধার করল গালাগাল দিয়ে। আবার শাসিয়েছে তার পার্টি এই হ্যারাসমেন্টের বিরুদ্ধে এসেমব্লিতে মোশান আনবে। একদিন ধর্মঘট ডাকবে!’
অমিত এবার বললেন, ‘আপনারা স্যার, অপরাধীর শর্তটা ঠিক ফলো করেন নি। ও দুটো রাস্তার নাম তেরো লেটারের বটে, কিন্তু কলেজ স্ট্রিটের তো নাম পাল্টায় নি। আর ক্যানিং স্ট্রিটের নাম পাল্টে হয়েছে B.R.B. Bose Road, তার লেটারের সংখ্যা এগারো।’
কমিশনার অবাক কন্ঠে বললেন, ‘অ, তাই নাকি? আপনার বুঝি হয়ে গেছে ক্যালকুলেশান করা? কদ্দূর এগোলেন?’
অমিত বললেন, ‘এগিয়েছি অনেকটা, এখনো টার্গেট রিচ করতে পারিনি। হয়ে যাবে।’
সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ মস্তিষ্কটা চনমনে করে তুলতে আর এক কাপ ফোলজার্স কফি নিয়ে বসলেন অমিত। ক্যালিফোর্নিয়াতে সেটলড বন্ধু রবি কুমার থেকে-থেকে ঠিক সাপ্লাই দিয়ে যায় এই কফির একটি করে jar; এর পাশে নেসকাফে নেহাত জোলো মনে হয়। সবে একটা সিপ দিয়েছেন, ফোনটা আবার বাজতে শুরু করল।
—‘হ্যালো!’
—‘এ্যাম আই টকিং টু ডিটেকটিভ মি. অমিত নিয়োগী?’
—‘ইয়েস, স্পিকিং!
—ডি.সি. সাউথ বলছি। আপনি তো মিটিং-এ শুনেছিলেন, আমরা ফণীমনসা চক্রতে হানা দিয়েছিলাম। ওখান থেকে একটা কম্পিউটার সিজ করা হয়েছিল। লোকটিকে জেরা করে তেমন কিছু জানা যায় নি। বলল, ও সবে এক বছর কাজ করছে। টেম্পোরারি এ্যাপয়েন্টমেন্ট। মাইনে মাত্র আড়াই হাজার। তবে Organizationটা অবশ্যই fishy, আমরা হার্ড ডিস্ক থেকে কিছু data উদ্ধার করতে পেরেছি। সেটা ফলো করে ফ্রি স্কুল স্ট্রিটে Pearson নামের একটি লোকের বাড়ি C.I.D. হানা দেয়। তার ইলেকট্রনিক্সের বিজনেস। ইণ্ডিয়ান ও ব্রিটিশ ডবল সিটিজেন। পাসপোর্টে কোনো গন্ডগোল নেই!...মোট কথা, কিছু এগনো গেল না! আপনি কি তেরো নামের তেরো নদী পেরতে পারলেন?’
অমিত বললেন, ‘খুব চেষ্টা করছি। এখনো বাইশ ঘণ্টা সময় আমাদের হাতে আছে।’
—‘আর একবার বোধহয় সকালে চিফ মিনিস্টার আমাদের ইমার্জেন্সি মিটিঙে ডাকবেন। দেখুন ততক্ষণে যদি...’
গোয়েন্দার ষষ্ঠেন্দ্রিয়
সন্ধে সাতটা পঁয়ত্রিশে সুমনা আবার অমিত নিয়োগীর বাড়িতে ঢুকল। তার ক্লান্তি এখনো যায় নি। থেকে থেকে হাত তুলে হাই চাপছে।
অমিত স্টাডিতে পায়চারি করছিলেন কিছুটা অস্থির মন নিয়ে। ওকে দেখেই বললেন, ‘উত্তর কি মিলল?’
সুমনা ওঁকে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘সরণি স্পেলিং-এ ni ধরব, নাকি nee?’
অমিত চমকে উঠে বললেন, ‘কোনো সরণি কি তেরো-র শর্ত পূরণ করছে?’
—‘হ্যাঁ, স্যার। nee ধরলে বিধান সরণীতে তেরো লেটার হচ্ছে!’
—‘কিন্তু তাহলেও তো আমাদের কাজে আসবে না! ওর আগের নাম কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট কত লেটারের দেখেছো?’
সুমনা লিস্টে Old names কালাম-এ গিয়ে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের লেটার কাউন্ট করে বলল, ‘ধূর! এতো ষোলো হয়ে যাচ্ছে! ...আপনি কি এখনো কনফিডেন্ট ব্যাপারটার সমাধান করতে পারবেন?’
অমিত বললেন, ‘দেখো, কমনসেন্স অনুযায়ী দুটো কথা মনে হচ্ছে। নাম্বারটা যদি ২১১ হয়, কোনো ছোটো রাস্তা ধর্তব্যের মধ্যে নয়। বড়ো রাস্তা উইথ থার্টিন-লেটার নেম খুব কম সংখ্যক হবে। তার মধ্যে আবার ওল্ড নেম নিউ নেম দুটোই সমসংখ্যার হবে। সুতরাং সন্ধানের এরিয়াটা খুব সীমিত হয়ে এসেছে। অঙ্কটা মোটেই কঠিন নয়। ...আর একটা কথা হল, বাড়িটা সম্ভবত কোনো ইনডিভিজুয়াল লোকের বাড়ি নয়, মানে, প্রাইভেট প্রপার্টি নয়। একটা অফিস বা পাবলিক প্লেস হবে।’
সুমনা বলল, ‘কিন্তু ভীষণ কনফিউজিং হয়ে যাচ্ছে। লেটার গুণতে গিয়ে গুলিয়ে যাচ্ছে...এই দেখুন না, পুরোনো লিস্টের মধ্যে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পরিষ্কার তেরোটা লেটার। কিন্তু চেঞ্জড নেম চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, সেটা ইংরেজিতে লিখলে আঠারোটা ক্যারাক্টার।’
‘হুঁ!’ অমিত মাথাটা ওপর-নীচ ঝাঁকালেন কয়েকবার। ‘আমার ষষ্ঠেন্দ্রিয়, মানে, ইনটুইশান, দুটি কথা বলছে। এক, পাজলটার সমাধান হতে আর বেশিক্ষণ লাগবে না। আর দুই, কোথাও একটা ছোট্ট ভুল হচ্ছে...খুব minute, হবার কথা নয় এরকম কিছু বোধহয় overlook করেছি। ...ব্যাপারটা প্রুফ রিডিং-এর মতো: অনেক সময় একজনের চোখে, বার-বার পড়লেও ধরা পড়ে না, কিন্তু আর একজন চট করে সেটা দেখতে পেয়ে যায়! দেখো, আমার এই লিস্টে নিউ নেমস-এর মধ্যে Sarat Bose Road তেরো-র শর্ত পূরণ করছে...it’s a long road, দুশো এগারোটা বাড়ি থাকতেই পারে, কিন্তু এর আগেকার নাম...’
সুমনা ওঁর কাঁধের পাশ দিয়ে মুখ ঝুঁকিয়ে কাগজের লিস্টটা লক্ষ্য করছিল। ও হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল ভীষণ উত্তেজিত ভাবে—
‘স্যার, আপনার এখানটায় ভুল হয়েছে!—’
অমিত চমকে উঠে বললেন, ‘মানে?’
—‘এই যে, এখানে Lansdown আপনি লিখেছেন, পাশে ব্র্যাকেটে 12, কিন্তু নামটা তো Lansdowne, মানে, n-এর পরে একটা e হবে! তাহলে তো...’
—‘ও গ্রেট!’ অমিত লাফিয়ে উঠলেন, সুমনাকে প্রায় ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে, ‘দ্যাট মিনস ইটস থার্টিন! ...উই ডান ইট! কিটি, উই ডান...!’
সুমনা ধাক্কা সামলে উঠে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, এটাই ধাঁধা ছিল: এমন একটা রাস্তা যা নাম পাল্টেও অপয়া তের-র খপ্পর থেকে বেরতে পারে নি।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, সুমনা!’ অমিত এবার ওর হাত ধরে ঝাঁকিয়ে অভিনন্দন জানালেন। তারপর বললেন, ‘এখন দেখতে হবে 211, Sarat Bose Road কার বাড়ি, বা কোন অফিস।’
সুমনা বলে, ‘সে তো আপনি পুলিশকে বললেই ওরা বার করে নেবে!’
অমিত একটু ঠোঁট টিপে গর্বিত স্বরে বললেন, ‘কিন্তু ওদের বলার আগে আমরাই সেটা জানতে চাই। সুতরাং—’
সুমনা বলল, ‘ক্যালকাটা টেলিফোনস-এর ওয়েব সাইটে গিয়ে ডোর নাম্বার আর রোড নেম দিয়ে কোয়েরি করলেই ওনারের নাম বেরিয়ে যাবে!’
অমিত এক গাল হেসে বললেন, ‘এটা তুমিই করো। আমার ইনটুইশান মেলে কিনা দেখি!’
একটু পরেই প্রশ্নের উত্তর দেখা গেল কম্পিউটারের পর্দায়—শরৎ বোস রোড পোস্ট অফিস!
খুশিতে হাততালি দিয়ে ফেললেন অমিত বাচ্চা ছেলের মতো—‘পারফেক্ট! পোস্ট অফিস...নীল কাপড়ের ব্যাগ...অর্থাৎ পার্সেল রুমেই আছে বস্তুটা!’
লক্ষ্যভেদ
এরপর দ্রুত কয়েকটি ফোন-চালাচালি হল। অমিত নিয়োগী CID প্রধানকে জানালেন সমাধান করা গেছে পাজলের। দু-জন আর্মড পুলিশ আর একজন পাকা স্যাকরাকে নিয়ে তিনি যেন চলে আসেন শরৎ বোস রোড পোস্ট অফিসের সামনে। উনি আবার বার্তা পাঠালেন পুলিশ কমিশানার এবং ডিসি সাউথকে। অমিত আবার পীযূষ বাবুকে রিং করে মুখ্যমন্ত্রীকে খবরটা দিতে বললেন, যাতে তাঁকে উদ্বেগ থেকে দ্রুত উপশম দেয়া যায়।
রাত সাড়ে এগারোটা। অমিত, সুমনা, সিআইডি চিফ মি. ভার্গব, দুই সশস্ত্র পুলিশ এবং এক স্যাকরা, এই ছজনের দল পোস্ট অফিসের লাগোয়া পোস্টমাস্টারের রেসিডেন্সিয়াল অংশে হাজির হল।
পোস্টমাস্টার প্রথমে চমকে উঠেছিলেন এমন অসময়ে এ ধরনের সমাবেশ দেখে। কাঁচা ঘুম ভেঙে যাওয়ায় মাথাটা ঘুলিয়ে রইল খানিকক্ষণ।
ব্যাপারটা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করে দিলেন অমিত। মি. ভার্গব বললেন, ‘আপনি চাবি নিয়ে আমাদের সঙ্গে আসুন। আমরা অফিসটা সার্চ করব।’
পোস্ট অফিসটা দোতলায়। সেখানেই সব কাউন্টার এবং অফিসের প্রয়োজনীয় ঘর। পার্শেল রাখার জায়গাতে পৌঁছে দেখা গেল সারি সারি নানা আকারের ছোটো বড়ো মাঝারি বাক্স ও ব্যাগ রয়েছে। তাদের কোনোটা মেল ভ্যানে তোলা হবে, কিছু যাবে স্পিড পোস্টে। রেজিস্টার্ড, ইনসিওরড, পার্সেল, খাতা, বই, যন্ত্রপাতি, কাপড়, বিছানা, কী নেই?
সব কটা আলো জ্বেলে তদুপরি স্পেশাল টর্চের জোর আলোও ফেলা হল পুঁটুলিগুলোর ওপর।
খানিক খুঁজতেই অভীষ্ট নীল থলিটি চোখে পড়ল অমিতের। যথারীতি পোস্টাল বিধি মেনেই পার্সেলটি করা হয়েছে। স্ট্যাম্প মারা কাপড়ের ওপর পরিষ্কার ইংরেজিতে লেখা নাম-ঠিকানা—সুরেশ পাণ্ডে। 18/3, জগন্নাথনগর, ধুরুয়া, রাঁচি—পিন: 834004।
মুখের সিল ভেঙে দেখা গেল, ওপরে ও দুপাশে কিছু খবরের কাগজ। মাঝখানে কয়েকটি সাবানের বাক্স।
একটি বাক্স খুলতেই যখন গহনা দেখা গেল, স্যাকরার হাতে সেটি তুলে দিয়ে যাচাই করতে বলা হল, আসল না ইমিটেশান।
সে একটি বালা নিয়ে দু-হাতে টিপে, দাঁতে কামড়ে এবং সবশেষে কষ্টিপাথরে ঘসে নিশ্চিন্ত হয়ে জানাল, ‘সোনার গয়না, বাবু, গিল্টিকরা মাল নয়! চব্বিশ ক্যারেট!’
সবচেয়ে বেশি অবাক হলেন পোস্টমাস্টার মশাই। এটা যে স্বপ্ন নয়, সত্যি, তিনি বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। আধখোলা মুখগহ্বর আর বাঁয়া তবলার গাবের মতো বড়ো বড়ো চোখ করে দেখলেন নির্বাক হয়ে।
অমিত তাঁকে বললেন, ‘আপনারই কোনো কর্মচারীর ওপর নিশ্চয়ই অফিস আওয়ার্সে এগুলোর ওপর নজর রাখার ভার দিয়েছে ডাকাতরা! তবে কে তিনি সেটা বার করা মুশকিল!’
গয়না উদ্ধার করে, পূর্বনির্দেশমতো পুলিশ সোজা নিয়ে গেল একেবারে মন্ত্রীর বাড়ি, যাতে মন্ত্রীপত্নী সেগুলো নিজের বলে সনাক্ত করতে পারেন। আর, অমিত মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ আহ্বানে তাঁর বাড়িতে গেলেন, সুমনাকে ওর বাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে।
উচ্ছ্বসিত ভাবে জড়িয়ে ধরে অভিনন্দন জানালেন মুখ্যমন্ত্রী। অমিতকে বললেন, ‘আপনি আমার মুখরক্ষা করেছেন, আর নিজের ইমেজ আরো উজ্জ্বল করেছেন। আমি নির্দ্বিধায় আপনাকে বাংলার ‘‘পয়রো’’ বলব এবং অবশ্যই এই কৃতিত্বের জন্য আনুষ্ঠানিক ভাবে সম্মানিত করব।’
এরপর তিনি অনুরোধ করলেন, অমিত যেন বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে CID তে যোগ দেন। তাঁর উপযুক্ত পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা করা হবে, এ আশ্বাসও দিলেন। অমিতও যথাযথ সৌজন্য ও বিনয় জানিয়ে বললেন, ওই উপদেষ্টা পদের প্রস্তাবটায় তিনি এক কথায় সায় দিতে পারছেন না। ভেবে দেখবেন। এরপর মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে একটি গাড়ি অমিতকে তাঁর বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এল।
পরদিন একটু বেলা হল অমিতের ঘুম থেকে উঠতে। চোখ মেলে দেখলেন বেশ রোদ্দুর বাইরে।
মা বললেন, ‘ভোরের দিকে একটা ফোন এসেছিল ল্যাণ্ডলাইনে। মাঝরাতে শুয়েছিস, তোকে আর ডাকি নি। এমনি তুলে রেখেছিলাম রিসিভারটা। খানিক বাদে দেখলাম লাইন কেটে গেছে। যা, মুখ-হাত ধুয়ে নে, চা আনছি।’
ড্রইংরুমে চা খেতে খেতে বৃহস্পতিবার ‘প্রতিদিন’-এ চোখ বোলাচ্ছিলেন অমিত। মিডিয়া কাল কোনো খবর পায় নি, জানতেন। তবু অবচেতন ভাবে কালকের পোস্টঅফিস অভিযান ও স্বর্ণোদ্ধারের একটা রিপোর্ট খুঁজলেন কাগজের পাতায় পাতায়।
ব্রেকফাস্ট করতে করতে অবশ্য একটা টিভি চ্যানেলের নীচের দিকে ‘ব্রেকিং নিউজ’ আইটেমের মধ্যে কালকের ঘটনার উল্লেখ দেখলেন: নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই মন্ত্রীর গহনা উদ্ধার...। অমিত হাসলেন, পুলিশ এত বড়ো কেরামতি আর কতক্ষণ চেপে রাখতে পারে!
এরপর বাজার যাবার জন্য দরজা খুলে বেরতেই চোখে পড়ল কাগজটা। লেটার-বক্সের মুখ থেকে খানিকটা বেরিয়ে রয়েছে।
টেনে বার করলেন অমিত চিরকুটটা। সেই PMC সিল মাথার ওপর। ভিতরে লেখাটা এইরকম:
অভিনন্দন! Smart chap! পার্সেলের ওপরের ওই ঠিকানায় যে সুরেশ পাণ্ডেকে পাওয়া যাবে না, তা নিশ্চয়ই আপনি বুঝেছেন। পুলিশ অবশ্য ‘ঢুঁড়তে রহ জায়েগি’...! একটা ভালো পরামর্শ শুনুন। এ সরকারের বেতনভোগীদের মধ্যে জুটবেন না। এদের দৌড় তো দেখলেন! আপনি আমাদের সঙ্গে যোগ দিন! কী ভাবে যোগাযোগ করবেন, সময়মতো জানিয়ে দেব। শুভেচ্ছা নেবেন!
পড়ার পর অমিত কাগজটা ভাঁজ করে পকেটে রাখলেন। চিন্তার কিছু কুঞ্চন পড়ল কপালে এবং চোখের কোণে। নিজের মনে বিড়বিড় করলেন—‘এফিসিয়েন্ট! খবরটা খুব কুইক গ্যাদার করেছে...সম্ভবত আমাকে একথাগুলো ফোনেই বলতে চেয়েছিল...‘ফণীমনসা চক্র’ নামটার মধ্যেই কিন্তু আসল ধাঁধা! ...এ ফণীর যে ফণা আছে, তা বিলক্ষণ বুঝছি, কিন্তু কতটা বিষধর সেটা দ্রষ্টব্য...আর মনসা? সে কি ফণীর সহায়িকা মাত্র, না আরাধ্যা দেবী এবং আসল মাস্টার মাইণ্ড? কতখানি কাঁটা তার মনে? এসব প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না হলে বোঝা যাবে না কোনোদিন!...’
কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য
ওই চিন্তাই ভবানীভবনে গোয়েন্দা কর্তাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে এবং দিনেও সেটা পুষিয়ে নিতে দিচ্ছে না। যদি উপযুক্ত ক্লু ধরে ওই দল তথা পাল-এর গোদাদের ধরা না যায়, লোকের সত্যি আর কোনো ভরসা থাকবে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষকদের ওপর। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাপক বদলি হতে পারে পুলিশের উঁচুমহলে এবং শহরের অনেক অফিসারকে পাঠানো হতে পারে মফস্বলে।
চিরকালই দেখা গেছে চাপটা ঠিকমতো পড়লে পুলিশ নড়েচড়ে বসে, ছোটাছুটিও করে, এমন কী, তাদের বুদ্ধিও একটু খোলে।
নন্দীগ্রামে লাগাতার অভিযান চলছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে যুগ্মভাবে আক্রমণও শানাচ্ছিল রাজ্যপুলিশ। মাওদের একটা মারলে ওরা পাঁচটা পুলিশ মারছে। যখন-তখন জঙ্গলপথে মাইন দিয়ে পুলিশ জিপ উড়িয়ে দিচ্ছে। আর তাদের অস্ত্রশস্ত্র কেড়ে নিয়ে নিজেদের আরো শক্তি বাড়াচ্ছে। কিন্তু এর একটা সুফল ফলেছে, পুলিশও গেরিলা যুদ্ধের কৌশল রপ্ত করেছে বাঁচার তাগিদে। বন্ধু ও আত্মীয়দের হত্যাকারী জঙ্গিদের নির্মূল করার জন্য প্রতিহিংসার জ্বালা তাদের সাহসী করে তুলেছে।
তাই মাঝে মাঝে ঠিক টিপস পেয়ে পুলিশ আচমকা আঘাত হানছে মাওবাদী ডেরায়। দখল নিচ্ছে জঙ্গলমহলের কিছু কিছু অংশ। উদ্ধার করছে মজুত অস্ত্রের ভান্ডার আর প্রচারমূলক লিফলেট।
এইভাবে একদিন পুলিশের হাতে ধরা পড়ল শঙ্কর মাহাতো আর তার বউ গীতা মাহাতো। তাদের কাছে বেশ কিছু রাইফেল, পিস্তল, কার্তুজ ইত্যাদির সঙ্গে একটি হাতে-লেখা চিরকূট উদ্ধার করা গেল। তাতে নির্দেশ—‘শুক্রবার রাত সাড়ে বারোটা, কড়াইদীঘি। সুপ্রিমো প্রমিত।’
প্রচুর ধামাকা প্রহারের সঙ্গে সূঞ্জ কারুকাজ প্রয়োগ করে শঙ্করের কাছ থেকে আদায় করা গেল, প্রমিত বা সেনদা এক সময় ওদের বিগ বসের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। কিছুদিন অন্তর ওদের কাজ দিতেন কলকাতায় কোনো কোনো জায়গায়। কাজ শেষ হলেই টাকা এসে যেত হাতে। শুট করে জঙ্গল মহলে গায়েব হয়ে যেত তারা। গীতার কাছে জানা গেল, হ্যাট-পরা এক সুন্দরী মহিলা দু-দিন তাদের ট্রেনিং দেখতে এসেছিল। সুবল সর্দারকে জিগ্যেস করে সে জেনেছে, ও-ই মনসা দিদি, সেন সাহেবের ইয়ে!
সুতরাং অন্তত একটি ধাঁধা পুলিশ অমিত নিয়োগীর সাহায্য ছাড়াই সমাধান করতে পেরেছে। ফণীমনসা নিয়ে আগে আলোচিত থিয়োরিগুলোর মধ্যে কোনটা ঠিক, সেটা বুঝে গেছে।
সুমনা কোথায়?
অমিতের গয়না-উদ্ধারের পর দু-সপ্তাহ কেটে গেল। আজ আবার বৃহস্পতিবার।
হোটেল কেনিলওয়ার্থ-এ পার্টি দিয়েছেন সুমনার রিসার্চ গাইড তুলিকাদি। ওনার মেয়ে ঝুমকো একটি আন্তর্জাতিক ডান্স কম্পিটিশানে ফার্স্ট হয়েছে, সেই উপলক্ষে। বেশ ভালোই অতিথি সমাগম হয়েছে। সুমনা গেল রাত আটটা নাগাদ।
ঝুমকোর হাতে একটা ফুলের ‘বোকে’ ধরিয়ে অভিনন্দন জানানোর পর ও দাঁড়িয়েছিল ডাইনিং হলে একটা কোণের টেবিল ঘেঁষে, সফট ড্রিঙ্কের গ্লাস হাতে নিয়ে।
হঠাৎ করিডরের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল।
সাদা জিনসের ওপর নীল কুর্তি পরা মেয়েটা তাকেই লক্ষ্য করছে তেরচা চোখে!
তারপরই আরো চমক। কী আশ্চর্য! শ্রীময়ীদি এখানে এল কী করে! চুলটা ব্যাকব্রাশ করেছে বলে প্রথমে ঠিক চিনতে পারছিল না!
পানীয়র গ্লাস টেবিলে নামিয়ে রেখে দ্রুত পায়ে করিডরের দিকে এগিয়ে গেল সুমনা। কিন্তু ততক্ষণে শ্রীময়ীও হনহনিয়ে দোতলার সিঁড়ির কাছে এগিয়ে গেছে।
সুমনা যখন সিঁড়ির মুখে এসে পৌঁছল শুধু দেখল, দোতলার বাঁকে সে মিলিয়ে যাচ্ছে।
চেঁচিয়ে ডাকল—শ্রীময়ীদি! শ্রীময়ীদি!
কোনো উত্তর না পেয়ে এক অদম্য কৌতূহল ভর করল সুমনার ওপর। ছুটে গেল ও সিঁড়ি বেয়ে। খুঁজতে লাগল বারান্দার দুধারে এঘর-ওঘর।...
রাত এগারোটা পাঁচ। অমিত নিয়োগী আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ছিলেন।
ল্যাণ্ডফোনটা বেজে উঠল।
শুধু ‘গুড নাইট’ জানাতে কেউ নিশ্চয়ই ফোন করছে না! আর্জেন্ট কিছুই হবে।
‘হ্যালো!’
—‘অমিতবাবু? আমি সুমনার মা বলছি। সুমু কি আপনার ওখানে?’
অমিত যুগপৎ বিস্মিত ও চিন্তিত হয়ে বললেন, ‘না তো! কোথায় গেছে সুমনা? ওর সেলফোনে পাচ্ছেন না?’
—‘না। দেখুন না, আমাকে বলেছিল পার্টিতে শুধু মুখটা দেখিয়ে দশটার মধ্যে ফিরবে। কিন্তু ওর মোবাইলে রিং হয়ে যাচ্ছে, নো রিপ্লাই!’
—‘পার্টিটা কোথায় বলেছিল?’
—‘কেনিলওয়ার্থ হোটেলে।’
—‘ওর কোনো বন্ধু পার্টি দিয়েছে?’
—‘না, ওর রিসার্চ গাইডের মেয়ে কী একটা কম্পিটিশান জিতেছে। তাই উনি...’
—‘অ, তা ওনার মোবাইল নাম্বার জানেন?’
—‘না, সে তো জানি না! ...আমার ভীষণ ভয় করছে অমিতবাবু! এত রাতে মেয়েটা কী করছে?’
অমিত নিজেও উদ্বিগ্ন হলেন যথেষ্ট। তবু ভদ্রমহিলাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘চিন্তা করবেন না। হয়তো ব্যাটারি ডাউন হয়ে গেছে বা রিচার্জের ডেট হয়ে গেছে, খেয়াল করে নি। আমি দেখছি হোটেলে কনট্যাক্ট করে। কিছু জানতে পারলে আপনাকে খবর দেব। আর, যদি ওর ফোন আসে, আমার মোবাইলে কাইণ্ডলি জানাবেন!...’
ওঁকে নিজের সেল নাম্বারটা দিয়ে ফোন রাখলেন অমিত। তারপর কেনিলওয়ার্থের রিসেপশান-এ ফোন করলেন। ওরা বলল, প্রাইভেট পার্টির ব্যাপারটা সম্পর্কে ওরা বিশেষ কিছু জানে না।
দ্রুত পোশাক পাল্টে জ্যাকেটের ইনসাইড পকেটে একটা লোডেড রিভলভার ভরে নিলেন অমিত। তারপর চেনা ট্যাক্সিঅলা বাবলুর গাড়িতে চললেন হোটেলের দিকে।
উত্তরমুখো যেতে যেতে পদ্মপুকুরের কাছাকাছি বেজে উঠল গোয়েন্দার সেলফোন। সুমনা কলিং...দেখে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললেন অমিত। যাক, মিথ্যাই নানারকম আশঙ্কা করছিলেন!
ফোন ধরে বললেন, ‘কী ব্যাপার? কোথায় তুমি? তোমার মা এ্যাwশাস হয়ে আমাকে ফোন করছিলেন—’
সুমনার গলা পাওয়া গেল না। ওধার থেকে এক পুরুষ কন্ঠ বলল, ‘ইয়েস স্যার! বলেছিলাম আপনাকে যোগাযোগ করে নেব। ফার্স্ট স্টেপ হিসেবে আপনার অ্যাসিস্ট্যান্টের সঙ্গে একটু আলাপ পরিচয় করছি। সে এখন আমাদের গেস্ট!’
অমিত চমকে উঠে বললেন, ‘আপনি কোথা থেকে বলছেন? সুমনাকে একটু দিন না!’
‘সরি! পরের কথা পরে হবে। শুধু জানিয়ে রাখি, হোটেলে গিয়ে মিছে সময় নষ্ট করবেন না। আমিই জানাব কোথায় আসতে হবে। Till then good night!’
অমিত রাগে নিজের নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলেন। রেকর্ডার অন করে উনি রহস্যময় ভিলেনের কন্ঠস্বর রেকর্ড করতে ভোলেন নি। কিন্তু সেটা কি কোনো কাজে লাগবে?...
সুমনাকে ওখানে পাবেন না জেনেও অমিত কেনিলওয়ার্থে গেলেন। কোনোরকমে প্রফেসর তুলিকা সান্যালকে পার্টিশেষে গাড়িতে ওঠার মুহূর্তে সনাক্ত করে ধরলেন। নিজের পরিচয় দিলেন। সম্প্রতি গহনা উদ্ধার কেসটা কাগজে ফলাও করে প্রচার হবার সূত্রে অমিতের নাম শুনে বেশ ইমপ্রেসড হলেন ভদ্রমহিলা। তারপর সুমনা-অন্তর্ধান বৃত্তান্ত শুনে বিস্ময় ও দুশ্চিন্তায় চুপসে গেলেন। তড়বড় করে বললেন, ‘এখনি পুলিশকে ইনফর্ম করা উচিত। এক রাতের মধ্যে সুমনাকে ওয়ার্ল্ডের যে-কোনো দিকে পাঠিয়ে দিতে পারে কিডন্যাপাররা।’
অমিত বললেন, ‘সে আপনি ভাববেন না। পুলিশের হায়েস্ট লেভেলে আমার পরিচিত অনেকে আছেন। তবে এক্ষেত্রে ক্রিমিনালদের আসল টার্গেট আমি নিজে। আমাকে পাবার জন্যই সুমনাকে ওরা কব্জা করেছে। তাই আসল ইনভেস্টিগেশানের দায়িত্ব আমার। আপনার হেল্প আমার প্রয়োজন। সুমনাকে আপনি পার্টিতে কটার সময় দেখেছেন। ইনভাইটেড গেস্টদের মধ্যে তার পরিচিত আপনারা ছাড়া আর কেউ ছিল কি না, এইসব তথ্য না জানলে ঠিক পথে এগোনো যাবে না।
এরপর তুলিকা সান্যালের গাড়িতে তাঁর বাড়ি একতা হাইটস যাবার পথে অমিত জ্ঞাতব্য তথ্য মোটামুটি জোগাড় করে নিলেন। ডিসি সাউথ এবং মিসিং পার্সন স্কোয়াডে রিপোর্ট দিয়ে দিলেন।
সে রাতে নানা চিন্তায় ঠিকমতো ঘুমোতে পারলেন না অমিত। তাই ভোর পাঁচটায় ফোনের আওয়াজে চোখ খুলতে কষ্ট হল।
‘হ্যালো’ বলতেই শুনলেন—‘সি.আই.ডি ইন্সপেক্টর ডি.সি.লাহা বলছি। অমিতবাবু, উই আর অন এ ট্রেল। আপনি ইমিজিয়েটলি চলে আসুন মৌলালির মোড়ে। আমাদের কালো রঙের টাটা সুমো দেখতে পাবেন ঠিক যুবকেন্দ্রের সামনে। যশোর রোড ধরে যেতে হবে কিছু দূর। ওভার।’
দু-মিনিটের মধ্যে তৈরি হয়ে জ্যাকেটের এক পকেটে বিস্কুটের প্যাকেট, অন্য পকেটে রিভলভারটা নিয়ে বেরিয়ে গেলেন অমিত।
কুড়ি মিনিটে মৌলালির মোড়ে পৌঁছে দেখলেন একটা কালো টাটা সুমো দাঁড়িয়ে। তার সামনে কলকাতা পুলিশের একটি লোক। ট্যাক্সিটা ছেড়ে সুমোর কাছে যেতেই দরজা খুলে গেল।
‘আসুন, মি. নিয়োগী।’ ভেতর থেকে আহ্বান এল।
কিন্তু ঢুকতে গিয়েই ডান চোখের কোণ দিয়ে অমিত দেখে ফেললেন, বাইরে দাঁড়ানো লোকটা তাঁর দিকে হেলে আঘাত হানতে তুলছে তার ডান হাতটা—
বিদ্যুদ্বেগে বাঁ দিকে ডাইভ দিয়ে রাস্তায় পড়লেন। তৎক্ষণাৎ গাড়ি থেকে একটা লোক লাফ দিয়ে পড়ল তাঁর ওপর।
অমিত চকিতে এক রাউণ্ড ফায়ার করলেন। কিন্তু আচমকা ধাক্কায় লক্ষ্য ঠিক থাকল না। গুলি লাগল গাড়ির এক পাশে। তারপর তাঁর হাত থেকে রিভলভার ছিটকে পড়ল রাস্তায়। মাথায় একটা বজ্রমুষ্টির ঘা লাগল...চোখে ঝাপসা দেখলেন কয়েক সেকেণ্ড...
অমিত শুনলেন কয়েক রাউণ্ড ফায়ারিং-এর শব্দ। দেখলেন কিছু লোকের ধ্বস্তাধ্বস্তি...এবং দারুণ স্পিডে টাটা সুমোটা ঘটনাস্থল থেকে উধাও হয়ে গেল! সবই কয়েক লহমার মধ্যে সিনেমাটিক ভাবে ঘটে গেল।
অমিত ধীরে ধীরে ধূলিশয্যা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। সামনে দেখলেন স্বয়ং ডিসি সাউথ-কে। আর তিনজন পুলিশ। দেখলেন তাদের হাতে ধরা পড়েছে এক মুস্কো গুন্ডা। বুঝলেন সে পিএমসি-র এ্যাকশান স্কোয়াডের একজন, এবং তাঁর মাথায় ঘুসিটা এই লোকটাই মেরেছে।
ডিসি সাহেব অমিতের হাতে হাত রেখে উচ্চ কন্ঠে বললেন, ‘আর ইউ ওকে মি. নিয়োগী?’
অমিত বললেন, ‘ইয়েস, থ্যাঙ্ক ইউ!’
ডিসি এবার পরিতৃপ্ত ভঙ্গিতে বললেন, ‘পুলিশকে আপনারা যতই নিন্দে করুন, আমরা কিন্তু সত্যিই ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না!’
অমিত লজ্জিতভাবে বললেন, ‘অ্যায়াম রিয়েলি গ্রেটফুল! খুব টাইমলি এসে পড়েছেন! একটি মাছও ধরেছেন দেখছি!’
ডিসি বললেন, ‘হ্যাঁ, বোয়াল মাছ বলতে পারেন! এই স্বনামধন্য ব্যক্তিটি হলেন রঘুবীর সিং। ইস্টার্ন রিজিয়ানের সবচেয়ে ফেরোশাস মাফিয়া এ্যাকটিভিস্টদের একজন। আপনাকে ধরাশায়ী করে ধোলাচ্ছিল।’
‘বটে! মহাপুরুষকে ভালো করে দেখব। ইন্টারোগেশানের সময় ডাকবেন আমাকে। আশা করি এই রঘু-বোয়ালই আসল রাঘব-বোয়ালের কাছে পৌঁছে দিতে পারবে আমাদের! ...এবার বলুন, কী করে এই গোয়েন্দা অপহরণের প্ল্যানটা জানলেন? আমার বাড়ির ওপর নজরদার রেখেছিলেন?’
—‘অব কোর্স! যখন জানলাম আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট সুমনা দেবীকে কিডন্যাপ করা হয়েছে, বুঝলাম আপনাকে কব্জা করার জন্যে ডেসপারেট হয়ে উঠেছে পি.এম.সি.। অঙ্কুরকে পোস্ট করা হল আপনার মুভমেন্টের ওপর নজর রাখার জন্য। সে বাইক নিয়ে রেডি ছিল। ভোর না হতেই আপনাকে বেরিয়ে ট্যাক্সি ধরতে দেখেই আমাদের স্পেশাল সেল-কে এ্যালার্ট করে, আর নিজে আপনার ট্যাক্সি ফলো করে এখানে আসে। তারপর তো বুঝতেই পারছেন...’
—‘সুমনার কোনো খবর পেলেন?’ উদ্বিগ্ন ভাবে শুধোলেন অমিত।
—‘না, তবে এবার পৌঁছে যাব আমরা ওদের হাইডিং-এ, রঘুবীরকে যখন পাকড়ানো গেছে—’
এক ইন্সপেক্টর এসে ডিসিকে স্যালুট করে একটা চিরকুট দিয়ে বলল, ‘স্যার গুন্ডাটার পকেটে এটা পাওয়া গেছে।’
আবার ধাঁধা
ডিসি সাহেব কাগজটা নিয়ে কয়েক সেকেণ্ড নিরীক্ষণ করে বললেন, ‘কী এটা? মাথামুন্ডু কিছুই বুঝছি না!’ বলে সেটি অমিতের হাতে দিলেন।
অমিত পড়লেন। একটি দু-লাইনের ছড়া।
কে সুরা বোতল
মৌ বন গো গোল।
ডিসি বললেন, ‘এতো আবার ধাঁধা মনে হচ্ছে! এসব, মশাই, আপনার ডিপার্টমেন্ট। আপনার কাছেই রাখুন। রহস্যোদ্ধার করে ইমপর্ট্যান্ট বুঝলে আমাদের জানাবেন। আমরা আসল মালকে আমাদের কাস্টডিতে নিয়ে চললাম। থার্ড ডিগ্রিতে না হলে তিন তিরিক্কে নাইন্থ ডিগ্রি দিতে হবে একে! আর, হ্যাঁ, আপনার ওপর আমরা কিন্তু ওয়াচ রেখে যাব। কারণ ওরা আবার অ্যাটেম্পট করতে পারে। এবার হয়তো ফণী নিজেই তেড়ে আসবে!’
‘ঠিক আছে। থ্যাঙ্ক ইউ এগেন!’ অমিত বিদায় নিলেন।
বাড়ি এসে লাইন দুটোর ওপর বারবার চোখ বুলিয়ে এবং কথাগুলো আবৃত্তি করে কোনো দিশা খুঁজে পেলেন না অমিত। বাট ইট মাস্ট মিন সামথিং!
কে সুরা বোতল
মৌ বন গো গোল।
বারবার আওড়াতে আওড়াতে আপন মনেই বললেন, ‘সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। এ ‘সুরা’ সুরা নয়, ‘মৌবন’ বন নয়, তা বুঝছি। কিন্তু এগুলোর মানে কী? ...হতে পারে এটা রঘুবীরের প্রতি বস-এর সাংকেতিক নির্দেশ। তা যদি হয়, কী ব্যাপারে নির্দেশ? নিশ্চয়ই তাকে যে কাজ করতে বলা হয়েছে, সেই ব্যাপারে...অর্থাৎ কিডন্যাপ এবং আনুষঙ্গিক কিছু কাজ...’
ভাবতে ভাবতেই অমিত স্নান, খাওয়া সারলেন। একটু গড়িয়েও নিলেন বিছানায়। বিকেল চারটে নাগাদ ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে হল, এগুলো কোনোটাই পুরো কথা নয়, সম্ভবত ইনিসিয়াল বা আদ্যক্ষর মাত্র। তারপরই মগজে আর একটা তরঙ্গ খেলে গেল—এ ধাঁধার মধ্যে কিছু জায়গার নির্দেশ রয়েছে। তার মধ্যে প্রথম দুটো তাঁর ইতিমধ্যে জানা নামের আদ্যক্ষর। ‘কে’ মানে ‘কেনিলওয়ার্থ হোটেল’ যদি হয়, ‘সু’ হতে পারে ‘সুমনা’। কেনিলওয়ার্থ হোটেল থেকে সুমনাকে নিখোঁজ করা হয়। দ্বিতীয় লাইনে ‘মৌ’ মানে কি মৌলালি? যেখান থেকে তাঁকে গাড়িতে তোলার প্ল্যান করা হয়েছিল? ইয়েস, হতে পারে! ...তা হলে...কিন্তু ‘সুরা’ মানে কি দাঁড়াচ্ছে? ‘সুরাট’ নাকি? সুমনাকে কি ওরা সুরাটে চালান করার মতলব করেছে? নাকি, ‘সু’ ফর ‘সুমনা’ আর ‘রা’ কোনো গন্তব্যস্থলের আদ্যক্ষর?...আমাকেই বা কোথায় নিয়ে যাবার মতলব ছিল? ‘বন’ মানে বনগাঁ? নাকি জার্মানির বন শহর? ...ন্না, এদের মনে হচ্ছে সবই কলকাতাকেন্দ্রিক ব্যাপার। ইন দ্যাট কেস, ‘বন’ মানে ‘বনদেল গেট’ও হতে পারে...!
হঠাৎ বেজে উঠল অমিতের সেলফোন।
অচেনা ল্যাণ্ডলাইন নাম্বার!
অমিত বেশ সশঙ্ক মনে ফোনটা তুললেন কানের কাছে।
বন্দি সুমনা
পার্টির সন্ধ্যায় সুমনা যখন কেনিলওয়ার্থের একটি উইং-এ খুঁজতে খুঁজতে শ্রীময়ীকে আবার দেখতে পেল একটি ঘরে, তখন বুঝল সে একটা ফাঁদে পা দিয়েছে। কারণ সে ঘরটায় শ্রীময়ীর দু-পাশে দুটি বেপরোয়া চেহারার লোক পাহারাদারের মতো বসে ছিল। তাদের একজনের হাতে রিভলভার, সেটিকে নিয়ে সে একহাতে ক্রমান্বয়ে ওপরে কয়েক ইঞ্চি তুলছিল, আবার মাটিতে পড়ার আগেই লুফে নিচ্ছিল। শ্রীময়ীর নিজের চোখেও ত্রাসের ছায়া দেখল সুমনা।
চকিতে পিছন ফিরতেই দেখল, তার ফেরার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছে আর এক বদমাস লোক। এবং ভালো করে দেখতেই তার মুখটা চেনা মনে হল। হ্যাঁ, এতো অজয় শ্রীবাস্তব! ডাক নাম ‘পিকু’! প্রেসিডেন্সির এক উজ্জ্বল ছাত্র। শ্রীময়ীর জন্মদিনের পার্টিতে ওদের ঢাকুরিয়ার বাড়িতে সুমনার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তারপর পথে-ঘাটে মাঝেমধ্যে গায়ে পড়ে আলাপ করেছে। একবার যেন জে.ইউ.-তে এক সেমিনারেও এসেছিল। তুলিকাদির কোনো দূর সম্পর্কের আত্মীয়? না কি ওঁর বেয়াড়া মেয়েটার পরিচিত কেউ? কিন্তু ও এখানে কেন? কী মতলবে শ্রীময়ীকে আটক করেছে?
সুমনাকে এক চোখ টিপে অজয় শুধু বলল, গুড ইভনিং!
সুমনা আঁতকে উঠতেই শ্রীময়ী বলল, ‘এখানে চেঁচামেচি করে কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে আয়, আমরা গল্প করে কিছুটা সময় কাটাই। যতক্ষণ ওদের বস অন্য কিছু অর্ডার না দেবে, ওরা আমাদের বিরক্ত করবে না!’
যন্ত্রচালিতের মতো সুমনা গিয়ে বসল খাটে, শ্রীময়ীর পাশে। লোকগুলো সত্যিই সব বেরিয়ে গেল সুড়সুড় করে, ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেল। অবশ্য তার আগে সুমনার সেলফোনটা হাতিয়ে নিতে ভুলল না।
শ্রীময়ী বলল, ‘খুব অবাক হচ্ছিস আমাকে এখানে দেখে এবং এরকম একটি রোল-এ! হয়তো ভাবছিস, আমি এদের মক্ষিরানি!’ একটা শুকনো হাসি ফুটল ওর মুখে।
সুমনা এতক্ষণে বলতে পারল—‘ব্যাপারটা কী? সবই তো বিরাট মিস্ট্রি মনে হচ্ছে! যেন স্বপ্ন দেখছি!’
—শুধু মিস্ট্রি নয়, ভীষণ বিপদ! তোকে সংক্ষেপে বলছি সিচ্যুয়েশনটা। আমার মনে হয় এরা আলটিমেটলি অমিত বাবুকে জালে ফেলতে চায়। আমাকে টোপ দিয়ে তোকে ধরল, তারপর তোর জন্য অমিতবাবুকে কোথাও ডেকে ফাঁদে ফেলবে!’
এরপর যতটুকু সময় ওরা দুজনে একান্তে ছিল, তার মধ্যে শ্রীময়ী তার অভিজ্ঞতার বিবরণ দিল সুমনাকে। দুদিন আগে সে দিল্লিতে একটা ফোন পায় কলকাতার জনৈক মি. দত্তের। নেবার হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি জানান যে, বাড়ির মধ্যে রান্নার গ্যাস লিক করে ওর বাবা-মা দুজনেই প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। প্রাণে বেঁচে গেলেও এখনো ভালো করে কথা বলতে পারছেন না। সুতরাং শ্রীময়ী যেন অবিলম্বে ঢাকুরিয়ায় চলে আসে। পরের ফ্লাইট ধরে ও কলকাতায় আসে এবং বাড়িতে ঢুকেই বুঝতে পারে এক দুষ্ট চক্র তাদের পরিবারের ওপর ভর করেছে। অজয় ওর বাবা-মাকে গৃহবন্দি করে রেখেছে। ফোনে বা কোনোভাবেই বাইরের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিচ্ছে না। কেউ দেখা করতে এলে বলে দিচ্ছে, ‘ওঁরা মেয়ের কাছে দিল্লি গেছেন আর্জেন্ট কল পেয়ে।’ আর, শ্রীময়ীকে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে, ওদের কথামতো না চললেই একে একে ওর মা, বাবা দুজনকেই খতম করা হবে।
সুমনা বলল, ‘কী চাইছে তোমার কাছে এরা?’
শ্রীময়ী—‘প্রথমত তোকে, আর সেই টানে অমিতবাবুকে ওদের দলে আনতে। দ্বিতীয়ত আমাকে বাধ্য করতে অজয়কে বিয়ে করতে।’
সুমনা শুধোল, ‘অজয়ই ওদের দলের লিডার?’
শ্রীময়ী উত্তর দেবার আগেই ঘরের দরজা খুলে অজয় ও তার একটি লোক ঢুকল। অজয়, শ্রীময়ীকে বলল, ‘তোমার সখীকে এবার আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। ওকে নতুন খাঁচায় পুরে দিয়ে এসে তুমি আর আমি অনেক গল্প করব!’
সুমনার হাত দুটো আর চোখ ওরা বেঁধে দিল মোটা কাপড়ে। তারপর খানিক হাঁটিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে একটা মোটরে তুলল।
বহুক্ষণ চলার পর—সুমনার মনে হল যেন তিন ঘণ্টা—একটা নির্জন সরু রাস্তার ভিতর গাড়িটা থামল।
অপহরণকারীরা সুমনাকে নামাল। একটা বাড়িতে ঢোকাল। একটা কুকুর গর্জন করে উঠল ওদের ঢুকতে দেখে। কাউকে উদ্দেশ্য করে ওদের একজন বলল, ‘সুদেব, এখানে পাখি থাকবে, যতক্ষণ বস নতুন অর্ডার না দিচ্ছে, বুয়েছ? একদম যেন বেরতে না পারে। খাবার-দাবার দিবি, খারাপ ব্যবহার করবি না। মনে থাকে যেন!’
সুমনা বলল, ‘এবার আমার চোখটা খুলে দিন!’
‘ওহো! ভেরি সরি ডার্লিং!’ বলে অজয় ওর গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে চোখের বাঁধন খুলে দিল। হাতেরও।
সুমনা দেখল, একটি ভুঁড়িঅলা মাঝবয়সী লোক, নাকে জড়ুল, তার দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে। আর একটা সাদা ল্যাব্রাডর আরো দুবার ‘ঘউ, ঘউ’ করে তাকে স্বাগত জানাল।
অজয় বলল, ‘দেখছ তো সখী, জিন্টাকে? পালাবার চেষ্টা করলে এর দাঁত আর নখের ধার টের পাবে!...টা-টা!’ চলে গেল ওরা মোটর চেপে।
খাসখবর
অমিত আশঙ্কিত মন নিয়ে ফোনটা তুলতেই শুনলেন, ‘সুমনা বলছি। রাজপুর থেকে।’
অমিত বললেন, ‘তুমি কি এখনো ওই গ্যাঙের কাস্টডিতে? তোমার মাকে কনট্যাক্ট করেছ?’
—‘হ্যাঁ। মাকে জাস্ট জানালাম, আমি সেফ। এখানে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে পালিয়ে এসেছি। ওদের পাহারাদারকে বাথরুমের দরজা বাইরে থেকে বোল্ট করে দিয়ে এসেছি।’
—‘দ্যাটস লাইক কিটি! কিন্তু ওরা মোটে একজনকে রেখেছিল পাহারায়?’
—না, সেই সঙ্গে একটা ল্যাব্রাডর ছিল। কিন্তু তাকে আমি আমার দলে করে নিয়েছি দুদিনের মেলামেশায়। আপনি তো জানেন, আমি বরাবরই pets ভালোবাসি। আর দু-বছর আগেই আমার ‘সুজান’ মারা গেছে। ঠিক একই স্পিসিস ছিল। এর নাম ওরা রেখেছে জিন্টা। এখানে আমার সঙ্গেই রয়েছে ও। ফরচুনেটলি ওদের আস্তানা থেকে বেরিয়ে কয়েক পা যেতেই আমার চেনা-চেনা মনে হল জায়গাটা। অপরাজিতাদের বাড়ি বার দুই এসেছি আগে। ওদের ওখান থেকেই ফোন করছি।
অমিত বললেন, ‘জাস্ট স্টে দেয়ার। আমাকে ডিরেকশানটা বলো। গিয়ে তোমায় পিক-আপ করে নিচ্ছি!’
পথনির্দেশ দিয়ে সুমনা বলল—‘কিন্তু তার আগে একটা আর্জেন্ট কাজ আছে। তাতে মনে হয় পুলিশের সাহায্য লাগবে।’
—কীরকম?
—‘শ্রীময়ীদি আর ওর বাবা-মা মিসক্রিয়ান্টদের খপ্পরে। ঢাকুরিয়ায় আর.এন.সেন রোডে ওদের বাড়িতেই অজয় শ্রীবাস্তব নামে এক ভিলেন হাউস-এ্যারেস্টে রেখেছে মাসিমা-মেসোমশাইকে। কেনিলওয়ার্থে শ্রীময়ীদিকে জোর করে ওরা টোপ হিসেবে ইউজ করেছিল আমায় কিডন্যাপ করতে!...’
অমিত অবাক হয়ে বললেন, ‘শ্রীময়ী মানে দিল্লির সেই দিদিমণি? তিনি এখন কলকাতায়, অ্যাণ্ড ইন দা হ্যাণ্ডস অব পি.এম.সি. গ্যাঙ?’
—‘হ্যাঁ। সী ইজ ইন ডেঞ্জার! ওকে এবং ওর ফ্যামিলিকে রেসকিউ করতে হবে।’
অমিত বললেন, ‘আর.এন.সেন রোড বললে? ওটা কি যাদবপুর পি.এস.-এর আণ্ডারে?...আচ্ছা, আমি ও.সি.-র সঙ্গে কথা বলে রাখছি। তোমাকে তুলে তারপর পুলিশ ফোর্স নিয়ে ওখানে চলে যাব। তুমিই রাস্তা দেখাতে পারবে। মিনহোয়াইল টেক কেয়ার! বাই!’ মনে মনে ভাবলেন, ও, ‘সুরা’-র রা হল রাজপুর!
অজয়ের পরাজয়
আর.এন.সেন রোডের নিজগৃহে বন্দি দত্তদম্পতি সেদিন সকাল থেকেই পরিবর্তনটা বুঝছিলেন। পাহারার কড়াক্কড়ি অনেকটা শিথিল লাগছিল। দুষ্কৃতীদের ঘনঘন সেলফোনে বাতচিৎ শুনে শ্রীময়ীর মা ঝর্ণাদেবীর মনে হল, ওদের কিছু কঠিন সমস্যা হয়েছে। আর, ওদের বিপদ মানেই ওনাদের পক্ষে আশা।
অপরাধীরা দোতলায় পশ্চিমের যে ঘরটাতে ওঁদের আটকে রেখেছে, তার জানলার পাল্লাতে ওরা মোটা সেলো টেপ দিয়ে সীল করে সাউণ্ড-প্রুফ করে ফেলেছে। যাতে কোনোমতেই বন্দিরা বাইরের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে, বা চিৎকার করে S.O.S. জানাতে না পারেন এবং কোনোভাবেই বাইরে থেকে কেউ তাঁদের দেখে না ফেলে।
দুপুরের দিকে ঘণ্টা দুয়েক নজরদারি না থাকার সুযোগে রণবীর বাবুর মাথায় আইডিয়াটা এল। সেফটি-রেজার থেকে ব্লেড খুলে ঘোষদের বাড়ির দিকের জানলাটার অনেকটা সেলোটোপ কেটে ফেললেন।
কিন্তু জানলা খোলার আগেই হঠাৎ এক পাহারাদার এসে পড়ল। ভাগ্যে তার হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না সে সময়।
‘এই জেঠু, আপনি তো হেভি খ—র!’ বলে তেড়ে এসে মারল এক ঝাপড়।
মরিয়া হয়ে মি. দত্ত হাতের ব্লেড দিয়ে দিলেন মস্তানের মুখ চিরে।
সে যন্ত্রণায় নিজের মুখে হাত-চাপা দিয়ে বসে পড়ল। গলগল করে রক্ত বেরল আঙুল ভেদ করে।
তার চিৎকার ছাপিয়ে আতঙ্কিত ঝর্ণা দেবী হাঁউ-মাউ করে কান্না জুড়লেন।
লোকটা সামলে ওঠার আগেই রণবীর বাবু কালবিলম্ব না-করে ঘরের মেঝে থেকে টুলটা তুলে সজোরে মারলেন তার মাথার ওপর।
তীব্র ‘আঁক’ শব্দ বেরল তার মুখ থেকে। তারপর সে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল।
কিন্তু তার পকেটের সেলফোন বেজে উঠল জোরে! বাজতেই থাকল...!
ভীষণ চমকে গিয়ে এবং নিজের হঠাৎ দুঃসাহসী এ্যাকশানের প্রতিক্রিয়ায় রণবীর দত্তর নার্ভাস ব্রেকডাউন মতো হয়ে গেল।
তিনি ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন।
তাঁর স্ত্রীরও একই অবস্থা।
এদিকে যখন এইসব ঘটছে, অমিত নিয়োগীও খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
যাদবপুর থানার ও.সি.-র সঙ্গে কথা বলে লাইন কাটতে না কাটতে ওনার সেলফোন আবার বেজে উঠল।
ওপার থেকে পুলিশ কমিশানার বললেন, ‘মি. নিয়োগী, এভরিথিং ইজ রেডি ফর দা ফাইনাল রেইড। রঘুবীরকে থার্ড ডিগ্রি দিয়ে দিয়ে পথে আনা হয়েছে। ও এখন হিজ মাস্টারস হাইড-আউটে আমাদের নিয়ে যাবে। আপনি রেডি থাকুন।’
অমিত বললেন, ‘ওকে, আমি শুধু সুমনাকে পিক আপ করে আনছি রাজপুর থেকে। ও ভিলেনদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে ওর এক বন্ধুর বাড়িতে শেল্টার নিয়েছে।’
পি.সি. বললেন, ‘হ্যাঁ। নির্ভয়ে নিয়ে আসুন লেডিকে। এখন আর কেউ আপনাদের পিছু নেবে না। প্রমিত সেনের দল এখন ছত্রভঙ্গ। সেদিন মৌলালিতে আপনার ওপর হামলার পর টাটা সুমোটা বেশি দূর পালাতে পারে নি। আমরা আরো দুজন দাগিকে ন্যাব করেছি।’
—‘গুড নিউজ, স্যার, আপনাকে এ্যাডভান্স কনগ্রাচুলেশান জানিয়ে রাখি এত বড়ো প্লটারকে ধরার জন্য।’
—‘থ্যাঙ্কস এ্যাণ্ড বাই! গাড়ি ঠিক সাতটায় পৌঁছচ্ছে আপনার বাড়ি।’
এদিকে সাকরেদ ফোন ধরছে না দেখে ঝামেলার আঁচ পেয়ে অজয় শ্রীবাস্তব দোতলায় উঠে এল।
গোটা দৃশ্যটা দেখে একটু স্তম্ভিত হল।
তারপর ‘এক্সকিউজ মি ড্যাড ইন ল’ বলে এগিয়ে এসে চেপে ধরল মি. দত্তর ঘাড়। ঠেলে নিয়ে গেল ভারি আলমারিটার দিকে। নাইলনের দড়ি দিয়ে আলমারির সঙ্গে বাঁধল তাঁকে। ঝর্ণা দেবীকে তারপর বাঁধল খাটের একটা পায়ার সঙ্গে।
এবার অজয় ঝুঁকে পড়ে আহত অচৈতন্য স্যাঙাতের নাকের কাছে হাত দিয়ে দেখল, বেঁচে আছে। জল দিয়ে মুখটা ধুতে হবে।
বারান্দায় গিয়ে সবে বেসিন খুলেছে— সদর দরজায় কলিং বেলের বোতামে পরপর কয়েকবার বলিষ্ঠ চাপ পড়ল। গোটা বাড়ি সে শব্দে ঝঙ্কৃত হয়ে উঠল।
অজয় তৎক্ষণাৎ পকেট থেকে রিভলভার বার করে এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে।
কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে আবার কলিং বেল। সেই সঙ্গে সজোরে দরজায় পদাঘাত এবং কর্কশ চিৎকার শোনা গেল—‘Open the door! দরজা খুলুন! পুলিশ!’
শুনেই শ্রীবাস্তব বুঝল, খেল খতম। দুপুরে বস বলল, বাইরে চলে যাচ্ছে কিছুদিনের জন্য! দ্রুত ভাবতে লাগল, ছাদে উঠে রেনওয়াটার পাইপ বেয়ে পিছনের রাস্তায় নাবা যাবে কি না...
আবার চিৎকার—‘খুলুন দরজা! নইলে আমরা ভেঙে ঢুকব!’
কী ভেবে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামল অজয়।
একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে নিয়ে খুলে দিল দরজা।
তারপর পুলিশ ও গোয়েন্দাদের পাশ দিয়েই ধাক্কা মেরে আচমকা পালাবার চেষ্টা করল।
সুমনা চেঁচিয়ে উঠল, ‘এ-ই অজয়!’
ইতিমধ্যে এক কনস্টেবলকে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল অজয়।
কিন্তু তার মাথায় রিভলভার ঠেকিয়ে ও.সি. বলে উঠলেন—‘হ্যাণ্ডস আপ!’
অমিত দ্রুত ওর প্যান্টের পকেট থেকে আগ্নেয়াস্ত্রটা বার করে নিলেন।
এক মুহূর্তের মধ্যে শ্রীবাস্তবের হাত লোহার বালায় আটকে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যে দত্ত দম্পতিকে বাঁধনমুক্ত করা হল। আহত দুষ্কৃতির সবে জ্ঞান ফিরছিল। তাকেও হাতকড়ি লাগানো হল।
পুলিশবাহিনী এবার অজয়কে দু-চার ঘা দিয়ে রাজি করাল শ্রীময়ী যেখানে আছে, সেখানে নিয়ে যেতে। সুমনা রইল মাসিমা-মেসোমশায়ের দেখভাল করতে। অমিত রওনা হলেন নিজের বাড়ি, পুলিশ কমিশানারের গাড়িতে যেতে হবে ফাইনাল অপারেশানে।
ভাগলবা
বালিগঞ্জ সারকুলার রোডের এই বাড়িটা ম্যাক্সমূলার ভবন থেকে কয়েকটা বাড়ি আগে, বালিগঞ্জের দিক থেকে।
পুলিশের গাড়ি এল তিন দিক থেকে। এ.জে.সি. থেকে একটি ভ্যান ঢুকে তিভোলি কোর্টের বাঁকে আড়াআড়ি দাঁড়াল। একটা রিচি রোডে ঢোকার রাস্তা ব্লক করল। আর একসঙ্গে দুটি জিপ ও ভ্যান আমির আলি এ্যাভেনিউ দিয়ে ঢুকে এগিয়ে এল বাড়িটার সামনে।
পুলিশ কমিশানার, ডিসি সাউথ, তিনজন ইন্সপেক্টর, দু-জন সাব-ইন্সপেক্টর, চার কনস্টেবল এবং একজন মহিলা পুলিশ নামলেন। সেই সঙ্গে, অবশ্যই গোয়েন্দা অমিত নিয়োগী।
সাব-ইন্সপেক্টর ও কনস্টেবলরা ছুটে গিয়ে দরজার দু-পাশে পজিশান নিল। তিন ইন্সপেক্টর উদ্যত রিভলভার হাতে বন্ধ দরজার সামনে গিয়ে বেল বাজাল। তিনবার কলিং বেল টেপার পরও দরজা খুলছে না দেখে লাথি মারা শুরু হল দরজায়। সেই সঙ্গে পুলিশি হুঙ্কার—
কৌন হ্যায় অন্দরমে? দরোয়াজা খোল! এখুনি দরজা খুলুন! পুলিশ!...
খুলে গেল দরজা। দরোয়ান পুলিশ দেখে পরম বিস্মিত এবং সন্ত্রস্ত মুখ করল। তুতলে তুতলে বলল—‘ক-ক্যা হুয়া স-সাব? ক-কুছ গড়বড়...?’
এক ইন্সপেক্টর বললেন, ‘হাউস সার্চ হোগা। অন্দরমে কৌন হ্যায়?’
দারোয়ান ঈষৎ কাঁপতে কাঁপতে জানাল, ‘ম-মা-মালিক, মালকিন, অউর কুছ আদমি, হুজুর! ম-ম-ম্যায় নহি জানতা উনহে!’
ওকে ধাক্কা মেরে একপাশে সরিয়ে দিয়ে পুলিশবাহিনী ভিতরে ঢুকল। দুজন এ.এস.আই বাইরে পাহারায় থাকলেন।
একতলার অনেকটাই পার্কিং লট। একটা নতুন ‘আই-টেন’ দাঁড়িয়ে আছে দেখে অমিত এগিয়ে এলেন সেদিকে।
না, তার ভিতরে কেউ নেই। দরজাও লকড। তবে আরো অন্তত তিন-চারটি গাড়ি সেখানে থাকার কথা। সেগুলো নিয়ে স-সাকরেদ চম্পট দিয়ে থাকতে পারেন সেন সাহেব।
ডিসি-কে সেকথা বললেন অমিত। উনি বললেন, ‘দেখা যাক না বাড়িটা সার্চ করে!’
দোতলায় উঠতেই মনে হল এক কেতাদুরস্ত অফিস। সুদৃশ্য রিসেপশন কাউন্টারে এক স্মার্ট তরুণী বসে আছে কম্পিউটারের সামনে।
পুলিশ দেখে সে চমকে উঠল প্রথমে। তারপর স্থির চোখে চেয়ে রইল।
ডিসি কড়া গলায় তাকে শুধোলেন, ‘হোয়্যার ইজ ইওর বস, প্রমিত সেন?’
সে মুখে কিছু না বলে আঙুল দিয়ে দেখাল কাউন্টারের ডান দিক দিয়ে গন্তব্য পিছনের একটি ঘরের দিকে। তার দরজায় লেখা Managing Director।
মহিলা পুলিশকে রিসেপশানিস্টের পাশে বসিয়ে রেখে এবং অন্যদের অফিসটা ঘুরে সন্দেহজনক কাউকে দেখলে গ্রেফতার করার হুকুম দিয়ে, কমিশানার, ডিসি ও অমিত ঢুকলেন ভারি কাচের দরজা ঠেলে ভিতরের ঘরে। ওঁদের পাইলট হিসেবে এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চের এক স্পেশাল অফিসার অবশ্য উদ্যত রিভলভার নিয়ে আগে আগেই গেলেন।
দেখা গেল ঘর বিলকুল ফাঁকা।
অমিত দ্রুত পায়ে বাথরুমের দরজার দিকে অগ্রসর হতেই ওই অফিসার মি. চাকলাদার সতর্ক করলেন, ‘বি কেয়ারফুল, স্যার, আপনার গানটা রেডি রাখুন!’
অমিত বাঁ হাত তুলে পুলিশ কর্তাদের আশ্বস্ত করে সাবধানে দরজা ফাঁক করে বাথরুমের ভিতর চোখ দিলেন।
‘নো ওয়ান হিয়ার!’ ঘোষণা করে ভালো করে দেখে নিলেন এপাশ ওপাশ, ওপর-নীচ। প্রিভির দরজা খোলা। জানলা পথে পালাবার কোনো চিহ্নও চোখে পড়ল না!
কিন্তু ঘরের মধ্যে ফিরে সকলেরই চোখে পড়ল, টেবিলে পিএমসি লেটার-হেড-এর প্যাড রয়েছে একটা।
তার ওপরের পাতাতেই একটা টাইপড চিঠি, অমিত নিয়োগীকে সম্বোধন করে লেখা।
প্রিয় অমিতবাবু,
আপনারা যখন পায়ের ধুলো দেবেন এই ঘরে, ততক্ষণে আমি এবং আমার প্রিয় সঙ্গিনী এদেশের মাটি থেকে এবং এখানকার আইনের আওতা থেকে অনেক নিরাপদ দূরত্বে চলে গেছি। এই রাউণ্ডের লুকোচুরি খেলায় আপনারাই সাময়িক বিজেতা। কিন্তু ‘আবার আসিব ফিরে’, এ শহর ভুলি কী করে! আবার আমাদের দেখা হবে। হয়তো তখন আপনি জার্সি বদল করতে রাজি হবেন।
যেতে যেতে একটা ধাঁধা দিয়ে যাই:
টেনিস-স্টার আন্দ্রে আগাসি, আর প্রবন্ধকার র্যাল্ফ এমারসন, এঁদের মধ্যে কি কোনো মিল আছে? উত্তরটা ইংরেজিতে দিতে হবে। যদি পারেন, fania@eastwest.com-এ মেইল করলে আমি পেয়ে যাব।
চিয়ার্স—
প্রমিত সেন
অমিত পড়ে, পুলিশ কর্তাদের দেখালেন পাতাটা।
পি.সি. একটু অপ্রসন্ন সুরে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে তো দোস্তি ভালোই মনে হচ্ছে। এইসব ধাঁধার খেলা আপনি এনজয় করেন। আবার উত্তর দেবেন নাকি?’
অমিত বললেন, ‘দেখি, আগে তো সলভ করি।’
ডি.সি. বললেন, ‘দেখুন, তবে ওই ই-মেল আই-ডিটা আমরা লিখে রাখছি। যদি কিছু অনুসন্ধান সূত্র মেলে!’
কমিশানার ঠোঁট উল্টে বিরস বদনে ভাবছিলেন। হঠাৎ হুকুম করলেন, ‘সার্চ দা রুম থরোলি! দেয়াল, ফ্লোর সব কিছু!’
এরপর একঘণ্টা দারুণ কাজ দেখাল পুলিশের লোক।
ঘরের মেঝে প্রতি ফুট ঠুকে ঠুকে দেখতে দেখতে সত্যিই একটা ট্র্যাপ ডোর পাওয়া গেল, চার ফুট বাই তিন ফুট। তৎক্ষণাৎ দুজন দুঃসাহসী লোককে সেই পথে নামিয়ে দেয়া হল এক আণ্ডার গ্রাউণ্ড টানেলে। তারা জানাল সেলফোনে, হামাগুড়ি দিয়ে এগোচ্ছে, মাইনারস হেডলাইট পরে।
এদিকে ঘরের দেওয়াল সার্চ করতে করতে একটা তালাবন্ধ ড্রয়ার পাওয়া গেল। সেটা ভেঙে কিছু কাগজপত্রের সঙ্গে দুটো সচিত্র পাসপোর্ট বেরল। দুষ্কৃতীদের তাড়াহুড়োয় ফেলে যাওয়া। ফটোর সঙ্গে নাম দুটো দুর্বাদল গুহ আর চন্দ্রকণা সেন, যা অবশ্যই ফলস। এতক্ষণে পুলিশ কমিশানারের মুখটা একটু উজ্জ্বল দেখাল। বললেন, ‘These must be the pair we want!’
ডিসি সাউথ বললেন, ‘হ্যাঁ, স্যার, রঘুবীরকে দিয়ে আইডেন্টিফাই করে নিতে হবে।’
বলতে বলতেই টানেলে নামা পুলিশকর্মীরা পি.সি.-কে ফোন করে জানাল, ‘স্যার, সুড়ঙ্গ শেষ হয়েছে থিয়েটার রোডে একটি বাড়ির পিছনের লনে। বাড়িটায় কেউ থাকে না!’
ধাঁধার মধ্যে প্রাণ, একজোড়া pun
বাড়ি এসে ধাঁধার প্রশ্নটা নিয়ে থেকে থেকে ভাবলেন গোয়েন্দা নিয়োগী দু-দিন। কোথায় টেনিস প্লেয়ার আন্দ্রে আগাসি, আর কোথায় দার্শনিক-প্রবন্ধকার এমার্সন। দু-জনের দেশ এক নয়। একজন ফ্রেঞ্চ, একজন আমেরিকান...এমার্সন কি টেনিস খেলতেন, না, আগাসি ‘এসে’ লিখতেন...‘এসে’ কথাটার প্রথমিক মানে ‘চেষ্টা’, সে তো সব মানুষই করে তার নিজের ফিল্ডে।...
হঠাৎ একটা গলার স্বর সুদূর অতীত থেকে তাঁর মনের কানে ভেসে এল। এক খাস সাহেবের গলা: ‘হোয়াটস দা সিমিল্যারিটি বিটউইন আ প্রিন্স অ্যাণ্ড আ ফুটবল?’
তরুণ মি. মেরউইন। ছিপছিপে লম্বা চেহারা। নাকটা টকটকে লাল। তিন মাসের জন্য কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে এসেছিলেন নটিংহ্যামশায়ারের এক কলেজ থেকে টিচার এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে।
প্রশ্নটা কী অদ্ভুত শুনতে— রাজপুত্র আর ফুটবলের মধ্যে মিল কোথায়?
শুনলে মনে হয় এমন কোনো রাজপুত্র যে ঘি-দুধ-মাংস খেয়ে খেয়ে ভুঁড়ি বাগিয়ে খানিকটা ফুটবলের মতো গোল আকার পেয়েছে।
আসলে কিন্তু ব্যাপারটা ইংরেজি শব্দ নিয়ে খেলা, যাকে বলে ‘পানিং’, এবং বাংলায় ‘যমক’ কথাটা খানিকটা তা-ই বোঝায়। মেরউইন সাহেব ‘রেটরিক’ অর্থাৎ অলঙ্কারশাস্ত্র পড়াতে পড়াতে প্রশ্নটা তুলেছিলেন।
এক্ষেত্রে প্রায় সম্মোচ্চারিত কিন্তু সম্পূর্ণ পৃথক দুটি শব্দের সঙ্গে prince এবং football দুটিকেই যুক্তিগ্রাহ্য ভাবে প্রয়োগ করে একটি বা দুটি বাক্য লিখে দেখাতে হবে রাজপুত্র ও ফুটবলের মধ্যে একটা সম্পর্ক কীভাবে তৈরি করা যায়।
উত্তরটা সঙ্গে সঙ্গে অমিতের মনে হল—এবং এটা ইংরেজি ভাষায় না লিখলে হবে না—‘A prince is heir (উচ্চারণ ‘এয়ার’) to the throne, and football is thrown to the air’: এখানে ডবল pun হয়েছে। সমোচ্চারিত কিন্তু ভিন্ন বানান ও অর্থের শব্দজুড়িরা হল heir/air এবং throne/thrown (প্রথম জুড়িতে heir মানে উত্তরাধিকারী আর air মানে বাতাস। দ্বিতীয় জুড়িতে throne মানে সিংহাসন বা রাজাসন, thrown মানে যা ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে)।
প্রমিত সেন যে প্রশ্নটা রেখেছে সেটা অবাস্তব, যুক্তিহীন বলেই মনে হয়। কারণ আগাসি আর এমার্সনের এক সাদা চামড়া ভিন্ন কোনো কিছুতেই মিল নেই। তাদের যুগ ভিন্ন, পেশা ভিন্ন, দেশ ভিন্ন। দুজনে যদি একই ক্যালেণ্ডার ডেটে জন্মে বা মরে থাকে, বা দু-জনের যদি কোনো কমন শখ বা ‘হবি’র কথা জেনে থাকে প্রমিত সেন কোনো উৎস থেকে, সে বিষয়ে অমিত নিয়োগীকে টেস্ট করার কোনো মানে হয় না! আবার লুইস ক্যারলের এ্যালিসের গল্পে পাগলা হ্যাটার যেমন ‘বাদুড় আর লেখার টেবিলের মধ্যে মিলটা কী?’ প্রশ্ন করে নিজেই বলেছে যে কিস্যু মিল নেই, অত বাজে ধাঁধা বলার লোকও প্রমিত নয়।
কাজেই pun-পূর্ণ কিছু উত্তর হতে পারে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমিত ভাবতে লাগলেন।
প্রায় ঘণ্টাখানেক ভাবার পর আইডিয়াটা এল মাথায়।
আগাসি...সার্ভ...ভলি...স্ম্যাশ...আবার সার্ভ—এস সার্ভিস—Ace...Aces
Emerson—thinker—writer—essays...হ্যাঁ, essays আর aces...
তাহলে মিলটা হল—Agassi is famous for his aces, and Emerson is famous for his essays.
অমিতের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটল। পরক্ষণেই মস্তিষ্কে একটা আচম্বিত তরঙ্গ খেলে গেল। মানশ্চক্ষে ভেসে উঠল রবিবারের কাগজে দেখা একটা বিজ্ঞাপন—ACE—তলায় একটু ছোটো টাইপে ‘The Prince of Restaurants’...কোনো সংযোগ আছে কি এই ধাঁধা আর এই রেস্তোরাঁর মধ্যে...!
না, ভাবনায় ভাবনা বাড়ে! অমিত বাথরুমে ঢুকে শাওয়ারের তলায় মাথা পাতলেন...ঘিলুটা একটু ঠাণ্ডা করা দরকার।
তদন্তের অগ্রগতি
দিন পনেরো কেটেছে এরপর। এক জমজমাট ‘মল’-এর ফুডকোর্টে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল অমিতের সঙ্গে ডিসি সাউথ-এর। টুকটাক দু-একটা সৌজন্যমূলক কথার পর উনি বললেন, ‘ভালো কথা, আপনারা পাসপোর্টে যে ফটো পেয়েছেন, তা দেখে রঘুবীর সিং কি বলল?’
ডিসি চওড়া হেসে জবাব দিলেন—‘হ্যাঁ। ওই দুর্বাদলকে বস বলে রেকগনাইজ করেছে রঘুবীর। আর তাঁর পাটর্নারকেও। সুখবরটা আপনাকে দেয়া হয়নি। সরি!’
অমিত বললেন, ‘এনি আদার নিউজ, যা আমাকে বলা চলে?’
ডিসি আবার গর্বিত ভঙ্গিতে হাসলেন, ‘রেড কর্নার নোটিশ চলে গেছে ইন্টারপোলে! বাছাধন যেখানেই থাকুন, শান্তিতে থাকবেন না! ধরা পড়তেই হবে!’
অমিত বললেন—‘গুড! তবে আমার মনে হয়, আপনার বাছাধন ইজ সামহোয়্যার ইন দিস ভেরি সিটি!’
—‘আপনার এমন ধারণার কারণ?’
—‘কয়েকটা কারণ আছে। যেমন ধরুন আম্বানি প্যালেস থেকে হিরের নেকলেস চুরির ঘটনা। তারপর সাউথ সিটিতে ক্রকারির দোকানে পটকা ফাটিয়ে যে ভাবে ওই ফ্লোরেই মোবাইল শপ থেকে চল্লিশ লাখের মাল লুট করা হয়েছে গত সপ্তাহে...’
—‘আপনি বলছেন, এর পেছনে পি.এম.সি. আছে?’
—‘কোয়াইট লাইকলি। আরো কিছু ক্লু আমি পেয়েছি। আই এ্যাম ওয়ার্কিং অন ইট। আপনাকে দুদিনের মধ্যে হয়তো জানাতে পারব। একটা কাজ করবেন, প্লিজ! ছবি দুটোর এনলার্জড কপি আমাকে পাঠাতে পারবেন আর্লি টুমরো?’
ডিসি বললেন, ‘তা পেয়ে যাবেন। কিন্তু ওয়াটসনের মতো আমাকে বেশিক্ষণ আঁধারে রাখবেন না! আফটার অল, আমাদের সাহায্য ছাড়া আপনিও শেষরক্ষা করতে পারবেন না!’
—‘একশোবার! আপনাদের শরণার্থী আমি হাজার বার হব, হুজুর!’
হাসিমুখে বিদায় নিলেন অমিত নিয়োগী।
নিজের বাড়ি এসে ডোর বেল বাজাতেই ভিতর থেকে হাউ! হাউ! হাউ!
সারমেয়-গর্জন শুনে ভ্রু কোঁচকালেন গোয়েন্দা নিয়োগী।
দরজা খুলতেই দেখলেন সুমনা, তার পাশে এক সাদা ল্যাব্রাডর। তার মাথা চাপড়াতে চাপড়াতে ঘরের ভিতর এনে অমিতকে ঢুকতে দিল সুমনা। বলল, ‘জিন্টা, মিট স্যার করমচাঁদ! ওয়েলকাম মাস্টার অব দা হাউস!’ কুকুরটি আর একবার ‘ঘাউ’ বলল, যেন, সরি, আপনাকে সন্দেহ করার জন্য।
অমিত সহাস্যে দু হাত তুলে বললেন, ‘ওয়েল, বেবি, আই সারেণ্ডার!’
কয়েকবার তাঁকে শুঁকে নিয়ে জিন্টা বুঝে গেল অমিত নিয়োগী লোকটা ভালো। দুজনের ভাব হয়ে গেল।
একটু বাদে সুমনা শুধাল, ‘প্রমিত সেনের হোয়ারএ্যাবাউটস কিছু জানলেন নাকি, স্যার?’
—‘একটি গেস করছি। ক্ষীণ একটা নিশানা পাওয়া গেছে...ভেঞ্চার করে দেখতে হবে। তার আগে ডিসি সাহেবের কাছ থেকে জিনিসটা আসা চাই!’
সুমনা দু-চোখ বড়ো করে বলল, ‘কী জিনিস? আপনি আমায় আজকাল কিছুই বলছেন না!’
অমিত ওকে সাসপেন্সে না রেখে বললেন, ‘জিনিসটা হল প্রমিত সেন ও তাঁর সহচরীর পাসপোর্ট থেকে পাওয়া ফটোগ্রাফ। আমি এনলার্জ করে দিতে বলেছি।’
—‘ও, সেই যেটা পুলিশ বালিগঞ্জ সারকুলার রোডের বাড়িতে পেয়েছিল?’
—রাইট! প্রথমে আমার দেখতে হবে, ওদের যে মুখ পাওয়া যাচ্ছে, তার ওপর খানিকটা ডিজগাইজ করলে কেমন দেখায়। তোমার তো স্কেচের হাত ভালোই। কয়েকটা কপি করে দেখতে হবে, সেন সাহেবের মুখ ক্লিন-শেভড কেমন, দাড়ি-গোঁফ দুইই থাকলে কেমন, শুধু গোঁফ বা ফ্রেঞ্চ কাট কম্বিনেশান, পরচুল, পরটাক, এসব পরালে কেমন হতে পারে, আইডিয়া করে নিতে হবে। কারণ, আমার বিশ্বাস উনি এই শহরেই আছেন এবং অবশ্যই ছদ্মবেশে। তুমি কাল আমার এখানেই লাঞ্চ করবে। সকালেই সম্ভবত আমার হাতে ফটো এসে যাবে!’
সুমনা তখনো ভীষণ অবাক গলায় বলে, ‘কিন্তু মেলাবেন কার সঙ্গে? তাঁকে কোথায় পাচ্ছেন?’
অমিত ফিকে হাসলেন, ‘ওই যে বল্লুম ক্ষীণ নিশানা! প্রায় অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়া! আমি যেটুকু ভাবছি, সব তোমায় কাল বলব।’
—বেশ, তবে এখন গুড নাইট!’
অমিত বললেন, ‘ভেরি গুড নাইট! জিন্টা, গার্ড হার ওয়েল।’ বলে তার সাদা মাথাটা ডান হাতে আলতো মাসাজ করে দিলেন।
অনুসন্ধানের তোড়জোড়
ভোর থেকে মেঘলা ছিল। প্রত্যাশিত একটা মুখ ‘সিল’ করা খাম দিয়ে গেল অমিতকে ডিসি-র ড্রাইভার পুরন্দর। লোকটার চেহারা দেখে বেশ চালাক চতুর মনে হয়। অমিতকে হালকা সল্যুট করে বলল, ‘সাহেব বলেছেন, জিনিসটা পেয়ে আপনি যেন ফোন করে জানিয়ে দেন।’
‘হ্যাঁ ভাই, করে দেব এখনি!’ দরজা বন্ধ করে নিজের কাজের টেবিলে এসে বসলেন অমিত। সকাল ন-টা পাঁচ। যথেষ্ট দিনের অলো ঢুকছে ঘরে। তবু টেবল-ল্যাম্পটা জ্বেলে খাম খুলে বার করলেন ফটো দুটো। মনসার-টা কয়েক সেকেণ্ড দেখেই সরিয়ে রাখলেন। প্রমিতের মুখটা বেশ কিছুক্ষণ তন্ময় হয়ে নিরীক্ষণ করতে করতে কিছু ভাবনার বুদ্বুদ উঠল মনে...
সেই কলেজের দিনগুলোয় ফিরে গেলেন...সেই মি. মেরউইনের ক্লাস...অমিতের নেমসেক, মানে সমনামা সেই ক্লাসমেট...সে তো সেনই ছিল! অমিত সেন!...ও মাই!! সে কি তবে প্রমিতের দাদা? বেশ একটা মিল পাওয়া যাচ্ছে ফেস-কাট-এ...যদিও তার সঙ্গে তেমন ইন্টিমেসি ছিল না অমিত নিয়োগীর। কোথায় বাড়ি তাও জানতেন না! কিন্তু হাইটটা একটু কম ছিল মনে আছে...পাঁচ-চারের বেশি নয়!...
অমিত ভাবতে লাগলেন, যদি ভায়ের মতোই প্রমিতের চেহারা একটু ক্ষয়াটে হয়— just in case—একটু সুবিধে হবে মুখের সঙ্গে মিলিয়ে গেস করার...ভাবতে ভাবতে নিজের প্রিন্টারে প্রমিতের ছবির পাঁচটা কপি আর সঙ্গিনীর তিনটে কপি করে রাখলেন অমিত।
সুমনা এগারোটার একটু আগেই এল। একাই। মুখে চাপা উত্তেজনা। নিজে থেকে কিচ্ছু প্রশ্ন করল না ঝাড়া পাঁচ মিনিট। অমিতই তারপর বললেন, শোনো তাহলে প্ল্যানটা!
কীভাবে ধাঁধাটা সলভ করেছেন, সেটা প্রথমে সুমনাকে জানালেন অমিত। তারপর বললেন, ‘আমার মনে হয় এই ধাঁধার চালাকি করতে গিয়ে প্রমিত সেন একটা ভাইটাল ক্লু আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন!’
সুমনা সবিস্ময়ে বলে, ‘কি রকম?’
অমিত বললেন, ‘কলকাতার ACE রেস্টুরেন্ট-কাম-বার পি.এম.সি.-র আসল কর্মকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে আমার সন্দেহ। প্রমিতবাবুর সঙ্গে ACE-এর সম্পর্ক সরাসরি মালিকানার হতে পারে, বা অন্যরকম। আবার আমার এই সন্দেহ সম্পূর্ণ ভ্রান্তও প্রমাণিত হতে পারে।...হয়তো wild goose chase! তবু সেখানে তাকে—সম্ভবত ছদ্মবেশে—দেখার ক্ষীণ আশা নিয়ে আমি ওই রেস্তোরাঁয় নিজে কিছুদিন ভিজিট করব!’
সুমনা এতটা শুনে লাফিয়ে উঠে বলল, ‘আমাকেও নিয়ে যাবেন তো?’
—‘না, তোমাকে দেখলে ও সতর্ক হয়ে যাবে। ইটস আ ডেনজারাস গেম!’
সুমনা বলল, ‘সে তো আপনাকে দেখলেও একই ফল হবে!’
অমিত বললেন, ‘আমি নিজের চেহারায় যাব না! এক-একদিন এক-একরকম রূপ ধারণ করব। কোনদিন কোন ডিসগাইস নেব, সেটা তোমাকে জানিয়ে যাব, যাতে আমার কিছু হলে তুমি ডিসি সাউথকে এ্যালার্ট করতে পারো।...এইবার এই ফটো দুটো দেখো ভালো করে। বিশেষ করে ধাঁধাগুরুরটা। তারপর, প্যাড আর স্কেচ পেন রেখেছি, কয়েকটা ডিসগাইস করিয়ে দেখতে হবে এই মুখে। প্রথমে যথাসম্ভব যেমন মুখ তেমনি পাঁচটা কাগজে ড্র করো। কতক্ষণ লাগবে তোমার?’
—‘দেড়-দু ঘণ্টার মতো লাগবে।’
—‘আচ্ছা। তাহলে একটি আঁকার পরই আমরা লাঞ্চটা সেরে নেব। কাজগুলো তারপর ধীরে-সুস্থে করো। তুমি আঁকো, আমি একটু নিজের ছদ্মবেশ নিয়ে ভাবি।’
দুজনেই যে যার কাজে ব্যস্ত। ঘর নিস্তব্ধ।
প্রায় মিনিট কুড়ি বাদে অমিতের মা ঘরে ঢুকে বলে উঠলেন—‘কী রে, তোরা খাবি কখন?’
সুমনা বলল, ‘হ্যাঁ, মাসিমা, আমি রেডি। দু-মিনিট!’
মাসিমা হেসে বললেন, ‘আমার কিন্তু দু-ঘণ্টা ধরে রাঁধতে হয়েছে। এ তোমার নুডলস নয়!’
উনি ভিতরে চলে যেতেই সুমনা উঠে পড়ল কাউচ থেকে। অমিতের ইজিচেয়ারের সামনে এসে স্কেচ-প্যাডটা ওঁর চোখের সামনে মেলে ধরল।
উজ্জ্বল হয়ে উঠল গোয়েন্দার চোখ। সপ্রশংস গলায় বললেন, ‘বা:! জাস্ট লাইক হিম!...আমি এতক্ষণ ভেবে দেখলাম, প্রথম ইভনিং-এ দাড়ি-গোঁফ হালকা রাখব, একটি লাল টুপি থাকবে মাথায়, ব্রাউন স্যুট। একটি সিঙ্গাপুরি লুক...চলো, এখন ডাইনিং টেবলে। খালি পেটে ব্রেনটা তেমন খেলছে না। চিংড়ির ঘিলু চুষলে ইমপ্রুভ করতে পারে!’
পরিকল্পনা মতো সুমনাকে নিয়ে সারাদিন ভিলেনের নানা ছদ্মমুখ আঁকালেন অমিত। সুমনা নিজে থেকে গগলস-পরা একটা ভার্সানও করল। মনসার মুখটাও দুরকম স্টাইল ও কালারের উইগে সাজাল।
অমিত অকৃপণভাবে তারিফ করলেন ওর হাতের কাজের। বললেন, ‘আশা করি তোমার এতো toil and fancy বৃথা হবে না! ...অবশ্য দুটো জিনিস খুব বড়ো হ্যাণ্ডিকাপ, যদি এরা আমার আন্দাজমতো ACE-এ আসেও!’
সুমনা সমঝদারের মতো মাথা নেড়ে বলল—‘টুপি?’
‘ইয়েস, টুপি আর হাইট। এ-দুটো প্রিসাইসলি জানা থাকলে অনেক ছোটো করে ফেলা যায় সন্দেহের গন্ডিটা। খুঁজে বার করার চান্স বেড়ে যায়। কী আর করা! আমি কাল থেকেই চেষ্টা শুরু করছি।’
—‘বেস্ট অব লাক! মি. সিঙ্গাপুরি! কাঁচকলার বেশে ধোঁকা দিয়ে এক্সপোজ করে দিন ধাঁধাবাজ ধান্ধাবাজটাকে!’
গোয়েন্দা ও পুলিশের যুগলবন্দি
এরপর একুশ দিন কেটে গেছে। ইতিমধ্যে মুম্বইয়ের পশ্চিম বান্দ্রার ফ্ল্যাটে মনসাকে স্পট করেছে সিআইডি এবং চব্বিশ ঘণ্টা তার ওপর নজরদারি চলেছে।
আজ এক শনিবারের সন্ধ্যা। রাত সবে দশটা। বেশ উপভোগ্য ঠাণ্ডা ডিসেম্বরের কলকাতায়। ACE-এর সব কটা টেবল বুকড। বাইরে থেকে ডাইনিং হলে ঢুকে সবচেয়ে দূরের দেয়াল ঘেঁসে যে দুটো কেবিন, তার একটাতে এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক ও এক সুগঠনা তরুণী। ভদ্রলোকের গায়ে ঘি রঙের ট্রাউজারের ওপর চকোলেট-কালার কোট, তাতে হালকা সোনালি স্ট্রাইপ। কাঁচা-পাকা দাড়ি গোঁফ। মাথায় হালকা গ্রে হ্যাট। তরুণীর চুল কাঁধ অবধি ছাঁটা ও পার্লারে শ্যাম্পু করে ফোলানো। পরনে নীল জিনস, বাসন্তী রঙের জ্যাকেট। অপরাজিতা রঙের লিপগ্লস। সব মিলে যেন বলিউডি নায়িকা।
ওদের সামনে টেবিলে কফি আর হংকং নুডলস। কিন্তু খাবার দিকে মন নেই। চোখ রয়েছে পর্দার ফাঁক দিয়ে ডান দিকে dais-এর ওপর, যেটা অনেক সময় dance floor-এর কাজ করে। বাঁ দিকের অন্য dais-এ মিউজিশিয়ানরা হিন্দি ফিল্মের সুরে অর্কেস্ট্রা বাজাচ্ছে।
চকোলেট-কোট ভদ্রলোক অবশ্যই অমিত নিয়োগী। তাঁর সঙ্গিনী ক্রাইম ব্র্যাঞ্চের কুং ফু ট্রেনার, কুনিকা সিং। অমিত তাকে বললেন—
‘ডায়াসের সেন্টার টেবলে দু-জনকে দেখছ। হেনা-ডাই চুল, ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি, ওই হল প্রমিত সেন। পাসপোর্টের ফটোর সঙ্গে ওর বিশেষ মিল নেই। কারণ ও ইতিমধ্যে প্লাস্টিক সার্জারি করে নাকের শেপটা বদলেছে, আর চোখে ব্রাউন কনট্যাক্ট লেন্স ইউজ করছে!’
‘বাট, স্যার, আপনি সিওর হলেন কী করে?’
‘এই সব খবর জোগাড় করতেই বেশ কিছু দিন কেটে গেল আমার। পুনে থেকে এক ইনফর্মার জানিয়েছিল ফটোর মতো চেহারার একজনকে সে ওখানে দেখেছে ঠিক চার সপ্তাহ আগে। তারপর আর ট্রেস করা যায় নি। আমার instinct বলছিল ও একটা চেহারা বদলের চেষ্টা করবে। তাই পুনের সব কটা বড়ো প্ল্যাস্টিক সার্জনকে কনট্যাক্ট করে ওই সময়ের কাছাকাছি সার্জারি পেশেন্টদের লিস্ট করা হল। মহারাষ্ট্রের ইনভেসটিগেটিং অফিসার মি. পাটিল কনফার্ম করেছেন, ড. কনেরিয়া প্রমিতের নাকে প্লাস্টিক সার্জারি করেন। অবশ্যই সে এসেছিল ছদ্মনামে—নির্মল সহায়। কিন্তু ডাক্তারের কাছে pre-operation এবং post-operation দুটি ছবিই ছিল। তার থেকে print out নেয়া হয় আমার নির্দেশে। আমার মনে হয়েছিল নাকটাই বাদলাবে ও। কারণ এই অল্প সময়ে গোটা মুখের প্লাস্টিক সার্জারি করা যেত না এবং রেড এ্যালার্ট বেরলে সব হসপিটাল ও নার্সিং হোম তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়, সে জানে।...একে লাস্ট উইকে দুদিন ACE-এ দেখেছি লেট নাইটে আসতে। আমার অ্যাসিস্টান্টের করা স্কেচে মাথাটা হেনা আর আই-বল ব্রাউন করে দেখে আমি সিয়োর হলাম...’
সাইলেন্ট মোডে রাখা মোবাইলটা কেঁপে উঠতেই অমিত কানে তুললেন। ওদিক থেকে ডিসি সাউথের গলা—323। অমিত পাল্টা সাংকেতিক উত্তর দিলেন— ইয়েস, পোপ। ডিসি জানিয়ে দিলেন তাঁর বাহিনী ACE ঘিরে ফেলেছে। সবচেয়ে আগে রেস্তোরাঁর ভিতর ঢুকছেন ডিটেকটিভ সার্জেন্ট কুন্দন বল, প্লেন ড্রেসে, তাঁর সেল নাম্বার...
অমিত সঙ্গে সঙ্গে সেই ডিজিট টাইপ করে নিয়ে বললেন, 323; জবাব এল, Pope, approaching target!
মনসার ওপর পুলিশের নজরদারির কথা আগেই বলা হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গে পাঠককে একটু আপডেট দেয়া দরকার।
যে রাতে ACE রেইড করছে পুলিশ তার আগের দিন, অর্থাৎ একুশে ডিসেম্বর, সে বোরখা পরে বেরোয়। পুলিশের জিপ তার ট্যাক্সিকে ফলো করে। স্টেশান ও এয়ারপোর্টকে এ্যালার্ট করা ছিল। মনসার গাড়ি কিন্তু সেসব জায়গায় যাবার চেষ্টা করল না। এদিক সেদিক ঘুরে, লুকোচুরি খেলে, শিবাজি পার্কের কাছে এক চত্বরে থামল। সেখানে কিছু বোরখা পরিহিতা মুসলিম রমণী জমায়েত হয়ে সভা করছিলেন। তাদের ভিড়ে মনসা বেমালুম মিশে যায়।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ইন্সপেক্টর রবি শর্মা ও হাবিলদার সজ্জন আলি দেখে, একজন বোরখা-পরা মহিলা জটলা থেকে বেরিয়ে ডান দিকের রাস্তা ধরে দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ তার পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে ধরে ফেলে তারা। দু-মিনিট লেগে যায় ধমকা-ধমকি এবং জোর করে তার মুখের ঢাকা খোলাতে। রাস্তায় লোকও জমে যায়।
পুলিশ দুটিকে প্রাণে বাঁচতে শেষ পর্যন্ত দৌড়ে গিয়ে জিপে উঠে পালাতে হল। কারণ, বোরখার ভিতর ছিলেন আয়েষা খাতুন নামে এক খাঁটি মুসলমান রমণী। মুখ বে-আব্রু হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজে যেমন বেপরোয়া জবান চালালেন, তেমনি জনতাও পুলিশ পেটানোর জন্য মুখিয়ে উঠল!
ততক্ষণে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে সটকে পড়ল মনসা। কিন্তু ওই জটলার চত্বরে সে ফেলে গিয়েছিল তার সেলফোন। সেটা পুলিশ জিপের ড্রাইভার তুলে নিয়েছিল। তা থেকে যে নম্বরে ফোন করা হয়েছে, সেটা ট্যাপ করে বোঝা গেল, প্রমিত সেন কলকাতাতেই। ইনফ্যাক্ট, তার লাস্ট এস.এম.এস. ছিল—CU@A22 ।
শেষ অঙ্ক শেষ দৃশ্য
পরবর্তী দু-তিন মিনিটে একটা রোমহর্ষক এনকাউন্টার দৃশ্য দেখা গেল।
শার্ট-ট্রাউজার পরা মনসা গাঙুলি—মাল্টিকালার চুলে মাথাটা অদ্ভুত দেখাচ্ছে—মেইন ডোর দিয়ে ঢুকে চকিত দৃষ্টিতে চারদিক দেখে নিয়ে ডায়াসের দিকে এগোল।

কুন্দল বলের সাইড কিক প্রায় উড়ন্ত প্রমিত সেনের তলপেটে লাগল...সজোরে আছড়ে পড়ল দেহটা কাঠের পাটাতনে ।
কুন্দন বলও এগোলেন একই লক্ষ্যে।
চকিতে প্রমিতের একটি চোখ ঝিলিক মেরে উঠল সতর্ক আশঙ্কায়।
পরমুহূর্তে পরপর তিনটি গুলির আওয়াজ কাঁপিয়ে দিল অষ্ক্রষ্ক এর অভ্যন্তর। প্রথমটা কুন্দনকে লক্ষ্য করে প্রমিতের। দ্বিতীয়টা তৎক্ষণাৎ মনসার রিভলভার-ধরা হাত লক্ষ্য করে অমিত নিয়োগীর। আর তৃতীয়টা আবার প্রমিত সেনের রিভলভার থেকে অমিতকে লক্ষ্য করে।
কুন্দন বলের বুকে বুলেট-প্রুফ প্লেট লাগানো ছিল। উনি ছুটে আসতে আসতে ডায়াসের ধারে ভল্ট মেরে উঠে ‘ডাক’ করলেন পরবর্তী গুলি এড়াতে।
অমিত দু-ইঞ্চি সরার সময় পেয়েছিলেন। গুলি তাঁর কোটের বাঁ-কাঁধের ওপরে খানিকটা কাপড় পুড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল!
এরপরই প্রমিত এক লাফে বেরিয়ে যেতে চাইছিল ডায়াসের বাঁ-দিক দিয়ে পাশের লন-এ, অর্থাৎ পার্কিং লটে।
কিন্তু কুন্দন বল কমব্যাটটা ভালোই জানেন। ঠিক সময় তাঁর সাইড কিক প্রায় উড়ন্ত প্রমিত সেনের তলপেটে লাগল। দু-বার পাক খেয়ে সজোরে আছড়ে পড়ল দেহটা কাঠের পাটাতনে।
ততক্ষণে অমিত ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে এক মোক্ষম প্যাঁচে পিন ডাউন করে রাখলেন। তারপর কুন্দন এসে ভিলেনের হাতে হাতকড়া পরালেন।
ইতিমধ্যে ডিসি সাউথ এবং স্বয়ং পুলিশ কমিশানার আট-দশ জন পুলিশ সহ ঢুকেছেন। পি.সি. শূন্যে একটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে চেঁচিয়ে উঠলেন—যে যার জায়গায় দু হাত তুলে দাঁড়ান। একদম নড়বেন না। পালাবার চেষ্টা করলেই ফায়ার করবে পুলিশ। ...নির্দোষ লোকের কোনো ভয় নেই...আমরা শুধু ডেঞ্জারাস ক্রিমিনালকেই ধরব। তারপর সবাই ফ্রি টু গো হোম!
কুন্দন বলকে যে সার্জেন্ট পিছন থেকে ‘কাভার’ করছিলেন, তিনি পিস্তলের বাঁট দিয়ে সতেজ আঘাত হেনেছিলেন মনসা-র মাথায়। জ্ঞান ফেরার আগেই তার হাতেও হ্যাণ্ড-কাফ লাগানো হল।
অমিত তার বুকের ওপর থেকে উঠে দাঁড়াবার পর, প্রমিত সেন একটা অদ্ভুত রাগ, ঘৃণা ও বিষণ্ণতা মাখা চোখে তাকিয়ে শুধু বলল—
‘ড্যাম ইউ! পাজলটা আপনাকে দেওয়া একটা বিরাট ভুল হয়েছিল। কিন্তু সেটা বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেল!’
অমিত বললেন, ‘অ্যায়াম সরি! আপনি হাইলি ট্যালেন্টেড পার্সন। বাট আ ক্রিমিনাল ইজ আ ক্রিমিনাল। আর, ট্যালেন্টেড ক্রিমিনালদের ওভার-কনফিডেন্স অনেক সময় তাদের পতনের কারণ হয়। আপনার ক্ষেত্রে ঠিক তাই হয়েছে। প্রমিত বাবু, নিজেকে জগতের সেরা বুদ্ধিমান ভাবাটা প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয় না!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন