সখী ভালোবাসা কারে কয়

অর্ণব মণ্ডল

এই গল্পটা আমার কোনোভাবেই লেখার ইচ্ছে ছিল না একটা বিশেষ কারণে। কিন্তু শারদ্বতর হুমকিতে বাধ্য হয়ে লিখছি।

আমাদের ফ্ল্যাটে রিসেন্টলি একটা সমস্যা শুরু হয়েছে। তালা দেওয়া নিয়ে। বিষয়টা খুলেই বলা যাক। আমাদের ফ্ল্যাটের একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল এখানে কখনও তালা দেওয়া থাকে না। মানে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা হোক, বা দিন বা রাত, ফ্ল্যাটের মেন গেট কখনও লক করা থাকে না। যে যার নিজের বাড়ির দরজায় খিল দেয় যদিও। কিন্তু মেন গেট কদাচিৎ নয়। তবে তার জন্য আমাদের অসুবিধের থেকে সুবিধেই বেশি হয়। আর এ পাড়ায় চুরি-টুরি তেমন হয় না।

সম্প্রতি আমাদের ফ্ল্যাটের একতলায় একজন নতুন ভাড়াটে এসেছেন। তাপস রায়। উনি আবার একটু ওভারপ্রোটেকটিভ ওঁর বউকে নিয়ে। আসার কয়েকদিনের মধ্যেই ওঁর স্ত্রীর প্রচণ্ড ভয় করতে শুরু করল। এবং যার ফলস্বরূপ উনি লোকজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে শুরু করলেন যে মেন গেট কেন লক থাকে না? কেউ বিষয়টার সদুত্তর দিতে না পারায় উনি শেষে ফ্ল্যাটমালিক সঞ্জয়বাবুর দ্বারস্থ হন। সঞ্জয়বাবুর সঙ্গে ওঁর কী কথা হয় সেটা আর তেমন আমরা কিছু জানি না। কারণ উনি নিজে আমাদের বলেননি। তবে এর কয়েকদিন পরেই আমাদের ফ্ল্যাটে একটা মিটিং হয়। যেখানে ভোট নেওয়া হয় যে কতজন ফ্ল্যাট সারাদিন চাবি দিয়ে রাখার পক্ষে এবং কতজন বিপক্ষে।

আমাদের ফ্ল্যাটে এই মুহূর্তে আটটা ফ্যামিলি রয়েছে। আর রয়েছি আমরা আর একটি মেয়ে। নাম অন্বেষা। মেয়েটিও একতলায় থাকে। একা। যাই হোক, ভোটে দেখা যায় চারজন বলছে সারাদিন চাবি দিয়ে রাখার কথা এবং চারজন বলছে চাবি না দেওয়া হলেও তাদের কোনও সমস্যা নেই। আমি এবং আমার সঙ্গে ফ্ল্যাটের যাদের ভালো সম্পর্ক তারা সবাই চাবি না দেওয়ারই পক্ষে। এরপরে ওই তাপসবাবু অর্থাৎ আমাদের ফ্ল্যাটের নতুন ভাড়াটে ব্যাপারটা নিয়ে আর বেশি বাড়াবাড়ি করেননি।

এতটা বিবরণ দেওয়ার কারণ এর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই আমাদের ফ্ল্যাটে একটা ব্যাপার হয়। তবে এটা আর আমি বলছি না। আমাদের ক্লায়েন্টের কাছ থেকেই শোনা যাক।

সেদিন আমি আর শারদ্বত দুজনেই বাড়িতে আছি। ও হ্যাঁ, বলা হয়নি। আমি আকাশবাণী কলকাতায় নিজের কণ্ঠ প্রদান করে আপাতত সংসার চালাই। না না, গান-টান আমি পারি না। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করি। আজ কোনও প্রোগ্রাম নেই। তাই বাড়িতেই ছিলাম। আর শারদ্বতেরও হাতে তেমন কেস নেই, তাই ল্যাপটপে কী একটা পড়ছিল। তার একটু আগেই বাথরুমের আলোটা পালটেছি কি না জিজ্ঞেস করছিল আমায়। বাথরুমের লাইটটা কেটে গিয়েছিল আমাদের। কারও সময় হচ্ছিল না বদলানোর। শেষ অবধি আমাকেই করতে হল কাজটা।

যাই হোক, সেদিন হঠাৎ বেল বাজল। দরজা খুলে দেখলাম আমাদের ফ্ল্যাটের মালিক সঞ্জয়বাবু দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, “আপনারা কি ব্যস্ত?”

আমি বললাম, “না না। আসুন না।”

শারদ্বত ল্যাপটপ থেকে মাথা পর্যন্ত তুলল না। সঞ্জয়বাবু এসে বসলেন। বললেন, “আসলে বাড়িতে গোয়েন্দা থাকা সত্ত্বেও এরকম একটা ব্যাপার হয়ে গেল! তাই আর কি, ভাবলাম আপনার সঙ্গে একবার কথা বলে যাই।”

আমি বুঝতে পেরেছি উনি কীসের কথা বলছেন। কিন্তু শারদ্বত দেখলাম এখনও কিছু বলল না।

ভদ্রলোক এবার একটু গলা ঝেড়ে ডাকলেন, “শারদ্বতবাবু?”

শারদ্বত মাথা তুলল এবার। বলল, “ওহ! সরি... আমায় বলছিলেন? বুঝতে পারিনি। হ্যাঁ বলুন।”

“না মানে... বলছিলাম যে এরকম একটা ব্যাপার ঘটে গেল ফ্ল্যাটে। একটা কিছু তো করা দরকার।”

শারদ্বত বলল, “কী ব্যাপার ঘটেছে বলুন তো? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।”

আমি বললাম, “সে কী গো? কাল এত বড়ো ঘটনা ঘটে গেল ফ্ল্যাটে। তুমি জানো না? তোমায় যে বললাম সব।”

শারদ্বত ভুরু কুঁচকে বলল, “আমাকে? কখন বললে?”

“আরে কাল বিকেলেই তো বললাম যে ফ্ল্যাটে চুরি হয়েছে!”

শারদ্বত এবার ল্যাপটপটা কোল থেকে নামিয়ে বলল, “সে হয়তো ভুলে গেছি আমি।”

আমি এবার রাগত স্বরেই বললাম, “এই ঘটনাটা কী করে একটা মানুষ ভুলে যেতে পারে?”

সঞ্জয়বাবু এবার বললেন, “আরে ঠিক আছে। ব্যস্ত মানুষ! হতেই পারে। আমি আর-একবার বলছি ঘটনাটা।”

শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ সেই বরং ভালো। কী হয়েছে একটু বলুন তো খুলে!”

সঞ্জয়বাবু বললেন, “কাল অনেক রাত্রে, মানে তা ওই ধরুন দুটোর পর, ফ্ল্যাটের মেন গেটে কেউ জোরে জোরে ধাক্কা মারে। মানে খুব জোরে। আর সকালে উঠে দেখা যায় ফ্ল্যাটের মেন গেটের কাছে যে বাল্বটা লাগানো ছিল সেটা খুলে নিয়ে পালিয়েছে চোর।”

“এক সেকেন্ড।” শারদ্বত থামাল, “ব্যাপারটা যে দুটোর পরেই হয়েছে, এটা কে বলল আপনাকে?”

- ওই অন্বেষা থাকেন তো একতলায়। উনি জেগে থাকেন দুটো অবধি। উনি বললেন, ঘুমোতে যাওয়ার একটু পরেই আওয়াজটা পান উনি।

- আচ্ছা বেশ! আপনাদের ধারণা এটা চোরের কাজ?

- হ্যাঁ মানে... তা ছাড়া আর কী-ই বা হবে!

- তাহলে চোর আওয়াজ করল কেন?

- আজ্ঞে?

- বলছিলাম যে, চোর যদি চুরিই করতে আসে, তাহলে অযথা দরজায় ঢোল বাজিয়ে আওয়াজ করবে কেন?

সঞ্জয়বাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “হ্যাঁ তাই তো! কেন করবে বলুন তো?”

শারদ্বত কিছু বলল না। আমি বললাম, “আচ্ছা আপনি পুলিশে খবর দিচ্ছেন না কেন?”

শারদ্বত বলল, “তাহলে যে উনি নিজেই বিপদে পড়বেন।”

সঞ্জয়বাবু বললেন, “আরে বিপদের আর কী আছে! আবার পুলিশের ঝামেলায় কে যায় বলুন তো? এটা তো সামান্য ঘটনা।”

শারদ্বত বলল, “জিএসটি চালু হয়েছে অথচ আপনি ভাড়াটেদের বিল দিচ্ছেন না। অর্থাৎ আপনি ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছেন। এই ব্যাপারটা পুলিশ ডাকলে বেরিয়ে যাবে, এই ভয় পাচ্ছেন কি?”

সঞ্জয়বাবু এবার হেসে বললেন, “সবই তো বোঝেন শারদ্বতবাবু। কী আর বলি। আপনি যদি একটু দেখেন তাহলে খুব ভালো হয় এই আর কি। তবে ফ্রিতে না। চোর ধরতে পারলে আমি আপনাকে পারিশ্রমিকও দেব।”

শারদ্বত বলল, “ঠিক আছে। আমি দেখছি কী করা যায়। তবে একবার ফ্ল্যাটের সবার সঙ্গে কথা বলতে হবে।”

- হ্যাঁ সেসব কোনও অসুবিধে নেই। আমি ব্যবস্থা করে দেব। আপনি শুধু দেখুন ব্যাপারটা কী ঘটল।

শারদ্বত আর কিছু বলল না। ঘাড় নাড়ল। সঞ্জয়বাবু চলে যাচ্ছিলেন। আমি বললাম, “আচ্ছা, গেটে তাহলে কি চাবি দেওয়া হবে এবার?”

সঞ্জয়বাবু বললেন, “দেখুন, যেরকম ঘটল তারপর আর রিস্ক নিই কীভাবে বলুন তো? জানি আপনি চাবি না দেওয়ার পক্ষেই ছিলেন। কিন্তু...

বললাম, “আরে না না। ধুর! সবাই চাইবে সেফ থাকতে। চাবি দিতে শুরু করুন। কোনও অসুবিধে নেই।”

“আপনি গোয়েন্দা?” ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন অন্বেষা দেবী।

শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ। আপনার বেশি সময় নেব না। কাল যেটা হয়েছে সেটা নিয়ে দু-একটা কথা যদি বলেন।”

অন্বেষা দেবী আবার জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি সত্যি গোয়েন্দা? মানে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর?”

শারদ্বত এবার বিরক্ত হয়ে আমার দিকে তাকাল। আমরা এখন রয়েছি একতলায় অন্বেষা দেবীর ফ্ল্যাটে। বারবার অন্বেষা দেবী বলতে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। ও আমারই বয়সি। শুনেছিলাম একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে গ্রাফিক ডিজাইনিং-এর কাজ করে।

শারদ্বত এবার বলল, “হ্যাঁ। আমি প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর। আমরা কি দু-একটা প্রশ্ন করতে পারি?”

অন্বেষা এবার গলার স্বরে বিরক্তি বুঝতে পেরে বলল, “আয়্যাম সরি। আসলে আমি কখনও আসল গোয়েন্দা দেখিনি। কিন্তু গোয়েন্দা গল্প পড়তে আমার অসাধারণ লাগে। সত্যজিৎ রায় থেকে কোনান ডয়েল, সব গুলে খাওয়া আমার।”

আমি বললাম, “আপনার প্রিয় গোয়েন্দা কে?”

অন্বেষা কিছু বলার আগেই শারদ্বত বলল, “আচ্ছা, কাল রাত্রে আপনি কটায় ঘুমোতে গিয়েছিলেন?”

আমি এবার একটু বিরক্ত হলাম। কথার মাঝখানে কথা বলার কি খুব প্রয়োজন ছিল? ইয়ে মানে এই মহিলার ওপর আমার হালকা একটু চাপ রয়েছে, মানে ক্রাশ যাকে বলে। ধুর! শারদ্বতটা না... বড্ড আনরোমান্টিক।

অন্বেষা শারদ্বতর প্রশ্নের উত্তরটাই দিল। বলল, “দুটোর সময়। আমি রোজই ওই সময়েই ঘুমোতে যাই।”

শারদ্বত বলল, “আর আপনি ওই গেটের আওয়াজ কখন পেয়েছিলেন?”

- আমি শোবার ওই ধরুন মিনিট পনেরো পরেই।

- কীরকম হল আওয়াজটা?

- আওয়াজটা একটু অদ্ভুত। মানে ওই লোহার গেটে কোনও একটা ধাতব বস্তু দিয়ে আঘাত করলে যেরকম হয় সেরকম আওয়াজ। অনেকটা স্কুলের ঘণ্টা বাজানোর মতো আওয়াজ।

- কতক্ষণ হল?

- কয়েক সেকেন্ডের বেশি না। আমি আওয়াজ শুনেই উঠে এসে দেখি বাইরে লাইট জ্বলছে না। আর গেট হাট করে খোলা।

- হুম। কাউকে দেখতে পাননি?

- নাহ। কাউকে দেখতে পাইনি।

শারদ্বত এবার জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, ওই যে মিটিংটা হয়েছিল, সেখানে আপনি কোনদিকে ছিলেন? চাবি দেওয়ার পক্ষে নাকি না-দেওয়ার পক্ষে?”

অন্বেষা এবার অবাক হয়ে বলল, “দেওয়ার পক্ষে। কেন বলুন তো?”

শারদ্বত বলল, “না এমনি। ঠিক আছে, আর বিরক্ত করব না আপনাকে! আসি।”

অন্বেষা আমাদের বাই বলে দরজা বন্ধ করে দিল। আমরা এরপর গেলাম উলটোদিকের ফ্ল্যাটে তাপস রায়ের বাড়িতে। অর্থাৎ যিনি প্রথম থেকেই ফ্ল্যাটের গেট বন্ধ করার আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন।

ভদ্রলোক দরজা খুলে আমাদের দেখেই কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকালেন। তারপর ভেতরে নিজের স্ত্রীকে একবার দেখলেন। তারপর আমাদের দিকে ফিরে বললেন, “সঞ্জয়বাবু বলেছিলেন আপনারা আসবেন। খুব সময় লাগবে নাকি?”

বুঝতেই পারলাম স্ত্রী আছে বলে আমাদের দুজনকে ফ্ল্যাটে ঢোকানোর ইচ্ছে ওঁর নেই। কেন এত বউ চুরি যাওয়ার ভয় ওঁর, কে জানে!

শারদ্বত বলল, “না। দু-মিনিট লাগবে।”

তাপসবাবু বললেন, “ঠিক আছে, বলুন।”

শারদ্বত বলল, “কাল রাত্রে আপনি দরজায় ওই আওয়াজ শুনেছিলেন?”

- নাহ। আমি শুনিনি। আমার ঘুম খুব গভীর। আমার স্ত্রী একটা আওয়াজ পেয়েছে বলল।

- স্ত্রীর গভীর নয়?

- অ্যাঁ?

- বলছিলাম আপনার স্ত্রীর ঘুম কি গভীর নয়? নাকি উনি জেগে ছিলেন?

- নাহ। হতে পারে... আমি জিজ্ঞেস করিনি। তবে আমি জানতাম এরকম কিছু একটা ঘটবে। কবে থেকে বলছি চাবি দেওয়ার জন্য। কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। শেষ অবধি একটা চোর পালানোর পর সবার বুদ্ধি বাড়ল।

শারদ্বত বলল, “আচ্ছা, ব্যাপারটা আপনার কাজ নয়তো?”

তাপসবাবু এবার থতোমতো খেয়ে বললেন, “মানে? কোন ব্যাপারটা?”

- এই যে... ফ্ল্যাটে রাতদুপুরে আওয়াজ করা, যাতে মেন গেটটা লক করা হয় এরপর থেকে।

তাপসবাবু বললেন, “ধুর মশাই! আপনি কি নেশা করেছেন নাকি? আমার কি মাথাখারাপ? রাতদুপুরে উঠে ওরকম করব?”

শারদ্বত বলল, “আপনার মাঝের প্রশ্নটার উত্তর– হ্যাঁ। তাই তো মনে হচ্ছে। ঠিক আছে, আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই আপনাকে!”

এরপর আমরা গেলাম তিনতলায় রাজুদার ফ্ল্যাটে। রাজুদা এবং ওর ফ্যামিলির সবাই বললেন কোনও আওয়াজ শোনেনি। এই রাজুদাও ছিলেন চাবি লাগানোর পক্ষে! উনি বললেন, “ভালোই হয়েছে বুঝলেন। এবার অন্তত একটু চাবি থাকবে গেটে। যে পারে ঢুকে পড়ে। এটা মোটেই ভালো ব্যাপার নয়।”

“কী বুঝছ শার্লক?” আমি জিজ্ঞেস করলাম শারদ্বতকে।

আমরা আমাদের ফ্ল্যাটেই রয়েছি এখন। জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শেষ হয়েছে। আপাতত ডিনার করতে হবে। রাজুদার পর আমরা গিয়েছিলাম যীশুদার কাছে। যীশুদা খুব ভালো মানুষ। কিন্তু রাত্রে আটটার পর উনি প্রচণ্ডভাবে অ্যালকোহলপ্রেমী হয়ে যান। তখন ওঁকে যা-ই জিজ্ঞেস করা হোক, আর-কোনো উত্তর পাওয়া যাবে না। যীশুদা ছিলেন সারাদিন চাবি না লাগানোর পক্ষে। আজও আটটা বেজে যাওয়ায় যীশুদার কাছ থেকে সেরকম উত্তর পাওয়া গেল না। বাকি তিনটে ফ্যামিলির মধ্যে আর-একজন হলেন সঞ্জয়বাবু। ওঁর সঙ্গে আর আলাদা করে কথা বলিনি। উনিও চাবি না-দেওয়ার পক্ষেই ছিলেন। আর চারতলায় যে দুজন থাকেন, তাঁদের একজন বললেন কোনও আওয়াজ শোনেননি। আর-একজনকে পাওয়া গেল না বাড়িতে। অগত্যা আমরা আমাদের ডেরায় ফিরলাম।

শারদ্বত বলল, “আপাতত যে কিছুই বুঝছি না ভায়া। এভাবে চোর খোঁজা আমার কাজ নাকি?”

আমি বললাম, “তুমি ফ্ল্যাটের কাউকে সন্দেহ করছ?”

- দ্যাখো, ফ্ল্যাটের কাউকে সন্দেহ করতে গেলে দুজনের কথা বেশি করে মনে হয়। একতলার দুই ভাড়াটে। অর্থাৎ অন্বেষা দেবী আর তাপসবাবু। দুজনেরই মোটিভ সুযোগ দুটোই রয়েছে প্রচুর পরিমাণে।

- আরে ধুর! অন্বেষা এতটা ডেসপারেটের মতো কাজ করবে বলে মনে হয় না!

- কেন? মেয়ে বলে আন্ডারএস্টিমেট কোরো না অনিরুদ্ধ!

- তাপসবাবুও তো করতে পারেন বলছ?

- হুম। করতেই পারেন। উনি তো অনেকদিন থেকেই চাইছিলেন গেটে চাবি দেওয়া হোক। ফ্ল্যাটের লোকজনকে ভয় দেখিয়ে সেটা এনশিওর করলেন হয়তো।

আমি আর কিছু বললাম না। কী জানি হতেই পারে। আজকাল মানুষজন ভালোবাসার জন্যে সব করতে পারে। আর স্ত্রীকে নিয়ে যেমন প্রোটেকটিভ উনি, ওঁর পক্ষে তেমন অসম্ভব কিছু না এটা।

বললাম, “আর সঞ্জয়বাবু? বা রাজুদা?”

শারদ্বত সিগারেটের প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বলল, “দ্যাখো, রাজুদার পক্ষে ব্যাপারটা করা খুব চাপের। উনি থাকেন তিনতলায়। গেটে আওয়াজ করে দৌড়ে তিনতলায় যেতে গিয়ে কেউ দেখে নিলে উনি খুব সমস্যায় পড়তেন। কাজেই একটু রিস্কি ওটা। আর সঞ্জয়বাবু শুরু থেকেই ফ্ল্যাটে চাবি না দেওয়ার পক্ষে। সুতরাং উনি অকারণ এই ঝামেলাটা করবেন না।”

কথাটা বলেই সিগারেট ধরিয়ে শারদ্বত চলে গেল বাথরুমের দিকে। আমি ভাবতে বসলাম কেসটা নিয়ে। যদিও ভেবে আমি কখনোই খুব একটা সুবিধে করতে পারিনি। তাই একটু পরে থেমে গেলাম। যার যেটা কাজ তার সেটা করা উচিত।

বাথরুম থেকে বেরিয়েই হঠাৎ শারদ্বত কাকে যেন ফোন করল, তারপর ওর ঘরে গিয়ে কিছু কথা বলল। আমি শুনতে পাইনি একেবারেই। না হলে লিখে দিতাম।

জিজ্ঞেস করলাম, “কাকে ফোন করলে?”

- সঞ্জয়বাবুকে!

- কেন, হঠাৎ?

- জানিয়ে দিলাম যে চোরকে ধরা আমার কম্ম নয়।

- মানে? তুমি হাল ছেড়ে দিচ্ছ এরই মধ্যে?

- হ্যাঁ। আর তদন্ত চালিয়ে গেলে সর্ষের মধ্যে ভূত বেরোবে। সেটাই আমি চাই না, বুঝলে ভায়া।

সর্ষের মধ্যে ভূত? কেসটা কী? কী সব বলছে শারদ্বত?

আমি বললাম, “কী হয়েছে একটু খুলে বলো না। চোর কে বুঝতে পেরেছ?”

শারদ্বত বলল, “হুম পেরেছি। তবে সেটা সবার সামনে ফাঁস না করাই ভালো।”

- বলো কী গো? কে সেই চোর? শুনি না।

শারদ্বত এবার বলল, “অনিরুদ্ধ সেন, আমায় একটা প্রশ্নের উত্তর দেবে?”

শারদ্বত আমায় পুরো নাম ধরে ডাকল দেখে আমি একটু অবাক হলাম। বললাম, “হ্যাঁ, কী প্রশ্ন বলো না!”

শারদ্বত বলল, “অন্বেষা দেবীর প্রেমে পড়েছ ভালো। তা ভাই, মুখ থুবড়েই পড়তে হল?”

আমি জানতাম শারদ্বত ধরে ফেলবে। শুধু অপেক্ষা করছিলাম কখন এবং কীভাবে বুঝতে পারে সেটার জন্যে। শারদ্বতর প্রশ্ন শুনে আমি একটু আমতা আমতা করে বললাম, “না... ইয়ে মানে... হঠাৎ এসব...”

“বোকা বোকা ক্রিমিনালদের মতো ন্যাকামো কোরো না অনিরুদ্ধ।” শারদ্বত বলল, “তুমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছ মানেটা। আমি শুধু ভাবছি তুমি আমায় কতটা বোকা ভাবো?

আমি বললাম, “আমি একদমই তোমায় বোকা ভাবি না বিশ্বাস করো। আমি জানতাম তুমি ধরে ফেলবে!”

- তা জানতে যখন তখন আর-একটু বেশি মাথা খাটানোর সুযোগ দিলে না কেন? সিঁড়ির লাইটটা খুলে এনে বাথরুমে লাগিয়েছ? পাশের ঘরে গোয়েন্দা ঘুমিয়ে থাকা সত্ত্বেও! বড্ড সাহস তো তোমার!

আমি হেসে বললাম, “তো কী করব? কিছু একটা চুরি গিয়েছে না জানলে তো থ্রেটটা বোঝা যেত না। আর বাল্বটা ফেলে দিতে ইচ্ছেও করল না। বাথরুমের আলোটা কেটে গিয়েছিল। তাই ভাবলাম ওখানেই লাগিয়ে দিই।”

শারদ্বত বলল, “হুম। বুঝলাম।”

- কী করে বুঝলে এবার বলো তো!

শারদ্বত বলল, “বিকেলে অন্বেষা দেবীর বাড়িতে তোমার চোখ দেখেই একটা খটকা লেগেছিল। তবে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু এই একটু আগে বাথরুমে গিয়ে সিএফএল-এর তারিখ দেখেই সন্দেহটা তোমার ওপর পড়ে। মনে আছে, সঞ্জয়বাবু বলেছিলেন একটা বাল্ব চুরি গিয়েছে।”

- তারিখ দেখে মানে?

- যে-কোনো দোকান থেকে তুমি যদি সিএফএল বাল্ব কেনো, তাহলে তাতে ছ-মাসের ওয়ারেন্টি থাকে। সেই কারণেই দোকান থেকেই মার্কার দিয়ে বাল্বের গায়ে বিক্রির তারিখটা লিখে দেয়। যাতে ছ-মাসের মধ্যে খারাপ হলে কাস্টমার ওয়ারেন্টি ক্লেম করতে পারে!

- হ্যাঁ, তো?

- তো আবার কী? আমাদের বাথরুমের বাল্বটার তারিখ সাত মাসের পুরোনো। তুমি যদি বাল্বটা নতুন কিনে থাকতে, তাহলে তারিখটা দু-দিন আগের থাকত।

“শিট!” আমার মুখ দিয়ে বেরিয়েই গেল কথাটা, “আর-একটু সাবধান হতে পারতাম। ধুর!”

শারদ্বত বলল, “দ্যাখো, কাজটা যে করেছে সে যে আমাদের ফ্ল্যাটেরই কেউ, সেটাই আমার বেশি করে মনে হচ্ছিল। কারণ বাইরের চোর হলে দরজায় আওয়াজ করে জানান দেবে না। সুতরাং উদ্দেশ্য হল ভয় দেখানো এবং দরজায় লক করা!”

আমি বললাম, “কিন্তু আমি তো ভোট দিয়েছিলাম চাবি না-দেওয়ার পক্ষে। তাহলে আমার মোটিভটা ধরলে কী করে?”

শারদ্বত বলল, “আমার মনে হয় সঞ্জয়বাবু ও যীশুদা চাবি না-দেওয়ার পক্ষে ভোট দেওয়ায় তুমিও ওদিকেই ভোট দিয়েছিলে। পরে যখন দেখলে যে অন্বেষা চাইছে চাবি দিতে, তুমিও তখন ভোট চেঞ্জ করতে চেয়েছিলে। কিন্তু সেটা খুব খারাপ দেখাত ভেবে আর কিছু বলোনি। কিন্তু প্রেমে পড়লে মানুষ কী-ই না করে! রাতদুপুরে বেরিয়ে নিজের ফ্ল্যাটেই চোর সেজে ভয় দেখাতেও পারে!”

আমি এবার বললাম, “দ্যাখো ভাই, আমি কিন্তু প্রেমে পড়িনি। আমার ওই দুর্বলতা রয়েছে একটু। তবে প্রেম নয়। আমার খারাপ লাগল ওর জন্যে। মনে হল একা থাকে একতলায়। হয়তো ভয় লাগে। তাই হয়তো চাবি দিতে চাইছে গেটে। সেই কারণেই, মানে...”

শারদ্বত বলল, “হুম। তবে চুরি ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও ভালো কাজ নয়। অন্তত পাশের ঘরে গোয়েন্দা যখন ঘুমিয়ে রয়েছে! এটা মাথায় রেখো।”

আমি মুচকি হেসে বললাম, “কিন্তু গোয়েন্দার নাকের ডগা থেকেই তো চুরি হয়ে গেল। গোয়েন্দা বুঝতেও পারেনি। এই ব্যাপারটাকে কিন্তু প্রশংসা করতেই হবে। কী বলো।”

শারদ্বত বলল, “তুমি কি চাইছ কাল আমি সঞ্জয়বাবু আর অন্বেষা দেবীর সামনে তোমার এই প্রশংসাটা করি?”

আমি চুপ করে গেলাম। ওটা ছাড়া উপায় নেই। গল্পের নায়ককে শেষ কথা বলতে দিতেই হবে। আর তা ছাড়া যেভাবে থ্রেট করল, তারপর চুপ করে থাকাটাই শ্রেয়। এই কারণেই এই গল্পটা লিখতে চাইনি আমি। ব্ল্যাকমেল করে ওটাও করিয়ে নিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%