অর্ণব মণ্ডল
কয়েকদিন আগে শারদ্বতর কাছে একটি রাজনৈতিক দলের (নাম উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন) কয়েকজন নেতা এসেছিলেন। তাঁদের দলের একটি বিশেষ ধর্মের এমএলএ, এমপিরা নাকি প্রায়ই ডেথ থ্রেট পাচ্ছেন। এবং একজনের ওপর নাকি হামলাও হয়েছে। ওঁদের ধারণা এটা বিরোধী পক্ষ করাচ্ছে। কিন্তু সর্ষের মধ্যেই যে ভূত আছে সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ওঁরা চাইছিলেন শারদ্বত কেসটার তদন্ত করুক। কিন্তু শারদ্বত পত্রপাঠ তাঁদের না বলে দিল দেখলাম।
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেসটা নিল না কেন?
শারদ্বত বলল, “পৃথিবীতে যত পেশা আছে, তার মধ্যে সবথেকে ভয়ংকর পেশা হল রাজনীতি। আর তারপরেই আছে ধর্ম। আর যখন এই দুটো পেশা একসঙ্গে মিলে যায়, তখন আরও কতটা ভয়ংকর হতে পারে ভাবতে পারছ?”
আমি বললাম, “তাহলে বলছ তুমি ভয় পাচ্ছ?”
শারদ্বত বলল, “ধর্মের রাজনীতিকে যে ভয় পায় না, সে বোকা!”
আমি আর কথা বাড়াইনি। কিন্তু এর মাসখানেকের মধ্যে এমন একটা ঘটনা ঘটল, যার জন্য শারদ্বত বাধ্য হয় এর থেকেও বড়ো একটা রাজনৈতিক কেস নিতে। সে ঘটনার কথা পরে বলব। এখন যেটা বলব সেটা হল এই কেসটা ওর হাত থেকে চলে যাওয়ার পর কী হল।
এর দিন কয়েক পর সকালে একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি শারদ্বত বসে আছে সোফাতে একটা পেপার নিয়ে। এত সকালে ও সাধারণত ওঠে না। কারণ ও ঘুমোতে যায় অনেক রাত্রে। জিজ্ঞেস করলাম, “কী ব্যাপার? এত সকাল সকাল?”
শারদ্বত বলল, “একজন আসছেন। কেস নিয়ে। ফোন করেছিলেন।”
- এত সকালে? কে?
কথা বলার পরেই কলিং বেল বাজল।
শারদ্বত বলল, “নিজেই দেখে নাও।”
আমি ভুরু কুঁচকে দরজাটা খুলে যাকে দেখলাম, তাকে দেখেই রীতিমতো অবাক হলাম। এই মানুষটা শারদ্বতর জন্য কেস নিয়ে এসেছে? স্ট্রেঞ্জ তো! মানুষটি আর কেউ নয়, আমার দাদা, স্বয়ং ইন্সপেক্টর নীলাদ্রি সেন।
আমি বললাম, “তুই শারদ্বতর জন্য কেস নিয়ে এসেছিস?”
দাদা বলল, “হুম। সর। ভেতরে যেতে দে।”
আমি সরে এলাম। চোখের অবাক ভাবটা তখনও কাটেনি। দাদা শারদ্বতকে একদম পছন্দ করে না। দু-একবার তো অ্যারেস্ট করবে বলে থ্রেটও দিয়েছে। কিন্তু আজ হঠাৎ এহেন পরিবর্তন কেন?
শারদ্বত আমাকে বলল, “অনিরুদ্ধ, ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি রাজুদাকে ফোন করে দিচ্ছি। তিন কাপ চা লাগবে।”
রাজুদার দোকানটা আমাদের ফ্ল্যাটের ঠিক নিচেই। ফোন করলেই ও চা বিস্কুট যখন যা লাগে দিয়ে যায়। আমি আর কথা না বাড়িয়ে ঢুকে গেলাম বাথরুমে।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখলাম রাজুদা এর মধ্যেই এসে চা দিয়ে চলেও গেছে। শারদ্বতর পাশে আর-একটা চেয়ারে বসলাম আমি।
শারদ্বত বলল, “বলুন নীলাদ্রি দা, কী ব্যাপার?”
দাদা একটু গলা ঝেড়ে বলল, “অভিনেত্রী নীহারিকা চট্টোপাধ্যায়-এর খবরটা তোমরা জানো কি?”
এটা আমি পড়েছিলাম। আটের দশকের বিখ্যাত অভিনেত্রী নীহারিকা চট্টোপাধ্যায় আগের সপ্তাহেই মারা গিয়েছেন। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছিল শুনেছিলাম।
শারদ্বত বলল, “না। তিনি কে?”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “সে কী? তুমি নীহারিকা চ্যাটার্জিকে চেনো না?”
শারদ্বত বলল, “কেন? চেনা উচিত?”
আমি বললাম, “অবশ্যই উচিত। বরুণ মুখার্জির সঙ্গে অসাধারণ সব সিনেমা করেছে একসময়। মঙ্গলপ্রদীপ, রত্নাকর, জীবন-যুদ্ধ।”
শারদ্বত এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর দাদার দিকে ফিরে বলল, “এই নীহারিকা চট্টোপাধ্যায়টা কে? আমায় একটু শুরু থেকে সবটা বলুন তো!”
আমি বলতে যাচ্ছিলাম... “আরে তুমি...”
দাদা হাতের ইশারায় থামাল আমাকে। তারপর বলল, “নীহারিকা চট্টোপাধ্যায় আটের দশকের একজন বিখ্যাত অভিনেত্রী। প্রচুর সিনেমা করেছেন এক সময়। কিন্তু ১৯৯৭-এ বরুণ মুখার্জি মারা যাওয়ার পর হঠাৎই সরে যান সিনেমার জগৎ থেকে। তার দু-বছর পর ওঁর স্বামীর সঙ্গে ডিভোর্স হয়। তারপর থেকে একাই থাকতেন বেহালাতে। মানুষজনের সামনে বিশেষ আসতেন না।”
তো উনি সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের হয়ে ভোটে দাঁড়াবেন বলেছিলেন। আর তার ঠিক এক সপ্তাহের মাথাতেই খুন হন উনি।
“ওঁর আর-কোনো আত্মীয়স্বজন কেউ আছেন?” শারদ্বত জিজ্ঞেস করল।
- হ্যাঁ আছেন। ভাইয়ের ছেলে আর তাঁর স্ত্রী আছেন। যাদবপুরে থাকেন।
- আর যাঁর সঙ্গে ডিভোর্স হয়েছিল, সে বর কোথায় থাকেন?
- তিনি থাকেন শ্যামবাজারে। নতুন স্ত্রী আর মেয়ের সঙ্গে।
- আর এই নীহারিকা চট্টোপাধ্যায় সম্পূর্ণ একা থাকতেন?
দাদা একটু ভেবে বলল, “হ্যাঁ, একাই থাকতেন। তবে একটি ছেলে ছিল। ওঁর বাড়িতে কাজ করত। ফাইফরমাশ খাটত। আর একজন মেয়ে রান্না করে চলে যেত দু-বেলা!”
“খুনটা কীভাবে হয়?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
দাদা বলল, “জ্যান্ত আগুনে পোড়ানো হয়।”
“কী করে জানলেন?” জিজ্ঞেস করল শারদ্বত
- মানে?
- মানে জ্যান্ত পোড়ানো হয় সেটা কী করে জানলেন? আগে খুন করে তারপরও তো পোড়ানো হতে পারে।”
- হ্যাঁ। তা অবশ্য হতে পারে।
- পোস্টমর্টেম রিপোর্ট কী বলছে?
- কিচ্ছু বলছে না। পোস্টমর্টেম ঠিক করে করাই যায়নি। কারণ ওঁর শরীরের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
আমি বললাম, “কিন্তু শরীর আগুনে পোড়ালে তো হাড়গুলো পুড়বে না। তাহলে অবশিষ্ট নেই কেন?”
দাদা বলল, “পোস্টমর্টেমে যতটুকু বোঝা গেছে তা হল সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড নামে একটি তীব্র অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়েছে। এই অ্যাসিডটি নাকি একটি মানুষের সারা শরীর গলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।”
শারদ্বত বলল, “বাহ! দারুণ তো!”
“কী বললে? দারুণ?” দাদার গলা কঠিন হয়ে গেল হঠাৎ। আসলে এই মৃত্যু নিয়ে মজাগুলো ও নিতে পারে না!
শারদ্বত যেন পাত্তাই দিল না ওতে। ও বলল, “আচ্ছা নীলাদ্রি দা, তাহলে কী করে বুঝলেন যে এটা নীহারিকা দেবীর দেহ?”
- দাঁত দেখে। অনেক সময়ই বডি আইডেন্টিফাই করতে না পারলে দাঁত থেকে DNA সিগনেচার পরীক্ষা করা হয়। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
- দাঁতগুলো গলল না? স্ট্রেঞ্জ!
- অল্প অ্যাসিড লেগেছিল ওতে। একটু আধটু গলে গেছে। কিন্তু পরীক্ষা করা গেছে অবশিষ্ট থেকে।
শারদ্বত বলল, “বেশ! আমার আর-একটা প্রশ্ন আছে।”
দাদা বলল, “কী প্রশ্ন?”
শারদ্বত বলল, “এই কেসটা নিয়ে হঠাৎ আমার কাছে এলেন কেন? মানে আপনি তো প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর খুব একটা পছন্দ করেন না।”
দাদা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “অনেকদিন হল এই কেসটা নিয়ে আমরা কোনও কূলকিনারা পাচ্ছি না। সব অ্যাঙ্গেলই কভার করেছি, কিন্তু ঠিক বুঝতে পারছি না কীভাবে এগোনো উচিত। তাই মনে হল নতুন একজোড়া চোখ হয়তো একটু ভালো কাজ করবে।”
শারদ্বত হাসল, তারপর বলল, “নীলাদ্রি দা, আমি জানি আপনি আমাকে পছন্দ করেন না খুব একটা। কিন্তু আপনি আসলে তো একজন সৎ পুলিশ অফিসার। কাজেই আপনার মিথ্যেটা একেবারেই কনভিন্সিং হচ্ছে না!”
“এক্সিউজ মি?” দাদার গলার স্বর আবার কঠিন।
শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ, আপনাকে এক্সিউজ করা হল। এবার আসল ব্যাপারটা বলবেন কী?”
আমি বললাম, “আরে কী আসল ব্যাপার? কী বলছ এসব?”
দাদা বলল, “দ্যাখো ভাই... আমি বুঝতে পারছি না তোমার কেন মনে হচ্ছে যে আমি মিথ্যে কথা বলছি। আমি তো...”
“নীলাদ্রি দা, প্লিজ!” শারদ্বত বলল, “আপনি বললেন খুনটা হয়েছে অনেকদিন হয়ে গেল, তাই নতুন কাউকে চাইছেন তদন্তে। কিন্তু নিউজপেপারগুলো তো বলছে নীহারিকা দেবী মারা গিয়েছেন আগের সপ্তাহেই। আর আপনাকে যতটুকু আমি চিনেছি, তাতে আমার মনে হয় না নিজের ইগো বিসর্জন দিয়ে প্রাইভেট গোয়েন্দার সাহায্য চাইতে আসবেন। আর এরকম একটা হাই প্রোফাইল কেস পুলিশ কখনোই অন্য কারও হাতে ছাড়বে না। যদি না ওপরমহল থেকে কোনও অর্ডার আসে! সুতরাং বুঝতেই পারছেন লুকিয়ে লাভ নেই। আপনি যদি কেসটা নিয়ে আমার হেল্প চান, তাহলে বলে ফেলুন আসল ব্যাপারটা!”
দাদা একটু থেমে তারপর বলল, “চাই না! হেল্প চাই না তোমার। কলকাতার পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এই কেস সলভ করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু আমরা সবাই তো হাতের পুতুল। তাই না?”
আমি বললাম, “কী হয়েছে? এরকম বলছিস কেন?”
দাদা বলল, “কয়েকদিন আগে তোদের হাতে কোনও পলিটিক্যাল কেস এসেছিল?”
- হ্যাঁ। কিন্তু শারদ্বত তো নেয়নি। না বলে দিয়েছে।
- হুম। কিন্তু এই কেসটাও নাকি ওই কেসগুলোর সঙ্গে লিংকড। অন্তত রাজনৈতিক মহলের ধারণা সেটাই। নীহারিকা চট্টোপাধ্যায় ভোটে দাঁড়াবে জানাজানি হওয়ার পরেই হল এই খুন। সেই কারণেই নেতামন্ত্রীরা চাইছে এটার দ্রুত কিনারা হোক। আর শারদ্বতর তো নাম রয়েছে কেস খুব তাড়াতাড়ি সলভ করার জন্য। সেইজন্যেই আমাকে পাঠানো হয় ওকে হায়ার করার জন্য।
শারদ্বত বলল, “আচ্ছা নীলাদ্রি দা, নীহারিকা দেবীকে রাজনীতি আসতে রাজি করায় কে?”
- ওঁর ভাইয়ের ছেলে! সেও এই দলের হয়েই রাজনীতি করে।
- আচ্ছা, আপনি আমার অ্যাকাউন্ট নাম্বার জানেন?
দাদা এবার একটু থতোমতো খেয়ে গেল এই প্রশ্নটা শুনে। বলল, “হ্যাঁ? অ্যাকাউন্ট নাম্বার? না তো!”
শারদ্বত বলল, “তাহলে পেমেন্টটা কীভাবে করবেন আপনারা?”
“কীসের পেমেন্ট?” দাদা এবার জিজ্ঞেস করল।
“কেসটা নিলে টাকা দেবেন তো? অনিরুদ্ধর দাদা বলে কিন্তু ফ্রিতে খাটতে পারব না!”
“ওহ আচ্ছা। কেসের টাকা। হ্যাঁ, তোমায় চেকে করা হবে পেমেন্ট!”
শারদ্বত বলল, “বাহ! আমি শুরুতে অ্যাডভান্স নেব দশ হাজার। আর কেস সলভ হলে আরও দশ হাজার!”
কথাটা বলেই সোফা থেকে উঠে পড়ল শারদ্বত। দাদা বলল, “কিন্তু তোমার ফি তো দশ হাজার নয়।”
শারদ্বত বলল, “নীহারিকা চ্যাটার্জির খুনের তদন্ত নীলাদ্রি দা। অত ভাবলে হবে? খরচা আছে!”
কথাটা বলেই মুচকি হেসে শারদ্বত চলে গেল ওর ঘরের দিকে। আর এদিকে দাদার মুখ দেখে বুঝলাম, ওর অবস্থা মোটেই খুব সুবিধের নয়। “আমার যে কী হবে” টাইপ মুখ করে ও উঠে পড়ল সোফা থেকে।
তারপর আমাকে বলল, “রিগ্রেট করতে হবে? কী মনে হয়?”
আমি বললাম, “শারদ্বত হাজরার হাতে কেস দিয়েছিস। রিগ্রেট তো করতেই হবে!”
“তাহলে তুমি নীহারিকা চট্টোপাধ্যায়-এর কথা শুনেছ আগে!”
প্রশ্নটা করেছি আমি। শারদ্বত ট্যাক্সিতে বসে ফোনে কিছু একটা করছিল। আমার প্রশ্ন শুনে ফোন থেকে মুখ না সরিয়েই বলল, “হ্যাঁ। শুনেছি তো! কেন?”
আমি এবার বিরক্তিসূচক গলায় বললাম, “তাহলে দাদা যখন জিজ্ঞেস করল, তখন ওরকম না-জানার ভান করছিলে কেন?”
শারদ্বত বলল, “এমনি ইচ্ছে হল।”
- হোয়াট? সিরিয়াসলি?
- না না। সিরিয়াসলি না। মজা করে।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। নীহারিকা চ্যাটার্জির এক্স-স্বামীর বাড়ি যাচ্ছি আমরা এখন। দাদা বলল ওর কিছু কাজ রয়েছে, তাই আমাদের সঙ্গে থাকতে পারবে না। তাই আপাতত একাই যাচ্ছি আমরা। যাওয়ার পথে ব্যাংকে গিয়ে ওকে দেওয়া চেকটা আজ ড্রপ করে দিল শারদ্বত।
ওঁর স্বামী থাকেন শ্যামবাজারের ফড়িয়াপুকুরের কাছে। পাঁচতলা ফ্ল্যাট। নিচে দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করতেই বলল সেকেন্ড ফ্লোরে চলে যেতে।
বেল বাজাতেই দরজা খুলল একটি বাচ্চা মেয়ে। বয়স ওই তেরো-চোদ্দো বছর হবে। মেয়েটি বলল, “কাকে চাই?”
শারদ্বত বলল, “বিমান দাসগুপ্ত আছেন?”
মেয়েটি বলল, “হ্যাঁ আছেন।” তারপর বাড়ির দিকে ফিরে “বাবা!” বলে ডাকার পরেই বেরিয়ে এলেন একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। আমাদের দেখে ভুরু কুঁচকে বললেন, “হ্যাঁ বলুন!”
শারদ্বত বলল, “নমস্কার। আমার নাম শারদ্বত হাজরা। আর ইনি আমার সহকারী বন্ধু অনিরুদ্ধ সেন। আমরা নীহারিকা চট্টোপাধ্যায়ের খুনের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন করতে চাইছিলাম আপনাকে।”
বিমানবাবু নিজের মেয়েকে বললেন, “রিনি ভেতরে যাও।”
তারপর দরজার কাছে এগিয়ে এসে আমাদের বললেন, “আপনারা কারা?”
শারদ্বত বলল, “আর-একবার নামগুলো বলব আমাদের? ঠিক শুনতে পাননি?”
বিমানবাবু বললেন, “শুনতে আমি পেয়েছি। কিন্তু আপনারা যে প্রশ্ন করবেন, আপনারা কি পুলিশ?”
শারদ্বত হেসে বলল, “নাহ। তবে পুলিশ কিছু কূলকিনারা পাচ্ছে না কেসটায়। তাই আমাকে ডাকা হয়েছে!”
বিমানবাবু এবার গলা ঝেড়ে বললেন, “দেখুন, পুলিশকে যা বলার তা তো আমি বলেছি। আবার একবার সেই একই প্রশ্নবাণের মুখোমুখি হতে পারছি না আমি। আর তা ছাড়া নীহারিকার সঙ্গে আমার যোগাযোগ নেই বহুদিন হয়ে গেল! আপনারা বরং আসুন আজ।”
কথাটা বলেই মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ করে দিচ্ছিলেন ভদ্রলোক।
শারদ্বত হঠাৎ ঠান্ডা গলায় বলল, “তাহলে কি ধরে নেব খুনটা আপনি করেছেন?”
বিমানবাবু দরজাটা বন্ধ করতে গিয়েও থেমে গেলেন। তারপর বললেন, “কী বললেন?”
শারদ্বত বলল, “আপনার কি কানের কিছু সমস্যা আছে? দুবার ধরে নাম জিজ্ঞেস করলেন। এখন আবার জিজ্ঞেস করছেন কী বললাম!”
“আপনার কথা বলার টোনটা আমার একদম ভালো লাগছে না কিন্তু!” বিমানবাবু এবার একটু রাগত স্বরে বললেন।
শারদ্বত বলল, “বিমানবাবু, আপনি চেনেন এরকম একজন মানুষ নৃশংসভাবে খুন হয়ে গেছে। আর আপনি আমার গলার টোন নিয়ে চিন্তিত? স্ট্রেঞ্জ!”
ভদ্রলোক বোধহয় এবার হাল ছেড়ে দিলেন। বললেন, “আসুন ভেতরে আসুন। একটু তাড়াতাড়ি শেষ করবেন প্লিজ। আমার মেয়ের কাল পরীক্ষা। ওকে পড়াতে হবে আমায়!”
শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ, শিয়োর।”
আমরা গিয়ে বসলাম ডাইনিংয়ে। এর মধ্যে বিমানবাবুর মেয়ে এসেছিল ডাইনিংয়ে। বিমানবাবু ওকে বললেন রুমে গিয়ে বসে বাংলা বইটা খুলতে। উনি একটু পর আসছেন। তারপর আমাদের বললেন, “বলুন কী বলবেন বলুন?”
শারদ্বত বলল, “আপনার সঙ্গে নীহারিকা দেবীর কতদিনের সম্পর্ক ছিল?”
- বছর সাতেক। দু-বছর সম্পর্ক। পাঁচ বছর বিয়ে।
- ডিভোর্স হয়েছিল কেন?
- দ্বিতীয় পুরুষের জন্য।
- এটা রচনাধর্মী প্রশ্ন ছিল। আর-একটু বড়ো করে উত্তরটা দিন।
বিমানবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, “ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই ব্যাপারটা জানত যে, বরুণ মুখার্জির সঙ্গে নীহারিকার একটা সম্পর্ক ছিল। আমিও কানাঘুষো শুনেছিলাম। কিন্তু পাত্তা দিইনি।”
“কনফ্রন্ট করেছিলেন কখনও?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
- নাহ করিনি। কারণ ওর কোনও উত্তরই আমাকে খুব একটা শান্তি দিত না। না বললে আমি বিশ্বাস করতাম না। আর হ্যাঁ বললে তো...
শারদ্বত বলল, “তারপর বলে যান...”
- হ্যাঁ। তো একদিন অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে নিজের বেডরুমে নীহারিকার সঙ্গে অন্য একজন পুরুষকে পেয়েছিলাম।
- বরুণ মুখার্জি?
- নাহ। বরুণ মুখার্জি তখন মারা গিয়েছেন। এটা অন্য একজন। বয়স কম। ইন্ডাস্ট্রিতে নতুন এসেছে শুনেছিলাম। দেবরাজ না কী একটা যেন নাম!
- তিনি এখন কোথায়?
- তা তো জানি না। নাম তো শুনিনি তারপরে খুব একটা। ঠিকমতো দাঁড়াতে পারেনি বোধহয়।
আমি বললাম, “আর ওই ঘটনার পর কী হল? কনফ্রন্ট করলেন তো?”
বিমানবাবু বললেন, “হ্যাঁ। আর-কোনো উপায় ছিল না।”
- তাতে উনি কী বললেন?
- বললেন যে এটা নতুন কিছু না। এটা হামেশাই হয়ে থাকে!
শারদ্বত বলল, “হুম। তারপর ডিভোর্স?”
বিমানবাবু ঘাড় নাড়লেন।
শারদ্বত বলল, “আপনাদের তো কোনও ছেলেমেয়ে হয়নি তখনও?”
বিমানবাবু বললেন, “নাহ। নীহারিকার মা হওয়ার ইচ্ছে ছিল না!”
- আপনার সেকেন্ড বিয়ে কবে হয়?
- ওর চার বছর পরে। ২০০১-এ।
- আপনার মিসেসকে দেখছি না যে!
- ও একটা স্কুলের টিচার। ওখানেই আছে এখন।
- আর আপনি?
- আমি তো ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়েছি।
- আচ্ছা আপনার সঙ্গে আর কখনও দেখা হয়নি বা কথা হয়নি?
- নাহ। দু-সপ্তাহ আগে একবার ফোন করেছিল। ট্রু কলারে নাম দেখিয়েছিল। তাই আমি তুলিনি।
- দু-সপ্তাহ মানে খুন হওয়ার আগে?
- হ্যাঁ। ঠিক তার আগেই।
শারদ্বত নিজের মনে মনেই ঘাড় নাড়ল। তারপর উঠে পড়ল চেয়ার থেকে। বলল, “ঠিক আছে বিমানবাবু। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে!”
বিমানবাবু কিছু বললেন না।
ঘর থেকে বেরোবার আগে শারদ্বত হঠাৎ বলল, “ও হ্যাঁ। ভুলে যাচ্ছিলাম আর-একটু হলেই! খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”
বিমানবাবু বললেন, “বলুন?”
শারদ্বত বলল, “আপনার ক্লাস টুয়েলভে কী ছিল? সায়েন্স না আর্টস?”
বিমানবাবু একটু অবাক হয়েছিলেন বোধহয় প্রশ্নটা শুনে। তারপর বললেন, “আমার... আমার তো কমার্স ছিল। কেন?”
শারদ্বত বলল, “ব্রিলিয়ান্ট। ঠিক আছে বিমানবাবু, আমরা আসি।”
এরপর ভদ্রলোককে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম ওঁর ফ্ল্যাট থেকে।
আমি চাপা গলায় বললাম, “এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল?”
শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ। প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ। তোমার কী ছিল? সায়েন্স না আর্টস?”
- সায়েন্স। কেন?
- সায়েন্স পাশ করে এসে গল্প লিখছ? ছি ছি!
“শাট আপ।” বলে উঠলাম আমি।
শারদ্বত মুচকি হেসে রাস্তায় এসে জোরে ডাকল... “ট্যাক্সিইইই?”
নীহারিকা চ্যাটার্জির বাড়ি থেকে বেরিয়েই শারদ্বত আবার ট্যাক্সি ডাকায় আমি একটু অবাক হয়েছিলাম। এক্ষুনি আবার কোথায় যাওয়া হবে? জিজ্ঞেস করতে বলল যাদবপুর যাবে। নীহারিকা চ্যাটার্জির ভাগনের বাড়িতে।
জিজ্ঞেস করলাম, “এক্ষুনি যাবে?”
শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ। কেন তোমার কি অন্য কাজ আছে?”
- না কাজ নেই। কিন্তু এই তো একজনকে ইন্টারোগেট করলে। আবার এক্ষুনি যাবে, সেইজন্যেই ভাবলাম আর কি।
- তোমার দাদা বলল কেসটা তাড়াতাড়ি সলভ করা জরুরি।
- তুমি কবে থেকে দাদার কথাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করলে?
- আজ থেকে।
আমি আর কথা বাড়াইনি। বুঝে গেলাম আজ পুরো গোয়েন্দা মোডে রয়েছে শারদ্বত। যাদবপুর পৌঁছোলাম এক ঘণ্টা পর। পুরো সময়টা শারদ্বত কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনে গেল। একবার চোখ পড়ল ওর ফোনের দিকে। দেখলাম Gregory Alan Isakov-এর গান শুনছে।
যাদবপুরে পৌঁছে দেখলাম এই ভদ্রলোকের বাড়ির সামনে প্রচুর রাজনৈতিক দলের হোর্ডিং, পতাকা লাগানো রয়েছে। বেল বাজাতে বেরিয়ে এল একজন মহিলা।
“কাকে চাই?” জিজ্ঞেস করল মেয়েটি।
শারদ্বত বলল, “যার বাড়ি, তাকে।”
মেয়েটি জুলুজুলু চোখে আমাদের দিকে তাকিয়েছিল। আমি বললাম, “পলাশবাবু আছেন?”
মেয়েটি বলল, “হ্যাঁ। কী দরকার আপনাদের?”
শারদ্বত বলল, “বলুন পুলিশ দেখা করতে এসেছে।”
“পুলিশ” শব্দটার মধ্যেই একটা জাদু আছে। কথাটা শুনেই আর একটাও প্রশ্ন না করে মেয়েটি চলে গেল ভেতরের ঘরে! একটু পর বেরিয়ে এলেন বাড়ির কর্তা। পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি।
আমাদের দেখে বললেন, “কে আপনারা?”
শারদ্বত বলল, “আপনি নীহারিকা চ্যাটার্জির ভাগনে তো?”
- হ্যাঁ, কিন্তু আপনারা কে?
- আমার নাম শারদ্বত আর ইনি আমার বন্ধু অনিরুদ্ধ। আমরা নীহারিকা দেবীর মৃত্যুর তদন্ত করছি।
- আপনারা পুলিশ? কোন থানা?
আমি বললাম, “না, আমরা পুলিশ না। কিন্তু আমাদের ওপর পুলিশের তরফ থেকে এই তদন্তভার পড়েছে!”
পলাশবাবু বললেন, “ধুর মশাই। অত সময় নেই আমার। আজ পুলিশকে সময় দাও, কাল টিকটিকিকে! যত্তসব!”
শারদ্বত বলল, “আপনার কী হারিয়েছে?”
পলাশবাবু বললেন, “মানে? কী হারাবে?”
- কিছু হারায়নি?
- না মানে... আপনি... আমি তো কাউকে...
আমি অবাক হয়ে তাকালাম শারদ্বতর মুখের দিকে। এসব আবার কী বলছে ও?
শারদ্বত বলল, “আপনি কাউকে কী?”
পলাশবাবু বললেন, “না মানে... আমার যে কিছু হারিয়েছে সেটা কে বলল আপনাকে?”
শারদ্বত বলল, “আপনার মাথায় মাকড়সার জাল লেগে আছে। সাদা পাজামার দুটো হাঁটুর কাছেও ধুলো লেগে আছে। আর দুটো হাতের অবস্থার কথা তো বাদই দিলাম। তাই মনে হল অনেকদিন হাত পড়েনি এরকম জায়গায় কিছু খুঁজছিলেন হয়তো।”
ভদ্রলোকের তখনও বিশ্বাস হচ্ছিল না। উনি বললেন, “কিন্তু আমি তো ঘর পরিষ্কারও করতে পারি। তাহলেও তো মাথায় মাকড়সার জাল থাকতে পারে বা হাত নোংরা হতে পারে।”
শারদ্বত হেসে বলল, “তা পারেন, কিন্তু যে বাড়িতে কে এল দেখার জন্য কাজের মেয়ে রাখা আছে, সে বাড়ির ঘর, বাড়ির কর্তা পরিষ্কার করবে বলে মনে হল না। সুতরাং...”
ভদ্রলোক কী বুঝলেন জানি না। তবে আমাদের বললেন, “আসুন। ভেতরে আসুন।”
ভেতরে গেলাম। বসলাম সোফায়। উনি “একটু আসছি” বলে চলে গেলেন ভেতরে। বোধহয় হাত-মুখ ধুতে গেলেন। একটু পর ফিরে এসে আমাদের সামনে একটা চেয়ারে বসলেন। তারপর বললেন, “আমি আজ হয়তো ডাকতাম পুলিশ। তাও শেষবারের মতো একটু খুঁজে নিচ্ছিলাম।”
“কী হারিয়েছে?” জিজ্ঞেস করল শারদ্বত।
- “আমার ফোনটা। কাল রাত্রে ঘুমোবার আগে টেবিলে রেখে শুয়েছিলাম। আজ সকালে উঠে দেখলাম নেই।”
শারদ্বত বলল, “আজকাল তো ফোন সবাই মাথার কাছে নিয়ে শোয়। আপনি টেবিলে রেখে শুলেন কেন?”
পলাশবাবু বললেন, “কারণ আমার মাথার কাছে কোনও প্লাগ পয়েন্ট নেই। ফোনে চার্জ দিতে হয়। তাই টেবিলে রাখি।”
শারদ্বত এরপর উঠে পড়ল চেয়ার থেকে। তারপর পায়চারি করতে থাকল ঘরময়। মাঝে মাঝে ছুড়ে দিচ্ছিল প্রশ্নবাণ।
“কাউকে সন্দেহ হয়?” জিজ্ঞেস করল শারদ্বত।
পলাশবাবু বললেন, “বাড়ির কাউকে একেবারেই হয় না। আর বাড়িতে লোক বলতে আমি, আমার স্ত্রী আর পল্টু।”
- ও হ্যাঁ, আপনার স্ত্রী। ওঁকেও একটু ডাকুন। একসঙ্গেই কথাটা সেরে নিই।
শারদ্বত বলার পরেই পলাশবাবু ডাকলেন “নীতা” বলে।
একটু পরেই ঘরে ঢুকলেন একজন মাঝবয়সি মহিলা। দেখতে খুব সুশ্রী তা বলা যায় না। তবে একসময় যে সুন্দরী ছিলেন সেটা বোঝা যায়। শারদ্বত তখন বাড়ির জানলা দিয়ে বাগানের দিকে তাকিয়েছিল একদৃষ্টিতে। আমি ডাকলাম ওকে, “শারদ্বত?”
হঠাৎ ওর সংবিৎ ফিরল মনে হল। বলল, “ও এসে গেছেন? আচ্ছা কাল কি আপনাদের এদিকে বৃষ্টি হয়েছে?”
পলাশবাবু বললেন, “হ্যাঁ। অল্প হয়েছে!”
“আপনার নামটা যদি একটু বলেন”, শারদ্বত এবার জিজ্ঞেস করল পলাশবাবুর স্ত্রীকে।
ভদ্রমহিলা বললেন, “আমার নাম দীপান্বিতা চ্যাটার্জি।”
শারদ্বত বলল, “বেশ! দেখুন আপনাদের বেশিক্ষণ সময় আমি নেব না। আপনাকে তো আবার পুলিশের কাছে যেতে হবে বললেন!”
পলাশবাবু বললেন, “আমাকে কোথাও যেতে হবে না। ফোন করব। পুলিশ এসে স্টেটমেন্ট লিখে নিয়ে চলে যাবে!”
“বলেন কী? বড্ড ক্ষমতা তো আপনার!” শারদ্বত বলল।
- ওই আর কি। এবার চটপট বলুন তো। বেশি সময় নেই আমাদের হাতে।
শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ। রাইট। আপনি কী করেন?”
“কেন? এর সঙ্গে মাসির মৃত্যুর কী সম্পর্ক?” সঙ্গে সঙ্গে পলাশবাবুর কাউন্টার প্রশ্নবাণ।
শারদ্বত বলল, “সম্পর্ক আছে কি নেই, সেটা তো আমি বের করব। আপাতত যেটা জিজ্ঞেস করলাম উত্তর দিন।”
ভদ্রলোক একবার ওঁর স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “ওই একটা ছোটো ব্যবসা আছে।”
- কীসের ব্যবসা?
- অনেক কিছুই। ইমপোর্ট এক্সপোর্টের।
- মানে কিছুই করেন না, তাই তো? পার্টির হোল টাইমার নাকি?
- এগেন… আমি কী করি না করি, তার সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?
- ঠিক আছে, ছাড়ুন। মাসির সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?
- ভালো না।
- ভালো না? বাহ!
- বাহ! কেন?
- বাহ! আপনার সত্যি বলার সাহস দেখে মনে হল।
- এখানে সাহসের তো কিছু নেই। যেটা সত্যি সেটাই বললাম। ভদ্রমহিলা সারাজীবন নিজের কথা ভেবেছে। মরার সময়েও শেষ করে দিয়ে গেল আমাদের।
- কীভাবে?
- ছাড়ুন তো মশাই! অত জেনে কী করবেন?
- দেখুন পলাশবাবু, জেনে আমি যাবই। আপনি না বললে অন্য কেউ বলবে।
- তাই নাকি? বড্ড ক্ষমতা তো আপনার!
শারদ্বত বাঁকা হাসি হেসে বলল, “ওই আর কি! এবার চটপট বলুন তো! বেশি সময় নেই আমাদের হাতে!”
পলাশবাবু স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন আমাদের দিকে। তারপর বললেন, “মাসির তিন কুলে কেউ নেই। ভেবেছিলাম মৃত্যুর আগে আমাদের হয়তো নিজের কিছু সম্পত্তির ভাগ দেবেন। সেসব তো করেননি। তার ওপর শুনলাম সব সম্পত্তি নাকি বাড়ির কাজের ছেলেটাকে দিয়ে গিয়েছেন।”
পলাশবাবুর স্ত্রী এতক্ষণ চুপ করে বসেছিলেন। এখন হঠাৎ নিজেই বললেন, “আসলে মাসি চিরকালই কাজের ছেলেটাকে বেশি ভালোবাসেন। সবসময় বলেন ছেলেটি নাকি ওঁর নিজের ছেলের মতো! আর আমরা রক্তের সম্পর্ক হয়েও নাকি বাইরের মানুষ!”
শারদ্বত বলল, “আচ্ছা উনি তো আপনার পার্টিতে জয়েন করবেন শুনছিলাম?”
পলাশবাবু বললেন, “এখানেও তো আমাকে ভাতে মেরে দিয়ে চলে গেল।”
- কেন কেন?
- কারণ মাসি ভোটে দাঁড়ালে পার্টির মধ্যে আমার পজিশনটা আর-একটু শক্ত হত। উনি চলে গিয়ে সেটা আর হওয়ার নেই।
- উনি কি স্বেচ্ছায় রাজনীতিতে আসতে চেয়েছিলেন? নাকি আপনি জোর করেছিলেন?
- মানে? কী বলতে চাইছেন কী?
শারদ্বত ওই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দীপান্বিতা দেবীকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আপনাদের কোনও ছেলে আছে নাকি? আঠেরো-কুড়ি বছরের?”
দীপান্বিতা দেবী বললেন, “নাহ। আমাদের ছেলের বয়স ন বছর। ও স্কুলে এখন!”
শারদ্বত মাথা নিচু করে কিছু একটা ভাবল। তারপর বলল, “আচ্ছা পলাশবাবু, আপনি কতদূর পড়াশোনা করেছেন?”
পলাশবাবু এই প্রশ্ন শুনে একটু থতোমতো খেয়ে গিয়েছিলেন। তারপর বললেন, “কী বললেন?”
শারদ্বত আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ বড্ড বেশি কালাদের নিয়ে ডিল করতে হচ্ছে!”
তারপর পলাশবাবুকে আবার জিজ্ঞেস করল, “আপনার ক্লাস টুয়েলভে সায়েন্স ছিল না আর্টস?”
পলাশবাবু বললেন, “আর্টস। কেন?”
“এমনি।” শারদ্বত বলল। তারপর চেয়ার থেকে উঠতে উঠতেই জিজ্ঞেস করল দীপান্বিতা দেবীকে, “আপনার কী ছিল? সায়েন্স না আর্টস?”
দীপান্বিতা দেবী বললেন, “আমার সায়েন্স ছিল।”
- বাহ। ভেরি গুড। তারপর গ্র্যাজুয়েশন কী নিয়ে করলেন?
- কেমিস্ট্রি নিয়ে। কেন বলুন তো?
শারদ্বতের চোখে যেন হঠাৎ কী একটা খেলে গেল এই কথাটা শুনে। ও বলল, “না এমনি। এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাই জেনে রাখলাম।”
কথাটা বলে আমরা বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিলাম ঘর থেকে। পলাশবাবু বললেন, “আপনার কাছে আমার ফোন নাম্বার আছে?”
শারদ্বত বলল, “না। নেই।”
- আমার তো ফোনটা গেছে। আমার স্ত্রীরটা নিয়ে রাখুন বরং।
- কেন?
- এই কেসে কী হচ্ছে না হচ্ছে সেটার আপডেট দেবেন আমায় নিয়মিত!
শারদ্বত বলল, “পলাশবাবু, আপনার বাবারও এত এক্সপেনসিভ চাকর রাখার ক্ষমতা নেই। চলি!”
“লাস্টে তো একটা মাইক ড্রপ হল পুরো!” রাস্তায় বেরিয়ে বললাম আমি।
শারদ্বত ফোনে কিছু একটা দেখছিল। হেসে বলল, “খিদে পাচ্ছে নাকি?”
- তা তো পাচ্ছে। এখন কোথায় যাবে?
- আগে খেয়ে নিই। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।
- আচ্ছা। কিছু ভাবলে?
- হ্যাঁ। চাইনিজ খাব ভাবছি আজ।
- আই মিন কেসটা নিয়ে কিছু ভাবলে?
- নাহ। এখনই নয়।
- কেন?
- আরে সমস্ত ডেটা পাই আগে। তারপর দেখা যাবে।
যাদবপুরে পলাশ চ্যাটার্জির বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা এলাম সাউথ সিটির কাছে। শারদ্বত তখন থেকে ফোনে কী একটা করছিল। আমি বললাম “এদিকে এলাম কেন আবার?”
শারদ্বত উত্তর দিল না। এখানে খুব বিখ্যাত একটা বাঙালি রেস্টুরেন্ট আছে। ‘বাঙালিয়ানা’।
শারদ্বত বলল, “এই আজ এখানেই খাই চলো!”
আমি বললাম, “তুমি যে বললে চাইনিজ খাবে?”
- মাইন্ড চেঞ্জ করে নিলাম। চলো।
- ওহ আচ্ছা। চলো। আমার কোনও চাপ নেই।
হোটেলে ঢোকার আগে মাটি থেকে কী একটা তুলে পকেটে ঢোকাল শারদ্বত। আমার আর প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছিল না। বড্ড খিদে পেয়েছে। ভেতরে গিয়ে বসে দুজনেই দুটো মাটন ভুনা থালি অর্ডার করলাম। শারদ্বতর চোখ দেখলাম তখনও ফোনের দিকে। মাঝে একবার উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে এল। একটু পরেই খাবার দিয়ে গেল। শারদ্বত আমাকে বলল, “অ্যাই তুমি হাত ধুয়েছ?”
আমি বললাম, “না। আমার হাত পরিষ্কার!”
শারদ্বত বলল, “ইস! না। যাও হাত ধুয়ে এসো। আমি সার্ভ করে দিচ্ছি!”
মাঝে মাঝে শারদ্বত এরকম বউয়ের মতো আচরণ কেন করে কে জানে! অগত্যা খিদে পেটে উঠে গেলাম হাত ধোয়ার জন্য। ফিরে এসে দেখলাম ও একজন ওয়েটারকে ডেকেছে খাবারটা সার্ভ করে দেওয়ার জন্য।
তখনই আমার চোখ গেল মাটন কারির দিকে। স্পষ্ট দেখলাম মাটন কারির ওপরে ভাসছে একটা মরা আরশোলা!
চেঁচিয়ে উঠলাম সঙ্গে সঙ্গে। “এটা কী?”
ওয়েটারও ব্যাপারটা দেখে চমকে গেছে। শারদ্বতও তখন খেয়াল করেছে ওটা। ও বলল, “এ কী? মরা আরশোলা খাবারে ভাসছে কেন? কোথায় রান্না করেন আপনারা?”
ওয়েটার এদিকে রিসেপশনে ম্যানেজারের দিকে তাকাচ্ছে। সে ইশারা করাতে ওয়েটার আমাদের বলল, “আমি এক্ষুনি চেঞ্জ করে দিচ্ছি স্যার। উই আর এক্সট্রিমলি সরি!”
“না না। সরিতে কাজ চলবে না।” শারদ্বতর গলার স্বর তখন তীক্ষ্ণ। “এক্ষুনি আপনাদের মালিককে ডাকুন।”
কথাটা বলার পরেই ছুটে এসেছেন ম্যানেজার নিজে। বললেন, “সরি স্যর। আপনাদের ফ্রেশ খাবার দিচ্ছি আমরা।”
শারদ্বত বলল, “ফ্রেশ খাবার দরকার হলে আপনাকে চেয়ে নেব। আপাতত মালিককে ডাকুন আপনাদের। এটা নিয়ে কথা বলা দরকার!”
ম্যানেজার বললেন, “আই অ্যাম সরি স্যর। বাট দ্যাট’স নট পসিবল। উনি ব্যস্ত মানুষ! এটা সম্ভব নয়।”
শারদ্বত আমার দিকে ফিরে বলল, “অনিরুদ্ধ, ক্যামেরা বের করো। ফটো তোলো। সোশ্যাল মিডিয়ার ক্ষমতাটা এরা এবার দেখবে।”
ম্যানেজার তখনও নিচু গলায় বলছেন, “এরকম করবেন না স্যর। আমরা খুব রেপুটেড একটা রেস্টুরেন্ট। প্লিজ ডোন্ট ডু দিস।”
আমি তখন ফোন বের করে অলরেডি তুলে নিয়েছি কয়েকটা ফটো। আশেপাশের টেবিলের লোকজনও দেখছে আমাদের দিকে।
শারদ্বত বলল, “দেখুন, এই সমস্যা সমাধানের রাস্তা একটাই। আপনাদের মালিককে ডাকুন। ওঁর সঙ্গে কথা বলা হলেই আমরা আর ঝামেলায় যাব না। না হলে কিন্তু সবকটা ফটোই যাবে ফেসবুকে। তার ফল কী হবে সেটা বোধহয় আপনাকে বলে দিতে হবে না!”
ম্যানেজার কী বুঝলেন জানি না। হাল ছেড়ে দিয়ে কাকে একটা যেন ফোন করলেন। তারপর আমাদের টেবিল থেকে খাবারগুলো তুলে নিয়ে শারদ্বতর আদেশে দিয়ে গেলেন চিংড়ির মালাইকারি, আলুপোস্ত আর ভাত। বড্ড খিদে পেয়েছিল ঠিকই। কিন্তু একটু ভয়ও লাগছিল খেতে। যদি আরও কিছু থাকে। শারদ্বত দেখলাম দিব্যি প্লেটে খাবার তুলে খেতে শুরু করে দিয়েছে।
আমাকে ইতস্তত করতে দেখে বলল, “খেয়ে লাও। এই খাবারে বিষ লাই লালমুহন বাবু!”
আমি বললাম, “জয় বাবা ফেলুনাথের ডায়ালগ দিচ্ছ ঠিক আছে। কিন্তু বিষের থেকে অন্য জিনিসে কাজ হয় বেশি। এটাও মনে রেখো।”
শারদ্বত উত্তর দিল না। ও তখন খাওয়াতে ব্যস্ত। আমিও আর কথা না বাড়িয়ে খাওয়ায় মন দিলাম। খাওয়ার পর হাত ধুয়ে এসে টেবিলে বসলাম দুজনে। তারপরেই রেস্টুরেন্টে ঢুকলেন একজন লম্বা সুদর্শন ব্যক্তি। বয়স পঁয়ত্রিশের আশেপাশে হবে। কিন্তু এখনও ভীষণ ফিট মনে হল। ম্যানেজারের সঙ্গে দুটো কথা বলেই এগিয়ে এলেন আমাদের দিকে।
তারপর বললেন, “সরি, আপনাদের এরকম একটা জিনিস ফেস করতে হল। কিছু মনে করবেন না প্লিজ।”
কথা শুনে বুঝলাম ইনি বাঙালিয়ানার মালিক।
শারদ্বত বলল, “বসুন না।”
ভদ্রলোক বসলেন আমাদের পাশের চেয়ারে। তারপর বললেন, “আই উড রিয়্যালি অ্যাপ্রিশিয়েট যদি এই ব্যাপারটা জানাজানি না হয়। আসলে আমরা খুব পপুলার কলকাতায়। এই একটা ঘটনার জন্য আমাদের ইমেজটা শেষ হয়ে যাক এটা চাই না। আমরা আমাদের কুকের এগেনস্টে ব্যবস্থা নিচ্ছি খুব শিগগিরি।”
শারদ্বত বলল, “আরে না না। এত কিছুর দরকার নেই। আমাদের আসলে আপনার সঙ্গে দরকার ছিল। তাই এরকম সিন ক্রিয়েট করলাম। ওই আরশোলাটা আমিই দিয়েছিলাম মাটন কারিতে।”
শারদ্বতর কথাটা শুনে আমি পুরো থ! কেসটা কী হল? এসব কী বলছে ও? এইটাই তাহলে তখন কুড়োল ও মাটি থেকে। ইসস! ঘেন্নাও করে না নাকি ওর!
“হোয়াট? আপনি করেছেন এটা? আর ব্লেম করেছেন আমাদের?” ভদ্রলোক এবার প্রচণ্ড রেগে গিয়েছেন বুঝতে পারছি।
আমি নিজেও বুঝতে পারছি না কিছু। এসব কী? কেন? মানে কী জন্যে? এইবার গণধোলাই না খেতে হয় আমাদের!
এমন সময় শারদ্বত বলে উঠল, “অনিরুদ্ধ, আলাপ করিয়ে দিই। তুমি এঁর নাম আগে শুনেছ। ইনি দেবরাজ বোস। নীহারিকা চট্টোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুরুষ!”
“এক্সিউজ মি? হু আর য়ু?” প্রশ্নটা করেছেন আমাদের সামনে বসে থাকা বাঙালিয়ানা রেস্টুরেন্টের মালিক দেবরাজ বোস।
আমার মাথার মধ্যেও অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু কোনটা ছেড়ে কোনটা করব বুঝতে পারছি না!
শারদ্বত বলল, “আমরা নীহারিকা চট্টোপাধ্যায়ের খুনের তদন্ত করছি। সেই ব্যাপারেই আপনাকে কিছু প্রশ্ন করার ছিল!”
“রিয়্যালি?” দেবরাজ বোসের গলায় এবার বিরক্তি, “আপনি এইমাত্র যে কাণ্ডটা ঘটালেন সেটা কি ভুলে যাব বলছেন?”
শারদ্বত বলল, “ভুলে গেলে ভালো। না হলে পুলিশ নিয়েও আসতে পারি পরে।”
- পুলিশ কেন? কী করেছি আমি?
- কিছুই করেননি। আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর না দিলে পুলিশ এসে অবস্ট্রাকশন অফ জাস্টিস কেস দিয়ে আপনাকে লক আপে নিয়ে যেতে পারে। আর বাঙালিয়ানার যা নাম! কাল সকাল থেকে নিউজপেপারগুলোর তো রমরমা চলবে।”
দেবরাজবাবু খুব জোরে দুবার নিশ্বাস নিলেন। তারপর শান্ত করলেন নিজেকে। তারপর বললেন, “কী প্রশ্ন আছে আপনাদের?”
শারদ্বত বলল, “আপনার সঙ্গে নীহারিকা দেবীর শেষ কথা কবে হয়?”
দেবরাজবাবু একটু ভেবে বললেন, “নীহারিকা মারা যাওয়ার আগের সপ্তাহেই আমাকে ফোন করেছিল। বলল খুব দরকারি কিছু কথা আছে। আমায় বলতে চায়।”
অত বয়স্ক একজন মহিলাকে নাম ধরে সম্বোধন করা দেখে বুঝলাম ওঁদের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠই ছিল।
শারদ্বত জিজ্ঞেস করল, “আপনি দেখা করেছিলেন?”
- নাহ। দেখা করতে পারিনি। আমি তখন লন্ডনে ছিলাম। বলেছিলাম ফিরে দেখা করব। কিন্তু ফেরার পরেই শুনলাম...
- আপনাদের সম্পর্ক কীরকম ছিল?
- দেখুন, নীহারিকা শেষদিকে কারও সঙ্গেই সম্পর্ক সেরকম রাখেনি। আমার রেস্টুরেন্টে কয়েকবার এসে খেয়ে গিয়েছে। আর ওই হাই হ্যালোর সম্পর্ক আর কি!
- শেষ প্রশ্ন, কেন খুন করলেন ওঁকে?
- হোয়াট? পাগল নাকি আপনি?
- লোকে তাই বলে। আচ্ছা আপনার ক্লাস টুয়েলভে সায়েন্স ছিল না আর্টস?
উফফ! সকাল থেকে এই এক প্রশ্ন করে যাচ্ছে সবাইকে।
দেবরাজবাবু বললেন, “আর্টস, কেন?”
শারদ্বত বলল, “নাহ। এমনি। ঠিক আছে। আমরা উঠি। কত বিল হয়েছে দাদা?”
ম্যানেজার দেখলাম প্রশ্নটা শুনে তাকিয়েছে মালিকের দিকে। দেবরাজবাবু আমাদের দিকে একবার দেখে বললেন, “লাগবে না। কাজটা কে করেছে তাকে খুঁজে বার করুন যদি সম্ভব হয়।”
শারদ্বত বলল, “নিশ্চয় করব।”
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে আমি বললাম, “তুমি মরা আরশোলা পকেটে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে ঢুকলে?”
শারদ্বত হেসে বলল, “কতক্ষণ থেকে এই প্রশ্নটা করবে ভাবছিলে?”
আমি বললাম, “গণপিটুনিটাও যে একটা অপশন হতে পারে সেটা কি ভুলে গিয়েছিলে?”
শারদ্বত বলল, “পেটে খেলে পিঠেও সইবে ভাই।”
- আমার সইবে না। এই রিস্কগুলো প্লিজ আমার সঙ্গে থাকাকালীন নিয়ো না।
শারদ্বত কিছু বলল না। আমিই আবার বললাম, “তুমি কীভাবে জানলে এটা ওই দেবরাজের রেস্টুরেন্ট?”
শারদ্বত বলল, “ইন্টারনেট একটা প্রচণ্ড বড়ো জায়গা ভাই। সব থাকে ওখানে। গুগলে সার্চ করছিলাম। নয়ের দশকে নীহারিকা দেবীর স্ক্যান্ডাল নিয়ে বহু খবর পেলাম। আর পেলাম দেবরাজ বোসের কথা। তার রেস্টুরেন্টের কথা।”
আমার মনে হল এই মোবাইল ফোন এসে যেন কেস সলভগুলো বড্ড সহজ হয়ে গেছে আজকাল। ফেলুদা, ব্যোমকেশের সময় তো এসব ছিল না। তখন মাথা খাটাতে হত অনেক বেশি। অবশ্য এই কেস সলভ হতে কত দেরি তা সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র আইডিয়া নেই। সবই এই শারদ্বত হাজরাই জানে!
শারদ্বত তখন কাকে একটা ফোন করছে দেখলাম। বলল, “নীলাদ্রি দা, ওই চাকর ছেলেটি কোথায় থাকে? ওর সঙ্গে একবার কথা বলতে পারলে ভালো হত!”
বুঝতে পারলাম দাদাকে ফোন করছে। ওদিক থেকে কী বলা হল জানি না। তবে শারদ্বত “ঠিক আছে। পাঠিয়ে দিন। আমরা বেহালা যাচ্ছি।” বলাতে বুঝলাম কাজ হয়েছে। বেহালা মানে নীহারিকা চ্যাটার্জির বাড়ি।
জিজ্ঞেস করলাম, “তাই? আমরা বেহালা যাচ্ছি নাকি?”
শারদ্বত বলল, “আমি তো যাচ্ছি। তুমি যাচ্ছ কি না জানি না।”
হঠাৎ চোখে পড়ল কিছুটা দূরেই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে চারজন লোক। কী হল কেসটা? এর মধ্যেই পেছনে গুন্ডা লেগে গেল নাকি? শারদ্বতকে ফিসফিস করে বললাম, “আমাদের দিকে কয়েকজন নজর রাখছে দেখেছ?”
শারদ্বত পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করতে করতে বলল, “দেখেছি।”
তারপর সিগারেট ধরিয়ে এগিয়ে গেল সেই লোকগুলোর দিকে। তারপর বলল, “কী ব্যাপার? তোমরা কি তোমাদের উঠতি নেতার ফোন নাম্বার দিতে এলে?”
উঠতি নেতা মানে? এরা কি পার্টির ছেলে নাকি? পলাশবাবু পাঠিয়েছেন?
ওদের মধ্যে হোমরাচোমরা গোছের একটি ছেলে ছিল। সে বলে উঠল, “শোনো ভাই, পলাশদার সঙ্গে বেশি পিঁয়াজি মেরো না। সুস্থ অবস্থায় বাড়ি ফিরতে পারবে না।”
শারদ্বত বলল, “পিঁয়াজি আমার ভালোই লাগে খেতে। চপও মন্দ লাগে না। আর তোমাদের পলাশদাকে জানিও, ওঁর যারা বাবা আছেন রাজনীতিতে, তাঁরা আমায় টাকা দিয়ে হায়ার করেছেন। কাজেই উনি সুস্থ অবস্থায় বাড়িতে থাকতে চাইলে আমার পিছনে লাগতে বারণ করো।”
ছেলেগুলো কী বুঝল জানি না। ওদের মধ্যে আর-একটি ছেলে আমাদের বলল, “আমাদের দাদার যদি কিছু হয় তাহলে কিন্তু রক্তগঙ্গা বইয়ে দেব এই বলে দিলাম।”
কথাটা বলেই চারজন হাঁটা দিল পিছন দিকে।
শারদ্বত দেখলাম ব্যাপারটাকে পাত্তা না দিয়ে ফোন থেকেই বুক করল একটা ক্যাব!
নীহারিকা দেবীর বাড়িতে যখন পৌঁছোলাম তখন বিকেল পাঁচটা। দেখলাম বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি কমবয়সি ছেলে। বুঝলাম এ-ই তাহলে নীহারিকা দেবীর চাকর ছিল। এখন সমস্ত সম্পত্তির মালিক। ভাবা যায়!
ছেলেটির কাছে গিয়েও কেমন যেন একটা গন্ধ লাগল নাকে। দামি একটা পারফিউম মেখেছে মনে হল। যাক টাকা দিয়ে কিছু তো করেছে।
শারদ্বত ছেলেটিকে বলল, “তোমার নাম কী?”
“অজয়”, বলল ছেলেটি।
“তুমি কতদিন কাজ করছ এখানে?” জিজ্ঞেস করল শারদ্বত।
ছেলেটি বলল, “অনেকদিন! প্রায় সাত বছর।”
আমি একটু অবাক হলাম। অনেক কম বয়স থেকেই কাজ করছে ছেলেটি তাহলে।
শারদ্বত বলল, “তোমার বাড়িতে আর কে কে আছে?”
- কেউ নেই। আমি একা।
- মা বাবা?
- সবাই মারা গেছেন ছোটোবেলায়। নতুন মা আমাকে মানুষ করেছে, স্কুলে পড়িয়েছে।
- নতুন মা মানে? নীহারিকা দেবী?
- হ্যাঁ।
ঘরের ভেতরে ঢুকলাম আমরা। ছেলেটি বলল জুতো দরজার বাইরে খুলতে। ভেতরে ঢুকে শারদ্বত জিজ্ঞেস করল, “কেমন লাগছে তোমার এখন?”
- কীসের কেমন লাগছে?
- এই যে সমস্ত সম্পত্তি পেলে। কেমন লাগছে এসব পেয়ে?
- আমি তো এসব চাইনি। আমি তো শুধু নতুন মাকে চেয়েছিলাম।
- তুমি এখনও বস্তিতে থাকো কেন? এই বাড়িটা তো এখন তোমারই।
- আমি এখানে থাকব না।
- কেন?
- সারা বাড়িতে নতুন মার স্মৃতি রয়েছে। আমি পারব না এখানে থাকতে।
বুঝতে পারলাম ছেলেটা সত্যিই ভালোবাসত নীহারিকা দেবীকে। আর নীহারিকা দেবীও যে ওকে ভালোবাসতেন সেটাও উনি নিজের উইলেই বুঝিয়ে দিয়েছেন।
শারদ্বত বলল, “নীহারিকা দেবী তো রাজনীতিতে ঢুকতে চেয়েছিলেন। জানো?”
অজয় ঘাড় নাড়ল। বলল, “ঢুকতে চাননি। ওঁকে জোর করা হয়েছিল।”
আমি বললাম, “তাই নাকি? কে জোর করেছিল? ওর ভাগনে?”
অজয় বলল, “ধুর! পলাশদা তো চুনোপুঁটি। আসল ক্ষমতা তো ওর স্ত্রীর।”
শারদ্বত বলল, “তাই নাকি? তোমায় কে বলল এই কথা?”
- মা বলছিল। ওরা নাকি থ্রেট দিয়েছিল মাকে। বলেছিল ওদের পার্টির হয়ে ভোটে না দাঁড়ালে ভোটের পর ওরা শেষ করে দেবে মাকে।
- তারপর? তোমার মা রাজি হয়েছিলেন?
- হ্যাঁ। বাধ্য হয়ে!
- আচ্ছা ওঁর কোনও শত্রু ছিল?
- না স্যার। অনেকদিন থেকেই তো কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই নতুন মায়ের। শত্রু থাকবে কী করে?
ঘরের বিভিন্ন কাগজপত্র উলটেপালটে দেখছিল শারদ্বত। আর পাশেই আলমারিতে পড়ে থাকা কিছু ফাইল খুলে দেখছিল ও। আর আমি দেখছিলাম ভদ্রমহিলার বইয়ের কালেকশন। আজকালকার দিনে এত বই কার বাড়িতে দেখেছি মনেই পড়ছে না। স্টাডিরুমটা মারাত্মক ভালো বানিয়েছেন ভদ্রমহিলা।
রুমের এক কোণে একটা ল্যাপটপ রাখা আছে দেখলাম। অন করার চেষ্টা করল শারদ্বত। কিন্তু পাসওয়ার্ড দেওয়া। তাই খুলতে পারল না। শারদ্বত বলল, “আচ্ছা, তোমার নতুন মার কোনও স্মার্টফোন ছিল?”
অজয় বলল, “হ্যাঁ। ছিল তো। দাঁড়ান। এনে দিচ্ছি।”
কথাটা বলার পরেই ফোন বেজে উঠল আমার। দেখলাম দাদা ফোন করছে। শারদ্বত একমনে ফাইলের কাগজপত্র দেখছে। আমি ফোনটা ধরলাম।
- হ্যালো।
- এই শোন, শারদ্বতকে ফোনে পাচ্ছি না। তোরা কোথায় এখন?
- এই তো বেহালাতে। কেন?
- আচ্ছা বেশ। শোন, খুনি ধরা পড়েছে। তোদের আর লাগবে না।
- খুনি ধরা পড়েছে মানে? কে খুনি?
- পলাশ চ্যাটার্জি। ওই যে ভাগনে।
- পলাশ চ্যাটার্জি? তাই? কখন?
কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে শারদ্বত আমার হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে নিল ফোনটা। তারপর দাদাকে বলল,
- শারদ্বত বলছি। কী প্রমাণ পেলেন?
ও প্রান্ত থেকে কী বলা হল সেটা শোনা গেল না।
শারদ্বত আবার বলল, “কীভাবে পেলেন? মানে বাড়ি সার্চ করেছিলেন?”
- ...
- ঠিক আছে। রাখছি।
- ...
ফোন রাখার পর শারদ্বতকে জিজ্ঞেস করলাম, “কীভাবে জানা গেল সবটা?”
ও উত্তর দিল না। অজয়ের হাত থেকে ফোনটা নিয়েই আমরা বেরিয়ে এলাম ঘর থেকে। একদৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটছিল ও।
আমরা একটা ট্যাক্সি নিলাম। বাড়ির দিকে। ওকে আরও কয়েকবার জিজ্ঞেস করলাম, কীভাবে জানা গেল সবটা? কোনও উত্তর দেয়নি। ওর কি মনটা খারাপ হয়ে গেল পুলিশ ওর আগে কেসটা সমাধান করে দিল বলে?
বাড়ি ফিরেও শারদ্বত কিছু বলল না। দরজা বন্ধ করে বসে রইল নিজের ঘরে। সন্ধের দিকে দাদা এল ফ্ল্যাটে। শারদ্বতকে ডাকলাম দুবার। দরজা খুলল না।
দাদা বলল, “বলেছিলাম না, এই কেস সলভ করার মতো ক্ষমতা পুলিশের আছে।”
আমি এখনও যেটা জানি না সেটাই জিজ্ঞেস করলাম আবার। “কীভাবে জানা গেল সবটা?”
দাদা বলল, “ওর বাড়িতে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের একটা কনটেনার পাওয়া গেছে। যেটা দিয়ে নীহারিকা চ্যাটার্জিকে খুন করা হয়।”
- একটা কথা বল আমায়। সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড তো শুনলাম হাড় পর্যন্ত গলিয়ে দেয়। তাহলে কনটেনারে থাকে কীভাবে?
- আমি যেটা শুনলাম সেটা হল এই সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড বাতাসের সংস্পর্শে এলে তবেই নাকি ওরকম তীব্র অ্যাসিডের মতো আচরণ করে।
- বাপরে।
- কীভাবে খোঁজ পেলেন এটার?
প্রশ্নটা হঠাৎ শুনে একটু চমকে গিয়েছিলাম। আসলে খেয়ালই করিনি কখন শারদ্বত এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের পিছনে।
দাদা বলল, “ওর নাকি ফোন হারিয়েছে। তাই একজন পুলিশ গিয়েছিল ওর বাড়িতে। সে-ই জিনিসটা দেখতে পেয়ে জানায় আমাদের। আমরা ওকে থাকতে বলি স্পটে। তারপর আমরা গিয়ে অ্যারেস্ট করি ওকে।”
শারদ্বত জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, জিনিসটা কোথায় রাখা ছিল? মানে পুলিশ অফিসারের চোখ গেল কীভাবে?”
- উনি রাত্রে কোথায় ফোন রেখেছিলেন সেটা দেখাচ্ছিলেন অফিসারকে। তখনই ওঁর চোখে পড়ে ওটা।
- স্ট্রেঞ্জ! ভদ্রলোককে দেখে ওরকম বোকা মনে হয়নি।
- আরে হয় হয়। এরকম ভুল সব খুনিরাই করে।
শারদ্বত বলল, “কিন্তু নীলাদ্রি দা, আমার তিনটে কথা বলার আছে।”
দাদা বলল, “কী, বলো?”
শারদ্বত বলল, “প্রথমত, ওঁর মোটিভটা কী? কারণ নীহারিকা চ্যাটার্জির মৃত্যুতে ওঁর লাভের চেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে।”
- আর?
- দ্বিতীয়ত, উনি যদি খুনটা করেও থাকেন তাহলে নিজে করবেন না। ওঁর প্রচুর চামচে রয়েছে। আর তাই যদি হয় তাহলে ওই সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের কনটেনার ওঁর বাড়িতে থাকবে না।
- আর তিন নম্বরটা কী?
শারদ্বত হেসে বলল, “আর তৃতীয়ত, উনি খুন করেননি। পিরিয়ড!”
দাদা বলল, “এইজন্যে তোমাদের মতো প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরদের সঙ্গে আমার মতের মিল হয় না। তোমরা সবকিছুকেই বড্ড জটিল করে ভাবো।”
- আর আপনারা সবকিছুকেই বড্ড সহজ করে ভাবেন!
- শোনো ভাই... সরকার থেকে তোমায় যে টাকা দিয়েছে সেটা আর ওরা ফেরত নেবে না। কাজেই তুমি টেনশন নিয়ো না। এবার পুলিশকে পুলিশের কাজ করতে দাও।
আমি বললাম, “আচ্ছা, তুই এতটা শিয়োর হচ্ছিস কীভাবে যে এই লোকটাই খুনি?”
দাদা বলল, “কারণ এটাই সবথেকে সম্ভাব্য সমাধান। এদের দলে আগে যে খুনগুলো হচ্ছিল, সেটাও নিশ্চয় এই ব্যাটাই করিয়েছে। ও ভাবছিল ওপরের লোকগুলো সরে গেলে সহজে ওপরে উঠতে পারবে।”
শারদ্বত বলল, “আমি এখনও বলছি আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে!”
দাদা উঠে পড়ল চেয়ার থেকে। বলল, “সে তোমার ইচ্ছে হলে তুমি বলতেই পারো। কিন্তু আমরা কেউ শুনছি না।”
তারপর আমাকে বলল, “এই এলাম রে। স্বীকারোক্তি দিলে জানাব!”
শারদ্বত আর কিছু বলল না। নিজের ঘরে যাওয়ার আগে বিড়বিড় করে বলল, “ফাঁকিবাজের দল!”
সত্যি কথা বলতে কী, আমরা মনের মধ্যেও একটা দোটানা রয়ে গিয়েছিল। শারদ্বতর সঙ্গে বেশ অনেকগুলো কেস হয়ে গেল আমার। খুব কম সময়েই ওকে ভুল প্রমাণিত হতে দেখেছি। নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে কেসটা নিয়েই ভাবছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে গেছি জানিও না।
সকালে শারদ্বতর ফোনে ঘুম ভাঙল। বলল, “রেডি হও।”
আমি ঘুমজড়ানো গলায় বললাম, “হ্যাঁ। কী? কোথায়? কেন?”
- বেরোতে হবে। তোমার দাদা আর একদিন সময় দিয়েছে! তার মধ্যেই যা করার করতে হবে!
- সে ঠিক আছে। কিন্তু এখন রেডি হব কেন?
- কারণ অলরেডি এগারোটা বাজতে যায়। আর যবনিকা পতন ঘটবে এক ঘণ্টার মধ্যে!
যবনিকা পতন শুনেই কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়লাম বিছানা থেকে। এটা মিস করা যাবে না। কিন্তু কেস সলভ হয়ে গেল? এক রাত্রের মধ্যে? সবটা কি এত সহজ নাকি?
কিছুক্ষণ পরে শারদ্বত ফিরল। বললাম, “কোথায় গিয়েছিলে?”
বলল, “কাজ ছিল।”
সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে বুঝলাম শারদ্বত এখন চুপচাপ ভাববে। এই সময় বেশ কথা বলেও লাভ নেই। ও আর কোনও কিছুরই উত্তর দেবে না।
একটু পর ওর ঘরে গিয়ে আর-একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না, “তুমি দাদাকে রাজি কীভাবে করালে বলো তো? ও তো তোমার কথা শোনার মানুষ না।”
শারদ্বত বলল, “আমি বললাম যে এই কেসের যদি অন্য কোনও রেজাল্ট হয়ও, তাহলেও কৃতিত্ব পাবে কলকাতা পুলিশ।”
“বাপরে”, বললাম আমি, “তুমি দেখছি মারাত্মক ডেসপারেট।”
শারদ্বত বলল, “খাবার অর্ডার করো। খেয়েই বেরোব।”
“তুমি সকালে কোথায় গিয়েছিলে বললে না তখন!”
কথাটা বললাম আমি। আমরা এখন একটা ক্যাব বুক করেছি। ঠিকানা শারদ্বত দিয়েছে। তাই কোথায় দিয়েছে আমি জানি না। শুধু এটুকু জানি কিছুক্ষণের মধ্যেই যবনিকা পতন হতে চলেছে।
“ডাক্তারের কাছে।” খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল শারদ্বত।
“কেন? কী হয়েছে তোমার?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।
শারদ্বত সেই কথার উত্তর না দিয়ে বলল, “আজ সকালে আমাকে ফোন করেছিলেন দীপান্বিতা চ্যাটার্জি।”
- মানে পলাশবাবুর স্ত্রী? কেন?
- থ্রেট দিলেন।
- থ্রেট দিলেন? তোমাকে?
- হ্যাঁ। বললেন ওঁর স্বামীকে জেল থেকে না বের করতে পারলে উনি কাউকে ছেড়ে কথা বলবেন না।
- তুমি কী বললে?
শারদ্বত বলল, “আমি বললাম, আপনি ছেড়ে কথা বলুন বা ধরে, আমার তাতে কিস্যু যায় আসে না।”
- সিরিয়াসলি এটা বললে?
- হ্যাঁ, বললাম তো! এই অনিরুদ্ধ, তুমি কি জানো, তুমি তোমার কম্পিউটারের ব্রাউজারে যা যা সাইট খুলবে, তার রেকর্ড তুমি তোমার ফোনেও পেতে পারো!
আমি বললাম, “হ্যাঁ জানি। একই ইমেল আইডি দিয়ে খুললে ওরা ইন্টারনেট থাকলেই সিংক করে নেয় সবটা।”
শারদ্বত বলল, “আমি কাল রাত্রে জানলাম।”
- কী জানলে একটু বলো না। শুনি।
- বলব বলব। আর-একটু অপেক্ষা করো। সব জানতে পারবে।
এই হচ্ছে শারদ্বতর সমস্যা। অকারণ সাসপেন্স তৈরি করার চেষ্টা করে। আর এদিকে আমি মরছি ভেবে ভেবে। গাড়িটা যেদিকে যাচ্ছে সেটা দেখেই কিছুটা আন্দাজ করেছিলাম কোনদিকে যাচ্ছি। কিন্তু সেদিকেই বা যাচ্ছি কেন সেটা বুঝতে পারছি না।
আধঘণ্টা পর গাড়ি এসে থামল একটা গলির সামনে। সেখানে পরপর ছোটো ছোটো কিছু বাড়ি রয়েছে। একটু দূর থেকেই একটা চিৎকার আসছে। শারদ্বত কাকে যেন একটা মেসেজ করল গাড়ি থেকে নামতে নামতে। তারপর আমরা এগিয়ে গেলাম সেই চিৎকারের শব্দ লক্ষ্য করে। নাকে একটা পোড়া গন্ধ আসছে তখন। পরে জেনেছিলাম পাশের শ্মশানে মৃতদেহ পোড়ানোর গন্ধ এটা।
কাছে গিয়েই বুঝতে পারলাম চিৎকারের কারণটা। পলাশ চ্যাটার্জির চারজন ভাড়াটে গুন্ডা তখন খুব ঝামেলা করছে একটা বাড়ির সামনে। আর সঙ্গে রয়েছেন ওঁর স্ত্রী। দীপান্বিতা দেবী। সামনে দাঁড়িয়ে সেই চাকর অজয়। কাছে যাওয়ার পরেই চিৎকারের বিষয়বস্তুগুলো কানে এল।
দীপান্বিতা দেবী অজয়কে বলছেন, “কী ভেবেছিলি তুই? আমাদের সব সম্পত্তি এত সহজে পেয়ে যাবি? পাবি না! আজ তোকে শেষ করেই এই বস্তি থেকে বেরোব আমি।”
অজয় তখন জোড় হাত করে বলছে, “আমি সম্পত্তি চাই না। ওসব আপনারা নিয়ে নিন। আমি কিচ্ছু চাই না।”
দীপান্বিতা দেবী বললেন, “ওসব ন্যাকামি অন্য কোথাও দেখিয়ো। আজ সমস্ত সম্পত্তি আমাদের নামে লিখে দিতে হবে তোকে। না হলে তোর ঘর বাড়ি আমি পুড়িয়ে দেব!”
আমি এগোতে যাচ্ছিলাম। শারদ্বত হাতটা ধরে আটকাল। চাপা গলায় বলল, “কতদূর কী হয় দেখতে দাও।”
আমি বললাম, “বাড়ি পুড়িয়ে দেবে বলছে যে!”
শারদ্বত বলল, “দেখা যাক না!”
এরপরেই পাড়ার একজন বয়স্ক মানুষ এগিয়ে এলেন অজয়ের সমর্থনে। বললেন, “আপনারা কারা? কেন এখানে এসে ঝামেলা করছেন?”
তারপরেই দীপান্বিতা দেবীর ইশারায় একজন স্যাঙাত পকেট থেকে বের করল একটা রিভলবার। তারপর শূন্যে দুবার ব্ল্যাংক ফায়ার করে বলল, “কেউ এক পা এগোলে মেরে শুইয়ে দেব!”
আমি আবারও এগোতে গেলাম। শারদ্বত শক্ত করে ধরে রইল হাতটা। ওর মতলবটা কী?
অজয় বলল, “দেখুন দিদি, নতুন মা তো আমার নামে সব লিখে দিয়ে গিয়েছেন। ওগুলো আমি আপনাদের নামে লিখে দিতে পারি না। তাহলে ওঁকে অসম্মান করা হবে। তবে আমারও কিছু চাই না। ওই বাড়ি, টাকা সব আপনারা নিয়ে নিন। আমি এখানেই ভালো আছি!”
দীপান্বিতা দেবী হেসে বললেন, “তাই না? আমরা তোর দয়ায় ভিখারির মতো থাকব ভাবছিস? নাহ। ভালো কথায় আর লাভ হবে না দেখছি।”
তারপর পাশের একটা স্যাঙাতের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এই রাজু, কেরোসিন ঢাল বাড়িতে। সব জ্বালিয়ে দে।”
স্যাঙাতটা এরপর সত্যি সত্যি এগিয়ে গেল বাড়ির দিকে কেরোসিন নিয়ে। আমি আর থাকতে না পেরে বলে উঠলাম, “এসব কী হচ্ছে কী? কী ভেবেছেন কী আপনারা?”
দীপান্বিতা দেবী দেখলাম আমার দিকে ফিরেও দেখলেন না। সেই রিভলবার হাতে স্যাঙাত আমাদের দিকে এগিয়ে এল। বুঝলাম আমাকেও মুখ বন্ধ রাখতে বলা হচ্ছে। দাদাকে একবার ফোন করতে হবে। এরা কী ভেবছে কী? অজয়ের বাড়িতে তখন কেরোসিন ঢালা হচ্ছে। আশেপাশের বাড়ি থেকেও উঁকি মেরে দেখছে সবাই। অজয় বারবার বলছে, “এরকম করবেন না আমার সঙ্গে। এরকম করবেন না।”
শারদ্বত এবার এগিয়ে গেল সামনের দিকে। তারপর দীপান্বিতা দেবীকে বলল, “আপনি সিগারেট খান?”
দীপান্বিতা দেবী বোধহয় হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে একটু চমকে গিয়েছিলেন। তারপর বললেন, “না, খাই না। কেন?”
শারদ্বত বলল, “না মানে... আগুন জ্বালানোর জন্য যদি দেশলাই না থাকে আমি ধার দিতে পারি।”
দীপান্বিতা দেবী এবার ভুরু কুঁচকে বললেন, “আপনি কি পাগল নাকি মশাই?”
তারপর রাজু নামে ছেলেটিকে বললেন, “হয়েছে? এবার আগুন লাগা!”
অজয় তখন হাত জোড় করে দীপান্বিতা দেবীকে বলল, “এরকম করবেন না। দয়া করুন আমার ওপর। আমি তো এসব চাইনি!”
রাজু ছেলেটি এরপর পকেট থেকে কী একটা বের করে ছুড়ে দিল ঘরের ভেতর। আস্তে আস্তে ধোঁয়াতে ভরে গেল চারপাশ। অজয় দৌড়ে গেল বাড়ির ভেতরে। আমিও বাড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
শারদ্বত আবার আমার হাতটা ধরে নিল। বলল, “নিজের নাকের ওপর ভরসা রাখো!”
নিজের নাকের ওপর? কী বলছে কী? জল ঢালতে হবে এক্ষুনি। দমকল ডাকতে হবে তো। এই আগুন ছড়িয়ে গিয়ে পাশের ঘরগুলোকেও জ্বালিয়ে দিতে পারে। চারপাশে তখন প্রচণ্ড ধোঁয়া। একটু পরেই একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। ওই ধোঁয়ার মধ্যেই অজয় হাত ধরে ভেতর থেকে বের করে আনছে একজন বয়স্ক মহিলাকে। ধোঁয়া তখন অনেকটাই কমেছে। মহিলার মুখটা ঢাকা! মহিলা বেরিয়ে আসার পরেই একটা খুব চেনা গন্ধ নাকে ভেসে এল। আরে! এই গন্ধটাই তো কাল পেয়েছিলাম অজয়ের কাছে। কী একটা পারফিউমের গন্ধ!
দীপান্বিতা দেবী তখন থ! হঠাৎ অবাক হয়ে বলে উঠলেন, “মাসি!”
এই এই, মাসি মানে? মাসি মানে কী? মাসি মানে তো...
শারদ্বত তখন আমাকে বলল, “অনিরুদ্ধ, এই যে, আলাপ করিয়ে দিই বরং। ইনি হলেন আশির দশকের বিখ্যাত অভিনেত্রী নীহারিকা চ্যাটার্জি। সেলফি নেবে নাকি একটা?”
নীহারিকা চ্যাটার্জি? কিন্তু তিনি তো মৃত? খুন হয়েছেন! সারা শরীর গলে গিয়েছিল। তিনি এখানে কীভাবে? মানে! আমার কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না!
“তুমি কি আমার ওপর রাগ করেছ?”
প্রশ্নটা করেছে শারদ্বত। আমরা এখন ফিরছি আমাদের ফ্ল্যাটে। ক্যাব বুক করেছে শারদ্বত। আমার মনের মধ্যে তখন যে কী হচ্ছে সেটা সত্যি বুঝতে পারছি না!
জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কখন বুঝতে পেরেছিলে যে নীহারিকা চ্যাটার্জি বেঁচে আছেন?”
শারদ্বত বলল, “সম্ভাবনাটা উড়িয়ে দিইনি কখনোই। দাঁতটা গলল না, বাকি সারা শরীর গলে গেল, তখনই মনে হয়েছিল। কেউ যেন জোর করে বোঝানোর চেষ্টা করছে উনিই খুন হয়েছেন!”
- তারপর কখন শিয়োর হলে যে উনি খুন হননি?
- কাল বিকেলেই আন্দাজ করেছিলাম কিছুটা। আজ সকালে নীহারিকা চ্যাটার্জির ডাক্তারের কাছে গিয়ে শিয়োর হলাম।
- কাল বিকেলে মানে? কখন?
- কাল বিকেলে নীহারিকা দেবীর বাড়িতে যখন গিয়েছিলাম, তখন তিনটে জিনিসে খটকা লাগে। যে গন্ধটা অজয়ের কাছে পেয়েছিলাম সেই পারফিউমটাই দেখতে পেয়েছিলাম নীহারিকা দেবীর ড্রেসিং টেবিলের কাছে।
- হ্যাঁ, তাতে কী? দুজনে এক পারফিউম ব্যবহার করতে পারে না?
- তুমি অজয়ের ব্যাকগ্রাউন্ডটা ভুলে যাচ্ছ অনিরুদ্ধ! ও একটা বস্তির ছেলে। লোকের বাড়িতে কাজ করে ওর সংসার চলত। তোমার মনে হয় হাতে টাকা পেলে ও আগে ওর মালকিনের ব্যবহার করা পারফিউম কিনবে?
- ওহ আচ্ছা। এটা তো একটা হল, আর দুটো কী?
- তোমার মনে আছে কি না জানি না, নীহারিকা দেবীর বাড়িতে আমি কিছু ফাইল ঘাঁটছিলাম। ওর মধ্যেই পেলাম নীহারিকা দেবীর ক্লাস টুয়েলভ এবং গ্র্যাজুয়েশনের মার্কশিটের জেরক্স।
- ওঁর সায়েন্স ছিল?
- হ্যাঁ, সায়েন্স তো ছিলই। তবে তার সঙ্গে গ্র্যাজুয়েশনে ছিল নিউট্রিশন অনার্স। আর তুমি জানো কি না জানি না, নিউট্রিশন পড়তে গেলে কেমিস্ট্রি মাস্ট। কেমিস্ট্রিতে ভালো না হলে নিউট্রিশনে খুব একটা সুবিধে করা যায় না। সুতরাং সোডিয়াম হাইড্রক্সাইডের ব্যবহার সম্পর্কে উনি অবগত ছিলেন।
- আর-একটা?
- আর-একটা হল ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন! দাঁতের ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিলেন উনি। তখনই খটকাটা দৃঢ় হয়। আজ সকালে গেছিলাম ডাক্তারবাবুর চেম্বারে। তখনই শুনলাম যে উনি ফলস দাঁত ব্যবহার করেন। অপারেশনের মাধ্যমে নিজের আসল দাঁত যে ক-টা অবশিষ্ট ছিল সেগুলো উনি তুলে ফেলেন! আর সেই দাঁতটা থেকেই পুলিশ পায় DNA। সুতরাং প্রমাণিত হয় যে নীহারিকা চ্যাটার্জি মারা গিয়েছেন।
কী সাংঘাতিক! কিন্তু এত কাঠখড় পুড়িয়ে উনি হঠাৎ এটা করলেন কেন? এর উত্তর অবশ্য পরে পেয়েছিলাম। দাদা জানিয়েছিল। নীহারিকা দেবী নিজের ভাগনের থ্রেট নিতে পারছিলেন না। রাজনীতিতে ওঁর আসার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু না এলেও বিপদ! সেই কারণেই বোধহয় দেবরাজ বোস আর নিজের এক্স হাজব্যান্ডকে ফোন করেছিলেন। সাহায্য চাইতে। কিন্তু সেটা না পাওয়ায় নিজেই কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। আর তাই ভেবেছিলেন নিজের বাকি জীবনটা অজয়কে নিয়ে বিদেশে কাটিয়ে দেবেন। সেই কারণেই এত কিছু করা। যাওয়ার আগে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ফাঁসিয়ে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন ভাগনেকে।
“একটা কথা বলো?” আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কেন অজয়কেই সন্দেহ করলে? মানে কেন মনে হল ও জড়িত এটার সঙ্গে!”
শারদ্বত হেসে বলল, “ওর জুতো দেখে!”
“জুতো? মানে?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
- পলাশ চ্যাটার্জির বাগানে একটা পায়ের ছাপ দেখেছিলাম। তার আগের দিন বৃষ্টি হওয়ায় ছাপটা মোটামুটি বোঝা যাচ্ছিল। পায়ের ছাপ দেখে একটা ছেলেরই মনে হয়েছিল। তখন ওঁদের জিজ্ঞেস করেছিলাম কোনও ১৬-১৭ বছরের ছেলে আছে কি না। ওঁরা বললেন নেই। তারপর অজয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে দেখলাম ওর জুতোয় কাদা লেগে আছে তখনও। তারপর যখনই তোমার দাদা ফোন করে বলল পলাশবাবুর বাড়ি থেকে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড পাওয়া গেছে, তখনই অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গেল। অজয়কে পাঠানো হয়েছিল পলাশবাবুর বাড়িতে সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড রেখে ফোনটা চুরি করে আনার জন্য। কারণ নীহারিকা দেবী নিজের ভাগনেকে চিনতেন খুব ভালো করে। উনি জানতেন যে পুলিশ ওঁর বাড়িতে আসবে। সুতরাং এক ঢিলে দুই পাখি!
- আর-একটা প্রশ্ন আছে আমার।
আমি বললাম।
- না না। আর-কোনো প্রশ্ন নয়। আমার খিদে পেয়েছে। সবই তো বলে দিলাম তোমাকে।
- না। প্লিজ। আর-একটা শেষ প্রশ্ন!
- উফফ! আবার কী?
আমি বললাম, “দীপান্বিতা দেবী ওই যে আগুন লাগাতে গিয়েছিলেন বাড়িতে, ওটা তোমারই কথাতে তো?”
শারদ্বত হেসে বলল, “সকালে যখন ফোন করেছিল থ্রেট দিতে, তখনই প্ল্যানটা মাথায় খেলে গেল। মনে হল খুব ড্রামাটিক হবে সবটা।”
- কিন্তু সত্যি আগুন লেগে গেলে কী হত?
- আরে ধুর! তোমাকে তো বললাম নিজের নাকের ওপর ভরসা রাখতে। কেরোসিনের গন্ধ পেয়েছিলে তুমি?
- না তা পাইনি... তবে...
- ওতে কেরোসিন ছিল না। পাতি জল ছিল। আর বাড়ির ভেতর ছুড়তে বলেছিলাম একটা স্মোক বম্ব! অত আগুন লাগানোর থ্রেটের পর ধোঁয়া দেখলেই লোকজন ভাববে আগুন লেগেছে। ওই ভয়েই অজয় ছুটে গেল ভেতরে। নিজের নতুন মাকে বাঁচানোর জন্য।
কী মারাত্মক প্যাঁচালো লাগছিল পুরো কেসটা। এখন তো মনে হচ্ছে খুব সোজা। এই অজয় তাহলে নীহারিকা চ্যাটার্জির আসল দ্বিতীয় পুরুষ। ইস! এই কেসের ক্রেডিট শারদ্বত পাবে না ভেবে খারাপ লাগছিল।
হঠাৎই ফোন বেজে উঠল আমার। দাদা ফোন করছে। বললাম, “বল।”
- তোরা কোথায় এখন?
- এই তো ট্যাক্সিতে। কেন?
- আজ সন্ধেবেলা বাড়িতে থাকবি?
- হ্যাঁ। কেন বল তো?
- কয়েকটা মিডিয়া তোকে আর শারদ্বতকে ইন্টারভিউ করতে চাইছে। এই কেসটা নিয়ে।
আমি এবার একটু অবাক হলাম। কিন্তু শারদ্বত যে বলল এর পুরো কৃতিত্বই কলকাতা পুলিশ পাবে! তাহলে?
- কী রে? পাঠাব?
ও প্রান্ত থেকে দাদার গলা পেলাম আবার!
বললাম, “হ্যাঁ। কিন্তু...”
- ঠিক আছে। পাঠিয়ে দিচ্ছি তাহলে আজ। পরে কথা হবে।
কথাটা বলেই ফোনটা রেখে দিল দাদা। মাঝে মাঝে বড্ড অবাক লাগে এই মানুষ দুটোকে। শারদ্বত আর আমার দাদা। দুজনে দু-মেরুর মানুষ। অথচ একটা দিক দিয়ে দুজনের খুব মিল।
“কী বলল দাদা? ক্রেডিট পুলিশ নিচ্ছে না?” প্রশ্নটা করল শারদ্বত।
উফফ! এই ছেলেটার কাছে কিচ্ছু লুকোবার উপায় নেই।
বললাম, “না, নিচ্ছে না। একটা মিডিয়া আসবে আমাদের ইন্টারভিউ করতে।”
শারদ্বত বলল, “তুমি কথা বলে নিয়ো! আমার ঘুম পাচ্ছে!”
- মানে? এই তো একটু আগে বললে খিদে পাচ্ছে?
শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ। ঘুম পাচ্ছে, খিদেও পাচ্ছে! প্রচুর কাজ আমার!”
কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎই আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ব্রেক কষল খুব জোরে। আমাদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে একটা কালো ভ্যান! এসব কী? কিছু বোঝার আগেই ভ্যান থেকে বেরোল কালো সানগ্লাস পরা কয়েকজন লোক। তারপর আমাদের গাড়ির দরজা খুলে আমাদের দিকে রিভলবার তাক করে বলল, “বাইরে!”
শারদ্বত বলল, “বাইরে কী?”
আমি তো তখন বুঝতেই পারছি না ব্যাপারটা কী হচ্ছে! আর শারদ্বত ফাজলামি মারছে! লোকটি এবার আরও জোরে বলল, “বাইরে!”
বেরিয়ে এলাম গাড়ির বাইরে। তারপর আমাদের ঠেলে দেওয়া হল সামনের কালো ভ্যানের দিকে।
শারদ্বত বলল, “বলছিলাম যে দাদা, আমাদের ড্রাইভারকে পেমেন্টটা করে দেবেন আপনারা?”
কেন এরকম সিরিয়াস মুহূর্তে ও এরকম করে বুঝি না! পিছনে থাকা লোকটি এবার ধাক্কা দিল শারদ্বতর পিঠে।
তারপরেই হঠাৎ করে একটা কালো হুড নিয়ে এসে পরিয়ে দেওয়া হল আমাকে। শারদ্বতর সঙ্গেও বোধহয় একই জিনিস হল। এরা কারা? আমাদের কেন নিয়ে যাচ্ছে? কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কিচ্ছু বুঝতে পারছি না আমি। শুধু বুঝতে পারছি আমাদের ঠেলে দেওয়া হল সামনের সেই ভ্যানের মধ্যে! তারপর স্টার্ট দেওয়া হল সেই ভ্যান!
শারদ্বত আর কথা বলছে না। এই রে! অজ্ঞান হয়ে গেল নাকি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন