অর্ণব মণ্ডল
কলিং বেলটা বাজানোর আগে একবার ভাবল অন্বেষা। বুকের ভেতরে একটা চাপা ভয় কাজ করছে। ওর সিলেক্ট হওয়ার পিছনে অনেক কিছু নির্ভর করছে। সেটা হতে পারবে তো ও? না হলেই কিন্তু শেষ! এতদিনের পরিশ্রম মাঠে মারা যাবে।
সাহস করে কলিং বেলটা বাজাল অন্বেষা। একবার দেখে নিল নিজের দিকে। নাহ, মেকআপটা এমন কিছু বেশি করেনি ও। সিনেমার অডিশনে যতটা করতে হয় ততটাই করেছে। সম্প্রতি একটি ছেলেকে বেশ ভালো লাগছিল অন্বেষার। তারও যে ওকে ভালো লাগে সেটা ও আগেই বুঝেছে। কথাটা বলার সময় বড্ড খেই হারিয়ে ফ্যালে ছেলেটা। অন্বেষার অবশ্য মজাই লাগে। মনোযোগ পেতে কারই বা খারাপ লাগে? কিন্তু সে ছেলের জন্য যে ওকে শেষ পর্যন্ত সিনেমায় অভিনয় করতে হবে, সেটা ও কস্মিনকালেও ভাবেনি।
বেল বাজার কিছুক্ষণ পরে একটি ছেলে এসে দরজাটা খুলে দিল। অন্বেষা ভেতরে ঢুকে দেখল আরও বেশ কয়েকজন মেয়েকে ডাকা হয়েছে। তারা আবার শাড়ি পরে এসেছে। এই রে! ওরও কি শাড়ি পরে আসা উচিত ছিল? ইস! এটা তো ভুল হয়ে গেল!
যে ছেলেটি দরজা খুলল সে বলল, “আপনি বসুন এখানে। ভেতরে ডেকে নেওয়া হবে।”
অন্বেষা বসল। কী ঝামেলায় ফেলল অনিটা। অবশ্য শুধু শুধু অনিকে দোষ দিয়ে তো লাভ নেই। ওর নিজেরও ইচ্ছে ছিল। তাই অ্যাকটিং ক্লাসটায় জয়েন করেছিল। তবে এত তাড়াতাড়ি যে ফিল্মে এরকম একটা রোল করার প্রস্তাবটা পেয়ে যাবে সেটা ও স্বপ্নেও ভাবেনি। কেমন একটা ভয় ভয় লাগছে ওর। কী যে হবে আজকে? অডিশনটায় পাশ করলে হয়।
ডিরেক্টর চঞ্চলদা প্রচণ্ড ভদ্র! উনি সেদিন বলছিলেন, “দ্যাখো অন্বেষা, আই রিয়ালি হ্যাভ হাই হোপস ফর য়ু। আমার মনে হচ্ছে এই রোলটার জন্য তুমিই পারফেক্ট। এরপর দেখা যাক তুমি অডিশনে কেমন পারফর্ম করো!”
ওর আগে যারা এসেছিল তাদের অডিশন হয়ে যেতেই বেরিয়ে গেল তারা। সেই ছেলেটি এসে এবার ওর নাম ধরে ডাকল। ওর পরে আর দুজন আছে। অন্বেষা উঠে গেল ভেতরের ঘরের দিকে। বুকের ভেতরে হাতুড়িটা এবার আরও জোরে জোরে পড়ছে বুঝতে পারল! ভেতরে গিয়ে দেখল চঞ্চলদা বসে আছেন একটা চেয়ারে। কানে ব্লুটুথ স্পিকার। কারও সঙ্গে কথা বলছেন ফোনে সম্ভবত। ওকে ঢুকতে দেখে সামনে সোফায় বসতে ইঙ্গিত করলেন।
ফোনে কাউকে একটা বললেন, “ওকে স্যার! ওকে!”
তারপর ওকে বললেন, “বলো অন্বেষা? টেনশন হচ্ছে?”
অন্বেষা বলল, “হ্যাঁ একটু!”
চঞ্চলদা বললেন, “টেনশন কোরো না। দ্যাখো, আমরা যে রোলের জন্য তোমায় ডেকেছি তুমি তো জানোই। কাদম্বরী দেবীর জীবন নিয়ে এই সিনেমা। তারই লিড রোলের জন্য আমরা একটা নতুন মুখ খুঁজছি!”
অন্বেষা বলল, “হ্যাঁ চঞ্চলদা, জানি! আচ্ছা শাড়ি পরে এলে কি বেটার হত?”
চঞ্চলদা বললেন, “আরে না না। কুর্তি অ্যান্ড জিনস ইজ ফাইন। সমস্যাটা ড্রেস নিয়ে নয়!”
অন্বেষা বলল, “ওহ আচ্ছা। তাহলে কি কিছু লাইন বলতে হবে?”
চঞ্চলদা বলল, “একেবারেই না। ওগুলো আমি করিয়ে নেব শুটের সময়। দ্যাখো কতকগুলো ব্যাপার আছে সেটা তোমায় বলি...
অন্বেষা বলল, “হ্যাঁ বলুন...
চঞ্চলদা বললেন, “দ্যাখো, সিনেমাটাকে আমরা ইন্ডিয়াতে রিলিজ করব না। কারণ সিনেমাটিতে বেশ কিছু দৃশ্য থাকবে যেগুলো ইন্ডিয়াতে অ্যালাওড না। সেন্সর বোর্ড অ্যালাও করবে না। কিন্তু আমরা সিনেমাটা পাঠাব বিদেশি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতে। এবং আমার ধারণা ওখানে বেশ ভালোই সমাদর পাবে আমাদের সিনেমা! বুঝতে পারছ তো?”
অন্বেষা ঘাড় নাড়ল।
চঞ্চলদা বললেন, “তোমায় খোলাখুলিই বলি সব। সিনেমায় কিন্তু আমরা ফুল ন্যুডিটি দেখাব। জানি বাংলা সিনেমার জন্য ব্যাপারটা খুব বোল্ড! কিন্তু এটা ভেবে পিছিয়ে আমরা আসব না।”
অন্বেষা বলল, “দেখুন চঞ্চলদা, সিনেমার স্ক্রিপ্ট যদি ডিম্যান্ড করে, তাহলে পিছিয়ে আসার প্রশ্নটাই আসবে কেন?”
“এগজ্যাক্টলি! এই কথাটাই লোকজনকে বোঝাতে পারছি না। এনিওয়ে, এখন ব্যাপার হল... মানে... তোমার কাছে আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে এটাই যে... তোমার ফুল ন্যুডিটিতে সমস্যা নেই তো?
অন্বেষা একটু থেমে বলল, “নাহ। আমি তো বললাম, স্ক্রিপ্ট যদি ডিম্যান্ড করে, তাহলে সমস্যা থাকার কথাও নেই!”
চঞ্চলদার মুখে এবার হাসি ফুটল, উনি বললেন, “গ্রেট। তুমি ধরে নাও তুমিই আমাদের মূল চরিত্রে থাকছ! শুধু আর-একটা ছোট্টো ব্যাপার রয়েছে!”
অন্বেষা বলল, “কী ব্যাপার?”
চঞ্চলদা বললেন, “আমাদের প্রোডিউসার যিনি রয়েছেন উনি তো অনেক টাকা ইনভেস্ট করবেন এটায়। এখন তুমি যদি লাস্ট মুহূর্তে পিছিয়ে যাও খুব ঝামেলা হয়ে যাবে। সেই কারণেই তোমায় আজ একবার প্রোডিউসারের কাছে যেতে হবে। এগ্রিমেন্টে সই করতে হবে একটা। টাকা কত কী দেওয়া হবে সব ওতেই লেখা থাকবে। আর ইয়ে...
- কী?
- প্রোডিউসার হয়তো একবার দেখতে চাইতে পারেন তোমায়। মানে... উইদাউট এনি ড্রেস অ্যান্ড অল… সেটায় চাপ নেই তো?
অন্বেষা কী বলবে বুঝতে পারছিল না। একবার গলা ঝেড়ে একটু থেমে ও বলল, “নাহ। চাপ নেই। উনি কি এখানেই আছেন?”
চঞ্চলদা বললেন, “এখানে বলতে আমরা হোটেলের এই হলটা ভাড়া নিয়েছিলাম অডিশনের জন্য। উনি এই হোটেলেই আছেন। ওপরের ফ্লোরে! ৩০২ নং রুম।”
- ওহ... আমি কি এখনই...
- হ্যাঁ। এখনই চলে যাও। আমি বলে দিচ্ছি ওঁকে। যেটা বলবেন শুনবে। এটা কিন্তু খুব বড়ো একটা ব্রেক! মিস কোরো না।
অন্বেষা একটু দোটানায় ছিল তখনও। তাও মুখে অল্প হাসি নিয়ে এসে বলল, “আচ্ছা। আসছি তাহলে আমি!”
- হ্যাঁ চলে যাও!
ব্যাপারটা একদম ঠিক লাগছে না অন্বেষার। অনি বলেছিল যা করতে বলবে করবি। কিন্তু সিলেক্টেড হতে হবে। খুব বড়ো অপরচুনিটি এটা। কিন্তু তাই বলে সিনেমায় অভিনয় করতে গেলে এসব করতে হয় নাকি?
৩০২ নম্বর রুমে গিয়ে বেল বাজাতে একজন চাকর গোছের লোক দরজা খুলল।
তারপর ওকে বলল, “আপনি দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিন। আমি বেরোব।”
অন্বেষা কথা না বাড়িয়ে দরজা আটকে দিল ভেতর থেকে।
তারপর ভেতরে এগিয়ে গেল। বাপ রে এটা নাকি হোটেলের ঘর! এত বড়ো! দুটো বড়ো বড়ো ফ্ল্যাটের সমান এই ঘরটা।
“ওয়েলকাম অন্বেষা দেবী!”
হঠাৎ ভেতর থেকে একটা ভারী গলার আওয়াজ পেল অন্বেষা। ও দেখল সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা একটি লোক হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে সামনে!
লোকটি বলল, “নমস্কার, আমি হৃষিকেশ চক্রবর্তী!”
অন্বেষা প্রতিনমস্কার জানাল! বলল, “চঞ্চলদা বললেন এখানে আসতে।”
হৃষিকেশবাবু বললেন, “বাহ! তা ভালো। চঞ্চল সব বলে দিয়েছে তো?”
অন্বেষা বলল, “হ্যাঁ। আপনি আমাদের সিনেমার প্রোডিউসার?”
হৃষিকেশবাবু হেসে বললেন, “আমি? না না! প্রোডিউসার বাবু খুব ব্যস্ত মানুষ। কলকাতাতে মডেলদের দেখাশোনা, ফাইনাল করা, এগুলো আমিই করি।”
অন্বেষা অবাক হল, “কিন্তু চঞ্চলদা যে বললেন, প্রোডিউসার নাকি দেখবেন আমাকে!”
হৃষিকেশবাবু বললেন, “হ্যাঁ। সে তো আমিই দেখব। তারপর উনি!”
অন্বেষার এবার ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগছিল না। এ আবার কী? এ বলে এ দেখবে! তারপর আবার বলে প্রোডিউসার দেখবে! ইয়ার্কি নাকি?
অন্বেষা বলল, “দেখুন, আমি চলি। আমার ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগছে না। প্রোডিউসারের সঙ্গে কথা বলার কথা ছিল আমার। সেটা যখন হল না, তখন বরং থাক!”
হৃষিকেশবাবু বললেন, “আরে কী যে বলেন অন্বেষা দেবী! থাকবে কেন? আমাকে আগে দেখে নিতে দিন! তারপর তো প্রোডিউসার সাহেব দেখবেন!”
অন্বেষা বলল, “না। হবে না। পারলাম না বস! আমি আসছি।”
অন্বেষা চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াতেই হৃষিকেশবাবু এগিয়ে এসে ওর হাতটা ধরলেন, “এত সহজে যে এখান থেকে যাওয়া যাবে না মামণি! আর তোমার যা ফিগার! প্রচুর দাম পাব আমরা!”
অন্বেষা বলল, “দাম পাবেন মানে? হোয়াট রাবিশ?”
হৃষিকেশবাবু বললেন, “এখনও এইটুকু বোঝোনি মামণি? দুধে শিশু তো পুরো! সিনেমা-ফিনেমা বলে কিছু নেই সোনা। আমরা সুন্দরী মেয়ে বিক্রি করে থাকি!”
অন্বেষা বলল, “হাতটা ছাড়ুন হৃষিকেশবাবু! ফল ভালো হবে না না হলে!”
হৃষিকেশবাবু হেসে বললেন, “বলো কী মা? আমায় থ্রেট দিচ্ছ? তুমি আমায় চেনো?”
অন্বেষা আর পারল না। আর-এক হাত দিয়ে টেনে একটা থাপ্পড় মারল লোকটার গালে। হৃষিকেশবাবু তখন ওর গলাটা চেপে ধরেছেন। অন্বেষা ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারল না! ও বুঝতে পারছে ও শ্বাস নিতে পারছে না। কোনোরকমে সব শক্তি সঞ্চয় করে ও বলল, “Vatican… Cameos… Vatican… Cameos!”
হৃষিকেশবাবু বললেন, “হ্যাঁ? কী?”
অন্বেষা অতিকষ্টে বলল, “আপনাকে... বলিনি...”
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে পিছনে খুব জোরে আওয়াজ হল একটা। হৃষিকেশবাবু হঠাৎ রুমের দরজা ভেঙে পড়তে দেখে চমকে উঠেছিলেন। ওঁর হাতটা একটু আলগা হতেই অন্বেষা ছাড়িয়ে নিল নিজেকে। আর তারপরেই ঘরের মধ্যে ঢুকে এল চারজন সাদা পোশাকের পুলিশ! হাতের রিভলবারগুলির লক্ষ্য একজনই। হৃষিকেশ চক্রবর্তী।
আমি দৌড়ে গেলাম অন্বেষার দিকে। ও তখন সোফাতে বসে পড়েছে গলায় হাত দিয়ে। আমি কাছে যেতেই আমার দিকে রাগি রাগি মুখ করে তাকাল! বলল, “কতবার Vatican Cameos বলে চেঁচাব? আরও আগে আসতে হয় তো!”
আমি পিছন দিকে ইঙ্গিত করে বললাম, “আরে আর বলিস না! আমি তো আসতামই... কিন্তু ও ব্যাটা আমায় বলছে আগে রাঘব বোয়ালের নামটা বলুক। তারপর ঢুকব!”
হৃষিকেশবাবু তখন হতভম্ব হয়ে গিয়েছেন। উনি বলছেন, “এসব কী? এটা প্রাইভেট রুম! এখানে ঢুকে এসব কী হচ্ছে? কে আপনারা!”
“ওহ প্লিজ! যখন হেরে গেছেন বলে বুঝতে পারছেন তখন সেটা মেনে নিতে শিখুন! এরকম ফালতু নাটক করবেন না!” বলল শারদ্বত হাজরা।
হৃষিকেশবাবু আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। শারদ্বত বলল, “অনিরুদ্ধ, অন্বেষা, আলাপ করিয়ে দিই। হৃষিকেশ চক্রবর্তী। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে সবথেকে বড়ো মহিলা পাচারকারী দল কাজ করছে, সেই দলের সেনাপতি উনি।”
হৃষিকেশবাবু তখন চেঁচিয়ে বলছেন, “কীসব আবোলতাবোল বলছেন? আমি সামান্য প্রোডিউসার মাত্র! কী মহিলা পাচারকারী? কী সব বলছেন বলুন তো?”
শারদ্বত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “শুনুন মশাই, আপনি অন্বেষাকে যা যা বলেছেন, সব রেকর্ড হয়ে আছে ওর রেকর্ডারে। কাজেই শ্রীঘরে আপনি যাচ্ছেনই। এবার এই ন্যাকামোটা বন্ধ করুন।”
হৃষিকেশবাবু আর কিছু বললেন না। একবার মনে হল কিছু একটা বলতে গেলেন। তারপরেই থেমে গেলেন আবার।
একজন কনস্টেবল এগিয়ে এসে হাতকড়া পরাল হৃষিকেশবাবুর হাতে। অন্বেষা বলল, “অনির দাদা আসেননি?”
শারদ্বত চেয়ারে বসতে বসতে বলল, “নাহ। নীলাদ্রিদা এল না। বলল এসব বাজে কাজে সময় নষ্ট করবে না।”
আমি বললাম, “উফ! তুমি থামবে!” তারপর অন্বেষাকে বললাম, “আরে দাদা বলল কী একটা কাজ পড়ে গেছে। তাই জয়ন্তদাকে পাঠিয়েছে। ও আপাতত নিচে আছে। চঞ্চল লোকটাকে একটু আদর যত্ন করছে। তারপর আসবে হয়তো!”
কনস্টেবলরা এরপর হৃষিকেশবাবুকে নিয়ে গেল বাইরে। শারদ্বত এসে বসল সোফায়! তারপর অন্বেষাকে বলল, “থ্যাংক য়ু। আপনি এই রিস্কটা না নিলে আজ কিন্তু কিছুই হত না!”
অন্বেষা আমার দিকে তাকাল। তারপর বলল, “আরে অনি যখন বলল প্রথম এই প্ল্যানটার কথা, তখন একটু ভয় লাগছিল। কিন্তু রোমাঞ্চের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে! তাই আর না বলতে পারলাম না!”
শারদ্বত পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে বলল, “এই আমি নিচে যাই। রাঘব বোয়ালকে এখনও ধরা বাকি অনিরুদ্ধ! ভুলে যেয়ো না।”
অন্বেষা বলল, “এক মিনিট। আপনি একটা কথা বলুন তার আগে...”
- কী?
- আপনি আমায় বলেছিলেন এই চঞ্চলবাবুর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে। তার মানে আপনি আগে থেকেই জানতেন যে এই লোকটা এই ব্যাপারটার সঙ্গে জড়িত।
শারদ্বত সিগারেটটা ধরিয়ে নিয়ে বলল, “তোমায় ওই অ্যাকটিং স্কুলে পাঠানোর আগেই আমি ওই স্কুলের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তো ওরা সবাই বলল ওদের সবচেয়ে পছন্দের স্যার চঞ্চলবাবু। বাকি সবার কিছু না কিছু খুঁত ছিল। কিন্তু এই ভদ্রলোকের ছিল না। যেমন মিষ্টভাষী, তেমনই ভদ্র, এবং সবাইকে ফিল্মে বা সিরিয়ালে চান্স করে দেন! এটা থেকেই বুঝলাম।”
অন্বেষা বলল, “হোয়াট? এটা থেকে আপনি বুঝেছেন যে চঞ্চল লোকটা প্রবলেম্যাটিক?”
শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ।”
- কেন? একজন মানুষ সব দিক থেকে পারফেক্ট হতে পারে না?
শারদ্বত বলল, “একেবারেই পারে না। অসম্ভব! উনি যে কাজটা করছিলেন সেই কাজের জন্য মিষ্টভাষী এবং ভদ্র হওয়া খুব জরুরি ছিল। যাতে লোকজন ওঁকে ভরসা করেন!”
অন্বেষা বলল, “কিন্তু আজ আমার আগে যারা অডিশনে ঢুকল তাদের এই ঘরে আসতে বলা হল না তো! ওরা কি কেউ ন্যুডিটিতে রাজি হয়নি?”
শারদ্বত বলল, “দেখুন এইসব লাইনে আপনাকে এমনভাবে কাজ করতে হবে যেন সবটা সত্যি মনে হয়। ওই অ্যাকটিং স্কুলে চঞ্চল বাবুর এত ফ্যান ফলোয়িং, তার কারণ হল উনি কয়েকজনকে সত্যিই ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন কিছু একটা। আর কয়েকজনকে উনি রাখেন শুধুমাত্র ওঁর বসদের জন্য। আপনি তার মধ্যে একজন!”
আমি বললাম, “কিন্তু বসের নাম তো জানা গেল না, তাই না?”
শারদ্বত বলল, “সে তোমার দাদা বের করে নেবে! ওটা নিয়ে আমার টেনশন নিয়ে লাভ নেই। তবে হ্যাঁ, অন্বেষা দেবী আজ যদি চঞ্চলবাবুর প্রস্তাবে না বলতেন, তাহলে কিন্তু আজকের অ্যারেস্টটা সম্ভব হত না!”
অন্বেষা বলল, “আরে চঞ্চলদা যখন বলল প্রোডিউসার দেখবে আমাকে উইদাউট এনি ড্রেস, তখন কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। সেইজন্যেই গলা ঝেড়ে বোঝালাম যে বুঝতে পারছি না কী বলব! তারপর আপনার কথাতেই হ্যাঁ বললাম।”
শারদ্বত চেয়ার থেকে উঠে পড়ল, বলল, “ওহ, দ্যাট রিমাইন্ডস মি, ইয়ারপিসটা দিন। যেটা আপনার কানে রয়েছে। নিচে গিয়ে জয়ন্তবাবুকে দিয়ে দিই!”
“ওহ হ্যাঁ। রাইট”, বলেই অন্বেষা কান থেকে খুলে দিল ছোট্টো ইয়ারপিসটা। এটার সাহায্যেই আমরা ওর সব শুনতে পাচ্ছিলাম বাইরে থেকে।
শারদ্বত বলল, “এনিওয়ে, তোমরা প্রেম করো। আমি নিচে যাই!”
আমি বললাম, “হোয়াট? প্রেম? তুমি না সত্যি... আরে... কী যে বলো!”
অন্বেষাও হাসল। বলল, “প্লিজ শারদ্বতবাবু, আপনিও না! আমি আর অনি একেবারেই প্রেম করছি না!”
শারদ্বত বলল, “ওহ আচ্ছা। তাহলে আমার ভুল। নান অফ মাই বিজনেস। এনিওয়ে, নিচে গেলাম আমি।”
কথাটা বলেই শারদ্বত এগিয়ে গেল দরজার দিকে। আমি তখন ভাবছি প্রেম? সিরিয়াসলি? শারদ্বত ওই কথাটা বলার পর ডিনাই করার আগে কয়েক সেকেন্ড টাইম নিল অন্বেষা। অনিরুদ্ধ থেকে অনিতেও বড্ড তাড়াতাড়ি শিফট করল অন্বেষা! এই ছোটো ছোটো জিনিসগুলো এখন খুব অবজার্ভ করতে শিখেছি শারদ্বতর দৌলতে! আর তা ছাড়া আমার জন্য এত বড়ো রিস্ক ও নিল। সেটাও কি...
“ও হ্যাঁ, আর-একটা কথা...” শারদ্বত দরজার কাছে গিয়েও ফিরে তাকাল, তারপর বলল, “এমার্জেন্সির সময় Vatican Cameos? রিয়্যালি? সবকিছুই শার্লক হোমস থেকে ঝাড়া বন্ধ করো ভাই! নিজের মাথা থেকেও কিছু বের করো!”
আমি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ নিচে খুব জোরে পরপর দুটো গুলির আওয়াজে চমকে উঠলাম আমরা সবাই। শারদ্বত দৌড়ে গেল সিঁড়ির দিকে। আমি আর অন্বেষাও গেলাম পিছনে।
অন্যান্য ফ্লোরের রুম থেকেও বেরিয়ে এসেছেন অনেকে। আওয়াজটা এসেছে একদম গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে। দৌড়ে গেলাম সেদিকে। শারদ্বতও আমাদের আগে আগে নামছে সিঁড়ি দিয়ে। নিচে গিয়ে দেখি পুলিশদের গাড়ির ঠিক পিছনেই পড়ে আছে দুটো বডি। দুজনকেই আমরা চিনি। চঞ্চল সরকার আর হৃষিকেশ চক্রবর্তী! চঞ্চল সরকারের হাতে একটা রিভলবার! জয়ন্তদা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে!
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী ব্যাপার! এর কাছে... রিভলবার...
জয়ন্তদা বলল, “মোজার মধ্যে ছিল। আমাদের গাড়িতে ওঠার আগে হঠাৎ বের করে হৃষিকেশকে গুলি করে তারপর নিজের মাথায়...”
শারদ্বত কিছু বলল না। নিচু হয়ে বসল বডিগুলোর কাছে। একজন কনস্টেবল বাধা দিতে যাচ্ছিল। জয়ন্তদার ইশারাতে থেমে গেল। শারদ্বত নিচু হয়ে চঞ্চল সরকারের শরীরে কিছু একটা দেখে সঙ্গে সঙ্গে হৃষিকেশবাবুর শরীরটাও চেক করল।
তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, “অনিরুদ্ধ, দুজনের হাতের তালুর নিচটা দ্যাখো। শিরাগুলোর কাছে।”
আমার গা-টা গোলাচ্ছিল। এত কাছ থেকে ডেডবডি আগে দেখেছি কি? মনে পড়ছে না!
তাও নিচু হয়ে দেখলাম। দুজনের হাতেই একই জায়গায় সেম ট্যাটু। দেখে মনে হচ্ছে একটা মেঘ। তার মাঝে বিদ্যুতের মতো কিছু একটা আঁকা। হঠাৎ চোখ গেল হৃষিকেশ চক্রবর্তীর বুকপকেটের দিকে। একটা সাদা কাগজ উঁকি মারছে।
বললাম, “জয়ন্তদা, এটা কী?”
জয়ন্তদা পকেট থেকে কাগজটা বের করে নিলেন। তারপর বললেন, “তোমার জন্য!”
শারদ্বতর ভুরু তখন কুঁচকে গেছে। “আমার জন্য?” ও জিজ্ঞেস করল অবাক হয়ে!
হাতে কাগজটা নিল শারদ্বত। ওতে লাল কালিতে লেখা “ওয়েল ডান শারদ্বত হাজরা!”
কাগজটার উলটো পিঠে ওই মেঘ আর বিদ্যুতের ট্যাটুটা আঁকা রয়েছে। যেটা এইমাত্র আমরা দেখলাম ওই মৃত দুজনের হাতে।
আমি অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। বললাম, “এর মানে কী? এটা এখানে কীভাবে এল?”
শারদ্বত কাগজটা এগিয়ে দিল জয়ন্তদার দিকে। তারপর বলল, “জানি না।”
এই শব্দটা শারদ্বত হাজরার মুখে খুব কম শুনেছি। বেশির ভাগ সময়েই ওর কাছে সব উত্তর থাকে। আজকের দিনটাই ব্যতিক্রম। কিন্তু কেন? এই ট্যাটুটার অর্থ কী? আর সেটা এই ডেডবডির হাতে এল কী করে? শারদ্বতর নাম লেখা কাগজটাই বা হৃষিকেশ চক্রবর্তীর বুকপকেটে কীভাবে এল? উনি তো শারদ্বতকে চিনতেনও না। আর তা ছাড়া সারাক্ষণই তো পুলিশ ছিল চারপাশে! এটা ওঁর পকেটে কে রাখল? অনেক প্রশ্নেরই উত্তর নেই আমার কাছে। শারদ্বতর কাছে আছে কি?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন