আলোছায়ার খেলা

অনীশ দেব

প্রথম পরিচ্ছেদ

১৭৮২ সালে ক্যাপ্টেন রজার অ্যাংমারিং যখন লেদারকোম্ব উপসাগরে এক দ্বীপে একটি বাড়ি তৈরি করলেন, তখন সেটাকে তাঁর খামখেয়ালিপনার চূড়ান্ত বলেই ধরে নেওয়া হয়েছিলো৷ তাঁর মতো একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে, নদী-বয়ে-যাওয়া, সবুজ-ঘাসে-ছাওয়া কোন বিস্তীর্ণ প্রান্তরে একটা প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করাটাই ছিলো বেশি স্বাভাবিক৷

কিন্তু ক্যাপ্টেন রজার অ্যাংমারিং-এর পরম ভালোবাসা ছিলো একটিমাত্র জিনিসের প্রতি—সমুদ্র৷ সুতরাং প্রয়োজন অনুয়ায়ী বেশ শক্ত কাঠামোয় তিনি বাড়িটা তৈরি করলেন, চঞ্চল বাতাস ও গাঙচিল অধ্যুষিত ছোট্ট পাথুরে অন্তরীপের ওপর—জোয়ারে সময় সেটা মুল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তো৷

তিনি বিয়ে করেননি, সমুদ্রই ছিলো তাঁর প্রথম ও শেষ সঙ্গিনী, এবং তাঁর মৃত্যুর পর সেই বাড়ি এবং দ্বীপের মালিক হলেন তাঁর দূরসম্পর্কে এক ভাই৷ সেই ভাই এবং তাঁর বংশধরেরা এই সম্পত্তি নিয়ে বিশেষ মাথা ঘামালেন না৷ তাঁদের নিজেদের জমি-জমা ক্রমশ কমে আসছিলো এবং তাঁদের উত্তরাধিকারীদের অবস্থা ক্রমে যেতে লাগলো খারাপের দিকে৷

অবশেষে ১৯২২ সালে ‘সমুদ্রতীরে-অবসর যাপনের’ সৌখিন রীতি যখন প্রচলিত হলো এবং গ্রীষ্মকালেও ডেভন ও কর্নওয়াল উপকূলের আর অসহ্য বলে মনে হলো না, আর্থার অ্যাংমারিং আবিষ্কার করলেন, তাঁর বিশাল অসুবিধাজনক জর্জীয় বাড়ি আর বিক্রি হবার নয়, কিন্তু সমুদ্রচারী ক্যাপ্টেন রজারের সংগ্রহ করা অন্যান্য সম্পত্তির বিনিময়ে তিনি ভালো দামই পেলেন৷

সুদৃঢ় বাড়িটাকে পরিবর্ধনের পর সাজিয়ে তোলা হলো৷ মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপ পর্যন্ত তৈরি হলো একটা কংক্রিটের সেতু৷ পরিকল্পনা-মাফিক দ্বীপের সর্বত্র তৈরি হলো ‘মনোরম পথ’ ও অবসর যাপনের নিভৃত স্থান৷’ তৈরি হলো দুটো টেনিস কোর্ট, ভেলা ও স্প্রীং-পাটাতনে সাজানো সৈকতের দিকে নেমে আসা খোলা চত্বর৷ জলি রজার হোটেল স্মাগলার্স দ্বীপ, লেদারকোম্ব উপসাগর একই সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করলো বিজয়ীর ভঙ্গিতে৷ এবং জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (সেই সঙ্গে ইস্টারে ছোট্ট মরসুমেও) জলি রজার হোটেলে সাধারণ তিলধারণের জায়গা থাকতো না৷ ১৯৩৪-এ হোটেলের উন্নয়নকল্পে একটা পানশালা, একটা বড় খাবার-ঘর ও কয়েকটা অতিরিক্ত কলঘর তৈরি করা হলো৷ মাথাপিছু থাকার খরচও গেলো বেড়ে৷

লোকে বলতো, ‘লেদারকোম্ব উপসাগরে কখনও গেছেন? একটা দ্বীপের মতো জায়গায় ভীষণ ভালো একটা হোটেল আছে৷ খুব আরামের জায়গা, কোন উটকো লোক বা শ্যারাব্যাং-গাড়ির ঝামেলা নেই৷ রান্নাবান্না আর তদারকি চমৎকার৷ ওখানে আপনার যাওয়া উচিত৷’

এবং সত্যিই লোকে যেতো৷

বর্তমানে একজন বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তি (অন্তত তাঁর নিজের মতো) জলি রজারে বাস করছেন৷ একটি আধুনিক ডেক চেয়ারে গা এলিয়ে তিনি অলস দৃষ্টি মেলে দিয়েছেন সামনের সমুদ্রতীরের দিকে৷ পরনের তাঁর দুধ-সাদা ধবধবে স্যুট, মাথার পানামা টুপি চোখের ওপর নামানো; গোঁফজোড়া বাঁকানো রাজকীয় পদ্ধতি৷

হোটেলের দিক থেকে সিমেন্ট বাঁধানো একাধিক চত্বর ঢালু হয়ে নেমে এসেছে সমুদ্রতীরের দিকে৷ সামনের বেলাভূমিতে ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে রবার ও ক্যাম্বিশের নৌকো, পলিথিনের বল, খেলনা এবং কয়েকটা ভসিকা৷ তীর থেকে বিভিন্ন দূরত্বে চোখে পড়ছে তিনটি ভেলা ও একটা দীর্ঘ স্প্রীং-পাটাতন৷ সমুদ্র-স্নানার্থীদের কয়েকজন স্নান করছেন, কেউ বা সৈকতে শরীর মেলে সূর্যস্নানে ব্যস্ত, আর কেউ কেউ শরীরে বুলিয়ে চলেছেন তেলের প্রলেপ৷

স্নানবিমুখ অতিথিরা বসে রয়েছেন বেলাভূমিসংলগ্ন খোলা বারান্দায়, তাঁদের কথাবার্তা প্রধানত আবহাওয়া, সৈকতের দৃশ্য, প্রাত্যাহিক সংবাদপত্রের খবর এবং অন্য যে-কোন আলোচনাসাপেক্ষ বিষয়ে সীমাবদ্ধ ছিলো৷

পোয়ারের বাঁ দিক থেকে মিসেস গার্ডেনারের অবিশ্রান্ত একঘেয়ে কথাবার্তার স্রোত ভেসে আসছে৷ কিন্তু মিসেস গার্ডেনারের কর্মব্যস্ত হাত এক মুহূর্তের জন্যেও বিচলিত হচ্ছে না৷ তাঁর কথার স্রোত এবং উল বোনার কাঁটা অভিজ্ঞতালব্ধ দক্ষতায় একই সঙ্গে তাল রেখে এগিয়ে চলেছে৷ তাঁর ঠিক পেছনেই একটা দোলনা-চেয়ারে গা এলিয়ে শুয়ে আছেন তাঁর স্বামী, ওডেল. সি. গার্ডেনার; মাথার টুপিটা টেনে নামানো তাঁর নাকের ওপর, এবং কোনরকম অনুমতি অথবা উৎসাহ পেলেই তিনি সংক্ষিপ্ত মন্তব্যে সরব হচ্ছেন৷

পোয়ারোর ডান পাশে বসে মিস ব্রুস্টার৷ তাঁর মাথার চুল ধূসর; মুখমণ্ডলের গড়নে প্রকৃত সহিষ্ণুতার ছাপ; শরীরের গঠন অনেকটা অ্যাথলিটদের মতো৷ থেকে থেকে তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর শোনা যাচ্ছে, যেন কোন পমেরেনিয়ান কুকুরের যতিহীন তীক্ষ্ণ চিৎকারকে কোন শিকারি হাউন্ডকর্কশ ধমকের সাহায্যে বাধা দিতে চেষ্টা করছে৷

মিসেস গার্ডেনার তখন বলে চলেছেন, ‘আর সেই জন্যেই মিঃ গার্ডেনারকে আমি বললাম, প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করা খুব ভালো, আমি বললাম, এবং যে-কোন জায়গা আমি তন্ন তন্ন করে ঘুরে দেখতে চাই৷ এমনিতে, আমি বললাম, গোটা ইংল্যান্ডটা আমরা মোটামুটি ঘুরে দেখেছি আর এখন আমি যা চাই তা হলো সমুদ্রের কাছাকাছি কোন শান্ত পরিবেশে গিয়ে নিছক বিশ্রাম করতে৷ আমি তাই বলেছি, বলিনি, ওডেল? শুদ্ধ বিশ্রাম৷ বেশ বুঝতে পারি, আমার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন, আমি ওকে বলেছি৷ তাই না ওডেল?’

মিঃ গার্ডেনার তাঁর টুপির নিচ থেকে অনুচ্চ কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, সোনা৷’

মিসস গার্ডেনার বিনা বিলম্বে তাঁর কাহিনি পশ্চাদ্ধাবনে মনোনিবেশ করলেন৷

‘আর সেই কারণেই, যখন আমি ‘কুক’-এর মিঃ কেলসাকো একথা জানালাম, তিনি যেচে আমাদের বেড়ানোর সমস্ত ব্যবস্থা করে দিলেন৷ তিনি না থাকলে আমরা যে কি করে কি করতাম, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন!—যাকগে, যা বলছিলাম মিঃ কেলসোকে এ জায়গাটার কথা বলামাত্রই তিনি বললেন, এর চেয়ে ভালো জায়গা আর নেই৷ নির্জন, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ, সঙ্গে পরিচর্যার সুব্যবস্থা; সব দিক থেকেই জলি রজার অন্য সব হোটেলের চেয়ে আলাদা৷ অবশেষে মিঃ গার্ডেনারের তখন জল-কলের ব্যবস্থার কথা জানতে চেয়েছিলেন৷ কারণ বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, মঁসিয়ে পোয়ারো, মিঃ গার্ডেনারের এক বোন একবার এই জাতীয় একটি অতিথিশালায় দিন কয়েকের জন্য ছিলেন, কিন্তু শুনলে অবাক হবেন, সেখানকার কলঘরে অবস্থা ছিলো নিতান্তই গ্রামের মতো—মাটির তৈরি৷ সুতরাং স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের ‘নির্জন, সুন্দর’ জায়গা সম্পর্কে মিঃ গার্ডেনার একটু সন্দেহপ্রবণ, তাই না, ওর্ডেল?’

‘নিশ্চয়ই, সোনা৷’ বললেন মিঃ গার্ডেনার৷

‘কিন্তু মিঃ কেলসো সঙ্গে-সঙ্গেই আমাদের আশ্বাস দিলেন৷ বললেন, জল-কলের ব্যবস্থা একেবারে আধুনিক এবং রান্না অত্যন্ত চমৎকার৷ এখন দেখছি, সে কথা সত্যি৷ আর আমি সবচেয়ে যেটা পছন্দ করি, তা হলো সময়ানুবর্তিতা—বুঝতেই তো পারছেন কি বলতে চাইছি৷ তাছাড়া এলাকাটা ছোট হওয়ার প্রত্যেকের সঙ্গেই প্রত্যেকের আলাপ পরিচয়ের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে৷ ইংরেজদের যদি কোন দোষ থেকে থাকে তা হলো আপনার সঙ্গে পরিচয় বছর দুয়েকের পুরোনো না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা একটু আলগা থাকতে চায়৷ অবশ্য তার পরে তাঁদের অন্তরঙ্গতার জুড়ি মেলা ভার৷ মিঃ কেলেসো আরও বললেন, নানা ধরনের বিচিত্র সব মানুষ এসে ভিড় করে এই স্মাগলার্স দ্বীপে, এবং সে কথা যে মিথ্যে নয়, এখন দেখতে পাচ্ছি৷ আপনি রয়েছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, আর রয়েছেন মিস ডানলি৷ ওহ্! আপনার আসল পরিচয় পেয়ে আমরা তো পালকের ঘায়ে মূর্ছা যাবার মতো অবস্থা—তাই না, ওডেল?’

‘হ্যাঁ, সোনা৷’

‘সত্যি!’ সামান্য সুযোগ পেয়েই সরব হলেন মিস ব্রুস্টার, ‘কি রোমাঞ্চকর ব্যাপার, তাই না মঁসিয়ে পোয়ারো?’

ক্ষীণ প্রতিবাদে হাত তুললেন এরকুল পোয়ারো৷ কিন্তু সে প্রতিবাদ নিছক ভদ্রতাবশেই৷ মিসেস গার্ডেনার সাবলীলভাবে এগিয়ে চললেন৷

‘জানেন, মঁসিয়ে পোয়ারো কর্নেলিয়া রবসনের কাছে আপনার সম্বন্ধে আমি অনেক কিছু শুনেছি, গত মে মাসে আমি এবং মিঃ গার্ডেনার ব্যাডেনহফে ছিলাম, সেই সময়েই কর্নেলিয়া মিশরের ব্যাপারটা আমাদের বলেছে—যখন লিনেট রিজওয়ে খুন হয়৷* ও বলেছে, আপনি যেভাবে ঘটনাটার সমাধান করেছেন, তা এক কথায় অপূর্ব আর সেই থেকেই আপনাকে দেখবার জন্যে আমি একেবারে পাগল, তাই না, ওডেল?’

‘হ্যাঁ সোনা৷’

‘তারপর ধরুন মিস ডার্নলির কথা৷ আমার বেশির ভাগ জামাকাপড়ই৷ ‘রোজ মন্ড’ থেকে কেনা—আর উনিই তো রোজ মন্ডের মালিক, তাই না? ওঁর দোকানের পোশাকগুলোর একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে৷ গত রাতে আমি যে পোশাকটা পরেছিলাম সেটাও তো ওঁরই দোকান থেকে কেনা৷ সব দিক দিয়েই মেয়েটিকে আমার ভীষণ ভালো লাগে৷’

মিস ব্রুস্টারে পেছন থেকে মেজর ব্যারী, যিনি তাঁর বিস্ফারিত চোখ স্নানার্থীদের ওপরে নিবদ্ধ রেখে বসেছিলেন, গম্ভীর স্বরে মন্তব্য করলেন, মেয়েটির চেহারায় বিশেষত্ব আছে!’

মিসেস গার্ডেনার উল বোনার কাঁটা সশব্দে সচল হলো৷

‘একটা কথা আমি স্বীকার না করে পারবো না, মঁসিয়ে পোয়ারো আপনাকে এখানে দেখে আমি ভীষণ অবাক হয়েছি৷ সেই সঙ্গে রোমাঞ্চিতও যে হইনি তা নয়৷ মিঃ গার্ডেনারও সে কথা জানেন৷ আমার যেন হঠাৎই মনে হলে, আপনি এখানে এসেছেন নিতান্তই আপনার—পোশার প্রয়োজনে, আশা করি বুঝতে পারছেন আমি কি বলতে চাইছি? এমনিতে আমার অনুভূতি অত্যন্ত প্রখর, মিঃ গার্ডেনারও আপনাকে সেই কথাই বলবেন, আর যে-কোন ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত হওয়াটাকে আমি একেবারেই বরদাস্ত করতে পারি না৷ দেখুন—’

মিঃ গার্ডেনার গলা-খাঁকারি দিয়ে উঠলেন, বললেন, ‘দেখতেই পাচ্ছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, মিসেস গার্ডেনারের চোখ সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি প্রখর৷’

এরকুল পোয়ারোর দু’হাত শূন্যে বিক্ষিপ্ত হলো৷

‘আমাকে অন্তত একবার আশ্বাস দেবার সুযোগ দিন, মাদাম—আমি এখানে আপনাদের মতোই ছুটি কাটাতে; আনন্দ করতে—এসেছি, কোন অপরাধের কথা আমি এখন চিন্তাও করছি না৷’

মিস ব্রুস্টার সংক্ষিপ্ত রুক্ষ স্বরে মন্তব্য করলেন, ‘স্মাগলার্স দ্বীপে কোন ‘দেহ’ নেই৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘কিন্তু সে কথা পুরোপুরি সত্যি নয়৷’ তিনি আঙুল তুলে নির্দেশ করলেন নিচের বেলাভূমির দিকে, ‘ওদিকে একবার তাকিয়ে দেখুন, সারি সারি শুয়ে থাকা শরীরগুলো৷ ওগুলো কি? মোটেই পুরুষ কিংবা মহিলা নয়৷ ওদের নিজস্ব কোন বৈশিষ্ট্য নেই৷ ওরা শুধুই দেহ!’

মেজর ব্যারী সপ্রশংস সুরে বললেন, ‘ওদের মধ্যে কয়েকটা মেয়ের চেহারা দেখবার মতো! যদিও একটু রোগার দিকে৷’

পোয়ারো জোরালো কণ্ঠে বললেন, ‘সুন্দর চেহারা মানছি, কিন্তু কি আবেদন আছে এর? কি রহস্য আছে? আমি, আমি বৃদ্ধ সেকেলে লোক৷ যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন বড়জোর গোড়ালিটুকু দেখা যেতো৷ সফেন সেমিজের সামান্য আভাস লুব্ধ করার মতো৷ পায়ের গোছের মসৃণ স্ফীতি—হাঁটু—মোজা বাঁধার ফিতে—’

‘দুষ্টু, দুষ্টু৷’ কর্কশ স্বরে বলে উঠলেন মেজর ব্যারী৷

‘আজকাল আমরা যে সব পোশাক পরি, তা অনেক বেশি মনোজ্ঞ৷’ মিস ব্রুস্টার বললেন৷

‘নিশ্চয়ই মঁসিয়ে পোয়ারো’, বললেন মিসেস গার্ডেনার, ‘আমার তো মনে হয়, জানেন, যে আজকালকার ছেলেমেয়েরা অনেক বেশি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করে৷ একসঙ্গে মিলে হৈ-হৈ করে বেড়ায়, আর ওরা—মানে, ওরা—’মুখের রক্তিম আভাসে মিসেস গার্ডেনারের মনের পরিচয় পাওয়া গেলো, ‘ওরা এই মেলামেশার ফলাফলের কথা একেবারেই চিন্তা করে না, বুঝতেই তো পারছেন?’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন৷’ এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘রীতিমতো দুঃখের কথা৷’

‘দুঃখের কথা?’ মিসেস গার্ডেনার তীক্ষ্ণ স্বরে বললেন৷

সমস্ত সুখকল্পনা, সমস্ত রহস্যের অপমৃত্যু—দুঃখেরী কথা নয়? আজকাল সব কিছুরই মানদণ্ড নির্দিষ্ট হয়ে গেছে৷’ তিনি হাত তুলে অর্ধশায়িত দেহগুলোর দিকে নির্দেশ করলেন, ‘ওই শরীর গুলো এই মুহূর্তে আমাকে প্যারিসের ‘লাশ-রাখা-ঘর’-এর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে৷’

‘মঁসিয়ে পোয়ারো৷’ মিসেস গার্ডেনার অস্বস্তি-অনুযোগের সুরে বলে উঠলেন৷

‘দেহ পাথরে ওপর সাজানো—অনেকটা মাংসের দোকানের মতো৷’

‘কিন্তু, মঁসিয়ে পোয়ারো, এ বড্ড কষ্টকল্পিত, তাই না?’

এরকূল পোয়ারো স্বীকার করলেন৷

‘হ্যাঁ—হয়তো৷’

‘তা হলেও,’ মিসেস গার্ডেনার দ্রুত হাতে বুনতে শুরু করলেন, ‘একটা বিষয়ে আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত যে সব মেয়েরা এভাবে খালি গায়ে রোদে শুয়ে থাকে, তাদের হাতে পায়ে অতিরিক্ত লোম জন্মাতে বাধ্য৷ আমি সেই কথাই বলেছি আমার মেয়ে আইরীনকে, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আইরীনকে বলেছি, তুমি যদি এভাবে খালি গায়ে রোদে শুয়ে থাকো, তাহলে তোমার সারা শরীরে লোমে ছেয়ে যাবে, হাতে লোক হবে, পায়ে লোম হবে, বুকে লোম হবে, আর তখন তোমাকে কিরকম দেখাবে বলো তো? আমি ওকে বলেছি৷ বলিনি ওডেল?’

‘হ্যাঁ, সোনা৷’ বললেন মিঃ গার্ডেনার৷

কিছুক্ষণ সকলেই চুপচাপ৷ সম্ভবত আইরীনের চূড়ান্ত বিপর্যস্ত চেহারাটা তাঁরা মনে মনে কল্পনা করার চেষ্টা করছিলেন৷

মিসেস গার্ডেনার এবার তাঁর সেলাই গুছিয়ে নিলেন, বললেন, ‘তাই ভাবছি—’

মিঃ গার্ডেনার বললেন, ‘কি হলো, সোনা?’

তিনি দোলনা চেয়ার ছেড়ে উঠে এলেন এবং হাত বাড়িয়ে মিসেস গার্ডেনারের কাছ থেকে সেলাই ও সেলাইয়ের বইটা নিলেন৷ তিনি জিগ্যেস করলেন, ‘মিস ব্রুস্টার, আসবেন নাকি, একসঙ্গে বসে একটু গলা ভেজানো যাক?’

‘না, এখন নয়, ধন্যবাদ৷’

গার্ডেনারা হোটেলের দিকে এগিয়ে চললেন।

মিস ব্রুস্টার বললেন, ‘মার্কিন স্বামীরা দারুণ চমৎকার৷’

মিসেস গার্ডেনারের শূন্যস্থান পূরণ করলেন ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷

তাঁর পঞ্চাশস্পর্শী দীর্ঘকায় শরীরে সতেজ আভাস সুষ্পষ্ট৷ মুখের রঙ তামাটে, পরনের গাঢ় ধূসর প্যান্টে অবসরসুলভ অগোছালো ছাপ৷

তিনি উৎসাহভরে বললেন, ‘চমৎকার জায়গা৷ লেদারকোম্ব উপসাগর থেকে হারফোর্ড পর্যন্ত গিয়েছিলাম, আর ফেরার সময় পাহাড়ি রাস্তা ধরে ফিরে এলাম৷’

‘আজকের দিনে হেঁটে বেড়ানো পরিশ্রমের কাজ৷’ বললেন মেজর ব্যারী৷ হাঁটাহাঁটি তিনি একদম পছন্দ করেন না৷

‘ভালো ব্যায়াম৷’ মিস ব্রুস্টার বললেন, ‘এখনও আমার নৌকো নিয়ে বেরোনো হলো না৷ পেটের পেশীর পক্ষে নৌকো চালানোর চেয়ে ভালো ব্যায়াম নেই৷’

পোয়ারোর বিষণ্ণ দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে এলো নিজের স্ফীত মধ্যদেশের দিকে৷

মিস ব্রুস্টার সেটা লক্ষ্য করে সান্ত্বনার সুরে বললেন, ‘রোজ যদি নৌকো নিয়ে বেরোন, তাহলে আপনার ওই ভুঁড়ি দিন কয়েকের মধ্যেই মিলিয়ে যাবে, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’

‘মাপ করবেন, মাদামোয়াজেল, নৌকো জিনিসটাকে আমি অত্যন্ত অপছন্দ করি৷’

‘ছোট নৌকো?’

‘উঁহু, বড়-ছোট সব রকমের নৌকো৷’ চোখ বুজে শিউরে উঠলেন তিনি, ‘সমুদ্রের দুলনি মোটেই সুখের নয়৷’

‘কি বললেন৷ সমুদ্র আজ পুকুরে মতো শান্ত৷’

পোয়ারো প্রত্যয়ের সুরে উত্তর দিলেন, ‘শান্ত সমুদ্র বলে সত্যি কিছু নেই, মাদমোয়াজেল৷ সর্বদা, সব সময়, সেখানে রয়েছে আলোড়ন৷’

‘যদি আমাকে জিগ্যেস করেন, তাহলে বলবো সমুদ্র-রোগের দশ ভাগের ন’ভাগই হচ্ছে স্নায়ুর ব্যাপার৷’ বললেন মেজর ব্যারী৷

‘এই তো,’ সামান্য হেসে ধর্মযাজক বললেন, ‘একজন অভিজ্ঞ নাবিকের কথা শুনুন—ঠিক বলেছি তো, মেজর?’

‘একবারই মাত্র অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম—ইংলিশ চ্যানেল পার হওয়ার সময়৷ সমুদ্র-রোগ জিনিসটাকে মনে একেবারেই আমল দেবেন না, এই হলো আমার মত৷’

‘সমুদ্র-রোগ ভারী, অদ্ভুত৷’ আনমনা সুরে বললেন মিস ব্রুস্টার, ‘সবার না হয়ে এ রোগ কারো কারো হয় কেন? এ ভারি অন্যায়৷ নিজের স্বাস্থ্যের ওপর তো কারো হাত নেই৷ রীতিমতো রুগ্ন চেহারার লোকও দক্ষ নাবিক হয়৷ একজন আমাকে বলেছিলেন, এ রোগের সঙ্গে নাকি শিরদাঁড়ায় কি একটা যোগ আছে৷ আবার অনেকে দেখি—উঁচু জায়গা একেবারেই সহ্য করতে পারে না৷ আমি নিজেও ওই দলের, কিন্তু মিসেস রেডফার্নের অবস্থা আরও খারাপ৷ এই তো সেদিন হারফোর্ডের পাহাড়ি পথে হঠাৎ মাথা ঘুরে গিয়ে তিনি আমাকে জড়িয়েই ধরলেন৷ তাঁর মুখেই শুনেছি, একেবার মিলান গীর্জা থেকে নামার পথে মাঝ-সিঁড়িতে তিনি আটকে পড়েছিলেন৷ ওঠার সময় কোনরকম চিন্তা না করেই উঠে গেছেন, কিন্তু নামার সময়েই হয়েছে বিপদ৷’

‘তাহলে পিক্সি কোভে নামার মইটা তাঁর ব্যবহার না করাই উচিত৷’ মন্তব্য করলেন স্টিফেন লেন৷

মিস ব্রুস্টার একটা মুখভঙ্গী করলেন৷

‘ওটাকে আমিও ভয় করি৷ অবশ্য ছোটদের পক্ষে মইটা ঠিক আছে৷ কাওয়ান আর মাস্টারম্যানদের ছেলেরা তো ওটা বেয়ে দৌড়ে ওঠা-নামা করতে ভালোবাসে৷’

লেন বললেন, ‘ওই যে, মিসেস রেডফার্ন স্নান সেরে ফিরে আসছেন৷’

মিস ব্রস্টার মন্তব্য করলেন, ‘ওঁকে মঁসিয়ে পোয়ারোর পছন্দ হওয়া উচিত৷ উনি সূর্যস্নান করেন না৷’

তরুণী মিসস রেডফার্ন তখন মাথা থেকে রবারের টুপিটা খুলে চুল ঝাড়ছিলো৷ ওর মাথার চুল ছাই-রঙা এবং ত্বকের রঙ চুলের সঙ্গে মানানসই মৃত-পাণ্ডুর৷ হাত ও পায়ের রঙ অত্যন্ত সাদা৷

কর্কশ চাপা হাসিতে মুখ খুললেন মেজর ব্যারী, ‘অন্যান্যদের তুলনায় রোদে একটু কম ভাজা হয়েছেন, তাই না?’

একটা দীর্ঘ স্নান-পোশাকে নিজেকে আবৃত করে ক্রিস্টিন রেডফার্ন বেলাভূমি ধরে এগিয়ে এলো ওঁদের দিকে, সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করলো৷

ওর সুন্দর মুখে গম্ভীর ছায়া৷ সুন্দর, তবে বিরুদ্ধ অর্থে, এবং হাত-পায়ের গড়ন ছোট হলেও নিখুঁত৷

ওঁদের দিকে চেয়ে হাসলো ক্রিস্টিন, স্নান-পোশাকটাকে শরীরে ভালো করে জড়িয়ে ওঁদের পাশে এসে বসলো৷

মিস ব্রুস্টার বললেন, ‘আপনি মঁসিয়ে পোয়ারোর মূল্যবান প্রশংসা অর্জন করেছেন৷ যার সূর্যস্নান করে তাদের তিনি একদম পছন্দ করেন না৷ বলছেন, তাদের অনেকটা কসাইয়ের দোকানে সাজানো মাংসের মতো দেখায়—৷’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন বিষণ্ণভাবে হাসলো, বললো, ‘যদি সত্যি সূর্যস্নান করতে পারতাম! কিন্তু তাতে আমার গায়ের রঙ বাদামি হয় না, শুধু ফোস্কা পড়ে, আর সারা হাতে বিশ্রী ফোঁটা ফোঁটা দাগ পড়ে যায়৷’

‘মিসেস গার্ডেনারের আইরীনের মতো সারা গায়ে চুল গজানোর চেয়ে তবু ভালো৷’ মিস ব্রুস্টার বললেন৷ ক্রিস্টিনের সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে তিনি বলে চললেন, ‘মিসেস গার্ডেনার আজ সকালে দারুণ মেজাজে ছিলেন৷ একেবারে এক নাগাড়ে চালিয়ে গেছেন৷ ‘তাই না, ওডেল?’ ‘হ্যাঁ, সোনা৷’ একটু থেমে তিনি বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি ওঁর সঙ্গে একটু চালাকি করলে পারতেন৷ কেন করলেন না? বললেন, না কেন, আপনি এখানে একটা নৃশংস খুনের সমাধান করতে এসেছেন, আর সেই উন্মাদ হত্যাকারীকে নিঃসন্দেহে হোটেলের অতিথিদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে?’

পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, ‘তিনি হয়তো সেটা বিশ্বাস করে বসতেন৷’

মেজর ব্যারী সশব্দ নিঃশ্বাসে হেসে উঠলেন৷ তিনি বললেন, ‘নির্ঘাত বিশ্বাস করতেন৷’

এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘না, আমার মনে হয় না, মিসেস গার্ডেনারের মতো মানুষও এখানে ঘটেছে এমন কোন খুনের কথা বিশ্বাস করতেন৷ কারণ, এটা ঠিক সে ধরনের জায়গা নয় যেখানে আপনি মৃতদেহ পাবেন৷’

পোয়ারো চেয়ারে সামান্য নড়েচড়ে বসলেন৷ প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বললেন, ‘কিন্তু কেন নয়, মাদমোয়াজেল? এই স্মাগলার্স দ্বীপে আপনার ভাষায় ‘মৃতদেহ’ পাওয়ার কোন অসুবিধেটা আপনি দেখলেন?’

এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘কি জানি, আমার মনে হয়, কতকগুলো জায়গা খুনের পক্ষে ঠিক উপযুক্ত নয়৷ এটা সেরকম জায়গা নয়, যেখানে—’ নিজের বক্তব্যকে পরিষ্কার করে বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে চুপ করে গেলেন তিনি৷

‘জায়গাটা স্বপ্নময়, মানছি৷’ সম্মতি জানালেন এরকুল পোয়ারো, ‘এখানে রয়েছে শান্তি৷ রয়েছে উজ্জ্বল কিরণ, গভীর নীল সমুদ্র৷ কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন, মিস ব্রুস্টার পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে অশুভ শক্তির ছায়া৷’

ধর্মযাজক লেন চেয়ারে নড়েচড়ে বসলেন৷ সামনে ঝুঁকে এলেন তিনি৷ তাঁর গভীর নীল চোখ চকচক করে উঠলো৷

মিস ব্রুস্টার কাঁধ ঝাঁকালেন৷

‘ও, হ্যাঁ, সে কথা মিথ্যে নয়, কিন্তু তবুও—’

‘কিন্তু তবুও আপনার মনে হচ্ছে, এ জায়গাটা কোন অপরাধ সংঘটিত হবার পক্ষে ঠিক উপযুক্ত নয়? আপনি একটা কথা ভুলে যাচ্ছেন, মাদমোয়াজেল৷’

‘মানব-চরিত্রের কথা বোধ হয়?’

‘হ্যাঁ, সেটাই প্রথম এবং শেষ কথা৷ কিন্তু সে কথা আমি বলতে চাইনি৷ আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিতে যাচ্ছিলাম, যে এখানে প্রত্যেকেই ছুটিতে বেড়াতে এসেছেন৷’

এমিলি ব্রুস্টার বিহ্বল চোখে তাকালেন তাঁর দিকে৷

‘ঠিক বুঝলাম না৷’

এরকুল পোয়ারো করুণার হাসি হাসলেন৷ শূন্যে তর্জনী নাচিয়ে বোঝাতে চাইলেন তাঁর বক্তব্যের ইঙ্গিত৷

‘মনে করা যাক, আপনার কোন শত্রু আছে৷ এখন, আপনি যদি তাঁর বাড়িতে, অফিসে বা রাস্তায় তাঁকে খোঁজ করেন, তাহলে আপনাকে যথেষ্ট উপযুক্ত কারণ দেখাতে হবে৷ কৈফিয়ৎ দিতে হবে আপনাকে৷ কিন্তু এখানে, এই সমুদ্রতীরে উপস্থিতির জন্য কাউকেই কৈফিয়ৎ দিতে হবে না৷ আপনি লেদারকোম্ব উপসাগরে এসেছেন—কেন? উত্তর অতি সহজ৷ এখন আগস্ট মাসে—লোকে এই আগস্ট মাসেই ছুটি কাটাতে সমুদ্রতীরে বেড়াতে যায়৷ সুতরাং আপনার এখানে আসাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক, যেমন স্বাভাবিক মিঃ লেন ও মেজর ব্যারীর এখানে আসা, অথবা মিসস রেডফার্ন ও তাঁর স্বামীর এখানে বেড়াতে আসা৷ কারণ আগস্ট মাসে সমুদ্রতীরে ছুটি কাটাতে আসাটা ইংল্যান্ডের রীতি৷’

‘হ্যাঁ, আপনার কথা অস্বীকার করা যায় না৷’ স্বীকার করলেন মিস ব্রুস্টার, ‘কিন্তু গার্ডেনারদের সম্পর্কে আপনি কি বলবেন? ওরা তো মার্কিনিয়৷’

পোয়ারো মৃদু হাসলেন৷

‘মিসেস গার্ডেনারও বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করেন, তিনি নিজেই আমাদের বলেছেন৷ যেহেতু তিনি গোটা ইংল্যান্ডটা ঘুরে দেখেছেন, সেহেতু এই সমুদ্রতীরে তাঁর সপ্তাদুয়েক কাটানো উচিত—অন্য কোন কারণে না হলেও অন্তত ভালো টুরিস্ট হিসেবে৷ তাছাড়া তিনি বিভিন্ন ধরনের মানুষ দেখতে ভালোবাসেন৷’

মিসেস রেডফার্ন অস্ফুট স্বরে বললো, ‘আপনিও তো মানুষ দেখতে ভালোবাসেন, তাই না?’

‘মাদাম, সে কথা আমি স্বীকার করি৷ আমি মানুষ দেখতে ভালোবাসি!’

ও চিন্তিত সুরে বললো, ‘আপনি—অনেক বেশি দেখতে পান৷’

কিছুক্ষণ নীরবতা৷ স্টিফেন লেন সশব্দে গলা-খাঁকারি দিয়ে অপ্রতিভ কণ্ঠে বললেন, ‘মঁসিয়ে পোয়ারো, এইমাত্র যে কথাগুলো আপনি বললেন, সে সম্পর্কে আমি একটু কৌতূহলী৷ আপনি বলেছেন, পৃথিবীর সর্বত্রই অপরাধ সংঘটিত হয়৷ আপনার এই কথাগুলোর সঙ্গে বাইবেলের ‘ইিক্লিসিয়াস্তেস’ অধ্যায়ের একটি উদ্ধৃতির বিশেষ মিল রয়েছে৷’ এক মুহূর্তে থামলেন তিনি৷ তারপর স্পষ্ট স্বরে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, ‘সত্য, মানুষের প্রতিটি পুত্রের হৃদয় অপরাধ-বাসনায় পরিপূর্ণ এবং জীবৎকালে অপ্রকৃতিস্থতা তাদের হৃদয়ের সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে৷’ তাঁর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো ধর্মীয় দীপ্তিতে, ‘আপনার মুখে এ কথা শুনে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি৷ আজকাল অশুভ শক্তিতে কেউই বিশ্বাস করে না৷ এটাকে বড়জোর শুভর বিপরীত হিসাবে বিচার করা হয় মাত্র৷ লোকে বলে, অসৎ কাজ তারাই করে যায়া অজ্ঞ—বুদ্ধিজ্ঞানে যারা অসম্পূর্ণ—যাদের দোষারোপ করার বদলে করুণা করা উচিত৷... কিন্তু মঁসিয়ে পোয়ারো, অশুভ শক্তির অস্তিত্ব আছে৷ এটা বাস্তব সত্য৷ আমি যেমন শুভতে বিশ্বাস করি তেমনি বিশ্বাস করি, তেমনি বিশ্বাস করি অশুভে৷ এর প্রভাব আছে, আছে নিজস্ব ক্ষমতা৷ পৃথিবী জুড়ে বিস্তৃত এর রাজত্ব!’

তিনি থামলেন৷ তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে উঠেছে৷ রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছে তিনি হঠাৎ ক্ষমাপ্রার্থীর দৃষ্টিতে তাকালেন৷

‘দুঃখিত৷ একটু আত্মবিস্মৃত হয়ে পড়েছিলাম৷’

পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, ‘আপনার বক্তব্যের অর্থ আমি বুঝতে পারছি৷ আপনার সঙ্গে আমি আংশিকভাবে একমত৷ অশুভের রাজত্ব সারা পৃথিবীতে রয়েছে এবং তার স্বরূপ আমাদের অজানা থাকে না৷’

মেজর ব্যারী গলা-খাঁকারি দিলেন৷

‘ভারতবর্ষের কয়েকজন ফকিরও এ ধরনের কথা বলেছিলেন।’

সুদীর্ঘ ভারতীয় কাহিনীর প্রতি তাঁর সর্বনাশা প্রবণতার বিরুদ্ধে প্রত্যেকের সাবধান হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট দিনই জলি রজারে কাটিয়েছেন মেজর ব্যারী৷ সুতরাং, মিস ব্রুস্টার ও মিসেস রেডফার্ন দুজনেই বক্তব্যে ঝাঁপিয়ে পড়লেন৷

‘ওই যে আপনার স্বামী সাঁতরে ফিরে আসছেন, তাই না, মিসেস রেডফার্ন? ওঁর হাত টানার ভঙ্গী দেখবার মতো৷ ভীষণ ভালো সাঁতারু আপনার স্বামী৷’

প্রায় একই সঙ্গে বললো মিসেস রেডফার্ন! ওই দেখুন! লাল রঙের পাল দেওয়া কি সুন্দর ছোট্ট একটা নৌকো! ওটা তো মিঃ ব্ল্যাটের, তাই না?’

লাল পালের নৌকোটা তখন উপসাগরের সীমানা অতিক্রম করছে৷

মেজর ব্যারী ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে বললেন, ‘আজব পছন্দ, লাল-রঙা-পাল, কিন্তু ফকির-কাহিনী আতঙ্ক এরানো গেলো৷

এইমাত্র যে যুবকটি সাঁতরে পাড়ে এসে পৌঁছেছে এরকুল পোয়ারো সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকে দেখছিলেন৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন মানুষের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত৷ দীর্ঘকায় তামাটে শরীর৷ প্রশস্ত কাঁধ, সুগঠিত সঙ্কীর্ণ ঊরু৷ তাকে ঘিরে রয়েছে একটা সংক্রামক হাসিখুশি আনন্দের ঢেউ—একটা সহজাত সারল্য, যা তাকে সমস্ত মহিলা ও অধিকাংশ পুরুষের কাছে করে তুলেছে প্রিয়৷

সৈকতে দাঁড়িয়ে শরীরে জল ঝাড়ছিলো সে; খুশিতে হাত নেড়ে ইশারা করলো স্ত্রীর দিকে৷

প্রতি ইশারা ফিরিয়ে দিলো, ক্রিস্টিন, ডেকে উঠলো, ‘এখানে এসো প্যাট৷’

‘আসছি৷’

বালিতে পড়ে থাকা তোয়ালেটা তুলে নিয়ে সৈকত ধরে আরও কিছুটা এগিয়ে গেলো প্যাট্রিক৷

ঠিক সেই মুহূর্তে একজন মহিলা হোটেলের দিক থেকে তাঁদের অতিক্রম করে নেমে গেলো বেলাভূমির দিকে৷

তার উপস্থিতিতে ছিলো নাটকীয় আবির্ভাবের সমস্ত বৈশিষ্ট্য৷

উপরন্তু, তার চলার ছন্দ জানিয়ে দিচ্ছে, এ তার অজানা নয়৷ আত্ম-সচেতনভাব আপাতদৃষ্টিতে সেখানে অদৃশ্য৷ এটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক, তার উপস্থিতির নাটকীয় প্রভাব তার কাছে নতুন কিছু নয়৷

সে তম্বী ও দীর্ঘকায়৷ পরনে সাধারণ পিঠখোলা সাদা সাঁতারে পোশাক, এবং তার শরীরে উন্মুক্ত প্রতিটি অংশে সূর্যস্নানের সুষম ব্রোঞ্চ-প্রলেপ৷ কোন ভাস্কর্যের মতোই নিখুঁত তার গড়ন৷ উজ্জ্বল আগুন রঙ চুল ঘাড়ের কাছে এসে নিয়েছে ঘনিষ্ঠ অন্তর্মুখী বাঁক৷ মুখমণ্ডলে সামান্য কাঠিন্য, তিরিশটা বছর এসে আবার বিদায় নিলে যা চোখে পড়ে, কিন্তু সব মিলিয়ে সেখানে টানা, এবং এক চৈনিক স্থৈর্য ছড়িয়ে রয়েছে সারা সুখে৷ মাথায় তার যমজ-সবুজ পিচবোর্ডের এক স্বপ্নময় চীনে টুপি৷

মহিলাটির মধ্যে এমন কিছু একটা ছিলো, যা সৈকতে উপস্থিত অন্যান্য মহিলাদের করে দিলো তুচ্ছ ও নিষ্প্রভ৷ এবং সমান অনিবার্যতায় উপস্থিত প্রতিটি পুরুষের চোখে আকর্ষিত হয়ে গেঁথে গেলো তার শরীরে৷

এরকুল পোয়ারোর চোখ পুরোপুরি খুলে গেলো, তাঁর গোঁফজোড়া নেচে উঠলো নীরব প্রশংসায়, মেজর ব্যারী সোজা হয়ে বসলেন, এবং তাঁর বিস্ফারিত চোখ আরও বিস্ফারিত হলো৷ পোয়ারোর বাঁ দিকে ধর্মযাজক স্টিফেন লেন সশব্দে গভীর শ্বাস নিলে এবং তাঁর শরীরের প্রতিটি পেশী হয়ে উঠলো কঠিন৷

মেজর ব্যারী কর্কশ ফিসফিস স্বরে বললেন, ‘আর্লেনা স্টুয়ার্ট (মার্শালকে বিয়ে করার আগে ওঁর নাম তাই ছিলো) অভিনয় ছেড়ে দেবার আগে ওঁর শেষ নাটক ‘কাম অ্যান্ড গো’ আমি দেখেছিলাম৷ দেখবার মতোই চেহারা বটে, কি বলেন?’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন ধীরে স্বরে বললো৷ ওর কন্ঠে শীতলতার পরশ, ‘ও সুন্দরী—সত্যি৷ তবে ওকে দেখে—পশু বলে মনে হয়!’

এমিলি ব্রুস্টাব আচমকা বলে উঠলেন, ‘এইমাত্র আপনি অশুভ শক্তির কথা বলছিলেন, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আমরা ধারণা এই মেয়েটা সেই অশুভ শক্তির মানবী রূপ৷ ওর মধে এতটুকুও ‘ভালো’র ছোঁয়া নেই৷ ঘটনাচক্রে ওর সম্পর্ক অনেক কিছুই আমি জানি৷’

মেজর ব্যারী স্মৃতি রোমন্থনের সুরে বললেন, ‘সিমলার একটি মেয়ের কথা আমার মনে পড়ছে৷ ওর মাথার চুলও ছিলো লাল৷ জনৈক নিম্নপদস্থ সৈনিকের বউ ছিলো মেয়েটা৷ যদি জানতে চান ও সেখানে কোন অশান্তির সৃষ্টি করেছিলো কিনা, তাহলে বলবো, হ্যাঁ, করেছিলো৷ পুরুষেরা ওর জন্য পাগল হয়ে যেতো। স্বাভাবিক কারণেই, অন্যান্য মহিলারা সুযোগ পেলে ওর চোখ উপড়ে নিতে ছাড়তো না৷ মেয়েটা বহু সংসার ছারখার করে দিয়েছিলো৷’

তিনি স্মৃতিচারণের চাপা হাসি হাসলেন৷

‘স্বামীটা ছিল শান্তশিষ্ট চমৎকার মানুষ৷ বউকে প্রায় পুজোই করতো৷ ওর কোন অন্যায় সে দেখতে পেতো না—অথবা, দেখেও না দেখার ভান করতো৷’

তীব্র আবেগভরা চাপা স্বরে স্টিফেন লেন বললেন, ‘এই ধরনের মেয়েরা সমাজের পক্ষে ভীষণ—ভীষণ ক্ষতিকর—’

থামলেন তিনি৷

আর্লেনা স্টুয়ার্ট ইতিমধ্যে জলের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে: দুজন যুবক, সবেমাত্র কৈশোরের সীমারেখা পেরিয়েছে চট করে উঠে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে এগিয়ে এসেছে ওর দিকে৷ তাদের দিকে হাসি মুখে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ও৷

ওর দৃষ্টি যুবক দুজনকে অতিক্রম করে পড়লো সৈকত ধরে এগিয়ে আসা প্যাট্রিক রেডফার্নের দিকে৷

এরকুল পোয়ারো ভাবলেন, ব্যাপারটা যেন অনেকটা কম্পাসের কাঁটা পর্যবেক্ষণ করার মতো৷ প্যাট্রিক রেডফার্নের গতিপথের বিচ্যুতি ঘটলো, তার পা-জোড়া দিক পরিবর্তন করলো৷ চুম্বক-বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী কম্পাসের কাঁটা সর্বদা উত্তরমুখী হবেই৷ প্যাট্রিক রেডফার্নের পা তাকে নিয়ে এলো আর্লেনা স্টুয়ার্টের কাছে৷

প্যাট্রিকের দিকে তাকিয়ে ও তখন অল্প অল্প হাসছে৷ তারপর ঢেউয়ের পাশাপাশি পা ফেলে ধীরে ধীরে সৈকত ধরে ও এগিয়ে চললো৷ প্যাট্রিক রেডফোর্ন ওর সঙ্গ নিলো৷ একটা পাথরের পাশে শরীর এলিয়ে শুয়ে পড়লো ও৷ রেডফার্ন বসলো ও-পাশে৷

আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে হোটেলে ঢুকে পড়লো ক্রিস্টিন রেডফান!

ও চলে যাবার পর একটা অস্বস্তিকর নীরবতা ক্ষণেকের জন্য জমাট বেঁধে রইলো৷

তারপর এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘সত্যি, খুব খারাপ লাগে৷ ও ভীষণ ভালো মেয়ে৷ মাত্র বছর কয়েক হলো ওদের বিয়ে হয়েছে৷’

‘যে মেয়েটার কথা আমি বলছিলাম,’ বললেন মেজর ব্যারী, ‘সিমলার মেয়েটা৷ ও বেশ কয়েকটা সত্যিকারের সুখের বিয়ে বিগড়ে দিয়েছিলো৷ দুঃখের কথা, কি বলেন?’

‘এক ধরনের মেয়ে আছে,’ বললেন, মিস ব্রুস্টার, ‘যারা পরে সংসার ভেঙে দিতে ভালোবাসে৷’ মিনিট কয়েক থেমে তিনি যোগ করলেন, ‘প্যাট্রিক রেডফার্ন এক নম্বরের বোকা৷’

এরকুল পোয়ারা নীরব রইলেন৷ তিনি একদৃষ্টে চেয়ে ছিলেন বেলাভূমির দিকে, কিন্তু প্যাট্রিক রেডফার্ন বা আর্লেনা স্টুয়ার্ট তাঁর লক্ষ্য ছিল না৷

মিস ব্রুস্টার বললেন, ‘আচ্ছা, আমি বরং যাই নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়ি৷’ তিনি বিদায় নিলেন৷

মেজর ব্যারী ঘুরে তাকালেন পোয়ারোর দিকে৷ তাঁর বিস্ফারিত চোখে চাপা উত্তেজনা ও কৌতূহল৷

‘বলুন, মঁসিয়ে পোয়ারো, কি এত ভাবছেন? আপনি তো কই মুখ খুললেন না? এই অপ্সরাটি সম্পর্কে আপনার কি ধারণা? জব্বর চিজ?’

পোয়ারো বললেন, ‘হয়তো তাই৷’

‘ঝেড়ে কাশুন, মশাই৷ আপনাদের ফরাসীদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনি!’

পোয়ারো শীতল স্বরে বললেন, ‘আমি ফরাসী নই!’

‘তা বলে এ কথা বলবেন না, সুন্দরী মেয়েরা আপনার নজর কাড়ে না! ওঁকে দেখে কি মনে হয় আপনার, হুঁ?’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘উনি মোটেই তরুণী নন৷’

‘তাতে কি আসে যায়? একজন মহিলার চোহারা দেখে যা মনে হয়, তাঁর বয়েস ঠিক তাই! ওঁর চেহারার কোন গলতি নেই৷’

এরকুল পোয়ারো সম্মতির মাথা নাড়লেন৷ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, উনি সুন্দরী৷ কিন্তু সৌন্দর্যই শেষ কথা নয়৷ সৈকতে উপস্থিত প্রত্যেকে একজন বাদে যে তাঁর দিকে তাকিয়েছে, তার কারণ সৌন্দর্য নয়৷’

‘ওটাই একমাত্র কারণ, মশাই,’ বললেন মেজর, ‘ওটাই একমাত্র কারণ৷’

তারপর হঠাৎ কৌতূহলী কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘কিন্তু সেই তখন থেকেই একদৃষ্টে আপনি কি দেখছেন বলুন তো?’

এরকুল পোয়ারো উত্তর দিলেন, ‘আমি তাকিয়ে আছি ব্যতিক্রমটির দিকে৷ সেই একমাত্র মানুষটির দিকে যিনি ভদ্রমহিলা যাওয়ার সময় চোখ তুলে তাকাননি৷’

পোয়ারোর দৃষ্টিতে অনুসরণ করে সেই ব্যতিক্রমটির দিকে তাকালেন মেজর ব্যারী৷ ভদ্রলোকের বয়েস প্রায় চল্লিশ, শান্ত সুন্দর মুখশ্রী, মাথায় হালকা রঙের চুল, গায়ের রঙ তামাটে৷ ঠোঁটে তাঁর ধূমায়িত পাইপ, চোখের নজর হাতের ‘দি টাইম্‌স্‌’এ নিবদ্ধ।

‘ওঃ, উনি!’ মেজর ব্যারী বললেন, ‘উনিই হলেন আমাদের স্বামীদেবতা মশাই৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘হ্যাঁ, জানি৷’

মেজর চাপা হাসি হাসলেন৷ তিনি নিজে অবিবাহিত৷ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গীতে যে কোন ‘স্বামী’র ভূমিকা মাত্র তিন রকমের—‘প্রতিবন্ধক’, ‘অসুবিধে সৃষ্টিকারী’, অথবা ‘রক্ষাকর্তা’৷

তিনি বললেন, ‘দেখে মনে হয় চমৎকার লোক৷ শান্তশিষ্ট৷ আমার ‘টাইমস্’ ‘টা দিয়ে গেলো কিনা কে জানে?’

উঠে দাঁড়িয়ে তিনি পা বাড়ালেন হোটেলের দিকে৷

পোয়ারো ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টি সরিয়ে স্টিফেন লেনের দিকে তাকালেন৷

স্টিফেন লেন আর্লেনা মার্শাল ও প্যাট্রিক রেডফার্নকে লক্ষ্য করছিলেন হঠাৎই তিনি ফিরে তাকালেন পোয়ারোর দিকে৷ তাঁর দু চোখে ঝিলিক মারলো বিতৃষ্ণার তীব্র আলো৷

তিনি বললেন, ‘এই মেয়েছেলেটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে শয়তান বাসা বেঁধেছে৷ আপনার কি এতে কোন সন্দেহ আছে?’

পোয়ারো ধীরে স্বরে উত্তর দিলেন, ‘এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া শক্ত৷’

স্টিফেন লেন বললেন, ‘কিন্তু আশ্চর্য মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আপনি কি বাতাসে এর উপস্থিতি টের পাচ্ছেন না? আপনার চারপাশে? অশুভের উপস্থিতি?’

ধীরে মাথা দুলিয়ে নীরব সম্মতি জানালেন এরকুল পোয়ারো৷

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

যখন রোজামন্ড ডানলি এসে পোয়ারের পাশে বসলো, তখন মনের খুশিকে তিনি গোপন করার চেষ্টা করলেন না৷

অন্যান্য মহিলাদের মতো রোজামন্ড ডানলিনকেও তিনি যে আন্তরিক শ্রদ্ধা করেন সে কথা পোয়ারো কখনও অস্বীকার করেননি৷ ওর স্বাতন্ত্র্য, শরীরে কমনীয় সেষ্ঠব চলার গর্বিত সতর্ক ভঙ্গী তাঁর ভালো লাগে৷ তাঁর ভালো লাগে ওর মেঘ-কালো চুলের সাবলীল ঝর্না এবং ঠোঁটের হাসিতে ছোট্ট শ্লেষের আভাস৷

ওর পরনে গাঢ় নীল পোশাক, তার মাঝে ইতস্তত শুভ্রতার ছোঁয়া৷ প্রথম দৃষ্টিতে পোশাকটা সাধারণ মনে হলেও তাঁর বৈচিত্র পোয়ারোর নজর এড়ালো না৷ রোজামন্ড ডার্নলির তক্ত্বাবধানে পরিচালিত ‘রোজমান্ড লিমিটেড’ লন্ডনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান৷

রোজামন্ড বললো, ‘এখানে আমার একদম ভালো লাগছে না৷ ভাবছি, এত জায়গা থাকতে এখানেই বা কেন বেড়াতে এলাম৷

‘হ্যাঁ, বছর দুয়েক আগে, ঈস্টারের ছুটিতে৷ তখন এখানে এত লোকজন ছিলো না৷’

এরকুল পোয়ারো চোখ ফেরালেন ওর দিকে৷ শান্ত স্বরে বললেন, ‘আপনাকে ভাবিয়ে তোলার মতো কিছু একটা হয়েছে, তাই না?’

ও নীরবে সম্মতি জানালো, পা দোলাতে লাগলো ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে তাকালো চঞ্চল পায়ের দিকে, তারপর বললে, ‘আমি একটা প্রেতাত্মার মুখোমুখি হয়েছি৷ সেটাই আমার চিন্তার কারণ৷’

‘প্রেতাত্মা, মাদমোয়াজেল?’

‘হ্যাঁ৷’

‘কিসের প্রেতাত্মা? কার প্রেতাত্মা?’

‘ওহ, আমার নিজেরই৷’

পোয়ারো শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘সে প্রেতাত্মা কি আপনাকে দুঃখ দিয়েছে?’

ভীষণ দুঃখ৷ সে আমাকে নিয়ে গেছে আমার অতীতে, জানেন...’

ও আনমনাভাবে থামলো, তারপর বললে, ‘একবার ভাবুন তো আমার ছোটবেলার কথা৷ নাঃ, আপনি পারবেন না৷ আপনি তো আর ইংরেজ নন৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার শৈশব বুঝি পুরোপুরি ইংরেজ পরিবেশে কেটেছে?’

‘হ্যাঁ, সম্পূর্ণ ইংরেজ পরিবেশে৷ সেই সবুজ গ্রাম—বিশাল জীর্ণ বাড়ি—ঘোড়া, কুকুর—বৃষ্টিতে পথ হাঁটা—শুকনো ডালপালায় আগুন জ্বালানো—বাগানের আপেল গাছ—বরাবরে অর্থাভাব—পুরনো, ছেঁড়া পোশাক—সান্ধ্য পোশাক, বা বছরের পর বছর ধরে চলতো—একটা অবহেলিত বাগান—যেখানে শরৎকালে মাইকেলম্যাস ডেইজিরা চোখ-ধাঁধানো নিশানের মতো হাজির হতো...’

পোয়ারো মৃদু স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘আর আপনি সেই অতীতে ফিরে যেতে চান?’

রোজামন্ড মাথা নাড়লো, বললো, ‘কেউ ফিরে যেতে পারে না, পারে? সেটা—কখনও হয় না৷ কিন্তু ফিরে যেতে পারলে আমি খুশি হতাম—অন্য কোন ভাবে৷’

পোয়ারো বললেন, ‘তাতে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷’

রোজামন্ড সশব্দে হাসলো৷

‘সে তো আমারও আছে!’

পোয়ারো বললেন, ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম (এবং সে মাদমোয়াজেল, সত্যিই বহুদিন আগের কথা) তখন একটা খেলা ছিলো৷ তার নাম, ‘তুমি যদি “তুমি” না হতে চাও, তবে কি হতে চাও?’ এর উত্তর ছোট মেয়েলি অ্যালবামে লিখে রাখা হতো৷ অ্যামবামগুলো ছিলো নীল চামড়ায় বাঁধানো, ধারগুলো সোনালী পাতে মোড়া৷ এর উত্তরটা কিন্তু সহজ নয়, মাদমোয়াজেল৷’

রোজামন্ড বললো, হ্যাঁ, আমারও তাই ধারণা৷ কারণ সেটা একটা বিরাট ঝুঁকি৷ কেউই বোধহয় মুসোলিনী বা রানী এলিজাবেথ হতে চাইবে না৷ আর নিজস্ব বন্ধুবান্ধবের কথা যদি বলেন, তাহলে বলবো, তাদের সম্পর্কে আমরা বড্ড বেশি জানি৷ মনে আছে, একবার এক চমৎকার দম্পতির সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিলো৷ ওঁদের পরস্পরের প্রতি ব্যবহার এত উচ্ছল, এত সুন্দর, আর বিয়ের বহু বছর পরেও নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক এত ভালো ছিলো যে আমি মহিলাটিকে রীতিমতো ঈর্ষা করতাম৷ ওঁর সঙ্গে স্বইচ্ছায় জায়গা বদল করতে আমি রাজি ছিলাম৷ পরে আমাকে কে যেন বললো, জনান্তিকে ওঁরা নাকি এগারো বছর ধরে কেউ কারো সঙ্গে কথা বলেন না৷’

ও সশব্দে হাসলো৷

‘এতেই বোঝা যায় যে কারো সম্পর্কে সঠিক কেউ বলতে পারে না, তাই না?’

মুহূর্ত কয়েক-নীরবতার পর পোয়ারো বললেন, ‘অনেকেই কিন্তু আপনাকে ঈর্ষা করবে মাদমোয়াজেল৷’

রোজমন্ড ডার্নলি শীতল স্বরে জবাব দিলো, ‘ওহ, হ্যাঁ৷ স্বাভাবিকভাবেই৷’

চিন্তায় ওর কপালে ভাঁজ পড়লো, ঠোঁটের বক্রতায় ফুটে উঠলো শ্লেষের হাসি৷

‘হ্যাঁ, আমি সত্যিই সার্থক কোন মহিলার এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি৷ আমি সফল সৃজনশীল কোন শিল্পীর মতো তৃপ্তির আনন্দ পাই৷ জামা-কাপড়ের নকশা করতে আমি সত্যি খুব ভালোবাসি৷ এবং সেই সঙ্গে সফল কোন ব্যবসায়ীর আর্থিক পরিতৃপ্তি৷ আমার অবস্থা ভালো, স্বাস্থ্য ভালো, মুখশ্রী মোটামুটি, আর জিভের ধার তেমন বেশি নয়৷’

ও একটু থামলো৷ বিস্তৃত হলো ওর হাসি৷

‘অবশ্য আমার কোন স্বামী নেই! ওই একটা জায়গাতেই আমি হেরে গেছি, তাই না মঁসিয়ে পোয়ারো?’

পোয়ারো মন-রাখা সুরে জবাব দিলেন, ‘মাদমোয়াজেল, আপনি যদি অবিবাহিত হয়ে থাকেন, তার কারণ আমাদের পুরুষদের কেউই আপনাকে তেমনভাবে আকর্ষণ করেনি৷ আপনি নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিয়েছেন নিজস্ব পছন্দ থেকেই, প্রয়োজনের জন্য নয়৷’

‘রোজামন্ড ডার্নলি বললো, ‘কিন্তু তবুও অন্য সব পুরুষদের মতো আপনিও হয়তো মনে মনে বিশ্বাস করেন, স্বামী-পুত্র ছাড়া কোন স্ত্রীলোকই পূর্ণতা পায় না৷’

পোয়ারো কাঁধ ঝাঁকালেন৷

বিয়ে করা এবং সন্তানের মা হওয়া, সেটা সাধারণ স্ত্রীলোকের জন্য৷ আপনার মতো খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এমন মহিলা শ’য়ে একটা—আরও বেশি, হাজারে একটা দেখা যায়৷’

রোজামন্ড বিস্তৃত হাসলো৷

‘কিন্তু তবুও, আমি একটা বিচ্ছিরি আইবুড়ি ছাড়া কিছু নয়! কেন জানি না, আজকাল সব সময় এই কথাটাই আমার মনে হয়৷ একটা ছাপোষা শান্ত জোয়ান স্বামী আর একপাল আঁচলধরা বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আমি হয়তো বেশি সুখী হতাম৷ কথাটা সত্যি, তাই না?’

পোয়ারো কাঁধা ঝাঁকালেন৷

‘আপনি যখন বলছেন, মাদমোয়াজেল তখন সত্যি!’

রোজামণ্ড সরবে হেসে উঠলো, ওর ভারসাম্য যেন আবার ফিরে এলো৷ একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে রাখলো ও৷

‘মহিলাদের সঙ্গে কিভাবে কথা বলতে হয়, তা আপনি ভালোই জানেন, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ এখন ইচ্ছে করছে, বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে মহিলাদের প্রতিষ্ঠার পক্ষে আপনার সঙ্গে আবার তর্ক জুড়ে দিই৷ অবশ্য এখন আমি যেভাবে আছি, বেশ সুখেই আছি—তা আমি ভালোভাবেই জানি৷’

‘সুতরাং, বাগানের—নাকি বলবো এই সৈকতের?—সমস্ত ফুলই সুন্দর, মাদমোয়াজেল৷’

‘ঠিক বলেছেন৷’

পোয়ারো এবার তাঁর সিগারেট কেস বের করলেন৷ অতি সন্তর্পণে তুলে নিলেন একটা ছোট্ট সিগারেট—নিতান্তই ধূমপানের প্রতি করুণাবশে৷

সর্পিল ধোঁয়ার সূক্ষ্ম পর্দার দিকে রহস্যময় চোখ মেলে মৃদু স্বরে উচ্চারণ করলেন পোয়ারো, ‘তাহলে মিঃ—উহুঁ, ক্যাপ্টেন মার্শাল আপনার একজন পুরনো বন্ধু, মাদমোয়াজেল?’

রোজমন্ড সোজা হয়ে বসলো৷ বললো, ‘কিন্তু আপনি সে কথা জানলেন কি করে? ওহ্ কেন্ বোধহয় বলে থাকবে৷’

পোয়ারো মাথা নাড়ালেন৷

‘কেউ আমাকে কোন কথা বলেননি৷ শত হলেও মাদমোয়াজেল, আমি একজন গোয়েন্দা৷ এক্ষেত্রে এটাই ছিলো যুক্তিসঙ্গত একমাত্র স্পষ্ট সিদ্ধান্ত৷

রোজমণ্ড ডার্নলি বললো, ‘কই, আমি তো বুঝতে পারছি না?’

‘কিন্তু ভেবে দেখুন৷’ ক্ষুদে মানুষটি হাত নেড়ে ব্যাপারটা বোঝাতে চাইলেন, ‘আপনি এখানে এসেছেন এক সপ্তাহ৷ আপনি প্রাণবন্ত, হাসিখুশি উচ্ছল৷ আজ, হঠাৎ আপনি বলছেন প্রেতাত্মার কথা, বলছেন, পুরনো দিনের কথা৷ কি এমন ঘটলো? গত কয়েকদিনে নতুন কেউ এখানে আসেননি, শুধু কাল রাত্রে এসেছেন ক্যাপ্টেন মার্শাল, তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে৷ আর আজ এই পরিবর্তন! সুতরাং এটা অত্যন্ত স্পষ্ট৷’

রোজমন্ড ডার্নলি বললো, ‘হ্যাঁ, কথাটা সত্যি! কেনেথ মার্শাল আমার ছোটবেলাকার বন্ধু৷ মার্শালরা আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতো৷ কেন্ আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতো আমার চেয়ে চার বছরে বড় হলেও সমবয়েসীর মতো মিশতো৷ বহুদিন ওর সঙ্গে আমার দেখা নেই৷ তা কম করে—বছর পনেরো তো হবেই৷’

পোয়ারোর কণ্ঠে ভেসে উঠলো গভীর চিন্তার সুর৷

‘পনেরো বছর বড় সুদীর্ঘ সময়৷’

রোজমন্ড মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো৷

কিছুক্ষণ নীরবতার পর এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল দরদী মানুষ কি বলেন?’

রোজামন্ড উষ্ণ স্বরে বললো, ‘কেন খুব ভালো৷ সবচেয়ে ভালো লোকদের একজন৷ ভীষণ শান্ত আর চাপা স্বভাবের মানুষ ও৷ আমার মতে, ওর একমাত্র দোষ হলো আজেবাজে বিয়ে করার ঝোঁক৷’

গভীর সমব্যথীর সুরে বললেন পোয়ারো, ‘হুঁ—’

রোজামন্ড ডার্নলি বলে চললো, মেয়েদের ব্যাপারে কেনেথটা একেবারে বোকা—এক নম্বরের বোকা! মাটিংডেল মামলাটা আপনার মনে আছে?’

পোয়ারোর ভুরুজোড়া কুঁচকে উঠলো৷

মার্টিংডেল? মার্টিংডেল? আর্সেনিক, তাই না?’

‘হ্যাঁ৷ সতেরো-আঠারো বছর আগের ঘটনা৷ স্বামীকে খুন করার অপরাধে ভদ্রমহিলাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো৷’

‘এবং ভদ্রলোক নিয়মিত আর্সেনিক খেতেন এ কথা প্রমাণিত হওয়ার পর তাঁর স্ত্রীকে মুক্তি দেওয়া হয়?’

‘ঠিক তাই৷ আর ছাড়া পাওয়ার পর কেন মেয়েটাকে বিয়ে করে বসলো৷ সাধারণত এই ধরনের বোকার মতো কাজই ও করে থাকে৷’

এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে বললেন, ‘কিন্তু মেয়েটি যদি নির্দোষ হয়ে থাকে?’

রোজামন্ড অধৈর্য সুরে বললো, ‘হ্যাঁ আমার ধারণা, সে নির্দোষ ছিলো৷ সঠিক কেউ জানে না৷ কিন্তু বিয়ে করার মতো প্রচুর মেয়ে পৃথিবীতে রয়েছে, আপনাকে যে কষ্ট করে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মেয়েকেই বিয়ে করতে হবে, তার কোন মানে নেই৷’

পোয়ারো নীরব রইলেন৷ হয়তো তিনি জানতেন, নীরব থাকলে রোজমন্ড ডার্নলি ওর কথা বলে যাবে৷ ও তাই করলো৷

‘অবশ্য, তখন কেনের বয়েস খুব কম ছিলো—সবে একুশ৷ বউকে ও প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো৷ লিন্ডার জন্মের সময় ওর বউ মারা গেলো—ওদের বিয়ের ঠিক এক বছর পর৷ স্ত্রীর মৃত্যুতে কেন ভীষণ ভাবে ভেঙে পড়েছিলো৷ এরপর ও হৈ-চৈ করে বেশ কিছুদিন কাটিয়ে দেয়—হয়তো সেই দুঃখ ভুলবার জন্যে৷’

ও একটু থামলো৷

‘আর তারপরেই ঘটলো এই আর্লেনা স্টুয়ার্টের ব্যাপার৷ তখন আর্লেনা রিভ্যুতে ছিলো৷ সেখানে কডরিংটন বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা চলছিলো৷ আর্লেনা স্টুয়াটের জন্যেই লেডি কডরিংটন তাঁর স্বামীকে ডিভোর্স করেন৷ লোকে বলে, লর্ড কডরিংটন ওর জন্যে একেবারে মজে গিয়েছিলেন৷ সবাই ভেবেছিলো, আদালতের চূড়ান্ত রায় বেরোলেই ওরা বিয়ে করবে৷ কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তা হলো না৷ লর্ড কডরিংটন সরাসরি ওকে পাশ কাটালেন৷ যদ্দুর মনে পড়ে, আর্লেনা প্রতিশ্রুতিভঙ্গের অপরাধে তাঁর নামে মামলা ঠুকেছিলো৷ যাই হোক, তখন এই ব্যাপারটা নিয়ে প্রচুর হৈ-চৈ হয়েছিলো৷ বোকা—এক নম্বরের বোকা৷’

এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে বললেন, ‘কোন পুরুষকে এ ধরনের বোকামির জন্য ক্ষমা করা যায়—মিস স্টুয়ার্ট অসামান্য সুন্দরী, মাদমোয়াজেল৷’

‘হ্যাঁ, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই৷ বছর তিনেক আগে ওকে নিয়ে হলো আর এক কেলেঙ্কারি৷ স্যার রজার আরস্কিন মারা যাওয়ার সময় তাঁর সমস্ত সম্পত্তি আর্লেনাকে দিয়ে গেলেন৷ আমার ধারণা ছিলো, আর কিছু না হোক, এই ব্যাপারটাই কেনের চোখ খুলে দেবে৷’

‘তাই কি হয়নি?’

রোজামন্ড ডার্নলি কাঁধ ঝাঁকালেন৷

‘বললাম তো, ওর সঙ্গে আমার বহু বছর দেখা নেই৷ অবশ্য, লোকে বলে, ব্যাপারটাকে ও ভীষণ ঠাণ্ডা মেজাজে নিয়েছিলো৷ কিন্তু কেন, সেটাই আমার জানতে ইচ্ছে করে৷ ও কি ওর স্ত্রীকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করে?’

‘হয়তো অন্য কোন কারণ থাকতে পারে৷’

হ্যাঁ৷ অহঙ্কার! সব ব্যাপারেই নির্বিকার থাকা! জানি না, নিজের স্ত্রীর সম্পর্কে সত্যি সত্যি ওর কি ধারণা৷ আমি কেন, কেউ জানে না৷’

‘আর মিসেস মার্শাল? নিজের স্বামী সম্পর্কে তাঁর কি ধারণা?’

রোজামণ্ড স্থির চোখে চেয়ে রইলো পোয়ারোর দিকে৷

ও বললো, আর্লেনা? ও পৃথিবীর সেরা স্বর্ণসন্ধানী৷ আর সেই সঙ্গে একটি নরখাদক বাঘিনী? যদি পুরুষের পোশাকে যে কোন বস্তু ওর একশো গজের মধ্যে আসে, তাহলে তখনই শুরু হয় ওর নতুন খেলা৷ ও ওই ধরনের মেয়ে৷’

পোয়ারো পূর্ণ সম্মতি জানিয়ে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন৷

‘হ্যাঁ,’ তিনি বললেন, ‘আপনার কথা মিথ্যে নয়...মিসেস মার্শালের চোখ শুধু একটা জিনিসই খুঁজে বেড়ায়—পুরুষ৷’

রোজামন্ড বললো, ‘আপাতত ওর নজর পড়েছে প্যাট্রিক রেডফার্নের ওপর৷ তিনি অত্যন্ত সুপুরুষ—আর, একটু সোজা ধরনের—; নিজের স্ত্রীকে তিনি ভালোবাসেন এবং তথাকথিত কলির কেষ্ট নন৷ ঠিক এই ধরনের পুরুষরাই আর্লেনার প্রিয় খাদ্য৷ মিসেস বেডফার্নকে আমার ভালো লাগে—তাঁর বিবর্ণ চেহারায় একটা নিজস্ব সৌন্দন্দর্য আছে—কিন্তু আমার মনে হয় না, নরখাদক বাঘিনী আর্লেনার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তিনি পেরে উঠবেন৷’

পোয়ারো বললেন, ‘না, আপনি ঠিকই বলেছেন৷’

তাঁর মুখমণ্ডলে যন্ত্রণার ছায়া৷

রোজমন্ড বলল, ‘যতদূর জানি, ক্রিস্টিন রেডফার্ন ইস্কুলের দিদিমণি ছিলেন৷ তিনি সেই ধরনের মহিলা, যাঁরা বিশ্বাস করেন, মনের ওপর ঘটনার প্রভাব থাকে৷ খুব শীগগিরই তিনি এক কঠিন আঘাত পাবেন৷’

পোয়ারো বিহ্বলভাবে মাথা নাড়লেন৷

উঠে দাঁড়ালো রোজামণ্ড, বললো, ‘কি বিশ্রী পরিস্থিতি বলুন তো!’ তারপর ও অনিশ্চিত সুরে যোগ করলো, ‘এ ব্যাপারে কারো অন্তত কিছু করা উচিত৷’

শোবার ঘরে আয়নায় নিজের মুখমণ্ডল শান্তভাবে জরীপ করছিলে না লিন্ডা মার্শাল৷ নিজের মুখ ভীষণ অপছন্দ হলো ওর৷ এই মুহূর্তে সে মুখের অধিকাংশে হাড ও বিন্দু বিন্দু দাগের উপস্থিত প্রকট বলে মনে হলো ওর কাছে৷ ও বিরক্তভাবে লক্ষ্য করলো ওর একরাশ নরম বাদামী চুল (ইঁদুর, মনে মনে বলল ও), সবুজ ধূসর চোখ, গালের উঁচু হাড় ও চিবুকের দীর্ঘ উদ্ধত রেখা৷ ওর মুখ দাঁত হয়তো ততটা খারাপ নয়—কিন্তু দাঁতের সৌন্দর্য কি আসে যায়? আর নাকের পাশে ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে ওটা কি কোন দাগ?

নিশ্চিন্ত হয়ে ও সিদ্ধান্ত নিলো, ওটা কোন দাগ নয়৷ ও আপন মনেই ভাবলো, ষোলো বছরে পা দেওয়া খুব বিচ্ছিরি—ভীষণ বিচ্ছিরি৷’

এ সময়ে নিজের সত্যিকারে অবস্থাটা কেউ বুঝতে পারে না৷ লিন্ডা এখন কোন ছোট্ট অশ্বশাবকের মতো হতবুদ্ধি ও শজারুর মতোই স্পর্শবিরূপ৷ নিজের অগোছালো অবস্থা সম্পর্কে ও প্রতিটি মুহূর্তে সচেতন; ও জানে, প্রতিটি মুহূর্তে দ্বিধাগ্রস্ত ওর মন৷ স্কুলের দিনগুলো এত খারাপ ছিলো না৷ কিন্তু এখন ও স্কুল ছেড়ে এসেছে৷ এর পর ও কি করবে তা সঠিক কেউ জানে বলে মনে হয় না৷ ওর বাবা ভাসা ভাসা ভাবে বলছিলেন সামনের শীতে ওকে প্যারিসে পাঠিয়ে দেবার কথা৷ লিন্ডা প্যারিস যেতে চায় না—কিন্তু বাড়িতে থাকতেও ওর ভালো লাগে না৷ এর আগে কোনদিন ও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেনি, আর্লেনাকে ও কি ভীষণ অপছন্দ করে৷

লিন্ডার কচি মুখ টান টান হলো উত্তেজনায়, সবুজ চোখজোড়া হয়ে উঠলো কঠিন৷

আর্লেনা...৷

ও আপনার মনেই ভাবলো, ‘ও একটা পশু—একটা পশু...৷’

সৎমা৷ সৎমা থাকাটাই ভীষণ বিচ্ছিরি, সবাই তাই বলে৷ এবং কথাটা সত্যি৷ আলেনা যে ওর সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করে তা নয়৷ বেশির ভাগ সময় লিন্ডাকে ও খেয়ালই করে না৷ যখন করে তখন ওর চোখে, কথায়, থাকে, এক অবজ্ঞাভরা কৌতুক৷ আর্লেনার নিখুঁত চালচলন লিন্ডার কিশোরীসুলভ বিশৃঙ্খল অবস্থাকে করে তোলে আরও বেশি প্রকট৷ আর্লেনা আশেপাশে থাকলে, যে কেউই নিজেকে ভীষণ অপরিণত অমার্জিত ভেবে লজ্জা পায়৷

কিন্তু শুধু তাই নয়৷ না, শুধুমাত্র তাই নয়৷

মনের আনাচে-কানাচে খাপছাড়াভাবে হাতড়ে চললো লিন্ডা৷ মনের বিভিন্ন ভাবকে আলাদা করে বেছে নিয়ে তাদের নামকরণে তেমন অভ্যস্ত নয় ও৷ কি যেন একটা করে আর্লেনা—মানুষগুলোকে—বাড়িটাকে—

‘ও খারাপ,’ সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবলো, লিন্ডা, ‘ও ভীষণ, ভীষণ খারাপ৷’

কিন্তু এখানেই থামলে চলবে না৷—নিছক নৈতিক উন্নাসিকতায় নাক সিঁটকে ওকে মন থেকে সরিয়ে দেওয়া যায় না৷

মানুষগুলোকে ও কি যেন করে৷ বাবা—বাবা এখন সম্পূর্ণ অন্যরকম...

ব্যাপারটা অবাক হয়ে ভাবলো ও৷ বাবা ওকে স্কুল থেকে ফিরিয়ে নিতে আসছেন৷ বাবা ওকে নিয়ে যাচ্ছেন জাহাজে করে বেড়াতে৷ এবং সেই বাবা, বাড়িতে আর্লেনার সঙ্গে যেন—যেন নিজেকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন৷ এবং তাঁর মন সেখানে থাকে না৷

লিন্ডা ভাবলো, ‘আর এইভাবেই চলবে৷ দিনের পর দিন—মাসের পর মাস৷ এ আমার কাছে অসহ্য৷’

জীবনের ওর সামনে দীর্ঘায়িত হলো—অন্তবিহীন—আর্লেনার উপস্থিতিতে অন্ধকার ও বিষাক্ত একরাশ দিনের মিছিলে৷ ওর শিশুসুলভ মনে সময় সম্পর্কে এখনও কোন স্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠেনি৷ লিন্ডার কাছে এক-একটা বছর যেন মনে হয় অনন্তকাল৷

আর্লেনার প্রতি ঘৃণা এক বিশাল কালো জ্বলন্ত ঢেউ উথলে উঠলো ওর মনে৷ ও ভাবলো, ‘ওকে আমার খুন করতে ইচ্ছে করে৷ ইস! যদি ও মরে যেতো...!’

আয়নার ওপরে চোখ তুলে ও তাকালো দূরে সমুদ্রের দিকে৷

এ জায়গাটা সত্যিই চমৎকার৷ অথবা চমৎকার হতে পারতো৷ মনোরম সমুদ্রতীর, নির্জন উপকূল৷ আর পায়ে চলার বিচিত্র আঁকাবাঁকা পথ৷ অজানা জায়গা আবিষ্কারের আনন্দ৷ এবং একা একা গিয়ে খুশিমতো হুল্লোড় করার কত জায়গা৷ এছাড়া গুহা আছে, কাওয়ানদের ছেলেরা ওকে তাই বলছিলো৷

লিন্ডা ভাবলো, ‘শুধু যদি আর্লেনা এখান থেকে চলে যেতো, তাহলে আমি আনন্দ করতে পারতাম৷’

ওর মনে ফিরে গেলো সেই বিকেলে, যেদিন ওরা এখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলো৷ মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপে আসাটা হয়েছিলো বেশ মজার৷ কংক্রীটের সেতুটা তখন জোয়ারে জলে ডুবে ছিলো ওরা এসেছিলো নৌকো করে৷ হোটেলটাকে দেখে কেমন রোমাঞ্চকর এবং অদ্ভুত মনে হয়েছিলো লিন্ডার৷ আর তারপর, সামনের খোলা চত্বরে বসে থাকা একজন লম্বা তামাটে চেহারার মহিলা ওদের দেখে লাফিয়ে উঠেছেন বলেছেন, ‘আরে, কেনেথ!’

এবং ওর বাবা, ভীষণ অবাক চোখে তাকিয়ে বিস্মিতভাবে বলে উঠেছেন, ‘রোজামন্ড!’

ও সিদ্ধান্ত নিলো, রোজামন্ডকে ও মেনে নিতে পেরেছে৷ রোজমন্ড, ও ভাবলো, বেশ বুদ্ধিমতী৷ আর ওর চুল কত সুন্দর—যেন ওর চেহারার সঙ্গে মানিয়েই তৈরি—বেশির ভাগ লোকের চুলই তাদের চেহারার বেমানান হয়৷ এছাড়া ওর পোশাকও চমৎকার৷ আর ও মুখে সর্বদাই কেমন এক অদ্ভুত খুশি—যেন সেই খুশির লক্ষ্য রোজামণ্ড নিজে, অন্য কেউ নয়৷ রোজমন্ড, ওর সঙ্গে, লিন্ডার সঙ্গে, সুন্দর ব্যবহার করেছে৷ কখনও আজেবাজে কথা বলেনি৷ (‘আজেবাজে’ শব্দের মধ্যে নিহিত রয়েছে লিন্ডার একরাশ বিভিন্ন অপছন্দ) আর রোজামন্ড কখনো এমন ভাব করেনি যাতে মনে হয় লিন্ডাকে ও বোকা ভাবছে৷ সত্যি কথা বলতে কি, লিন্ডাকে, সত্যিকারে মানুষ মনে করেই ওর সঙ্গে কথা বলেছে রোজামন্ড৷ এত কম সময়ে লিন্ডার নিজেকে সত্যিকারে মানুষ বলে মনে হয় যে কেউ ওকে সে মর্যাদা দিলে ও তার প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে৷

বাবাকে দেখে মনে হয়েছে, মিস ডার্নলিকে দেখে তিনি খুশি হয়েছেন৷

আশ্চর্য তাঁকে দেখে মনে হয়েছে সম্পূণ অন্য মানুষ, যেন মুহূর্তে বদলে গেছেন৷ তাঁকে দেখে মনে হয়েছে লিন্ডা অনেক ভেবে ঠিক করলো—হ্যাঁ, যেন তাঁর বয়েস অনেক কমে গেছে! তিনি সরবে হেসে উঠেছেন—এক অদ্ভুত বালকসুলভ হাসি৷ এখন লিন্ডার হঠাৎ মনে পড়লো বাবাকে সে খুব কম সময়েই হাসতে দেখেছে৷

ও কেমন বিহ্বল হয়ে পড়লো৷ যেন ও এক ঝলক দেখতে পেয়েছে সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষকে৷ ও ভাবলো, ‘আমার বয়েসে বাবা কি রকম ছিলো কে জানে...৷’

কিন্তু সে ভাবনা অনেক শক্ত৷ ও হাল ছেড়ে দিলো৷

একটা নতুন চিন্তা ঝলসে উঠলো ওর মনে৷

যদি ওরা এখানে এসে মিস ডার্নলির দেখা পেতো—শুধু ও আর বাবা—তাহলে কি মজাটাই না হতো৷

কিছুক্ষণের জন্য খুলে গেলো কল্পনার দরজা, ফুটে উঠলো এক কল্পদৃশ্য৷ বাবা, ছোট ছেলের মতো হাসছেন, মিস ডার্নলি, আর ও নিজে—সঙ্গে এই দ্বীপের সমস্ত মজা, আনন্দ সমুদ্রস্নান—গুহা৷

আবার ঝাঁপিয়ে পড়লো অন্ধকারে ঢেউ৷

আর্লেনা৷ আর্লেনা সঙ্গে থাকলে কারও পক্ষেই আনন্দ করা সম্ভব নয়৷ কেন সম্ভব নয়? কে জানে, তবে অন্তত ওর পক্ষে, লিন্ডার পক্ষে, সম্ভব নয়৷ কে সুখী হতে পারে, যদি এমন কেউ কাছাকাছি থাকে যাকে সে—ঘৃণা করে? হ্যাঁ, ঘৃণা৷ আর্লেনাকে ও ঘৃণা করে৷

অত্যন্ত ধীরে ঘৃণার সেই কালো জ্বলন্ত ঢেউ আবার উত্থলে উঠলো৷

লিন্ডার মুখ হয়ে গেলো ফ্যাকাশে৷ ওর ঠোঁট দুটো সামান্য ফাঁক হলো৷ ওর চোখের তারা তীক্ষ্ণ হয়ে এলো৷ এবং ওর আঙুলগুলো ক্রমশ কঠিন হয়ে আঁকড়ে ধরলো বাতাস...৷

স্ত্রীর ঘরে দরজায় টোকা মারলেন কেনেথ মার্শাল৷ ওর সাড়া পেতেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন তিনি৷

আর্লেনা তখন শেষবারের মতো নিজের সাজগোজ দেখে নিচ্ছিলো৷ ওর পরনে চোখ-ধাঁধানো সবুজ পোশাক—অনেকটা মৎস্যকন্যার মতো৷ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পাতায় ও ম্যাস্কারা লাগাচ্ছিল, বললো, ‘ও—তুমি!’

‘হ্যাঁ৷ দেখতে এলাম তোমার হলো কিনা৷’

‘আর এক মিনিট৷’

কেনেথ মার্শাল ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন জানলার কাছে৷ তাকালেন সমুদ্রের দিকে৷ তাঁর মুখমণ্ডল, বরাবরের মতোই, অভিব্যক্তিহীন৷ সেই সঙ্গে শান্ত এবং স্বাভাবিক৷

ঘুরে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘আর্লেনা?’

‘উঁ—?’

‘রেডফার্নকে তুমি আগে থেকে চিনতে, তাই না?’

আর্লেনা সহজভাবেই জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ, সোনা৷ কোন একটা ককটেল পার্টিতে যেন দেখা হয়েছিলো৷ ওকে আমাকে বেশ ভালো লেগেছিলো৷’

‘আমারও সেইরকম ধারণা৷ তুমি কি জানতে যে সে এবং তার স্ত্রী এখানে বেড়াতে আসছে?’

আর্লেনা মেলে ধরলো ওর গভীর আয়ত চোখ৷

‘ওঃ, না, সোনা৷ সেইজন্যেই তো ভীষণ অবাক হয়ে গেছি৷’

কেনেথ মার্শাল শান্ত স্বরে বললেন, ‘আমি ভাবছিলাম, হয়তো সেটা জানতে বলেই এ জায়গাটার কথা তোমার মাথায় এসেছে৷ আমরা যাতে এখানেই আসি, সেজন্যে তুমি বরাবরই একটু বেশি আগ্রহ দেখিয়েছো৷’

আর্লেনা ম্যাস্কারা নামিয়ে রাখলো, ঘুরে তাকালো স্বামীর দিকে। হাসলো নেশাধরানো নরম হাসি৷ বলল, ‘এ জায়গাটার কথা কে যেন আমাকে বলেছিলো৷ সম্ববত রোজান্ডরা৷ ওরা বলেছিলো, জায়গাটা ভীষণ চমৎকার—আর সুন্দর৷ কেন, তোমার ভালো লাগছে না?’

কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘কি জানি, জানি না৷’

‘ওঃ কেন তুমি তো সমুদ্রে স্নান করতে আর ঘুরে বেড়াতে ভালোবাসতে৷ এখানে তোমার নিশ্চয়ই ভালো লাগবে৷’

‘বেশ বুঝতে পারছি, জায়গাটা তোমার অন্তত ভালোই লাগবে৷’

আর্লেনার আয়ত চোখ আরও বিস্তৃত হলো৷ অনিশ্চিত দৃষ্টিতে ও তাকালো কেনেথ মার্শালের দিকে৷

কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘আমার মনে হয়, আসলে ব্যাপারটা হলো, তুমি রেডফার্নকে আগেই জানিয়েছো যে তুমি এখানে আসছো৷’

আর্লেনা বললো, কেনেথ সোনা, তুমি এরকম করে কথা বলছো কেন?’

কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘শোনো আর্লেনা৷ তুমি কি ধরনের মেয়ে আমি জানি৷ তাই বলছি, রেডফার্নরা মোটামুটি সুখী স্বামী-স্ত্রী৷ ছেলেটা সত্যিই ওর বউকে ভালোবাসে৷ তুমি কি চাও ওদের এই সুখের সম্পর্কে চিড় ধরুক?’

আর্লেনা বলল, ‘আমাকে দোষ দেওয়াটা তোমার ঠিক হচ্ছে না, কেন৷ আমি তো কিছু করিনি—কিছুই করিনি৷ আমি কি করতে পারি, যদি—’

আর্লেনার কথার খেই ধরে প্রশ্ন করলেন কেনেথ মার্শাল, ‘যদি কি?’

আর্লেনার চোখের পাতায় কাঁপন ধরলো৷

‘অবশ্য, আমি জানি, পুরুষরা আমাকে দেখলে পাগল হয়ে যায়৷ কিন্তু সেটা তো আমার দোষ নয়৷ ওদের অমনি হয়৷’

‘তাহলে তুমি স্বীকার করছো, রেডফার্ন তোমার জন্য পাগল?’

আর্লেনা অস্পষ্ট স্বরে জবাব দিলো, ‘সেটা নিছকই ওর বোকামি৷’

ও এক পা এগিয়ে গেলো স্বামীর দিকে৷

‘কিন্তু তুমি তো জানো, কেন, তুমি ছাড়া আর কারো কথা আমি ভাবি না?’

কৃষ্ণাভ চোখের পাতার ফাঁকে কেনেথ মার্শালের চোখে তাকালো আর্লেনা৷

সে দৃষ্টি এক কথায় বিস্ময়কর—যা খুব কম পুরুষই প্রতিরোধ করতে পারে৷

কেনেথ মার্শাল গম্ভীরভাবে চোখ নামালেন আর্লেনার চোখে৷ তাঁর মুখ অভিব্যক্তিহীন৷ কণ্ঠস্বর শান্ত৷ তিনি বললেন, ‘আমার ধারণা, তোমাকে আমি বেশ ভালোভাবেই চিনি, আলেনা...’

হোটেলের দক্ষিণ দিকে বেরোলেই আপনার চোখে পড়বে সামনে বিস্তৃত বাঁধানো উঠোন, আর তার নিচেই সমুদ্রতীর৷ দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের ছোট পাহাড়টার কোল ঘেঁষে আরও একটা পথ দ্বীপকে ঘিরে এগিয়ে গেছে৷ সেই পথ ধরে কিছুটা গেলে কয়েক ধাপ সিঁড়ি আপনাকে নামিয়ে নিয়ে যাবে পাহাড়ের পাথর কেটে তৈরি কতকগুলো কৃত্রিম কুঠুরীর দিকে৷ হোটেল থেকে প্রচারিত দ্বীপের মানচিত্রে এই জায়গাটাকে ‘সানি লেজ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে৷ কৃত্রিম গুহাগুলোর ভেতরে পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে কতকগুলো বেদী—বসার জন্য৷

নৈশভোজের ঠিক পরেই প্যাট্রিক রেডফার্ন ও তার স্ত্রী এসে বসলো—এই রকমই একটা গুহায়৷ রাতের স্পষ্ট আকাশে চোখে পড়েছে উজ্জ্বল চাঁদ৷

কিছুক্ষণ ওরা চুপচাপ রইলো৷

অবশেষে প্যাট্রিক রেডফার্ন মুখ খুললো, ‘আজকের রাতটা খুব সুন্দর তাই না ক্রিস্টিন?’

‘হুঁ —’

ওর কণ্ঠস্বরে একটা অদ্ভুত আভাস পেয়ে প্যাট্রিক অস্বস্তি বোধ করলো৷ ওর দিকে না তাকিয়েই সে চুপচাপ বসে রইলো৷

ক্রিস্টিন ওর স্বভাবসিদ্ধ শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলো, ‘তুমি কি জানতে যে ওই মেয়েটা এখানে আসছে?’

প্যাট্রিক চমকে ঘুরে তাকালো, বললো, ‘তার মানে?’

‘আমার তো মনে হয়, মানেটা বেশ ভালো বুঝতে পারছো!’

‘শোনো, ক্রিস্টিন—জানি না, হঠাৎ তোমার কি হয়েছে—’

বাধা দিলো ক্রিস্টিন৷ ও স্বরে আবেগের স্পর্শ, ও শরীর কাঁপচে৷

‘আমার কি হয়েছে? আমার কিছু হয়নি, হয়েছে তোমার৷’

‘আমার কিছু হয়নি—’

‘ও—প্যাট্রিক! কিছু একটা হয়েছে! তুমি এখানে আসার জন্যে প্রথম থেকে জোর করেছিলে৷ আমার কোন কথা কানে তোলনি৷ আমি টিন্টাজেলে আবার যেতে চেয়েছিলাম—সেখানে আমাদরে হানিমুন কেটেছিলো৷ কিন্তু তুমি এখানে আসার জন্যে একেবারে গোঁ ধরে ছিলে৷’

হ্যাঁ, তাতে কি হয়েছে? এ জায়গাটা অত্যন্ত চমৎকার৷’

‘হয়তো৷ কিন্তু তুমি এখানে আসতে চেয়েছিলে যেহেতু ও এখানে আসছে৷’

‘ও? ও মানে?’

‘মিসেস মার্শাল৷ তুমি—তুমি ওর মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছো৷’

‘ভগবানের দোহাই, ক্রিস্টিন, বোকার মতো কথা বলো না৷ কাউকে ঈর্ষা করা তো তোমার স্বভাব নয়!’

প্যাট্রিকের স্বরে উন্মক্ত ক্রোধের অনিশ্চিত সুর, এবং তার তীব্রতা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি৷

ক্রিস্টিন বললো, ‘আমরা কত সুখী ছিলাম৷’

‘সুখী? নিশ্চয়ই আমরা সুখী ছিলাম! আর এখনও আছি৷ কিন্তু আমাকে কোন মেয়ের সঙ্গে দুটো কথা বলতে দেখলেই তুমি যদি এমনি খুঁচিয়ে ঝগড়া করো, তাহলে আর বেশি দিন সুখে থাকা বোধহয় সম্ভব হবে না৷’

‘না, তা নয়৷’

‘হ্যাঁ, তাই৷ বিয়ের পর কোন পুরুষের অন্য লোকেদের সঙ্গে—ইয়ে—বন্ধুত্ব হওয়াটা নেহাৎই স্বাভাবিক৷ সে ক্ষেত্রে এ ধরনের সন্দেহজনক মনোভাবে মোটেই ঠিক নয়৷ আমি কোন সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে কথা বললেই তুমি ধরে নিচ্ছো আমি তার প্রেমে পড়েছি—’

সে থামলো, তারপর কাঁধ ঝাঁকালো৷

ক্রিস্টিন রেডফার্ন বললো, ‘তুমি সত্যিই ওর প্রেমে পড়েছো...’

‘ওঃ, বোকামো কোরো না, ক্রিস্টিন! আমি—আমি ওর সঙ্গে ভালো করে কথাই পর্যন্ত বলিনি৷’

‘মিথ্যে কথা৷’

‘ভগবানের দোহাই পথে দেখা হওয়া প্রতিটি সুন্দরী মেয়েকে ঘিরে আমাকে সন্দেহ করার এ স্বভাব তুমি ছাড়ো৷’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন বলল, ‘ও নিছকই একটা সুন্দরী মেয়ে নয়! ও—ও অন্য রকম৷ ও একটা নষ্ট মেয়েছেলে!৷ ও তোমার ক্ষতি করবে, প্যাট্রিক৷ আমার কথা শোনো,এসব ছেড়ে দাও৷ চলো, আমরা এখান থেকে চলে যাই৷’

প্যাট্রিক রেডফার্নের উদ্ধত চিবুকে ফুটে উঠলো বিদ্রোহী ভাব৷ বয়েসের তুলনায় অনেক বেশি তরুণ দেখালো তাকে৷ প্রতিবাদের সুরে সে বলে উঠলো, ‘একটু ভেবেচিন্তে কথা বলো, ক্রিস্টিন৷ আর—আর এ নিয়ে ঝগড়া কোরো না’

‘আমি তো ঝগড়া করছি না৷’

‘তাহলে একটু সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করো৷ এসো, হোটেলে ফিরে যাওয়া যাক৷’

প্যাট্রিক উঠে দাঁড়ালো৷ কিছুক্ষণ নীরব থেকে ক্রিস্টিন রেডফার্ন উঠে দাঁড়ালো৷

ও বললো, ‘আচ্ছা চলো...’

পাশের কুঠুরীতে বসে গভীর দুঃখে মাথা নাড়লেন এরকুল পোয়ারো৷

অন্য কেউ হয়তো সাধারণ ভদ্রতাবোধেই এই ব্যক্তিগত কথাবার্তার শ্রবণ-সীমার বাইরে নিজেকে সরিয়ে নিতেন, কিন্তু এরকুল পোয়ারো নয়৷ এ ধরনের ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ বিবেকহীন৷

‘তাছাড়া—’ পরে কোন একদিন তিনি তাঁর বন্ধু হেস্টিংসের কাছে এর ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘ওই ঘটনার সঙ্গে একটা খুনের প্রশ্ন জড়িয়ে ছিলো৷’

হেস্টিংস অবাক চোখে চেয়ে থেকে বলেছেন, ‘কিন্তু তখনও তো খুনটা হয়নি৷’

এরকুল পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ বললেন, ‘না হয়নি৷ কিন্তু বন্ধু সেই মুহূর্তে আমি তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পেয়েছিলাম৷’

‘তাহলে তুমি সেটা রুখলে না কেন?’

তখন এরকুল পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, যে কথা তিনি আগে মিশরেও একবার বলেছেন, যে যদি কোন মানুষ খুন করার জন্য বদ্ধপরিকর হয়, তবে তাকে বাধা দেওয়া নেহাৎ সহজ কাজ নয়৷ পরবর্তী ঘটনার জন্য তিনি নিজেকে কখনও দোষারোপ করেননি৷ কারণ তাঁর মতে খুনটা ছিলো অনিবার্য৷

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

‘গার্ল কোভ’ -এর ওপরে নরম ঘাসে ছাওয়া সমতলে পাশাপাশি বসেছিলেন রোজামন্ড ডার্নলি ও কেনেথ মার্শাল৷ দ্বীপের পূর্বদিকে অবস্থিত এই গোল কোভ৷ নির্জনে স্নান করতে ভোরের দিকে লোকে এখানে আসে৷

রোজামন্ড বলল, ‘লোকজনের সঙ্গ ছেড়ে নির্জনে কাটাতে বেশ ভালো লাগে৷’

নিচু স্বরে বিড়বিড় করলেন মার্শাল, ‘ম্‌-ম্‌-হুঁ৷

উপুড় হয়ে ছোট ছোট ঘাসের গন্ধ নিলেন তিনি৷

‘আ-হ—চমৎকার গন্ধ! শিপলির সেই মাঠগুলোর কথা মনে পড়ে?’

‘পড়ে৷’

‘দিনগুলো কি সুন্দর ছিলো৷’

‘হুঁ৷’

‘তুমি বেশি বদলাওনি, রোজামন্ড৷’

‘হ্যাঁ, বদলে গেছি৷ অনেক বদলে গেছি৷”

‘এখন তোমার অনেক নাম হয়েছে, অনেক টাকা-পয়সা হয়েছে, কিন্তু তুমি সেই পুরনো রোজামন্ডই আছো৷’

রোজমন্ড মৃদুস্বরে বলল, ‘যদি তাই থাকতে পারতাম—’

‘তার মানে?’

‘কিছু না৷ ভাবতে দুঃখ হয়, কেনেথ, যে ছোটবেলাকার সুন্দর স্বভাব উঁচু আদর্শ, কোনটাই আমরা চিরকাল ধরে রাখতে পারি না, তাই না?’

‘তোমার স্বভাব যে কোনকালে সুন্দর ছিলো, তার পরিচয় অন্তত আমি পাইনি, বৎসে৷ মাঝে মাঝেই যেভাবে রেগে উঠতে তুমি? একদিন তো রাগে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার গলাই টিপে ধরেছিলে৷’

রোজমণ্ড সশব্দে হাসলো, যেদিন টোবিক নিয়ে আমরা ভোঁদর ধরতে গিয়েছিলাম, সে দিনটা তোমার মনে আছে?...’

অতীত অভিযানের স্মৃতিচারণে এভাবেই কেটে গেলো বেশ কিছু সময়৷

অবশেষে নেমে এলো কয়েক মুহূর্তের নীরবতা৷

রোজামন্ডের আঙুল ওর ব্যাগের ফিতে নিয়ে খেলা করতে লাগলো৷ অবশেষে ও বললে, ‘কেনেথ?’

‘উঁ—’ কেনেথ মার্শালের উত্তর এলো অস্পষ্ট স্বরে৷ তিনি তখনও নরম ঘাসে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে আছেন৷

‘যদি আমি এমন কিছু বলি, যা হয়তো পুরোপুরিই অনধিকার চর্চা, তাহলে কি তুমি আমার সঙ্গে আর কথা বলবে না?’

কেনেথ মার্শাল ঘুরে উঠে বসলেন৷

‘আমার মনে হয় না,’ তিনি আন্তরিক সুরেই বললেন, ‘যে তোমার কোন কথাকে আমি কখনও অনধিকার চর্চা বলে-ভাবতে পারি৷ তুমি তো জানো, তোমার সে অধিকার আছে৷’

রোজামন্ড নিঃশব্দে ঘাড় নেড়ে কেনেথে মার্শালের শেষ কথাগুলোর অর্থ মেনে নিলো৷ ও শুধু গোপন করলো এই মুহূর্তে পাওয়া ওর ক্ষণিকের সুখটুকু৷

‘কেনেথ, তোমার স্ত্রীর কাছে তুমি বিবাহ-বিচ্ছেদ চাইছো না কেন?’

কেনেথ মার্শালের মুখমণ্ডলে পরিবর্তন এলো৷ খুশি খুশি অভিব্যক্তিটুকু ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়ে নেমে এলো কঠিনতার ছোঁয়া৷ পকেট থেকে পাইপ বের করে তিনি নিঃশব্দে তামাক ভরতে লাগলেন৷

রোজামন্ড বললো, ‘তোমাকে আঘাত দিয়ে থাকলে দুঃখিত৷’

তিনি শান্ত স্বরে বললেন, ‘না, আঘাত তুমি আমাকে দাওনি৷’

‘তাহলে, কেন তা করছো না?’

‘ও তুমি বুঝবে না, রোজামন্ড—’

‘তুমি কি ওকে খুব ভালোবাসো?’

‘এটা শুধু ভালোবাসাবাসির প্রশ্ন নয়৷ আমি ওকে বিয়ে করেছি৷’

‘জানি৷ কিন্তু ওর—ওর অনেক বদনাম আছে৷’

সতর্ক হাতে তামাক ঠুকতে ঠুকতে কথাটা কিছুক্ষণ ভাবলেন তিনি৷

‘কি জানি, হয়তো আছে৷’

‘তুমি ওকে ডিভোর্স করতে পারো, কেন৷’

রোজামন্ড সোনা, এ নিয়ে তোমার মাথা না ঘামানোই ভালো৷ পুরুষেরা ওকে দেখে জ্ঞানগম্যি হারিয়ে ফেলে বলে এ কথা মনে করার কোন কারণ নেই, যে ওর ও ওই একই অবস্থা হয়৷’

রোজামন্ড মুখের মতো একটা জবাব দিতে গিয়েও থেমে গেলো৷ তারপর বললে, ‘তবে এমন একটা ব্যবস্থা করো যাতে ও তোমাকে ডিভোর্স করে—যদি তুমি সে ভাবেই চাও৷’

‘তা বোধহয় সম্ভব নয়৷’

‘কিন্তু তোমাকে পারতেই হবে, কেন৷ আমি ঠাট্টা করে বলছি না৷ তোমার মেয়ের কথাটাও ভাবতে হবে৷’

‘লিন্ডা?’

‘হ্যাঁ, লিন্ডা৷’

‘এর সঙ্গে লিন্ডার কি সম্পর্ক?’

লিন্ডার পক্ষে আর্লেনা মোটেই ভালো নয়৷ আমার ধারণা, লিন্ডা আজকাল অনেক কিছু বেশ বুঝতে পারে৷’

কেনেথ মার্শাল দেশলাই জ্বেলে পাইপে অগ্নিসংযোগ করলেন, ধোঁয়া ছাড়বার ফাঁকে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, সে কথা মিথ্যে নয়৷ আমারও মনে হয় আর্লেনা ও লিন্ডা ঠিক মানিয়ে চলতে পারছে না৷ একটা ছোট মেয়ের পক্ষে এটা ভালো নয়৷ সেই জন্যেই আমার দুশ্চিন্তা হয়৷’

রোজামন্ড বললো, ‘লিন্ডাকে আমার খুব ভালো লাগে৷ ওর মধ্যে ভালো লাগার মতো কি যেন একটা আছে৷’

কেনেথ বললেন, ‘ও ঠিক ওর মায়ের মতো৷ সব কিছু ভীষণ গভীরভাবে নেয়, যেমন রুথ নিতো৷’

রোজামন্ড বললো, এরপরে কি তোমার মনে হয় না, আর্লেনাকে তোমার ত্যাগ করা উচিত?’

‘বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা সাজিয়ে?’

‘হ্যাঁ৷ আজকাল সবাই তাই করে৷’

আকস্মিক রুক্ষ স্বরে বলে উঠলেন, কেনেথ মার্শাল, ‘হ্যাঁ করে, আর ঠিক ওই জিনিসটাই আমি সবচেয়ে বেশি ঘেন্না করি৷’

‘ঘেন্না করো?’ ও ভীষণ চমকে গেলো৷

‘হ্যাঁ৷ জীবন যেন আজকাল বড় খেলো হয়ে গেছে৷ যদি কোন জিনিস নিয়ে পরে সেটা ভালো না লাগে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে ত্যাগ করতে আজ আর কোন বাধা নেই! আশ্চর্য! মানুষের মনে বিশ্বাস বস্তুটা অন্তত থাকা উচিত৷ তুমি যদি কোন মেয়েকে বিয়ে করে তার ভরণপোষণের ভার নাও, তাহলে সেই কর্তব্য পালনের দায়িত্ব একমাত্র তোমার৷ কারণ, তুমিই এ খেলা শুরু করেছো৷ সহজ বিয়ে এবং আরও সহজ বিবাহ-বিচ্ছেদে আমার ঘেন্না ধরে গেছে৷ আর্লেনা আমার স্ত্রী, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা৷’

রোজামন্ড সামনে ঝুঁকে এলো, নিচু স্বরে বললো, ‘তাহলে ব্যাপারটা তোমার কাছে অনেকটা সেইরকম? ‘যতদিন না মৃত্যু আমাদের বিচ্ছিন্ন করে?’

কেনেথ মার্শাল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই৷’

রোজমণ্ড বলল, ‘ও!’

একটি সঙ্কীর্ণ সর্পিল পথ ধরে লেদারকোম্ব উপসাগরে ফেরার পথে একটা বাঁকের মুখে মিসেস রেডফার্নকে আর একটু হলেই চাপা দিচ্ছিলেন হোরেস ব্ল্যাট৷

ক্রিস্টিন রাস্তার পাশে সারি দেওয়া ঝোপের গা ঘেঁষে দাঁড়াতেই সশব্দে ব্রেক কষে সানবীম থামালেন মিঃ ব্ল্যাট৷

‘এই যে!’ উৎফুল্ল কণ্ঠে বললেন মিঃ ব্ল্যাট৷

মিঃ ব্ল্যাট বিশাল চেহারার পুরুষ৷ মুখের রঙে লালচে আভাস৷ হালকা লাল চুলের আস্তরণ তাঁর চকচকে টাককে বৃত্তাকার পথে ঘিরে রেখেছে৷

ঘটনাচক্র তাঁকে যে জায়গাতেই নিয়ে যাক না কেন, সে জায়গার মধ্যমণি হয়ে থাকার ইচ্ছেটাই মিঃ ব্ল্যাটের একমাত্র উচ্চাশা৷ তাঁর মতে, বেশ সোচ্চারেই তিনি এ মত প্রকাশ করেছেন, জলি রজার হোটেলের কিঞ্চিৎ আনন্দ-সঞ্জীবনীসুধার প্রয়োজন আছে৷ কোন ঘটনাস্থলে তিনি যখনই উপস্থিত হন, তখন সেখানকার অন্যান্য লোকেরা যে বিচিত্র পদ্ধতিতে ক্রমশ দ্রবীভূত এবং অদৃশ্য করে ফেলে তাতে তাঁর রীতিমতো অবাক লাগে৷

‘আরেকটুকু হলেই আপনাকে স্ট্রবেরীর আচার বানিয়ে ফেলেছিলাম, কি বলেন?’ খুশির সুরে বললেন, মিঃ ব্ল্যাট৷

ক্রিস্টিন জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ, সে আর বলতে’

‘ঝটপট উঠে আসুন৷’ মিঃ ব্ল্যাট বললেন৷’

‘না, ধন্যবাদ—আমার হাঁটতে ভালোই লাগছে৷’

‘যত্তো সব!’ বললেন, মিঃ ব্ল্যাট, ‘তাহলে গাড়ির জন্ম হয়েছে কি করতে?’

নিরুপায় হয়েই গাড়িতে উঠলো ক্রিস্টিন রেডফার্ন৷

আচমকা ব্রেক কষে রোখার ফলে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো, মিঃ ব্ল্যাট বোতাম টিপে তাকে আবার চালু করলেন৷

মিঃ ব্ল্যাট প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, এখানে একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন কেন বলুন তো? উহুঁ, এ ঠিক নয়, অন্তত আপনার মতো সুন্দরী মেয়ের পক্ষে৷’

ক্রিস্টিন তাড়াতাড়ি বললে, ‘এমনিই৷ একা থাকতে আমার ভালো লাগে৷’

মিঃ ব্ল্যাট কনুই দিয়ে ওকে প্রচণ্ড এক খোঁচা মারলেন, এবং একই সঙ্গে গাড়িটা নিয়ে আর একটু হলে পাশের ঝোপে ধাক্কা মারছিলেন৷

‘মেয়েরা সবসময় ওই কথাই বলে!’ তিনি বললেন, ‘ওদের বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না৷ আসলে ওটা ওদের মনের কথা নয়৷ এই যে আমাদের জলি রজার হোটেল, ওটাকে ঘষে মেজে একটু চাঙ্গা করে তোলার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে৷ নামের সঙ্গে চরিত্রের কোন মিল নেই৷ কোন প্রাণ নেই৷ শুধু একগাদা বাজে লোক এসে হোটেলটায় ভিড় করেছে৷ প্রথমেই ধরুন, ওই একপাল বাচ্চা-কাচ্চা, আর নীরস বুড়োবুড়িগুলো৷ এছাড়া রয়েছে ভারতবর্ষ ঘুরে আসা ওই বিরক্তিকর বুড়োটা, আমাদের শরীর সাধক পাদ্রী সাহেব, ঘ্যানঘ্যানে মার্কিনগুলো আর ওই অদ্ভুত গোঁফওয়ালা বিদেশীটা—ওর গোঁফ দেখলেই আমার হাসি পায়৷ মনে হয়, লোকটা নির্ঘাত নাপিত-টাপিত না হয়ে যায় না৷’

ক্রিস্টিন মাথা নাড়ালো৷

‘উহুঁ, উনি একজন গোয়েন্দা৷’

মিঃ ব্ল্যাটের গাড়ি আবারও অল্পের জন্য সংঘর্ষের হাত থেকে রেহাই পেলো৷

‘পোয়ান্দা? আপনি বলতে চান উনি এখন ছদ্মবেশে রয়েছেন?’

ক্রিস্টিন হালকাভাবে হাসলো৷

ও বললো, ‘না, না, ওঁকে দেখতেই ওইরকম৷ ওঁর নাম এরকুল পোয়ারো৷ আপনি নিশ্চয়ই ওঁর নাম শুনে থাকবেন৷’

মিঃ ব্ল্যাট বললেন, ‘নামটা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি৷ ওহ্ হ্যাঁ, ভদ্রলোকের নাম আমি শুনেছি৷ কিন্তু আমার ধারণা ছিলো তিনি মারা গেছেন...৷ যাই বলুন, এরকম গোঁফওয়ালা গোয়েন্দার মরে যাওয়াই উচিত৷ তা উনি এখানে এসেছেন কি মতলবে?’

‘কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন নি—এমনিই ছুটিতে বেড়াতে এসেছেন৷’

‘হুঁ—হতে পারে৷’ মিঃ ব্ল্যাটকে এ ব্যাপারে বেশ সন্দিহান বলে মনে হলো, ‘লোকটা একটু কাঠখোট্টা ধরনের, তাই না?’

‘হ্যা, মানে—’ কিস্টিন ইতস্তত করে বললো, ‘একটু অদ্ভুত ধরনের বলতে পারেন৷’

‘আমার কথা হলো’, মিঃ ব্ল্যাট বললেন, ‘স্টটল্যান্ড ইয়ার্ড কি ঘুমিয়ে রয়েছে? এসব কাজে ইংরেজ ছাড়া আর কাউকে আমি ভরসা করি না৷’

পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে বিজয়ীর ভঙ্গীতে ঘনঘন হর্ন বাজিয়ে মিঃ ব্ল্যাট তাঁর সানবীমকে জলি রজারের গ্যারেজে ঢুকিয়ে দিলেন; গ্যারেজটা সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাসের কারণে, হোটেলের ঠিক বিপরীত দিকে, মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত৷

যে ছোট দোকানটা লেদারকোম্ব উপসাগরের অতিথিদের প্রয়োজন মেটায় সেই দোকানে দাঁড়িয়ে ছিলো লিন্ডা মার্শান৷ দোকানের একটা অংশ জুড়ে রয়েছে সারি সারি বই সাজানো কতকগুলো বইয়ের তাক৷ দু’পেনির বিনিময়ে অতিথিরা এই বই পড়তে নিতে পারেন৷ বইগুলোর নতুনতম সংস্করণটি অন্তত দশ বছরের পুরনো, কয়েকটা বিশ বছর আগেকার, আর বাকিগুলো আরও পুরনো৷

লিন্ডা দ্বিধাগ্রস্তভাবে প্রথমে একটা, তারপর আর একটা বই নামালো তাক থেকে, এক পলক উল্টোপাল্টে দেখলো বই দুটো, ওর মনে হলো ‘দি ফোর ফেদার্স’ অথবা ‘ভাইঝি ভার্সা’, কোনটাই ওর পড়তে ভালো লাগবে না৷ তাই ও ছোটখাটো বাদামি মলাটের আর একটা বই নামিয়ে নিলো৷

সময় গড়িয়ে চললো...

হঠাৎ পেছন থেকে ক্রিস্টিন রেডফার্নের কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েই চমকে উঠলো লিন্ডা, নিমেষের মধ্যে বইটাকে আবার তাকে গুঁজে রাখলো৷

‘কি বই পড়ছো, লিন্ডা?’

লিন্ডা তাড়াতাড়ি জবাব দিলো, ‘না, কিছু না৷ একটা ভালো বই খুজছি৷’

ও এবার ভালো করে না দেখেই টেনে বার করলো ‘দি ম্যারেজ অফ উইলিয়াম অ্যাশ’ বইটা এবং বিব্রতভাবে দুপেনি হাতড়াতে এগিয়ে গেলো কাউন্টারের দিকে৷

ক্রিস্টিন বললো, মিঃ ব্ল্যাট এইমাত্র আমাকে পৌঁছে দিলেন—অবশ্য তার আগে আমাকে প্রায় চাপাই দিয়েছিলেন৷ ভেবে দেখলাম, তাঁর সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে সেতুটা পার হাওয়া আমার সাহসে কুলোবে না, তাই কিছু কেনাকাটা করার আছে বলে চলে এসেছি৷’

লিন্ডা বলল, ‘ভদ্রলোক বড় সাংঘাতিক, তাই না? সব সময় খালি টাকার গরম দেখানো আর যতসব বীভৎস রসিকতা করেন৷’

ক্রিস্টিন বললে, ‘বেচারা! ওঁর জন্যে দুঃখ হয়৷’

লিন্ডা কিন্তু একমত হতে পারলো না৷ মিঃ ব্ল্যাটের জন্য দুঃখিত হওয়ার কোন কারণ ও খুঁজে পেল না৷ ও বয়েসে কিশোর এবং নির্মম৷

ক্রিস্টিন রেডফার্নের সঙ্গে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে এলো লিন্ডা, ঢালু রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল, কংক্রিটের সেতুর দিকে৷

নিজের চিন্তায় লিন্ডা তখন ব্যস্ত৷ ক্রিস্টিন রেডফার্নকে ওর ভালো লাগে৷ ওর মতে সারা দ্বীপে রোজমন্ড ডার্নলি এবং ক্রিস্টিন, এই দুজনকেই কেমন সহ্য করা যায়৷ প্রথমত, ওরা কেউই লিন্ডার সঙ্গে বেশি কথা বলে না৷ এবং এই মুহূর্তেও ক্রিস্টিন নীরবে ওর পাশে পাশে হাঁটছে৷ এটাই বুদ্ধিমতীর পরিচয়, লিন্ডা ভাবলো৷ যদি সত্যিই তেমন কিছু বলার না থাকে তাহলে শুধু শুধু বকবক করার দরকারটা কি?

নিজের সমস্যার জটিলতায় কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গেলো ও৷

তারপর হঠাৎই একসময় ও বললো, ‘মিসেস রেডফার্ন, আপনার কখনও মনে হয়নি, এখানে সবকিছু এত বিশ্রী—এত ভয়ঙ্কর যেন ঠিক ফেটে পড়ার মতো...?’

কথাগুলো প্রায় হাস্যকর, কিন্তু লিন্ডার চিন্তা-কুটিল কঠিন মুখে হাসির লেশমাত্র নেই৷ ক্রিস্টিন রেডফার্ন অনিশ্চিত অবুঝ চোখে ওর দিকে তাকালো, কিন্তু উপহাস করার মতো কিছু ওর নজরে পড়লো না৷

ওর শ্বাস প্রশ্বাস স্তব্ধ হলো মুহূর্তের জন্য৷

ও বললো, ‘হ্যাঁ—হ্যাঁ—মনে হয়েছে ঠিক এই জিনিসটাই...’

মিঃ ব্ল্যাট বললেন, ‘তাহলে আপনিই মশাই সেই বিখ্যাত গোয়েন্দা, অ্যাঁ?

ওঁরা বসেছিলেন জলি রজারের পানশালায়, মিঃ ব্ল্যাটের প্রিয় বিচরণ ক্ষেত্রে৷

এরকুল পোয়ারো তাঁর স্বভাবসিদ্ধ নাতিবিনীত ভঙ্গীতে ব্ল্যাটের বক্তব্যকে সমর্থন করলেন৷

মিঃ ব্ল্যাট বলে চললেন, ‘এখানে আপনি কি জন্যে এসেছেন কোন কাজে?’

‘না, না৷ আমারও তো মাঝে মাঝে বিশ্রামের প্রয়োজন৷ এমনি ছুটিতে বেড়াতে এসেছি৷’

মিঃ ব্ল্যাট চোখ টিপলেন৷

‘আপনি তো মশাই ওই কথাই বলবেন, তাই না?’

পোয়ারো জবাব দিলেন, বিনা প্রয়োজনে মিথ্যে বলে লাভ কি৷’

হোরেস ব্ল্যাট বললেন, ‘ওঃ হো! বলেই ফেলুন না৷ সত্যি কথা বলতে কি, আমার কাছ থেকে আপনি অন্তত নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন৷ আমি যা শুনি, সব সেরেফ হজম করে ফেলি! বহু বছর আগেই এ বিদ্যেটা মশাই রপ্ত করেছি৷ তা যদি না পারতাম, তাহলে আমার আজকের এই অবস্থায় পৌঁছতে পারতাম না৷ কিন্তু বেশির ভাগ লোকই কি রকম জানেন—খালি বকবক বক, যা শোনে তা উগরে না দিতে পারলে যেন স্বস্তি পায় না৷ অবশ্য আপনাদের পেশায় তো আর এ জিনিসটাকে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না! অতএব সেই কারণেই আপনাকে ভান করতে হবে যে আপনি এখানে শুধু ছুটি কাটাতেই এসেছেন, অন্য কোন কারণে নয়৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু আপনি এর উল্টোটাই বা ভাবছেন কেন?’

মিঃ ব্ল্যাট আবারও চোখ টিপলেন, বললেন, ‘আমি মশায় ঘোড়েল লোক৷ চেহারা দেখেই চরিত্র বুঝতে পারি৷ আপনার মতো লোকের পক্ষে “দাভিল’, “লা টোকে” অথবা “জুয়ান-লা-প্রিন্স”-এ যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিলো৷ অর্থাৎ যে জায়গাগুলোর সঙ্গে আপনার—কি যেন বলে?—আত্মিক যোগ থাকা সম্ভব৷

পোয়ারা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ জানলা দিয়ে বাইরে চোখ রাখলেন তিনি৷ কুয়াশাঘেরা দ্বীপে শুরু হয়েছে অঝোর বর্ষণ৷ তিনি বললেন, ‘সম্ভবত আপনার কথাই ঠিক৷ সেখানে অন্তত বর্ষার আবহাওয়ায় সময় কাটানোর বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে৷

‘যথা, আমার প্রিয় জুয়ার আড্ডা!’ বললেন মিঃ ব্ল্যাট, ‘জানেন, আমার জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কেটে গেছে কঠোর পরিশ্রমে৷ বেড়াবার বা ফুর্তি করবার, কোনটারই সময় পাইনি৷ চেয়েছিলাম সম্মান এবং প্রতিষ্ঠা—আজ তো পেয়েছি৷ এখন আমি যা মন চায় করতে পারি৷ আমার টাকার দাম কারও চেয়ে কিছু কম নয়৷ গত কয়েক বছরে অন্তত কিছু কিছু সুখ আনন্দ যে আমি চেখে দেখেছি, এটুকু আপনাকে বলতে পারি৷’

পোয়ারো অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘ও, তাই নাকি?’

‘জানি না, এখানে আমি কেন এলাম—’ মিঃ ব্ল্যাট বলে চললেন৷

পোয়ারো মন্তব্য করলেন, ‘সে কথা ভেবে আমিও অবাক হয়েেছি৷’

‘অ্যাঁ, কি বললেন?’

পোয়ারো অর্থপূর্ণভাবে হাত নাড়লেন৷

‘কিঞ্চিৎ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা যে আমরও নেই তা নয়৷ আমার বিশ্বাস, পছন্দের প্রশ্ন উঠলে, আপনি সহজেই এ জায়গার চেয়ে “দ্যভিল” অথবা “বিয়্যারিৎস”কে বেছে নিতেন৷’

‘আর তার বদলে আমরা দুজনেই এসে হাজির হয়েছি এখানে৷’

কর্কশ স্বরে হেসে উঠলেন মিঃ ব্ল্যাট৷

‘সত্যিই ভেবে পাই না, এখানে কেন এলাম৷’ তিনি আনমনা ভাবেই বলে চললেন, ‘আমার মনে হয়, এ জায়গাটার নামের সঙ্গে কেমন একটা অলীক গন্ধ জড়িয়ে ছিলো৷ জলি রজার হোটেল, স্মাগলার্স দ্বীপ৷ এগুলো যেন আপনাকে চঞ্চল করে তোলে, ছেলেবেলার কথা মনে করিয়ে দেয়, তাই না? জলদস্যু চোরাচালান, এই সব৷’

অপ্রতিভভাবে হাসলেন তিনি, ‘ছোটবেলা থেকে নৌকো নিয়ে প্রচুর ঘুরে বেড়িয়েছি৷ অবশ্য একদিকটায় নয়৷ পূর্ব উপকূল অঞ্চলে৷ আশ্চর্য, এ এমনই এক নেশা, যা কখনও পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায় না৷ ইচ্ছে করলে সাজানো-গোছানো একটা প্রমোদতরীও কিনে ফেলতে পারতাম, কিন্তু ও জিনিসটা ঠিক আমার মনে ধরে না৷ তার চেয়ে আমার ছোট পালতোলা নৌকোয় ভেসে বেরিয়ে মজা আছে৷ রেডফার্নও নৌকো বাইতে ভালোবাসে৷ বার দুয়েক আমার সঙ্গেও বেরিয়েছে৷ এখন তো ওর পাত্তাই পাওয়া যায় না—দিনরাত খালি মার্শালের লালচুলো বউটার পেছনে ঘুরঘুর করছে৷’

একটু থামলেন ব্ল্যাট৷ তারপর গলা নামিয়ে বলে চললেন, ‘হোটেলের বেশির ভাগ লোকই তো মশাই রসকষহীন শুকনো মাল! ওই মধ্যে মিসেস মার্শালের কাছেই যা একটু প্রাণের ছোঁয়া পাওয়া যায়৷ আমার ধারণা বউয়ের পেছনে দেখাশোনা করতেই মার্শালের গোটা দিনটা পার হয়ে যায় মিসেস যখন অভিনয়-জগতে ছিলেন তখন তাঁর নামে সবরকম গপ্পো চালু ছিলো—এবং এখনো আছে৷ ওঁকে দেখলে পুরুষদের মাথার আর ঠিক থাকে না৷ দেখবেন, এই নিয়েই এখানে একটা কেলেঙ্কারি হবে৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘কি কেলেঙ্কারি?’

হোরেস ব্ল্যাট উত্তর দিলেন, ‘সেটা অবস্থার ওপর নির্ভর করছে৷ মার্শালকে দেখে আমার অন্তত মনে হয়, সে একটু অদ্ভুত মেজাজের লোক৷ সত্যি কথা বলতে কি, “মনে হয় নয়’’ আমি ভালোভাবেই জানি৷ কারণ তার সম্বন্ধে কয়েকটা কথা আমার কানে এসেছে৷ এ ধরনের শান্ত কম কথার লোক আমি আগেও দেখেছি৷ মুখ দেখে এদের মনের ভাব কখনও জানা যায় না৷ রেডফার্নের সাবধান থাকা উচিত—’

তাঁর বক্তব্যের নায়কের পানশালায় প্রবেশ করতে দেখে মাঝপথেই থেমে গেলেন তিনি৷ তারপর অপ্রতিভ উঁচু স্বরে আলোচনার খেই ধরলেন, ‘আর আপনাকে যা বলছিলাম, এখানকার সমুদ্রে নৌকা চালিয়ে সত্যিই মজা আছে৷ আরে, রেডফার্ন যে, এক গেলাস করে হয়ে যাক? কি খাবেন বলুন? ড্রাই মার্টিনি? আচ্ছা মঁসিয়ে পোয়ারো আপনি?

পোয়ারো মাথা নেড়ে অসম্মত্তি প্রকাশ করলেন৷

প্যাট্রিক রেডফার্ন বসলো, বললো, ‘নৌকো চালানোর কথা বলছিলেন? পৃথিবীতে এর চেয়ে মজার নেশা আর নেই৷ ইচ্ছে হয়, এর পেছনে আরও বেশিসময় কাটিয়ে দিতে৷ ছোটবেলায় বেশির ভাগ সময় তো এখানকার উপকূলে নৌকো নিয়েই কাটিয়ে দিতাম৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনি তাহলে এইদিকটা ভালোভাবেই চেনেন?’

‘তা বলতে পারেন৷ এ হোটেল তৈরি হবার আগে থেকেই এ জায়গাটা আমার চেনা৷ তখন লেদারকোম্ব উপসাগরে পুরনো আমলের একটা পোড়ো বাড়ি আর কয়েক ঘর জেলে ছাড়া এ দ্বীপে কেউ ছিলো না৷’

‘একটা বাড়ি ছিলো এখানে?’

‘হ্যাঁ, বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত এক পোড়ো বাড়ি৷ বলতে গেলে প্রায় ধ্বংসাবশেষই বলা যায়৷ তখন নানারকম সব গল্প চালু ছিলো যে ওই বাড়ি থেকে পিক্সির গুহায় যাওয়ার নাকি অনেকগুলো গুপ্ত পথ আছে৷ এখনও মনে পড়ে, আমার সব সময় সেই গুপ্ত পথ খুঁজে বেড়াতাম৷’

হোরেস ব্ল্যাটের হাতে ধরা গেলাস কেঁপে উঠলো, ছলকে পড়লো পানীয়৷ শাপ-শাপান্ত করে রুমাল দিয়ে ভেজা জায়গাটা মুছে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘এই পিক্সির গুহাটা কি জিনিস?’

প্যাট্রিক বললো, ‘ও, আপনি জানেন না? ওটা পিক্সি কোভে আছে৷ গুহায় ঢোকবার পথটা কিন্তু চট করে খুঁজে পাবেন না৷ এক কোণে স্তূপাকারে রাখা একগাদা পাথরের মাঝে লুকানো রয়েছে পথটা৷ শুধু লম্বা একটা সরু ফাটল৷ একজন কোনরকমে কাত হয়ে ঢুকতে পারে৷ ভেতরে ওটা ক্রমশ চওড়া হয়ে বেশ বড়সড় একটা গুহার সৃষ্টি করেছে৷ বুঝতেই তো পারছেন, ছোট ছেলেদের কাছে সেটা কিরকম মজার জিনিস ছিলো৷ একজন বুড়ো জেলে আমাকে ওটা দেখিয়ে দিয়েছিলো৷ আজকাল এখানকার জেলেরাও ওটার খবর জানে না৷ এই তো সেদিন একজনকে জিগ্যেস করলাম, জাযগাটাকে পিক্সি কোভ কেন বলা হয়—তা সে কোন জবাবই দিতে পারলো না৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘আমি কিন্তু এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না৷ এই পিক্সিটা কি জিনিস?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন বললো, ‘একে আপনি খাস ডেভনশায়ারে চীজ বলতে পারেন৷ শীপস্টরের জলাভূমিতে একটা পিক্সির গুহা আছে৷ পিক্সির জন্যে উপহার হিসেবে লোকে সেখানে একটা করে আলপিন রেখে আসে৷ পিক্সি হলো এক ধরনের আত্মা, যা জলাভূমিতে বসবাস করে৷’

এরাকুল পোয়ারো বললেন, ‘হুঁ বেশ কৌতূহলের ব্যাপার৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন বলে উঠলো, ‘ডার্টমুরে এই পিক্সি নিয়ে এখনও অনেক কিংবদন্তী চালু আছে৷ সেখানে অনেক পাহাড়ের চূড়ায় পিক্সি আছে বলে মনে করা হয়৷ শুনেছি কুয়াশা-ঘেরা রাতে দেরি করে বাড়ি ফেরার পর কৃষকেরা এখনও অনুযোগ করে যে পিক্সি তাদের পথ ভুলিয়ে দিয়েছিলো৷’

হোরেস ব্ল্যাট বললেন, ‘তার মানে, যখন তারা দু-এক বোতল চড়িয়ে টং হয়ে থাকে?’

প্যাট্রিক হাসলো৷

‘এছাড়া সাধারণ বুদ্ধিতে এর আর কি ব্যাখ্যা হতে পারে, বলুন?’

ব্ল্যাট হাতঘড়িতে চোখ রাখলেন, বললেন, ‘আমি এবার চলি ডিনার সারতে৷ মোটের ওপর, রেডফার্ন যা-ই বলুন পিক্সিদের চেয়ে জলদস্যুদের আমি ঢের বেশি পছন্দ করি৷’

তিনি বেরিয়ে যেতেই প্যাট্রিক রেডফার্ন সশব্দে হেসে বললো, ‘সত্যি বলছি, পিক্সির পাল্লায় পড়লে ভদ্রলোকের কি হাল হয় সেটা আমার দেখতে ভীষণ ইচ্ছে করে!’

পোয়ারো আত্মগতভাবে মন্তব্য করলেন, ‘একজন কঠোর সংগ্রামী ব্যবসায়ীর পক্ষে মঁসিয়ে ব্ল্যাটের চিন্তাধারা একটু বেশি মাত্রায় কল্পনাবিলাসী৷’

রেডফার্ন বললো, ‘তার কারণ ভদ্রলোক অর্ধশিক্ষিত৷ অন্তত আমার স্ত্রী তাই বলে৷ ভদ্রলোক এখনও কি সব বই পড়েন, দেখুন! শুধু রহস্য-রোমাঞ্চ আর কাউবয়দের কাহিনী।’

পোয়ারো বললেন, অর্থাৎ, আপনি বলতে চান তাঁর মন এখনও ছোট ছেলের মতো?’

‘কেন, আপনার কি তা মনে হয় না?’

‘আমি? আমি ওকে কতটুকুই বা জানি৷’

‘সে তো আমিও জানি না৷ কেবল বারকয়েক তাঁর সঙ্গে নৌকো নিয়ে বেরিয়েছি—কিন্তু দেখলাম তিনি সঙ্গীসাথী খুব একটা পছন্দ করেন না৷ একা একা থাকতেই ভালোবাসেন৷’

‘ব্যাপারটা আমার কাছে একটু অদ্ভুত লাগছে৷ এটা তাঁর ডাঙার ব্যবহারে সম্পূর্ণ বিপরীত৷’

রেডফার্ন সশব্দে হাসলো, বললো, ‘জানি৷ ওঁর কাছ থেকে সর্বদা শত হস্তেন থাকতে আমাদের রীতিমতো অসুবিধায় পড়তে হয়৷ এ জায়গাটাকে ‘ম্যারগেট’ এবং ‘লা টোকে’র মাঝামাঝি কিছুতে তৈরি করতে পারলে তিনি খুশি হন৷’

কয়েক মিনিট পোয়ারো নীরব রইলেন৷ তিনি একান্ত মনোযোগের সঙ্গে তাঁর সঙ্গীর হাস্যময় মুখমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করছিলেন৷ তারপর আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিতভাবে বলে বসলেন, ‘আমার মনে হয়, মঁসিয়ে রেডফার্ন, আপনি জীবনকে উপভোগ করতে ভালোবাসেন৷’

প্যাট্রিক অবাক হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷

‘নিশ্চয়ই ভালোবাসি৷ কেন বাসবো না?’

‘সত্যিই তো, কেন বাসবেন না৷’ পোয়ারো সমর্থন করলেন, ‘এ জন্যে আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি৷’

‘এবং এই প্রসঙ্গে, একজন বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে, অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে, আপনাকে আমি একটা ছোট্ট উপদেশ দিতে সাহস করছি৷’

‘বলুন?’

‘আমার পুলিশ-বাহিনি জনৈক বিচক্ষণ বন্ধু বহু বছর আগে আমাকে বলেছিলেন, ‘ভাই এরকুল, জীবনে যদি শান্তি চাও তাহলে স্ত্রীলোকদের এড়িয়ে চলবে৷’

প্যাট্রিক রেডফান বললো, ‘তা যদি বলেন, তাহলে আমার ক্ষেত্রে আপনার একটু দেরি হয়ে গেছে৷ আপনি তো জানেন, আমি বিবাহিত৷’

‘হ্যাঁ, জানি৷ আপনার স্ত্রী একজন মর্জিত রুচির সুন্দরী মহিলা৷ আমার ধারণা, তিনি আপনাকে যথেষ্ট ভালোবাসেন৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন তীব্র স্বরে বলে উঠলো, ‘আমিও ওকে যথেষ্ট ভালোবাসি৷’

‘যাক’, বললেন, এরকুল পোয়ারো, ‘এ কথা শুনে বড় সুখী হলাম৷’

প্যাট্রিক অকস্মাৎ রাগে ফেটে পড়লো, ‘কি বলতে চাইছেন আপনি?’

‘নারী ছলনাময়ী৷’ পোয়ারো চোখ বুজে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন, ‘তাঁদের সম্পর্কে কিছু কিছু অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে৷ জীবনকে জটিল করে তুলতে ওঁরা পারদর্শিনী৷ এবং ইংরেজরা তাঁদের প্রণয়ঘটিত ব্যাপারে বড় অদ্ভুতভাবে আচরণ করে৷ মঁসিয়ে রেডফার্ন, এখানে আপনার আসাটা যদি এতই জরুরি ছিলো তাহলে, কোন্ সুবাদে আপনি স্ত্রী সঙ্গে নিয়ে এলেন?’

রেডফার্ন রাগী সুরে বললো, ‘আপনি কি বলেছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না৷’

এরকুল পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, ‘আপনি বেশ স্পষ্টই বুঝতে পারছেন৷ মোহাচ্ছন্ন কোন পুরুষের সঙ্গে তর্ক করার মতো নির্বোধ আমি নই৷ আমি শুধু আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি৷’

‘ও আপনি তাহলে ওই বেহদ্দ মেয়েছেলেগুলোর কথা শুনেছেন৷ মিসেস গার্ডেনার, ওই ব্রুস্টার মেয়েটা—দিনরাত জিভ চালানো ছাড়া ওদের আর কোন কাজ নেই৷ যেহেতু একটা মেয়েকে দেখতে সুন্দর ব্যস্ অমনি ওরা তাকে ঘিরে নোংরা গালগল্প নিয়ে মুখিয়ে উঠেছে৷’

এরকূল পোয়ারো উঠে দাঁড়ালেন৷ তিনি মৃদুস্বরে বললেন, ‘সত্যিই কি আপনার এখনও এসব করার বয়েস আছে?’

ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে পানশালা ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন পোয়ারো৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন আগুনঝরা দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলো তাঁর গমনপথের দিকে৷

খাবার ঘর ছেড়ে বেরিয়ে হল ঘরে এসে থমকে দাঁড়ালেন এরকুল পোয়ারো৷ ঘরে সব ক’টা দরজাই খোলা—রাতের এক ঝলক ঠাণ্ডা হাওয়া এসে অনধিকার প্রবেশ করলো ঘরে৷

বৃষ্টি থেমে গেছে৷ ঘন কুয়াশাও এখন মিলিয়ে গেছে৷ আবার আত্মপ্রকাশ করেছে৷ তারা ঝলমলে রাতে৷

পাহাড়ের কিনারায় ওর প্রিয় আসনে ক্রিস্টিন রেডফার্নকে আবিষ্কার করলেন এরকুল পোয়ারো৷ তিনি ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘আপনি ভিজে আসনে বসেছেন, মাদাম৷ এখানে আপনার বসা ঠিক নয়—ঠান্ডা লাগবে৷’

“উহুঁ, কিচ্ছু হবে না৷ আর হলেই বা কি যায় আসে?’

‘আপনি তো আর অবুঝ শিশু নন, মাদাম! আপনি একজন শিক্ষিত মহিলা৷ আপনার অন্তত সবকিছু বুঝে শুনে করা উচিত!’

শীতল স্বরে উত্তর দিলো ও, ‘নিশ্চিন্ত থাকুন, মঁসিয়ে পোয়ারো, ঠাণ্ডায় আমার কিছু হয় না!’

পোয়ারো বললেন, ‘আজকের দিনটা ছিলো বৃষ্টি-ভেজা দিন৷ ঝড় উঠে ছিলো, এসেছিলো বর্ষা, ঘনকুয়াশা আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে সাময়িকভাবে করে দিয়েছিলো অন্ধ... কিন্তু এখন? কুয়াশা মিলিয়ে গেছে, আকাশ আবার আগের মতোই পরিষ্কার এবং তারারা চিকমিক করে জ্বলছে৷ জীবনও অনেকটা এইরকম, মাদাম৷’

ক্রিস্টিন চাপা স্বরে বললো, ‘জানেন, এখানে আমার সবচেয়ে অসহ্য লাগে কোন জিনিসটা?

‘কি, মাদাম?’

‘দয়া!’

ওর তীক্ষ্ণ স্বরে শব্দটা যেন চাবুকের মতো আছড়ে পড়লো৷

ও বলে চললে, ‘আপনারা ভাবেন, আমি কিছু বুঝি না? কিছু দেখি না? সবাই সর্বক্ষণ বলে বেড়াচ্ছে, ‘বেচারা মিসেস রেডফার্ন—ইস, ওকে দেখলে কষ্ট হয়৷’ অর্থাৎ আমার অবস্থা দেখে তাঁদের করুণা হচ্ছে৷ আর, ঠিক এই জিনিসটাই আমি সহ্য করতে পারি না৷’

পকেট থেকে রুমাল বের করে অতি সাবধানে পাথরের আসনে বিছিয়ে দিলেন পোয়ারো, বসলেন৷ তারপর তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্য রাখলেন, ‘আপনার কথা একেবারে মিথ্যে নয়৷’

‘ওই মেয়েটা—’ মাঝপথেই থেমে গেলো ক্রিস্টিন৷

পোয়ারো গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে কয়েকটা কথা বলি, মাদাম? যে কথা আকাশের ওই উজ্জ্বল নক্ষত্রদের মতোই সত্যি? এই পৃথিবীর আর্লেনা স্টুয়ার্টরা—অথবা আর্লেনা মার্শালরা—কখনও ধর্তব্যের মধ্যে আসে না৷

ক্রিস্টিন রেডফার্ন বললো, ‘বাজে কথা৷’

‘উঁহু—সত্যি, আমি আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি৷ তাদের রাজত্ব হয় ক্ষণস্থায়ী, শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্যে৷ মনে সত্যিকারের স্থায়ী দাগ কাটেন একমাত্র তাঁরাই যাঁদের মধ্যে প্রশংসনীয় গুণ আছে, আছে বুদ্ধি৷’

ঘৃণাভরা স্বরে ক্রিস্টিন বললো, ‘আপনি কি ভাবেন পুরুষেরা গুণ বুদ্ধি—এসবের কোন গুরুত্ব দেয়?’

পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, নিশ্চয়ই দেয়৷’

ক্রিস্টিন সংক্ষেপে হাসলো, বললো, ‘আমি কিন্তু একমত হতে পারলাম না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনার স্বামী আপনাকে ভালোবাসেন, মাদাম৷ আমি জানি৷’

‘আপনার পক্ষে তা জানা সম্ভব নয়৷’

‘হ্যাঁ, আমি জানি৷ আমি তাঁকে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছি৷’

হঠাৎই ভেঙে পড়লো ক্রিস্টিন৷ পোয়ারোর কাঁধে মাথা রেখে ফুলে ফুলে কাঁদতে লাগলো ও৷

ও বলে উঠলো, ‘আমি আর সইতে পারছি না... আর সইতে পারছি না...’

পোয়রো ওর পিঠে হাতে রেখে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলেন৷ আশ্বাসের সুরে বললেন, ‘ধৈর্য ধরুন, মাদাম... শুধু একটু ধৈর্য ধরুন৷’

অবশেষে নিজেকে সামলে নিয়ে ও উঠে বসলো৷ রুমালে চোখ মুছে রুদ্ধ স্বরে বললো, ‘মসিয়ে পোয়ারো, আপনি এখন যান৷ আমি—আমি একটু একা থাকতে চাই৷’

পোয়ারো সে অনুরোধ রাখলেন৷ ক্রিস্টিনকে একা রেখে আঁকাবাঁকা পথ ধরে তিনি ফিরে চললেন হোটেলের দিকে৷

হোটেলের কাছাকাছি পৌঁছে হঠাৎই তাঁর কানে চাপা কথাবার্তার শব্দ৷

পথ ছেড়ে পাশে কিছুটা এগোতেই তিনি দেখলেন, ঝোপের সারির মাঝে একটা ফাঁকা অংশে পাশাপাশি বসে আছে আর্লেনা মার্শাল ও প্যাট্রিক রেডফার্ন৷

তিনি শুনতে পেলেন পুরুষটির আবেগকম্পিত কণ্ঠস্বর, ‘আর্লেনা, তোমার জন্যে আমি সবকিছু ভুলে বসে আছি—তুমি আমাকে—আমাকে পাগল করে দিয়েছো... কিন্তু তুমি কি আমার জন্যে একটুও ভাবো না, আমাকে ভালোবাসো না, বলো?’

পোয়ারো আর্লেনা মার্শালের মুখমণ্ডল স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলেন—তাঁর মনে হলো, যেন কোন বেড়াল আদরে উত্তাপে বসে সুখ অনভব করছে—সে ভঙ্গীর সঙ্গে মানুষের চেয়ে পশুর সাদৃশ্য অনেক বেশি৷ আর্লেনার হালকা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘নিশ্চয়ই, প্যাট্রিক সোনা, আমি তোমাকে ভালোবাসি৷ তুমি তো জানো...’

পোয়ারো এই প্রথম তাঁর অপশ্রবণে ক্ষান্তি দিলেন৷ সরু ঢালু পথ ধরে আবার ফিরে চললেন হোটেলের দিকে৷

মাঝপথে হঠাৎ একজন তাঁর সঙ্গ নিলেন৷ তিনি ক্যাপ্টেন মার্শাল৷

মার্শাল বললেন, চমৎকার রাত, কি বলেন? বিশেষ করে ওরকম একটা জঘন্য দিনের পর৷’ তিনি চোখ তুলে তাকালেন আকাশের দিকে, ‘মনে হচ্ছে, কালকের আবহাওয়া ভালো থাকবে৷’

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

২৫শে আগস্টের সকাল বয়ে নিয়ে এলো উজ্জ্বল নির্মেঘ দিনের আশ্বাস৷ এমন সুন্দর সকাল কোন চূড়ান্ত অলসকেও বিছানা ছাড়তে লোভ দেখায়৷

জলি রজারের অনেকেই আজ সকাল সকাল উঠেছেন৷

সাজের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বাদামী রঙের মোটা বাঁধানো বইটা খোলা অবস্থাতেই উপুড় করে রাখলো লিন্ডা৷ তারপর তাকালো আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে৷ সকাল এখন আটটা৷

ওর ঠোঁট জোড়ায় এক অদ্ভুত দৃঢ়তা, চোখের তারা স্বাভাবিকের চেয়ে ঈষৎ সঙ্কুচিত৷

ও রুদ্ধশ্বাসে উচ্চারণ করলো, ‘আমাকে পারতেই হবে...’

পাজামা ছেড়ে সাঁতারের পোশাক পরে নিলো লিন্ডা৷ তার ওপরে পরলো স্নানের ঢোলা পোশাক৷ ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা ধরে চলতে শুরু করলো ও৷ বারান্দার শেষে একটা দরজা খুলতেই দেখা গেলো একটা ঘোরানো লোহার সিঁড়ি সোজা নেমে গেছে নিচের পাথুরে জমিতে৷ সেখান থেকে একটা ঝোলানো লোহার মই নেমে গেছে সমুদ্রের জলে৷ প্রাত্যহিক প্রাতরাশ সেরে নেবার আগে হোটেলের যে সব অতিথিরা একটু শরীর ভিজিয়ে নিতে চান, তাঁরাই সময় সংক্ষেপ করার জন্য প্রধান সৈকতে না গিয়ে এ মইটা ব্যবহার করেন৷

লিন্ডা যখন বারান্দা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামছে, তখন ও মুখোমুখি হলো ওর বাবা সঙ্গে, তিনি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলেন৷ ওকে দেখে বললেন, ‘আজ সকাল সকাল উঠেছ দেখছি৷ স্নান করতে যাচ্ছো বুঝি?’

লিন্ডা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো৷

ওরা পরস্পরকে পাশ কাটিয়ে চলে গেলো৷

কিন্তু ঝোলানো মইয়ের দিকে না এগিয়ে হোটেলকে ঘিরে বাঁ পাশ দিয়ে যে পথটা কংক্রিটের সেতুর দিকে চলে গেছে, সে পথ ধরলো লিন্ডা৷ জোয়ারের কারণে সেতু এখন জলের নিচে, কিন্তু অতিথিদের পারাপারে নেকোটা কাছেই পাড়ে বাঁধা রয়েছে৷ ওটার দায়িত্ব যাঁর ওপর, তাঁকে কাছাকাছি কোথাও দেখা গেলো না৷ লিন্ডা নৌকোয় উঠে বাঁধন খুলে নৌকো ছেড়ে দিলো৷

ওপারে পৌঁছে, পাড়ে নৌকো বেঁধে ও ঢালু পথ বেয়ে এগিয়ে চললো... হোটেলের গ্যারেজ ছাড়িয়ে থামলো এসে ছোট দোকানটার কাছে৷

দোকানের মহিলাটি তখন সবেমাত্র দোকান খুলে ঘর ঝাঁট দিতে শুরু করেছে৷ লিন্ডাকে দেখে সে রীতিমতো অবাক হলো৷

‘আপনি আজ খুব সকাল সকাল উঠেছেন, মিস৷’

লিন্ডা স্নান-পোশাকের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনলো কিছু টাকা৷ তারপর কেনাকাটার মন দিলো৷

লিন্ডা যখন ফিরে এলো তখন ক্রিস্টিন রেডফার্ন ওর ঘরে দাঁড়িয়ে৷

‘ও, এই তো!’ বিস্মিত সুরে বললো ক্রিস্টিন, ‘আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো এখনও ঘুম থেকে ওঠোনি৷’

‘না, স্নান করতে গিয়েছিলাম৷’ লিন্ডা বললো৷

ওর হাতের প্যাকেটটা লক্ষ্য করলো ক্রিস্টিন, একটু অবাক হয়ে বললো, ‘পিয়ন আজ বেশ তাড়াতাড়িই ডাক বিলি করে গেছে দেখছি৷’

লিন্ডা চমকে উঠলো৷ ওর স্বভাবসিদ্ধ অগোছালো প্রকৃতির জন্য কাগজের প্যাকেটটা ওর হাত ফস্কে পড়ে গেলো মেঝেতে৷ পলকা সুতোটা ছিঁড়ে গিয়ে ভেতরে কয়েকটা জিনিস গড়িয়ে পড়লো বাইরে৷

ক্রিস্টিনের চোখে ফুটে উঠলো বিস্ময়৷

‘তুমি মোমবাতি কিনেছো কিসের জন্যে?’

কিন্তু লিন্ডার সৌভাগ্যবশত ক্রিস্টিন ওর উত্তরের অপেক্ষা করলো না৷ ওকে সাহায্য করতে মেঝে থেকে জিনিসগুলো তুলতে তুলতে বলে চললো, ‘জানতে এসেছিলাম, তুমি আমার সঙ্গে গাল কোভে যাবে কি না? আমি আজ সেখানে ছবি আঁকতে যাবো৷’

লিন্ডা বিনাদ্বিধায় সম্মতি জানালো৷

গত কয়েকদিনে ও একাধিকবারই ক্রিস্টিনকে ওর চিত্রাঙ্কন-অভিযানে সঙ্গ দিয়েছে৷শিল্পী হিসেবে ক্রিস্টিন খুব উঁচুদরের না হলেও লিন্ডার ধারণা, সম্ভবত এই ছবি আঁকার কপট অজুহাতই ওর অহঙ্কারকে এখনও অক্ষুণ্ণ রেখেছে৷ কারণ ওর স্বামী দিনের বেশিরভাগ সময়ই আর্লেনা মার্শালের সান্নিধ্যে কাটিয়ে দেয়৷

লিন্ডা দিনের পর দিন ক্রমশ খিটখিটে এবং বদ-মেজাজী হয়ে পড়ছে৷ ক্রিস্টিনের সঙ্গে সময় কাটাতে ওর ভালো লাগে, কারণ ক্রিস্টিন ছবি আঁকার সময় গভীর মনোযোগে ডুবে থাকে, এবং অত্যন্ত কম কথা বলে৷ তাতে লিন্ডা একরকম নিঃসঙ্গ তার স্বাদ অনুভব করে, অথচ ওর মনের মধ্যে থাকে কারও সঙ্গ লাভের এক অদ্ভুত আকুলতা৷ ওদের পরস্পরের প্রতি কেমন যেন একটা সূক্ষ্ম সহানুভূতির যোগ রয়েছে, সম্ভবত বিশেষ একজনকে সমানভাবে অপছন্দ করার মধ্যেই এর কারণ লুকিয়ে আছে৷

ক্রিস্টিন বললো, ‘বারোটায় আমি টেনিস খেলতে যাবো, তাই একটু তাড়াতাড়ি বেরোলেই ভালো হয়৷ ধরো, সাড়ে দশটা?’

‘ঠিক আছে, আমি তৈরি হয়ে থাকবো৷ হলঘরেই তাহলে আপনার সঙ্গে দেখা হবে৷’

অত্যন্ত দেরিতে প্রাতরাশ সেরে রোজামন্ড ডার্নলি খাবার ঘর ছেড়ে শ্লথ পায়ে বেরোতেই সিঁড়ি বেয়ে ত্বরিত নেমে আসা লিন্ডার সঙ্গে ওর ধাক্কা লাগলো৷

‘ওহ—দুঃখিত, মিস ডার্নলি৷’

রোজামন্ড বলল, ‘চমৎকার সকাল, তাই না? গতকালের পর এরকম একটা দিন বিশ্বাসই করা যায় না৷’

‘ঠিক বলেছেন৷ আমি মিসেস রেডফার্নের সঙ্গে গাল কোভে যাচ্ছি৷ সাড়ে দশটায় তাঁর সঙ্গে দেখা করবার কথা৷ ভাবছিলাম, হয়তো দেরিই হয়ে গেলো৷’

‘না, না—এখন সবে দশটা পঁচিশ৷’

‘যাক—তাহলে নিশ্চিন্ত৷’

লিন্ডাকে একটু হাঁপাতে দেখে রোজামণ্ড উৎসুক হয়ে তাকালো ওর দিকে।

‘তোমার জ্বর হয়নি তো, লিন্ডা?’

লিন্ডার চোখ অস্বাভাবিক উজ্জ্বল এবং ওর দু গালে লালচে আভা বেশ স্পষ্ট৷

‘কই—না তো৷ আমার কখনও জ্বর হয় না৷’

রোজমন্ড হেসে বললো, ‘আজকের দিনটা এত সুন্দর যে আমি বিছানায় বসে প্রাতরাশ খাওয়ার পুরনো অভ্যেস ছেড়ে সটান নিয়ে চলে এসেছি৷ এবং বীরপুরুষের মতোই খাওয়ার টেবিলে ডিম ও বেকনের মুখোমুখি হয়েছি৷’

‘হ্যাঁ—গতকালের পর আজকের দিনটা সত্যি অপূর্ব৷ আর সকালের দিকে গাল কোভে খুব ভালো লাগে৷ আমি গিয়ে একরাশ তেল মেখে খোলা রোদে শুয়ে থাকবো—’

রোজামন্ড বললো, ‘হ্যাঁ, গাল কোভে সকালের দিকে ভালো লাগে৷ তাছাড়া জায়গাটা এখানকার সৈকতের তুলনায় অনেক শান্ত নির্জন৷’

লিন্ডা লাজুক স্বরে বলল, ‘আপনিও চলুন না৷’

রোজামণ্ড মাথা নাড়লো৷ বললো, ‘না, আজ কতকগুলো অন্য কাজ আছে৷’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো নিচে৷

ওর পরনে আবহাওয়া উপযোগী লম্বা হাতার ঢোলা পোশাক: সবুজ কাপড়ের ওপর হলদে কাজ করা৷ ওর গায়ের ফ্যাকাশে পাণ্ডুর রঙের সঙ্গে সবুজ এবং হলদে রঙটাই যে সবচেয়ে বেশি বেমানান, সে কথা বলার জন্য রোজামণ্ডের জিভ নিসপিস করিতে লাগলো৷ পোশাক সম্পর্কে কোন বোধশক্তি নেই, এমন কাউকে দেখলে রোজামন্ডের ভীষণ অস্বস্তি হয়৷

ও ভাবলো, ‘যদি এই মেয়েটাকে আমি মনের মতো করে সাজাতে পারতাম, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই ওর স্বামী সচেতন হয়ে ঠিক ওর দিকে নজর দিতো৷ আর্লেনা বোকা হতে পারে, কিন্তু ও জানে নিজেকে কিভাবে সাজাতে হয়৷’

তারপর লিন্ডাকে ও বলল, ‘আশা করি সময়টা তোমার ভালই কাটবে৷ আমি একটা বই নিয়ে সানি লেজ-এর দিকে, যাচ্ছি৷’

এরকুল পোয়ারো যথারীতি তাঁর ঘরে বসেই কফি ও রোল সহকারে প্রাতরাশ সারলেন৷

সকালের সৌন্দর্য তাঁকে অভ্যাস-নির্দিষ্ট সময়ের আগেই হোটেল ছাড়তে বাধ্য করলো৷ তিনি যখন সমুদ্রতীরে নেমে এলেন, তখন সবে দশটা—এখানে তাঁর দৈনন্দিন উপস্থিতির সময় হতে তখনও অন্তত আধ ঘণ্টা দেরি৷ শুধু একজন ছাড়া বেলাভূমিতে আর কাউকে তাঁর নজরে পড়লো না৷

সেই একজন আর্লেনা মার্শাল৷

আর্লেনার পরনে ওর প্রিয় সাদা সাঁতারের পোশাক, মাথায় সবুজ টুপি৷ ও একটা সাদা কাঠের ভেলাকে জলে ভাসানোর চেষ্টা করছিলো৷ পোয়ারো নির্দ্বিধায় ওকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে গেলেন এবং পরোপকারিতার পুরস্কারস্বরূপ নিজের ধবধবে সাদা জুতো জোড়াকে সমুদ্রের জলে স্নান করালেন৷

আর্লেনা ওর নিজস্ব তির্যক দৃষ্টিতে পোয়ারোকে ধন্যবাদ জানালো৷

ভেলায় চড়ে এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে আর্লেনা তাঁকে ডাকলো, ‘মঁসিয়ে পোয়ারো?’

পোয়ারো তৎপর ভঙ্গিতে নিমেষে জলের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ালেন৷

‘মাদাম!’

আর্লেনা বললো, ‘আমার জন্যে একটা কাজ করবেন?’

‘নিশ্চয়ই।’

ও পোয়ারোর দিকে চেয়ে হাসলো৷ তারপর মৃদু স্বরে বললো, ‘কাউকে বলবেন না আমি কোথায় আছি৷’ ওর চোখে অন্তর-স্পর্শ করা দৃ্ষ্টি, ‘নইলে প্রত্যেকেই আমার পেছু নেবে৷ আমি আজ একটু একা থাকতে চাই৷’

নিপুণ হাতে বৈঠা বেয়ে এগিয়ে চললো আর্লেনা৷

পোয়ারো সমুদ্রতীর ছেড়ে উঠে এলেন৷ আপনমনেই বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘উহুঁ, একেবারেই অসম্ভব! আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না৷’

আর্লেনা স্টুয়ার্ট, যদি মঞ্চের নামেই ওকে সম্বোধন করা যায়, জীবনে কখনও একা থাকতে চেয়েছে কিনা সে বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷

অভিজ্ঞ এরকুল পোয়ারো সহজেই এর আসল কারণ অনুমান করলেন৷ আর্লেনা মার্শাল নিঃসন্দেহে কারও সঙ্গে দেখা করতে চলেছে, এবং কার সঙ্গে সে বিষয়েও পোয়ারোর মনে একটা সুস্পষ্ট ধারণা রয়েছে৷

কিন্তু মনে মনে ভাবলেও নিজের অনুমানকে ভ্রান্ত প্রমাণিত হতে দেখলেন পোয়ারো৷

কারণ সাদা ভেলাটা যেই পাহাড়ের বাঁকে অদৃশ্য হলো, তখনই তাঁর নজরে পড়লো, প্যাট্রিক রেডফার্ন লম্বা পা ফেলে হোটেলের দিক থেকে সমুদ্রতীরের দিকে নেমে আসছে—এবং তার ঠিক পেছনেই আসছেন কেনেথ মার্শাল৷

মার্শাল পোয়ারোকে দেখে ঈষৎ মাথা নোয়ালেন, ‘সুপ্রভাত, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আমার স্ত্রীকে দেখেছেন?’

পোয়ারো অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদের মতো জবাব দিলেন, ‘মাদাম তাহলে আজ সকালে উঠেছেন?’

মার্শাল বললেন, ‘ওকে ওর ঘরে দেখলাম না৷’ তিনি আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকালেন, ‘চমৎকার দিন৷ এখনই স্নানটা সেরে ফেলি৷ ফিরে গিয়ে আবার একগাদা কাগজ টাইপ করতে হবে৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন অপেক্ষাকৃত চাপা দৃষ্টিতে সমুদ্রতীরের দু-পাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো৷ তারপর পোয়ারোর পাশে বসে তার প্রেমিকার প্রতীক্ষা করতে লাগলো৷

পোয়ারো বললেন, ‘আর মাদাম রেডফার্ন? তিনিও কি ভোরে উঠেছেন?’

প্যাট্রির জবাব দিলো, ক্রিস্টিন? ও ছবি আঁকতে বেরোবে৷ ইদানীং দেখছি ওর ছবি আঁকার ঝোঁক বেড়ে গেছে৷’

প্যাট্রিক রেডফার্নের সুর অধের্য, এবং স্পষ্টই বোঝা গেলো তার মন পড়ে রয়েছে অন্য কোথাও৷ সময় যতই যেতে লাগলো, আর্লেনার জন্য তার অসহিষ্ণু ভাব ততই প্রকট হতে লাগলো৷ কোন পায়ের শব্দ শোনামাত্রই সে উৎসুক হয়ে ঘুরে তাকিয়ে দেখছে, হোটেলের দিক থেকে কে আসছে৷

কিন্তু শুধু হতাশার পর হতাশা৷

প্রথমে এলেন মিঃ এবং মিসেস গার্ডেনার—সেলাই ও সেলাইয়ের বইয়ে সুসজ্জিত হয়ে৷ তারপর এলেন মিস ব্রুস্টার৷

মিসেস গার্ডেনার তাঁর চেয়ারে গুছিয়ে বসলেন৷ তারপর যথারীতি অসীম উৎসাহে বুনতে শুরু করলেন—সেই সঙ্গে শুরু হলো তাঁর কথার স্রোত৷

‘আচ্ছা, মঁসিয়ে পোয়ারো, ব্যাপারটা কি? সমুদ্রতীর আজ এত ফাঁকা লাগছে? সব গেলো কোথায়?’

পোয়ারো বললেন, ‘মাস্টারম্যান ও কাওয়ানরা বাচ্চাকাচ্ছা সমেত দুটি পরিবারই সারাদিনব্যাপী নৌকো-বিহারে বেরিয়েছে৷’

‘ও, সেই জন্যেই আজ এত চুপচাপ লাগছে, হাসিহাসি চেঁচামেচি করার জন্য ওরা তো আর নেই৷ আর মাত্র একজনই দেখছি স্নান করছেন, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷’

মার্শাল তাঁর সাঁতার শেষ করে পাড়ে এলেন, তোয়ালে দুলিয়ে সৈকত ছেড়ে উঠে এলেন ওপরে৷

আজ সমুদ্রের জল চমৎকার৷’ তিনি বললেন, ‘কিন্তু এমনই দুর্ভাগ্য, ওদিকে একগাদা কাজ পড়ে রয়েছে৷ না গিয়ে উপায় নেই৷’

‘আজকের মতো চমৎকার দিনেও আপনার কাজ রয়েছে, ক্যাপ্টেন মার্শাল? তাহলে তো সত্যিই দুর্ভাগ্য বলতে হয়৷ উঃ, গতকাল কি বিশ্রীই না একটা দিন গেছে! আমি মিঃ গার্ডেনারকে বলেছিলাম যে রোজই যদি এইরকম বৃষ্টি-বাদলা চলতে থাকে তাহলে আমাদের এ জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া দ্বিতীয় পথ নেই৷ কারণ এইরকম কুয়াশা ঢাকা পরিবেশে আমার কেমন যেন মনমরা লাগে, আর একটা অদ্ভুত ভাব মনকে ঘিরে থাকে৷ আপনি হয়তো জানেন না, ছোটবেলা থেকেই আবহাওয়া আর পরিবেশের প্রতি আমি যথেষ্ট সংবেদনশীল৷ মাঝে মাঝে আমার মনে হতো, আমি শুধু চিৎকার করে যাই এবং বুঝতেই পারছেন, মা-বাবার কাছে এটা একটা সমস্যাই হয়ে উঠতো৷ কিন্তু আমার মা খুব ভালো ছিলো৷ মা বাবাকে বলতো, ‘সিনক্লেয়ার, বাচ্চাটার যদি সত্যিই চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়, তাহলে আমাদের বাধা দেওয়া উচিত নয়৷ এই চিৎকার করেই ও ও মনের ভাব প্রকাশ করতে চাইছে৷’ এবং স্বাভাবিকভাবেই আমার বাবা এ নিয়ে আর দ্বিমত করতো না৷ এমনিতে বাবা মায়ের অত্যন্ত অনুগত ছিলো৷ মা যা বলতো বিনাদ্বিধায় তাই করতো৷ তারা সত্যিই সুখী দম্পতি ছিলো, এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস মিঃ গার্ডেনারও আমার সঙ্গে একমত হবেন৷ তারা-এক কথায় ছিলো অসাধারণ স্বামী-স্ত্রী, ছিলো না, ওডেল?’

‘হ্যাঁ, সোনা৷’ বললেন, মিঃ গার্ডেনার৷

‘আপনার মেয়ে কোথায়, ক্যাপ্টেন মার্শাল?’

‘লিন্ডা? কি জানি, জানি না৷ হয়তো দ্বীপের এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷’

‘জানেন, ক্যাপ্টেন মার্শাল, মেয়েটাকে আমার দুর্বল আর রোগা বলে মনে হয়৷ ওকে ভালো মতো খাওয়া-দাওয়া করানো দরকার৷ আর খুব দরদ দিয়ে যত্ন আত্তি করা দরকার৷’

কেনেথ মার্শাল সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিলেন, ‘লিন্ডা ঠিক আছে৷’

কথা শেষ করে তিনি পা বাড়ালেন হোটেলের দিকে৷

প্যাট্রিক রেডফার্ন জলে নামলো না৷ সে অলসভাবে হোটেলের দিকে চেয়ে বসে রইলো৷ তার মুখমণ্ডলে নেমে এসেছে হতাশা ও অভিমানের কালো ছায়া৷

মিস ব্রুস্টার যখন এসেছেন, তাঁকে দেখে বেশ প্রাণবন্ত এবং হাসিখুশি বলেই মনে হয়েছে৷

আজকের কথাবার্তা অনেকটা সেদিন সকালেই মতোই চলতে লাগলো৷ মিসেস গার্ডেনারের শান্ত একঘেয়ে শব্দস্রোতকে কাটা কাটা তীক্ষ্ম মন্তব্যে যতিচিহ্নিত করতে চাইছেন মিস ব্রুস্টার৷

শেষে একসময় মিস ব্রুস্টার মন্তব্য করলেন, সমুদ্রতীর আজ একটু নির্জন মনে হচ্ছে৷ সবাই কি বেড়াতে-টেড়াতে গেছে নাকি?’

মিসেস গার্ডেনার বললেন, ‘এই তো আজ সকালেই আমি মিঃ গার্ডেনারকে বলছিলাম, আমাদের ‘‘ডাটমুরে’’ অবশ্যই একবার বেড়াতে যাওয়া দরকার৷ এমনিতেই জায়গাটা বেশ কাছে, তার ওপর ওখানকার পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার৷ আমার তো অপরাধীদের সেই কয়েদখানাটা দেখবার খুব ইচ্ছে—কি নাম যেন—‘প্রিন্সটাউন’, তাই না? আমার মনে হয়, আজই সব ব্যবস্থাপত্র সেরে কাল ডার্টমুরে রওনা দিলে ভালো হয়, কি বলো ওডেল?’

মিঃ গার্ডেনার বললেন, ‘হ্যাঁ, সোনা৷’

এরকুল পোয়ারো মিস ব্রস্টারকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আপনি কি এখন স্নান করতে নামবেন, মাদামোয়াজেল?’

‘নাঃ, আমি স্নানের পালা প্রাতরাশের আগেই সেরে নিয়েছি৷ সেই সময় একজন পরোপকারী ব্যক্তি একটা শিশি আর একটু হলেই আমার মাথায় বসিয়ে দিয়েছিলো৷ বোধহয় হোটেলের কোন জানলা দিয়ে বাইরে সমুদ্রে ছুড়ে দিয়ে থাকবে৷’

‘উহুঁ, এ ধরনের ছুড়ে ফেলার অভ্যেস রীতিমতো বিপজ্জনক৷’ বললেন, মিসেস গার্ডেনার, ‘একবার আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু টুথপেস্টের টিন মাথায় পড়ে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো—একটা বাড়ির পঁয়ত্রিশ তলার জানলা দিয়ে কেউ ওটাকে ছুড়ে ফেলেছিলো৷ ভাবুন, কিরকম সাংঘাতিক! এর জন্য আমার বন্ধুর অনেক ক্ষতি হয়৷’ তিনি এবার তাঁর উলের ভাণ্ডার হাতড়াতে লাগলেন, ‘ওডেল মনে হচ্ছে উলের বলটা আমি ফেলে এসেছি৷ ওটা শোবার ঘরে টেবিলের দ্বিতীয় কি তৃতীয় টানাতে আছে—একবার দ্যাকখো তো—’

‘হ্যাঁ, সোনা—দেখছি৷’

মিঃ গার্ডেনার অনুগতভাবে উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর অনুসন্ধানের কাজে রওনা হলেন৷

পোয়ারো বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাঁর সাদা জুতো জোড়া পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন৷ এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘আপনি কি জুতো পরেই জলে নেমেছিলেন নাকি, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

পোয়ারো মৃদু স্বরে বললেন, ‘অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে কাজ করার ফল—’

এমিলি ব্রুস্টার গলার স্বরকে খাদে নামিয়ে বললেন, ‘আমাদের ‘‘শ্রীমতী’’ কোথায়? তাকে এখনও দেখছি না?’

মিসেস গার্ডেনার তাঁর সেলাই থেকে চোখ তুলে প্যাট্রিক রেডফার্নের দিকে তাকালেন৷ তাকে লক্ষ্য করতে করতে চাপা স্বরে বললেন, ‘ওকে দেখে ঠিক থমথমে মেঘ বলে মনে হচ্ছে৷—ওঃ, এই পুরো ব্যাপার আমার এত বিশ্রী লাগছে—! ক্যাপ্টেন মার্শাল এ বিষয়ে কি ভাবেন কে জানে৷ ভদ্রলোক এত চমৎকার শান্ত মানুষ—একজন সত্যিকারে ইংরেজ এবং বিনয়ী৷ কোন বিষয়ে তিনি কি ভাবেন, তা আপনি টেরও পাবেন না৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন উঠে দাঁড়িয়ে সমুদ্রতীরে পায়চারি করতে লাগলো৷

মিসেস গার্ডেনার বিড়বিড় করলেন, ‘ঠিক যেন একটা বাঘ৷’

তিনজোড়া চোখ রেডফার্নকে লক্ষ্য করতে লাগলো৷ তাঁদের পর্যবেক্ষণ তাকে যেন অস্বস্তিতে ফেললো৷ তার মুখভাব এখন শুধু গম্ভীর নয়, তাতে এসে মিশেছে চাপা ক্রোধের কালো ছায়া৷ যেন এখুনি একটা বিস্ফোরণ ঘটবে৷

এই থমথমে আবহাওয়ায় তাঁদের কানে এলো মূল ভূখণ্ড থেকে ভেসে আসা ঘণ্টার হালকা শব্দ৷

এমিলি ব্রুস্টার মৃদু স্বরে বললেন, ‘পূব দিক থেকে তাহলে আবার হাওয়া বইছে৷ এখানে গির্জার ঘণ্টা শুনতে পাওয়াটা একটা সুলক্ষণ৷’

মিঃ গার্ডেনার বেগুনি উলের বল দিয়ে ফেরা পর্যন্ত কেউ আর কোন কথা বললেন না৷

‘কি ব্যাপার ওডেল, এত দেরি হলো?’

‘দুঃখিত, সোনা, কিন্তু এটা টেবিলের কোন টানাতেই ছিলো না৷ অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষে আলমারির তাকে পেলাম৷’

‘ও—৷ কিন্তু আশ্চর্য, আমার ধারণা ছিলো এটা আমি টেবিলের টানাতেই রেখেছি৷ সত্যি, আমার সেভাগ্যই বলতে হবে যে কখনও কোন আদালতে সাক্ষী দিতে আমার ডাক পড়েনি৷ সেখানে কোন কথা ঠিকমতো মনে করতে না পারলে অস্বস্তি আর চিন্তায় আমি হয়তো মরেই যেতাম৷’

মিঃ গার্ডেনার বললেন, ‘মিসেস গার্ডেনার অত্যন্ত নীতিবোধসম্পন্ন মহিলা৷’

আরও প্রায় মিনিট পাঁচেক পরে প্যাট্রিক রেডফার্ন মুখ খুললো, ‘মিস ব্রুস্টার, নৌকো নিয়ে আজ বেরোবেন না? আমি সঙ্গে গেলে আপনার আপত্তি আছে?’

‘আপত্তি? বরং অত্যন্ত খুশি হবো৷’ আন্তরিক সুরে বললেন, মিস ব্রুস্টার৷

‘তাহলে চলুন, আজ গোটা দ্বীপটাকে একটা চক্কর দিয়ে আসা যাক৷’ রেডফার্ন প্রস্তাব করলো৷

‘হাতে অত সময় পাওয়া যাবে কি?’ মিস ব্রুস্টার ঘড়ি দেখলেন, ‘ও—হ্যাঁ, এখনও সাড়ে এগারোটাই বাজে নি৷ চলুন, আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়া যাক৷’

ওরা নেমে চললো সমুদ্রের কিনারার দিকে৷

প্যাট্রিক রেডফার্নই প্রথম বৈঠার কাছে বসলো৷ সে সবল হাতে বৈঠা বাইতে লাগলো৷ নৌকো গতিবেগ নিয়ে চলতে শুরু করলো৷

এমিলি ব্রুস্টার প্রশংসার সুরে বললেন, ‘দেখা যাবে শেষ পর্যন্ত এভাবে বাইতে পারেন কিনা৷’

রেডফার্ন মিস ব্রুস্টারের চোখে তাকিয়ে হাসলো৷ তার মানসিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক হালকা হয়ে গেছে৷

‘যখন আমরা নৌকো নিয়ে ফিরবো, ততক্ষণে দেখবেন আমার গায়ে এক গাদা ফোস্কা গজিয়ে গেছে৷’ মাথা ঝাঁকিয়ে কপালে নেমে আসা কালো চুল স্বস্থানে ফেরত পাঠালো রেডফার্ন, ‘ওঃ, আজকের দিনটার তুলনা হয় না! ইংল্যান্ডে যদি কখনও একটা চমৎকার গ্রীষ্মের দিন পান, তাহলে তার চেয়ে ভালো আর কিছু হয় না৷’

এমিলি ব্রুস্টার একটু রুক্ষ স্বরেই জবাব দিলেন, ‘ইংল্যান্ডের সবকিছুই ভালো৷ পৃথিবীতে থাকবার মতো জায়গা ওই একটাই আছে৷’

‘ঠিক বলেছেন৷’

ওরা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পশ্চিমে মোড় নিয়ে এগিয়ে চললো৷ বাইতে বাইতেই হঠাৎই চোখ তুলে তাকালো রেডফার্ন৷

‘সানি লেজ-এ আর কেউ গেছে নাকি? হুঁ, একটা ছাতা দেখতে পাচ্ছি৷ কে হতে পারে, তাই ভাবছি৷’

এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘মনে হয়, মিস ডার্নলি৷ ওরকম জাপানি ছাতা ওঁর একটা আছে৷’

ওরা উপকূল ধরে নৌকো বেয়ে চললো৷ ওদের বাঁ দিকে উন্মুক্ত সমুদ্র৷

এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘আমাদের উলটো দিক ধরে যাওয়া উচিত ছিলো৷ এদিকে স্রোতের বিরুদ্ধে বাইতে হচ্ছে৷’

‘না, এদিকে স্রোত তেমন বেশি নেই৷ আমি তো এখানে সাঁতারও কেটেছি, স্রোতের টান কখনও টের পাইনি৷ তাছাড়া ওদিক দিয়ে আমরা যেতে পারতাম না, কারণ সেতুটা এ সময় জলের ওপরেই থাকবে৷’

‘সেটা অবশ্য ঢেউয়ের ওপর নির্ভর করছে৷ কিন্তু সকলে বলে পিক্সি কোভে স্নান করতে নামলে বেশি দূরে সাঁতরে যাওয়া বিপজ্জনক৷’

প্যাট্রিক এখনও সমান উদ্যমে বৈঠা বাইছে৷ এবং একই সঙ্গে বেশ মনোযোগ সহকারে সে পাহাড়ের কোলে প্রতিটি অংশে অনুসন্ধানী চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে৷

হঠাৎ এমিলি ব্রুস্টার ভাবলেন, ‘ও নিশ্চয়ই মিসেস মার্শালের খোঁজ করছে৷ সেই জন্যেই ও আমার সঙ্গে নৌকো করে আসতে চেয়েছে৷ আজ সারা সকালে আর্লেনার দেখা পাওয়া যায়নি এবং ওর অনু্পস্থিতির কারণ ভেবে ভেবে প্যাট্রিক এখন রীতিমতো দুশ্চিন্তায় পড়েছে৷ সম্ভবত সব জেনে শুনেই আর্লেনা এই ছল করছে; ওর প্রতি প্যাট্রিকের আকর্ষণ বাড়িয়ে তোলার নিঃসন্দেহে এ এক নতুন চাল৷’

পিক্সি কোভের দক্ষিণ দিকে সমুদ্রে বেরিয়ে আসা পাথুরে অংশটার কাছে ওরা বাঁক নিলো৷ পিক্সি কোভ জায়গাটা বেশি বড় নয়৷ এখানকার বেলাভূমিতে ছড়িয়ে রয়েছে অজস্র পাথরের টুকরো৷ পাহাড়ের কিছু অংশ গাড়ি বারান্দার মতো ঝুলে রয়েছে বেলাভূমির ওপর৷ উত্তর-পশ্চিমে মুখ করে অবস্তিত এই ছোট জায়গাটা পিকনিকের প্রয়োজনে অনেকের কাছেই অত্যন্ত প্রিয়৷ মাথার ওপরে পাথরের আড়াল থাকার জন্য সকালের দিকে সূর্যের কিরণ এখানে এসে পৌঁছয় না, এবং সেই কারণেই এ সময়ে কেউ এদিক প্রায় আসে না বললেই চলে৷

কিন্তু আজ, এই মুহূর্তে বেলাভূমিতে একজনকে দেখা গেলো৷

প্যাট্রিক রেডফার্নের কর্মরত হাত ক্ষণিকের জন্য নিশ্চল হলো, তারপর আবার বাইতে শুরু করলো৷

সে স্বাভাবিক এবং সহজ সুরে বললো, ‘আরে, কে ওখানে?’

মিস ব্রুস্টার নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিলেন, ‘দেখে তো মিসেস মার্শাল বলেই মনে হচ্ছে৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন যেন হঠাৎই খেয়াল হয়েছে এমন সুরে অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ—সত্যিই তো৷’

সুতরাং তার নৌকো চালানোর গতি পরিবর্তিত হলো৷ তীর অভিমুখে নৌকো এগিয়ে চললো৷

এমিলি ব্রুস্টার ক্ষীণ প্রতিবাদ করতে চাইলেন, ‘আমরা কি এখানে পাড়ে নামবো?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন চটপট জবাব দিলো, ‘ক্ষতি কি৷ হাতে এখনও প্রচুর সময় আছে৷’

সে মিস ব্রুস্টারের চোখে নিষ্পলকে তাকালো৷ তার দৃষ্টিতে যেন সরল আকুতি ঝরে পড়লো, অনেকটা প্রভুভক্ত কোন কুকুরের নীরব মিনতির মতো৷ মিস ব্রুস্টার মুখ ফুটে আর কিছু বলতে পারলেন না৷ তিনি মনে মনে ভাবলেন, ‘হায় বেচারা, প্রেমে ও একেবারে অন্ধ হয়ে গেছে৷ কিন্তু উপায় কি৷ সময় হলেই ও এটা কাটিয়ে উঠবে৷’

নৌকো তরতর করে নিঃশব্দে এগিয়ে চললো পাড়ের দিকে৷

আার্লেনা মার্শাল নুড়ি-ছাওয়া বেলাভূমিতে উপুড় হয়ে শুয়ে রয়েছে৷ ওর হাত দুটো দু-পাশে বিস্তৃত৷ সাদা ভেলাটাও অদূরেই চোখে পড়লো৷

কিছু একটা এমিলি ব্রুস্টারকে অস্বস্তিতে ফেললো৷ যেন তার অত্যন্ত পরিচিত স্বাভাবিক কোন দৃশ্যের দিকে তিনি চেয়ে আছেন, অথচ তার কোথায় যেন একটা অসঙ্গতি রয়েছে৷

আরও প্রায় মিনিট কয়েক পরে অসঙ্গতিটা তাঁর নজরে পড়লো৷

আর্লেনা মার্শালের শুয়ে থাকার ভঙ্গী কোন সূর্যস্নানার্থীর শুয়ে থাকার ভঙ্গীর মতোই নিখুঁত৷ হোটেলের সামনের সৈকতে ওকে প্রায়ই এই একই ভঙ্গীতে শুয়ে থাকতে দেখা গেছে: ব্রোঞ্জ রঙের শরীর সূর্যপিপাসায় টানটান, আর সবুজ পিচবোর্ডের টুপিটা ওর মাথা ও ঘাড় প্রখর সূর্যকিরণ থেকে রক্ষা করছে৷

কিন্তু পিক্সি কোভের বেলাভূমিতে সূর্যকিরণের এতটুকু আভাসমাত্র নেই, এবং আগামী কয়েক ঘণ্টাতেই থাকবে না৷ ওপরে ঝুলন্ত পাথরের আড়াল সকালের সূর্যকে বেলাভূমি থেকে সম্পূর্ণ অপসারিত করেছে৷ আশঙ্কার এক অদ্ভুত ইশারা এমিলি ব্রুস্টারের মনকে ধীরে ধীরে গ্রাস করলো৷

ওদের নৌকো এসে থামলো বেলাভূমির পাথুরে কিনারায়৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন চেঁচিয়ে ডাকলো, ‘এই আর্লেনা—’

এবং তখন এমিলি ব্রুস্টারের ভিত্তিহীন আশঙ্কা একটা নির্দিষ্ট রূপ নিলো৷ কারণ রেডফার্নের আহ্বানে শায়িত কোনও চাঞ্চল্য দেখা গেলো না, এলো না কোন উত্তর৷

প্যাট্রিক রেডফার্নের মুখের আকস্মিক পরিবর্তনটা এমিলির চোখে পড়লো৷ সে এক লাফে নৌকো থেকে নামলো, এমিলি ব্রুস্টারও তাকে অনুসরণ করলেন৷ নৌকোটাকে টেনে পাড়ে তুললো দুজনে, তারপর বেলাভূমি ধরে এগিয়ে চললো পাহাড়ের কোলে নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকা নিরুত্তর শুভ্র দেহটার দিকে৷

প্যাট্রিক রেডফার্নই প্রথমে এসে পৌঁছলো, এবং তার ঠিক পেছনেই মিস ব্রুস্টার৷

তিনি দেখলেন, যেন স্বপ্নে দেখার মতো, একটা ব্রোঞ্জ রঙের শরীরে সাদা পিঠ-খোলা সাঁতার পোশাক—সবুজ টুপির সীমানা ছাড়িয়ে বেড়িয়ে আসা লাল চুলের গুচ্ছ—দেখলেন আরও একটা জিনিস—বিস্তৃত দু’বাহুর অদ্ভুত, অস্বাভাবিক অবস্থান৷ সেই মুহূর্তে তিনি অনুভব করলেন, দেহটা ঠিক স্বইচ্ছায় শায়িত নয়, বরং কেউ যেন অবহেলাভরে ওটাকে ছুঁড়ে দিয়েছে উন্মুক্ত বেলাভূমিতে...

তিনি শুনতে পেলেন প্যাট্রিকের কণ্ঠস্বর—নিছকই এক আতঙ্কবিকৃত ফিসফিসে স্বর৷ সে হাঁটু ভেঙে বসলো নিথর দেহটার পাশে—স্পর্শ করলো একটা হাত—বাহু...

চাপা ফিসফিসে শব্দে তার স্বর কেঁপে উঠলো, ‘হায় ভগবান! ও মারা গেছে...’

এবং তারপর, সে সবুজ টুপিটা সামান্য তুলে ঘাড়ের কাছে উঁকি মারলো, ‘...কেউ ওকে গলা টিপে খুন করেছে... ওঃ ভগবান!’

সেটা এমনই এক মুহূর্ত, যে মুহূর্তে সময় নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে৷

এক অদ্ভুত অপ্রাকৃত অনুভূতির সঙ্গে এমিলি ব্রুস্টার শুনতে পেলেন নিজের কণ্ঠস্বর, ‘আমাদের কোন কিছুতেই হাত দেওয়া ঠিক হবে না... অন্তত যতক্ষণ না পুলিশ আসছে৷’

যান্ত্রিকভাবে ভেসে এলো রেডফার্নের উত্তর, ‘না—না, আপনি ঠিকই বলেছেন৷’ তারপর গভীর যন্ত্রণাক্লিষ্ট ফিসফিস স্বরে সে বললো, ‘কিন্তু কে? কে? কে আর্লেনার এ অবস্থা করলো? ওকে কেউ—ওকে কেউ খুন করতে পারে না? এ মিথ্যে—সব মিথ্যে!’

এমিলি ব্রুস্টার উত্তর খুঁজে না পেয়ে নীরবে মাথা নাড়লেন৷

তাঁর কানে এলো রেডফার্নের আচমকা গভীর শ্বাস টানার শব্দ—শুনতে পেলেন তার ক্রোধে উত্তেজিত সংযত স্বর, ‘ওঃ, ভগবান, যে এ কাজ করেছে, সেই শয়তানটাকে যদি একবার হাতের মুঠোয় পেতাম!’

এমিলি ব্রুস্টার শিউরে উঠলেন৷ তাঁর কল্পনায় ভেসে উঠলো কোন পাথরে আড়ালে লুকিয়ে ওঁৎ পেতে বসে থাকা কোন হত্যাকারীর ছবি৷ তিনি শুনতে পেলেন অনিশ্চয়তায় ভরা নিজের কণ্ঠস্বর, ‘যেই এ কাজ করে থাকুক, সে কি আর এখানে বসে আছে? আমাদের পুলিশে খবর দেওয়া উচিত৷ অবশ্য’ তিনি সামান্য ইতস্তত করলেন, ‘আমাদের একজনের মৃতদেহের কাছে থাকা দরকার—’

প্যাট্রিক রেডফার্ন বলল, ‘আমি থাকছি৷’

এমিলি ব্রুস্টার স্বস্তির ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললেন৷ তিনি সেই ধরনের মহিলা নন, যাঁরা নিজেদের ভয় পাওয়ার কথা কখনও স্বীকার করেন, কিন্তু বেলাভূমিতে আশেপাশে কোন উন্মাদ হত্যাকারীর উপস্থিতির ক্ষীণ সম্ভাবনা নিয়ে, তাঁকে একা থাকতে হবে না দেখে তিনি মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন৷

তিনি বললেন, ‘সেই ভালো৷ আমি যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরে আসবো৷ আমি নৌকো নিয়েই যাচ্ছি, ওর মই বেয়ে ওপরে ওঠা আমার কর্ম নয়৷ লেদারকোম্ব উপসাগরের কাছাকাছি একজন কনস্টেবল আছে, তাকেই খবর দিচ্ছি৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন যান্ত্রিক স্বরে বিড়বিড় করলো, ‘হ্যাঁ—হ্যাঁ—আপনি যা ভালো বোঝেন৷’

সুপটু হাতে নৌকো বেয়ে এগিয়ে চললেন এমিলি ব্রুস্টার৷ যেতে যেতেই দেখলেন, প্যাট্রিক ঝুঁকে পড়লো মৃতদেহের পাশে, দু’হাতে মুখ ঢাকলো৷ তার ভঙ্গীতে এমন একটা সর্বহারা হতাশার ভাব ছিলো যে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি প্যাট্রিকের জন্য দুঃখ অনুভব করলেন৷ তাকে দেখে মনে হলো, যেন কোন অনুগত কুকুর তার প্রিয় প্রভুর মৃতদেহের পাশে অপলকে বসে আছে৷ কিন্তু তবুও মিস ব্রুস্টারের সরল স্বাভাবিক বুদ্ধি তাঁকে নীরবে বললো, ‘ওর এবং ওর স্ত্রী ভালোর জন্য—মার্শাল ও তাঁর মেয়ের জন্যে—এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারতো না৷ কিন্তু আমার মনে হয় না, ও কখনও সেদিক থেকে ব্যাপারটাকে চিন্তা করে দেখবে,... বেচারা!’

এমিলি ব্রুস্টার সেই ধরনের মহিলা, যাঁরা প্রয়োজনে সর্বদা তৎপর হতে পারেন৷

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

ইন্সপেক্টর কলগেট পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আর্লেনার মৃতদেহ নিয়ে পুলিশ-সার্জনের পরীক্ষা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিলেন৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন ও এমিলি ব্রুস্টার একপাশে নীরবে দাঁড়িয়ে৷

ডাঃ নীসডন হাঁটু ভেঙে বসেছিলেন, অভ্যস্ত ক্ষিপ্ত ভঙ্গীতে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘শ্বাস রোধ করে খুন করে হয়েছে—এবং নিঃসন্দেহে একজোড়া শক্ত সবল হাতের কাজ৷ ওঁকে দেখে মনে হচ্ছে না, বাধা দেবার খুব একটা চেষ্টা করেছিলেন৷’

এমিলি ব্রুস্টার মৃতদেহের মুখের দিকে একপলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিলেন৷ নীলাভ রক্তিম যন্ত্রণাবিকৃত মুখমণ্ডলের বীভৎসতা কল্পনা করা যায় না৷

ইন্সপেক্টর কলগেট প্রশ্ন করলেন, ‘ক’টার সময় মারা গেছেন বলে মনে হয়, ডাক্তার?’

নীসডন অস্বস্তিভরে জবাব দিলেন, ‘ওর সম্পর্কে আরও কিছু না জেনে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়৷ কারণ অনেকগুলো ব্যাপারে আমাদের বিবেচনা করে দেখতে হবে৷... আচ্ছা, এখন বাজে পৌনে একটা; আপনারা ক’টার সময় মৃতদেহ আবিষ্কার করেন?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন, শেষ প্রশ্নটা যাকে লক্ষ্য করে করা হয়েছে, অস্পষ্টভাবে বললো, ‘বোধহয় বারোটার কিছু আগে৷ ঠিক বলতে পারছি না৷’

এমিলি ব্রুস্টার বললেন, ‘যখন আমরা বুঝলাম মিসেস মার্শাল মারা গেছেন, তখন ঠিক পৌনে বারোটা বাজে৷’

‘ও—৷ আচ্ছা, আপনারা তো এখানে নৌকো করে এসেছিলেন; যখন আপনারা দূর থেকে ওঁকে এখানে পড়ে থাকতে দেবেন তখন ক’টা বাজে?’

এমিলি ব্রুস্টার কিছুক্ষণ ভাবলেন৷

‘ধরুন তার প্রায় মিনিট পাঁচ-ছয় আগে আমরা পাথরের বাঁকটা ঘুরেছি৷’ তিনি ফিরলেন রেডফার্নের দিকে, ‘আপনার কি মনে হয়?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন অনিশ্চিত সুরে বলল, ‘হ্যাঁ—হ্যাঁ—ওই রকমই হবে; আমরাও তাই মনে হয়৷’

নীসডন নিচু গলায় পাশে দাঁড়ানো ইন্সপেক্টরকে প্রশ্ন করলেন, ‘ইনিই কি মৃত মহিলার স্বামী?... ও, তাহলে আমারও ভুল হয়েছে৷ ভদ্রলোক দেখছি রীতিমতো ভেঙে পড়েছেন৷ সেই জন্যই ভাবছিলাম হয়তো স্বামী হলেও হতে পারেন৷’

তিনি এবার অপেক্ষাকৃত উঁচু স্বরে বললেন, ‘তাহলে ধরা যাক, মোটামুটি বারোটা বাজতে কুড়ি মিনিটের সময় আপনারা ওঁকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন৷ আমার মনে হয় না, তার খুব একটা আগে ইনি মারা গেছেন ঃ হয়তো ওই সময় থেকে এগারোটা—কিংবা খুব বেশি পৌনে এগারোটার মধ্যে৷’

সশব্দে নোটবই বন্ধ করে মুখ তুলে তাকালেন ইন্সপেক্টর৷

‘ধন্যবাদ৷’ তিনি বললেন, ‘এতে আমাদের অনেক সাহায্য হবে৷ বিশেষ করে খুনের সময়টাকে যখন খুব অল্প পরিসরে বাঁধা গেছে—বলতে গেলে এক ঘণ্টার কম৷’

এবার তিনি ফিরলেন মিস ব্রুস্টারের দিকে৷

‘যাক এ পর্যন্ত সবকিছু তাহলে পরিষ্কার৷ আপনি হলেন মিস এমিলি ব্রুস্টার এবং ইনি মিঃ প্যাট্রিক রেডফার্ন আপনারা দুজনেই বর্তমানে জলি রজার হোটেলে রয়েছেন৷ এই মৃত মহিলাকে আপনারা দুজনেই বর্তমানে জলি রজার হোটেলে রয়েছেন৷ এই মৃত মহিলাকে আপনারা সেই হোটেলেরই অতিথি—এবং জনৈক ক্যাপ্টেন মার্শালের স্ত্রী বলে সনাক্ত করছেন৷’

এমিলি ব্রুস্টার নিঃশব্দে মাথা কেড়ে সম্মতি জানালেন৷

‘তাহলে, আমার মনে হয়,’ বললেন ইন্সপেক্টর কলগেট, ‘এখন আমাদের হোটেলে ফিরে যাওয়াই ভালো৷’

তিনি ইশারায় একজন কনেস্টবলকে ডাকলেন৷

‘হক্স, তুমি এখানে থাকো—আর কাউকে এখানে আসতে দেবে না৷ আমি একটু পরেই ফিলিপসকে পাঠিয়ে দিচ্ছি৷’

‘সত্যি বলছি৷’ বললেন কর্নেল ওয়েস্টন, ‘আপনাকে এখানে দেখবো আশাই করিনি!’

পুলিশ-প্রধানের অভিবাদের উত্তরে যথাযোগ্য ভঙ্গীতে প্রত্যাভিবাদন জানালেন এরকুল পোয়ারো৷ মৃদুস্বরে বললেন, ‘হুঁ—সেন্ট লু-র সেই ঘটনার পর বহু বছর কেটে গেছে৷’

‘তা হলেও ঘটনা আমার এখনও মনে আছে৷’ বললেন ওয়েস্টন, ‘আমার জীবনের সে এক বিরাট বিস্ময়৷ যে জিনিসটা আমি আজও ভুলতে পারিনি, তা হলো সেই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যাপারটায় আপনি যেভাবে আমাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন৷ পুরোপুরি বেনিয়মী অদ্ভুত আপনার পদ্ধতি! এক কথায় অবিশ্বাস্য!’

‘কিন্তু তা হলে তার ফল কি ভালো হয়নি কর্নেল?’ পোয়ারো বললেন৷

‘হ্যাঁ, হয়তো হয়েছে৷ তবে আমার ধারণা নিয়মমাফিক পথেই আমরা সেখানে পৌঁছতে পারতাম৷’

‘হয়তো পারতেন৷’ পোয়ারো অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদের মতো সমর্থন জানালেন৷

‘আর এখানে এসে আর একটা খুনের জটিল পরিবেশে আপনাকে আবিষ্কার করলাম৷’ পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘এটা নিয়ে তেমন কিছু ভেবেছেন?’

পোয়ারো ধীরে ধীরে জবাব দিলেন, ‘ঠিকমতো কিছু ভাবিনি—কিন্তু ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে কৌতূহল জাগিয়ে তোলে৷’

‘তা আমাদের একটু-আধটু সাহায্য করছেন তো?’

‘আপনি সে অনুমতি দিচ্ছেন?’

মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনাকে আমাদের সঙ্গে পেলে ভীষণ খুশি হবো৷ এ ব্যাপারে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে তুলে দেবো কিনা, সে সিদ্ধান্ত নেবার মতো যথেষ্ট খবর এখনও আমরা পাইনি৷ এমনিতে দেখে মনে হচ্ছে, একটা সীমিত এলাকার মধ্যেই আমাদের খুনীকে খুঁজে পাওয়া যাবে৷ কিন্তু আবার এদিকে দেখুন—হোটেলে যাঁরা উপস্থিত রয়েছেন, তাঁদের কেউ স্থানীয় বাসিন্দা নন৷ সুতরাং তাঁদের সম্বন্ধে খোঁজখবর করতে গেলে এবং খুন করার পেছনে তাঁদের উদ্দেশ্যের সন্ধান করতে গেলে লন্ডনে আপনাকে যেতেই হবে৷’

পোয়ারো বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন৷’

‘সর্বপ্রথম আমাদের জানতে হবে মৃত মহিলাটিকে শেষ কে দেখেছেন?’ বললেন ওয়েস্টন, পরিচারিকা সকাল ন’টায় মিসেস মার্শালকে তাঁর প্রাতরাশ পৌঁছে দেয়৷ তারপর, প্রায় দশটা নাগাদ, একতলার দপ্তরে বসে থাকা মেয়েটি তাঁকে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে দেখে৷’

‘বন্ধু, ওয়েস্টান,’ পোয়ারো বললেন, ‘সম্ভবত আমি আপনার প্রার্থিত ব্যক্তি৷’

‘আপনি তাঁকে আজ সকালে দেখেছেন? ক’টার সময়?’

‘দশটা বেজে পাঁচ মিনিটে৷ আমি তখন সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে ভেলা ভাসাতে সাহায্য করছিলাম৷’

‘এবং তিনি ভেলায় চড়ে চলে গেলেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘একা?’

‘একা৷’

‘কোনদিকে গেলেন সেটা কি আপনি খেয়াল করেছেন?’

‘ডানদিকে মোড় ঘুরে তিনি পাহাড়ের আড়ালে চলে যান৷’

‘তা মানে পিক্সি কোভের দিকে, তাই না?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তখন সময় কত ছিলো?’

‘আমি বলবো, তিনি সমুদ্রতীর ছেড়ে রওনা হন ঠিক সওয়া দশটায়৷’

ওয়েস্টান কিছুক্ষণ ভাবলেন৷

‘হুঁ—মোটামুটি সব মিলে যাচ্ছে৷ ভেলায় চড়ে পিক্সি কোভে পৌঁছতে তাঁর কতক্ষণ লাগতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’

‘আমি? আমি এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ৷ নৌকো বা ভেলায় চড়ায় আমি ঘোর বিরোধী৷ তবুও মনে হয়, আধ ঘণ্টার বেশি লাগা উচিত নয়৷’

‘আমারও তাই ধরাণা৷’ কর্নেল বললেন, ‘অবশ্য যদি তিনি স্বাভাবিকভাবে তাড়াহুড়ো না করে ভেলা চালিয়ে থাকেন৷ আর তাই যদি হয়, তাহলে পৌনে এগারোটা নাগাদ তিনি পিক্সি কোভে পৌঁছেছেন—হুঁ, সবই মোটামুটি খাপ খেয়ে যাচ্ছে৷’

‘ক’টার সময় তিনি মারা গেছেন বলে আপনাদের ডাক্তার মনে করেন?’

‘ওহ, নীডসন কখনও নিজের ঘাড়ে দায়িত্ব বা ঝুঁকি নেয় না৷ সে বড় সাবধানী লোক৷ তার মতো খুনটা খুব বেশি হলে পৌনে এগারোটার আগে হয়নি৷’

পোয়ারো নীরবে মাথা নাড়লেন৷ তারপর বললেন, ‘আরও একটা ছোট্ট ঘটনা আমার উল্লেখ করা উচিত৷ চলে যাওয়ার সময় মিসেস মার্শাল আমাকে অনুরোধ করেন, আমি যে তাঁকে দেখেছি, সে কথা যেন কাউকে না বলি৷’

ওয়েস্টন একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন৷

তারপর বললেন, ‘হুম—ব্যাপারটা ভাবার মতো, তাই না?’

পোয়ারো অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়েছিলো৷’

ওয়েস্টান বার কয়েক গোঁফে মোচড় দিলেন৷ বললেন, ‘আচ্ছা, মঁসিয়ে পোয়ারো, একটা কথা৷ আপনার অভিজ্ঞতা সাধারণের চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি৷ বলতে পারেন মিসেস মার্শাল ঠিক কি ধরনের মহিলা ছিলেন?’

একটা হালকা হাসির ছোঁয়া পোয়ারোর ঠোঁটে দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেলো৷ তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি এখনও কিছু শোনেননি?’

পুলিস-প্রধান নীরস কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘শুনেছি৷ তবে তার সবটাই অন্যান্য মহিলাদের বক্তব্য৷ সুতরাং বুঝতেই পারছেন—৷ তাই আমি জানতে চাই সে সব বক্তব্যের কতটুকু সত্যি? রেডফার্নের সঙ্গে মিসেস মার্শালের সত্যিই কি কোন ‘ইয়ে’ চলছিলো?’

‘এব্যাপারে আমি অন্তত নিঃসন্দেহ৷’

‘রেডফার্ন তাহলে মিসেস মার্শালকে অনুসরণ করেই এই দ্বীপে এসে হাজির হয়েছে বলতে চান?’

‘সে রকম ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে৷’

‘আর ভদ্রমহিলার স্বামী? তিনি কি এ ঘটনার কথা জানতেন? কি ভাবতেন তিনি এ বিষয়ে?’

পোয়ারো ধীর স্বরে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মাশার্ল কি ভাবেন বা উপলব্ধি করেন তা অনুমান করা নেহাত সহজ নয়৷ তিনি সেই ধরনের মানুষ, যাঁরা নিজেদের মনের ভাবকে কখনও বাইরে প্রকাশ করেন না৷’

ওয়েস্টান তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘কিন্তু তা হলেও মন বলে তো তার একটা পদার্থ আছে!’

পোয়ারো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন, বললেন, ‘হাঁ, তা হয়তো আছে৷’

পুলিশ-প্রধান ওয়েস্টান তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কুশলী পদ্ধতিতে মিসেস ক্যাসল-এর সঙ্গে কথা বলছিলেন৷

মিসেস ক্যাসল জলি রজার হোটেলের এক এবং একমাত্র স্বত্বাধিকারিণী৷ তাঁর চল্লিশোর্ধ্ব শরীরে বক্ষদেশে অস্বাভাবিক স্ফীত, মাথায় একরাশ ঘোর লাল চুল রীতিমতো দৃষ্টি বিকর্ষক এবং তাঁর কথা বলার ভঙ্গী অপ্রত্যাশিতরকম পরিমার্জিত৷

তিনি বলছিলেন, ‘এইরকম একটা ঘটনা আমার হোটেলে ঘটতে পারে, আশ্চর্য! এটা বরাবরই পৃথিবীর সব চেয়ে শান্ত জায়গা, এ আমি হলফ করে বলতে পারি! যে সব লোকেরা এখানে আসে তারা এ-তো ভদ্র, এ-তো চমৎকার, যে তার কোন তুলনা হয় না৷ কোনরকম কেলেঙ্কারি লেশমাত্রও এখানে নেই—বুঝতেই তো পারছেন, কি বলতে চাইছি৷ সেন্ট লু-র ওই বড় বড় হোটেলগুলোর মতো কোন জঘন্য ব্যাপার এখানে হয় না৷’

‘আপনি ঠিকই বলেছেন, মিসেস ক্যাসল,’ কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘কিন্তু অত্যন্ত সুনিয়ন্ত্রিত—ইয়ে, গৃহস্থ বাড়িতেও তো দুর্ঘটনা ঘটে—’

‘আশা করি ইন্সপেক্টর কলগেটও আমার কথায় মত দেবেন—’ পেশাদারী নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি নিয়ে অদূরে উপবিষ্ট ইন্সপেক্টরের দিকে সনির্বন্ধ দৃষ্টিতে এক পলক তাকালেন মিসস ক্যাসল, ‘ব্যবসার অনুমতিপত্রের ব্যাপারে আমি খুব সাবধান এবং মনোযোগী৷ আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোন বেআইনি কাজ আমি করিনি৷’

‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই—’ বললেন ওয়েস্টন, ‘আমরা আপনাকে কোনরকম দোষ দিচ্ছি না, মিসেস ক্যাসল৷’

‘কিন্তু তবুও একটা নামকরা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ নিঃসন্দেহে নিন্দের ব্যাপার৷’ উত্তেজিত শ্বাসপ্রশ্বাসে মিসেস ক্যাসেলের সুবিশাল বক্ষদেশ আন্দোলিত হলো, ‘ওঃ, যখনই আমি ভাবি হাঁ করে তাকিয়ে থাকা এই এলাকার লোকগুলোর কথা! অবশ্য, একমাত্র হোটেলের অতিথিরা ছাড়া বাইরে কোন লোককে দ্বীপে ঢুকতে দেওয়া হয় না—কিন্তু তা সত্ত্বেও ওরা নির্ঘাত ওপারে এসে ভীড় করবে, আর আমার—আমার হোটেলের দিকে আঙুল উঁচিয়ে নিজেদের মধ্যে সব নোংরা আলোচনা করবে—এ আমি কোনদিন কল্পনাও করিনি৷’

তিনি সে দৃশ্যের কথা ভেবে শিউরে উঠলেন৷

ইন্সপেক্টর কলগেট অপেক্ষাকৃত প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গে আলোচনার মোড় ঘোরাবার সুযোগ পেয়ে বলে উঠলেন, ‘এইমাত্র আপনি যে কথাটা তুললেন, অর্থাৎ দ্বীপটাকে সম্পূর্ণ নিজেদের আয়ত্তে রাখার ব্যাপারটা, সে সম্পর্কে আমার একটা প্রশ্ন আছে৷ আপনি বাইরের লোকদের দ্বীপে ঢুকতে বাধা দেন কি করে?’

ও ব্যাপারে আমি খুউব সাবধান থাকি৷’

‘হ্যাঁ, তা বুঝলাম—কিন্তু কি ভাবে তাদের আটকান? মানে, কি দিয়ে তাদের ঠেকিয়ে রাখেন? কারণ গ্রীষ্মকালে ভ্রমণকারীরা এখানকার প্রায় প্রতিটি জায়গাই মাছির মতো ছেয়ে ফেলে৷’

মিসেস ক্যাসল আরও একবার শিউরে উঠলেন, বললেন, ‘এ সব দোষই হলো বেড়াবার জন্যে তৈরি ওই আ-ঢাকা শ্যারাবাং গাড়িগুলোর৷ আমি দেখেছি, এক সঙ্গে ওইরকম আ-ঠেরোটা গাড়ি লেদারকোম্ব উপসাগরের নৌকোঘাটার কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ একবার ভাবুন আঠারোটা৷ হুঁঃ খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই, একটা শ্যারাবাং গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হলো৷’

‘সে না হয় মানলাম, কিন্তু এই দ্বীপে আসতে তাদের আপনি বাধা দেন কি করে?’ কলগেট মনে হলো তাঁর ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছেন৷

‘সে জন্যে অনেকগুলো নোটিস লাগানো আছে৷ আর তাছাড়া জোয়ারের সময় আমরা তো এমনিতেই একেবারে আলাদা হয়ে পড়ি৷’

‘হ্যাঁ, কিন্তু ভাটার সময়?’

অতঃপর মিসেস ক্যাসল সবিস্তারে ব্যাখ্যা করলেন৷ সেতুটা দ্বীপের প্রান্তে যেখানে এসে মিশেছে, সেখানে একটা বড় দরজা আছে৷ তাতে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে৷ ‘জলি রজার হোটেল; নিজস্ব এলাকা৷ হোটেল ব্যতীত অন্য কোথাও বহিরাগতের প্রবেশ নিষেধ৷’ এবং এই দরজার দুপাশে পাহাড়ের পাথর খাড়া নেমে গেছে সমুদ্রে সুতরাং কারও পক্ষে সে প্রাচীর বেয়ে ওঠা সম্ভব নয়৷

‘কিন্তু যে কেউ তো নৌকো বেয়ে দ্বীপের পাশ দিয়ে পিক্সি অথবা গাল কোভে সহজেই পৌঁছতে পারে? আপনি তো তাদের আর আটকাতে পারছেন না৷ তাছাড়া, সমুদ্রতীরে জোয়ার এবং ভাটার সময় জলে দুই প্রান্তের মাঝখানে বেলাভূমির যে অংশ, সেখানে বাইরের লোকদের প্রবেশের অধিকার আছে৷ সে অধিকারেও আপনি হস্তক্ষেপ করতে পারেন না৷’

কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে সম্ভব হলেও জানা গেলো, কার্যক্ষেত্রে এ ঘটনা প্রায় ঘটে না বললেই চলে৷ লেদারকোম্ব উপসাগরের নৌকোঘাটায় নৌকো ভাড়া পাওয়া যায় ঠিকই কিন্তু সেখান থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব অনেক৷ তাছাড়া লেদারকোম্ব উপসাগরের পোতাশ্রয় ছাড়িয়ে সমুদ্রের একটু ভেতরে এলেই অস্বাভাবিক জোরালো স্রোতের মুখোমুখি হতে হয়৷

গাল কোভ এবং পিক্সি কোভে নামার লোহার মইয়ের পাশেও যথারীতি বিজ্ঞপ্তি লাগানো আছে৷ মিসেস ক্যাসল আরও জানালেন জর্জ অথবা উইলিয়াম মূল ভুখণ্ডের নিকটতম বেলাভূমির যে অংশ, সেখানে প্রায় সর্বক্ষণই নজর রাখে৷

‘এই জর্জ এবং উইলিয়াম কারা?’

জর্জ সারাদিন বেলাভূমির তদারকিতে থাকে, ও নজর রাখে স্নানের পোশাক এবং রঙিন ভেলাগুলোর দিকে৷ আর উইলিয়াম এখানকার মালি৷ রাস্তাঘাটের দেখাশোনা, টেনিস কোর্টের ঘর কাটা—এ সবই ওর কাজ৷’

কর্নেল ওয়েস্টন অধৈর্য হয়ে বলে উঠলেন, ‘যাক, একটা ব্যাপার তাহলে এখন মোটামুটি পরিষ্কার৷ বাইরে থেকে কারও পক্ষে দ্বীপে আসা একেবারে অসম্ভব না হলেও এটুকু অন্তত বলা যায় যেই আসুক না কেন, তাকে একটা ঝুঁকি নিতে হবে—অন্য কারও নজরে তার উপস্থিতি ধরা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি৷ আমরা জর্জ এবং উইলিয়ামের সঙ্গে এ বিষয়ে এখুনি একবার কথা বলতে চাই৷

মিসেস ক্যাসল বললেন, ‘এখানে বেড়াতে আসা উটকো লোকদের আমি মোটেও পাত্তা দিই না—সব সময় খালি হৈ-হৈ করব, আর কমলালেবু খোসা থেকে শুরু করে সিগারেটের খালি বাক্স পর্যন্ত স-ব রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে ফেলে রেখে যাবে, কিন্তু তবুও এ কথা কখনও ভাবিনি, ওদের কেউ কখনও খুন করতে পারে৷ সত্যি! ব্যাপারটা এত বিশ্রী যে ভাষায় বলা যায় না৷ মিসেস মার্শালের মতো একজন ভদ্রমহিলা শেষে কিনা খুন হলেন? আর সবচেয়ে যেটা খারাপ লেগেছে, তা হলো যেভাবে তাঁকে খুন করা হয়েছে—ইয়ে, মানে,—গলা টিপে...’

শেষ দুটো শব্দে মিসেস ক্যাসল তীব্র অনিচ্ছাসত্ত্বেও উচ্চারণ করলেন৷

ইন্সপেক্টর কলগেট তাঁকে প্রবোধ দিলেন , হ্যাঁ, ব্যাপারটা যে বিশ্রী তাতে সন্দেহ নেই৷’

‘আর খবরের কাগজগুলো আর এক উৎপাত৷ ভেবে দেখুন, আমার হোটেলের সুনাম নিয়ে ওরা কাগজে-কাগজে কিরকম ছিনিমিনি খেলবে!’

মৃদু হেসে কলগেট বললেন, ‘তবে এক দিন দিয়ে সেটা আপনার হোটেলের বিজ্ঞাপনের কাজ করবে৷’

মিসেস ক্যাসল আচমকা গম্ভীর হলেন, স্ফীত বক্ষদেশ আন্দোলন সহকারে উঠে দাঁড়ালেন৷ বরফ-শীতল স্বরে জবাব দিলেন তিনি, এ ধরনের বিজ্ঞাপনের আমি পরোয়া করি না, মিঃ কলগেট৷’

কর্নেল ওয়েস্টন এবার কথা বললেন, আচ্ছা, মিসেস ক্যাসল, ‘আপনাকে যে বলেছিলাম হোটেলের বর্তমান অতিথিদের নামের একটা তালিকা তৈরি করতে, করেছেন?’

‘হ্যাঁ, স্যার—করেছি৷’

কর্নেল ওয়েস্টন হোটেলের অতিথি-তালিকার খাতার ওপর ঝুঁকে পড়লেন৷ তারপর পলকের জন্য চোখ তুলে তাকালেন মিসেস ক্যাসলের অফিস-ঘরে উপস্থিত চতুর্থ ব্যক্তি, এরকুল পোয়ারোর দিকে৷

‘দেখুন, এখানে হয়তো আপনি আমাদের সাহায্য করতে পারবেন৷’ মিসেস ক্যাসেলকে লক্ষ্য করে বললেন ওয়েস্টন৷ তিনি নীরবে নামের তালিকার ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন৷

‘হোটেলে চাকরবাকর ক’জন আছে?’

মিসেস ক্যাসল একটা দ্বিতীয় তালিকা বের করলেন৷

‘চারজন পরিচারিকা, একজন প্রধান পরিচারক—অ্যালবার্ট এবং তার অধীনের তিনজন পরিচারক৷ এছাড়া ‘বার’ এ থাকে হেনরি; উইলিয়াম অতিথিদের জুতো-চটির পরিচর্যার দিকে নজর রাখে, আর সবশেষে রাঁধুনি, ও তার সাহায্যের জন্য দুজন কর্মচারী—ব্যস্ এই সব৷’

‘পরিচারকরা কিরকম লোক?’

‘ওদের মধ্যে অ্যালবার্ট প্লিমাউথের ভিনসেন্ট হোটেল ছেড়ে আমার এখানে এসে কাজ নেয়৷ সেখানে ও বছর কয়েক ছিলো৷ আর ওর তদারকিতে যে তিনজন কাজ করে, তারা তিন বছর ধরে আমার এখানে চাকরি করছে—ওদের মধ্যে একজন আবার চার বছর পুরনো৷ ওরা অত্যন্ত ভদ্র এবং চমৎকার ছেলে৷ আর হেনরি তো হোটেলের শুরু থেকেই এখানে রয়েছে৷—বলতে গেলে ও নিজেই এখন একটা প্রতিষ্ঠান৷’

ওয়েস্টন মাথা নাড়লেন৷ কলগেটকে বললেন, ‘সন্দেহজনক কিছু নেই বলেই মনে হচ্ছে৷ অবশ্য তুমি তোমার নিয়মমাফিক ওদের সম্পর্কে খোঁজখবরের কাজ চালিয়ে যাবে৷ আচ্ছা, ধন্যবাদ, মিসেস ক্যাসল৷’

‘তাহলে আপনাদের আর কোন প্রশ্ন নেই?’

‘না, আপাতত নেই৷’

মিসেস ক্যাসল তাঁর বিশাল শরীর নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘আমাদের প্রথম কাজ হবে ক্যাপ্টেন মার্শালের সঙ্গে কথা বলা৷

কেনেথ মার্শাল শান্ত ভঙ্গীতে বসে তাঁর প্রতি জিজ্ঞাসিত প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিলেন৷ মাঝে মাঝে ঈষৎ কাঠিন্যের আভাস ছাড়া তাঁর মুখভাব বরাবরের মতোই নির্লিপ্ত৷ এখন, এই মুহূর্তে জানালা দিয়ে ঠিকরে আসা সোনা রোদের আলোয় তাঁকে দেখে বোঝা যায় তিনি সুদর্শন৷ মুখের প্রতিটি তীক্ষ্ণ রেখা, অবিচলিত নীল চোখ, দৃঢ়সংবদ্ধ ঠোঁট বুঝি তারই ইঙ্গিত বহন করছে৷ তাঁর কণ্ঠস্বর চাপা অথচ আন্তরিক৷

কর্নেল ওয়েস্টন বলছিলেন, ‘এ ঘটনা যে আপনাকে কতখানি আঘাত করেছে তা আমি বুঝি, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷ কিন্তু আপনি আমার অবস্থাটাও একবার ভেবে দেখুন—যত তাড়াতাড়ি এই খুন সম্পর্কে সমস্ত তথ্য আমরা সংগ্রহ করতে পারবো আমাদের ততই সুবিধে হবে৷’

মার্শাল মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ, কর্তব্য তো আপনাদের করতেই হবে৷ বলুন, কি জানতে চান৷’

মিসেস মার্শাল দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ছিলেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘আপনাদের বিয়ে হয়েছিলো কতদিন?’

‘চার বছরের সামান্য কিছু বেশি৷’

‘বিয়ের আগে আপনার স্ত্রীর নাম কি ছিলো?’

‘হেলেন স্টার্ট৷ তবে ওর অভিনয়-জগতের নাম ছিলো আর্লেনা স্টুয়ার্ট৷

‘তিনি অভিনেত্রী ছিলেন?’

‘হ্যাঁ৷ রিভ্যুতে বেশ কয়েকটা নাটকেও অভিনয় করেছে৷’

‘বিয়ের পর তিনি কি অভিনয় ছেড়ে দেন?’

‘উহুঁ৷ বিয়ের পরেও ও অভিনয় করতে থাকে৷ বলতে গেলে মাত্র বছর দেড়েক হলো ও অভিনয়-জগৎ থেকে পুরোপুরি অবসর নিয়েছিলো৷’

‘এই অবসর গ্রহণের কি বিশেষ কোন কারণ ছিলো?’

কেনেথ মার্শালকে দেখে মনে হলো, তিনি প্রশ্নটা একটু ভাবছেন৷

তারপর বললেন, ‘না৷ ও শুধু বলেছিলো, অভিনয় করতে করতে ও হাঁপিয়ে উঠেছে—তাই একটু বিশ্রাম চায়৷’

‘ও—তাহলে আপনার কোন বিশেষ—ইচ্ছের প্রতি অনুগত্য দেখিয়ে তিনি এ কাজ করেননি?’

মার্শাল ভুরু তুলে তাকালেন৷

‘না, না—’

‘বিয়ের পরে তাঁর অভিনয় করাটাকে আপনি তাহলে মেনেই নিয়েছিলেন?’

মার্শালের ঠোঁটে হালকা হাসির রেখা ফুটে উঠলো৷

‘ও অভিনয় ছেড়ে দিলে আমি হয়তো খুশিই হতাম—সে কথা অস্বীকার করি না৷ কিন্তু তা নিয়ে আমি কখনও উচ্চবাচ্য করিনি৷’

‘এ জন্যে আপনাদের মধ্যে কখনও কোনরকম মতবিরোধ হয়নি?’

‘একেবারেই না৷ তার কারণ আমার স্ত্রী-স্বাধীনতায় আমি কখনও হস্তক্ষেপ করিনি৷’

এবং এই বিয়েতে আপনারা সুখী ছিলেন?’

শীতল স্বরে জবাব দিলেন কেনেথ মার্শাল, ‘নিশ্চয়ই ছিলাম৷’

কর্নেল ওয়েস্টন মিনিটখানেক নীরব রইলেন৷ তারপর বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল, আপনার স্ত্রীকে কার পক্ষে খুন করা সম্ভব সে বিষয়ে কি আপনার কোন ধারণা আছে?’

বিন্দুমাত্রও দ্বিধা না করে তিনি উত্তর দিলেন, ‘না।’

‘তাঁর কি কোন শত্রু ছিলো?’

‘হয়তো ছিলো।’

‘হ্যাঁ?’

মার্শাল তাড়াতাড়ি বলে চললেন, ‘আমাকে ভুল বুঝবেন না, স্যার৷ আমার স্ত্রী একজন অভিনেত্রী ছিলো, এবং অত্যন্ত সুন্দরীও ছিলো সে৷ এই কারণেই অনেকের হিংসা ঈর্ষার শিকার হতে হয়েছিলো ওকে৷ এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিভিন্ন রকম সমালোচনা হতো—অন্যান্য মহিলারা ওর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতো—মোটের ওপর ওকে ঘিরে একটা ঘৃণা, ঈর্ষা ও বিদ্বেষপূর্ণ আবহাওয়া সব সময় থমথম করতো৷ কিন্তু তার মানেই এই নয় যে তাদের মধ্যে কারও পক্ষে ওকে এরকম নৃশংসভাবে খুন করা সম্ভব৷’

এরকুল পোয়ারো এই প্রথম মুখ খুললেন, বললেন, ‘আপনি তাহলে বলতে চান, মঁসিয়ে, যে আপনার স্ত্রীর শত্রুরা প্রধানত, অথবা সকলেই মহিলা ছিলেন?’

কেনেথ মার্শাল পোয়ারের দিকে তাকালেন, বললেন, ‘হ্যাঁ—তাই৷’

পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘আপনি এমন কোন পুরুষের কথা জানেন না, যার সঙ্গে আপনার স্ত্রীর শত্রুতা ছিলো?’

‘না৷’

‘এ হোটেলের কারো সঙ্গে কি তাঁর পুরানো আলাপ ছিলো?’

‘যদ্দুর জানি, মিঃ রেডফার্নের সঙ্গে কোন এক ককটেল পার্টিতে ওর আলাপ হয়েছিলো৷ এছাড়া আর কারো সঙ্গে পুরনো আলাপ-পরিচয় ছিলো কিনা বলতে পারি না৷’

ওয়েস্টন কিছুক্ষণ নীরব রইলেন৷ বিষয়টা নিয়ে আলোচনার আরও গভীরে যাওয়া যুক্তিসঙ্গত হবে কিনা ভাবতে লাগলেন, অবশেষে তিনি বিপরীত সিদ্ধান্তই নিলেন৷ বললেন, ‘এবার আজ সকালের কথায় আসা যাক৷ আপনার স্ত্রীকে আপনি শেষ কখন দেখেন?’

মার্শাল মিনিটখানেট চিন্তা করে বললেন, ‘নিচে প্রাতরাশ সারতে যাওয়ার সময় আমি একবার ওর ঘরে গিয়েছিলাম—’

‘মাপ করবেন, আপনারা কি আলাদা ঘরে থাকতেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তখন ক’টা বাজে?’

‘ন’টার কাছাকাছি তো হবেই৷’

‘তখন তিনি কি করছিলেন?’

‘ওর চিঠিপত্র খুলে দেখছিলো৷’

‘তার সঙ্গে আপনার কোন কথা হয়েছিলো?’

‘বিশেষ কোন কথা হয়নি৷ শুধু পারস্পরিক সুপ্রভাত জানানো—এবং আজকের দিনটা চমৎকার এই সব সাধারণ ব্যাপার নিয়ে আলোচনা হয়েছিলো৷’

তাঁর চালচলন আপনার কিরকম মনে হয়েছিলো? কোনরকম অস্বাভাবিক কিছু লক্ষ্য করেননি?’

‘উহুঁ—বরং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলেই মনে হয়েছে৷’

‘তাঁকে দেখে উত্তেজিত, অথবা মনমরা, অথবা মানসিক দিক দিয়ে কোনরকম বিচলিত মনে হয়েছিলো?’

‘না, আমার অন্তত তা নজরে পড়েনি৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘তিনি কি চিঠিপত্রের বিষয়বস্তুর কথা একবারও উল্লেখ করেছিলেন?’

মার্শালের ঠোঁটে আবারও ফুটে উঠলো হালকা হাসির রেখা৷ তিনি বললেন, “যতদূর আমার মনে পড়ছে, ও বলেছিলো সবক’টা চিঠিই নাকি রসিদ-সংক্রান্ত৷’

‘আপনার স্ত্রী আজ বিছানায় বসেই প্রাতরাশ সারেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তিনি কি রোজই তাই করতেন?’

‘হ্যাঁ, এটা ওর বরাবরের অভ্যেস৷’

পোয়ারো আবার প্রশ্ন করলেন, ‘সাধারণত তিনি কখন নিচে নামতেন?’

‘এই—দশটা থেকে এগারোটার মধ্যে—তবে বেশিরভাগ দিনই এগারোটা নাগাদ৷

পোয়ারো বলে চললেন, ‘সেক্ষেত্রে, তিনি যদি কখনও ঠিক দশটায় নিচে নামেন, তাহলে সেটাকে কি আপনি অস্বাভাবিক ভেবে আশ্চর্য় হবেন?’

‘হ্যাঁ, হবো৷ কারণ অত সকালে আর্লেনা কখনও নিচে নামে না৷’

‘কিন্তু আজ তিনি নেমেছিলেন৷ হঠাৎ তাঁর এই নিয়মভঙ্গের পেছনে কি কারণ থাকতে পারে বলে আপনার মনে হয়, ক্যাপ্টেন মার্শাল?’

মার্শাল নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দিলেন, ‘সে সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণাও আমার নেই৷ হয়তো আজকের সুন্দর আবহাওয়াই ওর অনিয়মের কারণ—’

আপনি তাঁকে ঘরে না পেয়ে অবাক হয়েছিলেন?’

কেনেথ মার্শাল চেয়ারে নড়েচড়ে বসলেন, বললেন, ‘প্রাতরাশের পর আমি ওর ঘরে গিয়েছিলাম৷ দেখলাম, ঘর খালি৷ তাই একটু অবাক হয়েছিলাম৷’

‘আর তারপরই আপনি সমুদ্রতীরে আসেন এবং আমাকে প্রশ্ন করেন, আপনার স্ত্রীকে আমি দেখেছি কি না?’

‘ওহ—হ্যাঁ!’ কণ্ঠস্বরে সামান্য জোর দিয়ে তিনি আরও বললেন, ‘এবং আপনি বলেন যে ওকে আপনি দেখেননি...’

পোয়ারোর নিষ্পাপ চোখে অস্বস্তির কোনরকম ছায়া পড়লো না৷ তিনি অলস ভঙ্গীতে তাঁর উজ্জ্বল, দর্শনীয় গোঁফে সস্নেহে আঙুল বোলাতে লাগলেন৷

ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার স্ত্রীর খোঁজ করার পেছনে আপনার কি কোন বিশেষ কারণ ছিলো?’

মার্শাল তাঁর সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃষ্টি মেলে ধরলেন পুলিশ-প্রধানের দিকে৷ বললেন, ‘না, শুধু এই কথা ভেবেই অবাক হয়েছিলাম যে এত সকালে ও কোথায় যেতে পারে—তার বেশি কিছু নয়৷’

ওয়েস্টন কয়েক মুহূর্তে নীরব রইলেন৷ চেয়ারটাকে সামান্য টেনে বসলেন৷ তাঁর কণ্ঠস্বর সামান্য নিচু গ্রামে নেমে এলো৷ তিনি বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল, আপনি একটু আগেই বলেছেন যে আপনার স্ত্রীর সঙ্গে মিঃ প্যাট্রিক রেডফার্নের পূর্বপরিচয় ছিলো৷ এখন প্রশ্ন হলো, আপনার স্ত্রী মিঃ রেডফার্নকে কতখানি জানতেন?’

কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘সামান্য ধূমপান করলে আশা করি আপনার আপত্তি হবে না৷’ তিনি পকেট হাতড়াতে লাগলেন, এই যাঃ! নিশ্চয়ই পাইপটা অন্য কোথাও ফেলে এসেছি!’

পোয়ারো তাঁর দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিলেন৷ মার্শাল সেটা গ্রহণ করে তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন৷ একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘আপনি রেডফার্নের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন৷ আমার স্ত্রী আমাকে বলেছিলো, কোন এক ককটেল পার্টিতে নাকি ওর সঙ্গে রেডফার্নের প্রথম আলাপ হয়৷’

‘ও—মিঃ রেডফার্ন তাহলে আকস্মিকভাবেই আপনার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচিত হন?’

‘আমার অন্তত তাই বিশ্বাস৷’

‘কিন্তু তারপর—’ একটু থামলেন পুলিশ-প্রধান, ‘আমার ধারণা, সেই পরিচয় ক্রমশ এক অন্তরঙ্গতায় পরিণত হয়.’

মার্শাল সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণস্বরে জবাব দিলেন, ‘আপনি বুঝি তাই ভাবেন? কে আপনাকে বলেছে একথা?’

‘এটাই তো হোটেলের এক এবং একমাত্র গুজব৷’

পলকের জন্য মার্শালের চোখ ফিরলো এরকুল পোয়ারোর দিকে৷ ক্রোধের এক শীতল দীপ্তি নিয়ে চোখজোড়া জরিপ করলো পোয়ারোকে৷ তারপর তিনি বললেন, ‘হোটেলের গুজব সাধারণত একরাশ মিথ্যে রটনা ছাড়া আর কিছু নয়!’

‘হয়তো তাই৷ কিন্তু আমি যা শুনেছি, তাতে মনে হয় মিঃ রেডফার্ন এবং আপনার স্ত্রী এই গুজব রটনার স্বপক্ষে বেশ কিছু সূত্র জুগিয়েছিলেন।’

‘যথা?’

‘তাঁরা বেশিরভাগ সময়ই একসঙ্গে থাকতেন৷’

‘এটাই একমাত্র কারণ?’

‘আপনি নিশ্চয়ই একথা অস্বীকার করেন না?’

‘সত্যিই হলেও হতে পারে৷ তবে তেমনভাবে আমার নজরে কখনও পড়েনি৷’

‘আপনি মিঃ রেডফার্নের সঙ্গে আপনার স্ত্রীর—ইয়ে বন্ধুত্বে কখনও—কিছু মনে করবেন না, ক্যাপ্টেন মার্শাল—বাধা দেননি?’

‘নিজেকে স্ত্রীর আচার-আচরণে সমালোচনা করা আমার স্বভাব নয়৷’

‘আপনি তাহলে এ নিয়ে কোনরকম প্রতিবাদ বা আপত্তি করেননি?’

‘নিশ্চয়ই না৷’

‘ব্যাপারটা একটা কেলেঙ্কারি পর্যায়ে যাচ্ছে দেখেও আপনি চুপচাপ ছিলেন?’

কেনেথ মার্শাল শীতল কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘আমি পরের চরকায় তেল দেওয়া পছন্দ করি না, এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে এই একই মনোভাব আশা করি৷ আর, গুজব অথবা পরচর্চামূলক মুখরোচক খবরে আমার তেমন আগ্রহ নেই৷’

‘আশা করি একথা আপন অস্বীকার করবেন না যে মিঃ রেডফার্ন আপনার স্ত্রীর প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত ছিলেন?’

‘হয়তো ছিলো, ঠিক জানি না৷ আমার স্ত্রী অত্যন্ত সুন্দরী ছিলো৷ সুতরাং বেশির ভাগ পুরুষই ওর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়তো৷’

কিন্তু আপনাকে বোঝানো হয়েছিলো যে ব্যাপারটা গুরুত্ব দেবার মতো তেমন কিছু নয়?’

‘বিশ্বাস করুন, এ নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি৷’

‘কিন্তু মনে করুন, এমন কোন সাক্ষী যদি আমাদের হাতে থাকে, যে শপথ করে বলবে, তাঁদের সম্পর্কে বন্ধুত্বের সীমানা ছাড়িয়ে চরম অন্তরঙ্গ পর্যায়ে এগিয়েছিলো?’

মার্শালের নীল চোখ আবার স্থির হলো পোয়ারোর চোখে৷ তাঁর সদা অভিব্যক্তিহীন মুখমণ্ডলে ক্ষণেকের জন্য ভেসে উঠলো অপছন্দের ছায়া৷

মার্শাল বললেন, ‘আপনি যদি সে সব গাল-গপ্পো বিশ্বাস করতে চান, করুন৷ আমার স্ত্রী মৃতা; ওর পক্ষে নিজেকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করা এখন আর সম্ভব নয়৷

‘আপনি বলতে চান, ব্যক্তিগতভাবে এ সবে আপনি বিশ্বাস করেন না?’

মার্শালের ভুরুতে এই সর্বপ্রথম লক্ষিত হলো স্বেদবিন্দুর ছোঁয়া৷ তিনি বললেন, ‘এ ধরনের গাল-গপ্পে বিশ্বাস করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও আমার নেই৷’

তিনি বলে চললেন, ‘আপনারা কি ক্রমশ প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছেন না? আমার মনে হয়, এই খুনের সঙ্গে আমার নিজস্ব বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সম্পর্ক নিছকই অবান্তর৷’

অন্য দুজন কোন উত্তর দেবারই আগেই এরকুল পোয়ারো বলে উঠলেন, ‘আপনি ব্যাপারটা ঠিক উপলব্ধি করতে পারছেন না, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷ খুনের চেয়ে চরম বাস্তব পৃথিবীতে আর কিছু নেই৷ দশটার মধ্যে অন্তত নটা ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নিহত ব্যক্তির চরিত্র এবং তাঁর পারিপার্শ্বিকের মধ্যেই খুনের প্রথম এবং প্রধান কারণ নিহিত রয়েছে৷ যেহেতু নিহত ব্যক্তির স্বভাব চরিত্রে তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিলো, শুধু সেই কারণেই তাঁকে হত্যাকারীর শিকার হতে হলো৷ সুতরাং যতক্ষণ না আমরা সম্পূর্ণভাবে জানতে পারছি আর্লেনা মার্শাল ঠিক কি ধরনের মহিলা ছিলেন, ততক্ষণ আমরা স্পষ্টভাবে বুঝতেই পারবো না ঠিক কোন ধরনের ব্ক্তয়র পক্ষে তাঁকে খুন করা সম্ভব৷ এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে আমাদের প্রশ্নের গুরুত্ব আপনার কাছে স্পষ্ট হবে৷’

মার্শাল ফিরলেন পুলিশ-প্রধানের দিকে৷ বললেন, ‘আপনারও কি একই মত?’

ওয়েস্টন একটু ইতস্তত করলেন৷ তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ—একরকম তাই—’

মার্শাল ছোট্ট করে হাসলেন৷

‘ভেবেছিলাম আপনি হয়তো একমত হবেন না৷ কারণ এই চরিত্র-সংক্রান্ত ব্যাপারগুলোকে আমি মঁসিয়ে পোয়ারোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বলেই জানতাম৷’

পোয়ারো সহাস্যে জবাব দিলেন, ‘তাহলে আপনি নিজেকে অন্তত এই কথা ভেবে অভিনন্দন জানাতে পারেন, ক্যাপ্টেন মার্শাল, যে আমাকে সাহায্য করার মতো কিছুই আপনি এখনও বলেননি৷’

‘তার মানে?’

‘আপনার স্ত্রীর সম্পর্কে আপনি আমাদের কতটুকু বলেছেন? কিছুই না! যেটুকু বলেছেন, তা সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন যে কোন মানুষের এমনিতেই নজরে পড়ে৷ অর্থাৎ আপনার স্ত্রী সুন্দরী এবং আকর্ষণীয়া মহিলা ছিলেন৷ এর চেয়ে বেশি কিছু আপনি আমাদের বলেছেন কি?’

কেনেথ মার্শাল কাঁধ ঝাঁকালেন৷ শুধু বললেন, ‘আপনার অভিযোগ সম্পূর্ণ অর্থহীন৷’

তিনি পুলিশ-প্রধানের দিকে তাকালেন, একটু জোর দিয়েই বললেন, ‘আপনি আমার কাছে আর কিছু জানতে চান?’

‘হ্যাঁ ক্যাপ্টেন মার্শাল—আজ সকালে আপনার গতিবিধির কথা৷’

কেনেথ মার্শাল সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়লেন৷ তিনি নিঃসন্দেহে এ প্রশ্নটাই আশা করছিলেন৷

তিনি বলতে শুরু করলেন, রোজকার মতো সকাল নটায় আমি প্রাতরাশ সারতে নিচে যাই এবং খবরের কাগজ পড়ি৷ পরে আমার স্ত্রী-ঘরে গিয়ে দেখি ও ঘরে নেই—সে কথা তো আপনাদের আগেই বলেছি৷ সমুদ্রতীরে এসে মঁসিয়ে পোয়ারোর সঙ্গে আমার দেখা হয়; আমি তাঁকে আমার স্ত্রী কথা জিগ্যেস করি৷ তারপর সংক্ষেপে স্নান সেরে আবার হোটেলে ফিরে আসি৷ তখন ক’টা হবে?... এই—এগারোটা বাজতে কুড়ির মতো—৷ হ্যাঁ, সময়টা আমার সঠিক মনে আছে, কারণ ফিরে এসেই হোটেলের দেওয়াল ঘড়িটা আমার প্রথম নজরে পড়ে: তখন এগারোটা বাজতে ঠিক কুড়ি মিনিট বাকি ছিলো৷ ওপরের ঘরে দেখি পরিচারিকা ঘর তদারকির কাজ তখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি৷ তাকে তাড়াতাড়ি কাজ সারতে বলে আমি আবার নিচে নেমে আসি, বার-এ হেনরীর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে এগারোটা বাজতে দশ মিনিটের সময় আবার ঘরে ফিরে যাই৷ আমার কতকগুলো জরুরি চিঠি টাইপ করার ছিলো৷ সেগুলোকে সকালের ডাকেই পোস্ট করবো বলে আর সময় নষ্ট না করে টাইপরাইটার নিয়ে বসে পড়ি৷ বারোটা বাজতে দশে কাজ শেষ করে আমি টেনিস খেলার পোশাক পরে নিই, কারণ বারোটায় আমাদের টেনিস খেলার কথা ছিলো৷ আমরা আগের দিনই টেনিস কোট বুক করে রেখেছিলাম—’

‘আমরা মানে কারা৷?’

মিসেস রেডফার্ন, মিস ডার্নলি, মিঃ গার্ডেনার এবং আমি৷ বেলা বারোটার সময় আমি টেনিস কোর্টে হাজির হই৷ মিস ডার্নলি ও মিঃ গার্ডেনার আমার আগেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন৷ শুধু মিসেস রেডফার্ন আসতে কয়েক মিনিট দেরি করেন৷ প্রায় ঘণ্টা খানেক আমরা খেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকি৷ তারপর হোটেলে ফিরে আসতেই আমি—আমি—খবরটা পাই৷’

ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷ এবারে নিছক রুটিনমাফিক একটা প্রশ্ন করবো—আপনি যে এগারোটা বাজতে দশ থেকে বারোটা বাজতে দশ পর্যন্ত আপনার ঘরে বসে টাইপ করছিলেন, এ বক্তব্যকে সমর্থন করতে পারে এমন কি কেউ আছে?’

কেনেথ মার্শালের ঠোঁটে ফুটে উঠলো হাসির রেখা৷ তিনি বললেন, ‘আপনি কি সন্দেহ করছেন যে আমি আমার স্ত্রীকে খুন করেছি?... দাঁড়ান, একটু ভাবতে দিন৷ পরিচারিকাটি তখন অন্যান্য ঘর ঝাঁড়পোঁছ নিয়ে ব্যস্ত ছিলো৷ সুতরাং সে নিশ্চয়ই টাইপরাইটারের শব্দ শুনে থাকবে৷ তাছাড়া চিঠিগুলো তো আমার কাছে রয়েছেই আর ডাকে দেওয়া হয়ে ওঠেনি৷ আমার মনে হয়, আমার বক্তব্যের সমর্থনে ও চিঠিগুলোই পর্যাপ্ত প্রমাণ৷’

পকেট থেকে তিনি চিঠি তিনটি বের করলেন৷ চিঠিগুলোতে ঠিকানা লেখা থাকলেও ডাকটিকিট লাগানো হয়নি৷ তিনি বললেন, ‘প্রসঙ্গত বলি, এই চিঠিগুলোর বিষয়বস্তু একান্ত গোপনীয়৷ কিন্তু খুনের মামলায় পুলিশের বিবেচনার ওপর ভরসা রেখে এগুলো আপনাদের হাতে তুলে দিতে আমি বাধ্য৷ এ চিঠিগুলোর আমার বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিবৃতি ও তাদের সঠিক অঙ্ক লেখা রয়েছ৷ আমার মনে হয়, যদি আপনারা এ চিঠিগুলো আপনাদের কোন লোককে দিয়ে টাইপ করান, তাহলে তার পক্ষেও এক ঘণ্টার খুব একটা কম সময়ে এগুলো শেষ করে ওঠা সম্ভব হবে না৷’

তিনি একটু থামলেন৷

‘আশা করি এবারে সন্তুষ্টু হয়েছেন?’

ওয়েস্টন মসৃণ স্বরে জবাব দিলেন, ‘এটা কোন সন্দেহের প্রশ্ন নয়, ক্যাপ্টের মার্শাল৷ এ দ্বীপে উপস্থিত প্রত্যেককেই আজ সকাল পৌনে এগারোটা থেকে এগারোটা চল্লিশ পর্যন্ত তাঁদের গতিবিধির জন্যে পুলিশের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।’

“হু-তা তো নিশ্চয়ই—’

‘আর একটা কথা, ক্যাপ্টেন মার্শাল—’ ওয়েস্টন বললেন, ‘আপনার স্ত্রীর নিজস্ব কোন বিষয় সম্পত্তি থেকে থাকলে সেগুলো তাঁর কিভাবে ভাগ করে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো সে সম্পর্কে আপনি কিছু জানেন?’

‘আপনি কি কোন উইলের কথা বলছেন? আমার মনে হয় না ও কোন উইল-টুইল করে গেছে৷’

‘কিন্তু সেটা তো শুধুই আপনার অনুমান—’

‘ওর সলিসিটর ছিলো ‘বাকেট, মার্কেট অ্যান্ড অ্যাপলগুড’, বেডফোর্ড স্কোয়ার৷ ওর সমস্ত অভিনয়-সংক্রান্ত চুক্তিগুলো তারাই দেখাশোনা করতো৷ কিন্তু আমি যদ্দুর জানি ও কখনও কোন উইল করেনি৷ একবার ও আমাকে বলেছিলো, এইসব উইল-টুইল করার কথা শুনলে ওর জ্বর আসে৷’

‘সে ক্ষেত্রে স্বামী হিসেবে তাঁর সমস্ত সম্পত্তির মালিকানা স্বত্ব তাহলে আপনার ওপরেই বর্তাচ্ছে?’

হ্যাঁ, সেরকমই তো মনে হচ্ছে৷’

‘তাঁর কাছাকাছি কোন আত্মীয়-স্বজর ছিলো?’

‘সম্ভভত না৷ আর থাকলেও তাদের কথা ও আমাকে কখনও জানায়নি৷ শুনেছি, ছোটবেলাতেই ওর মা বাবা দুজনেই মারা যায়—ওর আর কোন ভাই বা বোন নেই৷’

‘সে যাই হোক, রেখে যাওয়ার মতো তেমন বিষয়-সম্পত্তি তাহলে আপনার স্ত্রীর ছিলো না?’

কেনেথ মার্শাল শীতল স্বরে জবাব দিলেন, বরং ঠিক তার উলটো৷ মাত্র বছর দুয়েক আগে, ওর এক পুরনো বন্ধু স্যার রবার্ট আরস্কিন মারা যান, এবং তাঁর সমস্ত বিষয়-সম্পত্তি তিনি আর্লেনাকেই উইল করে দিয়ে যান৷ সে সম্পত্তির আর্থিক মুল্য, আমার অনুমান, প্রায় পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট চোখ তুলে তাকালেন৷ তাঁর দৃষ্টিতে ফুটে উঠলো এক তৎপর প্রতিক্রিয়া৷ এ পর্যন্ত তিনি একেবারেই নীরব ছিলেন, এবার প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে প্রকৃতপক্ষে আপনার স্ত্রী একজন ধনী মহিলা ছিলেন, ক্যাপ্টের মার্শাল?’

কেনেথ মার্শাল কাঁধ ঝাঁকালেন, ‘হ্যাঁ, তা হয়তো ছিলো৷’

আর তা সত্ত্বেও আপনি বলতে চান তিনি কোন উইল করে যাননি?’

‘আপনারা ওর সলিসিটরদের প্রশ্ন করতে পারেন৷ কিন্তু আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি ও কোন উইল করেনি৷ এটাকে ও অমঙ্গলসূচক কাজ বলে মনে করতো৷’

কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর মার্শাল যোগ করলেন, ‘আপনার আর কিছু জিজ্ঞাসা আছে?’

ওয়েস্টন মাথা নাড়লেন, মনে হয় না—কি, কলগেট? না, আপাতত প্রশ্নের পালা শেষ৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল, আপনার এই আকস্মিক ক্ষতিতে আমি আরও একবার আপনাকে সমবেদনা জানাচ্ছি৷’

মার্শালের চোখের পাতা কেঁপে উঠলো৷ আচমকা সুরে তিনি জবাব দিলেন, ‘ওহ—ধন্যবাদ৷’

তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন৷

উপস্থিত তিনজন পরস্পরে দিকে তাকালেন৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘ঠান্ডা মাথার মক্কেল৷ সহজে ধরা দেবার পাত্র নয়, তাই না? তোমার কি মনে হয় কলগেট?’

ইন্সপেক্টর অনিশ্চিত ভঙ্গীতে মাথা নাড়লেন৷

‘বলা শক্ত৷ তিনি সে ধরনের লোক নন যাঁরা নিজেদের মনের ভাব অভিব্যক্তিতে প্রকাশ করেন৷ এবং এ ধরনের লোকেরা সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জুরীদের সহানুভূতিকে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করতে পারেন না৷ সত্যি কথা বলতে কি, এই কারণে একাধিকবার তাঁদের ওপরই কিঞ্চিৎ অবিচারও করা হয়েছে৷ অনেক সময় তাঁদের মনের ভেতরে চিন্তা ও সমস্যার তুমুল আলোড়ন উঠলেও তাঁরা মুখের পর্দার সে মানসিকতার প্রতিবিম্ব ফুটিয়ে তুলতে পারেন না—সোজা কোথায়, অভিব্যক্তি প্রকাশে তাঁরা সম্পূর্ণ অক্ষম৷ ঠিক এই ধরনের স্বভাবের জন্যেই ওয়ালেসের বিরুদ্ধে জুরীরা ‘অপরাধী’ রায় দিতে বাধ্য হয়৷ তাঁদের এই রায় সাক্ষ্য-নির্ভর ছিলো না৷ তাঁরা বিশ্বাসই করতে পারেননি, কোন স্বামী তাঁর স্ত্রীকে হারিয়ে এত সহজ ও শান্তভাবে ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পারেন৷’

ওয়েস্টন ফিরলেন পোয়ারোর দিকে৷

‘আপনি কি বলেন, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

এরকুল পোয়ারো হাত তুলে একটা ভঙ্গী করলেন৷ বললেন, ‘কি-ই বা বলা সম্ভব৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল হলেন অবরুদ্ধ সিন্দুক—আবদ্ধ শুক্তি৷ তিনি নিজের ভূমিকা ইতিমধ্যেই বেছে নিয়েছেন৷ তিনি কিছুই শোনেননি, কিছুই দেখেননি, এবং কিছুই জানেন না!’

‘তবে খুনের উদ্দেশ্য হিসেবে অনেকগুলো কারণ আমাদের সামনে রয়েছে৷’ বললেন কলগেট, ‘প্রথমত রয়েছে ঈর্ষা, আর রয়েছে মিসেস মার্শালের রেখে যাওয়া প্রচুর অর্থ—এ দুটোয় যে কোনটাই খুনের জোরালো কারণ হতে পারে৷ অবশ্য এমনিতেই স্ত্রীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বামীই প্রথম এবং প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি, তাকে সন্দেহ করার কথাটাই সর্বাগ্রে আমাদের মনে আসে সুতরাং যদি আমরা জানতে পারি যে ক্যাপ্টেন মার্শাল নিজের স্ত্রীর ব্যভিচারের কথা সবই জানতেন, তাহলে ;’

পোয়ারো বাধা দিলেন, বললেন, ‘আমার মনে হয় তিনি তা জানতেন৷’

‘আপনার এ ধারণার কারণ?’

‘কারণ, গতরাত্রে আমি সানি লেজ-এ মিসেস রেডফার্নের সঙ্গে কথা বলছিলাম৷ সেখান থেকে হোটেলে ফিরে আসার পথে আমি ওদের দুজনকে—মানে মিসেস মার্শাল ও প্যাট্রিক রেডফার্নকে দেখতে পাই৷ এবং তার কয়েক সেকেন্ড পরেই ক্যাপ্টেন মার্শালের সঙ্গে আমার আচমকা সাক্ষাৎ হয়৷ তাঁর মুখমণ্ডল যথারীতি অভিব্যক্তিশূন্য, অচঞ্চল ও কঠিন৷ কিন্তু তাঁর ওই চেষ্টাকৃত অভিব্যক্তিশূন্যতা আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি৷ তিনিও ওদের দেখতে পেয়েছেন, সে সম্পর্কে আমার মনে সন্দেহের আর লেশমাত্র ছিলো না!’

কলগেট সন্দেহসূচকভাবে একটা গম্ভীর শব্দ করলেন৷

তিনি বললেন, ‘ও—তাহলে আপনার যদি সেইরকম মনে হয় থাকে—’

‘মনে হওয়া’ নয়, আমি নিঃসন্দেহ! কিন্তু তার থেকে কতটুকুই বা আমরা জানতে পারছি? কেনেথ মার্শাল নিজের স্ত্রী সম্পর্কে প্রকৃতপক্ষে কি ভাবতেন তা আমরা এখনও জানি না৷’

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘স্ত্রীর মৃত্যুকে তিনি বড় সহজভাবে নিয়েছেন৷’

পোয়ারো অতৃপ্তভাবে মাথা নাড়লেন৷

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘কখনও কখনও এই সব আপাত-শান্ত লোকেরা ভেতরে ভেতরে ভীষণ উগ্র হয়৷ তাঁদের সমস্ত আবেগ, অনুভূতি দিনের পর দিন মনে আবদ্ধ থাকে বলেই চূড়ান্ত বিস্ফোরণটা হয় ভয়ঙ্কর৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল হয়তো তাঁর স্ত্রীকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন—আর সেই জন্যেই ছিলেন অস্বাভাবিক রকম ঈর্ষাপরায়ণ৷ কিন্তু সে অনুভূতি বাইরে প্রকাশ করার মতো লোক তিনি নন৷’

পোয়ারো ধীর স্বরে বললেন, ‘হয়তো সম্ভব৷ কারণ আমাদের এ ক্যাপ্টেন মার্শাল বড় অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ৷ তাঁর প্রতি আমার যথেষ্ট কৌতূহল রয়েছে৷ যেমন রয়েছে তাঁর অ্যালিবাই সম্পর্কে৷’

‘টাইপরাইটার-অ্যালিবাই!’ শব্দ করে হাসলেন ওয়েস্টন, ‘এ ব্যাপারে তোমার মতামত কি কলগেট?’

ইন্সপেক্টর কলগেটের উজ্জ্বল চোখজোড়া ঈষৎ সঙ্কুচিত হলো৷ তিনি বললেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি, স্যার অ্যালিবাইটা আমাকে মোটামুটি সন্তুষ্টই করেছে৷ কারণ ওটা বেশি রকম নিখুঁত তো নয়ই, বরং বলতে পারেন—স্বাভাবিক৷ যদি আমরা জানতে পারি যে সেই পরিচারিকাটি তখন কাছাকাছিই ছিলো এবং টাইপরাইটার চলার শব্দ শুনতে পেয়েছিলো, তাহলে আমার মনে হয় এই অ্যালিবাই নিয়েই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে, এবং নিরুপায় হয়েই নজর দিতে হবে অন্যদিকে৷’

‘হুম!’ বললেন, কর্নেল ওয়েস্টন, ‘কিন্তু নজরটা তুমি দেবে কোন দিকে?’

প্রায় মিনিটখানেক ধরে ওঁরা তিনজন প্রশ্নটার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে চেষ্টা করলেন৷

অবশেষে ইন্সপেক্টর কলগেটই স্তব্ধতা ভঙ্গ করলেন৷ তিনি বললেন, ‘গোটা সমস্যাটা এখন নেমে এসেছে একটা প্রশ্নে—কাজটা কি কোন বাইরের লোকের, না হোটেলের কোন অতিথির? মনে রাখবেন, আমি চাকর-বাকরদেরও সন্দেহের আওতা থেকে পুরোপুরি বাদ দিচ্ছি না, তবে আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে ওদের কোন ভূমিকা নেই৷ উহুঁ—এ কাজ হয় হোটেলের কোন অতিথির, নয় বাইরে কোন লোকের; এ সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্রও দ্বিধা নেই৷ ব্যাপারটা এইভাবে দেখা ছাড়া আমাদের উপায় নেই৷ তাছাড়া, সবচেয়ে প্রথম আসে—খুনের উদ্দেশ্য৷ এখানে সেটা স্ববৈশিষ্ট্যে বতর্মান : আর্থিক লাভ৷ মিসেস মার্শালের এই আকস্মিক মৃত্যুতে একমাত্র লাভবান হচ্ছেন তাঁর স্বামী, আপাতদৃষ্টিতে অন্তত তাই মনে হচ্ছে৷ এ ছাড়া আর কি উদ্দেশ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি? প্রথম এবং প্রধান—ঈর্ষা৷ ঘটনার দিকে সরাসরি চোখ রেখে আমার মনে হয়, যদি কখনও নিছক প্রেমঘটিত ঈর্ষার কারণে কোনও খুন হয়ে থাকে, তাহলে এটাই সেই একমাত্র উদাহরণ (পোয়ারোর দিকে ফিরে মাথা ঝুঁকিয়ে ইশারা করলেন কলগেট)৷’

পোয়ারো চোখ তুলে তাকালেন ঘরে আভ্যন্তরীণ ছাদের দিকে৷ মৃদু স্বরে বললেন, ‘মানুষের মনের অসংখ্য আবেগের প্রকৃত চরিত্র কজন জানে—’

ইন্সপেক্টর কলগেট বলে চললেন, ভদ্রমহিলার স্বামী তো কিছুতেই স্বীকার করলেন না যা তাঁর স্ত্রীর কোন শত্রু ছিলো—সত্যিকারের শত্রু৷ কিন্তু সেকথা আমি বিশ্বাস করি না৷ আমি বলবো, মিসেস মার্শালের মতো মহিলার প্রচুর শত্রু থাকাটাই স্বাভাবিক—চরম শত্রু৷ আপনি কি বলেন, স্যর?’

পোয়ারো বিনা দ্বিধায় জবাব দিলেন, ‘আপনার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত৷ আর্লেনা মার্শালের শত্রু থাকাটা খুবই স্বাভাবিক৷ কিন্তু আমার মনে হয়, আপনার এই শত্রুতত্ত্বকে ভিত্তি করে বেশিদূরে আমরা এগোতে পারবো না৷ কারণ, আপনি তো জানেন ইন্সপেক্টর, আর্লেনা মার্শালের শত্রুরা সর্বদাই মহিলারা৷’

কর্নেল ওয়েস্টন সম্মতিসূচক একটা গম্ভীর শব্দ করে বললেন, ‘আপনার কথাটায় যুক্তি আছে৷ এই দ্বীপের মিসেস মার্শালের একমাত্র শত্রু ছিলো মহিলারা—’

পোয়ারো বলে চললেন, ‘এবং আমার মনে হয়, এই খুনটা কোন মহিলারা পক্ষে করা সম্ভব৷ আপনাদের ডাক্তারি সাক্ষ্য কি বলছে?’

ওয়েস্টন সেই বিচিত্র শব্দ সহকারে জবাব দিলেন, ‘মিসেস মার্শাল যে কোন পুরুষের হাতে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন যে বিষয়ে নীসডনের মনে কোন সন্দেহ নেই, বিশাল, শক্তিশালী একজোড়া হাতের কঠিন নিষ্পেষণ৷ অবশ্য, এও হয়তো সম্ভব যে অমানুষিক শক্তিসম্পন্ন কোন ক্রীড়াবিদ মহিলাই এ মৃত্যুর জন্যে দায়ী—কিন্তু আমার মতে, সেটা একটু কষ্টকল্পনা এবং অস্বাভাবিক৷’

পোয়ারো মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন৷

‘ঠিক তাই৷ চায়ের কাপে আর্সেনিক—বিষাক্ত চকোলেটের বাক্স কিংবা ছুরি—এমন কি পিস্তল পর্যন্ত আমি এগোতে রাজি আছি—কিন্তু শ্বাসরোধ করে হত্যা? অসম্ভব৷ আমাদের প্রার্থিত ব্যক্তি নিঃসন্দেহে কোন পুরুষ৷’

‘কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের সমস্যা হয়ে পড়ছে আরও জটিল৷’ তিনি বলে চললেন, ‘আর্লেনা মার্শালকে অপসারিত করে নিজেদের পথ নিষ্কণ্টক করতে চেয়েছেন এমন ব্যক্তি মাত্র দুজন উপস্থিত আছেন এই হোটেলে—কিন্তু তাঁরা দুজনেই মহিলা৷’

কর্নেল ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘তার মধ্যে একজন নিশ্চয়ই মিসেস রেডফার্ন?’

‘হ্যাঁ৷ মিসেস রেডফার্ন হয়তো আর্লেনা স্টুয়ার্টকে হত্যা করতে মনস্থির করেছিলেন৷ ধরে নেওয়া যাক, তার যথেষ্ট কারণও ছিলো৷ আমার মনে হয়, মিসেস রেডর্ফানের মতো মহিলার পক্ষে খুন করাটা অসম্ভব কিছু নয়৷ কিন্তু এই বিশেষ ধরনের হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণ তাঁর চরিত্র-বিরোধী৷ তাঁর সমস্ত মানসিক অশান্তি ও ঈর্ষার কথা মনে রেখেও আমি বলবো তিনি আবেগ তাড়িত মহিলা নন৷ ভালোবাসার ক্ষেত্রে তিনি অনুরক্ত এবং একান্ত-নিষ্ঠ উদ্দাম আসক্তিতে বিশ্বাসী নন৷ একটু আগেই আমি যে কথা বললাম—চায়ের কাপে আর্সেনিক, হয়তো সম্ভব—কিন্তু শ্বাসরোধ করে হত্যা, সম্পূর্ণ অসম্ভব! তাছাড়া দৈহিক গঠনের দিক থেকেও এ খুন মিসেস রেডফার্নের পক্ষে করা সম্ভব নয়—এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷ আপনারাও হয়তো লক্ষ্য করে থাকবেন, তাঁর হাত এবং পায়ের গড়ন সাধারণের তুলনায় বেশ ছোট৷’

ওয়েস্টন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘না, এ কোন মহিলার কর্ম নয়৷ আমাদের প্রার্থিত আসামী নিঃসন্দেহে পুরুষ৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট শব্দ করে কাশলেন৷

‘আমি একটা সম্ভাব্য সমাধান আপনাদের সামনে রাখতে চাই, স্যর ধরে নেওয়া যাক, এই মিঃ রেডফার্নের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে জনৈক পুরুষের সঙ্গে মিসেস মার্শালের একটু ইয়ে টিয়ে ছিলো, ধরা যাক, তার নাম ‘এক্স’৷ মিঃ রেডফার্ন রঙ্গ মঞ্চে প্রবেশ করা মাত্রই মিসেস মার্শাল এই ‘এক্স’ কে সবিনয় বিদায় দিলেন৷ সুতরাং ‘এক্স’ ঈর্ষা এবং অপমানের জ্বালায় উন্মাদ হয়ে উঠলো৷ সে তার প্রাক্তন প্রেমিকাকে অনুসরণ করে এলো এই অঞ্চলে৷ স্থানীয় কোন বাড়িতে বসে সুযোগের অপেক্ষায় রইলো৷ অবশেষে সে এলো এই দ্বীপে, এবং তার অপমানের প্রতিশোধ নিলো৷ এমনটা ঘটলেও ঘটতে পারে৷’

‘তা পারে৷’ জবাব দিলেন ওয়েস্টন, এবং ‘তোমার অনুমান যদি সত্যি হয়, তাহলে ব্যাপারটা প্রমাণ করতে কোন অসুবিধা হবে না৷ এই মিঃ ‘এক্স’ কি পায়ে হেঁটে দ্বীপে এসেছেন, না নৌকোয়, এটাই সবচেয়ে প্রথমে আমাদের জানতে হবে৷ আমার কাছে দ্বিতীয় পন্থাটাই বেশি সম্ভাব্য বলে মনে হচ্ছে৷ আর তাই যদি হয়, তাহলে সে নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোন জায়গা থেকে নৌকো ভাড়া করেছে৷ এ ব্যাপারে তুমি একটু খোঁজ খবর নাও৷’

ওয়েস্টন ফিরে তাকালেন পোয়ারোর দিকে, ‘কলগেটের এই ধারণা সম্পর্কে আপনার কি মত?’

পোয়ারো ধীর স্বরে বললেন, ‘এতে হত্যাকারীকে সুযোগ এবং সম্ভাবনার ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে৷ আর তাছাড়া—ইন্সপেক্টরের কাল্পনিক কাহিনিতে অন্তত এক জায়গায় একটা ভুল থেকে যাচ্ছে৷ কারণ এই ঈর্ষা এবং অপমানের জ্বালায় উন্মত্ত লোকটিকে আমি ঠিক কল্পনায় আনতে পারছি না...’

কলগেট বললেন, ‘কিন্তু স্যর, মিসেস মার্শালের জন্যে পাগল হওয়ার মতো লোকের অভাব এখানে নেই৷ এই রেডফার্নকে দেখুন না—’

‘হ্যাঁ, মানছি... কিন্তু তবুও—’

কলগেট সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকালেন৷

পোয়ারো মাথা নাড়লেন৷

তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো৷

তিনি বললেন, ‘কোথাও এমন কিছু একটা রয়েছে, যেটা আমাদের নজর এড়িয়ে গেছে...’

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

কর্নেল ওয়েস্টন হোটেলের অতিথি তালিকার খাতার ওপর ঝুঁকে ছিলেন তিনি সশব্দ উচ্চারণে পড়তে লাগলেন :

‘মেজর এবং মিসেস কাওয়ান,

মিস পামেলা কাওয়ান,

মাস্টার রবার্ট কাওয়ান,

মাস্টার ইভান কাওয়ান৷

রাইড্যালস মাউন্ট লেদারহেড৷

মিঃ এবং মিসেস মাস্টারম্যান,

মিঃ এডওয়ার্ড মাস্টারম্যান,

মিস জেনিফার মাস্টারম্যান,

মিঃ রয় মাস্টারম্যান,

মাস্টার ফ্রেডরিক মাস্টারম্যান,

৫. মার্লবোরো অ্যাভিনিউ, লন্ডন, এন ডব্লিউ৷

মিঃ এবং মিসেস গার্ডেনার,

ন্যু-ইয়র্ক,

মিঃ এবং মিসেস রেডফার্ন,

ক্রসগেটস সেলডন প্রিন্সেস, রিসবোরো৷

মেজর ব্যারী,

১৮, কারডন স্ত্রিট, সেন্ট জেমস, লন্ডন এস ডব্লিউ১৷

মিঃ হোরেস ব্ল্যাট,

৫, পিকাসর্জিল স্ট্রিট, লন্ডন, ই. সি, ২৷

মঁসিয়ে এরকুল পোয়ারো,

হোয়াটিহ্যাভেন, ম্যানসনস, লন্ডন ডব্লিউ, ১৷

মিস রোজামন্ড ডার্নলি

৮, কার্ডিগান কোর্ট, ডব্লিউ, ১৷

মিস এমিলি ব্রুস্টার,

সাউথ গেটস, সানবেরী-অন-টেমস৷

রেভারেন্ড স্টিফেন লেন,

লন্ডন

ক্যাপ্টেন এবং মিসেস মার্শাল

মিস লিন্ডা মার্শাল

৭৩, আপকট ম্যানসনস, লন্ডন এস, ডব্লিউ, ৭৷’

ওয়েস্টন থামলেন৷

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘আমার মনে হয় স্যর, প্রথম দুটো পরিবারকে আমরা স্বচ্ছন্দে বাদ দিতে পারি৷ কারণ মিসেস ক্যাসল, বলেছেন মাস্টারম্যান৷ এবং কাওয়ানরা নাকি প্রতি গ্রীষ্মেই ওঁদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এখানে বেড়াতে আসেন৷ আজ সকালে ওঁরা দুপুরের খাবার সঙ্গে নিয়ে দিনভর নৌকোভ্রমণে বেড়িয়েছিলেন৷ সকাল ন’টার কিছু পরেই ওঁরা রওনা হন৷ অ্যানড্রু ব্যাস্টন নামে একজন লোক ওঁদের নৌকো করে নিয়ে যায়৷ তাকে জিগ্যেস করলেই আমরা মিসেস ক্যাসল-এর কথা যাচাই করে নিতে পারবো৷ কিন্তু আমার মনে হয়, সন্দেহের আওতা থেকে ওঁদের আমরা অনায়াসে বাদ দিতে পারি৷’

ওয়েস্টন মাথা নোয়ালেন৷

‘আমারও তাই ধারণা৷ যে ক’জনকে পারা যায় এভাবেই আমরা বাদ দেবো৷ অবশিষ্টদের কারও সম্পর্কে আপনি কোন ইঙ্গিত দিতে পারেন, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

পোয়ারো বললেন, ‘ভাসা ভাসা ভাবে নিশ্চয়ই দেওয়া সম্ভব৷ গার্ডেনার মধ্যবয়ষ্ক বিবাহিত দম্পতি; আচরণে হাসিখুশি এবং ভ্রমণবিলাসী ৷ আলাপ-আলোচনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব শ্রীমতী গার্ডেনার একাই পালন করেন৷ তাঁর এই আধিপত্যকে মিঃ গার্ডেনার নীরবে মেনে নিয়েছেন৷ তিনি টেনিস গলফ খেলতে ভালোবাসেন, কখনও একান্ত সঙ্গী হিসেবে পেলে তাঁর অসামান্য রসবোধ আমার কাছে হয়ে ওঠে এক আকর্ষণ৷’

‘সুতরাং, নজরে পড়ার মতো অস্বাভাবিক কিছু নেই৷’

‘এরপর ধরুন রেডফার্নদের—৷ মিঃ রেডফার্ন বয়েসে তরুণ মহিলাদের কাছে প্রলোভনের বস্তু অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাঁতারু, ভালো টেনিস খেলোয়াড় ও প্রথম শ্রেণীর নাচিয়ে৷ তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে আমি আগেই আপনাকে বলেছি৷ তিনি শান্ত প্রকৃতির মহিলা: তাঁর বহিরঙ্গের বিবর্ণতার মধ্যে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য প্রচ্ছন্ন রয়েছে৷ তিনি, আমার মনে হয়, তাঁর স্বামীর প্রতি যথেষ্ট অনুরক্ত৷ তাঁর মধ্যে এমন একটা জিনিস রয়েছে যা আর্লেনা মার্শালের ছিলো না৷’

‘যথা?’

‘বুদ্ধি—’

ইন্সপেক্টর কলগেট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷ বললেন, ‘মোহের প্রশ্ন যখন আসে, তখন বুদ্ধির কোন গুরুত্ব সেখানে থাকে বলে আমার মনে হয় না, স্যার৷’

‘হয়তো থাকে না৷ কিন্তু তা সত্ত্বেও আমার বিশ্বাস মিসেস মার্শাল সম্পর্কে মোহচ্ছন্ন হলেও মিঃ রেডফার্ন প্রকৃতপক্ষে তাঁর স্ত্রীকেই ভালোবাসেন৷’

‘সেটা হতে পারে, স্যার৷ কারণ মিঃ রেডফার্নের এ জাতীয় পদস্খলন হয়তো এই প্রথম নয়—’

পোয়ারো অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘এটাই তো সবচেয়ে দুঃখের কথা! স্ত্রীরা এই সরল সত্যি কথাটাই সহজে বিশ্বাস করতে পারেন না!’

একটু থেমে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন ‘মেজর ব্যারী৷ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক৷ নারী-সৌন্দর্যের পূজারী দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর কাহিনীর কথক৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷

‘আর বলার প্রয়োজন নেই৷ এ ধরনের কিছু লোকের সঙ্গে দুর্ভাগ্যবশত আমারও পরিচয় হয়েছে, স্যর!’

মিঃ হোরেস ব্ল্যাট৷ আপাতদৃষ্টিতে তিনি একজন ধনী ব্যক্তি৷ কথা বলেন প্রচুর—তবে নিজের সম্পর্কেই৷ সকলের বন্ধুত্বই তাঁর কাম্য৷ এবং তার পরিণতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক৷ কারণ কেউই তাঁকে তেমন একটা পছন্দ করেন না৷ এছাড়া আর একটা ঘটনা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷ গত রাতে আমাকে তাঁর একরাশ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিলো৷ তখন আমার মনে হয়েছে, মিঃ ব্ল্যাট বেশ অস্বস্তি বোধ করছেন৷ তাঁর যে কোথাও কোন একটা গোলমাল রয়েছে সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত৷’

এক মুহূর্ত থামলেন তিনি৷ তারপর ভিন্ন স্বরে পুনরায় শুরু করলেন, ‘এরপর আসছেন মিস রোজামণ্ড ডার্নলি তাঁর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের নাম রোজামন্ড লিমিটেড৷ তিনি একজন বিখ্যাত পোশাক-বিশেষজ্ঞ৷ তাঁর সম্পর্কে আর বিশেষ কি বলা যায়? মোটের ওপর মিস ডানর্লির বু্দ্ধি, সৌন্দর্য ও চটক—সবই আছে৷ এবং তাঁর সৌন্দর্যের আকর্ষণী ক্ষমতাকে অস্বীকার করা খুবই কঠিন৷’ একটু থেমে তিনি আবার যোগ করলেন, সবশেষে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তিনি ক্যাপ্টেন মার্শালের একজন পুরনো বন্ধু৷’

ওয়েস্টন চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন৷

‘বলেন কি? তাই নাকি?’

‘হ্যাঁ৷ যদিও মাঝে বেশ কয়েক বছর তাঁদের দেখা সাক্ষাৎ হয়নি৷

ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘মিস ডানর্লি কি জানতেন যে ক্যাপ্টেন মার্শাল এখানে বেড়াতে আসছেন?’

‘তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, জানতেন না৷’

পোয়ারো কিছুক্ষণ নীরব রইলেন৷ তারপর বলতে শুরু করলেন, এরপর কে আসছেন? মিস ব্রুস্টার৷ তাঁর সম্পর্কে আমি কিঞ্চিৎ আশঙ্কিত৷’ তিনি ধীরে মাথা নাড়লেন, ‘তাঁর কণ্ঠস্বর পুরুষ-সদৃশ৷ আচরণে রূঢ় হলেও আন্তরিকতার অভাব নেই৷ নৌকা বাইতে ভালোবাসেন এবং গলফ খেলায় পারদর্শিনী৷’ একটু থামলেন তিনি তারপর বললেন, অবশ্য আমার মনে হয়, সব মিলিয়ে তিনি একজন সহৃদয় মহিলা৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘সুতরাং এরপর বাকি রইলেন ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷ কে এই ধর্মযাজক স্টিফেন লেন?’

‘এ ক্ষেত্রে একটা কথাই আমি বলতে পারি; ধর্মযাজক লেন এক প্রচণ্ড স্নায়ুবিক চাপের মধ্যে রয়েছেন৷ এছাড়া, আমার মতে, তিনি একজন ধর্মান্ধ ব্যক্তি৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট সংক্ষিপ্ত করলেন, ‘ও—এই ধরনের লোক!’

ওয়েস্টন বললেন, ‘ব্যস, আমাদের লিস্ট শেষ!’ তিনি তাকালেন পোয়ারোর দিকে, ‘কিন্তু বন্ধুবর, আপনাকে যেন বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে?’

পোয়ারো জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ৷ কারণ আজ সকালে মিসেস মার্শাল যখন ভেলা নিয়ে রওনা হন এবং আমাকে অনুরোধ করেন তাঁর উপস্থিতির কথা কাউকে না জানাতে, তখন সঙ্গে সঙ্গেই আমার মন এক সিদ্ধান্তে উপনীত হয়৷ আমার মনে হয়েছিলো প্যাট্রিক রেডফার্নের সঙ্গে মিসেস মার্শালের অন্তরঙ্গতা তাঁর এবং তাঁর স্বামীর মধ্যে এক অশান্ত জটিলতার সৃষ্টি করেছে৷ ভেবেছিলাম, তিনি সম্ভবত প্যাট্রিক রেডফার্নের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, এবং তিনি চান না তাঁর সেই গতিবিধি সম্পর্কে তাঁর স্বামী অবহিত হোক৷’

তিনি থামলেন৷ কিন্তু সে ক্ষণিকের জন্য৷

‘কিন্তু, এখন আশা করি আপনারা বুঝতে পেরেছেন, আমার ভুলটা হয়েছিলো সেইখানেই৷ কারণ, তিনি চলে যাওয়ার অব্যবহিত পরে ক্যাপ্টেন মার্শালের সমুদ্রতীরে এসে উপস্থিত হন ঠিকই, এবং আমাকে প্রশ্ন করেন তাঁর স্ত্রীকে আমি দেখেছি কিনা, কিন্তু প্রায় একই সঙ্গে প্যাট্রিক রেডফার্নও ঘটনাস্থলে হাজির হয়—এবং অত্যন্ত প্রকট ও নির্লজ্জভাবে মিসেস মার্শালের অনুসন্ধান করতে থাকে৷ সুতরাং, বন্ধুগণ, এই মুহূর্তে আমি নিজেকেই প্রশ্ন করছি, আজ সকালে আর্লেনা মার্শাল তাহলে কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন?’

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘আপনার বক্তব্য আমার ধারণাকেই পুরোপুরি সমর্থন করছে, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ লন্ডন অথবা অন্য কোন জায়াগা থেকে আসা জনৈক অজ্ঞাত-পরিচয় ব্যক্তির সঙ্গেই মিসেস মার্শাল—’

এরকুল পোয়ারো প্রতিবাদের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘কিন্তু, বন্ধু, আপনার অভিমত অনুযায়ী এই কাল্পনিক ব্যক্তির সঙ্গে আর্লেনা মার্শালের সম্পর্ক ইতিমধ্যেই ছিন্ন হয়েছে৷ সুতরাং এরপরেও তিনি এতোটা ঝুঁকি এবং শ্রম স্বীকার করে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাবেন, এটা ভাবতে কষ্ট হয়৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘তাহলে আপনি কাকে সন্দেহ করছেন?’

সেটাই তো আমি এখনও আন্দাজ করে উঠতে পারছি না৷ একটু আগেই আমরা হোটেলের অতিথি-তালিকা পড়ে শেষ করেছি৷ দেখেছি তাঁদের সকলেই প্রায় মধ্যবয়স্ক নীরস প্রকৃতির৷ তাঁদের কাউকে কি প্যাট্রিক রেডফার্নের চেয়ে বেশি গুরুত্ব মিসেস মার্শাল দেবে? উহুঁ—সম্পূর্ণ অসম্ভব৷ কিন্তু তবুও আমরা দেখতে পাচ্ছি, তিনি একজনের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাতের আয়োজন করেছিলেন—এবং সেই একজন প্যাট্রিক রেডফার্ন নন৷’

ওয়েস্টন মৃদু স্বরে বলে উঠলেন, ‘আপনার কি মনে হয়, মিসেস মার্শাল আপন খেয়ালে একাই বেরিয়ে পড়েছিলেন?’

পোয়ারো প্রতিবাদ জানিয়ে আরও একবার মাথা নাড়লেন৷

‘বন্ধু’, বললেন পোয়ারো, ‘আপনার কথা স্পষ্টই প্রমাণিত হচ্ছে মৃত মহিলার সঙ্গে পরিচয়ের সে ভাগ্য আপনার হয়নি৷ সুন্দরীশ্রেষ্ঠা ব্রুমেল অথবা নিউটনের মতো মানুষ—এই দুজনের ক্ষেত্রে ‘আরোপিত নিঃসঙ্গ বন্দী জীবন’-এর তাৎপর্যের যে পার্থক্য, তা নিয়ে জনৈক ব্যক্তি একদা এক জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধ লিখেছিলেন৷ নিঃসঙ্গতার জগতে আলেনা মার্শালের স্থান নেই, বন্ধু৷ পুরুষের প্রশংসা সর্বদা আলোকিত মঞ্চেই তাঁর চিরকালের অধিষ্ঠান৷ সুতরাং আজ সকালে তিনি কারো না কারো সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু কে সেই ব্যক্তি?’

কর্নেল ওয়েস্টন দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘আপাতত এসব তত্ত্ব-আলোচনা থাক৷ এ নিয়ে আমরা পরেও ভাববার অনেক সময় পাবো৷ এখন যেটা প্রয়োজন, তা হলো জবানবন্দিগুলো সেরে নেওয়া৷ কারণ প্রত্যেকের গতিবিধির একটা লিখিত বিবৃতি পেলে আমাদের কাজের অনেক সুবিধে হবে৷ প্রথমে তাহলে মার্শালের মেয়েটিকেই ডাকা যাক৷ সে হয়তো আমাদের কোন জরুরি খবর দিলেও দিতে পারে৷’

দরজার টোকা মেরে নিজের উপস্থিতি জানালো লিন্ডা মার্শাল, অগোছালো ভঙ্গীতে ঘরে পা রাখলো৷ ওর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত লয়ে বইছে, দু চোখের তারা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিস্তৃত৷ লিন্ডাকে দেখে কোন হতকচিত অশ্বশাবকের কথাই প্রথমে মনে আসে৷ওর প্রতি অদ্ভুত স্নেহের আবেগ অনুভব করলেন কর্নেল ওয়েস্টন৷

তিনি ভাবলেন ঃ ‘বেচারি মেয়েটা—এই তো কচি বয়েস! নিশ্চয়ই এ ঘটনায় ভীষণ মানসিক আঘাত পেয়েছে৷’

তিনি একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে আশ্বাসের সুরে বললেন, ‘আপনাকে এ অবস্থায় বিরক্ত করার জন্যে দুঃখিত, মিস লিন্ডা, তাই তো?’

‘হ্যাঁ৷ লিন্ডা৷’

ওর কণ্ঠস্বরে শ্বাস টেনে শব্দ উচ্চারণের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা অধিকাংশ স্কুলের মেয়েদের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়৷ ওয়েস্টনের সামনে, টেবিলের ওপর অসহায় ভঙ্গীতে রক্ষিত লিন্ডার হাড়সর্বস্ব, রক্তিম, দীর্ঘ আকৃতির করুণ হাত দুটো৷ তিনি ভাবলেন ঃ ‘এ ধরনের ঘটনায় কোন কিশোরীর কখনোই জড়িয়ে পড়া উচিত নয়৷’

তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠলো আশ্বাসের কোমল সুর, ‘এ সব দেখে আপনার ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই, মিস লিন্ডা৷ আমরা শুধু চাই, আপনি যদি এমন কিছু জেনে থাকেন যা আমাদের প্রয়োজন আসতে পারে, তাহলে সেটুকু আমাদের খুলে বলুন—ব্যস, এর বেশি কিছু নয়৷’

লিন্ডা বলল, ‘তার মানে—আর্লেনা সম্পর্কে৷’

‘হ্যাঁ৷ আজ সকালে আপনি কি তাঁকে একবারও দেখেছেন?’

অসহায় মেয়েটি মাথা নাড়লো৷

‘না৷ কারণ আর্লেনা বরাবরই একটু বেলায় নিচে নামে৷ তাছাড়া বিছানায় বসে প্রাতরাশ সারা ওর পুরনো অভ্যেস৷’

‘আর আপনি, মাদমোয়াজেল?’ এরকুল পোয়ারো বললেন৷

‘ও, আমি উঠে পড়ি৷ বদ্ধ ঘরে বিছানায় বসে প্রাতরাশ খেতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আজ সকালে উঠে আপনি কি কি করেছেন, সেটা আমাদের খুলে বলবেন?’

‘হ্যাঁ, প্রথমে আমি স্নান সেরে নিই৷ তারপর প্রাতরাশ সেরে মিসেস রেডফার্নের সঙ্গে গাল কোভে যাই৷’

‘কটার সময় আপনারা রওনা হয়েছিলেন?’ ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন৷

‘মিসেস রেডফার্ন বলেছিলেন, তিনি আমার জন্যে নিচের হলঘরে সাড়ে দশটায় অপেক্ষা করবেন৷ আমার মনে হচ্ছিলো, হয়তো দেরি করে ফেলেছি—কিন্তু না, তা হয়নি৷ সাড়ে দশটার মিনিট তিনেক আগেই আমরা রওনা হই—’

পোয়ারো বললেন, ‘গাল কোভে গিয়ে আপনারা কি করলেন?’

‘আমি গিয়ে সোজা তেল মেখে সূর্যস্নানে মনোযোগ দিই, আর মিসেস রেডফার্ন আপন মনে ছবি আঁকতে থাকেন৷ তারপর, আরও পরে, আমি সমুদ্রে নামি স্নান করতে, আর ক্রিস্টিন হোটেলে ফিরে যান টেনিস খেলার জন্য পোশাক পালটে প্রস্তুত হতে৷’

ওয়েস্টন গলার স্বরকে যথাসম্ভব সহজ ও স্বাভাবিক রেখে প্রশ্ন করলেন, ‘সেই সময়টা আপনার মনে আছে৷’

‘কখন, যখন মিসেস রেডফার্ন হোটেলে ফিরে যান?—পৌনে বারোটা৷’

‘আপনার ঠিক মনে আছে—পৌনে বারোটা?’

লিন্ডা চোখ বড় করে বলে উঠলো, ‘হ্যাঁ, স্পষ্ট মনে আছে৷ আমি ঘড়ি দেখেছিলাম৷’

‘যে ঘড়িটা আপনি এখন পরে আছেন?’

লিন্ডা চোখ নামিয়ে তাকালো হাতের দিকে৷

‘হ্যাঁ—’

ওয়েস্টন বললেন, ‘ঘড়িটা একবার দেখতে পারি?’

লিন্ডা ওর মণিবন্ধ এগিয়ে ধরলো৷ তিনি নিজের হাতঘড়ি ও হোটেলের দেওয়াল ঘড়ির সঙ্গে ওর ঘড়িটা মিলিয়ে দেখলেন৷ তারপর হেসে বললেন, ‘সেকেন্ড পর্যন্ত নির্ভুল...আচ্ছা—মিসেস রেডফার্ন চলে যাওয়ার পর আপনি তাহলে স্নান করতে নামেন?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তারপর হোটেলে ফিরলেন কখন?’

‘প্রায় একটা নাগাদ৷ আর—আর ফিরে এসে শুনলাম—আর্লেনা—আর্লেনা মারা গেছে...’

ওর স্বর শেষ দিকে কেমন বদলে গেলো৷

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘আশা করি সৎমায়ের সঙ্গে মানিয়ে চলতে আপনার—ইয়ে—কোন অসুবিধা হতো না?’

কোন উত্তর না দিয়ে প্রায় মিনিটখানেক লিন্ডা কর্নেল ওয়েস্টনের দিকে তাকিয়ে রইলো৷ তারপর বললো, ‘না হতো না৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি তাঁকে পছন্দ করতেন মাদমোয়াজেল?’

‘হ্যাঁ করতাম৷’ বলল লিন্ডা৷ একটু থেমে আবার যোগ করলো, ‘আর্লেনা আমার সঙ্গে যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করতো৷’

ওয়েস্টন অস্বস্তিপূর্ণ ঈষৎ সুরে বললেন, ‘তাহলে চিরাচরিত ‘নিষ্ঠুর সৎমা’ তিনি ছিলেন না, অ্যাঁ?’

লিন্ডা নির্বিকারভাবেই মাথা নাড়লো৷

‘ভালো কথা৷ খুব ভালো কথা৷’ বললেন, ওয়েস্টন, ‘কখনও কখনও, জানেন, ঈর্ষা ইত্যাদির কারণে সংসারে নানারকম অশান্তি দেখা দেয়৷ ধরুন, মেয়ে এবং বাপের মধ্যে হয়তো মধুর সম্পর্ক রয়েছে, সুতরাং বাবা নতুন বিয়ে-করা বউকে নিয়ে মেতে উঠলে মেয়ে একটু-আধটু বিরক্ত বা ক্ষুব্ধ হলেও হতে পারে? তা সেরকম কিছু নিশ্চয়ই আপনার ক্ষেত্রে হয়নি?’

লিন্ডা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তাঁর দিকে৷ তারপর স্পষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে জবাব দিলো, ‘না হয়নি৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আমার ধারণা, আপনার বাবা ইদানীং তাঁর স্ত্রীকে নিয়েই একটু বেশি—ইয়ে—ব্যস্ত ছিলেন...’

লিন্ডা শুধু বললো, ‘আমি ঠিক জানি না,’

ওয়েস্টন বলে চললেন, ‘আপনাকে যেমন বললাম, সব রকমের অশান্তিই সংসারে আসতে পারে... মানে—ঝগড়া, কথা কাটাকাটি—এই ব্যাপার আর কি৷ স্বামী এবং স্ত্রীর সম্পর্কে যদি তিক্ততা আসে, তাহলে তাঁদের মেয়ের কাছে পরিস্থিতিটা ভীষণ অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে৷ সে ধরনের কিছু কি এ ক্ষেত্রে হয়েছিলো?’

লিন্ডা স্পষ্ট স্বরে বলল, ‘আপনি কি জানতে চাইছেন বাবা এবং আর্লেনা ঝগড়া করতো কি না?’

‘হ্যাঁ—মানে—’

ওয়েস্টন আপন মনেই ভাবলেন : কি বিশ্রী ব্যাপার—একটা বাচ্চা মেয়েকে তার বাবার সম্পর্কে এই ধরনের প্রশ্ন করা—! লোকে যে কেন পুলিশের চাকরি নেয়! কিন্তু ছাই এ প্রশ্ন না করেও তো উপায় নেই!’

লিন্ডা নিশ্চিত স্বরে জবাব দিলো, ‘না৷ বাবা কখনও কারো সঙ্গে ঝগড়া করে না৷ তার স্বভাবই ওরকম নয়৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘মিস লিন্ডা, এবার আপনাকে যে প্রশ্নটা করবো, খুব ভেবেচিন্তে উত্তর দিন৷ আপনার সৎমাকে কে খুন করতে পারে এ সম্পর্কে আপনার কি কোন ধারণা আছে? এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারে এমন কিছু কি আপনি শুনেছেন অথবা জানেন?’

প্রায় এক মিনিট লিন্ডা নীরব রইলো৷ ওকে দেখে মনে হলো, খুব শান্তভাবে মনে মনে প্রশ্নটাকে ও বিবেচনা করে দেখেছে৷ অবশেষে ও মুখ খুললো, ‘না,আর্লেনাকে কে খুন করতে চেয়েছে, জানি না’—একটু থেমে আবার যোগ করলো, ‘অবশ্য মিসেস রেডফার্ন ছাড়া৷’

ওয়েস্টন বললেন, অর্থাৎ, আপনার ধারণা মিসেস রেডফার্ন আপনার সৎমাকে খুন করতে চাইতেন? কেন?’

লিন্ডা বলল, ‘কারণ তাঁর স্বামী আর্লেনার প্রেমে পড়েছিলেন৷ অবশ্য আমি বলছি না তিনি সত্যি সত্যি ওঁকে খুন করতে চাইতেন৷ মানে—তাঁর হয়তো মনে হতো আর্লেনা মরে গেলে খুব ভালো হয়—এই চিন্তা আর সত্যি সত্যি খুন করার নিশ্চয়ই এক জিনিস নয়, তাই কি?’

পোয়ারো নম্র স্বরে বললেন, ‘না—মোটেও এক জিনিস নয়৷’

লিন্ডা মাথা ঝুঁকিয়ে সমর্থন জানালো পোয়ারোর বক্তব্যকে৷ এক অদ্ভুত বিক্ষুব্ধ আবেগ ওর মুখমণ্ডলে ছায়া ফেলে গেলো৷ ও বললো, ‘আর তাছাড়া, মিসেস রেডফার্নের পক্ষে এ ধরনের কাজ করা—মানে, কাউকে খুন করা সম্ভব নয়৷ কারণ, তিনি তেমন—ইয়ে—উগ্র প্রকৃতির নন, মানে—আমি বোধহয় ঠিক আপনাদের বোঝাতে পারছি না৷’

ওয়েস্টন এবং পোয়ারো আশ্বাসের ভঙ্গীতে মাথা নাড়লেন৷ দ্বিতীয়জন বললেন, ‘আপনাদের কথা আমি স্পষ্টই বুঝতে পারছি, মাদমোয়াজেল লিন্ডা, এবং আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত৷ তিনি সে ধরনের মহিলা নন, যাঁরা—আপনাদের প্রবাদ অনুযায়ী—অল্পেতেই ‘রক্ত দর্শন’ করেন৷ তিনি কখনোই—’ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন পোয়ারো; অতি সন্তপর্ণে শব্দ চয়ন করে বলে চললেন, ‘—মানসিক আবেগসঞ্জাত কোন ঝঞ্ঝায় বিচলিত হবেন না—যদিও তিনি দেখেন, তাঁর চোখের সামনে জীবন ক্রমশ সংকীর্ণ হয়ে আসছে—সর্বদা ভেসে বেড়াচ্ছে একটা ঘৃণ্য মায়াবী মুখমণ্ডল, সুগঠিত শুভ্র গ্রীবা—অথবা হয়তো অনুভব করেছেন নিজের আক্রোশে মুষ্টিবদ্ধ হাত—এবং নরম শরীরে মরণ-স্পর্শে আকাঙ্ক্ষায় তাদের আকুল লিপ্সা৷ উহুঁ তা সত্ত্বেও তিনি বিচলিত হবেন না—’

পোয়ারো থামলেন৷

লিন্ডা এক ঝটকায় টেবিলের কাছ থেকে সরে যেতে চাইলো৷ কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করলো, ‘আমি তাহলে এখন যাই? আপনাদের কি আর কিছু জিগ্যেস করার আছে?’

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ—নিশ্চয়ই যাবেন৷ আপনার সহযোগিতার জন্যে ধন্যবাদ, মিস লিন্ডা৷

তিনি উঠে এসে লিন্ডার জন্য দরজা খুলে ধরলেন৷ তারপর ফিরে এলেন টেবিলের কাছে৷ একটা সিগারেট ধরালেন৷’

‘ওফ—’ হাঁফ ছাড়লেন কর্নেল ওয়েস্টন, ‘বড় বিশ্রী জিনিস, আমাদের এই পুলিশের চাকরি৷ বিশ্বাস করুণ মেয়েটাকে ওর বাবা এবং সৎমায়ের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করার সময় নিজেকে ভীষণ ছোটলোক মনে হচ্ছিল৷ বলতে গেলে ওকে যেন সরাসরি অনুরোধ করা হচ্ছে ওর বাবা গলায় ফাঁসির দড়িটা পরিয়ে দেবার জন্যে! অথচ এ কাজ না করেও তো উপায় নেই৷ খুন সব সময়েই খুন৷ আর এক্ষেত্রে লিন্ডাই একমাত্র ব্যক্তি যার পক্ষে সমস্ত ঘটনার প্রকৃত চরিত্র জানা সম্ভব৷ অবশ্য সে ব্যাপারে ও আমাদের তেমন কিছু বলতে না পারায় আমি একদিক দিয়ে খুশিই হয়েছি—’

পোয়ারো বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিও সেইরকমই অনুমান করেছিলাম৷’

অস্বস্তিভরে কাশলেন ওয়েস্টন৷ বললেন, প্রসঙ্গত বলি, মঁসিয়ে পোয়ারো, শেষ দিকে আপনি ওর সঙ্গে একটু বাড়াবাড়িই করে ফেলেছেন—অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে৷ বিশেষ করে ওই আক্রোশে গলা টিপে ধরার লিপ্সার ব্যাপারটা৷ একটা অল্পবয়েসি মেয়েকে এ ধরনের কথা বলে প্রভাবিত করাটা বোধহয় ঠিক নয়৷’

এরকুল পোয়ারো চিন্তাকুল চোখে তাঁর দিকে তাকালেন৷ বললেন, ‘তাহলে আপনার ধারণা, আমার কথা ওকে প্রভাবিত করেছে?’

‘হ্যাঁ৷ কেন, আপনার কি তাই মনে হয় না? এবারে একটু ঝেড়ে কাশুন দেখি!’

পোয়ারো মাথা নাড়লেন৷

ওয়েস্টন বক্তব্য থেকে সরে গিয়ে প্রসঙ্গের পরিবর্তন করলেন৷ বললেন, ‘মোটের ওপর ওর কাছ থেকে খুব কম কথাই আমরা জানতে পেরেছি৷ শুধু রেডফার্ন মহিলাটির একটা পুরোপুরি অ্যালিবাই পাওয়া গেলো, এই যা৷ ওরা যদি সাড়ে দশটা থেকে পৌনে বারোটা পর্যন্ত একসঙ্গে থেকে থাকে, তাহলে ক্রিস্টিন রেডফার্নকে সন্দেহের আওতা থেকে সরাসরি বাদ দিতে হয়৷ অর্থাৎ সন্দেহভাজন, ঈর্ষাপরায়ণ স্ত্রীর সসম্মানে নিষ্ক্রমণ৷’

পোয়ারো বললেন, ‘মিসেস রেডফার্নকে সন্দেহভাজনের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আরও জোরালো কারণ আমাদের হাতে রয়েছে৷ আমার স্থির বিশ্বাস দৈহিক এবং মানসিক দিক থেকে কাউকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা তাঁর পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব৷ তিনি শান্ত প্রকৃতির মহিলা, সহজে ধৈর্য হারান না৷ তাঁর কাছ থেকে গভীর অনুরাগ এবং অবিচল দৃঢ়তা আশা করা যায়, কিন্তু উষ্ণ রক্তপ্রসূত যে আবেগ এবং ক্রোধ, তা সম্পূর্ণ তাঁর চরিত্রের বিপরীত৷ উপরন্তু, তাঁর হাতের গড়ন অস্বাভাবিকরকম হালকা এবং ছোট৷’

কলগেট বললেন, ‘মঁসিয়ে পোয়ারোর সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত৷ মিসেস রেডফার্নকে আমরা স্বচ্ছন্দে বাদ দিতে পারি৷ কারণ ডাঃ নীসডন বলেছেন, যে দুটো হাতের চাপে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মিসেস মার্শাল মারা গেছেন, তাদের গড়ন মোটেই হালকা এবং ছোট নয়৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে রেডফার্নদের ডাকা যাক৷ আশা করি মিঃ রেডফার্ন এতক্ষণে অনেকটা সামলে উঠেছেন৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন ইতিমধ্যে পুরোপুরি সামলে উঠেছে৷ তার কোটরগত চোখ, পাণ্ডুর মুখমণ্ডলে তারুণ্যের ভাব সহসা প্রকট হয়ে উঠলেও ব্যবহারে সে এখন স্থৈর্য ফিরে পেয়েছে৷

‘আপনিই মিঃ প্যাট্রিক রেডফার্ন, ঠিকানা ক্রসগেটস, সেলডন প্রিন্সেস রিজবোরো?’

‘হ্যাঁ—’

‘মিসেস মার্শালের সঙ্গে আপনার পরিচয় কতদিনের?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন প্রথমে একটু ইতস্তত করলো, তারপর জবাব দিলো, তিন মাসের—’

ওয়েস্টন বলে চললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল আমাদের বলেছেন, একটা ককটেল পার্টিতেই নাকি মিসেস মার্শালের সঙ্গে আপনার প্রথম আলাপ হয়। কথাটা কি ঠিক?’

‘হ্যাঁ—প্রথম পরিচয় আমাদের ওইভাবেই।’

ওয়েস্টন বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল কথা প্রসঙ্গে এরকম ইঙ্গিতই দিয়েছেন যে এখানে আসার আগে আপনার দুজনের ঘনিষ্ঠতা তেমন গভীর হয়নি—আশা করি কথাটা সত্যি, মিঃ রেডফার্ণ?’

আবারও প্রায় মিনিট খানেক ইতস্তত করলো প্যাট্রিক রেডফার্ন। তারপর বললো, ‘হ্যাঁ—পুরোপুরি না হলেও আংশিক। কারণ, সত্যি কথা বলতে কি, আর্লেনার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ আমার প্রায়ই হতো।’

‘ক্যাপ্টেন মার্শালের অজান্তেই?’

রেডফার্নের মুখে রক্তিম আভাস পলকের জন্যে ঢেউ খেলে গেল। সে বললো, ‘তিনি জানতেন কি জানতেন না তা আমি বলতে পারছি না।’

এবার পোয়ারো কথা বললেন। তিনি মৃদু কন্ঠে জানতে চাইলেন, ‘আশা করি আপনার স্ত্রীও এ সম্পর্কে কিছু জানতেন না—?’

‘যদ্দূর মনে পড়ছে, আমি ওকে কথায় কথায় একদিন বলেছিলাম, বিখ্যাত আর্লেনা স্টুয়ার্টের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে।’

পোয়ারো সহজে সন্তুষ্ট হলেন না।

‘কিন্তু আপনাদের ঘন ঘন মেলামেশার কথা নিশ্চয়ই তিনি জানতেন না?’

‘কি জানি, হয়তো জানতো না।’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আপনাদের এই দ্বীপে দেখা হওয়ার ব্যাপারটা কি আগে থাকতেই সাজানো ছিলো?’

রেডফার্ন মিনিটকয়েক নীরব রইলো। তারপর কাঁধ ঝাঁকালো।

‘দেখুন—’বললো সে, ‘আমার মনে হয়, আজ নয় কাল ব্যাপারটা জানাজানি হবেই। সুতরাং আপনাদের সঙ্গে ছলনা করে লাভ নেই। আর্লেনার জন্যে আমার বিচারবুদ্ধি, হিতাহিতজ্ঞান, সবই যেন লোপ পেয়েছিলো—আমাকে পাগল বলুন, মোহাচ্ছন্ন বলুন, আমার কোন আপত্তি নেই। ও চেয়েছিলো আমিও এই দ্বীপে বেড়াতে আসি, প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও শেষে আমি রাজি হই। আমি—আমি—ওর অনুরোধে যে কোন কাজ করতেই প্রস্তুত ছিলাম; পুরুষদের ওপর ওর প্রভাব ছিলো এতই মারাত্মক।’

এরকুল পোয়ারো অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘আপনি তাঁর চরিত্রের খুব স্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন, মঁসিয়ে রেডফার্ন। তিনি ছিলেন পুরুষের কাছে চিরন্তন আকর্ষণের বস্তু-রুপোলি জলকন্যার মতো। এসম্পর্কে আমার কোন দ্বিমত নেই।’

প্যাট্রিক রেডফার্ণ তিক্তস্বরে বললো, ‘পুরুষদের মধ্যে বিশেষ প্রবৃত্তি জাগিয়ে তুলতে ওর জুড়ি ছিলো না।’ তারপর অপেক্ষাকৃত সংযত স্বরে বলে চললো, ‘আপনাদের সঙ্গে আমি কিন্তু খোলাখুলি আলোচনা করছি—আর কোন কিছু আমি লুকোতেও চাই না। তাতে লাভই বা কি? হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আর্লনা আমাকে যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। ও আমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসতো কি না—তা জানি না। তবে ভালোবাসার ভানটুকু অন্তত করতো। ও সেই ধরনের মেয়ে, যারা কোন পুরুষের দেহ-মন জয় করার পর তার সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে। ও জানতো, আমি ওর প্রভাবে সম্পূর্ণ অন্ধ। আজ সকালে, পিক্সি কোভের সৈকতে, আমি যখন ওর মৃতদেহ আবিষ্কার করি তখন মনে হয়েছিলো যেন—’ সে থামলো, ‘—যেন আমার মাথায় সারা আকাশ ভেঙে পড়েছে। আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি—হয়ে গেছি স্তম্ভিত।’

পোয়ারো সামনে ঝুঁকে এলেন, ‘আর এখন?’

প্যাট্রিক রেডফার্ণ স্থির চোখে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো।—বললো, ‘যা সত্যি, সবই আপনাদের বললাম। এখন আমি জানতে জানতে চাই—এর কতটুকু আপনারা প্রকাশ্যে আনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন? কারণ আর্লেনার মৃত্যুর সঙ্গে এ সবের তো আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ কোন যোগাযোগ নেই! আর এ ব্যাপারে যদি প্রকাশ্যে আলোচিত হয়, তাহলে আমার স্ত্রী ভীষন কষ্ট পাবে।

‘ওহ্ হ্যাঁ—আমি জানি,’ তাড়াতাড়ি বলে উঠলো প্যাট্রিক, ‘আপনারা ভাবছেন, এতদিন স্ত্রীর খেয়াল আমার কোথায় ছিলো! হয়তো এ অভিযোগ একেবারে মিথ্যে নয়। কিন্তু আসলে আমার স্ত্রীকে আমি খুব ভালোবাসি—যদিও এ কথা শুনে আপনারা আমাকে নিকৃষ্ট চরিত্রের ভন্ড বলেই ভাববেন, কিন্তু তবুও, বিশ্বাস করুন, ওকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। আর অন্য ব্যাপারটা—’ কাঁধ ঝাঁকালো রেডফার্ন, ‘ওটা নিছকই একটা পাগলামো-পুরুষেরা মাঝে মাঝে মোহাচ্ছন্ন অবস্থায় নির্বোধের মতো যে সব ভুল করে বসে, সেইরকম একটা ভুল! তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু ক্রিস্টিন আমার কাছে সম্পূর্ণ আলাদা। ওই আমার কাছে একমাত্র সত্যি। ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলেও, মনে মনে আমি জানি, ওই একমাত্র মানুষ যার গুরুত্ব আমার কাছে সবচেয়ে বেশি। ‘রেডফার্ণ থামলো-দীর্ঘশ্বাস ফেলশো-এবং অপেক্ষাকৃত করুণ কন্ঠে বললো, ‘এ কথাগুলো যদি আপনাদের বিশ্বাস করাতে পারতাম!’

এরকুল পোয়ারো সামনে ঝুঁকে পড়লেন, বললেন, ‘কিন্তু আমি বিশ্বাস করি। সত্যিই বিশ্বাস করি!’

প্যাট্রিক রেডফার্ন কৃতজ্ঞদৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকালো৷ বললো, ‘ধন্যবাদ৷’

কর্নেল ওয়েস্টন সশব্দে গলা খাঁকারি দিলেন৷ বললেন, ‘একটু আপনাকে কথা দিতে পারি, মিঃ রেডফার্ন যে অবান্তর প্রসঙ্গে আমরাও কখনও যাবো না৷ এই খুনের সঙ্গে মিসেস মার্শালের প্রতি আপনার ইয়ের ব্যাপারটার যদি কোন সম্পর্ক না থেকে থাকে, তাহলে সেটাকে প্রকাশ্যে টেনে আনার কোন প্রয়োজন আমি দেখি না৷ কিন্তু যে জিনিসটা আপনি ঠিক উপলব্ধি করতে পারছেন না, সেটা হলো ইয়ে মানে, আপনাদের এ অন্তরঙ্গতার সঙ্গে খুনের কোন গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষ যোগাযোগ থাকলেও থাকতে পারে৷ হয়তো এই দৃষ্টিকোণ থেকেই, বুঝতেই পারছেন, খুনের উদ্দেশ্যটাকে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন বললো, ‘খুনের উদ্দেশ্য?’

ওয়েস্টন বললেন, হ্যাঁ, মিঃ রেডফার্ন, খুনের উদ্দেশ্য! ক্যাপ্টেন মার্শাল সম্ভবত আপনাদের এ ব্যাপারটার কথা জানতেন না৷ এখন মনে করুন, হঠাৎই যদি তিনি জানতে পেরে থাকেন?’

রেডফার্ন বললো, ‘ওঃ ভগবান! আপনি বলতে চান, তিনি তখন সব দেখে শুনে তাঁর স্ত্রীকে—স্ত্রীকে খুন করেন?’

পুলিশ-প্রধান অপেক্ষাকৃত শুষ্ক স্বরে বললেন, ‘কেন, কথাটা আপনার কখনও মনে হয়নি?’

রেডফার্ন মাথা নাড়লো৷ বলল, ‘না—আশ্চর্য! কথাটা আমি কিন্তু একবারও ভাবিনি৷ আপনি তো জানেন মার্শাল কিরকম শান্ত স্বভাবের লোক! আমি—মানে—এটাকে ঠিক সম্ভব বলে ভাবতে পারছি না৷’

ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, তাঁর স্বামীর প্রতি মিসেস মার্শালের আচরণ কিরকম ছিলো? ব্যাপারটা তাঁর স্বামীর কানে যেতে পারে, এই ভেবে তিনি কি কখনও—মানে, অস্বস্তি—অনুভব করতেন? নাকি এ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন?’

রেডফার্ন ধীর স্বরে জবাব দিলো, ও একটু—একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলো৷ ও চাইতো না, ওর স্বামী এ নিয়ে কোনরকম সন্দেহ করুক৷’

‘আচ্ছা, তাঁকে দেখে কি কখনও মনে হয়েছে যে স্বামীকে ভয় করেন?’

‘ভয়? উহুঁ—আমার অন্তত তা মনে হয়নি৷’

পোয়ারো মৃদু অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘মাপ করবেন, মঁসিয়ে রেডফার্ন, এ প্রসঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদের কথা কখনও ওঠেনি?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন দৃঢ় নিশ্চয়তায় মাথা নাড়লো৷

‘ওহ না, এ ধরনের কথা কখনও ওঠেনি৷ প্রথম ক্রিস্টিন তো ছিলই; আর তাছাড়া,আর্লেনা কখনও সে কথা ভাবেনি—আমি জানি৷ মার্শালকে বিয়ে করে ও পুরোপুরি সন্তষ্ট ছিল৷ মার্শাল বলতে গেলে—একজন রইল আদমী—হঠাৎই হাসলো রেডফার্ন, জমিদার, ওই সব ব্যাপার আর কি, তাছাড়া পয়সাকড়িও আছে৷ ও কখনও সম্ভাব্য স্বামী হিসেবে, আমার কথা ভাবেনি৷ ওর অনুগামী হতভাগ্য, অপদার্থ, মোহাবিষ্ট পুরুষদের তালিকায় আমি ছিলাম সর্বশেষ সংযোজন নিছকই সময় কাটানোর কোন জিনিস৷ আমি প্রথম থেকেই সব জানতাম, বুঝতাম কিন্তু আশ্চর্য, তাতেও ওর প্রতি আমার আকর্ষণ কখনও কমেনি...’

তার স্বর শেষ দিকে নিচু পর্দায় নেমে মিলিয়ে গেলো৷ বসে বসেই কি যেন ভাবতে লাগলো সে৷

ওয়েস্টন তাকে সচকিত করে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনলেন৷

‘আচ্ছা, মিঃ রেডফার্ন, আজ সকালে কি মিসেস মার্শালের সঙ্গে আপনার দেখা করবার কথা ছিলো?’

প্যাট্রিক রেডফার্নকে দেখে কিছুটা যেন বিহ্বল মনে হলো৷

সে বললো, ‘না, সেরকম কোন কথা ছিলো না৷ সাধারণত, সকাল বেলা আমাদের সৈকতেই দেখা হতো৷ ভেলায় চড়ে আমরা সমুদ্রে এদিক-ওদিকে ভেসে বেড়াতাম৷’

‘তাহলে, আজ সকালে তাঁকে বেলাভূমিতে না দেখে আপনি কি অবাক হয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ, হয়ে ছিলাম—ভীষণ অবাক হয়েছিলাম৷ ওর এই না আসার কোন কারণই ভেবে পাচ্ছিলাম না৷’

‘তখন আপনার কি মনে হলো?’

‘কি আর মনে হবে! সারাক্ষণই ভাবছিলাম, এই হয়তো ও এসে পড়বে!’

‘যদি তিনি অন্য কারো সঙ্গে কোথাও দেখা করবার ব্যবস্থা করে থাকেন, তাহলে সে একজন কে আপনি জানতেন না?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন হতভম্ব দৃ্ষ্টিতে চেয়ে রইলো৷ আস্তে আস্তে মাথা নাড়লো৷

‘মিসেস মার্শালের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ আপনি কোথায় করতেন?’

‘কখনও কখনও বিকেলের দিকে গাল কোভে ওর সঙ্গে দেখা হতো৷ আপনি তো জানেন, বিকেলবেলা গাল কোভে সূর্যের আলো থাকে না, সুতরাং বেড়াবার লোকের ভিড় ও তখনও কম হয়৷ ওখানে আমরা বার কয়েক দেখা করেছি৷’

‘অন্য কোভটায় কখনও যাননি? পিক্সি কোভে?’

‘না৷ কারণ পিক্সি কোভটা দ্বীপের পশ্চিমদিকে হওয়ার ফলে পড়ন্ত সূর্যের আলো সেখানে অনেকক্ষণ থাকে৷ নৌকো, ভেলা ইত্যাদি নিয়ে অনেকেই ওখানে বেড়াতে যান৷ সুতরাং নির্জনতা সেখানেই নেই৷ আর, সকালেই দেখা করার চেষ্টা আমরা কখনও করিনি৷ তাতে আমাদের অনুপস্থিতিটা সহজেই সকলের নজরে পড়তো৷ বিকেলে প্রত্যেকে নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে, হয় ঘুমোয়, নয় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ায়, অন্য কারও খবর কেউ রাখে না৷’

ওয়েস্টন নিঃশব্দে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷

প্যাট্রিক রেডফার্ন বলে চললো, ‘কোন কোন সুন্দর রাতে, নৈশভোজের পর, আমরা দুজনে দ্বীপের অনেক অজানা অংশে পায়চারি করে বেড়িয়েছি—’

এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ—জানি!’ এবং প্যাট্রিক রেডফার্ন চকিত অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে তাকালো তাঁর দিকে৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে আজ সকালে মিসেস মার্শালের পিক্সি কোভে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে আপনি কোনরকম আলোকপাত করতে পারছেন না?’

রেডফার্ন মাথা নাড়লো৷ তার কণ্ঠে প্রকৃত বিহ্বল সুর ফুটে উঠলো, ‘বিশ্বাস করুন, এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না৷ তবে এটুকু বলতে পারি, ব্যাপারটা আর্লেনার স্বভাবের সঙ্গে যেন ঠিক খাপ খাচ্ছে না৷’

ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন, ‘এ অ্ঞ্চলের কাছাকাছি তাঁর কোন বন্ধুবান্ধব ছিলো?’

‘আমি চিনি এমন কেউ নেই; উহুঁ—আমার বিশ্বাস, সেরকম কেউ বোধহয় ছিলো না৷’

‘মিঃ রেডফার্ন, এবারে খুব ভেবেচিন্তে এই প্রশ্নটার উত্তর দিন৷ মিসেস মার্শালকে আপনি লন্ডনে থাকতেই চিনতেন৷ সুতরাং তাঁর বন্ধু-বৃত্তের অনেকের সঙ্গেই হয়তো আপনার পরিচয় রয়েছে৷ তাঁদের মধ্যে এমন কাউকে কি জানেন, যাঁর মনে মিসেস মার্শালের প্রতি একটা বিদ্বেষ মনোভাব ছিলো? হয়তো এমন কেউ, যাঁকে স্থানচ্যুত করে আপনি মিসেস মার্শালের মনে জায়গা করে নিয়েছেন?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন মিনিটকয়েক ভাবলো৷ তারপর মাথা নাড়লো৷

‘না’, সে বললো, সেরকম কাউকে মনে পড়ছে না৷’

কর্নেল ওয়েস্টন টেবিলে টোকা মেরে সৃষ্টি করলেন দ্রুত ছন্দের৷ অবশেষে চঞ্চল হাত থামিয়ে বলে উঠলেন, ‘সুতরাং, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে মাত্র তিনটে সম্ভাবনাই আমাদের হাতে রয়েছে৷ প্রথমটা কোন অজ্ঞাতপরিচয় খুনীর—জনৈক বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তি, যে ঘটনাচক্রে স্থানীয় অঞ্চলে উপস্থিত ছিলো, আর ‘‘স্থানীয় অঞ্চল’’ বলতে নেহাৎ ছোট জায়গা নয়।’

তাঁকে বাধা দিয়ে রেডফার্ন বলে উঠলো, ‘এবং আমার বিশ্বাস, এই সম্ভাবনাটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক৷’

ওয়েস্টন মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘উহুঁ, এই খুনটা ঠিক ‘পড়ে পাওয়া শিকার’ ধরনের নয়৷ বিশেষ করে, পিক্সি কোভ জায়গাটা যখন রীতিমতো দুর্গম৷ হয়তো সেই লোকটিকে কংক্রিটের-সেতু পার হয়ে, হোটেলের পাশ দিয়ে এসে, গোটা দ্বীপটা অতিক্রম করে, মই বেয়ে পিক্সি কোভে নামতে হয়েছে—নয়তো সে এসেছে সমুদ্রের দিক দিয়ে—নৌকো বেয়ে৷ এবং এই দুটোর যে কোনটাই কোন আকস্মিক খুনের পক্ষে অস্বাভাবিক৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন বললে, ‘আপনি বলছিলেন, তিনটে সম্ভাবনা রয়েছে—’

‘উম্—হুঁ,’ পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘কারণ, প্রথম সম্ভাবনা ছাড়া এই দ্বীপের মাত্র দুজন ব্যক্তি রয়েছেন, মিসেস মার্শালকে খুনের পেছনে যাঁদের জোরালো উদ্দেশ্য রয়েছে৷ প্রথমজন তাঁর স্বামী—এবং দ্বিতীয়জন আপনার স্ত্রী৷’

রেডফার্ন বিস্মিত অপলক চোখে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷ দেখে মনে হলো, সে যেন এ কথায় সম্পূর্ণ হতবুদ্ধি হয়ে গেছে৷ সে বললো, ‘আমার স্ত্রী? ক্রিস্টিন?! আপনি বলতে চান এ খুনের পেছনে ক্রিস্টিনের হাত রয়েছে৷’

সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো৷ স’ব কথা একই সঙ্গে উচ্চারণের চেষ্টায় তার জিব জড়িয়ে এলো৷ উত্তেজিত অসংলগ্ন স্বরে সে বলে উঠলো৷ ‘আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে—তাই এ রকম ভুল বকছেন! শেষ পর্যন্ত ক্রিস্টিন? যা একেবারে অসম্ভব, অবিশ্বাস্য—এমন কি রীতিমতো হাস্যকর!’

ওয়েস্টন বললেন, ‘কিন্তু তবুও মিঃ রেডফার্ন, ঈর্ষা বড় সাংঘাতিক জিনিস৷ ঈর্ষার অন্ধ মহিলারা সময়ে সময়ে নিজেদের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন৷’

রেডফার্ন একান্ত-আন্তরিক সুরে বলে উঠলো, ‘কিন্তু ক্রিস্টিনের কথা আলাদা৷ ও—ও মোটেই সে ধরনের মেয়ে নয়৷ হয়তো ও অসুখী—মানছি৷ কিন্তু তাই বলে কাউকে—ওঃ ওর মধ্যে এতটুকু উগ্রভাব নেই৷’

এরকুল পোয়ারো চিন্তিতভাবে মাথা নাড়লেন৷ উগ্রপ্রকৃতি৷ ঠিক এই একই শব্দ ব্যবহার করেছেন লিন্ডা মার্শাল৷ এবং তখনকার মতো, এখনও তিনি এই ধারণাকে মনে মনে সমর্থন জানালেন৷

‘আর তাছাড়া’ আস্থার সুরে বলে চললো রেডফার্ন, ‘এ সন্দেহ নিতান্তই অযৌক্তিক৷ কারণ আর্লেনা ক্রিস্টিনের চেয়ে অন্তত দ্বিগুণ শক্তিশালী ছিলো৷ ক্রিস্টিন একটা বিড়ালছানাকে গলা টিপে মারতে পারবে কিনা সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে—আর্লেনার মতো শক্তসমর্থ একজনকে খুন করা তো দূরের কথা! তার ওপর পাহাড়ের গায়ের ঝোলানো ওই মইটা বেয়ে ওর পক্ষে সমুদ্রতীরে নামা কখনও সম্ভব ছিলো না৷ জানেন তো, ক্রিস্টিন উঁচু জায়গা একদম সইতে পরে না৷ তাছাড়া—ওঃ, আপনারা কেন বুঝতে পারছেন না৷ পুরো ব্যাপারটাই একটা অবাস্তব, উদ্ভট কল্পনা!’

কর্নেল ওয়েস্টন অপ্রয়োজনেই বারকয়েক কান চুলকোলেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ—মানে, সেভাবে দেখতে গেলে সম্ভাবনাটা অবাস্তব বলেই মনে হয় বটে—সে কথা আমি অস্বীকার করছি না৷ কিন্তু সর্বপ্রথম আমাদের বিচার করতে হবে খুনের উদ্দেশ্যে।’ একটু থেমে তিনি আরও যোগ করলেন, ‘উদ্দেশ্য এবং সুযোগ৷’

রেডফার্ন ঘর ছেড়ে নিষ্ক্রান্ত হতেই পুলিশ-প্রধান মৃদু-হাসি-সহকারে মন্তব্য করলেন, তাঁর স্ত্রীর যে একটা নিশ্ছিদ্র অ্যালিবাই রয়েছে, সেটা মিঃ রেডফার্নকে জানাবার প্রয়োজন মনে করলাম না৷ এ সম্পর্কে কি বলেন সেটাই আমার শোনবার ইচ্ছে ছিলো৷ দেখলাম, ব্যাপারটা তাঁকে বেশ জোরালো ঝাঁকুনি দিয়েছেন, তাই না?’

এরকুল পোয়ারো মৃদুস্বরে বললেন, মঁসিয়ে রেডফার্ন যে সব যুক্তিতর্ক আমাদের সামনে রেখেছেন, তাদের গুরুত্ব অ্যালিবাইয়ের চেয়ে কোন অংশে কম নয়৷’

‘হ্যাঁ, সে কথা মানছি—ক্রিস্টিন এ কাজ করেননি, তাঁর পক্ষে করা সম্ভবও ছিলো না! আর আপনার কথা অনুযায়ী, দৈহিক শক্তির দিক থেকে তো একেবারেই অসম্ভব! বরং মার্শালকে আমরা সন্দেহ করতে পারি—কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে তিনিও নির্দোষ৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট কাশলেন, বললেন, ‘একটা কথা, স্যর—ওই অ্যালিবাইটা নিয়ে আমি তখন থেকে ভাবছি৷ আমার মনে হয়, তিনি যদি স্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা আগেই করে থাকেন, তাহলে চিঠিগুলো আগে থাকতে টাইপ করে রাখাটা তাঁর পক্ষে কিছু অসম্ভব নয়৷’

ওয়েস্টন বললেন, কথা মন্দ বলোনি, কলগেট৷ ব্যাপারটা আমাদের খোঁজ করে—’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন ঘরে ঢুকতেই মাঝপথে থমকে গেলেন তিনি৷

ক্রিস্টিনের আচরণ, বরাবরের মতোই, শান্ত এবং যথাযথ৷ ওর পরনে দুধ-সাদা টেনিস-ফ্রক এবং হালকা-নীল সোয়েটার৷ এই পোশাক ওর শুভ্র বিবর্ণ সৌন্দর্যকে যেন আরও গভীরভাবে প্রকাশ করেছে৷ তবুও আপন মনেই ভাবলেন এরকুল পোয়ারো, ক্রিস্টিনের মুখমণ্ডলে নিবুদ্ধিতা বা দুর্বলতার লেশমাত্র ছায়াও নেই৷ বরং সেখানে স্বপ্রাচুর্যে উপস্থিত বিশ্লেষণ-ক্ষমতা, সাহস এবং শুভ বাস্তববুদ্ধি৷ সপ্রশংসভাবে মাথা দোলালেন পোয়ারো৷

কর্নেল ওয়েস্টন ভাবলেন, ‘চমৎকার মহিলা৷ যদিও একটু কৃশ এবং দুর্বল প্রকৃতির৷ তবে ওর ছেনাল কচি গর্দভ স্বামীটির তুলনায় অনেক-অনেক ভালো৷ অবশ্য হ্যাঁ, ছেলেটার বয়স এখনও অল্প৷ আর মেয়েরার পুরুষদের সাধারণত একবারই বোকা বানায়৷’

তিতি বললেন, ‘বসুন, মিসেস রেডফার্ন৷ কিছু রুটিনমাফিক কাজ যে আমাদের সারতে হয়, তা তো জানেন৷ যেমন, প্রত্যেককে তাঁদের সকাল বেলার গতিবিধি সম্পর্কে বিশদভাবে প্রশ্ন করা হচ্ছে৷ অবশ্য সেটা নিছকই পুলিশি নথিভুক্ত করবার জন্যে৷’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন মাথা নেড়ে সম্মত্তি জানালো৷

ও স্বভাবসিদ্ধ শান্ত সংযত স্বরে বলল, ‘হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়ই—৷ বলুন, কোত্থেকে আমাকে শুরু করতে হবে?’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘যত শুরু থেকে পারেন, মাদাম৷ প্রথম বলুন, আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে আপনি কি করেছেন৷’

ক্রিস্টিনের ফর্সা কপালে ভাঁজ পড়লো৷ ও বললো, ‘দাঁড়ান, একটু ভাবতে দিন৷ আজ সকালে প্রাতরাশ সারতে যাওয়ার পথে আমি লিন্ডা মার্শালের ঘরে গিয়েছিলাম৷ ওর সঙ্গে গাল কোভে যাওয়ার কথা ঠিক করতে৷ সাড়ে দশটায় নিচের হলঘরে আমরা দেখা করবো বলে কথা হয়৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘প্রাতরাশের আগে আপনি স্নান করেননি, মাদাম?’

‘না অত সকালে খুব কম সময়েই আমি স্নান করি৷’ হাসলো ও, ‘রোদের তাপে সমুদ্র বেশ গরম না হওয়া পর্যন্ত আমি জলে নামি না৷ মানে—আমি একটু শীতকাতুরে৷’

‘কিন্তু আপনার স্বামী তো প্রাতরাশের আগেই স্নান করেন—?’

‘ওহ—হ্যাঁ৷ বলতে গেলে রোজই৷’

‘আর মিসেস মার্শাল, তিনিও?’

ক্রিস্টিনের কণ্ঠস্বরে ঈষৎ পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো৷ ওর স্বরে হয়ে উঠল শীতল ও ঝাঁঝালো৷ ও বললো, ‘না, মিসেস মার্শাল ছিলেন সেই ধরনের মানুষ যাঁরা মাঝবেলা না পেরোলে দর্শন দেন না৷’

ঈষৎ বিভ্রান্তির সুরে এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘প্রাসঙ্গিক আলোচনার বাধা দেওয়ার জন্য দুঃখিত, মাদাম৷ আপনি বলছিলেন, প্রথমে আপনি মিস লিন্ডা মার্শালের ঘরে যান৷ আচ্ছা, তখন ক’টা বাজে?’

‘দাঁড়ান, ভেবে দেখি...সাড়ে আটটা—না, তার চেয়ে কিছু বেশিই হবে।’

‘মিস মার্শাল কি তখন ঘুম থেকে উঠেছেন?’

‘হ্যাঁ। ও কোথায় যেন বেরিয়েছিলো।’

‘বেরিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ; ফিরে এসে ও বললো, ও নাকি স্নান করতে গিয়েছিলো।’

ক্রিস্টিনের কণ্ঠস্বরে একটা ক্ষীণ অত্যন্ত ক্ষীণ—অস্বস্তির সুর ফুটে উঠলো এরকুল পোয়ারোর মুখে বিহ্বলভাব ফুটে উঠলো৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘তারপর?’

‘আর প্রাতরাশের পর?’

‘প্রাতরাশের পর ছবি আঁকার সাজ-সরঞ্জাম আনতে ওপরে যাই, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমরা হোটেল ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ি৷’

‘মানে আপনি এবং মিস লিন্ডা?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তখন ক’টা বাজে?’

‘আমার মনে হয়, তখন প্রায় সাড়ে দশটা হবে৷’

‘তারপর কি করলেন?’

‘আমরা গাল কোভে যাই৷ দ্বীপের পূর্বদিকে, সমুদ্রের কোল ঘেঁষে যে জায়গাটা আছে৷ সেখানে গিয়ে আয়েস করে বসি. আমি ছবি আঁকাতে থাকি, আর লিন্ডা সূর্যস্নানে ব্যস্ত হয়ে পড়ে৷’

গাল কোভ ছেড়ে আপনারা ফিরলেন কখন?’

‘পৌনে বারোটা নাগাদ৷ কারণ বারোটায় আমার টেনিস খেলার কথা ছিলো, এবং স্বাভাবিকভাবেই পোশাক পালটানোর ঝঞ্ঝাটও ছিলো৷’

‘আপনার সঙ্গে ঘড়ি ছিলো?’

‘না, সত্যি কথা বলতে কি ছিলো না৷ আমি লিন্ডাকেও সময় জিগ্যেস করেছিলাম৷’

‘ও—৷ তারপর?’

ছবি আাঁকার সাজ-সরঞ্জাম গুছিয়ে আমি হোটেলে ফিরে আসি৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আর মাদামোয়াজেল লিন্ডা?’

‘লিন্ডা; ও লিন্ডা সমুদ্রে স্নান করতে নামে৷’

পোয়ারো আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কি সমুদ্র থেকে অনেকটা দূরে বসেছিলেন?’

‘হ্যাঁ—জোয়ার-রেখার অনেকটা ওপরে আমরা বসেছিলাম৷ আমি ছিলাম ঝুলন্ত পাহাড়ের ঠিক নিচে, ছায়াতে—আর লিন্ডা একটু দূরে, রোদে শুয়ে ছিলো৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনি সৈকত ছেড়ে আসার আগেই কি লিন্ডা মার্শাল জলে নেমেছিলেন?’

স্মৃতির মণিকোঠা অনুসন্ধানে ক্রিস্টিনের ভুরু কুঞ্চিত হলো৷ ও বললো, ‘দাঁড়ান৷ একটু ভেবে দেখি৷ ও সমুদ্রতীর ধরে জলের কিনারায় ছুটে গেলো—আমি বাক্স বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালাম—হ্যাঁ, ফিরে আসার পথে আমি ওর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ার শব্দ শুনেছিলাম৷’

‘এ নিয়ে আপনার মনে কোন সন্দেহ নেই, তো মাদাম? যে সত্যিই মাদমোয়াজেল লিন্ডা জলে নেমেছিলেন?’

‘হ-হ্যাঁ৷’

ক্রিস্টিন বিস্ময়ে অপলকে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷

কর্নেল ওয়েস্টনও বিহ্বল বিমূঢ় বিমূঢ় চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে৷ অবশেষে তিনি বললেন, ‘বলে যান, মিসেস রেডফার্ন—তারপর?’

‘আমি হোটেলে ফিরে খেলার পোশাক পরে টেনিস কোর্টে উপস্থিত হই৷ সেখানেই অন্যান্যদের সঙ্গে আমার দেখা হয়!’

‘অন্যান্যরা বলতে?’

‘ক্যাপ্টেন মার্শাল, মিঃ গাডেনার এবং মিস ডার্নলি৷ আমরা দু’সেট শেষ করে সবে তৃতীয সেট শুরু করেছি, এমন সময় খবরটা এলো—মানে, মিসেস মার্শালের মৃত্যু সংবাদটা৷’

এরকুল পোয়ারো সামনে ঝুঁকে পড়লেন, বললেন, ‘খবরটা শুনে আপনার কি মনে হলো মাদাম৷’

‘কি মনে হলো?’ ওর মুখমণ্ডলে প্রশ্নটার প্রতি একটা ক্ষীণ বিতৃষ্ণার ভাব ছায়া ফেললো৷’

‘হ্যাঁ—’

‘ক্রিস্টিন রেডফার্ন ধীর স্বরে জববা দিলো, ‘খবরটা শুনে—ঘটনাটা একটা জঘন্য বীভৎস ব্যাপারে বলে মনে হয়েছিলো৷’

‘আপনার রুচিশীল মন একটা মানসিক বিদ্রোহ করে উঠেছিলো, সেটা আমি বুঝতে পারছি৷ কিন্তু ঘটনাটা শুনে আপনার কি মনে হয়েছে—ব্যক্তিগতভাবে?’

ক্রিস্টিন চকিত নয়নে তাঁর দিকে তাকালো—ওর দৃষ্টিতে সনির্বন্ধ অনুরোধের ইশারা৷ পোয়ারো এই নীরব ইশারায় সাড়া দিলেন৷ সহজ সরল স্বরে তিনি বলে উঠলেন, ‘মাদাম, জনৈকা বুদ্ধিমতী, সুপ্রচুর শুভ বাস্তব বু্দ্ধি এবং বিচারশক্তি-সম্পন্না মহিলা হিসেবেই আপনাকে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি অনুরোধ করছি৷ মিসেস মার্শাল, অথবা তিনি কি ধরনের মহিলা সে সম্পর্কে আপনার নিজস্ব একটা ধারণা নিশ্চয়ই একদিনে গড়ে উঠেছে?’

ক্রিস্টিন সতর্ক সুরে বলল, ‘আমার মনে হয়, হোটেলে থাকাকালীন অন্যান্য অতিথিদের সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা প্রত্যেকের মনেই গড়ে ওঠে৷’

‘নিশ্চয়ই আর সেটাই চরম স্বাভাবিক৷ সুতরাং আমি জানতে চাই মাদাম, মিসেস মার্শালের এই আকস্মিক মৃত্যু-সংবাদে আপনি কি খুব অবাক হয়েছিলেন?’

ক্রিস্টিন ধীরে ধীরে বললো, ‘আপনি কি বলতে চান, সেটা সম্ভবত আমি বুঝতে পেরেছি৷ না, অবাক হয়তো হইনি৷ বরং একটা আকস্মিক আঘাত পেয়েছিলাম৷ কিন্তু উনি ছিলেন সেই ধরনের মহিলা—’

পোয়ারো ওর কথা শেষ করলেন, ‘মিসেস মার্শাল ছিলেন সেই ধরনের মহিলা যাঁদের জীবনে এই পরিণতিই স্বাভাবিক...হ্যাঁ, মাদাম, আজ সারা সকালে এ ঘরে উচ্চারিত সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ এবং চরম সত্য বক্তব্য এইটাই৷ সমস্ত—ইয়ে, ব্যক্তিগত এই শব্দটায় সযত্নে জোর দিলেন তিনি৷ আবেগপ্রবণতাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে বলুন তো, মাদাম, মৃতা মিসেস মার্শাল সম্পর্কে আপনি সত্যি সত্যি কি ভাবেন?’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন শান্ত কণ্ঠে বললো, ‘এ সব অবান্তর প্রসঙ্গে যাওয়ার সত্যিই কি কোন প্রযোজন আছে?’

‘আমার মনে হয়, হ্যাঁ, আছে৷’

‘কিন্তু আমি কি বা বলবো?’ ক্রিস্টিনের শুভ্র ত্বকে হঠাৎই ছড়িয়ে পড়লো রক্তিম আভা৷ ওর আচরণের সর্তক ভারসাম্য শিথিল হয়ে এলো৷ এবং ক্ষণিকের জন্য উঁকি দিলো ওর আভ্যন্তরীণ স্বাভাবিক চিরন্তন এক নারী৷ ‘উনি ছিলেন সেই ধরনের মহিলা যাঁরা আমার মতে একেবারে অপদার্থ! নিজের অস্তিত্বের সমর্থনে কোন কাজই উনি করতেন না৷ ওঁর মন বলেও কিছু ছিলো না...বুদ্ধি তো দূরের কথা! শুধু ভাবতেন পুরুষ, পোশাক এবং প্রেম...এই তিনটে জিনিসের কথা৷ উনি ছিলেন সমাজের এক স্বার্থপর পরগাছা মাত্র! পুরুষের কাছে ওর আকর্ষণ ছিলো, একথা অস্বীকার করি না...আর নিঃসন্দেহে সেটাই ছিলো ওঁর এক ও একমাত্র গুণ৷ এবং এ ধরনের জীবনই উনি পছন্দ করতেন৷ সুতরাং, বুঝতেই পারছেন, ওঁর এই আকস্মিক পরিণতিতে আমি ঠিক অবাক হইনি৷ ওঁর মতো চরিত্রের মেয়েরাই ব্ল্যাকমেল—ঈর্ষা-হিংসা—প্রভৃতি নোংরা আবেগসংক্রান্ত জঘন্য ব্যাপারে জড়িয়ে পড়ে৷ মানুষের নীচ প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলতে ওঁর—জুড়ি ছিলো না...’

ক্রিস্টিন থামালো৷ ওর শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত লয়ে বইছে: ঘৃণাজনিত বিরক্তিতে ওষ্ঠ স্ফুরিত৷ কর্নেল ওয়েস্টনের মনে হলো, আর্লেনা স্টুয়ার্টের সঙ্গে চারিত্রিক বৈসাদৃশ্যের সম্পূর্ণতায় রেডফার্নের চেয়ে যোগ্যতর কাউকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব৷ তাঁর এও মনে হলো, ক্রিস্টিন রেডফার্নের সঙ্গে বিবাহিত পুরুষের কাছে পারিপাশ্বিক পরিবেশ হয়তো এতই স্বচ্ছ মনে হবে যে এই পৃথিবীর আর্লেনা স্টুয়ার্টদের আকর্ষণকে সে কখনই এড়াতে পারবে না৷

এবং হঠাৎই, এই চিন্তাস্রোতের মাঝে ক্রিস্টিনের উচ্চারিত একটা শব্দ তাঁকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করলো৷

তিনি সামনে ঝুঁকে পড়লেন, বললেন, ‘মিসেস রেডফার্ন, মিসেস মার্শালের কথা বলতে গিয়ে আপনি হটাৎই ‘ব্ল্যাকমেল’ শব্দটার উল্লেখ করলেন কেন?’

সপ্তম পরিচ্ছেদ

ক্রিস্টিন অভিব্যক্তিহীন চোখে অপলকে চেয়ে রইলো কর্নেল ওয়েস্টনের দিকে৷ মনে হলো তাঁর কথার নিহিত তাৎপর্য ও উপলব্ধি করতে পারেনি৷ ও যান্ত্রিক সুরে জবাব দিলো, ‘না—মানে, কেউ সম্ভবত ওঁকে ব্ল্যাকমেল করছিলো৷ ওঁর মতো মেয়ের জবাব দিলো, ‘না মানে, কেউ সম্ভবত ওঁকে ব্ল্যাকমেলে করছিলো৷ ওঁর মতো মেযের পক্ষেই তো ব্ল্যাকমেল হওয়াটা স্বাভাবিক৷’

ব্যগ্র সুরে প্রশ্ন করলেন কর্নেল ওয়েস্টন, ‘কিন্তু...আপনি কি জানেন, কেউ তাঁকে ব্ল্যাকমেল করছিলো?’

ওর গালে ছড়িয়ে পড়লো রক্তিম আভা৷ অপ্রতিভ স্বরে ও বলে উঠলো, ‘সত্যি কথা বলতে কি, ঘটনাচক্রে ব্যাপারটা আমি জানতে পারি৷ একদিন হঠাৎই কিছু কথা আমার কানে আসে—’

‘আর একটু বিশদভাবে বললে ভালো হয়, মিসেস রেডফার্ন—’

আরও এক ঝলক রক্তিম আভা ছড়িয়ে গেলো ক্রিস্টিন রেডফার্নের মুখে৷ ও বললে, ‘আমি—আমি কথাগুলো মোটেই শুনতে চাইনি৷ মানে—ব্যাপারটা বলতে গেলে নিছকই একটা দুর্ঘটনা৷ ঘটনাটা ঘটে দুদিন—না তিনদিন আগে, রাতে৷ আমরা তখন ব্রীজ খেলছিলাম৷’ ও ফিরলো পোয়ারোর দিকে, ‘আপনার মনে আছে? আমি এবং আমার স্বামী, আর আপনি এবং মিস ডার্নলি—এই চারজনে মিলে তাস খেলছিলাম? আমি সেই দানটায় ডামি ছিলাম৷ ঘরে বদ্ধ আবহাওয়ায় আমার শ্বাস যেন বন্ধ হয়েও আসছিলো৷ তাই একটু খোলামেলা ঠান্ডা হাওয়ার লোভে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ি৷ সমুদ্রতীরে উদ্দেশ্যে নেমে চলেছি, কানে এলো কারও কণ্ঠস্বর৷ একটি স্বর—আর্লেনা মার্শালের, শুনেই চিনতে পেরেছি. তখন বলে চলেছে, ‘আমাকে শুধু শুধু চাপ দিয়ে কোন লাভ নেই৷ আর টাকার যোগাড় করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আমার স্বামী সন্দেহ করে বসবে৷’ আর তারপর কোন পুরুষের কণ্ঠস্বর বলে উঠলো, ‘ওসব ছেঁদো কথায় আমি ভুলছি না৷ যেমন করে হোক টাকা আমার চাই৷’ তখন আর্লেনা মার্শাল বললেন, ‘নীচ, ইতর, জানোয়ার কোথাকার!’ আর লোকটা বললো, ‘জানোয়ার হই আর নাই হই, দেবী, টাকা তোমাকে দিতেই হবে!’

ক্রিস্টিন একটু থামলো৷

‘আমি তখন হোটেলের দিকে ফিরলাম৷ মিনিটখানে পরেই আর্লেনা মার্শাল ঝড়ের বেগে আমাকে পাশ কাটিয়ে গেলেন৷ ওঁকে দেখে ভীষণ বিচলিত বলে মনে হলো৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আর লোকটা? আপনি কি তাকে চিনতে পেরেছেন?’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন মাথা নাড়লো, বললো, ‘না৷ সে খুব নিচু স্বরে কথা বলছিলো৷ তার কথাগুলো আমি কোনরকমে, অস্পষ্টভাবে শুধু শুনতে পেয়েছি মাত্র৷’

‘সেটা আপনার চেনা কোন লোকের গলা বলে মনে হয়নি?’

ক্রিস্টিন কিছুক্ষণ ভাবলো, তারপর আবার মাথা নাড়লো৷

ও বললো, ‘উহুঁ—ঠিক বলতে পারছি না৷ কারণ সে গলার স্বর খুব অস্পষ্ট এবং কর্কশ ছিলো৷ সে স্বর—মানে, কি বলবো?—যে কোন লোকের হতে পারে৷’

কর্নেল ওয়েস্ট বললেন, ধন্যবাদ, মিসেস রেডফার্ন৷’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পর দরজা বন্ধ হতেই ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘যাক, এতক্ষণে একটু আলোর ইশারা পাওয়া গেলো৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘তোমার কি তাই মনে হচ্ছে, হুঁ?’

‘হ্যাঁ, মানে, ব্যাপারটা বেশ ইঙ্গিতপূর্ণ, স্যার—এ কথা আপনি অস্বীকার করতে পারেন না৷ এই হোটেলেরই কোন বাসিন্দা মৃতা মহিলাটিকে সযত্নে ব্ল্যাকমেলা করছিলো৷’

পোয়ারো মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘কিন্তু সেই দুর্বৃত্ত ব্ল্যাকমেলার মোটেই নিহত হয়নি৷ মারা গেছে তার শিকার৷’

‘হুঁ, এটা একটু অস্বাভাবিক মানছি৷’ বললেন ইন্সপেক্টর, ‘কারণ ব্ল্যাকমেলারা কখনও তাদের শিকারকে খুন করে বেড়ায় না৷ কিন্তু এই ঘটনা থেকে আজ সকালে মিসেস মার্শালের অদ্ভুত আচরণের একটা সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ভেসে ওঠে৷ তিনি আজ সেই অজ্ঞাত ব্ল্যাকমেলারের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন, এবং সঙ্গত কারণেই তিনি চাননি, এ ঘটনা তাঁর স্বামী অথবা রেডফার্ন জানতে পারুক৷’

হ্যাঁ, এ থেকে ওই ব্যাপারটা অন্তত স্পষ্ট হচ্ছে৷’ সমর্থন জানালেন পোয়ারো।

ইন্সপেক্টর কলগেট বলে চললেন, ‘আর একবার ভাবুন তো গোপন সাক্ষাৎকারে জায়গাটার কথা! উপযুক্ত কাজের উপযুক্ত স্থানই বটে৷ মিসেস মার্শাল তাঁর ভেলায় চড়ে ভেসে পড়লেন৷ এবং তাতে অস্বাভাবিক কিছু নেই৷ এ তাঁর নিত্যনৈমিত্তিক অভ্যাস৷ তিনি ডাইনে বাঁক নিয়ে পিক্সি কোভের উদ্দেশে রওনা হন, যেখানে সকালের দিকে কেউ কখনও যায় না এবং তাঁর গোপন সাক্ষাৎকারের পক্ষে এক শান্ত, সুন্দর জায়গা৷’

পোয়ারো বললেন, ‘হ্যাঁ, এ কথাটা আমারও মনে হয়েছিলো৷ জায়গাটা, আপনি যা বললেন, গোপন সাক্ষাৎকারের পক্ষে এক আদর্শ মিলনস্থল৷ জায়গাটা নির্জন, এবং দ্বীপের দিক থেকে ওখানে পৌঁছবার একমাত্র পথ পাহাড়ের গা থেকে ঝোলানো ইস্পাতের মইটা ব্যবহার করা, যা সকলের কর্ম নয়৷—তার ওপর ঝুলন্ত পাহাড়ের ঠিক নিচে অবস্থিত হওয়ার, ওপর থেকে বেলাভূমির অধিকাংশই থেকে যায় পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য৷ এছাড়া, আরও একটা সুবিধে পিক্সি কোভের আছে, যেটার কথা মিঃ রেডফার্ন একদিন আমাকে বলেছিলেন৷ ওখানে নাকি একটা গুপ্ত গুহা আছে, যার প্রবেশ পথ খুঁজে পাওয়া নেহাৎ সহজ নয়, কিন্তু সেখানে লোকচক্ষুর আড়ালে যে কেউ অতি স্বচ্ছেন্দে কারও অপেক্ষা করতে পারে৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ, পিক্সি গুহা—ওটা সম্পর্কে বেশ কিছু কথা শুনেছি বলে মনে পড়ছে৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘অবশ্য বহু বছর ধরে এই গুহা প্রসঙ্গ একেবারে চাপা পড়েছিলো৷ জায়গাটা আমাদের একবার সরেজমিনে তদন্ত করে দেখা উচিত৷ বলা যায় না, তেমন কোন সূত্র-টুত্র পেয়ে গেলেও পেয়ে যেতে পারি৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমার কথাই ঠিক, কলগেট, এ সমস্যার প্রথম অংশের সমাধান আমরা করতে পেরেছি৷ মিসেস মার্শাল পিক্সি কোভে কেন গিয়েছিলেন? অবশ্য, এখন দ্বিতীয় অংশের উত্তরটা আমাদের প্রয়োজন৷ সেখানে তিনি কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন? অনুমান করা যায়, সেই ব্যক্তি হোটেলের অতিথিদেরই একজন৷ তাঁদের কাউকেই প্রেমিকের ভূমিকায় ঠিক মানায় না—কিন্তু ব্ল্যাকমেলারের প্রশ্ন উঠলে অন্য কথা৷’

হোটেলের অতিথি-তালিকার খাতাটা তিনি কাছে টেনে নিলেন৷

‘হোটেলের পরিচারক, চাকর ইত্যাদি, যাদের আমি সন্দেহভাজন বলে মনে করি না, তাদের বাদ দিলে বাকি থাকেন এঁরা : মার্কিন ভদ্রলোক গার্ডেনার, মেজর ব্যারী, মিঃ হোরেস ব্ল্যাট এবং ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘আমরা এই সন্দেহের পরিধিকে আরও সংক্ষিপ্ত করে আনতে পারি, স্যর৷ কারণ, আজ সারা সকালটা মিঃ গার্ডেনার সমুদ্রতীরেই উপস্থিত ছিলেন৷ তাই তো মঁসিয়ে পোয়ারো?’

পোয়ারো উত্তর দিলে, ‘শুধু মাঝে অল্প সময়ের জন্য উঠে গিয়েছিলেন, স্ত্রীর জন্য একটা উলের গোছা নিয়ে আসতে৷’

কলগেট বললেন, ‘ওহ, সেটা ধর্তব্যের মধ্যে নয়৷’

মেজর ব্যারী আজ সকাল দশটায় বেরোন, এবং ফিরে আসেন দেড়টা নাগাদ৷ মিঃ লেন বেরোন আরও সকালে৷আটটার সময় তিনি প্রাতরাশ সারেন৷ বলেন, একটু ‘পদব্রজে’ ভ্রমণে যাচ্ছেন৷ মিঃ ব্ল্যাট প্রায় রোজকার মতোই সাড়ে ন’টা নাগাদ তাঁর নৌকো নিয়ে বেরোন৷ এখনও পর্যন্ত তাঁরা কেউই ফেরেননি৷’

‘নৌকো নিয়ে বেরিয়েছেন, হুঁ?’ কর্নেল ওয়েস্টনের স্বরে গভীর চিন্তায় ছোঁয়া৷

ইন্সপেক্টর কলগেট সেই ইঙ্গিতে সাড়া দিয়ে বলে উঠলেন৷ ‘আমাদের সন্দেহের কাঠামোয় এই ভদ্রলোক চমৎকার মানিয়ে যাচ্ছেন, স্যার৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আচ্ছা, এই ব্ল্যাট ভদ্রলোকের সঙ্গে আমরা একবার কথা বলে দেখবো—দেখি, আর কে কে বাকি রইলো? রোজামণ্ড ডার্নলি৷ আর ওই ব্রুস্টার মহিলা, যিনি রেডফার্নের সঙ্গে মিসেস মার্শালের মৃতদেহ আবিষ্কার করেন৷ আচ্ছা, এই মহিলাটি কিরকম, কলগেট?’

বেশ বুদ্ধিমতী মহিলা, স্যার৷ পরিচ্ছন্ন পরিপাটি৷’

‘এই মৃত্যু সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য কি?’

ইন্সপেক্টর মাথা নাড়লেন৷

‘যতদূর জানি, এ সম্পর্কে আমাদের বলার মতো আর কোন খবর তাঁর কাছে নেই, কিন্তু তবুও আমাদের নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন৷ এছাড়া রয়েছেন ওই মার্কিন ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রী৷

কর্নেল ওয়েস্টন মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘ওঁদের সবাইকেই এখানে আসতে বলো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসব ঝামেলা মিটিয়ে ফেলা যাক৷ বলা যায় না, তেমন কোন খবর পেলেও পেয়ে যেতে পারি৷ আর কিছু না হোক অন্তত ওই ব্ল্যাকমেল সম্পর্কে হয়তো কিছু জানা যাবে৷

পরস্পরকে সঙ্গী করে মিঃ এবং মিসেস গার্ডেনার আরক্ষী-প্রধানের সম্মুখে উপস্থিত হলেন৷

সঙ্গে সঙ্গেই বিশদ ব্যাখ্যায় ব্যস্ত হলেন মিসেস গার্ডেনার৷

‘আশা করি আমাদের অবস্থাটা আপনি বুঝতে পারছেন, কর্নেল ওয়েস্টন (ওয়েস্টন তো আপনার নাম, তাই না?)’ শেষোক্ত বিষয়ে সম্মতি ও আশ্বাস পেয়ে তিনি বলে চললেন, ‘ঘটনার আকস্মিকতার আমি ভীষণ একটা মানসিক আঘাত পেয়েছি, আর মিঃ গার্ডেনার আমার স্বাস্থ্য সম্পর্কে বরাবরই ভীষণ সতর্ক—’

মিঃ গার্ডেনার মাঝপথে কথা বললেন, ‘মিসেস গার্ডেনার অত্যন্ত অনুভূতিশীল৷’

‘—তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘ক্যারি, তুমি কক্ষনো একা যাবে না; আমিও তোমার সঙ্গে যাবো৷’ অবশ্য তার মনে এই নয় যে ব্রিটিশ পুলিশের তদন্ত পদ্ধতি সম্পর্কে আমাদের বিন্দুমাত্রও শ্রদ্ধা নেই, বরং ঠিক তার উলটো৷ শুনেছি, তদন্তের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ পুলিশের পদ্ধতি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও উন্নত মানের, এবং আমি মনে প্রাণে তা বিশ্বাস করি, আরও বিশেষ করে যখন স্যাভয় হোটেলে আমার একটা ব্রেসলেট হারিয়ে গেলো, তখন যে ছেলেটি তদন্তের প্রয়োজনে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলো, তার মতো সহানুভূতিপূর্ণ ভদ্র ব্যবহার আমি খুব কম লোকেরই দেখেছি, আর ব্রেসলেটটাও সত্যি সত্যি হারায়নি, আমি ভুল করে কোথায় রেখেছিলাম, সব সময় তাড়াহুড়ো করার এই অসুবিধে, কোথায় কখন কি রাখি কিছুই মনে থাকে না—’ মিসেস গার্ডেনার থামলেন, ধীর শ্বাস নিলেন, এবং পুনরায় সরব হলেন, ‘আর আমি যা বলতে চাই, এবং আমি জানি মিঃ গার্ডেনারও আমার সঙ্গে একমত হবেন, তা হলো ব্রিটিশ পুলিশকে তদন্তে যে কোনভাবে সাহায্য করার জন্যে আমরা সর্বদাই উদগ্রীব৷ সুতরাং বিন্দুমাত্রও দ্বিধা না করে আপনারা আমার কাছে যা জানতে চান জিগ্যেস করুন—’

কর্নেল ওয়েস্টন এই আমন্ত্রণে সারা দিয়ে মুখ খুলছিলেন, কিন্তু মিসেস গার্ডেনার কথা বলতে থাকায় সে চেষ্টায় বিরত হলেন৷

‘সেই কথাই আমি বলেছিলাম, তাই না, ওডেল? আর বলছিও ঠিক তাই না?’

‘হ্যাঁ, সোনা, বললেন, মিঃ গার্ডেনার৷

কর্নেল ওয়েস্টন ঝটিতি বলে উঠলেন, ‘মিসেস গার্ডেনার, শুনলাম আপনি এবং আপনার স্বামী আজ সারা সকালটা সমুদ্রতীরেই কাটিয়েছেন?’

সম্ভবত এই প্রথম মিঃ গার্ডেনার স্ত্রীকে পরাস্ত করে প্রথমে কথা বলতে পারলেন৷

‘হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন৷’ তিনি বললেন৷

‘নিশ্চয়ই, সেখানেই তো ছিলাম আমরা,’ মিসেস গার্ডেনার বললেন, ‘কি সুন্দর, শান্ত ছিলো আজকের সকালটা, ঠিক অন্য দিনগুলোর মতোই, হয়তো তার চেয়েও স্বাভাবিক; আশা করি বুঝতে পারছেন, কি বলতে চাইছি; আর আমরা ঘুণাক্ষরেও টের পারিনি, বাঁক পেরিয়ে ওই নির্জন সৈকতে কি কাণ্ডটাই না ঘটে চলেছে৷’

‘মিসেস মার্শালকে আজ সারা দিনে আপনারা কখনও দেখেছেন?’

‘না—দেখিনি৷ আর সেইজন্যেই তো ওডেলকে বলছিলাম, মিসেস মার্শাল আজ সকালে কোথায় যেতে পারেন৷ আর প্রথমে খোঁজ করতে এলেন তাঁর স্বামী, তাঁরপর এলো ওই সুদর্শন ছেলেটি, মিঃ রেডফার্ন, আর সে যা অধৈর্য হয়ে পড়েছিলো কি বলবো! সৈকতে বসে প্রত্যেকের দিকে তাকিয়ে খালি বিরক্তভাব করছে৷ তখন আমি মনে মনে বললাম, নিজের অমন সুন্দরী, চমৎকার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তার কি ওই সাংঘাতিক মেয়ে ছেলেটার পেছনে না দৌড়লে চলছিলো না? কারণ মেয়েটাকে আমার সাংঘাতিক বলেই মনে হতো৷ ওর সম্পর্কে আমার ধারণা বরাবরই ওই রকম তাই না, ওডেল?’

‘হ্যাঁ, সোনা৷’

‘ক্যাপ্টেন মার্শালের মতো এমন চমৎকার একজন ভদ্রলোক যে কি করে এ ধরনের একটা মেয়েছেলেকে বিয়ে করে বসলেন, তা কিছুতেই আমার মাথায় আসছে না—তাছাড়া তাঁর মেয়ে এখন বড় হচ্ছে, আর মেয়েদের বাড়ন্ত বয়েসের মুখে প্রয়োজন উপযুক্ত পরিবেশ৷ মিসেস মার্শাল ঠিক সেরকম মানুষ ছিলেন না—কোন শিক্ষা-দীক্ষা নেই—আর আমি বলবো, আচরণে ঠিক পশুর মতো৷ ক্যাপ্টেন মার্শালের যদি সামান্যতম বাস্তব বুদ্ধি থাকতো, তাহলে তিনি মিস ডানলির মতো সুন্দরী এবং সম্মানিতা মহিলাকেই বিয়ে করতেন৷ একথা মানতেই হবে, যেভাবে তিনি জীবনে এগিয়ে গেছেন এবং প্রথম শ্রেণীর একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন, তা রীতিমতো প্রশংসার যোগ্য৷ এ কাজে বুদ্ধির প্রয়োজন—আর রোজামণ্ড ডার্নলির দিকে এক পলক তাকালেই আপনি বুঝতে পারবেন, তাঁর বুদ্ধির অভাব নেই! যে কোন কাজ পরিকল্পনামাফিক সুষ্ঠুভাবে শেষ করার ক্ষমতা তাঁর আছে৷ আমি যে তাঁকে কতখানি শ্রদ্ধা করি তা বলে বোঝাতে পারছি না৷ আর, এই তো সেদিন আমি মিঃ গার্ডেনারকে বলছিলাম, মিস ডার্নলি যে ক্যাপ্টেন মার্শালের প্রেমে অন্ধ, তা যে কোন লোকেরই চোখে পড়বে—বলেছিলাম, ক্যাপ্টেন মার্শালকে মেয়েটা ভীষণ ভালোবাসে, বলিনি, ওডেল?’

‘হ্যাঁ, সোনা৷’

‘শুনেছি, ওঁরা নাকি ছোটবেলা থেকেই পরস্পরকে চিনতেন, আর এখন, কে বলতে পারে, ওই নোংরা মেয়েছেলেটার চিরতরে সরে যাওয়ায় ওঁদের আন্তরিক ইচ্ছে পূর্ণ হবে না! আমাকে মোটেই সংকীর্ণমনা ভাববেন না, কর্নেল ওয়েস্টন, আর এও নয় যে অভিনয় আমি অপছন্দ করি—কেন, আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুদের অনেকেই তো অভিনয় নিয়ে আছেন—কিন্তু মিঃ গার্ডেনারকে আমি বরাবরই বলেছি, ওই মেয়েটার মধ্যে কোথায় যে একটা অশুভ ছায়া লুকিয়ে আছে৷ আর এখন দেখতেই পাচ্ছেন, যে আমার কথাই ঠিক হলো৷’

বিজয়ীর উল্লসিত অভিব্যক্তি নিয়ে থামলেন মিসেস গার্ডেনার৷

এরকুল পোয়ারোর ঠোঁটে ফুটে উঠলো ছোট্ট হাসির রেখা৷ তাঁর চোখ কিছুক্ষণের জন্য অপলকে চেয়ে রইলো মিঃ গার্ডেনারের বিচক্ষণ ধূসর চোখের তারায়৷

কর্নেল ওয়েস্টন মরিয়া হয়েই বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা, ধন্যবাদ, মিসেস গার্ডেনার৷ তাহলে আপনারা কেউই এমন কিছু দেখেননি৷ যার সঙ্গে এই খুনের কোন সম্পর্ক আছে?’

‘উহুঁ—সেরকম কিছু আমাদের নজরে পড়েছে বলে মনে হয় না৷’ মিঃ গার্ডেনার থেমে থেমে জবাব দিলেন, ‘মিসেস মার্শাল বেশির ভাগ সময়েই রেডফার্ন ছেলেটার সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন—কিন্তু সে কথা তো যে কেউ আপনাদের বলবে৷’

‘কিন্তু তাঁর স্বামী? আপনার কি মনে হয়, তিনি এতে অসন্তুষ্টু হতেন?’

মিঃ গার্ডেনার সতর্ক সুরে বললেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল খুব চাপা স্বভাবের মানুষ৷ বাইরে থেকে দেখে তাঁর মনের কথা বোঝা যায় না৷’

মিসেস গার্ডনার এ বক্তব্যের সমর্থনে মন্তব্য করলেন, ‘হ্যাঁ, তিনি যাকে বলে একেবারে খাস ইংরেজ৷’

মেজর ব্যারীর ঈষৎ-বিবশ মুখমণ্ডলে বিভিন্ন অভিব্যক্তির প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হলো৷ তিনি যে সত্যি অত্যন্ত বিস্মিত এবং আতঙ্কিত, সেটা বোঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, মেজর ব্যারী, কিন্তু তা সত্ত্বেও লজ্জানম্র তৃপ্তির ছোঁয়াটুকু তাঁর অভিব্যক্তিতে গোপন থাকেনি৷

তিনি তাঁর কর্কশ, সশব্দ-শ্বাসপ্রশ্বাস সম্বলিত স্বরে তখন বলছিলেন, ‘যে-কোনভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারলে খুশি হবো৷ অবশ্য ঘটনা সম্পর্কে আমি বলতে গেলে তেমন কিছু জানি না—কিছুই জানি না৷ পাত্র-পাত্রী কারো সঙ্গেই আমার সাক্ষাৎ পরিচয় নেই৷ তবে জীবনের বেশ কিছু সময় আমি একটু-আধটু ঘুরে বেড়িয়েছি৷ প্রাচ্য অঞ্চলে অনেকদিন ছিলাম৷ আর এ কথা আপনাকে জোর দিয়ে বলতে পারি, ভারতীয় কোন শৈলবাসে কিছুদিন কাটানোর পর মানব-চরিত্রের যেটুকু আপনার কাছে অজানা থাকে, জানবেন, সেটুকু জানার তেমন কোন প্রয়োজন নেই৷’

তিনি থামলেন, শ্বাস নিলেন, এবং পুনরায় শুরু করলেন, ‘বস্তুত এই ব্যাপারটা আমাকে সিমলার একটা ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়৷ লোকটির নাম ছিলো রবিনসন, নাকি ফ্যালকনার? সে যাই হোক, সে ছিলো ‘‘ইস্ট উইল্টস’’ অথবা ‘‘নর্থ সারেস’’-এর লোক৷ ঠিক মনে পড়ছে না, অবশ্য দরকারও নেই৷ শান্তশিষ্ট মানুষ, বুঝলেন, বইয়ের পোকা—দেখলে বলতেন, একেবারে ভিজে বেড়ালটি৷ একদিন সন্ধ্যায় নিজের বাংলোয় স্ত্রীকে হঠাৎ আক্রমণ করে৷ গলা টিপে ধরে দুহাতে৷ বউটা নাকি অন্য কোন একটা লোকের সঙ্গে ‘‘ইয়ে’’ চালিয়ে যাচ্ছিলো, হঠৎ সেটা সে জানতে পারে৷ ওঃ, আরেকটু হলেই বউটাকে একেবারে শেষ করে দিয়েছিলো৷ অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যায় মেয়েটা৷ আমরা তো চমকে গিয়েছিলাম৷ কখনো ভাবিনি, লোকটার ভেতরে এত তেজ আছে!’

এরকুল পোয়ারো মৃদুকণ্ঠে বললেন, ‘আর এই ঘটনার সঙ্গে মিসেস মার্শালের মৃত্যুর একটা সাদৃশ্য আপনি দেখতে পাচ্ছেন, তাই তো?’

‘হ্যাঁ—মানে, আমি বলতে চাইছি ওই শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টার ব্যাপারটা৷ অনেকটা একই রকম৷ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ভয়ঙ্কর কিছু একটা করে বসা!’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনার ধারণা, ক্যাপ্টেন মার্শাল তাই করেছেন?’

‘না, সে কথা আমি একবারও বলিনি৷’ মেজর ব্যারীর রক্তিম মুখমণ্ডল আরও রক্তিম হলো, ‘মার্শাল, সম্পর্কে কোন কথাই আমি বলিনি৷ সে অত্যন্ত ভালোমানুষ৷ তার সম্পর্কে কোন কুকথা মরে গেলেও মুখে আনতে পারবো না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘কিন্তু, মাপ করবেন, একটু আগেই একজন প্রতারিত স্বামীর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার প্রতি আপনিই আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন৷’

মেজর ব্যারী বললেন, ‘হ্যাঁ, মানে, আমি বলতে চাইছিলাম, মিসেস মার্শাল ছিলেন, আমার মতে, রীতিমতো গরম চীজ৷ কি বলেন? রেডফার্ন ছেলেটাকে একেবারে সুতোয় করে নাচাচ্ছিলেন৷ হয়তো এর আগে এরকম অনেকে তাঁর জীবনে গেছে এসেছে৷ কিন্তু মজার ব্যাপারটা কি জানেন, নিজের স্ত্রীর ব্যাপারে স্বামীদেবতারা বিশ্বাসে একেবারে অন্ধ! আশ্চর্য! এই জিনিসটা বরাবরই আমাকে অবাক করেছে৷ তাঁরা এটুকু বোঝেন, যে একটা লোক তাঁদের স্ত্রীর প্রতি আসক্ত কিন্তু এটা দেখেও দেখেন না যে তাঁদের স্ত্রীরত্নটিও লোকটির প্রতি সমানভাবে অনুরক্ত! পুনায় এরকম একটা ঘটনার কথা আমার মনে পড়ছে৷ খুব সুন্দরী মেয়েটি৷ ওঃ, নিজের স্বামীকে কম ঝঞ্ঝাটে ফেলেনি সে—’

কিঞ্চিৎ অনিচ্ছা নিয়েই নড়েচড়ে বসলেন কর্নেল ওয়েস্টন, বললেন, ‘ঠিক আছে, মেজর ব্যারী৷ এখন আমাদের প্রথম কাজ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে দেখা৷ আপনি তাহলে ব্যক্তিগতভবে এমন কিছু জানেন না অর্থাৎ এমন কিছু দেখেননি বা শোনেননি, যা আমাদের তদন্তে কোনরকম সাহায্য করতে পারে?’

উহুঁ, কর্নেল, সেরকম কোন তথ্য দিতে পারছি না৷ একদিন বিকেলে মিসেস মার্শাল এবং রেডফার্নকে গাল কোভে দেখেছিলাম—’ এই পর্যন্ত বলে মেজর ব্যারী চোখ টিপলেন, সবজান্তার ভঙ্গীতে৷ হেসে উঠলেন চাপা কর্কশ স্বরে—‘সে বড় সুন্দর দৃশ্য৷ কিন্তু সেরকম সাক্ষ্য প্রমাণ তো আর আপনি চাইছেন না? হাঃ-হাঃ-হাঃ-হাঃ!’

‘আজ সকালে আপনি মিসেস মার্শালকে একবারও দেখেনেনি?’

‘সকালে কারও সঙ্গে আমার দেখা হয়নি৷ সেন্ট লু-তে গিয়েছিলাম৷ দুর্ভাগ্য বলতে হবে৷ এ এমন জায়গা যেখানে মাসের পর মাস নির্বিঘ্নে কেটে যায়, আর যেদিন বিঘ্ন ঘটে সেইদিনই আমরা থাকি অনুপস্থিত৷’

মেজরের কণ্ঠে একটা পৈশাচিক আক্ষেপের সুর ফুটে উঠলো৷

কর্নেল ওয়েস্টন তাঁকে বক্তব্যের খেই ধরিয়ে দিলেন, ‘আপনি তাহলে সেন্ট লু তে গিয়েছিলেন বলছেন?’

‘হ্যাঁ, একটু টেলিফোন করার দরকার ছিলো। এখানে তো টেলিফোনের কোন ব্যবস্থা নেই, আর লেদারকোম্ব ডাকঘরে ফোনে একটু একা কথা বলার উপায় নেই!’

‘আপনার ফোনের বক্তব্য কি একান্ত গোপনীয় ছিলো?’

সহাস্যে আবার চোখ টিপলেন মেজর, ‘হ্যাঁ, গোপনীয় বলতে পারেন, আবার নাও বলতে পারেন৷ চেয়েছিলাম, আমার এক বন্ধুকে ডেকে তার মারফত একটা বিশেষ ঘোড়ার ওপর কিছু বাজী ধরতে, দুর্ভাগ্য লাইনই পেলাম না৷’

‘আপনি কোথা থেকে ফোন করেছিলেন?’

সেন্ট লু-র প্রধান ডাকঘর থেক৷ তারপর ফেরার সময় রাস্তা হারিয়ে ফেলি—যতসব জট পাকানো অলিগলি—গোটা এলাকাটা জুড়ে এঁকেবেঁকে যেন গোলধাঁধার সৃষ্টি করেছে৷ রাস্তা খুঁজে বার করতেই কম করে ঘণ্টাখানেক সময় নষ্ট হয়েছে৷ এটাই সম্ভবত পৃথিবীর জটিলতম হতচ্ছাড়া জায়গা! এই তো সবে আধঘণ্টা হলো ফিরেছি৷’

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘সেন্ট লু-তে কারও সঙ্গে আপনার দেখা হয়েছিলো কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলেছেন?’

মেজর ব্যারী স্বভাবসিদ্ধ চাপা হাসিতে উজ্জ্বল হলেন, বললেন, ‘অ্যালিবাই প্রমাণ করতে বলছেন? সেরকম কিছু মনে করতে পারছি না৷ সেন্ট লু-তে প্রায় হাজার পঞ্চাশেক লোককে আমি দেখেছি—কিন্তু তার মানে এই নয়, তারা আমাকে মনে রাখবে৷’

পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘এ ধরনের নিয়মমাফিক প্রশ্ন আমাদের করতে হয়, তা তো জানেন৷’

‘সে কথা ঠিক৷ দরকার পড়লেই খবর দেবেন৷ সাহা্য্য করতে পারলে খুশি হবো৷ মৃতা মহিলার চটক ছিলো৷ আমিও চাই, যে এ কাজ করেছে, ধরা পড়ুক৷ নির্জন সমুদ্র-সৈকতে হত্যাকাণ্ড—কাগজে এই শিরোনামাই যে দেখতে পাবো, তা বাজী রেখে বলতে পারি৷ এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে—’

ইন্সপেক্টর কলগেটই মেজর ব্যারীর এই সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণপর্বকে নিষ্ঠুরভাবে অঙ্কুকে বিনাশ করে তাঁকে সুকৌশলে এগিয়ে দিলেন দরজা পর্যন্ত৷

ফিরে এসো তিনি বললেন, ‘সেন্ট লু-তে কোন খোঁজ-খবর নেওয়া একটু কষ্টকর হবে৷ কারণ এখন সেখানে রীতিমতো ছুটির মরসুম চলছে৷’

পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘হ্যাঁ, মেজর ব্যারীকে আমরা সন্দেহভাজনের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারি না৷ অবশ্য আমার ধারণা, তিনি এ ব্যাপারে তেমনভাবে জড়িয়ে নেই৷ এইরকম ক্লান্তিকর বাচাল বৃদ্ধ বহু দেখা যায়৷ সৈন্যবাহিনিতে থাকাকালীন কয়েকজনের সাক্ষাৎ আমিও পেয়েছিলাম৷ কিন্তু তবুও—মেজরের দিকে নজর রাখতেও হবে৷ কলগেট, তোমার ওপরেই সেটা ছেড়ে দিলাম৷ খোঁজ নিয়ে দ্যাখো, ক’টার সময় তিনি গাড়ি নিয়ে বেরিয়েছেন, ট্যাঙ্কে তেল কতটা ছিলো—কোনকিছু বাদে দেবে না৷ হয়তো এও সম্ভব, কেন নির্জন জায়গায় গাড়ি রেখে তিনি দ্বীপে ফিরে আসেন এবং পিক্সি কোভে গিয়ে উপস্থিত হন৷ অবশ্য কাজটা তেমন যুক্তিগ্রাহ্য নয়৷ সেক্ষেত্রে মেজরকে কারও না কারও নজরে পড়ে যাওয়ার প্রচণ্ড ঝুঁকি নিতে হবে৷’

কলগেট মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ, বিশেষ করে আজই প্রচুর শ্যারাব্যাং গাড়ি এখানে উপস্থিত রয়েছে৷ আজ চমৎকার দিন৷ মোটামুটিভাবে সাড়ে এগারোটা নাগাদ ওরা আসতে শুরু করে৷ অবশ্য জোয়ার ছিলো সাতটায়৷ আর ভাটা শুরু হবে বেলা একটায়৷ সুতরাং লোকেরা কংক্রিট সেতু এবং বেলাভূমিতে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ৷ কিন্তু তাঁকে সেতু পার হয়ে হোটেলের পাশ দিয়েই তো আসতে হবে!’

ঠিক পাশ দিয়ে না এসে তিনি হয়তো অন্য রাস্তাটা দিয়ে দ্বীপের ওপ্রান্তে গেছেন—’

ওয়েস্টন দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বললেন, ‘আমি একবারও বলছি না, লোকজনের চোখ এড়িয়ে তাঁর পক্ষে এ কাজ করা অসম্ভব। আজ হোটেলের সমস্ত অতিথিই সমুদ্রতীরে উপস্থিত ছিলেন, শুধু মিসেস রেডফানী এবং লিন্ডা মার্শাল ছাড়া যেহেতু ওরা গাল কোভে গিয়েছিলেন, আর যে রাস্তার কথা তুমি বলছো , তার প্রথম অংশটুকু হোটেলের কয়েকটা মাত্র ঘর থেকেই শুধু দেখা যায়, এবং কেউ যে সেই “বিশেষ “ সময়ে জানলা দিয়ে ওই রাস্তার দিকে চেয়ে থাকবে, সে সম্ভবনা অত্যন্ত কম। সত্যি কথা বলতে কি, স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি, কোন লোকের পক্ষে সকলের চোখ এড়িয়ে হোটেলে এসে লাউঞ্জ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়াটা নেহাৎ অসম্ভব নয়। কিন্তু আমার মনে হয়, কেউ তাঁকে দেখতে পাবে না, এই বিশ্বাসের ওপর ভরসা করে তিনি এতটা ঝুঁকি নিতে পারেন না।’

কলগেট বললেন, ‘তিনি হয়তো নৌকো বেয়ে ঘুর পথে পিক্সি কোভে গিয়ে থাকবেন।’

ওয়েস্টন মাথা নাড়লেন, সম্মতি জানিয়ে বললেন, ‘এটা তবু অনেকটা যুক্তিগ্রাহ্য। যদি সমুদ্রের কিনারায় কাছাকাছি কোন নির্জন অঞ্চলে তিনি আগে থাকতেই নৌকোটা রেখে গিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর পক্ষে গাড়ি ছেড়ে নৌকো বেয়ে পিক্সি কোভে যাওয়াটা মোটেই অস্বাভাবিক নয়; তাঁরপর মিসেস মার্শালকে খুন করে তিনি নৌকো নিয়ে ফিরে আসেন, এবং গাড়ি নিয়ে আমাদের কাছে উপস্থিত হন ওই সেন্টুলু-তে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলার গল্প নিয়ে—এমন গল্প যা তিনি ভালোভাবেই জানেন, আমাদের পক্ষে যাচাই করা বেশ কষ্টকর হবে।’

‘ঠিক বলেছেন, স্যার।’

পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘সুতরাং, ব্যাপারটা আমি তোমার ওপরে ছেড়ে দিচ্ছি, কলগেট। স্থানীয় এলাকায় তন্নতন্ন করে চিরুনি চালাও। তুমি তো জানো কি করতে হবে। এখন তাহলে মিস ব্রুস্টারের সঙ্গে কথা বলা যাক।’

তাঁদের সংগৃহীত তথ্যের সঞ্চয়ে নতুন কোন প্রয়োজনীয় তথ্য উপহার দিতে সক্ষম হলেন না এমিলি ব্রুস্টার৷

তাঁর মৃতদেহ আবিষ্কারের কাহিনি দ্বিতীয়বার শোনার পর ওয়েস্ট বললেন, ‘এছাড়া এমন কিছু আপনি জানেন না, যা আমাদের তদন্তে সাহায্য করতে পারে?’

এমিলি ব্রুস্টার সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিলেন, ‘উহুঁ৷ এরকম একটা বীভৎস বিশ্রী ব্যাপার...৷ আশা করি খুব শিগগিরই আপনারা এর একটা সমাধান করতে পারবেন৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ, সেই রকমই আশা করছি৷’

নিস্পৃহ, শুষ্ক স্বরে এমিলি বললেন, ‘অবশ্য এর সমাধান তেমন কঠিন হওয়ার কথা নয়...’

‘তার মানে? কি বলতে চান আপনি, মিস ব্রুস্টার?’

‘দুঃখিত৷ আপনাকে গায়ে পড়ে উপদেশ দিতে চাইনি৷ শুধু বলতে চাইছিলাম, এ ধরনের মেয়েছেলে-সংক্রান্ত ব্যাপারে সমাধান যথেষ্ট সহজ হওয়াই উচিত৷’

এরকুল পোয়ারো মৃদুস্বরে বললেন, ‘আপনার তাই মনে হয়?’

তীব্র স্বরে জবাব দিলেন এমিলি ব্রুস্টার, ‘নিশ্চয়ই মনে হয়৷ মৃতব্যক্তি সম্পর্কে নোংরা কথা বলা উচিত নয় ইত্যাদি নীতিবাক্য মানলেও বাস্ববকে তো আপনি অস্বীকার করতে পারেন না৷ ওই মেয়েছেলেটা ছিলো পুরোপুরি নষ্ট চরিত্রের৷ আপনাদের তদন্তের মধ্যে যা করতে হবে, তা হলো ওর নোংরা অতীতটাকে একটু খোঁজ-খবর করে ঘেঁটে দেখা৷’

এরকুল পোয়ারো নম্র স্বরে বললেন, ‘আপনি তাঁকে পছন্দ করতেন না?’

‘না, কারণ ওর সম্পর্কে সাধারণের চেয়ে একটু বেশিই আমি জানি৷’ সকলের নীরব সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে তিনি বলে চললেন, ‘আমার খুড়তুতো ভাই আরস্কিনদের একজনকে বিয়ে করে৷ আপনারা হয়তো শুনে থাকবেন, আর্লেনা বৃদ্ধ স্যার রবার্টের ওপর এমন প্রভাব বিস্তার করেন যে তিনি ওর প্রতি অনুরাগে অন্ধ হয়ে নিজের আত্মীয়স্বজনকে বঞ্চিত করে সমস্ত সম্পত্তি ওই মেয়েটাকেই দিয়ে যান৷’

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘আর তাতে, তাঁর আত্মীয়স্বজনেরা—ইয়ে—মানে অসন্তুষ্ট হন?’

‘স্বাভাবিকভাবেই৷ প্রথমত আর্লেনার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক একটা চরম কেলেঙ্কারির সৃষ্টি করে, আর তার ওপর ওকে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড উইল করে দিয়ে যাওয়ার স্পষ্টই বোঝা যায় সে কি চরিত্রের মেয়ে ছিলো৷ কথাগুলো হয়তো আপনাদের কাছে রূঢ় ঠেকেছে, কিন্তু আমার মতে আর্লেনা স্টুয়ার্টের মতো মেয়েদের কোন সহানুভূতি দেখানো উচিত নয়৷ আরও একটা ঘটনার কথা আমি বলতে পারি—একজন হতভাগ্য যুবকের কথা, আর্লেনার জন্যে শেষ পর্যন্ত যে পাগল হয়ে গিয়েছিলে—সে বরাবরই একটু ছিটগ্রস্ত ছিলো, আর স্বাভাবিকভাবেই ওর সঙ্গ ছেলেটাকে সুস্থতার বাইরে ঠেলে দিয়েছে৷ সে কিছু শেয়ার নিয়ে তছরুপ না কি যেন করেছিলো, শুধু ওর পেছনে খরচ করার টাকা যোগাড়ের জন্যে, আর কোনরকমে আদালতের সাজা থেকেই সে রেহাই পায়৷ ওই মেয়েছেলেটা যার সঙ্গে মিশেছে তাকেই নষ্ট করে ছেড়েছে৷ দেখুন না, কেমন করে রেডফার্ন ছেলেটার মাথাটা দিনের পর দিন চিবিয়ে খাচ্ছিলো৷ না, ওর মৃত্যুতে ঠিক দুঃখ প্রকাশ করতে পারছি না বলে দুঃখিত—অবশ্য, এর বদলে ও যদি জলে ঝাঁপ দিয়ে বা পাহাড় থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করতো তাহলে ভালো হত৷ কারণ গলা টিপে খুন হওয়াটা ভীষণ বিশ্রী৷’

‘তাহলে আপনার ধারণা, খুনী মিসেস মার্শালের অতীত জীবনের কোন শত্রু?’

‘হ্যাঁ, তাই৷’

‘এমন কেউ, যে সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপে এসেছে?’

‘তাকে দেখবার লোক কোথায়? আমরা সকলেই তো সমুদ্রতীরে ছিলাম৷ যদ্দূর জানি মার্শাল মেয়েটা আর ক্রিস্টিন রেডফার্ন তখন গাল কোভে ছিলো৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল হোটেলে, নিজের ঘরে৷ তাহলে খুনীকে দেখবার জন্যে কোন কাক পক্ষীটা ছিলো বলতে পারেন? অবশ্য মিস ডার্নলি ছাড়া...’

‘কেন, মিস ডার্নলি কোথায় ছিলেন?’

‘হোটেলের পশ্চিম দিকের পাহাড়ের কিনারায়৷ জায়গাটার নাম সানি লেজ৷ আমি ও মিঃ রেডফার্ন তাঁকে সেখানে বসে থাকতে দেখেছি—যখন আমরা দ্বীপের গা ঘেঁষে নৌকো বেয়ে যাচ্ছিলাম৷’

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘হয়তো আপনার কথাই ঠিক, মিস ব্রুস্টার৷’

‘এমিলি ব্রুস্টার আত্মপ্রত্যয়ের সুরে বললেন, ‘হয়তো নয়, আমি জানি আমার কথাই ঠিক৷ যখন কোন মেয়ে এরকম নৃশংস পৈশাচিকভাবে খুন হয়, তখন জানবেন, সবচেয়ে মূল্যবান সূত্রের সন্ধান সে-ই আপনাদের হাতে তুলে দেবে৷ মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি কি আমার সঙ্গে একমত্ নন?’

এরকুল পোয়ারো চোখ তুলে তাকালেন৷ তাঁর চোখ পড়লো এমিলি ব্রুস্টারের আত্মবিশ্বাসের ভরা ধূসর চোখে৷ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই—আপনি এইমাত্র যা বললেন, তার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত৷ নিজের মৃত্যু রহস্যের শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র সূত্র আর্লেনা মার্শাল নিজেই৷’

মিস ব্রুস্টার তীক্ষ্ণ বললেন, ‘দেখলেন তো, তাহলে?’

তিনি ঋজু বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে রইলেন৷ তাঁর শীতল আত্মপ্রত্যয়ে পরিপূর্ণ দৃষ্টি চঞ্চলভাবে ছুঁয়ে যেতে লাগলো সবার মুখ৷

নীরবতা ভঙ্গ করলেন কর্নেল ওয়েস্টন, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, মিস ব্রুস্টার, মিসেস মার্শালের অতীত জীবনে নির্হিত কোন সূত্রই আমাদের নজর এড়িয়ে যাবে না৷’

এমিলি ব্রুস্টার নিষ্ক্রান্ত হলেন৷

ইন্সপেক্টর কলগেট টেবিলের কাছে নড়েচড়ে বসলেন, চিন্তান্বিত কণ্ঠে বললেন, ‘ভদ্রমহিলা একটু একরোখা প্রকৃতির; আর মৃতা মহিলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে ঠিক মধুর ছিলো না, সেটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে৷’

এক মিনিট নীরব থেকে তিনি আত্মগতভাবে বললেন, ‘এটা একদিন দিয়ে আমাদের দুর্ভাগ্য, যে আজকের গোটা সকালের জন্যে মিস ব্রুস্টারের এক নিখুঁত অ্যালিবাই রয়েছে৷ আপনি কি তাঁর হাত দুটো লক্ষ্য করেছিলেন, স্যার? যে কোন পুরুষের মতো বড়সড়৷ তাছাড়া তাঁর শরীরের গঠনও বেশ ঋজু—আমি বলবো, অনেক পুরুষের চেয়ে তাঁর শক্তি বেশি...’

ইন্সপেক্টর থামলেন৷ পোয়ারোর প্রতি তাঁর দৃষ্টিতে যেন একরাশ মিনতি ঝরে পড়লো৷

‘আর আপনি বলছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, তিনি আজ সকালে একবারের জন্যেও বেলাভূমি ছেড়ে যাননি?’

পোয়ারো ধীর মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘প্রিয় ইন্সপেক্টর, মিস ব্রুস্টার যখন সমুদ্রতীরে আসেন, তখন মিসেস মার্শাল সম্ভবত পিক্সি কোভেই পৌঁছননি, এবং মিঃ রেডফার্নের সঙ্গে নৌকো নিয়ে বেরোবার সময় পর্যন্ত তিনি সর্বক্ষণ আমার চোখের সামনেই ছিলেন৷’

কলগেট হতাশা ভরা কণ্ঠে বললেন, ‘তাহলে তো তাঁকেও বাদ দিতে হয়৷’

এবং এই অনুসিদ্ধান্ত যথেষ্ট বিচলিত বলে মনে হলো৷

রোজমণ্ড ডার্নলির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বরাবরের মতো খুশির একটা উদ্বেল অনুভূতি এরকুল পোয়ারোকে দোলা দিয়ে গেলো৷

এমন কি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্ত সংক্রামিত নীরস পরিবেশেও রোজমণ্ড ওর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে উপস্থিত হলো৷

কর্নেল ওয়েস্টনের মুখোমুখি বসে বুদ্ধিদীপ্ত মুখমণ্ডলে গম্ভীর অভিব্যক্তি ফুটিয়ে ও প্রশ্ন করলো, ‘আপনারা বোধহয় আমার নাম ঠিকানা জানতে চান; রোজমণ্ড অ্যান ডার্নলি৷ ‘রোজামণ্ড লিমিটেড’ নামে ৬২২, ব্রুক স্ট্রীটে আমার একটা পোশাক তৈরি প্রতিষ্ঠান আছে৷’

‘ধন্যবাদ, মিস ডানলি৷ এবার বলুন, এমন কিছু আপনি জানেন, যা আমাদের তদন্তে সাহায্য করতে পারে?’

‘উহুঁ, সেরকম কিছু জানি বলে মনে হয় না৷’

‘আজ সকালে আপনার গতিবিধি—’

‘প্রায় সাড়ে ন’টা নাগাদ আমি প্রাতরাশ শেষ করি৷ তারপর ওপরে ঘরে গিয়ে কয়েকটা বই এবং সূর্য-আচ্ছাদন নিয়ে চলে যাই সানি লেজ-এ৷ তখন অন্তত দশটা পঁচিশ হবে৷ বারোটা বাজতে দশ নাগাদ আমি হোটেলে ফিরে আসি, ঘর থেকে টেনিস রাকেট নিয়ে টেনিস কোর্টে যাই, খেলেছি প্রায় মধ্যাহ্নভোজ পর্যন্ত৷’

‘আপনি তাহলে সাড়ে দশটা থেকে প্রায় বারোটা দশ পর্যন্ত ওই পাহাড়ের কিনারায় ছিলেন, অর্থাৎ হোটেল থেকে যে জায়গাটাকে সানি লেজ বলা হয়?’

‘হ্যাঁ৷’

‘আজ সকালে মিসেস মার্শালকে একবারও দেখেছিলেন?’

‘না৷’

‘তিনি যখন ভেলা ভাসিয়ে পিক্সি কোভের দিকে যান, তখন কি সানি লেজ থেকে আপনি তাঁকে দেখেছিলেন?’

‘না৷ হয়তো আমি সেখানে পৌঁছবার আগেই উনি ভেলায় চড়ে জায়গাটা পার হয়ে যান৷’

‘সানি লেজ-এ থাকাকালীন কোন নৌকো বা ভেলা আপনার নজরে পড়েনি?’

‘না, তাছাড়া আগেই তো বলেছি, আমি বই পড়ছিলাম৷ অবশ্য মাঝে মাঝে দু’একবার চোখ তুলে তাকিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তখন সমুদ্রে কোন ভেলা বা নৌকো দেখিনি৷’

‘তাহলে মিঃ রেডফার্ন এবং মিস ব্রস্টারকেও নিশ্চয়ই আপনি যেতে দেখেননি?’

‘না, দেখিনি৷’

‘মিঃ মার্শালের সঙ্গে তো আপনার আগে থাকতেই পরিচয় ছিলো, তাই না?’

ক্যাপ্টেন মার্শাল আমাদের পরিবারে একজন পুরনো বন্ধু৷ আমরা এক সময় পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম৷ মাঝে অবশ্য বেশ কয়েক বছর তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি—অন্তত বারো বছর তো হবেই—’

‘আর মিসেস মার্শাল?’

‘তাঁকে আমি এই দ্বীপে এসেই প্রথম দেখি৷’

ক্যাপ্টেন ও মিসেস মার্শালের মধ্যে সম্পর্ক তো ভালোই ছিলো, কি বলেন?’

‘খুবই ভালো ছিলো—অন্তত আমি যদ্দুর জানি৷’

‘ক্যাপ্টেন মার্শাল কি স্ত্রীর প্রতি খুব অনুরক্ত ছিলেন?’

রোজমণ্ড বলল, ‘হয়তো ছিলেন—আমার পক্ষে সেটা সঠিক বলা সম্ভব নয়৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল ব্যবহারে একটু সেকেলে প্রকৃতির—সাংসারিক দুঃখ-দুর্দশার কথা পাঁচজনকে বলে বেড়াবার মতো ‘আধুনিক’ তিনি নন৷’

‘মিসেস মার্শালকে আপনি পছন্দ করতেন, মিস ডার্নলি?’

‘না৷’

ছোট এক অক্ষরের শব্দটা শান্ত এবং মসৃণ কণ্ঠে উচ্চারিত হলো৷ উচ্চারণের ভঙ্গীতে বক্তব্যের চরিত্র রইলো না—যেন একটা সহজ সত্যের নিষ্পাপ বিবৃতি৷

‘কারণটা জানতে পারি—?’

রোজামণ্ডের ঠোঁটে অর্ধস্ফুট হাসির ছোঁয়া রেখাপাত করলো৷ ও বললো, ‘ইতিমধ্যে আপনারা নিশ্চয়ই এটুকু আবিষ্কার করেছেন, মহিলা মহলে আর্লেনা মার্শাল তেমন জনপ্রিয় ছিলেন না৷ মেয়েদের আসরে উনি একঘেয়েমিতে ক্লান্ত হয়ে পড়তেন এবং মুখেও সেই বিরক্তি প্রকাশ করতেন৷ এত সত্ত্বেও আমি কিন্তু আর্লেনার পোশাকের প্রশংসা না করে পারছি না৷ পোশাক নির্বাচন এবং পরিধানের ব্যাপারে ওঁর কতকগুলো সহজ গুণ ছিলো৷ ওঁকে আমরা দোকানের খদ্দের হিসেবে পেলে আমি সত্যিই খুশি হতাম৷’

‘পোশাক-আশাকের পেছনে তিনি নিশ্চয়ই খুব খরচ করতেন?’

‘নিশ্চয়ই করতেন, কারণ ওঁর নিজের তো পয়সার অভাব ছিল না, তা ছাড়া ক্যাপ্টেন মার্শালও বেশ অবস্থাপন্ন লোক—’

‘একথা কি কখনও শুনেছেন, বা আপনার মনে হয়েছে মিস ডানলি, যে মিসেস মার্শালকে কেউ ব্ল্যাকমেল করছিলো?’

রোজামণ্ড ডার্নলির অভিব্যক্তিপূর্ণ মুখমণ্ডলে ফুটে উঠলো তীব্র বিস্ময়৷ ও বললো, ব্ল্যাকমেল করছিলো? আর্লেনাকে?’

‘মনে হচ্ছে, আপনি যেন বেশ অবাক হচ্ছেন?’

‘হ্যাঁ, বলতে পারেন, একরকম তাই৷ কারণ ব্যাপারটা এত বেমানান লাগছে—’

‘কিন্তু অসম্ভব তো নয়!’

‘না, অসম্ভব নয়৷ এ পৃথিবীতে সবকিছুই যে সম্ভব, সেটা ঠেকে শিখতে আমাদের বেশি সময় লাগে না, তাই না? কিন্তু আমি অবাক হচ্ছি এই কথা ভেবে, আর্লেনাকে কোন অজুহাতে ব্ল্যাকমেল করা হচ্ছিলো৷’

‘হয়তো এমন কতকগুলো বিষয় ছিলো, আমার মনে হয় যেগুলো মিসেস মার্শাল চাননি যে তাঁর স্বামীর কানে যাক৷’

‘ওহ-হ্যাঁ, হতে পারে—’

কণ্ঠস্বরে ফুটে ওঠে দ্বিধার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মৃদু হাসলো রোজামণ্ড, বললে, ‘আমাকে অবাক করার কারণ আশা করি বুঝতে পারছেন। মানে আর্লেনা বরাবরই ওর আচার-আচরণে একটু বেপরোয়া ছিলো৷ কখনই ও নিজেকে সতী সাবিত্রী বলে জাহির করার চেষ্টা করতো না৷’

‘তাহলে আপনার ধারণা অন্যান্য পুরুষদের সঙ্গে মিসেস মার্শালের ইয়ে, অন্তরতার কথা তাঁর স্বামী জানতেন?’

কিছুক্ষণ নীরবতা৷ রোজামণ্ডের কপালে চিন্তার সূক্ষ্ম রেখা৷ অবশেষে অনিচ্ছাভরা মৃদু স্বরে ও নৈঃশব্দ ভঙ্গ করলো, ‘ব্যাপারটা কি জানেন, কি যে ধারণা করবো সেটা আমি নিজেই ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না৷ বরাবরই আমার মনে হয়েছে, কেনেথ মার্শাল আর্লেনাকে আর্লেনা হিসেবেই সরাসরি মেনে নিয়েছেন৷ ওঁর সম্পর্কে তাঁর মনে কোন ভ্রান্ত ধারণা ছিলো না৷ কিন্তু কি জানি, আমার অনুমান ঠিক নাও হতে পারে৷’

‘হয়তো তিনি স্ত্রীকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতেন?’

রোজমণ্ড ঈষৎ উত্ত্যক্ত কণ্ঠে বললো, ‘পুরুষেরা ভীষণ বোকা৷ আর কেনেথ মার্শাল তাঁর কৃত্রিম মার্জিত আচরণের আড়ালে প্রকৃতপক্ষে একজন অসাংসারিক পুরুষ৷ সুতরাং তাঁর পক্ষে স্ত্রীকে অন্ধ বিশ্বাস করাটা কিছু অসম্ভব নয়৷ হয়তো তিনি ভেবেছেন, অন্যান্য পুরুষেরা তাঁর স্ত্রীর রূপমুগ্ধ ভক্ত মাত্র—তার বেশি কিছু নয়৷

‘তাহলে আপনি এমন কাউকে জানেন না—মানে, এমন কারো কথা শোনেননি, যাঁর পক্ষে মিসেস মার্শালের সঙ্গে শত্রুতা বা কোন আক্রোশ থাকা সম্ভব?’

রোজামণ্ড ডার্নলি হাসলো, বললো, ‘হ্যাঁ জানি, শুধু মাত্র ক্ষুব্ধ স্ত্রীদেরই আর্লেনার ওপর আক্রোশ ছিলো৷ কিন্তু যেহেতু ও শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে, সেহেতু আমি ধরেই নিচ্ছি ওকে খুন করেছে কোন পুরুষ৷’

‘ঠিকই বলেছেন—’

রোজামণ্ড চিন্তান্বিত কণ্ঠে বললো, ‘না, তেমন কোন পুরুষের কথা আমি বিশেষ করে বলতে পারছি না৷ অবশ্য আমার পক্ষে সঠিক জানার সম্ভাবনাও কম৷ আপনারা বরং আর্লেনার অন্তরঙ্গ সঙ্গীদের কাউকে জিগ্যেস করে দেখতে পারেন৷’

‘ধন্যবাদ, মিস ডার্নলি৷’

রোজামণ্ড চেয়ারে সামান্য ঘুরে বসলো, বললো, ‘মঁসিয়ে পোয়ারো, কি, জিগ্যেস করার মতো কোন প্রশ্ন নেই?’

‘ওর মুখমণ্ডলে ফুটে ওঠা হাসিতে শ্লেষের ছোঁয়া পোয়ারোর দিকে ঝিলিক মারলো৷

এরকুল পোয়োরো হাসলেন এবং মাথা নাড়লেন৷

তিনি বললেন, ‘না—এই মুহূর্তে কোন প্রশ্নের কথা মনে করতে পারছি না৷’

রোজামণ্ড ডার্নলি উঠে দাঁড়ালো, নিষ্ক্রান্ত হলো ঘর থেকে৷

অষ্টম পরিচ্ছেদ

আর্লেনা মার্শালের শোবার ঘরে ওঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন৷

দুটো বিশাল জানলা সামনের অলিন্দের সীমারেখা ছাড়িয়ে চোখ মেলে দিয়েছে সুনীল সাগরে এবং সংলগ্ন বেলাভূমির দিকে৷ আর্লেনা প্রসাধন টেবিলে রক্ষিত একরাশ শিশি-বোতলের বিভ্রান্তিকর জটিলতায় ঠিকরে পড়েছে সোনালী রোদ৷

প্রসাধন প্রতিষ্ঠানের পরিচিত সর্বপ্রকার প্রসাধান দ্রব্য এবং অনুলেপন এখানে উপস্থিত৷ স্ত্রীলোক-সংক্রান্ত আসবাবে পরিপূর্ণ ঘরে তিনজন পুরুষ বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে ইতস্তত ঘুরে বেড়াতে লাগলেন৷ ইন্সপেক্টর কলগেট ড্রয়ারগুলো যথাক্রমে খুলতে এবং বন্ধ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷

অনতিবিলম্বে তাঁর মুখ দিয়ে একটা গম্ভীর অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এলো৷ কারণ তিনি আবিষ্কার করেছেন একগোছা ভাঁজ করা চিঠি৷ তিনি এবং ওয়েস্টন চিঠিগুলো পড়ে দেখতে লাগলেন৷

এরকুল পোয়ারো ইতিমধ্যে এগিয়ে গেছেন পোশাকের আলমারির দিকে৷ দরজার একটা পাল্লা খুলতেই চোখে পড়লো রাশি রাশি বিভিন্ন আধুনিক পোশাক৷ পোয়ারো এবার অবশিষ্ট পাল্লাটা খুললেন৷ সফেন অন্তর্বাসের সমারোহ এক স্তুপের সৃষ্টি করেছে৷ একটা চওড়া তাকে রয়েছে অসংখ্য টুপি: গাঢ় লাল ও ফিকে হলুদ রঙের আরও দুটো কার্ডবোর্ডের সৈকত-টুপি—একটা বড় হাওয়াই ঘাসের টুপি—আরও একটা ঘন নীল কাপড়ে তৈরি, এছাড়া রয়েছে, তিন-চারটে অদ্ভুত আকারের টুপি, যেগুলোর পেছনে নিঃসন্দেহে কয়েক গিনি করে খরচ করা হয়েছে—একটা গাঢ় নীল রঙের সৈনিকের টুপি—কালো মখমলের একটা গুচ্ছ—এবং বিবর্ণ ধূসর একটা পাগড়ি৷

এরকুল পোয়ারো নিশ্চল দাঁড়িয়ে পোশাকগুলো পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন৷ এক টুকরো প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠলো তাঁর ঠোঁটে৷ মৃদু স্বরে মন্তব্য করলেন তিনি, ‘স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম৷’

কর্নেল ওয়েস্টন চিঠিগুলো ভাঁজ করে রাখছিলেন৷

‘তিনটে লিখেছে রেডফার্ন ছেলেটা,’ তিনি বললেন, কবে যে ওর বুদ্ধিশুদ্ধি হবে৷ মেয়েদের যে কখনও চিঠি লিখতে নেই, সেটা আশা করি বছর কয়েকের মধ্যেই ও ঠেকে শিখবে৷ মেয়েরা চিরকালই চিঠিপত্র যত্ন করে জমিয়ে রাখে, আর মুখে দিব্যি গেলে বলে সেগুলো তারা পুড়িয়ে ফেলেচে৷ এছাড়া আরও একটা চিঠি এখানে রয়েছে৷ ওই একই পদের৷’

চিঠিটা তিনি পোয়ারোর দিকে এগিয়ে দিলেন৷

‘প্রিয়তমা আর্লেনা—যদি বুঝতে আমার দুঃখ৷ আমি চলে যাচ্ছি সুদূর চীনদেশে—হয়তো তোমাকে আর দেখতে পাবে—না৷ কখনও ভাবিনি, কোন পুরুষ কোন মেয়েকে এত গভীরভাবে ভালোবাসতে পারে, যেমন তোমাকে বেসেছি আমি৷ চেকটার জন্যে ধন্যবাদ৷ ওরা আমাকে সাজা থেকে এবার মুক্তি দেবে৷ খুব অল্পের জন্য বেঁচে গেছি৷ এত সবের কারণ আমি চেয়েছিলাম বড়লোক হতে—তাও তোমারই জন্যে৷ আমাকে ক্ষমা করবে তো? আমি চেয়েছিলাম তোমার কানে—তোমার সুন্দর নরম কানে, হীরের বন্যা বইয়ে দিতে—চেয়েছিলাম তোমার কানে—তোমার সুন্দর নরম কানে, হীরের বন্যা বইয়ে দিতে—চেয়েছিলাম দুধ-সাদা মুক্তোর মালা তোমার গলায় পরিয়ে দিতে, কিন্তু লোকে বলে মুক্তোর নাকি এখন কদর নেই৷ তাহলে একটা বিশাল সবুজ পাল্লা, কি বলো? হ্যাঁ, তাই দেবো৷ একটা বিশ্বাস পান্না, শীতল এবং সবুজ প্রচ্ছন্ন আগুনে টইটম্বুর৷ আমাকে ভুলে যেও না যেন—জানি, ভুলবে না৷ তুমি আমার—চিরকালের জন্যে আমার৷

বিদায়—বিদায়—বিদায়

‘জে. এন’

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘এই জে. এন৷ সত্যিই চীনে গিয়েছিলো কিনা খোঁজ করে দেখলে কাজ হবে৷ আর তা যদি না হয়, তাহলে—বুঝতেই পারছেন, সম্ভবত সে-ই আমাদের প্রার্থিত ব্যক্তি৷ অন্ধের মতো মহিলাটিকে ভালোবাসতো, হয়তো পুজোই করতে তারপর হঠাৎ একদিন জানতে পারলো, তাকে ঠকানো হয়েছে৷ দেখে শুনে মনে হচ্ছে, মিস ব্রুস্টার সম্ভবত এই ছেলেটির কথাই বলেছিলেন৷ হ্যাঁ, মনে হয়, এতে হয়তো কাজ হবে৷’

এরকুল পোয়ারো মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘হ্যাঁ, এই চিঠিটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ৷ আমার মতে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ৷’

পোয়ারো ঘুরে দাঁড়ালেন, অপলকে চেয়ে রইলেন ঘরস্থ আসবারের দিকে—প্রসাধন টেবিলে রাখা অসংখ্য শিশিবোতলের দিকে—খোলা পোশাকের আলমারির দিকে, এবং সবশেষে তাঁর নজর পড়লো, উদ্ধত অলস ভঙ্গীতে বিছানায় শুয়ে থাকা বড়সড় জোকার পুতুলের দিকে৷

এবার ওঁরা কেনেথ মার্শালের ঘরে প্রবেশ করলেন৷

ঘরটা তাঁর স্ত্রীর ঘরে লাগোয়া, কিন্তু দু-ঘরে মাঝে যোগাযোগকারী কোন দরজা নেই, এবং বারান্দাও নেই৷ ঘরটার মুখ একই দিকে এবং দুটো জানলা আছে, তবে অনেক ছোট৷ দু-জানলার মাঝে দেওয়ালে টাঙানো রয়েছে সোনালী ফ্রেমে বাঁধানো একটা আয়না৷ ডান দিকের জানলা ছাড়িয়ে ঘরের এক কোণে রয়েছে প্রসাধন-টেবিল৷ টেবিলে রয়েছে দুটো গজদন্তের বুরুশ, একটা পোশাক পরিষ্কারের বুরুশ এবং এক শিশি কেশ প্রসাধনের আরক৷ বাঁ দিকের জানলার পাশে, ঘরে অন্য প্রান্তে, রয়েছে লেখার টেবিল৷ একটা খোলা টাইপরাইটার টেবিলে বসানো, এবং তার পাশে স্তুপাকারে সাজানো রয়েছে একরাশ কাগজ৷

কলগেট ক্ষিপ্ত অভ্যস্ত ভঙ্গীতে তাঁর অনুসন্ধানের কাজ শুরু করলেন৷

তিনি বললেন, ‘আপাতদৃষ্টিতে সবকিছুই বেশ সহজ সরল মনে হচ্ছে৷ ও, এই তো সেই চিঠিটা, যেটার কথা উনি আজ সকালে বলেছিলেন৷ তারিখ দেওয়া আছে ২৪শে—অর্থাৎ গতকালের৷ আর এই যে সেই খামটা—লেদারকোম্ব বে ডাকঘরের আজ সকালের ছাপ রয়েছে৷ সুতরাং কারচুপির কোন প্রশ্ন নেই৷ এবার আমাদের জানতে হবে, এই চিঠির উত্তর তাঁর পক্ষে আগে থাকতেই তৈরি করে রাখা সম্ভব ছিলো কিনা৷’

তিনি চেয়ারে বসলেন৷

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘তোমাকে কিছুক্ষণের জন্যে এ কাজে ছেড়ে যাচ্ছি। আমরা বাকি ঘরগুলোয় একবার চোখ বুলিয়ে নিই। সকাল থেকেই সবাইকে ঘরছাড়া করে নিচে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে, তাঁরা ক্রমশ অধৈর্য হয়ে পড়েছেন।’

ওঁরা দুজন ঢুকলেন লিন্ডা মার্শালের ঘরে। পূর্ব দিকের পাথুরে পাহাড়ী এলাকা ছাড়িয়ে নীল সমুদ্রের দিকে চোখ মেলে দিয়েছে ঘরটা।

ওয়েস্টন ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিলেন। মৃদু স্বরে বললেন, ‘মনে হয় না এ ঘরে দেখার মতো কিছু আছে। তবে এও সম্ভব, মার্শাল হয়তো তাঁর মেয়ের ঘরে এমন কিছু লুকিয়ে রেখেছে, যা আমাদের নজরে পড়ুক সে চায় না; অবশ্য তার সম্ভাবনা কম। কারণ খুনের কোন হাতিয়ার বা অন্য কিছু সরিয়ে ফেলার ব্যাপার তো এখানে নেই। ‘

তিনি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।

এরকুল পোয়ারো ঘরেই রয়ে গেলেন। অগ্নি-আধারে আবিষ্কৃত কয়েকটা জিনিস তাঁকে কৌতূহলী করে তুলেছেন। খুব সদ্য কোন কিছু সেখানে পোড়ানো হয়েছে। তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন, ধৈর্য ধরে কাজ শুরু করলেন। তাঁর আবিষ্কার একটা সাদা কাগজে গুছিয়ে রাখলেন তিনি। অসম আকৃতির বিশাল এক টুকরো গলা মোম—কিছু সবুজ কাগজ অথবা পিচবোর্ডের ছিন্ন অংশ—সম্ভবত কোন ক্যালেন্ডারের, কারণ তার সামান্য অক্ষত অংশে বড় অক্ষরে ‘৫’ লেখা, এবং চোখে পড়ছে একটু ছাপা অংশ: ‘...মহৎ কর্ম...।’ এছাড়াও রয়েছে একটা সাধারণ পিন এবং সম্ভবত কোন পশুর দগ্ধ লোম।

পোয়ারো নিখুঁত সারিতে জিনিসগুলো সাজিয়ে সেদিকে অপলকে চেয়ে রইলেন। তিনি মৃদু স্বরে উচ্চারণ করলেন, ‘ “জীবন মহৎ কর্ম চিন্তায় ফল নাই, সম্পাদনে ফল আছে। “হয়তো এ কথাই লেখা ছিলো। কিন্তু এদের উদ্ভট জিনিসের অর্থ কি? আশ্চর্য!’

আর সেই মুহূর্তে ছোট্ট পিনটা হাতে নিতেই তাঁর চোখ তীক্ষ্ণ ও সবুজ হয়ে উঠলো।

অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করলেন, তিনি, ‘হুঁ...কিন্তু এও কি সম্ভব?’

অগ্নি-আধারের কাছ থেকে উঠে দাঁড়ালেন এরকুল পোয়ারো।

সম্পূর্ণ নতুন চোখে ধীরে ঘরের চারদিকে আর একবার তিনি নজর বুলিয়ে নিলেন। মুখে থমথমে নিরুত্তাপ অভিব্যক্তি।

অগ্নি-আধারে ওপরেই শ্বেতপাথরের লম্বা তাক। তাকের বাঁ দিকে শেলফে সাজানো কয়েকটা বই। এরকুল পোয়ারো চিন্তান্বিত মুখে বইয়ের নামগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিলেন।

একটা বাইবেল, শেক্সপীয়রীয় নাটকের জরাজীর্ণ একটি সংকলন। মিসেস হামফ্রি ওয়ার্ড রচিত ‘দ্য ম্যারেজ অফ উইলিয়াম অ্যাশ’। শার্লট ইয়ং-এর লেখা, ‘দ্য ইয়াং স্টেপমাদার৷’ ‘দ্য শ্রপশায়ার ল্যান্ড৷’ ইলিয়ডের ‘মার্ডার ইন দ্য ক্যাথিড্রাল।’ বার্নাড শয়ের ‘সেন্ট জোয়ান’। মার্গারেট মিচেল-এর ‘গন উইথ দ্য উইন্ড’। আর সব শেষে ডিক্সন কার এর ‘দ্য বার্নিং কোর্ট’।

দুটো বই বের করে নিলেন পোয়ারো, দ্য ইয়াং স্টেপমাদার’ এবং ‘উইলিয়ম অ্যাশ’, বই দুটোর নামপত্রে বসানো অস্পস্ট রবার ছাপগুলো চোখ বুলিয়ে দেখলেন৷ বই দুটো তাকে ফিরিয়ে রাখতে গিয়েই আর একটা বই তাঁর নজরে পড়লো৷ অন্যান্য বইগুলোর পেছনে লুকিয়ে রাখা এই বইটি আকারে খাটো অথচ মোটা৷ বাদামী চামড়া দিয়ে বাঁধানো৷

বইটা হাতে নিয়ে খুললেন তিনি৷ তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন৷

অস্ফুটস্বরে বললেন, তিনি, ‘সুতরাং, আমার ধারণাই দেখছি ঠিক... না, কোন ভুল আমার হয়নি৷ কিন্তু অন্য ব্যাপারটা—সেটাও কি সম্ভব?’ উহুঁ, তা সম্ভব নয়, যদি না...’

নিথর দাঁড়িয়ে রইলেন, তিনি অন্যমনস্কভাবে গোঁফে হাত বোলাতে লাগলেন, তাঁর মন তখন এই সমস্যাকে ঘিরে আলোড়ন তুলে চলেছে৷

অস্পষ্ট কণ্ঠে দ্বিতীয়বার উচ্চারণ করলেন তিনি, ‘যদি না...?’

কর্নেল ওয়েস্টন দরজায় উঁকি মারলেন৷

‘কি হলো, মঁসিয়ে পোয়ারো, এখনও হয়নি?’

‘আসছি, আসছি৷’ সরবে বলে উঠলেন পোয়ারো৷

তিনি ঘর ছেড়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন বারান্দায়৷

লিন্ডার ঠিক পাশের ঘরটাই রেডফার্নদের৷

ঘরটা ভালো করে দেখলেন পোয়ারো৷ অনিবার্যভাবেই দুটো ভিন্ন স্বাতন্ত্র্যের ছাপ তাঁর নজরে পড়লো—প্রথমটা, পরিষ্কার এবং পরিচ্ছন্নতা, যেটা তিনি ক্রিস্টিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করলেন, এবং দ্বিতীয়টা স্পষ্ট বিশলঙ্খলা—বা প্যাট্রিকের চরিত্রানুগ৷ এই দুটো ভিন্ন ব্যক্তিত্বের ভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছাড়া অন্য কিছু তেমন ভাবে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলো না৷

এর পরে ঘরটা রোজমণ্ড ডার্নলির; এবং ঘরে মালিকের ব্যক্তিত্বের কারণে এ ঘরে নিছক আনন্দেই কিছু সময় কাটিয়ে দিলেন তিনি৷

বিছানার পাশে টেবিলে রাখা কয়েকটা বই ও প্রসাধন-টেবিলে সাজানো প্রসাধন সামগ্রীর ব্যয়বহুল সরলতা তিনি প্রশংসা সহকারে লক্ষ্য করলেন৷ এবং রোজামণ্ড ডার্নলি যে বহুমূল্য সুগন্ধী ব্যবহার করেন তার ছলনাময়ী সৌরভ তাঁর নাসারন্ধ্রে এসে প্রবেশ করলো৷

রোজামণ্ড ডার্নলির ঘরে ঠিক পরেই, উত্তর প্রান্তে, একটা খোলা দরজা এবং দরজাসংলগ্ন বারান্দা৷ বারান্দা থেকে সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের পাথুরে জমিতে৷

ওয়েস্টন বললেন, প্রাতরাশের আগে স্নান করার থাকলে সবাই এই সিঁড়িটাই ব্যবহার করে—’

এরকুল পোয়ারো চোখে কৌতূহল ঝিলিক মারলো৷ তিনি বাইরে এসে নিচের দিকে তাকালেন৷

একটা সরু পথ গিয়ে মিশেছে পাথর কেটে তৈরি আঁকাবাঁকা কয়েক ধাপ সিঁড়িতে। সিঁড়ি শেষ হয়েছে সমুদ্রে৷ এছাড়া আরও একটা পথ হোটেলকে ঘিরে বাঁ দিক দিয়ে চলে গেছে৷

তিনি বললেন, ‘এই সিঁড়ি নেমে, বাঁ দিকের পথ ধরে যে কেউ কংক্রিটের সেতুর কাছে প্রধান রাস্তায় পৌঁছতে পারে৷’

ওয়েস্টন সম্মতি জানিয়ে মাথা দোলালেন৷ পোয়ারোর মন্তব্যকে বিস্তারিত করলেন তিনি৷

‘সুতরাং হোটেলের মধ্যে দিয়ে না গিয়েও কারও পক্ষে দ্বীপের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত যাওয়া সম্ভব৷’ তিনি আরও যোগ করলেন, ‘কিন্তু সে ক্ষেত্রে কোন জানলা থেকে কারো নজরে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে৷’

‘কোন জানলা?’

‘সবার ব্যবহারের স্নান-ঘরগুলোর দুটোর জানলা ওই দিকে—উত্তর দিকে—এ ছাড়াও আছে কর্মচারীদের স্নান-ঘর, একতলার মালপত্র রাখার ঘর৷ আর সবশেষে রয়েছে বিলিয়ার্ড-ঘর৷

পোয়ারো সম্মতি জানালেন, বললেন, ‘কিন্তু প্রথম জানলাগুলোর লাগানো আছে ঘষা কাঁচ, আর সুন্দর সকালে কেউ কখনও বিলিয়ার্ড খেলে না৷’

‘ঠিক তাই৷’

একটু থামলেন ওয়েস্টন, তারপর বললেন, ‘সুতরাং এ যদি তাঁর কাজ হয়ে থাকে, তাহলে আজ সকালে এই পথ ধরেই তিনি গিয়ছিলেন৷’

‘মানে ক্যাপ্টেন মার্শাল?’

‘হ্যাঁ৷ ব্ল্যাকমেল-এর ব্যাপারটা সত্যি হোক আর নাই হোক, আমার এখনও মনে হচ্ছে, সব কিছু যেন তাঁরই দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছে৷ আর তাঁর ব্যবহার—তাঁর ব্যবহার রীতিমতো দুভাগ্যজনক৷’

এরকুল পোয়ারো নীরস কণ্ঠে বললেন, ‘হয়তো কিন্তু শুধুমাত্র ব্যবহারে অজুহাতে কাউকে খুনী সাব্যস্ত করা যায়৷!’

ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে আপনার ধারণা তিনি নির্দোষ?

পোয়ারো মাথা নাড়লেন, ‘না, সে কথা আমি বলবো না৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘দেখা যাক, ওই টাইপরাইটার-অ্যালিবাই থেকে কলগেট কদ্দূর কি করতে পারে৷ এদিকে হোটেলের যে পরিচারিকা এই অংশের দেখাশোনায় ছিলো সে জবানবন্দি দেবার জন্যে অপেক্ষা করছে৷ তার সাক্ষ্যের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করতে পারে৷’

পরিচারিকাটির বয়েস আনুমানিক তিরিশ৷ চটপটে, কর্মঠ, এবং বুদ্ধিমতী৷ প্রশ্নের জবাবে তার উত্তর পাওয়া গেলো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই৷

ক্যাপ্টেন মার্শাল তাঁর ঘরে উঠে পড়েন সাড়ে দশটার সামান্য পরেই৷ সে তখন ঘর ঝাড়পোঁছ করছিলো৷ তিনি তাকে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করতে বলে চলে যান৷ না, সে তাঁকে ফিরে আসতে দেখেনি বটে কিন্তু একটু পরে তাঁর টাইপরাইটারের শব্দ শুনেছে৷ তখন এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট মতো৷ সেই সময়ে সে মিঃ এবং মিসেস রেডফার্নের ঘরে কাজ করছিলো৷ ওই ঘরের কাজ শেষ করে সে হাত দেয় মিল ডার্নলির ঘরের বারান্দার একেবারে শেষ দিকের ঘরটা৷ সেখান থেকে টাইপরাইটারের শব্দ তার কানে আসেনি৷ মিস ডার্নলির ঘরে সে ঢোকে, যদ্দুর তার মনে পড়েছে, এগারোটার ঠিক পরেই৷ কারণ ঘরে ঢোকার সময় লেদারকোম্ব গীর্জার এগারোটার ঘণ্টা সে শুনতে পায়ে৷ সওয়া এগারোটা নাগাদ সে নিচে যায় প্রাত্যহিক চা ‘জলখাবার’ খেতে৷ তার পরে হোটেলের অন্য অংশের ঘরগুলো ঝাঁড়পোঁছ করতে বেরিয়ে পড়ে৷ পুলিশ প্রধানের প্রশ্নের সে উত্তরে বললো, এই অংশের ঘরগুলো সে নিম্নোক্ত ক্রমানুসারে পরিষ্কার করেছে :

মিস লিন্ডা মর্শালের ঘর, দুটো সর্বসাধারণের স্নান-ঘর, মিসেস মার্শালের ঘর এবং তাঁর নিজস্ব স্নান-ঘর, মিস ডার্নলির ঘর ও স্নান-ঘর৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল ও মিস মার্শালের ঘরে কোন লাগোয়া স্নান-ঘর ছিলো না৷

যখন সে মিস ডার্নলির ঘর ও স্নান ঘর নিয়ে ব্যস্ত ছিলো তখন দরজার পাশ দিয়ে কারও হেঁটে যাওয়ার অথবা বারান্দায় সিঁড়ি বেয়ে কারও নামার শব্দ সে শোনেনি, অবশ্য চুপিসাড়ে কেউ হেঁটে গেলে সে পায়ের শব্দ তার পক্ষে না শোনাটাই স্বাভাবিক৷

ওয়েস্টন প্রশ্ন এবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে মিসেস মার্শালের দিকে মোড় নিলো৷

না, খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা মিসেস মার্শালের অভ্যাস ছিলো না৷

তাই দশটা নাগাদ দরজা খোলা পেয়ে এবং মিসেস মার্শালকে ঘরে না দেখে সে, গ্ল্যাডিস-ন্যারাকট, একটু অবাকই হয়েছিলো৷ ব্যাপারটা রীতিমতো অস্বাভাবিক৷

‘মিসেস মার্শাল কি তাঁর প্রাতরাশ রোজ বিছানাতেই সারতেন?’

‘ওহ্-হ্যাঁ, স্যার, রোজই৷ অবশ্য প্রাতরাশ বলতে সামান্য এক কাপ চা, একটু কমলালেবুর রস, ও এক টুকরো সেঁকা পাউরুটি৷ বেশির ভাগ মেয়েদের মতো রোগা থাকতে চাইতেন কিনা!’

না, মিসেস মার্শালের ব্যবহারে অস্বাভাবিক কিছু তার নজরে পড়েনি৷ বরং রোজকার মতোই স্বাভাবিক ছিলো৷

এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘মিসেস মার্শাল সম্পর্কে তোমার ধারণা কি, মাদমোয়াজেল?’

গ্ল্যাডিস ন্যারাকট নির্বাকভাবে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷ অবশেষে বললো, ‘তার মতো বড়লোকের কথা কি আমার ছোট মুখে মানায়, আপনিই বলুন স্যার?’

‘হ্যাঁ, মানায়, তুমি নইলে বলবে কে! তোমার নিজস্ব মতামত শুনতে আমরা আগ্রহী—অত্যন্ত আগ্রহী৷’

গ্ল্যাডিস ঈষৎ অস্বস্তিভরা চোখে, তাকালো পুলিশ-প্রধানের দিকে৷ তিনি মুখ সম্মতি ও সহানুভূতি ফুটিয়ে তোলার প্রবল চেষ্টা করলেও মনে মনে তাঁর পরদেশী বন্ধুর বিচিত্র তদন্ত-পদ্ধতিতে অস্বস্তি বোধ করলেন৷ মুখে বললেন, ‘অ্যাঁ—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই৷ ভয় কি—বলো৷’

এই প্রথম দ্রুত কর্মদক্ষতা গ্ল্যাডিসের চরিত্রে অনুপস্থিত বলে মনে হলো ছাপা পোশাকের প্রান্ত নিয়ে নাড়াচাড়া করে চললো ওর হাতের আঙুলগুলো৷ ও বললো, ‘মিসেস মার্শাল—ভদ্রমহিলা বলতে যা বোঝায় ঠিক তা ছিলেন না৷ মানে, ওঁকে দেখে কেমন যেন অভিনেত্রী-অভিনেত্রী মনে হতো৷’

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘তিনি অভিনেত্রী ছিলেন৷’

‘হ্যাঁ, স্যার, আমিও সেই কথাই বলতে চাইছি৷ তিনি মনের ভাব কখনও ব্যবহারে গোপন করার চেষ্টা করতেন না৷ যেমন ভেতরে ভেতরে শান্ত না হয়ে থাকলে তিনি কখনও শান্তভাব দেখবার জন্যে ইয়ে কষ্ট করতেন না৷ এই হয়তো খুশি আছেন, হাসছেন, আবার পরমুহূর্ত হয়তো কিছু খুঁজে না পেলে, বা তাঁর ডাকে সাড়া দিতে দেরি করলে, অথবা কাচা পোশাক-আশাক সময়মতো ফেরত না পেলে, অত্যন্ত খারাপ এবং নোংরা ব্যবহার করতেন৷ আমাদের কেউই তাঁকে ঠিক পছন্দ করতো না৷ কিন্তু তাঁর পোশাকগুলো ছিলো দারুণ চমৎকার, দেখতেও ছিলেন সুন্দরী—সুতরাং সকলেই যে তাঁকে শ্রদ্ধা এবং প্রশংসা করবে এ আর আশ্চর্য কি!’

কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘এবার তোমাকে যে প্রশ্ন করবার জন্যে আমি আন্তরিক দুঃখিত, গ্ল্যাডিস, কিন্তু প্রশ্নটা ভীষণ জরুরী৷ আচ্ছা, মিসেস মার্শাল এবং তাঁর স্বামীর মধ্যে সম্পর্ক কিরকম ছিলো বলতে পারো?’

গ্ল্যাডিস ন্যারাকট মিনিটখানেক ইতস্তত করলো৷

তারপর বলল, ‘আপনারা নিশ্চয়ই—মানে আপনারা কি—আপনারা নিশ্চয়ই তাঁর স্বামীকে সন্দেহ করছেন না?’

এরকুল পোয়ারো প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘তোমার কি মনে হয়?’

‘ওঃ, আমার? আমার তা মনে হয় না৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল এত চমৎকার ভদ্রলোক। এ কাজ তিনি কখনোই করতে পারেন না—কোনমতেই না৷’

কিন্তু তুমি পুরোপুরি নিশ্চিত নও—তোমার কথাতেই বুঝতে পারছি৷’

অনিচ্ছা সত্ত্বেও গ্ল্যাডিস ন্যারাকট বলল, ‘এ রকম ঘটনা কাগজে প্রায়ই বেরোয়৷ সাধারণত যখন ঈর্ষার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে৷ এ ক্ষেত্রেও সেরকম একটা কানাঘুষো—সকলেই তো প্রায় ওই কথা নিয়ে আলোচনা করছে—মানে, মিসেস মার্শাল আর মিঃ রেডফার্নের ব্যাপারটা নিয়ে। আর মিসেস রেডফার্ন এত শান্ত মহিলা! সত্যিই লজ্জার কথা! অবশ্য মিঃ রেডফার্নও যথেষ্ট ভদ্রলোক, কিন্তু মনে হয়, মিসেস মার্শালের মতো মহিলার কাছে কোন পুরুষই নিজেকে ধরে রাখতে পারে না—বিশেষ করে উনি যখন আবার নিজের খেয়াল-খুশিমতো চলেন৷
এখানে প্রত্যেকে স্ত্রীকেই অনেক না-পসন্দ ব্যাপার সহ্য করতে হতো৷’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একমুহূর্ত থামলো ও, ‘কিন্তু ক্যাপ্টেন মার্শালের কানে যদি ব্যাপারটা উঠে থাকে—’

কর্নেল ওয়েস্টন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেন, ‘তাহলে?’

গ্ল্যাডিস ন্যারাকট ধীর স্বরে বললো, ‘কখনও কখনও আমার মনে হয়েছে মিসেস মার্শাল এসব ঘটনা তাঁর স্বামীর কানে যাবে এই কথা ভেবে ভয় পেতেন৷’

‘তোমার এ ধারণার কারণ?’

‘তেমন কোন জোরালো কারণ নেই, স্যার৷ এমনিই মনে হয়েছিলো যে—কখনও কখনও তিনি যেন তাঁর স্বামীকে—ভয় করতেন৷ তিনি খুব শান্ত মানুষ, কিন্তু—যাকে বলে ঠিক সহজ লোক নন৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে এ ধারণার পেছনে স্পষ্ট কোন প্রমাণ তোমার কাছে নেই? ওঁদের কথাবার্তা থেকে সেরকম কোন আঁচ পাওনি?’

গ্ল্যাডিস ন্যারাকট আস্তে আস্তে মাথা নাড়লো৷

ওয়েস্টন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে চললেন, ‘এবার তাহলে মিসেস মার্শালের আজ সকালে পাওয়া চিঠিপত্রের কথায় আসা যাক৷ এ ব্যাপারে তুমি কোন সাহায্য করতে পারো?’

‘প্রায় ছটা কী সাতটা চিঠি ছিলো, স্যার৷ ঠিক মনে নেই৷’

‘তুমি সেগুলো তাঁর কাছে নিয়ে গিয়েছিলে?’

‘হ্যাঁ, স্যার৷ অফিস থেকে চিঠিগুলো নিয়ে রোজকার মতো তাঁর প্রাতরাশের ট্রেতে রেখে দিই৷’

‘চিঠিগুলোর চেহারা একটু-আধটু তোমার মনে আছে?’

মেয়েটি মাথা নাড়লো৷

‘চিঠিগুলো দেখতে ছিলো সাধারণ চিঠিরই মতো৷ মনে হয়, তার মধ্যে কয়েকটা বিল ও ইস্তাহার ছিলো, কারণ পরে সেগুলো ছেঁড়া অবস্থায় ট্রেতে পড়ে থাকতে দেখি৷’

‘কি হলো সেগুলো?’

‘সেগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে স্যার৷ পুলিশ অফিসারদের একজনকে দেখে এলাম, ডাস্টবিন ঘেঁটে দেখেছেন৷’

ওয়েস্টন সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷

‘বাজে কাগজ-ফেলার ঝুড়ির কাগজগুলো, সেগুলো কোথায় গেলো?’

‘সেগুলো ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘হুম—আচ্ছা—আপাতত আর কিছু জিগ্যেস করবার নেই৷’ তিনি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকালেন৷

পোয়ারো সামনে ঝুঁকে এলেন৷

‘আজ সকালে মিস লিন্ডা মার্শালের ঘর পরিষ্কার করার সময় তুমি কি ফায়ারপ্লেসে কোন আগুন জ্বালানো হয়নি৷’

‘ফায়ার-প্লেসে কোন কিছু তোমার নজরে পড়েনি?’

‘না, স্যার, ওটা পরিষ্কারই ছিলো৷’

‘কটার সময় তুমি ওঘর পরিষ্কার করেছো?’

‘এই সওয়া ন’টা নাগাদ, স্যার, তখন মিস লিন্ডা প্রাতরাশ সারতে গেছেন!’

‘তিনি কি প্রাতরাশ সেরে ওপরে ফিরে এসেছিলেন, তুমি জানো?’

‘হ্যাঁ, স্যার, এসেছিলেন—প্রায় পৌনে দশটা নাগাদ৷’

‘তারপর কি ঘরেই ছিলেন?’

‘মনে হয় ছিলেন, স্যার৷ কারণ সাড়ে দশটার ঠিক আগে তাঁকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসতে দেখি৷’

‘তুমি তাঁর ঘরে আর যাওনি?’

‘না, স্যার৷ প্রথমবারেই কাজ সারা হয়ে গিয়েছিলো৷’

পোয়ারো সম্মতিসূচকভাবে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘আরও একটা কথা আমি জানতে চাই৷ আজ সকালে প্রাতরাশের আগে কারা কারা স্নান করেছিলেন?’

‘আমি শুধু এ’তলার অতিথিদের খবর আপনাকে দিতে পারি৷’

হ্যাঁ, শুধু সেইটুকুই আমি জানতে চাইছি৷’

‘তাহলে, স্যার, আমার মনে হয়, কেবল ক্যাপ্টেন মার্শাল এবং মিঃ রেডফার্নই স্নান করেছিলেন৷ এটা ওঁদের রোজকার অভ্যেস৷’

‘তুমি তাঁদের স্নান করতে দেখেছো?’

‘না স্যার, তবে তাঁদের ভিজে স্নানের পোশাক রোজকার মতোই বারান্দার রেলিং-এ ঝুলছিলো৷’

‘মিস লিন্ডা মার্শাল তাহলে আজ সকালে স্নান করেননি?’

‘না স্যার৷ তাঁর সমস্ত স্নানের পোশাকই একেবারে খটখটে শুকনো ছিলো৷’

‘ও—’ বললেন, পোয়ারো, ‘এইটাই আমি জানতে চাইছিলাম৷’

গ্ল্যাডিস ন্যারকট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যোগ করলো, ‘কিন্তু বেশির ভাগ দিনই উনি সকালে স্নান করেন স্যার৷’

‘আর বাকি তিনজন, মিস ডার্নলি মিসেস রেডফার্ন আর মিসেস মার্শাল?’

‘মিসেস মার্শাল কখনও করতেন না স্যার৷ মিস ডার্নলি দু-একবার করেছেন মনে হয়৷ মিসেস রেডফার্ন ও সচরাচর প্রাতরাশের আগে স্নান করেন না। তবে খুব গরম পড়লে করেন, কিন্তু আজ সকালে করেননি৷’

আবারও সমর্থনে মাথা নাড়লেন পোয়ারো৷ তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘এ দিকের যেসব ঘর তুমি দেখাশোনা করো, তার কোনটা থেকে কোন শিশি খোয়া গেছে বলে তোমার নজরে পড়েছে?’

‘শিশি, স্যার? কিসের শিশি?

‘দুর্ভাগ্যবশত সেটা আমার জানা নেই৷ কিন্তু তোমার কি নজরে পড়তো—মানে, সাধারণভাবে ব্যাপারটা কি তোমার চোখে পড়তো—যদি কোন শিশি এভাবে হঠাৎ হারিয়ে যেতো?’

গ্ল্যাডিস স্পষ্ট স্বরে জবাব দিলো, ‘মিসেস মার্শালের ঘর থেকে হারালে আমার পক্ষে একেবারেই বলা সম্ভব নয়, স্যার৷ তাঁর ঘরে এত শিশি বোতল থাকে!’

‘আর অন্যান্য ঘর থেকে?’

মিস ডার্নলির ঘরের বেলায়ও ভরসা করে বলতে পারবো না৷ তাঁর ঘরেও একগাদা ক্রীম আর লোশনের শিশি আছে৷ কিন্তু অন্য কোন ঘর থেকে কোন শিশি খোয়া গিয়ে থাকলে তা নিশ্চয়ই আমার নজরে পড়তো, স্যার৷ মানে, যদি সেরকমভাবে খুঁটিয়ে দেখতাম৷ বলতে পারেন, যদি আমাকে তেমনভাবে নজর করে দেখত বলা হতো৷’

‘কিন্তু ব্যাপারটা তোমার চোখে পড়েনি?’

‘না, কারণ, আপনাকে যা বললাম, আমি সেরকমভাবে নজর করে দেখিনি৷’

‘তাহলে এখন বরং যাও, ঘরগুলো একবার ভালো করে দেখে এসো৷’

‘নিশ্চয়ই, স্যার৷’

ছাপা পোশাকের খসখস শব্দ তুলে ও ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো৷ ওয়েস্টন তাকালেন পোয়ারোর দিকে৷ বললেন, ‘এসব কি ব্যাপার?’

পোয়ারো মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘আমার সুবিন্যস্ত মন তুচ্ছ কারণেই বড় বিচলিত হয়৷ আজ সকালে প্রাতরাশের আগে, মিস ব্রুস্টার পাথরে ঘাটের কাছাকাছি সমুদ্রে স্নান করেছিলেন; তিনি বলেছেন, ওপর থেকে একটি শিশি নাকি সমুদ্রে ছুঁড়ে ফেলা হয়, এবং খুব অল্পের জন্য সেই শিশির আঘাত থেকে তিনি রক্ষা পান৷ সুতরাং। এবং আমার জানতে ভীষণ ইচ্ছে করছে, কে সেই শিশিটা ছুড়ে ফেলেছিলো, এবং কেন?’

‘কিন্তু মশাই, যে কেউই তো শিশিটা ছুড়ে থাকতে পারে—’

‘না, পারে না৷ প্রথমত, হোটেলের পূর্বদিকের কোন জানলা থেকেই কেবল শিশিটা ওভাবে ছুড়ে ফেলা সম্ভব—অর্থাৎ যে ঘরগুলো আমরা একটু আগেই পরীক্ষা করে দেখলাম, তাদেরই কোন জানলা থেকে৷ এইবার আমি আপনাকে প্রশ্ন করছি, যদি কোন খালি অপ্রয়োজনীয় শিশি আপনার প্রসাধন-টেবিল অথবা স্নান-ঘরে থাকে, তাহলে সেটা নিয়ে আপনি কি করবেন? উত্তরটা আমিই বলছি—সেটাকে আপনি বাজে—কাগজের ঝুড়িতে ফেলে দেবেন৷ অযথা পরিশ্রম করে বারান্দায় গিয়ে সেটাকে সমুদ্রে ছুড়ে ফেলার মতো কষ্ট স্বীকার নিশ্চয়ই করবেন না৷ কারণ প্রথমত, আপনার ছুড়ে ফেলা শিশিটা আকস্মিকভাবে কাউকে আঘাত করতে পারে, আর দ্বিতীয়ত, সামান্য কারণে শ্রমস্বীকারের পরিণামটা নেহাৎই অসামান্য হয়ে পড়বে৷ সুতরাং, এই অসামান্য শ্রমস্বীকার আপনি তখনই করবেন যখন আপনি চাইবেন, সেই বিশেষ শিশিটা আর কারো নজরে না পড়ুক৷’

ওয়েস্টন স্তব্ধ বিস্ময়ে তাঁর দিকে চেয়ে রইলেন, বললেন, ‘চিফ ইন্সপেক্টর জ্যাপের সঙ্গে কাজের ব্যাপারে কিছুদিন আগে আমার আলাপ হয়েছে৷ শুনেছি, তিনি নাকি প্রায়ই বলে থাকেন আপনার মনের আসধারণ কুটিলতার কোন তুলনা নেই৷ এই মুহূর্তে আপনি নিশ্চয়ই বলে বসবেন না, আর্লেনা মার্শালেকে মোটেই গলা টিপে খুন করা হয়নি, বরং কোন রহস্যময় শিশি থেকে কোন রহস্যময় বিষয় প্রয়োগ তাঁকে খুন করা হয়েছে?’

‘না, না, ওই শিশিতে বিষ ছিলো বলে আমার মনে হয় না৷’

‘তাহলে কি ছিলো?’

‘তা জানি না৷ জানি না বলেই এত কৌতূহলী হয়ে পড়ছি৷’

গ্ল্যাডিস ন্যারাকট ফিরে এলো৷ ঈষৎ রুদ্ধশ্বাসে বললে, ‘আমি দুঃখিত স্যার, কোন কিছু হারিয়েছে বলে খুঁজে পেলাম না৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল, মিস লিন্ডা মার্শাল, মিঃ এবং মিসেস রেডফার্নের ঘর থেকে কোন জিনিস যে খোয়া যায়নি সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই৷ আর মিস ডার্নলির ঘর থেকেও কিছু হারায়নি৷ শুধু মিসেস মার্শালের ঘরটা আমাকে ধাঁধায় ফেলেছে৷ আগেই তো বলেছি, তাঁর ঘরে শিশি-বোতল একগাদা৷’

পোয়ারো কাঁধ ঝাঁকালেন, বললেন, ‘ঠিক আছে৷ এ নিয়ে তোমাকে আর ভাবতে হবে না৷’

গ্ল্যাডিস ন্যারাকট বললো, ‘আমাকে আর কিছু জিগ্যেস করার আছে, স্যার?’

সে উপস্থিত দুজনের দিকে যথাক্রমে তাকালো৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘উহুঁ, নেই৷ ধন্যবাদ৷’

পোয়ারো বললেন, ‘ধন্যবাদ আমার তরফ থেকেও, তবে একটা কথা৷ আশাকরি, আমাদের বলা প্রয়োজন এমন কোন কথা—কোন কথা—তুমি বলতে ভুলে যাওনি?’

‘মিসেস মার্শালের সম্বন্ধে, স্যার?’

‘না, যে কোন ব্যাপার সম্পর্কে৷ এমন কোন ঘটনা, যা তোমার কাছে অস্বাভাবিক, অসাধারণ, রহস্যময়, অথবা একটু অদ্ভুত, কিংবা আশ্চর্য বলে মনে হয়েছে—অর্থাৎ, এমন কোন ব্যাপার, যা দেখে তুমি আপনমনেই, অথবা কোন সহকর্মীর কাছে, বলতে বাধ্য হয়েছে, ‘‘ভারী অদ্ভুত তো!’’?’

ব্যঙ্গময় বিচ্ছিন্নতায় শব্দ তিনটি উচ্চারণ করলেন পোয়ারো৷

গ্ল্যাডিস বলল, ‘ব্যাপারটা খুব সামান্য৷ নর্দমা দিয়ে স্নানের জল বয়ে যাওয়ার একটা শব্দ মাত্র৷ আর সত্যিই নিচতলায় এলসিকে আমি তখন বলেছিলাম যে বেলা বারোটায় কারও স্নান করার ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুত ঠেকছে৷’

‘কার স্নান-ঘর থেকে জলটা আসছিলো, কে স্নান করছিলো তখন?’

‘সেটা আমি বলতে পারছি না, স্যার৷ নিচের নর্দমা দিয়ে জলটা যাওয়ার শব্দ আমরা শুনতে পেয়েছিলাম, ব্যস, আর তখনই এলসিকে আমি কথাগুলো বলেছিলাম৷’

‘ঠিক জানো, সেটা স্নানের জল? বেসিনে হাত ধোয়া জল নয়?’

‘হ্যাঁ, স্যার, ঠিক জানি৷ স্নানের জল বয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে কারও ভুল হয় না৷’

পোয়ারো গ্ল্যাডিসের উপস্থিতির অতিরিক্ত কোন ইচ্ছে প্রকাশ না করায় তাকে প্রস্থান করার অনুমতি দেওয়া হলো৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘এই স্নানের ব্যাপারটাকে আপনি নিশ্চয়ই তেমন কোন গুরুত্ব দিচ্ছেন না, মঁসিয়ে পোয়ারো? আমার ধারণা, এর সঙ্গে মূল ঘটনার কোন সংযোগ নেই৷ কারণ এ ক্ষেত্রে রক্তের দাগ-টাগ ধুয়ে ফেলার কোন ব্যাপার নেই৷ সেটাই হলো—’ তিনি ইতস্তত করতে লাগলেন৷

পোয়ারো অসমাপ্ত বক্তব্যকে শেষ করলেন, ‘আপনি বলবেন, সেটাই হলে গলা টিপে খুন করার সুবিধে। কোন রক্তপাত নেই, কোন অস্ত্র নেই—কোন কিছু সরিয়ে ফেলা বা লুকোবার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধুমাত্র দৈহিক শক্তির—আর একটা খুনী মন!’

তাঁর কন্ঠস্বরে প্রচণ্ডতায়, জীবন্ত অনুভূতির সংবেদনায়, একটু চমকে উঠলেন ওয়েস্টন।

এরকুল পোয়ারো ঈষৎ অপরাধী মুখে তার দিকে চেয়ে হাসলেন।

‘না,না,’ তিনি বললেন, ‘স্নানের ব্যাপারটার সত্যিই হয়তো কোন গুরুত্ব নেই। স্নান তো যে কেউই করে থাকতে পারেন। টেনিস খেলতে যাওয়ার আগে মিসেস রেডফার্ন, বা ক্যাপ্টেন মার্শাল, অথবা মিস ডার্নলি যে কেউ এতে তেমন কোন সূত্র নেই৷

দরজায় টোকা মেরে জনৈক পুলিশ কনস্টেবল ঘরে উঁকি দিলো৷

‘মিস ডার্নলি, স্যার৷ তিনি আপনাদের সঙ্গে মিনিটখানেকের জন্যে আবার দেখা করতে চান৷ বলছেন কি একটা জরুরি কথা আপনাদের বলতে ভুলে গেছেন৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আমরা নিচে যাচ্ছি—এখুনি৷’

প্রথম তাঁদের দেখা হলো কলগেটের সঙ্গে৷ তাঁর মুখমণ্ডলে বিষন্নতার ছোঁয়া৷

‘এক মিনিট, স্যার৷’

‘সুতরাং তাঁকে অনুসরণ করে ওয়েস্টন এবং পোয়ারো উপস্থিত হলেন মিসেস ক্যাসল-এর অফিসে৷

কলগেট বললেন, ‘হেল্ড-এর সঙ্গে এতক্ষণ ওই টাইপরাইটারে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম৷ কোন সন্দেহ নেই৷ এক ঘণ্টার কমে ওটা টাইপ করা সম্ভব নয়৷ বরং বেশিই লাগবে, যদি চিঠির এখানে-ওখানে থেমে ভাবতে হয়৷ মনে হয়, ব্যাপারটার এখানেই নিষ্পত্তি হয়ে গেলো৷ আর এই চিঠিটা দেখুন৷’

একটা চিঠি এগিয়ে ধরলেন তিনি৷

‘প্রিয় মার্শাল—ছুটির মাঝে বিরক্ত করছি বলে দুঃখিত, কিন্তু বার্লি অ্যান্ড টেন্ডারে চুক্তি নিয়ে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে...’

‘ইতাদি ইত্যাদি’, বললেন, কলগেট, ‘তারিখ ২৪শে—অর্থাৎ গতকালের খামে পোস্ট অফিসের ছাপ গতকাল সন্ধ্যের, ‘ই. সি. ১’-এর এবং আজ সকালের ‘লেদারকোম্ব বে’-র৷ চিঠিতে এবং খামে একই টাইপরাইটার ব্যবহার করা হয়েছে৷ আর চিঠির সারমর্ম দেখে মনে হয় আগে থেকে এর উত্তর তৈরি করে রাখা মার্শালের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিলো৷ কারণ এ চিঠির কয়েকটা সংখ্যা থেকে মার্শালের চিঠির সংখ্যাগুলো তৈরি—পুরো ব্যাপারটা ভীষণ জটিল৷’

‘হুম—’ ওয়েস্টন ম্রিয়মান স্বরে বললেন, ‘মার্শালকে তাহলে সন্দেহের অওতা থেকে রেহাই দিতে হচ্ছে৷ এগবারে আমাদের অন্য দিকে নজর দিতে হবে৷’ একটু থেমে যোগ করলেন, তিনি, ‘মিস ডার্নলির সঙ্গে একবার দেখা করতে হবে৷ তিনি বাইরে অপেক্ষা করছেন৷’

রোজামণ্ড সাবলীল স্বচ্ছন্দ ভঙ্গীতে ঘরে প্রবেশ করলো৷ ওর ঠোঁটের হাসিতে অপরাধী-চেতনার ঈষৎ ছোঁয়া৷

ও বলল, অত্যন্ত দুঃখিত৷ হয়তো ব্যাপারটা তেমন গুরুত্ব দেবার মতো নয়৷কিন্তু জানেনই তো, মাঝে মাঝে মানুষ কিরকম ভুলোমনা হয়ে পড়ে৷’

‘হ্যাঁ, বলুন, মিস ডানলি?’

একটা চেয়ার দেখিয়ে পুলিশ-প্রধানকে ওকে বসতে ইশারা করলেন৷

রোজমণ্ড ওর সুষম কালো মাথা নাড়লো৷

‘ওহ, ব্যাপারটা খুব সামান্য, বসে বলার মতো নয়৷ কথাটা হলো, আমি আপনাদের বলেছিলাম যে আজ সারাটা সকাল আমি সানি লেজ-এ কাটিয়েছি৷ সেটা পুরোপুরি ঠিক নয়৷ আমি যে একবারের জন্যে হোটেলে গিয়ে আবার ফিরে এসেছিলাম, সেটা বলতে একেবারেই ভুলে গেছি৷’

‘কটার সময়, মিস ডার্নলি?’

‘সওয়া এগারোটা তো হবেই৷’

‘আপনি তাহলে হোটেলে ফিরে গিয়েছিলেন বলছেন?’

‘হ্যাঁ, রোদ-চশমাটা আনতে ভুলে গিয়েছিলাম৷ প্রথমে ভেবেছিলাম না হলেও চলবে, কিন্তু ক্রমশ চোখ ব্যথা করতে লাগলো৷ তাই হোটেলে গিয়ে ওটা নিয়ে আসাই ঠিক করলাম৷’

‘আপনি সোজা নিজের ঘরে গিয়ে ফিরে এসেছিলেন?’

‘হ্যাঁ৷ অবশ্য, সত্যি বলতে কি, যাবার সময় কেনের—ক্যাপ্টেন মার্শালের ঘরে একবার উঁকি মেরেছিলাম৷ ওর টাইপ করার শব্দ শুনতে পেয়ে ভাবলাম, আজকের মতো একটা সুন্দর দিনে ওর ঘরে বসে টাইপ করে বোকার মতো সময়টা নষ্ট করছে ঠিক করলাম, ওকে বেরোতে বলবো৷’

‘তা ক্যাপ্টেন মার্শাল কি বললেন?’

রোজামণ্ড লজ্জা-লজ্জা মুখে হাসলো৷

‘দরজা খুলে দেখলাম, কেন এত গভীর মনোযোগে, ভুরু কুঁচকে দ্রুতহাতে টাইপ করে চলেছে যে ওকে আর বিরক্ত করলাম না, নিঃশব্দে চলে এলাম৷ আমার মনে হয়, ও আমাকে দেখতেও পায়নি৷’

‘আর এটা ঠিক—ক’টার সময় হয়েছে, মিস ডার্নলি?’

‘এগারোটা বেজে প্রায় কুড়ি মিনিট নাগাদ৷ বেরোবার সময় হলঘরে ঘড়িটা আমার নজরে পড়েছিলো৷’

‘অতএব ওই প্রসঙ্গে এবার পূর্ণচ্ছেদ পড়লো৷’ বললেন, ইন্সপেক্টর কলগেট, ‘পরিচারিকা তাঁকে এগারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত টাইপ করতে শুনেছে৷ মিস ডার্নলি তাঁকে দেখেছেন এগারোটা কুড়িতে, আর মিসেস মার্শাল নিহত হন পৌঁনে বারোটা নাগাদ৷ তিনি বলেছেন, পুরো একটি ঘণ্টা ঘরে বসে টাইপ করে কাটিয়েছেন, আর এখন স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, তিনি সত্যিই ওই সময়টা ঘরে বসে টাইপ করছিলেন৷ সুতরাং ক্যাপ্টেন মার্শাল এখন সব সন্দেহের বাইরে৷’

থামলেন তিনি, কৌতূহলী চোখে তাকালেন পোয়ারো দিকে, প্রশ্ন করলেন, ‘মঁসিকে পোয়ারোকে যেন কোন কারণে চিন্তিত মনে হচ্ছে—’

পোয়ারো চিন্তাচ্ছন্ন জবাব দিলেন, ‘মিস ডার্নলি কেন হঠাৎ এই অতিরিক্ত সাক্ষ্যটুকু যেচে আমাদের উপহার দিলেন, সেটা ভেবেই অবাক হচ্ছি৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট তৎপর ভঙ্গীতে ঘাড় কাত করলেন৷

‘ব্যাপারটা কি একটু গোলমেলে ঠেকছে? মানে, নিছক, ‘‘ভুলে যাওয়া’’র ঘটনা এটা নয় বলছেন?’

মিনিট কয়েক কি ভাবলেন তিনি৷ তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘আচ্ছা স্যার, ব্যাপারটাকে তাহলে একটু অন্যভাবে দেখা যাক৷ ধরে নেওয়া যাক, মিস ডার্নলি, তাঁর কথামতো, আজ সকালে সানি লেজ-এ ছিলেন না ; তাঁর গল্পটা সবৈব মিথ্যে৷ এবারে মনে করুন, তাঁর গল্পটা আমাদের শোনাবার পর হঠাৎই তিনি আবিষ্কার করলেন কেউ একজন তাঁকে অন্য কোথাও দেখে ফেলেছে, অথবা কোন একজন তাঁর খোঁজে সানি লেজ-এ গিয়ে সেখানে তাঁকে পায়নি৷ সুতরাং তিনি চট করে একটা নতুন গল্প বানিয়ে ফেললেন এবং সেটা আমাদের কাছে সবিস্তারে বিবৃত করে তাঁর অনুপস্থিতির কৈফিয়ত তৈরি করে রাখলেন আপনি হয়তো খেয়াল করে থাকবেন, তিনি বেশ সতর্কভাবেই বলেছেন, তিনি যখন ক্যাপ্টেন মার্শালের ঘরে উঁকি মারেন, তখন তিনি ওঁকে দেখতে পাননি৷’

পোয়ারো অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘হুঁ, খেয়াল করেছি৷’

প্রচণ্ড অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠলেন ওয়েস্টন, ‘আপনি কি বলতে চান মিস ডার্নলি এর মধ্যে জড়িয়ে আছেন৷ যত্তো সব উদ্ভট চিন্তা৷ এতে তিনি জড়াবেন কোন্ দুঃখে?’

ইন্সপেক্টর কলগেট কাশলেন, বললেন, ‘ওই মার্কিন ভদ্রমহিলা, মিসেস গার্ডেনারের কথাগুলো নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে৷ তিনি মোটামুটি স্পষ্টই ইঙ্গিত করেছিলেন৷ ক্যাপ্টেন মার্শালের ওপর মিস ডার্নলির যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে৷ সেখানেই তো খুনের উদ্দেশ্য পাওয়া যাচ্ছে স্যার৷’

ওয়েস্টন অধৈর্য কণ্ঠে বললেন, ‘আর্লেনা মার্শাল কোন মহিলার হাতে খুন হননি৷ আমাদের খোঁজ করতে হবে কোন পুরুষের৷ সুতরাং এ মামলার পুরুষদের পেছনে আমাদের আঠার মতো লেগে থাকতে হবে৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনার কথাই ঠিক, স্যার৷ এই একই জায়গায় আমরা বার বার ফিরে আসছি, তাই না?’

পুলিশ-প্রধান বলে চললেন, ‘বরং একজন কনস্টেবলকে দু-একটা বিষয়ের সময় খতিয়ে দেখবার কাজে লাগিয়ে দাও৷ হোটেল থেকে দ্বীপের অপর প্রান্তের মইটা পর্যন্ত তাকে একবার হেঁটে, একবার দৌড়ে যেতে বলো৷ মই দিয়ে ওঠানামার ব্যাপারটাও ওই একইরকমভাবে যাচাই করে দেখবে৷ আর বেলাভূমি থেকে ভেলায় চড়ে পিক্সি কোভে পৌঁছতে কতটা সময় লাগে সেটাও কাউকে দিয়ে খতিয়ে নাও৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷

‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, স্যার৷’ আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠলো তাঁর কণ্ঠস্বরে৷

পুলিশ-প্রধান বললেন, ‘মনে হয় এবার পিক্সি কোভে আমার একবার যাওয়া দরকার৷ দেখি, ফিলিপস সেখানে কিছু পেলো কিনা৷ তাছাড়া পিক্সি গুহাটাও রয়েছে—যেটার কথা আমরা সকাল থেকে শুনে আসছি৷ দেখা দরকার, কোন পুরুষের অপেক্ষা করার কোন চিহ্ন সেখানে পাওয়া যায় কিনা৷ হুঁ পোয়ারো? আপনি কি বলেন?’

‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ এর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘যদি বাইরে থেকে কেউ এ দ্বীপে এসে থাকে, তাহলে পিক্সি গুহাই হচ্ছে তার লুকোবার পক্ষে চমৎকার জায়গা—অবশ্য গুহার খবরটা যদি তার জানা থাকে৷ আমার তো ধারণা, স্থানীয় লোকেরা হয়তো গুহার খবরটা জানে৷’

কলগেট বললেন, ‘আজকালকার ছেলেমেয়েরা জানে না বলেই আমার মনে হয়৷ কারণ, যেদিন থেকে এই হোটেল খোলা হয় সেদিন থেকেই এই দ্বীপ এবং দ্বীপসংসলগ্ন কোভগুলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ জেলেরা অথবা কোন পিকনিক দল কেউই সেখানে যায় না৷ আর হোটেলের লোকদের আপনি স্থানীয় অধিবাসী বলতে পারেন না৷ মিসেস ক্যাসল লন্ডনের লোক৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘রেডফার্নকে আমাদের সঙ্গে নেওয়া যেতে পারে৷ উনিই আমাদের গুহার খবরটা প্রথম দিয়েছিলেন৷ আর, মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনি?’

এরকুল পোয়ারো ইতস্তত করলেন৷ তাঁর উচ্চারণে পরদেশী প্রভাব সুস্পষ্ট হলো, ‘আমি? আমার অবস্থাও মিস ব্রস্টার এবং মিসেস রেডফার্নের মতো—খাড়া মই বেয়ে ওঠানামা আমার সয় না৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘আপনি তাহলে নৌকো করে যেতে পারেন৷’

আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এরকুল পোয়ারো, ‘আমার পাকস্থলী সমুদ্রে ঠিক সুস্থ বোধ করে না৷’

‘কি বাজে কথা বলছেন, মশাই৷ সমুদ্র আজ পুকুরের মতো শান্ত৷ এই শেষ সময়ে আমাদের এভাবে ডোবাবেন না৷’

এই ইংরেজি সনির্বন্ধ অনুরোধেও এরকুল পোয়ারোকে বিশেষ বিচলিত বলে মনে হলো না৷ ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় আড়াল থেকে উঁকি মারলো মিসেস ক্যাসল-এর বিশদ কেশবিন্যাস-সমৃদ্ধ সম্ভ্রান্ত মুখমণ্ডল৷

‘আশা করি আপনাদের কথার মাঝখানে নাক গলিয়ে বিরক্ত করছি না,’ তিনি বললেন, ‘কারণ মিঃ লেন, সেই ধর্মযাজক ভদ্রলোক, এইমাত্র ফিরে এসেছেন৷ ভাবলাম, খবরটা হয়েতো আপনারা জানতে চাইবেন৷’

‘ওহ—হ্যাঁ, ধন্যবাদ, মিসেস ক্যাসল৷ আমরা এখুনি তাঁর সঙ্গে দেখা করছি৷’

মিসেস ক্যাসল ঘরের ভেতরে কয়েক পা এগিয়ে এলেন, বললেন, ‘জানি না, এটা বলার কোন দরকার আছে কি না, কিন্তু আমি শুনেছি, যে কোন ছোটখাটো জিনিসকেও এসব ব্যাপারে তুচ্ছ করা ঠিক নয়, তাই—’

হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন?’ ওয়েস্টন অধৈর্য কণ্ঠে বললেন৷

‘ব্যাপারটা হচ্ছে, বেলা একটা নাগাদ একজন ভদ্রলোক ও একজন ভদ্রমহিলা এখানে এসেছিলেন৷ এসেছিলেন দ্বীপের ওপার থেকে৷ মধ্যাহ্নভোজ সারতে৷ তাঁদের বলা হয়েছিলো যে এখানে একটা দুঘটনা ঘটেছে, এবং এ অবস্থায় মধ্যাহ্নভোজের কোনরকম ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়৷’

‘তাঁদের পরিচয় কিছু জনেন?’

কি করে বলবো! কোন নাম তাঁরা দেননি৷ দুর্ঘটনার বিবরণ শুনে কিছুটা কৌতূহল প্রকাশ করে, হতাশ হয়ে চলে গেছেন৷ আমি অবশ্য কোন কথাই তাঁদের বলিনি৷ তবে আমার মনে হয়, তাঁরা উঁচুদরের টুরিস্ট—গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াতে বেরিয়েছিলেন৷’

ওয়েস্টন ঈষৎ রূঢ় স্বরে বললেন, ‘এই সাহায্যের জন্যে ধন্যবাদ৷ খবরটা তেমন দরকারী না হলেও, সব ঘটনাই—ইয়ে—মানে রাখা ভালো৷’

‘নিশ্চয়ই’, মিসেস ক্যাসল বললেন, ‘আমার কর্তব্য আমাকে পালন করতেই হবে!’

‘ঠিক আছে, ঠিক আছে৷ এবারে মিঃ লেনকে এ ঘরে আসতে বলুন৷’

স্বভাবসিদ্ধ সতেজ পদক্ষেপে ঘরে প্রবেশ করলেন ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘আমি এ অঞ্চলের পুলিশ-প্রধান, মিঃ লেন৷ আশা করি এখানকার দুর্ঘটনার কথা আপনাকে জানানো হয়েছে?’

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, ফিরে আসতেই ব্যাপারটা কানে এসেছে৷ কি ভয়ানক কি ভয়ানক—’ তাঁর শরীরে হালকা কাঠামো কেঁপে উঠলো৷ নিচু স্বরে তিনি বললেন, ‘সেই প্রথম থেকেই—যেদিন থেকে এখানে এসেছি—অশুভ শক্তির অন্তরঙ্গ উপস্থিতি আমি টের পেয়েছি—স্পষ্ট টের পেয়েছি৷’

তাঁর চোখ, জ্বলন্ত একাগ্র চোখ, ফিরলো এরকুল পোয়ারোর দিকে৷

তিনি বললেন, ‘আপনার মনে আছে, মঁসিয়ে পোয়ারো? আমাদের দিন কয়েক আগেকার আলোচনার কথা? অশুভ শক্তির অস্তিত্ব নিয়ে?’

বিহ্বল দৃষ্টি নিয়ে দীর্ঘকায় কৃশ মানুষটিকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন ওয়েস্টন৷ মানুষটিকে বুঝে ওঠা তাঁর কাছে বেশ কষ্টকর মনে হলো৷ ধর্মযাজক লেনের চোখ ফিরে এলো তাঁর দিকে৷ ঈষৎ হেসে তিনি বললেন, ‘জানি, কথাগুলো হয়তো আপনার কাছে অদ্ভুত ঠেকেছে৷ কারণ বর্তমান যুগে অশুভ শক্তিতে বিশ্বাস আমরা করি না৷ নরকাগ্নিকে আমরা মন থেকে নির্বাসন দিয়েছি? শয়তানে আমরা বিশ্বাস করি না৷ কিন্তু জানবেন, শয়তান এবং তাঁর অনুচরেরা অতীতে যেমন শক্তিমান ছিলো, আজ, এই মুহূর্তে ,তার চেয়ে কিছু কম নেই৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ—ইয়ে—হয়তো তাই। সেটা পুরোপুরি আপনার এলাকা, মিঃ লেন। আর আমার এলাকা অনেক নিরস, বাস্তববাদী—একটা খুনের কিনারা করা।’

স্টিফেন লেন বললেন, ‘বড় নিষ্ঠুর শব্দ। খুন! পৃথিবীর প্রাচীনতম পাপ—নির্মমভাবে কোন নিষ্পাপ ভাইয়ের রক্তে হাত রাঙানো ...’কয়েক মুহূর্ত নীরব রইলেন তিনি, চোখ অর্ধনিমীলিত। তারপর অপেক্ষাকৃত স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘বলুন, কিভাবে আপনাদের সাহায্য করতে পারি?’

‘মিঃ লেন, যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে প্রথমে বলুন, আজ সারা সকালটা আপনি কিভাবে কাটিয়েছেন। ‘

‘বিন্দুমাত্রও আপত্তি নেই। বরাবরের মতো আজও আমি সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ি পদব্রজে ভ্রমণে। হাঁটতে আমি ভীষণ ভালোবাসি। এখানকার গ্রামাঞ্চলের অনেকটাই আমার পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখা হয়ে গেছে। আজ গিয়েছিলাম “সেন্ট পেট্রক-ইন-দ্য কোম্ব”-এ—এখন থেকে প্রায় মাইল সাতেক দূরে। আঁকাবাঁকা গলি ঘুরে ডেভনের পাহাড় উপত্যকার কোল ঘেঁষে চমৎকার হাঁটা পথ। সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজের জন্যে কিছু খাবার নিয়ে গিয়েছিলাম, তাই খেয়েছি। ওখানকার গীর্জটাও দেখে এলাম। সেখানে প্রাচীন কাঁচশিল্পের টুকরো টুকরো কিছু নিদর্শন অবশিষ্ট রয়েছে ; আমাদের দুর্ভাগ্য, যে সম্পূর্ণটা নেই এছাড়া একটা সুন্দর রঙ-করা পর্দাও চোখে পড়লো।’

‘ধন্যবাদ, মিঃ লেন। পথে আপনার সঙ্গে কি কারও দেখা হয়েছে?’

‘দেখা হলেও কথা হয়নি। একটা গরুর গাড়ি চোখে পড়েছে, কতকগুলো ছেলেকে সাইকেল চালিয়ে যেতে দেখেছি, আর দেখেছি কয়েকটা গরু অবশ্য,’ তিনি হাসলেন, আমার বক্তব্যের স্বপক্ষে প্রমাণ যদি চান, তাহলে বলতে পারি, গির্জার খাতায় আমি আমার নামটা লিখে এসেছি। খোঁজ করলে দেখতে পাবেন।’

‘গীর্জায় কারও সঙ্গে আপনি দেখা করেননি—ধর্মযাজক অথবা কোন কর্মচারীর সঙ্গে?’

স্টিফেন লেন মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘না, সেখানে কেউ ছিলো না; আমিই ছিলাম এক এবং অদ্বিতীয় দর্শক৷ সেন্ট পেট্রক বড় নির্জন জায়গা৷ গ্রামটা গীর্জা ছাড়িয়ে আরও অন্ত আধ মাইল ভেতরে৷’

কর্নেল ওসেস্টন হাসিমুখে বললেন, ‘ভাববেন না যেন আমরা আপনার কথায় ইয়ে মানে সন্দেহ করছি৷ শুধু প্রত্যেকের বক্তব্য যাচা করে দেখা হচ্ছে৷ নেহাতই নিয়মমাফিক কাজ, জানেন তো৷ এ ধরনের ব্যাপারে পুলিশি নিয়মের এতটুকু এদিক ওদিক হবার জো নেই৷’

স্টিফেন লেন শান্তস্বরে বললেন, ‘হ্যাঁ, জানি৷’

ওয়েস্টন বলে চললেন, ‘এবারে পরের কথায় আসি; আপনি কি এমন কিছু জানেন না যা আমাদের তদন্তের কাজে আসবে? মৃত মহিলা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কোন তথ্য? এমন কোন সূত্র, যা খুনীকে খুঁজে পেতে সাহায্য করবে? এমন কিছু, যা আপনি দেখেছেন অথবা শুনেছেন?’

স্টিফেন লেন বললেন, ‘কোন কিছুই আমার কানে আসেনি৷ আমি আপনাদের মোটের ওপর যেটুকু বলতে পারি তা হলো এই : আর্লেনা মার্শালকে দেখামাত্রই ষষ্ঠেন্দ্রিয়ের সহজাত ক্ষমতায় আমি অনুভব করতে পারি তিনি অশুভশক্তির একটি উৎসবিন্দু৷ তিনি ছিলেন অশুভশক্তির মানবীয় রূপ৷ পুরুষের জীবনে নারীই সবচেয়ে বড় সহায়, বড় প্রেরণা—আবার সেই নারীই তাকে নিয়ে যেতে পারে অবনতির অন্ধকারে গহনে, নিয়ে যেতে পারে পশুর পর্যায়ে৷ আমাদের মৃত মহিলাটি ছিলেন ঠিক সেই প্রকৃতির৷ পুরুষের চরিত্রের সব ক’টি হীন নিচ প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলতে তিনি ছিলেন তুলনাহীন৷ এ ক্ষেত্রে জেজবেল এবং অ্যাহেলিবার কথাই আমার মনে পড়ছে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচারের দণ্ড আকস্মিকভাবে নেমে এসেছে তাঁর পাপাচারে সমাপ্তি ঘটাতে তাঁকে স্তব্ধ করতে!’

এরকুল পোয়ারো চঞ্চল হলেন, বললেন, ‘বিচারের দণ্ড তাঁকে স্তব্ধ করেনি—স্তব্ধ করেছে কোন মানুষের হাত! একজোড়া মানুষের হাত তাঁকে শ্বাসরোধ করে খুন করেছে৷’

ধর্মযাজকের হাত কাঁপাতে লাগলো৷ তীব্র অনুভূতিতে বাতাস আঁকড়ে ধরার অগোছালো প্রয়াস পেতে লাগলো তাঁর হাতের দশ আঙুল৷ চাপা অবরুদ্ধ কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন, ‘কি ভয়ঙ্কর—কি ভয়ঙ্কর—আপনার বর্ণনাও বড় নৃশংস—’

এরকুল পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, ‘কিন্তু এটাই সরল সত্য৷ আপনি বলতে পারেন, মিঃ লেন, সেই অদৃশ্য হাত দুটির মালিক কে?”

ধর্মযাজক মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘জানি না—আমি কিছুই জানি না...’

ওয়েস্টন উঠে দাঁড়ালেন, কলগেটের দিকে এক পলক তাকাতেই সংক্ষিপ্ত অনির্ণেয় ভঙ্গীতে মাথা হেলালেন কলগেট, তারপর বললেন, ‘এবারে আমাদের পিক্সি কোভে একবার যাওয়ার দরকার৷’

লেন বললেন, ‘ওখানেই কি ব্যাপারটা ঘটেছে?’

ওয়েস্টন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷

লেন বললেন, ‘আ-আমি আপনাদের সঙ্গে গেলে আপত্তি আছে?’

সংক্ষিপ্ত উত্তর লেনকে নিরাশ করতে যাচ্ছিলেন, ওয়েস্টন, পোয়ারোর কথায় বাধা পেলেন৷

‘নিশ্চয়ই যাবেন৷’ উৎসাহের সঙ্গে বললেন, পোয়ারো, ‘আপনি আমার সঙ্গে নৌকোয় চলুন, মিঃ লেন৷ এখুনি আমরা রওনা হবো৷’

নবম পরিচ্ছেদ

একই দিনে দ্বিতীয়বার পিক্সি কোভ অভিমুখে নৌকো বেয়ে চললো প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ নৌকোর অন্যান্য যাত্রীদের একজন এরকুল পোয়ারো, পেটে হাত চেপে বিবর্ণ মুখে বসে রয়েছেন, এবং অন্যজন স্টিফেন লেন৷ কর্নেল ওয়েস্টন স্থলপথে রওনা হয়েছেন৷ কিন্তু পথে দেরি হওয়ার তিনি নৌকোর সঙ্গে প্রায় একই সময়ে এসে উপস্থিত হলেন পিক্সি কোভের বেলাভূমিতে৷ একজন পুলিশ কনস্টেবল ও একজন একজন সাদা পোশাকী সার্জেন্ট আগে থেকে সেখানে উপস্থিত ছিলো৷ ওঁরা তিনজন নৌকো থেকে নেমে যখন ওয়েস্টনের সঙ্গে যোগ দিলেন, তখন তিনি সার্জেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন৷

সার্জেন্ট ফিলিপস বললে, ‘বেলাভূমির প্রতিটি অংশ আমরা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছি, স্যার৷’

‘খুব ভালো৷ কিছু পেলে?’

‘সমস্ত এক জায়গায় রাখা আছে, স্যার, যদি একবার এসে দেখেন—’

বিভিন্ন জিনিসের একটা ছোটখাটো সংগ্রহ সুন্দরভাবে সাজানো রয়েছে একখণ্ড পাথরের ওপর৷ একটা কাঁচি, গোল্ড ফ্লেক সিগারেটের একটা খালি প্যাকেট, একইরকম পাঁচটা বোতলের ডাকনা, বেশ কয়েকটা পোড়া দেশলাইয়ের কাঠি, তিন টুকরো সুতো, খবরের কাগজের দু-একটা টুকরো, একটা ভাঙা পাইপের ধ্বংসাবশেষ, চারটে বোতাম, একটা মোরগের পায়ের হাড় এবং একটা সূর্যস্নানের তেলের খালি শিশি৷

মূল্যায়নের দৃষ্টিতে জিনিসগুলোর দিকে চোখ নামিয়ে দেখলেন ওয়েস্টন৷

‘হুঁম’ তিনি বললেন, ‘আজকালকার সৈকতের যা অবস্থা তার চেয়ে ভালোই বলতে হবে! ইদানীং বেশিরভাগ লোকই সৈকতকে নিজেদের ডাস্টবিনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছে! শিশির লেবেলেন রঙটা যেভাবে জ্বলে গেছে, তাতে মনে হয় এটা বেশ কিছু সময় এখানে রয়েছে—অন্যান্য জিনিসগুলোর অবস্থাও একইরকম দেখছি৷ অবশ্য কাঁচিটা একেবারে নতুন : পরিষ্কার ঝকঝকে৷ গতকাল বৃষ্টির সময়ে এটা নিশ্চয়ই এখানে ছিলো না! এটা কোত্থেকে পেলে?’

‘মইয়ের ঠিক নিচেই, স্যার৷ এই ভাঙা পাইপটাও সেখানে ছিলো৷’

‘হুম, হয়তো ওঠানামা করার সময় কারো হাত থেকে পড়ে গিয়ে থাকবে জিনিসগুলো কার বলে মনে হয়?’

‘জানি না, স্যার৷ কাঁচিটা অতি সাধারণ নখ কাটার কাঁচি৷ আর পাইপটা ভালো জাতের গোলাপের কাঠের তৈরি—নিঃসন্দেহে দামী৷’

পোয়ারো চিন্তাচ্ছন্ন অস্পষ্ট স্বরে মন্তব্য করলেন, ‘ক্যাপ্টেন মার্শাল আমাদের বলেছিলেন, তাঁর পাইপটা কোথায় হারিয়ে গেছে—’

ওয়েস্টন বললেন, ‘উহুঁ—মার্শাল এর মধ্যে নেই৷ সে ছাড়াও তো আরও অনেকে পাইপ খায়৷

এরকুল পোয়ারো স্টিফেন লেনকে লক্ষ্য করছিলেন৷ তাঁর হাত একবার পকেটে ঢুকেই আবার বেরিয়ে এলো৷ সুতরাং নম্রস্বরে বললেন পোয়ারো, আপনি পাইপ ব্যবহার করেন, তাই না, মিঃ লেন?”

ধর্মযাজক চমকে উঠলেন, তাকালেন পোয়ারোর দিকে, বললেন, ‘হ্যাঁ—ইয়ে পাইপ আমার বহু পুরানো বন্ধু ও সঙ্গী৷’ পকেটে হাত দিয়ে একটা পাইপ বের করলেন তিনি তামাক ভরে তাতে অগ্নিসংযোগ করলেন৷

এরকুল পোয়ারে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন শূন্যদৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রেডফার্নের কাছে৷ নিচু স্বরে বললেন, ‘ভালোই হয়েছে—ওঁকে ওরা সরিয়ে নিয়ে গেছে—’

স্টিফেন লেন প্রশ্ন করলেন, ‘মৃতদেহটা ছিলো কোথায়?’

সার্জেন্ট ফিলিপস উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, ‘ঠিক যেখানটায় আপনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, স্যার৷’

লেন ক্ষিপ্রভাবে একপাশ সরে গেলেন৷ পলকহীন চোখে তাকিয়ে রইলেন মুহূর্ত আগে দাঁড়িয়ে থাকা জায়গাটার দিকে৷

ফিলিপস বলে চললো, ‘ভেলাটা যেখানে থামানো হয়েছিলো, তা থেকে অনুমান করা যায় মিসেস মার্শাল পৌনে এগোরোটা নাগাদ এখানে এসে পৌঁছেছিলেন৷ জোয়ার-ভাটার নিয়ম থেকেই সময়টা অনুমান করছি৷ আর এখন সমুদ্রের জল দূরে সরে যাওয়ায় ভেলার মুখটা একপাশে ঘুরে গেছে৷’

‘ফটো-টটো যা তোলার তোলা হযে গেছে?’ ওয়েস্টন প্রশ্ন করলেন৷

‘হ্যাঁ, স্যার৷’

ওয়েস্টন ফিরলেন রেডফার্নের দিকে৷

‘আসুন মশাই, এবারে আপনার গুহার রাস্তাটা দেখান—’

প্যাট্রিক রেডফার্ন তখনও স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলো ধর্মযাজকের প্রথম দাঁড়ানো জায়গাটার দিকে৷ যেন উপুড় হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা মৃতদেহটা এখনও তাঁর চোখের সামনে ভাসছে৷

ওয়েস্টনের কথায় তার সম্বিৎ ফিরলো৷ সে বললো, ‘ওই তো ওখানে—’

পাহাড়ের গায়ে সুপ্রাচীন ধ্বংসাশেষের সৌন্দর্য নিয়ে জড়ো করা ছিলো একরাশ ছোটবড় পাথর; সেদিকেই এগিয়ে চললো রেডফার্ন৷ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুটো বড় পাথরে মাঝামাঝি একটা সরু ফাটলের সামনে গিয়ে থামলো সে৷ বললো, ‘এটাই গুহায় ঢোকার পথ৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘এটা? দেখেশুনে তো মনে হচ্ছে না একটা মানুষ কোনরকমে ঢুকতে পারবে৷’

‘ওটা মনের ভুল একটু পরেই বুঝতে পারবেন—’

ওয়েস্টন ধীরেসুস্থে ফাটলে প্রবেশ করলেন৷ ফাটলটা দেখে যতটা সরু মনে হয়েছিলো ততটা নয়৷ ভেতরে জায়গাটা ক্রমশ চওড়া হয়ে বড়সড় গুহার আকার নিয়েছে৷ সোজা হয়ে দাঁড়াতে অথবা ঘুরেফিরে বেড়াতে কোনরকম অসুবিধে নেই৷

এরকুল পোয়ারো এবং স্টিফেন লেন পুলিশ-প্রধানকে অনুসরণ করলেন৷ অন্যান্যরা বাইরেই দাঁড়িয়ে রইলেন৷ ফাটল দিয়ে আলোর রেশ ভেতরে এলেও গুহাকে আলোকিত করা পক্ষে পর্যাপ্ত নয়৷ ওয়েস্টন একটা শক্তিশালী টর্চ জ্বালিয়ে ইতস্তত দেখতে লাগলেন৷

অবশেষে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘বেশ জায়গা৷ বাইরে থেকে বোঝবারই উপায় নেই৷ তারপর মেঝের প্রতিটি অংশ টর্চের আলোয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন৷

এরকুল পোয়ারো শান্তভাবে বাতাসের গন্ধ নিচ্ছিলেন৷

সেটা লক্ষ্য করে ওয়েস্টন বললেন, ‘বাতাস মোটামুটি বিশুদ্ধ৷ শ্যাওলার গন্ধ বা আঁশটে গন্ধ নেই৷ অবশ্য জায়গাটা জোয়ারের জলের আওতার বাইরে৷’

কিন্তু পোয়ারো সূক্ষ্ম ঘ্রাণশক্তি ধরা পড়লো, বাতাস শুধু যে বিশুদ্ধ তা নয়,তার সঙ্গে মিশে আছে একটা হালকা মিষ্টি সুগন্ধ৷ অন্তত দুজনকে তিনি জানেন, যাঁরা এই ছলনাময়ী সুগন্ধী ব্যবহার করেন...

ওয়েস্টনের টর্চ ক্ষান্ত হয়ে থামলো৷ তিনি বললেন, ‘অস্বাভাবিক কিছুই পড়লো না৷’

মাথার ঠিক ওপরেই একটা সরু তাকের দিকে চোখে পড়লো পোয়ারোর৷ মৃদু স্বরে তিনি বললেন, ‘ওখানে যে কিছু নেই সেটা দেখে নিলে ভালো হয় না?’

ওয়েস্টন বললেন, ‘যদি কিছু থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সেটা কেউ ইচ্ছে করে লুকিয়ে রেখেছে৷... বলছেন যখন, দেখাই যাক৷’

পোয়ারো স্টিফেন লেনকে বললেন, ‘আমাদের মধ্যে আপনিই সবচেয়ে দীর্ঘকায় মঁসিয়ে লেন, তাই আপনাকে অনুরোধ করছি, যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে ওই তাকে যে কিছু নেই সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ হয়ে আমাদের দয়া করে আশ্বস্ত করুন৷’

লেন পা উঁচু করে হাত বাড়িয়েও তাকের ভেতর পর্যন্ত নাগাল পেলেন না৷ তখন পাথরের গায়ে একটা ফোকরে পা দিয়ে এক হাতে তাকের কিনারা ধরে বেয়ে উঠলেন৷

সঙ্গে সঙ্গে তাঁর উত্তেজিত কণ্ঠস্বর কানে এলো, ‘আরে একটা বাক্স রয়েছে দেখছি৷

মিনিটখানেকের মধ্যে ধর্মযাজকের আবিষ্কারকে পরখ করতে করতে তাঁরা বাইরে সূর্যালোকে পা রাখলেন।

ওয়েস্টন বললেন, ‘সাবধান! প্রয়োজনের বেশি হাত দেবেন না৷ কোন হাতের ছাপ-টাপ থাকলেও থাকতে পারে৷’

টিনের তৈরি বাক্সটার রঙ গাঢ় সবুজ৷ এবং তার গায়ে স্যান্ডউইচ শব্দটি লেখা রয়েছে৷

সার্জেন্ট ফিলিপস বলল, ‘হয়তো পিকনিক করতে এসে কেউ ফেলে গেছে৷’

রুমালে ধরে বাক্সের ঢাকনা খুললো সে৷

ভেতরে নুন, গোলমরিচ, রাই লেখা কয়েকটা ছোট ছোট টিনের কৌটো রয়েছে: আর রয়েছে দুটো বড় কৌটো—নিঃসন্দেহে স্যান্ডউইচ রাখবার জন্য৷ সার্জেন্ট ফিলিপস নুনের কৌটোর ঢাকনাটা খুলে ফেললো৷ ভেতরটা কানায় কানায় ভর্তি৷ পরে কৌটোটার ঢাকনা খুলে সে মন্তব্য করলো, হুঁ—গোলমরিচ লেখা কৌটোতেও নুন রয়েছে৷ দেখছি৷’

রাই-এর কৌটোর বেলাতেও তার ব্যতিক্রম হলো না৷

হঠাৎ সতর্ক হলো ফিলিপস-এর আচরণ৷ বড় কৌটো দুটোর একটা খুললো সে৷ তাতেও সেই একই সাদা স্ফটিকের গুঁড়ো৷

আরও সতর্ক তৎপর ভঙ্গীতে একটা আঙুল সাদা গুঁড়োয় ডুবিয়ে দিলো সার্জেন্ট ফিলিপস৷ আঙুলটা তুলে জিভে ঠেকালো৷

তার মুখভাবের আমূল পরিবর্তন ঘটলো৷ সে বলে উঠলো—তার কণ্ঠস্বরে চাপা উত্তেজনা৷ ‘এটা মোটে নুন নয়, স্যার৷ নুন হতেই পারে না! ভীষণ তেতো লাগছে৷ মনে হচ্ছে কোন মাদকদ্রব্য হবে৷’

‘তিন নম্বর দৃষ্টিকোণ৷’ প্রায় আর্তনাদের সুরে বললেন ওয়েস্টন৷

ওঁরা আবার হোটেলে ফিরে এলেন৷

পুলিশ-প্রধান বলতে লাগলেন, ‘যদি মাদকদ্রব্য চালানের কোন দল কোন কারণে এর সঙ্গে জড়িত থেকে থাকে, তাহলে নতুন কয়েকটা সম্ভাবনার কথা আমাদের ভেবে দেখতে হবে৷ প্রথমত, মৃত মহিলাটি হয়তো সেই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন৷ আপনার কি মনে হয়?’

এরকুল পোয়ারো সতর্কভাবে উত্তর দিলেন, ‘অসম্ভব নয়৷’

‘হয়তো তাঁর মাদকদ্রব্যের নেশা ছিলো?’

অসমর্থনে মাথা নাড়লেন পোয়ারো৷ বললেন, ‘সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে৷ তাঁর শক্তি-সাহস ছিলো অবিচল, ছিলো উজ্জ্বল স্বাস্থ্য, তাছাড়া তাঁর হাতে কোন ইনজেকশানের ছুঁচের দাগ আমার নজরে পড়েনি৷ (অবশ্য এ থেকে স্থির নিশ্চিত হওয়া যায় না৷ কারণ অনেকে শুধুমাত্র আঘ্রাণ নিয়েই এ ধরনের নেশা করে থাকেন৷) না, আমার মনে হয় না তাঁর এ সব নেশা ছিলো৷’

‘সেক্ষেত্রে’, চিন্তান্বিত কণ্ঠে বললেন, ওয়েস্টন, তিনি হয়তো আকস্মিকভাবেই এই মাদকদ্রব্যের ব্যবসার ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলেন, এবং পরিণতিস্বরূপ সেই দলের লোকেরা চিরতরে তাঁর মুখ বন্ধ করে দিয়েছে৷ ওই সাদা জিনিসটা যে কি সেটা এখুনি আমরা জানতে পারবো৷ ওটা পরীক্ষা করে দেখবার জন্যে নীসডনের কাছে পাঠিয়েছি৷ যদি সত্যিই কোন মাদকদ্রব্য চালানের দল এর পেছনে থেকে থাকে, তাহলে ছোটখাটো তুচ্ছ ঘটনার তারা থেমে থাকবে না।’

দরজা খুলে মিঃ হোরেস ব্ল্যাট ঘরে প্রবেশ করতেই মাঝপথে থমকে গেলেন ওয়েস্টন৷

মিঃ ব্ল্যাটের মুখমণ্ডল সূর্যতাপে রক্তাভ৷ তিনি কপালের ঘাম মুছছিলেন৷ তাঁর দরাজ কণ্ঠস্বরের তরঙ্গে ছোট্ট ঘরটা গমগম করতে লাগলো৷

‘এইমাত্র ফিরে এসেই খবরটা শুনলাম৷ আপনি পুলিশ-প্রধান? ওদের কাছেই শুনলাম আপনি এখানে আছেন৷ আমার নাম ব্ল্যাট—হোরেস ব্ল্যাট৷ কোনরকম সাহায্য করতে পারবো কিনা? মনে হয় না৷ সেই ভোরে নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি, গোটা দিনটাই বাইরে কেটেছে৷ আর সেই জন্যেই এমন একটা চাঞ্চল্যকর ঘটনা থেকে পুরোপুরি ফাঁকি পড়লাম৷ এরকম একটা নির্জন জায়গা যখন একটা ঘটনার মতো ঘটনা ঘটলো তখন কিনা আমি থাকলাম না৷ সত্যি, জীবনটাই এইরকম, কি বলেন? আরে, মঁসিয়ে পোয়ারো যে! আপনাকে তো খেয়ালই করিনি৷ আপনিও তাহলে এর মধ্যে রয়েছেন? অবশ্য থাকবেন না-ই বা কেন! শার্লক হোমস বনাম স্থানীয় পুলিশ—ঠিক বলিনি? হা-হা! লেসট্রেড—ওই জাতীয় সমস্ত ব্যাপার৷ আঃ আপনার শখের গোয়েন্দা গিরি দেখতে আমার ভালোই লাগবে৷’

মিঃ ব্ল্যাট এগিয়ে এসে একটা চেয়ার অধিকার করলেন, সিগারেট কেস বের করে এগিয়ে ধরলেন ওয়েস্টনের দিকে৷ ওয়েস্টন সবিনয় প্রত্যাখ্যান জানালেন৷ ছোট্ট হাসি হেসে বললেন, ‘আমি মশাই এক নম্বরের পাইপ ভক্ত৷’

‘আমিও তাই৷ সিগারেটও অবশ্যই খাই—তবে পাইপের কাছে কিস্যু না৷’

কর্নেল ওয়েস্টন হঠাৎ অন্তরঙ্গ সুরে বলে উঠলেন, ‘তাহলে পাইপটা ধরান না মশাই৷’

হোরেস ব্ল্যাট মাথা নাড়লেন৷

‘এই মুহূর্তে পাইপটা সঙ্গে নেই৷ এবারে দয়া করে একটু ঝেড়ে কাশুন তো৷ এ পর্যন্ত যেটুকু আমি শুনেছি তা হলো, মিসেস মার্শালকে নাকি এ অঞ্চলের কোন বেলাভূমিতে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেছে৷’

‘পিক্সি কোভে৷’ ব্ল্যাটের মুখে অপলক চোখ রেখে শান্ত কণ্ঠে বললেন, ওয়েস্টন৷

কিন্তু মিঃ ব্ল্যাট নিছকই উত্তেজিত স্বরে প্রশ্ন করলেন, ‘শুনলাম তাঁকে গলা টিপে খুন করা হয়েছে?’

‘ঠিক শুনেছেন৷’

‘ওঃ, নৃশংস—বড় নৃশংস৷ তবে জানবেন, মেয়েটা নিজেই নিজের মৃত্যু ডেকে এনেছিলো৷ ওরকম গরম ঝাঁঝালো মশলা—কি বলেন, মঁসিয়ে পোয়ারো? কাজটা কে করলো কিছু আঁচ পেলেন৷ নাকি প্রশ্নটা করা ঠিক উচিত হচ্ছে না?’

হালকা হাসি হেসে কর্নেল ওয়েস্টন বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, মিঃ ব্ল্যাট, বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশ্নগুলো আমাদেরই করবার কথা৷’

মিঃ ব্ল্যাট সিগারেটসমেত হাত নাড়লেন৷

‘দুঃখিত—অত্যন্ত দুঃখিত, আমারই ভুল হয়েছে৷ বলুন, কি জানতে চান৷’

‘আপনি আজ সকালে নৌকো বাইতে বেরিয়েছিলেন৷ ক’টার সময়?

‘পৌনে দশটা নাগাদ এখান থেকে বেরোই৷’

‘সঙ্গে কেউ ছিলো?’

‘কেউ না৷ আমিই ছিলাম একমাত্র নিঃসঙ্গ যাত্রী৷’ হাসলেন ব্ল্যাট৷

‘কদ্দুর গিয়েছিলেন?’

সমুদ্রের তীর ধরে প্লিমাউথের দিকে৷ সঙ্গে খাবার ছিলো৷ তেমন হাওয়া না থাকায় বেশি দূর যেতে পারিনি৷’

আরও দু-একটা প্রশ্নের পর ওয়েস্টন জিগ্যেস করলেন, ‘এবার মার্শালদের কথায় আসি; আমাদের সাহায্যে আসতে পারে এমন কিছু ওঁদের সম্পর্কে জানেন?’

‘আমার মতামত তো আপনাকে জানিয়েই দিয়েছি৷ এ অপরাধ প্রেম-প্রবঞ্চনার পরিণতি৷ তবে এটুকু হলফ করে বলতে পারি, এ কাজ আমার নয়৷ আমার জীবনে সুন্দরী আর্লেনার মুখ্য অথবা গৌণ কোন ভূমিকা ছিল না৷ মেয়েটা ওর নীল-নয়নে ছোকরাটাকে নিয়ে দিব্যি ছিলো৷ আর যদি জিগ্যেস করেন তাহলে বলবো, ব্যাপারটা ক্রমশ মার্শালের নজরে আসছিলো৷’

‘এ ধারণার সমর্থনে কোন প্রমাণ আছে?’

‘দু-একবার ওকে ঘৃণাভরে চোখে রেডফার্নের দিকে তাকাতে দেখেছি৷ ... মার্শালকে চেনা বড় শক্ত৷ দেখে মনে হয় খুবই শান্ত এবং নম্র স্বভাবের—যেন সর্বক্ষণ তন্দ্রায় ডুবে আছে, কিন্তু লন্ডনে ওর খ্যাতি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের৷ ওর সম্পর্কে দু-একটা কথা আমারও কানে এসেছে৷ একবার তো মারপিট করার জন্যে আদালতমুখো হতে হতে বেঁচে গেছেন৷ তবে এটা জানবেন, ওই ফরিয়াদী লোকটা মার্শালের সঙ্গে অত্যন্ত নোংরা ব্যবহার করছিলো৷ মার্শাল বিশ্বাস করেছিলো৷ লোকটাকে আর সে মার্শালের দুর্দিনে সেই বিশ্বাসের মুখে লাথি মেরে সরে পড়েছিলো৷ কাজটা যে অত্যন্ত অন্যায় হয়েছিলো, সেটা আমিও মানি৷ মার্শাল রাগে অন্ধ হয়ে লোকটাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলো৷ সেটা আমিও মানি৷ মার্শাল রাগে অন্ধ হয়ে লোকটাকে প্রায় মেরেই ফেলেছিলো৷ লোকটা অবশ্য আদালতে আর যায়নি—ভয় পেয়েছিলো, যদি কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে৷ যতটুকু শুনেছি আপনাদের বললাম—সত্যি-মিথ্যে জানি না৷’

‘তাহলে আপনার ধারণা,’ বললেন, পোয়ারো, ক্যাপ্টেন মার্শালের পক্ষে তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করা অসম্ভব নয়?’

‘উহুঁ, মোটেই না৷ সে কথা আমি একবারও বলিনি৷ শুধু বলেছি, মার্শাল এমন ধরনের লোক যে সময়ে সময়ে হঠাৎই ক্ষেপে উঠতে পারে৷’

পোয়ারো বললেন, ‘মিঃ ব্ল্যাট, কতকগুলো কারণের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বিশ্বাস, মিসেস মার্শাল আজ সকালে পিক্সি কোভে একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন৷ সেই ‘একজন’ টি কে হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?’

মিঃ ব্ল্যাট চোখ টিপলেন৷

‘মনে হয়-টয় নয়! একেবারে সঠিক বলতে পারি৷ রেডফার্ন!’

‘না, মিঃ রেডফার্ন নন৷’

মিঃ ব্ল্যাট যেন থিতিয়ে গেলেন৷ দ্বিধাগ্রন্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘রেডফার্ন নয়? তাহলে আমি ঠিক বলতে পারছি না... মানে, আর কাউকে সেরকম মনে হচ্ছে না...’

আংশিক আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে তিনি বলে চললেন, ‘আগেও বলেছি এখনও বলছি—সেই ‘একজন’ টি আই নই৷ সে সৌভাগ্য কখনও হয়নি৷ দাঁড়ান, ভেবে দেখি—নাঃ, গার্ডেনারে হবে না, কারণ ওর বউটা সর্বক্ষণ শ্যেনদৃষ্টিতে ওর ওপরে নজর রাখে৷ আর ওই বুড়ো বেতো ঘোড়া ব্যারীটা? রামোঃ! পাদ্রীসাহেবও হবেন বলে মনে হচ্ছে না৷ তবে মনে রাখবেন, আমাদের সম্মানিত পাদ্রীসাহেবকে প্রায়ই দেখেছি আর্লেনাকে লক্ষ্য করছেন : পুরোপুরি ধর্মীয় ঘৃণার দৃষ্টিতে, কিন্তু সেই সঙ্গে সেই ধর্মীয় চোখ মেয়েটার শরীরের চড়াই-উৎরাইগুলাকে রেহাই দেয়নি৷ কি বুঝলেন? শালা বেশিরভাগ পাদ্রীই এক নম্বরের ভণ্ড৷ গতমাসের মামলার খবরটা পড়ে ছিলেন? ধর্মযাজক আর র্গীজার দারোয়ানের মেয়ের কেলোর কীর্তি! এ সব কেচ্ছা দেখে লোকের তো চোখ খুলে যাওয়া উচিত৷’

চাপা হাসিতে মুখর হলেন হোরেস ব্ল্যাট৷

কর্নেল ওয়েস্টন শীতলকণ্ঠে বললেন, ‘আমাদের সাহায্যে আসতে পারে এমন কিছু আপনি তাহলে জানেন না?’

মিঃ ব্ল্যাট মাথা নাড়লেন ‘উঁহু,’ সেরকম কিছু মনে পড়ছে না৷’ একটু থেমে তিনি যোগ করলেন, ‘এ ধরনের একটা ব্যাপারটা নিয়ে যে বেশ তোলপাড় হবে, বুঝতে পারছি৷ কাগজের লোকেরা তো জায়গাটাকে একেবারে মাছির মতো ছেঁকে ধরবে৷ জলি রজারে যে বিশেষ একটা স্বাতন্ত্র্য ছিলো ভবিষ্যতে তার খুব বেশি আর অবশিষ্ট থাকবে বলে মনে হয় না৷ জলি রজারই বটে! এই না হলে আর আনন্দমুখর পরিবেশ!’

এরকুল পোয়ারো অস্ফুট কণ্ঠে বললেন, ‘এখানে ছুটির দিনগুলো আপনার ভালো লাগেনি?’

মিঃ ব্ল্যাটের রক্তাক্ত মুখমণ্ডল আরো রক্তিম হলো৷ তিনি বললেন, ‘সত্যি কথা বলতে গেলে, না, ভালো লাগেনি নৌকো বাওয়া, নিসর্গ দৃশ্য, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা, অতিথিসেবা, এ সম্পর্কে কোন অভিয়োগ আমার নেই—কিন্তু এ জায়গাটার মিশুকে ভাবটুকুর বড় অভাব, বুঝতেই তো পারছেন কি বলতে চাইছি৷ আমার কথা হলো, কারো টাকার দামই কারোর চেয়ে কম নয়৷ আমরা সবাই এখানে এসেছি ছুটি উপভোগ করতে, আনন্দ করতে৷ তাহলে একসঙ্গে মিলে সেটাই করি না কেন? তা নয়, কেবল দলাদলি, যার যার একা একা বসে আছে, দায়সারা ঠাণ্ডা গলায় সুপ্রভাত, শুভরাত্রি জানাচ্ছে—দম দেওয়া পুতুলের মতো নিষ্প্রাণ সুরে বলছে, আজকের দিনটা ভারী চমৎকার, তাই না—ওঃ অসহ্য৷’

মিঃ ব্ল্যাট থামলেন—তাঁর মুখমণ্ডলে রক্তিম প্রলেপ এখন আরও স্পষ্ট, আরও উজ্জ্বল৷

কপালে হাত বুলিয়ে ঘাম মুছে অপরাধী সুরে তিনি বললেন, ‘যাকগে, আমার কথায় কান দেবেন না৷ তুচ্ছ জিনিসকে আমি বড় বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলি৷’

এরকুল পোয়ারো মৃদু স্বরে বলে উঠলেন, ‘তাহলে মিঃ ব্ল্যাট সম্পর্কে আমাদের কি মতামত?’

কর্নেল ওয়েস্টন হাসলেন, বললেন, ‘আপনার কি মতামত তাই বলুন৷ আপনি তাঁকে বেশিদিন ধরে দেখেছেন—’

পোয়ারো কোমল সুরে বললেন, ‘আপনাদের ইংরেজি ভাষায় তাঁকে বর্ণনা করার মতো প্রচুর শব্দগুচ্ছ রয়েছে৷ অমসৃণ হীরে৷ স্বগঠিত মানুষ৷সমাজশীর্ষ আরোহী৷ তিনি হয়তো বা করুণামাত্রর পাত্র, উপহাস্যম্পদ, অথবা ফূর্তিপ্রিয় যে ভাবে আপনি দেখতে চাইবেন৷ এটা সম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গীর প্রশ্ন৷ কিন্তু আমার মনে হয়, এছাড়াও আরও একটা কিছুটা তাঁর চরিত্রে রয়েছে৷’

‘কি সেটা?’

এরকুল পোয়ারো ওপর দিকে নজর তুলে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করলেন, ‘আমার ধারণা, তিনি বর্তমানে অত্যন্ত বিচলিত!’

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘ওই সময়গুলো আমার যাচাই করা হয়ে গেছে৷ হোটেল থেকে বেরিয়ে পিক্সি কোভে নামার মই পর্যন্ত পৌঁছতে তিন মিনিট৷ অবশ্য এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে, হোটেল থেকে চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত আপনি হাঁটছেন, এবং তারপর প্রচণ্ডবেগে দৌড়চ্ছেন৷’

ওয়েস্টন ভুরু উঁচিয়ে বললেন, ‘আমি যা ভেবেছিলাম তার চেয়েও কম সময় লাগছে দেখছি!’

‘মই বেয়ে নেমে সৈকতে পৌঁছতে এক মিনিট পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড; আর ওঠবার সময় দু মিনিট৷ এ সবই কনস্টেবল ফ্রিণ্টের কাজ৷ অল্পস্বল্প খেলোয়ার বলে ওর নাম আছে৷ সাধারণভাবে হেঁটে গেলে, মই বেয়ে ওঠা নামা ইত্যাদি সেরে ফিরে আসতে সময় লাগবে মিনিট পনেরো মতো৷’

ওয়েস্টন সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন বললেন, ‘আরও একটা জিনিস আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে : পাইপের ব্যাপারটা৷’

কলগেট বললেন, ‘ব্ল্যাট পাইপের নেশা করেন, করেন মার্শাল এবং পাদ্রী ভদ্রলোক৷ রেডফার্ন পছন্দ করেন সিগারেট, মার্কিন ভদ্রলোক চুরুট৷ মেজর ব্যারী একেবারেই ধুমপান করেন না৷ মার্শালের ঘরে একটা পাপি রয়েছে, ব্ল্যাটের ঘরে দুটো; পাদ্রীর ঘরে একটা৷ পরিচারিকা বলছে, মার্শালের নাকি দুটো পাইপ আছে৷ অন্য পারিচারিকাটি তেমন চালাক চতুর নয়৷ বাকি দুজনের ক’টা করে পাইপ আছে সঠিক জানে না৷ অনুমানে বলছে, ‘ওঁদের ঘরে দু-তিনটি করে পাইপ সে পড়ে থাকতে দেখেছে৷’

ওয়েস্টন সম্মতিসূচক ভঙ্গীতে মাথা নাড়লেন৷

‘আর কিছু?’

‘হোটেল কর্মচারীদের সম্পর্কে খোঁজখবর করা হয়ে গেছে৷ ওদের মধ্যে কোন গলদ নেই৷ পানশালার পরিচারক হেনরী, তার সঙ্গে মার্শালের যে এগোরোটা বাজতে দশে দেখা হয়েছে সে কথার সমর্থন করছে৷ সৈকতে পরিচারক উইলিয়াম আজ সকালের বেশিরভাগ সময় হোটেল থেকে নিচের পাথরে নামার সিঁড়িটা মেরামতের কাজে ব্যস্ত ছিলো৷ মনে হয় না, ওর কথায় কোন ফাঁকি রয়েছে৷ জর্জ টেনিস কোটে দাগ কাটার কাজ সেরে খাবার ঘরে চারদিকে কতকগুলো গাছের চারা লাগায়৷ সেতু পার হয়ে কেউ দ্বীপে এসে থাকলে সেটা ওদের কারোরই নজরে পড়তো না৷’

‘জোয়ারের জল সেতুর নীচে নেমেছে কখন?’

‘সাড়ে ন’টা নাগাদ, স্যার৷’

‘হুম—’ ওয়েস্টন গোঁফে তা দিতে লাগলেন, ‘তাহলে সেতু পার হয়ে সত্যিই যদি কেউ দ্বীপে এসে থাকে, আমি মোটেই অবাক হবো না৷ কারণ আমরা একটা নতুন সূত্র পেয়েছি কলগেট৷’

তিনি গুহা থেকে স্যান্ডউইচের বাক্স আবিষ্কারে ঘটনাটা খুলে বললেন৷

দরজায় টোকার শব্দ হতেই ওয়েস্টন বললেন, ‘ভেতরে আসুন৷’

আগন্তক ক্যাপ্টেন মার্শাল৷

তিনি বললেন, ‘কবে নাগাদ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করবো কিছু বলতে পারেন?’

‘আমার মনে হয়, করোনারের বিচার পরশুদিনই শেষ হয়ে যাবে, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷’

‘ধন্যবাদ৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘একমিনিট স্যার, এগুলো দয়া করে নিয়ে যাবেন৷’

চিঠি তিনটি ক্যাপ্টেন মার্শালের হাতে দিলেন কলগেট৷

হাসলেন কেনেথ মার্শাল—হাসিতে ব্যঙ্গের ছোঁয়া৷

তিনি বললেন, ‘আমার টাইপ করার গতিবেগ পুলিশ-বিভাগ পরীক্ষা করে দেখছিলো বুঝি? আশা করি আমাকে সন্দেহ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে—’

কর্নেল ওয়েস্টন খুশিভরা কন্ঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন মার্শাল; আপনি আমাদের কাছ থেকে নির্দোষিতার প্রমাণপত্র পেতে পারেন৷ ওই কাগুজগুলো টাইপ করতে পুরোপুরি এক ঘণ্টাই লাগে৷ তাছাড়া, এগোরোটা বাজতে পাঁচ মিনিস পর্যন্ত হোটেলের পরিচারিকা আপনাকে টাইপ করতে শুনেছে, আর এগারোটা কুড়িতে আরও একজন সাক্ষী আপনাকে টাইপ করতে দেখেছে৷’

ক্যাপ্টেন মার্শাল অস্ফুটস্বরে বললেন, ‘তাই নাকি? সব কিছুই অতিরিক্ত সন্তোষজনক মনে হচ্ছে৷’

‘ঠিক তাই৷ মিস ডার্নলি এগারোটা কুড়িতে আপনার ঘরে এসেছিলেন৷ আপনি টাইপ করতে এত ব্যস্ত ছিলেন যে তাঁকে খেয়াল করেননি৷’

কেনেথ মার্শালের মুখমণ্ডল আবৃত হলো অভিব্যক্তিহীন অভিব্যক্তিতে৷ তিনি বললেন, ‘মিস ডার্নলি বুঝি তাই বলেছেন? তিনি একটু থামলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি তার একটু ভুল হয়েছে৷ আমিও তাঁকে দেখতে পেয়েছি, তবে তিনি সেটা জানেন বলে আমার মনে হয় না৷ সামনের আয়নায় আমি তাঁর প্রতিবিম্ব দেখেছিলাম.’

পোয়ারো অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘কিন্তু আপনি টাইপ বন্ধ করেননি৷’

মার্শাল সংক্ষিপ্তভাবে জবাব দিলেন, ‘না, আমার শেষ করার তাড়া ছিলো৷’

মিনিটখানেক নীরব থাকার পর হঠাৎই তিনি বলে উঠলেন, ‘আর কিছু আপনাদের জানার আছে?’

‘না ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন মার্শাল৷’

কেনেথ মার্শাল ধন্যবাদ গ্রহণ করে নিষ্ক্রান্ত হলেন৷

‘ওয়েস্টন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ওই চলে যাচ্ছে আমাদের অতি প্রত্যাশিত হত্যাকারী—নিজেকে সম্পর্ণ নির্দোষ প্রতিপন্ন করে!... এই তো, নীসডন এসে পড়েছেন৷’

ডাক্তারের আচার-ব্যবহারে উত্তেজনার সামান্য ছোঁয়া৷ তিনি বললেন, ‘সাঙ্ঘাতিক যা হোক এক জিনিস পাঠিয়েছেন, মশাই৷’

‘কেন, কি ওটা?’

‘কি ওটা? ডায়ামরফিন হাইড্রোক্লোরাইড! যে জিনিসটাকে সচরাচর হেরোইন বলা হয়ে থাকে৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট চাপা শিস দিয়ে উঠলেন বললেন, ‘এবারে পায়ের তলায় শক্ত মাটির পাওয়া যাচ্ছে৷ এই মাদকদ্রব্যের ব্যাপারটা যে সমস্ত ঘটনার মূলে তা আমি বাজি রেখে বলতে পারি৷’

দশম পরিচ্ছেদ

জনতার ছোট্ট দলটা বেরিয়ে এলো ‘রেড বুল’-এর বাইরে, ইতস্তত ছড়িয়ে পড়লো৷ করোনান্দের সংক্ষিপ্ত বিচার আজকের মতো শেষ—মুলতুবী রাখা হয়েছে পক্ষকালের জন্য৷

রোজমণ্ড ডার্নলি ক্যাপ্টেন মার্শালের সঙ্গে নিলো৷ ও নিচু গলায় বললো, যতটা ভেবেছিলাম সেরকম খারাপ কিছু হয়নি, কি বলো, কেন?’

তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিলেন না ক্যাপ্টেন মার্শাল৷ হয়তো উপস্থিত গ্রামবাসীদের নির্লজ্জ অপলক দৃষ্টি সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন, সচেতন ছিলেন তাদের প্রায় উদ্যত তর্জনী সম্পর্কে৷

‘এর কথাই তোমাকে বলছিলাম গো৷’ দ্যাখো, ওই যে মরা মেয়েটার স্বামী৷’ ‘হ্যাঁ, ওই লোকটার বউটাকে কে যেন খুন করেছে৷’ দেখতে পাচ্ছো ওই যে যাচ্ছে...’

জ্ঞানের তীব্রতা তাঁর শ্রবণে আসার পক্ষে যথেষ্ট নয়; কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি অনুভব করতে পারছিলেন তাদের উপস্থিতি, তাদের লক্ষ্যস্থল৷ অতীতের শাস্তি স্তম্ভের এই বোধহয় আধুনিক রূপ৷ ইতিপূর্বে সাংবাদিকদের মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়েছে—‘কিছুই বলার নেই’—জাতীয় যে নীরবতার প্রাচীর তিনি তাঁদের কাছে গড়ে তুলেছেন তা দক্ষ হাতে চুরমার করে দিয়েছে৷ সেই আত্মপ্রত্যয়ী অধ্যবসায়ী তরুণেরা এমন কি যে সব সংক্ষিপ্ত শব্দ করে কোন ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্তকে তিনি এড়াতে চেয়েছেন, সেই শব্দগুচ্ছই আজকের প্রভাতী সংবাদপ্রত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে৷

‘তাঁর স্ত্রী মৃত্যুরহস্যকে একমাত্র এ ধরনের ভিত্তিতেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যে, কোন স্বভাব-অপরাধী ঘটনাচক্রে এই দ্বীপে এসে উপস্থিত হয়েছিলো, এ বিষয়ে তিনি একমত কিনা প্রশ্ন করা হলে ক্যাপ্টেন মার্শাল বলেন—’ ইত্যাদি ইত্যাদি৷

ফ্লিক-ফ্লিক...ক্যামেরা ঝলসে উঠেছে ক্লান্তিহীনভাবে৷ আর এখন, এই মুহূর্তে সেই বহু পরিচিত ছোট্ শব্দ আবার তাঁর কানে এলো৷ ঘুরে তাকালেন তিনি—একটি যুবক, ঠোঁটে তার হাসি, নিজের কাজ সম্পূর্ণ করে খুশি-খুশিভাবে তাঁকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে৷

রোজমণ্ড অস্ফুট কণ্ঠে বললো, ক্যাপ্টেন মার্শাল ও তাঁর জনৈক বান্ধবী বিচারে শেষে রেড বুল থেকে বেরিয়ে আসছেন৷’

মার্শাল সঙ্কুচিত হলেন৷

রোজমন্ড বলল, ‘এড়াবার চেষ্টা করে লাভ নেই, কেন? বাস্তবের মুখোমুখি তোমাকে হতেই হবে! আমি শুধু আর্লেনার মৃত্যু কথা বলছি না—আনুষঙ্গিক সমস্ত নোংরা ব্যাপারগুলোর কথাও বলছি৷ দশজনের নির্লজ্জ চোখ, পরচর্চায় মুখর জিভ, কাগজের লোকেদের বোকা বোকা সাক্ষাৎকার—এসবের মুখোমুখি হওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো পুরো ব্যাপারটাকে কৌতুকের চোখে দেখা৷ পুরনো যত বস্তাপচা শব্দে এর জবাব দিয়ে ব্যঙ্গ ভরা কুটিল ঠোঁটে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকো৷’

তিনি বললেন, ‘তুমি বুঝি তাই করতে?’

‘হ্যাঁ৷’ একটু থামলো ও, ‘এবং তুমি তা করবে না আমি জানি৷ তোমার পথ হলো বর্ণচোরা বহুরূপীর পথ৷ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় থেকে পটভূমিতে মিলিয়ে যাওয়া৷ কিন্তু এখানে তোমার সে কায়দা খাটবে না, কারণ মিলিয়ে যাওয়ার মতো কোন পটভূমি এখানে নেই৷ এখানে সকলের চোখে তুমি ভীষণভাবে স্পষ্ট—সাদা পটভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকা হলদে-কালো ডোরা কাটা কোন বাঘের মতো৷ কারণ তুমি ‘‘নিহত-মহিলার-স্বামী”৷’

‘দোহাই তোমার, রোজমণ্ড!’

শান্তস্বরে বলল ও, ‘তোমার ভালোর জন্যই এসব বলছি, সোনা৷’

কিছুটা পথ ওঁরা নীরবে এগিয়ে গেলেন৷ তারপর ভিন্ন সুরে বললেন মার্শাল, জানি, রোজমণ্ড, জানি৷ আমাকে অতটা অকৃতজ্ঞ ভেবো না৷’

ক্রমে গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে এলেন ওঁরা৷ দূরাগত কৌতূহলী দৃষ্টি এখনও ওঁদের অনুসরণ করলেও কাছাকাছি কেউ নেই৷ রোজামণ্ড ডার্নলি ওর প্রথম মন্তব্যের পুনরাবৃত্তি করলো ভিন্নভাবে, ওর কণ্ঠস্বর স্বাভাবিকের চেয়ে নিচু হলো, ‘ওখানে সত্যি সত্যিই তেমন খারাপ কিছু হয়নি কি বলো?’

এক মুহূর্ত নীরব রইলেন তিনি, তারপর বললেন, ‘কি জানি, জানি না৷’

‘পুলিশ কি ভাবছে?’

‘ওরা স্পষ্ট করে কিছু বলছে না৷’

মিনিটখানেক নীরবতার পর রোজমণ্ড বলল, ‘আর আমাদের সেই ক্ষুদে মানুষটি—পোয়ারো—তিনি কি সত্যিই এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন?’

কেনেথ মার্শাল বললেন, সেদিন তো দেখে মনে হলো, পুলিশ-প্রধানের সঙ্গে আঠার মতো সর্বক্ষণ লেগে রয়েছেন৷’

‘সে জানি—কিন্তু তিনি কি সত্যিই কিছু করছেন?’

‘আমি কি করে জানবো, রোজামণ্ড?’

চিন্তিত স্বরে বলল, ভদ্রলোকর বয়েস হয়েছে৷ সম্ভবত অল্পসল্প ভীমরতিগ্রস্ত৷’

‘হতে পারে৷’

ওঁরা কংক্রীটের সেতুর কাছে এসে দাঁড়ালেন৷ সেতুর ও প্রান্তে সূর্যালোকে আলোকিত দ্বীপটা যেন একরাশ প্রশান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে রয়েছে৷

রাজামণ্ড হঠাৎই বললো, ‘কখনো কখনো—সবকিছু কেমন অবাস্তব বলে মনে হয়৷ এই মুহূর্তে আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না, ওরকম একটা নৃশংস ঘটনা এখানে ঘটতে পারে...’

মার্শাল ধীরে ধীরে বললেন, ‘জানি, তুমি কি বলতে চাইছো৷ কিন্তু প্রকৃতি বড় নিষ্ঠুর৷ বহু জনপ্রাণীর একটি না হয় ক্রমেই গেলো। প্রকৃতির কাছে এটা এরকমই তুচ্ছ, তার বেশি কিছু নয়৷’

রোজামণ্ড বলল, ‘সত্যি—হয়তো এইভাবেই ব্যাপারটা আমাদরে দেখা উচিত৷’

চকিত চোখে ওর দিকে তাকালেন তিনি৷ তারপর নিচু গলায় বললেন, ‘ভেবো না, রোজমণ্ড৷ সব ঠিক আছে৷ স-ব ঠিক আছে৷’

ওঁদের সঙ্গে দেখা করতে সেতুর ওপ্রান্তে এসে দাঁড়ালো লিন্ডা৷ ওর চলাফেরায় দ্বিধাগ্রস্ত অশ্বশাবকের আকস্মিক চঞ্চল ভঙ্গী৷ চোখের কোলে গভীর কালো ছায়া ও কচি মুখের সৌন্দর্যকে অনেকাংশে ম্লান করে দিয়েছে৷ ওষ্ঠাধারে শুষ্কতা ও রুক্ষতা প্রকটভাবে স্পষ্ট৷

রুদ্ধশ্বাসে ও বললো, ‘কি হলো—কি বললো ওরা?’

ওর বাবা সংক্ষিপ্তভাবে বললেন, ‘বিচার দু সপ্তাহের জন্য মুলতুবী রাখা হয়েছে৷’

‘তার মানে ওরা—ওরা এখনও সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি?’

‘হ্যাঁ৷ এখনও অনেক সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন আছে৷’

‘কিন্তু—কিন্তু ওদের কি মনে হচ্ছে?’

অনিচ্ছাসত্ত্বেও সামান্য হাসলেন মার্শাল৷

‘বড় অবুঝ তুমি—কে বলতে পারে ওরা কি ভাবছে? তাছাড়া ‘ওরা’ বলতে তুমি কার কথা বলছো? করোনারের, জুরিদের, পুলিশের, কাগজের সাংবাদিকদের নাকি লেদারকোম্ব উপসাগরে জেলেদের কথা?’

লিন্ডা আস্তে আস্তে বলল, ‘মনে হয় আমি—পুলিশের কথাই বলতে চাইছি৷’

মার্শাল নীরস কণ্ঠে বললেন, ‘পুলিশ যাই ভাবুক না কেন, সেটা এখুনি ওরা কাউকে বলছে না৷’

কথার শেষে তাঁর ঠোঁটের রেখা সূক্ষ্ম হলো, কঠিন হলো৷ তিনি হোটেলে প্রবেশ করলেন৷

রোজামণ্ড ডার্নলিও যখন একই পদাঙ্ক অনুসরণে পা বাড়িয়েছে, লিন্ডা ডাকলো, ‘রোজামণ্ড!’

রোজামণ্ড ঘুরে দাঁড়ালো৷ মেয়েটার অসুখী মুখমণ্ডলে নীরব কাকুতি ওর হৃদয় স্পর্শ করলো৷ লিন্ডার হাতে হাত রাখলো ও৷ তারপর হোটেলকে পেছনে রেখে সরু পথ ধরে ওরা এগিয়ে চললো, ‘দ্বীপের দূরপ্রান্তের দিকে৷

রোজমণ্ড শান্ত স্বরে বলল, এত বেশি ভেবো না, লিন্ডা৷ আমি জানি ব্যাপারটা কত নিষ্ঠুর, এবং তোমার কাছে কত বড় একটা মানসিক আঘাত—সবই জানি, কিন্তু সে নিয়ে শুধু শুধু চিন্তা করে কোন লাভ নেই৷ আর যে জিনিসটা সর্বক্ষণ তোমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে তা হলো ঘটনার বীভৎসতা—তার বেশি কিছু নয়৷ কারণ তুমি নিজেও খুব ভালোভাবে জানো, আর্লেনাকে তুমি একটুও পছন্দ করতে না৷’

লিন্ডার শরীরে আকস্মিক কম্পন রোজমণ্ড অনুভব করতে পারলো, সেই সঙ্গে শুনতে পেলো মেয়েটার উত্তর৷

‘না, ওকে আমার মোটেও ভালো লাগত না...’

রোজামণ্ড বলে চললো, ‘কারও জন্যে দুঃখ পাওয়া সম্পূর্ণ অন্য জিনিস—তাকে কখনও লুকিয়ে রাখা যায় না৷ কিন্তু মানসিক আঘাত এবং আতঙ্কের হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সে বিষয়ে এতটুকু চিন্তা না করা৷’

লিন্ডা তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো, ‘তুমি কিচ্ছু বুঝতে পারছো না৷’

‘মনে তো হয় পারছি, সোনা৷’

লিন্ডা মাথা ঝাঁকালো৷

‘না, পারছো না৷ তুমি একটুও বুঝতে পারছো না—আর ক্রিস্টিনও কখনও বোঝে না৷ তোমরা আমাকে এত ভালোবাসো, কিন্তু বুঝতে পারো না আমার মনের অবস্থাটা৷ তোমরা শুধু ভাবো, আমি অযথা একই জিনিস নিয়ে চিন্তা করে করে অসুস্থ হয়ে পড়ছি৷’

ও একটু থামলো৷ তারপর বললো, ‘কিন্তু আসলে মোটেই তা না৷ আমি যা জানি, তা যদি তুমি জানতে—’

রোজামণ্ড থমকে দাঁড়ালো৷ নিথর নিষ্পন্দ ওর শরীর এতটুকু কাঁপলো না—বরং কঠিন হলো৷ মিনিট কয়েক দাঁড়িয়ে রইলো ও, তারপর লিন্ডার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলো নিজের হাত৷

ও বললো, ‘কি জানো তুমি, লিন্ডা?”

মেয়েটা স্থির চোখে চেয়ে রইলো৷ তারপর মাথা ঝাঁকালো আপন মনেই বল, ‘কিচ্ছু না৷’

রোজামণ্ড আচমকা চেপে ধরলো ওর বাহু৷ চাপের তীব্রতায় ব্যথা পেলো লিন্ডা৷ ওর মুখমণ্ডলে ঈষৎ যন্ত্রণায় ছাপ ক্ষণিকের তরে দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেলো৷

রোজামণ্ড বললো, ‘সাবধানে থেকো, লিন্ডা৷ খুব সাবধানে থেকো৷’

ও বললো, ‘আমি খুব সাবধানে থাকি—স-ব সময়৷’

রোজমণ্ড জরুরি স্বরে বলল, ‘শোনো, লিন্ডা, একটু আগেই তোমাকে যে কথা বললাম, এখনও আমি সেই কথাই বলবো—প্রয়োজন হলে আরও একশোবার বলবো৷ সমস্ত ব্যাপারটা তোমার মন থেকে মুছে ফেলো৷ কখনও ও নিয়ে ভেবো না৷ ভুলে যাও—সব ভুলে যাও... চেষ্টা করলেই তুমি পারবে৷ আর্লেনা মারা গেছে, কোন কিছুর বিনিময়েই ওকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না... সমস্ত ভুলে গিয়ে ভাবো তোমার ভবিষ্যতের কথা৷ আর সবচেয়ে যেটা প্রয়োজন : মুখে একেবারে কুলুপ এঁটে থাকবে৷’

লিন্ডা যেন কুঁকড়ে গেলো৷ ও বললো, ‘তুমি—তুমি তাহলে সবই জানো?’

রোজামণ্ড সতেজ কণ্ঠে বললো, ‘আমি কিছুই জানি না৷ আমার মতে, ভবঘুরে কোন পাগল হঠাৎই এই দ্বীপে এসে আর্লেনাকে খুন করেছে৷ এটাই একমাত্র সম্ভাব্য সাবধান৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত পুলিশকেও এ কথা মানতে হবে৷ কারণ সত্যিই হয়তো তাই ঘটে থাকবে৷ হয়তো কেন, প্রকৃতপক্ষে তাই ঘটেছে!’

লিন্ডা বলল, ‘যদি বাবাকে—’

রোজমণ্ড বাধা দিলো৷

‘ও কথা যাক৷’

লিন্ডা বললো, ‘একটা কথা আমাকে বলতেই হবে৷ আমার মাকে—’

‘বলো, কি হয়েছে তোমার মায়ের?’

‘মাকে—মাকে খুনের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিলো, তাই না?’

‘হ্যাঁ—’

লিন্ডা বিলম্বিত স্বরে বললে, ‘আর তারপর, বাবা তাকে বিয়ে করে৷ এ সব দেখে শেুনে মনে হয় না যে বাবা খুন করাটাকে সত্যি সত্যি তেমন অন্যায় বলে মনে করে না। অন্তত সব ক্ষেত্রে তো নয়ই৷’

রোজমণ্ড তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলো, ‘আর কখনও এ ধরনের কথা উচ্চারণ করবে না—এমন কি আমার কাছেও! তোমার বাবার বিরুদ্ধে পুলিশের হাতে কোন প্রমাণ নেই৷ তাঁর অ্যালিবাই রয়েছে—এমন অ্যালিবাই যা ওরা শত চেষ্টাতেও ভাঙতে পারবে না৷ তোমার বাবা সম্পূর্ণ নিরাপদ৷’

লিন্ডা ফিসফিস করে বললো, ‘তাহলে কি ওরা প্রথমে ভেবেছিলো যে বাবা—?’

রোজমণ্ড চিৎকার করে উঠলো, ‘ওরা কি ভেবেছিলো আমি জানি না৷ কিন্তু এখন ওরা জানে, তাঁর পক্ষে এ কাজ করা সম্ভম ছিলো না৷ বুঝতে পারছো আমার কথা? তাঁর পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব ছিলো না৷’

ওর কথায় কর্তৃত্বের সুর, ওর চোখের শাসনে লিন্ডার মুখমণ্ডলে নেমে এলো নীরব বশ্যতা৷ মেয়েটার বুক ঠেলে বেরিয়ে এলো এক সুদীর্ঘ স্পন্দিত নিঃশ্বাস৷

রোজমণ্ড বলল, ‘শিগগিরই এ জায়গা ছেড়ে তুমি চলে যেতে পারবে৷ তখন সব ভুলে যাবে—স-ব!’

আকস্মিক অপ্রত্যাশিত বিদ্রোহী সুরে বলে উঠলো লিন্ডা, ‘আমি কোনদিন ভুলবো না৷’

কথা শেষ করেই ও ঘুরে দাঁড়িয়ে ছুটতে শুরু করলো হোটেল অভিমুখে৷

ওর অপসৃয়মান শরীরের দিকে অপলকে চেয়ে রইলো রোজামণ্ড৷

‘একটা কথা আপনার কাছে আমি জানতে চাই, মাদাম—’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন ঈষৎ আনমনা ভঙ্গীতে চোখ তুলে তাকালো পোয়ারোর দিকে৷ ও বললো, ‘বলুন?”

এরকুল পোয়ারো ওর অন্যমনস্কতাকে তেমন গ্রাহ্য করলেন না৷ তিনি লক্ষ্য করেছেন, কিভাবে ওর চোখজোড়া পানশালার বাইরে উঠোনে পায়চারির স্বামীকে অনুসরণ করে চলেছে, কিন্তু এই মুহূর্তে বিশুদ্ধ দাম্পত্য সমস্যায় বিন্দুমাত্রও কৌতূহল তাঁর নেই৷ তিনি চান প্রয়োজনীয় তথ্য৷

তিন বললেন, ‘হ্যাঁ, মাদাম, বলছি৷ একটা সামান্য কথা—সেদিন দৈবক্রমে বলে ফেলা আপনার একটা সামান্য কথা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷’

ক্রিস্টিন প্যাট্রিকের ওপর চোখ রেখেই বললো, ‘হ্যাঁ? কি বলেছিলাম আমি?’

‘পুলিশ-প্রধানের প্রশ্নের উত্তরে সেই কথাটা আপনি বলেছিলেন৷ আপনি বলেছেন, ‘কিভাবে খুনের দিন সকালে আপনি মিস লিন্ডা মার্শালের ঘরে গিয়েছিলেন, ঘরে তাঁকে পাননি, তারপর কিভাবে তিনি ঘরে ফিরে আসেন, এবং এই সময়ে পুলিশ-প্রধান আপনাকে প্রশ্ন করেছেন মিস মার্শাল ঘর ছেড়ে কোথায় গিয়েছিলেন৷’

ক্রিস্টিন একটু অধৈর্যভাবেই বললে, ‘আর আমি বলেছিলাম ও স্নান করতে গিয়েছিলো? তাই তো?’

হ্যাঁ—কিন্তু আপনি ঠিক এই কথাগুলো বলেননি, মাদাম৷ আপনি বলেননি ‘ও স্নান করতে গিয়েছিলো৷’ আপনার কথাটা ছিলো, ‘ও বললো, ও নাকি স্নান করতে গিয়েছিলো৷’

ক্রিস্টিন বললো, ‘কিন্তু সে তো একই কথা৷’

‘না, মাদাম, এক নয়! আপনার উত্তরের ধরন আপনার তরফে এক বিশেষ মনোভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে৷ লিন্ডা মার্শাল ঘরে এলেন—পরনে তাঁর স্নানের পোশাক, কিন্ত তা সত্ত্বেও—যে কোন কারণেই হোক, আপনার তখন মনে হয়নি তিনি স্নান করতে গিয়েছিলেন৷ আপনার কথাতেই এ সন্দেহে স্পষ্ট, ‘‘ও বলল, ও নাকি স্নান করতে গিয়েছিলো৷’’ সুতরাং তাঁর হাবভাবে কি এমন বিশেষত্ব ছিলো—সে কি তাঁর ব্যবহার, অথবা তাঁর পরনের কোন পোশাক, অথবা এমন কোন কথা যা তিনি বলেছিলেন—যার ফলে, তিনি স্নান করতে গিয়েছিলেন শুনে আপনি যথেষ্ট অবাক হন?’

ক্রিস্টিনের মনোযোগ প্যাট্রিককে পরিত্যাগ করে সম্পূর্ণ কেন্দ্রীভূত হলো পোয়ারোর ওপর৷ ওর মুখমণ্ডলে চাপা কৌতূহল৷ ও বললো, ‘আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়৷ এখন মনে হচ্ছে কথাটা মিথ্যে নয়... লিন্ডা যখন বললো, ও স্নান করতে গিয়েছিলো, তখন সামান্য হলেও আমি অবাক হয়েছিলাম৷’

‘কিন্তু কেন, মাদাম, কেন?’

‘হ্যাঁ, কেন? সেটাই তো এখন মনে করবার চেষ্টা করছি৷ ওহ-হ্যাঁ, এখন মনে পড়ছে, ওর হাতে একটা প্যাকেট ছিলো৷’

‘তাঁর হাতে একটা প্যাকেট ছিলো?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তার ভেতরে কি ছিলো আপনি জানেন না?’

‘ও হ্যাঁ, জানি৷ সুতোটা হঠাৎ ছিঁড়ে গিয়েছিলো৷ গ্রামের লোকেরা যেরকম করে বাঁধে, প্যাকেটটা সেরকম আলগা করে বাঁধা ছিলো৷ ভেতরে ছিলো কতকগুলো মোমবাতি। সেগুলা ছড়িয়ে পড়েছিলো মেঝেতে৷ আমি ওকে মোমবাতিগুলো তুলে রাখতে সাহায্য করেছিলাম৷’

‘হুঁ—’ বললেন পোয়ারো, ‘মোমবাতি...’

ক্রিস্টিন অবাক চোখে কয়েক মুহূর্ত তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷ তারপর বললো, ‘আপনাকে দেখে বেশ উত্তেজিত মনে হচ্ছে, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’

পোয়ারো প্রশ্ন করলেন, ‘তাঁর মোমবাতি কেনার কারণ কি মিস লিন্ডা আপনাকে বলেছিলেন?’

ক্রিস্টিনের মসৃণ কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো৷

‘না, যতদূর মনে পড়ছে বলেনি৷ তবে আমার মনে হয়, রাতে পড়াশোনো করবার জন্যেই ও মোমবাতিগুলো কিনেছিলো—হয়তো ঘরে আলোটা কমজোরী ছিলো৷’

‘বরং এর বিপরীতটাই সত্যিই, মাদাম৷ মিস মার্শালের বিছানার পাশে একটা চমৎকার বৈদ্যুতিক আলো আমার নজরে পড়েছে৷’

ক্রিস্টিন বললো, ‘কি জানি, তাহলে বলতে পারছি না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘সুতো ছিঁড়ে মোমবাতিগুলো যখন পড়ে যায়, তখন তাঁর মুখের অবস্থা কি রকম ছিলো?’

ক্রিস্টিন ধীরে ধীরে বললে, ‘ওকে কেমন—বিচলিত—হতবুদ্ধি বলে মনে হয়েছিলো?’

পোয়ারো সমর্থনে মাথা দোলালেন৷ তারপর প্রশ্ন করলেন, ‘তাঁর ঘরে কোন ক্যালেন্ডার আপনার নজরে পড়েছে?’

ক্যালেন্ডার? কিরকম ক্যালেন্ডার?’

পোয়ারো বললেন, ‘সম্ভবত একটা সবুজ ক্যালেন্ডার—যার পৃষ্ঠাগুলো ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে৷’

স্মৃতি রোমন্থনে সুতীক্ষ্ণ হয়ে এলো ক্রিস্টিনের আয়ত চোখ৷

‘একটা সবুজ ক্যালেন্ডার—সবুজ না বলে বরং গাঢ় সবুজ বলতে পারেন৷ হ্যাঁ, ওরকম একটা ক্যালেন্ডার আমি দেখেছি—তবে কোথায় ঠিক মনে করতে পারছি না৷ হতে পারে লিন্ডার ঘরে, কিন্তু জোর দিয়ে বলতে পারছি না৷’

কিন্তু ওরকম একটা জিনিস আপনি দেখেছেন, এটা সত্যি?’

‘হ্যাঁ৷’

সম্মতিসূচকভাবে আবার মাথা নাড়লেন পোয়ারো৷

ক্রিস্টিন একটু তীক্ষ্ণ স্বরেই বললো, ‘কিন্তু আপনি কি বলতে চাইছেন, মঁসিয়ে পোয়ারো? এ সবের অর্থ কি?’

উত্তরে পোয়ারো প্রকাশ করলেন বিবর্ণ-বাদামী চামড়ায় বাঁধানো ছোট বইটা। বললেন, ‘এটা আগে কখনও দেখেছেন?’

হ্যাঁ—মনে হয়—মানে, সেদিন গ্রামের লাইব্রেরীতে দাঁড়িয়ে লিন্ডা এই বইটা দেখছিলো, কিন্তু আমাকে আসতে দেখেই ও বইটা বন্ধ করে তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকিয়ে রাখে৷ ব্যাপারটা আমার কাছে একটু অবাক লেগেছিলো—কৌতূহলও যে হয়নি তা নয়৷’

ডাকিনীবিদ্যা, মায়াবিদ্যা ও লক্ষণহীন বিষের মিশ্রণপদ্ধতির বিস্তারিত ইতিহাস৷

ক্রিস্টিন বললো, ‘আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না, এ সবের মানে কি? পোয়ারো গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘এর অর্থ অনেক কিছু হতে পারে, মাদাম৷’

ওর সপ্রশ্ন দৃষ্টির কোন উত্তর দেবার পরিবর্তে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আরও একটা প্রশ্ন, মাদাম—খুনের দিন সকালে টেনিস খেলতে যাবার আগে আপনি কি স্নান করেছিলেন?’

ক্রিস্টিন অপলক স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো৷

‘স্নান? উঁহু৷ এমনিতেই আমার হাতে সময় কম ছিলো, আর তাছাড়া, তখন স্নান করবার ইচ্ছেও আমার ছিলো না—টেনিস খেলার আগে তো নয়ই৷ পরে হয়তো করলেও করতে পারতাম৷’

‘হোটেলে ফিরে এসে স্নানঘরে একবারও গিয়েছিলেন?’

‘হ্যাঁ, শুধু হাত-মুখ ধোবার জন্যে ব্যস৷’

‘স্নানের জন্য আপনি তাহলে কল খুলে রাখেননি?’

‘না৷ আমার স্পষ্ট মনে আছে খুলিনি৷’

পোয়ারো সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘এমনিই জিগ্যেস করলাম...’

মিসেস গার্ডেনার যেখানে বসে একটা ‘টুকরো ছবির-ধাঁধার সঙ্গে মানসিক যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন, সেই টেবিলের পাশে দাঁড়ালেন এরকুল পোয়ারো। ভদ্রমহিলা চোখ তুলেই চমকে উঠলেন৷

‘আরে, মঁসিয়ে পোয়ারো, চুপি চুপি কখন এসে দাঁড়ালেন৷ আমি তো টেরই পাইনি৷ এই মাত্র বিচার সেরে ফিরলেন বুঝি? জানেন, বিশেষ করে এ বিচারটার কথা শুনলেই আমাকে নিজেকে কিরকম দুর্বল বলে মনে হয়, কি করবো বুঝে উঠতে পারি না৷ সেইজন্যেই এই সমুদ্রতীরে আজ আর বসতে পারবো না৷ মিঃ গার্ডেনার জানেন, যখন আমার মন অস্থির থাকে, তখন তাকে শান্ত করতে এই ধাঁধার জুড়ি নেই! দেখুন তো, এই সাদা টুকরোটা কোথায় লাগবে? নির্ঘাত লোমের কম্বলটার অংশ হবে, কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে না...’

অমায়িক ভঙ্গীতে পোয়ারোর হাত ভদ্রমহিলার হাত থেকে টুকরোটা তুলে নিয়ে নিলো৷ পোয়ারো বললেন, এটা এইখানে বসবে, মাদাম৷ এটা বেড়ালটার একটা অংশ৷’

‘হতে পারে না! ওটা তো কালো বেড়াল!’

‘কালো বেড়াল, ঠিক কথা, কিন্তু লক্ষ্য করুন, ঘটনাচক্রে বেড়ালটার লেজের প্রান্তভাগ সাদা৷’

‘আরে, তাই তো! সত্যি আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়! কিন্তু তবুও আমার ধারণা, যারা এই ধাঁধাগুলো তৈরি করে, তারা ভীষণ পাজী লোক৷ আমাদের ঠকানোর জন্যে কত ফন্দীই না আঁটে!’

আরও একটা টুকরো যথাস্থানে বসিয়ে তিনি বলে চললেন, ‘জানেন মঁসিয়ে পোয়ারো, গত দু-একদিন ধরে আমি আপনাকে লক্ষ্য করছি৷ কখন আপনি গোয়েন্দাগিরি করেন, সেইটাই আমি স্বচক্ষে দেখতে চেয়েছি—অবশ্য এভাবে বললে, কথাটা কেমন নিষ্ঠুর শোনায়, যেন পুরো ব্যাপারটাই একটা খেলা—অথচ বেচারা মেয়েটা খুন হলো৷ ওঃ, প্রত্যেকবার এ কথা ভাবলেই আমি শিউরে উঠি৷ আজ সকালে মিঃ গার্ডেনারকে বলছিলাম, যে করে হোক এ জায়গা ছেড়ে আমাকে যেতেই হবে, আর এখন বিচার শেষ হয়ে যাওয়ায় তিনি বললেন, তাঁর ধারণা আগামীকালই আমরা রওনা হতে পারবো, এবং এটা নিঃসন্দেহে ভগবানের আশীর্বাদ৷ কিন্তু গোয়েন্দাগিরি প্রসঙ্গে বলি, এটা আপনার কায়দা-কানুনগুলো আমার জানতে ভীষণ ইচ্ছে করে—যদি একটু বুঝিয়ে বলেন, তাহলে সত্যি নিজেকে ধন্য মনে করবো৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ব্যাপারটা অনেকটা আপনার এই ধাঁধার মতো, মাদাম৷ সমস্ত টুকরোগুলো প্রথমে এক জায়গায় জড়ো করতে হয়৷ জিনিসটা ঠিক রঙিন পাথরের কারুকার্যের মতো, বিভিন্ন রঙ, বিভিন্ন নকশা—এবং প্রতিটি অদ্ভুত আকারে ছোট্ট টুকরোকে তাদের মানানসই জায়গায় নির্ভুলভাবে বসিয়ে দিতে হয়৷”

‘বাঃ, বেশ মজার তো! আর আপনি বলছেনও একেবারে জলের মতো সহজ করে!’

পোয়ারো বলে চললেন, ‘এবং কখনও কখনও অবস্থা হয়ে পড়ে আপনার ধাঁধার ওই টুকরোটার মতো৷ নিয়মমাফিক টুকরোগুলোকে হয়তো ‘একটার পর একটা সাজানো হচ্ছে—রঙ অনুয়ায়ী তাদের ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন অংশ—আর ঠিক তখন বিশেষ রঙের একটা টুকরো যেটা মানিয়ে যাওয়া উচিত—ধরুন, লোমের কম্বলের সঙ্গে মানিয়ে গেলো কালো বেড়ালের লেজে৷’

‘সত্যি মুগ্ধ হয়ে যাবার মতো! আপনার হাতে কি এইরকম অনেক টুকরো রয়েছে, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

হ্যাঁ, মাদাম৷ এই হোটেলের প্রায় প্রত্যেকেই একটি করে টুকরো উপহার দিয়েছেন আমার ধাঁধার জন্য৷ তার মধ্যে আপনিও রয়েছেন৷’

‘আমি?’ মিসেস গাডের্নারে কণ্ঠস্বর উত্তেজিত, তীক্ষ্ণ!

‘হ্যাঁ, মাদাম, আপনার একটা মন্তব্য আমাকে ভীষণভাবে সাহায্য করেছে, বলা যেতে পারে রহস্যের একটা দিক আলোকিত করে দিয়েছে৷’

‘শুনে আমার দারুণ আনন্দ হচ্ছে! আর একটু খুলে বলুন না, মঁসিয়ে৷ পোযারো?’

‘মাপ করবেন, মাদাম, সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আমি তুলে রেখেছি শেষ দৃশ্যের জন্য৷’

মিসেস গার্ডেনার আপনমনেই বললেন, ‘সব ভালো যার শেষ ভালো...’

ক্যাপ্টেন মার্শালের ঘরের দরজায় আলতো করে টোকা মারলেন এরকুল পোয়ারো৷ ভেতরে থেকে ভেসে আসছে টাইপরাইটারের শব্দ৷

সংক্ষিপ্ত ‘ভেতরে আসুন’ শোনামাত্রই ঘরে ঢুকলেন পোয়ারো৷

ক্যাপ্টেন মার্শাল তাঁর দিকে পেছন ফিরে বসে আছেন৷ দু-জানলার মধ্যে টেবিলে বসে টাইপ করছেন তিনি৷ ঘুরে তাকালেন না মার্শাল৷ মুখোমুখি দেওয়ালে টাঙানো আয়নায় প্রতিবিম্বিত পোয়ারোর চোখে চোখ রেখে বিরক্তির সুরে প্রশ্ন করলেন, ‘বলুন, মঁসিয়ে পোয়ারো, কি চান?’

পোয়ারো তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘অনধিকার প্রবেশের জন্য একশোবার ক্ষমা চাইছি৷ আপনি ব্যস্ত আছেন?’

মার্শাল সংক্ষিপ্তভাবে বললেন, ‘তা একটু আছি৷’

পোয়ারো বললেন, ‘একটা ছোট্ট প্রশ্ন আপনাকে আমি করতে চাই৷’

মার্শাল বললেন,’ওঃ ভগবান, প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়ে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি৷ পুলিশের প্রশ্নের উত্তর আমার দেওয়া হয়ে গেছে৷ সুতরাং, আর কারও প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আমার প্রশ্নটা অত্যন্ত সহজ৷ শুধু এই আপনার স্ত্রীর মৃত্যুর দিন সকালে টাইপ সেরে টেনিস খেলতে যাবার আগে আপনি কি স্নান করেছিলেন?’

‘স্নান? স্নান করবো কেন? তাঁর ঘণ্টাখানেক আগেই তো আমার স্নান হয়ে গেছে৷’

এরকূল পোয়ারো বললেন, ‘ধন্যবাদ, আমার আর কোন প্রশ্ন নেই৷’

‘কিন্তু শুনুন৷ ইয়ে—’ দ্বিধাগ্রস্তভাবে থামলেন তিনি৷

পোয়ারো নিষ্ক্রান্ত হলেন৷ যাবার আগে নিঃশব্দে ভেজিয়ে দিলেন দরজাটা৷

কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘লোকটা নির্ঘাত পাগল!’

পানশালার ঠিক বাইরেই মিঃ গার্ডেনারের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো পোয়ারোর৷

মিঃ গার্ডেনার দুটো ককটেল হাতে স্পস্টতই ‘টুকরো-ছবির-ধাঁধা’ নিয়ে আরামে বসে থাকা মিসেসের কাছে যাচ্ছিলেন, পোয়ারোকে দেখে অমায়িকভাবে হাসলেন৷

‘আসবেন নাকি, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

পোয়ারো মাথা নাড়লেন, বললেন, ‘করোনারের বিচার সম্পর্কে আপনার কি মতামত, মিঃ গার্ডনার?’

মিঃ গার্ডেনার গলার স্বর নিচু করলেন, বললেন, ‘দেখেশুনে তো মনে হলো, ওরা ফলাফল সম্পর্কে অনিশ্চিত৷ তবে আমার যদ্দুর ধারণা, আপনাদের পুলিশ তাদের তুরুপের তাস আস্তিনে লুকিয়ে রেখেছে৷’

‘অসম্ভব নয়৷’ এরকুল পোয়ারো বললেন৷

মিঃ গার্ডেনারের কণ্ঠস্বর আরও নিচু হলো৷

‘মিসেস গার্ডেনারকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারলে আমি বাঁচি৷ খুব অল্পেতেই ও বিচলিত হয়ে পড়ে, আর এই ব্যাপারটা ওকে ভীষণ উত্তেজিত করে তুলেছে৷ ওর স্নায়ু সহ্যক্ষমতা একেবারে শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে৷’

এরকূল পোয়ারো বললেন, ‘যদি অনুমতি দেন, তাহলে একটা প্রশ্ন করি মিঃ গার্ডেনার৷’

নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই৷ আপনাকে কোনভাবে সাহায্য করতে পারলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হবো, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘আপনি অভিজ্ঞ লোক, আপনার বিচার বুদ্ধিতে আমার বিশ্বাস আছে৷ স্পষ্ট করে বলুন তো মিসেস মার্শাল সম্পর্কে আপনার ধারণা কি রকম ছিলো?’

বিস্ময়ে মিঃ গার্ডেনার ভ্রুযুগল ঊর্ধ্বমুখী হলো৷ চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে চোখ বুলিয়ে তিনি গলার স্বর নামিয়ে নিলেন নিচু পর্দায়৷

‘কি জানেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, বিশেষ করে মেয়েমহলে ভেসে বেড়ানো কতকগুলো কথা আমার কানে এসেছে সত্যি, পোয়ারো মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন, ‘কিন্তু যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, তাহলে, স্পষ্টস্পষ্টি বলবো, ওই মেয়েটা ছিলো এক নম্বরের বোকা৷’

এরকুল পোয়ারোর চিন্তামগ্ন কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, ‘আপনার কথাটা ভেবে দেখার মতো...’

রোজমণ্ড ডার্নলি বললো, ‘এবার তাহলে আমার পালা, কি বলুন?’

‘মানে?’

ও হাসলো৷

‘আগের দিন পুলিশ-প্রধান তাঁর তদন্ত নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন৷ আপনি ছিলেন নীরব দর্শক৷ আর আজ, আমার ধারণা, আপনি আপনার নিজস্ব বেসরকারী তদন্ত শুরু করেছেন৷ আপনাকে আমি লক্ষ্য করেছি৷ প্রথমে মিসেস রেডফার্ন, তারপর লাউঞ্জের জানলা দিয়ে এক পলক দেখলাম, মিসেস গার্ডনার যেখানে তাঁর ওই বিতিকিচ্ছিরি ‘টুকরো-ছবির-ধাঁধা’ নিয়ে বসে আছেন, সেখানে আপনি দাঁড়িয়ে৷ আর এখন, আমার পালা৷’

এরকুল পোয়ারো ওর পাশে বসলেন৷ জায়গাটা সানি লেজ৷ নিচের চঞ্চল সমুদ্রে গাঢ় সবুজ দ্যুতি যেন ফেটে পড়ছে৷ সেই সবুজ ক্রমে মিলিয়ে গেছে সমুদ্রে চোখ ধাঁধানো বিবর্ণ প্রশান্ত নীলে, তারপর দিগন্তে৷

পোয়ারো বললেন, ‘আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, মোদমোয়াজেল৷ এখানে আসার পর থেকে এই কথাটাই আমার সব সময় মনে হয়েছে৷ বর্তমান দুর্ঘটনা নিয়ে আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে আমার ভালোই লাগবে৷’

রোজামণ্ড ডার্নলি নরম সুরে বললো, পুরো ব্যাপারটা সম্পর্কে আপনি আমার মতামত জানতে চান?’

‘জানতে পারলে অত্যন্ত খুশি হবো৷’

রোজমণ্ড বললে, ‘আমার তো মনে হয় ব্যাপারটা খুবই সহজ-সরল৷ মেয়েটার অতীত জীবনেই এ ঘটনার মূল সূত্র লুকিয়ে আছে৷’

‘অতীতে? বতর্মানে নয়?’

‘উহুঁ, অতীত বলতে খুব বেশি অতীতের কথা নাও হতে পারে৷ ব্যাপারটা আমি এভাবে দেখছি : পুরুষের কাছে আর্লেনা মার্শালের আকর্ষণ ছিলো প্রচণ্ড৷ আর, আমার মনে হয়, হয়তো খুব তাড়াতাড়িই ও তাদের সম্পর্কে ক্লান্তি বোধ করতো৷ ওর—কি বলবো?—অনুগামীদের মধ্যে এমন একজন ছিলো, যে এই ব্যবহারে তেমন খুশি হয়নি৷ আমাকে ভুল বুঝবেন না, মঁসিয়ে পোয়ারে, আমি এমন কারো কথা বলছি না যাকে চট করে সবার নজরে পড়বে৷ সম্ভবত, সাধারণ ছোটখাটো কোন মানুষ, দাম্ভিক, অনুভূতিশীল, এমন ধরনের মানুষ, যে ব্যর্থতার চিন্তায় সর্বক্ষণ মগ্ন৷ আমার ধারণা, সে আর্লেনার পিছু নিয়ে এখানে আসে, উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, এবং অবশেষে ওকে খুন করে৷’

‘আপনি বলতে চান সে বাইরের লোক, সে সেতু পার হয়ে দ্বীপে এসেছে?’

‘হ্যাঁ৷ সম্ভবত উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় সে ওই গুহাটায় লুকিয়ে ছিলো৷’

পোয়ারো অসম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷ বললেন, ‘আপনার কি মনে হয়, মিসেস মার্শাল এরকম কোন লোকের সঙ্গে দেখা করতে পিক্সি কোভে যেতেন? উহুঁ, কক্ষনো না৷ তিনি সে প্রস্তাব হেসে উড়িয়ে দিতেন৷’

রোজামণ্ড বলল, আর্লেনা হয়তো জানতো না ও সেই লোকটার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে৷’ লোকটা হয়তো অন্য কারো নামে ওকে ডেকে পাঠিয়ে থাকবে৷’

পোয়ারো অস্ফুট কণ্ঠে মন্তব্য করলেন, ‘সেটা সম্ভব৷’

তারপর তিনি বললেন, ‘কিন্তু একটা কথা আপনি ভুলে যাচ্ছেন, মাদমোয়াজেল৷ খুনের পরিকল্পনা নিয়ে কোন মানুষ প্রকাশ্য দিবালোকে সেতু পার হয়ে হোটেল অতিক্রম করার ঝুঁকি নেবে না৷ কেউ হয়তো তাকে দেখে ফেলতে পারে৷’

‘তা পারে—কিন্তু তার কোন নিশ্চয়তা নেই৷ আমার তো মনে হয় সকলের চোখ এড়িয়ে আসাটা মোটেও অসম্ভব নয়৷’

‘হয়তো সম্ভব, মানলাম৷ কিন্তু কথা হলো, ওই সম্ভাবনার ওপর কেউ ভরসা করতে পারে না৷’

রোজমণ্ড বললো, ‘কিন্তু একটা জিনিস কি আপনি ভুলে যাচ্ছেন না? আবহাওয়ার কথা৷’

‘আবহাওয়া?’

‘হ্যাঁ খুনের দিনটা ছিলো চমৎকার, কিন্তু তার আগের দিন, মনে করে দেখুন, বৃষ্টি এবং ঘন কুয়াশায় ঢাকা ছিলো এই দ্বীপে৷ তখন সকলের চোখ এড়িয়ে যে কেউ এখানে আসতে পারে৷ শুধু তাকে সমুদ্রতীরে গিয়ে রাতটা গুহায় কাটাতে হবে৷ ওই কুয়াশার ভূমিকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’

পোয়ারো চিন্তিতভাবে মিনিটকয়েক তাকিয়ে রইলেন ওর দিকে৷ তারপর বললেন, ‘এইমাত্র আপনি যা বললেন তার তাৎপর্য কম নয়, মাদমোয়াজেল৷’

রোজামণ্ডের মুখমণ্ডলে রক্তের উচ্ছ্বাস৷ ও বললো, ‘আমার মত এই, সম্ভব অসম্ভব বুঝি না৷ এবার আপনারটা বলুন৷’

‘হুঁ—’ বললেন, এরকুল পোয়ারো৷ স্থির চোখে রইলেন নিচে সমুদ্রের দিকে৷

‘জানেন মাদমোয়াজেল, আমি অত্যন্ত সরল মানুষ৷ সব সময় এই কথাটাই আমি বিশ্বাস করতে চেষ্টা করি যে সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যক্তিই কোন অপরাধের নেপথ্য নায়ক৷ একবারে শুরুতে আমার মনে হয়েছিলো, একজনের প্রতি এই ইঙ্গিত অত্যন্ত স্পষ্ট৷’

রোজামন্ডের স্বর কঠিন হলো৷ ও বললো, ‘বলুন—থামলেন কেন?’

এরকুল পোয়ারো বলে চললেন, ‘অথচ দেখুন, সে চিন্তার পথে আপনাদের ভাষায় একটা ‘‘ছোট প্রতিবন্ধক’’ রয়ে গেছে৷ আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, সেই একজনের পক্ষে এ খুন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিলো৷’

রোজামণ্ডের দ্রুত নিঃশ্বাসের শব্দ তাঁর কানে এলো৷ও রুদ্ধশ্বাসে বললো, ‘তাই?’

এরকুল পোয়ারো কাঁধ ঝাঁকালেন৷

‘তাহলে এখন আমরা কি করবো? সেটাই তো আমার সমস্যা৷’ তিনি এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর বললেন, ‘আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি?’

‘নিশ্চয়ই৷’

ও পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে৷ সতর্ক এবং তৎপর৷ কিন্তু যে প্রশ্ন এলো তা একেবারে অপ্রত্যাশিত৷

‘সেদিন সকালে আপনি যখন টেনিস খেলার পোশাক পরতে আসেন, তখন কি স্নান করেছিলেন?’

রোজামণ্ড হতবুদ্ধি দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলো৷

‘স্নান? কি বলতে চান আপনি?’

‘ঠিক ওই কথাই বলতে চাই৷ স্নান! চীনামাটির মসৃণ সুদৃশ্য আধার, কল খুলে ভর্তি করা হয় টলটলে জল, তারপর শরীর ডুবিয়ে দেওয়া হয় সেই জলে, শেষে বেড়িয়ে এসে হুশ—হুশ—হুশ, অস্বচ্ছ জল চলে যায় পাইপ বেয়ে নিচে!’

‘মঁসিয়ে পোয়ারো, আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে?’

‘উহুঁ—বরং আমি সম্পূর্ণ সুস্থ৷’

‘কি জানি, অতসব বুঝি না, তবে আমি স্নান করিনি৷’

‘হুঁ!’ বললেন, পোয়ারো, ‘তাহলে কেউ স্নান করেনি৷ বড়ই আশ্চর্য ব্যাপার৷’

‘কিন্তু কেউ হঠাৎ স্নান করতে যাবে কেন?’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘সত্যিই তো, কেন?’

রোজামণ্ড একটু রাগতভাবেই বললো, ‘এটা সম্ভবত আপনার শার্লক হোমস-মার্কা প্যাঁচ!’

এরকুল পোয়ারো হাসলেন৷

তারপর শান্তভাবে বাতাসের আঘ্রাণ নিলেন৷

যদি সামান্য ধৃষ্টতা প্রকাশের অপরাধ ক্ষমা করেন, মাদমোয়াজেল—’

‘আপনার পক্ষে কখনই ধৃষ্টতা দেখানো সম্ভব নয়, মঁসিয়ে পোয়ারো, আমি জানি৷’

‘সে আপনার মহানুভবতা৷ তাহলে দুঃসাহসের সঙ্গে আমি বলবো, যে সুগন্ধী আপনি ব্যবহার করেন তা এক কথায় অপূর্ব—এর একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে—আছে চমৎকার ছলনাময়ী আকর্ষণ৷’ শূন্যে হাত নাড়লেন পোয়ারো, তারপর প্রয়োজনীয় সুরে যোগ করলেন, ‘গ্যাব্রিয়েল নম্বর ৮, তাই না?’

‘আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়৷ হ্যাঁ, সব সময় এটাই আমি ব্যবহার করি৷’

‘মৃতা মিসেস মার্শালও এই সুগন্ধী ব্যবহার করতেন৷ অত্যন্ত আধুনিক জিনিস, কি বলেন? এবং দামীও বটে?’

সামান্য হেসে কাঁধ ঝাঁকালো রোজামণ্ড৷

পোয়ারো বললেন, ‘খুনের দিন সকালে আপনি এখানে বসে ছিলেন, মাদমোয়াজেল, যেখানে আমরা এখন বসে আছি৷ মিস ব্রুস্টার এবং মিঃ রেডফার্ন সমুদ্রপথে যাওয়ার সময়ে আপনাকে, অথবা অন্তত আপনার রঙিন ছাতাটাকে এখানে দেখেছিলেন৷ হলফ করে বলতে পারেন, মাদমোয়াজেল, যে সারা সকালে আপনি একবারের জন্যেও পিক্সি কোভে যাননি, ঢোকেননি সেই গুহাতে—বিখ্যাত পিক্সি গুহাতে?’

রোজমণ্ড ফিরে তাকালো, পোয়ারোর দিকে৷ চেয়ে রইলো স্থির চোখে৷

শান্ত মসৃণ কণ্ঠে ও বললো, ‘জানতে চাইছেন, আর্লেনা মার্শালকে আমি খুন করেছি কি না?’

‘না, আমি শুধু জানতে চাইছি, পিক্সি গুহায় আপনি গিয়েছিলেন কি না?’

ওটা কোথায় তাই-ই আমি জানি না৷ তাছাড়া ওখানে যাবো কেন? কি কারণে?’

গ্যাব্রিয়েল নম্বর ৮ ব্যবহার করে এমন একজন খুনের দিন ওই গুহায় গিয়েছিলো, মাদমোয়াজেল৷’

রোজামন্ড কণ্ঠস্বর তীক্ষ্ণ হলো৷

‘একটু আগে আপনিই বললেন, মঁসিয়ে পোয়ারো, আর্লেনা মার্শাল গ্যাব্রিয়েল নম্বর ৮ ব্যবহার করতো৷ সেদিন ও পিক্সি কোভের বেলাভূমিতে গিয়েছিলো৷ গুহাতেও সম্ভবত ও-ই গিয়ে থাকবে৷’

‘কিন্ত গুহাতে তিনি কেন যাবেন? ওটা অন্ধকার, অপ্রশস্ত এবং অস্বস্তিকর জায়গা৷’

রোজামণ্ড অধৈর্য স্বরে বলল, ‘কারণ আমাকে জিগ্যেস করবেন না৷ যেহেতু ও সেখানে গিয়েছিলো, গুহায় যাওয়াটা ওর পক্ষেই বেশি স্বাভাবিক৷ আপনাকে তো আগেই বলেছি, সারা সকালে এ জায়গা ছেড়ে আমি কোথায়ও যাইনি৷’

‘শুধু একবার ছাড়া, যখন আপনি হোটেলে ক্যাপ্টেন মার্শালের ঘরে গিয়েছিলেন৷’ পোয়ারো ওকে মনে করিয়ে দিলেন৷

‘ও, হ্যাঁ৷ সে কথা মনে ছিলো না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনি ভেবেছিলেন ক্যাপ্টেন মার্শাল আপনাকে দেখতে পাননি, মাদমোয়াজেল, কিন্তু আপনার ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত৷’

অবিশ্বাসের সুরে বলে উঠলো রোজমণ্ড, ‘কেনেথ আমাকে দেখেছিলো? ও—ও কি তাই বলেছে?’

পোয়ারো সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷

‘টেবিলের মুখোমুখি ঝোলানো আয়নায় তিনি আপনাকে দেখেছিলেন মাদমোয়াজেল৷’

রোজামণ্ডের শ্বাসপ্রশ্বাস স্তব্ধ হলো মুহূর্তের জন্যে৷ ও বললো, ‘ও—বুঝেছি৷’

পোয়ারোর চোখ এখন আর সমুদ্রের দিকে নেই৷ তাঁর দৃষ্টি নিবন্ধ রোজমণ্ড ডার্নলির কোলে, ওর ভাঁজ করা হাতের দিকে৷ দীর্ঘ আঙুলের সমন্বয়ে সুন্দর গড়নের হাত৷

চকিত দৃষ্টিতে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখকে অনুসরণ করলে রোজমণ্ড, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললো, ‘আমার হাতের দিকে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? আপনার কি ধারণা—আপনার কি ধারণা—?’

পোয়ারো বললেন, ‘আমার কি ধারণা, মাদমোয়াজেল ?’

রোজামণ্ড ডার্নলি বললো, ‘না, কিছু না৷’

প্রায় ঘণ্টাখানেক পরে গাল কোভে যাবার রাস্তার শীর্ষদেশে এসে উপস্তিত হলেন এরকুল পোয়ারো৷ নির্জন সৈকতে কেউ একজন বসে রয়েছে৷ লাল জামা ও গাাঢ় নীল সংক্ষিপ্ত প্যান্ট পরিহিত একটি কৃশকায় শরীর৷

আঁটোসাঁটো ফ্যাশানদুরস্ত জুতো পায়ে সন্তর্পিত পদক্ষেপে বেলাভূমিতে নেমে এলেন পোয়ারো৷

লিন্ডা মার্শাল চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো৷ পোয়ারোর মনে হলো, যেন সামান্য কুঁকড়ে গেলো৷

নিঃশব্দ চরণে ওর পাশে রুক্ষ নুড়ির ওপর এসে বসলেন তিনি৷ ওর ধুসর সবুজ চোখ ফাঁদে পড়া পশুর মতো সতর্ক সন্দিহান দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে৷ তীব্র বেদনার সঙ্গে পোয়ারো অনুভব করলেন, কত অনভিজ্ঞ এবং আত্মরক্ষায় কত অক্ষম এই দিশেহারা মেয়েটি৷

ও বললো, ‘কি ব্যাপার? কি চান?’

এরকুল পোয়ারো মিনিটকয়েক নীরব রইলেন৷ তারপর বললেন, সেদিন পুলিশ-প্রধানকে আপনি বলেছেন, আপনার সৎমাকে আপনি ভালোবাসতেন, এবং তিনিও আপনার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন৷’

‘তাতে কি হয়েছে?’

‘কথাটা সত্যি নয়—সত্যি কি মাদমোয়াজেল?’

‘হ্যাঁ, সত্যি৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনার প্রতি ব্যবহারে তিনি হয়তো নিষ্ঠুর ছিলেন না—সে কথা আমি মানছি৷ কিন্তু আপনি তাঁকে পছন্দ করতেন না—উহুঁ—বরং আপনি তাঁকে অত্যন্ত অপচ্ছন্দ করতেন৷ এটা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট৷’

লিন্ডা বলল, ‘হয়তো আপনার কথাই সত্যি৷ কিন্তু মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে ও কথা বলা ঠিক নয়৷ ভালো দেখায় না৷’

পোয়ারো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, ‘এসব আপনাকে ইস্কুল থেকে শেখানো হয়েছে?’

‘একরকম তাই৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘কোন খুনের ঘটনায় লৌকিক ভদ্রতার চেয়ে সত্যভাষণের গুরুত্ব অনেক বেশি৷’

লিন্ডা বলল, ‘ও কথা আপনার মুখেই মানায়—’

‘হ্যাঁ, আমার মুখেই মানায় এবং সে কথাই আমি বলছি৷ কারণ, আর্লেনা মার্শালের হত্যাকারীকে খুঁজে বের করাই আমার প্রথম ও প্রধান কাজ৷’

লিন্ডা অস্ফুট স্বগত কণ্ঠে বললো, ‘আমি স-ব ভুলে যেতে চাই৷ উঃ, কি ভয়ঙ্কর৷’

পোয়ারো শান্ত স্বরে বললেন, ‘কিন্তু ভুলতে আপনি পারছেন না—পারছেন কি?’

লিন্ডা বললো, ‘আমার মনে হয়, কোন নৃশংস উন্মাদ ওকে খুন করেছে৷’

এরকুল পোয়ারো অস্ফুটে উচ্চারণ করলেন, ‘না, আমার তা মনে হয় না৷’

লিন্ডার শ্বাসপ্রশ্বাস যেন স্তব্ধ হলো পলকের জন্য৷ ও বললো, ‘আপনি এমনভাবে বলছেন যেন—যেন আপনি সব জানেন ?’

পোয়ারো বললেন, হয়তো জানি৷’ একটু থেমে তিনি বলে চললেন৷ ‘বিশ্বাস করবে লিন্ডা, যদি বলি, তোমার চূড়ান্ত অশান্তিতে আমি তোমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করবো?’

লিন্ডা লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো৷ ‘আমার কোন অশান্তি নেই: সুতরাং আপনার সাহায্যেরও প্রয়োজন নেই৷’... জানি না, আপনি কি বলতে চাইছেন৷’

পোয়ারো বললেন, ওর চোখে চোখ রেখে, ‘আমি মোমবাতির কথা বলছি...’

আতঙ্কের শিখা দপ কর ঝলসে উঠলো লিন্ডার চোখে৷ ও চিৎকার করে বলল, ‘আমি আপনার কথা শুনবো না৷ কিছুতেই শুনবো না৷’

মৃগশিশুর তৎপরতায় সৈকত পার হয়ে ছুটে চললো ও৷ আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে নিমেষে মিলিয়ে গেলো ওর চঞ্চল শরীর৷

পোয়ারো ধীরে মাথা নাড়লো৷ তাঁর গম্ভীর মুখে দুশ্চিন্তার বিষণ্ণ ছায়া৷

একাদশ পরিচ্ছেদ

ইন্সপেক্টর কলগেট পুলিশ-প্রধানের কাছে তাঁর তদন্তের বিবরণ দিচ্ছিলেন৷

‘একটা ঘটনা আমার নজরে এসেছে, স্যার—রীতিমতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা৷ ব্যাপারটা মিসেস মার্শালের টাকা সম্পর্কে৷ তাঁর আইনজ্ঞদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি৷ আমি তো বলবো, সব দেখে শুনে তাঁরা বেশ অবাক হয়ে গেছেন৷ ব্ল্যাকমেলের গল্পটার সমর্থনে প্রমাণ আমার হাতে এসেছে৷ আপনার মনে আছে, স্যার আরস্কিন পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড মিসেস মার্শালকে দিয়ে গিয়েছিলেন? তা এখন সেই পঞ্চাশ হাজারের মাত্র হাজার পনেরো অবশিষ্ট আছে৷’

পুলিশ-প্রধান শিস দিয়ে উঠলেন৷

‘তাই নাকি! তাহলে বাকি টাকাগুলো গেলো কোথায়?’

‘সেটাই তো আশ্চর্যের কথা, স্যার৷ মাঝে মাঝে কিছু কিছু সম্পত্তি মিসেস মার্শাল হাত বদল করেছেন, এবং প্রতি ক্ষেত্রেই লেনদেন হয়েছে ক্যাশ টাকা, অথবা ক্যাশ টাকার সামিল—ঋণপত্রের বিনিময়ে—অর্থাৎ সে টাকা তিনি এমন কারও হাতে তুলে দিয়েছেন, যার পরিচয় প্রকাশ পাক তিনি চাননি৷ নিঃসন্দেহে ব্ল্যাকমেল৷’

পুলিশ-প্রধান সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন৷

‘তাই তো মনে হচ্ছে৷ এবং সেই ব্ল্যাকমেলার রয়েছে এই হোটেলেই৷ অর্থাৎ সে নিঃসন্দেহে ওই তিনজনের একজন, ওঁদের সম্পর্কে নতুন কিছু পেলে?’

‘তেমন জোরালো কিছু পেয়েছি বলে মনে হয় না, স্যার৷ মেজর ব্যারী, তাঁর নিজের কথা অনুয়ায়ী, একজন অবসরপ্রাপ্ত ফৌজী অফিসার৷ থাকেন একটা ছোট ফ্ল্যাটে; আয় বলতে পেনশনের টাকা এবং কিছু কোম্পানির শেয়ারের লভ্যাংশ৷ কিন্তু গত বছরে কয়েক দফায় বেশ মোটা টাকা তিনি ব্যাঙ্কে জমা দিয়েছেন৷’

‘চিন্তার কথা৷ তার কারণ হিসেবে কি বলেছেন?’

‘বলেছেন, ওগুলো বাজী-জেতা টাকা৷ একথা সত্যি যে ছোট-বড় সবরকম রেসের মাঠে তাঁর যাতায়াত আছে৷ সময়ে সময়ে বাজীও ধরেন, কিন্তু তার কোন হিসেবে রাখেন না৷’

পুলিশ-প্রধান সম্মতির ইঙ্গিতে মাথা নাড়লেন৷

‘এ কথা ভুল প্রমাণ করা শক্ত৷’ তিনি বললেন, ‘তবে এটাকে একেবারে অবহেলা করলে চলবে না৷’

কলগেট বলে চললেন, ‘এরপর, ধর্মযাজক স্টিফেন লেন৷ তাঁর পরিচয়ের কোন বুজরুকি নেই—হোয়াইটরিজ, সারে-র সেন্ট হেলেনে জীবিকা একটা ছিলো—কিন্তু ভগ্নস্বাস্থ্যের জন্যে বছরখানেক হলো সে জীবিকা ত্যাগ করেছেন৷ একই কারণে শেষ পর্যন্ত মানসিক রুগীদের এক নার্সিংহোমে তাকে যেতে হয়—সেখানে ছিলেন প্রায় এক বছর৷’

‘আচ্ছা৷’ ওয়েস্টনের কণ্ঠে কৌতূহলের ছোঁওয়া৷

‘হ্যাঁ স্যার৷ ভারপ্রাপ্ত ডাক্তারে কাছ থেকে আমি যতটা সম্ভব জানতে চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু এই ডাক্তারগুলো কি চিজ আপনি তো জানেন—ওদের কাছ থেকে কাজের কথা আদায় করা খুব কঠিন৷ কিন্তু আমার যদ্দুর ধারণা আমাদের মাননীয় ধর্ময়াজকের প্রধান রোগ ছিলো শয়তান সম্পর্কে এক অদ্ভুত আচ্ছন্নতা—বিশেষ করে স্ত্রীলোকের বেশে উপস্থিত যে শয়তান—রক্তবর্ণ স্ত্রীলোক—ব্যবিলনের বেশ্যা৷’

‘হুম’, বললেন, ওয়েস্টন, অতীতে এ জাতীয় খুনের কারণের যথেষ্ট নজির রয়েছে৷’

‘হ্যাঁ, স্যার৷ আমার মনে হয়, স্টিফেন লেনকে অন্তত সন্দেহ করা যেতে পারে৷ তাঁর চোখে নিহত মিসেস মার্শাল ছিলেন রক্তবর্ণ স্ত্রীলোকের জ্বলন্ত উদাহরণ—লাল চুল পরনের পোশাক এবং ব্যবহার সবদিক থেকেই৷ সুতরাং এ ধারণা নেহাত অসম্ভব নয় যে এই অশুভ মেয়েটিকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া তিনি তাঁর একান্ত কর্তব্য বলে মনে করেছিলেন৷ যদি অবশ্য সত্যি সত্যিই তাঁর মাথা গোলমাল থেকে থাকে৷’

‘ব্ল্যাকমেলের ব্যাপারে খাপ খাওয়ার মতো কিছু পাওনি?’

‘না, স্যার৷ ও ব্যাপারে তাঁকে আমরা সরাসরি বাদ দিতে পারি৷ খুব বেশি না হলেও তাঁর নিজস্ব কিছু আয়ের রাস্তা আছে, এবং সম্প্রতি তাঁর আয়ের অঙ্ক হঠাৎ করে বেড়ে যায়নি৷’

‘খুনের দিন সকালে নিজের গতিবিধি সম্পর্কে যে গল্পটা তিনি বলেছিলেন, তাঁর কি হলো?’

‘ওটার সমর্থনে কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না৷ রাস্তায় কোন পাদ্রীকে দেখেছে বলে কেউই মনে করতে পারছে না৷ আর গীর্জার খাতার কথা যদি বলেন, ওটাতে শেষ নামটা লেখা হয়েছে তিনদিন আগে এবং দিন পনেরো খাতাটা কেউ খুলেও দেখেনি৷ সুতরাং, মিঃ লেন খুব সহজেই খুনের আগের দিন, অথবা, ধরুন, তার দিনদুয়েক আগে গীর্জায় গিয়ে থাকতে পারেন, এবং তখন হয়তো নিজের নামটা ২৫ শে সই করে আসেন৷’

ওয়েস্টন মাথা দুলিয়ে সম্মতি জানালেন৷ বললেন, ‘আর আমাদের তৃতীয় জন?’

‘হোরেস ব্ল্যাট? আমার ধারণা, স্যার, ওখানে নির্ঘাত কোন গোলমাল রয়েছে৷ ভদ্রলোক যে আয়ের ওপর আয়কর দেন, তা তাঁর লোহার ব্যবসার আয়ের তুলনায় অনেক বেশি৷ মনে রাখবেন, এ মক্কেল একেবারে পাঁকালমাছ৷ তিনি হয়তো চটপট একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা খাড়া করে দেবেন। তিনি একটু-আধটু শেয়ার বাজারে যাতায়াত করেন, এবং কোন কোন দুনম্বরি ব্যবসায় তাঁর সামান্য অংশও আছে৷ জানি না, তাঁর কথা সত্যিও হতে পারে; তবে এ কথা স্বীকার করা যায় না যে গত কয়েক বছর ধরে অজ্ঞাত কোন উপায়ে—তিনি মাঝখানেই বেশ মোটা টাকা রোজগার করেছেন৷’

‘তাহলে তুমি বলতে চাইছো’, বললেন ওয়েস্টন, মিঃ হোরেস ব্ল্যাট একজন পেশাদার ব্ল্যাকমেলার?’

‘হয় তাই, না হলে হেরোইনের মামলায় তিনি জড়িয়ে আছেন, স্যার৷ চীফ ইন্সপেক্টর রিজওয়ে, যিনি এই মাদকদ্রব্য চালানের তদন্তে রয়েছেন, তাঁর সঙ্গে আমি দেখা করেছিলাম, এবং এ ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত আগ্রহী৷ মনে হচ্ছে, সম্প্রতি চোরাপথের বেশ কিছু হেরোইন এ দেশে আসছে৷ এ পর্যন্ত কয়েকটা চুনোপুঁটি দোকানদারের খোঁজ ওরা পেয়েছে, এবং মোটামুটি জানে, এ ব্যবসার অন্য মাথায় কে বা কারা রয়েছে৷ কিন্তু জিনিসটা কিভাবে শহরে আসছে সেটা এখনও ওদের মাথায় ঢুকছে না৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘জেনেই হোক বা না জেনেই হোক, হেরোইন চোরাচালানের দলে জড়িয়ে পড়ার কারণেই যদি মার্শাল মহিলার মৃত্যু হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের উচিত হবে পুরো ব্যাপারটা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে তুলে দেওয়া৷ এ পাখি ওদের শিকার৷ হুঁ? তুমি কি বলো?’

ইন্সপেক্টর কলগেট একটু দুঃখিতভাবেই বললেন, ‘হ্যাঁ, স্যার ঠিকই বলেছেন৷ যদি মাদকদ্রব্যের ব্যাপারী হয় তাহলে এ মামলা নিঃসন্দেহে ইয়ার্ডের৷’

কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে ওয়েস্টন বললেন, ‘এটাই সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যাখ্যা বলে মনে হচ্ছে৷’

কলগেট বিষণ্ণ মুখে সম্মতি জানালেন৷

‘হ্যাঁ, আমারও তাই ধারণা৷ মার্শাল এর মধ্যে নেই—যদি এমন কতকগুলো খবর আমার হাতে এসেছিলো যেগুলো মার্শাল অ্যালিবাই অত নিখুঁত না হলে অনেক কাজে লাগতো৷ তাঁর ব্যবসা বর্তমানে প্রায় পাড়ে এসে ঠেকেছে৷ এতে মার্শালের অথবা তাঁর শরিকের দোষ নেই: গত বছরে আর্থিক সঙ্কট এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের দুরবস্থাই এর জন্যে দায়ী৷ এবং তিনি যদ্দুর জানতেন, তাঁর স্ত্রী মারা গেলে তিনি পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড পাবেন৷ এবং এই পঞ্চাশ হাজার তাঁর ব্যবসার বর্তমান অবস্থায় অনেক কাজে আসতো৷’

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷

‘বড় দুঃখের কথা৷ লোকটার দু-দুটো জোরালো খুনের উদ্দেশ্য থাকা সত্তে্ও সে নিজেকে দিব্যি নির্দোষ প্রমাণ করে বসে রইলো৷’

ওয়েস্টন হাসলেন৷

‘দুঃখ কোরো না, কলগেট৷ আমাদের কৃতিত্ব দেখাবার সুযোগ এখনও রয়েছে৷ ব্ল্যাকমেল সূত্র এবং উন্মাদ ধর্মযাজক—সমাধানের এ দুটো পথ এখনও আমাদের হাতে আছে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারণা, মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত সমাধানটা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত৷’ তিনি আরও বললেন, ‘আর যদি ভদ্রমহিলাকে হেরোইন-চোরাচালান দলের কেউ খুন করে থাকে, তাহলে এই চোরাচালান রহস্যের সমাধান স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড পরোক্ষভাবে আমাদের সাহায্য পাবে৷ সুতরাং যেভাবেই হোক না কেন, আমরা যথেষ্ট কাজ দেখিয়েছি৷’

অনিচ্ছাকৃত হাসির ছায়া পড়লো কলগেটের মুখে৷

তিনি বললেন, ‘তাহলে এ-ই সব, স্যার৷ ও, ভালো কথা, মিসেস মার্শালের ঘরে পাওয়া চিঠিটার সম্পর্কে একটু-আধটু খোঁজখবর করেছি৷ যে চিঠিটায় জে. এন, সই ছিলো৷ ফল কিছু হলো না৷ ভদ্রলোক চীনদেশে নিরাপদেই রয়েছেন৷ মিস ব্রুস্টার আমাদের এই মক্কেলের কথা বলছিলেন৷ বলতে পারেন, একেবারে অকর্মার ঢেঁকি৷ মিসেস মার্শালের অন্যান্য বন্ধু-বান্ধব সম্পর্কেও খোঁজ নিয়েছি৷ এ ক্ষেত্রেও ফলাফল শূন্য৷ যা কিছু তলিয়ে দেখার কথা সবই আমাদের দেখা হয়ে গেছে, স্যার৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘তাহলে এখন সবই আমাদের ওপর নির্ভর করছে৷’ একটু থেমে তিনি বললেন, ‘আমাদের বেলজিয়ান বন্ধুর খবর কি? আমাকে যা যা বললে সব তাঁকে বলেছো?’

কলগেট একমুখ হাসলেন, বললেন, ‘ভদ্রলোক একটু অদ্ভুত ধরনের মানুষ, তাই না? জানেন, পরশুদিন তিনি আমাকে কি জিগ্যেস করছিলেন? গত তিন বছর শ্বাসরোধে ঘটা প্রতিটি খুনের মামলার খুঁটিনাটি তথ্য তাঁর চাই৷’

ওয়েস্টন সোজা হয়ে বসলেন৷

‘তাই নাকি৷ ও—তাহলে...’ তিনি মিনিট খানেক নীরব রইলেন৷ তারপর বললেন, ‘আমাদের পাদ্রীসাহেব কবে নাগাদ ওই নাসিংহোমে ভর্তি হয়েছিলেন বললেন?’

‘গত ইস্টারে এক বছর আগে, স্যার৷’

কর্নেল ওয়েস্টন তখন গভীর চিন্তায় মগ্ন৷ তিনি বললেন, ‘একটা ঘটনা আমার মনে আছে—‘ব্যাগশট’ এর কাছাকাছি কোন অঞ্চলে একটি যুবতীর মৃতদেহ পাওয়া যায়৷ মেয়েটা ওর স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে কোথায় যেন গিয়েছিলো, তারপর আর ফিরে আসেনি৷ এ ছাড়াও আরও একটা ঘটনা ঘটেছিলো, যেটাকে খবরে কাগজওলা নাম দিয়েছিলো, ‘নির্জন জঙ্গলের রহস্য’৷ যদি আমার ভুল না হয়ে থাকে, তাহলে দুটো ঘটনাই সারের৷’

তাঁর চোখ মিলিত হলো ইন্সপেক্টরে চোখে৷ কলগেট বললেন, ‘সারে? তাহলে তো, স্যার, পুরোপুরি খাপ খেয়ে যাচ্ছে! যদি তাই হয়...’

দ্বীপের সব্বোর্চ শিখরে ঘাসে ছাওয়া জমিতে বসেছিলেন এরকুল পোয়ারো৷

তাঁর সামান্য বাঁয়ে ইস্পাতের মইটা নেমে গেছে পিক্সি কোভে৷ তিনি লক্ষ্য করলেন মইয়ের শীর্ষ প্রান্তের কাছাকাছি কতকগুলো বিশাল রুক্ষ পাথর পড়ে রয়েছে; যেগুলো নিচের সৈকতে নামতে ইচ্ছুক কোন ব্যক্তিকে সহজেই লোকচক্ষের আড়াল করতে পারবে৷ পাহাড়ের ঝুলন্ত অংশের জন্য ওপর থেকে নিচের সৈকতের খুব সামান্য অংশই দেখা যায়৷

এরকুল পোয়ারো গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন।

তাঁর ‘টুকরো-ছবির ধাঁধা’র টুকরোগুলো ক্রমশ উপযুক্ত শূন্যস্থানে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।

মনে মনে ধাঁধার প্রতিটি টুকরোকে তিনি খতিয়ে দেখলেন, পরীক্ষা করলেন স্বতন্ত্র মনোযোগে।

আর্লেনা মার্শালের মৃত্যুর দিনকয়েক আগে স্নান-সৈকতে কাটানো একটি সকাল।

ব্রীজ খেলার একটি সান্ধ্য৷ টেবিলে ছিলেন তিনি, প্যাট্রিক রেডফার্ন এবং রোজামণ্ড ডার্নলি৷ ক্রিস্টিন ডামি থাকায় বাইরে পায়চারি করতে বেরিয়েছিলেন এবং শুনতে পান কিছু কথোপকথন৷ সেই সময় আরামকক্ষে আর কে ছিলেন? কে ছিলেন সাময়িকভাবে অনুপস্থিতি?

খুনের আগের দিন সন্ধ্যা সমুদ্রের সামনে পাহাড়ের কিনারায় ক্রিস্টিনের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা এবং হোটেলে ফিরে আসার পথে তাঁর দেখা একটি দৃশ্য৷

গ্যাব্রিয়েল নম্বর ৮৷

একটি কাঁচি৷

একটি ভাঙা পাইপ৷

জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলা একটি শিশি৷

একটি সবুজ ক্যালেন্ডার।

এক প্যাকেট মোমবাতি৷

একটি আয়না এবং একটি টাইপরাইটার৷

বেগুনী উলের একটি বল৷

একটি মেয়ের হাতঘড়ি৷

পাইপ বেয়ে স্নানের জল গড়িয়ে পড়ার শব্দ৷

এই সম্পর্কহীন তথাগুলোর প্রতিটি নিজের নিজের জায়গায় খাপ খেয়ে যেতে বাধ্য৷ কোনরকম শিথিলতা তার মধ্যে থাকবে না৷

আর তারপর, নির্দিষ্ট জায়গায় প্রতিষ্ঠিত তথ্যগুলো হাতে নিয়ে, তিনি ফেলবেন৷ পরবর্তী পদক্ষেপ, এই দ্বীপে অশুভ শক্তির উপস্থিত সম্পর্ক তাঁর নিজস্ব বিশ্বাস৷

অশুভ শক্তি...

হাতের টাইপ করা কাগজটার দিকে চোখ রাখলেন পোয়ারো৷

নীলি পার্সন্স—‘শবহ্যামে’ এর কাছাকাছি এক নির্জন জঙ্গলে তাকে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়৷ সেই খুনী সম্পর্কে কোন সূত্রই আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি৷

নীলি পার্সন্স?

অ্যালিস করিগান...

অ্যালিস করিগানের মৃত্যুর প্রতিটি খুঁটিনাটি তিনি গভীর মনোযোগ পড়তে লাগলেন৷

সমুদ্রকে সামনে রেখে শৈলশিরায় বসে থাকা এরকুল পোয়ারের দিকে এগিযে এলেন ইন্সপেক্টর কলগেট৷

ইন্সপেক্টর কলগেটেকে পোয়ারো পছন্দ করেন৷ তাঁর দৃঢ়সংবদ্ধ মুখের রেখা, বিচক্ষণ চোখ, এবং ধীর স্থির আচরণ পোয়ারোর ভালো লাগে৷

ইন্সপেক্টর কলগেট বসলেন৷ পোয়ারোর হাতের টাইপকরা কাগজগুলোর দিকে এক পলক দেখে তিনি বললেন, ‘ওই মামলাগুলো নিয়ে কিছু করলেন, স্যার?’

‘হ্যাঁ, ওগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছি৷’

কলগেট উঠে দাঁড়ালেন, এগিয়ে গিয়ে উঁকি মারলেন পাশের কৃত্রিম গুহাটায়৷ তারপর ফিরে আসতে বললেন, ‘সাবধানের মার নেই৷ আমি চাই না, আমাদের কথাবার্তায় কেউ কান পাতুক৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনি বিচক্ষণ৷’

কলগেট বললেন, ‘আপনাকে বলতে বাধা নেই, মঁসিয়ে পোয়ারো, ওই মামলাগুলো সম্পর্কে আমি নিজেও একটু কৌতূহলী হয়ে পড়েছি—অবশ্য আপনি ওগুলোর কথা জিগ্যেস না করলে আমি হয়তো নতুন করে আর মাথা ঘামাতাম না৷’ তিনি এক মুহূর্ত থামলেন, তারপর বললেন, ‘বিশেষ করে একটা মামলা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷’

‘অ্যালিস করিগান?’

‘অ্যালিস করিগান৷’ কিছুক্ষণ নীরবতা৷ এ ব্যাপারে আমি সারে পুলিশের সঙ্গে দেখা করেছি—কেসটার আগাপাশতলা জানতে চেয়ে৷’

‘বলুন, বন্ধু৷ আমার জানতে ইচ্ছে করছে—ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে৷’

‘অত্যন্ত স্বাভাবিক৷ অ্যালিস করিগানকে ‘‘ব্ল্যাকরিজ হীর্থ’’ -এর ‘‘সীজার্স গ্রোভ’’-এ শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়-‘‘মালে কপ্স’’, যেখানে নীলি পার্সন্সকে পাওয়া গিয়েছিলো, সেখান থেকে মাত্র মাইল দশেক দূরে—এবং এই দুটোর জায়গাই হোয়াইটরিজের বারো মাইলের মধ্যে, মিঃ লেন যেখানে ধর্মযাজক ছিলেন৷’

পোয়ারো বললেন, ‘অ্যালিস করিগানের মৃত্যু সম্পর্কে আরও বলুন৷’

কলগেট বললেন, ‘ওর মৃত্যুর সঙ্গে নীলি পার্সেন্সের মৃত্যুর কোন সম্পর্ক আছে বলে সারে পুলিশ প্রথমে মনে করেনি৷ এর কারণ, ওরা খুনি হিসেবে অ্যালিসের স্বামীকেই সঙ্গে সঙ্গে সন্দেহ করে৷ ঠিক জানি না কেন, তবে খবরের কাগজে ভাষায় ভদ্রলোক একটু ‘রহস্যময় মানুষ’ ছিলেন—তাঁর সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায়নি—যেমন, তিনি আগে কোথায় ছিলেন, তাঁর পরিচয় কি, ইত্যাদি৷ মেয়েটা ওর বাড়ির লোকের অমতে তাঁকে বিয়ে করেছিলো, ওর নিজের জমানো কিছু টাকাপয়সা ছিলো—এবং স্বামীর নামেই ও জীবনবীমা করা ছিলো—অতএব, সন্দেহ জাগিয়ে তোলার পক্ষে এগুলো যথেষ্ট, এবং আমার ধারণা, আপনি আমার সঙ্গে একমত হবেন, স্যার?’

পোয়ারো সম্মতি জানালেন৷

‘কিন্তু গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ উঠতেই আমাদের স্বামীদেবতাটি সন্দেহের দৃশ্যপট থেকে একেবারে মুছে গেলেন৷ অ্যালিসের মৃতদেহটি আবিষ্কার করেছিলো পল্লী অঞ্চলে ভ্রাম্যমাণ একজন শক্তসমর্থ খাটো প্যান্ট পরিহিতা যুবতী৷ মেয়েটি সাক্ষী হিসেবে ছিলো নিঃসন্দেহে উপযুক্ত এবং নির্ভরযোগ্য—ল্যাংকাশায়ারের এক স্কুলের খেলার দিদিমণি৷ যখন সে মৃতদেহ আবিষ্কার করে, তখন সময় দেখেছিলো সে—ঠিক সোয়া চারটে—এবং তার নিজস্ব মত হিসেবে সে জানায়, মেয়েটি খুব বেশিক্ষণ মারা যায়নি—দশ মিনিটের আগে তো নয়ই৷ পুলিশ সার্জন পৌনে ছ’টা নাগাদ মৃতদেহ পরীক্ষা করেন, তিনি মেয়েটির মতই সমর্থন জানান৷ মেয়েটি কোন কিছুতে হাত না দিয়ে সোজা পায়ে হেঁটে রওনা হয় ব্যাগশট থানার দিকে এবং সেখানেই খুনের খবরটা জানায়৷ এখন, তিনটে থেকে চারটে দশ পর্যন্ত এডওয়ার্ড করিগান লন্ডন থেকে আগত একটি ট্রেনে ছিলেন৷ লন্ডনে তিনি সেইদিনই ব্যবসার কাজে গিয়েছিলেন৷ ট্রেনের কামরায় তাঁর সঙ্গে আরো চারজন যাত্রী ছিলো৷ স্টেশনে নেমে তিনি স্থানীয় বাসে চড়েন, এবং ট্রেনে চার যাত্রীর দুজন ওই বাসে তাঁর সঙ্গী হয়৷ ‘‘পাইন রিজ’’ কাফেতে তিনি বাস থেকে নামেন৷ সেখানে চায়ের আসরে তাঁর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর যোগ দেবার কথা ছিলো৷ সময় তখন চারটে পঁচিশ৷ তিনি দুজনের জন্যে চায়ের ফরমাশ দেন, কিন্তু বলেন তাঁর স্ত্রী না আসা পর্যন্ত সেগুলো যেন টেবিলে না দেওয়া হয়৷ তারপর তিনি বাইরে এসে স্ত্রীর প্রতীক্ষায় পায়চারি করতে থাকেন৷ অবশেষে পাঁচটায় সময়েও যখন সে এলো না তখন ভদ্রলোক চিন্তিত হয়ে পড়লেন—ভাবলেন, সে হয়তো পায়ে চোট লাগিয়ে কোথাও বসে আছে৷ কারণ কথা ছিলো গ্রামে তাঁরা যেখান ছিলেন, সেখানে থেকে মেয়েটি পায়ে হেঁটে বিস্তীর্ণ প্রান্তর অতিক্রম করে পাইন রিজ কাফেতে আসবে, আর সেখান থেকে বাসে করে তাঁর ঘরে ফিরে যাবেন৷ কাফে থেকে সীজার্স গ্রোভের দূরত্ব বেশি নয়, এবং সকলের অনুমান, হাতে সময় থাকার দরুন মেয়েটি সীজার্স গ্রোফের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ হয়ে ওখানে কিছুসময় কাটাতে মনস্থ করে৷ এই সময় কোন ভবঘুরে অথবা উন্মাদ ঘটনাচক্রে তার সাক্ষাৎ পায় এবং সম্পূর্ণ অজ্ঞাতসারে তাকে আক্রমণ করে৷ মেয়েটির স্বামী সন্দেহের ছায়া থেকে মুক্তি পাওয়া মাত্রই সারে পুলিশ সিদ্ধান্ত নেয়, ওই মৃত্যুর সঙ্গে নীলি পার্সন্সের মৃত্যুর কোন সম্পর্ক আছে—নীলি পার্সন্স মানে সেই অস্থিরমনা পরিচারিকা, যাকে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় মার্লে কন্সে পাওয়া যায়৷ ওদের বিশ্বাস, একই লোক ওই দুটো খুনের জন্যে দায়ী, কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই লোককে ওরা ধরতে পারেনি—আর ধরা তো দূরে কথা, তার টিকিটি পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেনি! ওদের হাজারো তদন্তের ফলাফল একট বিরাট শূন্য৷’

একটু থেমে তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘আর এখন—শ্বাসরুদ্ধ হয়ে তৃতীয় একজন মহিলা মারা গেলেন—এবং জনৈক ভদ্রলোক, যাঁর নাম করতে চাই না, একই মহিলা সন্দেহের দৃশ্যপটে উপস্থিত৷’

তিনি থামলেন৷

তাঁর অন্তর্ভেদী বিচক্ষণ চোখ স্থির হলো পোয়ারোর চোখে৷ উত্তরের প্রত্যাশায় তিনি নীরবে অপেক্ষা করতে লাগলেন৷

পোয়ারো ঠোঁট নড়ে উঠলো৷ ইন্সপেক্টর কলগেট সামনে ঝুঁকে এলেন৷

পোয়ারো তখন অস্ফুট কণ্ঠে বলছেন, ‘—কোন, টুকরোটা লোমের কম্বলের আর কোন টুকরোটা বেড়ালের লেজের বুঝে ওঠা ভারী শক্ত৷’

‘কি বলছেন, স্যার?’ চমকে উঠে বললেন ইন্সপেক্টর কলগেট৷

পোয়ারো তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন৷ আমি নিজস্ব চিন্তায় একটু অনমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম৷’

‘লোমের কম্বল, বেড়ালের লেজ—এ সব কি?’

‘কিছু না—কিছু না৷’ তিনি একটু থামলেন৷ বলুন, ইন্সপেক্টর কলগেট যদি আপনার সন্দেহ হয় যে কেউ একজন মিথ্যে কথা বলছে—অজস্র, অজস্র মিথ্যে কথা, কিন্তু আপনার হাতে কোন প্রমাণ নেই, তাহলে আপনি কি করবেন?’

ইন্সপেক্টর কলগেট কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন৷

‘বলা শক্ত৷ তবে আমার মনে হয়, কেউ যদি অনর্গল মিথ্যে কথা বলে যায়, তাহলে শেষের দিকে মিথ্যে তোলগোল পাকিয়ে সে ধরা পড়ে যেতে বাধ্য৷’

পোয়ারো সম্মতি জানালেন৷

‘হ্যাঁ, আপনার কথা খাঁটি সত্যি৷ কারণ দেখুন, আমি শুধু মনে মনে জানি যে কিছু কিছু বিবৃতি পুরোপুরি মিথ্যে৷ আমার বিশ্বাস সেগুলো মিথ্যে, কিন্তু আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি না অবশ্য একটা পরীক্ষা করে দেখতে বাধা নেই—এটা ছোট্ট তুচ্ছ মিথ্যের কষ্টিপাথর পরীক্ষা৷ এবং সত্যিই যদি সেটা মিথ্যে বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে বিনা দ্বিধায় বলা যেতে পারে অবশিষ্ট বক্তব্যগুলো নির্ভেজাল মিথ্যে৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট কৌতূহলী চোখে পোয়ারো দিকে তাকালেন৷

‘আপনার মন বড় অদ্ভুতভাবে কাজ করে, তাই না, স্যার? কিন্তু আমার অনুমান, শেষ পর্যন্ত আপনিই জিতবেন৷ যদি কিছু মনে না করেন তাহলে একটা প্রশ্ন করছি : শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাগুলোর দিকে আপনার নজর গেলো কি কারণে?’

পোয়ারো ধীর স্বরে বললেন, ‘আপনার ভাষায় একটা শব্দ আছে—পরিপাটি৷ এই অপরাধটা আমার কাছে অত্যন্ত পরিপাটি অপরাধ বলে মনে হয়েছে৷ কখনও কখনও অবাক হয়ে ভেবেছি, হয়তো এটাই খুনীর প্রথম অপরাধ নয়৷’

ইন্সপেক্টর কলগেট বললেন, ‘ও—বুঝেছি৷’

পোয়ারো বলে চললেন, ‘আমি নিজের মনেই বললাম, এ ধরনের অতীত খুনের ঘটনা একবার পরীক্ষা করে দেখা যাক, এবং যদি দেখা যায়, অতীতের কোন খুনের সঙ্গে এই খুনের যথেষ্ট সাদৃশ্য রয়েছে, তাহলে—বলাই বাহুল্য একটা বহুমূল্য সূত্র আমাদের হাতে আসবে৷’

‘একই রকম খুনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে বলে, স্যার?’

‘না না, আমি তার চেয়েও বেশি কিছু বলতে চাইছি৷ যেমন নীলি পার্সন্সের মৃত্যু আমাকে কোন সূত্রই দেয়নি৷ কিন্তু অ্যালিস করিগানের মৃত্যু—বলুন, ইন্সপেক্টর কলগেট, বর্তমান খুনের সঙ্গে ওই মৃত্যুর একটা অদ্ভুত সাদৃশ্য কি আপনার নজরে পড়ছে না?’

ইন্সপেক্টর কলগেট মনে মনে প্রশ্নটা উলটে-পালটে খতিয়ে দেখলেন৷ অবশেষে তিনি বললেন, ‘না, স্যার, ঠিক যে নজরে পড়ছে তা বলতে পারছি না। অবশ্য যদি এটা না হয় যে দুটো ক্ষেত্রেই শ্রীযুক্ত পতিদেবতার হিমালয় প্রমাণ অ্যালিবাই রয়েছে৷’

পোয়ারো হালকা স্বরে বললেন, ‘ও—তাহলে আপনার নজরে পড়েছে?’

‘এই যে, পোয়ারো! আপনাকে দেখে খুশি হলাম৷ আসুন, ভেতরে আসুন৷ ঠিক এই মুহূর্তে যে মানুষটিকে চাইছিলাম৷’

এরকূল পোয়ারো সে আমন্ত্রণে সাড়া দিলেন৷

পুলিশ-প্রধান এক বাক্স সিগেরেট এগিয়ে দিলেন, নিজে একটা নিয়ে ধরালেন৷ ধোঁয়ার মুখ ঝাপসা করে তিনি বললেন, ‘একটা নির্দিষ্ট কর্মপন্থা আমি একরকম ঠিক করে ফেলেছি৷ কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবার আগে সে বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘বলুন, বন্ধু।’

ওয়েস্টন বললেন, ‘ঠিক করেছি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ডেকে পাঠিয়ে মামলাটা ওদের হাতে তুলে দেবো৷ আমার মতে, যদিও দু-একজনকে সন্দেহ করবার জোরালো যুক্তি রয়েছে, পুরো ব্যাপারটা কিন্তু দাঁড়িয়ে আছে ওই মাদকদ্রব্য চোরাচালানের ওপর৷

পোয়ারো সম্মতি জানালেন৷

‘আমি একমত৷’

‘শুনে সুখী হলাম৷ এবং আমাদের এই চোরাচালানকারী ব্যক্তিটি যে কে, তা আমি হলফ করে বলতে পারি৷ হোরেস ব্ল্যাট৷’

আবারও সম্মতি জানালেন পোয়ারো৷ তিনি বললেন, ‘সে ইঙ্গিতও মোটামুটি স্পষ্ট৷’

‘আমাদের চিন্তাধারা একই পথ ধরে এগিয়ে চলেছে দেখতে পাচ্ছি৷ ব্ল্যাট তাঁর নৌকো নিয়ে হরদম সমুদ্রে বেরিয়ে পড়তেন৷ কখনও কখনও সঙ্গী হিসেবে কাউকে সঙ্গে নিলেও বেশির ভাগ সময় তিনি একাই যেতেন৷ তাঁর নৌকোয় গোটাকয়েক লোক দেখানো লাল-রঙা পাল আছে, কিন্তু আমরা আবিষ্কার করেছি, এছাড়াও কয়েকটি সাদা পাল লুকোনো ছিলো৷ আমার ধারণা, একটা ভালো দিন দেখে তিনি নৌকো বেয়ে উপস্থিত হন নির্দিষ্ট কোন জায়গায়, এবং সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করে দ্বিতীয় কোন নৌকো সাধারণ পাল-তোলা নৌকো অথবা মোটরবোট জাতীয় কিছু তার তখনই আসল জিনিসের হাতবদল হয়৷ তারপর ব্ল্যাট পিক্সি কোভে ফিরে আসেন উপযুক্ত সময় দেখে।’

এরকুল পোয়ারো সামান্য হাসলেন৷

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, ধরুন দেড়টা নাগাদ, যখন ইংরেজদের মধ্যাহ্নভোজের সময়;তখন প্রত্যেকেই যে খাবার ঘরে থাকবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই৷ দ্বীপটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি৷ এখানে বাইরের লোকেরা কখনও পিকনিক করতে আসেন না৷ কখনও কখনও বিকেলে, পিক্সি কোভে যখন পড়ন্ত সূর্যের আলো থাকে, অতিথিরা হোটেল থেকে চা নিয়ে সেখানে যান, আর যদি তাঁরা পিকনিক করতে চান, তাহলে তাঁরা যাবেন অনেক অনেক মাইল দূরে কোন প্রান্তরে—পিক্সি কোভে নয়৷’

পুলিশ-প্রধান সমর্থনে মাথা নাড়লেন৷

‘ঠিক বলেছেন৷’ তিনি বললেন, ‘সুতরাং, ব্ল্যাট পিক্সি কোভে নেমে সেই গুহার তাকে জিনিসটা লুকিয়ে রাখেন৷ জিনিসটা সেখান থেকে যথাসময়ে সরিয়ে নেবার দায়িত্ব ছিলো দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির ওপর৷’

পোয়ারো মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘আপনার মনে আছে, খুনের দিন একটা দম্পতি মধ্যাহ্নভোজ সারতে এ দ্বীপে এসেছিলো?’ এটা সম্ভবত জিনিসটা পিক্সি গুহা থেকে সরিয়ে নেবার একটা পথ৷ মুর অতএব সেন্ট লু-র হোটেলে থেকে গ্রীষ্মের অতিথিরা কখনও কখনও স্মাগলার্স দ্বীপে আসেন৷ তাঁরা হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে মধ্যাহ্নভোজ সেরে নেবার ইচ্ছে প্রকাশ করেন৷ কিন্তু প্রথমে তাঁরা গোটা দ্বীপটা ঘুরে দেখতে বেরোন৷ তারপর সমুদ্র সৈকতে নেমে, স্যান্ডউইচের বাক্সটা নিয়ে মাদামের হাতে ঝোলানো স্নান-ব্যাগে ভরে নেওয়াটা একটু কঠিন কাজ নয়—এবং, যখন বাকি সবাই খাওয়ার ঘরে উপস্থিত, তখন নিজেদের আনন্দ-ভ্রমণ শেষ করে তাঁরা মধ্যাহ্নভোজ সারতে ফিরে আসেন হোটেলে। হয়তো একটু দেরিতে, ধরুন দুটো বাজতে দশে৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘হ্যাঁ, কাজটা অসম্ভব নয়৷ আর এ জাতীয় চোরাচালান দলের লোকেরা ভীষণ নৃশংস হয়৷ যদি কেউ আকস্মিকভাবেই তাদের কার্যকলাপ জানতে পেরে থাকে, তাহলে তাকে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দিতে তাদের হাত এতটুকু কাঁপবে না৷ আমার মনে হয়, আর্লেনা মার্শালের মৃত্যুও ঠিক এইভাবে ঘটেছে৷ হতে পারে, সেদিন সকালে ব্ল্যাট হয়তো পিক্সি কোভে ওগুলো লুকিয়ে রাখছিলেন৷ সেইদিনই তাঁর সঙ্গীদের সেখানে আসবার কথা ছিলো জিনিসটা সরিয়ে নেবার জন্যে৷ এমন সময় আর্লেনা উপস্থিত হলেন তাঁর ভেলা নিয়ে এবং বাক্স হাতে ব্ল্যাটকে দেখলেন গুহায় ঢুকতে৷ সে বিষয়ে তিনি ব্ল্যাটকে প্রশ্ন করায় ব্ল্যাট তাঁকে খুন করেন, এবং নৌকো নিয়ে তাড়াতাড়ি সরে পড়েন৷’

পোয়ারো বললেন, ‘তাহলে আপনার স্থির বিশ্বাস ব্ল্যাটই খুনী?’

‘সেটাই সবচেয়ে বেশি সম্ভব বলে মনে হচ্ছে৷ অবশ্য এও হতে পারে যে আর্লেনা আসল ব্যাপারটা আগেই জানতে পেরেছিলেন, সে সম্পর্কে ব্ল্যাটকে হয়তো কিছু বলেও ছিলেন, এবং দলের অন্য একজন লোক মিথ্যে সাক্ষাৎকারে নাম করে আর্লেনাকে ডেকে পাঠায় ও তাঁকে খুন করে৷ সুতরাং, যা বললাম, আমার মতে সবচেয়ে ভালো পথ হলো গোটা ব্যাপারটা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে তুলে দেওয়া। চোরাচালান দলের সঙ্গে ব্ল্যাটের সম্পর্ক প্রমাণ করবার সুযোগ আমাদের চেয়ে ওদের হাতে অনেক বেশি আছে৷’

এরকুল পোয়ারো চিন্তান্বিতভাবে মাথা নাড়লেন৷

ওয়েস্টন বললেন, ‘আপনার কি মনে হয়? কাজটা ঠিক হবে, হুঁ?’

পোয়ারো তখনও চিন্তাকুল৷ অবশেষে তিনি বললেন, ‘হয়তো ঠিক হবে৷’

‘ওসব হেঁয়ালি ছাড়ুন, মশাই৷ সত্যি করে বলুন তো, আস্তিনে কোন তুরুপের তাসটি লুকিয়ে রেখেছেন৷’

পোয়ারো বিষণ্ণ স্বরে বললেন, ‘লুকিয়ে রাখলেও জানি না, শেষ পর্যন্ত তা প্রমাণ করতে পারবো কি না৷’

ওয়েস্টন বললেন, ‘অবশ্য জানি, আপনার এবং কলগেটের ধারণা অন্যরকম৷ আমার কাছে সেটা একটু অবিশ্বাস্য ঠেকলেও একথা স্বীকার করতে আমি বাধ্য যে তার ভেতরে সত্যি কিছু থাকলেও থাকতে পারে৷ কিন্তু আপনার ধারণা যদি ঠিকও হয়, তাহলেও আমার বিশ্বাস এটা ইয়ার্ডের মামলা৷ আমরা ওদের সমস্ত তথ্য জানিয়ে দেবো, তাহলে ওরা সারে পুলিশের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে পারবে৷ আমার কেবলই মনে হচ্ছে, এ মামলা আমাদের জন্যে না৷ কারণ এর সীমানা অনেক বিস্তৃত৷’

তিনি একটু থামলেন৷

‘আপনার কি মনে হয়, পোয়ারো৷ এ বিষয়ে কি করা উচিত হবে বলে আপনি মনে করেন?’

পোয়ারোকে দেখে চিন্তামগ্ন বলে মনে হলো৷ অবশেষে তিনি বললেন, ‘শুধু এটুকু জানি, এখন আমার কি করতে ইচ্ছে করছে৷’

‘কি?’

পোয়ারো শান্ত অস্ফুট কণ্ঠে বললেন, ‘একটা পিকনিকে গেলে মন্দ হয় না৷’

কর্নেল ওয়েস্টন স্তব্ধ বিস্ময়ে চেয়ে রইলেন পোয়ারোর গম্ভীর মুখের দিকে৷

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

‘পিকনিক, মঁসিয়ে পোয়ারো?’

এমিলি ব্রুস্টার এমনভাবে পোয়ারোর দিকে তাকালেন যেন পোয়ারো তাঁর সুস্থতার সীমারেখা পার হয়ে গেছেন৷

মুগ্ধ একাগ্র স্বরে বললেন পোয়ারো, ‘আপনার কাছে ব্যাপারটা অত্যন্ত খারাপ লাগছে, তাই না? কিন্তু আমার ধারণা, এই মুহূর্তে এর চেয়ে সুন্দর প্রস্তাব সত্যিই আর নেই৷ বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক করে তুলতে গেলে আমাদের প্রয়োজন স্বাভাবিক, নিত্যনৈমিত্তিক আচরণের৷ ডার্টমুর অঞ্চলে বেড়াতে যাবার জন্য আমি বিশেষ উদগ্রীব, তাছাড়া আবহাওয়া এখন চমৎকার৷ এতে—ঠিক কিভাবে বলবো?—এতে সকলেই অত্যন্ত খুশি হবে৷—সুতরাং, এব্যাপারে আমাকে সাহায্য করুন, মাদমোয়াজেল৷ প্রত্যেককে এ পিকনিকে রাজি করান৷’

অপ্রত্যাশিত সাফল্যের সঙ্গে প্রস্তাব গৃহীত হলো৷ প্রথম প্রথম প্রত্যেকেই একটু ইতস্তত করলেন, তারপর অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্বীকার করলেন, প্রস্তাবটা নেহাত মন্দ নয়৷

ক্যাপ্টেন মার্শালকে অনুরোধ করার কথা উত্থাপিত হয়নি৷ তিনি নিজেই বলেছেন সেইদিন তাঁকে প্লিমাউথ যেতে হবে৷ মিঃ ব্ল্যাট পিকনিকের প্রস্তাবে রাজি হলেন অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে৷ অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে উঠতে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন৷ তিনি ছাড়া আরও ছিলেন এমিলি ব্রুস্টার, রেডফার্নরা স্টিফেন লেন, গার্ডেনাররা, যাঁদের আরও একদিন থেকে যেতে রাজি করানো হয়েছে, রোজামণ্ড ডার্নলি ও লিন্ডা৷

পোয়ারো তাঁর কথার মায়াজালে আচ্ছন্ন করেছেন রোজমণ্ডকে এবং বারংবার এই কথাটাই ওকে বুঝিয়েছেন যে এই পিকনিক লিন্ডাকে ওর বর্তমান মানসিক অবস্থা থেকে অন্তত সাময়িকভাবে হলেও মুক্তি দেবে৷ রোজমণ্ড তাঁকে সমর্থন জানালো৷ ও বললো, ‘আপনার কথাই ঠিক৷ ওই বয়েসের একটা বাচ্চার কাছে এই মানসিক আঘাত ভীষণ ক্ষতিকর৷ এতে ওর মনের বাঁধুনি অনেক দুর্বল হয়ে গেছে৷’

‘সেটা নিছকই স্বাভাবিক, মাদমোয়াজেল৷ কিন্তু ওই বয়সে মানুষ সহজে সবকিছু ভুলে যেতে পারে৷ ওকে আসতে রাজী করান৷ আপনি পারবেন, আমি জানি৷’

মেজর ব্যারী দৃঢ়তার সঙ্গে এ প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছেন৷ তিনি বলেছেন, পিকনিক তিনি পছন্দ করেন না৷ ‘একগাদা বাক্স বয়ে নিয়ে যাওয়া,’ তিনি বলেছেন, ‘আর অসুবিধের তো অন্ত নেই! টেবিলে সে খাওয়াটাই আমার বেশি পছন্দ৷’

সকাল দশটায় সকলে জমায়েত হলেন৷ তিনটে গাড়ির ব্যবস্থা করা ছিলো৷ মিঃ ব্ল্যাট সরব এবং উৎফুল্ল কণ্ঠে জনৈক ট্যুরিস্ট গাইডের অনুকরণ করছেন।

‘এইদিকে আসুন, ভদ্রমহিলা ও ভদ্রমহোদয়গণ—ডার্টমুরে যাবার পথ এইদিকে৷ এখানে রয়েছে বুনো ঝোপ ও জাম গাছের ছায়া, রয়েছে, ডেভনশায়ারের বৈশিষ্ট্য ও অভিযুক্ত অপরাধীদের সমাবেশ৷ আপনাদের স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে আসুন, ভদ্রমহোদয়গণ, অথবা সঙ্গে নিন, সুন্দরী সঙ্গিনীদের৷ প্রত্যেককে স্বাগত জানাই৷ জানাই স্বর্গীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখানোর প্রতিশ্রুতি৷ তাড়াতাড়ি চলুন৷ তাড়াতাড়ি চলুন৷’

শেষ মুহূর্তে চিন্তার ছায়া চোখে নিয়ে নিচে নেমে এলো রোজমণ্ড ডার্নলি৷ ও বললো, ‘লিন্ডা আসবে না৷ ও বলছে ওর নাকি ভীষণ মাথা ধরেছে৷’

পোয়ারো বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘কিন্তু এলে ওর পক্ষে ভালো হতো৷ ওকে রাজি করান, মাদমোয়াজেল৷’

রোজামণ্ড দৃঢ় কণ্ঠে বললো, কোন লাভ নেই৷ ও একেবারে মনস্থির করে ফেলেছে৷ আমি কয়েকটা অ্যাসপিরিনি দিয়েছি, সেগুলো খেয়ে ও শুয়ে পড়েছে৷’

রোজমণ্ড একটু ইতস্তত করলো, তারপর বললো, ‘মনে হয়, আমার যাওয়াটা হয়তো ঠিক হবে না৷’

সেটি হচ্ছে না, দেবী সেটি হচ্ছে না৷’ ইয়ার্কির ছলে ওর হাত চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠলেন মিঃ ব্ল্যাট, ‘আনুষ্ঠানকে মধুর করে তুলতে আপনার উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন৷ উহুঁ, কোন আপত্তি শুনছি না৷ আপনাকে আমি বন্দী করলাম, হা, হা৷ ডার্টমুরের কারাগারে আপনাকে নির্বাসন দেওয়া হবে৷’

অচ্ছেদ্য বন্ধনে ওকে সঙ্গী করে প্রথম গাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলেন ব্ল্যাট৷ যেতে যেতে পোয়ারোর দিকে একটা ক্রুদ্ধ দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে গেলো রোজামণ্ড৷

‘আমি লিন্ডার কাছে থাকছি৷’ বলল, ক্রিস্টিন রেডফার্ন, ‘আমার কোন আপত্তি নেই৷’

প্যাট্রিক বলল, ‘কি হচ্ছে, ক্রিস্টিন—চলো৷’

এবং পোয়ারো বললেন, ‘না, না, আপনি আসবেন বৈকি, মাদাম৷ মাথা ধরলে কারও পক্ষে একা থাকাটাই ভালো৷ চলুন, রওনা হওয়া যাক৷’

তিনটে গাড়ি চলতে শুরু করলো৷

ওঁরা প্রথমে গেলেন শীপস্টরের আসল পিক্সির গুহায়, তার প্রবেশপথ অনুসন্ধান করে যথেষ্ট আনন্দ পেলেন, অবশেষে, একটা ছবি-পোস্টকার্ডের সাহায্য পথটা খুঁজে পেলেন৷

বড় বড় পাথরে পা ফেলে চলার পথটা ছিলো অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এরকুল পোয়ারো সে চেষ্টা করলেন না৷ তিনি অসংযত চোখে অনুসরণ করে চললেন পাথর থেকে পাথরে হালকাভাবে লাফিয়ে যাওয়া ক্রিস্টিন রেডফার্নকে এবং লক্ষ্য করলেন, ওর স্বামী কোন সময়েই ওর থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই৷ রোজামণ্ড ডার্নলি ও এমিলি ব্রুস্টার অনুসন্ধানের কাজে যোগ দিয়েছিলেন, অবশ্য শেষোক্ত জন একবার পা ফস্কেছেন এবং ফলস্বরূপ নিজের গোড়ালিতে সামান্য মোচড় দিয়েছেন৷ স্টিফেন লেন ছিলেন অক্লান্ত অভিযাত্রী, তাঁর দীর্ঘকায় কৃশ শরীর সুবিশাল পাথরের সমাবেশ সর্বদাই ছিলেন কর্মব্যস্ত৷ মিঃ ব্ল্যাট কিছুটা পথ এগিয়ে ক্ষান্ত হলেন এবং সরবে উৎসাহবাণী জানিয়ে চললেন; কিন্তু সেই সঙ্গে অনুসন্ধানকারীদের ছবি তুলতে ভুললেন না৷

গার্ডেনাররা এবং পোয়ারো পথের একপাশে স্থিরভাবে বসে রইলেন, এবং মিসেস গার্ডেনারে মসৃণ কণ্ঠস্বর সরব হলো সুষম লয়ের ভাষণে, যে ভাষণে—তাঁর স্বামীর অনুগত ‘হ্যাঁ, সোনা’ দিয়ে থেকে থেকে যতিচিহ্নিত৷

‘আর সব সময় আমার যা মনে হয়েছে, মঁসিয়ে পোয়ারো, এবং মিঃ গার্ডেনারও আমার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত, তা হলো, আচমকা তোলা ছবি, ভীষণ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ অবশ্য, যদি না সেগুলো কেবল বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে তোলা হয়৷ ওই মিঃ ব্ল্যাটের সত্যিই কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই৷ তিনি প্রত্যেকের সামনে গিয়ে হঠাৎ করে হাজির হন, একনাগাড়ে কথা বলতে থাকেন আর ছবি তুলতে শুরু করেন—এ অত্যন্ত অশিক্ষিত আচরণ, মিঃ গার্ডেনারকেও আমি সেই কথাই বলেছি৷ কি, বলিনি, ওডেল?’

‘হ্যাঁ, সোনা৷’

‘সেদিন সমুদ্রতীরে তিনি আমাদের সকলের বসা অবস্থায় একটা ছবি তুলেছেন৷ তা, তুলেছেন ভালোই করেছেন, কিন্ত প্রথমে তাঁর জিগ্যেস করা উচিত ছিলো৷ কারণ, ঠিক তখনই মিস ব্রস্টার হোটেলে ফিরে যাবেন বলে উঠে দাঁড়াচ্ছিলেন, সুতরাং তাঁর সেই অবস্থায় তোলা ছবি যে অত্যন্ত কিম্ভূতকিমাকার হবে তাতে আর আশ্চর্য কি!’

‘কথাটা মিথ্যে নয়৷’ আকর্ণ হেসে বললেন মিঃ গার্ডেনার৷

‘আর মিঃ ব্ল্যাট কোনরকম জিজ্ঞাসাবাদ না করেই সেই ছবির একটা করে কপি সকলকে দিয়ে বেড়াচ্ছেন৷ আপনাকেও একটা দিয়েছেন মঁসিয়ে পোয়ারো, আমি দেখেছি৷’

পোয়ারো মাথা নেড়ে সমর্থন জানালেন৷ তিনি বললেন, ‘ওই ছবির মূল্য আমার কাছে অনেক৷’

মিসেস গার্ডেনার বলে চললেন, ‘আর তাঁর আজকের ব্যবহার দেখুন—মামুলি হৈ-হুল্লোড়ে সর্বক্ষণ মেতে আছেন৷ দেখেশুনে আমার তো কাঁপুনি দিচ্ছে৷ এই লোকটাকে বাড়িতে রেখে আসার ব্যবস্থাই আপনার করা উচিত ছিলো, মঁসিয়ে পোয়ারো৷’

এরকুল পোয়ারো অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘হায়, মাদাম, সেটা অত্যন্ত কঠিন কাজ হতো৷’

‘কঠিন বলে কঠিন৷ ওই লোকটা সর্বক্ষেত্রে গুঁতোগুঁতি করে হলেও নিজের জায়গা করে নেয়৷ ভদ্রলোকের কাণ্ডজ্ঞান বলে কোন পদার্থ নেই৷’

সেই মুহূর্তে নিচে থেকে ভেসে আসা সমবেত উল্লাস-চিৎকার জানিয়ে দিলো পিক্সি গুহার প্রবেশপথ আবিষ্কৃত হয়েছে৷

এরকুল পোয়ারোর পরিচালনায় পিকনিক দল এবার উপস্থিত হলো এমন একটা জায়গায় যেখানে গাড়ি রেখে পাহাড়ি ঝোপের পাশ দিয়ে সামান্য এগোলেই চোখে পড়ে একটা ছোট নদীর তীরে মনোরম এক সবুজ প্রান্তর৷

নদী পার হওয়ার সেতু একটা সরু কাঠের তক্তা এবং পোয়ারো ও মিঃ গার্ডেনার মিসেস গার্ডেনারকে সেতু পার হতে রাজী করালেন৷ নদীর পরেই গুল্মঝোপে ঘেরা চোখজুড়ানো একটা ছোট্ট সবুজ জায়গা, সেখানে আগাছার চিহ্নমাত্র নেই এবং পিকনিকের পক্ষে আদর্শ স্থান৷

সরু সেতু অতিক্রম করার সময় তাঁর বিচিত্র অনুভূতি সম্পর্কে উচ্চ স্বরে ভাষণ দিতে দিতে মিসেস গার্ডেনার গুছিয়ে বসলেন৷ হঠাৎ শোনা গেলো সামান্য কোলাহল৷

অন্যান্যরা খুব সহজেই দৌড়ে পার হয়েছে কাঠের সেতুটা, কিন্তু এমিলি ব্রুস্টার সেই সরু তক্তার ঠিক মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তাঁর দু চোখ বোজা, শরীরটা অনিশ্চিতভাবে এপাশ-ওপাশ দুলছে৷

পোয়ারো এবং প্যাট্রিক রেডফার্ন ব্যস্তভাবে ছুটে গেলেন তাঁকে উদ্ধার করতে৷

এমিলি ব্রুস্টার লজ্জিত কণ্ঠে সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিলেন, ‘ধন্যবাদ ধন্যবাদ৷ দুঃখিত৷ খরস্রোতা নদী পার হওয়ার ব্যাপারে কোনদিনই তেমন পটু ছিলাম না৷ কেমন যেন মাথা ঝিমঝিম করে৷ নেহাৎই বোকার মতো৷’

খাবার ভাগ করে দেওয়া হলো এবং পিকনিক শুরু হলো৷

উপস্থিত প্রত্যেকেই এই ছোট্ট অনুষ্ঠানটুকু কত ভালো লাগছে ভেবে ভেতরে ভেতরে অবাক হলেন৷ এর কারণ, সম্ভবত, এই অনুষ্ঠান সন্দেহ ও ত্রাসে ঘেরা এক পরিবেশ থেকে তাঁদের সাময়িক মুক্তি দিয়েছে৷ এখানে চঞ্চল জলের স্বনন, জলজ উদ্ভিদের নেশা ধরানো হালকা গন্ধ এবং গুল্প পর্ণের উষ্ণ রঙিন ছটা, হত্যা পুলিশি তদন্ত ও সন্দেহভরা পৃথিবীকে নিঃশেষে মুছে দিয়েছে, যেন কোনদিনই সে পৃথিবীর অস্তিত্ব ছিলো না৷ এমন কি মিঃ ব্ল্যাট পর্যন্ত অনুষ্ঠানের মধ্যমণি হয়ে উঠতে ভুলে গেলেন৷ খাওয়া-দাওয়ার পর কাছাকাছি একটা শোবার জায়গা বেছে নিলেন তিনি এবং তাঁর সুখের অচেতন অবস্থায় সাক্ষ্য দিয়ে চললো চাপা নাক ডাকার শব্দ৷

অবশেষে জিনিসপত্রর গোছগাছ করে প্রত্যেকেই পোয়ারোকে তাঁর সুন্দর পরিকল্পনার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন৷

সরু আঁকাবাঁকা গলিপথ ধরে যখন তাঁরা ফিরে আসছেন তখন সূর্য অস্ত যেতে বসেছে৷ লেদারকোম্ব উপসাগর সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়া থেকে দূরে দ্বীপের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা হোটেলবাড়িটাকে তাঁরা ক্ষণেকের জন্য দেখতে পেলেন৷

অস্তায়মান সূর্যের আলোয় বাড়িটাকে শান্ত নিষ্পাপ বলে মনে হলো৷

মিসেস গার্ডেনার এই প্রথম বাকসংযমের পরিচয় দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আপনাকে সত্যিই ধন্যবাদ জানাই, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ আমার নিজেকে ভীষণ শান্ত লাগছে৷ আজকের দিনটা একটা কথায় কাটলো চমৎকার৷’

হোটেল পৌঁছলে মেজর ব্যারী তাঁদের সম্বর্ধনা জানাতে বেরিয়ে এলেন৷

‘এই যে!’ তিনি বললেন, ‘দিনটা ভালো কাটলো তো?’

মিসেস গার্ডেনার বললেন, ‘নিশ্চয়ই৷ খোলা সবুজ মাঠগুলোর তুলনা হয় না৷ একেবারে খাস ইংরেজি আর সাবেকী৷ সেখানকার সতেজ বাতাসে শুধু তৃপ্তির ছোঁয়া৷ আলসেমি করে না যাওয়ার জন্যে আপনার লজ্জা হওয়া উচিত৷’

মেজর চাপা হাসি হাসলেন৷

‘জলার মেঝে বসে স্যান্ডউইচ খাওয়া—ও সবের বয়েস কি আর আছে৷’

একজন পরিচারিকা তখন হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছে৷ তার শ্বাসপ্রশ্বাস ছন্দহীন, গভীর৷ এক মুহূর্ত ইতস্তত করে সে ক্ষিপ্র পায়ে এসে উপস্থিত হলো ক্রিস্টিন রেডফার্নের সামনে৷

এরকুল পোয়ারো তাকে গ্ল্যাডিস ন্যারাকট বলে চিনতে পারলেন৷ ওর এলোমেলো দ্রুত কণ্ঠস্বর কানে এলো৷ ‘মাপ করবেন, মাদাম, ছোট দিদিমণির জন্যে আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে৷ মিস মার্শালের জন্যে৷ এইমাত্র তাঁর ঘরে চা নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু তাঁকে জাগাতে পারলাম না, আর তাঁকে এত—এত অদ্ভুত দেখাচ্ছে...’

ক্রিস্টিন দিশেহারা হয়ে চারপাশে তাকালো৷ মুহূর্তের মধ্যে পোয়ারো ওর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ ওর কনুই ধরে শান্ত স্বরে তিনি বললেন, ‘চলুন, গিয়ে দেখা যাক৷’

চঞ্চল পায়ে সিঁড়ি ভেঙে বারান্দা পেরিয়ে ওঁরা দুজনে লিন্ডার ঘরে উপস্থিত হলেন৷

লিন্ডার দিকে এক পলক তাকিয়েই ওঁরা স্পষ্ট বুঝতে পারলেন কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে৷ ওর মুখের রঙ কেমন অদ্ভুত ধরনের আর শ্বাস-প্রশ্বাসের লক্ষণ চোখে পড়ছে না বললেই চলে৷

পোয়ারো ওর নাড়ি দেখলেন৷ একই সঙ্গে তাঁর নজরে পড়লো বিছানার পাশে টেবিল-ল্যাম্পের নিচে চাপা দেওয়া একটা খাম৷ খামটা তাঁর নামেই৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল ত্রস্ত পায়ে ঘরে এসে ঢুকলেন৷ তিনি বললেন, লিন্ডার নামে এসব কি শুনছি? কি হয়েছে ওর?’

শঙ্কা মেশানো এক টুকরো চাপা কান্না বেরিয়ে এলো ক্রিস্টিন রেডফার্নের মুখ দিয়ে৷

এরকুল পোয়ারো বিছানার কাছ থেকে ঘুরে দাঁড়ালেন৷ মার্শালকে বললেন, ‘একজন ডাক্তার ডেকে নিয়ে আসুন—যত শীগগির পারেন৷ কিন্তু আমার আশঙ্কা হচ্ছে—ভীষণ আশঙ্কা হচ্ছে—আমাদের হয়তো অনেক দেরি হয়ে গেছে৷’

নিজের নাম লেখা খামটা তুলে নিলেন, তিনি, খামের মুখ ছিঁড়ে চিঠিটা বের করলেন৷ তাতে রয়েছে লিন্ডার ছিমছাম কিশোরী হাতে লেখা কয়েকটি লাইন৷

আমার মনের হয় এটাই মুক্তির সবচেয়ে সহজ পথ৷ বাবাকে বলবেন তাঁর বিচারে আমাকে ক্ষমা করতে৷ আর্লেনাকে আমিই খুন করেছি৷ এতে আমার খুশি হওয়ার কথা—কিন্তু হইনি৷ সব কিছুর জন্যে আমার ভীষণ দুঃখ হচ্ছে৷

ওঁরা সকলে জমায়েত হয়েছেন বিশ্রাম কক্ষে—মার্শাল রেডফার্নরা রোজমণ্ড ডার্নলি এবং এরকুল পোয়ারো৷

প্রত্যেকেই চুপচাপ বসে—প্রতীক্ষারত...

দরজা খুলে ডাঃ নীসডন ভেতরে এলেন৷ তিনি সংক্ষিপ্তভাবে বললেন, ‘যতটুকু করা সম্ভব করেছি৷ এ যাত্রা মেয়েটা টিকে গেলেও যেতে পারে—তবে এ কথা না বলে পারছি না, আশা খুব বেশি নেই৷’

তিনি একটু থামলেন৷

কঠিন মুখে কুয়াশাঘন শীতল নীল চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন মার্শাল, ‘কিন্তু জিনিসটা ও হাতে পেলো কেমন করে?’

দরজা খুলে নীসডন কাকে যেন ডাকলেন৷

পরিচারিকাটি ঘুরে ঢুকলো৷ ওর চোখে মুখে কান্নার স্বাক্ষর৷

নীসডন বললেন, ‘তুমি যা দেখেছো আমাদের আর একেবারে বলো৷’

বার কয়েক শব্দে নাক টেনে মেয়েটি বললো, ‘আমি মোটেই ভাবিনি—এক মুহূর্তের জন্যেও ভাবিনি ভেতরে ভেতরে কোন গলদ রয়েছে—অবশ্য ছোড়দিদিমণিকে দেখে তখন একটু অবাক লেগেছিলো৷’ ডাক্তারের কাছ থেকে সামান্য অধৈর্যসূচক ইঙ্গিত পেয়ে ও আবার শুরু করলো, ‘মিস মার্শাল তখন অন্য দিদিমণির ঘরে ছিলেন৷ মিসেস রেডফার্নের ঘরে৷ আপনার ঘরে মাদাম৷ বেসিনের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি, একটা ছোট শিশি হাতে নিয়ে৷ আমাকে ঢুকতে দেখেই তিনি ভীষণ চমকে ওঠেন, আর আপনার ঘর থেকে মিস লিন্ডার না বলে কোন জিনিস নেওয়াটা আমার কাছে কেমন অদ্ভুত ঠেকেছে, অবশ্য, এও হতে পারে, ওটা হয়তো তাঁরই জিনিস—আপনাকে ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলেন৷ তিনি শুধু বললেন, ‘এই তো, এটাই খুঁজছিলাম—’ এবং ঘর ছেড়ে চলে গেলেন৷’

ক্রিস্টিন প্রায় ফিসফিস করে বললো, ‘আমার ঘুমের ট্যাবলেটগুলো৷’

ডাক্তার রূঢ় স্বরে বললেন, ‘সে খবর মিস লিন্ডা পেলো কি করে?’

ক্রিস্টিন বললো, ‘আমি ওকে একটা দিয়েছিলাম৷ আর্লেনা মারা যাওয়ার দিন রাতে৷ ও বলছিলো ঘুম আসছে না৷ ও আমার মনে আছে ও বলেছিলো—‘একটাতেই হবে তো?’—আর আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, এই ট্যাবলেটগুলো খুব জোরালো—আমাকে কখনও একসঙ্গে দুটোর বেশি খেতে বারণ করা হয়েছে৷’

নীসডন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷

মেয়েটা ভুল-ভ্রান্তি হওয়ার কোন পথ রাখেনি, তিনি বললেন, ‘একসঙ্গে ছ-ছ’টা ট্যাবলেট গিলেছে৷’

ক্রিস্টিন আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো৷

‘ওঃ, এ সবই আমার দোষে হলো, ট্যাবলেটের শিশিটা আমার তালাচাবি দিয়ে রাখা উচিত ছিলো৷’

ডাক্তার কাঁধ ঝাঁকালেন৷

‘হয়তো সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ হতো, মিসেস রেডফার্ন৷’

ক্রিস্টিন হতাশ সুরে বলে উঠলো, ‘ও মারা যাচ্ছে—সম্পূর্ণ আমার দোষে...’

কেনেথ মার্শাল নিজের চেয়ারে নড়েচড়ে বসলেন৷

তিনি বললেন, ‘না আপনার কোন দোষ নেই৷ লিন্ডা যা করেছে জেনেশুনে করেছে৷ ও ট্যাবলেট খেয়েছে স্ব-ইচ্ছায়৷ হয়তো—হয়তো এ-ই সবচেয়ে ভালো হলো৷’

তিনি চোখ নামিয়ে দেখলেন তাঁর হাতে ধরা ভাঁজ করা চিঠিটার দিকে—যে চিঠিটা পোয়ারো নীরবে তাঁর হাতে তুলে দিয়েছেন৷

রোজামন্ড ডার্নলি চিৎকার করে উঠলো, ‘আমি বিশ্বাস করি না৷ আমি বিশ্বাস করি না লিন্ডা আর্লেনাকে খুন করেছে৷ কারণ সেটা পুরোপুরি অসম্ভব—অন্তত সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুয়ায়ী৷’

ক্রিস্টিন আগ্রহের সুরে বললো, ‘হ্যাঁ, সে কাজ ওর পক্ষে করা সম্ভব নয়৷ হয়তো অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তায় পুরো ব্যাপারটা ও কল্পনা করে নিয়েছে৷’

দরজা খুলে গেলো এবং কর্নেল ওয়েস্টন ঘরে ঢুকলেন৷ তিনি বললেন, ‘এ সব কি শুনছি?’

ডাঃ নীসডন মার্শালের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পুলিশ-প্রধানের হাতে তুলে নিলেন৷ শেষোক্ত ব্যক্তি সেটা পড়লেন৷ তিনি অবিশ্বাসী বিস্ময়ভরা স্বরে বলে উঠলেন, ‘কি? কিন্তু এর কোন মানে হয় না—একেবারে অর্থহীন৷ সম্পূর্ণ অসম্ভব!’ নিশ্চিত সুরে তিনি পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘অসম্ভব! তাই না, পোয়োরো?’

এরকুল পোয়ারো এই প্রথম নড়েচড়ে বসলেন৷ ধীর বিষণ্ণ কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘না, আমার ধারণা অসম্ভব নয়৷’

ক্রিস্টিন রেডফার্ন বললো, ‘কিন্তু আমি ওর সঙ্গে ছিলাম, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ পৌনে বারোটা পর্যন্ত আমরা একসঙ্গে ছিলাম৷ আমি পুলিশকেও তাই বলেছি৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আপনার সাক্ষ্যই ওকে অ্যালিবাই জুগিয়েছে—হ্যাঁ৷ কিন্তু আপনার সাক্ষ্য কিসের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে? লিন্ডা মার্শালের হাতঘড়ির ওপর ভিত্তি করে৷ আপনি নিজে থেকেই নিশ্চিত করে বলতে পারেন না যে ঠিক পৌনে বারোটার সময় আপনি মিস মার্শালকে ছেড়ে চলে আসেন—ও আপনাকে যা যা বলেছে আপনি শুধু সেইটুকুই জানেন৷ আপনি নিজে বলেছেন, সময় খুব তাড়াতাড়ি অতিবাহিত হয়েছে বলে আপনার মনে হয়েছিলো৷’

বিস্ময়াহত অপলক চোখে ও তাকিয়ে রইলো৷

তিনি বললেন, ‘এবারে ভাবুন মাদাম, যখন আপনি বেলাভূমি ছেড়ে চলে আসেন, তখন হোটেলে তাড়াতাড়ি না ধীরে ধীরে ফিরে গিয়েছিলেন?’

‘আমি—যতদূর মনে পড়ছে—বেশ ধীরে সুস্থেই ফিরে গিয়েছিলাম৷’

‘ওই ফিরে যাওয়ার ঘটনাটা আপনার ভালোমতো মনে আছে?’

‘না, খুব বেশি মনে নেই৷ আমি—আমি চিন্তা করছিলাম৷

পোয়ারো বললেন, ‘এ প্রশ্ন করার জন্য আমি দুঃখিত, মাদাম, কিন্তু দয়া করে বলবেন, সে সময়ে আপনি কি চিন্তা করেছিলেন?’

ক্রিস্টিনের গালে রক্তের ঝলক ছায়া ফেললো৷

‘আমি—যদি সেটা একান্তই জানতে চান... আমি এখান থেকে—চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম৷ আমার স্বামীকে না জানিয়ে চুপচাপ চলে যাওয়ার কথা৷ সেই সময়ে আমার—আমার ভীষণ খারাপ লাগছিলো, জানেন৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন অপেক্ষাকৃত উঁচু গলায় বলল, ‘ও ক্রিস্টিন৷ আমি জানি... আমি জানি...’

পোয়ারো নিখুঁত কণ্ঠস্বর এই আলোচনার মাঝে নিজের জায়গা করে নিলো, ‘ঠিক তাই৷ আপনি তখন একটা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবার কথা ভাবছিলেন৷ আমি বলবো, আপনি সেই মুহূর্তগুলোয় আপনার পারিপার্শ্বিকের প্রতি সম্পূর্ণ বধির এবং অন্ধ ছিলেন৷ সম্ভবত আপনি অত্যন্ত ধীর পায়ে হাঁটছিলেন এবং সময়ে সময়ে মিনিটখানেকের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে আপনার মানসিক সমস্যার সমাধান খুঁজছিলেন৷’

ক্রিস্টিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো৷

আপনার তো দারুণ বুদ্ধি৷ সত্যি তাই হয়েছিলো৷ হোটেলের দরজায় পৌঁছে আমি যেন এক অদ্ভুত স্বপ্ন নিয়ে জেগে উঠি এবং দেরি হয়ে যাবে ভেবে তাড়াতাড়ি ভেতরে ঢুকি, কিন্তু হঠাৎ লাউঞ্জের ঘড়িটা আমার নজরে পড়লো তখন বুঝলাম হাতে তখনও অনেক সময় রয়েছে৷

এরকুল পোয়ারো আবার বললেন, ‘ঠিক তাই৷’

তিনি ফিরলেন মার্শালের দিকে৷

‘খুনের পরে আপনার মেয়ের ঘর থেকে এমন কতকগুলো জিনিস আমি পেয়েছি৷ যেগুলো আপনাকে এখন বলা প্রয়োজন৷ ঘরের চুল্লীতে আমি পেয়েছি বিশাল এক টুকরো গলা মোম, কিছু পোড়া চুল, পিচবোর্ড ও কাগজের কিছু ছেঁড়া অংশ এবং একটা সাধারণ আলপিন৷ কাগজ ও পিচবোর্ডের টুকরোগুলো হয়তো অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু অন্য তিনটে জিনিস যথেষ্ট ইঙ্গিতবহ—বিশেষ করে যখন বইয়ের তাকে স্থানীয় পাঠাগারের ডাকিনীবিদ্যা ও মায়াবিদ্যাসংক্রান্ত একটি বই আমি লুকনো অবস্থায় আবিষ্কার করলাম৷ একটা বিশেষ পৃষ্ঠায় খুব সহজেই বইটা খুলে গেলো৷ সেই পৃষ্ঠায় মোমের পুতুলের সাহায্যে, যা ইপ্সিত শত্রুর প্রতীক, মত্যু সাধনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া বর্ণনা করা আছে৷ তারপর সেই মোমের পুতুলকে ধীরে ধীরে গলিয়ে ফেলা হয় উত্তাপের সাহায্যে—অথবা বিকল্প হিসেবে একটা আলপিন আপনি বসিয়ে দিতে পারেন ওই পুতুলের হৃৎপিণ্ডে৷ ফলে ইপ্সিত ব্যক্তির আসন্ন মৃতুক্ষণ নির্ধারিত হয়ে যাবে৷ পরে মিসেস রেডফার্নের কাছে আমি শুনেছি যে সেইদিন ভোরে লিন্ডা মার্শাল ওর ঘরে ছিলো না, বেরিয়েছিলো, এবং কিনে এনেছিলো এক প্যাকেট মোমবাতি, আর ওর সেই কিনে আনা জিনিস প্রকাশ হয়ে পড়লে ওকে দেখে অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে হয়৷ তারপরে কি ঘটেছে সে বিষয়ে
আমার মনে বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই৷ মোমবাতির মোম দিয়ে লিন্ডা কাঁচা হাতে একটা পুতুল তৈরি করে—সম্ভবত আর্লেনার মাথা থেকে কেটে নেওয়া লাল চুল দিয়ে সেটাকেও সাজিয়ে নেয় যাদুশক্তি জাগিয়ে তোলার জন্য—তারপর একটা আলপিন বসিয়ে দেয় পুতুলটার হৃৎপিণ্ডে এবং সবশেষে পিচবোর্ডের টুকরো জ্বেলে পুতুলটাকে ও গলিয়ে ফেলে৷

‘এটা অপরিণত শিশুসুলভ মনের কুসংস্কার কিন্তু একটা জিনিস এ থেকে স্পষ্ট হয় : খুনের আকাঙ্ক্ষা৷

‘এই আকাঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি কিছু থাকার সম্ভাবনা কি সেখানে রয়েছে? লিন্ডা মার্শালের পক্ষে ওর সৎমাকে খুন করা কি সত্যি সম্ভব ছিলো?’

‘প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ওঁর নিখুঁত অ্যালিবাই রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, একটু আগেই যেটা আমি আপনাদের নজরে এনেছি, সেই সময়ের সাক্ষ্য লিন্ডা নিজেই আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে৷ সঠিক সময়কে সিকি ঘণ্টা বাড়িয়ে খুব সহজেই ও সময় বলে থাকতে পারে৷

‘মিসেস রেডফার্ন সৈকত ছেড়ে চলে যেতেই তাঁকে অনুসরণ করে ওপরে উঠে আসা লিন্ডার পক্ষে অসম্ভব ছিলো না, অসম্ভব ছিলো না দ্বীপের গ্রীবাসৃদশ অংশটুকু অতিক্রম করে পিক্সি কোভের লোহার মইয়ের কাছে পৌঁছনো, মই বেয়ে তাড়াহুড়ো করে নেমে যাওয়া, সৎমার সঙ্গে দেখা করা, তাঁকে খুন করা এবং মিস ব্রুস্টার ও প্যাট্রিক রেডফার্ন নৌকো নিয়ে দৃশ্যপটে উপস্থিত হওয়ার আগেই মই বেয়ে ফিরে আসা৷ তারপর ও হয়তো ফিরে আসে গাল কোভে, স্নান সেরে ধীরেসুস্থে ফিরে যায় হোটেলে৷

‘কিন্তু দুটো জিনিস এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে৷ আর্লেনা মার্শাল যে পিক্সি কোভে থাকবেন সেটা ওর পক্ষে নিশ্চিতভাবে জানা প্রয়োজন, এবং দৈহিক শক্তির দিক থেকে সেই বিশেষ কর্ম সম্পাদনে ওকে হতে হবে সক্ষম৷

‘হ্যাঁ, এই দুয়ের প্রথমটি সম্পূর্ণ সম্ভব—যদি লিন্ডা মার্শাল অন্য কারও নামে আর্লেনাকে কোন চিঠি দিয়ে থাকে৷ আর দ্বিতীয়টির কথা যদি বলেন, লিন্ডার হাত যথেষ্ট প্রশস্ত এবং শক্তিশালী৷ কোন পুরুষের মতোই সুদীর্ঘ ওর হাত৷ শক্তির কথা যদি বলেন, ও এখন এমন একটা বয়েসে রয়েছে যখন মানসিক অস্থিরতার প্রবণতার দেখা দেয়৷ প্রায়শই এই মানসিক বিশৃঙ্খলার সঙ্গী হয় অমানুষিক শক্তি৷ এছাড়া একটা ছোট ঘটনা আমাদের চোখের সামনে উপস্থিত৷ লিন্ডা মার্শলের মাকে খুনের দায়ের অভিযুক্ত করা হয় এবং আদালতে তাঁর বিচারও হয়৷’

কেনেথ মার্শাল মাথা তুললেন৷ ভয়ঙ্কর সুরে তিনি বলে উঠলেন, ‘বিচারে ও মুক্তি পেয়েছিলো৷’

‘বিচারে উনি মুক্তি পেয়েছিলেন৷’ পোয়ারো একমত হলেন৷

মার্শাল বললেন, ‘আর—একটা কথা আপনাকে বলে রাখি, মঁসিয়ে পোয়ারো৷ রুখ—আমার স্ত্রী—সম্পূর্ণ নির্দোষ ছিলো৷ সে কথা আমি নির্ভুল এবং নিশ্চিতভাবে জানি৷ আমাদের দাম্পত্যজীবনের অন্তরঙ্গতায় ওর পক্ষে আমাকে প্রতারিত করা সম্ভব ছিলো না৷ ও পরিস্থিতির এক নির্দোষ শিকার হয়ে পড়েছিলো৷’

তিনি একটু থামলেন৷

‘আর লিন্ডা আর্লেনাকে খুন করেছে, এ আমি বিশ্বাস করি না৷ এ সম্পূর্ণ অসম্ভব—অবাস্তব৷’

পোয়ারো বললেন, ‘তাহলে আপনি মনে করেন, ওই চিঠিটা জাল?’

মার্শাল চিঠিটার জন্য হাত বাড়ালেন এবং ওয়েস্টন সেটা তাঁর হাতে তুলে দিলেন৷

মার্শাল মনোযোগ দিয়ে চিঠিটা পরীক্ষা করলেন৷ তারপর মাথা নাড়লেন৷

‘না’, অনিচ্ছার সুরে তিনি বললেন, ‘আমার ধারণা, এটা লিন্ডারই লেখা৷’

পোয়ারো বললেন, ‘চিঠিটা যদি ও লিখে থাকে, তাহলে এর মাত্র দুটো ব্যাখ্যা হতে পারে৷ হয় চিঠিটা ও নির্ভেজাল বিশ্বাসে লিখেছে, নিজেকে সত্যি খুনী জেনে, অথবা—আমার ধারণা; এই চিঠি ও লিখেছে অন্য কাউকে রক্ষা করার জন্য— এমন কাউকে, যাকে পুলিশ সন্দেহ করছে বলে ওর আশঙ্কা ছিলো৷’

কেনেথ মার্শাল বললেন, ‘আপনি আমার কথা বলছেন?’

‘সেটা খুবই সম্ভব, নয় কি?’

মার্শাল কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করলেন, তারপর শান্ত স্বরে বললেন, ‘না, আমার মনে হয়, সে ধারণা নিতান্ত অসম্ভব৷ লিন্ডা প্রথম প্রথম হয়তো ভেবে থাকবে, পুলিশ আমাকে সন্দেহ করছে৷ কিন্তু এখন ও নিশ্চিতভাবেই জানতো, সে সন্দেহ ধুয়েমুছে মিলিয়ে গেছে—জানতো, পুলিশ আমার অ্যালিবাই মেনে নিয়েছে এবং তাদের মনোযোগ এখন অন্যদিকে৷’

পোয়ারো বললেন, ‘আর যদি ধরে নেওয়া যায়, লিন্ডা শুধু ভাবেনি যে পুলিশ আপনাকে সন্দেহ করছে, বরং জানতো, আপনিই প্রকৃত অপরাধী?’

মার্শাল অবাক চোখে চেয়ে রইলেন তাঁর দিকে৷ তিনি শব্দ করে ছোট্ট হাসলেন৷

‘এ রীতিমতো হাস্যকর৷’

পোয়ারো বললেন, ‘কি জানি৷ মিসেস মার্শালের মৃত্যু সম্পর্কে একাধিক সম্ভাবনা রয়েছে, জানেন৷ একটা ব্যাখ্যা বলছে, তাঁকে কেউ ব্ল্যাকমেল করছিলো, সেদিন সকালে তিনি সেই ব্ল্যাকমেলারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন এবং সে তাঁকে খুন করে৷ দ্বিতীয় ব্যাখ্যা বলছে, পিক্সি কোভ ও পিক্সি গুহাকে মাদকদ্রব্য চোরাচালানের কাজে ব্যবহার করা হতো, এবং তিনি ঘটনাচক্রে সে সম্পর্কে কিছু জেনে ফেলায় তাঁকে খুন করা হয়৷ একটা তৃতীয় সম্ভাবনা রয়েছে—যে কোন ধর্ম-উন্মাদ ব্যক্তির হাতে তাঁর মৃত্যু হয়৷ আর চতুর্থ সম্ভাবনাও একটা আছে—আপনার স্ত্রীর মৃত্যুতে আপনার আর্থিক লাভের পরিমাণ নেহাৎ কম নয়, ক্যাপ্টেন মার্শাল?’

‘আমি তো একটু আগেই আপনাকে বললাম—’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ—মানছি, আপনার পক্ষে আপনার স্ত্রীকে খুন করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিলো—যদি অবশ্য, আপনি একাই এ কাজে নেমে থাকেন৷ কিন্তু কেউ যদি আপনাকে সাহায্য করে থাকে?’

‘কি বলতে চাইছেন আপনি?’

শান্ত মানুষটা এতক্ষণে বিক্ষুব্ধ হলো৷ তিনি চেয়ার ছেড়ে অর্ধেক উঠে দাঁড়ালেন৷ তাঁর কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর৷ একটা কঠিন ক্রুদ্ধ রোশনাই তাঁর দু চোখে জ্বলছে৷

পোয়ারো বললেন, ‘আমি বলতে চাই, এটা সে ধরনের অপরাধ নয়, যা সংঘটিত হয়েছে কারো একার হাতে৷ দুজন মানুষ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে৷ একথা সত্যি যে একই সঙ্গে আপনার পক্ষে পিক্সি কোভে যাওয়া ও সেই চিঠিটা টাইপ করা সম্ভব ছিলো না—কিন্তু চিঠিটা শর্টহ্যান্ডে লিখে রাখার মতো সময় আপনার হাতে ছিলো—এবং যখন আপনি নিজে অনুপস্থিত ছিলেন, ব্যস্ত ছিলেন জল্লাদ কর্মে, তখন অন্য কেউ হয়তো সে চিঠি আপনার ঘরে বসে টাইপ করে থাকবে৷’

এরকুল পোয়ারো তাকালেন রোজামণ্ড ডার্নলির দিকে৷ তিনি বললেন, ‘মিস ডার্নলি বলেছেন, তিনি এগারোটা দশে সানি লেজ ছেড়ে চলে আসেন৷ এবং আপনাকে আপনার ঘরে টাইপ করতে দেখেন৷ কিন্তু মোটামুটি এই সময়েই মিঃ গার্ডেনার হোটেলে এসেছিলেন তাঁর স্ত্রীর জন্য একটা উলের বল নিয়ে যেতে৷ মিস ডার্নলির সঙ্গে তাঁর কথা অথবা দেখা হয়নি৷ ব্যাপারটা একটু অসাধারণ৷ দেখেশুনে মনে হচ্ছে যে হয় মিস ডার্নলি কখনও সানি লেজ ছেড়ে আসেননি, নয় তিনি অনেক আগেই সে জায়গা ছেড়ে চলে আসেন এবং আপনার ঘরে পরিশ্রমের সঙ্গে টাইপ করতে থাকেন৷ আর একটা কথা, আপনি বলেছেন যে মিস ডার্নলি সওয়া এগারোটার সময় আপনার ঘরে উঁকি মারলে আপনি সামনের আয়নায় তাঁকে দেখতে পান৷ কিন্তু খুনের দিন আপনার টাইপরাইটার, কাগজ, সমস্ত ঘরের এক কোণে লেখার টেবিলে রাখা ছিলো, অথচ আয়নাটা ছিলো দু-জানলার মাঝখানে৷ সুতরাং আপনার সেই বিবৃতি নিছকই সাজানো মিথ্যে৷ পরে, আপনি টাইপরাইটারটা সরিয়ে নিয়ে যান আয়নার সামনে রাখা টেবিলটায়, আপনার গল্পকে প্রমাণ করার জন্য—কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে৷ আমি জানতাম, আপনি এবং মিস ডার্নলি, দুজনেই মিথ্যে কথা বলছেন৷’

রোজামণ্ড ডার্নলি মুখ খুললো৷ ওর স্বর নিচু অথচ স্পষ্ট৷

‘ও বললো, কি সাংঘাতিক চালাক আপনি৷’

উঁচু পর্দায় স্বর তুলে এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘কিন্তু আর্লেনা মার্শালের খুনীর মতো অত সাংঘাতিক এবং অত চালাক নই৷ একটিবার ভেবে দেখুন৷ সেদিন সকালে আর্লেনা মার্শাল কার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন বলে আমি ভেবেছিলাম—আপনারা প্রত্যেকে ভেবেছিলেন? আমরা সকলে একই সিদ্ধান্তে একমত হয়েছি৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ কোন ব্ল্যাকমেলারের সঙ্গে দেখা করতে তিনি যাননি৷ তাহলে তাঁর মুখের চেহারাই সেকথা আমাকে জানিয়ে দিতো৷ উঁহু, তিনি দেখা করতে যাচ্ছিলেন কোন প্রেমিকের সঙ্গে—অন্তত তিনি তাই ভেবেছিলেন৷

‘হ্যাঁ, সে বিষয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই৷ আর্লেনা মার্শাল যাচ্ছিলেন প্যাট্রিক রেডফার্নের সঙ্গে দেখা করতে৷ কিন্তু তার মিনিটখানেক পরেই প্যাট্রিক রেডফার্ন সৈকতে উপস্থিত হন এবং তাঁর চোখ বেশ স্পষ্টভাবেই আর্লেনা মার্শালের খোঁজ করতে থাকে৷ সুতরাং তাহলে?’

প্যাট্রিক রেডফার্ন চাপা ক্রোধের সুরে বললো, ‘কোন বদমাইস আমার নাম ব্যবহার করে থাকবে৷’

পোয়ারো বললেন, ‘মিসেস মার্শালের অনুপস্থিতিতে আপনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বিরক্ত এবং বিস্মিত হন৷ সম্ভবত, বড় বেশিরকম স্পষ্টভাবে৷ আমার মত হলো, মিঃ রেডফার্ন, যে তিনি পিক্সি কোভে আপনার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, আপনার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়, এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী আপনি তাঁকে সেখানে খুন করেন৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো৷ তারপর তার খোশ মেজাজী আইরিশ সুরে উঁচু গলায় বললো, আপনি কি মশাই পাগল হয়ে গেলেন? মিসেস ব্রুস্টারের সঙ্গে নৌকো নিয়ে বেরিয়ে ওর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়ার আগে পর্যন্ত আমি তো সৈকতে আপনার সঙ্গে ছিলাম৷’

এরকুল পোয়ারো বললেন, মিস ব্রুস্টার নৌকো নিয়ে পুলিশ ডাকতে গেলে পর আপনি আর্লেনা মার্শালকে খুন করেন৷ আপনি যখন পিক্সি কোভে নামেন তখন তিনি বেঁচে ছিলেন, গুহায় লুকিয়ে থেকে রাস্তা পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষা করছিলেন৷’

কিন্তু সেই দেহটা৷ মিস ব্রুস্টার এবং আমি, দুজনেই সেটা দেখেছি৷’

দেহ—ঠিক কথা৷ কিন্তু মৃহদেহ নয়৷ সেই মহিলার জীবন্ত দেহ, যিনি আপনাকে সাহায্য করেছেন৷ তাঁর হাতে পায়ে ছিলো বাদামী রঙের প্রলেপ, মুখ ঢাকা ছিলো সবুজ পিচবোর্ডের টুপিতে৷ ক্রিস্টিন, আপনার স্ত্রী (অথবা, সম্ভবত আপনার স্ত্রী নয়—কিন্তু তবুও আপনার দুষ্কর্মের সাথী) আপনাকে এ খুনে সাহায্য করেছেন, যেমন করেছিলেন অতীতে যখন তিনি অ্যালিস করিগানের দেহ ‘আবিষ্কার’ করেন অ্যালিস করিগানের মৃত্যুর কুড়ি মিনিট আগে—অ্যালিসকে খুন করেছিলো তার স্বামী, এডওয়ার্ড করিগান—আপনি৷’

ক্রিস্টিন কথা বললো৷ ওর স্বর তীক্ষ্ণ—শীতল৷ ও বললো, ‘সাবধান, প্যাট্রিক, মাথা গরম কোরো না৷’

পোয়ারো বললেন, ‘শুনলে হয়তো খুশি হবেন, এখানে তোলা একটা গ্রুপ ফটো দেখে সারে পুলিশ খুব সহজেই আপনাকে এবং আপনার স্ত্রী ক্রিস্টিনকে চিনতে পেরেছে৷ তারা সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের সনাক্ত করেছে, এডওয়ার্ড করিগান ও ক্রিস্টিন ডেভারিল বলো—ক্রিস্টিন ডেভারিল, অর্থাৎ সেই মহিলাটি, যিনি অ্যালিসের মৃতদেহ আবিষ্কার করেছিলেন৷’

প্যাট্রিক রেডফার্ন উঠে দাঁড়িয়েছে৷ তার সুন্দর মুখ অনেক বদলে গেছে৷ সে মুখে ফেটে পড়ছে রক্ত, সে মুখ ক্রোধে অন্ধ৷ সব মিলিয়ে সে মুখ কোন খুনীর—কোন বাঘের৷ সে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো, শালা হতচ্ছাড়া নাকগলানো টেকো গুঁফো গোয়েন্দা!’

সে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লো, তার হাতের আঙুল হাওয়া আঁকড়ে ধরছে, তার ক্ষিপ্ত স্বরে অশ্রাব্য শব্দের ফুলঝুরি, এবং তার দু’হাতের দশ আঙুল এরকুল পোয়ারোর গলায় চেপে বসলো...

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

চিন্তার সুরে বললেন, পোয়ারো, ‘কোন এক সকালে সৈকতে আমরা বসেছিলাম, আলোচনা করছিলাম কসাইয়ের দোকানে সাজানো মাংসের মতো পড়ে থাকা সূর্যস্নাত শরীরগুলো নিয়ে, এবং তখনই আমার মনে হয়েছে, দুটো ভিন্ন শরীরের মধ্যে কি সামান্যই না পার্থক্য৷ যদি কেউ গভীর এবং নিরীক্ষার দৃষ্টিতে দেখেন, তাহলে, হ্যাঁ পার্থক্য আছে—কিন্তু অসর্তক অমনোযোগী দৃষ্টির কাছে? একজন মোটামুটি স্বাস্থ্যের তরুণীর সঙ্গে দ্বিতীয় কোন তরুণীর মিল প্রচুর৷ দুটো তামাটে পা, দুটো তামাটে বাহু, এবং দুয়ের মাঝে এক টকুরো সাঁতার-পোশাক। সূর্য—কিরণে শুয়ে থাকা শুধুই একটা দেহ৷ যখন কোন মহিলা চলাফেরা করেন, কথা বলেন, হাসেন, মাথা ঘুরিয়ে তাকান, হাতের ভঙ্গী করেন—তখন হ্যাঁ, তখন একটা ব্যক্তিত্ব চোখে পড়ে—চোখে পড়ে স্বাতন্ত্র্য৷ কিন্তু সূর্যসাধনের সময় না৷

‘সেই দিনই আমরা অশুভ শক্তির প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছিলাম—মিঃ লেনের কথা অনুয়ায়ী শক্তির প্রভাব রয়েছে পৃথিবীর সর্বত্র৷ মিঃ লেন অত্যন্ত সচেতন মানুষ—অশুভের প্রভাব তিনি অনুভব করেন—বুঝতে পারেন তাঁর উপস্থিতি—কিন্তু তাঁর মতো সূক্ষ্ম যন্ত্রও সঠিক জানতো না অশুভের অবস্থান ছিলো ঠিক কোন জায়গায়৷ তাঁর মতে, অশুভ শক্তি লুকিয়ে ছিলো আর্লেনা মার্শালের ব্যক্তিতে, এবং কার্যত প্রত্যেকেই তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন৷’

‘কিন্তু আমার মতে, অশুভ শক্তি উপস্থিতি থাকলেও সে আর্লেনা মার্শালের মধ্যে আদৌ কেন্দ্রীভূত ছিলো না৷ তাঁর সঙ্গে অশুভের যোগ ছিলো, মানছি—কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে৷ আমি তাঁকে প্রথমে, শেষে এবং সর্বসময়েই দেখেছি অশুভের চিরন্তন নিশ্চিত শিকার হিসেবে৷ যেহেতু উনি সুন্দরী ছিলেন, যেহেতু তাঁর চেহারায় চটক ছিলো, তাঁর মতো মহিলারাই ঘর ও জীবন নষ্ট করেন৷ কিন্তু আমি তাঁকে দেখেছি একেবারে অন্যভাবে৷ সর্বনাশা আকর্ষণে পুরুষদের উনি কখনও টানতেন না বরং পুরুষেরাই তাঁকে টানতো৷ উনি ছিলেন সেই ধরনের মহিলা, যাঁদের প্রতি পুরুষেরা যেমন সহজে আগ্রহ দেখায়, তেমন সহজেই আবার ক্লান্ত হয়ে পড়ে৷ এবং তাঁর সম্পর্কে যা কিছু আমি দেখেছি, শুনেছি, সব আমার ধারণাকে আরও জোরদার করেছে৷ তাঁর সম্পর্কে প্রথম যে কথাটি শোনা যায় তা হলো কিভাবে সেই লোকটি, যার বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলায় উনি জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে, আর ঠিক তখন আমাদের ক্যাপ্টেন মার্শাল, যাঁর বিপাদাপন্ন-রমণী-সেবার ব্রত চিকিৎসার অযোগ্য, ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব জানালেন৷ ক্যাপ্টেন মার্শালের মতো লাজুক নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে যে কোনরকম প্রকাশ্য বিচার ছিলো এরকম যন্ত্রণা—সেই কারণেই আমরা দেখতে পাই প্রথম স্ত্রীর প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং করুণা, যাঁকে আদালতে অভিযুক্ত করা হয়েছিলো খুনের অপরাধে, যে খুন তিনি কখনও করেননি৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল তাঁকে বিয়ে করেছিলেন এবং বুঝতে পেরেছিলেন, স্ত্রী চরিত্র নির্ণয়ে তিনি কোন ভুল করেননি৷ তাঁর মৃত্যুর পর আর একজন সুন্দরী মহিলা, হয়তো একই ধরনের (কারণ লিন্ডার মাথার চুল লাল, যা সে ওর মায়ের কাছ থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে থাকবে), অভিযুক্ত হলেন প্রকাশ্য কলঙ্কে৷ আবারও মার্শাল তাঁর ত্রাণকার্য সম্পন্ন করলেন৷ কিন্তু এইবার আকর্ষণ জীইয়ে রাখার মতো কিছুই তিনি স্ত্রীর কাছে পেলেন না৷ আর্লেনা নির্বোধ, তাঁর করুণা প্রতিরক্ষার অযোগ্য এবং হৃদয়হীনা৷ তা সত্ত্বেও আমার মনে হয়, স্ত্রীর মোটামুটি সত্যিকারের অযোগ্য এবং হৃদয়হীনা৷ তা সত্ত্বেও আমার মনে হয়, স্ত্রীর মোটামুটি সত্যিকারের ছবিটা তাঁর আজানা ছিলো না৷ স্ত্রীর সঙ্গে ভালোবাসা শেষ হয়ে তাঁর উপস্থিতিতে বিরক্ত হতে লাগলেন মার্শাল, কিন্তু তার অনেক পরেও আর্লেনার প্রতি একটা দুঃখবোধ তাঁর মনে বরাবরের জন্য থেকে গিয়েছিলো৷ তাঁর কাছে আর্লেনা ছিলেন একটা শিশুর মতো, যিনি জীবন-কেতাবের একটা বিশেষ পৃষ্ঠা কোনরকমেই অতিক্রম করতে পারছেন না৷

‘পুরুষে আসক্ত আর্লেনা মার্শালকে আমি দেখেছিলাম বিশেষ একধরনের বিবেকহীন পুরুষের অনিবার্য শিকার হিসেবে৷ আর সেই বিশেষ ধরনের পুরুষকে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম প্যাট্রিক রেডফার্নের মধ্যে, তাঁর সুন্দর চেহারা, সহজ আত্মবিশ্বাস ও মহিলাদের আকর্ষণ করার অকাট্য ক্ষমতার মধ্যে৷ এ ধরনের ফাটকাবাজ পুরুষেরা, এভাবে ওভাবে যেভাবেই হোক, মহিলাদের মূলধন করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে৷ সৈকতে বসে যেটুকু আমার নজরে পড়েছে, তাতে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে আর্লেনাই ছিলো প্যাট্রিকের শিকার, তার উলটোটা নয়৷ এবং অশুভের কেন্দ্রবিন্দুতে আমি প্যাট্রিক রেডফার্নকেই দেখেছি, আর্লেনা মার্শালকে নয়৷

‘আর্লেনার জনৈক বয়স্ক প্রেমাস্পদ, যিনি আর্লেনার প্রতি ক্লান্ত হয়ে পড়ার সময় পাননি, সম্প্রতি অঙ্কের অর্থ তাঁর জন্য রেখে গেছেন৷ এ ধরনের মহিলারা সাধারণত অর্থসংক্রান্ত ব্যাপারে কোন না কোন পুরুষের হাতে অনিবার্যভাবে প্রতারিত হয়ে থাকেন৷ মিস ব্রুস্টার একজন যুবকের কথা আমাদের বলেছেন, যে আর্লেনার জন্য ‘নষ্ট’ হয়ে গিয়েছিলো, সে আলেনাকে হীরে জহরতে সাজানের ইচ্ছে প্রকাশ করে থাকলেও (যে ইচ্ছে প্রকাশে কোন খরচ নেই) প্রকৃতপক্ষে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া একটা চেকের প্রাপ্তিসংবাদ জানিয়েছে, যার সাহায্যে সে আদালত এড়াতে পারবে বলে আশা করে৷ কোন অপব্যয়ী তরুণীর হাতে আর্লেনার শোষিত হওয়ার এক স্পষ্ট উদাহরণ৷ সুতরাং তাঁর কাছ থেকে ‘‘ব্যবসায়িক লগ্নীর’’ নাম করে মাঝে মধ্যে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে নেওয়াটা যে রেডফার্নের কাছে সম্ভবত বিরাট সুযোগের লম্বা চওড়া গল্প ফেঁদে আর্লেনাকে মুগ্ধ করে ফেলেছিলেন—বলেছিলেন কিভাবে তিনি ওঁর এবং নিজের জন্য বিশাল সম্পত্তি গড়ে তুলবেন৷ অরক্ষিত, নিঃসঙ্গ স্ত্রীলোকেরাই এ ধরনের লোকের সহজ শিকার হয়—এবং সাধারণত সে নিশ্চিন্তে লুঠের মাল নিয়ে চম্পট দেয়৷ কিন্তু যদি একজন স্বামী, ভাই অথবা বাবা দৃ্শ্যপটে উপস্থিত থাকেন, তাহলে প্রতারকের পক্ষে ব্যাপার একটু খারাপের দিকে মোড় নিলেও নিতে পারে৷ ক্যাপ্টেন মার্শাল যদি একবার জানতে পারতেন তাঁর স্ত্রীর বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে কি কাণ্ডটা হচ্ছে, তাহলে প্যাট্রিক রেডফার্নের ভাগ্যে অর্ধচন্দ্র প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিলো অত্যন্ত প্রবল৷

অবশ্য, সেজন্য রেডফার্ন বিন্দুমাত্রও চিন্তিত হননি, কারণ অত্যন্ত ঠান্ডা মেজাজে তিনি স্থির করেছিলেন৷ প্রয়োজন বুঝলেই আর্লেনাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবেন—অতীতের একটা খুনের সাফল্য তাঁকে আরও বেশি সাহসী করে তুলেছিলো—যে মেয়েটিকে তিনি খুন করেছিলেন তাকে তিনি করিগান নাম নিয়ে বিয়ে করেন এবং বিশাল অঙ্কের এক জীবনবীমা করাতে মেয়েটিকে রাজি করান৷

‘তাঁর পরিকল্পনা তাঁকে সর্বরকমে সাহায্য করেছে একটি স্ত্রীলোক, যিনি এখানে রেডফার্নের স্ত্রীর পরিচয়ে বাস করছেন এবং যাঁর সঙ্গে রেডফার্নের সত্যিকারের সম্পর্ক রয়েছে৷ যেসব মহিলারা রেডফার্নের শিকার, তাদের সঙ্গে এই অল্পবয়সী মহিলার স্বাভাবিকভাবেই কোন মিল নেই—শীতল, শান্ত, আবেগহীন, কিন্তু রেডফার্নের প্রতি আনুগাত্যে অবিচল, আর তাঁর অবিশ্বাস্য অভিনয়দক্ষতাকে কোনরকমেই অবহেলা করা যায় না৷ এই দ্বীপে উপস্থিত হওয়া থেকে ক্রিস্টিন রেডফার্ন একটা বিশেষ ভূমিকায় অভিনয় করে চলেছেন, ‘হতভাগিনী বেচারা’ স্ত্রীর ভূমিকায়—দুর্বল, অসহায় এবং স্বাস্থ্যবর্তী না হলেও বুদ্ধিমতী৷ উনি কিভাবে একের পর এক নিজের বৈশিষ্ট্যগুলো আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছেন একবার ভেবে দেখুন৷ সূর্যস্নানে তাঁর শরীরে ফোস্কা পড়ে, যে কারণে তাঁর গায়ের রঙ সাদা ফ্যাকাশে, উঁচু জায়গায় উঠলে তাঁর মাথা ঘোরে—যেমন মিলান, গীর্জায় উঠে মাঝপথে আটকে পড়ার গল্পটা৷ অর্থাৎ সব মিলিয়ে নিজের দুর্বল অসহায় ভাবটাকে ফুটিয়ে তোলা—প্রায় প্রত্যেকেই তাঁর সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘ছোটখাটো মহিলা’৷ অথচ উনি আর্লেনা মার্শালের সমান লম্বা, যদিও তাঁর হাত-পায়ের গড়ন অপেক্ষাকৃত খাটো৷ ক্রিস্টিন বলেছেন, তিনি স্কুলের দিদিমণি ছিলেন, এবং এর দ্বারা উনি জোর দিয়েছিলেন নিজের বই-পড়ে শেখাবিদ্যে ও শারীরিক অপটুতার ওপর৷ আসলে একথা সত্যি যে ক্রিস্টিন স্কুলে চাকরি করতেন, কিন্তু সেখানে তাঁর চাকরি ছিলো খেলার দিদিমণি হিসেবে, এবং উনি অত্যন্ত চটপটে তৎপর মহিলা যিনি বেড়ালের মতো বেয়ে উঠতে পারেন, দৌড়তে পারেন কোন দৌড়বাজের মতো৷

‘এই খুনের পরিকল্পনা ও সময়ের ছক ছিলো নিখুঁত৷ এ খুন ছিলো, আমি আগেও যেমন বলেছি অত্যন্ত পরিপাটি৷ এর সময়ের ছক সত্যিই কোন প্রতিভাধরে চিন্তার ফসল৷

‘প্রথমত, মুখবন্ধ হিসেবে কতকগুলো দৃশ্যের অবতারণা করা হয়...একটি দৃশ্য অভিনীত হয় পাথুরে কুঠুরীতে, যখন তাঁরা জানতেন পাশের কুঠুরীতে আমি বসে আছি—ঈর্ষান্বিত স্ত্রী ও স্বামীর মধ্যে নিছক গতানুগতিক কথোপকথন পরে ক্রিস্টিন আমার সঙ্গেও ওই একই অভিনয় করেন৷ সেই সময়ে আমার কেমন ঝাপসাভাবে মনে হয়েছিলো এ সব আমি কোন বইয়ে পড়েছি৷ ব্যাপারটা বাস্তব বলে আমার মনে হয়নি৷ কারণ অবশ্যই, সেটা মোটেও বাস্তব ছিলো না—ছিলো অভিনয়৷ তারপর এলো খুনের দিন৷ দিনটা ছিলো চমৎকার যা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিলো৷ রেডফার্নের প্রথম কাজ হলো খুব ভোরে সকলের নজর এড়িয়ে বেরিয়ে পড়া—বারান্দার দরজা দিয়ে যে দরজা তিনি ভেতর থেকে চাবি দিয়ে খুলেছিলেন (যদি কেউ খোলা দরজাটা ঘটনাচক্রে আবিষ্কার করে ফেলেন, তাহলে তিনি ভাবেন কেউ ভোরে স্নান করতে বেরিয়েছেন)৷ তাঁর স্নান-পোশাকের আড়ালে তিনি লুকিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন একটা সবুজ চীনে টুপি, ঠিক যেরকম টুপি আর্লেনা প্রায়ই পরতেন৷ দ্বীপ পেরিয়ে, মই বেয়ে নেমে নির্ধারিত জায়গা মতো কয়েকটা পাথরের আড়ালে রেডফার্ন টুপিটা লুকিয়ে রেখে আসেন৷ প্রথম পর্ব৷

‘আগের দিন সন্ধ্যায় তিনি আর্লেনার সঙ্গে দেখা করে গোপন সাক্ষাৎকারের এক ব্যবস্থা করেন৷ আর্লেনা স্বামীকে একটু ভয় করতেন, তাই তাঁরা দেখাসাক্ষাতের ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধান হতেন৷ পরদিন সকালে তিনি পিক্সি কোভে দেখা করতে রাজি হলেন৷ সকালে সেখানে কেউ যায় না৷ রেডফার্ন সুযোগ বুঝে সকলের চোখ এড়িয়ে তাঁর সঙ্গে সেখানে গিয়ে দেখা করবেন৷ যদি তিনি কারো মই বেয়ে নামার শব্দ শোনেন, বা কোন নৌকোকে পাড়ে আসতে দেখেন তাহলে যেন পিক্সির গুহায় লুকিয়ে পড়েন এবং পথ পরিষ্কার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন৷ তাঁকে পিক্সির গুহার কথা রেডফার্নই বলেছিলেন৷ সমাপ্ত হলো দ্বিতীয় পর্ব৷

‘ইতিমধ্যে ক্রিস্টিন লিন্ডার ঘরে গেছেন, এমন—সময়ে, যখন উনি জানতেন লিন্ডা রোজকার মতো ভোরে স্নান করতে বেরিয়ে থাকবে৷ তখন উনি লিন্ডার ঘড়ির সময়ে বদলে দেবেন, ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে দেবেন কুড়ি মিনিট, অবশ্য এ ভয় ছিলো যে ঘড়ি ভুল সময়টা হয়তো লিন্ডার নজরে পড়ে যাবে, কিন্তু তাতে বিশেষ কোন ক্ষতি হতো না৷ ক্রিস্টিনের আসল অ্যালিবাই ছিলো তাঁর ছোট ছোট হাতের গড়ন, যার ফলে, দৈহিক শক্তির দিক থেকে খুনটা করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে৷ তা সত্ত্বেও অতিরিক্ত একটা অ্যালিবাই থাকা ভালো৷ লিন্ডার ঘরে গিয়ে তাঁর নজরে পড়ে যাদুবিদ্যা ও ডাকিনীবিদ্যার বইটা একটা বিশেষ পৃষ্ঠায় খোলা রয়েছে৷ উনি সেই পাতাটা পড়েন, এবং যখন লিন্ডা ঘরে আসে ও হাত থেকে মোমবাতির প্যাকেটটা মেঝেতে ফেলে দেয় তখন বুঝতে পারেন লিন্ডার মনে কি রয়েছে৷ এর ফলে ক্রিস্টিনের মনে কয়েকটা নতুন মতলবের উদয় হয়৷ আমাদের অপরাধী যুগলের প্রথম মতলব ছিলো কেনেথ মার্শালের ওপর যথেষ্ট সন্দেহ আরোপ করা৷ সেই কারণেই দৃশ্যপটে আবির্ভাব ইঙ্গিতবহ পাইপের—যার কিছু ভাঙা টুকরো পাওয়া গেছে পিক্সি কোভে মইয়ের নিচে৷

লিন্ডা ফিরে এলে ক্রিস্টিন খুব সহজেই ওকে গাল কোভে যাবার পরিকল্পনায় রাজি করিয়ে ফেলেন৷ তারপর তিনি নিজের ঘরে ফিরে আসেন, তালাবন্ধ স্যুটকেস থেকে বের করেন এক শিশি নকল সূর্যস্নানের প্রলেপ, সেটা বিশেষ যত্নে শরীরে মেখে শিশিটা ছুড়ে ফেলে দেন জানলা দিয়ে, যেটা স্নানরত এমিলি ব্রুস্টারকে অল্পের জন্য আঘাত করেনি৷ অতএব তৃতীয় পর্ব সুষ্ঠুভাবে শেষ হলো৷

‘ক্রিস্টিন তারপর পরে নিলেন সাঁতারু-পোশাক, তার ওপরে ঢোলা হাতা জামা ও পাজামা, সুতরাং তাঁর নতুন রঙ করা বাদামী হাত-পা ঢাকা পড়লো পোশাকের নিচে৷

‘সওয়া দশটায় আর্লেনা বেরিয়ে পড়লেন তাঁর গোপন সাক্ষাৎকার সারতে, তাঁর মিনিট কয়েক পরেই প্যাট্রিক রেডফার্ন এসে উপস্থিত হলেন সমুদ্রসৈকতে, আমাদের দেখালেন বিস্ময়, বিরক্তি ইত্যাদি৷ ক্রিস্টিনের কাজ ছিলো খুবই সহজ৷ নিজের হাতঘড়ি লুকিয়ে রেখে এগারোটা পঁচিশে লিন্ডাকে জিগ্যেস করলেন ক’টা বাজে৷ লিন্ডা ঘড়ি দেখে জবাব দিলো, পৌনে বারোটা৷ তারপর ও সমুদ্রে নামে স্নান করতে, আর ক্রিস্টিন ছবি আঁকার সরঞ্জাম গোছগাছ করতে শুরু করেন৷ লিন্ডা তাঁর দিকে পেছন ফিরতেই ক্রিস্টিন লিন্ডার হাত ঘড়িটা তুলে নেন, কারণ স্বাভাবিকভাবেই স্নান করতে নামার আগে লিন্ডা ঘড়িটা খুলে রেখে গেছে, এবং কাঁটা ঘুরিয়ে ঘড়ির সময় আবার ঠিক করে দেন৷ তারপর পাহাড়ি পথ ধরে তিনি রওনা হয়ে পড়েন, সরুর জমিটুকু এক ছুটে পার হয়ে পৌঁছে যান মইটার কাছে, ঢোলা জামা-পাজামা ছেড়ে, সেগুলো এবং ছবি আঁকার সরঞ্জাম একটা পাথরের আড়ালে লুকিয়ে অভ্যাসলব্ধ দক্ষতায় তরতর করে মই বেয়ে নেমে যান ক্রিস্টিন৷

‘আর্লেনা তখন সৈকতে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন প্যাট্রিকের এত দেরি হচ্ছে কেন? হঠাৎ মইয়ের কাছে কাউকে উনি দেখতে পান বা তার শব্দ শুনতে পান৷ খুব সন্তর্পণে লক্ষ্য করেন তিনি৷ এবং অসীম বিরক্তির সঙ্গে আবিষ্কার করেন সেই অবাঞ্ছিত মেয়েটিকে—স্ত্রীরত্নটিকে! সুতরাং তাড়াতাড়ি সৈকত পার হয়ে তিনি ঢুকে পড়েন পিক্সির গুহায়৷

‘লুকোনো জায়গা থেকে টুপিটা বের করে নেন ক্রিস্টিন; টুপিটার পেছনে কানায় লাল রঙের পরচুলায় গুচ্ছ আলপিন দিয়ে আঁটা ছিলো৷ তারপর টুপি ও পরচুলায় ঘাড় ও মুখ ঢেকে হাত-পা ছড়িয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েন তিনি৷ সময়ের হিসেবে একেবারে নিখুঁত৷ কারণ মিনিট দুয়েক পরেই প্যাট্রিক ও এমিলি ব্রুস্টার নৌকো নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিতি হন৷ মনে রাখবেন, যে ব্যক্তি নিচু হয়ে মৃতদেহ পরীক্ষা করেছেন তিনি প্যাট্রিক, প্যাট্রিকই অবাক হয়েছেন—আঘাত পেয়েছেন ভেঙে পড়েছেন তাঁর প্রেমিকার মৃত্যুতে৷ তিনি সাক্ষী বেছে নিয়েছিলেন অনেক ভাবনাচিন্তা করে৷ মিস ব্লুস্টারের মাথাঘোরা রোগ আছে, তিনি কখনোও মইটা বেয়ে ওঠার চেষ্টা করবেন না৷ তিনি গেলে নৌকো নিয়েই যাবেন, এবং প্যাট্রিক থাকবেন মৃতদেহের কাছে—‘‘কারণ খুনী হয়তো আশেপাশে কোথাও লুকিয়ে আছে৷’’ নৌকো নিয়ে মিস ব্রুস্টার চলে গেলেন পুলিশ খবর দিতে৷ তিনি চলে যেতেই চটপট উঠে পড়লেন ক্রিস্টিন, প্যাট্রিকের লুকিয়ে আনা কাঁচিটা দিয়ে টুপিটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেললেন, টুকরোগুলো লুকিয়ে ফেললেন সাঁতার পোশাকের ভেতর এবং প্রথমবারের অর্ধেক সময়ে মই বেয়ে উঠে ঢোলা জামা-পাজামা পরে নিয়ে ছুটে চললেন হোটেলের দিকে৷ তখন কোনরকমে স্নান সেরে নকল সূর্যস্নানের প্রলেপ ধুয়ে, টেনিস খেলার পোশাক পরে বেরোবার মতো সময়টুকু হাতে রয়েছে৷ আরও একটা কাজ উনি করেছেন৷ পিচবোর্ডের টুপির সবুজ টুকরোগুলো এবং লাল পরচুলার গুচ্ছ উনি পুড়িয়ে ফেলেন লিন্ডার ঘরে তাপচুল্লীতে—সঙ্গে যোগ করেন একটা ক্যালেন্ডারের পাতা, যাতে পোড়া পিচবোর্ডের সঙ্গে ক্যালেন্ডারে একটা যোগসূত্র গড়ে ওঠে৷ অর্থাৎ যা পোড়ানো হয়েছে সেটা একটা ক্যালেন্ডার, টুপি নয়৷ তাঁর সন্দেহ অনুয়াযী লিন্ডা যাদুবিদ্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিলো—মোমের পিণ্ড ও আলপিন তারই সাক্ষী৷

‘তাঁরপর তিনি উপস্থিত হলেন টেনিস কোটে, সবার শেষে, কিন্তু তাড়াহুড়ো অথবা অগোছালো ভাব—দুটোই তাঁর মধ্যে অনুপস্থিত৷

‘আর, ইতিমধ্যে, প্যাট্রিক ঢুকে পড়েছেন পিক্সির গুহায়৷ আর্লেনা কিছুই দেখেননি এবং শুনতেও পেয়েছেন খুব সামান্যই—একটা নৌকো—কিছু কথাবার্তা—উনি বুদ্ধি করে লুকিয়েই ছিলেন৷ কিন্তু এখন তাঁকে ডাকছেন প্যাট্রিক৷

‘আর ভয় নেই, সোনা’ এবং আর্লেনা বেরিয়ে এলেন বাইরে৷ তারপর প্যাট্রিকের হাত চেপে বসলো তাঁর গলায়—আর সেই হলো বেচারো নির্বোধ সুন্দরী আর্লেনা মার্শালের জীবনকাহিনির পরিসমাপ্তি...’

পোয়ারো কণ্ঠস্বর নিচু করে মিলিয়ে গেলো৷

এক মুহূর্তের নীরবতা তারপর রোজমণ্ড ডার্নলি সামান্য শিউরে উঠে বললো, ‘আপনি সব কিছু ছবির মতো দেখিয়ে দিচ্ছেন৷ কিন্তু এ তো অন্য তরফের কাহিনী৷ আপনি এখনও আমাদের বলেননি কি করে আপনি আসল সত্যিটা জানতে পারলেন?’

এরকুল পোয়ারো বললেন, ‘আপনাদের আগেও একবার বলেছি, আমার মন অতি সরল৷ সব সময়, সেই প্রথম থেকেই, আমার মনে হয়েছে যে সবচেয়ে সম্ভাব্য ব্যক্তিই আর্লেনা মার্শালকে খুন করেছেনে৷ এবং সেই সম্ভাব্য ব্যক্তি নিঃসন্দেহে প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ তাঁর চরিত্র এমন কোন মানুষের, যে আর্লেনার মতো মেয়েদের কাজে লাগায়। তাঁর চরিত্র এমন কোন মানুষের যে আর্লেনার মতো মেয়েদের কাজে লাগায়—তাঁর চরিত্র কোন খুনীর চরিত্র—তিনি সেই ধরনের লোক যাঁরা কোন মহিলার সঞ্চয় শুষে নিয়ে তাঁর গলা কাটতে পারেন৷ সেদিন সকালে আর্লেনা কার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিলেন? তাঁর মুখ, তাঁর হাসি,তাঁর আচরণ, আমার সঙ্গে তাঁর কথোপকথন আমাকে জানিয়ে দিয়েছে সেই ব্যাক্তির নাম—প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ সুতরাং স্বাভাবিক ঘটনাপরম্পরা অনুয়াযী, আর্লেনাকে যিনি খুন করেছেন, তিনি প্যাট্রিক৷

‘কিন্তু সেই মুহূর্তে, আপনারা জানেন, আমি মুখোমুখি হয়েছি এক অসম্ভব পরিস্থিতির৷ প্যাট্রিক রেডফার্নের পক্ষে আর্লেনাকে খুন করা সম্ভব ছিলো না, কারণ মৃতদেহ আবিষ্কার করা পর্যন্ত তিনি প্রথম সৈকতে ও পরে মিস ব্রুস্টারের সঙ্গে ছিলেন৷ সুতরাং অন্যান্য সম্ভাবনার দিকে আমাকে নজর ফেরাতে হলো—এবং তাদের সংখ্যাও ছিলো একাধিক৷ আর্লেনাকে তাঁর স্বামী খুন করে থাকতে পারেন—মিস ডার্নলির নীরব সমর্থন পেয়ে৷ (তাঁরা দুজনেও একটা বিষয়ে মিথ্যে কথা বলেছেন, যা অত্যন্ত সন্দেহজনক৷) আকস্মিকভাবে মাদকদ্রব্য চোরাচালানের খবর জানতে পারার ফলেও আর্লেনা মার্শালের মৃত্যু ঘটে থাকতে পারে৷ কোন ধর্মেন্মাদ ব্যক্তিও তাঁকে খুন করে থাকতে পারেন, এবং তাঁর সৎমেয়ের পক্ষেও তাঁকে খুন করা অসম্ভব ছিলো না৷ এর মধ্যে শেষেরটাই প্রকৃত সমাধান বলে আমার একবার মনে হয়েছিলো পুলিশের সঙ্গে লিন্ডার প্রথম সাক্ষাৎকার যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিলো৷ পরে ওর সঙ্গে এক আলোচনায় একটা বিষয়ে আমার বিশ্বাস স্থির হয়৷ লিন্ডা নিজেকে অপরাধী মনে করে৷’

‘আপনি বলতে চান ও ভেবেছিলো ও সত্যি সত্যিই আর্লেনাকে খুন করেছে?’

রোজমণ্ডের স্বরে অবিশ্বাসের সুর৷

এরকুল পোয়ারো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন৷

হ্যাঁ৷—মনে রাখবেন—ও নেহাতই শিশু৷ ডাকিনীবিদ্যার বইটা পড়ে ও সেটা প্রায় বিশ্বাস করে বসে৷ ও আর্লেনাকে ঘৃণা করতো৷ সুতরাং উদ্দেশ্য নিয়ে ও্ তৈরি করলো মোমের পুতুল, পড়লো, মন্ত্র পুতুলের হৃদপিণ্ড বিদ্ধ করলো আলপিন দিয়ে, পুতুলটা গলিয়ে ফেললো—এবং ঠিক সেইদিন মারা গেলেন আর্লেনা৷ লিন্ডার চেয়ে বয়ষ্ক ও প্রাজ্ঞ মানুষেরাও অন্ধভাবে যাদুবিদ্যায় বিশ্বাস করেছেন৷ স্বাভাবিকভাবেই লিন্ডাও বিশ্বাস করে এ সব সত্যি—যে যাদুবিদ্যার ক্ষমতা ওর সৎমাকে ও খুন করেছে৷’

রোজমণ্ড ডুকরে উঠলো৷

‘ওঃ, বেচারা লিন্ডা৷ আর আমি ভেবেছি—আমি ভেবেছি—সম্পূর্ণ অন্য কথা—যে ও এমন কিছু জানতো যাতে—’

রোজামণ্ড থামলো৷ পোয়ারো বললেন, ‘আপনি কি ভেবেছিলেন আমি জানি৷ প্রকৃতপক্ষে আপনার ব্যবহার লিন্ডাকে আরও বেশি ভয় পাইয়ে দিয়েছিলো৷ ও বিশ্বাস করেছিলো, আর্লেনার মৃত্যুর জন্য সত্যিই ও নিজে দায়ী এবং সেকথা আপনি জানেন৷ ক্রিস্টিনও ওর কানে মন্ত্র জোগান, ওর মনে গেঁথে দেন ঘুমের বড়ির কথা, দেখিয়ে দেন ও অপরাধের দ্রুত যন্ত্রণাহীন প্রায়শ্চিত্তের পথ৷ বুঝতেই পারছেন, একবার যদি প্রমাণিত হয় ক্যাপ্টেন মার্শালের অ্যালিবাই রয়েছে, তাহলে নতুন কোন সন্দেহভাজন খুঁজে বের করাটা হয়ে পড়বে একান্ত জরুরী৷ ক্রিস্টিন অথবা তাঁর স্বামী মাদকদ্রব্য চোরাচালানের ব্যাপারটা জানতেন না৷ সুতরাং বলির পাঁঠা হিসেবে লিন্ডাকেই তাঁরা বেছে নিলেন৷’

রোজমণ্ড বললো, কি শয়তান৷’

পোয়ারো সম্মতি জানালেন নীরবে৷

‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন ঠান্ডা রক্তের এক নৃশংস মহিলা৷ আর আমি—আমি পড়লাম মহা মুশকিলে৷ লিন্ডা কি শুধুমাত্র যাদুবিদ্যা প্রয়োগের শিশুসুলভ অপরাধে অপরাধী, নাকি ওর ঘৃণা ওকে আরও গভীরে নিয়ে গেছে—লিপ্ত করেছে প্রকৃত অপরাধে? আমি চেষ্টা করেছি ওর কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করতে৷ কিন্তু সবই বিফলে গেছে৷ সেই মুহূর্তে আমি দুলতে লাগলাম দুরন্ত অনিশ্চয়তায়৷ পুলিশ-প্রধান রাজি ছিলেন মাদকদ্রব্যের ব্যাখ্যাটাকে গ্রহণ করতে৷ আমিও সেখানেই ক্ষান্ত দিলেন পারতাম৷ সমস্ত তখ্য আমি আবার সন্তপর্ণে খতিয়ে দেখতে লাগলাম৷ আমার হাতে তখন বুঝতেই পারছেন, টুকরো-ছবির ধাঁধার অনেকগুলো টুকরো, বিচ্ছিন্ন কতকগুলো ঘটনা, নিছক তথ্য৷ সেগুলোর নিশ্চয়ই একটা সুষম সম্পূর্ণ নকশায় খাপ খেয়ে যাবে৷ প্রথমে রয়েছে বেলাভূমিতে পাওয়া একটা কাঁচি—জানলা দিয়ে ছুড়ে ফেলা একটা শিশি—একটা স্নানের খবর যা কেউই করেছেন বলে স্বীকার করেননি—অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নির্দোষ কতকগুলো ঘটনা, কিন্তু সেগুলোর প্রতি প্রত্যেকের অস্বীকার ঘটনাগুলোকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে৷ সুতরাং সেগুলোর তাৎপর্য নিশ্চয়ই একটা রয়েছে ক্যাপ্টেন মার্শাল, লিন্ডা অথবা চোরাচালানকারীদের দায়ী করলে ওই ঘটনাগুলোর কোন সুষ্ঠু ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু তবুও সেগুলোর নিশ্চিত কোন অর্থ রয়েছে৷ সুতরাং আমি ফিরে গেলাম আমার প্রথম সমাধানে—যে প্যাট্রিক রেডফার্নই খুনটা করেছেন৷ এর সমর্থনে কি কোন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে? হ্যাঁ, আর্লেনার তহবিল থেকে যে একটা বিশাল অঙ্কের টাকা উধাও হয়েছে সে কথা আমরা জানি৷ কে নিলো সেই টাকা? অবশ্যই প্যাট্রিক রেডফার্ন৷ আর্লেনা ছিলেন সেই রকম মেয়ে যাঁদের সুন্দর চেহারার যুবকেরা সহজেই ঠকিয়ে নিতে পারে—কিন্তু ব্ল্যাকমেল হবার মতো মেয়ে কখনই উনি ছিলেন না৷ প্রয়োজনের চেয়েও বেশি খোলা ছিলো তাঁর মন, গোপন কথা উনি গোপন রাখতে পারতেন না৷ তাই ওই ব্ল্যাকমেলারের গল্প একবারও আমার মনে সত্যি বলে নাড়া দেয়নি৷ কিন্তু তবুও হঠাৎ শুনে ফেলা সেই কথাবার্তার সাক্ষ্যটুকু আমাদের সামনে থেকে যাচ্ছে—হুঁ, কিন্তু সেই কথাবার্তা শুনেছেন কে? না প্যাট্রিক রেডফার্নের স্ত্রী৷ এটা সম্পূর্ণ তাঁর গল্প—দ্বিতীয় কারো সাক্ষ্যর সমর্থন সেখানে নেই৷ তাহলে এ গল্প বানানো হলো কেন৷ বিদ্যুৎচমকের মতো এর উত্তর ঝলসে উঠলো আমার মনে৷ আর্লেনার উধাও হয়ে যাওয়া টাকার একটা যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা যোগাতে৷

‘প্যাট্রিক ও ক্রিস্টিন রেডফার্ন৷ ওঁরা দুজনেই এ ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত৷ আর্লেনাকে গলা টিপে খুন করার মতো দৈহিক শক্তি অথবা মানসিক প্রস্তুতি, কোনটাই ক্রিস্টিনের ছিলো না৷ না, হত্যাপর্বের নায়ক প্যাট্রিক নিজে—কিন্তু সে তো অসম্ভব! কারণ আর্লেনার দেহ আবিষ্কার করার আগে পর্যন্ত প্রতিটি মিনিটের অ্যালিবাই তাঁর রয়েছে৷

‘দেহ—এই দেহ শব্দটা আমার মনে নাড়া দিলো—সৈকতে শুয়ে থাকা দেহ—সব একরকম৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন ও এমিলি ব্রুস্টার পিক্সি কোভে গেছেন এবং একটা দেহ বেলাভূমিতে শুয়ে থাকতে দেখেছেন৷ একটা দেহ—যদি ধরে নেওয়া যায় সে দেহ আর্লেনার নয়, অন্য কারো? কারণ তাঁর মুখ ঢাকা ছিলো বিশাল চীনে টুপিতে৷

‘কিন্তু একটা মাত্র মৃতদেহই আমরা পেয়েছি—আর্লেনার৷ তাহলে সেই দেহ কি কোন জীবন্ত দেহ—এমন কেউ, যিনি মৃতের ভান করে শুয়ে রয়েছেন৷ আর্লেনা নিজে নন তো? প্যাট্রিকের প্ররোচনায় উনি হয়তো এরকম লোকঠকানো মজা করতে রাজি হয়েছেন৷ আমি মাথা নাড়লাম—উঁহু, তাতে ঝুঁকি অনেক৷ একটা জীবন্ত দেহ—কার? এমন কোন মেয়ে কি এখানে আছেন, যিনি রেডফার্নকে সাহায্য করতে পারেন? অবশ্যই আছেন—তাঁর স্ত্রী৷ কিন্তু তাঁর গায়ের রঙ ফ্যাকাশে সাদা৷ মানলাম, কিন্তু সূর্যস্নানের নকল প্রলেপ সহজেই শিশি থেকে লাগানো যেতে পারে—শিশি—একটা শিশি—খুঁজে পেলাম আমার টুকরো-ছবির ধাঁধার একটা টুকরো৷ হ্যাঁ, তারপর, অবশ্যই প্রয়োজন একটা স্নানের—টেনিস খেলতে যাবার আগে সর্বনাশা প্রলেপের দাগ ধুয়ে ফেলতে হবে তো৷ আর কাঁচিটা? কেন, কাঁচিটা নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো পিচবোর্ডের টুপিটাকে টুকরো টুকরো করে কাটবার জন্যে—ওরকম অসুবিধে জনক বিশাল বস্তুটাকে লোকচক্ষুর আড়ালে না সরালেই নয়, এর তাড়াহুড়োর কাঁচিটা থেকে যায় অকুস্থলে—এই একটামাত্র জিনিস যেটা আমাদের খুনী দম্পত্তি ভুল করে রেখে আসেন৷

‘কিন্তু এতক্ষণ আর্লেনা ছিলেন কোথায়? সে উত্তরও অত্যন্ত স্পষ্ট৷ হয় রোজমণ্ড ডার্নলি নয় আর্লেনা মার্শাল পিক্সির গুহায় গিয়েছিলেন, তাঁরা যে সুগন্ধী ব্যবহার করতেন তার গন্ধই আমাকে জানিয়ে দিয়েছে৷ কিন্তু রোজামণ্ড ডার্নলি ওখানে যাননি৷ সুতরাং আর্লেনাই গিয়েছিলেন পিক্সির গুহায়, লুকিয়ে ছিলেন যতক্ষণ পর্যন্ত না পথ পরিষ্কার হয়৷

‘যখন এমিলি ব্রুস্টার নৌকো নিয়ে চলে গেলেন, প্যাট্রিক তখন সৈকতে একা এবং খুন করার পুরোপুরি সুযোগ তাঁর ছিলো৷ আর্লেনা মার্শাল খুন হন পৌনে বারোটার কিছু পরে, কিন্তু ডাক্তারি সাক্ষ্য শুধু মাথা ঘামায় সবচেয়ে কত বেশি আগে খুনটা হয়ে থাকতে পারে, সেই সময়টা নিয়ে৷ পৌনে বারোটার সময় আর্লেনা যে মৃত ছিলেন সে কথা ডাক্তারকেই বলা হয়েছে, ডাক্তার মোটেও পুলিসকে বলেননি৷

আরও দুটো রহস্যের সমাধান তখনও বাকি৷ লিন্ডা মার্শালের সাক্ষ্য ক্রিস্টিন রেডফার্নকে একটা অ্যালিবা জুগিয়েছে৷ মানছি, কিন্তু সে সাক্ষ্য দাঁড়িয়ে আছে লিন্ডা মার্শালের হাতঘড়ির ওপরে৷ এখন শুধু যেটুকু দরকার, তা হলো, প্রমাণ করা যে ওই হাতঘড়ির সময় বদলের অন্তত দুটো সুযোগ ক্রিস্টিনি পেয়েছিলেন৷ খুব সহজেই সে প্রমাণ পেলেন৷ সেদিন সকালে তিনি লিন্ডার ঘরে একা ছিলেন—এছাড়াও একটা পরোক্ষ প্রমাণ আছে৷ লিন্ডাকে বগলতে শোনা গেল যে ‘‘ওর ভয় হচ্ছিলো ওর হয়তো দেরি হয়ে গেছে,’’ কিন্তু যখন ও নেমে আসে তখন বিশ্রামকক্ষের ঘড়িতে মাত্র দশটা পঁচিশ৷ দ্বিতীয় সুযোগটা ছিলো অনেক বেশি সহজ—যখন লিন্ডা পেছন ফিরে সমুদ্রে স্নান করতে নামে তখন ঘড়ির সময় আবার পিছিয়ে দেওয়াটা ক্রিস্টিনের পক্ষে কিছু অসম্ভব ছিলো না৷

‘এরপর আসছে মইয়ের প্রশ্ন৷ ক্রিস্টিন বরাবরই জোর গলায় বলেছেন যে উঁচু জায়গা তাঁর ধাতে সয় না৷ আরো একটা সযত্নে সাজানো মিথ্যে৷

‘আমার নকশা এবার সম্পূর্ণ—প্রতিটি টুকরো নিখুঁতভাবে খাপ খেয়ে গেছে নিজের নিজের জায়গায়৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমার হাতের নির্দিষ্ট কোন প্রমাণ নেই৷ সমস্তটাই রয়েছে আমার মনের ফলকে গাঁথা৷

‘তখন একটা মতলব আমার মাথায় এলো৷ এই খুনের মধ্যে নিহিত রয়েছে একটা আত্মবিশ্বাসের ভাব—একটা পরিপাটি ছিমছাম পরিকল্পনা৷ প্যাট্রিক রেডফার্ন যে ভবিষ্যতেও তাঁর দুষ্কর্মের পুনরাবৃত্তি করবেন সে বিষয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ ছিলো না৷ তাহলে তাঁর অতীত কি বলে? এটা সম্ভব হলেও হতে পারে যে এ তাঁর প্রথম খুন নয়৷ এবং এই খুনের পদ্ধতি, শ্বাসরোধ করে হত্যা, প্যাট্রিকের প্রকৃতির সঙ্গে একই সুরে বাঁধা—শুধু ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়, নিছক আনন্দের জন্যও তিনি খুন করেন৷ যদি এটা তাঁর খুন না হয়, তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস অতীতেও তিনি একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন৷ আমি ইন্সপেক্টর কলগেটের কাছে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়েছে এমন মেয়েদের একটা তালিকা চাইলাম৷ এর ফলাফল আমাকে ভীষণ খুশি করলো৷ নির্জন ঝোপের পাশে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় পাওয়া নীতি পার্সন্সের খুন প্যাট্রিক রেডফার্নের কাজ হতেও পারে, নাও হতে পারে, হয়তো এ ঘটনা শুধুমাত্র স্থান নির্বাচনে তাঁকে সাহায্য করেছে, কিন্তু অ্যালিস করিগানের মৃত্যুতে আমি ঠিক যা খুঁজেছিলাম তাই পেয়ে গেলাম৷ সার কথায় বলতে গেলে হুবহু একই পদ্ধতি৷ সেই সময় নিয়ে কারচুপি, একটা খুন বা অনুমতি সময়ের আগে সংঘটিত হয়নি, সাধারণত যা হয়ে থাকে-বরং ঘটেছে এরই সময়ের পরে৷ সওয়া চারটের সময় ‘আবিষ্কৃত’ হয় ‘মৃতদেহ’৷ আর, একজন স্বামী, যার অ্যালিবাই রয়েছে চারটে পঁচিশ পর্যন্ত৷

‘তাহলে সত্যি সত্যি কি ঘটেছিলো? বলা হয়েছে যে এডওয়ার্ড করিগান পাইন রিজে গিয়ে উপস্থিত হয়, তার স্ত্রীকে সেখানে পায় না, এবং তখন বাইরে এসে পায়চারি করতে থাকে৷ অবশ্য কার্যত সে প্রাণপণে ছুটে যায় তাদের দেখা করার জায়গায় সীজার্স গ্রোভে৷ (আশা করি আপনাদের মনে আছে যে জায়গাটা ছিলো খুন কাছেই) স্ত্রীকে খুন করে এবং কাফেতে ফিরে আসে৷ পথচারী যে মেয়েটি খুনের খবর দেয়, সে ছিলো একজন সম্ভ্রান্ত যুবতী, সুপরিচিত একটি বালিকা বিদ্যালয়ের খেলার দিদিমণি৷ আপাতদৃষ্টিতে এডওয়ার্ড করিগানের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিলো না৷ খুনের খবর জায়গা মতো জানাতে তাকে বেশ কিছুটা পথ হেঁটে যেতে হয়৷ পুলিশের ডাক্তার মৃতদেহ পরীক্ষা করেন সেই পৌনে ছ’টা নাগাদ৷ এবং এখনকার মতো তখনও খুনের সময়টা সকলেই বিনা দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন৷

‘একটা চূড়ান্ত পরীক্ষা আমি করলাম৷ আমাকে সঠিকভাবে জানতেই হবে মিসেস রেডফার্ন মিথ্যাবাদী কিনা৷ সুতরাং ডার্টমুরে বেড়াতে যাওয়ার নির্দোষ বন্দোবস্ত করলাম৷ উচ্চতা ধাতে সয় না এমন কেউ কখনও সুস্থভাবে বয়ে যাওয়া জলের ওপরে দিয়ে সরু সাঁকো পার হতে পারে না৷ মিস ব্রুস্টার, যিনি প্রকৃত রোগী, নিজেকে সুস্থ রাখতে পারেননি৷ কিন্তু ক্রিস্টিন রেডফার্ন নিশ্চিন্তভাবে নির্বিকারে ছুটে পার হয়ে যান সাঁকোটা৷ ঘটনাটা ছোট হলেও একটা নিশ্চিন্ত পরীক্ষা৷ যদি তিনি বিনা প্রয়োজনে একটা মিথ্যে বললে থাকতে পারেন—নাহলে অন্যান্য মিথ্যেগুলোও অসম্ভব নয়৷ ইতিমধ্যে কলগেট সারে পুলিশ দিয়ে ছবিটা সনাক্ত করিয়াছেন৷ তখন আমি যেভাবে জেতা সম্ভব সেভাবেই হাতে তাস খেলেছি৷ প্যাট্রিক রেডফার্নকে নিরাপত্তার নিশ্চিন্ত আশ্রয়ে ঠেলে দিয়ে আকস্মিকভাবে তাঁকে আক্রমণ করেছি, যাতে তিনি আত্মসংযম হারিয়ে ফেলেন তার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি৷ তাঁকে যে করিগান বলে সনাক্ত করা হয়েছে সেকথা শুনেই তাঁর মাথা খারাপ হয়ে যায়৷’

চিন্তারতভবে গলায় হাত বোলালেন এরকুল পোয়ারো৷

‘আমি যা করেছি,’ গুরুত্ব দিয়ে বললেন তিনি, ‘তা অত্যন্ত বিপজ্জনক ঝুঁকি নিয়ে করেছি—কিন্তু তার জন্য আমার দুঃখ নেই৷ আমি জিতেছি৷ বিনা কারণে আমি কষ্ট করিনি৷’

এক মুহূর্তের নীরবতা৷ তারপর মিসেস গার্ডেনার এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন৷

‘সত্যি, মঁসিয়ে পোয়ারো, তিনি বললেন, কি ভীষণ ভালো লাগলো শুনতে—কিভাবে আপনি ধাপে ধাপে সমাধানে পৌঁছলেন, আশ্চর্য৷ আপনার প্রত্যেকটি কথা মুগ্ধ করার মতো, যেন অপরাধ-বিজ্ঞানের ওপর কোন বক্তৃতা। আসলে সত্যিই তো এটা অপরাধ-বিজ্ঞানের ওপর কোন বক্তৃতা, তাই না? আর ভাবতে কিরকম লাগছে যে আমার বেগুনি উল আর ওই সূর্যস্নান-নিয়ে কথাবার্তা, দুটোরই একটা করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো৷ ওঃ, আনন্দে আমি কি বলবো ঠিক করতে পারছি না, আর আমার বিশ্বাস মিঃ গার্ডেনারের অবস্থাও একই রকম, তাই না, ওডেল?’

‘হ্যাঁ সোনা৷’ বললেন, মিঃ গার্ডেনার৷

এরকুল পোয়ারো বললেন, মিঃ গার্ডেনারও আমাকে সাহায্য করেছেন৷ আমি মিসেস মার্শাল সম্পর্কে একজন বিচক্ষণ ব্যক্তির অভিমত চেয়েছিলাম৷ আমি মিঃ গার্ডেনারকে প্রশ্ন করেছিলাম মিসেস মার্শালকে তাঁর কিরকম মহিলা বলে মনে হয়৷’

‘তাই নাকি?’ বললেন, মিসেস গার্ডেনার, ‘আর তুমি কি বলেছো, ওডেল?’

মিঃ গার্ডেনার কাশলেন৷

তিনি বললেন, ‘তুমি তো জানো, সোনা, ওঁকে, আমার কখনই সেরকম কিছু মনে হয়নি৷’

‘লোকে তাদের বউদের সব সময় এই কথাই বলে৷’ বললেন, মিসেস গার্ডেনার, ‘তাহলে আর যদি আমাকে জিগ্যেস করো তাদের বলবো, এমন কি এই মঁসিয়ে পোয়ারো পর্যন্ত মিসেস মার্শালকে একটু যাকে বলে প্রশ্রয় দিয়েছেন, বিশেষ করে ওঁকে ঘটনাচক্রের স্বাভাবিক শিকার ইত্যাদি বলে উল্লেখ করে৷ অবশ্য এ কথা সত্যি যেন শিক্ষা-দীক্ষার বালাই ভদ্রমহিলার মোটেও ছিলো না, আর ক্যাপ্টেন মার্শাল যখন এখানে নেই তখন বলতে বাধা নেই যে ওঁকে আমার সব সময়েই কেমন বোকা-সোকা বলে মনে হয়েছে৷ সে কথা আমি মিঃ গার্ডেনারকেও বলেছি, বলিনি, ওডেল?’

‘হ্যাঁ, সোনা’, বললেন মিঃ গার্ডেনার৷

গাল কোভে এরকুল পোয়ারোর সঙ্গে বসে ছিলো লিন্ডা মার্শাল৷

ও বললো, ‘ভাগ্যিস শেষ পর্যন্ত আমি মরে যাইনি৷ কিন্তু, মঁসিয়ে পোয়ারো, আমার অপরাধ তো সত্যি সত্যি ওকে খুন করারই সমান, তাই না? আমি তো সেটাই চেয়েছিলাম৷

এরকুল পোয়ারো উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘না, দুটো এক জিনিস নয়৷ খুন করার ইচ্ছে আর খুন করা দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস৷ যদি তোমার শোবার ঘরে সেই ছোট্ট মোমের পুতুলের বদলে তুমি তোমার সৎমাকে বন্দী অসহায় অবস্থায় পেতে, আর তোমার হাতে আলপিনের বদলে একটি ছুরি থাকতো, তাহলে তুমি সে ছুরি তাঁর বুকে বিঁধিয়ে দিতে পারতে না! তোমার ভেতর থেকে কেউ একজন বলে উঠতো ‘না’৷ আমার নিজের বেলায়ও সেই একই ব্যাপার৷ কোন নির্বোধের ওপর রাগ করে আমি বলি, ‘ব্যাটাকে লাথি মারতে পারলে ভালো হতো৷’ কিন্তু পরিবর্তে আমি লাথি মারি টেবিলের গায়ে৷ বলি, ‘এই টেবিলটা, এটা একটা বোকা গর্দভ, তাই এটাকে লাখি মারছি৷’ আর তারপর, যদি পায়ের আঙুলে খুব একটা ব্যথা না পেয়ে থাকি, তাহলে আমার মেজাজ অনেক ভালো হয়, আর সাধারণত টেবিলেরও কোন ক্ষতি হয় না কিন্তু সেই নির্বোধ গর্দভ যদি সত্যি সত্যিই আমার সামনে থাকতো তাহলে আমি তাকে লাথি মারতে পারতাম না৷ মোমের পুতুল বানানো, তাতে আলপিন ফোটানো, এসব বোকার মতো ছেলেমানুষী কাজ, ঠিক কথা—কিন্তু এর উপকারী দিকটাও একটা আছে৷ তোমার মনে সমস্ত ঘৃণা এখন চলে গেছে সেই ছোট্ট পুতুলের ভেতর৷ আর আলপিন ও আগুন দিয়ে তুমি ধ্বংস করেছো—সৎমাকে নয়—বরং তাঁর প্রতি তোমার মনের ঘৃণাকে৷ পরে, তাঁর মৃত্যুসংবাদ শোনার আগেই, তুমি নিজেকে শুদ্ধ মনে করেছো, করোনি—তোমার মনের ভাব অনেক হালকা হয়ে গেছে—তুমি হয়েছো অনেক সুখী?’

লিন্ডা মাথা নেড়ে সম্মত্তি জানালো৷

ও বললো, ‘আপনি কি করে জানলেন? সত্যিই আমার সেরকম মনে হয়েছিলো৷’

পোয়ারো বললেন, ‘সুতরাং ভবিষ্যতে এরকম বোকামি আর করো না৷ এর পরে সৎমাকে যাতে ভালোবাসতে পারো তার জন্য এখন থেকে মনকে তৈরি করে নাও৷’

লিন্ডা চমকে উঠে বললো, ‘আপনার কি মনে হয় আমার ভাগ্যে আবার একটা সৎমা জুটছে? ও, বুঝেছি, আপনি রোজামণ্ডের কথা বলছেন৷ ওকে আমার ভালো লাগে৷’ এক মিনিট ইতস্তত করলো ও, ‘ওর যথেষ্ট বুদ্ধি-বিবেচনা আছে৷’

পোয়ারো নিজে হয়তো ঠিক এই বিশেষণটা রোজমণ্ড ডার্নলির জন্য বেছে নিতেন না, কিন্তু তিনি উপলব্ধি করলেন লিন্ডার কাছে এই বিশেষণ চূড়ান্ত প্রশংসার৷

কেনেথ মার্শাল বললেন, রোজামণ্ড, তোমার মাথায় কি এই উদ্ভট চিন্তা ঢুকেছিলো যে আর্লেনাকে আমি খুন করেছি৷’

রোজামণ্ডের মুখ লাজুক হলো৷ ও বললো, ‘আমার মতো বোকা আর কেউ নেই৷’

‘সে আর বলতে৷’

‘মানলাম, কিন্তু কেন, তুমি নিজেকে ঝিনুকের মতো এমন গুটিয়ে রাখো যে আমি কখনও জানতেই পারলাম না আর্লেনার সম্পর্কে সত্যিসত্যি তোমার কি ধারণা৷ কখনও বুঝিনি, তুমি ওকে সব জেনেশুনে মেনে নিয়ে ওর সঙ্গে অস্বাভাবিক ভালো ব্যবহার করতে নাকি—নাকি, ওকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে৷ আর আমি ভেবেছি যদি শেষেরেটা হয়, আর তুমি যদি হঠাৎ জানতে পারো ও তোমাকে ঠকাচ্ছে, তাহলে তুমি হয়তো রাগে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়বে৷ তোমার নামে অনেক গল্প আমার কানে এসেছে৷ তুমি সব সময়ই ভীষণ শান্ত থাকো, কিন্তু সময়ে সময়ে তোমাকে দেখলে ভয় হয়৷’

‘আর তাই তুমি ভেবেছো আমি সোজা গিয়ে ওকে গলা টিপে খুন করেছি?’

‘হ্যাঁ, মানে—সত্যিই আমি তাই ভেবেছিলাম৷ আর তোমার অ্যালিবাইটাও কেমন যেন হালকা ঠেকছিলো৷ তখনই তো আমি ঠিক করলাম, তোমাকে সাহায্য করবো৷ তাই তোমাকে তোমার ঘরে টাইপ করতে দেখেছি বলে বোকার মতো একটা গল্প ফেঁদে বসলাম৷ আর পরে যখন শুনলাম তুমি বলেছো যে তুমি আমাকে দরজায় উঁকি মারতে দেখেছো—তখন, ইয়ে, মানে...আমি ধরেই নিলাম আমার সন্দেহ পুরোপুরি সত্যি৷ এছাড়া রয়েছে লিন্ডার অদ্ভুত ব্যবহার৷’

কেনেথ মার্শাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বুঝতে পারছো না, সেকথা আমি তোমার গল্পকে সমর্থন করবার জন্যেই বলেছিলাম৷ আমি—আমি ভেবেছিলাম, তুমি চাও যে তোমার গল্পটাও আমি সমর্থন করি৷’

রোজামন্ড অপলকে তাঁর দিকে চেয়ে রইলো৷

‘তার মানে তুমি ভেবেছো তোমার বউকে আমি খুন করেছি?’

কেনেথ মার্শাল অস্বস্তিভরে নড়েচড়ে বসলেন৷ অস্পষ্ট স্বরে তিনি বললেন, ‘কেন, রোজামণ্ড, তোমার মনে নেই, একটা কুকুরের জন্যে কিভাবে তুমি সেই ছেলেটাকে প্রায় খুন করে বসেছিলো? কিভাবে তুমি ওর গলা টিপে ধরেছিলে, কিছুতেই ছাড়তে চাইছিলো না৷’

‘কিন্তু সে তো বহু বছর আগের কথা৷’

‘হ্যাঁ, জানি—’

রোজামণ্ড তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললো, ‘আর্লেনাকে খুন করার পেছনে আমার কোন মহৎ উদ্দেশ্য থাকতে পারে?’

কেনেথ মার্শাল চোখ সরিয়ে নিলেন, অস্পষ্ট স্বরে কি যেন বললেন৷

রোজমণ্ডের স্বর পর্দায় উঠলো, ‘কেন, সত্যি বুদ্ধির ঢেঁকি? তুমি ভেবেছো তোমার সুখের জন্যে আমি ওকে খুন করেছি, হ্যাঁ? নাকি—নাকি ভেবেছো আমি তোমাকে চাই বলে আমার পথের কাঁটা সরিয়ে দিয়েছি?’

‘না, মোটেও তা ভাবিনি৷’ ঘৃণা ও ক্রোধের সুরে বললেন, কেনেথ মার্শাল, ‘কিন্তু সেদিন তুমি কি বলেছিলে, আশা করি তোমার মনে আছে—লিন্ডার সম্পর্কে, আমাদের সম্পর্কে—আর—আর তখন তোমাকে আমার অবস্থার জন্য যথেষ্ট চিন্তিত মনে হয়েছিলো৷’

রোজামণ্ড বললো, ‘সে নিয়ে সব সময়েই আমি চিন্তা করেছি৷’

‘আমি তো তোমাকে অবিশ্বাস করিনি৷ জানো, রোজামণ্ড আমি সাধারণত এটা ওটা নিয়ে বেশি কথা বলতে পারি না, ভালো করে কথা বলা আমার আসে না৷ কিন্তু একটা কথা আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই৷ আর্লেনাকে আমি নিজের করে কখনও ভাবিনি—শুধু প্রথম দিকে ওকে একটু ভালোবেসেছিলাম—এছাড়া ওকে নিয়ে দিনের পর দিন কাটানো—সে যে কি দুঃসহ কষ্ট৷ সত্যি কথা বলতে কি, এ যেন সুদীর্ঘ এক নরকবাস৷ কিন্তু ওর জন্যে আমার ভীষণ দুঃখ হতো৷ ও এত সরল আর বোকা ছিলো—পুরুষ দেখলে পাগল হয়ে যেতো—নিজেকে সামলে রাখতে পারতো না, আর পুরুষেরা সব সময়েই ওকে ঠকাতে এবং ওর সঙ্গে বাজে ব্যবহার করতো৷ আমার শুধু মনে হতো, আর যাই করি, ওকে চরম পরিণতির দিকে ঠেলে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়৷ আমি ওকে বিয়ে করেছি, সুতরাং যথাসম্ভব ভালোভাবে ওর দেখাশোনা করা আমার কর্তব্য: আমার ধারণা, ও সেটা জানাতো, আর সে জন্যে আমার কাছে সত্যিই কৃতজ্ঞ ছিলো৷ ওকে-ওকে দেখে আমার করুণার পাত্র বলে মনে হতো৷’

রোজামণ্ড শান্তস্বরে বললো, ‘জানি কেন৷ এখন আমি সব বুঝতে পারছি৷’

ওর দিকে না তাকিয়ে কেনেথ মার্শাল সযত্নে পাইপে তামাক ভরতে লাগলেন৷ অস্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘তুমি—তুমি চট করে সব কিছু বুঝতে পারো, রোজামণ্ড৷’

একটা হালকা হাসির ঢেউ তুললো রোজামণ্ডের শ্লেষভরা ঠোঁটের রেখায়৷ ও বললো, ‘তুমি কি এখনই আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে, কেন, নাকি ছ’মাস অপেক্ষা করবে বলে ঠিক করেছো?’

কেনেথ মার্শাল পাইপ খসে পড়লো ঠোঁট থেকে, নিচের পাথরে পড়ে চুরমার হয়ে গেলো৷

তিনি বললেন, ‘যাঃ, এখানে এসে এ নিয়ে আমার দু-দুটো পাইপ গেলো৷ সঙ্গে আর পাইপও নেই৷ কিন্তু তুমি কি করে জানলে যে অপেক্ষা করার পক্ষে ছ’মাসই মোটামুটি ঠিক সময় বলে আমি ভেবে রেখেছি?’

‘কারণ সত্যিই সেটা ঠিক সময়৷ কিন্তু দয়া করে এখনই আমাকে স্পষ্ট কথা দাও৷ নয়তো আগামী ছ’মাসের মধ্যে তুমি হয়তো আবার কোন নির্যাতিত অসহায় মেয়ের দেখা পাবে আর সঙ্গে সঙ্গে তাকে উদ্ধার করতে বীরের মতো ছুটে যাবে৷’

তিনি সশব্দে হাসলেন৷

‘এবারে সেই নির্যাতিত অসহায় মেয়ে তুমি, রোজামণ্ড৷ তবে তোমার ওই হতচ্ছাড়া পোশাক তৈরির ব্যবসা তোমাকে ছাড়তে হবে, তারপর আমরা চলে যাবো গ্রামে, সেখানেই থাকবো৷’

‘তুমি কি জানো না, ওই সব ব্যবসা থেকে আমার অনেক আয় হয়? বুঝতে পারছো না, ওটা আমার নিজস্ব—ব্যবসা, আমিই ওটা সৃষ্টি করেছি, নিজের হাতে গড়ে তুলেছি, আর তার জন্যে আমার যথেষ্ট গর্ব আছে৷ আর তোমার এত সাহস, হঠাৎ এসে হুট করে বসলে, ‘ওসব ছেড়ে দাও, সোনা৷’

হ্যাঁ, আমার এতই সাহস৷’

‘আর তোমার বিশ্বাস তোমার জন্যে একথায় আমি রাজী হয়ে যাবো?’

‘যদি রাজী না হও’, বললেন, কেনেথ মার্শাল, ‘তাহলে তুমি আমার কোন উপকারেই আসবে না৷’

রোজামণ্ড অস্ফুট স্বরে বললো, ‘ওঃ কেন সোনা, তোমাকে নিয়ে আমি সারাটা জীবন আমি শুধু গ্রামে কাটাতে চেয়েছি৷ এখন আমার সে স্বপ্ন সত্যি হবে...৷’

অধ্যায় ২১ / ২১
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%