শোকনামা

হামিরউদ্দিন মিদ্যা

ভোরের ঝুঁঝকি আলোয় গোয়ালঘরের গোঁজ থেকে দড়ি খুলে, গোরুগুলো বের করে যখন বাথানে বাঁধল, তখনই বুধীর দিকে চোখ পড়ল মাসেমের। গোরুটার চোখ দিয়ে গড়গড় করে পানি গড়াচ্ছে। মাসেম গায়ে হাত বুলিয়ে পরখ করে দেখল। কই জ্বর-সর্দিও তো হয়নি! কোনও কাঁপুনি নেই, নাক-মুখ দিয়ে সর্দি ঝরেনি, শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক, এমনকী কাশেওনি গোরুটা। তাহলে চোখ দিয়ে এমন পানি গড়ায় কেন? ষোলো বছর মাহিন্দার খাটার অভিজ্ঞতাতেও কোনও কূলকিনারা খুঁজে পেল না মাসেম।

বুধী ছোটো থেকেই মাসেমের খুব কাছ ঘেঁষা। হবে নাই বা কেন! গোরুটা তো মায়ের দুধ খেয়ে খেয়ে এত বড়ো হয়নি। মাসেমই ওকে খাইয়েদাইয়ে বড়ো করেছে। দুই মাসের বাছুরটা নিয়ে মাসেমের সে কী কষ্ট! গাইটা তো হুট করে মরল। সেদিন আলুবাড়ি থেকে ছিঁড়ে আনা ঘাসে কী যে ছিল কে জানে! বুধী জন্মানোর পর প্রতিদিন গাইটাকে আদর করে ঘাস খাওয়াত মাসেম, ভাগ্য ভালো অন্য গোরুগুলোকে দেয়নি। সকালে গোয়াল থেকে গোরু বের করতে গিয়ে দেখে গাইটা পেট ফুলে ঢোল হয়ে মরে পড়ে আছে। শুধু কেনা দুধ খেয়ে খেয়ে বুধী তো এত বড়ো হয়নি। রাতের অন্ধকারে লোকের গোয়ালঘরে মগ হাতে চুপিসারে ঢুকে পড়ত মাসেম। গাইগোরুর বাঁটে হাত লাগিয়ে চু-চু করে দুধ দুইয়ে নিত। সেই তাজা দুধ মাইপুশে ভরে গুঁজে দিত বুধীর মুখে। পরম তৃপ্তিতে পান করত বুধী। তাই তো মাসেমের প্রতি এত টান। দুধের ঋণ গোরুটা কী সহজে ভুলতে পারে!

গলায় একটা পিতলের ঘণ্টি বেঁধে দিয়েছিল মাসেম। খুব ছটফটে ছিল বুধী। তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে বাগান টপকে চলে যেত এখানে সেখানে। হয়তো লোকের গোয়ালঘরে ঢুকে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকত, কোনও বাথানে বাঁধা গাইগোরুর বাঁটে মুখ লাগিয়ে দুধ খেয়ে নিত চুচাড়ে, পথচলতি মানুষকে বাগে পেলে তেড়ে নিয়ে যেত। দস্যিপনার শেষ ছিল না। অবশেষে ঘণ্টির ঢং ঢং আওয়াজকে অবলম্বন করেই খুঁজে পেত।

মাসেমের আদর বুঝত বুধী। একমনে বসে যখন ছানি কাটত মাসেম। তখন পেছন পানে গিয়ে জিভ দিয়ে চুকচুক করে গা চেটে দিত। গাইগোরুর দড়ি ধরে কোথাও নিয়ে গেলে বাছুর যেমন মায়ের পিছু পিছু আপনাআপনি গুটগুট করে হাঁটতে থাকে, মাসেমেরও তেমনি অবস্থা। কোথাও যাবার জো নেই, বুধী পিছু ছাড়ত না। তা দেখে লোকে মজা মেরে বলত, হা দেখ রে লাইলা-মজনু চলল।

হাসতে হাসতে মাসেম জবাব দিত, মানুষ তো নয়, যে দু-দিনেই ভুলে যাবেক।

গোয়ালের পাশে ছানিঘর। খড় কেটে কেটে ভরতি করে রেখেছে মাসেম। সেখান থেকে ঝুড়ি করে ছানি এনে বাথানের ডাবাগুলো ভর্তি করে দিল। গোরুগুলো মুখ নিচু করে ছানি খেতে লাগল, কিন্তু বুধী মুখে তুলল না। মাসেম খুব চিন্তায় পড়ে গেল, এ তো ভালো লক্ষণ নয়!

এই সবেমাত্র সকাল হয়েছে। সারকুঁড় থেকে শুকনো পাঁশ এনে ছড়াতে হবে গোয়ালে। গোবর-মুতে জ্যাবজ্যাবে হয়ে আছে। শুকনো পাঁশ ছড়ালে ঝাঁট দিয়ে গোয়াল-কাটা সুবিধে হয়। মাসেম লুঙ্গির কোঁচড়ে গুঁজে রাখা একটা বিড়ি বের করে ধরাল। ঝুড়িটা নিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে সাড়কুঁড়ের কাছে গেল পাঁশ আনতে। এমন সময় রশিদ আলীর বাড়ি থেকে কে যেন কঁকিয়ে কেঁদে উঠল। বিড়িটা হাত থেকে খসে পড়ল মাসেমের। মেয়েমানুষের গলা! এই সাতসকালে এমন করে কাঁদে কে?

মাসেম বাগানের বেড়া ডিঙিয়ে রশিদ আলীর বাড়ির কাছে হাজির হল। বাগানের পাশেই প্রাচীর ঘেরা দোতলা দালানবাড়ি। রান্নাঘর, বাথরুম, কলতলা নিয়ে ভেতরে অনেকটা এলাকা। গলাটা চিনতে পারল মাসেম। এ যে রশিদ আলীর বিবি খোদেজার গলা! তার এমন সাতসকালে মরাকান্নার মানে কী!

ভেতরে প্রবেশ করার জন্য প্রাচীরের গায়ে একখানা দরজা লাগানো। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। এখনও কেউ ঘুম থেকে ওঠে না। মাসেম দরজাটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ততক্ষণে আরও কয়েকটা গলার আওয়াজ মিলিত হয়েছে। ব্যাপার খুব সাংঘাতিক— ভেবে মাসেমের বুকটা ঢিপঢিপ করে উঠল। পাশের বাড়ি থেকে কান্নার আওয়াজ শুনে বদরুলের বউ, নাসের সেখ বেরিয়ে এসেছে। ওরাও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ে। সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে।

কিছুই তো বুজতি পারতিচিনি— বলে নাসের সেখ জোরে দরজা ধাক্কা দেয়। একটু পরেই দরজা খুলে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে রশিদ আলীর বড়ো ছেলে লিয়াকত। চোখ দিয়ে গড়গড় করে পানি গড়াচ্ছে। লিয়াকত ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, আব্বা আর নাই গো! ইন্তেকাল করেছে।

কান্নার আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেছে পাড়াপড়শির। রশিদ আলীর বাড়িতে ভিড় জমতে লাগল। খাটিয়ার উপর সুজনি কাঁথা বিছিয়ে শুইয়ে রেখেছে রশিদ আলীর লাশটা। যেন জিন্দা মানুষটাই, আয়েশ করে ঘুমোচ্ছে। নাকে কাপড় চাপা দিয়ে কাঁদছে খোদেজা ও রশিদ আলীর ছেলের বউগুলো।

দুই

রাত্রে মাগুর মাছের ঝোল মেখে মিনিকেট চালের ভাত খেয়েছিল রশিদ আলী। খাওয়াদাওয়ার পর কিছুক্ষণ আপন মনেই পায়চারি করল উঠোনে। ডুমুরজলার পাড়ে কাদু সেখের বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর ডাগরপারা চাঁদটা ডিমের ঘোলা কুসুমের মতো জ্যোৎস্না ঝরাচ্ছে। সেদিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে রশিদ আলী খোদেজাকে বলল, দেখছ বিবি, কী সোন্দর চাঁদ উঠেছে আজ!

খোদেজা ঘরের দাওয়া থেকে উঠোনে নামল। আকাশের পানে মুখ তুলে দেখল, চাঁদের আলোয় তারাগুলো কেমন তেল শেষ হয়ে যাওয়া লন্ঠনের মতো দিপ দিপ করছে। রশিদ আলীকে বলল, পুন্নিমের রেতে চাঁদ তো বরাবরই সোন্দর। কুনুদিন চেয়ে দেখেছ?

রশিদ আলী খোদেজার কথার জবাব দিল না। পাঞ্জাবির পকেট থেকে একখানা সিগারেট বের করে ধরাল। ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চাঁদ দেখল কিছুক্ষণ। তারপর আপন খেয়ালেই প্রাচীরের দরজাটা খুলে বাইরে বেরোল।

সবার খাওয়াদাওয়া হয়ে গেছে। ছেলে-বউরা সব নিজের নিজের ঘরে ঢুকে পড়েছে। সবার শেষে খায় খোদেজা ও রশিদ আলী। তাই শুতে রাত হয়। খোদেজা ঘরের ভেতর ঢুকে পালঙ্কের ওপর বিছানার চাদর পাতল। পা-তলে কাঁথা রাখতে হয়। ভোরের দিকে শিরশির করে ঠান্ডা লাগছে এখন। বিছানা করে দিয়ে খোদেজা ঘরের দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে খানিক। মনের ভেতর কিছুটা কৌতূহল ছোট্ট গুঁতে মাছের মতো লেজ ঝাপটা দিয়ে ওঠে। রেতের বেলায় কুথায় গেল মানুষটা? কিছু তো বলে গেল নাই!

সুড়সুড় করে বাইরে বেরিয়ে এল খোদেজা। এদিক-ওদিক তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেল না। হঠাৎ নজরে পড়ে বাগানে ঢোকার বাঁশের দরজাটার দিকে। কে যেন খুলে ভেতরে ঢুকেছে। মাসেম তো সাঁঝের বেলা গোরুগুলো বাথান থেকে গোয়ালে পুরে দিয়েই নিজের ঘরে চলে যায়। তাহলে নিশ্চয় মানুষটা বাগানে ঢুকেছে। এই রেতের বেলায় বাগানে কী করতে ঢুকেছে?— খোদেজা চুপিসারে বাগানে প্রবেশ করল। বাগানের আম, জাম, পেয়ারা, কাঁঠালগাছের পাতাগুলো জ্যোৎস্নায় স্নান করে নতুন শাড়িপরা বউয়ের মতো ঝিলিক মারছে। গাছপালার ফাঁকফোকর গলে, কচিপাতায় পিছল খেয়ে জ্যোৎস্না পড়ছে মাটিতে। কোথাও গাছের ছায়া, কোথাও চাঁদের আলো। এক মায়াময় আলোছায়ার পরিবেশ। খোদেজা মুখে কোনও কথা না বলে পরি পাওয়া মানুষের মতো আনমনাভাবে হাঁটতে থাকে বাগানে। গোয়ালের টিনের চাল থেকে জ্যোৎস্না ছিটকে গিয়ে পড়ছে খড়পালুই দুটোর ওপর। বুনো হাতির মতো পালুই দুটো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। খোদেজার চলার তালে তালে কাচের চুড়িগুলো ঠুনুক-ঠানুক আওয়াজ তোলে। খোদেজা ভাবে, এ যেন সাধারণ কোনও বাগান নয়, বেহস্তের বাগিচা!

হঠাৎ কাগজি গাছের তলায় ছাপ-ছাপ লুঙ্গি পরা, সাদা ধবধবে একটা মূর্তি দেখে চমকে উঠল খোদেজা। ওটা রশিদ আলী বটে তো! পাঞ্জাবিটা তো এত সাদা নয়। সারা গায়ে জ্যোৎস্না মেখে ওটা কে দাঁড়িয়ে? নিমেষেই কাঁঠালগাছের আড়ালে গা ঢাকা নিল খোদেজা। মূর্তিটার পিছু করতে থাকল। ঝাঁকর-ঝুমর কাগজি গাছটার উঁচু ডালের পানে মুখ তুলে, স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে কী দেখছে? কোনও নড়নচড়ন নেই, যেন মাটির সঙ্গে সেঁটে গেছে। খুব ডর লাগল খোদেজার। কোনোমতে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, কী করছ ওখানে?

রশিদ আলী চমকে উঠল। মুখ ঘুরিয়ে খোদেজাকে দেখল, কোনও সায় দিল না। গুটগুট করে খোদেজার পিছু পিছু এসে, ঘরে ঢুকে সটান শুয়ে পড়ে বিছানায়।

ফজরের আজান শুনে রোজ ঘুম ভেঙে যায় খোদেজার। রশিদ আলী শুক্রবারে ছাড়া নামাজ পড়ে না, শুধু জুম্বার নামাজটিই পড়ে। তাই ওকে উঠায় না খোদেজা। নিজেই উঠে কলতলায় গিয়ে বদনায় পানি নিয়ে ওজু করে, মেঝেতে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ে। যখন নামাজ পড়া শেষ হল খোদেজার, তখন বাইরে ঝুঁঝকি আলো ফুটে যায়। বুড়ো নিমগাছের টুগডালে বসা পানকৌড়িগুলো কিচকিচ করে ডাক পেড়ে উড়ান দেয় ভাড়ালগোড়ের মাঠের দিকে। এইসময় রশিদ আলী রোজ হাঁটতে বেরোয়। তাই ঠেলা মেরে খোদেজা উঠাতে থাকে, কই গো ঘুম হয়িছে? সকাল হয়ি গেছে, উঠো এবার।

অন্যদিনে খোদেজার একবার ঠেলা খেয়েই রশিদ আলী জেগে যায়। বিছানায় শুয়ে শুয়েই হাই তোলে, গা মোচড়ায়। আজ কোনও নড়নচড়ন নেই। কাঁথাটা মুখ পর্যন্ত টেনে ঢাকা নিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে আছে। খোদেজা কাঁথাটা গা থেকে সরিয়ে হাতটা ধরে ঝাঁকাতেই শিহরে উঠল। জিন্দা মানুষের শরীর এত ঠান্ডা? একেবারে হিম যে! রশিদ আলীকে ঠেলে সোজা করতেই হাঁওমাও করে কেঁদে ফেলল খোদেজা। পেট ফুলে ঢোল হয়ে মরে পড়ে আছে মানুষটা।

খোদেজা কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে গেছিল। চোখেমুখে পানির ঝাপটা দিতে জ্ঞান ফিরে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে কেঁদে রা পড়ে গেছে। গলা দিয়ে আর আওয়াজ বের হচ্ছে না। খোদেজা ভাবল, আমি কী কুনু ভয়ংকর খোয়াব দেখতিছি? জেগে উঠলেই দেখব কিছুই হয়নি, সব যেমনকার তেমন। কিন্তু এত মানুষজন এই যে আমার চোখের ছামুতে, সব কি খোয়াব? তাইলে কাল রেতের বেলা যা দেখলাম!

খোদেজা বিষয়টা কিছুতেই মেলাতে পারছে না। কাল রাতে বাগানে কার ডাকে ছুটে গিয়েছিল রশিদ আলী? ঝাঁকর-ঝুমর কাগজি গাছটার উঁচু ডালটার পানে মুখ তুলে, স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে কী দেখেছিল সে? তাহলে কি মৃত্যুদূত আজরাইল অমন মনভোলানো জ্যোৎস্না ঝরিয়ে হাতছানি দিয়ে বাগানে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল! আর কাগজি গাছটার উঁচু ডালটায় বসে রশিদ আলীকে দেখা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছিল, রশিদ আলী, তোমার সময় হয়ে এসেছে, এবার তৈরি হও। হয়তো মালেক-আল মউতের নির্দেশেই মানুষটা খোদেজার সঙ্গে একটাও কথা না বলে, চুপচাপ শুয়ে পড়েছিল বিছানায়!

মাসেমের চোখের সামনে রশিদ আলীর মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠল। কালকেই মানুষটা বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আহা গো, জলজিয়ন্ত মানুষটা হুট করে মরে গেল! ভুঁড়িতে হাত বুলিয়ে, সিগারেটে আয়েশ করে টান দিতে দিতে পুকুর, ইটভাঁটা, জমি-জায়গা, বাগান সব তদারকি করত। গ্রামের সবথেকে উঁচু দালানবাড়িটা, ত্রিশ বিঘা ধানি জমি, খামারে বাঁধা ঢাউসপারা দুটো ধানের মরাই, পুকুর, বাগান, টাকাপয়সা সব রইল পড়ে। সবাই যেন রশিদ আলীকে পরিহাস করছে, তুমি সাথে করে কিছুই নিয়ে যেতে পারলে না রশিদ আলী, কিছুই নিয়ে যেতে পারলে না!

মাসেম পালুই থেকে একবোঝা খড় টেনে ছানিঘরে নিয়ে যাবার সময় বুধীর দিকে চেয়ে দেখল। এখনও চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে। কী হল গোরুটার? এ বাড়ির কর্তা ইন্তেকাল করেছে বলেই এমন কান্না? তাহলে বাকি গোরুগুলো কাঁদছে কই? নাকি অন্য কারণ!

অন্য কারণটির কথা মাথায় আসতেই সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল মাসেমের। গ্রামে তো এখন অনেক মানুষজন। বাইরে থেকে এসেছে রশিদ আলীর আত্মীয়স্বজনরা। আজ জোহরের নামাজ বাদেই রশিদ আলীর জানাজার নামাজ পড়া হবে। আশপাশের গ্রামের কিছু মুসুল্লি -মেহমানরাও রশিদ আলীকে মাটি দিতে এসেছে। তাহলে কি এত মানুষজন দেখে বুধী কিছু টের পেয়েছে?

মাসেম ডাবাতে ছানি-খোল মেখে জাবনা খেতে দেয় গোরুগুলোকে। গোরু তো এখন খুব বেশি নেই। আগে চাষের বলদই ছিল তিনজোড়া। এখন রোটার ফালে চাষ! ধান কাটার সময় নেমে পড়ছে মেশিন। কম সময়ে, কম খরচে মাঠের ধান ঢুকে যাচ্ছে ঘরে। নেহাত খড়ের জন্য বিঘে দুই কাস্তেই কাটলেই হল।

বুধী মুখ তুলে ‘হাম্বা-আ...’ করে ডাক পাড়ল। চোখ দিয়ে পানি পড়ে পড়ে কালশিটে দাগ হয়ে গেছে। আপন মনেই মাসেম বুধীর গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে বলল, আর মাকে ডাকতি হয় না। তুর মা কি আর বেঁচে আছে!

বুধীর গায়ে হাত বুলোতেই শিরদাঁড়াটা তিরতির করে কেঁপে উঠল। লেজটা নাড়তে থাকল, কানগুলো দোলাল। বুধী কী বুঝল কে জানে! ডাবাতে মুখ ডুবিয়ে জাবনা খেতে থাকল।

বাগানের একধারে আমতলায় মাটি খুঁড়ে চুলো বানিয়ে রান্নার তোড়জোড় শুরু করেছে কয়েকজন। আছে মল্লিকপাড়ার ছমিরুল্লা, সেখপাড়ার আকবর আর লেদুনে। আকবর ওখান থেকে সরে এসে মাসেমের কাছে এসে দাঁড়াল। বাথানে বাঁধা গোরুগুলোর দিকে সন্দিগ্ধ চোখে পরখ করে বলে, মাসেম চাচা, কিছু বলেচে নাকি তুমাকে?

ইঙ্গিতটা বুঝতে মাসেমের দেরি হয় না। তবুও না-বোঝার ভান করে বলে, কী বল দিনি?

তুমি ন্যাকা নাকি! কুন গোরুটা জবাই করবেক, সেইসব কিছুই বলে নাই?

মাসেমের গা-টা ছ্যাঁক করে উঠল, যেন ইলেকট্রিক শক খেল। কোনোরকমে অবস্থাটা উপরে উপরে সামলে নিয়ে বলল, না রে বাপ, আমাকে তো কিছুই বলে নাই। তুই শুধিয়ে আসগা যা।

মাসেম কাঁধ থেকে গামছাটা নিয়ে মুখ মুছল। শরীরটা খুব ঘাম দিচ্ছে। সকাল থেকেই মাথাটা ভারী-ভারী, জ্বর-জ্বর ভাব। মাসেম জানে এবার কার পালা। কালো বকনাটা গেছে, লেজকাটা হেলেটা গেছে, বাঁজা বকনাটা গেছে, এবার— মাসেম হিসেব করল, যেহেতু একটা দুধেল গাই, যার বাচ্চাটা এখনও দুধ ছাড়েনি, আর একটা গোব্বিন, সেক্ষেত্রে মাসেম নিশ্চিত এবার বুধীর পালা।

আকবর হনহন করে এসে দেখল মাসেম থ্যাবড়া গেদে বসে আছে মাটিতে। গলা ঝেড়ে বলল, মাসেম চাচা, তুমিও আস একবার, ধরে দিবে। — বলে গোঁজ থেকে দড়ি খুলে বুধীকে টানতে টানতে নিয়ে যায়। বাগানের একপাশে কঞ্চির বেড়া দেওয়া একচিলতে সবজিবাড়ি। সেই সবজিবাড়ির বেড়ার আড়ালে ওরা হাজির হয়। ওরা বলতে ছমিরুল্লা, আকবর আর লেদুনে।

মাসেমকে আসতে না দেখে আকবর আবার হাঁক পাড়ে, কী হল চাচা? গোরুটা ধরে দিবে আস একবার, তিনজনে বাগানো যাবেক নাই।

ছমিরুল্লা মাথায় টুপি পরে ছুরিটা পাথরে ঘষতে ঘষতে শান দিয়ে মাসেমের দিকে তাকায়। আকবর আর লেদুনেকে শুনিয়ে বলে, ও আবাগীর ব্যাটা কেমন করে বসে আছে দেখ, ডাক ওকে।

আকবর বলল, দাঁড়াও চাচা। আমি একবার গিয়ে দেখছি।

আববর মাসেমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মাসেম চোখ বুজে বসে আছে। বিড়বিড় করে ভুল বকছে। তা দেখে আকবর জিজ্ঞেস করল, কী হয়িছে? অমন করে বসে আছ কেনে চাচা?

মাসেম বলল, আমার খুব জ্বর এইচে রে বাপ। তুরা বরং অন্য কাউকে ডাক। আমি ঘর যাচ্ছি।

আকবর পাশে বসে দেখল মাসেমকে। বলল, কাউকে দিইয়ে আসা করাব চাচা?

না বাপ, আমি ওই চলে যাব।

রহিমা মাসেমকে টলমল করে ঘরে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করল, কী হল গো তুমার? এই অবেলায় ঘর এলে?

জানটা খারাপ আমার, ভালো লাগে নাই, তাই চলি এলাম।

রহিমা মাসেমের কপালে হাত দিয়ে চমকে উঠল। — জ্বরে যে তুমার গা পুড়ে যাচ্ছে গো! পালিই এইচ ভালো করেচ। দাঁড়াও, আমি পিঁড়েতে বিছেন করে দিই।

শুয়ে শুয়ে মাসেম দৃশ্যটা কল্পনা করতে থাকে। এতক্ষণে ছমিরুল্লার ছুরির পোঁচে বুধীর গলা নিশ্চয়ই ফাঁক হয়ে গেছে। গলগল করে রক্ত ঝরতে ঝরতে জান খতম! ছুরি চালানোর আগে বুধী কি শেষবারের মতো ‘হাম্বা-আ...’ করে ডাক পেড়েছিল? কে জানে!

মসজিদের মাইকে ঘোষণা করা হল, লাশ গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আপনারা সব জানাজার নামাজে সামিল হতে হাজির হয়ে যান।

রহিমা বলল, কী গো, মাটি দিতে যাবে?

মাসেম গলায় বিরক্তি ঝরিয়ে বলল, যেতি পারবুনি।

তাইলে যেতি হয় নাকো। ভিড়ে-মিড়ে কুথায় উলটে পড়ি যাবে।

সবেমাত্র চোখে তন্দ্রা এসেছিল মাসেমের। ‘হাম্বা-আ...’ ডাকটা কানে আসতেই তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। ধড়মড় করে উঠে বসল তালাইয়ে। বাড়ির পেছনে তো ছাত্তার সেখের পুকুর। পুকুরপাড়ে আবার কাদের গোরু হামালছে? এ যে বুধীর মতো গলা! তাহলে কি বুধীকে ধরে রাখতে পারেনি ওরা, হাত পিচকে ছুটে চলে এসেছে? পালা বুধী, পালা। তুকে আমি বাঁচাতে লারব। — আপন মনেই বিড়বিড় করল মাসেম। টলমল করে পিঁড়া থেকে নেমে মাঝ উঠোনে দাঁড়াল। রহিমা রান্নাশালের ভেতরে বোধ হয়। ওকে কিছু না জানিয়ে নিঃশব্দে পুকুরপাড়ে চলে এল।

পুকুরটা খুব একটা বড়ো নয়। গ্রামের সবাই একে ‘গোড়ে’ বলে। এপার-ওপার জুড়ে বাঁশঝাড়, আঁকড়ঝোপ, ডুমুরগাছের বন। দুপুরবেলায় কেমন থমথমে পরিবেশ। ইতিউতি চেয়ে গোরুটাকে খুঁজতে থাকে মাসেম। এই মুহূর্তে কী দারুণ নিঃস্তব্ধতা! সমস্ত পুরুষমানুষরা এখন গোরস্থানে জানাজার নামাজে সামিল হয়েছে। খাঁ খাঁ করছে চারিদিক। গাছের পাতারাও নড়েনি। পুকুরের হাঁসগুলি পর্যন্ত চুপ করে গেছে। সবাই যেন রশিদ আলীর জন্য নীরবতা পালন করছে।

‘হাম্বা-আ...’ আবার ডেকে উঠল গোরুটা। মাসেম ডাকটা অনুসরণ করে লতাপাতা সরিয়ে আরও ভেতরে ঢুকে পড়ে। জ্বরের ঘোরে মাথাটা ভারী-ভারী লাগে। সারা দুনিয়াটা পাঁইপাঁই করে ঘুরছে। কিন্তু বুধী কই? এখুনি তো ডেকে উঠল। তুই পালা বুধী, ছুটে পালা। যেদিকে দু-চোখ যাবে, সেদিকে পালা! — পাগলের মতো বুধীকে খুঁজতে থাকে মাসেম। কোথাও তার দেখা মিলে না।

ওদিকে রহিমা মাসেমকে দেখতে না পেয়ে খুঁজতে বেরিয়েছে। পুকুরের ঘাটে এসে দ্যাখে মানুষটা ওপারে দাঁড়িয়ে। থম মেরে পানির দিকে চেয়ে আছে। কী আশ্চর্য! পুকুরটাও থম মেরে আছে। একটাও ঢেউ নেই কেন? রহিমার বুকটা ধড়াস করে উঠে। নিমেষেই মাসেমকে ডাক পাড়ল, জ্বর গায়ে গোড়ের পাড়ে দাঁড়িয়ে কী করছ?

মাসেম হেঁটে হেঁটে এপাড়ে আসে। রহিমাকে বলে, একটা গোরু হামালছে, তাই দেকতি এলাম।

রহিমা ভ্রূ কুঁচকাল, গোরু হামালছে? কুথায় গোরু? আমি তো শুনতে পাইনি!

মাসেম কোনও সায় দেয় না। ভ্যাবলার মত দাঁড়িয়ে থাকে। তা দেখে রহিমা খুব ডর পেয়ে যায়। কোনও শয়তান জিন নয়তো? গোরুর ডাক নকল করে, ভুলিয়ে-ভালিয়ে এই পুকুরপাড়ে ডেকে এনেছে, সুযোগ বুঝে... আর ভাবতে পারে না। বলে, জ্বর গায়ে কী শুনতে কী শুনেচ তার ঠিক নাই, মুনে হয় কোনও খোয়াব দেখেচ। এসো, ঘরে শুবে এসো।

আকবর যখন এল, মাসেম তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। শালপাতায় ঢাকা দেওয়া একটা থালাতে ভাত-তরকারি এনেছে মাসেমের জন্যে।

রহিমাকে বলল, কই গো চাচি, জ্বর কমল চাচার?

না বাপ, কমেনি। হাঁ দেক, মানুষটা কেমন কুঁকড়ে শুয়ে আছে। মাটি দিতেও যেতে পারেনি।

তাই তো শুনলাম। — বলে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল আকবর। হা লাও চাচি, এই খাবারগুলো রাখো। চাচা যেতি পারেনি, তাই রশিদ আলীর বড়ো বেটা লিয়াকত দিয়ে পাঠাল। — একটু ঢোক গিলে বলে, দুকান থেকি ওষুদ এনে খাওয়াও চাচাকে, এই অসুময়ে জ্বরজ্বালা ভালো লয়কো।

আকবরের হাত থেকে খাবারগুলো নিয়ে রহিমা ঘরের ভেতর পার করে রাখে।

মাসেম ঘুম থেকে জেগে উঠলে রহিমা বলল, হাতটা ধুয়ে লাও। ভাত খেইয়ি ঔষুদটা খেতি হবে। তাহেরের দুকান থেকি আনা করালাম।

আমার খেতি রুচি লাগে নাই। কিছু খাবুনিকো।

কিছু খাবুনি বললে হবেক? পেটে পীত পড়ি যাবেক যে! খালি পেটে ওষুদটাও খেতি বারণ করল।

রহিমা ঘর থেকে আকবরের দেওয়া ভাতের থালাটা এনে মাসেমের সামনে রেখে বলল, রশিদ আলীর বাড়ি থেকি তুমার লিগে পাঠাইচে, গোস্ত-ভাত, দুটি খেয়ে লাও।

থালাটার দিকে চেয়েই মাসেমের গা-টা গুলিয়ে উঠল। ভাতের উপর একবাটি গোরুর কষা গোস্ত। মুহূর্তে মাথার মধ্যে কী যেন ঘটে গেল। ভাতের থালা সমেত ধরে বোঁ করে ছুড়ে ফেলল উঠোনে। ভাত তরকারি সব ছড়িয়ে পড়ল ধুলোতে। ধাতব বস্তুটা মাটিতে আছাড় খেতেই ঝ্যাঁন-ন-ন... করে কঁকিয়ে উঠল।

রহিমা মাসেমের আচমকা এই আচরণের মানে খুঁজে না পেয়ে বলে, এ কী করলে গো! সব ফেলি দিলে?

মাসেম নিরুত্তর। মুরগিগুলো ছুটে এসে কাড়াকাড়ি লেগে গেল। খাবারের গন্ধ পেয়ে খড়ের চালা থেকে দুটো কাক সাঁই করে নেমে পড়ল উঠোনে। ছোটো ছোটো গোস্তের খণ্ডগুলোয় বসিয়ে দিল তাদের শক্ত চঞ্চু। যার আঘাত প্রথম টের পাচ্ছে মাসেম। ওই গোল-গোল খণ্ডগুলো শুধু তো গোরুর গোস্ত নয়, ওগুলো যে মাসেমের কলিজার টুকরো!

অনুষ্টুপ, শীত-বসন্ত সংখ্যা, ২০১৮

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%