হামিরউদ্দিন মিদ্যা
ঘুটঘুটে আঁধার রাত। নামোমাঠের মুড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে যে শিয়ালগুলি চরতে নেমেছে, আকাশের দিকে মুখ তুলে ডাক দিয়ে জানান দেয় রাত্রির গভীরতা। জিওলনালার ঢিবির উপর আদ্যিকালের শিরীষগাছে প্যাঁচা ডেকে উঠে। উত্তর থেকে পাগলের মতো হাওয়া বইছে হু হু করে। গাছের টুগডালে লাগতেই কড়িশিমের মতো শুকনো ফলগুলি বেজে উঠে, ঝুমঝুম ঝুমঝুম। কুঁড়েঘরের ভেতর হ্যারিকেনের ক্ষীণ আলোটুকুর নিদেন অবস্থা। চাপ চাপ জমাট বাঁধা আঁধার কেলে সাপের মতো ফণা তুলে আছে কুঁড়ের দোরগোড়ায়। সলতেটা সামান্য উসকে দিতেই ফণা নামিয়ে সড়সড় করে মাঠের দিকে পালাল। হ্যারিকেনটা দপ করে জিভ বাড়িয়েই যখন পুরে নিল মুখে, তখন সুযোগ পেয়ে ছুটে এসে ছোবল মারল কুঁড়ের ভেতর। দখল করে নিল নিজের আসনটুকু। কী নিকষ কালো আঁধার রাত!
কুঁড়েঘরের ভেতর কান খাড়া করে বসে আছি। ভটভট করে পাম্প চলছে ধানবাড়িতে। হঠাৎ শব্দটা কেমন বদলে গেল। অনেক সময় বোঝা যায় না, জোরে হাওয়া দিলে শব্দের হেরফের হয়। তবুও দেখে আসা ভালো। হাতড়ে হাতড়ে টর্চটা খুঁজলাম। কুঁড়ের ভেতরে মোটা করে খড় বেছানো আছে, তার উপর খেজুরপাতার ছেঁড়া তালাই। আব্বা ভং ভং করে ঘুমোচ্ছে। শিথান পাশে বসে আছি আমি। সন্ধে থেকে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি। জেগে উঠতেই, আব্বা তুমি এবার শুয়ে পড়ো, আমি বসি। — বলেছিলাম তখন।
আব্বা আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিল, দেখবি খোকা, ঘুমিয়ে যাস নাকো, ঘুম ধরলে আমাকে উঠুবি।
হ লাও, উঠোব। তুমি শুয়ে পড়ো।
দুইজনে একসঙ্গে ঘুমোলে আর পাম্প চালাতে হবে না। কাদায় ফাটল ধরে কখন যে হাওয়া টেনে নিবে তার ঠিক নেই। হাওয়া ধরে গেলেই পাম্পটা পানি ছেড়ে দিবে তখন। খালি মুখে চলতে চলতে চায়না ইঞ্জিন গরম হয়ে শেষ হয়ে যাবে। তাই জেগে থাকা।
আব্বাকে উঠোবুনি আর, আমি একলাই যাব — মনে সাহস বাড়িয়ে কুঁড়ের বাইরে বেরোলাম। আকাশের অনেক উঁচুতে তারা ফুটেছে দু-একটি। কেলে সাপটা জিভ বাড়িয়ে তারার মিটমিটে আলোটুকুও শুষে নিচ্ছে। পুবের আকাশের পানে তাকালাম, এখনও ফর্সা হয়নি। জিওলনালার শুকনো খালে দুটো শিয়াল টর্চের আলোয় থমকে দাঁড়াল খানিক। চোখগুলো জ্বলজ্বল করে উঠল। হেঁট হয়ে যখনই ঢিল কুড়োতে গেলাম, অমনি ভিং ভিং করে দৌড় মারল। ঢিবির পাশে আঁকড়, শিয়াকুল, বেঁচঝোপে জোনাকির নাচ। ভিজে মাটির গন্ধটা ছড়িয়ে পড়েছে মাঠময়। নাকের ভেতর সোঁদা গন্ধটা ঢুকতেই সতেজ হয়ে উঠল মনটা।
কী আঁধার রাত রে শালা, চারিচুম্নে আঁধার! — ধু-ধু মাঠের পানে তাকালাম। এমন রাতেই আশমান থেকে পরিরা নেমে আসে মাঠে। শরীরে একটাও পোশাক থাকে না, কচি লাউয়ের মতো হিলহিলে গড়ন। সারা গায়ে কী আশ্চর্যি জ্যোতি জ্বলে! — গাবান পাড়ার কাঁদু সেখ দেখেছিল একবার। বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল মাঠে। আমার চোখে কোনোদিন পড়েনি। কথাটা ভাবতেই গা-টা শিরশির করে উঠল।
জমির আলের মাথায় কবরের মতো ঢিবি হয়ে আছে যেখানটা, ওর পাশেই পোঁতা আছে শ্যালোটা। পায়ে পায়ে পাম্পটার কাছে গেলাম। এই ফাটল ধরেছিল, পানি ছাড়তে আর কতক্ষণ! টর্চটা জ্বেলে মুখে করে ধরে দুই হাত দিয়ে কাদা লেপলাম শ্যালোর গোড়ায়, নরম কাদা। পানির বেগ যেমনকার তেমনই, গোরুর মুতের মতো ছ্যাড়ছ্যাড় করে পড়ছে। শালার ব্যাটা শালা চাষ করেছে, দুনিয়ায় এত কাজ থাকতে শালার খালি চাষের নেশা! — যত রাগ আব্বার উপর ঝরে পড়ল।
আব্বাকে বীজতলা করতে দেখে দাদো বলেছিল, তুই কী খ্যাপা হয়ে গেচিস সামেদ? ক্যানেলে পানি ছাড়বেনি, বীজতলা করচিস যে?
আব্বা বলল, সে সুময় হলেই দেখতি পাবে। বোরোতে চাষ না করলে খাব কী? আমার তো বর্ষায় চাষ করার নিজের জমি নাই। বোরোতে যদি ধান না লাগায়, তাইলে ছেলেপুলে লিয়ে না খেতি পেইয়ে মরতি হবেক!
আব্বার কথা শুনে দাদোর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। দাদোকে ভালোই ঠোকাটা দিল আব্বা। শালা বুড়োতে গেল, এখনও জমিগুলো বাপ-কাকাদিকে ছাড়ল নাই। বুড়ো বয়েসেও রস কত!
এ বছর অনাবৃষ্টির ফলে দামোদর শুকনো খটখটে। মাইথনের ড্যামে পানি কম। ডি.ভি.সি আগেই ঘোষণা করে দিয়েছে ক্যানেলে পানি দিবে না। মাঠগুলো খাঁ খাঁ করছে। পানি ছাড়লে মাঠকে মাঠ সোনা ফলে যায়। গাঁয়ের বড়ো চাষিরা বোরোচাষে অনেক জমিই টাকা নিয়ে চাষ করতে দিয়ে দেয়। আড়াই-তিনহাজার টাকা বিঘেয় জমি পাওয়া যায়। সেই সুযোগটাকে আব্বার মতো ভূমিহীন চাষিরা লুফে নিয়ে নেমে পড়ে মাঠে। কিন্তু এ বছর দ্যাখো, কুনু শালার শ্যালোয় চাষ করার মুরোদ নাই, সব লেজ গুটিয়ে পগারপার! রাজমিস্ত্রির লিবার খাটতে চলে যাচ্ছে, নয়তো দুর্গাপুরের কারখানায়। হিম্মত তাইলে আব্বারই আছে বলতে হয়, চাষির ব্যাটা চাষি! — আব্বার জন্য গর্ববোধ হল।
ধানবাড়ির দিকে তাকাতেই একরাশ ভাবনা অজগরের মতো পেঁচিয়ে ধরল আমায়। ধানগুলো হবেক তো? শালার জমিতে কুনুমতে পানি রাখা যাচ্ছে নাই। আজ পানি দিলে পরের দিনই শুকিয়ে ঠাঁ ঠাঁ। কী করে যে গাছগুলো বড়ো হবেক!
খোকা, অ্যাই খোকা-আ, কুথায় গেলি রে?
হা দেখ-অ, আব্বা উঠে পড়েছে। আমি পাশে নেই, অমনি ঘুম ভেঙে গেছে।
যাচ্ছি-ই — বলে সুড়সুড় করে কুঁড়ের ভেতর ঢুকলাম। বাঁশ আর খড় দিয়ে দুই বাপ-ব্যাটায় বানিয়েছি কুঁড়েঘরটা। শ্যালোয় চাষ, সময়গুলো মাঠেতেই কেটে যায়।
পানি ছেড়ে দিইল না কি রে খোকা?
না আব্বা, এই ফাটল ধরেছিল। আমি শব্দটা শুনেই বুজতি পারলাম, তাই দেখে এলাম একবার।
ভালো করে কাদা লেপেচিস তো?
হ আব্বা, লেপেচি। পাম্পটা সেই থেকে চলছে, অনেক গরম হয়ি গেছে। জিরেন দিবে নাই?
তুই শুয়ে পড় খোকা, আমি টর্চটা লিয়ে ঘুরে আসি। দেখি জমিতে কতটা পানি বুলল।
চলও আব্বা, আমুও যাব।
তুই রাত জাগিস নাকো। শুয়ে পড়।
আমার ঘুম ধরেনি আব্বা।
ধুর খ্যাপা! চ তাইলে।
হাঁটতে হাঁটতে লুঙ্গির কোঁচড়ে গোঁজা বিড়ি বের করে মুখে নিল আব্বা। ঠক করে শব্দ। আব্বার মুখে আগুন। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ছেলেবেলায় কুঁড়েঘরে কত রাত কাটাইচি জানিস? তখন রাতগুলো মাঠেই কেটে যেত। তুর বড়ো কাকা আর আমি সারারাত আলাপালি করে জেগে থাকতাম। ‘আড়াখাল’ করতাম মাঠে। পাহারা দিতে হত। নাইলে সব মাছ হাপিস!
এখন কেউ আড়াখাল করে না কেনে আব্বা?
এখন মাঠে মাছ কুথায় পাবি? কীটনাশক দিয়ে স্প্রে করে করে, মাটিরও বারোটা বাজল, চুনোপুঁটি মাছও শ্যাষ হল।
তখন স্প্রে করতুক নাই? তাইলে ধান হতুক কী করে?
আমার কথা শুনে আব্বা হা হা করে হাসল। টর্চের আলোয় আচমকা ধানবাড়ি থেকে একটা বাচকা বক ফড়াস করে উড়ে গেল পিলে চমকে দিয়ে।
আব্বা বলল, তখন গোবর সারের ভরসা করেই যা হতুক। তবে মাঠে মাছ কত!বর্ষার সুময় মাঠে আড়াখাল করার হিড়িক লেগে যেত। ডেঙো-আড়া, চোঙ-আড়া, জিবে-আড়া, আরও যে কতরকম মাছধরার ফাঁদ! তাছাড়া ঘুনি, সঁটকা, এগুলো তো ছিলই। বর্ষায় মাঠগুলো পানিতে থইথই করত। বন্যার সুময় নদী, মাঠ, পুকুর সব মিলেমিশে একাকার। ধানবাড়িতে চ্যাং, ল্যাটা, কই, গুঁতে, পুঁটি খলবল খলবল করত। আড়াখাল ভর্তি মাছ!
এত মাছ কী করতে?
মাছ খেয়ে এলে গেছি তখন। বেচলেও দাম থাকেনি বেশি। খামারে ঝুড়ি ঝুড়ি মাছ রোদে মেলে শুকুই দিতাম। সেই শুকনো মাছ অসুময়ে বাজারে বেচে আসতাম। মাছ ফ্যা ফ্যা করত তখন। আর এখন চুনোপুঁটি মাছের মুখ দেখতে পাচ্ছি কই?
চৈত্রমাসের রাতেও আলের ঘাসের উপর শিশির জমেছে। পায়ের শব্দে ব্যাঙগুলো কুব-কাব ঝাঁপ মারে জমিতে। আব্বা ধানের গুছি সরিয়ে সরিয়ে পানি দেখল জমির। আট বিঘে জমি। পরপর তিনটে। সকাল থেকে পাম্প চলছে। চায়না ইঞ্জিন, তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর জিরেন দিয়ে দিয়ে। দুটো জমি পানি হয়ে গেছে। নিচের জমির ঘাইটা তেড়ে খুলে দিল আব্বা। কলকল করে পানি নামতে লাগল। আহা, কী মিষ্টি শব্দ!
আব্বা বলল, চ খোকা, পাম্পটা বন্ধ করে দিইগা, কতটা তেল আছে কে জানে! পানিটা ঝরে ঝরে নামুক নিচেরটাই।
একমুখ করে পানি বেরুতুক, তাইলে দেখতে রাত জাগতেও হতুক নাই। সব ডুবে যেত বেলাবেলি। এরকম করে জমিতে পানি রাখা যায়!
রাতারাতি গাছগুলো কেমন সবল হয়ি উঠিছে রে খোকা, পানির কী গুণ!
মেঘে পানি হতুক একবার, তাইলে দেখতে পেতে ধানের ঝাড় কাকে বলে!
সত্যিই বটে রে! এ বছর কী খরা হবেক নাকি দ্যাশে? গুটা জাড়কালটা পেরুল, একদিনও পানি হয়নিকো। চৈত্রমাস শ্যাষ হতি গেল, শালার ম্যাগে পানি নাই। পুকুরে পানি নাই, নদীতে পানি নাই, ক্যানেলে পানি নাই, পাতালেও পানির লিয়ার নেমে যাচ্ছে চড়চড় করে। কী যে হবেক ধানবাড়িটার কে জানে!
শুদুমুদু চিন্তা কোরো নাকো রেতের বেলায়। তখন তো কারু কথা শুনোনি।
আব্বা আমার কথার খোঁচাটা বুঝতে পারল। তাই চুপ করে গেল। অনেকেই বারণ করেছিল শ্যালোতে চাষ করতে। দাদি বলেছিল, ওরে খালভরা, শ্যালোয় ধান লাগাস নাকো, ফাঁকা মাঠে লারবি, আমার কথা শুন।
কারও কথাই শোনেনি আব্বা। এঁড়ে মরদের মতো ঘাড় ফুলিয়ে বলেছিল, তুরা বকিস না তো! আমি ঠিক বুঝে লিব যা।
মাঠের পশ্চিম প্রান্তে অনেক দূরে ওই যে টিমটিমে আলোগুলো জ্বলছে, ওটাই আমাদের গাঁ। গাঁয়ের ছামুতে পড়বে কাদু সেখের বাঁশঝাড়, তারপর ডুমুরজলার দিঘি। দিঘির গা ঘেঁষে প্রাচীর ঘেরা গোরস্থান। প্রাচীরের পাশ দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে ইয়াসিন খুড়োর মুদির দোকানকে বাঁয়ে ফেলে ডাইনে তাহের সেখের খামার, গোয়ালঘর পেরিয়ে তবেই আমাদের বাখুল। খড়ের ছাউনির নিচে দুটো প্রাণী ঘুমোচ্ছে। মা আর বুবু। মা কি ঘুমিয়ে পড়েছে? নাকি আমাদের কথা ভেবে সারারাত চোখের পাতা বুজতে পারেনি?
মা আব্বার মাথার বাতিক জানে। প্রথম থেকেই শ্যালোয় বোরোচাষ করার যুক্তিটায় মত থাকেনি।
আব্বা বলেছিল, খুব সস্তাদরে জমিগুলো পেইয়ে গেলাম বুজলে। জমির মাথাতেই শ্যালো পুঁতা আছে। পানির ভাবনা নাই।
কার জমি নিলে?
দিলবাহারের কাছে আট বিঘে লিলাম। মাত্র পনেরোশো টাকা বিঘেই দিইয়ে দিল।
মা মুখ বিকৃত করে বলেছিল, পনেরোশো টাকায় দিইয়ে দিল! যেমন হইচো খ্যাপা! ক্যানেলে পানি না ছাড়লে, দিবেকনি তো ফেলে রাখবেক? তুমার মতো বুকা লোক সারা দুনিয়ায় একটাও আছে নাকি সন্দেহ হয়।
কুন মাঠে জমি লিলে আব্বা?
জিওলনালার মাঠে। সেই যো রে খোকা শিরীষগাছটার কাছে বড়ো জমিগুলো।
শিরীষগাছটার কথা বলতেই বুঝতে পারলাম। ওই গাছটাকে গাঁয়ের কে না চেনে! কত যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আমার দাদোর দাদোর আমলের গাছ। কত রোদ ঝড় বইয়ে গেছে গাছটার উপর দিয়ে, তবুও কিছু হয়নি। একবার বাজ পড়ে জ্বলে গিয়েছিল, সবাই ভেবেছিল এবারেই শেষ। কিন্তু না, গাছটা মরেনি। ডালপালাগুলো মরে গেলেও বর্ষার পানি পেয়ে আবার গুঁড়ি থেকে কচি ডাল গজিয়েছিল।
মাঝমাঠে জমি লিইচ আব্বা, শ্যালোয় পানি দিয়ে বাগাতে পারবে তো?
আব্বা বুক ফুলিয়ে বলল, কেনে লারব? কষ্ট করে করতে হবেক। হাফ টাকায় জমি পাচ্ছি, শ্যালোর পানি পাচ্ছি, এই সুযোগ কেউ ছাড়ে! এবার একটা নতুন পাম্প কিনে লিব। আর লুকের খুশামুদি করবুনি।
কান পাতলে মাঠের আলের ফাটল থেকে উইচিংড়ে ও গঙ্গাফড়িং-এর সমবেত গান শোনা যায়। ঝোপের ভেতর থেকে দুটো বেজি সড়সড় করে সামনে দিয়ে পেরিয়ে গেল, একটা অপরটাকে তাড়া করে।
হ্যারিকেনটা কখন লিবল রে খোকা, কেরচিন শ্যাষ হয়ি গেছে নাকি?
হ আব্বা, ঘরেও তেল নাই। কন্টলে তেল আসেনি এবার।
আমি পাম্পটা বন্ধ করে যাচ্ছি, তুই চ, আঁধারেই শুয়ে পড়।
প্রচণ্ড ঘাস হয়েছিল জমিতে, যার লেতার এখনও যায়নি। গাছগুলো বড়ো হয়েছে বলে আর নিড়োয়নি। ধানগাছ চারা থাকলে ঘাস বেছে না ফেললে মাটির জোর ঘাসেতেই খেয়ে নেয়। তখন গাছগুলো সরু প্যাঁকাটির মতো হয়ে যায়। ভালো ফলন হয় না।
আমি এই সবেমাত্র চাষের কাজ শিখছি। কাজ করতে করতে আব্বার থেকে অনেক পিছু পড়ে যায়। তখন আব্বা নিজের পাইটা আমাকে ছেড়ে, আমারটা এগিয়ে দেয়। সাথে সাথে নিয়ে যায় আমাকে, ভুল হলে দেখিয়ে দেয়।
শুন বাপ, পড়াশুনা করে কুনু গ্যারান্টি নাই। দ্যাশটা ব্যাকারে ছ্যাপছ্যাপে হয়ে গেছে! চাষের কাজগুলো মুন দিয়ে শিখে রাখ বাপ। অন্তত মুনিশ খেটেও খেতে পাবি দু-মুঠো।— কাজ করতে করতে আব্বার যুক্তি শুনি আমি। আর ভাবি চাষির ব্যাটাকে চাষই করতে হবে, আমরা চাষ না করলে, মানুষ খাবেক কী?
ধান লাগিয়ে আব্বার মনে কতরকম আশা জাগে। মন ভালো থাকলে নিজের মনেই শোনায়।
বুজলি খোকা, আট বিঘে জমিতে নাই নাই করে একশোটা ধান করতেই হবেক। নাইলে কিছুই থাকবেকনি।
লাভের কথা ছাড়ও, দ্যাখো কী হয় যায় শেষ প’ন্ত।
কী আবার হবেক, ঘাসগুলো নিড়িয়ে দিয়েছি, এবার দেখবি ঝাড়ে ঝাড় লেগে যাবেক।
আমি আব্বাকে খুশি করার জন্য বলি, ঝাড় তো এখন থেকেই লিইচে, একশোটা ধান হয়ি যাবেক দেখবে।
তাই আল্লা আল্লা কর খোকা। ধানটা তুলে এবার নতুন খড় দিয়ে ঘরটা ছায়িয়ে লিব। চালাটার যা অবস্থা এবারের বর্ষাটাও পেরুবেকনি মুনে হয়।
ভাতের মুড়ির চাল করার জন্যি আগে ধান রেখে দিবে আব্বা। নাইলে আর বছরের মতন বেচে দিয়ে আর কিনতে লারবে।
খুব ভুল হয়ে গেইলে রে তখন। ধানগুলো কম দামে বেচে দিলাম, শ্যাষে চালের দাম চড়চড় করে যা বাড়ল, আমরাই কিনতে হিমশিম খেয়ে গেলাম। চাষ করেও চালের টান!
কথার মোড় ঘুরিয়ে বলি, শুনলাম বোরোচাষে আর পানি দিবেকনি কয়েক বছর।
তাই তো শুনলাম রে। আগের সরকার নাকি জলকর খাজনা মিটোয়নি, তাই ওরা পানি বন্ধ করে দিইচে। আবার কেউ বলচে মাইথনে বিশাল চর পড়েছে। আর পানি ধরে রাখতে পারছেনি। এবার খাল করি কাটাবেক ড্যামটা। তাই পানি বন্ধ।
তাইলে কী হবেক আব্বা?
দ্যাশে আকাল পড়ি যাবেক রে, ভাবছিলাম বেশি করে বোরোচাষ করে কিছু জমাব। তুর বুবুর বিয়ে দিব এবার, কিন্তু কী ফ্যাসাদে পড়লাম বল তো!
হ আব্বা, বুবুর বিয়েটা আগে দাও। তারপর যা করার করবে। পাড়ায় উয়ার বয়সি একটাও মেয়ে নাই আর।
একা মানুষ, কুনদিকে যে সামলাই!— আব্বা চাপা শ্বাস ছাড়ল।
কথাগুলো হয়েছিল মাঠে। কচি ধানের চারাগুলো দেখে মনে আশা জাগত। তখনও এতটা বোঝা যায়নি। জিওলনালার মাঠ হল মাঝমাঠ। খাঁ খাঁ ল্যাড়াবাড়ির মাঝখানে রোয়া জমির কচি চারাগুলো দেখে জানে বাতাস লাগত। চোখ জুড়িয়ে যেত। কিন্তু এখন দ্যাখো, পানির অভাবে গাছগুলো কেমন ধুঁকছে। তার উপর পোকার উপদ্রব। গোটা রাজ্যের পোকা আমাদের জমিটাতেই যেন বসত বানায়ছে।
স্কুল যাবার জন্যে গা ধুয়ে জামা পড়ছি। এমন সময় আব্বা মাঠ থেকে ঘুরে এসে উঠোনে দাঁড়িয়েই হাঁক পাড়ল, খোকা, অ্যাই খোকা, কুথায় গেলি রে?
আমার আগেই মা মুখঝামটা দিয়ে উঠল, এত টুঁটি ফাড়ছ কেনে? খোকা ইস্কুল যাচ্চে। মাস্টার বলে পাঠাইচে এত কামাই করলে চলবেকনি। এবছর মাধ্যমিক দিবেক।
আজ জমিতে স্প্রে করতে হতুক যে গো। আবার পোকা লেগে গেছে, ধানের পং কাটছে খুব। পানিও শুকিয়ে গেছে, পাম্প চালাতে হবেক।
বুবু বলল, ভাইকে আর এত টানো না আব্বা। মাধ্যমিকটা দেক।
এত কাজ একা করা যাবেক? আমি স্প্রে করব, উ খালি পাম্পটার কাছে বসবেক।
এই তো পরশুদিনে রাত জেগে পানি দিলে, ইয়ার মধ্যিই শুকিয়ে গেছে? তখনই বলেছিলাম, ফাঁকা মাঠে ধান লাগাও না। শ্যালোয় পানির জোগান দিতে লারবে, কম করে লাগাও।
আব্বার মাথায় রক্ত উঠে গেল, কী ভেবেচিস বল তো তুরা? ঘরে বসে বসে খাচ্ছিস, আর বড়ো বড়ো কথা? চ্যালাকাঠটা দেখেচিস?
বুবু দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকে দড়াম শব্দে কপাট বন্ধ করে দিল।
আব্বা আর কিছু বলল না। নিজের মনেই স্প্রে-মেশিনটা পিঠে ঝুলিয়ে, কীটনাশক, বালতি নিয়ে হনহন করে মাঠে চলে গেল।
এই বুবু, বুবু-উ। দরজাটা খুল, খুল বলছি।
জোর করে ধাক্কা দিয়ে দরজাটা খুললাম। চেয়ে দেখি বুবু মেঝের অন্ধকার কোণে বসে মুখ নামিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আমি পেছনপানে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রাখলাম। বুবু তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিল।
কলতলায় থালাবাসন ধুচ্ছিল মা। হাত থেকে ঝনাৎ করে নামিয়ে বাজখাঁই গলায় ডাক দিল, সেই থিকে ঘরের ভিতরে কী করচিস? মাঠ যা। কথাটা কানে যায়নি?
গামছা পরে ঘর থেকে বেরোলাম। মা এবার গলাটা নরম করে বলে, কী করবি বাপ, গরিব ঘরের ছেলে, সবই করতে হবেক। যা বাপ, মাঠ যা। সকাল সকাল খেতে চলে আসবি, তুর আব্বার জন্যে ভাত নিয়ে যাবি মাঠে।
মাঠ আর কতদূর? গাঁয়ের শেষে ডুমুরজলার দিঘি, দিঘির পাড়ে কাদু সেখের বাঁশঝাড়, তারপরই আদিগন্ত মাঠ। যতদূর চোখ যায় ধু-ধু মাঠ। আঁকড়গোড়ে, ভাড়ালগোড়ে, কাপাসে, জিওলনালার মাঠ। অনেক দূরে সোনামুখীর ধানমিলের চিমনিটা চোখে পড়ে ছোটো সিগারেটের মতো।
আশপাশের গাঁ থেকে বাগালরা গোরু-মোষ চরাতে আসে মাঠে। ক্যানেলে পানি থাকলে দুপুরবেলায় চরিয়ে চরিয়ে ক্যানেলের পাড়ে এসে পানিতে নামিয়ে দিয়ে গাছের তলায় থ্যাপসা গেদে বসে পড়ে। রোদে তেঁতে এসে অবোলা জীবগুলো পানিতে নেমে জানে আরাম পায়। তখন ভোঁস ভোঁস নিঃশ্বাস ছেড়ে দৌ-মাতাল করে পানিটাকে। তা সে চাষের আগে। ধান রোয়া হয়ে গেলে নদীর পাড়ে চরায়। কিন্তু এবছর খোলামেলা মাঠ পেয়ে গোরু-মোষের ফুর্তিই আলাদা। মাঠে ঘাস শুকিয়ে দড়দড়ি, তবুও খুঁটে খুঁটে খায়।
এক-দুজন বাগাল গোরু-মোষ চরাতে চরাতে আমাদের ধানবাড়িটার কাছে চলে আসে। শ্যালোর পানি খায় ঢক ঢক করে। জিওলনালার ঢিবির উপর আদ্যিকালের শিরীষগাছটার তলায় গামছা পেতে বসে। বিড়ি থাকলে আব্বার দিকে বাড়িয়ে দেয় হাতটা।
কী ফাঁসা ফাঁসলি বল দিনি! এমন করে কেউ ধানচাষ করে? হায় ভগবান!
আব্বা বলে, তখন তো এতটা বুজতে পারি নাই। একিই নামোমাঠ এগুলো, লিয়ার অনেক কম থাকে, ভাবলাম জমিগুলো ডুবে যাবেক। কিন্তু লিয়ারটা এত চড় চড় করে নেমে যাবেক কি করে জানব!
মিস্ত্রি এনে একবার দেখাতে পারতিস তো। ওয়াশ করলে যদি জল বাড়ে একটু।
সে দেখায়চি, এখন চারিদিকে খরা চলছে, ইয়ার বেশি পাতালে পানি নাইকো। আমাদের গাঁয়ের কত টিপকলে পানি বেরোয়নি জানিস? সব লিয়ার ফেল!
সে আমাদের গাঁয়েও একই অবস্থা! পশ্চিমের গাঁগুলোতে ক্যানেলের জল তো যায় না। উঁচু মাঠ। ওরা মাঠে মাঠে সাব-মার্সিবেল করেছে। রাতদিন পাতালের জল তুলে মাঠে সোনা ফলাচ্ছে। আর জল থাকবেক কী করে!
বাগালটা আব্বার সমবয়সি। মাঠের দিকে তাকিয়ে জিভ চুকচুক করল। এমন সময় গোরুর পাল থেকে একটা তৃষ্ণার্ত বাছুর পানির গন্ধ পেয়ে ছুটে এল ধানবাড়ির কাছে।
আব্বা নিঃশ্বাস ফেলল, আ-হা গো! ছোটো বাছুর, এতদূরের মাঠে কেউ আনে! যা, বালতি করে পানি দেখাগা।
শ্যালো থেকে এক বালতি ঠান্ডা পানি নিয়ে বাছুরটাকে খাওয়াল বাগালটা। তারপর পালে ছেড়ে এল।
বললাম, ধানগুলোর কী বুঝছ গো কাকা? এইভাবে বাঁচানো যাবেক?
গমগাছ পেয়েচিছ ভাইপো? ধানগাছের গোড়ায় জল না থাকলে গাছ বাঁচবেক কী করে? আর ফুলোবার সুময়ে জলের টান খেয়ে গেছে। ধানে দুধ জমেনি। দেখছিস নাই এখন থিকেই কত শিষ মরছে। শুন বাপ, যা করেচিস করেচিস। আর ফালতু খরচা করিস না। তেল পুড়িয়েও কিছু হবেক নাই মুনে হচ্চে।
আব্বা বুক ফুলিয়ে বলল, ছেড়ে দিব কী! চাষ যখন করেছি, তার শ্যাষ দেখিই ছাড়ব। কথায় বলে না, আশায় বাঁচে চাষা।
বৈশাখ মাস শেষ হতেই ধানবাড়িটা হলুদ হয়ে উঠল। ডুমুরজলার পাড়ে কাদু সেখের বাঁশতলায় দাঁড়িয়ে যদি ঠা ঠা রোদের দিকে কপালে হাত দিয়ে তাকানো হয়, তাহলে জিওলনালার মাঠে আমাদের ধানবাড়িটা হাতছানি দিয়ে ডাকবে। কিন্তু যদি কাছে যাওয়া হয় তাহলে দেখা যাবে, গাছ পেকে হলুদ, ধানের শিষ পেকে হলুদ, কিন্তু আঙুল দিয়ে টিপলে খালি ‘আগড়া’। শিষে ধান নেই। যদিও বা একটা দুটো আছে, সেগুলো হেপো রোগীর মতো ধুঁকছে।
খবরের কাগজের পাতায় জেলায় খরার খবর। প্রচণ্ড গরমে দু-একজন মানুষ মরার খবর প্রতিদিন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। যারা মাঠে মুনিশ খেটে খায়, তারা গাঁয়েঘরে কাজ না পেয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। চালের দাম আকাশছোঁয়া!
আব্বাকে বললাম, ধানগুলো কেটে কী হবেক আব্বা? কিছুই তো নাই আর। দেখে দেখে শিষগুলো ডগকাটি করে লিলেই তো হয়। যা পাওয়া যায় দু-চার বস্তা।
ধান না থাকুক, খ্যাড়গুলো তো আছে। সারাবছর পোড়াবার জ্বালানি চাই, ঘরটা ছাওয়াতে হবেক। একেই বোরোচাষ হয়নি, খ্যাড়ের অনেক দাম হবেক দেখবি।
বর্ষায় জ্বালানির অভাবটা মা বোঝে। তাই আব্বার কথাতে টুক করে সায় দিয়ে দিল, মুনিশ-ফুনিশ করার দরকার নাই, দুই বাপ-ব্যাটায় ঘা ঘা করে কাটোগা ধানটা, যদিনে হয় হোক। খুকার দাদো বলছিল, গাড়ি ভাড়া করার দরকার নাই, ওদের মোষের গাড়িটা লিয়ে বইয়ে লিবে ধানগুলো।
আব্বা কামারশাল থেকে কাস্তে দুটো ঝকঝকে করে পুরি কাটিয়ে এনেছে। কাল সকাল থেকেই ধান কাটতে লাগব। হঠাৎ মেঘটা গুড়গুড় করে উঠল।
আব্বা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলল, তাকাতেই আঁধার ঘনিয়ে উঠল সারা মুখে। বলল, ম্যাগ করিচে যে গো, কী হবেক এবার?
মা বলল, মরার ম্যাগের রস আমার জানা আছে। ঢং কত! যত না পানি, তত চুলকানি!
বুবু কাঁকালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়েছিল ঘরের দোরগোড়ায়। মায়ের কথার ঢং দেখে ফিক করে হেসে দিল। বলল, মা, তুই আর গাল দিস নাকো। আজ কিন্তু পানি হবেই হবে। দেখতে পাসনি কেমন আঁধার করি আছে ম্যাগটা।
হাওয়া পশ্চিমে ঘুরতেই গাভীন মোষের বেঢপ পেটের মতো কালো কালো মেঘগুলো সারা আকাশ জুড়ে আকুলিবিকুলি করতে লাগল। আচমকা ঝড় উঠল। গাছের পাতা নড়িয়ে, ধুলো উড়িয়ে, ডালপালা দুলিয়ে প্রচণ্ড ঝড়!
বাতাসে ধাক্কা খেয়ে মেঘগুলো একটা আর একটাকে ঠোক্কর মেরে আলোর চাবুক মারতে লাগল ক্ষণে ক্ষণে, গোটা আকাশটাকে দু-ফাঁক করে দিয়ে। উঠোনের পাশে সজনেগাছের একটা কাঁচা ডাল ভেঙে পড়ল হড়াস করে। খড়ের চালা থেকে পচা খড় বেরিয়ে উড়তে লাগল পাঁই পাঁই। কলতলার পাশে রসালো মাটিতে যে মানকচুর বন, হাওয়ার ঝাপটা লাগতেই কতকগুলো হয়ে গেল হরিণের শিং। চারিদিক ধুলোয় ঝাপসা, পানি নামাল ঝমঝম করে।
জানালা, দরজা সব লাগা খোকা, সব শ্যাষ হয়ি যাবেক রে, সব শ্যাষ হয়ি যাবেক! — আব্বা দৌড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল।
মা ঘরের ভেতর হাতড়ে হাতড়ে হ্যারিকেনটা খুঁজল। বার দুই দুলিয়ে ঠকাস করে নামিয়ে দিল। কী প্রচণ্ড আঁধার! সারা রাজ্যের আঁধার যেন আমাদের ঘরের ফুটো চালা দিয়েই ঢুকে পড়েছে।
আঁধারের ভেতরেই আব্বা বলে উঠল, ধানবাড়িটার কী হবেক গো? যা ঝড়-পানি হচ্ছে, আর কিছুই তো থাকবেকনি!
মা বলল, শ্যাষ হতে আর বাকি রইল কী? খামোকা আপশোশ কোরো নাকো। যা করে আল্লা!
পানির বেগ বাড়তেই খড়ের চালার ফুটো দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়তে লাগল মেঝেতে। বুবু ঘরের কোণে যে হেঁশেল, সেখান থেকে একটা জামবাটি এনে বসিয়ে দিল। টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল। কিছুক্ষণ পর হেঁশেলের থালা, বাটি, গেলাস, হাঁড়িকুড়ি, কড়াই, সব যখন শেষ হয়ে গেল, তবুও মেঝেটাকে রক্ষা করা গেল না, তখন মা বিরক্ত হয়ে বলল, মরার ম্যাগ কি ছ্যাঁদা হয়ি গেল নাকি রে!
খুব সকালে উঠে পড়ি আমি। দেখি আমাদের গোটা উঠোন জুড়ে বাঁশপাতা, আমপাতা, বটপাতা, খড়কুটোয় ভর্তি। কাদায় জ্যাবজ্যাবে হয়ে আছে। ফাঁপালো মাটিতে দুটি ধ্যাবড়া পায়ের ছাপ সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। বুঝতে অসুবিধা হল না। আমিও পায়ের ছাপে পা মিলিয়ে এগিয়ে গেলাম।
রাতারাতি পানি হয়ে ডুমুরজলার দিঘি ফুলেফেঁপে উঠেছে। কাদু সেখের বাঁশঝাড় তছনছ। মাঠগুলোয় পানি জমে গেছে। দূরের মাঠের পানে তাকালাম, কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া, কুয়াশার মতো আস্তরণ পড়েছে। আজও আকাশের মুখ গম্ভীর।
জিওলনালার মাঠের কাছে আসতেই আমার চোখ ছানাবড়া! দেখলাম আট বিঘে জমির ধানগাছগুলো যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত সৈনিকের মতো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে নিচে। জিওলনালার ঢিবির উপর যে আদ্যিকালের শিরীষগাছ, আব্বা ওই গাছটার মতো আলের মাথার উপর খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এত ঝড়ঝাপটাতেও যার কোনও নড়নচড়ন নেই!
কথা সোপান, শারদীয়, ১৪২৫
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন