ইন্দ্রজাল রহস্য

অর্ণব মণ্ডল

জাদুকরের কথা

“আজকে আমাদের এই ম্যাজিক শো শেষ করার সময় হয়ে গিয়েছে। তবে যাওয়ার আগে আরও একবার আপনাদের মোহিত করার জন্য আমার সেরা খেলা দেখানোর সময় হয়ে গিয়েছে।” — জাদুকর বললেন।

দর্শক আসনে বসে থাকা প্রায় সকলেই চেঁচিয়ে উঠলেন উচ্ছ্বাসে। জাদুকর এ.সি. সরকার-এর শো যাঁরা দেখেছেন আগে, তাঁরা প্রায় সবাই জানেন কী খেলার কথা বলছেন ম্যাজিশিয়ান।

জাদুকর বললেন, “আমার সামনে দুটো কাচের বোল আছে। তার একটাতে লেখা আছে রো নম্বর, অর্থাৎ এই হলের যতগুলো রো আছে, তার নাম্বার লেখা আছে একটা বোল-এ। এবং আর-একটা বোল-এ আছে সিট নাম্বার। আমার এই খেলাতে প্রয়োজন আপনাদের মধ্যে থেকে একজনকে। কে আসতে চান বললে বেশির ভাগ জায়গাতেই প্রায় মারামারি শুরু হয়ে যায়। সেইজন্যেই এই ব্যাবস্থা।”

জাদুকরের সুন্দরী অ্যাসিস্ট্যান্ট এগিয়ে এল সামনে। লটারির এই কাজটা ওকেই করতে হয় সাধারণত।

জাদুকর এবার ওঁর সহকারীকে বললেন, “উইল য়ু ডু দ্য অনার প্লিজ?”

হঠাৎই দর্শকদের মধ্যে একটা চাপা নীরবতা। কার সিট নাম্বার ওঠে লটারিতে, সেই অপেক্ষায় রয়েছে সকলে। মহিলাটি প্রথম বোল-এ হাত ঢুকিয়ে বের করলেন একটি কাগজ। তারপর এগিয়ে দিলেন জাদুকরের দিকে। জাদুকর কাগজটা খুলে বললেন, “আমার কাছে রয়েছে রো নম্বর… H”

আবার উচ্ছাসে ফেটে পড়ল হলঘর। রো নম্বর H-এ তখন একটা অদ্ভুত টেনশন। সবাই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রয়েছে জাদুকরের অ্যাসিস্ট্যান্টের দিকে। এবার সিট নাম্বার তোলার পালা। অ্যাসিস্ট্যান্টটি এরপর দ্বিতীয় বোল থেকে তুলে আনলেন আর-একটি কাগজ। তারপর একইভাবে পৌঁছে দিলেন জাদুকরের হাতে। জাদুকর কাগজটা খুলে দর্শকদের উদ্দেশে বললেন, “সিট নাম্বার আমরা পেয়ে গেছি। নাহ, বেশি টেনশন দেব না আর। আজ আমার কাছে স্টেজে আসছে H-16। দেখি কে আছে H-16 এ?”

আবার চিৎকার করে উঠল সারা হল। পিছনের সারিতে বসে থাকা লোকটি এবার একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। এরা যতটা না পারে, তার চেয়ে বেশি দেখায়। একে শীতকাল, তার ওপর হলে এসি চলছে। সব মিলিয়ে বেশ ঠান্ডাই লাগছে। কাজেই ওভারকোটের কলার তুলে মুখ ঢাকা দিয়ে লোকটি নিশ্চিন্তে বসে মাপছে সবাইকে।

একটু পরেই ম্যাজিশিয়ানের আর-একজন সহকারী এসে এসকর্ট করে নিয়ে গেল H-16 এ বসে থাকা মেয়েটিকে। মেয়েটির মুখ চোখে যেন চাপা একটা ভয়। নার্ভাস লাগছে কি?

স্টেজে নিয়ে যাওয়ার পর জাদুকর হাত বাড়িয়ে দিলেন মেয়েটির দিকে। তারপর বললেন, “আপনার নামটা যদি একটু বলেন।”

মেয়েটি বলল, “আমার নাম সুনন্দিতা... সুনন্দিতা চক্রবর্তী।”

- আপনি কার সঙ্গে এসেছেন এখানে আজ?

- আমার স্বামীর সঙ্গে। ওই যে বসে আছেন আমার পাশের সিটে।

সবাই তাকাল সেদিকে। পিছনে মুখ ঢেকে বসে থাকা লোকটি তখন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে স্টেজে থাকা মেয়েটির দিকে। জাদুকর এবার বললেন, “দর্শক আসনে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের অনেকেই হয়তো জানেন না আমার শেষ খেলাটা কী। তাঁদের জন্য আরও একবার বলি... এই খেলার নাম বর্ষচক্র। আমাদের প্রত্যেকেরই বয়সের একটা চাকা রয়েছে। যেটা একই দিকে ঘুরছে আর তার ফলে আমাদের বয়স ক্রমাগত বেড়েই যাচ্ছে। আমার হঠাৎ একদিন মনে হল, এই চাকাটা কি উলটোদিকে ঘোরানো যায় না? মানে বয়সটা হঠাৎ কি একটু কমিয়ে দেওয়া যায় না? তারপরেই অনেক সাধ্যসাধনা করে আমি এক অভিনব ট্রিকের খোঁজ পেয়েছি। বয়স কমানো যায়। সেটা আজ আপনাদের সামনে আমি দেখিয়ে দেব করে। আমার সাথে স্টেজে যিনি রয়েছেন, তাঁর বয়স আমি অন্তত পনেরো বছর কমিয়ে দেব। এটাই আমার শেষ খেলা।”

উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল দর্শক। জাদুকরের দুজন পুরুষ সহকারী এবার একটা কাঠের বড়ো বাক্স নিয়ে এল স্টেজে। বাক্সটির সামনে একটা হুইল। সেটা ডানদিক বাঁদিকে ঘোরানো যায়! তার ঠিক ওপরেই একটা নাম্বার লেখা জায়গা রয়েছে। হুইলটা বাঁদিকে ঘোরালে সেটা মাইনাস সহযোগে বাড়ে অর্থাৎ বয়স কমছে ইঙ্গিত করে, এবং ডানদিকে ঘোরালে সেখানে প্লাস সহযোগে বাড়তে দেখা যায়।

জাদুকর এবার স্টেজে দাঁড়ানো মহিলাকে বললেন, “আপনি তৈরি তো?”

মহিলা ঘাড় নাড়তেই জাদুকরের সুন্দরী সহকারী ওই বাক্সের দরজা খুলে দিলেন। বাক্সটিতে একজন ছ-ফুট লম্বা মানুষ অনায়াসে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। সেই জায়গা ভেতরে রয়েছে। জাদুকর এবার দর্শকের উদ্দেশে বললেন, “আপনারা ভালো করে এই বাক্সটা দেখুন। এই বাক্সের মধ্যেই যা ঘটার ঘটবে... আমি এখন সুনন্দিতা দেবীকে অনুরোধ করব এই বক্সটির মধ্যে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য।”

পিছনে বসে থাকা লোকটি আবার হাসল। যত্তসব বুজরুকি। সব ম্যাজিক বক্সের মধ্যেই। সামনে করার দম নেই কারও। ততক্ষণে স্টেজের ওপরে থাকা ভদ্রমহিলা গিয়ে দাঁড়িয়েছেন বক্সের মধ্যে। বক্সের দরজা বন্ধ করে দিলেন সুন্দরী অ্যাসিস্ট্যান্ট।

তারপর জাদুকর এগিয়ে গেলেন বক্সের সামনে। তারপর বললেন, “আপনারা আমার সঙ্গে গুনতে থাকুন সবাই। আমি যতবার হুইল ঘোরাব, তত বয়স কমবে ওঁর। লেট’স স্টার্ট।”

বলেই ম্যাজিশিয়ান বাঁদিকে ঘোরাতে শুরু করলেন বক্সের বাইরের হুইলটিকে।

“এক” চেঁচিয়ে উঠল দর্শক।

“দুই”... “তিন”... করতে করতে “পনেরো”-তে গিয়ে থামলেন জাদুকর এ.সি. সরকার।

“সবাই তৈরি তো?” জিজ্ঞেস করলেন জাদুকর।

“হ্যাঁ।” একযোগে উত্তর দিল দর্শকেরা।

জাদুকর এবার তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্টকে ইশারা করতেই তিনি খুলে দিলেন বক্সের দরজা। দেখা গেল বক্সের মধ্যে রয়েছে একটি তেরো-চোদ্দো বছরের বাচ্চা মেয়ে। মেয়েটিকে হাত ধরে বক্সের বাইরে নিয়ে এলেন ওই মহিলা অ্যাসিস্ট্যান্ট।

“তোমার নাম কী?” জিজ্ঞেস করলেন ম্যাজিশিয়ান।

মেয়েটার চোখ মুখের অবাক ভাব এখনও কাটেনি। মেয়েটি বলল, “আমার নাম সুনন্দিতা... সুনন্দিতা চক্রবর্তী।”

“তুমি কার সঙ্গে এসেছ আজ?” আবার জিজ্ঞেস করলেন জাদুকর।

“ওই তো... ওর সঙ্গে...” মেয়েটি হাত তুলে দেখাল স্টেজের একেবারে সামনে এগিয়ে আসা ভদ্রলোকের দিকে। তাঁর চোখ বিস্ফারিত। তিনি ভাবতেও পারছেন না, এই জিনিসও হতে পারে।

জাদুকর বললেন, “সময় আর নেই আমাদের হাতে। আজ আমাদের শো এখানেই শেষ হল। আমি জাদুকর এ সি সরকার। গুড নাইট সবাইকে।”

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই পর্দা পড়ে গেল স্টেজের। সুনন্দিতা চক্রবর্তীর স্বামীর গলা শোনা গেল একবার, “আর আমার স্ত্রী? ও কোথায়?”

কেউ উত্তর দিল না।

পিছনে ওভারকোট পরা ভদ্রলোককে আর দেখা যাচ্ছে না। তিনিই সবার আগে হল থেকে বেরিয়েছেন সম্ভবত।

একটু পরেই হন্তদন্ত হয়ে গ্রিনরুমে ঢুকলেন সুনন্দিতা চক্রবর্তীর স্বামী। চেঁচিয়ে বললেন, “আমার স্ত্রী কোথায়?”

জাদুকর এ সি সরকার তখন নিজের মেকআপ তুলছিলেন। না তাকিয়েই বললেন, “ওই গ্রিনরুমে দেখুন। ওখানেই থাকার কথা।”

- ওখানে নেই... আমি দেখেই এলাম।

- তাহলে হয়তো বাথরুমে গেছেন। অপেক্ষা করুন। পেয়ে যাবেন বউকে।

সুনন্দিতা চক্রবর্তীর স্বামী তখন রাগে ফুঁসছেন, “হয়তো মানে? আপনারা কেউ জানেন না? একটা দায়িত্বজ্ঞান নেই?”

এ সি সরকার এবার বিরক্ত হলেন, বললেন, “আহ! এ কি বাচ্চা মেয়ে নাকি? দেখুন নিজেই বাড়ি চলে গেছে হয়তো।”

ভদ্রলোক এরপরেও চেঁচামেচি করতে থাকায়, জাদুকরের হুকুমে দুজন সহকারী এসে টেনে নিয়ে গেল ওঁকে। তারপর বাইরে বের করে আটকে দিল দরজা।

ভদ্রলোক তখন চেঁচিয়ে বলছেন, “এটা কি ইয়ার্কি নাকি? আমি দেখে নেব‌। অন্য লোকের স্ত্রীকে কিডন্যাপ করা? আমি পুলিশ নিয়ে আসছি।”

ঐন্দ্রজালিক পাত্তা দিলেন না। এসব ফালতু হুমকিতে কিচ্ছু আসে যায় না ওঁর।

থানায় ঢুকে দাদার ঘরে ঢুকতে যেতেই একজন কনস্টেবল আটকাল আমাকে। হাতটা আম্পায়ারের নো বল দেখানোর মতো করে সামনে বাড়িয়ে বলল, “কোথায় যাবেন?”

রোজ রোজ এই এক জিনিস! এরা কি কিছু মনে রাখে না! বিরক্তিকর! বললাম, “নীলাদ্রি সেনের কাছে যাব।”

লোকটি হাতটা না নামিয়েই বলল, “হ্যাঁ, সে তো ওঁর ঘরের দিকে এগোচ্ছেন মানে ওঁর কাছে যাবেন বুঝতে পারছি। কিন্তু উনি এখন ব্যস্ত আছেন। মিটিংয়ে।”

আমার মাথাটা আজ এমনিতেই গরম ছিল। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ পিছন থেকে কে একজন যেন ওই কনস্টেবলকে ধমক দিয়ে উঠল, “কার সঙ্গে কী কথা বলছিস সেটা একটু ভেবেচিন্তে বল!”

গলাটা শুনেই চিনলাম আমি। জয়ন্তদার গলা। জয়ন্তদা সাব-ইন্সপেক্টর। দাদার আন্ডারেই কাজ করে। কনস্টেবল লোকটি আর কিছু বলল না। জয়ন্তদার সঙ্গে হাসি বিনিময় হল।

আমি দাদার ঘরে ঢুকে দেখলাম একটি ছেলে বসে আছে দাদার উলটোদিকের চেয়ারে। আমাকে দাদা ইশারা করল পাশেরটায় বসার জন্য। তারপর সামনের ছেলেটিকে বলল, “শোনো, তুমি কী বলছ আমার মাথায় ঢুকছে না। আর অত সময়ও নেই আমার। পুলিশের কাজ পুলিশকে করতে দাও।”

ছেলেটি বলল, “মাথায় যদি না ঢোকে তাহলে আর কাজটা করবেন কীভাবে? সেটা ভেবে দেখেছেন কি?”

দাদা এবার একটু রাগতস্বরেই বলল, “এই যে চেয়ারটা দেখছ, এখানে এমনি এমনি বসে নেই। তুমি কী করো হে? আমাকে জ্ঞান দিতে এসেছ?”

ছেলেটি বলল, “ওই যে যেগুলো আপনাদের মাথায় ঢোকে না, সেগুলোতে মাথা খাটিয়ে সংসার চালাই!”

আমার এবার একটু অবাক লাগল। ব্যাপারটা কী? পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে সাধারণত মানুষ একটু হোঁচট খায়। এ তো দেখছি সিক্সার মারছে!

দাদা বলল, “তুমি ভাই আজ এসো। আমার অনেক কাজ আছে। দিবাকরদা বলেছিল বলে তোমার কথা শুনতে বসেছিলাম। আর খুব একটা আগ্রহ পাচ্ছি না।”

ছেলেটি উঠে পড়ল চেয়ার থেকে। তারপর আমার দিকে একবার দেখে দাদাকে বলল, “হুম। ভেবে দেখুন যদি মাথায় ঢোকে কিছু।”

কথাটা বলেই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দাদাকে কিছু বলার আগেই আমার দিকে ফিরে দাদা জিজ্ঞেস করল, “ঘর পেলি তুই?”

বললাম, “নাহ পাইনি! ছেলেটা কে ছিল?”

দাদা বলল, “ধুর! হি ইজ আ নোবডি। বেকারত্বের জ্বালায় নিজেকে কী না কী ভাবছে! বাদ দে।”

- কী ভাবছে শুনি!

- তুই কি এখনও হোটেলে?

দাদার এই প্রশ্নবাণগুলোর জন্যেই আমি ওর সঙ্গে দেখা করা কমিয়ে দিয়েছি।

বললাম, “হ্যাঁ হোটেলে। বলছিলাম যে এই প্রশ্নগুলো এবার থাক না। রোজ রোজ একই উত্তর দিতে ভালো লাগছে না।”

দাদা আমার কথায় কান না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এই তোর আংটি কী হল? মুক্তো বসানো সোনার আংটিটা?”

- আরে হাতে বড্ড টাইট হচ্ছিল। আঙুলে লাগছিল। তাই খুলে রেখেছি। দোকানে দেব।

- ওটা খুলতে বারণ করেছিল কাকিমা তোকে।

- আঙুলে টাইট হলেও পরে থাকব নাকি? যাই হোক। বল কেন ডাকলি আজ আমায়?

- কাকিমা ফোন করেছিল আজ আমাকে।

- আবার? উফফ! এ তো মহা জ্বালা!

- তুই ওঁর কষ্টটা একবার বোঝ! নিজের ছেলে বাড়ি ছেড়ে দিয়ে হোটেলে থাকছে। তুই ওঁর জায়গায় থাকলে কী করতিস?

- এবার বাড়াবাড়ি হচ্ছে! আমি কি কচি খোকা নাকি?

- তুই ফিরে আয় না এবার! কাকিমা বড্ড কষ্টে রয়েছে।

- নাহ রে। ও বাড়িতে আমি আর ফিরব না। আর তা ছাড়া বাড়ির মালিকের তো আমার বাঁচা মরা নিয়ে খুব একটা চিন্তা নেই। তাহলে ফিরে কী লাভ বল তো?

সেই লোকটি এসে এবার শিঙাড়া আর দু-কাপ কফি দিয়ে গেল।

দাদা বলল, “কাকুর ওপর রাগটা তুই আমাদের সবার ওপর কেন দেখাচ্ছিস? প্লিজ ফিরে আয়। কতদিন এভাবে থাকবি? একটা চাকরিও তো নেই এখন তোর হাতে।”

আমি চেয়ার থেকে উঠে পড়লাম। বললাম, “চাকরি তো আমি করব না সেটা আগেই জানিয়েছি। যেটা করতে বেরিয়েছি সেটা ঠিকই করব।”

কথাটা বলেই দাদাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই বেরিয়ে গেলাম ওর ঘর থেকে।

থানা থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটছিলাম। হঠাৎ পিছন থেকে একটা গলার আওয়াজে হাঁটার গতি কমল আমার।

কেউ একজন বলল, “এই যে শুনছেন?”

পিছনে তাকিয়ে দেখলাম। থানার সেই ছেলেটি। বললাম, “শুনলাম। বলুন।”

লোকটি বলল, “তা লেখকবাবু কি থাকার জন্য ঘর খুঁজছেন?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ। তা তো খুঁজছি। কিন্তু আপনাকে কে বলল?”

ছেলেটি বলল, “কে আবার বলবে? দেখে শুনে মনে হল।”

- তাই? কীরকম? একটু শুনি তো!

ছেলেটি বলল, “আপনি দেখলাম থানা থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে উলটোদিকের অক্সফোর্ড বুকস্টোর-এর দিকে খানিকক্ষণ লোলুপ দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর এগোতে গিয়েও নিজের প্যান্টের পকেটে হাত দিয়েই পিছিয়ে এলেন। অর্থাৎ খেয়াল হল আপনার কাছে টাকা নেই। আর আপনার শান্তিনিকেতন মার্কা ঝোলাব্যাগ থেকে একটা পাণ্ডুলিপি উঁকি মারছে। টাকা নেই অথচ পাণ্ডুলিপি নিয়ে ঘুরছেন মানে লেখক ছাড়া অন্য কিছু হওয়ার চান্স একটু কম। আর না হলেও আজকাল দু-লাইন লিখেই লোকজন এমনভাবে নিজেকে হনু ভাবছে যে সবাই এখন লেখক।”

আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, “আর বাড়ি খুঁজছি কে বলল?”

ছেলেটি বলল, “আপনার দাদা।”

- মানে? কখন?

- ওই তো আমি যখন বেরোচ্ছিলাম তখন আপনাকে জিজ্ঞেস করল, ঘর পেয়েছেন কি না! ওটা শুনে মনে হল।

আমি বললাম, “হুম। খুঁজছি।”

ছেলেটি বলল, “আংটি বিক্রি করে কত পেয়েছেন?”

আমি একটু চমকে গিয়ে বললাম, “বিক্রি করে মানে? বুঝলাম না। ওটা হাতে লাগছিল তাই খুলে রেখেছি। আর আপনাকে কে বলল আংটির ব্যাপারটা?”

ছেলেটি বলল, “ওসব পরে হবে। বাদ দিন। আপাতত যেটা বলার সেটা হল ফ্ল্যাট শেয়ার করবেন কি? আমার সঙ্গে?”

আমি বললাম, “উইথ অল ডিউ রেসপেক্ট, আমি তো আপনাকে ঠিক চিনি না, জানি না। অচেনা মানুষের সঙ্গে ফ্ল্যাট শেয়ার করে থাকাটা একটু অড। কিছু মনে করবেন না।”

- একদম। আই আন্ডারস্ট্যান্ড। নো প্রবলেম। আমার কার্ডটা রাখুন। মাইন্ড চেঞ্জ করলে ফোন করে নেবেন।

কার্ডটা হাতে নিয়ে আবার অবাক হলাম। কার্ডের ওপর লেখা আছে, S.H., আর তার নিচে ফোন নাম্বার, ইমেল আইডি। জিজ্ঞেস করলাম, “S.H. মানে? আপনার নামটা...?

ছেলেটি হেসে বলল, “ওহ! আচ্ছা! আমার নাম... শারদ্বত... শারদ্বত হাজরা।”

সেদিন যখন হোটেলে ফিরলাম তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমেছে। হোটেলে ঢোকার সময়েই ম্যানেজার ডাকলেন, “দাদা, একবার আসবেন তো!”

গেলাম রিসেপশনের দিকে। ম্যানেজার আমাকে বললেন, “ইয়ে মানে... আপনি তো অ্যাডভান্স দিয়েছিলেন হোটেলে চেক ইন করার সময়। বাকি তো আরও প্রায় ছ-দিনের রয়েছে। ওটা একটু দিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন।”

জিজ্ঞেস করলাম, “কত হয়েছে ছ-দিনে?”

উনি কম্পিউটার স্ক্রিনে কী একটা দেখে বললেন, খাওয়াদাওয়া-সহ, ৪৬০০ টাকা।

ওয়ালেট থেকে বের করে ৫০০০ টাকা দিয়ে দিলাম। বলে দিলাম জমা রাখতে।

আংটির টাকাও প্রায় শেষ। এবার যে কী হবে? শেষ পর্যন্ত কি বাড়িতেই ফিরতে হবে? কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনটা শক্ত করলাম। অসম্ভব। ওই বাড়িতে আমি আর ফিরব না। তার জন্যে যদি ভিক্ষে করতে হয় তাও ভালো।

চাবি খুলে ঘরে ঢুকতে গিয়েও বুকটা ধ্বক করে উঠল। ভেতর থেকে টিভি চলার আওয়াজ আসছে। আমার স্পষ্ট মনে আছে আজ সকালে আমি একবারও টিভি চালাইনি। দরজাটায় হালকা করে চাপ দিতেই খুলে গেল। হোটেলের লোকজনকে ডাকব কি না ভাবছিলাম। পা টিপে টিপে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখি বিছানার ওপর পা তুলে বসে আছে স্বয়ং শারদ্বত হাজরা।

আমাকে দেখে বলল, “আরে অনিরুদ্ধ, বলছিলাম যে কিছু ভাবলেন নাকি?”

আমি বললাম, “আপনি ঘরে ঢুকলেন কীভাবে?”

শারদ্বত বলল, “ওই তো দরজা দিয়ে। যেভাবে সবাই ঢোকে। আমার প্রস্তাবটা নিয়ে কিছু ভাবলেন?”

আমি এবার বিরক্ত হলাম। প্রাইভেসি বলে কিছু নেই নাকি? এইজন্যে দাদা ওরকমভাবে তাড়িয়ে দিল অফিস থেকে। এ ছেলে মোটেই সুবিধের নয়।

বললাম, “এই তো ঘণ্টাখানেক আগে আপনাকে না বললাম। আবার ফলো করে করে এখানেও চলে এসেছেন? আপনার মনে হয় এরপর আমি আপনাকে হ্যাঁ বলব?”

শারদ্বত বলল, “গল্প লিখছেন এখন কিছু?”

প্রশ্নটায় আমি একটু থমকে গেলাম। কী জিজ্ঞেস করলাম আর কী উত্তর দিল।

আমি বললাম, “নাহ। এই মুহূর্তে কিছু লিখছি না। কেন?”

- লিখতে চান?

- লিখতে চাইলেই তো হল না। ভালো প্লট চাই তো।

- বাস্তব জীবন থেকে প্লট দিলে লিখবেন নাকি?

- এ আবার কী হেঁয়ালি মার্কা কথা বার্তা?

- আপনার ওপরের ফ্লোরে। যাবেন নাকি?

আমি বললাম, “দেখুন, আমার মাথায় এমনিতেও অনেক চাপ রয়েছে। এখন এসব হেঁয়ালি ভালো লাগছে না। আপনি কি যাবেন নাকি আমি হোটেলের লোককে ডাকব?”

শারদ্বত বলল, “এক ঘণ্টা। ওপরের ফ্লোরে আমার সঙ্গে চলুন। ভালো না লাগলে বা আপনার কোনও কাজে না লাগলে নেমে চলে আসবেন। আপনাকে আমি আর বিরক্ত করব না।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। নাহ, এর হাত থেকে মুক্তি নেই। বললাম, “ঠিক আছে, চলুন।”

শারদ্বত বলল, “বেশ। আর-একটা শর্ত আছে।”

- আবার কী?

- আপনিটা ভালো লাগছে না। যেখানে আমরা যাচ্ছি, সেখানে পরস্পর পরস্পরকে তুমি বলে সম্বোধন করাটাই ভালো।

- কেন? কোথায় যাচ্ছি আমরা?

শারদ্বত বলল, “আরে চলো না। দেখতে পাবে।”

বাবাহ! এ তো যেমন বলা তেমন কাজ! সঙ্গে সঙ্গে তুমিতে নেমে গেল। যাই হোক, হোটেলের ঘর চাবি দিয়ে শারদ্বতর সঙ্গে উঠে গেলাম ওই হোটেলেরই ঠিক ওপরের ফ্লোরে।

ওপরের ফ্লোরে উঠে শারদ্বত একটা ঘরের দরজায় গিয়ে টোকা মারল বারকয়েক। কিছুক্ষণ পর একটা বেঁটেমতো লোক এসে খুলে দিল দরজা। তারপর শারদ্বতকে বলল, “আরে স্যার। আসুন আসুন। আপনার জন্যেই সবাইকে নিয়ে এসচি।”

শারদ্বত আমাকে ইশারা করল ভেতরে আসার জন্য। গেলাম ওর পিছন পিছন। ভেতরে গিয়ে দুটো চেয়ারে বসলাম আমরা। ঘরের মধ্যে রয়েছেন তিনজন। একজন কমবয়সি মহিলা। মাথা নিচু করে বসে আছে। আর-একজন চশমা পরে সন্দেহজনক ভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে। আর ওই বেঁটেমতন লোকটি, যে দরজা খুলে দিল আমাদের, সে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের পাশে যেন আমাদের হুকুমের অপেক্ষায় রয়েছে। শারদ্বত তাকে বলল, “নিমাইবাবু, প্রথমে আপনার সঙ্গে কথা বলব। বাকিদের একটু বাইরে করিডরে অপেক্ষা করতে বলুন।”

নিমাইবাবু নামের লোকটিকে আর কিছু বলতে হল না। বাকি দুজন বিছানা থেকে উঠে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বেরোবার ঠিক আগে শারদ্বত বলল, “ও... ইয়ে...”

ফিরে তাকাল দুজনেই। “কাছাকাছিই থাকবেন। কোথাও যাবেন না। আর দরজাটা বন্ধ করে দিন”, বলল শারদ্বত।

নিমাইবাবু এবার আমাদের সামনে এসে বসলেন বিছানায়। বললেন, “বলুন স্যার। কী জিজ্ঞাসা করবেন করুন।”

শারদ্বত পকেট থেকে সিগারেটটা বার করে বলল, “সে করছি। তার আগে পুরো কেসটা আর-একবার বলুন তো। অনিরুদ্ধ জানে না এখনও কিছু।”

কথাটা বলে আমাকে আর নিমাইবাবুকে সিগারেট অফার করল ও। আমি না বললাম। নিমাইবাবু একটা নিয়ে পকেটে রেখে দিলেন।

শারদ্বত ভুরু কুঁচকে বলল, “সিগারেট খাও না?”

আমি বললাম, “কিছুই খাই না! তুমি আমার নাম জানলে কীভাবে? আমি তো বলিনি!”

- ভাত, রুটি?

- ওগুলো খাই।

- তাহলে কিছুই খাই না বললে কেন?

- মানে... নেশার জিনিস কিছু খাই না। নামটা কীভাবে জানলে সেটা বলো না।

- নেশা? কে বলে নেশা?

আমি আর কিছু বললাম না। এ উত্তর দেবে না আমার প্রশ্নের। নিমাইবাবুর দিকে ফিরে বললাম, “হ্যাঁ। আপনি বলুন।”

বলে তো দিলাম। কী বলবে, কেন বলবে কিছুই তো জানি না ছাই! আর আমিই বা এখানে কী করছি সেটাও জানি না! এই শারদ্বত ছেলেটা বড়ো অদ্ভুত। এ কি তবে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর? মানে গোয়েন্দা নাকি? রিয়েল লাইফ গোয়েন্দা? বাবাহ! এরাও মার্কেটে টিকে আছে এখনও।

“অনিরুদ্ধ?” আবার আমার নাম ধরে ডাক শুনে সংবিৎ ফিরল।

- হ্যাঁ বলো।

- কীসের এত চিন্তা তোমার? কেসটা শুনবে যে!

উফফ! এই ছেলেটা বড্ড ঘ্যানঘ্যান করে!

বললাম, “হ্যাঁ। শুনব তো। নিমাইবাবু, বলুন।”

নিমাইবাবু বললেন, “আমরা তিনজনেই জাদুকর এ.সি. সরকারের জন্য কাজ করি। উনি খুব বিখ্যাত জাদুকর। বিভিন্ন জায়গায় শো করেন। আমরা সঙ্গে থাকি। বহুদিন পর কলকাতায় এসেছিলাম শো করতে। আমাদের একটা খুব বিখ্যাত খেলা হচ্ছে বয়স কমানোর খেলা। দর্শক আসন থেকে একজনকে ডাকা হয়। তারপর একটা বক্সে ঢুকিয়ে তার বয়স দশ-পনেরো বছর কমিয়ে দেওয়া হয়। এটাই হল খেলাটা।”

“আর ব্যাপারটা কীভাবে ঘটে সেটা বলুন।” শারদ্বত সিগারেটে টান দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল।

নিমাইবাবু বললেন, “আমাদের আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয় কাকে ডাকা হবে স্টেজে। সেই অনুযায়ী আমরা একটা বাচ্চা মেয়ে বা ছেলেকে জোগাড় করি।”

আমি বললাম, “এক সেকেন্ড? নাম, পরিচয় কীভাবে জানেন?”

- আসলে স্যার আমাদের এখানে যারা টিকিট কাটে সবাইকেই নিজের যে-কোনো একটা আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার দিতে হয়। আমরা বলি এটা সিকিউরিটির জন্যে। কিন্তু আসলে এটা পরিচয় বের করার জন্যে।

- ঠিক আছে। তারপর বলুন।

- তারপর স্টেজে ডেকে একটি বক্সের মধ্যে ঢুকতে বলা হয় ওই ছেলে বা মেয়েকে। ওই বক্সের নিচের দিকটা খোলা যায়। ওটা খুলে ওই মহিলাকে নিচ দিয়ে গ্রিনরুমে নিয়ে গিয়ে বসানো হয়। আর বাচ্চাটিকে ওপরে তোলা হয়। এর মধ্যেই ওই জাদুকর বাইরে কিছু কথা বলেন। এটা সেটা বলে সময় কাটান কিছুক্ষণ। তারপর যখন বাক্সটা খোলা হয় তখন দেখা যায় ওখানে বাচ্চাটা রয়েছে। সেই বাচ্চাটাকে আগে থেকেই সব শিখিয়ে পড়িয়ে রাখা হয়। সে সেইমতো সব উত্তর দেয়।

শারদ্বত বলল, “অর্থাৎ পিয়োর বুজরুকি যাকে বলে! তার ওপর আধার কার্ড থেকে মানুষের তথ্য বের করছেন। মানে ইনভেশন অফ প্রাইভেসি। আপনাদের তো গুণের শেষ নেই!”

নিমাইবাবু বললেন, “এগুলোতে স্যার আমাদের কোনও দোষ নেই। আমাদের বস সবটা হ্যান্ডেল করেন। অনেক ওপরমহল অবধি হাত আছে ওনার।”

শারদ্বত হেসে বলল, “তাই যদি আছে, তাহলে আপনি আমাকে ডাকলেন কেন? ওপরমহলে খবর দিলেন না কেন?”

“এটাও স্যার ওই বসের হুকুম”, নিমাইবাবু বললেন, “তার কারণ বোধহয় এইসব আধার কার্ডের ব্যাপারস্যাপারে ওপরমহলের কেউ জড়িত জানতে পারলে তো খুব রিক্স হয়ে যাবে।”

আমি বললাম, “রিস্ক।”

নিমাইবাবু বললেন, “হ্যাঁ স্যার, রিক্স। বোঝেনই তো।”

- সে আমি বুঝেছি। কিন্তু রিস্ক! রিক্স না।

- আজ্ঞে স্যার?

শারদ্বত আমাকে বলল, “ছেড়ে দাও। ওটা হওয়ার নয়।” তারপর নিমাইবাবুকে বলল, “আপনি বলতে থাকুন। তারপর কী হল?”

নিমাইবাবু আবার শুরু করলেন, “হ্যাঁ, তো প্রত্যেকবার যেটা হয়, শো শেষের পর ওই ভদ্রলোক বা ভদ্রমহিলাকে আমরা ছেড়ে দিই। যে যার নিজের মতো বাড়ি চলে যান। সেদিনও আমাদের শো-এর পর তাই হয়েছিল। ভদ্রমহিলাকে বলেছিলাম বাড়ি চলে যেতে। বা যদি চেনা কেউ ভেতরে থাকে, তাহলে তার জন্য বাইরে অপেক্ষা করতে। তারপর থেকেই ওই মহিলাকে পাওয়া যাচ্ছে না!”

আমি বললাম, “পাওয়া যাচ্ছে না মানে? মিসিং?”

শারদ্বত ভর্ৎসনার চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “পাওয়া যাচ্ছে না মানে মিসিং-ই হয় অনিরুদ্ধ। বেসিক ইংরেজি।”

উফফ! মাঝে মাঝে বড্ড চালিয়াতের মতো আচরণ করে ছেলেটা। এর সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে। ভাবাই যাচ্ছে না!

নিমাইবাবু বললেন, “হ্যাঁ স্যার। মিসিং। ওঁর স্বামী এসেছিলেন ওখানে। খুব হল্লা করলেন। স্যার পাত্তা দেননি। তার পরের দিন সকালেই পুলিশ এসে স্যারকে তুলে নিয়ে যান। কিন্তু বিশ্বাস করুন, স্যার ওরকম মানুষ না। একটু রগচটা। তাড়াতাড়ি রেগে যান। কিন্তু... মানে অকারণে একজন মহিলাকে উনি কেন কিডন্যাপ করবেন?”

শারদ্বত বলল, “এটা ঘটার পরের দিন সকালেই নিমাইবাবু আমাকে ফোন করেন।”

- হ্যাঁ। স্যার বলে দিয়েছিলেন আপনাকেই যেন ফোন করি।

শারদ্বত আমাকে বলল, “এবার গেস করো, এই কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার কে?”

আমি বললাম, “আমার দাদা?”

- হ্যাঁ। সেই কারণেই থানায় যাওয়া। ওই জাদুকর ভদ্রলোকের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলে ভালো হত। কিন্তু তোমার দাদা, প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর অ্যালাও করবেন না জেলে।”

- হুম, দাদা পছন্দ করে না প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটরদের।

- ভাবছে ওর ভাত মেরে দেব! পুলিশগুলোও সত্যি! পারে বটে!

নিমাইবাবু বললেন, “এবার স্যার আমরা কী করব? বসকে ছাড়া বাড়িও ফিরতে পারব না। হোটেলে রোজ রোজ এত টাকা করে গুনতে হচ্ছে!”

শারদ্বত জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, এ.সি. সরকারের কোনও শত্রু রয়েছে?”

- দেখুন, শত্রু তো এই লাইনে থাকবেই। কমপিটিশনের বাজার! জাদুকর জে.পি. নামে একজন আছে। তার সঙ্গে স্যারের খুব রেষারেষি। আমরা যেখানে শো করব, ওই সময়েই দু-দিনের তফাতে উনিও সেখানে শো ফেলেন নিজের।

- ওই মহিলাকে শেষ কে দেখেন?

- বোধহয় আমিই। আমিই ওঁকে বললাম বাইরে অপেক্ষা করতে। তারপর আর কেউ দেখেনি।

শারদ্বত কিছু একটা ভাবতে ভাবতে ঘাড় নাড়ল। তারপর বলল, “ঠিক আছে, এবার আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন। আর ওই ভদ্রমহিলাকে পাঠিয়ে দিন।”

নিমাইবাবু বললেন, “স্যার ও বাংলাটা ঠিকমতো বলতে পারে না। মানে মোটামুটি পারে। বোঝে সবই। কিন্তু বলার সময় একটু আটকে আটকে যায়। আমি কি থাকব এখানে? মানে... কিছু বুঝতে না পারলে... বলে দিতাম…”

শারদ্বত বলল, “না না। আপনি বাইরেই দাঁড়ান। আমরা কাজ চালিয়ে নেব।”

নিমাইবাবু ব্যাপারটাতে একটু যেন ক্ষুণ্ণ হলেন মনে হল। তবে শারদ্বত তাতে পাত্তা দিল না। নিমাইবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর ঢুকলেন ওই মহিলা। বয়স বেশি না। কুড়ি থেকে বাইশের আশেপাশে। বেশ সুন্দরী। তবে মাথাটা নিচু করে আছে। ভয় পাচ্ছে নাকি?

শারদ্বত বলল, “আপনার নাম?”

মেয়েটি বলল, “শ্রদ্ধা।”

- কতদিন কাজ করছেন এই অখিলেশবাবুর হয়ে?

কথাটা শুনে বুঝলাম জাদুকর এ.সি. সরকারের আসল নাম অখিলেশ। এটা জানতাম না আমি।

শ্রদ্ধা বলল, “এই তো এক বছরের একটু বেশি হবে।”

- আপনার কাজ কী ছিল?

- আমি তো স্যারের অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলাম। স্টেজ পে উনকো হেল্প করতি থি।

- কেমন মানুষ ছিলেন আপনাদের স্যার?

- ভালো।

শারদ্বত গলা নামিয়ে বলল, “শুনুন। আপনাকে ভয় পেতে হবে না। আপনি যেটা সত্যি সেটাই বলুন। কেউ জানবে না।”

মেয়েটি কী বুঝল জানি না। বলল, “আচ্ছা হি তো থে। ঠিক টাইম পে টাকা দিতেন। তবে একটু রাগি ছিলেন। একটুতেই রেগে যেতেন।”

- গায়ে হাত তুলেছে কখনও?

- নেহি। কভি নেহি।

- সেদিনের ওই যে মহিলা, কী যেন নাম ওঁর?

- সুনন্দিতা চক্রবর্তী।

- হ্যাঁ, তা ওঁর সঙ্গে আপনার শেষ কখন দেখা হয়?

শ্রদ্ধা বলল, “ম্যায়নে হি তো উসকো আখরিবার দেখি থি।”

শারদ্বতর ভুরুটা দেখলাম কুঁচকে গিয়েছে। এই তো নিমাইবাবু বলে গেলেন উনি নাকি শেষবার দেখেছেন ওই মহিলাকে।

শারদ্বত বলল, “তাই? কী করছিলেন তখন উনি?”

শ্রদ্ধা বলল, “ও মুঝসে পুছ রহি থি কি বাথরুমটা কোনদিকে? আমি দেখিয়ে দিলাম। উনি চলে গেলেন।”

- এটা আপনি পুলিশকে বলেননি?

- হ্যাঁ, বলেছি তো!

- ওই অডিটোরিয়ামে কোথায় ছিল বাথরুমটা?

- ওখানে তো দোঠো বাথরুম থা। আচ্ছাওয়ালা স্যার কে গ্রিনরুম পে থা। আমি ওখানেই যেতে বললাম ম্যামকে।

- তার মানে আপনি শেষবার দেখেননি ওঁকে।

- জি?

শারদ্বত আমাকে বলল, “তাহলে কেসটা যেটা দাঁড়াল, অখিলেশবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করতে হবেই। কারণ সুনন্দিতা চক্রবর্তীকে শেষ দেখেছিলেন উনিই।”

আমি ঘাড় নাড়লাম। শারদ্বত মেয়েটিকে বলল, “ঠিক আছে। আপনি ম্যানেজারবাবুকে পাঠিয়ে দিন।”

শ্রদ্ধা বিছানা থেকে উঠে এগোল দরজার দিকে।

শারদ্বত বলল, “আপনি বাংলা লিখতে বা পড়তে জানেন নাকি?”

শ্রদ্ধা বলল, “নেহি সাহাব। শিখে নেব। স্যার বলেছে শিখিয়ে দেবে।”

শারদ্বত বলল, “বেশ। আপনি ম্যানেজারবাবুকে ডেকে দিন একটু।”

কয়েক সেকেন্ড পরেই ঘরে ঢুকলেন সেই ম্যানেজার ভদ্রলোক। এখনও চোখের চাউনিতে সন্দেহ স্পষ্ট। শারদ্বত বলল, “আপনার নামটা জানা হয়নি।”

“রঞ্জন মল্লিক।” বিছানায় বসতে বসতে ভদ্রলোকের সংক্ষিপ্ত উত্তর।

শারদ্বত বলল, “এবার বলুন। ওই সুনন্দিতা মহিলাকে কি আপনিও শেষ দেখেছিলেন?”

ভদ্রলোক বললেন, “আমি কিছু দেখিনি।”

শারদ্বত বলল, “ম্যাজিক দেখছিলেন তো স্টেজে?”

ভদ্রলোক আবার বললেন, “আমি কিছু দেখিনি।”

আমি শারদ্বতর মুখের দিকে তাকালাম। ও দেখলাম অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে রঞ্জনবাবুর দিকে। কয়েক মুহূর্ত থেমে শারদ্বত বলল, “দেখতে পান তো? চোখগুলো ফাংশনাল?”

রঞ্জন মল্লিক বললেন, “আমি কিছু দেখিনি। আমি কিছু জানি না।”

এ তো মহা জ্বালা। টেপরেকর্ডারের মতো এক কথা বলে যাচ্ছে!

শারদ্বত বলল, “সুনন্দিতা চক্রবর্তীর বাড়ির ঠিকানাটা দিন। ওগুলো আপনিই হ্যান্ডেল করেন তো?”

রঞ্জনবাবু বললেন, “আমি কিছু...”

শারদ্বত ওঁকে কথা শেষ না করতে দিয়েই বলল, “জানেন না। বুঝে গেছি।” তারপর জোরে চেঁচিয়ে ডাকল, “নিমাইবাবু?”

একবার ডাকতেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে এলেন নিমাইবাবু।

এদিকে তখন বিছানার ওপর বসে রঞ্জন মল্লিক ক্রমাগত বলে চলেছেন, “আমি কিছু দেখিনি। আমি কিছু জানি না।”

এক কথা। বারবার। গলার আওয়াজ টা আস্তে আস্তে কমছে। স্পষ্ট কথাগুলো বিড়বিড় শোনাচ্ছে।

শারদ্বত বলল, “আপনাদের ম্যানেজার কি পাগল? এক কথা বারবার বলে যাচ্ছে।”

নিমাইবাবু এবার বললেন, “রঞ্জুদা? ও রঞ্জুদা? কী হল তোমার?”

ভদ্রলোক দেখলাম কোনও কথার উত্তর দিলেন না। শারদ্বত হঠাৎ করে বিছানা থেকে উঠে বলল, “নিমাইবাবু, ওঁর বোধহয় স্ট্রোক হচ্ছে। কিংবা মাথা ঘুরছে। ডাক্তার ডাকুন। আর আমাকে আমার অ্যাডভান্স ফিজটা আর সুনন্দিতা চক্রবর্তীর ঠিকানাটা পাঠিয়ে দেবেন।”

তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, “চলো অনিরুদ্ধ। একটু চিকেন রোল খেতে ইচ্ছে করছে হঠাৎ।”

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। এ ছেলে তো বদ্ধ পাগল! একজন বয়স্ক মানুষের শরীর খারাপ, সেখান থেকে এমনভাবে বেরিয়ে এল যেন কিছুই হয়নি। আবার তাদের সামনেই বলে চিকেন রোল খাবে। এর সঙ্গে থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব মনে হচ্ছে! এর চেয়ে আমার হোটেলের ঘরই ভালো।

মাঝে মাঝে এরকম হয় যে, ঠিক কী ঘটছে কেন ঘটছে বুঝতেই পারি না। যে ছেলেটাকে আজ আমি প্রথম দেখলাম, তার সঙ্গে এখন আমি দাঁড়িয়ে রয়েছি একটা রোল চাউমিনের দোকানের সামনে। কিন্তু কেন হঠাৎ আমার হোটেল থেকে এত দূরে রোল খেতে এলাম সেটাও বুঝছি না। এটা কি এই কেসের কোনও অঙ্গ? আর আমার ভূমিকাটা কী এই কেসে? আমার ওপর শারদ্বত এত সদয় হয়ে কেসের সঙ্গী করতে চাইছে কেন? আমি লিখি না লিখি, বাঁচি, মরি তাতে ওর কী এসে যায়?

“তোমার রোলে লংকা হবে?”

শারদ্বতর ডাকে ফিরে এলাম ইহজগতে। “হুঁ? কী?”

“চিকেন রোলে লংকা? খাবে?”

বললাম, “আরে ভাই, কেন এমনি এমনি চিকেন রোল খেতে যাব? তোমার মতলবটা কী একটু বলবে? হঠাৎ রাতদুপুরে এখানে কেন রোল খেতে এলাম আমরা?”

শারদ্বত দোকানের দিকে ফিরে বলল, “অল্প লংকা দিন”, তারপর আমায় বলল, “বলব বলব। সব বলব। কিছু খাবার আগে পেটে পড়ুক। তারপর।”

কথাটা শুনেই খেয়াল হল সত্যি বেশ খিদে পাচ্ছে। দুপুরের পর আর কিছু খাওয়া হয়নি। ইতিমধ্যে দুটো চিকেন রোল চলে এল আমাদের হাতে। শারদ্বত তাতে একটা কামড় দিয়ে বলল, “ওই যে উলটোদিকে দেখছ... ওটা তোমার দাদার থানা।”

আমি ভুরু কুঁচকে বললাম, “হ্যাঁ, তো? তাতে কী?”

শারদ্বত বলল, “অখিলেশ চন্দ্র সরকারকে এখনও কোর্টে হাজির করা হয়নি। কাল সম্ভবত হবে। সুতরাং উনি এখনও এই থানারই হোল্ডিং সেলে আছেন।”

- বেশ। তো? আমি কী করব তাতে?

- তুমি যেটা করবে সেটা হল থানায় গিয়ে সবাইকে একটু ডিসট্র্যাক্ট করবে। আর আমি সেই ফাঁকে ম্যাজিশিয়ান বাবুর কাছে গিয়ে যা জানার জেনে চলে আসব।

- অ্যাঁ? না না। আমি পারব না। দাদা জানলে...

- আরেহ, তোমার দাদা বাড়ি চলে গেছে। এখন থানায় নেই।

- সেটা তুমি কী করে জানলে?

- সে তোমার না জানলেও চলবে। তুমি কাজটা পারবে কি না বলো।

- কিন্তু আমি বলবটা কী? জয়ন্তদা থাকবে। আরও কনস্টেবল থাকবে কয়েকজন। ওদের ডিসট্র্যাক্ট করব কী করে?

শারদ্বত একটু ভেবে বলল, “এক কাজ করো। বলো তোমায় কেউ ফলো করছে! তুমি মাঝে মাঝে একটা অচেনা ছেলেকে দেখতে পাচ্ছ তোমার পিছনে। এটা নিয়ে কী করা উচিত সেটা জানতে চাও সবার কাছে।”

আমি বললাম, “দ্যাখো ব্যাপারটা একটু রিস্ক হয়ে যাবে। দাদা জানতে পারলে ভাগ্যে দুঃখ আছে।”

- কেউ জানবে না। তুমি আমায় দশ মিনিট দাও। তার মধ্যেই সব করে নেব আমি।

কেন যে রাজি হলাম জানি না। হয়তো এই রিস্ক নেওয়ার রোমাঞ্চটা উপভোগ করতে চেয়েছিলাম। চিকেন রোল শেষ করে এগিয়ে গেলাম থানার দিকে। সকালের সেই কনস্টেবল দেখলাম বাইরে দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে এখন আর কিছু বলল না। আমি বললাম, “আপনার নাম কী?”

কনস্টেবল বলল, “সুজয়।”

বললাম, “সুজয়দা, আপনি একটু জয়ন্তদাকে ডেকে দিন। আমি দাদার ঘরে বসছি।”

কনস্টেবলটি কিছু না বলে চলে গেল। আমি ভেতরে গিয়ে বসলাম দাদার ঘরে। দাদা নেই। সাতটায় বেরিয়ে গেছে বোধহয়। প্রায় দিনই ওই টাইমেই বাড়ি ফিরত আগে। এখন জানি না। বেশ কয়েকদিন হল আমি বাড়িতে নেই। রুটিন চেঞ্জ হতেও পারে।

জয়ন্তদা ঢুকল ঘরে। সঙ্গে সেই কনস্টেবল। “কী হয়েছে অনিরুদ্ধ?”

ঘড়ির দিকে দেখলাম। পৌনে আটটা। ঠিক দশ মিনিট নাটক করতে হবে আমাকে।

জয়ন্তদাকে বললাম, “বসুন না, বলছি।”

জয়ন্তদা কী বুঝল জানি না। বসে পড়ল পাশে রাখা চেয়ারে। বলল, “হ্যাঁ বলো।”

আমি গলা ঝেড়ে বললাম, “গত কয়েকদিন ধরেই আমাকে কেউ ফলো করছে। কে আমি জানি না। কিন্তু করছে।”

- মানে? কী বলছ? ছেলে না মেয়ে?

- জানি না। শীতকাল তো। গায়ে জ্যাকেট থাকে আর হুড দিয়ে রাখে মাথায়। যখন রাস্তায় ভিড় থাকে দেখতে পাই না। কিন্তু খালি হলেই বুঝতে পারি কেউ একজন হাঁটছে পিছনে।

- স্যারকে জানিয়েছ?

স্যার অর্থে আমার দাদা। বললাম, “না, জানাইনি। এমনিতেই আমি বাড়ি ছেড়ে একা থাকছি, এই নিয়ে দাদার খুব টেনশন। তার ওপর আর টেনশন বাড়াতে চাই না।”

জয়ন্তদা ঘাড় নাড়তে নাড়তে বলল, “হ্যাঁ, তা অবশ্য ঠিক।”

- কী করা যায় একটু বলবে?

- দাঁড়াও, আমি বরং একটা রিপোর্ট লিখে নি এটার। তারপর দেখছি কী করা যায়।

হঠাৎ বাইরে আওয়াজ শুনলাম একটা। কেউ একজন চেঁচিয়ে বলছে, “এগ রোল, চিকেন রোল, চাউমিন, মোগলাই, এদিকে এদিকে এদিকে।”

গলা শুনেই বুঝলাম। কাজ হয়ে গিয়েছে। উঠে পড়লাম চেয়ার থেকে। বললাম, “আজ থাক জয়ন্তদা। আজ আসি।”

জয়ন্তদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মানে? কী হল? রিপোর্ট লেখাবে না?”

আমি বললাম, “নাহ। থাক। আমার মনের ভুলও হতে পারে। শুধু শুধু ঝামেলা করে লাভ নেই। আসছি আমি।”

কথাটা বলেই জয়ন্তদাকে আর কিছু বলতে না দিয়েই বেরিয়ে এলাম ওই ঘর থেকে। পেছনে না তাকিয়েও পরিষ্কার বুঝতে পারলাম দু-জোড়া চোখ আমার দিকে একদৃষ্টিতে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।

ডিনার সেরে এসে হোটেলের ঘরে শুয়েছিলাম। ভাবছিলাম আজকের সারা দিনটা কেমন অদ্ভুত কাটল। সাধারণত আমার দিনগুলো বড্ড বোরিং হয়। সকালে উঠে বদ্ধ হোটেলের ঘরে বন্দি হয়ে থাকা। ইচ্ছে হলে কিছু লেখা। লেখাগুলোও ঠিক হচ্ছিল না শেষ কদিন। আসলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকেই কীভাবে যে সব চলবে সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতেই আর লেখা হচ্ছিল না। আজ সারাদিনের অভিজ্ঞতাগুলোর মধ্যে দিয়ে যেন একটা অদ্ভুত থ্রিল এল।

থানা থেকে বেরোনোর পর দেখলাম উলটোদিকে ফুটপাথে সেই রোলের দোকানের সামনে শারদ্বত দাঁড়িয়ে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কাজ হল?”

শারদ্বত বলল, “হুম, হল। চলো।”

- কী বললেন এ সি সরকার?

- প্রচণ্ড ইগো। বললেন, উনি যখন ঘরে মেকআপ তুলছিলেন তখন কেউ একজন ওঁর ঘরে ঢুকেছিল বাথরুম যাবে বলে। কিন্তু উনি খেয়াল করেননি খুব একটা। কারণ উনি নাকি তখন নেশা করছিলেন।

- কী নেশা?

- একটা নয় সম্ভবত।

- আর কী বললেন?

- আর বললেন যে উনি নির্দোষ। ওঁর রাইভ্যাল ওঁর দুর্নাম করার জন্য এসব করছে। কিন্তু তাতেও কেউ ওঁর কিস্যু করতে পারবে না।

- রাইভ্যাল মানে ওই জাদুকর জে.পি?

- ইয়েস। জাদুকর জটিলেশ্বর পান।

- পান?

- ইয়াপ!

- এরকমও পদবি হয় নাকি?

- হয় বইকি। পান, আলু, মুলো, সব হয়।

তারপর একটু থেমে আমায় বলল, “অনিরুদ্ধ তোমায় আজ আর আটকাব না। কাল দেখা হচ্ছে।”

তারপর আমাকে কিছু বলতে না দিয়েই চলে গেল উলটোদিকে। কোথায় দেখা হবে, কীভাবে দেখা হবে, কিচ্ছু জানি না। ওর কাছে তো আমার ফোন নাম্বারও নেই। ধুর ছাই! এই ছেলেটা একটা আস্ত পাগল।

রাত্রে শুয়ে শুয়ে এসবই ভাবছিলাম। হঠাৎ ওপরের ফ্লোর থেকে একটা আওয়াজ পেলাম। পা টিপে টিপে কেউ তাড়াতাড়ি হাঁটলে যেরকম আওয়াজ হয় সেরকম আওয়াজ খানিকটা। একটু মন দিয়ে শুনলাম। আওয়াজটা থামছে না। শীতকাল তো। তাই চারিদিক আরও বেশি নিস্তব্ধ। লেপটা সরিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। তারপর দরজা খুলে পা টিপে টিপে উঠে গেলাম ওপরের ফ্লোরে।

কেউ কোত্থাও নেই। বেশ ঠান্ডা ওপরটা। সকালে যে ঘরে গিয়েছিলাম সেই ঘর থেকে একটা ছোট্টো আলোর রেখা বেরিয়ে আসছে। দরজাটা অল্প করে খোলা। পা টিপে টিপে সেই দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। ভেতরে তিনজন কথা বলছে ফিসফিসিয়ে।

এমন সময় হঠাৎ পিছন থেকে কেউ একটা আমায় শক্ত করে ধরল। আমি ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারলাম না। আমি কোনও আওয়াজ করার আগেই আমার নাকের কাছে ধরা হল একটা রুমাল। সেই রুমালের গন্ধটা খুব মিষ্টি। খুউউব মিষ্টিইই। ক্লোরোফর্ম কি? আমার হাত-পাগুলো অবশ হয়ে যাচ্ছে। চোখটা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল।

যখন চোখ খুললাম তখন দেখলাম আমি হোটেলে নিজের বিছানায় শুয়ে রয়েছি। আমার ঘরের দরজা জানলা হাট করে খোলা। আর বিছানার ঠিক সামনে বসে আছেন ইন্সপেক্টর নীলাদ্রি সেন। আমার দাদা। ওকে দেখেই ধড়ফড় করে উঠে বসলাম বিছানায়। ও আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

নীরবতা ভাঙলাম আমিই। “তুই কখন এসেছিস?”

দাদা বলল, “ঘণ্টাখানেক আগে। কী হয়েছিল?”

আমি বললাম, “মানে? কীসের কী হবে?”

দাদা বলল, “তুই জানিস না আমি কীসের কথা বলছি?”

আমি বললাম, “না মানে কীসের?”

- শোন তোকে একটা কথা বলি। ক্রিমিনালদের চরিয়ে আমায় খেতে হয়। তাই তাদের আচার আচরণ অনেকটাই আমার জানা। তুই এখন একজন ক্রিমিনালের মতো আচরণ করছিস। লুকোনোর চেষ্টা করছিস সহজ একটা সত্যিকে।

মাথাটা ভারী হয়েছিল তখনও। কপালে হাত বোলাতে বোলাতে বললাম, “কী হয়েছে? কীসের কথা বলছিস একটু বলবি?”

দাদা এবার একটু জোরেই বলল, “কাল সন্ধেবেলা থানায় যেটা ঘটালি সেটা কি আমি জানতে পারব না ভেবেছিলি? ওই যে ছেলেটা? কী যেন নাম, শারদ্যুতি না কী একটা—

- শারদ্বত।

- হ্যাঁ। শারদ্বত। তুই শেষ পর্যন্ত ওর পাল্লায় পড়লি? মানুষ চিনলি না এতদিনেও? ও ছেলে তোকে এক হাতে কিনে আর-এক হাতে বেচে দেবে রে!

এসব শুনতে ভালো লাগছিল না। চা খেতে হবে। বললাম, “তুই যা এখন। ভালো লাগছে না।”

দাদা চেয়ার থেকে উঠে পড়ল। বলল, “এরকম করতে থাকলে তোর সঙ্গে কেউ থাকবে না। সবাই চলে যাবে আস্তে আস্তে। আর ওই শারদ্বত? ও তো দু-দিনের জন্য। আজ তোর দরকার আছে তাই তোকে ব্যবহার করছে। কাল যখন দরকারে লাগবে না তখন জাস্ট ছুড়ে ফেলে দেবে।”

আমি কিছু বলার আগেই করিডরে একটা খুব চেনা গলার আওয়াজ পেলাম।

“অনিরুদ্ধ রেডি হও। আজকেই...”

শারদ্বত কথাটা বলতে গিয়েও ঘরে ঢুকে দাদাকে দেখে থেমে গেল। তারপর বলল, “...বিরিয়ানি খাওয়াতে নিয়ে যাব।”

আমি ভুরু কুঁচকে তাকালাম ওর দিকে।

শারদ্বত দাদাকে বলল, “আরে কী খবর? ভাইয়ের খোঁজ নিতে এসেছেন?”

দাদা ঠান্ডা গলায় শারদ্বতকে বলল, “তুমি জানো তোমায় আমি এক্ষুনি অ্যারেস্ট করতে পারি?”

শারদ্বত হাতের ফোনে কী একটা করতে করতে বলল, “সে আপনি পারেন। কিন্তু তারপর আপনার বস আপনাকে ফোন করবেন আমায় ছেড়ে দেওয়ার জন্য।”

দাদা বলল, “ওহ, তাই নাকি? চলো তো দেখি!”

কথাটা বলে দাদা শারদ্বতর দিকে এগোতেই হঠাৎ ওর ফোনটা বেজে উঠল। দাদা এক মুহূর্ত ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই থেমে গেল। তারপর বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

আমি বললাম, “এটা কী হল?”

শারদ্বত বলল, “আরে তোমার দাদার বস, পুষ্পল রায়, আমার কাছ থেকে প্রায়শই অ্যাডভাইস চান কেস নিয়ে। ওঁকেই একটা টেক্সট করে দিলাম কথা বলতে বলতে!”

- উফ! তোমার তো অনেক লম্বা হাত!

- তা বটে। এই, তুমি হঠাৎ দরজার বাইরে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে কেন? তোমার কি মৃগী আছে নাকি?

- তোমাকে আবার এটা কে বলল?

- যে তোমার মৃগী রোগ আছে?

- নাহ! উফফ! এই যে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।

শারদ্বত বলল, “এই তো হোটেলের ম্যানেজার বললেন ঢোকার সময়।”

এরপর আমি শারদ্বতকে কাল রাত্রের পুরো ঘটনাটা বললাম। সব শুনে শারদ্বত বলল, “বুঝলাম। এই কেসের আর একটা অ্যাঙ্গেল বাকি আছে। মোটিভ। সেটা জানলেই সব সমাধান পাওয়া যাবে। চলো বেরোতে হবে।”

“কোথায় বেরোবে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

শারদ্বত বলল, “যার গেছে, তার কতটা গেছে দেখে আসি চলো।”

- মানে?

- মানে সুনন্দিতা চক্রবর্তীর হাজব্যান্ডের সঙ্গে একবার দেখা করে আসা যাক।

কথাটা বলেই শারদ্বত পকেট থেকে বের করল একটা ভাঁজ করা কাগজ।

জিজ্ঞেস করলাম, “ওটা কী?”

শারদ্বত বলল, “নিমাইবাবু যতজন সেদিন হলে ছিল তার লিস্টটা কাল পাঠিয়েছিলেন। সেটা থেকেই পার্সন অফ ইন্টারেস্টদের আমি আলাদা করেছি এই কাগজে।”

- সেরকম কজন আছে?

- আপাতত তিনজন। যাও যাও তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। বেশি দেরি করলে চলবে না।

আমি আর-কোনো কথা না বলে ঢুকে গেলাম বাথরুমে।

সুনন্দিতা চক্রবর্তীর বাড়ি টালিগঞ্জে। ট্যাক্সিতে যেতে যেতে শারদ্বতকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ওই ম্যানেজারবাবু কেমন আছেন?”

শারদ্বত বলল, “বেশ ভালোই আছেন। কিছুই হয়নি ওঁর।”

আমি বললাম, “আর কাল রাতে যেটা আমার সঙ্গে ঘটল সেটা নিয়ে কী মনে হয় তোমার? আমার তো মনে হচ্ছে ওই নিমাইবাবুটাই ওরকম করেছে। কিছু একট ব্যাপার তো আছেই। এমনি এমনি পকেটে ক্লোরোফর্ম নিয়ে ঘুরবে নাকি লোকজন?”

শারদ্বত বলল, “সব জানা যাবে। আগে সব দিকটা ভালোভাবে বুঝে নিতে দাও।”

বেল বাজানোর পর একটা কাজের মেয়ে এসে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দিল। জিজ্ঞেস করল, “কাকে চাই?”

শারদ্বত বলল, “নিশীথ বাবু আছেন?”

সুনন্দিতা চক্রবর্তীর স্বামীর নাম তাহলে নিশীথ। এটা জানা ছিল না। শারদ্বত সম্ভবত ওই লিস্ট থেকে জেনেছে।

মেয়েটি বলল, “হ্যাঁ। দাঁড়ান ডেকে দিচ্ছি।”

একটু পর এলেন ভদ্রলোক। লম্বা, গায়ের রং একটু চাপা। বয়স ওই চল্লিশের কাছাকাছি হবে। শারদ্বত বলল, “ভেতরে আসতে পারি?”

ভদ্রলোক একটু সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কে আপনারা?”

শারদ্বত বলল, “আপনার স্ত্রী সুনন্দিতা চক্রবর্তী মিসিং তো? আমরা ওটা নিয়েই কিছু প্রশ্ন করতে চাই আপনাকে।”

“আপনারা পুলিশ?” ভদ্রলোকের আবার প্রশ্ন।

শারদ্বত বলল, “নাহ। এই অনিরুদ্ধ হল গিয়ে পুলিশের ভাই। আর আমি হলাম ভাইয়ের বন্ধু।”

“দেখুন আমি তো পুলিশকে যা বলার বলেছি।”

শারদ্বত বলল, “আপনি কি আপনার বউকে ফেরত চান?”

নিশীথবাবু একটু রেগে গিয়ে বললেন, “এ আবার কী প্রশ্ন? অবশ্যই চাই।”

“গুড। তাহলে পুলিশকে যা যা বলেছেন ভুলে যান। আমাদের প্রশ্নের উত্তরগুলো দিন।”

ভদ্রলোক এরপর ভেতরে ডেকে বসতে বললেন আমাদের। আমি বসলাম সোফায়। শারদ্বত ঘরের এদিক-ওদিক ঘুরতে লাগল। নিশীথবাবু বললেন, “বলুন এবার কী প্রশ্ন আছে আপনাদের।”

শারদ্বত বলল, “আপনার সঙ্গে আপনার স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন?”

- ভালোই।

- শুধু ভালো? খুব ভালো নয়?

- না মানে... ভালো মানে ভালোই। কোনও সমস্যা নেই।

- আপনাদের কোনও ছেলে মেয়ে নেই?

- না। নেই।

- সেদিন কখন গিয়েছিলেন আপনারা হলে?

- আমরা গিয়েছিলাম সাতটার দিকে।

- আর শো কটায় শেষ হয়?

- সাড়ে নটার দিকে।

“আচ্ছা ওঁর ফোনটা একবার দেখা যায়?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।

প্রশ্নটা করেই শারদ্বতর দিকে তাকালাম। ঠোঁটের কোনায় হাসি। আমি কেসটাতে আগ্রহ পেয়েছি দেখে বোধহয় হাসছে।

নিশীথবাবু বললেন, “হ্যাঁ, দাঁড়ান দিচ্ছি।”

পাশের ঘর থেকে ভদ্রলোক ফোনটা নিয়ে এসে শারদ্বতর হাতে দিলেন।

“উনি সেদিন হলে ফোন না নিয়ে গিয়েছিলেন?” শারদ্বত জিজ্ঞেস করল।

- হ্যাঁ। ভুলে গিয়েছিল। আর তা ছাড়া আমি তো সঙ্গে ছিলামই। সেইজন্যেই দরকারও হয় না সবসময়।

এমন সময় কাজের মেয়েটি বলল, “আমি আসছি বাবু।”

নিশীথবাবু বললেন, “হ্যাঁ যাও। বিকেলে আসতে হবে না আজ আর। কাল চলে আসবে।”

শারদ্বতও এবার বলল, “ঠিক আছে নিশীথবাবু, আমরাও আসি। আপনার স্ত্রীর ফোনটা নিয়ে গেলাম। কিছু জানাতে পারলে আপনাকে ফোন করে নেব।”

ভদ্রলোক এবার অবাক হয়ে বললেন, “আপনার ফিজটা?”

শারদ্বত বলল, “আপনি তো আমাকে হায়ার করেননি। অন্য একজন করেছেন। আমার ফিজ তিনিই দিয়ে দেবেন। চলি।”

কথাটা বলেই একরকম তাড়াহুড়ো করেই আমরা বেরিয়ে এলাম টালিগঞ্জের ওই ফ্ল্যাট থেকে। আমি বললাম, “কী হল? তুমি আর কিছু প্রশ্ন করলে না?”

শারদ্বত বলল, “ওঁর কাছ থেকে আর তেমন কিছু জানা যাবে না।”

- তাহলে কার কাছ থেকে জানা যাবে?

- ওই তো। সামনে তাকাও।

কথাটা বলার পরেই সামনে তাকিয়ে দেখলাম। শারদ্বত ইঙ্গিত করেছে বাড়ির কাজের মেয়েটির দিকে। যে এখন আমাদের ঠিক সামনে সামনে হাঁটছে।

“দিদি?” শারদ্বত ডাকল।

ফিরে তাকাল মহিলা। চোখে একটু ভয় কি?

শারদ্বত বলল, “আপনাকে দেখে মনে হল আপনি কিছু জিনিস জানেন। যেগুলো আমরা জানি না।”

মহিলা সঙ্গে সঙ্গে বলল, “না না। আমি কিছু জানি না।”

শারদ্বত বলল, “তাহলে যেদিন থেকে সুনন্দিতা দেবীকে পাওয়া যাচ্ছে না, সেদিন সকালে আপনি কিছু দেখেননি বলছেন তো? পুলিশ এরপর এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে আসবে। তখন কিন্তু ওরা দুবার জিজ্ঞেস করবে না।”

এই রে! সেদিন সকালে আবার কী হল? শারদ্বত মাঝে মাঝেই এমন সব কথা বলে, যেগুলো শুনে মনে হয় আমি যখন ওর সঙ্গে থাকি তখন কি নেশা করে থাকি? কত কিছু বলে দেয় যেগুলো আমি জানিই না।

মহিলা কয়েক মুহূর্ত একটু ভাবলেন। তারপর আমাদের বললেন, “বউদি যদি মরে গিয়েও থাকে, তাহলেও ভালো থাকবে। ওই পশুটার সঙ্গে থাকার চেয়ে না থাকা অনেক ভালো।”

ফেরার সময় একটা ওলা ক্যাব বুক করল শারদ্বত। কোথায় লোকেশন দিয়েছে জানি না। ড্রাইভারও দেখলাম তেমন কিছু জিজ্ঞেস করল না। গাড়িতে উঠে একদৃষ্টিতে জানলার দিকে তাকিয়ে কী একটা যেন ভাবছিল শারদ্বত। বললাম, “কী বুঝছ?”

কোনও উত্তর নেই। একটু পর আবার জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কী করে জানলে যেদিন উনি মিসিং হন সেদিন সকালে কাজের মেয়ের সামনে কিছু হয়েছে?”

আবার কোনও উত্তর নেই। আমি আর কিছু বললাম না। বুঝে গেলাম এই সময়গুলোতে চুপ করে থাকাটাই শ্রেয়।

মেয়েটি যে কথাগুলো বলছিল সেগুলো যদি সত্যি হয়, তাহলে সাসপেক্ট লিস্টে আরও একজন লোক বাড়ল। মেয়েটি বলল, “ওই পশুটার সঙ্গে থাকার চেয়ে না থাকা অনেক ভালো।”

শারদ্বত জিজ্ঞেস করেছিল, “কেন? উনি কি অত্যাচার করেন স্ত্রীর ওপর?”

“সবসময়”, মেয়েটি বলল, “সবসময় মারে। মদ গিলে বাড়ি আসে আর বউকে মারে। আশেপাশের ফ্ল্যাটের সবাই জানে সেটা। বউদির চিৎকার রাস্তা অবধি শোনা যায়।”

- বউদি পুলিশে জানাননি কেন?

- তা জানি না বাপু। এসব পুলিশে বলে কী হবে? তবে বউদি ওর বাড়িতে জানিয়েছিল। বাড়ির লোক বলেছিল কিছু করতে পারবে না।

- কে বলল এটা তোমায়?

- বউদি একদিন বলে ফেলেছিল।

“ওঁর বাড়িতে আর কে কে আছে জানো?” এবার প্রশ্ন করলাম আমি।

মেয়েটি বলল, “বাবা মা বেঁচে নেই জানি। আর কে থাকে জানি না।”

শারদ্বত বলল, “এই যে স্ত্রীর ওপর অত্যাচারের ব্যাপারটা, তুমি কোর্টে বলতে পারবে?”

মেয়েটি এবার বলল, “না বাবু। আমি কাজ করে খাই। আমি এসব করতে পারব না। আপনি ফ্ল্যাটের অন্য লোকদের বলুন। ওরাও সব জানে।”

যত সময় যাচ্ছে কেসটা বড্ড জটিল হয়ে যাচ্ছে। খেই হারিয়ে যাচ্ছে। কাকে ছেড়ে কাকে ধরবে শারদ্বত? কাল রাত্রে ওই ফ্ল্যাটের ঘরে কারা ছিল? নিমাইবাবু, ম্যানেজারবাবু আর শ্রদ্ধা, তিনজনেই কি কালপ্রিট? সবটাই কি প্ল্যান করে করেছে ওরা? নাকি ওই আর-একজন রাইভ্যাল জটিলেশ্বর পানের কীর্তি এটা?

“অত ভেবো না। চলো নামো।” শারদ্বতর কথার পরেই দেখলাম একটা অচেনা বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থেমেছে ওলা।

গাড়ি থেকে নামার পর জিজ্ঞেস করলাম, “এটা কোথায় এলাম? ওই রাইভ্যালের বাড়ি?”

শারদ্বত হেসে বলল, “চলো দেখতে পাবে। ফার্স্ট ফ্লোরে। এক মিনিট। একটা ফোন করে নি দাঁড়াও।” কথাটা বলে শারদ্বত কাকে যেন একটা ফোন করল। আমি উঠে গেলাম ফার্স্ট ফ্লোরে। শারদ্বত এসে পকেট থেকে চাবি বের করে বলল, “This is Casa de Sharadwato.”

আমি বললাম, “তাই? তোমার কেনা ফ্ল্যাট?”

শারদ্বত বলল, “না ভাই। অত টাকা নেই। ভাড়া নেওয়া। এটার জন্যেই রুমমেট খুঁজছিলাম। দ্য অফার ইজ স্টিল ওপন।”

আমি বললাম, “সে পরে হবে। তুমি প্লিজ আমায় একটু হেল্প করো ভাবতে। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।”

শারদ্বত ঘরে ঢুকে সোফায় বসল। তারপর আমায় পাশের চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “বোসো। বলছি।”

আজ সকাল থেকে শারদ্বতকে একটাও সিগারেট খেতে দেখিনি। এখন পকেট থেকে প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরিয়ে সুখটান দিয়ে বলল, “একদম গোড়া থেকেই শুরু করি। নাকি?”

“কেস কি পুরো সলভড?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

শারদ্বত বলল, “৯৯.৯৯ শতাংশ। এখন শুধু কালপ্রিটের ধরা দেওয়ার অপেক্ষা।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “মানে? আমাদের ধরতে যেতে হবে না? সে নিজেই ধরা দেবে?”

শারদ্বত বলল, “দেবে তো। তবে এই গল্পে দুজন কালপ্রিট আছে। একজনের দোষ লঘু। আর-একজনের দোষ একটু বেশি।”

“আরে ধুর ছাই!” আমি এবার খেঁকিয়ে উঠলাম, “শুরু থেকে একটু বলো দিকি। সবটা ঘেঁটে আছে আমার।”

শারদ্বত বলল, “প্রথমেই আসা যাক সুনন্দিতা চক্রবর্তীর কথায়। ভদ্রমহিলা রোজ রাত্রে স্বামীর হাতে মার খান। এবং সবটা মুখ বুজে সহ্য করেন। বাড়িতে সব জানানো সত্ত্বেও কোনও লাভ হয়নি। কারণ ওঁর নিজের বাবা-মা বেঁচে নেই। যে বা যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা ওঁর ভালো মন্দ নিয়ে খুব একটা কনসার্নড নন।”

“এইভাবেই সবটা চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একজনের সঙ্গে সুনন্দিতা দেবীর যোগাযোগ হয়। এবং সেই মানুষটা ঠিক করে, সুনন্দিতা দেবীকে যেভাবেই হোক এই নরক থেকে মুক্তি দিতে হবে।”

“কে? কে সেই মানুষ?” আমি বলে উঠলাম।

শারদ্বত বলল, “সে কথায় আসছি। তার আগে বলো, নিশীথবাবু, মানে সুনন্দিতা দেবীর বাড়িতে তুমি হঠাৎ কেন সুনন্দিতা দেবীর ফোনটা চাইলে? মানে সেদিন যদি সুনন্দিতা দেবী ম্যাজিক শো দেখতে গিয়ে মিসিং হয়ে থাকেন, ওঁর ফোনটাও তো ওঁর সঙ্গে মিসিং হওয়ার কথা। তা তুমি হঠাৎ ফোনটা দেখতে চাইলে কেন?”

আমি বললাম, “আমার মনে হল ফোনটা সঙ্গে থাকলে তো ভদ্রমহিলাকে ট্রেস করা যেত। কাজেই সেটা বাড়িতে থাকতে পারে হয়তো।”

শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ। এই যুক্তিটা হয়তো টিকে যেত। যদি না ওই অডিয়েন্স লিস্টে অনিরুদ্ধ সেনের নাম না পাওয়া যেত।”

আমি বললাম, “হ্যাঁ। আমি দেখতে গিয়েছিলাম এ সি সরকারের শো। তাতে কী প্রমাণ হয়?”

“আরে তাতে কিচ্ছু প্রমাণ হয় না। তুমি রেগে যাচ্ছ কেন? তবে তোমার আগেই বলা উচিত ছিল আমাকে এটা।”

আমি বললাম, “বলতাম হয়তো। কিন্তু তাহলে এই কেসটা এত কাছ থেকে দেখতে তো তুমি আমায় দিতে না। আমি সাসপেক্ট লিস্টে চলে যেতাম। সেইজন্যেই বলিনি।”

- বেশ। বুঝলাম। এবার বলো তো তুমি ঠিক কী দেখেছ?

- দ্যাখো, স্টেজের ব্যাপার আমি আর পাঁচজন যা দেখেছে সেটাই দেখেছি। কিন্তু আমি আর-একটা জিনিস দেখেছি। হলে ঢোকার সময়েই সুনন্দিতা চক্রবর্তীকে ওঁর স্বামী জিজ্ঞেস করেন ফোনের কথা। উনি বলেন যে উনি আনতে ভুলে গিয়েছেন ফোন। এই কথাটা শোনার পরেই সবার সামনে উনি থাপ্পড় মারেন নিজের স্ত্রীকে।

শারদ্বত বলল, “ভদ্রলোক তো সাক্ষাৎ যমদূত হে।”

- হুম। তারপর দেখলাম ভাগ্যক্রমে ওই মহিলাকেই আবার স্টেজে ডাকা হল।

- বেশ। আর কিছু?

একটু ভেবে বললাম, “নাহ। আর কিচ্ছু না।”

শারদ্বত বলল, “আচ্ছা। তাহলে কাজের মেয়েটি ভুল কিছু বলেনি।”

আমি বললাম, “আচ্ছা, তাহলে এই মানুষটি কে? আর এর মোটিভ কী? কীভাবেই বা সে সাহায্য করল সুনন্দিতা দেবীকে?”

- এই মানুষটি দুর্দান্ত অভিনয় করেন। আমাকেও বোকা বানিয়েই ফেলেছিলেন প্রায়। তবে ওই আর কি। পারেননি।

এমন সময় বেলটা বেজে উঠল ফ্ল্যাটের। কালপ্রিট কি এসে গেল তাহলে?

শারদ্বত আমাকে দরজার দিকে ইঙ্গিত করল। তারপর বলল, “এঁর আবার বাংলাটা ঠিক আসে না। কিন্তু হাতের ছোট্টো ট্যাটুটা বাংলা হরফেই লেখা একটি শব্দ— দিদি।”

কথাটা বলার পরেই দরজা খুললাম। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে জাদুকর এ.সি. সরকারের সুন্দরী অ্যাসিস্ট্যান্ট, শ্রদ্ধা!

স্পষ্ট বাংলায় সে আমাদের জিজ্ঞেস করল, “ভেতরে আসব?”

সুনন্দিতার কথা

অনেকক্ষণ থেকেই কেমন একটা ভয় ভয় লাগছিল সুনন্দিতার। ও এখনও ভাবছে, ও যেটা করতে চাইছে সেটা কি আদৌ সম্ভব? নিশীথ ওর ঠিক পাশেই বসেছে। বাঁদিকে। হঠাৎ নিজের বাঁদিকের গালে একটা তীব্র ব্যথা অনুভব করল ও। একটু আগে নিশীথের থাপ্পড়টার ব্যথা। সঙ্গে সঙ্গে নিজের মনকে শক্ত করল সুনন্দিতা। অনেক হয়েছে। আর এ নরকে থাকতে পারবে না। বিয়ের পর থেকে সহ্য করছে ও এসব।

মা-বাবা মারা যাওয়ার পর টাকার লোভে একজন দশ বছরের বড়ো লোকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয় ওর জেঠু জেঠিমা। ওর একটা বোন ছিল। অনিন্দিতা। ও জানত যে, একবার যদি ওর বিয়ে হয়, তারপরেই ওর বোনের পালা। মায়ের দুটো সোনার বালা বোনের হাতে দিয়ে ও বলেছিল পালিয়ে যেতে। সে প্রথমটা রাজি হয়নি। সুনন্দিতা জোর করে ওকে পাঠিয়ে দেয়। এই নরকযন্ত্রণা ভোগ করার থেকে নিজে বাঁচুক। তাতে যদি আধপেটা খেতে হয় তাও ভালো।

“কী হল তোমার, ঘামছ কেন?” নিশীথের ডাকে চিন্তার তার কাটল ওর।

সত্যিই তো! এই এসিতেও ও ঘামছে দরদর করে। সালোয়ারের ওড়না দিয়ে ঘামটা মুছে নিল ও। তারপর বলল, “কী জানি। খুব গরম আজকে।”

নিশীথ কিছু বলল না। নিশীথ সাধারণত কম কথাই বলে। বিয়ের পরেই ও বুঝেছিল সেটা। কথা কম বলে আর হাত চলে বেশি। রোজ রাতে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরত। তারপর চলত অত্যাচার। বিয়ের বছরখানেকের মধ্যেই ডাক্তার জানায় সুনন্দিতা মা হতে পারবে না কখনও। ও নাকি ফার্টাইল নয়। এরপর থেকেই অত্যাচারের পারদ আরও বাড়তে থাকে।

দিনকয়েক আগেই হঠাৎ একটা অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ ঢোকে সুনন্দিতার ফোনে।

“কেমন আছিস তুই?”

নিশীথ তখন ঘুমোচ্ছে মদের ঘোরে। সুনন্দিতা জিজ্ঞেস করে, “হু’জ দিস?”

রিপ্লাই আসে, “আমি অনিন্দিতা রে। তোর বোন। চিনতে পারছিস না?”

প্রায় চার বছর বোনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না ওর। নিজের মনকে বুঝিয়েছিল ও। যেখানে আছে সেখানে নিশ্চয় যোগাযোগের কোনও উপায় নেই।

এতদিন পর বোনের মেসেজ পেয়ে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। কাঁদতে কাঁদতে সব বলে ফ্যালে ও অনিন্দিতাকে। অনিন্দিতা এখন এক বিখ্যাত জাদুকরের অ্যাসিস্ট্যান্ট। ভালোই মাইনে পায়। অডিয়েন্স লিস্টে সুনন্দিতার নাম এবং আধার কার্ডের ছবি দেখেই ও চিনতে পারে দিদিকে।

দিদির কথা শুনে ও সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যান করে ফ্যালে। দিদিকে এই অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে হবে। তার জন্য যা দরকার ও করবে। সুনন্দিতাও বারণ করেনি। আর এই জীবনটা নিতে পারছিল না ও। ও এবার একটু বাঁচতে চায়।

হলের মধ্যে প্রচণ্ড চিৎকার শুরু হয়েছে। জাদুকর তখন বলছে, “… তবে যাওয়ার আগে আরও একবার আপনাদের মোহিত করার জন্য আমার সেরা খেলা দেখানোর সময় হয়ে গিয়েছে।”

সুনন্দিতার বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটানো শুরু হয়েছে। এবার ওকে ডাকা হবে স্টেজে। এবার ওকে যেতে হবে। এতগুলো মানুষের সামনে। সবার সামনে থেকে উধাও হয়ে যাবে ও।

একটু পরেই H-16 এর সিট নাম্বারকে ডাকা হল স্টেজে। সিট থেকে উঠে আস্তে আস্তে স্টেজের দিকে এগোচ্ছিল ও। ভয় হচ্ছিল ও পারবে কি না এটা ভেবে। পরক্ষণেই একবার পিছনে নিশীথের দিকে তাকাল ও। দৃষ্টি স্থির। সুনন্দিতা বুঝতে পারল স্টেজ থেকে ও যদি ফেরত আসে নিশীথের কাছে তাহলে...

আর ভাবতে পারল না ও। গতি বাড়িয়ে উঠে গেল স্টেজে। পুরো ব্যাপারটাই ঘটল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে। ও ওই বক্সে ঢুকল। বক্সের নিচটা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল নিচে। একটা বাচ্চা উঠে গেল ওপরে। তারপর শো শেষ হওয়ার আগেই বেরিয়ে গেল হলের পিছন দিক দিয়ে। যাওয়ার আগে অনিন্দিতার ইন্সট্রাকশন অনুযায়ী বেঁটেমতো লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, “আমি কি এখানেই অপেক্ষা করব?”

লোকটি বলল, “না না। আপনি বাইরে অপেক্ষা করুন।”

এরপর সুনন্দিতা বেরিয়ে গেল হল থেকে। ততক্ষণে জাদুকরের খেলা শেষ হয়েছে। খুব জোরে হাততালি পড়ছে। হলের ঠিক বাইরেই হেডলাইট নিভিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল একটা অ্যাম্বাসাডার। সুনন্দিতাকে দেখেই পিছনের দরজাটা খুলে দিল ড্রাইভার। সুনন্দিতা গিয়ে বসল গাড়ির ভেতর। আহ! মুক্তি!

১০

অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন পরে, যে, এই আধপাগলা ছেলেটার সঙ্গে থাকতে আমার অসুবিধে হয় না? অনেকে বলে, আমিই কেন থাকি এই ছেলেটার সঙ্গে রুমমেট হিসেবে। মাঝে মাঝে ভাবি, আমি কখন ঠিক করলাম যে আমি শারদ্বতর সঙ্গে থাকব? কারণ এখনও অবধি তো আমার মনে হচ্ছিল, এই ছেলেটার সঙ্গে থাকার চেয়ে আমার হোটেলের রুম ভালো। যাই হোক, সেই কথায় পরে আসছি। তার আগে বলি দরজা খোলার পর কী হল।

দরজা খোলার পর শ্রদ্ধা বলল, “ভেতরে আসতে পারি?”

শারদ্বত বলল, “আসুন, অনিন্দিতা দেবী। বসুন।”

অনিন্দিতা মানে? কে অনিন্দিতা? এর নাম তো শ্রদ্ধা! আরে ধুর ছাই। আমার মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। কী হচ্ছেটা কী? শ্রদ্ধা (নাকি অনিন্দিতা বলব?) ঘরে ঢোকার পর আমি দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। এই অবস্থায় কী করা উচিত কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমাদের এই কেসের কালপ্রিট তাহলে এই মহিলা। কিন্তু কেন? কী উদ্দেশ্য ওঁর? উনি হঠাৎ সুনন্দিতা দেবীকে সাহায্য করতে গেলেন কেন? কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।

শারদ্বত বলল, “আলাপ করিয়ে দিই অনিরুদ্ধ। ইনি হলেন আমাদের সুনন্দিতা দেবীর বোন অনিন্দিতা... বোস তো... তাই না?”

শ্রদ্ধা বলল, “হ্যাঁ। বোস। দিদির বিয়ের পর চক্রবর্তী পদবি হয়।”

এবার পুরো ব্যাপারটা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছিল। দিদিকে বাঁচানোর জন্যই তাহলে এত কিছু। অর্থাৎ সুনন্দিতা দেবী মিসিং হননি।

শারদ্বত বলল, “একটু শুরু থেকে বলবেন নাকি? অনিরুদ্ধ অনেকটাই আন্দাজ করতে পারেনি এখনও।”

আমি সত্যিই পারিনি। অনেকটাই তখন ধোঁয়াশার মতো লাগছিল। অনিন্দিতা দেবী এরপর সুনন্দিতা দেবীর কথা, ওঁর ওপর নিশীথবাবুর অত্যাচারের কথা, সব বলে গেলেন গড়গড় করে এবং স্পষ্ট বাংলায়। তারপর বললেন কীভাবে দিদিকে নিয়ে পালানোর প্ল্যান করেছিলেন উনি। এও বললেন, কীভাবে বাড়ি থেকে পালিয়ে অন্য নামে নিজের একটা অন্য জীবন তৈরি করেছিলেন শুধুমাত্র মায়ের দুটো বালাকে সম্বল করে।

আমি বললাম, “সবই তো বুঝলাম, কিন্তু ওই এ সি সরকার যে তোমাকে বললেন, ওঁর ঘরে কাকে একটা ঢুকতে দেখেছেন। কিন্তু সুনন্দিতা দেবী তো অপেক্ষাই করেননি শো শেষ হওয়া অবধি।”

অনিন্দিতা দেবী বললেন, “ওটা আমি ছিলাম। স্যার নেশার ঘোরে অত বুঝতে পারবেন না আমি জানতাম।”

“সেইজন্যেই ডিটেকটিভকে কনফিউজ করে দেওয়ার জন্য এই ঘটনাটা সুনন্দিতা দেবীর নাম দিয়ে চালালেন।” শারদ্বত বলল।

অনিন্দিতা দেবী কিছু বললেন না। মাথা নিচু করে বসে রইলেন। আমি বললাম, “আচ্ছা উনি এখন হঠাৎ আমাদের ফ্ল্যাটে কেন এলেন?”

শারদ্বত বলল, “যখন তুমি আমার ফ্ল্যাটের দোতলায় উঠছিলে, তখনই ফোন করি ওঁকে। নাম্বার নিমাইবাবুর থেকে নেওয়াই ছিল। ফোন করে আসতে বললাম। এবং ফোনে ওঁর আসল নাম ধরেই সম্বোধন করায় উনি বুঝে যান যে আমি সবটা জানি।”

অনিন্দিতা দেবী এবার মাথা তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “কখন বুঝলেন আমিই করেছি কাজটা?”

শারদ্বত বলল, “যখন প্রথমবার প্রশ্ন করার পর আপনি অবাঙালি হওয়ার অভিনয় করলেন। অথচ আপনার ডান হাতের শিরার কাছে ছোট্টো একটা ট্যাটু দেখলাম আমি। তাতে বাংলা হরফে লেখা দিদি। সেই কারণেই জিজ্ঞেস করলাম আপনাকে, আপনি বাংলা লিখতে বা পড়তে জানেন কি না। আপনি বললেন, না। খটকাটা তখন থেকেই রয়ে গেছিল।”

“তারপর তো রাত্রে ওপরের ঘরে দেখলাম সুনন্দিতা দেবীকে আর আপনাকে। সঙ্গে আর-একজন ছিলেন। উনিও খুব দুর্দান্ত অভিনেতা সন্দেহ নেই। আমি কিছু জানি না, আমি কিছু দেখিনি বলে কী অসাধারণ নাটকটাই না করলেন!”

“ম্যানেজারবাবু!” আমার মুখ থেকে অস্ফুট শব্দ বেরোল।

“ইয়েস স্যার। ম্যানেজারবাবু। উনিই তো আপনাকে সাহায্য করেন সবটাতে। তাই না?”

অনিন্দিতা দেবী ঘাড় নাড়লেন।

আমি বললাম, “এক সেকেন্ড। সেদিন রাত্রে মানে? সেদিন তো আমিও ওপরের ঘরে নজর রাখছিলাম। তুমি কোথায় ছিলে? আর আমাকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞানই বা করল কে?”

শারদ্বত বলল, “উম.. ওটা ভায়া আমার ডিপার্টমেন্ট। তুমি গর্দভের মতো ঘরের খুব কাছে চলে গিয়েছিলে। তোমাকে দেখলেই সবটা ঘেঁটে যেত। তাই ওই ব্যবস্থা।”

আমি চোখ বড়ো বড়ো করে বললাম, “তুমি? তুমি আমাকে অজ্ঞান করেছিলে ক্লোরোফর্ম দিয়ে?”

শারদ্বত কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, “সরি অনিরুদ্ধ। ইট ওয়াজ নাথিং পার্সোনাল।”

আমার মাথা খুব গরম হয়ে গেল। এই ছেলেটার সঙ্গে কিনা আমি থাকব ভাবছিলাম! এ ব্যাটা তো চাইলে জলেও আগুন ধরিয়ে দিতে পারে। আর কে পকেটে করে ক্লোরোফর্ম নিয়ে ঘোরে?

“আপনি যদি কাল রাত থেকেই সব জানেন, তাহলে আজ আমাকে এত দেরিতে ফোন করলেন কেন? আগে পুলিশকে জানিয়ে দিলেন না কেন?” অনিন্দিতা এবার জিজ্ঞেস করল।

শারদ্বত বলল, “আমি কাল জেনে গিয়েছিলাম কাজটা কে করেছে। কিন্তু কেন করেছে সেটা জানতাম না। সেইজন্যেই আজ সকালে নিশীথবাবু, মানে সুনন্দিতা দেবীর স্বামীর বাড়ি গিয়েছিলাম। অনিরুদ্ধ সুনন্দিতা দেবীর ফোন চাওয়াতে ব্যাপারটা আরও সহজ হয়ে গেল। ওই মেসেজেই আপনার ছবি দেখলাম হোয়াটসঅ্যাপে। আর আপনাদের মেসেজের কথাবার্তা দেখার পরেই সবটা আরও ক্লিয়ার হয়ে গেল। ফোনটা তো উনি ইচ্ছে করে ফেলে গিয়েছিলেন। তাই না?”

অনিন্দিতা ঘাড় নাড়ল, তারপর বলল, “কারণ ফোন থাকলে ওকে ট্রেস করা যেত।”

শারদ্বত বলল, “সবই তো বুঝলাম অনিন্দিতা দেবী। কিন্তু আপনাদের এই প্ল্যানের জন্যে একজন নিরপরাধ মানুষ যে এখন জেলে। সেই ব্যাপারটা ভেবে দেখেছেন?”

অনিন্দিতা দেবী বললেন, “আমি জানি। কিন্তু আমি জানি না আমার কী করা উচিত। আপনি চাইলে পুলিশ ডেকে আমায় ধরিয়ে দিতে পারেন। শুধু আমার দিদিকে খোঁজার চেষ্টা করবেন না। ওকে একটু বাঁচতে দিন।”

শারদ্বত ল্যাপটপ স্ক্রিনটা একবার দেখে নিয়ে বলল, “খোঁজার কী আছে? আপনার দিদি এখন ঝাড়গ্রামে আছেন। আপনার মামাবাড়িতে।”

আমি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি শারদ্বতর দিকে। অনিন্দিতা দেবীও দেখলাম কিছু বুঝতে না পেরে থ! “কিন্তু আপনি... আপনি এটা... আমি তো দিদিকে মেসেজ...”

শারদ্বত বলল, “হ্যাঁ। মেসেজ আপনি দিদিকে ডিলিট করতে বলেছিলেন জানি। আপনার দিদি আপনার কথাও শুনেওছিলেন। কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ ডেটাবেস বলে একটা জিনিস হয়। ব্যাকআপ ফোল্ডার-এর মধ্যে থাকে সেটা। ওখানে মেসেজগুলো এনক্রিপ্টেড ফর্ম্যাটে স্টোরড থাকে। সেগুলো ডিক্রিপ্ট করতে বসিয়েছিলাম ল্যাপটপে। বাড়িতে ঢোকার পরেই। ওখানেই পেলাম সব ইনফো।”

অনিন্দিতা মাথা নিচু করে বসেছিল। চোখের কোণে জল স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমার খুব খারাপ লাগছিল ওর জন্যে। এত চেষ্টা করেও দিদিকে বাঁচাতে পারল না। আবার ওই নরপিশাচটার কাছে ফিরে যেতে হবে ওঁকে। জাদুকর অখিলেশ সরকারকে বাঁচানোর আর-কোনো উপায়ও তো নেই।

শারদ্বত বলল, “নিশীথবাবু যে আপনার দিদির ওপর অত্যাচার করতেন, এটা তো প্রায় সবাই জানে। ফ্ল্যাটের লোকজনও জানে শুনলাম। আর কাজের মেয়ে তো জানেই। কাজেই এটা প্রমাণ করা খুব কঠিন হবে না যে আপনার দিদি নিজের ইচ্ছেয় বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছেন। উনি একজন প্রাপ্তবয়স্কা মহিলা। ওঁর সে অধিকারও আছে।”

অনিন্দিতা এবার অবাক হয়ে বলল, “সো, আপনি কী বলছেন?”

শারদ্বত বলল, “আমি বলছি যে এ.সি. সরকারকে জেল থেকে বের করার বিকল্প উপায়ও আছে। সেটা আমি করবই। কাজেই আপনার দিদি ঝাড়গ্রামে থাকুক বা ঝাড়খণ্ডে, তাতে আমার খুব একটা যায় আসবে না।”

অনেক মানুষ আমায় জিজ্ঞেস করে, শারদ্বত হাজরার সঙ্গে আমি থাকব এটা আমি কখন ঠিক করলাম? তাদের আমি ঠিকমতো উত্তর দিতে পারি না, তার কারণ এই মুহূর্তটা মুখে বলে বা লিখে বোঝানো সম্ভব না আমার পক্ষে। অনিন্দিতা দেবীর চোখে জল। আমার ভেতরেও অদ্ভুত একটা আনন্দ হচ্ছিল।

অনিন্দিতা বলল, “তাহলে... আপনি... আমাকে পুলিশে দেবেন না?”

শারদ্বত ওর ফোনে কী একটা দেখতে দেখতে বলল, “পাগল নাকি? আমি তো পুলিশের লোক নই ম্যাডাম। আজ বিকেলে সাড়ে পাঁচটায় একটা ট্রেন আছে। হাওড়া থেকে। বেরিয়ে পড়ুন। ভালো থাকবেন।”

অনিন্দিতা চোখের জল মুছে উঠে পড়ল সোফা থেকে। তারপর আমাদের বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

হঠাৎ শারদ্বত বলে উঠল, “এই, বিরিয়ানি খেতে ভালো লাগে?”

আমি ওর হঠাৎ এই প্রশ্নে চমকে গিয়ে বললাম, “অ্যাঁ? কী?”

শারদ্বত চোখ দুটো গোল গোল করে বলল, “বিরিয়ানি ভালো না লাগলে এই ফ্ল্যাটে জায়গা হবে না ভায়া। অন্য বাড়ি দ্যাখো!”

আমি বললাম, “বিরিয়ানি আমার ভালো লাগে। কিন্তু আমি যে তোমার সঙ্গে ফ্ল্যাটে থাকব, সেকথা আমি এখনও তো বলিনি ভায়া!”

শারদ্বত মুচকি হেসে বলল, “মুখে বলোনি ঠিকই। কিন্তু চোখে বলেছ।”

- তাই নাকি? চোখও কথা বলে?

- বলে বইকি! আলবাৎ বলে।

আমি আর কিছু বললাম না। শারদ্বত বলল, “অন আ সিরিয়াস নোট অনিরুদ্ধ, এই কেসের কথা কিন্তু এখন বাইরে যাবে না। তোমার দাদা যা জিনিস, আসল কালপ্রিটকে ছেড়ে দিয়েছি জানলে কোমরে দড়ি দিয়ে বেঁধে আনবে। আর অনিন্দিতা দেবীর সমস্ত চেষ্টা জলে যাবে। কাজেই আগে এ.সি. সরকারের ঝামেলা মিটুক। তারপর নাহয়…”

আমি বললাম, “ঠিক আছে। তাই হবে।”

পুনশ্চ: এই কারণেই শারদ্বত সিরিজের গল্প শুরু করেছিলাম সেদিন চৈত্র মাস দিয়ে। কিন্তু ইন্দ্রজাল রহস্যের ঘটনা আরও আগের। এতদিন পর সব ঝামেলা মেটায় এই লেখা প্রকাশ পেল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%