অনীশ দেব

একটা সময় ছিল যখন আমি প্রতি রাতে শহরতলীর পথে পথে বহুক্ষণ ধরে ঘুরে বেড়ানোর জন্য বেরিয়ে পড়তাম৷ আমার মা-বাবা এই নৈশ ভ্রমণে মোটেই খুশি ছিলেন না, ফলে আমার শোবার ঘরে কাঠের দেওয়ালে প্রতিটি ফাটলের ওপর ধর্মীয় বিধি লেখা কাগজের চিরকুট আঠা নিয়ে লাগিয়ে দিতেন, কিন্তু সব চেষ্টাই বৃথা৷ প্রতি সন্ধ্যায় আমি বেরিয়ে পড়লাম, এবং গভীর রাতে ফিরে এসে এমন একটা জায়গায় সামান্য ফাটল দিয়ে বাইরের বাতাস ঘরে এসে ঢুকছে৷ এতে আমি এক অদ্ভুত দুষ্টুমির আনন্দ পেতাম, কারণ সেই ফাটল দিয়ে সমস্ত অশুভ আত্মা ঘরে এসে ঢুকতে পারে, আর ওদের কাছ থেকে দূরে সরে থাকতে আমার মোটেই ভালো লাগত না৷ মনের অস্থির অনুভূতি আমি কখনও হারাতে চাই না৷
পথে বেড়াতে বেরিয়ে আমি আমার বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতাম৷ গভীর রাতে অপ্রত্যাশিত ভাবে ওদের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়ে পড়ায় ওদের সেই সব মুখ আমি দেখতে পেতাম, সেগুলো ওরা লুকিয়ে ফেলতে পারলেই স্বস্তি পেতো৷ আমি লক্ষ্য করতাম, ওদের মুখের ওপর অন্ধকারের প্রতি আতঙ্কের অসংখ্য রেখা, নিজেদের প্রতি ভয়ের করাল ছায়া৷ এই সব মুখ আমি সংগ্রহ করতাম, এবং দিনের বেলা তুহিন-আনন্দে সেগুলোকে খুঁটিয়ে দেখতাম৷ অনেকটা যেন শয়তান-নাচের মুখোস সংগ্রহ করার মতো৷ শুধু একটা মুখোসই তাতে নেই, আমার নিজেরটা৷
একদিন সন্ধ্যায় কিয়োবাশি জেলায় ঘুরে বেড়াচ্ছি, দেখি আমার বন্ধু কাপড় ব্যবসায়ী, মাৎসুয়ার দোকান থেকে হালকা আলো বেরিয়ে আসছে৷ ওর সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছে আজ থেকে দুবছর আগে, সুতরাং আপন মনেই হেসে উঠে ওর দোকানে ঢুকে পড়লাম৷ মনে এক অদ্ভুত শীতল ঘৃণা৷ নিজের আচরণে আমি নিজেই বিস্মিত৷ মুখোস সংগ্রহ করতে করতে আমি কি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি?
আমাকে সাদর আহ্বান জানিয়ে মাৎসুয়া চা-পানের অনুরোধ করল৷ পিতলের ধুনীটা সামনে এগিয়ে দিল যাতে আমি হাত দুটো গরম করতে পারি৷
শুনেছি তুমি নাকি অন্ধকারে পথে পথে ঘুরে বেড়াও? এ কি সত্যি? আমার দিকে না তাকিয়েই প্রশ্ন করল৷
হ্যাঁ!
কখনো কোন আত্মার সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে?
না৷
কখনো ‘মুজিনা’ দেখেছ?
না! মুজিনা কাকে বলে আমি জানি না৷
আমিও জানি না, তবে একজন ধর্মযাজককে আমি জিগ্যেস করেছিলাম যে আমি যা দেখেছি সেটা কি, তাতে উনি বলেছিলেন, ওটা মুজিনা৷
কিন্তু মুজিনা কি? আমি জানতে চাইলাম৷
জানি না, সেই ধর্মযাজকও বলতে পারেননি৷
নিজের হাঁটুতে চোখ রেখে আমি বসে রইলাম, কিন্তু মাৎসুয়া আর কিছু বলছে না দেখে বিদ্যুৎ ঝলকের মতো ওর দিকে চোখ তুলে দেখলাম, মুখ হাঁ করে শূণ্যদৃষ্টি নিয়ে বসে আছে৷ মনে হল, ওর ভেতরটা যেন ফাঁপা হয়ে গেছে৷
তারপর দুটো আলোর কণা ওর কালো চোখের গভীরে হঠাৎই জন্ম নিল, এবং ক্রমশ যেন কাছে আসতে লাগল, অনেকটা অন্ধকার রাস্তা ধরে এগিয়ে আসা লণ্ঠনের মতো৷ অবশেষে ওরা ওপরের স্তরে উঠে এল৷ ও চোখ বন্ধ করে আর্তনাদ করে উঠল এবং সংবিত ফিরে পেল৷
ওঃ, কী ভয়ঙ্কর! মাৎসুয়া বলল, মুজিনা কী বীভৎস—সে আমি বলে বোঝাতে পারব না, কারণ বোঝানোর মতো কিছু নেই—মুজিনা নৃশংস, তবে পালাবার সুযোগ দেয়—আপাতভাবে৷ যদি ওটা একটা কান ছিঁড়ে নিত—অথবা কাউকে খেয়ে ফেলত—তাহলে আমি হয়তো বুঝতে পারতাম—কিন্তু মুজিনা সে সব কিছুই করে না—ওঃ, আমার ভীষণ ভয় করছে৷
মাৎসুয়া হাঁ করল, যেন এক্ষুনি চিৎকার করে উঠবে, এবং সেইভাবেই অনেকক্ষণ বসে রইল৷ অনিঃসৃত সেই পাগলা-করা দীর্ঘ চিৎকারে আমার কানে যেন তালা লেগে গেল৷
তারপর এক সময় ওর মুখ বন্ধ হল, এবং কোন রকম ভূমিকা না করেই চাপা গলায়, অনেকটা গানের ভঙ্গীতে ও বলতে শুরু করল৷ যেন এ গল্প ওর মুখস্থ হয়ে গেছে৷
একদিন রাতে একটা মাঠের ওপর দিয়ে সংক্ষেপে পথ সারছিলাম৷ সাধারণত এই সময়েই লোকে অশুভ জিনিসের দেখা পায়৷ চারদিকে ঘন অন্ধকার, কিছুই নজরে পড়ছে না৷ তাহলে কেমন করে আমি ছোট্ট পুকুর, একটা গাছ আর ওই মেয়েটিকে দেখতে পেলাম? আকাশে চাঁদ ছিল না, এবং সেই পুকুর, গাছ কিংবা মেয়েটির কাছ থেকেও কোন আলো আমার চোখে আসেনি, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি দেখতে পেলাম৷ মেয়েটি মাথা ঝুঁকিয়ে বিষণ্ণভাবে বসে ছিল৷ কান্নার তীব্র দমকে ওর কাঁধ দুটো থেকে থেকে কেঁপে উঠছে৷
আমি এগিয়ে গিয়ে ওর খুব কাছে বসলাম, ভয় হচ্ছিল, ও হয়তো পুকুরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়বে৷
এখানে কোন যুবতীর বসে থাকা ঠিক নয়—আমি ওকে বললাম, এবং ওর কাঁধে হাত রাখলাম৷ একই সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, ওর পরণের কিমোনো অদ্ভুত সুন্দর রেশমের তৈরি৷ আমি তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে নিলাম৷ আমার দোকানেও কখনও এত ভালো রেশমী কাপড় আসেনি৷ এখনও যেন সে কাপড় আমি অনুভব করতে পারছি৷
রাতে এই সময়ে এ জায়গায় ভয় আছে! আমি বলে চললাম, কিন্তু ও আরও ঝুঁকে পড়ল, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলল৷ পোশাকের চওড়া হাতার ও নিজের মুখ লুকিয়ে রইল৷
আপনার কোনও সাহায্য দরকার থাকলে বলুন? কীসের দুঃখে—
ও একটু সরে বসল৷
আমি আপনাকে সাহায্যই করতে চাই৷ আমি আপনাকে কিছুতেই আত্মহত্যা করতে দেব না! দয়া করে কাঁদবেন না!
ও আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল, যেন আমার কথায় ক্লান্তি বোধ করছে৷ তারপর আমার দিকে পিছন ফিরে দাঁড়াল, কিন্তু আমি চলে যেতে পারলাম না৷ ওকে একা রেখে আমি যেতে পারি না৷ সুতরাং উঠে দাঁড়িয়ে ওর কাছে গেলাম৷
আসুন! এই বিপজ্জনক পুকুরের কাছ থেকে আমরা চলে যাই! আমি বললাম৷ তখন ও ঘুরে দাঁড়াল৷ দু-হাতে নিজের মুখ ঢেকে রেখেছে৷ মনে হল যেন ওর কান্না ভেজা চোখ দুটো আমার কাছ থেকে লুকোতে চাইছে৷ তারপর ও কপাল ও নাকের ওপর দিয়ে হাত বুলোনোর একটা ভঙ্গী করল৷ আমি ঝুঁকে পড়লাম৷ ওর মুখটা দেখতে চাইলাম, ওকে সান্ত্বনা দিতে চাইলাম, ওর চোখে চোখ রাখতে চাইলাম, কিন্তু—ওর কোন চোখ নেই, নাক নেই, মুখ নেই৷ ওর গোটা মুখমণ্ডল ডিসের মতই মসৃণ৷
মাৎসুয়া আমার দিকে চোখ ফেরাল, যেন সাহায্যের আশায়, কিন্তু আমি দেখলাম, ওর গাল দুটো ভাঙা এবং সেগুলো ওর মুখোসের ওপর মজাদার ভাঙাচোরা রেখার জন্ম দিয়েছে৷ ওর মুখের প্রতিটি অদ্ভুত খুঁটিনাটি আমি নিষ্ঠুর স্পষ্টভাবে দেখতে লাগলাম৷ কেন, তা বলতে পারি না৷
আমি সরবে হাসলাম, নিজের দৃঢ় ভরাট গালে আত্মতুষ্টিতে হাত বুলিয়ে বললাম, এই তোমার মুজিনা? আমার কথায় নিষ্করুণ ব্যাঙ্গ ঝরে পড়ল৷
এমনি করে হেসে উড়িয়ে দিও না! মাৎসুয়া অনুনয় করে বলল, সে যে কি ভয়ঙ্কর কি বলব! আরেকটু হলে আমি ভয়েই মরে গিয়েছিলাম৷ মাঠ ধরে আমি তখন ছুটতে শুরু করেছি, উঁচু নিচু জমিতে হোঁচট খেতে খেতে ছুটে চলেছি, আর এমন ভয়ংকর চিৎকার করে চলেছি যেন আমার আত্মা আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে পালাতে চাইছে, আরও জোরে ছুটতে চাইছে৷ ওই মেয়েটি তারপর কী করেছে জানি না৷ আমি ঘুরে তাকাতে সাহস পাইনি—
মাৎসুয়া এক মুহূর্ত থামল এবং শরীরের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করে আবার তার কাহিনী শুরু করল৷ ও আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে রইল৷
এক টুকরো টিস্যু কাগজ নিয়ে আমি নাক মুছলাম৷ তারপর ভুরু ওপর-নীচ করে শরীরের হাল্কা ক্লান্তিটুকু দূর করতে চাইলাম৷
গল্পের খেই ধরে একঘেয়ে গুণগুণ স্বরে মাৎসুয়া আবার বলতে শুরু করল ঃ
তখন, সৌভাগ্যবশে, কিছু দূরে একটা ছোট্ট আলো আমার নজরে পড়ল৷ ঠিক বুঝতে পারলাম না, আলোটা কোন খোলা জানালা দিয়ে আসছে, না রাস্তা থেকে আসছে, কিন্তু এটুকু মনে হল কাছাকাছি কোন লোকালয় রয়েছে, এবং আমি যেন ভীষণ স্বস্তি পেলাম৷ আলোটা ক্রমশ বড় হতে লাগল৷ সামান্য নড়েও উঠল, আর যেন কাউকে দেখতে পেলাম৷ আলোটা রাস্তা ধরেই এগিয়ে আসছে৷
আমি ছুটে গেলাম সেই আলো লক্ষ্য করে এবং আবিষ্কার করলাম, এক ফেরিওয়ালা তার জিনিসপত্রের ডালা নামিয়ে সবে সাজতে শুরু করেছে৷
বাঁচান! বাঁচান! আমি চিৎকার করে উঠলাম৷
ছোট্ট আলোটা তার সস্তা নীল প্যান্টের ওপর এক লাল্চে আভা ছড়িয়ে দিয়েছে, এবং তার হাতের কয়েকটা ছোট গামলায় প্রতিফলিত হয়ে ঠিকরে পড়েছে৷
কী হয়েছে? চিৎকার করছেন কেন? সে রুক্ষ সংক্ষিপ্ত স্বরে প্রশ্ন করল৷
ওঃ, সে আমি বলতে পারব না!
রাস্তার চোর-ডাকাত বেরিয়েছে নাকি? সে অবজ্ঞার সুরে বলল৷
না, না! আমি কিছু বুঝতে পারছি না! আর আপনাকে বলতেও পারছি না,
যন্ত্রণাকাতর চিৎকার করে আমি তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম৷
ও—তাহলে বোধ হয় এই ব্যাপার? নিজের মুখের ওপর হাত বুলিয়ে সে উত্তর দিল, এবং তখন আমি দেখতে পেলাম৷ লণ্ঠনের আবছা আলোয় স্পষ্ট দেখলাম, তার চোখ, নাক, মুখ কিছু—ঠিক একটা ডিমের মতো!
কী করে যে বাড়ি ফিরেছিলাম জানি না৷
মাৎসুয়া সামনে ঝুঁকে বসল৷ ও এখনও আমার পায়ের দিকে তাকিয়ে৷ ওর কপালে অসংখ্য খাপছাড়া রেখা এবং ওর ঠোঁট যেন ঝুলে পড়েছে৷
আমি কিছু বুঝতে পারছি না! ও ফিস ফিস করে বলল, মাঝ রাতে হঠাৎ হঠাৎ আমি জেগে উঠি এবং এক ভয়ংকর যন্ত্রণা টের পাই—সেই আতঙ্ক যেন এখনও আমাকে ছেড়ে যায়নি৷ কি করে সেই রাতের কথা আমি ভুলব? কী করব আমি এখন? আমি বোধ হয় পাগল হয়ে যাব!
ওর জন্য আমার মনে এতটুকু দরদ হল না৷ ওর মুখের চেহারা এত হাস্যকর আর কথাগুলো এত গতানুগতিক যে আমি হেসে উঠে বললাম, এই সব?
মাৎসুয়া বিহ্বলভাবে চোখ তুলে তাকাল এবং একই সঙ্গে আমি আমার ঠান্ডা কপাল মুছলাম৷ আমার কপালে ওর মত কোন ভাঁজ নেই ভেবে এক শয়তানি আনন্দ অনুভব করলাম৷
হঠাৎই মাৎসুয়ার মুখ পাল্টে গেল৷ উদভ্রান্ত দৃষ্টি নিয়ে ও আমার দিকে তাকিয়ে রইল৷ মুখ হাঁ করে এক বিকট চিৎকার করে উঠল৷
আমি ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে চুপচাপ শান্ত হয়ে বসে রইলাম৷
মুজিনা! আমার দিকে আঙুল উঁচিয়ে ও চিৎকার করে উঠল৷ বিরাট এক গর্তের মতো ওর মুখ এখনও হাঁ করা৷ ওর গলা থেকে এক অদ্ভুত ঘরঘর শব্দ উঠে এল, আর তার পরই শুরু হল আকস্মিক, দীর্ঘ, চিৎকারের মিছিল৷ ও লাফিয়ে উঠল, ধুনীটাকে উল্টে দিয়ে ছুটে পালিয়ে গেল দোকানের বাইরে৷
ও পাগল হয়ে গেছে, এই কথা ভেবে আমি যেমন বসে ছিলাম তেমনই বসে রইলাম৷ লক্ষ্য করলাম, ধুনীর জ্বলন্ত কাঠকয়লাগুলো মেঝের কার্পেট পুড়িয়ে গর্ত করে ফেলেছে৷ একটা ছোট্ট আগুনের শিখা কার্পেটের এক প্রান্ত লেহন করে তার যাত্রা শুরু করল৷ অন্য প্রান্ত ধরে আরো একটা শিখা একইভাবে এগিয়ে চলল৷ এক সময় ওদের দেখা হল, এবং এক বিশাল শিখা জন্ম নিল৷ সেটা ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে৷ মনে হল, ধোঁয়ায় আমার চোখ জ্বলছে, ফলে আমি হাত তুলে চোখ ঘষতে গেলাম৷ তখনই আবিষ্কার করলাম, আমার কোন চোখ নেই৷ মুখের ওপর হাত বোলালাম৷ আমার মুখ ডিমের মতোই মসৃণ! নিঃসীম আতঙ্কে আমি লাফিয়ে উঠলাম, ছুটে গেলাম ড্রয়ারের কাছে, এক হ্যাঁচকায় ড্রয়ার খুলে একটা আয়না বের করে তাতে দেখলাম৷ একটা সাদা ডিম্বাকৃতি খোল, তাতে কোন আঁচড়টি পর্যন্ত নেই! আমার চুলগুলো অপার্থিব ভঙ্গিতে ডিমের ওপর গজিয়ে উঠেছে৷
কিন্তু চোখ, যা দিয়ে আমি এ সব দেখছি? আমার সেই চোখ কোথায়?
ডিমের সাদা খোল ভেদ করে আমি আয়নায় তাকালাম৷ দেখলাম, ডিমটা আমার মাথার নড়াচড়া অবিকল নকল করে চলেছে—আমার চুল দিয়ে আমারই ঘাড়ের ওপর বসে আছে৷
আতঙ্কে সবকিছু ভুলে আমি দিশেহারা হয়ে পড়লাম, আয়নাটা হাতে নিয়ে আগুনের লকলকে শিখা ভেদ করে লাফিয়ে পড়লাম, এবং ছুটে বেরিয়ে গেলাম রাস্তায়৷ চারপাশে তাকিয়ে দেখি কয়েকজন লোক চুপচাপ শান্ত পায়ে এগিয়ে আসছে৷ ওরা এখনও আগুন দেখতে পায়নি৷
চট করে হাত তুলে মুখ ঢাকা দিয়ে ছুটে চললাম বাড়ির দিকে৷
বাড়ি ফিরে একটা টুপি দিয়ে মুখ আড়াল করে আয়নাটা হাতে নিয়েই মা-বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম৷
তোমাদের কাছে ধর্মীয় বিধি লেখা আর কোন কাগজ আছে? আমার ঘরে এখনও একটা ফাটল রয়েছে যেটা দিয়ে মুজিনা ঢুকে পড়তে পারে৷
কয়েক চিলতে কাগজ এনে ওঁরা তৎক্ষণাৎ সেই ফাটলের ওপর আঠা দিয়ে লাগিয়ে দিলেন৷ তারপর আমি মাৎসুয়ার আয়নাটা তুলে ধরলাম, গিল্টি করা ফ্রেমে বাঁধানো পুরোনো দামি হাত-আয়না, পিছনে সারসের ছবি খোদাই করা৷ আয়নায় তাকিয়ে আমি আবার নিজের পুরোনো মুখটা ফিরে পেলাম৷
পরদিন শুনলাম কিয়োবাশির একটা বিরাট এলাকা পুড়ে সম্পূর্ণ ছাই হয়ে গেছে এবং এক মাঠের ওপর এক ছোট্ট পুকুরে মাৎসুয়ার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া গেছে৷ তার পর থেকে অন্ধকার হয়ে এলেই আমি আর বাইরে বেরোতে সাহস পাই না৷ আমার মা-বাবা ভাবেন আমি পড়াশোনা করি এবং প্রার্থনা করি, কিন্তু আমি বসে থাকি মাৎসুয়ার আয়নাটা হাতে নিয়ে, পরীক্ষা করি নিজের মুখ৷ মুখটা কোথাও কি শক্ত হয়ে উঠেছে? ওটা কি পালটে যাচ্ছে একটা মসৃণ ডিমে? এখন আমি শুধু একটা মুখোসই খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করি, সে আমার নিজের মুখ, সে মুখকে আমি ভীষণ ভয় পাই৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন