শালীনদীর হড়পা বান

হামিরউদ্দিন মিদ্যা

বানটা প্রথম দেখেছিল বাসেদ সেখের রাতবাঘা ব্যাটা মজিদ সেখ। গ্রামের মানুষের কাছে এখন সেটা বড়ো কথা নয়। কে আগে দেখেছে সে নিয়ে তর্কবিতর্ক করার সময়ও নয় এটা। এখন ঘোর দুর্যোগ! এই দুর্যোগ কাটানোর জন্য মানুষ এখন উপরওয়ালার কাছে প্রার্থনা করছে।

এ বছর নামেই বর্ষা, কাজে নয়। অন্য বছর পুকুর, নালা-ডোবা, মাঠ-ঘাট সবই পানিতে টইটুম্বুর হয়ে থাকে। শালীনদীর পেটটা পোয়াতি বউয়ের মতো হয়ে যায়। কিন্তু এখন সবই শুখা শুখা। অবশ্য ‘খরার দেশ’ নামে রটনা আছে এই জেলার। তা বলে বর্ষাতে পানি হয়নি এমন হাল মজিদ কখনও দেখেনি। আষাঢ় মাসটা ঢিমেতালে কাটতে কাটতে শ্রাবণ মাস পড়তেই পানি ও খাদ্যের ফেরেশতা মিকাইলের দিলে এই শুখা দেশের ধরিত্রীর ওপর রহম জেগেছে। তবে সে কুলোয় ঢালা পানি নয়, খামখেয়ালি ঝিমঝিম করে দু-এক পশলা। যাদের নদীর ধারে জমি তারা টানটান পানিতে আমন ধান রোয়ার কাজ শেষ করেছে। একেই তো নামী করে চাষ, তার ওপর পানির টান। ডাঙা টিলা জমির চাষিরা নদীর গাবায় পাম্প লাগিয়ে হুশহুশ পানি তুলেছে। মজিদের বিঘা তিনেক জমির রোয়া কাজ শেষ। সবই নদীর ধারে দখল করা ভেস্টের। কী যে হিড়িক লাগল তখন! নদীপাড়ের মানুষরা গাইতি, কোঁদাল, টাঙনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে লেগেছিল। বাসেদ সেখ তখন তাগড়া মরদ। মজিদকে নিয়ে নদীর পাশে আগলে ছিল কিছুটা। রাতদিন খেটেখুটে, মাটি-ফাটি তেড়ে চাষের উপযোগী করে। খোদা মেহেরবান বছরে একবার খেত ভরা ধান দেয়। বাকি সময় আলু, ডিংলে, মুলোর চাষ।

বউকে হারানোর পর মজিদ আবার বউ পেয়েছে, কিন্তু রফিকুল তার মাকে ফিরে পায়নি। দাদি যতদিন বেঁচে ছিল মায়ের অভাবটা বুঝতে পারেনি। এখনও দাদোর ন্যাওটা। রাতে দাদোর কাছেই শোয়। মাটির দু-কুঠরি খড়ের ছাউনি ঘরটার পুবধারের মেঝেটায় মজিদের বাপ থাকে। নদীটা এখান থেকে খুব কাছাকাছি। কতগুলো মাঠ পেরোলেই বাঁশবনের আড়াল। কান পাতলে পানি বওয়ার কুলকুল শব্দ কানে আসে।

মজিদ বিছানায় উঠে বসল। কচি মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে চুকচুক করে দুধ খাচ্ছে। কচির মা বলল, কী হল গো তুমার? আজ আবার কুথা বেরুবে?

ভাবছি একবার পলুইটা লিয়ে বেরুব। সারারাত তো পিটির পিটির পানি লাগিয়েই রেখেচে, বাদাবনে মাছের হাউশ লাগবেক ভালো।

তুমি রাতবাঘা যাচ্চ যাও, খুকাকে উঠোও না বলে দিচ্চি। মরে ছেলে, রেতের বেলা কীসের উপর পা দিবেক!

সে তুমার চিন্তা নাই। আমি কী রাতবাঘা, রফিকুল আমার থেকুও এক কাট উপরে।

বাঁশের আগলটা ঠেলে মজিদ বাইরে বেরল। আসমানের পানে মুখ তুলল। কোনও তারা ফুটে নেই। গাভীন মোষের বেঢপ পেটের মতো কালো কালো মেঘগুলো সারা আশমান জুড়ে আকুলিবিকুলি করছে। নরম বতরে ব্যাঙ ডাকছে ঘ্যাঙরঘ্যাঙ ঘ্যাঙরঘ্যাঙ। সেই সঙ্গে ঝিঁঝিপোকার গান। খঞ্জনির তাল দিচ্ছে ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে উইচিংড়ের দল। সব মিলিয়ে মিশিয়ে মনে হচ্ছে বাগদিপাড়ার শ্মশানতলায় হরিসংকীর্তনের মতো। তাতে শ্রোতা নাই বা থাকল! রেওয়াজটা তো চালিয়ে যেতে হবে!

মেঝের ভেতর বাসেদ কাশছে, খক খক করে। শালার ধুকোটা বিড়ি খেয়ে খেয়েই মলো গো!— কাশির শব্দে মজিদ তিতিবিরক্ত হল বাপের ওপর। ত্রস্ত পিঁড়ের ভেতর হেঁট হয়ে ঢুকল। এ ঘরের দরজাটা কাঠের। মজিদ যখন বিয়ে করে কচির মাকে ঘরে তুলল, তখন এ ঘরটা নেওয়ার কথা ভেবেছিল। কিন্তু বাপ-মায়ের বসবাসযোগ্য ঘরটা ছিনিয়ে নিতে মন সায় দেয়নি। কচির মা কাপড়ের পরদা লাগিয়েছে। মজিদ দেখল দরজাটা ঠেসানো আছে। এক হাতে ঠেলা মেরে সামান্য ফাঁক করে চেয়ে দেখল, মেঝের ভেতর আব্বার শিথানতলে লন্ঠন জ্বলছে টিমটিম করে। হলুদ আলোটা অনেকক্ষণ ধরেই দমবন্ধ অবস্থায় ছিল, মুক্তি পেতেই ছুটে বেরিয়ে গেল মজিদের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে। আগুনের শিখাটা এবার কোমর দুলিয়ে নাচতে লাগল। রফিকুলের ঘুমন্ত মুখের পানে চেয়ে উঠাতে মন সায় দেয় না। কিন্তু না নিয়ে গেলে খালুই ধরবে কে? তা ছাড়া কাল আবার শুনে কান্নাকাটি জুড়ে দেবে।

মেঝের ভেতর টুপটাপ করে পানি পড়ছে খোকা। চালাটা বাগা এবার!

মজিদ চমকে গেল। শালা বুড়ো ঠিক টের পেয়ে গেছে। অথচ আমি ভেতরেই ঢুকিনি। — মজিদ বিরক্ত হল বাপের বারবার এই আবদারে। — রেতের বেলা কানের গুড়ায় ফ্যাচর-ফ্যাচর কোরো না দিনি! পালুইয়ে খড় কি লাফাচ্চে? সব তো পুড়িয়েই শ্যাষ হল। এই অসুময়ে খড় বেচবেক কে!

তা কী বলতে আইচিস?

রফিকুলকে উঠিই দাও, পলুই লিয়ে বেরুব।

কানখড়কা রফিকুল ওদের কথোপকথনেই জেগে গেল।

আয় বাপ, মাছ ধরতে যাব।

চোখ কচলে কচলে রফিকুল পিঁড়েতে নামল।

তুর দাদোর ছাতাটা সঙ্গে লিয়ে চল খুকা। — বলে ঘরের ভেতর থেকে সার্জার টর্চটা বের করে আনল মজিদ। পিঁড়ের দেওয়ালে এখানে ওখানে পেরেক পেটানো, পেরেকে নানারকম হাবিজাবি জিনিস তুলা আছে। মাছ রাখার খালুইটা পেড়ে রফিকুলের হাতে দিল। বাঁশের আতি দিয়ে বোনা পেছের মতো মিহি বুনোট। সামনের দিকটা ডিমের মতো ছুঁচোলো, সেখানে ছেঁড়া মশারি দিয়ে ল্যাপটানো। ফুটো দিয়ে মাছ ভরে দিলে তার আর বাপের সাধ্য নেই যে বেরিয়ে যায়। মজিদ নিজে নিল ভারী পলুইটা।

টর্চের আলো ফেলে ফেলে মজিদ সামনে হাঁটছে, রফিকুল বাপের পেছন পেছন। রফিকুল ভাবল, শালার এ টর্চ বটে একখানা! এত জ্যোতি! আমাদের গ্রামের আর কারও এমন টর্চ নেই, শুধু মাছচাষি মালু সেখ ছাড়া। পুকুরের এমাথা থেকে জ্বাললে ওপারের মাছচোরের মুখটাও জ্বলজ্বল করে ওঠে।

মজিদ লুঙ্গির কোঁচড়ে গুঁজে রাখা বিড়ি বের করে ধরাল একখানা। অন্ধকারে লাল বিন্দুটা একবার বাড়ে, একবার কমে। রফিকুল বলল, আমাদের আগেই যদি কেউ যেয়ে ঘেটকিয়ে দেয় আব্বা, তাইলে তো মাছই পাবুনি।

ধুর খ্যাপা! বাদাটা কী ছোটোখাটো? মেলা পানি, মেলা মাছ! তবে আগে যেতি পারলে লাভ আছে, দল-দাবড়ার ভেতরে মাছ লড়বেক ভালো।

আঁধারে ধানবাড়ির ওপর দিয়ে জোলো বাতাস বওয়ার শনশন শব্দ ওঠে। জমির আল বরাবর হেঁটে হেঁটে ওরা নদীর ধারে চলে এল। নদীর এধারে সারি সারি বাঁশবন, তাল-খেজুরের গাছ। মাঝেমধ্যে ইতস্তত ছড়িয়ে ছিটিয়ে শ্যাওড়া, বাবলা, আর বেনাঝোপ। পাড়টাকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বিড়িটায় শেষ টান মেরে মজিদ ছুড়ে ফেলল নদীতে। ছ্যাঁক শব্দ করে ভেসে গেল স্রোতে। পলুইটা কাঁধের বাঁ পাশ থেকে ডান পাশে করল। আচমকা নদীর দিকে আলো মেরে মজিদ বলল, পানিটা বেড়েচে মুনে হচ্চে খুকা! বিকালে দেখলাম চরগুলো ডুবেনি, আর এখন দেখ একটাও চর বেরিয়ে নাই। — রফিকুল তাকাল নদীর পানে, কিন্তু কোনও সায় দিল না। পানি বাড়া দেখলে মজিদের গায়ে এখনও কাঁটা দেয়। কথার মোড় ঘুরিয়ে বলে, চো চো, টপটপ পা চালা।

কাদার ওপর চলতে ছপছপ শব্দ উঠছে। আঁধার রাতে বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে আচমকা কোনও রাতজাগা পাখি ভয়ে ডানা ঝাপটায়। ঝোপঝাড়ের ভেতর নাদুস-নুদুস জাড় ব্যাঙগুলো কুবকাব ঝাপ মারে নদীতে। মজিদ ভাবে, মোসলমানদের ব্যাঙ খেতে নাই, হারাম! নাইলে তরকারির কুনু চিন্তা থাকেনি। বাগদিপাড়ার চ্যাংড়া ছেলেপুলেরা মাঝেমধ্যে ব্যাঙ মারতে বেরোয়। মারার কী কৌশল! ব্যাঙের চোখের পানে টর্চ মেরে দাঁড়িয়ে থাকলে ব্যাঙ তখন চোখে আঁধার দেখে। লাফিয়েও পালায় না। তখন সুযোগ বুঝে গপ করে কেঁচা দিয়ে গেঁথে দিলেই খালাস।

ঘোরের মধ্যে থেকে মজিদ বলে, তুই বান দেখেছিস খুকা?

না দেখি নাই।

হঃ দেখেছিস।

না, দেখি নাই বলছি।

তুই দেখেছিস, কিন্তু মুনে পড়তেছেনি। তখন তো তুই পা-পা করে চলতে শিখেছিস। খুকারে এই শালী তুর মাকে খেল, ঘরবাড়ি খেল...

রেতের বেলায় ওসব কথা বল না আব্বা। আমার ডর লাগে। — মজিদ চুপ করল। চলতে চলতে রফিকুল আচমকা প্রশ্ন করে, বান কেনে আসে আব্বা?

মানুষকে কাঁদালে যেমন কাঁদে, হাসালে হাসে, রাগালে রাগে। নদীও তেমনি পারা। — রফিকুল বাপের কথার মানে বুঝতে পারে না।

বাদাবনের কাছাকাছি একটা নালা। নদীতে পানির বেগ থাকলে নালা দিয়ে পানি বয়ে যায় ভাড়ালগোড়ের মাঠের পানে। টর্চের আলোয় কালো কালো তালের মতো দুটো মাথা নালাতে নড়ছে। কাছে যেয়ে মজিদ বলল, কী বে লেউলে, রেতের বেলায় মাগ-ভাতারে জাল এড়েছিস? তা মাছ কেমন উঠচে বে?

লেউলের বউ ফিকফিক করে হাসল মজিদের কথা শুনে। এই নির্জন নিঃস্তব্ধতাকে খানখান করে ভেঙে দিয়ে লেউলের বউয়ের হাসিটা চরাচর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। লেউলে বলল, মাছ কুথায়! পতি খেপে শুদু দু-চারটা পুঁটি মাছ!

পুঁটিমাছের চরচরানি/ ভাত দে লো পাটের রানি... গুনগুন করতে করতে ঝাঁপিয়ে সরু নালাটা পেরোল। নালার পর শুরু হয়েছে বাদাবন।

নদী এখানে ধ্বস ছেড়ে ছেড়ে খাল-ডোবা, সরু সরু অজস্র নালার সৃষ্টি করেছে। ধান চাষ হয় না। ঝোপঝাড়, নলখাগড়া, কাঁশবন, আর কলমি-কচুরিপানার রাজত্ব। দলদাবড়ার ভেতরে কই, ল্যাটা, চ্যাং, মাগুর এমনকী পুকুরের দেশি রুই-কাতলাও ঘুরে বেড়ায়। শুধু কি মাছ? ফকিরডাঙার ঝোপের কবরের ভেতর থেকে বুড়ো ফকিরও নাকি পানির ভেতর মাছের সুরত ধরে ঘাপটি মেরে থাকে। কেউ যদি ভুল করেও পলুইয়ে চেবে দিয়েছে, তো সে আর এগোতেও পারে না, পেছোতেও পারে না। পানির ভেতর শুঁড়ের মতো কী যেন জড়িয়ে পায়ে ধরে। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় নদীর পেটে। — সেই কোন যুগ থেকে কথাটা শুনে আসছে মজিদ। ভাগ্য ভালো তেনার কখনও পাল্লায় পড়েনি।

লুঙ্গিটা সেঁটে পাছার তলা দিয়ে গলিয়ে পেছনে গুঁজে মজিদ নেমে পড়ল হপর হপর, রফিকুল প্যান্ট গুটিয়ে বাপের পিছু পিছু। এই বাদাবনে বর্ষায় আধহাঁটু পানি থাকে।

টর্চের আলো ফেলে ফেলে মজিদ স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে লক্ষ রাখছে পানির দিকে। কোথাও দলদাবড়ার ভেতর মাছ নড়ে উঠলেই ঝপাং করে চেবে দিচ্ছে পলুইটা। তারপর বাঁ হাত দিয়ে পলুইটা চেপে ধরে, ডান হাত পলুইয়ের ফুটো দিয়ে গলিয়ে হাতড়াতে থাকে। মাছ চাবা পড়লে অভিজ্ঞ হাত খপ করে মাছের টুঁটি চেপে ধরে বের করে আনে। পলুইয়ের ছোট্ট চৌহদ্দির মধ্যে মাছ বাবাজির আর বেরোনোর উপায় থাকে না। মাছগুলো রফিকুলের হাতের খালুইটাতে ভরে দিচ্ছে। রফিকুল মাঝেমধ্যে খালুইটা পানিতে চোবায়। তাতে মাছ জিয়ন্ত থাকবে ভালো।

গাভীন মোষগুলো আশমানে চরতে চরতে ঢুস করে ধাক্কা খেতেই ঝিমঝিম করে পানি নামল আবার। রফিকুল নিমেষে খালুইটা বগলে গলিয়ে নিয়ে ছাতাটা ফুটাল। মজিদও আশ্রয় নিল ছাতার তলে। আঁধারে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পায়ের পাতায় পানির টান অনুভব হচ্ছে। মজিদ ভাবল ভাগ্যিস আব্বার বুড়ো ছাতাটা এনেছিল। এ শালার ছাতা বটে একখানা! ভাঙতে ভাঙেনি। অথচ পাটজোড়ের হাটে সে কত ছাতা কিনেছে। একটাও টেকেনি— একটু জোরে হাওয়া দিলেই ফড়াস! মজিদ উপরপানে চাইল। এ তো ছাতা নয়, যেন আস্ত একটা ছাউনি! এই যে লম্বা কাঠের বাঁটটা, এটা পূর্বপুরুষের মেরুদণ্ড। আর এই জালিকাকার ছিপগুলো সব পূর্বপুরুষদের হাড়-পাঁজরা। সমস্ত পূর্বপুরুষরা মাথার ওপর ছাউনি হয়ে যেন তাদের রক্ষা করছে। এর তলায় ঢুকে গেলে আর কোনও চিন্তা নেই।

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই রফিকুলের প্যান্ট ভিজে গেল। বৃষ্টিটা কমেছে। মজিদ বলল, এত পানিতে কুথায় মাছ লাফাচ্ছে বুঝা মুশকিল।

তাইলে চলো, আর এট্টু ডাঙা পানে যাই।

ডাঙায় মাছ লাফাচ্ছে!

বাপের এই রাগের কারণ খুঁজে পায় না রফিকুল। তবে বোঝে, বেশি মাছ না পাওয়ায় আব্বার মেজাজটা খিঁচড়ে আছে। সেই থেকে ঘুরে ঘুরে মোটে গোটা তিনেক কই, আর কয়েকটা ল্যাটা মাছ।

মজিদ বলল, তুকে লিয়ে আর মাছ ধরতিই আসবুনি। যা হপর হপর চলিস, মাছ তো ধারেকাছে ঘেঁষবেনি!

আগের বছরেও বর্ষায় বাদায় মাছ ধরতে এসেছিল রফিকুল। মুষলধারে বর্ষা নেমেছিল তবু এত পানি থাকেনি, অথচ এবারে সেভাবে বর্ষাই নামেনি তাও বাদায় এত পানি!— ব্যাপারটা মাথায় ঢোকে না রফিকুলের। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল মজিদ। চুপ খোকা, চুপ!

রফিকুল কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করল।

পানি আছড়ানোর ছলাৎ ছলাৎ শব্দ পাচ্ছিস খুকা? — বলেই বাদার বাবলা গাছের পানে টর্চ মারল মজিদ। ভয়ে থরথর কাঁপছে। বাপকে এমন কাঁপতে দেখে রফিকুলের খুব ডর লাগল। মজিদ নিমেষেই একবার আশপাশটা চেয়ে দেখে কী বুঝল কে জানে! ত্রস্ত রফিকুলের হাতটা হ্যাঁচকা টান মেরে ধরে ছুটতে লাগল। উঠ উঠ, টপ টপ উঠ খুকা! বান আইচে রে! সব শ্যাষ করি দিবেক। এই শালি কাউকে ছাড়বেনি, তুর মাকে খেইচে, আরও অনেককে খাবেক! — হপর হপর করে দুইজন ডাঙায় ওঠে। হস হস করে নিশ্বাস নেয়। হাঁপাতে হাঁপাতে মজিদ বলল, মাছের হুবে আমরা আজ মরতে বসেছিলাম রে! শালার খিয়ালই নাই। চো চো তাড়াতাড়ি চো। গাঁয়ের লোককে খবর দিইগা।

আসার সময় যে পথে এসেছিল ওরা, সেই বাঁশতলার নিচে দিয়ে পানি বইছে। কী প্রচণ্ড স্রোত! কী তার গর্জন! এমন স্রোত দেখে মজিদের গায়ের লোমগুলো খাড়া হয়ে গেছে। পড়িমরি করে ধানবাড়ির আলপথ দিয়ে ছুটতে থাকে দুজন। গ্রামে পৌঁছে দেখে পানির শব্দে অনেকে উঠে পড়েছে। বাগদিপাড়ার মানুষরা টেনেটুনে ঘরের জিনিস বের করে নিচ্ছে।

দুই

অনেক বছর নদীটা এইভাবে ফুলেফেঁপে ওঠেনি। সেই যে একবার হয়েছিল ‘কাল’বান! তখন রফিকুল আড়াই বছরের। সেদিনের কথা ভাবতে মজিদের গায়ে কাঁটা দেয়। সেই বান কলজেটাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে গেছে। এইজন্য মজিদ তার চোদ্দোপুরুষের নামে গালিগালাজ দেয়, শালারা ঘর বাঁধার আর জায়গা খুঁজে পায়নি। নদীর ধারে ঘর বেঁধেছেল! পানি বাড়লে নদীর কিছু এসে যায় না, এসে যায় নদীপাড়ের জনজীবনের। নদী ঠিক তার পথ করে নেয়। সেবার আশমান ফুটো হয়ে গেছিল, আর মিকাইল কুলোয় করে পানি ঢালল। রাত্রে শুয়ে আছে সবাই। হঠাৎ ভোরের দিকে রফিকুল কঁকিয়ে কেঁদে ওঠে। ধড়মড় করে উঠে পড়ে রফিকুলের মা। মজিদ মোষের মতো ঘুমোচ্ছিল। রফিকুলের মা ঠেলা মারে, এই শুনছ, কই গো, তাড়াতাড়ি উঠো।

হয়েচে কী?

হা দ্যাখো, ঘরের ভেতর পানি ঢুকে গেছে। বিছানা-টিছানা সব ভিজে সপসপে।

ওদিকে পাশের ঘরে মজিদের বাপ-মা জেগে বসেছে। নিমেষেই মজিদ রফিকুলকে কোলে তুলে নেয়। ভীত দৃষ্টিতে পাঁই পাঁই করে চোখগুলো ঘুরিয়ে দেখে নেয় আশপাশটা। কিছু শোনার চেষ্টা করে। চারিদিকে শোরগোল পড়ে গেল, বান আইচে গো! বান...

কিছু আর নেওয়ার সময় পায় না মজিদ। হড়াস করে পানির স্রোত ঘরের ভেতর আছড়ে পড়েছিল। রফিকুলকে কাঁধে তুলে নিয়ে রফিকুলের মায়ের হাত ধরে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। মজিদের বাপ-মাও বেরিয়ে পড়েছিল। আঁধারে চেয়ে দেখে চারিদিকে সাদা কাপড়ের মতো থইথই পানি। কী প্রচণ্ড স্রোত! কোনদিকে পথ, আর কোনদিকে খাল-ডোবা, মালুম হয় না। পা টিপে টিপে এগোচ্ছিল। হঠাৎই হুমড়ি খেয়ে রফিকুলের মা পড়ে গেল আঁধারে। আর উঠতে পারেনি। খ্যাপা মোষের মতো পানির স্রোত গুঁতিয়ে গুঁতিয়ে নিয়ে যায় শালির পেটে। রফিকুলকে শক্ত করে ধরে মজিদ উঠেছিল সাবেরালির দু-তলা দালানকোঠায়। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিল। মজিদের মা বলেছিল, তুর বউ কই মজিদ, তুর বউ কই?

হাঁওমাও করে কেঁদে উঠেছিল মজিদ। সে আর নাই গো! স্রোতে ভেসি গেছে!

তিনদিন তিনরাতের পানিতে সরু কেঁচোর মতো লিকলিকে নদীটা কেলে সাপ হয়ে ছোবল মেরেছিল পাড়ের গ্রামগুলোকে। কত যে ঘরবাড়ি ধ্বসে পড়েছিল! গোরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, মানুষ ভেসেছিল নদীতে। মোসলমান পাড়াটা তাহলে নদীর থেকে দূরে, কিন্তু বাগদিপাড়ার কিছুই আর রাখেনি। সবাই আশ্রয় নিয়েছিল গ্রামের দালানবাড়িগুলোয়। ইস্কুলঘরে। বিডিও এসেছিল, রিলিফের গাড়ি এসেছিল, সাংবাদিক এসেছিল। সেই থেকে নদীটা ধ্বস ছেড়ে ছেড়ে অনেক চওড়া হয়ে গেছে।

বাসেদ মেঝের ভেতর শুয়ে শুয়ে খকখক কাশছে। আমি কি কিছু বুঝি না ভাবচিস? সব বুঝি, সব টের পাচ্চি।

মজিদ খেঁকিয়ে উঠল, তা টের পাচ্চ তো হয়েচে কী? ফুঁ দিয়ে পানিটা কমিয়ে দিবে?

রফিকুল দাদোর ঘরে প্রবেশ করে। শুনো দাদো, পানিটা বাগদিপাড়ার ভিতর দিয়ে বইছে। আমাদের এদিকপানে আসতে বহু দেরি!

আমাকে একবার লিয়ে চল না ভাই।

তুমি বুড়ো মানুষ কী কত্তে যাবে? ভিড়েমিড়ে কে কুথায় ঠেলি দিবেক!

বাসেদের বয়স নব্বইয়ের ওপরে। সেকালের খাঁটি আখের গুড়, বুটের ছাতু খাওয়া মানুষ। গ্রামে ওর বয়সি কোনও জন নেই। শুধু পোদোর পাড়ে বুড়ো অশোকগাছটা ইতিহাস বহন করে চলেছে।

বাগদিপাড়ার মানুষরা ঘরের জিনিসপত্র বের করে তুলেছে মোসলমান পাড়ায়। একটু বেলা বাড়তেই ধানবাড়িগুলো একগলা পানির নিচে। বিভিন্ন গ্রাম থেকে সাইকেল, মোটরবাইকে চেপে বান দেখতে এসেছে। চারিদিকে হইহই চইচই। যেন কোনও উৎসব! এ পাড়ের শিবডাঙা, লাগারডাঙা, করচমনি, পোলশোড়া, অলিগঞ্জ— ওপারের কামারডাঙা, পাটজোড়, বৌলা, পর্বতে, রপটগঞ্জ ঘেঁষে সোনামুখী পর্যন্ত থইথই পানি। যতদূর চোখ যায় শুধু সাদা আস্তরণ। সব গ্রামের একই অবস্থা! পানির কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে কয়েকশো মানুষ। কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে, ভিডিয়ো করছে। নদীর ওপাড়ের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ওধারেই হাসপাতাল, অফিস-আদালত। সকালে যারা পেরিয়েছিল, তারা ফেরার পথে খুবই বিপদে পড়ে। নদীর নিচ থেকে এক তালগাছ উঁচু ব্রিজের উপর দিয়ে একহাঁটু পানি বইছে। বাধ্য হয়ে কাঁধে সাইকেল নিয়ে, বউরা ছেলে কাঁকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এপারে আসছে। মজিদ চোখে চেয়ে দেখতে পারে না এসব। যেখানে তার ধানখেত, সেদিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

ঘরে ফিরতেই কচির মা বলে, কী গো, সকাল থেকে যে তুমি মুখে কিছু তুল নাই? নিজেকে এইভাবে শাস্তি দিলে হবেক? ধান তো তুমার একলার যায় নাই, গাঁয়ের বেবাক মানুষের গেছে।

গাঁয়ের বেবাক মানুষের শুধু চাষটাই ভরসা লয়, তাদের অন্য রুজগারপাতিও আছে। কিন্তু আমার ধানগুলো চলে গেলে সুমবচ্ছর খাব কী? হায় আল্লা! — মাথায় হাত দিয়ে মজিদ বসে পড়ল। কচির মা খেতে দিল। মুখে তুলতে মজিদের রুচি হয় না। কোনোমতে দু-মুঠো খেয়ে হাত ধুয়ে উঠে পড়ে।

শুনো কচির মা, শুধু ধানের চিন্তাই লয়। আমাদের ঘরটা মোসলমান পাড়ার সবথেকে বাইরে। পানির বেগ যে হারে বাড়ছে তাতে রেতের বেলাতেই আর থাকবেনি।

ও আল্লা! তুমার মুখে কী কুনু কথা বাধে না? ওসব কুলক্ষুণে কথা মুখে আনতে নাই গো! — কচির মায়ের বুকে হাহাকার।

গ্রামের প্রবীণরা মাথায় হাত দিয়ে হায় হায় করে ওঠে। এ কী আল্লার গজব পড়ল গো! এদিকে পানিই হয়নি, তবু নদীতে বান!

যারা টিভিতে-রেডিয়োতে খবর শুনেছে তারা বলে, এদিকে পানি নাই বা হল। পশ্চিমে প্রচুর পানি হইচে। বাঁকুড়ার টাউনে রাস্তাঘাট সব ডুবে যান চলাচল বন্ধ!

ভিড়ের মধ্যে একজন ফোড়ন কাটল, হঁ গো হঁ। সতীরঘাটের দুতলা দালানবাড়িটা ধ্বসে পড়ল। এত পানি যাবেক কুথায়? সব শালার গড়িয়ে গড়িয়ে এই পুবে ধেয়ে আসছে। রেতে পানি কুমলে ভালো, নয়তো সবার কপালে দুঃখু আছে।

তিন

বিকালের মধ্যেই পানিটা উঠে এল মোসলমান পাড়ার কাছাকাছি মজিদের ঘরের উঠোনে। গ্রামের অনেকে পরামর্শ দেয় মজিদকে, দেখ বাপ, মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলে চলবেকনি। পানি কুমার তো কুনু লক্ষণ দেকতিছিনি। জিনিসপত্র বের করে কারও বাড়িতে পার করে রাখ।

মজিদ বাঘের মতো হিংস্র দৃষ্টিতে তাকাল পানির দিকে। তারপর লেগে পড়ল তাড়াতাড়ি। অনেকে মজিদের সঙ্গে হাত লাগাল। গ্রামের সব থেকে বড়ো চাষি সাবেরালি মণ্ডলের দালান কোঠায় তুলল নিয়ে গিয়ে।

রফিকুল দাদোকে ঠেলে উঠাল। দাদো, ও দাদো, চলো এবার।

বাসেদ ঘুমোচ্ছিল। ধড়মড় করে উঠে বলে, কুথায় যাব ভাই?

পানিটা চলে এইচে উঠোনে। ফাঁক পানে বেরুবে চলো।

মজিদ ঘরের ভেতর ঢুকে বাপকে তুলে সোজা করে দাঁড় করাল। এই মাস তিনেক বিছানাতেই পড়ে রয়েছে। কচির মা, রফিকুল ধরে ধরে ‘বার বসাতে’ নিয়ে যায়। বুড়োকে মাঝে রেখে মজিদ ও রফিকুল দুইপাশে ধরে ফাঁকে বেরোল। বুড়ো পেছন পানে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, তুর বউ কই মজিদ?

ওরা সাবেরালির ঘরে উঠেছে, তুমি চলো।

আমার ছাতাটা লিইচিস তো?

হঁ সব লিইচি, তুমি চলো।

আকার লাঠিটা?

হঁ সব লিইচি।

হাঁটতে হাঁটতে বুড়ো থম মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঘোলাটে দৃষ্টিতে পানির দিকে চেয়ে ফোকলা দাঁতে হেসে বলল, এই বান দেখে এত ভয় পাচ্ছিস কেনে বাপ? এ তো হড়পা বান রে! এত ডরের কী আছে! এমন বান জেবনে কত দেখেচি।

চলো চলো, ওখান থেকুও দেখতি পাবে।

সাবেরালির বউ মনোয়ারা তালাই বিছিয়ে দিল মজিদের বাপকে। মনোয়ারা বলল, হ্যাঁ গা মজিদের বাপ, তুমার মুনে পড়ছে? আগের বারেও তো আমাদের ঘরে এসে উঠেছিলে। চাচি তখন বেঁচেছেল।

সন্ধে ঘনিয়ে পড়েছে। অনেকেই ভিড় জমিয়েছে এখানে। ভিড়ের মধ্যে নাসু মণ্ডল বলে ওঠে, তুমাদের মতো মজবুত ঘর গাঁয়ে আর কাদের আছে বলো দিনি চাচি?

গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে আঁধার রাত নামল। বাগদিপাড়া, মোসলমান পাড়ার কেউই রাতে শোয়নি। বস্তা-তালাই বিছিয়ে এর-তার ঘরের পিঁড়েতে, ধাপে, ছাদে বসে আছে। এখন হিন্দু-মোসলমান, ধনী-গরিব, সবার জীবন একই সুতোয় বাঁধা। কোলের বাচ্চা কঁকিয়ে কেঁদে উঠলে মায়ের বুক ধড়াস ধড়াস করে। গ্রামের কুকুরগুলো আশমানে মুখ তুলে তারস্বরে হু-উ-উ-উ ডাক পাড়ে।

সাবেরালির দালানের ছাদে উঠে বসেছিল গ্রামের কিছু মাথাওয়ালা মানুষ। ওরা একসময় নিচে নেমে এসে ভিড়টা আরও বাড়িয়ে দেয়। কবরেজ জিকিরুল্লা বলল, শুনো গো, এ বুড়ো ফকিরের কাজ। ফকিরডাঙার ঝোপ তো ডুবে গেছে। কব্বরের ভেতর দিয়ে যত গলগল করে পানি ঢুকছে, বুড়ো ফকির ততই রুষ্ট হচ্ছে। কতবার বলেছি, ওগো জায়গাটার একটু পরিচর্চা করো। সেই কুন কাল থেকে ফকির সাহেব ছেল মোদের গাঁয়ে। আমার কথা তো বাপু কেউ কানে লাওনি!

মাছচাষি মালু সেখের দুটো পুকুর ডুবে গেছে। মেজাজটা খুব খারাপ। ধমকে থামিয়ে দিল জিকিরুল্লাকে, তুমার ওই আলবাল কথা এখন তাকে তুলে রাখো দিনি! ফকির সাহেব রুষ্ট হয়েচে! সব শালার ধান্দা! ওখানে মাজার করে কবিরাজি ফলাবে লাই? — জিকিরুল্লার চোখ দুটো মরা মাছের মতো হয়ে গেল। হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে রইল।

গ্রামের ইমাম সাহেব হনহন করে সামনে এসে দাঁড়াল। ঘর থেকে চেয়ারটা বের করে বসতে দিল সাবেরালির ব্যাটা।

হালচাল কী বুঝছ গো জি?

শুনো ভাইসকল, গাঁয়ে সেরেকি গোনাহ প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। আল্লার রাস্তায় মানুষ আর যাচ্ছে না। টিভি-সিরিয়ালে সব মেতেছে। ছেলেছোকরারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পেচ্ছাব করে। লুকিয়ে ছাপিয়ে মদ-গাঁজা খায়। তাতে কী শুধু ছেলের দোষ! এই পাপের অর্ধেক ভাগীদার ছেলের বাপ-মা। ছোটো থেকে মক্তবে, মাদ্রাসায় না পড়িয়ে সব স্কুল-কলেজে ভরতি করছে। আল্লার কালাম না পড়ে, আখেরের দিনে পেরুবে কেমনে? — একটু ঢোক গিলে দাড়িতে হাত বুলিয়ে নিল ইমাম সায়েব। আবার বলল, বানে, মানুষের ফসল গেছে, ঘরবাড়ি পড়েছে। এ যখন খাদ্য ও পানির বৃদ্ধিজনিত সমস্যা, তখন নিশ্চয় মিকাইল ফেরেশতা মোদের প্রতি রুষ্ট হয়েছে। তার জন্য আল্লার দরবারে দুই হাত তুলে মোনাজাত করেন সবাই। আল্লা রসুলের নাম করেন। সব পানি নেমে যাবেক।

বাগদিপাড়ার কয়েকজন বসে আছে ভিড়ের মধ্যে। সর্দার ষষ্ঠীচরণ ভাবল, কতদিন পর আবার সব এককাছে হলাম। আগে মোসলমান পাড়ার লাগোয়া ঘর ছিল বাগদিদের। দুটো পাড়াকে আলাদা করে চেনা যেত না। ফলে অনেক সামাজিক সমস্যায় পড়তে হয় বাগদিদের। ভিনগাঁয়ে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে গেলে নানা কথা শুনতে হয়। নেড়েগুলোর সাথে মিশে মিশে নাকি নেড়ের মতো স্বভাব হয়েছে। সহজে কুটুম্ব করতে চাইত না কেউ। তাই একে একে নদীর দিকে সরে পড়েছে সব। ষষ্ঠীচরণের পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ল আজ। বাগদিরা এখনও তাকে সর্দার হিসেবে মান্য করে। ওর কথাতেই ওঠে বসে। কালো কালো নিরীহ মানুষগুলো আঁধারের সাথে মিশে আছে। মুসলমানদের মোনাজাত করতে দেখে ওরা মা কালী, বিপদতারিণীর নাম জপে।

পানিটা এখন মজিদের ঘর পেরিয়ে মোসলমান পাড়ার গোড়ায়। ভয়ের তাড়সে সাপ-খোপ, ইঁদুর, নেউল, স্যাডনা, বিছে পাড়ের দিকে এগিয়ে আসছে। কেউ কাউকে আক্রমণ করছে না। তারা যে পরস্পরের শত্রু, সে কথাটাই ভুলে গেছে। একজন বলল, দেখ মজিদ, ভাগ্যে ঘরের জিনিসগুলো বার করে এনেছিলি, এখন দেকগা ঘরের ভেতর পানি ঢুকে গেছে।

বাগদিপাড়ার অধিকাংশ ঘরই মাটির ঝিঁটেবেড়া খুপরি, কেউ কেউ ইন্দিরা-আবাসের টাকায় ইটের বাড়ি তুলেছে। ধপাস-ধস শব্দ করে অনেক খুপরিই পড়ে গেছে। বিড়িতে টান দিতে দিতে ষষ্ঠীচরণ বলল, তুমাদের মোসলমান পাড়ার তো কুনু চিন্তা নাই গো! ধানগুলো গেলেও, ঘরগুলো রইল। আর আমরা হলাম জলের পোকা। জলের ধারে বাস। কথায় বলে না, লদীর ধারে বাস/ চিন্তা বারোমাস। সেই যে ভিটেছাড়া হলাম একবার! কতরকম প্রতিশ্রুতি দিল সব। তবু শিক্ষে হল নাই শালাদের। আবার সেই লদীর ধারেই ঘর বাঁধলাম। আবার ভিটেছাড়া!

মালু সেখ মুখ ঝামটা দিয়ে উঠল, এ কী বলচিস বে ষষ্টে? ক্ষতি শুদু তুদের হইচে? মোসলমানদের ক্ষতি হয় নাই? আর আমাদের ঘর-দুয়োরের কী ভরসা আছে? রাতটা পেরুলেও কালই যে কপালে কী লেখন আছে সেটা বলিতে পারবে কেউ?

মালুনে সেই থিকে দেকচি খুব ফ্যাচর ফ্যাচর করচিস। পুকুরগুলো ডুবে গেছে বলেই তুর মাথাটা ঠিক নাই। চুপ করে বস। নিজেদের মধ্যে খামোকা ঝামেলা করিস কেনে? সবাইকে দিলের কথা খুলে বলতে দে। — পরিস্থিতিটা সামলে দিল সাবেরালি।

মজিদের বাপ শুয়ে শুয়ে সব শুনছিল। ওর চারপাশে এ বাড়ির বউ-ঝিরা ঘুমে ঢলছে। হঠাৎ নদীর ধার থেকে জনাকয়েক ছুটে এসে জানায়, শুনো গো সবাই, শুনো-ও-ও। পানি কমছে, পানি কমছে।

সঙ্গে সঙ্গে ছুটাছুটি পড়ে গেল। ভিড়টা হালকা হল অনেক। যাদের হাতে টর্চ আছে, তারা পানি দেখল। পানি এখন মজিদের ঘরের কাছাকাছি চলে গেছে। ঘরটা একদিকে কাত হয়ে গেছে।

ইমাম সাহেব কানে হাত দিয়ে আজান দিল। মোসলমানরা দুই হাত তুলে মোনাজাত করল, ও আল্লা এই গরিব-দুঃখীদের ওপর রহম করো। ছেলেপুলের মুখ চেয়ে ধানগুলো বাঁচিয়ে রাখো।

মজিদের বাপ খকখক করে কেশে বলল, তুদের শুদুতেই লাফালাফি, শুদুতেই কুদাকুদি! প্রেথম দেখেই বলেচি, এ হড়পা বান। হড়পা বানে ধানের কিছুই হবেকনি। বড়োজোর দু-চারটা গুছি পড়েমো লাগবেক। ‘কাল’বান পেয়েচিস, যে পলি পড়ে যাবেক!

দাদো তুমার কথাই ঠিক গো! পানি হড়হড় করে নেমে যাচ্ছে।

ভোরের দিকে মজিদের ঘরটা ধপাস করে ধ্বসে পড়ল। — এ কী হল গো আমাদের! বলে কচির মা নাকে কান্না জুড়ে দেয়।

মেহের মোল্লার ব্যাটা অঞ্চল অফিসে কাজ করে। গ্রামের সুবিধা অসুবিধা দ্যাখে। সে বলল, তুমি কাঁদো না গো চাচি। মাঝখান থেকে তুমরাই তো লাভ করে লিলে। মোসলমান পাড়ায় আর কারু ঘর তো পড়েনি। সকালে বি.ডি.ও সাহেব যখন পরিদর্শন করতে আসবেক, তখন ঘরটা দেখিই নামটা খাতায় তুলা করিই দিব।

আকবর সেখ বলল, সোধরুলে আমার গুয়ালঘরটা গেছে, সকালে ভুলে যাস না যেন!

আজ সকালে লাল টুকটুকে সূর্য উঠেছে। মুঠো মুঠো রং ছড়িয়ে দিচ্ছে শালীনদীর দু-পাড়ে।

অনুষ্টুপ, ২০১৯

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%