উদ্দেশ্য জটিল

অনীশ দেব

(টিউসডে ক্লাবে হাজারো খুন নিয়ে আলোচনা করতেন ওরা দু’জন৷ স্যর হেনরী ক্লিথারিং, আর্টিষ্ট জয়েস লেম্প্রিয়ের, ধর্মযাজক ডক্টর পেণ্ডার, আইনজ্ঞ মিষ্টার পেথারিক, লেখক রেমণ্ড ওয়েষ্ট এবং মিস জেন ম্যার্পল৷

কিন্তু কোন খুন ছিল না এই কাহিনীতে, তাই বোধহয় সবচেয়ে কঠিন ও রহস্যময় মনে হয়েছে সবার কাছে—অবশ্য একজন বাদে৷ তার কাছে কোন কিছুই কঠিন নয়—তার নাম মিস জেন ম্যার্পল৷)

মিষ্টার পেথারিক গলা ঝাড়লেন—কিন্তু তার মধ্যে একটু বিশেষত্ব ছিল যার জন্য সবাই উৎসুক হয়ে তার দিকে তাকালেন৷

আমার মনে হয়, আমার সমস্যাটা আপনাদের কাছে একটু নীরস ঠেকবে৷ আমতা আমতা করে বললেন তিনি, কারণ এতক্ষণ আমরা যেসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছিলাম সবই অত্যন্ত রোমাঞ্চকর৷ আমি যে সমস্যাটির কথা বলতে চলেছি তাতে (দুর্ভাগ্যবশত) কোন রক্তপাতের বালাই নেই৷ কিন্তু তবু সমস্যাটি অত্যন্ত রহস্যময় এবং কৌতূহলোদ্দীপক৷ আর একটা কথা বলা প্রয়োজন তা হল—সমস্যাটির সঠিক সমাধান আমি জানি৷

এটা ঠিক আইন সঙ্গত হল না, তাই না? প্রশ্ন করলেন জয়েস লেম্প্রিয়ের, মানে আইনের দিক দিয়ে...৷

মিঃ পেথারিক তার চশমার ওপর দিয়ে ভদ্রমহিলার দিকে চেয়ে হাসলেন৷ —না না, আপনার ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই৷ কারণ যে গল্পটা আমি বলব সেটা অত্যন্ত সহজ এবং সরল—কারোরই বুঝতে অসুবিধা হবে না গল্পটা৷

আইনের মারপ্যাঁচ বাদ দিন এখন, মিস ম্যার্পল বললেন৷

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ মিঃ পেথারিক তাকালেন মিস ম্যার্পলের দিকে৷

আমি ঠিক এখনই কিছু কথা দিতে পারছি না, তবু আপনি শুরু করুন গল্পটা৷

ঘটনাটা আমার এক ভূতপূর্ব ক্লায়েন্টকে জড়িয়ে৷ ধরুন তার নাম—মিষ্টার ক্লোড—সাইমন ক্লোড৷ তার টাকা পয়সা ছিল প্রচুর এবং কাছাকাছিই একটা বিরাট বাড়িতে থাকতেন৷ তার একমাত্র ছেলে যুদ্ধে মারা গিয়েছিল৷ কিন্তু তার একটি বাচ্চা মেয়ে ছিল—সে থাকত সাইমনেরই বাড়িতে৷ মেয়েটির মা মেয়েটিকে জন্ম দেবার সময় মারা গিয়েছিল৷ সাইমন ভীষণ ভালবাসতেন তার এই নাতনীটিকে৷ তার কোন কাজেই আপত্তি জানান নি তিনি৷ একটা বাচ্চাকে ঘিরে যে কোন লোকের দুনিয়া থাকতে পারে একথা বিশ্বাস হত সাইমনকে দেখলে৷ তাই যখন এগারো বছর বয়সেই মেয়েটি নিউমোনিয়ায় মারা গেল তখন সাইমন যে আঘাত পেয়েছিলেন তা আমার পক্ষে বোঝোনো সম্ভব নয়৷

হতভাগ্য সাইমনকে কেউই সমবেদনা জানাতে পারেনি৷ এই কিছুদিন আগে তার এক ভাই মারা গেছে৷ সাইমন তার অবস্থা দেখে তার ছেলেমেয়েদের নিজের বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন৷ এটা তার মহানুভবতার পরিচয় বলতে পারেন, কিন্তু বৃদ্ধ সাইমন কোনদিনই গ্রেস, মেরী বা জর্জকে ভালবাসতে পারেননি—যেমন তিনি ভালবাসতেন তার ছোট নাতনীকে৷ জর্জ্জ ক্লোড কাছাকাছিই একটা ব্যাঙ্কে চাকরী পেল৷ গ্রেস, ফিলিপ গ্যারড নামে এখন তরুণ রিসার্ট কেমিষ্টকে বিয়ে করল৷ কিন্তু মেরী অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ মেয়ে৷ সে বাড়িতে থেকে কাকার দেখাশোনা করত৷ হয়ত সে তার কাকাকে ভালবাসত৷ বেশ শান্তির সঙ্গেই কেটে যেতে লাগল দিনগুলো৷ সাইমনের নাতনী ক্রিষ্টোবেল মারা যাবার পরে তিনি আমার কাছে এসেছিলেন নতুন উইল করানোর জন্য৷ সেই উইলে তিনি তার বিশাল বিষয় সম্পত্তি সমান তিন ভাগে ভাগ করে লিখে দিলেন জর্জ্জ মেরী ও গ্রেসের নামে৷

এইভাবে দিন যেতে লাগল৷ একদিন রাস্তায় আমার সঙ্গে দেখা হল জর্জ্জ ক্লোডের৷ আমি তাকে সাইমনের কথা জিজ্ঞাসা করলাম৷ কারণ অনেকদিন তার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি৷ জর্জ্জের মুখের ভাব দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম৷ বলল, আপনি যদি গিয়ে কাকাকে একবার বোঝাতে পারতেন, দুঃখ করে বলল সে, এই আত্মা-টাত্মার ব্যাপারগুলো দিনকে দিন বেড়েই চলেছে৷

কি সব আত্মার কথা বলছ? খুব অবাক হয়ে প্রশ্ন করলাম আমি৷

তখন জর্জ্জ আমাকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল৷ কিভাবে সাইমন ধীরে ধীরে স্পিরিচুয়ালিজমে অনুরক্ত হয়ে ওঠেন এবং কিভাবে তার সঙ্গে এককজ আমেরিকান মিডিয়াম, মিসেস ইউরডাইস স্প্র্যাগের দেখা হয়৷ এই মহিলাটি একজন এক নম্বরের প্রতারক এবং তার ভড়ং-এর সুযোগে সাইমনের উপর আশাতীত আধিপত্য বিস্তার করেছেন৷ বাড়িতে কাকা ওই মেয়েটির কথায় অনেকগুলো সিয়াঁসে বসেছিলেন এবং তাতে নাকি ক্রিষ্টোবেলের আত্মা তার ঠাকুরদাকে দেখা দিয়েছিল৷

এখানে বলা প্রয়োজন যে যারা স্পিরিচুয়ালিজমকে ঠাট্টা এবং অবজ্ঞা করেন তাদের সঙ্গে আমি একমত নই৷ আম একট জিনিসই বিশ্বাস করি, তা হল প্রমাণ৷ এবং আমার মনে হয় যে, যদি আমরা নিরপেক্ষ ভাবে প্রমাণগুলোকে স্পিরিচুয়ালিজমের দিক থেকে দেখি তবে ব্যাপারটাকে ঠিক অবিশ্বাসও কার যায় না৷ তাই আমি স্পিরিচুয়ালিজম বিশ্বাস করি না ঠিক, কিন্তু অবিশ্বাসও করি না৷ কতগলা এমন প্রমাণ আছে যেগুলোকে কেউ ঠিক অবিশ্বাস করতে পারে না৷

অন্যদিকে স্পিরিচুয়ালিজমকে পুঁজি করে অনেক ঠগ প্রতারক আবির্ভূত হয়৷ তাই জর্জ্জ আমাকে যখন ঐকথা বলল তখন আমি স্বাভাবিক ভাবে ধরে নিলাম যে মিসেস ইউরডাইস স্প্র্যাগ একজন প্রথম শ্রেণীর প্রতারক, তিনি নাতনীরি প্রতি সাইমনের অপত্য স্নেহের সুযোগ নিয়ে সাইমনকে ঠকাবার তালে আছেন৷ অর্থাৎ তিনি যে বিপদে পড়েছেন তা তিনি নিজেও জানেন না৷

যতই আমি ব্যাপারটা চিন্তা করতে থাকলাম, ততই অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম৷ আমি জর্জ্জ, মেরীকে খুবই স্নেহ করতাম! তাই মনে হল যে মিসেস স্প্র্যাগ এবং সাইমনের উপর তার আধিপত্য ভবিষ্যতে ওদের ওপর বিপদ ডেকে আনতে পারে৷

তাই প্রথম সুযোগেই একটা ছুতো করে দেখতে গেলাম সাইমনের সঙ্গে৷ সেখানেই দেখা হল মিসেস স্প্র্যাগের সঙ্গে৷ তাকে দেখে আমার ধারণা দৃঢ় হল৷ তিনি যেন একজন সম্মানিত অতিথি হিসাবে বাড়িতে রয়েছেন৷ মিসেস স্প্র্যাগ মধ্যবয়স্কা শক্ত সমর্থ্য মহিলা৷ পরণে সুরুচিসম্পন্ন সুন্দর পোশাক—তবে সাজের আধিক্যটা সহজেই নজরে পড়ে৷ তার কথাবার্তায়ও কোনো খুঁদ দেখলাম না৷ বেশ সহানুভূতি সম্পন্ন বলেই মনে হল৷ তবে এটা যে তার অভিনয় তাও আমার অজানা রইল না৷

তার স্বামীও তার সঙ্গে ঐ বাড়িতে ছিলেন৷ মিষ্টার এ্যাবসালোম স্প্র্যাগ একজন রোগা লিকলিকে চেহারার মানুষ৷ তার মুখমণ্ডলে সর্বদাই একটা বিষাদের ছায়া অথচ চোখ জোড়ায় রয়েছে শৃগালের মত চোরা চাউনি৷

সাইমনকে একা পাওয়া মাত্রই কৌশলে স্প্র্যাগ-প্রসঙ্গের উল্লেখ করলাম৷ তিনি দেখলাম মিসেসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ৷ ইউরডাইস স্প্র্যাগ দারুণ চমৎকার মহিলা৷ সাইমনের প্রার্থনার উত্তরে ভগবানই তাকে সাইমনের কাছে পাঠিয়েছেন৷ তার টাকার প্রতি কোনো লোভ নেই, কোনা ব্যথিত হৃদয়কে (সাইমন ক্লোভের) তিনি যে সাহায্য করতে পারছেন তাই তার পক্ষে যথেষ্ট৷ ক্রিষ্টোবেলের জন্য মিসেস স্প্র্যাগের মনে যেন মাতৃস্নেহ দেখা দিয়েছে৷ সাইমন তাকে প্রায় নিজের মেয়ের মতই মনে করেন, ইত্যাদি৷ তারপর তিনি আমাকে বলতে আরম্ভ করলেন—কিভাবে তিনি ক্রিষ্টোবেলের কথা শুনতে পেয়েছেন, ক্রিষ্টোবেল তাকে বলেছে যে, সে তার মা ও বাবার সঙ্গে ভালই আছে...৷ এরকম আরও অনেক কথা৷ শেষে যে কথাটা বললেন তা হল, ক্রিষ্টোবেল প্রত্যেকবারই এই এক কথা বলেছে, মা আর বাবা মিসেস স্প্র্যাগকে খুব ভালোবাসেন৷

কিন্তু পেথারিক, হঠাৎ থেমে তিনি বললেন, তুমি হয়তো আমাকে উপহাস করবে৷

না, আমি তোমাকে উপহাস করবো না৷ বরং যারা এসব বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, বই লিখেছেন তাদের দেওয়া প্রমাণগুলো আমি দ্বিধাহীন ভাবে গ্রহণ করব৷ এবং তারা যদি কোনো মিডিয়ামের প্রশংসা করেন তবে তাকে আমি সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করব৷ আশাকরি মিসেস স্প্র্যাগ মিডিয়াম হিসেবে জনস্বীকৃতি পেয়েছেন৷

সাইমন উচ্ছ্বসিত ভাবে মিসেস স্প্র্যাগের প্রশংসা করতে লাগলেন৷ বার বার বলতে লাগলেন যে তিনি ঈশ্বর প্রেরিত৷ গত গ্রীষ্মে তার সঙ্গে সাইমনের দেখা হয়৷ সাইমনের ভাগ্য খুব ভাল যে মিসেস স্প্র্যাগের মতো একজন মহিলার সাক্ষাৎ পেয়েছেন...৷

বিচলিত অবস্থায় আমি ফিরে এলাম৷ সবই আমি বুঝতে পারলাম, কিন্তু কি করব ভেবে উঠতে পারলাম না৷ অনেক চিন্তার পর সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি ফিলিপ গ্যারডকে (গ্রেসের স্বামী) চিঠি দিয়ে ডেকে পাঠালাম৷ খুব সতর্কতার সঙ্গে আমি ব্যাপারটার তাকে লিখে জানালাম৷ এই মহিলাটি যদি সাইমনের যে অনতিবিলম্বে কোন নামকরা স্পিরিচুলায়িষ্টিক চক্রের সংস্পর্শে আসা প্রয়োজন এও লিখলাম৷ আমার মনে হল এসব ব্যবস্থা করতে ফিলিপের অসুবিধা হবে না৷

গ্যারড বিনাবিলম্বে ব্যবস্থা-পত্র করতে শুরু করল৷ ও বুঝতে পেরেছিল যে সাইমনের স্বাস্থ্য খুব ভাল নয়! তাই এসব ক্ষেত্রে অবশ্যম্ভাবী যে ফল তা ও এড়াতে চাইল৷ কারণ আর বেশী দিন এভাবে চলচে মেরী, গ্রেস এবং জর্জ্জ যে সম্পত্তি থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হবে তা ও বুঝতে পারল! ফিলিপ প্রফেসর লংম্যানকে সঙ্গে করে সাইমনের বাড়িতে এল৷ লংম্যান স্পিরিচুয়ালিজম সম্বন্ধে প্রচুর পড়াশোনা করেছেন এবং বিদ্বান ব্যক্তি৷ তিনি অতিথি হিসেবে এসে দু-একটা সিয়াঁসেতে অংশগ্রহণ করলেন৷ ফিরে গিয়ে কিছুদিন বাদে তিনি ফিলিপকে চিঠি লিখে জানালেন যে মিসেস স্প্র্যাগের ব্যাপারটা জালিয়াতি কিনা তা ধরতে পারেননি৷ কিন্তু তার যেন মনে হয়েছে ব্যাপারটা নির্ভেজাল নয়৷ তিনি এও লিখলেন যে ফিলিপ ইচ্ছে করলে তার এই চিঠিটা সাইমনকে দেখাতে পারেন এবং প্রফেসার লংম্যান একজন খাঁটি মিডিয়ামের সঙ্গে সাইমনের পরিচয় করিয়ে দেবেন৷

ফিলিপ লংম্যানের এই চিঠিটা সোজা নিয়ে গিয়ে সাইমনকে দেখাল৷ কিন্তু ফল যা হবার তাই হল৷ সাইমন রাগে জ্বলে উঠলেন৷ এটা মিসেস স্প্র্যাগের মহত্বকে ছোট করার একটা নীচ, হীন চক্রান্ত! মিসেস তাকে আগেই বলেছিলেন যে শহরের অনেক স্পিরিচুয়ালি ওকে হিংসা করে৷ সাইমন প্রায় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন যে লংম্যান মিসেস স্প্র্যাগকে ঠগ বা প্রতারক বলেন নি৷ তার জীবনের সবচেয়ে দুঃসময়ে মিসেস দেবদূতের মত আবির্ভূতা তা হয়ে তাকে শান্তি, সুখ, আনন্দ, সব দিয়েছেন৷ তিনি সব সময়ই মিসেসকে সমর্থন করবেন৷ তার জন্য যদি পরিবারের সবার সঙ্গেই তার ঝগড়া হয় তো হোক৷ পৃথিবীতে সবার চেয়ে ইউরডাইসকেই বেশী ভালবাসেন৷

ফিলিপকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বললেন সাইমন৷ কিন্তু আচমকা এই উত্তেজনা ও রাগের ফলে তার শরীর একেবারে ভেঙ্গে পড়ল৷ গত একমাস ধরে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে রিলেন বিছানায়৷ তারপর যা অবস্থা দাঁড়াল তাতে তার পক্ষে বিছানা ছেড়ে ওঠার কোন সম্ভাবনাই রইল না, অর্থাৎ যতদিন না মৃত্যু এসে তাকে মুক্তি দিচ্ছে ততদিন আর তার নড়বার ক্ষমতা নেই৷ ফিলিপ চলে যাওয়ার দুদিন পরে আমি সাইমনের কাছ থেকে এক জরুরী ডাক পেলাম৷ একটুও দেরী না করে আমি গিয়ে উপস্থিত হলাম তার বাড়িতে৷ সাইমন বিছানায় শুয়েছিলেন৷ যেন বিছানার সঙ্গে মিশে গেছেন৷ আমার মনে হল তার অবস্থা খুব খারাপ৷ তিনি শ্বাসকষ্টে হাঁপাচ্ছিলেন৷

আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে। আমাকে দেখে তিনি বললেন, আমি বেশ বুঝতে পারছি৷ কোন তর্ক করো না পেথারিক৷ কিন্তু আমি মারা যাওয়ার আগে, যে আমার জন্য সবচেয়ে বেশী করেছে তার প্রতি আমার কর্তব পালন করতে চাই৷ আমি নতুন উইল করব পেথারিক৷

নিশ্চয়ই৷ আমি বললাম, তুমি আমাকে বল কি করতে হবে, আমি সেটা থেকে উইল ড্রাফট করে তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব৷

না না, তা হয় না৷ সাইমন বললেন, হয়তো আমি কাল পর্য্যন্ত নাও বাঁচতে পারি৷ আমি আমার ইচ্ছানুযায়ী সব লিখে রেখেছি এই কাগজটায়—তিনি বালিশের নীচে হাতড়াতে হাতড়াতে বললেন, দেখ, এটা ঠিক আছে কিনা?

বালিশের নীচ থেকে একটুকরো পেন্সিলে লেখা কাগজ বার করলেন তিনি৷ খুব সহজ ও সংক্ষিপ্ত ঐ কাগজের ভাষা৷ সাইমন তার ভাইপো, ভাইঝিদের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার পাউণ্ড করে দিয়ে যাচ্ছেন৷ আর অবশিষ্ট বিশাল সম্পত্তি রেখে যাচ্ছেন ইউরভাইস স্প্র্যাগের নামে—তার প্রতি ‘কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধার’ বশে৷

আম মনে মনে অসন্তুষ্ট হলাম, কিন্তু নিরর্থক৷ মস্তিষ্ক বিকৃতির কোন কথাই ওঠে না, কারণ বৃদ্ধ সাইমন আর যে কেন মানুষের মতোই প্রকৃতিস্থ৷

তিনি ঘণ্টা বাজাতেই দুজন পরিচালিকা এসে ঘরে প্রবেশ করল৷ এম্মাগণ্ট লম্বা, মধ্যবয়স্কা মহিলা৷ সে বহু বছর ধরে সাইমনের কাছে কাজ করছে এবং তার প্রচুর সেবা যত্নও করেছে৷ তার সঙ্গে যে ঢুকল সে রাঁধুনী—বয়স তিরিশের কাছাকাছি, স্বাস্থ্যবতী৷ সাইমন তার ঘন ভ্রু-যুগলের নীচ দিয়ে আগুন ঝরা চোখে তাকালেন তাদের দিকে৷

আমি চাই যে তোমরা আমার উইলের সাক্ষী হও৷ এম্মা আমার পেনটা নিয়ে এস৷

এম্মা তাড়াতাড়ি ডেস্কের কাছে গেল পেনটা আনতে৷

না না, বাঁ দিকের ড্রয়ারটা নয় এম্মা৷ ইতস্ততঃ করে সাইমন বললেন, তুমি জানো না যে ওটা ডানদিকের ড্রয়ারে থাকে?

না সাইমন, এটা বাঁদিকেরটাতেই রয়েছে৷ এই যে৷ পেনটা হাতে করে বলল এম্মা৷

তাহলে তুমি নিশ্চয়ই ভুল করে ওখানে রেখেছো৷ একটু রাগত কণ্ঠে বললেন সাইমন, জিনিসপত্র ঠিক জায়গায় না রাখা আমি অত্যন্ত অপছন্দ করি৷

গজ গজ করতে করতেই তিনি পেনটা এম্মার হাত থেকে নিলেন এবং তার করা ড্রাফটাকেই আমার কথামত শুদ্ধ করে কপি করলেন৷ তারপর তিনি নিজের নাম সই করলেন৷ তার নীচে এম্মা গন্ট এবং রাঁধুনী—লুসী ডেভিট—ওরাও সই করল৷ আমি উইলটা ভাঁ করে একটি লম্বা নীল খামে ভরলাম৷ স্বাভাবিকভাবেই উইলটা সাধারণ কাগজেই লেখা হয়েছিল—আপনারা তো বুঝতেই পারছেন?

এম্মা এবং লুসী ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই সাইমন হঠাৎ হাঁফ ছেড়ে শুলেন৷ তার মুখ যন্ত্রণাবিকৃত হয়ে উঠল৷ আমি তাড়াতাড়ি ঝুঁকে পড়লাম তার ওপর৷ এম্মা গণ্ট যেতে গিয়েও ফিরে এল৷ কিন্তু সাইমন সামলে নিয়ে হাসলেন—কষ্টকৃত হাসি৷

কোন ভয় নেই পেথারিক—আমি ঠিকই আছি৷ আমার কর্তব্য পালিত হয়েছে, এখন আমি শান্তিতে মরতে পারব৷

এম্মা আমার দিকে তাকাল—অর্থাৎ সে ঘর ছেড়ে যাবে কিনা? আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালে সে চলে গেল৷ কিন্তু যাবার আগে নীল খামটা মাটি থেকে তুলে আমার হাতে দিয়ে গেল৷ খামটা উত্তেজনার মুহূর্তে আমার কোল থেকে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল৷ আমি ওটাকে কোটের পকেটে ঢুকিয়ে রাখলাম৷

পেথারিক, তুমি হয়তো আমার উপর বিরক্ত হয়েছে৷ সাইমন বললেন, তুমিও আর সবার মত আমার ইচ্ছের বিপক্ষে—

প্রশ্নটা তা নয় সাইমন৷ আমি বললাম, মিসেস স্প্র্যাগ হয়তো প্রতারক নন৷ তুমি তাকে কৃতজ্ঞতা বশে তোমার সম্পত্তির সামান্য কিছু অংশ দিয়ে যেতে পারতে৷ কিন্তু একজন অজানা অচেনা মহিলার জন্য তোমার ঘনিষ্ঠতম আত্মীয়দের বঞ্চিত করা—আমার মনে হয় কাজটা তুমি ঠিক করছ না৷

একথা বলে আমি ঘর ছেড়ে বেরোলাম৷ আমার যথাসাধ্য আমি করেছি৷ আমি সাইমনের কাছে উইল সম্বন্ধে প্রতিবাদ করেছি৷ আর কিই বা আমি করতে পারি৷

হলঘরে বেরী সাইমনের সঙ্গে আমার দেখা হল৷

মিঃ পেথারিক, শুধু মুখে আপনি যাবেন না৷ আসুন, অন্ততপক্ষে এক কাপ চা আপনাকে খেয়ে যেতে হবে, আসুন৷ মেরীর সঙ্গে আইম ড্রইরুমে ঢুকলাম৷

ঘরের কোণায় ফায়ার প্লেসে আগুন জ্বলছে৷ ঘরের ভেতরটা বেশ সুন্দরভাবে সাজানো গোছানো৷ আমার ওভারকোটটা খুলতেই মেরী এসে আমার হাত থেকে নিল৷ এমন সময় জর্জ্জ ঘরে ঢুকতে মেরী কোটটা ওর হাতে দিল৷ জর্জ্জ কোটটাকে নিয়ে গিয়ে দূরের একটা চেয়ারের উপর রাখল৷ তারপর ও ফিরে এসে আমরা যেখান বসেছিলাম (ফায়ার প্লেসের কাছে) সেখানে বসল৷ আমরা চা পান করতে লাগলাম—সেই সঙ্গে কথাবার্তাও হচ্ছিল৷ কথায় কথায় জর্জ্জ বলল যে এষ্টেটের একটা জরুরী সমস্যা মিঃ ক্লোড তার হাতে তুলে দিয়েছেন৷ সে এখন কি করবে ভেবে উঠতে পারছে না, মহা চিন্তায় পড়ে গেছে৷ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে আমি যদি তাকে একটু সাহায্য করি তবে সে খুব উপকৃত হবে৷ আমি বললাম যে তবে ষ্টাডিতে (যেখানে এস্টেট সংক্রান্ত কাগজপত্র থাকে) খাওয়াই ভাল৷ আমরা স্টাডিতে গেলাম৷ আমি কাগজপত্রগুলো পরীক্ষা করলাম৷ জর্জ্জ ও মেরী তখন আমার সঙ্গেই ছিল৷

মিনিট পনেরো পরে আমার কাজ শেষ হলে আইম বিদায় গ্রহণ করলাম৷ তখন হঠাৎ মনে পড়ল যে আমার ওভারকোটটা ড্রইিংরুমেই আছে—তাই ওটাকে আনতে গেলাম৷ ঘরে একমাত্র মিসেস স্প্র্যাগ উপস্থিত ছিলেন৷ তিনি যে চেয়ারের উপর কোটটা ঝুলছিল তার ওপর ঝুঁকে পড়ে কি যেন করছিলেন৷ একটু লক্ষ্য করতেই বুঝলাম, তিনি অনাবশ্যক ভাবেই চেয়ারের ওপর যে কাপড়ের ঢাকনা ছিল সেটা টানাটানি করছিলেন৷ আমাদের দেখেই তিনি মুখ চোখ লাল করে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন৷

এই ঢাকনাটা কিছুতেই ঠিকভাবে ফিট করছে না, অনুযোগের সুরে বললেন তিনি, আমি একটা ঠিক মাপমত তৈরী করতে পারি কিনা দেখি৷

আমি ওভারকোটা নিয়ে গায়ে দিলাম৷ তখনই খেয়াল করলাম যে উইলের খামটা মাটিতে পড়ে আছে৷ আমি ওটাকে তুলে পকেটে রাখলাম৷ তারপর বিদায় নিলাম৷

অফিসে পৌঁছে আমি যা যা করলাম তা পরপর আমি বলে যাচ্ছি৷ ওভারকোট খুলে, উইলটা পকেট থেকে বের করে হাতে নিয়ে আমি টেবিলের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম৷ এমন সময় আমার কর্মচারী ঘরে ঢুকে বলল যে কেউ আমার সঙ্গে ফোনে কথা বলতে চায় এবং আমার ঘরে যে এক্সটেনসন লাইন আছে সেটা খারাপ হয়ে গেছে৷ তাই আমি তার সঙ্গে বাইরের ঘরে গেলাম ফোন ধরতে৷ কথাবার্তা সেরে মিনিট পাঁচেক বাদে আমি যখন এলাম দেখি আমার কর্মচারী দরজায় দাঁড়িয়ে আছে৷ আমাকে দেখে সে বলল, মিঃ স্প্র্যাগ আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, স্যর৷ আমি তাকে আপনার অফিস রুমে বসতে বলেছি৷

আমি আমার অফিসরুমে ফিরে গিয়ে দেখি মিঃ স্প্র্যাগ টেবিলের কাছে একটা চেয়ারে বসে রয়েছেন৷ আমাকে দেখে অত্যন্ত মোলায়েমভাবে অভ্যর্থনা জানালেন৷ তারপর অপ্রাসঙ্গিক ব্যাপার নিয়ে বকতে শুরু করলেন৷ তার স্ত্রী কোমলস্বভাবা মহিলা৷ লোকে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রীকে জড়িয়ে নানা কথা বলছে ইত্যাদি ইত্যাদি৷ আমি যত সংক্ষেপে পারলাম তার কথার জবাব দিলাম৷ আমার কথায় বোধহয় বিরক্তির আভাস পেয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং হঠাৎই চলে গেলেন৷ তখনই আমার মনে পড়লো যে আমি ভুল করে উইলটা টেবিলের উপরই রেখে গেছি৷ আম ওটাকে নিয়ে খামটা সীল করলাম৷ তারপর ওটার ওপর নাম লিখে সিন্দুকে রেখে দিলাম৷

এইবার গল্পের সর্বাপেক্ষা জটিল অংশের সম্মুখীন হব আমরা, দু’মাস পরে মিঃ সাইমন মারা গেলেন৷ আমি সমস্ত দীর্ঘ আলোচনা, কথাবার্তা বাদ দিয়ে যা ঘটলো তাই বলছি৷

সীল করা খামটা যখন খোলা হল, তখন তার ভেতর থেকে উইলের বদলে পাওয়া গেল একটা সাদা কাগজ৷

মিস্টার পেখারিক থামলেন৷ সবার কৌতূহল মুখের ওপর একবার করে চোখ বুলিয়ে হাসলেন৷

আপনারা নিশ্চয়ই এই ব্যাপারটা প্রশংসা করবেন? দু’মাস ধরে সীল করা খামটা আমার সিন্দুকেই পড়ে ছিল৷ কারো পক্ষে সেটাকে বদল করা সম্ভব ছিল না৷ না, যেই এটা করুক না কেন সে খুব কম সময়েই পেয়েছিল—তা হল উইল সই করার পর থেকে সিন্দুকে আটকানো পর্যন্ত৷ এখন প্রশ্ন হল কার সবচেয়ে বেশী সুযোগ ছিল এবং এর ফলে সবচেয়ে বেশী লাভবান কে হবে?

সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় পয়েণ্টগুলো আমি সংক্ষেপে আপনাদের বলছি৷ উইল সাইমন সই করলেন এবং আমি সেটাকে খামে ভরলাম; এ পর্যন্ত সব ঠিক আছে৷ ওটা আমি পকেটে রাখলাম৷ এরপর মেরীর হাতে গেল কোটটা; ওর থেকে জর্জ্জের হাতে৷ জর্জ্জ যখন কোটটা নিয়ে চেয়ারে রাখল সে আমার চোখের সামনেই ছিল৷ যতক্ষণ আমি স্টাডিতে ছিলাম, মিসেস ইউরডাইস স্প্র্যাগ উইলটা বের করে দেখবার যথেষ্ট সময় পেয়েছিলেন৷ আমি ফিরে এসে ওটাকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেছি৷ তাহলে তিনি নিশ্চয়ই উইলটা বের করে রেখেছিলেন৷ তার ওটা পাল্টে সাদা কাগজ ভরবার সুযোগ ছিল৷ কিন্তু কোন উদ্দেশ্য নেই৷ কারণ, তিনি দেখেছেন যে উইলে তার নামে সম্পত্তির বিশাল অংশ রয়েছে৷ তাই তিনি নিশ্চয়ই সেটা পাল্টে সাদা কাগজ রেখে তার সৌভাগ্য বৃক্ষের পায়ে নিজে হাতে কুড়ুল মারবেন না৷ মিঃ স্প্র্যাগের বেলায়ও তাই৷ তার সুযোগ ছিল ওটাকে বদল করবার; আমার অফিসে তিনি দু’তিন মিনিট সময় পেয়েছিলেন৷ কিন্তু তাতে তার স্বার্থহানি ছাড়া আর কোন লাভ হত না৷ তাই আমরা এক বিচিত্র সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি৷ দু’জন লোক—যাদের সুযোগ ছিল কিন্তু কোন উপায় ছিল না৷ এবং আর দুজন—জর্জ্জ ও মেরি—যাদের উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু কোন সুযোগ ছিল না৷ হ্যাঁ, আর একটা কথা, আমি কিন্তু এম্মাকে বাদ দিচ্ছি না৷ ওরও উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু সুযোগ ছিল না৷ কারণ খামটা তুলে আমার হাতে দেওয়ার মধ্যে ভেতরের উইলটা পাল্টানো সম্ভব ছিল না৷ কিন্তু সে যদি সুযোগ পেতো তবে সে সেটা পাল্টাতে দ্বিধাত করত না৷ কারণ সে একজন অনুগত পরিচারিকা ছিল এবং বহুবছর সাইমনের কাছে কাজ করেছে৷ তার পক্ষে বদলে অন্য ডুপ্লিকেট খাম, দেওয়াও সম্ভব ছিল না, কারণ খামটা আমি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম৷ তার ডুপ্লিকেট ও বাড়ীতে কারো পক্ষে সংগ্রহ করা অসম্ভব ছিল৷

মিঃ পেথারিক হাসিমুখে তাকালো উপস্থিত পাঁচজনের দিকে৷

আমার মনে হয় আমি বেশ ভালভাবেই গল্পটা আপনাদের বলতে পেরেছি৷ এটাই হল আমার ছোট্ট সমস্যা৷ এবার আপনাদের মতামত শুনতে পেলে আমি খুব খুশী হব৷

মিস ম্যার্পল চাপা হাসি হাসলেন৷ মনে হল কাহিনীর কোন বিশেষ অংশ তার আছে খুবই আনন্দদায়ক বলে মনে হয়েছে৷

কি হল, আণ্ট জেন? ব্যাপারটা কি আমরা শুনতে পারি না? রেমণ্ড ওয়েস্ট বলল৷

আমি টমি সিমণ্ডস—ভীষণ দুষ্টু ছেলে—ওর কথা ভাবছিলাম৷ খুব দুষ্টুমী করে কিন্তু সময়ে সময়ে ভারী মজা করে৷ এমনিতে সব সময় মন হয় অন্য ছেলেদের মতই দুষ্টুমীর চিন্তা৷ এই সেদিন ও স্কুলে মিসেস ভার্সটন-এর ছেলের গায়ে রং দিয়ে দিয়েছিল৷ মিসেস ভার্সটন যখন ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে টমিকে বকতে এলেন তখন টমি বলল, আনম ওর গায়ে দিইনি৷ মিসেস ভার্সটন ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখেন টমির কথা ঠিক৷ তখন নিরে ছেলের কান মলে দিয়ে বললেন, বিল, আর কখনও মিথ্যে কথা বলবে না৷ ভীষণ মজার ব্যাপার, আমি ও ছোটবেলার ঐ রকম দুষ্টুমী করতাম৷

হতে পারে মজার ব্যাপার৷ কিন্তু আণ্ট জেন, এর সঙ্গে মিঃ পেখারিকের কাহিনীর তো কোন সম্বন্ধ দেখছি না৷ —রেমণ্ড বলল৷

না না, সম্বন্ধ আছে, মিস ম্যার্পল বললেন, দুটোই মুগ্ধ করার মত গল্প৷ সহজ অথচ চতুর প্রশ্ন তাই না, মিঃ পেথারিক?

আমি ভাবছি আপনি সত্যিই এর উত্তরটা জানেন কিনা? আইনজীবী পেথারিক মিটমিটে হাসি হাসলেন৷

একটুকরো কাগজের উপর মিস ম্যার্পল কিছু লিখে সেটা ভাঁজ করে পেখারিকের দিকে বাড়িয়ে দিলেন৷

তিনি ওটা খুলে পড়লেন৷ তারপর সপ্রশংস দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন ম্যার্পলের দিকে, মাই ডিয়ার মিস ম্যার্পল, এমন কোন সমস্যা কি পৃথিবীতে আছে যার উত্তর আপনি জানেন না?

ছোটবেলা হতেই জানতাম এগুলো৷ অনেক খেলা করেছি এই জিনিসগুলো নিয়ে৷ লজ্জা নম্র কণ্ঠে জবাব দিলেন মিসেস ম্যার্পল৷

আমার মনে হচ্ছে আমাকে এ সম্বন্ধে অন্ধকারে রাখা হচ্ছে৷ কপট গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন স্যর হেনরী, সম্ভবত মিঃ পেথারিক কোন আইনের ভেল্কীর কথা চেপে যাচ্ছেন৷

না না৷ মিঃ পেথারিক বললেন, মোটেও না৷ অতি সাধারণ সহজ সমাধান এই গল্পটার৷ মিস ম্যার্পলের কথায় আপনারা কান দেবেন না৷ তার দৃষ্টিভঙ্গী আলাদা রকমের৷

সমাধানটা আমরা নিশ্চয়ই বের করতে পারব৷ জোর গলায় বললো রেমণ্ড ওয়েস্ট, ঘটনাগুলো এমনিতে অত্যন্ত সরল এবং সাধারণ৷ ঠিকভাবে বলতে গেলে পাঁচজন হাত দিয়েছিল খামটায়৷ স্প্র্যাগরা উইলটা বদল করতে পারত, কিন্তু তার কোন অর্থ হয় না—কারণ ব্যাপারটা হত ওদের স্বার্থবিরুদ্ধ৷ সুতরাং বাকী রইল তিনজন৷ আমার মনে হয় জর্জ্জ ক্লোডই বদল করেছে উইলটা—যখন সে কোটটাকে নিয়ে গিয়ে চেয়ারে রাখছিল৷ মিঃ পেথারিক, এখানে আপনাকে মনে রাখতে হবে সাধারণ যাজুকরদের হাত সাফাই-এর কথা৷ জর্জ্জ ক্লোড হয়তো৷ আপনার চোখের সামনেই ঐ হাত সাফাইটা করেছিল আপনার চোখে ধুলো দিয়ে৷

আমার কিন্তু মনে হয় মেয়েটাই এর জন্য দায়ী৷ জয়েস বলল, হয়তো এম্মা দৌড়ে নীচে গিয়ে মেরীকে বলেছিল ওপরে কি হচ্ছে৷ তখন মেরী আরেকটি নীল খাম (সাদা কাগজ ভরা) নিয়ে পাল্টাপাল্টি করে দিয়েছিল৷

স্যর হেনরী মাথা নাড়লেন৷ আমি তোমাদের কারো সঙ্গেই একমত হতে পারলাম না৷ ধীরে ধীরে বললেন তিনি, আমার মনে হয় হাত সাফাইয়ের ব্যাপারটা স্টেজে বা গল্প উপন্যাস চলতে পারে, কিন্তু বাস্তবে নয়, বিশেষ করে একজন বিচক্ষণ আইনজীবীর চোখের সামনে৷ কিন্তু আমার একটা মতমত আছে৷ সেটা যে সত্যি তা আমি বলছি না, শুধু মাত্র আমার ধারণার কথাই আমি বলবো৷ এটা বলা বোহয় যুক্তিসঙ্গত, যে স্প্র্যাগরা প্রফেসর লংম্যানের সঙ্গে সাইমনের সাক্ষাৎকারের ফলাফল সম্বন্ধে খুবই চিন্তিত ছিল৷

যদি সাইমন প্রফেসর কথায় তাদের অবিশ্বাস করে, যা খুবই সম্ভব ছিল তবে মিঃ পেথারিকের আগমনের সম্পূর্ণ বিপরীত একটা ব্যাখ্যা ওরা করতে পারে৷ হয়তো ওদের বিশ্বাস ছিল যে, সাইমনের আগেই মিসেস স্প্র্যাগের নামে উইল করেছিলেন৷ এখন মিঃ পেথারিককে ডাকার কারণ সেই উইল নষ্ট করে নতুন উইল তৈরী করা৷ তাতে মিসেস স্প্র্যাগ বঞ্চিতও হতে পারেন, তার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল৷ তাই যদি হয়, তবে মিসেস স্প্র্যাগ উইলের মর্ম জানতে চেয়েছিলেন নিশ্চিত হবার জন্য৷

কিন্তু উইল পাল্টানোর পর ওটা পরে দেখবার আগেই মিঃ পেথারিক এসে ঘরে ঢুকলেন৷ হয়তো মিসেস স্প্র্যাগ ওটা না পরেই, ধরা পড়ার ভয়ে ফায়ার প্লেসে ফেলে দিয়েছিলেন৷

জয়েস বলল, অসম্ভব! কোন মেয়েই ঐ অবস্থায় ওটাকে না পড়ে পোড়াতে পারে না৷ ধরা পড়লেই বা, তিনি তো আর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হতেন না৷

সমাধানটা ঠিক জোরালো নয়৷ স্বীকার করলেন স্যর হেনরী, আশা করি মিঃ পেথারিক, আপনি ব্যাপারটাতে সাহায্য করেননি?

যদিও খুবই হাস্যকর অবাস্তব চিন্তা তবু মিঃ পেথারিক উঠে দাঁড়ালেন৷—সম্পূর্ণ ভুল ধারণা৷ প্রতিবাদ করলেন তিনি৷

ডঃ পেণ্ডার, আপনার কি ধারণা? প্রশ্ন করলেন স্যর হেনরী৷

আমার সুস্পষ্ট কোন ধারণা নেই৷ তবে মনে হয় বদলের ব্যাপারটার জন্য মিঃ অথবা মিসেস স্প্র্যাগই দায়ী৷ মোটিভ, স্যর হেনরী যা বললেন তাই৷ যদি মিসেস স্প্র্যাগ উইলটা মিঃ পেখারিক চলে যাবার পর পড়ে থাকেন তাহলে তিনি পড়বেন উভয় সঙ্কটে৷ সম্ভবত তখন তিনি উইলটাকে সাইমনের কাগজপত্রের সঙ্গে রেখে দেবেন—তিনি মারা গেলে যেন ওখান থেকে উইলটা আবিষ্কৃত হয়৷ কিন্তু তা যখন পাওয়া যায়নি, তা থেকে এটা ধরে নেওয়া যায় যে এম্মা হঠাৎই ওটা দেখতে পায় এবং ওটাকে নষ্ট করে ফেলে৷

ডঃ পেণ্ডারের সমাধানটাই বোধহয় সঠিক৷ বলল জয়েস, তাই না মিঃ পেথারিক?

আইনজীবী মিঃ পেথারিক ঘাড় নাড়লেন৷

এবার আমি গল্পের বাকী অংশ বলব৷ উইলটা না পেয়ে আমি একেবারে অবাক হয়ে গেলাম৷ আপনাদের মতই আমি তখন অকুল পাখারে৷ আমার ধারণা আমি কোনদিন আসল ব্যাপারটা জানতে পারতাম না, যদি না একজন এ রহস্যের উপর চতুরভাবে আলোকপাত করত৷

প্রায় একমাস পরে ডিনারের আমন্ত্রণ পেয়ে আমি ফিরিপ গ্যারডের বাড়ি গেলাম৷ খাওয়া দাওয়ার পর সে একটা কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার কথা বলল৷

আমি আপনাকে ঘটনাটা বলতে পারি তবে আশাকরি আপনি সেটা গোপন রাখবেন৷

নিশ্চয়৷ আমি জবাব দিলাম৷

আমার এক বন্ধু তার এক আত্মীয়ের কাছ হতে উত্তরাধিকার আশা করেছিল৷ কিন্তু হঠাৎ সে জানতে পারল সেই আত্মীয় একজন অপদার্থকে সবকিছু দিয়ে যাচ্ছেন৷ আমার বন্ধু তার পদ্ধতির ব্যাপারে সামান্য নীতি-জ্ঞানহীন বলতে পারেন৷ সেই আত্মীয়ের বাড়িতে একজন পরিচারিকা ছিল যে আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারীর পক্ষে ছিল (আমার বন্ধুর)৷ আমার বন্ধু তাকে কতগুলো সহজ নির্দেশ দিয়েছিল৷ সে একটা ফাউন্টেন পেন পরিচারিকাটিকে দিয়ে বলেছিল তার মনিবের (সেই আত্মীয়) রাইটিং টেবিলের ড্রয়ারে রাখতে—যে ড্রয়ারে সব সময় পেন থাকত সে ড্রয়ারে নয়, অন্য ড্রয়ারটায়৷ তাকে বলা হয়েছিল যে, যদি কোনদিন তার মনিব কোন কাগজপত্রে তাকে সাক্ষী হতে বলে এবং পেন আনতে বলে তবে সে যেন বন্ধুর দেওয়া পেনটা এনে দেয়৷ আর কোন কথা সে মেয়েটিকে জানায়নি৷ কিন্তু পরিচারিকা মেয়েটি অত্যন্ত অনুগত ছিল এবং সে বন্ধুর কথা অনুযায়ী কাজ করেছিল৷

হঠাৎ সে বলল মিঃ পেথারিক, আপনার নিশ্চয়ই শুনতে খারাপ লাগছে না?

না না, আমি মনোযোগ দিয়েই শুনছি৷ আমাদের চোখাচোখি হল৷

আমার বন্ধু কিন্তু আপনার পরিচিত নয়৷

নিশ্চয়ই নয়৷ আমি আপনার বন্ধুকে চিনিই না৷

শুনে খুশী হলাম৷ বলল ফিলিপ গ্যারড৷

একটু থেমে সে আবার বলল হাসিমুখে—আপনি আশা করি বুঝতে পারছেন?...পেনটা যে কালি দিয়ে ভর্ত্তি ছিল তাকে বিলীয়মান বা ক্ষণস্থায়ী কালি বলতে পারেন৷ এই কালি তৈরী হয়, স্টার্চ ও জলের দ্রবণে দু-এক ফোঁটা আয়োডিন দিলে৷ এতে একটা ঘন নীলচে কালো তরল কালি হয়৷ কিন্তু এই কালি দিয়ে লিখলে সে লেখা চার-পাঁচদিনের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়৷

মিস ম্যার্পলে চাপা হাসি হাসলেন৷

অদৃশ্য হয়ে যাওয়া কালি৷ বললেন তিনি, ছোটবেলার ওরকম কালি দিয়ে আমরা কত খেলা করেছি৷ বন্ধু-বান্ধবদের গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে মজা করেছি৷

মিস ম্যার্পল সহাস্য মুখে প্রত্যেকের ওপর চোখ বোলালেন৷ তারপর মিঃ পেথারিকের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করে বললেন, তবুও মিঃ পেথারিক, এটা একটা সহজ চতুর রহস্য৷ দারুণভাবে উপস্থিত করেছেন প্রশ্নটা—একজন আইনজ্ঞের মতই!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%