শিকড়টা ছিঁড়ে যাবার পর

হামিরউদ্দিন মিদ্যা

এই শহরে কোথাও একফোঁটা ফাঁকা জায়গা পড়ে নেই। চারিদিকে হাউজিং, শপিং-কমপ্লেক্স, মাল্টিপ্লেক্স, ফুডকর্নার, প্রশস্ত রাস্তা, যানবাহন, হাজার হাজার মানুষের ভিড়। আলতাফ হোসেন এই অস্বস্তিকর পরিবেশ থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। খাঁচার ভেতর বন্দি পাখির মতো ছটফট করছেন। জানালার পর্দাটা সরিয়ে বাইরে দৃষ্টি ফেরালেন। ভরা শ্রাবণের মুষলধারা পানি পড়ছে ঝমঝম। সূর্যের দেখা নেই কয়েকদিন। জানালার বাইরের পৃথিবীটা ঝাপসা দেখাচ্ছে। স্মৃতির দেওয়াল হাতড়ে হাতড়ে ফেলে আসা দিনগুলোকে ছুঁতে চান, তাও বা ধরা দিচ্ছে কই? এই বাহাত্তর বছর বয়সে আর কী-ই বা করবেন! এখন ছেলের হাতে সবকিছু। যা ভালো বোঝে করুক!

বৃষ্টি দেখতে দেখতে আনমনা হয়ে পড়েছিলেন। হঠাৎ পেছনে পদশব্দ পেয়ে ঘুরে তাকান। খোকন বাটি করে কী যেন এনেছে। এ বাড়িতে খোকনই একমাত্র, যার সঙ্গে গল্পগুজব, সুখ-দুঃখের দুটো কথা বলতে পাওয়া যায়। এটা তো আর সোনাডাঙা নয়, যে উঠোনের পাশ দিয়ে রাস্তাটায় চেনাজানা পথচারী পেরিয়ে গেলে সাড়া দিয়ে যাবে। মাছওয়ালা সরকত, কালু ফকির, তিনু গয়লা যাবার সময় সাড়া দেবেই। খোঁয়াই বিছানো সরু রাস্তাটা এঁকেবেঁকে নেমে গেছে দামোদরের খেয়াঘাটে। সকালবেলাতেই কালু ফকির কাঁধে ঝোলাঝুলি ঝুলিয়ে, ‘শোনো মোমিন মুসলমান, করি আমি নিবেদন...’ গাইতে গাইতে চলে যায় খেয়াঘাটে। নৌকায় চেপে ওপারে বর্ধমান।

খোকন বাটিটা এগিয়ে দিয়ে বলে, দাদো জাম খাও।

কুথায় পেলি খোকন?

আব্বা সোনাডাঙা থেকে চলে এসেছে। ওখানের একজন তোমাকে খেতে দিয়েছে।

সোনাডাঙা নামটা শুনেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁক করে উঠল আলতাফ হোসেনের। সেই সোনাডাঙা! সোনাডাঙার জাম! ডাগর ডাগর কালো জাম। এ তো ভুবুনমাস্টারের গাছের জাম। সাত গাঁ ঘুরলেও এমন সুমিষ্ট জাম দ্বিতীয়টি মিলবে না কোথাও। এই বর্ষায় ছাতা মাথায় মাঠ দেখতে বেরলে যদি ভুবন মাস্টারের বউয়ের নজরে পড়েন, তাহলে ঠোঁট ফুলিয়ে বলবে বইকি, একদিনও জাম খেতে এলেননি যে দাদা, আসুন জাম খেয়ে যান।

আহ! ভুবন মাস্টারের বউ মনে করে জাম পাঠিয়েছে। গবগব করে জাম খেতে লাগলেন আলতাফ হোসেন। খোকনের দিকে কয়েকটা বাড়িয়ে দেন, তুইও নে খোকন।

তুমি খাও দাদো, মা আমাকে দিয়েছিল। — একটু আঁকিবুঁকি কেটে খোকন বলল, দাদো জামগাছ কেমন হয় গো?

আলতাফ হোসেন আকাশ থেকে পড়লেন। তার এই নাতিটি বলে কী!

এ কী বলছিস রে! জামগাছ দেখিস নাই?

না দাদো, আমাদের এখানে একটাও জামগাছ নেই। — একটু ঢোক গিলে বলে, বীজগুলো পুঁতে দিলে গাছ হবে দাদো?

আলতাফ হোসেন ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন খোকনের কচি মুখের পানে, যেখানে হাজার কৌতূহলের রেখা ফুটে উঠেছে। ওই রেখার মধ্যেই দেখতে পেলেন একটা চারা জামগাছ ধীরে ধীরে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে কীভাবে মহীরুহ হয়ে উঠছে।

কুথায় লাগাবি শুনি?

খোকন একটা আঙুল মাথার মধ্যে ঠুকতে থাকে। ঠুকে ঠুকে বুদ্ধির শিকড়ে পানি ঢেলে বলে, ছাদের উপরে একটা খালি টব আছে, ওটাতে হবে দাদো?

আলতাফ হোসেন শহুরে এই নাতিটার কথা শুনে আরও চমকে গেলেন।

ধুর খ্যাপা কুথাকার! ফুলগাছ পেয়েছিস নাকি? জানিস একটা জামগাছ কত বড়ো হয়? তুদের এখানে গাছ লাগাবার জায়গা কুথায়?

দাদোর কথা শুনে খোকনের মুখটা পাংশু হয়ে যায়। জামগাছ শুকিয়ে কাঠ। নিমেষেই ক্যানভাসে ভাসিয়ে তোলে তাদের এই নীলরঙা দোতলা বাড়ি, বাড়ির পর সরু গলি, গলির পর বাড়ি... কোথাও একটা জামগাছ লাগাবার মতো ফাঁকা জায়গা খুঁজে পায় না। শেষে নিরাশ হয়ে বলে, আমি টবটাতেই পুঁতব দাদো, চারাগাছটা কেমন হয় দেখব।

আকাশটা কয়েকদিন ধরেই মেঘাচ্ছন্ন, পানি হচ্ছে অবিরত। শ্রাবণ মাসের বর্ষা। বৃষ্টি দেখেই কাটাতে হচ্ছে। নিঃসঙ্গ জীবনের বড়োই কষ্ট! ছেলে ও ছেলের বউ থাকে নিচের তলায়। সোয়ারফ বলেছিল, সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে তোমার কষ্ট হবে আব্বা, তুমি নিচের ঘরটাতে থাকো, আমরা বরং...

বাধা দিয়েছিলেন আলতাফ হোসেন, না, আমি উপরেই থাকব। এই নিয়ে আর কোনও কথা বাড়ায়নি সোয়ারফ। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে কষ্ট হবে! বাপের কষ্টটা বুঝিস? জানিস কতগুলো সিঁড়ি দিয়ে উঠিয়েছিস বাপকে? আলতাফ হোসেন কথাগুলো মনে মনে বিড়বিড় করেছিলেন। ওদের চোখের একটু আড়ালে থাকার জন্যেই দোতলার এই ঘরটা বেছে নেন তিনি।

সোনাডাঙা থেকে চলে আসার সময় ওখানের ঘরের আলমারি, টেবিল, পালঙ্ক থেকে শুরু করে সমস্ত আসবাব, এমনকী দেওয়ালের ক্যালেন্ডারগুলো পর্যন্ত আনতে ভোলেননি, ঘরটা যেন একটু নিজের ঘরের মতো লাগে। প্রথম দিন ঘরটা যখন সাজানো হল, তখন দেওয়ালে টাঙানো সাবেরার সঙ্গে যুগল ছবিটা দেখে খোকন বলেছিল, দাদি দেখতে এত সুন্দরী ছিল দাদো?

বউমা মুখ টিপে হেসেছিল, সোয়ারফ সরে পড়েছিল। আলতাফ হোসেন ফাজিল নাতিটার কথা শুনে কিছুই জবাব দিতে পারেননি। বউমার সামনে কিছু বলা যায়?

ঘরের মধ্যে অনেক স্মৃতির পাহাড় জমে আছে। প্রত্যেকটা জিনিসে সাবেরার হাতের ছোঁয়া, ওর সঙ্গে কাটানো পঞ্চাশটা বছরের এক-একটা স্মরণীয় মুহূর্ত ভেসে ওঠে চোখের সামনে।

খোকন এটা-সেটা নাড়াচাড়া করতে করতে দাদোর দিকে মুখ তুলে বলে, তোমাদের জামগাছ আছে দাদো?

না, আমাদের নাই। তবে সোনাডাঙায় অনেক জামগাছ আছে। গোলাপজাম, কাদাজাম, কুড়কুড়ে জাম, কালোজাম, আরও যে কতরকম! — একটু ঢোক গিলে বলেন, এই যে পালঙ্কটায় বসে আছিস, জানিস এটা কীসের? জামগাছের পাটা দিয়ে তৈরি।

খোকন বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে পালঙ্কটার দিকে। চোখগুলো গোল গোল করে বলে, এটা জামগাছের! খোকন নাক ঠেকিয়ে গন্ধ শোঁকে পালঙ্কটার।

আলতাফ হোসেন ওর কাণ্ডকারখানা দেখে নিজের মনেই হাসলেন। একবিংশ শতাব্দীর ছেলে যদি জামগাছ না দেখতে পায় তাহলে তো পরবর্তী প্রজন্ম নামটাই ভুলে যাবে। গ্রামের গাছগুলোই থাকছে কই? একটার পর একটা গাছ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। আর পাখিগুলো?...

আলতাফ হোসেন ঘোরের মধ্যে তলিয়ে ছিলেন। প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরান। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলেন, আমার এক বন্ধু রাসেদ বিয়ের সময় আমাকে দিয়েছিল পালঙ্কটা। জানিস খোকন, ওই গাছটায় চেপে আমরা কত জাম খেয়েছি, কত দুষ্টুমি করেছি ছেলেবেলায়! সেইসব বৃত্তান্ত শুনলে অবাক হয়ে যাবি।

খোকন আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। পালঙ্কের ওপর উঠে দাদোর গলাটা জড়িয়ে ধরে বলে, বলো গো দাদো শুনি, আজ তো স্কুল নেই, ছুটি।

আলতাফ হোসেন ভাবলেন খোকনের কথা। এদের শৈশব কৈশোর চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই ছেলে ডাংগুলি খেলেনি, লোকের বাগানের পেয়ারা চুরি করে খায়নি, কালবৈশাখীর ঝড়ে আম কুড়োয়নি। এদের খেলা মোবাইল ও কম্পিউটারের স্ক্রিনে।

সিগারেটটা শেষ করে জানালা দিয়ে ফেলে দিলেন তিনি। বৃষ্টির যেন বিরাম নেই। এই শহরের বর্ষা, আর সোনাডাঙার বর্ষার মধ্যে আকাশপাতাল ফারাক। এইসময় দামোদর ফুলেফেঁপে উঠে কত চর ভাঙে। জেলেদের মাছ ধরার মরশুম। মাঝিমাল্লারা নৌকা নিয়ে ভেসে বেড়ায় নদীতে। খাল-বিল-পুকুর সব এখন পানিতে টইটুম্বুর। নদীর দু-চরে সবুজের সমারোহ। পূর্ববাংলা থেকে উঠে আসা ছিন্নমূল মানুষগুলো খেতে কাজ করে। এইসময় উঠোনের কদমগাছটায় কত ফুল ফোটে। তার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পাড়াময়, কদমফুলের গন্ধে ম-ম করতে থাকে বাতাস। এবারের বর্ষাটাই জীবন থেকে হারিয়ে গেল!

মেঘলা আকাশের জন্য ঘরের ভেতরটাও কেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন। শরীরটাকে এলিয়ে দিলেন পালঙ্কটার ওপর, অনেকটা শোয়ার মতো। বললেন, জানিস খোকন, রাসেদ আমার ন্যাংটোবেলার বন্ধু। আমরা ছিলাম মানিকজোড়। ওদের বাড়ির পেছনে একটা ছোটো পুকুর ছিল, যার চারিধার বাঁশবন, ঝোপঝাড়, গাছপালায় ঘেরা। সূর্যের আলোও ভালোভাবে পড়তে পেত না। দিনের বেলাতেই আঁধার ঘনিয়ে থাকত। লোকে বলত, জড়ুলীর পাড়ে শাঁকচুন্নি আছে। আমাদের এত ভয়ডর ছিল না। জামগাছে চেপে ডালে ডালে ঝুলে বেড়াতাম...

খোকন বলল, দাদো তুমি শাঁকচুন্নি দেখোনি?

কী যে বলিস না, গ্রামের ছেলে শাঁকচুন্নি দেখব নাই? আমি একবার জল-জিয়ন্ত শাঁকচুন্নি দেখেছিলাম।

খোকন মুখটা ঘুরিয়ে আরও গুটিসুটি মেরে দাদোর কাছে সরে এল।

দুপুর বারোটা বাজছে তখন। বোরো ধান কাটার সুময়। আব্বার জন্যে ভাত নিয়ে যাচ্ছি মাঠে। রোদে খাঁ খাঁ করছে মাঠ। মাঝমাঠে একটা ঝাঁকর-ঝুমর বেঁটে বটগাছ আছে। সেই বটতলা দিয়ে পেরোতেই মড়-মড় মড়াৎ করে শব্দ। ভয়ে তিকুড়ে উঠলাম। উপরদিকে যেই চেয়েছি ওমনি দেখি সাদা শাড়ি পরা একটা শাঁকচুন্নি বটগাছের ডালে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেল আমার, সারা শরীরটা দরদর করে ঘামতে লাগল।

খোকন বলল, ছুটে পালিয়েছিলে?

পালাব কী রে, আমিও কম ডাকাবুকো ছিলাম না। গলা তুলে ডাক পাড়লাম, গাছের উপরে কী করিস?

তখন শাঁকচুন্নিটা বলল, দেকতে পাওনি নাকি, ছাগলের জন্য পাতা পাড়ছি।

ও বাবা! শাঁকচুন্নি কুথায় পাবি? পীরু বাগদির বিধবা বোনটা গাছে উঠে বটের ডাল ভাঙছে। তো বুঝলি খোকন, আমার আর কিছুই দেখতে বাকি রইল না। — বলে হো হো করে হাসতে লাগলেন আলতাফ হোসেন। হাসতে হাসতে মাথাটা পালঙ্কের কোনাটায় লেগে ঠক করে ঠোকা গেল। নিমেষেই সংবিৎ ফিরে পেলেন। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! খোকনকে কথাটা বলে ফেললাম!

খোকন বলল, জামগাছটা কেন কেটেছিল দাদো?

সেটাই তো দুঃখ রে, পরে সেই জড়ুলীর পাড়ের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে, পুকুরটা বুজিয়ে পাকা বাড়ি তুলল ওখানে। আমি জামগাছটা রাখতে বলেছিলাম। কিন্তু এমন জায়গায় ছিল যে গাছটা না কাটলেই নয়। — একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আলতাফ হোসেন আবার বললেন, যে গাছটা ছেলেবেলার দিনগুলোর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেটাও কাটা পড়ল। তখন স্কুল যাবার নাম করে কতবার টুগডালে চেপে বসে থেকেছি জানিস! ডালপালার আড়ালে বাঁদরের মতো চুপ করে বসে থাকতাম।

খোকন দাদোর কথা শুনে ফিক ফিক করে হেসে ফেলল। বলল, দাদো, তাহলে তো তুমি দারুণ ফাঁকিবাজ ছিলে।

আলতাফ হোসেনও না হেসে পারলেন না।

চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হাসির স্ফুলিঙ্গ ছাপিয়ে খোকনের মায়ের গলা ভেসে আসে, কই রে ফোকন, গোসল করবি আয়।

যাচ্ছি-ই-ই-ই। দাদো, তুমি গোসল করবে না?

না, আজ আর গা ধুবোনি, দারুণ ঠান্ডা লাগছে। তুই যা।

বৃষ্টিটা থেমেছে, সম্পূর্ণ নয়, পিটপিট করে পড়ছে। এই কয়েকদিন ঘরের ভেতরেই বন্দি। দমবন্ধ হয়ে আসছে আলতাফ হোসেনের। ভোরে উঠে প্রাতঃভ্রমণ করা হয়নি। মেঘের যা মতিচ্ছন্ন ধরেছে, কী করে বেরোবেন! প্রথম প্রথম এসে ঘরের মধ্যেই চুপচাপ বসে থাকতেন। তা দেখে বউমা একদিন বলল, সারাদিন ঘরের মধ্যে বসে না থেকে, একটু হাঁটাচলাও তো করে আসতে পারেন। শরীরটা ভালো থাকবে।

যুক্তিটা মন্দ দেয়নি বউমা। সেই থেকেই খুব সকাল সকাল উঠে হাঁটতে বেরোন। প্রথম কয়েকদিন গলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তারপর গলি ছাড়িয়ে এক-একদিন পৌঁছে যান বড়ো রাস্তায়, কোনোদিন খেলার মাঠটাতে।

জীবনের এতগুলো বছর সোনাডাঙায় কাটিয়ে হঠাৎ করে এখানে চলে আসতে হল। সোয়ারফ কর্মসূত্রে কলকাতাতেই থাকত। প্রথমে ভাড়াবাড়ি, তারপর আয় উন্নতি করে এই বাড়িটা কিনেছে। বিয়ে-শাদিও করে নিয়েছিল গোপনে, জানায়নি পর্যন্ত! চাকরি পাওয়ার পর প্রথম দু-বছর যোগাযোগ রেখেছিল বাড়ির সঙ্গে। টাকাকড়ি পাঠাত, ফোন করে খবরাখবর নিত। ইদের সময় বাড়ি যেত। তারপর কী যে হয়ে গেল ছেলেটা!...

সাবেরা বেঁচে থাকতে একবার গিয়েছিল সোয়ারফ। হু হু করে কেঁদে উঠেছিল সাবেরা। মায়ের মন তো! বুকটা ধক করে উঠেছিল। — এইজন্যেই তোকে লেখাপড়া শেখানো খোকা? বল আমাকে, বল? কী দোষ করেছি আমরা?

সোনাডাঙা ছেড়ে প্রায় এক-দেড় বছর আসা হয়ে গেল আলতাফ হোসেনের। সোয়ারফ আনতে গিয়েছিল। সাবেরা যদি বেঁচে থাকত সেদিন, তাহলে ঝাঁটার বাড়ি মেরে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিত। কিন্তু আলতাফ হোসেন সেদিন নির্বাক। সাবেরা ইন্তেকাল করার পর খুব কষ্টে দিন যাচ্ছিল। যাকে বলে ‘কাঁকালে পিঠে লল্লাট’। রান্নাবান্না, জামাকাপড় কাচা, সবই করতে হচ্ছিল নিজেকে। জমিগুলো অবশ্য মুনিশ দিয়েই চাষ করতেন। এত কষ্ট দেখে পাড়াপ্রতিবেশীরাও নিঃশ্বাস ফেলত। সোয়ারফ যেদিন আনতে গেল সেদিন সবাই বুঝিয়েছিল আলতাফ হোসেনকে। ছাত্তার সেখের বড়ো ছেলে, যে বাড়ির পেছনের খামারটা কেনার জন্যে উঠেপড়ে লেগেছিল ওখানে ইটভাঁটা করবে বলে, সেও ফোড়ন কেটেছিল, এই বয়সে কেনে এত কষ্ট করচ চাচা? তুমার ব্যাটা যখন নিজে লিতে এইচে, তখন এত ভাবনার কী আছে? শেষ বয়সে বউমার হাতের রান্নাটা খেয়ে লাও। অনেক কিছুই তো দেখলে জীবনে...

সোয়ারফ কাল সোনাডাঙা গিয়েছিল, আজ ফিরেছে। কাগজপত্র সমস্ত কিছুই তৈরি। সইসাবুদ করতে একটুও হাত কাঁপেনি আলতাফ হোসেনের। ছেলে যদি তাতেই খুশি হয় হোক। আর ক-দিনই বা আগলে রাখতে পারতেন। মরে গেলেই তো সব খতম। সোনাডাঙার সঙ্গে শেষ যে শিকড়টা জোড়া লেগেছিল, সেটাও ছিন্ন হয়ে গেল। ওখানের জমিজায়গা সবকিছু ছাত্তাররা কিনে নিল।

একদিন সোয়ারফ বলল, আব্বা একটা কথা ছিল তোমার সঙ্গে।

বল খোকা, কী বলবি।

বলছি এবার তো এখানেই থাকবে, তাহলে জমিজায়গাগুলো রেখে কী লাভ? ঠিকঠাক ভাগ দেয় না লোকে, সব লুটেপুটে খাচ্ছে।

আলতাফ হোসেন বলতে চেয়েছিলেন, আমার ভিটেমাটিতে আম, জাম, বটের চারা পুঁতব। পশুপাখিরা আশ্রয় নিবে। — কিন্তু মনের কথা মনেই থেকে যায়। তা আর প্রকাশ করা হয়নি। প্রচণ্ড অভিমানে চুপ করে ছিলেন। অফিসের কম্পিউটারে হাত রেখে কাস্তে ধরে কীভাবে বুঝবে সোয়ারফ? বুঝবে মাটির কদর? কোনোদিনও পারবে না। আলতাফ হোসেনকে চূপচাপ থাকতে দেখে সোয়ারফ সম্মতির লক্ষণ হিসাবে ধরে নিয়েছিল।

পালঙ্কের থেকে ধীরেসুস্থে নেমে আবার একটা সিগারেট ধরালেন আলতাফ হোসেন। জানালার পর্দাটা ফড়ফড় করে উড়ছে বাতাসে।

সবসময় কী এত ভাবছ বলো তো?

সব শেষ হয়ে গেল সাবেরা, সব খতম...

মরতে কেনে এইছিলে এখানে?

সব তুমার জন্যেই। হুট করে ছেড়ে চলে গেলে কেনে?

ওইখানে মানুষ দুইদিনের খেলতে নামে। তুমার কি এখনও খেলা শেষ হয়নি?

আমার অবস্থা তো দেখতেই পাচ্ছ, নিজের ভিটেমাটিতেও মরতে পাবনি আর।

বুড়োর ঢং দ্যাখো, বেচে দিয়ে আবার ভিটেমাটি দেখাচ্ছে! আর সেই ভিটেমাটি আছে গা? কুনদিন ভেঙেভুঙে দেখো গা ইটভাঁটা করেছে ওখানে। জানো মিনসেরা আমার সাধের কদমগাছটাও রাখেনি!

জানালার বাইরে গাভীন মোষের বেঢপ পেটের মতো কালো কালো মেঘগুলো উড়ে উড়ে উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। হয়তো আবার কোথাও জমাট বাঁধছে, ফেটে পড়বে বলে।

আলতাফ হোসেন আকাশের দিকে চাইলেন। সব শূন্য। কোথায় সেই সোনাডাঙা? কোথায় সেই কদমফুলের গন্ধ? সব তো শেষ! শিকড়ছেঁড়া গাছের মতো ছটফট করতে থাকেন তিনি।

সংবর্তক, ২৫শে বৈশাখ সংখ্যা, ১৪২৫

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%